কয়েদি – ৪
৪
অচিরেই সে প্রতিজ্ঞারক্ষার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করে। অনতিবিলম্বে শান্ত নিপাট কুটির হয়ে ওঠে জেলখানার একক কক্ষকোষ। এখানে ভোর ও সন্ধ্যার বিশেষ তফাত নেই। শুধু ভোরে পশ্চিমের জানালা থাকে অন্ধকার, সন্ধ্যায় হালকা কমলা আলো শ্মশানের ধোঁয়ায় মিশে ঢুকে পড়ে। বর্ষায় সেই আলো চাপা পড়ে মেঘে। বৃষ্টির ছাট এলে সে দুই হাতে সাপটে নেয় মেঘবারি। সিক্ত স্নিগ্ধ বাতাস ঢুকে পড়লে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা করে, তার সঙ্গে দেখা হয়, জলীয় বাতাস? ও ভালোবাসে তোমায়। গায়ে-পড়া দু-চার দানা জলের স্বাদ নিতে চেটে নেয় খানিক।
বিজলি বাতি আছে ঘরখানায়, ওই টুঙ্গিতে, অতি স্বল্পালোক। ওই আলোকেই সে বই পড়ে। এর আগে এক কারাপ্রধান তার বইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। সে কারান্তরিন হওয়ার আগে থেকে, অনেক আগে থেকেই, তারা পরস্পর পরিচিত ছিল। একজন হত্যাকারী সাব্যস্ত হয়ে সে জেলখানায় এলে সেই জেলার বলেন, তার খুনি হয়ে ওঠা ঘটনাচক্র ছাড়া কিছু নয়। সে দেশহিতৈষী, মেধাবী ও অনুগত, সে অপরাধমনস্ক নয়। সদাচার ও নিয়মানুবর্তিতা দ্বারা সে নিজের বন্দিদশা খানিক শিথিল করে তুলতেও পারে।
একজন বন্দি হিসেবে, জেলখানার ভিতর দেশাত্মবোধ ও মেধার পরিচয় রাখার প্রয়োজন হয় না খুব একটা। সুযোগও হয় না সচরাচর। তবে নিয়মানুবর্তী না হয়ে সে নিরুপায়। জেলখানা নিজের নিয়মে সক্কলকে চালিয়ে নেয়। বহুজনীন কক্ষগুলিতে চলে অপরাধতত্ত্ব বিস্তার করে চলা বিশেষ আইন। দেশের বিচারব্যবস্থা যে আইনে পরিচালিত তার সঙ্গে এই কক্ষাভ্যন্তরীণ কানুনের কোনও মিল নেই, সামঞ্জস্যরক্ষার কোনও দায় আছে বলে কেউ মনে করে না। যে যত বড়ো অপরাধী, যত বেশি দাগি, যত নির্মম, সে জেলের রাজা। তার ইচ্ছাই আদেশ। তার নির্দেশই বিচার।
সেই অসদাচার, নির্যাতন, নিষ্ঠুরতার নিরন্তর প্রতিযোগিতার মধ্যে তাকে প্রবেশ করতে হয়নি ওই কারাপ্রধানের আনুকূল্যে। সে এক প্রশান্ত, গম্ভীর, বৃদ্ধ হননকারীর কক্ষে স্থান পেয়েছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নমাজি সেই বৃদ্ধ শান্ত ও নিরুৎসুক। কিছুকাল একত্রে থাকার পর কারাপ্রধান প্রেরিত বইগুলি তিনি চেয়ে নিয়ে পড়তেন। অবশেষে দুই ভিন্ন বয়সি কয়েদির মধ্যে একরকম সম্ভ্রম সম্পর্ক তৈরি হয়। বৃদ্ধ একদিন তাকে বলেন, বিধর্মী বিবাহ করায় তিনি তাঁর পুত্র, পুত্রবধূ ও তাদের দুই মাসের সন্তানকে হত্যা করেছেন।
সেই বৃদ্ধকে দেখলে কখনো এমত নৃশংস বোধ হয় না। এমন সৌম্যকান্তি, সদাচারী, এমন অকপট। কারাগারে অধিকাংশ অপরাধী নিজেকে নিরপরাধ বলে থাকে। অপরাধের ভার বইতে না পেরে অনেকে লুপ্তস্মৃতি অথবা পাগল হয়ে যায়। সেই বৃদ্ধ এর মধ্যে পড়েন না। বৃদ্ধ বলেছিলেন, তার উপস্থিতি তাঁকে নিজের ছেলের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। সে তখন খানিক বিব্রত বলে, ‘তাহলে আমি আপনার সঙ্গে থাকলে আপনার কষ্ট।’
‘না। আমি কি তা-ই বললাম? আমার ভালো লাগে। আমার ছেলেকে আর কোনওদিন দেখতে পাব না। তোমাকে দেখি।’
‘নিশ্চয়।’
‘আজকে আমি জানি, আমার ছেলে সত্যিকারের ধার্মিক ছিল। তার বিবিও ছিল তা-ই। কারণ তাদের কাছে সবচেয়ে বড়ো ধর্ম ছিল ভালোবাসা। প্রেম। তারা আমার নিষেধ অমান্য করেছিল, কিন্তু আপন হৃদয়ের বাণী মেনে নিয়েছিল।’
‘ঠিক।’
‘সেই মেয়েটি, যে ছিল আমার ছেলের বউ, মুসলমান ছেলেকে প্রেম করেছে বলে কত মার খেয়েছে তার বাপ-মায়ের কাছে, আরও কত অত্যাচার, সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এসেছিল আমাদের কাছে। নিজের বাবা-মায়ের ওপর যে ভরসা হারিয়েছিল, আমাদের কাছে সেই ভরসার আশায় এসেছিল।’
‘তারপর?’
