Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    প্রমথনাথ মল্লিক এক পাতা গল্প533 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৬. কলিকাতায় জমিদারী ও ব্যবসা

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – কলিকাতায় জমিদারী ও ব্যবসা

    কলিকাতা কৌন্সিলের প্রথম অধিবেশনের মন্তব্যে এইরূপ উল্লেখ আছে যে, ইংরাজেরা যে পর্য্যন্ত স্থায়ীভাবে ঘর করিবার অনুমতি পান নাই, তদবধি চালা মাটির ঘরেই মালাদি রাখিতেন এবং তাঁবুতে বা জাহাজাদিতে বসবাস করিতেন। উহারা সেরেস্তার কাগজাদি লালদিঘির উপর জমিদারদের কাছারি বাড়ী ভাড়া করিয়া রাখিতেন। তখন লালদিঘি এত বড় ছিল না। সেই পূর্ব্ব স্মৃতিই, বোধ হয়, এখন উহার ধারে ট্রেডস্ এসোসিয়েসন ডেলহাউসির স্মৃতির সঙ্গে সম্মিলিত। ঐ দিঘির উপর জমিদারদের বিগ্রহের দোলমঞ্চ ছিল। তাহাদের আমমোক্তার ফিরিঙ্গি এন্টুনি দোলের সময় উৎসবাদিতে ইংরাজ কর্ম্মচারগণকে ভিতরে গিয়া উহা দেখিতে না দেওয়ায় চার্ণক চাবুকের বহরে রসিকতার সীমা লঙ্ঘন করিয়াছিলেন। এন্টুনি সেই অপমানের প্রতিকার করিতে না পারিয়া অগত্যা কলিকাতা ত্যাগ ও কাঁচড়াপাড়ায় বাসারম্ভ করে। হুগলীতে বিবাদ ও কলিকাতার জমিদারের আমোক্তারকে ঐরূপ অপমান করা মুষ্টিমেয় ইংরাজের মধ্যে চার্ণকই স্বীয় হঠকারিতার পরিচয় দিয়া ভবিষ্যতে ইংরাজের কলিকাতা লাভ ও তথায় বাণিজ্য ও রাজ্যলক্ষ্মী সূত্রপাতের উপলক্ষ্য হইয়াছিল। ইংরাজেরা কি ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করিয়া সেকালে সেই ঘোর অস্বাস্থ্যকর কলিকাতার চালাঘরে ব্যবসা আরম্ভ করে, উহা উপলব্ধি করা কল্পনার চক্ষেও অসম্ভব। হুগলীর ব্যাপারে যখন মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষেরা ইংরাজের বিরুদ্ধে কিছুই করিতে পারিল না দেখিয়া, তখন সাবর্ণ চৌধুরীরা তাহাদের আমোক্তারের অপমান গলাধঃকরণ ভিন্ন উপায়ন্তর নাই স্থির করে ও তাহাদের সহিত ভবিষ্যতে পুনরায় বিবাদ বিসম্বাদ ও অপমানের ভয়ে জমিদারীর স্বত্ব বিক্রয় করিতে প্রস্তুত হইয়াছিল। কোম্পানিকে উহা খরিদ করিবার অনুমতি লাভের জন্য মুসলমান সুবেদারাদিকে প্রায় কুড়ি হাজার টাকা ব্যয় করিতে হইয়াছিল কিন্তু দলিলে জমিদারের ভাগ্যে বিক্রয় মূল্য মোট তেরশত টাকা মাত্র উল্লেখ আছে। ৯ই নভেম্বর ১৬৯৮ খৃষ্টাব্দে ইংরাজেরা কলিকাতাদি কয়েকখানি গ্রাম যে দলিলে খরিদ করেন, এখনও উহা অতি যত্নে বিলাতে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত হইয়াছে। এখনকার কলিকাতার অত্যন্ত অলিগলির মধ্যে এক কাঠার দাম তখনকার সমস্ত কলিকাতাদির দামের চতুর্গুণ হইয়াছে।

    ১৭০০ খৃষ্টাব্দে মিঃ রালফ্ শেল্‌ডন্‌ কলিকাতার প্রথম কলেক্টর হইয়া জমিবিলি আরম্ভ করিয়াছিলেন। তখন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি মুসলমান শাসনকর্ত্তাকে তাহাদের খরিদা জমিদারীর খাজনা বারশত টাকা দিত। প্রথমে কিছুই লাভ ছিল না, কিন্তু চার বৎসরের মধ্যে ৪৮০ চারিশত টাকা লাভ হইয়াছিল ও ক্রমশ উত্তরোত্তর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি হইতে থাকে শেষে ১৭০৯ খৃঃ ১৩০০্ টাকা হয়। নয় বৎসরের দেখা যায় যে, যত টাকার খরিদ, তত টাকা বাৎসরিক লাভ। সাহাজাদা আজিমউশ্বান বঙ্গ দেশ হইতে যত অর্থাদি সংগ্রহ করিয়াছিলেন সেরূপ আর কোন মুসলমান শাসনকর্ত্তাই করিতে পারেন নাই। তিনিই কলিকাতাদি গ্রাম প্রায় ২০০০০্ টাকা নজর লইয়া ইংরাজ বণিকগণকে বিক্রয় করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর উহাতে সম্পূর্ণ অমত ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর অমতেই ইংরাজদের বিশেষ বেগ পাইতে হয় ও খরচা বাড়িয়া গিয়াছিল। বাঙ্গলায় নবাবী আমলের কর্ত্তৃত্ব মুর্শিদকুলি খাঁর আমল হইতেই সূত্রপাত হয়। ঔরঙ্গজেব ইংরাজদের উপর বিরক্ত হইয়া ১৭০৯ খৃষ্টাব্দে যে পরওনা জারি করেন উহাতে এক বৎসরে কোম্পানির বাষট্টি হাজার টাকা ক্ষতি হইয়াছিল। অতএব ইহাতেই দেখা যায় যে, কলিকাতায় জমিদারী ও ব্যবসা ইংরাজ কোম্পানির একাদশ বৃহস্পতির সময় হয় নাই।

    মল্লিকঃ— রাজারামের দৌত্যাভিযান ও চেষ্টায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষ এবং হুগলীর কুটী বন্ধ হইয়া কলিকাতায় সেই যুক্ত কোম্পানি ১৭০৪ খৃষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ হইতে এক মোহর দস্তকে কার্য্যারম্ভ করিয়াছিল। এইরূপে উভয় কোম্পানির আত্মকলহ শেষ হওয়ায় মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষগণের লাভের বিলক্ষণ হানি হয়। উহারা রাজারামের উপর খড়্গ হস্ত হয় ও অগত্যা তিনি ত্রিবেণী হইতে কলিকাতায় আসিয়া বাস করিতে বাধ্য হন। উক্ত রাজারামের দুই পুত্র, দর্পনারায়ণ ও সন্তোষ কুমার। উঁহারা কলিকাতায় মল্লিক বংশের বসবাস উপযোগী অট্টালিকা ও বাজারাদি করিয়াছিলেন। কোম্পানির সেরেস্তার কাগজে সেই সন্তোষ বাজারের উল্লেখ আছে ও সন্তোষ মল্লিক অনুরোধ করায় রামভদ্রকে নন্দরাম সেনের কার্য্য বাজারের হিসাব পরিদর্শনাদির ভার দেওয়া হয়। নন্দরামসেনের নাম কলিকাতার রাস্তা ও শিব প্রতিষ্ঠায় বর্ত্তমান উপযুক্ত বিশ্বাসী লোকের অভাবে ঐ পদ বহুদিন খালি থাকে। ১৭১১ খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বে কলিকাতার মণ্ডী বাজার ও সন্তোষ বাজারের নাম মাত্র পাওয়া যায় তৎপরে বড়বাজার ও লালবাজারের নামোল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ১৭০৯ খৃষ্টাব্দে লালদিঘির পঙ্কোদ্ধার চারিপাশে পথঘাট সবজী ও ফলের বাগান করা হয়। ইংরাজ কর্ম্মচারী সেই লালদিঘির মিঠা পানির বড়ই পক্ষপাতী হইয়া পড়েন ও ঐকথা চলিয়া আসিতেছে। সেকালে সেই জলাবাদা ভীষণ জঙ্গল ব্যাঘ্রাদি শ্বাপদকুল পরিবেষ্টিত কলিকাতায় কোম্পানির কর্ম্মচারীরা হরিণ বাঘ শীকারাদি করিত। কোম্পানির জমিদারিতে প্রথমে রাজারাম মল্লিক বিনা খাজনায় বড়বাজারের জমি জায়গায় ঘরবাড়ী ও বাজার করিতে পাইয়াছিলেন, পরে অতি অল্প খাজনায় অনযান্যকে জমিবিলি পাট্টাদির দ্বারা করিতে আরম্ভ হইয়াছিল। কলিকাতার আভ্যন্তরীণ জমিজমা বিলি জরিপাদি ও অন্যান্য যাবতীয় কার্য্য ইংরাজ কোম্পানিই করিত। তখন পুরাতন দুর্গের মধ্যে কোম্পানির প্রধান কর্ম্মচারী গবর্ণরের বাড়ী অতি সুন্দর ও প্রশস্ত ছিল ও উহার বাহিরে চতুর্দ্দিকে ইংরাজেরা ক্রমে ক্রমে বাড়ী আদি করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। ১৭০৯ খৃষ্টাব্দে লাল দিঘির উত্তরে (বর্ত্তমান সেক্রেটারিয়েট আফিসের স্থানে) কলিকাতার প্রথম গির্জ্জা সেন্ট এন্ নির্ম্মিত হইয়াছিল। লালবাজারের পার্শ্ববর্ত্তী স্থানসমূহে উমিচাঁদ প্রভৃতির বাগানাদি হয় ও সেইখানে উহারা কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের সহিত আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকিত। এইরূপে কলিকাতার উন্নতি বসবাস উহাদের দ্বারা হইয়াছিল। দলিলাদি রেজিষ্ট্রী করার ভার কলেক্টারগণের উপর ছিল ও উহা না করিলে জরিমানা আদায় করার ব্যবস্থা ছিল। ঐ জরিমানার টাকা হইতে রাস্তাদি সংস্কার করা হইত। বাড়ী ঘর জমি বিক্রিতে শতকরা ৫্ টাকার হিসাবে কর আদায় করা হইত। কোম্পানির কর্ম্মচারিরা মাসিক কুড়ি টাকা বেতন, খোরাকি ও জ্বালানি কাঠ পাইত। কলিকাতার চারিদিকে পাহারা দিবার জন্য এদেশী ৬০ ষাট জন লোক, একজন ইংরাজ করপোরাল ও ছয়জন গোরা সৈন্যের অধীনে কার্য্য করিত। থানার কোতয়াল তাহাদের সাহায্য করিত। ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় কোম্পানির বিচার পদ্ধতির প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতি শনিবার নয় ঘটিকা হইতে ১২টা পর্য্যন্ত কৌন্সিলের তিনজন সভ্য বিচার করিত ও অপরাধির জরিমানার টাকা হইতে সহরের থানা ডোবা ভরাট ও নর্দ্দামাদির সংস্কারাদি করা হইত। চোর ডাকাতকে গলায় তপ্ত লোহার ছাঁকা দিয়া গঙ্গা পার কিরয়া দেওয়া হইত। পুরাতন দুর্গের চারিধারে জঙ্গল পরিষ্কার ও দুর্গন্ধময় নালাদির যথারীতি সংস্কার করিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল। ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় প্রথম হাঁসপাতাল হয়। ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে সহরে কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের অনভিমতে বাড়ী ঘর পাঁচিল পুষ্করণাদি যথেচ্ছা করিবার ক্ষমতা কোম্পানির কৌন্সিল বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। ১৭০৪ হইতে ১৭১০ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় আটজন কালেক্টর নিযুক্ত হইয়াছিলেন। প্রতিমাসে কালেক্টার কৌন্সিলে খাজনা আদায় ও আয় ব্যয় দাখিল করিত। কলিকাতা কৌন্সিলের মেম্বরেরা প্রত্যেকে বার্ষিক সাড়ে ছয়শত টাকা ও প্রেসিডেন্ট ও পাদরী সাহেব বার্ষিক পনেরশত টাকা বেতন পাইতেন। বিবাহিত কর্ম্মচারীরা দুর্গের বাহিরে থাকিত ও বাড়ী ভাড়ার জন্য মাসিক ত্রিশ টাকা পাইত প্রেসিডেন্টের থাকিবার পৃথক বাড়ী ছিল। তখন তাহারা বায়ু পরিবর্ত্তন করিবার জন্য নদীয়ায় যাইত। তখন কলিকাতায় সবেমাত্র আটটী পাকা বাড়ী ও আট হাজার মেটে ঘর, দুইটী রাস্তা ও দুইটী গলিতে যাতায়াতের পথ ছিল। ক্রমে ক্রমে গঙ্গাতীরের ছোট ছোট ঘর গুলি ভাঙ্গিয়া গুদাম ও কর্ম্মচারীগণের থাকিবার ঘরাদি ডক ও ঘাটাদি বাঁধানদি কার্য্য আরম্ভ হয়। তখনকার কলিকাতার অধিকাংশ স্থানই বন ও জঙ্গলময় মধ্যে মধ্যে কলাবাগান, শাকশব্জীর ক্ষেত্র ও চাষ কার্য্যাদি হইত। সম্রাট আকবর হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান সকল ধর্ম্মের লোকের সহিত সাম্যাদি রাজনীতির মন্ত্রৌষধিতে মোগল সাম্রাজ্য বিস্তার ও দৃঢ় করিয়াছিলেন ও তাহার উত্তরাধিকারিগণের মধ্যে ঔরঙ্গজেবের সময় হইতেই উহার পতনের সূত্রপাত হইয়াছিল। শায়েস্তা খাঁর আমলে বাঙ্গালায় সুখ শান্তি সংস্থাপিত হইয়াছিল বটে, কিন্তু উহা চিরস্থায়ী হয় নাই। শোভাসিংহাদির বিদ্রোহানল বাঙ্গালাকে বিধ্বস্ত করিয়াছিল। বিদ্রোহি রহিম সার মস্তক ছিন্ন করিয়া হামিদ খাঁ কোরেসী বলবুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্ন মতিত্বের পরিচয় দিয়া আজিম উশ্বানের বাঙ্গালায় সুবেদারীর পথ পরিষ্কার করিয়াছিলেন। তাঁহারই কৃপায় ইংরাজদের কলিকাতাদি লাভ ও নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর বাঙ্গালায় কর্ত্তৃত্ব লাভ হইয়াছিল।

