১৪. কোম্পানির বিচার কৌশল ও ছিয়াত্তর মন্বন্তর
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ – কোম্পানির বিচার কৌশল ও ছিয়াত্তর মন্বন্তর
ভেরিলষ্টের রাজত্বকালে কলিকাতার জমিদার চার্লস ফ্লায়ারের নিকট রাজা নবকৃষ্ণের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ হইয়াছিল উহা লইয়া তখন সহর তোলপাড় হয়। বোল্টস্ সাহেব সেকালের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের অত্যাচারের প্রতিবাদ করিতেন বলিয়া তাঁহাকে তাহারা বিধিমত অপমানিত করিত। নবকৃষ্ণ সেই সমস্ত মোকদ্দমায় যথারীতি উত্তর নন্দকুমারের কৌশলে কৃত্রিম বলিয়াছিলেন। উহা জমিদার বোল্টস্ সাহেব স্বয়ং বিচার না করিয়া কলিকাতার গবর্ণরের সভায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা প্রিয়পাত্র নবকৃষ্ণের কথায় বিশ্বাস করিয়া তাঁহাকে অভিযোগমুক্ত করিলেন। আর তাঁহারা সেই সূত্রে বোল্টসকে এদেশ হইতে বহির্গত ও নন্দকুমারকে গৃহে আবদ্ধ রাখিবার উপযুক্ত বলিয়া অভিমত প্রকাশ করেন। তদপুলক্ষে তাহাকে বলপূর্ব্বক বিলাতে পাঠাইয়া দিয়াছিল। নন্দকুমারের প্রতি তখনই ঐরূপ আদেশ নূতন হয় নাই, আরও যখন মীরজাফরের সিংহাসন চ্যুতির পর তাহাকে গোপনে পুনর্স্থপিত করিবার আয়োজনাদি করেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তৎপুত্র নজম উদ্দৌলার নামে গোপনে বাদশাহি সনন্দানয়নের চেষ্টাদির অপরাধে নন্দকুমারকে ও তাঁহার জামাতা জগচ্চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করিয়া কলিকাতায় আনয়ন ও তাহাদিগকে প্রহরী বেষ্টিত করিয়া রাখা হইয়াছিল। তৎপরে ক্লাইবই তাঁহাদিগকে মুক্ত করিয়াছিলেন। তখন উহাতে নন্দকুমার ভীত হইবার পাত্র ছিলেন না। তখন এদেশের এমনই দুরবস্থা হইয়াছিল যে, যে কেহ গরীবের উপর অত্যাচারের প্রতিকার করিতে যাইত, তাহারই সর্ব্বনাশ হইত। তখন এদেশে অর্থ অপেক্ষা বলবান আর কিছুই ছিল না, অর্থের নিকট সমস্তই পরাস্ত হইয়াছিল।
মুর্শিদাবাদ কাহিনী লেখক নবকৃষ্ণ ও নন্দকুমার সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন উহাই উদ্ধৃত করা হইলঃ— “ক্লাইব নন্দকুমারকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন, সে সময়ে নবকৃষ্ণ তাঁহার অধীনতায় সামান্য মুন্সীগিরি কার্য্যে নিযুক্ত ছিলেন। নন্দকুমারের এত সম্মান তাঁহার প্রাণে সহ্য হইবে কেন? উহার পর যে অবধি তিনি ইংরেজদিগের চক্ষুঃশূল হইয়া উঠেন, তখন হইতে নবকৃষ্ণ তাঁহার নিন্দা করিয়া ইংরেজ মহলে আপনার প্রতিপত্তি বাড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহারই পরামর্শক্রমে ইংরেজরা নন্দকুমারের উপর মহাক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন ক্রমে নন্দকুমারের পতন হইলে, নবকৃষ্ণ বাঙ্গালীদিগের মধ্যে ক্ষমতাবান হইয়া উঠেন। যথেষ্ট অর্থ ও নানাবিধ পদের ক্ষমতালাভ করিয়া তিনি দেশের লোকের উপর স্বীয় ক্ষমতা প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন। সকলে আসিয়া নন্দকুমারের আশ্রয় লয়।” * “নবকৃষ্ণের উৎকোচ গ্রহণ ও গৃহস্থের পরিবার বর্গের সতীত্বনাশ প্রভৃতির দ্বারা নিন্দনীয় হইয়া উঠেন, অন্ততঃ এই মর্ম্মে তাঁহার নামে অভিযোগ উপস্থিত হয়। যদিও তৎকালের ইংরেজদিগের প্রিয়পাত্র নবকৃষ্ণ উহা হইতে নিষ্কৃতি পাইয়াছিলেন, তথাপি সাধারণ লোকের মনে সে সমস্ত অভিযোগ একেবারে মিথ্যা বলিয়া প্রতীত হয় নাই।” সেই গ্রন্থকর্ত্তা ২৮শে জুলাই ১৭৭২ খৃষ্টাব্দে নন্দকুমারের সম্বন্ধে হেষ্টিংসের অভিমত যাহা লিখিয়াছেন উহার সারাংশ উদ্ধৃত করিলেই নন্দকুমারের দোষ গুণ উপলব্ধি করিতে বিলম্ব হইবে না।
নন্দকুমার প্রভুভক্ত কর্ম্মচারী ও মন্ত্রীর ন্যায় স্বীয় প্রভুর কল্যাণের বা ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বৈদেশিকগণের সাহায্য গ্রহণের প্রার্থনা দ্বারা কোম্পানির শক্তি হ্রাসের চেষ্টা করিয়াছিলেন। নবাব মীরজাফর তাঁহাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করিতেন ও তিনি কখনও তাঁহাকে অবিশ্বাসী বলিয়া কোন দোষারোপ করেন নাই, বরং তাঁহার রাজত্বের প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত তাঁহাকে রাজসম্মানে সম্মানিত করিয়াছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে তখন তাঁহার কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রভুর সপক্ষে কার্য্য করায় তাঁহার নিন্দা না করিয়া প্রশংসাই করিতে হয়। আর তিনি যে মহম্মদ রেজা খাঁর নিয়োগ সম্বন্ধে আপত্তি করিয়াছিলেন উহাও স্বাভাবিক, প্রত্যেকেই আপনার স্বার্থ ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখিবার চেষ্টা করে।
এখন কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেকালের ব্যক্তি বিশেষের চরিত্রালোচনা করিতে প্রস্তুত হইবেন না, তবে সেকালের কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণের কৃপায় কলিকাতায় কিরূপ বিচার মীমাংসা হইত, উহা হৃদয়ঙ্গম করিতে গেলে উহা করা আবশ্যক হইয়া পড়ে। নন্দকুমার উচ্চ ব্রাহ্মণ ও নবকৃষ্ণ হীন কায়স্থ ও নন্দকুমারের অধীনে কার্য্য করিত। ব্রাহ্মণ পত্নীর সতীত্বনাশের দ্বারা ব্রাহ্মণ নন্দকুমার উহার মিথ্যাপবাদ করিবেন ইহা সেকাল কি, এ কালের হিন্দুসমাজও বিশ্বাস করিতে পারেন না। বিশেষতঃ নবকৃষ্ণের বংশধরগণের অতি নিকট আত্মীয় তাঁহার জীবনচরিত প্রকাশ করিয়াছেন উহার ৯১/৯২ পৃষ্ঠায় আছে “তাঁহার দোষের মধ্যে ইন্দ্রিয় দোষই অধিক ব্যাপকতা লাভ করিয়াছিল।” আবার ঐ সম্বন্ধে ক্লাইবের জীবনচরিতকার লিখিয়াছেন * তাঁহার ৭টী স্ত্রী (মিঃ এন ঘোষের মতে ৬টি) বর্ত্তমান থাকিলেও তাঁহার বিরুদ্ধে ইন্দ্রিয় দোষের কথা যথেষ্ট শুনিতে পাওয়া যায়। ক্লাইবের ও ঐ দোষ বড় কম ছিল না, কাহার সঙ্গগুণে কে এ বিষয়ে গুণবান হয় তাহা আমরা জ্ঞাত নাহি।” তাঁহার সম্বন্ধে ক্লাইবের ইংরাজি জীবনচরিত লেখক নবকৃষ্ণকে লর্ড ক্লাইবের গবর্ণরীর সময় তাঁহার মনস্তুষ্টির নিমিত্ত নাচগানাদি উৎসবে লক্ষ লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করিয়াছিলেন ও তিনি প্রভুর নিকট হইতে আপনার ধনরত্ন লুক্কায়িত রাখিতেন। তিনি প্রভুর ও নিজের স্বার্থের জন্য দেশের সর্ব্বনাশ করিয়াছিলেন উল্লেখ আছেঃ—
‘Lord Clive’s chief banyan Nobhoiss …by his skilled up connections became one of the wealthiest agents in the East, his riches were not known and he had the policy to hide his views and his treasure from his noble master, whose plan he pursued with a relentless severity for their mutual advantage and the ruin of the country. He spent within a few years after Lord Clive’s return to Europe lacs of rupees (120000 L) in balls, feasts and other entertainments. **
