কপিলাবস্তুর কলস – ৪০
৷৷ চল্লিশ ৷৷
ডাবল অ্যারো মার্কেট প্লেসের মালিক লি ঝেনের একটা ম্যানিয়া হল নিজের বিটকয়েন ওয়ালেট মাঝেমাঝেই চেক করা। এটা আজকের অভ্যাস না, দেড় দশক আগে টোকিওর বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সয়ের চারশ’ ষাট মিলিয়ন ডলার বিটকয়েন হ্যাকাররা গায়েব করে দেওয়ার সময় লি ঝেন যে ঝটকাটা খেয়েছিল সেটার হ্যাংওভার এখনো আছে। আমেরিকান ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলোর মত বিটকয়েন অ্যাকাউন্ট ইনসিওরড থাকে না। হ্যাক হয়ে বিটকয়েন চুরি গেল তো গেল। লেক জর্জের মনাস্টারি থেকে ফেরার পর থেকেই লি ঝেনের মুডটা খিঁচিয়ে গেছে। অনেক আশা করেছিল সে, বোধহয় রিনপোচে তার বুদ্ধের হাড় কিনেই নেবে, তাই ডেকেছে। কিন্তু ধড়িবাজ বুড়ো এমন অপমানজনক ভাবে কোয়েশ্চেন করছিল যে তার মনে হচ্ছিল একটা ভেটেরান বেশ্যাকে কাস্টমার এসে কমপ্লেন করছে সে কেন ভার্জিন না।
মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ঘুম আসছে না লি ঝেনের। ম্যানহাটনের সাত তারা হোটেল হিউগোর এগারতলার বিরাট কাঁচের জানলা দিয়ে রাতের নিউ ইয়র্ক দেখা যাচ্ছে। আলোকমালা আবার শহরে ফিরে এসেছে। অন্যমনস্ক হয়ে ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে লি ঝেন ল্যাপটপ খুলল। হোটেলের ওয়াইফাই ব্যবহার করে না লি ঝেন। সেলফোনের পার্সোনাল হটস্পট থেকে ল্যাপটপে ওর বিটকয়েন ওয়ালেট চেক করল। সব ঠিক আছে। এবার সে ডাবল অ্যারো মার্কেট প্লেসে অকশন সাইটে ঢুকল। অকশন কাল রাত নটায়। আবার ঘড়ি দেখল লি ঝেন, অ্যাকচুয়ালি আজ রাত নটায়। আটজন বিডার ইন্টারেস্ট দেখিয়েছে। এক বিলিয়ন ডলার না পেলেও অর্ধেক দাম তো উঠবেই। নেপাল গভর্নমেন্ট যদি কাল UN-এ স্বীকার করে নেয় যে পিতরাওয়ার স্তূপের হাড় সত্যিকারের বুদ্ধের হাড়, তবে বিডিং প্রাইস এক বিলিয়নে উঠে যেতে পারে।
অকশন সাইটের ই-মেইল ইনবক্সে অনেক প্রশ্ন। সকলেই ইনভিজিবল । কিন্তু আবোল তাবোল বিডার একজনও নয়। সকলেই রেজিস্ট্রেশন করেছে এই অকশনের জন্য হান্ড্রেড থাউজ্যাণ্ড ডলারসের ইকুইভ্যালেন্ট বিটকয়েন দিয়ে। প্রত্যেকের অ্যাকাউন্ট অকশন সিকিউরিটি মানি ডাবল অ্যারোকে অথরাইজ করে রেখেছে। একটা প্রশ্নে লি ঝেনের চোখ আটকে গেল। সাবজেক্টে লেখা—
অকশন – ওয়ান বিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন
কৌতূহলে লি ঝেন ইমেইলটা ক্লিক করল এবং ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে লি ঝেনের মনে হল কিছু একটা গ্লিচ আছে। ডিফেন্ডার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম গুর ল্যাপটপে একটা ম্যালওয়্যার ওয়ার্নিং দিল। পরক্ষণেই ওয়ার্নিং-এ ওয়ার্নিং-এ ভরে গেল ল্যাপটপ স্ক্রিন। লি ঝেন বুঝল ডাবল অ্যারোর সিকিউরিটি ব্রিচ করে হ্যাকার ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দিল। এবং যত সময় যাবে ম্যালওয়্যার ফাইল আনপ্যাক করবে আরও ম্যালওয়্যার ফাইল, তারপর রক্তবীজের ঝাড়ের মত এই ম্যালওয়্যার সফটওয়্যার গোটা ডাবল অ্যারোতে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর সেই রিমোট অ্যাটাকার ডাবল অ্যারো মার্কেটপ্লেসের কমপ্লিট কন্ট্রোল নিয়ে নেবে। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হল? এখানে প্রত্যেক মেইল একটা ডিজিটাল সিকিউরিটি চ্যানেলের মধ্যে দিয়ে আসে। এবং সেই চ্যানেল কোনও ভাইরাসের সম্ভাবনা দেখলেই মেইল রিজেক্ট করে দেয়। এই সিকিউরিটিকে বোকা বানানো প্রায় ইম্পসিবল। তাহলে কি?
সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে লি ঝেনের কপালে ভাঁজ, আর প্রতি সেকেণ্ডে ওর বটক্স করা গালে একটা করে ভাঁজ বাড়তে লাগল, ওর মুখ ঝুলে পড়ল ‘জিরো ডে’ নিজেদের অ্যাডমিন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড লাগে ডাবল অ্যারোর ইমেইল সিকিউরিটি চ্যানেল বাইপাস করে ভিতরে ঢুকতে। অ্যাডমিন রাইটস না থাকলে এটা কিছুতেই করা সম্ভব না।
লি ঝেন জানে এবার কী হতে চলেছে।
কারা এর পিছনে?
রাশিয়ান হ্যাকার?
রাশিয়ান সাইবার ক্রিমিনালরা এত এক্সপার্ট যে ওদের কাছে এমন কি আমেরিকার নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ হ্যাক করে ক্র্যাশ করানো চাইল্ড প্লে। কিন্তু ওরা সেই চেষ্টা করে না কেন সেটা সকলেই জানে। ওরা চায় না মার্কেট ক্র্যাশ করুক, কেনাবেচা বন্ধ হোক, ওরা চায় চুপচাপ বড় বড় ট্রেডারদের কাছ থেকে র্যানসাম আদায় করতে যাতে তাদের বিজনেস বন্ধ না হয়। সেরকম এবার র্যানসমওয়্যার ওকে ইনফর্ম করবে এই ক্রিপ্টোওয়াল বা ওর এনি নাজায়েজ বংশধরের র্যানসমওয়্যার এনক্রিপশনটাকে আনলক করার জন্য কত র্যানসম চাইবে। লি ঝেন জানে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই । এমন কি FBI-এর বাপও এইসব আল্ট্রাসিকিওরড এনক্রিপশন খুলতে পারে না। জেনারেলের অলক্ষ্যে একটা ছোট্ট ওয়ান বাই ওয়ান পিক্সেলের বিন্দু জেনারেলের স্ক্রিনে এসে পড়ল। এত সূক্ষ্ণ যে দৃষ্টিগোচরই হয় না। কিন্তু এটা অনেক দূরে একটা রিমোট ট্র্যাকিং সার্ভারকে জেনারেলেরই ল্যাপটপের ওয়েবক্যাম দিয়ে জেনারেলের চেহারা দেখাতে লাগল।
লি ঝেন অপেক্ষা করল। এবার এক্সটরশন ডিম্যাণ্ডটা উপস্থিত হল। স্ক্রিনে ছোট একটা চ্যাট বক্স খুলল।
—গুড ইভিনিং!
—ইউ আর কিসিং আ ভাইপার, ইউ অ্যাসহোল! লি ঝেন রেগে আগুন হয়ে লিখল।
—রিয়্যালি?
ঘড়ি দেখল লি ঝেন। মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এটা এমন একটা ব্ল্যাকমেল যে FBI-কে রিপোর্ট করা যায় না।
—তাড়াতাড়ি বল কী চাই?
চ্যাট বক্স বন্ধ হয়ে গেল। এবার ল্যাপটপের স্পিকারে একটা পুরুষ কণ্ঠ ‘হার্ভার্ডের প্রফেসরদের মারলে কেন?’
কণ্ঠস্বর শুনে লি ঝেন বুঝে গেল একটা টেক্সট-টু-স্পিচ এঞ্জিন চালানো হয়েছে। এটা মানুষটার নিজের কণ্ঠস্বর না। অন্যপ্রান্তের মানুষটা শুধু টাইপ করে যাচ্ছে। লি ঝেন মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করল, তাড়াতাড়ি এই ঝামেলাটা মেটাতে হবে।
‘হার্ভার্ডের প্রফেসরদের বলা হয়েছিল ওরা যেন সার্টিফাই করে যে আর্টিফ্যাক্টটা সত্যি বুদ্ধের হাড়। কিন্তু ওরা তাতে রাজি হল না। এটা জানলেই আমার কাস্টমাররা পিছিয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে বুদ্ধের হাড়ের অকশন। এক বিলিয়ন ডলারের স্টেক, তাই হার্ভার্ডের প্রফেসরদের মারতেই হল ।
‘এই বুদ্ধের হাড় কি সত্যিই নকল হাড় ছিল?’
‘আই সোয়্যার। আমি নকল জিনিস বেচি না। এটা দিল্লী মিউজিয়ামের ওরিজিন্যাল পিতরাওয়া বোনস অব বুদ্ধা। আমি এটা দিল্লী মিউজিয়াম থেকে চুরি করিয়েছিলাম। এবার মার্কেট-প্লেস খুলে দাও। আমার প্রতি মিনিটে মিলিয়ন ডলারের বেচাকেনা হয়।’
‘কীভাবে এল তোমার হাতে দিল্লী মিউজিয়ামের বুদ্ধের হাড়?’
‘বুদ্ধের হাড় DNA টেস্ট করবার জন্য চার বছরে আগে আমেরিকায় আনা হয়েছিল। তখন ওটা আমি কিনি।’
‘কে বিক্রি করেছিল?’
লি ঝেন চুপ।
‘আমার তার নামটা চাই।’
‘মিউজিয়ামের কিউরেটার সিদ্ধার্থ বোস।’
‘মিথ্যা কথা বললে ডাবল অ্যারোর গেটে চিরকালের জন্য তালা লেগে যাবে। কোনও পাসওয়ার্ড দিয়েও খুলতে পারবে না।’
‘আমার সঙ্গে কেন তুমি এই শত্রুতা করছ?’
‘তোমার ওই ইণ্ডিয়ান সেলারের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া বাকি আছে। ওদের পরিচয় পেয়ে গেলেই আমি ডাবল অ্যারো খুলে দেব। কে সেই সেলার?’
আধ মিনিটের নীরবতা। ‘এনাফ!’ জেনারেল ঝেন বলল, ‘লি ঝেন অনেক ইল্লিগ্যাল কাজ করে, কিন্তু বিশ্বাস ভাঙে না। নাম আমার মনে আছে, কিন্তু আমি বলব না।’
‘টেন মিনিটস। তারপর ডাবল অ্যারো ক্র্যাশ করবে।’
জেনারেলের মাথায় একটা ফুটো থাকলে সারা শরীরের রক্ত গাইজারের মত বাইরে বেরিয়ে আসত। জেনারেলের ধৈর্য তার লাগামছুট হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। জেনারেল ঝেন দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘আজ আমাকে বেকায়দায় ফেলেছিস, কিন্তু তোকে আমি খুঁজে বের করবই। যে ডাবল অ্যারো তৈরি করতে পারে সে ট্রিপল অ্যারোও তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। আর বুদ্ধের হাড় বিক্রি তুই কিছুতেই আটকাতে পারবি না।’
‘কীভাবে করবে? অকশন তো হবে না।’
‘জেনারেল লি সব সময় একটা ব্যাক-আপ প্ল্যান রাখে। কাল ইউনাইটেড নেশনসে গ্লোবাল বুদ্ধিস্ট কনভেনশন হচ্ছে, ওখানে সারা পৃথিবীর বৌদ্ধধর্মের মাথারা আসছে। কাল UN-এর কনভেনশনে আমি ঐ বুদ্ধের হাড় গোপনে বিক্রি করে যাব। হ্যাঁ হয়তো এক বিলিয়ন পাব না, তবে কাছাকাছি দাম পাব। কাল কনভেনশনের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটা মিটিং, ব্যাস। যদি পারিস তো আমায় আটকাস। আর হ্যাঁ, আমি জানি কে পিছনে থেকে এসব করাচ্ছে। ওই PhD স্টুডেন্ট ইণ্ডিয়ান মেয়েটা প্রফেসরদের মিসলিড করেছে। ঐ যত নষ্টের গোড়া। আই সোয়্যার ওকে আমি মারবই। ওই মেয়েটাকে আমি কাল খতম করবই, এটা আমার প্রমিস।’
‘একটা সাজেশন দেব?’
‘কী সাজেশন?’
‘রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার ব্লাড প্রেশারটা মেপে নিও। ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক না হয়ে যায়, গুড নাইট!’ সুনয়ন ডাবল অ্যারোর সাইট থেকে বেরিয়ে এল।
ল্যাপটপ বন্ধ করে সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকাল— ‘এবার তো আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন?’
‘জেনারেল লি ঝেন?
