কপিলাবস্তুর কলস – ৩৫
৷৷ পঁয়ত্রিশ ৷৷
ইস্ট রিভারের আণ্ডারগ্রাউণ্ড কুইনস মিডটাউন টানেল হল ম্যানহাটন আর কুইনসের মধ্যে সংযোগ। টোল গেটের E-ZPass এর লাইনে স্পিড কমিয়ে সুনয়ন রিধিমার উদ্দেশ্যে বলল ‘দিজ ওর্জুন অ্যাটর্নি ইজ আ হুইজ অ্যাট ইনভেস্টিগেশন।’ রিধিমার দিক থেকে কোনও উত্তর এল না। সুনয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রিধিমা মহাদেবীর লাইসেন্সটা নিয়ে একমনে দেখছে।
‘চিন্তা নেই, এত খুঁটিয়ে ওরা দেখবে না, ইউ উইল বি ফাইন,’ সুনয়ন বলল।
‘মহাদেবীকে দেখতে খুব সুন্দরী ছিল,’ রিধিমার চোখ মহাদেবীর ফটোতে। সুনয়ন উত্তর দিল না। চুপচাপ নদী পার হয়ে লং আইল্যাণ্ড এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির স্পিড বাড়াল।
চল্লিশ মিনিট পর সুনয়নের গাড়ি গেজেটের অফিসের সামনে এসে পৌঁছোল। সুনয়ন গাড়িটা ঘুরিয়ে বিল্ডিঙের পিছনের পার্কিং লটে আনল। ছোট পার্কিং লট, দেওয়ালে প্রাইভেট পার্কিং ওনলি লেখা। দু’জনে নামল। সুনয়ন পিছনের দরজায় কী-প্যাডে রিচমণ্ড হিলস গেজেটের আইডি কার্ড স্ক্যান করে ভিতরে ঢুকল ।
কালির গোটা বিল্ডিং জনশূন্য। সুনয়ন সিঁড়ি দিয়ে বেসমেন্টে নেমে এল। ভিতরটা ড্যাম্প, আধো অন্ধকার হলওয়ে, বড় বড় পাথরের দেওয়াল, স্পিরিট, গন্ধ। বোঝাই যায় এখানে কাগজ ছাপা হয়। সুনয়ন কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা দরজায় কার্ড স্ক্যান করল। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে রিধিমা দেখল সারি সারি প্যানেল, কোনোটাতে সবুজ LED আলো জ্বলছে নিভছে, কোনোটাতে লাল আলো, UPS, র্যাকে কম্পিউটার হার্ডওয়ার, ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা মোটা মোটা কেবল।
‘এত বড় সার্ভার রুম!’
‘এদিকে আসুন, সুনয়ন রিধিমাকে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। একটা ছোট কনফারেন্স রুম, ইলিপ্টিকাল টেবিল, একটা ওয়াল মাউন্টেড চল্লিশ ইঞ্চি টেলিভিশন, টেবিলের একপাশে একটা কম্পিউটার। খালি ঘর। ঘরের ভিতর আরেকটা ঘর। সুনয়ন দরজায় টোকা লাগাল। যে দরজা খুলল তাকে দেখে রিধিমা অবাক।
সাবওয়ে ট্রেনের কুকিওয়ালা!
‘ওভাহ দেয়া—,’ কুকিওয়ালা সুনয়নকে তর্জনী দিয়ে ঘরের কোনায় দেখাল। মাথায় কালো সিল্কের থলে আটকানো একটা ছেলে বসে আছে, ওর দুটো হাত টেবিলের ওপর। হাতে পুলিশের হ্যাণ্ডকাফের মত হ্যাণ্ডকাফ লাগানো, পাশে একটা কাগজ-কলম। ছেলেটার মাথায় পিস্তল ধরে বসে এক হাতে টাইটা ঢিলা করছে যে লোকটা সেই নিশ্চয়ই ওর্জুন অ্যাটর্নি।
‘দেখুন তো একে চিনতে পারেন কিনা?’ সুনয়ন বলল।
মাথা কালো থলেতে ঢাকা মানুষটার মুখ না দেখতে পেলেও এর খোলা হাতে উল্কিটা দেখতে পেল রিধিমা— ‘কোবরা-কিস’। সারা নিউ ইয়র্কে এরকম উল্কি বোধহয় একজনের হাতেই আছে।
সফটওয়্যার জিনিয়াস— ডেভিড!
সুনয়নের নির্দেশে কুকিওয়ালা ছেলেটা কালো থলে খুলে দিল।
‘এই সেই ডেভিড,’ রিধিমা বলল।
‘থ্যাঙ্ক ইউ,’ সুনয়ন বলল। ‘আপনার কাজ শেষ, আপনি বাইরে চলুন।
‘কেন?’
‘আপনাকে বাইরের ঘরে রেখে এসে আমরা যা করব তা আপনার দেখতে ভাল লাগবে না।’
‘আপনারা এখানে কী করবেন?’
‘আমরা এই ডেভিডকে ডাবল অ্যারোর অ্যাডমিন লগ ইন পাসওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করব। ও সেটা বলবে না, তখন আমরা ওর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা চপার দিয়ে কেটে নেব। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করব পাসওয়ার্ড, ও তখনও বলবে না, তখন আমরা এক এক করে—’
‘বাইরে যাব,’ রিধিমা তাড়াতাড়ি বলল। রিধিমা টলতে টলতে বেরিয়ে এল। ‘ওই কুকিওয়ালা ছেলেটা আমাকে প্রসপেক্ট অ্যাভ মেট্রো স্টেশন থেকে—’
‘জানি,’ সুনয়ন রিধিমার কথার মাঝে কথা বলল। ‘ওর্জুন অ্যাটর্নির স্ট্যাফ সারা নিউ ইয়র্কে ছড়িয়ে আছে। আপনাকে তো বিপদের মধ্যে আর একলা ছাড়তে পারি না।’ রিধিমাকে পাশের ঘরে বসিয়ে সুনয়ন আবার ঘরে ঢুকে গেল। আধঘন্টা পর সুনয়ন আর ওর্জুন অ্যাটর্নি বেরিয়ে এল— ‘চলুন।’
রিধিমার মনে প্রশ্নের পাহাড়— ‘কটা আঙুল কাটতে হল?’
‘ওটা ওকে ভয় দেখাবার জন্য বলেছিলাম। সত্যি সত্যি কাটতাম নাকি?’ সুনয়ন গম্ভীর ভাবে বলল। ‘কিন্তু কাজ হয়ে গেল। এখন ডাবল অ্যারো আমাদের হাতের মুঠোয়। নেশাই ওর কাল হল।’
‘উল্কির ইনফরমেশনটা আপনাদের কাজে লেগে গেল?’
‘ঠিক,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল। ‘আপনি যে এর হাতের “কোবরা-কিস” উল্কির কথাটা বলে এর বর্ণনাটা দিলেন, সেটা একে খুঁজে বের করতে অনেক সাহায্য করল। এ হল ডার্কওয়েব ডাবল অ্যারোর অ্যাডমিন, জিনিয়াস টাইটান— ডেভিড হু। এর বাবা হল মেজর হু।’
‘ওকে কি পুলিশের হাতে তুলে দেবেন?’
‘না, পুলিশকে এর মধ্যে জড়ানো যাবে না। এই ডেভিড একটা বিস্ময়কর তথ্য দিল, জানেন এই ডাবল অ্যারোর মালিক কে?’
‘কে?’
‘জেনারেল লি ঝেন।
‘লি ঝেন?’ রিধিমা চমকে উঠল।
‘স্মল ওয়ার্ল্ড!’ সুনয়ন বলল। ‘ডেভিডকে আমরা ছেড়ে দেব। তবে এখন না, এ আমাদের সকলকে দেখে নিয়েছে। আপনার কাজ আগে হয়ে যাক। এ এখন নির্বিষ সর্প, বিষদাঁত আমি ভেঙে দিয়েছি। আমরা ডাবল অ্যারোর পাসওয়ার্ড বদলে দিয়েছি। এখন এ আর ডাবল অ্যারোতে ঢুকতে পারবে না।’
৷৷ ছত্রিশ ৷৷
চিন্তা ব্লটিং পেপারের মত জেনারেল ঝেনের চোখ থেকে ঘুম শুষে নিয়েছে। BMW এম ফাইভ টুওরিং ছুটে চলেছে লেক জর্জের দিকে। ইন্টারস্টেট 1-87 এ প্রায় ঘন্টা চারেক হয়ে গেল। পথে অনেকক্ষণ আগেই সূর্য ক্যাটস্কিলের পাহাড়ের ঢেউয়ের পিছনে অস্ত গেছে। কাল সারা রাত ঘুম হয়নি দুশ্চিন্তায়। রেড আই ফ্লাইট ধরে সানফ্রান্সিসকো থেকে নিউ ইয়র্কের কেনেডি এয়ারপোর্ট। দুপুরে নেপাল এম্বাসীতে গিয়ে অতটা সময় নষ্ট। জেনারেল ঝেন মনে মনে হিসেব কষে চলেছে পরের চালগুলো কী হতে পারে। সামনে প্যাসেঞ্জার সিটে বসে মেজর হ সেলফোনে টুকটুক করে কাকে টেক্সট করে চলেছে। মেজরের এবার রিটায়ার করার সময় হয়ে এসেছে। মেয়েটাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও কীভাবে মেজর মেয়েটাকে যেতে দিল তা ভাবলেই জেনারেলের মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে। এক বিলিয়ন ডলার ক্রমশঃ হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রিনপোচে লামা ডেকে পাঠিয়েছে। মেজর হু’র কী পরিণতি হবে তা নিয়ে পরেও ভাবা যাবে, আপাততঃ তার বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বৌদ্ধজগতে দালাই লামার প্রতিদ্বন্দ্বী এই রিনপোচেকে বড়শিতে গেঁথে ফেলা।
রাস্তার দু’পাশে অন্ধকারে অ্যাডিরনড্যাকের রেঞ্জ যেন ঘাপটি মেরে রয়েছে। এখান থেকে ক্যানাডার বর্ডার পেরিয়ে মন্ট্রিয়েল মাত্র ১৬৫ মাইল। কিন্তু গাড়িটা সেদিকে না গিয়ে এবার এক্সিট টোয়েন্টি ওয়ানে হাইওয়ে ছাড়ল। তারপর বরফ জমা লেক জর্জের পাশ দিয়ে চলতে লাগল পূর্ব দিকে। লেকের পাশে গায়ে গা লাগান প্রচুর মোটেল। শীতে সবকটা বন্ধ। বাইরের রাস্তা অন্ধকার। পাহাড়ের মাথায় মনাস্টারির আলো দেখা গেল। জেনারেল ঝেন অনুভব করল রক্তচাপ বাড়ছে। চারদিকে বরফ ঢাকা পাহাড়, বাঁ-পাশে বরফ জমা বিশাল লেক জর্জ যেন একটা বিশাল আইস স্কেটিং রিংক। পাহাড়ের নিচে মনাস্টারির চেকপোস্ট। লেখা আছে প্রাইভেট প্রপার্টি নো ট্রেসপাসিং। সিকিউরিটি গার্ডকে বলা ছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করে গেট খুলে দিল। গাড়ি একেবেঁকে পাহাড়ে ওঠা শুরু করল। পাহাড়ের মাথায় অনেকটা সমতল জায়গা, মনাস্টারির ফেন্সিংয়ের বাইরে পার্কিং লট স্বল্প আলোকিত। জেনারেল ঝেনের গাড়িটা দাঁড়াল। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডায় নেমে জেনারেল ওর সিডনির পার্সোনাল বিচটাকে মিস করল খুব। অস্ট্রেলিয়ায় এখন গরমকাল, সমুদ্রের ধারে দেহ সেঁকতে সেঁকতে ঠোঁটে বরফ-শীতল মার্টিনির সঙ্গে ক্যাঙারু বার-বি-কিউর গেমি টেস্ট। কমফোর্ট জোন মানে কাউন্টার প্রস্পারিটি, ভেজা ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল জেনারেল ঝেন। পাশে পাশে আসছে মেজর হু। ওর দাঁড়িতে ঢাকা নির্বিকার মুখ দেখে বোঝাই যায় না কী ভাবছে।
