৮. নবাব আলিবর্দ্দি ও সিরাজউদ্দৌলা
অষ্টম পরিচ্ছেদ – নবাব আলিবর্দ্দি ও সিরাজউদ্দৌলা
১৭৪৮ খৃষ্টাব্দ নানা ঘটনায় ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ও স্মরণীয় হইয়াছে। সেই সময় হইতেই বিলাতের সন্ধি বিগ্রহের সহিত ভারতের সম্বন্ধ সূত্র আরম্ভ হয়। সেই সময় হইতেই ইংরাজ ও ফরাসী কোম্পানিরা ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের রাজা নবাবগণের ভাগ্যোদয়ের সহায়তা করিতে আরম্ভ করে ও উহাতে পরস্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে! উহাতেই ক্লাইব প্রমুখের প্রতিভা ও বীরত্ব প্রকাশ হয়। সেই সময়ই মৃত্যু আদিতে দিল্লীর সিংহাসন, দাক্ষিণাত্যের সুবেদারি ও তাঞ্জোরের রাজত্ব লাভের জন্য উত্তরাধিকারিগণ বিব্রত হইয়া পড়েন ও উহা লইয়া পরস্পর উত্তরাধিকারিগণের বা হৃতাধিকারিগণের মধ্যে বিবাদ উপস্থিত হয়। ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দে ১৭ই এপ্রিল মহম্মদ শার মৃত্যুতে আহাম্মদ শা দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিল উহা লইয়া কোন বাদানুবাদ হয় নাই সত্য কিন্তু তিনি দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিজাম উলমুলুকের মৃত্যুতে উহার মনোনীত দ্বিতীয় পুত্র নাসিরজঙ্গ উত্তরাধিকারী অনুমোদন করেন উহা রক্ষা করিবার সম্যক ক্ষমতা না থাকায়, সেই পদপ্রার্থী মৃত নিজামের পৌত্র বিজাপুরের অধিপতি মজফরজঙ্গ সাতরায় গিয়া মারহাট্টাগণের দ্বারা চাঁদ সাহেবকে মুক্ত করাইয়াছিলেন। উহার সহিত তিনি এই বন্দোবস্ত করেন যে, যুদ্ধ করিয়া তিনি দাক্ষিণাত্যের সুবেদার হইবেন ও চাঁদ সাহেবকে কর্ণাটের নবাব করিবেন। ফরাসিরা চাঁদ সাহেবের যেমন সহায়তা করেন, তেমনি ইংরাজেরা তাঞ্জোরের হৃত রাজার সাহায্য করিয়াছিলেন।, প্রথমে ফরাসিরা কৃতকার্য্য হইয়াছিল বটে, কিন্তু শেস রক্ষা করিতে পারে নাই। ইংরাজেরা চতুরতা করিয়া হৃত রাজার পক্ষত্যাগ করিয়া তাঞ্জোরের রাজার নিকট যুদ্ধযাত্রার সমস্ত খরচ ও দেবীকটের দুর্গ লাভ করেন। সেই সময়েই চতুর মেজর লরেন্স ক্লাইবের বীরত্ব ও ক্ষমতার পরিচয় পান ও ভবিষ্যতে উঁহার প্রতি? দৃষ্টি আকর্ষণ করাইয়া তাঁহাকে সৈনিক বিভাগের কাপ্তেন করিয়া দেন। উহাতেই আরকটের দুর্গাধিকারের ক্লাইবের যশঃ শৌর্য্য পৃথিবীব্যাপী হইয়া পড়ে।
১৭৪৮ খৃষ্টাব্দে ৭ই অক্টোবর Aix La Chapelle-এর যে সন্ধি হয় উহাতে ইংরাজ ও ফরাসি জাতির মধ্যে স্থির হয় যে যাহা জয় করিয়াছিল উহা পরস্পর প্রত্যর্পণ করিবে। ঐ শর্ত ভারতে অবগত হইবার পূবের্বই পূর্ব্বোক্ত ব্যাপার ঘটিয়াছিল। আরকটের যুদ্ধ ব্যাপার বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের * অভিমতানুসারে হয় নাই।
ঘটনাচক্রে বিদেশী বণিকেরা ব্যবসা হইতে রাজত্ব করিবার সুযোগ দেখিয়া সেই বাসনা কার্য্যে পরিণত করিবার বিধিমত চেষ্টা করিয়াছিল ও ইংরাজের ভাগ্যেই কেবল উহা ফলবতী হইয়াছিল। বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণের কথার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া ইংরাজ কোম্পানি এখানে কার্য্য করে নাই বলিয়াই কৃতকার্য্য হইয়াছিল ও বিলাতের যুদ্ধে ফরাসীর পরাজয় হওয়াতেই উহারা যে এখানে ইংরাজদের যাহা কিছু জয় করিয়াছিল উহা প্রত্যার্পণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল ** কিন্তু হায়! উহারা ইংরাজের করতলগ্রস্ত ব্যবসা ফিরিয়া পান নাই।
মিঃ ষ্টানলিনোপোল ঔরঙ্গজেবের জীবন চরিতে স্পষ্টই বলিয়াছেন যে, সায়েস্তা খাঁ *** জানিতেন না যে তিনি মগের দৌরাত্ম্য দূর করিয়া ও চাটগাঁর নাম ইসলামাবাদ করিয়া ভবিষ্যতে ইংরাজ কোম্পানির শক্তি বৃদ্ধির পথ পরিষ্কার করিবেন।
কলিকাতার ভিতপত্তন অর্থ সম্বন্ধেই হইয়াছিল উহার মূল ব্যবসা ও উহার উন্নতিতে মাশুল আদায় করা হইত। আর মোগল সাম্রাজ্যের পতনই ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পনির ভবিষ্যত ক্ষমতা ও উন্নতির মূল কারণ। *
এইরূপে ষ্পষ্ট দেখা যায় যে, ইংরাজ কোম্পানি ভারতবর্ষের সর্ব্বত্রই উহাদের প্রাধান্য ও ক্ষমতা বিস্তার অনুকূল ঘটনাস্রোতে করিয়াছিল উহা কাহারও বিদ্যা, বুদ্ধি বা কৌশলে হয় নাই। তবে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে যে, সেই শক্তির বিস্তার কলিকাতা হইতে হইয়াছিল ও সেইজন্য কলিকাতা ইংরাজ কোম্পানির পরশমণি ও ক্লাইব সেই পরশমণি লাভ করিয়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতপত্তন করেন। সেই সূচনার সংক্ষেপে বৃত্তান্ত সূচনে করিয়া পূর্ব্বে কিরূপে আলিবর্দ্দির সময়ের কথা সংক্ষেপে বলিতে হইবে।
আলিবর্দ্দি খাঁঃ— আলিবর্দ্দি ন্যায়মতে বাঙ্গালার সিংহাসন লাভ করেন নাই ও তিনি বাঙ্গালার এমন কিছুই করেন নাই যে, যাহার জন্য তাঁহাকে একজন বিখ্যাত নবাব বলা যায়। তবে তিনি যে মারহাট্টাগণকে চৌথ দিতেন সেজন্য তাঁহার নিন্দা বা দোষ দেওয়া যায় না। কারণ দাক্ষিণাত্যে নিজামের প্রতিষ্ঠাতা আসফজাকেও সেই মারহাট্টা কর দিতে হইয়াছিল। আলিবর্দ্দি খাঁ জীবনে অনেক অন্যায় কার্য্য করিলেও তাঁহার হৃদয় যে কোমল ও স্নেহশীল ছিল উহার উদাহরণ যথেষ্ট পাওয়া যায়। তাঁহার সময়ে রাষ্ট্রবিপ্লবে দেশ বিপর্য্যস্ত বলিলেই চলে। বিদ্রোহীর হস্তে তাঁহার চক্রীভ্রাতা হাজি ও জামাতা জইসুদ্দিনের মৃত্যু হইয়াছিল। আমিনা বেগম প্রমূখ পরিবারাদি নিগৃহীত ও অপমানিত হইয়াছিল। নবাব সরফরাজ খাঁর সহিত হাজি যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিলেন উহার প্রতিকূল স্বরূপই যেন তিনি নৃশংসরূপে হত ও ৭০ সত্তর লক্ষ টাকার গুপ্তধন বাহির করিয়া দিতে হইয়াছিল।
আলিবর্দ্দির কেবলমাত্র তিন কন্যা ভিন্ন কোন পুত্র সন্তান ছিল না। উহাদের সহিত আলিবর্দ্দির তিন ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাদ হইয়াছিল। জ্যেষ্ঠা কন্যা ঘসোট বেগমের স্বামী নোয়াজিস আহম্মদ, সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ সহোদর, একরামুদ্দৌলাকে পোষ্যপত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন ও উহার মৃত্যু শোকে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। তিনি ঢাকার নায়েব নাজিন ছিলেন। তাঁহার অধীনে হোসেন কুলী খাঁ ও রাজা রাজবল্লভ কার্য্য করিতেন। দ্বিতীয়া কন্যার স্বামী সৈয়দ আহম্মদ, পুত্র সওকৎজঙ্গ ও কনিষ্ঠা আমিনা বেগমের স্বামী জইনুদ্দিন, পুত্র সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন। নবাব আলিবর্দ্দির বৈমাত্র ভগিনীপতি মীরজাফর হজরৎ আলির বংশধর ও প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি সাহসী ও বদান্য ছিলেন কিন্তু শেষে বিলাসী ও কত্তর্ব্য কর্ম্মে অবহেলা করিয়া আলিবর্দ্দির বিরাগভাজন হন। শেষে নোয়াজিদ আহম্মদের শরণাপন্ন হন। দৌহিত্রগণের মধ্যে সিরাজউদ্দৌলাই নবাবের সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল, কিন্তু তিনিও মাতামহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়াছিলেন। আলিবর্দ্দি তাহাকে স্নেহময় কথায় বাধ্য করিয়াছিলেন। উহা উল্লেখ করিলেই নবাবের কোমল হৃদয় প্রকাশ হইবে।
সেইজন্য উভয়ের মধ্যে পরস্পর যে পত্র বিনিময় হইয়াছিল উহার অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হইলঃ—
“বালকের ন্যায় আমায় আর ভুলাইতে পারিবেন না। আপনি আমাকে অনেক সময়েই কল্পিত আদর ও স্তোতবাক্যে প্রতারিত করিয়াছেন ও পিতৃব্যদিগকে রাজপদ দিয়া সম্মানিত করিয়াছেন। এই বিবাদে হয় আপনার মস্তক আমার বক্ষদেশে, নয় আমার মস্তক আপনার পাদদেশে পতিত হইবে, সেইখানেই শেষ মীমাংসা হইবে। আমার নিজের বলে নিজের ন্যায্য দাবী অধিকার করিতে ইচ্ছা করি, ইহাতে আপনার বাধা দেওয়া উচিত নয়।”—সিরাজ!
