৫. হিন্দু মুসলমান ও ইংরাজ জাতির পরস্পর উন্নতির কারণের প্রভেদ ও তারতম্য
পঞ্চম পরিচ্ছেদ -হিন্দু মুসলমান ও ইংরাজ জাতির পরস্পর উন্নতির কারণের প্রভেদ ও তারতম্য
হিন্দুর অর্থ, পদ, রাজ্য, নির্ব্বাণ, মোক্ষাদি যাবতীয় সুখের ও সম্পদের নিদান সমস্তই তপস্যায় হয়, ইহা পুরাণ ইতিহাসাদিতে উল্লিখিত হইয়াছে। ব্যাস, বাল্মীকি, রাবণ, পরশুরাম, ভীষ্ম, বলি, ধ্রুব, প্রহ্লাদ প্রভৃতি সকলেই তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন বলিয়া শাস্ত্রে প্রকাশ ও সকলের বিশ্বাস। ভগবান মনু ব্রাহ্মণের জ্ঞানোপার্জ্জন, ক্ষত্রিয়ের প্রজারক্ষা ও সত্যপালন, বৈশ্যের কৃষি, গো, বাণিজ্যাদি রক্ষা এবং শূদ্রের সেবাকেই তপস্যা বলিয়াছেন। শৌচ, আচার, অহিংসা, সরলতা, দেবদ্বিজে গুরুভক্তি ও ব্রহ্মচর্য্যাদিকে শারীরিক, চিত্তশুদ্ধি, আত্মনিগ্রহাদি সৌম্যতাকে মানসিক ও অনুদ্বেগকররহিত সত্যপ্রিয় সম্ভাষণ ও শাস্ত্রাভ্যাসাদিকে বাঙ্ময় তপস্যা বলে। এই সকল একান্তঃকরণে অনুষ্ঠিত হইলে পুরুষকার দ্বারা দৈব সহায় হয়। সেই তপস্যায় সকলে পশুভাব হইতে মনুষ্যত্ব, ঋষিত্ব, ব্রহ্মত্ব ও দেবত্ব পর্য্যন্ত লাভ করিয়া থাকে। সাধনা দ্বারা আত্মশক্তির বিকাশের নামই তপস্যা। আর্য্য মুনি, ঋষি ও সুরাসুর সকলেই ইষ্ট দেবতার নিকট বরলাভ করিয়া উন্নত ও সুখভোগ করিয়াছিলেন। বশিষ্ট, বিশ্বামিত্র, শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির, বুদ্ধ সকলেই সেই তপস্যার বলে অমর হইয়াছেন। ভারতে শঙ্করাচার্য্যের দ্বারাই বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম্মের পুনরুদ্ধার ও বৌদ্ধধর্ম্মের পতন; নানকের শিক্ষা ও ধর্ম্মোপদেশে দুর্দ্ধর্ষ শিখজাতির অভ্যুদয় ও তাহাদের সাম্রাজ্য স্থাপন হইয়াছিল। নানক হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সমাদৃত হইতেন ও তাঁহার সম্বন্ধে যে উক্তি আছে তাহা সবর্ববিদিত বলিলেই চলে। “হিন্দুকা গুরু, মুসলমানকা পীর, উস্কা নাম, নানক সাহেব ফকির”। শঙ্করাচার্য্য তাঁহার ভাষ্যাদিগ্রন্থের দ্বারা যেমন পাণ্ডিত্য ও শৈবধর্ম্মের প্রচার করিয়া গিয়া কেবল শৈবাবতার বলিয়াই স্বীকৃত হন, কিন্তু তাহাতে বৌদ্ধসাম্রাজ্যের ন্যায় কোন শৈবসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বৌদ্ধধর্ম্মের অসারতা প্রমাণ দ্বারা আর্য্যধর্ম্মের পুনরুত্থানে দেশের ও দশের বিশেষ কোন মঙ্গল হয় নাই ও তাহাতে হিন্দু সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিতও হয় নাই। মহাপ্রভু চৈতন্য প্রেমভক্তি স্রোতে নির্য্যাতিত বৌদ্ধ যবনাদিককেও বৈষ্ণব ধর্ম্মের বিশাল উদরে স্থান দিয়াছিলেন। লোকের মতিগতি আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকেই গিয়াছিল, কিন্তু তাহাতে দেশের দুঃখ দূর হয় নাই। অতি প্রাচীনকাল হইতেই ভারতবর্ষে গৃহবিবাদে লোকক্ষয় ও জাতীয় ধন নষ্ট হইতেছে উহার প্রতিকারের জন্য কোন তপস্যাই হয় নাই। কলির প্রারম্ভে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যাহা হইয়াছিল তাহা স্থায়ী হয় নাই। জনকয়েক মূর্খ ইংরাজ বণিক কি তপস্যায় বিশাল ভারত সাম্রাজ্য লাভ করিল তাহা খৃষ্টধর্ম্মের গৌরব ভিন্ন আর কিছুই নয় বা উহা অন্য কোন অভিসম্পাতে ঘটিয়াছিল উহারই সমালোচনা উচিত।
ধর্ম্মঃ— ধর্ম্মের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা এক নয়। ধর্ম্মই মানবকে ধারণ ও পোষণ করে এবং পৃথিবীর সহিত মানব জীবজন্তুর সম্বন্ধ স্থাপন করে। সেইজন্যই ধর্ম্মের লক্ষ্মণঃ— অহিংসা অর্থাৎ যাহা দ্বারা দেশের ও দশের মঙ্গল হয় এবং দুঃখ দারিদ্র্য দূর ও শান্তিলাভ হয়। পুরাণের মতে লোকস্থিতি বিহিত করা, যুক্তিবাদিরা কত্তর্ব্যকর্ম্মকে, এবং জ্ঞানবাদিরা পরমাত্মার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকেই ধর্ম্ম বলে। দেশ বা জাতি বিশেষের পরিত্রাণের সোপানই ধর্ম্ম। শিক্ষা, দীক্ষা, দেশ, কাল, পাত্র ও সম্বন্ধ লইয়া ধর্ম্মের সৃষ্টি। বিলাতে ধর্ম্ম বিশ্বাসেই পাদ্রী ক্রানমার অবলীলাক্রমে জ্বলন্তানলে জীবনোৎসর্গ করিয়াছিলেন। একজন ব্রাহ্মণ দিল্লিতেও সেইরূপ করিয়া মুসলমান অধিপতি ফিরোজাসাহকে স্তম্ভিত করিয়াছিলেন। ঐরূপ রাজপুতরমণীরা জ্বলন্তানলে বা বিষগ্রহণে প্রাণত্যাগ শ্রেয়ঃ মনে করিতেন। সম্রাট ফিরোজসাহ পিতৃব্যের নৃশংস অত্যাচারের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ নিপীড়িত প্রজাবর্গের অর্থাদিবিনিময়লব্ধ সন্তোষলিপি পিতৃব্যের সমাধিস্থ করা শান্তিপ্রদ ধর্ম্ম বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন। ধর্ম্ম লাভাকাঙ্ক্ষাতেই মুসলমান নরপতিগণ জিজিয়াদি কর ও নানা নির্য্যাতনাদি দ্বারা এবং অর্থ, পদ কন্যাদি দান করিয়াও হিন্দুগণকে মুসলমান করিয়াছিলেন। কতিপয় রাজপুত রাজারা অধীনতা অপেক্ষা অধর্ম্ম আর কিছুই নাই বলিয়া মনে করিতেন। তাঁহারা যৌনাদি সম্বন্ধ যাঁরা বা অন্য কোন হীন কার্য্য দ্বারা রাজ্যসম্পদ রক্ষা করা অপেক্ষা বনে বাস করা ধর্ম্ম মনে করিতেন। চিতোরের মহারাণা আজও সেই সকলজন্য মহিমান্বিত। আজও সেই সকল রাজপুতদিগের শ্লেষোক্তি শ্লাঘার সহিত উক্ত হইয়া থাকেঃ— “যো রাজপুত দরবারি হুয়া, উ, তিন লোকসে বাহার গিয়া।” কি পাপে ভারতবাসীর বর্ত্তমান দুর্দ্দশা ও ইংরাজজাতির রাজত্বলাভ হইয়াছিল? অতি প্রাচীনকাল হইতে শিক্ষা, সংযম ও ধর্ম্মানুশীলন দ্বারা ভারতবাসিরা আর্য্যপদবী লাভ ও সকলের আদর্শ হইয়াছিলেন। সভ্যতা ও স্বাধীনতার উৎস ভারতবর্ষ হইতেই পৃথিবীব্যাপ্ত হইয়াছিল। যেখানে বিশ্বব্যাপী প্রীতির ছবি ও প্রেমের আকর্ষণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান সেই খানেই মিত্রভাবে স্বাধীনতা বিকশিত হয়, সেখানে সীমাবদ্ধ স্বার্থপরতা বা স্বজাতি, স্বজন, স্বদেশবাৎসল্যেরভা নাই। সকলের সমানাধিকারাদি সংকীর্ণতার মধ্যে শত্রুর ছায়া বিদ্যমান, উহা আর্য্য সনাতন ধর্ম্মের মধ্যে নাই। ফরাসি জাতির সাম্যের মধ্যে সেই ভোগের ছায়া ছিল বলিয়া বিপ্লব হইয়াছিল, আর দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ হিরণ্যকশিপুর ভেদজ্ঞান নৃসিংহমূর্ত্তির দ্বারা নষ্ট করাইয়া সকলকে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত করিয়াছিলেন। বলি দানে বিরাট মূর্তি হিরণ্যগর্ভ বিষ্ণুকে বামন অবতার করিয়া তাঁহার সঙ্গে স্বর্গ অপেক্ষা পাতালে গিয়া স্বার্থত্যাগের মাহাত্ম্য বর্দ্ধিত করাই শ্রেয়ঃ ধর্ম্ম মনে করিয়াছিলেন। সেইরূপ রাবণকে বধ করিয়া বিভীষণকে রাজ্যদান ও করগ্রহণ না করা শ্রীরামচন্দ্রের কীর্ত্তি। যেখানে জেতার পরাজিতকে দাসত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ করিবার কোন লক্ষ্য বা চেষ্টাই ছিল না, সেইখানেই হিন্দুর আর্য্যত্বের মহিমা। কলির প্রারম্ভে শ্রীকৃষ্ণ ও পাণ্ডবগণের শিক্ষা, দীক্ষা, ত্যাগ ও শক্তি সামর্থ্যের জ্বলন্ত উদাহরণ খাণ্ডবদাহন ও রাজসূয় যজ্ঞ। এক একটি লোক লইয়া জাতি, তেমনি দশটি জাত লইয়া সমাজ ও দেশ। জাতি ও সমাজের মঙ্গলের সহিত দেশের মঙ্গলও হইয়া থাকে। উহা কুক্ষিগত, ব্যক্তিগত বা জাতিগত হিতচিন্তার উপর নির্ভর করে না। দেশের মঙ্গল ব্যক্তিগত ও জাতিগত সমূহের সামঞ্জস্য ও দায়িত্বের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। পরস্পরের শিক্ষা, সহিষ্ণুতা, ত্যাগ, সৎচিন্তা, সাহস ও সৎকার্য্যের অনুশীলন দ্বারা বিরাট জাতীয়ভাবের উদ্বোধন হইয়া থাকে। তাহারই অভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার হানি, পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস, নির্ভরাদি লোপ পায়। উহাতেই হিংসাদ্বেষাদি নগ্ন বিলাসিতার সৃষ্টি করে। তাহাতেই দেবাসুরের সংগ্রাম। তাহাতে আর্য্য মুনি ঋষিরা স্ব স্ব তপস্যা ও অস্থিরপঞ্জরাদি দান দ্বারা দেবতার কার্য্যের সহায়তা করিয়াছিলেন। রাবণের সহস্র মুণ্ডেও ইন্দ্রিয়লালসা পরিতৃপ্তি হয় নাই বলিয়াই শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাব। দুর্য্যোধনাদির রাজ্যাদি অপহরণ বাসনা ও জতুগৃহে ও খাণ্ডববনে পাণ্ডবগণকে নষ্ট করিবার চেষ্টা ব্যর্থ করিবার জন্যই শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। রাজসূয়াদিতে পাণ্ডবগণের সামর্থ্য ও পুরুষকারের জ্বলন্ত উদার দৃষ্টান্তেও শিক্ষালাভ না করিতে পারিয়া তাহা কপট দ্যূতক্রীড়ায় হরণ করিতে গিয়াই দুর্য্যোধনাদি ভীষণ কুরুক্ষেত্রের সমরানলে নষ্ট হইয়াছিল। সেই নরনারায়ণের কীর্ত্তি কলাপ মহাভারতের জল্পনা ও কল্পনা। আর্য্য হিন্দুজাতিকে ধর্ম্ম কর্ম্মাদি শিক্ষা দিবার জন্য পঞ্চম বেদস্বরূপ সেই মহাভারতের সৃষ্টি। গোব্রাহ্মণ হিতের নিমিত্তই সেই মহাযুদ্ধে দুর্য্যোধনাদির পূর্ণাহুতি দান হইয়াছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ফলে যুধিষ্ঠিরের স্বশরীরে স্বর্গলাভ হইয়াছিল। কারণ যুধিষ্ঠিরের শরীরে দুর্য্যোধনাদি কৃত শতাপরাধেও হিংসাপাপ স্পর্শ করে নাই। সেই জন্যই তিনি ধর্ম্মের স্বরূপ বলিয়া উক্ত হন। “অহিংসা পরমো ধর্ম্ম” উহা কি ব্রহ্মণ্যধর্ম, কি বৌদ্ধমহাপ্রাণ সকলেরই মূল মন্ত্র।। অহিংসাতেই বিশ্বব্যাপী প্রীতির জ্বলন্ত তেজ স্থাবর, জঙ্গম, তৃণ, পাতা, কীট, পতঙ্গ, পশু, পক্ষী, ও মানবে প্রতিফলিত হয় উহাই সাবিত্রী মন্ত্রের স্ফুরন্ত তপস্যা ও তেজ।
