কয়েদি – ২
২
সে এমত বিশ্বাস করে। সে নিজেকেও মনে করে দেশপ্রেমিক একজন। যথার্থই দেশপ্রেমী ও দেশমাতৃকার সেবক সে, বিশ্বাস করে।
প্রথমাবধি সে বুঝেছিল দেশপ্রেম বরণীয় পেশা হতে পারে। একটি অজানা পথে চলতে চলতে যদি কেউ এমন কোনও বিভাজিকায় উপনীত হয়, যেখানে কোনও পথনির্দেশিকা নেই, তখন অচল সিকি বা আট আনি সহায়। টস। মাথা পড়লে দক্ষিণে, লেজ পড়লে বামে। সে দক্ষিণে যাওয়া সাব্যস্ত করে এবং যাবতীয় নীতি দেশহিতকর বিবেচনা করে কারণ শেষ পর্যন্ত বিবেচনা বিশ্বাসে উপনীত হয়, বিশ্বাস পেশায় পরিণত হয়, পেশার দায়িত্ব স্থির করে কর্ম, সেই কর্মসাধন হয়ে দাঁড়ায় জীবন, সেই জীবন ভুল করে কোনও মানব বা মানবীর প্রেমে আচ্ছন্ন হলে কোনও না কোনও কুঠুরিতে আবদ্ধ হওয়া তার নিয়তি।
অনেকেই মনে করে, দক্ষিণ শান্ত, দখিনা বাতাসের মতো মলয়ানিল, দক্ষিণপন্থী দেশভক্তির অর্থ কেবল সহন, কেবল ধৈর্য, শুধুই অনুরোধ, অথবা অনশন মাধ্যমে আত্মপীড়ন দ্বারা অপরের করুণাভিক্ষা, আর বামপন্থা মানেই রে রে রে রে রণপা, অস্ত্রের ঝলক, বন্দুকের নল থেকে বেরুনো ধোঁয়া ও আগুন, হয়তো যথার্থ, কিংবা যথার্থই, তবে রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমিক দক্ষিণপন্থার আপাতশান্ত নকাব উড়ে গেলে পড়ে থাকে অস্ত্রের ঝলক, বন্দুকের নল থেকে বেরুনো আগুন ও ধোঁয়া, মাটিতে পেতে রাখা মাইন, জলে চুবিয়ে রাখা সলিলনিবাসী যুদ্ধজাহাজ ইত্যাদি। অতএব, মোদ্দা ব্যাপার, দেশপ্রেমের সঙ্গে বারুদের নিবিড় যোগ। রক্তেরও। বোতলের রক্ত নয়। যে রক্ত প্রাণহরণী। যে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকলে ভূমিজিহ্বা শোষণ করে নেয়।
বামপন্থা নির্দয় মারকুটে মশাল আগুন বোমা গুলি হত্যা প্রতিহত্যা হিংসা প্রতিহিংসা। দক্ষিণ দয়া করুণা ক্ষমা ছিছি হিংসা ছিছি আগুন ছিছি বোমা ছি ছি ছি কিন্তু আত্মরক্ষার্থে গুলি। জনগণের নিরাপত্তায় গণহত্যা। দেশরক্ষার্থে মাটি খুঁড়ে দেওয়াল ভেঙে কঙ্কালের অতীত নিয়ে লাগিয়ে দেওয়া করুণাময় ধর্মযুদ্ধ। এই দাঁড়াচ্ছে তাহলে?