    ইংরাজের স্বদেশী বাণিজ্যঃ— বঙ্গভূমির শস্যসম্পদ প্রাকৃতিক অনুকম্পায় ভারতে শ্রেষ্ঠ বলিলেও বলা যায় ও সেই সোণার বাঙ্গলার ধনসম্পত্তি বাণিজ্য দ্বারা রক্ষিত হইত। কিরূপে উহার মূলে ইংরাজ জাতি কলিকাতাদি জমিদারী লাভ করিয়াই কুঠারাঘাত করিয়াছিল, উহা ইতিহাসের কথা। * বিলাতে ১৭০০ খৃষ্টাব্দে যে আইন পাশ হয় তাহার মর্ম্ম এই যে, পূর্ব্বদেশের (East India) ব্যবসায় স্বদেশের সর্ব্বনাশ করা যাইতে পারে না। স্বদেশের ধন মুদ্রাদি নষ্ট করিয়া বিদেশের দ্রব্যাদি ক্রয় করার স্বদেশের লোকের অভাব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি করা যুক্তিসঙ্গত নয়; সেইজন্য ১৭০১ খৃস্টাব্দে ২৯এ সেপ্টেম্বরের পর হইতে কোন ইংরাজই বাঙ্গালার সিল্ক কেলিকো আদি ও অন্যান্য যাবতীয় ভারতীয় পণ্য দ্রব্যাদি স্বদেশে আনয়ন বা ব্যবহার করিতে পারিবে না ও তাহা করিলে তাহার যথারীতি গুরুতর দণ্ড বিধান করা হইবে। আর যদি কেহ সেই সকল দ্রব্য বিলাতে আনয়ন করে, তবে উহা বাজেয়াপ্ত করিয়া সেই সকল পুনরায় সেই দেশে ফেরত পাঠান হইবে। এই গূঢ় নীতির বশবর্ত্তী হইয়া কলিকাতায় ইংরাজজাতি জমিদারী ও ব্যবসা আরম্ভ করে। তখন কলির সহিত কলিকাতার উন্নতি ও সৌভাগ্যোদয় হইয়াছিল, ইহা সিদ্ধান্ত করা একেবারে অযৌক্তিক নয়। ইহা উল্লেখ করিলেই সেকালে বাণিজ্য সম্বন্ধে অতি সংক্ষেপে সমস্ত কথাই বলা হইল মনে হয়।

    ২১এ ফেব্রুয়ারী ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে ঔরঙ্গজেব সমগ্র ভারতের সাম্রাজ্য একচ্ছত্রীকরণে মুসলমান ধর্ম্মের উন্নতি ও দাক্ষিণাত্য জয় করিতে গিয়া জীবনের শেষ দশায় রাজধানিতে প্রত্যাগমনের সময় পথিমধ্যে ৯২ বৎসরে ইহলীলা শেষ হইয়াছিল। মুসলমান গ্রন্থকারগণ ঔরঙ্গজেবকে মনস্বিতা ও ধর্ম্মোপাসনায় উচ্চস্থান দিয়া আলমগীর উপাধিতে মণ্ডিত করিয়াছিলেন। সিংহাসন লাভার্থ পিতা ও ভ্রাতার প্রতি যাবতীয় ধর্ম্ম বিগর্হিত নৃশংস ব্যবহার ও হিন্দুদিগের প্রতি অন্যায়াচরণ ও তাহাদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দান উপেক্ষা করায় ভগবান তাঁহার সেই চিরবাঞ্ছিত শুক্রবারের মৃত্যুকামনা পূর্ণ করিয়াছিলেন সেইজন্য তাঁহার ধর্ম্মজীবনের প্রশংসা অবশ্যম্ভাবী। দিল্লির সিংহাসন বিনা রক্তপাতে প্রায়ই অধিকার হয় নাই বলিলেই চলে। কিন্তু ঔরঙ্গজেব মৃত্যুকালে নিজ মুখে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য কাতরোক্তি লিখিয়া রাখিয়া স্মরণীয় হইয়াছেন উহা বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। সে সময়ে অন্য কাহারও নামে কোন জাহাজের নামকরণ বড়ই সম্মানের চিহ্ণ ছিল, তদনুসারে যুক্ত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এক খানা ৪৫০ টন জাহাজের নাম “ঔরঙ্গজেব” রাখিয়াছিলেন। সেইসময়ে পিতার ন্যায় ঔরঙ্গজেবের পুত্রেরাও বুঝিয়াছিল যে, এক কম্বলে দশ দরবেশের স্থানের অভাব হয় না, কিন্তু এক সাম্রাজ্যে দুই রাজা থাকিতে পারে না। আজিম উশ্বানের পিতারই ভাগ্যে দিল্লির সিংহাসন লাভ হইয়াছিল ও তাঁহাকে বাঙ্গলা ত্যাগ করিয়া দিল্লিতে থাকিতে হয়। তিনি মুর্শিদকুলি খাঁ হইতে সম্মানিত করিয়া তাঁহার পুত্র ফরকশেরকে নামে মাত্র সুবেদারী দিয়া রাজমহলে রাখিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর পরামর্শানুসারে ফরকশের প্রায় যাবতীয় কার্য্য করিতেন। উহাতে যুক্ত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কাশিমবাজার হইতে মাল পত্রাদি কলিকাতায় আনাইলেন। আজিম উশ্বানের পিতার সাম্রাজ্য ভোগ বেশী দিন হইল না। ১৭১২ খৃষ্টাব্দে বাদশাহ বাহাদুর শার মৃত্যু হয় ও তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ময়জুদ্দিন আজিম উশ্বানকে সম্মুখ সমরে নিহত করিয়া দিল্লির সিংহাসনে জেহেন্দার শা নাম ধারণ করিয়া প্রতিষ্ঠিত হন। সেই দিল্লির সিংহাসনারোহণের সময় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে বন্দি কর্ম্মচারীদের মুক্তিলাভ ও মাল আটকাদি ছাড়াইতে বহু অর্থব্যয় করিতে হইয়াছিল। চিরন্তন প্রথানুসারে বিপ্লবের সময় ইউরোপের বণিকগণ কুঠি আদি দৃঢ় করিত। ইংরাজেরাও কলিকাতার দুর্গাদির চতুর্দ্দিকে গড় খাত ও বুরুজের উপরে কামানাদি সুসজ্জিত করে। সেই সময়েই বাঙ্গালার প্রেসিডেন্ট মান্দ্রাজের অধীনতা পাশ ছিন্ন হইয়া স্বতন্ত্র হইয়া পড়ে। ১৭১০ খৃষ্টাব্দে কলিকাতার রোটেশন গবর্ণমেন্টের শেষ হয়।

    ফৌজদারী বালাখানাঃ— ঐ বৎসর ২০-এ জুলাই তারিখে কলিকাতার নূতন গবর্ণর আসিবার সময় তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য আট হাজার হিন্দু, দুই হাজার একশত পঞ্চাশ জন মুসলমান ও আঠারশত খৃষ্টান উপস্থিত হইয়াছিল। বিপ্লব হাঙ্গামায় অতি অল্প দিনের মধ্যেই কলিকাতার অধিবাসির সংখ্যা ঐরূপ অধিক বৃদ্ধি হইয়াছিল ও পাঁচ হাজার টাকা আয় হইয়াছিল। ঐ বৎসর সেপ্টেম্বর মাসে কলিকাতায় হুগলীর ফৌজদার অভ্যর্থনা করার জন্য এক উৎসব হইয়াছিল। কোম্পানির দালাল জনার্দ্দন শেঠের উদ্যোগে ও কৌশলে উহার আয়োজন আদি হইয়াছিল। বর্ত্তমান কলুটোলা স্ট্রীট ও চিৎপুর রোডের মোড়ের বাড়ীতে হুগলীর ফৌজদারের বালাখানা বাড়ী ছিল এখনও ঐ স্থান ঐ নামে পরিচিত। সেকালে হুগলীর ফৌজদার যখনই কলিকাতায় আসিতেন, তখনই তিনি ঐখানে থাকিতেন। উভয়পক্ষের প্রীতি প্রদর্শন ও পূজা উপহারাদিসহ শিষ্টাচারের বিনিময়, যেমন ফৌজদারের কলিকাতায় হইয়াছিল তেমনি নভেম্বর মাসে যুক্ত কোম্পানির গবর্ণরের হুগলীতে হইয়াছিল। গবর্ণরকে ফৌজদার পোষাক, ঘোড়া ও সম্রাটের সম্মানলিপি আদি পরস্পর আদান প্রদান করিয়াছিল। আজিম উশ্বানের পরাজয় ও মৃত্যুর প্রতিশোধ ও দিল্লির সিংহাসন অধিকার করা যুবরাজ ফরকশেরের লক্ষ্য হইয়াছিল। তিনি উহা অবিলম্বে কার্য্যে পরিণত করিয়াছিলেন। উহাতেই তখনকার ইংরাজ কর্ত্তৃপক্ষগণের উদ্বেগ ও অশান্তি কিয়ৎপরিমাণে তিরোহিত হইয়াছিল। তাঁহারা নূতন বাদশাকে স্বর্ণরঞ্জিত পার্শ্বি লিখিত পৃথিবীর ম্যাপ আয়নাদি উপহার পাঠাইয়া দিয়াছিলেন।

