১৬. প্রাচীন ব্যবসা বাণিজ্য
উপসংহার – প্রাচীন ব্যবসা বাণিজ্য
কলিকাতার কথার আদিকাণ্ডে বিদেশী বণিকগণের মধ্যে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পূর্ব্ব হইতে হেষ্টিংসের গবর্ণরী পদ পর্য্যন্তের কথাই সংক্ষেপে বলা হইয়াছে, কিন্তু উহার পূর্ব্বে কেমন করিয়া বাঙ্গালা দেশে স্বদেশী ও বিদেশী বণিকগণ ব্যবসারম্ভ করিয়াছিল ও উহার সূত্রপাত কিরূপে হইয়াছিল উহা সংক্ষেপে বলা বিশেষ আবশ্যক। কলিকাতার আদিম অধিবাসিগণ সকলেই বাঙ্গালার প্রধান প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র ও রাজধানী হইতে কলিকাতায় আসিয়াছিল। বাঙ্গালার বিখ্যাত ব্যবসা শিল্পনৈপুণ্য কাহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও কাহার দ্বারা নষ্ট হইয়াছিল সেকথা এই কলিকাতার কথার বহির্ভূত নয়, বরং প্রধান অঙ্গ বলিলেই চলে। মোগল রাজত্বকালে বাঙ্গালার গৌরবসূচক সোনার বাঙলা নাম এখনও উল্লিখিত হয়, কিন্তু কেমন করিয়া সোনার বাঙ্গালার সেই অবস্থা হইয়াছিল উহারই উল্লেখ করিতে হইবে। বাঙ্গালা দেশের ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে সংগৃহীত হয় নাই সুতরাং ব্যবসার সহিত উহার সম্বন্ধ যে অধিক সেকথা বলা বাহুল্য। পুণ্যভূমি আর্য্যাবর্ত্তে ধর্ম্ম, শৌর্য্যাদি বর্ণাশ্রম ধর্ম্মানুসারে অনুষ্ঠিত হইত, কিন্তু কলিকালে উহার ব্যতিক্রম অবশ্যম্ভাবী উহাতেই ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের পতন হইয়াছিল। হিন্দু রাজত্বকালে জাতি জন্মগত ছিল না, স্বয়ম্বর সভায় ব্রাহ্মণবেশী পাণ্ডব দ্রৌপদীকে লাভ করিয়াছিল ও ক্ষত্রিয় বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণ হইয়াছিল ও তিনিই বশিষ্ঠের সহিত বিবাদ করিয়াছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বৈশ্য গৃহে লালিত পালিত ও তাঁহার ভগ্নী সুভদ্রার সহিত অর্জ্জুনের বিবাহ হইয়াছিল। জাতিগত শত্রুতার সৃষ্টী পরশুরামের সময়েই সমুজ্জ্বল হইয়া পড়ে।
ইহাতে কলিকালের প্রারম্ভে জাতি কর্ম্মগত ছিল বলিয়া বোধ হয় ও আর্য্য ও অনার্য্য মধ্যেই বিবাহাদি হইত না। সূতপুত্র কর্ণের লক্ষ্যভেদের সময় সেই আপত্তি হইয়াছিল। একলব্যের শিক্ষালাভের সময়ও সেই কথা। বাঙ্গালার সীমা আর্যাবর্ত্তের মধ্যে নির্দ্দিষ্ট হয় নাই। মনুতে বাঙ্গালার ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য পতিত বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে, সেই বাঙ্গালার নাম সোনার বাঙলা। প্রাচীন পঞ্চ গৌড়ের মধ্যে বাঙ্গালার স্থান, বাঙ্গালা দেশের অনেক স্থানের নাম ব্যবসানুযায়ী হইয়াছিল বলিয়া অনেকের মত ও সিদ্ধান্ত। গৌড়ের ইতিহাসকার বলেন যে, পুণ্ড্রদেশের ইক্ষু সেকালের বিখ্যাত ছিল ও উহাতে গুড় হইত। সেই গুড় হইতে গৌড় নামোৎপত্তি অসঙ্গত বলিয়া বোধ হয় না। খৃষ্ট জন্মাইবার বহু শতাব্দী পূর্ব্বে জৈনগণের কল্পসূত্রে পৌন্ড্র বর্দ্ধনের নিকট পুন্ডরীক নামক বণিক শাখার উল্লেখ আছে। খৃষ্টপূর্ব্ব তৃতীয় শতাব্দীতে যাঁহারা শাকদ্বীপি ব্রাহ্মণ ছিলেন তাঁহারা পুণ্ড্রে উপনিবেশ করিয়া জৈন ধর্ম্মাবলম্বন করিয়া পুণ্ডরীক নামে খ্যাত হন, ইহা কৃষ্ণদাস রচিত গ্রন্থে আছে। বাণভট্টের হর্ষচরিতে পৌন্ড্রবাসের কথা আছে। মালদহ হইতে বগুড়া পর্য্যন্ত স্থানে এক সময়ে প্রচুর পরিমাণে রেশম উৎপন্ন হইত। রেশমের বীট পালন ও রেশম উৎপাদন পুণ্ডরীকগণের ব্যবসা ছিল। ব্যাকরণ মহাকাব্যে পৌন্ড্রপদ পুণ্ড্র নগরবাসী শব্দে প্রতিপন্ন হইয়াছে। ইহাতে পুণ্ড্রনগর যে খৃষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে একটি প্রসিদ্ধ স্থান ছিল ইহা সন্দেহ করা যায় না। ব্রাহ্মণগণের ললাটে ত্রিপুণ্ড্রক রেখা ইক্ষুদণ্ডের অগ্রভাগের ন্যায় দেখা যায়। গৌড়ব্রাহ্মণই জন্মেজয়ের সর্পসত্রে ব্রতী হইয়াছিল। বর্ত্তমান দিল্লীতে ও সন্নিকটবর্ত্তী স্থানের ব্রাহ্মণগণ এখনও শ্লাঘার সহিত গৌড়ীয় বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকে। মহাভারতে অর্জ্জুন পুণ্ড্রদিগকে জয় ও শ্রীমদ্ভাগবতে ৯ম স্কন্ধে ভরতরাজা পুণ্ড্রদেশের অব্রহ্মণ্য রাজাকে জয় করার কথা উল্লিখিত হইয়াছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত যে, মালদহের পাণ্ডুয়াই প্রাচীন পুণ্ড্রবর্দ্ধন হইতে পারে। পেরিপ্লুস অফ দি ইরিয়ান গ্রন্থে খৃষ্টীয় ১ম বা ২য় শতাব্দীতে কোন গ্রীক বণিক ও টলেমী সেকালের বাণিজ্যের কথায় বলিয়াছেন যে, তখন ইউরোপে এদেশের দ্রব্য গঙ্গা বাহিয়া লইয়া যাইত। মেলায় লোকে রেশমী কাপড় ও রেশম সুন্দর পাটিতে জড়াইয়া বিক্রি করিতে আসিত। যোগবাশিষ্ট রামায়ণে তাম্রলিপ্ত ও গৌড়ের কথায় গৌড়ভট্টগণের লাঠি যুদ্ধের অত্যন্ত প্রশংসা আছে। সেখান হইতে প্রাচীন ৫ম শতাব্দির বৌদ্ধ যুগের রৌপ্য তাম্র মুদ্রাদি পাওয়া গিয়াছে। সেইখানে একান্ন পীঠের অন্তর্ভুক্ত দেবীমূর্ত্তি বর্ত্তমান আছে। ইহার সহিত বাঙ্গালার সম্বন্ধ প্রাচীন সুন্দর রাস্তাদি দ্বারা সন্নিবিষ্ট রহিয়াছে। সেই রাস্তা দিয়া মোগলবাহিনী উড়িষ্যাদি জয় করিয়াছিল ও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও সেই পথাদি মেরামতাদি করিয়া রক্ষা করিয়াছিল। সেকালে ইউরোপবাসী বণিকগণ তাহাদের জাহাজে জহরত সোনারূপাদির বিনিময়ে এদেশের দ্রব্যাদি লইয়া যাইত। সেই হইতেই বাঙ্গালার বহির্বাণিজ্যের লোপ হইবার সূত্রপাত হয়। তখন গ্রীস ও রোমবাসী বণিকগণ সপ্তগ্রামকে গাঞ্জেস রিজিয়া বলিত। সেই সপ্তগ্রামের অভ্যুদয় সম্বন্ধে বাণভট্টের হর্ষচরিতের মধ্যে কিঞ্চিৎ গূঢ় তথ্য আবিষ্কার করা হইয়াছে, উহাই অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা যাইতেছে।
বর্ত্তমান দিল্লী বা পুরাতন ইন্দ্রপ্রস্থ শ্রীকণ্ঠ নামক অতি প্রাচীন জনপদের অন্তর্গত ছিল। উহার রাজধানী স্থানীশ্বর একটি সমৃদ্ধিশালী নগর ছিল ও পুষ্পভূতি সেই দেশের রাজা ছিলেন। তিনি ভৈরবাচার্য্য নামক সিদ্ধ গুরুর নিকট তান্ত্রিক শৈবধর্ম্মে দীক্ষিত হন ও এক অট্টহাস নামক শত্রুজয়ী অসি সেই দীক্ষার স্মৃতিচিহ্ণস্বরূপ লাভ করেন। উহারই বংশধর রাজা হর্ষবর্দ্ধনের কথা বাণভট্ট হর্ষচরিতে উল্লেখ করিয়াছেন। উহাতে দেখা যায় যে, রাজা হর্ষবর্দ্ধনই কনৌজের রাজা হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতা প্রভাকরবর্দ্ধন মৃত্যুর পূর্ব্বে জ্যেষ্ঠ রাজ্যবর্দ্ধনকে হুনদিগের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলেন। প্রভাকর বর্দ্ধনের মৃত্যু সংবাদ শ্রবণ করিয়া তাঁহার জামাতা কান্যকুব্জাধিপতি গ্রহবর্ম্মাকে মালবাধিপতি যুদ্ধে নিহত করিয়া তাঁহার রাজ্যাপহরণ করেন। কর্ণসুবর্ণরাজ উক্ত মালব রাজের পরম মিত্র ছিলেন, তিনি বন্ধুতাছলে বিশ্বাসঘাতকতায় রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের প্রাণসংহার করিয়াছিলেন। কুণ্ডল নামক জনৈক দূত সেই সংবাদ হর্ষবর্দ্ধনকে জানাইবার পূর্ব্বরাত্রে হর্ষবর্দ্ধন স্বপ্নে সেই বৃত্তান্তের আভাস পান, উক্ত হইয়াছে। উহাতে সেই ঘটনা কোথায় হইয়াছিল উহার সন্ধান পাওয়া যায়। ইঁহাদের পূর্ব্ব পুরুষগণের নামের সহিত সূর্য্যের নামের সম্বন্ধ আছে, যথা—প্রভাকর ও আদিত্যবর্দ্ধন। হর্ষবর্দ্ধন স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন যে, সূর্য্যের দিকে কবন্ধ রাহু অগ্রসর হইতেছে, সপ্তর্ষিমণ্ডল হইতে ধূম উদগীর্ণ হইতেছে ও সমগ্র গ্রহমণ্ডল ধূম ধূসরিত ও চতুর্দ্দিকে যেন দারুণ অগ্নি শিখা আবির্ভূত হইয়াছে। ইংরাজিতে হর্ষচরিত লেখক শ্রদ্ধেয় ডাক্তার রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় লিখিয়াছেন যে, রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যু তাঁহার মন্ত্রীর কুপরামর্শেই হইয়াছিল। হর্ষ সেই ভণ্ডীকেই ভ্রাতৃহন্তা গৌড়াধিপের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলেন ও স্বয়ং ভগ্নী রাজ্যশ্রীর উদ্ধারের জন্য গিয়াছিলেন। হর্ষচরিতে রাজ্যশ্রীর উদ্ধার ও হর্ষবর্দ্ধনের রাজ্য লাভাদির কথা আছে, কিন্তু গৌড়াধিপেরে নির্য্যাতন ও প্রতিহিংসার কোন কথা নাই। আরও আছে যে, উক্ত রাজ্যবর্দ্ধন হুনদিগকে পরাস্ত করিয়া যখন পিতার মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হইলেন, তখন তিনি জ্যেষ্ঠ বলিয়া রাজ্যলাভ অপেক্ষা সন্ন্যাস গ্রহণ করয়িা বনে গমন করিতে উদ্যত হন কিন্তু তিনি উহা কার্য্যে পরিণত করিবার পূর্ব্বেই ভগ্নীপতির হত্যাদি সংবাদে অবিলম্বে পুষ্পভূতির বংশ মর্য্যাদা ও গৌরব রক্ষা করার জন্য রাজ্যোদ্ধার করিয়াছিলেন। কনৌজই তাঁহাদের রাজধানী হইল। তৎপরে বঙ্গের সহিত কনৌজের সম্বন্ধ সূত্রপাত হইয়াছিল। গৌড়ের ইতিহাসকার রাজ্যবর্দ্ধনের হত্যা সম্বন্ধে এইরূপ লিখিয়াছেন “রাজ্যবর্দ্ধন কান্যকুব্জ অধিকার করিয়া মালবরাজকে পরাজিত করেন। রাজ্যবর্দ্ধন মালবেশ্বরকে পরাজিত করিলে কর্ণসুবর্ণরাজ শশাঙ্ক নরেন্দ্র রাজ্যবর্দ্ধনকে নিমন্ত্রণ করিয়া স্বশিবিরে আনিয়া বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ব্বক মালবরাজ দেবগুপ্তের দ্বারা নিহত করান ও শেষে কান্যকুব্জ অধিকার করিয়া রাজ্যশ্রীকে গৌড়ে আনিয়া কারারুদ্ধ করিয়া রাখেন। গুপ্ত নামক কোন ব্যক্তির সাহায্যে রাজ্যশ্রী কারামুক্ত হইয়া বিন্ধ্যারণ্যে পলায়ন করেন। রাজ্যবর্দ্ধনের ভ্রাতা হর্ষবর্দ্ধন কনৌজ অধিকার করিয়া ভ্রাতৃহত্যার পরিশোধের জন্য কর্ণসুবর্ণ আক্রমণ করেন। হর্ষবর্দ্ধন গৌড়ে কিয়ৎকাল বাস করিয়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ জয়ার্থ সৈন্য প্রেরণ করেন।” স্থানীশ্বর হইতে রাজ্যবর্দ্ধন তখন কান্যকুব্জে রাজধানী করিয়াছিলেন সেই সময় কান্যকুব্জের রাজবংশ ও রাজ্যবর্দ্ধনের স্ত্রী যথারীতি কৌলিক নিয়মানুসারে নিহত স্বামী রাজ্যবর্দ্ধনের সহমৃতা হইয়াছিলেন। তৎপূর্ব্বে সরস্বতী নদীতীরে প্রভাকরবর্দ্ধনের পত্নী পতির মৃত্যু হইবার পূর্ব্বেই সেইরূপ প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন, কন্যাও সেই ক্রিয়া সম্পন্ন করিবার সময়েই হর্ষবর্দ্ধন তাঁহাকে উদ্ধার করিয়াছিলেন, ইহা হর্ষচরিতে উল্লিখিত হইয়াছে। কবি রাজ্যবর্দ্ধনের হত্যার পরে তাঁহার স্ত্রীর সহমরণ বৃত্তান্তপূর্ব্বোক্ত স্বপ্নে সূচিত অতি সুন্দর রূপে করিয়াছেন। আরও কবি বাণভট্ট প্রভাকর বর্দ্ধন যে সূর্য্যের উপাসক ছিলেন ও তাঁহাদের পূর্ব্বপুরুষের শৈব ও দেবী উপাসক ও তাঁহাদের মূর্ত্তি ছিল বলিয়াছেন। শ্রদ্ধেয় ৺রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সপ্তগ্রাম সম্বন্ধে যে প্রবন্ধ এসিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় প্রকাশ করিয়াছেন উহাতে সেখানে সূর্য্যোপসনার যথেষ্ট প্রমাণ প্রস্তর ফলকাদি দেখিয়াছেন। পাণ্ডবেরা খাণ্ডবদাহন করিবার পূর্ব্বে ইন্দ্রের উপাসনা করিয়া যে রাজধানী করেন উহার নাম ইন্দ্রপ্রস্থ। সম্ভবতঃ স্থানুর উপাসক পুষ্পভূতি তাঁহার রাজধানী স্থানীশ্বর রাখিয়াছিলেন, আর রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধর সূর্য্যের উপাসক বলিয়া পিতার অন্ত্যেষ্টী ক্রিয়া স্থলের নাম সপ্তসপ্তি হইতে সপ্তগ্রাম দিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণের গায়িত্রী মন্ত্র ও সূর্য্যের উপাসনা। আরও সেকালের যে সকল ব্রাহ্মণেরা গায়িত্রী ভিন্ন অন্য কোন বৈদিক কর্ম্ম জানিত না, তাহাদিগকে সাতসতি বা সপ্তসপ্তি ব্রাহ্মণ বলিত। বৈদিক ক্রিয়ার সময় কনৌজ সময় কনৌজ হইতে ব্রাহ্মণানয়ন করা হইত এইরূপ প্রবাদ সকলেই বিশ্বাস করে। হিন্দু অভ্যুদয়ের সময় হইতেই রাজার উপাস্য দেবতার নাম হইতে রাজধানীর নাম হইত, যথা কলিকাতার নামোৎপত্তি সম্বন্ধেও সেইরূপ কথা রিয়াজুস সলাতিন গ্রন্থে দেখিতে পাইঃ— The City of Calcutta in past times was a Village in a talugah endowed in favour of Kali, which is the name of an idol which is there.” Riyazus Salatin P. 30.