দক্ষিণপন্থার হিংস্রতায় দয়ার আবরণ নিয়ে তার কখনো আপত্তি ছিল না। গোড়া থেকে যদি দেখা যায়, এক ভূমিখণ্ডের নাম দেশ, দেশের অধিকার অর্জনের মাধ্যম অস্ত্র, রক্ত ও প্রাণ, তার নাম স্বাধীনতা। কিন্তু এখানেই বিষয় থেমে থাকে না। এরপর সেই স্বাধীনতার রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্ন আসে। তার জন্যও দরকার অস্ত্র। রক্ত অনুসরণ করে অস্ত্রকে। রক্তের পশ্চাদ্ধাবন করে প্রাণ। রক্তের অনুসরণ করে মৃত্যু, এমনও বলা যায়।
তবে স্বাধীনতার রক্ষণাবেক্ষণ কেজো কথা। নিষ্প্রাণ। নিরাপত্তা, রক্ষা বা প্রতিরক্ষা উঁচু উদ্ধত দুর্গপ্রাকার। ভিতরকার প্রাণরব ও হৃদিপদ্মসুগন্ধ মোক্ষণ সেখানে নেই। বরং কোনও প্রেমের জন্য প্রাণ ও রক্ত শব্দগুলি অনেক বেশি লাগসই। সে নিজে অন্তত তা-ই মনে করে।
প্রাণ দাও, প্রাণ নাও, প্রাণ সমর্পণ করো, সমর্পিত প্রাণ ধারণ করো।
তাহলে কূপস্থিত সত্যের মধ্যে এই সত্যও কি নিক্ষিপ্ত, যে, প্রেম প্রকৃতপক্ষে দুইখানি প্রাণ জড়িয়ে দেয়? তোমার ও আমার। আমার ও তার। তার ও দেশের। আমার ও দেশের।
সে তার জন্য বরাদ্দ ঘরে বসে সেই সত্যকুলের কথা ভাবে, যারা আপনা-আপনি গভীর কুয়ো থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সেই সত্যদের প্রত্যেকের নিশ্চয় নিজস্ব যুক্তি ছিল। সত্য যে যুক্তি ছাড়া কিছু নয়, সে খুব ভালো জানে। কতবার এই কথা বোঝাবার চেষ্টা করেছে।
লোকে সাধারণত একটা ঘটনাকে বলে সত্য। ঘটনা তো ঘটনাই। প্রকৃত সত্য ঘটনার ব্যাখ্যা। একটি ঘটনায় তিনজন যুক্ত থাকলে সত্য তিনরূপে উপস্থাপিত হবে। দেশপ্রেমও তদ্রূপ সত্য।
কিন্তু সত্য কী, সত্য কেমন, এই ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করেছে, করে চলে নিরন্তর, কিন্তু একদিন সে হঠাৎ জেনে ফেলল প্রেম। আরও এক ব্যাখ্যাতীত। আরও এক সত্তাহীন অস্তিত্ব।
প্রেম দেখতে কেমন?
কে জানে।
প্রেম কী।
কে জানে।
প্রেম কোথায় থাকে?
বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, থাকে হৃদয়ে। রক্তস্রোতে মিশে সে ক্রমাগত শুদ্ধ হয়, শুদ্ধতর হয়।
সত্য বলো, তুমি কি জানো না, প্রেম নেমে আসে নাভিতলে?
জানি।
আশ্রয় করে যৌনাঙ্গ?
জানি। তাতে কী? প্রেম কামমোহিত হলে তাৎক্ষণিক যৌনতায় অবস্থান করে। কিন্তু তার আবাস হৃদিপদ্ম।
মানুষে মানুষে ভালোবাসা হলে ধ্রুবতারা রচিত হয়, এইটে বিশ্বাস করে সে ভারী আনন্দে আছে।
তার এই বিবিধ জ্ঞান এই ঘরে মাঝে মাঝে পায়চারি করতে চায়। খুব একটা সুবিধা হয় না। ঘরখানি অনেকটা ওই সত্য ফেলার কুয়ো ধরনের। কুয়োটা ছিল অপ্রশস্ত ও অতলস্পর্শী। এই ঘর অপরিসর, কিন্তু সুউচ্চ। কত? চোদ্দো ফুট, আঠেরো, কুড়ি, একশো, অভ্রংলিহ। অনেকদিন সে ঠাহর করার চেষ্টা করেছে, তারপর ভুলে গেছে।
এই প্রকোষ্ঠে থাকতে শুরু করার পর, সবার আগে সংখ্যা ভুলে যাওয়া তার প্রধান সাফল্য। কেননা তার জীবন থেকে গণনার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। সে বরং দিক বিষয়ে সচেতন। কারণ, এই কারাকক্ষে একমাত্র পশ্চিমে একটি জানালা। খুব উঁচুতে। যা, সঠিকভাবে, জানালা না বলে বড়ো ঘুলঘুলি বলা চলতে পারে। তাতে গরাদ দরকার ছিল না। ওই উঁচু দেওয়াল বেয়ে কে উঠবে? যদি ওঠে, লোহার গরাদ বাঁকিয়ে চুরিয়ে ভেঙে, নিজের শরীর সরীসৃপ করে বেরুতে হবে। আপাতভাবে অসম্ভব হলেও কেউ তাতে সক্ষম হতেও পারে, কারানির্মাণকারীগণ এমত ভেবেছে নিশ্চয়।
ধরা যাক, এই ঘরে থাকতে থাকতে একটা মানুষ ক্রমে টিকটিকি হয়ে গেল। অসম্ভব নয়। যেকোনও মানুষ যখন-তখন টিকটিকি হতে পারে। তাহলে সে অনায়াসে দেওয়াল বেয়ে ওই ঘুলঘুলি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। যদি তখন এই দেশে নেমে আসে সায়ংকাল, সে একঝলক রক্তালক্তক সূর্যাস্ত সৌন্দর্য দর্শন করতে পারে।
অথবা, যদি টিকটিকি না হয়ে সে তক্ষক হয়?
