৪. ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও তাহাদের উদ্যোগ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ – ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও তাহাদের উদ্যোগ
দৈবঃ— উচ্চাভিলাষ, ঐকান্তিকতা, অধ্যবসায়, ধৈর্য্য ও শিক্ষাই উন্নতি ও কৃতকার্য্যতার সোপান। উপযুক্ত সময় ও সুযোগে কার্য্য না; করিলে উন্নতি হয় না কৃতকার্য্যতা মনুষ্যের বিদ্যা, বুদ্ধি, ভাগ্য ও অভিজ্ঞতাতেই লাভ হয়। ঘটনাচক্রের সমাবেশেই মনুষ্যের ভাগ্য পরিবর্ত্তন ও উন্নতি হয়, লোকে উহাকেই দৈব বলে। আর তাহা না হইলে লোকে আকাশে উঠিতে গিয়া পাতালে পড়িয়া যায়। সে দুর্দ্দশা স্পেন পর্ত্তুগালের অজেয় রণতরীর মত বাঙ্গালার বারভূঁঞাদের হইয়াছিল। তাহারা যদি মন্তব্য স্থির করিয়া সকলে একত্রিত হইত ও যে সময় ইউরোপীয় বণিকগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ ও ষড়যন্ত্রে কৃতকার্য্য হইয়াছিল, সেই সময়ে যদি তাহারা তাহাই করিত, তাহা হইলে বোধ হয়, ভারতবর্ষের কিম্বা বাঙ্গালার ইতিহাস পৃথক হইত। ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়া যথাবিধি সমস্ত প্রস্তুত করিয়া শীকার করিতে গেলে, লোকের আশাভঙ্গ হয় না; কিন্তু তদ্বিপরীতে লোকে যদি অগ্রপশ্চাৎ না ভাবিয়া কার্য্য করে তবে কোন সুফল হয় না। তৃণ সকল একত্রিত করিয়া রজ্জু দ্বারা মত্ত হস্তীকে বদ্ধ করা যায় কিন্তু পাশ্চাত্য রাজনৈতিক বণিকগণ উপযুক্ত কৌশলে ও অবসরে হস্তীকে পঙ্কে মগ্ন করিয়া তাহার উপর চড়িয়া কার্য্যসিদ্ধ করিয়াছিলেন। কবিরা তাই বলিয়া থাকেন যে, লক্ষ্মী উদ্যোগী বিমৃশ্যকারী ব্যক্তির গুণে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে আশ্রয় করেন। মহাভারতে সেইজন্যই পরম রাজনৈতিক যুধিষ্ঠির দ্যূত ক্রীড়ার সময় সমস্ত অপমান অবনত মস্তকে সহ্য করিয়াছিলেন। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একদিনে স্থাপিত হয় নাই। দুইশত বর্ষের উদ্যোগ, অধ্যবসায়, কার্য্য কুশলতা ও যুদ্ধ বিদ্যার ফলে হইয়াছিল। তাহার বিবরণ ঘোর কলির দ্বিতীয় মহাভারত বলিলেই চলে। তখনকার সকল অভিনয়েই ইংরাজজাতির দৈব সহায় হইছিল।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ঃ— ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দে ২২শে সেপ্টেম্বর বিলাতের অলড্যারম্যানের বাড়ীতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই গৃহটি শেষে বিলাতে ‘‘Founder’s Hall” নামে পরিচিত ও বিখ্যাত হইয়া পড়ে। ১৫৯০ খৃষ্টাব্দের ৩১ এ ডিসেম্বর ওলন্দাজগণের নিকট ভারতবর্ষের মরিচাদি দ্বিগুণ অপেক্ষা অধিক মূল্যে খরিদ করিতে হইতেছে দেখিয়া, ভারতে বাণিজ্য করিবার জন্য সত্তর হাজার পাউণ্ড মূলধন স্থির করিয়া একজন গবর্ণর ও কতিপয় ডিরেক্টরের অধীনে একশত পঁচিশ জন বিলাতী বণিকগণ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সংগঠিত করে। রাজি এলিজাবেথ উহাদের সনন্দ প্রদান করেন। ১৬০৩ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের দরবারে জন মিডেল হল কয়েকটি রত্ন আর ঘোটকাদি উপহার লইয়া উপস্থিত হন। তিনি পার্শি ভাষা জানিতেন না। পর্ত্তুগীজ জোসুইট ধর্ম্মাবতার পাদরীগণের ক্ষমতা ও চক্রান্তে তিনি কিছুই করিতে পারিলেন না; কিন্তু তাহাতে তিনি পশ্চাৎপদ হইলেন না। সেখানে ছয় মাস থাকিয়া পার্শি ভাষা শিক্ষা করেন ও নিজের মন্তব্য দরবারে পুনরায় সেকালের কৌশলাদির সহ অবগত করাইলেন। তাহাতে তাঁহার উদ্দেশ্য কিয়ৎ পরিমাণে সিদ্ধ হইল ও কার্য্য কিয়ংদংশ অগ্রসর হইল মাত্র। তাঁহার ধৈর্য্য, অধ্যবসায় ও ঐকান্তিকতায় সকলেই মুগ্ধ হইয়াছিল।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় পর্ত্তুগীজ ও আরমাণি বণিকগণ পরমা সুন্দরী রমণীগণকে উপহার দিতেন ও তাহারা তাহাতেই তাঁহাদের প্রিয়পাত্র হইতেন। সম্রাট আবার সেই সকল সুন্দরীগণকে তাঁহার প্রিয়পাত্রদিগকে উপহার দিতেন। সম্রাটেরা ঐ সকল রমণীদানের প্রলোভন দ্বারা শত্রুগণের উদ্দেশ্য বিফল করিবার চেষ্টা করিতেন, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহাতেই স্ত্রীজাতির দুর্দ্দশার সীমা ছিল না, তাহারা স্বাধীনতা হারাইয়া যেন পণ্য দ্রব্যের মত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাতেই সমাজে অবরোধ ও সহমরণ ব্যবস্থা দ্বারা স্ত্রীজাতির ধর্ম্মরক্ষা করিবার ব্যবস্থা হয়। সর্ব্বত্রই ব্যাভিচারবৃত্তির প্রশ্রয়ে লোকের দেশের নবাব, সম্রাট বা তাহাদের কর্ম্মচারিদের উপর কাহারও কোনও ভক্তি বা শ্রদ্ধা ছিল না। তাহারা সর্ব্বদাই ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিত যে, ভগবান কবে তাহাদিগকে তাহাদের হস্ত হইতে উদ্ধার করিবেন। এইরূপ যখন দেশের অবস্থা, তখনই ইউরোপীয় বণিকগণ সম্রাটের দরবারে যাতায়াত করে ও এদেশে বাণিজ্য করিবার জন্য আসিয়াছিল। তাহাতেই তাহারা অনায়াসে কৃতকার্য্য হইয়াছিল।
যখন বর্ত্তমানের ভোগ বিলাসিতা অপেক্ষা ভবিষ্যতের উন্নতির দিকে তাকাইয়া যে জাতির মধ্যে অধিকাংশ লোক কার্য্যারম্ভ করে, তখনই সেই জাতির উন্নতি আরম্ভ হয়। ইউরোপের বণিকগণের তাহা পূর্ণমাত্রায় ছিল, সেই জন্যই তাহারা দেশের সমস্ত উপভাগ ও মমতা বিসর্জ্জন করিয়া বিদেশে মৃত্যুকে বরণ করিতেও কখনও কুণ্ঠিত হয় নাই। ইতিহাসে উহারই দৃষ্টান্ত জাজ্জ্বল্যমান রহিয়াছে। ধর্ম্মের সঙ্গে, কর্ত্তব্য প্রতিপালনের সঙ্গে, জাতির উন্নতি কোথায় কেমন করিয়া কি করিলে হয়, তাহা সেকালের ঘটনা সমূহের মধ্যে লক্ষ্য হয়। সেকালে “জোর যার মুলুক তার” “মারি অরি পারি যে কৌশলে” এই সকল দুর্নীতির প্রশ্রয়ে দেশে ঘোর অরাজকতা আসিয়াছিল। গুপ্তহত্যা ও লোকবলই তখন এদেশে ব্যক্তি বিশেষের উন্নতির সোপান; দেশে কাহারও সহিত কাহারও সদ্ভাব ছিল না। পরস্পর পরস্পরের আন্তরিক হিংসা করিত; তাহাতেই যথাসময়ে বিদেশী বণিকগণ এদেশের লোকদিগকে সাহায্য করিয়া তাহাদিগকে বাধ্য করিয়াছিল। সকালের ঘটনা রাশির মধ্যে এই সহানুভূতি সূত্র বর্ত্তমান। তাহা লক্ষ্য করিবার অগ্রে উহার সূচনাদি উল্লখ করা হইল। * ১৬০৯ খৃষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর পার্শী ভাষাজ্ঞ ইংরাজ হকিন্সের নিকট হইতে উপহারাদি গ্রহণ ও আড়াই বৎসর কাল তোষামোদাদিতে বাধ্য হইয়া শেষে তাহাকে এক পরমাসুন্দরী আরমাণি রমণী উপহার দিবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন কিন্তু সুচতুর কর্ত্তব্যপরায়ণ হকিন্স তাহাতে সম্মত হইলেন না। অবশেষে অনেক কষ্টে তিনি সুরাটে বাণিজ্য কুঠী করিবার অনুমতি লাভ করিয়াছিলেন। এ দেশের লোকেরা কেহই তখন তাহাতে কোন আপত্তি করে নাই। পুনরায় ১৬১৫ খৃষ্টাব্দে স্যার টমাস রো নানাবিধ উপহারে সন্তুষ্ট করিয়া দিল্লির দরবার হইতে ইংরাজদের ১৬২০ খৃঃ আগরায় ও ১৬২৩ খৃষ্টাব্দে পাটনায় কুঠী খুলিবার অনুমতি লাভ করিয়াছিল। শোনা যায় যে, ১৬৩৪ খৃঃ ইংরাজের ডাক্তার ব্রাউটন সম্রাট সাজাহানের কন্যাকে ও বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা সুলতান সুজার মহিষীকে আরোগ্য করিয়া বিনা শুল্কে বাঙ্গালা দেশে বাণিজ্য করিবার অনুমতি লাভ করে।
সাজাহান সম্রাট হইবার পূর্ব্বে দুই বৎসর বাঙ্গালায় ছিলেন ও তিনি পর্ত্তুগীজদের দুবর্ব্যবহার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। তাহারা লোকজনকে খাটাইয়া মজুরী দিত না, জোর করিয়া খৃষ্টান করিত, কাহারও কোন কথা গ্রাহ্য করিত না ও অবসর পাইলেই সব লুটপাঠ করিতে ছাড়িত না। তিনি সম্রাট হইয়াই হুকুম দিলেন যে, বাঙ্গালার রাজকার্য্যের দপ্তর হুগলীতে আনিয়া সেখান হইতে যেন পর্ত্তুগীজগণকে তাড়াইয়া দেওয়া হয়। তিনি আকবরের ন্যায় দেশের মঙ্গলের জন্য ও বাঙ্গালীর মনে ধর্ম্মবল সঞ্চারণ করিবার নিমিত্ত গৌড়ের ধ্বংসের পর সরকারী খরচায় ব্রাহ্মণের দ্বারা যথারীতি দুর্গোৎসব করাইয়াছিলেন। তাহাতেই বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে দুর্গোৎসবের আড়ম্বর বাড়িয়াছিল। কিন্তু সেই সরকারী দুর্গাপূজা ঔরঙ্গজেবের সময় উঠিয়া তাহার পরিবর্ত্তে মহরম উৎসব আরম্ভ হয়।
