২. কালধর্ম্ম ও পূর্ব্বস্মৃতি
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – কালধর্ম্ম ও পূর্ব্বস্মৃতি
কলি।—কলিই কলিকালের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। ক্রোধের ঔরসে তাহার ভগ্নী হিংসার গর্ভে কলির জন্ম। কলি স্বীয় ভগ্নী দুরুক্তির পাণিগ্রহণ করেন। ভয় উহার পুত্র—মৃত্যু কন্যা। হিন্দু জাতির মধ্যে কলিকে দেবতা শ্রেণীর মধ্যে স্থান দেওয়া হয় নাই ও তাঁহার পূজাদি করা হয় না। কলির অবতার কল্কী—নাদির শাহ প্রমুখ সকলেই কল্কীর ন্যায় ভারত শোষণ করিয়া উহা ত্যাগ করিয়াছিল। দাবানলে কুরঙ্গদল যেমন ইতস্ততঃ পলায়ন করিয়া, শেষে তাহাতেই দগ্ধ হইয়া যায়—সেইরূপ ভয়ানক দৃশ্য নাদির শাহের আমলে দিল্লীতে হইয়াছিল। নাদির শাহ একটী মসজিদ উপরে থাকিয়া, ঐ বীভৎস ব্যাপার দর্শন ও সৈন্যগণ দিয়া নিরীহ নাগরিকগণকে পশুবৎ বধ করিতে উৎসাহিত করিয়াছিল। তখন নিরুপায় নিরীহ নাগরিকগণ সেই সকল সৈন্যগণের সম্মুখীন হইয়া প্রতিহিংসা করিতে গিয়া নষ্ট হইয়াছিল। এইরূপে সকলের সর্বস্ব অপহরণ করিয়া তাহাদের গৃহে অগ্নি সংযোগ করিয়া হত ও আহত ব্যক্তিগণকে তাহার মধ্যে নিক্ষেপ করিয়াছিল ও পথে রক্তস্রোত উষ্ণতায় প্রবাহিত হইয়াছিল। ঐ সময় দিল্লী, শ্মশান অপেক্ষা শত সহস্র গুণে বিভীষিকাময় দৃশ্য ধারণ করিয়াছিল। রমণীগণ পশুগণের হস্ত হইতে নিস্তার পাইবার জন্য আত্মহত্যা করিয়াছিল। নাদির শাহের এই ভীষণ অত্যাচারের মূল কারণ অর্থলিপ্সা। বাঙ্গালার স্বাধীনতা লোপ করিয়া মোগল সম্রাটের কর অর্থাদি আদায় করিবার জন্য রাজপুতগ্লানি মানসিংহ দুইবার বাঙ্গালায় আসিয়াছিল। সেই সকল দানবগণের কৃপায় সোনার বাঙ্গালা ছারখার হইয়াছিল। প্রাসাদাদি পরিপূর্ণ নগর গ্রাম হিংস্র জন্তুর আবাস হইয়াছিল। বাঙ্গালার বীরগণ যাঁহারা তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইয়াছিল, তাহারা সর্ব্বস্বান্ত ও নিহত হইয়াছিল। কলির প্রভাবে হিন্দুর সর্ব্বনাশ ও যবনের অভ্যুদয় হিন্দু কুলাঙ্গারগণের দ্বারাই হইয়াছিল। ইহাতে বাঙ্গালী জাতির কলঙ্কের বিষয় কিছুই নাই। এই লীলাখেলা কলির প্রারম্ভে শ্রীকৃষ্ণের আমল হইতেই হইয়া আসিতেছে। যাদবগণকে মথুরা ত্যাগ করিয়া দ্বারকায় পুরী নির্ম্মাণ করিতে হইয়াছিল। বাঙ্গালীর শ্রীকৃষ্ণের মত মন্ত্রী ছিল না তাই মানসিংহের পতন হয় নাই। সেই কলির প্রভাব যখন ষোলকলা, তখনই কলিকাতার উন্নতি আরম্ভ হয়। সেই কলিকাতার যুদ্ধে প্রতাপাদিত্য যবনরক্তে পৈত্রিক ঋণ পরিশোধ ও তর্পণ করিয়াছিলেন কিন্তু তাহা তাঁহার ভোগে আসিল না। সেই কলিকাতা তাঁহার পরাজয়কেতন স্বরূপ তাঁহার অনুগত ভক্ত লক্ষ্মীকান্তের হইল। কি আশ্চর্য্য! ইনিই প্রতাপাদিত্যের বিজয়ের পর সকলের অগ্রণী হইয়া তাঁহার সম্বর্ধনা করিয়াছিলেন। ইনিই বড়িষার সাবর্ণচৌধুরীদের পূর্ব্বপুরুষ। কেমন করিয়া ইহার সৌভাগ্যোদয় হইল, উহার সংক্ষেপ বিবরণ প্রকাশ করা আবশ্যক। উহাতেই কলির প্রভাব কলিকাতার প্রাপ্তিতে কতদূর বর্ত্তমান, তাহা সবিশেষ অবগত হওয়া যায়। কলিকাতায় মোগলবীর্য্য ক্ষুণ্ণ হইয়াছিল, শেষে আবার সেই কলিকাতা তাহাদের বিজয়ের পুরস্কার স্বরূপ লক্ষ্মীকান্ত বিনা রক্তপাতে লাভ করিল। হায়! উহাতেই দেশ চিরদিনের জন্য দাসত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ হইল। তাহাতেই মনে হয়, কলিকাতার নাম সন্ধিবিচ্ছেদ ব্যুৎপন্ন করিলে মন্দ হয় না। কলির + কাতা (রজ্জু) এই সন্ধিবিচ্ছেদে কলিকাতার উৎপত্তি নিষ্পন্ন করা হইল। লক্ষ্মীকান্তের জন্মের সময় জননী তাহাকে ত্যাগ করিয়াছিলেন পিতাও তাহাই করিয়াছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুতে কামদেব সদ্যোজাত সন্তান লক্ষ্মীকান্তের প্রতি তাকাইয়া আছেন, এমন সময়ে হঠাৎ তাঁহার ভগবদ্দত্ত আশ্চর্য্য উপায়ে ভূপতিত অসহায় জ্যেষ্ঠী শাবকের জীবনরক্ষা ও আহার লাভের ব্যবস্থা দেখিয়া তাঁহার মায়ারজ্জু ছিন্ন হইয়া যায় ও তিনি ব্রহ্মচারী হন। সেই অবধি তিনি পরিত্যক্ত পুত্রের কোনরূপ সংবাদাদি গ্রহণ করেন নাই, কিন্তু কলির প্রভাবে পরম পবিত্র তীর্থ কাশীতেও কলির অবতার মানসিংহের সহিত সাক্ষাৎ ও তাঁহার পুত্রের প্রতি মমতা হঠাৎ তীব্র হইয়া পড়ে। তাহাতেই বলিতে হয়, প্রতাপাদিত্যের ধ্বংস তাঁহার কর্ম্মচারিগণের অভ্যুদয় বিধাতার লিপি। তখন কলির প্রভাব ধর্ম্মলোপ হইয়াছে। “ঘটক কারিকায়” কামদেবের নাম জীয়ো গাঙ্গুলী। তাঁহার নিকট মানসিংহ উপদিষ্ট হইয়াছিলেঃ —
“মানসিংহ মহারাজ কাশীতে আছিল
জীহোর নিকটে তিঁহু উপদিষ্ট হ’ল।”
* * * *
“মানসিংহ গুরুপুত্র করে অন্বেষণ
কালীঘাটে পায় নাম লক্ষ্মীনারায়ণ।”
* * * *
“আজি হ’তে তব ইচ্ছা যত লও তুমি
কুলীনে ধরুক্ ছাতা অন্নদাতা তুমি।”
* * * *
“লক্ষ্মীর অতুল বিত্ত রায় চৌধুরী খ্যাতি
কন্যাদানে কুলনাশে কুলের দুর্গতি।”
“কালীঘাট কালী হ’ল চৌধুরী সম্পত্তি
হালদার পুজক তাঁর এই ত বৃত্তি।”
সেই শত সহস্র মোগল বাঙ্গালীর রক্তপাতের লভ্য কলিকাতাদি পরগণা সকল কামদেব ব্রহ্মচারীর সন্তান লক্ষ্মীকান্তের হইল। উহার সহিত পিতাপুত্রের সম্মিলন পরস্পর কুলশীলাদির পরিচয় হইল। স্বজাতি বৎসল মুসলমান ঐতিহাসিকগণ কেহই প্রতাপাদিত্যের কোন কথাই উল্লেখ করেন নাই। যদি করিতেন, তাহা হইলেই কলিকাতা সম্বন্ধে কোন কিছু বলিতেন। যাহাই হউক, মোগল দরবারে কলিকাতাদি পরগণার নাম মোগল সম্রাটগণের শ্রেষ্ঠ আকবরের সময়ের প্রতাপের বিজয়ে উল্লেখ ও উহাকে জাহাঙ্গীরের সময় সেই কলঙ্কের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ দান করা হয়। সাবর্ণ চৌধুরীদের পূর্ব্ববাস হুগলী জেলার অন্তর্গত গোহট্ট গোপালপুরে ছিল। তাঁহারা জমিদারী লাভ করিয়া কলিকাতায় বসবাস আরম্ভ করেন নাই। হুগলী ত্যাগ করিয়া নিমতা ও শেষে বড়িশায় বাস করেন। কলির ব্রহ্মাস্ত্র মায়া—তাহার রজ্জু ছিন্ন করিয়া লক্ষ্মীকান্তের জন্মের সময় কামদেব ব্রহ্মচারী হইয়াছিলেন, আবার তাহার অনেক পরে বহু সাধনার পর সেই মায়ার রজ্জু ব্রহ্মচারীকে কাশী হইতে কলিকাতায় আনাইয়া পিতা পুত্রের পরিচয় ও সম্মিলনের সঙ্গে সঙ্গে কালী ও কলিকাতা পরগণা লাভ করাইয়া দিল। ইহা কলির অনুগ্রহেই হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয়। লক্ষ্মীকান্তের জন্ম ফকির ডাঙ্গায় হয়।
মানব অহঃরহ দেবীর নিকট কামনা করিয়া পূজা করিতেছে। প্রার্থনায় আপনার মনের উচ্চভিলাষের ছায়া প্রতিবিম্বিত হয়। বাসনার পরিতৃপ্তিতে উহা উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত হইতে থাকে। সেই বাসনাই মানুষকে দড়ির মত বাঁধিয়া কলির পদতলে লুণ্ঠিত করে। সেই কৃতকার্য্যতার চিন্তাই মানুষের বিবেক বুদ্ধি নষ্ট করে। তাই কামদেব বহুকাল কাশী বাস ও সাধনা করিয়াও মায়ায় মুগ্ধ হইয়াছিল। তোডর মল্লের আমলের রাজস্ব বন্দোবস্তে বাঙ্গালীর সাতপুরুষের বাস ত্যাগ করিতে হইয়াছিল। সেই দুঃখে দুঃখিত হইয়া হিন্দু মুসলমান এক হইয়া মোগল সম্রাটের কর বন্ধ করিয়াছিল ও যাহাতে তাহা আর দিতে না হয়, তাহারই জন্য বার বার মোগল সৈন্য বিধ্বস্ত করিয়াও শেষে কৃতকার্য্য হইতে পারিল না। সেকালে কলিকাতার এমন কিছুই ছিল না যে, যাহা দ্বারা তাহার এই অলৌকিক উন্নতি সূচনা করিতে পারে। তাহাতেই মনে হয় কলির প্রভাবে উহা সম্পন্ন হইয়াছিল ও সন্ধি বিচ্ছেদের অর্থের সহিত উহার নামের সার্থকতা করিবার বিলক্ষণ কারণ আছে।