মনাস্টারির গেটে সিকিউরিটি বক্স থেকে বেরিয়ে এল একজন লামা ‘জেনারেল ঝেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘রিনপোচে আপনার জন্য লেকের ভিতর অপেক্ষা করছেন।’
‘লেকের ভিতর?’ জেনারেল ঝেনের খটকা লাগল। রিনপোচে কক্ষনো ওকে মনাস্টারিতে ঢুকতে দেয় না। নানা আছিলায় বাইরে রাখে। গতবার যখন এসেছিল পাহাড়ের জঙ্গলে পাকদণ্ডিতে দু’জনে হেঁটেছিল, তার আগের বার লেকের জলে মোটরবোটে। এ নিয়ে মাথা ঘামায়নি লি ঝেন, হাড় বেচে ডলারের জন্য কক্ষনো চিন্তা করতে হয় নি তাকে। পেমেন্ট এক ডাইমও মার যায় নি। কথা দিলে সব সময় কথা রেখেছে এই রিনপোচে। তবুও এই শীতের অন্ধকারে লেকে—
লেক জর্জ জমে বরফ। আসার সময় বরফের চাদরের মধ্যে জায়গায় জায়গায় আইস ফিশিং টেন্টস, এবং অন্যান্য পোর্টেবল ফিশিং শেলটার লক্ষ্য করেছে জেনারেল ঝেন। বৌদ্ধ লামা স্নো-ফিশিং করে? জেনারেল ঝেনের পিছন পিছন মেজরও রওনা দিল।
‘জেনারেল ঝেনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চান রিনপোচে,’ লামা মেজরকে বলল। ‘আপনি মঠের অতিথিশালায় অপেক্ষা করুন।’
মেজর কুতকুতে চোখে লামার দিকে তাকাল, কথাটা ওর মনঃপূত হল না। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে মেজর জ্যাকেটে চাপ দিয়ে অনুভব করল পিস্তলের অস্তিত্ব, তারপর মনাস্টারির দিকে অগ্রসর হল। অন্য একজন লামা জেনারেল ঝেনকে পার্কিং লটের শেষ প্রান্তে নিয়ে গেল। একটা বরফের ঢালু পথ। সেখানে অপেক্ষা করছে একটা স্নো-মোবিল।
‘স্নো-মোবিল!’ জেনারেল ঝেন বলল।
‘বরফ জমা লেকের ভিতরে চার মাইল যেতে হবে। আসুন।’ জেনারেল ঝেন উঠে বসতে লামা স্নো-মোবিল স্টার্ট করল। বরফের মধ্যে দিয়ে অন্ধকার চিরে পাহাড়ের ঢালে নামতে লাগল স্নো-মোবিলের হেড লাইট। লেকে নেমে পড়ল স্নো-মোবিল, তারপর লেকের অভ্যন্তরে ছুটে চলল। এদিক ওদিকে ফিশিং টেন্টস। অ্যাডিরনড্যাকে স্নো-ফিশিং একটা জনপ্রিয় উইন্টার স্পোর্টস। স্নোমোবিলের জোরালো হেডলাইটে সি ঝেন বুঝতে পারছে ওরা লেকের একদম অভ্যন্তরে চলে এসেছে, এখানে ফিশিং টেন্টস নেই। বরফের মধ্যে দেখা যাচ্ছে একটা ফিশিং হাউস।
স্নো-মোবিলটা ফিশিং হাউসের সামনে থামল। ভিতর থেকে একজন লামা সোলার ক্যাম্পিং লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে এল, পায়ে ইনসুলেটেড ওয়াটারপ্রুফ জুতো, গায়ে চীবরের নিচে থার্মালের অনেকগুলো আস্তরণ। লেকের ভিতর খুবই ঠাণ্ডা। লামা জেনারেল ঝেনকে স্বাগত জানিয়ে বলল ‘রিনপোচে আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।’
আইস ফিশিং হাউসের মধ্যে ঢুকে জেনারেল ঝেন অবাক।
এক্সট্রিম কমফোর্ট! জেনারেল মনে মনে বলল। ভিতরে হিটার লাগানো একটা বড় উজ্জ্বল গরম কামরা, তাতে সোফা, পাশে একটা লাগোয়া রান্নাঘরে মাইক্রোওয়েভ, সিঙ্ক, বাথরুম। টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে জলের গভীরে এক ঝাঁক ব্লু-গিল ঘুরে বেড়াচ্ছে, ওদের মাঝে একটা বিশাল লেক ট্রাউট এসে পড়ায় ওরা সরে গেল গুল্মের দিকে। ভিতরে একটা বরফের গর্তের পাশে বসে রিনপোচে একটা ছোট কলসী গর্তের ভিতর উপুড় করে দিল। টিভির ক্যামেরায় দৃষ্টিগোচর হল ছোট ছোট মাংসখণ্ডে জল রক্তিম হয়ে গেল আর ক্ষুধার্ত মাছের ঝাঁক সেখানে এসে ভিড় করল।
‘ইয়োর হাইনেস, জানতাম না আপনিও আইস ফিশিং করেন,’ জেনারেল ঝেন লামাকে হাত জোড় করে বুকের কাছে এনে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ করল।
‘আমি আইস ফিশিং পছন্দ করি না,’ রিনপোচের প্রশান্ত মুখে তৃপ্তি লেগে আছে। ‘শীতকালে বরফের নিচে জলের তলায় মাছগুলো খুবই ক্ষুধার্ত থাকে, এখন তো বড়শিতে খাবার লাগিয়ে পনের-বিশ ফুট নিচে ফেললেই মাছ উঠে আসে। লেক জর্জ, ব্র্যান্ট লেক এসব জায়গায় প্রচুর লোক মোটরাইজড তুরপুণ দিয়ে বরফে গর্ত করে সারা শীতকাল ধরে এই করে চলেছে, কিন্তু এতে কৃতিত্বের কিছু নেই।’
‘তাহলে এই ফিশিং টেন্ট?’ জেনারেল ঝেন বলল৷
‘আমি ওদের খাওয়াই,’ লামা বলল। ‘জলের নিচে শক রেসিস্ট্যান্ট হাইড্রোডায়নামিক ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছি, ক্ষুধার্তকে খেতে দেখার মত এত বড় আনন্দ এ পৃথিবীতে আর কিছুতে নেই। আমি রোজ এসে কয়েকঘন্টা এই আনন্দ উপভোগ করি।’
রিনপোচে ওয়াশ-বেসিনে গিয়ে হাত ধুলো, আঙুলে শুকনো রক্ত, জলের স্পর্শে লাল রঙ বেসিনে ঝরে পড়তে লাগল। ‘তিব্বতে মানুষ মারা গেলে স্কাই বারিয়াল করে জানেন তো?’
‘জানি,’ লি ঝেন মাথা নাড়ল। ও দেখেনি কিন্তু শুনেছে মৃতদেহ পাহাড়ের ওপর নিয়ে গিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে সাম্পা মাখিয়ে শকুনদের দিয়ে খাওয়ান হয়। ‘তবে এখন অনেকটা কমে গেছে।’
লামার শিষ্য একটা তোয়ালে হাতে নিয়ে দাঁড়াল, লামা হাত মুছল। ‘অনেকের স্কাইবারিয়ালের সুযোগ থাকেনা, তারা মৃতদেহ কেটে টুকরো করে জলে ফেলে দেয়। মাছেরা সেই মাংস খায়।’
লি ঝেন বুঝতে পারছে না এসব কথা বলার অর্থ কী— ‘আপনি কী—?’
‘হ্যাঁ,’ রিনপোচে লামার মুখে প্রশান্ত হাসি। ‘আমাদের একজন লামা ফেন্সিংয়ে ইলেকট্রোকিউটেড হয়ে মারা গেছে। রোজ কিছু কিছু করে তার সৎকার করে চলেছি।’
লি ঝেনের মনে হল লাঞ্চে খাওয়া দু’হাজার ডলারের শ্যাটো লাট্যুর ওয়াইনটা বমি হয়ে যাবে।
রিনপোচে লামা হাত তুলতেই ভিতরের দু’জন লামা কক্ষ ত্যাগ করল।
‘বসুন,’ লামা সোফা দেখিয়ে দিল। ‘পথে কষ্ট হয় নি তো?’
আপনি ডেকে পাঠিয়েছেন, এজন্য পথের সমস্ত কষ্ট সহ্য করতেও আমি রাজি। আদেশ করুন।
‘আপনি আমার কাস্টডিতে যে জিনিসটা চার বছর ধরে রেখেছেন, সেটা ফেরত দিতে চাই,’ লামা দেরাজ থেকে একটা ছোট হাতির দাঁতের কাজ করা চন্দন কাঠের বাক্স বের করল।
আপনি শিওর যে এটা আপনি কিনবেন না, ইয়োর হাইনেস?’
‘সে কথা আমি আপনাকে চার বছর আগেই বলেছি। আপনি একটা মিথ্যাকে ক্রমাগতঃ ঢেকেই চলেছেন,’ লামার প্রশান্ত হাসি মিলিয়ে গেল।
‘এটা আপনার ভুল ধারণা ইয়োর হাইনেস। এই যে ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ল্যাব থেকে আনা DNA টেস্টের রিপোর্ট—’ জেনারেল ঝেন পেটের সঙ্গে লাগানো পাসপোর্ট পাউচ থেকে একটা কাগজ বের করে বলল— ‘কপি।’
‘ওটা দেখাবার দরকার নেই জেনারেল। আপনি এসব DNA রিপোর্ট কেনার ক্ষমতা রাখেন।’
‘যিশাসের দিব্যি, আই উড নেভার ডু আ স্নো জব অন ইউ। আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না। আপনি ক্রমাগত বলছেন পিতরাওয়ার থেকে পাওয়া হাড় বুদ্ধের হাড় না। অথচ ভিনসেন্ট স্মিথ থেকে শুরু করে আজকের চার্লস অ্যালেক্সের মত বিখ্যাত হিস্টোরিয়ানরা যখন বলছেন পিতরাওয়া থেকে পাওয়া হাড়ই বুদ্ধের হাড়। আপনি কীভাবে এতটা নিশ্চিত যে এটা বুদ্ধের হাড় না? আপনাকে কে বলছে?’
