কয়েদি – ৯
৯
সে কারাপ্রধানের আপিসের দরজায় প্রহরারত নিরাপত্তারক্ষীকে বলল, ‘সাহেবকে বলো, আমি দেখা করব।’
রক্ষী তাকে চেনে। কারাপ্রধান তাকে আপিসঘরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন। লোকটি কথা না বাড়িয়ে তার কর্তব্য সম্পাদন করল। কয়েদি কারাপ্রধানকে সরাসরি রুক্ষ প্রশ্ন করল, ‘আপনি বলেছিলেন, দেখবেন, কিন্তু আপনি তো কিছুই করছেন না।’
কারাপ্রধানের সঙ্গে আগে সে রূঢ়ভাষী হয়নি। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘আমার হাতে তো কিছু নেই। আমি প্যারোল বোর্ডকে বলেছি। তবে কী জানো, আইন মোতাবেক তুমি এখনও প্যারোলের অধিকারী নও।’
‘এককথা কতবার শুনব? আপনি তো বলেছিলেন, ব্যতিক্রম আছে।’
‘আছে। তার জন্য সবসময় ভালো আচরণ করতে হবে। সেই সঙ্গে, পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ, এমন পরিস্থিতি হলে ব্যতিক্রমীভাবে প্যারোল অনুমোদন করা হয়। দেখি কিছু যদি করা যায়। তুমি যে লাইফার ভাই। পরিস্থিতি অসুবিধেজনক, তা-ই না? অপেক্ষা করো।’
‘অপেক্ষা অপেক্ষা। আর কত অপেক্ষা করব? আমার ন্যায্য প্যারোল আমাকে দিতে হবে।’
‘তুমি আইন জানো। প্যারোল তোমার অধিকার নয়। বোর্ড যাকে প্যারোলের উপযুক্ত মনে করবে, তাকে দেবে। নতুন বিধান কিছু তৈরি হয়নি। যা করতে হবে, এর মধ্যেই।’
‘আমি কীসে উপযুক্ত নই, জানতে পারি? দেশের জন্য আমি কর্তব্য করিনি? জেলখানায় ভদ্র আচরণ করিনি?’
‘আরে আইন না থাকলে কী করা যাবে? মাত্র ৮ বছর জেল খেটে লাইফ ইম্প্রিজনমেন্টে প্যারোল হয় না। আমার হাতে যতটুকু ক্ষমতা, তা-ই দিয়ে আমি চেষ্টা করে চলেছি। তুমি ধৈর্য ধরো। আমি কোনও কথা দিচ্ছি না। যদি কিছু করতেও পারি, প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে করতে হবে। এসবের জন্য সময় লাগে না? তোমাকে এত কৈফিয়ত আমি দিচ্ছি কেন? যাও। এখন যাও।’
‘আমার উকিল বলে গেছে, আপনি চাইলে করে দিতে পারেন। জেলের মধ্যে কত আইন মানা হয়, আমি দেখছি না? শুধু আমার বেলায় আইন? আপনি যদি ব্যবস্থা না করেন, আমি অনশন করব।’
‘তোমাকে বলছি, একটু ধৈর্য ধরো, ধৈর্য, ধৈর্য।’
‘ধৈর্য? না? সব মিথ্যে। কিচ্ছু চেষ্টা করেননি আপনি। সব সব মিথ্যে। আপনিও ওদের দলে। আপনিও চান না ওর সঙ্গে আমার দেখা হোক।’
‘আমার তাতে কোনও লাভ আছে কি? আমি তোমাকে যতখানি সম্ভব সাহায্য করিনি? আজ তোমার মন স্থির নেই। যাও এখন। আমার কাজ আছে।’
‘আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন? সাহায্য করবেন বলে গাছে তুলে মই কেড়ে নিচ্ছেন? মিথ্যেবাদী! আপনি আমাকে আটকে রাখবেন? ওর কাছে যেতে দেবেন না? আটকে রাখবেন আপনি?’