সূতানটী।—মার্কোপোলোর আমল হইতে বাঙ্গালায় ক্রীত দাস দাসীর ব্যবসা চলিত। সেকালের মুসলমান দরবারে বিদ্যাবুদ্ধি অপেক্ষা সুন্দরী স্ত্রীর মূল্য অধিক ছিল। আরমানি পর্ত্তুগীজেরা সম্রাটের দরবারে সুন্দরী স্ত্রী সরবরাহ করিয়া তাঁহাদের অর্থ লাভ ও সম্মানাদি যথেষ্ট হইত। সেকালে দেশে সুন্দরী স্ত্রী রক্ষা করা দায় ছিল। বীর শের আফগানের রূপসী মেহেরুন্নিসার হরণ ও তাঁহাকে “নূরজাঁহা” অর্থাৎ জগজ্যোতিঃ নামে প্রখ্যাতা করিয়া সম্রাট তাঁহাকে প্রাধানা সাম্রাজ্ঞী করেন। তিনিই জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্য রক্ষা ও চালনা করিতেন। তাঁহারই বুদ্ধি কৌশলে জাহাঙ্গীর নূরজাঁহা সহ বন্দি হইয়া মুক্ত হইয়াছিলেন। তাঁহারই ষড়যন্ত্রে তাঁহার ভ্রাতৃকন্যা-পতি শাহজাঁহা সম্রাটের তৃতীয় পুত্র হইয়া সাম্রাজ্য লাভ করেন। ঐ সকল কারণে বাঙ্গালা দেশে কেন সমস্ত ভারতবর্ষে স্ত্রীজাতির স্বাধীনতা ও শিক্ষা লোপ হইয়াছিল। অবরোধ ও সহমরণ প্রথার প্রশ্রয়ে বাঙ্গালী জাতি দুর্ব্বল হইয়া পড়ে। আরমানিরা স্ত্রীজাতির ব্যবসায় সম্রাটের মনস্তুষ্টি করিয়া “ফকর অলতোজার” অর্থাৎ বণিকগৌরব উপাধি লাভ করে। কলিকাতায় মোগল সম্রাটের আমল হইতেই সূতা ও নটীর ব্যবসা আরমানি পর্ত্তুগীজেরা করিত। উহাতেই উহার ঐ নাম হয়।
বরানগর।—ওলন্দাজেরা নটীর ব্যবসা বারনগরে করিত। পুরাতন ওলন্দাজী দলিলে বারনগরই লেখা আছে ও তাহা হইতে বরানগর হইয়াছে। ইংরাজেরা সূতা ও নটীর ব্যবসা করিয়াছিলেন উহা সেকালের সেরেস্তার কাগজে প্রকাশ পায়। তদনুরূপ সূতা ও নটীর ব্যবসা হইতে সূতানটী নাম পত্তন হইয়াছিল।
সেকালে এদেশে স্ত্রীলোকেরা চরকা কাটিয়া বেশ দু’পয়সা রোজগার করিত। সেকালের চরকা কাটার ছড়া এইরূপ ছিলঃ—
“চরকা মোর ভাতার পুত, চরকা মোর নাতি।
চরকার কল্যাণে মোর, দ্বারে বাঁধা হাতি।।”
সেকালে এইদেশে চরকার সূতা কাটিয়া কাপড় তৈয়ারী হইত, সে জন্য মাঞ্চেষ্টার বা লাঙ্কেশায়রের উদর পূরণ বা এক্সচেঞ্জের খেলায় ব্যবসায়ীর সবর্বনাশ হইত না। মহাত্মা গান্ধী এখন তাই সেই চরকার বড়ই পক্ষপাতী হইয়া পড়িয়াছেন। সেকালে দেশের স্ত্রী পুরুষ উভয়েই উপার্জ্জনক্ষম ছিল। এদেশে তখন স্ত্রীলোকেরা দিবানিদ্রাদি সুখভোগ করিত না, চরকায় সূতা কাটিত। দেশের অভাব দেশের লোকেই দূর করিত, তাহার জন্য বিদেশীর মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হইত না। তাহাতেই পৃথিবীতে এদেশের শিল্প ও নৈপুণ্য বিশেষ সুখ্যাতি লাভ করিয়াছিল। এমন কি, দিল্লিতে সম্রাটেরা ঢাকার মসলিন বড়ই আদরে গ্রহণ ও ব্যবহার করিতেন। শেষে তাঁতিরা পর্ত্তূগীজ, আরমানি বণিকগণের কুপরামর্শে দাদনি প্রথায় দেশের সেই সূতা কাটা ক্ষতিকর করিয়া ফেলে ও ক্রমে উহা বন্ধ হইয়া যায়। কবিকঙ্কনের চণ্ডীতে উহার উল্লেখ আছে তাহা দেওয়া গেল:—
“প্রভুর দোসর নাই উপায় কে কারে, কাটনার কড়ি কত যোগাব ওঝারে।
দাদনি দেয় এবে মহাজন সবে, টুটিল সূতার কড়ি উপায় কি হবে?
দু’পণ কড়ির সূতা, একপণ বলে, এত দুঃখ লিখেছিলা অভাগী কপালে।”
সেকালে বিদেশী ইউরোপীয় জাতিগণকে ফিরিঙ্গি বলিত ও তাহারা যেখানে থাকিত ও ক্রীত দাস দাসীর ব্যবসা করিত; লোকে সেখান দিয়া যাইবার সময় ভয়ে জড়সড় হইত। এদেশের স্ত্রী পুরুষ হরণের জন্য তাহাদিগকে হারাম বলিত। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে আভাস পাওয়া যায়ঃ—
“ফিরিঙ্গি দেশ খান বহে কর্ণধার, রাত্রিদিন বহে যায় হারামদের ডরে।”
সেকালের পর্ত্তুগীজেরা বাণ্ডেলে গির্জ্জা করিয়া এদেশের লোক জনকে জোর করিয়া খৃষ্টান ও সপ্তগ্রামের বাণিজ্য পোতাদি লুটপাঠ করিত। ধৃত স্ত্রীপুরুষ কলিকাতার জঙ্গলে লুকাইয়া রাখিত ও তাহারা ক্রীত দাস দাসীর ব্যবসা করিত। সেকালে ইউরোপের বণিকগণ স্বদেশ হইতে স্ত্রীলোকদিগকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিত না। তাহাদের সেবা শুশ্রূষা ঐ সকল নটীরা করিত ও তাহারা তাদের যত্নে মুগ্ধ হইত। তাহাতে সেই সকল ইউরোপীয় বণিকগণের যে সন্তানসন্ততি হইত তাহাদিগকে ফিরিঙ্গি বলিত। সেকালের নবাব বাদশাহরা ইউরোপের সুন্দরী স্ত্রীজাতির উপর অত্যাচার করে, সেই ভয়েই বা স্বাস্থ্যের জন্যই হউক, তাহাদিগকে এদেশে আনিত না, সেই জন্য তাহারা সেখানে থাকিত, সেখানে নটীরা ব্যবসা বেশ চলিত ও দালাল থাকিত। সেই সকল ইউরোপীয়গণের সহিত নটীগণের আলাপাদি করাইয়া ধোপা রতন সরকার নূতন ইউরোপবাসিদের ঘনিষ্টতার দোভাষীর কাজ করিবার অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিল। সেকালের তাঁতিরা তাহাদের সহিত তাহার আলাপ করিইয়া দিত। ইহাতেই সে বেশ রোজগার করিত ও সে সেখানে থাকিত, তাহার বাগান বলিয়া এখনও রাস্তায় তাহার নাম রহিয়াছে। অনেক ক্রীতদাসী আপনাদের স্বাধীনতা ইউরোপীয় বণিকগণের নিকট লাভ করিত ও মদের ব্যবসা করিত। সেকালে ইউরোপবাসিগণের জন্য জাভা ও বাটেডিয়া হইতে একরকম মদ আসিত; আর আরমেনিয়ানগণ এক আরক মদ বিক্রী করিত। বর্ত্তমান আরমানি গির্জ্জায় ১৬৩০ খৃষ্টাব্দের এক আরমানির সমাধি বর্ত্তমান রহিয়াছে। সেকালে আরমানি পর্ত্তুগীজ ও ওলন্দাজেরা তাঁতিদের সঙ্গে পাশাপাশি বাস ও ব্যবসা করিত। কয়লা ঘাটায় বর্ত্তমান মেটকাফ্হলের নিকট, তাঁতিরা থাকিত, বাঙ্কশাল ষ্ট্রীটের নিকট ওলন্দাজেরা, ক্যানিং ও আরমোনিয়ান ষ্ট্রীটের নিকট পর্ত্তুগীজ ও আরমানিরা থাকিত। ওলন্দাজেরা খিদিরপুর হইতে শৃকরালের খাল পর্য্যন্ত ভাগীরথিকে গভীর করিয়া বাণিজ্যেপযোগী করে ও উহাকে কাটি গঙ্গা বলিত। ঐখানে ওলন্দাজেরা কুতঘাটা মাশুল আদায় করিত, তাহাতেই তাহাদের ভাষানুযায়ী ব্যাঙ্কশাল রাস্তার নাম হইয়াছে। পর্ত্তুগীজদের যেখানে তুলার গুদামাদি ছিল, আজও তাহা আলুগুদাম বলিয়া পরিচিত। পর্ত্তুগীজ ভাষায় তুলাকে ‘অল’ বলে সেই অল গুদাম হইতে আলুগুদাম, বর্ত্তমান ক্যানিং ষ্ট্রীটের নিকটবর্ত্তীস্থান। অনেক পর্য্যটকগণ পর্ত্তুগীজদিগকে বনের পশুর মত বাস করিতে দেখিয়া গিয়াছে ও তাহারা যাহা ইচ্ছা তাহাই করিত, কাহাকেও কোন দৃক্পাত করিত না বলিয়াছেন।
