৩. বঙ্গ বিজয়ের কারণ ও ফল
তৃতীয় পরিচ্ছেদ – বঙ্গ বিজয়ের কারণ ও ফল
আর্য্য অতীত গৌরব ভারতে চন্দ্রগুপ্ত, হর্ষবর্দ্ধন, অশোকাদির আবির্ভাবেই হইয়াছিল। মহাবীর আলেক্জাণ্ডারের বিজয়বাহিনী আর্য্যাবর্ত্তের ধনরত্নৈশ্চর্য্য অপহরণ ও রাজ্য স্থাপন করিয়াছিল বটে, কিন্তু তাহারা বঙ্গাধিকার করিতে গিয়া বিফলমনোরথ হইয়াছিল। বাঙ্গালার বিজয়সিংহ প্রমুখ শূরবীরগণ সিংহল, জাভা,* বালি দ্বীপ জয় ও রাজ্য স্থাপন করিয়া রাজত্ব করিয়াছিল। প্রতাপাদিত্য অর্থগৃধ্নুমোগলদিগের করদান হইতে জননী জন্মভূমি ও স্বদেশবাসীকে রক্ষা করিতে গিয়া পিঞ্জরাবদ্ধ ও অনাহারে প্রাণ হারাইল, পত্নী যমুনায় প্রাণত্যাগ করিল। হায়! যাঁহারা হিন্দুজাতির বিজয় বৈজয়ন্তী সমগ্র বাঙ্গালীর স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া বারবার মোগলসেনা ও সেনাপতিগণকে পশুর ন্যায় বধ ও তাড়াইয়া দিয়াছিল তাঁহারা অতীতের অতল গর্ভে লুক্কায়িত। হা ভারতচন্দ্র!**
সেই বাঙ্গালী বীরগণের নিঃস্বার্থ স্বদেশহিতৈষীতার কথা ও গৌরব, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অন্নদাস বলিয়া কি এক ফোঁটা চক্ষের জলেও তর্পণ করিলে না, ও সেকালের বাঙ্গালীকে লিখিয়া তাহা শিখাইলে না? কিন্তু কি আশ্চর্য্য! এখনও লোকে বলে যে, যেখানে প্রতাপাদিত্যের পত্নী জলমগ্না হইয়াছিলেন, সেই যমুনাগর্ভ অজ্ঞ নাবিকগণ নরনারীপথিকগণকে দেখাইয়া চক্ষের জল ফেলে! মানবের শিক্ষা দীক্ষার উপর যে তখন স্বদেশ হিতৈষীতা নির্ভর করিত তাহা নয়। এদেশের অশিক্ষিত ব্যক্তিগণ তখনও এখন স্বভাবতই স্বদেশভক্ত ও তাহারী হিতৈষীর জন্য কাতর। সেকালের লেখাপড়া জ্ঞানোন্মুখী না হওয়ায় লোকজনকে এইরূপ করিয়াছিল। দেশের লোক মাতৃভাষা ত্যাগ করিয়া পার্শী পড়িত ও বিধর্ম্মীর আচার ব্যবহার বেশভূষা পর্য্যন্ত গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হইত না। অর্থই, তখন সকলের লক্ষ্য হইয়াছিল। উহা উপার্জ্জন করিতে গেলে নবাব সরকারি চাকরি বা তাহাদের মনোমত কার্য্য না করিলে, হইবার উপায় ছিল না। দেশে অরাজকতায় ও উচ্চশিক্ষা ও আদর্শের অভাবে এই দুর্দ্দশা হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয়। সাধারণ লোক সেরূপ অর্থ পিশাচ তখনও ছিল না ও এখনও হয় নাই। সেইজন্য তাহাদিগকে সে পাপ স্পর্শ করিতে পারে নাই।
কবি ভারতচন্দ্রের কথায় বেশ জানা যায় যে, গুরু পুরোহিতগণ প্রতাপাদিত্যকে পরিত্যাগ করিয়া রাজা মানসিংহের সহিত সম্মিলিত হইয়াছিল ও সৈন্য সামন্ত ও দেশবাসিকে যশোরেশ্বরী বিরক্ত হইবার কথা নানা কৌশলে সঙ্গত করিয়া তাহাদিগকে আপনাদের দলভুক্ত করিয়াছিল। রাজা মানসিংহের বিজয় তাঁহার বলবীর্য্যে হয় নাই—তাঁহার কল কৌশল ও অর্থে হইয়াছিল। সেই সকল দেশদ্রোহী গুরু পুরোহিতেরা দেবতাকে লইয়া মানসিংহের পশ্চাদনুসরণ করিয়াছিল। সেকালের যুদ্ধ ঐরূপই হইত। সেই দুর্দ্দৈব হইতেই বাঙ্গালা মোগলের রাজত্বের “জিন্নেৎ-উল্-বেলাৎ” অর্থাৎ স্বর্গ হইয়াছিল। বিদেশী পর্য্যটকেরা ইহাকে মিশর অপেক্ষা ভাল বলিয়া গিয়াছেন। একটী চলিত কথা আছে যে, বাঙ্গালায় ভগবান্ গাছের উপর ঐ দেশের রাজা বিশ্বামিত্রের প্রার্থনায় নারিকেলে একখানি রুটি ও জলের ব্যবস্থা ও মাটীতে তরমুজ করিয়াছিলেন। বাঙ্গালার স্বাধীনতা সূর্য্য অস্ত যাইবার সময় পশ্চিমের গগনে যে চিত্রকলা অঙ্কিত করিয়াছিল তাহাতেই মার্হাট্টা ও শিখজাতির অভ্যুদয় হইয়াছিল।
জাতীয়তাই স্বাধীনতার সোপান। কবি ভূষণের কবিত্বে ও শিবাজীর ফলোন্মুখী বীরত্বে মহারাষ্ট্রীয়দের মধ্যে ভ্রাতৃভাব জাগরিত হইয়াছিল। মোগল অত্যাচারে তাহাদের উচ্ছেদ সাধনের জন্যই ধর্ম্ম জাতীয়তার সঙ্গে এক হইয়া ঐন্দ্রজালিক রণজিৎ সিংহের খালসা হইয়াছিল। হায়! বাঙ্গালীর মধ্যে সেরূপ কিছুই হইল না।
ভারতবর্ষের মধ্যে পৃথিবীর দেশ সমূহের ছায়া যেন প্রতিফলিত রহিয়াছে। শীত উষ্ণ ঋতু ভারতবর্ষের সকল স্থানে এক নয়, উহার তারতম্য আছে কোথাও মরুভূমি, কোথাও পর্ব্বতরাজি সুশোভিত গিরি কন্দর, কোথাও নদনদী পরিশোভিত হরিৎ ক্ষেত্র, আবার কোথাও কুমুদ কহ্লার বেষ্টিত হ্রদ। উহার প্রায় চতুর্দ্দিকে সমুদ্রে উদ্বেলিত তটভূমি। ভগবান যেন প্রাকৃতিক নিয়মে ইহার রক্ষা বিধান করিয়া দিয়াছেন কিন্তু আশ্চর্য! তবুও ভারত পরাধীন। বাঙ্গালারও সেই দুর্দশা। বঙ্গদেশ হইতে মোগল দরবারে কত টাকা রাজস্ব যাইত ও তাহার সংখ্যা ক্রমে ক্রমে কিরূপ বাড়িয়াছিল তাহাতেই বেশ বোঝা যাইবে যে, বঙ্গ বিজয়ে দেশবাসীর কি দুর্দ্দশা হইয়াছিল। আইন আকবরীতে বাঙ্গালা চব্বিশ সরকারে বিভক্ত ছিল ও ৫২৪৫৯৩১৯ দাম রাজস্ব আদায় হইত। হকৎ ইকলি মতে জাহাঙ্গীরের সময় বাইশ সরকার বিভক্ত বঙ্গদেশের রাজস্ব ২৩৯০২৮০০ দাম ও খুলসাৎ-উল্-তয়ারিখে আরঙ্গজেবের সময় সাতাইশ সরকার বিভক্ত বাঙ্গালায় ৪৬২৯০০০০০ দাম খাজনা আদায় হইত। আবুল ফজল আইন আকবরীতে আকবর যে সকল স্থান দখল করিতে পারেন নাই, তাহাও তালিকাভুক্ত করিয়াছেন। দেশ হইতে কোটী কোটী টাকা ও দেশের লোকের উদর পূরণ না করিয়া দিল্লিতে চলিয়া যাইত, তাহা দূর করিবার যুদ্ধ যশোরেশ্বরীর অনভিমত নয় বলিয়া তিনি মুখ ফিরাইয়াছিলেন তাহাতেই মানসিংহের জয়লাভ—এ পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে? হায়! রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যনাশও শাস্ত্রকারগণের ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বারা হইয়াছিল। অনেক দিন হইতে নানা কারণে ভারতবর্ষে স্বজাতি প্রতিষ্ঠা লোপ পাইয়াছে। তাহারই জন্য রাবণের বংশ ধ্বংস ও সোনার লঙ্কা ছারখার হইয়াছিল। হায়! কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের পূর্ণাহুতির ফল বহুকাল স্থায়ী হয় নাই। ভারতবর্ষ একদেশ হইলেও তাহার মধ্যে এক ধর্ম্ম, এক ভাষা ও এক জাতি হয় নাই। আবার কে এক দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে পরস্পর সৌহার্দ্দ্য নাই, মেশামেশি নাই, একজন একজনের উপর প্রভুত্ব করিতে পারিলে যে সুযোগ ত্যাগ করে নাই। হিন্দু রাজ্যে বিবাদে সকল জাতীয় রাজা রাজত্ব করিয়াছেন। আসুরীয়, মিশরীয়, রোমক সাম্রাজ্য কোথায় চলিয়া গিয়াছে, ভারতবাসী কেন যে বিধর্ম্মীর বন্যায় ভাসিয়া যায় নাই তাহার কারণ পাশ্চাত্য লেখকগণ * যাহা উল্লেখ করিয়াছেন তাহা না বলিয়া থাকা যায় না। “ভারতবাসীর মধ্যে যদি শাস্ত্রকারদের জাতিভেদরূপ সামাজিক দৃঢ় বাঁধ বর্ত্তমান না থাকিত, তাহা হইলে তাহারা সভ্যতার পদবী হইতে পিছাইয়া পড়িত, অর্দ্ধ মানুষ অর্দ্ধ জন্তুর ন্যায় বিষম দুর্গতিগ্রস্ত হইত। সেই বাঁধ ছিল বলিয়াই মুসলমানগণের দৌরাত্ম্য ও খৃষ্টানগণের প্রবল প্রতাপের স্রোতে তাহারা ভাসিয়া যায় নাই।”