    শেঠঃ— কলিকাতায় তখন গঙ্গারজল বিক্রি করার ব্যবসা ছিল। বৈষ্ণবচরণ শেঠের পিতার শিলমোহর করা গঙ্গাজল দেশ বিদেশে যাইত ও ত্রৈলঙ্গ দেশে শ্রী শ্রী ৺রামচন্দ্রের পূজায় ঐ জল ভিন্ন অন্য কোন জল ব্যবহার হইত না। উক্ত তাঁতি শেঠেরাও কোম্পানির দালাল ছিল। কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের পরামর্শে ও কৌশলে মুর্শিদাবাদে উহাদের গুরু পত্নীর মৃত স্বামির জ্ঞাতিরা উহাদের প্রাপ্য সম্পত্তি লাভের দরখাস্ত করিলে উহারা সেই বিচার তলবের হাত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়াছিল। সেকালে অবীরা বিধবারা স্বামির সম্পত্তি পাইত না। সেকালে কোম্পানির কর্ম্মচারীরা যে কেবল ব্যবসা ও জমিদারী করিত উহা নয়; এইরূপ কার্য্যাদিতেও অনেককে মুর্শিদাবাদে বিচার বিভ্রাট ও তলবের অত্যাচারের হাত হইতে বাঁচাইয়া বিপন্ন লোকের বিশেষ সহায়তা করিয়া তাহাদিগের নিকট প্রচুর অর্থলাভ করিত। সেই জন্য তখন কলিকাতায় অন্যান্য স্থান হইতে অনেক সঙ্গতিপন্ন ও বিপন্ন লোকে বসবাস করিতে আসিত। ১৭১১ খৃষ্টাব্দে কয়েক মাস আহার্য্য বস্তু সকল দুর্মূল্য হওয়ায় কোম্পানি দরিদ্র প্রজাগণের দুঃখ দূর ও প্রজা বৃদ্ধি করিবার জন্য পাঁচশত মণ চাউল বিতরণ করিয়াছিল। উহা তাহারা তখনকার এদেশের জমিদারেরা ঐরূপ করিত দেখিয়া করিয়াছিল মাত্র, কিন্তু উহাতে তাহাদের উপর সকলের বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভক্তি হইয়াছিল। আরমানি সওদাগর খোজা সরহদ্দ প্রভৃতিকে ঋণদানে বাধ্য করিয়া তাহাদের নিকট হইতে পরামর্শ ও অনেক গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহ করা উক্ত কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণের তখন নিত্যকর্ম্ম ছিল। কলিকাতার দুর্গের পার্শ্বের সদর রাস্তা মেরামত ও পরিষ্কার রাখিবার জন্য কলিকাতার পূর্ব্বোক্ত জনার্দ্দন, গোপাল, যদু, বারাণসী ও জয়কৃষ্ণ শেঠেরা শেঠের বাগান পাইয়াছিল। তখন কোম্পানির সনন্দে প্রতি বিঘা তিন টাকার অধিক জমি বিলির হার করিবার ক্ষমতা ছিল না। কলিকাতায় তখন ধান জমির পরিমাণই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক, উহার পর তামাক ও পানের বোরজ আদি ছিল। কোম্পানির কর্ম্মচারীরা তখন রূপার বাসনে খাবার খাইত ও ডাক্তার বা উচ্চ কর্ম্মচারীরা রূপার ঝালর দেওয়া পাল্কী ও ছাতা ব্যবহার করিত। সেকালে কোম্পানির দালাল নিয়োগাদির সময় নূতন দালালকে এক বোতল গোলাপজল, পান ও শিরোপা দান করা রীতি ছিল। কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্য শুভানুধ্যায়ী লোকেরাই ঐ দালালি পদে প্রতিষ্ঠিত হইত। দালালেরা প্রতি টাকায় আধ পয়সা কমিশন ও সামান্য বেতন পাইত বটে, কিন্তু তদপেক্ষা তাহারা খরিদ বিক্রির কমিশন ও দরে বেশ পোষাইয়া লইত ও উহাতেই তাহারা ধনবান হইত। সিরাজউদ্দৌলা কর্ত্তৃক কলিকাতা জয়ের সময় সেকালের কোম্পানির সেরেস্তার কাগজপত্রাদি নষ্ট হইয়া যায়।

    দাস ব্যবসা ও জরিপঃ— কলিকাতায় কোম্পানি দাসব্যবসা করিতেন ও ক্রীতদাসেরা কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের সেবা শুশ্রূষাদি সকল কার্য্যই করিত। তখন কোম্পানির কর্ম্মচারীরা নিজ নামে কলিকাতায় জমি বিলি লইয়া জমিদার ও বাড়ী ঘরাদি করিত। অনারেবল মিঃ জন বেয়ার্ডকে বাৎসরিক ৫।৶১০ খাজনায় এক বিঘা ষোল কাঠা জমি, জেমস্ জনসনকে দুই বিঘা চার কাঠা বাৎসরিক ৭।৶ খাজনায়, ডাক্তার ওয়ারেনকে দুই বিঘা আঠার কাঠা বাৎসরিক ৮।।৶১৫ খাজনায় বিলি করা হইয়াছিল। জমিদার বৌচার সাহেব গোবিন্দপুরে বাজার বসাইবার আদেশ দিয়াছিলেন।

    ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে কোম্পানি তাহাদের জমিদারি জরিপাদি বাস্তু পতিত ও আবাদ জমির বিবরণ এইরূপ দেখা যায়ঃ— মোট জমি ৫০৭৬ বিঘা ১৯ কাঠাঃ—

    বাস্তু পতিত ও আবাদ জমির বিবরণ

    পুরাতন পাট্টা কবুলিয়ত হইতে দেখা যায় যে, কোম্পানি হিসাব পত্রাদি বাঙ্গালা সেরেস্তার মত রাখিত, পাট্টাদিও ইংরাজি ও বাঙ্গালাদি ভাষায় লিখিত হইত। রালফ্ শেলডনের অধীন সহকারী কলেক্টার নন্দরাম সেন ছিল। সে তহবিল তছরূপ করায় পদচ্যুত হইয়াছিল। উহাকে হুগলী হইতে ধৃত করিয়া কারারুদ্ধ করণ হয়। উহার পরে জগৎদাস, গোবিন্দরাম মিত্র প্রভৃতি হইয়াছিল। গোবিন্দরাম বড়ই দুর্দান্ত ছিলেন; হলওয়েল সাহেব উহারও বিরুদ্ধে তহবিল তছরূপের অভিযোগ করিয়াছিলেন। তিনি কিন্তু নন্দরাম সেনের মত পলাইয়া যান নাই। তিনি নির্ভয়ে বলিয়াছিলেন যে, পদের মর্য্যাদা ও কর্ম্ম করিবার উপযুক্ত বেতনের অভাবে বাধ্য হইয়া তিনি যথারীতি খরচা পূর্ব্বাপর সকলে যেরূপ করিয়া আসিতেছে সেইরূপ করিয়া কোন দোষই করেন নাই। উইলসন সাহেব ঐ সময়ের ইতিবৃত্তলেখক, তিনি উহার সমর্থন করিয়া যাহা লিখিয়া গিয়াছেন উহাতে তখন যে কোম্পানি তাহাদের কর্ম্মচারীগণকে যথোপযুক্ত বেতনাদি দান করিত না, একথা স্বীকার করিতে হয়। কলেক্টারকে খাজনা পত্রাদি যেমন আদায় ও তৎসংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তি করিতে হইত, তেমনি ফৌজদারী মীমাংসায়েও তাঁহার হাত ছিল। কলিকাতার জমি বিলি জব চার্ণকের আমল হইতেই আরম্ভ হয়। তখন জায়গা জমির খাজনা বিলি করিবার ক্ষমতা চার্ণকের ছিল না বটে, কিন্তু তখন তাহার উপর কথা কহিবার কি জমিদার বা কি কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের মধ্যে কাহারও সাহস না থাকায় অনায়াসে কলিকাতার অনেক স্থান আবাদ হইয়াছিল।

    আদিম বাসিন্দাঃ— তখন লোকে যে যেখানে বাস করিত তাহার চারিদিকে বাঁশ বা কাঠের বেড়া দিয়া হিংস্র জন্তুদিগের হাত হইতে রক্ষা করিবার উপায় করিতে হইত। সেই বেড়ার মধ্যে গৃহাদি নির্ম্মিত হইত ও উহার পরিচয় অমুকের বেড়া বলিয়া হইত। কোম্পানি যেখানে আসিয়া মাল পত্রাদি রাখিত ও তাহাদের জাহাজের সারেঙ আদি থাকিত, উহাকে সারেঙ বের বলিত। উহা কলিকাতার বড়বাজারে ছিল। সেইখানেই কলিকাতার রাজারাম মল্লিকেরা প্রথম বাস করেন। উঁহাদের নিকট একজন পাঞ্জাবী বাস করিত। সেকালের তিনি একজন কলিকাতার ব্যবসাদার ও পুরাতন বাসিন্দা। তাহার বংশধর কলিকাতার ইতিহাসে একজন প্রধান অভিনেতা বলিলেও বলা যায়। তিনি লাহোর নিবাসী মুলুকচাঁদ টন্ডন, ব্যবসা করিবার জন্য বাঙ্গালাদেশে বাস করেন। তাঁহার বাড়াও বড়বাজারে ছিল ও তিনি সুন্দরবনের বিনায়াসলব্ধজাত দ্রব্যাদি লইয়া ব্যবসা করিতেন। তখন সুন্দরবনের বাঁশ, গোলপাতা, উলুখড়, ঘাস, হেঁতাল, বেত, কুচিলা, গালা, হরিতকি, মধু ও মোম অতি উত্তম ব্যবসার জিনিস ছিল। মুলুক চাঁদের পুত্র দেওয়ান কাশীনাথ কলিকাতার গঙ্গার ঘাটে শিব প্রতিষ্ঠা ও জুম্মা পীরের দরগাদি করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্রের নামে ঠাকুর প্রতিষ্ঠা ও বহু মূল্যবান সম্পত্তি দেবতার সেবার জন্য উৎসর্গ করিয়া যান। সেইখানে তাঁহার নিকট আত্মীয় রাজা হুজুরীমল কলিকাতায় আর একজন নামজাদা বাসিন্দা ছিলেন। ১৫৮৩ খৃষ্টাব্দের ভয়ানক ঝড়ে সুন্দরবনের দুরবস্থা হইয়াছিল। বেলা তিনটার সময় হঠাৎ সমুদ্রের জলে দেশ ভাসিয়া গিয়া শত সহস্র লোক ও আবাদ নষ্ট হইয়া যায়, উহাতেই উহা ঘোর অরণ্যে পরিণত হইয়াছিল। কি আক্ষেপের বিষয়! লোকে বনের দ্রব্য লইয়া ব্যবসারম্ভ করিল, কিন্তু আর কেহই উহা আবাদ করিবার চেষ্টা করিল না। সেই সকল দ্রব্য লইয়া ব্যবসা করিবার জন্য সুদূর পঞ্জাবের বণিকেরা কলিকাতাদি স্থানে বাস করে এবং ইউরোপবাসিগণ এদেশে বাণিজ্যার্থে আসিয়াছিলেন।

    প্রাচীন বাণিজ্য সম্বন্ধঃ— পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের মতে পৃথিবীর মধ্যে অধিকাংশ জাতিই আর্য্য হিন্দু জাতি হইতে উৎপন্ন। প্রাচীন নরপতিগণ কর্ত্তৃক পরাজিত হইয়া অনেক স্বাধীন বৃত্তি হিন্দুরা সুদূর ইউরোপ আফ্রিকাদি স্থানে বাস করে। আচার্য্য মোক্ষমুলর প্রমুখ ভাষা তত্ত্ববিদ্‌গণ উহারই পোষকতা করেন। ১৮৬১ খৃস্টাব্দে একখণ্ড তাম্রফলকে প্রকাশ হইয়াছে যে, ভারতবাসীরা খৃষ্ট জন্মাইবার বহু পূর্ব্বে ইংলণ্ডে বাণিজ্যার্থে গমন করিত। ইংলণ্ডের মধ্য হইতে উহা সংস্কৃত ভাষায় লিখিত উত্থিত হইয়াছিল। সম্রাট হারুণ অল রসিদ গণিত চরক সুশ্রুতাদি ভারতবর্ষ হইতে ইউরোপে প্রচার করেন। রামায়ণে হুনাদি পরাক্রান্ত জাতিগণ হিমালয়ের উত্তর দেশে বাস করিত উল্লেখ আছে। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞে স্বদেশীয় ও বিদেশীয় ক্ষত্রিয় ম্লেচ্ছাদির নিমন্ত্রণাদিতে সেকালের বাণিজ্য সংঘটিত পূর্ব্ব সম্বন্ধাদি নির্দ্দেশ করে। ঐ যজ্ঞের উপহারে সেকালের ভারতের ও অন্যান্য স্থানের উৎপন্ন দ্রব্য যাহার জন্য যাহার সুখ্যাতি ছিল, উহার উল্লেখ আছে। সেকালের সংস্কৃত নাটকাদিতেও বণিকগণের সমুদ্র যাত্রার কথা উল্লিখিত আছে। কালের কুটিল গতিতে ও ভাগ্য চক্রের আবর্ত্তনে ইউরোপবাসিরা ভারতে বাণিজ্য করিতে আসে ও উহাতে এদেশের বহির্বাণিজ্য ও অন্তর্বাণিজ্য সমস্তই তাহাদের করায়ত্ত হয়। রামায়ণ মহাভারতোক্ত সেকালের আর্য্য-মহিমা সুখশান্তি ও সমৃদ্ধি এখন যেন, কবি কল্পনা ও স্বপ্ন হইয়াছে।