ভবানীপুর।—ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারীর জামাতা ভবানিদাসের নাম হইতে ভবানিপুরের নাম হইয়াছে। ইনি কালীর সেবায়েত বর্ত্তমান হালদারদের পূর্ব্বপুরুষ। সেকালের কলিকাতা খাল বিল ও বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল, স্থানে স্থানে লোকালয় ছিল। ঐ সকল খাল বিলাদিতে কলিকাতাদি মহালের সীমানির্দ্দিষ্ট ছিল না। কলিকাতার স্থান সমূহের অবস্থা বিশেষের সঙ্গে ঐ সকল স্থানের নাম হইয়াছিল। যেমন মেছুয়াবাজার, পটুয়াটোলা, কসাইটোলা, ময়রাহাটা, নাপতেহাটা, কলুটোলা, বেনেটোলা, শাঁখারিটোলা, কাঁসারিপটী, হোগলকুড়িয়া, পার্শিবাগান, উল্টাডিঙ্গি, নারিকেলডাঙ্গা ইত্যাদি।
চৌরঙ্গী—চৌরঙ্গির মধ্যে দিয়া একটী খাল কালীঘাটে ও একটী হেষ্টিংস ষ্ট্রীটের মধ্য দিয়া ক্রীকরো ওয়েলিংটন হইয়া বেলিয়াঘাটা ধাপায় যায়। সেই খালে নামিবার সিঁড়ি ২৬ নং ক্রীকরোর বাড়ীতে বর্ত্তমান রহিয়াছে। সেকালে দিনের বেলায় একা কেহই চৌরঙ্গি জঙ্গলে ঢুকিতে সাহস করিত না। উহা হিংস্রজন্তু পরিপূর্ণ ছিল। ঐখানে চোর ডাকাতেরা কালীঘাটের যাত্রীদের দ্রব্যাদি লুটপাট করিত। ঐরূপ চোর বাগানে চোরেরা লুকাইয়া থাকিত ও সুবিধা পাইলে দিনেরাতে চুরি করিত। ঐ জন্য উহার নাম চোরবাগান হয় ইউরোপের নাবিকগণ ও এদেশের নটীসন্তান, ফিরিঙ্গিরা চৌরঙ্গীর জঙ্গলে তখন দস্যুর কার্য্য করিত। কোম্পানির সেরেস্তার কাগজে দৃষ্ট হয় যে, ঐরূপ চারজন দস্যুকে অতিকষ্টে ধরিয়া বিলাতে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের জীবনচরিত যার সর্ব্ব প্রথমে প্রকাশিত হয়, তাহাতে ইংরাজ গণকে ইঙ্গরাজ বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। চোর ইঙ্গরাজগণের আড্ডা হইতে চৌরঙ্গীর নমোৎপত্তি যুক্তিযুক্ত বলিয়া বোধ হয়। চৌরঙ্গি গৌরি সন্ন্যাসীর নাম হইতে উহার উৎপত্তি কবিকল্পনা ভিন্ন আর কিছুই নয়; কারণ ঐ ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে কোন সন্ন্যাসীর আশ্রম থাকা অসম্ভব, বিশেষতঃ তাহার কোন প্রমাণ বর্ত্তমান নেই। বর্ত্তমান মিডলটনরোর নিকট হরিণেরা খেলা করিত বলিয়া উহাকে “ডিয়ার পার্ক” বলিত। তাহাতেই পার্ক ষ্ট্রীটের নামোৎপত্তি হইয়াছিল।
সেকালের সীমানা।—ডিহি কলিকাতার পশ্চিমে ভাগীরথী, উত্তরে সুতানটী,—পূর্ব্বে তখনকার নোনা জলাভূমি বর্ত্তমান শিয়ালদহাদি ও দক্ষিণে গোবিন্দপুর ছিল। বর্ত্তমান টাঁকশাল হইতে বর্ত্তমান কষ্টম হাউস পর্য্যন্ত সমস্তই কলিকাতা, আর উহার উত্তরে বর্ত্তমান বাগবাজারের খাল পর্য্যন্ত সুতানটী, কলিকাতার দক্ষিণ খিদিরপুর ভবানিপুর পর্য্যন্ত গোবিন্দপুর ছিল। পুরাকালের স্মৃতি বর্ত্তমানের মধ্যে ডুবিয়া আছে, তাহা সেকালের কলিকাতা, সুতানটী ও গোবিন্দ পুরের সীমা উল্লেখ করার সঙ্গে চিত্রিত করা আবশ্যক। সেকালের কলিকাতার চারিদিকে কাঠের বেড়া দেওয়া ছিল। গঙ্গাতীরে ও ঐরূপ বেড়া ছিল ও মধ্যে মধ্যে আসিবার পথ ও ফট ছিল। আজকালের ফান্সিলেন ও ওয়লেসলী প্লেশের মোড় হইতে ঐ বেড়া আরম্ভ হইয়া লারকিন্স লেনের নিকট দিয়া ব্রিটিশ, ইণ্ডিয়ান ষ্ট্রীটে পৌঁছিয়াছিল। সেখান হইতে উহা বারেটো লেন, মাঙ্গো লেন, মিশনরোয়ে গিয়াছিল এবং সেখান হইতে বরাবর লালবাজার রাধাবাজার, এজরাষ্ট্রীট, আমড়াতলা ষ্ট্রীট, আম্মিনিয়ান ষ্ট্রীট, হামাম গলি, মুরগীহাটা, দরমাহাটা, খোংরাপটী, বন্ফিল্ডস্ লেন, রাজা উদ্মণ্ডষ্ট্রীট দিয়া গঙ্গার ধারে আসিয়াছিল। সেকালের পুরাতন কেল্লা বর্ত্তমানে কয়লাঘাট ষ্ট্রীট ও ফেয়ার্লি প্লেশের মধ্যে ছিল। উহার পশ্চাৎ পথের পর মালগুদাম ক্ষুদ্র ডক ও বাগান ছিল। বর্ত্তমান চর্চ্চ লেন ও হেষ্টিংস ষ্ট্রীটের মোড়ে চৌকা মাটির বরূজের উপর কামান সাজান থাকিত। গঙ্গার ধার হইতে ফান্সিলেনের মধ্যে তিনটি পুল ছিল। বর্ত্তমান সেণ্টজন গির্জ্জার নিকট একটি পুলের ধারে বারুদ ঘর ছিল।
ইংরাজী কোয়াটার।—কাপ্তেন পেরিনের তখন দুই তিন খানি বাণিজ্য জাহাজ ছিল ও তাঁহার বাগবাজারের নিকট একটী মনোরম বাগান ছিল। সেখানে সেকালের ইউরোপীয় বাসিন্দারা বেড়াইতে যাইত ও সেইজন্য সেইখানেও দুদশ ঘর ইউরোপের লোকেরাও থাকিত। লোকে মিশনরোকেও তখন রোপ ওয়াক বলিত। ১৭৪২ খৃষ্টাব্দে কলিকাতার যে নকসা হয়, তাহাতে ঐ সকল স্থান চিহ্নিত হইয়াছে। ১৭৫৩ খৃষ্টাব্দে উক্ত পেরিনের বাগান পঁচিশ হাজার টাকায় বিক্রি হয় ও উহা গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেণ হেষ্টিংসের প্রথম পক্ষের শ্বশুর কর্ণেল স্কটের হইয়াছিল। শেষে উহা কোম্পানির বারুদ খানা হইয়াছিল। আপজানের ম্যাপে ঐ স্থানের বিবরণ পুরাতন বারুদখানা, বাজার ও রাস্তা বলিয়া উল্লেখ আছে।
এইরূপে দেখা যায় যে, কলিকাতায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গবর্ণর জেনারেল হেংষ্টিস প্রভৃতির শ্বশুর বাড়ী বাগবাজার আদি স্থানে ছিল।
সেকালের সাহেব পল্লীর মধ্যে প্রায় আড়াই শত পাকা বাড়ী ছিল। সেকালের বাড়ীর হাতার মধ্যে পুকুর ও বাগান থাকিত। ঐ সকল ইউরোপ বাসিদের জন্য নিকটে মুরগীর হাট, তেলি, মুদি, মুচি কসাইদের বাস হাড়িটোলা ডোমটোলা জানবাজারের কাছে ছিল। তাহাতেই ঐ সকল জায়গার নাম ঐরূপ হইয়াছিল। কুমারের বাসন তাহাদের কাছে আসিত না বলিয়া কুমারটুলি দূরে পড়িয়াছিল। সেকালের ইংরাজী টোলায় উমিচাঁদ ও কোম্পানির দালাল রামকৃষ্ণ শেঠ বাস করিতেন। বর্ত্তমান মেটকাফ হলের স্থান কাপ্তেন ইউলসেরম্যাপে উক্ত শেঠের বাড়ী বলিয়া উল্লিখিত হয়। শেষে ঐখানে থাকিতে না পারায়, ঐ বাড়ী আমিয়ট সাহেবকে ভাড়া দেওয়া হয়। আর তখন বর্ত্তমান লিয়নস রেঞ্জে তিন খানি বাড়ী ছিল, উহার মধ্যে এক খানিতে উমিচাঁদ থাকিত। আজকাল যেখানে ফিনলে মিউরের অফিস, পূর্ব্বে সেইখানে থিয়েটার হইত। যেখানে হলওয়েলের বাড়ী ছিল, এখন সেইখানে ছোট আদালত, ও পুরাতন কোম্পানির টাঁকশাল যেখানে ছিল, সেইখানে ষ্ট্যাম্প ষ্টেশনারি অফিস হইয়াছে। যেখানে কোম্পানীর সোরার গুদাম ছিল, এখন সেইখানে এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক হইয়াছে। এখন যেখানে রয়েল এক্সচেঞ্জ হইয়াছে, সেইখানে লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেণ হেষ্টিংস, স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসের বাসস্থান ছিল। কোম্পানির গবর্ণর ক্রুটেনডেন সাহেবের বাড়ীই বর্ত্তমান ফোয়ার্লি প্লেশের প্রায় অধিকাংশ স্থল। তাঁহার গঙ্গার ধারে পাকা ঘাট বাঁধান ছিল। উহা পূর্ব্বোক্ত ম্যাপে দেখা যায়। গ্রিফিথস সাহেবের বাড়ীতে গ্রেহাম কোম্পানির অফিস ছিল। পাদরী বেলামির বাড়ীতে পূর্ব্বে কোম্পানির কালিকোপ্রিন্টারেরা থাকিত, শেষে ঐখানে বড়লাটের মিলিটারী সেক্রেটারী থাকিতেন। উহার সীমানা ও হাতা বর্ত্তমান ওয়েলস্লি প্লেশ ও ডালহাউসী স্কোয়ার পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কাউন্সিল হাউসে কোম্পানির পুরাতন সভাগৃহ ও ওল্ডকোর্টহাউস রাস্তায় কোম্পনির আদালতাদি ছিল। হেয়ার ষ্ট্রীটের মুখের সেকালের কোম্পানির হাঁসপাতাল ও সরকারী আস্তাবল ছিল।