‘মঞ্জুশ্রী লামা।
‘কে মঞ্জুশ্রী লামা?’
আপনাকে আমি আগে এঁর কথা বলিনি,’ রিনপোচের ঠোঁটে প্রশান্ত হাসি ফিরে এল। ‘বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী বা বোধিসত্ত্ব অব উইজডমের পুনর্জন্ম। মহাজ্ঞানী ব্যক্তি।’
লি ঝেনের মুখ বিরক্তিতে ভরে গেলেও পরমুহূর্তে সামলে নিয়ে বলল, ‘হোয়াটেভার! এই মঞ্জুশ্রী লামা কীভাবে জানল এটা বুদ্ধের হাড় না?’
‘কারণ এই বুদ্ধের হাড় দিল্লী মিউজিয়ামে তার তদারকিতেই রাখা ছিল। মঞ্জুশ্রী লামা পূর্বজন্মে ছিলেন দিল্লী মিউজিয়মের কিউরেটার।’
‘হোয়াট?’ লি ঝেন আশা করেনি এত বড় বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। ‘ওই কিউরেটার তো এই বুদ্ধের হাড় বিক্রি করতে বাধা দিচ্ছিল। তাই সে তো মৃত?’
রিনপোচে স্মিত হাসল— ‘আপনার লোকেরা এই চন্দন কাঠের বাক্সে দিয়ে গেল বুদ্ধের হাড়, আর সঙ্গে দিয়ে গেল একটা কফিনে এই হাড়ের মৃত কেয়ারটেকার দিল্লী মিউজিয়মের কিউরেটারকে। ওদের অনুরোধে আমি রাজি হয়েছিলাম শবের ওয়াটার বারিয়াল সম্পন্ন করাবো। গভীর রাতে মঠে বুদ্ধ মূর্তির সামনে মাখন প্রদীপ, ধুপ জ্বালিয়ে ঝাটরের প্রার্থনা শুরু করলাম, রগ্যাপাকে ডাকা হল। কিন্তু কফিন খুলতেই মৃতদেহের মুখ দেখে চমকে উঠলাম। মঞ্জুশ্রী লামা!’
‘আপনি কীভাবে বুঝলেন ইনিই মঞ্জুশ্রী লামা?
‘ধ্যানে বসে আমি লেক জর্জের নীল জলে ওঁর মুখ অনেকবার দেখেছি।’
‘ধ্যানে বসে লেকের জলে?’ হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লি ঝেন।
‘তিব্বতে অবতারদের এইভাবেই আবিষ্কার করা হয়।’
‘ইন্টারেস্টিং!’
‘রেটিং রিনপোচের নাম শুনেছেন?’
‘না।’
‘তিব্বতের পবিত্র লেক নামোলাৎসোর পাশে বসে ধ্যান করতে করতে স্ফটিকের মত জলে রেটিং রিনপোচে দালাই লামার আমডোর একতলা বাড়ির নীল ছাদ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখেন। সার্চ টিম পাঠানো হয় এবং ওরা শিশু দালাই লামাকে ওখানে আবিষ্কার করে।’
‘আপনিও সেরকম লেক জর্জের জলে শিশু মঞ্জুশ্রী লামাকে—’
‘হ্যাঁ। আমি অনেকবার লেক জর্জের জলে ভগবান মঞ্জুশ্রী লামার মুখ স্পষ্ট দেখেছিলাম। এসব কথা থাক। আপনাকে বিশ্বাস করানো কঠিন।’
‘কিন্তু ডেডবডি বেঁচে উঠল কীভাবে?’ লি ঝেনের পাগল পাগল লাগছে।
স্মিত হাসলেন রিনপোচে— ‘আমার মঠের শিষ্যরা বলে আমি নাকি মৃত মঞ্জুশ্রী লামার দেহে প্রাণসঞ্চার করেছি। আমি ওদের বিশ্বাসে আঘাত দিই না। কিন্তু আমি জানি যে ওরা একটা জীবিত অচেতন মানুষকে কফিনে আমার কাছে দিয়ে গেছিল, মানুষটাকে কুচি কুচি করে কেটে জলের তলায় মাছের খাবারের জন্য ফেলতে।’
‘অসম্ভব!’ লি ঝেন বলল। ‘মেজর হু নিজে এই হত্যার দায়িত্ব নিয়েছিল। আমাকে বলেছে যে—’
‘তাহলে আমিই মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করেছি।’
‘লোকটা এখনো জীবিত?’
‘মঞ্জুশ্রী লামা ভগবান। ওর সম্বন্ধে এভাবে অশ্রদ্ধা করে কথা না বললে আমি খুশি হব জেনারেল।’
‘মাই অ্যাপোলোজিস, ইয়োর হাইনেস,’ লি ঝেন বলল। ‘কিন্তু উনি যদি পুলিশকে সব বলে দেন?’
‘ভয় নেই। বলবেন না। উনি কথা বলতে সক্ষম নন৷ এমনকি চলাফেরাও করতে পারেন না।’
‘ইয়োর হাইনেস, আমি কিছু বুঝতে পারছি না,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লি ঝেন বলল। ‘অ্যান্টিক বিক্রি আমার পেশা। অনেক মূল্য দিতে হয় এই অ্যান্টিক কেনবার জন্য। আপনি জানেন সমস্ত অ্যান্টিক কেনাবেচা সৎ পথে সম্ভব হয় না। আপনাকে আমি যে বুদ্ধের শরীরের বিভিন্ন অংশের এত অজস্র হাড় বিভিন্ন দেশ থেকে এনে বিক্রি করেছি আপনি ভালই জানেন এগুলো চুরির হাড়—’
‘ওগুলো ছিল চুরির হাড়, কিন্তু খাঁটি হাড়। আমি প্রচুর যাচাই করে নিই এই হাড়ের সত্যতা। আপনার মনে কখনো প্রশ্ন জেগেছে কি যে আমি কেন এত হাড় কিনি?’
‘জেগেছে। কিন্তু আমি অনধিকার চর্চার কৌতূহল দমন করে রেখেছি। আমি জানি আপনি চাইলে নিজেই আমাকে বলবেন।’
‘তবে শুনুন। অনেক বছর আগে হিউয়েন সাঙ নামে একজন চাইনিজ ট্র্যাভেলার ভারতে আসেন এবং উনি ‘নন্দীমিত্রবদন’ নামে একটা পুঁথি পান, উনি সেই পুঁথি নিজে অনুবাদ করেন। সেই পুঁথিতে বিস্ময়কর একটি ভবিষ্যত্ৰাণী ছিল। সেই ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী বুদ্ধের সমস্ত হাড় আবার এক জায়গায় ফিরে আসবে। সেই সমস্ত একত্রিত হাড় বোধিবৃক্ষের নিচে নিয়ে এলে সেখানে আবার বুদ্ধের ধ্যানরত মূর্তি জন্ম নেবে এবং সেই মূর্তি অন্তর্হিত হয়ে পরবর্তী বুদ্ধ মৈত্রেয়ের আগমনবার্তা ঘোষণা করবে৷ এই হাড় মৈত্রেয়ী বুদ্ধকে ডেকে আনবে।’ রিনপোচে লামা চুপ করল। ‘ক্রকুচন্দ, কনক, কাশ্যপ, তারপর সিদ্ধার্থ এরা সবাই অতীতের মরণশীল বুদ্ধ, তারপর মৈত্রেয়— ভাবী বুদ্ধ। সেজন্য বুদ্ধের মৃত্যুর কুড়ি বছরের মধ্যে তখনকার বৌদ্ধধর্মের প্রধান মহাকাশ্যপ মগধরাজ অজাতশত্রুকে দিয়ে বুদ্ধের সমস্ত হাড় এক জায়গায় একত্রিত করেন। কিন্তু অশোকরাজা নিজের কলিঙ্গ হত্যার দুর্নাম ঘোচাতে সেই হাড় আবার চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে তাতে অজস্র স্তূপ বানান। তারপর থেকে বৌদ্ধরা সকলে পথভ্রষ্ট। পরবর্তী বুদ্ধের আগমনের জন্য কারোর এতটুকু প্রচেষ্টা নেই। কেবল আমি এগিয়ে চলেছি বুদ্ধের হাড় একত্রিত করে বুদ্ধের ধ্যানরত মূর্তির জন্ম দেখার জন্য। সেই পথে আমি বুদ্ধের দেহে একটাও সন্দেহজনক হাড়ের টুকরো লাগাতে চাই না।’
‘কিন্তু এতো অনেক বিলিয়ন ডলার খরচা। এটা ফাইনান্স করছে কে?’
‘সেটা না হয় অন্য এক সময় বলব জেনারেল,’ রিনপোচে লামা রহস্যময় মৃদু হাসি হাসল। ‘সকলেই যে দালাই লামাকে পছন্দ করে তা তো নয়৷’
‘আপনার ইচ্ছাকে আমি সম্মান করি, ইয়োর হাইনেস,’ জেনারেল লি ঝেন বলল। ‘কিন্তু এটুকু অন্ততঃ বলুন, আপনার মঞ্জুশ্রী লামা ঠিক কী বললেন এই হাড়ের সম্বন্ধে?’ লি ঝেন চন্দন কাঠের বাক্সে হাত বোলাল।
‘কফিনের মধ্যে যখন মঞ্জুশ্রী লামার জ্ঞান ফিরল, তখন তার দু’চোখে ভয় আমি আশ্বাস দিলাম— ভয় নেই। তখনও উনি ড্রাগসের ঘোরে ছিলেন। ঠিকমত জ্ঞান আসল পরদিন সকালে। ততক্ষণে আমরা ওর মস্তক মুণ্ডিত করে ওঁর শরীর চীবরের আবরণে ঢেকে দিয়েছি। সেই চেহারা দেখে আমি আরও নিশ্চিত হলাম যে উনিই তিনি যিনি ভাবী বুদ্ধকে পৃথিবীতে আনবেন। জ্ঞান হতেই উনি বুদ্ধের চন্দন কাঠের বাক্সের খোঁজ করলেন। আমি মিথ্যা কথা বলিনা। ওঁকে বললাম যে আমি প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ওই হাড় কিনতে চলেছি। ওঁকে বললাম যে উনি বাধা দিচ্ছিলেন তাই ওঁর জীবন বিপন্ন হয়ে গেছিল। সৌভাগ্যবশতঃ আমরা ওঁকে বাঁচাতে পেরেছি। তা শুনে উনি বললেন যে ওটা বৃদ্ধের হাড় না। শুধু শুধু এত অর্থ ব্যয় করতে বারণ করলেন আমাকে।’
‘কিন্তু কীভাবে উনি বুঝলেন সেটা?’
