১৩. ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের কারণ
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের কারণ
দেওয়ানিঃ— ক্লাইবের পূর্ব্বের গবর্ণরগণের নামোল্লেখ মাত্র ইতিহাসে আছে কিন্তু ক্লাইবের কথা শেষই হয় না। তাঁহার শেষবার কলিকাতায় গবর্ণরী করিবার ইচ্ছা আদৌ ছিল না, কেবল দায়ে পড়িয়া তাঁহার জমিদারীর স্বত্ব দশ বৎসরের জন্য লাভ করিবার জন্যই, ক্লাইব গবর্ণরী করিতে সম্মত হইয়াছিলেন। ভবিতব্যতার লিপি অলঙ্ঘনীয়! অতীত আবিষ্কার করা যায়, কিন্তু উহা ভবিষ্যত সম্বন্ধে বলিতে পারা যায় না। যদি লোক উহা করিতে পারিত, তাহা হইলে সংসার হইতে দুঃখ শোক দূর হইয়া নিরবচ্ছিন্ন সুখশান্তিময় হইত। সেই লর্ড ক্লাইবের পদত্যাগের পর ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তাঁহার অতুল ঐশ্বর্য সম্পত্তি হরণ করিবার জন্য বিলাতের পার্লিয়ামেণ্ট মহাসভায় তাঁহার বিচার প্রার্থনা করিয়াছিলেন। ২৫এ নবেম্বর ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে সেই মহাসভা এক বিশেষ তদন্তসভা মনোনীত করেন, ও শেষে সেই সভা ১০ই ডিসেম্বর কোম্পানির ১৭৫৬ হইতে ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত যাবতীয় ব্যবসার যাবতীয় হিসাবপত্র সন্ধি বিগ্রহ বিষয়ক চিঠিপত্র দৃষ্টে এই মীমাংসা করেন যে, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের নিকট হইতে যে দেওয়ানি লাভ করিয়াছেন উহা ইংলণ্ডের রাজার প্রাপ্য। তজ্জন্য ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দ হইতে প্রতি বৎসর চার লক্ষ পাউণ্ড করদান ও তদনুরূপ পাউণ্ডের মাল বিলাত হইতে রপ্তানি করিতে হইবে। কোম্পানি কোন এক বৎসরে বার্ষিক সাড়ে বার হারের উপস্বত্ব অধিক করিতে পারিবেন না, উহা দশ টাকার কম হইলে, তদনুপাতে করাংশ হ্রাস হইবে। আর যদি কখন ঐ লাভের বণ্টনের হার বার্ষিক ছয় টাকার নিম্নে যায়, তখন কোম্পানিকে একেবারে বার্ষিক করদান করিতে হইবে না। সার জন্ লিণ্ডসে ইংলণ্ডের রাজার রণপোতগুলির সর্ব্বাধ্যক্ষ পদে মনোনীত হইলেন ও রাজার স্বত্ব রক্ষা সমুদ্রে থাকিয়া করিবেন। এইরূপে ক্লাইবের বিচার হইবার পূর্ব্বেই বিলাতের মহাসভা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মস্তকে হস্ত প্রদান করিয়া বিনা অর্থ, বল ও লোকক্ষয়ে বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি ইংলণ্ডের পক্ষে লাভ করিল। এরূপ সৌভাগ্যোদয় পৃথিবীর মধ্যে কাহারও কখন হয় নাই।
পরিবর্ত্তনশীল জগতের নিয়মানুসারে একদিক ভাঙ্গিল ও অন্যদিক গড়িল—ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সূর্য্য চিরদিনের জন্য অস্তমিত হইয়া আমেরিকার গগনে উদিত হইয়াছিল। হায়! ইংরাজ বণিকগণের শতাধিক বর্ষব্যাপী প্রভূত ধন রত্নোপহার, চিকিৎসা-কৌশল, অবিশ্রান্ত জীবনোৎসর্গ, নিগ্রহাপমান, ষড়যন্ত্র, চাতুরী, সন্ধি, যুদ্ধ বিগ্রহাদির সুফল লাভ তাহাদের না হইয়া শেষে ইংলণ্ডের রাজারই হইল। ইহাকেই বলে সৌভাগ্য। তখনই ইংরাজ মহাপুরুষগণের পৃথিবীতে স্বর্ণ সিংহাসনে ইন্দ্রত্ব করিবার দ্বার উন্মুক্ত হইল। বামনাবতার ক্লাইব বলির নিকট যেন দেওয়ানি দান গ্রহণ করিয়া কলিকাতায় চক্রদণ্ডধারী চতুর্ভূজরূপে দ্বারিবেশে প্রহরীর কার্য্য করিতেছিলেন। ভগবান যদি আহম্মদ সা ডুরানি দ্বারা ১৭৬১ খৃষ্টাব্দে ৭ই জানুয়ারি পাণিপথক্ষেত্রে সম্মিলিত মার্হাটাশক্তি খবর্ব না করিতেন, তাহা হইলে লর্ড ক্লাইবকে পূর্ব্বের মত ঐ দেওয়ানি পুনরায় প্রত্যাখ্যান করিতে হইত। দেওয়ানি লইয়া মার্হাটাদিগকে চৌথ দিয়া কি লাভ হইত? ১৭৫৯ খৃষ্টাব্দে ক্লাইব বিলাতের প্রধান সচিবকে এদেশের অবস্থা ও দেওয়ানি সম্বন্ধে স্পষ্ট লিখিয়াছিলেন যে, তিনি কেন পূর্ব্বে উক্ত দেওয়ানি গ্রহণ করেন নাই, কত ইংরাজ সৈন্য রক্ষা করিলে উহা গ্রহণ করিয়া দেশ শাসন করা যাইতে পারে, সেকালের মুসলমান সুবেদারগণকে কিরূপ বিশ্বাস করা যাইতে পারে, * দেশের লোকেরা উহাতে কোন আপত্তি করিবে না, বরং তাহারা সন্তুষ্ট হইবে। উহার প্রত্যুত্তর তাঁহার প্রেরিত দূত ওলাস্ সাহেবের নিকট প্রাপ্ত হইতে বিলম্ব হওয়ায় ক্লাইব অত্যন্ত বিরক্ত হন ও ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ২৫এ ফেব্রুয়ারী কলিকাতা ত্যাগ করিয়া বিলাত গমন করিয়াছিলেন। ক্লাইবের পত্র নিয়ে সন্নিবেশিত করা হইল:—
“In taking this step there would be no opposition on the part of the people who would rejoice in so happy a change as that of a mild for a despotic Government, provided we agrred to pay him (Moghul Emperor) the stipulated allotment out of the revenues. Application has been made to me from the Court of Delhi to take charge of collecting this payment, the persom entrusted with which is styled the King’s Dewan and is the next person both in dignity and power to the Subah. But this high office I have been obliged to decline for the present, as I am unwilling to occasion any jealousy on the part of the Subah especially I see no likelihood of the Company’s providing us with sufficient force to support properly so condiderable an employ, and which would open a way for our securing the Subahship to ourselves. So large a sovereignty may possibly be an object too extensive for a mercantile company; and it is to be feared they are not of themselves able, without the nation’s assistance to maintain so wide a dominion. I have thereupon presumed, to represent this matter to you, and submit it to your consideration whether the execution and a design, that may hereafter be carried to still greater, lengths, be worthy of the Government’s taking it in hand. I flatter myself I have made it pretty clear to you that there will be little or no difficulty in obtaining the absolute possession of these rich kingdoms; and that the Mughul will consent, on condition of our paying him less than a fifth of the revenues thereof. Now I leave you to judge, whether an income yearly of upwards of 2000000 sterling, with the possession of three provinces abounding in the most valuable productions of nature and art, be an object deserving the public attentions, and whether it be worth the nation’s while to take proper measures to secure such an acquisition which under the management of so able and disinterested a minister, would prove a source of immense wealth to the Kingdom, and might in time be appropriated in past as a fund towards diminishing the heavy load of debt under which we at present labour.”
ইংলণ্ডের প্রধানমন্ত্রী তখন ক্লাইবের প্রস্তাব কার্য্যকরী হইলেও ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মে হস্তক্ষেপ করিতে প্রস্তুত হন নাই, কিন্তু যখন ক্লাইব কর্ত্তৃক দেওয়ানি গ্রহণ করা হইল, তখন আর তিনি নিশ্চিন্ত রহিলেন না। ইহাই বিলাতী রাজনীতি, তখন তাঁহাকে মনে মনে লর্ড ক্লাইবের মহৎ উদ্দেশ্যের প্রশংসা করিতে হইয়াছিল ও মহাসভায় তিনি উহা সাধারণে প্রচার করিতে কুন্ঠিত হন নাই। বিলাতের রাজার সনন্দ লইয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এদেশে বাণিজ্য করিতে আসিয়াছিল সুতরাং তাহারা সেই রাজার শাসনাধীন ও তদনুসারে ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে ফরাসি ও ইংরাজজাতির সন্ধির সর্ত্তানুসারে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে চন্দননগর প্রত্যর্পণ করিতে হইয়াছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে, ইংলণ্ডের সহিত ভারতবর্ষের সম্বন্ধ সেই সময় হইতেই সূত্রপাত হইল। যখন দিল্লীর সম্রাট ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পল্টন লইয়া যেই যুদ্ধ করিতেছে, সেই জয়ী হইতেছে দেখিতেছিলেন, তখনই চতুর সাহ আলম এলাহাবাদে তাঁবুর ভিতর টেবিলের উপর বসিয়া নিম্নে ক্লাইবকে নতজানু করাইয়া কুর্নিশ গ্রহনাস্তে দেওয়ানি পাট্টা দান করিয়াছিলেন। চতুর্দ্দিক হইতে মুসলমানগণ চীৎকার করিয়া বলিল “জয় দিল্লিশ্বরের জয়! জয় সাহ আলামের জয়!” কিন্তু ইংরাজপক্ষ ইংরাজিতে তাহাদের আনন্দধ্বনিতে মুসলমানগণের যেন কণ্ঠরোধ করিয়াছিল। সেই দুই শব্দের সম্মিলিত অস্পষ্টধবনিই প্রতিধবনিত হইয়াছিল। উহার সঙ্গে সঙ্গে ইংরাজিবাদ্য ও জয়গান হইয়াছিল। কোম্পানির সিপাইরা ক্লাইবকে সঙ্গে করিয়া আনন্দোৎসাহে কলিকাতায় প্রবেশ করিয়াছিল ও সেইখানে মহামায়ীর পূজা মহাড়ম্বরে করিয়া শ্রীশ্রী ৺কালীমাতার মন্দির হইতে নিম্নলিখিত গান গাহিতে গাহিতে কেল্লায় প্রত্যাগমন করিয়াছিল।
“কালি গৈয়ে কলকত্তাকি, যিনকে পূজা ফিরিঙ্গি কিন,
বাঙ্গালিকো মুলুক ধনদৌলত দখল করলিন।”