বর্ত্তমান চিৎপুর রোড ও কলুটোলার মোড়ের বাড়ীতে হুগলীর ফৌজদারগণ মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তি করিত, সেইজন্য ঐস্থানের নাম “ফৌজদারী-বালাখানা” হইয়াছিল। বড়বাজার খোংরাপটীতে আর্ম্মানি গীর্জ্জা ও গোরস্থান তাহাদের সেকালের ঐ সকল ব্যবসায়ীদের বসবাসের স্মৃতিরক্ষা করিতেছে। কলিকাতায় সেকালে ব্যবসা ও গাছের নামে স্থানের নাম হইয়াছিল। যেমন সোনাপটি, তুলাপটি, দারমাহাটা, মরয়াহাটা, দরমাহাটা, মলঙ্গা, বটতলা, সিমূলিয়া ও ইটালী। ইটালীতে হিন্তাল গাছ ও বনজঙ্গল ছিল ঐ হইতে ইটালীর নাম হইয়াছে। *
যতদূর দেখা যায় সেকালের কলিকাতার উন্নতি চার শ্রেণীর লোকের দ্বারা হইয়াছিলঃ—যথা,
প্রথম। ইউরোপীয় বণিকগণ, তাহাদের কর্ম্মচারী, তাহাদের বংশধর আত্মীয়স্বজন ও দালালগণ।
দ্বিতীয়। স্বদেশী ও আরমেনি ব্যবসাদার মহাজন ও অন্যান্য সওদাগারগণ।
তৃতীয়। কোম্পানির সেকালের কর্ত্তৃপক্ষগণের প্রিয়পাত্র উমেদারগণ।
চতুর্থ। ভারতবর্ষের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর রাজা মহারাজাদের গুপ্তচর ও বাঙ্গালার জমিদারগণ।
পূর্ব্বেই সেকালের ইউরোপীয় বণিকগণ ও তাহাদের কর্ম্মচারী দালালদের কথা বলা হইয়াছে। এখন দ্বিতীয় ব্যবসাদারদের বাসস্থানের উল্লেখ করা যাইতেছে। তাহারা প্রায় সকলেই নিজ কলিকাতার মধ্যে বড়বাজারে থাকিত। সেকালের পুরাতন দুর্গের পাশ দিয়া একটি রাস্তা বড় বাজারে আসিয়াছিল। এখন যেখানে নঙ্গরেশ্বর মহাদেব আছেন, ঐখানে পূর্ব্বে মাল নামাইবার ঘাট ছিল। নঙ্গরের নীচে ঐ শিব ছিলেন, নঙ্গর তুলিতে গিয়া উহা পাওয়া যায় ও প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাহাতেই উঁহার ঐ নাম হয়। ব্যবসায়ীরা নঙ্গর ফেলিবার ও উঠাইবার সময় শিবের পূজা করিতেন। সেকালে ভাল ঘাটের অভাবে ব্যবসাদাররা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হইত, সেই জন্য তাহারা পাকা ঘাট গঙ্গার উপর করিয়াছিল; উহা সেকালের সেই সকল খ্যাতনামা ব্যবসায়ীর স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। উহা তখনকার ম্যাপে দেখিতে পাওয়া যায়। সেকালে সেইজন্য সাহেবদেরও ঘাট ছিল যেমন রস, বরেটো, জ্যাকশন, ব্লাইথার ইত্যাদি। বড় বাজারের ঘাটের পর যথাক্রমে কাশীনাথ, হুজরীমল, নয়ান মল্লিক ও বলরামচন্দ্রের ঘাট গোকুল মিত্র, গোবিন্দরাম মিত্র, মদন দত্ত, বনমালি সরকার, বৈষ্ণব দাস শেঠের ঘাট ছিল। ইঁহারা সকলেই নামজাদা ব্যবসাদার ও পুরাতন কলিকাতার বাসিন্দা। ১৭৯২ খৃষ্টাব্দের তালিকায় গঙ্গার ধারে বাগবাজার হইতে চাঁদপল ঘাট কম বেশ পঞ্চাশটি ঘাট হইয়াছিল। তাহার মধ্যে নগরের ও কোম্পানির ঘাট ও স্থান বিশেষের নামের ঘাট ছিল। হাটখোলার ঘাট হাটতলায় বলিয়া আছে। তাহাতেই মনে হয় যে কলিকাতার বাজারাদি হইবার পূর্ব্বে, নির্দ্দিষ্ট দিনে হাট বসিত, বা তখন যেখানে খোলা হাট থাকিত, অর্থাৎ যাহার, যে কিছু বিক্রয় করিতে হইত, সে ঐখানে তাহা করিত। কালে তাহাই বোধ হয় হাটখোলা নামে খ্যাত ও তাঁহার ঘাট হাট তলার ঘাট বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। বলরাম চন্দ্র বোধ হয়, মাড়েদের পুরুষ তাহার নামে ঐ ঘাট ছিল। দেওয়ান কাশিনাথ বাবুর শ্যামলিয়াজী, গোবিন্দরাম মিত্রের সিদ্ধেশ্বরী আদি দেবদেবীগণ সকল লোকের ভক্তি ও পূজা গ্রহণ করিয়া থাকে ও ঐ সকল দেবতা যেন একরকম সাধারণের হইয়াছে। আনন্দময়ীজীউ ও দেওয়ান রাধামাধব বন্দ্যোর পূর্ব্ব পুরুষগণের হয়, উহাও সেইরূপ। কলিকাতার আদিম অধিবাসিগণের দেবদেবী স্থাপনের অভাব নাই। দেওয়ান কাশীনাথ বাবুর পূর্ব্বপুরুষ লাহোরের মুলুক চাঁদ টণ্ডন সুন্দরবনের কাষ্ঠাদির ব্যবসা করিতেন, তিনি উক্ত নঙ্গরেশ্বর শিবের মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। ঐখানের সমস্ত জায়গা বর্ত্তমান তাঁহার বংশধরগণের মূল্যবান দেবতার সম্পত্তি। ঐ সকল মূল্যবান সম্পত্তি তখন অধিকাংশই গঙ্গাগর্ভে ছিল। হুজরীমল ও মল্লিকেরা পাশাপাশি থাকিত ও তাহাদের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব ছিল। উক্ত হুজরীমল ইতিহাস প্রসিদ্ধ উমিচাঁদের পরম আত্মীয় শ্যালক ছিলেন। নয়ান চাঁদ মল্লিক ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে মল্লিক বংশের মধ্যে কলিকাতায় প্রথম জন্ম গ্রহণ করেন। ইহার পিতামহ রাজারাম মল্লিক ত্রিবেণী ত্যাগ করিয়া কলিকাতায় বাসারম্ভ করেন ও তাঁহারই পরামর্শে জব চার্ণক কলিকাতায় আসিয়া নবাবের কর্ম্মচারীগণের অত্যাচার হইতে কোম্পানিকে বাঁচাইয়াছিলেন। রাজারাম ইউরোপীয় বণিকগণ ও দেশীয় বণিক গণের সহিত ব্যবসা করিতেন ও পুরুষানুক্রমে ধনী ছিলেন। ইঁহাদের পূর্ব্বপুরুষ বনমালী, কৃষ্ণদাস প্রমুখ সকলেই ব্যবসায় প্রভূত ধনোপার্জ্জন করিতেন ও সপ্তগ্রামে থাকিতেন। ইঁহারা সকলেই নবদ্বীপ, কাঁচড়াপাড়া কাশী প্রভৃতি স্থানে সদাব্রত দেবমন্দিরাদি দ্বারা আপনাদের বৈশ্য রাজবংশের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখিয়া গিয়াছেন। নয়ান চাঁদের পিতা দর্পনারায়ণ ধর্ম্ম কর্ম্মে ব্যাপৃত থাকিতেন। দর্পনারায়ণের কনিষ্ঠ সন্তোষ কুমার মল্লিক, যেমন ব্যবসা বাণিজ্য করিতেন, তেমনি তাঁহারও কোম্পানির সেরেস্তায় বিশেষ সম্মান ছিল। তিনি কলিকাতায় সন্তোষ বাজার নিজ নামে স্থাপন করিয়া সেকালের কলিকাতাবাসীদের অভাব মোচন করিয়াছিলেন। তাঁহারই কথায় কোম্পানি বাজারাদির পরিদর্শক কর্ম্মচারি বহাল করিত। নন্দরাম সেন কোম্পানির টাকা কড়ি ভাঙিয়া পলায়ন করিলে, জনৈক রামভদ্র নামক ব্যক্তি সন্তোষ মল্লিকের কথায় ঐ চাকরি পাইয়াছিল। ইহা কোম্পানির সেরেস্তায় দেখা যায়। এখনও নটীরা রাম ভদ্র খুড়োর নামে জ্বলিয়া যায়। ইহার মধ্যে কি রহস্য আছে, তাহা সহজেই নির্ণয় করা যায়। সেকালের কোম্পানির আয় ব্যয়ের হিসাবে বড় বাজার ও সন্তোষ বাজারের নামোল্লেখ আছে। পূর্ব্বোক্ত বাজার পরিদর্শকের স্মৃতি নন্দরাম সেনের রাস্তায় ও শিবমন্দিরে রক্ষা করিতেছে। সেকালের মল্লিকেরা কলিকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী ও তাহার উন্নতি কর্ত্তা। সেকালের নামজাদা বাঙ্গালীরা সকলেই তাঁহাদিগকে সম্মান করিত। সকলেই মল্লিকদের পূর্ব্বপুরুষের কুলদেবী সিংহবাহিণীর পূজা সেকালে ও এখন করিয়া থাকে। এই দেবীমূর্ত্তি বাঙ্গালার মূর্ত্তির ন্যায় উলঙ্গ নয়। অতি প্রাচীন জাতির বস্ত্র পরণের ধাঁজে ইঁহার নিম্নাঙ্গ মাত্র আবৃত, ঐ মূর্ত্তির মস্তক ধাতুময় মুকুট রাজ গৃহলক্ষ্মীর চিহ্ণ ধারণ করিয়া আছে। ভ্রমক্রমেই, উঁহাকে রাজা রাজ্যবর্দ্ধনের পরিবর্তে মানসিংহের গৃহদেবী বলিয়া থাকেন। রাজা মানসিংহ উহাকে লইয়া যাইবার চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য্য হইয়াছিলেন বলিয়া লোকে ঐরূপে ভ্রমে পতিত হন। ঐরূপ কলিকাতায় বিষ্ণুপুরের রাজার কুলদেবতা মদনমোহন জিউও গোকুল মিত্রের বাসস্থান বাগবাজারে বিদ্যমান আছেন। সেকালে দেবতার মন্দির সাধারণের পূজাদি ও ভক্তি উৎকর্ষের জন্য উন্নতিশীল হিন্দুমাত্রেই নির্ম্মাণ ও ক্রিয়াকর্ম্ম করিত। খৃষ্টান