৯. কলিকাতাধিকার ও নাম পরিবর্ত্তন
নবম পরিচ্ছেদ – কলিকাতাধিকার ও নাম পরিবর্ত্তন
মন্ত্রণাগারঃ— সেকালের জমিদারগণের মধ্যে সখ্যতা বা স্বার্থরক্ষার জন্য পরস্পর সম্মিলিত হইবার কোন কথা শুনিতে পাওয়া যায় না। উহাদের খাজনা আদায় দিবার জন্য মুর্শিদাবাদে যাতায়াত করিতে হইত। নবাবের প্রিয়পাত্রগণের সহিত সৌহার্দ্দ্য স্থাপন করা সেইজন্য বড়ই আবশ্যক হইত। আলিবর্দ্দি খাঁ জগৎ শেঠাদির সাহায্যে সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন। উঁহারাই অর্থশালী ও নবাবের অর্থ সরবরাহ ও হুণ্ডীতে খাজনা দিল্লির দরবারে পেশ করিতেন। জমিদারেরাও উঁহাদের নিকট হইতে অর্থাদি কর্জ্জ করিয়া নবাবের খাজনা দিতেন। ক্রমে ক্রমে সেই শেঠভবনে জমিদারগণ একত্রিত হইত ও পরস্পরের মধ্যে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হইতেছিল। ঋণদাতার কথা তাহাদের সকলকেই অবনত মস্তকে পালন করিতে হইত। ইহাতেই সেকালে জগৎ শেঠের বংশধরেরা নবাব অপেক্ষা বলবান হইয়া পড়েন। তাঁহাদেরই তত্ত্বাবধানে নবাবের মুদ্রাদি টাকশালে মুদ্রিত হইত। তাহাদের সেই পুরাতন ভগ্নাবশেষ বাসস্থানের নিকট টাঁকশালের বনিয়াদ এখনও দৃষ্ট হইয়া থাকে।
জমিদারগণের উপর জগৎ শেঠের ক্ষমতা বিস্তার বাঞ্ছনীয় নয়, ইহা সিরাজউদ্দৌলা সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিলেন। সেইজন্য নবীন নবাবের উপর উঁহার মাতামহের মত তাঁহাদের সৌখ্যতা ও প্রভুত্ব ছিল না। যাহা তাহারা এতদিন ভোগ করিয়া আসিতেছিল তাহা হারাইয়া যৎপরোনাস্তি ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হইয়াছিল। উহাদের সহিত মুসলমান পুরাতন রাজকর্ম্মচারীগণ যাহারা নবাবের বিষদৃষ্টিতে পড়িয়াছিল তাহারা সম্মিলিত হয়। ইহাতেই ইংরাজেরা ভাবিয়াছিল সিরাজউদ্দৌলার কলিকাতা আক্রমণ কার্য্যে পরিণত হইবে না। যখন তাহাদের সেই ভুল ধারণা দূর হইল, তখনই তাহারা লালদীঘির ধারে কতকগুলি বাড়ী ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া যুদ্ধের জন্য কিয়ৎপরিমাণে প্রস্তুত হইয়াছিল। অর্থাৎ পূর্ব্বে ইংরাজেরা সিরাজউদ্দৌলার পুত্র উমিচাঁদের টাকা আদায়ের কৌশল ভাবিয়াছিল, শেষে যখন তাহা নয় তখনই অগত্যা যুদ্ধর জন্য প্রস্তুত হইতে হইয়াছিল। ঐতিহাসিক হিল সাহেব বলিয়াছেন যে, সিরাজউদ্দৌলা মনে করিতেন ও বলিতেন যে ইউরোপবাসিগণকে শাসন করিতে গেলে যেমন কুকুর তেমন মুগুরের ব্যবস্থা না করিলে করা যায় না। উহা এখন বাঙ্গালার প্রবাদ বাক্যের মধ্যে বর্ত্তমান রহিয়াছে।
সিরাজউদ্দৌলা আলিবর্দ্দি খাঁর সময়েও সেনাপতি মুস্তাফা খাঁ যে ইংরাজগণকে তাড়াইবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন উহার সম্পূর্ণ অনুমোদন করিতেন। সিরাজউদ্দৌলার শিক্ষা দীক্ষার অভাবে স্বাভাবিক দুর্ব্বলতা অবশ্যম্ভাবী হইয়া ছিল। এতদ্ভিন্ন পরিণত বয়স্ক না হওয়ায় অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ অভাব স্বাভাবিক। উহার জন্যই কলিকাতাক্রমণ ও অধিকারের সময় ভুল ভ্রান্তি ও ত্রুটী হইয়াছিল তবে যাহা শাসনকর্ত্তার করা কর্ত্তব্য, তাহা তিনি করিয়াছিলেন। তিনি যুদ্ধযাত্রায় ভীত হইতেন না, কিন্তু যখন আপনার কর্ম্মচারীগণকে বিশ্বাসঘাতকতা করিবে মনে করিতেন, তখনই মাতামহের কৌশলানুসরণ করিয়া শরণাপন্ন হইতেন। তাঁহার দুর্ভাগ্যক্রমে ফল বিপরীত হইয়াছিল।
আলিবর্দ্দি খাঁর মৃত্যুর পরে সিরাজউদ্দৌলা নবাবের ধনভাণ্ডার শূন্য ছিল, তিনি ঘসেটি বেগমাদির নিকট হইতে যাহা কিছু পাইয়াছিলেন উহা কলিকাতার আক্রমণাদিতে নষ্ট করিয়াছিলেন। মনে করিয়াছিলেন যে, কলিকাতা অধিকার করিয়া সে দুঃখ দূর হইবে কিন্তু তাঁহার সে আশা বিফল হইয়াছিল।
কলিকাতাধিকার ঃ— নবাব সিরাজউদ্দৌলা কেমন করিয়া কলিকাতা অধিকার করিয়াছিলেন উহার কোন বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস নাই বলিলেই অত্যুক্তি হয় না। ইংরাজ পক্ষ হইতে যাহা প্রকাশ হইয়াছে উহার বিরুদ্ধে নবাব পক্ষের কোন কথাই নাই। সিরাজউদ্দৌলার রাজত্বকাল স্বল্প, কোন মুসলমান ঐতিহাসিক উঁহার পক্ষের সত্য কথা সরলভাবে বলেন নাই। যৎকিঞ্চিৎ হলওয়েলের ট্রাকটস হইতে দেখা যায় যে, তিনি নবাবের সেনানায়ক মানিকচাঁদের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া শান্তি ভিক্ষা করিয়াছিলেন। উহার সার মর্ম্ম এই হয় যে, “যথেষ্ট শিক্ষা হইরাছে, আর কখন ইংরাজেরা নবাবের কথা অমান্য করিবে না, সর্ব্বদাই উহা শিরোধার্য্য করিবে।” বোধ হয়, গবর্ণর ড্রেক, কাপ্তেন গ্রান্ট, সেনাপতি মিনাচন প্রমুখ সাহসী ইংরাজ বীরগণ প্রতিহিংসা গ্রহণ করিবার জন্য প্রাণরক্ষা করা কর্ত্তব্য মনে করিয়া দুর্গ ত্যাগ পূর্ব্বক নদীবক্ষস্থ জাহাজে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। অনেক ইউরোপীয় রমণীগণ জাহাজে পলায়ন করিয়াছিল। মিঃ জন কুক সাহেব তাঁহার এজাহারে বলিয়াছিলেন যে, গবর্ণরাদি অকস্মাৎ কেন যে পলায়ন করিলেন এবং দুর্গ হইতে অনবরত সঙ্কেত সত্ত্বেও জাহাজ দুর্গের নিকটবর্ত্তী না হইয়া দুর্গস্থ ব্যক্তিগণকে উদ্ধার করিল না তিনি উহা বুঝিতে পারেন নাই। আর ঘোর মাতাল ইংরাজ সৈন্যগণ সহসা দুর্গের পশ্চিম দ্বার উন্মোচন করিয়া নবাবের সৈন্যগণের প্রবেশের পথ বিনা যুদ্ধে পরিষ্কার করিয়াছিল। ২০ এ জুন অপরাহ্ণ পাঁচ ঘটিকার সময় ইংরাজ দুর্গে নবাব দরবারে বসিয়া প্রথমেই উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভের অনুসন্ধান করিয়াছিলেন ও উহারা যখন উপস্থিত হইয়াছিল, তখন উহাদিগকে কোনরূপ তিরস্কারাদি না করিয়া সাদরে আসন গ্রহণ করিতে বলিয়াছিলেন। উহার কারণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজবল্লভের সহিত সন্ধি করিয়া কলিকাতা আক্রমণ ও অধিকার করিয়াছিলেন। উহাতেই তিনি কৃষ্ণবল্লভের সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়াছিলেন। সেইজন্যই কৃষ্ণবল্লভ ও উমিচাঁদ ইংরাজগণ কর্ত্তৃক কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন। অতএব উহাদিগকে মুক্ত করা নবাবের সর্ব্বপ্রথম ও প্রধান কর্ত্তব্য কর্ম্ম, তিনি উহা পালন করিয়াছিলেন। হলওয়েলের বন্ধন মোচন ও অভয়দান নবাবের অনুমতিক্রমেই হইয়াছিল।
