কয়েদি – ৫
৫
ইদানীং বই দেখলেই তার ভয়-ভয় করে। মনে হয়, চোখের আলো নিভে যাচ্ছে, এই গোপন সংবাদ ঠিক জেনে যাচ্ছে অক্ষর। অথচ, ভয় থেকে নির্ভয়ে যাওয়াও এক মুক্তির সাধনা।
মুক্তি কয় প্রকার ও কী কী?
হেহ, কারো পক্ষেই তা বলা সম্ভব নয়। মুক্তি এক অনিঃশেষ ছিদ্র, যতই ভরো-না কেন, খালি হয়ে যায়।
যখন অসম্ভব ভয় ঘাড় কামড়ে ধরে আর শিরদাঁড়া শিনশিন করতে থাকে, সে পশ্চিমের দেওয়ালে কালি ফুরিয়ে যাওয়া কলমের ডগা দিয়ে লেখে চে।
প্রথম প্রথম ছোটো করে লিখত। যেমন লেখে লোকে। একদিন হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, যদি তার বাহুপরিমাণ ব্যাসার্ধ নিয়ে সে একটি বৃত্ত নেয়, আর তার মধ্যে অর্ধবৃত্তীয় এ-কার দিয়ে ব্যাস বরাবর এঁকে নেয় চ-এর ডাঁটি, লিখে ফেলে মস্ত চে, আর যখনই ভয় করে তখনই তার ওপর দাগা বুলিয়ে চলে, একদিন না একদিন ওই চে নিশ্চয় ভেদ করে যাবে সিমেন্ট, তারপর ইট এবং ইট ও সিমেন্টের প্রগাঢ় সম্পর্ক গড়ে দেবার জন্য গেঁথে দেওয়া লোহার শিক, সেইসবও গলিয়ে বা ভেঙে, বেরিয়ে যাবে চে। পশ্চিমের দেওয়াল ভেদ করে এনে দেবে উদার মুক্তি। আঃ। কবে আসবে সেই দিন?
আসবে। নিশ্চয় আসবে। সে তখন স্নান-টান সেরে পরিপাটি চুল আঁচড়ে ইস্ত্রি-করা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে তাকে বলবে, ‘আজ শুধু হিঞ্চের শুক্তো আর ঘি সহযোগে তোপসে মাছ ভাজা।’
সঙ্গে বাসমতী চালের গরম ভাত তো থাকবেই। উত্তরা ওই চাল ছাড়া খেতে পারে না।
বাসমতী চালের গন্ধ মনে আছে?
গন্ধ? ওই যে জানালা দিয়ে ক্রমাগত আসে। কয়েদখানার দেওয়ালের ওপারেই শ্মশান। কত কে পুড়ে যায়। পুড়তেই থাকে, পুড়তেই থাকে। শ্মশান একজন সদাব্যস্ত লোক। তার প্রেয়সীর বাবা লোকটার মতো। কত যে কারবার। কত যোগাযোগ।
ওই বাড়ি গেলেই একেকদিন একেকরকম গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ ওদের অনেক ব্যবসায়ের মধ্যে এক গন্ধদ্রব্যের ব্যবসায়। বাড়িতে সুগন্ধি ছড়িয়ে রাখা ওর বাবার মূল্যবান শখ। কোনওটা কামোদ্রেক করে। কেউ ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ‘এটা হল প্রেমে পড়ার আগের মুহূর্তের গন্ধ।’ সেই মেয়ে রিনরিনে স্বরে হাসি মাখিয়ে বলে।
‘সে আবার কী!’
‘জানেন না? পূর্বরাগের গন্ধ। এরকম অনুরাগের গন্ধ আছে। ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা।’ মেয়ে, নাকি কিশোরী, লজ্জিত স্বভাবে মুখ নিচু করল।
‘অনুরাগের গন্ধ মাখার দিন যদি আসে তোমার, আমাকে ডাকবে তুমি?’ তার প্রথম প্রকাশ্য প্রস্তাব। প্রেমের ঢেউ লাগলে প্রস্তাব করতে হয়। সে শুনেছিল। সে সুদীর্ঘ ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার বাইরে সম্পূর্ণ নিবেদিত ছিল দেশ বিষয়ক ভাবনা ও কর্মে। সহপাঠিনী বা আশপাশে অপরাপর মেয়েরা তার হৃদয়ে প্রেমের ঢেউ তোলেনি। যাকে দেখে তার পৃথিবী উঠল দুলে, সে ওই একফোঁটা মেয়ে। বয়সে তার চেয়ে ছোটো। অনেকটাই। কত? ঠিক সতেরো বছর। বয়সের ব্যবধান মুছে ফেলেছিল ওই মেয়ে নিজেই। প্রগলভ নয়, কিন্তু স্পষ্টবাক। বয়ঃসন্ধির মহালগ্নে দাঁড়িয়ে, কিন্তু আয়নায় আত্মপ্রতিবিম্ব প্রতি মোহগ্রস্ত নয়। মেধাবিনী, ব্যক্তিত্বশালিনী। এবং রমণীয়। অনুরাগের গন্ধ মাখার কথা শুনে সে বলল, ‘সেই গন্ধ কি আপনি পাননি?’
‘আলাদা করতে পারি না। এত সৌরভ। এত সৌগন্ধ। মনে হয়, আমার হাড়মাংস সব গলে গলে গন্ধে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।’
‘আমি পেয়েছি। এক-এক গন্ধের ধর্ম এক-একরকম। কিছু গন্ধ শুধু বিশেষ একজনের সান্নিধ্যে পাওয়া যায়। হাজার দামেও বাজারে আপনি তা কিনতে পাবেন না। সেইরকম আঘ্রাণের আমি অধিকারী।’
‘কী?’
‘আপনার অনুরাগের গন্ধ। পারফিউম মাখার দরকার নেই আপনার। কস্তুরী হরিণ আপনি।’
‘তাহলে কী হবে? আমি তোমায় না দেখে থাকতে পারি না। তোমার বাবার কাছে কাজের ছলে ছুটে আসি।’
‘আপনি একদিন না এলে আমারও সেই দিনটি মিছে হয়ে যায়। ভালো লাগে না কিচ্ছু।’
‘এভাবে বোলো না। মনে হয়, তুমি আমার। তোমাকে হারাতে পারব না, তাই তোমাকে পাবার আগে দু-চার কথা বলা দরকার।’
‘আমি কি তাহলে পাইনি আপনাকে? ভালোবাসেন না আপনি আমায়?’
‘এক অপূর্ব প্রেমে আমি ভালবেসেছি তোমাকে, একমাত্র তোমাকেই।’
‘আমিও যে ভালোবাসি আপনাকে। একমাত্র আপনাকেই। আমার প্রেম, আমি দাবি করতে পারি অপূর্ব, কারণ আর কাউকেই আমি এভাবে ভালোবাসিনি আগে।’
‘আমি যেন আনন্দে উন্মাদ হয়ে যাব।’
‘আপনি উন্মাদ হলেও আমি আপনাকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচব।’
‘এভাবে আমায় গ্রহণ করলে তুমি?’
‘এভাবে আমি আমাকে দিয়ে দিলাম, আপনাকে, আপনি গ্রহণ করলেন কি?’
‘ওঃ, আমি যেন কল্পনাতীত কিছু পেয়ে যাচ্ছি, জানো।’
‘আপনি মিতবাক। বাকসংযম আপনাকে আরও আকর্ষণীয় করে। তাই এই মুহূর্তে ওই অনাবশ্যক অতিকথনে আমি বিরক্ত হচ্ছি। আমাকে পাওয়া যদি আপনার কল্পনার অতীত হত, আপনি আমার কাছে আসতেন না।’
‘দূর থেকেও ভালোবাসা যায়, যেমন আমরা ভালোবাসি চাঁদ।’
‘চাঁদ আমাদের মুগ্ধ করে। অমানিশায় ঢেকে গেলে আপনি চাঁদের জন্য কিছু করার কথা ভেবেছেন এ পর্যন্ত?’
‘আমি চাঁদের জন্য কিছু করি সেই ক্ষমতা আমার নেই, আছে সূর্যের, আছে পৃথিবী গ্রহের।’
‘যে ধরাছোঁয়ার বাইরে তাকে ভালোবাসা যায় না। প্রেম? হ্যাঁ। হতে পারে। একপাক্ষিক মুগ্ধতায় ভরা প্রেম, তার মধ্যে ভালোবাসা আছে বলে আমি মনে করি না।’
‘তাহলে? ভালোবাসা কী?’