‘আমার ছেলের মা, আমার বিবি, বলল, ”আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরালে পাপ হবে। এমন গুনাহ কোরো না।” ও তবে আমাদের ধর্ম নিক আগে, আমি হুংকার ছেড়ে বললাম। ছেলের আম্মি বলে, ”ধর্ম কি জোর করে চাপানো যায়? না তা করা উচিত? সে আমাদের এখানে থাকতে থাকতে যদি মনে করে ভগবানকে আল্লাহবলে ডাকবে, তা-ই হবে।”…
‘কত সুন্দর কথা।’
‘হ্যাঁ। সুন্দর। আমি মেনে নিলাম। আমি তার কথা ফেলতে পারতাম না। দুঃখ দিতে পারতাম না তাকে। আশায় আশায় থাকলাম, বউয়ের মন পরিবর্তন হবে, সে আমাদের একজন হবে। আমরা তাকে স্থান দিয়েছি, সেই কৃতজ্ঞতায় সে ঈশ্বরকে আল্লাহ ডাকবে।’
‘ডাকল না?’
‘সে আমার বংশ প্রসব করল, কিন্তু কই, ইসলাম গ্রহণের কথা কিছু তো বলে না। আমার ভিতর রাগ জ্বলে। ভীষণ রাগ। বিবিকে বললাম, এই শিশুর ধর্ম কী? আমার বিবি ছেলেকে জিজ্ঞেস করল। ছেলে বলল, ”এ মানুষের সন্তান, মানুষ। অজ্ঞান শিশুর ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া অপরাধ। সে বড়ো হোক, জানতে-বুঝতে শিখুক, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে।”…’
‘আমিও তা-ই মনে করি। ঠিক বলেছিল সে।’
‘কিন্তু আমার কাছে ঠিক লাগেনি। মনে হল, ওরা সব বিশ্বাসঘাতক। আমাকে ঠকিয়েছে। আল্লাহতালাকে ঠকিয়েছে।’
‘জি, আল্লাকে ঠকায় কার সাধ্য? যদি আল্লাহ বা ঈশ্বর কেউ থাকেন আদৌ।’
‘তুমি নাস্তিক?’
‘আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি। আমাকে নাস্তিক বলা চলে কি?’
‘সে তো আমি জানি না। তবে আজ আমার মনে হয়, ভালোবাসাই একমাত্র ধর্ম। ভালোবাসতে পারলে স্নেহ, প্রেম, দয়া, ক্ষমা, সেবা সমস্ত সদগুণ আয়ত্ত করা যায়।’
‘জি জি। আমিও এই বিশ্বাস নিয়ে আছি।’
‘আমার পায়ে একটা ফোড়া হয়েছিল। বিশাল। লাল হয়ে ফুলে গেল। পাড়ার ডাক্তারের কাছে গেলাম। কী এক দাওয়া দিল, ফেটেফুটে একাকার। দুর্গন্ধ পুঁজ, কালো রক্ত। আমার বিবি কাঁদতে লাগল। ছেলের বউ এসে বসল আমার পায়ের কাছে। যত্ন করে পরিষ্কার করল ক্ষত। ছড়িয়ে পড়া রক্তপুঁজ। রোজ সে এসে আমার পায়ের কাছে বসত। পুঁজ পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিত। পেটে বাচ্চা ছিল, অসুবিধা হয় বুঝি, কিন্তু নির্লজ্জভাবে পা বাড়িয়ে দিয়েছি আমি। সেবা করুক। এটাই তো ওর কাজ। দয়া করে আশ্রয় দিয়েছি। অহংকারে আর ধর্মের নামে অন্ধ উত্তেজনায় আমার মাথায় তপ্ত লাভা বইত, লাভা। মনে হত, ছেলেটা ওই মেয়ের জন্য ধর্মচ্যুত হয়েছে। ও নাস্তিক হয়ে গেছে।’
‘যার ভালোবাসা আছে, সে কখনো নাস্তিক নয়।’
‘সে কথা তুমি কার কাছে বলবে ছেলে? বাচ্চার কী নাম রাখবে? দুনিয়া নামের ওপর ধর্মের মার্কা দিয়ে রাখেনি? সরকারি ফর্ম ভরতে গেলে রিলিজিয়ন কী লিখবে? মানবধর্ম? বাতিল করে দেবে। স্কুলে ভরতি করতে যাও, পরীক্ষায় বসো, চাকরিতে ঢোকো, ধর্ম তোমাকে ছাড়বে না। ওরা কি নাকাল হয়নি? বাচ্চার বার্থ সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে নাম রাখল নীলাঞ্জন ইসলাম মৈত্র। বউমা ছিল মৈত্র। আমি চেয়েছিলাম নীলাঞ্জন মৈত্র ইসলাম রাখা হোক। আমাদের পরিবারের বাচ্চা। আমাদের হক আছে পারিবারিক পদবি দেওয়ার। ছেলে শুনল না। ওর কাছে নিরপেক্ষতা সবার ওপরে। আমি অপমানিত বোধ করলাম। আমার বিবি কষ্ট পেল।’
‘আসলে এসবের কোনও মূল্য নেই। এইসব পালটে যাবে একদিন। নিশ্চয়। দেখবেন। নাম বলেই কিছু থাকবে না আর। মানুষ হয়ে যাবে নম্বর। এই যেমন এখানে আপনি ৬৪ আমি ২২৯। ওই দিয়েই আমাদের চেনা যায় না কি? ধর্মানুগত প্রাচীন দেশ চীন এখন রিলিজিয়ন বাদ রেখে চলেছে। ওদের লক্ষ্য ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধি। ওদের লক্ষ্য সৎ ও সাম্যের দেশ গড়ে তোলা। প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়াই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত উৎকর্ষ, এই উপলব্ধি হওয়ার পর ওরা দেখেছে ধর্ম সমাজের পুরোনো বাসন। ফুটো কড়াই যাকে বলে। এখন আর এসবের দরকার নেই। ওরা জানে, মগজ ও শ্রমশক্তি ঠেসে দিতে হয় উৎপাদনে, ব্যাবসায়। আপনি দেখবেন, ওদের ক্ষমতা একদিন সব দেশের উন্নয়নমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’
‘রিলিজিয়ন বাদ রাখা মানে ঠিক কী? সরকারি ফর্ম ও বাচ্চাদের পরিচয়পত্রে ধর্মীয় নাক না-গলানো?’