‘ভিডিওটা একবার দেখা যাক,’ সুনয়ন মাউজ ক্লিক করে লি ঝেনের ফাইলটা খুলল। জেনারেল লি ঝেনের নিজের ওয়েবক্যাম দিয়ে রেকর্ডিং করানো ফাইলটা সুনয়নের ল্যাপটপে চলে এসেছে। সার্ভারের অ্যান্টিভাইরাস প্রহরীরা জানিয়ে দিল ফাইল সেফ। সুনয়ন ফাইলটা খুলে দেখে নিল। জেনারেল লি ঝেনের স্বীকারোক্তি। দু’বার চালিয়ে ভালভাবে দেখল সুনয়ন। ভিডিও পরিষ্কার এসেছে। ‘ফাইনাল অ্যাসল্টটা UN-এ হবে,’ সুনয়ন ল্যাপটপ বন্ধ করল। ‘তবে প্ল্যানটা একটু বদলাতে হবে।
‘তাহলে এখন প্ল্যান কী?’ রিধিমা বলল।
সুনয়ন ল্যাপটপে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের লে-আউটটা নিয়ে এল। হলের ভিতরটা দেখুন। আপনাকে জেনারেল অ্যাসেম্বলির রস্ট্রামে যে ভাবেই হোক পৌঁছে সমস্ত পৃথিবীর অতগুলো দেশের প্রতিনিধিদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে যে হার্ভার্ডের প্রফেসরদের খুনি হল লি ঝেন।’
‘তারপর?’
‘লি ঝেন এবং ওর সাঙ্গপাঙ্গরা প্রতিবাদ করে উঠবে। আমি তখন এই যে রস্ট্রামের পিছনের দেওয়ালে উপরের দিকে দুপাশে যে দুটো জায়েন্ট স্ক্রিন আছে, সেখানে প্রোজেক্ট করব লি ঝেনের এই ভিডিও। ওর স্বীকারোক্তি হার্ভার্ডের প্রফেসরদের ও খুন করিয়েছে এবং আপনাকে ও খুন করতে চায়। ব্যাস, খেল খতম।’
‘কিন্তু আপনি প্রোজেক্টরের কন্ট্রোল পাবেন কীভাবে?’
‘ওটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।’
‘UN সার্ভার হ্যাক করবেন?’
‘আপনি বুদ্ধিমতী।’
‘কিন্তু UN সার্ভার হ্যাক করা কি সম্ভব?’
‘UN-এর সার্ভার এর আগেও অনেকে বহুবার হ্যাক করেছে।’
‘ইম্পসিবল।’
‘এসব তো এখন পাবলিক নিউজ, গুগল করলে নিজেই জেনে যাবেন।
‘রিয়্যালি?’ রিধিমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
‘সুতরাং ওটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। কিন্তু প্রধান হার্ডল হল যেভাবেই হোক আপনাকে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের রস্ট্রাম পর্যন্ত পৌঁছোতে হবে। ‘কিন্তু পৌঁছোবো কীভাবে?’
‘গাইডেড ট্যুর ইউনাইটেড নেশনসের হেড কোয়ার্টারসের সিকিউরিটি কাউন্সিল চেম্বার, ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বার এসব দেখিয়ে সবার শেষে আসে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে। আপনাদের ট্যুর যখন জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের ফোর্থ ফ্লোরে পাবলিক গ্যালারিতে নিয়ে যাবে—’
‘বুঝেছি,’ রিধিমা বলল। ‘ওটাই আমার সুযোগ। ভিতরে ঢুকেই আমি ওখান থেকে ছুটে পোডিয়ামে গিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।’
‘ভুল করেও ওটা করতে যাবেন না।’ সুনয়ন বলল। ‘প্রথমতঃ, ফোর্থ ফ্লোরের পাবলিক গ্যালারি থেকে রস্ট্রামে যাওয়া যায় না। এই লে আউটটা ভাল করে দেখুন।’ সুনয়ন জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের ফ্লোর প্ল্যান স্ক্রিনে আনল ৷ ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের চার তলার গ্যালারিতে ঢোকার দরজার পাশেই ডান দিকে দেখুন এই যে দুটো এলিভেটর। আপনাকে ওই এলিভেটর দিয়ে এক ফ্লোর নিচে নেমে আসতে হবে। তারপর ঢুকতে হবে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে। আর UN-এর মিটিং চলাকালীন যে কেউ রস্ট্রামে যেতে পারে না। প্রত্যেকের সিটের সামনে একটা মাইক্রোফোন থাকে। যার কিছু বলার থাকে, সে তখন সিটের ডেস্ক থেকে উঁচু করে ‘আই রাইস টু মেক আ স্পিচ’ লেখা একটা প্ল্যাকার্ড তুলে চেয়ারপার্সনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আপনাকে নিচে নেমে এসে একটা সিটে বসে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরতে হবে। আপনাকে অনুমতি দিলে তবে আপনি মাইক্রোফোনে বলবেন আপনার বিপদের কথা। রস্ট্রামে যাওয়ার পারমিশন চাইবেন। প্রথমেই রস্ট্রামে ওঠার চেষ্টা করবেন না, সিকিউরিটি গার্ড আপনাকে অ্যারেস্ট করবে।’
‘আমি পারব তো?’ রিধিমার গলায় দ্বিধা।
‘পারতেই হবে। ভয় নেই, আমি জার্নালিস্ট এন্ট্রি নিয়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে আলাদা ঢুকব। কিন্তু আমরা জার্নালিস্টরা ইন্টারপ্রেটারস বুথের ভিতরে থাকব। এই যে একদম ডানদিকে কাঠের দেওয়াল কেটে যে সারি সারি কাঁচের জানলা, তার ওপারে বুথের ভিতর থেকে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের প্রসিডিংস দেখা যায়। আপনি রস্ট্রামে লি ঝেনের নামে অ্যালিগেশন আনা মাত্রই আমি ভিডিও প্রোজেক্ট করব।’
রিধিমা নার্ভাস, লি ঝেনের ছবিটা মনে গেঁথে নিল। ‘এই শয়তানটাই আমাদের প্রফেসরদের খুন করেছে?’
‘না খুন করেছে এর হিটম্যান। রাত অনেক হয়েছে, আপনি এখন শুয়ে পড়ুন। আপনার একটা খুব ভাল ঘুম দরকার। সকালে আপনার অগ্নিপরীক্ষা।’ সুনয়ন উঠে দাঁড়াল।
* * *
জেনারেল ঝেন ল্যাপটপ বন্ধ করে চোখ বুজে অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট থিওরিগুলো অ্যাপ্লাই করার চেষ্টা করল, কিন্তু ফল হল না। ড্যামেজ কন্ট্রোল সম্বন্ধে চিন্তা করতে গেলে সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। জেনারেল ঝেন সেলফোনে ডায়াল করল আর শান্ত গলায় বলল, ‘মেজর, ডেভিড কোথায়?’
‘কে জানে ডোপ নিয়ে হাই হয়ে কোন চুলোয় পড়ে আছে? আবার এও সম্ভব যে নার্ক্স নিকড হিম। আমি কতক্ষণ ধরে ওর ফোনে রিং করে যাচ্ছি। উত্তরই দেয় না!’
‘মেজর, মেয়েটা যেন সকালে ইউনাইটেড নেশনসে কিছুতেই ঢুকতে না পারে। এবার যদি ফেল করো তবে এটাই তোমার এ জীবনের লাস্ট অ্যাসাইনমেন্ট।’
‘ওভার মাই ডেড বডি, জেনারেল। আই স্যোয়ার!’
মেজরের কথা জেনারেলকে খুব একটা আশ্বস্ত করল না। জেনারেল এবার ইণ্ডিয়ান সেলারের নম্বর ফোনবুকে খুঁজতে লাগল।
৷৷ একচল্লিশ ৷৷
‘পারবো তো?’ রিধিমা ভয়ে ভয়ে বলল।
সুনয়ন স্টিয়ারিং হুইল থেকে ডান হাত তুলে রিধিমার হাতের ওপর হাত রাখল। অভয়স্পর্শ। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে দেখাচ্ছে সকাল এগারটা, বাইরের টেম্পারেচার পাঁচ ডিগ্রি ফারেনহাইট। উইণ্ডচিল নিয়ে কম করে মাইনাস পনের।
‘ওই জেনারেল লি’র বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব,’ রিধিমা বিড়বিড় করে বলল, কিন্তু নিজের কানেই এই প্রতিজ্ঞা খুব একটা জোরালো শোনাল না।
সুনয়ন এক ঝলক রিধিমার দিকে তাকিয়ে আবার উইণ্ডস্ক্রিনে চোখ রেখে বলল, ‘আজ কিন্তু আপনি শুধু নিজেকে বাঁচাতে যাচ্ছেন না, আপনি যাচ্ছেন সকলের সামনে আপনার প্রফেসরদের খুনের মাস্টারমাইণ্ড ওই লি ঝেনের মুখোশ খুলতে।’
‘আমাকে পারতেই হবে,’ রিধিমা বিড়বিড় করে বলল। ‘যত কঠিনই হোক এই কাজ৷’
‘আপনার কাজ জেনারেল অ্যাসেম্বলির রস্ট্রাম পর্যন্ত পৌঁছোনো। যেভাবেই হোক। বাকিটা আমার দায়িত্ব।’
‘তারপর কী হবে?’ রিধিমা ভয়ে ভয়ে বলল।
‘প্রোজেকশন শেষ হলেই ওরা ডিজিটালি এবং ফিজিকালি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াবে হ্যাকারকে। তাই আমি তখন কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে থাকতে পারব না। আমাকে UN থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমি আবার ঢুকব।’
‘যদি ওরা আপনাকে খুঁজে বের করে?’
‘যে UN সিস্টেম হ্যাক করতে পারে, তার কাছাকাছি যাতে কেউ না পৌঁছোতে পারে সেটুকু ডিফেন্স সে নিশ্চয়ই করতে জানে।’ সুনয়ন ভরসা দিল রিধিমাকে। ‘সেলফোনে কোনও আউটগোয়িং কল করবেন না। কলার ID-তে আমার নাম দেখলে শুধু তবেই ফোন তুলবেন।’
ফটিফিফথ স্ট্রীট, সেকেণ্ড অ্যাভিনিউর মোড়ে রিধিমাকে ড্রপ করে সুনয়ন গাড়িটা ধীর গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলল, বাঁদিকে আণ্ডারগ্রাউণ্ড গ্যারাজ পার্কিং। গ্যারাজের মুখে বোর্ডে আর্লি বার্ড $22.82 + ট্যাক্স লেখা। সারাদিন গাড়ি রাখা যাবে। সুনয়ন গাড়িটা গ্যারাজের মুখে ঢুকিয়ে দিল। ও পরে ঢুকবে ইউনাইটেড নেশনসে।
রাস্তায় তাড়াতাড়ি হেঁটে চলল রিধিমা। অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। রাস্তার সাইডওয়াকে কনস্ট্রাকশন পাইপের স্ক্যাফোল্ডিং বাঁধা, রিধিমা সামনে তাকাল। উনচল্লিশ তলা UN-এর বিল্ডিংয়ের সামনে অজস্র ফ্ল্যাগ পতপত করে উড়ছে। ১৯৩টা মেম্বার স্টেটের পতাকা। অ্যালফাবেটিকালি বাঁদিকে আফগানিস্তান ডানদিকে শেষে জিম্বাওয়ে।
রাস্তার উল্টোদিকে ইউনাইটেড নেশনসের চত্বরের বাইরে বিশাল সিকিউরিটি জোনে আজ স্যাফ্রনই স্যাফ্রন। গেটের বাঁদিকে প্রচুর বৌদ্ধ লামা একসঙ্গে ভিড় করেছে। সিকিউরিটি জোনের মধ্যে দিয়ে এক এক করে ভিতরে ঢুকছে লামারা। রিধিমাকে আগে ভিজিটার পাস নিতে হবে। রিধিমা রাস্তার উল্টোদিকের বিল্ডিং ৮০১, ফর্টি-ফিফথ স্ট্রীটের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। ছোট একটা লাইন। রিধিমা লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়াল। লাইন এগোতে এগোতে যখন রিধিমার নম্বর এল, একজন সিকিউরিটি গার্ড রিধিমাকে বলল— মাথার টুপি খুলে ফেলুন। রিধিমার বুক ধক করে উঠল। উলের টুপি খুলে সে কাউন্টারের দিকে অগ্রসর হল। পাশাপাশি তিনটে কাউন্টার। একটা খোলা। একজন ব্লণ্ড ক্লার্ক রিধিমাকে বলল, ‘আইডি প্লিজ!’