‘প্রেমের উদবেল কামোচ্ছ্বাসের পর আসে ভালোবাসা। কামোচ্ছ্বাস অন্যায় নয়, কিন্তু ওই কাল পেরিয়ে, ভালোবাসায় পৌঁছে, তবেই কামবিমণ্ডিত প্রেমস্বাদ গ্রহণ করা উচিত।’
‘আমি কামাতুর হয়ে আসিনি তোমার কাছে।’
‘সে আপনি বলতে পারবেন। কামাতুরতা চাইলে গোপন রাখাই যায়। লোকে অহরহ রাখছে। একেবারে কাণ্ডজ্ঞান না হারালে কেউ কাম উৎকট করে তোলে না। আমিও তুলি না। আপনি আমার কাছে এলে আমার মনের ভিতর আনন্দের জোয়ার, আর আমার শরীরের ভিতর কামোচ্ছ্বাস।’
‘এই কথাগুলি আমাকে বোলো না।’
‘কেন? আপনাকে বলতে পারব না কেন? লজ্জায়? আপনার কাছে আমার কীসের লজ্জা? ভয়ে? আপনি কামতাড়িত হয়ে আমায় কামড়ে দেবেন, এই ভয়ে? আপনি সেইরকম যদি মনে করতাম, ভালোবাসতেই পারতাম না।’
‘ভালোবাসা সম্পর্কে তোমার ধারণা বলো, আরও বলো। আমি বুঝতে চাই।’
‘বেশি কিছু বলার নেই। ভালোবাসার সংজ্ঞা দেয় পণ্ডিত মানুষেরা। ভালোবাসা কি বলে বা লিখে বোঝানো যায়? চুমু খেতে কেমন লাগে, কেউ বলে বোঝাতে পারবে? হ্যাঁ, তুলনা করে উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন আমার মনে হয়, চুমু যেন লিচু খাওয়ার মতো। কখনো তা টুসটুসে পাকা কালোজাম খাবার মতোও হতে পারে।’
‘আমি কাল তোমার জন্য দারুণ লিচু আর কালোজাম নিয়ে আসব।’
‘চেরি আর পাকা পিচ?’
‘আনব।’
‘তাহলে শুনুন, ভালোবাসা হল, মারিগুটিকায় আক্রান্ত বাসবদত্তাকে নিতে আসা সন্ন্যাসী উপগুপ্ত। কিংবা কৃষ্ণ গোকুল ছেড়ে গেলে যমুনার পারে আজীবন অপেক্ষমাণ রাধারানি।’
‘আর কৃষ্ণর চলে যাওয়া কী তাহলে?’
‘ওই যে, মুগ্ধতা ও মুগ্ধতার অবসান। কামাতুরতা ও তার তাৎক্ষণিক প্রয়োগ। এক বাঁশি দু’জনে বাজালেই কি ভালোবাসা হয়?’
‘তাহলে?’
‘আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আমি নিজেকে আপনার সঙ্গে একাকার করে দিয়েছি। আপনি কি তা উপলব্ধি করেন?’
‘করি। নিশ্চয়।’
‘যা-ই করুন, যেখানেই যান, আপনি আমার কাছে ফিরে আসবেন? আমি অপেক্ষা করব।’
‘আমি, যে আমি এখানে তোমার সামনে, তার বাইরেও এক আমি থাকে, তাকে তুমি জানো না। আমি শপথবদ্ধ, আমি তোমাকে জানাতেও পারি না। তাই আমার সংশয়, আমাকে না জেনে তুমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ো না। আইনের চোখে তুমি এখনও পরিণতমনস্ক নও।’
‘আইন পরিণত মনের সীমা নির্ণয় করেছে সাধারণ বিকাশের ওপর ভিত্তি করে। ব্যতিক্রম কি থাকে না? আমার নিজের সম্পর্কে সব সিদ্ধান্ত এতকাল বাবা নিয়েছে, শুধু এই একটি বিষয় আমি বাবার হাতে তুলে দিতে পারব না। আমি নিজেকে আপনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছি, আপনি উপলব্ধি করেছেন। আজ থেকে আমার ও আপনার মধ্যে আর কোনও গোপনীয়তা নেই। আপনাকে শপথ ভাঙতে হবে না। আমি জানি আপনি কী ও কতখানি।’
‘কী জানো?’
‘মাত্র কিছুদিন আগে যে দশজন সন্ত্রাসবাদী, কাগজে যেমন বলেছে, জঙ্গলে নিহত, যারা রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য আলোচনায় বসতে এসেছিল, তাদের মুখোমুখি আপনি ছিলেন সরকারি প্রতিনিধি।’
‘তোমার জানার কথা নয়। আমার এ ধরনের কাজের কোনও লিখিত আদেশনামা নেই।’
‘আমি এখনও বড়ো হইনি এবং কিছুই বুঝি না এই মর্মে আমাদের বাড়িতে আসে যত ক্ষমতাশালী লোক, তারা আমাকে কোলে বসিয়ে গূঢ় ও গোপন আলোচনা সেরে নিতে থাকে।’
‘আমি বা আমার সঙ্গে যারা আসে, তারা কখনো এমন করেনি। তোমার বাবা তোমাকে আলোচনার মধ্যে ডাকেননি।’
‘আপনারা তেমন ক্ষমতাশালী কোথায়? আপনাদের সঙ্গে বাবার মামুলি কথাই হতে শোনা যায়। আপনারা আসেন, কারণ এখানে সরকারিভাবে বেসরকারি লেনদেন নিরাপদে সারা যায়। আমি কোন স্তরের ক্ষমতাশালীর কোলে উঠব, বাবা বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত নেয়।’
‘তোমার বাবাকে আমি সজ্জন বলেই জানি। একজন আদর্শবাদী ব্যক্তি।’
‘রাজনৈতিক আদর্শ ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের অববাহিকায় প্রবাহিত না-ও হতে পারে। রাজনৈতিক আদর্শভাণ্ডারে বাবা বিপুল অঙ্কের অনুদান দেয়। সৌজন্য ও মেধাবী নির্দেশ দেয় নিয়মিত। বাবা বেসরকারিভাবে একজন সরকারি মাথা। ক্ষমতাশালীদের সঙ্গ করে এবং তাদের একজন। আর আমার নিরিখে, তারাও বাবার মতো।’
‘কী?’
‘আপনি হাঁ করে থাকবেন না। আপনার কাছে আমার লুকোনোর কিছু নেই। লজ্জার কিছু নেই। আপনাকে হারাবার ভয় নেই। আপনি কি কখনো এমন মহিলাকে প্রণাম করেননি, যিনি মায়ের মতো? তাহলে, আমি কেন সেইসব লোকের আদরের পুতুল হতে পারি না, যারা আমার বাবার মতো?’
‘কোলে বসে আদর আর প্রণাম এক নয়।’
‘রাজনীতি আর ব্যবসায়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য কী জানেন?’
‘ভাবতে হবে।’
‘আপনার মতে দুইই এক, নাকি আলাদা?’
‘বললাম তো, ভাবতে হবে।’
‘গন্ধদ্রব্য ছাড়াও বাবার কত ব্যবসায় ছড়িয়ে পড়ছে। আরও ব্যাবসা, আরও টাকা, আরও ক্ষমতা। একলা বাবা পারে কি? আমি না দেখলে বাবাকে কে দেখবে? বাবা আমাকে না দেখলে কে দেখবে? তাই বাবাও আমাকে কোলে নেয় যখন ইচ্ছে। আদর করে চুমু খায়, আর আমার গায়ে বাসবদত্তার মারিগুটিকা উঠতে থাকে। বাবা আমার সারা শরীরের সব গন্ধ জানে এবং আমার বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেয়।’
‘আমি এগুলো সহ্য করতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে।’
‘হোক কষ্ট। আমার জন্য কষ্ট ভোগ করবেন না আপনি?’
‘নিশ্চয় করব।’
‘আর এক বছর পর, আমার নিজস্ব টাকায় হাত দিতে পারব, আমি সেই সন্ন্যাসীর হাত ধরে চলে যাব যার অপেক্ষায় ছিলাম।’
‘আমি তোমাকে বুঝতে পারছি না। বয়ঃসন্ধি অনেক সময় হ্যালুসিনেশন দেখায়।’
‘কীরকম?’
‘যেমন তুমি বলছ।’
‘মিথ্যা বলছি না। কেন বলব? যাকে ভালোবাসি তাকে মিথ্যা বললে ভালোবাসার আর রইল কি?’