ও মুসলমানদিগের গির্জ্জায় ও মসজিদে প্রার্থনাদি করা ও হিন্দুর মন্দিরে বিখ্যাত দেবদেবীর শ্রীচরণে ভক্তি স্তোত্রপাঠ ও পূজা করার উদ্দেশ্য একই। উহাতে পৌত্তলিকতা কিছু মাত্র নাই। উহা জীবন্ত বা মৃত মানবের আদর্শ পূজা করা অপেক্ষা শতাংশে শ্রেয়স্কর। স্মরণাতীত কাল হইতে জাতিজীর্ণ হিন্দুর ধর্ম্ম প্রচার ও রক্ষা দেবদেবীর ও দেবালয় হইতেই হইয়া আসিতেছে। আত্মবিস্তৃতেই সাধারণের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করা যায়। আর আত্মসংকোচই দাসত্বের মূল কারণ। গ্রামের লোকের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়া আপনার পরিবারবর্গের সুখ স্বচ্ছন্দতা বাড়ালেই আত্ম সংকোচেরই উদাহরণ হইয়া পড়ে। আর তাহা না করিয়া, নিজের উপার্জ্জিত ধন পুত্র কলত্রের ভরণপোষণের সঙ্গে দেবদেবীর পূজা উৎসব, আহার, বিহার, যাত্রা ও মহোৎসব করা প্রাচীন আর্য্যজাতির উন্নতির আদর্শ। সর্ব্ব সাধারণের সমক্ষে সেই প্রীতির ছবি ধরিয়া নিজের শক্তি দশের সহিত সঞ্চার করিলেই আত্মবিস্তৃতি। অতি প্রাচীন ব্রহ্মধারণা—সেই আত্মশক্তির বিস্তারের উপরই তখন সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়াছিল তাহাতেই ব্রাহ্মণ, মুকুটমণি, আর শূদ্র দাস ও অনার্য্য। পরোপকার লক্ষ্য হইলেই বুদ্ধের জন্ম হয়, আর আত্মসেবায় চিত্ত প্রবৃত্তি পর্য্যাপ্ত করিতে গেলে, নাদির শাহ, নীরোর আবির্ভাব। মানুষ যতক্ষণ স্বার্থের আকুঞ্চন ক্রিয়ার বশীভূত, ততক্ষণ তাহার সমাজ বন্ধন জাতিভেদ বিদ্যমান থাকে, আর যাই ধর্ম্মের প্রসারণ ক্রিয়া আরম্ভ হয়, অমনি তখন তিনি আপামর সকলকেই আলিঙ্গন করিতে চান, প্রতিহিংসা আসে না, ক্ষমা আপনা হইতেই আসিয়া পড়ে। তাহাতেই যিশু খৃষ্ট ঈশ্বরের সুসন্তান—উন্নতিশীল জাতির আরাধ্য, আর গৌর নিতাই মহাপ্রভু প্রেমের অবতার। তাহাতেই জগাই মাধাই মুক্ত ও ব্রাহ্মণ ডোম মুসলমান বৈষ্ণব হইয়াছিল। এই আত্মবিস্তৃতি লাভের জন্যই আকবর প্রতাপাদিত্য কেহও কোন ধর্ম্মকে ঘৃণা করিতেন না, সকলের উপাসনা গৃহ ও মন্দিরাদি করিবার অনুমতি দিতেন। হিন্দুর উপাসনা ও ধর্ম্ম যে কি, তাহা সংক্ষেপে উল্লেখ করা আবশ্যক, তাহা না করিলে তদ্বিপরীত কাল ধর্ম্ম যে কি, তাহা উপলব্ধি করা যাইবে না। দুঃখমোচনই মনুষ্যজীবনের লক্ষ্য। সুখ দুঃখ দেহীর অভাবে দেহ ভোগ করিতে পারে না অর্থাৎ মৃতদেহ সুখ দুঃখ যে কি, তাহা সে জানে না। মৃতদেহ মানুষ হয় পোড়াইয়া, নয় পুঁতিয়া ফেলে। দেহীর অভাবে উহা থাকে না ও উহা কোন কাজেই আসে না, বরং দুঃখ দায়ক হইয়া পড়ে। ইহাতে দেখা যায় যে, সংসারের সুখ দুঃখ দেহীই ভোগ করে, দেহ করে না। সুখ দুঃখ অনুমেয় মাত্র, ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উহা হইয়া থাকে, কিন্তু ঐ সকল ইন্দ্রিয় বা দেহ তাহা ভোগ করে না। সেই সূক্ষ্মদর্শী মহাত্মারা ভোগকে কর্ম্মের অনুসঙ্গ করিয়া কর্ম্মে পরিচিত করাকেই ধর্ম্ম বলিয়াছেন। উহা ভোগ মোহময় লালসাতৃপ্তির জন্য নয়, ধর্ম্মের নিমিত্ত প্রশস্ত। ইহার জন্য ধর্ম্মলাভের মূলে পানাহার স্নানাচমণ কীর্ত্তনাদি শারীরিক, শ্রবণ স্মরণাদি মানসিক ও ধ্যান ধারণাদি আধ্যাত্মিক উপাসনাদি ও বিবাহাদি দ্বারা ধর্ম্ম লাভের ব্যবস্থা। মানুষ যখন আপনাকে ভুলিয়া পরের জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়ে, তখনই তাহার দেবত্ব, তখন হয় সে রাজা রামচন্দ্র, হরিশচন্দ্র, নয় সে ব্যাস, বুদ্ধ, শঙ্করাচার্য্য। আর যখন সে নিজের উদর পূর্ণ করিতে চায়, তখন সে পশুরাজ নাদিরশাহ, নয় সেকেন্দর। এই পরার্থ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বেই স্বর্গ নরক ও ঘোর কলির সৃষ্টি। এই উভয়ের পরস্পর সামঞ্জস্যেই সমাজ ও জাতির সৃষ্টি! মানব চরিত্র সংগঠন ও সঞ্চালন ধর্ম্মের আদর্শেই হইয়া থাকে। সেই নিমিত্ত ব্যাস বাল্মীকির আদর্শ দেবত্ব লাভ করিয়াছে। খৃষ্টান মুসলমান মহম্মদ যিশুর জন্ম ও মৃত্যু ধর্ম্মের অঙ্গ করিয়া সর্ব্বদাই উৎসবাদি করিয়া থাকে। পশুরা ধর্ম্মাধর্ম্মের কোন ধারই ধারে না, মানুষ যখন সেইরূপ হইয়া পড়ে, তখনই ধর্ম্মবীর মহম্মদের আবির্ভাব। শিক্ষার অভাবে বলের দ্বারা মানুষকে সমাজভুক্ত ও বশীভূত ও একত্রিত করা, এক হস্তে কোরাণ ও অপর হস্তে তরবারি ব্যতিরেকে করিতে পারা যায় না। সেইখানে অভ্যাস ও আচারই ধর্ম্মপ্রাপ্তির সোপান, উহাতেই ঈশ্বরে বিশ্বাস ও আত্মতৃপ্তির সৃষ্টি। তাহাতেই হিন্দুর সন্ধ্যা গায়ত্রী মুসলমানের নামাজ, খৃষ্টানের ঊপাসনা—বেদ, কোরাণ, বাইবেল অভ্রান্ত ভগবদ্বাক্য। যাহা তাহার অনুমত, যাহা পূর্ব্বপুরুষগণ মানিয়া আসিয়াছে, তাহাতেই আত্মপ্রসাদ লাভ হয়। এই সহজ জ্ঞানের পূজায় পাদরী ক্রানমার অবলীলাক্রমে অগ্নিতে ভস্মীভূত হইয়াছিল। পূর্ব্বে অবলীলাক্রমে হিংস্র ক্ষুধার্ত সিংহব্যাঘ্রের উদরে খৃষ্টানগণের স্ত্রী পুত্র পরিবারকে, ঐ ধর্ম্ম যাহাতে সকলে গ্রহণ না করে, সেই জন্য রোমের রাজারা সাধারণের চত্বরে প্রকাশ্যভাবে দান করা, পুণ্য ও ধর্ম্ম মনে করিত। ধর্ম্মের প্রাণ ও ভিত্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস, ভয় ও ভক্তিতে। তাহাতেই লোকের আত্মপ্রসাদ, তাহাতেই কঠোর কর্ত্তব্যসাধনই ধর্ম্ম। কিন্তু কর্ম্মে দাসত্ব ও জ্ঞানে মুক্তি। যতক্ষণ জ্ঞান না হয় ততক্ষণ মানবকে কর্ম্ম করিতে হইবে। কলিকাতার প্রাচীন দেবদেবীর আবির্ভাব, আগমন ও পূজার উৎসবাদিতে বাঙ্গলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানের নরনারী সেখানে আসিত ও ক্রমে ক্রমে বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছিল।
লাল দিঘিঃ— জমিদার সাবর্ণ চৌধুরীরা কলিকাতা বা তন্নিকটবর্ত্তী স্থানে থাকিতেন না, কেবল তাহাদের কাছারি বাড়ী লাল বাজারে ছিল। কালীঘাটের শ্যামরায় উক্ত সাবর্ণ চৌধুরীদের কুলদেবতা। উহাঁকে ঐ কাছারী বাড়ীর নিকট রাখা হইত ও ঐখানে দোলের উৎসব মহাসমারোহে করা হইত। ঐ সময় সেইখানে হাটবাজার বসিত, তাহাতেই লালবাজার রাধাবাজারাদির ও দিঘির জল আবিরে লাল হইত বলিয়া ঐ সকল নাম হইয়াছিল। আদম সোমারির কর্ম্মচারী মিঃ এ, কে, রায় অনুসন্ধানের দ্বারা উহা জানিয়াছেন প্রকাশ করেন। ঐ সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছারির কর্ম্মকর্ত্তা শোভাবাজার রাজাদের পূর্ব্বপুরুষ রুক্মিণিকান্ত তিনি রাজা নবকৃষ্ণের প্রপিতামহ। কেশব রায়ের নাবালক অবস্থায় ঐ কার্য্য করিয়া নবাবের মনতুষ্টি করিয়া “ব্যবহর্ত্তা” উপাধি লাভ করিয়াছিলেন। চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী ও সর্ব্বমঙ্গলা রাজা টোডরমলের রাজস্বের মুহুরী মনোহর ঘোষের স্থাপিত। তিনি ডাকাতের উৎপাতে ঐ সকল দেবীত্যাগ করিয়া বারাকপুরে চন্দন পুকুরে থাকিতেন। * শেষে চিতে ডাকাত ঐ দেবীর সমক্ষে অনেক নরবলি দান করিয়া বিখ্যাত হইয়াছিল। উক্ত মনোহর ঘোষ—দেওয়ান শ্রীহরি ঘোষ ও বারাণসী ঘোষের পূর্ব্বরুষ। ইহাদের সহিত রাজা নবকৃষ্ণের কুটুম্বিতা হইয়াছিল। কলিকাতায় হরিঘোষের গোয়াল প্রবাদ বাক্য ও বারাণসী ঘোষের নামে রাস্তা আছে। ঐরূপ হাটখোলায় দত্তেরা বালিতে থাকিতেন ও মদনদত্তের বৃহৎ শিব মন্দির এখনও নিমতলায় আছে। উঁহারা বড়ই অভিমানি ছিলেন ও তাহাতে এখনও লোক কথায় কথায় বলে অভিমানে ‘বালির দত্ত যান গড়াগড়ি’। আর একজন দত্তের নামে কলিকাতার রাস্তা আছেঃ— কালি প্রসাদ দত্ত, রাজা নবকৃষ্ণের প্রতিবাসি ও প্রতিদ্বন্দী চূড়ামণি দত্তের বংশধর। চূড়ামণি দত্ত সেকালের খাঁটি হিন্দুয়ানির বড়ই পক্ষপাতী ছিলেন। সেইজন্য তিনি রাজা নবকৃষ্ণকে নানারূপ উপহাস করিতেন। রাজা নবকৃষ্ণের ছেলেরা সেই শোধ তাহার শ্রাদ্ধের সময় তুলিবার বিধিমত চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই।