অন্ধকূপহত্যাঃ— অন্ধকূপ হত্যার সত্যাসত্য সম্বন্ধে তর্কবিতর্ক করা অপেক্ষা ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, উহার জন্য নবাব কোনরূপে দায়ী নহেন। যুদ্ধ বিগ্রহে মূর্খ সৈন্য সামন্ত প্রহরীর অনবধানতার ওরূপ হত্যা সর্ব্বত্র হইয়া থাকে, উহাতে দোষ নাই। নবাব যে বন্দী ইংরাজগণের প্রতি সৌজন্য ও সদ্ব্ব্যবহার করিয়াছিলেন একথা ক্লাইবের ইংরাজী জীবন চরিত লেখক কর্ণেল মালিসন স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। ইহার জন্য যদি কেহ সর্ব্বপ্রথমে দায়ী হইতে পারে, তবে গবর্ণর ড্রেক ও তাঁহার পূর্ব্বোক্ত সহচরণগণ যাঁহাদের হস্তে উহাদের রক্ষণাবেক্ষণের ভার ছিল। আরও তাঁহারা নিজের প্রাণরক্ষা করা প্রথম কার্য্য মনে করিয়া শত শত সঙ্কেতেও দুর্গ সমীপে জাহাজ লইয়া গিয়া উহাদিগকে উদ্ধার করেন নাই। ঘটনার কি বৈচিত্র্য সম্মিলন যে, যেদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতা অধিকার করেন, সেই দিনই ক্লাইব ফোর্ট সেন্ট ডেভিডে শুভাগমন করেন। আবার ক্লাইব ১৭৫৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদ্রাজ পরিত্যাগ করিয়া বিলাতের পার্লিয়ামেন্ট সভায় মনোনীত হইয়াছিলেন বিলাতের দলাদলির স্বার্থ সম্বন্ধের জন্য তাঁহার সেই পার্লিয়ামেন্টের মনোনয়ন সিদ্ধ হয় নাই। উহাতেই ভারতে ক্লাইবের পুনরাগমন হইয়াছিল। বিধাতার ভবিতব্যতা যে, বলবান ইহাতেই বুঝিতে পারা যায়। ক্লাইব নীচান্তঃকরণের লোক ছিলেন না, কারণ যখন বিলাতে তাঁহাকে হীরক মণ্ডিত তরবারি তাঁহার বীরত্বের চিহ্ণ স্বরূপ দিতে চাহিয়াছিল, তখন তিনি মেজর ষ্ট্রীঙ্গার লরেন্সকে, যাঁহার অধীনে তিনি কার্য্য করিয়াছিলেন, উহা না দিলে, উক্ত উপহার গ্রহণ করিবেন না বলিয়াছিলেন। ভারতে তিনি যে অর্থ উপার্জ্জন করিয়াছিলেন, উহাতে তিনি বিলাতে সুখে জীবন যাপন অনায়াসে করিতে পারিতেন বলিয়াই পার্লিয়ামেন্টে প্রবেশ করিতে গিয়াছিলেন। এইরূপে মনোনয়ন বিপুল অর্থ ব্যয় ও সিদ্ধ হইয়াও ক্লাইব যখন অন্যায়রূপে পরাস্ত হইলেন, তখনই অগত্যা শেষে কোম্পানির মাদ্রাজ্যের গবর্ণরী পদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। ঘটনাচক্র এমনই বলবান যে উহাকে ভগবানের পরমাস্ত্র বলা যায়, মানব কেবল ক্রীড়াপুত্তলীবৎ দেখিতে পাওয়া যায়।
নবাবের মহত্ত্বঃ— ২১-এ জুন প্রাতঃকালে নবাব যখন প্রহরীগণের মুখে সেই দুর্ঘটনার কথা শুনিলেন তখনই সমস্ত বন্দীকেই মুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন এবং হলওয়েলকে দরবারে ডাকাইয়া আসন ও জল প্রদান করিয়া তাঁহাকে সুস্থ করাইয়াছিলেন, একথা স্বয়ং হলওয়েল বলিয়াছেন। কেবল রাজা মানিকচাঁদ উমিচাঁদের কারাবাসের প্রতিহিংসা বাসনায় অনুরুদ্ধ হইয়া হলওয়েল ও তাঁহার তিনজন সঙ্গীকে বন্দি করিয়া মুর্শিদাবাদে পাঠাইয়া ছিলেন। ইংরাজগণ কর্ত্তৃক উমিচাঁদ যে অন্যায়রূপে উৎপীড়িত ও কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন একথাও হলওয়েল স্বীকার করিয়াছেন। উহাতে নবাবের চরিত্র ও সহানুভূতি পরিষ্কার হইয়া পড়ে। যে সকল মুসলমান ঐতিহাসিকগণ সিরাজউদ্দৌলার নামে নানা দোষারোপ করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারাও কেহ যে অন্ধকূপহত্যার কথা উল্লেখ করেন নাই। মুতাক্ষরীণ অনুবাদক ফরাসী পণ্ডিত হাজি মুস্তাফা উহার টীকায় বলিয়াছেন যে, তিনি অনেক অনুসন্ধান করিয়া সমসাময়িক কলিকাতার বাঙ্গালী অধিবাসিগণের নিকটও ঐ অন্ধকূপ হত্যার বিন্দুবিসর্গও জানিতে পারেন নাই। শ্রদ্ধেয় অক্ষয় মৈত্র, জে.এইচ. লিটল প্রমুখ সত্যান্বেষী ব্যক্তিগণ অন্ধকূপহত্যাকে আকাশকুসুমবৎ প্রহেলিকাময় প্রমাণ করিয়াছেন। উহাতেই লর্ড কর্জ্জন তাঁহার শাসনকালে লুপ্ত অন্ধকূপহত্যার স্মৃতি স্থাপিত করেন এবং বহু অর্থ ব্যয় করিয়া উইলসন প্রমুখ সাহেব দ্বারা পুস্তকাদি প্রণয়ন ও সেকালের পুরাতন জায়গার চিহ্ণ সরকারের ব্যয়ে পিত্তলাদি ফলকে উৎকীর্ণ করিয়া সন্নিবেশিত করান। সিরাজউদ্দৌলা যে কলিকাতার নাম পরিবর্তন করিয়া আলিনগর রাখিয়াছিলেন উহার স্মৃতি রক্ষার জন্য বিখ্যাত উক্ত রাজপ্রতিনিধি কিছুই করেন নাই। সিরাজউদ্দৌলার ইসলাম ধর্ম্মের ধর্ম্মকর্ত্তার উপর যে প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধা ছিল উহা উক্ত নাম পরিবর্ত্তনে প্রকাশিত হয়। তাঁহার সেই ধর্ম্মবিশ্বাসের সাক্ষী স্বরূপ মদিনা নগরের পবিত্র মৃত্তিকা হরণ করিয়া উহার উপরে তিনি যে মসজিদ করিয়াছিলেন, উহা এখনও ভাগীরথীর তীরে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। তিনি মাতামহের উপদেশ মতে ধর্ম্মবিশ্বাসে দুরূহ সুরাসক্তি একেবারে ত্যাগ করিয়াছিলেন। উহা নিশ্চয়ই তাঁহার মানসিক বল ও সংযমের উদাহরণ। তিনি যে মূর্খ ছিলেন না ইহারও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কলিকাতা আক্রমণ করিবার পূর্ব্বে যেমন ফরাসী ওলন্দাজাদি বণিকগণ তাঁহার কোন সাহায্য করে নাই, তেমনি তিনি প্রত্যাবর্ত্তন কালে তাহাদের নিকট যথাক্রমে সাড়ে তিন ও সাড়ে চার লক্ষ টাকা আদায় করিয়াছিলেন। যে তিন জন ইংরাজ তাঁহার সঙ্গে বন্দি ছিল, উহাদের মধ্যে তিনি হলওয়েলকে মুক্ত করিয়া ওয়াটস ও কলেটকে ওলন্দাজগণের নিকট রাখিয়া যান। একজন মাতাল ইংরাজ একজন মুসলমানকে হত্যা করায় তিনি মুর্শিদাবাদ যাইবার দুই তিন দিন পূর্ব্বে ইংরাজদের কলিকাতা প্রবেশের যে অনুমতি দান করিয়াছিলেন, উহা প্রত্যাহার করিয়াছিলেন। উহাতেই ইংরাজেরা ফলতায় পলাইয়া জাহাজে থাকিত ও তখন অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিরা তাহাদের সহায়তা করিয়াছিল। ১১ই জুলাই নবাব মুর্শিদাবাদে পৌঁছিয়া তাঁহার রাজ্য মধ্যে ইংরাজের যে কিছু সম্পত্তি আদি ছিল উহা বাজেয়াপ্ত করিবার হুকুম দিয়াছিলেন। তিনি পূর্ণিয়ার শওকৎজঙ্গের বিরুদ্ধে গমন করিবার পূর্ব্বে মুর্শিদাবাদের সিংহাসন কলিকাতাধিকার দ্বারা উহা নিরাপদ করা নিতান্ত আবশ্যক বলিয়া করিয়াছিলেন। পরবর্ত্তী কালের ঐতিহাসিকগণ উহার জন্য যে দোষ দিয়া থাকেন, উহা ন্যায্য বা যুক্তিসঙ্গত নয়। লুট বা হত্যা যুদ্ধের শেষে চিরকালই হইয়া থাকে এবং সকল দেশেই উহার উদাহরণ আছে। প্লেনকোর হত্যা ও বেভারিজ সাহেব ১৮৯২ খৃষ্টাব্দের কলিকাতা রিভিউএ শত বর্ষ পরে অমৃতসরের হত্যাকাণ্ড অন্ধকূপহত্যা অপেক্ষা সবর্বাংশে ভীষণতর নৃশংস সে কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ইংরাজ কর্ম্মচারীর অপেক্ষা ভীষণতর নৃশংস সেকথা উল্লেখ করিয়াছেন। ইংরাজ কর্ম্মচারীর আদেশে এক কারাগৃহে বহুসংখ্যক সিপাহিকে আবদ্ধ করিয়া রাখা হয় ও এক একটি করিয়া ২৩৭ জনকে গুলি করিয়া মারিবার পর ঐ গৃহ হইতে অবশিষ্ট ব্যক্তিরা যখন বাহির হইতে চাহিল না, তখন তাহাদিগকে সেইখানে দ্বার রুদ্ধ করা হয় ও যখন উহা খোলা হয় তখন অবশিষ্ট ৪৫ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। অন্ধকূপহত্যার জন্য ইংরাজ কোম্পানি ভবিষ্যতে কোন ক্ষতিপূরণের দাবী করেন নাই অথচ কলিকাতা দগ্ধ করিবার জন্য অনেক টাকা আদায় করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, তখন কলিকাতা দগ্ধ করা যে অন্ধকূপহত্যা অপেক্ষা অধিক গুরুতর অপরাধ, ইহা স্বীকার করিবে হইবে ও সেজন্য ভগবান নবাবের উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। কি মাদ্রাজের পিগট সাহেব, কি ক্লাইব, কাহারও পত্রে সেই অন্ধকূপহত্যার কথা নাই। এমন কি, তাঁহারা সিরাজউদ্দৌলার নিকট কলিকাতা অধিকার বা নবাবের সহিত যে সন্ধি হইয়াছিল উহাতেও উহার উল্লেখ করেন নাই। কলিকাতার নাম আলিনগরে পরিবর্তিত হইয়া সেখানে পরে যে সন্ধি হইয়াছিল, উহাতে সেই অন্ধকূপহত্যার জন্য কোন ক্ষতিপূরণের কথা না থাকায় ঐতিহাসিক থরনটন সেই মারাত্মক দোষের জন্য বড়ই দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন উহা উল্লেখ যোগ্য।*