আক্কেল সেলামীঃ— এইরূপ বিচার বিভ্রাটের সূত্রপাত ভেরিলষ্টের সময় হইতে কলিকাতায় আরম্ভ হয়। কলিকাতার ন্যায়পরায়ণ লোকেরা নবকৃষ্ণের উপাধি ও ও অর্থ সত্ত্বেও তাঁহাকে ঘৃণা করিত। তিনি তাঁহার সামজিক হীনাবস্থা কুলীন ব্রাহ্মণ ও কায়স্থগণের ষোড়পচারে পূজা করিয়া উন্নত করিয়াছিলেন, তাঁহার ব্যবহর্ত্তা পদবী স্থলে দেব উপাধি হইয়াছিল। অগ্রদ্বীপের ৺গোপীনাথ বিগ্রহ লইয়া মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সহিত মহারাজা নবকৃষ্ণের বিলক্ষণ বিবাদ হয়। তিনি চোরের উপর বাটপাড়ী করিতে গিয়াছিলেন। *** উক্ত গোপীনাথ ঠাকুর পাটুলির জমিদারগণের ছিল। কিন্তু একবার মেলার সময় দাঙ্গা হাঙ্গামায় চার পাঁচজন খুন জখম হয় তৎকালিন বিচারাধীন হওয়া অপেক্ষা ঠাকুর তাহাদের নয় স্বীকার করাই শ্রেয়ঃ বিবেচনা করেন। তিনি সেইরূপ কার্য্য করিলে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ঠাকুর দখল করিয়া লন। নবকৃষ্ণ কলিকাতায় বাঙ্গালার যাবতীয় বিগ্রহ আনয়ন করাইয়া এক দেবতার সভা করেন ও ঐ গোপীনাথ বিগ্রহ প্রত্যর্পণ করিতে অস্বীকৃত হন। উহাতে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র গর্বণরের সাহায্য গ্রহন করেন ও তাহার অনুমতিক্রমে নবকৃষ্ণ ঐ ঠাকুর প্রত্যপর্ণের সময় স্বাভীষ্ট সিদ্ধির জন্য এক কৌশল করিলেন। সেই বিগ্রহের অবিকল নকল করিয়া আর এক বিগ্রহ নির্ম্মাণ করিয়া আসল ঠাকুর আপনার বহুমূল্য অলঙ্কারে বিভূষিত করিয়াছিলেন। ভাবিয়াছিলেন নকলটিই প্রত্যর্পণ করিবেন, কিন্তু পরিণাম বিপরীত হইল। আসল ঠাকুরও গেল ও উহার সঙ্গে সঙ্গে বহুমূল্যের অলঙ্কারাদিও ফেরৎ পাইলেন না। শেষকালে বল্লভপুরের বল্লভজীউকে লইবেন স্থির করিলেন, কিন্তু উহাদেও কৃতাকার্য্য হইলেন না। তিনি সেই বিগ্রহের সেবার খরচার দাবী করিলে ভাবিয়াছিলেন যে, দরিদ্র ব্রাহ্মণ সেবাইতগণ ঠাকুর ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিবে কিন্তু তাহারা যখন অনাহারে কলিকাতায় ক্ষিপ্তের ন্যায় বেড়াইতে লাগিল, যখন নয়ানচাঁদ মল্লিক সেই অর্থদান করিবেন স্বীকার করিলেন ও নবকৃষ্ণকে উহাদের দেবতা প্রর্ত্যপণ করিতে বলিলেন, তখন তিনি লজ্জিত হইয়া বিনার্থে ঐ দেবতা দিয়াছিলেন। * সেই প্রতিশ্রুতার্থ গ্রহণ করা মহাপাপ মনে করিয়া উহাতে নয়ানচাঁদ দেবতার মন্দির করিয়াছেন। রাজা নবকৃষ্ণ অপযশ দূব করিবার জন্য দেবতার সেবার্থ বল্লভপুর তালুক দান করেন। সেই নবকৃষ্ণের দেবসভার সময় উহার দর্শন করিবার জন্য কলিকাতায় মেলা বাজার বসিয়াছিল। তজ্জন্যই উহার নাম সভাধাম ও সভাবাজার হইয়াছিল। উহা এখনও তাঁহাদের মূল্যবান সম্পত্তি ও দেবতার সেবায় উহার আয় ব্যয় হয়।
মহারাজা নবকৃষ্ণের ইংরাজিতে জীবন চরিত তাঁহার বংশধরের চেষ্টায় বারিষ্টার এন্, এন্, ঘোষ লিখিয়াছেন। উহাতে ঐ সকল ঘটনা অন্যরূপে প্রকাশ করা হইয়াছে। স্বপ্নের প্রত্যাদেশে রাজা নবকৃষ্ণ ঐরূপ করিয়াছিলেন ও তিনি আসল ঠাকুরই রাখিয়াছিলেন। আবার তিনি একথাও বলিয়াছিলেন যে, যদি তিনি আসল ঠাকুরটী পাইতেন তবে কৃষ্ণচন্দ্রকে তিনি যে লক্ষ টাকা ঋণদান করিয়াছিলেন উহাও ত্যাগ করিতে চাহিয়াছিলেন। তখন জীবনচরিতকার কেমন করিয়া আসল ঠাকুর রাখিয়াছিলেন বলেন উহা বুঝিতে পারা যায় না। বিশেষতঃ তাঁহার পুস্তকে উহার প্রমাণ স্বরূপ তিনি যে ওয়ার্ড সাহেবের পুস্তকের অংশ উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতেও উহা সম্পূর্ণ প্রমাণ হয় না। সেকালের বাঙ্গালীরা দুঃখ দারিদ্র দূর করিবার জন্য দেবতা প্রতিষ্ঠা ও দেব চ্চনা করিত। নবকৃষ্ণ প্রমুখ এতদিন বিদেশী বণিকগণের ও মুসলমান নবাবগণের সেবা শুশ্রূষা করিয়া যাহা কিছু উপার্জ্জন করিয়াছিল, উহার কলঙ্কাপনোদন করিবার জন্য দেবসেবায় ও দেবতা প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন কিন্তু সেখানেও লোকের ‘তুম্বনাড়া’ স্বভাবটি যায় নাই। প্রবাদ আছে “স্বভাব যায় না মলে।” উক্ত নবকৃষ্ণের জীবনচরিতকার আসল ঠাকুর রাখার কথায় ধর্ম্মের চক্ষে তাঁহার অধোগতির পথই পরিষ্কার করিয়াছেন। কোন হিন্দু বা বাঙ্গালীই উহা করিতে প্রস্তুত হইবে না বিশেষতঃ যাহাদের সেই রাজবংশের উপর কিঞ্চিৎ শ্রদ্ধা ভক্তি আছে। রাজা নবকৃষ্ণ কখনই ঠাকুরাপহরণ করেন নাই। কেমন করিয়া তাঁহার বংশধর বারিষ্টার গ্রন্থকার দ্বারা পূর্ব্বপুরুষকে সেই অপরাধে অপরাধী করিয়া গৌরবান্বিত মনে করিয়াছিলেন ইহা বুঝিতে পারা যায় না। সেকালের ইংরাজ কর্ম্মচারিরাও হিন্দুর দেবদেবী পূজা করিত ও তাহাদের উৎসবে যোগদান করিত। কলিকাতায় হিন্দু ষ্টুয়ার্ট সাহেবের সমাধি মন্দির উহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁহার সেই সমাধির শিখরদেশে হিন্দু মন্দিরের আকৃতি স্থাপিত, তিনি ধর্ম্মাকাঙ্ক্ষায় নগ্নপদে উড্ ষ্ট্রীট হইতে গঙ্গাস্নান করিতে যাইতেন। কোন যুদ্ধে জয়লাভ হইলে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ইংরাজ-কর্ম্মচারিগণ কালিঘাটে জগন্মাতা কালীদেবীর পূজা অতি সমারোহে করিতেন। ঐরূপ পূজা ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে পর্য্যন্ত চলিয়াছিল, তৎপরে আইন করিয়া উহা বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। ওয়ার্ড সাহেবের পুস্তকে মুসলমানেরাও কালীপূজা করিত উল্লেখ আছে।
জাতি বিচারঃ— কলিকাতায় ইংরাজেরা এদেশের লোকের জাতি বিচার করিবার নিমিত্ত এক কাছারি করিয়াছিল, উহার মীমাংসা ব্রাহ্মণ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র করিতেন না। নবকৃষ্ণ, কৃষ্ণকান্ত প্রমুখ ঐ সভার সভাপতি ছিলেন, উহাতে হিন্দু সমাজ খড়্গহস্ত হইয়াছিল। তখন ন্যায্য জাতিবিচার উঠিয়া যায়, অর্থ ও পদই জাতির মুলাধার হইয়া পড়ে। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির গবর্ণর ভেরিলষ্ট সেই সম্বন্ধে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন উহা উল্লেখ করা যাইতেছেঃ—
“All nations have their courts of ecclesiastical jurisdiction distinct from the administration of civil justice in some with a more limited, in others with more extensive authority. The followers of Brahma in Bengal have their caste cutcheries or courts to take cognisance of all matters relative to the several castes or tribes of the Hindu religion. Their religious purity depends on the constant observance of such mumberless precepts that the authority of their courts enters into the courses of common lifen and is consequently, very extensive. A degradation from the caste by their sentence is a species of excommunication attended with the most dreadful effecta, rendering the offender an outcast from society. But as the weight of punishment depends merely upon the opinion of the people, it is unneceessary to say that it cannot be inflicted by the English Governor (as Mr. Bolts asserts p. 83) unless the mandate of a Governor could instantly change the religious sentiments of a Nation. Neither can a man once degraded be restorted, but by the general suffrage of his own tribe the sanction of the Brahmins (who are the head of the tribe) and superadded the concurrence of the supreme civil power.”
উহার সার মর্ম্ম আর কিছুই নয়, যে তখন সেকালের উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারিরা আপনাদের এদেশী অনুগত ভৃত্যগণের দ্বারা এদেশের কি ব্যবসা, কি রাজ্য, কি জমিদারী, কি সমাজ, কি জাতি, সমস্তের উপরই কর্ত্তৃত্ব করিতে গিয়াছিল। যাহাতে এদেশের কেহই তাঁহাদের অনুগত ব্যক্তিগণের উপর বিপক্ষতাচরণ করিতে না পারে। উহাতেই নবকৃষ্ণ প্রভৃতির হিন্দু সমাজে ও স্বজাতিগণ মধ্যে উন্নতি হইয়াছিল কিন্তু উহা সর্ব্ববাদীসম্মত হিন্দু সমাজানুমোদিত হয় নাই। ঐ নিমিত্তই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও নন্দকুমারের মনোমালিন্যের প্রধান কারণ ও উহার সৃষ্টি হয়। কলিকাতায় যদি জাতিবিচার কাছারি না থাকিত, তাহা হইলে বোধহয়, উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের মনোভিলাষ ইন্দ্রিয় চরিতার্থ করিবার সুবিধা ও সুযোগ হইত না। সেইজন্যই উক্ত কাছারির কর্ত্তা তাঁহাদের মুন্সীগণ না হইলে চলিত না। সেকালের হষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের কলিকাতায় কিরূপ চাল চলন ও নবাবি ছিল উহা ক্লাইবের কথায় বলিলেই যথেষ্ট হইবে যথাঃ—
“They ride upon fine prancing Arabian horses, and in palanquins and chaises, they keep seraglios, make entertainments and treat with champagne and claret.”