ইহাতে মাতামহ অতিমাত্র বিরক্ত বা ক্রুদ্ধ না হইয়া প্রত্যুত্তরে বলিলেন যে, “ধর্ম্মের জন্য যাহারা যুদ্ধ করিয়া প্রাণদান করে তাহারা জানে না যে, উহার তুলনায় সংসার সংগ্রামে স্নেহের সহিত যুদ্ধ উহা অপেক্ষা কত গুরুতর। উহাতে যে জয়ী হয় সেই শ্রেষ্ঠতর বীর। নির্ব্বোধ! তুমি ভ্রান্ত, নহিলে তুমি অনায়াসেই বুঝিতে পারিতে যে, যদি আমার ক্ষমতার অধীন হইত তাহা হইলে বিহার কি, সমস্ত ভারতবর্ষের আধিপত্য তোমায় দান করিতাম। তুমি জান না, যে শেষ বিচারের দিন উপরোক্ত বীরগণের মধ্যে কোন তুলনাই হয় না, কারণ একজন শত্রুহস্তে ও অন্যে প্রাণসম বন্ধুহস্তে প্রাণ বিসর্জ্জন করিতে উদ্যত হয়।”
“গাজী কে পায় সাহাদাৎ, অন্দর ভাগো পোম্ভ।
গাফেলকে সাহীদে এশক্ ফাজেল্ তার্ আজ্ দোস্ত।
ফারদায় কেয়ামৎ ইঁ বা আঁ কায়মানাৎ
ইঁ কোস্তা দুষ্মানাস্য ওয়া কোস্তারে দোস্ত।”
আলিবর্দ্দি পাটনায় উপনীত হইয়াই সিরাজের সহিত সম্মিলিত হইলেন। অল্পকাল পাটনায় থাকিয়া অশ্রুজলে পরস্পরের মনের মালিন্য দূর হইয়াছিল। তৎপূর্ব্বে নবাবের প্রতিনিধি রাজা জানকীরাম পাটনার দুর্গ ত্যাগ করিয়া সিরাজকে উহাতে প্রবেশ করিতে দেন নাই, বরং উভয়ের মধ্যে যুদ্ধাদি গোলাবৃষ্টি হইয়াছিল ও উহাতে সিরাজের পক্ষের সেনাপতি মেহিদীমেলার খাঁ সমরশায়ী হইয়াছিল। তখন অগত্যা সিরাজউদ্দৌলাকে দুর্গবহিস্থ এক ক্ষুদ্র কুটিরে বসে করিতে হইয়াছিল ও রাজা জানকীরাম তাঁহার জন্য উপযুক্ত বাসস্থান নির্দ্দেশ করিয়া নবাবের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।
১৭৩০ খৃষ্টাব্দে সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হইয়াছিল। আফগান বিদ্রোহকালে যুদ্ধস্থলে সিরাজউদ্দৌলাকে অনেক সময় উপস্থিত থাকিতে দেখিতে পাওয়া যায়, তবে তখন রীতিমত যুদ্ধ শিক্ষা করিবার কোন মুসলমান নবাব পুত্রের সুবিধা বা সুযোগ ছিল না। সেকালে মুসলমান জাতির প্রায় সকলেই ক্ষমতাপ্রিয়, বিলাসী ও অসংযমী ছিল। উহা একরূপ স্বতঃসিদ্ধ হইয়াছিল, সুতরাং নৃশংস অত্যাচারী হওয়া অবশ্যম্ভাবী বলিলেই চলে। মুতাক্ষরীণ প্রণেতা লিখিয়াছেন যে “আলিবর্দ্দির পরিবারবর্গ মধ্যে লাম্পট্য ও অনাচার পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাইয়াছিল।” উহারই মধ্যে সিরাজউদ্দৌলা লালিত পালিত হইয়া যে যৌবনসুলভ চাপল্যে ও নবাবের স্নেহ এবং আদরে যে বিলাসী ও অত্যাচারী হইবেন না, ইহা আশা করা যায় না। উক্ত গ্রন্থকর্ত্তা হোসেনকুলীর ভ্রাতা হায়দার ও উহার ভ্রাতুষ্পুত্র হোসেন উদ্দিনের মৃত্যুর দ্বারা নির্দ্দোষীর রক্তপাতে সিরাজের ধ্বংসের মূল কারণ লিখিয়াছেন ও উহা আলিবর্দ্দির ঘোর কলঙ্ক বলিয়াছেন।
তদ্ভিন্ন পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ সিরাজের যে চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন উহা স্বাভাবিক নহে বলিয়া বোধ হয় ও উহার বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রয়োগ দেখান হইয়াছে। হইতে পারে যে, সিরাজউদ্দৌল্লা বালস্বভাব চপলতায় ও শিক্ষাভাবে ব্যাভিচারী ও অবাধ্য ছিল, কিন্তু বড়বাটির যুদ্ধে তাহার সাহসের গুণকীর্ত্তন আছে। তাঁহাকে যখন বৃদ্ধ মাতামহ ও মাতামহীর অভিমতানুযায়ী কুলের কলঙ্ক দূর করিবার জন্য পাপিষ্ঠ হোসেনকুলি খাঁর শিরচ্ছেদন করিতে দেখা যায়, তখন কেমন করিয়া বলা যায় যে, সে অবাধ্য ও উচ্ছৃঙ্খল এবং তাহার দুষ্প্রবৃত্তির উপর ঘৃণা ছিল না? আলিবর্দ্দি খাঁর মৃত্যুর পরে ঘোর বিশৃঙ্খলা ও প্রতিদ্বন্দ্বী শওকতজঙ্গকে পরাজিত করিয়া ঘোর ষড়যন্ত্রের মধ্য হইতে সিরাজউদ্দৌলা যেরূপে রাজ্য লাভ করিয়াছিল, উহাতে যে সে মূর্খ ছিল, ইহা কখনই বিশ্বাস হয় না বিশেষতঃ আলিবর্দ্দির মত চতুর ব্যক্তি সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনের উপযুক্ত বলিয়া মনোনীত করিয়াছিল। পূর্ব্বেই দেখা হইয়াছে যে, তিনি আলিবর্দ্দি খাঁর জীবদ্দশায় রাজকার্য্য মাতামহের উপদেশমত করিতেন ও তাঁহার অপুরোধমত আলিবর্দ্দি ইংরাজগণের পক্ষে পরওয়ানা জারি করিয়াছিলেন। এইরূপ স্নেহপ্রবণ ব্যবহারে আলিবর্দ্দি যে কেবল দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাধ্য করিয়াছিলেন উহা নয় মুস্তাফা খাঁর সম্বন্ধেও ঐরূপ ব্যবহার উল্লিখিত হইয়া থাকে।
মন্সুরগদীঃ— নোয়াজিস মহম্মদ যেমন রাজধানীর দক্ষিণপ্রান্তে মতিঝিলের সম্মুখে এক প্রকাণ্ড প্রাসাদে বাস করিতেন সেইরূপ নবাব দৌহিত্রের জন্য ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে একটী মনোরম স্থান মনোনীত করিয়া এক সুন্দর উদ্যান মধ্যে সরোবরকে বিস্তৃত ও নানা কারুকার্য্য খচিত গৌড় প্রস্তরাদির দ্বারা এক উত্তম প্রাসাদ প্রস্তুত করাইয়াছিলেন। উহার নাম প্রিয় দৌহিত্রের উপাধি অনুসরে মন্সুরগদী রাখিয়াছিলেন ও উহার ব্যয়ভার জন্য নূতন আবওয়াব জমিদার ও প্রজাবর্গের স্কন্ধে স্থাপিত হইয়াছিল। আরও মনসুর বাজারের আয় হইতে দৌহিত্রের বিলাস ব্যয় সংগৃহীত হইত। ঐ বাজার উক্ত প্রাসাদের নিকট প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। নবাব এইরূপে সিরাজউদ্দৌলা আর যাহাতে বিদ্রোহী না হয় উহারই চেষ্টা করিয়াছিলেন বোধ হয়।
যখন ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে হুগলীতে রাজপরিদর্শন জন্য পাঠাইয়াছিলেন, সেই সময়েই ইউরোপীয় বণিকগণের নিকট হইতে নানা পূজোপহার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। রাজ রাজবল্লভ ঢাকার সর্ব্বময় কর্ত্তা। নোয়াজিস মহম্মদ নামে ঢাকার কর্ত্তা, তিনি সেখানে কখন যাইতেন না, বা থাকিতেন না। কোম্পানির ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দের ১২ই ফেব্রুুয়ারির মন্ত্রণা বিবরণীতে দেখা যায় যে, রাজা রাজবল্লভ সেলামির জন্য জুলুম জবরদস্তী করিয়া ইংরাজের কয়েকজন গোমস্তা ও চালের নৌকা আটক করিয়া এই আদেশ প্রচার করেন যে, যাহাতে কেহ ইংরাজের অধীনে তখন কর্ম্ম না করে। কি ইংরাজ, কি ফরাসী, কি ওলন্দাজ সমস্ত ইউরোপীয় বণিকগণ তখন নবাবের কর্ম্মচারীগণের অত্যাচারে বিব্রত ও সকলে মিলিয়া নবাবের নিকট সুবিচারের জন্য আবেদন করিবেন স্থির করিয়াছিলেন। সেই সময়েই নবাব ও হুগলীর ফৌজদার এবং দেওয়ান নন্দকুমার নানা উপহার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সেই সর্ব্ব প্রথম ইংরাজি কাগজ পত্রে নন্দকুমারের নামোল্লেখ দেখা যায়।