উনি বললেন পিতরাওয়ার আসল বুদ্ধের হাড় চুরি গেছিল একশ বছর আগে যখন স্তূপ খোঁড়া হচ্ছিল তখনই।’
‘কোথায় সেটা লেখা?’ জেনারেল ঝেন প্রতিবাদ করল। কোনও তথ্য প্রমাণ আছে?’
‘বলছি, শান্ত হোন,’ রিনপোচে বলল। ‘উনি বললেন যে চেপ্পি নিজে এশিয়াটিক সোসাইটির রিপোর্টে লিখেছে ঢাকনাটা ভাঙা ছিল। ঢাকনাটা নাকি পাথরের চাপে ভেঙে গেছে। তাহলে চেপ্পি প্রথম দিনই কেন ভিতরের পাত্রগুলো বের না করে পুলির সন্ধান করছিল?’
লি ঝেন অবাক হয়ে শুনছিল। তাকে তো এসব কেউ বলে নি?
‘মঞ্জুশ্রী লামা বললেন যে চোর এসেছিল এই খবর লোকের মুখে মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল,’ —রিনপোচে বলে চলল সে বছরই গরমে শ্রীলঙ্কার কালুতারার ওয়াস্কদুরে মনাস্টারির প্রধান পুরোহিত সুভূতি চেপ্পিকে একটা চিঠি লিখেছিল। তাতে সুভূতি লিখেছিল যে ভারতের কিছু লোক রটাচ্ছে যে হাড়গুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি বুদ্ধের আর বাকি সমস্তটাই সেই সব শাক্যদের হাড় যাদের বিরুধক রাজা মেরেছিল। সেটা কি ঠিক? এছাড়া সুভূতি কয়েকটা প্রশ্ন করেছিল— সে জানতে চেয়েছিল মাটির নিচে পাঁচটা কলস ছিল না ছ’টা? চেপ্পি যখন তার রিপোর্টে লিখেইছে যে সে পাঁচটা কৌটো পেয়েছিল, তাহলে সুভূতি কেন ষষ্ঠ কলসের উল্লেখ করল?’
‘তার মানে সেখানে আরেকটা কলস ছিল?’
‘এই পাঁচটা কলসের একটাতেও বুদ্ধের হাড় ছিল না। বুদ্ধের হাড় ছিল ওই ষষ্ঠ কলসে। এবং সেটা চুরি গেছিল।’
‘আশ্চর্য। আপনি কি জানেন সেই ষষ্ঠ কলস কোথায়?’
‘মঞ্জুশ্রী লামার বন্ধু ছিলেন হার্ভার্ডের ডঃ উইকস। উনি মঞ্জুশ্রী লামাকে নাকি বলেছিলেন যে একটা কলস এসে পৌঁছেছে তার কাছে, তার দৃঢ় অনুমান সেটাই ওই কলস। আনফরচুনেটলি, কোনও প্রমাণ তার কাছে নেই।’
‘ইয়োর হাইনেস, ঘটনাটা ঘটে চার বছর আগে, অথচ আপনি এতদিন পর সেই ঘটনার কথা আমাকে বলছেন?’
‘তখন ডঃ উইকসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুদ্ধের হাড়ের কলসের খোঁজ করা অসম্ভব ছিল। FBI হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে ডঃ সিদ্ধার্থ বোসকে, ডঃ উইকসের এতটুকু সন্দেহ হলেই পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ত আমাদের মঠে। আমরা সকলে ধরা পড়ে যেতাম, জেনারেল।’
‘আপনি বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন, ইয়োর হাইনেস।’
লামা স্মিত হাসল— ‘আপনি অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন জানতে যে কেন আমি এই বুদ্ধের হাড় কিনছিলাম না। আমার পক্ষে তখন আপনাকে সব বলা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম যে ডঃ উইকস কক্ষনো সার্টিফাই করবেন না যে পিতরাওয়ার হাড় আসল বুদ্ধের হাড়। তাই আপনাকে বললাম যে হার্ভার্ড যদি সার্টিফাই করে তবেই আমি এই হাড় কিনব। কিন্তু আপনি হার্ভার্ডের প্রফেসরদের খুন করালেন।’
‘আমি?’
আপনাকে ছাড়া আর কারুকে বলিনি হার্ভার্ডের অ্যাসাইনমেন্টটার কথা। জেনারেল নিরুত্তর।
‘জোর করে প্রফেসরদের দিয়ে লিখিয়ে ওই সার্টিফিকেট এনে আমাকে দেখাতেন যে এটা সত্যিই বুদ্ধের হাড়?’ রিনপোচের দৃষ্টিতে তিরস্কার।
‘ওটা অন্য কাস্টমারদের জন্য,’ জেনারেল লি ঝেন বলল। ‘আমি যখন দেখলাম আপনি দ্বিধাগ্রস্ত এবং খুব সম্ভবতঃ ওই হাড় কিনবেন না, আমাকে তখন এই হাড় অকশনে দিতে হল। হার্ভার্ডের প্রফেসররা যদি একবার সার্টিফাই করে দিত যে এটা নকল হাড় তাহলে কেউ এই হাড় কিনত না।’
‘আপনার এই খুন আমার এক অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। ডঃ উইকস একমাত্র জানতেন বুদ্ধের অস্থিকলসটা কোথায়।’
জেনারেল ঝেন টিভির স্ক্রীনের দিকে তাকাল, জলের নিচে একটা গুল্মে আটকে আছে অক্ষিকোটরে একটা মানুষের চোখ, আর একটা ট্রাউট সেটা ঠোকরাচ্ছে। জেনারেলের মাথা দপদপ করছে, রেড আই ফ্লাইটটা না নিলেই ভাল হত। জেনারেল এবার বলল, ‘আপনি যেভাবে হাড়ের শুদ্ধতা যাচাই করে নিচ্ছেন তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই, আপনি মনে খুঁত রেখে এই হাড় কিনবেন সেটাও আমি চাইব না। হ্যাঁ, আমি খুন করিয়েছি, কিন্তু আমি আপনাকে ঠকাই নি, কেননা আমি এখনো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি দিল্লী মিউজিয়াম থেকে আনানো এই পিতরাওয়ার হাড়ই খাঁটি বুদ্ধের হাড়। আমার যদি এতে তিলমাত্র সংশয় থাকত তবে আমি এত খরচা করে, এত রিস্ক নিয়ে এই হাড় কিনতাম না। আপনি যে উদ্দেশ্যে এই হাড় কিনছেন না, আমি চাই আপনার সেই উদ্দেশ্য সফল হোক। কিন্তু অন্য কাস্টমাররা এই হাড় কিনতে চান তাদের মঠের কৌলিন্য বাড়াবার জন্য। বুদ্ধের হাড় তাদের মনাস্টারিতে লাখ লাখ ভক্তকে টেনে আনে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ইনকাম করে তারা। তাদের জন্য এই কন্ট্রোভার্সির কোনও দরকার নেই।’
রিনপোচে জেনারেল ঝেনের হাতের ওপর হাত রাখল ‘আমি দুঃখিত। আপনি এখন আসুন, নিউ ইয়র্ক পৌঁছোতে পৌঁছোতে মধ্যরাত হয়ে যাবে।’
জেনারেল ঝেন ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়াল। অনেক কাজ বাকি। গাড়িতে আসার সময় নেপাল কনসুলেট থেকে ডঃ রজত থাপার ফোন এসেছিল। মেয়েটা নেপাল কনসুলেটে গেছিল, কাল UN-এর সেমিনারে ঢোকার চেষ্টা করছে। কিন্তু নেপাল কনসুলেটে মেয়েটার চেষ্টা সফল হয় নি। মেজর হু’র ওপর জেনারেলের রাগের পাহাড় ক্রমশঃ উঁচু হচ্ছে। মেয়েটাকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিল মেজর? মেয়েটা কথা বললে বিলিয়ন ডলার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
মনাস্টারির পার্কিং লটে ফিরে BMW-তে উঠে জেনারেল ঝেন বিড়বিড় করে বলল, ‘মেয়েটা UN-এ ঢোকার আগেই আমি ওকে শেষ করব। বুদ্ধের বাপের দিব্যি।’
৷৷ সাঁইত্রিশ ৷৷
সুনয়ন আর রিধিমা যখন সুনয়নের পার্কার লেনের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ফিরে এল তখন সন্ধ্যা অনেকক্ষণ নেমে গেছে, ঠাণ্ডা নিউ ইয়র্কের পাঁজরে হিংস্র শ্বাপদের মত কামড় বসাচ্ছে। তখনই সুনয়নের ফোনটা বাজল।
‘ওর্জুন অ্যাটর্নি আবার,’ সুনয়ন সাইডওয়াকে ফোনটা কানে তোলার আগে রিধিমাকে বলল। রাস্তার কার্বে সারি সারি গাড়ি পার্ক করা, সুনয়ন পুরোনো হণ্ডা সিভিকটাও সেখানে পার্ক করল। কানে ফোন নিয়েই সুনয়ন গাড়ি থেকে নামল। রিধিমাও নামল। গাড়ি থেকে নেমে হণ্ডা সিভিকের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রিধিমার খেয়াল হল সুনয়নের গাড়িটার ম্যাসাচুসেটসের লাইসেন্স প্লেট । নিচে লেখা দ্য স্পিরিট অব আমেরিকা।
সুনয়ন ফোনে কথা বলছে। রিধিমা ভাবল এটা কীভাবে হল? সুনয়ন কিছুক্ষণ হুঁ হাঁ করে কথা বলে ফোন রেখে দিল। রিধিমা ভেবেছিল ওরা অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকবে। কিন্তু সুনয়নের গাড়ির হেড ল্যাম্প অন্ধকারে দপ করে জ্বলল। সুনয়নের হাত রিমোট স্টার্টারে— ‘গাড়িতে আসুন।’
‘আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সিরিয়াস কিছু হয়েছে,’ রিধিমা বলল। ‘আপনাদের ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে ইণ্ডিয়া থেকে ডঃ মনোজ যোশী বলে কেউ এসেছেন?’
‘হ্যাঁ। উনি ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিস্ট। UN ডিবেটের জন্য ওঁকে আনা হয়েছে।
‘ওর প্রাণের ওপর ধমকি দেওয়া হয়েছে,’ সুনয়ন রিধিমার জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিল। ‘আজ একজন চিনা ছেলে এসে ওর নামে একটা চিঠি দিয়ে গেছে— তাতে নাকি লেখা ছিল মনোজ যোশী কাল UN-এ গেলে ও আর দেশে ফিরে যাবে না।’ সুনয়ন গাড়িতে এসে বসে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করল। ‘ইণ্ডিয়ান কনসুলেট মনে করছে যে নেপাল কনসুলেট এর পেছনে আছে। ওরাই ভয় দেখাচ্ছে যাতে ইণ্ডিয়ান এক্সপার্টরা কাল UN-এ ডিবেটে না যায়।’
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘মিনিট পনেরর একটা কাজ আছে। সেটা সেরেই ফিরে আসছি।’
রিধিমার মনে এবার চিন্তাটা ঢুকল এটা কেমন হল? ভক্তি থাকে ম্যাসাচুসেটসে, ওর নিউ ইয়র্কের লাইসেন্স প্লেট; আর সুনয়ন থেকে নিউ ইয়র্কে, ওর ম্যাসাচুসেটসের লাইসেন্স প্লেট! চিন্তাটা খচখচ করে বিধতে লাগল রিধিমার মনে৷
পনের মিনিটের মধ্যে সুনয়ন একটা ফেডেক্স অফিস প্রিন্ট অ্যাণ্ড শিক সেন্টারের পার্কিং লটে গাড়ি থামাল। ভিতরে একটা ছেলে সুনয়নের অপেক্ষা করছিল। সুনয়নকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাসল। ‘রেডি?’