অর্থাৎ তাহারা পক্ষীরাজ আরব ঘোড়ায় বা গাড়ী পাল্কী চাপিয়া বেড়াইত, ও তাহাদের বিলাসের রঙমহলাদিও ছিল, যেখানে শাম্পেন ক্লারেট মদ খাইয়া আনন্দোৎসব করিত, সেইসকল উচ্চকর্ম্মচারিরা নবকৃষ্ণ প্রমুখ বেণিয়াণ মুন্সিগণের হাতের পুতল বলিলে অত্যুক্তি হয় না। এখনকার শিক্ষিত যুবকবৃন্দ যাহা রঙ্গালয়ে উপন্যাস ইতিহাসের প্রণয় প্রহসনাদি দর্শন ও পাঠ করিয়া চিত্ত বিনোদন করে, তখন সেকালের বিদেশী মদনমোহনগণ কলিকাতায় রাসলীলা করিত। নবকৃষ্ণ প্রমুখের কৃপায় তাঁহার প্রাসাদের নিকট কলিকাতায় দেওয়ান শ্রীহরিঘোষের বাড়ীতে বাঙ্গালার নিষ্কর্ম্মা যুবকের খোসগল্প আহার বিহারাদি পরের পয়সায় বাবুগিরির বেশ সুবিধা পাইয়াছিল। সেইখানে হরিঘোষের নামে রাস্তা ও “হরি ঘোষের গোয়াল” প্রবাদ বাক্যে পরিণত হইয়াছে।
বাগবাজারে বিষ্ণুপুরের ৺মদনমোহন ঠাকুর লইয়া ঐরূপ আর এক গণ্ডগোল হইয়াছিল। গোকুল মিত্রের উহা লাভ করিবার ছড়া তদ্বংশধর মুদ্রিত করিয়াছেন। উহার কিয়দংশ যথাঃ—
“বাগবাজারে এসে ঠাকুর রহিলেন বোসে, বিষ্ণুপুরের শ্রীমন্দিরে পাথর পড়ে খসে।
রাজা কাঁদেন, রাণী কাঁদেন, কাঁদে প্রজাগণ, পূজারী ব্রাহ্মণ কাঁদেন হয়ে অচেতন।
হাতিশালের হাতি কাঁদে, ঘোড়ায় না খায় পাণি, বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদেন গোপাল সিংহের রাণী।
* * * *
রাজা ডাকে গোকুল মিত্র শুনহে বচন, টাকা লয়ে দেও আমার ‘মদনমোহন’।
মিত্র বলে মহারাজ কোয়াঁলা দেখ আছে, বন্ধক নয় মদনমোহন বিক্রি করে গেছে।”
সেকালে লবণের ব্যবসায় গোকুল মিত্রের ভাগ্যোদয় হইয়াছিল ও ১৭৪২ খৃষ্টাব্দে বালি হইতে কলিকাতায় বসবাস আরম্ভ ও তথায় তিনি সেই অর্থে উক্ত বিগ্রহ খরিদ বা লাভ করিয়া ঠাকুর বাড়ী করেন। প্রসিদ্ধ মহামায়ীর গানরচয়িতা রামপ্রসাদ সেন সেই গোকুল মিত্রের নিকট সরকার ছিল ও ঐ ছড়া তাহারই প্রণীত বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। ভিখারীরা উহা গান করিয়া কলিকাতায় কৃষ্ণভক্তি প্রচার করিত। ইহা যদি সত্য হয়, তবে তিনি যাহা প্রকাশ করিয়াছেন উহা ভিখারীর গানে স্থান পাইতে পারে না। উহার যতটুকু সম্ভব হইতে পারে উহাই সন্নিবেশিত করা হইয়াছে। গোকুল মিত্রের দেবতা লাভ সম্বন্ধে ও কলিকাতার সেকালের ও একালের গ্রন্থকর্ত্তা পূর্ব্বোক্ত নবকৃষ্ণের গোপিনাথ হরণ সদৃশ এক অনুরূপ প্রবাদ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। যাহাই হউক, কলিকাতায় দেশ ও বিদেশ হইতে বিখ্যাত দেবতারাও আসিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। মদনমোহন বাগবাজারের মধ্যে প্রসিদ্ধ দেবতা, সাধারণ লোক তাঁহাকে যেরূপ ভক্তি করে সেরূপ নবকৃষ্ণের গোপীনাথ বা গোবিন্দ জীউকে করে না, উহাই নকল ও আসলের উত্তম প্রমাণ বলিয়া বোধ হয়।
মন্বন্তরঃ— ১১৭৬ সাল ও ১৭৬৯ খৃঃ— বিলাতে যখন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি টলমল করিতেছিল, তখন বাঙ্গালায় বিখ্যাত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর উপস্থিত হয়। উহাতে কেবল কলিকাতায় ছিয়াত্তর হাজার লোকের মৃত্যু ও সমগ্র বাঙ্গালার এক কোটি লোক নষ্ট হইয়াছিল। তখনও দেশে মুদ্রাযন্ত্র ব্যবহৃত হয় নাই। তখনকার যৎকিঞ্চিৎ চিত্র ছড়াতেই বর্ত্তমান রহিয়াছেঃ—
“নদনদী খালবিল সব শুকাইল, অন্নাভাবে লোক সব যমালয়ে গেল।
দেশের সমস্ত চাল কিনিয়া বাজারে, দেশ ছারখার হ’ল, রেজাখাঁর তরে।
একচেটে ব্যবসায় দাম খরতর, ছিয়াত্তরের মন্বত্তর হ’ল ভয়ঙ্কর।
পতিপত্নী পুত্র ছাড়ে, পেটের লাগিয়ে, মরে লোক, অনাহারে অখাদ্য খাইয়ে।”
বোধ হয়, যেন ভগবানের উদ্দেশ্য ছিল যে, উহাতে ইউরোপের বণিকগণ এদেশ ত্যাগ করিবে, কিন্তু উহা হয় নাই।
রেজাখাঁর আদায় প্রণালীতে কৃষক জমিদারেরা বীজের ও সঞ্চয়ের ধান্য চাউল পর্য্যন্তও বিক্রয় করিয়াছিল। কোম্পানির সৌভাগ্যোদয়ে বাঙ্গালায় অনাবৃষ্টি হইয়াছিল। দুই বৎসরকাল ঐরূপ অনাবৃষ্টিতে যে পরিমাণে শস্যোৎপন্ন হইত, উহার চতুর্থাংশ কি অষ্টমাংশও হয় নাই। উহার উপর রেজাখাঁ বিলাতী প্রণালীতে চাউল ধান একচেটে ব্যবসায় দুর্ম্মূল্য করিয়া অর্থোপার্জ্জন করিতে যান। অথবা বোধহয়, যেন ভগবান তখন দেখাইলেন যে, যাহারা জননী জন্মভূমিকে প্রাণভয়ে রক্ষা করে নাই, তাহাদের মৃত্যু অনাহারেই হইয়া থাকে। ইহাই যেন স্বর্গীয় সূক্ষ্ম বিচার—যেখানে আত্মসম্মান জ্ঞান নাই, সেখানে বিবেক অন্ধ তমসাচ্ছন্ন হয়, স্বার্থপরতাই লোকের একমাত্র লক্ষ্য হইয়া দাঁড়ায়। আত্মসম্মান রক্ষা করিবার জন্য হিন্দু স্থানীরা এইরূপ বলিয়া থাকেঃ—
“মরণা ভালা, বিদেশমে যাঁহা না আপন কৈ, পাঁচো পক্ষী ভোজন করে, মহামহোৎসব হৈ।”
আত্মসম্মানই সজীবতার লক্ষণ ও মানবকে পশুর ন্যায় নীচ দাসত্ব বা হীন কার্য্য করিতে বিরত করে। আত্মসম্মানই সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশির যুদ্ধে লিপ্ত করিয়াছিল। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সেই মুসলমান জাতির আত্মসম্মান রক্ষা করিবার নিমিত্ত মীরজাফরের সম্মুখে মুকুট ত্যাগাদি করিয়াছিলেন, যখব উহা হইল না, তখনই তিনি পলায়ন করিয়াছিলেন। তিনি যখন রাজ্য উদ্ধার করিবার জন্য ফরাসিদিগের সহিত সম্মিলিত হইবার আশায় যাইতেছিলেন তখন ভাগ্যদোষে ধৃত হইয়াছিলেন। উহাতে তাঁহার গৌরবের পরিচয় পাওয়া যায়। ছায়ের মধ্যে সত্যাগ্নি লুক্কায়িত থাকে না, বায়ু দূরে খার নিক্ষেপ করিয়া উহাকে প্রজ্জ্বলিত করে। যিনি যৌবনসুলভ চপলতায় ও বিলাস বিভবে ফৈজির ন্যায় অপূর্ব্বোসুন্দরী ললনাগণের রূপমাধুর্য্য তুচ্ছ করিয়া মাতামহ আলিবর্দ্দির নানা নিষেধ ও কৌশলে লুৎফুন্নিসার পবিত্র প্রণয় ত্যাগ করেন নাই, সেই যুবক কি চরিত্র হীন অপদার্থ ব্যক্তি? ধৃত কালে কোন ব্যক্তি তাঁহার সেই রমণীকে ও বহুমূল্য ধনরত্ন বিনা বাধায় ত্যাগ করিয়া থাকে? তাঁহার অন্তরে ভগবানের উপর নির্ভর ছিল। যাহা হয় হউক, বৃথা অনুরোধ করিয়া আত্মসম্মান নষ্ট করা উচিত নয়, এই ভাবিয়াই তিনি তখন কোন কিছুই করেন নাই। যে নবাব সাধক রামপ্রসাদ সেনের মুখে সঙ্গীত শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে আপনার বজরায় আনয়ন করাইয়া কোন রূপ রসের উত্তেজক গান না গাওয়াইয়া মায়ের নাম শ্রবণ করিতে চাহিয়াছিলেন, তিনিই কি নৃশংস ধর্ম্মহীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা? যিনি হত্যাকালে ভগবানের নাম স্মরণ করিবার জন্য সময় ভিক্ষা করিয়াছিলেন, যিনি পবিত্র শান্তিময় নাম স্মরণ করিতে ঘাতকের কঠিন অস্ত্রাঘাত নিশ্চলভাবে সহ্য পূর্ব্বক অবলীলাক্রমে প্রাণত্যাগ করিতে পারেন, উহার জন্য কাতর হন না, তিনি ধর্ম্মপ্রাণ বৈরাগী নবাব সিরাজউদ্দৌলা, না, হীন পাপী ইন্দ্রিয়াসক্ত উন্মত্ত সিরাজউদ্দৌলা? তখন আর তাঁহার মুখে লুৎফুন্নিসা বা রাজ্যকামনার কোন খেদোক্তি প্রকাশ হয় নাই। মুসলমান জাতি সেই মহাত্মার শাপে মুর্শিদাবাদের সিংহাসন চিরকালের জন্য হারাইয়াছিল। ভগবানের নিকট তাঁহার প্রেতাত্মার শান্তির জন্য কি মীরজাফর, কি মীরকাশিম কেহই প্রার্থনা করে নাই, সেইজন্যই তাহাদের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। দেশের লোকেও সেইরূপ কিছুই করে নাই বলিয়াই কি ভগবানের বজ্ররোষ দেশকে উৎসন্ন করিয়াছিল? ইহাই সেকালের সকলের ধারণা হইয়াছিল বলিয়া, বোধহয়। সেইকথা, সেই রোদনধ্বনি যেন হিন্দু মুসলমান ফকির উদাসিনগণ সাধারণকে সান্তনা দান করিয়াছিল এইরূপ প্রবাদ। দেশে তখন হাহাকার ধবনি, পথে, ঘাটে, হাটে বাজারে সর্ব্বত্রই, জীর্ণ, শীর্ণ মৃতপ্রায়ব্যক্তি নিরুপায় হইয়া ভগবানের মুখপানে তাকাইয়াছিল। অগত্যা যেখানে সেখানে দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট অনাথগণ প্রাণত্যাগ করিয়াছিল। একদিন সিরাজউদ্দৌলার জীবন ঘাতকের হস্তে কিরূপে গিয়াছিল, আর কিরূপে দুর্ভিক্ষে ভগবানের বজ্ররোষে লক্ষাধিক নিরীহ নির্ব্বিরোধী বাঙ্গালীর প্রাণ বিসর্জ্জন হইয়াছিল! ইহার জন্য কে দায়ি? শূন্য গগন হইতে প্রতিধ্বনি হইল—আত্মসম্মান হীন মানবগণ!!!