কলিকাতা উদ্ধার ও সেইখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও মীরজাফরের সহিত সন্ধি এবং পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ ও ক্লাইবের সৌভাগ্যোদয় ও উপাধি লাভের মূল কারণ কিন্তু তিনি কলিকাতার ব্যারণ না হইয়া পলাশির ব্যারণ বলিয়া খ্যাতি লাভ করিলেন। ইহা নিশ্চয়ই রহস্যময় বলিতে হইবে। বাঙ্গালাদির নিয়মিতভাবে রাজস্বাদায় করা ও ক্লাইব রোমের প্রোটিয়ান গার্ডের সাহায্যে যাহাকে ইচ্ছা তাহাকেই মুর্শিদাবাদের মসনদে বসাইতেছিল উহাতে দিল্লির সম্রাটের যে স্বত্ত্বহানি হইতেছিল সেই স্বত্ত্ব ও মান্য অক্ষুণ্ণ রাখাই দিল্লীর সম্রাটের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে দেওয়ানি দান করার মূল উদ্দেশ্য ছিল। তখন তিনি উহা মনের সুখে করেন নাই কারণ দুঃখ কষ্টেই মানবের মনে ধর্ম্মালোচনা হইয়া থাকে। সেইজন্য সেই দিল্লির সম্রাট পাদরী কায়ারনাণ্ডারকে ইংরাজের ধর্ম্মপুস্তক আরবি ভাষায় অনুবাদ করিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন বোধ হয়, তিনি তাঁহাদের ধর্ম্মাধর্ম্ম পর্য্যালোচনা করিবেন কিন্তু দেওয়ানি দান করিবার পূর্ব্বে হইলেই ভাল হইত। ক্লাইব দেওয়ানি লাভ করিয়াই নানা কৌশলে সকলের চক্ষে ধূলিদান করিয়া সোনার থলি পূর্ণ করিবার উপায় করেন। সেই হইতেই “তোর শীল, তোর নোড়া, ভাঙ্গবো তোর দাঁতের গোড়া” এই প্রবাদ বাক্য প্রচলিত হয়।
রাজস্বঃ— মীরকাশিম নবাবী পদলাভ করিবার জন্য কলিকাতার ইংরাজ মহাপ্রভুগণের উদরপূরণ ও মনোভিষ্ট সিদ্ধ হইলে নানাবিধ অন্যায় কার্য্যদ্বারা রাজস্ববৃদ্ধি ও অর্থসঞ্চয় করিয়াছিল। উহাতেই বাঙ্গালার রাজস্ব দ্বিগুণ ও পীরত্র ব্রহ্মত্র ও নিষ্কর জমির উপর কর ধার্য্য হইয়াছিল। উহাতে দেশের কি হিন্দু, কি মুসলমান সকলেই ভগবানের নিকট ঐরূপ নবাবের হস্ত হইতে মুক্ত হইবার জন্য আন্তরিক প্রার্থনা করিতেছিল। উহাতেই কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করায় সকলেই প্রথমে যেন নিষৃকতি লাভ করিল মনে করিয়াছিল, কিন্তু ফলে বিপরীত হইল। ক্লাইব এদেশের রাজস্ব কিরূপ ধার্য্য হওয়া ন্যায্য মীমাংসা না করিয়া বা উহা ক্রমঃশই যাহাতে বৃদ্ধি না হয়, এরূপ কোন ব্যবস্থা না করিয়া এক অকর্ম্মণ্য নবাব মনোনীত করিয়াছিলেন ও শেষে তাহার গোবর গণেশ সন্তানকে উপবেশন করাইয়া উহার মন্ত্রী শনি রেজাখাঁকে করিলেন। সেই রেজাখা ও সভ্যগণ কোন সুবিচার না করিয়া নানা অত্যাচারে রাজস্বাদায় ও বৃদ্ধি করিতে লাগিল ও সেইসকল মূর্খ ব্যক্তিগণ আশাতীত বেতন লাভ করিয়া যেন অন্ধ হইয়া পড়ে। সেই সকল উচ্চপদ লাভের জন্য সেকালের ক্ষমতাপ্রিয় হিন্দু মুসলমানগণের মধ্যে বিলক্ষণ হিংসাদ্বেষ গাত্রদাহ সৃষ্টি করিয়াছিল। মুর্শিদাবাদেই পূর্ব্ববৎ রাজত্বের রাজস্বাদায় ও বিচারাদি হইতে লাগিল, সেখানে কেবল কোম্পানির একজন তত্ত্বাবধায়ক ইংরেজ রেসিডেন্ট নিযুক্ত হইয়াছিলেন। সাক্ষিগোপাল নবাব নিজামতীর উচ্চ কর্ম্মচারীর পদপ্রার্থী কোন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিবার অনুরোধমাত্র করিতে পারিতেন কিন্তু উহাদের নিয়োগ, পদচ্যুতি বা বিচার সমস্তই কলিকাতার কোম্পানির গবর্ণর ও সভ্যগণ করিতেন। তখন এদেশের সকল বড় বড় লোক বার্ষিক নয় লক্ষ টাকা বেতন প্রাপ্তির জন্য কলিকাতায় নানাবিধ উপায়ে ঐসকল উচ্চ ইংরেজ কর্ম্মচারিগণের মনস্তুষ্টি করিত। মহারাজ নন্দকুমার ও রেজাখাঁ ঐ পদপ্রার্থী হইয়াছিলেন। কলিকাতার উচ্চ কর্ম্মচারিরা কোন না কোন এক পক্ষাবলম্বন স্বার্থসম্বন্ধে করিতেন। তখন যোগ্যতার বিবেচনা করিয়া সেকালের হিন্দুমুসলমান উচ্চ কর্ম্মচারিগণ নিযুক্ত হইতেন না। উহাদের তখন বেতন অধিক না হইলে কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণের উদর পূরণের ব্যবস্থা কোথা হইতে হইবে? নির্য্যাতীত জমিদারগণ যাহাতে তাহাদের কর বৃদ্ধি না হয় সেজন্য তাহাদিগকে অর্থদানে বশীভূত করিত। সেই নূতন দ্বৈত শাসন প্রণালীর ফল অতীব সুন্দর হইল। নিজামতীর উচ্চ কর্ম্মচারিগণের যৎপরোনাস্তি কঠোর শাসন দ্বারা জমিদারীর রাজস্ব বৃদ্ধি হইত ও সেই অত্যাচার হইতে মুক্তিলাভ করিবার নিমিত্ত জমিদারগণের বিপত্তে মধুসূদন স্বরূপ কলিকাতার উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের ষোড়শোপচারে পূজাদি করিয়া শরণাপন্ন হইতে হইত। ইহাতে সেকালের দেশের জমিদার ও উচ্চ স্বদেশী কর্ম্মচারিরা ইংরাজ গবর্ণর ও তাঁহার সভার সভ্যগণের কামধেনু স্বরূপ হইয়াছিল। অথচ সেই সকল অত্যাচার যে স্বদেশবাসী করিতেছে ও ইংরাজ সুবিচার করিতেছে ইহাও এক অন্যায় ধারণা সাধারণ লোকের মনে বদ্ধমূল হইতেছিল। কি অপূর্ব্ব কৌশল! সেকালের রাজস্বাদায় কিরূপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হইয়াছিল নিম্নে তালিকা দ্বারা উপলব্ধি হইবেঃ—
| ১৭৬১।২ খৃষ্টাব্দে | ১৩৯৫৯৫৯ পাউণ্ড | ১৭৬২।৩ খৃষ্টাব্দে | ১৩০৫৬৫২ পাউণ্ড |
| ১৭৬৩।৪ ” | ১৩৬৬৪৬৩ ” | ১৭৬৪।৫ ” | ১৮৬১৭২৬ ” |
| ১৭৬৫।৬ ” | ৩৬৬৬৩৪৭ ” | ১৭৬৬।৭ ” | ৩১৮১৭৬৩ ” |
| ১৭৬৭।৬৮ ” | ২৯৯৬৫৩৮ ” | ১৭৬৮।৯ ” | ৩৯৩৩২৫৫ ” |
| ১৭৬৯।১৭৭০ ” | ৩২৮৭৭০৬ ” | ১৭৭০।১ ” | ২৭৯৭৩০৬ ” |
খেলাৎঃ— ক্লাইব মুর্শিদাবাদের দরবারে শুভপুন্ন্যাহ সময় সাক্ষি গোপাল গোবর গণেশ নবাবকে মসনদে বসাইয়া খেলাৎ আদি বিতরণ আরম্ভ করেন। উহার ব্যয় ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে দুই লক্ষ ষোল হাজার আটশত সত্তর টাকা হওয়ায় বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ উহা বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। সেই আশ্চর্য্য কৌশল খেলাৎ দান দ্বারা অনেকেই বিনা বেতনে কোম্পানির অনুগত ভৃত্যের ন্যায় কার্য্য করিত। উহাতেই মুর্শিদাবাদের দরবারে পুণ্যাহ কর্ম্মের সময় লোকে লোকারণ্য হইত ও সেই দরবারের মহাসমারোহের মধ্যে দেশের লোকে কোম্পানির কলিকাতার গবর্ণরকে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে দর্শন লাভ করিত। লোকে তখন তাঁহার হস্তে খেলাৎ লাভ করিলে আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিত।
নূতন ব্যবসাঃ— তখন দিল্লির বাদশাহ আপনাকে গৃহশত্রুর হাত হইতে রক্ষা করিবার নিমিত্ত দেওয়ানি দান করিয়া দেশের কি সর্ব্বনাশ করিয়াছিলেন পরবর্ত্তী ঘটনায় প্রমাণ হইয়াছিল। ক্লাইব রাজস্বাদায় ও শাসন প্রণালীকেও এক নূতন অর্থকরী ব্যবসায় পরিণত করিয়াছিলেন। ক্লাইবের সময় এইরূপ দেওয়ানি কার্য্যারম্ভ হইয়াছিল মূর্খ মীরকাশিম প্রমুখ নবাবগণ যে অযথা রাজস্ব বৃদ্ধি আদি করিয়া দেশের সর্ব্বনাশ ও দশের উপর অত্যাচার করিয়াছিল উহার কোন প্রতিকার কি ক্লাইব, বা তাহার পরবর্ত্তী কোন শাসনকর্ত্তা বা বিলাতের পার্লিয়ামেণ্ট সভা কেহই কিছু করেন নাই, ইহা অতি দুঃখের বিষয় বলিয়া বোধ হয়। উহার জন্যই বোধ হয় বিধাতার অভিশাপে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে বিলাতের রাজাকে করদান করিতে হইয়াছিল। ভগবান উদাহরণ দ্বারা করভার কার্য্যতঃ কিরূপ দুঃসহ উহাই তখন উক্ত কোম্পানিকে হৃদয়ঙ্গম করিবার উপযুক্ত সুযোগ দান করিয়াছিলেন কিন্তু ফলে কিছুই হইল না।
কলঙ্কঃ— সেকালের কোম্পানির কর্ম্মচারিরা যখন সামান্য কার্য্য করিত তখন এদেশের লোকের সহিত তাহাদের সুখে দুঃখে সহানুভূতি ও তাহাদের প্রতি যে অত্যাচারাদি হইতেছে উহার প্রতিকারের জন্য পরামর্শ ও সাহায্যদান করিত কিন্তু তাহারা যেমন কোন উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হইত, অমনি যেন তখন তাহাদের সম্পূর্ণ পরিবর্ত্তন হইত। লোকে আন্তরিক দুঃখে উহার প্রতিকারের পথ না থাকায় বলিতে আরম্ভ করে যে, “যে আসে লঙ্কায় সেই হয় রাবণ” ও সেইকথা এখন প্রবাদ হইয়াছে। তখন রামায়ণ মহাভারতই লোকের জ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষার একমাত্র অবলম্বন ছিল, সেইজন্য উহার উপমা দিয়া তখনকার লোকে আপনার সুখ দুঃখ বিবৃত করিত। কলিকাতায় রোগে শোকে জর্জ্জরিত ইংরাজ কর্ম্মচারিগণ অর্থলাভ লালসায় সে সব দুঃখ যেন অনুভব করিত না ও উহাদের অপরের দুঃখ অনুভব করিবার ক্ষমতা ছিল না। হায়! তখন যাঁহারা এদেশের গণ্য-মান্য-বরেণ্য ব্যক্তি, যাঁহারা চেষ্টা করিলে স্বদেশ ও স্বজাতির দুঃখ দারিদ্র্য আদি কষ্ট দূর করিতে পারিত, তাঁহারা সকলেই স্ব স্ব স্বার্থোন্নতির জন্য সর্ব্বদা মুগ্ধ ও ব্যস্ত! হায়! যে রবার্ট ক্লাইব বাঙ্গালীর সহানুভূতি ও আন্তরিক সাহায্যে এই বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি পত্তন করিয়াছিলেন ও আপনার দুঃখ দারিদ্র্য দূর করিয়া উচ্চ পদবী ও গৌরব প্রতিষ্ঠা সমস্তই লাভ করিয়াছিলেন, তিনিও দেওয়ানি লাভ করিয়া এদেশের জমিদার ও প্রজা সকলকেই উদ্ব্যস্ত করিলেন। তখন এদেশে চারিদিকে স্বার্থপরতায় জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত সকলের আদর্শ হইয়াছিল। অর্থ ও পদপ্রাপ্তির লোভে, স্ব স্ব পদোন্নতি ও বিলাস বিভব ভোগ করিবার নিমিত্ত কোম্পানির দাসত্ব করা প্রায় সকলের ধ্যান ও ধারণা হইয়াছিল। তখন যেন সকলে উহা করিতে পারিলেই আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিত।
কোম্পানির এই দেওয়ানি লাভ হওয়ায় মুসলমানগণ বাঙ্গালার যথার্থ মসনদ হইতে একরূপ বঞ্চিত হইলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকগণ সিরাজউদ্দৌলার উপর নানা অযথা কলঙ্কদান করিতে কুণ্ঠিত হন নাই, কিন্তু তাঁহার পক্ষের অধিকাংশ লোক মনের দুঃখে সেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার করুণ উক্তির গল্পটি এখনও বলিয়া থাকে। পলাশি যুদ্ধের কবি উক্ত নবাবের অন্যায় চিত্র অঙ্কন করিয়া যে মহাপরাধ করিয়াছিলেন উহার প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্যই যেন তাঁহার জীবনীতে উহা উল্লিখিত করিয়াছেন। কারণ তিনি তাঁহার পিতার নিকট উহা শ্রুত হইয়াছিলেন, কিন্তু হায়! কি দুঃখের বিষয় উহা তাঁহার প্রসিদ্ধ কাব্যে স্থান পায় নাই। মীরজাফর সিরাজউদ্দৌলার অনুগ্রহে বা মূর্খতায় যে রাজ্যাপরণ করে উহা তাহার ভোগে হয় নাই ইংরাজ বণিক কর্ম্মচারিগণই উহার ধনরত্নাদি সর্ব্বস্ব লাভ করিয়াছিল। উহা নবাব সিরাজউদ্দৌলার নিকট হইতে দুই ফকিরের তরমুজ লাভের গল্পে উক্ত হইয়া থাকে। একজন ফকির নবাবের কৃপা, অপরে ভগবানের কৃপায় দুঃখ দূরের পথ বলিত। সেই দুই ফকিরের উক্তি পরীক্ষা করিবার জন্য নবাব প্রথম ফকিরকে তাহার অজ্ঞাতসারে সুপক্ক তরমুজের মধ্যে ধনরত্ন দান করিল, আর অন্যকে একটি সুপক্ক তরমুজ মাত্র প্রদান করিল। উহাদিগকে পরদিন নবাবের সহিত সাক্ষাত করিতে বলা হইল। ভাগ্য চক্রে উহারা পরস্পর তরমুজ বিনিময় করিয়াছিল। উহাতেই সিরাজউদ্দৌলা বলিয়াছিলঃ— “নাহি দেনেসে মৌলা কেয়া করেগা সিরাজউদ্দৌলা” হায়! শেষে সিরাজউদ্দৌলা সম্বন্ধেও সেই উক্তি সম্যক প্রযুজ্য উল্লিখিত হইতে পারে।