‘তার চেয়ে বেশি। আমরা মনে করি, রাষ্ট্র ধর্মভাবনার বাইরে থাকবে। সব দিক দিয়ে। ধর্মের প্রতি ব্যক্তির আনুগত্য থাকবে কি না, সে নিয়েও ভাবিত হবে না। এমনকী ধর্মাচরণ নিষিদ্ধ, এমনটাও ঘোষণা করার কোনও অধিকার রাষ্ট্রের থাকবে না। একজন নাগরিক ঘুমিয়ে কী স্বপ্ন দেখবে তা যেমন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তেমনই হবে ধর্মভাবনার স্থান।’
‘তোমরা কারা আমি জানি না। তবে তোমাদের স্বপ্নের চীন দেশে ইসলামধর্মাবলম্বী জনগণ ভালো নেই। তাদের ধর্মত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ ধর্মাচারহীন রাষ্ট্র ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকের বিচার করছে। হস্তক্ষেপ করছে তার চিন্তায়। তুমি যে বললে রাষ্ট্র স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তা ভুল। মানুষ যে জীবন যাপন করে, তা-ই নিয়েই স্বপ্ন দেখে। জীবনের রূপরেখা রাষ্ট্র দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।’
‘খানিকটা। কিন্তু যে জীবন কেউ যাপন করতে চায়, তার স্বপ্ন সে স্বাধীনভাবেই দেখে না কি?’
‘দেখে না। কারণ তার চাওয়া তৈরি হয় প্রাপ্ত জীবনের অসন্তোষ ও অতৃপ্তির নিরিখে। নিরাপত্তার নিরিখেও। চীন কীসের নিরিখে তোমাদের স্বপ্নের দেশ? আমাদের দেশ অতি প্রাচীন সময় থেকেই মগজ ও শ্রম সার্বিকভাবে উৎপাদনে ব্যয় করতে শিখেছে। কে-ই বা শেখেনি? গ্রিস, পারস্য, পেরু, মিশর, অতীতের চীন, কে নয়? যে দেশ বলে ধর্ম বলে কিছু নেই, অথচ ধর্ম কেড়ে নিতে চায়, সে ভণ্ড। যা নেই তা তুমি কীভাবে কেড়ে নেবে? সাম্যের নামে প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ চীনে হয়নি? চীন কী করে তোমার চোখে সৎ হয়ে গেল?’
‘চীন আমাদের স্বপ্নের দেশ নয়। ওই দেশ যে নৈতিক আদর্শের কথা বলে, তাকে নিজেই লঙ্ঘন করে। কিন্তু ওই নৈতিক আদর্শটি প্রশংসনীয়। জিনিসটা ভালো, কিন্তু তার অপব্যবহার হচ্ছে। কুমির যদি বাঘছাল পরে শিকারে যায় তাহলে ওই কৃত্তিবাসের মহিমা কম পড়ে না। কুমিরের প্রতারণা ধরা পড়ে। ওই দেশ এখনও নাগরিকের স্বাধীনতা কুক্ষিগত রাখে। আমরা তার সমর্থক নই। গণতন্ত্র কোনওরকম ফ্যাসিবাদ সমর্থন করে না। চীন, স্পষ্টত এখন ফ্যাসিস্ট কমিউনিস্ট। চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান যারা বলত তারা ছিল স্বপ্নবাদী, আবেগে ভেসে-চলা লক্ষ্যহীন যুবগোষ্ঠী। আমরা তাদের চেয়ে অনেক বেশি প্রগতিশীল। আমি জানি, চীনে বহু মুসলমানকে জোর করে শুয়োরের মাংস খাওয়ানো হয়। ঠিক একইভাবে হিন্দুদের জোর করে গোভক্ষণে বাধ্য করা হয়েছে অন্য কোথাও। অর্থাৎ, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য বেশি মানুষের কাছে পৌঁছোতেই পারেনি। কিছু খাওয়া বা না-খাওয়া, কিছু পরা বা না-পরার মধ্যে ধর্ম আটকা পড়ে গেছে। ধর্ম চিন্তা ঋদ্ধ করবে, এই ছিল উদ্দেশ্য, কিন্তু ধর্ম চিন্তা হীন করেছে, নিকৃষ্ট করেছে মানবিকতা, ধর্ম উদ্দেশ্যপালনে ব্যর্থকাম। অথচ একটা শক্তিমান প্রতিষ্ঠান হয়ে বসে আছে। যে প্রতিষ্ঠান প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। ক্ষমতার মোহ ছাড়া কিছু নয়। এই যেমন আপনি। আপনার পরিবারের মধ্যেও ধর্মান্ধতা আপনাকে ক্ষমাহীন, হৃদয়হীন, স্নেহ-মায়াহীন ঘাতক করে তুলল।’
‘সে তো ধর্ম নয় বাবা। সে অধর্ম। দেখো, সব ধর্মেই কী করতে হবে না করতে হবে, তার জন্য বইপত্র আছে। যাকে বলে ধর্মগ্রন্থ। সেখানে ন্যায়নীতির সঙ্গে সঙ্গে পালনীয় কর্তব্য নির্দেশ করা আছে। এমনকী, সেই সকল সদাচার কতখানি অমোঘ, তার প্রমাণের জন্য অনেক গল্প আছে। কে জানবে সেগুলি সত্য কাহিনি কি না। সাতশো-আটশো-হাজার বছর আগে একটা লোক, মেয়েমানুষ কি পুরুষমানুষ কোন অসদাচারের জন্য কী ফল ভোগ করেছিল, অথবা গ্রন্থকথিত নির্দেশ পালন করে কী প্রকার অভীষ্ট লাভ করেছিল, আজ তা পরীক্ষা করে জানা যাবে না। সুতরাং তোমাকে নির্বিচারে বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস ছাড়া জীবন অচল। এই অপ্রমাণ ও বিশ্বাসের বাধ্যতা কখনো তোমাকে ধর্মের মূল দিক নির্দেশ করে না। তোমাকে আচরণে প্রবৃত্ত করে। নিত্যকর্ম অতি সহজ কাজ। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে তোমার শরীর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো সেগুলি পালন করে যাবে। আর মন যাবে কোথায়? ধর্মের মধ্যে যে নিগূঢ় বাণী, যেখানে দয়া ও প্রেম সাধনের কথা বলা আছে, সহিষু�তা ও পরোপকারের কথা বলা আছে, সেগুলি এতই কঠিন, এমনই অসাধ্য যে মন একে বুঝতে চাওয়ার কষ্ট করতে না চেয়ে প্রবৃত্তির দাসত্ব করবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে করতে সে ভাবতে থাকবে কীভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায়, কীভাবে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া যায়, কীভাবে ভয় দেখানো যায়, দুর্বলের পিঠে লাথি মেরে কোন উপায়ে দাসত্ব করানো যায়। এখানেই সে থামে না। এর মধ্যে কেউ কেউ ছদ্ম অবতার। তারা ধর্মের নামে ধর্মগ্রন্থে প্রবেশ করিয়ে দেয় রিরংসা। পাপ ও পুণ্যের বিকারগ্রস্ত ধারণা। লিখে দেয়, আচরণই ধর্ম, তোমার হাতে তুলে নাও হত্যা, তুলে নাও হিংসা ও ঘৃণা।’