আত্মসম্মানঃ— মানবের আত্মসম্মান জ্ঞান থাকিলে নিজের উদর পূরণ হিংস্র সিংহ ব্যাঘ্রের ন্যায় ভগবানদত্ত নখ কুলিস শক্তির অপব্যবহার দ্বারা করিতে পারে না। সিরাজ সিংহাসনে বসিয়া দেশবাসির নিকট রাজস্ব অধিক করিয়া প্রজার সর্ব্বস্বহরণ করিবার চেষ্টা আদৌ করেন নাই, কিসে রাজ্য নিরাপদ হয়, সেই চেষ্টায় তিনি তাঁহার রাজকোষ শূন্য করিয়াছিলেন। আর মীরজাফর, মীরকাশিম নবাবীর জন্য উন্মত্ত, দেশবাসি রসাতলে যাক্, কিছু যায় আসে না, ইংরাজ কোম্পানি সেইরূপ মূর্খ ব্যক্তির অযথা উচ্চাভিলাষের প্রশ্রয় দিয়া যে মহাপাপ অর্জ্জন করিয়াছিল উহার উহার প্রায়শ্চিত্ত তাহারা মুক্তকণ্ঠে প্রকাশ্যে ইতিহাস ও ক্লাইবাদির বিচারে স্বীকার করিয়া শুদ্ধ হইয়াছিল। ধন্য ন্যায়পরায়ণ ইংরাজজাতি!!! ভগবান সেইজন্যই তাঁহাদের উপর হইয়া আর্য্যভূমি ভারতবর্ষ তাঁহাদের উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। সেইজন্যই পূর্ব্বতন শাসন ও বিচারবিভ্রাটাদি সংশোধন জন্য বিলাতে হুলস্থূল পড়িয়াছিল। বাঙ্গালাদেশের উৎকৃষ্ণ ব্যবসায়ী, শিল্পি, কারিকরের দল একচেটিয়া ব্যবসায় যে দুঃখ ভোগ করিতেছিল উহাদিগকে শান্তিদান যেন দুর্ভিক্ষে মৃত্যু আলিঙ্গনদান করিয়া কহিল। দেশের সর্ব্বনাশ বিদেশীতে করিতে পারে না যেমন গাছ কেবল লোহার কুড়ুলে বিনা কাঠের বাঁটে কাটা যায় না আর সেই বাঁট গাছের ডালেই হয়, অন্য কিছুতে উহা হয় না। দেশের লোক দেশের সর্ব্বনাশের জন্য যত দায়ী, সেরূপ বিদেশী নহে। স্বদেশী স্বার্থান্ধ ব্যক্তিগণ বিদেশীর সহিত তাহাদের হিতৈষী হইয়া দেশের সর্ব্বনাশ করে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে রেজা খাঁর নাম সেইজন্য বিলাত পর্য্যন্ত পৌঁছিয়াছিল। বিলাতে তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী মহারাজ নন্দকুমার এজেণ্ট দ্বারা রেজা খাঁর দ্বারাই ছিয়াত্তর মন্বন্তর হইয়াছে প্রমাণ করিতে গিয়াছিলেন। কলিকাতার বিচার বিভ্রাট যে কি, সেই রেজা খাঁর বিচার উহা ছিয়াত্তর মন্বন্তর কি, সকলের হৃদয়ঙ্গম হইয়াছিল। ছিয়াত্তর মন্বন্তরকালে বাঙ্গালায় ভগবান একজন বাঙ্গালীকে রক্ষা করিয়া রেজা খাঁকে বিচারাধীন করিয়াছিলেন। আবার সেই বাঙ্গালীই একসময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া ইংরাজের সহায়তার জন্য দ্বাদশ সহস্র মুদ্রা লাভ করিয়াছিল, উহাতেই বোধ হয়, যেন ভগবান শেষে তাঁহাকেও শাস্তিদান করিয়াছিলেন। বাঙ্গালায় ইংরাজ মুসলমান দরবারের সহিত নন্দকুমার যেরূপ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ হইয়াছিল, তখন সেরূপ অন্যকোন বাঙ্গালীর ছিল না। কেবল নবকৃষ্ণ প্রমুখের দাসত্বে ও কৌশলে নন্দকুমার সকলের মনস্তুষ্টি করিয়া চলিতে পারেন নাই। কলিকাতার উচ্চকর্ম্মচারিরা একবার নন্দকুমারকে চাঁটগাঁয়ে নির্ব্বাসিত করিতে গিয়াছিলেন তখন কিন্তু নবকৃষ্ণ নন্দকুমারের ন্যায় প্রখর বুদ্ধি বলসম্পন্ন ব্যক্তিকে দূরে রাখা কর্ত্তব্য নয় বলিয়া সদুপদেশ দান করিয়াছিলেন ও সেজন্য উহা হয় নাই। নন্দকুমারকে কলিকাতার ইংরাজকর্ম্মচারিরা কাঁটা দিয়া কাঁটা তুলিবার জন্য যখন প্রশ্রয় দান করিতেন, তখন তিনি উহা লক্ষ্য না করিয়া সরলভাবে গ্রহণ করায় বিপদে পতিত হইয়াছিলেন। নন্দকুমার ব্রাহ্মণ সন্তান, তাঁহার ধমণীতে আর্য্য রক্তস্রোত প্রবহমান, উহার অনন্যসাধারণ শক্তিতে মস্তিষ্কে জ্ঞান বুদ্ধি পুষ্ট হইলেও কালোপযোগী শিক্ষা দীক্ষার অভাবেই উহা তাঁহার কৃতকার্য্যতার সম্পূর্ণ অন্তরায় হইয়াছিল। সে সময়ে সকলেই উচ্চ ইংরাজ কর্ম্মচারিগণের অনুগ্রহ প্রাপ্তির জন্য অর্থদান, তোষামোদ বা কোনরূপ হীন কার্য্য করা দোষের মনে করিত না। তখন নন্দকুমার সেই সকল কর্ম্মচারিগণকে উপেক্ষা করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে বিলাতে অভিযোগ করিলে তাঁহাদের মনের অবস্থা কিরূপ হইতে পারে উহা অনায়াসেই উপলব্ধি করা যায়। হায়! সেকালের নবাবি আমলের ঢাকার মসলিন, দলমাদল, জাহান কোষাদি কামান, মসজিদ, প্রাসাদ, নদীগর্ভে সীসকাদি দ্বারা স্রোতরক্ষা প্রভৃতি কলাবিদ্যার আদর্শ প্রসিদ্ধ হইয়া আছে কিন্তু পরাধীনতায় বাঙ্গালীর বিদ্যাবুদ্ধি সম্পূর্ণরূপে শিক্ষিত ও দ ক্ষিত না হইলেও উহার যে স্বাভাবিক স্বতঃসিদ্ধ প্রভাব দ্বারা সৃষ্টিধর নন্দকুমারাদির আদর্শে বিলাতের মহাপুরুষগণ মুগ্ধ হইয়াছিল, ইহা কি গৌরবের কথা নয়? নিজের স্বার্থ অন্তর্নিহিত না থাকিলে কেহ কোন কার্য্য করে না সত্য, কিন্তু নন্দকুমার ভিন্ন কে তখন সাহস করিয়া মুর্শিদাবাদের দরবারের সর্ব্বাপেক্ষা অর্থশালী বলবান মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষ রেজা খাঁর সহিত শত্রুতা বা তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থিত ও বিচার প্রার্থনা করিতে পারিত? যাঁহাকে ইংরাজেরা পর্য্যন্ত অর্থপদ দ্বারা বশীভূত রাখা কর্ত্তব্য মনে করিত, তাঁহার বিরুদ্ধে সেকালে বিচার প্রার্থনা করা মূর্খতা ভিন্ন আর কিছুই নয়। মহারাজ নন্দকুমার সম্পূর্ণ মূর্খ ছিলেন না, তিনি সেকালের উচ্চ দরের রাজনৈতিক পুরুষ বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তিনি জানিতেন যে, তখন রেজা খাঁর অর্থবল ও ক্ষমতা কিরূপ ছিল, তাঁহার উপর তৎকালিন উচ্চকর্ম্মচারি ইংরাজ রাজপুরুষগণের কিরূপ মনোভাব ও তাঁহাদের বিচার শক্তি ও অর্থলিপ্সাদি সকলই তিনি বুঝিতেন কিন্তু তিনি চক্ষের উপর অবিচার ও অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া অসীম সাহসে বিলাতে অর্থব্যয় করিয়া উহার আশু প্রতিবিধান করিবার শেষ চেষ্টা করিয়াছিলেন। পুরাকালে পুরাণে নিজের হৃদয়াস্থি দ্বারা যেরূপ দৈত্য বিনাশের সহায়তা করায় দধীচি মুনির নাম চিরস্মরণীয় হইয়া আছে, সেইরূপ মহারাজ নন্দকুমার কর্ম্মচারিগণ কর্ত্তৃক রেজা খাঁ প্রমুখ দেশবাসিকে পদে পদে নিগৃহীত হইতে দেখিয়া উহার প্রতিকারের জন্য আপনার ধন মান জীবন সর্ব্বস্ব পণ করিয়া বিলাতে দূতাদি পাঠাইয়া বিচার প্রার্থনা করায় অক্ষয় কীর্ত্তি করিয়াছেন। বজ্রাঘাত, আগ্নেয় গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বাড়বাগ্নি, দাবানল প্রভৃতি আধিদৈবিক উৎপাতের মধ্যে যেমন ভগবানের কোন না কোন অজ্ঞাত হিতকর উদ্দেশ্য বর্ত্তমান থাকে, সেইরূপ ছিয়াত্তর মন্বন্তরের ভিতর কি কোন কিছু ছিল না? নন্দকুমার বাঙ্গালার শত সহস্র লোকের মৃত্যুতে তাহাদের প্রেততর্পণ করিবার নিমিত্ত রেজা খাঁর বলিদানোৎসর্গ আবশ্যক মনে করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, যদি অতীত ঘটনা দ্বারা সেই ব্যক্তির বিচার করিতে হয়, তাহা হইলে সর্ব্বাগ্রে বলিতে হয় যে, সেকালের প্রধান শ্রেণীর ন্যায়পরায়ণ পাশ্চাত্য শিক্ষিত রাজনৈতিক মহাপুরুষগণ যাঁহারা কখন নন্দকুমারকে চক্ষে দেখেন নাই তাঁহারা কেন নগণ্য নন্দকুমারের জন্য স্বদেশবাসি প্রসিদ্ধ নরশার্দ্দুলগণের বিরুদ্ধে বিলাতের মহাসভায় বত্তৃতা করিলেন? সেই বত্তৃতায় সাক্ষাৎ সরস্বতী যেন তাঁহাদের কন্ঠে অধিষ্ঠান হইয়াছিল বলিয়াই সকলেই স্তম্ভিত ও বিস্মিত হইয়াছিল এমন কি, হেষ্টিংসও মুক্তকণ্ঠে বলিয়াছিলেন যে, তিনিও উহা শ্রবণ করিয়া আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করিয়াছিলেন। কলিকাতায় রেজা খাঁর বিচার বড় আড়ম্বরের সহিত আরম্ব হইয়াছিল, কিন্তু উহার পরিণাম কিছুই হইল না, উহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে। তখন কলিকাতায় নন্দকুমারের অধীনস্থ কর্ম্মচারীরা তাঁহার ন্যায় সম্মান অর্থ সমস্তই লাভ করিয়াছিল কিন্তু তিনি থাকিতে তাহাদের সম্পূর্ণ মনোভীষ্ট সিদ্ধ হইতেছিল না বলিয়া বা অন্যান্য কারণে নন্দকুমারের প্রতিহিংসা করিবার জন্য তাহারা সকলেই রেজা খাঁর মুক্তি লাভের সুবিধা ও সহায়তা করিয়াছিল। সেই সকল ব্যক্তিই যেন ইংরেজের কুড়ুলের মধ্যে বাঁটস্বরূপ হইয়া মহীরুহ বিশেষ সজ্জন দেশহিতৈষী ব্যক্তির সর্ব্বনাশ করিয়া বাঙ্গালা দেশকে রসাতলে নিমগ্ন করেন। যে সময় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর উপস্থিত হইয়াছিল তখনই বাঙ্গালায় মুসলমান রাজত্ব শেষ হইয়া ইংরাজ রাজত্ব বাঙ্গালায় যুগ পরিবর্ত্তনের আরম্ভ হইয়াছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে তখন হইতেই কোম্পানির এদেশে শাসন ও বিচারের হাতে খড়ি আরম্ভ হইয়াছিল ও ছিয়াত্তরে মন্বন্তর বিচার কৌশল যেন এক সমন্ধ সূত্রে বদ্ধ।
কাল ও দেবতা মাহাত্ম্যঃ— কোথা হইতে জন কয়েক বিদেশী অশিক্ষিত ইংরাজ এদেশে ভাগ্য পরীক্ষা করিতে আসিয়া নবাব সম্রাটের রোগারগ্য করিয়া বাণিজ্য করিবার অনুমতি লাভ করিয়া বাঙ্গালায় ও অন্যান্য দেশে ব্যবসারম্ভ করে। জলপথে জাহাজে যুদ্ধ করিয়া এদেশের লোকের দ্বারা সৈন্য সৃষ্টি করিয়া ও অকর্ম্মণ্য মুসলমান কর্ম্মচারিগণকে অর্থদ্বারা হস্তগত করিয়া বা ভয়ে জড়সড় করিয়া যুদ্ধজয়াদি দ্বারা দেশ দখল করিতেছিল। অন্যান্য দেশের ন্যায় বাঙ্গালা দিল্লির সম্রাটের সম্পূর্ণ অধীন ছিল না, কলিকাতায় বর্গীয় হাঙ্গামায় ইংরেজের সৌভোগ্যোদয় ও উন্নতি, তাঁহাদের বিধাতা পুরুষ ডাক্তার হামিল্টন বা বৌটন। প্রকৃতপ্রস্তাবে তাঁহারাই ইংরাজ রাজত্বের ভিত্তি স্থাপনের সম্পূর্ণ সহায়তা করেন, নতুবা মুর্শিদকুলি খাঁ কলিকাতায় ইংরাজের উহা করিবার অবসর প্রদান করিতেন না। হায়! বাঙ্গালায় সেই সময় রোগে দুঃখে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেল। ইংরাজের দেওয়ানি লাভের পরই এই মন্বন্তর উপস্থিত হইয়াছিল কিন্তু তখন সেই সকল এদেশী শাসনকর্ত্তারা এদেশ বাসি প্রজাগণের দুঃখ দূর করিবার জন্য কে কি করিয়াছিল উহার কোন সবিশেষ উল্লেখ নাই। কলিকাতার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ধনকুবের যিনি দেশের লোকের দুঃখ অন্নাভাব দূর করিবার নিমিত্ত বাঙ্গালার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে মন্দির নির্ম্মাণ, ভোগ বিতরণ বা ভোজনোপকরণ প্রেরণাদি সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠান দ্বারা বাঙ্গালার ক্ষমতাশালী জমিদারগণ অপেক্ষা সেই সময় বিখ্যাত হইয়া পড়েন তিনিই কলিকাতার ৺নয়ানচাদ মল্লিক। তিনিই কলিকাতায়, মহেশ, বল্লভপুর, কাঁচড়াপাড়াদি স্থানে তৎপ্রতিষ্ঠিত মন্দিরে ভোগ বিতরণ ও অন্যান্য দানাদিদ্বারা “কমল নয়ান” সংজ্ঞা খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন অর্থাৎ তাঁহার দৃষ্টি যেখান পড়িত সেইখানে কমলার আবির্ভাবে দুঃখকষ্ট দূর হইত। তিনি তাঁহার কলিকাতার আবাস গৃহের নিকট যে এক অতীথিশালায় দরিদ্রগণকে ভোজন ও দানাদি করিতেন উহা “কমল নয়ানবের” বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছিল। তখন রাস্তার নামে বা নম্বরে কলিকাতার জমি জায়গার পরিচয় হইত না, সীমানা উল্লেখ করিয়া করিতে হইত। ৺নয়ানচাঁদ মল্লিক পলাশি যুদ্ধের পর ক্ষতি পূরণের অর্থ বিতরণের ভারপ্রাপ্ত একজন কমিশনার ছিলেন ও সেকালের কলিকাতার বিখ্যাত দাতা। তাঁহার সহিত কোম্পানির উচ্চ কর্ম্মচারিগণের কোন সৌহার্দ্দ্য বা কোন বিরোধ ছিল না। তিনি সেকালের জমিদারগণকে ঋণাদি দান করিতেন ও সেইজন্য তাঁহারা তাঁহাকে বিশেষ মান্য করিতেন।
ওয়ার্ড সাহেব তাঁহার পুস্তকে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এক সেঁকরার হাত কাটিয়া শাস্তি দিবার কথা লিখিয়াছেন, কিন্তু তিনি যে ৺নয়ানচাঁদ মল্লিকের কথায় লজ্জিত হইয়া তাহার জীবিকা-নির্ব্বাহের বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন উহা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করেন নাই। উহা করিলে, বোধ হয়, সেকালের জমিদারগণের নৃশংস অত্যাচার দণ্ডের উদাহরণ লঘু হইয়া যাইবে। ৺নয়ানচাঁদ মহারাজকে বলিয়াছিলেন উপযুক্ত করিগরী বা মজুরী না দেওয়ায় সেকালের কারিগরেরা চুরি করিতে বাধ্য হইত। উহা বিচার না করিয়া তিনি যখন উহার জীবিকানির্ব্বাহের পথবন্ধ করিয়া দিলেন, তখন তাঁহাকে লোকে কেন আর সমাজপতি বলিয়া মান্য করিবে বা তাঁহার নির্ম্মিত সেই ঠাকুরকে দয়াময় ঈশ্বর বলিয়া লোকে ভক্তি করিবে? কৃষ্ণচন্দ্র লজ্জিত হইয়া সেই কারিগরের জীবিকা নির্ব্বাহের উপযুক্ত মাসিক বৃত্তি বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছিলেন। ওয়ার্ড সাহেব মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বানরের বিবাহে অর্থ অপব্যয়াদি করার কথাও লিখিতে বিস্মৃত হন নাই। উহা উল্লেখ করার তাঁহার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল যে, তিনি রাজস্ব দান না করিয়া তাঁহার অর্থের অপব্যবহার কিরূপে করিতেন উহা ওয়ার্ড, হিবার প্রমুখ ইংরেজেরা সেকালের অনেক কথার নেজা মুড়াদি বাদ দিয়া লিখিয়া গিয়াছেন, উহাতে অনেক সময় সেই সকল ঘটনা অনুসন্ধান করিয়া অবগত না হইলে উহার তাৎপর্য্য বোধগম্য হয় না। তখন ছিয়াত্তরে মন্বন্তর দেশের সকলের মতি গতি ফিরাইয়াছিল ইংরাজ বা মুসলমান রাজকর্ম্মচারিগণের পূজা করিয়া বড়মানুষ জমিদার হওয়া অপেক্ষা দেবতার পূজা ও প্রতিষ্ঠা করিয়া দেশ হইতে রোগ শোক দৈন্য দূর করা কর্ত্তব্য ও সৌভাগ্য লাভ করিবার পরমপন্থা বলিয়া লোকের ধারণা হইয়াছিল। সেইজন্যই নবকৃষ্ণ প্রমুখও দেবতার সভা ও প্রতিষ্ঠা আরম্ভ করিয়াছিলেন।