মানুষের পক্ষে তক্ষক হওয়া বেশ মুশকিলের বলেই তার মনে হয়। একবার গভীর জঙ্গলে দেশদ্রোহী ধরতে গিয়ে সে তক্ষক দেখেছিল। তার মনে হয়, প্রাণীটা বোকা ধরনের। টিকটিকি তক্ষকের চেয়ে ছোটো হলেও অনেক বেশি চতুর। তবে মানুষ মাকড়সা হতে পারে। বাচ্চারা মাকড়সা মানুষের গপ্প খুব পছন্দ করে। করাই উচিত। অতগুলি হাত-পা, নানা রং, বহুতর বিষবান অথবা গরলবতী, চমৎকার বাইতে জানে, সবচেয়ে বড়ো কথা, মানুষের সঙ্গে মাকড়সার এক জায়গায় হুবহু মিল। মাকড়সা অত্যাশ্চর্য জাল বুনে শিকার ধরতে পারে। সত্য মিথ্যের নকশায় বোনা অমোঘ সেই জাল।
মাকড়সা ছাড়াও, বাদুড় মানুষরাও বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু বাদুড়ে তার আগ্রহ নেই। পথ ভুলে একবার একটা চামচিকে ঢুকে পড়েছিল। উড়ন্ত ঘুরন্ত সেই প্রাণী প্রজাপতি ভেবে সে প্রীত হয়ে উঠল। কিন্তু চক্রাকারে নামতে নামতে তার গায়ে ঠোকর খেয়ে সেটি মুখ থুবড়ে পড়তে সে হতাশ বোধ করেছিল।
‘তবু তো একটা প্রাণী।’ তার এক বন্ধু তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
‘হুমম মশাও তো প্রাণী। মাছি, পিঁপড়ে, আরশোলা বাদ যায় কেন?’
বন্ধু নীরব।
সে আপনমনেই বলে উঠল, ‘চামচিকে হল বাদুড়ের ভাইপো। খুদে। ব্যাঙা ব্যাঙা হাত-পা। একটুখানি ডানা। দেখলে মায়া হয়, আবার গা ঘিনঘিন করে।’
‘চর্মচটিকা না এসে বাদুড় এলে কি ভালো হত?’
বাদুড় এই ঘরে আসে না। উলটো ঝুলে থাকার কোনও উপায় নেই এখানে। বাদুড় দেওয়াল বেয়ে ওই পশ্চিমি বাতায়ন পর্যন্ত যেতে অক্ষম। তা ছাড়া, প্রকট দিনের আলোয় যারা মগডালে উঠে উলটো ঝুলে থাকে, যে গাছের ডাল আশ্রয় করে, বিষাক্ত মলবর্জন করে হত্যা করে তাকেই, তাদের সে চিরকাল ঘৃণা করেছে। সেইসব দেশদ্রোহীরা কি বাদুড় মানুষ নয়?
তাদের কথা মনে হলে সে আজও দেওয়ালে থুতু ফেলবে। তখন তার কল্পিত দেওয়াল বাওয়া লোক তরতর করে উঠে যাবে জানালায়। সেই টিকটিকি মানুষ বুঝি-বা তার জন্য অপেক্ষা করবে এক মরণলাফ। মুক্তির জন্য এক মরণোন্মুখ লম্ফন। নাকি জীবনের জন্য? জীবনের জন্য মরণের আশ্রয়? নাকি মুক্তির জন্য? জীবন? মুক্তি? জীবন? মুক্তি?
মৃত্যুই কি জীবন থেকে প্রাণের মুক্তি? নাকি প্রাণের মুক্তি মৃত্যুর মুখ থেকে তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনে?
নাকি জীবনই এক নিরন্তর মরণ, মৃত্যুতে যার সমাপ্তি।
তাহলে প্রাণ কী?