‘হ্যাঁ। বিশ্বাস ও সততা। আমি নিজেকে উন্মোচন করি, তারপর তুমি যেদিন যখন চাইবে, আমার কাছে চলে আসবে।’
‘আমি ধন্য, আপনি আমাকে উদ্ধার করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠছেন না।’
‘ভালোবাসায় উদ্ধার বলে কিছু হয় না। উদ্ধারের পর আসে কৃতজ্ঞতা। মানুষ কৃতজ্ঞতার কাছে বন্দি হয়ে যায়। ভালোবাসা মানে মুক্তি। সেখানে কোনও বন্ধন থাকবে না। শোনো, এ কথা ঠিক যে আমার সামনেই গুপ্তঘাতকের হাতে মারা গেছিল ওরা দশজন।’
‘আপনি তো দেখেছেন কে মারল, তাহলে আর ঘাতক গুপ্ত কোথায়?’
‘আমি গুপ্ত রেখেছি, কারণ প্রিয়তমা, ঘাতকদের মধ্যে আমিও একজন। কিন্তু ঈশ্বর জানেন আর তুমি জানো, যা করেছি দেশের জন্য। যা করেছি মানুষের জন্য।’
‘দেশের জন্য বলাই ঠিক হবে। আমার সমর্থন আছে। মানুষের জন্য বললে ওই যে মানুষগুলো মারা গেছে, তারা বিচার চাইতে আসবে।’
‘কার কাছে বিচার চাইবে?’
‘আপনার কাছে। কারণ ওরা আপনার সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসেছিল যাতে দেশের ভালো করার পন্থা বিষয়ে সম্মিলিতভাবে ঐকমত্যে উপনীত হওয়া যায়। যাতে, ওরা আর সন্ত্রাসবাদী থাকবে না, আত্মসমর্পণ করে শান্তিকামী হয়ে যাবে। ভাবুন, আপনাকে ওরা ক্ষণমাত্র হলেও বিশ্বাস করেছিল। লোকে তো তার কাছেই বিচার চায় যাকে বিশ্বাস করে। শেষ মুহূর্তের ওই বিশ্বাসের শক্তি একত্র করে ওরা শেষতম ক্ষণের বিশ্বাসঘাতকতার বিচার চাইবে। তখন আপনি মধ্যস্থতাকারী, আপনিই ঘাতক, বিশ্বাসঘাতক, বিচারক আপনিই।’
‘না না। আমি বলতে চাইছিলাম, যা করেছি দেশের মানুষের ভালোর জন্য।’
‘সেই। দেশের মানুষ। দেশের ভালো বললে আপনার উচিত হাজার হাজার গাছ লাগানো। সেগুলি বাঁচিয়ে রাখা। লালনপালন করা। উত্তপ্ত গলন্ত হিমবাহ ঠান্ডা করে তার হিমবন্ত সত্তা রক্ষা করা। আপনার উচিত বাতাসের কার্বন যৌগ ন্যূনতম অবস্থানে নিয়ে আসা যাতে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি আমাদের দেশের গায়ে না লাগে। আপনার কর্তব্য, পাহাড়ের হাতে ফিরিয়ে দিন পাহাড়ের কৌমার্য, নদনদী আবর্জনামুক্ত করে প্রত্যর্পণ করুন তার গভীর অববাহিকা।’
‘প্রিয়তমা, প্রেয়সী আমার, আমার ক্ষমতা অতি সামান্য। তাই দিয়ে যা পারি, তা-ই করে চলেছি।’
‘নিশ্চয়। সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। রাষ্ট্র আপনার ওপর গুরুদায়িত্ব দিয়ে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। আপনি ও আপনারা দেশের মানুষের নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্য পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা ও হত্যার গুপ্ত সাক্ষী হয়ে যান। কিন্তু ওরা ও আপনারা, উভয়েই যখন দেশের ভালো চাইছেন, তাহলে কেন ওদের হত্যা করা হল?’
‘দেশের মানুষের ভালো করার নামে ওরা সাধারণ নাগরিক খুন করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছিল।’
‘উদ্দেশ্য?’
‘যাতে ওদের হাতে ক্ষমতা আসে।’
‘এতখানি একাকার করে দেওয়া কি ঠিক?’
‘কীসের একাকার?’
‘ক্ষমতা অর্জন করতে গেলে আস্থাও সংগ্রহ করতে হয় না কি? যত সাধারণ লোক ওরা মারে, তার বহুগুণ বেশি লোক ওদের ভালোবাসে। সেইসব মানুষের সাহায্যে ওরা দিনের পর দিন আত্মগোপন করে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সেই ভালোবাসা যত বাড়বে, যে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে ওদের যুদ্ধ ঘোষণা, সেই শক্তির ক্ষয় হবে বলেই আপনারা তাদের সঙ্গে সমঝোতা করার ছদ্মপ্রস্তাব দিয়ে, ভুলিয়েভালিয়ে সামনে এনে হত্যা করেন।’
‘ওরা ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য হত্যা করতে পারে, ওরা ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে থাকতে পারে, ওরা ধ্বংসের রাস্তা নিতে পারে, কিছু মানুষকে এই ধারণা দিয়ে ভালোবাসাও আদায় করে যে, তারা ক্ষমতাসীন হলে, এক ভূস্বর্গ গড়ে ফেলবে, যেখানে অসাম্য নেই, দুর্নীতি নেই, শোষণ নেই। কতদিনে গড়ে তুলবে? তোমার কী মনে হয়?’
‘বলা সম্ভব নয়।’
‘কীভাবে গড়ে তুলবে? সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, এর মধ্যে কোনটা রাতারাতি পালটে দেবার ক্ষমতা রাখে ওরা?’
‘রাতারাতি পালটে দেবে, এমন জাদুশক্তির কথা ওরা বলে না।’
‘বলে না, কারণ তা সম্ভব নয়। যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সমস্ত সমস্যা সমেত অতি ধীরে এগিয়ে চলেছে, শৈবালদামে ভরা অনতিগভীর সংকীর্ণ নদের মতো, তার বহমানতা নিন্দাজনক, হতাশাব্যঞ্জক, তার উজ্জীবন প্রত্যাশার অতীত, কিন্তু পলিতে ভরে-ওঠা উদর, পানায় আকীর্ণ জলের সহিষু�তা সকলের চোখ এড়িয়ে যায়।’
‘আপনি বলতে চান, এ দেশের পরিচালনব্যবস্থা ত্রুটিহীন?’
‘একবারও আমি তা বলিনি। তাহলে ওই দামোদর নদের তুলনা দিলাম কেন?’
‘দামোদর কোথা থেকে এল?’
‘দামে পূর্ণ উদর। উপমা মাত্র। রাষ্ট্রপরিচালনব্যবস্থা যার হাতেই আসুক, ওই সমস্যার বহর নিয়ে তাকে চলতে হবে। গোপন হত্যা ও কয়েকটি গ্রামে অধিকার স্থাপন করে প্রমাণ করা যায় না, আমরা পবিত্র, ওরা কলুষিত। না, না, হয় না এমন।’
‘আপনি ওদের গোপন হত্যার বিরোধী, এবং আপনিই একজন প্রশস্ত ঘাতক।’
‘সেই। কোনও এক রাজনৈতিক দর্শনের নামে, লুকিয়েচুরিয়ে ওরা অস্ত্র কিনলে, ওরা মানুষ মারলে বিপ্লব, আর রাষ্ট্রের শক্তি ওদের দমন করলে অন্যায়, ফ্যাসিবাদী আচরণ, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ।’
‘রাষ্ট্র দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান, সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর, তাকে ধৈর্য ধরতে হবে। ক্ষমতা থাকলেই তার যথেচ্ছাচার করলে তা উগ্র স্বৈরাচার। গণতন্ত্রে তার স্থান নেই।’
‘আর জঙ্গলে পাহাড়ে লুকিয়ে, অপহরণ, তোলাবাজি, হত্যা চালিয়ে যাওয়া আদর্শ বিপ্লব।’
‘ওরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না? ভূমিহীন কৃষক, প্রান্তেবাসী শ্রমিক, অরণ্যে যাদের শিকড়ের অধিকার, সেই আদিবাসীদের জন্য কি ওরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে না?’
‘যাচ্ছে। আরও বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সেই সামাজিক অথবা রাজনৈতিক কাজ করে, তাদের ইঁদুরধর্ম নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।’
‘বার বার ইঁদুর ইঁদুর করবেন না। বৈপ্লবিক পন্থায়, ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ স্বীকৃত পথ। কিউবা বিপ্লবের কথা কি আপনি জানেন না? চে-র জানেন না কি দক্ষিণ আমেরিকায় তাঁর অবদানের ইতিহাস?’