কলিকাতায় ৺নয়ানচাঁদ মল্লিকের কুলদেবী শ্রীশ্রী ৺সিংহবাহিনী দেবীর পূজা ও ভোগাদি অতি সমারোহে হইত। সেই দেবীর কৃপায় উক্ত মল্লিক বংশ পুরুষানুক্রমে সৎকর্ম্ম দান ধর্ম্ম করিয়া কোন অধর্ম্মে কিছু লাভ বা কাহারও সর্ব্বনাশ করিতে উদ্যত হইত না। অনেকে সেইসময় সিংহবাহিনী দেবীর প্রতিমা ও পূজা আরম্ভ করে। ওয়ার্ড সাহেব সে সম্বন্ধে লিখিয়াছেন:—
“The ten forms of Doorga (3) Singha Vahinee she fought with Rukhi Veiju (this goddes with yelow garment) is represented as sitting on a lion, she has four hands; in one a sword, in another a spear; with a third is forbidding fear and with the forth bestowing a blessing. Many people make this image and worship it in the day time, on the 9th of the increase of the moon, in whatever month they please, but in general in the month Ashwin or Chaitra, for two or three days. The ceremonies, including, bloody sacrifices, are almost entirely the same as those before the image of Doorga. Sometimes a richman celebrates with worship at his own expense, and at other times several persons who expect heaven as their reward, unite in it. Some Hindus keep in their houses images at all the forms of Durga, made of gold, silver, brass, copper, crystal, stone or mixed metal and worship them daily’’ (Ward’s Mythology of the Hindus V. III p213.)
মল্লিকদের সিংহবাহিনী দেবী দুর্ব্বহ ধাতুমূর্ত্তি, অতি প্রাচীন ধাতুময়ী মুকুট বৃক্ষত্বকাবৃতা ছিন্ন হস্তী মস্তকের উপর অসাধারণ সিংহের উপর দণ্ডায়মানা—উহা সেকালের নির্ম্মিত মূর্ত্তি নয়। সিংহবাহিনী দেবীমূর্ত্তি আন্দুলের রাজবংশ বা বিখ্যাত কলিকাতার ধনী লাহা বা গুপ্তেরা পুজা করিয়া থাকেন। তাঁহাদের দেবী অতি ক্ষুদ্র উহা সন্ন্যাসীরা বহন করিতে পারে কিন্তু মল্লিকদের সিংহবাহিনী মূর্ত্তি বৃহৎ ও গুরু সেরূপ কেহ করিতে পারে না। যখন নিম্নাঙ্গ বৃক্ষত্বক দ্বারা আবৃত করা ও মস্তকে মুকুটাদি দ্বারা রাজচিহ্ণ প্রচলন ছিল তখনকার রাজার। ওয়ার্ডের পুস্তকে বাঙ্গালার দেবদেবীর প্রতিষ্ঠার বিবরণ আছে উহা প্রকাশ করা অনাবশ্যক কারণ কলিকাতায় মল্লিকদের ৺সিংহবাহিনী দেবী সে সময়ের নয়। উহা সর্ব্বাপেক্ষা অতি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ সকলেই তাঁহাকে পূজা ভক্তি করে। তাঁহার কৃপায় অনেকের মনোভীষ্ট লাভ হইয়া থাকে। খৃষ্টান জাতির ধর্ম্মপুস্তকে ভগবান তাঁহার সূক্ষ্ম বিচার ও ধার্ম্মিক রাজাকে স্বপ্নে আগন্তুক বিপদ দুর্ভিক্ষাদির সংবাদ পূর্ব্বেই জ্ঞাপন করিয়া থাকেন উল্লেখ আছে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পূর্ব্বে বাঙ্গালার রাজত্ব খৃষ্টান ইংরাজ রাজার হইবে একথা কোন বিখ্যাত পাদরী লিখিয়া যান নাই, বা তাঁহাদের ধর্ম্মপুস্তকে খৃষ্টান জাতির ধর্ম্মমাহাত্ম্য প্রকাশ করেন নাই। মুসলমান ইংরাজ নবাবাদি হিন্দুর ধর্ম্ম বিশ্বাস ও পৌত্তলিকতা যেমন ঘৃণা করে তেমনি উহারা অপূর্ব্ব অলৌকিকত্বে মুগ্ধ। উহাতেই এখনও হিন্দুধর্ম্ম নানা অত্যাচারের মধ্যে ও শিরোত্তলন করিয়া বর্ত্তমান রহিয়াছে। কলিকাতার শ্রীশ্রী ৺কালিমাতার যেমন প্রভাব, মুর্শিদাবাদে রাধামাধবেরও সেইরূপ প্রভাব ছিল। কৌতূহল পরিতৃপ্তির জন্য মুর্শিদাবাদ কাহিনীতে উহার সম্বন্ধে যে বিবরণ আছে উহার সারাংশ উল্লেখ করিলাম। মতিঝিলের প্রাসাদে শ্রীশ্রী ৺রাধামাধবের পূজার সময় শঙ্খঘন্টার শব্দ শুনিয়া নবাব জামাতা নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ বড়ই উৎপীড়িত হইতেন। সেই দেবতাকে স্থানান্তরিত করিবার জন্য তিনি লোক দিয়া খানা পাঠাইয়া দেন। সেবাইত গোস্বামীগণ বাহককে যত বার উহার আবরণ উন্মোচন করিতে বলেন, ততবারই সেই অখাদ্য যুই ফুলের মালা হইয়া যায়। নওয়াজেস স্বয়ং উহা প্রথমে বিশ্বাস করেন নাই, কিন্তু যখন তাঁহার চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হইয়াছিল, তখন তিনি সেই দেবতার পাকা দালান করিয়া দেন ও শেষে এক্রামউদ্দৌলার শোকে উন্মত্ত হইয়া মারা যান। বাঙ্গালা দেশে কালী ও কৃষ্ণ পূজার আবির্ভাব ও মাহাত্ম্য এইরূপ ঘটনায় প্রকাশ হয়।
ভগবানের সূক্ষ্ম বিচার ভেদ করা দুরূহ উহা কেবল ধর্ম্মধবজীরাই করিতে পারেন, সেইরূপ সেকালের কলিকাতার সূক্ষ্মবিচার রহস্যভেদ ইংরাজ জাতি ভিন্ন অন্য কেহ করিতে পারে নাই। উহার রহস্যভেদ করিবার অনেক পুস্তক আছে বিলাতের মহাসভায় সার ইলাইজাইম্পে ও ওয়ারেণ হেষ্টিংস প্রমুখ এদেশের প্রধান কর্ম্মকর্ত্তা ও মহাপুরুষ বিচারক ও অভিযোক্তাগণের সেকালের বিচার প্রসঙ্গ আছে। কলিকাতায় বিচারের আড়ম্বর ও ফলে কলিকাতা চিরস্মরণীয় হইয়াছে। সেইরূপ ইংরাজ জাতির পৌরুষ, আত্মসম্মান ও গৌরব পৃথিবীর ইতিহাসে স্থান লাভ করিয়াছে কিন্তু সেকালের লোকেরা রাধাচরণ রেজা খাঁ নবকৃষ্ণের অব্যাহতি ও নন্দকুমারের ফাঁসি বিচার বিভ্রাট ও কলিকাতার কলঙ্ক বলিয়া মনে করিত। নন্দকুমার যেখানে থাকিতেন সেখানে তাঁহার পুত্র রাজা গুরুদাসের নামে রাস্তা আছে ও গঙ্গাধারে কুলিবাজারে নন্দকুমারের ফাঁসি হইয়াছিল। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম শ্রেষ্ঠ আদালতের প্রধান বিচারপতি কলিকাতার সুপ্রীম কোর্টে সেই সুবিচার করিয়া শেষে বিলাতে তাঁহাকে স্বয়ং বিচারাধীন হইতে হইয়াছিল। উহা তখন সকলের প্রহেলিকাস্বরূপ বোধ হইয়াছিল।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কলিকাতার শেষ গবর্ণর ওয়ারেণ হেষ্টিংস নন্দকুমারের সাহায্যে মহম্মদ রেজা খাঁ দুর্ভিক্ষের সময় চাউল একচেটিয়া করিয়া উচ্চ দরে বিক্রয় ব্যবসায় লোকহত্যা, নিজামতির রত্নালঙ্কার হস্তী, অশ্ব বিংশত্যধিক কোটি টাকা আত্মসাৎ আদি সেতাব রায়ের বিরুদ্ধে নববই লক্ষ টাকা তহবিল তচ্ছ্রপ অভিযোগকালে উহাদের অব্যাহতির জন্য রেজা খাঁ ও সেতাব রায় যে সকল উৎকোচ দান করিবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন উহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন কিন্তু উহার অব্যবহিত পরেই কলিকাতার সেকালের সকল লোক উহাদের মুক্তিতে যারপরনাই আশ্চর্য্যান্বিত হইয়াছিল।