অর্থাৎ শ্রীশ্রী ৺কালীমাতার নাম হইতেই কলিকাতার নামোৎপত্তি হইয়াছিল। আর আইনি আকবরিতে কলিকাতা সরকার সাতগাঁর অধীনে ছিল উল্লেখ আছে যথাঃ — “In 1596 A.C. it is mentioned in the Aini Akbari as a rent paying Village named Kalikata under Sarkar Satgong”. (Vol.II. P. 141.)
আদ্যাশক্তির অস্থিপঞ্জরের সহিত যেমন কলিকাতার সম্বন্ধোল্লেখ ও নামোৎপত্তি উক্ত হইয়া থাকে, সেইরূপ সপ্তগ্রামের প্রাচীন আবিষ্কৃত প্রস্তরফলক মন্দিরাদিতে বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্রদ্ধেয় ৺রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাচীন সূর্য্যোপসনা ও বিষ্ণু লক্ষ্মী সরস্বতীর মূর্ত্তি আদির পূর্ব্বোক্ত প্রবন্ধে উল্লেখ করিয়াছেন।
সর্ব্বত্রই অতীতের অন্ধকারের মধ্যে ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নির ন্যায় সত্যাবিষ্কার হইতেছে। সেইরূপ সপ্তগ্রামের সহিত প্রাচীন আর্য্য বৈশ্যজাতির পতন ও অভ্যুত্থান ও ব্যবসা বাণিজ্যের সম্বন্ধ ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায়। আর্য্য বণিকজাতিই ভারতবর্ষের সর্ব্বতোভাবে উন্নতির মূল কারণ বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তাঁহারা অতি প্রাচীন স্মরণাতীত কাল হইতে ভারতবর্ষের নির্ম্মিত অর্ণবপোতে বাণিজ্য করিতে যাইতেন ও সেই বাণিজ্যের সাহায্যেই তাঁহাদের রাজ্যশ্রী ও সাম্রাজ্য লাভ হইয়াছিল। উহাতেই ইতিহাসে রাজা হর্ষবর্দ্ধনের নাম সমুজ্জ্বল হইয়া আছে ও খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে আর্য্যাবর্ত্তে বৈশ্য সাম্রাজ্যের অভ্যূদয় হইয়াছিল। অতি প্রাচীন কাল হইতেই জৈন ও বৌদ্ধগণের মধ্যে শত্রুতা ছিল। বাঙ্গালায় জৈন প্রভাব ক্ষুণ্ণ করিবার জন্য বিখ্যাত রাজা অশোকের আজ্ঞায় তাঁহার ভ্রাতা বীতশোককে জৈনভ্রমে কোন গোপাল হত্যা করে। বহুকাল হইতে সেইরূপ হত্যায় বাঙ্গালার নাম কলঙ্কিত। আদিত্যবর্দ্ধনের পুত্র প্রভাকরই হুনগণের যম ছিলেন ও তিনি প্রতাপশিলা নামে খ্যাত হন। সেই হইতে তাঁহার বংশধরেরা শৈলবংশ বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ঐতিহাসিক মাত্রেই অবগত আছেন যে, শ্রীহর্ষের পিতা উক্ত প্রভাকর পাঞ্জাব হইতে গুজরাট পর্য্যন্ত আপনার প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন। শ্রীহর্ষচরিতে রাজ্যবর্দ্ধন হুনদিগকে পরাজিত করিয়াছিলেন ও পিতার মৃত্যুর সময় সেই নিমিত্ত উপস্থিত ছিলেন না। বাণের শ্রীহর্ষচরিত নিরপেক্ষভাবে পাঠ করিলে স্পষ্টই বোধ হয় যে, তিনি হর্ষবর্দ্ধনের প্রশংসাই করিয়াছেন তাঁহার বিরুদ্ধে কোন কথাই বলেন নাই এবং রাজ্যবর্দ্ধনের বিষয় যেন গোপনই করিয়াছেন। যুদ্ধ জয় করিয়া ক্ষত-বিক্ষত বীর রাজ্যবর্দ্ধন রাজ্যে আগমন করিয়া পিতার মৃত্যু সংবাদ পাইলেন আর কনিষ্ঠ হর্ষ তাঁহাকে রাজ্য গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিলেন বটে কিন্তু কেন যে, তিনি উহা ত্যাগ করিয়া বল্কল পরিধানের সংকল্প ব্যক্ত করিলেন উহা উল্লেখ করেন নাই। পিতা যখন মৃত্যুশয্যার তখন বীর জ্যেষ্ঠপুত্রকে রাজ্যদানাদির কথা ও তাঁহার সংবাদের জন্য উৎসুক না হইয়া কেন কনিষ্ঠকে সিংহাসনারোহণাদি আশীর্ব্বাদ দান করা হইল সে কথাও কিছু বলিলেন না। অথচ হর্ষচরিতে রাজ্যবর্দ্ধনের সেই বৈরাগ্য সংকল্প ত্যাগ কিসের নিমিত্ত হইয়াছিল সে কথা আছে। বীর রাজ্যবর্দ্ধন পিতার মৃত্যুতে যখন বিহ্বল, তখন ভগ্নীপতির মৃত্যু ও ভগ্নীর দুরবস্থায় তাঁহার সেই শ্মশান বৈরাগ্য দূর হইল, তদনন্তর তিনি তাঁহার বিজয়বাহিনী লইয়া মালবরাজের বিরুদ্ধে যাত্রা করিলেন। তিনি হর্ষকে সঙ্গে লইয়া গেলেন না, যদিও হর্ষবর্দ্ধন জ্যেষ্ঠকে সেজন্য নানানুরোধ করিয়া ছিলেন। মাতুলপুত্র ভণ্ডিই অশ্বারোহী সৈন্যের পরিচালক হইয়াছিলেন। মহত্রারাজ প্রভাকর যে মালবরাজকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া তাঁহার দুইপুত্র কুমার ও মাধব গুপ্তকে আপনার পুত্রদ্বয়ের সহচর স্বরূপ নিয়োগ করিয়াছিলেন ও কান্যকুব্জের রাজার সহিত কন্যা রাজ্যশ্রীর বিবাহ দ্বারা কুলগৌরব বর্দ্ধিত করিয়াছিলেন ইহা হর্ষচরিতকার বলিয়াছেন। বীর রাজ্যবর্দ্ধন শত্রুদমন ও রাজ্যোদ্ধার করিলেন কিন্তু কেমন করিয়া তাঁহার মৃত্যু, অন্তেষ্টিক্রিয়া বা তাঁহার সন্তানের কথা কিছুই নাই। গৌড়াধিপ প্রলোভন দেখাইয়া নিরস্ত্র অবস্থায় গৃহে বধ করেন ও ভ্রাতৃহন্তার শাস্তি দিবার জন্য প্রতিজ্ঞাদি আছে, কিন্তু পরিণাম যে কি হইল সে কথা নাই। যাঁহার পরামর্শে গৌড়াধিপের নিকট নিরস্ত্র একাকী গমন করিয়া রাজ্যবর্দ্ধন প্রাণ হারাইয়াছিল, সেই ভণ্ডীকেই গৌড়াধিপের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়া হর্ষবর্দ্ধন নিশ্চিন্ত রহিলেন। এইখানেই রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যু সম্বন্ধে বিলক্ষণ সন্দেহ করিবার কারণ হইয়াছে। রাজ্যবর্দ্ধন ও হর্ষবর্দ্ধন পিতার মৃত্যুর সময় উভয়েই বিবাহিত ছিলেন। *
প্রসিদ্ধ রায় সাহেব নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁহার বৈশ্যজাতির ইতিহাস নামক গ্রন্থে লিখিয়াছেন ঃ— “রাজ্যবর্দ্ধনের যে পুত্র ছিল সে নিতান্তই শিশু। রাজমন্ত্রিগণ রাজপুত্র কি রাজ সহোদরকে সিংহাসন প্রদান করা উচিত এই বিষয়ের মীমাংসার জন্য হর্ষবর্দ্ধনের সহাধ্যায়ী ভণ্ডির পরামর্শ প্রার্থনা করেন। তিনি অনুকূলে মত প্রকাশ করিলেও হর্ষবর্দ্ধন রাজোপাধি গ্রহণ করিতেন না। “কুমার শিলাদিত্য” নাম গ্রহণ করিয়া রাজকার্য্য করিতে লাগিলেন। পিতা প্রভাকরবর্দ্ধনের প্রতাপশিলা নাম ছিল। ৬০৬ খৃষ্টাব্দের আশ্বিন মাসে তিনি ঐ রাজ্যভার গ্রহণ করেন ও তাহার নামে সম্বৎ আরম্ভ হয়। ইহাতেই শৈলবংশ ও হর্ষসম্বৎ উৎপত্তি হইল”।
* “হর্ষবর্দ্ধনের পূর্ব্ব পুরুষেরা শৈব ও সৌর ছিলেন কিন্তু হর্ষবর্দ্ধনই বৌদ্ধ হইলেন। তাঁহারই সময় হইতে কান্যকুব্জ আর্য্যাবর্ত্তের রাজধানী হইয়াছিল। মালবরাজের কনৌজাক্রমণাধিকার ও উহার উদ্ধার রাজ্যবর্দ্ধনের গৌরব কাহিনী ভারতবর্ষের ইতিহাস একটি স্মরণীয় ঘটনা। সেই যুদ্ধে যদি রাজ্যবর্দ্ধন পরাস্ত হইতেন, তাহা হইলে হর্ষবর্দ্ধনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা বড়ই কঠিন হইত। যখন মালবরাজ অতীত গৌরব ও রাজ্য উদ্ধার করিবার নিমিত্তই প্রভাকর বর্দ্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজাধিকার ও শ্রীকণ্ঠরাজ্য আক্রমণ করিতে ধাবমান হইয়াছিলেন, তখন হুনকেশরী রাজ্যবর্দ্ধন পথিমধ্যে তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া কৃতকার্য্য হন।” যাহাই হউক, কূটনীতির বশবর্ত্তী হইয়া কোন রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের প্রাণনাশ করে। বাণভট্টের স্বপ্ন বৃত্তান্তের সহিত কৌলিক সহমরণ প্রথার কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। রাজ্যবর্দ্ধনের পুত্র ও আত্মীয়গণ হর্ষবর্দ্ধনের নিকট অবস্থান করা যুক্তিযুক্ত নয় বলিয়াই সপ্তগ্রামেই অবস্থান করিলেন। উহা বিবেচনা করিবার কারণ প্রবাদ অপেক্ষা অধিক রহিয়াছে। বর্দ্ধমান জেলার মধ্যে অট্টহাস নামে এক অতি প্রাচীন শিব মন্দির আছে। পুষ্পভূতি তাঁহার গুরু বৈভবাচার্য্যের নিকট হইতে যে শিবাস্ত্র পাইয়াছিলেন উহার নামানুসারে শিবমূর্ত্তির পূজা ইহারা থাকে। ৺রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিবেণীর গাজীর কুড়ুল সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন উহাও উল্লেখযোগ্য। সেই মসজিদের পূর্ব্বে যে ঐখানে বৈশ্যমন্দির ছিল, উহার প্রমাণ রামায়ণ মহাভারতাদির নানাঙ্কের ঘটনাবলীর চিত্রাবলি ও সূর্য্য লক্ষ্মী সরস্বতী আদি দেব দেবী মূর্ত্তির দ্বারা তিনি প্রমাণিত করেন। সপ্তগ্রাম ও ত্রিবেণী ভিন্ন স্থান নয়, তিনি একথাও স্পষ্ট বলিয়াছেন। ‘গাজীর কুড়ুল নড়ে চড়ে পড়ে না’ প্রবাদ বাক্য সেই অট্টহাসাস্ত্র যাহা পূর্ব্বে সেইখানে ছিল ও মুসলমানেরা উহা গ্রহণ করিতে পারেন নাই লোকে মনে করেন, কিন্তু সেই অট্টহাসাস্ত্র লুপ্ত হইয়াছে ও লোকে সেইখানে শিব স্থাপনা করিয়া পূজা করে। সেইজন্যই উক্ত শিবের নাম ঐরূপ হইয়াছে। শিবের সহস্রনামের মধ্যেও অট্টহাস নাম নাই। সপ্তগ্রাম চৈনিক পরিব্রাজকগণের আগমনের বহু পূর্ব্বেই প্রতিষ্ঠিত, গ্রীকাদি লেখকগণের বৃত্তান্তে প্রমাণিত হইয়াছে। হুয়েন সাঙ সেখানে যাওয়া বিপদজনক ভাবিয়াই যান নাই। তিনি হর্ষবর্দ্ধনের সমসাময়িক ছিলেন সুতরাং তিনি যেখানে রাজ্যবর্দ্ধনের হত্যা ও অন্তেষ্টিক্রিয়া হিন্দুমতানুসারে হইয়াছিল ও যে রাজবংশ হিন্দুধর্ম্ম রক্ষা করবিার জন্য সেইখানে তাহাদের গৃহ দেবদেবী লইয়া গিয়া বাস করিতেছেন সেখানে তিনি কিসের জন্য যাইবেন? শ্রীহর্ষচরিত যে রাজা হর্ষবর্দ্ধনের গুণকীর্ত্তন, ইতিহাস নহে একথা তাঁহার সভাকবি বাণভট্ট স্পষ্টই স্বীকার করিয়াছেন। তিনি রাজার আত্মীয় স্বজনের দ্বারা অনরুদ্ধ হইয়া স্বগ্রামে উক্ত পুস্তক লিখিয়াছিলেন। বাণভট্ট সরস্বতী বন্দনা করিয়া গ্রন্থারম্ভ করিয়াছেন ও রাজ্যবর্দ্ধনের মহিষী যে স্বামীর সহমৃতা হইয়াছিলেন ইহা হর্ষবর্দ্ধনের দৃষ্টস্বপ্নে প্রমাণিত হয়। মহাবীর রাজ্যবর্দ্ধনের হস্তে লাঞ্ছিত হইবার ভয়ে যে গৌড়াধিপ ক্রুর নীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া