টাঁকশাল ঃ— কোম্পানি কলিকাতায় টাঁকশাল করিবার জন্য ওয়াটস্ সাহেবকে বিশেষ সতর্ক করিয়াছিলেন যে, যাহাতে জগৎশেঠ উহার কোন সংবাদ না পান এবং সেজন্য দিল্লিতে ও মুর্শিদাবাদে প্রায় এক এক লক্ষ টাকা ব্যয় করা হইয়াছিল। মুসলমান রাজত্বে ষড়যন্ত্রেই সকলের সর্ব্বনাশ হইত। ঢাকার দেওয়ান গোকুলচাঁদের পদচ্যুতিতে রাজবল্লভের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। আবার রাজবল্লভকে হিসাব নিকাশ দিবার জন্য মুর্শিদাবাদে আসিলে ঢাকায় উহার প্রভুত্ব লোপ হইয়াছিল। নোয়াজিস ও সইদ আহম্মদ দুইজনেই ঐ সময় ইহলীলা সম্বরণ করেন। নবাবও মৃত্যুশয্যায় শায়িত, সিরাজউদ্দৌলার প্রতিদ্বন্দ্বীকে সিংহাসনে বসাইবার চক্রান্ত করায় রাজবল্লভ সিরাজউদ্দৌলার চক্ষুশূল হইয়াছিলেন। সেইজন্য রাজবল্লভ পুত্র কৃষ্ণদাসকে ঢাকা হইতে সপরিবারে জগন্নাথ যাত্রার অছিলায় কলিকাতায় আশ্রয় লইতে উপদেশ দিয়াছিলেন। উহা কার্য্যে পরিণত হইলে সিরাজউদ্দৌলা আলিবির্দ্দ খাঁর কর্ণগোচর করান। নবাবের সহিত দৌহিত্রের ঐ সংক্রান্ত কথোপকথনের সময় ইংরাজ ডাক্তার ফোর্থ সাহেব উপস্থিত ছিলেন বলিয়া হলওয়েল লিখিয়াছেন। নবাব উঁহাকে তৎকালীন ইংরাজদিগের সৈন্যবল ও জাহাজাদির কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। ওয়াটস্ সাহেব সংবাদ করিলেন যে, নবাব দরবার হইতে উহার সঠিক তথ্য অবগত হইবার জন্য গুপ্তচর প্রেরিত হইয়াছে, কারণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার অনুযোগ বিশ্বাস করেন নাই যে, চতুর ইংরাজেরা পলায়িত রাজবল্লভকে স্থান দান করিয়া নবাবের বিরাগভাজন হইবে। ঐরূপ করিবার কোন বিশেষ উদ্দেশ্যও তখন তিনি বুঝিতে পারেন নাই। যদি বস্তুতঃ সিরাজউদ্দৌলা বিলাসি ও অকর্ম্মণ্য হইত, তাহা হইলে কি এইসব গুরুতর বিষয় তাহার লক্ষ্যের মধ্যে আসিতে পারিত। অতীত ঘটনা দ্বারা নিরপেক্ষভাবে আলিবর্দ্দি ও সিরাজউদ্দৌলার পরস্পর যোগ্যতার বিচার করিতে গেলে আলিবর্দ্দিকে কখনই সিরাজউদ্দৌলা অপেক্ষা যোগ্যতর বলিয়া স্বীকার করা যায় না। আলিবর্দ্দি সিরাজউদ্দৌলার শিক্ষা দীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। সিরাজউদ্দৌলা পণ্ডিত না হইলেও আলিবর্দ্দির মত কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতায় রাজ্যলাভ করে নাই। উহার বরং দূরদর্শিতা বা স্বাভাবিক শত্রু মিত্র জ্ঞান করিবার শক্তি মাতামহাপেক্ষা অধিক ছিল। ইংরাজ যে তাহার ভবিষ্যত শত্রু, ইহা সে রাজ্যলাভ করিবার পূর্ব্বেই স্পষ্টই বুঝিতে পারিয়াছিল। প্রবীন মাতামহ সিরাজউদ্দৌলার রাজ্যলাভের কোন বন্দোবস্তই ঠিক করিয়া যাইতে পারেন নাই। নবীন বালক আপনার বুদ্ধি, বিবেচনা ও যুদ্ধ দ্বারা উহা লাভ করিয়াছিল। উহার তখন ঘরে ও বাহিরে শত্রু বিলক্ষণ ছিল। মুসলমান ঐতিহাসিকগণ আলিবর্দ্দি খাঁর প্রশংসা করিয়াছেন কিন্তু উহার সমর্থন করা যায় না। আলিবর্দ্দি সরফরাজের নিকট হইতে গিরিয়ার যুদ্ধে রাজ্যলাভ সদুপায়ে করেন নাই। আলিবর্দ্দির পারিবারিক জীবনও সুখময় ছিল না কারণ, তিনি কন্যা বা দৌহিত্র কাহাকেও সংযমী হইবার উপদেশ দান করেন নাই বা সেদিকে কোন দৃষ্টিপাত করেন নাই। বরং উহারা যথেচ্ছাচারী তাঁহারই দোষে হইয়াছিল। তাঁহারই অকর্ম্মণ্যতায় বর্গীয় হাঙ্গামায় হৃতসর্বস্ব দরিদ্রধনী প্রজামণ্ডলী ইউরোপের বণিকগণের পক্ষপাতী হইয়াছিল ও তাঁহারই দোষে উমিচাঁদ ও তাঁহার কন্যারা ইংরাজাদি বণিকগণের সহিত ব্যবসাদি আরম্ভ করিয়াছিল। জামাতারা ঢাকাদির কর্ত্তৃত্ব না করিয়া রাজধানীতে বিলাসাদিতে মুগ্ধ হওয়ায় উহাদের নিম্ন কর্ম্মচারীরা সেই সকল স্থানের সর্ব্বেসর্ব্বা হইয়া ষড়যন্ত্রপ্রিয় ও অত্যাচারী হইয়াছিল। ইহাতেই রাজা রাজবল্লভ তাঁহার পুত্রকে কলিকাতায় আশ্রয় লাভ করিবার জন্য হলওয়েল ও মামিংহাম সাহেবকে পঞ্চাশ সহস্র মুদ্রা উপঢৌকন দিতে সক্ষম হইয়াছিলেন ও সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতে সাহসী হইয়াছিলেন। এমনকি, হলওয়েল বসেটি বেগমকে রাজবল্লভের উপপত্নী বলিতে ও উক্ত উপঢৌকন গ্রহণের কথা অস্বীকার করিতে কুষ্ঠিত হন নাই। যাহা হউক, এই সকল বিশৃঙ্খলার জন্য নবাব আলিবর্দ্দিই সম্পূর্ণ দায় ও দোষী। যিনি আপনার পরিবারবর্গের উপর কর্ত্তৃত্ব করিয়া তাহাদিগকে সৎপথালম্বী করিতে পারেন নাই ও অধীনস্থ কর্ম্মচারীরা যখন তাঁহার কুলে কলঙ্ক দান করিতে সক্ষম হইয়াছিল, এমনকি মুসলমান ঐতিহাসিকগণ সেই সকল কুৎসিত কথা প্রকাশ করিয়াছে তখন তাঁহার প্রজাবর্গকে শাসন করিবার ক্ষমতা কোথায়? তাঁহার পরিবারবর্গের কুৎসিত আদর্শ উহারা যে অনুসরণ করে নাই ইহা কে বলিতে পারে? রাজার আদর্শ প্রজা অনুসরণ করিয়া থাকে ইহা সর্ব্ববাদি সম্মত। সরফরাজের হস্ত হইতে রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া দেশের ও দশের তিনি কি হিতসাধন করিয়াছেন উহা কোন ঐতিহাসিক কিছুই লিপিবদ্ধ করিয়া যান নাই। আলিবর্দ্দি খাঁর সময়েই ইউরোপের বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজশক্তি লাভের চেষ্টা জাগরুক হইয়াছিল। বুদ্ধিমান সিরাজউদ্দৌলা উহা দমন করিতে গিয়া ঘরের শত্রু বিভীষণের হস্তে প্রাণ ও রাজত্ব হারাইয়াছিল। বিশ্বাসঘাতেকতায় গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দ্দি খাঁর উত্থান ও পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতন হইয়াছিল। দোস্ত মহম্মদ ও রহিম খাঁকে উৎকোচ দ্বারা বশীভূত করিয়া নজর আলি নামক বেগমের প্রিয়পাত্র ও পরামর্শদাতা হইয়া ১২।