১০. সৌভাগ্যোদয়ের কারণানুসন্ধান
দশম পরিচ্ছেদ – সৌভাগ্যোদয়ের কারণানুসন্ধান
“ঐ দেখরে দেখ, পলাশি ময়দানে ওড়ে, কোম্পানি নিশান!
মলে মোহন, জাফর ছলে লড়াই সঁপে নবাব পলান,
করলে কি তার দশা শেষে, সেই ঐ, মীরজাফরের ছেলে,
রাজ্য নিয়েও, মিটল না সাধ, কাটে নবাবকে ধরে ফেলে,
ঐ তার ধড় গর্দ্দান, কাটা মুণ্ড, হাতির পরে লয়ে ফেরে
সেই দেখে, সেই কেঁদে মরে, ভয়ে সবাই সহর ছাড়ে।”
অভ্যুদয়ঃ— বহুকাল হইতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্যক্তি বিশেষের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতিবিশেষের রাজত্ব আরম্ভ হইয়াছে ও উহা প্রায়ই শত বৎসর অন্তরই হইতেছিল দেখিতে পাওয়া যায়। শতবর্ষান্তর ৫৭এর অঙ্কে সেইরূপ আমূল পরিবর্ত্তন হইতেছে—১৫৫৭ খৃষ্টাব্দে হিমুর সর্ব্বনাশ ও চতুর্দ্দশ বয়স্ক বালক আকবরের অভ্যুদয়, সেইরূপ ১৬৫৭ খৃষ্টাব্দে, শিবাজির বিজাপুর লাভ ও ঔরঙ্গজেবের সিংহাসনারোহণ ও পুনরায় ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে ক্লাইবের পলাশীযুদ্ধের জয়লাভ ও সিরাজউদ্দৌলার নৃশংসহত্যা সংসাধিত হইয়াছিল। আবার সেইরূপ শতবর্ষ পরেও ইংলণ্ডের রাজ্ঞী ভারতেশ্বরী হইয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অস্তিত্ব লোপ করিয়াছিলেন। উহাতেই ইংরাজ জাতির অভ্যুদয় ও মুসলমানের পতন হইয়াছিল। উহার কলঙ্কভার ইতিহাসে মীরজাফর, মীরকাশিম, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ ও কৃষ্ণচন্দ্রাদিকে বহন করিতে হইতেছে। সিরাজউদ্দৌলা আকবরের ন্যায় বৈরামের ক্রীড়াপুত্তলী ছিলেন না, বরং গৃহশত্রু মীরজাফরকে হস্তগত করিয়া বহিঃশত্রু দমন করিতে গিয়াই তাঁহার সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। তিনি পাপিষ্ঠের চক্রান্ত জানিতে পারিয়া উহাকে বন্দি করিয়া ও শেষে ভাগ্যদোষে বৃদ্ধা মাতামহীর অনুরোধে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের শপথে বিশ্বাস করিয়া তাঁহার জীবন ও রাজ্য সমস্তই হারাইয়াছিলেন। শেষে সেই শতবর্ষান্তর অঙ্ক ফলে বাঙ্গালায় ইংরাজের রাজ্য হইয়াছিল।
হায়! কি কুক্ষণে, নবাব বালস্বভাব-চপলতার বশবর্ত্তী হইয়া শেঠ দুহিতার রূপলাবণ্য দর্শন করিবার জন্য শেঠ ভবনে বেগমের বেশে প্রবেশ করিয়া লাঞ্ছিত হইয়াছিলেন ও উহার প্রতিশোধের ব্যবস্থা শেঠ জামাতার গুপ্ত হত্যা দ্বারা করিয়াছিলেন! হায়! কি কুক্ষণে, তিনি জগৎ শেঠের ঔদ্ধত্যের শাস্তি স্বহস্তে চপেটাঘাত দ্বারা করিয়া তাহাকে কারারুদ্ধ ও মাতামহীর কথায় মুক্ত করিয়াছিলেন! হায়! কি কুক্ষণে, তিনি যুদ্ধে অগ্রসর হইয়া ইংরাজ জাতিকে পরাস্ত না করিয়া তাহাদের সহিত সন্ধিসূত্রে বদ্ধ হইয়াছিলেন! হায়! কিক্ষণে তিনি মাণিক চাঁদকে অধিকৃত কলিকাতার অধ্যক্ষ মনোনীত করিয়াছিলেন। হায়! কি কুক্ষণে, তিনি উমিচাঁদের কথায় মুগ্ধ হইয়া ইংরাজগণকে বিশ্বাস করিয়াছিলেন। হায়! কিক্ষণে, তিনি নন্দকুমারকে হুগলীতে ফরাসিগণের সাহায্য করিবার জন্য ভার দিয়েছিলেন! হায়! কি কুক্ষণে, তিনি ক্লাইব ও ওয়াটসনের চাতুরীতে মুগ্ধ হইয়া ইংরাজ তাহাকে বহিঃশত্রুর হস্ত হইতে রক্ষা করিবে এই বিশ্বাসে প্রতারিত হইয়াছিলেন! হায়! কি কুক্ষণে সেই মোহে তিনি ফরাসির সাহায্য করেন নাই। হায়! কেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফরের সৈন্যগণের ব্যবহার অনুসন্ধান না করিয়া উহার কথায় যুদ্ধত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলেন! হায়! এই সমস্তই তাঁহার অপরিণামদর্শিতা বা হঠকারিতার ফল, বরং তাঁহার সৌভাগ্যহীনতার নিদর্শনস্বরূপ। তিনি যে উমিচাঁদ প্রভৃতির শপথাদি বঞ্চনায় বঞ্চিত হইয়া ফরাসি ও ইংরাজের যুদ্ধকালীন আপনার রাজশক্তির মান্য রক্ষা করেন নাই এ সকল ঘোরতর অপরাধে তাঁহার সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। শত্রুকে বর্দ্ধিত হইতে দেওয়া রাজার অমার্জ্জনীয় দোষ ও উহাই পতনের মূল কারণ। এইজন্য উমিচাঁদ, নন্দকুমার ও জগৎ শেঠের দোষ মীরজাফর অপেক্ষা কোন অংশে নূ্যন নহে। কোন শৌর্য্যবীর্য্য পরাক্রমশালী মহাবীরের যুদ্ধ কৌশলে বা বলাধিক্যে যে পলাশীর যুদ্ধ জয় করা হয় নাই ইহা বলা অনাবশ্যক। কলিকাতার মন্ত্রণাগার ও কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীই সেজন্য সম্পূর্ণ দায়ী। তাঁহাদিগকেই প্রকৃতপক্ষে পলাশি যুদ্ধের প্রধান অভিনেতার দোষ, গুণ, গৌরব বা কলঙ্কভার বহন করিতে হইবে, সিরাজউদ্দৌলা কেবল উপলক্ষ মাত্র।
পলাশীর জয় ও ফলাফল উহা হইবার পূর্ব্বেই মীরজাফরের কলিকাতার গুপ্তসন্ধি পত্রেই হইয়াছিল, কেবল সেই জয় ঘোষণার জন্য পলাশীর নাম চিরস্মরণীয় হইয়াছে। পূর্ব্বোক্ত প্রচলিত গ্রাম্য গীতিতে ইংরাজ গৌরব ও রাজ্যে সকলের মনে ভয় ও ক্রন্দনের রোলই লক্ষ্য করা যায়। এই জন্যই কলিকাতার গুপ্তসন্ধির মাহাত্ম্য যে নাই এ বলা যায় না। সেইখানেই ক্লাইবের বত্রিশ সিংহাসনে তাঁহার বিক্রমাদিত্য নামের ঘোষণা হইয়াছিল। সেই মাহাত্ম্যেই একদিন উমিচাঁদের সঙ্কেতে সিরাজউদ্দৌলার এখনও কামান আসে নাই জানিয়া উপযুক্ত অবসরে ক্লাইবের আক্রমণ দ্বারা ভীতি উৎপাদনে নবাব সন্ধি করিয়াছিলেন, আবার উপযুক্ত সময়ে উহা অমান্য করিয়া ক্লাইব মীরজাফরের সহিত গুপ্ত সন্ধি দ্বারা সিরাজউদ্দৌলায় সেই দুর্ব্বুদ্ধিতার উপযুক্ত শিক্ষা দান করিয়াছিলেন। বর্ত্তমানকালে উহা যেন উপন্যাসের মত বোধ হয়, সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না। কলিকাতার অধিবাসী উমিচাঁদকে মহাভারতের শকুনির সহিত তুলনা করিলে, বোধ হয়, কোনই দোষ হয় না। হায়! সপ্তরথী দ্বারা পরিবেষ্টিত নিরস্ত্র অভিমন্যুর ন্যায় সিরাজউদ্দৌলারও সর্ব্বনাশ হইয়াছিল।
সূক্ষ্ম বিচারঃ— ঐতিহাসিকগণের মতের অনৈক্য হইতে পারে কিন্তু ভগবানের সূক্ষ্ম বিচার যে ঘটনাস্রোতেই লক্ষিত হয়। মৃত্যুর সময়ই মানবের ধর্ম্মকর্ম্মের পরিচয় পাওয়া যায়, চলিত কথাও উহার সমর্থন করে “তপ জপ করিলে কি হয়, মরতে জানলে ধন্য হয়।” মীরজাফরের রোগে, শোকে অপমানে, পাপিষ্ঠ মীরণের বজ্রাঘাতে, ক্লাইবের স্বহস্তে, উমিচাঁদের ক্ষিপ্তাবস্থায়, চক্রী ও পাষণ্ড জগৎশেঠের ভ্রাতৃদ্বয়ের, রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস প্রমুখ পলাশি যুদ্ধ উপন্যাসের প্রধান প্রধান অভিনেতৃগণের কী ভীষণ মৃত্যুই হইয়াছিল! সিরাজউদ্দৌলা ঘটনাস্রোতে উপযুক্ত অবসরকে আপনার অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করিতে পারেন নাই, মীরমদনাদির শুভাকাঙ্ক্ষীর উপদেশ বাক্যাবহেলন ও পাপিষ্ট মীরজাফরের দুরভিসন্ধি ভেদ করিতে না পারাই তাঁহার সর্ব্বনাশের মূল কারণ। ব্রুটসের অস্ত্রাঘাতে যেমন জুলিয়াস সিজার মৃত্যুকে বরণ করিয়াছিলেন, উহার প্রতিরোধ বা প্রতিহিংসা করেন নাই, তেমনি সিরাজউদৌলা মীরজাফরের দুর্ব্বব্যহারে ক্ষুণ্ণ হইয়া যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিয়া প্রাণ হারাইয়াছিল। বাঙ্গলার শস্য শ্যামল প্রান্তর হইতে মুসলমান শক্তি পলাশীর রণক্ষেত্রে চিরকালের জন্য অন্তর্হিত হইয়াছিল। প্রদীপ যেরূপ নির্ব্বাণের অগ্রে একবার দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠে, সেইরূপ সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতা অধিকার করিয়া নবাবীর পদমর্য্যাদাদি রক্ষা করিবার শেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন। কলিকাতা উদ্ধার করিয়া এড্মিরাল ওয়াটসন ও কর্ণেল ক্লাইব দুইজনই পলাশী যুদ্ধের মহাবীর হইলেন। একজন উমিচাঁদকে ফাঁকি দিতে কুণ্ঠিত হন নাই, আর যিনি ঐরূপ কুৎসিত কার্য্যে যোগদান করিতে অসম্মত হইয়াছিলেন, হায়! সেই ওয়াটসনকেই কলিকাতার সেন্টজন গির্জ্জার প্রাঙ্গণে সমাধি লাভ করিতে হইয়াছিল। ক্লাইব তাঁহার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিয়া বিলাতে যে পত্র লিখিয়াছেন উহাতে এক সার সত্য কথা আছে, উহা উল্লেখ করা আবশ্যকঃ—“হায়! ওয়াটসনকে তাঁহার গৌরবময় বিজয়কাহিনী সম্পূর্ণ ফলভোগ করিতে হইল না, ইহাতেই সকলের মনে নশ্বর মনুষ্য জীবনের স্মৃতি জাগরুক করে।” একদিন ক্লাইবের সঙ্গে ওয়াটসনের কলিকাতার অধিকার লইয়া বিবাদ ও বাক বতিণ্ডা হইয়াছিল, পরে তিনিই আবার তাঁহার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিতেছেন। কালের কি অপার মহিমা! মৃত্যু ওয়াটসনকে অপসারিত ও কলিকাতায় প্রোথিত করিল, আর ক্লাইব বাঙ্গালায় ব্রিটিশ কেতন উড্ডীন করিয়া প্রশংসার সম্পূর্ণ অধিকারী হইলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র যথার্থই যেন মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ, কারণ তিনিই ইংরাজের রাজত্ব লাভের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁহাদের পক্ষে বহুতর প্রশংসা করিয়া সেকালের মহাত্মাগণকে ইংরাজের ষড়যন্ত্রে যোগদান করিতে সম্মত করান। বুদ্ধিমতী রাণী ভবানীই ভাবি ভবিষ্যত অনিষ্ট দেখিয়া অসম্মতা হইয়াছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল কলিকাতার উন্নতি ও স্বদেশী ব্যবসার অবনতির কারণ হইয়াছিল।
নূতন বাণিজ্যঃ— পলাশীর যুদ্ধের পর লুটপাটে সৈন্যসামন্তেরা বিশেষ কিছুই পায় নাই। নবাবের রাজকোষে দুই কোটি টাকা মাত্র ছিল, উহা ক্লাইব প্রমুখ কয়েকজনের উদর পূরণেই শেষ হইয়াছিল। তাঁহারা গুপ্ত ধনাগারে কথা জানিতেন না ও উহা যাহাতে তাঁহারা জানিতে না পারেন, সেইজন্য মীরজাফর আমীর বেগম খাঁ, দেওয়ান রামচাঁদ রায় ও নবকৃষ্ণ মুন্সী প্রমুখ জনকয়েককে উহার কিঞ্চিদাংশ দান করিয়াছিলেন। উহাতেই কলিকাতার শোভাবাজারে ও আন্দুলে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ করিয়াছিলেন। রামচাঁদ সর্ব্বপ্রথমে কলিকাতায় থাকিতেন ও তাঁহার তথায় সম্পত্তি ছিল। নবকৃষ্ণই কলিকাতার পোস্তার রাজবাড়ীর মাতামহ লক্ষ্মীকান্ত ধরের নিকট সামান্য কর্ম্মচারী ছিলেন। উক্ত ধর মহাশয় ও বড়বাজারের মল্লিকেরা সুবর্ণবণিক, ইঁহারা সেকালের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একরকম অর্থ সরববরাহকার সওদাগর ছিলেন। পলাশি যুদ্ধের পর ক্লাইব তাঁহাদিগের নিকট হইতে অর্থ লওয়া বন্ধ করিয়া নবাবদের নিকট হইতে উক্ত কোম্পানির অভাব দূর করিতে আরম্ভ করেন। ইহাই ক্লাইবের কলিকাতার নূতন বাণিজ্যারম্ভ। নবকৃষ্ণ প্রমুখ ব্যক্তিগণের সৌভাগ্য পলাশীর যুদ্ধের পরই উদয় হয় ও ওয়ারেণ হেস্টিংসের সময় উহার চূড়ান্ত হয়। নবকৃষ্ণ তাঁহারই কৃপায় সুতানটির জমিদারি ও মহারাজ পদবী লাভ করেন। রামচাঁদের ভাগ্যে ততদূর কিছুই হয় নাই বটে, তবে ইঁহারা দুইজনেই কলিকাতায় থাকিতেন ও উহারা উভয়ে উহার উন্নতি করিয়াছিলেন। পলাশি যুদ্ধের পর বাঙ্গালায় ইংরাজ কোম্পানির প্রধান কুঠি ও দপ্তর কলিকাতায় হইয়াছিল। কলিকাতাই তাঁহাদের সৌভাগ্য লক্ষ্মীর পরশমণি বলিয়া স্বীকার করিতে কেহই কুণ্ঠিত হইবেন না।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রঃ— রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কলিকাতার সর্ব্বনাশ ব্যতীত আর বিশেষ কিছু করেন নাই, তথাপি তাঁহার জীবন চরিত লেখকেরা কেহ কেহ উহাকে তাঁহার জমিদারী ভুক্ত বলিয়া * পদ্য উদ্ধৃত করিতে কুণ্ঠিত হন নাই, কিন্তু তাঁহার ঐতিহাসিক কোন প্রমাণই নাই। তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাঙ্গালীর হিন্দুধর্ম্মের ও সমাজের হর্ত্তাকর্ত্তা বিধাতা বলিলে অত্যুক্তি হয় না কিন্তু কলিকাতায় তাঁহার প্রাদুর্ভাব ততদূর হয় নাই। কলিকাতাধিকারকালে সিরাজউদ্দৌলার মূর্খ অনুচরেরা উহা অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করিয়া যে ভয়ানক ক্ষতি করিয়াছিল উহার ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় হইয়াছিল উহা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগণের যৎকিঞ্চিৎ লাভ হইয়াছিল। তাঁহারা পুনরায় ঐ অর্থ দ্বারা বসবাসভূমি সংস্কার করিয়া কলিকাতার শোভাসম্পদ বৃদ্ধি করিয়াছিল। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ হইতে এক কপর্দ্দকও লাভে করেন নাই, উহাতে তিনি যে সেইস্থানের জমিদার বা তাঁহার কোন সম্পত্তি সেইখানে ছিল না ইহাই প্রমাণ হয়। ক্লাইব রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে অতি সমাদরের সহিত কলিকাতার আহ্বান করিয়া তাঁহার করভার প্রত্যুপকারের চিহ্ণ স্বরূপ অর্দ্ধেক করিয়া দেন ও পলাশী যুদ্ধের পাঁচটি কামান উপহার দান করেন। তদ্ব্যতীত দিল্লীর সম্রাটের নিকট হইতে “মহারাজেন্দ্র বাহাদুর” উপাধি দ্বারা তাঁহাকে সম্মানিত করিয়াছিলেন। ইহাতেই তাঁহার ইংরাজ রাজত্ব স্থাপনে যে বিশেষ কৃতিত্ব ছিল ইহা প্রমাণিত হয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে কলিকাতার জমিদার বলিয়া স্বীকার না করিলেও, তিনি যে ষড়যন্ত্রের সহায়তায় গৌণভাবে কলিকাতার উন্নতি ও বর্ত্তমান পরিণতি করেন ইহা বলিতে পারা যায়। পলাশীর যুদ্ধের জয়লাভ সমস্তই কলিকাতার ষড়যন্ত্রে হইয়াছিল ও উহা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মধ্যস্থতার পরিণাম। অনেকের মতে জব চার্ণকই কলিকাতায় বাণিজ্য কুঠি করিয়া ব্রিটিশ রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিলেন। উহার কি গূঢ়তত্ত্ব নির্ণয় করিতে গেলে অতীত ইতিহাসের কিঞ্চিৎ সংক্ষেপ সমালোচনা আবশ্যক হইয়া পড়ে।