ইংরাজের সৌভাগ্য বলেই শিবাজীর অভ্যুদয় হইয়াছিল, তাহা না হইলে ইংরাজের উপর দেশের লোকের শ্রদ্ধা ও তাহাদের উপর সম্রাট ঔরঙ্গজেবেরও দৃষ্টি পড়িত না। ১৬২২ খৃঃ অক্সেনডেন ইংরাজের সুরাটের কুঠি রক্ষা করিয়া ঔরঙ্গজেবের নিকট হইতে যে খেলাত ও তরবারি পাইয়াছিলেন ও তাঁহাদের বাণিজ্য দ্রব্যের মাশুল কমাইয়া লইয়াছিলেন। তাহার পর অঙ্গিয়ার অধ্যক্ষ হইয়া বোম্বাই-এর স্বাস্থ্যরক্ষা বিধান, বিচার নীতি ও প্রজাতন্ত্র শাসন চালাইয়া সেখানকার লোকদিগকে মুগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। এদিকে পর্ত্তুগীজেরা লোকের নিকট হইতে এক চতুর্থাংশ খাজনা আদায় করিত, লুটপাট করিত, নরনারী লইয়া ক্রীত দাসের ব্যবসা করিত, লোক খাটাইয়া মজুরী দিত না, তদ্পরিবর্ত্তে ওদিকে অঙ্গিয়ার যাহাতে কেহ অত্যাচার করিতে না পারে, সেই জন্য রণতরী সাজাইয়া সৈন্য সৃষ্টি, দুর্গ নির্ম্মাণ, স্থানীয় লোকদের ভিতর আপোষে বিবাদাদি বিসম্বাদ নিষ্পত্তি, বিচারপদ্ধতি ও লজ্জাকর দণ্ড বিধান প্রচলন দ্বারা সকলের পরম হিতৈষীর কার্য্য করিতেছিল। ইহাতে দেশের লোকেরা বিপদে ইংরাজদিগকে উদ্ধারকর্ত্তার ন্যায় দেখিতে লাগিল। ইহাতে বোম্বাই সহর অতি অল্পদিনের মধ্যে সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিল।
১৬২৫ খৃষ্টাব্দে মসলিপট্টনের নিকট অমর গাঁয়ে ইংরাজের কুঠী স্থাপিত হইয়াছিল, ১৬৩২ খৃঃ আট জন ইংরাজ বণিক সেই সময়ের প্রচলিত নিয়মানুসারে উড়িষ্যার মোগল শাসনকর্ত্তার পদ চুম্বন ভান ও নানা উপহারে তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিয়া সেখানে বাণিজ্য করিবার অনুমতি পাইয়াছিল। ডাঃ ব্রাউটন ১৬৩৪ খৃঃ দিল্লির সম্রাটের নিকট হইতে বঙ্গ দেশে বাণিজ্য করিবার সনন্দ পাইয়াছিল এবং ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ১৬৩৯ খৃঃ চন্দ্রগিরির রাজার নিকট হইতে মান্দ্রাজ খরিদ করিয়া সেইখানে সেন্ট জর্জ্জ দুর্গ স্থাপন করিয়াছিল। ১৬৪০ খৃঃ হুগলীতে ১৬৪২ খৃঃ জলেশ্বরে ও ১৬৫৮ খৃঃ কাশীম বাজারে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কুঠী স্থাপন হইয়াছিল। দিল্লীর সিংহাসন ঔরঙ্গজেব কৌশলে অধিকার করিয়াছিল। সেই সময় ইংলণ্ডে ক্রম ওয়েলের প্রাদুর্ভাব ও প্রজাতন্ত্র শাসন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল ও সেই সময়ে ভারতে বাণিজ্য করিবার সনন্দ আর একদল বণিক পাইয়াছিল। ১৬৬১ খ্রীঃ ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্টুগালের রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়া বোম্বাই সহর যৌতুক পাইয়াছিলেন। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি উহা তাহার নিকট হইতে বার্ষিক দশ পাউণ্ড খাজনায় বিলি করিয়া লইয়াছিলেন। এইরূপে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বোম্বাই মান্দ্রাজ লাভ হইয়াছিল। বোম্বায়ের টাকশালে কোম্পানির মুদ্রা প্রস্তুত হইত তাহার ওজন ঠিক ও খাদ কম থাকায় ঐ অঞ্চলের বাজারে তাহা বেশী চলিত এবং মুদ্রার উপর লোকের বিশ্বাস ও আস্থা হয়।
ছত্রপতি শিবাজীঃ— ১৬৭০ খৃঃ অঙ্গিয়ার মারহাট্টা আক্রমণ ব্যর্থ করিলেন সত্য বটে কিন্তু শিবাজী ছাড়িবার পাত্র ছিলেন না। তিনি হঠাৎ হুবলী আক্রমণ করিয়া ধারওয়ার পর্য্যন্ত লুঠ করিলেন। ১৬৭৪ খৃঃ তাহাতেই শিবাজী ইংরাজদিগকে তাঁহার সহিত সন্ধি করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। হুবলী তখন ধারওয়ার বিভাগের কার্পাসের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ইংরাজ সেই কার্পাস লইয়া বাণিজ্য করিত। ঐ স্থান গেলে ঐ ব্যবসা চলে না বলিয়া অঙ্গিয়ার অর্থ দিয়া সমস্ত মিটাইয়া ফেলেন। এইরূপ শিবাজী ইংরাজদিগকে হস্তগত করিয়াই ও তাহাদের নিকট হইতে উপঢৌকন ও কর লইয়া রায়গড়ে প্রকাশ্যভাবে স্বাধীন সম্রাটের ন্যায় নিজ রাজ্যাভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়াছিলেন। এইরূপে ঔরঙ্গজেবও শিবাজীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, পর্ত্তুগীজ বোম্বাটিয়াদের অত্যাচারে ও দেশের দুরবস্থায়, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারগণের বীরত্ব ও চতুরতায় ইংরাজদের নৌ সেনাবল ও সৈন্য সামন্ত পরিবর্দ্ধিত ও অবাধে স্থানে স্থানে দুর্গাদি প্রতিষ্ঠিত করিতে দেওয়ায়, তাহাদের ভবিষ্যৎ রাজশক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। শিবাজীর রাজ্যাভিষেকে ভারতবর্ষে মোগল সম্রাটের ক্ষমতা প্রকাশ্য ভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। ইংরাজ দূত ডাক্তার ফ্রায়ার নানা কৌশলে ও বহুমূল্য উপঢৌকনাদি দ্বারা শিবাজীর নিকট হইতে ঐ দেশে বাণিজ্য করিবার ও মুদ্রা প্রচলন করিবার অনুমতি লাভ করেন। এদেশে ইংরাজি ডাক্তারেরাই ইংরাজের ব্যবসার পথ পরিষ্কার করিয়াছিল।
বাঙ্গালায় ১৬৭২ খৃঃ সায়েস্তা খাঁর আমলে তাঁহার দ্বারা এইরূপ এক আদেশপত্র ইংরাজেরা প্রচারিত করাইয়াছিল যে, যাহাতে ইংরাজেরা তখন অবাধে মালপত্র বাঙ্গালা বিহার ও উড়িষ্যায় আমদানি রপ্তানি করিতে পারে এবং দিনেমাররা সেইরূপ কোন কিছু করিতে পারে না। তখন অন্যান্য সওদাগর বা তন্তুবায়গণ ইংরাজদিগকে কোনও মতে ঠকাইতে না পারে সে কথারও উল্লেখ ছিল। ১৬৭৫ খৃঃ ওলন্দাজেরা চুঁচুড়ায় বাণিজ্যারম্ভ ও তাহার উন্নতি সাধন করিয়াছিল। দিনেমারেরা বরাহনগরে শূকরমাংস লবণে জারিত করিয়া তাহা ইউরোপে বিক্রয়ের জন্য পাঠাইত। প্রথম ১৬৪৮ খৃঃ ইংরাজ পাদরী জন্ ইভান্স বাঙ্গালাদেশে আসিয়াছিল ও ১৬৭৯ খৃঃ ইংরাজদের প্রথম বাণিজ্য জাহাজ ফ্যাকন মেটিয়াবুরুজ হইয়া হুগলীতে গিয়াছিল। উক্ত বাঙ্গালার ইংরাজের কুঠীগুলি মান্দ্রাজ কুঠীর অধীন ছিল বটে কিন্তু কর্ম্মাচারীগণ যথেচ্ছাচার গুপ্ত বাণিজ্যে ও বিশ্বাসঘাতকতায় কোম্পানীর বিশেষ ক্ষতি করিতেছিল। কাশীমবাজারের কুঠীতে কোম্পানির খাজাঞ্চী রঘুনাথ পোদ্দারের হঠাৎ খুন হয়। উক্ত হত্যাকাণ্ডের গোলযোগ বিলাত হইতে স্ট্রীনসম্ মাষ্টার আসিয়া মোগল সরকারে তের হাজার টাকা দিয়া মিটাইয়া ফেলেন। তিনি ভিন্ সেন্টকে কাজের লোক বলিয়া পদচ্যুত করেন নাই এবং কুঠীগুলি সম্বন্ধে নানা সুব্যবস্থা করিয়া যান। তাহাতে ঘরবাড়ী পাকা হইয়াছিল। তখনকার কুঠীর বড় সাহেবেরা পাল্কী ব্যবহার করিতেন, তাহা সেকালের জমিদারেরা করিতে পারিত না, পাদ্রী ও অন্যান্য কর্ম্মচারিগণের মাথায় ছাতা ধরিবার ব্যবস্থা ছিল। ১৬৭৯ খৃঃ মাদ্রাজের গবর্ণর হুগলীতে আসিয়া কর্ম্মচারীগণের নৈতিক উন্নতি সাধন করিবার জন্য কতকগুলি কঠোর নিয়ম করিয়াছিলেন। তাহাতে বেশ বুঝা যায় যে, তখন বাঙ্গালার কর্ম্মচারীরা ঈশ্বরভজনাদি করিত না, মিথ্যা শপথ ও ব্যাভিচারাদিতে লিপ্ত থাকিত। তাহারা রাত্রে গৃহে থাকিত না, তাহাদের অন্যান্য দোষও যথেষ্ট ছিল।
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নিকট হইতে ১৬৮০ খৃষ্টাব্দে ইংরাজেরা নূতন ফরমান পাইয়াছিলেন কিন্তু তাঁহাতে তাঁহাদের বিশেষ কোন ফলোদয় হইল না। ইংরাজদিগের হুগলিতে বাণিজ্য করিবার বড় সুবিধা হইল না। শেষে জব চার্ণকের সহিত মোগল কর্ম্মচারীদের বিলক্ষণ ঝগড়া বাধিয়া উঠিল, এমন কি, দুই পক্ষে ছোট খাট যুদ্ধ হইয়াছিল। জলযুদ্ধে ইংরাজেরা তাহাদিগকে পরাজিত করিয়াছিল কিন্তু স্থলযুদ্ধে নিস্তার নাই ভাবিয়া জব চার্ণক সুতানুটী ও কলিকাতাতে উপস্থিত হন। উহা তখন যেমন মহাজঙ্গলময়, তেমনি গঙ্গার মোহনার অতি সন্নিকট ও নদীর জল গভীর থাকায় সেখানে অনায়াসে বড় বড় রণতরী বা ব্যবসায়ী জাহাজ থাকিতে পারিত। আরও ঐরূপ স্থানে সম্রাটের কর্ম্মচারীদিগের অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষা করাও সহজসাধ্য বোধ হয়। এতদ্ভিন্ন সেখানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করিলে নদীর পথ তাহাদের আয়ত্তাধীন থাকিবে। সে সময় কলিকাতায় মল্লিকেরা থাকিতেন না তাঁহারা তখন ব্যবসার জন্য যাতায়াত করিতেন মাত্র। জব চার্ণক সেই মল্লিকদের পূর্ব্বপুরুষের পরামর্শে সুতানুটী ও কলিকাতায় আসিয়াছিল ও শেষে তাহারাও সেইখানে কুঠী করে। সেই মল্লিক বংশের পূর্ব্বপুরুষ রাজারামের সহিত ইংরাজদের ব্যবসার সম্বন্ধ ছিল। নবাব মুর্শীদ কুলী খাঁ ইংরাজগণের নিকট হইতে সম্রাটের পুরাতন সনন্দ তলব করেন। ইংরেজরা তাহা হারাইয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা নূতন বন্দোবস্ত করিবার জন্য নবাবের সেরেস্তায় সেই রাজারাম মল্লিককে পাঠান। তিনি পারশী ও উর্দ্দু ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপন্ন