ছেলেটা বলল, ‘হ্যাঁ।’ ছেলেটা সুনয়নের হাতে একটা ব্রাউন এনভেলপ দিল। ব্রাউন এনভেলপটা নিয়ে গাড়িতে উঠে মাথার ওপরে রিডিং লাইটটা জ্বালল সুনয়ন। ‘দেখুন তো এটা ঠিক লাগে কিনা?’
‘এটা কী?’ রিধিমা কৌতূহলী।
‘খুলুনই না।’
রিধিমা এনভেলপ খুলে অবাক—
‘হার্ভার্ড স্টুডেন্ট ID!’
‘ফোটোশপ করে এর চেয়ে ভাল ফ্যাক্সিমিলি বের করা যেত না।’
‘এটা করলেন কীভাবে?’
‘এর পিছনের ম্যাগনেটিক স্ট্রীপটা ফেক। এটা ক্যাশ মেশিনে কাজ করবে না। ভেণ্ডিং মেশিন, ক্যাম্পাস লঞ্জি, ডাইনিং হলের, বা আপনাদের পার্কিন্স হলের অ্যাকসেস এই কার্ডে হবে না। তবে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারবে না।’
‘এটা কেন করলেন?’
‘এটা কাল আপনার UN-এ কাজে লাগবে। তবে খুব সাবধান। ফেক ID কার্ড রাখা একটা ফেলোনি, থ্রি ইয়ার্স ইন দ্য স্ল্যামার এণ্ড টেন গ্র্যাণ্ড মানিটারি ফাইন হতে পারে। ধরা পড়লে হার্ভার্ড আপনাকে বের করে দেবে এবং আরেকটা ক্রিমিনাল চার্জ আপনার মাথায় জুড়ে যাবে।’
আবার সেই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। সুনয়ন বলেছিল ঘরের সমস্ত আসবাব সেকেণ্ড হ্যাণ্ড, ক্রেইগ লিস্ট থেকে কেনা কিংবা ফ্রিতে জোগাড় করেছে । লোকটার কথা বিশ্বাস হয় না। হঠাৎ রিধিমার চোখের সামনে একটা পথ খুলে গেল। ‘ডার্ন!’ রিধিমা নিজেকে ধিক্কার দিল। ‘এতক্ষণেও কথাটা মনে আসেনি? সুনয়নের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড ভক্তি হলে ওর গাড়ির কাস্টম প্লেট নাম্বারও ভক্তি হওয়াটা কি অসম্ভব?’
সুনয়ন বাথরুমে স্নান করতে ঢুকতেই রিধিমা স্যালিকে ফোন লাগাল। স্যালি টিভিতে খবর দেখছিল। রিধিমার ফোন পেয়ে টিভিটা মিউট করে দিল।
‘স্যালি, একটা হেল্প চাই।’
‘এনিথিং ফর ইউ, হান,’ স্যালি ফিসফিস করে বলল।
স্যালি, দুটো গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের নম্বর ইনফোট্রেসারে চেক করে আমাকে জানাতে পারবে ওদের মালিক কে?’
‘নাম্বারগুলো বল।’
‘একটা হল কাস্টম প্লেট নাম ভক্তি। আর দ্বিতীয়টা সিটিডি-১৫১২। প্রথমটার লাইসেন্স প্লেট নিউ ইয়র্কের, আর দ্বিতীয়টার লাইসেন্স প্লেট ম্যাসাচুসেটসের।’
স্যালি কাগজে নোট করে নিল।
‘তোমাকে বোধহয় চার ডলার মত ক্রেডিট কার্ড থেকে পেমেন্ট করতে হবে। আমার ক্রেডিট কার্ড তো কাজই করছে না।’
‘দ্যাটস ফাইন হানি,’ স্যালি বলল। ‘যখন দেখা হবে স্টারবাকস থেকে কফি খাইয়ে দিও। আর হ্যাঁ, আমি তোমার বুদ্ধার মায়ের মন্দির গোটা হার্ভার্ডে খুঁজে বেরিয়েছি। পুরো হার্ভার্ডে একটাও বুদ্ধার মায়ের মন্দির নেই।’
রিধিমা ফোন বন্ধ করল। রিধিমা জানে কী-বোর্ডের ওপর স্যালির আঙুলগুলো মুষলধারা বর্ষণের মত ঝমঝম করে দ্রুত আছড়ে পড়ে। খুব তাড়াতাড়ি স্যালির ফোন আসবে।
‘রিধিমা!’ স্যালির ফোন একটু পরেই এল। স্যালি উত্তেজিত। ‘আশ্চর্য! এদের ওনারশিপ সোয়াপ করেছে।’
‘মানে?’
‘নাম্বার প্লেট ভক্তি লেখা গাড়ির মালিক সুনয়ন সীটাপোটি আর অন্য গাড়ির মালিক ভক্তি সীটাপোটি।’
‘তুমি শিওর?’
‘ইনফোট্রেসার তো তাই বলছে,’ স্যালি বলল।
একটা বড় জট খুলে গেল রিধিমার সামনে থেকে। তার মানে ভক্তি মিথ্যা কথা বলেছে। সুনয়ন গেছিল হার্ভার্ডে। ব্লিজার্ডের মধ্যে গাড়ি চালাতে গিয়ে ও গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করে, গাড়িটা মা’র গ্যারাজে রেখে মা’র গাড়ি নিয়ে নিউ ইয়র্কে ফিরে আসে। ব্লিজার্ড না থাকলে গাড়ি এতক্ষণে কোনও রিপেয়ারিং শপে চলে যেত। কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে সুনয়ন কেন গেছিল হার্ভার্ড? তবে কি খুনের সঙ্গে সুনয়নও জড়িত? তাই কি ডঃ উইকস ওর নাম লিখে গেছিলেন?
সুনয়নের শাওয়ার বন্ধ হল। রিধিমা ভাবল খল মানুষদের কী অপূর্ব সব মুখোশ হয়! রিধিমা ডঃ উইকসের খুনির আতিথ্য গ্রহণ করে আছে? অত্যন্ত চালাক এই লোকটা। এমনভাবে উপকার করে চলেছে যে মনে কোনও সন্দেহই আনতে দেয় না। অথচ এই লোকটা জানে কীভাবে রিধিমার হার্ভার্ডের জাল আইডেন্টিটি কার্ড বানাতে হয়। এই লোকটাই কি তাহলে রিধিমার ID কার্ড খুনের জায়গায় ফেলে এসেছিল যাতে পুলিশ রিধিমাকে সন্দেহ করে? ‘ইম্পসিবল!’ রিধিমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখন সে কী করবে? পুলিশে ফোন করবে? পুলিশ কি ওর কথা বিশ্বাস করবে? সম্ভাবনা কম, আগে ওকেই অ্যারেস্ট করবে। নাকি ও এখন চুপচাপ অভিনয় করে যাবে? কাল UN-এ ঢোকার পর এই লোকটার মুখোশ খুলে দেবে।
বাথরুমের দরজা খুলে সুনয়ন বেরোল। একটা বড় শ্বাস নিয়ে তৈরি হল রিধিমা। অভিনয় করা এখন সম্ভব না। একটা এস্পার ওস্পার হয়ে যাক।
‘ডঃ উইকসের খুনের দিন আপনি কোথায় ছিলেন?’ রিধিমার চোখ খোলা ল্যাপটপে।
সুনয়ন প্রস্তুত ছিল না হঠাৎ এই প্রশ্নের জন্য— ‘কেন? আমার অ্যাপার্টমেন্টে। যা বরফ পড়ছিল—’
‘মিথ্যা কথা!’ রিধিমা ধমকে বলল। ‘হার্ভার্ডে গেছিলেন। সত্যি কিনা বলুন?’ সুনয়ন নিরুত্তর।
‘খুন করে হার্ভার্ডের রাস্তায় আপনার গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তাই ভাঙা গাড়ি আপনার মায়ের গ্যারাজে রেখে আপনি মায়ের গাড়ি নিয়ে ফিরে আসেন। আমি সেই গাড়ি দেখেছি। আর এও আমি জেনেছি আপনার এই হণ্ডা সিভিকের মালিক আপনি না, আপনার মা ভক্তি সীটাপোটি। স্বপ্নেও ভাবিনি, আপনার মাও এই খুনের সঙ্গে জড়িত। ছিঃ! আমি পুলিশ ডাকছি। আমার যা হওয়ার হোক । রিধিমা সুনয়নের দেওয়া সেলফোন বের করল।
সুনয়ন রিধিমাকে বাধা দিল— ‘আপনার একটা বড় ভুল হচ্ছে—’
‘ভুল হয়েছিল এখন সে ভুল ভেঙে গেছে। কেন আপনি চারজন প্রফেসরকে খুন করলেন?’ রিধিমার গলার স্বর উচ্চগ্রামে।
‘কিছুক্ষণ সময় চাইছি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য,’ সুনয়ন বলল।
‘আউট অফ কোয়েশ্চেন! আমার প্রশ্নের এক্ষুনি উত্তর দিন, না হলে আমি পুলিশকে সব বলব।’
‘এতবার যখন আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছি, তখন একবার বিশ্বাস করুন, ঠকবেন না।’ সুনয়ন বলল।
‘মাকে দেখে যত সিম্পল মনে হয়, আপনি মোটেই ততটা সিম্পল নন। আসল পরিচয় কী?’
‘আমি একজন হ্যাকার।’
‘আপনি জার্নালিস্ট নন?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু গোটা রিচমণ্ড গেজেট খবরের কাগজের অফিসটা হল উপরের খোলস। আর নিচে যে সার্ভার রুম দেখলেন ওটা আমাদের হ্যাকারদের সার্ভার। ওখানে মিলিয়নস অ্যাণ্ড মিলিয়নস ডেটা স্টোর করা, বড় বড় ক্রিমিনাল, পলিটিশিয়ান, সেলিব্রিটি সকলের পাসওয়ার্ড স্টোর করা। মিলিয়নস অব ক্রেডিট কার্ড ইনফরমেশন। কে কখন কোথায় লাখ লাখ ডলার খরচা করছে সেটা আমরা জানতে পারি। আমরা এখান থেকেই আণ্ডারওয়ার্ল্ডেরও খবরাখবর জোগাড় করে সেই খবর বড় বড় নিউজ এজেন্সিকে বিক্রি করি,’ সুনয়ন বলল।
‘আপনার সঙ্গে ডঃ উইকসের খুনের কী সম্পর্ক?’