আরও ক্লাইব বিলাতের কোর্ট অফ্ ডিরেক্টারগণের নিকট নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচুত্যাদির জন্য যে পত্র লিখিয়াছিলেন উহাতেও সেই নৃশংস অন্ধকূপহত্যার কোন কথাই নাই, বা হলওয়েল যে ১৭৬০ খৃষ্টাব্দে ৪ঠা আগস্ট তারিখের (Select Committee-র) বিশেষ অধিবেশনের নিকট ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ঘটনার সম্বন্ধে তাঁহার মন্তব্য লিপি পাঠ করেন উহাতেও সেই অতীত অন্ধকূপহত্যার কথা নাই। পরবর্ত্তীকালেই ইংরাজগণ উহা উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করিয়াছিলেন। উহাই সিরাজউদ্দৌলার প্রতি অমানবিক হত্যার কলঙ্ক দূর করিবার অমোঘাস্ত্র হইয়াছিল, ইহাই অনেকের ধারণা। কলিকাতায় ঐ নৃশংস ঘটনা হইয়াছিল কিনা, উহা রহস্যময় ও অনেকে তদ্বিষয়ে সন্দিহান ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে। এই সূত্রে মৈত্রেয় মহাশয় যাহা বলিয়াছেন যাহার বিরুদ্ধে আজ পর্য্যন্ত কোন সন্তোষজনক প্রতিবাদ বহির্গত হয় নাই, উহার কিয়দংশ তন্মিমিত্ত উদ্ধৃত করা হইলঃ—
“মীরজাফরের সঙ্গে ইংরাজদিগের যে সন্ধি সংস্থাপিত হইয়াছিল তাহাতে ইংরাজেরা প্রত্যেক শ্রেণীর ক্ষতিপূরণের জন্য কড়ায় গণ্ডায় অঙ্কপাত করাইয়া লইয়াছিলেন। (অথচ) যাহারা নিদারুণ মর্ম্মযাতনায় অন্ধকূপে জীবন বিসর্জ্জন করিয়াছিল, সন্ধি সর্ত্তে তাহাদের স্ত্রীপুত্রের জন্য কপর্দ্দকও লিখিত হয় নাই কেন? এই সকল দেখিয়া শুনিয়া অনেকের ধারণা হইয়াছে যে, অন্ধকূপহত্যা কাহিনী নিতান্তই কাহারও রচা কথা। অন্ধকূপহত্যা কাহিনী কবে, কাহার কৃপায় জনসমাজে প্রচারিত হইয়াছিল, সে ইতিহাসও সবিশেষ রহস্য পরিপূর্ণ। হলওয়েল সাহেব তাহার প্রধান প্রচারক। ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারিখে হলওয়েল তাঁহার প্রিয়বন্ধু উইলিয়ম ডেভিসকে যে পত্র লিখেন তাহাতেই অন্ধকূপহত্যার প্রথম এবং শেষ বিস্তৃত পরিচয়! হলওয়েল ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে “সাইরেন” নামক পোতারোহণে বিলাত যাত্রা কালে অনন্যকর্ম্মা হইয়া এই বিষাদ কাহিনীর রচনা করিয়াছিলেন কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পূর্ব্বে ইহা যে জনসমাজে পরিচিত হইয়াছিল সেরূপ প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না। পলাশীর যুদ্ধাবসানে ভারত প্রবাসী ইংরাজ বণিকের অপকীর্ত্তির উল্লেখ করিয়া ইংলণ্ডের নরনারী যখন তুমুল কোলাহল উপস্থিত করিল, সেই সময়ে (তৎপুর্ব্বে নহে) এই পত্রখানি জনসাধারণের নিকট প্রথম প্রকাশিত হইল! ইংলণ্ডের নরনারী নরপিশাচ সিরাজউদ্দৌলার নামে শিহরিয়া উঠিল; ইংরাজের কুকীর্ত্তির কথা বিস্মৃতি গর্ভে বিলীন হইয়া গেল, সিরাজউদ্দৌলার কলঙ্ককাহিনীতে সভ্য জগৎ ধ্বনিত হইয়া উঠিল!” *
পুরাণদিতে যেমন দক্ষযজ্ঞের কথা বিবৃত হইয়াছে, সেইরূপ কলিকাতার কথায় অন্ধকূপহত্যাকে স্থান দান করা উচিত উহারই জন্য উহার সমালোচনা কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করা হইল। দৈব বিড়ম্বনায় যুদ্ধে অন্ধকূপহত্যাদির ন্যায় শত শত নৃশৎস ব্যাপার প্রায়ই হইয়া থাকে, উহা যে নবাবের কৃত অপরাধ বলিয়া স্থির করিতে যাওয়া নিতান্ত বিড়ম্বনা কারণ উহা যদি যথার্থ ই হইয়া থাকে, তবে উহাতে যে, নবাবের দোষ নাই ইহা’তে প্রধান প্রচারক হলওয়েল তাঁহার বৃত্তান্তে স্পষ্টই লিখিয়া গিয়াছেন।
যাহাই হউক, ২রা জুলাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজা মাণিকচাঁদের অধীনে তিন সহস্র লোক কলিকাতায় নিযুক্ত করিয়া সেইখান হইতে মহাসমারোহে মুর্শিদাবাদ যাত্রা করিয়াছিলেন ও ১১ই জুন মহানন্দে স্বীয় রাজধানীতে পৌঁছিয়াছিলেন। মীরজাফর রাজা মাণিকচাঁদের উপর কলিকাতা রক্ষণাবেক্ষণের ভার অর্পিত হওয়ায় আপনাকে অপমানিতা জ্ঞান করিয়াছিলেন। রাজা দুর্ল্লভরাম জগৎশেঠ প্রভৃতি যাঁহারা আলিবর্দ্দির সময়ে মহা সম্মানিত হইতেন তাঁহারা নবীন নবাব কর্ত্তৃক সেরূপ না হওয়ার শওকৎজঙ্গকে সিংহাসনে বসাইবার ষড়যন্ত্র করিতেছিলেন। এমন কি, সেই সকল লোকের মন্ত্রণায় মীরজাফর শওকৎজঙ্গকে এক সুদীর্ঘ পত্রাদি লিখিয়াছিলেন ও পরস্পরের মধ্যে অঙ্গীকারাদি স্থির হইয়াছিল একথা মূতাক্ষরীণে উল্লেখ আছে। এদিকে লালু হাজারী নামক শওকতের একজন প্রবীণ তোপাধ্যক্ষ একারণে নির্ব্বাসিত হইয়া মুর্শিদাবাদে সিরাজউদ্দৌলার নিকট সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিল। উহাতে নবীন নবাবের মনের অবস্থা কিরূপ হইয়াছিল উহা অনুমান করা অসম্ভব নয়। ঘরের ও বাহিরের শত্রু দমন করিবার জন্য তিনি অস্থির হইয়া পড়িলেন। কলিকাতার বিষয় তাঁহার দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া পড়িল। কলিকাতাধিকার করিয়া নবাব যাহা লাভ করিয়াছিলেন, উহাতে যে তাঁহার আশানুরূপ ধনলাভ হয় নাই উহা অনেকেই বলিয়াছেন। ঐতিহাসিক মার্টিন সাহেবের ** মতে তিনি কোম্পানির দুর্গ হইতে সবেমাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা পাইয়াছিলেন। বেভারিজ সহেব * বলেন যে, নবাব অসময়ে দুর্গাধিকার করিয়া আশানুরূপ অর্থ লাভ করিতে পারেন নাই, কারণ গত বৎসরের যাহা কিছু ছিল তৎসমস্তই এপ্রেল মাসে বর্ষার পূর্ব্বেই চলিয়া যাইত। এখন হইতে বর্ষার সময় কেবল পত্রাদিই যাইত, এবং বিলাতের কোন কিছু তখন এখানে আসিত না। ইহাতেও কোম্পানির অনূ্যন দুই লক্ষ পাউণ্ডের ক্ষতি হইয়াছিল। নবাব উমিচাঁদের সংগৃহীত** চল্লিশ হাজার পাউণ্ড নগদ ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য পাইয়াছিলেন।