প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে কৃষির তুলনায় শিল্প হীন ও জড়বৎ কারণ উহার দ্বারা দেশের আহার আহরণ ও অভাব দূর হয় না। সেই নিমিত্ত কৃষি ও গোপালনাদি দ্বারা ভারতবর্ষের ধন ও ধনাগম হইয়াছিল। পাণ্ডবগণের অজ্ঞাতবাসের পর, তাহাদের প্রকাশ ও পরিচয় সেই বিরাটের গোগৃহ-হরণেই হইয়াছিল। পৃথিবীতে প্রথমাবস্থা হইতেই কৃষিকার্য্যের দ্বারাই সমাজের উন্নতি ও রক্ষা হইয়াছিল। গোজাতিই উহার প্রধান সম্পদ হইয়াছিল। বর্ণাশ্রম ধর্ম্মকর্ত্তারা শ্রমী বৈশ্যজাতির উপর কৃষি, গোরক্ষা, বাণিজ্য করিবার ভার অর্পণ করিয়াছিলেন। “অর” ধাতু হইতে আর্য্য শব্দের উৎপত্তি ঐ ধাতুর অর্থ ভূমিকর্ষণ। যাহারা কৃষিকার্য্যাদি করিত তাহারা আর্য্য, আর যাহারা পশু পক্ষী আদি হিংসা করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করিত তাহারা অনার্য্য শ্রেণীভুক্ত হইয়াছিল। আর্য্য ও অনার্য্য হইতেই বর্ণাশ্রম ধর্ম্মের সৃষ্টি। আর্য্য মুনি ঋষিগণ গিরিকন্দরে ফল মূল ভক্ষণ করিয়া স্বভাবের শোভার অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল। তাহাদের হৃদয়ে ভোগবিলাস স্থান পায় নাই। মানবজীবনের শৈশবাবস্থার সেই বিমল শ্রী অপূর্ব্ব। তখন বেদ উপনিষদাদির আবশ্যকতা ছিল না। সিন্ধু নদীর উপকূলে ঋষিগণ বেদাদির দ্বারা যে ধর্ম্ম প্রচার করেন তাহাই হিন্দুর আরাধ্য। ঋগ্বেদে ১ম, ৫১সূ, ৮ঋকে আর্য্য ও অনার্য্য জারি সূত্রপাত দৃষ্ট হয়। পৃথূরাজার সময় বর্ণাশ্রমধর্ম্মের সৃষ্টি। আদিম অবস্থায় সকল মানবই এক ছিল কেবল স্থান ও জল বায়ুর গুণে শ্বেত, কৃষ্ণ, পীত ও রক্তবর্ণ হইয়াছিল মাত্র। সেই এক আদি মনুষ্যজাতি হইতে ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও ধর্ম্ম হইয়াছে। ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোকেই কৃষি ও শিল্প দ্বারা বহুকাল হইতেই জীবিকার্জ্জন করিতেছে তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ দেশের রাজা ও ধর্ম্মযাজকগণ করিতেন ও দেশের উদ্বৃত্ত সামগ্রী অন্তঃ ও বহির্বাণিজ্যের দ্বারা বৈশ্যেরা দেশে ধনাগম করিত। গোজাতি মাতার ন্যায় শিশু ও বৃদ্ধের প্রাণরক্ষা করিত বলিয়া দেশের ও দশের আদরের ধন ও পূজ্য হইয়াছিল। মোক্ষ মূলর প্রভৃতি পাশ্চাত্য পুরাবিদ্গণ স্বীকার করিয়াছেন যে বণিক জাতিই বর্ণ লিপির উদ্ভাবয়িতা। বিখ্যাত বৈয়াকরণিক পাণিনি ‘পণ’ ধাতু হইতে ‘বণিক’ শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে বলিয়াছেন। যাস্ক ঋক্মন্ত্রের ব্যাখ্যায় নিরুক্ত (২।৫।৩) উহারই সমর্থন করিয়া গিয়াছেন। ভারতীয় পণ্যদ্রব্য লইয়া পৃথিবীর সর্ব্বত্র বণিকেরা গমনাগমন করিত ইহা বেদাদি ও ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। উহাদের নিকট হইতে গ্রীক ও রোমবাসিরা ধ্রুবতারা লক্ষ্য করিয়া নৌবিদ্যা ও চিকিৎসাদি শিক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অত্যন্ত নম্র ও নির্ব্বিরোধী ছিল। প্রাচীনতম ঋকবেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ও ভাষ্যকার সায়ণাচার্য্যের অর্থানুসারে করপ্রদান, পরাধীনতা ও তিরস্কারভাগিতা বৈশ্যের গুণ বলিয়া প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। সেই বৈশ্য জাতির মধ্যে হর্ষবর্দ্ধনাদি প্রবল প্রতাপান্বিত রাজার আবির্ভাব হইয়াছিল। মৎস্যপুরাণে ভলাদ, বন্দ্য, সৎকৃত্তি প্রভৃতি বৈশ্যগণ বেদের মন্ত্র প্রকাশ করিয়াছিল উক্ত হয়। চণ্ডীতে ও বৈশ্য সুরথ রাজা হৃত রাজ্য উদ্ধার করিবার জন্য দেবীর উপাসনা করিয়াছিলেন। তখন গুণ, কর্ম্ম ও বৃত্তি অনুসারেই জাতি নির্ণীত হইত। ব্রাহ্মণাদির মর্য্যাদা শূদ্র, বৈশ্য, ক্ষত্রিয়, লাভ করিয়াছিল বিশ্বামিত্র, মতঙ্গাদি তাহার দৃষ্টান্ত। হিন্দু জাতির অধঃপতনে, সেই উদার আদর্শ জাতি বংশগত হইয়া পরস্পরের মধ্যে হিংসা দ্বেষের উৎপত্তি করে তাহাতেই হিন্দু সাম্রাজ্য নষ্ট হইয়া যায়। ভারতবর্ষের নির্ম্মিত জাহাজ এরূপ সুন্দর ছিল যে, উন্নতিশীল ইউরোপবাসীরা গত দুই শত বৎসরেও উচ্চতর বিজ্ঞানের সাহায্যে সেই সকল জাহাজের বিশেষ কোনই উন্নতি করিতে পারেন নাই। ইহা এসিয়াটিক সোসাইটীর পত্রিকায় প্রথম সংখ্যায় উল্লেখ আছে। বাঙ্গালার ঐ সব জাহাজ সুন্দর ও সুলভ ছিল বলিয়া তুরস্কাদিদেশে উহা অধিক পরিমাণে বিক্রীত হইত। ধর্ম্মধ্বজী পণ্ডিতগণ বিদেশে সমুদ্রযাত্রা শাস্ত্রবিরুদ্ধ করিয়া নিজেদের বিদ্যা, বুদ্ধি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করায় বহির্বাণিজ্য হ্রাস হইয়া যায়। এই বহির্বাণিজ্যের সুবিধার জন্য রুসিয়ার অধিপতি মহামতি পিটার ডেনমার্কে সামান্য মজুর সাজিয়া জাহাজ তৈয়ারির কার্য্য শিক্ষা করিয়াছিলেন। হায়! কালের করাল গতিতে দেশের ব্রাহ্মণগণের মূর্খতায় ও বৈদেশিক বণিকগণের বহির্বাণিজ্যের প্রভাবে এদেশের বহির্বাণিজ্য ক্রমে ক্রমে বন্ধ ও একেবারে উঠিয়া যায়। আর্য্য বণিক জাতির কৃষি, গো, বাণিজ্য রক্ষা ও পালন করা বর্ণাশ্রম ধর্ম্মের মূল তাহার প্রতি দেশবাসী সকলের যতদিন ধ্যান ও ধারণা ছিল, যতদিন তাহা রাজাদি ক্ষমতাশীল ব্যক্তিগণ রক্ষাদি করিবার যত্ন ও অবসর প্রদান করিয়াছিলেন, ততদিন দেশে শিশুমৃত্যু রোগ ও শোকের প্রশ্রয় হয় নাই লোকে বলিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও দীর্ঘজীবী ছিল। শঙ্করাচার্য্যের ধর্ম্ম প্রচারে বা হিন্দুধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ভারতের লুপ্ত গৌরব বা বর্ণাশ্রম ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ফলবতী হয় নাই বরং বিষময় হওয়ায় মুসলমান রাজত্বের মূল পত্তন করিয়াছিল। মুসলমান রাজত্বে কর্ম্মকর্ত্তারা ঘোর অত্যাচারী হইলেও তাহারা এদেশের কোন আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বা ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করেন নাই, সেই জন্যই দেশের লোকেরা সেই অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করিয়াও তাহাদের শিক্ষা বাণিজ্যে বিদেশী বণিকগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে অক্ষম হয় নাই। সেই জন্যই ভারতবাসির দুঃখ দারিদ্র্য সাময়িক হইলেও চিরস্থায়ী হয় নাই; দেশের কৃষি, বাণিজ্য, শিল্পাদির কোন হানি হয় নাই, বরং বৌদ্ধ বিপ্লবের পর হইতেই উহার সমধিক উন্নতি হইয়াছিল। মোগল সাম্রাজ্যে ভারতবর্ষের শিল্পের উন্নতি হইয়াছিল বটে, কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের আবির্ভাবে ও প্রশ্রয়ে উহার অধঃপতনের সূত্রপাত আরম্ভ হইয়াছিল।
বিদেশী বাণিজ্যঃ— বৈদেশিক বণিকগণের অন্তঃ ও বহির্বাণিজ্যের ফলে যে ভারতবর্ষ দেবতার রঙ্গমঞ্চ, মুনি, ঋষির আরাধ্য তীর্থস্থান এবং শিক্ষা ও সভ্যতার আদর্শ বলিয়া জগতে সমাহুত হইত, হায়! বর্ত্তমানে তাহার অধিবাসিগণ অধিকাংশই মূর্খ এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা দীক্ষায় দরিদ্র, নয়, বিলাসী! হায়! যে পল্লীনিবাস সুখ ও স্বাস্থ্যের নিদর্শন ও আশ্রয় ছিল, তাহা এখন রোগ ও দুর্ভিক্ষের আশ্রয় হইয়া অরণ্য ও মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে। যে আর্য্যজাতি দেবতা, ঋষি ও অতিথিকে পঞ্চ বলিদান না করিয়া অন্ন গ্রহণ করিতেন না, হায়! এখন তাহারা নিজের ও পুত্র পরিবারকে দুইবেলা অন্নদান করিতে পারে না। যে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য প্রত্যেক গ্রাম ও পল্লীর বৈশিষ্ট্য রক্ষা ও গৌরব বৃদ্ধি করিত, এখন তাহা লোপ পাইয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। যে ভারতবর্ষ বহুকাল হইতে পরাধীন তাহার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যাদির বৈশিষ্ট্যে পৃথিবীর প্রশংসা লাভ করিয়াছিল তাহা এক বৈদেশিক বাণিজ্যের ফলে তাহার সে গৌরব নষ্ট হইয়াছে। হায়! গ্রাম ও নগরবাসিরা ক্রমে ক্রমে পরমুখাপেক্ষী, নিরাশ্রয় ও অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। ভারতবর্ষের শিল্প, কৃষি, বাণিজ্যের উন্নতির জন্যই গ্রাম ও পল্লী-সমাজ এক একজন বিচক্ষণ জমিদারের অধীনে সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছিল। কৃষকেরা জমিদারকে রাজার খাজনা শিল্পী ও বণিকগণের নিকট উৎপন্ন দ্রব্যের বিনিময়ে যাবতীয় অভাব দূর করিয়া সুখে স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিত। বণিকদের