রিধিমা মহাদেবী শিউচরণের ড্রাইভিং লাইসেন্সটা মেয়েটার হাতে দিল। মেয়েটা লাইসেন্সটা দেখছে। রিধিমার বুক দুরুদুরু করছে। বিশাল রিস্ক। কিন্তু এই রিস্ক ওকে নিতেই হবে। মেয়েটা রিধিমাকে বলল, ‘সাদা পর্দাটার সামনে দাঁড়ান।’ রিধিমা দাঁড়াল, মেয়েটা একটা ফটো তুলল। তারপর একটা পাবলিক ভিজিটরের কাগজ মেশিন থেকে বেরিয়ে এল। মেয়েটা বলল, ‘এটা জ্যাকেটের বুকের কাছে লাগিয়ে রাখবেন।’
লাইসেন্সটা ফেরত নিয়ে রিধিমা বাইরে এসে একটা বড় শ্বাস নিল। রাস্তা পার হয়েই সিকিউরিটি চেকিং জোন। রিধিমা অপেক্ষা করল পেডিস্ট্রিয়ান ক্রশিংয়ের সঙ্কেতের জন্য। লাল আলো সবুজ হল। রাস্তা পার হওয়ার জন্য রিধিমা ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল ।
ডানদিকে ট্রাফিক লাইটে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল সবুজ আলোর অপেক্ষায়। রিধিমা রাস্তা প্রায় পার হয়ে এসেছে, হঠাৎ পিছন থেকে সজোরে এক ধাক্কা রিধিমাকে সামনে সাইডওয়াকে ছিটকে ফেলে দিল। রিধিমার ব্যাকপ্যাক ছিটকে গেল। কে একজন রিধিমার গায়ের উপরে এসে পড়ল।
রিধিমা মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা শেভি ট্রাক গোঁ গোঁ করতে করতে রাস্তার লাল বাতির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তার প্রায় গায়ের ওপর দিয়ে চলে গেল। পিছনে মাটিতে শুয়ে ওর প্রাণরক্ষক কাতরাচ্ছে। ছেলেটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল রিধিমা। এ কোথা থেকে এল? সেই সাবওয়ে মেট্রোর কুকি বিক্রেতা!
‘তুমি?’ রিধিমা ছেলেটার পাশে ঝুঁকে বসল।
ছেলেটার গোড়ালি ছুঁয়ে ট্রাকের ভারি টায়ার চলে গেছে। ছেলেটার মুখ যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গেছে। দু’হাতে ডান পায়ের গোড়ালি চেপে ধরে রিধিমাকে বলল— ‘আমি ঠিক আছি। তাড়াতাড়ি ভিতরে চলে যান।’
রাস্তায় আশেপাশের পথচারীরা হৈ হৈ করে উঠল, কিন্তু ট্রাকটা ফার্স্ট অ্যাভিনিউ ধরে এগিয়ে যেতেই একটা বিশাল ওয়েস্ট রিমুভ্যাল ট্রাক ওটাকে দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দিল।
‘তোমাকে এভাবে ফেলে আমি কীভাবে যাব?’
‘আমি ঠিক আছি। তাড়াতাড়ি ভিতরে চলে যান, ছেলেটা বলল। ‘কুইক!’ রিধিমা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। ব্যাকপ্যাক তুলে সামনের লোহার রেলিং দেওয়া গেটের দিকে এগিয়ে গিয়ে লামাদের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। রিধিমার মনে হল ওর হৃদপিণ্ড যেন মুখের ভিতর ঢুকে ধুকপুক করছে। সামনে ভিজিটারদের সিকিউরিটি স্ক্রিনিং জোন। অনেকটা এয়ারপোর্টের মত সিকিউরিটি স্ক্রিনিং। বেল্ট, পার্স, সেলফোন, ল্যাপটপ এসব স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে পাস করাবার জন্য প্ল্যাস্টিকের ট্রেতে বেল্টে রেখে সকলে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রিধিমা একজন ইউরোপিয়ান মহিলার পিছনে দাঁড়াল আর ভগবানের নাম জপতে লাগল। ধরা পড়লে? সিকিউরিটি পার্সোনেলরা ওয়াক থ্র মেটাল ডিটেকটর লাগানো সিকিউরিটি গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে হাতে স্ক্যানার নিয়ে দরকার মত ভিজিটারদের শরীর চেক করছে। মেটাল ডিটেকটরের গেট পেরোতেই একজন কালো মহিলা সিকিউরিটি গার্ড কর্কশ কণ্ঠে বলল— ইউ আর অল সেট।
রিধিমা উত্তেজনায় ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে পিছন ফিরে তাকাল, কুকিওয়ালা ছেলেটা খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে একটা বার্গেণ্ডি রঙা গাড়িতে উঠছে। কিন্তু রিধিমা উত্তেজনায় যা নজর করল না তা হল রাস্তার মোড়ে NYPD বুথের পাশে মেজর হু’র সেই চিনা পুলিশ গাড়ির ড্রাইভার সেলফোনে একটা সংক্ষিপ্ত বার্তালাপ সেরে ফোনটা পকেটে রাখল।
৷৷ বিয়াল্লিশ ৷৷
ম্যানহাটনের সাত তারা হোটেল হিউগো থেকে একটা কালো মার্সেডিজ পুলম্যান এক্সিকিউটিভ লিম্যুজিন গ্রীনউইচ স্ট্রীটে নামল। ভিতরে চামড়ার গদী মোড়া চারটে বিলাসবহুল সোফা। একদিকে সোফায় বসে লি ঝেন, চোখ তার অধৈর্য হয়ে খুঁজে চলেছে তার সামনের এয়ারক্র্যাফট স্টাইল ডেস্কে রাখা খোলা ল্যাপটপে, বাঁ দিকের সোফাটা খালি। মুখোমুখি উল্টোদিকের দুটো সোফার একটায় পাথরের মত স্থির বসে কেভিন দ্য বুচার, অন্যটাতে কানে টেলিফোন লাগিয়ে বসে মেজর হু, তার কপালের ভাঁজ বলে দিচ্ছে যে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কোনও সুসংবাদ প্রেরণ করা হচ্ছে না। মেজর হু ফোন বিরক্তির সঙ্গে নামিয়ে রাখল— ‘দ্য বিচ ইজ ইনসাইড UN,’ মেজর হু’র কণ্ঠস্বরে হতাশা।
লি ঝেন জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল, ডার্ক সানগ্লাসেস থাকা সত্ত্বেও মেজর হু বুঝতে পারল লি ঝেনের দু’চোখে বিরক্তি মাখামাখি হয়ে আছে। মেজর হু বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল, ‘আউট অব ব্লু একটা পেডিস্ট্রিয়ান এসে মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে সাইডওয়াকে ছিটকে ফেলে দিল। না হলে আজই—’
লি ঝেন নীরবে ডান হাত তুলে থামার আদেশ দিল। মেজর হু চুপ করে গেল। লি ঝেন বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউ ইয়র্ক সিটির ব্যস্ততা বেড়েছে। ট্রাফিক লাইট সবুজ হল, টুইন টার্বো ভি সিক্স ইঞ্জিন রাজকীয় লিম্যুজিনকে এগিয়ে নিয়ে চলল।
‘মেজর,’ লি ঝেন কালো সানগ্লাসেস নামিয়ে রাখল সামনের ডেস্কে।
‘ইয়েস জেনারেল।’
‘কাল একটা সত্য জানতে পারলাম।’
‘কী সত্য জেনারেল?’ মেজরের অস্বস্তি হচ্ছে জেনারেলের নির্লিপ্ত গলার স্বরে।
‘দিল্লী মিউজিয়ামের বুদ্ধের হাড় বিক্রি করার সময় মিউজিয়ামের কিউরেটার বাধা দিচ্ছিল—’
‘হ্যাঁ, আর সেজন্য আপনার ইনস্ট্রাকশন মত—’
‘আমার ইনস্ট্রাকশন ছিল কিউরেটারকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার।’
‘তাই করা হয়েছিল, জেনারেল। কিউরেটারের বডি টুকরো টুকরো করে কেটে লের মাছকে খাওয়ানো হয়েছিল।’
‘তুমি নিজে সেটা করেছিলে?’
হ্যাঁ বলতে গিয়েও জেনারেলের চোখের দিকে তাকিয়ে মেজর হোঁচট খেল ‘না মানে, ডেভিডকে এই ভার দেওয়া হয়েছিল। ডেভিড ওকে ড্রাগস ইনজেক্ট করে ‘
‘ডেভিড কি মাছ দিয়ে খাওয়ানো দেখেছে?’
‘অবশ্যই,’ মেজর জোর দিয়ে বলল। ‘ওর সঙ্গে ইণ্ডিয়ানটাও ছিল।
‘কাল সত্যটা জানতে পারলাম।’
‘কী সত্য জেনারেল?’
‘ওরা একটা কফিনে অচৈতন্য কিউরেটারের বডি লেক জর্জের মঠে সঁপে দিয়ে ফিরে আসে, ডেভিড নাকি নিজের চোখে লাশ কাটা দেখতে পারে না।’
‘কিন্তু কাজটা এমন নিখুঁত ভাবে করা হয়েছিল যে পুলিশ চার বছরেও ডেডবডি কোথায় গেল সেটা খুঁজে পেল না,’ মেজর সাফাই গাইল।
‘যাক গে, তোমার ছেলে ডেভিড খুব স্মার্ট, মেজর। তুমি কী বল?’
মেজরের ডেঞ্চার করা বাঁধানো দাঁত ঝকঝক করে হেসে উঠল— ‘আমি বাবা হয়ে কী বলব,’ মেজর গদগদ স্বরে বলল। ‘আপনি ঠিকই বলেছেন একটু সফট মাইণ্ডেড, কিন্তু খুব ব্রিলিয়ান্ট। আই য়্যাম ভেরি প্রাউড অফ হিম।
‘ডেভিড কি তোমার ব্যবসা সামলাবার জন্য প্রায় তৈরি?’
‘অলমোস্ট,’ গর্বের সঙ্গে বলল মেজর হু। ‘ও নিজেও খুব ভাল প্রোগ্রামার, আপনার ডাবল অ্যারো ‘
‘প্রকৃতি নিজেই এক অপূর্ব প্রোগ্রামার, মেজর,’ লি ঝেনের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। ‘প্যাসিফিক স্যামন সমুদ্র থেকে নদীর স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কেটে এক লম্বা যাত্রা করে নদীতে উঠে আসে ডিম পাড়ার জন্য।’ লি ঝেন কেভিনের দিকে তাকাল। তারপর কেভিনকে বলতে শুরু করল – ডিম ছাড়ার পর স্যামন মাছের অ্যাড্রেনাল গ্ল্যাণ্ড কর্টিকোস্টেরয়ড নামে এক ধরণের কিলার হরমোন নিজের বডিতে রিলিজ করে যাতে সে তাড়াতাড়ি মরতে পারে।’
‘এটা নেচার কেন করে?’ কেভিন বলল।
‘প্রকৃতি চায় না বয়স্ক স্যামন তার বাচ্চার সঙ্গে খাবার নিয়ে লড়াই করুক, তাই প্রকৃতির প্রোগ্রামে বাপ-মা স্যামনকে শিশু স্যামনের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে প্রকৃতি থেকে বিদায় নিতে হয়।
‘ভাগ্যিস নেচার আমাদের মানুষের জন্য এরকম নিয়ম বানায় নি,’ মেজর হালকা চালে বলল।
‘বানালে ভাল হত। তুমি তোমার ছেলেকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করতে।
নেচার যখন এরকম নিয়ম মানুষের জন্য বানায় নি, তখন তখন মানুষকেই সেই কাজটা করতে হয়।’ লি ঝেন কেভিনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল, কেভিন তৎক্ষণাৎ কোটের ভিতরে গোঁজা গ্লক বের করে মেজরের কপালে ঠেকাল।
‘এটা কী জঘন্য তামাশা হচ্ছে, কেভিন?’ মেজর যুগপৎ বিস্মিত ও বিরক্ত। ল্যাপটপটা ডেস্ক থেকে তুলে মেজরের ডেস্কে রাখল লি ঝেন— ‘পাসওয়ার্ড!’ ‘কীসের পাসওয়ার্ড?’ মেজরের গলা কেঁপে গেল৷
‘পাসওয়ার্ডটা টাইপ কর মেজর, তারপর তুমি ফ্রি, লি ঝেন ঠাণ্ডা গলায় বলল। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ডেভিডের হিসেব আমি আলাদা ভাবে চোকাবো।’
‘বিশ্বাস করুন, যিশাসের দিব্যি আমি বুঝতে পারছি না কী বলছেন আপনি৷’ লি ঝেন ঘড়ির দিকে তাকাল, হাতে সময় কম, একটু পরেই গাড়ি UN-এর সামনে পৌঁছোবে। ‘আমি ডাবল অ্যারোতে ঢুকতে পারছি না, আমার পাসওয়ার্ড কাজ করছে না কেন?’ এবার চেঁচিয়ে উঠল লি ঝেন।
‘ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করুন, ও শিওর জানে এর সলিউশন।’
‘ডেভিড আমার ফোন তুলছে না।’
এবার মেজর বুঝল ব্যাপারটা সাংঘাতিক। ডেভিডকে সেও কাল দুপুর থেকে কন্ট্যাক্ট করে পায় নি। কিন্তু এরকম প্রায়ই ঘটে, ডেভিডের মুড ঠিক না থাকলে বাপের ফোনকে পাত্তাই দেয় না। ‘আমি দেখছি।’ মেজর ওর সেলফোনে সেভ করা ডেভিডের নাম্বারে কল করল। ফোন বাজছে, কিন্তু কেউ ওঠাচ্ছে না, এবার মেজরের কপাল স্বেদসিক্ত। মরিয়া হয়ে সে ডেভিডের অলটারনেট নাম্বারে ফোন করল, এটারও একই অবস্থা। ‘কেউ ফোন ওঠাচ্ছে না।’
‘ইউ নো মেজর,’ লি ঝেন থামল। ‘তোমাদের আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তোমরা আমাকে ব্যাকস্ট্যাব করলে, ডাবল অ্যারোর বিশাল মার্কেটটা আমাকে ঠকিয়ে আমার থেকে কেড়ে নিলে। শেষবারের মত বলছি, পাসওয়ার্ডটা এখানে লেখ, আমি পাসওয়ার্ড রিসেট করে দেব। তারপর ভেবে দেখব তোমার শাস্তি মুকুব করা যায় কিনা।’
‘বিলিভ মি জেনারেল! আমি পাসওয়ার্ড জানি না।’
‘এনাফ!’ লি ঝেন চোখের ইশারা করল কেভিনকে। কেভিন এবার বাঁ হাতের কনুই দিয়ে মেজরের গলা সাঁড়াশির মত চেপে ধরল। সিট বেল্টের মধ্যে মেজর ছটফট করতে লাগল, কিন্তু কেভিনের গায়ে অমানুষিক জোর। মেজরের দুচোখ ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসতে লাগল। কেভিনের দৃষ্টি অনঢ়, শুধু মেজরের গলায় কনুইয়ের চাপ বাড়াতে লাগল। মেজরের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, মেজরের কানে আসছে লি ঝেনের অস্পষ্ট কথা ছেলেটাকে কিডন্যাপ করার সময় ওর কুকুরটা কেন সঙ্গে আনতে দিলে মেজর? আজকালকার কুকুরের গলায় স্মার্ট কলার থাকে ভুলে গেছিলে? কুকুরটা না থাকলে ওই কুলি ইণ্ডিয়ানটা পালালেও আমরা ওকে জঙ্গল কিংবা রাস্তা থেকে তুলে আনতাম। ওকে কেউ উদ্ধার করতে আসত না। মেজর হু’র আর কিছু কানে গেল না, মেজর নিস্তেজ হয়ে নেতিয়ে পড়ল।
কেভিন মেজরের গলায় দু-আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করল, তারপর আবার নিজের সিটে গিয়ে সিট বেল্ট বেঁধে বসল ৷
‘মেজর কথা দিয়েছিল যে মেয়েটাকে কিছুতেই UN-এ ঢুকতে দেবে না।’ লি ঝেন কেভিনের দিকে তাকাল। ‘ID কার্ড, UN-এ ঢোকার অ্যাডমিশন পাস সব ঠিক আছে তো?’