ও অবস্থাভিজ্ঞ ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। এদেশে ব্যবসার সুবিধার বিষয় বিজ্ঞ ব্যবসায়ী ভিন্ন অন্যে তাহা করিতে পারিবে না বলিয়াই রাজারামকে চারিশত টাকা পাথেয় ও দেওয়ানের খাস কর্ম্মচারীর জন্য কতকগুলি উপঢৌকনাদি দিয়া পাঠাইয়া দিয়াছিল। ইংরাজেরা রাজারামকে এই গুরুতর কর্ম্মের ভার দিয়া ভাল করিয়াছিল। নবাবের অর্থলোলুপ কর্ম্মচারীরা কিছুতেই সন্তুষ্ট হইবার পাত্র ছিলেন না, সেইজন্য রাজারাম তাহাদের দাবীর টাকা দেওয়া সম্বন্ধে ইতঃস্তত করিতে লাগিলেন। শেষে যখন হঠাৎ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুসংবাদ আসিয়া পৌঁছিল, তখন আর কিছুই দিতে হইল না, চারিদিকে একটা হুলস্থূল পড়িয়া গেল। রাজারামের দেহান্ত হইল কিন্তু নবাবের কর্ম্মচারীরা রাজারামের চতুরতায় অসন্তুষ্ট হয়। শেষে তাহার বংশধর দর্পনারায়ণের উপর উক্ত কর্ম্মচারীরা কোনরূপ অত্যাচার করিতে না পারে সেইজন্য তখন কলিকাতায় দর্পনারায়ণ সগোষ্ঠী বড়বাজারে আসিয়া বসবাস আরম্ভ করে। ভবিষ্যতে ইংরাজদের সংশ্রবে থাকিলে মুসলমান কর্ম্মচারীদের বিষনয়নে পড়িতে হইবে ভাবিয়া দর্পনারায়ণ ইংরাজদের সংশ্রব ত্যাগ করিয়াছিলেন। তাঁহারা নিজের সওদাগরী ব্যবসায় কলিকাতায় অনেক উন্নতি করেন।
জব চার্ণকঃ— জব চার্ণক ঘটনার স্রোতে ভগবানের উদ্দেশ্য সাধন করিয়াছিলেন। ইতিহাসে সেই সময়ের ঘটনাবলির ও জব চার্ণকের কার্য্যের সহিত কলিকাতার প্রতিষ্ঠার ঘনিষ্ট সম্বন্ধ বিদ্যমান আছে, দেখা যায়। কলিকাতায় শোভা সিংহের বিদ্রোহের সময় ইংরাজদের এদেশী সিপাহী রাখিতে হইয়াছিল। সেই অজ্ঞ সিপাহীরা কামানের গোলার বল জানিত না, তাহারা কখনও ভাবে নাই যে, এই কামানের গোলার ভয়ে কলিকাতার অধিবাসীরা বিদ্রোহীগণের হাত হইতে রক্ষা পাইবে। যখন পরিণামে তাহাই হইল, তখন তাহারা পরম হিন্দু বলিয়া উহা মা কালীর মায়া ও দয়া ভিন্ন আর কিছুই নয় বলিয়া স্থির করে। উৎসাহিত হইয়া “ব্যোম কালী কল্কাত্তাওয়ালী, তেরা নাম না যায় খালি” এই ভৈরব রণ রবে সর্ব্বদাই আস্ফালন করিত। সেই কথা নির্দ্দিষ্ট সময়ে তোপের আওয়াজে কলিকাতার লোক আজও তাহা বলিয়া থাকে। মুসলমান রাজকর্ম্মচারিগণের নিকট ইংরাজেরা জব চার্ণকের কার্য্যকলাপে ছেলেদের জুজুর মত হইয়াছিল। কারণ তাহারা ইংরাজের নিকট বেশ নাকাল হইয়াছিল—তাহাদিগকে জব চার্ণকই অনেক বার শিক্ষা দিয়াছিলেন। এখন সেইসব ঘটনা সংক্ষেপ করিল চার্ণকের কার্য্যকুশলতার পরিচয়, বা কেন ইংরাজ বণিকগণ কলিকাতায় কুঠিস্থাপন করিয়াছিল, তাহা সম্যক্ উপলব্ধি করা যাইবে। পলাশী যুদ্ধের একশত বৎসর পূর্ব্বে জব চার্ণক কাশীমাবাজরের কুঠীতে ২০ পাউণ্ড বেতনে চাকরী করিতেন ও পাটনা ফ্যাক্টরীতে ষোল বৎসর অধ্যক্ষ হইয়া কার্য্য করিতেন। সেই সময় অনেক ইংরাজই এ দেশের নিয়মানুসারে ঢিলা পায়জামা ও পোষাকাদি পরিতেন ও ক্রমে ক্রমে এদেশের লোকের রীতি নীতির পক্ষপাতী হইয়া পড়িতেন, এমন কি, এ দেশের স্ত্রীলোকদিগকেও পত্নীরূপে গ্রহণ করিতেন। জব চার্ণকেরও তাহাই হইয়াছিল। পাটনায় এক সতীদাহে তিনি এক ষোড়শী হিন্দু রমণীর প্রণয়ের ও অনুরাগের পরাকাষ্ঠায় এতই মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, তিনি তাহাকে সিপাইয়ের সাহায্যে উদ্ধার করিয়া বলপূর্ব্বক বিবাহ করিয়াছিলেন ও তাহার গর্ভস্থ কন্যাগুলিকে সৎপাত্রস্থ করিয়াছিলেন। আবার, বৌরিজ প্রমুখ উচ্চ পদস্থ কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের সহিত তাহাদের বিবাহ হইয়াছিল। উহাতেই জব চার্ণকের কোম্পানির কর্ম্মচারিদের উপর কর্তৃত্ব করিবার ক্ষমতা হইয়াছিল। উইলিয়ম হেজস্ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসার প্রধান অধ্যক্ষ গভর্ণর ছিলেন ও তাঁহার অধীনে সাত জনের এক মন্ত্রীসভা ছিল। জব চার্ণক ঐ সভার সভ্য ছিলেন। কোম্পানির কর্ম্মচারীরা বাদসাহী ছাড় ও নিশান অর্থ লাভ লালসায় অপব্যবহার করিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ের বিশেষ ক্ষতি করিত। উক্ত হেজেস্ তাহা দমন করিবার জন্য নেলারকে নজরবন্দী, এলিস্কে কর্ম্মচ্যুত ও ওয়াটসনকে অস্থায়ী ভাবে পদচ্যুত করিয়াছিলেন। ইহারা সকলেই জব চার্ণকের অনুগত ছিল। হেজেসের পদচ্যুতির পূর্ব্বেই জব চার্ণক পদচ্যুতির কথা বলিতেন। হেজেসের মত শক্তিমান কার্য্যক্ষম পুরুষ জব চার্ণকের আক্রমেণ ও কথায় পদচ্যুত হইয়াছিল। বেয়ার্ড সেই পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া এক বৎসরের মধ্যে হুগলীতে সমাধিস্থ হইয়াছিলেন। শেষে ১৬৮৫ খৃঃ আগষ্ট মাসে সেই পদে জব চার্ণক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। মোগল কর্ম্মচারিগণের চক্রান্তে এদেশের মহাজনেরা চার্ণকের নামে টাকা পাওনার নালিশ করিয়া ও তাহাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ নজরবন্দীরূপে কাশীমবাজারে প্রেরণ করিয়াছিল। ১৬৮৬ খৃঃ এপ্রিল মাসে চার্ণক হুগলীতে পলাইয়া গিয়াছিল। সেখানে একটী সামান্য ঘটনা হইতে আগুন জ্বলিয়া উঠে, মোগল সৈন্যগণ হুগলী ঘেরিয়া ফেলিল। চার্ণক ৪০০শ সৈন্য লইয়া দুই তিন হাজার মোগল সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করা অসম্ভব ভাবিয়া, কাপ্তেন আর বথনটের অসীম সাহস ও রণকৌশলে এবং নিজের ভগবদ্দত্ত বুদ্ধি ও বীরত্বে কোনক্রমে নদীপথে মোগল সৈন্য বিধ্বংস করিয়া সুতানুটীতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। ঐ সময় ইংরাজেরা মালদহে রেশমের কুঠী প্রতিষ্ঠা করে। কেহ বলে, চার্ণক তলোয়ার দিয়া লোহার শিকল কাটিয়াছিল, কেহ বলিত আতুষী কাচ সূর্য্যরশ্মিতে ধরাইয়া হুগলী পোড়াইয়া দিয়াছিল নানা গল্পই উঠিয়াছিল। উহাতে লোকে ইংরাজেরা যে বীরপুরুষ ও আত্মরক্ষা করিতে পারে, ইহা সকলেই বুঝিতে পারিয়াছিল। জব চার্ণকের সুতানটীতে আশ্রয় লইবার মূল কারণ কোনরূপে আত্মরক্ষা করা ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। মোগলের হাতে নির্ম্মুল বা অপদস্থ হওয়া অপেক্ষা রোগে কষ্টে দু দশ জনের মরা ভাল, এই ভাবিয়া যেখানে আর মোগল সেনা তাহাকে নাকাল করিতে বা ধরিতে পারিবে না, সেইখানে আশ্রয় লওয়াই তিনি যুক্তিযুক্ত স্থির করিয়াছিলেন। তখন কলিকাতা ও সুতানুটী গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। জলে কুমীর ও ডাঙ্গায় সাপ ও বাঘ নদীর জল গভীর ও নদীর বাঁকও বেশ সুবিধাজনক ছিল। তাহার উপর আবার আদিগঙ্গা জঙ্গলের মধ্য দিয়া গিয়াছিল। জোয়ারের জলে ঐ বাদা জায়গা ডুবিয়া যাইত, জঙ্গলের মধ্যে খাল বিলও বেশ ছিল, আর হোগলা বনেরও অভাব ছিল না। তখন তাহারা এমন আত্মরক্ষার স্থান আর কোথায় পাইবে? আরও তখন এই কলিকাতার সম্বন্ধে একটী হিন্দী কথা চলিত ছিল, যাহাতে তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, পশ্চিমের সিপাহীগণ ঘরে বসিয়া মৌহা খাইবে, তথাপি পেটের জন্য কলিকাতা আসিবে না। “দাদ হোয় খাজ হোয়, আর হোয় হৌ হা, কলকাত্তা নাহি যাও, বিন খাও মৌহা।” সেই জন্যই তখন জব চার্ণক সুতানুটীতে আশ্রয় লইয়াছিল। চতুর নবাব সায়েস্তা খাঁ এই গোলযোগ মিটাইবার জন্য ভরমল নামক একজন বিশ্বস্ত মোগল কর্ম্মচারীকে সুতানুটীতে পাঠাইয়াছিলেন।