মাশুলে রাজস্ব বিশেষ লাভবান হইত। পল্লীগ্রামের উৎপন্ন দ্রব্যে সেই স্থানের অভাব পূরণ করিয়া অবশিষ্টাংশ সামগ্রী অন্যত্র যাইত। জমিদারেরা সকলের আপদ বিপদে সর্ব্বোতাভাবে রক্ষা বিধানাদি করিয়া রাজার করাদি প্রেরণ করিয়া যথেষ্ট লাভবান হইতেন। তখন দেশে কল, কারখানা বা যৌথ কারবার ছিল না। জমির জমা ব্যবস্থায় যাবতীয় কাজ কর্ম্ম চলিত, নগদ মজুরীতে কাজকর্ম্ম হইত না। তাহাতেই সকলের জমা জমি ছিল ও পরস্পর সৌহার্দ্দ্যে সুখস্বচ্ছন্দে সংসার যাত্রা নির্ব্বাহ হইত। এক গ্রামে নানা জাতি ও হিন্দু মুসলমান সুখে বাস করিত তাহাদের মধ্যে কোনরূপ হিংসা দ্বেষ ছিল না বা ধর্ম্মকর্ম্মের জন্য কোনরূপ অকৌশল বিবাদাদি ছিল না। যতদিন সেই সহিষ্ণুতা শিক্ষা দীক্ষার সাফল্যের চিহ্ণস্বরূপ বর্ত্তমান ছিল, ততদিন কোন বিশৃঙ্খলা বা অভাব হয় নাই। তাহার অভাবেই ধর্ম্ম কুসংস্কারাচ্ছন্ন হইয়া নগ্ন বিলাসিতায়, স্বার্থপরতা ও আত্মম্ভরিতায় মুগ্ধ হইয়া পরস্পর হিংসাদ্বেষ সৃষ্টি করিয়া বর্ণাশ্রমধর্ম্ম ও জাতীয়তার সামঞ্জস্য নষ্ট করে। বিরাট হিন্দু মুসলমান জাতির বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়াতেই দৃঢ়ব্রত খৃষ্টান জাতির অভ্যুদয় হইয়াছিল। অতি স্মরণাতীত কাল হইতে এদেশে কৃষি শিল্প বাণিজ্যাদি জাতির সহিত পুরুষানুক্রমে সংশ্লিষ্ট থাকায় উহার উত্তরোত্তর এরূপ উৎকর্ষলাভ করিয়াছিল যে যাহাতে বিজ্ঞানবিৎ পাশ্চাত্য জাতি সকল তাহার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে অক্ষম হইয়া সেই সকল দ্রব্য ক্রয় ও ব্যবহার করিত। ভারতবর্ষ হইতে তখন কাঁচা মাল বিদেশে কখনও যায় নাই, কেবল সুগন্ধি ব্যবহার্য ও খাদ্য দ্রব্যাদি যাহা ইউরোপাদিতে হইত না তাহাই যাইত। সার্ব্বজনীন শুভ চিন্তাতেই হিন্দু জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা, উহা ভিন্ন ভিন্ন জাতির দায়িত্ব ও ধর্ম্ম কর্ম্মের উপর নির্ভর করিয়া বিরাট হিন্দু জাতির সৃষ্টি করে। তাহাদের মধ্যে যথারীতি সামঞ্জস্যের অভাবেই পতন হইয়াছে। পুরাকালে হিন্দু রাজারা উহার প্রতিকার যজ্ঞাদিতে দেবতার আবাহন ও আহুতি দ্বারা করিতেন। তাহাতেই ব্রাহ্মণাদি সকল জাতি স্ব স্ব বৃত্তি অবলম্বন করিতে বাধ্য হইত ও যথারীতি পুরস্কৃত হইয়া স্ব স্ব অভাব দূর করিত। সেই হইতে সংযমাদি শিক্ষার জন্য পশুবৃত্তির নিদর্শন স্বরূপ ছাগ মহিষাদিকে দেবতার তুষ্টি সাধনের জন্য বলি প্রদান করা হইত। যজ্ঞে দেবদত্ত বারিলাভের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের সংগৃহীত অর্থ কোষাগার হইতে মুক্ত করিয়া সকলের অভাব দূর করিত। সেই সকল যজ্ঞে কৃষি শিল্প বাণিজ্যের প্রসার ও উন্নতি হইত। সেই সকল ধর্ম্মানুমত বৈদিক ক্রিয়া ক্রমে কালের গতিতে নষ্ট হইয়া গেলে হিন্দুর রাজত্ব শেষ হয় ও বৌদ্ধ ও মুসলমান সাম্রাজ্যে সংগৃহীত অর্থ অন্যথা নষ্ট হইতেছিল। চতুর ইউরোপবাসিগণের মন্ত্রণা ও কৌশলে বা মোগল মন্ত্রী ও সম্রাটগণের নির্বুদ্ধিতায় তাজমহলাদিতে রাজার অর্থ নষ্ট হইয়া পৃথিবীর মধ্যে উহা যথার্থই সাতটী আশ্চর্য্যে বস্তুর মধ্যে একটিতে পরিগণিত হইয়াছে। ভারতবর্ষের পতিত জমিতে কৃষিকার্য্যাদি দ্বারা উন্নতি, তখন কি বিদেশী কি স্বদেশী কেহই করে নাই ও দেশের যে অন্তর ও বহির্বাণিজ্যে সর্ব্বনাশ হইতেছে সেদিকে কেহই এক কপর্দ্দক ব্যয় বা চেষ্টা করে নাই। ভারতবর্ষে চিরকাল ধরিয়া স্থানোপযোগী ও আবশ্যকীয় যে সকল কৃষি বাণিজ্য ও শিল্পাদি আবহমানকাল চলিয়া আসিতেছিল তাহাতে হস্তক্ষেপ সর্ব্ব প্রথমে বিদেশী ইউরোপীয় বণিকগণই করে। দেশের যাবতীয় উৎপন্নদ্রব্য দ্বারা দেশের যে অভাব দূর হইত, তাহার স্থলে নীল, আফিম, তুলা, পাট, চা আদি নূতন চাষের ব্যবস্থা করিয়া দেশের অবশ্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়াইয়া দেওয়া এবং তাহা বিদেশে রপ্তানি করা আরম্ভ হয়। বিদেশী বণিকেরাই কলিকাতা প্রভৃতি স্থানে দেশের মালের আড়ত ও সেই সকল স্থানে বস্ত্রাদি বয়নাদি করিয়া বিদেশে পাঠান প্রথম আরম্ভ করে। এই কেন্দ্রীভূত ব্যবসার ফলে এদেশের যাবতীয় দ্রব্য উৎপন্ন হইবার পূর্ব্বেই বিক্রীত হইতে আরম্ভ হয়। তাহাতে নিজের ক্ষেতের ফসল জমিদারের খাজনা ও বিদেশী বণিকের লাভাংশ না দিয়া কাহারও উদরস্থ হইবার উপায় ছিল না। ইহাতেই স্থানীয় অভাব ও আবশ্যকীয় জিনিষের মূল্য দিন দিন বাড়িতে থাকে। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি বা অন্য-কোন বিদেশী ইউরোপীয় কোম্পানিরা কেন্দ্রীভূত ব্যবসা আরম্ভ করিয়া কলিকাতা, হুগলী, চুঁচুড়া প্রভৃতি স্থানের উন্নতি করিয়াছিলেন বটে কিন্তু তাহাতে যে দেশের ও দশের কি সর্ব্বনাশ হইয়াছিল তাহা মুসলমান শাসনকর্ত্তাদের বা তাঁহাদের কোন মন্ত্রী বা জমিদারগণের লক্ষ্য পড়ে নাই। তাহাতেই দেশের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। শিল্পী, কৃষক, ব্যবসায়ীরা দেশের অরাজকতায় দাদন গছান ও এক চেটিয়া ব্যবসায় কোম্পানির ক্রীতদাস স্বরূপ হইয়াছিল। শেষে দেশে তখন যাত্রা কথকতায় সাধারণ অজ্ঞ লোকেদের ধর্ম্ম শিক্ষাদি দান করা হইত। তখনকার কবির ছড়ায় উহার প্রতি কেন কটাক্ষপাত করা হয় নাই ইহাই বড় আশ্চর্য্যের বিষয়। হায়! তাহাতেই সেই বাঙ্গালীর ও বাঙ্গালার সুখ সম্পদ যাহা মুসলমান রাজত্বের ঘোর অত্যাচারের মধ্যেও বর্ত্তমান ছিল তাহা এখন সুখস্বপ্ন বা আকাশকুসুম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। হায়! সেই স্মৃতির মধ্যে বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর অপূবর্ব যে সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য্য ছিল তাহা এখন আর নাই। সে বাঙ্গালীর ভোজন শক্তি ও স্বাস্থ্য ও সুখের পল্লিনিবাস এখন কোথায়? সেই শস্য শ্যামলা হরিতক্ষেত্র পরিশোভিত নদী ও পুষ্করিণী কুমুদ কাহ্লার পরিবেষ্টিত পল্লিসমাজে বাঙ্গলার গৃহলক্ষ্মীর জয়বার্ত্তা ধন ধান্য সমাগমের সহিত যাহা হইত, তাহা এখন কোথায়? সেই হিন্দুর ভাদ্র পৌষ চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজায় যে লেহ্যপ্যেয় সুখাদ্য ফল মূল ব্যঞ্জন পলান্ন পায়স মিষ্টান্নাদির দ্বারা গ্রামে গ্রামে পল্লীতে পল্লীতে উৎসব কোলাহল হইত তাহা এখন কোথায়? এখন সেকালের কবির বর্ণনায় তাহা উপভোগ করা ভিন্ন আর উপায় নাই। বাঙ্গালার জমিদারগণের সেই দনুজদলনী দুর্গান্নপূর্ণা পূজা উৎসবে দীন দরিদ্রকে ধন বস্ত্রাদি বিতরণ বিবাদ বিসম্বাদ দলাদলির শান্তি ও স্নেহালিঙ্গন এখন কোথায়! সেই সকল পূজা ও উৎসবে দেবীচরণে অসুরশক্তি আত্মগ্লানি অহঙ্কার সঙ্কীর্ণতার পরাজয়বার্ত্তা যেন সাক্ষাৎ মূর্ত্তিমতি করিয়া শিক্ষা দিবার যে ব্যবস্থা হইত, তাহা এখন কোথায়? হায়! সেই সকলের পবিত্র স্মৃতি সেকালের কবিরা আনন্দে বিহ্বল হইয়া গাহিয়া গিয়াছেন মাত্র এখন তাহা উপভোগ করা মূর্খতার চিহ্ণ হইয়াছে। হায়! সেই সকল পূজা বর্ত্তমান পাশ্চাত্য শিক্ষার বিষময় ফলে ঘোর পৌত্তলিকতায় পরিণত হইয়াছে সেই সকল দেব দেবীর মূর্ত্তি পূজা তখনকার তুলনায় নাই বলিলেই অত্যুক্তি হয় না। শিল্পিরা সেই সকল দেবদেবীর প্রতিকৃতি মৃণ্ময় ও হস্তিদন্তে প্রস্তুত করিয়া বিদেশী ইউরোপীয় জাতির গৃহসজ্জার সাজ সরাঞ্জাম করিয়া গৌরবান্বিত হইতেছে। ইহা অপেক্ষা এখন আর কি দুঃখের বিষয় হইতে পারে? সেই সকল পূজা ও উৎসবে পরস্পরের মনোমালিন্য দূর ও একতা সৃষ্টি দ্বারা আত্মরক্ষার সংগ্রামের জন্য শক্তি সঞ্চয় যে শক্তি উপাসনার মূল উদ্দেশ্য ছিল, এখন আর সেরূপ ভাবে তাহা অনুষ্ঠিত হয় না। সেই গৌরব স্মৃতি যাহারা পুরুষানুক্রমে রক্ষা করিত ও জমিদার বলিয়া সমাজে সমাদৃত হইত তাহারা এখন আর নাই। তাহাদের বংশধরগণ প্রায়ই বিশ্বাসঘাতকতায় ও অত্যাচারে এখন নাই বা দীন দরিদ্র পিপীলিকাগণ যেমন আহারের জন্য চতুর্দিকে ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়ায়, বিন্দুমাত্র রসাস্বাদন করিলে তাহারা শ্রেণীবদ্ধ হইয়া তাহা আহরণ করে ও সকলে সম্মিলিত হইয়া তাহাদের বল বুদ্ধির পরিচয় তাহাদের অপেক্ষা শতগুণ অধিক মৃত জীবজন্তুর মাংস ভোজনাদি করে ও তাহাদিগকে লইয়া যায়, সেইরূপ ইউরোপের বণিকগণ এদেশের সুখস্বচ্ছন্দতা দৃষ্টিগোচর করিয়া সাত সমুদ্র তের নদী পার হইয়া মৃত্যু, রোগ, পীড়া, সমস্ত বরণ করিয়া আসিয়াছিল। তাহাদের ব্যক্তিগত স্বার্থাপেক্ষা জাতিগত স্বার্থের চিন্তা বলবান ছিল। তাহারাও একদিন পরাধীন ছিল, তাহারা তাহাদের দেশকে স্বাধীন শান্তিস্বস্ত্যয়নে বা যজ্ঞে করে নাই। যেমন বিদ্যুৎশিখা মেদিনীমণ্ডলে সঞ্চরণশীল মেঘলাকে তূর্য্যনিনাদে বিদীর্ণ ও ভেদ করিয়া ভূতলে জলাধারায় নদ নদী সমুদ্রাভিমুখে প্রেরণ করে, তেমনি সমস্ত জাতিগণ তাহাদের নেতৃবৃন্দের তড়িৎ প্রবাহে উদ্দীপিত ও আকৃষ্ট হইয়া কার্য্য নির্দ্ধারণ পূর্ব্বক দেশবৈরী