কেভিন কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে জানাল সে তৈরি।
‘ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টারের ভিতর প্রত্যেকটা লাউঞ্জ, প্ৰত্যেক হলওয়ের প্রত্যেক বর্গফুট সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা জরিপ করে। ভিতরে খুন করা আউট অব দ্য কোয়েশ্চেন!’
কেভিন নীরবে হাসল— ‘এত সব সত্ত্বেও UN-এর ভিতর কিন্তু একজন খুনি এদেরই এক সিনিয়র সিকিউরিটি অফিসারের কপালে নয় মিলিমিটারের ফুটো করে লাশটাকে জেনারেল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ের খালি লাউঞ্জে বসিয়ে রেখে গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে গেছিল। ইফ ওয়ান ক্যান ক্ল্যাপ ইনসাইড UN, দেন কেভিন অলসো ক্যান ক্ল্যাপ। মেয়েটা UN থেকে বেরোতে পারবে না।’
‘গুড,’ লি ঝেন বলল। লিম্যুজিন UN-এর গেটে এসে গেল। শেফার নেমে দরজা খুলে স্যালুট করল। দু’জনে লিম্যুজিন থেকে নামল। লি ঝেন ইশারায় পিছনে সোফায় সিট বেল্ট স্ট্র্যাপ করা মৃতদেহটা দেখাল। লিম্যুজিনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
৷৷ তেতাল্লিশ ৷৷
UN বিল্ডিঙের সামনে খোলা চত্বরে ইস্ট-রিভারের ঠাণ্ডা হাওয়া হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু রিধিমা প্রাণভরে বাতাস বুকে টানল।
আঃ!
সে এখন UN চত্বরে, ওকে এখন কোনও পুলিশ গুলি করতে পারবে না। রিধিমা তাড়াতাড়ি UN বিল্ডিঙের লবিতে গিয়ে ঢুকল। লবির শুরুতেই নেলসন ম্যাণ্ডেলার স্ট্যাচু। পিছনে সিঁড়ি ফার্স্ট বেসমেন্টে নেমে গেছে।
ইউনাইটেড নেশনস হেড-কোয়ার্টারের বিশাল লবিতে আজ প্রচুর মানুষের ভিড়। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, জাপান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইংল্যাণ্ড, রাশিয়ান ফেডারেশন, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালদীভ, মঙ্গোলিয়া, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, চিন প্রভৃতি দেশের মুণ্ডিতমস্তক, শ্মশ্রুগুম্ফবিহীন নানা বয়সি বৌদ্ধ লামারা চীবর পরে ঘোরাফেরা করছে। প্রত্যেকের গলায় UN থেকে ইস্যু করা ভিজিটারস ID। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা একে অপরকে মাথা ঝুঁকিয়ে হেসে অভিবাদন করছে। গলায় আইডেন্টিটি কার্ড সন্ন্যাসীদের চীবরের ওপর বেমানান লাগছে। সারা পৃথিবী থেকে অজস্র জার্নালিস্ট এসেছে এই প্রোগ্রাম কভার করতে। লবির শেষ মাথায় ক্যাশিয়ারের ডেস্ক। রিধিমা ওখানে গিয়ে নিজের টিকিটটা স্ক্যান করাল আর ক্যাশিয়ার রিধিমাকে একটা হলুদ স্টিকার দিয়ে বলল, ‘এটা জ্যাকেটে লাগিয়ে রাখবেন, আপনাদের ট্যুর একটায় শুরু।’
রিধিমা চারদিকে তাকিয়ে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে লাগল। পেসেন্স।
একটায় রিধিমাদের ট্যুর শুরু হওয়ার জন্য অ্যানাউন্সমেন্ট হল। ওদের গাইড একজন অল্পবয়স্কা মেয়ে। ট্যুরের ডু’স এণ্ড ডু-নটসগুলো বলল— ট্যুরে ভিডিও অ্যালাউড নয়, ওনলি স্টিল ফটো। ট্যুর শুরু হল। কুড়ি জনের দল ট্যুর গাইডের পিছনে পিছনে চলেছে। রিধিমা মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছে— জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে ঢুকতে হবে। বাঁদিকের দেওয়ালে ‘টু কাউন্সিল চেম্বার্স’ লেখা, পাশে একটা কাঁচের দরজা। ট্যুর গাইড ওই দরজা দিয়ে গোটা দলটাকে সিকিউরিটি ক্লিয়ার করিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরের ফ্লোরে উঠতে লাগল।
রিধিমাদের ট্যুর ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল হলের সামনে এসে দাঁড়াল। গাইড অনেক কিছু বলে চলেছে। রিধিমার চোখ চারদিকে ঘুরছে। কীভাবে এই দল থেকে পালানো যায়? এবার রিধিমাদের দলটাকে নিয়ে গাইড সিকিউরিটি কাউন্সিল হলে ঢুকল। গাইড লম্বা লেকচার দিচ্ছে, দলে অনেক ঔৎসুক ভিজিটার আছে, নানা রকম প্রশ্ন করছে, গাইড উত্তর দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রিধিমার কানে এসব কিছুই ঢুকছে না, রিধিমা শুধু ফাঁক খুঁজছে। ট্যুর এবার জেনারেল অ্যাসেম্বলী বিল্ডিংয়ে এসে ঢুকল। দেওয়ালের গায়ে একটা ডিজিটাল ক্লকে পিড়িং পিড়িং করে নম্বর বেড়েই চলেছে। টু পয়েন্ট এইট ফোর বিলিয়ন গাইড বলল। ‘আজ মিডনাইট থেকে এখন পর্যন্ত টু পয়েন্ট এইট ফোর বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনাবেচা হয়েছে পৃথিবীতে। প্রত্যেক দিন পৃথিবীতে পাঁচ থেকে সাত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বেচাকেনা হয়।’
ট্যুর এবার নাগাসাকির সেইন্ট অ্যাগনেসের পাথরের স্ট্যাচু পেরিয়ে, ডিসআর্মামেন্ট জোন পেরিয়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের বাইরে এল। রিধিমার বুক ধুকধুক করছে। দরজার বাইরে একটা বোর্ড টাঙানো তাতে লেখা—
সাইলেন্স
মিটিং ইন প্রোগ্রেস
এলিভেটরের পাশে ‘রিমেম্বারিং স্লেভারি’ বলে একটা বিশাল বোর্ড। গাইড মেয়েটা বলল, ‘ভিতরে বৌদ্ধ রিলিজিয়নের একটা ইম্পরটেন্ট সেমিনার চলছে।’
আপনারা লাকি যে আপনারা ভিউয়িং গ্যালারি থেকে ওটা দেখার সুযোগ পাবেন। কিন্তু ভিতরে কেউ কোনও কথা বলবেন না। চুপচাপ দেখে বেরিয়ে আসবেন। ডানদিকে দুটো এলিভেটর। একটার দরজা খুলে গেল। একজন স্ট্যাফ বেরিয়ে এল। রিধিমা মনে মনে ছক এঁকে চলেছে। সুনয়ন বলেছে ফোর্থ ফ্লোর দিয়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে ঢুকে নজর কাড়া যাবে না। কেননা ফোর্থ ফ্লোরে ভিজিটারস গ্যালারি। এলিভেটরে তিন তলায় নেমে আসতে হবে। রিধিমার অস্বস্তি লাগছে। এবার ট্যুর গাইড সকলকে নিয়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলির পাবলিক গ্যালারিতে ঢুকল। সকলে চুপচাপ চেয়ার দখল করে বসে দেখতে লাগল। নিচের তলা থেকে গ্যালারির সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে। প্রতিটি ধাপের ডেস্কগুলো ভর্তি। ডেলিগেটসদের আসনে একদিকে স্যুট প্যান্ট পরা ডিগনিটারিজ যেমন আছে তেমন অনেক চীবর পরা লামা কানে হেডফোন লাগিয়ে বসে আছে। প্রত্যেকের টেবিলে ভোট দেবার জন্য লাল, সবুজ, হলুদ বোতাম। ডান দিকে নিচে মেহগনি কাঠের দেওয়ালের নিচের দিকে কাট-আউটে কাঁচের দেওয়াল, ওর ওপাশে কোথাও বসে সুনয়ন লক্ষ্য রাখছে নিশ্চয়ই। একদম শেষে তেরছা ব্যাকড্রপের দু’পাশে দুটো জায়েন্ট স্ক্রিন রস্ট্রামকে ক্যাপচার করেছে।
রস্ট্রামে ঘন সবুজ মার্বেল ডেস্কে তিনটে আসন। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে যারা তিনজন বসে তাদের সামনের ডেস্কে একটাতে লেখা UN সেক্রেটারি জেনারেল, আরেকটাতে চেয়ারম্যান এবং তৃতীয় ডেস্কে লেখা প্রেসিডেন্ট। রস্ট্রামের জায়েন্ট স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ভাষণ দিচ্ছে। স্ক্রিনে তার ছবি দেখে চমকে উঠল রিধিমা—
জেনারেল লি ঝেন!