জব চার্ণক ভরমলকে ইংরাজহিতৈষী জানিয়া তাহার হাতে সন্ধিপত্র পাঠাইয়াছিলেন, ও তাহা যে অস্বাক্ষরিত অবস্থায় ফিরিয়া আসিবে সায়েস্তা খাঁর এই দুরভিসন্ধিও বুঝিতে পারিয়াছিলেন। সেইজন্য তিনি আর সময় নষ্ট না করিয়া এখনকার যেখানে মেটেবুরুজ নিমক মহল ঘাট রোড আছে, তখন সেইখানে বাদসাহী নিমক মহলের ঘর ছিল, তাহা পোড়াইয়া থানা দুর্গ অধিকার করিয়াছিল ও কাপ্তেন নিকল্সন্কে হিজলী অধিকার করিতে পাঠাইয়াছিলেন। যাহা দীনেমার ওলন্দাজ ফরাসী বণিকগণের মধ্যে কেহ করিতে সাহস করেন নাই, তাহাই জব চার্ণক করিয়া ফেলিলেন। হিজলী, সুতানুটী বা কলিকাতা অপেক্ষা আরও অস্বাস্থ্যকর স্থান ছিল। চলিত কথায় বলিঃ— “একবার খেলে হিজলী পানি, যমে মানুুষে টানাটানি।” এই ভাবিয়া বা হুগলীর কথা স্মরণ করিয়া হিজলীর সেনাপতি মালিক কাসেম বিনা যুদ্ধে মোগলের কামান রসদ ছাড়িয়া অপর পারে রসুলপুরে পলাইয়া যান। তাহাতেই নিকল্সন্ সহজে হিজলী দখল করিয়াছিলেন। তখন হিজলীতে প্রচুর লবণ প্রস্তুত হইত ও মোগলের সেখানে একটী দুর্গ ছিল। উহার চারিদিক ক্ষুদ্রনদীর দ্বারা সুরক্ষিত। মোগল রাজত্বে লবণের কর বড়ই লাভজনক ছিল। চার্ণক সেখানে গিয়া অগাধ শস্য, গৃহপালিত পশু ও কামান বারুদ লইয়া সেই জনপূর্ণ দ্বীপে বেশ জাঁকাইয়া বসিয়াছিলেন। দেখিতে দেখিতে বালেশ্বরের মোগলদিগের দুর্গ ও তোপখানা দখল করিয়া ফেলিলেন ও দুই দিন ধরিয়া লুঠ করিয়া চলিয়া আসিয়াছিলন। জব চার্ণকের এ রাজত্ব বেশী দিন চলে নাই। মালেক কাসেম যাহা ভাবিয়াছিল, তাহাই হইয়াছিল। সেখানে এপ্রিল মাসে মড়ক দেখা দিয়াছিল, কুলী মজুর লোকজন পলাইয়া যায় ও ইংরাজের প্রায় দুই শত সেনা রোগে ধরাশায়ী ও রসদ পাওয়া দুর্লভ হইল। শেষে অভাব ও রোগের দুঃখে দুঃসাহসিক চার্ণক ১৫০০০ হাজার মণ চাউল ও কামানাদি দখল করিয়া লইলেন। নবাব সায়েস্তা খাঁ নিশ্চিন্ত ছিলেন না। তিনি সেখানে আব্দুল সামেদকে বার হাজার ফৌজ দিয়া পাঠাইয়াছিলেন। এইবার চার্ণকের অবস্থা বড়ই শোচনীয় হইয়া পড়িল। তাঁহাকে দুর্গের ভিতর আশ্রয় লইতে হইল ও ইংরাজদিগের বাণিজ্য জাহাজগুলি সমুদ্রে জিনিষপত্র লইয়া পলাইয়া গেল। এমন সময়েও চার্ণকের বুদ্ধি লোপ হয় নাই। তিনি দুইটী কামানের সাহায্যে নদীর ধারে পলায়নের বা সাহায্যের পথ পরিষ্কার করিয়া রাখিয়াছিলেন। এই সময় কাপ্তেন ডেন্হাম জাহাজে বিলাতী সত্তর জন মাত্র লোক লইয়া তাঁহার সাহায্যে উপস্থিত হইলেন। তাহাতে তাঁহার কিছু উপকার হইল বটে; কিন্তু জয়লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। ভগবান্ সহায় হইলে বুদ্ধি যোগায়, চার্ণকের তাহাই হইয়াছিল। তিনি মোগল সেনাগণকে ভীত করিবার জন্য ক্রমাগত ঐ সকল লোককে গীতবাদ্য সহ জয়সূচক উল্লাসে গন্তব্যপথে যাতায়াত করাইতে লাগিলেন। এই খেলায় মোগলেরা প্রতারিত হইয়া ভাবিয়াছিল, না জানি বিলাত হইতে কত সৈন্যই না আসিয়াছে। সেই সুযোগে চার্ণক সন্ধির প্রস্তাব করাইয়া পাঠাইলেন। উহাতে আব্দুল সামেদ যুদ্ধ স্থগিত রাখিয়া নবাব সায়েস্তা খাঁর মঞ্জুরের জন্য ঢাকায় সন্ধিপত্র পাঠাইয়াছিলেন। তিন মাসের মধ্যে কোনও উত্তরই আসিল না দেখিয়া, চার্ণক উলুবেড়িয়ায় গিয়াছিলেন, কিন্তু সেখানে বাঙ্গালায় বাণিজ্যের আমদানি রপ্তানীর বিশেষ ক্ষতি হইতে লাগিল। যখন ১৬ই আগষ্ট তারিখে নবাবের প্রত্যুত্তরে সুফল লইল না, তখন পুনরায় হুগলীতে বাণিজ্য করা অপেক্ষা সুতানুটীতে করাই ভাল স্থির করিয়া জব চার্ণক সেখানে গিয়াছিল। তিনি ডিরেক্টারগণের অভিমতে চট্টগ্রাম দখল করেন নাই বলিয়া তিরস্কৃত হইয়াছিলেন। তাঁহারা কাপ্তেন হিথ্কে বিলাত হইতে তাঁহার জন্য পাঠাইয়া ছিলেন। তাহাতেও তিনি কোনরূপ বড় কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। চার্ণক হিথের মারফত পত্র পাইয়া বিচলিত হইবার পাত্র ছিলেন না। ভগবদ্দত্ত প্রতিভায় তিনি ভবিষ্যত দেখিতে পাইয়াছিলেন যে, ইংরাজের সুতানটীতে বাণিজ্য করিলেই ভাল হইবে। হিথ্কে ইহার রহস্য বুঝাইবার প্রয়াস যখন ব্যর্থ হইল তখন চার্ণক অগত্যা মান্দ্রাজে ফিরিয়া গিয়াছিল। শেষে নবাব ইব্রাহিম খাঁর সময়ে সুতানুটীতে আসিয়া তিনি আপনার কথা সপ্রমাণ করিয়াছিলেন। গঙ্গাই বিদেশী ইংরাজ বণিকগণকে স্রোতে ভাসাইয়া মা কালীর আশ্রয়ে আনিয়া ফেলিয়াছিলেন। তাহাতেই তাঁহারা মায়ের দয়ায় সসাগরা ধরার অধিপতি হইয়া রাজত্ব করিতেছেন। এইখানে ইংরাজ জাতির আগমন ও ব্যবসাদির অভ্যুন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতার শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল। সেই নিমিত্ত সেই সময়ে দেশের অবস্থার কথা না বলিলে, কেমন করিয়া বন্যজন্তু পরিপূর্ণ, বন জঙ্গল ভীষণ অস্বাস্থ্যকর স্থান, ধীবর কৃষকের কলিকাতা পৃথিবীর এক প্রধান মহানগরীতে পরিণত হইয়াছিল জানা যায় না। ১৬৮৭ খৃঃ ১৬ই আগস্ট জব চার্ণকের সহিত সুবাদার ইব্রাহিম খাঁর সন্ধি হয়। তদনুসারে উক্ত চার্ণক সাহেব উলুবেড়িয়াতে ডক্ আদি করিয়া জাহাজ মেরামত আরম্ভ করে। সেখানে তিন-চার মাস থাকিয়া জায়গাটী মনোমত না হওয়ায় সুতানুটীতে আসিয়াছিলেন। সেই ১৬৮৮ খ্রীষ্টাব্দের ডাইরী ও মন্ত্রী-সভার বই বিলাতে বর্ত্তমান আছে। সায়েস্তা খাঁর পর ইব্রাহিম খাঁ বাঙ্গালার সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া পড়িলেন। সেই ইব্রাহিম খাঁর অনুরোধেই সুতানটীতে চার্ণক সাহেব আসিয়াছিলেন। সে অনুরোধের উদ্দেশ্য ও অর্থ ছিল। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ইংরাজের উপর শুভদৃষ্টি ছিল না। কিন্তু যখন তিনি দেখিলেন যে, ইংরাজের অন্তর্দ্ধানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার রাজত্বের আয়ের বিশেষ ক্ষতি হইতেছে ও তাহাদের রণতরী সকল আরব ও ভারতবর্ষের মধ্যে যে ব্যবসা বাণিজ্য চলিতেছিল, তাহার ক্ষতিও করিতে পারে, তখন তিনি চতুরতা করিয়া তাঁহাদের সহিত সন্ধি করিবার অবসর খুঁজিতে লাগিলেন। চার্ণক সাহেবও সুতানুটীতে আসিয়া ঘর দরজার অভাবে বড়ই কষ্ট পাইয়াছিলেন। প্রথম অধিবেশনে কৌন্সিলের মন্তব্যে প্রকাশ হয় যে, যে সমস্ত ঘর বাড়ী ছিল তাহা নাই; পুনরায় তাহা করিতে হইবে। একটী গুদাম, রান্নাঘর, থাকিবার ঘর, প্রহরীর ঘর ও এলিস্ সাহেবের ঘর শীঘ্রই প্রয়োজন এজেন্ট মিঃ পিচির ঘর মেরামত করিয়া লইলেই চলিবে। যে পর্য্যন্ত না স্থায়ীভাবে ফ্যাক্টরীর অনুমতি পাওয়া যায়, সে পর্য্যন্ত চারিদিকে মাটীর ঘর ও চালাঘর করিয়া চালাইতে হইবে। এদিকে ঔরঙ্গজেবের ইঙ্গিতানুসারে তাঁহার মন্ত্রী বোম্বাইয়ের গভর্ণর সার্ জন্ চাইল্ড-এর প্রেরিত কমিশনারদ্বয়ের সহিত সন্ধি করিয়া ফেলিয়াছিলেন ও ১৬৯০ খৃঃ ২৩শে এপ্রিল নবাব ইব্রাহিম খাঁ ইংরাজকে বাঙ্গালায় পুনরায় ব্যবসা করিবার জন্য সনন্দ প্রদান করিয়াছিলেন। তাহার পর ১৬৯০ খৃঃ ২৪শে আগষ্ট চার্ণক সাহেব ও কাপ্তেন ব্রুক্ ৩০ জন মাত্র সৈনিক সঙ্গে করিয়া আসিয়াছিলেন। উহার বিবরণ এইরূপ আছে—সুতানুটীতে বৈকালে আসিলাম। অবস্থা অতি শোচনীয়, অনবরত বৃষ্টি, অথচ উপযুক্ত আশ্রয়ের স্থান কিছুই নাই; আমাদের পরিত্যক্ত চালাগুলি নাই তাহা ব্যারাকদার মল্লিক দেশীয় লোকেরা জ্বালাইয়া দিক যা লইয়া গিয়াছে। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্যের অনুরোধে বোটের উপর থাকা ভিন্ন উপায় নাই, বড়ই। ইহাতে স্পষ্ট জানা যায় যে, মল্লিকেরা ইংরাজের সহিত বাণিজ্য করিত ও তাহাদের জিম্মায় ইংরাজেরা ব্যারাক ঘর রাখিয়া চলিয়া যাইত। মল্লিকেরা তখন কলিকাতায় বসবাস করিত না, সুতরাং তাহারা ঐ ঘরসকল রক্ষা করিতে পারিত না। যাহারই উপর তাহা রক্ষা করিবার ভার দিত, তাহারা তাহা পোড়াইয়া ফেলিত বা তুলিয়া লইয়া যাইত। পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে যে, রাজা রাম মল্লিক হুগলী হইতে ফারমান্ আনিয়া বন্দোবস্ত করিবার জন্য ইংরাজ কর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়াছিলেন। তাঁহারই কথা এই রেকর্ডে উল্লেখ করা হইয়াছে। সেই মল্লিকদের পূর্ব্বে সপ্তগ্রামে বাস করিত, কিন্তু সেখান হইতে যখন নদীর জলাভাবে ও দস্যু উৎপীড়নে বাণিজ্য আদি চলা অসম্ভব হইয়া পড়ে ও নবাবী দপ্তর সম্রাটের আদেশে হুগলীতে স্থানান্তরিত হয়, তখনই তাঁহারা ত্রিবেণীতে বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। অপর পারে কাঁচড়াপাড়ায় বাগের খাল দিয়া পূর্ব্ববঙ্গের ব্যবসাদি তখন চলিত, সেখানে মল্লিকদের ব্যবসা ছিল ও উহার উন্নতির জন্য ঐ খাল মল্লিকেরাই কাটাইয়া বিস্তার করাইয়া দিয়াছিলেন, শুনা যায়। মল্লিকেরা যে কেবল ব্যবসার খাতিরে ত্রিবেণী ত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন তাহা নহে, সে সময় চারিদিকে গোলযোগ ও বিদ্রোহ চলিতেছিল।
কৃষ্ণকুমারীঃ— রহিম খাঁ ও শোভাসিংহের অত্যাচারে দেশ ঘর ফেলিয়া যাহার যে দিকে ইচ্ছা সে সেই দিকে পলাইতেছিল। বর্দ্ধমানের জমিদার কৃষ্ণরাম রায় পরাজিত হইয়া শত্রুহস্তে প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন। শেষে তাঁহার কন্যা কৃষ্ণকুমারী নরপিশাচ শোভাসিংহের রক্তে পিতৃতর্পণ করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছিলেন। যে শোভাসিংহের ভয়ে নবাব ইব্রাহিম খাঁর প্রেরিত নুরউল্লা খাঁ হুগলীতে পলায়ন করিয়াছিল, শেষে সেই দুর্ব্বৃত্তের মৃত্যু এক হিন্দু রমণীর হস্তে হইয়াছিল। ইহাই ভগবানের লীলা! রমণীর রূপলাবণ্যে মোহিত হইয়াই সেই দুর্ব্বৃত্ত যমালয়ে গমন করিয়াছিল। সত্য সত্যই সেই সময়ে বাঙ্গালায় শক্তির আবির্ভাব হইয়াছিল। সত্যযুগে যে উপায় শক্তির আবির্ভাবে দুর্ব্বৃত্ত অসুরগণের নাশ হইয়াছিল; ঘোর কলিতেও তাহারই পুনরাভিনয় হইয়াছিল। বোধ হয়, সেই পুণ্যেই বর্দ্ধমানের জমিদার রাজবংশে পরিণত হইয়াছিল। ঐ ঘটনা হইয়া নাটকাদি লিখিত হইয়াছিল।