প্রাণ সেই অগ্নিহোত্র যা জীবনের হুতাশনে মৃত্যুর যজ্ঞ করে।
ওঃ। তার বিশ্বাস করে ভারী আরাম হয়েছিল, ভালোবাসাই প্রাণ।
অবশেষে তার মনে হয়, প্রাণের মুক্তির জন্যই ভালোবাসা। জীবন তো জীবনই। বেঁচে আছে, ব্যাস। কেমন জীবন, সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে, তবে মুক্তির জন্য জগতে চিরকাল, এক অপেক্ষমাণ করাল গ্রাসের কবলে পড়তে হতে পারে জেনেও, ওই লম্ফন ছাড়া উপায় নেই। তার আগে দেওয়াল বেয়ে চলার কসরত এক জীবনসত্য যা মানুষকে অসম্ভব সম্ভব করার প্রেরণা দেয়। আর অস্তগামী রবিচ্ছবির আকর্ষণীয় সৌন্দর্য জীবনে প্রাপ্ত প্রেমের ফুলকি, যত ক্ষুদ্র ও ক্ষণপ্রাণ হোক, সেই সুন্দরের দ্বারা মন একই সঙ্গে তৃপ্ত ও তৃষাকাতর হয়।
সে এক আশৈশব প্রেমিক। দেশপ্রেমিক। কর্মসূত্রে সে দেশপ্রেম মার্জিত, উন্নত, কার্যকরী ও দায়বদ্ধ করেছে। আনুগত্য অভ্যাস করেছে। লৌহচক্রে ছুরি, কাঁচি, দা ঘষে ঘষে যেমন ধারালো ও ঝকঝকে করা হয়, সেইরকম, তার বোধের মধ্যে একমাত্র মন্ত্র সমুজ্জ্বল ছিল, দেশের জন্য মারো কিংবা মরো। আনুগত্যের অভ্যাস সেই বিশ্বাসে, প্রকাশ্য প্রশাসক ও প্রকাশ্য বৈরুদ্ধ রাজনৈতিকতা অব্যর্থ দেশপ্রেম। আর গোপন সন্ত্রাসী গেরিলা আক্রমণকারী, যারা শাসনলোভী কিন্তু গুপ্ত গর্তবাসী, তারা দেশদ্রোহী।
এক গোপন গেরিলা যোদ্ধার দল, যারা নিজেদের প্রকৃত দেশসেবক এবং গরিবের সত্যিকার বন্ধু বলে দাবি করে, তারা একবার এক খণ্ডযুদ্ধে পরাস্ত হয় এবং ধরা পড়ে। যুদ্ধ হয়েছিল ঘন অরণ্যে, যা পর্বতসংকুল। সময় বর্ষাঋতু। খরস্রোতা নদ ও নদীরা মহাশক্তিময়ী জলবেগে বয়ে চলেছে কত বৃক্ষকাণ্ড, পাথর ও আদিম ভীমপ্রস্তর ভাসিয়ে নিয়ে, সেখানে, রাষ্ট্রের দেশপ্রেমী প্রতিনিধিদলের জয় হওয়া সত্ত্বেও তিন রাত্রি বিজয়ী ও বিজিত জঙ্গলে একত্রবাস করতে বাধ্য ছিল। তার ফলে, জয়ী দেশপ্রেমী দলের দু’জন আহত বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, আর দেশদ্রোহীগণের অধিকাংশ যুদ্ধে প্রাণ দেওয়ার পর যে ক’জন জীবিত ছিল, তাদের একজনের দুই হাত উড়ে ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। বহু রক্তপাতে সে যখন মারা যাচ্ছে, সে একটি সিগারেট চাইল। এই কক্ষবাসী দেশপ্রেমীর তার জন্য করুণা হচ্ছিল এই ভেবে যে, এ প্রতিপক্ষ না হয়ে স্বপক্ষ হলেই বা কী ক্ষতি ছিল? অস্থায়ী ছাউনির নীচে সেই বলশালী ও প্রতিযোধী তরুণের মুখে সে একটি জ্বলন্ত সিগার দেয় এবং ধূমপানে সাহায্য করে। তরুণ সিগার টানে, সে বের করে নেয়, তরুণ ধোঁয়া ছাড়ে। সে আবার সেই সিগার তার ঠোঁটে সেঁধিয়ে দেয়। তরুণ যন্ত্রণায় কাতর ছিল। সেই অবস্থায় উভয়ের খানিক বাকবিনিময় ঘটে। তরুণ তাকে সিগারেটের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিল, ‘এই মুহূর্তে, যখন আমার প্রাণ বেরিয়ে গেলে আমি খুশি হতে পারব, তখন এই সামান্য সিগারেট দিয়ে তুমি আমার বন্ধুত্ব অর্জন করেছ।’
সে বলে, ‘আমি তোমার বন্ধুত্ব স্বীকার করছি। এমনকী তুমি আমার ভাই হলেও আমার আপত্তি থাকে না। কারণ, আমরা আসলে একই মায়ের সন্তান। দেশমাতৃকার এক কোলে আমি, এক কোলে তুমি। তুমি সন্ত্রাসবাদী, আমি শান্তিকামী।’
‘ভাই, তোমরা সন্ত্রাসবাদের নামে যে হত্যা করো, অন্ধকার কারাগারে বীভৎস পীড়ন করে পচিয়ে মারো, আদিম অসভ্য কায়দায় ফাঁসি দাও, তা কি ওই সন্ত্রাসের আরেক রূপ নয়?’