ভাগ্য ও ভগবানঃ— পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে মূর্খ নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফরকে তৎকৃত শপথাঙ্গিকার পূর্ণ করিবার জন্য যে মুকুট শিরদেশ হইতে উহার সম্মুখে ত্যাগ করিয়াছিল উহা মীরজাফর শিরে ধারণ করিয়াছিল বটে কিন্তু শেষে উহার রাজ্যের সমস্তই বিদেশী ইংরাজ বণিকগণের হস্তগত হইল। যাঁহারা সিরাজউদ্দৌলার সর্ব্বনাশ করিয়াছিল তাহাদের পরিণাম শুভ হয় নাই। ভাগ্যই বলবান! মানব ঘটনাচক্রে উহা অর্জ্জন করিয়া থাকে। বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ এদেশের গণ্ডগোল যুদ্ধ হত্যাকাণ্ড মীমাংসা করিবার নিমিত্ত লর্ড ক্লাইবকে নানা উপরোধ অনুরোধ করিয়া পাঠাইলেন তিনি কলিকাতায় পদার্পণ করিবার পূর্ব্বেই উহার সমস্ত নিষ্পত্তি হইয়াছিল। যাহা কিছু বাকি ছিল উহা তিনি করিলেন। ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে ভান্সিটার্ট, কর্ণেল ফোড ও ক্রাফটন আরোরা জাহাজে এদেশে তদন্ত করিবার জন্য আসিতেছিল কিন্তু তাঁহাদের কোন উদ্দেশ্যই পাওয়া গেল না। ক্লাইব যখন এখানে কার্যারম্ভ করেন তখন চারজন মনোনীত সভাপতি তিনমাস অন্তর ক্রমান্বয়ে সভার সভাপতিত্ব করিবেন স্থির করিয়া বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ হুকুম প্রেরণ করিয়াছিলেন কিন্তু উহারা সকলে একমত হইয়া উহা কার্য্যকারী হইবে না স্থির করেন ও ক্লাইবকেই স্থায়ী সভাপতি পদে প্রতিষ্ঠিত করেন। যদি ভান্সিটার্ট প্রমুখ ব্যক্তিগণ এদেশে তদন্ত করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয় ক্লাইবের বিচার ফল অন্যরূপ হইত। উহাতেই তাঁহারা ঘটনাচক্রে বিস্মৃতির অতল গর্ভে সমুদ্রে লুক্কায়িত হইলেন। ক্লাইব কখনও বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের আদেশানুসারে কোন কার্য্য করেন নাই, কি সন্ধি, কি বিগ্রহ, কি ব্যবসা, কি শাসন, কি দেওয়ানি সকলই নিজের মতে অনুগত সভ্যগণের অনুমোদনে করিয়াছিলেন ও স্বয়ং ও বন্ধুবর্গ সকলেই অপরিমিত অর্থলাভ করিয়াছিল। তাঁহার মূল অস্ত্র ছিল ষড়যন্ত্র তিনি একজন উহার প্রধান নেতা ও কর্ত্তা ছিলেন। তাঁহার অধীনে যাহারা কার্য্য করিত তাহারাও সকলে অর্থশালী মর্য্যাদাবান হইয়াছিল। ইংরাজেরা ক্লাইবকে পলাশিযুদ্ধের জেতা বলিয়াই গৌরব করিয়া থাকেন ও তিনি সেইজন্য আভিজাত্য লর্ড পদবী লাভ করিয়াছিলেন কিন্তু উহার যথার্থ মূল্য যে কি উহা নদীয়ার জমিদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশধরকে মহারাজা উপাধিলাভের সনন্দ দানের সময় কোম্পানির কর্ম্মচারি মনি সাহেব যাহা বলিয়াছিলেন উহা উল্লেখ করিলেই যথেষ্ট হইবে।
“Government had conferred on the Rajah the title of Maharajah Bahadur bacause he had long thought him worthy of it. It was throngh the advice and assistance of the ancestors of this Rajah that the British founded the magnificient Empire in Hindustan. If it were not for that assistance, Lord Clive would never perhaps have succeeded in winning the battle of Plassay. অর্থাৎ বোধ হয়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উপদেশ ও সহায়তা ব্যতীত লর্ড ক্লাইব কখনই পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করিতে সক্ষম হইতেন না। “একে বলে ভূতের মুখে রামনাম।”
প্রায়শ্চিত্তঃ— কোম্পানি ব্যবসাদারের রাজত্বে অর্থের ব্যাপারে মুড়ি মিছরির একদর। সেই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে রাজস্বদানের বিলম্ব হওয়ায় ষ্ক্রাফটন সাহেব তাঁহাকে সামাজিক দণ্ড দ্বারা জাতিনাশ করিবার ভয় প্রদর্শন করিয়াছিলেন ও তাঁহার পুত্র শিবচন্দ্রকে ঐজন্য কলিকাতায় নজরবন্দি পর্য্যন্ত করিয়াছিলেন। ইহাই তাঁহার মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত। লর্ড ক্লাইব মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজস্ব হ্রাস করিয়া ও পলাশিযুদ্ধ লব্ধ কতকগুলি কামান উপহার দিয়া যে সদুপদেশ দান করিয়াছিলেন, তিনি যদি উহার মর্ম্মাবগত হইতেন, তবে তাঁহার সেই দুর্দ্দশা হইত না। মানবের উদ্দমশীল হইয়া আত্মরক্ষার আয়োজন সর্ব্বাগ্রে করা উচিত তবে কেবল চাতুরি চক্রান্তে আলস্যের উদাহরণ স্বরূপ হওয়া বা নিশ্চিন্তে রাজস্ব আদায় করিয়া বিলাস, জাতি, কুল, মানের ভিখারি হইয়া তন্নিমিত্ত অর্থ নষ্ট করা কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি সমর্থন করিতে পারে না। গোপাল ভাঁড় প্রমুখের ভাঁড়ামিতে বা কবি ভারতচন্দ্রের অশ্লীল আদিরসের প্রশ্রয়দান বা বানরের বিবাহে অর্দ্ধ লক্ষ অর্থ ব্যয় করা শ্লাঘার কথা নয়। প্রকৃত জমিদারের ন্যায় দেশের যাহাতে মঙ্গল হয় সে বিষয়ে কর্ম্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইলে ভাল হইত। ক্লাইবের ন্যায় উদ্যমশীল ব্যক্তি ইংরাজ জাতির গৌরব—তিনি মিঃ রসকে ১৫ই এপ্রেল ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে যে পত্র প্রেরণ করেন উহাতে স্পষ্টই লিখিয়াছিলেন যে, সৈন্যসামন্ত দ্বারা বাণিজ্য রক্ষা করা আবশ্যক, কিন্তু আবার যখন দেখিলাম যে উহা অপেক্ষা সৈন্য তৈয়ারি করিয়া উহাদিগকে কাহারও সাহায্যে প্রেরণ করা অধিকতর লাভজনক ব্যবসা তখন উহাই অবলম্বন করিয়াছি। এতদূর অগ্রসর হইয়া এখন পশ্চাদনুবর্ত্তন করা যায় না। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র যদি ক্লাইবের ন্যায় উদ্যমশীল হইতেন, তাহা হইলে চেষ্টা করিলে তিনিই অনায়াসে বাঙ্গালার দেওয়ানি লাভ করিতে পারিতেন। সৌভাগ্য ও উদ্যম উভয়ই মানবের উন্নতির পথ। উহাদের মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ রক্ষা করিতে পারিলেই মানব কৃতকার্য্য হইতে পারে। উপযুক্ত সময়ে বীজ বপন করিয়া ফললাভ করা উচিত। “সময়েতে ফলে বৃক্ষ সর্ব্বদা না ফলে”। ক্লাইবের আর এক প্রধান গুণ যে তিনি আশ্রিত প্রতিপালক ও তাহাদের উন্নতিকারক ছিলেন।
গুরুদক্ষিণাঃ— কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারীরা এদেশী পৃষ্ঠপোষকগণের দ্বারা কিরূপ চক্রান্তে কেমন করিয়া অর্থলাভ করিতে হয় উহা শিক্ষা করিত ও তাহার ফলভোগ করিয়া প্রভুদিগকে গুরুদক্ষিণা দান করিত। উহাতেই কলিকাতায় রাজা মহারাজার ছড়াছড়ি ও গড়াগড়ি হইয়াছিল। সেকালে মোগল শাসনকর্ত্তারা অত্যন্ত অল্প সৈন্য লইয়া দেশ শাসন করিত সুতরাং তখন অস্ত্রশস্ত্র হাতী পাল্কি আদি ব্যবহার করা সম্রাটের অনুমতি ব্যতীত কেহ করিতে পারিত না। ক্লাইবের অনুগ্রহে কলিকাতায় উচ্চ নীচ হইয়াছিল ও নীচ উচ্চ হইয়াছিল। কোম্পানির অনুগৃহীত ব্যক্তি যতই অপরাধী হউক বা সমাজে তাহার স্থান যেমনই হউক, তাহাকে উন্নত করিতে হইবে। কারণ উহা না করিলে লোকে কেন কোম্পানির কর্ম্ম করিয়া দেশের সর্ব্বনাশ করিবে। ক্লাইব প্রমুখ সৃষ্টিধর মহাপুরুষ দেওয়ানি লাভ করিয়া যেরূপ স্বজাতি ও স্বদেশের রাজার দুঃখ দূর করিয়াছিল, সেইরূপ তাহাদের মুন্সি দেওয়ান ও বেণিয়াণগণেরা রাজা মহারাজা উপাধি, হস্তী, পাল্কি আরোহন দিল্লির সম্রাটের সনন্দে করিয়াছিল। উহাতেই রাজবল্লভ, নন্দকুমার, রামচরণ, সুখময় প্রভৃতি সকলেই মহারাজা উপাধিলাভ, চার পাঁচ হাজার সৈন্যরক্ষা ও হাতী পাল্কী আরোহন করিবার সনন্দ লাভ করিয়াছিল। কোম্পানি সেই সকল উপাধির সনন্দ দিল্লি হইতে আনাইয়া প্রদান কালে কলিকাতায় বা অন্যত্রে শোভাযাত্রায় উহা জাহির করিত। সেকালে যাহারা কোম্পানির সহায়তা করে তাহাদের কিরূপ সৌভাগ্যোদয় যাহাতে দেশের নরনারী সকলে উদাহরণ দৃষ্টে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, তজ্জন্য আড়ম্বরের শোভাযাত্রা আবশ্যক হইয়া পড়ে। লোকে তখন উহাদিগকে কোম্পানির পোষ্যপুত্র বলিয়া উপহাস করিত। উহার প্রতিকার করিবার নিমিত্ত কোম্পানি তাহাদের পরামর্শে কলিকাতায় এক নূতন বিচালয় সৃষ্টি করেন উহাতে জাতি সংক্রান্ত বিবাদ মীমাংসা করা হইত। সেই আদালতের বিচারপতি হইতেন সেই সকল কোম্পানির পৌষ্যপুত্রগণ। উহাতেই সেই উপহাস বন্ধ হইয়া সকলেই তাহাদিগকে প্রকাশ্যে অত্যন্ত সম্মান করিত। কোম্পানির কর্ম্মচারিরা যে কেবল ব্যবসা ও রাজত্ব করিত উহা নয়, এইরূপে তখন সমাজ শাসনও আরম্ভ করিয়াছিল। মহাপ্রভুদের কৃপায় সেই সকল এদেশের মহাপুরুষগণ সকলেই কলিকাতায় বাস করিতেন ও তাঁহাদের রাজত্ব বা জমিদারী করিবার কোন কিছু অভাব হয় নাই। তাঁহারা একরূপ স্ব স্ব প্রভুদের স্মৃতি রক্ষা করিতেছেন। তাঁহাদের উপাধি ও বংশ মর্য্যাদা তাঁহাদের দ্বারাই হইয়াছিল বলিলেই চলে। তত্রাপি তাঁহাদের লইয়া কলিকাতায় দলাদলি বিবাদ হইত, ও সঙ্গে সঙ্গে বিলাতের পার্লিয়ামেণ্টেও কোম্পানির সৃষ্টিধর গবর্ণরগণও যৎপরোনাস্তি নিগৃহীত ও অপমানিত হইতে লাগিলেন। সেইখানেই বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর মাহাত্ম্য ও ইংরাজের অপূর্ব্ব কীর্ত্তি!!! বাঙ্গালায় বল্লালী পন্থায় রাজ্যশাসন ও জাতি বিচার আদর্শ হইয়াছিল।