ফোর্ট উইলিয়মঃ— সেই সকল বিদ্রোহিরা বর্দ্ধমান হইতে রাজমহল পর্যন্ত দখল করিয়া ফেলিয়াছিল। হুগলীর ফৌজদার * থানা দুর্গ রক্ষা করিবার জন্য ইংরাজদিগকে অনুরোধ করিয়া পাঠাইয়াছিলেন ও বিদ্রোহিগণ তাহাদের দুইখানি রণতরী দেখিয়া ভয় পাইয়া নিরস্ত হইয়াছিল। এই সময় ইংরাজ বণিকগণ অনেক দেশী সৈন্য নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহারা তখন নবাবের অনুমত্যানুসারে দুর্গ নির্ম্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। সেই বিদ্রোহ কলিকাতার ও ইংরাজ বণিকের ভাগ্যলক্ষ্মী উভয়ের প্রধান কারণ স্বরূপ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহা না হইলে ইংরাজের দুর্গ নির্ম্মাণ করার অনুমতি লাভ করা কখনই সম্ভবপর হইত না। নবাবের কর্ম্মচারিগণ ইংরাজ বণিকগণকে সে সময়ে শত্রু করা যুক্তিসঙ্গত মনে করে নাই, বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য মিত্রভাবেই তখন সাহায্য চাহিয়াছিল। উহাতে কলিকাতার উন্নতি হইয়াছিল ও উহাতেই শান্তিপ্রিয় বাঙ্গালী ও নানাজাতি অস্বাস্থ্যকর কলিকাতায় গিয়া বাস করে। উহার মূল কারণ যে, সকলেই বিদ্রোহীর দারুণ অত্যাচারের হাত হইতে বাঁচিতে চাহিয়াছিল। ইহাই ঘোর কলির কথাঃ— তখন দেশের লোকের উপর দেশের লোকের সহানুভুতি ছিল না, দেশের লোকের হাত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য বিদেশী বণিকগণের সাহায্যে ও শরণাপ্ন্ন হইতে হইত। এমন কি তখন এদেশের মুসলমান শাসনকর্ত্তারা যে, আপনাকে ও প্রজাবর্গকে বিদ্রোহীগণের হাত হইতে রক্ষা করিতে অসমর্থ একথা কাহারও বুঝিবার জন্য কষ্ট করিতে হয় নাই। সেইজন্যই মুসলমান শাসনকর্ত্তারা তখন বিদেশী বণিকগণকে দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিবার অনুমতি দান করিয়াছিলেন। তখন তাঁহাদের অনুমতি ব্যতীত কেহ কোন জমি জায়গা হস্তান্তর বা দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিতে পারিত না। বিদ্রোহ দমন করিবার জন্যই মুসলমান নবাবের কর্ম্মচারীরা ইংরাজ, ফরাসী ও দিনেমার বণিকগণকে তাহাদের কুঠি ও ব্যবসা রক্ষা করিবার জন্য দুর্গাদি নির্ম্মাণ ও রণতরী আদি সুসজ্জিত রাখিতে বলেন। তাহাতেই বণিকবৃন্দের ঐ সকলের উপর ভক্তি ও শ্রদ্ধা আকৃষ্ট হয় ও তাহারা যে দেশের রাজা অপেক্ষা বলবান তাহাও তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস হইয়া যায়। সেই জন্যই দেশের সম্ভ্রান্ত লোকেরা ঐ সকল বণিকগণের সহিত বন্ধুতা ও তাহাদের নিকট স্ব স্ব অস্থাবর সম্পত্তি আদি রাখিতে আরম্ভ করে। বিদেশী বণিকগণেরা দেশে দুর্গ নির্ম্মাণ করিয়া যেমন আত্মরক্ষার উপায় করিয়াছিল তেমনি তাহারা অলক্ষিতভাবে এদেশের লোকেদের মূল্যবান সম্পত্তিরক্ষা ও বিপদাপদে ত্রাণকর্ত্তা হইয়া দাঁড়ায়। কলিকাতার বর্ত্তমান দুর্গ সে সময়ে হয় নাই, উহা পলাশীর যুদ্ধের পর হইয়াছিল। সেই পুরাতন লুপ্ত দুর্গ বর্ত্তমান জেনারেল পোষ্ট অফিস ও তাহার সন্নিকটস্থ গঙ্গার তটে ছিল। লর্ড কর্জ্জন বহু অনুসন্ধান করিয়া স্মৃতিফলক ও পিত্তল নির্ম্মিত রেখা দ্বারা সেই দুর্গের স্থান চিহ্ণিত ও নির্দ্দিষ্ট করিয়াছিলেন। সেই দুর্গ পূর্ব্ব-পশ্চিমে ৭১০ ফিট্, উত্তরে ৩৪০ ফিট্ ও দক্ষিণে ৪৮৫ ফিট্ লম্বা ছিল। চার কোণে বুরুজের উপর দশটী কামান ও পূর্ব্বের প্রধান প্রবেশ দ্বারে ৫টি কামান সজ্জিত করা হইয়াছিল। গঙ্গার ধারে বাঁধান ঘাট ও সেখানে কোম্পানির নিশান উড়িত। উত্তরে বারুদখানা ছিল ও দক্ষিণে মালপত্র থাকিত। সেই দুর্গের মধ্যে কোম্পানির কর্ম্মকর্ত্তা গবর্ণরের আবাসগৃহ নির্ম্মিত হইয়াছিল। সে সকল এখন আর কিছুই নাই। কেবল সেই পুরাতন নাম “ফোর্ট উইলিয়ম” আছে, উহা বর্ত্তমান কলিকাতা হাইকোর্টের এলাকার সম্বন্ধে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সেই সময় হইতে ইংলণ্ডের রাজার সহিত এ দেশের যে সম্বন্ধ সূত্রপাত হইয়াছিল তাহা ক্রমে ক্রমে দৃঢ়ীভূত ও স্থায়ী হয়। ১৭০২ খৃষ্টাব্দের রিপোর্টে দেখিতে পাওয়া যায় যে, দুর্গ নির্ম্মাণ করিয়া কোম্পানীর কর্ম্মচারীরা আত্মরক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত ও সক্ষম হইয়াছিল। তাহাদের সেই ভ্রান্তবিশ্বাস সিরাজউদ্দৌলা কার্য্যতঃ প্রমাণ করিলে বর্ত্তমান দুর্গ নির্ম্মিত হইয়াছিল। সেই পুরাতন দুর্গ ১৭০৭ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত ক্রমান্বয়ে দৃঢ়ীকৃত করা হয় ও তাহার চতুর্দ্দিকে চার ফিট্ মোটা ও আঠার ফিট্ উচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত করা হইয়াছিল। সেকালের যাবতীয় কোম্পানির ঘোষণা পত্রাদি সেই দুর্গদ্বারে দেওয়া হইত। সার জন গোল্ডসবরাই পুরাতন কলিকাতা দুর্গের স্থান নির্দ্দেশ করিয়াছিলেন ও উহা তখন ভাগিরথীর তীরে সর্ব্বোচ্চ স্থান ছিল।
নাম পত্তনঃ— ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সেরেস্তার চিঠিপত্রে ১৭০০ খৃষ্টাব্দের মার্চ্চ মাস পর্য্যন্ত সুতানটীর নামই ব্যবহৃত হইয়াছিল। ১৭০০ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাস হইতে কলিকাতার নাম পত্তন হয়। সেই নাম পত্তনের মধ্যে রহস্য আছে। কলম্বস যেমন ভারতবর্ষে আসিবার পথ বাহির করিতে গিয়া আমেরিকা আবিষ্কার করিয়া ফেলে, তেমনি ইংরাজ বণিকগণ কালিকটে বাণিজ্যকুঠী করিতে না পারিয়া যে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল তাহার সুদের সুদ ও আসল কলিকাতার নামপত্তন করিয়া আদায় করিয়া লইয়াছিল। ইংরাজ বণিকগণ কলিকাতায় আসিবার অনেক পূর্ব্বেই আরমানি বণিকেরা কলিকাতায় সুতা ও নটীর ব্যবসা করিত। জব চার্ণক প্রাণের ভয়ে কলিকাতায় থাকিতেন না, বারাকপুরেই থাকিতেন। বর্ত্তমান শিয়ালদহ ষ্টেশনের মধ্যে একস্থানে পূর্ব্বে এক প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ ছিল। উহারই তলায় বসিয়া জব চার্ণক ব্যবসায়ীগণের সহিত সম্মিলিত হইতেন ও আহার বিহারাদি করিতেন। সেই হইতে ঐ জায়গার বৈঠকখানা নাম হইয়াছিল ও উহার নিকট বহুবাজার নামেরও বোধ হয় কোন সার্থকতা থাকিবে। কেন না ফিরিঙ্গি টোলা উহারই নিকট ও তাহাদের কালী বহুবাজারেই প্রতিষ্ঠিত। কলিকাতার নামের রহস্যভেদ করা জব চার্ণকের ভাগ্যে হয় নাই কারণ তিনি ১৬৯৩ খৃষ্টাব্দে ১০ই জানুয়ারী কলিকাতায় সমাধিস্থ হন। তাঁহার জামাতা সার চার্লস আয়ারের সময়েই কলিকাতার নাম পত্তন হইয়াছিল। উহার গূঢ় রহস্য এই যে, কালিকট ও কলিকাতার নামের সৌসাদৃশ্য ছিল। কালিকটেই পর্ত্তুগীজেরা প্রথমে ভারতের সহিত বাণিজ্যারম্ভ করে, সেই জন্য সেই খানের দ্রব্য সুদূর ইউরোপাদির বাজারে ভারতের দ্রব্য বলিয়া বিখ্যাত হয়। সেইজন্য সেখানের দ্রব্যের নামডাক যথেষ্ট ছিল। ব্যবসায়ীর নিকট তাহার মূল্য বড়ই অধিক। ** আরমাণি বণিকেরা তাহাদের দ্রব্যাদি কলিকাতার নাম কালিকটরূপে ব্যবহৃত করিয়া চালান দিয়া বিশেষ লাভ করিত। চতুর ইংরাজ বণিকগণ যখন তাহা জানিতে পারে তখনই তাহা করিতে আরম্ভ করে। কলিকাতার মাল কালিকটের বলিয়া চালান হইত। *** সেই জন্যই সুতানটীর স্থলে কলিকাতার নামপত্তন আবশ্যক হইয়া পড়ে। ঐরূপ ব্যবসা চালাইবার জন্যই শত সহস্র ইংরাজবণিক বিনষ্ট হইয়াছিল ও উহার নাম গোলগথা * হইয়াছিল। এই ব্যবসার মূলোৎপাটন করিবার জন্যই সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতার নাম “আলিনগর” পরিবর্ত্তিত করিয়াছিলেন, তাহাতেই কোম্পানির সর্ব্বোনাশ হইয়াছিল। মীরজাফরের সহিত পলাশী যুদ্ধের পূর্ব্বে যে সন্ধিপত্র হইয়াছিল তাহার সর্ত্তের মধ্যে কলিকাতার নাম বাহাল করা প্রধান ছিল। কোম্পানির ** সেরেস্তার কাগজে এ সম্বন্ধে সবিশেষ উল্লেখ ও সন্ধান লক্ষ্য করা যায়। আরও দেখা যায় যে লিসবন নগর ভারতীয় যাবতীয় দ্রব্যের আমদানির কেন্দ্র ছিল। লিসবন নগরের ভূমিকম্পে কোম্পানির মাল বিক্রয় বন্ধ হইয়াছিল। * পরবর্ত্তীকালে এই জাল জুয়াচুরীর কথা প্রকাশ হইয়া পড়িলে পর্ত্তুগীজের কনসল জেনারেলের ১৮২৫ খৃষ্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারীর বিজ্ঞাপন যাহা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল তাহাতে উহার আভাস পরিষ্কার আছে ও উহা নিম্নে দেওয়া হল।