লি ঝেন এই কনভেনশনের প্রেসিডেন্ট? নিচের ফ্লোরে যেতে হবে। রিধিমা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে গেল, গাইডকে নিচু গলায় বলল, ‘একটু রেস্টরুমে যেতে হবে।’
‘ফার্স্ট বেসমেন্টে ক্যাফেটেরিয়ার পিছনে ভিজিটারদের রেস্টরুম,’ গাইড ফিসফিস করে বলল। ‘এলিভেটরে নেমে যেতে পারেন। ওখান থেকে কিন্তু ফিরে আসতে দেবে না। তবে এটাই আমাদের শেষ ভিজিটিং স্পট।’
রিধিমা গাইডকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এসে এলিভেটরের বোতাম টিপল।
থার্ড ফ্লোরে এলিভেটরের দরজা খুলতেই রিধিমা বেরিয়ে এল। সামনে ডান দিকে জেনারেল অ্যাসেম্বলি। রিধিমা এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সোজা দরজা টেনে ভিতরে ঢুকল। উত্তেজনায় রিধিমার বুক ধুকপুক করছে। রস্ট্রামে ভাষণ দিচ্ছে লি ঝেন, নিচের চেয়ারগুলোতে বিভিন্ন দেশের সিনিয়ার ডিপ্লোম্যাটস, সিনিয়র UN অফিসিয়ালস, স্ট্যাফ অফ পার্মানেন্ট মিশনস, ইউনাইটেড সেক্রেটারিয়েট স্ট্যাফেরা এবং অজস্র বৌদ্ধ লামা মনোযোগ দিয়ে শুনছে লি ঝেনের কাঁপা গলায় আবেগতাড়িত ভাষণ।
লি ঝেনের ভাষণ শেষ হল। রিধিমা বিড়বিড় করে বলল, ‘এবার তোমার মুখোশ আমি খুলব।’
হঠাৎ রিধিমার পিছনে হলের দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকল একজন আকাশি নীল ইউনিফর্ম পরা সিকিউরিটি গার্ড। রিধিমার দিকে তাকিয়ে গার্ডের অভিজ্ঞ চোখ বুঝে ফেলল যে রিধিমা ট্যুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে এসেছে। গার্ড রিধিমার পিছনে এসে নিচু গলায় বলল, ‘মিস! পাবলিক গ্যালারি আপস্টেয়ার্সে। চলুন আমি আপনাকে পৌঁছে দিই।’
অসম্ভব! রিধিমা মনে মনে বলল। অনেক কষ্ট করে সে এতদূর আসতে পেরেছে। এখান থেকে বেরিয়ে গেলে আর সে এই জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে ফিরে আসতে পারবে? একবার UN-এর বাইরে গেলে একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে জেনারেল লি ঝেনের খুনিরা। এরকম সুযোগ আর কক্ষনো আসবে না। ‘নাউ ওর নেভার!’ যা থাকে কপালে, রিধিমা এক লহমায় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। সুনয়নের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে ওর বাঁদিকের ডেলিগেটসদের সামনের ডেস্কে রাখা প্ল্যাকার্ডটা হঠাৎ টেনে আইল দিয়ে আচমকা স্টেজের দিকে দৌড় লাগাল রিধিমা । সিকিউরিটি গার্ডটা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি যে এভাবে কেউ রস্ট্রামের দিকে দৌড়ে যেতে পারে।
‘হল্ট!’ গার্ড চেঁচিয়ে বলল।
কিন্তু ততক্ষণে রিধিমা গ্যালারির ধাপের ওপর দিয়ে ছুটে রস্ট্রামের কাছাকাছি চলে গেছে— রিধিমার হাতে উঁচু করে ধরা প্ল্যাকার্ড ‘আই রাইস টু মেক আ স্পিচ’। দু’পাশ থেকে দু’জন সিকিউরিটি অফিসার রিধিমার দিকে ছুটে এল। জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের দর্শকেরা অবাক। এটা কী হচ্ছে! গুনগুন স্বরে হলের ভিতর বিস্ময় ছড়িয়ে গেল। রিধিমা রস্ট্রামে উঠে পড়ল। হাঁফাতে হাঁফাতে চেঁচিয়ে বলল, ‘মিস্টার চেয়ারম্যান, আমি হার্ভার্ডের একজন PhD স্টুডেন্ট। কিছু খারাপ লোক আমাকে খুন করতে চাইছে। আমাকে প্লিজ বাঁচান। ওরা আমাদের হার্ভার্ডের চারজন প্রফেসরকে খুন করেছে।’ রিধিমা ওর হার্ভার্ডের ID কার্ডটা, যেটা কাল সন্ধ্যাবেলায় সুনয়ন দোকান থেকে ছাপিয়েছে, সেটা তুলে বলল, ‘আমার হার্ভার্ডের ID।’
দর্শকেরা সবাই বিস্মিত। প্রেসিডেন্টের আসনে বসে জেনারেল লি ঝেনের দৃষ্টিতে ঘোর অবিশ্বাস, যা দেখছে তা সত্যি? এভাবে মেয়েটা রস্ট্রাম পর্যন্ত চলে আসতে পারে?
‘প্লিজ!’ রিধিমা হাত জোর করে আকুতি জানাল। ‘আপনারা বলেন UN ওয়াজ ক্রিয়েটেড টু সেভ হিউম্যানিটি ফ্রম হেল।’ রিধিমা দু’হাত সামনে দু’দিকে ছড়িয়ে বলল, ‘প্লিজ সেভ মি ফ্রম দ্য হেল! অ্যাসাসিন একটু আগেই আমাকে এই UN হেডকোয়ার্টার্সের বাইরে মারতে চেষ্টা করেছে। আমাকে কথা বলতে দিন। প্লিজ এলাউ মি দ্য ফ্লোর!’ রিধিমা হাঁফাচ্ছে। ‘প্লিজ!’
UN সেক্রেটারি জেনারেল ফিসফিস করে চেয়ারম্যানকে কিছু বললেন, পাশ থেকে প্রেসিডেন্ট লি ঝেনও খুব বিরক্ত মুখে চেয়ারম্যানকে ফুসুর ফুসুর করে কিছু বলল। ততক্ষণে সিকিউরিটি গার্ড দু’জন রিধিমার পাশে এসে রিধিমা দু’হাত শক্ত করে ধরল।
‘প্লিজ!’ রিধিমা কাতর ভাবে বলল। প্লিজ, গিভ মি দ্য ফ্লোর!’
সিকিউরিটি গার্ড দু’জন এবার রিধিমাকে হিঁচড়ে টেনে রস্ট্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। একজন রিধিমার ব্যাকপ্যাকটা ধরে টান মারল।
‘প্লিজ!’ রিধিমা অনুনয় বিনয় করতে লাগল।
‘ওয়েট!’ পিছন থেকে চেয়ারম্যানের গলা। ‘আই গিভ দ্য ফ্লোর টু দিস লেডি ফ্রম হার্ভার্ড ফর নেক্সট ফাইভ মিনিটস,’ চেয়ারম্যান ডেস্কে গ্যাভেল ঠুকল।
সিকিউরিটি অফিসাররা রিধিমাকে ছেড়ে দিল। রিধিমা চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা গলায় বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইয়ু।’ পাঁচ মিনিট। রিধিমা এক লম্বা শ্বাস নিয়ে শুরু করল ‘আমি এখন একটা নির্মম সত্য প্রকাশ করার জন্য লড়াই করছি। এই সত্য আঁকড়ে ধরেছিল বলে গত ছ’দিনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রফেসরকে হত্যা করা হয়েছে। এদের দোষ ছিল বুদ্ধের হাড়ের সম্বন্ধে একটা মিথ্যা সার্টিফিকেট তারা দিতে চান নি। চার বছর আগে বুদ্ধের এই একই হাড়ের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে আমার দাদা দিল্লী মিউজিয়ামের কিউরেটার ডঃ সিদ্ধার্থ বোস এই নিউ ইয়র্ক থেকেই রহস্যময় ভাবে চিরতরে হারিয়ে গেছিল। দিল্লীর সেই বুদ্ধের হাড় এখন এদেশে ব্ল্যাক মার্কেটে নিলামে চড়েছে। এক বিলিয়ন ডলার দামে সেই হাড় বিক্রি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই হাড়ের অথেন্টিসিটি সার্টিফিকেট দেবার জন্য হার্ভার্ডের কয়েকজন প্রফেসরকে জোর করা হয়েছিল, তারা রাজি হয় নি, তাই সেই চারজন প্রফেসরকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি এই চারজন প্রফেসরকে কে মেরেছে। আমি তার মুখোশ এখন খুলে দিতে চাই।’
রিধিমা চুপ করল। স্টেজের নিচে দু’ধারে একদল ইউনিফর্ম পরা সিকিউরিটি গার্ড জড়ো হয়ে গেছে। ওদের মধ্যে টাই জ্যাকেট পরা লোকটা সম্ভবতঃ ওদের চিফ, সেলফোনে মুখ চেপে উত্তেজিত হয়ে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে। বোধহয় আরও সিকিউরিটি অফিসারকে আসতে বলছে। গোটা অডিটোরিয়ামে ফিসফিসানি ছড়িয়ে যাচ্ছে। রিধিমা বলল, ‘খুনিকে যে ভাড়া করেছে সে হল আপনাদের এই কনভেনশনের প্রেসিডেন্ট— জেনারেল লি ঝেন।’
‘স্টপ দিস ননসেন্স!’ জেনারেল লি ঝেনের চিৎকার বিশাল জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলের আনাচ কানাচ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। ‘বেসলেস অ্যালিগেশনস! আসলে এ মেয়েটা নিজেই খুনি। আ সিরিয়াল কিলার! এই ফিউজিটিভ হার্ভার্ড স্টুডেন্টকে তিনটে স্টেটের ল’ এনফোর্সমেন্ট, পুলিশ, FBI গত পাঁচ দিন ধরে ম্যানহান্ট করে চলেছে। একে এক্ষুনি গ্রেফতার করা হোক।’
রিধিমা চুপ করল। এবার সুনয়নের ভিডিও রস্ট্রামের স্ক্রিনে প্রোজেক্ট হওয়ার কথা। লি ঝেনের স্বীকারোক্তি।
কিন্তু কোথায় ভিডিও?
সুনয়ন এত দেরি করছে কেন?
এরপর ওরা ওকে আর সময় দেবে না। অ্যাসেম্বলি হলে গুঞ্জন বেড়ে এখন কলরবে পরিণত হয়েছে। লি ঝেন এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার চিৎকার করল— ‘এই খুনি মেয়েটাকে এখুনি গ্রেফতার করা হোক।’
রিধিমা অসহায় ভাবে এদিক ওদিক তাকাল। ইউনিফর্ম পরা দু’জন সিকিউরিটি অফিসার এবং সঙ্গে টাই-জ্যাকেট পরা একজন মাথা কামানো মানুষ ওর দিকে এগিয়ে আসছে। এক্ষুনি রিধিমার দিকে অজস্র অপবাদের আঙুল উঠবে। টাই-জ্যাকেট পরা মানুষটা পোডিয়ামের নিচ থেকে বলল, মিস, প্লিজ গেট ডাউন।’ রিধিমা কিছু বলতে যাচ্ছিল, লোকটা বিরক্ত হয়ে সিকিউরিটি অফিসার দু’জনকে বলল, ‘ব্রিং হার ডাউন।’ সিকিউরিটি অফিসার দু’জন স্টেজে উঠে এল, রিধিমা কুঁকড়ে গেল ভয়ে। কিন্তু হঠাৎ পিছনের জায়েন্ট স্ক্রিন দুটো সরব হয়ে উঠল। গোটা স্ক্রিন জুড়ে জেনারেল লি ঝেনের মুখ।
অ্যাসেম্বলি হলের সমস্ত গুঞ্জন থেমে গেল। জেনারেল লি ঝেন স্বীকারোক্তি দিচ্ছে—
‘হার্ভার্ডের প্রফেসরদের বলা হয়েছিল ওরা যেন সার্টিফাই করে যে আর্টিফ্যাক্টটা সত্যি বুদ্ধের হাড়। কিন্তু ওরা তাতে রাজি হল না। এটা জানলেই আমার কাস্টমাররা পিছিয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে বুদ্ধের হাড়ের অকশন। এক বিলিয়ন ডলারের স্টেক, তাই হার্ভার্ডের প্রফেসরদের মারতেই হল।’
দর্শকদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই পরের স্টেটমেন্টগুলো—
‘আই সোয়্যার। আমি নকল জিনিস বেচি না। এটা দিল্লী মিউজিয়ামের ওরিজিন্যাল পিতরাওয়া বোনস অব বুদ্ধা। আমি এটা দিল্লী মিউজিয়াম থেকে চুরি করিয়েছিলাম। ওই PhD স্টুডেন্ট ইণ্ডিয়ান মেয়েটা প্রফেসরদের মিসলিড করেছে। ঐ যত নষ্টের গোড়া। আই সোয়্যার ওকে আমি মারবই। ওই মেয়েটাকে আমি কাল খতম করবই, এটা আমার প্রমিস।’
সিকিউরিটি গার্ড দু’জন থেমে গেল। সুনয়ন কথা রেখেছে। সুনয়ন আজ যেন মেঘনাদ— মেঘের আড়াল থেকে বাণ ছুড়েছে। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ।
এবার প্রবল গণ্ডগোল শুরু হল। লি ঝেন রেগেমেগে হনহন করে স্টেজ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মাথা কামানো টাই-জ্যাকেট পরা লোকটার ইঙ্গিতে সিকিউরিটি গার্ড ওকে গ্রেফতার করল। উত্তেজিত জেনারেল হাত পা ছুড়তে লাগল, সিকিউরিটি গার্ডরা জেনারেলকে ব্যাক স্টেজ দিয়ে বের করে নিয়ে গেল।