‘তোমাদের ভয় দেখানো বন্ধ করার জন্য আমরা ভয় দেখাই। তোমাদের খুনোখুনি আটকাবার জন্য আমরা খুন করি। শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জনসাধারণের নিরাপত্তা প্রদান আমাদের লক্ষ্য।’
‘আমরা তাদের কাছেই সন্ত্রাসবাদী যারা জনসাধারণকে প্রতারণা করে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষমতা ও সুখ নিরাপদ করে। সাধারণ মানুষ আমাদের ভালোবাসে। তারা জানে, আমরাই তাদের এনে দেব সেই স্বপ্নের দেশ, যেখানে শোষণ নেই, অত্যাচার নেই, বিভেদ নেই, ফাঁসি নেই, ভয় দেখিয়ে পিটিয়ে বাকস্বাধীনতা হরণ করা নেই।’
‘সাধারণ জনগণ কারা বন্ধু? আমিও তাদের একজন। তোমাদের উদ্দেশ্য কখনো আমার সমর্থনযোগ্য মনে হয় না।’
‘উদ্দেশ্য শুধু নয়, আদর্শ, লক্ষ্য। এক স্বপ্নের দেশ গড়ার লক্ষ্য।’
‘সে এক স্বপ্নের দেশই বটে। ভাই, লুকিয়ে দু’চারটে পুলিশ মেরে, ওজনদার লোকজন অপহরণ করে অর্থসংগ্রহ ও অস্ত্র কেনা, চোরাপথে আসা মারণাস্ত্র কিনে, আত্মগোপন রেখে খুনখারাপি, এভাবে স্বপ্নের দেশ গড়া যায় না।’
‘দেশ কতরকম হয়, তা কি জানো তুমি?’
‘কী বলতে চাও?’
‘এক-একজন মানুষ বুকের ভিতর কত দেশ বয়ে বেড়ায় জানো কি তার সন্ধান?’
‘দেশ একটাই হয়। একমেবাদ্বিতীয়ম অন্য সমস্ত ভূখণ্ড অন্য দেশ।’
‘না ভাই। একজন মানুষের বুকের ভিতর অনেক দেশ। আমার গ্রাম এক দেশ, আমার জেলা আরেক, আমার রাজ্য, সে-ও এক দেশ, আমার জাতি-পরিচয়, তারও আছে ভিন্ন দেশ, আমার ভাষা, তার দেশও রাখা আছে হৃদয়ে।’
‘এ তো বিচ্ছিন্নতাবাদ।’
‘না। বহু খণ্ড একত্রিত করতে পারলে বৃহৎ গড়ে ওঠে। এই যে তুমি যে হাতে আমাকে মেরেছ, অস্ত্র ধরেছ, যে হাতে আমার মরণাপন্ন ঠোঁটে গুঁজে দিচ্ছ সিগারেট, সেই হাতটুকুই কি তোমার পুরো শরীর?’
‘না।’
‘তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুঠাম ও সবল রাখতে সর্বত্র পাঠাতে হয় না কি খাদ্যরস? শক্তিপ্রদায়ী বস্তু?’
‘তার সঙ্গে দেশপ্রেমের কী?’