আশ্চর্য্য প্রত্যুপকারঃ— এদেশের ব্যবসায়ীরা তখন কোম্পানির বীর ও বরপুত্রগণের ন্যায় কোনরূপ অনুগ্রহ লাভ করেন নাই, বরং তাহারা তাহাদের পৈত্রিক ব্যবসা ত্যাগ করিয়া সঞ্চিত অর্থ ঋণদান করিয়া যৎকিঞ্চিৎ সুদের উপস্বত্তে জীবন যাপন করিতে আরম্ভ করে। সেইখানেই ক্লাইবের সর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর কলঙ্ক ও অপরাধ। বাঙ্গালায় পাঠান ও মোগল রাজত্বকালে জনসাধারণ এক অসভ্যোচিত ইতর নিষ্ঠুরতায়, অদম্য পাশবিক ইন্দ্রিয়াসক্তি, দুর্দ্দমণীয় অত্যাচার ও অর্থপীড়নে প্রপীড়িত ছিল তাহারা ভাবিয়াছিল যে ইংরাজ জাতি বৈজ্ঞানিক শিক্ষিত রণনিপুণ ও ব্যবসায়ী, তাহাদের অভ্যুদয় হইলে সকলে এবং যাহারা তাহাদিগকে এদেশের ব্যবসা বাণিজ্য কেমন করিয়া করিতে হয়, অর্থ সাহায্যাদি দ্বারা উহাদিগকে শিখাইয়াছিল তাহারা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক উপকৃত হইবে কিন্তু পরিণাম অতীব শোচনীয় হইল। ব্যবসায়ীও ধনে প্রাণে মারা গেল। বাঙ্গালা দেশে ইংরাজ ব্যতীত আর কেহই ব্যবসা করিতে পারিল না। তাহাদের একাধিকার ব্যবসা ক্লাইবের কঠোর শাসন দণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ক্লাইবের গবর্ণরীর শাসন ও ব্যবসা রীতি দ্বারা ব্যবসায় কিরূপ লাভ কোম্পানির কর্ম্মচারিগণ করিত উহার মর্ম্ম পূর্ব্বের সহিত পরবর্ত্তীকালের তুলনা করিলেই উহা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারা যাইবে। ১৭১০ খৃষ্টাব্দ হইতে প্রায় কুড়ি বৎসর ব্যবসা করিয়া টমাস্ ফকনার নামে এক কোম্পানির সামান্য কর্ম্মচারি মৃত্যুকালে উইলে তাহার সম্পত্তি বন্দোবস্ত করিয়া যান। উহাতে তাহার সমস্ত সম্পত্তির অধিক মূল্য অবধারিত করিবার উপায় নাই বটে, তবে উহাতে যে সকল দানোল্লেখ আছে উহাতে তাহার সম্পত্তির পরিচয় অনুমান করা যায়। সেই ব্যক্তি তাহার মাতাকে দশ হাজার পাউণ্ড, গবর্ণর ফিচের কন্যাকে (যাহাকে সে ভগ্নি বলিয়া সম্বোধন করিত) সাড়ে ছয় হাজার পাউণ্ড, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে দুই হাজার ও ভৃত্য আণ্টিলোপকে বিলাতের শিক্ষাদান করিবার জন্য আড়াইশত পাউণ্ডের সুদ দান করিয়াছিলেন এবং অবশিষ্ট সম্পত্তি তুল্যাংশে দুই সহোদরকে প্রদান করেন। * আর সেকালের ইংরাজগণের মধ্যে যিনি বাঙ্গালা ভাষায় পণ্ডিত হইয়াছিলেন ও এদেশে সর্ব্বপ্রথম মুদ্রাযন্ত্র আনয়ন করেন, তিনি ও বলিয়াছেন যে, কতকগুলি কোম্পানির কর্ম্মচারী প্রদেশে গোপনে দুই বৎসর একাধিকবার ** লবণ, পান ও তামাকের ব্যবসা করিয়া ষাট জন অংশীদারকে দশলক্ষ চুয়াত্তর হাজার লাভাংশ বিতরণ করেন।
তখন এদেশের লোক পরিশ্রমী ছিল জমিদারগণের ন্যায় অলস ছিল না। স্ত্রী পুরুষ বালক সকলেই স্ব স্ব পরিশ্রম দ্বারা অর্জ্জিত ধনে জীবন নির্ব্বাহ করিত। দিবাভাগে গৃহস্থালী করিয়া যে সময় অবশিষ্ট থাকিত উহা-স্ত্রীলোকেরা বয়ন, সুতাকাটা শিল্পাদিতে ও পুরুষ বালকেরা পৈত্রিক বৃত্তিতে নিযুক্ত থাকিত। দেশের অভাব দেশের লোকে দেশের দ্রব্য ব্যবসায়ীর দ্বারা বিনিময়াদি করিয়া পূরণ করিত। বিদেশীর মুখপ্রত্যাশী হইয়া আমদানী ও রপ্তানীর অভাবের অনুপাতে দ্রব্যের মূল্য হ্রাস বৃদ্ধি হইত না। এদেশের ব্যবসার মূলে কুঠারাঘাত বিলাত হইতে পার্লিয়ামেণ্টের আইনে চারলক্ষ পাউণ্ডের দ্রব্য আমদানি করিতে হইবে বিধিবদ্ধ করায় হইয়াছিল। পূর্ব্বে যে জিনিষ বিক্রি করিয়া এদেশের বণিকগণ অন্যদেশ হইতে ধনাগম করিত, উহার পথ সেই বিদেশী বণিকের ব্যবসায় ও দেওয়ানিতে শেষ হইয়াছিল। শিল্পিকে কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের শাসনদণ্ডে ও চাতুরিতে কর্ম্ম করিতে বাধ্য হইয়াও দাসত্ব করিতে হইয়াছিল। মুসলমান রাজত্বকালে দেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা নষ্ট হয় নাই। দেশে রোগে দুর্ভিক্ষে যে কিছু দুঃখ দারিদ্র উপস্থিত হইত তখনকারকালে উহার হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিবার পথ ও উপায় ছিল কিন্তু কতকগুলি মূর্খ গোবরগণেশ নবাব ও তাহাদের কর্ম্মচারিগণের ক্রমাগত রাজস্ব বৃদ্ধি করায় ও উহার প্রতিবাদ না করিয়া জমিদারগণ পীড়ন করিয়া নিরীহ প্রজার নিকট রাজস্ব আদায় করায় কৃষকগণ পলায়ন ও জমি জায়গা পতিত হইতে থাকে। কি ছিল!! কি হইল!!!
ক্লাইব ইউরোপের কোন বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন নাই বা কোন বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করেন নাই। তাঁহার যাহা কিছু শিক্ষাদীক্ষা সমস্তই কলিকাতায় হইয়াছিল কি ব্যবসা, কি জমিদারী, কি যুদ্ধ জয়, কি রাজ্যাধিকার, কি সন্ধি, কি বিগ্রহ সমস্তরই হাতে খড়ি ও নৈপুণ্য লাভ কলিকাতায় হইয়াছিল। তিনি এদেশেই ঐ সকল শিক্ষা করিয়া যে গুরুদক্ষিণা দান করিয়াছিলেন উহা বিস্মৃত হইবার কথা নয় ইহা সকলেই স্বীকার করিবেন। ক্লাইবের শাসন প্রণালীতে দেশের ভয়ানক সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। প্রাচীন জমিদারগণ যতদিন পূর্ব্বসঞ্চিত ধনরত্নাদি ছিল, ততদিন তাহারা উহা দ্বারা পৈত্রিক সম্পত্তি জমিদারী রক্ষা করিয়াছিল কিন্তু শেষে উহা কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের উমেদারগণের করতলস্থ হইল। উহারা কেহ বিনামূল্যে, কেহ স্বল্প মূল্যে প্রাপ্ত হইয়া জমিদার ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হইয়াছিল। বর্ত্তমান গর্বণমেণ্টের সাহায্যে মিঃ জর্জ ডবলিউ ফরেষ্ট সেকালের কোম্পানির কাগজপত্রাদি অনুসন্ধান করিয়া যে পুস্তক প্রকাশ করিয়াছিলেন উহার মুখবন্ধেই ঐরূপ বলিয়াছেনঃ—
“The double Government established by Clive, by which, the internal administration of the Country had been placed in the hands of natives under the control of a few European supervisors, had proved a failure. The people grew poorer day by day and the native functionaries and Zaminders richer. To remedy the evil, the court of Dirrectors determined to place the internal administration of Bengal and the Collection of the revenue directry under their own European servants. They henceforward determined to use their own words to Startforth as, Duan” অর্থাৎ ক্লাইবের শাসন প্রণালী বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষ ফল দ্বারা বিভ্রাটকারী ও অনিষ্টকারী মনে করিয়াছিলেন আর তাঁহারা এদেশী লোকেজনের সাহায্যে কোন কার্য্য করা যুক্তি সঙ্গত নয় স্থির করেন। সেই হইতে ইংরাজি কর্ম্মকর্ত্তাগণের দ্বারা এদেশের শাসন ও রাজস্ব আদায়াদি আরম্ভ হইয়াছিল। ক্লাইবের শাসন প্রণালী অনুসারে কার্য্য করিবার ভার ভেরিলষ্ট ও তাঁহার পরে কার্টিয়ারের হস্তে অর্পিত হইয়াছিল। তাঁহারা ক্লাইবের যুগের লোক ও পরবর্ত্তী শাসনকর্ত্তা ছিলেন। কলিকাতার ইংরাজ শাসনকর্ত্তাগণের নামের সহিত তাঁহাদের শাসনকালের তালিকা নিম্নে সন্নিবেশিত করা হইলঃ—
ইহাদের রাজত্ব ও শাসনের সঙ্গে সঙ্গেই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আদিকাণ্ড শেষ হইয়াছিল। আর ওয়ারেণ হেষ্টিংস ক্লাইবের যুগের লোক ও তিনিই সন্ধিক্ষণের সন্ধিপূজায় মহামায়ীর নিকট ব্রাহ্মণ নরবলি দান করিয়া কলিকাতার মাহাত্ম্য বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন।
মহারাজ নন্দকুমারঃ— সেই মহাত্মা নন্দকুমার কলিকাতার অধিবাসী ও কলিকাতা হইতে নবাব মীরজাফরের রাজ্য প্রাপ্তির জন্য যাবতীয় চক্রান্ত করিয়াছিলেন, কিন্তু উহা প্রকাশ হইয়া পড়ায় তিনি সেইখানে নিগৃহীত হইয়াছিলেন। ক্লাইবই মীরজাফরের বিধাতা পুরুষ, কিন্তু শেষে নন্দকুমার শ্বশুর জামাতার সিংহাসন বিনিময় উপন্যাসের ন্যায় করাইয়া অনেকের বিষদৃষ্টিতে পড়িয়াছিলেন। সেইজন্যই তাঁহার নিয়োগ সম্বন্ধে কোম্পানির মাতা মণিবেগমের অনুরোধও উপেক্ষিত হয় ও রেজা খাঁ নিজামতির সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া পড়েন। সেই নন্দকুমারই বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ দ্বারা রেজা খাঁর পদচ্যুতি করাইয়াছিলেন। সেকালের শিক্ষিত বাঙ্গালীর কিরূপ ক্ষমতা ছিল, উহা নন্দকুমারের কথায় স্পষ্ট প্রকাশ হয়। তাঁহার বিচার বিভ্রাট লইয়া বাঙ্গালায় ও ইংরাজিতে বহু পুস্তক প্রকাশিত হইয়াছে, সুতরাং সে সম্বন্ধে বিশেষ কিছু না বলিলেই চলে। তবে তাঁহারা নন্দকুমারের সহিত কলিকাতার ঘনিষ্ট সম্বন্ধের কথা যাহা প্রকাশ করেন নাই উহাই বলিতে হইবে। কলিকাতাতেই তাঁহার বিচার ও লীলা শেষ হইয়াছিল। পূর্ব্বে সেইখানে তিনিই রেজাখাঁর শাস্তি বিধানের আয়োজন অতি দক্ষতার সহিত করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু শেষে অর্থের মোহিনী শক্তির নিকট তাঁহার পরাজয় হইয়াছিল। ক্লাইব ভেরিলষ্ট প্রমুখ গবর্ণরগণ মুর্শিদাবাদে গমন করিলে মনি বেগমের আতিথ্য স্বীকার হিসাবে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা লাভ করিতেন, একথা ওয়ারেণ হেষ্টিংসের বিচারের সময় প্রকাশ হইয়াছিল। সেজন্য নন্দকুমারকে ইতিহাসে ধন্যবাদ দান করা উচিত ও সেকথা এখানে উল্লেখ করা অবশ্য কর্ত্তব্য।
“Every Governor coming to Murshidabad received two thousand rupees a day in lieu of provisions, beyond that Munny Begum had not given a single cowrie and every payment would appear on the record. At the trial of Warren Hastings the managers of the impeachment having summoned the auditor of the India office, he read from a book of public accounts a statement of the allowance made at Murshidabad to Lord Clive first and next to Mr. Varlest when they were Governors which confirmed the truth of the Begum’s declaration that every Governor at Murshidabad received the same allowance as Hastings”. (Forrest Selection from Government Records.) xxxviii Introduction.