যে জাতিভেদ পাশ্চাত্য মতে মনুষ্যবুদ্ধির কার্য্যকরী শক্তির স্বাভাবিক প্রসর ক্ষুণ্ণ করে। ভারতে জন্মভেদে কর্ম্মভেদে হইয়া কতকগুলি কৃত্রিম গণ্ডীর ব্যবস্থায় তাহাদের মধ্যে যে গণ্ডী নির্ম্মাণ করিয়াছে তাহাতে তাহার বাহিরে যাওয়া অধর্ম্ম। প্রতাপাদিত্য দেশের ও দশের মঙ্গলের জন্য বিদেশের ফিরিঙ্গি মুসলমানদিগকে প্রিয়পাত্র করিয়াছিলেন। তাহাদের সহিত ঐরূপ সৌহার্দ্দ্য করায় ব্রাহ্মণেতর জাতি হইয়াও তিনি দেশের রাজা হইয়াছিলেন। সেকালের ব্রাহ্মণেরা ষড়যন্ত্র করিয়া যেমন বৌদ্ধরাজ্য ধ্বংস করিয়াছিল, তেমনি তাহারা প্রতাপের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। উহার সহিত প্রতাপের স্বজাতী আত্মীয় ভৃত্যগণের ও ষড়যন্ত্র ছিল। প্রতাপাদিত্যর যুধিষ্ঠির ছিলেন না, বা আর্য্য রাজাগণের আদর্শ অনুসরণ করিয়া কার্য্য করিতেন না। তাঁহার সাধনা ও দোষ সম্বন্ধে মহানির্ব্বাণ তন্ত্রের হরগৌরীর কথোপকথন উল্লেখ করিলেই হইবে। গৌরী মহাদেবকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন যে, কেমন করিয়া অসৎ প্রবৃত্তি সম্পন্ন লোকের উদ্ধার হইবে, তাহাদের কি কোন নিস্তারের পন্থা নাই? মহাদেব তদুত্তরে এই কথা বলিয়াছিলেন,—যে জীব যদি ধর্ম্মের উদ্দেশ্যে প্রবৃত্তির চরিতার্থ করে, তবে তাহার তাহাতে সদ্গতি হইবে অর্থাৎ ভোগেচ্ছা না করিয়া সাধনার উপায়স্বরূপ বিশ্বাসে কর্মেচ্ছু হইয়া মদ্য পান বা মাংস ভক্ষণ করে বা অন্য কিছু করে, তবে তাহার প্রবৃত্তির ক্রমে ক্রমে নিবৃত্তি হইবে, উহাতেই তাহার সদ্গতি হইবে। সমাজের ভয়ে বা ধর্ম্মের ভয়ে বা লোভের বশবর্ত্তী হইয়া পরকালে স্বর্গলাভ ইচ্ছায় প্রবৃত্তি দমন করায় বা অন্য সৎকর্ম্মে সদ্গতি লাভ হয় না।” ইহাই ধর্ম্মের সূক্ষ্ম মর্ম্ম। সত্যযুগে প্রহ্লাদ ধ্রুবের জন্ম হইয়াছিল, মায়ের পেট হইতেই সে ভগবানের নাম আরম্ভ করিয়াছিল কিন্তু কলিকালে কালধর্ম্মে অধিকাংশ লোককেই লম্পট মাতাল হইতেই হইবে, তাহাদের ব্যাভিচার দমন গৌর নিতাই এর ক্ষমা নীতিতে করিতে হইবে। মদের দোকান বন্ধ বা বেশ্যা নগর হইতে স্থানান্তরিত করিলে, তাহা হইতে পারে না। সেকালের হিন্দুসমাজ বা ব্রাহ্মণগণ প্রতাপাদিত্যের কার্য্যসমূহ সূক্ষ্ম বিচার করিয়া দেখেন নাই। তাহাতেই দেশের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। দেশের লোক দেশের লোকের সঙ্গে দেশের রত্ন ভোগ করে, ইহা জাতিজীর্ণ দেশবাসীর প্রাণে সহ্য হয় নাই। তাহাতেই হিন্দুর ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের রাজ্যনাশ ও কায়স্থ প্রতাপাদিত্য আদিকে বন্দী হইতে হইয়াছিল। তাহাতেই পারসীক, বাহ্লিক, শক, যবন সিন্ধু নদী পার হইয়া আর্য্যাবর্ত্ত জয় করিয়াছিল। আর্য্য হিন্দুজাতির ধর্ম্মবলই চতুবর্ণকে আশ্রয় করিয়া বহুকাল পর্য্যন্ত স্বতন্ত্রতা রক্ষা ও স্বদেশকে কামধেনু করিয়াছিল। তাঁহাদের কৃষি শিল্প বাণিজ্য ও শিক্ষাই দেশের ও দশের মূল উন্নতির সোপান। ব্রাহ্মণ শিক্ষা দ্বারা রাজ্যের মঙ্গল চিন্তা ও ক্ষত্রিয়বাহুবল দ্বারা রাজ্য রক্ষা করিত, বৈশ্য বাণিজ্য কৃষিশিল্প দ্বারা দেশের ধনবৃদ্ধি ও শূদ্র সমাজ পালন করিত। তাহাদের মধ্যে হিংসাদ্বেষ ছিল না, যে যাহা করিত ও উহা ক্রমে ক্রমে বংশ পরাম্পরাগত হইয়া, এমনই উৎকর্ষ লাভ করিয়াছিল যে তাহা অলৌকিক হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাতেই সকলেই গৌরবান্বিত হইত। সেই স্বজাতি প্রতিষ্ঠা যতদিন বর্তমান ছিল, ততদিন হিন্দুজাতিকে কাহারও নিকট মস্তক অবনত করিতে হয় নাই। তাহাতেই তাহাদের বাণিজ্যশিল্প পৃথিবী ব্যাপী হইয়া পড়ে তাই পুরুষ পরম্পরাগত অভ্যাসের ফলে সূক্ষ্ম শিল্পাদির কারুকর্ম্ম ও বৈচিত্র্যে ভারতবর্ষ বিখ্যাত হইয়া পড়ে। ভারতবাসীর সেই হস্তজাত দ্রব্যসকল ইউরোপবাসিগণের উচ্চতর বিজ্ঞানের কল নির্ম্মিত বস্তুর সহিত প্রতিযোগিতা করিয়াও সর্ব্বতোভাবে উৎকৃষ্ট ও সুলভ হওয়ায় বিদেশীয় বণিকগণ উহা লইয়া বাণিজ্য করিত। ভারতবর্ষের উর্ব্বরতা পরিশ্রমের তারুতম্য, জাতিভেদে ব্যবসা ও দক্ষতায় প্রয়োজনীয় সাধারণ দ্রব্য সামগ্রী আপনাদের অভাব দূর করিয়াও অবশিষ্ট থাকিত। উহাতেই বিদেশ হইতে স্বর্ণরৌপ্যাদি বিবিধ রত্ন বিনিময়ে বণিকগণ এদেশে ধন আহরণ করিত। তাহাতেই ঐ সকল বণিকগণের ভিন্ন ভিন্ন নাম হইয়াছিল। সেকালে বাঙ্গালাদেশে জাহাজ তৈয়ারি হইত ও ঐ সকল তুরস্ক দেশাদিতে যাইত। ঐ সকল জাহাজে চড়িয়া এদেশের বণিকগণ বাণিজ্য করিত ও দ্বীপপুঞ্জ হইতে মণিমুক্ত প্রবাল ও নানাপ্রকার দ্রব্য আনয়ন করিত। সেকালে লোকের অন্নকষ্ট ছিল না। দেশের উৎপন্ন দ্রব্য দেশবাসীর অভাব দূর করিয়া উদ্বৃর্ত্ত থাকিত। অধিক পরিমাণে উৎপন্ন হইত বলিয়া বড়ই সুলভ ছিল। তাহাতেই প্রতাপাদিত্যের জন্মের পূর্ব্বে ইবন বতুতা প্রমুখ ভ্রমণকারীরা যাহা বলিয়াছেন তাহা অতি রঞ্জিত ও অবিশ্বাস যোগ্য বলিয়া বোধ হয় না। আট দরহাম বা দামে অর্থাৎ সেকালের চার আনায় এক বৎসরের এক পরিবারের আহার সংগ্রহ হইত। সায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আটমণ চাউল বিক্রয় হইত ও প্রচুর ধানের গোলা দুর্ভিক্ষের দায় হইতে রক্ষা পাইবার জন্য রাখা হইত। বিদেশী মুসলমানের আমলেও যদি ঐরূপ দ্রব্য সুলভ ছিল, তখন স্বাধীনতার সময় উহা অপেক্ষা শতাধিক গুণে সুলভ হওয়ার কথায় বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। ভ্রমণকারী টাভারনিয়ার বাঙ্গালায় হীরার খনি ছিল বলিয়া গিয়াছেন ও ইকনমিক জিয়লজি আফ্ ইণ্ডিয়া গ্রন্থের ২৫ হইতে ৩০ পৃষ্ঠার বিবরণ উহার সম্পূর্ণ পোষকতা করে। কিন্তু হায়! এখন তাহার কোন উদ্দেশই নাই, সে স্থলে কেবল কয়লার খনিরই আবিষ্কার হইতেছে। ইহাতে কি অধিকারিগণের ভাগ্যের তারতম্যের কথা সূচনা করে না? পূর্ব্বে সুবর্ণরেখা দামোদর প্রভৃতির বালুকা হইতে স্বর্ণ আহরণ করা হইত। বঙ্গের লৌহ ও সোরা যুদ্ধের অসি ও বারুদে ব্যবহৃত হইত। শ্রীহট্টের উৎকৃষ্ট চর্ম্ম হইতে ঢাল, ভারতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল। উহা যেমন লঘু ও তেমনি দুর্ভেদ্য ছিল, সেইজন্য উহা সকলেই আগ্রহের সহিত গ্রহণ করিত। বার্ণিয়ার প্রমুখ ভ্রমণকারীরা বলেন যে সেকালে মেক্সিকোর যাবতীয় রৌপ্য ও পেরুর স্বর্ণ পৃথিবী ভ্রমণ করিয়া ভারতবর্ষের মোগল সাম্রাজ্যে প্রবেশ করিত, কিন্তু উহা আর সেখান হইতে বাহির হইত না। মোগল বিজয়ে সোনার বাঙ্গালার দুরবস্থার সূত্রপাত হইয়াছিল।