‘আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন? কথায় বলে, মরা মরা জপতে জপতে রামনাম লাভ করা যায়। অর্থাৎ, আচরণ থেকে নৈতিক দীক্ষায় পৌঁছোনো সম্ভব।’
‘হাজারে একজনের পক্ষে সম্ভব। যে চিন্তক, যে দূরদর্শী, যার চিন্তায় ভালোত্ব প্রবেশ করেছে নানা পথে, যে ধীমান, তার পক্ষে সম্ভব।’
‘ধীমান, চিন্তক ও দূরদর্শী ব্যক্তি ধর্ম ও নৈতিকবোধ স্বার্থে পরিচালিত করতে পারে।’
‘সেই তো বললাম, ছদ্ম অবতার। তারা মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে, ঠিক যেমন রাখে একজন সৎ বা অসৎ রাজনৈতিক নেতা। ধীশক্তি যাদের সাধারণ, সাধারণ কামনা-বাসনা, সাধারণ লক্ষ্য, তারা প্রভাবিত হতেই পছন্দ করে। তাদের ভিতরকার শক্তি অলস, তারা চায় শক্তিমান কেউ তার হয়ে আদর্শ ও নৈতিক ভাবনাগুলো ভেবে দিক। তারা শুধু অনুসরণ করবে। সাধারণ জনমনে এই আলস্য ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যর্থ করার এক বড়ো কারণ।’
‘আপনি কী ছিলেন? কে ছিলেন? আপনার ভাবনায় এতখানি বিশ্লেষণী দক্ষতা, আপনি কী করে পুত্রহন্তা হতে পারেন?’
‘আমি কী ছিলাম, সেই পরিচয়ের আজ আর কোনও মূল্য নেই। যে কথাগুলি তোমাকে বললাম, সেইসব আমার কারাবাসকালীন আত্মবিশ্লেষণের ফল। আমার সেই উপলব্ধি যা আগে হয়নি, আমিও একজন সাধারণ চিন্তালস ব্যক্তি বলে। আমার ছেলে ধর্ম ঠিক উপলব্ধি করেছিল। সে নৈতিকতায় এমন উচ্চতার ছিল, যেখানে সেই সময় আমি পৌঁছোতে পারিনি। আজও পারিনি। তখন আমি বুঝিনি সত্যি ভালোবাসা কাকে বলে। পুত্রস্নেহ বলে যা ভেবেছি, সে ছিল দখলদারি মনোবৃত্তি। আজ আমি জানি, আমি আমার ছেলেকে কতখানি ভালোবাসতাম, সে আমাকে ভালোবাসত কত। তার জীবনের পথে আমি ছিলাম প্রধান বাধা, তাতেও সে আমাকে কখনো আঘাত করেনি, তর্ক করেছে, অশ্রদ্ধা করেনি, আমার আচরণে দুঃখ পেয়েছে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে প্রমাণ করেছে তার মেরুদণ্ড ভাঙা সহজ নয়। আমার জীবনে সে ছিল আনন্দের উৎস। সে ছাড়া আমি আর তার আম্মু কিছুই ভাবতে পারতাম না। তার জন্মের পর তাকে বুকে নিলে মনে হত, স্বর্গীয় সুখ একেই বলে। দ্রুতই সে বড়ো হয়ে গেল। এতই বড়ো, কে জানে, আমি বোধহয় তাকে ঈর্ষাও করতে শুরু করলাম।’
‘কী বলছেন? আপনার দ্বন্দ্ব ছিল ধর্ম নিয়ে, মানে রিলিজিয়ন।’
‘সে আমার চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত হল, আরও অনেক বেশি উপার্জনের পথ পেয়ে গেল, আরও অনেক বড়ো সম্মানের অধিকারী হল, অথচ আমার প্রতি তার বিনয় ও আনুগত্য একই রকম থাকার কারণে, আমি, তার আব্বাজান, মনে করলাম, সে অধিকার বহির্ভূতভাবে এই সাফল্য উপভোগ করছে, ওই সমস্তই আমার, এবং সে আমার দাসানুদাস। তাই, সে যখন জানাল এক বিধর্মী মেয়েকে সে ভালোবেসেছে, তাকে বিয়ে করতে চায়, আমার মনে হল এ তো স্পর্ধা। এ তো বিদ্রোহ। আমাকে সে কীভাবে অতিক্রম করতে পারে? আমি, আমি, তার জন্মদাতা, তার অভিভাবক। আমি! আমার অমতে জীবনের এত বড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও অধিকার তার নেই। এই সমস্তই কি ঈর্ষা নয়? সে তো এক আত্মনির্ভর, পরিণত মানুষ, সে তখন নিজেই নিজের অভিভাবক। তাও আমি তাকে উত্যক্ত করতে লাগলাম। আমার মেরুদণ্ড তার মতো ঋজু নয়, আমি ধর্ম ধর্ম শুরু করলাম। যেভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা জনগণের মধ্যে ধর্মের নামে বিদ্বেষ ও বিভাজন ঘটায়, ঠিক সেভাবেই।’
‘পিতা সন্তানকে ঈর্ষা করতে পারে?’
‘নিশ্চয়। আমি নিজেই তার উদাহরণ। এমনকী, আজ আমার অকপটে স্বীকার করতে বাধা নেই, তার নির্বাচিত মেয়েটি বড়ো বেশি সুন্দরী ছিল। তার ডিগ্রিও ছিল আমার ছেলের সমান। সে যদি মুসলমান হত, আমি হয়তো তাহলেও ওদের বিয়ে আটকাবার ছলছুতো খুঁজতাম।’
‘ওঃ! কেন? কেন? একজন পিতা কেন তার সন্তানের প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়? হ্যাঁ? কেন?’