কলিকাতাভিযানঃ— ৫ই আগস্ট ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে কলিকাতাধিকারের কথা মাদ্রাজে পৌঁছে। কলিকাতার কর্ত্তৃপক্ষগণ স্ব স্ব দোষাপরাধ ক্ষালন করিয়া ভিন্ন ভিন্ন পত্র মাদ্রাজে প্রেরণ করিয়াছিলেন। উহারা যে অকর্ম্মণ্য মাদ্রাজের কর্ত্তৃপক্ষগণের সেকথা বুঝিবার সময় লাগে নাই। অনেক তর্ক বিতর্ক ও বিবেচনার পর রবার্ট ক্লাইবই কলিকাতা উদ্ধার করিবার জন্য মনোনীত হইলেন। ইহাতেই দুই মাস কাল অতিবাহিত হয়। ১৩ই অক্টোরব এডমিরাল ওয়াটসনের অধীনে কেন্ট, পিককের কম্বরল্যাণ্ড, টাইগর, সলস্বেরী, ব্রিজওয়াটর ইত্যাদি যুদ্ধ জাহাজ কোম্পানির অন্যান্য তিনখানি জাহাজ ও ক্ষুদ্রতরীর সহিত যাত্রা করিয়াছিল। কর্ণেল ক্লাইবের অধীনে নয় শত ইংরাজ ও পনের শত সিপাহী ছিল। যাত্রা করিয়া সমুদ্রে নানা বাধা বিপত্তিতে গন্তব্য স্থানে যাইবার বিলম্ব হইয়াছিল। ১১ই অক্টোবর কর্ণেল ক্লাইব যিনি কেবলমাত্র ফোর্ট সেন্ট ডেভিডের গবর্ণরী পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন তিনিই ঐ যুদ্ধযাত্রার নেতা মনোনীত হইয়া যাত্রা করিবার অগ্রে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণকে যে পত্র প্রেরণ করেন উহাতে তাঁহার কলিকাতাধিকারের দৃঢ় বিশ্বাস ও ফরাসিগণকে পরাজিত করিবার উল্লেখ ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা কর্ত্তৃক এই সকল সংবাদ সংগৃহীত হয় নাই উহাই তাঁহার সম্পূর্ণ দোষ ও পরাজয়ের কারণ হইয়াছিল। তখন তিনি এমনই গৃহ বিবাদে বিব্রত যে, উহা করিবার তাঁহার সময় ছিল না। তখন জগৎশেঠগণের সাহায্যেই বাদশাহী সনন্দ সংগৃহীত হইত, কারণ উহা অর্থ ভিন্ন হইত না। উহার সহায়তা না করায় নবাব কর্ত্তৃক জগৎশেঠ প্রকাশ্য সভায় অত্যন্ত অপমানিত ও কারারুদ্ধ হন। মীরজাফর উহাকে কারামুক্ত করিবার জন্য অনুরোধ করিলেন, কিন্তু নবাব উহাতে কর্ণপাত করিলেন না। শেষে মাতামহীর মধ্যস্থতায় জগৎশেঠ মুক্ত ও মীরজাফর তুষ্ট হইলেন। শওকৎজঙ্গকে পত্রাদি দ্বারা বশীভূত করিতে না পারিয়া, অবশেষে নবাব তাঁহাকে যুদ্ধ করিয়া পরাস্ত ও নিহত করেন, সেই সময় নবাবের অধিকাংশ সৈন্যগণ কলিকাতার রক্ষাবন্ধনীর কেন্দ্রস্থল বজবজ হইতে সেইখানে চলিয়া যায়। যদিও তখন প্রতিকূল ঝঞ্ঝাদিতে নিয়মিত কালে কোম্পানির মালবরাদি জাহাজ আসে নাই, তথাপি ২৭শে ডিসেম্বর ক্লাইব কলিকাতার আটক্রোশ দূরে বজবজ জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া স্থলপথে যাত্রা করেন। চতুর কোম্পানির কর্ম্মচারিরা কেমন করিয়া সেকালের নবাবগণের সেনাপতি ও কর্ম্মবীরগণকে বাধ্য করিতে হয়, সে বিষয়ে সিদ্ধহস্ত ছিল।
যুদ্ধঃ— বজবজের দুর্গ হইতে শত্রুগণের বিপক্ষে কিছুই করা হইল না। রাজা মানিকচাঁদ প্রভুর লবণের মর্য্যাদা রক্ষা করিবার ভান করিয়া ইংরাজগণের বিরুদ্ধে কলিকাতা হইতে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া পরাস্ত হইলেন। * লঙ্ সাহেবের পুস্তকে উঁহার সেই কার্য্যের পুরস্কারের কথা আছে। মানিকচাঁদের পুত্রকে তাহার পিতার কোম্পানির সপক্ষে ত্রিশ বৎসর পূর্ব্বের কার্য্যাবলীর পুরস্কার স্বরূপ কোম্পানির অধীনে কোন কার্য্য দেওয়া উচিত। সে ইংরাজের বিরুদ্ধে বজবজে যুদ্ধ যে করিয়াছিল উহাতে কিছু আসে যায় না। মানিকচাঁদের কোম্পানিকে সহায়তা করিবার ইচ্ছা কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য ক্লাইবের ** চিঠি প্রকাশ হইয়াছে। ঐরূপ অবস্থায় বজবজের দুর্গাধিকার করা ইংরাজের পক্ষে কঠিন বিষয় হয় নাই। কিন্তু হায়! ভ্রমক্রমে ঐ যুদ্ধে ইংরাজ কাপ্তেন কাম্বেল সাহেবকে স্বপক্ষের লোকগণ শত্রুজ্ঞানে নিহত করিয়াছিল।
কলিকাতাধিকার:— কর্ত্তব্যপরায়ণ মাণিকচাঁদ কলিকাতার দুর্গের পাঁচশত সিপাহীর উপর উহার রক্ষা ভার দিয়া স্বয়ং মুর্শিদাবাদে পরাজয় বার্ত্তা দিতে গেলেন। কলিকাতা হইতে পঞ্চাশটি কামান টানাদুর্গে সাজাইবার পূর্ব্বেই উহা ইংরাজেরা জানিতে পারিয়া ১লা জানুয়ারি ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে অধিকার করে, উহাদিগকে কেহ কোন বাধা দান করে নাই। ২রা জানুয়ারি ক্লাইব কলিকাতায় আসিলেন। দুই একবার দুর্গ হইতে ইংরাজের জাহাজের উপর গোলাবর্ষণ হইয়াছিল। প্রতিকূল বায়ুর জন্য জাহাজ যথারীতি ফিরাইতে না পারায় ইংরেজের ১৬ জন লোক আহত হইয়াছিল, কিন্তু শেষে যখন ঐ জাহাজ হইতে গোলাবর্ষণ আরম্ভ হইল, তখন দুর্গস্থ সৈন্যগণ পলায়ন করিয়াছিল। এইরূপে ক্লাইব ও ওয়াটসন কলিকাতার দুর্গাধিকার ও তাহাতে কোম্পানির মাল পত্র যাহা ছিল, সমস্তই তাঁহারা প্রাপ্ত হইলেন। শেষে ক্লাইব ও ওয়াটসনের মধ্যে কাহার প্রতিনিধি স্বরূপ সেই দুর্গ জয় করা হইল, ইহা লইয়া ঘোর বাক্ বিতণ্ডা হইয়াছিল। ওলন্দাজেরা হুগলীর বণিকগণকে আশ্রয় প্রদান করিয়াছিল ইংরাজেরা দেড় লক্ষ টাকার অধিক দ্রব্য লুঠ করিতে পারিল না বলিয়া বড়ই দুঃখ করিয়াছিল। ঐরূপ ঔপন্যাসিক অধিকারের পূর্ব্বে ক্লাইব নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামে মাদ্রাজের ইংরাজ অধ্যক্ষ পিগটের, নিজাম সলাবৎজঙ্গের ও আরকটের নবাব মহম্মদ আলির নিকট হইতে যে পত্র আনেন, উহা মানিকচাঁদ, ক্লাইব ও ওয়াটসনের পত্রের সঙ্গে নবাবকে দিতে অস্বীকৃত হইলে ইংরাজেরা এইরূপে বাহুবলে নবাবের অধিকৃত কলিকাতাদি উদ্ধার করিলেন। ইহাতে ঐরূপ অধিকারের পূর্ব্বে মানিকচাঁদের সঙ্গে ক্লাইব ও ওয়াটসনের পরস্পর কথাবার্ত্তা চর মারফত পত্র দ্বারা হইয়াছিল। উমিচাঁদই উহার সম্পূর্ণ সহায়তা করিয়াছিল, কারণ নবাব তাহার যে সম্পত্তি অপহরণ করিয়াছে, সে উহা উদ্ধার করা আবশ্যক মনে করিয়াছিল। ইংরাজ বনিকগণ যখন নবাব কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া ফলতায় জাহাজে বাস করিত, তখন উহাদের আহার্য্য বস্তু আদি জীবন ধারণের যাবতীয় সামগ্রী উমিচাঁদই সরবরাহ করিত। নবকৃষ্ণও উহা করিয়া ইংরাজদের প্রিয়পাত্র ও অর্থশালী হইয়াছিল। ইহাতেই বোধ হয় যে, সেই সময়েই উমিচাঁদের মন্ত্রৌষধিতে বশীভূত হইয়া রাজামানিকচাঁদ ক্লাইবের হস্তগত হন।