‘সব বলছি, একটু ধৈর্য ধরুন।’ সুনয়ন নিজেকে যেন প্রস্তুত করে নিল। তারপর বলল, ‘রোববার দুপুর একটা নাগাদ মা’র ফোন এল। মা বলল ডঃ উইকস স্পিকারে পাশে আছেন। ফোনটা নামিয়ে রাখছিলাম, কিন্তু ডঃ উইকস বললেন ওঁর আর আমার মা’র খুব বিপদ! কদিন ধরে ওঁর কাছে ফোনে বেনামী শাসানি আসছে যে লিখে দিতে হবে যে পিতরাওয়ার হাড় সত্যি বুদ্ধের হাড়। না হলে তাকে খুন করা হবে। একটু আগে ওঁকে একটা আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে আজ সন্ধ্যা আটটা ডেডলাইন। তার মধ্যে না লিখে দিলে ওকে খুন করা হবে। পুলিশে খবর দিলে আমার মাকে খুন করা হবে। ডঃ উইকস আমার মা’র লাইফের কোনও রিস্ক নিতে চান না, উনি বললেন আমি যেন এক্ষুনি হার্ভার্ড আসার চেষ্টা করি। মা’কে নিয়ে নিউ ইয়র্কে ফিরে আসি। মা কেঁদে বললেন যেভাবেই হোক তোর বাবাকে বাঁচা সুনয়ন। বাইরে তখন বম্ব-সাইক্লোন নিউ ইয়র্ককে অলরেডি হিট করে গেছে, রাস্তায় একফুট বরফ, আমি রওনা দিলাম । তুষারঝড়ে রাস্তায় ভিজিবিলিটি একদম ছিলনা, গাড়ি জোরে চালানো যাচ্ছিল না, রাস্তায় অন্য গাড়ি একেবারে নেই বললেই চলে, শুধু কয়েকটা লং ডিস্টেন্স কার্গো ট্রাক চলছে।’ সুনয়ন অন্যমনস্ক, যেন চারদিন আগেকার অতীতে চলে গেছে ‘রাত আটটা ডেডলাইন। আমার ক্যালকুলেশন অনুযায়ী হার্ভার্ড পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধ্যা সাড়ে ছটা সাতটা বাজবে। আমি ভেবেছিলাম ওদের দু’জনকেই সঙ্গে নিয়ে সে রাতেই ফিরে আসব নিউ ইয়র্ক। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল, শুধু বরফের ঝড় উইগুশিন্ডে আছড়ে পড়ছে। আমি দেখলাম এভাবে চললে পৌঁছোতে পারব না। স্পিড বাড়ালাম, যা থাকে কপালে—’
‘তারপর?’
‘ম্যাসাচুসেটসে নির্জন হাইওয়েতে আমার গাড়ির সামনের ডান দিকের চাকাটা ফ্ল্যাট হল। স্টিয়ারিং হুইলের কন্ট্রোল হারালাম। গাড়ি রাস্তা থেকে বেরিয়ে ডানদিকের একটা বোর্ডে সজোরে ধাক্কা মেরে আটকে গেল। ডান দিকের হেডল্যাম্প ভেঙে চৌচির, এয়ারব্যাগ ডিপ্লয় করল।’
‘তারপর?’
‘তাড়াতাড়ি ডোনাট টায়ারটা লাগাতে আরম্ভ করলাম। রাস্তায় কোনও গাড়ি নেই যে লিফট চাইব। গাড়ি রাস্তায় ফিরিয়ে আনতে বেশ অনেকটা সময় লাগল । ঘড়ি দেখলাম, আর কোনও উপায় নেই, ডঃ উইকসকে ফোন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু স্নো-স্টর্ম আমাকে একটা ফ্রাস্ট্রেটিং ডেড জোনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিছুতেই ফোনের সিগনাল পেলাম না।’ সুনয়ন ডান হাতের মুঠি পাকিয়ে বাঁ হাতের তালুতে মারল। ‘বাঁচাতে পারলাম না।’
‘তারপর আপনি আপনার গাড়ি আপনার মা’র ব্যাক-ইয়ার্ডের গ্যারাজে রেখে মায়ের গাড়ি নিয়ে নিউ ইয়র্কে ফিরে এলেন—’ রিধিমা জিগস জুড়ে চলেছে।
‘ঠিক।’
‘আপনার মা কেন আপনার সঙ্গে এলেন না?’
‘মা বলল, পুলিশ নিশ্চয়ই মা’র খোঁজে আসবে— মা’কে না দেখলে ওদের সন্দেহ হবে এটা আমাদের কাজ।’
রিধিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর মনে পড়ল ডঃ উইকস দাবা খেলতে খেলতে বলতেন দাবাড়ুদের মাথা বরফের মত ঠাণ্ডা রাখতে হয়। চরম বিপদের মধ্যেও ফোকাস হারাতে নেই। বলতেন— ‘মনে পড়ে আর্কিমিডিসকে? রোমান সৈন্যরা— তাঁকে ঘিরে ধরেছে, তিনি চারদিকের ঘাতকদের অবজ্ঞা করে নিজের অঙ্ক কষে চলেছেন ঠাণ্ডা মাথায়।’ আর্কিমিডিসরা এ যুগেও আছে। হার্ভার্ড তার সাক্ষী ।
‘আমার যা বলার আপনাকে বললাম। বিশ্বাস না হলে—’ সুনয়ন ফোনটা রিধিমার হাতে দিল— ‘পুলিশ ডাকতে পারেন।’
‘আপনাকে বিশ্বাস করা শক্ত,’ রিধিমা ফোনটা নামিয়ে বলল। ‘আরও প্রমাণ চাই আমার।’
‘প্রমাণের খুব কাছাকাছি এসে গেছি। আমাকে আজ রাতটুকু সময় দিন।’ সুনয়ন ল্যাপটপ খুলল।
৷৷ আটত্রিশ ৷৷
রাতের বেলা মনাস্টারি প্রেতপুরীর মত নিঝুম। ঘরের মাঝখানে মেঝেতে কিছু হাড় ছড়ানো, অন্যমনস্কভাবে হাড়গুলোর ধারগুলো ভালভাবে দেখছিল হরিপরসাদ। ওর মনের মধ্যে উত্তর না পাওয়া প্রশ্নগুলো ঘুরছিল। নেশার জন্য মাথার ভিতর দাপাদাপি অনেকক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। টু ডাইমেনশন জিগসতে শুধু ইন্টারলকগুলোর খেয়াল রাখতে হয়, কিন্তু থ্রি ডাইমেনশনে সারফেস কার্ভেচারটাও মনে রাখতে হয়। বুদ্ধের হাড়! হাজার হাজার নানান সাইজের ছোট বড় হাড় জুড়ে বুদ্ধের কঙ্কাল বানানো কোনও মানুষের দ্বারা সম্ভব না। হরিপরসাদ শিওর যে গডম্যান বুদ্ধও পারতেন না। রিনপোচে বাইরে কোথাও গেছিল, এখন ফিরল। হরিপরসাদকে দেখে খুশি হল রিনপোচে— ‘এখনো কাজ করছ?’
আপনার জন্য বসে আছি, আজকের কোটার পাউডারটা চাই। সারা শরীরে অস্বস্তি বেড়েই চলেছে।’
রিনপোচের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। চীবরের ভিতর থেকে হরিপরসাদের হাতে একটা প্যাকেট দিল। প্যাকেটটা নিয়ে হরিপরসাদ বলল, ‘কিন্তু এই হাড় আপনি কোথায় জুড়বেন? ফটোতে?’
‘না জীবিত মানব দেহে,’ রিনপোচে পাশে বসল৷
চমকে গেল হরিপরসাদ— ‘কার দেহে?’
‘মঞ্জুশ্রী লামা।’
‘মঞ্জুশ্রী লামা!’ হরিপরসাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ‘আমাদের এখানে একটা স্টেট অব দ্য আর্ট অপারেশন থিয়েটার আছে।’
‘মানে?’
‘বুদ্ধের কপালের হাড় এখন মঞ্জুশ্রী লামার কপালে, পায়ের গোড়ালি, দুটো কাঁধের হাড়, হাতের কবজি—’
হরিপরসাদ শিউরে উঠল। এবার বুঝতে পারছে মঞ্জুশ্রী লামা অত কুৎসিৎ কেন। আর কেনই বা তাকে হুইল চেয়ার নিতে হয়েছে।
‘মেডিক্যাল সায়েন্স এখন অনেক অ্যাডভান্সড,’ রিনপোচে লামা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল। ‘ডলার ছড়ালে পৃথিবীর নামকরা অর্থোপিডিক সার্জনরা এসে গোপনে এই সার্জারি করে যায়। ডাক্তারের চিন্তা আমাদের নেই, আমাদের অভাব ভাল জিগস পাজলারের। কোন হাড় শরীরের কোন জায়গায় বসবে সেটা নির্ধারণ করা—’
‘সে জন্য আমার আগের নিউ ইয়র্ক জিগস ডার্বির চ্যাম্পিয়ন লিওনার্ড মোরাস্কিকে গত সামারে আপনারাই ধরে এনেছিলেন?’
‘ঠিক,’ রিনপোচে লামা মাথা নাড়ল। ‘এত নিষেধ সত্ত্বেও ও পালাতে গিয়ে আমাদের মনাস্টারির হাই-ভোল্টেজ ফেন্সে ইলেক্ট্রোকিউটেড হয়ে মারা গেল, তাই তোমার সাহায্য নিতে হল।’
‘মঞ্জুশ্রী লামার গোটা কংকাল পালটে দেবেন?’ হরিপরসাদ শিউরে উঠল। ‘তাহলে মঞ্জুশ্রী লামা মারা যাবেন!’