    মুসলমানী ব্যবসাঃ— সপ্তম শতাব্দীতেই পারস্য ও আরবদেশের বণিকগণ ভারতীয় বাণিজ্য বহুল পরিমাণে করিতে আরম্ভ করে। চাণক্যাদির অর্থ শাস্ত্রে অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যের উপর শুল্কাদির হার ও আদায়ের ব্যবস্থা নিরূপিত হইয়াছিল। শাস্ত্রকারেরা বাণিজ্যের প্রশংসা ও উন্নতির মূল কারণ নির্দ্দেশ করিয়াছেন। বাণিজ্যের মত লক্ষ্মী লাভের উপায় কৃষি, রাজসেবা বা ভিক্ষার হইতে পারে না।* হায়! কলিকাতায় ইংরাজজাতি ব্যবসা করিবার সময় লোকদিগকে জমি ও অর্থ আদি ভিক্ষাস্বরূপ দান করিয়াছিল। কলিকাতার লাভে ও বিক্রয়ে বাঙ্গালার অতীত দুরবস্থার সম্বন্ধ যে বর্ত্তমান নাই, একথা বলা যায় না। হায়! সেই আর্যবাণিজ্যপ্রধান ভারতবর্ষ আজ ইতিহাসে কৃষি প্রধান দেশ বলিয়া উল্লিখিত হয়। যে বাণিজ্যের প্রভাবে ইংরাজ রাজত্বে সূর্য্য অস্তমিত হয় না, সেই বাণিজ্যে আজ ভারতবাসি উহাতে বঞ্চিত। সূক্ষ্ম চক্ষে দেখিতে গেলে এখন সমস্তই সম্পূর্ণ দাসত্বে পরিণত হইয়াছে যে জমিদারের জমিদারী উচ্ছেদ করিতে গেলে তখন দিল্লি দরবারের পরওয়ানা ও সৈন্যসামন্ত প্রয়োজন হইত, উহা এখন সূর্য্যাস্ত নিয়মে বৎসর বৎসর বিনা বিঘ্নে হইতেছে। কোনরূপ কর্ত্তৃত্বধীকার জমিদারের প্রজার উপর করিবার ক্ষমতা নাই। এখন শিল্পি ও কৃষিকার্য্য স্বেচ্ছামত করিবার উপায় নাই। উহা রাজার অভিমতে করিতে হইবে। উহা দ্বারাই উদরান্নের সংস্থান হওয়া দুরূহ হইয়াছে। শিক্ষিত ব্যক্তিগণ রাজসেবায় সম্পূর্ণ পরাধীন হইয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করিতেছে। বিদেশী সওদাগর ও ব্যবসাদারগণের প্রতিযোগিতা করা ত’ দূরের কথা, তাহাদের অধীনে সম্পূর্ণ ব্যবসা করা ভিন্ন উপায় নাই উহাতে লাভ অপেক্ষা ক্ষতিই অধিকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে। এই দাসত্বের শৃঙ্খল যেন কলিকাতাধিকার ও বিদেশীয় বাণিজ্যের সূত্রপাতেই আরম্ভ হইয়াছিল। ইংরাজ জাতিকে বিলাত হইতে নগদ টাকা বা সৈন্য সামন্ত আনয়ন করিয়া ব্যবসা বা জমিদারী করিতে হয় নাই। এদেশের ব্যবসায়ীরাই বেনিয়ানের কার্য্য ও ঋণদান করিয়া তাহাদের ব্যবসার সম্পূর্ণ সহায়তা করিত। সেকালের কোম্পানির সেরেস্তোর কাগজে উহার উল্লেখ আছেঃ— “নগদ টাকা তহবিলে না থাকায় ও টাকার তাগাদা বন্ধ করিবার জন্য ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা তাহাদের নিকট হইতে লক্ষ টাকা ঋণ সুদ দিয়া লওয়া স্থির হইল। ইতি ১৭১৩—১৭ই জানুয়ারী।” তাঁতিরা ইংরাজ বণিকগণের সহিত সুতা কাপড়াদির ব্যবসা ও সুবর্ণবণিকেরা টাকা ধার ও বেণিয়াণি করিয়া সুদ ও কমিশন দ্বারা অর্থোপার্জন করিত। তখন কোম্পানির কর্ম্মচারীরা অল্প বেতন পাইত, উহাতে তাহাদের আহার বিহারাদির সঙ্কুলান হইত না। সেইজন্য তাহারা সকলেই ব্যবসাদি করিয়া বিলক্ষণ অর্থোপার্জ্জন করিত। সুতরাং এদেশের শিল্পি ও ব্যবসায়ীরা তাহাদের দৌরাত্ম্যে অত্যন্ত নিগৃহীত হইত। তখন উহার কোন প্রতিকারেরও উপায় ছিল না। মুসলমান উচ্চকর্ম্মচারীরাও তখন ধর্ম্ম ও নীতিতে তাহাদের অপেক্ষা উন্নত ছিল না এবং সম্রাট, নবাব, রাজা ও জমিদারেরা স্ব স্ব বিলাস বিভব ও সুখ স্বচ্ছন্দতায় অন্ধ হইয়াছিল। বাঙ্গালায় পাঠান রাজত্ব কালে জমিদারেরাই সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়াছিল। তাহাদের নিকট খাজনা আদায় করাই মোগলদরবারে রাজ প্রতিনিধিবর্গের লক্ষ্য হইয়াছিল। ইংরাজেরাও সেই খাজনা দিয়া যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতেছিল। উহার কেহই কোন প্রতিবাদ করেন নাই। কোম্পানী উহাতেই অনায়াসে কলিকাতার কলেক্টর বন্দোবস্তের সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা টোল কুতঘাটাদি আদায় আরম্ভ করিয়াছিল।

    মুসলমানদের আমল হইতেই জমিদারগণ মূর্খ ও অত্যাচারী হইয়া দেশের দুরবস্থার কারণ হইয়াছিল। শেষে তাহারাও নিগৃহীত হইয়াছিল। দেশে তখন কিসে সকলের উন্নতি ও অত্যাচারাদি দূর হইবে উহার উপায়াদি উদ্ভাবন করা যে কর্ত্তব্যকর্ম্ম, উহা কাহারও ধারণাই ছিল না। অনন্তর প্রজারা ষোল আনার ধন দশ আনায় বেচিতে বাধ্য হইত। যাহার যাহা কিছু ছিল মুসলমান ডিহিদারদের অত্যাচারে তাহা বেচিয়া খাজনা ও উপহারাদি দিয়া তাহাদিগের অত্যাচার হইতে নিষৃকতি লাভ করিত। তাহার সেই দুরবস্থার কথা কবি কঙ্কণের চণ্ডীতে ও * বৈষ্ণবগ্রন্থাদিতে সবিশেষ উল্লেখ আছে। উহা উল্লেখ না করিলে স্পষ্ট করিয়া বোঝাইবার উপায় নাই যে, কেমন করিয়া বিদেশী বণিকেরা এদেশের জমিদার, ব্যবসাদার ও সর্ব্বময় বিধাতা পুরুষ হইয়াছিল।

    ৺লক্ষ্মী পুজাঃ— ধান্যই লক্ষ্মীর আধার বলিয়া বাঙ্গালায় লক্ষ্মীর পূজা ধান্যের রেকেই স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রায় হইয়া থাকে। ভাদ্র, পৌষ ও চৈত্র মাসেই ধান্য গৃহে আনিবার সময়ই ঐ পূজা এখনও পর্য্যন্ত হয়। অতি প্রাচীনকাল হইতে ধান্যের উৎপত্তির সহিত নববর্ষ গণনা আরম্ভ হইয়াছিল। তখন চন্দ্র বা সূর্য্যের গতিদর্শন করিয়া উহা করা হয় নাই। সেইজন্যই তখন যে মাঘ হইতে বর্ষারম্ভ হইত উহাকে অগ্রহায়ণ মাস বলিত। কৃষি ও বাণিজ্যেই ভারতবর্ষের অস্থিমজ্জা ও উন্নতি। সেই কৃষি বাণিজ্যের দুর্দ্দশার কারণ দেশের মূর্খ শাসনর্ত্তারা, উঁহারা কেবল অর্থগৃধ্নু বিলাসিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা দেশের সবর্বনাশ করিয়াছিলেন। উহার জন্য বিদেশী বণিকেরা কোনরূপ দোষী বা দায়ী নহে। রাজা মানসিংহের আমল হইতেই যে সকল জমিতে চাষাদি হইত না, পতিত ছিল উহার উপর খাজনা ধরা হইয়াছিল। উহাতেই জমিদারেরা খাজনার জন্য নজরবন্দি, জেল পর্য্যন্ত খাটিত, এবং শেষে যখন মুসলমান রাজত্বের অত্যাচার ষোলকলায় পূর্ণ হয়, তখন হিন্দু জমিদারগণের জন্য অন্ধকূপ হত্যার অপেক্ষা শতগুণ ভীষণতর বৈকুণ্ঠেরও ব্যবস্থা মুর্শিদকুলি খাঁর পোষ্যপুত্র রেজা খাঁ করিয়াছিল।

    করাচির অন্তর্গত সেহওয়ান নামক পুরাতন সহরে মহাবীর (আলেকজাণ্ডার) সেকেন্দার সা নির্ম্মিত পুরাতন দুর্গ আছে। অষ্টম শতাব্দীতে আরবগণ ঐ করাচি দখল করে। ক্লাইবের ভবিষ্যৎ উন্নতির সূচনা আরকটের এক দুর্গলাভ হইতেই হয়। যদি দিনেমারেরা অম্বোয়িনার হত্যায় ইংরাজদের ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবসা বন্ধ করিয়া না দিত, ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য তখন তাহাদিগকে ব্যতিব্যস্ত হইতে না হইত তাহা হইলে ভারতের ভাগ্যলিপি অন্যরূপ হইত এইরূপই অনুমান হয়।