ওয়ারেণ হেষ্টিংস যতদিন কলিকাতার গবর্ণর ছিলেন, ততদিন নন্দকুমারের সহিত সখ্যতা ছিল। যখন বিলাতের আইনানুসারে তিনি কলিকাতার গবর্ণর জেনারেল পদে ১৭৭৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হন তখনই গণ্ডগোল উপস্থিত হইল। বিলাতের পার্লিয়ামেণ্ট ভারতবর্ষের যাবতীয় কোম্পানির বাণিজ্য ও অধিকারের উপর কর্ত্তৃত্ব করিবার জন্য গবর্ণর জেনারেল পদের সৃষ্টি করেন। নন্দকুমার বিচার কৌতুকের পূর্ব্বেই উৎকোচাদির উল্লেখ করিয়াছিলেন ও শেষে হেষ্টিংসের বিরুদ্ধে ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে ৮ই মার্চ্চ তারিখে যে সুদীর্ঘ আবেদন করেন উহাতেই তাঁহার সর্ব্বনাশ হইল। উহাতেই বন্ধু বিচ্ছেদ হইয়াছিল। সেই সময়ে বর্দ্ধমানের মহারাজ তিলকচাঁদের বিধবা পত্নী হেষ্টিংসের অত্যাচারের কথা কলিকাতা সভায় আবেদন করেন। কলিকাতার গবর্ণর জেনারেলের বিচার একজন বিধবা জমিদার রমণী করিবার অব্যবহিত পরেই নন্দকুমারের অভিযোগ যেন সঙ্গদোষে দুষ্ট অনুমিত হইল। বিলাত হইতে নবাগত কলিকাতার গবর্ণর জেনারেল সভার সভ্যগণ স্বাধীনচেতা ব্যক্তিগণ তখন পূর্ব্বমত পুরাতন এদেশী কর্ম্মচারী পদোন্নতি দ্বারা সেই সভার সভ্য না হওয়ায় হেষ্টিংসের সহিত তাঁহাদের মতের অনৈক্য হইতে আরম্ভ হয়। তাঁহাদের নিকট হেষ্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিরূপ ভয়ানক হইয়াছিল ইহা লিখিয়া কাহারও বোধগম্য করান দুরূহ ব্যাপার, কিন্তু উহা কল্পনা চক্ষে অনুভব করা কঠিন নয়। হেষ্টিংস নির্ব্বুদ্ধিতা বশতঃ বুঝিলেন যে নন্দকুমার নিশ্চয়ই তাঁহার সভার বিপক্ষগণ কর্ত্তৃক উত্তেজিত হইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে এই দুঃসাহসিক কার্য্য করিতে অগ্রসর হইয়াছে। সেইজন্য তিনি নন্দকুমারের আবেদন সভায় পঠিত হইবার পর ফ্রান্সিস সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন যে, তিনি ঐ আবেদনের বিষয় পূর্ব্বে কিছু অবগত হইয়াছিলেন কি না উহা জানিবার জন্য তাঁহার কৌতূহল হইয়াছে। ফ্রান্সিস উহাতে বিশেষ ক্ষুণ্ণ হইয়া উহা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন ও পরস্পরের মধ্যে উহাতেই মনোমালিন্য সৃষ্টি করে। ১৩ই মার্চ্চ নন্দকুমার আর এক আবেদন দান করিয়া উহা প্রত্যাহার না করিয়া উহা প্রমাণ করিতে প্রস্তুত আছেন বলেন। উহাতেই অগ্নি প্রজ্বলিত হইল। পুণ্যশ্লোকা রাণী ভবানির বাহারবন্দ পরগণা কিসের জন্য বলপূর্ব্বক গ্রহণ করিয়া কান্তমুদির সন্তান লোকনাথের হইল, বাদশাহের প্রদত্ত রাজসম্মান ঝালরওলা পাল্কী যাহা নন্দকুমারের জন্য প্রেরিত হইয়াছিল উহা কেন হেষ্টিংস সাহেব স্বয়ং ব্যবহার করেন ও ছিয়াত্তরে মন্বন্তরে মণি বেগমের বংশলোপ হইলে নিজামতির সিংহাসনে বববুর সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করিবার সময় মণি বেগমের কর্ত্তৃত্ব ও রাজা গুরুদাসের নিয়োগ ব্যাপারে কোম্পানির কর্ম্মচারী কান্তমুদির ভ্রাতা নৃসিংহ আদির মারফত উপহার লাভ ইত্যাদির তালিকা দান করা হইয়াছে উহা সত্য কিনা জিজ্ঞাসা করা হয়।
সেদিনের কলিকাতার লাটসভার ঘটনাবলী রঙ্গমঞ্চের অভিনয় স্বরূপ গণ্য হইতে পারে। যখন সভ্য মন্সন সভাস্থলে নন্দকুমারকে উপস্থিত হইবার জন্য প্রস্তাব করেন, তখন হেষ্টিংস বারওয়েল উহা হইতে পারে না বলিয়া তর্ক বিতর্কে সভ্যগণকে বিরত করিতে পারিলেন না। যখন তিনি বোর্ডের সেক্রেটারীকে নন্দকুমারকে উপস্থিত করাইবার আদেশ প্রদান করিলেন, তখন হেষ্টিংস সেই সভার সভ্যত্রয়ই যে নন্দকুমারের নাম দিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে এই সমস্ত করিতেছেন বলিয়া সভাভঙ্গ আদেশ দান করিয়া যেমন উঠিয়া যান অমনি বারওয়েলও সঙ্গে সঙ্গে চলিয়া যান। নন্দকুমার সেই সভায় উপস্থিত হইয়া দুইখানি মূল দলিল দাখিল করেন। উহাতে কান্তমুদির উপস্থিতি প্রয়োজন হইয়া পড়ে। সভা তাঁহাকে আহ্বান করিয়া পাঠান তখনই সে গবর্ণরের নিকট উপস্থিত তাঁহার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিতে পারেন না বলিয়া লিখিত উত্তর দান করিল। সেদিনের সভা এইরূপে ভঙ্গ হইল। নন্দকুমার ও কান্ত প্রহসন পর্ব্বারম্ভ হইল। সেই হেষ্টিংসের প্রসাদে তখন হইতে যিনি কান্তমুদি বলিয়া সর্ব্ববিদিত ছিলেন তিনি কান্তবাবু বলিয়া পরিচিত হইলেন। তাঁহার নাম কৃষ্ণচন্দ্র দাস কিন্তু মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রস্তাবে তিনি কৃষ্ণবিহীন হইয়াছিলেন। শেষে কান্তবাবুকে কলিকাতার সভার সেই অবমাননার কারণ প্রদর্শন করাইবার জন্য উপস্থিত হইতে হইয়াছিল। সেইদিন সেইখানে কান্তবাবু কলিকাতার সর্ব্বপ্রধান অধিবাসী বলিয়া গবর্ণর জেনারেলের অভিনন্দন লাভ করেন। তাঁহার পূর্ব্বোক্ত অপমান করার জন্য শাস্তি দিবার ব্যবস্থালোচনাকালে হেষ্টিংস সাহেব পরিষ্কার বলিয়াছিলেন যে, তিনি নিজের জীবন বিনিময় করিয়া কৃষ্ণকান্ত মণিকে রক্ষা করিবেন। গবর্ণর বাহাদুর অত্যল্প অপরাধে প্রত্যহ হতভাগ্য হিন্দুগণকে তুড়ুম শাস্তি দান করিয়া থাকেন ঐরূপ শাস্তি বিধানাজ্ঞা কি কান্তবাবুর কৃতাপরাধের যোগ্য শাস্তি নহে উহা বিচার হয়। সেই বিচার বিভ্রাটের রহস্য কলিকাতাবাসিগণ তখন নিম্নলিখিত ছড়ায় উপভোগ করিয়াছিলঃ—
“কান্তবাবু হয়ে কাবু, হাবুডুবু খায়, তুড়ুং লাগান হোক ক্লেভারিং এর রায়
হেষ্টিংস যাহার হাত,তারে করে কাবু, বাঙলার হেন লোক, আছে কেহে বাবু।”
ইহা নন্দকুমারকে অপদস্থিত করিবার জন্য ও হেষ্টিংসের ক্ষমতা প্রচার করিবার জন্য হইয়াছিল, অর্থাৎ আর কেহ ভবিষ্যতে যাহাতে নন্দকুমারের ন্যায় হেষ্টিংসের সহিত শত্রুতা করিতে না পারে।
কৃষ্ণকান্ত নন্দীঃ— কোম্পানির সেরেস্তায় স্বাক্ষরিত দরখাস্তে কৃষ্ণকান্ত দাসই উল্লেখ আছে। যিনি সর্ব্বপ্রথমে কান্তমুদি বলিয়া খ্যাতি লাভ করেন হেষ্টিংসের অনুগ্রহে বাবু ও সর্ব্বপ্রকারে উন্নত হইয়াছিলেন। কেহ কেহ বলেন, যে বহরমপুরের দেওয়ান কৃষ্ণকান্ত সেন নিমক মহলের সর্ব্বেসর্ব্বা ছিলেন তাঁহার সহিত পার্থক্য রাখিবার জন্য তিনি মুদি বলিয়া পরিচিত হন। তিনি শেষে কলিকাতায় জাত কাছারির কর্ত্তা হইয়া মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুগ্রহে ‘নন্দি’ উপাধি লাভ করেন। উহার পূর্ব্বে পুরীতে অন্নছত্র করিতে গিয়া সেখানকার পাণ্ডারা তাঁহার নিকট হইতে উহাতে অকৃতকার্য্য হন ও আপনাকে অপদস্থিত মনে করিয়াছিলেন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সমাজপতি ছিলেন কোন এক পিরালি তাহার বাড়ীতে গেলে তাঁহাকে লক্ষাধিক টাকা উপহার দিতে চাহিয়াছিলেন, ওয়ার্ড সাহেব তাঁহার পুস্তকে উল্লেখ করিয়াছেন। যাহাই হউক, হেষ্টিংসের দৌলতে এক কান্তমুদি কেন অনেকেই উপাধি, রাজত্ব ও জমিদারী লাভ করিয়া কলিকাতায় আন্দুল, কাশিমবাজারাদির বনিয়াদি রাজবংশের পত্তন করিয়াছিলেন।
