১২. লর্ড ক্লাইব
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ – লর্ড ক্লাইব
ক্লাইব ইংলণ্ডে উপনীত হইলে পলাশী যুদ্ধের ফললাভ তাঁহার অভূতপূর্ব্ব সম্বর্দ্ধনায় ও লর্ড উপাধীতে হইয়াছিল। তিনি যদি তখন অবিবাহিত থাকিতেন, তাহা হইলে তাঁহার ভাগ্যে লর্ডের কন্যা লাভও অসম্ভব হইত না। ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে তিনি মাদ্রাজেই একবন্ধুর ভগ্নিকে বিবাহ করিয়াছিলেন ও কলিকাতার পলাশী যুদ্ধের পর পুত্রের মুখদর্শন করিয়া বিলাত যাত্রা করিয়াছিলেন। কলিকাতায় ক্লাইবের যথার্থ ধনেপুত্রে লক্ষ্মীলাভ হইয়াছিল। পাদরী কায়ারানাণ্ডরকে তিনি কলিকাতার পাদরী মনোনীত করিয়া রাখিয়াছিলেন ও তিনিই ১১ই নবেম্বর ১৭৫৯ সেই পুত্রকে খৃষ্টধর্ম্মে দীক্ষিত করেন। নবাব মীরজাফর উহার হিন্দুস্থানি মুসলনানি ধাত্রী নিযুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন। মিস্ ব্লিচিনডেন সেই শিশুর নিদ্রাকর্ষণের জন্য ধাত্রীরা যেরূপ গান গাহিত উহার উল্লেখ করিয়াছেন। উহাতে তখন যে, কোম্পানির নিশানের মর্যাদা ছত্রে ছত্রে কীর্ত্তিত হয়। বাঙ্গালায় ব্রিটিশ কেতন পলাশিযুদ্ধের ফলে উড্ডীন হইয়াছিল, উহাই যে সবর্বাপেক্ষা অধিক লাভ ইহা সামান্য ধাত্রীও হৃদয়ঙ্গম করিয়া সেই শিশুর কর্ণে উহার মর্ম্ম দ্বারা সুধাবর্ষণ করিত। সেই জন্য ব্রিটিশ রমণী সেই গীতির স্মৃতি রক্ষা করিয়াছেনঃ—
“দেখোমেরি জান, কোম্পানি নিশান বিবি গিয়ে দমদমা, উড়িছে নিশান
বড়া সাহেব, ছোটা সাহেব, বঙ্কাকাপ্তেন, দেখোমেরি জান লিয়াহৈ নিশান!”
ইহাতেই বোধ হয় যে, তখন কলিকাতার ক্লাইবের বাড়ীতে কোম্পানির নিশান উড়িত। শিক্ষিত ইংরাজগণ উহার মর্ম্ম সর্ব্বাপেক্ষা অধিক উপলব্ধি করিয়াছিল। পলাশিযুদ্ধের গ্রাম্যগীতিতে উহা পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে উহাতেও এদেশীয় গ্রাম্যলোকেরা কোম্পানির নিশান পলাশির ময়দানে উড়িবার মর্ম্ম বুঝিয়াছিল। কলিকাতায় ক্লাইবের সম্বর্দ্ধনার যে কিছু ত্রুটি হইয়াছিল, উহার সুদের সুদ সহিত ইংলণ্ডে আদায় হইয়াছিল। কোম্পানির অংশীদারগণ মহাসভা ভোজ দ্বারা তাঁহার অসামান্য কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা ও ইংলণ্ডের রাজা তাঁহাকে ‘লর্ড’ উপাধি ও মন্ত্রীবর পিট তাঁহাকে সগর্ব্বে “স্বর্গসম্ভূত যোদ্ধা’ বলিয়া গুণগান কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। কিন্তু হায়! তাহাতেও তাঁহার দুঃখ হইয়াছিল যে, তিনি গরীবের সন্তান সামান্য কেরানিগিরির জন্য এদেশে আসিয়াছিলেন, সেইজন্য নৃতাদি শিক্ষা করিবার অবসর বা সুযোগ হয় নাই। যদিও সে দুঃখ ভবিষ্যতে দূর হইয়াছিল তদ্ভিন্ন তাঁহার আর এক দুঃখ হইয়াছিল যে, তিনি ইংলণ্ডের অভিজাত্য গৌরব লর্ড উপাধি লাভ করিতে পারিলেন না, তিনি আইরিস লর্ডই হইয়াছিলেন। তিনি বেশভূষার আড়ম্বর প্রিয় ছিলেন ও তখন তাঁহার পারিপাট্যের প্রতি বিলাতের সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। তখন তিনি একজন বিলাতের ধনীগণের মধ্যে গণনীয় হইয়াছিলেন। বিলাতেও পলাশিযুদ্ধের বিজয়োৎসব হইয়াছিল। মুর্শিদাবাদ কিম্বা কলিকাতার সহিত উহার তুলনা নাই। ক্লাইব ২৪এ জুন যুদ্ধ জয়লাভ করিয়া তখনই প্রাণের ভয়েই রাজধানী মুর্শিদাবাদে গমন করিতে পারে পারেন নাই। ২৬এ জুন সৈয়দাবাদে তাঁবু ফেলিয়া মুর্শিদাবাদে ধনভাণ্ডর রক্ষার জন্য আয়োজন করিবার সময় যাহাতে তিনি ২৭-এ জুন পূর্ব্বকথানুসারে তথায় আগমন না করেন সেইজন্য একপত্র গিয়াছিল। নবাবের ধনরত্ন সমস্তই গুপ্তভাবে গরুর গাড়ীতে প্রেরিত হইয়াছে ও আপনি যখন নবাবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিবেন, তখন আপনাকে হত্যা করা হইবে গতরাত্রে মীরণ, মীরকাশিম ও রায়দুর্ল্লভ এইরূপ চক্রান্ত করিয়াছে। ইহাতেই ক্লাইব ভীত হইয়া সেই সংকল্প ত্যাগ করেন ও মুর্শিদাবাদে সে দিবস গমন করেন নাই। সেই সুযোগে তখন ধনভাণ্ডারের অধিকাংশ বহুমূল্য ধনরত্নাদি নবাব ও মণিবেগম হস্তগত করেন এবং রায়দুর্ল্লভই উহার সহায়তা করেন। উহার সারমর্ম্ম ক্লাইব স্বয়ং শেষে বুঝিয়া লিখিয়াছিলেন। কথাইত আছে “চোর পালাইলে বুদ্ধি বাড়ে” ক্লাইবের তাহাই হয়। মুর্শিদাবাদের কোষাগারে কত টাকা থাকিতে পারে আনুমাণিক সিদ্ধান্ত পলাশির যুদ্ধের পূর্ব্ব হইতেই ইংরাজেরা অনুসন্ধান করিতেছিল ও ঐ সম্বন্ধে ডাক্তার ভোর্থ ১১ই ডিসেম্বর ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে ফলতার কর্ত্তৃপক্ষগণকে ষাট ক্রোর, পরে ওয়াট সাহেব ক্লাইবকে চল্লিশ ক্রোর জানাইয়াছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে উহাই শেষে একক্রোর চল্লিশ লক্ষে পরিণত হইয়াছিল। *
পলাশি যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই মীরজাফর ও তাঁহার পুত্র মুর্শিদাবাদের ধনভাণ্ডার যাহাতে পলাতক নবাব সিরাজউদ্দৌলার হস্তগত না হয়, সেইজন্য তাঁহারা দুই প্রাসাদ মুনসরগঞ্জ ও জাফরগঞ্জ অধিকার করিয়াছিল। সেই নবাবের ধনরত্ন মীরজাফর হস্তগত করিয়া রক্ষা করিবার জন্য চতুর ক্লাইব ও তাঁহার সহচরগণকে পূর্ব্বোক্ত প্রভুতার্থ উৎকোচদান করিয়া তৎসম্বন্ধে কোন কথা আর উত্তোলন করিবার উপযুক্ত অবসর প্রদান করেন নাই অর্থাৎ তদ্দ্বারা তাহাদের মুখ বন্ধ করিয়াছিলেন। পলাশি যুদ্ধের সময় ক্লাইবের বিদ্যাবুদ্ধি ও বীরত্বের পরিচয় এইরূপ পাওয়া যায়। উহার সহিত তাঁহার কলিকাতার সন্ধির তুলনা করিলে কলিকাতার স্থান মাহাত্ম্যই সর্ব্বাপেক্ষা শীর্ষস্থান অধিকার করে। ক্লাইব সাক্ষ্যদানকালে ২৯শে জুন প্রাতঃকালে দুইশত গোরা ও তিনশত সিপাই লইয়া কিরূপ মনের অবস্থায় মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন তাহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। তখন তাঁহার অন্তঃকরণ যে ভয়ে কাঁপিতেছিল বলিয়া বোধ হয়। কারণ তিনি বলিয়াছিলেন যে, আমরা যখন মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করি তখন আমাদের চারিদিকে যে লক্ষ লক্ষ দর্শকবৃন্দ উপস্থিত তাহারা মনে করিলে লাঠি ও ঢিল দিয়া সমস্ত ইউরোপ বাসিকে মারিয়া ফেলিতে পারিত। পলাশি ক্ষেত্রের ইংরাজ মহাবীর কিরূপ সাহসী ও কি ভাবে মুসলমান রাজধানীতে প্রবেশ ও দর্শকবৃন্দের ভাব গতিক দেখিয়া তাঁহার মনে যে আশঙ্কা হয় ও উহা কিরূপ বর্দ্ধিত হইয়াছিল উহাতে স্পষ্টই অনুমান হয়। যাহাই হউক, ক্লাইবের ইংলণ্ডের সম্বর্দ্ধনার সহিত মুর্শিদাবাদের জয় যাত্রার বিবরণের সমালোচনা অতিশয় কৌতুকাবহ।