‘বোধিসত্ত্বরা চিরকাল মানবকল্যাণের জন্য নির্বাণকেও ত্যাগ করে এসেছেন। এটা ঠিক যে ওঁর শরীরে কষ্ট ক্রমশঃ বাড়বে, একেকবার ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখেন ওঁর শরীরের একেক অঙ্গ বিকল হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে গলার স্বর বন্ধ হয়ে গেল, তারপর হাঁটাচলার ক্ষমতা চলে গেল, তারপর হাতের শক্তি— কিন্তু মানবকল্যাণের জন্য কষ্ট স্বীকার করার উদ্দেশ্যেই উনি এখনো বোধিসত্ত্ব আছেন,’ রিনপোচে বলল।
হরিপরসাদের মনে হল এই বদ্ধ উন্মাদের মাথায় যেন কোনওমতেই সন্দেহ না আসে। হরিপরসাদ চিন্তিত মুখে বলল, ‘এটা কঠিন কাজ, কিন্তু সমাধান সম্ভব।’
রিনপোচে লামা খুশি হল, ‘জানতাম তুমি পারবে।’
হরিপরসাদ অতি সন্তর্পণে হাড়গুলোকে সাজিয়ে রাখল ক্যাসকেটের ভিতর। ক্যাসকেট বন্ধ করল। তারপর দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে ফিরে এল নিজের কামরায়।
অনেক রাত হয়ে গেছে। দু’জন প্রাণী হরিপরসাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘরের দরজার বাইরে রগ্যাপা লামা, আর দরজার ভিতরে লুসি। ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে লামাকে হরিপরসাদ বলল, ‘কিছু ফল-টল পাওয়া যাবে? খিদে পাচ্ছে।’
‘ওয়াটারমেলন?’ লামার মুখে হাসি।
‘শিওর।’ হরিপরসাদ প্লেট ধুতে বাথরুমে ঢুকল। বাথরুমের দরজা খোলা, লোকটা দেখছে হরিপরসাদ সিঙ্কে প্লেট ধুচ্ছে। এবার হরিপরসাদ দরজা বন্ধ করল, তারপর চীবর থেকে মেথের সাদা পাউডার বের করে কোরেলের সাদা প্লেটে ঢেলে ছড়িয়ে দিল। তারপর বেরিয়ে এল।
কিছুক্ষণ পর লামা এক প্লেট তরমুজের টুকরো নিয়ে ঢুকল। হরিপরসাদ বেশ কয়েকটা তরমুজ যত্ন করে লামার সামনে তুলে রাখল ওর মেথ মাখানো প্লেটে। রাখার সময় খেয়াল রাখল যাতে টুকরোগুলোতে সাদা উইড পাউডার মেখে যায় ভালভাবে। তারপর বাকিটা খেয়ে নিজের প্লেটটা তুলে দিল লামার হাতে— ‘আপনি খান?’
লামা না না করল।
‘নো?’ হরিপরসাদ প্লেট হাতে তাকাল লামার দিকে। ‘নাহ্ ঝুটাহ্।’ মেথ মাখানো তরমুজ রাখা প্লেটটা এগিয়ে দিল লামাকে। লোকটার দু-চোখ লোভে চকচক করছে। রান্নাঘরে গিয়েই গিলবে তরমুজ।
‘থ্যাঙ্কস!’ হরিপরসাদ বলল। ‘গুড নাইট!’
‘গুড নাইট।’ রগ্যাপা লামা তরমুজের প্লেট নিয়ে চলে গেল।
হরিপরসাদ ঘরের আলো নিভিয়ে খাঁচা খুলে লুসিকে পাশে টেনে নিল কুকুররা কীভাবে টের পায় কে জানে— হয়তো হরিপরসাদের হার্টবিট যে বেড়ে গেছে এটা লুসি ধরতে পেরেছে। আজ শুতে যাবার নাম করছে না।
রাত বাড়তে লাগল— এক ঘন্টা, দু-ঘন্টা— হরিপরসাদ এবার ধীরে ধীরে গেরুয়া জ্যাকেট, উলের মোজা, চামড়ার জুতো, উলের টুপি পরল, তারপর সন্তর্পণে দরজা খুলল। মাথা বের করে হলওয়ের দু’দিকে উঁকি মেরে দেখে নিল। রগ্যাপা লামা পাহারায় নেই, হলওয়ে ফাঁকা। লোকটা হয়তো নিজের বিছানায় নেশায় স্টোনড হয়ে জ্ঞানহীন। কামরার দরজা ধীরে টেনে বন্ধ করে হলওয়ে দিয়ে পিছনের এক্সিট লেখা দরজা খুলে ফেলল হরিপরসাদ।
দরজা খুলতেই ঠাণ্ডা হাওয়া হাড় কাঁপিয়ে দিল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা টেনে দিল হরিপরসাদ। এই দরজা বাইরে থেকে খোলা যায় না। আর পিছন ফেরার কথা চিন্তাই করছে না হরিপরসাদ। লুসিকে কোলে তুলে দৌড় লাগাল গ্রীনহাউসের দিকে। পিছনে গোটা মনাস্টারি অন্ধকারে ঘুমিয়ে কাদা। এবার পাহাড়ের নিচের দিকে নামতে নামতে গ্রীনহাউসের সামনে পৌঁছে গেল হরিপরসাদ। ফেন্স সামনেই। গ্রীনহাউসের দরজা ল্যাচ দিয়ে আটকানো। ল্যাচ খুলে ভিতরে ঢুকতেই পচা মাংসের গন্ধ নাকে ধাক্কা মারল। মনে হচ্ছে বমি হয়ে যাবে। যেন একটা স্লটার হাউসে ঢুকেছে। চীবর দিয়ে নাক চেপে ধরল হরিপরসাদ। অন্ধকারে চোখ সইতে কিছুক্ষণ সময় নিল। ড্রেনটা কোনদিকে? লুসিকে মাটিতে নামাল হরিপরসাদ। লুসির ওপর ভরসা খুব হরিপরসাদের, আগে অনেকবার খরগোশ শিকারে নিয়ে গেছে ওকে। ক্ষুদে ক্ষুদে পা হলে কী হবে, ওরা ব্যাসেট হাউণ্ড, গন্ধ শুঁকে বলে দেয় মাটির নিচে গর্তে জ্যান্ত খরগোশ আছে কিনা। গ্রীনহাউসের পিছন দিকে একটা বড় বাথটব। লুসি ওর কাছে গেল। বাথটব বরফে ভরা, পচা গন্ধটা এই বরফের মধ্যে থেকে আসছে। কিছু একটা রাখা আছে এর ভিতর। মৃতদেহ? বাথটবের পাশে লুসি থাবা দিয়ে এত জোরে আঁচড়াতে লাগল যেন ও আঁচড়েই গর্ত করে দেবে। হরিপরসাদ বাথটবটা জোরে ঠেলে সরাল। একটা প্লাস্টিকের চাদর। লুসি ওখানে আঁচড়াতে লাগল। হরিপরসাদ লুসিকে পাশে টেনে নিল, চাদরটা সরাতেই উন্মুক্ত হল একটা কংক্রিটের মোটা পাইপ। পাইপটা তেরছা ভাবে নিচে নেমে গেছে। ‘গো লুসি!’ হরিপরসাদ লুসিকে ছেড়ে দিতেই লুসি পাইপের ভিতর ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল ৷ হরিপরসাদও নিজের শরীরটা ঢুকিয়ে দিল পাইপের মধ্যে। ড্রেন পাইপটা নিচের দিকে নেমে গেছে, ভিতরে ঝুরো বরফ। লুসির পিছনে পিছনে হরিপরসাদ বাচ্চাদের স্লাইডের মত পাইপের ভিতর দিয়ে হুশ করে অনেকটা নিচে নেমে গেল। তারপর পা দিয়ে বরফ ঠেলতে ঠেলতে নিচে নামতে লাগল, পিঠ ঠাণ্ডা জলে ভিজছে, মনে হচ্ছে ফ্রস্ট বাইট হয়ে যাবে। নিচে নামতে নামতে এক সময় হরিপরসাদ হঠাৎ দেখল মাথার ওপর অন্ধকার আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা, পিছনে উঁচু কাঁটা তারের ফেন্স, হরিপরসাদ কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে চলে এসেছে।
‘লুসি,’ ঠাণ্ডায় হরিপরসাদের দাঁত ঠকঠক করে কাঁপছে। ‘ডাহলিন, লেটস গেট আউট্টা ডিস ব্রিক হেল!’
লুসি বুঝল, আর পাহাড়ের বরফের ওপর দিয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল। হরিপরসাদ লুসিকে অনুসরণ করে নামতে নামতে বার কয়েক হোঁচট খেতে খেতে যখন নিচে জঙ্গলে পৌঁছোল তখন হঠাৎ মনাস্টারি যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। চারদিকে আলো জ্বলে উঠল মনাস্টারিতে।
‘লুসি কুইক, বাড্ডি!’ মরিয়া হয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছুটতে লাগল হরিপরসাদ। লুসিও বিপদের গন্ধ পেয়েছে, ও ওর গতি বাড়িয়ে দিল।
এবার পাহাড় স্নো-মোবিলের এক্সহস্টের ভটভট শব্দে জেগে উঠল। দুটো জোরালো লাইট নিচে নেমে আসছে বরফের ঢাল বেয়ে। লুসিকে অনুসরণ করে হরিপরসাদ ছুটে নেমে এসেছে অনেকটা পথ। হাঁফাতে হাঁফাতে পিছন ফিরে তাকাল হরিপরসাদ। স্নো-মোবিলগুলো নেমে আসছে পাহাড়ের ঢালে। হরিপরসাদ আবার ছুটল। জঙ্গলের কাছে এসে স্নো-মোবিলগুলো ঢুকতে না পেরে দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু এবার অন্ধকারে জঙ্গল দিয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে আসছে একঝাঁক টর্চের আলো। আবার গতি বাড়িয়ে দিল হরি পরসাদ, সামনে সামনে ছুটে চলেছে লুসি। হরিপরসাদ জানে এভাবে পালাতে পারবে না, লোকগুলো একটু পরেই ওকে ধরে ফেলবে। মরিয়া হয়ে ছুটতে ছুটতে ওরা জঙ্গল থেকে একটা পাকা রাস্তায় এসে উঠল। রাস্তায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল হরিপরসাদ। অন্ধকারে দূরে সামনে একটা গাড়ির হেডল্যাম্প এগিয়ে আসছে। ‘হেল্প-হেল্প!’ হরিপরসাদ অন্ধকার রাস্তার মাঝখানে দু’হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল। একটা NYPD লেখা গাড়ি ওর সামনে এসে থামল। গাড়ির ভিতর থেকে কেউ চেঁচিয়ে ডাকল ‘হরিপরসাদ?’
হরিপরসাদ গাড়ির দিকে ছুটে গেল।
‘গেট ইনসাইড, কুইক,’ একজন মোটাসোটা পুলিশ সার্জেন্ট গাড়ি থেকে নেমে এল, হাত পিস্তল হোলস্টারে। পিছনের দরজা খুলে বলল, ‘কুইক!’