‘বৃহৎ দেশপ্রেম সঞ্চার করতে গেলে ওই ছোটো ছোটো দেশ ও তার প্রতি মায়া বুঝতে হবে। তুমি যদি আমার ভাষার কণ্ঠরোধ করো, যদি আমার গ্রামের ফসল লুণ্ঠন করো, আমার জাতি পরিচয় ঘৃণা করো, যদি আমার জেলা, আমার রাজ্য অবহেলিত, অপুষ্ট থাকে, তবে আমি নিঃস্বার্থ কীভাবে হতে পারি? কীভাবে বলতে পারি, আমার বুকের মধ্যে রাখা ছোটো ছোটো দেশ অর্থহীন? প্রিয় বন্ধু, আমাদের বুকে গুলি করার আগে একবার এগুলো ভেবে দেখো।’
‘লুটপাট, ডাকাতি আর ত্রসন, এই আদর্শ দিয়ে তোমরা সেই বুকের ভিতর রাখা ছোটো ছোটো দেশ লালন করো? কী সাংঘাতিক প্রেম! ওই প্রেম ওই আদর্শ আমি পায়ে মাড়িয়ে যাওয়ার উপযুক্ত বলেই মনে করি।’
‘আমাদের আদর্শ ও নীতিকে অসম্মান কোরো না ভাই। একদিন আমাদের জয় হবে। আমি থাকি বা না থাকি, আমাদের আদর্শ থাকবে, কারণ আমাদের মতবাদ প্রগতি ও সভ্যতার ধ্বজাধারী। তোমাদের ফাঁসি দেওয়া সভ্যতা তার নাগাল পায় না।’
‘ভাই, তুমি এক স্বপ্নিল তরুণ। আরেকটা সিগারেট চাও? দেশ ভালোবাসলে দেশদ্রোহী হওয়ার দরকার পড়ে না। ফাঁসিতেও তোমার খুব আপত্তি।’
‘কারণ ফাঁসি নিষ্ঠুর।’
‘হত্যা মাত্রই নিষ্ঠুর, কারণ মানুষ মমতা ও নির্মমতার সংজ্ঞা তৈরি করে রেখেছে। জীবন ও মরণ পরস্পরের পক্ষে এতই অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে নিষ্ঠুরতার ধারণা ছেঁড়া মোজার মতো ফেলে দিতে হয়।’
‘দাও, আরেকটা সিগারেট দাও। আমার বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। হয়তো একটু পরেই আমি মরে যাব। তার আগে বলে রাখি, আমার এই দেশকে আমি ভালোবাসি। আমার কাছে তারাই দেশদ্রোহী যারা দেশ পরিচালনার নামে দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে। জনসাধারণকে নিরাপত্তা দেওয়ার নামে জনগণের টাকায় বিদেশি অস্ত্র কিনছে, মাথায় ঋণের বোঝা নিয়ে জন্মাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। দেশের কাজের নামে স্বার্থসিদ্ধি করছে। তোমার মতো লোক তাদের দালালি করছ যারা, তোমরা, তারা, সবাই আমাদের চোখে দেশদ্রোহী।’
‘তোরা কী করিস? শেয়ালের গর্তে সেঁধিয়ে থাকা ছাড়া তোরা যা করিস সব ভুল, সব বেঠিক, সব অন্যায়, সব বেআইনি, দুর্নীতি, আদর্শহীন, শালা তোলাবাজ, খুনে, ডাকাত, ইঁদুরের আদর্শ দিয়ে স্বপ্নের দেশ গড়তে চাও? শালা তোমার স্বপ্নের গায়ে মুতি। তোমার আদর্শের গায়ে।’
সদ্য পাতানো সেই ভাই অথবা বন্ধু হলেও হতে পারত তরুণের ঠোঁটে ঝুলে পড়ল জ্বলন্ত সিগারেট। প্রবল হাওয়ায় এমন হওয়া সম্ভব মনে করে সে উত্তেজিত কুকথা সংহত করে সিগারেট পুনরায় যথাস্থানে দিতেই আবার তা ঝুলে পড়ল এবং কেউ সৎকার না-করায় অভিমানী অগ্নিরেতা দ্রুত ছাই হয়ে যেতে থাকল।