‘বিপ্লবের সংজ্ঞা হয়ে গেছে যে, তার নাম চে। মুক্তির প্রতীক হয়ে গেছে যে, তার নাম চে। বিশ্বের সব দেশে, সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি হয়ে আছে যে, তার নাম চে।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে কী, আমার হৃদয়েশ্বরী? সামাজিক-রাজনৈতিক বিপ্লব কোনও প্যাটার্নের মধ্যে পড়ে না। বাঁধা ছকে বিপ্লব হয় না কখনো। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব ধর্ম আছে। রিলিজিয়ন নয়, ধর্ম, অর্থাৎ লক্ষণ, মাটির গুণ, গন্ধ, মানুষের চিন্তার প্রক্রিয়া। তাকে বাদ দিয়ে গেরিলা যুদ্ধ সফল হতে পারে না।’
‘কেন পারে না?’
‘বৈপ্লবিকতা দুইরকম, তা-ই না?’
‘যেমন?’
‘এক, আকস্মিক গণঅভ্যুত্থান, যাকে বলা হয় বিদ্রোহ। দুই, দীর্ঘ সময় নিয়ে অল্প অল্প করে বদলে দেওয়া, সেই পরিবর্তন শুশ্রূষার মতো। গেরিলা যুদ্ধ এর মধ্যে পড়ে না। কারণ, বিপ্লবের ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা অঙ্গারে এই যুদ্ধ বারুদ, এবং ক্ষমতায়নের পর তার কাজ ফুরিয়ে যায়। বিপ্লবের কাজ তখনও অনেক বাকি থাকে। কারণ বিপ্লব ইতিবাচক ও গঠনমূলক না হলে, আবার জনমনে হতাশা ও বিক্ষোভ তৈরি হবে, আগুন নিভবে না।’
‘তখন আবার এক গেরিলা যুদ্ধ নতুন ক্ষমতায়ন ঘটাবে।’
‘তাহলে প্রশাসনিক স্থায়িত্ব কীভাবে তৈরি হবে? দেশবাসী যদি শুধু মারে আর মরে, কীভাবে তৈরি হবে শান্তি আর নিরাপত্তা?’
‘আপনি বলতে চান, উগ্র বিপ্লব অসার্থক?’
‘আমি কী করে সে কথা বলতে পারি? ইতিহাস বলে। এ দেশে এই পদ্ধতি এখনও সফল নয়। যদি ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকে, হয়তো সফল হবে। আমাদের দেশে এত বিভিন্নতা, এত লোক, এখানে পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে তোলা কঠিন।’
‘চীন কি করছে না?’
‘চীন? সেখানে তিয়েন আন মেন স্কোয়্যারে কী হয়েছিল, তুমি কি ভুলে গিয়েছ জ্ঞানী মেয়ে?’
‘আমি জনসংখ্যার কথা বলছিলাম।’
‘চীন তাদের সেই প্রাচীন প্রাকারের মধ্যে নিজেদের লুকিয়ে রাখে কেন, বলতে পারো? ওদের দেশে শৃঙ্খলা আছে, শৃঙ্খলও দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছড়ানো। ওদের আর্থিক উন্নতি আছে, শোষণও আছে।’
‘চীন এখন মহাশক্তিমান এবং কমিউনিস্ট শাসনের সফল উদাহরণ। মানেন তো আপনি?’
‘প্রিয়তমা, হয়তো কোনও কোনও সময়, তর্কের উদ্দেশে, আমিও চীনের গুণকীর্তন করি। তোমার চে আমারও সবচেয়ে প্রিয় নেতা। কোথাও কোথাও গেরিলা যুদ্ধ প্রয়োজন হয় এবং এই যুদ্ধ দ্বারা কোনও স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।’
‘শুধু এ দেশের চে-ভক্ত বিপ্লবীদের প্রতারণা ও হত্যা করা ন্যায়সম্মত, এই আপনার বক্তব্য?’
‘আমি ওদের হত্যা না করলে ওরা আমায় মারত। খবর ছিল।’
‘এ কথাও রাষ্ট্র আপনার মতো ঘাতককে বলতে শেখায়।’
‘তুমি সন্ত্রাসবাদের পক্ষে, আমি বিশ্বাস করি না।’
‘সন্ত্রাসের ধারণা যেভাবে দেওয়া হয়, আমি তা মানি না।’
‘কী তোমার ব্যাখ্যা?’
‘সাধারণ নাগরিককে খুন করাই সন্ত্রাস? অন্য কিছু নয়?’
‘যেমন?’
‘রাজা, তোমার সিংহাসনের পায়াগুলো নড়বড়ে, এই সত্য বলামাত্র, যে বলছে, তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া সন্ত্রাস নয়?’
‘আর?’
‘পাঁচ লাখ লোক বাসমতী চালের ভাত, মাংসের রোগান জোস খাচ্ছে আর একশো কোটি রেশনের দোকানে মাথা খুঁড়ছে কাঁকর ও পোকা-লাগা চালের জন্য, এই প্রতিবেদন যেমনই ছাপা হল, খসে পড়ল বিজ্ঞাপনের লোহার খাঁচা, সন্ত্রাস নয়?’
‘তারপর?’
‘তারপর সেই গ্যাস বেলুনের কেচ্ছা তো আপনি খুব ভালো করেই জানেন। চোপসানো বেলুন নিয়ে পুনরায় গ্যাসের লাইন পড়ামাত্র একজন লেখক, এক সাংবাদিক, এক সমাজসেবী, শ্রমিক সংগঠনের এক প্রতিবাদী পাণ্ডাকে লোপ করে দেওয়ামাত্র দেখুন কত্ত মনীষী বশ্যতার ধ্বজা উড়িয়ে চুপ।’
‘ভয় দেখালেই ভয় পেতে হবে?’
‘সামরিক শক্তি, গোপন হত্যাকারী, জেলখানা আর পুলিশকে ভয় করে না কে? উদ্দেশ্যই তো তা-ই। ভয় পাও, মুখ বুজে থাকো, নয় মরো। যারা ভয় পেল না, যারা বলল, মারতে যারা চায়, আমরা তাদের মারি, হয়ে গেল উগ্র সন্ত্রাসবাদী।’
‘বেশ, বুঝলাম। আর?’
‘পেট্রোল পাম্পগুলো দাউদাউ জ্বলছে। চুপচাপ ছাঁটাই হয়ে গেল ১৯ কোটি লোক, ২৪ কোটি কর্মী বেতন পাচ্ছে ৭ মাস অন্তর কেননা পেট্রোল পাম্পে আগুন এই অজুহাতে ক্ষতি প্রদর্শন করতেই পারে নিহিত সন্ত্রাস, বলতেই পারে, আয় নেই, মাসান্তে বেতন পাবে না, চাইলে থাকো, চাইলে চলে যাও। কোথা যাবে? সমস্ত দরজা বন্ধ। তবু তো চাকরি আছে, তবু তো সাত মাস পর হাতে কিছু আসে, লোকে জানবে লোকটা কাজে যায়, এখনও মাথা উঁচু করে হাঁটে। সন্ত্রাস নয়? এগুলি সন্ত্রাস নয়?’
‘এই সমস্তই অন্যায়। কোনও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা রাতারাতি পালটানো যায় না বলেই যারা বোঝাচ্ছে, হাতে ক্ষমতা পেলেই তারা স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ করে ফেলবে, তাদের মিথ্যাচার আমরা বন্ধ করে দিতে চাই। এ কথাই বোঝাতে চাই তোমায় বালিকা।’
‘আমাকে বালিকা বললে আমার যুক্তির ধার কমে যায় কি?’
‘না সোনা। ঋজু ও নির্ভয় তোমার বক্তব্য। ধারালো তোমার যুক্তি। আমি সম্মান করি তোমার ভাবনা। কিন্তু তুমি যাদের হয়ে এত কথা বলছ, তাদের পথে আস্থা রাখে না যারা, চলতে চায় না তাদের সঙ্গে, তাদের ঘরে ধর্ষণ, তাদের পাকা ধানের ক্ষেতে আগুন, লুকোনো মাইনে বিস্ফোরণ। কেউ ফাঁসি, কেউ গুলি, কেউ হাঁসুয়ার কোপ। যারা স্বাধীন পথে চলতে দিতে নারাজ, তারা কোন স্বপ্নের দেশ গড়বে?’