হরিপরসাদ লুসিকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে উঠল। গাড়ির ইঞ্জিন চালু আছে। পুলিশটা তাড়াতাড়ি গাড়ির পিছনের দরজা বন্ধ করে দৌড়ে ড্রাইভারের সিটে এসে বসে গাড়িটা গিয়ারে ফেলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। গাড়ি যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে এগিয়ে চলল অন্ধকার রাস্তায়। ভিতরে পুলিশ সার্জেন্ট ভারি গলায় বলল ‘হ্যালো মিস্টার হরিপরসাদ, আই অ্যাম সার্জেন্ট ব্রায়ান স্পেনসার—’
‘থ্যাঙ্কস সার্জেন্ট, হরিপরসাদ হাঁফাচ্ছে। পিছন ফিরে তাকাল সে, রাস্তার ধারে অন্ধকারে অনেকগুলো টর্চের আলো দাঁড়িয়ে গেছে। ‘থ্যাঙ্কস,’ হরিপরসাদ আবার বলল। ‘রিলিজিয়াস সাইকোসিস! ভাবতেই পারিনি ওই হাইপার রিলিজিয়াস ম্যানিয়্যাকদের গ্রিপ থেকে বেরোতে পারব।’ পায়ের কাছে লুসি জিভ বের করে হাঁফাচ্ছে। হরিপরসাদের নিজেরও হৃদপিণ্ডের গতিও দ্বিগুণ। লুসিকে জড়িয়ে ধরল। লুসি হরিপরসাদের মুখ চেটে দিল একবার, তারপর আবার হাঁফাতে লাগল।
‘এনিথিং মিসচিভিয়াস ইউ নোটিসড ওভার দেয়ার?’ সার্জেন্ট বলল৷
হরিপরসাদের মস্তিস্ক সিগন্যাল দিল আর বাড়তি ঝামেলায় জড়িও না৷ ইউ আর অল সেট। এবার তাড়াতাড়ি পুলিশের ফর্মালিটি সেরে বাড়ি ফিরে গিয়ে সাদা পাউডার নাকে টানলেই আবার জীবন নর্মাল। ব্রেনে খুব কষ্ট হচ্ছে, চব্বিশ ঘন্টার ক্ষুধার্ত ব্রেনের ক্ষিধের জ্বালা। পাউডার এখন দরকার।
কিন্তু মঞ্জুশ্রী লামার কী হবে?
সিম্প্যাথি আছে মঞ্জুশ্রী লামার জন্য কিন্তু এখন নিজেকে আগে সামলানো দরকার, মেথ না পেলে শরীরে যে কোনও মুহূর্তে খিঁচুনি শুরু হতে পারে৷ প্লেন ড্যামেজ হয়ে ডেথ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু মঞ্জুশ্রী লামাই আমাকে পালাবার পথ বলে দিয়েছে। লোকটাকে ওই উম্মাদ রিনপোচে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিছুই কি আমি করব না? যুক্তিগুলো মাথার দিকে ছুটে এল, হরিপরসাদ পালটা যুক্তির ঢাল দিয়ে নিজেকে আড়াল করল কে হয় আমার ওই মঞ্জুশ্রী লামা? সাত দিন আগেও তো ওকে চিনতাম না। দেরি করলে যে কোনও সময় আমি নিজে কোল্যাপ্স করে যাব ৷ মঞ্জুশ্রী লামার যা হবে হোক, আমার কী আসে যায়? কাল সকালে দেখা যাবে। এখন দরকার সাদা পাউডার।
রিয়্যালি? মনে আবার যুক্তি হাজির— ও পালাবার রাস্তা না দেখালে পালাতে পারতাম? কাঁটাতারে ইলেকট্রিক শক খেয়ে মরতাম?
কিন্তু আমি কি ওকে হেল্প করতে পারব?
ও হুইলচেয়ারে বসে আমাকে হেল্প করতে পারলে আমি পুলিশের গাড়িতে বসেও ওকে হেল্প করতে পারব না?
মানসিক দ্বন্দ্বে শরীর দুমড়ে যেতে লাগল হরিপরসাদের। দেহের পেশীতে খিঁচুনি শুরু হয়ে গেছে। গাল কুঁকড়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে উত্তপ্ত মরুভূমি। হরিপরসাদের শরীরের মধ্যে হঠাৎ একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হল ‘টার্ন দ্য কার অ্যারাউণ্ড!’ হরিপরসাদ চিৎকার করে উঠল।
‘হোয়াট হ্যাপেন্ড!’ ব্রায়ান বিস্মিত হরিপরসাদের চিৎকারে। ও বুঝতে পারছে না কী হল?
‘মনাস্টারিতে ফিরে চলুন, এক্ষুনি, প্লিজ!’
‘হোয়াট?’
‘যেতেই হবে,’ হরিপরসাদের হৃদস্পন্দন খুব বেড়ে গেছে, হাতের তালু, কপাল ঘামছে। কোনওরকমে ওর গলা দিয়ে কাকুতি বেরিয়ে এল, প্লিজ! দেরি করবেন না। মঞ্জুশ্রী লামা ভিতরে আটকা পড়ে আছে।’
‘হু?’
হরিপরসাদের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। সারা শরীর মনে হচ্ছে নিংড়ে শরীরের সব শক্তি বাইরে বেরিয়ে গেছে। কীভাবে একে এত কথা বোঝাবে? হরিপরসাদ বলল— ‘দ্য লামা অন আ হুইলচেয়ার। দেরি করলে ওরা ওকে মেরে ফেলবে! প্লিজ, আই বেগ ইয়ু!’
বিস্মিত সার্জেন্ট ব্রায়ান স্পেনসার রেডিও সুইচ অন করল।
৷৷ উনচল্লিশ ৷৷
‘কলিং অল ইউনিটস। ব্রায়ান ইলেভেন,’ সার্জেন্ট ব্রায়ান স্পেনসার এক সেকেণ্ড বিরতি দিয়ে আবার কথা বলল। ‘টেন এইটি ফাইভ।
‘ব্রায়ান ইলেভেন, কোড ফোর?’ মহিলা ডিসপ্যাচারের খ্যাস-খ্যাস আওয়াজ রেডিওতে এল।
‘কোড ফোর। গো অ্যাহেড।’
‘টেন সেভেন?’ মহিলা ডিসপ্যাচারের গলা।
ব্রায়ান বলল ‘ওরিয়েন্টাল বোধি মনাস্টারি নিয়ার লেক জর্জ।’
‘হু ইজ মাই আর পি?’
‘আর পি ইন মাই ভিহেকেল। নিড সার্চ ওয়ারেন্ট।’
লিশ সার্জেন্ট দুর্বোধ্য রেডিও কোডের আদান প্রদান করে চলেছে হরিপরসাদ যার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পারলেও সার্জেন্টের মুখ দেখে বুঝতে পারল কেসটা পুলিশ টেক ওভার করে নিয়েছে। হরিপরসাদ স্বস্তি পেল। নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আর জবাবদিহি করতে হবে না।
ওয়াকিটকি বন্ধ করে ব্রায়ান হরিপরসাদকে বলল, ‘লেটস নেইল দেম!’
কিছুক্ষণের মধ্যে লেক জর্জ পুলিশের সাইরেন মুখর হয়ে উঠল। পাহাড়ের নিচের মনাস্টারির চেক পোস্টে চারটে পুলিশের গাড়ি আর একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল। পাহাড়ি পথ বেয়ে পাহাড়ের উপর থেকে অন্ধকার চিরে এঁকেবেঁকে নেমে আসছে গাড়ির একজোড়া হেডল্যাম্প।
‘ইউ স্টে হিয়ার,’ ব্রায়ান হরিপরসাদের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নামল। একটা সিক্সটিন সিটার মিনিবাস উপর থেকে নেমে এসে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে গেল। দুটো পুলিশ ভ্যান রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে। বন্দুকধারী চারজন পুলিশ ছুটে গেল। এবার ব্রায়ান সকলের আগে। বাসের গেট খুলে দেওয়া হল। ব্র্যায়ান বন্দুক উঁচিয়ে বাসে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল— ‘এভরিওয়ান’স হ্যান্ডস গো আপ, অর আই উইল শ্যুট!’
বাসের ভিতরে আটজন লামা সকলে হাত উপরে তুলল। বাসের মাঝামাঝি আরেকটা দরজা। সেখানে ডানদিকের একটা সিট খুলে সেখানে হুইলচেয়ার বসানো। হুইলচেয়ারে বসে একজন লামা, মাথা কাত হয়ে রয়েছে, মনে হচ্ছে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, সে হাত তুলল না।’
ব্রায়ান বুঝল এই হল হরিপরসাদের লামা অন হুইলচেয়ার।
‘গেট ডাউন, ওয়ান বাই ওয়ান,’ ব্রায়ান হুংকার ছেড়ে বাস থেকে নেমে এল। লামারা বাধা দিল না। হাত মাথায় তুলে একে একে বেরিয়ে এল বাস থেকে। পুলিশ প্রত্যেকের হাতে হাতকড়ি পরিয়ে ভ্যানে ঢোকাতে লাগল। ব্রায়ান আবার বাসের ভিতর ঢুকল। হুইলচেয়ারে নেতিয়ে বসে আছে লামা। ‘বাড্ডি! লেটস গেট আউট,’ ব্রায়ান মঞ্জুশ্রী লামাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে নিচে নেমে এল। এবার পুলিশের ভ্যানের পাশে অপেক্ষামান অ্যাম্বুলেন্সের তৎপরতা শুরু হয়ে গেল। শীঘ্রই মঞ্জুশ্রী লামাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
ব্রায়ানের পুলিশের গাড়ির ভিতর থেকে কুকুরের চিৎকার আসছে। পুলিশ রা লামাদের হ্যাণ্ডকাফ পরিয়ে নিজেদের গাড়ির পিছনে ঢোকাতে ব্যস্ত। ব্রায়ানের রেডিও খ্যাস-খ্যাস করে উঠল। মহিলা ডিসপ্যাচারের গলা— ‘ব্রায়ান ইলেভেন?’
ব্রায়ান স্পেনসার রেডিও অন করল, ‘ব্রায়ান ইলেভেন, গো অ্যাহেড।’
‘আপডেট?’
‘সাস্পেক্টস ইন কাস্টডি। ওয়ান টেন-ফিফটি-সেভেন রেস্কিউড
‘কণ্ডিশন অব দ্য মিসিং পার্সন?’
‘এনরুট অলবানি মেডিক্যাল।’
‘কপি।’ ডিসপ্যাচার বলল।’
সার্জেন্ট ব্রায়ান স্পেনসারকে তৃপ্ত দেখাল। ডান হাত কপালে ঠেকিয়ে অন্ধকারে একটা স্যালুট ঠুকে নিজে নিজেই বলল— ‘ওর্জুন! থ্যাঙ্কস বাড! ইউ হ্যাভ মেড মাই ডে।’ গাড়ির ভিতর থেকে কুকুরটা ডেকেই চলেছে। ব্রায়ান বিরক্ত হয়ে নিজের গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল, ‘ইউ আর অল সেট মিস্টার হরিপরসাদ, প্লিজ স্টপ ইয়োর ডগ। হরিপরসাদের দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে সিটে বসতে গিয়ে থমকে গেল ব্রায়ান। ব্যাকসিটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিঃ হরিপরসাদ, মিঃ হরিপরসাদ। হোলি সুগার!’ ব্রায়ান ছিটকে বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে, চেঁচিয়ে পাশের পুলিশকে বলল, ‘কল দ্যাট অ্যাম্বুলেন্স ব্যাক। ইমিডিয়েটলি!’ গাড়ির পিছনের দরজায় ছুটে গেল ব্রায়ান। দরজা খুলে সামনের দিকে ঝুঁকল। হরিপরসাদের মাথাটা সিটের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। হরিপরসাদের দেহটা টেনে সিটে তুলল ব্রায়ান। এবার লুসি চুপ করল।