‘মানুষের মন অতল অন্ধকার কুয়ো। যত নীচে নামো, তত নির্মম ক্লেদাক্ত সত্যের মণ্ড পাবে।’
‘এর কিছুই কি আপনি আগে বোঝেননি? খুন করার আগে?’
‘আমি তখন নির্বোধ, অন্ধ, বিকারগ্রস্ত, ঈর্ষাকাতর ও ক্রোধে জ্বলছি। বাইরে কঠিন হিমশৈল, ভিতরে আগুন। আমি ঠান্ডা মাথায় কিনে আনলাম ঘুমের ওষুধ। অনেক ভাবলাম, কীভাবে খুন করব। ভাবতে ভালো লাগত।’
‘আপনার স্ত্রী কিছুই টের পাননি?’
‘না। ধর্মপরায়ণতার নিখুঁত সাজপোশাক দেখে আমার সঙ্গে সহমত না হয়েও সে ছিল আমার প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল। সে বিশ্বাস করেছিল, যা করি, সবই ধর্মের জন্য। সে ছেলের বিয়ে সমর্থন করল, কিন্তু ছেলের বউ যখন বলল, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবে, সে আমার অভিভাবকত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। আমি বললাম, এ বাসায় কি সে নাস্তাপানি পাচ্ছে না? নাকি তার বাচ্চার ডায়াপার কেনার পয়সা নেই? আমার বিবি বলল, এত লেখাপড়া করা মেয়ে ঘরে বসে থাকবে? তোমার অনুমতি চায়, দিয়ে দাও। বাচ্চার জন্য আমি তো আছিই। আমি বলে ফেললাম, একবার পা বাড়িয়ে দেখুক, খুন করে ফেলব। আমার বিবি চমকে উঠে বলল, এসব কী কথা? ছেলের বউ শান্তভাবে বলল, রাগারাগির দরকার নেই। যতদিন সবার মত না পায়, সে ঘরেই থাকবে। আমার মনে হল, এটাও আমাকে অপমান করা। দেখো, আমি কত ব্যক্তিত্বময়ী, আমি কারো মতের জন্য পায়ে ধরি না। বরং আমি সান্ত্বনা দিচ্ছি তোমায়, তুমি করুণার পাত্র। বিবি আমার কথা শুনে বলেছিল, মেয়েটার মুখের দিকে দেখেছ কখনো? অমন সুন্দর চোখের তলায় কালি পড়েছে। বাপের ঘরেও সে তম্বি সয়েছে। এরকম একটা ভালো মেয়ে, তাকে অত্যাচার করেছে আমার ছেলেকে ভালোবাসে বলে। জন্তুর মতো আটক রাখত, জানো তা? অমনি কি পালিয়ে এসেছিল নাকি? ওখানেও বন্দি ছিল, এখানেও তুমি বন্দি করে রাখবে? তোমার নিজের মেয়ে হলে পারতে?’
‘তিনি, আপনার স্ত্রী, মহানুভব।’
‘হ্যাঁ। সে এক মহৎ হৃদয় মহিলা। ব্যক্তিত্বই আলাদা। এমন শান্ত, মায়াময়ী। তার কাছে আমার যাবতীয় উগ্রতা প্রশমিত হয়ে যেত। ভালোবাসার নরম নিরাপদ চাদরে সে জড়িয়ে রেখেছিল গোটা সংসার। নিজের এতটুকু চাহিদা নেই। সে দিতে জানত। দিতে পারা বিরলতম গুণ, তা-ই না? কিন্তু তার ওই মেয়ের প্রতি স্নেহ ও সহানুভূতি দেখে আমার ইচ্ছা হল, মেয়েটাকে কুচি কুচি করে কেটে ফেলি। তারপর ওর বাপের পোষা কুত্তা দিয়ে খাওয়াই। সবসময় ঘোরের মধ্যে থাকতাম। প্রত্যেকটি নৃশংসতার পরিকল্পনায় বুঁদ। দেখলাম, আমার রক্ত দরকার। হিংস্রতাই খুনের চরম আনন্দ। যত নির্মম যত নিষ্ঠুরতা, তত তৃপ্তি।’
‘আপনার স্ত্রীকেও খুন করার কথা ভাবতেন?’
‘নাহ, ভেবেছিলাম, আমি ওকে ভালোবাসি। ওর ক্ষতি করা সম্ভব না আমার পক্ষে।’
‘তাঁর পুত্রঘাতী হয়ে চরম ক্ষতি করলেন তো।’
‘এখন সে কথা আমি জানি। এখন জানি, আমি ছিলাম প্রভু। না পিতা, না স্বামী, না প্রেমিক। উগ্র লোকেরা মনে মনে খুব একা ও অসহায়। বিবি আমার সেই অসহায়তা অনুভব করে আমাকে পরমাদরে তার স্নিগ্ধতা দিয়ে আগলে রেখেছিল। সে ছিল আমার আশ্রয়। ভালোবাসা টাসা কিচ্ছু নয়। ওই আশ্রয়ের লোভে আমি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। একটুও ভালোবাসতাম যদি, আমি খুনি হতে পারতাম না।’
‘ভালোবেসেও খুনি হতে পারে কেউ।’
‘পারে না। সেই ভালোবাসা মিথ্যে। মায়া। তার কোনও অস্তিত্ব নেই।’
‘আপনি বলুন, কীভাবে আপনি খুনের পরিকল্পনা করলেন।’
‘কাগজে খুঁটিয়ে পড়েছি খুনের নানাবিধ পন্থা। চার মেয়ে আর তাদের মা-কে ধরে কুয়োয় ফেলে দিল তাদের বাবা, চাচা, নানা, নানি। ভাইকে মেরে ভাই ঘরের মেঝে খুঁড়ে পুঁতে ওপরে সিমেন্টের বেদি করে দিল। হোটেলে প্রেমিকাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নলি কেটে খুন। সব দেখেশুনে মনে হল এটাই রাস্তা। একরাত্রে কড়া ঘুমের ওষুধ মেশানো খাবার খেয়ে সবাই বেহুঁশ।’
‘ধরা পড়ে যাবেন, জানতেন না?’