‘এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা।’
‘প্রিয়াঙ্গনা, বিশ্বাস ভালো, কিন্তু বিশ্বাসে অন্ধত্ব ভালো নয়। ওরা সরল সাধারণ লোক মারে, কেউ কথা না শুনলেই তাকে পুলিশের চর দাগিয়ে খুন করে। ওরা সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, নির্মম। দরিদ্র কৃষকের মুন্ডু কেটে ঘরের দাওয়ায় রেখে চলে যেতে ওদের হাত কাঁপে না। তাই আমরা ওদের মারি।’
‘হয়তো আর কেউ ওই মর্মান্তিক কাজ করে ওদের নামে অপবাদ দেয়, যাতে ওদের সংগঠন দুর্বল হয়ে যায়। ওরাই খুন করে, তার প্রমাণ কী?’
‘প্রমাণ থাকে, আবার থাকেও না। কিন্তু কাজের ধরন থাকে, খবর সংগ্রহ করার লোক থাকে। ওরা মিথ্যার স্বপ্নজাল বোনে, সেই জাল কেটে আমরা নিরাপদ করি সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ।’
‘নিরাপদ? হাহ।’
‘মারা ও মারণ, খুন ও হনন, হত্যা ও প্রতিহত্যার পথ এখুনি প্রত্যাহার করার নীতি গণনিরাপত্তার স্বার্থে গ্রহণ করা যাবে না। দুনিয়ার কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতা পথকণ্টক জিইয়ে রাখে না, আমাদের সেই নীতি বজায় রাখতে হচ্ছে। কিন্তু তার জন্য গোপনীয়তা আবশ্যক বলে কি তোমার মনে হয় না?’
‘নিশ্চয়। অত্যাবশ্যক। অন্য দেশ আক্রমণ করে খুল্লমখুল্লা গণহত্যা করা যায়, দেশের ভিতর তা করতে হয় চুপিচুপি। আমার তাতে আপত্তির কী থাকতে পারে? আমি যে গোপন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সমর্থন করি আর গোপন রাষ্ট্রীয় পুনর্নির্মাণ মানতে পারি না তা তো নয়। আমার বিশ্বাস আটকাচ্ছে কে?’
‘না। আমি তোমাকে কখনো আটকাতে চাইব না, যতক্ষণ না, নিজের ক্ষতি হয় এমন কিছু করতে উদ্যত হচ্ছ তুমি।’
‘ওই বিশ্বাসের ভিতর আমি আমার ভেতরের দ্রোহানল জ্বেলে রাখি, আপনি জানেন না।’
‘জানাও আমাকে। আমি তোমার সব জানতে পারি না কি?’
‘নিশ্চয়, নিশ্চয় পারেন।’
‘বলো, আমায় বলো, কেন ওই জ্বালা? কেন যন্ত্রণা? কেন দুঃখ?’
‘আমার নিজের জীবন এক ফিসফিসে হিলহিলে পিচ্ছিল আদরের ঘাট। তবু এ জীবন আমার অতি প্রিয়। কিন্তু তার চেয়েও প্রিয় আপনি। যারা আপনাকে বা আপনাদের খুন করার চক্রান্ত করেছিল, তাদের জন্য আমার একটুও কষ্ট নেই।’
‘ওরা যদি আমাকে হত্যা করত, আমার মৃত্যু তোমাকে কোন অনুভবে ডুবিয়ে দিত বলে তোমার মনে হয়?’
‘ঠিক বুঝি না। ওরকম কল্পনা করিনি তো। তবে মাঝে মাঝে ভাবি, আপনি যদি আর না আসেন!’
‘কেন আসব না?’
‘কোনও কারণে, ধরুন আমাকে আর ভালোবাসেন না আপনি, খুব খারাপ লাগবে।’
‘কেন সোনা? কেন এমন হবে? আমি তোমাকে ভালোবাসি, এই আমার সত্য। সত্যের চেয়ে সম্মাননীয় কিছু নেই, ভালোবাসার চেয়ে ধ্রুব কিছু নেই।’
‘আপনি যদি আর ভালো না বাসেন, যদি আর না আসেন ফিরে, মনে হয়, আকাশে তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ব, আর জাগব না। আপনাকে ছাড়া সূর্য ওঠা ঠিক কেমন, ভুলে গেছি।’
‘ও সোনা। আদরের প্রিয়তমা আমার। এমন ভাবে না। ভাবতে নেই।’
‘ভাবনা আসে যে। আপনি আমায় ভুলে যাবেন না তো?’
‘না না না। তোমাকে না পেলে আমি পাগল হয়ে যাব।’
‘আপনি আর না এলে আমি ঘুমিয়ে পড়ব, আর জাগব না।’
‘আর যদি আমরা একসঙ্গে তারা দেখতে দেখতে ঘুমোই, জেগে উঠবে তো?’
‘উঠবই তো। আবার এক নতুন দিন। সুন্দর একটা দিন। কিন্তু ধরুন, আপনারা যাঁরা দেশের ভালো চান, তাঁরা পরস্পরের ভালো চাইতে পারেন না?’
‘একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে করে তুমি নিশ্চিত হতে চাও। বেশ। শোনো, দেশের ভালো চাওয়া খুব ছোটো কথা। আমরা চাই মুক্তি।’
‘ওঃ। স্বাধীন দেশের মুক্তি?’
‘স্বাধীনতা আর মুক্তি এক নয় যে। স্বাধীনতা হল আত্মশাসন, মুক্তি আত্মশৃঙ্খলমোচন।’
‘ঠিক যেন জল থেকে দুধ তুলে নেওয়া, তা-ই না? আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন। আমি সারা দিনরাত আপনার কথা শুনতে পারি। একদিন আপনি খুব ঘেমে একেবারে স্বেদাক্ত হয়ে আমার কাছে আসবেন?’
‘কেন বলো তো?’
‘আপনার গন্ধ আমি একটা হাতির দাঁতের কৌটোয় পুরে রাখব।’
‘পাগলি একটা। এরকম করে না।’
‘আমি যদি আপনাকে ভালোবেসে পাগল হয়ে যাই, চিরকালের মতো, এক্কেবারে উন্মাদিনী, এখন যেমন দেখছেন তেমন না, একেবারে হিলিবিলি চুল, গায়ে মাথায় উকুন, দুর্গন্ধ, ময়লা শাড়িতে রজস্বলা নারীর রক্তের ছোপ, গায়ে ময়লার পুরু স্তর, কেউ স্নান করিয়ে দেয় না, চুলের জট ছাড়িয়ে দেয় না, পোশাক পালটাবার জন্য জোর করে না, খাবার ধরে না মুখের কাছে, কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার কথা চিন্তাও করে না।’
‘এমন কখনো হবে না। তুমি পাগলি ঠিকই, এখনও সেটা খুব আকর্ষণীয়, মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আমি তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।’
‘আমি জানালার কাছে বসে আছি। আমার হাত-পা শেকলে বাঁধা। তখন আপনি আমায় মুক্তি দেবেন?’
‘নিশ্চয়। কিন্তু কেউ তোমাকে শেকলে বাঁধবে না। আমি থাকতে তা হতে পারে না। আমি ভালোবাসি তোমাকে। সবকিছু পারি তোমার জন্য।’
‘আমি কঠিন শেকলে বাঁধা, আমার মুক্তি অবধি আপনি আমার কাছ থেকে চলে যাবেন না।’
‘না। যাব না। এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করব না তোমাকে।’
‘আমরা কথা বলছি অনর্গল, তবু কথা ফুরোয় না। রাত যায় দিন আসে, দিন যায় রাত আসে, আপনার মনে হয় না অলৌকিক ভালোবাসার আবহমান স্রোতে আপনি আর আমি দুটি ছোট্ট মৌরলা?’
‘হঠাৎ মৌরলা মাছের তুলনা মনে এল যে?’
‘আজ খেয়েছি। মৌরলা মাছের টক। আচ্ছা, আপনি আমাকে ভালোবেসে কী কী করতে পারেন।’
‘তোমার যা দরকার তার সব কিছুই। এই প্রশ্ন করার অর্থ কী? আমাকে বিশ্বাস করো না?’
‘দেশের জন্য যা যা পারেন, সব?’
‘সব।’
‘খুনও করতে পারেন?’
‘আমি কখনো খুন করিনি। খুন অপরাধ।’
‘ওই যে ওদের মারলেন?’
‘সে তো হত্যা। দেশের ভালোর জন্য, দশের মুক্তির জন্য দেশের পক্ষে ক্ষতিকারকদের হত্যা করা। দুই দেশে যুদ্ধ হলে কী হয়? পরস্পরকে হত্যা করে, তা-ই না?’