১৩ লক্ষ টাকার মণি মুক্তাদি লইয়া পলায়ন করে ইহা মুস্তাফা বলিয়াছিলেন। ঘসেটি বেগম ও শওকৎজঙ্গ দুইজন সিরাজউদ্দৌলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কলিকাতার কোম্পানির কর্ম্মচারীরা যে পক্ষের জয় হইবে সেই পক্ষকে উপযুক্ত পূজোপহার দ্বারা বশীভূত করিবেন স্থির করিয়া নিশ্চিন্ত ছিলেন। নবাব আলিবর্দ্দি খাঁ ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে এপ্রেল মাসে ইহলোক ত্যাগ করিয়া যান। দু’একদিন পরেই সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতার প্রেসিডেন্টের নিকট মেদিনীপুরের ফৌজদারের ভ্রাতা নারায়ণ সিংহকে পাঠাইয়া কৃষ্ণবল্লভকে পাঠাইবার পত্র প্রেরণ করেন। সে ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে নগরে প্রবেশ করিয়া উমিঁচাদের গৃহে উপস্থিত হয় ও শেষে উহার সঙ্গে যথাস্থানে পত্র দান করে। কলিকাতা কাউন্সিল প্রেরিত পত্র সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া উহা গ্রহণ করা উচিত নয় স্থির করেন। যথাসময়ে সেই অপমান বার্ত্তা সিরাজউদ্দৌলার কর্ণগোচর হইল, কিন্তু তিনি তখন নীরব ও নিশ্চেষ্ট থাকিয়া আপনার সিংহাসন প্রথমে যাহাতে নিষ্কণ্টক হয়, উহারই চেষ্টায় মনোযোগ করিলেন। ইহা কি মূর্খ বালসুলভ উচ্ছৃঙ্খল যুবকের কার্য্য? যদি তিনি তাঁহার হিতকাম উপদেষ্টৃগণের সৎপরামর্শানুসারে ঐরূপ করিয়া থাকেন, তবে তিনি যে উচ্ছৃঙ্খল একথা ’ত প্রমাণ হয় না। তিনি সৎপরামর্শের বশীভূত হইয়া কার্য্য করিতেন ইহাই স্বীকার করিতে হয়। সিরাজ প্রথমেই মতিঝিল হইতে ঘসেটি বেগমকে আনাইয়া অন্যত্র তাঁহাকে অবরুদ্ধ ও তাঁহার যাবতীয় সম্পত্তি রাজকোষভুক্ত করিয়াছিলেন। যে সকল ব্যক্তি ঘসেটি বিবিকে উত্তেজিত করিয়া তাহার অর্থে উদর পূরণ করিতেছিল তাহারা কার্য্যকালে সকলে পলাইয়া যায়। সে সকল লোক আর মুর্শিদাবাদে থাকিতে সাহস করিল না। বেগমের দল এইরূপে একেবারে ভাঙ্গিয়া গেল ও রাজবল্লভের জারিজুরি শেষ হইল। ইহা নিশ্চয়ই সিরাজউদ্দৌলার গৌরব ও ক্ষমতার পরিচয় দান করে।
ফরাসীগণের সহিত আবার ইংরাজের যুদ্ধ হইবার উপক্রম হওয়ায় কোম্পানির কর্ত্তৃপক্ষগণ এদেশের কর্ম্মচারীগণকে ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে ২৯ এ জানুয়ারির পত্রে বিশেষ সাবধান হইয়া আত্মরক্ষার ও সুবেদারের অনুগ্রহ পাত্র হইবার বিধিমত উপদেশ দিয়াছিলেন। ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে বিলাত হইতে তিন চারিজন অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার পাঠাইবার অনুরোধ হইয়াছিল যে, যাহাতে তাহারা আসিয়া যথারীতি কলিকাতার দুর্গ সংস্কার বা দৃঢ় করে। প্রাচীন দুর্গ ভাঙ্গিয়া গড়িতে অনেক অর্থ ব্যয়, সেইজন্য দুর্গ সংস্কার ও নির্ম্মাণ কার্য্য আরম্ভ করা হইয়াছিল। ইহাও নবীন নবাবের কর্ণগত হইয়াছিল ও তিনি উহা বন্ধ ও ভাঙ্গিয়া ফেলিবার পরোয়ানা জারি করিয়াছিলেন। উহা তিনি পূর্ণিয়া যাত্রার দিন করিয়াছিলেন।
পাঠানেরা ভারতবর্ষে আসিয়া ধর্ম্মাধর্ম্ম কর্ম্মাকর্ম্ম বিচার না করিয়া কিসে আপনার উন্নতি হয় সেই দৃষ্টান্ত সর্ব্বত্রই আদর্শ করিয়াছিল, সেইজন্য আলিবর্দ্দি খাঁকে বহির্শ্রুত্রুর বিদ্রোহাদিতে কষ্ট পাইতে হইয়াছিল। তদপেক্ষা সিরাজউদ্দৌলাকে আত্মীয় স্বজনের ও তদধীন কর্ম্মচারীগণের গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতায় উৎপীড়িত হইতে হইয়াছিল। তখন সকলেই আলিবর্দ্দি যে উপায়ে সরফরাজের নিকট হইতে রাজত্ব লইয়াছিল উহারই অনুসরণ করিবার জন্য ব্যস্ত। মিঃ সিডনে ওয়েল সাহেব তাঁহার মোগল সাম্রাজ্যের পতন নামক পুস্তকে এইরূপই বলিয়াছেন। উহা সন্নিবেশিত করা হইল:—
(Page 228) “The Afghan soldiery whom Nadir had repelled from Persia and their own country, and whose settlement in India had been the original pretend of his invasion. These men, arrogant, brutal, treacherous, snd insubordinate, could only be kept in good temper by lavish indulgence of their greedy disposition. They resented Aliverdhi’s strict discipline. They had no sympathy with his desire to husband the resources of the country, and to improve its civil administration. Bent upon this and cramped by consatant military requirements, Aliverdhi was unable to gratify their insatible appetites or even to fulfil the expectations which he had led them to entertain as the reward of their services in the field. Hence they were ever ready to join in disturbances, to break out into rebellion against him, and to become tools of leaders as unprincipled as themselves, and ambitious to repeat the subversive part which Aliverdhi had played against Serfaraj.”
নবীন সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফর আত্মীয় হইলেও শত্রু বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে পদচ্যুত করেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, অবসর পাইলে সে রাজ্যলাভের জন্য সরফরাজের মত তাঁহাকে বলি প্রদান করিবে। তিনি মুসলমান অপেক্ষা হিন্দু কর্ম্মচারীগণকে অধিক বিশ্বাস করিতেন ও সেইজন্য মোহনলাল ও মীরমদন প্রভৃতি অনেকে প্রধান মন্ত্রী আদি পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। ইহাতে পুরাতন প্রবীন মুসলমানগণ ও হিন্দু কর্ম্মচারীরা আপনাদিগকে অপমানিত জ্ঞান করিয়াছিল।
রিয়াজ উস্ সালাতিনে উল্লিখিত আছে যে, সকলেই সিরাজউদ্দৌলার দরবারে যাইতে শঙ্কিত হইত, কারণ তিনি বড়ই আত্মাভিমানী ও স্পষ্ট রূঢ়ভাষী লোক ছিলেন। যাবতীয় প্রধান সদস্যকে মোহনলালের নিকট উপস্থিত হইয়া সম্মান প্রদর্শন করিতে অনুমতি দান করিলে মীরজাফর উহা করিতে অসম্মত হইলেন ও দরবারে যাওয়া বন্ধ করিয়া দিলেন। আলিবর্দ্দি খাঁর নিজামতী দারোগা ও আরঙ্গজেবী নবাব গোলাম হোসেনকে, হয় মাসিক দুই শত টাকা বেতন স্বীকার, নয় দেশত্যাগের আদেশ দেন। সে মক্কা যাত্রার ছল করিয়া হুগলী প্রস্থান করে। ইহা বলিলেই চলিবে যে, তখন মুসলমান উচ্চ কর্ম্মচারীরা সিরাজউদ্দৌলার কঠোর আচরণে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়াছিল উহাতেই তাহাদের মুখপত্র মুতাক্ষরীণ মোহনলালের উন্নতির কারণ উহার ভগিনীদানই উল্লেখ করিয়াছেন ও নবীন নবাবের নানা দুশ্চরিত্র ও অত্যাচারের কথাও বলিয়াছেন। গোলাম হোসেন লিখিয়াছেন যে, মইনুদ্দীন প্রমুখের শোচনীয় হত্যাকাণ্ডের পরে আফগান বিদ্রোহীরা পর্য্যদস্ত হইলে