কালীঘাটের বর্ত্তমান মন্দিরাদিঃ— তখন কালী প্রসাদ দত্তকে সাবর্ণ চৌধুরীদের কেশব রায়ের পুত্র সন্তোষ রাম পঁচিশ হাজার টাকায় কালীঘাটের বর্ত্তমান মন্দির নির্ম্মাণের প্রস্তাব করেন, তাহাতে সুচতুর কালীপ্রসাদ সম্মত হইয়া তাহাই করেন। সন্তোষ রায় তাঁহার অনুগত কালীঘাটের যাবতীয় ব্রাহ্মণদিগকে চূড়ামণি দত্তের শ্রাদ্ধে আনিয়া দত্তদের মান রক্ষা করিয়াছিলেন। বর্ত্তমান কালীর মন্দির সন্তোষ রায় আরম্ভ করিয়া যান ও তাঁহার পুত্র ১৮০৯ খৃষ্টাব্দে উহা শেষ করেন। ঐ সময়েই রাজা বসন্ত রায়ের পুরাতন মন্দির ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়। সাবর্ণ চৌধুরীরা ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দের পর কেশব রাম নিমতা বিরাটী হইতে বড়িশায় আছেন। বর্ত্তমান শ্যাম রায়ের মন্দির বাওয়ালীর জমিদার দিগের পূর্ব্বপুরুষ ৺উদয় নারায়ণ মণ্ডল ও সাহা নগরের ৺মদন কলে উহার সমুখের দোলমঞ্চটী প্রস্তুত করাইয়া দেয়। আর তারা সিংহ নামে একজন ধনী শিখ ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রস্তর দিয়া নকুলেশ্বরের মন্দির প্রস্তুত করাইয়া দেন।* পূর্ব্বোক্ত মল্লিক বংশের কালী চরণ মল্লিক কালীদেবীর ভূকৈলাশের রাজাদের দেওয়া রূপার চার হাত সোনার করিয়া দেন পাইকপাড়ার রাজাদের ইন্দ্র নারান সিং সোণার জিহ্বা, বেলিয়া ঘাটার চালের মহাজন রাম নারায়ণ সরকার স্বর্ণ মুকুট, চড়ক ডাঙ্গার রামজয় বন্দ্যোপাধ্যায় চারিটী স্বর্ণ কঙ্কন, এবং নেপাল রাজ্যের প্রধান সেনাপতি স্যর জঙ্গ বাহাদুর মস্তকের স্বর্ণ ছত্রটি দিয়াছিলেন। ইহাতেই দেখা যায় যে, সাবর্ণ চৌধুরীরা দেবীর সেবা, অলঙ্কার বা মন্দিরাদি জমিদারী লাভ করিয়া কিছুই করেন নাই, বা সেইখানে সেই সময় হইতে বাস আরম্ভ করেন নাই। তাহাতেই বোধ হয়, তাঁহারা দেবীর সেবা হইতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন। পূজক হালদারেরাই দেবীকে পূজাদি করিয়া ঐ স্বত্ত্ব পাইয়াছিল। লাট মন্দির আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায় ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে করিয়া দেন। নহবত খানা ভোগ ঘরাদি সমস্তই ভক্তেরা করিয়া দেয়।
আধুল, কাশিম বাজার, নশীপুর, বর্দ্ধমান, ভুকৈলাস, পাইকপাড়া প্রভৃতি সেকালের বিদেশী বণিকগণের সোনার কাঠি রূপার কাটিগণকে কলিকাতায় থাকিতে হইত ও তাহাদের যথেষ্ট মূল্যবান সম্পত্তি এখনও বর্ত্তমান আছে। বহুদিন হইতে বাঙ্গালা পলাতক রাজা, নবাব, রাজপুত্র ও সাহাজাদাগণের নিরাপদ আশ্রয় স্থল হইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে কলিকাতাও সেইরূপ হইয়াছিল। সেইজন্য ঐখানে যে সকল ষড়যন্ত্রাদি হইত, তাহার তত্ত্বানুসন্ধানের জন্য প্রায়ই কলিকাতায় গুপ্তচর থাকিত ও তাহারা কলিকাতার জনরবাদি পর্য্যন্ত ও ভারতের সর্ব্বত্র রাজা মহারাজা নবাব ও সম্রাটকে পাঠাইয়া দিত। এ কথা সেকালের কোম্পানির সেরেস্তায় পরিষ্কার লেখা আছে। তাহাতেই কলিকাতার নামও জাহির হইয়াছিল। ঐ সকল সংগ্রহের জন্য কতকগুলি লোক ও কর্ম্মচারী বিশেষরূপে পুরস্কৃত হইত। তাহারা কোম্পানির বিশ্বস্ত কর্ম্মচারী বা অনুগত প্রিয়পাত্র ছিলেন। পৃথিবীতে যত রকম ব্যবসা আছে, তাহার মধ্যে ইহাতে যেমন অতি অল্প সময়ের মধ্যে অধিক লাভ হইত, তেমন আর কিছুতেই হইত না। যাহারা একবার ঐ রোজগার করিয়াছে, তাহারা উহা করিবার জন্য সর্ব্বদাই ব্যস্ত থাকিত ও সুযোগ অনুসন্ধান করিত। সেইজন্য উমিচাঁদ প্রমুখের বাড়ী বাগান কলিকাতায় ছিল ও সর্ব্বদাই ইউরোপবাসী বণিকগণের সন্নিকটে থাকিতে হইত। তাহাদের অধীন অনেক গুপ্তচর থাকিত, যাহাদের মারফত কোম্পানির কর্ম্মচারিগণ অর্থ সাহায্য লাভ করিত ও তাহাদের অন্তরের কথা মত্ততাবস্থায় নটীদিগের দ্বারা বাহির করাইয়া লইত। আরও ইউরোপীয় বণিকগণও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুবিধা করিবার জন্য ঐরূপ করিত। সেইজন্য কলিকাতায় ঐরূপ আড্ডা ও বাগানবাড়ীর অভাব ছিল না। বর্ত্তমান বেণ্টিঙ্ক ষ্ট্রীটের ধারে ঐরূপ বহুবাগান ছিল ও স্থানে স্থানে সর্ব্বত্রই ঐরূপ মদ ও খাবার আড্ডায় সেকালের ফিরিঙ্গী রূপসীরা থাকিত। ইহাতেই সাবর্ণ চৌধুরীদের আম্মোক্তার আণ্টুনি সাহেবের সঙ্গে জব চার্ণক প্রমুখের রসিকতা হইত। তাহার সহিত চাবুক লইয়াও রঙ্গরস হইত—কোম্পানির কর্ম্মচারিগণকে লালবাজারে সাবর্ণ চৌধুরীদের দোলের উৎসবে যোগদান করিতে না দিয়া, জব চার্ণকের প্রাণের আন্তরিকতায় উপহাস কথা “চাবুক মারিয়া লাল করা” কার্য্যে পরিণত হইয়াছিল। তাঁহার পিঠে চাবুক পড়িয়াছিল ও সেই লজ্জায় তিনি কলিকাতা ছাড়িয়া কাঁচড়াপাড়ায় চলিয়া যান। আন্টুনির বাগানের স্মৃতি ঐ নামের রাস্তায় বর্ত্তমান রহিয়াছে। উহার নামে হাটও ছিল। উহার পৌত্র একজন কবি ও একজন কেলি সাহেব সেকালের অর্থশালী ক্ষমতাবান পুরুষ ছিলেন। কবি আন্টুনি কলিকাতার বিখ্যাত কবিওয়ালা। সে এক কুলটা ব্রাহ্মণীর প্রেমে হিন্দু হইয়াছিল। সে যে কালীভক্ত ছিল, তাহা তাঁহার গানে প্রকাশ পায়। সেকালের ফিরিঙ্গিদের আভিজাত্য গৌরব ছিল। ঠাকুর গোষ্ঠির দ্বারকানাথ প্রমুখ শেরবোর্ণ সাহেবের স্কুলে পড়িয়াছিলেন। ঐ সকল ছাত্রদিগের নিকট শেরবোর্ণ আপনাকে ব্রাহ্মণের দৌহিত্র বলিয়া পূজার বার্ষিক আদায় করিতেন। বৌবাজারে ফিরিঙ্গিরা যে কালীর পূজা করিত, তাহাকে লোকে ফিরিঙ্গি কালী বলে। তাহাদের ব্রাহ্মণী উপপত্নীর নিকট হিন্দু ধর্ম্মের উপদেশ ও ভক্তি শিক্ষা আদি করিত। উহাতেই কবি আন্টুনির কবিত্বে হিন্দু সমাজ তখন বড়ই আনন্দিত হইত। উহার উদাহরণ স্বরূপ নিয়ে হিন্দু ও ফিরিঙ্গি কবির প্রশ্ন উত্তর দেওয়া গেল। উহাতে সেকালের ফিরিঙ্গিদের হিন্দু ধর্ম্মের প্রতি কিরূপ ভাব ও ভক্তি ছিল প্রকাশ পায়। সেকালে কবিরা পরস্পর উত্তর প্রত্যুত্তর বেশ আসর জমকাইত। যথাঃ—
প্রশ্ন— “বল হে এন্টুনি, একটী কথা জান্তে চাই
এসে, এ দেশে, এ বেশে, তোমার গায়ে কেন কুর্ত্তি নাই।”—রাম বসু
উত্তর— “এই বাঙলায়, বাঙালীর দেশে, আনন্দে আছি
হ’য়ে ঠাকুর সিং এর বাপের জামাই, কূর্ত্তি টুপি ছেড়েছি।”—আন্টুনি