দুরাত্মাগণকে শাস্তিদান করিয়া স্বদেশকে স্বাধীন করে। হিন্দু জাতির সহস্র যুগব্যাপী আবর্জ্জনা সংস্কারাভাবে সমাজ ও ধর্ম্মের স্তরে স্তরে স্থান লাভ করিয়া পরস্পর পরস্পরকে গিরি মরুর ব্যবধানের মত দূরে ফেলিয়া হীন ও অধীনতা পাশে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে; যেখানে রোগ সেখানে চিকিৎসা হয় নাই। জাতীয় ঐক্যের প্রধান অবলম্বন ভাষা, ধর্ম্ম ও সমাজ। পরস্পরের ভাব বিনিময় ও সম্মিলনের রাজপথ ভাষা, ধর্ম্ম ও সমাজ। উহার বৈচিত্রেই ভারতবাসীর দুর্দ্দশা। সকল ভাষা, ধর্ম্ম ও সমাজের মূল উদ্দেশ্য এক হইলেও তাহাদের পরস্পর খুঁটিনাটিতেই সর্ব্বনাশ। ক্ষুদ্র সংঙ্কীর্ণতাতেই ভেদ জ্ঞানের উৎপত্তি। তাহাতেই বিশাল বৃক্ষের ভিন্ন ভিন্ন কোটরে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ধর্ম্ম ও সমাজের সৃষ্টি করিয়া মূল বৃক্ষের নাশ করিয়াছে। মহম্মদ বুদ্ধ খৃষ্টাদি সকলেই ধর্ম্মের সংস্পর্শে ভেদজ্ঞান তিরোহিত করিয়া বিশাল সাম্রাজ্য ও জাতির সৃষ্টি করিয়াছিল। ইউরোপে সর্ব্বপ্রথমে ফরাসি জাতির মধ্যে সাম্যনীতি ও স্বাধীনতার মন্ত্র জাগরিত হইয়া রাজা ও তাহার দেশ ও রক্ষকগণের রক্তস্রোতে ধরাতল প্লাবিত করিয়াছিল। সেই বিজয় বৈজয়ন্তীতে মহাবীর নেপোলিয়ান সিংহাসন ও পৃথিবী জয় করিবার সংকল্পে সমরানলে ইউরাপ ছারখার করিয়াছিলেন। সেই দুর্দ্দান্ত ফরাসি জাতিকে ইংরাজ জাতি জলে স্থলে পরাজিত করিয়া পৃথিবীর পূজ্য ও প্রধান হয়েন। সেই ইংরাজ জাতির বিরুদ্ধে আমেরিকার যুক্ত রাজ্যের ঔপনিবেশিক ইংরাজেরা অস্ত্র ধারণ করিয়া স্বাধীনতা লাভ করিয়াছিল। ইংরাজ জাতির শিক্ষা দীক্ষার মধ্যে স্বাধীনতার বীজ আছে ইহা স্বীকার করিতে হইবে। সেই শিক্ষা দীক্ষার নিকট এদেশবাসিরা অতি আশ্চর্য্য কৌশলে পরাজিত হইয়াছিল। কলির প্রারম্ভে কপট দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবগণ রাজ্য হারাইয়া বনবাসী হইয়াছিল নল হরিশচন্দ্রেরও সেই দশা, কিন্তু তাহাদের সকলেরই পুনর্রাজ্যলাভ হইয়াছিল। সেকালের অক্ষক্রীড়ায় জীবন্ত পাশা ও অক্ষ লইয়া হয় নাই ইংরাজের রাজ্য লাভে কলিকাতায় তাহাতেই হইয়াছিল। তাহাতেই ইংরাজের বিশেষত্ব ও কলিকাতার কথা মহাভারতের অপেক্ষা কোন অংশে নূন্য নহে। ইংরাজেরা এদেশে আসিয়া নূতন পাশাখেলার সৃষ্টি করিয়া ব্যবসা, জমিদারী চক্রান্ত, ও অর্থ বলে কৃতঘ্ন ব্যক্তিগণের সাহায্যে কৃতকার্য্য হইয়াছিল। তাহা লাভ করিবার জন্য জয়োপযোগী অর্থ, লোক বা আয়োজন করিতে হয় নাই। সমস্তই এদেশের লোকেরা তাহার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিল। ইহাই ইংরাজদের ভাগ্যের বিশেষত্ব। কলিকাতার মন্ত্রণা সভায় অনেক জীবন্ত ঘুটী তৈয়ারি হইত ও তাহাদের খেলার বোড়ের কিস্তিতে অনেক রাজা নবাব মাৎ হইয়াছিলেন। তাহাদের চালে এদেশের লোকগুলিকে যেন মন্ত্রমুগ্ধ পশুবৎ করাইয়া কার্য্য করাইয়া লইত। সকলেরই তখন কলিকাতায় গিয়া কোম্পানির কর্ম্মচারী বা বেনিয়ান হইয়া রাতারাতি বড় মানুষ হইবার চেষ্টা বলবতী হইয়াছিল। ব্রাহ্মণাদি গুরুজন ঐ কথা বলিয়া সকলকে আশীর্বাদ করিতে আরম্ভ করে ও এমন কি উহা মেয়েদের গল্প ব্রতকথায় স্থান লাভ করিয়াছিল। যাহাতে এদেশের লোকেরা ইংরাজদিগকে পর না ভাবে সেজন্য তাহারা স্বদেশের বেশভূষা ও আচার ব্যবহারাদি ত্যাগ করিয়াছিল। তাহারা মসলিনের কামিজ, ঢিলে পায়জামা ও সাদা টুপি পরিয়া মুসলমান কর্ম্মচারীর বেশে থাকিত ও তামাক খাইত। সকালে বিকালে কাজ করিয়া দুপুর বেলায় মাছ ধরিত। সন্ধ্যার সময় বিবি ডোমিঙ্গ আশের হোটেলে বসিয়া গল্প গুজব পানাহারে সময়ের সদ্ব্যবহার করিত। ভাগ্য প্রসন্ন হইলেই শত্রুর শত্রুতায় ও শুভ ফল হয়। মুর্শিদকুলি খাঁ যদি অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকগণের ন্যায় সমান কর ইংরাজ বণিকগণের নিকট দাবী করিতেন তাহা হইলে বোধ হয় তাহারা কলিকাতাদি গ্রাম ক্রয় ও বাদশার নিকট দৌত্যাভিযানের ব্যবস্থা করিত না। ইংরাজগণের যাহা কিছু শিখিবার বাকি ছিল তাহা তাহারা কলিকাতার চতুর আরমানি ব্যবসায়ীগণের নিকট শিক্ষা করে ও তাহাদের সহায়তায় নবাব উজির সম্রাটের প্রিয়পাত্র হইয়া সকল কার্য্যে জয়লাভ করে। কেমন করিয়া কি উপঢৌকনাদি দ্বারা এদেশের সামান্য লোক হইতে সম্রাট পর্য্যন্ত বশীভূত করা যায়, তাহার মন্ত্র ও কৌশল আরমানিরাই তাহাদিগকে শিখাইয়াছিল। আরমানিরা উর্দ্দু, পার্শি জানিত ও ইংরাজের দ্বিভাষীর কার্য্য করিত। খোজা সরহদ্দের নাম সেইজন্যই ইতিহাসে স্থান পাইয়াছে। মুর্শিদকুলি খাঁ বা দেশের বণিকগণের আপত্তিআদিতে তাহাদের কোন কিছুতে করিতে পারে নাই। ১৬৯০ খৃষ্টাব্দে আরমানিদের জন্য কাঠের গির্জ্জা ইংরাজ কোম্পানির ব্যয়ে নির্ম্মিত ও তাহাদের উপর সদয় ব্যবহারের উল্লেখ করিয়া কলিকালে ধর্ম্ম ও প্রীতি বলাপেক্ষা যে অর্থ ও চক্রান্ত বলই শ্রেষ্ঠ সে কথার শিক্ষা ও দীক্ষা ইংরাজ জাতির হাতেকলমে কলিকাতায় হইয়াছিল ও তাহাদের গুরু আরমানিরা। তাহারা উহারই প্রাদুর্ভাবে সম্রাটের দরবার বা নবাবাদির নিকট প্রিয়পাত্র হইয়াছিল। কলিকালের ব্রহ্মাস্ত্র কামিনী ও কাঞ্চন যাহার সহায় তাহার আর চিন্তা কি? কলিকাতায় ইংরাজ জমিদারীর কার্য্যের সঙ্গে উহার ব্যবসাদি করে। উহার মধ্যে নদীটাস ব্যবসায়ও করিয়াছিল। মুসলমান সম্রাট বা দেশের রাজাদির তখন এমন কোনই ক্ষমতা ছিল না যে যাহার দ্বারা ইউরোপের বণিকগণকে জলযুদ্ধে পরাজিত করিয়া তাহাদের এদেশে আসিবার পথ রোধ করিতে পারে। আর কথায় কথায় ফারমনাদি দিয়া প্রয়োজনীয় অর্থ শোষণ করা তখনকার সম্রাট ও তাঁহার প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীগণের নিত্য কর্ম্মের মধ্যে হইয়া পড়ে। সেই নিমিত্ত সেকালে ইউরোপীয় বণিকেরা তাহাদের কামধেনু স্বরূপ বড়ই আদরের ধন হইয়াছিল। ১৬৯০ খৃষ্টাব্দে ১৭ই ফেব্রুয়ারির ফরমানে ইংরাজদের দেড় লক্ষ টাকা দণ্ড-বিধান হইয়াছিল ও তাহাদের বাণিজ্য করিবার অনুমতি দান করা হইয়াছিল। এই মহাপাপেই মুসলমান সাম্রাজ্য নষ্ট হইয়াছিল। ইংরাজ জাতির যদি কোন তপস্যার কথা উল্লেখ করা যোগ্য হয় তবে বলিতে হইবে যে তাহারা সংযমী না হইলেও কামিণী-কাঞ্চনে বশীভূত হইয়া স্বজাতীয় ও স্বদেশের কোন অনিষ্টই করেন নাই। ফরাসি-জাতির ইংরাজ-জাতির মত সে গুণের ইতর বিশেষ হওয়ায় তাহাদের নিকট পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছিল। ফরাসি সৈনিক ও সেনাপতিরা এদেশের লোকদিগকে পাশ্চাত্য মতে রণ-বিদ্যা ও যুদ্ধ কৌশল শিক্ষাদান করে। ইংরাজ জাতি তাহা করে নাই কেবল সৈন্যসমান্ত প্রস্তুত করিয়া গুলি ছুড়িতে শিখাইয়াছিল, গোলা চালনাআদি সমস্ত কার্য্যই ইংরাজরা করিত। ইংরাজদের রাজ্যলাভ “তোর শিল তোর নোড়া ভাঙবো তোর দাঁতের গোড়া” নীতিতেই হইয়াছিল। বাঙ্গালার সূক্ষ্ম সূত্র শিল্প নির্ম্মিত “ঢাকাই মসলিন” জগদ্বিখ্যাত উহা উচ্চ মূল্যে মোগল দরবারে ও সুদূর ইউরোপে বিক্রয় হইত। প্রবাদ আছে যে এক রতি ওজনের তুলনায় একশত পঁচাত্তর হাত সূতা কাটা হইত। দেশের কিরূপ বিলাসিতার বৃদ্ধি পাইয়াছিল তাহা উহাতেই লক্ষ্য করা যায়। তখন দেশে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নবাব বাদশারা কোনরূপ উপযুক্ত সৈন্যসামন্তাদি প্রস্তুত বা রক্ষা করিতেন না। বাঙ্গালা দেশে প্রতাপাদিত্য সীতারাম প্রভৃতি যাহা কিছু করিয়া মোগল বাহিণীর বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল কিন্তু ইংরাজের অস্ত্র-শস্ত্রাদির বা রণ-বিদ্যায় অনুমত ছিল না। তাহাতেই ১৭০০ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি বাঙ্গালা, বিহার উড়িষ্যার সুবেদারের নিকট হইতে ঐ সকল স্থানে অবাধ বাণিজ্যের স্বত্বলাভ করিয়া কলিকাতা হইতে উহার কতিপয় সুবন্দোবস্তের জল্পনা আরম্ভ হয়। ইংরাজেরা যেমন দুর্গ নির্ম্মাণ করিয়াছিল তেমনি ভাগীরথীবক্ষে দুইখানি জাহাজ কামানাদি দ্বারা সুসজ্জিত করিয়া রাখিত। হুগলী, চুঁচুড়া, ফরাস ডাঙ্গার ওলন্দাজ দিনেমার ফরাসিগণও সেইরূপ করিয়াছিল। অনলবর্ষী কামানের ভয়ে দেশের সৈন্যসামন্ত ভয়ে কাঁপিত সামান্য লোকের তো কথাই নাই। ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে ইংরাজ ব্যবসায়ীরা আপনাদের মধ্যে বিবাদ করিয়া কর্ম্মচারী বা সুবেদারাদির উদর পূরণ করা যুক্তিসঙ্গত নয় ইহা তাহাদের সুহৃদ রাজারামের পরামর্শানুসারে স্থির করিয়া দুইটী কোম্পানি এক হইয়া হুগলী হইতে সমস্ত মালপত্র কলিকাতায় আনিয়াছিলেন ইহা সেকালের রোটেশন গবর্ণমেন্টের কাগজপত্র হইতে দেখিতে পাওয়া যায়। তাহারা প্রথমে উড়িষ্যায় বাণিজ্য করিতে গিয়াছিল ও তাহাদের মধ্যে একজনের নাম মিঃ টবাস কলি ছিল। রাজা মুকুন্দদেবের রাজধানী মালখণ্ডির কাপড় আজও বিবাহে বাঙ্গালী বণিকে ব্যবহার করিয়া থাকে। মালখণ্ডি রাজ সভায় বিবরণাদিতে দেখিত পাওয়া যায় যে দৈব প্রতিকূলতাবশতঃ সেখানে ইংরাজেরা কুঠি বা বাণিজ্য করা অপেক্ষা বাঙ্গালায় বাণিজ্যাদি করা স্থির করিয়াছিল। তখন বাঙ্গালার প্রধান লাভকর বাণিজ্য দ্রব্য সেরা চিনি ও রেশম ছিল। হিজলীর নিকট বাদশাহী লবণের কারখানা ও সুন্দরবন হইতে মোম ও মধুর ব্যবসা মোগল সম্রাটের একচেটিয়া ছিল। উহার নিকট বেগম রিডার বলিয়া স্থানে আরকানী বোম্বেটিয়াগণের আড্ডায় ঐরূপ নাম হইয়াছিল। তাহারা লুটপাট করিত ইংরাজেরা কলিকাতায় থাকিলে তাহারা প্রতিবাদ হইবে এই আশায় তাহাদিগকে ঐস্থান বিক্রয় ও ব্যবসা করিবার অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল। তাহারা মসলিপট্টনের ছিট ও কাপড়ের ব্যবসা করিত। যেমন বাদশাহ ঔরঙ্গজেব একজন বিখ্যাত গোঁড়া মুসলমান ছিলেন তেমনি তাঁহার প্রিয়পাত্র মুর্শিদকুলি খাঁ আনুষ্ঠানিক মুসলমান ও তপস্যা পরায়ণ ছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকরা তাঁহাকে * সইফি মন্ত্রে সিদ্ধ করিয়াছিলেন ও উহাতে তিনি যুদ্ধাদি জয়লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া গিয়াছেন। তিনি পীর অর্থাৎ সাধু পুরুষ বলিয়া সম্মানিত হইয়াছেন। কাটরার মসজিদ তাঁহার কীর্ত্তি, তাঁহার চেহেল সতুন দরবারও উল্লেখযোগ্য। উহা চল্লিশটি স্তম্ভে সুশোভিত বাঙ্গালার জমিদারেরা সেইখানেই শুভ্য পুণ্যাহ কার্য্য করিত। ঐ দরবারে প্রবেশের সময় তখন অনেক জমিদার ভীত হইত বটে, কিন্তু তাহা বলিয়া জমিদারেরা সময়ে সময়ে বিদ্রোহী হইতে ভয় করে নাই। মুর্শিদকুলি খাঁ অঙ্ক শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও তাঁহার হস্তাক্ষর সুন্দর ছিল। তিনি প্রত্যহ নিয়মিত পাঁচবার নামাজ ও সম্পূর্ণ কোরাণ পাঠ করিতেন। অমাবস্যা পূর্ণিমার দিন উপবাস, বৃহস্পতিবার সমস্ত রাত্রি জাগিয়া উপাসনা ও শুক্রবার রোজা রাখিতেন। তাঁহার সে তপস্যায় ও বাদসাহের গোঁড়ামীতে ইংরাজ বণিকগণের তখন কোন ক্ষতিই হয় নাই বরং তাঁহাদের বিরুদ্ধাচরণে ইংরাজ বণিকগণ কিছুমাত্র ভীত বা তাঁহারা তাঁহাদের কর্ত্তব্য কর্ম্ম সম্পাদন করিতে পশ্চাৎপদ হন নাই। ইংরাজেরা উহাদের শত্রুগণকে আশ্রয় দান করিতেও কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হয় নাই। তখন মুর্শিদকুলি খাঁ ইংরাজ বণিকদের বিরুদ্ধে যাহা কিছু করা উচিত তাহা সমস্তই করিয়াছিলেন। বাদশাহ সুবেদারের হুকুম ও বয়নামার কূটার্থ দ্বারা উহা কার্য্যে পরিণত করিবার যথেষ্ট বাধা দান করিতেন। তিনি হুগলীর ফৌজদারকে দিয়া এদেশের সমস্ত প্রধান প্রধান ব্যবসায়ী ও বণিকগণকে প্রকাশ্য সভায় ইংরাজ বণিকগণের সহিত ব্যবসা করা নিবারণ করাইয়া দিয়াছিলেন। সম্রাট পুত্র ফরক্শিয়ার ফৌজদারকে ঐরূপ করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন যে, উহা মুর্শিদকুলি খাঁর উপদেশ মতই হইয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁই ফৌজদারের বেতন বার্ষিক ২৪০০০ টাকা হইতে ৩২০০০ টাকা করিয়াছিলেন। ১৭১০ খৃষ্টাব্দে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ বাঙ্গালার নায়েব নাজিম ও দেওয়ানি পদ লাভ করিয়াছিলেন। তখন মুসলমানগণের তপস্যায় তাহাদের স্ব স্ব পদ বৃদ্ধি নবাব মন্ত্রীতে উন্নীত হইত বটে, কিন্তু তখন উহাতে মুসলমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ়তর-হয় নাই, বরং শিথিল হইয়া পড়িতেছিল। উহাদের তপস্যা ইংরাজের মত বলবান ছিল না। মুর্শিদকুলি খাঁর পারিবারিক জীবন সুখময় ছিল না। তিনি তাঁহার একমাত্র পুত্রকে “কাজীশরফ খোদাকা তরফ” ঔরঙ্গজেবী নীতির বশবর্ত্তী হইয়া হারাইয়াছিলেন, আর সুজাউদ্দীনের হস্তে তাঁহার একমাত্র কন্যাকে দান করিয়াও সুখী হন নাই। স্বামির ব্যাভিচার দোষে ক্ষুণ্ণ হইয়া জিন্নেতেন্নুসা বেগম পিতার নিকটেই থাকিতেন, পতি উড়িষ্যার নায়েব নাজিম ও নায়েব দেওয়ান স্বরূপে নিজের সুখ সম্ভোগে মত্ত থাকিতেন। তিনি পারস্যদেশীয় প্রখ্যাত তুর্কবংশ সম্ভূত ছিলেন ও তাঁহার আত্মীয় আলিবর্দ্দি খাঁ তাহার নিকট উড়িষ্যায় থাকিত। আলিবর্দ্দি খাঁর পিতামহ বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের দুই ভাই ছিলেন ও সেইজন্য বাদশাহ সরকারে সুপরিচিত ছিলেন। ভাগ্যান্বেষী অজ্ঞাত আলিবর্দ্দি খাঁ মুর্শিদকুলি খাঁর নিকট মুর্শিদাবাদে আসিয়া সুবিধা করিতে পারেন নাই। মুর্শিদকুলি খাঁর কন্যা পিতার মত ধর্ম্মপরায়ণা ছিলেন ও পতি সুখে একরূপ বঞ্চিত হইয়াও পতিব্রতধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেন। বাঙ্গলার ইতিহাস বিশ্রুত এক মসনদ যাহা সম্রাট সাজাহানের পুত্র শাহসুজার আমলে প্রস্তুত হইয়াছিল উহা রাজমহলে, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে চেহেলসতুন দরবারে বিদ্যমান ছিল। উহারই উপর বাঙ্গালার নবাবেরা অভিষিক্ত হইতেন। লোকে বলিয়া থাকে যে, বঙ্গীয় নবাবগণের দুঃখ দারিদ্র্য দেখিয়া ঐ প্রস্তরময় সিংহাসনের বুক ফাটিয়া রক্ত ও বাষ্পবারি বিসর্জ্জন হইয়া থাকে। সেই মসনদ লর্ড কর্জ্জনের চেষ্টায় কলিকাতার মিউজিয়মে শুভাগমন করিলে ভারত সাম্রাজ্যের ব্রিটিশ রাজধানী কলিকাতা হইতে দিল্লিতে অন্তর্হিত হয়। সেইজন্য উহাকে সুভ লক্ষণাক্রান্ত বলিয়া অনেকেরই ধারণা নাই। উহার মধ্যে যে, কতকগুলি লাল দাগ আছে, উহা বৈজ্ঞানিকেরা বলেন যে, উহার মধ্যে লৌহের ভাগের শীতল হইলেই কণা জমিয়া ঘর্ম্ম নিঃসৃত হয়। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে মুসলমানী বিচার প্রণালীর বিলক্ষণ পরিবর্ত্তন হইয়াছিল। মুর্শিদাবাদে দেওয়ানি ও ফৌজদারী চারিটী আদালতে বাঙ্গালার যাবতীয় বিচার কার্য্য হইত। প্রধান প্রধান কানুনগোরা রাজস্ব বিভাগের যাবতীয় কার্য্য করিত ও সেই পদে কার্য্য করিতে করিতে তাহারা বাঙ্গালার জমিদার হইয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর গোঁড়ামী থাকিলেও তিনি গুণগ্রাহী ছিলেন ও তাঁহার অধীনে অনেক হিন্দু বাঙ্গালী প্রধান কর্ম্মচারী ছিল। লাহরীমল্ল, রঘুরাম প্রভৃতি সেনাপতি, দর্পনারায়ণ ও রঘুনন্দনের নাম উল্লেখযোগ্য। বাঙ্গলার ইতিহাস বাঙ্গালির ভাগ্যদোষেই অন্ধ তমসাচ্ছন্ন। উহাতেই বর্ত্তমান যুগের ঐতিহাসিকগণ ও মুসলমান লেখকগণ বাঙ্গালীর চরিত্রে অযথা নানারূপ কালিমা ও কলঙ্ক দান করিয়া থাকেন। বাঙ্গালী কবিগণ ও ইংরাজী লেখকগণ বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর দুঃখাদি উহারই রাজত্বে হইয়াছে বলিয়া প্রমাণ করিয়া থাকেন। কিন্তু বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর অবস্থা তখন হইতে এখন কোন অংশে উন্নত হয় নাই, একথা অনায়াসে বলা যাইতে পারে। মহাবীর আলেকজাণ্ডারের সময় হইতে ইউরোপের বণিকগণের এদেশে শুভাগমনের সময় পর্য্যন্ত সেকালের বাঙ্গালীর বীরত্ব কাহিনী ও গুণগরীমায় মুসলমান সম্রাট ও নবাবগণ মুগ্ধ ছিলেন ও তাহাদিগকে কন্যা, রাজ্যাদি দান দ্বারা মুসলমান করিয়া দেশে অনেক কালাপাহাড়ের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ইংরাজ জাতির মধ্যে সেরূপ কালাপাহাড় নাই বলিলেই অত্যুক্তি হয় না। উহাই তাহাদের ঘোর তপস্যার ফল ও উন্নতির মূল কারণ। বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বদেশ-স্বজাতিদ্রোহিতাদি দোষেই সম্রাট নরপতি ও জাতি পদদলিত হইয়া থাকে। ইতিহাসে উহার শত সহস্র উদাহরণ জাজ্জ্বল্যমান রহিয়াছে। বাঙ্গালা দেশের কার্পাস রেশমী বস্ত্র বিখ্যাত ছিল ও উহা রোমাদি নগরে আদরের সহিত গৃহীত হইত। মুসলমান রাজত্ব কালে সেই বাণিজ্যের কর্ম্ম আরবাদি জাতি করিতে লাগিল, অগত্যা বাঙ্গালি বণিকেরা উহা ত্যাগ করিতে বাধ্য হইল। উহাতেই ভারতে আসিবার পর বহু দিন পরে ইউরোপবাসিগণ আবিষ্কার করে ও এদেশের বহির্বাণিজ্য নষ্ট করিয়া ফেলে। মুসলমান রাজত্বকালে বাহির ও অন্তর্বাণিজ্যের হ্রাস ও দস্যুভয় ও উৎপীড়ন হইয়াছিল ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
টাকা:— মোগল রাজ্যারম্ভে সর্ব্ব প্রথমে গোলাকার টাকা প্রচলিত হয় ও তুরানি ভাষায় ‘তঙ্কা’ হইতে টাকা শব্দের উৎপত্তি। বাঙ্গালাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজত্বকালে সমচতুষ্কোণ বিশুদ্ধ রূপার টাকা ছিল। সেই টাকাই ওজন ও মাপের মূল ছিল। সরাসরি চব্বিশটী টাকায় একহাত ও একশত টাকার ওজনে একসের হইত। রাজার নামদি উহাতে লেখা থাকিত। তখন সিকি দুয়ানি আনি বা আধুলি ছিল না। কড়ির ব্যবহার ও বিনিময় অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। তখন এদেশে জিনিষের বিনিময়ে টাকার দামের জুয়াখেলা বা ব্যবসা ছিল না। বিখ্যাত সুন্দরী নূরজাহানই টাকা ভাঙ্গাইয়া কড়ির বোঝা বওয়ার দুষ্কৃতি দূর করিয়া তামার পয়সা প্রচলিত করিয়াছিলেন। উহাতে কিছুই লেখা থাকিত না। রাজকীয় তত্ত্বাবধানে যে কেহ উহা নির্ম্মাণ করিতে পারিত। সেইজন্য তাহার ওজন ও আকৃতির সামঞ্জস্যের অভাব হইত। উহাকে ঢেপুয়া বলিত ও এক টাকায় ষোল গণ্ডা ও এক ঢেপুয়া বিশ গণ্ডা কড়ির সংখ্যা নিরূপণ করিত।