বাণিজ্যঃ— মুসলমানজাতির এদেশে অভ্যুদয় হইবার বহুপূর্ব্বে ফিনিসীয় বণিকগণ ভারতবর্ষের সহিত বাণিজ্য সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছিল। বাণিজ্যে ভারতবর্ষের ভাগ্য বিপর্য্যয়ের সম্বন্ধ একথা এখন সকলেই স্বীকার করিয়া থাকেন। সর্ব্বপ্রথমে মিশর দেশেই ভারতের পণ্যদ্রব্যের প্রধান পণ্যশালা ছিল। সেই মিশর হইতেই ভারতের ঐশ্বর্য্য খ্যাতি পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে ও ভারত বাণিজ্যে মিশর রাজ্য সমৃদ্ধ হইয়া উঠে। ভূমধ্য সাগর দিয়া ইস্লাম শক্তি যখন ইউরোপকে বিধবস্ত করে, তখনই উহাদিগকে পরাভূত করিয়া রাজ্য উদ্ধার করা বীরের কার্য্য বলিয়া সকলের লক্ষ্য হয়। ধর্ম্মযাজকগণ যিশুর জন্মস্থান উদ্ধার করিবার জন্য কত শত খৃষ্টান বীরপুরুষকে উৎসাহিত করিয়াছিল ও তাহারা জীবন পণ করিয়া যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করিয়াছিল। দেশ ধর্ম্মাদি কলহ কোলাহলের মধ্যেই ইউরোপবাসীগণের ইসলাম জাতির সৌভাগ্যদয়ের কারণান্বেষণে বিব্রত থাকিয়া ভারতের বাণিজ্য ও রাজ্যের প্রতি তাহাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়িয়াছিল। মহাবীর আলেকজাণ্ডারের সময় হইতেই ভারত জয়ের চেষ্টা চলিতেছিল। যতদিন পর্য্যন্ত তাহারা ভারতে বাণিজ্য করিতে পারে নাই, ততদিন তাহাদের মনোভিলাষ সিদ্ধ হয় নাই। সেকালে ভারতের উপর যাহারা আধিপত্য করিত, তাহারা মাশুল ও পণ্য বিনিময়ে অর্থ লাভ করিবার জন্য ইউরোপবাসীগণের সহিত বাণিজ্য করিতে আপত্তি করিত না। ভারতের কালিকট কোচিন প্রভৃতি স্থান যেমন ঐ জন্য প্রসিদ্ধ, সেইরূপ বাঙ্গালায় তমলুক ও সপ্তগ্রাম ছিল। ভারতের সত্যপ্রতিষ্ঠায় ও অনন্যসাধারণ অধ্যবসায় যে বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল, উহার কেন্দ্রস্থল ফিরিঙ্গি ও মগের দৌরাত্ম্যে স্থানান্তরিত হইতেছিল।
সপ্তগ্রামঃ— সপ্তগ্রামই তখন বাঙ্গালার প্রধান বন্দর ছিল। উহার নামোৎপত্তি সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত, কিন্তু যতদূর অনুসন্ধান দ্বারা অবগত হওয়া যায়, উহাতে সূর্য্যের সপ্তসপ্তি বা সপ্তাশ্ব নাম হইতে সপ্তগ্রামের নাম হইয়াছিল। * এসেয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কর্ত্তৃক সপ্তগ্রাম সম্বন্ধে যে প্রবন্ধ লিখিত হইয়াছিল, উহাতে সেইখানে সূর্য্যের প্রতিমূর্ত্তি আবিষ্কারের কথা এবং সপ্তাশ্বাদির উল্লেখ আছে। তিনি ত্রিবেণীর মন্দিরকে বিষ্ণুদেবতার মন্দির ও স্থানে স্থানে ভূমিস্পর্শ মুদ্রার বুদ্ধমূর্তির নিম্নাংশ বিদ্যমান, তিনি আরও বলেন যে, ত্রয়োবিংশ তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের প্রতিমূর্ত্তির অপর পার্শ্বে রুকনুদ্দিন বারবক শার কথা উৎকীর্ণ হইয়াছিল। তিনি মালিক উপাধি মণ্ডিত ছিলেন। ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দের কলিকাতা প্রদর্শনীতে** গ্রন্থকারের পুত্র অভিরাম একখানি রাজা হর্ষবর্দ্ধনের সময়ের রূপা ও তামার থালা যাহার মধ্যে সূর্য্যের সপ্তাশরথ সমন্বিত মূর্ত্তি ও উহার চতুর্দ্দিকে গ্রহতারার মূর্ত্তি পরিবেষ্টিত দেখাইয়াছিল ও উহাতে সংসৃকতাক্ষরে গ্রহতারার বিবরণ লিখিত। ত্রিবেণী সপ্তগ্রামের অন্তর্ভুক্ত ছিল উহা কোনরূপ পৃথক নহে। সেখানে মুসলমানগণের টাঁকশাল ও সেনাপতি শাসনকর্ত্তা থাকিতেন। ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে পর্ত্তুগীজ বণিকেরা বাঙ্গালায় যাতায়াত ও ব্যবসা আরম্ভ করে ও সম্রাট আকবর কাপ্তেন টবরেজকে হুগলীতে বাণিজ্য কুঠী আদি করিবার অনুমতি দান করিয়া সপ্তগ্রামের সবর্বনাশ করেন। ১৫৪০ খৃষ্টাব্দে সরস্বতী নদী মজিতে আরম্ভ করায় জাহাজাদি যাতায়াতের জন্য পূর্ব্ব প্রচলিত পথ পরিত্যাগ করিয়া বেতোড় ও কলিকাতার সম্মুখ দিয়া জাহাজাদি গমনাগমন করিত। সেইজন্যই জব চার্ণক সপ্তগ্রামবাসী * সুবর্ণ বণিক রাজারাম মল্লিকের উপদেশমতই কলিকাতায় কুঠি করিয়া হুগলীর কুঠি উঠাইয়া দেওয়া ভাল বুঝিয়াছিলেন। সাজাহান কর্ত্তৃক হুগলীতে পর্ত্তুগীজেরা শাসিত হইলে কলিকাতার উন্নতি আরম্ভ হইয়াছিল। উহার পূর্ব্বে পর্ত্তুগীজেরা ব্যবসায়ীগণের মাল পত্রাদি লুটপাট করিত ও উহাতেই সপ্তগ্রামের বন্দর কতকাংশে পরিত্যক্ত হইয়াছিল। আরও হুগলীতে সেই সময়ে সপ্তগ্রাম হইতে সরকারী দপ্তর উঠিয়া আসে। জব চার্ণকের সহিত মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষের বেশ সংঘর্ষও হইয়াছিল। উহাতেই তিনি কলিকাতায় আসেন।
ব্যবসায়ীরাঃ— এইরূপে দেখা যায় যে, নদীর জলের জন্য বাণিজ্য জাহাজ যাতায়াতের প্রতিবন্ধক হওয়াতেই কলিকাতায় প্রাধান্য ও উহার ভবিষ্যত বিখ্যাত বন্দর হইবার সূত্রপাত হইয়াছিল। উহা কোন ব্যক্তি বা জাতিবিশেষের চেষ্টায় হয় নাই। পূর্ব্বে কলিকাতা সরকার সাতগাঁর অধীন মহাল মাত্র ছিল, ইহাই আইনি আকবরীতে আছে। সপ্তগ্রামের বাণিজ্য হুগলী, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, কলিকাতাদি বিদেশী বণিকগণের কুঠিতে আসিয়া পড়ে। তখন বিদেশীরা বাঙ্গালার বণিকগণের নিকট এদেশের ব্যবসা শিখিয়া তাহাদের জামিনে ও সর্ব্বপ্রকার সাহায্যে ঐ সকল কুঠিতে ব্যবসা করিত। তখন এদেশের বণিকেরা উহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হইয়া কেবল অর্থ সরবরাহকার ও বেণিয়ান স্বরূপ মধ্যস্থতায় কার্য্য করিতে আরম্ভ করে। সেই সূত্রেই খোজা সরহদ, পাঞ্জাবী হুজরীমল ও তাহার নিকট আত্মীয় উমিচাঁদ, সুবর্ণবণিক, তন্তুবায়গণ, ইংরাজ ও মুসলমান দরবারে প্রিয় হইয়াছিল। সেকালে ইউরোপের বণিকগণের ব্রাহ্মণেরা ঘৃণা করিতেন, উহাদিগকে স্পর্শ করিলে স্নান পর্য্যন্ত করিতেন, সুতরাং যাহারা তাহাদের সহিত ব্যবসা করিত ও সর্ব্বদা যাতায়াত, একসঙ্গে বসিত, তাহারা তাহাদিগকেও ভাল বলিত না। উহাতেই সমাজে তাহাদের স্থান নিম্ন করিয়াছিল। ব্যবসায়ীরাও তজ্জন্য ক্ষুব্ধ হয় নাই, কারণ তাহারা আপনার কর্ম্মে ব্যতিব্যস্ত, তাহারা অলস ব্যক্তির ন্যায় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের মনতুষ্টি করিয়া চলিবার অবসর পাইত না। আরও ব্যবসায়ীরা তখন হয় জৈন, নয় বৈষ্ণব ধর্ম্মাবলম্বী। উহাতেও ব্রাহ্মণের বড়ই বিরক্ত কারণ উহারা তাহাদিগকে গ্রাহ্য করিত না, কিন্তু অন্যান্য সকল জাতিই তখন তাহাদিগকে যথেষ্ট সম্মান ও প্রভূত অর্থদান করিত। উহাতেই সুবর্ণ বণিকজাতির প্রতি ব্রাহ্মণগণের আক্রোশ পূর্ণমাত্রায় হইয়াছিলেন। বৈষ্ণব কবিরাও উহাদের উপর সুবিচার করেন নাই। তখন সপ্তগ্রামেই বাণিজ্য ও সুবর্ণ বণিকগণের বাস ছিল। তাহাদিগকে অধম মূর্খ ইত্যাদি বিশেষণে বিভূষিত এবং নিত্যানন্দ প্রভু যে তাহাদিগকে উদ্ধার করিয়াছিলেন বলিয়া সত্যের অপলাপ করিয়াছেন। * গৌড়ের ইতিহাসকার বলিয়াছেন যে, শ্রীমন্নিত্যানন্দের বিবাহে উদ্ধার দত্ত দশ সহস্র মুদ্রা দান দ্বারা বিবাহাদি সম্পন্ন করান। সে সময়ে উদাসী নিত্যানন্দকে কেহই কন্যা দান করিতে প্রস্তুত হন নাই, কেবল সূর্য্যদাস সরখেল সেই অর্থ লোভে মুগ্ধ হইয়া দুই কন্যা দান করিয়া সমাজের পীড়ন হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, এক কন্যা দান করিলে দ্বিতীয় কন্যার বিবাহ হওয়া দুষ্কর হইবে। তখন ঘটকেরা