ধর্ম্মবলঃ— পৃথিবীতে জাতির উত্থান ও পতন তাহাদের শিক্ষাদীক্ষা, ধর্ম্মনিষ্ঠা ও জাতীয়তার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। স্বধর্ম্মরক্ষা ও বিস্তার আদি চেষ্টা করা, স্বজাতি ও স্বদেশ সম্পূর্ণ নির্ভর করে। স্বধর্ম্মরক্ষা ও বিস্তার আদি চেষ্টা করা, স্বজাতি ও স্বদেশ রক্ষার আন্তরিক আস্থাই—ঐ প্রেমের মূলমন্ত্র। বৌদ্ধযুগে অশোকাদি প্রস্তর স্তম্ভে ভারতবর্ষের নানাস্থানে স্থাপন করা হইয়াছিল। বৌদ্ধ ধর্ম্মের অসারতা শঙ্করাচার্য্য, কুমরিলাভট্ট প্রমুখ সকলে প্রচার করিয়া চিরস্মরণীয় হইয়াছেন। সেকালে খৃষ্ট ধর্ম্মের ধর্ম্মযাজকগণ ভারতে শুভাগমন করিয়া আপনাদিগকে শ্বেতদ্বীপি ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দিয়া অশিক্ষিত হিন্দুগণকে ঐ ধর্ম্মে দীক্ষিত করেন শেষে যখন তাহাদের সেই চাতুরী প্রকাশ হইয়া পড়ে তখন তাহাদের হাতে জীবনোৎসর্গ করিয়া ধন্য হইয়াছিল। তাহাদের সেই মৃত্যুকালের ভবিষ্যদ্বাণী শেষে সত্য হইয়াছিল। একজন বলিয়াছেন যে, যখন তাঁহার সমাধি স্তম্ভে সমুদ্রের জল স্পর্শ করিবে, তখন ইউরোপবাসিরা সেইখানে আসিয়া তাঁহাদের মনোভিষ্ট সিদ্ধ করিবে। ভাস্কোডিগামা যখন ভারতবর্ষে আসেন তখন সমুদ্রের জল সেই সমাধি স্তম্ভ সত্যই ধৌত করিয়াছিল। সেই সেন্ট থমাসের বর্ষাবিদ্ধ অস্থিপঞ্জর পর্ত্তুগালের জর্জ্জের আজ্ঞায় রাজা তৃতীয় ময়লাপুর হইতে পর্ত্তুগীজেরা তাহাদের স্থাপিত ভারতের প্রথম গির্জ্জায় মহাসমারোহে সমাহিত করিয়াছিল।
সেই সেণ্ট থমাসের সমাধিতে সিঘেলমাস নামক একজন ইংরাজ উপাসনা করিয়া যাইবার সময় এদেশ হইতে প্রচুর পরিমাণে মণিমুক্তাদি সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন। ১৫৭৯ ও ১৫৮৩ খ্রীষ্টাব্দে টমাস্ ষ্টীফেন্স ও রালফ ফীচ ভারত ভ্রমণ করিবার জন্য আসিয়াছিল। সেই ষ্টীফেন্সের ভ্রমণ বৃত্তান্তেই ইংলণ্ডবাসিগণের ভারতবর্ষের উপর প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাহাতেই ফীচের সঙ্গে লণ্ডনের বণিক জননিউবেরী, জহুরী উইলয়ম লিডস ও চিত্রকরর লেমসষ্টোরিও টাইগর অফ লণ্ডন জাহাজে আসিয়াছিল।
স্বদেশ, স্বধর্ম্ম ও স্বজাতী আপনার এই জ্ঞানে তাহাদের বিস্তৃতি করা উন্নতিশীল জাতির ধর্ম্ম। নীচ স্বার্থপরতা বা সঙ্কীর্ণ আভিজাত্যাদি গৌরবে মুগ্ধ হইয়া ব্রাহ্মণেতর জাতির অধীন হইয়া থাকা অপেক্ষা, বিদেশী যবনের দাসত্ব করা বা সেই যবনের অধীনে দেশের হর্ত্তা কর্ত্তা বিধাতা হওয়া ভাল, এই জ্ঞানেই বাঙ্গালার সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। রাজা মানসিংহ সেই মন্ত্রের উপাসক ও তাঁহার শিষ্য সেবকরা সেই সময় সেই মতের পক্ষপাতী হইয়া বাঙলাদেশে অনেকেই রাজা, জমিদার ও সমাজকর্ত্তা হইয়াছিলেন। হায়! সেই আত্মঘাতী হিন্দুসমাজ আকবরের “দীন এলাহি” ধর্ম্মের পক্ষপাতী হইয়া “দিল্লিশ্বরো বা জগদীশ্বরো” বলিয়া গৌরব করিত। মানবের ধর্ম্মবল সর্ব্বাপেক্ষা বলবান, কিন্তু উহা যখন অন্যায় আগ্রহে অন্ধ গোড়ামিতে পরিণত হয়, তখন তাহা রোগ হইয়া দাঁড়ায়। ধর্ম্মের মধ্যে দুরভিসন্ধি আত্মম্ভরীতা থাকিলে মহাপাপ ও পতনের মূল হইয়া পড়ে। আকবরের সেই দশা হইয়াছিল। তাই তিনি ভারতবর্ষের হিন্দু রাজাগণের সহিত যৌন সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া মোগলসাম্রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ় করিতে গিয়াছিলেন। কতিপয় বিলাসবিভবলোলুপ মূর্খধর্ম্মজ্ঞানহীন-রাজপুতরা রাজ্যরক্ষা ও রাজ্যলাভাকাঙ্ক্ষায় সেই ঘৃণীত প্রস্তাব কার্য্যে পরিণত করিয়া কাবুল বাঙ্গালাদি দেশ নানা কৌশলে জয় করিয়া শেষে ধর্ম্মের ভাণ করিয়া সেই সকল স্থান হইতে বহু দেবদেবী নিজের রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। ভগবানের সূক্ষ্ম বিচারে সে সকল মহাত্মার বংশরক্ষা পোষ্যপুত্র দ্বারাই হইয়া আসিতেছে। হায়! তাহাদের কাহারও হৃদয়ে আর্য্য হিন্দুজাতীর মত বা মুসলমান খৃষ্টানদের যেমন ব্যক্তিগত স্বার্থাপেক্ষা জাতিগত উন্নতি লক্ষ্য ছিল না। মানব ধর্ম্মবলেই ত্যাগস্বীকার করিয়া কর্ত্তব্যপালন করিয়া থাকে ও তাহাতেই তাহার ও স্বজাতীয় মঙ্গল হয়। তখন তাহারা স্ব স্ব স্ত্রীপুত্র পরিবারের সুখ স্বচ্ছন্দতার নিমিত্ত দেশের ও দশের সর্ব্বনাশ করিতে পারে না। তখন তাহারা নিজের বা আত্মীয় কুটুম্বের মঙ্গল দিকে না তাকাইয়া শতকষ্ট, এমন কি, প্রাণ পর্য্যন্ত পণে দেশের মঙ্গলের জন্য আত্মোৎসর্গ ও যাহা কিছু মূল্যবান সমস্তই অবলীলাক্রমে বলিদান করে। ইহার জ্বলন্ত উদাহরণ উন্নতিশীল জাতি মধ্যে ভূরিভূরি দৃষ্টিগোচর হয়।
রাজনীতিঃ— কিন্তু হায়! কেমন করিয়া গৌরব ও রাজ্যলাভ লালসায় সেই মিথ্যাজাত্যাভিমানী ও বলবীর্য্যহীন রাজপুত রাজারা বিদেশী মুসলমানকে আনিয়া সকল রকম সাহায্য করিয়া পৃথ্বীরাজ প্রমুখের রাজ্যহরণ ও মোগল পাঠানের রাজত্ব স্থাপনের পরিষ্কার করিয়াছিল তাহা বুঝিতে পারা যায় না। সেই হইতেই বিশ্বাসঘাতকতায় প্রভু, পিতা, ভ্রাতা ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা বা তাহাদের সর্ব্বনাশ করিয়া রাজ্যলাভ বা মন্ত্রী হওয়া সেকালের রাজধর্ম্ম হইয়াছিল। দেশে বিজ্ঞান নীতি ও শিক্ষার অভাবে সকলেই ধর্ম্মাধর্ম্ম বিচার করিয়া কার্য্য করিত না। বিদ্যাবুদ্ধি বলবীর্য্য অপেক্ষা নীচ ষড়যন্ত্রের প্রভাবই তখন অধিক হইয়াছিল। ইহাতেই দেশের ও দশের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল।
সেই মহেন্দ্রক্ষণে ইউরোপের ব্যবসায়ীগণ ভারতে ব্যবসা করিতে আসে।
আকবরের দরবারে তখন জেসুইট পাদরীগণের বিলক্ষণ প্রাদুর্ভাব ছিল। তাহাতেই এদেশে পর্ত্তুগীজেরা অত্যাচারী হইয়া পড়ে। মগ বোম্বেটিয়াদের অত্যাচারে জলপথে বাণিজ্য করা বন্ধ হইয়াছিল।
কালিকটঃ— রোমবাসিরা সিরিয়া বিজয়ের পর হইতে এদেশের সহিত বাণিজ্যারম্ভ করে। তাহারা মিশর দিয়া আরবদের সহিত মালাবার উপকূলে কালিকটে বাণিজ্য করিত। মহম্মদের মৃত্যুর পর মুসলমানেরা পারস্যাধিকার করিয়া ইসলাম রাজ্যের খলিপা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই হইতেই ভারতীয় বাণিজ্য মুসলমানদের হস্তে ন্যস্ত হয়। তাহাদের সম্মতি ব্যতীত সেখানে কেহই বাণিজ্য করিতে পারিত না। সেই সময় তাহারা কালিকটের হিন্দু রাজাকে মক্কায় লইয়া গিয়া মুসলমান করে। * ঐ কালিকটের নামের উৎপত্তি উহার দানের সময় হয়। এই কালিকটেই রোমবাসিরা ব্যবসা করিতেন ও পর্ত্তুগীজেরা প্রথম বাণিজ্য কুঠী স্থাপন করেন। ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দে পর্ত্তুগীজেরা সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ভারতবর্ষের পণ্য দ্রব্যাদি লইয়া সর্ব্বপ্রথমে কালিকটে বাণিজ্যারম্ভ করে। কালিকট ও কলিকাতার ইংরাজি বানানে সৌসাদৃশ্য আছে ও ব্যবসার সম্বন্ধ ছিল। রোম ও অন্যান্য ইউরোপবাসি বণিকগণ স্ব স্ব পোতে সপ্তগ্রামে আসিয়া সেইরূপ বাঙ্গালার সহিত বাণিজ্য করিত। সপ্তগ্রামে সেকালের যেসকল স্তম্ভে সকল বাণিজ্য পোত সংলগ্ন থাকিত, তাহা এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। ইহাতেই দেখা যায় যে, উহার কিছুদিন পূর্ব্ব হইতেই এদেশের বণিকগণের বিদেশে গিয়া বাণিজ্য করা এক রকম বন্ধ হইয়া গিয়াছিল।
উদ্যোগঃ— ১৫৫৭ খ্রীষ্টাব্দে কাপ্তেন ড্রেক পর্ত্তুগীজদের গোয়া প্রত্যাগত এক জাহাজ পণ্যদ্রব্য স্বদেশে লইয়া যান। দেখা যায় যে, তাহাতেই ইংরাজজাতির ভারতীয় পণ্যদ্রব্য লইয়া বাণিজ্য করিবার আকাঙ্ক্ষা প্রথম অঙ্কুরিত হয়। ১৫৭৪ খ্রীষ্টাব্দে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক্ উত্তমাসা অন্তরীপ প্রদক্ষিণ করিয়া ভারতে উপস্থিত হইয়াছিল। তাহাতেই ভারতীয় বাণিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশঙ্কা দূর করিবার জন্য ১৫৮৮ খৃষ্টাব্দে সম্মিলিত স্পেন পর্ত্তুগাল কতকগুলি রণতরী লইয়া ইংলণ্ড জয় করিতে যায়। উহাই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ অজেয় রণতরী বা স্প্যানিশ আরমেডা বলিয়া উক্ত হয়। তখন ইংরাজ জাতির দ্বাদশ বৃহস্পতি—সেক্সপীয়র, বেকন, প্রমুখ মনিষীগণ বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাসাদি চর্চ্চা করিয়া ইংলণ্ডে যুগান্তর উপস্থিত করিয়াছিল। বিধির বিধানে ও ইংলণ্ডের সৌভাগ্য বলে ঝড় উঠিয়া সেই সকল সুবৃহৎ রণতরীগুলি আয়ত্ব করা কঠিন হইয়া পড়ে ও ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া যায়। তখন উপযুক্ত অবসর বুঝিয়া ইংলণ্ডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রণতরীগুলি তাহা অবলীলাক্রমে ধ্বংস করিয়া ফেলে। উহাতেই ইংরাজজাতির নাম ও প্রতিপত্তি জগদ্ব্যাপী হইয়া পড়ে। “ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্রং ন চ বিদ্যা ন চ পৌরুষং।”
যুগান্তরঃ— ইহাতে বেশ দেখা যায় যে, সে সময় যুগান্তর পরিবর্ত্তনের সময়, পৃথিবীর মধ্যে অনেক স্থলেই ঐ যুগান্তরের লক্ষ্মণ দেখা দিয়াছিল। এক সময়েই পশ্চিম গগনে ইংরাজ জাতির অভ্যুত্থান ও পূর্ব্বগগনে প্রতাপাদিত্যের যশঃ ও গৌরব দিগন্তব্যাপী হইয়াছিল। ঐ সময়েই ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেকের সময়, তাঁহারই সাহায্যে বাঙ্গালায় খৃষ্টানদের প্রথম গির্জ্জা নির্ম্মাণ ও বিলাতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। বঙ্গদেশেও রঘুনন্দন বাচষ্পতি মিশ্র প্রমুখ ব্যবস্থাকারগণ পুরাতন স্মার্ত্তগণের অধীনতা পাশ ছিন্ন করিয়া নূতন ব্যবস্থা করিয়াছিলেন জগদীশ, গঙ্গাধারাদি তাঁহাদের নব ন্যায়ে বঙ্গদেশে যুগান্তর আনয়ন করিয়াছিলেন। গোবিন্দদাস, নরোত্তম প্রমুখ বৈষ্ণব কবিগণ ও উদ্ধারণ শ্রীনিবাসাদি পরম বৈষ্ণবগণ ভক্তির বন্যায় দেশ তোলপাড় করিয়াছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁহার আত্মজীবনীতে লিখিয়াছেন যে, বাঙ্গালী ঐন্দ্রজালিকগণ ঘোর অন্ধকারময় নিশিকে এরূপ আলোকিত করিয়াছিল যে, তাহাতে দশ দিনের দূরবর্ত্তী স্থানের লোকেরাও ঐ আলোক দেখিয়াছিল। এইরূপ বহুবিধ ক্রীড়ায় সাতজন বাঙ্গালী সম্রাট প্রমুখ সকলকেই মুগ্ধ করিয়াছিল। সেকালে বাঙ্গালায় বণিকেরা প্রভূত ধনশালী ছিল এবং বৈদেশিকগণও তাহাদের প্রশংসা * করিয়াছিল। সপ্তগ্রাম সেকালের ব্যবসায়ীগণের কেন্দ্র ছিল। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে তাহাদের কথা বিবৃত আছে। তাহারা ঘরে বসিয়া দেশবাসী ও বিদেশী বণিক্গণের সহিত ব্যবসা করিত। তাহাতেই তাহারা স্বাধীনচেতার লোক ছিল। তাহাদের আপদ্ বিপদে কি দেশবাসি, কি বিদেশী সকলেই সাহায্য করিত। সেইজন্য সম্রাট হইতে তাঁহার মুসলমান কর্ম্মচারীগণের সপ্তগ্রামবাসীর উপর শুভদৃষ্টিপাত ছিল না। তাহারা সপ্তগ্রামকে বিদ্রোহীর আড্ডা বা তাহাদের ভাষায় “বুল্ঘক খানা” নাম দিয়াছিল। আরও বোধ হয় যে, সেইজন্য “সাতগেঁয়ের কাছে মামদোবাজী” কথাটী প্রচলিত হইয়াছে। বণিকগণ বৈষ্ণবগণের প্রিয় হইয়া শাক্তপ্রধান দেশে তাঁহাদেরও বিষনয়নে পড়িয়াছিলেন। বিশ্বকোষ প্রণেতা এইরূপ লিখিয়াছেনঃ— “মুসলমান ঐতিহাসিকদিগের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে ব্রহ্মণ্য প্রভাবের পুনরভ্যুদয়ের সহিত ভারতীয় বৈশ্যকুলকে শূদ্র জাতিতে পতিত করিবার জন্য ঘোরতর ষড়যন্ত্র চলিতে থাকে, তৎকালে বৈশ্যবৃত্তিক বহু সম্ভ্রান্ত জাতি পাল রাজবংশের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল, তন্মধ্যে সুবর্ণবণিক জাতিই প্রধান।” ট্রাভার্নিয়ারের ভ্রমণ বৃত্তান্তে দেখিতে পাওয়া যায় যে, ইউরোপীয় বণিকগণ সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে বহুমূল্য রত্নাদি ঠকাইয়া লইয়াছিল ও সেই অবধি তাহাদের মাল জোর করিয়া দিল্লীতে পাঠান হইত। বেণিয়ান নেহালচাঁদ ঐ সকলের দাম ও আসল নকল ঠিক করিয়া দিলে তাহার উপর মাশুল আদায় করা হইত। বণিকগণের মধ্যে সত্যবাদী ও সততার কথা শুনিয়া ঔরঙ্গজেব একজন বণিককে তাঁহার দরবারে আনিয়া পরীক্ষা করিয়াছিলেন ও উপহারাদি লাভ করিয়া সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে পাথেয় দশ হাজার টাকা ও হাতী আদি পুরস্কার দিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। শোনা যায় যে, ইনি মল্লিক বংশের কৃষ্ণদাস মল্লিক। নেহাল চাঁদ তাঁহারই নির্ব্বাচিত লোক ছিলেন। ইনিই রাজারামের পিতা ও দর্পনারায়ণ ও সন্তোষ মল্লিকের পিতামহ।
উক্ত ট্রাভার্নিয়ার “বেণিয়ান” শব্দের উৎপত্তি গুজরাটি “বেণিয়া” ও সংস্কৃত “বণিজ” শব্দ হইতে হইয়াছে বলিয়াছেন। তাহারা মণিমুক্তা, হীরাপান্না, সোনারূপার পরীক্ষা করিত ও দর দাম করিয়া দিত। কবিকঙ্কণের চণ্ডীতে গুজরাটের সহিত বাঙ্গালার যে বেশ সম্বন্ধ ছিল, তাহা প্রকাশ পায়। উহাতে বণিক্গণের আগমনের মধ্যে সুবর্ণবণিক্দিগের নামও দেখিতে পাওয়া যায়। সুবর্ণবণিকদিগের মধ্যে নেহালচাঁদের নাম বর্ত্তমান ছিল। কলিকাতার প্রসিদ্ধ দাতা ৺সাগর দত্তের পূর্ব্বপুরুষের ঐ নাম ছিল। আইনী আকবরীতে সুবর্ণবণিক্দের মধ্যে একমাত্র “আঢ্য” পদবী সম্বন্ধে এইরূপ লেখা আছে দেখিতে পাওয়া যায়ঃ— “যাঁহারা সামরিক হিসাবে মন্সবদার ছিলেন না, অথচ সাহসী কর্ম্মঠ কর্ম্মচারী, সম্রাটের খাস পার্শ্বচর ছিলেন, তিনি ভিন্ন অপর কেহ তাহাদের উপর হুকুমজারি করিতে পারিত না, সেইরূপ স্বাধীন ও বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীদিগকে “আঢ্য” বলা হইত বা তাহাদিগকে ঐ পদবীতে ভূষিত করা হইত।” সুতরাং সুবর্ণবণিকগণ তখন বেশ সর্ব্বত্রই সম্মানিত হইত।
বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ— দেশের সম্রাট রাজাদের অজ্ঞতায় যখন বিদেশী বণিকগণের বহির্বাণিজ্য দ্বারা বিদেশ হইতে ধনাগম বন্ধ হইয়া যায় ও ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এদেশের বণিক্গণ পূর্ব্বসঞ্চিত অর্থ লইয়া তাহা খাটাইয়া খাইতে আরম্ভ করে তখনই তাহাদের উপর অধমর্ণগণ বিরক্ত হয়। একটি চলিত কথা আছেঃ— “লাভ লোকসান গণে চাষ করে না যে বেণে”। রাজা বল্লাল সেনের সময় হইতেই রাজাকে দিয়া শাসন দণ্ডের দ্বারা সমাজ সংস্কার করিতে গিয়া ব্রাহ্মণগণ উহাকে রাহুগ্রস্ত করাইয়াছিল। সেকালের সুবর্ণ ধেনু ব্রত আদি করিয়া বল্লালসেন ব্রাহ্মণ ও সুবর্ণবণিকগণকে নির্যাতিত করে; আর রাজা গণেশের পুত্র যদুও সেইরূপ ব্রাহ্মণগণকে নির্যাতিত করিয়াছিল। এই সকল কারণে সমাজ একেবারে হীনবল হইয়াছিল। দেশের ধনরত্ন দেশবাসীরা লইবার জন্য নানা কৌশল করিত। একজনের ধনরত্ন জমিদারী একজন কাড়িয়া লইয়া আপনি রাজা ও জমীদার হইত। সেকালের স্বার্থপর লোকেরা নিজের বল বুদ্ধি ভরসায় না কুলাইলে নানা চক্রান্ত করিয়া বলবানের সাহায্য গ্রহণ করিত। বাজারে পণ্যজীবিগণ রাজকর্ম্মচারীগণের ভয়ে কিরূপ অস্থির থাকিত, তাহা ভাড়ু দত্তের প্রসঙ্গে দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে ধর্ম্মকর্ম্মের বৃত্তিতে লাভ নাই দেখিয়া দরিদ্র সমাজনেতা ব্রাহ্মণগণ চটিয়া আগুন হইত। বাপান্ত তাহাদের মুখের অলঙ্কার ও লোকজনকে অযথা সমাজচ্যুতি করিয়া দণ্ড আদায় করা তাহাদের নিত্য ধর্ম্মকর্ম্মের মধ্যে একটী প্রধান কার্য্য ছিল। সেই ব্রাহ্মণ জাতিকে সেকালে কেহ ঋণদান করিত না। যাহারা অর্থশালী, তাহারা উহা না করিলে ক্রোধের সীমা কতদূর অতিক্রম করিত, তাহা লেখা অপেক্ষা অনুমানে অধিক অনুভব করা যাইতে পারে। বণিকগণের উপর ব্রাহ্মণগণের সেইজন্যই বড় আক্রোশ ছিল। এমন কি, প্রতাপাদিত্য আপনাদের স্বজাতির মধ্যে সংস্কার বা মর্য্যাদা লাভ করিতে গিয়া তাঁহার আপনার জামাতার সহিত মনান্তর হইয়াছিল। প্রতাপাদিত্যের মৃত্যুর পর তাহার কন্যা স্বামীর সহিত সম্মিলিত হয়। দেশের এত দুরবস্থায় শত প্রতাপাদিত্যও স্বাধীনতা রক্ষা করিতে পারে না। এ কথা বলা বাহুল্য যে, জাতীয়তায় সমাজ শক্তি সংগঠিত হইলে, তবেই স্বজাতী ও স্বদেশপ্রীতি সাধারণের হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে। ইংরাজের কর্ম্মচারী হইয়া বা হইবার লালসায় দেশের সর্ব্বনাশ করা স্বদেশহিতৈষীতার কর্ম্ম নয়। ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এদেশে বাণিজ্য করিতে আসিল। কিন্তু এ দেশের রাজা, নবাব, সম্রাট মন্ত্রীগণ একবার ভাবিয়া দেখিলেন না যে, তাহাতে দেশের কি সর্ব্বনাশ হইল বা হইবে। তাহারা অর্থ উৎকোচ ও উপহারের বহরে কর্ত্তৃপক্ষের নিকট ব্যবসা করিবার অনুমতি লাভ করিয়াছিল। তাহাতেই দেশের ব্যবসায়ী দল নীরব ও নষ্ট হইল। তাহাতেই প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণের মধ্যে বিরোধ। যেখানে এমন সুন্দর দৃশ্য—সেখানে সে জাতীর উন্নতি বা স্বাধীনতা কেমন করিয়া হয়? বর্ত্তমান লেখকগণ প্রতাপপ্রমুখ বারভুঞাগণের বিরুদ্ধাচারীগণের উপর খড়্গহস্ত, কিন্তু সেকালের স্মার্ত্ত ও ন্যায়বাগীশেরা বা দেশের প্রধান প্রধান লোকেরা সেরূপ তখন কিছুই করেন নাই বরং তাহাদের সেবা ও গুণকীর্ত্তনাদি করিতেন বলিয়া বোধ হয়। এখনও সমাজ সংস্কৃত বা উন্নত নয়, তখন অতীতের ঘটনা লইয়া বর্ত্তমানে তীব্র কটাক্ষপাত করিলে কোন ফলোদয়ই হইতে পারে না তবে যেটুকু না, করিলে বর্ত্তমান যুগের পাঠকগণের প্রবৃত্তি ও রুচি মার্জ্জিত করা যায় না সেকালের দোষের প্রতি লোকের লক্ষ্য হয় না, তাহাই করা কর্ত্তব্য বলিয়া বোধ হয়।
সমাজ বিপ্লবঃ— দেশের সমাজবিপ্লব তখন তাঁহারা কেহই করেন নাই—বল্লালের কৌলিন্য প্রথাতেই তাহার সূত্রপাত। বাঙ্গালার ব্রাহ্মণ “বার রাজপুতের তের হাঁড়ীর” মত কৌলিন্য জাতরক্ষার জ্বালায় জর্জরিত, আবার তাহার উপর ঘটক ও মুসলমানদের অত্যাচার। তাহাতেই এদেশে রাড়, বারেন্দ্র, বগড়ি, বঙ্গ ও মিথিলা ভিন্ন হইয়া তখন পৃথক পৃথক সমাজের সৃষ্টি করিয়াছিল। বল্লালের যেমন ডোম কন্যাপবাদ ছিল, তেমনি রাজা গণেশের চরিত্রেও কলঙ্ক কালিমা ছিল। তাহার পুত্র যদু মুসলমান ধর্ম্মাবলম্বন করিলে, তিনি যদুকে সুবর্ণ নির্ম্মিত গাভীর মুখ দিয়া প্রবিষ্ট করাইয়া পশ্চাদ্দেশ দিয়া বাহির করাইয়া সেই সুবর্ণ গাভী বিতরণ করিয়া তাহাকে হিন্দু করাইয়াছিলেন। ঐতিহাসিক ষ্টুয়ার্ট যদুকে গণেশের মুসলমান উপপত্নীর গর্ভজাত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার উহারই পোষকতায় উহার নাম ফুলজানি বলিয়াছেন। যে সকল ব্রাহ্মণ সেই সুবর্ণ ধেনুর দান গ্রহণ করিয়া তাহাকে হিন্দু করিয়াছিল, সেই কুলাঙ্গার যদু তাহাদিগকে গোমাংস ভক্ষণ করাইয়াছিল। ইহা রিয়াজ-উস্-সালাতিনের ইংরাজী অনুবাদে দেখিতে পাওয়া যায় (পৃঃ ১১৮)। শোনা যায় যে, সম্রাট সাজাহান হিন্দু রমণীর গর্ভজাত বলিয়া তাতার জাতি তাহার অধীনতা স্বীকার করে নাই। কিন্তু হিন্দুর মধ্যে সে ভাব ছিল না। সেই জন্যই যদু রাজ্য রক্ষার জন্য হিন্দু হইয়া পুনরায় মুসলমান হইয়াছিলেন। সুবর্ণগ্রামস্থ বজ্রযোগিণী গ্রামের একটি পরমা সুন্দরী বিধবা ব্রাহ্মণকন্যা বলপূর্ব্বক গৃহীত হইলে, সামসুদ্দীনের ফৌজদারগণ উহা রাজধর্ম্মের বিরুদ্ধ বলিয়া সেই কন্যার মুক্তি প্রার্থনা করেন। তাহাতে তিনি বলিয়াছিলেন যে, ভগবানের সৃষ্ট এমন সুন্দর ফুলটী বৃথা নষ্ট হইতে দেওয়া উচিত নয়। যদি কোন ব্রাহ্মণ ইহাকে বিবাহ করে, তাহা হইলে তিনি ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছেন কিন্তু কেহই তাহা করিল না। শেষে তাহার নাম ফুলমতী বেগম হয় ও তিনি নবাব সামসুদ্দীনের অঙ্কশায়িনী হইয়াছিলেন। বাঙ্গালীর ঘরে সোনামুখী ফুলজানি প্রমুখ ক্লিওপেট্রার জন্ম না হইলেই ভাল হইত। কি আশ্চর্য্য! কুলাচার্য্যগণ ঘটকমহাত্মাগণ পতিত হইয়াও ব্রাহ্মণদিগের দণ্ড মুণ্ডের কর্ত্তা হইয়াছিল। দেবীবর ঘটকাদির ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোন ব্রাহ্মণই দণ্ডায়মান হইতে তখন সাহস করেন নাই। নিশ্চয়ই তাঁহারা সময়োপযোগী বংশোৎপত্তি ও কৌলিন্য ব্যবস্থা করিতে জানিতেন ও উহার সহায়তা করিবার জন্য ব্রহ্মবৈবর্ত্ত, বৃহদ্ধর্ম্মাদি কতিপয় পুরাণের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সেকালে প্রকৃত প্রস্তাবে হিন্দুর জাত, ধর্ম্ম বা কুল কিছুই ছিল না, তাই ঘটক মহাপ্রভুরা বলিতেন যে, “দোষ নাই যার, কুল নাই তার” অমনি তাহাতে সকলে ধন্য ধন্য করিয়া উঠিত “যথার্থ কুলীনই অগ্নির ন্যায় সকল দোষকে হরণ করিতে সক্ষম।” হিন্দু সমাজ যখন এইরূপ আত্মঘাতী হইয়া পড়িয়াছিল, তখন ভগবান গৌর নিতাইকে পাঠাইয়াছিলেন। প্রেম ভক্তি দিয়া বাঙ্গালায় বৈষ্ণবজাতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বাঙ্গালীর মধ্যে তখন জাতীয়তার সৃষ্টির চেষ্টা হইয়াছিল কিন্তু হায়! তাহাও ভণ্ড ও অষ্টসিদ্ধি দলের কৃপায় সমাজে স্থান পাইল না। শরীর রক্ষা না হইলে কি উপাসনা করা যায়, এই মতই প্রবল হইয়া বৈষ্ণবদের মুখে “মাগুর মাছের ঝোল, ভর যুবতীর কোল, হরি হরি বোল,” উচ্চারিত হইয়া দেশকে নষ্ট করিয়াছে। তখন এই সকল ঘোরতর বিশৃঙ্খলায় হিন্দুসমাজ ও ধর্ম্ম লুপ্ত হইয়াছিল। লোকের জাত ধর্ম্ম তখন দেশের রাজা জমিদার ও ঘটক মহাশয়দের হাতে ছিল। তাহার উদাহরণ স্বরূপ নিয়ে দু’একটী সেকালের ঘটক মহাশয়দের ছড়া ও তাহার আনুসঙ্গিক ঘটনা প্রকাশ না করিলে সম্যক বুঝিতে পারা যায় না। হায়! এই সমাজ ও জাত লইয়া এখন লোকে মারামারি করে।
বল্লালের ডোম কন্যার প্রসঙ্গে পুরোহিত ও পুত্র লক্ষ্মণ সেন তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া যান। রাজা লক্ষ্মণ সেনের আমলে সেই পুরোহিত সিন্দুর ও শাখিনী নামে দুই পরগণা জায়গীর পান। কালে তাঁহার বংশধরগণ পাঠান রাজত্বকালে “রায়” উপাধি লাভ করিয়া দেশে জমিদার ও রাজার মতো হইয়াছিলেন। ঐ বংশের রাজীব রায় রাঢ় দেশ হইতে শিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আনিয়া মৈত্র উপাধি দিয়া তাঁহার দুই ভগ্নীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তাহাতে দেশে হুলস্থল পড়িয়া যায়। বারেন্দ্র সমাজ জ্বলিয়া আগুন হইল ও সেই প্রসঙ্গে দেশময় ছড়া বাহির হইল। ছড়া তখন খবরের কাগজের কাজ করিত।
“গঙ্গাপারের মৈত্র ঠাকুর গলায় রুদ্রাক্ষ মালা,
পরিচয়ের মধ্যে কেবল রাজীব রায়ের শালা।”
“খাট খুটু ঠাকুরটী গলায় রুদ্রাক্ষ মালা,
গাঁই গোত্র কিছুই নাই রাজীব রায়ের শালা।”
জমিদার রাজীব রায়কে তাহার কায়স্থ কর্ম্মচারী ফটিক দত্ত রাঢ়ী বারেন্দ্রের সমাজের সম্মিলন করাইয়া যে সকল ত্রুটী করিয়াছেন দেশে তার বাহির হইবার যো নাই, তাহা তিনি কেমন করিয়া সংশোধন করিবেন, এইরূপ কথা বলিলে, তিনি তাঁহার উপর রাগ করিয়া বলিলেন, “কী এত বড় আস্পর্দ্ধা তুই আমাকে ধোবা বলিলি! ধোবাতেই ময়লা সাফ করে, আমি সেই কাজ করিব, নিশ্চয়ই ফটিক ধোবা না হইলে, কখনই অবলীলাক্রমে ঐ কথা বলিয়া আমায় অপমান করিতে তাহার সাহস হইত না।” তৎক্ষণাৎ রাজীব রায় ফটিককে ধোবা করিয়া দিল। আর ঘটকেরা তাহাদের পুঁথিতে ছড়া লিখিয়া রাখিলেন, যথা:—
“জাতির কর্ত্তা রাজীব রায়, মুলুকের শুবা,
তাঁর হুকুম তুচ্ছ ক’রে, দত্ত হলেন ধোবা।”
দেশ ও সমাজ নীরব; ভয়ে ভয়ে আর কেহ কেহ দ্বিরুক্তি করিল না। শেষে সব থামিয়া গেল। কার্য্যতঃ মহাপ্রভু গৌর নিতাই রাঢ়ী বারেন্দ্র সম্মিলনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। সামাজিক ইতিহাসকার সেকালে ঘটক মহাশয়দিগকে দক্ষিণা দিয়া লোকে গমন করিয়া নিম্নশ্রেণীর জাত হইতে উন্নত হইত, তাহাও প্রকাশ করিয়াছেন। তাহার নদীর সেকালের কুলজী ছড়াতে আছে, যথাঃ—
“হাল বয়, তাল খায়, গিধনায় বাস,
তার বেটা কায়েত হলো বিশ্বাস খাস।”
তখন হিন্দুদের মধ্যে একতা বা জাতীয়তা জ্ঞান কিছুই ছিল না, দেশে যেমন অরাজকতা, সমাজও তেমনি বিশৃঙ্খল। মহামারীতে গৌড়ের ধ্বংস, সপ্তগ্রামের অধঃপতন ও যশোরের ধ্বংসই কলিকাতার উন্নতির কারণ। উহা না হইলে কলিকাতা বোধ হয় যে, অতীতের অতল অন্ধকারে তখনও যেমন লুক্কায়িত ছিল, এখনও তেমনি থাকিত। সেকালের নদীয়া, বাঁশবেড়িয়া, বড়িষার জমিদারগণের দোষ অপেক্ষা হিন্দুসমাজের অধঃপতনই বাঙ্গালার স্বাধীনতা লোপের জন্য অধিকতর দোষী ও তাহার মূল কারণ। তাহাতেই বিদেশী বণিকেরা কলিকাতার উন্নতির সোপান কেন্দ্রীভূত ব্যবসায় করিয়াছিল। স্বদেশী বণিকগণের হতাদর হওয়ার সেই সকল বিদেশী বণিকগণ এদেশে ব্যবসা করিতে পারিয়াছিল। বিদেশী বণিকেরা এদেশী বণিকগণকে বেণিয়াণ করিয়া ব্যবসা আরম্ভ করিয়াছিল। উহাতেই বোধ হয়, “তোর কড়ি মোর বুদ্ধি ফলার করি আয়” এই কথা, চলিত হয়।
যতদিন লোক স্বজাতি বলিয়া স্বজাতিকে কোল দেওয়া কর্ত্তব্য বলিয়া বিবেচনা না করিবে, আপনার দেশের লোকের মুখের অন্ন পরের মুখে তুলিয়া দেওয়াকে পাপ জ্ঞান না করিবে, আপনার জাত্যাভিমান ভুলিয়া সকলের মঙ্গলের জন্য কাতর না হইবে, ততদিন দেশকে স্বাধীন করিবার জন্য স্বরাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, আকাশ কুসুম ভিন্ন আর কিছুই নয়। সে জ্ঞান, সে তপস্যা বাঙ্গালী জাতীর তখনও ছিল না ও তাহা কখনও যে হইবে বলিয়া বোধ হয় না। মিথ্যা মৃত ব্যক্তিগণের প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া কোন ফল নাই। তাঁহাদের বর্ত্তমান বংশধরগণ পোষ্যপুত্রের বংশ মাত্র। আর্য্য, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, বেদ্ধ, গুপ্ত, মুসলমান, খৃষ্টান সাম্রাজ্য ঐ জাতীয়তা ও ধর্ম্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। আর্য্য হিন্দু জাতির অধঃপতন ও বিদেশীদের উন্নতিতে কলিকাতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। কোন ব্যক্তি বিশেষের মহাপাপ বা জাতি বিশেষের চেষ্টায় কলিকাতায় ইংরাজ জাতির সাম্রাজ্য স্থাপনের সূত্রপাত হয় নাই। উহা তাহাদের ভাগ্য, অধ্যবসায় ও জাতীয়তায় হইয়াছিল। সেই কথা পরিষ্কার করিয়া বলিবার জন্য যৎকিঞ্চিৎ সমালোচনা করা হইল।
ভারতবর্ষে বিজ্ঞান চর্চার অভাব দেশের লোক মূর্খ হইয়া পড়িয়াছিল। ইউরোপীয় জাতিগণ তাহারই জন্য এদেশের লোকের উপর সহজেই প্রভুত্ব বিস্তার করিতে পারিয়াছিল ও দেশের কর্ত্তা হইয়াছিল। মুসলমান আধিপত্য যতই সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে লাগিল, ততই সেই আত্মঘাতী হিন্দুসমাজ টোলের অধ্যাপকগণের হস্তে গিয়া পড়িয়াছিল। তখন দেশের লোক সেকালের কাজির বিচার অপেক্ষা সেই সকল শাস্ত্রব্যবসায়ী পণ্ডিতগণকে বড়ই বিশ্বাস ও মান্য করিত। তাহাতেই মুসলমানকে স্পর্শ করা, সমুদ্র যাত্রাদি পাপ হইয়া পড়ে। সেই ব্রাহ্মণগণের বিরুদ্ধে যে কেহ কোন কথা বলিত, সেই পতিত হইত। তাহারা তাহার ধোপা নাপিত বন্ধ করিয়া নিঃগৃহীত করিত। ইহাতেই তখন তাহাদের বিরুদ্ধে কেহই কোন কথা বলিত না। ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশ অপেক্ষা বাঙ্গালা দেশে ব্রাহ্মণ শাসন অধিকতর প্রবল হইয়া পড়ে। যে সমুদ্রযাত্রী বণিক ভারতের সমৃদ্ধির কারণ ছিল, তখন ব্রাহ্মণ শাসন তাহারা * সমুদ্রযাত্রী বৈদেশিক বণিকের কর্ম্মকর্ত্তা বেণিয়াণ হইয়া দেশের ধন তাহাদের হাতে তুলিয়া দিয়া কেবলমাত্র শতকরা কমিশনে সন্তুষ্ট হইতে হইয়াছিল। তাহাতে কলিকাতা, শ্রীরামপুর, হুগলী, চুঁচড়া, ফরাশডাঙ্গার নাম প্রসিদ্ধ হইয়াছিল। সেই সকল স্থানেই ইউরোপীয় বণিকগণ বাণিজ্যারম্ভ ও উহাদের ব্যবসার কেন্দ্র করিয়া উহা দখল করিয়াছিল। হায়! কালের করাল গতিতে যে চিকিৎসাশাস্ত্র রোমমিশরবাসীগণ ভারতবর্ষের নিকট শিক্ষা করিয়াছিল ও উহা পৃথিবীতে প্রচারিত হইয়াছিল, সেই চিকিৎসা দ্বারা ভাগ্যবান ইংরাজজাতি ভারতে বাণিজ্য করিবার ছাড় সনন্দ ও কলিকাতাদি কয়েকখানি গ্রাম খরিদ করিবার স্বত্ব লাভ করিয়াছিল। মুসলমান সম্রাট নবাবেরা সেই জন্য ইউরোপীয় চিকিৎসকগণকে বড়ই সমাদর ও তাঁহাদিগকে নিকটে রাখিতে চাহিতেন। প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হিপক্রেটিস তাঁহার গ্রন্থে কৃষ্ণতিল, চিরতা, দারুচিনি প্রভৃতি দ্রব্যের ভিন্ন ভিন্ন রোগের ঔষধ বলিয়া এদেশী বৈদ্যশাস্ত্রানুযায়ীই চিকিৎসা করিবার ব্যবস্থা উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। সুবর্ণবণিকগণ বিলাত হইতে আমদানির সোনারূপা দিয়া বাঙ্গালাদেশে গহনার চাল করিয়া দেশের লোকের অর্থসঞ্চয়ের ব্যবস্থা করিয়া শেষে সকলের চক্ষুশূল হইয়াছিল। ঐ ব্যবস্থা করায় উহাদিগকে লোকে সোনার বেণে বলিত। সুবর্ণরেখা বাঙ্গালার সীমা ছিল, সেখানে সুবর্ণ আহরণ ঐ প্রদেশী বণিকেরাই করিত। সেই সোনা ও বিদেশী সোনা দেশে ব্যবহৃত না হইলে ঐ ব্যবসা চলে না বলিয়া, তাহারা সেঁকরা রাখিয়া উৎকৃষ্ট গহনা গড়াইত ও বিক্রি করিত। সেই হইতেই সুবর্ণ বণিক ও সোনার বাঙ্গালা নাম আরম্ভ হয়। সেইজন্য সুবর্ণবণিক জাতি ভারতবর্ষের আর কোথাও নেই। সেঁকরারা ঐ সকল গহনা তৈয়ারি করিবার সময় মেল দিয়া সোনা চুরি করিত। সুবর্ণবণিকগণের উপর সেই অপরাধ ন্যস্ত হইত। তাহাতেই তাহাদের ছায়া মাড়াইলে চান করিতে হয়, এই ব্যবস্থা করিবার চেষ্টা চলিয়াছিল। নবশায়কগণ ব্রাহ্মণের মর্যাদারক্ষা ও অর্থসাহায্য করিয়া হিন্দু সমাজে সম্মানিত, আর সুবর্ণবণিকগণ তাহা না করিয়া অপদস্থিত। ইহাতেই তাহারা তখন ঐ ব্যবসা ত্যাগ করিয়া বিদেশী বণিকগণের বেণিয়ান হইয়াছিল। যদি তাহারা ঐরূপ কার্য্য করিতে অযথা বাধ্য না হইত, তাহা হইলে এদেশে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণের বাণিজ্য করা বা তাহাদের রাজ্য লাভ করা অসম্ভব হইত। ঐ সকল বেণিয়ানগণের নামের ও প্রতিপত্তির উপর নির্ভর করিয়া দেশের লোক ইউরোপের ব্যবসায়ীগণকে মাল দিত ও তাহাদের সহিত কারবার করিত। দেশের স্বাধীনতা লোপের জন্য সেকালের ক্ষমতাপ্রিয় অর্থলোলুপ ব্রাহ্মণ সমাজ সম্পূর্ণ দায়ী ও দোষী। তাহারাই দেশের বহির্বাণিজ্য ও অন্তর্বাণিজ্যের মূলে কুঠারাঘাত করিয়া দেশকে দরিদ্র করিয়াছিল। সেকালের সুবর্ণ বণিক তাহাতে অত্যন্ত উত্ত্যক্ত হইয়া নবশায়ক উন্নতকারী হিন্দু সমাজ ত্যাগ করিয়া গৌর নিতাই-এর প্রবর্ত্তিত বৈষ্ণব ধর্ম্মের পক্ষপাতী হইয়া পড়ে। তাহাতেই ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত বিরক্ত ও রুষ্ট হন। সুবর্ণবণিকগণের মধ্যে মহাত্মা উদ্ধারণ দত্ত বৈষ্ণব চূড়ামণি, তাঁহাকে বৈষ্ণবরা বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণলীলার সুবাহুর অবতার বলিয়া থাকেন। তিনি নবাব হুসেন শার সময় জমিদারী খরিদ করিয়া উদ্ধারণপুর নামে নগর সৃষ্টি করেন। তাঁহার পাট বৈষ্ণবগণের তীর্থও ক্রমশঃই উন্নতি লাভ করিতেছে। বৈষ্ণব গ্রন্থে তাঁহার পরিচয় ও মহাপ্রভু গৌর নিতাইয়ের দয়া ও ভক্তির কথা প্রকাশিত রহিয়াছে। সেকালের ব্রাহ্মণ সমাজের সুবর্ণবণিকগণের উপর অযথা হিংসাদ্বেষ ও পীড়নের বিরুদ্ধে পরমদয়াল গৌর নিতাই দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন উক্ত হইয়াছে। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার বাঙ্গালার ইতিহাসে সেই পুণ্য শ্লোক বৈষ্ণবের কথা যাহা লিখিয়াছেন তাহা নিম্নে দেওয়া গেল। উহাতে রাঢ় ও বারেন্দ্রদিগের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধাদিতে কিরূপ ব্যয় হইত, তাহারও প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটকগণ নিত্যানন্দের সময় কিছুই করিতে পারিলেন না, কিন্তু উপযুক্ত তাঁহার সন্তানের বংশে বীরভদ্রী দোষ স্পৃষ্ঠ করাইতে ছাড়িলেন না। সে দোষের সঙ্গে উদ্ধারণের হাতে নিত্যানন্দের অন্নগ্রহণের কথা কিন্তু উক্ত হয় নাই, যদি তখন উহা দোষ বলিয়া গণ্য হইত, তাহা হইলে ঘটকেরা তাহা ছাড়িবার পাত্র ছিলেন না। বাঙ্গালা দেশে হিন্দুজাতির মধ্যে জাতিগত ছুঁই ছুঁই ও অন্যান্য কুসংস্কারের সৃষ্টি সেকালের টুলো গোড়া ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণই করিয়াছিলেন। ১৪৮১ খৃষ্টাব্দে সুবর্ণ বণিক উদ্ধারণ দত্তের জন্ম হইয়াছিল। উদ্ধারণ দত্ত, দশ সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিয়া নিত্যানন্দের বিবাহ দিয়াছিলেন। তিনি ৪৮ বৎসর বয়সে গৃহত্যাগ করিয়াছিলেন এবং ছয় বৎসর পুরুষোত্তম ও ছয় বৎসর বৃন্দাবনে বাস করিয়া ১৫৪১ খৃষ্টাব্দে দেহ ত্যাগ করিয়াছিলেন। পণ্ডিত সূর্য্যদাস সরখেলের দুই কন্যা বসুধা ও জাহ্ণবীকে শ্রীমন্নিত্যানন্দ বিবাহ করেন। সুবর্ণবণিকগণ মনে করিলে সে সময়ে হিন্দুসমাজে তাহাদের যথাস্থান অনায়াসে লাভ করিতে পারিতেন কিন্তু তাঁহারা হিন্দু সমাজের দুরবস্থা দেখিয়া বৈষ্ণব সমাজে সমাদৃত হওয়াই ভালো বিবেচনা করিয়াছিলেন। তাহাতেই হিন্দু সমাজের আক্রোশ তাঁহাদের উপর দ্বিগুণ বাড়িয়াছিল। ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব কবিগণের লেখাতে তাহার সবিশেষ আভাস লক্ষ্য হয়। সেকালে বাণিজ্য জলপথেই অধিক হইত। দেশে যাতায়াতের রাস্তায় গাড়ী যাইবার সুবিধাও ছিল না ও সেদিকে দেশের শাসনকর্ত্তাদের লক্ষ্য পড়িবার সময় বা সুবিধা ছিল না। তখন এখনকার মত গাড়ী ঘোড়ার চল ছিল না। গরুর গাড়ীতেই মালাদি ও লোক যাইত। তাহাও দস্যু ও হিংস্র জন্তুর ভয়ে বেশী দূর যাইতে পারিত না। একদিনে যতদূর পথ যায়, ততদূরই চলিত। তাহাতে তখন একদিনের অধিক দূরের লোকের সহিত পরস্পর মেশামিশি ছিল না এমন কি, পরস্পর পরস্পরকে জানিত না ও চিনিত না। ঐ সকল স্থানের গণ্ডি মধ্যে তাহারা পৃথক হইয়া থাকিত। তাহাতেই রাঢ় বারেন্দ্র আদি ভিন্ন হইয়া ক্রমে ক্রমে ও পরস্পর পরস্পরকে পর ভাবিত। ইহাতেই ইউরোপবাসীগণ এদেশে ব্যবসা করিতে আসিয়া এদেশে লোকের সহিত মেশামিশি করিয়া স্বজাতীও স্বদেশবাসি অপেক্ষা অধিকতর ঘনিষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। হায়! তখন দেশের অভাব দূর করা লোকের চিন্তার অতীত হইয়াছিল।
তখন ভারতবর্ষের অধিকাংশ দেশেই ইচ্ছাতন্ত্র শাসন প্রণালী প্রচলিত ছিল। অসংযত ক্ষমতাশীল সম্রাট মূর্খ নবাবেরা প্রজার উপর যথেচ্ছাচার দুর্ব্ব্যবহার করিত। তাহাতেই প্রজারা সর্ব্বদাই দুঃখ ভোগ করিত ও শাসনকর্ত্তার ভয়ে জড়সড় হইয়া থাকিত। তখন কেহ কোন কথার প্রতিবাদ করিতে পারিত না। সর্ব্বদাই ঘরে বসিয়া আপদ বিপদ হইতে স্ত্রী পুত্র পরিবারকে বাঁচাইবার চিন্তায় ব্যস্ত থাকিত। আরও সেকালে গৃহস্থেরা শিক্ষিত ছিল না, যাহার যে কার্য্য, যা ব্যবসা, তাহা চালাইবার জন্য যতটুকু শিক্ষা আবশ্যক, তাহাই শিক্ষা করিত। সেকালের গুরু মহাশয় শিক্ষার আচার্য্য ছিল। তাঁহাদের বিদ্যা ও বুদ্ধির দৌড় অক্ষর পরিচয় লেখা ও পড়া, অঙ্ক ও শুভঙ্করী। টোলের পণ্ডিতের কাছে ব্রাহ্মণেতর জাতি শিক্ষা লাভ করিতে পারিত না। লোকে তখন কথকতায় শাস্ত্র জ্ঞান লাভ করিত। বাঙ্গালায় কাশীদাস কীর্ত্তিবাস রামায়ণ মহাভারত রচনা করিয়াছিল। সেকালে রাজনীতি চর্চ্চা করিবার বিদ্যা ও বুদ্ধি সেকালের জমিদার বা টোলের পণ্ডিতদের কিছুই ছিল না। প্রতাপাদিত্য প্রমুখের যাহা কিছু হইয়াছিল তাহা দিল্লি দরবারে গিয়া ও পূর্ব্ব পুরুষগণ নবাব সরকারে কার্য্য করিত সেই নিমিত্ত তাঁহাদের নিকট হইতে যৎকিঞ্চিৎ শিক্ষা লাভ করিয়াছিল।
রাস্তাঃ— কলিকাতা হইতে যশোরের রাস্তা বর্ত্তমান আছে ও বারাকপুর আদি স্থানের সহিত যাতায়াতের ব্যবস্থা স্থল পথে আছে, কিন্তু উহা কে কবে করিয়াছিল, তাহার সবিশেষ নির্ণয় করিবার উপায় নাই। অনেকেই বলেন যে, ঐ সব রাস্তা প্রতাপাদিত্য বা মুসলমান নবাব বাদশারা করিয়াছিলেন। ঐ সকল রাস্তা তৈয়ারির বিবরণ সেকালের মুসলমান ঐতিহাসিকগণ বা ঘটকেরা প্রশংসার কর্ম্ম মনে করিত না, তাহাতেই কোন উল্লেখ নাই। কেবল ঐজন্য শেরশার নাম প্রসিদ্ধ, তিনি সুন্দর সুন্দর পথ ও বিশ্রামাগার করিয়াছিলেন। গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রাস্তা তাঁহারই কীর্ত্তি বলিয়া উল্লিখিত হয়। তিনি সোনার গাঁ হইতে সিন্ধু পর্য্যন্ত ১৫০০ ক্রোশ রাস্তা করিয়াছিলেন। তিনি দিল্লি ও আগ্রার মধ্যে রাস্তা করিয়াছিলেন। শেরশার আমলে ঐ সকল রাজপথ নিরাপদ হইয়াছিল ও রাস্তায় পণ্যদ্রব্যের উপর কর আদায় হইত। তাহার আমলে বাঙ্গালায় বিদেশী দ্রব্য বিনা মাশুলে আসিত। উহার কর গ্রহণের সুবিধা ছিল না। সেকালে কলিকাতায় এমন কোন বাণিজ্য দ্রব্য ছিল না যে, যাহার জন্য উহা ঢাকা বা অন্য কোন স্থানের ন্যায় বিখ্যাত হইয়াছিল। বিদেশী বণিকগণের সঙ্গে যাহারা বাণিজ্য করিত, তাহারা বেণিয়াণের কার্য্য করিত বা দালালি করিত। তাহাদের দাদন লইয়া তাঁতিরা প্রথম কলিকাতায় সূতা কাটিত ও উহার ব্যবসা করিত। এই পর্য্যন্ত কবিকঙ্কণাদিতে আভাস পাওয়া যায় মাত্র। কলিকাতার নিকট প্রতাপাদিত্যের দুর্গাদি ছিল ও সেইখানে মোগল সেনাপতি আজিম খাঁ প্রতাপাদিত্যের নিকট পরাজিত হয়। তাহাতেই বোধ হয় যে, কলিকাতার কতকাংশ উন্নতি প্রতাপাদিত্যের সময় হইয়াছিল ও ঐখানে আজিম খাঁ শিবির স্থাপন করিয়া থাকিবার সময়, তাহারাই বন জঙ্গল পরিষ্কার করিয়াছিল। তখন সেখানে ঐ সকল মোগল সেনার আহারোপযোগী দ্রব্যাদি ছিল ও লোকজন তখন তাহা সরবরাহ করিত ইহাও স্বীকার করিতে হইবে। তখন লোক সংখ্যা বড়ই অল্প ছিল।
ইউরোপীয় বণিকগণের শুভাগমনের পূর্ব্বে বনজঙ্গল ও যুদ্ধোপযোগী স্থান ভিন্ন অন্য কোনরূপ বসবাসের উপযুক্ত স্থান বলিয়া কলিকাতার সমন্ধে কোনই উল্লেখ পাওয়া যায় না; তাহাতেই উহা বড়ই অস্বাস্থ্যকর স্থান হইয়াছিল।
* Numerous Sanskrit inscriptions in Champa, Kamboja (Tonking and America)
in Java and Sumatra tell us that Hindus conquered these countries and held
them from second century of the Christian era downwards untill the 12th
century. Dr. Biihler Bombay Gazette, 1890.
** যুঝে প্রতাপ আদিত্য, যুঝে প্রতাপ আদিত্য
ভাবিয়া অসার, ডাকে আর বার, সংসার সব অনিত্য।
শিলাময়ী নামে, ছিল তার ধামে, অভয়া যশোরেশ্বরী
পাপেতে ফিরিয়া, বসিল রুষিয়া, তাহারে অকৃপা করি।
বুঝিয়া আহিত, গুরু পুরোহিত, মিলে মানসিংহে রাজে
লস্কর লইয়া, সত্বর হইয়া, প্রতাপ আদিত্য সাজে।”
* * * *
“পাতশাহি ঠাটে, কবে কেবা আঁটে, বিস্তর লস্কর মারে,
বিমুখী অভয়া, কে করিবে দয়া, প্রতাপ আদিত্য হারে।
শেষে ছিল যারা, পলাইল তারা, মানসিংহ জয় হৈল
পিঞ্জর করিয়া, পিঞ্জর ভরিয়া প্রতাপ আদিত্যে লৈল।”
* * * *
“প্রতাপ আদিত্য রাজা মৈল অনাহারে মৃতে ভাজি মানসিংহ লইল তাহারে।
কতদিনে দিল্লীতে হইয়া উপনীত, সাক্ষাৎ করিল পাতশাহের সহিত।
ঘৃত ভাজা প্রতাপ আদিত্যেরে ভেট দিলা, কব কত যত মত প্রতিষ্টা পাইলা।
পাতশাধ আজ্ঞামত মানসিংহ রায়, প্রতাপ আদিত্যে ভাসাইলা যমুনায়।”
* জনৈক বৈদেশিক লেখক ভারতে অশান্তি ও উপদ্রব লিখিয়াছেনঃ— “If the inhabitant
of that law-flooded land had not erected his social dams, dim the shape of caste
customs whereby he has been able to stem the inroads of Christian vigour as
well as of Mahomedan violence, it is difficult to see how he could have prevented
himself from retrograding into a semi-snimal existence. A perpetual flow in the
whole structure of human relations is not the best social medium for the realisation
of higher possibilities, and yet this would have been the inevitable result, without
the powers of resistence residing in caste prejudices.”
* মক্কার যাত্রাকালে চেরামন পেরুমল হিন্দুরাজা কালী মন্দির হইতে কুক্কুটধ্বনি যতদূর শ্রুত
হইয়াছিল সেইস্থান মানবিক্রম জামরিণকে দান করিয়াছিলেন। কলিকট্টা এই দেশজ শব্দ হইতে
কালিকট নামের উৎপত্তি। ঐ দেশজ শব্দের কুক্কুটে ধ্বনি বা দুর্গ।
* In Bengal there are the richest merchants I ever met with. —Ludovico di
Verthema’s travels—P. 212.
* সমুদ্র যাত্রা স্বীকার কমণ্ডলু বিধারণং ইমান ধর্ম্মাণ কলিযুগে বর্জ্জ্যানা ইমানীষিণঃ রঘুনন্দনের
উদ্বাহতত্ত্ব।