অতি প্রাচীনকাল হইতেই ঢাকা শান্তিপুর ও পাবনায় কাপড় সূতা ও মালদহ, রাজশাহী বগুড়া মুর্শিদাবাদের রেশমী কাপড় প্রসিদ্ধ ছিল। রঙ্গপুরের হাড়ের জিনিষ ও শ্রীহট্টের পাটীও তেমনি খ্যাত ছিল। মোগল রাজত্বকালে উহাদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ও বাঙ্গালাদেশের গব্যঘৃত, ঢাকাই সোনা-রূপার অলঙ্কার মুর্শিদাবাদের খাগড়াই বাসন, পাট, তামাক ও নারিকেলাদি দিল্লিতে যাইত ও বড় আদরের ধন ছিল। তখন সমস্ত সহরে ও পরগণার সদর কশবাতে ডাকঘর ছিল। রাজা জমিদারের চিঠি মাত্র বিলি করা হইত, অন্যান্য লোকের চিঠি মাশুল দিয়া লইয়া আসিতে হইত। তখন এখনকার মত টিকিট দিয়া মাশুল আদায় করিবার ব্যবস্থা ছিল না। দূরত্ব অনুসারে মাশুলের হারের কম বেশী হইত। জমিদারগণকে তাহাদের চিঠি বিলির দরুণ বার্ষিক মাশুল দিতে হইত। সম্রাট শেরসাহই সর্ব্বপ্রথমে এদেশে ডাক ঘরের সৃষ্টি করেন। তখনকার বাদশাহ নবাবেরা হিন্দু-কর্ম্মচারীগণকে অত্যন্ত বিশ্বাস করিত ও তাহারা রাজকার্য্যের যাবতীয় কার্য্য সুশৃঙ্খলায় সম্পাদন করিত। কার্য্য দক্ষতায় মুসলমানেরা হিন্দুর সমকক্ষ না হইলেও তাহারা সম্বন্ধ, ধর্ম্ম বিদ্বেষাদি নানা কৌশলে নবাব বাদশার নিকট প্রিয় ও উচ্চপদ লাভ করিত। উহাতেই মুসলমান রাজত্বের বিলক্ষণ ক্ষতি হইয়াছিল। মুসলমান ধর্ম্মপুস্তকে কুল ও মানের মর্য্যাদা বলিয়া কোন কিছু ছিল না, মুসলমান সকলেই সমান, অন্য সকলেই কাফের উহাদিগকে মুসলমান করিতে পারিলে মহাপুণ্য। কেবল মহম্মদের বংশে কুল ও আভিজাত্যগৌরবের উৎপত্তি হইয়াছিল। ক্রমে তাহাদের মধ্যেও দলাদলি ও মতভেদাদি লইয়া মারামারি আরম্ভ হয়। তাহাতেই তাহাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে। মোগল সাম্রাজ্যে সংবাদপত্রও বর্ত্তমান ছিল, কারণ “কানুন এজং” নামক পারস্য গ্রন্থে দেখা যায় যে, পাণিপথ যুদ্ধের শিবিরে সংবাদপত্র বাবর পাঠ করিয়াছিলেন ও সেই সময়ে হিন্দুরাজারা আসিয়া সন্ধির প্রস্তাব করিয়াছিল। আইনি আকবরীতেও প্রতিমাসে গবর্ণমেন্ট গেজেটের মত সংবাদ পত্র বাহির হইত। আগরার দরবারে শাজাহান সংবাদপত্র পাঠে যে সমস্ত বিবরণ অবগত হইয়াছিলেন। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু সংবাদ ও পীড়ার সমাচার “পায়গম-এ-হিন্দু” সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল * তখন লাঠির বলে বাঙ্গালাদেশে জমিদারেরা রাজার মত রাজত্ব করিত। গোলাগুলির ব্যবহার করিতে তাহারা জানিত না। পাঠান রাজত্বকালে বাঙ্গালায় বিদ্রোহনল প্রজ্জ্বলিত হইয়া সকলকে অত্যন্ত বিব্রত করিয়াছিল। তখন উহাদিগের ও দুর্দ্দান্ত জমিদারগণের হাত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য যেমন দিল্লির দরবারে আকবর প্রমুখ সম্রাটকে অনুরোধাদি করিতে হইত, তেমনি এদেশের কতকগুলি অকর্ম্মণ্য কুলাঙ্গারগণ স্ব স্ব স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইউরোপের বণিকগণকে ধন লোক ও পরামর্শাদি দ্বারা বিলক্ষণ সাহায্য করিত। এদেশের লোকেরা উক্ত বণিকগণের আত্মরক্ষার ক্ষমতা ও গোলাগুলি বর্ষণদ্বারা মুসলমানগণকে যৎপরোনাস্তি বিপর্য্যস্ত করিতে দেখিয়া ঐ পথ অবলম্বন করা যুক্তিসঙ্গত মনে করিয়াছিল। সুলেমান নিজের সঞ্চিত অর্থ ও লোকবল দ্বারা কখন বাঙ্গালাকে স্বাধীন করিবার চেষ্টা করেন নাই, বরং সম্রাট আকবরের আনুগত্য কর ও উপঢৌকনাদি দ্বারা করিতেন। কিন্তু তাঁহার পুত্র দাউদ খাঁই মূর্খ আমাত্যগণের পরামর্শে আপনাকে সম্পূর্ণ উপযুক্ত জ্ঞান করিয়া দিল্লী সম্রাটের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইয়া ইউরোপের বণিকগণের ব্যবসা ও রাজ্যলাভের পথ পরিষ্কার করিয়া দিয়াছিলেন। বাঙ্গালাদেশে কর সংগ্রহ করিবার জন্য ও সম্রাটের হুকুম অমান্যের সময়ই দেশে সৈন্য সামন্ত আগমন করিত তখন দেশরক্ষা করিবার জন্য কোনরূপ উপযুক্ত সৈন্যসামন্ত ও সময়োপযোগী কোন ব্যবস্থা ছিল না ও হয় না। নবাবের ইহার জন্য ইউরোপীয় বণিকগণের বারম্বার পরাস্ত ও অপদস্থিত হইয়াও উহার কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা করে নাই। সেই মূর্খতায় কিয়ৎকাল মার্হাটগণ এদেশে উৎপাত করিয়াছিল ও শেষে সুদূরের ইউরোপীয় বণিকগণের জিগীষাবৃত্তি উদ্দীপিত করে। মূর্খ বাঙ্গালার জমিদারগণ প্রতাপাদিত্যাদির পরিণাম দর্শন করিয়া আর কেহ সে পথের পথিক হইতে সাহসী হয় নাই। পাঠান রাজত্বকালে যে সকল বাঙ্গালী রাজকার্য্য করিত, তাহাদের মধ্যে প্রায় সকলেই ষড়যন্ত্রপ্রিয় ও শেষে জমিদার হইয়াছিল। সেকালের বিধর্ম্মীর নিকট হিন্দুর কর্ম্ম করা ধর্ম্মবিরুদ্ধ ছিল। উহাতেই যে সকল বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা উহা উপেক্ষা করিয়াছিল তাহারা সম্মানিত ও জমিদার হইত। সেই সকল মহাপ্রভুরা সেই সময় হইতে মুসলমান ও ইংরাজ রাজত্বের পক্ষপাতী হইয়াছিলেন। প্রাতঃস্মরণীয় রাণী ভবানী স্ত্রীলোক হইলেও অন্তর্দৃষ্টি বলে উহা অনুমোদন করেন নাই। বাঙ্গালী জাতির মধ্যে একতা, স্বদেশ ও স্বজাতিপ্রিয়তার অভাবে বাঙ্গালাদেশ নদ নদী খাল বিল জঙ্গলাদি দ্বারা স্বাভাবিক দুর্ভেদ্য হইলেও কতিপয় পাঠান সর্দ্দারগণের ও কানুনগোর হস্তগত হইয়াছিল। আবার তাহাদের উপর দিল্লির সম্রাটের অবাধ্য পুত্র পৌত্র বা উমেদারগণ আসিয়া রাজত্ব করিত। উহাতে দেশের ও দশের দুঃখ দারিদ্র্য দূর হইত না কেহই উপযুক্ত শিক্ষাদির অভাবে উহা দূর করিবার পথ নির্দ্ধারণ করিতে পারে নাই। কেবল আত্মাভিমান ও অর্থ রক্ষার জন্য সক্ষম ইউরোপের বণিকগণের শরণাপন্ন হওয়া ভিন্ন গত্যন্তর নাই স্থির করিয়াছিল। ইউরোপে সাধারণ প্রজাগণ প্রাণপণে জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার নিমিত্ত সবর্বদাই তৎপর, কিন্তু ভারতবর্ষে সহস্র যুগব্যাপী রাজতন্ত্র শাসন প্রণালীর ফলে জাতীয়তার জ্ঞান বহু দিন হইতে তিরোহিত হইয়াছিল। তখন লোকের জাতীয় জয়, পরাজয় ও স্বাধীনতা জ্ঞান ছিল না। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ সমস্ত জাতির সেই জ্ঞান তিরোহিত হওয়ায় ইউরোপের ব্যবসায়ীগণ বিনায়াসে এই বিশাল সাম্রাজ্য বাণিজ্য করিতে আসিয়া লাভ করিয়াছিল।
তখন নবদ্বীপে নব ন্যায়ের তর্কে বালক নিমাই এর নিকট দিগ্বিজয়ীর পরাজয়। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! ডাকাত বেণী রায়ের মত কেহই তখন চলন বিলে “যবন মর্দ্দিনীর” মূর্ত্তি স্থাপন করিয়া অত্যাচারীর মুণ্ড উৎসর্গ করিতে পারেন নাই। মানসিংহ তাহার ভ্রাতাকে দিয়া তাহার সহিত সন্ধিই করিয়াছিলেন। উহাতে কালীর দেবত্র সম্পত্তি লাভ ও তাঁহার দলবল সকলেই জায়গীর লাভ করে। সেই মূর্ত্তি ভূমিকম্পে অন্তর্হিত হইয়াছে। প্রতাপাদিত্যই দেশ রক্ষার জন্য পর্ত্তুগীজদিগের সাহায্যে বাঙ্গালী জাতিকে বৈদেশিক যুদ্ধ প্রণালীতে অভ্যস্ত করিয়া মোগল বাহিনী বিধ্বস্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু হায়! কি আক্ষেপের বিষয়, আর কেহই উহা করে নাই, সেই মহাপাপেও মুসলমান নবাব সম্রাটের অধঃপতনে বৈদেশিক বণিকগণ দেশ, বাণিজ্য ও ধনরত্নাদি সমস্তই অধিকার করিয়া লইয়াছিল। প্রতাপ সময়োপযোগী সামাজিক সংস্কার করিতে গিয়া সমাজের চক্ষুশূল হইয়াছিলেন। সেকালে তিনি বিধবাবিবাহ প্রচলন করিতে গিয়া লোকগঞ্জনায় তাঁহার বিধবা কন্যা আত্মহত্যা করে ও তাঁহার মনোরথ সিদ্ধি হয় নাই। তিনি জাতি বিচার করিতেন না, তিনি বলবান নিম্ন শ্রেণীর বাগদি চণ্ডালীদিকে সৈন্য শ্রেণীভুক্ত করিয়া সকলের বিরাগভাজন হইয়াছিলেন। কিন্তু হায়! মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে যখন * রাধানাথ রায়কে বাকি খাজনার জন্য অত্যাচারের হাত হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য মুসলমান হইতে হইয়াছিল তখন সমাজ নীরব, জমিদারেরা চাঁদা করিয়াও তাহাকে রক্ষা করেন নাই। সেই মহাপাপেই আর্য্যাবর্ত্ত বিদেশী বণিকগণের করতলস্থ হইয়াছিল।
“Ambition, the desire of active souls
That pushes them beyond the bounds of nature
And elevates the Hero to the Gods”