এইরূপে কলিকাতার উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারীগণ যোদ্ধা ও ধনশালী হইয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও ইংরাজ জাতির গৌরব বৃদ্ধি করেন ও এদেশে দুর্ভিক্ষ ও অরাজকতা উপস্থিত করিয়াছিল। সেই ক্লাইবের উদাহরণে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারিগণকে বিপথগামী করে ও উহাতেই মীরজাফর রাজ্যচ্যুত ও মীরকাশিম নবাব হইয়াছিল।’ কলিকাতা, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অল্পবেতনভোগী উচ্চ কর্ম্মচারিগণের লীলাক্ষেত্র ক্রমশঃ উহাতেই উহার উন্নতি হইতেছিল। সেইজন্য ইংরাজ কর্ম্মচারীরা সফলেই প্রাণপণে অর্থ লাভের জন্য ব্যস্ত। তখনকার ইংরাজ কর্ম্মচারিরা হিন্দুর দেবদেবীর পূজা অতি সমারোহে আপনাদের অধীন কর্ম্মচারিগণ দ্বারা সম্পন্ন করাইত ও উহাতে দেশী সিপাইরা আনন্দে যোগদান করিত। সেই হইতে ‘বোম কালী কলকত্তা ওয়ালী’ বলিয়া বোম আতস বাজী ছোড়া হইত। উহাতে খড়ো ঘরাদি জ্বলিয়া যাওয়ায় বাজি ছোড়া সেই সময় হইতে বন্ধ হইয়া যায়। কলিকাতায় শোভাযাত্রা শুভাগমনকালে কালীঘাটে অতি সমারোহে মহামায়ির পূজা বলিদানাদি হইয়াছিল এবং মীরজাফরও সিংহাসনচ্যুত হইলে আলিপুরে থাকিয়া সিংহাসন প্রাপ্তির জন্য কালিমাতার পূজা ও বলিদান করিয়াছিলেন, শোনা যায়। সেকালে এদেশের কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণের বিরুদ্ধে কথা কহিবার লোক এক মহারাজ নন্দকুমার ভিন্ন আর কেহই ছিল না বলিলে অত্যুক্তি হয় না। কেবল উচ্চ কর্ম্মচারিগণের মধ্যে পরস্পর বিবাদ হইলেই বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষ দু একটি বিষয় জানিতে পারিতেন ও উহার প্রতিকারের নিমিত্ত যত্নবান হইতেন। তখনই এখানকার কর্ম্মচারিরা পূর্ব্ব বৈরকৃত অপরাধের পরিণাম হৃদয়ঙ্গম করিয়া শেষে পরস্পর এক হইয়া যাইত। উহাতেই শেষে বিলাতের প্রতিকারের হুকুম কার্য্যকরী হইত না এবং এদেশের অসহায় প্রজারা উৎপীড়িত হইত। তাহাদের প্রতিকারের উপায় নাই বলিয়া ভগবানের মুখপানে চাহিয়া নীরবে সকল অত্যাচার সহ্য করিতে হইত।
রাজমহল ঃ— তখন মীরকাশিম যে কোন প্রকারে অর্থ সংগ্রহ করিয়া কলিকাতার ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মহাপ্রভুগণের উদর পূরণ করিয়া মুর্শিদাবাদে হইতে দূরে নিরাপদ স্থানে সিংহাসনে বসিয়া রাজত্ব করিবার জন্য ব্যবস্থা করিতেছিলেন। * হুসেন সার আমলে মুঙ্গেরের দুর্গ নির্ম্মিত হইয়াছিল ও মোগলেরা বাঙ্গালা জয়লাভ করিলে রাজা মানসিংহ রাজমহলে থাকিবার জন্য এক যে প্রাসাদ করেন, উহা হইতেই উহার নাম রাজমহল হইয়াছিল। পরে ঔরঙ্গজেবের ভ্রাতা সুজা শাহের সময় তিনি ঐ স্থানের শ্রীবৃদ্ধি করিয়া উহার নাম আকবর নগর করিয়াছিলেন। সেইখানে মীরকাসিমের একটি প্রসাদ ও উধূর নালা পর্য্যন্ত দুর্গাদি প্রস্তুত এবং উধূর নালা ও পীর পাহাড়ে দুই ইষ্টকসেতুও নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। কিন্তু হায়! তাঁহাকে আর উহা ভোগ করিতে হয় নাই। যে বিষবৃক্ষ মীরজাফর বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন মীরকাশিম উহারই মূলে জল সেচন করিয়া শ্বশুরের ন্যায় সিংহাসনচ্যুত হন। তিনি নিজের ক্ষমতার বলাবল বিবেচনা না করিয়া অসময়ে মূর্খের মতন ইংরাজগণের বিরুদ্ধে গমন করিয়া পথের ভিখারি হইয়াছিলেন। মীরকাশিমই ইংরাজের রাজত্ব ও ব্যবসা করিবার পথ সরল করিয়াছিলেন।
মীরকাশিম প্রদত্ত অর্থে হলওয়েল কোম্পানির কর্ম্মত্যাগ করিয়া কলিকাতার অধিবাসি হইয়াছিলেন। মীরকাশিম কলিকাতার উচ্চ কর্ম্মচারিগণের উদর পূরণ করিবার জন্য অর্থসংগ্রহ করিয়াছিলেন। সে সম্বন্ধে ঐতিহাসিক গোলাম হোসেম বলেন যে, মীরকাশিম কবি সাদির উপদেশানুবর্ত্তী সকলের নিকট কিঞ্চিৎ লইয়া নিজের ভাণ্ডার পূর্ণ করিয়াছিলেন। মৈত্রেয় মহাশয় বলেন যে, “অর্থসংগ্রহের জন্য কাসিম আলি যে সকল নূতন উপায় অবলম্বন করিলেন, তাহা কাহারও বিস্ময়োৎপাদন করিল না। নূতন নবাবের আদেশে মোগল রাজপ্রাসাদের ইতিহাস বিশ্রুত বিলাস তরঙ্গ সহসা তিরোহিত হইয়া গেল নৃত্য গীত অর্দ্ধপথে স্তম্ভিত পদে অবসন্ন হইয়া পড়িল, হাস্য কৌতুক রাজপ্রাসাদ হইতে শসম্ভ্রমে বহু দূরে দণ্ডায়মান হইল। ঐশ্বর্য্যছটা অপসারিত হইয়া গেল অমনি ও দাসদাসীর সংখ্যা ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া উঠিল, যাহা না থাকিলে সংসারে চলে না, কেবল তাহাই রহিল। অন্যান্য সকল বিষয়েই ব্যয় সংক্ষেপ করিয়া অর্থসংগ্রহের ব্যবস্থা হইয়া গেল।” * কিন্তু তদ্বিরুদ্ধে নবাবী আমলের ইতিহাসকর লিখিয়াছেন যে “নবাব সরকারের ভূতপূর্ব্ব কর্ম্মচারিগণের আর্থিক অবস্থা ও তাঁহার সবিশেষ পরিজ্ঞাত ছিল। যথেষ্ট উৎপীড়ন করিয়া এইরূপ অনেকের নিকট অর্থ সংগৃহীত হইতে লাগিল। পূর্ব্বতন নবাবগণের দাসদাসীবর্গও নবাবের অশ্রুত পূর্ব্ব অর্থদোহনের যন্ত্র হইতে পরিত্রাণ পাইল না। নবাব নাগরিকগণের সম্পত্তি যথেচ্ছ আত্মসাৎ করিলেন। নগরে হাহাকার উঠিল! বলবতী অর্থ পিপাসা ক্রমে তাঁহাকে বিপথগামী করিয়া তুলিয়াছিল। যাহা হউক, এইরূপে এবং জমিদারবর্গের নিকট নজর প্রভৃতিতে যথাসম্ভব অর্থসংগ্রহ করিয়া মিরকাশিম সত্বরই মুর্শিদাবাদস্থ সেনাদলের বাকী বেতনের অধিকাংশ শোধ করিয়া তাহাদিগকে সন্তুষ্ট করিলেন।” “অর্থসঞ্চয় উদ্দেশ্য তাঁহার উৎপীড়নে বঙ্গ বেহারের বহুতর সম্ভ্রান্ত পরিবারের দুর্দ্দশার একশেষ হইয়াছিল।” মোগল আমলে তোডর মল্লের কৃপায় বঙ্গের রাজস্বাদায় এক কোটি সাত লক্ষ ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে এক কোটি পয়তাল্লিশ লক্ষ ছিল মীরকাশিমের সময় ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে দুই কোটি ছাপান্ন লক্ষ টাকার অধিক রাজস্ব ধার্য্য হইয়াছিল। সুতরাং কেমন করিয়া মীরকাশিম লেখকের কথা অনুমোদন করা যায়। বাঙ্গালার বেগম লেখক মীরকাসিমের চরিত্র ও অর্থ লাভের সম্বন্ধে আরও যাহা বলিয়াছেন উহা তদপেক্ষা অধিকতর সুন্দর “মীরকাশিম ভয় প্রদর্শন করিয়া লুৎফুন্নিসার বহু মূল্য অলঙ্কার ও যাবতীয় ধনরত্নাদি কাড়িয়া লইলেন। মীরকাশিমের এই লুণ্ঠন কলঙ্ক তাঁহার জীবনকে চির কলঙ্কিত করিয়া রাখিবে।”
সতীঃ— সেই সিরাজ প্রণয়িনী লুৎফন্নিসা জীবনের অবশিষ্টাংশ স্বামীর সমাধি প্রতিদিন কুসুমদামের সহিত অশ্রু বিসর্জ্জনে সিক্ত ও সন্ধ্যায় দীপমালায় উজ্জ্বল করিতেন। সিরাজের হত্যার পর অন্যান্য বেগমের ন্যায় তাঁহাকে কাহারও আশ্রয় গ্রহণ করিবার প্রস্তাবে মীরকাশিমকে সগর্ব্বে তিনি প্রত্যাখান করায় তাঁহাকে ঢাকায় নির্ব্বাসিত হইতে হয় ও পরে কলিকাতার কর্ম্মচারিগণের দয়ায় মাসিক বৃত্তি লাভ করিয়া উক্ত স্বামীর সমাধিতে চিরাভ্যস্ত আত্ম নিবেদন করিবার সময় তাহার দেহ শৃঙ্খল হইতে প্রাণবায়ু বহির্গত হইয়া স্বামীর অন্তরাত্মা আলিঙ্গন করে। তাঁহার সেই সগর্ব্ব প্রত্যাখ্যান ইতিহাসের অঙ্কে স্থান পাইয়াছে, যে হস্তী পৃষ্ঠে আরোহন করিয়াছে সে কি কখন গর্দ্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করিতে চায়? সত্য সত্যই সিরাজউদ্দৌলা যদি উচ্ছৃঙ্খল ব্যাভিচারী হইতেন তবে কি কখন তাঁহার প্রেমে লুৎফুন্নিসা মুগ্ধ হইত না, তাঁহার অবর্ত্তমানে জীবনোৎসর্গ করিয়া স্বামীর সমাধি পূজা ইহজীবনের সুখ ও ঐশ্বর্য মনে করিত? * ধন্য সেই রমণি! ধন্য তাঁহার পতি!