Portuguese Consulate Office, London
February 1st, 1825
Sir,
I beg leave to apprise you for the information of merchants and others concerned in the trade with Portugal that His most faithful Majesty in order to put a stop to the smuggling of colonial and Asiatic produce which has been carrying on lately by coasters and small vessels in the port of his dominions by his Royal decree under date of the 3rd of January 1825 has been pleased to order as follow :— [1] The law prohibiting the importation of Asiatic goods and colonial produce not coming direct in Portuguese vessels to put in full vigour. [2] The entry of such goods and produce is prohibited in Portuguese vessels of less than 80 tons burden. [3] The rgulation of the first article is to be understood only with regard to the house consumption as foreign vessles of more than 80 tons burden loaded with such goods either from Portuguese or foreign dominions may tranship deposit and re-export the same. [4] The regulation of the second article in general and any Portuguese vessel of less than 80 tons burden that may enter any port in Portugal or may be found at any distance of three leaguddes with such goods will be confiscated together with the cargo and the same in regard to foreign vesseles of laess than 80 tons that may be made at the same distance if they shoud not be able to prove by authentic documents that their destination is to another country and that stress of weather forces them to approach the coast of the Portuguese dominions. These regulations are to be put in force in 6 weeks after their publication in regard to Portuguese vesseles and in 3 months to foreign—F.I.Sampayo. Consul General.
আরও দেখা যায় যে, যে বয়নামা বলে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর আদি গ্রামগুলি জমিদারের নিকট ক্রয় করিয়াছিল তাহাতে ** যে বানান ব্যবহৃত হইয়াছে সে বর্ত্তমান ইংরাজি বানান পূর্ব্বে হইতেই পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল। বর্ত্তমান Calcutta নাম পুরাকালের কালিকটের প্রতিলিপি মাত্র বলিলেও বলা যায়। ইহা না হইলে সেকালের ঘোর অস্বাস্থ্যকর কলিকাতার অজস্র লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় করিয়া বিলাতের কর্ত্তাদের অনভিমতে ব্যবসা চালানর মূল উদ্দেশ্য আর কি হইতে পারে? ক্লাইবকেও কলিকাতার অস্বাস্থ্যকরতার কথা উল্লেখ করিতে হইয়াছিল। তখন ১৭০০ খৃষ্টাব্দে উহা যে কিরূপ ভয়ানক ছিল তাহা অনায়াসে কল্পনা করা যাইতে পারে। কাপ্তেন এলেকজাণ্ডার হামিলটন কলিকাতার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন যে গঙ্গার উপর এমন অস্বাস্থ্যকর স্থান আর নির্দ্দিষ্ট হইতে পারে না। তিনি ১৬৮৮ হইতে ১৭৩৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে বাঙ্গালা দেশ ভ্রমণ করিয়াছিলেন। ** হ্যামিলটন সাহেব বলেন ১৭০০ খৃষ্টাব্দে ১২০০ ইংরাজের মধ্যে কলিকাতার ৪৬০ জনকে গোর দেওয়া হইয়াছিল। কলিকাতা লাভ করিয়া তাহার আয়ব্যয়ের হিসাবে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির লাভ কিছুই ছিল না। তবে উহা লাভ করিয়া উহার জন্য এত স্বদেশবাসী ও অর্থ উৎসর্গ ও লাঞ্ছনা ভোগ করিবার অবশ্যই কোন না কোন গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল। তখন এদেশে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব স্থাপনের কথা কেহ স্বপ্নেও চিন্তা করিতে পারেন নাই। ব্যবসায়ই তাহাদের লক্ষ্য ও ধ্যান ছিল। তাহাতেই অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকগণের যৎপরোনাস্তি প্রতিযোগিতা এবং সম্রাট ও তৎকর্ম্মচারীগণের অত্যাচার সহ্য করিতে হয়। ঔরঙ্গজেবের ১৭০১ খৃষ্টাব্দের হুকুম নামায় তাহা পরিষ্কার দেখিতে পাওয়া যায়। উহাতেই সমুদ্রপথে জলদস্যুদের হাত হইতে মুসলমানগণের জাহাজাদি যাহাতে লুণ্ঠিত না হয় তাহার জন্য ইংরাজ বণিকেরা অঙ্গীকার বদ্ধ ছিল ও সেই জন্যই তাহাদের সমাদর হইয়াছিল। বাঙ্গালায় তখন দুইজন প্রভু একজন সুবাদার সুলতান আজিম উশ্বান, আর একজন দোর্দ্দণ্ডপ্রতাপ দেওয়ান নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। কূটনীতিপরায়ণ ঔরঙ্গজেব বাঙ্গলার রাজস্ব হ্রাস হইতেছে দেখিয়া সুবেদারের কর্ত্তৃত্ব হইতে রাজস্ব বিভাগ স্বতন্ত্র করিয়া দিয়াছিলেন। দেওয়ান সুবেদারের অধীনস্থ কর্ম্মচারী হইলেও দেওয়ানের উপর কোনরূপ আদেশ চালাইতে পারিতেন না। তাহাদের উভয়ের মধ্যেও সদ্ভাব ছিল না। তাহাতেই মুর্শিদাবাদে রাজস্ব বিভাগের যাবতীয় কার্য্য মুর্শীদকুলী খাঁর অধীনে হইত। আর পাটনার আজিম উশ্বান সুবেদারি করিতে লাগিলেন। তাহাতেই মুখসুদাবাদের নাম মুর্শিদাবাদ ও পাটনার নাম আজিমাবাদ হইয়াছিল। কোম্পানির সেরেস্তার নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান নবাব বাদশাহের দপ্তরেও তাহা হইয়াছিল। এমন বিরোধ বিসম্বাদের সময় কলিকাতার কুঠী রণতরী দুর্গাদি দ্বারা দৃঢ়ীকৃত করিবার সেই গূঢ় উদ্দেশ্য ভিন্ন হয় নাই। আরও মুর্শিদকুলি খাঁ ইংরাজ বণিকদিগের বন্ধু ছিলেন না, পরম শত্রু বলিলেও বলা যায়। তাঁহার অধীনে ও দুই প্রভুর কর্ত্তৃত্বে কলিকাতার কুঠী ও দুর্গাদির জন্য অর্থব্যয় ও লোকক্ষয় করা বিশেষ কোন কারণ ব্যতীত হয় নাই। কারণ কলিকাতার কুঠী খুলিবার পূর্ব্বেও ইংরাজ বণিকদের অন্যান্য স্থানে কুঠী ছিল ও মুর্শিদাবাদের কুঠী তখন বাঙ্গালার প্রধান বলিলেও বলা যায়। ইউরোপের বণিকগণ মুর্শিদকুলি খাঁর কামধেনু ছিল, তাহাতেই তিনি সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নিকট পৌত্র আজিম উশ্বান অপেক্ষা প্রিয়তর হইয়াছিলেন। পৌত্রও সেই জন্য বোধ হয় মুর্শিদকুলি খাঁর দূরে থাকিতেন। ঔরঙ্গজেব পুত্র পৌত্রদিগকে বিশ্বাস করিতেন না ও তাহাদিগকে নিকটে রাখিতেন না। তাহাতেই মোগল সাম্রাজ্যের অধঃপতন হইয়াছিল। তাহারই জন্য মুর্শিদকুলি খাঁ প্রমুখ প্রিয়পাত্র কর্ম্মচারীরা সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া পড়ে। এই সকল নানা কারণে তখন বাঙ্গালা দেশে বাণিজ্যাদির সুবিধা বড় বিশেষ ছিল না। আরও সেকালের নবাবের বেগমরা পর্য্যন্ত ইউরোপের বণিকগণের ব্যবসার প্রতিযোগিতা করিতেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। সিরাজউদ্দৌলার মাতা আমিনাবেগম সেইরূপ করিতেন ও তাহাতেই সিরাজউদ্দৌলা কোম্পানির কলিকাতার ব্যবসা করিবার গূঢ়সন্ধিতে বাণ নিক্ষেপ করিয়া পলাশীর যুদ্ধাদির অবতারণা করেন। * সেইজন্যই কোম্পানির সেরেস্তার সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতার নাম পরিবর্ত্তন করিবে না বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। সিরাজউদ্দৌলার পতনেই কলিকাতার নাম বজায় ও আলিনগর আলিপুরে পরিণত হইয়াছিল। কলিকাতার নামের রহস্যের মধ্যে কলিকটের নামের সুনামের (Goodwill) সম্বন্ধ বর্ত্তমান ছিল। সেই নিমিত্তই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীর নিকট উহা অমূল্য। ইংরাজ বণিকগণ সুরাটেই প্রথম কুঠী করিয়াছিলেন ও যাবতীয় যেখানে যে কুঠী ছিল তাহারই অধীন হইয়াছিল। শেষে যখন মান্দ্রাজকে পৃথক প্রেসিডেন্সি করা হয় তখন বাঙ্গালা তাহার অধীন হইয়াছিল। মান্দ্রাজ উপকূলে ওলন্দাজগণের সহিত সর্ব্বদা প্রতিযোগিতায় বিবাদ বিসম্বাদ হইত, তাহাতে ইংরাজ কোম্পানিকে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্থ হইতে হইয়াছিল। সেই নিমিত্ত বাঙ্গালায় বাণিজ্য করা একেবারে বন্ধ করিবার * সিদ্ধান্ত হইয়াছিল কিন্তু কলিকাতার গূঢ় ব্যবসার জন্য তাহা হয় নাই। আরও ইংরাজ জাতির ভাবী