নন্দকুমার এদেশী কর্ম্মচারী বলিয়া এইসকল গুপ্তবিষয় প্রকাশ করিয়া ভবিষ্যতে কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের অর্থোপায়ের বিলক্ষণ ক্ষতি করিয়াছিলেন। তজ্জন্যই বোধ হয়, বিদেশী কর্ম্মচারিগণের দ্বারাই এদেশের যাবতীয় কর্ম্ম করা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়ে। নন্দকুমার যখন নবাব মীরজাফরের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ মুর্শিদাবাদের রাজকার্য্য করিতেন, তখন ওয়ারেন হেষ্টিংস সেইখানে রেসিডেণ্ট ছিলেন। উহাদের পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব ভিন্ন কোন বিবাদ ছিল না।
ওয়ারেণ হেষ্টিংসঃ— কলিকাতার আদিকাণ্ডে ওয়ারেণ হেষ্টিংসের পরিচয়ও পুরাতন প্রথায় শাসনাদির বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক। হেষ্টিংস কলিকাতায় সর্ব্বপ্রথমে কেরানিগিরী করিতেন ও সিল্ক মসলিনের যাচাই ও ইনভয়িস লিখিতেন। পরে মুর্শিদাবাদে বন্দি হইলে পলতায় পলাইয়াছিলেন ও ক্লাইবের অধীনে বজবজের যুদ্ধে লড়াই করিয়াছিলেন। তিনি কলিকাতার কোম্পানির সভায় সভ্যরূপে গবর্ণর ভান্সিটাটের প্রস্তাব সমর্থন করিয়া সততার জন্য সুখ্যাতি লাভ করেন। তিনি বিলাতে পনর বৎসর কার্য্যের পর ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে গমন করেন ও পূর্ব্বোক্ত ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দের তদন্ত সভায় এতদ্দেশের কর ও রাজা নবাবগণের বিষয়ে সাক্ষ্যদান করিয়া বিলাতের কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের শুভদৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে তাঁহারা তাঁহাকে কৃতজ্ঞতার চিহ্ণস্বরূপ মাদ্রাজের গবর্ণরের সভায় নিয়ে দ্বিতীয় সভ্য মনোনীত করেন। সেই হইতেই তাঁহার উন্নতির সূত্রপাত হয়। কোম্পানির রাজত্বকালের আদিকাণ্ডের শেষ ও অন্ত্যলীলায় আদি হেষ্টিংসই পত্তন করিয়া ইতিহাসে কলঙ্ক ও গৌরব উভয়ই লাভ করিয়াছিলেন।
সিরাজউদ্দৌলার রাজ্যচ্যুতির পর হইতে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের সেখান হইতে এদেশের প্রতিনিধি বা কর্ম্মচারিগণের কার্য্যকলাপ তত্ত্বাবধান করিবার কোন সুযোগই ছিল না। ক্লাইবের একাধিকার ব্যবসা বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের হুকুমের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে করা হইয়াছিল। উহাতে লবণের অত্যধিক দাম বৃদ্ধি হওয়ায় উহা গরীব প্রজাগণকে কর স্বরূপ বহন করিতে হইয়াছিল। দরিদ্রের দুরবস্থা চিরকাল, কিন্তু সেকালের এদেশী কর্ম্মদক্ষ অর্থশালী ব্যক্তিরও সেই দশা হইয়াছিল।
সেকালের পদমূল্য ও মর্য্যাদাঃ— ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের তদন্তকাল যাহা বিলাতে প্রেরিত হইয়াছিল উহাতে প্রকাশ যে, কোম্পানির প্রধান প্রধান কর্ম্মচারিরা নবাবকে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসাইবার ও রেজা খাঁকে কর্ম্মকর্ত্তা করিবার জন্য উহাদের নিকট হইতে সতের লক্ষ টাকার অধিক লাভ করিয়াছিলেন। আরও তাঁহারা ঐপদ প্রধানের পূর্ব্বে দুর্ল্লভরাম ও নন্দকুমারের নিকট হইতে কয়েক লক্ষ টাকা উপহার লাভও করিয়াছিলেন, কিন্তুর রেজা খাঁ তাহাদিগকে পরাস্ত করিয়া পদের যথার্থ মূল্য দান বা কর্ত্তাগণের মর্য্যাদা স্বরূপ উপহার দান করিয়া কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন। ইহাও কি এক নূতন ব্যবসা নয়, যে, যাহার জন্য ক্লাইবের ও পরবর্ত্তী গবর্ণরগণের মর্য্যাদা রক্ষিত হইত এমন অর্থকারী গৌরবের পদ মর্য্যাদা তখন বোধ হয়, আর কোথাও বর্ত্তমান ছিল না। সেইজন্যই তখন কলিকাতার সৌভাগ্যলাভ করিবার জন্য রোগ ও প্রাণভয় তুচ্ছ করিয়া লোকে গবর্ণরী করিতে আসিত। সেই সকল ভাগ্যবান পুরুষেরা স্বদেশে নবাব বলিয়া আদৃত হইতেন। কলিকাতা ইংরাজের অর্থলাভ ও শক্তি বিস্তারের কেন্দ্র হইয়াছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকগণ উহার নিকটবর্ত্তী স্থানে থাকিয়া সেরূপ কিছুই করিতে পারে নাই। ইহাতেই কলিকাতার মাহাত্ম্য স্বীকার করিতে হয়। ফরাসিরা ইংরাজগণ অপেক্ষা বলশালী ছিল, কারণ ক্লাইব কলিকাতায় আসিবার পূর্ব্বেই উহাদিগকে পরাস্ত করিয়া আপনাকে বীর বলিয়া পরিচয় দিবার কৃতসঙ্কল্প করিয়াছিলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলারও সেইরূপ ধারণা ছিল।
রাজধানীঃ— কোন নগর রাজধানীতে পরিবর্ত্তিত হইলে উহার সঙ্গে সঙ্গে সেই নগরের ক্রমশ কালে উন্নতি হইয়া থাকে, সেরূপে কলিকাতা কিছু হয় নাই। বাঙ্গালায় কোন একস্থানে কোন এক বাণিজ্য বা শিল্পকেন্দ্রীভূত হইয়া ব্যবসা চলিতেছিল। উহাতে ঢাকা, শান্তিপুর আদি স্থান বিখ্যাত হয়, কিন্তু দেশের দুরবস্থায় ও ইউরোপের ব্যবসায়ীগণের কুঠিতে মাল সরবরাহ করায় ও তাহাদের অধীনে শিল্পিগণ কার্য্য করায় সেই সকল স্থানের গৌরব ক্রমশঃই অন্তর্হিত হইয়াছিল। ইংরাজের প্রাদুর্ভাব ও ফরাসিগণের দুর্দ্দশা হওয়ায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একাধিকার ব্যবসা ও শাসনদণ্ডে লোকে স্বাধীনভাবে ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প করিতে পারিত না, দেশে দুর্ভিক্ষে ভোগবিলাসের দ্রব্য উৎকৃষ্ট কারিকরগণ বিক্রি করিতে না পারিয়া কোম্পানির অধীনে কার্য্য করিতেছিল। উহাতেই তখন কলিকাতায় আসিলে লোকের সৌভাগ্যোদয় হয়, ইহা কি ব্যবসায়ী, কি শিল্পি, কি ধনী, কি দরিদ্র সকলেরই দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল, কিন্তু তখনও উহার স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা কিছুই হয় নাই। উহাতেই দেশে রোগের প্রাদুর্ভাবে প্রলয় উপস্থিত করিয়াছিল। সেইজন্যই কার্টিয়ারের রাজত্বকাল খ্যাত ও ভেরিলষ্টের সময় চট্টগ্রামাদি স্থানের বিলিবন্দোবস্তাদি হইয়াছিল। তাঁহার দেওয়ান বা মুন্সী গোকুল চন্দ্র ঘোষাল ঐ কার্য্য করিয়া সৌভাগ্যশালী হইয়াছিলেন। তিনিও গোবিন্দপুরে থাকিতেন শেষে দুর্গনির্ম্মানকালে ভূকৈলাসে বাসারম্ভ করেন। তাঁহারই ভ্রাতুষ্পুত্র জয়নারায়ণ ঘোষাল উচ্চ উপাধিলাভ ও মান সম্ভ্রমাদি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। উহাই ভেরিলষ্টের কীর্ত্তি বলিলেই চলে। কলিকাতার টাঁকশালে টাকা হইতেও তাহারও ব্যবসা চলিয়াছিল। ক্লাইব উহার ব্যবসা কেমন করিয়া করিতে হয় জগৎশেঠের বংশধরগণের নিকট হইতে সেই শিক্ষালাভ করেন ও উহার গুরুদক্ষিণায় এদেশে ঐ ব্যবসা আর কাহাকেও করিতে হয় নাই।
পোদ্দারিঃ— কোম্পানির কর্ম্মচারীরাই কেমন করিয়া পরের ধনে পোদ্দারি করিতে হয় সর্ব্বসাধারণকে শিক্ষাদান করেন ও উহা কালে চলিত কথায় পরিণত হইয়াছে। কলিকাতায় যাহারা পোদ্দারি করিত, উহাতে তাহাদিগকে ঘর বাড়ী বাগান আদি বিক্রি করিতে হইয়াছিল। ১৭৬৬ খৃষ্টাব্দে ২০এ ডিসেম্বর রাজা নবকৃষ্ণ অতি অল্প মূল্যে পোদ্দার বীরেশ্বর সেনের আঠার কাঠা বসত বাড়ী নয়শত টাকায় ও গোবিন্দচন্দ্র শীলের বাগান খরিদ করিয়া সেইখানে বসবাস করেন মুন্সী নবকৃষ্ণ মুর্শিদাবাদের নবাবগণের বিলাস বিভব যাহা দেখিয়াছিলেন ও যাহা কিছু হস্তগত করিয়াছিলেন উহা স্বয়ং ভোগ করিবার নিমিত্ত উহা দ্বারা নবাবি প্রাসাদ ও দাস দাসী, সপ্তপত্নী বা উপপত্নী কোন অনুষ্ঠানেরই কোন ত্রুটি করেন নাই। শেষে উহা লইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে কলিকাতায় বৃহৎ অভিযোগাদিও হইয়াছিল। বাগবাজারের নামকরণ পেরিণের বাগানের নাম হইতে হইয়াছিল, হিন্দুস্থানী ভাষায় বাগানকে বাগ বলে। পলাশির যুদ্ধের পূর্ব্বে ঐখানে মাটির বুরুজে কামান দ্বারা রক্ষাবন্ধনী হইয়াছিল উহা ১০ই মার্চ্চ ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে নয়ানচাঁদ দত্তের নিকট হইতে সাতশত টাকার খরিদ করা হয়, কলিকাতায় তাঁহার নামে রাস্তা আছে। বাগবাজারের নিয়োগীরা পুরাতন বাসিন্দা—বোধ হয়, উহাদের পূর্ব্বপুরুষ কেবলরাম নিয়োগী কলিকাতায় মাশুল আদায়ের জন্য যে সকল মাল আটক ও বিক্রি হইত তন্মধ্যে লৌহ খরিদ করিত। ঠাকুর গোষ্টীর পূর্ব্বপুরুষ দর্পনারায়ণ ঠাকুর গালা মোমবাতি ও ফ্রান্সিস ডিকোষ্টা চাউল খরিদ করিত। দর্পনারায়ণ ঠাকুরের নামেও কলিকাতায় রাস্তা আছে। হায়! তখন দেশের কি দুরবস্থা—তখন লোকে সেই আটকি মাল খরিদ ও বিক্রি করিয়া ব্যবসা করিত, উহাতেই দুপয়সা লাভ করিয়া ক্রমে ক্রমে বড়মানুষ হইত।