কারাপ্রধান রক্ষীকে ডেকে নির্দেশ দিলেন কয়েদিকে বাইরে নিয়ে যেতে। রক্ষী কয়েদির পিঠে হাত রাখামাত্র তার মাথায় বিস্ফোরণ হল। রক্ষীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি করল রক্ষীকে, কারাপ্রধানকে, গুলির শব্দে ছুটে আসা জনতাকে।
মোট কতজন, মনে পড়ে না।
সে যখন রাষ্ট্রের সুরক্ষার কাজে ব্রতী হয়, প্রাপ্ত প্রশিক্ষণের মধ্যে ক্ষিপ্রতা অভ্যাস করতে হয়েছিল। এতদিনেও সেই ক্ষিপ্রতা ফুরিয়ে যায়নি ভেবে তার খানিক গর্ব হল।
এরপর ঠিক কোন ধরনের বিচার হয়েছিল তার? সে ভুলে গেছে। প্রথম খুনের জন্য তার যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা হয়েছিল। মেয়ের সামনে বাবাকে খুন করা হিংস্র ও গর্হিত। সে কী করে আদালতে বলতে পারত, মেয়ের প্রতি বাবাও ছিল হিংস্র ও গর্হিত। মেয়ে সেই প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ নীরব।
দ্বিতীয়বার তার মৃত্যুদণ্ড হওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল। সে জানে না, কেন তাকে মেরে ফেলা হয়নি। সম্ভবত তার প্রেয়সী আবেদন করে তাকে জীবিত রেখেছে এই আশায়, একদিন তার মুক্তি হবে।
একটি জীবন অনেকগুলি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। কারাগার তাকে ছাড়বে না। প্যারোলের আশাও আর নেই। কিন্তু মুক্তির আশা সে ছাড়বে কেন? মুক্তি সে অর্জন করবে। পশ্চিমের দেওয়ালে সে চে লিখতে লিখতে গলিয়ে ফেলবে ইট-লোহা-সিমেন্টের আস্তরণ। আর মাত্র কয়েকদিন।
সে ডাকল, ‘বন্ধু।’
দক্ষিণের দেওয়াল বলল, ‘বলো। কেমন বোধ করছ? তিন দিন তোমার সাড় ছিল না। তুমি ঘুমিয়ে ছিলে।’
‘আমার চে এবার মুক্তির জন্য তৈরি।’
‘কেমন করে বুঝলে?’
‘শ্মশানের হাওয়ায় আমার প্রেয়সীর গন্ধ পেলাম।’
‘সে কী!’
‘না না। তার শবদেহ পোড়ার গন্ধ নয়। সে আমাকে দেখার জন্য কারাগারের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমি যে এই কুঠুরিতে বন্দি, সে জেনে গেছে। শ্মশানে এসে বসে থাকে, তখন গন্ধ আসে। আমার গন্ধ ও হাতির দাঁতের কৌটোয় ভরে রেখেছে। আমি রেখেছি স্মৃতিতে।’
‘তা-ই তো।’
‘চে আমাকে মুক্ত করলেই সে নিজে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যাবে। আমার নখ কেটে দেবে যত্নে। স্নান করিয়ে দেবে। আমার সারা শরীরের ঘা পুঁজ পোকা সব সারিয়ে আমায় দেবে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি। সামনে ধরবে বাসমতী চালের ভাত, ধোঁয়া-ওঠা। সঙ্গে ঘি, নিমপাতা ভাজা, মোচার ঘণ্ট, তপসে মাছ ভাজা আর সর্ষে-ইলিশ।’
‘চমৎকার সব খাদ্য।’
‘আচ্ছা তোমার সেই ইমামসাহেবের কথা মনে আছে? তাঁর কোনও খবর জানো?’
‘কোন ইমামসাহেব?’
‘আরে, সেই যে, সেই যে, বলো-না, যাঁর ছেলে না মেয়ে দাঙ্গায় মারা গেল, তিনি খুনিদের মাপ করে দিলেন। মনে নেই?’
‘না। মনে পড়ছে না। আমাকে কিছু বলোনি।’
‘কাকে বললাম? উত্তরাকে?’