একজন দেশদ্রোহীর মৃত্যুতে তার দুঃখ হয়নি। পরিস্থিতি এতই খারাপ, দুর্যোগ এমন যে তাদের অস্থায়ী শিবিরের কাপড় ফুলে ফেঁপে উঠছিল। নদীর শব্দ উচ্চনাদ গর্জন। দুর্ভেদ্য দেওয়ালের মতো বৃষ্টির জলধারা। তার মধ্যে স্বপক্ষীয় আহতদের যথাসাধ্য সেবা করতে করতে সে ভাবতে বাধ্য হয়েছিল, এই দুর্গম পাহাড়ে, এই মৃত্যুফাঁদে ভরা জঙ্গলে, এই অবাধ্য অবিশ্বস্ত জলধারার পাশে জঙ্গলের দুর্বল ডালপালা ও আলতো টিনে ছাওয়া ঘরে এই দেশদ্রোহীরা শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কাটিয়েছিল। শুধুমাত্র এই যাপন তাদের দেশদ্রোহের পাপ ও অপরাধ থেকে মুক্তি দিয়ে বিপ্লবী বা বিদ্রোহী করে তোলে না কি? অনৈতিক উপায়ে অস্ত্র ক্রয় করে তারা আদর্শবাদী গেরিলা যুদ্ধে নেমেছিল। পথ আলাদা হলেও, মতপার্থক্য থাকলেও তাদের দেশদ্রোহী না দেগে বিরুদ্ধবাদী বলা যায়। নিজের আদর্শের প্রতি আস্থা না থাকলে, নিজের স্বপ্নের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এভাবে দিনযাপন সম্ভব? কোন সেই প্রেরণা? শুধুই সাময়িক ক্ষমতা অধিকার করার মোহ? সত্যিই তাদের হৃদয়ে পুঞ্জীভূত দেশ বোঝার চেষ্টা হয় না।
কিন্তু সেই স্বীকারে কে নমিত হবে? বরং তারা দেশদ্রোহী নামে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, কারণ বিপ্লব বা বিদ্রোহ উদবেগ উৎকণ্ঠার কারণ হলেও দেশদ্রোহিতার মতো ঘৃণার সঞ্চার করে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামো কঠিন ও সুবিধাজনক করতে শুধু প্রেম হলে চলে না, ঘৃণাও প্রয়োজন।
আচমকা উৎসারিত ক্ষণপ্রভার আলোয় সেই বর্ষণবিহ্বল রাত্রে, মৃত তরুণের দেহ বহন করে সে বেহদ্দ মাতালের মতো বলে উঠেছিল, বলো ভাইসব, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
তার সহকর্মীরা এই মহারঙ্গে হেসে ওঠে এবং এই অভিযানের জয় তাদের দেশের পক্ষে শান্তিসুরক্ষা মনে করে পরিতোষ পায়।
তাহলে? কাউকে রাখতে গেলে কাউকে মারতে হবে।
সহসা প্রবল হাওয়ায় ছাউনির কাপড় উড়তে লাগল উলটে যাওয়া ছাতার মতো। যেটুকু বন্ধন, তখুনি যাবে টুটে, আর তারা স্রেফ ওই ঠান্ডা বৃষ্টিতে ভিজে মরে যাবে।
সে তখন কাঁধে বিপ্লবী বহন করা দশায় ছাউনির একটি অংশ ধরে নিজেদের জড়িয়ে ফেলল। শিব যেমন উমার দেহ কাঁধে তাণ্ডব নেচেছিল, সেই প্রক্রিয়ায় সে ছাউনির কাপড়ের প্রান্ত তার জ্যান্ত শরীর ও বিপ্লবীর মৃতদেহের ভারে চেপে রাখে, অন্যরা শিবির মেরামত করে নেয় দ্রুত হাতে, আর সেই সময় ওই শীতলীভূত হতে থাকা দেহখানিকে তার বিরক্তিকর বোঝা বোধ হয়।
নিজেকে সে মৃতদেহ থেকে ছাড়িয়ে ভিজে চুল থেকে ঝরে পড়া জল মুছতে থাকে। তার মনে পড়ে, স্বপক্ষীয় একজনকে ওই দেশদ্রোহীরা মাত্র তিন মাস আগে বীভৎস অত্যাচার করেছিল। প্রতিদিন সেই দেশভক্ত বেতনভোগী সৈনিকের দেহের খানিকটা অংশ তারা কেটে ফেলত। জঙ্গলের জোঁক ও রক্তপায়ী পিঁপড়েরা তাকে খুবলে খেয়ে যেত। যন্ত্রণায় বিবশ কাতর এক যুবককে তিল তিল করে খুন করার প্রক্রিয়া কেন্দ্র করে তারা স্থানীয় গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা ভেড়ার বাচ্চা কেটে ঝোল রান্না করে ভোজন করত।