তাঁহার প্রাণবধ বিশ্বাসঘাতকতায় করিয়াছিল। রাজ্যবর্দ্ধনের শেষ ক্রিয়া কান্যকুব্জাধিপতির সন্তানাদি করিয়াছিল ও তাঁহারা সেই খানে বাস করেন। সপ্তগ্রামের নামোৎপত্তি সম্বন্ধে প্রবাদ আছে যে ** কান্যকুব্জের সাত রাজপুত্র বসবাস করায় ঐ নাম হইয়াছে। সতীর শাঁপে বা বিশ্বাসঘাতকতার পাপে রাজা শশাঙ্কের অঙ্গ কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত হয় ও সেই ব্যাধির হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিবার জন্য সূর্য্য ও প্রতিমাদির পূজা করিয়াছিলেন। গৌড়ের ইতিহাসকার সেকথা বলিয়াছেন। ত্রিবেণীর প্রাচীন মন্দিরে বৈষ্ণবাতারাদির সম্বন্ধ আছে ৺রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলিয়াছেন। বৈষ্ণব কবিগণ সপ্তগ্রামের বণিকগণের সুখ্যাতি করিয়াছেন ও তাঁহারা বহির্বাণিজ্যহীন অন্তর্বাণিজ্যেই রত বলিয়াছেন। হর্ষচরিতে রাজা হর্ষবর্দ্ধনের উপাধি ‘দেব’ ছিল ও তাহারা বৈশ্য ছিলেন ইহা পূর্ব্ব পুরুষ পুষ্পভূতির বর্ণ উপাধি দ্বারা প্রমাণিত হয়, যথা দ্বিতীয় উচ্ছ্বাস ১৩৩ পৃষ্ঠা “মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর শ্রীহর্ষদেবস্য ভ্রাতা” পুনঃ (১৮৭ পৃষ্ঠা) “পশ্যতাবৎ দেবং ইত্যভিধীয়মানশ্চ” চতুর্থ উচ্ছ্বাস (৩৩১ পৃষ্ঠা) “যশোবত্যাং দেবো রাজবর্দ্ধনঃ প্রথমেব সম্ভভুব গর্ভে”। তাঁহাদের গৃহে লক্ষ্মী ও চণ্ডীর উক্ত শ্রীশ্রী ৺সিংহবাহিনী মূর্ত্তির পূজা নিত্য হইত। উক্ত দেবীর মুকুট ও মূর্ত্তির প্রাচীনত্ব ও রাজার কুলদেবী প্রমাণ করিয়া থাকে। উহার সহিত ঐ নামের অন্য কোন মূর্ত্তির তুলনা বা সৌসাদৃশ্য নাই। ভারতবর্ষে দুই ত্রিবেণী বর্ত্তমান, গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সম্মিলন এলাহাবাদে আর বাঙ্গালায় আছে। রাজা হর্ষবর্দ্ধন এলাহাবাদে তাঁহার দান ধ্যানাদি করিতেছিলেন, আর বাঙ্গালায় ত্রিবেণীতে রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধর জ্ঞাতি কুটুম্বের সহিত হিন্দু ধর্ম্মানুযায়ী কার্য্য করিতেছিলেন। উহা কোন ইতিহাসে স্থান পায় নাই। তাঁহারা প্রভাবশালী হর্ষবর্দ্ধনের বিরুদ্ধে গমন করেন নাই। তাঁহারা উড়িষ্যা ও বাঙ্গালায় রাজত্ব করিয়াছিলেন ও সেখানে শৈলবংশীয় রাজাদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ প্রাচীন ঐতিহাসিক তারানাথ বাঙ্গালায় বৈশ্যরাজ্যের কথা বলিয়াছেন। সপ্তগ্রাম বা ত্রিবেণী বাঙ্গালাদেশের অতি প্রাচীন বন্দর, উহার উন্নতি রাজ্য বর্দ্ধনের বংশধরগণ ও আত্মীয় কুটুম্ব দ্বারা হইয়াছিল। বৈশ্যজাতির উপর ব্রাহ্মণ সমাজ কেন খড়্গহস্ত হইয়া ছিল তৎসম্বন্ধে শ্রদ্ধেয় নগেন্দ্রনাথ বসুর জাতীয় ইতিহাসে আছে যে, *** “যতদিন সম্রাট হর্ষবর্দ্ধন ব্রাহ্মণ ও শ্রমণে কোন পার্থক্য রাখেন নাই, ততদিন তাঁহার উপর ব্রাহ্মণ্য সমাজের কোন বিদ্বেষের কারণ উপস্থিত হয় নাই কিন্তু যখন প্রয়াগের ন্যায় একটি প্রধান ব্রাহ্মণ তীর্থে সকল ধর্ম্মাবলম্বীর সমক্ষে সম্রাট সর্ব্বপ্রথম বুদ্ধমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করিলেন এবং বৌদ্ধশ্রমণে ও ভিক্ষুগণকে একপ্রকার সর্ব্বস্ব দান করিয়া বৌদ্ধভক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন, তখন বিজ্ঞ ব্রাহ্মণ সমাজের ধৈর্য্যচ্যুতি হইল। বিশেষতঃ যখন হর্ষবর্দ্ধন স্বয়ং বৈদিক বিপ্রগণের সর্ব্বপ্রধান উপাস্য দেবতা ইন্দ্রের বেশ ধারণ পূর্ব্বক বুদ্ধ প্রতিমার পরিচর্য্যায় নিযুক্ত হইলেন, তখন আর তাঁহাদের ক্রোধের সীমা রহিল না।” * তাঁহার প্রধান মন্ত্রী অরুণাশ্ব ব্রাহ্মণের ষড়যন্ত্রের উত্তরসাধক হইয়া হর্ষবর্দ্ধনকে হত্যা করিয়া কান্যকুব্জের সিংহাসনাধিকার করেন ও সেই সময় হইতেই উহা বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজের কেন্দ্র হইয়া পড়ে। তখনই বৈশ্য সমাজের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ সমাজ উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। সে সম্বন্ধে উক্ত বসু মহাশয় লিখিয়াছেন য়ে, “নিবন্ধকারগণ সেই সময় হইতে বৈশ্য সমাজের বিরুদ্ধে লেখনী চালনা করিতে আরম্ভ করিলেন। এমন কি, তাঁহাদের ধর্ম্মনৈতিক সনাতন অধিকার হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করিবার জন্যই অনেকেই বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন।’ *
গুপ্তবংশের অধিকার কাল হইতেই তান্ত্রিক মহাশক্তির প্রভাবে শৈব, শাক্ত, বৌদ্ধ মন্ত্রযান উহার অত্যন্ত পক্ষপাতী হইয়া পড়েন, তখনই বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজ বিপন্ন, উহার সমুজ্জ্বল চিত্র ভবভূতির গ্রন্থে প্রকাশিত হইয়াছে। মহারাজ যশোবর্ম্মা গৌড়াক্রমণ করিয়াছিলেন। উহাতে গৌড়রাজ ধৃত ও নিহত হন। সেই গৌড়রাজের নাম ও বংশ এখন পর্য্যন্ত সবিশেষ প্রকাশ হয় নাই। ঐ ঘটনা বাকপতির গৌড়বহো কাব্যে বর্ণনা করা আছে। সেই রাজাই চীন সম্রাটের নিকট ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের গুণ কীর্ত্তন করিবার জন্য দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। সেই সময়েই অনেক সংস্কৃত ভাষায় শাস্ত্র গ্রন্থ প্রণয়ন হইয়াছিল যাহাতে আদি হিন্দুশাস্ত্রের সর্ব্বনাশ করা হয়। জাতিকে তখন জন্মগত করিবার চেষ্টা শাস্ত্রের বচন দ্বারা করিবার উপায় উদ্ভাবন করা হয়, কারণ তখন জাতিবিচার অতি সামান্য ছিল। তৎসম্বন্ধে সুপ্রসিদ্ধ বৌদ্ধাচার্য্য আর্য্যদেব যাহা বলিয়াছেন উহা উল্লেখযোগ্যঃ— “অক্ষত্রিয়েরা ক্ষত্রিয় হইতেছে। শক প্রভাবে ব্রাহ্মণের রাজশক্তি বিলুপ্ত হইয়াছিল, ক্ষত্রিয় শক্তিও সঙ্গে সঙ্গে ম্রিয়মাণ, তখন অগত্যা ব্রাহ্মণ সমাজ বৈশ্য গুপ্তবংশের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। বৈশ্য সমাজের যে কেহ রাজত্ব করিত, প্রায় তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ আপনাকে ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নত করিবার প্রয়াসী হইয়া সমৃদ্ধিশালী সকল সমাজের সহানুভূতি হারাইয়াছিল। এইরূপে দেখা যায় যে, শৈলবংশীয় রাজাগণের মধ্যে বর্দ্ধন শব্দ নামান্ত না হইয়া মধ্যে ব্যবহৃত হইত। ইহা অনুমান করা অস্বাভাবিক নয় যে, তাহাদের বংশধরের মধ্যে কেহ যে সপ্তগ্রাম ত্যাগ করিয়া অন্যত্র বাস ও রাজত্ব লাভ করিয়াছিল। হোয়ান সিং এর ভ্রমণ বৃত্তান্তেও সেইরূপ স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ৪৬৫ খৃষ্টাব্দে হুনেরা ভারতবর্ষাক্রমণ করিয়া গুপ্ত সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবনতি করে। মহারাজ প্রভাকরবর্দ্ধন বা প্রতাপশিলা সেই হুনদিগকে পরাস্ত করিয়া বৈশ্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময়েই ভারতবর্ষের বাণিজ্য হইতে রাজ্যলাভ হয় ও উহার অবনতির সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমান ও শেষে ইউরোপের বণিকগণ এদেশে বহির্বাণিজ্য স্থাপন করিবার সুবিধা লাভ করে। তখনই ব্রাহ্মণ সমাজ সমুদ্র যাত্রা নিষেধ করিয়াছিলেন। ভীত বৈশ্য সমাজ ক্রমে ক্রমে বহির্বাণিজ্য ত্যাগ করে। যাঁহারা সুবর্ণ দ্বীপ (বর্ম্মা) সিংহলাদিতে সমুদ্রযাত্রায় বাণিজ্য করিত, তাঁহারা সুবর্ণবণিক বলিয়া খ্যাত ছিল। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে গুজরাটে বণিকগণের গমন বৃত্তান্ত আছে (৮৭/৮৮ পৃষ্ঠায় ও ২১৭ পৃষ্ঠায়) শ্রীমন্তের সহিত জনার্দ্দন গুরুমশায়ের ঝগড়ায় শ্রীমন্তকে সুবর্ণবণিক বলিয়া স্থির করিতে হয়। * চীনদেশের লোকেরা বৌদ্ধ ধর্ম্মশাস্ত্রাধ্যয়ন করিতে ভারতবর্ষে আসিত ও সেই সঙ্গে স্বদেশের দ্রব্যের বিনিময়ে এদেশ হইতে তেজপত্রাদি লইয়া যাইত। বেনারসের চিনিয়াপোত সাড়ীর নাম উহাতেই হইয়াছে। মনু ভিন্ন ঊনবিংশ সংহিতার মধ্যেও সেই সব ব্যবসায়ী পতিত ইত্যাদি স্থান লাভ করিল।”
গৌড়ের ইতিহাসকার বলেন যে, বুদ্ধদেবের পিতৃব্য পাণ্ডুশক্য হইতেই পাণ্ডুয়া নামোৎপত্তি হইয়াছে। মালদহের ভূতপূর্ব্ব ম্যাজিস্ট্রেট পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদের ভিত্তিভূমি পরীক্ষা করিয়া বলিয়াছেন যে, উহার কিয়দংশ হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরের ভিত্তির উপর বৌদ্ধ স্তূপের মালমসলায় নির্ম্মিত। ত্রিবেণী ও সপ্তগ্রাম প্রাচীন ভূরিশ্রেষ্ঠী রাজ্যের অন্তর্গত ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। অনেক ধনশালী বণিক সেই রাজ্যে বাস করিত বলিয়া উহার নাম ঐরূপ হইয়াছিল। এই সম্বন্ধে গৌড়ের ইতিহাসকার বলেন যে, “বর্ত্তমান হুগলী জেলার আমতা গ্রামের নিকট পেঁড়ো বসন্তপুর হইতে হুগলী জেলায় পেঁড়ো পর্য্যন্ত ভূরিশ্রেষ্ঠী রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই রাজ্য বৌদ্ধ রাজত্বকালে স্থাপিত হয়।” পশ্চিমের ব্যবসায়ীরা এখন শ্রেষ্ঠীর স্থলে শেঠজী বলিয়া আদৃত হইয়া থাকে।
উক্ত গ্রন্থকার বলেন যে, “সপ্তগ্রাম হইতে বাণিজ্যপোত উত্তর পশ্চিম প্রদেশে ও জলিঙ্গী দিয়া পূর্ব্ব বাঙ্গালায় যাওয়ার সময় নবদ্বীপের নিকট দিয়া গমন করিত তজ্জন্য নবদ্বীপ একটি প্রধান বাণিজ্য নগর হইয়া উঠে। লক্ষ্মণসেন ঐ নগরকে বড় ভাল বাসিতেন। লক্ষ্মণসেন গৌড় নগরকে সুশোভিত করেন। গঙ্গা নদী মালদহ জেলায় বারম্বার আপনার স্থান পরবির্ত্তন করিয়াছে। সেই সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ও ব্যবসার স্থানের পরিবর্ত্তন হইয়াছে। ভূরিশ্রেষ্ঠীর অপভ্রংশ ভুরসুট এখনও বর্ত্তমান আছে।”