সমাজের কর্ত্তা। শ্রীমন্নিত্যানন্দের বংশধরেরা বীরভদ্রী দোষের হস্ত হইতে রক্ষা পান নাই। তখন নিত্যানন্দ সমাজকর্ত্তা ছিলেন না। বণিকেরা তখন যে মূর্খ অধম ছিল না, উহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ উমাপতিধর, উদ্ধারণাদি। বৈষ্ণব কবিরা ঐতিহাসিক ছিলেন না যে, তাঁহারা যাহা বলিবেন উহাই ধ্রুব সত্য। আর সেকালের কলিকাতার আদিম অধিবাসিরা প্রায় সকলেই সপ্তগ্রামবাসী ছিল, যেমন শেঠ, বসাক ও মল্লিকেরা মল্লিকদের সহিত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সর্ব্বাপেক্ষা বাণিজ্যসূত্রে অধিক ঘনিষ্ঠতা থাকিলেও দেশের স্বাধীনতা লোপাদি সংক্রান্ত কোন সংস্রব নবকৃষ্ণাদির ন্যায় ছিল না। হুজরীমলের সম্পত্তির একজিকিউটার পূর্ব্বোক্ত রাজারাম মল্লিকের প্রপৌত্র ৺নিমাইচরণ মল্লিকের পুত্রেরা ছিলেন। তখন সেকালের নামজাদা বিদেশী পাঞ্জাবী বণিকগণের সহিত তাহাদের সৌহার্দ্দ্য ছিল, অধিকন্তু তাঁহাদের উপর অন্যান্য বণিকগণের কিরূপ বিশ্বাস ছিল উহাও ইহাতে সবিশেষ প্রমাণিত হয়। “লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন” এই প্রবাদবাক্য যাহার নামে গ্রতিথ তিনিও সুবর্ণবণিক এবং লক্ষ্মীকান্ত ধর যিনি ক্লাইবের অর্থ সরবরাহকার ও নবকৃষ্ণের প্রভু ছিলেন তিনিও উক্ত মল্লিকদের কুটুম্ব। উক্ত ধর মহাশয়ও কলিকাতার একজন আদিম অধিবাসী ও তাঁহার দৌহিত্র মহারাজা শুকমরই পোস্তার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ইনিই লক্ষাধিক অর্থ ব্যয় করিয়া কলিকাতা হইতে পুরীধাম পর্যন্ত রাস্তা ও দুইধারে আম্রবৃক্ষ জলাশয়াদি করিয়া শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের তীর্থযাত্রীগণের যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা করিয়াছিলেন। মাহেশ ও বল্লভপুরের জগন্নাথ ও বল্লভজীউর মন্দির কুঞ্জবাটী আদি ও কাঁচড়াপাড়ার মন্দির ও চঁুচুড়ার দশমহাবিদ্যার মন্দিরাদি সমস্তই উক্ত কলিকাতার সুবর্ণবণিক মল্লিকদের স্থপতি। এতদ্ভিন্ন সেই মল্লিকেরা পুরীর পূর্ব্বোক্ত জগন্নাথের ভোজন ঘর নির্মাণ প্রস্তুতের মন্দির সংস্কারাদি সৎকর্ম্ম করিয়াছিল। মুসলমান রাজত্বকালের নিয়মানুসারে তাহারা মল্লিক উপাধি ও জায়গীর লাভ করিয়া সেই দেব উপাধি ত্যাগ ও সেইরূপ রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের পূর্ব্বপুরুষ শীল উপাধি ত্যাগ করিয়াছেন। উহারা রাঢ়ী, শেষে সপ্তগ্রামে বাস করিয়া রাঢ়ী হইতে সপ্তগ্রামী হন। ইঁহারা পূর্ব্বোক্ত মল্লিকগণের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধে বদ্ধ। তাঁহার কলিকাতার মার্ব্বেল প্রাসাদ বিখ্যাত। সুবর্ণবণিক মল্লিকদের অট্টালিকায় কলিকাতা পরিপূর্ণ ও সুন্দর হইয়াছে। মুসলমান রাজত্বকালে হিন্দুরা ঐসকল মুসলমান উপাধি মণ্ডিত হইলে মুসলমানগণের অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিত। সেইজন্যই তখন জাতিগত উপাধি ত্যাগ করিয়া উহাতেই পরিচিত হইত।
চান পরিব্রাজকের সময় সপ্তগ্রাম বন্দর ছিল না, বা উহার উন্নতির কোন কথা তিনি লিপিবদ্ধ করেন নাই, কেবল তাম্রলিপ্তের কথাই বলিয়াছিলেন। * ইংরাজ বণিকেরা বঙ্গদেশে বাণিজ্য করিবার পূর্ব্বেই উড়িষ্যায় আসিয়াছিল। উড়িষ্যার সহিত বাঙ্গালার সম্বন্ধ বহুদিন হইতে বর্ত্তমান। রাজা মুকুন্দদেব মুসলমানগণের নিকট হইতে সপ্তগ্রাম উদ্ধার করিয়া ত্রিবেণীতে ঘাট মন্দির ও পোস্তা এবং মগরা হইতে ত্রিবেণী পর্য্যন্ত রাস্তা করিয়াছিলেন। ষড়ঙ্গদেব ঐ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আপনাকে গাঙ্গ বলিয়া পরিচিত করিয়াছিলেন। সেইজন্য ঐ বংশের সকলেই ঐ বিশেষণ দ্বারা পরিচিত। রাজা রাজ্যবর্দ্ধনকে কর্ণ সুবর্ণের রাজা চাতুরী ও বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া হত্যা করিলে রাজা হর্ষবর্দ্ধন কান্যকুব্জে শিলাদিত্য নামে সিংহাসনারোহণ ও ভ্রাাতৃহন্তাকে পরাজিত করিয়া ** উহার রাজ্যাধিকার করেন। উহাদের উপাধি দেব ও উহারা শৈব *** ও শাক্ত ছিলেন। ইহা তাঁহার তাম্রশাসন ও হর্ষচরিত হইতে জানিতে পারা যায়। উহাতে আরও আছে যে, হর্ষবর্দ্ধনের মাতা পুত্রের অনুনয় বিনয় উপেক্ষা করিয়া সহমৃতা হন ও তাঁহার ভগ্নী ঐরূপ চিতারোহণ করিবার সময় তিনি তাঁহাকে উদ্ধার করিয়াছিলেন। ঐ প্রসঙ্গে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পক্ষপাতী হলেন। প্রবাদ যে, রাজ্যবর্দ্ধনের স্ত্রী ত্রিবণীেতে সহমৃতা হইয়া বংশমর্য্যাদা রক্ষা করেন ও সেই সময় তাঁহার পুত্র ও কুলদেবী শ্রীশ্রীসিংহবাহিনী জ্ঞাতিগণ সমভিব্যাহারে আগমন করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহারা আর স্বদেশে প্রত্যাবর্ত্তন করেন নাই। উঁহারাই সপ্তগ্রামের উন্নতি করিয়াছিলেন। হর্ষচরিতে পৌণ্ড্রবাসের কথা আছে।
মহাবীর আলেকজাণ্ডারের সময় হইতে রোমবাসিরা বাঙ্গালীকে “গাঙ্গে রাইডিস” ও সপ্তগ্রামকে “গাঞ্জেস রিজিয়া” বলিয়া আসিতেছেন ও ষ্টারলিং সাহেবের উড়িষ্যার ইতিহাসে ১১৩১ খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বে উড়িষ্যার গঙ্গাবংশের রাজা ও প্রতিষ্ঠাতা উড়িষ্যা জয় করেন নাই এবং গঙ্গেশ্বর দেব ১১৫১ খৃষ্টাব্দে উড়িষ্যার সিংহাসনারোহণ করেন। তিনিই শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির পুরীতে নির্ম্মাণ ও তাঁহার বংশধর অনঙ্গ ভীমদেব উহার সৌন্দর্য্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে বর্দ্ধিত করেন। ১৫৫০ হইতে ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দে মুকুন্দদেব রাজত্ব করিয়াছিলেন ও অনঙ্গ ভীমদেবের গৌড়েশ্বর উপাধি তাঁহার মুদ্রা ও মোহরে ছিল আবিষ্কৃত হইয়াছে। এসিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকার ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দের ৮ম খণ্ডের ১৭৬ পৃষ্ঠায় খজুবহো তাম্রলিপি (৪নং) হইতে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে ধনদেব নামে এক রাজা রাজত্ব করিত। ইহাতেই অনুমান হয় যে, উহারা রাজ্যবর্দ্ধনের কোন এক বংশধর উড়িষ্যায় রাজত্ব করিতেন, কারণ গৌড়ের ইতিহাসকার বলিয়াছেন যে, শৈলবংশলতিকা শ্রীবর্দ্ধন নামক নরপতির সৌবর্দ্ধন নামক পুত্রের তিন পুত্র চিল। উহাদের মধ্যে এক শৌর্য্যান্বিত পুত্র পৌণ্ড্রাধিপকে নিহত করিয়া পৌণ্ড্ররাজ্যাধিকার করেন। সুবর্ণরেখা নদীতে সুবর্ণ লাভ হইত ও উহা লইয়া যাহারা বাণিজ্য করিত তাহাদিগকে সুবর্ণবণিক ও বাঙ্গালার নাম সোনার বাঙ্গালা করা হইয়াছিল। এইরূপে দেখা যায় যে, বৈশ্যরাজার রাজত্ব নষ্ট হইলে তাহাদের বংশধরগণ বাঙ্গালায় বাণিজ্যারম্ভ করিয়াছিল ও সেইজন্য ভূরিশ্রেষ্ঠিক নগরের উল্লেখ প্রবোধ চন্দ্রোদয় নাটকে ২য় অধ্যায় ২৮এর পৃষ্ঠায় আছে। উহা বুন্দেলখণ্ডের রাজা কৃত্তিবর্দ্ধনের সভাপণ্ডিত কৃষ্ণমিশ্রের প্রণীত। গৌড়ের ইতিহাসকার ঐ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন * “ত্রিবেণী ও সপ্তগ্রাম ভূরিশ্রেষ্ঠি রাজত্বের অন্তর্গত ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। অনেক ধনশালী বণিক ঐ রাজ্যে বাস করিত বলিয়া সেই রাজ্যের নাম ভূরিশ্রেষ্ঠি হয়।”