সৈয়দ আহম্মদকে পাটনার নায়েবী পদ আলিবর্দ্দি দিবেন মনস্থ করিয়াছিলেন কিন্তু নবাব বেগমের কৌশলে উহা কার্য্যে পরিণত হয় নাই। সিরাজউদ্দৌলা পৈত্রিক পদ প্রাপ্ত না হইলে তিনি আত্মহত্যা করিবেন এই ভয় দেখাইয়া আলিবর্দ্দির সেই সঙ্কল্প পরিত্যাগ করাইয়াছিলেন। নবাবের মৃত্যুর পূর্ব্বে উহার সুবেদারী দিল্লির দরবারে উৎকোচাদি দ্বারা সৈয়দ আহম্মদ আপনার নামে আনাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। উহাতেই সিরাজউদ্দৌলা পূর্ণিয়া যাত্রা করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার মনোভিষ্ট সিদ্ধ হয় নাই। রাজমহলে সিরাজউদ্দৌলা ইংরাজ কোম্পানির পক্ষ হইতে ড্রেক সাহেবের উত্তর পাইয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া উহার প্রতিকার করা প্রথম কার্য্য মনে করিয়া মুর্শিদাবাদে ফিরিয়া আসিলেন। গোলাম হোসেন বলিয়াছেন যে, শওকৎজঙ্গ সাধু ফকিরের আশ্রয় লওয়ায় উহাদের তপজপের বলেই সিরাজউদ্দৌলা অগ্রসর হইতে পারেন নাই।
সিরাজউদ্দৌলা প্রথমেই কাশিম বাজারে কুঠি অবরোধ করিলেন। হলওয়েল সাহেব লিখিয়াছিলেন যে, ড্রেক সাহেব পরামর্শ না করিয়াই এইরূপ উত্তর দিয়াছিলেন যে, নদীর ধারে পোস্তা ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় উহা মেরামত করা হইতেছে, কোন নূতন প্রাকার প্রস্তুত করা হয় নাই, মারহাট্টা বিপ্লবের সময় কেবল যে খাত করা হইয়াছে, উহা ভিন্ন আর কিছুই নূতন করা হয় নাই। সম্প্রতি ফরাসিদের সহিত যুদ্ধাশঙ্কা রহিয়াছে গত যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়া যাহাতে তাহারা মাদ্রাজের মতো কলিকাতা আক্রমণ করিতে না পারে তজ্জন্য যে কিছু করা আবশ্যক উহাই করা হইতেছে মাত্র বলেন। ঐতিহাসিক অর্ম্ম সাহেব ড্রেকের উত্তর সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে, ওয়াটস্ সাহেবের ড্রেক সাহেবকে সিরাজউদ্দৌলার মূল উদ্দেশ্যের কথা জানান উচিত ছিল, কারণ তিনি চিরাগত কিঞ্চিৎ অর্থ গ্রহণের জন্য ঐরূপ পরোয়ানা জারি হইয়াছে এইরূপ মনে করিয়া ঐরূপ সরল উত্তর দিয়াছিলেন। দেওয়ান দুর্ল্লভরাম ডাক্তার ফোর্থের মারফত বলিয়া পাঠাইলেন যে, বাগবাজারে পেরিন্ পয়েন্টে যে দুর্গপ্রাকার ও কেল্শাল সাহেবের বাগানে যে গড়বন্দী করা হইয়াছে উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিলেই নবাবকে নিরস্ত করা যাইতে পারে। ওয়াটস্ সাহেব দুর্ল্লভরামের দ্বারা অর্থ প্রয়োগে নবাবকে বশীভূত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু কোন ফলোদয় হয় না। তখন তিনি অগত্যা শেষে নবাবের নিকট উপস্থিত হইয়া নিম্নলিখিত মর্ম্মে একখানি মুচলকাপত্র স্বাক্ষর করেন যে, যদি কেহ নবাবের দণ্ড হইতে অব্যাহতি লাভ করিবার জন্য কলিকাতায় পলায়ন করে, তবে উহাকে নবাবের আজ্ঞা মাত্রেই তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিতে হইবে। গত কয়েক বৎসরের বাণিজ্যের দস্তকের হিসাব ও উহার অপব্যবহারের জন্য যে কিছু ক্ষতি হইয়াছে উহা পূরণ করিতে হইবে। পেরিন্ পয়েন্টের দুর্গ প্রাকার ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া কলিকাতায় হলওয়েল সাহেবের ক্ষমতা হ্রাস করিতে হইবে যাহাতে প্রজাগণের কোনরূপ ক্ষতি না হয় উহা করিবেন। কলেট ও ব্যাটসন উহাতে স্বাক্ষর করিলেন ও তিনজনে নজর বন্দী হইলেন। ঐতিহাসিক অর্ম্ম বলেন যে, নবাবের আদেশমত তাঁহার কর্ম্মচারীরা কোম্পানির দ্রব্যাদি তালাবন্ধ না করিয়া লুঠ করে ও তৎকর্ত্তৃক অপমানিত হইয়া লেফটেনান্ট ইলিয়ট অভিমানে আত্মহত্যা করিয়াছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিক মুতাক্ষারণ দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন যে, যে বিবাদ সামান্য কর্ম্মচারিগণের দ্বারা দু’এক কথায় মীমাংসিত হইতে পারিত উহার জন্য কলিকাতা যাত্রা করিয়া যুদ্ধ বিগ্রহ করিয়া আলিবর্দ্দি খাঁর পাপের অর্জ্জিত সোনার রাজ্য তাঁহার দুইজন মূর্খ বংশধর সিরাজউদ্দৌলা ও শওকৎজঙ্গের হস্তে পড়িয়া নষ্ট হইয়াছিল। হলওয়েল সাহেব সিরাজউদ্দৌলার ইংরাজ বিদ্বেষ আলিবর্দ্দি খাঁর অন্তিম উপদেশের ফলে হইয়াছিল বলিয়াছেন। উহার সার মর্ম্ম এই যে, আলিবর্দ্দির চিরজীবন যুদ্ধ ও কৌশলে অতিবাহিত করিয়াও শেষে শান্তি লাভ হইল না। তিনি সিরাজউদ্দৌলাকে নিরুদ্বেগে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য যে সকল কণ্টকোন্মোচন করিয়াছিলেন তাহাতে তিনি ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিন্ত হইতে পারেন নাই। হোসেনকুলী, নোয়াজেস মহম্মদ গিয়াছে, দেওয়ান মাণিকচাঁদকে রাজপ্রাসাদে তুষ্ট হইলেও তিনি ইউরোপীয়গণের দিন দিন যেরূপ শক্তি বর্দ্ধিত হইতেছে উহাই বড় আশঙ্কার বিষয় ও উহার প্রতিবিধান সিরাজউদ্দৌলাকে করিতে হইবে বলিয়াছিলেন। ভগবান যদি তাঁহার জীবন দীর্ঘ করিতেন, তবে তিনিই উহা করিতেন। অনেকেই ইহা হলওয়েলের কবিকল্পনা বলিয়া থাকেন, কারণ গোলাম হোসেনের কথার সহিত ইহার সামঞ্জস্য রক্ষা হয় না। আলিবর্দ্দির সেনাপতি মুস্তাফা খাঁ ইংরাজগণকে তাড়াইয়া দিবার প্রস্তাব করিলে তাঁহাকে ও তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রদ্বয়ের বারম্বার নিবর্বন্ধাতিশয়ে উত্যক্ত হইয়া নির্জ্জনে বলিয়াছিলেন যে, এখন স্থলে যে অগ্নি মারহাট্টারা জ্বালাইয়াছে উহা নির্ব্বাণ করিতে পারিতেছ না, আবার জলে উহা জ্বালাইতে চাও। তোমরা যুদ্ধ করিতে ভালবাস কিন্তু ভবিষ্যত পরিণামের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে জান না। যাহাই হউক, কি সূত্রে বিধাতার ভবিতব্যতা হইয়া থাকে উহার কারণ নির্ণয় করা অতীব দুরূহ। সিরাজউদ্দৌলা সবর্ব প্রথমে মীরজাফরকে পদচ্যুত করিয়াছিলেন আলিবর্দ্দিও উহাকে ঐরূপ করিয়াছিলেন। ঐ সম্বন্ধে মোগল সাম্রাজ্যের পতন লেখক এইরূপ উল্লেখ করিয়াছেন:—”Aliverdi in vain tried to expel the enemy from Calcutta; and in the course of these operations was obiliged to cashier two officers who had shown symptoms of treachery. One of them, Meer Jaffir, was afterwards the English Nawab of the Bengal Provinces.”