কলিকাতায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির গবর্ণরগণের আমলে বিচার কার্য্যের বিভ্রাট ব্যাপার অতি সংক্ষেপে বিবৃত করা হইল। কলিকাতায় গোপীনাথ ও মদনমোহনের মামলা নিষ্পত্তি কলিকাতার আদালত যেরূপ করিয়াছিল, সেইরূপ নবকৃষ্ণ রেজা খাঁ সেতাব রায়ের মামলা কলিকাতায় আরম্ভ হইয়া শেষে নন্দকুমার ও হেষ্টিংসের বিচারারাম্ভ হয়। উহা তখন কলিকাতার কর্ম্মকর্ত্তাগণের গৌরব বা কলঙ্ক যাহা প্রকাশ করিয়া দেয়। উহাতে বাঙ্গালার কর্ত্তৃপক্ষগণের সহিত এদেশী রাজকর্ম্মচারী ও জমিদারগণের যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হইয়াছিল উহা দ্বারা ছিয়াত্তরে মন্বন্তরাপেক্ষা অধিকতর ক্ষতি হইয়াছিল।
তবে বিচার বিভ্রাট প্রসঙ্গে একটি কথা না বলিলে সম্পূর্ণ হয় না। ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে কলকাতার দুর্গ নির্ম্মাণ কার্য্যের দরুণ একটি বিচার হইবার কথা হয়, কিন্তু চতুর দোষী ক্লাইবকে লক্ষ টাকা উৎকোচ দান করিয়া অব্যাহতি পান। তিনি অর্থাৎ ক্লাইব সেই টাকা নিজে আত্মসাৎ না করিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে দিয়াছিলেন। উহা কোম্পানি গ্রহণ করায় বোধ হয়, উহাদের কর্ম্মচারিগণ ঐরূপ গ্রহণ করা নীতি বিগহিত কার্য্য নয় মনে করিয়াছিলেন। উহাই কলিকাতার বিচার বিভ্রাটের সূত্রপাত—সেখানেও সৃষ্টিধর মহাপুরুষ ক্লাইব। ধন্য কলিকাতার সূক্ষ্ম বিচার!!! ধন্য সেই সকল মহাপুরুষগণ যাঁহারা সেই বিচারের সূত্রপাত ও শেষ করিয়াছিলেন!!! যাহা সেই বিচার প্রার্থনা করিত, তাঁহাদের নন্দকুমারের ন্যায় পরিণাম অপরিহার্য্য ভাবিয়া আর কেহ করে নাই। ধর্ম্মাবতারগণের সূক্ষ্ম বিচারের মধ্যে গূঢ় রাজনীতি ও শাসন প্রণালী বিরাজমান। উহা লক্ষ্য না করিয়া সৃষ্টীধর ইংরাজ পুরুষসিংহগণের দোষ ও কলঙ্ক দান যে ঘোর অন্যায় ইহা তখন নন্দকুমার অনুভব করিতে পারে নাই। বিলাতের শিক্ষিত মহাসভা উহা সর্ব্ববাদি সম্মতিক্রমে অনুমোদন না করিলেও অধিকাংশের মতে গৃহীত হইয়াছিল। উহার আলোচনা সেইখানেই শেষ অতএব উহা লইয়া ছিদ্রান্বেষণ করা অনাবশ্যক। সেকালের কলিকাতার গবর্ণরগণের মাহাত্ম্য ও দেশের লোকের ব্যবহারের জন্য যতদূর করা উচিত উহাই অতি সংক্ষেপে করা হইয়াছে। ইংরাজের আইনে যে উৎকোচ দান ও যে উহা গ্রহণ করে উভয়েই দণ্ডার্হ। তবে কোথাও সেই দোষ ক্ষমার্হ হইয়া থাকে, কোথাও দণ্ড বজ্ররূপে দোষিকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া ফেলে। সেইখানে সেকালের বিচারকর্ত্তাগণ বোধহয় বলিবেনঃ—
“সেই লিখি মদনমোহন যে লিখায় কাষ্ঠের পুতুলি যৈছে কুহকে নাচায়।”
“ঈশ্বর সর্ব্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জ্জুন তিষ্ঠতিভ্রাময়ন্ সর্ব্বভূতানি যন্ত্রারূড়ানি মায়রা।”
ভগবানের রাজত্বে কেহই দোষী নাই কেবল ভগবৎ বিশ্বাসের অভাবে একজন নিজের দোষ পরের ঘাড়ে চাপাইতে চায়। নন্দকুমারই সিরাজউদ্দৌলার সর্ব্বনাশ করিয়া খাল কাটিয়া বাঙ্গালায় কুমীর আনিয়া সকলের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল ও মীরকাশিমই প্রকৃত প্রস্তাবে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সূত্রপাত করিয়াছিল। কলিকাতার ষড়যন্ত্রে উমিচাঁদ নন্দকুমারকে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি দ্বাদশ সহস্র মুদ্রায় ক্রয় করিয়াছিল। উহাতেই ফরাসিরা সিরাজউদ্দৌলার সহায়তায় বঞ্চিত হইয়া পরাস্ত হইয়াছিল। আর কিছুদিন পরে সেই নন্দকুমার হেষ্টিংসের উৎকোচ গ্রহণের জন্য অভিযোগ প্রার্থনা করিয়াছিল। মানব উহা লইয়া মারামারি তর্ক বিতর্ক করিতে পারে কিন্তু ভগবানের নিকট সূক্ষ্ম বিচার, তিনি উহা গ্রাহ্য করিবার অগ্রে অভিযোগকারিকে অগ্রে তৎকৃত পাপের দণ্ডবিধান করিয়াছিলেন। ইহাতে হেষ্টিংস বা ইম্পের দোষ কি? ছিয়াত্তরে মন্বন্তরের মধ্যেও সেই সূক্ষ্ম বিচার! দেশের লোক জননী জন্মভূমির দাসত্ব মোচনের চেষ্টা না করিয়া একমাত্র অর্থকরী রাজসেবায় কানগোই নাজীর, নায়েব নাজেমীর মন্ত্রীত্বাদি উচ্চপদলাভের জন্য লালায়িত—উহার জন্য দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা উমেদারি করিয়া সেই পদে বাহাল হইবার চেষ্টায় ইংরাজ বণিকগণ দেশের অধিপতি, আর তাহাদের উমেদারের জমিদার রাজাদি পদে উন্নত হইয়াছিল। প্রাচীন নীতি উপদেশ দেশবাসি উপেক্ষা করিয়া দেশের ও আপনার সকলের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। লোক পরের ছিদ্রই অনুসন্ধান করিয়া থাকে নিজের দোষ দেখিতে পায় না।
“বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীস্তদর্দ্ধং কৃষি কর্ম্মনি
তদর্দ্ধং রাজসেবায়াং ভিক্ষায়াং নৈব দৈব চ।”
অর্থাৎ বাণিজ্যেই লক্ষ্মীলাভের প্রধান উপায়, কৃষিদ্বারা উহার অর্দ্ধেক, উহার অর্দ্ধেক রাজসেবায় কিন্তু ভিক্ষায় অষ্টরম্ভা আর চলিত কথায় “লাভ লোকেসানগণে” চার করেনা যে বেনে।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ যে দেওয়ানি লাভ করার বিপক্ষে বারংবার উপদেশ সত্ত্বেও ক্লাইব দেওয়ানি লাভ করিয়া সেই কোম্পানির ভারতবর্ষের বাণিজ্যস্বত্ত্ব বলে আদি পর্ব্বাঙ্ক শেষ করিয়াছিল। ওয়ারেণ হেষ্টিংসের আমলে আদি পবের্বর শেষ ও মধ্য লীলার প্রারম্ভ উহা সঙ্গেই কোম্পানির ও ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্টের প্রথম সম্বন্ধ সূত্রপাতের সন্ধিক্ষণ। সুতরাং তাঁহার কথা কলিকাতার কথায় আদি পবের্ব শেষে ও আবার মধ্য পর্ব্বের প্রথমেই বলিতে হইবে।
হেষ্টিংসই মুর্শিদাবাদ হইতে কলিকাতার রাজপাট বিচারালয় কলিকাতায় আনয়ন করেন ও কলিকাতা কোম্পানির দেওয়ানির সর্ব্বপ্রথম রাজধানী হয়।
* শাস্ত্রীয় ক্লাইব চরিত ১৫২ পৃষ্ঠা
* Carrocaoli’s Life of Lord Clive, V. II. Page
** দেবতাগণের মর্ত্তে আগমন ৬৭৬ পৃষ্ঠা।
*** দেবতাগণের মর্ত্তে আগমন ৩৮৬ পৃষ্ঠা।
* Martin’s The Indian Empire V. I. p. 308/9
“জয়েতি দেবাশ্চ মুদা তামূচুঃ সিংহবাহিনীং তুষ্টু মূবুনয়শ্চৈনাং ভক্তি নম্রাক্ষ্ম মুর্ত্তয়ঃ।”
চণ্ডীর ২য় অধ্যায় দেবতাগণের শক্তিদ্বারা সিংহবাহিনীর উৎপত্তি কীর্ত্তিত হইয়াছে।