‘ধরা পড়ব, জেল হবে, ফাঁসি হবে, হোক। আমি ওসব ভাবিনি খুব একটা। শুধু ভাবতাম, ওরা পাপী, ধর্ম লঙ্ঘন করেছে। ওদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। ওদের বাচ্চা তো দুই ধর্মদ্বেষী শয়তানের বাচ্চা। অকম্পিত হাতে ওটাকেই আগে মারলাম। এইটুকু একটা মাথা। সরু লিকলিকে গলা। কাঠি-কাঠি হাত-পা। বিবি বলত, মুখখানা অনেকটা আমার মতো। ওর পাশবালিশ চেপে ধরলাম মুখে, একটুক্ষণের মধ্যে নীল হয়ে গেল। তারপর মারলাম মেয়েটাকে। মারার আগে, আমি ধার্মিক মানুষ, মনে পড়ল, একটান মারলে অধর্ম হবে, তাই প্রথমে গলায় ছোটো টান দিলাম, তার রোগা ফরসা শরীর একটু কেঁপে উঠল। মুখখানা এত সুন্দর, ঘুমন্ত মুখে এত সরলতা, এক মুহূর্ত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছি, তার গলায় মটরদানা সোনার হার রক্তে ঢেকে যাচ্ছে, হঠাৎ চোখ দুটি খুলে গেল। আমি একেবারে পাকা খুনির মতো নলি কেটে দিলাম।’
‘এত কিছু দেখতে পেলেন কী করে? ঘরে আলো জ্বালা ছিল? কারো ঘুম ভাঙল না এতটুকু?’
‘যদি ঘুম ভাঙত, আমাকে ঠেকাতে পারত কেউ? আমি কি তখন মানুষ? হ্যাঁ, আলো জ্বেলে নিয়েছিলাম। আমার চোখ রক্ত চাইছিল। তবু, ছেলেকে মারার আগে আমার এই শয়তান হাত কেঁপে উঠল। কান্না পেয়ে গেল। মারব? ওকে মারব? বুকে করে বড়ো করেছি। কখনো এমন কোনও অন্যায় করেনি যাতে আমি বিব্রত হই। বরাবর ভালো ছেলে। নিশ্চিন্তে অসাড়ে ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ পাশ ফিরে ও বউয়ের রক্তে ভেসে যাওয়া শরীর জড়িয়ে ধরল। ওই প্রেম দেখে একটানে ওর গলার নলি কেটে দিলাম।’
‘তখন আর দুই পোঁচ দেওয়ার কথা মনে এল না?’
‘না। আমার রিরংসার অবসান হল। না ধর্ম না অধর্ম, না পাপ না পুণ্য, না জীবন না মৃত্যু, কিছুই আমাকে ছুঁতে পারল না।’
‘তারপর?’
‘ছেলেটা খাবি-খাওয়া মাছের মতো শ্বাস নিল, একটু কাঁপল। মরে গেল। মেয়েটাকে জড়িয়েই। মেয়েটা খাবি খায়নি কিন্তু। একবার ছটফটাল, দুটো পা কুঁকড়ে গেল। মনে আছে, আমি একটানে কাঁথা দিয়ে বাচ্চাটাকে ঢেকে দিলাম। তারপর আমার বউয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।’
‘কী দিয়ে? মানে অত সহজে নলি কাটা, মানে আপনার হাতে কী ছিল?’
‘ছুরি। খুব পাতলা কিন্তু মারাত্মক ধারালো। একগুচ্ছ কাগজ মসৃণভাবে কেটে দেয়।’
‘কী করলেন? ওটা? ফেলে দিলেন?’
‘নাহ, আমার হাতেই ছিল। ঘুমের ঘোরে পাশে পড়ে গেছিল। যখন জ্ঞান এল, অনেক লোক। পুলিশ। আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেইদিনের কথা আমার ভালো মনে পড়ে না। আমি যেন ঘুমন্ত অবস্থায় থানায় চলে গিয়েছিলাম। লুকোনোর কিছু ছিল না। কোর্টে আমার স্ত্রী, মানে আমার বিবিকে আসতে হত, হিজাবে মুখ ঢেকে রাখত। ওই মুখ আর দেখিনি। বিচার শেষ হওয়ার দিন থেকে সে আর আমার মুখ দেখেনি। সেইটাই কি আমার সবচেয়ে বড়ো সাজা? নাকি আমি যে ছেলেকে বলতেই শিখলাম না, আমি তাকে কত ভালোবাসি, সেইটাই। আমি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু আমার বিবি ব্যবস্থা করল যাতে যাবজ্জীবন হয়।’
‘যাতে আপনার আত্মোপলব্ধি হয়।’
‘হয়তো। অথবা, কে বলতে পারে, সে আমায় ভালোবেসেছিল বলেই হয়তো বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আমার মধ্যে খবিশ বাস করত। খবিশ জানো?’
‘শয়তান।’
‘শুধু শয়তান না, নোংরা শয়তান। কিন্তু আমার স্ত্রী ছিল পবিত্র। তাই আমার মৃত্যুকামনা করতে পারেনি।’
‘তাহলে একবারও দেখা করলেন না কেন?’