মধুবনের তাম্রশাসনে সম্রাট হর্ষের পিতামহ আদিত্য মহাসেনগুপ্তাকে বিবাহ করেন উল্লেখ আছে। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ সেই মহাসেনগুপ্তাকে দামোদর গুপ্তের কন্যা বলিয়াছেন। তদনুসারে মগধরাজ আদিত্যসেন মহারাজ হর্ষের সম্পর্কে ভ্রাতা হইতেছেন। সেই আদিত্যসেনই হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর অঙ্গ বঙ্গ গৌড়াদি লাভ করেন ও তিব্বতীয়গণ বঙ্গ মগধ আক্রমণ করিয়াছিল এই কথা গৌড়ের ইতিহাসে আছে। রাজতরঙ্গিণীতে ৭৬৫ খৃষ্টাব্দে কাশ্মীররাজ জয়পীড় ছদ্মবেশে পুণ্ড্রবর্দ্ধন নগরে আসিয়াছিলেন উল্লেখ আছে। উক্ত জয়াপীড় পুণ্ড্রবর্দ্ধনের দেবমন্দিরে কমলা নাম্নী নর্ত্তকীর নৃত্যকলা ও রূপমাধুরীতে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজের গৃহে লইয়া যান। সেই কমলার মুখে নগরবাসির দুঃখ এক সিংহের অত্যাচার কেহ নিবারণ করিতে পারিতেছে না জানিতে পারেন ও তিনি উহাকে সংহার করিয়া শেষে দেশের রাজার কন্যাকে বিবাহ করেন। নিহত সিংহের মুখে জয়ন্তের অজ্ঞাতে তাঁহার নামাঙ্কিত বহুমূল্য অলঙ্কার প্রাপ্ত হইয়া রাজা তাঁহাকে অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিয়া ফেলেন। রাজার কন্যা কল্যাণী ও নর্ত্তকী কমলাকে লইয়া জয়াপীড় স্বরাজ্যে গমন করেন। দৌহিত্র ভুশূর বাঙ্গালার সিংহাসন লাভ করে ও রাজা আদিত্যসেন পাণ্ডুয়ার হোমদীঘি ও ধুমদীঘির তীরে এক যজ্ঞ করিয়াছিলেন উহাতেই ঐসকল দীঘির নামে স্মৃতি বর্ত্তমান রহিয়াছে। সেই রাজা ভুশূর রাঢ়ী বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদিগেরে শ্রেণী বিভাগাদি ও তৎপুত্র রাঢ়ী ও সপ্তসতী ব্রাহ্মণগণকে যথাক্রমে যে ছাপান্ন ও আটাইশ গ্রাম দান করেন উহাতেই ব্রাহ্মণগণের গাঁই সৃষ্টি হয়। ব্রাহ্মণেরা যাজনবৃত্তি ব্যবসা স্বরূপ বাঙ্গালাদেশে আরম্ভ করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষের অন্যত্র এইরূপ নাই, কারণ দেবলেরা শাস্ত্রানুযায়ী পতিত। উহাতেই প্রাচীন মন্বাদি সংহিতাতে বিসদৃশ নূতন ব্যবস্থা সংযোজিত হইল। ঐ সকল তখন হস্তলিখিত সুতরাং উহা করিবার সুবিধাও বিলক্ষণ ছিল। এতদ্ভিন্ন অনেক নূতন নূতন সংস্কৃত গ্রন্থ সেকানে প্রণয়ণ হইয়াছিল। যথা, ৯৭/১২ শ অধ্যায় মনুঃ—
“চাতুর্ব্বণ্যং ত্রয়োলোকাশ্চত্বারশ্চাশ্রমাঃ পৃথক ভৃত্যং ভবদ্ভবিষ্যঞ্চ সর্ব্বংবেদাৎ প্রসিদ্ধ্যাতি”।
অর্থাৎ যে কিছু অতীত বর্ত্তমান বা ভবিষ্যত সকলই বেদ সিদ্ধ, ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র চারিবর্ণ ও স্বর্গাদি লোকত্রয় ব্রহ্মচর্য্যাদি চতুষ্টয় ইহারা সমস্তই প্রসিদ্ধ পিতৃমাতৃ জাতত্ব ও উহার উপযোগি জানিবে। আবার ৪১৭/৮ম অধ্যায় মনুঃ—
“বিস্রব্ধং ব্রাহ্মণঃ শূদ্রাদ্দ্রব্যোপাদানমাচরেৎ নহিতস্যাস্তি কিঞ্চিৎ স্বং ভর্তৃহার্য্যধনোহি সঃ”।
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ দাস শূদ্র হইতে বলপ্রয়োগেও ধনগ্রহণ করিতে পারে, কারণ তাহার যাবদীয় ধন সমস্তই ভর্ত্তৃগ্রাহ্য হইতেছে। আবার ৪১৩/৮ ম অধ্যায় মনুঃ—
“শূদ্রণ্ডু কারয়েদ্দাস্যং ক্রীতমক্রীমত্তমেব বা দাস্যায়ৈব হি সৃষ্টোহসৌ ব্রাহ্মণস্য স্বরম্ভুবা”।
অর্থাৎ বিধাতা দাস্য কর্ম্মের জন্যই শূদ্রের সৃষ্টি করিয়াছেন সুতরাং সেই শূদ্র ভক্তাচ্ছাদনাদি দ্বারা প্রতিপালিত হউক বা না হউক, উহাকে ব্রাহ্মণ দাস্য কার্য্য করাইতে পারিবেন। আবার ৩৯০/৮ম অধ্যায় মনুঃ—
“আশ্রমেষু দ্বিজাতিনাং কার্য্যে বিবদতাং মিথঃ ন বিব্রূয়ান্নৃপোধর্ম্মং চিকীষণ্ হিতমাত্মনঃ”।
অর্থাৎ ধর্ম্মেচ্ছু রাজা দ্বিজাতিগণের গার্হস্থ্যাদি আশ্রম ঘটিত কোন বিবাদ মীমাংসা করিবেন না। আবার সেই অধ্যায়েই ইহার বিরুদ্ধ শ্লোক সন্নিবেশিত রহিয়াছে যথাঃ—৩৪৬/৮ম অধ্যায় মনুঃ—
“রক্ষন ধর্ম্মেণ ভূতানি রাজা বধ্যাংশ্চ ঘাতয়ন যজতেহহর হর্ষজ্ঞৈঃ সহস্রশত দক্ষিণৈঃ”।
অর্থাৎ রাজা প্রজাগণের ধর্ম্মানুযায়ী রক্ষা ও বধ করিলে প্রত্যহ লক্ষ গো দক্ষিণাও যাগযজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হন। আরও মনু যে সময়ের ধর্ম্মশাস্ত্রকর্ত্তা তখন অন্য দেশের বলবান যোদ্ধৃগণকে অগ্রে রাখিয়া যুদ্ধ করিবার ব্যবস্থা ও কারুক শিল্পিক শূদ্রাদিকে প্রতি মাসে একদিন রাজা কর্ম্ম করাইয়া লওয়া ধর্ম্ম হইতে পারে না। ৭ম অধ্যায় মনু ১৯৩ শ্লোক।
“কুরুক্ষেত্রাঃশ্চ মৎস্যাংশ্চ পঞ্চালাণ্ শূরসেনজাণ্ দীর্ঘাণ্ লঘুংশ্চৈবনরানগ্রাণীকেষু যোধয়েৎ”
“কারুকাণ্ শিল্পিনশ্চৈব শূদ্রাংশ্চাত্মোপজীবিনঃ একৈকং কারয়েৎ কর্ম্ম মাসি মাসি মহীপতিঃ”।
১৩৮/৭ম অধ্যায় মনু।
চাণক্যের শ্লোকেই আছে যে, কোন কর্ম্মের অগ্রে গমন করা উচিত নয়, কারণ বিপদকালে অগ্রগামী প্রথমে নষ্ট হয়। এইরূপ কূট নীতির কথা যখন মনুর স্মৃতির শ্লোকে দেখিতে পাই, তখনই উহা যে প্রক্ষিপ্ত একথা বলিতে কেহ কুণ্ঠিত হইতে পারে না। মনুর ৭ম অধ্যায়ের ২১৩ শ্লোক চাণক্যের শ্লোকের মধ্যবর্ত্তী। যথাঃ— “আপদর্থং ধনং রক্ষেদ্দারাণ্ রক্ষেদ্ধনৈরপি আত্মানং সততং রক্ষেদ্দারৈরপি ধনৈরপি।” অর্থাৎ আত্মরক্ষা করাই ধর্ম্ম, স্ত্রী অর্থ সমস্তই তজ্জন্য ত্যাগ করা যাইতে পারে। যদি ইহা সত্যযুগের ধর্ম্ম হইত, তবে শিবি রাজার বা হরিশ্চন্দ্রের উদাহরণ মিথ্যা হয়। স্বার্থত্যাগ ও আত্মবিসর্জ্জনই আর্য্য হিন্দুর সত্যযুগের ধর্ম্ম, দধীচি মুনি উহার উদাহরণ। গুপ্ত ও মৌর্য্য সাম্রাজ্যের প্রভাবে যখন লোকে অর্থশাস্ত্রোক্ত কূটনীতির পক্ষপাতী হইয়াছিল, তখন তাহাদের রুচি পরিতৃপ্তি শাস্ত্রের উদরে নানা পূর্ব্বোক্ত আবর্জ্জনায় স্থানলাভ করিয়াছে। সেকালের রাজারা, বা তাঁহাদের পরামর্শদাতা ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীগণ নীতি ও ধর্ম্মশাস্ত্রবেত্তা ছিলেন না। তাঁহারা উহার প্রতিকারের চেষ্টা না করায় দেশের চারিদিকে বিশৃঙ্খল ও হিন্দু প্রভাব ধর্ম্মাভাবে নষ্ট হয়।
বৈশ্য রাজত্বের শেষে ব্যবসার ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী। প্রাচীর সংস্কৃত নাটকাদিতে হিন্দু বণিকগণের সমুদ্রযাত্রার উল্লেখ আছে ও তৎসম্বন্ধে প্রামাণ্য পুস্তকাদিও মুদ্রিত হইয়াছে। পৃথিবীর সর্ব্বত্রই ভারতবাসিরা ব্যবসা উপলক্ষে যাইত। মহাভারত রামায়ণে ভারতবর্ষের নানাস্থানের বিখ্যাত দ্রব্যের উপহার আদির কথা উল্লেখ আছে। বাণ্যিজ্যের অভাবে দেশের কৃষিকার্য্যের বিলক্ষণ ক্ষতি হইয়াছে। বহুদিন পূর্ব্বে মহাবীর আলেকজাণ্ডার ভারত জয় করিতে আসিয়াছিলেন। তিনি বাঙ্গালার বল বীর্য্য ঐশ্বর্য্য দেখিয়া সেদিকে অগ্রসর হন নাই। সপ্তম শতাব্দিতে পারসিক ও আরবিক বণিকগণ বহির্বাণিজ্যের একচেটিয়া ব্যবসা আরম্ভ করে ও সেই ব্যবসায় উন্নত হইয়া ইসলাম রাজ্য এককালে ইউরোপ বিধ্বস্ত করিতে গিয়াছিল। অষ্টম শতাব্দিতে আরবগণ করাচি দখল করে। যতদিন ইউরোপের বণিকগণ এদেশে বাণিজ্য ও ব্যবসায় হস্তক্ষেপ করিতে পারে নাই, ততদিন তাহারা দেশের উপর কোন কর্ত্তৃত্ব করিতে পারে নাই। ব্যবসাই লক্ষ্মীর বাহন বলিলে চলে। ক্লাইবের সৌভাগ্যোদয় আরকটের দুর্গ জয়ে ও কলিকাতা উদ্ধারে হইয়াছিল। উহাও তাঁহারা ব্যবসা রক্ষা করিবার জন্য ভিন্ন অন্য কিছুর জন্য করেন নাই। বাঙ্গালায় কাহার পর কে রাজা হইয়াছিল, উহার ধারাবাহিক ইতিহাস নাই। যাহা হইয়াছে উহা অনুমান সিদ্ধ, কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রতিপন্ন করিয়া হয় নাই। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ ভিন্সেন্ট স্মিথ ও সার অরেল স্টাইন জয়াপীড়ের পৌন্ড্রবর্দ্ধনাধিপতি কন্যা কল্যাণীর সহিত বিবাহ ও নর্ত্তকী কমলার সহিত কাশ্মীর যাত্রা বিবরণ বিশ্বাস করেন না। কোন সমসাময়িক লিপিতে বা গ্রন্থে কহ্লন মিশ্র বর্ণিত জয়াপীড় কাহিনী ৺রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও গৌড়রাজমালা লেখক গ্রহণ করেন নাই কিন্তু প্রসিদ্ধ নগেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ কতিপয় প্রত্নতত্ত্ববিদগণ আদিশূর ও জয়ন্তকে একব্যক্তি প্রমাণ করিতে গিয়াছেন। উক্ত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার বাঙ্গালার ইতিহাসে লিখিয়াছেন যে, খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীর পূের্ব্ব গৌড়ে, মগধে বা বঙ্গে শূরবংশীয় রাজগণের অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোনই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। ইঁহারা কেবল পাশ্চাত্য শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কথাই প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকার করেন। ইহা প্রকৃতপ্রস্তাবে বিবেক ও নীতিবিরুদ্ধ বলিতে হয়, কারণ যে পর্য্যন্ত না রাজতরঙ্গিণী ও কহ্লনের উক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রয়োগাদি দ্বারা ভিন্সেন্টস্মিথ ও সার অরেল ষ্টাইন তাঁহাদের মতের পোষকতা করিতে পারেন সে পর্য্যন্ত ঐতিহাসিক বিবরণ যাহা তাঁহাদের বহুপূর্ব্বে লিখিত হইয়াছে উহা অযথা অগ্রাহ্য করা যায় না। উক্ত বাঙ্গালার ইতিহাসকার বলেন যে, “মধ্যপ্রদেশে রঘোল গ্রামে আবিষ্কৃত শৈল বংশোদ্ভব দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধন নামক নরপতির তাম্রশাসন হইতে অবগত হওয়া যায় যে, ২য় জয়বর্দ্ধনের পিতামহের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পৌণ্ড্রদেশের নরপতিকে নিহত করিয়া সমস্ত পৌণ্ড্রদেশ অধিকার করিয়াছিলেন। এই তাম্রশাসনের অক্ষর দেখিয়া অনুমান হয় যে, ইহা খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শেষ পাদে উৎকীর্ণ হইয়াছিল।” ** “নেপালে পশুপতিনাথ মন্দিরের পশ্চিম তোরণের পার্শ্বে সংলগ্ন জয়দেবের খোদিত লিপি হইতে অবগত হওয়া যায় যে, ১৫৩ শ্রীহর্ষাব্দে ৭৫৯ খৃষ্টাব্দে এই খোদিত লিপি উৎকীর্ণ হইয়াছিল। এই খোদিত লিপি জয়দেবের বংশ পরিচয় ও তাঁহার শ্বশুর বংশের বিবরণ জানিতে পারা যায়। জয়দেবের খোদিত লিপিতে হর্ষদেব গৌড়, ওড্র, কলিঙ্গ ও কোশলপতি উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিল অতএব ৭৫৯ * খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বে গৌড়দেশ হর্ষদেব কর্ত্তৃক অধিকৃত হইয়াছিল। হর্ষদেব কামরূপরাজ বলিয়া খোদিত লিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত নাই, তবে তাঁহার কন্যা রাজ্যমতীর “ভগদত্ত রাজকুলজা” উপাধি দেখিয়া বোধ হয় যে, হর্ষদেব কামরূপাধিপতি ছিলেন। গৌড়দেশ হর্ষদেব কর্ত্তৃক জিত হইয়াছিল, অথবা তাঁহার পূর্ব্বেই জিত হইয়াছিল তাহার নির্ণয় করিবার কোন উপায় নাই।” ইহাও সমর্থন করা যায় না, কারণ বাণের শ্রীহর্ষচরিতে কামরূপের রাজার সহিত হর্ষের সম্বন্ধ স্পষ্টই আছ। শ্রদ্ধেয় * ডাক্তার রাধাকুমুদের হর্ষচরিত গ্রন্থে আসামের রাজা কুমার হর্ষের দাসত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন ও উভয়ে পরস্পর ইন্দ্র ও ব্রহ্মারূপে বুদ্ধের উপাসনা করিয়াছিলেন। আর যদিই গৌড় জয় আসামাধিপতি করিতেন, তাহা হইলে কান্যকুব্জরাজ যশোবর্ম্মার সভা কবি বাকপতিরাজ বিরচিত ‘গউডবহো’ নামক গ্রন্থে সেকথা কেন উল্লেখ করেন নাই। সেই কথা প্রসঙ্গে তিনি তাঁহার গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, “যশোবর্ম্মা যে, মগধেশ্বর ও বঙ্গেশ্বরকে পরাজিত করিয়াছিলেন “গউডবহো” কাব্যে তাঁহাদিগের নাম পাওয়া যায় না। যশোবর্ম্মাদেব কর্ত্তৃক পরাজিত মগধনাথ ও গুপ্তবংশীয় রাজা ২য় জীবিতগুপ্ত একই ব্যক্তি।” এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না, কারণ গৌড় রাজমালা পৃ ১৫ নজীর দেখাইয়া তাঁহার নিজের কথা বলিয়াছেন “এই সময়ে বঙ্গদেশে কোন রাজার অধিকারভুক্ত * ছিল তাহা অদ্যাপি নির্ণীত হয় নাই।” নেপালের পূর্ব্বোক্ত খোদিত লিপিতে যে হর্ষদেবকে গৌড়, ওড্র ও কোশলপতি উপাধিতে ভূষিত করা হইয়াছে, ইহাতে তিনি যে রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধর ২য় হর্ষদেব সে বিষয়ে সন্দেহ হইতে পারে না। কারণ সেকালের ও একালের প্রাচীন রাজবংশের মধ্যে একই রাজার নাম উক্ত হইতে থাকে। সেই প্রথা সেই সময় হইতে চলিয়া আসিতেছে। গুপ্তবংশ আছে ও জয়পুরের রাজাদের মধ্যে মানসিংহ রামসিংহ এখনও হইয়া থাকে। শৈলবংশ ওড্র, কলিঙ্গ ও কোশলে আছে। বাঙ্গালায় সপ্তগ্রামে যাহারা শৌর্য্য বীর্য্যাপেক্ষা ধর্ম্মাযাজন করা মঙ্গলকর মনে করিয়াছিল তাহারা সেইখানে কুল দেবদেবীর পরিচর্য্যা ও ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। চণ্ডীর উপাস্য দেবী শ্রীশ্রী ৺সিংহবাহিনী যিনি সকল দেবতার শক্তি সমূহে সমুত্থিত তাঁহারই কৃপায় সেকালের বাঙ্গালার সীমায় যে নদী প্রবাহিত হইয়াছিল উহাতে সুবর্ণ রেণু প্রবাহিত হইত ও সেই সুবর্ণ লইয়া বাণিজ্য করিয়া সেই নদীর ও বণিকগণের নাম যথাক্রমে সুবর্ণরেখা ও সুবর্ণবণিক হইয়াছিল। সেই সুবর্ণ বণিকগণের মধ্যেই “আঢ্য” বৈশ্যোপাদি বর্ত্তমান ও শ্রীহর্ষচরিতের প্রথম উচ্ছ্বাসে প্রশন্তি বন্দনায় আঢ্যরাজ বলিয়া আছে। এই ‘আঢ্য উপাধি বৈশ্যবর্ণের সুবর্ণবণিকগণের আছে, একথা মনুর অনুবাদক ভরতচন্দ্র শিরোমণি ও মথুরানাথ তর্করত্ন স্বীকার করিয়াছেন। সনক আঢ্যের পুত্র বল্লভানন্দের সহিত বল্লালসেনের বিরোধের কথা বল্লাল চরিতে আছে। শর্ম্মা, বর্ম্মা, ভূতি দাসাদি মঙ্গল বল সম্পত্তি ও সেবক সূচক উপপদযুক্ত ব্রাহ্মণাদির উপাধি হইয়া থাকে, মনু বলিয়াছেন।
প্রাচীন বাঙ্গালার ইতিহাসের কথায় যাহা কিছু বলিবার বাকি আছে উহা সংক্ষেপে শেষ করা উচিত বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাঁহার বাঙ্গালার ইতিহাসে হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যু ৬৪৭ খ্রীষ্টাব্দে হইয়াছিল বলেন। আরও বলেন যে, সেই সময়ে “মাধবগুপ্ত অথবা আদিত্যসেন স্বাধীনতা লাভ করিয়াছিলেন। অফসড় গ্রামে আদিত্য সেনের একখানি খোদিত লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছিল। উহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, আদিত্যসেন একটি বিষ্ণুমন্দির নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার পত্নী কোণদেবী একটি পুষ্করিণী খনন করাইয়াছিলেন। এই খোদিত লিপি গৌড়বাসী সূক্ষ্মশিব কর্ত্তৃক রচিত বা উৎকীর্ণ হইয়াছিল। হর্ষবর্দ্ধন কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত অব্দে ৬৬ সম্বৎসরে ৬৭১/২ খৃষ্টাব্দে সালপক্ষ নামক জনৈক সেনাপতি কর্ত্তৃক একটি সূর্য্যমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।” সেই সময়ের সূর্য্যোপসনা ও সেই সকল মূর্ত্তি সপ্তগ্রামে আবিষ্কৃত হওয়ায় উহা যে সেই সময়ের কথা বলিয়া বোধ হয়। কাশ্মীরের সহিত বাঙ্গালার সম্বন্ধও সেই সময়েই দৃষ্ট হয়। কাশ্মীরের রাজারাও তখন বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন। গৌড়লেখমালা লেখক বলেন যে, “পৌণ্ড্রদেশ” যখন “শৈলবংশীয়” আক্রমণকারীর পদানত তখন যশোবর্ম্মা নামক একজন উচ্চাভিলাষী নরপাল কান্যকুব্জের সিংহাসন লাভ করিয়া হর্ষবর্দ্ধনের রাজধানীর পূর্ব্বে গৌরব পুনর্জ্জীবিত করিতে যত্নবান হইয়াছিলেন।” “গৌড় বঙ্গ বিজয়ের অনতিকাল পরেই (৭৩৬ খৃষ্টাব্দের পরে) কাশ্মীরের অধিপতি ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় আসিয়া তাঁহাকে কান্যকুব্জের সিংহাসন হইতে অপসারিত করিয়াছিলেন।”
“বিন্ধ্য প্রদেশের অধীশ্বর ২য় জয়বর্দ্ধনের (রাঘোলিতে) প্রাপ্ত তাম্রশাসন হইতে জানা যায়,—“শৈলবংশতিলক” শ্রীর্দ্ধন নামক নরপতির সৌবর্দ্ধন নামক পুত্র ছিল। এই সৌবর্দ্ধনের আবার তিন পুত্র ছিল। ইঁহাদের মধ্যে শৌর্য্যান্বিত একজন পরাক্রান্ত শত্রু বিদারণ পটু পৌণ্ড্রাধিপতিকে নিহত করিয়া সমস্ত পৌণ্ড্রদেশ অধিকার করিয়াছিলেন। এই পৌণ্ড্র বিজেতার কনিষ্ঠ সহোদরের প্রপৌত্র ২য় জয়বর্দ্ধন রঘোলিতে প্রাপ্ত শাসনের সম্পাদন কর্ত্তা।” অন্যান্য তাম্রশাসন হইতে জানা যায় — ৭ম শতাব্দে উড়িষ্যা ও কলিঙ্গ “শৈলোদ্ভব” বংশীয় রাজগণের করতলগত ছিল। অজ্ঞাতনামা “শৈলবংশীয়” পৌণ্ড্রজিৎ “শৈলোদ্ভব” বংশের শাখান্তর হইতে সমুদ্ভুত বলিয়া অনুমান হয় * (১৪/১৫ পৃষ্ঠা) উক্ত গ্রন্থকারও বলেন যে, “৬৪৮ খৃষ্টাব্দে হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর ৭ম শতাব্দীর শেষাঙ্কের বাঙ্গালার ইতিহাস ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন। মগধের আদিত্যসেন ৬৭১ খৃষ্টাব্দে “মহারাজ” উপাধি গ্রহণ করিয়া, অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। বাঙ্গালায় তাঁহার আধিপত্য বিস্তার লাভ করিয়াছিল কিনা, বলা সুকঠিন।” আদালতের সাক্ষ্য গ্রহণের রীত্যানুসারে গৌড়ের ইতিহাসকারের মতেরই পক্ষপাতী হইতে হয়। কারণ তাহার কথা পাণ্ডুয়ার হোম ও ধুমদিঘি দ্বয়ের পোষকতা করিতেছে। পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক ভিন্সেণ্টস্মিথ যাহা অনুমান করিয়াছেন উহাই রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় শিরোধার্য্য করিয়া গোপালদেবকে গৌড়াধিপতি স্বীকার করিয়াছেন। বৌদ্ধধর্ম্মের ইতিহাসকার তারানাথের আরব্যোপন্যাসের কথা স্বরূপ গোপালদেবের রাজ্য লাভ ও কাহিনী উক্ত বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বিশ্বাস করেন নাই, অথচ তিনি তাঁহাকে ৭৯০ হইতে ৭৯৫ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত সিংহাসনে ছিলেন, বলেন। ভিন্সেণ্টস্মিথ তারানাথের মতের পোষকতা করিয়া গোপালদেবের রাজত্বকাল ৭৩০ বা ৭৪০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে ৮০০ খৃষ্টাব্দ স্থির করিয়াছিলেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রভামিত্র বাঙ্গালী ছিলেন। যাঁহারা বাঙ্গালীকে ভীরু বলিয়া ঘৃণা করেন তাঁহারা জানেন না যে, বাঙ্গালীরা কাশ্মীরে গমন করিয়া তাহাদের রাজার নিধনের প্রতিশোধ দেবমন্দির ভগ্ন করিয়া বীরত্ব দেখাইয়াছিল। যাহাই হউক, এই সকল পণ্ডিতগণের মতামতের মধ্যে একটী মূল সত্য কথা বর্ত্তমান আছে যে, বাঙ্গালার সহিত ভারতবর্ষের নানাস্থানের রাজাগণের সম্বন্ধ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। বাঙ্গালায় অরাজকতায় ব্যবসা ও বাণিজ্য নষ্ট হইয়াছিল ও উহাতেই বাঙ্গালার উন্নতির পথ রুদ্ধ হইয়াছিল। সোনার বাঙলার পার্শ্ববর্ত্তী ও দূরবর্ত্তী রাজন্যগণের দৌরাত্ম্যে বিলক্ষণ অনিষ্ট হইয়াছিল। উহার জন্য সেকালের বণিকগণ সম্পূর্ণ দোষী নয়। তখন অন্তর্বাণিজ্য বহুমূল্য সোনারৌপ্যাদি কাঁসা শঙ্খ গন্ধ দ্রব্যাদি ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা দ্বারা যাহারা আপনাদের দুঃখ দারিদ্র দূর করিয়াছিল তাহারাই সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, আদির নাম ব্যবসানুযায়ী লাভ করে। সাধারণতঃ লোকে ইহাই বিশ্বাস করে কিন্তু উহারা সকলেই যে বৈশ্য ছিলেন সে সম্বন্ধে বিলক্ষণ মতভেদ আছে বলিলেই যথেষ্ট হইবে। গৌড়ের ইতিহাসকার বলেন যে, “মুসলমান অধিকারের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত ভারতের পূর্ব্বাংশের সমস্ত বাণিজ্য বাঙ্গালীর হস্তে ছিল। বাঙ্গালী আপনাদের নির্ম্মিত অর্ণবপোতে সুবর্ণদ্বীপে অর্থাৎ বহ্মদেশে বাণিজ্য করিতে যাইত। তাহারাই সুবর্ণবণিক বলিয়া বিখ্যাত, আর যাহারা গন্ধাদি সুমাত্রা যাভা দ্বীপ হইতে লইয়া আসিত তাহারা গন্ধবণিক বলিয়া প্রসিদ্ধ। গন্ধাদি দ্রব্য ব্যবসা করা সংহিতকারগন পাতিত্যের কারণ, সেইজন্য বোধ হয় গৌরবান্বিত বৈশ্যগণ উহা করিত না। সুদূর তিববত ও মাঙ্গোলিয়া বাঙ্গালীদের নামের পূর্ব্বে যেমন “শ্রীযুক্ত” ব্যবহৃত হইয়া থাকে উহারাও ঐরূপ করে। উক্ত গ্রন্থকার বলেন যে, বাঙ্গালার শ্রেষ্ঠ জাতিদিগের আদি পুরুষগণ কেহই বাঙ্গালার আদিম অধিবাসী নহেন। তাঁহারা মিথিলা, কান্যকুব্জ, অযোধ্যা, বারাণসী, মগধ, মহারাষ্ট্র, দ্রাবিড় মধ্যভারত প্রভৃতি হইতে বঙ্গদেশে উপবিষ্ট হইয়াছেন। সদগোপ, তিলি, তাম্বুলী, তন্তুবায়, গন্ধবণিক প্রভৃতি জাতির কুলগ্রন্থের উপক্রমে শূন্য মূর্ত্তি, সদ্ধর্ম্ম নিরঞ্জনের স্তব থাকায় বোধ হয়, উহারা বৌদ্ধ হইয়াছিল।” চীন পরিব্রাজক যেখানে বৌদ্ধ প্রভাব ছিল সেইখানেই গিয়াছিলেন, সপ্তগ্রামে ইহা ছিল না বলিয়া সেইখানে যান নাই ও উহার বিবরণ তাঁহাদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে নাই। সেইরূপ তাম্রলিপ্তে ছিল বলিয়া সেখানে গিয়াছিলেন। সেকালের বাণিজ্যদ্রব্যের তালিকা উক্ত গ্রন্থকার এইরূপ দিয়াছেনঃ— “ঘোড়া, পট্টবস্ত্র, স্বর্ণ-রৌপ্যের অলঙ্কার, হীরা, মুক্তা, চন্দন, কর্পূর, নানাবিধ মাল মসলা, তেজপত্র, ভোটকম্বল, মেঘডম্বর শাড়ী, রাম লক্ষ্মণ শাঁকা ইহাদের প্রধান বাণিজ্যদ্রব্য ছিল।”
“সেনরাজগণের সময় তাম্রলিপ্তের বাণিজ্যখ্যাতি লুপ্ত হইয়াছিল। তৎপরিবর্ত্তে সপ্তগ্রাম বাণিজ্য প্রধান স্থান হইয়া উঠে। সপ্তগ্রামের সুবর্ণবণিক সম্প্রদায় প্রয়োজনের সময়ে দেশের হিতকল্পে অর্থ দিয়া সাহায্য না করায় বল্লালসেন লক্ষ্মণসেন উভয়েই তাঁহাদের প্রতি অপ্রসন্ন ছিলেন। বাণিজ্যের জন্য সাতাগাঁ অতি প্রধান স্থান হইয়াছিল। প্রাচীন বাঙ্গালা গ্রন্থে উহাকে মহাস্থান বলা হইয়াছে।”
* “সেকালে কোন সদাগর বা বড়লোক রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে যাইলে পাটের দোলায় চড়িয়া যাইতেন। সঙ্গে বাদ্যকরগণ বাজাইতে বাজাইতে ও পাইকেরা চীৎকার করিতে করিতে যাইত। রাজাগণ সদাগরগণকে বাণিজ্যার্থ অর্থ সাহায্য করিতেন। বণিকেরা অবশ্য রাজার অর্থ সন্তোষজনকরূপে পরিশোধ করিতেন। তখন স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ছিল তবে সাধারণ ক্রয় বিক্রয়ে কড়ি ব্যবহৃত হইত।”
“খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমে এদেশে হিন্দুদিগের মধ্যে নানাজাতির উদ্ভব হইয়াছিল। ব্রহ্মবৈর্ত্তপুরাণ বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ, পরশুরাম সংহিতা, পরাশর পদ্ধতি প্রভৃতি সংস্কৃত গ্রন্থ প্রায় এই সময়ে রচিত হইয়াছিল। বিবিধ জাতির উৎপত্তি এই সকল গ্রন্থ সম্বন্ধে যাহা যাহা বলা হইয়াছে তাহা কল্পনামূলক মাত্র।” “চণ্ডীপূজার মধ্যে শুভাচণ্ডীর পূজা, মঙ্গলচণ্ডীর পূজা অগ্রে স্ত্রীজাতির মধ্যে প্রচারিত হইয়াছিল। এই শুভচণ্ডী এখন বঙ্গদেশে সুবচনী নামে পূজা পাইতেছেন। * “পুণ্ড্রবর্দ্ধনে কার্ত্তিকের দেবের মন্দির ছিল। তাঁহার শক্তি ষষ্ঠী এদেশে পূজিত হইতেন।” “বল্লালসেনের সময়ে এদেশের একটা সামাজিক যুগান্তর উপস্থিত হয়। তখন শৈব, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব ও তান্ত্রিক মত লইয়া দেশ তোলপাড় হইতেছিল। শক্তি সাধন তন্ত্র পাঠে বোধ হয় যে এই সকল মতের সামঞ্জস্য সম্পাদনের জন্য তন্ত্রমতের সৃষ্টি হয়। বাঙ্গালার যে সকল জাতি জাতি মর্য্যাদাহানী হইয়াছে তাহারা বলে, বল্লালসেনের দৌরাত্মে তাহাদের জাতি ছোট হইয়া গিয়াছে।” গোবর্দ্ধন মিশ্রের কুলজী গ্রন্থে আছে ধনপতি গৌড় হইতে সুবর্ণবণিকদের পাঁচজনকে উজানী নগরে সঙ্গে করিয়া আনয়ন করেন। এই পাঁচজন অযোধ্যা হইতে ব্যবসায়ের জন্য গৌড়ে আসিয়াছিলেন। ইহা সনকাদি আঢ্যের কথাই উল্লিখিত হইতেছে। পূর্ব্বেই কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে ধনপতি যে সুবর্ণবণিক ছিলেন, উহা গুরু মহাশয়ের গালি ও শিষ্যের প্রত্যুত্তরে পরিষ্কার আছে। সুবর্ণবণিকেরা বল্লালের কৌলিন্যাদি স্বীকার করে নাই। তজ্জন্য বল্লালচরিতে উহাদিগকে দাম্ভিক বলা হইয়াছে।
সামাজিক দণ্ডঃ— যাহাই হউক রাজা বল্লাল রাজনীতি অবলম্বন করিয়া দণ্ডাদির দ্বারা রাজ্য রক্ষা করা অপেক্ষা সামাজিক দণ্ড বলবান প্রমাণিত হয়। ব্রাহ্মণাদি উচ্চ বর্ণ সমূহের মধ্যে জাতি গৌরব জাগ্রত করিয়া তিনি কৌলিণ্যাদির সৃষ্টি করিলেন যাহাতে তাহারা উহারই জন্য বিব্রত হইয়া ও রাজার বাধ্য থাকিবে। রাজত্বের মধ্যে শিক্ষিত সমাজে উহা লইয়া দ্বন্দ্ব হইলে তাহারা রাজার বিরুদ্ধে একত্রিত হইয়া ষড়যন্ত্রাদি করিবার সুযোগাদি পাইবে না। তিনি হিন্দুধর্ম্মের অভ্যুত্থানের জন্য যে কৌলিন্যাদি করিয়াছিলেন, ইহা অনুমান হয় না। বাঙ্গালায় অসচ্চরিত্র বল্লালের সময় হইতেই রাজা জমিদারেরা সমাজ কর্ত্তা সাজিয়া দেশের ব্যবসাদির ও রাজত্বের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। বৌদ্ধযুগের পর জাতি লইয়া হিন্দুর গোড়ামি ও দণ্ডবিধি শাস্ত্রের অঙ্কে সেই সকল সমাজপতিগণের ইঙ্গিতে স্থান পাইয়াছিল। মন্বাদি অষ্টাদশ পুরাণাদি নানা প্রক্ষিপ্ত রচনা দেখিতে পাওয়া যায়। বল্লালের সময় কৈবর্ত্তাদি জলাচরণীয় হয় ও শুদ্ধ বৈশ্যাদির সমাজিক দণ্ড হয়। বল্লভানন্দের ঋণদান ও যুদ্ধের বিনা রাজত্ব বদ্ধকে উহা দান করিতে না চাওয়ায় ঐ সমাজিক দণ্ডের মূল কারণ। শেষে উহাতেই নীচ ব্রাহ্মণ ঘটকেরা জাতির সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়া পড়ে। মুসলমানগণও ঐ নীতির পক্ষপাতী হইয়া পড়েন। জাতিমালা কাছারি দেবীবর ঘটকের আবির্ভাবের পূর্ব্বে ছিল। দত্তখান নামক একব্যক্তি মুসলমানরাজ্যের মন্ত্রী সেই কাছারির অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনিই রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের ৫৭তম সমীকরণ করিয়াছিলেন। নুলো পঞ্চানন তাঁহার গোষ্ঠীকথায় প্রসিদ্ধ ঘটক দেবীবরের মেলবন্ধনের তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন। তিনি চৈতন্যের ধর্ম্ম, রঘুনন্দনের স্মৃতি বা রঘুনাথের তর্কমহিমা কাহারও প্রশংসা করেন নাই, বরং উহাতে যে প্রাচীন আর্য্য ধর্ম্ম ও শাস্ত্রের অবমাননা হইয়াছে উহা বলিয়াছেন। উহাতেই বাঙ্গালার অনেক প্রাচীন জাতি বংশের মর্য্যাদা শেষ হইয়াছিল।
“এইকালে রাঢ়ে বঙ্গে পড়ে গেল ধুম, বড় বড় ঘর যত হইল নির্ধুম।”
উহাতেই রাজসাহী উদায়নাচার্য্য করণ প্রথা, পুরন্দর খাঁ সমান পর্য্যায়ে বিবাহ ও পরমানন্দ রায় অন্য কতকগুলি নিয়ম সৃষ্টি করেন। ক্রমে ক্রমে এক জাতির মধ্যে নানা বিভাগ ও গণ্ডগোল উপস্থিত হইল। ইহাতে লোকের ব্যবসা ও ধর্ম্মের প্রতি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল, লোকে মর্য্যাদা লইয়া বিব্রত হইল কিন্তু যাঁহারা আভিজাত্য গৌরবে রাজা অপেক্ষা কোন প্রকারে হীন নন, বরং তাঁহার দুবর্ব্যবহারে ক্ষুণ্ণ ও লজ্জিত, যাঁহারা প্রসিদ্ধ বৈশ্য রাজার কুটুম্ব তাঁহারা কি সুযোগ পাইলে পুনরায় রাজ্য ও রাজত্ব করিবার জন্য ব্যস্ত না হইয়া সুস্থির থাকিতে পারেন? সেইজন্যই বল্লালসেনকে ঋণদান দ্বারা রাজত্ব লাভাকাঙ্ক্ষা করিয়াছিল। বল্লভানন্দ আঢ প্রভৃতি সপ্তগ্রামের রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধরগণের দ্বারা উৎসাহিত হইয়া ঐ কার্য্যের অগ্রণী হইয়াছিলেন। কিন্তু হায়! বিধি বিড়ম্বনায় ১১৯৮ খৃষ্টাব্দে পীর জাফর খাঁ গাজী ত্রিবেণীতে মুসলমান ধর্ম্মপ্রচারের জন্য একটি মসজিদ করেন ও উহাতে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। জাফর খাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ সফি জাফর খাঁই সংস্কৃত ভাষায় গঙ্গার স্তব লিখিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছিলেন। এই সকল কারণেই বল্লালের বিরুদ্ধে রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধরেরা কোন কার্য্য করিতে পারেন নাই। বল্লাল যাহা ইচ্ছা তাহাই করিয়াছিলেন বল্লাল চরিতে যৎকিঞ্চিৎ উল্লেখ আছে। সেই বাঙ্গালায় বৈশ্য রাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শেষ হইল। ত্রিবেণীর উদ্ধারণ দত্ত বৈষ্ণবগণের মধ্যে বিখ্যাত কাটোয়ার উত্তর গঙ্গাতীরের উদ্ধারণপুর প্রসিদ্ধ। হোসেন সাহের রাজত্বকালে তাঁহারই মন্ত্রীগণ সম্মানিত হইয়াছিলেন ও গৌড় লুণ্ঠনের সময় অনেক গুপ্তধন ও ত্রয়োদশ সহস্র স্বর্ণপাত্র হোসেন সাহ লাভ করিয়াছিলেন। রূপ সনাতনের সাকর মল্লিক, দবির খাস ও গোপীনাথ বসুর পুরন্দর খাঁ উপাধি হইয়াছিল। এইরূপে রূপসনাতন দুই ভ্রাতাই বিখ্যাত বৈষ্ণব ও মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের দুইহস্ত স্বরূপ ছিলেন। বঙ্গের সেনবংশীয় রাজারা কর্ণাটের পলাতক রাজপুত্রের বংশ। হর্ষচরিতে উহার উল্লেখ আছে ও গৌড়ের ইতিহাসকার উহা স্বীকার করিয়াছেন। ** কথা সরিৎ সাগর গ্রন্থে পুণ্ড্রবর্দ্ধনের দেবসেন নামক রাজার কন্যা দুঃখ লব্ধিকার স্বয়ম্বর কথা আছে ও ঐ দেশের নানাস্থানে ২য় চন্দ্রগুপ্ত ও রুদ্রসেনের মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। সেনেরা সামান্য সামন্তরাজা হইতে উন্নত হইয়াছিলেন। আরও তাঁহাদের সহিত যাঁহাদের রাজবংশানুযায়ী প্রাচীন আচার পদ্ধতির উপরে আসক্তির অভাব হয় নাই তাঁহাদের সহিত বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। তাঁহারা কেমন করিয়া রাজশক্তির প্রভাবে মস্তক নত করিবেন। তাঁহারা দেশত্যাগ করা শত সহস্র গুণে শ্রেয়ষ্কর অনুভব করিয়াছিলেন। এইরূপে তাহারা হিন্দুরাজার পক্ষপাতী না হইয়া সপ্তগ্রাম, রাঢ়ে ও উড়িষ্যাদি নানা ব্যবসাকেন্দ্রে চলিয়া গিয়াছিল। উহাতেই স্থানানুসারে তাহাদের মধ্যে পার্থক্য সঙ্ঘটিত হয়। *