দূতঃ— যাহাই হউক, কলিকাতা উদ্ধারের কথা বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগণকে জানাইবার জন্য কাপ্তেন কিং প্রেরিত হইয়াছিলেন ও ক্লাইব আপনার ক্ষমতা সম্পূর্ণ করিবার জন্য যাহা কিছু করিতে হয় উহার কোন ত্রুটি হয় নাই। ওয়াটসনাদি সাহেবের সহিত নবাবের পরস্পর উত্তর প্রত্যুত্তর চলিয়াছিল। * ইংরাজ ঐতিহাসিকগণ সকলেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন যে, তাঁহাদের বীরপ্রবর ক্লাইব মুষ্টিমেয় সৈন্য লইয়া সেই নবাবের সৈন্যবাহিনীর সম্মুখে দাঁড়াইতে সম্মত হন নাই। পত্রে কোন ফলোদয় হয় নাই। ৩০ এ জানুয়ারি হুগলী হইতে গঙ্গাপার হইয়া কলিকাতা আক্রমণ করিবার জন্য গমন করেন। বাগবাজারের অর্দ্ধক্রোশ উত্তরে একটি স্থানে ছাউনী করিয়া ক্লাইব নবাবের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। ২রা ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণের সময় উভয়পক্ষের মধ্যে অগ্নি বৃষ্টি আরম্ভ হয়, কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ায় কোন পক্ষই অধিক অগ্রসর হইল না। নবাবের ভয়ে পার্শ্ববর্ত্তী লোকেরা ইংরাজগণকে আহার্য্য খাদ্যাদি বন্ধ করিয়াছিল। নবাব সন্ধির পক্ষপাতী ছিলেন, সেইজন্য তিনি নবাবগঞ্জ হইতে ইংরাজগণকে দূত প্রেরণ করিতে বলেন। ওয়ালস ও স্ক্রাফ্টন দূতস্বরূপ উমিচাঁদের হালসী বাগানে নবাবের ছাউনিতে উপস্থিত হইয়াছিল, চতুর মন্ত্রী দুর্ল্লভরাম পাছে তাহারা নবাবকে হত্যা করে এই আশঙ্কা করিয়া উহাদের নিকট পিস্তল আছে কিনা অনুসন্ধান করিয়াছিলেন। সেইজন্যই তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে বলবান ভীষণাকৃতি কতকগুলি লোক যাইতেছিল ও উহাতে তাহারা ভীত হইয়াছিল। নবাবের মূল উদ্দেশ্যই যদি সন্ধি করা, তবে কেন তিনি কলিকাতা পর্য্যন্ত অগ্রসর হইলেন ইহার মর্ম্ম তাহারা বুঝিতে পারে নাই। তাহারা শেষে উমিচাঁদের নিকট নবাবের গুপ্ত সংবাদ অবগত হইয়া সত্ত্বর ক্লাইবকে গিয়া উহা বলেন যে, নবাবের কামানগুলি এখনও পৌঁছে নাই বলিয়াই নবাব সন্ধির প্রস্তাব করিয়া কেবলমাত্র কালহরণ করিতেছেন। ক্লাইব সেই সুযোগে উদ্দেশ্য সিদ্ধির উপায় উদ্ভাবন করিলেন। রাত্রির শেষে ইংরাজেরা দূতগণের পরিচিত পথে গিয়া নবাবশিবির একেবারে হঠাৎ আক্রমণ করিলেন। ইংরাজের সৌভাগ্যবলেই নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি দোস্ত মহম্মদ খাঁ আহত হওয়ায় নবাব আপনার শ্বশুরের পরামর্শে ক্লাইবের নিকট সন্ধির প্রস্তাব করিয়াছিলেন। প্রাতে সেই অল্প সৈন্য লইয়া সম্মুখ সমরে নবাবকে পরাজয় করা অসম্ভব তবে হঠাৎ আক্রমণে সৈন্যগণকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করিলে ভয়ে তাহারা পলায়ন করিবে ও উহাতে সন্ধি হইবে, ক্লাইবের সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইল।
প্রথম সন্ধিঃ— ৯ই ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে রণজিৎ রায়ের উদ্যোগে নিম্নলিখিত সর্ত্তে সন্ধিপত্র কলিকাতা বা আলিনগরে হয়ঃ— কোম্পানির বাণিজ্য সম্বন্ধে সমস্তাধিকার রহিল, যে সমস্ত স্থান নবাব দখল ও বাজেয়াপ্ত করিয়াছিলেন, তিনি উহা প্রত্যর্পণ করিবেন, লুণ্ঠিত দ্রব্যের জন্য নবাবের বিচারানুসারে ক্ষতিপূরণ ও কলিকাতায় টাঁকশাল ও কোম্পানির মুদ্রা প্রচলন জন্য তাহাদিগকে বাটা দিতে হইবে না, স্থির হইল। কিন্তু অত্যাশ্চর্য্যের বিষয় তখন ইংরাজেরা সেই সন্ধিপত্রে মীরজাফর ও দেওয়ান দুর্ল্লভরামের স্বাক্ষরের জন্য অনুরোধ করিয়া উহা করাইয়া লয়। উল্লিখিত রণজিৎ রায়ের পরিচয় দেওয়া উচিত। তিনি জগৎশেঠের সর্ব্বাপেক্ষা বিশ্বাসী দক্ষ কর্ম্মচারী। উহারা যখন বিধিমত চেষ্টা করিয়া নবাবের সহিত ইংরাজ কোম্পানির সন্ধি কোনমতে করাইতে পারিলেন, তখন উহাকে নবাবের সঙ্গে প্রেরণ করিয়াছিলেন। জগৎশেঠের সাহায্যেই ও চক্রান্তে এই সন্ধি হইয়াছিল, ইংরাজেরা ইহার জন্য উহার শরণাপন্ন হইয়াছিল। উমিচাঁদও উহাতে সংশ্লিষ্ট ছিল। উমিচাঁদ ভাল জিনিষের পরিবর্ত্তে খারাপ জিনিষ দেওয়ায় উহার সহিত ইংরাজ কোম্পানির যে কারবার সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ছিল উহা ক্রমে নষ্ট হইয়া যায়। কোম্পানি যাহারা মাল তৈয়ারি করিত, তাহাদের নিকট হইতে দ্রব্যাদি খরিদ করিতে আরম্ভ করে। তজ্জন্য ইংরাজেরা অনুমান করে যে উমিচাঁদ তাহাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করিয়া নবাব দ্বারা আক্রমণের ব্যবস্থা করিয়াছে, সেইজন্য তাহারা উহাকে কারারুদ্ধ করিয়াছিল। কলিকাতা অধিকারে সকলের সম্পত্তি সমূহ আগুনে ও অন্য রকমে নষ্ট হইয়াছিল উহার ক্ষতিপূরণের বিষয় এই সন্ধিতে নবাবের বিরুদ্ধে ইংরাজের স্বপক্ষে সম্পূর্ণ সহায়তা করিয়াছিল। নবাব কখনই উহাতে সম্মত হইতেন না, তবে কেবল তিনি তাঁহার কর্ম্মচাগিণকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেন না বলিয়াই উহা করিয়াছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা মূর্খের মত কার্য্য করেন নাই। * ক্লাইবও জয়াশা নিতান্ত অসম্ভব ভাবিয়া সন্ধি দ্বারা আপনার ও ইংরাজ কোম্পানির মান রক্ষা করিয়াছিলেন। ঐতিহাসিকে ব্রুম লিখিয়াছেন যে, ক্লাইবের রাত্রের আক্রমণ ব্যর্থ হইয়াছিল তিনি দিবাভাগে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাস্ত করিতে পারিবেন না ইহা বুঝিয়াছিলেন। * ঐ সন্ধিতে এডমিরাল ওয়াটসন প্রমুখ অনেকেই অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। তজ্জন্য বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষকে ক্লাইব সন্ধির সপক্ষে বিশেষ কারণ দেখাইতে হইয়াছিল। ফরাসিরা নবাবকে সাহায্য করিত। উহাতে যুদ্ধ বহুকালব্যাপী হইত, তদ্দ্বারা ইংরাজ কোম্পানির পঞ্চাশ লক্ষ টাকার অধিক খরচ হইত। এতদ্ভিন্ন বাঙ্গালা দেশের বড় লোকদের কথার উপর নির্ভর করা যায় না, কারণ তাহারা কখন কোন এক পক্ষাবলম্বন করিয়া থাকে না। ** তজ্জন্য বেভারিজ সাহেব ক্লাইবকে যোদ্ধা ও রাজনীতি বিশারদ বলিয়া প্রশংসা করিয়াছন।
চন্দননগরাধিকারঃ— ১৮ই ফেব্রুয়ারি ক্লাইব সৈন্য সামন্ত লইয়া কলিকাতা ত্যাগ করিয়া চন্দননগর দখল করিতে গেলেন। নবীন নবাব তখনও মুর্শিদাবাদে পৌঁছান নাই, অগ্রদ্বীপে ছিলেন, সেইখানে নবাবকে দিয়া ফরাসি দূতেরা ইংরাজ কোম্পানিকে উহা করিতে নিষেধ করান। যদি তাঁহারা উঁহার কথা অমান্য করে, তাহা হইলে হুগলীর অধ্যক্ষ নন্দকুমারকে ফরাসিগণের সহায়তা করিবে ও মীরজাফরকে অর্দ্ধেক সৈন্য লইয়া চন্দননগরের নিকট উপস্থিত থাকিতে আজ্ঞা করেন ও তাহাদিগকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিবার জন্য লক্ষ টাাক দান করেন। ইহাতে ক্লাইব বিচলিত হইয়া নবাবের নিষেধ আজ্ঞা মান্য করিবেন স্বীকার করিলেন ও ফরাসি কোম্পানির সহিত প্রথম সন্ধি প্রস্তাব করিলেন যে, ভবিষ্যতে কোম্পানির সহিত যদি কাহারও কোন যুদ্ধ বিবাদ হয়, তবে তাহারা কোন পক্ষে যোগদান করিবে না। কিন্তু পণ্ডীচারীর কর্ত্তৃপক্ষগণের অভিমত ভিন্ন ঐরূপ কোন সন্ধি করিবার ক্ষমতা তাহাদের ছিল না। তখন ক্লাইব অন্য ব্যবস্থা করিতেছিলেন। তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরাজগণের সততায় সন্দিহান হন ধূর্ত্ত উমিচাঁদ ব্রাহ্মণের পায়ে হাত দিয়া শপথ করিয়া তাঁহার সে সন্দেহ দূর করিয়াছিলেন। সেই সময় নবাব চারিদিকের ঘটনায় কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়েন। তখনই আহম্মদ শা আবদালি দিল্লীর ভিতরে প্রবেশ করিয়াছেন, সেইজন্য নবাব ইংরাজগণের বন্ধুত্বের দ্বারা স্বীয় রাজ্য রক্ষা করা কর্ত্তব্য মনে করিয়াছিলেন। এডমিরাল ওয়াটসন ও নবাবকে যে চিঠি লিখিয়াছিলেন, উহাতেও সেই সঙ্কেত স্পষ্ট ছিল ও সেইজন্য চন্দননগর অধিকার করা যে আবশ্যক উহা লিখিতেও ভুলেন নাই। সেই কৌশলে নবাব তাঁহার নিষেধ বাক্যের উপর আর অধিক বল না দিয়া, তৎসম্বন্ধে দ্বিরুক্তি না করিয়া নীরব রহিলেন। উহাতেই বোম্বাই হইতে কোম্পানির সৈন্যগণ আসিলেই ১৪ই মার্চ ক্লাইব চন্দননগর আক্রমণ করিয়াছিলেন। ২৪শে মার্চ জলপথে যুদ্ধ জাহাজ সকল চন্দননগরের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হয়। দেওয়ান রায়দুর্ল্লভ ফরাসিগণের সহায়তা করিবার জন্য অগ্রসর হইতেন, কিন্তু উমিচাঁদের কৌশলে নন্দকুমার বশীভূত হওয়ায় তিনি উহা করিতে পারেন নাই। বোধ হয়, ইহারই জন্য ভগবান নন্দকুমারের ফাঁসির ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। চন্দননগর ইংরাজেরা অধিকার করিলে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা সন্তুষ্ট হয় নাই, তিনি তখন আফগানেরা তাঁহার রাজ্যাপহরণ করিবে এই জুজুর ভয়ে এতই ভীত ও কাতর হইয়াছিলেন যে, তিনি চন্দনগর অধিকারের পরে ইংরাজগণকে প্রশংসা করিয়া সেই স্থানে যে শর্তে ফরাসিরা ব্যবসা করিত তদনুরূপ করিবার প্রস্তাব পর্য্যন্তও করেন। ইংরাজেরা তখন তিনি যে, মুর্শিদাবাদে পলাতক ফরাসি সৈন্যগণকে আশ্রয় দিয়াছিলেন ও ফরাসি সৈন্যাধ্যক্ষ বুসির সহিত পত্র বিনিময় করিতেছিলেন ইত্যাদি বলিয়া উহার উত্তর দিয়াছিলেন। * ঐতিহাসিক বেভারিজ তাঁহার পুস্তকে নবাবের পত্র হইতে কতকাংশ উদ্ধৃত করিয়াছেন। যাহাই হউক, এই সকল ব্যাপারে স্পষ্টই দেখা যায় যে, যদি নবাব তখন বালকের মত কার্য্য করিতেন, তাহা হইলে ইংরাজেরা কখনই তাঁহাকে এমন করিয়া ভয় দেখাইত না ও তাঁহাকে হস্তগত করিবার জন্য কর্ম্মচারিগণকে উৎকোচ দান করিত না। ইংরাজেরা তখন বেশ বুঝিয়াছিল যে, নবীন নবাব যে কোন প্রকারেই হউক প্রতিশোধের জন্য উপযুক্ত অবসর অনুসন্ধান করিতেছে। অতএব তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিতে না পারিলে ইংরাজের মঙ্গল হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। সেইজন্যই মুর্শিদাবাদে ওয়াট, উমিচাঁদ, জগৎশেঠাদিকে নানা রকমে ইংরাজদিগের পক্ষে কার্য্য করিবার ও গুপ্ত সন্ধানাদি লইবার কোনরূপ অনুষ্ঠানের ত্রুটী করেন নাই। ক্লাইব নবাবকে সেই সকল ফরাসি সৈন্যগণকে দূর করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ ও যদি তিনি উহা না করেন, তবে তিনি তাঁহার সৈন্যগণ দ্বারা সেই কার্য্য করিবেন বলিয়াছিলেন। ফরাসিরা নবাবকে সাবধান করেন যে, তিনি যেন ইংরাজগণ কর্ত্তৃক প্রতারিত হইয়া তাঁহাদের মত বিশ্বাসী বন্ধুর নিকট হইতে সাহায্য লাভে বঞ্চিত হন না। সেই সুযোগেই নবাবের বিরুদ্ধে মীরজাফরাদি ইংরাজগণের সহিত চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করিবার বিলক্ষণ সুবিধা হয়। সেই সময়ে বাজীরাও পেশওয়া ক্লাইবকে উত্তেজিত করিয়া এক পত্র লেখেন যে, যদি তিনি তাহাকে সাহায্য করেন, তবে নবীন নবাবের আক্রমণে তাঁহাদের যে কিছু ক্ষতি হইয়াছে উহার দ্বিগুণার্থ দান করিবেন। ক্লাইব মার্হাটাগণকে বিলক্ষণ চিনিতেন, সেইজন্যই সেই পত্র তিনি নবাবকে পাঠাইয়া তাহাকে পুবর্বাপক্ষা অধিকতর ভীত ও ত্র্যস্ত করিলেন। কেহ কেহ উহাকে জাল বলিয়া থাকেন ঐরূপ মনে করিবার যথেষ্ট কারণও ছিল ক্লাইব নবাবের পাত্রমিত্র সকলের সহিত প্রায়ই নানারূপ চাতুরী ও কৌশলে বশীভূত করিতেন। এমন কি জগৎশেঠের ধনাদি রক্ষা করিবার জন্য এবং আবশ্যক হইলে নবাবের অত্যাচার হইতে আপনাদিগকে রক্ষা করিবার জন্য যে দুই হাজার সৈন্য ইয়ার লতিফ খাঁর অধীনে ছিল তাহাদিগকেও হস্তগত করেন। সেই ইয়ার লতিফ ও মীরজাফর দুইজনেই মুর্শিদাবাদের সিংহসন লাভ করিবার জন্য উন্মত্ত ও প্রার্থী। উমিচাঁদ ইয়ার লতিফের পক্ষেও খোজা পিট্রুস মীরজাফরের জন্য ক্লাইবের সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন। মীরজাফরের ভাগ্যেই ক্লাইবের সোনার কাটি স্পর্শ করিয়াছিল। কারণ ইংরাজি ঐতিহাসিক বেভারিজ বলেন যে, যে স্ত্রীলোক অন্ধকূপহত্যায় বাঁচিয়াছিল তাহাকে মীরজাফর অন্দরে প্রবেশ করাইয়াছিলেন ও ঐ নৃশংস ব্যাপারের জন্য যদি কাহাকেও দায়ী বা দোষী স্থির করিতে হয় তবে সে দোষ তাঁহারই উপরে পড়ে।
ষড়যন্ত্রঃ— ১০ই জুন ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে রাজ্যচ্যুত করিবার কলিকাতায় একখানি অঙ্গীকার পত্র মীরজাফরের সহিত ক্লাইব ওয়াটসন, ড্রেক, মেজর কিলপেট্রিক ও বিচার প্রভৃতি কলিকাতা কাউন্সিলের সভ্যগণ স্বাক্ষরিত করেন। সেই কথা তখন উমিচাঁদ নবাবের কর্ণগোচর করাইবে এই ভয় দেখাইয়া নিজের উদর পূরণের ব্যবস্থা করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা উহার গন্ধ আঘ্রাণ করিয়াছিল বলিয়া অনেকে অনুমান করেন ও তিনি মীরজাফরকে ধৃত করিবার জন্য তাহার বাড়ীর চতুর্দিকে সিপাহি দ্বারা বেষ্টন করিয়াছিলেন। উহাতেই মিঃ ওয়াটস মুর্শিদাবাদ হইতে পলায়ন করেন। ভাগ্যদোষে উহাতেই মূর্খ নবাব ভীত হইয়া মাতামহ যে পথালম্বন করিয়া মুস্তাফাদিকে বাধ্য করিয়াছিলেন সেইরূপে সেই বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরকে বশীভূত করিতে গিয়াছিলেন। ধূর্ত্ত মীরজাফর তখন কোরাণ স্পর্শ করিয়া নবাবের সহায়তা ভিন্ন ইংরাজের পক্ষে গমন করিবেন না স্বীকার করেন। উহাতেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা কৃতকার্য্য হইলেন মনে করিয়া ক্লাইবকে ১৫ই জুন যে এক পত্র প্রেরণ করেন উহাতে ওয়াট সাহেবের পলায়নাদি বিশ্বাসঘাতকতার কথা উল্লেখ করিলেন।
তখন নবাব ফরাসি সেনাপতিকে তাঁহার সহায়তা করিবার জন্য পত্র লেখেন ও তাঁহাকে রাজমহলে উপস্থিত থাকিতে বলেন। ১৭ই জুন ক্লাইব কাপ্তেন কুট কাটোয়ার দুর্গ অধিকার করিলেন। সেইখানে মীরজাফর অঙ্গীকারানুযায়ী ক্লাইবের সঙ্গে যোগদান করেন নাই। মীরজাফর আলিবর্দ্দির ভগ্নীপতি ও তাঁহার অন্নে বহুকাল প্রতিপালিত, বিশেষতঃ মাতামহীর অনুরোধ বশতঃ নবাব স্বীয় ইচ্ছার বিরুদ্ধে কার্য্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। সেইজন্যই তিনি তাঁহার চরণতলে উষ্ণীষ ত্যাগ করিয়া আপনার পূর্ব্বকৃত সমস্ত দোষের ক্ষমা প্রার্থনা করিলে মীরজাফর কোরাণ স্পর্শে নবাবের পক্ষে প্রাণপণে যুদ্ধ করিবেন স্বীকার করিয়াছিলেন ও মীরজাফর সেই অঙ্গীকার মত কাটোয়ায় ক্লাইবের সাহায্য করেন নাই। ক্লাইব শেষে একজন ব্রাহ্মণের দ্বারা মীরজাফরকে ইংরাজের পক্ষালম্বন করিবার অনুরোধ করিয়া কৃতকার্য্য হন। ইহা ক্লাইব তাঁহার প্রেরিত গুপ্ত সভার পত্রে উল্লেখ করিয়াছেন।