প্রশ্ন— “সাহেব! মিথ্যে তুই কৃষ্ণে ভজে মাথা মুড়োলি
পেলে শুনতে পাদরী, দেবে মুখে চুণকালি।”—রাম বসু
উত্তর— “খৃষ্টে আর কৃষ্ণে নাই রে কিছু ভিন্ন ভাই
নামের ফেরে ভোলে মানুষ, ফিরিঙ্গি তা বই আর নয় কিছুই।”—আন্টুনি
দেবীর উপর ভক্তির উক্তিতে আপনাকে ফিরিঙ্গি জাতি বলিয়া পরিচয় দিতেছে—
“ভজন সাধন জানি নে মা, জেতেও ফিরিঙ্গি
পায়ে রাখ করে কৃপা, ওমা শিবে মাতঙ্গি।”—আন্টুনি
ফিরিঙ্গিঃ— পারস্য ভাষায় সাধারণতঃ ইউরোপীয়গণকে ফিরিঙ্গি বলে। এ দেশে খ্রীষ্ট ধর্ম্মাবলম্বী বর্ণসঙ্কর জাতি বিশেষকে ফিরিঙ্গি বলে। * সেকালে এই ফিরিঙ্গি কথা লইয়া মামলাও হইয়াছিল। সাবর্ণ চৌধুরীদের আম্মোক্তার আন্টুনি পর্ত্তুগীজ ছিল। সেকালে ফিরিঙ্গিরা হিন্দুদ্বেষী ছিল না, তাহারা সকলের সহিত মেলামেশা করিত। শেষে তাহারা যখন হিন্দুদের উপর অত্যাচার আরম্ভ করে ও ব্রাহ্মণের বিধবাদিগকে প্রলুব্ধ করিতে থাকে, তখনই তাহারা পৃথক হইয়া পড়ে। কবি ভারতচন্দ্রের কবিতায় বিদ্যাসুন্দরের পুরবর্ণন আছে, তাহাতে তাহাদের নাম গন্ধ কিছুই নাই। যথাঃ—
“ইরাকী, তুরকী তাজী আরবী জাহাজী
হাজার হাজার দেখে থানে বান্ধা বাজী।”
জাতিঃ— ভারতচন্দ্রের সময় সেকালের হিন্দু সমাজের জাতি বিশেষের পরস্পর কিরূপ মর্য্যাদার স্থান ছিল, যাহা লইয়া এখন আদম সোমারির সময় বড়ই পরস্পর মনান্তর ও গ্রন্থাদির দ্বারা জাতির উচ্চ নীচতার বিচার হয়, তাহা নিম্নে দেওয়া গেল। উহাতে কোন জাতির কি ব্যবসা ছিল, তাহাও নির্ণয় করা যায়। কারণ, বলা বাহুল্য যে সমাজপতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সমাজের অনুমোদিত কথাই ভারতচন্দ্রের গ্রন্থে স্থান পাইয়াছে।
“ব্রাহ্মণ মণ্ডলে দেখে বেদ অধ্যয়ন, ব্যাকরণ অভিধান স্মৃতি দরশন
ঘরে ঘরে দেবালয় শঙ্খ ঘণ্টা রব, শিবপুজা চণ্ডীপাঠ যজ্ঞ মহোৎসব।
বৈদ্য দেখে নাড়ী ধরে কহে ব্যাধি ভেদ, চিকিৎসা করয় পড়ে কাব্য আয়ূর্ব্বেদ।
কায়স্থ বিবিধ জাতি দেখে রোজগারি, বেণে মণি, গন্ধ, সোণা, কাঁসারি, শাঁখারি।
গোয়ালা, তামুলী, তিলি, তাঁতী, মালাকার, নাপিত, বারুই, কুরী, কামার, কুমার।
আগরি প্রভৃতি আর নাগরি যতেক, যুগি, চাষা, ধোবা, কৈবর্ত্ত অনেক।
সেকরা, ছুতার, নুড়ী, ধোবা, জেলে, গুঁড়ী, চাঁড়াল, বাগ্দী, হাড়ী, ডোম, মুচী, শুঁড়ী।
কুরমী, কোরঙ্গা, পোদ, কপালি, তিয়র, কোল, কলু, ব্যাধ, বেদে, মালি, বাজিকর।
বাইতি, পটুয়া, কান, কসবি যতেক, ভাবক ভক্তিয়া ভাঁড় নর্ত্তক অনেক।”
কলিকাতায় সেকালে যেখানে যে জাত থাকিত, সেইখানে তাহাদের নাম উল্লেখ আছে যেমন বেনে টোলা, শাঁখারি টোলা, কাঁসারি পাড়া, জেলে টোলা, তিলি পাড়া, কুমারটুলি, চাষাধোপা পাড়া, সেকরা পাড়া, হাড়ী টোলা, ডোম টোলা, মুচী পাড়া, শুঁড়ী পাড়া, কপালি টোলা, কলু টোলা, পটুয়া টোলা ইত্যাদি। তখন কলিকাতায় এই সকল জাত ছাড়া অন্য জাত ছিল না বলিয়া বোধ হয়। পিরালি জাতির কোন উল্লেখ নাই—অথচ জয়ানন্দের চৈতন্য মঙ্গলে দেখা যায় যে, পিরল্যা গ্রামের পিরালিরা যবন বিশেষ ও ব্রাহ্মণের উপর বড়ই অত্যাচার করিতঃ—
“পিরুল্যা গ্রামেতে বৈসে যতেক যবন, উচ্ছন্ন করিল নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ।
কপালে তিলক দেখে যজ্ঞ সূত্র কাঁধে, ঘর দ্বার লোটে আর লৌহ পাশে বাঁধে”
পিরালী ধর্ম্ম প্রতাপাদিত্যের জন্মের প্রায় একশত বৎসর পূর্ব্বে খানজা আলি নামে একজন ঈশ্বর পরায়ণ মুসলমান বাগের হাট মহকুমায় প্রচার করিয়াছেন। তিনি হিন্দু মুসলমান উভয় জাতির সম্মিলন করিবার নিমিত্ত ঐ ধর্ম্ম প্রচার করেন। এই ধর্ম্মের নাম পিরালি হইবার কারণ গবর্ণমেন্টের স্মৃতি স্তম্ভের খোদিত লিপির পুস্তক হইতে জানা যায় যে, খানজা আলির মৃত্যুর পর তাঁহার প্রিয় শিষ্য মহম্মদ তাহীর পিরালী নাম গ্রহণ করিয়া গুরূর মন্তব্য কার্য্যে পরিণত করেন। শাস্ত্রী মহাশয় প্রতাপাদিত্যের জীবন চরিতে যশোর জেলায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, নাপিত পিরালী দেখিয়াছেন। তিনি ২৮ শে এপ্রেল ১৮০৯ খৃষ্টাব্দের কোম্পানির রেগুলেসন ছাপাইয়া দেখাইয়াছেন, যে যেখানে জাতি বিচার নাই সেই শ্রীক্ষেত্রের জগন্মাথদেবের মন্দিরেও তাহাদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। কলিকাতার পিরালীরা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যকালে বা তাহার পরে কলিকাতার গোবিন্দপুরে আসেন। তাহাদের বংশের মধ্যে ব্রাহ্মধর্মের একরূপ প্রবর্ত্তক মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর, জগদ্বিখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ, রাজনৈতিক দ্বারিকানাথ, রাজবল্লভ যতীন্দ্রমোহন বংশ পরম্পরা মহারাজা উপাধি সৃষ্টি করিয়া কলিকাতার শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছেন। প্রবাদ যে, মহারাজ স্যর যতীন্দ্র মোহনের উদ্বোগে রায় সাহেব নগেন্দ্র নাথ বসু পিরালী ব্রাহ্মণ বিবরণ প্রকাশিত হয়, কিন্তু তাহাতে শাস্ত্রীর কথা বা দ্বারিকানাথের জীবন চরিত লেখকের কথা, বা বিশপ হিবারের কথার কোন মীমাংসা করা হয় নাই, ইহা বড়ই দুঃখের বিষয়। ইঁহারা ভট্ট নারায়ণের বংশধর বলিয়া প্রমাণ করিতে গিয়াছেন। উক্ত বংশ হইতে রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র, রাজা রামমোহন রায়, ও নল ডাঙ্গার রাজারা সম্বন্ধ নির্ণয় করিয়া থাকেন। কিন্তু তাহাদের সহিত পিরালীদের সম্বন্ধাদিও প্রকাশ হয় নাই ও পরস্পর পর্য্যায় মিলে না। পিরালীদের ঠাকুর উপাধির কারণ লাল মোহন বিদ্যানিধি তাঁহার সম্বন্ধ নির্ণয়ে যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহারও সহিত বসু মহাশয়ের সামঞ্জস্য হয় না। উক্ত বিদ্যানিধি মহাশয় বর্দ্ধমানাধীশের সভাসদ তারা নাথ তর্করত্নের প্রদত্ত কুলাচার্য্য সংগ্রহীত ও মুদ্রিত করিয়াছেন, তাহাতে পিরালী ব্রাহ্মণ রায় রেঁয়ে অতি কৃপণ বলিয়া হীন ঠাকুর উপাধি লাভ করে বলেন, যথাঃ—
“পঞ্চানন নুলো বলে, জ্ঞানী কবে, ধনে ভুলে, পাপক্ষয় বিদ্যা অন্নদানে
রায় রেঁয়ে সুকৃপণে, পারালী দ্বিজ নন্দনে, অপকৃষ্টে ঠাকুরত্ব ভণে।”
কলিকাতায় কোম্পানির আমিন ও প্রধান কর্ম্মচারীর কাজ পঞ্চাননের দুই সন্তান জয়রাম ও রামসন্তোষ করিতেন। কলিকাতা কোম্পানির হইলে জয়রামই উহার জরিপ করে ও কোম্পানির কর্ম্মচারীদের মাহিনা রামসন্তোষ দিত। পঞ্চানন, বোধ হয়, প্রতাপাদিত্যের দখলের সময় গোবিন্দপুরে আসিয়া রায় রেঁয়ের কাজ করিত ও যৎকিঞ্চিৎ সংগ্রহ করিয়াছিল। সেই সময়েই বোধ হয় তাঁহার ঠাকুর উপাধি লাভ হইয়াছিল। কোম্পানি ঐ জন্যই বোধ হয় জয়রামকে ঐ কার্য্য দিয়াছিল। কলিকাতার জরিপেই পিরালী ঠাকুর গোষ্ঠীর সৌভাগ্যোদয় ও গোবিন্দপুরে বাস। সাধারণের কৌতূহল তৃপ্তির জন্য ও সত্যের অনুরোধে কলিকাতার উন্নতিশীল পিয়ালী জাতির সম্বন্ধে ওয়ার্ড সাহেবের হিন্দু মাইথলজি গ্রন্থে ও অনেক কথা আদালতের দাখিল উইলে লেখা আছে। উহাতে দেখা যায় যে, সিরাজ কর্ত্তৃক কলিকাতা আক্রমণের পর জয়রামের সর্ব্বস্ব, তের হাজার টাকা মাত্র ও তাঁহার প্রতিষ্ঠিত রাধাকান্ত জীউ ঠাকুর থাকে। সেকালের কলিকাতার উন্নতি ও আবাদ করার প্রাচীন ছড়াটী নিম্নে দেওয়া গেলঃ—
“পিরালি কায়েত তাঁতি, আর সোনার বেণে
করলে আবাদ তারা দেশ, বয়ে ধন এনে।”
প্রাচীন কলিকাতার সম্বন্ধে প্রাচীন আর যে ছড়া আছে তাহা কালক্রমে পরিবর্ত্তিত হইত। তাহার আভাস মিঃ এ, কে, রায় আদম সোমারির বিবরণে প্রকাশ করিয়াছেন। যথা ঃ— ‘‘গোবিন্দ রামের ছড়ি, উমি চাঁদে দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ী। নন্দ রামের ছড়ি, উমি দাঁদের দাড়ী, হুজরীমলের কড়ি, বনমালী সরকারের বাড়ী।” গোবিন্দ রাম মিত্র ও নন্দ রাম সেন কোম্পানির কর্ম্মচারি ছিলেন। তাঁহারা সেকালের বড়ই জবরদস্ত লোক ছিলেন—একরূপ সেকালের ধর্ম্মাবতার হাকিম ছিলেন। উমি চাঁদের দাড়িতেই যাদু ছিল, তাহাতে নবাব কোম্পানি সকলেই ভুলিত ও তিনি কলিকাতার ব্যবসায় সিদ্ধ হস্ত। ভগবান দত্ত দাড়িই তাঁহার অঙ্গের ভূষণ ও বিশেষত্ব হইয়াছিল। সদগোপ বনমালি সরকার কোম্পানির নিকট পাটনায় দেওয়ানি ও কলিকাতার ডেপুটী ট্রেডার বা কেম্পানির অধীন ব্যবসায়ী ছিলেন। কুমারটুলিতে সেকালে তিনি এক প্রশস্ত বাড়ী করেন। তাহাতেই লোক বলিত—“সর্ব্বস্ব খোয়াইয়া পাকা সেথখানা”। মথুরসেন লাট সাহবের বাড়ীর অনুকরণ নিমতলায় বাড়ী করেন। তিনি ও ব্যবসাদার ছিলেন, তাঁহারও ঐ দশা। উমিচাঁদের শালা হুজরীমল তেজারতি করিত। নকুধর ও মথুর সেন উভয়ে সুবর্ণ বণিক, এক সময়ের লোক নহেন। নকুধর পোস্তার রাজ বংশের আদি পুরুষ। তিনি লর্ড ক্লাইবের টাকা কড়ি সরবরাহ করিতেন ও তাহার জন্য কোম্পানির নিকট খেলাৎ লাভ করেন। নকুধরের ভাল নাম লক্ষ্মীকান্ত ধর। তাঁহার নিকট রাজা নবকৃষ্ণ সামান্য মহুরীর কাজ করিতেন। লর্ড ক্লাইব লক্ষ্মীকান্তের নিকট হইতে নবকৃষ্ণকে পান। নবকৃষ্ণ সেইজন্য পোস্তার রাজার বাড়ীতে জুতা পরিয়া যাইতেন না। মহারাজা সুখময় লক্ষ্মীকান্তের দৌহিত্র ও তিনিই পোস্তার রাজবাটির সৃষ্টি কর্ত্তা। লক্ষ্মীকান্ত ধর ও তাহার দৌহিত্রেরা কলিকাতার পুরাতন বাসিন্দা। মহারাজা সুখময় কলিকাতা হইতে পুরীর রাস্তা পাকা ও দুই ধারে আম্র বৃক্ষ স্থাপন করিয়া তীর্থ যাত্রীদের বিশেষ সুবিধা হয় ও তখন হইতে ঐ তীর্থে যাইবার এক রকম কেন্দ্র কলিকাতা হইয়া পড়ে। ইহাদেরও গৃহদেবতা প্রতিষ্ঠিত আছে। কোম্পানির কর্ম্ম করিয়া রাজ বল্লভ, নবকৃষ্ণ, গোবিন্দ মিত্র, কাশী নাথ, আঁধুল কাশিম বাজার, নসী পুর, পাইক পাড়া, ভূকৈলাসের জমিদারেরা রাজা উপাধি ও সম্পত্তিলাভ করিয়াছিল। তাঁহাদের পূর্ব্বপুরুষদের প্রায় সকলেরই কলিকাতায় ভাগ্যোন্নতি হইয়াছিল ও তাঁহারা সেখানে থাকিতেন। তাহারাও ঐ হিসাবে কলিকাতার পুরাতন বাসিন্দা। কলিকাতার উপকণ্ঠে কাশীপুরে পাইকপাড়ার রাজাদের ঠাকুর বাড়ী ও খিদিরপুরের ভূকৈলাসে রাজাদের ঠাকুর বাড়ী আছে। বৎসর বৎসর ভূকৈলাসে শিব রাত্রির দিন এখনও মেলা হয় ও বহু যাত্রীর সমাগম হইয়া থাকে।
চিত্র কলার নৈপুণ্যে যেমন তাহার মূল চিত্রের পশ্চাতের রঙের ও অস্পষ্টাংশের বৈচিত্রের উপর নির্ভর করে অর্থাৎ পশ্চাতের রঙই ঐ মূল চিত্রকে উজ্জ্বল করিয়া তোলে, তেমনি কলির ধর্ম্মাবনতি ও কলিকাতার পুরাতন স্থান সমূহের ও অধিবাসিগণের সম্বন্ধে অতি সংক্ষেপে একটি চিত্র অঙ্কিত করা গেল। নাটকেও অভিনয়ের প্রধান প্রধান অভিনেতা অভিনেতৃগণের সংক্ষেপ বিবরণ পূর্ব্বে দেওয়ারই ব্যবস্থা।
পাঞ্জাবের ও উত্তর পশ্চিমের ব্যবসায়ী হুজরী মলাদি সেকালের কলিকাতার পুরাতন বাসিন্দা ও ব্যবসাদার ছিল। পূর্ব্ব ও পশ্চিম বঙ্গের জমিদার ও সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তিদের কলিকাতা কেন্দ্রস্থল হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় কোম্পানির কর্ম্মচারীরা ঘর বাড়ী, বিবাহ ও নিকা করিত ও ধর্ম্ম বিস্তার করিত, তাহাতে ফিরিঙ্গি জাতির উৎপত্তি। তাহারাও কলিকাতার পুরাতন অধিবাসী। তাহাদের দুরবস্থা ইসপের ময়ূর পুচ্ছধারী দাঁড় কাকের মত হইয়াছিল। তাহাতেই তাহাদের দুঃখ দারিদ্র্য ঘোচে নাই। তাহারা যদি পূর্ব্বের মত থাকিত, ইংরাজ না সাজিত, তাহা হইলে তাহাদের ওজন বুঝিয়া চলা হইত। আরও যখন ইউরোপবাসিরা স্বদেশ হইতে আপনাদের স্ত্রী জাতিগণকে আনিতে আরম্ভ করে, তখন তাহারা ফিরিঙ্গি দিগকে এক ঘরে করিয়া ফেলে। ইংরাজ জাতি দেশ করতলস্থ করিয়া এ দেশের পোষাক ও আচার ব্যবহারাদি সমস্তই ত্যাগ করিয়াছিল। কলিকাতায় যে, শুধু কেবল ওয়ারেণ হেষ্টিং-এর শ্বশুর বাড়ী ছিল তাহা নয়, কোম্পানির কুঠির গবর্ণর স্যার্ চার্লস আয়ার জব চার্ণকের ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত কন্যার সহিত পরিণয় হইয়াছিল। চার্ণকের অন্যান্য কন্যাগণকেও কোম্পানির ইংরাজ কর্ম্মচারীরা বিবাহ করিয়াছিল। সেকালে ঐ সকল ফিরিঙ্গি কন্যার অদৃষ্টে ইংরাজ কর্ম্মচারী স্বামী লাভ হইত, কিন্তু শেষে উহা কবি কল্পনা হইয়াছিল। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ এ দেশীয় বিপন্ন লোকের আশা ভরসা ও সহায় ছিল। তাহারা কোন অন্যায় কার্য্য করিলে তখন লোকে বিশেষ কোন দ্বিরুক্তি করিত না। গৃহস্থের সুন্দরী বিধবা বা সধবা হরণ করা সেকলের মুসলমান নবাব, সম্রাট ও তাহাদের কর্ম্মচারিদের অভ্যস্ত বিদ্যা যদি কেহ সেইজন্য এক ঘরে হইত ও তাহা নবাবের কর্ম্মচারীদের কানে যাইত, তাহা হইলে সে যথেষ্ট অর্থলাভ করিত ও তাহার গোষ্ঠী পতিত্ব লাভ হইত। জব চার্ণকের ঐ ব্রাহ্মণপত্নী লাভের বিবরণ সম্বন্ধে মতভেদ আছে। হিন্দুর সতীদাহ ধর্ম্মের সঙ্গে সম্বন্ধ। পাটনায় চার্ণক অবস্থান কালে এক সতীদাহে এক যুবতীর সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইয়া সিপাহি দিয়া বল পূর্ব্বক তাহাকে উদ্ধার করিয়াছিলেন, আবার হেজেস্ সাহেবের ডায়েরীতে একজন হিন্দু নারী স্বামীর অর্থ ও অলঙ্কারাদি লইয়া চার্ণকের আশ্রয় গ্রহণ করে, উক্ত হইয়াছে। ইহাতে সে সময়ে দেশের ও দশের কিরূপ দুর্দ্দশা হইয়াছিল তাহা বেশ অবগত হওয়া যায়। সাধারণ লোক দারিদ্র্যে, শিক্ষাভাবে ও দেশের স্বদেশী ন্যায়বান রাজা বা সমাজপতির অভাবে পশুরও অধম হইয়াছিল। কেহ কোন অত্যাচার করিলে ঘাড় নীচু করিয়া চলিয়া যাইত। তাহাদের তাহার প্রতীকার করিবার কোন উপায় বা ব্যবস্থা ছিল না। আর যখন উপযুক্ত সুযোগ ও সুবিধা হইত তখন স্বার্থান্ধ ব্যক্তি তাহা নষ্ট করিয়া দিত।
* কোম্পানির সেরেস্তার কাগজে ইটালির নাম হিন্তালী আছে, যথাঃ— সম্রাট ফরক্শিয়ারের
ফারমাণের ৬৮ খানি গ্রামের তালিকা।
* Calcutta Reveaw 1845 Vol. 3.
* দেওয়ান গোকুল চন্দ্র ঘোষাল ভূ কৈলাসের রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কালীদেবীর চারিটী রূপার
হাত করিয়া দিয়াছিলেন।
* অভিধান