‘কী করে বলি বোলো দেখি।’
‘কাকে বললাম? কী জানো, চে এবার মুক্তি দেবে। ইট-সিমেন্ট-লোহা গলিয়ে পশ্চিমের দেওয়ালে মস্ত ফোঁকর। তা-ই দিয়ে আমি বেরিয়ে যাব। মুক্তি। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। সে শ্মশানে বসে আছে। আমাকে নিয়ে যাবে। শুধু একটা কথা ভাবছি।’
‘কী কথা?’
‘যদি বলে, তার পিতাকে খুন করেছি বলে সে আমাকে ক্ষমা করেনি, তাহলে ইমামসাহেবের কথা তাকে বলব। কিন্তু ভালো করে মনে পড়ছে না। ইমামসাহেব। ক্ষমা, ভালোবাসা, মুক্তি, ধর্ম।’
‘কী বলছ?’
‘না না। এইবার মুক্তি।’
‘চে লেখার অর্থ কী বন্ধু?’
‘চে মুক্তি। চে চৈতন্য। চে চিৎকার।’
‘তুমি কি লক্ষ করেছ?’
‘কী?’
‘তোমার উত্তরার সব ছবি পুরু শ্যাওলায় ঢাকা পড়েছে। হলদে-কালো শ্যাওলা। কোথায় জলের পাইপ ফেটে কবে থেকে চুঁইয়ে পড়ছে। যেকোনও দিন দেওয়াল ধসে পড়বে। তোমার জন্য অন্য কোনও জায়গার কথা ভাবা হচ্ছে।’
‘সর্বনাশ!’
‘কীসের সর্বনাশ?’
‘চে-র কাজ প্রায় শেষের মুখে। এ সময় অন্য কোনও দেওয়াল ভেঙে পড়লে আমার মুক্তি হবে কী করে?’
‘উত্তরার ছবি মুছে গেল, সে নিয়ে ভাবছ না? খারাপ লাগছে না তোমার?’
‘না না। আমি যেকোনও সময় মুক্ত হয়ে তার কাছে চলে যাব। আর কতদিন তাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখব বলো তো বন্ধু। সব কিছুর একটা সীমা আছে।’
‘বন্ধু।’
.
নিঃশব্দ।
.
‘বন্ধু। শুনতে পাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি বোধহয় আবার ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। বলো।’
‘উত্তরার পুরো নাম কী?’
‘উত্তরা নয়।’
‘তার মানে?’
‘তার নাম উত্তরা নয়।’
‘কী নাম তাঁর?’
‘নাম? কী যেন! কী যেন! মনে পড়ছে না।’
‘মনে করার চেষ্টা করো। চে মুক্তি দিলে তুমি কার কাছে যাবে?’
‘সে ঠিক আমাকে চিনে নেবে। অপেক্ষা করে আছে। তার গন্ধ পেয়েছি। তুমি কি খানিকটা এগিয়ে আসতে পারবে? বন্ধু? পশ্চিমের দেওয়ালে ওই চে অক্ষরে খানিক ঠেলা দিয়ে দেখো তো মুক্ত হয় কি না। আমার নিজেকে অনড় মনে হচ্ছে। শরীরটা পাথর। আমার সারা শরীরে কি শেকল পরিয়ে দিয়ে গেছে?’
‘তাঁর নাম কী, বন্ধু? মনে করো। মনে করো। তুমি কার কাছে যাবে?’
‘তার কাছে। ওই যে। সে বলেছিল আমাকেই ভালোবাসবে, আজীবন।’
‘চে মানে মুক্তি। চে মানে চৈতন্য। চিৎকার। বন্ধু, এবার সময় এসেছে। সত্য না-জানা অবধি তোমার মুক্তি নেই। আমরা তোমাকে মুক্তি দেব না।’
‘কোন সত্য? কে তোমরা?’
‘আমাদের সবাইকে তুমি নিজের বন্দিদশায় নিয়ে এসেছ।’
‘ভুবন এক সুবিশাল জেলখানা।’
‘সে তুমি যা-ই বলো, সত্য জানতেই হবে তোমায়। শুনতে হবে তোমার পাপ। জানতে হবে জেলার মহাশয়ের সহৃদয়তার বিনিময়ে তুমি কত বড়ো অকৃতজ্ঞ।’
‘কোন জেলার মহাশয়? কার কথা বলছ দক্ষিণ? তোমার কণ্ঠে অত শৈত্য কেন?’
‘জেলার মহাশয়কে মনে পড়ছে না তোমার? যিনি সবসময় তোমাকে সাহায্য করেছেন, তুমি না চাইতেই তোমাকে দিয়েছেন সম্মাননীয় রাজনৈতিক বন্দির মতো সুবিধা, যিনি কারাপ্রধান হিসেবে এবং একজন মানুষ হিসেবে ছিলেন মহৎ, সবার প্রিয়, তোমাকে প্যারোল এনে দিতে পারেননি বলে যাঁকে তুমি খুন করেছ, সঙ্গে প্রাণ নিয়েছ আরও তিনজনের, সেই তুমি, উন্মাদ ঘাতক, শুনে যাও, তিনি তোমাকে প্যারোল পাইয়ে দিতে পারতেন, তুমি ঠিকই ধরেছিলে। তাঁর ক্ষমতা ছিল। তোমার জন্য ঝুঁকি নিতেও ভয় ছিল না তাঁর।’
‘তাহলে? আমাকে আটকে রাখলেন কেন?’
‘এই তো। মনে পড়েছে তোমার। চমৎকার।’
‘আমার কোনও অনুশোচনা নেই। যা করেছি, ঠিক করেছি। আমার আর তার মধ্যে যে বাধা হবে, তাকে আমি হত্যা করব।’
‘তিনি তোমার প্রেমের পথে কিছুমাত্র বাধা ছিলেন না।’
‘তাহলে? তাহলে? আমি শুধু তাকে দেখতে চেয়েছিলাম। একবার দেখে, একটু কথা বলে, একটু ছুঁয়েই আমি ঠিক খাঁচায় ফিরে আসতাম। কেন তিনি আমাকে আটকে রাখলেন?’
‘কারণ, যার জন্য তুমি পাগল ছিলে, সে বিয়ে করে সুখে জীবনযাপন করছে, এই সত্য তিনি আড়াল করতে চেয়েছিলেন। তুমি, কত কষ্ট পাবে ভেবে তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তোমার জীবনের একমাত্র অবলম্বন কেড়ে নিতে চাননি।’
‘হতে পারে না। মিথ্যে বলছ তুমি।’
‘তিনি ভয় পেয়েছিলেন, তাঁকে বিবাহিতা দেখলে তুমি হয়তো পুরো পরিবার খুন করে বসবে। তোমার ভিতরের ঘাতককে তিনি ঠিক চিনেছিলেন। যাও, যাও। চলে যাও। মুক্ত তুমি। বিদায় বন্ধু। বিদায়।’
পিঠে সত্য, মুক্তি, ক্ষমা, প্রেম ও বিপ্লব। আজকাল যেখানে সেখানে তাকে দেখা যায়। মাথায় ময়লায় জট-পড়া চুল, সারা গায়ে বিজবিজে ঘা, পায়ে লোহার শেকল, ঘা থেকে টুপটাপ খসে পড়ে মাংসখেকো কীট, সম্পূর্ণ উলঙ্গ, অন্ধ ও বধির একটা মানুষ পথেঘাটে শ্মশানে হাসপাতালে জেলখানায় রাজভবনের অদূরে পার্কে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে, চে মানে চেতনা, চেতনা মানে মুক্তি, মুক্তি মানে ভালোবাসা। কখনো নিজেই গুলিয়ে ফেলে। বলে, চে মানে ভালোবাসা, ভালোবাসা মানে মুক্তি, মুক্তি মানে চেতনা। চে মানে সত্য। চে মানে মুক্তি। চে মানে প্রেম।
এক-আধবার কেউ কেউ শুনেছে, কপালে হাত ঠেকিয়ে সে বলে, ক্ষমা, ক্ষমা, ইমামসাহেব, ক্ষমা। চে মানে ক্ষমা। চে মানে প্রেম। চে মানে ইমামসাহেব। চে মানে দেশ।
***