মীরকাশিম কখন মুঙ্গের, কখন রাজমহলে, কখন মুর্শিদাবাদে থাকিয়া সৈন্য সামন্তকে সমরু মারকার প্রভতি সেনাপতির অধীনে শিক্ষাদান করিতে ছিলেন। ক্লাইব যেমন কলিকাতায় সৈন্যদল প্রস্তুত করেন তদনুকরণে মীরকাশিম আপনার সিংহাসন নিরাপদ নয় এই ভাবিয়াই সৈন্যসামন্ত প্রস্তুত করিয়াছিলেন। মীরকাশিমের অন্যায় রাজস্ববৃদ্ধির জন্য বাঙ্গালায় চারিদিকে বিদ্রোহানল প্রজ্জ্বলিত হইয়াছিল। মীরকাশিমই বাঙ্গালার জমিদারগণের আদ্য শ্রাদ্ধ করিয়াছিলেন। সেই নিঃস্ব জমিদারগণের শাঁপে মীরকাশিমকে রাজত্ব হারাইয়া ফকির হইয়া ভিক্ষা পর্য্যন্ত করিয়া গোপনে জীবন যাপন করিতে হইয়াছিল। সেই ব্যক্তির সুখ্যাতি করিবার কি আছে? বিদ্রোহ জন্য অর্থের আবশ্যক রাজস্ব বৃদ্ধি করিবার পর শুল্কদায়ে বণিকের সর্ব্বনাশ করিবার মনস্থ করিবার ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণের বিষনয়নে পড়িলেন। পূর্ব্বে কলিকাতার সভায় নবাবের বিরুদ্ধে অভিযোগের অভাব হয় নাই, কিন্তু ভাসিটার্টের কৃপায় তখন উহার কিছুই হয় নাই। উহাতেই মূর্খ মীরকাশিম যেমন মাত্রা বাড়াইয়া কার্য্য করিতে আরম্ভ করিলেন অমনি তাঁহারা সুর বদলাইলেন।
লবণঃ— মোগল সম্রাটগণের আমল হইতেই বাঙ্গালায় লবণের ব্যবসারম্ভ হইয়াছিল ও উহা বড়ই লাভের ব্যবসা ছিল। মীরকাশিম ভাবিয়াছিলেন যে, কলিকাতার উচ্চ কর্ম্মচারিগণের মুখ অর্থদ্বারা বন্ধ করিয়া রাজত্বের আয়ে স্বয়ং রাজত্ব ও সুখসম্ভোগ করিবেন। প্রসিদ্ধ তত্ত্বানুসন্ধানকারক মার্টিন সাহেব রাজমহলের মীরকাশিম নির্ম্মিত গৃহাট্টালিকা দেখিয়া সেই উদ্দেশ্যে নির্ম্মিত হইয়াছিল অনুভব করা অযৌক্তিক নয়, বলিয়াছেন। মীরকাশিম কলিকাতার ইংরাজী দপ্তরে কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের অত্যাচার রহিত করিবার জন্য যথারীতি আবেদন ও যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য্য হইলেন। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মকর্ত্তারা নিয়োগ কর্ত্তাদের স্বার্থের জন্য যদি ঐরূপ ব্যবহার করিতেন, তাহা হইলে তাঁহাদের বিশেষ কিছু দোষ হইত না, কিন্তু তাঁহারা স্ব স্ব উদর পূরণ করিবার নিমিত্ত এদেশের সমুদায় অন্তর্বাণিজ্য করায়ত্ত করিয়া লন ও দেশীয় বাণিকগণকে যাবতীয় পণ্য দ্রব্য অধিক মূল্যে ক্রয় ও অল্প মূল্যে বিক্রয় করিতে বাধ্য করেন এতদ্ভিন্ন লবণের কারবার একচেটিয়া করিয়া লন। উহাতে রাজ্যে প্রজার সর্ব্বনাশ হইতেছিল। দস্তক ছাড়ের অপব্যবহারে ক্রমশই নবাবের শুল্ক হ্রাস হইতেছিল। এইরূপে নিতান্ত বিরক্ত হইয়া মীরকাশিম শেষে অগত্যা বাঙ্গালায় কাহারও নিকট শুল্ক গ্রহণ করিবেন না হুকুম জারি করেন ও উহাতেই ইংরাজ বণিকগণ বিচলিত হইলেন, কলিকাতার মন্ত্রণাগারে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইল ও যুদ্ধ ভিন্ন মীরকাশিমকে বশীভূত করা যাইবে না। কলিকাতায় ১৭৬২ খৃষ্টাব্দের মহামারিতে পঞ্চাশ হাজার লোক মারা যায়। সেই উদাহরণাবলম্বন করিয়া যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জ্জন করা শ্রেয়ঃ সঙ্কল্প করেন ২৫শে জুন ১৭৬৩ এলিস ** নামে কলিকাতাধিকারের সময়ের একজন নামজাদা যোদ্ধা হঠাৎ পাটনার দুর্গাধিকার ও লুট পাট আরম্ভ করিলেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন যে, ইহাতেই মীরকাসিমের চৈতন্যোদয় হইবে বা জব চার্ণকের পদানুসরণের পক্ষপাতী বা যশ লুব্ধ হইয়া ঐরূপ করিয়া থাকিবেন। অন্য কর্ম্মচারীরা তখন নবাবের সহিত মীমাংসা করিতে গিয়াছিল উহা শেষ না হইতে হইতে ঐরূপ কার্য্য করিতে কলিকাতার কর্ত্তৃপক্ষগণ কোন ইঙ্গিত পর্য্যন্তও করেন নাই। এলিসই যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন।
যুদ্ধঃ— তখন ইংরাজদের বিখ্যাত সেনাপতি ক্লাইব বা তাঁহার সহচরগণ সকলেই বিলাতে ছিলেন, অতএব ইংরাজগণকে পরাজিত করা সহজ মনে করিয়া নবাব অথবা তাঁহার সেনাপতি মার্কারকে পাটনায় পাঠাইলেন ও সমরুকে বক্সারে থাকিয়া ইংরাজের সর্ব্বতোভাবে সর্ব্বনাশ করিতে বলিলেন। যুদ্ধ করিলে পলাশিযুদ্ধের ফল কি হইত ইহাই যেন মীরকাশিম ইংরাজগণকে পরিষ্কার হৃদয়ঙ্গম করাইবার নিমিত্ত যুদ্ধ করিলেন ২৯শে জুন ইংরাজগণকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করিলেন। ইংরাজগণকে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে হইল। সেই যুদ্ধে ভীষণ হত্যাকাণ্ড হইয়াছিল এলিসকে সকলের সঙ্গে উহার ফলভোগ করিতে হইয়াছিল। কিন্তু ভগবান মুসলমানের রাজত্বপেক্ষা ইংরাজের রাজত্বের পক্ষপাতী সেই যুদ্ধের পর ১৯এ জুলাই ঘেরিয়ার যুদ্ধে মেজর জন আডমস্ ইংরাজের রণ নৈপুণ্য দেখাইয়া মীরকাশিমের সৈন্যসামন্ত দুর্গ বিধ্বস্ত করিলেন। নবাব ৬ই নবেম্বর উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অযোধ্যায় পলায়ন করিলেন। হায়! আডমসের ভাগ্যে ক্লাইবের মত পুরষ্কার লাভ হইল না। ২৩এ অক্টোবর ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দের বক্সারের যুদ্ধে ইংরাজের চূড়ান্ত জয়লাভ হইল।
বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষ এই সকল সংবাদে বিচলিত হইয়া ক্লাইবকে কলিকাতার গবর্ণর মনোনীত করিয়া পাঠান ও তিনি ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দের মে মাসে কলিকাতায় উপস্থিত হন। তখন ইংরাজেরা ফায়জাবাদ লক্ষনৌ আদি অধিকার করিয়া যথার্থই রাজ্যারম্ভ করিয়াছেন। এই সকল ঘটনাতেই ক্লাইবের কলিকাতার গবর্ণর হইয়া আসিতে হইয়াছিল। সেই সময়ের কিঞ্চিৎ ইতিহাসের কথা সংক্ষেপে সন্নিবেশিত করিতে হইল ও উহার অভিনেতৃগণের কিঞ্চিৎ পরিচয়ের সহিত সমালোচনা না করিলে উহা সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারা যায় না।
কলিকাতার ইংরাজ কর্ম্মচারীরা ক্লাইবের শুভাগমনে সন্তুষ্ট হন নাই ও তাঁহার শুভাগমন ও ভাগ্যোন্নতির জন্য কলিকাতায় তাঁহাকে বিশেষ কোনরূপ সম্মান প্রদর্শন করেন নাই। তিনি যে তখন একজন বিলাতের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পারিসে নৃত্যকলা বিলাস বিভব ভোগ করিয়া আসিয়াছেন কেহই তাঁহার অভ্যর্থনাদি দ্বারা নয়নগোচর করেন নাই, ইহা বড় দুঃখের বিষয়।
পরশমণিঃ— ক্লাইবের সহিত কলিকাতার যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল না একথা বলিতে পারা যায় কারণ তাঁহার সময় হইতে কলিকাতার সন্ধিতেই মুর্শিদাবাদের সিংহাসন অধিকার আরম্ভ হইয়াছিল। তাঁহার অবর্ত্তমানে মীরকাশিম ও মীরজাফর সেইরূপে সিংহাসন লাভ করিয়াছিল। সেই কলিকাতার দ্বিতীয় সন্ধি যাহা দ্বারা মীরজাফর তাঁহার হৃত রাজ্য জামাতার করকবল হইতে উদ্ধার করিয়াছিল উহার মধ্যে এমন কিছু বিশেষ সর্ত্ত ছিল যে, যাহার জন্য ক্লাইবের শুভাগমন কলিকাতায় আবশ্যক হইয়া পড়ে। ১০ই জুলাই ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে উক্ত দ্বিতীয় সন্ধিপত্র যাহা উভয় পক্ষের স্বাক্ষর কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গে হইয়াছিল উহার মুখবন্ধেই বৃদ্ধ মীরজাফরের যে মৃদু গম্ভীর ন্যায্য তিরস্কারানুরোধ ছিল, উহাতেই ক্লাইবের কলিকাতাগমনের মূল কারণ বলিলেও বলা যায়। উহার সারমর্ম্ম এই যে, সন্ধির অনুমোদন বিলাতের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও রাজার নিকট হইতে আনাইয়া দিতে হইবে কারণ আর যাহাতে ভবিষ্যতে সন্ধিভঙ্গ না হয় উহার ব্যবস্থা থাকা উচিত। ইংরাজ কোম্পানি সেই সন্ধি অনুসারে মীরজাফরকে বাধ্য করিয়া তাঁহার সহিত মীরকাশিমের বিরুদ্ধে কলিকাতা হইতে যুদ্ধ যাত্রা করিয়াছিলেন। পলাশি যুদ্ধের জগৎশেঠাদি সকলেই মীরকাশিমের অনুগ্রহে ইহজগৎ হইতে তখন অবসর গ্রহণ করিয়াছিল বা কারারুদ্ধ ছিল। তখন “লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন”, নবাব মীরজাফরের পশ্চাৎ গমন অর্থাৎ সেই যুদ্ধের অর্থ সরবরাহ করিয়াছিল। আরও খোজা পিদ্রু, দুর্ল্লভরাম ও নন্দকুমার সঙ্গে ছিল বর্দ্ধমানের জমিদার রাজা মীরজাফরের বন্ধু ছিলেন ও সেইখান হইতে অর্থ খাদ্যরসদাদি লইয়া একদল ইংরাজ সেনা লেফ্টেনেন্ট গ্লেনের অধীনে নবাবের সৈন্যের বাধা অতিক্রম করিয়া মেজর আডামসের যুদ্ধে সহায়তা করিয়াছিল। মীরজাফরই মীরকাশিমের পতনের মূল কারণ। তাঁহার পক্ষে মুসলমান ও জমিদারগণ সানন্দে যোগদান করিয়াছিলেন। কারণ তাহারা সকলেই মীরকাশিমের অর্থ শোষণে উদ্বাস্তু হইয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলার শ্বশুর মুর্শিদাবাদের সকলকেই আলিবর্দ্দির স্বপক্ষে আনিয়াছিলেন। তখন মীরকাশিম সকলের ধনাপহরণ করিয়াছিল। খোজা পিদ্রুর জন্য গুর্গিন খাঁ যুদ্ধক্ষেত্রে আসেন নাই ও মীরজাফরের অধীনস্থ সৈন্যগণ মীরকাসেমের অধীনে হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাহারা মীরজাফরের লবণ মর্য্যাদা ও মীরকাশিম অপেক্ষা তাঁহার অধীনে কর্ম্ম অধিকতর সুখের ছিল উহা বিস্মৃত হন নাই *** । উহাতেই মীরজাফর ২৩এ জুলাই দ্বিতীয় বার ইংরাজ কর্ত্তৃক মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। তিনি তখন আর অশুভ সিরাজের মন্সুরগঞ্জ প্রাসাদে বাস করেন নাই আলিবর্দ্দির ভবনেই বাস করা মঙ্গলকর স্থির করিয়াছিলেন। কলিকাতার প্রথম সন্ধিতে সিরাজউদ্দৌলার বলিদান, দ্বিতীয়ে মীরজাফরের সিংহাসনচ্যুতি ও তৃতীয়ে জামাতা মীরকাশিমের সর্ব্বনাশ সাধিত হইয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভারতবর্ষে দৃঢ়তর হইয়াছিল। সেইজন্য বলিতে হয় কলিকাতাই ব্রিটিশ জাতির অর্থ সাম্রাজ্য লাভের পরশমণি। বৃদ্ধ মীরজাফরের মনস্কামনা সিদ্ধ হইল বটে, কিন্তু তাঁহার সহিত ক্লাইবের আর সাক্ষাৎ হয় নাই। তিনি ক্লাইবের কলিকাতাগমনের কয়েক মাস পূর্ব্বেই ব্রাহ্মণ নন্দকুমারের সৎপরামর্শে হিন্দুর আরাধ্যদেবী কিরীটেশ্বরীর চরণোদক পান করিয়া ঋণ জাল ক্লীষ্ট মুকুট ও রাজ দায় মুক্ত হইয়া ইহলীলা সাঙ্গ করিয়াছিলেন। উধূয়নালার যুদ্ধে জয়লাভ যে পলাশি যুদ্ধাপেক্ষা গৌরবের ছিল, অনেকেই উল্লেখ করিতে পারেন তবে খোজা পিদ্রু ঐ যুদ্ধের কি সহায়তা করিয়াছিল উহা তাহার আবেদনে * কলিকাতার দপ্তরের কাগজে প্রকাশ হয়। তিনি মেজর আডামের অনুরোধে মীরকাশিমের মার্কান ও বীর আরাটুন প্রমুখ দুই আরমেনিয়ান সেনাপতিকে স্বজাতির উপকারের নিমিত্ত তাহারা যাহাতে ইংরাজের বিরুদ্ধে কিছু না করেন, সেজন্য কর্ত্তব্য বৃদ্ধি ও বিবেকের আশ্রয় গ্রহণ করিবার উপদেশ দিয়াছিলেন। গুর্গিন খাঁ পিদ্রুর ভ্রাতা তাঁহাকেও তিনি পত্র দান করিয়াছিলেন ও উহাতেই সেই গুর্গিন খাঁর শবদেহ নিশাযোগে নবাবের আদেশে সমাহিত হইবার কথা মুতাক্ষরীণকার উল্লেখ করিয়াছেন। অনুবাদক মুস্তাফা উহার টীকায় হত্যাই সম্ভব বলিয়াছেন।
নৃশংসা হত্যাঃ— পাটনার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংবাদ একমাত্র ডাক্তার ফুলার্টন কলিকাতায় আনিয়াছিলেন উহাতে কলিকাতায় * হুলস্থূল পড়িয়াছিল। সেখানে ইংরাজ রীত্যানুসারে এক মিনিটান্তর তোপধ্বনি উপবাস প্রার্থনাদি কোন অনুষ্ঠানেরই ত্রুটি হয় নাই। যিনি মীরকাশিমকে ধৃত করিয়া দিবেন তাঁহাকে লক্ষ মুদ্রা পারিতোষিক ও তাহার প্রতি যথাসাধ্য অনুগ্রহ দর্শন করা হইবে ঘোষণা করা হয় কিন্তু, বোধহয়, কোম্পানি উমিচাঁদের সহিত দুর্ব্যবহারের কথা লোকে তখনও বিস্মৃত হয় নাই তজ্জন্য উহা কেহই করে নাই। ইংরাজেরা মীরকাশিমকে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না দেখিয়া লিখিয়াছেন যে, তিনি ধৃত হইবার ভয়েই যান নাই। অথবা মুসলমান সেনানায়কগণ তাঁহাকে যে শত্রুহস্তে সমর্পণ করিবে না এই বিশ্বাস তাঁহার ছিল না। কলিকাতার দপ্তরের কাগজ পত্রের মধ্যে মেজর আদাম সাহেবের পত্র দ্বারা লেখক গুর্গিণ খাঁ ওরফে খোজাগ্রেগরী সত্য সত্যই ইংরাজের সহায়তা করিয়াছেন। কলিকাতার সন্ধিতে যেমন সেকালের নবাবী লাভ হইত তেমনি উহার দপ্তরের কাগজপত্রের বিচার করিয়া অনেকেই ইতিহাসের অনেকের কলঙ্ক মোচন ও যশঃ কীর্ত্তন করিতেছেন। উহাতে কোন কোন সর্ব্বোচ্চ রাজপ্রতিনিধি পর্য্যন্তও বিব্রত হন। সেই লেখক পাটনার লোমহর্ষণ হত্যাকাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। ডাক্তার ফুলারর্টনের নিকট হইতে উহা শ্রবণ করিয়া ইংরাজের কলিকাতার দরবার কি করিয়াছিল উহা নিম্নে উদ্ধৃত করা হইলঃ **—
নিবাসি বৈদ্যরাজ রাজবল্লভ প্রভৃতি গণ্যমাণ্য ইংরাজ হিতৈষী পাত্র মিত্রগণ পূর্ব্বেই নিহত হইয়াছিলেন। গুর্গিণ খাঁ পট মণ্ডপের মধ্যে স্বকীয় শরীর রক্ষকদিগের অস্ত্রাঘাতে পঞ্চত্বলাভ করিয়াছিলেন। সেনানায়কদিগের মধ্যে বহুলোক এইরূপে নিধন প্রাপ্ত হইলে, ইংরাজ বন্দিদিগের মুণ্ডচ্ছেদের আদেশ হইল। সমরু ভিন্ন কেহ তাহাতে অগ্রসর হইল না। সমরু খৃষ্টিয়ান, যে নরাধম দস্যুতস্কররাও বর্ব্বরতায় পরাজিত করিয়া নির্ম্মম হৃদয়ে বন্দিদিগের হত্যাকাণ্ডে অগ্রসর হইল।” “সমরুর সেনাদল যখন পাটনার কারাকক্ষের নিকট এই অমানুষিক কার্য্য সম্পাদনের জন্য সমবেত হইলে, তখন প্রভাতের তরূণ তপন পূর্ব্বগমনে লোহিতবর্ণে সমুদিত হইয়াছে সাহেবরা কেবল চা পান করিয়াছেন। সেই সময়ে সমরু আসিয়া ইলিজ, হে, লসিংটন সাহেবকে আহ্বান করিল। যিনি বাহিরে আসিতেছেন তিনিই পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইতেছেন অল্পক্ষণের মধ্যেই সে কথা অভ্যন্তরে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। ইংরাজেরা তখন যাহা নিকটে পাইলেন, শিশি, বোতল, চেয়ার, কোচ, ছুরি, কাঁটা কিছুই পরিত্যাগ করিলেন না, তদ্দ্বারা যথাসম্ভব আত্মরক্ষার আয়োজন করিলেন। তখন সেনাদলের প্রতি আদেশ প্রদত্ত হইল। তাহারা আদেশ পালন করিবার জন্য অগ্রসর হইল বটে, কিন্তু তাহারও শিহরিয়া উঠিল। তাহারাও নিরস্ত্র দেহে অস্ত্রাঘাত করিতে ইতস্ততঃ করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘একি বীরোচিত ব্যবহার, এ যে কেবল কসাই খানার হত্যাকাণ্ড, বন্দিদিগকে অস্ত্রশস্ত্র প্রদান কর, যুদ্ধ না করিলে কাহারাও অঙ্গে অস্ত্রাঘাত করিতে পারিব না’! এ ধিক্কারেও নরাধম সমরুর হৃদয় বিচলিত হইল না। সে রোষ কষায়িত লোচনে গর্জ্জন করিয়া উঠিল। যে সৈনিক ধিক্কার দিয়াছিল তাহাকে মুষ্ট্যাঘাতে ভুপাতিত করিয়া পুনঃ পুনঃ উত্তেজনাপূর্ণ বচনে আদেশ প্রদান করিতে লাগিল। “এই হত্যাকাহিনী যখন কলিকাতার ইংরাজ দরবারের কর্ণগোচর হইল, তখন সমস্ত কলিকাতা যেন গভীর বিষাদচ্ছায়ায় আচ্ছন্ন ইংরাজদরবারের অধিবেশনে কেহ সহসা হৃদয়বেগ প্রকাশ করিতে পারিলেন না রুদ্ধকণ্ঠে বাষ্পাকুল লোচনে, হৃদয় নিহিত প্রতি হিংসাসাধনেচ্ছায় সকলেই কিয়ৎকাল হাহাকার করিয়া অবশেষে স্থির করিলেন,—সে মধ্যাহ্ণে কেহ জলবিন্দুও স্পর্শ করিবেন না। সকলে সায়ংকালে ধর্ম্মমন্দিরে সমবেত হইবেন” দুর্গ প্রকারে, রণ তরীতে, ভাগীরথি তীরে সর্ব্বত্র শোকসূচক কামানধ্বনি হইবে, চতুর্দ্দশ দিবস ইংরাজ মাত্রেই শোকচিহ্ণ ধারণ করিবেন, এবং যে কেহ মীরকাশিমকে ইংরাজ হস্তে সমর্পণ করিতে পারিবে তাহাকে লক্ষমুদ্রা পারিতোষিক প্রদান করা হইবে।”
নবাবি ও দেওয়ানিঃ— লর্ড ক্লাইব ঐতিহাসিক ব্রুম বা কলিকাতার ইংরাজ দরবারের সভ্যগণের ন্যায় সেই সকল ব্যাপার অবগত হইয়া অতিমাত্র বিচলিত হন নাই। তিনি কেরাণি গিরি হইতে সৈন্যনায়ক রাজশাসন সকল বিদ্যাই হাতে কলমে শিক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি কলিকাতার কর্ত্তৃপক্ষগণের সভার মন্তব্যের মধ্যে দেখিলেন যে, মীরকাশিম সিংহাসনচ্যুত হইয়া মুসলমান নবাবাদি দ্বারা ইংরাজের সর্ব্বনাশের জন্য বদ্ধপরিকর সেইজন্য অযোধ্যার নবাবের সহিত ইংরাজের যুদ্ধ হইয়াছিল ও দিল্লীর সম্রাট সা আলম বন্দি। তিনি ইংরাজগণের বিজয় লাভে আনন্দিত হইয়া তাহাদিগকে বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানী সনন্দ দিয়া তাঁহাদের আশ্রয় লাভ করিলে আনন্দিত হইবে বলিয়া এক পত্র বক্সারের যুদ্ধের পরদিবসই ইংরাজ সেনাপতি মেজর মনরোকে পাঠান ও ১৯-এ নবেম্বর ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দের কলিকাতাদরবারের অভিমতানুসারে ২৪-এ তারিখে দিল্লীর বাদশাহের সহিত নজর দিয়া দেখা করিয়াছিলেন। তখনও নবাব মীরজাফর জীবিত ও তাঁহার নিকট অর্থ আদায় হয় নাই তজ্জন্য উহার সহিত সন্ধিভঙ্গের ভয়ে কোনরূপ কার্য্য অগ্রসর হইতে পারে নাই। উহার মৃত্যুর পর যে উপায়ে মীরণের শিশু পুত্র মুর্শিদাবাদের সিংহাসন লাভ না করিয়া মীরজাফরের প্রণয়িনী মণিবাই-এর অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান নিজামুদ্দৌলা সেই পদে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি মীরজাফরের সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয় ছিলেন ও সিরাজের হিরাঝিলের প্রাসাদ হইতে যে সমস্ত ধনরত্ন মীরজাফর লাভ করিয়াছিলেন উহা দ্বারা প্রেয়সির মনস্তুষ্টি করিয়াছিলেন। উহাতে তিনি মুর্শিদাবাদে তখন প্রভূত ধনশালিনী হন। মিল সাহেব সিংহাসন প্রাপ্তির কারণ এইরূপ লিখিয়া গিয়াছেন যে, মীরণের যে কিছু সম্পত্তি ছিল উহার আয় ব্যয়ের হিসাব তখন কোম্পানিকে দিতে হইত, সুতরাং মীরণের শিশুপুত্রের নবাবি প্রাপ্তির জন্য যে কিছু উপহার দান আবশ্যক, উহা করিবার কাহারও ক্ষমতা ছিল না ***। মণিবেগমের উত্তরাধিকারি বার লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া উহা লাভ করিয়াছিল। ক্লাইবের পূর্ব্ববর্ত্তী গবর্ণর ও তাঁহার সহকারিগণ এমন মুর্শিদাবাদের নবাবি পদ দান করিয়া অর্থ লাভের উপায়ের পথ রুদ্ধ করিয়া দিল্লীর সম্রাটের নিকট হইতে দেওয়ানি লাভ করার পক্ষপাতী হইতে পারেন নাই। লর্ড ক্লাইব সেই ভ্রম সংশোধন করিয়া ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের যথার্থ সূত্রপাত করেন ও মূর্খ মীরকাশিমকে ফকিরি গ্রহণ করিতে বাধ্য করেন এবং সেই অবস্থায় তাহাকে দিল্লীতে ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে জুন মাসে সমাধিস্থ হইতে হয়। এক সময়ে উহাকে ধৃত করিয়া দিতে হইবে এই অঙ্গীকারে বদ্ধ হইতে না চাওয়ায় সুজাউদ্দৌলার ইংরাজের সন্ধি স্থাপন হয় নাই। ইহা নিশ্চয়ই মীরকাশিমের ও মুসলমান জাতির গৌরব ও মহিমা। ১২ই আগষ্ট ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে লর্ড ক্লাইব সম্রাট সা আলমের নিকট দেওয়ানি লাভ করেন ও উহার অব্যবহিত পরেই মণি বাইএর পুত্র লোকান্তরিত হইলে অন্য পুত্র সৈয়ফুদ্দৌলা ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে মে মাসে সিংহাসনে উপবেশন করেন। মণি বাইএর নৃত্যগীতে মুগ্ধ হইয়া মীরজাফর তাঁহার সহিত পরিণয় ক্রিয়া করা দোষের মনে করেন নাই ও তাহার পুত্রকে সিংহাসনে বসাইবার উপযুক্ত অনুরোধ ও করিয়াছিলেন। মণি বাই-এর দানশীলতায় কোম্পানির কর্ম্মচারিরা মাতৃবৎ মান্য করিত ও সেই নামেই তিনি আখ্যাত হইয়াছিলেন। সেইজন্যই মীরজাফরের প্রধান মহিষী গদিনাসীন বেগমের বংশধরেরা নবাবীপদ লাভ করিতে পারেন নাই। ক্লাইবই মুসলমানগণের চক্ষে ধূলি দান করিয়া মুর্শিদাবাদের নবাব ও বেগমগণের বার্ষিক বৃত্তি দান ও উদ্বৃত্ত রাজস্ব কোম্পানির প্রাপ্য ধার্য্য করেন। মণিবাই নন্দকুমারকে দেওয়ান করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু সেইপদে কলিকাতার মহাপ্রভুদের কৃপায় রেজা খাঁই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ক্লাইব সেজন্য দায়ি ছিলেন, তিনি দিল্লীর নর্ত্তকী মণি বাই ও বব্বু বাই-এর সন্তানেরাই মুর্শিদাবাদের প্রাসাদে লালিত পালিত ও নবাব পদে প্রতিষ্ঠিত হইবার পথ পরিষ্কার করিয়াছিলেন। হায়! ইহা মীরকাশিমকে দিল্লীতে বসিয়া শুনিতে হইয়াছিল। তদপেক্ষা উহার অধিকতর শাস্তি আর কি হইতে পারে? সেই হইতেই ইংরাজের সৌভাগ্যোদয় আরম্ভ হয়। কলিকাতাতেই ইংরাজবণিক সম্প্রদায়ের দেওয়ানি লাভের সূত্রপাত ও শেষে উহাই ইংরাজের রাজধানী হইয়াছিল। ক্লাইবই এলাহাবাদে কোম্পানির পক্ষে দেওয়ানি সম্রাটের নিকট গ্রহন করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজস্ব কাহিনী ও বিলাস বিভবের জন্য কলিকাতা বিখ্যাত।
বিলাতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টর সভার অধ্যক্ষ সলিভান সাহেবের সহিত যে বিবাদ ছিল উহা মিটাইয়া সণ্ডার্স সাইকস্ সাহেবকে সঙ্গে করিয়া ৪ঠা জুন ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের নিকট হইতে অপরিসীম ক্ষমতা লাভ করেন। কলিকাতার গত বিপ্লব বাণিজ্য ও যুদ্ধ ব্যাপারের আমূল তদন্ত ও উহার যথারীতি ব্যবস্থা করিবার জন্য কলিকাতায় আসিয়াছিলেন। ক্লাইব জুন মাসের শেষে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বাদশাহ ও সুজাউদ্দৌলার
সহিত দেওয়ানি ও সন্ধিবন্ধনের যাত্রাকালে রেজা খাঁর উৎকোচ গ্রহণ ও জুলুম জবরদস্তির অভিযোগাদি সম্বন্ধে বিচার করিবার জন্য মুর্শিদাবাদে গিয়াছিলেন। সেখানে ক্লাইব সাইকস্ সাহেবকে কোম্পানির পক্ষে মুর্শিদাবাদের রেসিডেণ্ট মনোনীত করিয়া ছিলেন ও সকল কার্য্য এক মন্ত্রিসভার পরামর্শানুসারে করিতে হইবে, রেজা খাঁ স্বয়ং কিছুই করিতে পারিবেন না স্থির করেন। ক্লাইব ঐ সভার সভ্য রেজা খাঁ, দুর্ল্লভরাম ও জগৎশেঠ খেসাল চাঁদকে মনোনীত করিয়াছিলেন। আরও তিনি নন্দকুমারকে জামাতাসহ মুক্ত করিয়া রাজকার্য্যের সহিত তাঁহার কোন সংশ্রব থাকিবে না স্থির করিয়াছিলেন। তৎপরে উক্ত ক্লাইবের নিযুক্ত কমিটি দেওয়ানি লাভান্তে মুর্শিদাবাদের নিজামতি ব্যয়ের জন্য ৫৩৮৬১৩১।।/০ তিপান্ন লক্ষ ছিয়াশি হাজার একশত একত্রিশ টাকা নয় আনা বঙ্গ বেহারের রাজস্ব হইতে দেওয়া হইবে তদধিক যাহা আদায় হইবে উহা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি পাইবেন স্থির করেন। মণিবাই বা তাহার অকর্ম্মণ্য পুত্রের ক্লাইবের হুকুমের বিরুদ্ধে দ্বিরুক্তি করিবার সাহস ছিল না, কারণ তাহাদের কাহারও সিংহাসন অধিকার করিবার কোন ন্যায্য দাবী ছিল না। হায়! গোলাম হোসেন অতি দুঃখে বলেন যে, বাদশাহের সহিত সন্ধি ও দেওয়ানি লাভের কথা এত অল্প সময়ের মধ্যে হইয়াছিল যে, সেই সময়ের মধ্যে একটা গর্দ্দভ বিক্রয়ও হয় না*। সত্যসত্যই মণিবাই তখন কোম্পানির মাতা উপাধি লাভের যোগ্যা হইয়াছিলেন, কারণ তখন তিনি কোম্পানির নিকট হইতে মুর্শিাদাবাদের প্রধানা বেগমের বৃত্তি লাভ ও বেগম পদবীতে মণ্ডিত হইয়াছিলেন। ক্লাইব প্রমুখ কলিকাতার গবর্ণরগণের মুর্শিদাবাদে অবস্থিতিকালে দৈনিক দুই সহস্র মুদ্রালাভ হইত। ইহা ভবিষ্যতে প্রকাশ হইয়া পড়ে ও মণিবাই সম্বন্ধে মহামতি বার্ক তীব্র মধুর কটাক্ষ লাভ করিয়াছিলেন। *
একচেটিয়া ব্যবসাঃ— ক্লাইব বিলাতের ডিরেক্টারগণের পরামর্শানুযায়ী ঐ সকল কার্য্য করেন নাই। তাঁহাদের মতে বাণিজ্য রক্ষা করিতে গেলে যে, রাজত্ব করা আবশ্যক একথা ক্লাইব স্পষ্টই বুঝিয়াছিলেন ও বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণকে উহা হাতে কলমে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের মতামতের উপর নির্ভর করিয়া ক্লাইব করিতেন না, আবশ্যক হইলে তাঁহার নিজের মতও পরিবর্ত্তন করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। তিনিই বলিয়াছিলেন যে, যাহাতে এদেশের বণিকগণের অত্যন্ত ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা কোম্পানির সে ব্যবসা করা উচিত নয় কিন্তু হায়! কলিকাতার স্থান মাহাত্ম্যে ও কোম্পানির অর্থলোভী কর্ম্মচারিগণের বেতন বৃদ্ধি না করিয়া উহা করাই উচিত শেষে স্থির করিয়াছিলেন। তিনিই এদেশবাসি ব্যবসায়ির দিকে না তাকাইয়া লবণ, তামাক, শুপারির একচেটিয়া ব্যবসা আরম্ভ ও উহার সমস্তই লাভ কোম্পানির কর্ম্মচারিরা পাইবে হুকুম জারি করিলেন। তদ্বিরুদ্ধে তখন তিনি বিলাতের আদেশ গ্রাহ্য করিলেন না। উহাতেই তিনি এদেশের অন্তর্বাণিজ্যের সর্ব্বনাশ করিলেন। উহাই তাঁহার সর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর কলঙ্কের বিষয়। ক্লাইব সৈন্যগণের ব্যয়ভার সংক্ষেপ করিবার চেষ্টা করিতে গিয়াছিলেন উহাতে সেনাপতিগণ বিদ্রোহী হইয়া উঠে কিন্তু তিনি উহাতে কিঞ্চিন্মাত্র ভীত না হইয়া বিদ্রোহী সেনানীগণের পদচ্যুতি ও তৎপদে নূতন লোক নিযুক্ত করিয়া উহাদিগকে দমন করিয়া ফেলেন। ক্লাইবই যুদ্ধকালে ডবল ভাতা দেওয়ার রীতি পরিবর্ত্তন করেন। সেই সময় হইতে সৈন্যগণ নবাবি আমলের সহিত বর্ত্তমানের তারতম্য বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করিল। *
কোম্পানির প্রথম পুণ্যাহঃ— ক্লাইব দেওয়ানি লাভ করিয়া উহার কার্য্য করিতে মুহূর্ত্তকাল বিলম্ব করেন নাই। মীরজাফরের ভ্রাতা কাজেম খাঁকে পাটনায় নায়েব কাজিম করিলেন ও ঢাকায় জসরৎ খাঁকে বাহাল রাখিলেন। মুর্শিদাবাদ দরবারে প্রচলিত প্রথানুসারে ক্লাইব মহাসমারোহে কোম্পানির দেওয়ানির প্রথম শুভ পুণ্যাহ কার্য্য করিলেন সেখানে কেবল অকর্ম্মণ্য নজমুদ্দৌলা ক্রীড়াপুত্তলিকাবৎ মসনদে উপবিষ্ট ছিল। সেই পুণ্যাহে বাঙ্গালার যাবতীয় জমিদার ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ক্লাইবকে তাহাদের যথার্থ জমিদার স্বরূপ দর্শন ও অভিনন্দন করিল। তখন বহু টাকা রাজস্ব স্বীকৃত হইল ও এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা আদায় হইবে বিলাতে পত্র প্রেরিত হইল। লর্ড ক্লাইবই বাঙ্গালাদি দেশের যথার্থ নবাব হইলেন। কৈশোরোন্মুখ নজমুদ্দৌলা ক্লাইবের সেই অঙ্গীকারপত্র শিরোধার্য্য করিয়া মাতার প্রবৃত্তি অনুযায়ী নৃত্যগীতাদি দ্বারা সময় ক্ষেপণ করিবার বিশেষ সুবিধা হইল বলিয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছিল, ইহাই ইংরাজ লেখকগণ প্রকাশ করিয়া থাকেন। উহার ফলে উক্ত পুণ্যাহের পরই সেই হতভাগ্যের ভবলীলা শেষ হইল। উহার সহোদর সইফউদ্দৌলা সেই পদে প্রতিষ্ঠিত হইল।
ক্লাইবের কীর্ত্তিঃ— ক্লাইব সইফউদ্দৌলার নিকট হইতে তিন লক্ষ টাকা প্রাপ্ত হয়েন ও মীরজাফরের নিকট অন্তিমকালে পাঁচ লক্ষ টাকা পাইয়াছিলেন। এই দুই টাকা একত্র করিয়া সর্ব্বসমেত আট লক্ষ টাকায় আহত ইংরাজ সৈন্যগণের সাহায্যার্থে বিলাতে এক দাতব্য ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। স্বয়ং উহা লন নাই নবাবের অর্থে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজস্বলাভের সঙ্গে সঙ্গেই বিলাতী আহত সৈনিকগণের ভরণপোষণের ব্যবস্থা ক্লাইবের সর্ব্বপ্রধান কীর্ত্তি। আরও কলিকাতায় ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে ২৯শে সেপ্ঢেম্বর তারিখে জন্ জ্যাকেরিয়া কায়ারণাণ্ডার নামক একজন প্রোটেষ্ট্যাণ্ট পাদরীকে আনাইয়া উহার বাড়ী ঘরাদির যাবতীয় বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। তিনিই প্রথম প্রোটেষ্ট্যাণ্ট পাদরী, উহার পূবের্ব কলিকাতায় ফরাসি, পর্ত্তুগীজ, রোমান কাথলিক পাদরীরাই গির্জ্জায় মূর্ত্তি পূজা করিত। ক্লাইব উহার পক্ষপাতী ছিলেন না। সেকালে এক বৎসরের মধ্যে পাদ্রীগণকে দেশী ও পর্ত্তুগীজ ভাষা শিক্ষা করিতে হইত। কোম্পানির কাছারিতে পর্ত্তুগীজ আমলার অভাব ছিল না তজ্জন্য বাঙ্গালা ভাষায় অনেক পর্ত্তুগীজ কথা স্থান পাইয়াছে। উহার পূর্ব্বে কোন এক ব্যবসায়ী বার্ষিক পঞ্চাশ পাউণ্ড বেতন লইয়া পাদরীর কার্য্য করিত। তৎকালে জল কষ্ট দূর করিবার জন্য কলিকাতায় পুষ্করিণী কাটাইবার নিমিত্ত জমি দান করিবার ব্যবস্থা হয়। ক্লাইব নটীগণের নিকট হইতে কর আদায় করা বন্ধ করিয়া দেন। কলিকাতা হইতে মুর্শিদাবাদে চিঠি পত্রাদি যাইবার ডাক বন্দোবস্ত হইয়াছিল। তখন চিঠি পৌঁছিতে ৩০ ঘণ্টা লাগিত। সেকালে মগেরা জলপথে দস্যুগিরি করিত, ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে কোম্পানির কাগজে উহাদিগকে দমন করিবার জন্য ব্যবস্থা আরম্ভ হয়। ক্লাইবের আমলে কলিকাতায় ইংরাজের দৌদ্দণ্ড প্রতাপে লোকে স্পর্দ্ধা করিয়া বলিতে আরম্ভ করে ‘একি মগের মুল্লুক নাকি?’
নাচ তামাসাঃ— তখনকার কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণ কলিকাতার বিশিষ্ট হিন্দু অধিবাসিগণের সহিত সময়ে সময়ে উৎসবে নাচ তামাসায় একত্র বসিয়া প্রকাশ্যে আনন্দ উপভোগ করিতেন। শোভাবাজারের রাজবাড়ী, পোস্তার নকুধরের বাড়ী ও বড়বাজারের নয়ানচাঁদ মল্লিকের বাড়ীতে প্রায়ই ক্লাইবাদি তাঁহাদের বন্ধু-বান্ধবগণসহ ঐরূপ উৎসবে যোগদান করিতেন। কলিকাতার রাস্তায় তখন বড় বড় শাঁড়ের উৎপাত ছিল। ক্লাইবের পশ্চাৎ একটি শাঁড় তাড়া করিয়াছিল, উহাতে তিনি উহাদিগকে কলিকাতা হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিবার হুকুম জারি করেন।
কোম্পানির নামজাদা বেণিয়াণঃ— কোম্পানি গৌরীসেনের অর্থবলে মীরকাশিমকে যুদ্ধে পরাজয় করে সেই হইতে “লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন” প্রবাদ প্রচলিত হইয়াছে। সুবর্ণ-বণিক গৌরীসেন কর্ত্তৃক বিপুল অর্থ সরবরাহ করায় মীরজাফরের রাজ্যলাভ হইল কিন্তু তাঁহার সেই অর্থ আদায় হইল না। উহাতেই তাঁহার সর্ব্বনাশ হইয়াছিল কিন্তু উহার ফলভোগ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি করিল কিন্তু নবকৃষ্ণের ভাগ্য উহাতেই প্রসন্ন হইল। প্রবাদ হইয়াছে—ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বন। লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।। * কিন্তু নবকৃষ্ণ সেই যুদ্ধের সময় আডসের বেণিয়ানি করিয়া এবং মীরজাফরের নবাবী পুনরাধিকারের সময়ও সহায়তা করিয়া অতুল অর্থ লাভ করে।
নজরবন্দিঃ— কলিকাতায় জমিদারীর খাজনার জন্য জমিদারগণের নজরবন্দি হইতে হইত। নন্দকুমারই উহার পথ প্রদর্শক, তিনি খাজনা আদায়ের জন্য কৃষ্ণনগর হইতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্রকে কলিকাতায় নজরবন্দি করিয়াছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মীরকাশিমের হস্ত হইতে নিস্তার লাভ করিয়া নিগৃহীত হইলেন। কলিকাতার ডেপুটি ফৌজদার গোবিন্দরাম মিত্রের লাঠির ভয়ে কলিকাতার চোর ডাকাত ভীত ছিল ও সেই হইতে গোবিন্দরামের ছড়ি প্রবাদ বাক্য হইয়াছে। মালিসন ব্রুম প্রমুখ ইংরাজ ঐতিহাসিকগণ মহাবীর আডমসের সহিত পৃথিবীর যে কোন যোদ্ধার তুলনা হইতে পারে বলিয়াছেন, সেই বীর কলিকাতার স্বাস্থ্য যুদ্ধে পরাজিত হইয়া ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে ১৭ই জানুয়ারি সেইখানে বীরের সমাধি হইয়াছিল। এডমিরাল ওয়াটসন ও আডামান খ্যাতনামা প্রভৃতি ইংরাজ বীরবৃন্দের সমাধিস্থান বলিয়া কলিকাতার নামোল্লেখ ইংলণ্ডের ইতিহাসে আজ পর্য্যন্তও হয় নাই, যা কোন গৌরবের স্থান লাভ করে নাই, ইহাই বড়ই দুঃখের বিষয়।
বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ কলিকাতার গবর্ণর ভান্সিটার্টের সুখ্যাতি মীরকাশিমের নিকট হইতে বর্দ্ধমানাদি গ্রহণের ও অর্থ লাভাদির জন্য না করিয়া থাকিতে পারেন নাই বটে, কিন্তু তাঁহারা উহার পরিণাম দেখিয়া আর রাজত্ব বৃদ্ধির বিরোধী হন। ক্লাইব দেওয়ানি লাভের পর স্বদেশে যাত্রা করিলেন, ভাবিয়াছিলেন যে, সেখানে শুভ পুণ্যাহে রাজস্ব নির্দ্ধারণ ও বাঙ্গালা বেহারাদির সমস্ত অন্তর্বাণিজ্যের উপস্বত্বে কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের উদর পূরণের ব্যবস্থা করিয়া স্বজাতি প্রেম ও প্রভুভক্তির উৎকৃষ্ট উদাহরণ দ্বারা স্বদেশবাসির বিশেষ প্রশংসাভাজন হইবেন। বোধহয়, মুর্শিদাবাদের শুভ পুণ্যাহে সিংহাসনের নিকটে বসিয়াই কাল হইয়াছিল, কারণ উহার পরই ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে ক্লাইবের এরূপ স্বাস্থ্যভঙ্গ হইয়াছিল যে, তাঁহার লিখিবার ক্ষমতা ছিল না। যে সকল ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারিগণকে তিনি দূর করিয়া দিয়াছিলেন তাহারা ও এদেশে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য যাহারা আগমন করিত কিন্তু শেষে আকাঙ্ক্ষিত ফল লাভে বিমুখ হওয়ায়, তাহাদের শক্তিশালী বিশিষ্ট আত্মীয় বা পৃষ্ঠপোষকগণ সকলে এক হইয়া ক্লাইবের বিরুদ্ধে পার্লিয়ামেণ্ট সভায় যাহাতে তাঁহার বিচার হয় উহার চেষ্টা করিতেছিলেন। কলিকাতার গবর্ণর লর্ড ক্লাইবের বিচারের কথা উহার অন্তর্ভুক্ত বিষয় বলিতে হইবে। কারণ উহাতে তখনকার অনেক গূঢ় সত্য কথা প্রকাশ পাইয়াছে। সেকালের মুর্শিদাবাদের নবাবেরা যে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কেবলমাত্র অর্থ সরবরাহকার ছিল, একথা ক্লাইব তাঁহার বিচারকালে মুক্তকণ্ঠে উল্লেখ করিয়াছিলেন।
ক্লাইবের জীবন চরিত লেখক মালিসন সাহেব সেই বিচারের মূল কারণগুলির উল্লেখও ক্লাইবের সাপক্ষে অনেক কথা বলিয়াছিলেন। সেই চর্ব্বিত চর্ব্বণ করিয়া কোন ফলোদয় নাই, তবে ইহা একরূপ সর্ব্ববাদিসম্মত যে, ক্লাইবের কলিকাতার প্রথম সন্ধিপত্রের সময় উমিচাঁদের জাল প্রতারণা ও মিথ্যা কথায়
কলিকাতার নাম নিম্নলিখিত ছড়ায় কলঙ্কিত হইয়াছিলঃ— “জাল জুয়াচুরি মিথ্যা কথা এই তিন নিয়ে কলিকাতা”।
ক্লাইব সেই সময়ে দেশের ও দশের সম্বন্ধে তাঁহার বিচারের সময় বা তৎপূবের্ব যাহা বলিয়াছেন উহাও উল্লেখযোগ্য। উহা করিবার পূর্ব্বে ইহা বলা উচিত যে, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির স্বত্বাধিকারগণের বাৎসরিক সভায় প্রস্তাব ক্লাইবের বিপক্ষ পক্ষগণের অধিকাংশ ভোটে বার্ষিক দশ টাকা হার সুদ হইতে সাড়ে বার টাকা বৃদ্ধি হইয়াছিল ও ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে ১৪ই জুলাই ক্লাইব বিলাতে পৌঁছিয়া ঐ বিলাতের রাজা ও রাণীর সহিত সম্মানস্পদ সাদরাহ্বান সম্ভাষণ ও তাঁহাদের সহিত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের ধন্যবাদাদি লাভ করিয়াছিলেন। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির স্বত্বাধিকারিগণ মীরজাফরের প্রদত্ত ক্লাইবের জায়গীর লাভ ও উহার উপস্বত্ত্ব ভোগ দশ বৎসরের জন্য সর্ব্ববাদি সম্মতিক্রমে অনুমোদন করিয়াছিলেন। তখন ইংলণ্ডের রাজা ক্লাইবকে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সম্বন্ধে বিলাতে ও এখানে কিরূপ ব্যবস্থা করিলে মঙ্গলজনক হইবে উহার প্রস্তাব তাঁহার নিকট প্রেরণ করিবার অনুমতি দান ও উহা যাহাতে কার্য্যে পরিণত হয় উহার চেষ্টা করিবেন বলেন। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে জানুয়ারি মাসে সস্ত্রীক ক্লাইব প্যারিসে বেড়াইতে যান তখনও কোনরূপ গোলযোগ ছিল না। ক্লাইবের ডাক্তার ও বন্ধুবর্গের উপরোধে স্বাস্থ্যলাভ ও উহার উন্নতি করিবার জন্য একেবারে চৌদ্দ পনর মাস থাকিবার কথা ছিল কিন্তু তিনি আট মাসের অধিককাল থাকেন নাই। তিনি ও তাহার ছয় জন বন্ধু বিলাতের পার্লিয়ামেণ্টে মনোনীত হইয়াছিলেন তাঁহাদের অনুপস্থিতির সময় ইহার জন্য বিশেষ কোন চেষ্টা করিতে হয় নাই কেবল অভিমত প্রকাশ করিয়াই সফল হইয়াছিলেন। তাঁহারই অনুরোধানুযায়ী ভারেলেষ্ট বাঙ্গালায় তাঁহার পদপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু ক্লাইবের বিলাতের পার্লিয়ামেণ্ট সভায় প্রবেশ মঙ্গলজনক হয় নাই। ক্লাইবই বিলাতের খ্যাতনামা বিলাস গৃহাদি ক্রয় করিয়া বিলাতের আভিজাত্য গৌরবান্বিত ব্যক্তিগণের ঈর্ষাকর্ষণ করেন। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কার্য্যকলাপ লইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে বিলাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তিকা ও শেষে এখানে তদন্ত সভা নিযুক্ত হইয়াছিল। বিলাতের পার্লিয়ামেণ্ট সভায় কর্ণেল বরগয়েনই ক্লাইবের নিন্দা কুৎসার বিষয় উত্থাপন করেন ও শেষে পরাস্ত হন। ক্লাইব তখন পার্লিয়ামেণ্টে যেরূপ নির্ভীকতার সহিত সমস্ত কথা ব্যক্ত করিয়াছিলেন, উহাতে তাঁহার প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। কারণ উমিচাঁদের জাল তিনি নিজে না করিলেই উহার দোষ নীচ ব্যক্তির ন্যায় লসিংটনের উপরে দান করেন নাই, বরং স্পর্দ্ধার সহিত বলিয়াছিলেন ঐরূপ ঘটনাস্থলে ঐরূপ কার্য্য করিতে তিনি সকল সময়েই প্রস্তুত ও প্রয়োজন হইলে পুনরায় করিতে পশ্চাৎপদ নহেন। যদি তিনি উমিচাঁদকে ঐরূপে প্রতারিত না করিতেন তবে বহু লোকের জীবন যাইত ও শঠের সহিত শঠতা করায় রাজনীতি। তিনি স্পর্দ্ধার সহিত বলেন যে, উমিচাঁদের প্রাপ্য টাকা নিজে আত্মসাৎ করেন নাই। ইংরাজজাতি স্বদেশের ও স্বজাতির স্বার্থ গৌরব ও মান রক্ষার জন্য বা শ্রীবৃদ্ধির জন্য যদি কোন অন্যায় কর্ম্মের আশ্রয়গ্রহণ করিয়া কার্য্য করে উহা কখনই দোষের হইতে পারে না বিলাতের মহাসভা এই রাজনীতির পোষকতা ও ক্লাইবের দোষ ক্ষালন করিয়াছিল। ক্লাইবের তিরস্কার উল্লেখযোগ্য, কি আশ্চর্য্য! যাঁহারা কিছুদিন হইল আমাকে জোর করিয়া বাঙ্গালার গবর্ণর করিয়া পাঠাইয়াছিল ও বলিয়াছিল যে তাঁহারা বড়ই দুঃখিত যে তাঁহাকে শরীরের অসুস্থতাবশতঃ এত শীঘ্র স্বদেশে ফিরিয়া আসিতে হইল, তাঁহারাই কিনা শেষে আমার ষোল বৎসরের দখলি সম্পত্তি হরণ করিবার জন্য বিলাতের পার্লিয়ামেণ্টে একজন ইতর চোর ডাকাতের যেরূপ বিচার হওয়া উচিত আমার বিরুদ্ধে সেইরূপ প্রার্থনা করিয়াছে। যদি আমি কাহারও নিকট হইতে কোন অর্থ গ্রহণ করিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কোন অনিষ্ট করিয়া থাকি তবে উহার উল্লেখ ও বিচার হওয়া উচিত। আরও যে সময় কোম্পানির যুদ্ধেও জয়লাভের জন্য প্রাণপণ করিয়া মহাপমান গ্রাহ্য না করিয়া কার্য্য করিয়াছি সেই সময় যদি আমি ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থ সঞ্চয় করিতাম তাহা হইলে যে টাকা উপহার স্বরূপ লওয়ায় এখন দোষারোপ হইতেছে তদপেক্ষা যে শতগুণ অর্থলাভ করিতে পারিতাম। আমি আমার সংযম দর্শনে নিজেই আশ্চর্য্যান্বিত, কারণ তখন মনে করিলে মুর্শিদাবাদের রাজকোষাগারের বহুমূল্য মণি মুক্তা ধনরত্ন অর্থাদি সমস্ত আত্মসাৎ করিতে পারিতাম কিন্তু উহা করি নাই কেবলমাত্র মীরজাফরের প্রদত্ত যৎকিঞ্চিৎ লাভ করিয়াই সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম। যদি তাঁহাদের ইচ্ছা হয়, তবে তাঁহারা আমার পৈত্রিক সম্পত্তির বার্ষিক পাঁচশত পাউণ্ড বাদে সমস্ত সম্পত্তি লইতে পারেন তাহাতেও আমি আপনাকে অধিকতর সুখী জ্ঞান করিব।” তাঁহার সেইসকল দারুণ শ্লেষব্যঞ্জক দুঃখকাহিনী শ্রবণ করিয়া বিলাতের পার্লিয়ামেণ্টের সভ্যগণ দ্রবীভূত ও আর্দ্র হইয়াছিল। সিরাজের হত্যাকালে সেই বাড়ীতে তিনি উপস্থিত ছিলেন ইহা একজন ফরাসি লেখক লুই হারমান প্রকাশ করিয়াছেন কিন্তু ক্লাইবের শত্রুগণ সেকথা তাঁহার বিরুদ্ধে বলেন নাই।
যাহাই হউক, ক্লাইব বিলাতের বিচারে নির্দ্দোষী প্রমাণিত হইয়া সুস্থির হইতে পারিলেন, তিনি রোগে দুঃখে ও অপমানে স্বদেশ ত্যাগ করিয়া স্বাস্থ্য লাভের জন্য স্থানে স্থানে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন কিন্তু কিছুতেই তাঁহার শান্তিলাভ হইল না। রাত্রে নিদ্রা হইত না, থাকিয়া থাকিয়া ফিট হইত শেষে জীবনের শেষ জ্বালা-যন্ত্রণা দূর করার মৃত্যু ভিন্ন উপায় নাই দেখিয়াই পলাশি যুদ্ধের সেই অমর বীর স্বহস্তে ইহলীলা ১৭৭৪।২২এ নবেম্বর শেষ করিয়াছিলেন। হায়! তাঁহার ইংরাজী জীবনচরিত লেখক কাঁদিয়া বলিয়াছেন—“With all his faults Cliva was one of the men who did the most for the greatness of England” অর্থাৎ ক্লাইবের যতই কেন দোষ থাকুক না, তিনি ইংলণ্ডের অত্যন্ত মহত্ত্ববৃদ্ধিকারক মহাত্মাদের মধ্যে একজন গণনীয় ব্যক্তি আর তাঁহার বাঙ্গালী জীবন চরিত লেখক এইরূপ বলিয়াছেনঃ—
“টাকার সহিত তিনি ভারতবর্ষ হইতে আর একটি দুর্লভ জিনিস লইয়া যান। তাহা অহিফেন, কেহ বলেন তিনি ইহার পাকা ব্যবহার করিতেন। পাকাই করুন আর কাঁচাই করুন, তিনি প্রত্যহ প্রচুর পরিমাণে অহিফেন সেবন করিতেন।”
“ধনে মানে সকল অপেক্ষা বড়, তিনি স্বদেশবাসিকে নানারূপ ভোজ্যে আপ্যায়িত করিলেও তাহারা তাঁহাকে দৈত্য দানব শ্রেণীর মধ্যে অন্তর্নিবিষ্ট করিতে কিছুমাত্র দ্বিধা বোধ করিত না। যাহারা ক্লাইব অর্থে প্রতিপালিত হইত তাহারাও মূর্ত্তিমান পাপেয় অবতার, ক্লাইবকে দূর হইতে উকি মারিয়া দেখিয়া বিভীষিকাগ্রস্থ হইত।”
ক্লাইব মনে করিয়াছিলেন যে অর্থের দ্বারা সকলকে বশীভূত করা যায়। তজ্জন্য ক্লাইবকে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দশ লক্ষ টাকার অধিক অংশ খরিদ করিয়াছিলেন। ক্লাইব কলিকাতায় যে একচেটিয়া ব্যবসারম্ভ করিয়া যান, উহাতে বিলাতে বসিয়া কোম্পানির স্বত্ত্বের অধিকাংশের মালিক হইয়া কলিকাতার গর্বণরীর পর ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সর্ব্বেসর্ব্বা হইবেন ভাবিয়াছিলেন। এদেশের মত স্বদেশবাসির সহিত ব্যবহার করিতে গিয়া তাঁহার শেষে দুর্দ্দশার একশেষ হইয়াছিল। হায়! উহাতেই শেষে জীবন রক্ষা করা অপেক্ষা জীবন শেষ করাই শ্রেয় হইয়াছিল।
বাঙ্গালার পলাশীর যুদ্ধের প্রধান দুহ প্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতার শেষ, হত্যাঃ—ইংরাজের রাজত্বের ও ব্যবসার জন্য সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু ঘাতক হস্তে, আর ইংরাজ জাতির জন্য তাঁহাদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ কর্ত্তৃক প্রকাশ্য পার্লিয়ামেণ্ট সভায় শাস্তি বিধানের জন্য বিচারাধীন হইয়া অপমানিত হওয়ায় ক্লাইবের মৃত্যু স্বহস্তে হইল। হায়! রোগের ও দুঃখের জ্বালা নিবৃত্তির জন্য তিনি স্বয়ং আত্মহত্যা করিলেন। ধর্ম্মের কি সূক্ষ্ম বিচার! কালের কি কুটিল গতি! এতদিনেও সেই সকল অভিনেতৃগণের কথা লইয়া বর্ত্তমানকালে বিচার চলিতেছে। কত নূতন তথ্য আবিষ্কৃত হইতেছে, ঐতিহাসিকগণেরও দোষ গুণ বিচার উহার সঙ্গে হইতেছে। সে যাহাই হউক, কিন্তু এ কি অবিচার! ক্লাইবের সেই ন্যায্যান্যায্য বিচারযোগ্য কলঙ্ক কালিমা কলিকাতার স্কন্ধে যাহা বর্ত্তাইয়াছিল উহা এখনও ছড়ায় বর্ত্তমান! সিরাজউদ্দৌলার প্রতি যে অবিচার হইয়াছিল উহার জন্য শিক্ষিত ব্যক্তিগণ অনেকেই কালি কলম ধরিয়াছেন, লক্ষাধিক অর্থ ব্যয়ে দিল্লি হইতে আনীতা অপূর্ব্ব সুন্দরী ফৈজীর চরিত্রদোষে উহাকে জীবন্তে সমাধিস্থ করিবার কথা লইয়া তিনি যে সচ্চরিত্রের পক্ষপাতী ছিলেন এই আন্দোলন চলিতেছে। সিরাজ লুৎফুন্নিসার গুণে যেমন মুগ্ধ সেরূপ ফৈজীর রূপজ মোহে মুগ্ধ ছিলেন না।
যাহাই হউক, এই দুই মহাত্মাই কলিকাতার উন্নতিকারক। ক্লাইবই বাঙ্গালায় হিন্দু-মুসলমান বাঙ্গালীর উচ্চ বেতনের বিরুদ্ধে কোনরূপ কটাক্ষপাত করেন নাই, বরং নবাবী রাজকোষ হইতে উহারা যাহাতে উহা পূর্ণমাত্রায় লাভ করিয়া সন্তুষ্ট থাকে, কোনরূপ ষড়যন্ত্রাদি না করে, উহার ব্যবস্থা করিয়া যান। বর্ত্তমানকালে ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের সর্ব্বোচ্চ রাজপ্রতিনিধি ঐরূপ বেতন লাভ করেন না। কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য নিম্নে যৎকিঞ্চিৎ দেওয়া গেল ঃ—
১৭৬৭ খৃষ্টাব্দ হইতে রেজা খাঁ ও দুর্ল্লভরাম যথাক্রমে বার্ষিক নয় লক্ষ ও দুই লক্ষ বেতন পাইতেন ও ১৭৭১ খৃষ্টাব্দে নয় হইতে পাঁচ লক্ষে নামিয়াছিল। উহার পরে অর্থাৎ ১৭৭২ খৃষ্টাব্দে রাজা গুরুদাস ঐরূপ এক লক্ষ বেতন পাইতেন। ইহাতে বাঙ্গালীরা ও মুসলমানেরা সেকালে কর্ম্মচারি হইবার জন্য ইংরাজের তোষামোদ করিত ও অগত্যা তাহাদের পক্ষপাতী হইত। ক্লাইবের এই সকল কূটনীতিতেই বাঙ্গালায় মুসলমান রাজত্বের শেষ ও বাঙ্গালীর সিংহাসন মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের পর হইতে আর সম্ভ্রান্ত মুসলমান বংশের প্রাপ্য বলিয়া বিবেচিত হইত না। উহা কিছুদিন পৈত্রক সম্পত্তি স্বরূপ সরফরাজ পর্য্যন্ত চলিয়াছিল, শেষে যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল সেহই জগৎশেঠের সাহায্যে উহা লাভ করিয়াছিল। জগৎশেঠেরা কিছুকাল বাঙ্গালায় নবাবী লাভের সোণার কাঠি হইয়াছিল। শেষে ইষ্ট ইণ্ডিয়ার কোম্পানির সৃষ্টিধর পুরুষ ক্লাইব প্রমুখ কলিকাতা উদ্ধার করিয়া মীরজাফর মীরকাশিমাদির সৌভাগ্যোদয়ের বিধাতা দিল্লির সম্রাট সা আলম ইংরাজেরা তাহার অমান্য করিয়া সেই সকল অকর্ম্মণ্য ব্যক্তিগণকে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসাইতেছে দেখিয়া ক্লাইবকে দেওয়ানি দান করিয়া আপনার রাজস্ব আদায় ও ক্ষমতা অব্যাহত রাখা কর্ত্তব্য মনে করেন। ক্লাইবের দোষ গুণ বিচার সেইখানেই, কারণ বিধাতা যখন তাহাকে অর্থে সম্মানে ও ক্ষমতায় সমধিক উন্নত করিয়াও দুঃখী বাঙ্গালার বণিক জমিদার প্রভৃতির সবর্বনাশের প্রতিবিধান না করিয়া উহার পথ প্রশস্ত করিয়া দিলেন দেখিলেন তখনই তিনি তাঁহার রুদ্র দণ্ডে ধীরে ধীরে শাস্তিবিধান করিয়াছিলেন। যদি ক্লাইব মীরকাশিমের স্থাপিত অন্যায় করভার হইতে জমিদারগণকে মুক্ত করিয়া ন্যায্য রাজস্ব স্থির করিতেন, যদি তিনি বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের অভিমত লবণাদির ব্যবসা কোম্পানি করিবে না স্থির করিতেন, তাহা হইলে কোম্পানির দেওয়ানি লাভে সকলেই সুখী হইত, তবে তখন দেশে দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হইত না, বিলাতে স্বদেশবাসি তাঁহার কর্ম্মাদি লইয়া অভিযোগাদি গ্রাহ্য করিত না। বিলাতের কবি কাওপার সেই মর্ম্মে গাহিয়াছিলেন ঃ—
“Remember Heaven has an avenging rod
To smite the poor is Treasen against God.”
পূর্ব্বে প্রকৃতপক্ষে ক্লাইবই বাঙ্গালার দেওয়ানি লাভ করিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গবর্ণর ও বাঙ্গালার সজীব নবাব ছিলেন। ক্লাইবের বিচারে ইংলণ্ডের রাজশক্তি ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির উচ্চ নীচ কর্ম্মচারীর উপর ছিল ইহাই তখন বাঙ্গালার সকলে বিশেষতঃ কলিকাতাদি ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মক্ষেত্রে উহা সম্যক প্রচারিত হয়। সেই সময় হইতেই ভারতবর্ষে ইংরাজ রাজত্বের সূত্রপাত।
এডমিরাল ওয়াটসন, লর্ড ক্লাইব যাহা চাহিয়াছিল মূর্খ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের ঈর্ষা ও অন্তর্দ্দাহে ক্লাইবের বিচার প্রার্থনা করিয়াই উহা পূর্ণ করিয়াছিল। ক্লাইবের কার্য্যের তত্ত্বানুসন্ধান করিবার জন্য কলিকাতায় পার্লিয়ামেন্টের বিচারের নিমিত্ত তদন্তকারিগণ আসিয়াছিল। উহাতেই কলিকাতাবাসি বাঙ্গালীদের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের উপর এক অপূর্ব্ব ভাবান্তর সৃষ্টি করিয়াছিল। উহাতেই নন্দকুমার ও নবকৃষ্ণ ও প্রভৃতির অবনতি উন্নতি কলিকাতার গবর্ণরাদির অনুগ্রহ ও নিগ্রহ হইতে আরম্ভ হয় ও তাঁহাদের বিলাতে বিচার হইতে থাকে। বাঙ্গালার সহিত বিলাতের বাণিজ্য সম্বন্ধ হইতে অবশেষে উহার রাজত্বের রাজস্ব লাভ ও কর্ম্মচারিগণের সৎকর্ম্ম ও দুষ্কর্মের পুরস্কার ও বিচার ক্লাইবের সঙ্গেই সূত্রপাত হইল। ক্লাইবকেই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সর্ব্বতোভাবে উন্নতিকারক বলিতে হইবে। যে দেশের লোক সেই দেশের লোকই তাহার দোষ গুণ বিচার করিতে পারে বিদেশী পরাধীন ব্যক্তির উহা করিবার অধিকার নাই। “The English Army of traders in their march, ravaged worse than Tartarian Conqueror. The trade they carried on more resembled robbeery than commerce. Thus this miserable country was torn to pieces by the horrible rapacity of the Foreign Traders.” * অর্থাৎ সংক্ষেপে বিদেশী বাণিজ্যেই বাঙ্গালার সবর্বনাশ হইয়াছিল।
ক্লাইব ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে পার্লিয়ামেন্টের কমিটিতে যে সাক্ষ্য দান করিয়াছিলেন উহাতে সেকালের বাঙ্গালার অবস্থা তখন কিরূপ ছিল অবগত হওয়া যায়।
“Bengal the country of inexhanstible riches, capable of making its masters the richest Corporation in the world.”
“The city of Muxadabad is an extensive populous and rich as the city of London with this difference that there are individuals in the first possessing infinitely greater property than any of the last city. The inhabitants there must have mounted to some hundred thousand and if they had an inclination to have destroyed the Europeans, they might have done it with sticks and stones.” *
অশেষ ধনরত্নসমন্বিত বঙ্গদেশ—তাহার অধীশ্বরকে জগতের সর্ব্বপ্রধান ধনী বলিয়া গৌরবান্বিত করিতে সক্ষম।
মুর্শিদাবাদ নগর লণ্ডন সহরেরই মত বিস্তীর্ণ, অর্থশালী ও জন বিশিষ্ট—কেবল এই প্রভেদ যে প্রথম নগরটীতে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যাঁহারা শেষোক্ত নগরের অধিবাসী অপেক্ষা বহুতর সম্পদশালী। ঐ নগরের অধিবাসী সংখ্যা কয়েক লক্ষ সুতরাং তাহারা যদি ইউরোপীয়দিগকে বিনষ্ট করিতে মনস্থ করিত, তাহা হইলে তাহারা, অনায়াসে লাঠী এবং প্রস্তরখণ্ড দ্বারা করিতে পারিত।
ক্লাইবের সত্য কথার মূল্য অত্যন্ত অধিক কিন্তু হায়! বর্ত্তমান কালের ইংরাজগণের চিত্তাকর্ষণ করে না, ইহাই অতি দুঃখের বিষয়।
* ক্লাইবের ১৭, ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের পত্র যাহা তিনি সিলেক্ট অর্থাৎ নির্ব্বাচিত সভাকে প্রেরণ
করিয়াছিলেন।
* Martin’s Eastern India Vol. II. Page 25-47.
* মীরকাশিম
* ৩৪৫।৩৫৫ পৃষ্ঠা।
** ৫৭।৫৮ পৃষ্ঠা।
*** “Reflection of the enternal moon of love under whose motions life’s dull
billows move.”
* ইংরাজের সহিত ক্লাইবের সিয়ালদহে বন্দুক লইয়া ডুয়েল যুদ্ধ হইয়াছিল।
* “The fly that sips treacle is losy in the sweets.”
** মুতাক্ষরীণ ২য় খণ্ড মীরকাশিমের মুসলমান সেনানীগণ মীরজাফরের শরণাপন্ন হইয়াছিল।
রাজারামনায়ন, জগৎশেঠ, স্বরূপচাঁদ, রাজনগর
*** Long’s Records P-335-36. Transactions in India 1756-1783. Broom’s Bengal
Army V. I. 390.
* ১৮২, ১৮৩, ও ১৭৮ পৃষ্ঠা
মীরকাশিম “ঘ” ক্রোড় পত্রে দ্রষ্টব্য।
* Miles Histry of British India V. III. P. 358. Secand Reveet P 21.
* Munny Begum declared before Mr. Gorang ‘’Every Governor coming to
Murshidabad received Rs. 2000/- a day in sica for provisions.” XXXVI. Forrest’s
State Paper selections.
‘Your Lordships are to suppose the lowest degree of ignomy and occupation
and situation when I tell you that Munny Begum was a slave and dencing
girl.” Burke’s Impendment on Waren Hastings. V. T 265.
* উহারই বংশধর ঈশ্বরচন্দ্র সেন খ্যাতনামা মতিলাল শীলের শ্যালক ছিলেন। উহাদের বাড়ী
কলুটোলা ও কিরাম লেনের গলির মোড়ে ছিল।
* Burke’s Impeactment speech 15-2-1787.
* (The evidence of Lord Clive before the Parliamentary Committee)