“বর্ত্তমান হুগলী জেলার আমতা গ্রামের নিকট পেঁড়ো বসন্তপুর হইতে ঐ জেলার আমতা পেঁড়ো পর্য্যন্ত ভূরিশ্রেষ্ঠি রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। উহা বৌদ্ধ রাজত্বকলে স্থাপিত।”
গৌড়ঃ— ইহাতেই স্পষ্টই দেখা যায় যে, বাণিজ্যের জন্যই বাঙ্গালার বন্দরগুলি ব্যবসায়ীগণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কাহারও কাহারও মতে একজন কর্ণাটের সামন্ত রাজা কর্ণাটাধিপতির কোপে পতিত হইয়া নবদ্বীপে পলায়ন করিয়া বাস করিয়াছিলেন। তিনিই বাঙ্গালার সেনবংশীয় রাজাগণের আদিপুরুষ ছিলেন। প্রাচীন পুরাণাদিতে গৌড়ের নামোৎপত্তি মান্ধাতার দৌহিত্র গৌড় হইতে হইয়াছিল উল্লেখিত আছে। যাহাই হউক হর্ষচরিতে আছে যে, রাজা গজাধ্যক্ষ স্কন্দগুপ্ত হর্ষবর্দ্ধনকে বলিতেছেন মহাদেবীর গৃহর গূঢ় ভিত্তিতে লুক্কায়িত থাকিয়া মহাদেবীর ভ্রাতা ** বীরসেন স্ত্রীবিশ্বাসী কলিঙ্গ রাজের মৃত্যুর কারণ হইয়াছিল। বীরসেনের বংশজাত সামন্ত সেন তিনি তখন অন্তর্বিদ্রোহে উত্ত্যক্ত হইয়া কর্ণাট ত্যাগ করিয়াছিলেন। উমাপতিধরের প্রশস্তিতে সামন্ত সেন গঙ্গাপুলিনে পুণ্যস্রোতে বাস করেন ও তিনিই নবদ্বীপের পত্তন করেন। হেমন্ত সেন তাহার পুত্র সুবর্ণরেখা তীরে কাশী পুরীতে রাজত্ব করিতেন ইহা কুলজী গ্রন্থকার বলিয়াছেন। এইরূপে দেখা যায় যে, পলাতক রাজপুত্রগণ দ্বারা বাঙ্গালার বন্দর ও রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইত, বিদেশী বণিকগণের শুভাগমনে সেই সকল স্থানের প্রাধান্য হ্রাস হইয়া শ্রীরামপুর, হুগলী, চন্দননগর, চুঁচুড়া ও কলিকাতা আদি ক্রমে ক্রমে প্রতিপত্তিশালী বন্দর বলিয়া ইউরোপবাসিরা পরিচিত করিয়াছিল।
হুগলীঃ— ১৫৩৭ খৃষ্টাব্দে পর্ত্তুগীজেরা হুগলীতে আগমন ও ঐখানে কুঠি আদি প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট আকবর উহা করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। ডাক্তার বৌটন সাহ সুজা, সম্রাট সাজাহানের দ্বিতীয় পুত্রের কন্যার রোগ শান্তি করিয়া ইংরাজের ঐখানে ও বাঙ্গালায় বাণিজ্য করিবার অনুমতি লাভ করেন। ১৬৪০ খৃষ্টাব্দে এখানে ইংরাজেরা কুঠি করিয়া বাণিজ্য আরম্ভ করে। ইহার পূবের্বই ১৬৩২ খৃষ্টাব্দে পর্ত্তুগীজদের আধিপত্য শেষ হইয়া সেইখানে মুসলমানগণের প্রাদুর্ভাব হয়। সপ্তগ্রাম হইতে যাবতীয় মুসলমান রাজত্বের সরকারী দপ্তর হুগলীতে উঠিয়া আসে। জব চার্ণকই ঐ স্থান ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় আগমন করেন।
চুঁচুড়াঃ— ওলন্দাজগণের কুঠি চুঁচড়ায় ছিল, ১৮২৫ খৃষ্টাব্দে ইংরাজেরা চুঁচুড়ার সহিত সুমাত্রা দ্বীপের বিনিময় করেন। ১৬৫৬ খৃষ্টাব্দে ঐখানে কুঠি করিয়া ওলন্দাজগণ ব্যবসা করিত। ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে উহা ইংরাজের দখলে আসে ও ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে তাঁহারা উহা তাহাদিগকে সন্ধিশর্ত্তে প্রত্যার্পণ করেন।
শ্রীরামপুরঃ— দিনেমারেরা ১৬১৬ খৃষ্টাব্দে শ্রীরামপুরে কুঠি করিয়াছিল ও উহার নাম ফেডারিক নগর দিয়াছিল। ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে ইংরাজেরা দিনেমারগণের নিকট শ্রীরামপুরাদি ও তাহাদের যাবতীয় এতদ্দেশীয় অধিকার সাড়ে বার লক্ষ টাকায় খরিদ করিয়াছিলেন।
চন্দননগরঃ— ১৬৬৮ খৃষ্টাব্দে ফরাসিরা ঐস্থানে আসে ও ১৬৭৩ খৃষ্টাব্দে প্রকৃত প্রস্তাবে সেইখানে বাণিজ্যারম্ভ করেন। উহার প্রকৃত উন্নতি ডুঁপ্লের শাসনকালে ১৭৩১-৪১খৃষ্টাব্দে হইয়াছিল। এডমিরাল ওয়াটসন ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে চন্দননগর আক্রমণ করিয়া উহার দুর্গাদি ও দুই সহস্র অট্টালিকা ভূষিত নগর একেবারে ধুলিসাৎ করেন। ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে সন্ধি অনুসারে উহা ফরাসিরা পুনরায় লাভ করে। পুনরায় ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮০২ পর্য্যন্ত এবং ১৮০২ হইতে ১৮১৫ পর্য্যন্ত উহা ইংরাজের অধিকারভুক্ত হইয়াছিল। কিন্তু অবশেষে সন্ধির সর্ত্তানুসারে ১৮১৫ খৃষ্টাব্দ হইতে এখন পর্যন্ত উহা ফরাসির অধিকারভুক্ত আছে।
দিল্লির মনোনয়নঃ— ১৩৩৬ খৃষ্টাব্দে মহম্মদ তোগলক যখন দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত তখনই বাঙ্গালার মুসলমান শাসনকর্ত্তাগণ স্বাধীনভাবে বাঙ্গালা শাসন করিয়াছিলেন। ১৫৩৯ খৃষ্টাব্দে শেরশাহ দিল্লির সিংহাসন অধিকার করিয়া প্রথম বাঙ্গালার স্বাধীনতা লোপ করেন। শেষে ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে সুবর্ণরেখার নিকট মোগলমারীর যুদ্ধে দাউদ পরাস্ত হইয়া উড়িষ্যায় গমন করে। সেই সময় হইতে দিল্লীর সম্রাট বাঙ্গালায় শাসনকর্তা মনোনীত করিতেন। উহা আলিবর্দ্দি খাঁ পর্যন্ত একরকম হইয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলার নামে দিল্লীর সম্রাটের নিকট হইতে বাঙ্গালীর নবাবী সনন্দ আসে নাই। ইহার জন্যই সিরাজউদ্দৌলা জগৎশেঠের গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করিয়াছিলেন। সেকালে জগৎশেঠেরাই অর্থ দ্বারা বাঙ্গালার নবাবী সনন্দ আনাইত। সিরাজউদ্দৌলা গুপ্ত চরগণদ্বারা অবগত হইয়াছিলেন যে, জগৎশেঠেরা ঐ সনন্দ শওকৎজঙ্গের জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন এবং সেই সম্বন্ধে ইংরাজের সঙ্গে গুপ্ত পরামর্শ করিতেছিলেন। উহাতেই নবাব ক্রোধে স্বহস্তে তাহাকে শাস্তিদান করিয়াছিলেন। আলিবর্দ্দি-পত্নীর অনুগ্রহে জগৎশেঠ কারাগার হইতে মুক্ত হইয়া সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার নিমিত্ত দিবারাত্র নানার্থব্যয় ও কৌশল অবলম্বন করিয়া, শেষে কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন। সরফরাজখাঁর সময় হইতে জগৎশেঠেরা এইরূপ ব্যবসায় বাঙ্গালার নবাব আলিবর্দ্দিকে করিয়াছিল, উহা শেষে কলিকাতার সন্ধিপত্রে ও ষড়যন্ত্রে হইয়াছিল। অতএব ইংরাজের কলিকাতার দরবার দিল্লীর দরবার অপেক্ষা কোনাংশে ন্যুন নহে, বরং উচ্চ হইয়াছিল। পলাশী যুদ্ধের এই পরিণাম হইয়াছিল। ইংরাজেরা মীরজাফরকে বাঙ্গালার সিংহাসনে বসাইল ও মীরণ সিরাজউদ্দৌলাকে পশুর ন্যায় অন্যায়রূপে হত্যা করিল। উহার অন্য কোথাও কোন বাক-বিতণ্ডা পর্যন্তও হইল না। ইহাতে তখন দিল্লীর সিংহাসন শূন্য ছিল বলিলে অত্যুক্তি হয় না। সেকালের বাঙ্গালায় যত কিছু ব্যবসা ছিল উহার মধ্যে এই এক নূতন প্রধান ব্যবসার সৃষ্টিকর্তা জগৎশেঠ। উহা তাহাদের নিকট হইতে ইংরাজেরা শিক্ষা করে। বাঙ্গলায় বহুকাল হইতে ক্রীতদাসের ব্যবসা চলিতেছিল, উহাতেই, বোধ হয়, দেশবাসিরা দাসত্বের পক্ষপাতী হইয়াছিল কিন্তু কি আশ্চর্য্য! যাহারা দাসত্ব করিত, তাহারা স্বাধীন নবাব জমিদার হইবার জন্য ব্যস্ত হইত। কারণ মুসলমান ঐতিহাসিক ফেরস্তা, গোলাম হোসেন প্রমুখ সকলেই বলিয়াছেন যে, বাঙ্গালায় পিতার সিংহাসন পুত্রের হইত না, যেই প্রভুহত্যা করিত, সেই উহা লাভ করিত। যে কেহ হউক বিশ্বাসঘাতকতায় সিংহাসনাধিকার করিলে তখন কেহ উহার কোন প্রতিবাদ করিতে সাহসী হইত না। ফারিয়া ইসুজা পর্ত্তুগীজ ইতিহাসকার সেই কথাই বলিয়াছেন।
বহুকাল হইতে বাঙ্গালার এইরূপ দুরবস্থায় বিদেশী ইউরোপীয় বণিকগণ বিশেষ কোন যুদ্ধ বিগ্রহ না করিয়াই বাঙ্গালার নদীতীরের স্থান দখল করিয়াছিল। বখতিয়ার খিলজির বাঙ্গালা জয়, আর ক্লাইবের পলাশী যুদ্ধ জয়, উভয়ের মধ্যে বিশেষ তারতম্য বর্ত্তমান আছে। বাণিজ্য দ্বারা বাঙ্গালার শ্রীবৃদ্ধি ও শেষে সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে বাঙ্গালায় সাধারণ বাণিজ্য ব্যবসা অপেক্ষা অর্থ দান দ্বারা রাজ্যলাভ ও বিনিময় ব্যবসা ইংরাজ বণিকগণ আরম্ভ করিয়াছিল। শেষে যখন অর্থলাভ হইবার উপায় ছিল না, তখনই ঈশপের গল্পে বানর যেরূপ বিড়ালের বিবাদভঞ্জন ছলে ননীর ভাগ স্বরূপ এদেশের রাজ্য অর্থাদি সমস্তই ইংরাজ বণিকগণ উদরস্থ করিয়াছিল। মূর্খ ক্ষুধার্ত্ত বিড়ালের ন্যায় এদেশের নবাব রাজারা সর্ব্বস্বান্ত হইয়াছিল। জগৎশেঠ ও উমিচাঁদের সংক্ষেপ পরিচয় আবশ্যক, কারণ উহা না করিলে বাঙ্গালার অধোগতি কিরূপ হইয়াছিল উহা সম্যক বুঝিতে পারা যাইবে না।
জগৎশেঠঃ— তখন দেশবাসির এমন শিক্ষা দীক্ষা ছিল না যে, তাহারা দেশাধিপতির গুণাগুণ বিচার চিন্তা বা দশের ও দেশের মঙ্গলাদির জন্য প্রকাশ্যে একত্রিত হইতে পারিত, বা তাহার বাদানুবাদ করিয়া কাহারও পক্ষপাতী হইত। উহাতেই জগৎশেঠ ক্রমে ক্রমে বাঙ্গালার নবাবের পদচ্যুতি ও মুকুটদানের সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়াছিল। ইহারা মুর্শিদকুলি খাঁর সময় হইতেই প্রবল হইয়া উঠে ও সম্রাট মহম্মদ সা ফতেচাঁদকে মুর্শিদকুলির স্থলে বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তার পদ প্রদান করিতে অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, তিনি উহা লইতে অস্বীকৃত হন। তখন ধূর্ত্ত সম্রাট প্রীত হইয়া তাঁহাকে জগৎশেঠ নামাঙ্কিত উজ্জ্বলরত্ন প্রদান করেন। সেই হইতেই উহারা সর্ব্বত্র ঐ উপাধিতে পরিচিত। সরফরাজ ইঁহার দুহিতাকে প্রাসাদে আনাইয়া উহার অসামান্য রূপের লাবণ্য ও সৌন্দর্য্য দর্শন করিয়া কৌতূহল নিবৃত্তি করিয়াছিলেন। উহাতেই ফতেচাঁদ আলিবর্দ্দির সহিত চক্রান্ত করিয়া তাঁহাকে বাঙ্গালার নবাব করিয়াছিলেন। তাঁহারই আমলে ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দে নবাব ইংরাজদের কুঠী আক্রমণ করিলে, উহারা জগৎশেঠের নিকট হইতে বার লক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করিয়া সেই নবাবকে সন্তষ্ট করিয়া তাহার সেই অত্যাচার হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়াছিলেন। তখন হইতে জগৎশেঠের সহিত ইংরাজদের ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৭৪২ খৃষ্টাব্দে ভাস্কর পণ্ডিত ইহাদের বাড়ী লুঠ ও উহাদগিকে যৎপরোনাস্তি অপমান করিয়া আড়াই কোটি টাকার সম্পত্তি অপহরণ করিলে নবাব উহা রক্ষা বা উদ্ধার করিতে না পারায়, এদেশের অধিপতি ইংরাজেরা হইলে তাহাদের উপর ঐরূপ অত্যাচার হইবে না এইরূপ ধারণার বশবর্ত্তী হইয়া জগৎশেঠেরা উহাদের পক্ষপাতী হইয়াছিল। মীরজাফরী ক্লাইবের অনুগত ভক্ত, আর জগৎশেঠ বাঙ্গালার কামধেনু। ক্লাইব সেইজন্যই মীরজাফরকে নবাবের সিংহাসনে বসাইয়া সার উপদেশ দিয়াছিলেন যে, যেন তিনি কোনমতে জগৎশেঠের বন্ধুত্ব লাভ হইতে বঞ্চিত হন না।
পলাশী যুদ্ধের পূর্ব্বে ক্লাইব বর্দ্ধমানের জমিদার রাজার সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি উহা করিতে সম্মত হন নাই। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে পলাশী যুদ্ধের উদ্যোগ পর্ব্বের প্রধান নেতা বলিলে দোষ হয় না। তিনি যখন কলিকাতার শ্রীশ্রী ৺কালীমাতাকে দর্শন করিতে আসিতেন তখন সেখানকার ইংরাজ উচ্চ কর্ম্মচারিগণের সহিত সদালাপ ও সৌজন্য বিনিময় করিতেন। সেইজন্য সেকালের জমিদারেরা মর্য্যাদানুযায়ী আশা, শোটা, হাতি, ঘোড়া, পাল্কী, সিপাহী আদি সঙ্গে করিয়া আসিতেন। তাঁহার গূঢ় উদ্দেশ্য যে, দেবীদর্শন নয়, একথা বড়িষার জমিদার সন্তোষ রায় উপহাসচ্ছলে ইঙ্গিত করিতে ছাড়িতেন না। তিনি প্রায়ই বলিতেন যে দেবী আর তোমার ও বাহ্যাড়ম্বরে ভুলিবেন না। ইনি যে বিশেষ কিছু উপকার, কি কলিকাতাধিকার, বা কি পলাশী যুদ্ধের সময় করিয়াছিলেন ইহাতে আজ পর্যন্ত সেকালের কোম্পানির পুরাতন কাগজে প্রকাশ হয় নাই। তবে তিনি যে একজন কোম্পানির রাজত্বের পক্ষপাতী ও উত্তরসাধক মহাপুরুষ ছিলেন, ইহাই পলাশী যুদ্ধের পর ক্লাইবের পুরস্কারে পরিষ্কার বুঝিতে পারা যায়। উহার জীবন চরিত লেখকেরা অনেক কথাই বলিয়াছেন, কিন্তু উহার উপর ততদূর নির্ভর করা যায় না। এইরূপ নবকৃষ্ণের বংশধর মহামান্য রাজা রাধাকান্ত দেবও কলিকাতাধিকারে হিন্দুগণ ইংরাজের পক্ষপাতী ও নবকৃষ্ণ তাঁহাদের বিশেষ সাহায্য করিয়াছিলেন কলিকাতায় তাঁহার এক সভাপতির অভিভাষণে বলিয়াছিলেন। উহা ১৮৫৩ খৃষ্টাব্দের ৬ই আগষ্টের ইংলিশম্যান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। উহাতে তিনি প্রথমেই বলিয়াছিলেন যে উঁহার উক্তির সমর্থনের কাগজপত্র তাঁহার নিকট আছে, কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় ঐ বংশের রাজা বিনয়কৃষ্ণ কলিকাতা বিষয়ক যে পুস্তক প্রকাশ করিয়াছেন উহাতে সেই পৈত্রিক কাগজ পত্রের কোন সন্ধানই নাই। যাহাই হউক, নবকৃষ্ণেণ বংশধর শব্দকল্পদ্রুতম অভিধানাকার রাজার কথা ঐতিহাসিক হিসাবে উহার কোন মূল্য না থাকিলেও তাঁহার পূর্ব্ব পুরুষের উন্নতি কিসে হইয়াছিল যাহা শুনিয়াছেন বা জানিয়াছেন উহার সারমর্ম্ম প্রকাশ করা কর্ত্তব্যঃ—১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ঔদ্ধত্য ও অত্যাচারে বাঙ্গলা ও বিহার প্রদেশের সমুদয় সর্দ্দার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ তাহার উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়াছিল। সেকালের একজন বৈদ্যকুলোদ্ভব বিশিষ্ট ব্যক্তি রাজা রাজবল্লভ ** নবাবের অত্যাচারে মুর্শিদাবাদ হইতে কলিকাতায় পলায়ন করিয়া আসেন। নবাব কলিকাতার তৎকালীন গবর্ণর ড্রেক সাহেবকে উক্ত রাজাকে বন্দী করিয়া মুর্শিদাবাদে পাঠাইবার জন্য আজ্ঞাপত্র পরোয়ানা দ্বারা জারি করান। তিনি উহা অমান্য করিলে পূর্ব্বে যেরূপ ইংরাজদিগকে কলিকাতা হইতে বহিষ্কৃত ও উহা লুঠ করা হইয়াছিল সেইরূপ করা হইবে উহাও স্মরণ করাইয়া এক দ্বিতীয় পরোয়ানা জারি করা হয়। সেই পরোয়ানা প্রাপ্ত হইয়া ড্রেক সাহেব অত্যন্ত ভীত হইলে, উক্ত রাজা রাজবল্লভ তাহাকে আশ্বাস দিয়া বলেন যে, নবাবের উপর সর্দারগণ এরূপ অসন্তুষ্ট যে তাহারা ইংরাজের বিরুদ্ধে কখনই অস্ত্রধারণ করিবে না। তাহার সেই কথায় ড্রেক সাহেবের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাইবার জন্য রাজা রাজবল্লভ নবাবের প্রধান প্রধান হিন্দু কর্ম্মচারীগণের দ্বারা ড্রেক সাহেবের নামে একখানি গুপ্ত পত্র পার্শিতে যাহাতে আসে, উহার ব্যবস্থা করিবার জন্য এবং উহার মর্ম্ম অবগত হইয়া যাহাতে তাঁহারা উত্তর দেন এরূপ মুন্সির আবশ্যক হয়। তিনি যাহাতে মুসলমান মুন্সী কাজিউদ্দিনের সাহায্য গ্রহণ না করেন তজ্জন্যও বিশেষ অনুরোধ করেন। ঐকার্য্য সুচারুরূপে হিন্দু মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর কর্ত্তৃক সম্পাদিত হইয়াছিল ও তিনি সেই জন্যই সমসাময়িক ইতিহাসে মুন্সী নবকৃষ্ণ নামে পরিচিত। পরে তিনি কোম্পানির স্বাপক্ষে একাধিক দৌত্য ও অন্যান্য রাজকার্য্যে নিযুক্ত হইয়া বিলক্ষণ প্রতিভার পরিচয় দান ও কোম্পানির বিশেষ বিশ্বাসভাজন হইয়া পড়েন। উহার অনতিকালমধ্যেই সিরাজউদ্দৌলা যখন বহুসংখ্যক সৈন্য লইয়া কলিকাতাক্রমণ করেন তখন ড্রেক তাহার কাউন্সিলের সভ্যগণের সহিত মাদ্রাজে পলায়ন করেন। অন্ধকূপহত্যার নাটক সমাপনান্তে সিরাজউদ্দৌলা রাজা মাণিকচাঁদকে কলিকাতার গবর্ণর করিয়া মুর্শিদাবাদে প্রত্যাগমন করিয়াছিলেন। উহার কয়েক মাস পরেই ক্লাইবের অধীনে ড্রেক এক বিশাল বাহিনী সমভিব্যাহারে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। সিারেজ সৈন্যগণ সর্দ্দারগণ দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ায় উহারা ক্লাইবের নিকট পরাজিত হয়। এইরূপে বজবজের দুর্গ ইংরাজেরা হস্তগত করিয়া ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে জানুয়ারি মাস কলিকাতাধিকার করে। উহাতে হিন্দু জন সাধারণ সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছিল।
পলাশি যুদ্ধঃ— রবার্ট ক্লাইব পলাশীর যুদ্ধ বৃত্তান্ত মাদ্রাজে যে পত্র দ্বারা জানাইয়াছিলেন সেই মূল পত্রখানি ‘খ’ ক্রোড়পত্রে সন্নিবেশি করা হইল। উহার সারাংশ উদ্ধৃত করিয়া ইংরাজ বণিকাভ্যুদয়ের কথা শেষ করা উচিতঃ—
ফরাসি সেনাগণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার অধীনে মাসিক দশ হাজার বেতনে কার্য্য করিত ও বুসিকে পাটনা হইতে আগমন করিবার অনুরোধ করা হইয়াছিল। নবাবের মূল উদ্দেশ্য ইংরাজের মূলোৎপাটন করা ও সেইজন্যই তিনি সন্ধির সর্ত্তানুসারে কার্য্য করিতে বিলম্ব করিতেছিলেন। বিশ্বাসযোগ্য চিঠির নকল দেখিয়া এই সকল সংবাদ জ্ঞাত হইয়াছি। আরও মীরজাফর প্রমুখ প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণ যাহারা রাজ্য মধ্যে বিশেষ গণ্যমান্য তাঁহাদের সহিত আমাদের প্রস্তাব পরামর্শাদি চলিতেছিল। এক গুপ্ত সন্ধি দ্বারা তাঁহাদের মধ্যে প্রধানকে নবাব করিব স্থির করিয়া এক হাজার ইংরাজ সৈন্য ও দুই হাজার সিপাই আটটি কামান লইয়া ১৩ই জুন চন্দননগর হইতে যাত্রা করে ও যথাসময়ে উহারা পাটনা ২২এ বিনা বাধায় অধিকার করে। উহারা রাত্রে নদী পার হইয়া পলাশীতে একটার সময় পৌঁছে প্রাতঃকালে দেখিতে পায় যে, নবাবের পনর শত অশ্বারোহী, পঁয়ত্রিশ হাজার সিপাই, চল্লিশের অধিক কামান লইয়া তাহাদের বিরুদ্ধে আগমন করিতেছে। কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়াই ছটার সময় হইতে তাহাদের উপর গোলাবর্ষণ অতি গুরুতরভাবে করিতে আরম্ভ হইলে, উহাতে কয়েক ঘণ্টা ধরিয়া উহাদের বিলক্ষণ ক্ষতি হইতে থাকে। তাহারা স্থানের মাহাত্ম্যে রক্ষা পাইয়াছিল তখন মাটির ঢিপির আড়ালে বসিয়া আত্মরক্ষা করা ভিন্ন উপায় ছিল না কারণ তখন গোলাগুলি ছুড়িয়া উহা জয় করিবার অবসর হয় নাই। উহারা রাত্রে অবসরক্রমে আক্রমণ করিবে এই স্থির করিয়া বসিয়াছিল। বেলা দুই প্রহরের সময় নবাবের গোলন্দজেরা সরিয়া গেলে তাহারা যেমন পুষ্করিণীর উপরস্থ উচ্চ স্থান দিয়া গিয়া উপস্থিত হয় অমনি তখনই ফরাসিগণ তাহাদের উপর আবার গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে কিন্তু যখন উহা কার্য্যকরী হইতেছে না দেখে তখনই তাহারা আর দুই একটি উচ্চস্থান অধিকার করে ও সেইখান হইতে তাহাদের গোলাবর্ষণ বন্ধ করিয়া দিবার সুযোগ হয়। তাহাদের কামান আনিবার চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছিল, তখন কেবল তাহারা বন্দুক ছুড়িতে ছিল মাত্র। অনন্তর ইংরাজের কামানের গোলায় তাহারা পশ্চাৎপদ হইতেছিল। অশ্বারোহী সৈন্যগণ সেই সময় অগ্রসর হইতে গিয়া নষ্ট হইয়া যায় সেই সঙ্গে চার পাঁচজন সৈন্যাধ্যক্ষ মারা যাওয়ায় সৈন্যগণ হতাশ হহয়া পড়ে ও ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে। অমনি সেই সময় তাহাদের উচ্চ স্থান দখল করা হয়। ঐ সময় ঐ স্থান চল্লিশ জন ফরাসি দুইটী কামান দ্বারা সৈন্য সামন্ত লইয়া রক্ষা করিয়াছিল। ঐ স্থান দখলের সময় ইংরাজ পক্ষের বিশেষ কিছু ক্ষতি হয় নাই। সেই সময়েই সৈন্যগণ পলায়ন করে ও ইংরাজ সৈন্য তাহাদের পশ্চাৎ ছয় মাইল পর্যন্ত গিয়া চল্লিশের অধিক পরিত্যক্ত কামান ও রাস্তার ধারে ত্যক্ত সর্ব্বপ্রকার যুদ্ধ সরঞ্জাম লাভ করে। বিপক্ষ পক্ষের ৫০০ জন ব্যক্তি মারা যায় অনুমান করি ও ইংরাজ পক্ষে কুড়িজন হত ও পঞ্চাশ জন আহত ও উহাদের মধ্যে অধিকাংশই কালা ব্যক্তি ছিল। যুদ্ধের সময় ইংরাজের দক্ষিণ দিকের সৈন্যগণ কেবলমাত্র দণ্ডায়মান ছিল। তাহারা ইংরাজের বন্ধু স্বরূপ অবস্থিত কিন্তু তাহারা সেইরূপ কোন সঙ্কেত না করায় ইংরাজেরা তাহাদিগকে গোলাবর্ষণ করিয়া সরাইয়া দিয়াছিল। যুদ্ধের শেষে তাহারা ইংরাজদিগকে প্রশংসাভিবাদন করিয়াছিল ও তাহাদের পাশেই রাত্রিযাপন করে। সিরাজউদ্দৌলা উষ্ট্রপৃষ্ঠে পলায়ন করে ও প্রাতঃকালে মধ্যরাত্রে নগরে পৌঁছিয়া সেখান হইতে সুবিধামত ধন রত্নাদি চার পাঁচজন লোকের দ্বারা লইয়া যান। জাফর আলি খাঁ ইংরাজদের নিকট আসিয়া স্তুতিবাদ ও সন্ধি সর্ত্ত রক্ষা করিবে বলিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছিল। তিনি নবাবের পলায়ন করিবার ঘণ্টা কয়েক অগ্রে সহরে পৌঁছিয়া ছিলেন। নবাবের পলায়নের পর জাফর আলি নির্ব্বিবাদে প্রাসাদ ও নগর অধিকার করে। ক্লাইব গোলমাল দূর করিবার জন্য প্রথমে মণ্ডিপুরে ও পরে সৈয়াবাদে যেখানে ফরাসিদের কুঠি ছিল সেইখানে গিয়াছিল। ক্লাইব ২৯-এ জুন সহরে দুইশত ইংরাজ ও তিনশত সিপাই লইয়া প্রবেশ করেন এবং প্রাসাদের নিকট একটি বিস্তৃত বাগান বাড়ীতে থাকেন। সেই দিনই তিনি জাফর আলির সহিত দেখা করেন। জাফর নবাবের সিংহাসনে উপবেশন করিতে অসম্মত হইলে, ক্লাইবই তাহাকে সেইখানে বসাইলেন তখন সকলে তাহাকে যথারীতি নবাব বলিয়া অভিবাদনাদি করে। পরদিন প্রাতে তিনি ক্লাইবের সহিত সাক্ষাৎ করেন, তখন ক্লাইব তাঁহাকে জগৎশেঠের সহিত পরামর্শ করিয়া সকল কার্য্য করিতে অনুরোধ করেন। কারণ তাঁহারই সর্ব্বাপেক্ষা রাজ্যের মধ্যে অধিক সম্পত্তি, তাঁহার ন্যায় শান্তি ও নির্ব্বিঘ্নতার পক্ষপাতী তখন আর কেহই হইতে পারে না। তদনন্তর ক্লাইব ও জাফরের সম্মতিক্রমে উভয়েই জগৎশেঠের সহিত দেখা ও তাঁহাদের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুতাবন্ধন ও জগৎশেঠ নবাবের সনন্দ দিল্লী হইতে আনয়ন করিবার বিধিমত চেষ্টা করিবেন স্বীকার করেন। সেই সম্মিলনে বাঙ্গালায় নবাবী পদ ও অভ্যুদয় সাক্ষাৎ সম্বন্ধে হইয়াছিল প্রকাশ হয়।
জগৎশেঠের সহিত ক্লাইবের বন্ধুত্বের ও সম্মিলনের উদ্দেশ্যও সেই পত্রে এইরূপ আছেঃ— নবাবের সিপাইগণের বেতন পুরস্কারাদি দিবার মত ধনই নবাবের ধনাগার হইতে পাওয়া যাইবে ও উহা সর্ব্বপ্রথমেই দেওয়া উচিত। আর ইংরাজগণের কি পাওয়া উচিত ইহা স্থির করিবার ভার জগৎশেঠের উপর অর্পণ করা হয়। তিনি উভয় পক্ষের পরম বন্ধু। তাঁহার মীমাংসানুসারে ইংরাজদের যাহা প্রাপ্য ধার্য্য হইবে উহার অর্দ্ধাংশ তখনই দশ আনা নগদ টাকায় ও ছয় আনা জহরত সোনাদি নানা প্রকারে দেওয়া হইবে, আর অপর অর্দ্ধাংশ তিন বৎসরে বার্ষিক সমানাংশে দেওয়া হইবে স্থির হয়। ইহাতেই জগৎশেঠের সহিত ক্লাইবের ও মীরজাফরের সম্মিলন কিসের জন্য পলাশী যুদ্ধের পরই আবশ্যক হয় উহা প্রকাশ হইয়া পড়ে। ন্যায়পরায়ণ পারকার সাহেব ভারতবর্ষের ঘটনাবলি পর্য্যালোচনা করিয়া বলিয়াছিলেন যে, ইংরাজেরা ন্যায়ের জন্য কোন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন নাই, কেবল অর্থই তাঁহাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। তখন প্রাচ্য জগতের কার্য্যে ধর্ম্মানুশাসন রক্ষা হয় নাই, বরং রাজ্যলাভেচ্ছায় উহার প্রতি কেহ কোন ভ্রুক্ষেপ করে নাই। ঐ পত্রের শেষে সিরাজউদ্দৌলাকে যেরূপ দুর্দ্দশাগ্রস্থাবস্থায় ধৃত ও কেন হত্যা করা হয় উহার উল্লেখ আছে।
২রা জুলাই রাত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নগরে আনয়ন করিয়া তাহাকে সত্বর যমসদনে প্রেরণ করা হইয়াছিল, কারা উহাকে যখন ধৃত করা হয়, তখন ফরাসি সেনাপতি লা তাঁহার সৈন্যসামন্ত লইয়া তিন ঘণ্টার দূর পথে ব্যবস্থিত এবং সেই ধৃত নবাব আগমন করিলে তাঁহার সৈন্যাধ্যক্ষগণ তাঁহার পত্রে উৎসাহিত হইয়া গোলমাল আরম্ভ করে উহাতেই তখন উহাকে হত্যা করা আবশ্যক হইয়া পড়ে।
রিয়াজ গ্রন্থে জগৎশেঠ ও ইংরাজদের উত্তেজনায় সিরাজের হত্যা হইয়াছিল উল্লেখ আছে। তখনকার ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের বিদ্যা বুদ্ধি ও হিসাব জ্ঞানের পরিচয় দিয়া তাহাদের সৌভাগ্যোদয়ের কথা শেষ করা উচিত। ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের ৩১ শে জানুয়ারির মন্তব্যে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের দুঃখ উল্লেখ আছে যে, হিসাবের ভুলে ও জঘন্য লেখায়, কি বড়, কি ছোট, সকল কর্ম্মচারির কর্ম্মের গাফিলতিতে তাঁহারা বড়ই লজ্জিত হইয়াছিলেন। হলওয়েল ও মানিংহাম সাহেবের বিরুদ্ধে কৃষ্ণবল্লভকে কলিকাতায় আশ্রয় দান করিয়া পঞ্চাশ হাজার মুদ্রা লাভ করার অভিযোগ উপস্থিত হইয়াছিল। তখন রাজা রাধাকন্ত দেব যে রাজা রাজবল্লভ কলিকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন ইত্যাদি পূর্ব্বোক্ত যাহা বলিয়াছেন উহা সত্য হইতে পারে না।
মুসলমান ইতিহাসকার রিয়াজ উক্ত রাজার কথার প্রতিবাদ করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন যে, মীরমদন প্রভৃতি সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বাসী হিন্দু কর্ম্মচারীরা মীরজাফরের জীবননাশ করিবার সৎপরামর্শদান করিয়াছিল, কিন্তু মীরজাফরের চক্রান্তে নবাব তদনুসারে কার্য্য না করিয়াই রাজ্য ও প্রাণ উভয়ই হারাইয়াছিলেন। তাঁহার হত্যা ব্যতিরেকে মীরজাফরের সিংহাসন নিরাপদ নয় বলিয়াই উহা তখন করা হইয়াছিল, উহাই ক্লাইবের পত্রে পরিষ্কার রহিয়াছে। এরূপ প্রমাণ সত্ত্বেও কেমন করিয়া সেই নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে অত্যাচারী ও তাহার উপর হিন্দু বা অন্যান্য সকলেই বিরক্ত ছিল একথা বিশ্বাস করিতে পারা যায়। তাহার পলায়নের পর তাঁহাকে যখন রাত্রে রাজধানীতে বন্দি করিয়া আনয়ন করা হয় তখন ও যে সৈনাধিপতিগণের মধ্যে বিলক্ষণ চাঞ্চল্য উপস্থিত হইয়াছিল উহা কি তাঁহার অধীন সৈন্যাধিপতিগণের রাজভক্তির চিহ্ণ স্বরূপ উল্লিখিত হইতে পারে না? যাহাই হউক, বাঙ্গালায় সে সময় বিলাতের ইংরাজবণিকগণ ব্যবসা করিয়া বিশেষ কিছু লাভ করিতে পারে নাই, তবে কলে কৌশলে তাহাদের কর্ম্মচারীরা অতি অল্প দিনের মধ্যেই এদেশের কতকগুলি অকর্ম্মণ্য উচ্চাভিলাষী লোকদিগকে নবাব বাদশা করিয়া প্রভুতার্থ লাভ ও আপনাদিগকে গৌরাবন্বিত করিতেছিলেন। ক্লাইব প্রমুখ ইংরাজ কর্ম্মচারি ও যোদ্ধাগণ উহা ভিন্ন আর কিছুই করেন নাই। সেই পূর্ব্বাপর অনুসৃত পথালম্বন করিয়া ইংরাজ কোম্পানির সৌভাগ্যোদয় ও সকলের নিকট আপনাদিগকে গৌরবান্বিত করিতেছিল। সেই রহস্য ইতিহাসকারগণ প্রহেলিকাময় করিয়া গিয়াছেন কিন্তু ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নির ন্যায় সত্য আবিষ্কার হইয়া থাকে। তখন বিলাতের স্বত্বাধিকারীরা তাহাদের টাকার উপর শতকরা বার্ষিক আট দশ টাকার হারে সুদ ভোগ করিয়া নীরব ও সন্তুষ্ট ছিল উহাও নিশ্চয়ই কৌতুকাবহ ব্যাপার বলিতে হয়।
* “অধিকার বাজার চৌরাশী পরগণা, গাড়ী জুড়ী আদি করি দপ্তরে গণনা, রাজ্যের উত্তর সীমা
মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমের সীমা গঙ্গা ভাগীরথী খাদ, দক্ষিণের সীমা গঙ্গাসাগরের ধার, পূর্ব্বসীমা
ধুলাপুর বুড়োগঙ্গা পার।
* Vol V. No. 7. 1909 July.
** Exhibition.
* “The Bengalee families which have been so closely associated with British
Rule in India-the Setts, the Bysacks, the Mullicks, whose ancestor Rajaram
of Triveni advised Charnock to transfer the Company’s factory from Hooghly
to Sutanati.” Sir Evan Cotton’s some glimpases into forgotten India. Bengal
Part and Present XXIV.
* বাঙ্গলার ইতিহাসেও সেই কথা। (২য় ভাগ ৩১২ পৃষ্ঠা)
* গ ক্রোড় পত্রে উহার বিবরণ দেওয়া হইল।
** গৌড়ের ইতিহাস ১ম খণ্ড ৫৭ পৃষ্ঠা।
*** গৌড় রাজলেখম লা।
* ১ম খণ্ড ১৪২ পৃষ্ঠা।
** ঔ ১৫৬ পৃষ্ঠা।
* Broom’s Bengal Army
রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকেই পাঠাইবার কথা ইতিহাসে আছে। নবকৃষ্ণের এই মুন্সিগিরির
কথা কোথাও নাই। অন্ধকূপহত্যার কথা আছে অথচ কলিকাতা দগ্ধ ও উহা অধিকার সম্বন্ধে
বিশেষ কোন কিছুই নাই। এই অপ্রসাঙ্গিক কথা উল্লেখ করিবার কোন গূঢ় উদ্দেশ্য যে ছিল
না ইহা বলা যায় না।