‘শেষ পর্যন্ত দুইই প্রাণে মেরে ফেলা।’
‘অপযুক্তি। খুন হল ব্যক্তিগত বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য প্রাণ কেড়ে নেওয়া। তার মধ্যে মঙ্গল নেই, ন্যায় নেই, নীতি, গৌরব কিচ্ছু নেই। কিন্তু হত্যা বৃহৎ মঙ্গলার্থে আয়োজিত।’
‘খবরের কাগজগুলো সব একাকার করে দেয়। ওদের কাছে সব হত্যা আর হত্যা মামলা। আপনি কী বলতে চাইছেন আমি বুঝেছি। তখন আমাদের বাড়িতে চারটে কুকুর ছিল। একটার খুব খারাপ ধরনের জীবাণুবাহী রোগ হল। বাকি তিনজনের পক্ষে ও হয়ে গেল ক্ষতিকারক, অমঙ্গলজনক আর কী। তখন নৈতিক আদর্শ অনুযায়ী তিনের স্বার্থে এককে হত্যা করা হল। ঠিক যেভাবে আপনারা ওদের গুলি করে মেরেছেন, সেভাবে। আমি সেই দিনই বুঝেছি, বন্দুকে গুলি ভরা থাকলে অনেক ক্ষতিকারক জীবাণুর হাত থেকে বাঁচা যায়।’
‘নিশ্চয়।’
‘কিন্তু, ওই যেটা জানতে চাইছিলাম, ওরাও দেশের মঙ্গল চায়, আপনারাও চান। তার অর্থ, পারস্পরিক মঙ্গল চাওয়া হচ্ছে। কারণ সব তো একই দেশের। চাওয়ার রকম আলাদা। সেই রকমফেরের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে বসে পরস্পর হত্যার চক্রান্ত করতে হয় কেন?’
‘দেশহিতৈষণা হল বক্সিং খেলা। লড়ে যাও। অপর পক্ষ ভূপাতিত হওয়া পর্যন্ত লড়ে যাও। প্রতিদ্বন্দ্বী আর প্রতিপক্ষ, আর কোনও সম্পর্ক নেই। এ এক হিতৈষণা, ও আরেক। এ এক মুক্তিকামী, ও সেই মুক্তিকে বলে দাসত্ব। সুতরাং হিতৈষণা বনাম হিতৈষণা, মুক্তি বনাম মুক্তি, আদর্শ বনাম আদর্শ।’
‘তার জন্য হত্যার কী দরকার?’
‘সবসময় দরকার নেই তো। অনেক হিতৈষণা জেলে বন্দি। বহু আদর্শ আদৌ প্রতিদ্বন্দ্বী না থেকে জনতার দলে ভিড়ে গেছে।’
‘জনতার কোনও আদর্শ নেই নাকি?’
‘না। জনতার আদর্শ হয় না। জনতার চেতনায় শুধু সমর্থন অথবা অসমর্থন। এটাই জনতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। জনতাকে একক মানুষের প্রকৃতিতে দেখলে ভুল হবে। আদর্শ, ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছোয়। পৃথিবীর কোথাও, কোনওকালে, জনতাকে এক নির্দিষ্ট আদর্শে প্রাণিত করা যায়নি। তবে হ্যাঁ। জনতা আদর্শের ছদ্মবেশ ধরতে পারে।’
‘তাহলে বিপ্লব কী?’
‘আদর্শের গোষ্ঠীবদ্ধ সাময়িক উন্মাদনা। অথবা চাহিদার ভিত্তিতে ছদ্ম আদর্শে ভেসে যেতে থাকা জনসমাবেশের সাময়িক গর্জন।’
‘না না। বিপ্লব আরও বড়ো কিছু বলেই আমার বিশ্বাস। আপনি যে বললেন, বিপ্লবের এক দীর্ঘস্থায়ী, সুদূরপ্রসারী ফলাফলের সম্ভাবনাময় রূপ আছে, সেই ধারণার চেয়েও বড়ো কিছু।’
‘ব্যাখ্যা করো।’
‘করব। নিশ্চয় করব। পরে কোনওদিন। যখন আপনার মতো অনেক বই পড়া হবে, আপনার মতো কথা বলতে শিখব। যখন মানবহত্যার স্পর্ধা হবে আমার, দেশের জন্য, দশের জন্য।’
‘স্পর্ধা নয়। কর্তব্য। দেশহিতব্রতগৌরব।’
‘হ্যাঁ। গৌরব। দেশ ধারণা কী অদ্ভুত, না? ধরুন, চাইলে আমি দেশ ছেড়ে যেতে পারি, কিন্তু যতক্ষণ আমি আছি, দেশ আমাকে ছাড়তে পারে না।’
‘ঠিক যে কারণে একজন মঙ্গলকামী দেশহিতৈষী আদর্শের অন্তরের কারণে মরে, জেলে যায়, গৃহবন্দিও থাকতে পারে, ঠিক সেই জাতীয় কোনও অন্যায়ের জন্য কেউ দেশ থেকে নির্বাসিত হতে পারে।’
‘নির্বাসন শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি নয়? ও আমাদের দেশের, কিন্তু ওকে আমরা বহিষ্কার করছি, কিংবা দেশে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি না, দেশের মাটিতে পা দিলেই ওকে গুলি করে মারা হবে। ফাঁসিও হতে পারে। সে যা-ই হোক, বলা যাচ্ছে না যে ও আমাদের দেশের না। আর, সেরকমভাবে দেখতে গেলে দেশ থেকে কেউ নির্বাসিত হতে পারে না, নির্বাসন দেয় রাষ্ট্র।’
‘এক জায়গায় দেশ ও রাষ্ট্র অভিন্ন।’
‘ভোরের সূর্য ও ভরা গ্রীষ্মে মধ্যগগনের সূর্য যেমন।’
‘ব্যাখ্যা করো।’
‘দেশ হল ভূমি, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, মানুষ ও ভাষা। দেশ আপনার শরীরের স্বেদগন্ধ যা কেউ হাতির দাঁতের কৌটোয় ধরে রাখতে চায়, দেশ আপনার রেখে যাওয়া সত্তা নিরন্তর হৃদয়ে অনুভব করা।’
‘বেশ।’
‘এই যে একটু পরেই আপনি চলে যাবেন, আর আমি একা এই ঘরে, কিন্তু আপনি সারাক্ষণ বিরাজ করবেন, এই হল দেশ। আর রাষ্ট্র দেশের রাজনৈতিক সীমানা। রাজনৈতিক মঙ্গল প্রকরণ। রাষ্ট্রের কাঁটাতার পেরিয়ে যাওয়া নিষেধ। দেশ বুকে করে আমি যেখানে খুশি যেতে পারি।’
‘সুন্দর।’
‘রাষ্ট্র আমার বাবা, যে আমাকে খেয়ালখুশিমতো আদর করে যায়। যার আদর আমার আনন্দ বা বেদনার পরোয়া করে না।’
‘রাষ্ট্রব্যবস্থা নাগরিকের আনন্দবেদনা পরোয়া করতে বাধ্য। তার জন্যই সংবিধান।’
‘বিধান লেখা থাকে।’
‘রাষ্ট্রকে তা মান্য করতে হয়।’
‘চাতুর্যের সঙ্গে অমান্য করতে পারলে বিষয় মানিত হল, এমন প্রতারণা করা যায়। কিন্তু দেশ কখনো প্রতারক নয়।’
‘অদ্ভুত।’
‘আপনি দেশ, আপনি আমাকে আদর করেন সারাক্ষণ, মনে মনে, আমার অস্তিত্ব আদর করেন। এই মুহূর্তে আপনি আমার দেশ। আর ওই জঙ্গলে, যখন আপনি জানেন, আসলে আলোচনা টোনা কিছু নয়, আপনার সহকর্মীরা আপনাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে, আপনার ইশারার জন্য অপেক্ষা করে কখন হত্যা শুরু করা যায়, সেই আপনি রাষ্ট্র।’
‘হত্যা হত্যা হত্যা। বার বার এমন বলছ যেন আমি খুনি, জঘন্য অপরাধী। রাষ্ট্র কি শুধু হত্যাই করে? নিরাপত্তা দেয় না? বিপর্যয়ে নাগরিকের পাশে দাঁড়ায় না? এই যে কোটি কোটি লোক রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোয়, সে ওই কাঁটাতারের সীমানায় বিনিদ্র সৈনিক আছে বলে, সৈনিকের হাতে শক্তিশালী অস্ত্র আছে বলে। সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র কতখানি সতর্ক সেই বিষয়ে কোনও ধারণা আছে তোমার? তা ছাড়া রাষ্ট্র কী? রাষ্ট্র রাষ্ট্র! রাষ্ট্র কোনও দেশের রাজনৈতিক পরিকাঠামো মাত্র নয়। একটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব পতাকা, সংবিধান, কোষাগার, বিচারব্যবস্থা, সৈন্য ও শাসনতন্ত্র সমন্বিত পরিচয় হল রাষ্ট্র। তুমি যেদিকে আঙুল তুলতে চাইছ, সেটা, হতে পারে শাসনতন্ত্র। রাষ্ট্র নয়।’
‘শাসনতন্ত্র সংবিধান মেনে চলে তো? সংবিধানে লেখা আছে তো, রাজনীতি হল নিরন্তর বক্সিং লড়াই? দেশের ও দশের হিতার্থে সবার আগে দরকার রথের রশি অধিকার করে নেওয়া, তার জন্য প্রয়োজনে ভাই ভাইকে হত্যা করো, বোন বোনের রক্ত খাও, কারণ তুমি মঙ্গলসাধনে ব্রতী? আছে তো? বলুন?’