গূঢ় উদ্দেশ্যঃ— যাহাই হউক, নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতা অধিকার করিয়া উহার নাম আলিনগর রাখিয়াছিলেন, উহার নাম পুনরায় কলিকাতা করার বিষয় নবাবের মুসলমানী ধর্ম্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধ বলিয়া ক্লাইব নবাবের সহিত কলিকাতার প্রথম সন্ধিতে উহার উল্লেখ করেন নাই কিন্তু পলাশি যুদ্ধের পূর্ব্বে মীরজাফরের সঙ্গে যে দ্বিতীয় ষড়যন্ত্র সন্ধি উভয় পক্ষে স্বাক্ষরিত হইয়াছিল উহাতে সেকথা পরিষ্কার ছিল। ইরাজের সৌভাগ্যবলে ও পাকে চক্রে তখন নবীন নবাব মূর্খ হইয়া পড়েন কিন্তু বস্ততুঃ তাহার কার্যকলাপ দ্বারা উহা প্রমাণিত হয় না। মাতামহের অবলম্বিত পথানুসরণ করিয়া মীরজাফরকে বিশ্বাস করাই তাঁহার সর্ব্বনাশের মূল কারণ হইয়াছিল। শেষে তিনি যে ইংরাজের চক্রে ব্রাহ্মণের কৌশলে মীরজাফর ধর্ম্ম কর্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়া নবাবের সর্ব্বনাশ করিবেন ইহার সন্ধান রাখেন নাই। কলিকাতায় বাঙ্গালার শেষ নবাবের রঙ্গস্থল ও সমাধির আয়োজন তাঁহার একজন পরম বিশ্বাসী আত্মীয় ও বন্ধুবর্গের অঙ্গীকারপত্র দ্বারা কলিকাতায় হইয়াছিল। মীরজাফর কৃত কলিকাতার নাম আলিনগর হইতে পরিবর্তিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের মূলোৎপাটন হইয়াছিল। কলিকাতার সহিতই ইংরাজের অভ্যুদয়ের প্রধান সম্বন্ধ বর্ত্তমান ও ক্লাইব যেন সেই সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিল। ক্লাইব কাহারও কোন ক্ষমতার দিকে দৃষ্টিপাত বা বিবেচনা করিয়া কার্য্য করেন নাই, এমন কি, তিনি সময়ে সময়ে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষগেণর অভিমতের বিরুদ্ধে কার্য্য করিতেন ও সেই সকল ত্রুটিতে ইংরাজের মঙ্গল ও নবাবের সর্ব্বনাশ হওয়া বিধাতার লিপি ভিন্ন আর কিছুই নয়! যথা সময়ে ফরাসিরা নবাবের সাহায্যে আগমন করিতে না পারায় নবাবের সর্ব্বনাশ মীরজাফর স্বার্থোন্নতির বশবর্ত্তী হইয়া করিয়াছিল। ঐরূপ বিধাতার শাপেই ওয়েলিংটন মহাবীর ও নেপোলিয়নের সর্ব্বনাশ হইয়াছিল। তাঁহার তুলনায় ক্লাইব অতি সামান্য সৈনকিমাত্র সৌভাগ্যক্রমেই ইতিহাসে সেইরূপ তাঁহার নাম বিখ্যাত হইয়াছিল।
কলিকাতা ব্রিটিশ জাতির উন্নতির পরশমণি স্বরূপ, সেইজন্যই উহা ভারত সাম্রাজ্যের রাজধানী হইয়াছিল ও সেইখান হইতেই তাহাদের শক্তি বিস্তৃত হইয়াছিল। সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতাধিকার করিয়া সেইখানের নগরবাসিগণের গৃহাট্টলিকা ধ্বংস করিল, কিন্তু কোম্পানির দুর্গাদি সম্বন্ধে সেরূপ কোন কিছুই করেন নাই, উহার সম্বন্ধে কেহই কোন কথা বলেন নাই। যদি দুর্গাদি দৃঢ় করিবার অপরাধে কলিকাতা গ্রহণ করাই নবাবের মূল উদ্দেশ্য হইত, তবে উহা তিনি প্রথমেই নষ্ট করিতেন। বাঙ্গালায় ইউরোপের যে সকল কোম্পানিরা ব্যবসা করিত, তাহাদের প্রত্যেকের এক একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল। ইংরাজ ভিন্ন আর কেহই আড়তদারী ও কারখানা খুলিয়া শিল্পিগণকে অর্থ দ্বারা বশীভূত পূর্ব্বক কাপড়াদি বয়ন ও ছিট তৈয়ারি ব্যবসার কেন্দ্রস্থল বাঙ্গালায় করে নাই। আলিবর্দ্দি মুর্শিদাবাদে মনসুরগঞ্জ স্বীয় প্রিয় দৌহিত্রের আয়ের নিমিত্ত করিয়াছিলেন। উহাতেই নবীন নবাবের ব্যবসাদির প্রতি দৃষ্টি পড়িয়াছিল। উহাতেই তাঁহাদের পরস্পরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হইয়াছিল। বাঙ্গালার সেকালের প্রধান প্রধান সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ীরা কলিকাতায় আসিয়া ইংরাজগণের উৎসাহে ও বিপদাপদে রক্ষা পাইবার জন্য বসবাস আরম্ভ করে। উহাতে মুর্শিদাবাদ হুগলী আদি স্থানের বিলক্ষণ ক্ষতি হইতেছিল। সেই সকল ব্যবসায়ীরা যাহাতে কলিকাতা ত্যাগ করিয়া সেই সকল স্থানে গমন করে, উহাই নবাবের বা অর্থগৃধ্নু তৎকর্ম্মচারীগণের কলিকাতার নিরীহ ব্যবসায়ীগণের গৃহাদি ধ্বংস করিবার গূঢ় মূল উদ্দেশ্য ছিল।
সেই সকল অগ্নি দ্বারা ভস্মসাৎ হয়, যুদ্ধ বিগ্রহের গোলাগুলি দ্বারা হয় নাই। সেই মহাপাপে সিরাজউদ্দৌলার পতন ও নাশ হইয়াছিল। ইংরাজগণ সেকালের প্রধান প্রধান ব্যবসায়ীগণকে ক্ষতিপূরণের টাকা বণ্টন করিবার ভার অর্পণ ও তাঁহারা যাহাতে কলিকাতা ত্যাগ করেন না সেই ব্যবস্থা করিয়াছিলেন ও যাহারা সেই সময় কলিকাতা হইতে পলায়ন করিয়াছিল তাহারা ঐ টাকা পাইবে না বলেন। আরও যাহাতে তাঁহাদের আত্মীয় স্বজন আদি কলিকাতায় আসিয়া বসবাস করে, সেইজন্য তাঁহাদের অনুগত ব্যক্তিগণ ঐ অর্থ লাভ করে। পুরাতন কলিকাতার ধ্বংস ও উহাতে নূতন ঘর বাড়ীর পত্তনের জন্য সিরাজউদ্দৌল্লার কলিকাতাধিকার সম্পূর্ণ ভাবে দায়ী। মূর্খ নবাব কলিকাতা অধিকার সম্পূর্ণভাবে যাহাতে স্থায়ী থাকে সে বিষয়ে যথারীতি ব্যবস্থা না করিয়া নিজের পতনের জন্য কতকাংশে দায়ী ও দোষী।
ক্ষতিবৃদ্ধিঃ— যাহাই হউক, কলিকাতার ধ্বংসে পুরাতন বাসিন্দাগণের যে সর্ব্বনাশ হইয়াছিল উহার শতাংশের একাংশও ক্ষতিপূরণের অর্থে হয় নাই কিন্তু উহাতে ভবিষ্যতে ইংরাজ কোম্পানির সম্পূর্ণ লাভ হইয়াছিল। কারণ সেকালের নবাবী আমলে বাদসাহী ও নবাবী সনদ উপাধি দলিল আদি রক্ষা করিবার উপযুক্ত সিন্ধুক আদি যাহা অগ্নি তে দগ্ধ হয় না সেরূপ বর্ত্তমান কালের ন্যায় কোন কিছু ছিল না। সেই সকল অমূল্য বস্তু কলিকাতায় সেই অগ্নি সৎকারে নষ্ট হইয়াছিল। উহাতে অনেক জায়গা জমি কোম্পানি লাভ করে। তখন মল্লিক উপাধিদানের সঙ্গে সঙ্গে জায়গীর দেওয়া হইত। নয়নচাঁদের পূর্ব্বপুরুষেরা মল্লিক উপাধি লাভ করিবার সময় হালিসহরে জায়গীর পাইয়াছিলেন। তাঁহারা সেইখানে বহু অর্থ ব্যয় করিয়া খাল কাটাইয়াছিলেন ও কাঁচড়াপাড়ার শ্রী শ্রী কৃষ্ণরায় জীউর অতি সুন্দর বৃহৎ মন্দিরাদি প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। তখন ঐ খালের মধ্যে পূর্ব্ববঙ্গের যাবতীয় মালের নৌকা যাতায়াত করিত, উহার সুবিধার জন্যই ঐরূপ করিয়াছিল। প্রথমে তাঁহারা সপ্তগ্রাম ও পরে ত্রিবেণীতে বাণিজ্য ও বাস করিত। শেষে কলিকাতার সেই অগ্নি তে তাঁহাদের সেই সকল অমূল্য বাদশাহি পাঞ্জাদিসহ জায়গীর ও উপাধির সনন্দ ও প্রাচীন হর্ষবর্দ্ধনের আমলের নানা রাজনিদর্শন ও বংশলতিকা প্রভৃতি নষ্ট হইয়া যায়। পরবর্ত্তীকালে তাঁহারা সেইরূপ জায়গীরের কায়েমী স্বত্ত্ব নষ্ট দলিলাদি দ্বারা প্রতিপন্ন করিতে না পারায় কোম্পানি উহা আত্মসাৎ করিয়া আপনার ইষ্টসিদ্ধি করেন। আজও ঐ খাল মজিয়া গেলেও উহা মল্লিকের খাল বলিয়া বিদিত হইয়া থাকে। তবে এই পর্যন্ত স্থির যে, যাহারা ক্ষতিপূরণের টাকা বণ্টন করিবার ভার পাইয়াছিল ও করিয়াছিল তাহারা প্রায় অধিকাংশই সেকালের শ্রেষ্ঠ গণ্যমান্য ব্যবসায়ী ও যাহাদের সততার উপর কোম্পানির ও সর্ব্বসাধারণের সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল একথা অস্বীকার করা যায় না। আরও তাহারা যাহাতে কলিকাতা ত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন না করে উহাও কোম্পানির গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল। উহাদেরই উপর কলিকাতার অতীত উন্নতি যেমন নির্ভর করিয়াছিল এবং ভবিষ্যতে সেইরূপ করিবে ইহা ইংরাজেরা বুঝিতে পারিয়াছিল। নবাবের কলিকাতা অধিকার ও ইংরাজ কোম্পানি উহার উদ্ধারাদি করায় স্বদেশী ব্যবসায়ীগণের ব্যবসায় মঙ্গল ও উন্নতি হয় নাই। সেকালে কলিকাতায় ইংরাজ কোম্পানির কোন গৌরবান্বিত ব্যবসার কেন্দ্র ছিল না। ইতিহাসে যে দাস ব্যবসা রহিত করার জন্য বিলাতের ইংরাজগণের নাম স্বর্ণাক্ষরে উল্লিখিত হইয়া থাকে, সেই হেয় ব্যবসা ইংরাজ কোম্পানি তখন কলিকাতায় করিত। তদ্ভিন্ন দাদন ও গছান প্রথায় দেশী তাঁতিরা তাহাদের স্বজাতীগণের মোড়লীতে দাসত্ব করিত। শেঠেরা বা বসাকেরা সেইজন্য সম্পূর্ণ দায়ী ও তাহারাই কোম্পানির নামজাদা দালাল ও সেই ব্যবসার মোড়ল ছিল। তাহাদের সেই স্মৃতি আজও কলিকাতার রাস্তায় রক্ষিত হইতেছে। উহারা সেই সময়ের পর হইতে ইংরাজ টোলার নিকট না থাকিয়া বাঙ্গালীর টোলার নিকট বাস করা মঙ্গলের বিষয় বুঝিতে পারিয়াছিল। সেইজন্য তাহাদের আবাস গৃহাদিতে ইংরাজ কর্ম্মচারীরা ভাড়া করিয়া বাস করিত, উহা সেকালের পুরাতন নকসায় আছে। সেকালে গঙ্গার ঘাট ধর্ম্মার্থে যেমন নির্ম্মিত হইত, তেমনি ব্যবসায়ীরা উহা আপনাদের মাল তুলিবার ও বোঝাই দিবার জন্য করিত। সেইজন্য তখন অনেক ঘাট ইংরাজের ও নবাবের নামে ছিল। ব্যবসায়রা নবাবের ঘাটে মাল তুলিলে ঐ ঘাট ব্যবহারের মাশুল তাহাদিগকে দিতে হইত।
কলঙ্কঃ— কলিকাতার নাম নবাব সিরাজউদ্দৌলার দৌলতে মুসলমানী আলিনগর হইয়াছিল। নবাবের সহিত কলিকাতার যে অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্বন্ধ ছিল উহাও দেখা যাইতেছে। রামায়ণে যেমন শ্রীরামচন্দ্র সপ্ততাল বিদ্ধ করিলে তিনি যে বালিকে বধ করিতে পারিবেন সুগ্রীবের এই বিশ্বাস হইয়াছিল ও তিনি বালিকে সম্মুখ সমরে বধ না করায় তাঁহার যেমন দুরপনের কলঙ্ক বর্ত্তমান, তেমনি ক্লাইবের ভাগ্যেও সেইরূপ হইয়াছিল। তাঁহার পূর্ব্বের সমস্ত বীরত্ব কাহিনী কলিকাতার সন্ধি ও পলাশি যুদ্ধে কলঙ্কিত হইয়াছিল। মূর্খ মীরজাফর ক্লাইবকে কলিকাতা উদ্ধার একপ্রকার বিনাস্ত্রপাতে করিতে দেখিয়া উহার সহিত ষড়যন্ত্র ও সন্ধি করে ও বিশ্বাস বিমুগ্ধ নবাবের মস্তক গর্ব্বিত বংশধর মীরণের হস্তে অর্পণ করিয়া তাঁহার ইহলোকের ও পরলোকের সকল জ্বালাযন্ত্রণার দুঃখ হইতে তাঁহাকে মুক্ত করিয়াছিলেন। সেই মীরজাফর ও মীরণ বীর মুসলমান জাতির কলঙ্ক ও সেইরূপ লোকেরাই উহাদের পতনের মূল কারণ ও ইংরাজ কোম্পানির উন্নতির সহায় হইয়াছিল।
হায়! ঘটনাচক্র, চক্রান্ত, মূর্খতা ও বিশ্বাসঘাতকতাতেই বাঙ্গালার সেকালের অধিপতিগণের ও দেশের সবর্বনাশ হইয়াছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলিকাতাধিকার করিয়া ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দাদন ও আড়তদারী ব্যবসা নষ্ট করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু ভগবানের শাপে তিনি কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই বলিয়া তাঁহার যে কিছু কলঙ্ক সম্ভব হইতে পারে। তিনি দেশের ও দশের উন্নতির চেষ্টা করিয়া গৌরবান্বিত হইয়াছিলেন।
The Nawab spoke kindly to them, and ordered that they should be guarded for the night, having no intention whatever, there is the strongest reason to believe, that any harm should befall them. But owing to the natural cruelty or indifference of their guards they were thrust after the departure of the Nawab into a small room.” page 79.
* “No satisafaction was obtained for the atrocities of any provision for this
purpose is the greatest scandal attached to the treaty. For this no sufficient
apology can be found. Peace was desirable, but even peace is bought too
dearly when the sacrifice of national honour is the price.” (Thoton’s History
of the British Empire Vol. I. 231.)
* সিরাজউদ্দৌলা পৃষ্ঠা ২০৩/৪
** The Indian Empire V.I Page 373
* “As soon as an expedition was resolved upon I offered my service, which was
at last accepted and I am now upon the point of embarkiig on board His
Majesty’s squadron with a five body of Europeans full of spirit and resentment
for the insults and barbarities inficted on so many British subjects. I flatter
myself that this expedition will not end with the taking of Calcutta only, and
that the Company’s estate in those parts will be settled in a better and
ever lasting condition than ever. I hope we shall be able to disposess the
French of Chandernagore and leave Calcutta in a state of defence.”
** History of India V. III page 545
* “The Government agreed to entertain at the Company’s pay the son of the
deceased Manickchand who was useful to them in various ways during the
preceding thirty years, though he led the Nabobo troops against them at
the battle “Bugsbuge.”
** ক্লাইব চরিত ৪৬ পৃষ্ঠা।
* Orme II. P. 125-126.
* ক্লাইবের চিঠি যাহা মোহনলাল পাইয়াছিল:—কলিকাতার আক্রমণকালে এখনকার মত আমার
সৈন্যবল ছিল না। এখন যদি যুদ্ধ হয়, তবে এক পক্ষ নির্ম্মূল হইবে জানিবেন, সন্ধি হইবে
না। আপনার মতেই নবাব কার্য্য করেন, সেইজন্যই আমার মত জানাইলাম। (ক্লাইব চরিত
পৃষ্ঠা ১০৬)
* Beveridge’s History of India Bk III page 557.
** ক্লাইবকে ওয়াটসন লিখিয়াছিলেন:— নবাব কেবল ভবিষ্যত বল সঞ্চয়ের জন্য সন্ধি করিতেছেন
উহার চতুরতায় ভুলিও না, পরিণাম বিষময় হইবে।Ivis Narrative.
* History of India Bk III. page 572 & 574.