স্মৃতিঃ— ইতিহাসে ক্লাইব ও সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি কলিকাতা অধিকার করার জন্য বহন করিতেছে হায়! সিরাজের কলিকাতা অধিকার ক্ষণস্থায়ী, সে পুরাতন কলিকাতার চিহ্ণমাত্রও এখন নাই, আছে কেবল তাঁহার সৈন্যগণের আস্ফালন ধ্বনি যাহা ছড়ায় চলিত ছিল, এখন লোপ পাইয়াছে—
“নবাব বাহাদুরকো ফৌজ, যৈসি, খোলা তলোয়ার
ঘড়ি ভরমে জিৎ লিয়া, কেল্লা কলকাত্তা বাজার।”
তাঁহার প্রদত্ত সেই আলিনগর নামও নাই, সেই স্মৃতিমাত্র আলিপুর বহন করিতেছে। তবে তাঁহার কলঙ্ক কাহিনীর স্মৃতিমাত্র ব্রিটিশ রাজপ্রতিনিধি লর্ড কার্জ্জন কর্ত্তৃক শ্বেতমর্ম্মরে পুনরুদ্দীপিত হইয়াছে বটে, কিন্তু তাঁহার কৃত কলিকাতা সন্ধির সর্ত্তানুসারে মিরজাফর উত্ত্যক্ত রাজকোষ হইতে কলিকাতা দগ্ধ করিয়া উহার ক্ষতিপূরণের অর্থ শেষে দান করিয়াছিলেন ও উহাতেই কলিকাতার পুনর্গঠন হইয়াছিল সিরাজের সেই স্মৃতি চিরকাল বর্ত্তমান থাকিবে। ইতিহাসে ইহা অপেক্ষা আর এক স্মৃতি আরও অধিকতর গৌরবময়, সিরাজ ক্লাইবের প্রতিদ্বন্দ্বী, ক্লাইব কলিকাতার যুদ্ধে যাঁহাকে সাক্ষাৎ সংগ্রামে পরাভব অসম্ভব প্রত্যক্ষ করিয়া ষড়যন্ত্র ভিন্ন উপায় নাই স্থির করেন ও সৈন্যাধক্ষকে গোপনে বশীভূত করিয়াছিলেন। সেই রাজ্যলাভ অসিদ্ধ ও অস্থায়ী হইবার ভয়ে সিরাজকে গোপনে হত্যা করিতে হইয়াছিল। কারণ যখন সেই নবাবকে রাজধানীতে ধৃত করিয়া আনা হয় তখন সৈন্যনায়কগণ বিচলিত হইয়াছিল। তিনি জীবিত থাকিলে যে রাজ্যোদ্বার করিবেন ইহা নিশ্চয়ই জ্ঞান করিয়াই মীরজাফরের জামাতা মীরকাশিম তাঁহাকে ধৃত করিয়াছিলেন। যদি সেই নবাব অকর্ম্মণ্য, লম্পট ও অত্যাচারী ছিল, তবে এ সব করিবার প্রয়োজন কি? হায়! পলাশি যুদ্ধের কবি ইতিহাস প্রসিদ্ধ ফৈজী ও লুৎফুন্নিসায় পরস্পর বিরোধী নারীচিত্র দ্বারা যৌবনোন্মত্ত নবাবের চরিত্র অঙ্কিত না করিয়া কি এক বিসদৃশ চিত্রই উপহার করিয়াছেন।
কাম ও প্রেম ঃ— মুসলমান রমণীগণের মধ্যে ফৈজি ও লুৎফুন্নিসা কাম ও প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ! নবাব কামুক ফৈজীকে জীবন্ত সমাধি দান করেন ও লুৎফুন্নিসা যতদিন জীবিতা ছিলেন নবাবের সমাধি পূজা করিয়া তাহার নশ্বর দেহ প্রেমের উৎসর্গ স্বরূপ ত্যাগ করিয়াছিল। চমৎকৃত ইংরাজ জাতি ঐতিহাসিকগণও সেই কথা উল্লেখ করা শ্লাঘার বিষয় মনে করিয়া থাকে। হায়! হতভাগ্য সিরাজের হৃদয়রাজ্য যে বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যার সুবেদারী অপেক্ষা শতগুণে মূল্যবান। সেই হৃদয় এক সময় দিল্লির অলোকসামান্যারূপসী নর্ত্তকী ফৈজীর রূপও প্রেমাস্বাদন করিবার জন্য যখন লক্ষ মুদ্রা উপহার করা তুচ্ছ করিয়াছিল কিন্তু যখন যৌবনের উদ্দাম তরঙ্গের মধ্যে মত্ত নবাব সেই রূপমাধুরীর মধ্যে পবিত্র প্রেমের লেশমাত্র দেখিতে পাইলেন না, কেবল কামই বিদ্যমান, কেবল উহার ইন্দ্রিয়-চরিতার্থতা করাই মুখ্য লক্ষ্য, যখন সে ঐরূপ শ্লেষোক্তির দ্বারা নবাবের আত্মমর্যাদা লঙ্ঘন করে, তখনই তিনি তাহাকে উপযুক্ত কঠোর শাস্তি দিতে কিছুমাত্র কুন্ঠিত হন নাই, তখন তিনি আর রূপজ মোহে মুগ্ধ অপদার্থ যুবক নন। আবার ক্রীতদাসী জারিয়ার মধ্যে যখন প্রেমসুরভি আঘ্রাণ করিয়াছিলেন, তখন মাতামহের শত শাসনানুরোধ উপেক্ষা করিয়া সেই ক্রীতদাসীকে হৃদয়ে ধারণ করিয়াছিলেন। তাঁহার লুৎফুন্নিসা নাম দান সার্থক, জগৎ উহার যথার্থতা প্রত্যক্ষ করিয়াছে ও ইতিহাসে উহার স্মৃতি বর্ত্তমান। গুণীর নিকটই গুণের আদর, সিরাজ গুণগ্রাহী প্রেমিক নবাব ছিলেন।
লুৎফুন্নিসাঃ— নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রেমিক, তিনি লম্ফট ছিলেন না, সেইজন্য রাজত্ব ঐশ্বর্য্য ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিবার সময়ও লুৎফুন্নিসাকে ত্যাগ করেন নাই। সেই লুৎফ (ভালবাসা) নেসা (স্ত্রী) নবাবের ভালবাসার পত্নী, সিরাজউদ্দৌলার প্রেম রাজ্যের অপূর্ব্ব কীর্ত্তিস্তম্ভ! আহা! হৃত ও হত সিরাজের পাষাণ নির্ম্মিত সমাধি স্তম্ভ কামিনীর কোমল হৃদয়ের উৎস নয়নের জলে স্নাত ও পবিত্র হইত। জগত মুসলমান যুবতীর যাবজ্জীবন অলৌকিক আত্মোৎসর্গ ও প্রেমোপহার দর্শন করিয়া মুগ্ধ ও চমৎকৃত! ক্লাইবের বা মীরজাফরের হৃদয়ে যদি প্রণয়বেদনা যে কি, প্রেম কি বস্তু কখনও অনুভূত হইয়া থাকিত, তাহা হইলে কখনই সিরাজউদ্দৌলার ঐরূপ নির্দ্দয় হত্যা তাঁহারা কেহই কখন অনুমোদন করিতেন না, আর যদি উহা তাঁহাদের অজ্ঞাতে হইয়া থাকিত, তবে তাঁহারা হত্যাকারীকে বিনা দণ্ডে অব্যাহতি দিতেন না। সেই পবিত্র প্রেমের স্মৃতি নবাবের সকল কলঙ্ক মোচন করিয়াছিল। কলিকাতা দগ্ধের অনুতাপার্থে যে অর্থদান করিয়াছিলেন উহার পুনর্গঠন দ্বারা নবাবের স্মৃতি উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে।
মহত্ত্বের লক্ষ্যভেদঃ— সেই সাধবী রমণীর গভীর প্রেমের মধ্যেও নবীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজ্যরক্ষার চেষ্টা ও কর্ত্তব্যকর্ম্মের অবহেলা না করা, মহত্ত্বের প্রধান প্রমাণ। ক্লাইবের সদ্গুণের মধ্যে একমাত্র ভোগ ও অর্থলালসা ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। কলিকাতার ভীষণ রৌদ্র, বর্ষা, রোগ, হিংসা, দ্বেষ, অপমান, অধর্ম্ম, কিছুতেই ক্লাইবের সেই কামনা ও অর্থলাভ লালসা তিরোহিত হয় নাই। শত্রুর সেনাপতির সহিত ষড়যন্ত্র করিয়া কোন্ বীর তাহাকে বশীভূত করে, না তাহার রাজত্বাপহরণ করিয়া নিজের বীরত্বের পরিচয় দান করে, না, উহার জন্য সেই যুদ্ধক্ষেত্রের সহিত আপনার উপাধি সংযুক্ত করে? সেইখানেই ক্লাইবের মহত্ত্বের ও বীরত্বের পরিচয়! প্রবঞ্চনা করিয়া রাজ্যলাভ কাপুরুষ অলসব্যক্তিরই পক্ষেই শ্লাঘার বিষয় হইতে পারে। যখনই ক্লাইবের বিচার মূক্তির পর সেই সূক্ষ্ম বিষয় বিবেকে আঘাত করিতেছিল, তখনই তিনি কাতর হইয়া যন্ত্রণায় মূক হইয়া পড়িতেন। শেষে বোধ হয়, “যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর” এই দুঃখে হৃদয় দগ্ধ হইত বলিয়া তিনি ঐরূপ করিতেন। মানবমাত্রেই দোষগুণ বর্ত্তমান, তবে তিনি যে ক্ষণজন্মা পুরুষ একথা অস্বীকার করা যায় না ও ইংরাজজাতিমাত্রেই তাঁহার সুখ্যাতি করিবে। বিলাতের সুবিখ্যাত মন্ত্রীর কথা সকলের ধ্যান ও ধারণার বিষয় হইয়াছে। তিনি মুক্তকণ্ঠে ক্লাইবের বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া বলিয়াছিলেন যে ঐরূপ উৎকৃষ্ট বক্তৃতা তাঁহার জীবনে আর কাহারও মুখে পূর্ব্বে শ্রবণ করেন নাই ও তিনি যে, মহৎ উদ্দেশ্য লক্ষ্য করিয়া কার্য্য করিয়াছেন উহার প্রতি সর্ব্বাগ্রে দৃষ্টিপাত করা উচিত। ঐরূপ মহৎ কার্য্যে ব্যক্তিগত দোষগুণ বিচার করিলে চলিবে না, দেখিতে হইবে ক্লাইব স্বজাতি ও স্বদেশের জন্য ভারতবর্ষের সহিত এদেশের বাণিজ্য ও রাজত্ব সম্বন্ধে এক অভিনব শৃঙ্খলাবদ্ধন করিয়াছেন, যাহাতে কালে উভয় দেশের শ্রীবৃদ্ধি ও উন্নতি হইবে। ঐরূপ কার্য্যে কতকগুলি দুষ্কর্ম্ম অনিবার্য্য, উহা অপেক্ষা করিতে হইবে। সেই সূক্ষ্ম বিচার বিলাতের মহাসভার অধিকাংশ সুধীবৃন্দ সাদরে অনুমোদন করিয়াছিলেন, আর ক্লাইব সহমানে মুক্ত হইলেন। স্বদেশবাসী বিলাতের সূক্ষ্মদর্শিতার জন্য ইংলণ্ডের জয়! ধর্ম্মাবতার ক্লাইবের জয়! বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার দেওয়ান বাহাদুরের জয়! কিন্তু হায়! ইত্যাকার জয় জয়কারধ্বনিতেও ক্লাইবের আত্মকৃত অপরাধের শান্তি হইল না। সেইখানেই ক্লাইবের হৃদয়ের যথার্থ মহত্ত্বের পরিচয়। যাহার জন্য ইংরাজজাতি ধন্য হইতে পারেন, কিন্তু হায়! সে কথা তাঁহার জীবনচরিত লেখকগণ কেহই বলেন নাই। বিচারের পর দেশবিদেশ ভ্রমণ করিলেন কিন্তু কিছুতেই শান্তিলাভ পাইলেন না, শেষে নিরুপায় হইয়া সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয় জীবন ক্লাইব স্বহস্তে রক্ষা না করিয়া বিসর্জ্জন করিলেন। ইহা কি ভগবানের শাস্তি, না, ইহা মূর্খতার ফল? হায়! উষ্ণরক্তের স্রোতে দগ্ধ অনুতপ্ত জীবনের স্মৃতি শেষ করিলেন। হায়! ক্লাইবের স্মৃতি সুখজনক নয়, কলিকাতায় তাহার স্মৃতির অভাব নাই। সেখানেও সব লালঃ— বাঙ্গালার লালপল্টন, কলিকাতার লালদিঘি, লালবাজার, লালরাস্তা, লালকুঠি সমস্তই তাঁহার স্মৃতি বহন করিতেছে। কলিকাতার মাটি পোড়াইয়া লাল করিয়া ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের জন্য লালদিঘির উত্তরে বৃহৎ লাল বাড়ী হইয়াছিল। উহাকে এখন Writer’s Building বলে। লালপল্টন পুরাতন দুর্গের মধ্যে থাকিত, দিঘির জল ব্যবহার করিত, তাহাদের জন্য উহার নিকটে বাজার ও কুচকাওয়াজের লাল রাস্তা ছিল। সকলেরই নাম সেই লালপল্টনের সঙ্গে সম্মিলিত হইয়া লালে লাল হইয়াছিল। উহাতেই লালদিঘি, লালবাজার ও ও লাল রাস্তা (Red Road) নামোৎপত্তি। তাঁহার অবস্থান গৃহস্থলে কলিকাতার সুন্দর (Royal Exchange) গৃহ নির্ম্মিত হইয়াছে। কলিকাতার বিখ্যাত সওদাগর তাঁহার নামে আফিসগৃহ (Clive House) নির্ম্মাণ করিয়া কলিকাতার শোভা বৃদ্ধি করিয়াছেন। সেই রাস্তা ক্লাইবের স্মৃতিরক্ষা করিতেছে ও যাবতীয় বিদেশী বণিকগণ সেই রাস্তার ধারে কার্য্যালয় করিয়া এখনও পর্য্যন্ত ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থোপার্জ্জন করে। তখনও যেরূপ এদেশবাসির রক্ত জল করিয়া ব্যবসা চলিয়াছিল এখনও সেইধারার পরিবর্ত্তন হয় নাই, এদেশের যে কিছু ব্যবসা প্রায় সমস্তই বিদেশীর হস্তে, স্বদেশের লোক কিছুই করিতে পারে না। উহাই ক্লাইবের মহিমা ও সর্ব্বাপেক্ষা উজ্জ্বল স্মৃতি। ইউরোপবাসির অর্থই তাহাদিগকে একাধিকার ব্যবসা করিবার ক্ষমতা দান করিয়াছে, সেজন্য এখন আর ক্লাইবের শাসনদণ্ডের আবশ্যক হয় না। ক্লাইবের কলিকাতায় মর্ম্মর প্রতিমূর্ত্তি ছিল না সেই অভাব লর্ড কার্জ্জন তিনিই করিয়াছিলেন কিন্তু হায়! কি দুঃখের বিষয় মুসলমানগণের মধ্যে এখন এমন কেহই বর্ত্তমান নাই যে, যিনি মুসলমানজাতিকে তাহাদের কর্ত্তব্যপরায়ণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি কলিকাতায় স্থাপন করিবার জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে উপদেশ দান করিবেন। মুর্শিদাবাদের নবাবের সমাধি স্তম্ভই কি সেই কার্য্য করিবে? কলিকাতাতেই প্রতাপাদিত্যের সহিত মোগল বাহিনীর যুদ্ধ হইয়াছিল, সেইখানেই ইংরাজ ও নবাবি সেনার প্রথম দ্বিতীয় যুদ্ধ হইয়াছিল। ১৭৬৭ খৃষ্টাব্দে ২৭শে মে পাদরী কায়ারনান্তার ষাট হাজার টাকায় প্রথম প্রোটেষ্টান গির্জ্জা কলিকাতায় করিয়াছিলেন ও মিসেস কিণ্ডার্সলি ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে কলিকাতার সর্ব্বোৎকৃষ্ট রাস্তা কষ্টম গৃহ হইতে বৈঠকখানায় গিয়াছিল ও ইংরাজদিগের মধ্যে যেরূপ পরস্পর পরস্পরকে অর্থ সাহায্য করে সেরূপ পৃথিবীতে আর কোথাও নাই বলিয়াছেন। ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে জুলাই মাসে অস্থায়ী-গির্জ্জা পুরাতন দুর্গের মধ্যে হইয়াছিল, পুরাতন টাঁকশাল তখন সেণ্টজন গির্জ্জার পশ্চিমে ছিল। ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে গ্রীকজাতি কলিকাতায় ব্যবসা করিতে আসে ও তাহারা কলিকাতার প্রধান ব্যবসায়ীর স্থানাধিকার করিয়াছিল। কলিকাতার আয়তন বৃদ্ধিকারক ভান্সিটার্ট ও উহার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্ণকের স্মৃতি সেইখানের রাস্তার নামে রক্ষিত হইতেছে। সেকালের ইংরাজ কর্ম্মচারীগণের কায়ব্যুহ সমস্তই লালবাজার লালদিঘি ক্লাইব ষ্ট্রীটে ও বৌবাজারে ছিল। বৌবাজারের নাম সেকালের ব্যবসার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। মুর্শিদাবাদে যখনই নবাব পরিবর্ত্তন হইত তখনই বেগমগণকে ভরণ পোষণ দান করা অপেক্ষা তাহাদিগকে বিতরণ করা হইত। পলাশির যুদ্ধের পরে ক্লাইবের ভাগ্যে সেইরূপ উপহারলাভও হইয়াছিল তবে সে সময়ে তাহাদিগকে কোথায় কিভাবে রাখিয়াছিল উহার কোন সঠিক সন্ধান পাওয়া যায় না। দমদমায় ক্লাইব হাউস বাগান এখনও বর্ত্তমান, বোধ হয়, সেইখানেই সেইসকল উপহারলব্ধ * ললনারা বাস করিত। বৌবাজারের আশেপাশে ফিরিঙ্গি পল্লী ও নানাজাতীয় বেশ্যা এখনও বাস করে ও পূর্ব্বেও থাকিত। সেই হইতে উহার নামে বৌবাজার হইয়াছিল অর্থাৎ রাত্রে লালবাজার লালদিঘি হইতে কোম্পানির কর্ম্মচারীরা ঐ সুন্দর রাস্তায় সুন্দরীর হাটে অর্থের সদ্ব্যবহার আহার বিহারের সঙ্গে করিত। উহাতেই ফিরিঙ্গি জাতির শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল। সেকালে এদেশে ইউরোপের স্ত্রীলোকেরা রোগ ও জলবায়ু গ্রীষ্মাদির জন্য আসিত না। বোধ হয় যে, পূর্ব্বোক্ত মুর্শিদাবাদের উপহারের সদ্ব্যবহারে সেকালে ফিরিঙ্গি সংখ্যাবৃদ্ধি হইত, সেইজন্য ঐখানে ফিরিঙ্গির বাস অধিক হইয়াছে। ফিরিঙ্গিরা সেই বৌবাজারে কালীপূজা করিত ও সেহ কালীঠাকুর এখনও বর্ত্তমান ও ফিরিঙ্গি বিশেষণে উক্ত হইয়া থাকে। মার্হাটার স্মৃতি উহাদের ভয়ে যে খাত নির্ম্মাণ হয় উহাতে বর্ত্তমান আছে। বৌবাজারে ফিরিঙ্গি বারবণিতার সহিত মুসলমানীগণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ইউরোপবাসি মহাপ্রভুগণ হিন্দুকেও ত্যাগ করেন নাই। তখন কলিকাতার বিলাস বিভব মুর্শিদাবাদ অপেক্ষা অনেক অংশে নূ্যন থাকিলেও অনেকেই সেখান হইতে অর্থলাভ লালসায় যাতায়াত ও অবস্থান করিত। সেকালের মুর্শিদাবাদের মুন্সী বা কোম্পানির উচ্চকর্ম্মচারিগণ কলিকাতায় নবাবদের হীরামতি ঝিলের প্রাসাদের অনুকরণে কলিকাতাকে সজ্জিত করিতেছিল। সেইখানের নাচ গানে ক্লাইব প্রমুখ উচ্চ ইংরাজ গবর্ণরগণ যোগদান করিত।
মুর্শিদাবাদ মসনদঃ— নবাবদের আমলে মুর্শিদাবাদে দিল্লির নর্ত্তকীবৃন্দ আগমন করিয়া নবাবগণের প্রধান মহিষী হইয়াছিল, মীরজাফরের মণি ও বব্বু পত্নীদ্বয় সেইরূপ। অর্থের লহরীতে ও ইংরাজ মহাপ্রভুদের কৃপায় তাহাদের পুত্রগণই মুর্শিদাবাদের মসনদে উপবেশন করিয়াছিল। হতভাগ্য মিরণের বংশধর সেই সিংহাসন লাভ করে নাই। মুর্শিদকুলি খাঁর মুর্শিদাবাদের সিংহাসন অবশেষে তাহাদের হইল। কালের কি অপূর্ব মহিমা! কাহার ধন কে পায়, ইহাতেই ভাগ্যের সূক্ষ্ম গতি লক্ষ্য হয়। মুশিদাবাদের প্রতিষ্ঠা মঙ্গলের হয় নাই। ঐ সিংহাসন উপবেশন করিয়া মুর্শিদকুলি খাঁর বংশ বা আলিবদ্দিখাঁর বংশ লোপ হইয়াছিল। মীরজাফরের বংশে কে কিরূপে মসনদে বসিল উহা উল্লেখ করা হইয়াছে। মীরকাশিমের স্মৃতি মুর্শিদাবাদের ইতহাসে নাই, উহা পাটনার বর্ব্বরোচিত হত্যায় পলাশীযুদ্ধের পাপী জগৎ শেঠ মহাতাপ ও স্বরূপচাঁদ, রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস ইত্যাদিকে গঙ্গার জলে মগ্ন করিয়া মুক্তিদান করায়, যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ং বন্দি হইবার ভয়ে অনুপস্থিতি থাকায়, বিশ্বাসঘাতক শ্বশুরের সিংহাসন চ্যুতিতে, রাজস্ববৃদ্ধি ও জমিদার প্রজাপীড়নে, স্ত্রীহত্যায় এবং ভিক্ষাবৃত্তিতে জাজ্জ্বল্যমান রহিয়াছে। আলিবর্দ্দি খাঁর খোশবাগ মুর্শিদাবাদের নবাবগণের স্মৃতিরক্ষা করিতেছে সেইখানেই ৯ই এপ্রেল ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে আলিবর্দ্দি সমাহিত, ৩রা জুলাই ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে সিরাজউদ্দৌলা কবরস্থ, মির্জ্জামেহহদ পঞ্চদশ বৎসরে হত ও ভ্রাতা সিরাজউদ্দৌলার পার্শ্বে প্রোথিত আর সিরাজের দক্ষিণে পদতলে লুৎফুন্নিসা চিরনিদ্রিতা! ১৭৮২ খৃষ্টাব্দে ইউরোপবাসি ফষ্টার সেই বিভৎস সমাধির প্রশংসা, পতির জন্য লুৎফুন্নিসার দুঃখ-কাতরোক্তি দর্শন করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। সেই সমাধিক্ষেত্রের তত্বাবধান ভার লুৎফুন্নিসা ও তাঁহার অবর্ত্তমানে তাঁহার চার দৌহত্রীরা করিতেছিল। লুৎফুন্নিসার কন্যা জহুরা মাতার জীবিতাবস্থায় উন্মত্তা হইয়া প্রাণত্যাগ করে ও তাহার চার কন্যারা মাতামহীর অনুসরণ করিয়া খোষবাগের তত্ত্বাবধান ভার কোম্পানির গবর্ণর হেষ্টিংসের নিকট প্রার্থনা করেন ও লর্ড কর্ণওয়ালিস তাহাদিগের মনোভীষ্ট সিদ্ধ করেন।
মণিবেগমের দুই পুত্র কেমন করিয়া মসনদে বসিয়াছ বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের প্রতিবাদেও সুফল হয় নাই, কিন্তু হায়! শমন শাসনে তাহারা অকালে সিংহাসন চ্যুত হইয়াছিল। তখন বব্বু বাইএর গর্ভজাত দ্বাদশ বর্ষের নাবালক পুত্র মোবারকউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদের মসনদে প্রতিষ্ঠিত হইল। আর লুৎফুন্নিসার কন্যারা সমাধির পরিচর্য্যায় রত হইল। এইখানেই ধর্ম্মের সূক্ষ্ম বিচার রহস্যময় উঠে।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর মুর্শিদাবাদের সিংহাসন অপেক্ষা মাতামহের সমাধি পরিচর্য্যাভার তাহাদের চক্ষে উচ্চতর হইয়াছিল বলিয়া সিরাজউদ্দৌলার যথার্থ পত্নী ও দৌহিত্রীরা সেই পবিত্র স্মৃতি সেইরূপে রক্ষা করাই শ্রেয়োজ্ঞান করিয়াছিল। তাহারা দরিদ্র ছিল, তাহাদের সিংহাসন দাবী করিবার কোনরূপ সঙ্গতিই ছিল না। ক্লাইবের অভ্যুদয়কাল হইতে অর্থ বিনিময়ে মুর্শিদাবাদের সিংহাসন প্রাপ্তি আরম্ভ হইয়াছিল তখনও পর্য্যন্ত শেষ হয় নাই। মণিবেগম অর্থের নৃত্যকলা কেমন করিয়া করিতে হয় উহা জগৎকে দেখাইয়াছিলেন। অর্থ অপেক্ষা ধর্ম্মপালন করা যে অধিকতর কর্ত্তব্যকর্ম্ম খোসবাগের সমাধি মন্দিরে লুৎফুন্নিসা চক্ষের জলে শিক্ষাদান করিয়া জগৎকে মুগ্ধ করিয়াছে। আহা! উহাই প্রেমের অপূর্ব্ব স্মৃতি! ঐরূপ পতিভক্তি মুর্শিদাবাদের বেগমগণের মধ্যে কেবল যে একমাত্র লুৎফুন্নিসার ছিল, উহা নয়। মুর্শিদকুলি খাঁর কন্যা জিন্নদুন্নিসার নামও তদনুরূপ গৌরবের সহিত উল্লিখিত হইতে পারে।
কিন্তু হায়! সেই সমাধি মন্দিরের বর্ত্তমান দুর্দ্দশা সম্বন্ধে কোন লেখক বলেন:— “পূর্ব্বে খোসবেগমের সমাধিভবন রৌপ্য ও স্বর্ণময় পুষ্পখচিত কৃষ্ণবর্ণ বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত হইত ও সমাধিগৃহে উত্তমরূপে প্রদীপ জ্বালিত হইত। এক্ষণে আর সে সকল বস্ত্র দেখিতে পাওয়া যায় না। শুনা যায় বিশেষ বিশেষ পর্ব্বোপলক্ষে শতচ্ছিন্ন সেই পুরাতন বস্ত্রগুলি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সমাধি গৃহে দীপ জ্বলিবার জন্য এক্ষণে মাসে চারি আনা মাত্র তৈলের ব্যবস্থা হইয়া থাকে। বিশেষ বিশেষ পর্ব্বোপলক্ষে সমাধিগুলির উপর মিষ্টান্নাদিও নিক্ষিপ্ত হইয়া থাকে।”
উক্ত গ্রন্থকর্ত্তা যদি কলিকাতার ইংরাজ সৃষ্টিধর ব্যক্তিগণের সমাধিস্থান অবলোকন করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয়, তাঁহার দুঃখ করিবার কিছুই থাকিত না। কলিকাতায় বর্ত্তমান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অপূবর্ব নৈপুণ্য কীর্ত্তিছটা—মহিমান্বিত ভারতেশ্বরীর সমাধিমন্দিরে বা উহার উদ্যানে রজনীতে কোন আলোক দান করা হয় না। সেই মনোরম উদ্যান অন্ধকারে বোধ হয় তাঁহার জন্য ক্রন্দন করিয়া থাকে, তখন এখনও পর্য্যন্ত যে সিরাজউদ্দৌলা প্রভৃতির সমাধিমন্দিরে কখন প্রদীপ জ্বলিতেছে কি না ইহার নিশ্চয়তা নাই উহাতে দুঃখ করিবার ও কিছুই নাই। সিরাজউদ্দৌলা হিন্দুর গুণগ্রাহী ছিলেন বলিয়া এখনও হিন্দুরা তাঁহাকে শ্রদ্ধা করিয়া থাকে, সেইজন্যই মুসলমান ঐতিহাসিকগণ তাঁহার নামে অযথা কলঙ্ক দান করিয়াছিলেন। ফৈজিকে মোহনলালের ভগ্নী সাজাইয়া মোহনলালের উন্নতির উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু যাঁহারা উহা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন তাঁহারা ভাবেন নাই যে, ফৈজী দিল্লির মুসলমান নর্ত্তকী, নবাব যাহাকে লক্ষ টাকা উপহার দিয়া মুর্শিদাবাদে আনাইয়াছিলেন। আর যদি সেকথাও মিথ্যা হয়, তবে কি মোহনলাল ফৈজীর জীবন্ত সমাধিতে কখনই নিশ্চিন্ত থাকিতেন, বা সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে পলাশীর যুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতেন? কি অবিচার!!!
সেকালের মুর্শিদাবাদের নবাবগণ যেন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির উচ্চকর্ম্মচারীগণের নবাবীর আনুকূল্যের জন্য প্রতিষ্ঠিত। সেই সকল গোবর গণেশ সাক্ষিগোপালগণ মুর্শিদাবাদের মসনদে বসিয়া যাত্রাদলের অভিনেতৃগণের ন্যায় নানা অভিনয় প্রহসনাদি মাত্র করিত। উহাই কলিকাতার উন্নতির মূল কারণ। কলিকাতার উচ্চকর্ম্মচারিরা যেন কলে পুত্তলিকার ন্যায় মুর্শিদাবাদের নবাব হইতে সমস্ত কর্ম্মচারিগণকে নৃত্য করাইত। উহাই ক্লাইবের দেওয়ানি শাসন প্রণালীর অত্যাশ্চর্য্য নীতি ও সেই দেওয়ানিই লাভই ক্লাইবের সর্ব্বোৎকৃষ্ট স্মৃতি ও গৌরবময় কীর্ত্তি।
উড়িষ্যা তখনও ইংরাজ কোম্পানির হয় নাই, তবে ভেরিলষ্টের গবর্ণরীর সময়ে নেপালে বিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছিল ও সেই সময়েই বর্ত্তমান রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। তাঁহারা ইংরাজগণের সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিল। তখন ভেরিলিষ্ট রংপুর ও পূর্ণিয়ার কলেবর বৃদ্ধি করিতে পারেন নাই। সেই সময়ে বাঙ্গালার ও বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের কিরূপ শোচনীয় অবস্থা হইয়াছিল উহা ঐতিহাসিক মার্টিন সাহেব বলিয়াছেন। উহার সার মর্ম্ম এই যে, দেশে সর্ব্বত্রই অরাজকতা, কোম্পানির কর্ম্মচারিরা দেশের ও দশের দুঃখ দূর করিবার জন্য রাজত্ব ও দেওয়ানি লাভ করে নাই, উহারা কেবল স্ব স্ব উদর পূরণের জন্য ব্যস্ত। বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ ক্লাইবের আড়ম্বর ও বাক চাতুরীতে মুগ্ধ হইলেও লাভাংশ বৃদ্ধি অথবা তদনুযায়ী অর্থাগম হইতেছে না দেখিয়া বিষণ্ণ ও হতাশ হইয়াছিল। তাঁহাদের লাভাংশ নানা চাতুরী করিয়া বিশ্বাসী কর্ম্মচারিরা আত্মসাৎ করিতেছিল। লর্ড ক্লাইব দেখিয়াছিলেন যে, যে সকল সৈন্যগণ হাসপাতালে শয়ন করিয়াছিল তাহাদিগকে সমাধিস্থ করিবার খরচ খাতায় পড়িয়াছে। সেইরূপ অসদুপায়ে ও চীনের সহিত সোণা রূপার বাটের কারবারে যাহা কিছু লাভ হইতেছিল উহা সমস্তই বা কতকাংশ অন্যায় অপহৃত হইতেছিল। উহার উপর কোম্পানিকে বিলাতের গবর্ণমেণ্টকে করদান করিতে হইবে। ইহাতে উহাদের দেওলিয়া হইবার উপক্রম হইয়াছিল। দক্ষিণাত্যে হায়দার আলির অভ্যুদয় আশঙ্কার কারণ হইয়াছিল। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করিয়াই যদি দেশের সমস্ত কার্য্য স্বহস্তে লইতেন, মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে মুসলমান রাজ্যাপহরণকারীর সন্তানকে উপবেশন না করাইয়া কর্ম্মচারিগণের অর্থলাভের পথ বন্ধ করিতেন তাহা হইলে ভাল হইত।* এখন কেহই কলিকাতার ক্লাইব ও তাঁহার পরবর্ত্তী গবর্ণরগণের শাসন ও বিচার প্রণালীর পরিণাম দর্শন করিয়া প্রশংসা করিতে পারেন না।
* “The reigning Soubahdar retains his attachment to us and probably while
he has no other support will continue to do so; but Mussulomans are so
little influenced by gratitude, that shlold he ever think it his interest to break
with us the obligations he owes us would prove no restraint. He is advanced
in years and his son (Miran) is so cruel worthless a young fellow, and so
apparently an enemy to the English,that it will be almost unsafe trusting
him with the succession. So small a body as 2000 Europeans will secure
us against any apprehensions from either the one or the other; and, in case
of their daring to be troublesome, enable the Company to take (the advantage
of) sovereignty upon themselves”.
* Geantleman’s Magazine 1784.
** 45 per cent profit in Salt trade in nine months অর্থাৎ লবণের ব্যবসায় নয় মাসে
বার্ষিক শতকরা ৪৫্ টাকা হারে লাভ হইয়াছিল। (Martin’s History P. 306.)
* The violation of all decorum was committed by Mirjaffer in giving Clive
tenhandsome womenout o Serajudoulla’s Serajlio. Sijaw-ul Muktakhan I. 772.
Wards Hindu Mythology V. VII. P. 123 (see Appendix 3)
* মুস্তাফা বলেন মীরকাশিম স্ত্রীগণের চরিত্র সন্দেহ করিয়া কয়েকজন অনুচরের হত্যা স্ত্রীগণকে
বেত্রাঘাত ও দশজনকে কুপে ত্যাগ করে। জ্ঞাতি ভাই ফতে আলিও সেই বেত্রাঘাত লাভ
করিয়াছিলেন কেবল ভীষণ দণ্ডের হস্ত হইতে রাণার অনুগ্রহে মুক্তি লাভ করিয়া মুর্শিদাবাদে
কোম্পানির নিকট হইতে মাসিক দেড় হাজার টাকা বৃত্তি লাভ করিয়াছেন।
Martin’s Indian Empire V. I. p. 308/9.