‘শাসনতন্ত্র নিশ্চয় সংবিধান মেনে চলে। কিন্তু শাসন রাজনীতির একটি অংশমাত্র। রাজনীতির বিস্তার ও জটিলতার সংবিধান রচনা করবে কে?’
‘আচ্ছা, আমাকে দেখাবেন?’
‘কী? তোমাকে দেখাব না এমন কী থাকতে পারে? নিশ্চয় দেখাব।’
‘মৃতদেহগুলির ছবি। যাদের আপনারা মেরেছেন। যারা দেশহিতব্রতী কিন্তু দেশদ্রোহী।’
‘চেয়েছ যখন, দেখাব। তোমাকে আমার অদেয় কিছু নেই। কিন্তু কী করবে তুমি ওই ছবি দেখে? বীভৎস ছিন্নভিন্ন দেহ।’
‘দেখব। দেখব। যদি আপনি মারা যেতেন, তাহলে শহিদ হতেন। আপনাকে কেমন দেখাত, তার খানিকটা আভাস পেতে চাওয়া।’
‘ওঃ, আমি শহিদ হলে কী করবে তুমি?’
‘আপনার বুকে মাথা রেখে খুব কাঁদব, তারপর সহমরণে চলে যাব।’
‘হাহ হাহ, সহমরণের ভাবনা প্রশংসনীয়। তার জন্য ওই রক্তাক্ত, ভয়ানক ছবি কি খবরের মধ্যে দেখে নেওয়াই যথেষ্ট নয়?’
‘না। যদিও খবর বীভৎস রস ও ত্রসনের বেসাতি ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তবু আমি ছবিগুলো কাছ থেকে দেখতে চাই।’
‘কেন? কেন?’
‘বোঝা দরকার, গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাবার পর মাথা রাখবার মতো বুকের পাটা আদৌ থাকে কি না।’
‘প্রিয়তমা, মৃত্যুর জন্য বুকে একটি মোক্ষম গুলি যথেষ্ট। তাতে মৃতের বুকে মাথা রাখার জন্য পর্যাপ্ত সুবিধেজনক জায়গা থাকতে পারে। কিন্তু কথা হল, একটিই বুক, একটিই গুলি, এমনটা হয় না। এ তো পৌরাণিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ নয়। এখন লক্ষ্য এক, গুলি অনর্গল। ক্রমাগত গুলিচালনার মধ্যে বর্তমানের যাবতীয় বীরত্বগাথা।’
‘বুকে মাথা না রেখেই সহমরণে চলে যাব, বলছেন?’
‘হৃৎকম্পন থেমে যাওয়া বুকে মাথা কেউ রাখতেই পারে, সেক্ষেত্রে মুখে-গালে রক্ত লেগে যাবে। তোমার লিপস্টিকের রং রক্তের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। মৃতদেহ পর্যন্ত পৌঁছোতে দেরি হলে রক্তখেকো পিঁপড়ের কবলেও তুমি পড়তে পারো।’
‘পিঁপড়ে রক্ত খায়?’
‘পিঁপড়ে মাংসাশী, প্রিয়তমা।’
‘তাহলে আমি বুকে মাথা রাখতেই পারব না।’
‘শোনো বালিকা, বুকে গুলি লেগে মৃত্যুর মধ্যে রমণীয় কল্প জড়িয়ে আছে। মাথায়, ঘাড়ে, এমনকী পশ্চাদ্দেশে গুলি লেগেও কারো দিব্য মরণ হতে পারে। তারপর ধরো, বিস্ফোরক, একযোগে বহু লোককে শহিদ করে দেওয়ার কী মেধাবী উপায়!’
‘আপনারা বিস্ফোরক ব্যবহার করেন না? হত্যার জন্য?’
‘ওই যে তুমি বললে সংবিধান, ওখানে তো বলে দেওয়া নেই, প্রতিরক্ষা মানে হয় মরো অথবা মারো।’
‘তাহলে?’
‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যতরকম উপায়, তার দুই হল গুপ্তঘাত এবং বিশ্বাসঘাতকতা।’
‘স্বীকার করলেন।’
‘সত্য বললাম।’
‘অতঃপর?’
‘সেই হন্তারক সময়ে কী ব্যবহৃত হবে, ছুরি, কাঁচি, বন্দুক, গুলি, মাইন অথবা বিস্ফোরক, এসব বলা নেই। বলা আছে কল্যাণ ও সর্বধর্মসমন্বয়। বলা আছে সাম্য ও সমানাধিকার। প্রিয়তমা, প্রত্যেকদিন, তোমার আমার যাবতীয় আলোচনা পৌঁছোয় পীড়ন, হত্যা অথবা নির্যাতনে। তুমি আমাকে একই প্রশ্ন করো, আমি তোমাকে একই উত্তর দিই।’
‘জীবন অর্থ একই প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া। নয় কি? গ্রীষ্মের হাওয়ায় শুকনো পাতার একদল পাক খেতে খেতে ওড়ে, তারপর আবার একদল, তারপর আবার। এমন উড়তেই থাকে। দৈনন্দিনের একঘেয়েমিতে জীবন সেই কবে থেকেই বন্দি, আপনার মনে হয় না এ কথা?’
‘জীবনকে এভাবে দেখতে নেই। নিজেকে একঘেয়েমি থেকে মুক্ত করতে হয়। না হলে সারাক্ষণ খাঁচার গরাদগুলিই চোখে পড়বে। ওপরের অনন্ত আকাশ, তাকেও মনে হবে কয়েদখানা।’
‘হয়তো আকাশও আসলে বন্ধন।’
‘এভাবে ভেবো না। মুক্তচিত্ত হও।’
‘কীভাবে? হত্যা করে?’
‘না। ভালোবেসে। তুমি আমাকে ভালোবাসছ, তোমার কীসের বন্ধন? তুমি বললেই আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাব।’
‘রোজ আপনি এই কথা বলেন। রোজ আমি মনে মনে এক শেকল ভাঙি, আবার এক শেকল দেখা দেয়।’
‘কীসের শেকল? কোথায়? কে তোমাকে বাঁধে এমন?’
‘বলেছি তো আপনাকে, গন্ধদ্রব্যের ব্যাবসা ছাড়াও আমার পিতৃদেবের ব্যাবসা আরও অনেক। তার মধ্যে একটি, শেকল তৈরির গনগনে কারখানা। প্রতিদিন এক-একটি নতুন শেকল আমার গলায় দিয়ে বাবার তৃপ্তি।’
‘পিতার স্নেহ, আদর, উপহার তোমার শেকল মনে হয়?’
‘যা মনে হয়, তা-ই তো বলব।’
‘নিশ্চয়। তবে অভিভাবকের শাসন ভুল বুঝে নিজেকে বন্দি মনে করার বয়স তোমার। আমি সচেতন করে দিতে চাই। আদর আর শাসন পাশাপাশি না রেখে উপায় নেই। তুমি মন থেকে বন্দিত্ব, শৃঙ্খল, হত্যা, অত্যাচার ইত্যাদি বর্জন করো।’
‘আচ্ছা, আজ আর হত্যা বা শৃঙ্খল নয়, শুধু একটা উত্তর দিন, রক্তের রং যদি লাল না হত, আদৌ রক্ত বলে যদি কিছু না থাকত, হত্যা এত আকর্ষণীয় হত কি?’
‘এর অর্থ কী? প্রিয়তমা আমার।’
‘আমার মনে হয়, রক্তের লালিমা হত্যা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। গাছের রক্ত নেই বলে কত সহজে গাছ মেরে ফেলি আমরা।’
‘ভালোবাসার রং লাল।’
‘ক্রোধের রং লাল।’
‘যৌনতার রং লাল।’
‘নিষেধের রং লাল।’
‘কামনার রং লাল।’
‘আচ্ছা, আপনি রোজ এসে এত কথা বলেন, আমি এত কথা বলি, রাতদিন রাতদিন কথা কথা কথা, আমাকে একটুও আদর করেন না কেন?’