‘ভালোবাসা সবসময় কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। আমার ভাই আছে, বোন আছে। কেউ আসে না। কেন আসবে? আমি কি মানুষ? তুমি এখানে আসার আগে আগে আমার বিবি তার ছেলের কাছে চলে গেছে। আমিও যাব যেকোনও দিন। তাই যখনই সুযোগ পাই, ভালোবাসার কথা বলি। ক্ষমার কথা, পরোপকার ও প্রকৃত ধার্মিকের কথা। তবে নিজের কথা বলি না। তোমাকে বললাম। তোমাকে দেখে আমার ছেলের কথা মনে হয়। মনে হয় বুকে জড়িয়ে ধরি।’
সে তখন বৃদ্ধকে কদমবুসি করে। পদচুম্বন ঠিক নয়। পায়ের ধুলো নেওয়া। বৃদ্ধ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমি খুব ভালো করে জানি না তোমার অপরাধ কী। জানার দরকার নেই। তুমি আমার ছেলের মতো। আমি তোমার জন্য দোয়া করব। আমি পাপী মানুষ, কিন্তু আল্লাহ রহমান রহিম। তাঁর কাছে সিজদা করো।’
এই বৃদ্ধ জেলখানাকে সংশোধনাগারে পরিণত করেছেন বলেই তার মনে হয়েছিল। ইনি প্রকৃতই সিদ্ধপুরুষ। নিজেকে এমন ব্যবচ্ছেদ করা যে সম্ভব, সে আগে জানত না। বৃদ্ধের প্রতি তার একপ্রকার আকর্ষণ জন্মায়। পুত্রহন্তা ও শিশুঘাতী ব্যক্তির প্রতি যে ঘৃণা জাগে, ওই বৃদ্ধের প্রতি তার সঞ্চার হয় না। তিনি যখন তাঁর কাহিনি বলে চলেন, উদবেগহীন, যেন শরতের ভরা নদে ভেসে যাওয়া পাল-তোলা নৌকা, মনে হয়, অন্য কারো কাহিনি বর্ণনা করছেন।
যতই ভাবলেশহীন বিবরণ দিন, রাতে সে ঘুমোতে পারছিল না। নারী ও শিশুঘাত সে ভাবতে পারে না। এবং, সেই হনন কতখানি অর্থহীন। বৃদ্ধের জন্য তার অন্তরে বেদনা সঞ্চার হতে লাগল।
সে যে এপাশ-ওপাশ করছে, বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘আমার পাপের কাহিনি শুনিয়ে তোমার মনের ভার বাড়িয়ে দিলাম।’
সে বলে, ‘আমি পাপ-পুণ্য মানি না। আমি জানি ন্যায় অথবা অন্যায়। আপনার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে, কারণ জীবিত থেকেও আপনার নরকযন্ত্রণা হচ্ছে।’
‘দোজখ তো মানো না তুমি।’
‘যন্ত্রণার মাত্রা বোঝাতে বললাম। আপনি আমাকে এভাবে সব বললেন কেন?’
‘তোমাকে দেখে আমার ছেলের কথা মনে হয়। এ ঘরে যারা থেকে গেছে, তারা আমাকে ঘৃণা করেছে, ভয় পেয়ে অন্য সেলে চলে যাবার চেষ্টা করেছে। কারো সঙ্গে দুটো মনের কথা বলার সুযোগ হয়নি। এই জেলখানায় অপরাধের গল্প ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। ও বউকে খুন করেছে। ও বন্ধুকে মেরেছে। এ ওকে ঘৃণা করে অপরাধের মাত্রা বিচার করে। তুমি যেখানেই যাও, সর্বত্র বিচারক বসে থাকে রায় দেবার জন্য।’
‘না না। আমি সেরকম ভাবিনি।’
‘তুমি, তুমি অন্যরকম। তোমাকে বলতে ইচ্ছা হল। বুক হালকা হল। কেউ যদি নিজের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের পাপ দেখতে পারে, তবেই সে ধর্মের পথে চলতে পারবে। আমি সেইটুকুই করার চেষ্টা করছি। তুমি আমার ছেলের মতো। আমাকে ক্ষমা কোরো। পারবে? এই পাপী বৃদ্ধ মরার আগে এইটুকু জানুক, অন্তত একজন তাকে ক্ষমা করেছে।’
‘আমি আপনার বিচার করিনি। আপনাকে ঘৃণাও করিনি। আপনি অনুতাপে পুড়ে যাচ্ছেন। আপনি নিঃস্ব, ক্লান্ত, আল্লাহর করুণাভিখারি। আমি আপনার কী বিচার করব? কেনই বা করব? ক্ষমার কথা যদি বলেন, একজনের কথা আপনাকে বলতে পারি। অন্তরে ভালোবাসা থাকলে ক্ষমা আসে। আমি তাঁকে দেখে শিখেছিলাম।’
‘কার কথা বলছ?’
‘একজন ইমামসাহেবের কথা। তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, ঈশ্বর বলা যায়। এক নির্বাচনী মিছিল থেকে শহরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগল। হিন্দুরাই ছিল মূল উদ্যোগী। তারা মরল কম। ক্ষয়ক্ষতিও তাদের কম। মুসলমান পাড়ায় অনেকগুলি ঘর পুড়ল, মারা গেল ক’জন, তার মধ্যে ছিল ষোলো বছরের একটি ছেলে। ওখানকার মসজিদে ইমামসাহেবের ছেলে। এমনিই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সে। রাজনীতির সঙ্গে এতটুকু যোগ নেই, স্কুলের শেষ পরীক্ষা দিয়ে ফলের অপেক্ষায়। কয়েকজন তাকে ধরে ঢুকিয়ে দিল একটা ঘরে। বাইরে থেকে দরজা আটকে আগুন দিল।’
‘আহাহাহা, এরা মানুষ নয়, খবিশ। আল্লাহতালা কখনো এদের ক্ষমা করবেন না।’
‘আপনি অনুমান করতে পারছেন, পরিস্থিতি কতখানি উত্তপ্ত। অন্যান্য মৃত্যুর চেয়ে অনেক বড়ো হয়ে উঠল ওই কিশোরের মৃত্যু। প্রশাসন তৎপর হল। শহরে কারফিউ জারি হল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে মারাত্মক দাঙ্গা লাগবে যেকোনও সময়। তখন ইমামসাহেব ক্রোধে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় থাকা প্রতিবেশীদের বার্তা দিলেন, তিনি তাঁর ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধ কামনা করেন না। চান না, ছেলের মরদেহ রাজনৈতিক প্রচারসর্বস্বতার অংশ হোক। চান না, ধর্মের নামে উগ্র হয়ে উঠুক তাঁর সমধর্মী ভাইয়েরা। প্রতিশোধ তাঁর সন্তান ফিরিয়ে দেবে না। বরং মারদাঙ্গায় আরও অনেক মায়ের কোল শূন্য হয়ে যাবে। তাতে ইমামসাহেব ও ছেলের মায়ের দুঃখ কমে যাবে না। আল্লাহর করুণার ওপর নির্ভর করে, ছেলের স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবন ঠিক কাটিয়ে দিতে পারবেন।’
‘আল্লাহতালার কী করুণা।’
‘যারা উন্মাদনার কবলে পড়ে শয়তান হয়ে উঠেছিল, তারা সাধারণ মানুষ, তাদের ঘরে বিবি-বাচ্চা আছে। আরও অনেক মানুষের ভালোর জন্য, আরও অনেক প্রাণঘাত থেকে শহর বাঁচাবার জন্য ইমামসাহেব ও তাঁর বিবি ওই লোকগুলোকে ক্ষমা করলেন। তিনি বললেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারী, তারা কারা আমি জানি না। কৃতকর্মের জন্য তারা নিশ্চয় অনুতপ্ত হবে। আল্লাহতালাদের মার্জনা করুন।’
‘এতখানি মহৎ হতে পারে মানুষ?’
‘তিনি ইমাম। কোরানের আয়াত তাঁর মুখস্থ। ক্ষমার ওই প্রতিমূর্তিকে আমি শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমি তাঁকে মনে রাখব আজীবন।’
বৃদ্ধ নিজের শয্যা থেকে উঠে এসে তার পাশে বসলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘খুনের আসামি তুমি, সে কথা শুনেছি। যার চিন্তায়, যার বিচারে এতখানি দরদ, এত শ্রদ্ধা, যে ঈশ্বরের মতো মানুষকে জেনেছে, সে কেন খুনি হয়ে গেল? বাবা, তোমার সারাজীবন যে বাইরে পড়ে রইল।’
‘আমার ভালোবাসা কেড়ে নিতে চাইল যে।’
‘কে?’
‘লোকটা, যে আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছিল, তার বাবা।’
বৃদ্ধ আর একটিও কথা বলেননি। কোনও কৌতূহল নেই, উপদেশ নেই। কম্পিত হাতে তিনি হয়তো মনে মনে নিজের ছেলেকে স্মরণ করেই চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। এমন স্নেহের স্পর্শে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
বৃদ্ধ কখন ঘুমিয়েছিলেন, আদৌ ঘুমিয়েছেন কি না সে জানে না। ফজরের নমাজ পড়ার অব্যবহিত পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় আর জ্ঞান ছিল না। সাত দিন পর তাঁর ইন্তেকাল হল। বৃদ্ধের ওষ্ঠাগত প্রাণ সম্ভবত অপেক্ষা করছিল ভিতরের ওই কথা, যার কিছু কিছু তিনি আদালতে ব্যক্ত করেন, যার অনেকখানি বুকে চেপে রেখেছিলেন, সেগুলি প্রকাশের জন্য। সেই প্রথম সে উপলব্ধি করে, কথা, চিন্তার ভিতর জমে-ওঠা অজস্র কথা প্রকাশ চায়। প্রকাশ এক উপশম।
বৃদ্ধ গত হলে তার কিছুদিন শূন্য লাগত ভিতরটায়। তাকেও কেউ দেখতে আসে না। তার অপেক্ষমাণ প্রিয়তমাও নয়।
জেলার বলেছিলেন, ‘কিছু লাগলে আমাকে বলবে। আমি যতদিন এখানে থাকি, তোমার কোথাও কোনও অসুবিধে হবে না। বলো, তুমি কি কিছু চাও?’
সে বলে, ‘না চাইতেই আপনি আমাকে অনেক দিয়েছেন। জেলখানার নোংরা জীবনের বাইরে রেখেছেন আমাকে। বই এনে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ আপিসে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ। শুধু যদি জানতে পারি, ও কেমন আছে।’
কারাপ্রধান খানিক চুপ থেকে বলেন, ‘শোক কাটিয়ে উঠছে।’
‘আমাকে একটা দিন না দেখে থাকতে পারে না তো। আসে না কেন? কোর্টে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে বলে? ওকে বলবেন, ও কোনও অন্যায় করেনি। যা সত্যি তা-ই বলেছে। যা সত্যি, আমিও তা-ই বলেছি। আমিও কোনও অন্যায় করিনি।’
‘আমি তোমার কথা ওকে বলব।’
‘আসতেও বলবেন।’
‘ভেবে দেখো, বাড়ির লোক ওকে আসতে দেবে কি?’
‘তা ঠিক। কিন্তু ও তো আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমাকে কত কথা বলার থাকবে ওর। আমিও যে ওকেই বলি সব। সমস্ত। এমনকী সেইসব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাজনিত দায়িত্ব আমার, যা অপ্রকাশ রাখার শপথ নিতে হয়, সেইসবও ও জানে, কারণ আমরা ভালোবেসে একটিই সত্তায় পরিণত হয়েছি। আমাদের পরস্পরের কাছে লুকোনোর কিছু নেই। যদি এমন কিছু থাকে, যা এখুনি ওকে বললে ওর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, সেইসব আমি পরে বলব। ও জানবে। সব জানবে। আমি বুঝতে পারছি, আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ও কত অধীর। যতদিন হোক, ও অপেক্ষা করবে।’
‘নিশ্চয়। কেন করবে না?’
‘দেখা না হোক, আমরা চিঠি বিনিময় করতে পারি।’
‘এখনই নয়। যাক আর কিছুদিন। শোনো, কিছুদিন পর এই জেল থেকে তোমাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’
‘ওঃ। আচ্ছা। দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে? এরকম ভাবা হচ্ছে কি, আমি ওর ক্ষতি করতে পারি? সে তো অসম্ভব। আমি ওর ক্ষতির কথা চিন্তাও করতে পারি না।’
‘তোমার অপরাধের নিরিখে তোমার সাজা হয়েছে। এক জেল থেকে অন্য সংশোধনাগারে পাঠানো সাধারণ নিয়ম ছাড়া কিছু নয়।’
‘আবার কি আমি এই জেলে ফিরে আসব?’
‘আসতেও পারো। এক কারাগার থেকে অন্যটায়, এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় ঘুরে চলাই দস্তুর।’
‘তখন ওর সঙ্গে দেখা হবে।’
‘দেখা হবে নিশ্চয়।’
‘আমি কি আপনার দেওয়া বইগুলো সঙ্গে নিতে পারি?’
‘এগুলো তো পড়া হয়ে গেছে তোমার। যেখানে যাবে, যাতে এখানকার মতো সুবিধা পাও, আমি তা দেখব।’
সে ফিরে এসেছিল। সাত বছর পর।