১১. পলাশী যুদ্ধের ফল
একাদশ পরিচ্ছেদ – পলাশী যুদ্ধের ফল
অভিশাপঃ— প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্ত্তনশীল, কিন্তু হায়! ভারতবর্ষের ভাগ্যে যে সকল পরিবর্ত্তন মুসলমান রাজত্বের পূর্ব্বে বা পর হইতে হইতেছিল, উহাতে ভারতবাসির স্বাধীনতা লাভ হইল নাউহাতেই উহাকে বিধাতার অভিশাপ বলিতে হয়। যাঁহারা উহার জন্য উদ্যোগ আয়োজন করিয়াছিলেন তাঁহারা প্রায় সকলেই নিগৃহীত ভিন্ন, কেহই কৃতকার্য্য হন নাই। তখন ভারতবর্ষের সর্ব্বত্রই বিদেশী বিধর্ম্মীর অত্যাচারে হাহাকার ধ্বনিতে পরিপূর্ণ—দিল্লীতে ১৭৩৯ খৃষ্টাব্দে নাদির সা আটান্ন দিন রাজত্ব করিয়া অসংখ্য নরনারী হত্যা ও ন্যূনকল্পে চারি কোটি টাকার ধন রত্নাপহরণ লইয়া স্বদেশ যাত্রা করিয়াছিলেন। তখন হত্যা, লুণ্ঠন, পলায়ন ও বিদ্রোহ এদেশের সর্ব্বত্রই হইতেছিল। পলাশী যুদ্ধের পূর্ব্বে মহীশূরের রাজার অবস্থা অতীব শোচনীয় উহাতেই হায়দর আলির অভ্যুদয়ের সম্পূর্ণ সহায়তা করিয়াছিল। সেই দেশের রাজার শ্বশুর প্রকাশ্য সভায় জামাতার বন্ধুবর্গের নাসিকা কর্ণ ছেদন করিয়াছিল এবং আর পলাশী যুদ্ধের পরিণামে মুর্শিদাবাদের রাজকোষ শূন্য হইয়াছিল। জগতে মানবের ভাগ্য পরিবর্ত্তনশীল কিন্তু বাঙ্গালার রাজ্য সম্পদ বা সৌভাগ্য যেন বার বিলাসিনী নর্ত্তকীর ন্যায় কাহারও নিকট কখন চিরস্থায়ী হয় নাই। উহাই সেকালের বাঙ্গালার রাজত্বে বিধাতার অভিশাপ, বা মুসলমান রাজত্বের বিষময় ফল। প্রকৃত প্রস্তাবে উহাই কোম্পানীর অভ্যুদয়ের মূল কারণ হইয়াছিল।
বিজয়োৎসবঃ— শ্রীরামচন্দ্র যেরূপ বিভীষণের সাহায্যে দশাননের বধ ও বংশলোপ করিয়া দগ্দ সোনার লঙ্কা বিভীষণের হস্তে সমর্পণ পূর্ব্বক অযোধ্যায় প্রত্যাগমন করিয়াছিলেন, সেইরূপ ক্লাইবাদি মহাত্মারা মুর্শিদাবাদ হইতে কলিকাতায় এক বিচিত্র শোভাযাত্রা করিয়া কলিকাতায় আগমন করেন। পলাশী যুদ্ধের ব্রিটিশ বিজয় দুন্দুভি ভাগীরথী তীর প্রতিধ্বনিত করিয়া কলিকাতা মুখরিত করিয়াছিল। ৬ই জুলাই ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে শতাধিক নৌকা ভাগীরথী বক্ষে সগর্ব্ব মহোল্লাসে ইংরাজ মহাপুরুষেরা বাদ্য ঝঙ্কারে গগনমণ্ডল প্রতিধবনিত পূর্ব্বক ব্রিটিশ পতাকা উড্ডীন করিয়া ক্রোরাধিক অর্থাদি সহিত কলিকাতায় আগমন করিয়াছিল। ইংরাজেরা কলিকাতায় পলাশী যুদ্ধের পরই সেই অলৌকিক বিজয়োৎসব করিতে কোনরূপ কুণ্ঠিত হন নাই। পলাশী যুদ্ধের গ্রাম্য কবিতায় কলিকাতায় সেই সময়ে একজন কেবল বসিয়া কাঁদিতেছিল প্রকাশ আছেঃ—
“কলকাতাতে বসে কাঁদে মোহনলালের বেটি” যে সময় সিরাজউদ্দৌলা ধৃত হন, সেই সময়েই মোহনলাল ভগবান ভগবান গোলায় ধৃত হইয়াছিলেন। গোলামহোসেন তাঁহার সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে, যিনি সিরাজউদ্দোলার হিত চিন্তায় উন্নত হইয়াছিলেন, তাঁহার পতন সিরাজের সঙ্গে সঙ্গেই হইয়াছিল। হায়! তাঁহার শোচনীয় হত্যাও প্রভুর সঙ্গে সঙ্গেই হইয়াছিল। তাঁহার পুত্র পূর্ণিয়ার ফৌজদার ছিল তিনিও সেইসঙ্গে কারারুদ্ধ হন। রাজা দুর্ল্লভরাম প্রতিদ্বন্দ্বীর সমস্ত সম্পত্তি হস্তগত ও তাঁহার জীবন নাশ করেন। সেইজন্যই সুবিচার প্রার্থনার জন্য তাহার কন্যা তখন ক্রন্দন করিতেছিল। তখন কলিকাতা ও মুর্শিদাবাদে যেন কি এক ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধসূত্র স্থাপিত হইয়াছিল। তখনই মুর্শিদাবাদ যেন কলিকাতার অধীনতা স্বীকার করে। ক্লাইব ও ওয়াটসন পলাশি যুদ্ধের যেন রামায়ণে রাম ও লক্ষণ, মীরজাফর বিভীষণ, আর রাজবল্লভ ও দুর্ল্লভরাম যেন হনুমান ও সুগ্রীব হইয়াছিলেন।
জঙ্গের দলঃ— মুর্শিদাবাদের দরবারে মীরজাফরের পদবী সুজাউমুল্লক হিসামউদ্দৌলা মীরজাফর আলিখাঁ বাহাদুর “মহবৎজঙ্গ” উপাধি হইল, পুত্র মীরণের “সাহামৎজঙ্গ” ও ভ্রাতা কাজেম খাঁর “হায়বৎজঙ্গ” * হইয়াছিল। ২৬এ জুলাই মুর্শিদাবাদ দরবারে, সর্ব্বপ্রথম খেলাৎ লাভ বিতরণ করা হয়। সর্ব্বশ্রেষ্ঠ খেলাৎ ক্লাইব ও ওয়াটসন পাইয়াছিলেন, একটি সুসজ্জিত হস্তী, দুইটী উৎকৃষ্ট ঘোটক, সুবর্ণখচিত পরিচ্ছদ, মণিমণ্ডিত চূড়াদি শিরোভূষণ তাঁহারা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইংরাজেরা তাহাদের রণতরীতে কামান গর্জ্জনের সহিত নিশান তুলিয়া নব নবাবের সম্মান দান ও তাঁহাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। এতদ্ভিন্ন যথাসময়ে ক্লাইব দরবারে গিয়া ও ওয়াটসন সাহেব পত্রদ্বারা ধন্যবাদ জানাইতে বিস্মৃত হন নাই, ক্লাইবেরও শালাবৎজঙ্গ উপাধি হইয়াছিল।
বিদ্রোহঃ— মীরজাফরের সিংহাসন প্রাপ্তির পর দুর্ল্লভরাম দেখিলেন যে তাঁহার কোন বিশেষ কিছু লাভ হইল না। তিনি মন্ত্রী হইলেন ও তাঁহার সহোদর ও পুত্রগণ উচ্চ কর্ম্মচারীর পদ লাভ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাঁহার পূর্ব্ববৎ প্রভুত্ব রহিল না। তিনি সেই প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য নানা কৌশলাবম্বন করিতেছিলেন ও বেহারের রাজা রামনারায়ণ নূতন অধিপতির বশ্যতা স্বীকার করেন নাই। মেদিনীপুরের ফৌজদার সিরাজের অনুগত ছিলেন, তিনিই চরাধিপতি রাজারামসিংহ যাঁহাকে মুর্শিদাবাদে হিসাব নিকাশ দিবার জন্য আগমনাদেশ দান করা হয়। উহার সহিত দুর্ল্লভরামের বিলক্ষণ ঘনিষ্ঠতা ছিল উহার জন্য তিনি স্বয়ং উপস্থিত না হইয়া দুইজন আত্মীয়কে মুর্শিদাবাদে পাঠাইয়াছিলেন। উহাদের সকলকে যখন নজরবন্দি রাখা হয়, তখন রাজারাম সৈন্যসামন্ত সংগ্রহ করিয়া ক্লাইবকে মধ্যস্থতা অনুরোধ করিলেন। উহাতে ক্লাইব রাজারামের বিরুদ্ধে প্রেরিত সৈন্যাদিকে বর্দ্ধমানে থাকিতে আদেশ করিলেন ও সেনাপতি খাজা হাদি তদনুসারে কার্য্য করিলেন। নবাব খাদেম হোসেন খাঁকে ছয়সহস্র সৈন্য লইয়া পূর্ণিয়া যাত্রা করিবার যে আদেশ করিয়াছিলেন উহা অমান্য করা হইল। কয়েকজন সেনানীর চক্রান্তে সৈন্যগণ বাকি বেতন না পাইলে উহা করিবে না বলিয়া পরিষ্কার উত্তর প্রদান করিল। হুলস্থূল গণ্ডগোল চলিতেছিল। নবাব সর্ব্বত্রই তখন হিন্দুর অভ্যুত্থান লক্ষ্য করিয়া দুর্ল্লভরামের সর্ব্বনাশ সাধনে কৃত সংকল্প হইলেন। রাজা দুর্ল্লভরামও নিজ সৈন্যদল সমবেত করিয়া দরবারে যাওয়া বন্ধ করিলেন। ইতিমধ্যে ক্লাইব ইংরাজ পক্ষের গুপ্তচরের নিকট প্রাপ্ত ছাপাড়ার ইংরাজ রেসিডেন্টের প্রেরিত সংবাদ মীরজাফরকে অবগত করাইলেন। ঐ পত্রে আলিবর্দ্দির বেগম রাম নারায়ণকে বলিতেছেন যে, তুমি অযোধ্যার নবাবের সহিত সম্মিলিত হইয়া মীরজাফরকে সিংহাসনাচ্যুত কর। দুর্ল্লভরাম তখনও সিরাজের মাতামহীর নিকট যাতায়াত ও যথেষ্ট সম্মান প্রর্দশন করিত, উহাতে তিনিই যে সেই সকল চক্রান্তের মূল উহা নবারের দৃঢ় বিশ্বাস হইল। এদিকে ঢাকার কয়েকজন লোক সরফরাজ খাঁর দ্বিতীয় পুত্র আমানী খাঁকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য বিদ্রোহ উপস্থিত করে। ক্লাইবের কৌশলে ইংরাজ কুঠির সাহায্যে ঢাকার নায়েব নবাব সেই বিদ্রোহ দমন করিলেন ও ওয়াটসের মধ্যস্থতায় দুর্ল্লভরামের সহিত নবাবের মৌখিক মিলন সম্পন্ন করা হইল। ৭ই নভেম্বর সৈন্যদলের বাকি বেতনের কিয়দংশ পরিশোধ করিয়া নবাব স্বয়ং গন্তব্যস্থানে যাত্রা করিলেন ও ক্লাইবকে তাঁহার সহিত যোগ দিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। মীরণ পিতার অনুপস্থিতিতে সহরে রাষ্ট্র করে যে, দিল্লির দরবারে মীরজাফরের সুবেদারী গ্রাহ্য হয় নাই, মির্জ্জামেহেদীকেই ঐ পদ দান করা হইবে ও রাজাদুর্ল্লভরাম ইংরাজগণের সহায়তায় উহাকেই নবাব করিবে। আরও পাটনা হইতে সংবাদ আসিয়াছে যে, অযোধ্যার নবাব রামনারায়ণ ফরাসি লার সহিত একযোগে বাঙ্গলা অধিকার করিতে আসিতেছেন।
হত্যা ও শাস্তিঃ— উহাতে ১০ই নভেম্বর মুর্শিদাবাদে ভয়ানক গোলমালঃ— গত রাত্রের বীভৎস হত্যাকাহিনীতে সকলের মুখ বিবর্ণ ও বিষণ্ণ, নিরপরাধি মির্জ্জামেহেদীর হত্যা ও আলিবর্দ্দির বেগম ও সিরাজ জননীর নিরুদ্দেশে সকলে তাঁহাদের হত্যাও স্থির সিদ্ধান্ত করে। সেই অমানুষিক হত্যায় সকলেই তখন স্তম্ভিত, দুঃখিত ও কাতর হইয়া পড়ে। গোলাম হোসেন বলিয়াছেন যে, সেই ব্যাপারে মীরজাফর লিপ্ত ছিলেন। হায়! মীরণের আদেশ ঢাকায় রক্ষিত হয়, সেইখানে সিরাজের মাতা ও মাতামহীকে জল মগ্ন করা হয়। তাঁহাদের মৃত্যুকালের অভিশম্পাত ব্যর্থ হয় নাই। গোলাম হোসেন মীরণের মৃত্যু বজ্রাঘাতে হইয়াছিল বলেন। উহাতে মীরণের মস্তক উদর পৃষ্ঠ, এমন কি, উপাধানের পার্শ্বের অস্ত্রখানি পর্য্যন্তও ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ও দ্রবীভূত হইয়াছিল। ২রা জুলাই দর্পহারী ভগবানের দণ্ডে মীরনের দেহ ছিন্ন ভিন্ন ও দুর্গন্ধময় হইয়াছিল ও রাজমহলে সেই পাষণ্ডকে সমাহিত করা হয়।
তন্খাঃ— ক্লাইব উপযুক্ত অবসরে পূর্ব্ব প্রতিশ্রুত টাকার পরিশোধ না করিলে, তিনি কেমন করিয়া মীরজাফরের সহিত পাটনায় যাইবেন ও দুর্ল্লভরাম না হাইলেই বা উহার সুব্যবস্থা বা মীমাংসা কেমন করিয়া হইতে পারে, অনুযোগ করিলে, নবাবকে দুর্ল্লভরামের সহিত সদ্ভাব করিতে বাধ্য হন। ইংরাজপক্ষের প্রাপ্য ২৩ লক্ষ টাকার অর্দ্ধাংশ রাজকোষ হইতে দান ও বাকি টাকার জন্য বর্দ্ধমান, কৃষ্ণনগর, হুগলীর রাজকর হইতে দিবার চিঠি দেওয়া হইল, পরবর্ত্তী কিস্তির ১৯ লক্ষ টাকার জমাও সেইরূপ তনখার বন্দোবস্ত করা হইল। কোম্পানি সৈন্য সাহায্য করার জন্য তনখা লাভের এক নূতন সৃষ্টি করিল। উহার জন্য সৈন্য সংগ্রহ ও প্রস্তুত করা লাভের বিষয় হইয়াছিল। তখনই কলিকাতার দক্ষিণে কোম্পানির জমিদারীর জন্য বিনাবাধায় ফরমান প্রদত্ত হইয়াছিল। পূর্ব্ববর্ত্তী ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তখন মীরজাফর নামে মাত্র নবাব, ক্লাইবই সর্ব্বেসর্ব্বা ছিলেন।
চব্বিশ পরগণাঃ— উহাতে কোম্পানির রাজত্ব কলিকাতার দক্ষিণ কুলপী পর্য্যন্ত বিস্তৃত হইবে, ইহাতে আর আশ্চর্য্য হইবার বিষয় কিছুই নাই। পলাশিযুদ্ধের পরিণামে ইংরাজেরা কলিকাতার মার্হাটা খাত বেষ্টিত স্থানের বাহিরে ছয়শত গজ পরিমাণ জমির অধিপতি হইল ও সন্ধির সর্ত্তানুসারে কোম্পানিকে সরকারি বার্ষিক রাজস্ব দুই লক্ষ বাইস হাজার নয়শত আটায় টাকা দিতে হইত। উহাতেই চব্বিশ পরগণার সৃষ্টির সূত্রপাত হয়।
স্বত্বলাভঃ— পাটনার দরবারে ক্লাইবের কৌশলে বিনাযুদ্ধে মীরজাফরের নিকট রামনারায়ণ অবনত মস্তকে তাঁহাকে নবাব স্বীকার ও বাকি টাকার জন্য সাতলক্ষ টাকা দিয়াছিল। মীরজাফর রামনারায়ণ প্রমুখকে বহুমূল্য খিলাৎ আদি উপহার দিয়াছিলেন কিন্তু ক্লাইব ঐসব কিছু না লইয়া এক সোরার ব্যবসার একাধিকরা স্বত্ব লাভ করিলেন। উহাতে তখন কোম্পানির বিলক্ষণ লাভ ছিল ও নূতন স্বত্ব দ্বারা তদপেক্ষা অধিকতর লাভ হইবে বলিয়া চতুর ক্লাইব উহাই চাহিয়াছিলেন।
নবাবের নিমন্ত্রণ রক্ষাঃ— মীরজাফর নবাব হইয়া কলিকাতায় ক্লাইবের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে আসিয়াছিলেন। সেইজন্য ঢাকা হইতে রাজকীয় নাওয়ারা আনয়ন করা হয়। ৬ই জুলাই নবাব মুর্শিদাবাদ হইতে যাত্রা করেন এবং সেই নাওয়ারায় অগ্রদ্বীপ হইতে উঠিবার ব্যবস্থা করা হয়। ক্লাইব প্রমুখ উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারিগণ হুগলী পর্য্যন্ত প্রত্যুদগমণ করিয়া মীরজাফরকে সসম্মানে কলিকাতায় আনয়ন করেন। হায়! মীরজাফর একদিন মাণিকচাঁদকে কলিকাতার গর্বণর মনোনীত করায় আপনাকে অপমানিত জ্ঞান করিয়াছিল, আর কিছুদিন পরে তিনিই নবাব হইয়া মহাড়ম্বরে কয়েকদিবস কলিকাতায় ইংরাজের আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন। মীরজাফরের নগর ত্যাগের দুইদিন পরে দুর্ল্লভরামের সৈন্যগণ বেতনের দাবী করিয়াছিল। মীরজাফরের চক্রান্তে মীরণই উহা করাইয়াছিলেন। ইংরাজ প্রতিনিধি স্ক্রাফটনের চেষ্টায় সৈন্যদল নিবৃত্ত করিয়াছিল। রাজা দুর্ল্লভরাম নৌকাযোগে ইংরাজের লোকজন সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় আসিয়াছিলেন। উহার পরিবারবর্গ মীরণের নিযুক্ত রক্ষিগণ দ্বারা আবদ্ধ হইয়াছিল। ক্লাইবের অনুরোধে তাহারাও ১৭৫৮ সেপ্টেম্বরে কলিকাতায় প্রেরিত হইয়াছিল।
কলিকাতা হইতে প্রত্যাগমনের পরে সৈন্যদলের বেতন দিবার জন্য ইংরাজ কোম্পানির নিকট হইতে নবাবকে দুইলক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। মহরমের সময় মীরজাফরকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র সেনাপতি খাজাহাদী করিয়াছিল। মীরণের চক্রান্তে রাজমহলের ফৌজদার ও তৈলিয়াজাতীয় পথরক্ষক সমস্ত দলবল একত্রিত হইয়া সেই হাদীর প্রাণনাশ করে। বিদ্রোহীদলের অনেকেই রাজা দুর্ল্লভরামের অনুগত, ইহা তাঁহার ভ্রাতৃবৃন্দগণ হেষ্টিংসের নিকট স্বীকার করিয়াছিলেন ও উহা দুর্ল্লভরামের লিখিত একখানি পত্রে প্রকাশ পাইয়াছিল।
এইরূপে দেখা যায় যে, তখন বিদ্রোহ অরাজকতা বাঙ্গালার চতুর্দ্দিকে বিদ্যমান ছিল। তখন কেহই মীরজাফরের নবাবিতে সন্তুষ্ট হয় নাই। সেকালের লোকেরা মীরজাফর সম্বন্ধে যাহা বলিত উহা এখন প্রবাদ বাক্যের মধ্যে স্থান পাইয়াছে “সকল কর্ম্মের ওস্তাদ আমি, সাঁকরেত কারও নই। নিত্য টাকার তাগাদায় ভাই, কচিখোকা সাজতে হয়।”
যাহাই হউক, পলাশীযুদ্ধের পরিণাম শুভ হয় নাই, উহাতে বাঙ্গালার বিদ্রোহ দমন হয় নাই বরং উহার বৃদ্ধি হইয়াছিল। মূর্খ মীরজাফর ভাবিয়াছিল যে, ক্লাইব প্রমুখ ইংরাজগণের উচ্চ কর্ম্মচারির মনস্তুষ্টি করিলেই, আর সন্ধির সর্ত্তানুসারে অর্থদান বা অন্য কোন কার্য্য করিতে হইবে না কিন্তু পরিণাম বিপরীত হইল। ব্রুম সাহেব অতি সুন্দর ভাবে ইংরাজ উচ্চ কর্ম্মচারিগণের সততার প্রশংসা করিয়াছেন। ক্লাইবাদি সকলে যে সকল উপহারাদি লাভ করিয়াছিলেন উহা প্রত্যুপকারের নির্দশন স্বরূপ গণ্য করা উচিত। উহা কেহই উৎকোচ স্বরূপ লন নাই। সেইজন্যই ক্লাইবের কোম্পানির পক্ষে টাকার তাগাদা করা, সততার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হইতে পারে সত্য, কিন্তু হায়! ক্লাইবের প্রেরিত পত্র যে, উহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করে। সেই পত্রে ওয়াটস সাহেবকে ক্লাইব উপদেশ দিতেছেন যে, যদি নবাব নিতান্তই অত অধিক টাকা দিতে অস্বীকার অক্ষম হন, তবে কোটির অর্দ্ধেক পঞ্চাশ লক্ষে নামিতে পার। আরও সাধু ওয়াটসন সাহেব পলাশীর যুদ্ধের পূর্ব্বে মীরজাফরের নিকট হইতে কোন অর্থাদি লাভের কথা ছিল ইহা তিনি জানিতেন না। তিনি গুপ্ত সন্ধির সর্ত্তের মধ্যে উহার উল্লেখ নাই বলিয়া উল্লিখিত দাবীর অংশ পান নাই। কিন্তু হায়! তাঁহার অবর্ত্তমানে তাঁহার উত্তরাধিকারীগণ ঐ উপহারাদির ন্যায্য অংশ লাভ করিবার জন্য বিলাতে অভিযোগ মামলাদি পর্য্যন্ত করিয়াও যে কৃতকার্য্য হন নাই ইহা নিশ্চয়ই সততার উজ্জ্বল প্রমাণ! তখন কলিকাতা, মুর্শিদাবাদে ও বিলাতের সহিত পরস্পর কি সম্বন্ধ হইয়াছিল ইহাতেই স্পষ্ট অনুভব করা যাইতে পারে।
নব কলেবরঃ— তখন বাঙ্গালায় অন্য কাহারও সমৃদ্ধি বা শ্রীবৃদ্ধি হউক, আর নাই হউক, কলিকাতার ইংরাজগণের উহা যে হইয়াছিল ইহা স্বীকার করিতে হয়। কলিকাতাধিকারের সময় মুসলমান সৈন্যগণের অত্যাচারে, কি ইংরাজি টোলা, কি বাঙ্গালী টোলা, সকল স্থানের বাড়ীই অগ্নিতে ভস্মসাৎ হইয়াছিল। তখন প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক কলিকাতা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র পলায়ন করিয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলার সন্ধিতে উহার ক্ষতি পূরণের জন্য টাকা দিবার সর্ত্ত ছিল ও উহাতেই কলিকাতার পুনর্গঠন বা নবকলেবর হইয়াছিল। প্রবাদ আছে যে, সৌভাগ্যোদয় কালে মানুষের মাথায় হিংস্রসর্পে ফণাদ্বারা সূর্য্যকিরণ আবরণ করে। ওয়াটসনের ভাগ্যে মৃত্যু ও সমাধি কলিকাতায় হইয়াছিল, আর ক্লাইবের সেইখানে ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভ করিলেন। ক্লাইবের স্মৃতি ভারতবর্ষের ইতিহাসে, কলিকাতার পথে ও প্রতিকৃতিতে বর্ত্তমান, আর ভাগ্যহীন ওয়াটসনের সে সব কিছুই নাই কেবল তাঁহার সমাধিই বর্ত্তমান। ক্লাইবের অন্যান্য সহচরগণ তাঁহার সহিত আশাতীত অর্থ লাভ করিয়াছিল। মুর্শিদাবাদের রাজকোষে যেন তাঁহাদেরই জন্য অর্থ সঞ্চিত হইয়াছিল, ক্লাইব কুড়ি লক্ষ আশী হাজার, উহার অর্দ্ধেকও ওয়াটস ও পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজার মেজর কিলপাট্টীক, পাঁচ লক্ষ ওয়ালস্, মানিংহাম বীচার প্রত্যেকে দুই লক্ষ আশি হাজার, স্ক্রাফটন দুইলক্ষ, কৌন্সিলের ছয়জন সভ্য প্রত্যেকে লক্ষ টাকা ও লসিংটন সাহেব পঞ্চাশ হাজার টাকা লাভ করিয়াছিলেন। ইহা ১৭৭২ খৃষ্টাব্দের পার্লিয়ামেন্টের সভা তদন্তের ফলে প্রকাশ হইয়াছিল। মুতাক্ষরীণ অনুবাদক মুস্তাফা বলিয়াছেন যে, তিনি পরবর্ষে ক্লাইবের দোভাষীরূপে কার্য্য করিবার সময় ক্লাইবের সেক্রেটারী ওয়ালসের মুখে শুনিয়াছিলেন যে, তিনি ওয়াটস, লসিংটন, দেওয়ান রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ মুর্শিদাবাদের ধনাগারে গিয়াছিলেন। বেগম মহলের কোষাগারের আট কোটি টাকা ছিল, উক্ত বাঙ্গালীদের কৌশলে ইংরাজেরা উহার সন্ধান পান নাই। মীরজাফর তখন উমর বেগ রামচরণ ও নবকৃষ্ণকে উহার কিঞ্চিৎ দান করিয়া সমস্ত লইয়াছিলেন। তখন রামচরণ বা নবকৃষ্ণ ৬০্ টাকা মাত্র মাসিক বেতনে কর্ম্ম করিতেন, ঐ বিপ্লবের সময় তাহারা কিরূপ অর্থলাভ করিয়াছিল উহা তাঁহাদের ত্যক্ত ধন সম্পত্তি দ্বারাই প্রমাণিত হয়। রামচরণ কলিকাতার পাথুরিয়াঘাটায় ও নবকৃষ্ণ শোভাবাজারে থাকিতেন। তাঁহারা সে সময়ের গণ্য মাণ্য কলিকাতা অধিবাসিগণের মধ্যে উল্লিখিত হইতেন না। তখন লোকে বংশ মর্য্যাদায় সদ্গুণ সৎকর্ম্ম ও সম্মান দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করিত। সে সময়ের গণ্যমাণ্য বিশ্বাসভাজন কলিকাতাধিবাসিরাই কলিকাতাধ্বংসের ক্ষতিপূরণের টাকা যথারীতি বিচার করিয়া বিতরণ করিবার ভার পাইয়াছিলেন। তাঁহাদের নাম নয়নচাঁদ ও শুকদেব মল্লিক, হরেকৃষ্ণ ঠাকুর, দুর্গারাম দত্ত, দয়ারাম বসু, নীলমণি মিত্র, রামসন্তোষ, রতন সরকার, শোভারাম বসাক, গোবিন্দরাম মিত্র, আলিজান ভাই, মহম্মদ সাদেক ও আইনুদ্দিন ছিল। একজন কলিকাতার ইতিবৃত্তকার কোম্পানির বাদ দেওয়া টাকাকে মঞ্জুর বলিয়া তালিকাভুক্ত ও অযথা তীব্র সমাােচনা করিয়া অক্ষমনীয় ভ্রমে পতিত হইয়াছেন। ইহারা সকলেই সেকালের নামজাদা ছিলেন, তবে সেই সময়ে তাহারে মধ্যে জনকয়েক ব্যক্তি লোভ সম্বরণ করিতে না পারিয়া আশ্রিত অনুগতগণের ঐ অর্থে সাহার্য্য দান ও স্বয়ং নিজের উদর পূরণ করিয়াছিলেন। সেইজন্য উহাদের বিপক্ষে তদন্ত প্রার্থনা হইয়াছিল, উহাদের নাম ও কার্য্য জানিতে পারা যায়। সূত্রে প্রকাশ হয় শোভারাম বসাক হিসাব না দিয়া, জাল নাম দিয়া অনেক টাকা আত্মসাৎ করিয়াছিলেন। অন্যান্য কমিশনেরা গরীবগণের দাবীর টাকা সমস্ত দিতে চাহিলে, কিন্তু তিনি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন “তবে আমাদের মত বড় মানুষের জন্য আর কি থাকিবে।” কলিকাতার বিখ্যাত পূর্ব্বোক্ত বড়বাজারে মল্লিক বংশের দুইজন ঐ সভার তেরজন সভ্যের মধ্যে ছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহই গোবিন্দরাম মিত্র বা শোভারাম বসাকের মত কোন অন্যায় মিথ্যা দাবী করেন নাই, বা তাঁহাদের কোন আশ্রিত ব্যক্তি তাঁহাদের কৃপায় এক কপর্দ্দকও লাভ করেন নাই। উহার সংক্ষেপ বিবরণ “ক” ক্রোড় পত্রে দেওয়া হইল। কলিকাতার ক্ষতি পূরণের টাকার ৫০ লক্ষ ইংরাজেরা ২০ লক্ষ হিন্দু মুসলমান ও ৭ লক্ষ আরমেনিয়ানেরা পাইয়াছিল। উহাতেই কলিকাতার পুনর্গঠন কার্য্যারম্ভ হইয়াছিল।
কলিকাতায় ধনাগমঃ— প্রথমে মুর্শিদাবাদ হইতে কলিকাতার সিন্ধুকে নগদ রৌপ্যমুদ্রা বাহাত্তর লক্ষ একাত্তর হাজার ছয়শত ছেষট্টি, ৯ই আগষ্ট ষোল লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার তিনশত আটান্ন টাকা ও ৩এ আগষ্ট পনর লক্ষ নিরানববই হাজার সাতশত সায়ত্রিশ টাকা জহরাৎ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রায় আসিয়াছিল। এই অর্থ সম্পত্তি কলিকাতায় পহুঁছিবার পূর্ব্বে মানিংহাম সাহেব বিজয় সংবাদ লইয়া বিলাতে গিয়াছিলেন। উহাতে ক্লাইবের নাম ও যশ বিলাতে ও ভারতবর্ষে প্রতিধ্বনিত হইয়াছিল। তাঁহারই কৌশলে দিল্লি দরবার হইতে ক্লাইবের ওমরা পদবী ও ছয় হাজারী মনসব দারী শলাবৎজঙ্গ উপাধির সঙ্গে মীরজাফরের নামে সুবাদারী সনন্দ আসে। তখন ক্লাইব কলিকাতা কাউন্সিলের মত উপেক্ষা করিয়া কার্য্য করিতেন। যখন কলিকাতায় সংবাদ আসিল যে, ফরাসিরা সেণ্ট ডেভিড দুর্গজয় ও তাঞ্জোর অবরোধ করিয়াছে শীঘ্রই ফরাসি সেনাপতি লালী ও বুসী মাদ্রাজ আক্রমণ করিবে, তখন ক্লাইব সেখানে গিয়া কাহারও অধীনে কার্য্য করিতে চাহেন নাই। সেখানে অধিক সৈন্য পাঠাইবার তিনি বিরোধী, তিনি কেবল মাত্র দুই হাজার সিপাই ও পাঁচশত গোরা পাঠাইলেন। কলিকাতায় ১ম সংখ্যক লাল পণ্টন ক্লাইবের সৃষ্টি উহাতে দেশীয় সৈন্যগণকে গোরা সৈন্যের ন্যায় অস্ত্রসস্ত্র বেশভূষা দিয়া রীতিমত ইংরাজি প্রণালীতে শিক্ষিত করা হয়। ঐরূপ ২য় দল ভোজপুরী সিপাই লইয়া করা হয়। এইরূপে সিপাই সৈন্যদ্বারা কোম্পানির আয় ও বল বৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়। আরও গোবিন্দপুরে তিনি কলিকাতার বর্ত্তমান দুর্গ নির্ম্মাণ আরম্ভ করিয়াছিলেন। তখন কলিকাতায় কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের পাকাবাড়ী ও ইংরাজ প্রহরীর বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। সেই সময়ে কলিকাতায় জ্বরে একশত গোরা মারা যায় ও সাতশত জন হাসপাতালে ছিল। তখন এক অভিনব উপায়ে কলিকাতার চারিধারের জঙ্গল কাটাইবার ব্যবস্থা করিবার হুকুম জারি হইয়াছিল যে, যে কেহ আপনার খরচায় ফলের গাছ না কাটিয়া জঙ্গল পরিষ্কার ও চাষবাস বা গৃহাদি করিবে, সেইই তাহার মালিক হইবে। সেকালে ইংরাজ কর্ম্মচারীরা কলিকাতা ও তন্নিকটবর্ত্তী স্থান সমূহ নিজনামে বা বেনামিত বন্দোবস্ত করিয়া উন্নতি করিত ও পরে উহা বিক্রি করিয়া লাভ করিত। ১০ই জানুয়ারি ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে বিলাত হইতে হুকুম হয় যে, কলিকাতার ইংরাজ অধিবাসিরা চব্বিশ পরগণার জমি খরিদ বা আবাদ করিতে পারিবে না ও উহা তাহাদিগকে যেন কোনমতে বিলি করা হয় না।
কলেক্টরীঃ— সেকালের সমস্ত কলিকাতা সম্পত্তির মালিকানী স্বত্ত্ব কোম্পানির কলেক্টার গণের পাট্টা ও কবুলিত দ্বারা সিদ্ধ ও স্বীকৃত হইত। তখন লালবাজারে কলিকাতার কলেক্টারী আফিস ছিল। ষ্টারণ্ডেল সাহেব কলিকাতার পুরাতন কাগজের মধ্যে ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দে কলেক্টার জ্যাকসন সাহেবের সহি দেখিয়াছেন বলিয়াছেন। ১৭৫২ হইতে ১৭৫৬ পর্য্যন্ত হলওয়েল, ১৭৫৮ পর্য্যন্ত কলেট ও তাঁহার পরে উইলিয়ম ফ্রাঙ্কলাণ্ড কলিকাতার কলেক্টার জেনারেল হন।
নবাব কর্ত্তৃক কলিকাতাক্রমনের কাপুরুষের ন্যায় ডোভালি জাহাজে পলায়নের পুরস্কার স্বরূপ ফ্রাঙ্কল্যাণ্ড সাহেব ঐপদ বোধহয় পাইয়াছিলেন এবং ফিরিঙ্গি এই নামোৎপত্তি তাঁহারই নাম হইতে হইয়াছিল। উহাই তাঁহার সর্ব্বোচ্চ গৌরবের বিষয় ও কীর্ত্তি বলিতে হইবে।
উপাধিঃ— তখন দেশবাসিগণ জন্মভূমির অধীনতাকারকগণের প্রতি অত্যন্ত অশ্রদ্ধা করিতেন। বাদশাহি উপাধি আদি দ্বারা তাহাদের সেই দুঃখ দূর করিবার জন্য কোম্পানি তাহাদের মনস্তুষ্টিকারক ও সাহায্যকারীগণের সমাজে পদবৃদ্ধির উপায় করিলেন। নবাবী রীতি অনুসারে কোম্পানি ও খেলাৎ দিতে আরম্ভ করেন ও ১৭৬২ খৃষ্টাব্দে ৫ই জুলাই লক্ষ্মীকান্ত ধর ওরফে নকু ধরকে খেলাৎ দান করেন। তাঁহারই অধীনে নবকৃষ্ণ পূর্ব্বে কার্য্য করিতেন। নবকৃষ্ণ তাঁহার উন্নতাবস্থায় প্রভুর সম্মান রক্ষা করিতে পশ্চাৎপদ ছিলেন না। তিনি কখন লক্ষ্মীকান্তের বাড়ীতে জুতা পায়ে দিয়া যাইতেন না। উক্ত ধর মহাশয় আড়ম্বরের পক্ষপাতী ছিলেন না, ক্লাইব তাঁহার দোহিত্রকে মহারাজা উপাধি আনাইয়া দেন, তিনিই বিখ্যাত সুখময় রায়। কলিকাতায় ইহাদের পোস্তার বাড়ীতে দুর্গাপূজার সময় সর্ব্বপ্রথম টানা পাখা ও ইংরাজগণের মনস্তুষ্টির জন্য ইংরাজির সহিত হিন্দুস্থানী গৎ মিলাইয়া গান নাচ আরম্ভ হয়। নবকৃষ্ণ উহার অনুকরণ করিয়াছিলেন। কলিকাতায় তখন যে সাত্ত্বিকভাবে দুর্গোৎসব হইত না উহা নয়। বড়বাজারের নয়ান চাঁদ মল্লিকের বাড়ীতে নবম্যাদি বোধনের দিন হইতে পক্ষাধিক দীনদরিদ্রের সেবা ও তাহাদিগকে ধন বস্ত্রাদি দান উৎসবাদিতে এক অপূর্ব্ব ব্যাপার হইত। ঋণগ্রস্থ ব্যক্তিগণ সেইসময়েই ঋণমুক্ত হইত। সেই প্রথানুসারে উক্ত বংশধরগণ ও বহুকাল ঐরূপ পূজা ও উৎসব করিয়া আসিতেছে।
পঞ্চপাণ্ডবঃ— নবকৃষ্ণের জন্ম ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে কলিকাতার নিকট গোবিন্দপুরে হইয়াছিল। সৌভাগ্যবলে তিনি শেষে সুতানটীর জমিদারী লাভ করিয়াছিলেন। সেই সুতানটীতেই জব চার্ণক সর্ব্বপ্রথমে পদার্পণ করিয়াছিলেন। নবকৃষ্ণ মুন্সী নামেই পরিচিত, কেহ তাঁহাকে বাবু পর্য্যন্ত বলিত না। * বাবু তখনকার সম্মানসূচক উচ্চকর্ম্মচারীর পদবী ছিল। চুঁচুড়ার ডচ কোম্পানির দেওয়ান শ্যামরাম সোম সেই বাবু উপাধি লাভ করিয়াছিল। নবকৃষ্ণ বাঙ্গালীর মধ্যে সেকালের একজন শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। সেকালে তাঁহার মত কোন বাঙ্গালীই ইংরাজ কোম্পানির প্রিয়পাত্র ছিলেন না বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তিনি রাজা মহারাজা উপাধি, উৎকৃষ্ট জমিদারী লাভ ও অদ্বিতীয় ক্ষমতায় কলিকাতার সেকালের অনেক সম্পত্তিশালী ক্ষমতাবান ব্যক্তির চক্ষুঃশূল হইয়াছিলেন। কলিকাতায় তাঁহার ন্যায় আরও চারজন ব্যক্তি কোম্পানির অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁহাদের নাম কৃষ্ণকান্তবাবু, কাশিনাথ, গঙ্গাগোবিন্দ ও দেবী সিং এই পঞ্চপাণ্ডবই সেকালে বাঙ্গালার পাণ্ডববর্জ্জিত দেশের সকল কলঙ্কমোচন করিয়াছিলেন। ইহাঁরা কেহই পলাশিযুদ্ধের দু’একবৎসর পরেও কলিকাতায় জ্ঞাতনামা ব্যক্তি ছিলেন না। শেষে সৌভাগ্যবলে ও ইংরাজ কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারীগণের অনুগ্রহে তাঁহারা সকলেই বাঙ্গালার প্রধান জমিদার ও উচ্চ পদবীশালী ব্যক্তি এবং কলিকাতায় সম্পত্তি ঐশ্বর্য্য লাভ করেন। কাশিনাথ বড়বাজারে, কৃষ্ণকান্তবাবু শ্যামবাজারে, নবকৃষ্ণ শোভাবাজারে, গঙ্গাগোবিন্দ পাইকপাড়া ও দেবি সিং ক্লাইব ষ্ট্রীটের নিকট প্রভৃতি স্থানের উন্নতি করেন। ইহাঁদিগকে তখনকার বাঙ্গালার প্রাচীন জমিদারেরা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পোষ্যপুত্র বলিতেন ও তাঁহাদের নিকট অনুগ্রহ ভিক্ষা পর্য্যন্ত করিতে হইয়াছিল। নসীপুরের রাজবংশের পূর্ব্বপুরুষ দেবী সিং ও কলিকাতার যেখানে থাকিতেন সেইখানে উহার ভ্রাতুষ্পুত্র রাজা উদমণ্ড সিংহের নামে রাস্তা হইয়াছে। কৃষ্ণকান্ত মুর্শিদাবাদ রাজবংশের আদি পুরুষ কান্তবাবু। ইহাঁদের সকলেরই অভ্যুদয় ঐশ্বর্য্য কলিকাতার উচ্চ কর্ম্মচারীগণের অন্যায়াচরণে ও অথবা পৃষ্ঠপোষকতায় হইয়াছিল। ঐ সকল ব্যাপারে হেষ্টিংসকে বিলাতে কৈফিয়ত দিয়া অপমানিত ও সর্ব্বস্বান্ত হইতে হইয়াছিল। তাঁহারাই সেকালের কলিকাতার নাম ও খ্যাতি নিম্নলিখিত প্রবাদে বিখ্যাত করিয়াছিলেনঃ—
“জাল, জুয়াচুরি, মিথ্যাকথা, এই তিন নিয়ে কলিকাতা”
স্পষ্ট কথা বলিতে হইল উক্ত পাণ্ডবেরাই বংশাবলী ক্রমে পলাশী যুদ্ধের পরিণাম উপভোগ করিতেছেন তজ্জন্য তাঁহাদের নাম সর্ব্বপ্রথমে উল্লেখ আবশ্যক। সিরাজদ্দৌলা জয় করিলে অগ্নি তে যাহাদের বাড়ীঘর মূল্যবান ধনরত্ন পুরাতন কাগজ দলিলাদি নষ্ট হইয়াছিল তাহারা কোম্পানির নিকট হইতে যৎকিঞ্চিৎ ক্ষতি পূরণের টাকায় কলিকাতা পুননির্ম্মাণের সহায়তা করিয়াছিল বটে কিন্তু তাহারা তখন পূর্ব্বোক্ত পাণ্ডবগণের ন্যায় কোনরূপ জমিদারি বা উপাধি প্রাপ্ত হন নাই ইহা নিশ্চয়ই প্রহেলিকাময়। কলিকাতা ক্রমে ক্রমে কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারীগণের পৃষ্ঠপোষক বা প্রিয়পাত্রগণের আবাস ও লীলাস্থল হইয়াছিল। এইখানেই কলিকাতার মাহাত্ম্য শেষ হয় নাই।
আলিপুর ঃ— ক্লাইব সিরাজউদ্দৌলার কৃত কলিকাতার আলিনগর নাম পরিবর্ত্তিত করিলেও উহার স্মৃতি লোপ করিতে পারেন নাই। উহা আলিপুর রক্ষা করিতেছে ও সেইখানেই কোম্পানির প্রতিনিধিগণের বিখ্যাত নন্দনকানন আবাস ভূমি বেলভিডিয়ায় বর্ত্তমান রহিয়াছে। যখন ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে গবর্ণর ভান্সিটার্ট কর্ত্তৃক মীরজাফর সিংহাসনচ্যুত হইলেন, তখন তিনি মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় বাস করা মঙ্গলের কথা স্থির করেন ও উহাতেই ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে পুনরায় নবাবী পদ লাভ করেন। তাঁহার নির্ম্মিত আলিপুরের অধিকাংশ সম্পত্তি তিনি মণি বেগমকে দান ও পরে উহা হেষ্টিংস লাভ করেন। এখন সেইখানে ব্রিটিশ রাজপ্রতিনিধির বাসস্থান হইয়াছে ও কলিকাতার বিশিষ্ট ইউরোপবাসীগণ বাস করেন। সেই হেষ্টিংস হাউস এখনও বর্ত্তমান হেষ্টিংসের চেষ্টায় কালিঘাটের গঙ্গার উপর সেতু নির্ম্মাণ হইয়াছিল।
লাটপ্রাসাদ:— পুরাতন দুর্গের মধ্যে কোম্পানির গবর্ণরের আবাস ভবনটির পরিবর্ত্তে অন্য এক প্রাসাদ “বাকিংহাম হাউস” বিলাতি নূতন নাম দিয়া গবর্ণরের জন্য হইয়াছিল, সেইখানে সর্ব্বপ্রথম গবর্ণর জেনারেলের সময় হইতে বাসারম্ভ হয়। হেষ্টিংস ঐ বাড়ীতে অধিক সময় থাকিতেন না। তিনি কখন উহার নিকট হেষ্টিংস ষ্ট্রীটের বাড়ীতে, কখন কাশীপুরে বা ঋষড়ার বাগানে, কখন হেষ্টিংস হাউসে থাকিতেন। এতদ্ভিন্ন হেষ্টিংসের নিজের প্রাইভেট সেক্রেটারীর কার্য্যালয় বর্ত্তমান এসপ্লানেভ ম্যানসন যেখানে হইয়াছে, সেইখানে ছিল। হেষ্টিংস বড়ই আড়ম্বর প্রিয় ছিলেন। সেই গবর্ণরের বাড়ী তাঁহার উপযুক্ত বলিয়া মনে হয় নাই, সেইজন্যই অধিকাংশ সময় তিনি হেষ্টিংস হাউসে বা বাগানে কাটাইতেন। বিশেষ কোন কাজ পড়িলেই কলিকাতায় আসিতেন। সেই কলিকাতার লাট প্রাসাদ সম্বন্ধে ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে গ্রাণ্ড প্রে সাহেবও এইরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন। পার্শ্ববর্ত্তী বাড়ীগুলির সহিত লাটসাহেবের দোতলা বাড়ীর তুলনা করিলে উহাতে ভাল বলিতে পারা যায় না। পণ্ডিচেরীর গবর্ণরের বাড়ী কলিকাতার গবর্ণরের বাড়ী অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর। তখনকারের লাটের বাড়ীতে বিশেষ কোনরূপ বাহ্য সৌন্দর্য্যের বা আড়ম্বরের পরিচয় লক্ষ হইত না। পলাশী যুদ্ধের বীর ক্লাইব কলিকাতায় যে বাড়ীতে থাকিতেন, এখন সেইখানে রয়েল এক্সচেঞ্জ প্রস্তুত হইয়াছে। দমদমে তাঁহার একখানি বাগান ছিল উহাকে * ক্লাইব হাউস বলে। তখন কলিকাতায় কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারীরা থাকিত না। বারওয়েল খিদিরপুরে ও গার্ডেনরীচের পাঁচকুঠিতে থাকিতেন। এখন সেখানে বেঙ্গল নাগপুরের অফিসারগণ থাকে। তখন কলিকাতার স্বাস্থ্য অতি মন্দ ছিল ও আমোদ প্রমোদ আহার বিহারের সুবিধার জন্য কলিকাতার বাহিরে কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিরা থাকিতে ভালবাসিতেন। চৌরঙ্গিতে তখন দু একজন মাত্র সাহেব থাকিত রাত্রে ঐ রাস্তায় কেহ যাতায়াত করিত না। বর্ত্তমান মিডলটন রোর নিকট হরিণেরা দৌড়াদৌড়ি করিত বলিয়া উহার নাম ডিয়ার পার্ক ছিল। সেই পার্ক নামের স্মৃতি পার্ক ষ্ট্রীটে বর্ত্তমান রহিয়াছে।
ইংরাজের নবাবীঃ— সেকালের কোম্পানির উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নবাব বিশেষ। তাঁহাদের চাল চলন সমস্তই নবাবদের মত ছিল। তাঁহারা বিলাতে প্রত্যাবর্ত্তন করিলে ঐ নামে সেখানে পরিচিত হইতেন। চাকর ভিন্ন তাঁহাদের দুইদণ্ড চলিবার উপায় ছিল না। তখন কাফ্রি ক্রীতদাস দাসী চার পাঁচশ টাকায় বিক্রি হইত এবং গান বাজনার দক্ষ হইলে, উহাদের মূল্য অধিক হইত। ১৮৪২ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত এদেশে ঐ ব্যবসা অবাধে চলিয়াছিল। কলিকাতায় আরমানিদের কৃপায় মদ ও নটীর অভাব ছিল না। নবাবদের ন্যায় কোম্পানির কর্ম্মচারীদের মদ্যপান ও বেশ্যাগমন প্রায়ই অভ্যাস হইয়াছিল। তাহারা অলবোলা ফরসীতে তামাক ও পান খাইত, অগ্রপশ্চাৎ রূপার আশাশোটাধারী চোপদার মশালচি সঙ্গে করিয়া পাল্কিতে বেড়াইত। কোম্পানির মন্ত্রণা সভার কাগজে প্রকাশ হয় যে, তখন চাকরদের মাসিক চার পাঁচ টাকার অধিক বেতন ছিল না। শেষে উহারা অধিক বেতন দাবী করিলে এক নির্দ্ধারিত বেতন ধার্য্য করিয়া হুকুম দেওয়া হয় যে, যে উহাতে কার্য্য করিবে না তাহার জরিমানা, বাসোচ্ছেদ বা কারাদণ্ড ব্যবস্থা করা হইবে। সিরাজউদ্দৌলার কলিকাতাধিকারের সময় ইংরাজদের সেণ্ট এন নামে গির্জ্জা নষ্ট হইয়াছিল। লালদিঘির স্কচ গির্জ্জার উত্তর পশ্চিম দিকে চাঁদা করিয়া একটি থিয়েটার গৃহ করিয়াছিল, উহাতেই তখন উপাসনা কার্য্য সম্পন্ন হইত। পলাশি যুদ্ধের জয়লাভের পরে থিয়েটার বন্ধ রাখা অনুচিত বলিয়া গবর্ণরাদির মতানুসারে বলপূবর্বক অন্যের গির্জ্জা অধিকার করা উচিত স্থির হয়, তদনুসারে ইংরাজ কর্ম্মচারীরা “One lady of the rosary” নামক পর্ত্তুগীজগণের গির্জ্জায় উপাসনা কার্য্য করিত। কলিকাতায় ক্লাইব নূতন গির্জ্জা করিবার বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, সারমন সাহেব খিদিরপুরের বাগানে ডক তৈয়ারি করিয়াছিলেন। ক্লাইব গোবিন্দপুরে বর্ত্তমান কেল্লা তৈয়ারীর ব্যবস্থা করায় চৌরঙ্গির উন্নতি আরম্ভ হইয়াছিল।
কাশিনাথঃ— ফ্রাঙ্ক লাণ্ড সাহেব কলিকাতার জরিপ করিয়াছিলেন। তিনি ঐ কার্য্য একমাত্র কাশীনাথ টণ্ডমেনবর তত্ত্বাবধানে করাইতে আপত্তি করিয়াছিলেন। তাঁহার চিঠিতে উহার কারণ উল্লেখ ছিল, তিনি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন যে, কিছুদিন পূর্ব্বে সেই ব্যক্তিই মাণিকচাঁদের সাহায্য করিয়া ইংরাজ কোম্পানির পরম শত্রুতা করিয়াছিল। বিলাত হইতে ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে ১৪ই এপ্রেল উহার আপত্তির সম্পূর্ণ অনুমোদন পত্র আসিয়াছিল, কিন্তু কাশীনাথ পাকে প্রকারে কলিকাতার যত ভাল ভাল বাজার উপযোগী জায়গা সমস্তই হস্তগত করিয়া লইয়াছিলেন। তিনি প্রমারা খেলায় বর্দ্ধমানের রাজার নিকট হইতে মূল্যবান চক বাজার জিতিয়া লইয়াছিলেন। অনেকে বলেন যে, উক্ত রাজা কৌশল করিয়া পরস্পরের মধ্যে যৌন সম্বন্ধ স্থাপন করিবার জন্যই ঐরূপ করিয়াছিলেন কিন্তু কৃতকার্য্য হন নাই।
দুর্ভিক্ষঃ— তখন কলিকাতার জিনিষের দাম ও মজুরী অত্যন্ত অধিক হইয়াছিল। কোম্পানি মফঃস্বল হইতে শস্য সস্তায় খরিদ করিয়া কলিকাতায় সেই দামে বিক্রি করিবেন স্থির করেন। সাইত্রিশ হাজার পাঁচশত টাকার শস্য খরিদ করা হইবে স্থির হয় ও হুজরীমল ঐ টাকার সিকি স্বয়ং সরবরাহ করিয়া ঐ কার্য্যের ভার লইয়াছিলেন। এখন যেমন এক্সচেঞ্জের খেলায় ব্যবসাদারদের সর্ব্বনাশ হয়, সেকালে তেমনি টাকার বাজারের হর্ত্তা কর্ত্তা * জগৎশেঠ ছিল তাহাদের যখন যাহা ইচ্ছা তাহাই করিত। তখন উহারই উপর ব্যবসায়ীর ক্ষতি বৃদ্ধি নির্ভর করিত। ইংরাজ কোম্পানি জগৎশেঠের পরম বন্ধু সুতরাং তাহাদের দৌর্দ্দণ্ড প্রতাপ, জিনিষের দুর্ম্মুল্যতায় ও টাকার বাজারের অনিশ্চিত দামের উত্থান ও পতনে স্বদেশী ব্যবসায়িগণ ব্যবসা একরকম বন্ধ করিয়াছিল অগত্যা ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় দুর্ভিক্ষ হইয়াছিল। খাদ্য সামগ্রীর দাম অত্যন্ত অধিক হওয়ায় উহার উপর যে মাশুল আদায় করা হইত, উহা গ্রাণ্ড জুরি বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হন। সেকালে ব্যবসার দুর্দ্দশার কথা পরিশিষ্টে দেওয়া হইল।
অপমান ও পলায়নঃ— ক্লাইব কলিকাতায় কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের আচার, ব্যবহার, চরিত্র ও ব্যবসা দেখিয়া উহার প্রতিকার করিবার জন্য অনেক পুরাতন কর্ম্মচারীগণকে পদচ্যুত করেন। উহাতে কর্ম্মচারীরা অসন্তুষ্ট হইয়া ভান্সিটার্ট সাহেবের বাগান বাড়ীতে এক প্রকাশ্য সভা করে ও উহাতে এই প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, তাহাদের মধ্যে কেহই ক্লাইবের সহিত পানাহার আদি কোন সামাজিক ক্রিয়া করিবেন না ও যে কেহ উহার সহিত উহা করিবে তাহার সহিত তাহারা ঐরূপ সামাজিক সম্বন্ধ ত্যাগ করিবে। অধিকন্তু যাহাতে সকলে ক্লাইবের সহিত সাক্ষাৎকালে অসম্মান প্রকাশ করে, সে প্রস্তাবও তখন গৃহীত হইয়াছিল। ইহাতেই কাপ্তেন ডোর হুকুম জারি হইয়াছিল যে, যে কেহ কোম্পানির খাতাপত্র গোলমাল বা তহবিল আত্মসাৎ করিবে, তাহার নাক কান কাটিয়া দিবে, যে কেহ জমি জায়গার বিবাদ লইয়া কাহাকেও যদি আঘাত করে, তবে তাহার একদিন হাত পা বন্ধ করিয়া ষ্টকে সাজা দিবে ও হত্যাপরাধীকে চাবুক মারিয়া জেলে মারিয়া না ফেলিয়া তোপে উড়াইয়া দিবে। তখন ক্লাইবের চৈতন্যোদয় হয় ও পূর্ব্বমত সম্পূর্ণ পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল কারণ তিনি কিছুদিন পূর্ব্বে কলিকাতাধিকারের সময় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে উহা দখল করিতে চাহিয়াছিলেন, আর ওয়াটসন সাহেব ইংলণ্ডের রাজার পক্ষে উহা করিবেন বলিয়াছিলেন ও সেইজন্য উভয়ের মধ্যে বিবাদ হইয়াছিল। অবশেষে সেই ক্লাইবই ৭ই জানুয়ারি ১৭৫৯ খৃষ্টাব্দের পত্রে ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রী পিট সাহেবকে ইংলণ্ডাধিপতির নামে জয়লাভ ঘোষণা করিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। কালের কি অপার মহিমা! ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির স্বত্ব শেষ হইবার কুড়ি বৎসর বাকি ছিল বলিয়া উহা করিবার মন্ত্রীপ্রবরের তখন সুবিধা সুযোগ হয় নাই। সেই ক্লাইবই অথচ দাদপুর হইতে পলাশীর যুদ্ধের বিজয় বার্ত্তা ২৪এ জুন আহ্লাদ সহকারে মীরজাফরকে লিখিয়াছিলেন “এ জয়লাভ আপনার—আমার নহে।” বলিহারি!!! পলাশী যুদ্ধে ক্লাইব তাঁহার পিতাকে আপনার লাভালাভের কথা এইরূপ লিখিয়াছিলেন “যাহা কখন স্বপ্নে ভাবি নাই, তাহা নবাবের কৃপায় হইয়াছে। আমার এখন দেশে গিয়া উত্তমরূপে বাস করিবার উপায় হইয়াছে। সেই অভিপ্রায়েই বোধ হয়, তিনি পলাশিযুদ্ধের পর চারিদিকের ব্যবস্থা করিয়া ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারী স্বদেশ যাত্রা করিয়াছিলেন।
মীরকাশিমঃ— ক্লাইবের আমল হইতে কলিকাতার দরবারে বাঙ্গালার নবাব ষড়যন্ত্রের নিবর্বাচন দ্বারা হইতেছিল। ক্লাইব যাইবার সময় মাদ্রাজ হইতে তাঁহার বন্ধু ভান্সিটার্টকে তাঁহার পদে মনোনীত করিবার জন্য বিলাতের ডিরেক্টারগণকে বিশেষ অনুরোধ করেন। কি আশ্চর্য্য! তাঁহার সেই অনুরোধ মঞ্জুর হইয়া আসিবার সঙ্গে সঙ্গেই হলওয়ের পরামর্শে ও চক্রান্তে গবর্ণর ভান্সিটার্ট বশীভূত হইয়া মীরজাফরকে নবাবি পদচ্যুত করেন ও তাঁহারই জামাতা মীরকাশিমকে সেই পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। কলিকাতার ২৭শে সেপ্টেম্বর ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের গুপ্তদরবারের সন্ধিপত্রে সেইকার্য্য সমাধা হয়। মীরকাশিম খোজাপিদ্রুর মধ্যস্থতায় হলওয়েল ও ভান্সিটার্টকে অর্থদ্বারা বাধ্য করিয়াছিলেন। ইহাতেই বলিতে হয় কলিকাতার মাটির নীচে রাজা বিক্রমাদিত্যের বিখ্যাত বত্রিস সিংহাসন ছিল। পলাশিযুদ্ধের পর কলিকাতার দরবারের সন্ধিতে মীরকাশিমের কি গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল উহা প্রকাশ হয় না। তবে সেই সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত। সেই সূত্রে কেহ নবাব মীরজাফরকে ক্লাইবের গর্দ্দভ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন ও মীরণের মৃত্যু বাঙ্গালার ইতিহাসে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা বলিয়াছেন। যাঁহারা মীরজাফরকে সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে অনেকে স্বদেশে চলিয়া গিয়াছিলেন। তখন পুত্রশোকে মীরজাফর অকর্ম্মণ্য হইয়াছিলেন। ইংরাজের সন্ধির প্রাপ্য অর্থ প্রদত্ত হয় নাই, ঢাকা প্রদেশের রাজকর সংগৃহীত হয় নাই। ইংরাজ বাণিজ্যের অত্যাচারে শুল্ক বিভাগের আয় বিলুপ্ত হইবার উপক্রম হইয়াছে বেতন না পাইয়া অসন্তুষ্ট সেনাদল বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে সেই সকল দুর্দ্দশায় নিপতিত হইয়া বৃদ্ধ নবাব জামাতার উপরেই সর্ব্বস্ব নির্ভর করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। মীরকাশিম উপযুক্ত সময় বুঝিয়া হলওয়েলকে উত্তেজিত করিতে ত্রুটি করেন নাই। হলওয়েল সামরিক পরামর্শের ছলে পত্র লিখিয়া মীরকাশিমকে আনাইয়া ছিলেন ইত্যাদি অনেক কথা আছে, তবে সার কথা অর্থলাভ করিয়া সিংহাসন বিক্রয় করা হয়। ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর ইতিহাস বিখ্যাত কলিকাতার গুপ্ত দরবারের অধিবেশনে ভান্সিটার্ট সভাপতি ছিলেন। তিনি মীরকাশিমকে ইংরাজের ন্যায় তাঁহারও বন্ধুবর্গের অর্থাভাবের কথা জানাইলেন ও মীরকাশিম যাঁহাকে যাহা পুরস্কার দিবেন অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। উহার বিবরণ “গ” ক্রোড়পত্রে সন্নিবেশিত করা হইল। তখন কোম্পানির কর্ম্মচারীরা সকলেই ক্লাইবের ন্যায় অর্থলাভ লালসায় দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হইয়াছিল। এই উপায়ে কোম্পানির অর্থাভাব দূর হইতেছিল বলিয়াই খতে টাকা লওয়া বন্ধ ১লা অক্টোবর ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের বিলাতের হুকুম জারি হইয়াছিল। কলিকাতার পূর্ব্ব দরবারের মন্ত্রণা অর্থেই পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল। উহাতেই পলাশি যুদ্ধের অত্যাশ্চর্য্য দ্বিতীয় অভিনয় মুর্শিদাবাদেই হইয়াছিল। গবর্ণর ভান্সিটার্ট সেনাপতি কেলড্ কাশিম বাজারের ইংরাজ কুঠিতে হঠাৎ উপস্থিত হইলেন। নূতন গবর্ণরের সম্মান রক্ষার্থ নবাব মীরজাফর কাশিমবাজারে প্রথমেই উপস্থিত হইলেন ও পরস্পরের মধ্যে শিষ্টাচার ও ঘনিষ্ঠতার অভাব হইল না। দ্বিতীয় সম্মিলনে তাঁহাদের শুভাগমনের কারণ জানিতে পারিলেন যে, তাঁহার যথারীতি শাসনাভাবে রাজত্ব উৎসন্ন যাইতেছে যাহার উহার সুবন্দোবস্ত হয়, উহারই জন্য তাঁহারা সেইখানে আসিয়াছিলেন।
কীস্তিমাৎঃ— পরদিন প্রাতঃকালেই মীরজাফরের প্রাসাদ লালপল্টনে অবরুদ্ধ রহিয়াছে উহা তিনি শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখিলেন। অধিকন্তু তিনি উহার মধ্যে প্রিয় জামাতা মীরকাশিমের রণ পতাকা উড্ডীন হইতেছে দেখিয়া চমকিত হইলেন। তখন অকস্মাৎ সেই বিসদৃশ ব্যাপারের সঙ্ঘটনের কারণ উপলব্ধি করাইবার জন্য সিংহদ্বারেই সেনাপতি কর্ণেল কেলড্ গবর্ণরের পত্র লইয়া সশস্ত্রে দণ্ডায়মান ছিলেন। তখনই মুহূর্ত্তের মধ্যে অতীত ঘটনা সকল মূর্খের স্মৃতিপটে জাগরুক হইল। তৎক্ষণাৎ তিনি বুদ্ধিমানের ন্যায় পত্রের সৎপরামর্শ গ্রহণ করিয়া বিনা বাক্য ব্যয়ে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় ইংরাজগণের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন একেই বলে কীস্তিমাৎ। আবার কলিকাতায় তাঁহার পক্ষে ইংরাজ সভার সভ্যেরা ইহা যে, অতি গর্হিত ও অন্যায় কার্য্য করা হইয়াছে সে কথা পত্রস্থ করিতে কুন্ঠিত হন নাই ও আর একদল উপযুক্তই হইয়াছে বলিয়া বিবেক বুদ্ধির চরিতার্থ করিয়াছিলেন। উহা লইয়া সেখানে পরস্পর দলাদলি আরম্ভ হইল। ইহাই সেকালের কোম্পানির গূঢ় রাজনীতি। শ্রদ্ধেয় অক্ষয় কুমার মৈত্রের মীরকাশিমের নবাবী পদ লাভ সম্বন্ধে যে কয়টি কারণ উল্লেখ করিয়াছেন উহার সারাংশ সংক্ষেপে উল্লেখ ও কিঞ্চিৎ ইতিহাসের সহিত সমালোচনা না করিলে কলিকাতার উন্নতি ও পলাশি যুদ্ধের ফল সম্যক উপলব্ধি হইবে না।
সমালোচনাঃ— মীরকাশিম উপযুক্ত অবসরজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, ইংরাজেরা অনতিবিলম্বে অকর্ম্মন্য মীরজাফরকে পদচ্যুত করিয়া শাহাজাদাকে দিল্লীর সিংহাসনে বসাইয়া, তাঁহার ফারমানের দোহাই দিয়া অন্য কাহাকেও নাম মাত্র নবাব নিয়োগ করিবে ও নিজেরাই বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার নবাবী করিবেন। পূর্ব্বে তিনি পাটনার নবাবি পদ প্রার্থী হইয়া হলওয়ের শরণাপন্ন ও তাঁহার মূল্য নিরূপণ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার নিকট যখন শেষে এইকথা শুনিলেন যে, তাহারা তাঁহার শ্বশুরকে পদচ্যুত করিবে তখন তিনিই সেই পদ লাভের জন্য উদ্গ্রীব ও প্রার্থী হইলেন। মৈত্রেশ মহাশয় বলেন যে, ক্লাইবই মীরকাশিমের পদোন্নতির কারণ—তিনিই স্বদেশ যাত্রার সময় মীরকাশিমের উন্নতির জন্য অনুরোধ পত্র রাখিয়া গিয়াছিলেন, আর হলওয়েলের সহিত মীরকাশিমের যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয় তখন তিনি মেদিনীপুরের দিকে মহারাষ্ট্র সৈন্যের গতিরোধ করিতে গিয়াছিলেন। তৎকালে তিনি তাঁহার সহিত কথোপকথনে ইংরাজগণের গূঢ় অভিসন্ধি ভেদ করিয়া আপনার ভবিষ্যত উন্নতির পথ উদ্ভাবন করেন। মীরজাফর ও মীরকাশিম উভয়ের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যের মধ্যে বিলক্ষণ তারতম্য ছিল। মীরকাশিম মীরজাফরের ন্যায় নিজের স্বার্থের জন্য ইংরাজবণিকগণকে অর্থপাশে বদ্ধ করিয়া সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু উহার ভিতরে মীরকাশিমের মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। দিল্লীতে মোগল রাজশক্তির পুনরুদ্ধার করিয়া মুসলমান রাজত্ব অক্ষুণ্ণ রাখিয়া স্বদেশের শিল্প বাণিজ্য ও রাজশক্তি রক্ষা করিবার তখন ইংরাজগণের মধ্যে গৃহবিবাদ ও কলহেই মীরকাসিমের সিংহাসন প্রাপ্তির পথ সরল করিয়াছিল। তদ্ভিন্ন যাহা ভাবিয়া ইংরাজেরা সিরাজউদ্দৌলার পতন ও মীরজাফরকে সিংহাসনে বসাইয়াছিল উহার পরিণাম সম্পূর্ণ বিপরীত হইয়াছিল। মৈত্রেয় মহাশয় এইরূপ লিখিয়াছিলেন যে * “ইংরাজেরা ভাবিয়াছিলেন,—রাষ্ট্রবিপ্লবে ইংরাজের অবাধ বাণিজ্য সংস্থাপিত হইবে, ইংরাজ শক্তি দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইবে, ইংরাজের পদোন্নতির সূত্রপাত হইবে, বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যায় রামরাজ্য সুবিস্তৃত হইবে। মীরজাফর সিংহাসনে পদার্পণ করিতে না করিতে সে মোহনিদ্রা ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। ইংরাজেরা সহসা সুপ্তোত্থিতের ন্যায় চাহিয়া দেখিলেন নিয়ত সমর কোলাহল লিপ্ত হইয়া, ইংরাজের বাণিজ্য বিলক্ষণ ক্ষতিগ্রস্থ হইতেছে ইংরাজ শক্তি দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত না হইয়া অর্থাভাবে ইংরাজ কুঠি উঠিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে, ইংরাজের পদোন্নতির সূত্রপাত না হইয়া সর্ব্বনাশের সূত্রপাত হইয়াছে, বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যার রাম রাজ্য সুবিস্তৃত না হইয়া, অহিফেনাসক্ত বৃদ্ধ মীরজাফর ও তাঁহার কুক্রিয়াসক্ত অশান্ত পুত্র মীরণের শাসন কৌশলে দেশের মধ্যে হাহাকার ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে। তখন আত্মকার্য্যের পরিণাম চিন্তা করিয়া, অনেকেই শিহরিয়া উঠিয়াছিলেন যে কোন ছল ছুতায় ভ্রম সংশোধনের চেষ্টা করা প্রয়োজন হইয়া উঠিয়াছিল। সেনাপতি ক্লাইব নিজেও উহা আকার ইঙ্গিতে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষের কর্ণগোচর করাইয়াছিলেন। মীরজাফরের উপর অসন্তোষ যতই বর্দ্ধিত হইতে লাগিল, ততই মনে হইতে লাগিল মীরজাফরের অযোগ্যতাই অনর্থের মূল তাঁহাকে তাঁড়াইতে পারিলেই, শান্তি এবং কল্যাণ আসিয়াই যুগপৎ ইংরাজ বাণিজ্যের উন্নতি সাধন করিবে।” “ইংরাজেরা একটি ভ্রম অপনোদন করিবার আশায়, আর একটি ভ্রমে নিপতিত হইলেন। মোগল শাসন শক্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করাই তাঁহার প্রধান লক্ষ্য হইয়া উঠিল। তখন ভারতবর্ষের সকল প্রদেশেই রাষ্ট্রবিপ্লবের অভ্যুদয় হইয়াছে! দিল্লিশ্বরের শাসন ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হইৈয়া গিয়াছে! দাক্ষিণাত্যে, অযোধ্যায়, উত্তরে, দক্ষিণে, পূবের্ব, পশ্চিমে, সর্ব্বত্র বাহুবল ও ছল কৌশলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছে। এসময়ে বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যা হইতে ইউরোপীয় শক্তি নির্ম্মূল করিতে পারিলে, এদেশে যে মুশির্দাবাদের নবাব বংশের স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হইতে পারে, আলিবর্দ্দি উহা পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করিয়াছিলেন, সেকথা সিরাজউদ্দৌলাকে উত্তেজিত ও ইংরাজের সহিত কলহে লিপ্ত করিয়া সিংহাসন চ্যুত করিয়াছিল। পাত্র মিত্র অনুকূল থাকিলে, আলিবর্দ্দির আশা সফল করা যে অসম্ভব নহে এই বিশ্বাস মীরকাশিমকেও বিচলিত করিয়া তুলিল।” যাহাই হউক, মৈত্রেয় মহাশয়ের উক্তির সম্পূর্ণ সমর্থন করিতে পারা যায় না। কারণ মীরকাশিম বা তাহার প্রতিষ্ঠাতৃগণের কি মূল উদ্দেশ্য ছিল উহা তিনি একমাত্র কল্পনার চক্ষে দেখিয়াই নানা অলঙ্কারে উহা ভূষিক করিয়াছেন যে, তবে মূল সত্যকথা এই যে, কলিকাতার গুপ্ত সন্ধিতে কি মীরজাফর, কি মীরকাশিম, উভয়েই বাঙ্গালার নবাব হইয়াছিল এবং উহার জন্য ইংরাজকর্ম্মচারিগণ তখন যাহারা কলিকাতার কর্ত্তৃপক্ষ ছিলেন, তাহারা সকলেই আশাতীত অর্থলাভ করিয়াছিল। কোম্পানির তখন অর্থাভাব ছিল না ও তখনকার বিলাতের কোম্পানির অংশীদারগণের মধ্যে কেহই উহার জন্য এক কপর্দ্দকও লাভ করে নাই। উহাতে কেমন করিয়া শিক্ষিত ইংরাজজাতিকে বা সেকালের ইংরাজ স্বত্ত্বাধিকারিগণকে দোষী করা যাইতে পারে? অথচ মৈত্রেয় মহাশয় বিলাতের কোম্পানিয়ান অফ্ ইণ্ডিয়া উপাধি অলঙ্কারে ভূষিত!!! সেইখানেই কলিকাতার মাহাত্ম্য! মীরজাফরের কলিকাতায় বনবাস ও মুর্শিদাবাদে মীরকাশিমের সিংহাসন লাভ প্রহসন উপন্যাসের মত হইয়াছিল!!! কলিকাতা মুর্শিদাবাদের পরস্পর সম্বন্ধ সেইখানে বিরাজমান। মীরকাশিম আলির সিংহাসন প্রাপ্তির পর কলিকাতার দরবারে তাঁহার বিরুদ্ধে প্রথমে নানা অভিযোগ উপস্থিত হইয়াছিল কিন্তু অর্থের মোহিনী শক্তিতে ভান্সিটার্টের বিচারে মীরকাসিমের রাজশক্তি অব্যাহত হইল। কলিকাতা কাউন্সিলের উহা বিচার করিবার ক্ষমতা আর রহিল না। তিনি ব্যয় সংক্ষেপ ও আয় বৃদ্ধি করিয়া ইংরাজের ঋণ পরিশোধের জন্য তৎপর হইলেন। সুশাসন দ্বারা দেশ ও দশকে করায়ত্ত করা তাহার লক্ষ্য হইয়াছিল। সেইজন্য নিজের ভোগবিলাসিতা বিসর্জ্জন করিয়া ইংরাজের ঋণ পরিশোধ নগদ ও বর্দ্ধমান মেদিনীপুর চট্টগ্রাম ইংরাজগণকে ইজারাদি দিয়া মীমাংসা করিলেন। তখন আর ইংরাজেরা তাঁহাকে, যাহাতে অধমর্ণের চক্ষে না দেখেন তাহারই ব্যবস্থা করিলেন উহাতেই নবাবের পদমর্য্যাদি গৌরব রক্ষা করিলেন।
বিষময় ফল ঃ— মীরজাফরের সন্ধিতে চব্বিশ পরগণা ও মীরকাশিমের সন্ধিতে বর্দ্ধমান মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম ইংরাজদের হইল। ইহাতেই বোধ হয় কি মোগল সম্রাটের শক্তি সঞ্চয় করা হইয়াছিল? বলিহারি! উহাতেই বলিতে হয় যে, কলিকাতার সন্ধির জয় জয় কার!!! বিনাযুদ্ধে অর্থলাভ ও দেশের পরগণা সকল একে একে ইংরাজের হইতেছিল। চট্টগ্রাম একটি উত্তম বন্দর ছিল পর্ত্তুগীজেরা উহাকে প্রধান বন্দর বলিত। এমন করিয়া ব্যবসা করা পৃথিবীর মধ্যে অন্য কোন জাতি কখনও কোথাও করিতে পারে নাই। সেইখানেই বাঙ্গালার বিশেষত্ব, সেইখানেই মুসলমানী রাষ্ট্রনীতি কৌশলের পরীক্ষা, ঐতিহাসিক মৈত্রের মহাশয় উহার সহিত মীরকাশিমের প্রশংসা করিতে পারেন, কিন্তু উহা করা সকলের পক্ষে সম্ভবপর নহে বলিলেই যথেষ্ট হইবে।
ঐ সকল অকর্ম্মণ্য নবাবেরা ইংরাজ বণিকগণের কর্ম্মচারীদিগকে উৎকোচ অপরিমিত অর্থদান ও পরগণাদি দিয়া তাহাদিগকেই সর্ব্বতোভাবে বলবান করিয়া বাঙ্গালার ও বাঙ্গালীর অস্থিপঞ্জর চিরদিনের জন্য একেবারে ভাঙ্গিয়া দিয়াছিল ও নিজের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। তখন তাহাদের উপযুক্ত শিক্ষা দীক্ষা ছিল না বলিয়াই উহা হইয়াছিল ও ইংরাজগণ যাহারা এখানে বাণিজ্য করিতে আসিয়াছিল তাহাদেরও উহার সম্পূর্ণাভাব ছিল। তখন উহারা সকলে ধর্ম্মনীতি বিবেক বুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিয়া যাহা ইচ্ছা তাহাই করিত। বর্ত্তমান যুগে কোন যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তিই ঐ সকল ব্যক্তির পৌরুষ ও বীরত্বের বা কৌশলের প্রশংসা করিতে পারেন না। তখনও কলিকাতা ও বিলাতের সভায় উহা লইয়া দুই পক্ষের লোকের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলিত। এবং পরেও বিলাতের প্রসিদ্ধ পার্লিয়ামেন্ট সভায় মহামতি বার্ক শেরিডন প্রমুখ বাদানুবাদ করিয়াছিলেন।
হায়! বিধাতার শাঁপেই কলিকাতা বাঙ্গালার ও বাঙ্গালীর দুর্দ্দশার কেন্দ্রস্থল হইয়াছিল এবং বাঙ্গালীরা সেই ইংরাজ বণিকগণের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ হইয়া সর্ব্বত্রই উহাদের আন্তরিক সাহায্য করিত। মুসলমান নবাবগণ অকর্ম্মণ্য, স্বার্থপর ও অশিক্ষিত ছিল, আর বাঙ্গালার হিন্দু জমিদারগণও তদ্রূপ। উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষার অভাবে বাঙ্গালার ও বাঙ্গালীর শোচনীয় অবস্থা হইয়াছিল, কার্য্যতৎপর ইউরোপের বণিকবৃন্দর কর্ম্মচারিগণ স্বস্ব স্বার্থোন্নতির বশীভূত হইয়া স্বত্তাধিকারীগণের নিকট কৈফিয়তের দায় হইতে নিষৃকতি লাভের জন্য তৎকালীন বিদ্রোহী একপক্ষের সহায়তা করিয়া এদেশে তাহাদের ব্যবসার সুবিধা ও রাজ্যলাভ করিতেছিল। উহারই প্রধান অভিনয় স্থল কলিকাতা ও ইংরাজ কোম্পানির কর্ম্মকর্ত্তারাই উহার প্রধান নায়কের স্বরূপ ছিলেন।
অযথা কোন জাতির নিন্দা বা কোন মুসলমান নবাবের গুণগান করা গৌরবের কথা নয়। সত্য অতীত ঘটনা কতকাংশ ঐ অনুমান করিয়া লইতে হয় বটে, কিন্তু উহা পক্ষপাতশূন্য হইলেই ভাল হয়। কি ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানি বা অন্য কোম্পানির কর্ম্মচারীদের চরিত্র ও কীর্ত্তি লইয়া ইউরোপের জাতি বিশেষের উপর কোন কটাক্ষপাত করা যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না। ঐতিহাসিক সত্যানুসন্ধান করিবার জন্য যতদূর ন্যায্য সমালোচনা করা আবশ্যক উহাই করা কর্ত্তব্য। কলিকাতা ও সেখানকার অধিবাসিগণের অভ্যুদয়াদি বৃত্তান্ত যাহা ঐতিহাসিক ঘটনায় বিবৃত উহা দ্বারা অনেক কথা প্রকাশ হয়।
মীরকাশিমের দ্বারা কলিকাতার আয়তন বৃদ্ধি ও ইংরাজের চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বর্দ্ধমানাদি লাভ হইয়াছিল। তিনি কোম্পানির দাবী পরিশোধ করিয়াছিলেন সেজন্য যদি কোন ঐতিহাসিক ধন্যবাদ দান করেন তাহাতে ক্ষতি নাই কিন্তু তিনি যখন শ্বশুরের সিংহাসন উত্তরাধিকারীসূত্রে লাভ করিবার অবসর থাকিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া কলিকাতার ইংরাজ কর্ম্মচারীগণের পাপ উৎকোচ গ্রহণ প্রবৃত্তির অযথা প্রশ্রয় দিয়া রাজ্যলাভ করিয়াছিলেন, তখন তাঁহার যত গুণই থাক, সমস্তই নরকের অতল গর্ভে লুপ্ত হইয়াছে। প্রচলিত ঈশপের ভল্লুক ও পথিকের কথা বা কালিদাসের সসেমিরার গল্পের কথা মনে পড়ে।
সঃ— ‘স’দ্ভাব প্রতিপান্নানাং বঞ্চনে কা বিদগ্দতা অঙ্কমারুহ্য সুপ্তস্য হত্বা কিং নাম পৌরুষঃ।
সেঃ— ‘সে’তুবন্ধ সমুদ্রেচ গঙ্গাসাগর সঙ্গমে ব্রহ্মহা মুচ্যতে পাপী মিত্রদোহী ন মুঞ্চতি।
মিঃ— ‘মি’ত্র দ্রোহি কৃতঘ্নশ্চ যে নরা বিশ্বাসঘাতকা তে নরা নরকে যান্তি যাবচ্চন্দ্র দিবাকরৌ।
রাঃ— ‘রা’জহসি রাজপুত্রোহসি, যদি কল্যাণ মিচ্ছসি, দেহি দানং দ্বিজাতিভ্য দেবতারাধনং কুরু।
প্রাচীন আর্য্য পণ্ডিতেরগণের মতে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর বা মীরকাশিমের চিরন্তন নরকে ব্যবস্থাই হয়। তাহারা স্বর্গে বা মর্ত্তের নবাব ছিলেন না, নরকের উপর কর্ত্তৃত্ব করিয়া নবাবী করিয়াছেন। সত্য কথা বলিতে গেলে ইংরাজেরা পলাশি আদি যুদ্ধ জয়লাভ করিয়া তাহাদিগকে নবাব করিয়া পাপের প্রশ্রয় দিয়াছিলেন। ইহার জন্য ধর্ম্মতঃ কি মীরজাফর, কি মীরকাশিম, কি ইংরাজ, কাহাকেও ধর্ম্মপক্ষে প্রশংসা করা যায় না।
* বৈদ রাজা রাজবল্লভ মীরণের দেওয়ান আর কায়স্থ রাজবল্লভ ও তাহার পিতা রাজা দুর্ল্লভরাম
মীরজাফরের সর্ব্বনাশ করিতে না পারিয়া ক্লাইবের কৃপায় কলিকাতাশ্রয় শ্রেয় স্থির করিয়া
প্রাণরক্ষা করে।
* Baboo, an appellation, given to a rich native or to any one whom
we wish to show respect. It is the peculiar title of that nefarious
class of natives who lend money to the young writers. (Glossary in
Alexalder Fraser Tylers consideratios on the present political state
of India 1815.)
* ৺মতিলাল শীলের সম্পত্তি। + ঁযদুলাল মল্লিকের নিকট হইতে বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে
কোম্পানি খরিদ করিয়াছে।
* Bills are never discounted but by the house of Jagat Sett and
occasionally lend money in advance to landholders who are in arrear
of revenue one per cent a month as legal interest but exact as
much more under the name of Munafa, deducted from the principal
at the time of advance. Martin Vol. II. P. 1006.
* মীরকাশিম ৬৩ পৃষ্ঠায়