মহাবীর আলেকজান্দার যে সমরকন্দের সিংহাসনে সেকেন্দর বাদশা বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন, সেই সিংহাসনে টাইমুর ও তাঁহার প্রপৌত্র বাবর বসিয়াছিল। যখন ভাস্কোডাগামা কালিকটে পদার্পণ করে ও ইউরোপের বিদেশী বণিকগণ ভারতে বাণিজ্যারম্ভের সূত্রপাত করে, তখনই বাবর সমর বিজয়লাভের জয়োল্লাসে উক্ত সিংহাসনে উপবেশন করিয়াছিলেন। তিনি বিলাসবিমুগ্ধ মুসলমান নবাব বা সম্রাট ছিলেন না। তাঁহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিলাসিতার সুকোমল অঙ্কে লালিত ও পালিত হয় নাই। তাঁহার জীবন ভীষণ ক্লেশ পরিপূর্ণ বিপদসঙ্কুল জয় ও পরাজয়ের সন্ধিস্থলে সবর্বদাই ব্যবস্থিত ছিল। তিনবার রাজ্যলাভ ও তাহাতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন কিন্তু তাহাতে তিনি ভগ্নমনোরথ হইয়া লক্ষ্যভ্রষ্ট হন নাই। তিনি নিজের সুখের জন্য লালায়িত ছিলেন না, তাঁহার অনুচরবর্গ ও সৈন্যের সঙ্গে একত্রে বাস ও তাহাদের সহিত কোনরূপ তারতম্য বিহীন সুখ দুঃখ ভোগ করাই তাঁহার প্রিয় ছিল ও উহাতেই তিনি বহু অসুবিধার মধ্যে তাহাদের সাহায্যে জয় লাভ করিয়াছিলেন। তিনি শিক্ষিত কবি ও হৃদয়বান মহাপুরুষ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি জীবনের সুখ দুঃখ কর্ত্তব্যের অনুরোধে কোন কষ্ট ক্লেশ বহন করিতে পশ্চাৎপদ ছিলেন না। তিনি পারসি বয়ানের বড়ই পক্ষপাতী ছিলেন। বন্ধুর সহিত মৃত্যুও যে উৎসবময় হইয়া পড়ে এই কথার সার মর্ম্ম যেন তাঁহার জীবনের ধ্রুবতারা হইয়াছিল। ১৩৯৮ খৃঃ টাইমুর ভারতবর্ষ অধিকার করিয়াছিল সেই কথা একশতদশ বৎসরের এক বৃদ্ধা রমণীর মুখে তাহার বাড়ীতে বৃদ্ধার পৌত্র প্রপৌত্রগণের সঙ্গে শুনিয়া বাবরের হৃদয়ে সেই ভারতাধিকারের বাসনা জাগিয়া উঠে। বাবর তাঁহার জীবনী লিখিয়া সেকালের অনেক কথা ও আপনার শিক্ষাদীক্ষার পরিচয় দান করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, কাবুল জয় করিয়া সৈন্যসামন্ত ও অশ্ববৃন্দের আহারাদির সুব্যবস্থা করিবার জন্যই ভারতাধিকার করা আবশ্যক হইয়া পড়ে, সেইজন্য তাঁহার সেই দিকে লক্ষ্য হয়। টাইমুর ভারতের বহু মূল্য ধনরত্নাজি ও শিক্ষা দীক্ষা কারুকার্য্যাদি দ্বারা সমরকন্দের ও স্বজাতির সর্ব্বাঙ্গীন উন্নতি সাধন করিয়াছিলেন। সেখানে মানমন্দির, বিখ্যাত জ্যোতির্ব্বিদ দার্শনিক কবি আদি বিদ্বান ও ব্যবসায়ী লোক ছিল। সেখানকার বিবিধ ফলমূল অতীব সুস্বাদু ও তদ্ভিন্ন সেখানকার যাবতীয় শ্রমলব্ধ শস্যদ্রব্যাদি চারিদিকে রপ্তানি হইত ও পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাগজ ও লাল রঙ আমদানি হইত। সেখানে বাণিজ্য ও বাজারের যেমন খ্যাতি ও প্রতিপত্তি ছিল তেমনি স্থপতি বিদ্যার সমাদর ছিল। চেহেল সেতুন দরবার ও অন্যান্য অট্টালিকা বড়ই সুন্দর বলিয়া উহার অনুকরণ হইয়াছিল। বাবর ভারতবর্ষে তাঁহার দেশের মত সুস্বাদু ফল মূল ও আহারাদি নাই বলিয়া দুঃখ করিয়া গিয়াছেন ও সেইজন্য উহা তাঁহার ভাল লাগিত না। তিনি সেই সকলের চাষাদি এদেশের দুরবস্থা দূর করিবার জন্য আরম্ভ করান। সেই সময় হইতেই কাবুলের সুস্বাদু ফল মূল ও মেওয়া ভারতবাসির আদরের ধন হয়। বাবর এদেশের লোকেরা আপনার দেশের লোকেদের মত সামাজিক বা যন্ত্রবিদ্যা পারদর্শী বা স্থাপত্যবিদ্যা কুশল ছিল না বলিয়া গিয়াছেন। ভারতবর্ষের সমস্ত বিষয় সবিশেষ জানিবার তাঁহার সুবিধা হয় নাই বলিয়াই এইরূপ বলিয়াছিলেন। বাবরের জীবনীতে সেকালের মোগল জাতির উন্নতির মূল কারণ, তাঁহার অনন্য সাধারণ অধ্যবসায়, ধৈর্য্য, বলবীর্য্য, সহিষ্ণুতা, শিক্ষা, দীক্ষা প্রমাণ করে। বাবর সেই সকলের আধার বলিয়াই তিনি ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি একদিনে অশ্বারোহনে চল্লিশ ক্রোশ যাইতে পারিতেন ও সন্তরণ পটু ছিলেন। তাঁহার একাধিক পত্নী থাকিলেও তিনি তাহার জন্য তাঁহার বংশধরগণের ন্যায় রাজ্য ও লোকক্ষয় করেন নাই। বাবরই বাঙ্গালার পাঠান রাজত্বের বিদ্রোহানল যুদ্ধ করিয়া শান্ত করিয়াছিলেন। তিনি গঙ্গায় সাঁতার দিতে ভাল বাসিতেন, কিন্তু বাবর দীর্ঘজীবী হন নাই। তাঁহার লীলাখেলা ৪৮ বৎসরেই শেষ হয়। তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক ছিলেন। তাঁহার জন্ম ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৪৮৩ খৃঃ ও মৃত্যু ২৬শে ডিসেম্বর ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে হয়। তাঁহার নামের অর্থ ভক্ত, বাবরের সেই পরিচয় দিবার গুণ তাঁহাতে ছিল। মামুদগজনী বহুবার ভারত আক্রমণ করিয়া গজনীকে সমৃদ্ধিশালী করিয়াছিলেন। শেষে তুর্কজাতীয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন ভ্রাতা মইজুদ্দিনকে গজনীর শাসন দণ্ড প্রদান করেন। মইজুদ্দিনই মহম্মদঘোরী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া ভারতে দেশদ্রোহী বিভীষণ জয়চন্দ্রের প্রলোভনে ও উত্তেজনায় পরাজিত হইয়াও আর্য্যবলদৃপ্ত ক্ষত্রি বীর মহারাজা পৃথ্বিরাজ ও মহারাণা সমর সিংহকে ধরাশায়ী করিয়াছিলেন। সেই হইতেই মুসলমান রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন হইয়াছিল। শেষে সেই গজনী বাবরের প্রপিতামহ জোঙ্গিস খাঁর হস্তগত হইলে বাবর কর্ত্তৃক মোগল সাম্রাজ্যের সূত্রপাত হয়। ভারতে দাসবংশীর মুসলমানেরাও সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছিল। ক্রীতদাস আলপ্তগিন সমরকন্দের রাজদরবারে উচ্চ পদবী লাভ করিয়া শেষে বলপূর্ব্বক গজনী অধিকার করে। তাহার কন্যর পাণি পীড়ন করিয়া ক্রীতদাস সবক্তগিনি গজনীর শাসনকর্ত্তা হন। ৯৯৭ খৃষ্টাব্দে তাহার পুত্রই ইতিহাস বিশ্রুত মামুদ গজনীতে প্রতিষ্ঠিত হইয়া বহুবার ভারতাক্রমণ করেন। লাহোরে, সেই গজনীর বংশধর খসরু মালিককে ১১৮৬ খৃষ্টাব্দে পরাজিত ও বন্দি করিয়া মুসলমান দাসবংশের সাম্রাজ্য সৃষ্টি হয়। মহম্মদ ঘোরী বিশ্বাসঘাতক জয়চন্দ্রের প্রাণ ও রাজ্যাপহরণ করিয়া শেষে অসভ্য পার্ব্বতীয় জাতির হস্তে ১২০৫ খৃষ্টাব্দে প্রাণ বিসর্জ্জন করে। সেই মহম্মদ ঘোরীর ক্রীতদাস কুতবউদ্দিন দিল্লির সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হইয়া তাঁহার নামে মসজিদ ও মিনারে তাঁহার সেই স্মৃতি রক্ষা করিতেছে। সেই কুতবউদ্দিনই বাঙ্গালার ১২০৩ খৃষ্টাব্দে বক্তিয়ার খিলজিকে প্রেরণ করিয়া জয় করে।
হায়! ভারতের স্বাধীনতা সূর্য্য সেই হিন্দু রাজাদের মৃত্যু ও তাহাদের বংশধরগণের কর্ত্তব্য জ্ঞানের অভাবে দেবভোগ্য আর্য্যাবর্ত্ত ক্রীতদাসগণের লীলাক্ষেত্র হইয়াছিল। সেই কলঙ্ক মোচন করিবার জন্য ভারতে কোন হিন্দু জাতি বা রাজার আবির্ভাব হয় নাই—ইহাই দেবতার অভিশাপ। হায়! গজনীর ও সমরকন্দের সিংহাসনাধিকারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সম্রাজ্যাধিকার সেই সময় হইতেই চলিয়া আসিতেছিল। ১২১০ খৃষ্টাব্দে কুতবউদ্দিনের অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পতিত হইয়া মৃত্যু হইলেও মুসলমান সাম্রাজ্যের শেষ হয় নাই। বাবর তাহার জীবনীতে রাজপুত জাতির বলবীর্য্য ও রণকৌশল প্রশংসা করিলেও তাহাদের এই কলঙ্ক দূর করিবার চেষ্টা না করায় যে মহাপাপ হইয়াছিল তাহার আর প্রায়শ্চিত্তের উপায় নাই। দ্বাদশ অশ্বারোহি সৈন্য দ্বারা বক্তিয়ারের বাঙ্গালা অধিকার ও বাবরের দ্বাদশ সহস্র অনুচরবৃন্দ সহিত সৈন্যাদি দ্বারা ভরতাধিকার প্রহেলিকাময় হইয়া রহিয়াছে। যখন মুসলমান জাতির ক্রীতদাসের মধ্যেও যখন স্বাধীনতা ও রাজত্ব লাভের চেষ্টা বলবতী হইয়াছিল তখন হিন্দু রাজারা বা তদ্বংশধরেরা পৈত্রিক সম্পত্তি বা রাজ্যোদ্ধারের চেষ্টা করাও ধারণার বহির্ভূত হইয়া ছিল। তখন বিদেশী মুসলমান বা তাহাদের ক্রীতদাসেরা ক্রমাগত যে রাজ্যলাভ করিবে ইহাতে আর আশ্চর্য্য কি? তখন ভারতবাসির কিরূপ শোচনীয় অবস্থা হইয়াছিল উহাতেই স্পষ্ট অনুমান করা যাইতে পারে।
হায়! সে সময়ে হিন্দুরা মুসলমান নবাবাদির অনুগ্রহে দেশের লোকের সর্ব্বনাশ করিয়া নিজে পদস্থ জমিদার হওয়া ধর্ম্মসঙ্গত মনে করিয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর অত্যাচারে উদয়নারায়ণ সর্ব্বস্বান্ত ও রামজীবন নাটোরের জমিদার হইলেন তাহাতে কেহ কোন কথা কহিল না সমাজ বা জমিদারগণ কোন আপত্তি করিল না তখন বিদেশী বণিকগণ এদেশের ধন ধান্য ব্যবসা ও রাজ্যলাভ করিবে, ইহাতে আর আশ্চর্য্য কি? তখন দেশের লোককে মাতৃভাষা শিক্ষা না করিয়া প্রাণ, মান ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য পারসী ও উর্দ্দু শিক্ষা করিতে হইত। অগত্যা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন ও রক্ষা করা কেবল ব্রাহ্মণ জাতির একচেটিয়া হইয়াছিল। তখন আজকালের মত বিদ্যালয়ে অর্থ দ্বারা বিদ্যাশিক্ষা করিবার উপায় ছিল না। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ছাত্রদিগকে দিয়া যাবতীয় হীন সাংসারিক ও পারিবারিক কার্য্য করাইয়া লইত, অনুগ্রহ করিয়া যৎকিঞ্চিৎ উচ্ছিষ্ট বা উদ্বর্ত্তান্ন দান ও ব্রাহ্মণছাত্রগণকে শিক্ষা দান করিত। সেকালের জমিদারেরা অধ্যাপকগণের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা জমি জায়গা বা বাৎসরিক বৃত্তি দ্বারা করিতেন। এতদ্ভিন্ন অধ্যাপকের ব্যবস্থাদি ও দণ্ডাদি দ্বারা সমাজের উপর কর্ত্তৃত্ব বা অত্যাচার করিয়া বিশেষ লাভবান হইতেন। তখন কথায় কথায় লোকের জাতপাত ও সমাজচ্যুতি হইত। তখন ব্রাহ্মণেরা প্রবল তাহাদিগকে জমিদার ও নবাবের কর্ম্মচারীরা অর্থাদি দ্বারা বশীভূত করিয়া দেশের ও দশের বহুপ্রকারে নানা অনিষ্ঠ করিয়াছে। এইরূপে জমিদার, ব্রাহ্মণ, নবাব ও কর্ম্মচারীরা জাতির হত্তাকর্ত্তা হন। কেহ অধ্যাপকগণের বিরুদ্ধে কোন কথা বা কার্য্য করিতে সাহস করিত না। উহাতেই বৈষ্ণব ধর্ম্মের প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল। হিন্দু সমাজ যখন এমনই বিশৃঙ্খল তখন বিজাতীয় বিধর্ম্মী বিদেশী বণিকগণ যে, দেশ ও রাজ্য লাভ করিবে। উহাতে আর আশ্চর্য্য কি? হিন্দুর মন্দির মুসলমানের মসজিদ বিনা আপত্তিতে পরিবর্ত্তিত হইত। বলবান মুসলমান নবাব বা উচ্চ কর্ম্মচারীরা বলপূবর্বক সুন্দরী রমণী গ্রহণ করিত, কাহারও কোন কথা বলিবার বা অভিযোগ করিবার স্থান ও উপায় ছিল না। তখন দেশবাসি সেই অত্যাচারের হাত হইত নিষ্কৃতি লাভ করিবার নিমিত্ত বিদেশী বণিকগণকে রাজার ন্যায় সম্মান করিতে কুণ্ঠিত হইত না বা জাতি কুলাদি রক্ষা করিবার জন্য তাহাদের শরণাপন্ন হওয়া ভিন্ন আর কোন উপায়ই তখন বর্ত্তমান ছিল না বলিলেই অত্যুক্তি মনে হয় না। সেকালে জমিদারেরা জমির মালিক ছিল না, কর সংগ্রাহক বৃত্তিভোগী মাত্র ছিল। তখন তোষামোদ ও অর্থ বলই উন্নতির কারণ হইয়াছিল গুণের আদর অতি অল্পই ছিল। লঘু পাপে গুরু দণ্ড হইত, ঘটনাচক্রে মূর্খ পণ্ডিতও বুদ্ধিমান হইত। অনেক নিরক্ষর ব্যক্তি সম্রাটের সিংহাসন হইতে উচ্চ রাজকর্ম্মচারীর পদে সম্মানিত হইত। তখন অলীক গর্ব্বাভিমানে কত শত যুদ্ধ ও রাজ্য ক্ষয় হইত। ষড়যন্ত্র করিয়া বলবানকে পক্ষভুক্ত করিয়া শত্রুর সর্ব্বনাশ করা সনাতন ধর্ম্মস্বরূপ হইয়াছিল। পিতা পিতৃব্য হত্যা বা কারারুদ্ধ বা বিশ্বাস নিমুগ্ধ প্রভুকে হত্যা বা গরল দানে রাজ্য লাভ করা, তখনকার রাজা হইতে দাসগণের বিবেক বুদ্ধির অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল। উহাতেই বিদেশী বণিকেরা অন্যের রাজ্যাদি লাভের সহায়তা করিয়া রাজ্য লাভ করিয়াছিল। মুসলমান রাজত্বকালে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ঈর্ষা মূর্ত্তিমান হইয়া আর্য্যরাজনীতির নিয়মাবলি সমূহের প্রতি লোকের দৃষ্টিপাত ছিল না। বিদেহী বণিকগণের শুভাগমনেও ব্যবসায়ে স্বর্ণ-প্রসূ ভারতের সুলভ দ্রব্যের বিনিময়ে প্রতি লোকের দৃষ্টিপাত ছিল না। বিদেশী বণিকগণের শুভাগমনেও ব্যবসায়ে স্বর্ণ-প্রসূ ভারতের সুলভ দ্রব্যের বিনিময়ে বৈদেশিক ধন রত্নাদি আহরণ করা শেষ হইয়াছিল। দেশের ভিতর পণ্যদ্রব্যাদির উপর শুল্কাদিতে যে রাজস্ব আদায় হইত উহার সর্ব্বনাশ ইউরোপের বণিকগণের চতুরতায় হইয়াছিল। মূর্খ বাদসা নবাব তাহাদের প্রতিনিধিগণ উপহার উপঢৌকনাদিতে বশীভূত হইয়া দেশের বণিকগণের নিকট হইতে পণ্যদ্রব্যের উপর শতকরা পাঁচ হইতে কুড়ি টাকা মাশুল আদায় করিত কিন্তু ইউরোপের বণিকগণের নিকট হইতে এককালে বার্ষিক দুই তিন সহস্র টাকা মাশুল নির্দ্ধারণ করিয়া দেশের যাবতীয় বাণিজ্য তাহাদের হাতে তুলিয়া দিয়াছিলেন। উহাতে তখন রাজস্বের কিরূপ যে ক্ষতি হইয়াছিল উহা অনায়াসেই অনুমান করা যাইতে পারে। কলিকাতাদিস্থান সমূহ সেই বিদেশী বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হইয়া অতি অল্প দিনের মধ্যেই উহাকে সমধিক সমৃদ্ধিশালী করিয়াছিল। শাসনকর্ত্তাদের ক্ষমতার অবনতির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের কর্ম্মচারিরা যথেচ্ছাচারী ও অর্থলোভী হইয়া পড়ে। দেশের দুরবস্থার প্রতি কাহারও লক্ষ্য ছিল না। বিদেশী বণিকগণ অর্থবলে ও কৌশলে সেইসকল অকর্ম্মণ্য শাসনকর্ত্তা ও তাহাদের কর্ম্মচারিগণকে বাধ্য ও বশীভূত করিয়া এদেশের ব্যবসা, বাণিজ্য জমিদারী ও রাজত্ব ক্রমে ক্রমে করায়ত্ত করিয়াছিল। ব্যবসা বাণিজ্যে যে রাজস্ব আদায় হইত তাহা ক্রমে ক্রমে যতই হ্রাস হইয়া পড়ে, ততই জমিদারগণের উপর অত্যাচার ও করবৃদ্ধি হইতে থাকে। উহার বিষময় ফলেই দেশের বাঙ্গালার জমিদারগণ সাতপুরুষের জমিদারী হইতে বঞ্চিত ও প্রজাবর্গের আর্ত্তনাদে দেশে হাহাকার উপস্থিত হইয়াছিল। মুসলমান রাজকর্ম্মচারীরা ক্রমে ২ অর্থাদিকৌশল দ্বারা সেই সকল জমিদারী হস্তগত করিয়া দিল্লির দরবার হইতে খেলাৎ মনশাবদারী আনাইয়া প্রজা পীড়ন ও জমিদারী আরম্ভ করে। তাহাতেই প্রজারা চাষাদি ত্যাগ করিয়া প্রাণ লইয়া পলায়ন করে। বাঙ্গালার সেই অত্যাচার ও দুরবস্থার সময় লাঠিয়াল পাইকেরা ডাকাত জমিদারগণের প্রজাপীড়ন ও অবসরক্রমে ডাকাতি করিত। দেশের এমন দুরবস্থার সময় ইউরোপের বণিকগণের এদেশের ব্যবসা বাণিজ্য ও রাজ্যলাভ করার বিশেষ পৌরুষেরও সৌভাগ্যের কথা বলিয়া বোধ হয় না। ইংরাজের রাজ্যলাভে কোনব্যক্তি বা জাতি বিশেষের বিশ্বাসঘাতকতায় বা মূর্খতায় হয় নাই, কিম্বা ইংরাজ জাতির ক্লাইভ প্রমুখ ব্যক্তির শৌর্য্যবীর্য্যে বা ওয়ারেণ হেস্টিংস কর্ণওয়ালিস প্রমুখের রাজকার্য্য কৌশলে বা নৈপুণ্যে উহা আদৌ হয় নাই। কিছুদিন পূর্ব্বে যাহা মূর্খ পাঠানগণ করিয়াছিল উহাই চতুর বণিকেরা বিশেষ কোন ঘোর তপস্যা বা অসাধারণ কৃত্তিত্বের পরিচয় দান করিয়া লাভ করে নাই। মোগল শাসক সম্প্রদায় যে কিছু প্রতিকূলতাচরণ ও শত্রুতা করিয়াছিল, উহা কেবল অর্থলাভ লালসা প্রণোদিত ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। বিদেশী বণিকজাতি অর্থলাভ লালসার সেই সকল গর্হিত অত্যাচারের অতি সহিষ্ণুতার সহিত সহ্য করিয়া তাহাদের জরিমানা উৎকোচাদি দিয়া গূঢ় উদ্দেশ্য সফল করিয়া কোন বিশেষ গুণগরিমার পরিচয় দান করেন নাই, বরং তাঁহারা কলির ধর্ম্ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াই দেশের সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়াছিলেন। উহাতেই যেন কলির কল্কী অবতার ক্লাইভকে বোধ হইয়াছিল। কলিকাতায় সেই অভিনয়ের সূত্রপাত হয়। কলিকাতার ইংরাজের পরাজয় উহার উদ্ধার ও সিরাজের পরাজয় ও হত্যায় ক্লাইভকে কল্কী অবতার বলিয়া সিদ্ধান্ত করা দোষের হয় নাই। তিনি যেরূপ অসাধ্য সাধন করিয়া বহুদিনের মুসলমান রাজত্বের মূলোৎপাটন ও দেওয়ানি লাভ করিয়াছিলেন সেরূপ সৌভাগ্য দেখিয়া যে কেবলমাত্র হিন্দু জাতি যে তাঁহাকে অবতার বলিয়া স্বীকার করিয়াছিল উহা নয়, কি মুসলমান কি ইংরাজ সকলেই তাঁহার গুণ ও শৌর্যবীর্য্যে মুগ্ধ। তাঁহার স্মৃতি কলিকাতার সেকালে প্রধান রাস্তার নামকরণে রক্ষিত কিন্তু তাঁহার স্মৃতি চিহ্ন মূর্ত্তি এতকাল হয় নাই উহা লর্ড কর্জ্জন করিয়া মারকুইস উপাধি লাভ করিয়া সমাধিস্থ হইয়াছেন।
পরকাল বিমুগ্ধ হিন্দু জাতির শিরোমণি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রমুখ সকলেই সেই বিশ্বাসে ক্লাইভ ও ইংরাজ জাতির পক্ষপাতি হইয়া পড়িয়াছিলেন। এমন কি, মীরজাফর মনিবেগমাদি সকলেই ক্লাইভের গুণে মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাঁহার সহিত সমস্ত পরামর্শ ও প্রকাশ্যভাবে তাঁহাকে উইলে অর্থদান পর্য্যন্ত করা কর্ত্তব্য মনে করিয়াছিলেন। পূর্ব্বজন্মার্জ্জিত তপস্যাই সৌভাগ্যের মূল ইহা অধিকাংশই হিন্দু বিশ্বাস করিয়া থাকে। সেই মতানুসারে ক্লাইভ ও ইংরাজ জাতির পূর্ব্বজন্মার্জ্জিত তপস্যার ফলেই কলি ও শক্তিমতি কালীদেবীর অনুগ্রহে কলিকাতা উদ্ধার ও পলাশির যুদ্ধ জয় করিয়া বিশাল ভারত সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্থাপন করিয়াছিলেন। তাঁহার পূর্ব্ববর্ত্তী জব্ চার্নক প্রভৃতিরা তাঁহার ভোগৈশ্বর্য্যের ও কীর্ত্তি মহিমার পরিচয় দিবার জন্য যেন দূত স্বরূপ যাহা কিছু করিবার তাহা করিয়াছিলেন। রাম না হইতে হইতেই যেমন বাল্মীকি রামায়ণের সৃষ্টি করিয়াছিলেন এইরূপ প্রবাদ, তেমনি ক্লাইভের প্রতিদ্বন্দ্বী বলিয়া সিরাজকে রাবণের আসন দেওয়া ভিন্ন উপায় নেই। ঐতিহাসিক ও কবিরা বলবান প্রতিদ্বন্দ্বীর বলবীর্য্যের সবিশেষ প্রশংসা করিয়া জেতার মহিমা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। উদ্দাম চিত্তবৃত্তিকে কেবল রুদ্ধ করিয়া যে বিষময় ফল হয়, ইতিহাসে উহার উদাহরণ মইজুদ্দীন কারেকোবাদ, সিরাজউদ্দোলা নয়, ইহা বলিয়া অবতারণিকা করিয়া রাখিলেই যথেষ্ট হইবে।
স্বয়ং মহাত্মা ব্যাসদেব মহাভারতে আশ্বমেধিক পর্ব্বের ৩য় অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিয়াছেন যে, মানব সমস্ত কর্ম্মই ঈশ্বর প্রেরণায় করিয়া থাকে উহাতে বিশেষ ব্যক্তির কোন অপরাধ নাইঃ—
“নহি কশ্চিৎ স্বয়ং মর্ত্ত্যঃ স্ববশঃ কুরুতে ক্রিয়াং।
ঙ্গশ্বরেণ চ যুক্তোহয়ং সাধবসাধু চ মানবঃ
করোতি পুরুষঃ কর্ম্ম তত্র কা পরিদেবনা।।”
* সিরাজ গ্রন্থকার বলিয়াছেনঃ— মুর্শিদকুলি খাঁ রসিদ খাঁর সহিত হস্তীপৃষ্ঠে সইফি শাস্ত্র পাঠ
করিয়া যুদ্ধজয় করিয়াছিলেন ও নিহত সেনা ও সেনাপতিগণের ছিন্ন মস্তক প্রকাশ্য রাজপথে
প্রত্যেক স্তম্ভের উপর রাখিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।
* বাদসাহদের প্রত্যেক শাসনকেন্দ্রে সংবাদ প্রেরণের জন্য “সওয়ানে নেগার” নামক কর্ম্মচারী
নিযুক্ত থাকিত।
* কৃষ্ণগঞ্জের মুসলমান জমিদারেরা তাঁহারই বংশধর।