যাবনিক সম্মানঃ— যবনাধিকারের সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ জাইগীরসহ মল্লিক, রায়, মণ্ডলাদি উপাধি লাভ করিত ও সুবর্ণবণিকগণের মধ্যে দৃষ্ট হয়। রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের কুলদেব দেবী শিব, সিংহবাহিনী চণ্ডি লক্ষ্মী আদি দেব মল্লিকেরা বংশানুক্রমে পূজা করিয়া আসিতেছেন। মুসলমান রাজত্বকাল যাঁহারা সেই শ্রেষ্ঠ উপাধি পাইয়াছিলেন, তাঁহারা হিন্দু পদবী বংশাবলীক্রমে ত্যাগ করিয়াছিলেন। জাতি পদবী অপেক্ষা উহা তখন অধিক মূল্যবান ছিল। কোন মুসলমান উচ্চ কর্ম্মচারীরা তাঁহাদের উপর কোন অত্যাচার করিতে পারিত না। গোবিন্দচন্দ্রের গীতে হাড়িপা যোগমার্গে প্রবিষ্ট স্বীয় শিষ্য গোবিন্দচন্দ্রকে চারি কড়া সোনার কড়িতে হীরাদারি নাম্নী বেশ্যার নিকট বন্ধক রাখিয়াছিলেন। ইহাতে মনে হয় যে, তখন সোনার কড়ি আদি ব্যবহৃত হইত। ক্রমে জাতি মর্য্যাদা রক্ষা করিবার জন্য ব্যবসায়ী ভিন্ন সকল লোকেরা ব্যস্ত হইয়া পড়ে। বাঙ্গালার অধিপতিগণেরও জাতি লইয়া সমস্যা রহিয়াছে। আদিশূরের অস্তিত্ব অনেক ঐতিহাসিক বা প্রত্নতত্ত্ববিদগণ স্বীকার করেন না কিন্তু আইনি আকবরীতে তাঁহার নাম ও বংশ পর্য্যায় বর্ত্তমান রহিয়াছে। উহার উপর ঘটক মহাপ্রভুদের কারিকায় কনৌজ ব্রাহ্মণগণের বাঙ্গালায় আগমন হইতে মর্য্যাদা আরম্ভ হইয়াছে সুতরাং তাঁহাকে সহজে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তাঁহাকে আইনি আকবরীতে কায়স্থ ও অন্যত্রে বৈদ্য আবার ** গৌড়ের ইতিহাসকার ক্ষত্রিয় প্রমাণ করিতে গিয়াছেন। তদ্ভিন্ন বল্লালচরিতে তাহার বংশধর বল্লালকে ব্রহ্মনদ পুত্র বলা হইয়াছে। কুলজী গ্রন্থে দেখা যায় যে, হেমন্ত সেন সুবর্ণরেখা তীরে, কাশী ও পুরীতে রাজত্ব করিতেন। পরে দক্ষিণ বঙ্গ দিয়া পূর্ব্ব বঙ্গাধিকার করেন। ইহাঁর পুত্র বিজয়সেনই গৌড়াধিকার করেন। বল্লালচরিতে বীরসেনকে সুতপুত্র কর্ণের বংশজাত ও অঙ্গদেশ হইতে গৌড়ে আগমন করিয়াছিলেন উল্লেখ আছে। যাহা হউক, ইহাতে সেকালের রাজাদের জাতি ও বংশ পরিচয় লইয়া এইরূপ গণ্ডগোল, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান দ্বারা যতদূর অনুমাণ করা যায় উহাতে বোধ হয় যে, তিনি উচ্চ জাতি ছিলেন না। বৃক্ষ ফলের দ্বারা পরিচিত হয়, মানব কার্য্যের দ্বারা জাতির উচ্চ ও নিম্নতা লাভ করিত, উহার উদাহরণ বিশ্বামিত্রাদি। শুদ্ধ বৈশ্য বল্লভানন্দের কুটুম্বিতা স্থাপন করিতে না পারায় বল্লাল সুবর্ণবণিক জাতিকে সমাজদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কলিকাতার খ্যাতনামা মল্লিকদের পূর্ব্বপুরুষ রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের বংশাবলি ও অন্যান্য নিদর্শন যাহা কিছু ছিল, কলিকাতার ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দের অধিকারের অগ্নি তে দগ্ধ হইয়াছে। উক্ত মল্লিকেরা কখন এই উপাদিলাভ করে সে সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ বলা আবশ্যক। ১৩৫৭ খৃষ্টাব্দ বাঙ্গালার ইতিহাসে বড় স্মরণীয় হইয়াছে, সম্রাট ফিরোজ সাহ একডালা দুর্গ অবরোধ করিলে সেনাগণের স্ত্রীসমূহের ক্রন্দনে ও ইলিয়াস শাহ ফকিরের বেশে দুর্গ হইতে বহির্গত হইয়া সেখ রাজা বিয়াবানু নামক সাধুর অন্তেষ্টি ক্রিয়া করেন ও সম্রাট শিবিরে তাঁহার সহিত আলাপ করেন। শেষে সন্ধি হইয়া যায় উহাতে বাঙ্গালার স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। *** গৌড়ের ইতিহাসকার বলেন যে, “মুসলমান রাজত্বের পূর্ব্বেই গঙ্গা, পাণ্ডুয়ার সান্নিধ্য ত্যাগ করিয়াছিল। কালিন্দী নদী যেস্থানে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত হইয়াছিল, তথায় একটি বাণিজ্য বন্দর স্থাপিত হয়, সেখান হইতে পাণ্ডুয়ায় পণ্য দ্রব্য প্রেরিত হইত। ক্রমে এইস্থান বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত হইয়া উঠে। ঐ স্থানের নাম ধনবত্তার জন্য মালদহ হয়। মালদহ, পাণ্ডুয়ার সীমা হইতে অধিক দূরবর্ত্তী নয়, ফিরোজ শাহ এই স্থান হইতে ইলিয়াসের সেনাদিগকে তাড়াইয়া দেন।” * “পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু জমিদারেরা সম্রাটের পক্ষ অবলম্বন করিলেন। যাঁহারা সম্রাটের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে সাগরদিয়ার মহাধনী উদয়ন কবিকঙ্কণ, বিকর্ত্তন চট্টকে রাজা ও শ্রীরামকে খান উপাধি দান করেন। ইলিয়াস শাহ স্বপক্ষীয় হিন্দুবীরগণকে উপাধি দান করিয়াছিলেন।” সেই সময় উক্ত রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধরেরা “মল্লিক” উপাধি লাভ করেন। পাঠান রাজত্বকালে উহা অতি সম্মানের ছিল।
সত্যনিষ্ঠাঃ— সেই সময় মার্কোপোলো বাঙ্গালায় আসেন ও তিনি সেখানে নানাপ্রকার খাদ্য ফল শস্যাদি ও পণ্য দ্রব্যের উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ব্যবসায়ীগণের সত্যনিষ্ঠা ও সততার প্রশংসা করিয়াছেন।
* “মুগা ও রেশম মিশাইয়া প্রায় ত্রিশ প্রকার কাপড় প্রস্তুত হইত! মুসলমান বিজয়ের সঙ্গে এই প্রকার মিশ্রিত উপাদানে বস্ত্রবয়ন প্রণালী মালদহ হইতে ঢাকার প্রবর্ত্তিত হয়, এইজন্য উহার সাধারণ নাম মালদহ।” ট্রভারনিয়ার প্রমুখ পাশ্চাত্য পরিভ্রমণ বৃত্তান্তে সত্যনিষ্ঠার প্রশংসা উল্লেখ আছে। কৃষ্ণদাস পিতৃদত্ত নামাপেক্ষা সত্যবাদি নামেই সর্ব্ববিদিত ছিলেন। ভ্রমণবৃত্তান্তে পিতৃদত্ত নামোল্লেখ নাই। যেমন যুধিষ্ঠির অজাতশত্রু নামেই পরিচিত ছিলেন।
Shaista Khan having completed the years of his Government, according to the custom of the Empire of the Great Mogul, and Aurangzeb, son of Shah Jahan, having succeeded him, he withrew to Agra, where the court then was. One day, when he conversed with the King, he said that he had seen many uncommon things in all the Governments with which his Majesty had honoured him, but one thing alone surprised him, which was to have discovered a rich merchant who had never told a lie, and who was upwards of seventy years old. The King surprised on his own part with so extraordinary a fact, told Shaista Khan that he desired to see the man of whom, he had told him, and ordered him to send him forthwith to Agra, which was done. This much distressed the old man, both on account of the length of the road, which is from twenty five to thirty days, and because it was necessary for him to make a present to the King. In fact, he made him one valued at 40,000 rupees, and it was a gold box for keeping betel, ornamented with diamond, rubies, and emeralds. After he had saluted the King, and had made his present to him, the King merely asked his name, to which he replied that he called himself the man who had never lied. The King asking him further what his father’s name was: “Sire”, replied he, “I know not.” His Majesty, satisfied with this reply, stopped there, and, not desiring to know more, ordered them to give him an elephant, which is a great honour, and 10,000 rupees for his journey.” *