কলিকাতা হইতে উমিচাঁদের সম্পত্তি লইয়া সে যাহাতে অন্যস্থানে যাইতে না পারে তজ্জন্য কুড়িজন প্রহরী ইংরাজেরা নিযুক্ত করিয়াছিল। ঐসময় উমিচাঁদের আত্মীয় হুজরীমলকে ধরিতে গিয়া বেশ দাঙ্গাহাঙ্গামা হইয়াছিল। উহার জমাদার জগবন্ত সিংহ স্বয়ং তেরজনকে মারিয়া ফেলে ও ঘরে আগুন লাগাইয়া দেয়। নবাবের চরাধিপতি রাজারাম সিংহের পত্রে উঁমিচাদকে কলিকাতা ত্যাগ করিবার উপদেশ ছিল বলিয়া কোম্পানি ঐরূপ করিয়াছিল।
যিনি সিরাজউদ্দৌলার কথা লিখিয়া বিশেষ খ্যাতি অর্জ্জন করিয়াছেন, তিনি এই সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন উহা উল্লেখ করা নিতান্ত আবশ্যক। যথা ঃ—
* “ইংরাজেরা যে মুচলিকা পালন করিবেন না সেকথা অল্পদিনের মধ্যেই সিরাজউদ্দৌলার কর্ণগোচর হইল। তিনি ইংরাজদের কুটিল কৌশলের পরিচয় পাইয়া জ্বলিয়া উঠিলেন। ইহাঁরাই না বলিয়াছিলেন যে, নবাবের অভিপ্রায় কি, তাহা অবগত হইতে যাহা কিছু অপেক্ষা? ইঁহারাই না মুচলিকা পালন করিবেন বলিয়া বিবি ওয়াটসনের নয়নকজ্জলে ইংরাজ বন্দীর মুক্তিপত্র লিখাইয়া লইয়াছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা অনেক সহ্য করিয়াছেন আর সহ্য করিতে পারিলেন না—ইহাই তাঁহার সর্ব্ব প্রধান অপরাধ।” “সিরাজউদ্দৌলা পদে পদে অপমানিত হইয়া যেরূপ উত্যক্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন তাহা স্মরণ করিলে, কলিকাতা আক্রমণের জন্য তাঁহাকে ভর্ৎসনা করা যায় না।”
** “ইংরাজেরা পদাশ্রিত বণিক হইয়াও নবাবের বিনানুমতিতে যে দুর্গ প্রাকার রচনা করিয়াছিলেন কোন্ স্বাধীন নরপতি তাহা চূর্ণ করিবার জন্য আয়োজন না করিতেন? ইহাতে সিরাজউদ্দৌলা প্রবল প্রতাপ ও শাসনাঢ্যই প্রকাশিত হইয়াছে। ইংরাজেরা পলায়িত কর্ম্মচারীদিগকে নির্ব্বিবাদে কলিকাতার আশ্রয় দিবার অবসর পাইলে, নবাবের রাজশক্তিকে আর কেহ মুহূর্তের জন্যও সম্মান করিত না, আবশ্যক হইলেই কলিকাতায় পলায়ন করিত। শাসন সংরক্ষণের জন্য অবশ্যই তাহার গতিরোধ করা আবশ্যক। কোম্পানির নামের দোহাই দিয়া ইংরাজগণ যাহাকে তাহাকে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করিবার পরোয়ানা বিক্রয় করিয়া আত্মোদর পরিপূর্ণ করিতেন, তাহাতে দেশের লোকের স্বাধীন বাণিজ্য অবসন্ন হইত, রাজকোষ শুল্কগ্রহণে অযথা বঞ্চিত হইত। এরূপ স্বেচ্ছাচার নিবারণ না করিলে কোন নরপতি সিংহাসনের অধিকারী বলিয়া গর্ব্ব করিতে পারিতেন? হলওয়েলের অত্যাচারে কালা বাঙ্গালী জর্জরিত হইতেছিল তাহার গতিরােধ করিবার চেষ্টা না করিলে, কোন্ নিরপেক্ষ ইতিহাস লেখক সিরাজউদ্দৌলাকে আশীর্ব্বাদ করিতে সম্মত হইতেন? এই মুচলিকা পত্রে সিরাজউদ্দৌলার যেরূপ চরিত্র প্রকাশিত রহিয়াছে, কয়জন সৌভাগ্যশালী স্বাধীন নরপতি বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার মসনদে উপবেশন করিয়া সেরূপ চরিত্রবল, সেরূপ শাসন কৌশল, সেরূপ প্রজাহিতৈষণার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন? তথাপি সিরাজউদ্দৌলা ইংরাজের ইতিহাসে ইহার জন্যও শত ধিক্কারে সম্বোধিত হইয়াছেন। সিরাজ অন্যের পরামর্শ গ্রহণের পাত্র ছিলেন না, তাহা পুনঃপুনঃ লিখিয়াও বিনা রক্তপাতে কাশিম বাজার অবরোধ সম্বন্ধে সিরাজকে তাঁহার অবশ্য প্রাপ্য প্রশংসা প্রদত্ত হয় নাই। “
কলিকাতার কৌন্সিল যদি কাশিম বাজারের কুঠিয়ালগণের প্রদত্ত মুচলিকা স্বীকার করিয়া কার্য্য করিতেন ও তখন যদি সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতা অধিকার করিতে যাইতেন, তাহা হইলে তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে দোষী বলা যাইতে পারে কিন্তু বিবি ওয়াটসের ক্রন্দনে সিরাজউদ্দৌলা জননীর অনুরোধ লঙ্ঘন করিতে পারেন নাই ও ইংরাজ কুঠিয়ালগণের মুক্তিদান করেন। অনেকের বিশ্বাস যে, হেষ্টিংস সাহেব ঐ সময় কান্তবাবুর আশ্রয়ে গিয়া বাঁচিয়া যান কিন্তু উহা * সত্য নহে, কারণ সে সময়ে তিনি আড়ঙ্গে গিয়াছিলেন। যখন হুগলীতে ইংরাজ কোম্পানি সিরাজউদ্দৌলাকে উপহারাদি দান করে তখন উহাদের উপর তাঁহার কোনরূপ বিদ্বেষানল ছিল না, কারণ তাঁহারই কথায় মুগ্ধ হইয়া মাতামহ আলিবর্দ্দি ইংরাজগণের পক্ষে পরোয়ানা জারি করিয়াছিলেন।
“যে কেহ সমুন্নত রাজশক্তির প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিবে, তাহাকেই পদানত করিবার জন্য রাজকোষ উৎক্ষিপ্ত হইয়া উঠিবে। ইহাই সকল দেশের রাজধর্ম্ম। সিরাজউদ্দৌলা সেই রাজধর্ম্মের মর্য্যাদা রক্ষার্থ পদাশ্রিত ইংরাজ বণিকের ধৃষ্টতার সমুচিত প্রতিফল প্রদান জন্য তাঁহাদিগের ক্ষুদ্র দুর্গ অবরোধ করিবার আদেশ প্রদান করিলেন।”
ইহাতেই দেখা যায় যে, সিরাজউদ্দৌলা রাজধর্ম্ম প্রতিপালন করিবার জন্য সরল মনে যাহা করিয়াছিল উহা বিধি বিড়ম্বনায় ও চক্রান্তকারীগণের বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁহার সর্ব্বনাশের কারণ হইয়াছিল। জগৎ শেঠের বংশধর মহাতাপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদ, উমিচাঁদ হুগলীর প্রধান সওদাগর খোজা বজিদ প্রমুখ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিগণ সাধ্যমত চেষ্টা করিয়া সিরাজউদ্দৌলাকে কলিকাতা আক্রমণ হইতে নিরস্ত করিতে পারেন নাই। এইরূপে ঐতিহাসিকগণের রুচি ও প্রবৃত্তি অনুসারে সিরাজউদ্দৌলার মূর্খতা বা কর্ত্তব্যনিষ্ঠা প্রমাণিত হইয়া থাকে। বিদ্যাবুদ্ধি ও শিক্ষার গুণে ও দোষে বানর মানুষ ও মানুষ বানর হইয়া থাকে। সিরাজ যে মূর্খ ছিল না, ইহা উহার রাজ্যলাভের কার্য্যকৌশলে পরিষ্কার প্রমাণ হয়। তিনি মুসলমান দরবারের মন্ত্রীবর্গের ক্রীড়াপুত্তলী ছিলেন না বলিয়াই মুসলমান ঐতিহাসিকগণ তাঁহার বিরুদ্ধে নানা অযথা কলঙ্ক দান করিয়াছেন। তিনি যদি গুণের আদর করিয়া মোহনলাল মীরমদন প্রমুখ হিন্দুগণের পক্ষপাতী না হইতেন, তাহা হইলে বেধ হয়, তাঁহার কথা মুসলমান ঐতিহাসিকগণ অন্যরূপ লিখিতেন। কালে ভস্মাচ্ছাদিত সত্য প্রকাশ হইয়া পড়ে। কেহই সিরাজউদ্দৌলার নৃশংসতা, প্রতিহিংসা প্রভৃতি নীচবৃত্তির উদাহরণ, কি মুর্শিদাবাদ অবরোধ, কলিকাতাধিকার বা সিংহাসনারোহণের কথায় দেখাইতে পারেন নাই। সিরাজউদ্দৌলা যে একজন গুণগ্রাহী ব্যক্তি ছিলেন, ইহা মোহনলালের সামান্যাবস্থা হইতে প্রধান মন্ত্রীত্বে উন্নীত হওয়ায় প্রামণিত হয়। সেইজন্য মীরমদনাদি অন্যান্য হিন্দু কর্ম্মচারীগণেরও সেইরূপ উন্নতি হইয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলা বাহুবলের উপর নির্ভর করিয়া প্রিয় মাতামহ আলিবর্দ্দিরও বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়াছিলেন। সেইরূপ রাজ্যলাভ করিয়া ইংরাজ বণিকগণকে শাসন করিবার জন্য কলিকাতা আক্রমণ করা স্থির করিয়াছিলেন। ইহাতে তিনি যে শৌর্য্য বীর্য্যের পক্ষপাতী ছিলেন ইহাই প্রমাণিত হয়। তিনি নীচ কৌশলের দ্বারা মনোভীষ্ট সিদ্ধ করিবার লোক ছিলেন না। মুসলমান নরাধিপের কলঙ্ক সিরাজউদ্দৌলায় ছিল না বলিয়া তাঁহার প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তিনি মনে করিলে অনায়াসে অর্থবলে বা কৌশলে ইউরোপের বণিকগণ দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধি ও রাজ্যবৃদ্ধি করিতে পারিতেন কিন্তু হলওয়েলের পত্রে স্পষ্টই প্রকাশ পায় যে, তাঁহার মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, ইংরাজগণকে তাঁহার রাজত্ব হইতে দূর করিয়া উহাদের অর্থলাভ ও ষড়যন্ত্রের দৌরাত্ম্য শেষ করা। তিনি সেইজন্যই কলিকাতা আক্রমণের সময় সকলের কথা উপেক্ষা করিয়াছিলেন। হায়! তিনি কৃতকার্য্য হইয়াও বিশ্বাসঘাতকতায় উহার শেষ রক্ষা করিতে পারিলেন না। তিনি জুজুর ভয়ে ভীত হইয়া ঐ সঙ্কল্প ত্যাগ করেন নাই, উহা নিশ্চয়ই প্রশংসার কথা। তিনি নিশ্চয়ই জব চার্ণকাদির কথা অবগত ছিলেন ও দাক্ষিণাত্যের জয় বার্ত্তার কথা অজ্ঞাত ছিলেন না। তিনি আরও ফরাসি ও ওলন্দাজগণক ইংরাজের বিরুদ্ধে সহায়তা করিতে অনুরোধ করিয়া বুঝিয়াছিলেন যে, উহারা এদেশের শাসনকর্ত্তাদের জন্য স্বধর্ম্মী ইউরোপবাসীর সহিত বিবাদ করিতে প্রস্তুত নয়। সেইজন্য ইহারা ইউরোপের সন্ধির কথা উল্লেখ করিয়া নবাবের সে অনুরোধ রক্ষা করে নাই। কণ্টকের দ্বারা কণ্টক উৎকীর্ণ করিবার রাজনীতির কথা সিরাজউদ্দৌলা অবগত ছিলেন উহাই প্রমাণিত হয়। অর্থ লোভে তিনি যে কলিকাতা আক্রমণ বা কাশিম বাজার অবরোধ করেন নাই ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে। কারণ হলওয়েল সাহেব স্পষ্টই বলিয়াছেন যে, সে কৌশল দ্বারা ইংরাজ কোম্পানি কৃতকার্য্য হন নাই। থরনটন সাহেবও ঐকথা বলিয়াছেন ঃ—
“The usual method of continuing the angry feeling of Eastern princes was resorted to. A sum of money was tendered in purchase of the Subader’s absence but refused.”