‘তুমি জানো, মনে মনে সারাক্ষণ আমি তোমায় আদর করি।’
‘সে আমি জানিই। আমাকে ছুঁয়ে ছেনে চটকে মটকে আদর করেন না কেন?’
‘তুমি চাইলে নিশ্চয় আদর করব।’
‘আমাকে আদর করুন। ভীষণ আদর করুন যাতে অন্য সব আদর আমি নস্যাৎ করতে পারি।’
সে প্রিয়তমাকে জড়িয়ে ধরে, সাহস দেয়, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও আদর তোমার সহ্য করার প্রয়োজন নেই। তুমি তোমার শরীর ও মনের অধীশ্বরী। তুমি সুন্দর। তুমি অনন্যা।’
সে খুলে ফেলে ছাইরঙা ব্লেজার। খুলে ফেলে প্রেমিকার সাদা শার্ট। আগ্নেয়াস্ত্র সাবধানে রাখল বিছানার পাশে টেবিলে। প্রেমিকা বলল, ‘সবসময় সঙ্গে রাখো?’
‘রাখতে হয়। ফর সেফটি।’ সে আলো নিভিয়ে দিতে চাইল। এগিয়ে গেল দরজার দিকে। ছিটকিনি দেওয়া দরকার।
‘কেউ আসবে না।’ বলল তার প্রেয়সী।
‘তবু। সাবধান থাকা ভালো।’
‘আলো নিভিয়ে দেবেন না। আমাকে দেখুন। আমার সবকিছু দেখুন। আমাকে পান করুন। আমার কিচ্ছু যেন আর থাকে।’
‘তোমার সর্বস্ব পান করব আমি।’
‘আমি আপনার লালারসে স্নান করব।’
সে চক্ষু ভরে দেখল প্রথম নগ্নিকা।
স্পর্শ করল প্রেমিকার নাভি।
ওষ্ঠ রাখল গালে, চোখে, কপালে, অধরে। হয়ে উঠল প্রেমিক পুরুষ।
পুরুষ।
অনাকাঙ্ক্ষিত পীড়নে কাতর দুই স্তন নরম আদরে ভরিয়ে দিল।
মানবতার নীতি লঙ্ঘন করা আঙুলগুলি নির্যাতন করে যে অপ্রস্তুত যোনি, বিশ্বস্ত ও আর্দ্র জিহ্বায় লেহন করে কত মধুর রস পান করল তার।
প্রেয়সী কাতরস্বরে বলছে, ‘এত ভালো লাগে? এত? আমাকে এত ভালোবাসেন আপনি? আমি আর এক মুহূর্ত আপনাকে ছেড়ে থাকতে চাই না। আপনি আজই আমাকে নিয়ে চলুন। বলুন, যাবেন। বলুন। আজই আমাকে নিয়ে যাবেন।’
‘নিশ্চয়। তুমি চাইছ, আমি আজই তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।’
‘বাবার সঙ্গে? বাবা? আমাকে যেতে দেবে না। আমি বন্দি। আপনি বিশ্বাস করেন না? বাবা আমাকে শেষ করে দেবে।’
‘আমি আছি। কেউ তোমার কিছু করতে পারবে না।’
‘বাবাকে জানেন না আপনি।’
‘জানি।’
‘না। জানেন না। আমাকে খেয়ে ফেলে লোকটা।’
‘আর খেতে দেব না।’
‘জানোয়ারের থালায় ফেলে খাওয়ায় আমার শরীর।’
‘এই সব শেষ। সব। আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাব। আজই। এখুনি।’
‘আদর করুন, আরও আরও আরও আদর।’
‘কেউ এসেছে।’
‘না। থামবেন না।’
বন্ধ দরজায় করাঘাত বেজে উঠল। দরজা খোলার কড়া আদেশ। পিতৃকণ্ঠ শোনামাত্র সে টের পেল, তার প্রেয়সী প্রস্রাব করে ফেলছে। কাঁপছে সে। খামচে ধরেছে তার পিঠ। ‘বাবা! কী হবে? আজ আসার কথা ছিল না তো। কী হবে?’
‘শান্ত হও। জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে যাও। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। ভয় নেই। আমি আছি।’
অতঃপর, এক ক্রুদ্ধ পিতা ও সেই পিতার প্রতি প্রবল ঘৃণা এবং অশ্রদ্ধা হৃদয়ে বহন করা প্রেমিকের মধ্যে শুরু বাকযুদ্ধ।
‘আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে যাব।’ বলল প্রেমিক।
পিতা বলল, ‘সঙ্গে নিয়ে যাবে? কে হে তুমি? গপ্পগাছা করো, কিছু বলি না। তোমাকে ভালো ছেলে মনে করেছি। তুমিও ওর দিকে হাত বাড়ালে? এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। না হলে পুলিশে দেব।’
‘ওকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব। ও নিজের ইচ্ছায় যাবে। আপনাকে জানানো আমার কর্তব্য, তাই বললাম।’
‘কর্তব্য? আমার মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নয়। ওর ইচ্ছের কোনও দাম নেই। আমি ওর বাবা, আমি যা বলি ও তা-ই করে। তুমি যদি এখুনি চলে যাও, তোমার এই অন্যায় ক্ষমা করে দেব, যদি আর একটিও কথা বলো, তোমার ভবিষ্যৎ শেষ।’
‘আমি আজ ওকে সঙ্গে নিয়ে যাবই। ভয় দেখিয়ে আমাকে আটকাতে পারবেন না আপনি।’
‘কত টাকা চাও? কত টাকা? তোমাদের মতো খুনে বদমাইশ বাড়িতে আনাই ভুল হয়েছে আমার। বলো, বলো, কত টাকা চাও।’
‘আমি খুনি নই।’
‘ধোয়া তুলসীপাতা! ভাবলে কী করে, তোমার মতো হত্যাকারীর হাতে মেয়েকে তুলে দেব আমি? এত স্পর্ধা হয় কী করে? আমার মেয়ের পায়ের নখের যুগ্যি তুমি নও। একটা বাচ্চা মেয়ের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছ। তুমি তো মানুষের ছেলে নও।’
‘আমি কোনও অপরাধ করিনি। আমি খুনি নই। আমি ওকে ভালোবাসি। ও আমাকে ভালোবাসে। ও আমার সঙ্গে যাবে।’
‘ও কখনো তোর সঙ্গে যাবে না। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখ, লাল লাল লাল। তুই খুনি। তুই খুনি।’
‘আমি খুনি নই।’
‘তুই খুনি।’
‘না।’
‘খুনি।’
‘না।’
‘খুনি খুনি খুনি।’
‘না না না।’
সে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নিচ্ছিল, সেই মুহূর্তে দেখে ফেলল প্রেয়সীর ভয়ার্ত ফ্যাকাশে মুখ।
এত ভয় লোকটাকে? এত নির্মম এই মানুষ?
তার মনে হল, এই লোকটা বেঁচে আছে কোন অধিকারে? যে মেয়েকে যৌনসম্ভোগের বস্তু মনে করে, যে তাকে বলে খুনি, যে তাদের ভালোবাসার পথে অনতিক্রম্য বাধা, যে মানুষের মতো দেখতে অমানুষ, সে সে সে…
শুধু দুটি আঙুলের টান। অব্যর্থ গর্জন। চিৎকার করে উঠল প্রেয়সী, বাবা…
কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়া মারণাস্ত্র ঘটাচ্ছে রক্তপাত। কালচে লাল স্রোত। মেয়ে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে বুকে। সে সাপটে ধরল। প্রেমিকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। বিস্ফারিত চোখে তাকে দেখছে। চেঁচিয়ে উঠল, ‘আপনার গায়ে রক্ত। আপনার গায়ে বাবার রক্ত।’
এত রক্ত কখন পড়ল তার শরীরে? কোনও হত্যায় সে এমন রক্তস্নাত হয়নি। ওঃ ওঃ। সে বুঝতে পারল। হত্যা নয়। আজ সে খুন করেছে।
প্রেমিকা বলছে, ‘রক্ত ধুয়ে ফেলুন। আপনি চলে যান। ও, কী রক্ত! ধুয়ে ফেলুন।’
সে বলছে, ‘ভালোবাসবে তো আমায়? আজীবন? অপেক্ষা করবে তো? হ্যাঁ?’