অর্থাৎ মোগল সাম্রাজ্যের নিয়মানুসারে সায়েস্তা খাঁর তিন বৎসর দাক্ষিণাত্যের প্রাদেশিক শাসন কর্ত্তার কার্য্য কাল সমাপ্ত হইলে, আরঙ্গজেব তাঁহার স্থানে সম্রাটের পুত্রকে নিযুক্ত করেন। একদিন সায়েস্তা খাঁ আগ্রায় সম্রাটের সহিত কথোপকথনে বলেন যে, তাঁহাকে সম্রাট যেখানে কর্ম্মোপলক্ষে রাখিয়াছিলেন সেখানে অনেক অসাধারণ বস্তু দেখিয়াছেন, কিন্তু তন্মধ্যে কেবলমাত্র একটী ঘটনায় সর্ব্বাপেক্ষা তিনি আশ্চর্য্যান্বিত হইয়াছিলেন। তিনি একজন ধনী ব্যবসায়ীকে দেখিয়াছেন, যে জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলে নাই, তাঁহার বয়স সত্তরেরও অধিক হইবে। সম্রাট অত্যন্ত আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া সায়েস্তা খাঁকে বলেন যে, তিনি সেই ব্যবসায়ীকে দেখিতে ইচ্ছা করেন ও তাঁহাকে অবিলম্বে আগ্রায় পাঠাইবার আদেশ দান করেন। উহাতে সেই বৃদ্ধ ধনী ব্যবসায়ীটি অত্যন্ত বিপদগ্রস্থ হন, কারণ তাঁহাকে ২৫ হইতে ৩০ দিনের পথ অতিক্রম করিয়া সম্রাটকে উপঢৌকনাদি প্রদান করিতে হইবে। তিনি যথাসময়ে সম্রাট সন্নিধানে উপনীত হইলেন ও সম্রাটকে একটি ৪০ হাজার টাকা মূল্যের হীরা মণি ও পান্না খচিত তাম্বুল পাত্র উপহার প্রদান করিলেন। সম্রাট তাঁহাকে তাঁহার নাম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তরে বলেন য়ে, “সে ব্যক্তি কখনও মিথ্যা বলে নাই” এই নামেই তিনি বিদিত। সম্রাট তখন তাঁহার পিতার নাম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন যে, উহা তিনি জানেন না। সম্রাট তখন অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে আর অন্য কোন প্রশ্ন করেন নাই। সম্রাট তাঁহাকে প্রভূত সম্মান নিদর্শণ স্বরূপ একটি হস্তি উপহার এবং তাঁহার পাথেয় ১০০০ দশ হাজার টাকা দিতে আজ্ঞা করেন। এই সত্যবাদী ব্যক্তির অনুসন্ধানের মূল কারণ ভ্রমণকর্ত্তা যথাস্থানে সন্নিবেশিত করেন নাই। প্রবাদ যে, উহাকে সম্রাট তাঁহার বহু মূল্য আমদানি দ্রব্যাদির মূল্যের উপর করাদায় করবিার ভারার্পণ করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু তিনি স্বয়ং উহা না করিয়া নেহাল চাঁদ দত্তের নামোল্লেখ করিয়াছিলেন ও তিনি ঐ কার্য্য করিতেন। ট্রেভানিয়ার সেই কথা তাঁহার ভ্রমণ বৃত্তান্তে এইরূপ দিয়াছেন। সম্রাট কোন হীরা পান্নাদি দর্শন করিলে পর কোন আমীর ওমরাও জ্ঞাতসারে ঐ প্রস্তরাদি ক্রয় করিতেন না। তদ্ভিন্ন সম্রাট কর্ত্তৃক নিযুক্ত তিনি জন বিশেষজ্ঞ যখন ঐ প্রস্তরাদির বিষয় পরীক্ষা করিতেন তখন যে কোনও ব্যবসায়ীকে প্রস্তর সকল তাঁহাদের গৃহে লইয়া যাইতে হইত এবং ঐ স্থানে ঐ ব্যবসায়ীর অনেক ঐরূপ বেণিয়ানের সাক্ষাৎ ঘটিত, যাহাদের মধ্যে কেহ হীরার বিশেষজ্ঞ, কেহ বা পান্নার বিশেষজ্ঞ এবং কেহ বা মণির বিশেষজ্ঞ অথবা মুক্তার বিশেষজ্ঞ, যাহারা প্রত্যেক দ্রব্যটির ওজন ও অপরাপর বিশেষত্ব লিখিয়া লইত। পরে যখন ঐ ব্যবসায়ী কোন আমীর বা প্রাদেশিক শাসনকর্ত্তার নিকট উহার কোনটী বিক্রয় করিতে যাইত, সেই পূর্ব্বোক্ত বিশেষজ্ঞেরা তাঁহার নিকট উহার প্রত্যেক দ্রব্যটীর বিশেষত্ব ও মূল্য সম্বলিত একটী তালিকা পাঠাইয়া দিত।
“It is that after the King has seen any stones, a prince or other noble who knows of it will never buy them, and besides, while these three men appointed to view the jewels are considering and examining them in their dwellings, where he is obliged to carry them, he meets several Banians (two Persians and a banian Nehal chand) who are experts, some for diamonds, others for rubies, for emeralds, and for pearls, who write down the weight, quality, perfection, and colour of each piece. And if the merchant afterwards goes to the Princes and Governors of Provinces, these people send them a memorandum of all that he carries, with the price.” *
হর্ষচরিতের পুষ্পভূতিই সম্রাট হর্ষবর্দ্ধনের আদি পুরুষ উক্ত আছে তদন্তর মধুবন তাম্র ফলকানুসারে এইরূপঃ—

হর্ষচরিতে আফসড় ফলকে ও নৈসরি দান পত্রে দেব উপাধি বর্ত্তমান আছে। হর্ষের মুদ্রাতেও দেবীমূর্ত্তি আছে। রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধর দেব উপাধি দেবী আদি কুলদেবীর পূজা ও তুলাদান করে এবং আজও বিবাহের সময়ে মল্লিকবংশে সেই প্রাচীন বৈশ্যের উষ্ণীষ আয়বৃদ্ধ্যন্নের সময় ব্যবহার করিয়া থাকে। তাঁহারা পাঠান রাজত্বকালে “মল্লিক” উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁহাদের বংশতালিকা এই গ্রন্থের পূর্ব্বোক্ত ব্যক্তি বিশেষের পরিচয়ের জন্য নিম্নে প্রদত্ত হইলঃ—
কলিকাতার ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের অগ্নি তে দগ্দান্ত বিখ্যাত শ্রীশ্রী ৺সিংহবাহিনী সেবাধিকারী দেব মল্লিক বংশাবলিঃ—
৺বনমালির পুত্র বৈদ্যনাথ তাঁহার পুত্রই উল্লিখিত সত্যবাদী কৃষ্ণদাস মল্লিক তাঁহার পুত্র রাজারামই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির উপদেষ্টা ও তিনিই কলিকাতার প্রতিষ্ঠা ও উন্নতির সূত্রপাত করেন।

উক্ত কৃষ্ণদাসের ত্রিবেণীতে অন্নছত্রে দরিদ্রেরা আহার ও অবস্থান করিতে পারিত, তিনি বল্লভপুরে মন্দির করিয়াছিলেন উহা এখন নদীতীরে ভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান, বংশধরেরা নূতন মন্দির করিয়াছে। উহা গঙ্গাগর্ভে পড়িবে এই ভয়েই উহা পরিত্যক্ত হইয়াছিল। বিখ্যাত কবি সাদি বলিয়াছেন যে, ফলের দ্বারাই বৃক্ষের পরিচয় পাওয়া যায়। কোন উচ্চ বংশের পরিচয় বংশধরগণের কার্য্যকলাপেই দৃষ্ট হইয়া থাকে। তদনুসারে মল্লিকবংশ যে রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের বংশধর বলিয়া দাবী করিতে পারে উহা মল্লিকবংশর দানধ্যান ও ক্রিয়াকলাপ দ্বারা বংশানুক্রমে বিখ্যাত হইয়া আছে। ইহাদের বংশ পরিচয় সেইজন্য ব্যক্তি বিশেষের নামের দ্বারা করা হয় না। কৃষ্ণদাস তাঁহার দান ধ্যান, সত্যকথা ও সততার জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি তাঁহার বংশধরগণও বিদিত। তাঁহাদের মধ্যে কেহই কাহারও দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করেন নাই, কেবল শুকদেব ও তাঁহার বংশধরেরা উহা করিয়াছে, সেইজন্য তাঁহারা দৌহিত্র সন্তান বলিয়া বোধ হয়। আরও শুকদেব নয়ান চাঁদের সমসাময়িক ছিলেন, সুতরাং দৌহিত্র ভিন্ন দর্পনারায়ণের ভ্রাতা হইয়া তাঁহার পুত্রের সমসাময়িক হইতে পারেন না নয়নচাঁদের নাম কমলনয়ান ও তাঁহার নামে ঘাট ছিল।
রাজারামই জব চার্নককে কলিকাতায় চলিয়া আসিতে বলিয়াছিলেন ও তদনুসারে তিনি কার্য্য করিয়াছিলেন রাজারাম সপরিবারে কলিকাতায় আসেন ও তাঁহার পুত্রেরাই কলিকাতায় বাজারাদি করিয়া সর্ব্বতোভাবে উহার উন্নতি করেন। নয়ানচাঁদ কমলনয়ান বলিয়া ছিয়াত্তরে মন্বান্তরের সময় বিখ্যাত হইয়াছিলেন। তিনি ও শুকদেব পলাশী যুদ্ধের পর কলিকাতা ধবংসের ক্ষতি টাকা বিলির সভার তের জন সভ্যের মধ্যে দুইজন পূবের্ব ছিলেন। এই সকল ক্ষতিপূরণের কথা ইতিপূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে। সপ্তগ্রামে শ্রেষ্টিচত্বর ও বেনে পাড়ার কথা এখন সেখানকার কৃষকগণ বলে ও স্থান দেখাইয়া দেয়। গ্রন্থকর্ত্তা সেই সকল স্থান খনন করিবার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন কিন্তু গবর্ণমেন্টের কর্ত্তৃপক্ষগণ এখনও পর্য্যন্ত কোন মনোযোগ করেন নাই। বিখ্যাত দাতা ব্যবসায়ী ও মহাজন নিমাইচরণের কথা পরে যথাস্থানে বলা হইবে। গ্রন্থকর্ত্তা স্বর্গত ৺নিমাইচরণের প্রপৌত্র, তাঁহার পিতা ৺যদুলাল কলিকাতার বিখ্যাত দেশহিতৈষী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পিতামহ মতিলাল দান ধ্যান সত্যবাদিতার জন্য বিখ্যাত এবং প্রথম কলিকাতা মিউনিসীপ্যালিটি সভার সভ্য ছিলেন। উক্ত মল্লিক বংশের অনেকেই অর্থদানাদি ক্রিয়াকর্ম্মে ও গৃহাট্টালিকায় এবং দেশের ও দশের হিতকর কার্য্য দ্বারা কলিকাতার শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছিলেন।

উড়িষ্যার সহিত বাঙ্গালার সম্বন্ধ ষ্টারলিং প্রভৃতির ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায় ও পুরীর জগন্নাথের নিত্যভোগের জন্য নিমাইচরণ প্রত্যহ অর্থদান ও মাহেশ বল্লভপুরের উক্ত দেবতার মন্দিরাদি নির্ম্মাণ ও ভোগের সহায়তার জন্য কায়েমি বন্দোবস্ত করিয়া গিয়াছেন। ইহাতে উড়িষ্যার জগন্নাথদেবের প্রতিষ্ঠাতৃ বা রাজার সহিত কোন সম্বন্ধ ছিল বলিয়া ধারণা করা হয়। আরও ইহাদের কুটুম্ব মহারাজা সুখময় নিজ ব্যয়ে পুরীর রাস্তা করিয়াছিলেন।
* (শ্রীহর্ষচরিত ষষ্ঠ উচ্ছ্বাস ২৪২ শ্লোক)।
* হুগলী জলোর ইতিহাসে শ্রদ্ধেয় ৺নন্দলাল দে লিখিয়াছেন।
** ১৭৬ পৃষ্ঠা।
*** ১৭৭ পৃষ্ঠা।
* ১৭৮ পৃষ্ঠা।
* “ব্রাহ্মণের মত নহি বল্লালসেন্যা।”
“তোমার ঘরে জল খায় সে কোন ব্রাহ্মণ।”
* Indian Antiquary Vol. P. 17.
** ১৪৩ ও ১৫১ পৃষ্ঠা।
* এই উপাধির বিশিষ্টতার কথা আইনি আকবরীতে উল্লেখ আছে।
* ১ ভাগ ১০৩/৪/৪/৫ পৃষ্ঠা। ৭৮৩ পৃষ্ঠা (১০অ ১২০ শ্লোক) ও ৫৭ পৃষ্ঠা (২০অ ৩১/২)
* গৌড়ের ইতিহাস ১ম খণ্ড ১৫১ পৃষ্ঠা।
* ১ম ভাগ ২১০-২১১ পৃষ্ঠা। ঐ ২২৪ পৃষ্ঠা। ঐ ১৭৯ পৃষ্ঠা…
* ১ম ভাগ পৃষ্ঠা ১২৫।
* ১৫৬।৭।
** কাঁচড়াপাড়ার কৃষ্ণরায়জীর মন্দির ও মল্লিকের খাল মল্লিকদের জাইগীরের পরিধির মধ্যে ছিল।
উহার দলিল কলিকাতায় অগ্নি তে দগ্দ হইয়া যাওয়ায় কোম্পানির রাজত্বে হইয়াছে, কিন্তু
মল্লিকদের স্থাপিত দেব মন্দির ও সেবার ব্যবস্থা বর্ত্তমান ও তাহাদের কৃত খাল স্মৃতি রক্ষা
করিতেছে।
* ১ম। ১৫৭
** ২য়। ৫৪। ৫৩
*** গৌড়ের ইতিহাস ২য়। ৫৫ পৃষ্ঠা। ঐ ৫৪।
* Tavernier’s Travels, Vol.I. Page 77.
* (Tavernier’s Travels, Vol. I. Page 136)
* প্রভুরাম ফ্রেঞ্চ গবর্ণমেন্টের বোরলেষ্ট সাহেবের এজেণ্ট ছিলেন।
* ইহাদের নামে বৈষ্ণবতার পক্ষপাতী দৃষ্ট হয় ও সেই সময় হইতেই বোধ হয় খড়দহের
গোস্বামীগণের শিষ্য হন।