সে নিজে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে এই ডেরায় নিঃশব্দ আক্রমণের মানচিত্র তৈরি করেছিল। বহুবিধ কসরত তার আয়ত্তে। উঁচু প্রাচীর বেয়ে তুঙ্গে ওঠা ও অবতরণ সেগুলির মধ্যে একটি। তবে সে কাজের জন্য শক্ত দড়ি-টড়ি লাগে, লোহার আঁকশি, মস্ত ডালের কাঁটার মতো মাথা। সেসব এখানে, এই কক্ষে পাবে না। বিনা উপকরণে দেওয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল সে। প্রথমদিকে ওই পশ্চিমের উঁচু জানালা দিয়ে জিদ্দি সুযোগসন্ধানীর মতো অনুপ্রবিষ্ট আলোকে সে লক্ষ করত, কীভাবে দেওয়াল বেয়ে যায় টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়সা। সবার কাছেই কিছু না কিছু শিক্ষণীয়। কিন্তু তা বললে কী হবে? টিকটিকি বা মাকড়সা মানুষ সে হতে পারেনি।
কোন সুদূর অতীতে সে এক দার্শনিকের কথা শুনেছিল, নাম মনে নেই, অথবা আবছা মনে পড়ে সেই নাম ডায়োজেনেস, তিনি এক পিপের মধ্যে বসবাস করতেন। রাজার আদেশ লঙ্ঘন করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। মুক্ত পুরুষ। তাহলে কি রাজার আদেশ অমান্য করাই মুক্তি? আর তার জন্য পিপেতে থাকলেই হবে? না নাহ। সে অনায়াসে দেখতে পায় পুব দেওয়ালে আঁকা অসংখ্য দর্শনের বই, যেগুলির মধ্যে সত্য, মিথ্যা, মায়া, বাস্তব, নীতি, নীতিবিরোধ ও মুক্তির বিষয়ে বহু মত ও পথের হদিশ আছে। কারণ এই প্রত্যেক বিষয় বহু সংজ্ঞায়িত, বিতর্কিত, অনন্ত সম্ভাবনাময়। মুক্তিও বহুবিধ। তোমার মুক্তি আমার মুক্তি একরকম না-ও হতে পারে।
কিন্তু বিষয় যখন রাজার আদেশে এসে ঠেকে, তখন সে নিজেকে ডায়োজেনেসের মতোই মুক্তিকামী ভেবে দাঁতে নখ কাটে। ডায়োজেনেস বাস্তবিক একজন মুক্ত মানুষ, নাকি সম্রাট আলেকজান্ডার তাঁর মুক্ত থাকা নিরবরুদ্ধ রেখেছিলেন বলেই সেই মুক্তি সম্ভব হয়েছে? রাজা মুক্তি দিয়ে রেখেছেন বলেই তিনি মুক্ত। অর্থাৎ, মুক্তির মুক্ত থাকা, যা কিছু শর্ত বা কারো নির্দেশের অপেক্ষক।
সেদিক থেকে দেখলে, সমাজের সকল নিয়ম অবজ্ঞা করা ডায়োজেনেস, যিনি পিপের মধ্যে বসবাস করেন, ময়লা থাকেন, চেয়েচিন্তে ভোজন করেন, জনসমক্ষে হস্তমৈথুন ইত্যাদি, যাঁর কাছে সভ্যতাই অসভ্যতা, কারণ, তা প্রকৃতির বিরুদ্ধতা; তাঁকে মুক্ত রাখেন এবং তাঁর দর্শনাগ্রহে স্বয়ং সেই আবর্জনা ও দুর্গন্ধ পিপের আবাসে উপস্থিত হলেন যে সম্রাট, তিনি কি অধিক পরিমাণে মুক্তচিত্ত নন?
সে বিচ্ছিন্নভাবে সম্রাট ও দার্শনিকের বাক্যালাপ নাটকীয়ভাবে বলে চলে।
সম্রাট। বলুন দার্শনিক ডায়োজেনেস, কী করতে পারি আপনার জন্য?
ডায়ো। সূর্যের আলো আড়াল করেছেন আপনি। সরে দাঁড়ান সম্রাট।
সম্রাট। দার্শনিক ডায়োজেনেস, আপনি ধন্য। আমি আলেকজান্ডার যদি না হতাম, তবে আমি চাইতাম ডায়োজেনেস হতে।
ডায়ো। আমি ডায়োজেনেস না হলেও ডায়োজেনেস হতেই চাইতাম।