    বিলাতের রাজার লাভ:—ভারতে ইংরাজ জাতি বাণিজ্য করিতে আসিবে উহার সনন্দ লইবার জন্য অনুমতি দান দ্বারা তখন ইংলণ্ডের রাজার বিলক্ষণ অর্থাগম হইত। বিলাতের রাজা তৃতীয় উইলিয়ম যাঁহার নামে কলিকাতার দুর্গের নামকরণ হইয়াছিল তিনি নূতন ইংরাজী কোম্পানিকে সনন্দ দিবার সময় উভয় কোম্পানিকে সম্মিলিত হইবার জন্য বিশেষ অনুরোধ * করিয়াছিলেন। বিদেশী রাজা উভয় কোম্পানির নিকট হইতে সনন্দ দানের সময় অর্থাদি লাভ করিয়াছিল বটে, কিন্তু তিনি কর্ত্তব্য কর্ম্ম করিতে অবহেলা করেন নাই। এই সম্মিলনের জন্য যে শুধু রাজা অনুরোধ করিয়াছিলেন, উহা নয়, বিলাতের পার্লিয়ামেন্ট ঐ উদ্দেশ্যে দু একটী আইনাদি পাশ করিয়াছিল। উভয় কোম্পানির হিসাবাদির গণ্ডগোল আর্ল গডলফিনের মধ্যস্থতায় মিটিয়া যায়। ১৭০৮ খৃষ্টাব্দে ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানি নূতন কোম্পানির সহিত সম্মিলিত হইয়া “United Company of merchants trading to the East Indies” বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। ইংরাজ জাতি ও উহাদের রাজারা ভবিষ্যত উন্নতির সূত্রপাতের পথে প্রতিদ্বন্দ্বীতার কণ্টক যেমন করিয়া উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন, সেরূপ ভারতবাসী ও তাহাদের অধিপতিরা বহির্বাণিজ্য বা ভারতের অন্তর্বাণিজ্যের রক্ষার সম্বন্ধে কেহই কিছুই করে নাই, উহাতেই সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। বিলাতের রাজা ১৬৯৮ খৃষ্টাব্দে জুন মাসে জেনারেল সোসাইটীর নিকট হইতে ভারতে বাণিজ্য করিবার সনন্দ দান করিয়া কুড়ি লক্ষ পাউণ্ড আট টাকা ব্যাজে লইয়াছিল এবং ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে ঐ যুক্ত কোম্পানির নিকট বার লক্ষ পাউণ্ড বিনাসুদে লাভ করিয়াছিলেন। ভারতে বাণিজ্যারম্ভের সূত্রপাতেই বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের এইরূপ লাভ ও অর্থ সঞ্চয় আরম্ভ হয়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়। বিলাতে পার্লিয়ামেন্ট ও রাজারা ভারতবর্ষে ব্যবসা করিতে সনন্দ স্বত্বাদি ক্ষমতাদানে এইরূপ লাভ করিতে লাগিল, কিন্তু উহার তুলনায় এদেশের সম্রাট নবাবদের কিছুই লাভ হয় নয়। পুরাতন কোম্পানি ছয় লক্ষ পাউণ্ড এদেশের ব্যবসায় প্রতিবৎসর খাটাইত ও তাহাতে অনেক টাকা বাকী পড়িয়াছিল। নূতন কোম্পানির নগদ টাকা বড় বিশেষ কিছু ছিল না। বিলাতের গবর্ণমেন্টর নিকট হইতে তাহাদের ধার দেওয়া টাকার সুদের উপর নির্ভর করিয়া কার্য্য করিতে হইত। এইরূপ ঋণদান করার মূলে গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল। বিলাতের ব্যাঙ্কওয়ালারা যে টাকা গবর্ণমেন্টকে কর্জ্জ দিয়া থাকেন, সেই টাকার নোট বাহির করিতে পারেন। সেই উদ্দেশ্যেই ইংরাজ ব্যবসাদারেরা বিলাতে কর্ত্তৃপক্ষগণকে টাকা সুদে ও বিনা সুদে ধার দিয়াছিলেন ও উহা ১৭২০ খৃষ্টাব্দে কার্য্যে পরিণত করিয়াছিল, অর্থাৎ তাহারা তাহাদের নোট চালাইবার ক্ষমতা লাভ করিয়াছিল কিন্তু তাহারা উহাতেই নিরস্ত হইবার পাত্র ছিল না। ১৭২৬ খৃষ্টাব্দের ২৫ এ মার্চ্চ পর্য্যন্ত উহার ভারতবর্ষে একচেটিয়া ব্যবসা করিবার ক্ষমতা লাভ করিয়াছিল। রাজ্ঞী এলিজাবেথই ইংরাজ জাতিকে প্রথমে যৌথ ও একচেটিয়া ব্যবসা করিবার অনুমতি দান করিয়াছিলেন। কালে উহার বিষময় ফল কিরূপ হইয়াছিল উহার সংক্ষেপ বিবরণ দেওয়া উচিত। উহাতে বাণিজ্যের সঙ্গে অর্থনীতির জটিল সম্বন্ধ প্রকাশ পাইবে। সেকালে বাষ্পীয় পোতাদি দ্বারা ব্যবসা বাণিজ্য চলিত না। অনুকূল বায়ুর উপর নির্ভর করিয়া জাহাজাদি বহুদিনে ব্যবসার দ্রব্যাদি লইয়া যাতায়াত করিত। উহার জন্য অনেক অর্থ ও লোক নষ্ট হইয়াছিল। এক সময় মুসলমানেরা সুদূর ইউরোপে রাজ্যাদি অধিকার করিয়া সমগ্র ইউরোপবাসিকে বিচলিত করিয়াছিল।

    গূঢ়োদ্দেশ্যঃ— ১২৪৫ খৃঃ খৃষ্টান সম্রাজ্যের রক্ষার জন্য লায়নস নগরীতে মহাসভা হইয়াছিল উহাতে খৃষ্টান জাতিকে জাগরিত ও মুসলমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসের জন্য উৎসাহিত করে। সেই উদ্দিপনায় জন কয়েক খৃষ্টান ভারতে প্রথমে পদার্পণ ও জীবনোৎসর্গ করিয়াছিল। শেষে যেমন বক একপদ উন্নত করিয়া নদ, নদী বা জলাশয়ের তীরে আহারের অন্বেষণে নিরীহের মত বসিয়া থাকে, তেমনি ইউরোপের বণিক সম্প্রদায় ভারতবর্ষের নানা স্থানে উপস্থিত হইয়াছিল ও কুঠী করিয়া নানা বাণিজ্যাদি আরম্ভ করে। ভারতবর্ষীয় ব্যবসায়ীরা উহাদিগকে পথ দেখাইয়া এদেশে আনয়ন করে নাই। উহা নিশ্চয়ই তাহাদের গৌরবের কথা। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময় ২০শে ডিসেম্বর ১৬৮৬ যে কলিকাতায় শত বিঘ্নবিবাদ ও অস্বাস্থ্যকর হেতু সত্ত্বেও ইংরাজের কুঠি ও ব্যবসা আরম্ভ করিয়া ছিল উহাতেই শেষে মুসলমান রাজত্বের মূলোৎপাটন হইয়াছিল। সম্রাট আকবর পারস্যদেশ হইতে লোক আনাইয়া ভারতে গালিচার বয়নারম্ভ করেন, নূরজাহানাদি গোলাপ জল ও আতর সৃষ্টি ও প্রচার করেন, শাজাহান তাজমহল পৃথিবীর আশ্চর্য্য কীর্ত্তির মধ্যে পরিগণিত করিয়াছেন। তাঁহাদের জন্য বিদেশী বণিকেরা বহুমূল্য ধন রত্নাদি আহরণ করিয়া বিক্রয় করিত। পারসিক, ইহুদী ও আরমানিরা পৃথিবীর মধ্যে সুন্দরী আহরণ করিয়া তাঁহাদের ভোগবিলাসের সহায়তা করিতেন। সেই রমণী-রত্ন-লাভের জন্য কত শত দেশ ও লোক অকালে নষ্ট হইয়াছে। আলাউদ্দীন খিলজী কমলাদেবীকে লাভ করিবার জন্য গুজরাট জয় করিয়াছিলেন, কিন্তু চিতোরের পদ্মিনী চিতাভস্মে নষ্ট হইয়া উহার সে বাসনা পরিতৃপ্তি আকাশ কুসুমে পরিণত করিয়াছিলেন। বাইবেলের বিখ্যাত রাজা সুলেমানের দরবারে ভারতবর্ষীয় পণ্যদ্রব্যের উল্লেখ আছে। কচিনের ইহুদীদিগের মন্দিরের খোদিত তাম্রলিপিতে তাহারা সেখানে নেবুচাঁদ নেজারের রাজত্বের শেষভাগে আসিয়াছিল উল্লেখ আছে।

    দেশে দাসত্বের সৃষ্টিঃ— এদেশে সর্ব্বপ্রথমে সপ্তম শতাব্দীতে পারসিক ও আরবিক বণিকগণই ভারতীয় পণ্যদ্রব্য লইয়া নিবির্ব্বাদে এক প্রকার এক চেটিয়া ব্যবসা করিয়াছিল। হায়! উহাতেই বাণিজ্যপ্রধান রত্নপ্রসূ ভারতবর্ষ ক্রমে ক্রমে কৃষিপ্রধান দেশ হইয়া পড়ে। শেষে এখন ভারতে একমাত্র কৃষকই ধান্যাদি উৎপন্ন করিতে থাকে। জমিদার কর সংগ্রহাদি করিবার দায়িত্বাদি লইয়া কিঞ্চিৎ উপস্বত্ব ভোগ করিত মাত্র অন্যান্য সকলে শিক্ষা ও শিল্পাদি দ্বারা কর্ম্ম করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করিতে থাকে। উহাতেই দেশে দাসত্বের সৃষ্টি আরম্ভ হয়। বাণিজ্যে মানব হৃদয়ে দুর্দ্দমনীয় সাহস, বল, অধ্যবসায়, স্বাবলম্বনাদি বৃত্তি প্রকাশ ও স্ফূর্ত্ত করে ও উহা বিশ্বাস ও সততার বর্দ্ধিত ও প্রতিষ্ঠিত। উহা কেবল দ্রব্য বিনিময় দ্বারা হয় না। সম্রাট আকবর জিজিয়া ও তীর্থযাত্রীর করাদি প্রত্যাহার করিয়া সকলের শ্রদ্ধাকর্ষণ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু উহাতে দেশের ও দশের আভ্যন্তরীণ কোন দুঃখ দারিদ্র্য দূর হয় নাই। দেশের বাণিজ্যাদির বিস্তার হওয়া’ ত দূরের কথা, উহা তখন নষ্ট হইয়াছিল ও দেশে ধনাগমের পথ চিরকালের জন্য রুদ্ধ হইয়াছিল। কেবল বিলাসের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে রাজকোষাদি শূন্য হইয়াছিল। উত্তরোত্তর রাজস্ব বর্দ্ধিত হওয়ায় দেশের জমি পতিত হইয়াছিল ও কৃষকেরা জমিদার কর্ত্তৃক উৎপীড়িত হইয়া শাসনকর্ত্তাদিগের সুবিচার লাভ করিতে না পারায় পলাতক হইতে বাধ্য হইত। দেশের ও দশের দুঃখ দূর করিয়া উন্নতি বিধান কোন শাসনকর্ত্তারই লক্ষ্য ছিল না। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ইউরোপের বণিকগণ দেশের উৎপীড়িত লোকের বিপদের সহায় মধুসূদন হইয়াছিল। হায়! সে কার্পাস বীজ এক সময়ে অতুৎকৃষ্ট বলিয়া ভারতবর্ষ হইতে মিসরে যাইত, কালের করাল গতিকে উহাই আবার সেইখান হইতে আনীত হইতেছে। সম্রাট নবাব বা তাহাদের কোন কর্ম্মচারীরা ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি লক্ষ্য করে নাই ও বিদেশী বাণিজ্যের প্রসারের বিপক্ষে কেহই দণ্ডায়মান হয় নাই। বরং সকলে তাহাদের সহিত ব্যবসা করাই মঙ্গলের বিষয় মনে করিয়াছিল। এমন কি, উহা নবাবের কন্যাগণেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে ও তাহারা ইউরোপের ব্যবসায়ীগণের সহিত বাণিজ্যে লিপ্ত হইয়া পড়ে। ঐতিহাসিক * হিল সাহেব বলিয়াছেন যে, সেইজন্য তাহারা ইংরাজের প্রতি সহানুভূতি দেখাইয়াছিল। সেই বিদেশী বাণিজ্যের মূল সূত্রপাত মুর্শিদাবাদ ও কলিকাতায় হইয়াছিল। সেইজন্য কলিকাতার নামের সার্থকতা কলির কাতা অর্থাৎ রজ্জুর দ্বারা সকলকে বদ্ধ ও দাস করিয়াছিল ইহাই প্রশস্ত বলিয়া বোধ হয়। বিদেশী বাণিজ্যের আশ্চর্য্য মহিমায় বাঙ্গালার নবাবজাদীরাও ইংরাজের পক্ষপাতী হইয়া নিজেদের বংশধরগণের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল।

    শাসন প্রণালীঃ— ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে ১লা ফেব্রুয়ারী হইতে বাঙ্গালায় নানা আড়ম্বড়ের সহিত কোম্পানীর যে শাসন প্রণালী প্রচলিত হয়, উহাতে দুইজন সভাপতি প্রতি সপ্তাহে এক একজন সভাপতি লইয়া আটজন সভ্যের সঙ্গে বাঙ্গালার যাবতীয় কার্য্য পর্য্যালোচনা করিতেন। ১৭১০ খৃষ্টাব্দে উহার পরিবর্ত্তন হয়। গবর্ণর ওয়েলডনই কলিকাতায় পৌঁছিয়া ক্ষহা করেন। তাঁহার অভ্যর্থনার এরূপ জনতা হইয়াছিল যে, তিনি অতি কষ্টে দুর্গে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তাঁহার অভ্যর্থনায় এরূপ জনতা হইয়াছিল যে, তিনি অতি কষ্টে দুুর্গে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারই আমলে গঙ্গার ঘাট বাঁধান ও নিম্নপদস্থ কোম্পানীর কর্ম্মচারীগণের বাসগৃহের নির্ম্মাণ শেস হয়। ওয়েলডনাদির গভর্ণরাীপদ বেশী দিন স্থায়ী হয় নাই, তবে ঐ সম্বন্ধে গভর্ণর হেজেসের নাম গভর্ণরগণের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য। তাঁহারি আমলে দুর্গের আয়তন বৃদ্ধি, পেরিণের বাগানের নিকট পয়ঃপ্রণালী ও সেতু ডক ও নূতন গুদামাদি নির্ম্মিত হইয়াছিল। তাঁহারই আমলে বাদশাহি পরোয়না জন্য দিল্লিতে দৌত্য বাহিণী প্রেরণ করা হইয়াছিল ও উহাতে কৃতকার্য্য হইয়াই কলিকাতায় বাণিজ্যদির উন্নতির সুবিধা আরম্ভ হয়। মোগল সাম্রাজ্যের নিময়ানুসারে প্রত্যেক নূতন সম্রাটের সিংহাসনাদিধকার করিবার সময় নূতন সনন্দ আবশ্যক হইত। যুবরাজ ফরকসিয়ার ১৭০৯ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালার সুবেদার ছিলেন ও বর্দ্ধমানের সাহ সুফি ফকিরদের আশীর্ব্বাদ ও ভবিষ্যদ্বাণীতে সম্রাট হইয়াছিলেন। তাঁহারই প্রেরিত সম্মানসূচক পরিচ্ছদ, অশ্ব, লিপি আদি হুগলীর ফৌজদার জেয়াদ্দিন কোম্পানির গবর্ণরকে দিয়াছিলেন। ফরকশিয়ার দিল্লির সিংহাসন অধিকার করিবার পূবের্ব বাঙ্গালার রাজস্ব মুর্শিদকুলি খাঁর নিকট চাহিয়া পান নাই বলিয়া উহা ষড়যন্ত্র করিয়া কৃতকার্য্য না হইলেও মুর্শিদকুলি খাঁর বিরুদ্ধে উহার প্রতিশোধ লন নাই। তিনিই বাঙ্গালার সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়া রহিলেন। তখন দিল্লির শাসন প্রণালী এতই বিশৃঙ্খল হইয়া পড়ে। যখন ইংরাজ কোম্পানি দিল্লিতে দৌত্যাভিযান প্রেরণ করিয়াছিল তখন দিল্লির সিংহাসনাধিপতির বাঙ্গলার মুর্শিদকুলি খাঁর উপর কর্ত্তৃত্ব শেষ হইয়া যায়। সেইজন্য উপহারাদি গ্রহণ করিয়া উহাকেই বাঙ্গালার দেওয়ান পদে বাহাল রাখা হয়। সুবিচারক মুর্শিদকুলি খাঁ ইউরোপের বণিকগণের মধ্যে ইতর বিশেষ করিয়া ইংরাজগণকে যথারীতি শুল্ক দিতে বাধ্য করিতে চাওয়ায় ইংরাজেরা পূর্ব্বোক্ত দৌত্যাভিযান প্রেরণ করিয়াছিল। ডাক্তার হ্যামিলটন চিকিৎসকরূপে ও একজন আরমাণি সওদাগর খোজা সরহাদ দ্বিভাষিরূপে ঐ দৌত্যাভিযানে গমন করেন। তদ্ভিন্ন জন সর্ম্মান ও এডওয়ার্ড নিকলসন প্রধান দূত স্বরূপ গিয়াছিলেন। ১৭১৫ খৃঃ ৮ই জুলাই তারিখে দিল্লি গিয়া প্রায় সার্দ্ধ তিন লক্ষ টাকার উপহার দিয়া সর্ম্মান সাহেবের এক প্রস্থ মণি খচিত কলসী পরিচ্ছদের সহিত লাভ করা ভিন্ন আর কোন বিশেষ কিছুই করিতে পারেন নাই। খোজা সরহাদের ভাগ্যেও সেইরূপ হইয়াছিল। সেকালের নামজাদা সর্ম্মানের বাগান বর্ত্তমান খিদিরপুরের নিকট কুলীবাজারের উত্তরে এখন যেখানে সৈনিকগণের বারাকসমূহ আছে সেইখানেই ছিল।

    ডাক্তার হ্যামিল্টনঃ— ভগবান সহায় হইলে সমস্তই সুবিধা হইয়া যায়, একথা তখনকার এক ঘটনায় প্রমাণ হইয়া যায়। সেই সময়ে যোধপুরের রাজা অজিত সিংহের রূপসী কন্যার সহিত বাদসাহের পরিণয় ক্রিয়ার উৎসবে দিল্লিতে মহা আনন্দোৎসব হইতেছিল। সেইজন্য যখন পাত্রীপক্ষ উপস্থিত, এমন সময় বাদসাহ হঠাৎ পীড়িত হইয়া পড়েন, উঁহার চিকিৎসকগণ কেহই কিছুই করিতে পারিতেছিল না, তখন ইংরাজের সৌভাগ্যগুণে ডাক্তার হামিল্টন অস্ত্রের সাহায্যে সম্রাটের স্ফোটক ভেদ করিয়া শীঘ্র আরাম করাইয়া দেন। ইংরাজ ডাক্তার সেই চিকিৎসার পুরস্কার নিজের স্বার্থাপেক্ষা অন্নদাতা কোম্পানীর বা দেশের উন্নতির দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া চাহিয়াছিলেন। উহাতেই ইংরাজ কোম্পানি কলিকাতার পার্শ্ববর্ত্তী ৩৮ খানি গ্রাম খরিদ করিতে পারিয়াছিলেন ও তদ্ভিন্ন তেত্রিশটী আবশ্যকীয় স্বত্বাধিকার লাভ করেন। সকলগুলি কার্য্যে পরিণত না হইলেও উহাতে কোম্পানির বাণিজ্য ও জমিদার বিস্তারের পথ উন্মুক্ত হইয়া পড়ে। সেকালের কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের মধ্যে যদি কর্ত্তব্যবুদ্ধি ও স্বজাতি প্রীতির জন্য কাহারও নাম উল্লেখযোগ্য হয়, তবে সে সম্বন্ধে ডাক্তার হামিল্টনের নাম শ্রেষ্ঠ ও সর্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া আছে। ভগবান ধরাধামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ও বাণিজ্যের মূল দৃঢ় করিবার জন্যই যেন, ডাক্তার হামিল্টনকে দিল্লিতে পাঠাইয়াছিলেন ও যেই সেই কার্য্য শেষ হইল অমনি, তিনি ১৭১৭ খৃষ্টাব্দে ৪ঠা ডিসেম্বর কলিকাতায় সমাধিস্থ হইয়াছিলেন। ডাক্তার হামিল্টনই কলিকাতার নাম জাহির করিয়াছিলেন ও সেইজন্যই যেন কলিকাতা তাহাকে সমাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়াছিল। সেই সমাধিতেও তিনি সম্রাটের সহানুভূতি লাভ করিয়াছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর শত সহস্র বাধা ও প্রতিকূলাচারণ সত্ত্বেও কলিকাতায় ইংরাজ কোম্পানির প্রতিপত্তি ও শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল।

    হজবল হুকুমঃ— কোম্পানির যতগুলি স্বত্ত্বলাভ হইয়াছিল উহার মধ্যে এইগুলি প্রধান (১) ইউরোপীয় বা দেশীয় লোকেরা কোম্পানির টাকা ঋণ গ্রহণ করিলে স্থানীয় মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষগণকে কলিকাতা কৌন্সিলের আবেদনানুসারে মালের ছাড় ও তাহাকে কলিকাতায় প্রেরণ করিতে বাধ্য হইবেন। (২) কলিকাতার প্রেসিডেন্ট সাহেবের সহি দেখিবামাত্র উহা বিনা বাধায় ছাড়িয়া দিতে হইবে। (৩) মুর্শিদাবাদের ট্যাঁকশালে ইংরাজেরা তাহাদের প্রয়োজন মত সপ্তাহে তিন দিনের জন্য তাহাদের প্রয়োজনীয় মুদ্রাসকল প্রস্তুত করাইয়া লইতে পারিবে। উহাই ইতিহাসে “লজবুল হুকুম” বলিয়া বিখ্যাত। ইহার জন্য ১৭১৭ খৃষ্টাব্দে মে মাসে কলিকাতায় এক মহা-আনন্দোৎসব হইয়াছিল। উহাতে মুহুমুর্হু তোপধ্বনি আতস বাজী পানাহার প্রচুর পরিমাণে হইয়াছিল। ১৭০৯ খৃষ্টাব্দ হইতে কোম্পানির সম্রাটের ট্যাঁকশালের মুদ্রা পূর্ব্বমত বাদসাহী দরবারে চলা বন্ধ হইয়াছিল। উহাতে কোম্পানির বিশেষ ক্ষতি হইয়াছিল। সেইজন্যই মুর্শিদাবাদের বাদসাহী ট্যাঁকশালে বিনা মাশুলে মুদ্রা প্রস্তুত ও পূর্ব্বমত অবাধ বাণিজ্য স্বত্ব বড়ই আনন্দের বিষয় হইয়াছিল।