সৌভাগ্যলক্ষ্মীর জন্যই, বোধ হয়, বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণ কতকগুলি সুব্যবস্থা দ্বারা অল্প বেতনভোগী কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের স্বাধীন গোপন ব্যবসা বন্ধ করিয়া দিয়া বেতন বাড়াইয়া দিয়াছিলেন। পলাশী যুদ্ধের শতবর্ষ পূর্ব্বে ১৬৫৭ খৃষ্টাব্দে হুগলী কুঠীর শ্রীবৃদ্ধি সাধন ও জলেশ্বর, পাটনা ও কাশিমবাজারে কুঠী হইয়াছিল। ঐ হুগলীর কুঠী সম্বন্ধে বাঙ্গালার গ্রন্থকার তওয়ারিখ লিখিয়াছিলেন যে, যখন কুঠীর সাহেবেরা ভোজন করিতেছিল তখন হঠাৎ তাহাদের কুঠী ভাগীরথী গর্ভে বসিয়া যায়। তাহাতে মালপত্র নষ্ট ও অনেকে প্রাণ হারাইয়াছিল। উহার পর নবাবের অনুমতি না লইয়া তেতলা ঘর, গড়খাত ও বুরুজ প্রস্তুত হইলে সেখানকার মোগল অধিবাসীগণ তাহাদের পর্দ্দানশীন স্ত্রীগণের গৃহ-প্রাঙ্গনে পর্দ্দা নষ্ট হইবে বলিয়া অভিযোগ উপস্থিত করে। কারণ অত উচ্চ বাস নির্ম্মাণ করিলে তাহা অবশ্যম্ভাবী। তাহাতে মুর্শিদকুলি খাঁর হুকুমে কুঠী নির্ম্মাণ যখন শেষ হইয়াছিল তখন তাহা বন্ধ করিতে গিয়াই জব চার্ণকের সহিত বিরোধ হয় ও কলিকাতার শ্রীবৃদ্ধির পথ পরিষ্কার হয়। শাহাজাদা আজিম উশ্বান ১৬৯৮ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির নিকট হইলে ষোল হাজার টাকা নজর লইয়া কলিকাতাদি ক্রয় করিবার অনুমতি দান করেন এবং হুগলীর ফৌজদারের অর্থলাভের আশা নষ্ট হইল দেখিয়া কলিকাতায় বিচার করিবার একজন কাজি নিয়োগের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন কিন্তু অর্থোপহারের মন্ত্রৌষধিতে তাহা হয় নাই। উহাতে কলিকাতার পার্শ্ববর্ত্তী স্থানের অনেকেই আসিয়া বসবাস আরম্ভ করে। পূর্ব্বে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সোরা, রেশমাদির ব্যবসা করিত, কলিকাতায় আসিয়া নূতন ব্যবসা আরম্ভ করে। ঐ ব্যবসা শিখাইবার গুরু আরমানি ওলন্দাজ মহাপ্রভুরা বলিয়া বোধ হয়।
কাজির বিচারঃ— সেকালে স্বয়ং সম্রাটও কাজির বিচারের ওপর হস্তক্ষেপ করিতেন না; এমন কি, সাহাজাদা আজিম উশ্বানও মুর্শিদকুলি খাঁর অনুরোধেও তাহা করিতেন না, তাহাতেই লোকের লঘু পাপে গুরুদণ্ড হইত ও বিচার বিভ্রাট ঘটিত। সেইজন্য তখন সেই বিচারের অধীন বাস করা বড়ই বিপদের হইয়াছিল। এক মোগলের কন্যাপহরণাপরাধে হুগলীর ফৌজদারের প্রাণদণ্ডাজ্ঞায় ও একজন মুসলমান ফকিরের আজানে বাধা দেওয়ার মিথ্যাভিযোগে চুনাখালীর সম্ভ্রান্ত ধনী বৃন্দাবনের প্রাণদণ্ডাজ্ঞায় দেশের লোক বিচলিত হইয়াছিল। তাহাতে সকলে তাহাদিগকে আশ্বস্ত করিবার জন্য ও যাহাতে তাহারা ভয়ে ঐ স্থান ত্যাগ না করে সেজন্য পুনর্ন্যায়বিচারের বা দণ্ডাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিশেষ অনুরোধ করিয়া পাঠান, কিন্তু পরিণাম কিছুই হইল না। ইহাতেই তখন লোকে কলিকাতা অস্বাস্থ্যকর হইলেও সেখানে বাস করিয়া কাজির অন্যায় বিচারের হাত হইতে আত্মরক্ষা করা মঙ্গলের কথা মনে করিয়াছিল।
রাজধানীঃ— ইংরাজ জাতির রাজধানী যে সকল কারণে সচরাচর হইয়া থাকে কলিকাতায় সেরূপ হয় নাই ও উহার নামাদির সঙ্গে সেরূপ কোন সম্বন্ধ নাই। ১৫৯১ খৃষ্টাব্দে রাজা মানসিংহ উড়িষ্যা জয় করিয়া বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী রাজমহলে স্থাপন করিয়া উহার নাম আকবরনগর করেন। পরে ১৬০৮ খৃষ্টাব্দে ইসলাম খাঁ ঢাকায় ঐ রাজধানী করিলেন। অবশেষে সাহাজাদা আজিম উশ্বান পাটনাকে আজিমাবাদ ও মুর্শিদকুলি খাঁ মুখসুদাবাদকে মুর্শিদাবাদ করিয়াছিলেন। তাহাতে দেখা যায় যে, তখন রাজধানী কথায় কথায় সরিয়া যাইত। রাজকার্য্যের সুবিধার জন্য হইত না, বরং কোন সম্রাটের প্রতিনিধির ব্যক্তিগত অভিমত ও বিজয় চিহ্ণের মত হইত এবং রাজারা তৎপ্রতিনিধির গৌরব প্রচার করিবার জন্যই হইত। রাজার রাজ্য নিরাপদ করিবার বা রাজধানীর যোগ্যতা বিচার করিয়া হইত না। ইংরাজ জাতি কলিকাতায় রাজধানী করিবার পূর্ব্বে ঐখানে কলির দেবতা কালীর নিকট যেমন অজস্র স্বজাতিবর্গ উৎসর্গ করিয়াছিল তেমনি অকাতরে অর্থব্যয় করিয়া তদানীন্তন কর্ত্তৃপক্ষের মনতুষ্টি করিয়াছিল। কলির প্রভাবে যেমন যুধিষ্ঠির নলাদি রাজাদিগকে রাজ্য হারাইতে হইয়াছিল তেমনি কলিকাতার ব্যবসা ও ষড়যন্ত্রের প্রভাবে ইংরাজগণ ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছিল। ইহাতেই অনুমান করা যায় যে, কলিকাতার ভিতর বিক্রমাদিত্যের বিখ্যাত বত্রিশসিংহাসন ছিল বা কলিকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীর দয়ায় তাহাদের সৌভাগ্যদয় হইয়াছিল। কোনরূপ যুদ্ধকৌশলে বা বিজ্ঞানের বলে বা উত্তরাধিকার সূত্রে ইংরাজেরা বিপুল সাম্রাজ্য লাভ করে নাই। ভগবানই জানেন যে কালযবনের সহিত ইংরাজ জাতির কোন সম্বন্ধ আছে কিনা কিন্তু তাহা না হইলে কি, জবচার্ণক প্রমুখ কতিপয় অজ্ঞ লোক কলিকাতায় কুঠী ও ব্যবসা করিয়া বিশাল ভারত সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করিতে পারে? ত্রেতাযুগে হনুমানের সাহায্যে শ্রীরামচন্দ্র যেমন সীতা উদ্ধার ও লঙ্কাজয় করিয়াছিলেন, তেমনি ইংরাজ জাতির সৌভাগ্যলক্ষ্মী উদ্ধারের সন্ধান জবচার্ণক প্রমুখ নিজের মুখ পোড়াইয়া সোনার বাঙ্গালা ছারখার করিয়াছিল। কলিকাতার নাম সেই কলঙ্ক কালিমায় বিজড়িত বলিয়া কলির রজ্জুর সহিত কলিকাতার নামের সম্বন্ধ সৃষ্টি কখনই অবান্তর বলিয়া বোধ হয় না।
মুর্শিদকুলি খাঁঃ— একজন দক্ষিণী ব্রাহ্মণ সন্তান, ইস্পাহান নগরের একজন বণিকের কৃপায় শিক্ষিত ও লালিত পালিত হন ও শেষে বেরারের রাজস্ববিভাগে সামান্য কার্য্য করিতেন। স্বীয় কর্মকুশলতায় ও প্রখর বুদ্ধিকে সহায় করিয়া তিনি হায়দারাবাদের দেওয়ানি পদের জন্য ঔরঙ্গজেবের দরবারে উপস্থিত হইয়াছিলেন। সম্রাট তাঁহার গুণগ্রামে মুগ্ধ হইয়া জিয়াউল্লা খাঁর পদচ্যুতির পর বাঙ্গালার দেওয়ানি পদে মনোনীত করেন। দাক্ষিণাত্যে ঔরঙ্গজেব যখন যুদ্ধ ব্যাপারে অর্থাভাব অনুভব করিতেছিলেন চতুর মুর্শিদকুলি খাঁ সেইখানে গিয়া বাঙ্গালার বর্দ্ধিত রাজকর ও জায়গীরের উপসত্ত্ব হইতে উদ্বৃত্ত টাকা সরবরাহ করিয়া “মুর্শিদকুলি খাঁ” উপাধিতে সম্মানিত হইয়াছিলেন। বহুকাল মধ্যে বাঙ্গালা হইতে এত অর্থ বাদশাহ সরকারে উপস্থিত হয় নাই। তাহাতেই বাঙ্গালার সর্ব্বময়মর্ত্তা মুর্শিদকুলি খাঁ হইয়া পড়েন। সাহাজাদা আজিম উশ্বান পাটনায় নামমাত্র সুবেদার ছিলেন। মুর্শিদাবাদের নামকরণ হইতে যাবতীয় উন্নতি মুর্শিদকুলি খাঁই করিয়াছিলেন। তিনি ন্যায় বিচারের উজ্জ্বল উদাহরণ স্বরূপ কোন বিবাহিতা পত্নীর ধর্ম্মনাশ অপরাধে নিজের একমাত্র পুত্রের প্রাণদণ্ডাজ্ঞা দিয়াছিলেন। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, তিনি ঐ অপরাধে হুগলীর কোতোয়ালের প্রাণদণ্ডাজ্ঞা হ্রাসের জন্য সম্রাটের নিকট অনুরোধ উপরোধ করিয়াছিলেন। তিনি একজন আনুষ্ঠানিক মুসলমান ছিলেন অতিথিসৎকার ও মুসলমানী পর্ব্বাদি অতি সমারোহে করিতেন। তাঁহার চেহেলসুতুন দরবার বিখ্যাত ছিল। অত্যাচারীরা তাঁহার ভয়ে কাঁপিত। জমিদারগণ সর্ব্বদাই গুপ্তচরাদির দ্বারা তাহাদের প্রজাবর্গের অনুযোগ অভিযোগাদি যাহাতে ঐ দরবারে উপস্থিত না হয় তাহার জন্য সর্ব্বদা ব্যস্ত থাকিত। একচেটিয়া ব্যবসায় খাদ্য সামগ্রী প্রভৃতির মূল্য অধিক যাহাতে না হয় তিনি তাহার সবিশেষ ব্যবস্থা করিতেন। ঐ অপরাধে দোকানদার ও ব্যবসাদারের গর্দ্দভপৃষ্ঠে নগর পরিভ্রমণাদি দণ্ডদান করা হইত। মৃগয়ায় প্রাণিবধ ভিন্ন আর কোন ব্যসন তাঁহার ছিল না। শীতকালে রাজমহলের পাহাড় হইতে বর্ষভোগোপযাগী বরফ মাত্র ব্যবহার করা তাঁহার বিলাস ছিল। তিনি সুরা বা নৃত্যগীতাদির অনুরক্ত বা ভক্ত ছিলেন না। মক্কার সুপ্রসিদ্ধ প্রধান মসজিদের অনুকরণে যে মসজিদ করেন তাহাই তাঁহার কীর্ত্তি। সেখানে নিজের কবরের স্থান নির্দ্দেশ করিয়া গিয়া নিজের দৈন্যের উদাহরণ জাজ্জ্বল্যমান রাখিয়া গিয়াছেন। মসজিদ দর্শনার্থী যাত্রী ও উপাসকগণের পদধূলি যাহাতে উক্ত কবরের উপর পতিত হয় সেইরূপ ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। মুর্শিদাবাদে টাঁকশালাদি নির্ম্মিত হইয়াছিল। নির্দিষ্ট সময়ে তোপধ্বনির সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র রাজপথ ও ভাগীরথীবক্ষ যুগপৎ বিদ্যুতের আলোকমালায় আলোকিত হইত। বেরা নামক পবের্বর সময় নানাবর্ণের তরণী সকল দীপমালায় সুশোভিত হইয়া নদী বক্ষকে সমুজ্জ্বল করিত ও আপামর সাধারণ পানভোজনের আপ্যায়িত হইত। রবিওল্ আওয়েল মাসের দ্বাদশ দিবসেও সকলে বিনাব্যয়ে ভোজনাদি ও পরিচর্য্যা লাভ করিত। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে মুর্শিদকুলি খাঁর নানাগুণগ্রামাদির ভূয়সী প্রশংসা সেকালের গ্রন্থকারগণ লিপিবদ্ধ করিয়া তাঁহাকে অমানুষিক জমীদার পীড়নের দোষ হইতে অব্যাহতি দেন নাই। সেই দোষেই ইংরাজের সৌভাগ্যোদয় হইয়াছিল ও কলিকাতার উন্নতি হয়। মুর্শিদকুলি খাঁ দরিদ্র সন্তান, বোধ হয়, সেই জন্য তাঁহার জমিদারগণের প্রতি জাতক্রোধ ছিল। সেই জন্যই তিনি জমিদারগণকে পালকি ব্যবহার করিতে বা তাঁহার সমক্ষে আসনে উপবেশন করিতে অনুমতি দিতেন না। দরবারে পরস্পরকে অভিবাদনাদি করা পর্য্যন্ত নিষেধ ছিল। ভ্রান্ত ধর্ম্মনীতিবুদ্ধি প্রণোদিত রোমের ব্রুটসের ন্যায় স্বীয় পুত্রকে লঘু অপরাধে প্রাণদণ্ডদান ও অমানুষিক জমিদারপীড়ন দ্বারা সেইসময় জমিদারগণের বিদ্রোহ উপস্থিত করিয়াছিলেন। তাহাতেই জমিদারেরা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করা বা তাহাদের শরণাপন্ন হওয়া কর্ত্তব্য বিবেচনা করিয়াছিল। তাহাদের নিকটই দেশের দুরবস্থা ও অন্যান্য আবশ্যকীয় সংবাদ চতুর বিদেশী বণিকগণ সংগ্রহ করিয়াছিল। * সীতারাম কলিকাতায় কোম্পানির কাটোয়ার রামনাথের আশ্রয় লাভ ও কৃষ্ণনগরের রাজা কলিকাতার কুঠীতে সর্ব্বদাই যাতায়াত করিত। রাজা তোডরমল ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে যে বন্দোবস্ত করিয়া বাঙ্গালার রাজস্ব নির্দ্ধারণ করিয়াছিলেন, তাহাতে সাত পুরুষের পুরাতন ভিটা ত্যাগ করিয়া অনেককে পলাইতে হইয়াছিল। আর মুর্শিদকুলি খাঁর আশ্চর্য্য সুবন্দোবস্ত সম্রাটের আশাতীত ফল লাভ হইয়াছিল ও মুর্শিদকুলি খাঁর রাজস্ব ও কীর্ত্তি ঘোষিত হইয়াছিল, কিন্তু উহাই মুসলমান রাজত্বর মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছিল। পাঞ্জাবী আবুরায়, দর্পনারায়ণ প্রভৃতি কানুনগো চৌধুরীর কাজ করিয়া বঙ্গের বড় বড় জমিদার হইয়া পড়েন। তাহাতেই প্রাচীন জমিদারগণের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁ নিজের প্রতাপ অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য অনেক সামান্য কর্ম্মচারীকে জমিদার ও ধনবান * করেন। মুর্শিদকুলি খাঁর সময় বঙ্গের অনেকগুলি উত্তম জমিদারী তাঁহার জ্যেষ্ঠ রামজীবন ও তৎপুত্র কালিকাপ্রসাদের নামে বন্দোবস্ত করিলেন। সেকালে কানুনগোর প্রভাব অত্যন্ত ছিল। বাদশাহের নিকট কাগজ দাখিল কানুনগোর সহি ভিন্ন হইত না। শোনা যায় যে, সেইজন্যই মুর্শিদকুলি খাঁর সহিত দর্পনারায়ণের মনান্তর উপস্থিত হইয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর মত প্রতাপশালী ব্যক্তিকেও এজন্য চিন্তিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইয়াছিল। দর্পনারায়ণের উপর তাঁহার বিষদৃষ্টিতেই রঘুনন্দনের উন্নতির পথ পরিষ্কার হয়। দর্পনারায়ণই বাঙ্গালার রাজস্ব নানা উপায়ে এক কোটী ত্রিশ লক্ষ হইতে দেড় কোটী করিয়া দেন। অতি অল্পকালমধ্যেই সমগ্র বাঙ্গালার প্রায় পঞ্চমাংশ ভাগ নাটোর জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহাতেই রঘুনন্দনী বাড়ের প্রবাদ প্রচলিত হইয়াছে। রঘুনন্দন নিকাশি কাগজে দর্পনারায়ণ সহি করিতে না চাহিলে কৌশলে কানুনগোকে দিয়া খালসা দেওয়ানের পদে উন্নত ও নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হয়েন। রঘুনন্দন নিঃসন্তান ও তাহার ভ্রাতুষ্পুত্র কালিকাপ্রসাদও সেইরূপ ছিল। শেষে রামজীবনের পোষ্যপুত্র রামকান্তই পুণ্যশ্লোকা রাণী ভবানীর স্বামী ছিলেন। সেই নাটোরের কর্ম্মচারী দয়ারামই দিঘাপতিয়ার জমিদারগণের পূবর্বপুরুষ। সেই দয়ারাম ও রঘুনন্দনের চক্রান্তেই সীতারামের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। বাঙ্গালায় সীতারাম প্রতাপাদিত্যের ন্যায় বীরধর্ম্মী ব্যক্তি প্রায়ই দৃষ্টিগোচর হয় নাই। কিন্তু হায়! তাঁহারা স্বদেশ ও স্বজাতির দুর্দ্দশা দূর করিতে গিয়া স্বজাতি ও স্বদেশীর চক্রান্তে নির্যাতিত ও বিনষ্ট হইয়াছিল। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যই যেন বিধির বিধানে সোনার বাঙ্গালা ইংরাজ বণিকের শেষে করায়ত্ত হইয়াছিল। সেই জন্যই বাঙ্গালার জমিদারেরা সীতারামের সহযোগিতা না করিয়া তাহার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। বাঙ্গালায় তখন বাদশাহ অপেক্ষা মুর্শিদকুলি খাঁকে লোকে ভয় করিত। মুর্শিদকুলি খাঁর অনুগ্রহ ও নিগ্রহে তখন বাঙ্গালায় সকলের উন্নতি অবনতি নির্ভর করিত। সেই মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে ইংরাজ বণিক ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতা আদি গ্রাম ক্রয় ও দুর্গাদি নির্ম্মাণ করিয়াছিল, ইহাই তাহাদের পরম সৌভাগ্যের কথা। আরও সেই সময়ে সীতারাম প্রমুখকে কলিকাতার আশ্রয় দান করিয়া সাহস ও ধর্ম্মের পরিচয় দান করে। ইংরাজ বণিকেরা যে সেসময় সমস্ত কার্য্য সবিশেষ বিবেচনা করিয়া করিয়াছিল এরূপ বিশ্বাস করা যায় না। তাহারা তপস্যা দ্বারা অদৃষ্ট সঞ্চয় করিয়াছিল। সেই সৌভাগ্যোদয়ের কেন্দ্র কলিকাতা বলিয়া কলিকাতার এত মহিমা। অদৃষ্ট কি তপস্যা দ্বারা সঞ্চয় করা যায়, সে সম্বন্ধে দু’একটি কথা সংক্ষেপে বলিলেই চলিবে। যাহা দেখা যায় না তাহাই অদৃষ্ট। অনেকের মত যে, পূর্ব্বজন্মাজ্জিত কর্ম্মের ফলে জন্মকালীন গ্রহনক্ষত্রের সঞ্চার উন্নতি ও অবনতি এবং ভাগ্যের সূচনা হয়। সে কথা তর্কের অনুরোধে ব্যক্তি বিশেষ সম্বন্ধে প্রযুজ্য হইতে পারে কিন্তু জাতি বা দেশ সম্বন্ধে তাহা কোনরূপেই প্রযুজ্য হইতে পারে না। জব চার্ণক, লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস আদি যাহারা কলিকাতার প্রতিষ্ঠাতা তাহারা সকলেই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের নিকট পুরস্কার লাভ না করিয়া বরং লাঞ্ছিত ও তিরষ্কৃতই হইয়াছিল। জবচার্ণক এদেশের একটা কুলটার প্রেমে মুগ্ধ হইয়া জাতি ও ধর্ম্ম ত্যাগ করে নাই ও লর্ড ক্লাইব আত্মহত্যা ও ওয়ারেন হেষ্টিংস সর্ব্বস্বান্ত হওয়াও শ্রেয়ঃ জ্ঞান করিয়াছিল, তথাপি ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে কোন চক্রান্ত বা তাহাদের দেশ ও কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া যায় নাই। তাহারা নিজের স্বার্থ অপেক্ষা জাতির মঙ্গল লক্ষ্য করিয়া ঐরূপ কোন কার্য্য করে নাই বা এদেশের কোনরূপ ধনৈশ্চর্য্যে বা রূপলালসায় মুগ্ধ হইয়া স্বজাতি বা স্বদেশ বা তাহাদের প্রভু ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধ কোন কার্য্য করে নাই। এই মহত্ত্ব ও স্বার্থত্যাগই ইংরাজ জাতির উন্নতির মূল কারণ। উহা ঘোর তপস্যার ফল, তাহাতেই তাহাদের ভাগ্য প্রসন্ন ও বিষম বিপদের সময়ও তাহাদের ভগবান রক্ষা করিয়াছিল।
* বর্তমান শিবপুরের রয়েল বোটানিকাল্ গার্ডেনের ভিতর থানা দুর্গ ছিল।
* Abbo Guyon’s writings in 1774.
** (Letter to Court January 10, para 78, A.D. (1758.)—274 Long’s Records.
“We have the
*** Hunter’s Imperial Gazetteer & Calcutta Review, Vol. XVIII. pleasure to inform
your Honors that the world “Alinagore”is by our present sunnud, to be
omitted in the impression on our sides. an indulgence we couldnot obtain
from Serajadowla”
* The Mussulmans like the American were fond of dropping the indigenous
names of places and using their own, though (as appears by the Ani Akberi),
the name of Calcutta was known long before the English came yet they
would not use it.
** 182 Long’s Records “The Lisbon Earthquake postpones the Company’s sales.”
* Kalikata (vide British Muserum additional Mss. No. 24039)
** Rev. Long’s “Peeps into Social life.”
* পলাশির যুদ্ধের দশ বৎসর পরে হায়দর আলি কালিকট হইতে সমস্ত ইউরোপের বণিকগণের
* পণ্যদ্রব্য নষ্ট করিয়া বিতাড়িত করিয়াছিলেন।
* Bruce’s Annals Vol. I.
* ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কাটোয়ার রামনাথের আশ্রয়ে সীতারাম আশ্রয় লাভ করিয়াছিল শোনা
যায় ও প্রবাদ।
* Philip’s Landtenure (p p. 120-129.)