ফরাসিরা সিরাজউদ্দৌলাকে কেবলমাত্র বারুদ দিয়া সহায়তা করিয়াছিল। উমিচাঁদ কলিকাতা আক্রমণের সংবাদ পূর্ব্বেই পাইয়াছিল ও ইংরাজেরাও উহা জানিতে পারিয়াছিল। সেই সংবাদে শ্রদ্ধেয় অক্ষয় মৈত্রেয় মহাশয় কলিকাতার অবস্থা যেরূপ লিখিয়াছেন উহাই উদ্ধৃত করিলাম ঃ— “কলিকাতার লোকে সংবাদ পাইয়া একেবারে জড়সড় হইয়া উঠিল এত কল কৌশল, এত সগর্ব্ব আস্ফালন, এত রণকৌশল শিক্ষা প্রণালী সকলই যেন সিরাজউদ্দৌলার নামে সহসা অবসন্ন হইয়া পড়িল। নগরের মধ্যে তুমুল কোলাহল উপস্থিত হইল। ইংরাজ অধিবাসিগণ যিনি সেখানে ছিলেন, মুহূর্তের মধ্যে আপন আপন সুসজ্জিত বাসভবনের দিকে সাশ্রুনয়নে একবার মাত্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া স্ত্রী পুত্র লইয়া দুর্গাভ্যন্তরে পলায়ন করিতে লাগিলেন দেশীয় বণিকগণ যিনি যে পথে সুবিধা পাইলেন নগর হইতে বহিষ্কৃত হইয়া পড়িতে লাগিলেন পথে ঘাটে, নদী সৈকতে, বনান্তরালে সকল স্থানেই মহা কলরবে নরনারী বালকবালিকা, শত্রু মিত্র কাতারে কাতারে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। সকলেই পলায়ন করিল, কিন্তু হায়! ফিরিঙ্গিদল বড়ই বিপন্ন হইয়া পড়িল। ইংরাজের অনুকরণ করিয়া সাহেব সাজিয়া দেশের লোকের সঙ্গে প্রণয়বন্ধন বিচ্ছিন্ন করিয়া এতদিন ফিরিঙ্গিদিগকে বিশেষ ক্লেশ ভোগ করিতে হয় নাই। কিন্তু আজ বিপদের দিনে তাহাদের মসী-মলিন মূর্ত্তির উপর তুষার ধবল সাহেবী পরিচ্ছদ বড়ই বিড়ম্বনার কারণ হইয়া উঠিল।” ইহার মধ্যে যে কোন কথা অতিরঞ্জিত নাই, ইহা বলিতে পারা যায় না কারণ তখন ইংরাজেরা সাহেবী পোষাক ত্যাগ ও এদেশী সাজসজ্জা আহার বিহারে মত্ত ইঁহা সেকালের বিবরণে উল্লেখ আছে। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ঐ কলিকাতার অবস্থার কথা যাহা কিছু বলিয়াছেন উহার মধ্যে কলিকাতার দেশী বণিক বাসিন্দারা পলাইয়া কোথায় গিয়াছিল উহার কোন উল্লেখ নাই। আরও যখন কলিকাতা জয়ের পর যাহারা উহা ত্যাগ করিয়া পলায়ন করে নাই, তাহারাই ক্ষতিপূরণের অর্থ লাভ করিয়াছিল, তখন সকলেই যে কলিকাতা ত্যাগ করিয়া গিয়াছিল একথা স্বীকার করা যায় না। যাহাই হউক, সিরাজের আক্রমণের পূর্ব্বে কলিকাতার কিরূপ অবস্থা হইয়াছিল উহার কোন বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ প্রকাশিত হয় নাই বলিলেই চলে। অতএব পূর্ব্বোক্ত বিবরণের অধিকাংশ কল্পনাপ্রসূত ভিন্ন আর কিছুই নয়। কারণ যে দুর্গে কলিকাতার অধিবাসীরা আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল উহার চিহ্ণমাত্রও এখন দৃষ্ট হয় না। আর সেই দুর্গের অবস্থা সম্বন্ধে Early Records of British India or First Report of the Commitee of the House of Commoons. 1772—এ যাহা আছে তাহা অতি শোচনীয়। উহার সার মর্ম্ম এই যে, দুর্গের প্রাচীর এরূপ জীর্ণ ছিল যে, উহার মধ্যে বাস করা যায় না, তদ্ভিন্ন কামানাদি চক্রহীন, গতিহীন অবস্থায় বরুজের উপর সন্নিবেশিত, গোলা বারুদাদি ও রসদ যাহা ছিল উহাতে তিন দিনের অধিক অধিক আত্মরক্ষা করা যাইতে পারে না। ইহাতেই মনে হয় যে, ইংরাজ বণিকেরা মনে করিয়াছিলেন যে, নবাবকে তাহারা যে কোন উপায়ে প্রতারিত করিতে পারিবেন কিন্তু শেষে উহা কার্য্যে ফলবতী হয় নাই।
* কিন্তু শ্রদ্ধেয় মৈত্রেয় মহাশয় বলিয়াছেন যে, “সমসাময়িক ইংরাজ এবং বাঙ্গালী মিলিয়া যাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়াছিল, পরবর্ত্তী ইংরাজ এবং বাঙ্গালীর নিকটেও তিনি সুবিচার লাভ করিতে পারেন নাই। বাঙ্গালী সিরাজউদ্দৌলাকে কি জন্য সিংহাসনচ্যুত করিয়াছিল, এ পর্য্যন্ত তাহার বিচার হয় নাই কিন্তু এদেশে বাণিজ্য করিতে আসিয়া, রাজবিদ্রোহীদিগের সঙ্গে গুপ্ত মন্ত্রণায় মিলিত হইয়া, ইংরাজগণ কি জন্য সিরাজউদ্দৌলালার সর্ব্বনাশের সহায়তা করিয়াছিলেন, ইংলণ্ডের লোক উহার বিচার করিয়াছিল। সেই বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অভিযুক্ত ইংরাজগণ সিরাজউদ্দৌলার যে সকল অপবাদ রটনা করিয়াছিলেন তাহাই এখন ইতিহাসে বাস্তব ঘটনা বলিয়া সমাদরে স্থান লাভ করিয়াছে।
সেকালে বাদশা নবাব বা রাজাদের ইন্দ্রিয় সেবা অবশ্য কর্ত্তব্য বিষয় বলিয়া সমাজে আদৃত হইত, তখন উহা বড় দোষাবহ ছিল না। উহারা গোপনে অন্তঃপুরে কে কি করিত, উহার সন্ধান পাওয়া কাহারও সুবিধা ছিল না। আলোচনা করার সুযোগ’ত দূরের কথা বলিলেই চলে, তখন ঐ সকল কথা কেমন করিয়া পরবর্ত্তীকালের ঐতিহাসিক বলিয়াছেন, ইহা বুঝিতে পারা যায় না। কেহই কখন উঁহাদের নিকট ধর্ম্ম জীবনের আদর্শ প্রত্যাশা করে নাই।
বাঙ্গালার শেষ নবাবঃ— প্রাচীন আর্য্য হিন্দু রাজারা ভিন্ন অন্য কেহই নৈতিক জীবনের আদর্শ হইতে পারেন নাই। প্রায় সকল ঐতিহাসিকই শাসনকর্ত্তা হিসাবে আকবরের সুখ্যাতি করিয়াছেন কিন্তু তাঁহারও ধর্ম্ম, কর্ম্ম ও চরিত্র কলঙ্কহীন ছিল না বলিলেই যথেষ্ট হইবে। পৃথিবীতে নৈতিক জীবনের বিচার ভিন্ন ভিন্ন জাতির ধর্ম্ম ও আচার ব্যবহারানুসারে হইয়া থাকে। মুসলমান নরপিতরা প্রায় অধিকাংশই অত্যাচারী ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র ছিল। নৃশংসতা উহাদের অঙ্গের ভূষণ স্বরূপ বলিলে অত্যুক্তি হয় না। সেই সকল সম্রাট ও নরপতির প্রশংসা যে সকল মুসলমান ঐতিহাসিকগণ করিয়াছেন উঁহাদের পদাঙ্কানুসারিগণ কেন যে সিরাজউদ্দৌলার উপর তদ্বিপরীত সম্পূর্ণ অবিচার করিয়াছিলেন উহার মূল কারণ নির্দ্ধারণ করা যায় না। আলিবর্দ্দির চরিত্রগত কোন দোষের উল্লেখ না থাকিলেও তাঁহার এক বিশ্বাসঘাতকতা ও কৃতঘ্নতা দোষে অন্যান্য যে কিছুগুণ ছিল, উহা নষ্ট করিয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলার সেই মারাত্মক দোষ সকল না থাকায় ও অতি অল্প বয়সে অশিক্ষিত হইলেও তিনি যে কাপুরুষ ছিলেন না এবং সূক্ষ্ম রাজনীতির ধর্ম্মভেদ করিতে পারিতেন ইহাই অতি গৌরবের কথা। তিনি যদি ভীরু কাপুরুষ হইতেন তাহা হইলে কখনই স্বয়ং ইংরাজের বিপক্ষে কলিকাতা আক্রমণ করিবার জন্য অগ্রসর হইতে পারিতেন না, কারণ তদ্বিরুদ্ধে রাজত্বের প্রধান প্রধান কর্ম্মচারীরা বিরোধী। তিনি শওকৎজঙ্গকে যুদ্ধ করিয়া পরাস্ত করিয়াছিলেন। মাতামহের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই মীরজাফরকে পদচ্যুত করিয়া অনেকের মতে তিনি ভাল বুদ্ধিমানের কার্য্য করেন নাই, কিন্তু উহার সমর্থন করা যায় না। কারণ যাহার পরামর্শের উপর নির্ভর করিয়া কার্য্য করিতে পারিবেন না, তেমন ব্যক্তিকে রাজ্যের প্রধান স্বরূপ কার্য্য করিতে দেওয়া মঙ্গলের কথা নয়। যে ইংরাজের বিরুদ্ধে দিল্লির সম্রাট মার্হাটারা দণ্ডায়মান হয় নাই, উহাদের উচ্ছেদ সাধন করিবার যে মুসলমান নবীন নরপতির সংকল্পও কিয়ৎপরিমাণে সফল হইয়াছিল তাহার সাহস ও বিক্রমের সুখ্যাতি না করিয়া থাকা যায় না। সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করিয়াই ইংরাজ জাতির গৌরব ব্যাপ্ত হইয়াছিল উহাও কি সিরাজউদ্দৌলার গৌরবের কথা নয়? ডিউক্ অফ্ ওয়েলিংটন মহাবীর নেপোলিয়নকে পরাজিত করিয়াই চিরস্মরণীয় হইয়াছিলেন। আরও ন্যায় যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হয় নাই, উহা মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাতেই হইয়াছিল। তদ্ভিন্ন সেই নবাব জীবিত থাকিলে পাছে, উহার পক্ষ হইয়া দেশের লোক যুদ্ধ করে, সেই ভয়ে বিনা বিচারে যাহার কোন ক্ষমতা নাই সেই মূর্খ মীরণের আজ্ঞায় নবাবকে হত্যা করিয়া তাঁহার সেই বিভীৎস মৃতদেহ শহরের চারিদিকে হস্তীপৃষ্ঠে প্রত্যক্ষ করান হইয়াছিল। উহা দ্বারা সকলের মনে ভীতি উৎপাদন করা ও যুদ্ধের ফল ঘোষণা মূল উদ্দেশ্য ছিল। সিরাজউদ্দৌলার যত কিছু কলঙ্কের কথা থাকুক না, উহার মধ্যে যে তাঁহার গৌরবের কথা শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া আছে ইহা কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না। তিনিই প্রকৃত প্রস্তাবে বাঙ্গালার শেষ নবাব, যিনি আপনার আধিপত্য স্থাপন করিবার জন্য কি ইংরাজ, কি ফরাসী, কি ওলন্দাজ, কি মুসলমান প্রতিদ্বন্দ্বী শওকৎজঙ্গ কাহাকেও দৃকপাত করেন নাই। তিনি তখনকার মুসলমান নবাবগণের ন্যায় দরবারের চক্রান্তের বশবর্ত্তী হহয়া কোন মন্ত্রী বা সেনাপতির আজ্ঞাবহ হইয়া রাজ্য করা অপেক্ষা নিজের বল বুদ্ধির উপর নির্ভর করিয়া আধিপত্য করা কিম্বা জীবন উৎসর্গ করা শ্রেয়ঃ স্থির করিয়াছিলেন। ইহাতেই চতুর ইউরোপের সকল বণিকেরা ত্র্যস্ত হইয়াছিল। সেইজন্যই উহাদের মধ্যে আন্তরিক শত্রুতা থাকিলেও কেহই নবাবের সহায়তা করিতে চাহে নাই। ফরাসি ওলান্দাজেরা স্পষ্টই বুঝিয়াছিল যে, নবাব ইংরাজকে তাহাদের সাহায্যে পরাজিত করিয়া কলিকাতা হইতে বিতাড়িত করিলে, একদিন উহাদেরও সেই অবস্থা হইবে। দূরদর্শী ইউরোপের বণিকগণ সকলেই চতুর ও কর্ম্মতৎপর ছিল। তাহাদের বিরুদ্ধ কৃতঘ্ন কর্ম্মচারী ও বন্ধুবর্গে পরিবেষ্টিত নবাব যতই চতুর হউক না কেন, উহার যে সিরাজউদ্দৌলার মত পরিণাম হইবে না ইহার প্রমাণ কি? হইতে পারে যে, সিরাজউদ্দৌলা যথাসময়ে আটঘাট চতুর্দ্দিকে বাঁধিয়া কার্য্য করেন নাই বলিয়া তাঁহার পতন হইয়াছিল কিন্তু যেখানে স্বজাতি স্বধর্ম্মাবলম্বীকে বিশ্বাস করা যায় না, বরং বিজাতি বিধর্ম্মীকে উহা করিত হয়, সেখানে সময়াসময়ের জন্য শত্রুগণকে অবসর দান করা কি মূর্খতার পরিচয় নয়? ঘটনাচক্রে ভগবান ভূত হইয়া থাকেন, সিরাজউদ্দৌলার সম্বন্ধে উহা যে হয় নাই, ইহা কে বলিতে পারে? সত্যের অনুরোধে ব্যক্তিবিশেষের উপর অবিচার হইলে সকল বিষয়ের দুইদিক দেখা আবশ্যক হইয়া পড়ে। সুতরাং উহা কোন পক্ষপাতীত্ব নহে। ক্লাইবের জীবন চরিত লেখক কর্ণেল মালিসন সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁহার মাতামহ সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন উহা নিম্নে দেওয়া গেল।
লেখক সিরাজউদ্দৌলার স্বদেশ-প্রেম, স্বাধীনতা ও সততার সর্ব্বান্তঃকরণে প্রশংসা করিয়াছন ও আলিবর্দ্দি যে উৎকোচাদি অর্থের অপব্যবহার করিয়া বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব হইয়াছিলেন স্পষ্ট বলিয়াছিলেন।
হিল সাহেবের বেঙ্গল রেকর্ডে দেখা যায় যে, আলিবর্দ্দি ৯ই এপ্রিল ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে মির্জা মহম্মদের নাম সিরাজউদ্দৌলা রাখিয়া আপনার উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়াছিলেন। মুর্শিদাবাদের মসনদ লেখক সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতিচিহ্ণ সম্বন্ধে ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে যে পদ্য লিখিত হইয়াছে উহা উদ্ধৃত হইল।
“The desolator desolate
The Victor, the Arbiter of others wishes,
Now a supplicant for his own overthrown!”
আরও উল্লেখ আছে যে, যখন হস্তীপৃষ্ট হইতে সিরাজউদ্দৌলার রক্তাক্ত অস্থিকঙ্কাল কবরস্থ করা হয় তখন আলিবর্দ্দির কবর দ্বিধা হইয়া তাহার হৃদয় হইতে রক্ত বহির্গত হইয়াছিল।
হায়! বাঙ্গালার সিংহাসনাধিপতির দুর্দ্দশা দেখিয়া আর কেহই উহা অধিকার করিবার জন্য চেষ্টা ও সাহস করে নাই। যে করিয়াছে, তাহারও ভাগ্যে সেই শোচনীয় পরিণাম হইয়াছিল।
* রবার্টসনের The Trade of the East Indian Company-র ১৭৯ পৃষ্ঠারঃ—
In 1749 the Presidency of Madras entered unwarrantably into the war of
Tanjore which was followed by that of Arcot. This was contary to the wishes
of the Directors and should not be taken as evidence of the Military character
of the Company. The real truth lies in a complete understanding of the
genral development of the Company from a purely commercial enterprise to
a sovereign and rural in India.”
** “The English Company was not subjected to the dictation of the home
Government, so that, when the French attacked the English settlement, the
English attacked the French trade. The English navy defeated France, and
the French East India Company was compelled to surrender the English
settlements, which it had captured, but could not demand, in return, the
resititulition of its trade.” Robinson’s The Trade of the East India Company
(page171.) Sir Alfred Lyall has put forward a somewhat different view in
his book named Rise and Expansion of the British Dominion in India.
*** “Shayista then sent an expedition against Arakan and annxed it, changing
the name of Chittagong into Islambad, “the city of Islam” He little knew
that in suppressing piracy in the gulf of Bengal he was materially assiting
the rise of that future power, whose coming triumphs could scarecely have
been foretold from the humble beginning of the little factory established by
the English at the Hugli in 1640. Just twenty years after the suppression
of the Portuguese, Job Charnock defeated the local forces of the faujdar,
and 1690 received from Aurangjdeb, whose revenue was palpably suffering
from the loss of trade and customs involved in such hostilities, a grant of
land at Sutanuti, which he immediately cleared of jungle and fortified. Such
was the modest foundation of Calcutta. (page117)
* (Ibid. p. 118.) : The growth of the East India Company’s power, however be
longs to the period of the decline of the Moghal Empire : whilst Aurangjeb
lived, the disputes with the English traders were insignificant.”
* শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার মৈত্রের সিরাজউদ্দৌলা পৃষ্ঠা ১৫৭।
** ১৫৪ পৃষ্ঠা।
* Hasting Mrs. সিরাজউদ্দৌলা পৃষ্ঠা ১৪৮
* ৬৫ পৃষ্ঠা সিরাজউদ্দৌলা।
“Whatever may have been his faults, Serajuddullah had neither betrayed his master nor sold his country. Nay more, no unbiassed Englishman, sitting in judgement on the events which passed in the interval between the 9th February and the 23rd June, can deny that the name of Serajuddullah stands higher in the scale of honour than does the name of Clive. He was the only one of the principle actors in that tragic drama who did not attempt to deceive!” “Ali-Vardi Khan, who had risen from the position of a menial servane to be Governor of Behar, rose in revolts defeated and slew the representative of the family nominated by the Moghals in a battle at Gheria in January 1741 and proclaimed himself Subadar. Ali-Vardi Khan was a very able man. Having bribes the shadow sitting on the throne of Akbar and Aurangeb to recognise him as subadar Bengal, Bihar, Orissa, he ruled wisley and well.”