রিধিমার আন্দাজ ঠিকই। টাই-জ্যাকেটের লোকটা উঠে এল পোডিয়ামে, তারপর মাইক্রোফোনে বলল, ‘লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলম্যান, আমি রজার হুইলার, ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টাসের সেফটি অ্যাণ্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেসের ডেপুটি চিফ। আপনারা নিজের জায়গায় প্লিজ বসে থাকুন। আমরা এক্ষুনি অবস্থা আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসছি। জেনারেল লি ঝেনকে ইন্টারোগেশনের জন্য আমাদের সিকিউরিটি অফিসাররা নিয়ে গেছে। আমরা আপনাদের আপডেটস জানাব।’
এবার UN-এর সেক্রেটারি জেনারেল সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে তিনি পোডিয়ামে এসে দাঁড়ালেন। রিধিমাকে এসে ধীরে ওর নাম জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি পোডিয়ামের মাইকে বললেন— ‘ইটস আ শেম!’ গোটা অ্যাসেম্বলি হল এবার চুপ। UN সেক্রেটারি জেনারেল এবার কর্তৃত্ব সহকারে অবস্থা সামলালেন – ‘বৌদ্ধধর্ম সবসময় পৃথিবীর শান্তির জন্য এক জোরালো আহ্বান দিয়ে এসেছে। আজ আমাদের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বুদ্ধের সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং মানবতাবাদের বাণীকে আলিঙ্গন করার সময়। মহাপরিনিব্বানসুত্তং অনুযায়ী বুদ্ধের ইনজাংশন ছিল স্তূপের নিচে শরীর ধাতু রেখে তাকে শ্রদ্ধা জানানো। এই পবিত্র মানুষের অস্থি স্তূপ খুঁড়ে বের করে নিয়ে যাওয়ার অর্থ সেই মহামানবকে চূড়ান্ত অশ্রদ্ধা করা। নিজেদের স্বার্থে মানুষ কবর থেকে পর্যন্ত বুদ্ধকে টেনে এনেছে। আজ বুদ্ধের হাড়, বুদ্ধের রক্তে ভেজা তুলো, বুদ্ধের ছাই সব বিক্রি হচ্ছে। চারদিকে এক জুয়াচুরি চলছে। বুদ্ধের শরীরধাতু হল শুধুমাত্র ওর চিতার ছাই, ওতে কোনো অলৌকিক শক্তি নেই। শুধুমাত্র এদের পুজো করে মানুষ মোটেই কোনো বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে না। এটা শুধু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই পৃথিবীতে একজন মহান মানুষ জন্মেছিলেন, তার নাম শাক্যমুনি বুদ্ধ। বুদ্ধের এই হাড়কে অতিরঞ্জিত করে আমরা কখনোই ধর্মের পথে উত্তরণ করতে পারি না। যারা ভালবাসার আহ্বানকে ঘৃণার কান্নায় রূপান্তর করতে চায় আমাদের উচিত তাদের বিরোধিতা করা। এটা শুধু কথার কথা না। আমি একে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তাই আমি, সেক্রেটারি জেনারেল অব ইউনাইটেড নেশনস, মিস রিধিমা বোসের সিকিউরিটির দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনারা প্রোগ্রামের স্কেজুলে ফিরে যান। আমাদের UN সেফটি অ্যাণ্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এবিষয়ে তদন্ত করুক। আমি নিজে মিস রিধিমা বোসের সঙ্গে আমার অফিসে কথা বলব।’
রিধিমার মনে হল সে যেন স্বপ্ন দেখছে। রিধিমা অনুভব করল ওর শরীর থেকে সারা জীবনের ভার নেমে গেল, ও এত হাল্কা হয়ে গেছে যেন তুলোর বীজের মত হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে দেশে পৌঁছে যেতে পারে।
সেক্রেটারি জেনারেল রস্ট্রাম থেকে বেরিয়ে গেলেন। এবার ডেপুটি চিফ অব সিকিউরিটি রিধিমাকে খুব নম্রভাবে বলল, মিস, আপনি প্লিজ আমার সঙ্গে চলুন ।’
স্টেজের পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে রিধিমাকে GA200 মিটিং রুমে নিয়ে এল রজার হুইলার, সঙ্গে দু’জন সিকিউরিটি গার্ড। ‘আপনি কিছুক্ষণ বসুন।’ রিধিমাকে সিকিউরিটি গার্ডদের তত্ত্বাবধানে রেখে দৌড় লাগাল রজার হুইলার। রিধিমা মিটিং রুমে বসে অপেক্ষা করতে করতে ভাবল সুনয়ন কি পালাতে পেরেছে? ও ধরা পড়ে যায় নি তো? স্লাইডিং রেড প্লেট গ্লাস পার্টিশনের পাশে UN-এর পতাকা মুড়ে দাঁড় করানো, তার পাশে দেওয়ালে UN-এর ছ’টা অফিসিয়াল ভাষায় লেখা একটা শব্দ— রিধিমা শুধু ইংরাজীটাই পড়তে পারল — ‘পিস’ —শান্তি। রিধিমার মনে এখন অনেক শান্তি।
কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল রজার হুইলার। লোকটা অসম্ভব ব্যস্ত। ‘চলুন।’ রিধিমা রজারের সঙ্গে হলওয়েতে বেরিয়ে এল। ফোনে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিতে দিতে হনহন করে হাঁটছে। রিধিমাও ওর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। রিধিমা ভেবেছিল ওরা সেক্রেটারি জেনারেলের অফিসে যাচ্ছে, কিন্তু লোকটা ওকে ওর নিজের অফিসে নিয়ে গেল।
‘বসুন,’ লোকটা নীল স্ট্রাইপড টাইয়ের গিঁটে মুদ্রাদোষের মত বারবার হাত দিচ্ছে। নিজের অফিসে ঢোকার পর থেকেই লোকটার রণংদেহি মূর্তি, ফোনে যার সঙ্গে কথা বলছিল তার ওপর চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘কীভাবে এই সিকিউরিটি ল্যান্স হল, আমার তার রিপোর্ট চাই, ASAP।’ তারপর ফোন রেখে রিধিমা দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি আমাদের এক এমব্যারাসড অবস্থায় ঠেলে দিয়েছেন। আপনার জন্য অন্ততঃ দু’জন সিকিউরিটি অফিসার আজ সাসপেণ্ড হবে। কাল গোটা পৃথিবীর কাগজে কাগজে ফলাও করে আমাদের সিকিউরিটি ল্যান্সের কথা ছাপা হবে। আপনি এটা কেন করলেন? কেন আমাদের পারমিশন ছাড়া মিটিংয়ে ঢুকলেন?’
রিধিমা বলল, ‘মনে করুন একটা জঙ্গলের মধ্যে একদল হিংস্র নেকড়ে আপনাকে তাড়া করেছে। সামনে একটা বাড়ি দেখলেন যার দরজায় লেখা নো অ্যাডমিশন উইদাউট পারমিশন। বাড়িতে ঢুকতে এক মুহূর্ত দেরি করলে নেকড়ের ধারালো দাঁত আপনার শরীরের মাংসে গেঁথে যাবে। আপনি তখন কি গৃহস্বামীর পারমিশন চাইবেন? নাকি প্রাণ বাঁচাতে ভিতরে ঢুকে যাবেন?’
রজার হুইলারের হাত আবার টাইয়ের গিঁটে, রিধিমা বুঝল এই লোকটা এখন আগে নিজের চাকরি বাঁচাবার জন্য ওকে জেরা করতে বসবে। রিধিমা বলল, ‘সেক্রেটারি জেনারেল বললেন আমার সঙ্গে কথা বলবেন। ওনার অফিসে কি আমরা— ?’
‘থার্টি এইটথ ফ্লোর?’ রজার হুইলার রিধিমার অজ্ঞতায় হাসল। ‘ওঁকে ধরা এত সহজ নাকি? উনি সারাদিনে মিটিংয়ের পর মিটিংয়ে আটকে থাকেন। কখনো ক্লাইমেট চেঞ্জ, কখনো পভার্টি ইস্যু, কখনো গ্লোবাল হেলথ, পাকিস্তান, সোমালিয়া, সুদান, এক মিটিং রুম থেকে আরেক রুমে শুধু ছুটেই চলেছেন। লোকটা যেন সবসময় একটা মুভিং কনভেয়ার বেল্টে বসে। কখনো হেড অব স্টেট, হেড অব গভর্নমেন্ট, ফরেন মিনিস্টারস—’ রজার হুইলার বলল। ‘ওঁর সিকিউরিটির দায়িত্ব আমার, তাই আমি ওঁর প্রতিদিনের স্কেজল জানি। গত দশ দিনে লোকটা একশ বিরানব্বইটা মিটিং করেছে, তারমধ্যে একশ কুড়িটা বাইল্যাটারাল মিটিং। ওর সেক্রেটারিকে কনট্যাক্ট করে মিটিং স্কেজল করতে হবে।’
রজার হুইলারের সেলফোন ভাইব্রেট করল, ফোনটা তুলতে তুলতে রজার হুইলার বলল, ‘এক্সিউজ মি, ইটস ফ্রম হিম।’ তারপর রজার হুইলার কিছুক্ষণ— ইয়েস স্যার শিশুর শিশুর শিওর স্যার এসব বলতে লাগল । ফোনালাপ বন্ধ হলে রজার হুইলার বলল, ‘লি ঝেন একজন ওয়ার্ল্ড রিনাউন্ড ডিগনিটারি। ও অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেন, UN সেমিনারের প্রেসিডেন্ট হিসাবে আমেরিকায় এসেছে। ওর ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি আছে। ইন্টারোগেশনের জন্য ওকে বেশিক্ষণ হোল্ড করে রাখা যাবে না। ওর নামে এদেশে কোনও ক্রাইমের জন্য অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নেই। তাই ওকে টেকনিক্যালি আমরা FBI-এর হাতে তুলে দিতে পারি না। ওকে ছেড়ে দিতে হবে। সেক্রেটারি জেনারেল ঠিক পাঁচটায় আপনাকে নিয়ে ওঁর অফিসে যেতে বলেছেন উইথ আ কমপ্লিট রিপোর্ট অব প্রিলিমিনারি ইনভেস্টিগেশন।’
‘বলুন আমাকে কী করতে হবে?’
‘আপনি আপনার কমপ্লিট স্টোরি বলুন, আমি রেকর্ড করব।’
পরের পনের মিনিট রিধিমা সমস্ত ঘটনা টেপ রেকর্ডারের সামনে বলল রজার হুইলার মাঝে মাঝে নোটস নিচ্ছিল। রিধিমার বলা শেষ হলে রজার বলল, ‘মিস বোস, আপনাকে যে কেমব্রিজ পুলিশ অফিসার ফোন করে লাইফ থ্রেটনিং দিয়েছিল তার নাম আপনি জানেন কী?’
‘ব্রেট কলিন।’
‘সেই থ্রেটের ভয়ে আপনি পুলিশের কাছে সারেণ্ডার না করে ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন, কারেক্ট?’
‘কারেক্ট।’
রজার হুইলার প্যাডে সেই পুলিশ অফিসারের নাম লিখে নিল। তারপর বলল, ‘মিস বোস, আমি এই পজিশনে ষোলো বছর আছি। আমার আণ্ডারে তিনশ কুড়ি জন আর্মড সিকিউরিটি ফোর্স টোয়েন্টি ফোর সেভেন এই UN হেডকোয়ার্টার পাহারা দিয়ে চলেছে। সমস্ত স্ট্যাফ, ডিপ্লোম্যাটস, হেডস অব স্টেট, এবং প্রত্যেক বছর যে প্রায় দেড় মিলিয়ন লোক এই ক্যাম্পাসে ঢোকে তাদের সেফটি আমি এন্সিওর করি। গত ষোলো বছরে এই প্রথম এরকম ঘটনা ঘটল। ইটস আ টোটাল ব্রিচ ইন মাই সিকিউরিটি। শেম! আমার জায়গায় আপনি নিজেকে চিন্তা করে দেখুন একবার—’
‘আর আমার জায়গায় আপনি হলে কী করতেন?’
এবার রজার ঠোঁট কামড়ে এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর বলল, ‘আমিও হয়তো আপনার মত একই কাজ করতাম। আই লাইকড ইয়োর অ্যানালজি উইথ প্যাক অব হাঙ্গরি উলভস। তবে আমাকে এখন আমার জায়গায় থেকেই ডিসিশন নিতে হবে। আপনার নামে পুলিশের ওয়ারেন্ট আছে। আপনাকে অ্যারেস্ট করে FBI-এর হাতে তুলে দেওয়া আমার জব ডেস্ক্রিপশনে পড়ে। কিন্তু সেক্রেটারি জেনারেল নিজে আপনাকে ইমিউনিটি দিয়েছেন। উনি ইমিউনিটি ওয়েভ না করলে আমি তা পারি না। তাই আপনার সমস্ত অ্যালিবাই আমরা চেক করব, সন্ধ্যাবেলা সেক্রেটারি জেনারেলকে রিপোর্ট করব। দেন ইট ইজ হিজ কল।’
‘আর লি ঝেন? ও ছাড়া পেয়ে যাবে?’
‘ওকে আটকে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এনিওয়েজ, আপনি আমার পারমিশন ছাড়া এই বিল্ডিং ছেড়ে বাইরে যাবেন না। আপনি সিকিউরিটি কাউন্সিল কনসাল্টেশন রুমে থাকবেন। আমার স্ট্যাফ আপনাকে পাহারা দেবে। আমি আপনার ইণ্ডিয়ান কনসুলেটকে জানিয়ে দিচ্ছি।’
‘থ্যাঙ্কস!’
রিধিমাকে UN সিকিউরিটি কাউন্সিল কনসাল্টেশন রুমের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে চলে গেল রজার হুইলার, একজন সশস্ত্র সিকিউরিটি দরজায় দাঁড়াল। রুম আজ খালি। দেওয়ালে হেনরি মাতিজের ওয়াটারকালার ল্যাণ্ডস্কেপ। অস্ট্রিয়ান ওয়ালনাট টেবিলে রিধিমা ল্যাপটপের ব্যাগ রাখল। কিছুক্ষণ আগেও উত্তেজনা চরমে ছিল, এখন অনেক হালকা লাগছে। রিধিমা দু’পা দু’হাত টানটান করল। মেহগনি কাঠের দেওয়ালে UN এমব্লেম— পাঁচটা বৃত্তের মাঝে পৃথিবীর মহাদেশগুলোকে ঘিরে রেখেছে দুটো বিশাল অলিভ শাখা শান্তির প্রতীক। দরজায় নক। সিকিউরিটি স্ট্যাফ ভিতরে এসে বলল, ইণ্ডিয়ান কনসুলেটের কেউ দেখা করতে চান।
‘পাঠিয়ে দিন, প্লিজ।’
রিধিমা ভেবেছিল মোহন আসবে, কিন্তু ভিতরে ঢুকল ফার্স্ট সেক্রেটারি জয়দেব সাউ, আর সঙ্গে ডিজি মোহন যোশী। জয়দেব সাহু বলল, ‘মিনিস্টার সাহাব ফোনে পি এমকে ইমারজেন্সি ব্রিফিং করছেন। আপনি আজ সন্ধ্যায় আমাদের ইণ্ডিয়া মিশনে আসবেন, মিনিস্টার কথা বলতে চান।’
রিধিমা তাকিয়ে দেখল মনোজ যোশীর চোখে নার্ভাস দৃষ্টি। ওর চোখের দৃষ্টিতে সেই জোর আর নেই। মনোজ যোশী খুব নিচু গলায় বলল, ‘আপনার জন্য একটা পার্সোনাল নোট, খুব ইম্পরটেন্ট।’ রিধিমাকে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল মনোজ যোশী। দু’জনে চলে গেলে রিধিমা চিঠিটা খুলল—
কাল আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে আমি আজ UN-এ এলে আমার মৃতদেহই ভারতে ফিরবে। জানি না দেশে ফিরতে পারব কিনা। একটা সত্যি কথা আপনার জানা দরকার। আপনার দাদা চোর ছিলেন না। উনি আমার গোপন পরামর্শেই দিল্লী মিউজিয়াম থেকে বুদ্ধের হাড় সরিয়ে হাড়ের DNA টেস্ট করার জন্য এদেশে এনেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে কয়েকজন দেশদ্রোহী লি ঝেনের সঙ্গে বুদ্ধের হাড় বেচার গোপন চুক্তি করে ফেলেছে৷ আপনার পাসপোর্টের পাতা কে ছিঁড়েছে আমি জানি। সে এক সময় আপনার ঘনিষ্ঠ লোক ছিল। আমি আপনাকে একটা ভীষণ গোপন তথ্য দিয়ে যাব যে কে আপনার দাদাকে খুন করেছে। আপনি চারটের সময় মেন ক্যাফেটেরিয়াতে আসুন। মন্ত্রী বা আর কেউ যেন জানতে না পারেন।
– ম-যো
৷৷ চুয়াল্লিশ ৷৷
রজার হুইলার যখন সিকিউরিটি কাউন্সিল কনসাল্টেশন রুমে এল দেওয়াল ঘড়িতে তখন পৌনে চারটে।
‘সাম গুড নিউজ ফর ইউ লেডি,’ রজার একটা চেয়ার টেনে বসল, মুখের উদ্বেগের চিহ্ন অন্তর্হিত। ‘কাল একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে যেটা আপনার কেসের সঙ্গে রিলেটেড। কাল লি ঝেন লেক জর্জে ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটি নামে এক মনাস্টারি ভিজিট করেছিল। সেই মনাস্টারির হেড লামাকে পুলিশ কাল রাতে অন্য একটা ইস্যুতে অ্যারেস্ট করেছে। আজ সেই হেড লামা স্বীকার করেছে যে লি ঝেন ওকে বুদ্ধের হাড় বিক্রি করার জন্য অ্যাপ্রোচ করেছিল এবং এক বিলিয়ন ডলার দাম চেয়েছিল। কিন্তু হেড লামা সেই হাড় কেনেনি। সুতরাং স্ক্রিনে প্রোজেক্টেড ভিডিওটা সত্যি।’
‘থ্যাঙ্কস!’ রিধিমা বলল। ‘আমি জানতাম—,
‘আরও আছে,’ রজার হুইলার টাইয়ের গিঁটে হাত দিল। ‘আপনি খুনের সময় এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটে ছিলেন এটা যেমন সত্যি, ঠিক ততটাই সত্যি যে ব্রেট কলিন নামে একজন পুলিশ সার্জেন্ট আপনাকে মেরে ফেলার ধমকি দিয়েছিল।’
‘বাঁচালেন,’ রিধিমা হেসে বলল। ‘আমি তো নিজেই নিজেকে সন্দেহ করতে শুরু করে দিয়েছিলাম।
‘ইউ ও’ মি আ লাঞ্চ। অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হল, FBI আপনার নামে সমস্ত চার্জ ড্রপ করে দিয়েছে। আমাদের ফিডব্যাকের ভিত্তিতে ওরা লি ঝেনকে ইন্টারোগেট করতে চায়। আর কেমব্রিজ পুলিশ ব্রেট কলিনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, ব্রেট স্বীকার করেছে যে ওর তখন রাগে দুঃখে মাথার ঠিক ছিল না।’
‘লাঞ্চের কথায় মনে পড়ল। এখন কি আমি ক্যাফেটেরিয়ায় যাওয়ার অনুমতি পেতে পারি? আমার লাঞ্চ করা হয় নি।’
রজার ঘড়ির দিকে তাকাল… ‘হোলি স্যুগার। পাঁচ মিনিটে ক্যাফেটারিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। গো গেট সাম বাইটস, তারপর কথা হবে। রাশ! আমাকে সেক্রেটারি জেনারেলের জন্য রিপোর্টটা তৈরি করতে হবে— না হলে আমি আপনাকে ক্যাফেটেরিয়ায়—’
‘নো ওরি,’ রিধিমা বলল। আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব।’
রিধিমা কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে এল। একা যাওয়াটাই দরকারি। রিধিমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল যে এই মনোজ যোশী লোকটা অনেক কিছু জানে, কিন্তু ভয়ের চোটে বলতে পারছে না।
UN সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের ভিতর ফর্টি সেকেণ্ড স্ট্রীট ফার্স্ট অ্যাভিনিউর সংযোগে সেক্রেটারিয়েটের মেন ক্যাফেটেরিয়া। রিধিমা দ্রুতপায়ে হেঁটে পৌঁছোল। ক্যাফেটেরিয়ার দরজার পাশে বোর্ডে অপারেটিং টাইম লেখা, ক্যাফেটেরিয়া চারটের সময় বন্ধ হয়ে যায়।
ক্যাফেটেরিয়া খালি। বিশাল ক্যাফেটেরিয়া, একসঙ্গে সাতশ লোক লাঞ্চ করতে পারে। মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত কাঁচের দেওয়াল, বাইরে বিকেল ঘুমিয়ে পড়ছে।
‘বন্ধ হয়ে গেছে,’ একজন স্ট্যাফ মেঝে মপ করছিল। লোকটা মপ কার্ট ঠেলতে ঠেলতে কিচেনের ভিতরে চলে গেল। তারপর আবার বেরিয়ে গেল বাইরে। রিধিমা দেখল মনোজ যোশী জানলার ধারে বসে। রিধিমাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। রিধিমা মনোজ যোশীর উলটো দিকে চেয়ার টেনে বসল।
‘আমার হাতে একদম সময় নেই,’ মনোজ যোশী বলল। ‘মিনিস্টার সাহাব যে কোনও মুহূর্তে ডেকে পাঠাবেন। সিদ্ধার্থ আমার খুব ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিল—’
মনোজ যোশীর পকেটে ফোনটা ঝাঁঝাঁ করে ভাইব্রেট করল।
ফোনের দিকে তাকিয়ে মনোজ যোশীর মুখে বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ল— ‘মিনিস্টার!’ তারপর বলল, ‘আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন প্লিজ। আপনি এখানেই থাকুন। খুব ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি। আর সম্ভবতঃ আপনাকে বলার সুযোগ আমি পাব না।’ মনোজ যোশী ফোনটা কানে লাগিয়ে প্রায় দৌড় লাগাল।
রিধিমা বাইরে তাকাল। জানলা দিয়ে ইস্ট রিভার আর ওপারে কুইন্স দেখা যাচ্ছে, আরও একটু দূরে ব্রুকলীন এই পড়ন্ত আলোয় ঝাপসা সিলোউয়েট। আলোকবিন্দু নদীর ওপারের হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোতে ছড়িয়ে গেছে কিন্তু রিধিমার এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তারিফ করার মত মনের অবস্থা নেই। রিধিমা ওর ল্যাপটপটা খুলল। সুনয়নের কোনও ইমেইল এসেছে কি? UN-এর গেস্ট ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডটা কী? কয়েক মিনিট কেটে গেল। জনহীন ক্যাফেটেরিয়ায় একা একা অস্বস্তি লাগছে। রিধিমা দরজার দিকে তাকাল, সাদা অ্যাপ্রন, মাথায় সাদা স্কাল ক্যাপ পরা একজন এমপ্লয়ি ক্যাফেটেরিয়ার দরজায়। সম্ভবতঃ ডিনারের স্ট্যাফ। লোকটার পিছনদিক দেখা যাচ্ছে। ক্যাফেটেরিয়ায় ঢোকার কাঁচের দরজার সামনে পাকানো মোটা দড়িটা দরজার এমাথা থেকে টেনে ও মাথার হুকে গুঁজল লোকটা, আর ‘ক্যাফেটেরিয়া ইজ ক্লোজড’ বোর্ডটা ঝোলালো। তারপর সুইচবোর্ডে লোকটা থাবা মারতেই একসঙ্গে অনেকগুলো আলো নিভে গেল ক্যাফেটেরিয়ায়। লোকটা এবার রিধিমার দিকে মুখে ফেরাল । ওর মুখের দিকে তাকাতেই রিধিমা আতঙ্কে শিউরে উঠল।
কেভিন দ্য বুচার!
কেভিন এবার ক্যাফেটেরিয়ার দরজা আগলে ভিতরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। রিধিমা একনজরে চারদিকে দেখল। কিচেনের দিকে যাবার একটা দরজা। ওখান দিয়ে হয়তো বাইরে বেরোবার কোনও ইমারজেন্সি এক্সিট থাকবে। রিধিমা কিচেনের দিকে ছুটে গেল। রিধিমাকে ছুটতে দেখে কেভিন ও ছুটতে শুরু করল। রিধিমা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে কিচেনে ঢুকল। কেভিন এক্ষুনি ঢুকবে। রিধিমা নিচু হয়ে কিচেনের আইল্যাণ্ডে বসে পড়ল। পাশেই জেনিটারের কার্টটা রাখা, জেনিটার কাজ শেষ করে নি, সম্ভবতঃ একটু পরেই ফিরে আসবে। রিধিমার বুক ধকধক করছে। ভারি পদশব্দ ঢুকল কিচেনে। রিধিমা শ্বাস বন্ধ করে জেনিটারের কার্টের দিকে তাকাল, অ্যাসিড-ট্যাসিড কিছু পাওয়া যায় কিনা। ধুপ ধুপ করে পদশব্দ কিচেনের অন্যদিকে চলে গেল। কেভিন ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কার্টে পাশাপাশি কয়েকটা ড্রেনোর বোতল। রিধিমা কার্ট থেকে একটা বোতল তুলে নিল। ড্রেনের চুল, গ্রিস, ময়লা সব কাটিয়ে দেয় এই করোসিভ লিক্যুইড। সুনয়নের গায়ানিজ বন্ধুর মুখের চামড়া পুড়িয়ে দিয়েছিল। পায়ের শব্দ কাছে এসে গেছে। রিধিমা হাতের মোচড়ে বোতলের ছিপি খুলে ফেলল। পায়ের শব্দ আইল্যাণ্ডের ঠিক ওপাশে থেমে গেল। রিধিমা জানে ওপাশ থেকে লোকটা ড্রেনোর ক্ষারের গন্ধ পেয়েছে। রিধিমার দৃষ্টি কাঠের আইল্যাণ্ড ভেদ করে দেখতে পাচ্ছে লোকটার মুখে কুৎসিত হাসি খেলে গেল।
আইল্যাণ্ড ডিঙিয়ে কেভিন আচমকা রিধিমার সামনে এসে দাঁড়াল। ড্রেনোর বোতলের ক্ষার কেভিনের মুখের ওপর ছুড়বার জন্য রিধিমা হাত তুলল। কিন্তু কেভিন খুব দ্রুত শরীরের মোচড়ে রিধিমার হাত চেপে ধরে হাত পিছনে মুচড়ে দিল। রিধিমা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, হাত থেকে খসে পড়ল ড্রেনোর বোতল। মেঝেতে গড়িয়ে গেল ক্ষার। রিধিমা এক ঝটকায় লোকটাকে ছাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু কেভিনের গায়ে অসুরের শক্তি। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না সে। বিশাল গ্রিজলি ভালুক যেমন নদী থেকে এক ঝটকায় স্যামন মাছ তুলে নেয় ও সেরকম দু’হাতে রিধিমাকে শূন্যে তুলে নিল। তারপর ছুটে গেল কিচেনের ওয়াক-ইন-ফ্রিজারের দিকে। ফ্রিজারের ভারি হাতল খুলে রিধিমাকে কাঁধে ফেলা অবস্থায় ফ্রিজারের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল কেভিন।
ফ্রিজারের ভিতরে কনকনে ঠাণ্ডা অন্ধকার। স্টিলের মেঝে, মোটা স্টিলের চাদর ফ্রিজারের চারদিকে। রিধিমা জোর চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু কেভিন রিধিমার মুখ ওর থাবা দিয়ে চেপে ধরল। রিধিমার মুখ থেকে শুধু চাপা গোঙানি বেরোলো। কেভিনের চোখে হিংস্র দৃষ্টি। কুৎসিত মুখ আরও কুৎসিত হয়ে গেছে। রিধিমা ছটফট করতে লাগল। লোকটার গায়ে দুর্ধর্ষ শক্তি। ও রিধিমার গলা টিপে ধরল। রিধিমার মনে হল ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে যাবে।
হঠাৎ বাইরে পায়ের শব্দ। কেভিন ঘাড় ঘোরালো ফ্রিজারের দরজার দিকে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করল।
কেউ আসছে? ওই জেনিটার ওর মপিং কার্ট ফেরত নিতে এসেছে?
রিধিমা এক ঝটকায় কেভিনের হাতে কামড় দিয়ে চিৎকার করে উঠল। ফ্রিজারের দরজাটা খুলে গেল। সুনয়ন। হাতে একটা খোলা ড্রেনোর বোতল । কেভিন রিধিমাকে এক ধাক্কায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে দরজার দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে সুনয়ন ড্রেনোর বোতলের একদলা ক্ষার ছিটিয়ে দিল কেভিনের চোখ লক্ষ্য করে। ক্ষার কেভিনের দু’চোখ, নাক-মুখ স্পর্শ করতেই কেভিন আর্তনাদ করে উঠল। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ফ্রিজার থেকে বেরিয়ে কিচেনের বেসিনগুলোর দিকে ছুটে গেল কেভিন। কল খুলে মুখে ক্রমাগতঃ জলের ঝাপটা দিতে লাগল। এবার কেভিনের দিকে এগিয়ে গেল সুনয়ন। ফ্রিজারের ভিতরের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার আগে রিধিমা দেখল একটা বড় বর্শার মত লম্বা আর ভারি স্টিলের খন্তা হাতে তুলে নিয়ে সুনয়ন ভীষণ জোরে কেভিনের মাথার পিছনে আঘাত করল। কেভিন বুচার দু’হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল। কেভিনের পা টলছে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কেভিন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সুনয়নের দু’চোখে আগুন ঝরছে। সুনয়ন কেভিনের মাথায় আবার জোরে আঘাত করল। তারপর অজ্ঞান কেভিনের পা ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে আবার ফ্রিজারের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। কেভিনের মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, মুখ ক্ষারে বিকৃত।
সুনয়ন এবার ফ্রিজার থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে কিচেন থেকে একটা মোটা দড়ি নিয়ে ফিরে এসে অচৈতন্য কেভিনকে আষ্টেপৃষ্টে লোহার র্যাকের সঙ্গে বাঁধল। তারপর সুনয়ন দ্রুতহাতে কেভিনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওর সেলফোন বের করে আনল। আই ফোন। সুনয়ন এবার কেভিনের অন্য পকেট হাতড়াল— আরেকটা সেলফোন! এটা স্যামসাং গ্যালাক্সি এস টেন। দুটো সেলফোনই লকড। সুনয়ন এবার কেভিনের পিছনের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে নিজের পকেটে ভরল। তারপর সুনয়ন জ্ঞানহীন কেভিনের ডান হাতের বুড়ো আঙুল কেভিনের আইফোনের টাচ আইডি সেন্সরে ধরল, ফোন অন হয়ে গেল। সুনয়ন এবার নিজের আইফোন পকেট থেকে বের করে একটা অ্যাপ খুলে সেখানে কেভিনের বুড়ো আঙুল চেপে ধরল।
‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট কপি করছেন?’
সুনয়ন মাথা নাড়াল। কেভিনের আঙুলটা অ্যাপের স্ক্রিনে চেপে ধীরে ধীরে একশ আশি ডিগ্রী ঘোরালো। অ্যাপে একটা সবুজ টিক মার্ক পিং করে শব্দ করে জেগে উঠে জানিয়ে দিল ক্লোনিং কমপ্লিট। সুনয়ন উঠে দাঁড়াল— ‘এটা কাজ না করলে ওর আঙুলটা কাটতে হত।’
‘সত্যি?’ রিধিমা ভাবতেও পারছে না লোকটার পক্ষে কী অসম্ভব।
সুনয়ন ফ্রিজারের টেম্পারেচার কন্ট্রোল সুইচ মিনিমাম তাপমাত্রায় করে দিল। ‘চলুন বাইরে।’ সুনয়ন রিধিমাকে বাইরে এনে ফ্রিজারের দরজা বন্ধ করল।
রিধিমা জিজ্ঞাসা করল, ‘ওর কী হবে?’
‘যদি ওকে কেউ সারা রাত উদ্ধার না করে তবে ওর ফ্রস্টবাইট শুরু হবে, ‘সুনয়ন নির্বিকার ভাবে বলল। ‘শরীর থেকে দ্রুত হিট বেরিয়ে যাবে হাইপোথার্মিয়া। তারপর শ্বাসকষ্ট শুরু হবে, ব্রেনে রক্ত যাবে না, তারপর ওর হার্ট মাসল কুঁকড়ে যাবে, বডিতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক এক করে অর্গানগুলো ফেল করবে। কয়েক ঘন্টা, তারপর ব্যাস—’
দুজনে ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকল। রিধিমা এসব নিতে পারছিল না— আপনি জানলেন কিভাবে আমি এখানে?’
‘ইউ ব্রোক দ্য গ্রাউণ্ড রুল নাম্বার থ্রি। কিন্তু আপনার ম্যাকবুক আপনাকে বাঁচিয়ে দিল,’ সুনয়ন বলল। ‘ল্যাপটপটা ক্যাফেটেরিয়াতে খোলা পড়েছিল।’
রিধিমা টেবিল থেকে ল্যাপটপটা তুলে নিল ‘কখন লোকেশন এনেবল করলেন?’
‘যখন আপনি প্লেন ধরতে গেছিলেন তখন।’
‘আমার পাসওয়ার্ড?’
‘HARVARD123 তো?’ সুনয়ন গম্ভীর মুখে বলল।
রিধিমা বাকরহিত। এই লোকটা মনে হয় ওর প্যান্টির রঙও জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে।
সুনয়ন বলে চলল, ‘ভাগ্যিস আপনার কোঅর্ডিনেটস ট্রেস করতে পেরেছিলাম। তারপর ক্যাফেটেরিয়ার কিচেনে ঢুকে ওয়াক ইন ফ্রিজারের ভিতরে ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেলাম। বাকিটা আপনি জানেন।
রিধিমার একটু সময় লাগল ধাতস্থ হতে। বাস্তবে ফিরে এসে বলল, ‘আমাকে এক্ষুনি সিকিউরিটি হেড রজার হুইলারের সঙ্গে দেখা করে সব বলতে হবে।’
* * *
রিধিমা ও সুনয়ন সেফটি অ্যাণ্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেসের ডেপুটি চিফ রজার হুইলারের অফিসে ঢুকল। রজার বলল, ‘আপনার আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে আমি বুঝলাম আপনি কিছু খাবার পেয়ে গেছেন।’ তারপর সুনয়নের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, ‘ইনি—?’
‘বলছি, আগে বলুন লি ঝেনকে কি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?’
‘না, ওর সঙ্গে সেক্রেটারি জেনারেল কথা বলতে চান।
‘গুড,’ রিধিমা বলল। ‘ইনি সুনয়ন সীটাপোটি, রিচমণ্ড হিলস গেজেটের সাংবাদিক, আজকের কনভেনশনে এসেছেন। একটু আগে অনেক কিছু হয়ে গেছে। সব বলছি। লি ঝেনকে কি আপনারা অ্যারেস্ট করতে পারেন না?’
‘আপনার মাথা খারাপ! ওর ডিফেন্স ল-ইয়ার আমাদের ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। কে কোথাকার হ্যাকার আমাদের স্ক্রিনে কিছু ছবি দেখিয়ে গেল তাকে আমরা জানি না, চিনি না, তার ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে আমরা লি ঝেনকে অ্যারেস্ট করব কীভাবে?’
‘ভিডিওটা আমার।’
‘আপনার?’ রজার হুইলার যেন রিফ্লেক্স অ্যাকশনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর নিজেই নিজেকে যেন শান্ত করার জন্য বলল, ‘ওককে, ওয়ান স্টেপ অ্যাট এ টাইম।’ তারপর রিধিমাকে বলল, ‘লি ঝেনকে অ্যারেস্ট করার জন্য কংক্রিট এভিডেন্স চাই। ভিডিও যে কেউ ফটোশপ করে বানিয়ে দিতে পারে।’
‘আমাদের হার্ভার্ডের প্রফেসরদের যে খুন করেছিল সেই খুনি আপনাদের UN বিল্ডিঙের ভিতর ঢুকে পড়েছে। ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই লি ঝেনের সঙ্গে ওর কানেকশন বেরিয়ে পড়বে।’
‘আপনি কীভাবে জানলেন?’
‘একটু আগে সেই জল্লাদটা আমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। ইনি আমাকে বাঁচিয়েছেন৷’
‘হোয়াট?’ হুইলারের চোখে বিস্ময়। ‘কোথায়, কীভাবে?’
‘ক্যাফেটেরিয়ার ওয়াক-ইন-ফ্রিজারে। খুনি অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। ‘আপনারা এখানে থাকুন,’ রজার হুইলার ছুটল ক্যাফেটেরিয়ার দিকে।
‘আপনার ল্যাপটপটা একটু দরকার,’ সুনয়ন বলল৷
রিধিমা ল্যাপটপটা সুনয়নকে দিল। সুনয়ন কেভিনের আইফোনটা রিধিমা ল্যাপটপের সঙ্গে প্লাগ ইন করে পেয়ারিং করে নিল। কেভিনের আইফোন আর রিধিমার ম্যাকের মধ্যে ট্রাস্টেড রিলেশনশিপটা তৈরি হতেই কম্পিউটার কেভিনের ফোনের iTune ব্যাক আপ নিয়ে সমস্ত ফটো, ভিডিও, SMS, কল লগ, —সব কম্পিউটারে তুলে আনল। এবার সুনয়ন পকেট থেকে কেভিনের অ্যান্ড্রয়ড ফোনটা বের করে একই ভাবে সব কপি করে নিল।
মেসেঞ্জারটা খুঁজল সুনয়ন— কেভিন মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেনা। এটা আশ্চর্যের কিছু না। কেউ হোয়াটসঅ্যাপে খুনের অর্ডার নেবে না। অনেকে হোয়াটসঅ্যাপের অল্টারনেটিভ অ্যাপ— টেলিগ্রাম ব্যবহার করে, কিন্তু সেটাও ফুলপ্রুফ না। এনক্রিপটেড টেলিগ্রাম মেসেজকে রিট্রিভ করা জলভাত। কেভিন স্যামসাংয়ে চ্যাটসিকিওর আর আইফোনে টর মেসেঞ্জার ইউজ করেছে। দুটোই সলিড। চ্যাটসিকিওরের সার্টিফিকেট পিনিংয়ে প্রতিটি মেসেজে প্রুফ অব আইডেন্টিটি হিসাবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট না দেখালে খুলবেই না। আর টরের তো কথাই নেই। কার সঙ্গে মেসেজিং চলছে বোঝার উপায় নেই।
সুনয়ন কেভিনের টর মেসেঞ্জারের মেসেজ স্ক্রল করল। অজস্র কন্ট্যাক্ট। ছোট ছোট সব মেসেজ। ‘ডান’ — ‘ফাণ্ড রিসিভড’ — ‘টার্গেট হিট’ এসব। একজন কন্ট্যাক্ট— অ্যাঙ্গরি বুদ্ধা। সুনয়ন মেসেজ বক্স খুলল। মেসেজ পড়ে ওর চক্ষুস্থির।
আড়াইটার সময় কেভিন অ্যাঙ্গরি বুদ্ধাকে লিখেছে — চারটের সময় UN ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন যেভাবেই হোক মেয়েটাকে বন্ধ ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে এসো।
অ্যাঙ্গরি বুদ্ধার উত্তর — ঠিক আছে। কাজ হয়ে গেলে একটা ভিডিও পাঠিও।
ফোন বন্ধ করে সুনয়ন পকেটে রাখল। রিধিমা বলল, ‘হাতে সময় কম। কিন্তু আমাকে এবার একবার মনোজ যোশীজীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। উনি হয়তো ফিরে এসে আমাকে ক্যাফেটেরিয়াতে খুঁজেছিলেন।
‘সেটা ঠিক হবে না।’
রিধিমা সুনয়নের চোখের দিকে তাকাল। তীব্র অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। ‘কেন? কী হয়েছে?’
সুনয়ন কেভিনের ফোন বের করে চ্যাটটা দেখাল।
‘মনোজ যোশী!’ রিধিমা একটা বড় শ্বাস নিল। ‘আনবিলিভেবল! লোকটাকে এক্ষুনি অ্যারেস্ট করা উচিত।’
‘তাহলে ওর সঙ্গে যে গভীর জলের মাছটা আছে সে সাবধান হয়ে যাবে। তাকে আর ধরতে পারবেন না।’
‘পার্টনার?’
‘এসব কাজ মনোজ যোশীর একার কম্মো না। একটা সাপোর্ট আছে ওর সঙ্গে আপনাদের ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে। সে খুব চালাক লোক। সামনে আসছে না। এখন প্রশ্ন হল তাকে পাব কীভাবে?’