    দিল্লিশ্বরের প্রভুশক্তি মুর্শিদকুলি খাঁ স্বীকার করিলেও উঁহার দুর্ব্বলতার বিষয় তাঁহার অজ্ঞাত ছিল না। তন্নিমিত্ত তিনি বাদসাহি ফার্ম্মানে সমুদ্রপথে যাবতীয় মাল আমদানি ও রপ্তানি বিনা মাশুলে করিতে দিবার অনুমতি থাকিলেও, কিন্তু উহাতে এদেশের এক স্থান হইতে অন্যত্র মাল বিনামাশুলে চালাইবার ক্ষমতা দান করিলে দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হইবে বলিয়া তিনি উহা করিতে দেন নাই। ইহাতেও দশ বৎসরের মধ্যে কলিকাতা হইতে মাল বার্ষিক দশ হাজার টন রপ্তানি হইয়াছিল। কোম্পানির দিন দিন বাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতারও উন্নতি হইয়াছিল। তখন বহুদেশীয় মহাজনেরা তাহাদের সহিত ব্যবসা করিবার জন্য কলিকাতায় বাস করিতে বাধ্য হইয়াছিল। তখন কোম্পানির কর্মচারীরা সাময়িক উপহারাদি দ্বারা মুসলমান কর্ম্মচারি বা শাসনকর্ত্তাগণকে হস্তগত করিয়া আপনাদের মনোরথ পূর্ণ করিত। এদেশের ব্যবসাদারেরা ইংরাজ ব্যবসায়ীগণের সংস্রবে কার্য্যাদি করায় তখন এদেশের প্রাচীন ব্যবসা প্রণালীর বহু পরিবর্ত্তন হইয়া যায়। মুসলমান কর্ত্তৃপক্ষেরা কখনই ব্যবসা দ্বারা ধনোপার্জ্জন করে নাই ও স্বদেশী ব্যবসার উন্নতি সাধন করা রাজার ধর্ম্ম উহা তাঁহারা উপলব্ধি করিতে পারেন নাই। বাঙ্গালা দেশে অরাজকতা ও বিদ্রোহিতায় সকলেই বিব্রত হইয়াছিল। রাজনীতি ও রাজকার্য্য কাহারও শিক্ষা ও দীক্ষার বিষয় ছিল না। দেশবাসী সকলেই স্ব স্ব প্রাণ ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য বিব্রত। সুতরাং দেশের বা দশের উন্নতি বা মঙ্গলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবার লোকের অবসর বা সুবিধা ছিল না। ইহাতেই দেশ অধঃপাতে গিয়াছিল। তখন সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে সকলেই স্ব স্ব সুবিধা ও উন্নতির জন্য দেশের বা দশের দুঃখের দিকে তাকাইত না। শাসনকর্ত্তারা বিলাস ও অন্ধ গোড়ামীর বশবর্ত্তী হইয়া সাধারণ প্রজাবর্গের চক্ষুশূল হইয়াছিল। কেমন করিয়া তাহাদের অত্যাচারের হাত হইতে ধন, প্রাণ ও আত্মীয় স্বজনকে রক্ষা করিবে, এই চিন্তাই তখন সর্ব্বদাই সকলের ধ্যান ও ধারণার বিষয় হইয়াছিল। অধিকাংশ রাজপুত রাজারা মোগল সম্রাটের সহিত যৌন সম্বন্ধ স্থাপন করা শ্লাঘার বিষয় মনে করিত। মানসিংহ প্রমুখ রাজারা সম্রাটের সেনাপতির কার্য্য করিয়া প্রাণদান, বংশলোপ বা দেহদ্রোহির কার্য্য করাকে পাপ মনে করেন নাই। বাঙ্গলার সীতারাম, বেণী রায় জমিদার হইলেও মুর্শিদকুলি খাঁর মত দুর্দ্দান্ত শাসনকর্ত্তার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইতে কুণ্ঠিত হয় নাই। রেজা খাঁ প্রমুখের নারকীয় করাদি আদায়ের প্রশ্রয় দেওয়া অপেক্ষা জীবন ও জমিদারী উৎসর্গ করা শতাংশ শ্রেয় মনে করিয়াছিল। ইহাই বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীর বিশেষত্ব। বাঙ্গালীর আর্য্য মহিমা ও গুণগরীমার যদি কিছু স্বত্ব সাবস্থ্য করিবার দাবী থাকে, তবে ইহাই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। হায়! বঙ্কিমচন্দ্র পাশ্চাত্য শিক্ষার অভিসম্পাতে বাঙ্গালীকে অনার্য্য জাতি বলিয়া প্রমাণ করিতে গিয়াছিলেন। জাতির পরিচয় আকার প্রকার অপেক্ষা ব্যক্তি বিশেষের রক্তের মহিমায় উহাদের কার্য্যের দ্বারা বিচার করা যুক্তিসঙ্গত। বাঙ্গালী ও বাঙ্গালীর কলঙ্ক মোচন করা বাঙ্গালীর কর্ত্তব্যকর্ম্ম, কিন্তু উহা জ্ঞান ও শিক্ষার অভাবে কলঙ্ক দান করা যে মহাপাপ ইহা ধারণ হয় না। ইহা কি দুঃখের বিষয়। কালের কুটিল কি প্রভাব! ইংরাজ জাতির শতাধিক বৎসর রাজত্বের ফলে শিক্ষিত বাঙ্গালীর এই দুর্দ্দশা হইয়াছে হিন্দুর বেদ আর্য্য উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ইংরাজের ভাষায় ইংরাজী অধ্যাপকের মতানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতবাসী শিক্ষা ও পরীক্ষা দিতেছে। উহাতে প্রাচীন আর্য্য শিক্ষা দীক্ষার প্রতি যে কি বিষময় অযথা অশ্রদ্ধার সৃষ্টি করিতেছে, উহা উল্লেখ করা অপেক্ষা অনুভব করাই মঙ্গলের বিষয়। বাঙ্গলার বঙ্কিচন্দ্র প্রমুখের নাটক নভেল যে পরিমাণে বিক্রয় ও শ্রদ্ধার সহিত যুবক মণ্ডলী কর্ত্তৃক পঠিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার বিষয়ীকৃত হইয়া পড়িয়াছে, উহার শতাংশের একাংশও হিন্দুর আর্য্য শাস্ত্র গ্রন্থাদির ভাগ্যে ঘটে নাই। হায়! বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতবিদ্যা মহাত্মারা বাইবেল পড়িয়া পরীক্ষা না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণকে কৃতিসন্তান মধ্যে গণ্য হইতে পারে না স্থির করিয়াছেন। এই সকল দেশের দুর্ভাগ্যবশতঃ কোন স্বদেশহিতৈষী মহাত্মারা এখনও উপলব্ধি করিতে পারেন নাই। হায়! এখনও কি উহার প্রতিকার করিবার সময় হয় নাই? মুসলমান রাজত্বে আর্য্য সংসৃকত ভাষার অনাদর ছিল না। সংষ্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরাই তখন গণ্যমান্য ও বরেণ্য ছিলেন তাঁহারা বুদ্ধিমান ছিলেন ও কিন্তু তাঁহারা কেহই রাজনীতি, অর্থনীতি বা ভবিষ্যতের মঙ্গলামঙ্গলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া কার্য্য করিতেন না। কাব্য ও শাস্ত্রাদির চর্চ্চায় শিক্ষানবীশ সেবক মণ্ডলীরা উপর কর্ত্তৃত্বই তাঁহাদের লক্ষ্য ছিল। সমাজের কুসংস্কারাদির বা সঙ্কীর্ণতা দূর করা তাঁহারা কর্ত্তব্য কর্ম্ম বলিয়া মনে করেন নাই, বরং তাঁহারা উহার সর্ব্বোতোভাবে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ দায়ীও দেশেরও দশের সবর্বনাশের মূল কারণ। হায়! বাঙ্গালার রঘুনন্দনের মত স্মার্ত্তের ও অনেক দ্বিগ্বজয়ী নৈয়ায়িকের আবির্ভাব হইয়াছিল, ও চৈতন্যের মত প্রেমভক্তির অবতার হইয়াছিল কিন্তু কেহই প্রতাপাদিত্যের মত প্রতাপান্বিত স্বাধীনচেতা স্বদেশভক্ত জমিদার দিল্লির সম্রাট আকবরকে উপর্য্যুপরি পরাস্ত করিয়া বাঙ্গালা ও বাঙ্গালীকে অধীনতা পাশ হইতে মুক্ত করিতে চেষ্টা করে নাই। ইহাই বিধাতার শাপ ও বিড়ম্বনা। সেইজন্যই বাঙ্গালীরা অকস্মাৎ উত্তেজিত কর্ম্মতৎপর ও বুদ্ধিমান হইলেও পৃথিবীর অন্যান্য জাতি অপেক্ষা আপনাকে কার্য্যক্ষেত্রে উন্নত বা স্বাধীন করিতে পারে নাই। ইহা নিশ্চয়ই তাহাদের অনার্য্য বলিয়া ঘৃণিত হইবার কারণ বা নিদর্শন নহে। বাঙ্গালী আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের সম্রাট হইলেও আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক দুদ্দৈবেই উৎপীড়িত নিগৃহীত। প্রকৃতির অনুকম্পায় বঙ্গভূমি সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যমলা, স্বর্ণপ্রসু হইলেও বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি, আদির হস্ত হইতে রক্ষালাভ করে নাই ও উহাতে সর্ব্বদাই বিব্রত। প্রকৃতির ঐশ্বর্য্যই উহার দাসত্বের মূল কারণ। দেশবাসী অল্প পরিশ্রমে প্রচুর পরিমাণে শস্যাদি লাভ করিয়া বিলাসী হইয়া পড়ে। স্বাভাবিক জলবায়ুর গুণে স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য্যে হীন হইয়া পড়ে। ইহা বলিয়া যে, বাঙ্গালায় বীরের অভাব ছিল তাহা নয়। দয়ারাম রায়ই গুপ্তচর দ্বারা মেনা হাতীর প্রাণ সংহার করিয়া দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হন। হায়! সেই কুম্ভকর্ণের ছিন্ন মস্তক দেখিয়া মুর্শিদাবাদের নবাব দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন যে, এমন মহাবীরকে হত্যা করা ভাল হয় নাই। সেই মহাবীরের মৃত্যুতেই সীতারামের পতনের কারণ হইয়াছিল। নবাব দয়ারামকে সীতারামের অস্থাবর সম্পত্তির কিয়দংশ দান করিয়া পুরষ্কৃত করেন। অপরাংশ নাটোর ও নলডাঙ্গা লাভ করেন। বাঙ্গালীই বাঙ্গালার সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। বাঙ্গালার সুবেদার জমিদারগণকে বাদশাহী সনন্দ প্রচলিত প্রথানুসারে যথারীতি আনাইয়া দিতেন। সম্রাট ফরকশিয়ারই ঐ সকল সনন্দ দান করিয়াছিলেন। সেকালের জমিদারেরা নানকর বলিয়া পরিবার পোষণের জন্য নিষ্কর ভূসম্পত্তি লাভ করিত। কলিকাতায় ইংরাজেরা জমিদার হইবার সময়েই নাটোর, দিঘাপতিয়া, দিনাজপুরাদি জমিদারগণের সৃষ্টি হইয়াছিল ও তাহারা সকলেই সমসাময়িক বলিয়া উল্লেখযোগ্য। মুসলমানদিগের মধ্যেও পরাক্রান্ত মহাবীরের অভাব ছিল না * সে সম্বন্ধে মির্জা আকরাশিয়ার খাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। ফরকশিয়ার ফিরিঙ্গি গোলন্দাজদের দ্বারা নানা কৌশলে “মালেক ময়দান” নামক একটী বৃহৎ কামান শকরীসলির নিকট কর্দ্দমাক্ত নিম্ন ভূমিতে পড়িয়াছিল। উহা উত্তোলন করিতে না পারিলে, শেষে তাঁহার কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য ঐ কামানের চাকার নীচে দুই হস্ত দিয়া মির্জা আফারশিয়ার বক্ষস্থল পর্য্যন্ত তুলিয়া উচ্চ স্থানে রাখিয়া দেন। উহাতে তাঁহার চক্ষু হইতে রক্তস্রাব হইবার উপক্রম হইয়াছিল। ঐ কামান টানিতে দুইটী হাতী বা পঞ্চাশটী গরুর আবশ্যক হইত ও উহার গোলা একমণ লাগিত। ** রাঢ় নিবাসি সৈয়দ আদুল্লা খাঁ ও হোসেন আলী দুইজন রণকুশল বীরের সাহায্যে সাম্রাজ্য লাভ হইয়াছিল। মূর্খ জাহান্দার সাহ তাহাদিগকে পদচ্যুত করায় তাহারা ফরকশিয়ারের পিতার নিকট যথেষ্ট অনুগ্রহ লাভ করিয়াছিল সেই ঋণপরিশোধ করিবার উঁহার সহায়তা করিয়াছিল। ব্যক্তিগত বীরত্বে ও পরামর্শে রাজ্যলাভ বা জাতি স্বাধীন হইতে পারে না। যখন আপামর সকলেরই হৃদয়ে স্বাধীন হইবার জন্য দুর্দ্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত হয়, যখন সেইজন্য কোন কিছু উৎসর্গ করা কঠিন বলিয়া বোধ হয় না, তখনই স্বরাজ ও স্বাধীনতা লাভ হয়, পৃথিবীর ইতিহাসের ঘটনাবলি ইহার প্রমাণ। বাল্মীকি, ভূষণ, রুসো, গারিবল্ডি ইহার আচার্য্য। শ্রীরামচন্দ্র রাবণের অত্যাচার হইতে পৃথিবীকে রক্ষা করেন, শিবাজী মার্হাট্টা জাতির অভ্যুদয়ের কারণ, ফরাসি বিপ্লব, ইটালির স্বাধীনতা, উহাই অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে। কলিকাতায় ইংরাজ জাতি যে সাহস ও সহিষ্ণুতার শত শত স্বদেশভক্ত জীবকে বলিদান ও সমাধিস্থ করিয়াছিল, উহার মধ্যে ডাক্তার হ্যামিলটন, জবচার্ণক প্রভৃতির নাম চিরস্মরণীয় হইয়াছে। জবচার্ণকের নামে রাস্তা তাঁহার স্মৃতিরক্ষা করিতেছে, কিন্তু কি দুঃখের বিষয়! ডাক্তার বৌটন বা হামিলটনের সেরূপ কিছুই নাই। ইহা নিশ্চয়ই ইংরাজ জাতির কলঙ্কের কথা। অন্ধকূপহত্যার স্মৃতিরক্ষা অপেক্ষা উহাদের স্মৃতি জাগরূপ রাখা ইংরাজ জাতির প্রধান কত্তর্ব্যকর্ম্ম। মুসলমান জাতির কিরূপ অধঃপতন হইয়াছিল উহা সম্যক উপলব্ধি করিতে গেলে কেমন করিয়া তখন ফরকশিয়ার দিল্লির সিংহাসন লাভ করেন উহা উল্লেখ করিলেই চলিবে। কাজোয়ার যুদ্ধে জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠ পুত্র এয়াজউদ্দিন পরাভূত ও নিহত হইলে অপদার্থ ভীরু বাদশা জাহান্দারশা শ্মশ্রু ত্যাগ করিয়া হিন্দু সাজিয়া লালকুমারী নামক বারবণিতার সঙ্গে পলায়ন করেন। শেষে দিল্লির সহর কোতোয়াল আসাদউল্লার বাড়ীতে ধৃত ও নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়। সম্রাট ফরকশিয়ার সেই নৃশংস জাহান্দারশার অমানুষিক হত্যা করিয়া সিংহাসন দখলের প্রতিশোধ লইয়া কৃতকৃতার্থ জ্ঞান করিয়াছিল। তাঁহার মন্ত্রী জুলফিকারখাঁই জাহান্দারশার দক্ষিণ হস্ত ও পরামর্শদাতা, সেজন্য তাঁহাকে ফাঁসি দিয়া উভয়ের মৃতদেহ হস্তীতে তুলিয়া ফরকশিয়ার দিল্লিতে সদলবলে প্রবেশ করেন।

    সম্রাট ফরকশিয়ারের প্রদত্ত ফারমানে ৩৮ খানি গ্রামের তালিকা তৎকালীন রাজস্বের সহিত দেওয়া গেল।

    ৩৮ খানি গ্রামের তালিকা
    ৩৮ খানি গ্রামের তালিকা

    বঙ্গদেশে চোর ডাকাতের উৎপাত মুর্শিদকুলি খাঁর শাসন সময়ে নিবারিত হইয়াছিল। ইহা মুসলমান গ্রন্থকারগণ উল্লিখিত করিয়াছেন ও মহম্মদ জানের নাম শুনিলে চোর ডাকাতেরা ভয়ে কাঁপিত। তিনি দস্যুদিগকে ধরিয়া কুড়াল দ্বারা কাটিয়া পথের ধারের গাছে লটকাইয়া রাখিতেন। তাঁহার নাম সেইজন্য “কুড়লিয়া” বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছিল। তাহার পাল্কীরা অগ্রে ঘাতকগণ কুড়াল হস্তে গমন করিত। সেইজন্যই কলিকাতায় তাহারা বোধ হয়, আসিয়াছিল। কলিকাতার সন্নিকটবর্ত্তী স্থানে অনেক ডাকাতের কালী প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী ও বাগবাজারে সিদ্ধেশ্বরী তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    মিগাস্থিনিসের লিখিত বিবরণ হইতে যেমন চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যে সর্ব্বদা যুদ্ধার্থ সৈন্য সামন্ত প্রস্তুত থাকিত ও তাহাদের যুদ্ধ কৌশল ও বলবীর্য্য পাশ্চাত্য দূতগণ মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করিয়াছিলেন। সে সময়ের নগর রক্ষণাবেক্ষণ রাজকর্ম্মচারীরা এমন সুন্দরভাবে করিত যে, তাহারা স্বীকার করেন যে, সেরূপ সুবন্দোবস্ত ইউরোপের পুলিশেরা করিতে পারে না। মুসলমান ঐতিহাসিকগণ সেরূপ কোন কিছুই লিখিয়া যান নাই, ইহা নিশ্চয়ই দুঃখের বিষয়।

    ভারতের সহিত সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বাণিজ্য করিয়া স্পেন, পর্ত্তুগালের ঐশ্বর্য্য ও উন্নতিতে একদিন জগতকে স্তম্ভিত ও কম্পিত হইয়াছিল। তাহাদের পদানুসরণ করিয়া ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি, জার্ম্মান প্রভৃতি অনেক জাতিই ভারতবর্ষে পদার্পণ করিয়াছিল, কিন্তু একমাত্র ক্ষুদ্র ইংরাজ জাতির প্রতি সৌভাগ্য লক্ষ্মী প্রসন্না হইয়াছিলেন। এই বঙ্গদেশেই সেই সমস্ত ইউরোপের উন্নতিশীলজাতির বাণিজ্য, কুঠি ও পরস্পর স্বার্থ-ঘটিত বিবাদ বিসম্বাদও উত্থান পতনের লীলা ক্ষেত্র। সেই কর্ম্মময় জীবন্ত জাতির অতীত ইতিহাসের সহিত হুগলী, চুচুঁড়া, শ্রীরামপুর, বরানগর, ঢাকা ও কলিকাতার সম্বন্ধ বর্ত্তমান। ভারতের পশ্চিমোপকৃলের কালিকটের সহিত কলিকাতার বাণিজ্য সম্বন্ধ প্রকাশ করা হইয়াছে। কালিকটে ১৫০০ খৃষ্টাব্দের অব্যবহিত পূবের্বই যেমন জামোরিনের দরবারে পর্ত্তুগীজেরা আশ্রয় লাভ করিয়া সেই মালাবার উপকূল হইতে পারস্য উপসাগর ও বাঙ্গালার প্রধান প্রধান বন্দরে আধিপত্য স্থাপন করে, তেমনি ইংরাজ জাতি স্পেনের অজেয় রণতরীর ধ্বংস ভগবানের অনুকূলতার পরিচয় দিয়া সেই স্পেন পর্ত্তুগীজ প্রমুখ ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী বণিকগণের ক্ষমতা ও বাণিজ্যাদির হ্রাস করিয়াছিলেন। উহা কলিকাতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ হইয়া পড়িতেছে। উহাতেই ইংরাজ জাতিকে কলির অবতার বলিয়া উল্লেখ করিলে কোন দোষ হইতে পারে না। বর্ত্তমানে ফরাসীর পণ্ডীচারী চন্দননগর পর্ত্তুগীজের গোরাদি ব্যতীত ইউরোপের জাতি সমূহের অতীতের অস্তিত্বের সম্বন্ধ যেন তাহাদের সমাধি ক্ষেত্রের সহিত সমস্তই লোপ হইয়াছে। হায়! বর্ত্তমান উচ্চ শিক্ষা, বিচার ও শাসন সংসর্গে সর্বোচ্চ রাজপদ ভারতবাসীর করায়ত্ত হইয়াও কেন সেকালের সুখ, সম্পদ ও গৌরব দূরে পড়িয়াছে? বিপ্লবগ্রস্ত ভারতবাসী তখন কেন উদরান্নের এত লালায়িত ছিল না, এখন কেন দুইবেলা পেট ভরিয়া উদর পোষণ করিতে পারে না? তখন দেশের দ্রব্য দেশের লোক ভোগ করিত, এখন কেন তাহা দুর্ম্মুল্য হইয়া বিলাসের সামগ্রী ও দেশবাসির পরিশ্রমে তাহাদের উপভোগের সীমাতিক্রম করিয়াছে? এই সকল জটিল প্রশ্ন দিন দিন জটিলতর হইয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুশাসনেও অশান্তির কারণ হইয়া পড়িয়াছে। ব্যবসায়ী যুক্ত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দুর্ব্ব্যবহারে তাহাদের রাজ্যাবসন হইয়া ভারত সাম্রাজ্যের রাজধানী কলিকাতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া পড়ে।

    গ্রন্থোদ্দেশ্যঃ— যতদিন ভারতবর্ষ যুক্ত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ছিল সেই কথা কলিকাতার ইতিহাসে লিখিত হইয়াছে। ইহাতে ব্রিটিশ শাসনের কোন কথায় উল্লিখিত হয় নাই ও হইবে না। তবে কেমন করিয়া যুক্ত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ভাগ্যৈশ্বর্য্যের উদয় ও অস্ত হইয়াছিল উহাই উল্লিখিত হইবে। বর্ত্তমান শাসন বা ব্রিটিশ শাসন প্রণালী বা শাসন কর্ত্তাদের কোন কথাই নাই ও থাকিবে না। তাহাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া কোন কটাক্ষপাত কলিকাতার কথায় করা হইবে না, বর্ত্তমান অশান্তির সূত্রপাত কোথায় উহারই বিচার ঐতিহাসিকের লক্ষ্য ও কর্ত্তব্য কর্ম্ম সেই অশান্তির মূলোৎপাটন করা সকলেরই কর্ত্তব্য কর্ম্ম। সেই অশান্তির মূলোৎপাটন করা সকলেই কর্ত্তব্য কর্ম্ম। সেই সাধু উদ্দেশ্যে চেষ্টা করা স্বদেশভক্ত ও রাজভক্ত ব্যক্তি মাত্রেই অনুমোদন করিবেন, সন্দেহ নাই।

    মহাভারতাদিতে যেমন প্রথমেই গ্রন্থের উদ্দেশ্য উক্ত হইয়াছে তদনুসারে যে সময়ে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে পদার্পণ করিয়াছিল সেই সময়ের চিত্র ও ঘটনাদি অতি সংক্ষেপে প্রকাশ করিয়া গ্রন্থের উদ্দেশ্যে ব্যক্ত করা হইল। বর্ত্তমান যুগে ইহা না করা বিপদের কথা। ভারতে সর্ব্বত্রই অশান্তি তাহার প্রচার বা যাহাতে উহা বৃদ্ধি হয়, উহা এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়, অথবা ইউরোপের কোন জাতি বিশেষের প্রতি অযথা কটাক্ষপাত বা ঘৃণোদ্রেক? করা ইহার উদ্দেশ্য নয়। ব্রিটিশ শাসনের আরম্ভের পূর্ব্বে ব্যবসায়ীগণের শাসন পদ্ধতির অভিসম্পাতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব পলাশি যুদ্ধের একশত বৎসর পরে শেষ হইয়াছিল। এই গ্রন্থের উহার মূল উদ্দেশ্য। সেই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা হইতে রাজ্যাবসান পর্য্যন্তের হতিহাস ও সমালোচনা উহা সরস সুরুচি মার্জ্জিত করিবার জন্য যেখানে যেটুকু বলা বা করা আবশ্যক তাহা করা হইয়াছে।

    * 11 & 12 Will III ch. 10 (1700) An act for the more effectual employing the

    power by encouraging the manufactures of this Kingdom.

    * “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী স্তবর্দ্ধং কৃষিকর্ম্মণি তদর্দ্ধং রাজসেবায়াং ভিক্ষায়াং নৈবনৈবচ।।”

    * “মাপে কোণে দিয়ে দড়া, পোনের কাঠায় কুড়া, নাহি মানে প্রজার গোহরি।

    “সবকার হৈল কাল, খিল ভূমি লিখে মাল, বিনা উপকরে মায় খতি।”

    “পোদ্দার হইল যম, টাকা আড়াই আনা কম, পাই লভ্য লয় দিন প্রতি।

    “ডিহিদার অবোধ খোজ, টাকা দিলে নাহি রোজ ধান্য গরু কেহ নাহি কেনে।

    “প্রভু গোপীনাথ নন্দী, বিপাকে হইল বন্দী, হেতু কিছু নাহি পরিত্রাণে।

    “পেয়াদা সভায় নাছে, প্রজারা পলায় পাছে, দুয়ারে জুড়িয়া দেয় থানা।

    “প্রজারা ব্যাকুলচিত্ত, বেচে ধান্য গরু নিত্য, টাকার দ্রব্য হয় দশ আনা।

    * F. P. Robinsons’ The Trade of the East India Company. “Gentlemen, you know

    my mind already. I am for union. If world be most for the interest of the

    Indian trade.

    * Indian Record Series I (X C ii.)

    * রিয়াজ উস্ সালাতিন পৃঃ ২৫৫।

    ** সায়েরমুতাক্ষরীন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস
    Next Article সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }