Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    প্রমথনাথ মল্লিক এক পাতা গল্প533 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৭. ঘটনা বৈচিত্র্যে মার্হাটা ও শিখের অভ্যুদয়

    সপ্তম পরিচ্ছেদ – ঘটনা বৈচিত্র্যে মার্হাটা ও শিখের অভ্যুদয়

    শতবর্ষব্যাপী ঘটনা বৈচিত্র্যের সহিত ভবিষ্যতের ঘটনাবলীর ছায়াপাত স্বরূপ ঐতিহাসিক সমন্ধসূত্র পর্য্যালোচনা করা কৌতূহলপ্রদ। ১৭২৫ খৃষ্টাব্দ ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে চিরস্মরণীয় হইয়া আছে, কারণ কলিকাতার কথায় প্রধান প্রধান অভিনেতৃগণের মধ্যে লর্ড ক্লাইবের জন্ম ও বাঙ্গালার সর্ব্বময় কর্ত্তা নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও রুসিয়ার অধিপতি মহাত্মা পিটারের ইহলোক ত্যাগ ঐ বৎসরেই হইয়াছিল। উপন্যাসের অভিনয়ের মত বাঙ্গালায় সিংহাসনের জন্য পিতাপুত্রের রণ সজ্জা ও শেষে পিতাপুত্রের সম্মিলন সৌহার্দ্দ্যে পরিণত হইয়াছিল। ইহার জন্য নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর পত্নী ও কন্যার নাম ইতিহাসে স্থান পাইয়াছে। জিন্নেতূন্নেসা স্বামী সুজা খাঁর ব্যাভিচার দোষে বিরক্ত হইয়া পুত্রকে লইয়া পিতার নিকট থাকিতেন ও মুর্শিদকুলি খাঁ’ দৌহিত্রকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়া গিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার মৃত্যুর পূর্ব্বেই আলীবর্দ্দি খাঁর মন্ত্রণায় বাঙ্গালার সুবেদারীর সনন্দ সুজা খাঁর নামে দিল্লির দরবারে পেশ ও যুদ্ধ যাত্রার পথেই উহা তাঁহার হস্তগত হয়। পুত্রকে পিতার বিরুদ্ধে রাজ্যলাভ লালসায় যুদ্ধ করা যুক্তি সঙ্গত নয় ইহা পতিভক্তিপরায়ণা জিন্নেতুন্নেসা সরফরাজের মাতা বোঝাইতে তিনি পিতার রাজ্যলাভের সহায়তা ও সম্মতি দান করিয়াছিলেন। সরফরাজ খাঁর মাতৃপিতৃ ভক্তির উদাহরণ মুসলমানজাতির গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই।

    ক্লাইব জন্মাইবার একশত বৎসর পূর্ব্বে ইংরাজ বণিকগণ বর্ত্তমান মাদ্রাজের ছত্রিশ মাইল উত্তরে আরমেগন নামক স্থানে প্রথম বাণিজ্য কুঠী স্থাপন করেন। তাহার দুই বৎসর পরে ৬ই এপ্রিল ১৬২৭ খৃঃ মহারাষ্ট্র বীর শিবাজীর জন্ম হইয়াছিল। দাক্ষিণাত্যের সহিত বাঙ্গালার ও দিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীতে দৃষ্ট হয়। কলিকাতা মেয়র আদালত করিবার অনুমতি ইংল্যাণ্ডধিপতি প্রথম জেমসের নিকট গ্রহণ করা হইয়াছিল। চন্দন নগরের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাইভের প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সিস ডুঁপ্লের পদচ্যুতি ও সম্রাট সাহ আলম যিনি ক্লাইবকে দেওয়ানি দান করিয়াছিলেন প্রায় সকলেই এক সময়েই জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৩৯ খৃষ্টাব্দে মিঃ ফ্রান্সিস যে মাদ্রাজ ও কোর্ট সেন্টজর্জ প্রতিষ্ঠা করেন এবং শত বৎসর পরে নাদির শা দিল্লি দখল ও উহা ভস্ম করিয়া ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের মূলোৎপাটন করেন।

    শিবাজিঃ— ১৬৬১ খৃষ্টাব্দে শায়েস্তা খাঁ শিবাজির অনুপস্থিতিতে যে সকল দুর্গাদি জয় করিয়া মার্হাটা শক্তি খর্ব করিতে পারেন নাই। উহার প্রতিশোধ স্বরূপ শিবাজী বরযাত্রীর দলের অছিলায় শায়েস্তা খাঁর পুত্র ও রক্ষকগণকে হত্যা করিয়া সাক্ষাৎ ঔরঙ্গজেবের মাতুলের ভীরুতার চিহ্ণ স্বরূপ তাঁহার দক্ষিণ হস্তের দুইটী অঙ্গুলি গ্রহণ করেন। একশত বৎসর পরে আমেদশা ডুরাণী পাণিপথের যুদ্ধে মহারাষ্ট্রীয়-শক্তি খবর্ব করিয়া দেন। পাণিপথের যুদ্ধ বহুকাল হইতে ভারতসাম্রাজ্যের ভাগ্য পরিবর্ত্তনের স্থান বলিয়া ইতিহাসে কীর্ত্তিত হইয়া আসিতেছে, তেমনি কলিকাতা প্রতাপ ও ইংরাজগণের সৌভাগ্যোদয়ের জন্য বিখ্যাত। দাক্ষিণাত্যের মুর্শিদকুলি খাঁই বাঙ্গালার সুবেদারী করিয়া উত্তরাধিকারী সূত্রে উহা লাভ করিবার পথ পরিষ্কার করিয়া যান, তেমনি ক্লাইব আরকটে তাঁহার শৌর্য্যবীর্য্যের পরিচয় দিয়া কলিকাতার উদ্ধার ও পলাশির যুদ্ধ জয় করিয়াছিলেন। বাঙ্গালার সুখদুঃখের কাহিনীর মধ্যে বর্গীর হাঙ্গামা উপকথার মত সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। সেইজন্য উহার বিষয় সংক্ষেপে উল্লেখ করিতে গেলে দাক্ষিণাত্যে মার্হাটা জাতির অভ্যুদয়াদি কেমন করিয়া হইয়াছিল ও চৌথের সৃষ্টির কথা বলিতে হয়। ১৭২০ খৃষ্টাব্দে ক্লাইবের কত সমরু নামে আর একজন ভাগ্যান্বেষী ইউরোপবাসী জন্ম গ্রহণ করেন ও ইতিহাসে তাঁহার নাম তাঁহার বীর পত্নীর সহিত স্থান পাইয়াছে। ঐরূপ ভাগ্যান্বেষী বহু মুসলমান ক্রীতদাস ও পাঠান যুবক শৌর্য্যে ও বীর্য্যে দিল্লির সিংহাসনাধিকার করিয়াছিল। বাঙ্গালার শেরসাহ রিক্তহস্তে এক প্রকাণ্ড ব্যাঘ্রকে হত্যা করিয়া অতি অল্পদিনের মধ্যে মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করিয়া দিল্লির সিংহাসনাধিকার করিয়াছিল। বহলোললোদির ও সমসুদ্দিনের পুত্র যথাক্রমে সেকেন্দর নামে ঐ জন্য সমাদৃত হইয়াছিলেন। পাণ্ডুয়ায় গৌড় হইতে রাজধানী আনয়ন, আদিনার মসজিদ নির্ম্মাণ, হিন্দুর তীর্থ যাত্রাদি পর্য্যটন রহিত করিয়া বহু নিম্ন শ্রেণীর বলবীর্য্যশালী হিন্দুগণকে মুসলমান ধর্ম্ম প্রচারকগণ দ্বারা বা কামিনীকাঞ্চণের প্রালোভনে কালাপাহাড়ের সৃষ্টি করা বাঙ্গালার পাঠান শাসন কর্ত্তাগণের কীর্ত্তি বলিলেই চলে। হায়! আর্য্যাবর্ত্তের এমন কােন হিন্দু সন্তানের নামোল্লেখ করা যাইতে পারে না যে, যিনি জননী ও জন্মভূমিকে উদ্ধার করিবার জন্য শৌর্য্যবীর্য্য ও কীর্ত্তি কাহিনী রাখিয়া গিয়াছেন। যদি সে অধিকার কাহারও থাকে তবে সে ছত্রপতি শিবাজীর। চিতোরের মহারাণারা স্বদেশ ও স্বজাতি রক্ষার জন্য চিরস্মরণীয়। সংগ্রাম সিংহ ষোলবার মুসলমানগণকে পরাস্ত করিয়া মূর্খতাবশতঃই এক জাতীয় মুসলমানের হস্ত হইতে অপর জাতীয় মুসলমানের হস্তে রাজ্য দান করিয়াছিল। তখন হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য কেহ কোন চেষ্টাই করেন নাই। সেইজন্যই শিবাজিকে হিন্দুর অবতার বলিয়া পূজা করা হয়। তাঁহার পূর্ব্ব পুরুষ চিতোরের অধিবাসি দাক্ষিণাত্যে ভাগ্য পরীক্ষার জন্য গিয়াছিলেন ও দেবীর বরে তাঁহাদের সৌভাগ্যোদয় হইয়াছিল। কিন্তু শিবাজীর পিতা সাহজী মুসলমান পীরের অনুগ্রহে হইয়াছিলেন বলিয়া তাহার নাম সাহজী হয় বলিয়া প্রবাদ। যাহাই হউক মার্টাহার ক্ষত্রিয় জাতির চিরন্তন প্রথানুসারে অসিবিদ্যা মসিবিদ্যা অপেক্ষা অধিকতর গৌরবের বিষয় মনে করিতেন ও তাহারই সমধিক অনুশীলন ও অভ্যাস করিতেন। সেই জন্য অসি, ধনু, মল্ল ও অশ্বরোহনাদি যাবতীয় বীরোচিত কার্য্যে শিবাজীর বাল্যকালে নৈপুণ্যলাভ হইয়াছিল কিন্তু বিদ্যাশিক্ষাদি সেরূপ হয় নাই। তবে তিনি বীরব্যঞ্জক রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী শ্রবণ করিতে ভাল বাসিতেন। শক্তি সামর্থ্য আহরণ করিয়া রাজ্য স্থাপন করা তাহার জীবনের ধ্রুবতারা হইয়াছিল। সেইজন্য তিনি পার্ব্বত্য প্রদেশের অসভ্যজাতিগণকে দ্রোণাচার্য্যের ন্যায় শিক্ষাদানে বশীভূত করিয়া উহাদের অধিনায়ক স্বরূপ অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহ করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহার পিতার জায়গীর মধ্যে বিপদ আপদে রক্ষার জন্য কোন দুর্গাদি না থাকায় সেইদিকে তাঁহার দৃষ্টিপাত ও ১৬৪৬ খৃষ্টাব্দে টোর্নার দুর্গাধিকার ও কৌশলে বিজাপুরের সুলতানকে সন্তুষ্ট করিয়া অন্যান্য দুর্গাদি নির্ম্মাণ করেন। দিন দিন তাঁহার শক্তি সামর্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই ধনতৃষ্ণা ও রাজ্যাকাঙ্ক্ষা প্রবল হইয়া পড়ে। তাঁহার বিজাপুরের রাজকোষাপহরণ অপরাধে বিজাপুরে সুলতান সাহজিকে কারারুদ্ধ করেন ও ঐরূপ অন্য কোন অন্যায় কর্ম্ম করিলে তাহার প্রাণনাশ করা হইবে বলিয়া শিবাজীকে ভয় দেখান। শিবাজী পিতৃভক্ত ছিলেন ও উহাতে তিনি বিচলিত হইয়া পড়েন কিন্তু সংসারের আদ্যাশক্তি ভার্য্যা সহীবাহই তাঁহাকে উত্তেজিত করিয়া দিল্লির সম্রাট সাজাহানের সাহায্য প্রার্থনা করিতে পরামর্শ দেন। স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী কথাটি সত্য। কারণ সেই ঔষধের ফলে বিজাপুরের সুলতানের হিন্দু মন্ত্রী মুরারীপন্থের পরামর্শে শিবাজীর পিতাকে মুক্ত করিয়া দেন ও যাহাতে তাঁহার পুত্র মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন, সেই সৎ পরামর্শ দান ও প্রত্যুপকার স্বরূপ সেই অনুরোধ রক্ষা করিবার কথা বলেন। শেষে সেই অনুরোধ কার্য্যে পরিণত হয়। শিবাজী মোগল অধিকার হইতে তিন শত তিন লক্ষ টাকার ধনরত্নাপহরণ করিয়া মার্হাটা জাতিকে লুঠপাটের পক্ষপাতী করিয়া ফেলেন ও ভবিষ্যত বরগীর হাঙ্গামার ভিতপত্তন করেন। শিবাজীর অর্থে ও বলবীর্য্যে বশীভূত হইয়া মুসলমানেরাও তাঁহার দলপুষ্ট করিয়াছিল। তাহাতেই তিনি সমস্ত কঙ্কণ প্রদেশ জয় করিয়া ফেলেন। বিজাপুরের সুলতান তাহার প্রতিকার করিবার জন্য তাহার প্রধান পাঠান সেনাপতি আফজল খাঁকে পাঠান। সুচতুর শিবাজী যেন সেই ভয়ে ভীত হইয়া তাঁহার নিকট সন্ধির প্রস্তাব করিয়া শেষে যথোপচারে সেনাপতি অনুচরগণকে বশীভূত করিয়া দুইজনের গোপনে সন্ধির প্রস্তাবাদি আলোচনা স্থির হয়। সেই সময় উপযুক্ত সুযোগে শিবাজী আফজল খাঁকে বধ তাঁহার সৈন্যের উপর অকস্মাৎ আপতিত হইয়া তাহাদিগকে হত্যা ও জয়লাভ করেন। ক্লাইবের বাঙ্গালা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের একশত বর্ষ পূবের্ব ঔরঙ্গজেবের সহিত শিবাজীর পুরন্দর নগরের সন্ধি স্থাপন ও তাহাকে রাজা বলিয়া স্বীকার ও কতিপয় বাদশাহের সুবার রাজস্বের চতুর্থাংশ চৌথাদি পাইবার স্বত্বলাভ হয়। সেই সন্ধির পরই দাক্ষিণাত্যে মোগল পতাকা শিবাজীর সাহায্যে উড্ডীন হয়। শেষে শিবাজীকে আফজল খাঁর হত্যার বিশ্বাসঘাতকতা স্বরূপ মহাপাপের ফলভোগ ভোগ করিতে হইয়াছিল। রাজা জয়সিংহ দিলির খাঁ প্রমুখ সম্রাটের সেনাপতিগণ তাহার শৌর্য্যবীর্য্যের প্রশংসাসূচক সম্রাটের দিল্লির আমন্ত্রণ পত্র আনাইয়া তাঁহাকে কৌশলে বন্দি করান। ঔরঙ্গজেবের শঠতার ঔষধ প্রয়োগ করা শিবাজীর বিদ্যাবুদ্ধির অতীত বিষয় ছিল না। তিনি দ্বিসহস্র পদাতিক ও পঞ্চশত অশ্বারোহী সৈন্যের সাহায্যে তাঁহার ও পুত্রের কারামুক্তির ব্যবস্থা করেন নাই। তাহাদিগকে সম্রাটের অনুমত্যানুসারে সেইখান হইতে বিদায় করিয়া দিল। সম্রাট উহাতে নিষ্কণ্টক মনে করিলেন। শিবাজি কারাগারে রুগ্ন শয্যায় শয়ন করিয়া রোগের ঔষধের ব্যবস্থা করেন ও আরোগ্য লাভের দিন হইতে হিন্দু ও মুসলমানগণের উপাসনা স্থানে মিষ্টান্নাদি বিতরণ করিতে থাকেন। সেই মিষ্টান্নাধারের মধ্যে পিতা ও পুত্রের কারামুক্তির ব্যবস্থা হয়। সমস্ত রাত্রি অশ্বপৃষ্ঠে গমন করিয়া মথুরায় জনৈক পরিচিত ব্রাহ্মণের নিকট পুত্রকে রাখিয়া স্বয়ং মস্তক মুণ্ডন সন্ন্যাসীর বেশে পদব্রজে একবৎসর মোগল দূতানুসন্ধানকারীর লক্ষ্য অতিক্রম করিয়া রায়গড়ে উপস্থিত হন। সেই হইতেই মোগল ও রাজপুত বিশ্বাসঘাতকতায় জিঘাংসাবৃত্তি মার্হাঠা জাতির হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত হয়। ১৬৬৯ খৃষ্টাব্দে মোগলদিগের নিকট হইতে তাঁহার হৃত রাজ্য উদ্ধার ও মোগলদিগের বিরুদ্ধে গোলকুণ্ডা ও বিজাপুরের রাজাদের সহায়তা করিয়া চৌথাদি লাভের পথ পরিষ্কার করেন। সেই প্রবল প্রতাপ শিবাজীর ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু হইয়াছিল। শেষে সেই বর্গীর হাঙ্গামা প্রজাবর্গের ও সুবেদারগণের মহা অশান্তির কারণ হহয়া পড়ে। দুর্দ্ধর্ষ শিবাজী প্রতিষ্ঠিত মার্হাটা জাতি মোগল গর্ব্ব খর্ব্ব করে ও কিছুদিন ভারতবর্ষের সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়া পড়ে। দিল্লির সিংহাসন তাহাদের ক্রীড়া পুত্তলীর অবস্থান ভূমিরূপে পরিণত হইয়াছিল। যখন বাঙ্গালা, বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি ক্লাইব লাভ করেন তখন আজমীর মহারাষ্ট্রীয়গণ অধিকার করেন। ইউরোপে যেমন নেপোলিয়নের নামের সঙ্গে ছেলেদের ভয় দেখাইয়া ঘুম পাড়াইবার গান আছে, তেমনি বাঙ্গালায় হাঙ্গামার বর্গীর গানঃ—

    “ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে।

    বুল্‌বুলীতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিব কিসে।”

    আজও সেই গানে ছেলেদের ঘুম পাড়ানোর সময় গীত হয়। ইংরাজেরাই তাহাদের হাত হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য কলিকাতার চতুর্দ্দিকে খাত খনন করিয়াছিল। কলিকাতাদি খরিদর সময় ক্লাইবের সমকক্ষ ফরাসি বীর ডুপ্লের জন্ম হয়। ব্যক্তি বিশেষের বলবীর্য্যে বা বিশ্বাসঘাতকতায় রক্ষণশীল জাতির বা দেশের কেহই কিছু করিতে পারে না। সকল দেশে সকলকালে বিভীষণেরা সোণার লঙ্কা ছারখার করিয়া দেশকে ও দেশবাসিকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে বা অত্যাচারীর হাত হইতে মুক্ত করিতে পারে নাই। ইংরাজ জাতির রাজ্যলাভ যে কেবল কতকগুলি অর্থলোলুপ রাজ্যালোভী মীরজাফর প্রমুখের ষড়যন্ত্রে বা পলাশীর যুদ্ধের জয়লাভে হয় নাই। উহা শতবর্ষব্যাপী ঘটনা বৈচিত্র্যেই হইয়াছিল। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা বাবরের ন্যায় কবি ও ভক্তের দ্বারাই হইয়াছিল। মহাবীর আলেকজাণ্ডারের যেমন হোমারের ইলিয়ড ও অডিসির ভক্ত ছিলেন, বাবরও তেমনি সর্ব্বদাই সাহনামা পড়িতেন। ফরদৌসীর লিখিত সাহনামার সম্বন্ধে গজনীর মহম্মদের আজ্ঞাতেই হইয়াছিল। প্রতি শ্লোকে এক স্বর্ণ ডরহাম দিবার কথা ছিল কিন্তু ষাট হাজার শ্লোক পরিপূর্ণ হওয়ায় মহম্মদ স্বর্ণস্থলে রৌপ্য মুদ্রা দান করিতে গেলে কবি তাহা গ্রহণ করেন নাই। তিনি মহম্মদকে ব্যঙ্গ করিয়া এক তীব্র কাব্য লিখিয়া উঁহার বিবেক বুদ্ধির উদ্রিক্ত করেন। সেইজন্যই মহম্মদ ফরদৌসীকে ষাট হাজার স্থলে এক লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রা পাঠাইয়া দেন কিন্তু যখন উহা ফরদৌসির দেশে পৌঁছ তখন তাঁহার শবদেহ নগরের বাহিরে সমাহিত হইতে যাইতেছিল। সেই অর্থ তাহার একমাত্র কন্যা প্রথমে লইতে অস্বীকার করেন, শেষে নিবর্বন্ধতাশিয় প্রযুক্ত উহা গ্রহণ ও দানধ্যানাদি সৎকার্য্যে ব্যয় করেন। মুসলমান জাতির উন্নতির মধ্যে বিদ্যানুশীল ও স্বধর্ম্ম ভক্তির উদাহরণ যে ছিল না, একথা বলা যায় না। শিবাজীর গুরু ও উপদেষ্টা সাধক তুকারাম ও রামদাসের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য ও ভূষণের কবিত্ব মার্হাটা জাতিকে সজীব করিয়া তুলিয়াছিল। সেকালে বাঙ্গালায় বাঙ্গালীর সেরূপ কোন কিছুই ছিল না যে, যাহাতে বাঙ্গালীজাতি উহার লুপ্তগৌরব উদ্ধার করিবার যোগ্যতা লাভ করিতে পারিয়াছিল। সেই মহাপাপে বাঙ্গালার পরাধীনতা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হইয়াছে। হিন্দু জাতির শাস্ত্র দর্শনকাব্য ইতিহাস গণিত আকবরের সময় পারস্য ভাষায় তাঁহার দরবারের প্রধান কবি আবুল ফজল অনুবাদ করিয়াছিলেন। দিল্লির আমীর খসরুর পর তাঁহার ন্যায় উচ্চশ্রেণীর পারসিক কবি আর কেহই ছিল না। অতীতের সহিত বর্ত্তমানের ও ভবিষ্যতের যে সম্বন্ধ উহার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিলে ইউরোপের বণিকগণের অভ্যুদয় ও রাজ্যলাভ কলিকাতায় কেমন করিয়া হইয়াছিল তাহা সম্যক্ উপলব্ধি করিতে পারা যায় না সেইজন্যই অতীতের সমুদ্র মন্থন করা আবশ্যক হইয়া পড়ে। রত্ন বা বিষ লাভ দেবতা ও অসুরের পরস্পর ভাগ্যের উপর নির্ভর করে।

    ভারতবর্ষের মুসলমান রাজত্বের সময় লাহোর দিল্লি লক্ষনৌ আগ্রা প্রভৃতির যেরূপ উন্নতি হইয়াছিল, তেমনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূত্রপাত কলিকাতার ব্যবসায় ও জমিদারীতে হইয়াছিল ও মুসলমান রাজত্বের কলা কৌশল, স্থাপত্য বিদ্যার গৌরব তাজমহল যেমন পৃথিবীর নয়টি অত্যাশ্চর্য কীর্ত্তির মধ্যে স্থান পাইয়াছে, তেমনি অধুনা কলিকাতায় ভারতেশ্বরীর শ্বেত মর্ম্মর সমাধি মন্দির প্রজা ও রাজন্যবর্গের অর্থে নির্ম্মিত হইয়া ব্রিটিশ জাতীর গৌরব কীর্ত্তন করিতেছে। সেকালে ভারতে ব্রিটিশ জাতীয় সৌভাগ্যোদয়ের পরশ-মণি কলিকাতাকে বলা যায়। পর্ত্তুগীজ বণিকেরা আমেরিকা হইতে তামাকের আমদানি করিয়া দিল্লির সম্রাটের নিবারণ সত্ত্বেও অতি অল্পদিনের মধেয ভারতবসিকে তামাকের ভক্ত করিয়া ফেলে, তেমনি ইংরাজ জাতির বণিকগণের অপূর্ব্ব ব্যবসা ও জমিদারীতে তাহাদের বিশেষত্ব কলিকাতার নামের সহিত বিজড়িত করিয়া এখনও প্রবাদ বাক্যে বিদ্যামান রহিয়াছেঃ—

    “জাল, জুয়াচুরি, মিথ্যা কথা, এই তিন নিয়ে কলিকাতা।”

    সেইজন্য কলিকাতার নামের সহিত কলির অবতারগণের পরস্পর সম্বন্ধ ও পরিচয় দিয়া কলির দ্বিতীয় মহাভারতের অবতারণা করা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। বর্ত্তমানকালে ঘটনার অব্যবহিত পরেই একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন সংবাদপত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয় তখন অতীতের কথা মুসলমান ও ইউরোপের ঐতিহাসিকগণের দ্বারা সত্যাসত্যের অলৌকিকতা সম্পাদন করিবে ইহাতে আর আশ্চর্য্য কি? সেই পাশ্চাত্যনবীশ শিক্ষিত ব্যক্তিগণ উহাতে প্রতারিত হইয়া যে কেবল গত ঘটনার দোষাদি কীর্ত্তন করিয়া যশোপার্জ্জন করিবেন উহাও বিচিত্র নয়। তবে কোম্পানির ধর্ম্মাবতারগণ কলিকাতাদি স্থানে সমাধি মন্দির, গির্জ্জা হাঁসপাতালাদি নির্ম্মাণ করিয়া তৎকৃত মহাপাপের প্রায়শ্চিত্তের পথ পরিষ্কার করিয়া চির-স্মরণীয় হইয়া আছেন।

    রাজসেবাঃ— মুসলমান ও অন্যান্য সম্রাটেরা ঘোর অত্যাচারী ও বিলাসী হইলেও ইসলাম ধর্ম্মের উন্নতির জন্য দান ধ্যান নগর পত্তন ও নাম পরিবর্ত্তন করিতেন। রিয়াজ উস্ সালাতিনে তায়ুল, আয়মা ও আলতমগা নামক গ্রন্থে তিন প্রকার জমিদানের ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। আলতমগা দানেই উত্তরাধীকারীর দান বিক্রয়ের স্বত্ত্ব থাকিত। কার্য্যদক্ষতার জন্য “তায়ুল” ও আয়মা আলাতমগার বিদ্বান্, ধার্ম্মিক ও দীন-দুঃখীগণের উদরান্নের জন্য ঐরূপ দানের ব্যবস্থা ছিল। বহুকাল হইতে বাঙ্গালীরা মুসলমান শাসন কর্ত্তাদের অধীনে কার্য্য করিয়া দেশের জমিদার ও সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়াছিল। ব্রাহ্মণেরাও যুগমুখী সুতরাং তাহাদের কলঙ্ককে কোথায়? সেকালে কায়স্থগণের নাম ও প্রতিপত্তি সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ছিল। বিহারের কায়স্থেরা মুসলমানী আচার ব্যবহার উপাসনা আদি বহুকাল ধরিয়া করায় উহা ত্যাগ করে নাই। প্রতাপাদিত্য বিহীন কায়স্থ জাতি অসি ত্যাগ করিয়া মসির সেবায় মত্ত হইয়াছিল। হায়! আর্য্য হিন্দুধর্ম্মের সারমর্ম্ম উপলব্ধি করিবার শিক্ষা ও অবসরাভাবে সেকালের কায়স্থ জাতিকে রাজসেবারই পক্ষপাতী করিয়াছিল। শরীরের সুখে জলাঞ্জলি দিয়া লোক সেবা করা যে হিন্দুর ধর্ম্ম, উহা সেকালে তাহাদের লক্ষ্যের বহির্ভূত হইয়া পড়ে। জমিদারেরা অভিমান ও অহঙ্কারবশতঃ কাহাকেও মনুষ্যের মধ্যে গণ্য করিত না। লোকের প্রতি সহানুভূতি, পরোপকার, প্রিয় সম্ভাষণ ও বিপদ আপদে দেশবাসিকে রক্ষা করা, কি জমিদার, কি রাজকর্ম্মচারীগণ, কেহই উহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিত না। ঈর্ষা, দ্বেষ তখন যেন সকলের অঙ্গের ভূষণ স্বরূপ হইয়াছিল। কর্ত্তব্য প্রতিপালন করা যে ধর্ম্ম, রাজার যুদ্ধাদি দ্বারা দেশোদ্ধার, মূর্খকে শিল্প দ্বারা উন্নত করা, অলসকে কর্ম্ম দ্বারা উপার্জ্জনক্ষম ও দেশের বাণিজ্যাদি সংরক্ষণ দ্বারা উহার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করা, তখন যেন রাজা প্রজা বা শাসনকর্ত্তাদি কাহারও ধ্যান ধারণার বিষয় ছিল না। পান ভোজন গীতবাদ্য, সাজসজ্জা, উদ্যান সমারোহ আদিতে ও বিহার বিলাসে ভারতের রাজন্যবৃন্দের ও সম্রাটের সংগৃহীত অর্থ ব্যয়িত হইত। সুজা খাঁর রাজত্বকালে উহা চরম সীমায় গিয়াছিল। ক্লাইব জন্মাইবার পূর্ব্বেই ১৭২৩ খৃষ্টাব্দে জার্ম্মাণ সম্রাটের সনন্দ বলে হুগলীর অপরপারে বাঁকি বাজারে অষ্টেণ্ড কোম্পানি নামক দ্রব্যাদি অল্প মূল্যে বিক্রয় করিয়া ইউরোপের বণিকগণের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরম্ভ করে। উহার মূল কারণ যে মুর্শিদকুলি খাঁর রাজত্বে তাহারা যাহাতে বাণিজ্য করিবার অনুমতি লাভ না করে সে বিষয়ে অন্যান্য ইউরোপের বণিকদের চেষ্টা করিয়াছিল তাহাদের উপর আক্রোশ করিয়া অষ্টেণ্ড কোম্পানি ঐরূপ করে। জার্ম্মাণাদি জাতির বাণিজ্য ব্যাপারে প্রতিযোগিতার সূত্রপাত সেই সময় হইতেই হয়।

    ভাষাঃ— শাসনকর্ত্তাদের অনেক কথারই বাঙ্গালাভাষায় অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে তন্মধ্যে পর্ত্তুগীজভাষার গির্জ্জা, পাদরী, চাবি, ফিতা, নিলাম, কপি আদি অনেক কথা আছে ও ফিরিঙ্গি জাতির উৎপত্তি সঙ্গে সন্নিবিষ্ট। বোধ হয়, কলিকাতার সেকালের ফিরিঙ্গি পাড়া বহুবাজারের নামের ও স্বার্থকতা সেই জন্য হইয়া থাকিবে। কলিকাতার সকল রাস্তাপেক্ষা বহুবাজারের রাস্তায় যত অধিক গির্জ্জা এমন আর কোথাও নাই। সেকালের ফৌজদারগণের শোভাযাত্রা বড় আড়ম্বরের সহিত হইত। ছত্র, আঢ়ানী বাদ্যযন্ত্রাদির তূর্য্যনিনাদে তাহাদের গৌরব নিনাদিত করিত। হিন্দুস্থানীরা বাঙ্গালাদেশের ঐসব দেখিয়া বলিত যে “সাজাবাজা কেশ তিম্মে বাংলাদেশ।”

    বর্দ্ধমানঃ— পলাশির যুদ্ধের একশত বৎসর পূর্ব্বে বর্ত্তমান বর্দ্ধমান বংশের প্রতিষ্ঠাতা কোতায়াল ও চৌধুরীর কার্য্য করিয়া এরূপ উন্নতিলাভ করে যে, তাহার পুত্র বাবুয়ায় জমিদারী খরিদ করিয়াছিলেন। বর্দ্ধমান শের আফগানের হত্যা ও তাঁহার পত্নী মেহেরুন্নিসার জাহাঙ্গীরের অঙ্কশায়িনী হইয়া জগজ্যোতি নামে পরিচিত হন। পুণ্যাশ্লোকা কৃষ্ণকুমারী হন্তে পিতৃহন্তার বিনাশ জন্য সেই বর্দ্ধমান রাজবংশ বাঙ্গালায় সমাদৃত হইয়া থাকেন। অপদার্থ কবি ভারতচন্দ্র বিদাসুন্দরের উপাখ্যান বর্দ্ধমানের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া আজও লোকের চিত্তবিনোদন করিয়া থাকে। সাহাজাদা আজিমওয়ান জুম্মা মসজিদ বাসাট্টলিকা বর্দ্ধমানে করেন। তাঁহার পুত্রগণের মধ্যে ফরকশিয়ার বায়োজিদ নামক জনৈক বিখ্যাত সুফী সাধু ফকিরের আশীর্ব্বাদে দিল্লির সম্রাট হইয়াছিল। ইহার বিবরণ রিয়াজ উস সালাতিনে ও ষ্টুয়ার্ট সাহেবের বাঙ্গলার ইতিহাসে বিবৃত আছে। এই বর্দ্ধমানেই ১৬৯৮ খৃস্টাব্দে ওয়ালেস সাহেব ষোল হাজার মুদ্রার বিনিমায় সাত মাসকাল তোষামোদ করিয়া সাহাজাদা আজিম ওশ্বানের নিকট কলিকাতাদি গ্রামত্রয় খরিদ করিবার অনুমতি লাভ করেন। বর্দ্ধমানের সহিত কলিকাতার খরিদ বিক্রির যে কেবল সম্বন্ধ ছিল উহা নয়, দিল্লির সিংহাসন লাভের বিষয়ও সংশ্লিষ্ট। সাহাজাদা আজিম উশ্বান যথোপচারে পূজা বিনয়াদিতে সন্তুষ্ট ফকিরের বাক্যাশীর্ব্বাদ প্রত্যাহার করিতে পারেন নাই। ভবিষ্যতে ফকিরের কথা সত্য হইয়াছিল। শতবর্ষব্যাপী ঘটনাই সৌভাগ্যলক্ষ্মী লাভের মূল কারণ। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যে কেহ অধ্যবসার সহিত কার্য্য করিত, সেই কৃতকার্য্য হইত। বিধাতার ভবিতব্যতা কে উল্লঙ্ঘন করিতে পারে? বণিকের এই সৌভাগ্যোদয় জন কয়েক ভাগ্যান্বেষী ইংরাজ কর্ম্মচারীর দ্বারা মান্দ্রাজে ও কলিকাতায় হইয়াছিল। তাহাদের সেই কার্য্যের সহায়তার জন্য কালনেমির লঙ্কাভাগের মত মীরজাফর বা মীরকাসেম কাহারও ভাগ্য প্রসন্ন হয় নাই।

    এইরূপে দেখা যায় যে, ইউরোপের বণিকবৃন্দ মাহেন্দ্রক্ষণে ভারতে বাণিজ্য করিতে আসিয়াছিল। ভগবানের কৃপায় সমস্তই যেন তাহাদের অভ্যুদয়ের কারণ স্বরূপ হইয়াছিল। মুসলমান সাম্রাজ্য মার্হাট্টা ও শিখ শক্তির অভ্যুদয়ে ম্রিয়মান ও দীপ নিবাবার পূর্ব্বে যেমন প্রজ্বলিত হইয়া উঠে সেইরূপ মার্হাট্টা শক্তিরও অন্তর্ধান হয়। সেই সুযোগে উদ্দেশ্য সিদ্ধির নানা সুযোগে উপস্থিত হইয়া ইউরোপীয় জাতিগণের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ইংরাজ জাতির সৌভাগ্যোদয় হইয়াছিল। ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে রঙ্গপুরের ভবচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীর নির্ব্বুদ্ধিতায় যেমন ঔরঙ্গজেব সেই স্থান অধিকার করিয়া লয় ও তাহা প্রবাদবাক্যে পরিণত হইয়াছে, তেমনি ইংরাজ জাতি ভারতবাসির মূর্খতা ও অনভিজ্ঞতা বশতঃ “তোর কড়ি মোর বুদ্ধি ফলার করি আয়” এই নীতির বশবর্ত্তী হইয়া বিশাল ভারত সাম্রাজ্যাধিকার জন্য যে বীজ বপন করিয়াছিল উহা ফলোন্মুখী হইয়াছিল। ভারতবর্ষ অধিকার করিতে স্বদেশ হইতে অর্থ বা সৈন্য সমাগম যাহা হইয়াছিল, উহা ভারতের অধিবাসিগণের সংখ্যাহিসাবে গণনা বা উল্লেখ যোগ্য নহে। ইহাই বোরকলির অভিনয় যে, দেশের লোক পরস্পর বিবাদ করিয়া ঈর্ষাদেষাদিতে জর্জ্জরিত অস্থিপুঞ্জের জ্বালায় দেশের সর্বস্ব বিদেশীর হাতে তুলিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়াছিল। মূর্খ শাসনকর্ত্তারা বা দেশবাসিরা ইউরোপের বণিকবৃন্দের ধূর্ত্ততায় তাহাদের পরস্পর সহায়তা করিয়া নিজের সর্বস্ব, এমন কি প্রাণ পর্য্যন্ত পণ করিয়া শেষে পথের ভিখারী হইয়াছিল। সেই দুরপনেয় কলঙ্কের কথা শুধু বাঙ্গালীর দুঃখ দারিদ্র্যের কারণ নয়, উহা সমগ্র ভারতবাসিকে দুঃখ সাগরে নিমগ্ন করিয়াছিল। হায়! বীরভোগ্যা বসুন্ধরা, কলির প্রভাবে ভারত সাম্রাজ্য সেরূপ কোনকিছু বীরত্ব দ্বারা ইংরাজ বণিকগণের লাভ হয় নাই। ইতিহাস কি ইহা প্রমাণ করে না যে, রাজার যুদ্ধাদি জয় ও পরাজয়ের সহিত দেশেণ ও জাতির সুখ-ও দুঃখের সম্বন্ধ। উহা যে দেশবাসীর শিক্ষা দীক্ষা ও অধিনায়কত্বের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে।

    রণজিৎ সিংহঃ— পাঞ্জাবে শিখজাতির অভ্যুদয় উহার সমুজ্বল উদাহরণ। মহারাজ রণজিৎ সিংহ সবর্বপ্রথমে ডেরাগজি, পেশওয়ার, কাশ্মীর মূলতান পর্য্যন্ত বিস্তৃত করিয়াছিলেন। ইউরোপবাসির আগমন ও তাহাদের সহিত পাঞ্জাব শিখকেশরী কিরূপ সদ্ব্যবহার করিয়াছিল ও মুসলমান শক্ত নষ্ট করিয়া রাজচক্রবর্ত্তী হইয়াছিলেন উহা ইতিহাস কীর্ত্তন করিয়াছে। উন্নতিশীল জাতি বা পুরুষের জন্য ভগবান যেন সমস্তই প্রস্তুত করিয়া রাখেন ও ঘটনা সমূহও যেন তাহাদিগকে পরীক্ষা করিবার জন্য শত সহস্র প্রতিবন্ধকদান করিয়া, শেষে ইষ্টসিদ্ধি দান করে। পাশ্চাত্যজাতির মধ্যে আলফ্রেডের নাম সেইজন্যই চিরস্বরণীয় আছে। তাহার কথা আজও বালকগণের শিক্ষাস্বরূপ উপদেশ দান করা হয়। হিন্দুশাস্ত্রকারগণ সেই জন্যই পুরুষকারের প্রশংসা করিয়া থাকেন। ভাগ্যের উপর নির্ভর করিয়া শুভাশুভ ফলের দিকে লক্ষ্য করিতে উপদেশ দেন নাই। বিপ্লবগ্রস্থ দেশ অশিক্ষিতাবস্থায় প্রতিকারের কোন উপায় নির্দ্ধারণ না করিতে পারিয়া কেবল ভাগ্যের দিকে তাকাইয়া নানা দুর্ব্বিসহ যাতনা সহ্য করিয়া দেশ ও দশের সর্ব্বনাশ করিয়াছিল। দেশের নবাব বা রাজারা বিদেশী ভাগ্যোন্বেষী পুরুষ বিশেষের পদানত হইয়া একমাত্র ভট্টধনাপহরণ ও শক্তি বিস্তার করা লক্ষ্য হইয়ছিল সুতরাং তাহারা এখনে কোন কিছুই করিতেন না যে, যাহাতে দেশের ও দশের মঙ্গল হয়। মুসলমান ও মার্হাট্টাজাতির অভ্যুদয়ে ভারতবাসির প্রকৃতপক্ষে মঙ্গলাপেক্ষা অমঙ্গলই অধিক হইয়াছিল। সেদিকে দৃষ্টিপাত করিলে ইউরোপবাসির শুভাগমনকে ভগবানের অভিশাপ বলিয়া বলা যায় না। সংসারে সর্ম্মার্জ্জনীয় যেরূপ প্রয়োজনীয়তা হোমাপক্ষীর পর সম্মান চিহ্ণও সেইরূপ আবশ্যকীয়।

    মুসলমানী স্মৃতিচিহ্ণঃ— সম্রাট হুমায়ুনের একনিষ্ঠা ও অধ্যবসাতেই তাঁহার সিংহাসন লাভ করিয়াছিল। সম্রাট আকবর প্রিয়তম পুত্রের সহিত মেহেরুন্নিসার অনুরাগ বৃত্তান্ত অবগত হইয়া সেই রূপসীর সহিত শের আফগানের পরিণয় ক্রীয়া সম্পাদন ও বর্দ্ধমানের শাসনকর্ত্তা করিয়া পাঠাইয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার সেই পূর্ব্বানুরাগের বশবর্ত্তী হইয়া জাহাঙ্গীর কুতবদ্দিনকে শেষ আফগানের নিকট সসৈন্য প্রেরণ করিয়া পত্নী পরিত্যাগের ঘৃণীত প্রস্তাব করান। উহাতেই শের আফগান কুতবুদ্দিনের শিরশ্চেদন ও নিজের প্রাণ বীরের ন্যায় ত্যাগ করেন। সেই মেহেরুন্নিসাই জগজ্যোতি নূরজাঁহা নামে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়া মোগল সাম্রাজ্যের অধীর্শ্বরী ও সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া পড়েন। ১৬২৬ খৃষ্টাব্দে জাহাঙ্গীর ও নূরজাঁহা তাঁহাদের সেনাপতি মহাবত খাঁ কর্ত্তৃক বন্দি হন ও নূরজাঁহার অসাধারণ বুদ্ধিতে ও কৌশলে আপনাদের মুক্তিলাভ করেন। ১৬২৭ খৃষ্টাব্দে জাহাঙ্গীর লাহোরে সমাহিত হন ও স্বামীর পার্শ্বে নূরজাঁহা ব্রহ্মচর্ষ্যবলম্বন্ কুড়িবৎসর যাপন করিয়া সমাহিত হইয়াছিলেন। শের আফগানের ঔরসজাত কন্যার সহিত সম্রাট জাহাঙ্গীরের চতুর্থ পুত্র শেহরিয়ারের বিবাহ ও ভগ্নি মমতাজমহলের সহিত খুরম অর্থাৎ সম্রাট শাহজাঁহার বিবাহ দিয়াছিলেন। সেই মমতাজমহালের স্মৃতি মন্দিরই জগদ্বিখ্যাত তাজমহল। নূরজাহান্ বিলাসের সামগ্রীর মধ্যে গোলাপী আতর ও জলের সৃষ্টি করিয়াছিলেন ও স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁহার ভরণ পোষণের জন্য বার্ষিক পঁচিশ লক্ষ টাকা বৃত্তির পরিমাণে সেকালের ভোগ বিলাসের অনুমান করা অসম্ভব নয়। মহম্মদঘোরীই ১১৯৩ খৃষ্টাব্দে দিল্লিকে রাজধানী করেন। মোগল সম্রাটের মধ্যে লাহোরের দুর্গ প্রাচীর হর্ম্ম্যদি আকবরের নামে, খোয়াবাগ, সাহাদারা মতিমসজিদ ও সমাধির জন্য জাহাঙ্গীরের নাম ও সলিমার উদ্যান সাহজাঁহার নামে অলঙ্কৃত। মোগলের বাঙ্গালার সহিত স্থাপত্যাদি দ্বারা কোন স্মৃতিই রক্ষা করেন নাই কেবল তাঁহাদের প্রতিষ্ঠিত রাজধানীর নামে তাঁহাদের সম্বন্ধ ও থোৎবায় নামেল্লেখেই ব্যবস্থা দেখা যায়। পর্ত্তুগীজদের নিকট হইতে চট্টগ্রাম দখল করিয়া ইসলামাবাদ নাম রাখিয়াছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতার নাম আলিনগর করেন কিন্তু শেষে উহা পরিবর্ত্তিত হয়। সেই স্মৃতি এখন আলিপুর কেবল রক্ষা করিতেছে।

    মুসলমান বিচার পদ্ধতিঃ— মোগল সম্রাটেরা নিজে অসংযমী হইলেও রাজত্বে সুরাপানাদি নিষেধ করিতেন ও সুবিচারাদির পক্ষপাতী ছিলেন। জাহাঙ্গীর নিজের শয়নকক্ষে এক স্বর্ণ ঘণ্টার সহিত নগরের দুর্গ দ্বারে উহার শৃঙ্খল আবদ্ধ কদ্দিরয়া রাখিতেন উহা আকর্ষণ করিলেই বিচারপ্রার্থী প্রজারা বিনা অর্থ ব্যয়েই বিচার লাভ করিত। সম্রাট বাঙ্গালার শাসনকার্য নির্ব্বাহের জন্য সুবেদারের অধীন দশজন ফৌজদার স্বয়ং নিযুক্ত করিতেন। তাহাদের পদমর্য্যাদানুসারে তাহাদের অধীন কর্ম্মচারী ও সৈন্যাদি থাকিত, উহারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করিত। কিন্তু মোগল সম্রাটগণের অবনতির সঙ্গে সঙ্গেই সেই সব সুবেদারেরা নিজে ফৌজদার নিযুক্ত করিত ও তাহারা দেশের সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়াছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর আমল হইতেই উহার সূত্রপাত হয়। মুর্শিদকুলি খাঁই প্রাচীন বিচার প্রণালীর পরিবর্ত্তন করেন। তিনি নিজামত, দেওয়ানি, ফৌজদারী ও কাজির আদালত পরস্পর বিভক্ত করিয়া ছিলেন এবং একজন অতিরিক্ত ফৌজদার মুর্শিদাবাদে রাখিতেন। সেইরূপ রীতিনীতির বশবর্ত্তী হইয়া কলিকাতায় ইংরাজ বণিকেরা জমিদারী বন্দোবস্ত বা আদালতাদি করেন নাই, ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে। সেকালের ইংরাজ কর্ম্মচারী যিনি কলিকাতায় জমিদারী করিতেন, তাঁহার মাসিক বেতন দুই শত টাকা ছিল ও তাঁহার অধীনে একজন বাঙ্গালী মাসিক ত্রিশ টাকা বেতন কার্য্য করিত। উহাতেই তখন হইতে ইংরাজ কোম্পানির রাজস্ব ও জমিদারী ধলা ও কালার সম্মিলিত শক্তিতে পরিচালিত হইতে আরম্ভ হয়। সেইরূপ জমি বিলির লাভ লোকসান তখন মাপ কাঠির কৌশলে দাতা গৃহীতার সঙ্গে বিলক্ষণ সম্বন্ধ ছিল।

    মিত্রঃ— গোবিন্দরাম জবচার্ণকের সময়ের লোক ও তিনি পূর্ব্বে বারাকপুরে থাকিতেন। সেকালের কোম্পানির কর্ম্মচারীরা অল্প বেতন পাইতেন, কিন্তু তাহারা কলিকাতার জমি বিলি অল্প হারে ও মাপে কমি এবং গুপ্ত ব্যবসাদি দ্বারা অতি অল্প দিনের মধ্যেই বড়মানুষ হইতেন। উহাতেই “গোবিন্দরামের ছড়ী” প্রবাদবাক্য স্বরূপ চলিয়া আসিতেছে ও তিনিই কুমারটুলির মিত্রবংশের আদিপুরুষ। তাঁহার নবরত্নের মন্দির ও নন্দরামসেনের শিবালয় চিৎপুর রাস্তায় সেকালের অর্থোপায়ের নিদর্শন স্বরূপ বা প্রায়শ্চিত্তের দণ্ড বলিয়া এখন গৃহীত হইতে পারে। তখন লোকে অর্থের সদ্ব্যবহার দেবতার মন্দির বা দুর্গোৎসবাদি করিয়া আহার বিহার কীর্ত্তনাদির আড়ম্বরে হিন্দুধর্ম্ম প্রচারের জন্য করিত। সেকালের ও একালের মধ্যে এই তারতম্যের জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষা, সভ্যতা ও বিচার প্রণালী সম্পূর্ণ দায়ী। বিদেশী বিজাতীয় মুসলমান ও খৃষ্টান জাতীর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য বর্ত্তমান, উহার সূচনা কলিকাতার জমিদারী ও বিচার পদ্ধতিতে আরম্ভ হইয়াছিল। সেইজন্যই ইউরোপীয় বণিকগণ প্রথমে কলিকাতায় পাশ্চাত্যমতে মেয়র আদালতাদির স্থাপন করেন ও উহার উপর মুসলমানগণের বিচার পদ্ধতির কোনরূপ হস্ত না থাকে, তন্নিমিত্ত বিলাতের রাজা প্রথম জেমসের অনুমতি লইয়াছিলেন। আরও তাহা না হইলে, পাছে সেদেশের লোকেরা এখানকার আইন যদি অমান্য করে, সেই ভয়ে উহা করিতে হইয়াছিল। তখন কোম্পানির অধঃস্তন কর্ম্মচারীরা উচ্চ কর্ম্মচারীগণের অবাধ্য ছিল। ব্যবসাদারেরাও স্বদেশবাসির কর্ত্তৃত্ব মানিয়া চলা কর্ত্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিত না। সেকালের সমস্তই তখন বিশৃঙ্খলাময়। দেশের মধ্যে প্রকৃত প্রস্তাবে কাহারও কর্ত্তৃত্ব চলিত না। উহাতেই “কার শ্রাদ্ধ কেবা করে, খোলাকেটে বামুন মরে” এই প্রবাদেই সেকালের ফিরিঙ্গি ও ইংরাজ বণিকগণের বিশৃঙ্খলার চিত্র অঙ্কিত করে।

    ঘটনা বৈচিত্র্যে মার্হাটা ও শিখজাতির অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ইংরাজ জাতির ভারতবর্ষে প্রভুত্বের সম্বন্ধ বিলক্ষণ আছে। আমেরিকা স্বাধীন হইলে ইংরাজ জাতির যে ক্ষতি হইয়াছিল উহার পূরণ ভারতে প্রভুত্ব লাভ করিয়া হইয়াছিল। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর হইতে ১৭৫৯ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত দিল্লীর সিংহাসনে পাঁচজন নাম মাত্র সম্রাট ছিল, কিন্তু তখন মার্হাটারাই সর্ব্বেসর্ব্বা ছিল। সেইজন্য ভারতের চতুর্দ্দিকে বিশৃঙ্খলাময়। ইংরাজ জাতির প্রভুত্বের ও অভ্যুদয়ের পথ পরিষ্কার জন্যই যেন মার্হাটা ও শিখ জাতির অভ্যুদয় হহয়াছিল। উহার সম্বন্ধে অনারেবেল জন্ ফরটেসকিউ তাঁহার কৃত বর্ত্তমান রাজার ভারতশাসনের পুস্তকে যাহা লিখিয়াছেন উহা উদ্ধৃত করিলাম (পৃষ্ঠা ৪১)—

    “It may be gathered that the position of the British in India at the close of the war of American independence was of the strongest; but fortunetly a new power had arisen in the north one to deliver them from their most pressing dangers—This was the Sikhs whose organisation and enthusiasm had been so far quickened by presecution that they had by 1785 mastered the whole of the Punjab between the Jhelum-and the Sutlej; where they formed at once a barrier against any new invasion from Northwestern passes and a dam against the flood which was once again rising of the Marathas. It was pretty certain that before long there must be a struggle between British and Marathas for the final mastery of India for Sindia had not only reoccupied Delhi and Agra, but had actually called upon the East India Company to pay tribute for the tenure of Bengal.”

    এখন কেমন করিয়া মুর্শিদকুলি খাঁর পর বাঙ্গালার নবাবী কে কাহার পর লাভ করিল ও তাহার সহিত ইংরাজ কোম্পানির সৌভাগ্য বা লাভালাভ কি হইয়াছিল উহাই সংক্ষেপে উল্লেখ করা আবশ্যক।

    সুজাউদ্দিনঃ— তিনি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন, যে রাজ্য লোভে উড়িষ্যা হইতে আসেন নাই, তবে উহার সুবন্দোবস্ত করাই তাঁহার মূল উদ্দেশ্য। তিনি উহা কার্য্যে পরিণত করিয়াছিলেন। তিনি দাতা ও সুবিচারক ছিলেন। তাঁহার আমলে মুর্শিদকুলি খাঁর জমিদারী বন্দোবস্ত পাকা হয় ও বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যা প্রকৃত প্রস্তাবে একজনের অধীনে শাসিত হইয়াছিল। তিনি খাজনা আদায়ের জন্য কোন জমিদারকে কারারুদ্ধ করিতেন না, বরং যাহারা তজ্জন্য কারারুদ্ধ ছিল তাহাদিগকে মুক্ত করিয়া দিয়া যাহাতে নিয়মিত খাজনা দিতে পারে উহার সৎপরামর্শ দিয়াছিলেন। উহাতে জমিদারেরা প্রাণপণে জমি আবাদ করিয়া নির্দ্ধারিত খাজনাদি সরবরাহ করিত, অধিকন্তু উনিশ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত আবওয়াব বাবদও দিত। তাঁহারই আমলে আবওয়াবের সৃষ্টি হয়। সেজন্য দেওয়ান আলম চাঁদ ও রাজা রাজবল্লভ দায়ী। ইহারা মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের দেওয়ান ও মোহরার ছিল। সুজাউদ্দিনের সময় উঁহারা সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া পড়েন। সুজাউদ্দিনের সময় ঢাকার বিস্তীর্ণ জনপদ সম্পূর্ণ আবাদ ও সায়াস্তা খাঁর আমলে যেমন টাকায় আট মন চাউল বিক্রি হইত সেইরূপ সস্তা হয়। উহাতেই তিনি সায়েস্তা খাঁর স্পর্দ্ধা খর্ব্ব করেন অর্থাৎ তিনি যে ঢাকার পশ্চিম পার্শ্বে তোরণ নির্ম্মাণ করাইয়া উপরে লিখিয়াছিলেন যে উহার দ্বার, যখন চাউল তাঁহার সময়ের মত সস্তা হইবে, তখনই উন্মুক্ত হইবে, সে গর্ব্ব চূর্ণ হইয়াছিল। তবে কিন্তু তিনি সেকালের পশ্চিমি, পাঞ্জাবী কতকগুলি বাস্তুঘুঘু ও আত্মীয়ের ষড়যন্ত্রের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারেন নাই। দেওয়ান আলমচাঁদ আবওয়াবের টাকায় নবাবের বিলাস ফরক্কাবাগে দোলের মজলিসে আবির ও কুমকুমের সহিত নাচ ও গানের উৎসবে ও প্রতি বৎসর তাঁহার জন্ম দিনে তুলটদানে কর্ম্মচারী, অনুচর, কবি ও দরিদ্রগণকে স্বর্ণ রৌপ্য অর্থ বিতরণ করিতেন। উহাতে তাঁহার সুখ্যাতি সর্ব্বত্রই হইত। সেই সময়েই দিল্লীর রাজকর ফতে চাঁদ তাহার হস্তীর দ্বারা সরবরাহ করিয়া সম্রাট কর্ত্তৃক “জগৎশেঠ” উপাধিতে সম্মানিত হন। শেষে ইাঁহারাই ভবিষ্যতে বাঙ্গালার বিধাতা পুরুষ হইয়াছিলেন। সুজাউদ্দিনের একপুত্র তকি খাঁ উড়িষ্যায় ও সরফরাজ বেহারের শাসন কর্ত্তা মনোনীত হন। আলিবর্দ্দির মাতার সহিত সুজাউদ্দিনের সম্পর্ক ছিল সেইজন্য তিনি তাঁহার ভ্রাতা হাজির সহিত সুজাউদ্দিনের অধীনে উড়িষ্যায় কার্য্য করিতেন। শেষে সরফরাজের অধীনে বিহারের শাসন কর্ত্তা হইয়া যান। সরফরাজের মাতা ও মাতামহী তাঁহাকে নিকটে রাখিতেন, বিহারে বড় যাইতে দিতেন না। উহাতে আলিবর্দ্দিই বিহারে সবর্বময় কর্ত্তা হইয়া পড়েন ও অর্থ দ্বারা দিল্লির দরবার হইতে আপনার নামে বিহারের শাসন কর্ত্তা হইবার সনন্দ সংগ্রহ করেন। উহা অবগত হইয়া সুজাউদ্দিন যেমন সেই কৃতঘ্নের শাস্তি বিধান করিবার উদ্যোগ করিতে ছিলেন, অমনি তাঁহার হঠাৎ মৃত্যু হইয়াছিল। ঐতিহাসিক হলওয়েল সাহেব, হাজির ষড়যন্ত্রে বিষ প্রয়োগে সুজাউদ্দিনের মৃত্যু ও অভিচার ক্রিয়া দ্বারা তাঁহার পুত্র তকি খাঁর শেষ হইয়াছিল বলেন। তকি খাঁ বড় অত্যাচারী ছিলেন। সেইজন্য পুরীর জগন্নাথকে চিল্কাহ্রদের নিকট পাহাড়ের উপর স্থানান্তরিত করিতে হইয়াছিল। পৃথিবীতে দুর্ব্বলচেতা মানবগণ নিজের স্বার্থসিদ্ধি চক্রান্ত দ্বারাই করিয়া থাকে।

    সরফরাজঃ— সরফরাজ পিতার মৃত্যুর পর ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালার নবাব হইলেন, কিন্তু তিনি আলিবর্দ্দি, হাজি, আলম চাঁদ প্রমুখের বিশ্বাসঘাতকতায় উহা অধিক দিন ভোগ করিতে পারেন নাই। যে উপায়ে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ হয়, সেইরূপে গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দ্দি সরফরাজকে পরাজিত করিয়া ১৭৪১ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালার মসনদে উপবেশন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সরফরাজ জীবনোৎসর্গ করেন ও জালিম সিং ও যৌস খাঁর বিরত্বকাহিনী আজও সেইখানে রাখাল বালকগণ প্রাণের উল্লাসে উহাদের গুণ গান করিয়া থাকে। হতভাগ্য অলমচাঁদ তাহার পত্নীর গঞ্জনায় আহত অবস্থায় প্রত্যাগত হইয়া পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ বিষপান করিয়া প্রাণত্যাগ করে। বাঙ্গালায় তখনও স্বাধীনতার গৌরব সাধারণে বুঝিত।

    বর্গীর হাঙ্গামা ও চৌথঃ— আলিবর্দ্দি নবাব হইয়া সুস্থির হইতে পারেন নাই, এগার বৎসরকাল মার্হাটাগণের উৎপীড়নে ব্যতিব্যস্ত হইয়া, শেষে বার্ষিক বার লক্ষ টাকা কর ‘চৌথ’ দিবার অঙ্গিকার করিয়া সন্ধি করিয়াছিলেন। মার্হাটারা কলিকাতা আক্রমণ করে নাই ও তাহারা উহা কেন যে করে নাই, সে সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত। লঙ্ সাহেবের পুস্তকে কোম্পানির মন্তব্যে ২৫ শে এপ্রিল ১৭৪৮ খৃঃ দেখা যায় যে, বর্গীরা ইংরাজদের বলবীর্য্যের কথা অবগত ছিল, সেইজন্য উহাদের বিরুদ্ধে কিছুই করে নাই। ইতিহাস প্রসিদ্ধ উমি চাঁদের পত্রের প্রত্যুত্তরে বর্গির সেনাপতি লিখিয়াছিলেন যে, তিনি যদি ঐ সকল দ্রব্য ইংরাজদের জানিতেন, তাহা হইলে তিনি উহা কখনই গ্রহণ করিতেন না। কিন্তু অনারেবেল জন করটেস্ কিউ উহার প্রতিবাদ করিয়া লিখিয়াছেন এবং ঐতিহাসিক অরম্ উমিচাঁদকে বর্গীর হাঙ্গামার মূল কারণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইংরাজ কোম্পানিকে মার্হাটাগণকে চৌথ দিতে হইয়াছিল কিনা, উহা সবিশেষ জানিবার উপায় নাই, তবে উমিচাঁদ যে কোম্পানির নিকট হইতে এক লক্ষ টাকা আদায় ভয় দেখাইয়া করিয়াছিল ইহার উল্লেখ আছে। এতদ্ভিন্ন তিনি যে ব্যবসাদারদের পাওনা টাকার উপর শতকরা পনর টাকা কমিশন আদায় ও অগ্রিম টাকা না দিলে তাহারা কোম্পানির ব্যবসা করিবে না বলিয়াছিল, ইহা কোম্পানির কাগজে উল্লেখ আছে। তিনি ফরাসিরা উক্ত লক্ষ টাকা দাদন বিলি করিতেছে বলিয়া আদায় করে। ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দে আগস্ট মাসেWalpole জাহাজে কোম্পানির যে টাকা আসে উহা হইতেই সেই টাকা দেওয়া হয়। এতদ্ভিন্ন নবাবের কর্ম্মচারীগণেণ উদর পূরণের জন্য ত্রিশ হাজার দিতে হইয়াছিল, কারণ তাহারা কোম্পানির মাল ও তাহাদের রসদ বন্ধ করিয়াছিল। ইহাতেই তখন ইংরাজ কোম্পানির শক্তি সামর্থ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। কলিকাতার পুরাতন দুর্গের সংস্কার ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে আরম্ভ হইয়া ১৭৩৫ খৃষ্টাব্দে শেষ হয়। লালবাজারে তখন যে জেলখানা ছিল, উহার সম্মুখে ১৭৩৩ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় কোম্পানির প্রথম কালেকটারী গৃহ তৈয়ারী হয়। তখন কলিকাতা হইতে এক কোটি টাকার মাল আমদানী ও রপ্তানি হইত। ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দের বিলাতের কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণ তাহাদের কর্ম্মচারিগণকে এদেশের লোকের সহিত টাকার লেনদেন করা বন্ধ করিবার হুকুম জারি করেন কিন্তু উহা কতদূর কার্য্যে পরিণত হইয়াছিল উহা জানিবার উপায় নাই।

    ঝড়ঃ— ঐ বৎসর ঝড়ে ও ভূমিকম্পে কলিকাতার বিলক্ষণ ক্ষতি হয়। ১৭৩৭ খৃঃ ১১ই অক্টোবর রাত্রে ঐ ঝড় ও ভূমিকম্পে নদীর জল চল্লিশ ফিট উচ্চ ও নৌকা জাহাজ লোকজনাদি নষ্ট হয়, স্থলে গির্জ্জা ঘর বাড়ী গাছপালা জীবজন্তুরও মৃত্যু হয়। উহাতে পর বৎসর দুর্ভিক্ষ হইয়াছিল। চতুর ইংরাজ কোম্পানি সেই সময়ে সকলের দুঃখ দূর করিবার বিধিমত চেষ্টা করিয়া সকলকে বাধ্য করিয়াছিল।

    ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মন্ত্রণা সভার সভ্য সার ফ্রান্সিস রসেলের বর্ণিত ঝড়ের বিবরণ সংক্ষেপে দেওয়া গেলঃ— “আমি কখন সেই ঝড়ের বিষম সন্ সন্ শব্দের সহিত মুষলধারে বৃষ্টি ও বজ্রাঘাত আদি ভুলিতে পারিব না। প্রতি মুহূর্ত্তেই বোধ হইতে লাগিল যে, যেন সকলে বাড়ী চাপা পড়িয়া সমাধিস্থ হইবে। সকলে সেই ভয়, উদ্বেগ ও মৃত্যুর আশঙ্কায় সমস্ত রাত্রি বসিয়া কাটাইলাম। প্রভাতের দৃশ্য অতীব ভয়ঙ্কর, পূর্ব্ব দিনের রাত্রের ঝড়ে ডিউক অফ ডর্সেট নামক জাহাজ ভিন্ন সমস্ত ছোট বড় ঊনত্রিশ জাহাজাদি, কতকগুলি নদীতে ডুবিয়াছে, তীরে ভাঙ্গিয়া আড় হইয়া পড়িয়াছে ও কতকগুলি খণ্ড বিখণ্ড হইয়া চূর্ণ হইয়া পড়িয়া আছে। বৃক্ষ সমুদায় রাস্তার দুই ধার জুড়িয়া পড়িয়া আছে। সেন্টএন্ গির্জ্জার চূড়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়া আছে। আর সমস্ত মাটিতে সমভূমি, ইংরাজ ও বাঙ্গালীর বাড়ীর মধ্যে দশ বার খানি একেবারে ধুলাশায়ী হইয়াছে। নদীস্রোতে বাঘ, গণ্ডার ও গৃহপালিত পশুপক্ষী মৃতাবস্থায় ভাসিতেছ ও কতক পথিমধ্যে পড়িয়া আছে। ঝড় থামিবার পর জলমগ্ন জাহাজের মধ্য হইতে মাল উদ্ধার করিবার চেষ্টা হয়। একে একে তিন জন লোক নামিয়া গেল, কিন্তু তাহারা আর ফিরিল না। শেষে দেখা যায় যে, এক প্রকাণ্ড কুম্ভীর সেই ডেকের মধ্যে উহাদিগকে জলপান করিয়াছে। পরে উহাকে বধ করিলে উহার উদরমধ্য হইতে তাহাদের মৃতদেহ দেখিতে পাওয়া যায়। পাঁচ ঘণ্টায় নদীর জল ১৫ ইঞ্চি বাড়িয়াছিল ও সেই সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্প। ঝড়টি বঙ্গোপসাগর হইতে আরম্ভ হইয়া ষাট লিগ পর্য্যন্ত দূরবর্ত্তী স্থানে ব্যাপৃত হয়। উহাতে অনেক ছোট জাহাজ নৌকা দুই শত ফিট দূরবর্ত্তী গ্রামের মধ্যে সবেগে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল।

    বর্গীর হাঙ্গামায় কলিকাতার বিলক্ষণ উন্নতি হইয়াছিল। আত্মরক্ষার জন্য ইংরাজ কোম্পানি কলিকাতার চারিদিকে প্রশস্ত খাত খনন করাইয়াছিল। উহা চিৎপুর হইতে আরম্ভ হইয়া সারকিউলার রোডের ধার দিয়া বরাবর চলিয়া যায়। উহা ছয় মাইল করিবার প্রস্তাব ছিল, কিন্তু ছয় মাসে তিন মাইল পর্য্যন্ত হইয়াই বন্ধ হয়। মার্হাটারা কলিকাতা আক্রমণ করে নাই। তাহারা উহা করিতে পারিবে না বলিয়া যেন খাত খনিত হইয়াছিল। ইহাতে অতি অল্প দিনের মধ্যে কলিকাতায় বাঙ্গালার যাবতীয় ভদ্রলোক পলাইয়া আসে। বর্গীর হাঙ্গামার লোকের দুর্দ্দশার কথা মহারাষ্ট্র পুরাণে এইরূপ আছে:—

    “ব্রাহ্মণ পণ্ডিত গলায় পুঁথির ভার লইয়া

    গোঁসাই মোহান্ত যত চোপলায় চড়িয়া।।

    ক্ষেত্রি রাজপুত্র যত তলয়ারের ধ্বনি

    তলয়ার ফেলাইয়া তারা পলায় অমনি।

    কায়স্থ বৈদ্য যত যে যে গ্রামে ছিল

    বরগির নাম শুনি সে সব পলাইল।

    সোনার বেনে পলার ধনরত্ন লইয়া

    বোচকা বুচকি করি বাহুকে করিয়া।

    ঘেরাও হইতে নবাব আইল কাটুয়াতে

    শুনিয়া ভাস্কর তবে লাগিল ভাবিতে।”

    তবে সব বরগি গ্রাম লুটিতে লাগিল

    যত গ্রামের লোক সব যে যথা পালাইল।”

    ঝড়ে কলিকাতার যে পরিমাণ অনিষ্ট হইয়াছিল, বর্গীর হাঙ্গামার উহার চতুর্গুণ লাভ হইয়াছিল। ইংরাজ কোম্পানি ১৭৪৯ খৃষ্টাব্দে ১৫ই নভেম্বর কলিকাতার চারিদিকে বড় বড় গাছ ও জঙ্গল কাটিবার ও ড্রেন মেরামত করিবার হুকুম জারি করেন। উহাতে ইট তৈয়ারি ও পোড়াইবার ব্যবস্থা হয়। কোম্পানির কর্ম্মচারীরা জোয়া খেলিত। তাহার বাড়ীভাড়ার জন্য মাহিনা বৃদ্ধির আবেদন করে। সেই সময় ইউরোপে ফরাসি ইংরাজ ও ওলন্দাজগণের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ চলিতেছিল সেইজন্য ভারত সাগরে ইংরাজদের একখানি রণতরী থাকিত। উহা ডায়মণ্ড হারবার পর্য্যন্ত আসিবার অনুমতি লইয়া কলিকাতায় আসিত। সেইখান হইতে হুগলীর সৈয়দ, মোগল আরমানী ব্যবসায়ীগণের লক্ষ লক্ষ টাকার মাল আত্মসাৎ করায় হুলস্থূল পড়িয়া যায়। কলিকাতা হইতে আরমানিদিগকে বহির্গত করিবার ভয় দেখান হয়, কারণ ইংরাজেরা বুঝিয়াছিল, যে তাহারাই নবাবের নিকট আবেদন করিয়াছিল। বিখ্যাত জগৎ শেঠেরাও ইংরাজের সহিত তখন ব্যবসা করিত। কারণ সেরেস্তার কাগজে দেখিতে পাওয়া যায় যে, উহারা অপর জাতির মারফতে ইংরাজের সহিত দাদনি ব্যবসা করিতে আপত্তি করিয়াছিল। তখন সেই জগৎ শেঠের মারফত ইংরাজেরা এক লাখ বিশ হাজার টাকা দিয়া সেই গোলমাল মিটাইয়া ফেলে। বিলাতের বিবাদের জন্য ফরাসিরা ওলন্দাজগণের চুঁচড়ার বাগান কাড়িয়া লয় ও তাহারা পাছে কলিকাতা আক্রমণ করে সেই ভয়ে ইংরাজেরা আপনার মালপত্র ওলন্দাজগণের সহিত বরানগরে নামাইয়া কলিকাতায় আনিবার বন্দোবস্ত করে।

    উপহারঃ— ইংরাজেরা হুগলীর ফৌজদারকে বার্ষিক ২৭৫০্ টাকার উপহার দিতেন এবং এতদ্ভিন্ন নবাব আলিবর্দ্দিকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য তাঁহার দৌহিত্র যখন হুগলীতে নবাব হইবার পূর্ব্বে আসিয়াছিলেন তখন তাঁহাকে ফরাসী ওলন্দাজেরা যে উপঢৌকনাদি * দিয়াছিল ইংরাজেরা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক দিয়া সন্তুষ্ট করিয়াছিল ও তাঁহার নিকট হইতে শিরোপা ও হস্তী লাভ করিয়া সম্মানিত হইয়াছিল। উহাতে ইংরাজের মনোভীষ্ট সিদ্ধ হইয়াছিল, অর্থাৎ ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে ৮ই অক্টোবর আলিবর্দ্দি খাঁ ইংরাজদিগকে পরওয়ানা দান করেন। তৎপূবের্ব নবাবকে হাজি সেলিম বেওয়ারিশ প্রজার সম্পত্তি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে হইয়াছিল ও ঐ সব লইয়া নবাবের সহিত ইংরাজ কোম্পানির কর্ম্মচারীগণের মনোমালিন্য প্রায়ই হইত। বর্দ্ধমানের রাজা তিলকচাঁদ ইংরাজদের পরম শত্রু ছিলেন। তিনি তাঁহার এলাকায় ইংরাজের কুঠি কারবারাদি বন্ধ করিয়া দেন। মিঃ উড সাহেব উক্ত রাজার গোমস্তা রামজীবন কবিরাজের বিরুদ্ধে ডিক্রি করিয়া কলিকাতায় রাজার ঘর বাড়ী শীল করায় রাজা ইংরাজদের উপর খড়্গহস্ত হন। ইংরাজেরা বর্দ্ধমানের রাজার বিরুদ্ধে আবেদন করিয়া কৃতকার্য্য হইয়াছিল। ইংরাজেরা ফৌজদার ও দেওয়ান নন্দকুমারকে উপহারাদি দ্বারা সন্তুষ্ট রাখিতেন। নবাবকেও বহুমূল্য ঘোটকাদি উপঢৌকন দিতেন। তখন উহারা বাগবাজারে বারুদ তৈয়ারি ও নগর রক্ষার জন্য পাকা বুরুজাদি করিয়াছিল।

    ভয়ঃ— এগারজন মুসলমান নাবিক একজন ইংরাজ কাপ্তেনকে সমুদ্রে জাহাজে মারিয়া ফেলিয়াছিল, কোম্পানি দোষী মুসলমানগণের প্রাণদণ্ডাজ্ঞা দিতে পারে নাই, কেবল দুইজন খৃষ্টানের উপর ঐ আজ্ঞা হইয়াছিল। উকিল গডার্ড ও কেম্পকে কলিকাতার বাসিন্দা ছাড়া আর কাহারও মামলা পেশ করিলে তাহাদিগকে বিলাতে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিবেন, একথা কোম্পানির কর্ম্মচারীরা স্পষ্টই বলিয়াছিলেন। কারণ উহাতে মুসলমান বিচারের সহিত বিবাদ হইবার সম্ভাবনা আছে, আরও সেইজন্য এক নোটিশ জারি করা হয় যে, যাহাতে ইউরোপীয়ান, আরমানী, পর্ত্তুগীজ প্রভৃতিকে এদেশী লোকের হ্যাণ্ডনোটে টাকার আদান প্রদান না করে। যদি কেহ সেরূপ করে, তবে তাহাকে কলিকাতার বাহির করিয়া দেওয়া হইবে। তখন কোম্পানির মাসিক খরচা কুড়ি হাজার টাকা, কেবল টাকা আদায় খরচাই আড়াই হাজার টাকা ছিল। তখন বেশ্যার সম্পত্তি কোম্পানি লইত।

    অপব্যবহারঃ— নবাব কোম্পানির নিশান ছাড় অপব্যবহার করার অপরাধে রামকৃষ্ণ শেঠকে মুর্শিদাবাদ পাঠাইবার নিমিত্ত কোম্পানির উপর পরওয়ানা জারি করেন। কোম্পানি উহাকে বাঁচাইবার জন্য কৌশল করিয়া এইরূপ প্রত্যুত্তর দান করিল যে, ক্ষহার পিতামহ পিতা ও সে নিজে কোম্পানির অনেক টাকা দাদনি হিসাবে ধারে অতএব কেমন করিয়া উহাকে তাহারা পাঠাইয়া দেয়। কারণ বাদশাহি ফারমনে দেনদারকে আটক করিয়া টাকা আদায় করিবার ইংরাজ কোম্পানির ক্ষমতা ছিল। তখন উক্ত কোম্পানির কর্ম্মচারিদের সহিত তাহাদের দালালগণের সম্বন্ধ বড়ই ঘনিষ্ঠ ছিল। প্রত্যেক প্রত্যেকের আপদ বিপদে সহায়তা করিত ও প্রাণপণে পরস্পর পরস্পরকে রক্ষা করিত। কোম্পানির কর্ম্মচারী মিঃ বেলীকে আঠার হাজার টাকা ফেরত দিবার হুকুম হইলে, উহা দালালের দালালী লিখিয়া হিসাব শোধ করিয়া লয়। রামকৃষ্ণ প্রমুখ দালালেরা রাত্রে একত্র হইয়া কি দরে কি জিনিষ বিক্রয় করিবে উহা স্থির করিয়া যোগসাজগে জিনিষ বিক্রি করিত। তখন এইরূপে দালালেরা শক্তিশালী ও ধনবান হইত। কলিকাতার চাউল ও তৈলের দাম অধিক হওয়ায় উহার উপর যে বার্ষিক মাশুল পাঁচ শত টাকা আদায় হইত উহা উঠাইয়া দেওয়ায় হলওয়েল সাহেব প্রতিবাদ করিয়া বলেন যে, উহাতে ব্যবসাদারদেরই লাভ হইবে গরীব প্রজার কোন উপকারই হইবে না। শেষে এই আদেশ দেওয়া হয় যে, আউস ধানের চাউল টাকায় পঁয়ত্রিশ সের ও আমন ধানের চাউল টাকায় দশ সের করিয়া বিক্রীত হইবে। কুলীদের রোজ তখন দৈনিক দশ পয়সা * মাত্র ছিল। কোন নবাব বা তাঁহার মন্ত্রীর মৃত্যুতে বা বিদ্রোহে সোনার মোহরের চৌদ্দ টাকা ধার্য্য দামের কম বেশী হইত। কোম্পানি ইট করিবার সেলামী বাবদ বার্ষিক ৩৭৯০/১০ পাইতেন ও বাজার হইতে ৪২৯্ টাকা মাত্র আদায় করিতেন। সেকালের ইটের হাজার ৩।।/ মাত্র ছিল। উহার মাপ ৯ ইঞ্চি লম্বা, ৩।। ইঞ্চি চওড়া ও ২।। ইঞ্চি পুরু ছিল। এক শত মণ জ্বালানি কাঠের দাম দশ টাকা হইতে কুড়ি টাকা পর্য্যন্ত ছিল।

    জমিবিক্রিঃ রাজা কিষণচাঁদ জাল দলিল দ্বারা ট্যাঙরা দখল করিতে গিয়া ধরা পড়িয়া যান। প্রকাশ্য নিলামে হলওয়েল সাহেব পেরিনের বাগান সবে মাত্র আড়াই হাজার টাকায় খরিদ করেন। উহা ১৭৫৩ খৃষ্টাব্দে কর্ণেল স্কট ২৫ হাজার টাকায় খরিদ করেন শেষে উহাতে বারুদখানা হয়। কোম্পানি রসিদ মল্লিক ও নারায়াজি মল্লিকের নিকট হইতে সিমুলিয়া পাগলডাঙ্গা ২২৪৫ বিঘা জমি ও ব্রহ্মোত্তর ১১৬ বিঘা খরিদ করেন। তখন কলিকাতার জমি জায়গার দাম অল্প হইলেও সেকালের লোকের ও কোম্পানির খরিদ করিবার আগ্রহ হইয়াছিল। কোম্পানির কর্ম্মচারীরা প্রায়ই উহা খরিদ ও বিক্রি করিত। তখন ছুটি লইতে হইলে কোম্পানির কর্ম্মচারিকে এক বৎসর আগে নোটিশ দিয়া আপনার হিসাব নিকাশ দিতে হইত। ইংরাজ কোম্পানি ফরাসিগণের সহিত ব্যবসা করিতে ব্যবসাদারগণকে প্রকাশ্যভাবে নিষেধ করিয়াছিলেন। নবাব ফরাসিদের কাশিম বাজারের কুঠি আটক করিয়া তাহাদের নিকট হইতে পঞ্চাশ হাজার টাকা আদায় করিয়াছিলেন। কলিকাতার জমির দাম দিন দিন বাড়িতেছিল।

    বাঙ্গালীঃ— মুসলমান রাজত্বের শেষভাগে হিন্দুর প্রাদুর্ভাব যেমন হইয়াছিল, তেমনি বাঙ্গালায় বাঙ্গালীর ক্ষমতার উপর নির্ভর করিয়া গুণবান মুসলমান নবাবেরা প্রতিষ্ঠাবান হইয়াছিলেন। ইংরাজেরাও সেই দৃষ্টান্তের অনুকরণ করিয়া তাহাদের হস্তে গুরুতর কর্ম্মের ভারার্পণ করিতেন ও সুফল লাভ করিতেন। ইহাতেই অতি অল্পদিনের মধ্যে কলিকাতায় বাঙ্গালী পরিপূর্ণ হইয়া যায় ও তাহাদিগকে রক্ষা করিবার জন্য ইংরাজ কর্ম্মচারীরা প্রাণপণ চেষ্টা করিতেন। বাঙ্গালীর কর্ম্মকুশলতায় কলিকাতা তখন নবাব বা তাঁহার উচ্চ কর্ম্মচারীগণের অত্যাচার হইতে উদ্ধার লাভের স্থান হইয়াছিল। সীতারাম প্রমুখ সকলেই সেইজন্য কলিকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাতেই বাঙালীর সহিত ইংরাজের ঘনিষ্ঠতা হয় ও উহারাই ইংরাজের সৌভাগ্যলক্ষ্মী লাভের সোপান বলিতে হইবে। বাঙ্গালীর বুদ্ধি ও সাহায্যে উহাদের কি ব্যবসা, কি রাজ্যলাভ সমস্তই হইয়াছিল। হোসেন সার আমল হইতে বাঙ্গালী বাঙ্গালার হর্ত্তা কর্ত্তা বিধাতার কর্ম্ম করিয়া আসিতেছে। উঁহার প্রধান মন্ত্রী ও বিশ্বস্ত কর্ম্মচারী পুরন্দর খাঁ, রূপ ও সনাতন ছিলেন। সুলেমান সার শ্রীহরি জানকীবল্লভ, প্রমুখের সাহায্য লইয়া রাজ্য টোডরমল্ল রাজস্ব বিষয়ক কাগজপত্র বুঝিয়া বন্দোবস্ত করেন। বাঙ্গালার অধিকাংশ কানুনগো বাঙ্গালী। রঘুনন্দন প্রমুখ কানুনগো মুর্শিদকুলির মত কর্ম্মদক্ষ দুর্দ্দান্ত শাসনকর্ত্তাকেও গ্রাহ্য করিত না। প্রতাপাদিত্য প্রমুখ জমিদারগণের বিদ্রোহে দিল্লীর সিংহাসন পর্য্যন্ত বিব্রত হইয়াছিল। এই সকল দেখিয়াই চতুর ইংরাজ কোম্পানি বাঙ্গালীকে হস্তগত করা প্রধান কর্ত্তব্য কর্ম্ম মনে করিয়াছিল। উহাতেই ইংরাজ কোম্পানির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতায় অনেক বাঙ্গালীর সৌভাগ্য লক্ষ্মী লাভ হয়। শিল্পনৈপুণ্যেও বাঙ্গালী জগদ্বিখ্যাত। জনার্দ্দন কর্ম্মকার ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে ২১২ মণ ওজনের বার হাত লম্বা ও তিন হাত চওড়া কামান তৈয়ারি করিয়াছিল। উহার নাম জগজ্জয়ী বা ‘জাহানকোষা’ বলিয়া সম্রাট সাজাহান প্রমুখ প্রশংসা করিয়াছেন। বাদশাওয়ালী নামে আর একটী কামানও বাঙ্গালীর নির্ম্মিত। উহা মুর্শিদাবাদের প্রদর্শনী গৃহে রক্ষিত হইয়াছে। সেকালে বাঙ্গালীরা যে অস্ত্রাদি নির্ম্মাণ করিতে নিপুণ ছিল উহাতেই প্রমাণ হয়। বাঙ্গালী স্বাধীন বৃত্তির অনুশীলনাভাবে পরমুখাপেক্ষী হইয়া সর্ব্বস্ব হারাইয়াছে। জননী ও জন্মভূমিকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ দেখিয়াও অন্যান্য জাতির অভ্যুদয়ের সহায়তা প্রাণপণে করিয়াও বাঙ্গালী স্বজাতির দুঃখ অধীনতা দূর করিবার কোন চেষ্টাই কখন করে নাই। সেই মহাপাপে বাঙ্গালীজাতি দাসত্ব মুগ্ধ হইয়া ইংরাজ কোম্পানির অভ্যুদয়ের পথ প্রদর্শক স্বরূপ বলিলেই চলে। বাঙ্গালায় বাঙ্গালী যে ইংরাজ জাতির অভ্যুদয়ের সহায় হইয়াছিল উহাতেই শেষে ভারতবর্ষ উহাদের করায়ত্ত হইয়াছিল।

    হায়! বাঙ্গালী পরের অভ্যুদয়ের সহায়তা করিতে পারে, কিন্তু নিজের উহা করিতে পারে না, ইহা অপেক্ষা দুঃখের ও পশুত্বের পরিচয় আর কি হইতে পারে? মানবেরা যেমন গৃহপালিত পশুপক্ষী দ্বারা তাহাদের যাবতীয় কর্ম্ম করাইয়া লয়, তেমনি বাঙ্গালীজাতি মুসলমান ও ইংরাজের কর্ম্মচারী স্বরূপ উহাদের প্রভুত্ব ও রাজত্বের সহায়তা করিয়া আসিতেছে।

    আলিবর্দ্দি খাঁ যদি বর্গীর হাঙ্গামায় বিব্রত না হইতেন ও সিরাজের কথায় মুগ্ধ না হইতেন, তাহা হইলে বোধ হয়, কখনই বিদেশী বণিকেরা বিশেষতঃ ইংরাজেরা কলিকাতায় আট খাট বাঁধিয়া দেশের লোকজনকে বাধ্য করিয়া রাজত্ব করিবার অবসর পাইত না। আলিবর্দ্দি নিজের ভাগ্যোন্নতি সিরাজের জন্মের সহিত সম্বন্ধ ছিল মনে করিয়া উহাকে বড়ই ভালবাসিত। রামকৃষ্ণ উমিচাদ প্রমুখ ব্যক্তিরা কোম্পানির কর্ম্মচারিগণের সহিত ঘনিষ্ঠতা দ্বারা আপনাদের স্বার্থসিদ্ধি করিত। সেইজন্য উহারা সেকালের ইংরেজিটোলার নিকটে থাকিত। যেখানে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী ছিল সেইখানে রামকৃষ্ণ শেঠের বাড়ী ছিল। উমিচাঁদের বাগান বেণ্টিঙ্ক স্ট্রীটের নিকট ছিল। ৺নয়নচাঁদ মল্লিক প্রমুখের ভাড়াটিয়া বাড়ীতে ইংরাজেরা থাকিত ও তাহাদের সহিত ব্যবসা করিত। সেকালে লালবাজারে একটি সুন্দর সরাই এপেলো (Apollo) নামে খ্যাত ছিল। সেইখানে নাবিকেরা থাকিত ও মারপিট খুনজখম হাঙ্গামার জন্য কেহ তখন সেখানে যাইত না। হলওয়েল সাহেব কলিকাতার কালেক্টার ও কলিকাতায় উন্নতি ও অবনতি সম্বন্ধে অনেক কথা বলিয়া গিয়াছেন। তিনি ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে কলিকাতা জরীপ করান ও উহার জনসংখ্যা চারি লক্ষ নয় হাজার বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। জন নগর মারহাট্টা খাতের বাহিরে ছিল। রোটেসন গবর্ণমেন্টের কাল হইতে হলওয়েলের সময় পর্যন্ত কলিকাতার লোকসংখ্যা অসম্ভব ভাবে বৃদ্ধি হইয়াছিল, একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কলিকাতায় ১৭২৭ খৃষ্টাব্দে মিউনিসিপালিটির সূত্রপাত হয়। হলওয়েল সাহেব ঐ সভার প্রথম সভাপতি ছিলেন। বিলাতী মেয়র ও অলডারম্যানের অনুকরণে উহা গঠিত হইয়াছিল। ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের কোম্পানির কার্য্য বিবরণী হইতে জানা যায় যে, গঙ্গার স্রোতে সুতানটীর মাল নামাইবার ঘাট ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল, সেইজন্য উহা তৈয়ারি করিয়া যাহাদের মালপত্র ঐ ঘাটে তুলিত তাহাদের নিকট হইতে অতিরিক্ত মাশুল আদায় করিবার আদেশ হইয়াছিল। সেইজন্য বড় বড় ব্যবসায়ীরা আপন আপন * ৺নয়ানচাঁদ মল্লিক প্রভৃতির ঐরূপ ঘাট ছিল। ঐ ঘাটে লোকে গঙ্গাস্নানও করিত ও উহাতে পুণ্যার্জ্জন হয় ইহা সেকালের হিন্দুরা বিশ্বাস করিত।

    কলিকাতায় শোভাবাজার, চার্লস বাজার, বাগবাজার, শ্যামবাজার, হাটখোলা, জানবাজার ও কোনও বাসটোলার বাজার গোবিন্দপুরে হইয়াছিল। আজকালের ক্লাইব স্ট্রীট সেকালে বর্ত্তমান উহারই দুইবারে সেকালের কোম্পানির বড় বড় কর্ম্মচারীরা বাস করিত। সেখানে কলিকাতার ইংরাজ বাঙ্গালী ও মুসলমান যাবতীয় ব্যবসায়ীরা বাড়ির চারিদিকে বাগান করিত। সেকালের বিচার ঘরের পুরাতন স্মৃতি ওল্ড কোর্টে হাউস রাস্তা রক্ষা করিতেছে। তখন দিল্লীর সিংহাসন একরূপ শূন্য বলিলেই চলে, দক্ষিণাপথে রাষ্ট্রবিপ্লব, বাঙ্গালায় বর্গীর হাঙ্গামা, এই সুযোগে ইংরাজেরা যাহা ইচ্ছা আদালতাদি করিয়া দেশের সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়াছিল। ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে ৩১শে জানুয়ারি কলিকাতার গবর্ণর কর্ত্তৃক মনোনীত চব্বিশজন অধিবাসী দেওয়ানী ও ফৌজদারী মোকদ্দমার জন্য কোর্ট অফ রুিকুয়েস্ট ও সেসন আদালতে বিচার করিতেন। স্বয়ং গবর্ণর ও তাঁহার সদস্যগণ উহার উপর শেষ চূড়ান্ত বিচার করিতেন।

    মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর হইতেই কোম্পানির কর্ম্মচারীরা গোপনে স্বাধীন ব্যবসা আরম্ভ করিয়াছিল। উহার কল্যাণে বিলাতের কোম্পানির লাভের অংশ ক্রমশই হ্রাস হইয়াছিল। এতদ্ভিন্ন এখান হইতে আর উৎকৃষ্ট দ্রব্য পাঠান হইত না, উহাতে সেখানকার খরিদদারেরা চটিতেছিল। উহাতেই বিলাতের ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অংশীদারগণের মনে ভীতির সঞ্চার হইয়াছিল।

    ঘটনা দ্বারাই বর্দ্দতে সিংহের মস্তকে পাদাঘাত করিয়া থাকে সেকথা ঈশপের কথায় শিশু শিক্ষার উপদেশের মধ্যে উল্লিখিত হইয়াছ। উহার উদাহরণ যেন বিচিত্র ঘটনার ভারতবর্ষে সত্য সত্যই অভিনীত হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয়। উহা না হইল কি যে সকল কোম্পানির কর্ম্মচারীরা অন্নদাতার অন্ন হরণ করিতে কুণ্ঠিত হয় না তাহারাই কি এই বিশাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিবার পথ পরিষ্কার করিতে পারিত? হায়! সেই সকল ধর্ম্মভীরু কর্ত্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিরা রাজ্য লাভ করিয়াছিল!

    * উপঢৌকনের বিবরণঃ হীরার আঙটি মূল্য ১৪৩৬ টাকা।

    সোনার মোহর ৩৫ খানা মূল্য ৫৭৭্ টাকা নগদ ৫৫০০্ টাকা।

    আলিবর্দ্দি খাঁর বেগমগণকে মোহর ২৫ খানা মূল্য ৪২৯্ টাকা নগদ ফকিরগণকে ১৮০্ টাকা।

    হুগলীর ফৌজদারকে ৭৭৭্ টাকা দিনেমার রক্ষিগণকে ৭৫৬্ টাকা।

    মোমবাতি ১১১০্ টাকার ঘড়ি ৮৮০্ টাকার আয়না ১ জোড়া ৫৫০্ টাকা।

    দুইটি পিস্তল ১১০্ টাকা এক জোড়া মারবেল পাথর ২২০্ টাকা।

    * সিরাজউদ্দৌলার যুগে ইংরাজদের উপহার ও বন্ধুতার কথা ও প্রশংসা শুনিয়া অত্যন্ত প্রীত  ও মুগ্ধ হইয়াছি যাহাতে তাহাদের ভাল হয় উহা আমি করিব আলিবর্দ্দি খাঁ বলিয়াছিলেন।

    * চাঁদপালঘাট, কাশীনাথ ঘাট,, ব্যাবেটের ঘাট, জ্যাকসন, ফোরসনস, ব্লাইথার, রস, হুজরীমল ইত্যাদি ঘাটে তাহাদের মাল নাামইত ও উহা তাহাদের নামে খ্যাত হইত।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস
    Next Article সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }