Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কহলীল জিবরান রচনা সমগ্র (ভাষান্তর : মোস্তফা মীর)

    মোস্তফা মীর এক পাতা গল্প1071 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    মানুষের পুত্র যিশু [জেসাস, দ্য সান অব ম্যান]

    মানুষের পুত্র যিশু [জেসাস, দ্য সান অব ম্যান] 

    যীবিদি’র পুত্র জেমস : পৃথিবীর সাম্রাজ্যে

    বসন্তকালের একদিনে যিশু জেরুজালেমের বাজার এলাকায় দাঁড়ালেন এবং তিনি কথা বললেন স্বর্গের সম্রাজ্যের জনতার উদ্দেশে।

    তিনি অভিযুক্ত করলেন অনুলেখক ও প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকদেরকে যারা ফাঁদ পেতে ও গর্ত খুঁড়ে রাখে সেইসব মানুষের পথে যাদের আকুল আকাঙ্ক্ষা এই সম্রাজ্যের জন্য এবং তিনি তাদেরকে নিন্দাবাদ করলেন।

    এখন কোলাহলের ভেতরে ছিল একদল মানুষ, যারা নিরাপত্তা দিত এইসব ইহুদি ও অনুলেখকদের, যারা তাদের হাতকে শুইয়ে দিত কখনও যিশুর সামনে, কখনও আমাদের সামনে।

    কিন্তু তিনি তাদেরকে এড়িয়ে গেলেন, নিজেকে সরিয়ে নিলেন একপাশে এবং তারপর হাঁটতে লাগলেন নগরীর উত্তরের দরজার দিকে।

    এবং তিনি আমাদেরকে বললেন, ‘আমার সময় এখনও আসেনি, বহু জিনিস আমি এখনও তোমাদেরকে বলিনি এবং বহু কর্মকাণ্ড আমি তোমাদেরকে দেখাব না, যা যা আমি পৃথিবীর মানুষকে আগে দেখিয়েছি।’

    তারপর তিনি বললেন এবং তার কণ্ঠে ছিল উল্লাস ও উচ্চহাসি, ‘চলো আমরা উত্তরের দেশগুলিতে যাই এবং বসন্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আমার সঙ্গে পাহাড়ে চলো, কারণ শীত চলে গেছে এবং লেবাননের বরফগুলি অবতরণ করছে উপত্যকাগুলিতে নদীর সঙ্গে গান গাইতে।

    আঙুর এবং শস্যক্ষেতগুলি নির্বাসিত হয়েছে ঘুমের ভেতরে এবং এখন তারা জেগে ওঠে সবুজ ডুমুর ও তরতাজা আঙুর নিয়ে সূর্যকে অভিবাদন জানাতে।

    তিনি আমাদের আগে আগে হাঁটতে লাগলেন এবং আমরা তাকে অনুসরণ করলাম সেইদিন এবং তার পরবর্তী দিনগুলিতেও।

    তৃতীয় দিনের অপরাহ্নে আমরা মাউন্ট হারমন-এর চূড়ায় পৌঁছালাম এবং সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাকিয়েছিলাম সমতলভূমির শহরগুলির দিকে।

    গলিত সোনার মতো চকচক করছিল তাঁর মুখমণ্ডল এবং তিনি তার বাম বাহু প্রসারিত করে আমাদের উদ্দেশে বললেন, ‘লক্ষ্য করো সবুজ পোশাকে সজ্জিত হয়েছে পৃথিবী এবং কী পরিমাণ রুপালি স্রোত ছুঁয়েছে তার পোশাকের প্রান্ত।

    ‘সত্যের ভেতর পৃথিবী হচ্ছে পক্ষপাতহীন এবং তার ওপরে যা-কিছু আছে সবই পক্ষপাতহীন।

    ‘কিন্তু তোমরা যা দেখে থাকো তারও ওপরে একটা সাম্রাজ্য আছে এবং তা আমি শাসন করব। তবে যদি তা তোমাদের পছন্দ হয় এবং বস্তুতপক্ষে যদি তা হয় তোমাদের আকাঙ্ক্ষা, তাহলে তোমরাও আসবে এবং শাসন করবে আমার সঙ্গে।

    ‘আমরা মুখোশ পরবো না, আমাদের হাতে থাকবে না কোনো তরবারি অথবা রাজদণ্ড এবং আমাদের বিষয়গুলি আমাদেরকে ভালোবাসবে শান্তির ভেতরে এবং তা আমাদেরকে কখনও ভয় করবে না।’

    যিশু এসব বললেন এবং আমি ছিলাম পৃথিবীর সমস্ত সম্রাজ্য, দেয়ালের নগর ও সুউচ্চ প্রাসাদগুলির প্রতি অন্ধ এবং প্রভুকে তার সাম্রাজ্যে অনুসরণ করার বিষটি ছিল আমার হৃদয়ে।

    সেই মুহূর্তে ইসক্যারিওটের জুডাস সামনে এগিয়ে এল এবং হেঁটে গেল যিশুর কাছে এবং বলল, ‘লক্ষ্য করুন পৃথিবীর সাম্রাজ্য বিশাল এবং লক্ষ্য করুন দাউদ ও সোলেমানের শহরগুলি রোমের বিরুদ্ধে সাফল্যের সাথে লড়াই করবে। আপনি যদি ইহুদিদের রাজা হন তাহলে আমরাও তরবারি ও ঢাল নিয়ে আপনার পাশে দাঁড়াব এবং আমরা অতিক্রম করে যাব বহিরাগতদের।’

    যিশু একথা শুনে জুডাসের দিকে তাকালেন এবং তার মুখমণ্ডল পরিপূর্ণ ছিল তীব্র ক্রোধে এবং আকাশের বজ্রের মতো ভয়াবহ স্বরে তিনি বললেন, ‘পেছন থেকেই কেটে পড়ো শয়তান। তুমি ভাবছ আমি এসেছি একদিনের জন্য উইটিবি শাসন করতে?

    ‘আমার সিংহাসন হল সেই সিংহাসন, যার অবস্থান তোমার দৃশ্যমানতারও ওপরে। যার পাখা পৃথিবীকে বৃত্তাবদ্ধ করে সে কি আশ্রয় সন্ধান করে একটা পাখির বাসায়, যা পরিত্যক্ত এবং বিস্মৃত?

    ‘একজন জীবন্ত কি সম্মানিত ও প্রশাংসায় ভূষিত হবে মৃতের পোশাক পরে? এই পৃথিবী আমার সাম্রাজ্য নয় এবং তোমাদের বংশধরের খুলির ওপর আমার আসন নির্মিত হয়নি।’

    ‘যদি কোনোকিছু না-জানা ছাড়াই তোমরা আত্মার সাম্রাজ্য অনুসন্ধান করো তাহলে আমাকে এখানে পরিত্যাগ করাই তোমাদের জন্য অধিকতর উত্তম এবং নেমে যাও মৃত্যুর গুহায়, যেখানে প্রাচীনকালের মুকুট পরিহিত মাথাগুলি টিকে আছে তাদের সমাধিতে এবং এখনও পর্যন্ত সম্মান করতে পারো তোমাদের প্রপিতামহের হাড়গুলিকে। —

    ‘কী দুঃসাহসে তোমরা আমাকে প্রলুব্ধ করো অপরিশোধিত ধাতু নির্মিত রাজমুকুট পরতে, যখন আমার ললাট অনুসন্ধান করে প্লেয়াডেস-কে অথবা তোমাদের সিংহাসনকে।’

    ‘এটা কি একটা স্বপ্ন ছিল না, যে স্বপ্ন দেখেছিল একটা বিস্মৃত প্রতিযোগিতা। আমি তোমাদের সূর্যকে কষ্ট দেব না আমার ধৈর্যের ওপর উদিত হতে অথবা কষ্ট দেব না তোমাদের চন্দ্রকে আমার ছায়া নিক্ষেপ করতে তোমাদের পথের ওপর আড়াআড়িভাবে।

    ‘এটা কি ছিলনা একটা মায়ের আকাঙ্ক্ষা যে, আমি আমার গায়ে একটুকরো পোশাকও রাখবনা এবং আমি পালিয়ে ফিরে যাব মহাশূন্যে?

    ‘এবং এটা ছিল না তোমাদের প্রত্যেকের দুঃখ যে, আমি অবস্থান করব না এখানে কাঁদবার জন্য।

    ‘জুডাস তুমি কে এবং কী এবং কেন তুমি আমাকে প্রলুব্ধ কর?

    ‘সত্যের ভেতরে তুমি কি আমাকে পরিমাপ করছ কোনো মাপদণ্ড দিয়ে এবং আমাকে দেখেছ বিপুলসংখ্যক পিগমীকে নেতৃত্ব দিতে এবং পরিচালনা করতে আকৃতিহীনতার রথ সেইসব শত্রুদের বিরুদ্ধে যারা তাঁবুতে বসবাস করে শুধুমাত্র তোমাদের ঘৃণার ভেতরে এবং তোমাদের আকাঙ্ক্ষার ভেতরে ছাড়া কোথাও তারা কুচকাওয়াজ করে না।

    ‘অসংখ্য অমেরুদণ্ডী কীট আমার পায়ের ওপর হামাগুড়ি দেয় এবং আমি কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করি না। ঠাট্টার ব্যাপারে আমি ক্লান্ত এবং ক্লান্ত কীটপতঙ্গদের করুণা করার ব্যাপারে, যারা আমাকে কাপুরুষ মনে করে, কারণ আমি তাদের সুউচ্চ প্রাসাদ ও প্রহরারত দেয়ালের মাঝখান দিয়ে চলাচল করব না।

    ‘দয়া, আমার অবশ্যই দয়া প্রয়োজন একেবারে শেষদিকে। আমি কী আমার পদক্ষেপকে ফেরাতে পারব বৃহত্তর কোনো পৃথিবীর দিকে যেখানে বিশলাকৃতির মানুষেরা বসবাস করে? কিন্তু আমি কীভাবে করব?

    ‘তোমাদের যাজক ও রাজারা আমার রক্ত ঝরাবে। আমি যদি এখানে থেকে চলে যাই তাহলে তারা তৃপ্ত হবে। আমি আইনের গতি পরিবর্তন করব না এবং আমি শাসন করব না মূঢ়তাকে।

    ‘অজ্ঞতাকে পুনরুৎপাদন করতে দাও নিজেকেই যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিজস্ব বংশধরদের ক্লান্ত করে না তোলো।

    ‘অন্ধকে নেতৃত্ব দিতে দাও অন্য একজন অন্ধকে গর্তের দিকে এবং একজন মৃতকে সমাহিত করতে দাও অন্য একজন মৃতকে, যতক্ষণ মাটির শ্বাসরুদ্ধ না হয় নিজস্ব তিক্ত ফল দ্বারা।

    ‘আমার সাম্রাজ্য এই পৃথিবীর নয়। আমার সাম্রাজ্য হবে সেখানে, যেখানে তোমাদের দুই অথবা তিনজন মিলিত হবে ভালোবাসা, জীবনের চমৎকারিত্ব, উত্তম সান্ত্বনা এবং আমার স্মৃতির ভেতরে।

    তারপর হঠাৎ করেই তিনি জুডাসের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘আমার পেছন থেকেই তুমি কেটে পড়ো। তোমার সাম্রাজ্য কখনও আমার সাম্রাজ্য হবে না।’

    এবং এটা ছিল গোধূলিবেলা এবং তিনি আমাদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘চলো নিচে যাই। আমাদের ওপর রাত্রি নেমে আসবে। চলো আমরা আলোতে হাঁটি যতক্ষণ আলো আমাদের সঙ্গে আছে।’

    তারপর তিনি পাহাড় থেকে নামতে লাগলেন এবং আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। জুডাস অনুসরণ করল দূর থেকে এবং যখন তিনি নিচে পৌঁছালেন তখন রাত্রি।

    ডিওফেন্স-এর পুত্র টমাস তাকে বলল, ‘প্রভু এখন অন্ধকার এবং আমরা আর পথ দেখতে পারছি না। এটা যদি হয় আপনার ইচ্ছা, তাহলে ওই আলোকোজ্জ্বল গ্রামের দিকে আমাদেরকে নেতৃত্ব দিন যেখানে আমরা খাবার ও আশ্রয় পেতে পারি।’

    যিশু উত্তরে বললেল, ‘যখন তোমরা ক্ষুধার্ত ছিলে আমি তখনই তোমাদেরকে ওপরে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং তোমরা সমতল ভূমিতে নেমে এসেছ আরও বিশাল ক্ষুধাকে বহন করে। কিন্তু আমি আজ রাতে তোমাদের সঙ্গে থাকতে পারব না। আমি একা থাকব।’

    তারপর সাইমন পিটার সামনে এগিয়ে এল এবং বলল, ‘প্রভু, আমাদের কষ্ট হোক কিন্তু অন্ধকারে আপনি একা যাবেন না, বরং অনুমোদন করুন এখানে এই পথের ওপর আমাদের একসঙ্গে থাকা। রাত্রি এবং রাত্রির ছায়া দীর্ঘায়িত হবে না এবং যদি আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন তাহলে ভোরবেলা দ্রুত আমাদেরকে খুঁজে পাবে।’

    যিশু উত্তরে বললেন, ‘এই রাতে শেয়ালেরা তাদের গর্তে থাকবে এবং বাতাসে উড়ে বেড়ানো পাখিরা থাকবে তাদের বাসায়, কিন্তু মানুষের পুত্রের জন্য কোনো ভূমি নেই যেখানে সে তার মাথাকে শায়িত করতে পারে। বস্তুতপক্ষে এখন আমি একা হব। যদি আমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা জাগে তাহলে তোমরা আমাকে আবার খুঁজে পাবে সেই জলাভূমির ধারে যেখানে আমি তোমাদেরকে পেয়েছিলাম।’

    ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা তাকে রেখে চলে গেলাম, কারণ আমাদের ইচ্ছা ছিল না তাকে পরিত্যাগ করার।

    বহু সময় আমরা থেমেছি এবং মুখ ফিরিয়েছি তার দিকে এবং আমরা দেখেছি রাজকীয় নিঃসঙ্গতার ভেতরে তিনি পশ্চিমদিকে চলেছেন।

    আমাদের ভেতরে শুধু একজন তাকে দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়নি তাঁর নিঃসঙ্গতার ভেতরে এবং সে ছিল জুডাস।

    সেই দিন থেকে জুডাস বিষণ্ন ও দূরবর্তী মানুষে পরিণত হল এবং আমার মনে হয় তার অক্ষিকোটরের ভেতরে ছিল ভয়াবহ বিপদ।

    মেরির মাতা আন্না : যিশুর জন্ম

    যিশু আমার কন্যার পুত্র। সে জানুয়ারি মাসে নাজারেতে জন্মেছিল এবং যে রাতে সে জন্মায় সেই রাতে পুব থেকে কয়েকজন লোক এসেছিল আমাদের বাড়িতে। তারা ছিল পারস্যের লোক, যাচ্ছিল এসড্ৰেইলনে মিশরগামী এক কাফেলার সঙ্গে। সরাইখানায় কোনো জায়গা না-পেয়ে আমাদের এখানে তারা আশ্রয় নিয়েছিল।

    আমি তাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললাম, ‘আমার কন্যা আজ রাতে একটা ছেলেশিশুর জন্ম দিয়েছে। সুতরাং অতিথি হিসেবে আপনাদের প্রতি যথেষ্ট কর্তব্য না করতে পারলে আপনারা অবশ্যই আমাকে ক্ষমা করবেন।’

    আশ্রয় দেবার জন্য তারা আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং রাতের খাবার খাওয়ার পর বললেন, ‘আমরা নবজাতককে দেখব।’

    তখন মেরির পুত্রকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল এবং তাকেও।

    তারপর সেই পারসীয়রা মেরি ও তার শিশুকে দেখল এবং তারা সোনা, রুপা, গন্ধরস ও রজন একত্রিত করল শিশুর পায়ের কাছে।

    তারপর তারা মাটিতে পতিত হয়ে প্রার্থনা করল অদ্ভুত ভাষায় যা আমরা বুঝতে পারলাম না।

    তারপর আমি তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত শোবার ঘরে তাদেরকে নিয়ে গেলাম, কিন্তু তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠল সম্ভ্রম, বিশেষ করে যা তারা দেখেছিল।

    ভোরবেলা আমাদেরকে পরিত্যাগ করে তারা মিশরের পথে চলে গেল। কিন্তু যাবার সময় তারা আমাকে বলল, ‘এই শিশুর চোখের ভেতরে আমরা আমাদের ঈশ্বরের আলো দেখতে পেয়েছি এবং মুখে ঈশ্বরের হাসি।

    ‘আপনারা তাকে রক্ষা করুন, সে আপনাদের সবাইকে রক্ষা করতে পারে।’ এসব বলে তারা উঠের পিঠে চড়ল এবং আমরা তাদেরকে আর দেখি নাই।

    প্রথম শিশু জন্মানোর যে বিস্ময় ও চমক তার উচ্ছ্বাস মেরির মধ্যে লক্ষ্য করা গেল না। সে তার ছেলের দিকে তাকাল এবং তারপর মুখ ফেরাল জানালার দিকে এবং আকাশের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল যেন সেখানে সে কিছু দেখতে পেয়েছে।

    এবং যেখানে ছিল উপত্যকাগুলি তার হৃদয় ও মনের ভেতরে।

    শরীর ও আত্মায় শিশুটি বড় হতে থাকল এবং সে ছিল অন্য শিশুদের থেকে আলাদা। সে ছিল উদাসীন এবং তাকে শাসন করাও ছিল কঠিন এবং আমি কখনও সে চেষ্টা করতাম না।

    কিন্তু নাজারেতবাসীর কাছে সে ছিল অত্যন্ত পছন্দের মানুষ এবং আমি তা জানতাম, কেন।

    প্রায়সময়ই সে আমাদের খাবার নিয়ে পথিকদেরকে দিত এবং শিশুদেরকে সে খেতে দিত মিষ্টি, যা আমি তাকে খেতে দিতাম তার স্বাদ গ্রহণ করার আগেই

    সে আমার কুঞ্জবনের গাছে উঠে ফল পাড়ত, কিন্তু নিজে সে কখনও খেত না। সে ছিল খুবই দ্রুতগামী, ফলে অন্য ছেলেরা দৌড় প্রতিযোগিতায় তার সঙ্গে পেরে উঠত না। পিছিয়ে পড়ত। সে কারণে সে ইচ্ছা করে বিলম্ব করত যেন তারা তার আগেই সীমানায় পৌঁছাতে পারে।

    মাঝে মাঝে রাতে শোবার সময় আমি তাকে বিছানায় নিয়ে যেতাম। তখন সে আমাকে বলত, ‘আমার মা ও অন্যদেরকে বলবে শুধু আমার শরীরটা এখানে ঘুমিয়ে থাকবে। আমার মন থাকবে তাদের সঙ্গে ভোর না-হওয়া পর্যন্ত।’

    ছেলেবেলায় বহু বিস্ময়কর কথা সে বলত, কিন্তু তার অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আমি ছিলাম খুবই অজ্ঞ।

    এখন তারা আমাকে বলে, আমি তাকে আর দেখতে পাব না। কিন্তু কীভাবে আমি তা বিশ্বাস করব, তারা যা বলে?

    আমি এখনও শুনতে পাই তার উচ্চহাসি এবং আমার বাড়িতে তার দৌড়ানোর শব্দ এবং যখনই আমি আমার কন্যার কপোলে চুমু খাই তাঁর সুগন্ধ ফিরে আসে আমার হৃদয়ে এবং মনে হয় তার শরীর আমার দুই-বাহু পূর্ণ করে তোলে।

    কিন্তু এটা কি বিস্ময়কর নয় যে আমার কন্যা তার প্রথম সন্তান নিয়ে আমার সঙ্গে কখনও কথা বলে না?

    মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমার কন্যার চেয়ে তাঁর প্রতি আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক বেশি। সে দিনের সামনে এমন দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়ায় যেন একটা ব্রোঞ্জের মূর্তি, পাশাপাশি আমার হৃদয় গলে গিয়ে স্রোতোধারার মতো দৌড়াতে থাকে।

    সম্ভবত সে তা জানে, যা আমি জানি না। সে কি আমাকেও তা বলতে পারে?

    টাইরি’র বক্তা আসাফ : যিশুর বক্তৃতা সম্পর্কে

    তাঁর বক্তৃতা সম্পর্কে আমি কী বলব? সম্ভবত তাঁর চরিত্রের কিছু একটা, যার কাছ থেকে ক্ষমতা ধার করে সে তা প্রদান করে তার শব্দাবলিকে এবং তা নাড়া দেয় সেইসব মানুষকে, যারা শুনেছিল। কারণ সে ছিল সুন্দর এবং তার প্রসন্নতার ওপরে ছিল দিনের ঔজ্জ্বল্য।

    নারী ও পুরুষ স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল তার বক্তব্য শোনার চেয়ে। কিন্তু সময়মতো তিনি একটি আত্মার ক্ষমতায় কথা বললেন, এই আত্মার ছিল তাদের ওপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা যারা তার কথা শুনছিল।

    আমার যৌবনে আমি রোম, এথেন্স এবং আলেকজান্দ্রিয়ার বক্তাদের বক্তৃতা শুনেছিলাম। এই নাজরেতবাসী তাদের মতো ছিল না।

    তারা একত্রিত করত তাদের শব্দাবলি সৃজনীক্ষমতার দ্বারা যা কানকে আনন্দ দিত, কিন্তু তোমরা যখন তাঁর কথা শুনবে, তখন তোমাদের হৃদয় তোমাদেরকে পরিত্যাগ করবে এবং সেইসব আস্থাবলে দীর্ঘভ্রমণে যাবে যা এখনও কেউ পরিদর্শন করেনি।

    তিনি তোমাদেরকে একটা কাহিনী বলবেন অথবা কোনো নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী এবং তাঁর বলা গল্প বা রূপক কাহিনী সিরিয়াতে কখনও শোনা যায়নি। মনে হয় তিনি ওগুলো বয়ন করেছেন ঋতুগুলির বাইরে গিয়ে, যেভাবে সময় বয়ন করে বছর ও প্রজন্মগুলিকে।

    তিনি তার গল্প শুরু করেন এভাবে : ‘কৃষক তার মাঠে গিয়েছিল বীজ বুনতে।’ অথবা ‘এক সময় এক ধনী লোকের অনেকগুলি আঙুরক্ষেত ছিল।’

    অথবা ‘এক মেষপালক সন্ধ্যায় তার মেষগুলোকে গুনে দেখল একটা নেই।’

    এসব শব্দাবলি তার শ্রোতাদের বহন করে নিত তাদের আত্মার কাছে এবং তাদের ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে।

    হৃদয়ের ভেতরে আমরা প্রত্যেকেই কৃষক এবং প্রত্যেকেই আমরা আঙুরক্ষেত ভালোবাসি এবং আমাদের স্মৃতির চারণভূমিতে রয়েছে একজন মেষপালক, পশুর পাল এবং সেই হারিয়ে যাওয়া মেষটিও।

    সেখানে রয়েছে লাঙলের ফলা, আঙুর পেষণকারী যন্ত্র এবং মাড়াইখানা

    তিনি জানেন আমাদের প্রাচীন সত্তার উৎস এবং সেই অনন্ত সুতো সম্পর্কে যা আমাদেরকে বয়ন করেছে।

    গ্রিক এবং রোমান বক্তারা জীবন সম্পর্কে তাদের শ্রোতাদেরকে বলে যা তাদের মনে হয়, আর এই যুবক নাজারেতবাসী বলে আকুল আকাঙ্ক্ষার কথা, যার বসতি হচ্ছে হৃদয়ে।

    তারা শুধুই চোখ দিয়ে জীবনকে দেখে, যা তোমার ও আমার থেকে অল্পকিছু স্বচ্ছ। তিনি জীবনকে দেখেন ঈশ্বরের আলোয়।

    আমি প্রায়ই ভাবি তিনি জনতার উদ্দেশে সেইভাবে কথা বলেন যেভাবে পাহাড়চূড়া কথা বলবে সমতল ভূমির সঙ্গে।

    এবং তাঁর বক্তৃতার ভেতরে ক্ষমতা ছিল যা এথেন্স অথবা রোমের বক্তাদের মতো হুকুম করে না।

    মেরি ম্যাগডালিন : যিশুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ

    আমি যখন তাঁকে প্রথম দেখি তখন ছিল জুন মাস। তিনি গমক্ষেতের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন যখন আমি তাকে অতিক্রম করে গেলাম, আমার সঙ্গে ছিল আমার দাসীরা এবং তিনি ছিলেন একা

    তাঁর হাঁটার ছন্দ ছিল অন্যান্য মানুষের তুলনায় আলাদা এবং তার শরীরের নড়াচড়া ছিল এমনই যা আমি আগে কখনও দেখি নাই।

    মানুষ এভাবে পৃথিবীতে হাঁটে না, এমনকি আমি এখনও পর্যন্ত জানি না তিনি জোরে হাঁটেন না আস্তে হাঁটেন।

    আমার দাসীরা তাঁর দিকে আঙুল নির্দেশ করে পরস্পরের সঙ্গে লজ্জা-মেশানো স্বরে কথা বলে ফিসফিস করে। আমি এক মুহূর্তের জন্য থামি এবং হাত তুলি তাকে সম্ভাষণ জানাতে। কিন্তু তিনি তার মুখ ফেরালেন না এবং আমার দিকে তাকালেনও না এবং আমি মনে মনে তাকে ঘৃণা করলাম। আমি দ্রুত ফিরে এলাম আমার ভেতরে এবং এত ঠাণ্ডা নিজের ভেতরে অনুভব করলাম মনে হল বরফ উড়িয়ে নেওয়া বাতাসে আমিও উড়ে যাব এবং আমি ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকলাম।

    সেই রাতে আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম এবং অন্যেরা আমাকে পরে বলল আমি স্বপ্নের ভেতরে চিৎকার করে উঠেছিলাম এবং বিছানার ওপর সারারাত ছিলাম অস্থির।

    আগস্ট মাসে আমি আবার তাঁকে দেখলাম আমার জানালার ভেতর দিয়ে। আমার বাগানের উল্টোদিকে সাইপ্রেস গাছের ছায়ায় তিনি বসেছিলেন। তিনি স্থির হয়েছিলেন যেন এ্যান্টিওচ ও উত্তরের দেশের বিভিন্ন নগরীর মূর্তিগুলির মতো পাথর খোঁদাই করে তাঁকে তৈরি করা হয়েছে।

    আমার মিশরীয় দাস আমার কাছে এসে বলল, ‘সেই লোকটা আবার এখানে এসেছে। আপনার বাগানের উল্টোদিকে বসে আছে।’

    আমি তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম এবং আমার আত্মা শিহরিত হচ্ছিল কারণ তিনি ছিলেন সুন্দর।

    তার শরীর দেখে মনে হয় প্রতিটি অংশ প্রতিটি অংশকে ভালোবাসে।

    তারপর আমি গ্রামাঞ্চলের পোশাকে নিজেকে সজ্জিত করলাম এবং ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁর দিকে হাঁটতে লাগলাম।

    এটা কি ছিল আমার একাকিত্ব অথবা এটা কি ছিল তার সুগন্ধ যা আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেল? আমার চোখে এটা কি ছিল একটা ক্ষুধা, যার আকাঙ্ক্ষা মনোরম অথবা এটা ছিল তাঁর সৌন্দর্য যা আমার চোখে আলো অনুসন্ধান করেছিল?

    এখনও পর্যন্ত আমি তা জানি না।

    আমি আমার সুরভিত পোশাক ও সোনালি চটি পরে তার কাছে হেঁটে গেলাম। এক রোমান ক্যাপ্টেন আমাকে এই চটি দিয়েছিল। আমি তাঁর কাছে পৌঁছালাম এবং বললাম, ‘সুপ্রভাত।’

    তিনি বললেন, ‘সুপ্রভাত, মিরিয়াম।’

    তিনি আমার দিকে তাকালেন। তাঁর ঘোরকৃষ্ণ চোখ আমাকে যেভাবে দেখছিল সেভাবে কেউ কোনোদিন আমাকে দেখেনি এবং হঠাৎ করেই আমার মনে হল আমি নগ্ন হয়ে গেছি এবং আমি লজ্জা পেলাম।’ যদিও সে আমাকে কেবলই বলল, ‘সুপ্রভাত।’

    আমি তাকে বললাম, ‘আপনি আমার বাড়িতে আসবেন না?’

    তিনি বললেন, ‘আমি কি ইতিমধ্যেই তোমার বাড়িতে আসিনি?’ আমি তখন বুঝতে পারিনি তিনি কী বোঝাতে চাইলেন কিন্তু এখন আমি বুঝি।

    আমি বললাম, আপনি কী আমার সঙ্গে বসে সামন্য রুটি ও একটু মদপান করবেন? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ মিরিয়াম কিন্তু এখন নয়।’

    এখন নয়, এখন নয়, তিনি বললেন, ঐ দুই শব্দের ভেতরে ছিল সমুদ্রের কণ্ঠস্বর এবং বাতাস ও বৃক্ষের কণ্ঠস্বর এবং যখন তিনি আমাকে একথা বললেন তখন জীবন কথা বলল মৃত্যুর সঙ্গে।

    বন্ধুরা আমার, মনে করে দ্যাখো আমি ছিলাম মৃত। আমি হলাম এমন একজন নারী যে তার আত্মার বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। আমি সেই আত্মা থেকে দূরে বসবাস করছিলাম তোমরা যে আত্মাকে এখন দ্যাখো। আমি সব মানুষের কিন্তু কারও নই। তারা আমাকে বেশ্যা বলে গালি দেয় এবং আমি হলাম এমন একজন নারী যার সঙ্গে থাকে সাতজন ষড়যন্ত্রকারী নিষ্ঠুর মানুষ এবং আমি হিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিলাম।

    কিন্তু যখন তিনি ভোরবেলার মতো স্বচ্ছ চোখে আমার দিকে তাকালেন তখন আমার রাত্রির আকাশের সমস্ত নক্ষত্র বিবর্ণ হয়ে গেল এবং আমি মিরিয়ামে পরিণত হলাম, শুধুই মিরিয়াম, যে পৃথিবীতে হারিয়ে গিয়েছিল এবং নিজেকে খুঁজে পেয়েছে একটা নতুন জায়গায়।

    আবার আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার বাড়িতে আসুন এবং আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করুন রুটি ও মদ।

    তিনি বললেন, ‘কেন তুমি আমাকে তোমার অতিথি হতে আমন্ত্রণ জানাও?

    আমি বললাম, ‘আমি আপনার কাছে ভিক্ষা চাই, আপনি আমার বাড়িতে আসুন।’ এটা ছিল সবকিছু যা আমার ভেতরে একটা স্তর হিসেবে বেড়ে উঠল এবং এই সবকিছুই আমার ভেতরে তৈরি করেছিল একটা আকাশ যা তাঁকে আহ্বান জানাচ্ছে।

    তারপর তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং দুপুরের মতো তাঁর জ্বলজ্বলে চোখদুটো ছিল আমার ওপর নিবদ্ধ এবং তিনি বললেন, ‘তোমার অনেকগুলো প্রেমিক, যদিও আমি একাই তোমাকে ভালোবাসি। তোমার নৈকট্যে অন্যেরা নিজেকে ভালোবাসে। আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার সত্তার ভেতরে। অন্য মানুষ তোমার ভেতরে যে সৌন্দর্য দেখে তা দ্রুত বিবর্ণ হয়ে আসে। কিন্তু আমি তোমার ভেতরে যে সৌন্দর্য দেখি তা বিবর্ণ হয় না এবং তোমার শরৎকালের দিনগুলিতে সেই সৌন্দর্য তোমাকে ভীত করে তুলবে না আয়নায় তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাতে এবং এই সৌন্দর্য অসন্তুষ্ট হবে না কোনোদিন।’

    ‘আমি একাকি আপনার ভেতরে সেই সব দেখতে ভালোবাসি যা দৃশ্যমান নয়। তারপর তিনি অত্যন্ত নিচু স্বরে বললেন, ‘এখন যাও। যদি এই সাইপ্রেস গাছটা তোমার হয় এবং এর ছায়ায় যদি তুমি আমাকে বসতে দিতে না চাও তাহলে আমি আমার পথে চলে যাব।’

    আমি কেঁদে ফেললাম এবং বললাম, ‘প্রভু আমার বাড়িতে আসুন। আপনাকে অর্ঘ্য দেওয়ার মতো ধূপ আছে যা আমি পোড়াতে পারি এবং আপনার পা ধোয়ানোর জন্য আছে একটা রুপার বেসিন। আপনি একজন আগন্তুক এবং যদিও আপনি আগন্তুক নন। আমি আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি আমার বাড়িতে আসুন।’

    তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং তাকালেন আমার দিকে যেভাবে ঋতুগুলি শস্যক্ষেতের দিকে তাকায় এবং তিনি হাসলেন। তারপর আবার বললেন, ‘সব মানুষই তোমাকে ভালোবাসে তার নিজের জন্য। আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার জন্য।’

    তারপর তিনি চলে গেলেন।

    কিন্তু তিনি যে পথে হেঁটে গেলেন সেই পথে কেউ কখনও হাঁটেনি। এটা কি একটা শ্বাস- প্রশ্বাস যার জন্ম হয়েছিল আমার বাগানে যা এখন পুবদিকে যায় অথবা এটা কি ছিল একটা ঝড় যা সব জিনিসকে নাড়া দেবে ভিত্তিভূমিসহ। আমি জানতাম না কিন্তু সেইদিন তার চোখের ভেতরে ফুটে ওঠা সূর্যাস্ত আমার ভেতরে হত্যা করেছিল সেই ড্রাগনকে এবং আমি পরিণত হয়েছিলাম নারীতে, পরিণত হয়েছিলাম মিরিয়ামে—মিজদেল-এর মিরিয়াম।

    গ্রিক চিকিৎসক ও ওষুধ-বিক্রেতা ফিলেমোন : দক্ষ চিকিৎসক যিশু সম্পর্কে

    নাজারেতবাসী যিশু ছিলেন তাঁর জনগণের জন্য একজন দক্ষ চিকিৎসক। কেউই তখন আমাদের শরীর সম্পর্কে এত বেশি জানত না, এমনকি শরীরের উপাদান ও সম্পদ সম্পর্কে

    রোগাক্রান্ত মানুষের কষ্ট সম্পর্কে গ্রিক ও মিশরীয়রা তেমন কিছুই জানত না। তারা বলে, তিনি মৃত্যুকে জীবনের দিকে আহ্বান জানান এবং এটা সত্য হোক বা না হোক, এটা তার ক্ষমতা ঘোষণা করে, কারণ যে বৃহত্তম জিনিসকে উৎসাহিত করে এটা শুধু তার দিকেই যায়, যা চিরকালীন বৃহত্তম গুণ।

    তারা আরও বলে যিশু ভারত এবং দুই নদীর মাঝখানের দেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখানকার যাজকেরা তার কাছে প্রকাশ করেছিলেন সেই জ্ঞান যা লুকিয়ে আছে আমাদের মাংসের নিভৃত স্থানে।

    ঈশ্বর তাঁকে সরাসরি জ্ঞান দিয়েছেন, যাজকদের মাধ্যমে নয়। সেইসব জ্ঞান যা সব মানুষের কাছে অজ্ঞাত কারণ, অপরিমেয় ঝাল তা একজনের কাছে মুহূর্তেই প্রকাশ করে দিতে পারে এবং এ্যাপোলো তার হাতকে শায়িত করতে পারে অস্পষ্টতার হৃদয়ের ওপর এবং একে বিচক্ষণ করে তুলতে পারে।

    টাইরীয় ও থিবীয়দের সামনে বহু দরজা খোলা ছিল এবং এই লোকের কাছেও সিলমোহরকৃত কিছু নির্দিষ্ট দরজা এখন উন্মুক্ত। তিনি প্রবেশ করেছিলেন আত্মার মন্দিরে যা হচ্ছে শরীর এবং তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেই খারাপ আত্মা যা ষড়যন্ত্র করেছিল মাংসপেশির বিরুদ্ধে এবং ভালো আত্মার বিরুদ্ধে যা বয়ন করতে থাকে তার সূতাগুলি।

    আমার মনে হয় এটা ছিল প্রতিপক্ষের বিরোধিতা এবং প্রতিরোধ, যা দিয়ে তিনি অসুস্থদের সারিয়ে তুলতেন কিন্তু এমনই এক পদ্ধতিতে যা আমাদের দার্শনিকদেরও অজানা। তার স্পর্শে মানুষের জ্বর ছেড়ে যেত এবং মানুষ হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত এবং সে তার নিজস্ব প্রশান্তি দিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বিস্মিত করে তুলত এবং তারা প্রাকৃতিক রীতিতে উৎপন্ন হত তার কাছে এবং শান্তিতে থাকত।

    তিনি জানতেন হলরেখার ভেতরে চিৎকার করে ভাটায় পড়ে যাওয়া প্রাণরস- কিন্তু কীভাবে তিনি প্রাণরসে পৌঁছতেন তার আঙুলের সাহায্যে তা আমি জানিনা। তিনি চিনতেন মরিচার নিচে শুয়ে থাকা শান্ত ইস্পাত- কিন্তু কীভাবে তিনি মুক্ত করেছেন তরবারি এবং তাকে করে তুলেছেন দীপ্তিময়, কোনো মানুষ তা জানে না।

    মাঝে মাঝে আমার মনে হয় সূর্যের নিচে বেড়ে ওঠা যাবতীয় জিনিসের বেদনার মর্মরধ্বনি তিনি শুনতে পান এবং তিনি তাদেরকে উত্তোলন করেন এবং ধারণ করেন শুধু তার নিজের জ্ঞানের মাধ্যমে নয়, তিনি তাদের নিজস্ব ক্ষমতাকেও তাদের কাছে প্রকাশ করে থাকেন বেড়ে উঠতে ও সমগ্রে পরিণত হতে।

    যদিও চিকিৎসক হিসেবে তিনি নিজের সঙ্গে অধিক সম্পর্কযুক্ত ছিলেন না বরং তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন ধর্ম ও তাঁর ভূমির রাজনীতিতে।

    কিন্তু যখন এসব সিরীয়দের কাছে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি আসে তখন তারা ওষুধের চেয়ে মত বিনিময়ের সুযোগ অনুসন্ধান করে।

    তাদের সেইসব বিশাল চিকিৎসকদের জন্য করুণা হয় যারা চিকিৎসার চেয়ে বাজার এলাকায় বক্তৃতাবাজি করতে বেশি পছন্দ করে।

    সাইমন, যাকে পিটার বলে ডাকা হত : তাকে এবং তার ভাইকে যখন আহ্বান জানানো হয়েছিল

    গালীল প্রদেশের লেকের তীরভূমিতে আমি আমার প্রভু যিশুকে প্রথম দেখেছিলাম।

    আমার ভাই এ্যান্ড্রু আমার সাথে ছিল এবং আমরা পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছিলাম।

    উঁচু উঁচু ঢেউগুলি উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল, ফলে আমরা খুব অল্পই মাছ ধরেছিলাম এবং আমাদের হৃদয় ছিল ভারাক্রান্ত।

    হঠাৎ যিশু আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন যেন সেই বিশেষ মুহূর্ত থেকে তাকে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ আমরা তাকে কাছে আসতে দেখিনি।

    তিনি আমাদের নাম ধরে ডাকলেন এবং বললেন, ‘যদি তোমরা আমাকে অনুসরণ করো তাহলে আমি তোমাদেরকে একটা খাঁড়িতে নিয়ে যাব যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে শুধু মাছ আর মাছ।’

    আমি তার মুখের দিতে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত থেকে জাল খসে পড়ল, কারণ আমার ভেতরে একটা অগ্নিশিখা জ্বলে উঠল এবং আমি তাকে শনাক্ত করলাম।

    আমার ভাই এ্যান্ড্রু বলল, ‘এই তীরভূমি আমরা খুব ভালোভাবে চিনি এবং আমরা জানি এরকম ঝড়ো বাতাসের দিনে মাছেরা আমাদের জালেরও ওপরের গভীরতা অনুসন্ধান করে।’

    এবং যিশু বললেন, ‘আমাকে অনুসরণ করো বিশাল সমুদ্রের তীরভূমি পর্যন্ত। আমি তোমাদেরকে মানুষ-শিকারিতে পরিণত করব এবং তোমাদের জাল কখনই শূন্য থাকবে না।’

    আমরা আমাদের নৌকা ও জাল পরিত্যাগ করে তাকে অনুসরণ করলাম। আমি একটা ক্ষমতা দ্বারা উত্তোলিত হয়েছিলাম যা দৃশ্যমান নয় এবং তা তাঁর পাশাপাশি হাঁটছিল।

    পরিপূর্ণ বিস্ময় ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আমি তার কাছে হেঁটে গেলাম এবং আমার ভাই এ্যান্ড্রু ছিল আমার পেছনে হতভম্ব ও বিস্মিত। বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি সাহস সঞ্চয় করলাম এবং তাঁকে বললাম, ‘জনাব আমি এবং আমার ভাই আপনার পদচিহ্ন অনুসরণ করব এবং আপনি যেখানে যাবেন আমরাও সেখানে যাব। কিন্তু আজ রাতে যদি দয়া করে আমাদের বাড়িতে আসেন তাহলে আপনার আগমনে আমরা সম্মানিত বোধ করব। আমাদের বাড়িটা বড় নয়, ছাদও উঁচু নয় এবং আমাদের খাবারও কম দামের। তবে আপনি আমাদের বাড়িতে গেলে তা প্রাসাদে পরিণত হবে এবং আপনি যদি আমাদের সঙ্গে রুটি ভাগাভাগি করেন তাহলে আপনার উপস্থিতিতে এই ভূমির রাজকুমারেরা আমাদেরকে ঈর্ষা করবে।’

    তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আজ রাতে আমি তোমাদের অতিথি হব।’

    আমাদের হৃদয় উল্লসিত হয়ে উঠল এবং আমরা নীরবতার ভেতরে তার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকলাম আমাদের বাড়িতে না-পৌঁছানো পর্যন্ত।

    আমরা মাড়াইখানার কাছে এসে দাঁড়ালাম এবং যিশু বললেন, ‘এই গৃহে শান্তি আসুক এবং শান্তি আসুক তাদের ওপর যারা এর ভেতরে বসবাস করে।’

    তারপর তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আমরা তাকে অনুসরণ করলাম।

    আমার স্ত্রী, তার মা এবং আমার কন্যা তার সামনে দাঁড়াল এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করল, তারপর তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার পোশাকের প্রান্ত চুম্বন করল।

    তারা হতভম্ব হয়ে গেল যে, অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দের তিনি আমাদের অতিথি হয়েছেন, কারণ তারা ইতিমধ্যেই জর্ডান নদীর তীরে তাকে দেখেছিল যখন ব্যাপ্টিস্ট জন জনতার সামনে তার সম্পর্কে প্রচার করছিল।

    আমার স্ত্রী ও তার মা সরাসরি রাতের খাবার প্রস্তুত করতে শুরু করলেন।

    আমার ভাই এ্যান্ড্রু ছিল লাজুক প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু যিশুর প্রতি তার বিশ্বাস ছিল আমার চেয়েও গভীরতর।

    আমার বারো বছর বয়সী কন্যা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং এক হাতে ধরেছিল তাঁর পোশাকের প্রান্ত যেন সে ভয়ে আছে তিনি আমাদের ছেড়ে আবার রাত্রির অন্ধকারে চলে যাবেন। হারিয়ে যাওয়া ভেড়ার মতো সে তার সঙ্গে সেঁটে থাকল যেন তার রাখালকে সে খুঁজে পেয়েছে।

    তারপর আমরা খাবার টেবিলে বসলাম এবং তিনি রুটি ও মদ ভাগাভাগি করলেন আমাদের সঙ্গে এবং আমাদের উদ্দেশে বললেন, বন্ধুরা আমার, আমার সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে তোমরা আমাকে সম্মানিত করেছ।’

    এইসব কথা বলার আগে তিনি একটুকরো খাবার স্পর্শ করলেন, কারণ তিনি একটা প্রাচীন প্রথা অনুসরণ করতে চাইলেন এবং তা হল একজন সম্মানিত অতিথির নিমন্ত্রণ বার্তায় পরিণত হওয়া।

    তার সঙ্গে টেবিলের চারপাশে বসে অনুভব করলাম আমরা একজন বিশাল রাজার সঙ্গে ভোজ উৎসবে বসেছি।

    আমার কন্যা পেত্রোনেলাহ ছিল যুবতী এবং অজ্ঞ। সে স্থিরদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়েছিল এবং অনুসরণ করছিল তার হাতের গতিবিধি। আমি তার চোখে কান্নার একটা অবগুণ্ঠন দেখতে পেলাম।

    খাবার শেষ হওয়ার পর আমরা তাকে অনুসরণ করলাম এবং তাকে ঘিরে বসলাম আঙুরবাগানের ভেতরে।

    তিনি কথা বলছিলেন এবং আমরা শুনছিলাম এবং আমাদের হৃদয় আমাদের ভেতরে পাখা ঝাপটাচ্ছিল পাখির মতো।

    তিনি কথা বলছিলেন মানুষের দ্বিতীয় জন্ম, স্বর্গের দ্বার উন্মুক্তকরণ এবং দেবদূতদের অবতরণ ও সব মানুষের জন্য শান্তি ও সান্ত্বনা বহন করে আনা সম্পর্কে। আরও বলছিলেন ঈশ্বরের প্রতি মানুষের আকঙ্ক্ষা বহনকারী সিংহাসনের ওপর দেবদূতদের অবতরণ করার কথা।

    তারপর তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং স্থিরদৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন আমার হৃদয়ের গভীরতা এবং বললেন, ‘আমি তোমাকে ও তোমার ভাইকে পছন্দ করেছি এবং তোমাদের অবশ্যই আমার সঙ্গে যাওয়া উচিত। তোমরা কঠোর পরিশ্রম করেছ এবং বহন করেছ জীবনের ভারী বোঝা। এখন আমি তোমাদেরকে বিশ্রাম দেব। গ্রহণ করো আমার জোয়াল এবং আমার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, কারণ আমার হৃদয়ের ভেতরে আছে শান্তি এবং তোমাদের আত্মা সেখানে খুঁজে পাবে অতি প্রাচুর্য এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

    যখন তিনি এসব বলছিলেন আমি এবং আমার ভাই তার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম এবং আমি তাঁকে বললাম, ‘প্রভু আমরা আপনাকে পৃথিবীর শেষপর্যন্ত অনুসরণ করব এবং আমাদের

    বোঝা যদি পাহাড়ের মতো ভারীও হয় তাও আমরা আপনার সঙ্গে বহন করব আনন্দের সঙ্গে এবং আমরা যদি পথের আশপাশেও পতিত হই তাহলে আমরা বুঝব আমরা স্বৰ্গ থেকে পতিত হয়েছি এবং আমরা পরিতৃপ্ত হব।

    আমার ভাই এ্যান্ড্রু বলল, ‘প্রভু আমরা আমাদের হাত ও তাঁতের মাঝে সূতায় পরিণত হব। ইচ্ছা করলে আমাদের দিয়ে আপনি পোশাক বুনতে পারেন, কারণ আমরা সবচেয়ে উঁচু পর্যায়ের পোশাকে পরিণত হতে চাই।’

    আমার স্ত্রী তার মুখ তুলল। অশ্রু ঝরে পড়ছিল তার চোখ থেকে এবং সে উল্লাসের সঙ্গে বলল, ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোন তিনি যিনি ঈশ্বরের নামে আমাদের কাছে এসেছেন। আশীর্বাদ প্রাপ্ত হচ্ছে সেই গর্ভ যা আপনাকে বহন করেছিল এবং সেই স্তন যা আপনাকে প্ৰদান করেছিল দুগ্ধধারা।’

    আর আমার বারো বছর বয়সী কন্যা বসেছিল তাঁর পায়ের ওপর এবং তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

    আমার স্ত্রীর মা বসেছিলেন মাড়াইখানার কাছে এবং তিনি কোনো কথা বললেন না। তিনি নীরবে কাঁদছিলেন এবং তার চোখের পানিতে তার গাল ভিজে গিয়েছিল।

    তারপর যিশু তার কাছে গেলেন এবং তার মুখখানা তুলে ধরলেন নিজের দিকে এবং বললেন, ‘আপনি হলেন সবার মাতা। আপনি আনন্দে কাঁদছেন এবং আপনার এই অশ্রুজল আমি আমার স্মৃতিতে রেখে দেব।’

    তখন বৃদ্ধ চাঁদ উদিত হল দিগন্তের ওপর এবং যিশু এক মুহূর্ত ভাবলেন এবং বললেন, ‘দেরি হয়ে গেছে। এখন অনুসন্ধান করো তোমাদের বিছানাগুলি এবং ঈশ্বর তোমাদের বিশ্বাস পরিদর্শন করতে পারেন। আমি ভোর পর্যন্ত এই কুঞ্জবনে থাকব। আমি আজ জাল ফেলব এবং ধরব দুজন মানুষ। আমি তৃপ্ত এবং এখন আমি তোমাদেরকে বিদায় জানাব।’

    তখন আমার স্ত্রীর মা বললেন, ‘কিন্তু আমরা ঘরে আপনার বিছানা করেছি। আমি প্রার্থনা করছি, আসুন এবং বিশ্রাম করুন।’

    তিনি বললেন, ‘আমি বিশ্রাম নেব ঠিকই কিন্তু তা ছাদের নিচে নয়। এই রাতে আমাকে নক্ষত্র ও আঙুরের আচ্ছাদনের নিচে শুয়ে কষ্ট পেতে দিন।’

    দ্রুত ভেতরে গিয়ে তিনি বালিশ, তোশক ও চাদর নিয়ে এলেন এবং তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং বললেন, ‘দেখুন, আমি সেই বিছানার ওপর শয়ন করব যা দুইবারে তৈরি হয়েছিল।’

    তারপর আমরা তাকে পরিত্যাগ করলাম এবং প্রবেশ করলাম ঘরের ভেতর। সবশেষে প্রবেশ করল আমার কন্যা এবং দরজা বন্ধ না-করা পর্যন্ত সে তাঁর দিকে তাকিয়েছিল। এভাবে আমি প্রথমবারের মতো আমার ঈশ্বর ও অধিপতিকে চিনলাম।

    যদিও এটা ছিল বহু বছর আগের ঘটনা কিন্তু এখনও মনে হয় এটা আজকে ঘটেছে।

    ক্যায়াফাস : উঁচু পর্যায়ের যাজক

    যিশু নামে পরিচিত সেই লোক এবং তার মৃত্যু সম্পর্কে কথা বলতে হলে আমাদেরকে দুটি প্রধান ঘটনার কথা বিবেচনা করতে হবে : আমাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে তোরাহ (ইহুদদিদের ধর্মমত অনুযায়ী ঈশ্বরের আইন যা মুসার ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তা লিপিবদ্ধ আছে বাইবেলের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থে) এবং এই সম্রাজ্যের জন্য প্রয়োজন রোমের নিরাপত্তা।

    সেই লোক অবাধ্য ছিল আমাদের ও রোমান সাম্রাজ্যের কাছে। সাধারণ মানুষের মন সে বিষিয়ে দিয়েছিল এবং সে তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছিল আমাদের ও সিজারের বিরুদ্ধে, যেন তা ছিল একটা জাদু।

    আমার নারী ও পুরুষ ভৃত্যরা বাজার এলাকায় তার বক্তব্য শোনার পর বিষণ্ন হয়ে পড়ে এবং বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাদের কেউ কেউ আমার বাড়ি পরিত্যাগ করেছিল এবং পালিয়ে গিয়েছিল মরুভূমিতে, যেখান থেকে তারা ফিরে এসেছিল।

    ভুলে যাওয়া যাবে না যে, তোরাহ হচ্ছে আমাদের ভিত্তি এবং আমাদের শক্তির সুউচ্চ প্রাসাদ। কেউ আমাদের দুর্বল করতে পারবে না, যতক্ষণ এই শক্তি আমাদের আছে তার হাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কোনো মানুষই পরাস্ত করতে পারবেনা জেরুজালেমকে যতদিন প্রাচীন পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এর দেয়ালগুলি, যেখানে দাউদ শুয়ে আছেন। যদি ইব্রাহিমের বীজ এই ভূমিতে বেঁচে থাকে এবং সমৃদ্ধি লাভ করে তাহলে অবশ্যই তাকে কলুষমুক্ত রাখতে হবে।

    যিশু নামে পরিচিত সেই লোক ছিল একজন দূষণকারী এবং দুর্নীতিবাজ। আমরা তাকে সচেতনভাবেই হত্যা করেছিলাম যা ছিল সুচিন্তিত এবং পরিচ্ছন্ন এবং আমরা তাদের প্রত্যেককেই হত্যা করব যারা মুসার আইনগুলির চরিত্র নষ্ট করার অথবা আমাদের ঐশ্বরিক ঐতিহ্যকে কলুষিত করার চেষ্টা করবে।

    সেই লোকটা কতখানি ভয়াবহ তা আমরা এবং পন্টিয়াস পিলাটুস জানে এবং এটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে তার সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্তে আসা।

    আমি দেখব যে তার অনুসারীরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে এবং তাঁর কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একই নীরবতার ভেতরে।

    যদি যুদেয়া বেঁচে থাকে তাহলে যারা তার বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে নামিয়ে আনা হবে পথের ধুলোয় এবং যুদেয়া মারা যাবার আগেই আমি আমার ধূসর মাথা ঢেকে ফেলব ছাই দিয়ে যেমন নবী স্যামুয়েল করেছিলেন এবং আমি ছিঁড়ে ফেলব আমার এই পোশাক এবং আমাকে একটা চটের পোশাক পরিয়ে দাও যতক্ষণ এখান থেকে আমি চিরদিনের জন্য চলে না যাই।

    হেরডের তত্ত্বাবধায়কের স্ত্রী যোআন্না : শিশুদের সম্পর্কে

    যিশু কোনোদিন বিয়ে করেননি কিন্তু তিনি এক নারীর বন্ধু ছিলেন। তিনি তাদেরকে চিনতেন যেভাবে তারা তাঁকে চিনত এবং তাদের বন্ধুত্ব ছিল গভীর।

    তিনি শিশুদেরকে ভালোবাসতেন যেভাবে বিশ্বস্ততা ও উপলব্ধির ভেতরে তাদেরকে ভালোবাসা উচিত।

    তার চোখের আলোর ভেতরে ছিল একজন পিতা, একজন ভাই ও একজন পুত্র।

    তিনি একজন শিশুকে তাঁর হাটুর ওপরে বসিয়ে বলতেন, ‘এই হল তোমাদের প্রবল ক্ষমতা ও স্বাধীনতা এবং এই হল আত্মার সাম্রাজ্য।’

    তারা বলত মুসার আইনের প্রতি যিশু কোনো কর্ণপাতই করতেন না এবং জেরুজালেম ও তার আশপাশের বেশ্যাদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই ক্ষমাহীন।

    আমাকে সে সময় বেশ্যা মনে করা হত। কারণ আমি একজন মানুষকে ভালোবাসতাম যে আমার স্বামী নয় এবং একদিন সেই লোক আমার বাড়িতে এল যখন আমি আমার অন্য এক প্রেমিকের সঙ্গে ব্যস্ত ছিলাম এবং তারা আমাদের পাকড়াও করে নিয়ে এল এবং আমার প্রেমিক চলে গেল আমাকে ফেলে।

    তারপর তারা আমাকে নিয়ে এল বাজার এলাকায় যেখানে যিশু শিক্ষা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

    আমাকে ধরে তাঁর সামনে নিয়ে আসাটা ছিল তাদের ইচ্ছা। তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য আমাকে তারা ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

    কিন্তু যিশু আমার বিচার করেননি। তিনি তাদেরকে লজ্জা দিয়েছিলেন যারা আমাকে লজ্জিত করে তুলেছিল এবং তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করেছিলেন এবং তিনি আমাকে আদেশ দিয়েছিলেন চলে যেতে।

    তারপর জীবনের সমস্ত স্বাদহীন ফল আমার মুখে মিষ্টি মনে হতে লাগল এবং গন্ধহীন বক্ষ নাসারন্ধ্রের ভেতর দিয়ে প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করল সুগন্ধ। কলঙ্কের স্মৃতিমুক্ত এক নারীতে পরিণত হলাম আমি এবং আমি ছিলাম মুক্ত এবং আমার মাথা আর কখনও নত হয়নি।

    রাফকা : কানা-এর নববধূ

    লোকজনের কাছে তিনি পরিচিত হওয়ার আগেই এটা ঘটেছিল।

    আমি আমার মায়ের বাগানে গোলাপঝাড়ের পরিচর্যা করছিলাম, তখন তিনি আমাদের বাগানের দরজায় থামলেন। তিনি বললেন, ‘আমি খুবই তৃষ্ণার্ত। তুমি কি তোমাদের কূয়া থেকে আমাকে একটু পানি খাওয়াবে?

    আমি দৌড়ে গেলাম এবং রুপার পাত্র পানিতে ভর্তি করে তার মধ্যে কয়েক ফোঁটা জেসমিন সৌরভ মেশালাম এবং তারপর তাকে পান করতে দিলাম। তিনি পান করে তার গভীর তৃষ্ণা মেটালেন এবং খুশি হলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার ওপর আমার আশীর্বাদ থাকবে সবসময়।’

    যখন তিনি একথা বললেন তখন আমি অনুভব করলাম একটা তীব্র বাতাস বয়ে গেল আমার শরীরের ভেতর দিয়ে। আমি দ্বিধাগ্রস্ত হলাম না এবং আমি বললাম, ‘জনাব, গালীল প্রদেশের কানায় এক লোকের সঙ্গে আমার বাগদান হয়েছে। আগামী সপ্তাহের চতুর্থদিনে আমার বিয়ে হবে। আপনি কি আমার বিয়েতে থাকবেন না এবং আপনার উপস্থিতি দিয়ে মর্যাদাসম্পন্ন করে তুলবেন না আমার বিয়ের উৎসবকে’

    তিনি বললেন, ‘অবশ্যই আমি আসব।’ তিনি আবার বললেন, ‘মনে রেখো আমি আসব।’

    তারপর তিনি রাস্তায় নেমে গেলেন।

    আমার মা আমাকে বাড়ির ভেতরে না-ডাকা পর্যন্ত আমি বাগানের দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।

    পরবর্তী সপ্তাহের চতুর্থ দিনে আমাকে আমার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিয়ের জন্য এবং যিশু এসেছিলেন তাঁর মা ও ভাই জেমসকে সঙ্গে নিয়ে।

    তারা আমাদের ভোজ-উৎসবের টেবিলে বসলেন অতিথিদের সাথে এবং আমার যুবতী বন্ধু রাজা সোলেমান-এর বিয়ের গান গাইতে শুরু করল। যিশু আমাদের রান্না খাবার খেলেন, মদ পান করলেন এবং আমার ও অন্যদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

    বিয়ের গানগুলি তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, কিন্তু আমার মনে হল তিনি অন্যকোনো গান শুনছিলেন, যা আমি শুনতে পাই না।

    সূর্যাস্তের সময় বরের পিতা যিশুর মায়ের কাছে এলেন এবং ফিসফিস করে বললেন, ‘অতিথিদের জন্য আমাদের এর বেশি আর মদের ব্যবস্থা নেই, যদিও দিন এখনও শেষ হয়নি।’

    যিশু এই ফিসফিসানি শুনলেন এবং বললেন, ‘কিন্তু পাত্রবাহক জানে এখনও অনেক মদ আছে।’

    বস্তুতপক্ষে তা-ই ছিল এবং যতক্ষণ অতিথিরা ছিল ততক্ষণ মদের কোনো অভাব হয়নি।

    তারপর যিশু আমাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, পৃথিবী ও স্বর্গের বিস্ময় সম্পর্কে, পৃথিবীর ওপর রাত্রি নেমে এলে আকাশপুষ্পের ফুটে ওঠা এবং অন্যান্য ফুলেরাও বিকাশিত হয় যখন দিন নক্ষত্রগুলিকে লুকিয়ে ফেলে।

    তিনি আমাদেরকে গল্প ও নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী শোনালেন এবং তার কণ্ঠস্বর আমাদেরকে মুগ্ধ করল এবং আমরা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম যেন আমরা কোনো দৃশ্য দেখছি এবং আমরা কাপ ও প্লেটের কথা ভুলে গেলাম।

    যখন আমি তার কণ্ঠস্বর শুনলাম তখন মনে হল যেন আমি কোনো দূরবর্তী ভূমিতে আছি এবং তা অপরিচিত।

    কিছুক্ষণ পর একজন অতিথি বরের পিতাকে বললেন, ‘একেবারে অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত আপনারা সবচেয়ে ভালো মদের ব্যাবস্থা রেখেছেন। অন্যরা তা করে না।’

    প্রত্যেকেই বিশ্বাস করল এটা যিশুর কাণ্ড।

    আমিও চিন্তা করলাম যে যিশু এই মদ ঢেলেছিলেন। কিন্তু আমি বিভ্রান্ত হইনি কারণ তার কণ্ঠস্বর আমার কাছে অলৌকিক মনে হয়েছে।

    তার কন্ঠস্বর ছিল আমার হৃদয়ের কাছাকাছি এবং আমার প্রথম সন্তানের জন্ম না-হওয়া পর্যন্ত আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেতাম।

    আজকের দিন পর্যন্ত আমাদের গ্রাম ও কাছাকাছি গ্রামের মানুষেরা সেই অতিথির কথা স্মরণ করে এবং বলে, ‘নাজারেতবাসী যিশুর আত্মা হচ্ছে সবচেয়ে পুরোনো ও শ্রেষ্ঠ মদ।’

    দামেস্কে পারশীয় দার্শনিক : প্রাচীন ও নতুন ঈশ্বরেরা

    এই লোকের ভাগ্য সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে পারি না, এমনকি আরও জানি না তার শিষ্যদের ভাগ্যে কী ঘটবে।

    কুঞ্জবনে একটা আপেলের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা বীজ এবং এটা দৃশ্যমান নয়। যদি সেই বীজ একটা পাথরের ওপর পতিত হয় তাহলে তা নেতিবাচকতায় পরিণত হবে। কিন্তু আমি বলি : ইসরায়েলের প্রাচীন ঈশ্বরেরা কঠোর ও নির্মম। ইসরায়েলের অন্য ঈশ্বর থাকা উচিত, যে হবে কোমল এবং ক্ষমাশীল, যে তাদের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবে, যে অবতরণ করবে সূর্যরশ্মির সাথে সাথে এবং হাঁটাহাঁটি করবে তাদের সীমাবদ্ধ পথে, চিরকালের জন্য ন্যায়বিচারের আসনে বসতে তাদের ত্রুটির পরিমাণ জানতে এবং পরিমাপ করতে তাদের ভুল কর্মকাণ্ড।

    ইসরায়েলের উচিত এমন একজন ঈশ্বরকে সামনে নিয়ে আসা যার হৃদয়ে হিংসা নেই এবং তার ত্রুটিবিচ্যুতির স্মৃতি সংক্ষিপ্ত এবং সে কখনও প্রতিশোধ নেবে না তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের ওপর।

    সিরিয়ার মানুষেরা অন্যান্য ভূমির মানুষের মতোই। সে আয়নার ভেতরে তাকাবে তার নিজস্ব উপলব্ধির দিকে এবং সেখান থেকেই খুঁজবে তার ঈশ্বরকে। নিজস্ব পছন্দের পর সে তৈরি করবে তার ঈশ্বরকে এবং প্রার্থনা করবে তার, যে প্রতিফলিত হবে তার নিজস্ব প্রতিমূর্তিতে।

    সত্যের ভেতরে মানুষ প্রার্থনা করে গভীর আকাঙ্ক্ষার যেন তা বেড়ে উঠতে পারে এবং পূর্ণ করে দিতে পারে তার আকাঙ্ক্ষার যোগফল।

    মানুষের আত্মার ওপরে কোনো গভীরতা নেই এবং সেই আত্মা গভীর যে নিজেকেই আহ্বান জানায়, কারণ সেখানে অন্য কোনো কণ্ঠস্বর নেই কথা বলার মতো এবং সেখানে অন্য কোনো কানও নেই শোনার মতো।

    এমনকি পারস্যে আমরা সূর্যগোলকের ভেতরে দেখব আমাদের মুখমণ্ডল এবং আমাদের শরীর নাচছে আগুনের ভেতরে, যা দিয়ে আমরা আগুন জ্বালাব বেদির ওপরে।

    এখন যিশুর ঈশ্বর, যাকে তিনি পিতা বলে আহ্বান জানান, তার অনুসারীদের কাছে তিনি আগন্তুকে পরিণত হবেন না এবং তিনিই তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দেবেন।

    মিশরের ঈশ্বরেরা তাদের পাথরের বোঝা দূরে নিক্ষেপ করেছে এবং পালিয়েছে নুবিয়া মরুভূমিতে তাদের ভেতর থেকে স্বাধীন হতে, যারা এখনও পর্যন্ত স্বাধীন চতুরতার ভেতরে।

    গ্রিস ও রোমের ঈশ্বরেরা নিজস্ব সূর্যাস্তের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তারা খুব বেশি ভালোবাসে মানুষের মতো মানুষের পরমানন্দের ভেতরে বেঁচে থাকতে। তাদের জাদুমন্ত্রের জন্ম হয়েছিল কবরের ভেতরে কিন্তু আলেকজান্দ্রীয় ও এথেনীয়দের কুড়াল তা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

    এবং এই ভূমি খুবই উঁচু মানসম্পন্ন, তবে তা নিচুমানের করে তুলেছে বৈরুতের আইনজীবী ও এ্যান্টিওচের সন্ন্যাসীরা। শুধুমাত্র বৃদ্ধ নারী এবং পরিশ্রান্ত পুরুষেরাই তাদের প্রপিতামহের মন্দির অনুসন্ধান করে, শুধুমাত্র চরম পরিশ্রান্তরাই পথের শেষপ্রান্তে পৌঁছে সন্ধান করে এর শুরুটা।

    কিন্তু নাজারেতবাসী যিশু, তিনি একজন ঈশ্বর সম্পর্কে বলেছেন যিনি খুবই বিশাল, মোটেই মানুষের আত্মার মতো নয়, শাস্তি দেবার বেলায় খুবই কৌশলী এবং তার প্রাণীদের পাপকে স্মরণ করতে খুবই ভালোবাসেন। নাজারেতবাসীদের এই ঈশ্বর পাসোভার উৎসবে শিশুদের দ্বারপ্রান্ত অতিক্রম করে যাবার সময় তাদের অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসবাস করবেন এবং দেয়ালের ভেতরে তিনি হবেন তাদের আশীর্বাদ এবং হবেন পথের ওপরের আলো।

    কিন্তু আমার ঈশ্বর হচ্ছে জরাথ্রুস্টের ঈশ্বর। তিনি হলেন সেই ঈশ্বর যিনি আকাশে সূর্য, পৃথিবীর ওপরে আগুন এবং মানুষের বুকের ভেতরে আলো। আমি পরিতৃপ্ত। আমার অন্য কোনো ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই।

    তাঁর একজন অনুসারী, দাউদ : বাস্তববাদী যিশু

    আমি তার ধর্মোপদেশের অর্থ অথবা তার নীতিকথা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না যতক্ষণ তিনি আমাদের ভেতরে দীর্ঘসময় না থেকেছেন। না, তাঁর কথা আমি উপলব্ধি করতে পারি নাই আমার চোখে তা জীবন্ত আকার না-নেওয়া পর্যন্ত এবং তিনি তাদেরকে শরীরে পরিণত না করা পর্যন্ত, যা আমার নিজস্ব দিনগুলিতে মিছিলের সঙ্গে হেঁটে যায়।

    বলতে দাও আমাকে এসব কথা : এক রাতে আমি বাড়িতে বসেছিলাম, চিন্তা করছিলাম, স্মরণ করছিলাম তাঁর কথা, তার কর্মকাণ্ড এবং তা আমি লিপিবদ্ধ করছিলাম। এমন সময় তিনজন চোর ঢুকল আমার বাড়িতে। আমি জানতাম তারা আমার সম্পদ অপহরণ করতে এসেছে। আমিও ঠিক করলাম অস্ত্র নিয়ে তাদের মুখোমুখি হব অথবা জিজ্ঞাসা করব, ‘তোমরা এখানে কী করছ?’

    কিন্তু আমি আমার প্রভুর স্মৃতি লিপিবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলাম।

    চোররা চলে গেলে আমার মনে পড়ল তিনি বলছেন, ‘যদি কেউ তোমার একটা পোশাক চুরি করে, তাহলে তাকে তোমার অন্য পোশাকটাও চুরি করতে দাও।’

    আমি তা বুঝতে পারলাম।

    তার কথা অনুসারে আমি বসেই ছিলাম। কেউ আমাকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারবে না যদি আমার সমস্ত কিছুই চোরে নিয়ে যায়।

    যদিও আমি আমার সম্পদ ও স্বজনদেরকে পাহারা দেব এবং আমি জানি সেখানে রয়েছে বৃহত্তর সম্পদ।

    লুক : ভণ্ডদের সম্পর্কে

    যিশু ভণ্ডদেরকে ঘৃণা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন এবং তার এই তীব্র ক্রোধ ছিল প্রচণ্ড ঝড়ের মতো যার কারণে তাদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হত। তাদের কানে যিশুর কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রের মতো এবং তিনি তাদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতেন।

    এই ভয়ের কারণে ভণ্ডরা তার মৃত্যু অনুসন্ধান করত এবং অন্ধকারে ছুঁচোর মতো তারা পদচিহ্নের ওপর গর্ত খুঁড়ত। কিন্তু সেই ফাঁদে তিনি কখনও পড়েননি।

    তিনি তাদের উদ্দেশ্যে হাসতেন, কারণ তিনি ভালো করেই জানতেন যে আত্মারা উপহাসের পাত্রে পরিণত হবে না, গর্তেও তারা পড়বে না।

    তিনি হাতে একটা আয়না ধরলেন এবং তার ভেতরে দেখলেন অলস, খুঁড়িয়ে চলা এবং সেইসব ব্যক্তিদের যারা মাতালের মতো এলোমেলোভাবে পথ চলে এবং পড়ে যায় পাহাড়শিখরে যাওয়ার পথের পাশেই।

    তিনি তাদেরকে দয়া করেন। এমনকি তিনি তাদেরকে উত্তোলন করেন তাঁর বিস্ময়মণ্ডিত গুণাবলি দিয়ে এবং তিনি বহন করেন তাদের বোঝা। না, তিনি তাদের দুর্বলতাকে শায়িত করেন তাঁর শক্তির ওপর।

    তিনি প্রকাশ্যে মিথ্যাবাদী, চোর এবং খুনিদের সম্পর্কে কোনো নিন্দাবাক্য উচ্চারণ করতেন না। কিন্তু তিনি ভণ্ডদেরকে সরাসরি নিন্দা করতেন যাদের মুখমণ্ডল মুখোশাবৃত এবং হাত দস্তানায় লুকানো। প্রায়ই আমি মনে মনে ভাবি যে সেই আশ্রয়, যা পতিত ভূমি থেকে এই অভয়ারণ্যে আসে যদিও তা ভণ্ডদের জন্য বন্ধ ও সিলমোহরকৃত।

    একদিন আমরা তাঁর সঙ্গে বসেছিলাম ডালিম বাগানে। আমি বললাম, ‘প্রভু আপনি পাপী, দুর্বল এবং যারা সামর্থ্যের দিক দিয়ে ক্ষীণ হয়ে এসেছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং সান্ত্বনা দিন শুধুমাত্র ভণ্ডদের ছাড়া।’

    তিনি বললেন, ‘তোমার পছন্দের কথাগুলি সুন্দর যখন তুমি পাপী, দুর্বল ও ক্ষীণ সামর্থ্যের মানুষকে আহ্বান জানাও। আমি ক্ষমা করি তাদের শরীরের দুর্বলতা এবং তাদের আত্মার জরগ্রস্ততা। কারণ তাদের ব্যর্থতাই তাদের ওপর শুইয়ে দিয়েছে তাদের পূর্বপুরুষেরা অথবা এটা সম্ভব হয়েছে তাদের প্রতিবেশীদের লোভের কারণে। কিন্তু আমি ভণ্ডদেরকে সহ্য করতে পারি না কারণ তারা নিজেই একটা জোয়াল চাপিয়ে নেয় প্রতারণাহীনতার ওপর।’

    ‘দুর্বল প্রাণী, তোমরা যাদেরকে পাপী বলো, তারা হচ্ছে পালকবিহীন পাখি যে খাঁচা থেকে পড়ে গেছে। ভণ্ডরা হচ্ছে সেই শকুন যে পাথরের ওপর শিকারের মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে। এজন্যই আমি তাদেরকে গ্রহণ করতে পারি না।

    এসবই আমাদের প্রভু বলেছিলেন কিন্তু তখন তা উপলব্ধি করতে পারি নাই, কিন্তু এখন বেশ বুঝতে পারছি।

    তারপর এই ভূমির ভণ্ডরা তাদের হাতগুলি প্রসারিত করল তার ওপর এবং তারা তাঁর বিচার করল এবং এসব করে তারা নিজেদেরকে তৃপ্ত করল। কারণ তারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণসহ মুসার আইনের উদ্ধৃতি দিয়েছিল।

    তারা প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় আইন ভাঙত এবং আবার ভাঙত সূর্যাস্তের সময়, যা ডেকে এনেছিল তাদের মৃত্যু।

    ম্যাথিউ : পাহাড়ের ওপর ধর্মোপদেশ

    ফসল তোলার সময় একদিন যিশু আমাদের এবং তাঁর অন্যান্য বন্ধুদেরকে পাহাড়ে আহ্বান জানালেন। মাটি ছিল সুরভিত এবং বিবাহ-উৎসবে রাজার মেয়ের মতো সে তার সমস্ত অলংকার পরেছিল এবং আকাশ ছিল তার বর।

    আমরা যখন পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচুতে পৌঁছালাম তখন যিশু জলপাই-বনের ভেতরে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনি বললেন, ‘এখানে বিশ্রাম নাও। মন শান্ত করো, কারণ অনেককিছু তোমাদেরকে আমার বলার আছে।’

    ‘

    তারপর আমরা শরীর এলিয়ে দিলাম ঘাসের ওপর। আমাদের চারপাশে ফুটে আছে গ্রীষ্মের ফুল এবং যিশু বসেছিলেন আমাদের মাঝখানে।

    যিশু বললেন,

    ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক তারা, যারা আত্মার ভেতরে স্থির।’

    ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক তারা, সম্পদের কারণে যারা বাধাগ্রস্ত নয় এবং তাদের যন্ত্রণার ভেতরে অপেক্ষা করে তাদের উল্লাস।’

    ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক তারা সত্য ও সৌন্দর্যের জন্য যারা ক্ষুধার্ত, কারণ তাদের ক্ষুধা বহন করে আনবে রুটি এবং তাদের তৃষ্ণা বহন করে আনবে ঠাণ্ডা পানি।’

    ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক মহানুভব যারা, কারণ তারা সান্ত্বনা পাবে তাদের নিজস্ব মহানুভবতার কাছেই।’

    ‘দয়ালুরা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক, কারণ ক্ষমা হবে তাদের জন্য তাদেরই নিজস্ব অংশ।’

    ‘শান্তির নির্মাতারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক, কারণ তাদের আত্মা বসবাস করবে যুদ্ধক্ষেত্রের ওপরে কারণ, তারা কুমোরের রাশি রাশি মৃত্তিকাকে বাগানে রূপান্তরিত করতে পারে।

    ‘শিকারে পরিণত হয়েছে যারা তারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হোক, কারণ তারা পায়ের দিক থেকে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এবং তারা হবে পাখাযুক্ত।

    ‘আনন্দিত ও উল্লসিত হয়ে ওঠো কারণ তোমরা স্বর্গের সাম্রাজ্য দেখতে পেয়েছ তোমাদের ভেতরে। তোমরাও শাস্তি পাবে, তারপর লুণ্ঠিত করা হবে তোমাদের সম্মান এবং পুরস্কার।

    ‘তোমরা হলে পৃথিবীর লবণ। লবণের কি উচিত তার স্বাদ হারানো যা মানুষের হৃদয়ের খাদ্যকে তৃপ্তিকর করে তোলে?

    ‘তোমরা হলে পৃথিবীর আলো। শস্যাধারের নিচে সেই আলো রেখো না, বরং তাকে শিখরচূড়া থেকেও উজ্জ্বল হতে দাও তাদের জন্য, যারা সূর্যের শহর অনুসন্ধান করে।

    ‘এরকম ভেবো না আমি নকলনবিশ ও ফ্যারিসী* সম্প্রদায়ের আইনগুলিকে ধ্বংস করে দেব, কারণ তোমাদের ভেতরে আমার দিনগুলি সংখ্যায়িত এবং আমার কথাও হিসাব করা আছে এবং অন্য আইন পরিপূর্ণ করে তোলার সময় কোটি, যখন একটা নতুন চুক্তিও প্রকাশিত হবে।

    [* ধার্মিকতা ও আচারনিষ্ঠার জন্য প্রসিদ্ধ প্রাচীন ইহুদিদের একটি সম্প্রদায়।]

    ‘তোমাদের বলা হয়েছে যে তোমাদেরকে হত্যা করা হবে না, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলছি কোনো কারণ ছাড়া তোমরা আর ক্রুদ্ধ হবে না।’

    ‘প্রাচীনদের দ্বারা তোমরা অভিযুক্ত হবে বাছুর, মেষশাবক ও ঘুঘু বহন করে মন্দিরে আনার ও তাদেরকে বেদির ওপর হত্যা করার জন্য। ঈশ্বরের নাসারন্ধ্র তাদের চর্বির ঘ্রাণ ভক্ষণ করতে পারেন এবং তোমাদের ব্যর্থতার জন্য তোমাদেরকে ক্ষমা করা হতে পারে।

    ‘কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলছি, তোমরা কি ঈশ্বরকে সেইসব দেবে যা শুরু থেকেই ছিল তার নিজস্ব এবং তোমরা কি তাকে শান্ত করবে যার সিংহাসন গভীর নীরবতারও ওপরে এবং যার বাহুদ্বয় বৃত্তাবদ্ধ করে রাখে এই মহাশূন্যকে?

    ‘বরং তোমরা অনুসন্ধান করো তোমার ভাইকে এবং মিটিয়ে ফেল তার সাথে যাবতীয় বিরোধ মন্দির অনুসন্ধান করার আগে এবং তোমার প্রতিবেশীদের কাছে পরিণত হও পছন্দের দাতা হিসেবে। কারণ এইসব ঈশ্বরের আত্মার ভেতরে একটা মন্দির নির্মিত হয়েছে যা ধ্বংস হবে না এবং তাদের হৃদয়ে ঈশ্বর একটা বেদি তুলে ধরেছেন যা কখনও লোপ পাবে না।’

    ‘তোমাদেরকে বলা হয়েছিল, একটা চোখ কেউ উপড়ে নিলে অন্য চোখও দান করো এবং একটা দাঁত ভেঙে দিলে আরও একটা দাঁত ভেঙে ফেলতে দাও। কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলি : মন্দ লোককে প্রতিরোধ কোরো না, কারণ প্রতিরোধ খাদ্য যোগায় মন্দকে এবং একে শক্তিশালী করে তোলে এবং শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেবে দুর্বলেরাই। শক্তিশালী আত্মারা ক্ষমা করে আহতকে, ক্ষমা করা একটি সম্মান প্ৰদৰ্শন।

    ‘একমাত্র ফলভর্তি গাছকেই ঝাঁকি দেওয়া যায় এবং পাথর ছোঁড়া যায় খাবারের জন্য।

    ‘আগামীকালের প্রতি অত মনোযোগী হয়ো না, বরং আজকের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাও, কারণ আজকের জন্য পর্যাপ্ততাই হচ্ছে তার অলৌকিকতা।

    ‘তোমরা নিজেদের প্রতি অতিরিক্ত সচেতন হয়ো না, যখন তোমরা দান করো তখন প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগী হও। কারণ দাতা নিজেই গ্রহণ করেছেন তার পিতার কাছ থেকে এবং তা পর্যাপ্তভাবে।

    ‘প্রত্যেককেই দান করো যার যার চাহিদা অনুযায়ী। কারণ পিতা তৃষ্ণার্তকে লবণ দান করেন না, ক্ষুধার্তকে দান করেন না পাথর এবং যে শিশুকে বুকের দুধ ছাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে তার জন্য ব্যবস্থা করেন না বুকের দুধের।

    ‘দান কোরো না সেইসব যা কুকুরের কাছে পবিত্র, ছুড়ে দিও না শূকরের কাছে তোমাদের মুক্তাগুলি, কারণ এ-ধরনের উপহার দিয়ে তোমরা তাদেরকে উপহাস করো এবং তারাও তোমাদের উপহারকে ব্যঙ্গ করবে এবং তাদের ঘৃণার ভেতরে তোমাদের মূর্ছিত অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে।

    ‘তোমরা সম্পদ জমা কোরো না নিজের জন্য, যা দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে অথবা চোর তা চুরি করতে পারে এবং তা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতে পারে যে এর চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হয়, কারণ অনেকের চোখই এটা দেখছে। তোমাদের সম্পদ কোথায় থাকে, এমনকি তোমাদের হৃদয়?

    ‘তোমাদেরকে বলা হয়েছিল খুনিকে তরবারির মুখোমুখি এনে দাঁড় করাবে। চোরকে ক্রুশবিদ্ধ করে মারবে এবং বেশ্যাকে পাথর। কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলি—খুনি, চোর ও বেশ্যার অপকর্ম থেকে তোমরাও মুক্ত নয় এবং যখন তারা শারীরিকভাবে শাস্তি পায় তখন তোমাদের নিজস্ব আত্মাও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

    ‘একজন পুরুষ বা একজন নারী কোনো অপরাধ করতে পারে না। সমস্ত অপরাধই সবাই মিলে করে এবং যে ক্ষতিপূরণ দেয় সম্ভবত সে সেই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলছে যা তোমাদের হাঁটুর ওপরে ঝুলে থাকে। সম্ভবত সে তার বেদনার সঙ্গে এর মূল্য দিচ্ছে তোমাদের উল্লাসের কারণে।’

    যিশু এসব বলেছিলেন এবং আমি আমার আকুল আকঙ্ক্ষার ভেতরে হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম এবং প্রার্থনা করছিলাম তার, যদিও লাজুক হওয়ার কারণে আমি নড়াচড়া করতে পারছিলাম না, বলতে পারছিলাম না একটা শব্দও।

    কিন্তু অবশেষে আমি বললাম, ‘এই মুহূর্তে আমি প্রার্থনা করব, যদিও আমার ঠোঁট ভারী হয়ে আছে। আমাকে শিক্ষা দিন কীভাবে প্রার্থান করতে হয়।’

    যিশু বললেন, ‘যখন তোমরা প্রার্থনা করবে, তখন তোমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে কথায় উচ্চারণ করতে দাও। আমার আকুল আকাঙ্ক্ষার ভেতরে এখনকার প্রার্থনা হচ্ছে :

    ‘আমাদের পৃথিবী ও স্বর্গের পিতা, ঐশ্বরিক আপনার নাম।

    আপনার ইচ্ছা সম্পন্ন হবে আমাদের সঙ্গে, এমনকি তা মহাশূন্যেও।

    আমাদেরকে দান করুন আপনার রুটি যা আমাদের দিনের জন্য পর্যাপ্ত।

    আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের বড় করে তুলুন একে অন্যকে ক্ষমা করার জন্য।

    আমাদেরকে পরিচালিত করুন আপনার দিকে যেতে এবং অন্ধকারের ভেতরে প্রসারিত করুন আপনার হাত।

    কারণ আপনিই হলেন সাম্রাজ্য এবং আপনার ভেতরেই হচ্ছে আমাদের ক্ষমতা ও আমাদের পরিপূর্ণতা।’

    সন্ধ্যায় যিশু পাহাড় থেকে নেমে এলেন। আমরা সবাই তাকে অনুসরণ করলাম এবং তাকে অনুসরণ করতে করতে আমি তার প্রার্থনার পুনরাবৃত্তি করছিলাম মনে মনে এবং স্মরণ করছিলাম সেইসব যা তিনি বলেছিলেন কারণ, আমি জানতাম সেই কথাগুলো যা টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়েছিল, ধারণ করেছিল স্ফটিকাকার এবং সেই পাখাগুলি ঝাপটানোর শব্দ হয়েছিল আমাদের মাথার ওপরে যেন লোহার খুর দিয়ে পৃথিবীকে আঘাত করছে।

    যিবীদি’র পুত্র জন : যিশুর বিভিন্ন নাম সম্পর্কে

    তোমরা লক্ষ্য করেছ যে, আমাদের কেউ কেউ যিশুকে ক্রাইস্ট বলে ডাকে, কেউ কেউ বলে নাজারেতবাসী এবং এখনও পর্যন্ত অন্যেরা বলে— মানুষের পুত্র।

    আমি তোমাদেরকে এখন এসব নামের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করব সেই আলোকে যা ঈশ্বর আমাকে দান করেছেন।

    ক্রাইস্ট, প্রাচীনকালের দিনগুলিতে ছিলেন ঈশ্বরের অগ্নিশিখা যিনি মানুষের ভেতরে বসবাস করতেন। তিনি হলেন জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস যা আমাদেরকে পরিদর্শন করে, একটি শরীর আমাদের মতোই।

    তিনি হলেন ঈশ্বরের ইচ্ছা।

    তিনি হলেন প্রথম শব্দ, যা আমাদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে কথা বলবে এবং বেঁচে থাকবে আমাদের কানের ভেতরে যা আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনতে এবং উপলব্ধি করতে পারব।

    ঈশ্বর শব্দ দিয়ে ঈশ্বর মাংস ও হাড়ের একটা বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং মানুষ ছিল তোমার মতো ও আমার মতো।

    কারণ শরীরহীন বাতাসের গান আমরা শুনতে পারি না, দেখতে পারি না আমাদের বৃহত্তর আত্মা ধোঁয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

    বহু সময় ক্রাইস্ট পৃথিবীতে এসেছেন এবং বহুভূমির ওপর দিয়ে তিনি হেঁটেছেন। বস্তুতপক্ষে সবসময়ই তাকে মনে হয়েছে একজন আগন্তুক এবং একজন পাগল।

    যদিও তার কণ্ঠস্বরের শব্দ কখনও শূন্যতার ওপর অবতরণ করে না, কারণ মানুষের স্মৃতি তা রক্ষা করে এবং যা রক্ষার জন্য তার মন কোনো ধরনের পরিচয় বহন করে না।

    এই হলেন ক্রাইস্ট, সবচেয়ে ভেতরের এবং উচ্চতার মানুষ, যিনি মানুষের সঙ্গে অনন্তকালের দিকে হাঁটছেন।

    ‘তোমার কি তার কণ্ঠস্বর শোনো নাই ভারতের দুই রাস্তার সংযোগস্থলগুলিতে এবং মাজিদের ভূমিতে এবং মিশরের বালির ওপরে?

    এখানে তোমাদের এই উত্তরের দেশে, তোমাদের বৃদ্ধদের চারণ কবিরা গায় প্রমিথিউসের গান, আগুন বহনকারী প্রমিথিউস, যে ছিল মানুষের পরিপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা, একটা খাঁচাবদ্ধ আকাঙ্ক্ষা যা মুক্ত হয়েছিল এবং আর্ফিয়স যে একটা কণ্ঠস্বর ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এসেছিল মানুষ ও পশুর ভেতরে আত্মাকে দ্রুত গতিসম্পন্ন করতে।

    তোমরা কি রাজা মিথ্রকে চেনো না এবং পারসীয়দের নবী জরাথ্রুস্টকে, যারা জেগে উঠেছিল মানুষের ঘুম থেকে এবং দাঁড়িয়েছিল আমাদের স্বপ্নের বিছানায়?

    ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা শরীরে তেল লেপন করি, যখন আমরা অদৃশ্য মন্দিরে মিলিত হই প্রতি এক হাজার বছরে একবার, তারপর একজন সামনে এগিয়ে আসে প্রতিমূর্তি নির্মাণ করতে এবং তার আগমনে আমাদের নীরবতা সংগীতে পরিণত হয়।

    যদিও সবসময় আমাদের কান ও চোখ শোনা ও দেখার জন্য শ্রবণ ও দর্শনে পরিণত হয় না।

    নাজারেতবাসী যিশু জন্মেছিলেন এবং লালিত পালিত হয়েছিলেন আমাদের মতোই। তাঁর পিতামাতা ছিলেন আমাদের পিতামাতার মতোই এবং তিনি ছিলেন একজন মানুষ।

    ‘কিন্তু ক্রাইস্ট, এই শব্দটি যে শুরুর ভেতরে ছিল, একটি আত্মা, যে আমাদের পরিপূর্ণ জীবনের ভেতরে বেঁচে থাকবে। এটা এসেছিল যিশুর কাছে এবং এটা তাঁর সাথেই ছিল।

    আত্মা ছিল ঈশ্বরের অভিজ্ঞ হাত এবং যিশু ছিলেন বাদ্যযন্ত্র।

    আত্মা ছিল একটা স্তুতিগীতি এবং যিশু ছিলেন তার মূর্ছনা! নাজারেতবাসী যিশু ছিলেন ক্রাইস্ট এর নিমন্ত্রণকর্তা এবং মুখপাত্র, যিনি আমাদের সঙ্গে হাঁটতেন সূর্যালোকে এবং আমাদেরকে আহ্বান জানাতেন বন্ধু বলে।

    সেইসব দিনগুলিতে গালীলের পাহাড় ও উপত্যকাগুলি তাঁর কণ্ঠস্বর শুনেছিল এবং আমি ছিলাম তখন যুবক এবং পায়ে মাড়িয়েছি তাঁর পথ এবং তাড়া করেছি তাঁর পদচিহ্ন।

    আমি এসব করেছি ক্রাইস্ট-এর কথা গালীল এর যিশুর মুখে শুনতে

    এখন তোমরা জানবে আমাদের কেউ কেউ কেন তাকে মানুষের পুত্র বলে ডাকে।

    তিনি চাইতেন মানুষ তাকে এ নামে ডাকুক, কারণ তিনি জানতেন মানুষের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা এবং তিনি লক্ষ্য করতেন মানুষ অনুসন্ধান করছে তার বৃহত্তর সত্তা। মানুষের পুত্র যিশুই ছিলেন সেই ভদ্র ও সৌজন্যময় ক্রাইস্ট যিনি সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

    তিনি ছিলেন নাজারেতবাসী যিশু, যিনি তাঁর ভাইদেরকে নেতৃত্ব দেবেন সেই তেল লেপন অনুষ্ঠানের প্রতি, এমনকি সেই শব্দের (ক্রাইস্ট) প্রতি, যা সৃষ্টির শুরু থেকে ঈশ্বরের সঙ্গে ছিল।

    আমার হৃদয়ে বসবাস করে গালীলের যিশু, মানুষেরও ওপরের একজন মানুষ, একজন কবি, যিনি আমাদেরও কবি হয়ে ওঠার প্রেরণা, একটা আত্মা যিনি আমাদের দরজায় কড়া নেড়ে আহ্বান জানান, যেন আমরা জেগে উঠি, বেড়ে উঠি এবং সত্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই, যা নগ্ন এবং ভারমুক্ত।

    একজন তরুণ যাজকের বাচালতা : জাদুকর যিশু

    তিনি ছিলেন একজন জাদুকর এবং ওজন করার বাটখারা এবং একজন ভেল্কিবাজ, একজন মানুষ, যিনি খুব সাধারণ বিষয়েও মানুষকে হতভম্ব করে ফেলতে পারতেন তার আকর্ষণক্ষমতা ও জাদুমন্ত্র দিয়ে। তিনি আমাদের নবীর কথা ও আমাদের প্রপিতামহের পবিত্রতা নিয়ে ভেল্কি দেখিয়ে থাকেন।

    হ্যাঁ, তিনি মৃত্যুকেও আদেশ দেন তার ঘটনার সাক্ষী হতে এবং শব্দহীন কবরগুলি হচ্ছে তাঁর অগ্রদূত ও কর্তৃপক্ষ

    তিনি জেরুজালেম ও তার আশপাশের নারীদের অনুসন্ধান করতেন মাকড়সার চতুরতা নিয়ে, যা অনুসন্ধান করে ওড়ার সুযোগ এবং তারা তাঁর পালের ভেতরে ধরা পড়ে যেত।

    কারণ নারীরা দুর্বল এবং তাদের খালিহাত এবং তারা সেই মানুষকে অনুসরণ করে, যে তাদেরকে শান্তি দেবে সঞ্চিত আবেগ দিয়ে কোমল ও অনুভূতিশীল কথার মাধ্যমে। তাঁর খারাপ আত্মার প্রভাবে এসব নারীরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তারা হারিয়েছিল তাদের অধিকার। তাঁর নাম মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে।

    সেইসব মানুষ কারা, যারা তাকে অনুসরণ করেছিল?

    তারা ছিল যাযাবরের পাল, তাদের কাঁধের ওপর জোয়াল চাপানো এবং তারা দুর্গম পথে চলে। তাদের অজ্ঞতা ও ভীতির ভেতরে তারা কখনও বিদ্রোহ করবে না তাদের ন্যায়সঙ্গত প্রভুর বিরুদ্ধে। কিন্তু যখন তিনি প্রতিশ্রুতি দেন সেই উঁচুপর্যায়ের সাম্রাজ্যের উঁচুমানের গন্তব্যের, যা মূলত মরীচিকা, তখন তারা তার কল্পনার কাছে প্রাকৃতিক রীতিতে উৎপন্ন হয়, যেমন কুমোরের কাছে মাটি।

    তোমরা জানো না যে, একজন দাস তার স্বপ্নের ভেতরে সব সময়ই প্রভু এবং দুর্বল মানুষেরা সিংহ।

    এই গালীলীয় ছিলেন একজন জাদুকর এবং একজন প্রতারক, তিনি সব পাপীকে ক্ষমা করেন এবং তিনি শুনতে পান নরক এবং মানুষের অপরিচ্ছন্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসা পরিত্রাহি (ঈশ্বরের প্রশংসাসূচক ও বন্দনামূলক ধ্বনি) রব এবং তিনি বোকাদের মুর্ছিত হৃদয় ও দুর্গতদের খাবার যোগান।

    তিনি তাদের সঙ্গে বিশ্বাস দিবসের নিয়ম ভেঙেছেন যারা তা সবসময় ভেঙে থাকে এবং আশা করতেন আইন অমান্যকারীদের সমর্থন পাবেন তিনি। বিরোধিতার কারণে তার খ্যাতি বেড়েছে।

    আমি প্রায়ই বলেছি যে আমি লোকটিকে ঘৃণা করি। হ্যাঁ, আমি রোমানদের চেয়েও তাকে বেশি ঘৃণা করি যে আমার দেশ শাসন করছে। এমনকি তার নাজারেত থেকে আসাও আমার পছন্দ নয়। এটা এমন একটা শহর যা আমাদের নবী চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন, এটা হল ইহুদি নয় এরকম মানুষের জন্য।

    একটা পচা গোবর সার এবং তার ভেতর থেকে ভালো কোনোকিছুই উৎপন্ন হতে পারে না।

    নাজারেতের প্রতিবেশী সম্পদশালী লেভি : চমৎকার কাঠমিস্ত্রি যিশু

    তিনি ছিলেন একজন চমৎকার কাঠমিস্ত্রি। তাঁর তৈরি দরজা চোর কখনও খুলতে পারত না এবং তার তৈরি জানালা সবসময় উন্মুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকত পূব ও পশ্চিমের বাতাসে।

    তিনি তৈরি করেছিলেন সিডার কাঠ দিয়ে একটা চমৎকার সিন্দুক। তারপর তা পালিশ করেন এবং তা টেকসই হয়।

    তিনি তৈরি করেছিলেন গির্জায় বাইবেল রেখে পাঠ করার জন্য ব্যবহৃত ঢালু ডেস্ক আমাদের ধর্মমন্দিরের জন্য। এই টেবিলের ওপর তিনি খোঁদাই করেছিলেন তুঁত গাছ, যার ওপর এই পবিত্র গ্রন্থ রাখা হত। তিনি আরও খোঁদাই করেছিলেন পাখাযুক্ত ষাঁড়ের মাথা, ঘুঘু এবং বড় বড় চোখওয়ালা হরিণ।

    গ্রিক ও ক্যালডীয় পদ্ধতিতে তিনি এসব বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু তার যে দক্ষতা ছিল তা না গ্রিক না ক্যালডীয়।

    ত্রিশ বছর আগে আমার এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিল অনেকগুলি হাত। আমি গালীল শহরের সমস্ত নির্মাণকারী ও কাঠমিস্ত্রিদেরকে অনুসন্ধান করেছিলাম। তাদের প্রত্যেকেরই নির্মাণের দক্ষতা ও সৌন্দর্য প্রকাশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা রয়েছে এবং তারা যা করেছিল তাতে আমি আনন্দিত ও তৃপ্ত ছিলাম।

    কিন্তু, এখন তোমরা এসো এবং লক্ষ্য করো দুটি দরজা এবং জানালা নাজারেতের যিশু তৈরি করেছিলেন। তাদের দৃঢ়তার ভেতরে তারা আমার বাড়ির সবকিছুকে বিদ্রূপ করে।

    দ্যাখো, এই দরজা দুটো অন্যসব দরজা থেকে আলাদা নয় এবং এই জানালা পুবদিকে খোলে, এটা কি অন্য জানালা থেকে আলাদা নয়?

    আমার সমস্ত দরজা ও জানালাই এ বছর আবার তৈরি করা হয়েছে শুধুমাত্র তিনি যেগুলো তৈরি করেছিলেন সেগুলি ছাড়া এবং তারা কোনোরকম সাহায্য ছাড়াই যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থায় খাড়া হয়ে আছে।

    দেখুন ঐসব আড়াআড়ি কড়িকাঠগুলো কীভাবে তিনি তা স্থাপন করেছেন এবং এই তারকাঁটাগুলি? কীভাবে তা তিনি কাঠের একপাশ থেকে অন্যপাশে ঠুকে ঠুকে ঢুকিয়েছেন।

    অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে যে সেই শ্রমিকের প্রাপ্য হয়েছিল দুজনের মজুরি কিন্তু সে গ্রহণ করেছিল একজনের মজুরি এবং সেই শ্রমিকই এখন ইসরাইলে নবী।

    তারপর আমি জেনেছিলাম যে, এই যুবক করাত ও রেঁদা নিয়ে আমার কাছে এসেছিল, সে একজন নবী। আমি ভিক্ষা চাইব তাঁর কাছে তাঁর কথা শুনতে কাজের চেয়ে এবং তাঁর কথার জন্য তাকে অধিক মজুরি প্রদান করব।

    এখনও পর্যন্ত আমার প্রচুর লোক রয়েছে যারা বাড়িতে ও শস্যক্ষেতে কাজ করছে। আমি কী করে জানব কোন্ লোকটির নিজস্ব হাত রয়েছে তার যন্ত্রপাতির ওপর, সেই লোকের কাছ থেকে আসা হাত, যার ওপর ঈশ্বর পেতে দিয়েছেন তার নিজের হাত?

    হ্যাঁ, কী করে চিনব আমি ঈশ্বরের হাত?

    উত্তর লেবাননের একজন মেষপালক : নীতিগর্ভ রূপক-কাহিনী

    গ্রীষ্মের শেষশেষি তিনি এবং আরও তিনজন প্রথম ঐ পথে হেঁটে এলেন। তখন সন্ধ্যা এবং তিনি থামলেন এবং দাঁড়ালেন পশুচারণ ভূমির প্রান্তে।

    আমি বাঁশি বাজাচ্ছিলাম এবং আমার মেষগুলো চরে বেড়াচ্ছিল আমার চারপাশে। যখন তিনি থামলেন তখন আমি উঠে হেঁটে গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালাম।

    তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এলিজার কবর কোথায়? এই জায়গায় কাছাকাছি কোথাও নাকি?’

    আমি তাকে উত্তর দিলাম, ‘জনাব, এটা ঐখানে, ঐ বিশাল পাথরের স্তূপের নিচে। সত্যি কথা বলতে কী, আজকের দিন পর্যন্ত প্রতিটি পথিক পাথর বহন করে এনেছে এবং এই পাথরের স্তূপের ওপর তা রেখে গেছে।’

    তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান এবং তার বন্ধুরা যায় তার পিছনে পিছনে।

    তিন দিন পর গ্যানালিয়েল নামের অন্য এক মেষপালক আমাকে বলল, ‘যে লোকটির সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল সে জুদেয়া-তে একজন নবী ছিল। কিন্তু আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি, যদিও অনেকগুলি চান্দ্রমাস আমি তার কথা ভেবেছি।

    বসন্ত এলে আরও একবার যিশু চারণভূমিতে এলেন এবং তখন তিনি ছিলেন একা।

    সেদিন আমি বাঁশি বাজাচ্ছিলাম না, কারণ আমার একটা মেষ হারিয়ে গেছে। আমি বিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম এবং আমার ভেতরে আমার হৃদয় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

    আমি হেঁটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম কারণ আমি স্বস্তি পেতে চেয়েছিলাম।

    তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘আজ তুমি বাঁশি বাজাচ্ছ না? তোমার চোখে বেদনার ছায়া দেখতে পাচ্ছি। কী হয়েছে?’

    আমি জবাব দিলাম, ‘আমার মেষপালের ভেতর থেকে একটা মেষ হারিয়ে গেছে। সব জায়গায় খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। এখন জানি না আমি কী করব?’

    তিনি এক মুহূর্ত নীরব থাকলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং বললেন, ‘কিছুক্ষণ এখানে অপেক্ষা করো। আমি তোমার মেষ খুঁজে আনছি’ এবং তিনি পাহাড়ের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

    এক ঘণ্টা পর তিনি ফিরে এলেন এবং আমার মেষটা ছিল তার ঠিক পেছনে এবং তিনি যখন আমার সামনে দাঁড়ালেন মেষটা তখন তার দিকে তাকাল, এমনকি আমিও তাঁর দিকে তাকালাম। তারপর আমি আনন্দের মঙ্গে মেষটাকে জড়িয়ে ধরলাম।

    তারপর তিনি তাঁর হাত রাখলেন আমার কাঁধের ওপর এবং বললেন, ‘আজ থেকে এই মেষটাকে তোমার পালের অন্য মেষদের চেয়ে বেশি ভালোবাসবে, কারণ সে হারিয়ে গিয়েছিল এবং তাকে তুমি আবার ফিরে পেয়েছ।’

    আবার আমার মেষটাকে আমি আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম এবং সে আমার আরও কাছাকাছি সরে এলো এবং আমি ছিলাম নীরব।

    কিন্তু আমি যিশুকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য মাথা তুলতেই দেখি তিনি বহুদূর চলে গেছেন, কিন্তু তাকে অনুসরণ করার সাহস আমার ছিল না।

    ব্যাপ্টিস্ট জন : বন্দি অবস্থায় তার এক শিষ্যকে বলে

    এই নোংরা গর্তে আমি মোটেও নীরব নই যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে যিশুর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। আমি এখানে বন্ধ হয়ে থাকবনা যখন তিনি মুক্ত।

    তারা আমাকে বলে নাগীনিরা তাঁর কোমরের চারপাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে কিন্তু আমি বলি : সাপ তার শক্তিকে জাগিয়ে তুলবে এবং তিনি তাদেরকে চূর্ণবিচূর্ণ করবেন তাঁর পায়ের তলায়।

    আমি হলাম তার বিদ্যুতের চমক যদিও আমি প্রথম বলেছিলাম তিনি ছিলেন সেই শব্দ এবং উদ্দেশ্য।

    তারা আমাকে সতর্ক না করেই ধরেছিল। সম্ভবত তারা তাদের হাতগুলিকে শুইয়ে দেবে তাঁর ওপর, যদিও তার আগেই তিনি ঈশ্বরের পুরো নাম উচ্চারণ করেছেন এবং তিনি তাদেরকে অতিক্রম করে যাবেন।

    তাঁর রথ তাদেরকে অতিক্রম করে যাবে এবং তাঁর ঘোড়ার খুর মাড়িয়ে যাবে তাদেরকে এবং তিনি সফল হবেন। তারা অবশ্য সামনে এগিয়ে যাবে বর্শা ও তরবারি নিয়ে, কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন আত্মার শক্তি দিয়ে।

    তাঁর রক্ত দৌড়াতে থাকবে মাটির ওপর দিয়ে, কিন্তু তারা নিজেই জানবে আহতাবস্থা এবং তার ব্যথা এবং তারা ব্যাপ্তিস্ত লাভ করবে তাদের অশ্রুজলের ভেতরে যতক্ষণ নিজের পাপ থেকে তারা পরিচ্ছন্ন হতে না পারছে।

    তাদের বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী কুচকাওয়াজ করতে করতে যাবে তাঁর শহর অভিমুখে পাথর ভাঙার যন্ত্রসহ, কিন্তু তারা তাদের পথে যেতে ডুবে যাবে জর্ডান নদীতে।

    তাঁর দেয়ালসমূহ এবং উঁচু প্রাসাদগুলো আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তাঁর যোদ্ধাদের ঢাল হবে সূর্যালোকে অধিকতর উজ্জ্বল।

    তারা বলে, তাঁর সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে এবং তা হল আমাদের পরিকল্পনা জনগণকে জেগে ওঠার জন্য তাড়া দেওয়া এবং যুদেয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা।

    আমি জবাব দেই : যদি তারা মনে করে এই পাপাচারের গর্ত একটি সাম্রাজ্য, তাহলে একে ধ্বংসের মুখে পতিত হতে দাও। তাদেরকে যেতে দাও সদোম ও ঘমোরার দিকে এবং এই প্রজাতিকে ভুলে যেতে দাও ঈশ্বরকে এবং এই ভূমিকে ছাইয়ে পরিণত হতে দাও।

    হ্যাঁ, এই কারাগারের দেয়ালের পেছনে বস্তুতপক্ষে আমি হলাম নাজারেতবাসী যিশুর মিত্র এবং তিনি আমার সেনাবহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী ও পদাতিক বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন এবং আমি নিজে যদিও একজন অধিনায়ক কিন্তু আমি চাই না তাঁর স্যান্ডেলের ফিতে হারিয়ে ফেলতে।

    তার কাছে যাও এবং আমার কথা পুনরাবৃত্তি করো এবং তারপর আমার নাম করে তাঁর কাছে ভিক্ষা চাও আয়েশ ও আশীর্বাদের জন্য।

    আমি এখানে বেশিক্ষণ থাকব না। রাত্রিতে জাগরণ এবং জাগরণের মাঝখানে আমি অনুভব করি ধীরগতিসম্পন্ন পায়ের পরিমাপ করা পদক্ষেপ এই শরীর মাড়িয়ে যাচ্ছে এবং আমি শ্রবণ করি, আমি শ্রবণ করি আমার কবরের ওপর বৃষ্টিপাতের শব্দ।

    যিশুর কাছে যাও এবং তাঁকে বলো কেদরন-এর জন যার আত্মা ছায়ায় পরিপূর্ণ এবং তা আবার শূন্য হয়ে যায়। সে তাঁর জন্য প্রার্থনা করে যখন গোরখোদক কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকে এবং অসি চালনায় পারদর্শী ব্যক্তি মজুরির জন্য প্রসারিত করে হাত।

    আরিমেথিয়ার জন : যিশুর প্রধান উদ্দেশ্য সম্পর্কে

    যিশুর প্রধান উদ্দেশ্য তোমরা জানবে এবং বলতে গিয়ে আমি মূর্ছিত হয়ে পড়ব। কিন্তু কেউই আঙুল দিয়ে জীবনের আশীর্বাদকৃত মদ স্পর্শ করতে পারে না, দেখতে পারে না প্রাণরস যা শাখাগুলিকে খাবার যোগায়।

    যদিও আমি আঙুর খেয়েছি এবং স্বাদ নিয়েছি আঙুর-পেষণকারী যন্ত্র থেকে নতুন মদের, আমি তোমাকে সবকিছু বলতে পারি না।

    আমি সেইসব বিষয়কে সম্পর্কিত করতে পারি যা তাঁর সম্পর্কে আমি জানি।

    আমাদের প্রভু এবং আমাদের পছন্দের মানুষ নবীরা তিনটি ঋতুর ভেতরে বসবাস করেন। তারা হচ্ছে তাঁদের গানের বসন্তকাল, পরমানন্দের গ্রীষ্মকালে এবং অনুভূতির শরৎকাল এবং এই প্রতিটি ঋতু ছিল এক হাজার বছরের।

    তার গানের বসন্তকাল কেটেছিল গালীলে। এ সময় তিনি জড়ো করেছিলেন তাঁর ভালোবাসার মানুষগুলিকে তাঁর চারপাশে এবং এটা ছিল একটা নীল লেকের তীরভূমি সেখানে তিনি প্রথম পিতা সম্পর্কে বলেছিলেন এবং আমাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা সম্পর্কে।

    গালীলের সেই লেকের পাশে আমরা নিজেদেরকে হারিয়েছিলাম পিতার নির্দেশিত পথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এবং তাতে সামান্য ক্ষতি হলেও কিছু অর্জনও হয়েছে, যেখানে দেবদূতেরা আমাদের কানে কানে গান গাইছিল এবং ঘোষণা করছিল আমাদেরকে এই অনুর্বর ভূমি পরিত্যাগ করতে হৃদয়ের আকঙ্ক্ষা দিয়ে তৈরি বাগানের জন্য।

    তিনি শস্যক্ষেত ও পশুচারণভূমি সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। কথা বলেছিলেন লেবাননের পাহাড় ও সমতল ভূমির ঢালগুলি সম্পর্কে যেখানে ফুটে থাকা পদ্মফুলগুলি উপত্যকার ধুলোয় ঢাকা পড়ে যায় এবং মরুযাত্রী দলেরও মনোযোগ কাড়তে পারে না তারা।

    তিনি কথা বলেছিলেন বুনো গোলাপ সম্পর্কে যা সূর্যালোকে হাসে এবং প্রাকৃতিক রীতিতে উৎপন্ন তার সুগন্ধ বয়ে নিয়ে যায় মৃদুমন্দ বাতাস।

    তিনি বলেছিলেন, ‘পদ্মফুল ও গোলাপ বাঁচে একদিনের জন্য যদিও সেইদিন হচ্ছে অনন্তকাল যা কেটে গেছে স্বাধীনতার ভেতরে।’

    এক সন্ধ্যায় আমরা বসেছিলাম একটা নদীর পাশে। তিনি বললেন, ‘লক্ষ করো এই নদীটাকে এবং শুনতে থাকো এর গান। চিরকাল আমি সমুদ্র অনুসন্ধান করব এবং ভাববো এটাই চিরকালীন অনুসন্ধান, এক দুপুর থেকে অন্য দুপুর পর্যন্ত তার রহস্যকেই গেয়ে চলেছে।

    তুমি কি সেইভাবে পিতাকে সন্ধান করবে যেভাবে একটা নদী সমুদ্রকে সন্ধান করে।

    তারপর এল তাঁর পরমানন্দের গ্রীষ্মকাল এবং তাঁর ভালোবাসার জুন মাস আমাদের কাছে ছিল। তিনি বলেছিলেন অন্য লোক সম্পর্কে— প্রতিবেশী, রাস্তার সহকর্মী, আগন্তুক এবং আমাদের ছেলেবেলার খেলার সঙ্গীরা।

    তিনি কথা বলেছিলেন সেইসব পর্যটক সম্পর্কে যারা ভ্রমণ করছে পূব থেকে মিশরে, কথা বলেছিলেন সেইসব কৃষক সম্পর্কে যারা লাঙল, জোয়াল ও ষাঁড়গুলিকে নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আসছে, তিনি কথা বলেছিলেন সেইসব অতিথি সম্পর্কে অন্ধকার যাদের নেতৃত্ব দেয় আমাদের দরজায়।

    তিনি বললেন, ‘তোমাদের প্রতিবেশী হল তোমাদের অপরিচিত সত্তা যা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তার মুখমণ্ডল প্রতিফলিত হবে তোমাদের মুখমণ্ডলে স্থির জলের ভেতরে এবং যদি তোমরা সেদিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাও তাহলে দেখতে পাবে তোমাদের প্রসন্ন মুখ

    ‘রাত্রে তোমাদের কান পেতে থাকা উচিত, তাহলে তোমরা শুনতে পাবে তাঁর কথা, তাঁর শব্দাবলি তোমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেবে।

    ‘তাঁর প্রতি অনুগত হও, যাঁর মাধ্যমে তোমরা তাকে পাবে তোমাদের প্রতি।

    ‘এই হল আমার আইন এবং আমি তোমাদেরকে এবং তোমাদের শিশুকে বলব এবং তারা তাদের শিশুকে বলবে যতক্ষণ সময় অতিবাহিত না হয় এবং প্রজন্ম অধিক বেড়ে না ওঠে।

    অন্য একদিন তিনি বললেন, ‘নিজেরা কখনও একা হবে না। তোমরা হলে অন্য মানুষের কর্মকাণ্ড, যদিও তোমাদের দিনগুলি সম্পর্কে তারা জানে না।’

    ‘তারা কোনো অপরাধ করবে না এবং তোমাদের হাত কখনও থাকবে না তাদের হাতের সাথে।

    ‘তারা কখনও পতিত হবেনা কিন্তু তোমরা নিচে পতিত হবে এবং তারা বেড়ে উঠবে না, কিন্তু তোমরা বেড়ে উঠবে তাদের সঙ্গে।

    ‘তাদের অভয়ারণ্যে যাবার পথ হচ্ছে তোমাদের পথ এবং যখন তারা পরিত্যক্ত ভূমি সন্ধান করে, তখন তোমরাও তাদের সঙ্গে তা সন্ধান করো।

    ‘তোমরা এবং তোমাদের প্রতিবেশীরা হল শস্যক্ষেতে বপনকৃত দুটো বীজ। একসঙ্গে তোমরা বেড়ে ওঠো এবং একসঙ্গে দুলতে থাকো বাতাসে এবং তোমাদের কেউই শস্যক্ষেতের অধিকার দাবি করতে পারো না। কারণ একটা বীজ তার নিজস্ব পদ্ধতিতে তার বেড়ে ওঠা দাবি করে, পরমানন্দ নয়।

    ‘আজ আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। আগামীকাল আমি যাব পশ্চিমদিকে, কিন্তু যাবার আগে আমি তোমাদেরকে বলি, ‘তোমাদের প্রতিবেশী হল তোমাদের অদৃশ্য সত্তা যা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অনুসন্ধান করো তাকে ভালোবাসার ভেতরে, যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদেরকে জানতে পারো, কারণ শুধুমাত্র সেই জ্ঞানের মাধ্যমে তোমরা আমার ভাইয়ে পরিণত হবে।’

    তারপর এল তাঁর অনুভূতির শরৎকাল।

    তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন স্বাধীনতার কথা, যেভাবে তিনি গালীলে বলেছিলেন বসন্তকালে তাঁর গানের মাধ্যমে কিন্তু এখন তাঁর কথা আমাদের গভীরতার উপলব্ধি অনুসন্ধান করে।

    তিনি বলেছিলেন সেই গান পরিত্যাগ করতে শুধুমাত্র যখন বাতাসের ওপর তা পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে। তিনি বলেছিলেন সেই মানুষ সম্পর্কে পাত্র হিসেবে যাকে পূর্ণ করে দেয় সাহায্যদানকারী দিনের দেবদূত অন্য দেবদূতের তৃষ্ণা মেটাতে। তাঁর কাপ খালি বা ভর্তি যা-ই হোক না কেন তা স্ফটিকাকারে দাঁড়িয়ে থাকে সবচেয়ে উঁচু ও মর্যাদাসম্পন্ন টেবিলের ওপর।

    তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা হলে কাপ এবং তোমরাই হলে মদ। পান করো তলানি পর্যন্ত অথবা স্মরণ করো আমাকে এবং তোমাদের তৃষ্ণা নিবারিত হবে।

    দক্ষিণ দিকে যাবার পথে তিনি বললেন, ‘জেরুজালেম গর্বের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক উচ্চতায়, তবে তা অবতরণ করবে অন্ধকার উপত্যকা জাহান্নামের গভীরতায় এবং তার বিষণ্নতার ধোঁয়াশার ভেতরে আমি একাকী দাঁড়িয়ে আছি।

    ‘ধুলায় পতিত হবে মন্দির এবং এর প্রাঙ্গণের চারপাশে তোমরা শুনবে বিধবা ও শিশুদের কান্না এবং পুরুষেরা দ্রুততার সঙ্গে পালিয়ে যাবে, নিজের ভাইয়ের মুখকেও তারা চিনবে না, কারণ তাদের প্রত্যেকের ওপর নেমে আসবে ভীতি।

    ‘কিন্তু সেখানে যদি তোমাদের দুজন মিলিত হয় এবং আমার নাম উচ্চারণ করে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে, তাহলে তোমরা আমাকে দেখতে পাবে এবং আমার কথা পুনরায় পরিদর্শন করবে তোমাদের কর্ণকুহর।

    আমরা যখন বেথানীর পাহাড়ে পৌঁছালাম, তিনি বললেন, ‘চলো আমরা জেরুজালেমে যাই। শহরটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমি একটা বাচ্চা ঘোড়ার পিঠে চড়ে শহরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করব এবং কথা বলব জনতার উদ্দেশে।

    ‘সেখানে অনেকেই আছে যারা আমাকে শৃঙ্খলিত করবে এবং অনেকেই আছে যারা আমাকে নিক্ষেপ করবে আগুনে এবং আমার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তোমরা খুঁজে পাবে জীবন এবং তোমরা মুক্ত হবে।

    তারা অনুসন্ধান করবে শ্বাসপ্রশ্বাস যা আত্মার ওপর পাখা না নাড়িয়ে ভেসে থাকবে এবং মন সোয়ালো পাখির মতো ভেসে থাকবে মাঠ এবং তার বাসার মাঝখানে কিন্তু আমার শ্বাসপ্রশ্বাস ইতিমধ্যেই তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছে এবং তারা আমাকে অতিক্রম করে যায়নি।

    ‘দেয়ালগুলি, যা আমার পিতা নির্মাণ করেছেন আমার চারপাশে তা পতিত হবে না এবং নষ্ট হবে না সেই একর একর ভূমি। পবিত্র যা-কিছু তিনি তৈরি করছেন তা কখনও অলৌকিকে পরিণত হবে না।

    ‘যখন ভোর হবে এবং সূর্য আমার মাথায় মুকুট পরাবে এবং আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব। সেই দিনটা হবে দীর্ঘ এবং পৃথিবী কোনো সন্ধ্যার মুখোমুখি হবে না

    ‘অনুলেখক ও পারসীয়রা বলে মাটি আমার রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত। আমি আমার রক্ত দিয়ে পৃথিবীর তৃষ্ণা মেটাব কিন্তু যে রক্তবিন্দু ওক এবং মেপল (এই গাছের নির্যাস থেকে চিনি তৈরি হয়) গাছকে বাড়িয়ে তুলবে এবং পুবের লোকেরা সেই ওকগাছের বীজ বহন করে নেবে অন্যান্য ভূমিতে।

    তারপর তিনি বললেন, ‘জুদেয়া’র একজন রাজা আছে এবং সে রোমান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবশ্যই কুচকাওয়াজ করতে করতে অগ্রসর হবে।

    ‘আমি তার রাজা হব না। জেরুজালেমের মুকুট তৈরি হয়েছিল তাদের জন্য যাদের ভ্রু পাতলা এবং সোলেমানের আংটি তাদের আঙুলের চেয়ে ছোট।

    ‘লক্ষ করো আমার হাতের দিকে। দেখে কি তোমাদের মনে হয় না একটা রাজদণ্ড ধরে রাখার জন্য এটা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং একটা সাধারণ অস্ত্র ধরে রাখার জন্য অধিক মাংসপেশিসম্পন্ন?

    ‘না, আমি সিরীয় মাংসকে আদেশ দেব না রোমান মাংসের বিরদ্ধে। কিন্তু তোমরা যারা আমার কথার সঙ্গে আছ তারা সেই শহরটাকে জাগিয়ে রাখবে এবং আমার আত্মা তাকে বলবে দ্বিতীয় জন্ম সম্পর্কে।

    ‘আমার কথারা হবে ঘোড়া ও রথসহ একটা অদৃশ্য সেনাবাহিনী এবং কুড়াল ও বর্শা ছাড়াই আমি জয় করে নেব জেরুজালেমের সব যাজক এবং সীজারদের।

    ‘আমি এরকম একটা সিংহাসনে বসব না যেখানে দাসেরা বসে অন্যান্য দাসদের শাসন করেছে। আমি ইটালির পুত্রদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করব না।

    ‘কিন্তু আমি তাদের আকাশে একটা ঝড়ে পরিণত হব এবং আত্মায় পরিণত হব একটা সংগীতের ভেতরে।

    ‘এবং আমাকে স্মরণ করা হবে।

    ‘তারা আমাকে আহ্বান জানাবে যিশু বলে।’

    এই সবকিছু তিনি বললেন দেয়ালের বাইরে জেরুজালেম শহরে প্রবেশ করার আগে।

    তাঁর কথারা ইহুদিদের ধর্মসভার মতোই স্মৃতিতে খোঁদাই করা আছে।

    নাথানিয়েল : যিশু প্রতিবাদহীন ছিলেন না

    তারা বলত যে নাজারেতবাসী যিশু ছিলেন ভদ্র ও বিনয়ী কিন্তু প্রতিবাদহীন নয়।

    তারা বলত যে, চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যথাযথ এবং ন্যায়নিষ্ঠ। তিনি ছিলেন দুর্বল এবং প্রায়ই হতবুদ্ধি হয়ে পড়তেন শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি এবং তিনি যখন কর্তৃপক্ষের লোকদের সামনে দাঁড়াতেন তখন তাঁকে মনে হত সিংহের ভেতরে একটা মেষশাবক।

    কিন্তু আমি দেখেছি মানুষের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ছিল এবং যুদেয়া ও ফিনিসীয় নগরগুলি এবং গালীল প্রদেশের পাহাড়গুলির মাঝখানে কী পরিমাণ ক্ষমতা তাঁর সে সম্পর্কে তিনি জানতেন।

    মানুষ কী উৎপন্ন করছে? তিনি বললেন, ‘আমি হলাম জীবন এবং আমিই হলাম সত্যের পথ।’

    কোন্ মানুষ অপ্রতিবাদী হবে এবং বলবে, ‘আমাদের পিতা ঈশ্বরের ভেতরে আমি এবং আমার ভেতরে আমাদের ঈশ্বরই হলেন পিতা।’

    কোন্ ব্যক্তি তার নিজের শক্তি সম্পর্কে অসচেতন, যে বলে, ‘কে সেই ব্যক্তি যে আমাকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে না এই জীবন এবং আরও বিশ্বাস করে না সেই জীবন, যা চিরস্থায়ী।’

    আগামীকাল সম্পর্কে অনিশ্চিত কোন্ মানুষ ঘোষণা করবে ‘তোমাদের পৃথিবী মারা যাবে এবং কিছুই থাকবে না তবে ছাইগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়ার আগেই মারা যাবে আমার কথারা।’

    সে কি নিজের সম্পর্কেই সন্ধিহান ছিল যখন সে তাদেরকে বলল, ‘বিভ্রান্ত হবে যদি তাকে বেশ্যার সাথে দেখে এবং বলে, ‘কে সে যে পাপী নয়, তাকে একটা পাথর নিক্ষেপ করতে দাও।’

    সে কি কর্তৃপক্ষকে ভয় পেয়েছিল মন্দিরের আদালত থেকে যখন মুদ্রা-বিনিময়কারীদেরকে তাড়িয়ে দেয়, যদিও তাদের ছিল যাজকদের অনুমতিপত্র।

    তার পাখার পালক কি কেটে ফেলা হয়েছিল যখন সে উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠল, ‘আমার সাম্রাজ্য হল তোমাদের জাগতিক সাম্রাজ্যেরও ওপরে।’

    সে কি তাঁর কথার ভেতরে আশ্রয় খুঁজেছিল যখন সে পুনরাবৃত্তি করছিল : ‘ধ্বংস করো এই মন্দির এবং আমি তা তিনদিনের ভেতরে পুনরায় নির্মাণ করব।’

    এটা কি ছিল একটা কোলাহল যা কর্তৃপক্ষের মুখের সামনে হাত নাড়িয়েছিল এবং উচ্চারণ করেছিল, ‘মিথ্যাবাদী, নীচ, নোংরা এবং পথভ্রষ্ট।’

    একজন মানুষ কি যথেষ্ট দৃঢ়চেতা হবে তাদেরকে এইসব বলতে, যারা যুদেয়া শাসন করেছিল ভদ্র ও প্রতিবাদহীন হয়ে।

    না, ঈগল তার বাসা তৈরি করেনা ক্রন্দনরত ইউলো গাছে এবং সিংহ অনুসন্ধান করে না ফার্ন বনে নিজের আবাসস্থাল।

    আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি এবং আমার ভেতরের পাত্রটি নিশ্চল এবং তা বেড়ে ওঠে যখন আমি শুনি মূর্ছিত কোনো হৃদয় বলে, যিশু ভদ্র এবং বিনয়ী এবং প্রতিবাদহীন নয়, যেন তারা তাদের নিজস্ব হৃদয়ের মূর্ছাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে এবং নিপীড়িত স্বস্তি ও সঙ্গ পাবার জন্য যিশুর কথা বলে জ্বলজ্বলে অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো।

    হ্যাঁ, আমার হৃদয় পীড়িত এরকম মানুষের কারণে। আমি বলব এটা হল পরাক্রমশালী শিকারি এবং পাহাড়ের মতো উদ্যাম এবং তা অজেয়।

    এ্যান্টিওচের সাবা : টারসাসের সাউল সম্পর্কে

    এই দিনে এই শহরে আমি শুনলাম টারসাসের সাউল ক্রাইস্টের বাণী প্রচার করছে ইহুদিদের কাছে।

    এখন সে নিজেকে বলছে পল, ইহুদি নয় এরকম এক ব্যক্তির শিষ্য।

    আমি তাঁকে যৌবনে চিনতাম এবং সেই দিনগুলিতে যখন সে নাজারেতবাসীর বন্ধুদেরকে পীড়িত করেছিল। হ্যাঁ, আমি ভালোভাবেই স্মরণ করতে পারি স্টিফেনকে যখন তার সহকর্মী পাথর মারছিল তখন তার সে কী তৃপ্তি।

    বস্তুতপক্ষে এই পল একজন অদ্ভুত মানুষ। মুক্ত মানুষের আত্মার মতো তার আত্মা নয়।

    কোনো কোনো সময় তাকে বন্য পশুর মতো মনে হত, যেন তাকে শিকার করা হয়েছে এবং সে আহত, অনুসন্ধান করছে একটা গুহা যেখানে সে এই পৃথিবী থেকে তার যন্ত্রণা লুকাতে পারে।

    সে যিশু সম্পর্কে কথা বলে না, পুনরাবৃত্তি করে না তাঁর কথা। সে প্রচার করে ইহুদিরা যে ত্রাণকর্তার আগমন বিশ্বাস করে তার সম্পর্কিত পুরোনো নবীদের ভবিষ্যৎবাণী।

    যদিও সে একজন বিদ্বান ইহুদি তারপরও সে সহকর্মী ইহুদিদের সঙ্গে গ্রিক ভাষায় কথা বলছে, তবে গ্রিক সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে পারে না এবং শব্দ নির্বাচনও খুব শোভন নয়।

    কিন্তু সে এমন মানুষ যার লুকানো ক্ষমতা আছে এবং সে তার উপস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে তাদের দ্বারা যারা তার পাশে জড়ো হয়। সেসময় সে তাদেরকে নিশ্চিত করে সে নিজে কী সে সম্পর্কে, যা তার কাছেও নিশ্চিত নয়।

    আমরা যারা যিশুকে চিনতাম এবং শুনেছিলাম তার ধর্মোপদেশ, যেমন তিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে বন্ধনের শৃঙ্খল ভাঙতে হয়, যা তাকে মুক্ত করতে পারে তার আগামীকাল থেকে।

    কিন্তু পল লোহাকে তাপে গলিয়ে পিটিয়ে আগামীকালের মানুষের জন্য শিকল তৈরি করছে। সে তার নিজস্ব হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে সেই লোহাকে এমন একজন মানুষের নামে যে এটা জানে না।

    নাজারেতবাসী আমাদেরকে গ্রহণ করবে আবেগ ও পরমানন্দের ভেতরে।

    টারসাসের লোকটা প্রাচীন গ্রন্থে নথিবদ্ধ আইনগুলির প্রতি মনোযোগী হবে।

    যিশু মৃতদেরকে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস দান করেছিলেন এবং আমার নিঃসঙ্গ রাত্রিতে আমি তা বিশ্বাস ও উপলব্ধি করেছিলাম।

    যখন তিনি টেবিলে বসেছিলেন তাঁর গল্প ভোজ-উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের সুখ দিয়েছিল এবং তাঁর আনন্দের মশলা তিনি মিশেয়েছিলেন মাংস ও মদের সঙ্গে।

    কিন্তু পল ব্যাবস্থাপত্র দেবে আমাদের খাবারের গ্রাস ও আমাদের কাপ সম্পর্কে

    আমাকে অন্যদিকে চোখ ফেরানোর কষ্ট দিও না।

    একজন নারীবন্ধুর প্রতি সালোমি : একটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা

    তিনি রৌদ্রালোকে পপলার গাছের মতো ঝিকমিক করছিলেন এবং জলাভূমির মতো জ্বলজ্বল করছিলেন নিঃসঙ্গ পাহাড়ের ভেতরে।

    পাহাড়চূড়া ঢেকে থাকা বরফের মতো
    সাদা, সূর্যালোকে জ্বলজ্বলে সাদা।

    হ্যাঁ, তিনি এই সবকিছুর প্রতি এরকম
    এবং আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।

    যদিও আমি ভয় পেতাম তাঁর উপস্থিতি।
    এবং আমার পা আমার ভালোবাসার বোঝা বহন করবে না।
    তাই আমি আমার বাহু দিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করব তাঁর পা
    আমি তাঁকে বলব,
    ‘আমি আপনার বন্ধুকে এক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করব
    আপনি কি আমার পাপ ক্ষমা করবেন?’

    আপনি কি আমাকে ক্ষমা করবেন না
    আমার যৌবনের কর্মকাণ্ড
    যার প্রতি আমি অন্ধ ছিলাম,
    যা আপনার আলোতে হাঁটতে পারে।’

    আমি জানি তিনি,আমার নৃত্যকে ক্ষমা করে দিয়েছেন
    কারণ তার বন্ধু হচ্ছে সন্ন্যাসী।

    আমি জানি আমার ভেতরে তিনি তাঁর
    নিজস্ব শিক্ষার বিষয়গুলো দেখতে পেয়েছেন।

    কারণ সেখানে ক্ষুধার কোনো উপত্যকা ছিল না
    সুতরাং তিনি সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেনি এবং
    সেখানে ছিল না কোনো তৃষ্ণার মরুভূমি সুতরাং
    তিনি তা অতিক্রম করতে পারেননি।

    হ্যাঁ, তিনি ছিলেন পপলার গাছের মতো
    যেমন পাহাড়ের ভেতরের জলাভূমিগুলি
    এবং লেবাননের বরফের মতো।

    এবং আমি তাঁর পোশাকের ভাঁজে আমার
    ঠোঁট ঠাণ্ডা করে নেব।

    কিন্তু তারপরও তিনি ছিলেন আমার থেকে বহু দূরে
    এবং আমি ছিলাম লজ্জিত।

    আমার মা আমাকে পেছন থেকে ধরে রেখেছিলেন,
    যখন তাঁকে অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা আমার
    ওপর আবির্ভূত হয়েছিল।

    যখন তিনি আমাকে অতিক্রম করে যান, আমার হৃদয়
    বেদনার্ত হয়ে ওঠে তার চমৎকারিত্বে, কিন্তু আমার মা
    পরিতৃপ্তির সঙ্গে তাঁর দিকে ভ্রূকুটি করেন এবং তিনি
    দ্রুততার সঙ্গে আমাকে জানালা থেকে সরিয়ে
    আমার শোবার ঘরে নিয়ে যান।

    তিনি শব্দ করে কেঁদে ওঠেন এই বলে,
    ‘কে সে, নিশ্চয়ই মরুভূমি থেকে আসা
    পঙ্গপালখেকো কোনো প্ৰাণী?

    কী সে, একজন নির্বোধ ও একজন
    স্বধর্মত্যাগী ছাড়া আর কিছুই নয়।
    সে একজন রাজশত্রু ও দাঙ্গাব্যবসায়ী
    যে অপহরণ করবে আমাদের রাজদণ্ড ও রাজমুকুট।

    ঘোষণা করে দাও তাঁর অভিশপ্ত ভূমি
    শেয়াল ও হায়েনাদের জন্য যারা আমাদের হলরুমে
    হুঙ্কার দেয় এবং বসে থাকে আমাদের সিংহাসনে।

    যাও এবং লুকিয়ে ফেল তোমার মুখখানা
    আজকের দিন থেকে এবং অপেক্ষা করো সেই দিনের
    যখন তার মাথা মাটিতে পতিত হবে,
    কিন্তু তা তোমাদের বিশেষ পাত্রে পড়বে না।’

    এসব বলল আমার মা, কিন্তু আমার হৃদয়
    তার এসব কথা গ্রহণ করল না।

    আমি তাঁকে ভালোবাসতাম গোপনে এবং
    আমার ঘুম ছিল অগ্নিশিখার সঙ্গে আবদ্ধ।
    এখন তিনি চলে গেছেন
    এবং যা-কিছু আমার ভেতরে ছিল তার কিছুই এখন নেই।

    সম্ভবত এটা ছিল আমার যৌবন
    যা কালিমা লেপন করবে না,
    যতক্ষণ যৌবনের ঈশ্বর খুন না হন।

    একজন মহিলা শিষ্য র‍্যাচেল : মানুষ যিশু ও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে

    আমি প্রায়ই বিস্মিত হতাম যে যিশু ছিলেন আমাদের মতোই রক্তমাংসের একজন মানুষ অথবা শরীর ছাড়া একটা চিন্তা মনের ভেতরে অথবা একটা ধারণা যা মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে পরিদর্শন করে।

    প্রায়ই আমার মনে হত যে, তিনি ছিলেন একটা স্বপ্ন, যা দেখে থাকে গণনাহীন নারী ও পুরুষেরা একই সময় ঘুমের ভেতরে এবং ঘুমের থেকেও অধিকতর গভীর যে ঘুম এবং একটা সকালের ভেতরে যা অধিকতর স্বচ্ছ অন্যান্য সকালের চেয়ে।

    মনে হত যে একজনের সঙ্গে অন্যের স্বপ্নকে সম্পর্কিত করে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম এটা একটা বাস্তবতা, বস্তুতপক্ষে যা অতিক্রম করার জন্যই আসে এবং আমাদের কল্পনার ভেতরে শরীর এবং আকুল আকাঙ্ক্ষার ভেতরে একটি কণ্ঠস্বর প্রদান করে। আমরা নিজস্ব বস্তু থেকেই একটা বস্তু তৈরি করেছিলাম।

    কিন্তু সত্যের ভেতরে এটা কোনো স্বপ্ন ছিল না। আমরা তিন বছর ধরে তাকে চিনতাম এবং প্রখর মধ্যাহ্ন পর্যন্ত আমরা আমাদের খোলাচোখে তাকে লক্ষ্য করেছিলাম।

    আমরা স্পর্শ করেছিলাম তাঁর হাত এবং তাকে অনুসরণ করেছিলাম এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। আমরা শুনেছিলাম তিনি কীভাবে নিরুৎসাহিত করেন মানুষকে এবং আমরা ছিলাম তাঁর কর্মকাণ্ডের সাক্ষী। ভেবে দ্যাখো তোমরা, আমরা একটা চিন্তাকে অনুসন্ধান করেছি অধিকতর চিন্তার পেছনে অথবা অসংখ্য স্বপ্নের ভেতরে একটি স্বপ্ন।

    আমাদের নিত্যদিনের জীবনে বিশাল ঘটনাগুলি সবসময়ই বহিরাগত মনে হয়। যদিও তাদের প্রকৃতির শিকড়-বাকড় আমাদের প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে কিন্তু তারা হঠাৎ করেই আসে এবং হঠাৎ করেই চলে যায়। তাদের প্রকৃতই মধ্যবর্তী ব্যবধান হচ্ছে বছরগুলির এবং প্রজন্মগুলির।

    নাজারেত-এর যিশু নিজেই ছিলেন একটা বিশাল ঘটনা। সেই লোক যার পিতা, মাতা ও ভাইদেরকে আমরা চিনতাম এবং তিনি নিজে ছিলেন যুদেয়াতে একটা অলৌকিক ঘটনা। হ্যাঁ, সবকিছুই তাঁর নিজস্ব অলৌকিকতা, এটা যদি তাঁর পায়ে স্থাপন করা হয় তাহলে তা তাঁর হাঁটু পর্যন্তও বাড়বে না।

    সারা বছরের প্রবহমান সমস্ত নদী আমাদের এই স্মৃতিচারণকে তার কাছে বহন করে নিয়ে যাবে না।

    তিনি ছিলেন একটা পাহাড় যা রাত্রিতে পুড়ে যায় যদিও তিনি ছিলেন পাহাড়ের ওপরে একটা কোমল রক্তিমাভা। আকাশে তিনি ছিলেন বজ্র যদিও তিনি ছিলেন দিনশেষের ধোঁয়াশার ভেতরে একটা মর্মরধ্বনি।

    তিনি ছিলেন একটা প্রবল জলধারা যা অনেক উঁচু থেকে ঝরে পড়ছে সমতলভূমিতে এর পথের ওপর যাকিছু আছে তা ধ্বংস করে দিতে এবং তিনি ছিলেন শিশুদের উচ্চহাসির মতো।

    প্রতি বছর আমি এই উপত্যকা পরিদর্শনের জন্য বসন্তের অপেক্ষায় থাকি। আমি অপেক্ষা করতে থাকি যখন পদ্মফুল ও তীব্র গন্ধবিশিষ্ট ফুলগুলি ফুটবে এবং প্রতিবছর আমার হৃদয় এ সময় বেদনার্ত হয়ে থাকে, কারণ সব সময়ই আমি বসন্তের সঙ্গে উল্লসিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় থাকি, যদিও আমি উল্লসিত হতে পারি না।

    কিন্তু কখন যিশু আমার ঋতুগুলির ভেতরে এসেছিলেন; তিনি ছিলেন বস্তুতপক্ষে একটি বসন্ত এবং তাঁর ভেতরে ছিল সমস্ত বছরের আগমনের প্রতিশ্রুতি। তিনি আনন্দে আমার হৃদয় পূর্ণ করে দিতেন এবং পছন্দ করতেন আমার পরিচর্যাকৃত উদ্যান-উদ্ভিদ, তাঁর আগমনের আলোতে যা লজ্জা পেত।

    এখন পৃথিবীর এই ঋতু-পরিবর্তন যদিও আমাদের নয়, তবে তাঁর চমৎকারিত্ব আমদের পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না।

    না, যিশু কোনো অপচ্ছায়া নয়, নয় কোনো কবির ধারণা। তিনি ছিলেন তোমার ও আমার মতোই মানুষ কিন্তু শুধুমাত্র দেখা, শোনা ও স্পর্শ করার ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম, বাকি সবকিছুই আমাদের মতো।

    তিনি হচ্ছেন একজন উল্লসিত মানুষ এবং এই আনন্দের পাশে চলতে গিয়ে তিনি সব মানুষের দুঃখের সঙ্গে মিলিত হন এবং এটা ছিল তাঁর দুঃখের উঁচু ছাদ যেখানে তিনি সব মানুষের উল্লাসকে লক্ষ্য করেন।

    তিনি অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে বহুদূর দেখেন, যা আমরা দেখতে পাই না এবং সেই কণ্ঠস্বর শোনেন যা আমরা শুনতে পাই না। তিনি কথা বলেন অদৃশ্য জনতার উদ্দেশে এবং প্রায় সময়ই তিনি আমাদের ভেতর দিয়ে কথা বলেন মল্লযুদ্ধে রত হতে তাদের সঙ্গে যারা এখনও জন্মায়নি।

    যিশু প্রায় সময়ই একা থাকতেন। তিনি ততক্ষণ আমাদের ভেতরে থাকতেন যতক্ষণ আমাদের সঙ্গে কেউ নেই। তিনি পৃথিবীর ওপরে ছিলেন যদিও তিনি ছিলেন আকাশের এবং শুধুমাত্র আমাদের একাকিত্বের ভেতরেই আমরা তাঁর একাকিত্বের ভূমি পরিদর্শন করতে পারি।

    তিনি আমাদের ভালোবাসতেন এবং তাঁর ভালোবাসা ছিল কোমল। তাঁর হৃদয় ছিল একটা আঙুর পেষণকারী যন্ত্র। তোমরা এবং আমি একটা কাপ নিয়ে তাঁর কাছাকাছি যেতে পারি এবং পান করতে পারি তার কাছ থেকে।

    যিশুর একটা বিষয় আমি বুঝতে পারি না : তিনি তাঁর শ্রোতাদের সঙ্গে আনন্দিত হবেন, তিনি রসিকতা করবেন এবং খেলা করবেন নিজের কথা নিয়ে, হেসে উঠবেন তাঁর হৃদয়ের যাবতীয় পরিপূর্ণতার সঙ্গে, এমনকি যখন তাঁর কণ্ঠস্বরের ভেতরে রয়েছে বেদনা এবং দৃষ্টির ভেতরে রয়েছে দূরত্ব। কিন্তু এখন আমি তা উপলব্ধি করতে পারি।

    প্রায়ই আমি নারীকে মাটি হিসেবে মনে করি যে তার প্রথম সন্তান ধারণ করে আছে। যখন যিশু জন্মালেন, তিনি হলেন সেই প্রথম শিশু এবং যখন তিনি মারা গেলেন তখন তিনিই হলেন সেই প্রথম মানুষ যে মারা গেল।

    এটা তোমাদের কাছে আবির্ভূত হয় নাই পৃথিবী অন্ধকারে স্থির হয়ে গিয়েছিল বলে, নাকি স্বর্গ স্বর্গের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল?

    তোমরা কি অনুভব করো নাই যখন তাঁর মুখমণ্ডল আমাদের চোখে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন আমরা নয় ধোঁয়াশার ভেতরে যাকে স্মৃতিগুলি।

    বেথ্রোনের ক্লিওপাস : আইন এবং নবী সম্পর্কে

    যিশু যখন কথা বলেছিলেন তখন সমস্ত পৃথিবী তা চুপ করে শুনেছিল। তাঁর কথা আমাদের কানের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল সেইসব উপাদানের জন্য যা দিয়ে ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন।

    তিনি কথা বলেছিলেন সমুদ্রের সঙ্গে, যে আমাদের বিশাল মাতা এবং যে আমাদেরকে জন্ম দিয়েছিল। তিনি কথা বলেছিলেন পাহাড়ের সঙ্গে, যে আমাদের বড়ভাই, যার চূড়া হচ্ছে একটা প্রতিশ্রুতি।

    তিনি সমুদ্র ও পাহাড়ের ওপর দিয়ে কথা বলেছিলেন দেবদূতদের সঙ্গে যার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল আমাদের স্বপ্নগুলি, অবশ্য যে কাদা আমাদের ভেতরে আছে তা সূর্যালোকে শুকিয়ে যাওয়ার আগেই।

    এখনও পর্যন্ত তাঁর বাণী সুখনিদ্রার ভেতরে রয়েছে আমাদের বক্ষে অর্ধেক ভুলে যাওয়া প্রেমসংগীতের মতো এবং কখনও কখনও তা নিজেকেই নিজে পুড়িয়ে ফেলে স্মৃতির মাধ্যমে।

    তাঁর বাণী ছিল সহজবোধ্য ও আনন্দদায়ক এবং তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল খরায় পুড়ে যাওয়া শস্যক্ষেতে ঠাণ্ডা পানির মতো।

    একবার তিনি তাঁর হাত তুলেছিলেন আকাশের দিকে এবং তাঁর আঙুলগুলিকে মনে হচ্ছিল চিনার গাছের শাখার মতো এবং তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন :

    ‘অতীতে নবীরা তোমাদেরকে অনেক কথা বলেছেন এবং তোমাদের কান তাদের কথায় পরিপূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলছি তোমাদের কান খালি করে ফ্যালো যা যা শুনেছিলে সেইসব থেকে।’

    যিশুর এই কথাগুলি ‘কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলি’, আমাদের পৃথিবী অথবা আমাদের প্রজাতির কোনো মানুষের দ্বারা উচ্চারিত হয়নি; বরং তা উচ্চারিত হয়েছে দেবদূততুল্য একজন নিমন্ত্রণকারীর দ্বারা, যে কুচকাওয়াজ করতে করতে দেয়ার আকাশ অতিক্রম করছে।

    যদিও বারবার তিনি উদ্ধৃতি দেবেন আইন ও নবীদের এবং তারপর তিনি বলবেন ‘কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলি।’

    আহ, কীরকম জ্বলন্ত একটি বাণী, সমুদ্রের কী ভয়াবহ ঢেউ যা আমার মনের তীরভূমির কাছে অচেনা, কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলছি।

    কোন্ সেই নক্ষত্রগুলি আত্মার অন্ধকার অনুসন্ধান করে এবং কোন্ নিদ্রাহীন আত্মা অপেক্ষা করছে ভোরবেলার?

    যিশুর বাণী সম্পর্কে বলার অর্থ হল, কারও কারও এটা খুবই প্রয়োজন হতে পারে অথবা প্রয়োজন হতে পারে এর প্রতিধ্বনির।

    আমার কাছে কোনো বাণীও নেই, কোনো প্রতিধ্বনিও নেই।

    আমি সেই গল্প শুরু করার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, যা আমি শেষ করতে পারি না, কিন্তু এখনও এর সমাপ্তিটা আমার ওষ্ঠের ওপর নয়। এটা এখনও বাতাসে একটা প্রেমসংগীত।

    গাদারিনিজ এর নামান, স্টিফেনের বন্ধু : স্টিফেনের মৃত্যু সম্পর্কে

    তাঁর শিষ্যরা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। তিনি নিজে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার আগেই তাদেরকে যন্ত্রণার উত্তররাধিকার দান করেছিলেন। তাঁর শিষ্যদেরকে শিকার করা হত হরিণের মতো, শস্যক্ষেতে শেয়ালের মতো, শিকারির শিহরণের মতো যদিও তাদের তীর ছিল পরিপূর্ণ।

    কিন্তু যখন তাদেরকে ধরে ফেলা হল এবং নেতৃত্ব দেওয়া হল মৃত্যুর দিকে, তখন উল্লাসিত হয়ে উঠল তারা এবং তাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিয়ের ভোজ উৎসবে উপস্থিত বরের মুখমণ্ডলের মতো। কারণ, তিনি তাদেরকে উল্লাসের উত্তরাধিকারও দান করেছিলেন।

    উত্তরদেশ থেকে আসা আমার একজন বন্ধু ছিল, তার নাম স্টিফেন এবং সে যিশুকে ঈশ্বরের পুত্র বলে ঘোষণা করেছিল। তাকে বাজার এলাকায় নিয়ে পাথর ছুড়ে মারা হয়।

    যখন স্টিফেন মাটিতে পতিত হয় তখন সে তার দুই বাহু প্রসারিত করেছিল যেন সে তার প্রভুর মতো মারা যাবে এবং সেভাবেই মারা গিয়েছিল। তার বাহুগুলি প্রসারিত হয়েছিল ওড়ার জন্য প্রস্তুত দুটো পাখার মতো এবং যখন তাঁর চোখের শেষ দীপ্তিটুকুও বিবর্ণ হয়ে আসছিল, তখন আমি নিজের চোখে দেখলাম তাঁর ঠোঁটের ওপর একটুকরো হাসি। এই হাসি ছিল শীতের আগের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো, যা হচ্ছে শীতের প্রতিশ্রুতি এবং বসন্তের অঙ্গীকার।

    কীভাবে আমি এটা বর্ণনা করব?

    মনে হয় যেন স্টিফেন বলছে, ‘যদি এরকম হয় যে আমার মারা যাওয়া উচিত তাহলে অন্য লোকদের উচিত আমাকে নেতৃত্ব দেওয়া বাজারের দিকে যেতে, এমনকি যখন আমি মৃত্যুর জন্য তার নাম উচ্চারণ করব, যে সত্যের ভেতরে তিনি ছিলেন এবং সেই একই সত্যের কারণে যা এখন আমার ভেতরে।’

    আমি বুঝতে পারলাম কাছাকাছি একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং আনন্দের সঙ্গে তাকিয়ে দেখছে স্টিফেনের প্রতি পাথর ছোড়া।

    তার নাম হচ্ছে সাউল। সে টারসাসের লোক এবং তার জন্যই স্টিফেন যাজক, রোমান ও জনতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল তার প্রতি পাথর মারার জন্য।

    মাথা কামানো সাউল দেখতে ছিল বেঁটে। তার কাঁধ ছিল বাঁকা, স্বাস্থ্য খারাপ এবং আমি তাকে পছন্দ করি না।

    আমাকে বলা হয়েছিল সে এখন বাড়ির ছাদ থেকে যিশুর কথা প্রচার করছে। এটা বিশ্বাস করা খুবই কষ্টকর।

    কিন্তু কবর যিশুর চলাচল থামাতে পারে না, বিশেষ করে শত্রু শিবিরের দিকে, তাদেরকে পোষ মানাতে এবং বন্দি করতে যারা তাকে অস্বীকার করেছিল।

    এখনও আমি টারসাসের ঐ লোককে পছন্দ করি না যদিও আমাকে বলা হয়েছিল স্টিফেনের মৃত্যুর পর সে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল এবং দামেস্কের পথের ওপর পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তার মাথা ছিল খুবই বড় তার হৃদয়ের জন্য একজন প্রকৃত শিষ্যে পরিণত হতে।

    সম্ভবত আমি ভুল করেছিলাম। প্রায়ই আমি ভুল করে থাকি।

    টমাস : পূর্বপুরুষ সম্পর্কে তার সন্দেহ

    আমার আইনজীবী পিতামহ একবার বলেছিলেন, ‘চলো আমরা সত্যকে পর্যবেক্ষণ করি কিন্তু শুধুমাত্র তা তখনই, যখন সত্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’

    যখন যিশু আমাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তখন আমি তার আহ্বানের প্রতি মনোযোগী হয়েছিলাম কারণ তাঁর আদেশ ছিল আমার ইচ্ছায় চেয়ে অধিক শক্তিশালী, যদিও আমি নিজের প্রতি পরামর্শ অব্যাহত রেখেছিলাম।

    যখন তিনি কথা বলেছিলেন অন্যেরা তখন বাতাসে গাছের শাখার মতো দুলছিল। আমি তাঁর কথা শুনেছিলাম নিশ্চল অবস্থায়। যদিও আমি তাঁকে ভালোবাসতাম।

    তিন বছর হল তিনি আমাদের পরিত্যাগ করে গেছেন, তাঁর নামে প্রশংসাসংগীত গাইতে থাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংঘগুলো এবং তাঁর সাক্ষ্য-প্রমাণ জাতির সাক্ষ্য-প্রমাণে পরিণত হয়।

    সেই সময় আমি সন্দেহকারী টমাসকে ডাকলাম। আমার পিতামহের ছায়া তখনও ছিল আমার ওপর এবং সবসময়ই আমি ছিলাম সুস্পষ্ট সত্যের ভেতরে।

    এমনকি আমি আমার হাত রাখব নিজস্ব ক্ষতের ওপর রক্তকে অনুভব করতে, তার আগেই আমি অবশ্য আমার ব্যথা অনুভব করব।

    এমন একটি মানুষ যে হৃদয় থেকে ভালোবাসে সেও মনে সন্দেহ পুষে রাখে, কিন্তু দাঁড়টানা কয়েদিদের ভেতরে একজন দাস যে তার দাঁড়ের ওপর ঘুমায় এবং স্বপ্ন দেখে তার স্বাধীনতার যদিও তার প্রভুর চাবুক তাকে জাগিয়ে তোলে বারবার।

    আমি নিজে ছিলাম সেই দাস এবং আমি স্বপ্ন দেখতাম মুক্তির কিন্তু আমার পিতামহের ঘুম শুয়ে পড়েছিল আমার ওপর। আমার মাংস চাবুক খেতে চেয়েছিল আমার নিজস্ব দিনগুলিতে।

    এমনকি নাজারেতবাসীদের উপস্থিতিতে আমি আমার চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম যেন দাঁড়ের সঙ্গে শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা আমার হাত দুটো দেখতে না হয়।

    সন্দেহ হল একটা যন্ত্রণা যা জানার ক্ষেত্রে খুবই একাকী এবং বিশ্বাস হল তার জমজ ভাই।

    সন্দেহ হচ্ছে একটি সুখহীনতা এবং বর্জ্যপদার্থ, যদিও তার নিজের মা-ই তাকে জন্ম দিয়েছিল কিন্তু তাকে অনুসন্ধান ও আলিঙ্গন করা উচিত, কারণ সতর্কতা ও ভয় থেকে নিজেকে সে তুলে নেবে।

    কারণ সন্দেহ সত্যকে চিনবে না যতক্ষণ তার নিজের ক্ষতকে সারিয়ে তোলা ও পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে না আনা হয়।

    আমার সন্দেহ হয় যিশু যতক্ষণ নিজেকে সুস্পষ্টরূপে আমার কাছে প্রকাশ না করেন ততক্ষণ তাঁর প্রতিটি ক্ষতে আমার নিজের হাতকেও বিশ্বাস করেননি।

    তারপর আমি তাকে বিশ্বাস করলাম এবং গতকালের কাছ থেকে অব্যাহতি নিলাম এবং গতকাল ছিল আমার পূর্বপুরুষ।

    মৃত্যু আমার ভেতরে তার মৃতদেরকে সমাহিত করছিল এবং জীবন্তরা বেঁচে থাকবে তেল-লেপনকারী রাজার জন্য, এমনকি তার জন্য যে ছিল মানুষের পুত্র।

    গতকাল তারা আমাকে বলল, আমাকে অবশ্যই পারসীয় ও হিন্দুদের ভেতরে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে হবে।

    আমি যাব এবং আজকের দিন থেকে আমার শেষদিন পর্যন্ত সকালে ও সন্ধ্যায় আমি দেখব আমার ঈশ্বর রাজকীয় ক্ষমতার ভেতরে উদিত হচ্ছেন এবং আমি তাঁর কথা শুনব।

    যুক্তিবিদ এলমাদাম : গৃহহীন ও নির্বান্ধব যিশু

    তোমারা আমাকে নাজারেতবাসী যিশু সম্পর্কে বলতে আহ্বান জানাও এবং আমার অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু এখনও সময় হয় নাই। যদিও তাঁর সম্পর্কে যা-ই বলো না কেন তা সত্য, কারণ সমস্ত বক্তব্যই অর্থহীন হয়ে পড়ে, যখন তা সত্য প্রকাশ করে।

    লক্ষ্য করো একজন মানুষ বেপরোয়া, সমস্ত নিয়মের বিরদ্ধে, একজন ভিক্ষুক সমস্ত অধিকার অস্বীকার করে, একজন মাতাল সে শুধুই উল্লসিত হবে দূর্বৃত্ত এবং জাহাজ থেকে ভেসে আসা সমুদ্রযাত্রীর সঙ্গে।

    তিনি রাষ্ট্রের গর্বিত সন্তান ছিলেন না, ছিলেন না সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত নাগরিক, সুতরাং রাষ্ট্র ও সম্রাজ্য দুটোর ব্যাপারেই তিনি ছিলেন পরিতৃপ্ত

    তিনি বেঁচে থাকতেন মুক্ত ও দায়িত্বহীনভাবে, যেভাবে পাখিরা আকাশে উড়ে বেড়ায় এবং এ কারণেই শিকারিরা তাকে তীরের সাহায্যে মাটির কাছে বহন করে এনেছিল।

    ডুবে মারা যাওয়া ছাড়া কেউ তার পূর্বপুরুষদের দরজা উন্মুক্ত করবে না। এটা হচ্ছে আইন এবং নাজারেতবাসী আইন ভেঙেছিল, তিনি এবং তাঁর বিভ্রান্ত অনুসারীরা কিছুই বহন করে আনেননি।

    তাঁর মতো জীবনযাপন অনেকেই করত যেসব মানুষ আমাদের নিয়তির গতিপথ বদলে দেবে।

    তারা নিজেই নিজের পরিবর্তন করেছিল এবং তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

    একটা আঙুরহীন লতা যা শহরের দেয়ালের ফাটলেই বেড়ে ওঠে। এটা হামাগুড়ি দেয় উপরের দিকে এবং সেঁটে থাকে পাথরের সঙ্গে। এই আঙুরলতার কি তাঁর হৃদয় থেকে বলা উচিত ‘আমার পরাক্রমশীলতা ও ওজন দ্বারা আমি এইসব দেয়াল ধ্বংস করে দেব।’ অন্য চারাগাছেরা কী বলে? অবশ্যই, তার বোকামিতে তারা হেসে উঠবে।

    এখন জনাব, আমি হাসতে পারি না কিন্তু তারপরও এই লোক ও তাঁর পীড়িত পরামর্শপ্রাপ্ত শিষ্যদের কথা মনে করে হাসছি।

    মেরিদের ভেতরে একজন : তাঁর বেদনা ও হাসি সম্পর্কে

    তাঁর মাথা ছিল সবসময় উঁচু এবং তাঁর চোখে ছিল ঈশ্বরের অগ্নিশিখা।

    তিনি প্রায়ই বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় থাকতেন, কিন্তু তাঁর বিষাদগ্রস্ততা কোমলতা প্রদর্শন করত তাদের প্রতি, যারা বেদনায় আছে এবং সহমর্মিতা প্রদান করত তাদেরকে, যারা নিসঙ্গ।

    যখন তিনি হাসেন তখন তার হাসি সেইসব ক্ষুধার্তদের হাসিকেই উচ্চকিত করে তোলে, যারা দীর্ঘসময় ধরে তাঁর অচেনা। এটা ছিল নক্ষত্রের ধুলোর মতো যা পতিত হচ্ছে শিশুদের চোখের পাতায় অথবা এটা ছিল কণ্ঠনালীতে ছোট্ট এক টুকরো রুটির মতো।

    তিনি ছিলেন বেদনা-ভারাক্রান্ত, যদিও এটা ছিল এমন এক ধরনের বেদনা যা বেড়ে উঠবে ঠোঁটের ওপর এবং পরিণত হবে হাসিতে।

    এটা ছিল বনভূমিতে সোনালি অবগুণ্ঠনের মতো যখন শরৎ এই পৃথিবীর ওপর অবস্থান করছে এবং মাঝে মাঝে একে মনে হত লেকের তীরভূমির ওপর চন্দ্রালোকের মতো।

    তিনি হেসেছিলেন যেন তাঁর ঠোঁট বিবাহের ভোজ-উৎসবে গান গাইবে।

    যদিও তিনি ছিলেন বেদনার্ত, পাখাযুক্ত বেদনার সঙ্গে, যে বন্ধুদের মাথার ওপর পাখা না নাড়িয়ে ভেসে থাকবে না।

    একজন গ্রিক কবি, রুমানাস : কবি যিশু

    তিনি ছিলেন একজন কবি। তিনি দেখতেন আমাদের জন্য এবং শুনতেনও আমাদের জন্য এবং আমদের নীরব শব্দাবলি ছিল তাঁর ঠোঁটের ওপর এবং তাঁর আঙুল স্পর্শ করত সেইসব যা আমরা অনুভব করতে পারতাম না।

    তাঁর হৃদয়ের বাইরে যেখানে উড়ে বেড়াত গান গাইতে থাকা অসংখ্য পাখিরা, যারা উত্তরে যাচ্ছে এবং যারা দক্ষিণে যাচ্ছে। পাহাড়ের পাশে ফুটে থাকা ছোট ছোট ফুলগুলি অবস্থান করছে তাঁর স্বর্গাভিমুখী পদচিহ্নের ওপর।

    প্রায় সময়ই আমি দেখেছি তাঁকে, বাঁকা হয়ে তিনি স্পর্শ করছেন বৃক্ষপত্র এবং আমার হৃদয়ের ভেতরে আমি শুনেছি তিনি বলছেন, ‘ছোট্ট সবুজ জিনিস, আমার সাম্রাজ্যে তুমি আমার সাথে থাকবে, এমনকি বেসানের ওক ও লেবাননের সিডারের মতো।’

    সমস্ত কিছুর চমৎকারিত্ব তিনি ভালবাসতেন-শিশুদের লাজুক মুখমণ্ডল, ধর্মযুদ্ধের শহীদ এবং দক্ষিণের রজন।

    তিনি ভালোবাসতেন ডালিম অথবা করুণার ভেতরে দানকৃত এককাপ মদ, যা কোনো বিষয় নয় তবে তা পান্থশালায় আসা একজন আগন্তুক অথবা একজন ধনী আমন্ত্রণকারী যে-ই প্রস্তাব দিয়ে থাকুক না কেন।

    তিনি ভালোবাসতেন কাঠবাদামের বক্ষস্থল। আমি দেখেছি তাদেরকে জড়ো করতে তাঁর হাতে এবং ঢেকে ফেলতে তাঁর মুখ পাপড়ি দিয়ে, যেন তিনি ভালোবাসার সঙ্গে পৃথিবীর সব বৃক্ষকে আলিঙ্গন করবেন।

    তিনি সমুদ্র ও স্বর্গকে চিনতেন এবং তিনি কথা বলেছিলেন মুক্তা নিয়ে যার আলো আছে কিন্তু তা তার নিজস্ব আলো নয় এবং তা হল নক্ষত্রের আলো যা আমাদের রাত্রির ওপরে অবস্থিত।

    তিনি পাহাড়কে চিনতেন যেভাবে ঈগল তাদেরকে চেনে, যেভাবে তারা চেনে উপত্যকা, ছোট নদী ও তার স্রোতোধারা। তাঁর নীরবতার ভেতরে ছিল একটা মরুভূমি এবং তাঁর বক্তব্যের ভেতরে ছিল একটা বাগান।

    হ্যাঁ, তিনি ছিলেন একজন কবি যার হৃদয় বসবাস করত উচ্চতারও ওপরের কুঞ্জবনে এবং যদিও তার গান গাওয়া হত আমাদের ও অন্যদের কানের জন্য এবং অন্য ভূমির মানুষের জন্য যেখানে জীবন হচ্ছে চিরযৌবনের জন্য এবং সময় হচ্ছে চিরকালীন ভোরবেলা।

    একসময় আমিও নিজেকে কবি মনে করেছিলাম। কিন্তু বেথানিতে আমি যখন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ালাম, আমি জানতাম কি সেই যন্ত্রকে ধরে রাখে, কিন্তু একটি মাত্র তার একজনের সামনে যে সমস্ত যন্ত্রকে আদেশ দেয়। কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রের উচ্চহাসি, বৃষ্টির কান্না এবং বাতাসে বৃক্ষদের উল্লসিত নৃত্য।

    যখন আমি জেনেছি যে, আমার বাদ্যযন্ত্রের একটাই তার আছে যাকে আমার কণ্ঠস্বর গতকালের স্মৃতির ভেতরে বয়ন করে না, বয়ন করে না আগামীকালের আকাঙ্ক্ষার ভেতরে। আমি আমার বাদ্যযন্ত্র একপাশে রেখে দিয়েছি এবং আমি নীরব হয়ে থাকব। কিন্তু সবসময় গোধূলিবেলায় আমি তা শুনব এবং আমি শুনব সেই কবির কথা যে সব কবিদের মধ্যে উৎকৃষ্ট।

    লেভি, একজন শিষ্য : তাদের সম্পর্কে, যারা যিশুকে বিভ্রান্ত করবে

    এক সন্ধ্যায় তিনি আমার বাড়ি অতিক্রম করে গেলেন এবং আমার আত্মা আমার ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল।

    তিনি আমাকে বললেন, ‘এসো লেভি এবং আমাকে অনুসরণ করো।’

    সেদিন আমি তাঁকে অনুসরণ করেছিলাম।

    পরদিন সন্ধ্যায় আমি তাঁর কাছে ভিক্ষা চাইলাম যেন তিনি আমার বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং আমার অতিথি হন। তিনি এবং তার বন্ধুরা আমার মাড়াইখানা অতিক্রম করে যান এবং আমাকে, আমার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আশীর্বাদ করেন।

    আমার বাড়িতে তখন অন্যান্য অতিথিরাও ছিলেন। তারা ছিলেন পানশালার মালিক এবং জ্ঞানী লোক কিন্তু তারা মনের দিক থেকে তাঁর বিরোধিতা করতেন। যখন আমরা টেবিলে একত্রে বসলাম এক অতিথি যিশুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কি সত্য যে আপনি এবং আপনার শিষ্যরা আইন ভেঙেছেন এবং বিশ্রাম দিবসে আগুন জ্বালিয়েছেন?’

    যিশু উত্তরে বললেন, ‘বস্তুতপক্ষে বিশ্রাম দিবসে আমরা আলো জ্বেলে থাকি। আমরা প্রজ্বলিত করব বিশ্রাম দিবসকে এবং আমাদের স্পর্শে পুড়িয়ে ফেলব সমস্ত দিনের ফসলের অবশিষ্টাংশ যা ফসল কেটে নেবার পর ক্ষেতে পড়ে থাকে।

    অন্য এক অতিথি বলল, ‘আমাদের কাছে এ খরবও এসেছে আপনি পান্থশালায় অশুচি লোকদের সঙ্গেও মদ্যপান করেন।’

    যিশু জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, এটাও আমরা করি স্বস্তি পাবার জন্য। আমরা এখানে এসেছিলাম রুটি ও মদ তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে, তোমাদের ভেতরে যাদের মাথায় কোনো মুকুট নেই এবং জুতো নেই যাদের পায়ে।

    ‘কয়েকজন, হ্যাঁ, কয়েকজন মাত্র পালকহীন, যারা সাহসী হয়ে ওঠে, আবার অনেকেই যথাযথভাবে পাখাযুক্ত, যদিও তারা থাকে বাসায়

    ‘এবং আমরা আমাদের ঠোঁট দিয়ে তাদের সবাইকে আহার জোগাব-নিষ্ক্রিয় এবং দ্রুত উভয়কেই।’

    অন্য এক অতিথি বলল, ‘আমি শুনেছি যে আপনি জেরুজালেমের বেশ্যাদের রক্ষা করবেন।’

    তখন যিশুর মুখমণ্ডলে আমি দেখলাম লেবাননের সর্বোচ্চ পাহাড়ের উচ্চতা নেমে এসেছিল এবং তিনি বললেন, ‘এটা সত্য।’

    ‘হিসাব নিকাশের দিনে এসব নারী আমার পিতার সিংহাসনের সামনে উত্থিত হবে এবং নিজের অশ্রুজলে তারা নিজেকে শুদ্ধ করে তুলবে। কিন্তু তোমারা নির্যাতিত হবে তোমাদের নিজের বিচারের শৃঙ্খল দ্বারা।

    ‘ব্যাবিলন তার বেশ্যাদের দ্বারা বর্জ্যে নিক্ষিপ্ত হবে না, ব্যাবিলন পতিত হবে ছাইয়ের গাদায় যেন তার প্রতারকদের চোখ দিনের আলো না দেখতে পারে।’

    অন্য এক অতিথি জানতে চাইলেন, কিন্তু আমি তাদেরকে ইঙ্গিত করলাম নীরব থাকতে কারণ আমি জানতাম তিনি তাদেরকে বিভ্রান্ত করবেন এবং তারাও ছিল আমার অতিথি এবং তাদেরকে আমার লজ্জা দেওয়া উচিত নয়।

    মধ্যরাতে অতিথিরা চলে গেলেন এবং তাদের আত্মা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। তারপর আমি আমার চোখ বন্ধ করলাম এবং দেখলাম, যেন এটা একটা দৃশ্য, সাদা পোশাক পরা সাতজন নারী যিশুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের অস্ত্রগুলি রয়েছে আড়াআড়িভাবে বুকের ওপর এবং মাথা নিচের দিকে বাঁকানো এবং আমি আমার স্বপ্নে ধোঁয়াশার ভেতর দিয়ে তাকালাম এবং লক্ষ্য করলাম সাতজন নারীর ভেতরে একজনের মুখমণ্ডল এবং তা জ্বলজ্বল করছিল আমার অন্ধকারে।

    এটা ছিল একজন বেশ্যার মুখমণ্ডল যে জেরুজালেমে বসবাস করে।

    তারপর আমি আমার চোখ খুললাম এবং তাঁর দিকে তাকালাম এবং তিনি হাসছিলেন আমার দিকে তাকিয়ে এবং অন্যেরা তখনও টেবিল পরিত্যাগ করে নাই।

    আমি আবার আমার চোখ বন্ধ করলাম এবং আলোতে দেখতে পেলাম সাতজন পুরুষ সাদা পোশাক পরে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাদের একজনের মুখ লক্ষ্য করলাম।

    এটা ছিল সেই চোরের মুখ যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল তাঁর ডান হাতের ওপর

    তারপর যিশু ও তার বন্ধুরা আমার বাড়ি পরিত্যাগ করলেন।

    গালীলের এক বিধবা : নিষ্ঠুর যিশু

    আমার পুত্র ছিল আমার প্রথম ও একমাত্র সন্তান। সে শস্যক্ষেত শ্রম দিত এবং ততদিন পর্যন্ত সে সুখী ছিল যতদিন সে জনতার উদ্দেশে যিশু নামের লোকটির দেওয়া বক্তব্য শোনেনি।

    হঠাৎ করেই আমার পুত্র একেবারে অন্যরকম হয়ে গেল, যেন একটা নতুন উদ্যম লক্ষ্য করা গেল তার ভেতরে, বহিরাগত এবং প্রাণহীন, যা তার আত্মাকে আলিঙ্গন করেছিল।

    সে মাঠ ও বাগান পরিত্যাগ করেছিল এবং পরিত্যাগ করেছিল আমাকেও। সে মূল্যহীন রাস্তার প্রাণীতে পরিণত হয়েছিল।

    এই নাজারেতবাসী যিশু ছিলেন খুবই খারাপ লোক, কারণ একজন ভালো মানুষ কীভাবে একজন পুত্রকে তার মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে।

    আমার পুত্র আমাকে বলেছিল : ‘আমি তাঁর একজন শিষ্যের সঙ্গে উত্তরের দেশে যাচ্ছি। তুমি আমাকে জন্ম দিয়েছে এবং সেজন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাকে অবশ্যই যেতে হবে এবং আমি তোমাকে সঙ্গে নিচ্ছি না। নিচ্ছি না সোনা, রুপা ও আমাদের উর্বর জমিগুলি। আমি শুধু একটা পোশাক ও এই লাঠিটা সঙ্গে নেব।’

    এসব বলে আমার পুত্র আমাকে পরিত্যাগ করে গেল।

    এখন রোমান ও যাজকরা যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করেছে এবং তারা কাজটা ভালো করেছে।

    যে লোক মাতা ও পুত্রকে আলাদা করে ফেলে সে কখনও ধার্মিক হতে পারে না!

    যে লোক আমাদের সন্তানকে শহরে পাঠায়, যে শহর ইহুদিদের নয়, সে আমাদের বন্ধু হতে পারে না।

    আমি জানি আমার ছেলে আমার কাছে ফিরে আসবে না। তার চোখ দেখেই আমি তা বুঝতে পেরেছিলাম এবং সেজন্য আমি নাজারেতের যিশুকে ঘৃণা করি যার কারণে আমি এই অকর্ষিত শস্যক্ষেত এবং এই বিবর্ণ বাগানে একা হয়ে গেছি।

    আমি তাদের প্রত্যেককে ঘৃণা করি যারা তাঁর প্রশংসা করে।

    খুব বেশিদিন আগে নয় তারা আমাকে বলেছিল যে যিশু একবার বলেন, ‘আমার বাবা, মা ও ভাই হল তারাই যারা আমার কথা শোনে এবং আমাকে অনুসরণ করে।’

    তাহলে কোনো একজন পুত্রের কি উচিত তার মাতাকে পরিত্যাগ করে তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করা?

    কেন আমার বুকের দুধের উচিত নিজেকে ভুলে যাওয়া একটা ঝর্নার জন্য, এখনও যার স্বাদ গ্রহণ করা হয়নি এবং আমার বাহুর উষ্ণতা পরিত্যক্ত হয়েছে উত্তরভূমির জন্য যা ঠাণ্ডা এবং অবন্ধুসুলভ।

    হ্যাঁ, নাজারেতবাসীদের ঘৃণা করি এবং আমি ঘৃণা করব তাঁকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কারণ সে আমার প্রথম সন্তানকে আমার কাছ থেকে অপহরণ করেছে যে আমার একমাত্র সন্তান।

    যিশুর খালাতো ভাই জুডাস : ব্যাপ্টিস্ট জন-এর মৃত্যু

    আগস্ট মাসের একরাত্রে আমরা প্রভুর সঙ্গে গুল্মাবৃত এক পতিত জমিতে ছিলাম, যা জলাভূমি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এই পতিত জমিকে প্রাচীনকালের মানুষেরা বলত খুলির চারণভূমি।

    যিশু ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েছিলেন এবং স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন নক্ষত্রদের দিকে।

    এমন সময় হঠাৎ করেই দুজন লোককে দেখলাম রুদ্ধশ্বাসে তাড়াহুড়া করে আমাদের দিকে আসছে। তারা ছিল মর্মবেদনায় পীড়িত এবং তারা গভীর শ্রদ্ধায় যিশুর পায়ের ওপর পতিত হল।

    যিশু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কোথা থেকে আসছ তোমরা?’

    একজন জবাব দিল, ‘ম্যাকায়েবেয়াস থেকে।

    যিশু এবার উত্তরদাতার দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জনের কী হয়েছে?’

    লোকটি বলল, ‘এই দিনে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তাকে তার সেলের মধ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়।’

    তারপর যিশু মাথা তুললেন এবং হেঁটে আমাদের একটু সামনে এগিয়ে গেলেন। আবার কিছুক্ষণ পর আমাদের মাঝখানে দাঁড়ালেন।

    তিনি বললেন, ‘এই দিনের আগেই রাজা একজন নবীকে হত্যা করতে পারত। বস্তুতই রাজা তার বিষয়ে আনন্দ পেতে চেষ্টা করেছেন। প্রাচীনকালের রাজারা মস্তক শিকারিকে একজন নবীর মাথা প্রদান করার ব্যাপারে মোটেও ধীরগতিসম্পন্ন ছিলেন না।

    ‘জনের জন্য তত কষ্ট হয়নি, বরং কষ্ট হয়েছিল হেরোডের জন্য যে অস্ত্র ফেলে দিয়েছিল এবং তোমরা কী করতে পারো স্থির সমুদ্রে মৃত মাছ ধরা ছাড়া।’

    ‘আমি তোমাদের রাজাদের ঘৃণা করি। মানুষকে শাসন করতে দাও তাদের, কিন্তু তা শুধুমাত্র তখনই সম্ভব যখন তারা মানুষের চেয়ে অধিকতর জ্ঞানী।’

    প্রভু দুটি বেদনার্ত মুখের দিকে তাকালেন এবং তারপর তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর তিনি কথা বললেন, ‘জন জন্মেছিল আহত অবস্থায় এবং তার ক্ষতের রক্ত সামনে প্রবাহিত হয়েছিল তার কথার সঙ্গে সঙ্গে। সে ছিল স্বাধীনতা কিন্তু তা থেকে সে মুক্ত ছিল না।

    ‘সত্যের ভেতরে তিনি ছিলেন একটা কণ্ঠস্বর এবং কাঁদছেন বধিরদের ভূমিতে এবং তার একাকিত্ব ও বেদনার ভেতরে আমি তাকে ভালোবাসতাম।

    ‘এবং আমি ভালোবাসতাম তার অহঙ্কার, যা তার মাথাকে ধুলায় লুটিয়ে দেওয়া আগেই শুইয়ে দেবে তরবারির নিচে।

    ‘বস্তুতপক্ষে আমি তোমাদেরকে বলি জাকারিয়ার পুত্র জন, তার বংশের শেষ মানুষ এবং তার পূর্বপুরুষের মতোই যাকে হত্যা করা হয়েছিল মন্দির ও বেদির মাড়াইখানার মাঝখানে।’

    এবং আবার যিশু হেঁটে আমাদের কাছ থেকে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

    তারপর তিনি ফিরে এলেন এবং বললেন, ‘চিরকালের জন্য এটা ছিল তারাই যারা এক ঘণ্টার জন্য শাসন করবে এবং হত্যা করবে বছরগুলির শাসকদেরকে। চিরকালের জন্য তারা একটা বিচার কাজকে স্থগিত করে রাখল এবং নিন্দাবাদ উচ্চারণ করল সেই মানুষটির উদ্দেশে যে এখনও জন্মায়নি এবং সে অপরাধ করার আগেই তার মৃত্যুর আদেশ এসেছিল।

    জাকারিয়ার পুত্র আমার সাম্রাজ্যে আমার সঙ্গে বেঁচে থাকবে এবং তার দিন হবে আরও দীর্ঘ।

    তারপর তিনি জনের শিষ্যদের কাছে এলেন এবং বললেন, ‘প্রত্যেক কর্মকাণ্ডেরই আগামীকাল আছে। সম্ভবত আমি হলাম এই কর্মকাণ্ডের আগামীকাল। ফিরে যাও আমার বন্ধুর বন্ধুরা এবং তাদেরকে বোলো আমি তাদের সঙ্গে থাকব।’

    তারপর দুটো লোক আমাদেরকে পরিত্যাগ করে চলে গেল এবং মনে হল তারা তাদের ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কষ্ট কিছুটা লাঘব করেছিল।

    তারপর যিশু আবার ঘাসের ওপর শুয়ে দুবাহু প্রসারিত করলেন এবং পুনরায় স্থিরদৃষ্টিতে তাকালেন নক্ষত্রের দিকে।

    যাহোক, আমি তাঁর কাছ থেকে একটু দূরে শুয়ে পড়লাম এবং বিশ্রাম নিতে নিতে আমি মূর্ছিত হয়ে পড়ব, কিন্তু সেখানে একটা হাত ছিল যে আমার ঘুমের দরজায় আঘাত করছে এবং আমি জেগে শুয়ে থাকলাম যতক্ষণ যিশু এবং ভোরবেলা আমাকে ডেকে রাস্তায় নামিয়ে না আনল।

    মরুভূমি থেকে আসা লোকটি : মুদ্রা-বিনিময়কারী

    জেরুজালেমে আমি ছিলাম আগন্তুক। আমি এই পবিত্র শহরে এসেছিলাম বিশাল মন্দির দেখতে এবং বেদিতে উৎসর্গ করতে, কারণ আমার স্ত্রী আমার গোত্রকে দুটো পুত্রসন্তান উপহার দিয়েছিল।

    উৎসর্গ সম্পন্ন হওয়ার পর আমি মন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়ালাম, তাকালাম নিচের দিকে মুদ্রা বিনিময়কারীদের ওপর এবং তারপর তাকালাম তাদের দিকে, যারা ঘুঘু বিক্রি করছিল উৎসর্গ করার জন্য এবং শুনছিলাম আদালতের ভয়াবহ চিৎকার ও চেঁচামেচি।

    আমি দাঁড়িয়ে থাকতেই সেখানে হঠাৎ করে এক লোক এল ঘুঘু বিক্রেতা ও মুদ্রা- বিনিময়কারীদের মাঝখানে।

    তিনি ছিলেন রাজকীয় ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এবং তিনি এসেছিলেন দ্রুততার সঙ্গে।

    তিনি তাঁর হাতে ধরে রেখেছিলেন একটা দড়ি, যা ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি এবং তিনি শুরু করেছিলেন মুদ্রা-বিনিময়কারীদের টেবিল উল্টে দিতে এবং দড়ি দিয়ে পাখিওয়ালাদের মারতে।

    আমি শুনলাম তিনি উঁচুকণ্ঠে বলছেন, ‘পাখিগুলিকে আকাশে উড়িয়ে দাও, যেটা হচ্ছে তাদের বাসা।’

    নারী ও পুরুষেরা তাঁর সামনে থেকে পালিয়ে যায় এবং তিনি এমনভাবে তাদের ভেতরে চলাচল করেন যেভাবে ঘুরপাক খাওয়া বাতাস বেদনার পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলাচল করে।

    এই সবকিছুই আসে চলে যেতে এক মুহূর্তের মধ্যে এবং তারপর মন্দিরের আদালত একেবারে খালি করে দিয়েছিল মুদ্রা বিনিময়কারীরা। শুধুমাত্র লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল একাকী এবং তাঁর অনুসারীরা দাঁড়িয়ে ছিল দূরে।

    তারপর আমি আমার মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম মন্দিরপ্রাঙ্গণে অন্য একজন লোক। আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং বললাম, ‘কে এই লোক যে একা দাঁড়িয়ে আছে, এমনকি যেন সেও একটা মন্দির।’ তিনি বললেন, ‘এই হল নাজারেতের যিশু। একজন নবী, যিনি বেশ একটু দেরিতে গালীল প্রদেশে আবির্ভূত হয়েছেন। এখানে এই জেরুজালেমে সব লোক তাকে ঘৃণা করে।’

    আমি বললাম ‘আমার হৃদয় যথেষ্ট শক্তিশালী তাঁর চাবুক সহ্য করার জন্য এবং তাঁর পদযুগে পরিণত হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতেও আমি রাজি আছি।’

    তারপর যিশু তার অনুসারীদের দিকে ফিরলেন, যারা তার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তাদের কাছে পৌঁছানোর আগে তিনটি ঘুঘু ফিরে এল এবং একটা বসল তাঁর বাম কাঁধের ওপর এবং অন্য দুটো বসল তার পায়ের পাতার ওপর। তিনি প্রতিটি ঘুঘুকে কোমলভাবে স্পর্শ করলেন এবং তারপর হাঁটতে শুরু করলেন।

    এখন আমাকে বলো, কোন্ সেই ক্ষমতা তাঁর ছিল হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে আক্রমণ ও ছত্রভঙ্গ করার কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। আমাকে বলা হয়েছিল তারা তাঁকে ঘৃণা করে, কেউ তার মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। সে কি ঘৃণার লম্বা তীক্ষ্ণ দাঁত তুলে নেবে যা তাঁর মন্দিরের আদালতের পথের ওপর পুঁতে রাখা হয়েছিল?

    পিটার : তাঁর অনুসারীদের আগামীকাল

    সূর্য অস্ত যাবার সময় একদিন যিশু আমাদেরকে নেতৃত্ব দিলেন বেইথসাইডা গ্রামের দিকে। আমরা ছিলাম ক্লান্ত এবং রাস্তার ধুলো ছিল আমাদের শরীর জুড়ে। আমরা বাগানের মাঝখানে একটা বিশাল বাড়িতে এসেছিলাম এবং বাড়ির মালিক দাঁড়িয়েছিলেন দরোজায়।

    যিশু তাকে বললেন, ‘এই লোকগুলি ক্লান্ত এবং তাদের পাও আহত হয়েছে। তাদেরকে আপনার বাড়িতে ঘুমাতে দিন। রাতটা ঠাণ্ডা এবং তাদের প্রয়োজন উষ্ণতা এবং বিশ্রাম।’

    ধনী লোকটা বলল, ‘তারা আমার বাড়িতে ঘুমাবে না।’

    যিশু বললেন, ‘তাহলে তাদেরকে আপনার বাগানে ঘুমিয়ে কষ্ট করতে দিন।’

    লোকটা উত্তরে বলল, ‘না, তারা আমার বাগানে ঘুমাবে না।’

    তারপর যিশু আমাদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘এটা হচ্ছে তোমার আগামীকাল যা হবে তা-ই এবং এই বর্তমান হচ্ছে তোমার ভবিষ্যতের মতো। সমস্ত দরজা তোমার মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যাবে, এমনকি তা বাগানে নয়, তা শুয়ে থাকে নক্ষত্রের নিচে।

    ‘তোমাদের পায়ের কি উচিত ধৈর্যের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে আমাকে অনুসরণ করা? হতে পারে এটা তোমাদের ইচ্ছা, তাহলে খুঁজে নাও একটা বেসিন ও বিছানা এবং সেইসঙ্গে রুটি ও মদ। কিন্তু যদি এটা হয়, তাহলে ঐসব জিনিসের কিছুই তুমি খুঁজে পাবে না, তবে ভুলে যেও না তোমরা আমার একটা মরুভূমি অতিক্রম করেছ মাত্র।

    ‘এসো, আমরা সামনে যাই।’

    ধনী লোকটা বিরক্ত হয়েছিল। তার মুখের চেহারা বদলে গেল এবং সে বিড়বিড় করে নিজেকে যা বলল তা আমি শুনতে পেলাম না। সে সংকুচিত হয়ে পড়ল এবং প্রবেশ করল বাগানে।

    আমরা রাস্তায় যিশুকে অনুসরণ করেছিলাম।

    ব্যাবিলনের মেলাচি, একজন জ্যোতির্বিদ : যিশুর অলৌকিকতা

    যিশুর অলৌকিকতা সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করেছ।

    প্রতি এক হাজার বছরে সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলি একটি সরলরেখায় চলে আসে এবং তারা এর মুহূর্তের জন্য পরস্পর মিলিত হয় ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করতে।

    তারপর তারা ধীরগতিতে সবদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় এবং অপেক্ষা করে অন্য হাজার বছরের, কখন তারা অতিক্রম করে যাবে।

    ঋতুগুলির ওপরে কোন অলৌকিকতা নেই, যদিও আমি এবং তোমরা সবগুলি ঋতু সম্পর্কে জানি না এবং কি হবে যদি একটা ঋতু মানুষের আকৃতিতে নিজেকে সুস্পষ্ট করে তোলে?

    যিশুর ভেতরে আমাদের শরীরের উপাদান এবং স্বপ্নগুলি একত্রে এসেছিল আইন অনুসারে। তাঁর সামনে সবকিছুই ছিল সময়হীন যা তাঁর ভেতরে হয়েছিল সময়ানুগ।

    তারা বলে তিনি অন্ধদেরকে দৃশ্য দেখিয়েছেন এবং হেঁটেছেন পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সাথে এবং বিতাড়িত করেছেন পাগলদের ভেতর থেকে প্রেতাত্মাদেরকে।

    অন্ধত্ব হচ্ছে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন চিন্তা, যা প্রজ্বলিত চিন্তা দ্বারা অতিক্রম করা যায়। সম্ভবত বিবর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হচ্ছে অলসতা যা শক্তির দ্বারা দ্রুতগতিসম্পন্ন হতে পারে। সম্ভবত খারাপ গুণ, আমাদের জীবনের এই ক্লান্তিহীন উপাদানগুলি তাড়িত হয়েছে শান্তি ও স্বস্তির দেবদূতদের দ্বারা।

    তারা বলে তিনি মৃতদেরকে জীবনে উত্থিত করেন। যদি তোমরা বলতে পারো মৃত্যু কী তাহলে আমি তোমাদেরকে বলব জীবন কী।

    শস্যক্ষেত আমি দেখেছি একটা ওকগাছের বীজ, একটা জিনিস যা খুবই স্থির এবং মনে হয় অর্থহীন। বসন্তে আমি দেখেছি যে ঐ বীজ থেকে শিকড় গজায় এবং বেড়ে ওঠে। এই হল একটা ওকগাছের শুরু, সূর্যের দিকে।

    তোমরা নিশ্চয়ই মনে করবে এটা একটা অলৌকিকতা, যদিও সেই অলৌকিকতা উৎসাহিত হয়েছে হাজার হাজার বার প্রতি শরতের তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও প্রতি বসন্তের তীব্র আবেগের ভেতরে।

    কেন এটা উৎসাহিত হবে না মানুষের হৃদয়ে? ঋতুগুলি কি সাক্ষাৎ করবে না একজন মানুষের হাত অথবা ঠোঁটের ওপর?

    যদি আমাদের ঈশ্বর মাটিকে সৌন্দর্য প্রকাশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে থাকেন এবং সেই ক্ষমতা দিয়ে সে জড়িয়ে ধরে বীজগুলিকে যখন তা মৃতপ্রায় মনে হয়, তাহলে কেন ঈশ্বর মানুষের হৃদয়কে সেই ক্ষমতা দেবেন না যার সাহায্যে একটি হৃদয় অন্য হৃদয় থেকে জীবনের শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারবে?

    যেসব অলৌকিকতা সম্পর্কে কথা বলেছি সেগুলি আমার ধারণা, কিন্তু বিশাল অলৌকিকত্বের পাশাপাশি তা কিছুই নয়। মানুষ নিজেই হচ্ছে একটা অলৌকিকত্ব, একজন পথিক, একজন মানুষ যে আমার ধাতুর অপরিশোধিত বর্জ্যকে সোনায় পরিণত করে, যে আমাকে শিক্ষা দেয় কীভাবে তাদেরকে ভালোবাসতে হবে যারা আমাকে ঘৃণা করে এবং তা আমাকে স্বস্তি এনে দেয় এবং আমার ঘুমকে ডুবিয়ে দেয় মধুর স্বপ্নে।

    এটা হল আমার নিজের জীবনের অলৌকিকতা।

    আমার আত্মা অন্ধ এবং পঙ্গু ছিল। ক্লান্তিহীন উদ্যম আমাকে দখল করে রেখেছিল এবং আমি ছিলাম মৃত।

    কিন্তু এখন আমি পরিষ্কার দেখতে পাই এবং আমি সোজা হয়ে হাঁটি। আমি শান্তিতে আছি এবং আমি বেঁচে থাকি দিনের প্রতিটি ঘণ্টায় নিজের অস্তিত্বকে ঘোষণা করতে এবং তার সাক্ষ্য দিতে।

    আমি তাঁর অনুসারীদের একজন নই। আমি একজন বৃদ্ধ জ্যোতির্বিদ যে এক ঋতুতে একবার মহাশূন্যের শস্যক্ষেত পরিদর্শন করে এবং কে আইনের প্রতি মনোযোগী হবে এবং অলৌকিকতার প্রতি?

    আমি আছি আমার সময়ের গোধূলিবেলায় কিন্তু যখন আমি তার ভোরবেলা অনুসন্ধান করব তখন মূলত আমি অনুসন্ধান করব যিশুর যৌবন।

    চিরকালের জন্য সময় অনুসন্ধান করে যৌবন। আমার ভেতরে এখন এটাই হল জ্ঞান যা দৃশ্য অনুসন্ধান করে।

    একজন দার্শনিক : বিস্ময় ও সৌন্দর্য সম্পর্কে

    তিনি যখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন তখন তিনি আমাদের ও আমাদের পৃথিবীর দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন, কারণ তার চোখে কোনো অবগুণ্ঠন ছিল না এবং তিনি তাঁর যৌবনের আলোতে ছিলেন স্বচ্ছ।

    তিনি জানতেন সৌন্দর্যের গভীরতা, তিনি চিরকাল বিস্মিত ছিলেন শান্তি ও রাজকীয় ক্ষমতার দ্বারা এবং তিনি দাঁড়িয়েছিলেন প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর মুখোমুখি এবং দাঁড়িয়েছিলেন প্রথম দিনের মুখোমুখি।

    আমরা যারা নির্বোধে পরিণত হয়েছি তারা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি প্রকাশ্যে দিনের আলোয়, যদিও আমরা কিছুই দেখিনি। আমরা কান উন্মুক্ত রাখছি কিন্তু কিছুই শুনতে পাইনি এবং আমরা দুহাত সামানে বাড়িয়েছি কিন্তু স্পর্শ করিনি কিছুই, যদিও আরবের সমস্ত ধূপ পুড়ে গেছে এবং আমরা গন্ধ না শুঁকে যে যার পথে চলে যাব।

    আমরা দেখি না সন্ধ্যাবেলায় কৃষকেরা শস্যক্ষেত থেকে ফিরে আসছে, শুনতে পাই না মেষপালকের বাঁশি যখন সে তার পশুর পালকে খোঁয়াড়ের দিকে নেতৃত্ব দেয়, বাড়াই না আমাদের হাত স্পর্শ করতে সূর্যাস্ত এবং গোলাপফুলের সুগন্ধের জন্য ক্ষুধার্ত হয় না আমাদের নাসারন্ধ্র।

    না, আমরা কোনো সম্রাজ্যহীন রাজাকে সম্মান করি না, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ছাড়া অন্যকিছু শুনিনা যখন তারগুলি কেউ ছিঁড়ে নেয়, দেখি না একটা শিশু খেলা করছে অলিভ-কুঞ্জে যেন সে একটা বাড়ন্ত অলিভ গাছ এবং সমস্ত শব্দাবলির অবশ্যই প্রয়োজন মাংসের ঠোঁটের ওপর বেড়ে ওঠা অথবা আমরা ধরে নিতে পারি প্রত্যেকেই মূক ও বধির।

    সত্যের ভেতরে আমরা স্থিরদৃষ্টিতে তাকাই কিন্তু কিছুই দেখতে পাই না এবং শোনার নামে আমরা কিছুই শুনি না, আমরা আহার করি এবং পান করি কিন্তু তার স্বাদ গ্রহণ করি না এবং নাজারেতের যিশু ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

    তাঁর অব্যাহত বোধশক্তি জন্ম দিয়েছিল নতুন কিছুর এবং তাঁর কাছে পৃথিবী ছিল সবসময়ই একটা নতুন পৃথিবী।

    তাঁর কাছে একটা শিশুর আধো আধো কথা সমস্ত মানবজাতির কান্নার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেখানে আমাদের কাছে তা কেবলই আধো-আধো কথা।

    তাঁর কাছে একটা মাখনের পাত্রের শিকড় ছিল ঈশ্বরের প্রতি আকুল আকাঙ্ক্ষা, আমাদের কাছে যা কিছুই নয়, কেবলই একটা শিকড়।

    নাজারেতের এক বৃদ্ধ ব্যক্তি, উরিআহ : যিশু ছিলেন আমাদের ভেতরে আগন্তুক

    তিনি ছিলেন আমাদের ভেতরে একজন আগন্তুক এবং তাঁর জীবন লুকানো ছিল অন্ধকার অবগুণ্ঠনে।

    তিনি আমাদের ঈশ্বরের পথে হাঁটতেন না কিন্তু অনুসরণ করতেন জঘন্য ও অখ্যাত মানুষের পথ।

    তাঁর শৈশব বিদ্রোহ করেছিল এবং প্রত্যাখ্যান করেছিল আমাদের প্রকৃতির দুধের মধুরতা।

    তাঁর যৌবন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল ধূসর ঘাসের মতো, যা রাতের অন্ধকারে পুড়ে যায়।

    যখন তিনি মানুষে পরিণত হয়েছিলেন তখন সে অস্ত্র ধরেছিলেন আমাদের সবার বিরুদ্ধে।

    এরকম কিছু মানুষ আছে যারা মনুষ্য প্রজাতির দয়ার ভাটার স্রোতের ভেতরে পড়ে গিয়েছিল এবং জন্মেছে প্রচণ্ড অশুভ ঝড়ের ভেতরে এবং সেই ঝড়ের ভেতরে তাঁরা একদিন বাঁচে এবং চিরকালের জন্য লোপ পায়।

    তোমরা কি তাকে স্মরণ করতে পারনা, যে আমাদের জ্ঞানী বয়স্কদের সঙ্গে তর্ক করত এবং হাসাহাসি করত তাদের মর্যাদা নিয়ে।

    তোমরা কি স্মরণ করতে পারো না তাঁর যৌবনকে যখন সে করাত ও রেঁদা নিয়ে বসবাস করত? তিনি সঙ্গ দেননি আমাদের পুত্র-কন্যাকে তাদের ছুটির দিনগুলিতে। তিনি চলাচল করেছে একা একা।

    তিনি কখনও তাদেরকে কোনো জবাব দিতেন না যারা তাকে শুভেচ্ছা জানাত যেন তিনি আমাদের ওপরের কেউ ছিলেন।

    আমি একবার শস্যক্ষেতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম এবং তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম এবং তিনি শুধুই হেসেছিলেন। তাঁর এই হাসির ভেতরে আমি লক্ষ করেছিলাম ঔদ্ধত্য এবং অপমান করার প্রবণতা।

    পরবর্তীকালে আমার কন্যা আঙুর ক্ষেতে আঙুর জড়ো করার জন্য তার সঙ্গ নিয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে কথাও বলেছিল কিন্তু তিনি কোনো কথার উত্তর দেননি।

    তিনি শুধুমাত্র আঙুর একত্রকারীদের উদ্দেশে কথা বলেছিলেন। এর অর্থ হল আমার কন্যা তাদের ভেতরে ছিল না।

    যখন তিনি তাঁর লোকদের পরিত্যাগ করেন তখন একজন ভবঘুরেতে পরিণত হন, এবং পরিণত হন বাচালে। তীক্ষ্ণ নখের মতো তাঁর কণ্ঠস্বর এবং তাঁর কণ্ঠস্বরের যে শব্দ আমাদের স্মৃতির ভেতরে তা এখনও পর্যন্ত একটা বেদনা।

    তিনি কেবলই খারাপ কথা উচ্চারণ করতেন আমাদের, আমাদের পিতা ও আমাদের পূর্বপুরুষের সম্পর্কে এবং তার জিভ অনুসন্ধান করত আমাদের বক্ষকে একটা বন্দি তীরের মতো।

    যিশু ছিলেন এরকম।

    যদি তিনি আমার সন্তান হতেন তাহলে আমি তাকে রোমানদের হাতে সঁপে দিতাম এবং ক্যাপ্টেনের কাছে প্রার্থনা করতাম তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রথম সারিতে দাঁড় করিয়ে দিতে যেন শত্রুর ভ্রূকুটি তাকে চিহ্নিত করতে পারে এবং আমাকে মুক্তি দিতে পারে তাঁর দাম্ভিকতা থেকে।

    কিন্তু আমার কোনো পুত্র নেই এবং সেজন্য আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। যদি থাকত তাহলে কী হত? সে আমার নিজের লোকদের শত্রুতে পরিণত হত এবং লজ্জায় আমার মাথার চুলগুলো অনুসন্ধান করত রাস্তার ধুলো।

    কবি নিকোডেমাস, সানহেড্রিমে বয়স্কদের ভেতরে সবচেয়ে কম বয়সী : বোকা ও বাজিকরদের সম্পর্কে

    বহু বোকা লোক বলে থাকে যিশু তাঁর নিজের পথে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বিরোধিতা করেছেন নিজের, যা তিনি জানতেন না এবং সেই জ্ঞানের অভাবে তিনি বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।

    বস্তুতপক্ষে অনেক পেঁচাই কোনো গান জানে না তাদের নিজস্ব ডাকাডাকি ছাড়া।

    তোমরা এবং আমি উভয়েই জানি কথার বাজিকরই বিশাল বাজিকর হিসেবে সম্মানিত হয়ে থাকে, মানুষ তাদের মাথা থলেতে করে বাজারে নিয়ে যায় এবং প্রথম ডাকেই তাদেরকে বিক্রি করে দেয়।

    আমরা পিগমিদেরকে জানি যারা আকাশ-মানবদের নির্যাতন করে এবং আমরা আরও জানি ওক ও সিডার বৃক্ষকে বিধবার শোকবাস কী বলে থাকে।

    আমি তাদেরকে করুণা করি যারা সাধারণ উচ্চতা পর্যন্ত বাড়তে পারে না।

    আমি করুণা করি শিহরিত হতে থাকা সিংহাসনকে যা দেবদারুকে হিংসা করছে এবং যা তার নিজস্ব ঋতুতে সাহসী হয়ে ওঠে।

    কিন্তু করুণা, যদিও সব দেবদূতের অনুতাপ তাকে জড়িয়ে ধরে, কিন্তু তাদের জন্য কোনো আলো বহন করতে পারে না।

    আমি কাকতাড়ুয়াকে চিনি, যার নোংরা পোশাক পাখা ঝাপাটায় শস্যক্ষেতে, যদিও সে নিজে শস্যক্ষেত ও গান গাইতে থাকা বাতাসের কাছে মৃত।’

    আমি পাখাহীন মাকড়সাকে চিনি যে একটা জাল বয়ন করে সবার জন্য, যারা ওড়ে।

    আমি চিনি শঠদের, আরও চিনি যারা শিঙায় ফুঁ দিয়ে শব্দ তোলে এবং চিনি ড্রামবাদকদের, যারা নিজের শব্দের অতিপ্রাচুর্যের ভেতরে ভরতপাখির গান শুনতে পারে না, শুনতে পারে না বনভূমিতে পূবের বাতাসের মর্মরধ্বনি।

    আমি তাকে চিনি যে সবগুলি স্রোতের বিরুদ্ধে নৌকা চালায়, কিন্তু কখনও এর উৎস খোঁজে না। সে সমস্ত নদীর সঙ্গে দৌড়ায়, কিন্তু কখনও সমুদ্রে যাবার তার সাহস হয় না।

    আমি তাকে চিনি যে মন্দিরের নির্মাতাদেরকে তাঁর অদক্ষ হাত দান করে এবং যখন সেই অদক্ষ হাত প্রত্যাখ্যাত হয় তখন তা তার হৃদয়ের অন্ধকারে বলে ওঠে, ‘যা নির্মাণ করা হবে তার সবকিছুই আমি ধ্বংস করব।’

    এই সবকিছুই আমি চিনি। তারা হল সেইসব লোক যারা বিরোধিতা করে বলে, একটি নির্দিষ্ট দিনে যিশু বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে শান্তি বহন করে আনব’ এবং অন্যদিকে বলেছিলেন, ‘আমি একটা তরবারি বহন করে আনব;

    সত্যের ভেতরে তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না এবং তিনি বলেছিলেন আমি তাদের প্রতি শান্তি আনব যারা ভালোমানুষ এবং আমি স্থাপন করব তরবারি তার মাঝখানে যে শান্তির কথা বলত এবং যে প্রদর্শন করত তরবারি।’

    তারা বিস্মিত হয় যখন তিনি বলেন, ‘আমার সম্রাজ্য এই পৃথিবীর নয়’ এবং আরও বলেন, ‘সিজারের জন্য সেইসব তুলে ধরো যা সিজারের।’ তারা জানত না যে, যদি তারা বস্তুতপক্ষে আবেগানুভূতির সাম্রাজ্যে প্রবেশের জন্য মুক্ত হতে পারত তাহলে তারা তাদের প্রয়োজনের দ্বাররক্ষককে অবশ্যই প্রতিরোধ করত না। এটা তাদের সঙ্গে যা করা উচিত তা-ই করত আনন্দের সঙ্গে শহরে প্রবেশ করার অংশ হিসেবে।

    সেখানে উপস্থিত লোকেরা বলে, ‘তিনি প্রচার করেছেন কোমলতা, দয়ার্দ্রতা এবং সন্তানোচিত ভালোবাসা, যদিও তিনি তাঁর পিতা ও মাতার কথায় কোনো কর্ণপাত করেননি যখন তারা তাঁকে জেরুজালেমের রাস্তায় সন্ধান করেছিলেন।’

    তারা জানে না, তাঁর মা ও ভাইয়েরা তাদের ভালোবাসার আতঙ্কের ভেতরে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কাঠমিস্ত্রির বেঞ্চির ওপর, যেখানে তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন একটা নতুন দিনের ভোরবেলায়।

    তাঁর মা ও ভাইয়েরা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখত মৃত্যুর ছায়ার ভেতরে কিন্তু তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান জানিয়েছিলেন মৃত্যুকে ওইখানে পাহাড়ের ওপর, যেখানে তিনি আমাদের নিদ্রাহীন স্মৃতির ভেতরে বেঁচে থাকতে পারেন।

    আমি এইসব ছুঁচোদের চিনি যারা কোথাও রাস্তা খোঁড়ে না। এরা কি তাদের একজন নয় যে যিশুকে অভিযুক্ত করে নিজেকে গৌরবান্বিত করার জন্য এবং তিনি জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমি হচ্ছি পথ এবং দরজা পাপমোচনের’ এবং নিজেকে আহ্বান জানিয়েছিলেন জীবন ও পুনরুত্থান বলে।

    কিন্তু যিশু অধিক কিছু দাবি করেননি মে মাসের চেয়ে, যা তার সর্বোচ্চ জোয়ারের ভেতরে দাবি করে থাকে।

    তিনি জ্বলজ্বলে সত্যের কথা বলেননি কারণ তা কি ছিল সত্যিই খুব জ্বলজ্বলে?

    বস্তুতপক্ষে তিনি বলেছিলেন যে, তিনিই হলেন পথ, জীবন এবং হৃদয়ের পুনরুত্থান। সাক্ষ্য হিসেবে আমি নিজে হলাম তাঁর সত্য।

    তুমি কি আমাকে স্মরণ করতে পারো না নিকোডেমাস যে আর কিছুতে বিশ্বাস করতনা আইন ছাড়া এবং সে ছিল অব্যাহত পরাধীনতার ভেতরে তা পর্যবেক্ষণ করতে। এবং এখন আমার দিকে লক্ষ্য করো একটা মানুষ যে জীবনের সঙ্গে হাঁটে এবং সূর্যের সঙ্গে শব্দ করে হেসে ওঠে। সেই প্রথম মুহূর্ত থেকে সে হাসে পাহাড়ের ওপর যতক্ষণ তা নিজে প্রাকৃতিক রীতিতে পাহাড়ের পেছনে উৎপন্ন না হয়।

    তোমরা কেন পাপমোচন শব্দের বিরুদ্ধে থমকে দাঁড়াও? আমি ঈশ্বরের মাধ্যমে আমার পাপমোচনের সুযোগ অর্জন করেছি।

    আগামীকাল আমার কী হবে তা নিয়ে আমি পরোয়া করি না, কারণ আমি জানি যে যিশু আমার ঘুমকে দ্রুততম করবেন এবং আমার দূরবর্তী স্বপ্নগুলিকে পরিণত করবেন আমার সঙ্গী ও সহযাত্রীতে।

    আমি কি একজন ক্ষুদ্র মানুষ নই, কারণ আমি একজন মহৎ মানুষকে বিশ্বাস করি?

    মাংস ও হাড়ের বাধাসমূহ কমে এল যখন গালীলের কবি আমাকে বললেন এবং একটা আত্মা আমাকে ধরে রেখেছিল। আমাকে উঁচু করে তুলে ধরেছিল এবং আমার পাখার মাঝখানের বাতাসে জড়ো করেছিল আবেগের তীব্র অনুভূতির সংগীত।

    যখন আমি বাতাসের ভেতর থেকে অবতরণ করলাম এবং সেনহেড্রিমে আমার বেঁধে রাখা হাত ছিল মুক্ত। এমনকি, তারপর আমার পাঁজর, আমার পালকহীন পাখা রক্ষা ও পাহারা দিয়েছিল সেই গানকে। নিম্নাঞ্চলের সমস্ত দারিদ্র্য আমার সম্পদ থেকে আমাকে অপহরণ করতে পারে না।

    আমি যথেষ্ট কথা বলেছি। বধিরদেরকে জীবনের গুঞ্জন সমাহিত করতে দাও তাদের মৃত কর্ণকুহরে। আমি তাঁর বীণার শব্দে তৃপ্ত, যা তিনি থামিয়ে দিয়েছিলেন এবং আঘাত করেছিলেন যখন তাঁর হাতদুটো পেরেকবিদ্ধ এবং তা থেকে রক্ত ঝরছিল।

    আরিমেথিয়ার জোসেফ : যিশুর হৃদয়ের দুইটি স্রোতোধারা

    নাজারেতবাসীদের হৃদয়ের ভেতরে দুটি স্রোতোধারা প্রবাহিত হচ্ছিল : ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কের স্রোত, যাকে তিনি সম্বোধন করতেন পিতা বলে এবং তূরীয় আনন্দের স্রোতকে তিনি বলতেন ওপরের পৃথিবীর সাম্রাজ্য।

    আমি আমার নির্জনতার ভেতরে তাঁর সম্পর্কে ভাবতাম এবং তাঁর হৃদয়ের ভেতরে আমি অনুসরণ করতাম এই দুটো স্রোতকে। এই স্রোতোধারার একটির তীরের ওপরে আমি আমার নিজস্ব আত্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম এবং কখনও কখনও আমার আত্মা ছিল একজন ভিক্ষুক এবং একজন পথভ্রষ্ট এবং কখনও কখনও এটা ছিল একজন রাজকুমারী তার নিজস্ব বাগানে।

    তারপর অনুসরণ করেছিলাম তাঁর হৃদয়ের অন্য স্রোতোধারা এবং আমার পথে দেখা, হয়েছিল এমন একজনের সঙ্গে যাকে পেটানো হয়েছিল এবং অপহরণ করা হয়েছিল তার সোনা এবং সে হাসছিল। আবার আমি দেখলাম অপহরণকারী তার সম্পদ ছিনিয়ে নিল এবং তখন সে ক্রমাগত কাঁদছে।

    তারপর আমি আমার বুকের ভেতরে এই দুই স্রোতোধারার মর্মরধ্বনি শুনতে পেলাম এবং উল্লসিত হলাম।

    আমি যিশুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম পন্টিয়াস পিলাটুস এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা তাঁকে খুঁজে পাওয়ার আগের দিন। আমরা দীর্ঘসময় কথা বলেছিলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বহু প্রশ্ন। তিনি উদার চিত্তে আমার সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন এবং যখন আমি তাঁকে পরিত্যাগ করলাম তখন আমি উপলব্ধি করতে পারছিলাম যে তিনিই আমাদের এই পৃথিবীর মালিক এবং প্রভু।

    দীর্ঘদিন হয়েছে আমাদের সিডার গাছগুলি পড়ে গেছে কিন্তু এর সুগন্ধ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে এবং তা চিরকালের জন্য অনুসন্ধান করবে পৃথিবীর চারদিকের বাঁকগুলি।

    বৈরুতের জর্জাস : আগন্তুকদের সম্পর্কে

    তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা ছিলেন চিরহরিৎ কুঞ্জবনের ভেতর এবং এই কুঞ্জবন ছিল আমার সীমানা-নির্দেশক দীর্ঘ তরুসারির ওপরে এবং তিনি তাদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন।

    আমি কুঞ্জবনের কাছে দাঁড়ালাম এবং মনোযোগ দিয়ে তা শুনলাম। আমি জানতাম তিনি কে, কারণ তাঁর খ্যাতি এই তীরভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছিল তিনি তাদেরকে পরিদর্শন করার আগেই।

    যখন তিনি কথা থামালেন তখন আমি তাঁর কাছাকাছি গেলাম এবং বললাম, ‘জনাব, সবাইকে নিয়ে আমার বাড়িতে আসুন এবং আমাকে ও আমার বাড়ির ছাদকে সম্মানিত করুন।

    তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘আজ নয় বন্ধু, আজ নয়।’

    তার কথার মধ্যে আশীর্বাদ ছিল এবং তাঁর কথা শীতরাত্রির পোশাকের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরল।

    তারপর তিনি তাঁর বন্ধুদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘লক্ষ করো একটা মানুষ, যে আমাদেরকে আগন্তুক মনে করে না, যদিও সে আজকের আগে আমাদেরকে কখনও দেখেনি এবং সে আমাদেরকে তার মাড়াইখানায় যাওয়ার অনুরোধ করে।

    ‘বস্তুতপক্ষে আমার সাম্রাজ্যে কোনো আগন্তুক নেই। আমাদের জীবন অন্য মানুষের জীবন ছাড়া আর কিছু নয়, যা আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে যেন আমরা সব মানুষকে জানতে পারি এবং সেই জ্ঞানের ভেতরে ভালোবাসতে পারি তাদেরকে।

    ‘সমস্ত মানুষের কর্মকাণ্ড আমাদের কর্মকাণ্ড ছাড়া আর কিছুই ছিল না, উভয়ের কর্মকাণ্ডই লুকানো এবং প্রকাশিত।

    ‘একটি আত্মায় পরিণত হওয়ার জন্য আমি তোমাদেরকে অভিযোগ করি না বহু আত্মায় পরিণত হওয়া ছাড়া, গৃহবাসী এবং গৃহহীন, কৃষক এবং চড়ুই যারা মাটিতে সুখনিদ্ৰা গ্রহণের আগেই শস্য ছিঁড়ে নেয়, সেই দানকারী যিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সেই গ্রহণকারী যিনি গ্রহণ করেন গর্ব ও স্বীকৃতির ভেতরে।

    ‘দিনের সৌন্দর্য তোমরা শুধু যা দেখ তাই নয়, তার ভেতরে অন্য মানুষেরা যা দেখতে পায় তা-ই হল সৌন্দর্য।

    ‘কারণ আমি সেইসব মানুষের ভেতর থেকে তোমাদেরকে পছন্দ করেছি যারা, আমাকে পছন্দ করেছ।

    তারপর তিনি আবার আমার দিকে ফিরলেন এবং হেসে বললেন, ‘তোমাকেও আমি একই কথা বলছি এবং এসব স্মরণ রাখবে।’

    তারপর আমি তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালাম এবং বললাম, ‘প্রভু আপনি একবার আমার বাড়িতে যাবেন না?’

    তিনি উত্তরে বললেন, ‘আমি তোমার হৃদয়কে জানি এবং আমি তোমার বিশাল গৃহ পরিদর্শন করেছি।’

    তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে চলে যেতে যেতে বললেন, ‘শুভ রাত্রি এবং তোমার গৃহ আরও যথেষ্ট বড় হোক এই ভূমির সব পথভ্রষ্টকে আশ্রয় দিতে।’

    মেরি ম্যাগডালিন : তাঁর মুখমণ্ডল ছিল ডালিমের হৃদয়ের মতো

    তাঁর মুখমণ্ডল ছিল ডালিমের হৃদয়ের মতো এবং তাঁর চোখের ছায়া ছিল গভীর

    তিনি ছিলেন বিনয়ী এবং সেই মানুষের মতো যে তার নিজের সামর্থ্যের প্রতি মনোযোগী।

    আমার স্বপ্নের ভেতরে আমি দেখতে পাই পৃথিবীর রাজারা তাঁর উপস্থিতিতে আতঙ্কের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে।

    আমি তার মুখমণ্ডল সম্পর্কে কথা বলব কিন্তু কীভাবে আমি তা বলব?

    এটা ছিল অন্ধকারহীন রাত্রি এবং কোলাহলমুখর একটা দিনের মতো।

    এটা ছিল একটা বিষাদাচ্ছন্ন এবং উল্লসিত মুখমণ্ডল।

    আমার ভালোই মনে আছে কীভাবে তিনি তাঁর হাত তুলেছিলেন আকাশের দিকে এবং তাঁর দ্বিধাবিভক্ত আঙুলগুলি ছিল দেবদারু গাছের শাখার মতো।

    আমার স্মরণ আছে সন্ধ্যায় আমি তাঁকে ধীর পদক্ষেপে হাঁটতে দেখেছিলাম। কিন্তু তিনি হাঁটছিলেন না। তিনি ছিলেন রাস্তার ওপরের রাস্তা এমনকি মেঘ হিসেবে পৃথিবীর ওপর, যা পৃথিবীকে তরতাজা করে তুলতে অবতরণ করে।

    কিন্তু আমি যখন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ালাম এবং বললাম, তিনি একজন মানুষ ছিলেন এবং তাঁর মুখমণ্ডল ছিল বলিষ্ঠ, তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার কী হয়েছে মিরিয়াম?’

    আমি তাঁর কথার কোনো জবাব দিলাম না, কিন্তু আমার পাখাগুলি জড়িয়ে রেখেছিল আমার গোপনীয়তাকে এবং আমি উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলাম।

    যেহেতু আমি তাঁর আলো আর সহ্য করতে পারছিলাম না সে-কারণে আমি ঘুরে হাঁটতে শুরু করলাম কিন্তু তা লজ্জার কারণে নয়। আমি শুধুমাত্র তখনই লজ্জিত হয়েছিলাম যখন আমার হৃদয়ের তারে তাঁর আঙুলের স্পর্শ অনুভব করেছিলাম।

    একজন রোমানের উদ্দেশে নাজারেতবাসী জোথাম : অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকা সম্পর্কে

    বন্ধুরা আমার, তোমরা হলে অন্যান্য রোমানদের মতো যারা জীবনকে ধারণ করত জীবনের ভেতরে বেঁচে থাকার চেয়েও। একইভাবে তোমরা আত্মার দ্বারা শাসিত হওয়ার চেয়ে পছন্দ করবে ভূমি শাসন করতে।

    তোমরা জয় করবে প্রতিযোগিতা এবং তাদের দ্বারা চূর্ণবিচূর্ণ হবে রোমে আশীর্বাদপ্রাপ্ত এবং সুখী হয়ে বসবাস করার চেয়ে।

    তোমরা চিন্তা করো তোমাদের সেনাবাহিনী সম্পর্কে যা কুচকাওয়াজ করছে এবং সেইসব জাহাজ সম্পর্কে যা সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

    কীভাবে তোমরা নাজারেতের যিশু সম্পর্কে উপলব্ধি করবে, একজন মানুষ সাধারণ ও একাকী, যিনি জাহাজ ও সৈন্য-সামন্ত ছাড়াই এসেছিলেন, হৃদয়ের ভেতরে এবং আত্মার মহাশূন্যে একটা সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে?

    কীভাবে তোমরা সেই মানুষটিকে উপলব্ধি করবে যিনি যোদ্ধা ছিলেন না কিন্তু পরাক্রমশীল ইথারের ক্ষমতা নিয়ে তিনি এসেছিলেন?

    তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, তিনি আমাদের মতোই মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর ভেতরে মাটির গন্ধরস বেড়ে ওঠে আকাশের গন্ধরসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এবং তাঁর কথার ভেতরে আমাদের আধো-আধো কথা অদৃশ্যের ফিসফিসানিকে আলিঙ্গন করে এবং তাঁর কণ্ঠস্বরের ভেতরে আমরা শুনতে থাকি অতলস্পর্শী সংগীত।

    হ্যাঁ, যিশু ঈশ্বর ছিলেন না, মানুষ ছিলেন এবং তাঁর ভেতরেই রয়েছে আমাদের বিস্ময় ও চমক।

    কিন্তু তোমরা, রোমানরা ঈশ্বর ছাড়া কোনো কিছুতেই বিস্মিত হও না এবং কোনো মানুষ তোমাদেরকে বিস্মিত করতে পারবে না। সুতরাং নাজারেতবাসীদের তোমরা বুঝতে পারবে না।

    তিনি ছিলেন মনের যৌবনের অংশস্বরূপ এবং তোমরা হলে এর বৃদ্ধবয়সের অংশস্বরূপ। তোমরা আজ আমাদেরকে শাসন করো কিন্তু আমাদেরকে অন্যদিনের অপেক্ষা করতে দাও।

    কে জানে যে এই লোক জাহাজ ও সেনাবাহিনী দিয়ে আগামীকাল শাসন করবে না?

    আমরা যারা আত্মাকে অনুসরণ করি তারা তাঁর সঙ্গে ভ্রমণকালে রক্তকে ঘামের মতো ঝরিয়ে ফেলবে। কিন্তু রোম শুয়ে থাকবে রৌদ্রালোকে একটা সাদা কঙ্কালের মতো।

    আমরা দুঃখকষ্ট ভোগ করব অনেক যদিও আমরা টিকে থাকব এবং বেঁচে থাকব। কিন্তু রোমের অবশ্যই প্রয়োজন ধূলায় পতিত হওয়া।

    রোমের মানুষেরা যখন তাঁর নাম উচ্চারণ করবে তখন তিনি তাদের কণ্ঠস্বর মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং তিনি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করবেন নতুন জীবনকে হাড়ের ভেতরে, যার মাধ্যমে তারা বেড়ে উঠতে পারে- পৃথিবীর নগরগুলির ভেতরে একটি নগর।

    কিন্তু এইসব তিনি করবেন বিপুল সংখ্যাক মানুষ ছাড়াই, এমনকি সেইসব দাস ছাড়া যারা তার রণতরীর বৈঠা বায়। তিনি হবেন একা

    জেরিখোর এফরাইম : অন্য এক বিয়ের ভোজ-উৎসব

    যখন তিনি আবার জেরিখোতে এলেন তখন আমি তাকে অনুসন্ধান করছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম, ‘প্রভু আগামীকাল আমার পুত্রের বিয়ে। আমি প্রার্থনা করছি আপনি বিয়ের ভোজ-উৎসবে উপস্থিত হয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করবেন, যেভাবে গালীলের কানাতে বিবাহ-উৎসবে আপনি তাদেরকে সম্মানিত করেছিলেন।

    তিনি উত্তরে বললেন, ‘এটা সত্যি যে আমি একবার এক বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলাম, কিন্তু আমি আর পুনরায় এরকম অতিথি হব না। আমি নিজেই এখন বর।’

    আমি বললাম, ‘আমি অনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি প্রভু আমার পুত্রের বিয়ের ভোজ-উৎসবে উপস্থিত হওয়ার জন্য।’

    তিনি হেসে বললেন, ‘কেন তুমি আমার কাছে অনুনয় করছ? তোমার উৎসবের জন্য কি যথেষ্ট পরিমাণ মদ নেই?’

    আমি বললাম, ‘আমার পিপাগুলি পরিপূর্ণ প্রভু এবং আমি তারপরও আপনাকে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করছি।’

    তারপর তিনি বললেন, ‘ কে জানে? আমি হয়তো আসতে পারি, অবশ্যই আমি আসতে পারি যদি তোমার মন্দিরে তোমার হৃদয় একটা বেদিতে পরিণত হয়।’

    আগামীকাল এল এবং আমার ছেলের বিয়েও সম্মন্ন হল কিন্তু যিশু ভোজ-উৎসবে এলেন না, যদিও অনেক অতিথি এসেছিল, কিন্তু আমার মনে হল বিয়েতে কোনো অতিথি আসেনি।

    এই সত্যের ভেতরে আমি নিজে অতিথিদেরকে স্বাগত জানাই, যারা সেখানে ছিল না। সম্ভবত, আমার হৃদয়ে কোনো বেদি ছিল না যখন আমি তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সম্ভবত আমার আকাঙ্ক্ষার ভেতরে ছিল অন্য কোনো অলৌকিকতা।

    টাইরির এক ব্যবসায়ী, বারকা : কেনা ও বেচা সম্পর্কে

    আমি বিশ্বাস করি, না রোমান না ইহুদি কেউই নাজারেতের যিশুকে উপলব্ধি করতে পারেনি, এমনকি বুঝতে পারেনি তাঁর শিষ্যদেরকেও যারা আজ তাঁর নাম প্রচার করছে।

    রোমানরা তাঁকে হত্যা করেছিল এবং সেটা ছিল একজন অন্ধের পথ চলা। গালীলীয়রা তৈরি করেছিল তাঁর একজন ঈশ্বরকে যা ছিল একটা ভ্রান্তি।

    যিশু ছিলেন মানুষের হৃদয়।

    আমি সাত সমুদ্রে আমার জাহাজের পাল উড়িয়েছি এবং দূরবর্তী শহরের বাজার এলাকায় বিনিময় করেছি রাজা, যুবরাজ, প্রতারক ও ধূর্তদের সঙ্গে, কিন্তু আমি কখনও এরকম মানুষ দেখি নাই যে ব্যবসায়ীদেরকে উপলব্ধি করতে পারে, যেমন যিশু উপলব্ধি করতে পারতেন।

    আমি একবার তাঁকে এই নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী বলতে শুনেছিলাম :

    ‘বিদেশী ভূমির উদ্দেশে এক ব্যবসায়ী দেশ ত্যাগ করলেন। তার দুজন দাস ছিল এবং তিনি দুজনকেই হাত ভরে স্বর্ণমুদ্রা দান করলেন এবং বললেন, ‘আমি যখন বিদেশে যাব তখন তোমরা বাইরে গিয়ে মুনাফা অনুসন্ধান করবে। শুধুই বিনিময় করবে এবং দেখতে পাবে তোমরা গ্রহণ ও দানে ভেতর দিয়ে সেবা করার সুযোগ পেয়েছ।’

    এক বছর পর ব্যবসায়ী ফিরে এলেন।

    ‘তিনি জিজ্ঞাসা কররেন দুই ভৃত্যকে তারা সোনা দিয়ে কী করেছে?’

    ‘প্রথম ভৃত্য বলল, ‘প্রভু লক্ষ্য করুন, আমি বহন করেছি এবং বিক্রি করেছি এবং আমি লাভবান হয়েছি।’

    ব্যবসায়ী বলল, ‘যা লাভ হয়েছে তা তোমার, কারণ তুমি ভালো কাজ করেছে এবং বিশ্বস্ত হয়েছ যেমন আমার কাছে তেমনি তোমার নিজের কাছে।’

    ‘তারপর অন্য ভৃত্য সামনে এগিয়ে এল এবং বলল, ‘প্রভু আমি আতঙ্কিত হয়েছি যে আপনার অর্থ আমি লোকসান করে ফেলতে পারি। সে-কারণে আমি বেচাকেনা করি নাই। লক্ষ্য করুন আপনার সব অর্থই এখানে আছে।’

    ‘ব্যবসায়ী সোনাগুলো তুলে নিলেন এবং বললেন, ‘তোমার আস্থা কম। বিনিময় এবং লোকসান চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে উত্তম। কারণ বাতাস বীজগুলোকে ছড়িয়ে দেয় এবং অপেক্ষা করে ফলের, যা সব ব্যবসায়ী করে থাকে। অন্যকে সেবা করার উদ্দেশে এটা ছিল তোমাদের জন্য যথাযথ উপায়।’

    যখন যিশু এসব বললেন, যদিও তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন না কিন্তু তিনি ব্যবসায়ের গোপনীয়তাকে উন্মোচিত করলেন।

    যাহোক, তাঁর নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী প্রায়ই আমার মনে বহন করে আনে আমার ভ্রমণের চেয়েও অধিক দূরবর্তী ভূমিকে এবং যদিও তা আমার গৃহ ও আমার ভালো গুণগুলির চেয়ে অধিকতর নিকটবর্তী।

    কিন্তু সেই যুবক নাজারেতবাসী ঈশ্বর ছিলেন না এবং তাঁর অনুসারীরা একটা করুণা অনুসন্ধান করত এরকম একজন প্রাজ্ঞ ঈশ্বর তৈরি করতে।

    ফুমিয়া, সিডোন-এর উঁচুপর্যায়ের যাজিকা অন্য যাজিকাদের উদ্দেশ্যে : আহ্বান

    বাজানোর জন্য তোমাদের বাদ্যযন্ত্র তুলে নাও এবং আমাকে গান গাইতে দাও।

    আঘাত করো তোমাদের তারাগুলিকে, যা সোনা ও রুপার

    কারণ আমি গান গাইব সেই মানুষটি সম্পর্কে যে অকুতোভয়,

    যে উপত্যকার ড্রাগনকে হত্যা করেছিল,
    তারপর তাকিয়েছিল করুণার দৃষ্টিতে
    তার ওপর যাকে সে হত্যা করেছিল।

    তোমাদের বাদ্যযন্ত্র তুলে নাও এবং গান গাইতে থাক আমার সঙ্গে,

    উচ্চতার ওপরে উঠে গেছে ওক গাছটি,

    আকাশের মতো উদার হৃদয় এবং সমুদ্রের মতো প্রসারিত হাত যে মানুষের,

    যে মৃত্যুর ফ্যাকাশে ওষ্ঠকে চুম্বন করে।

    যদিও তা এখন শিহরিত হয় জীবনের মুখের ওপর।

    তোমাদের বীণাগুলো তুলে নাও এবং চলো আমরা গান গাই।

    পাহাড়ে আতঙ্কহীন এক শিকারি,

    যে চিহ্নিত করবে পশুদের এবং ছুড়ে দেবে তার হাতের লক্ষ্যবিহীন তীর,

    সে বহন করেছিল শিং ও শুকরের দাঁত মাটির তলা পর্যন্ত।

    তোমাদের বীণাগুলো তুলে নাও এবং আমার সঙ্গে গান গাও,

    সাহসী যৌবন পাহাড়ি শহরগুলো দখল করেছিল
    এবং দখল করেছিল সমতল ভূমির শহরগুলি যা বালির ভেতরে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে।

    তিনি পিগমিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি, তিনি যুদ্ধ করেছিলেন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে

    যারা আমাদের মাংসের জন্য ক্ষুধার্ত এবং রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত।

    এবং প্রথম সোনালি বাজপাখির মতোই
    শত্রুতা করত শুধুমাত্র ঈগলের সঙ্গে
    কারণ তাঁর পাখা ছিল বিশাল এবং গর্বিত।

    তুলে নাও তোমাদের বীণা এবং গান গাও আমার সঙ্গে
    সমুদ্র ও সমুদ্রতীরের উল্লসিত সংগীত।

    ঈশ্বরেরা মৃত,

    তাঁরা স্থির হয়ে শুয়ে আছেন
    বিস্মৃত সমুদ্রের ক্ষুদ্র দ্বীপে।

    এবং তিনি তাদেরকে হত্যা করেন তাঁর সিংহাসনের ওপর বসে।

    তিনি ছিলেন একজন যুবক।

    বসন্ত তখনও তাকে পুরোপুরি দান করেনি
    এবং তার শস্যক্ষেতে গ্রীষ্ম ছিল তখনও যুবক।

    তুলে নাও তোমাদের বীণা এবং গান গাও আমার সঙ্গে।
    বনভূমিতে প্রচণ্ড ঝড় ভেঙে ফেলে শুকনো শাখা
    এবং পাতাহীন ছোট ছোট ডালপালা,
    যদিও জীবন্ত শিকড়গুলিকে মাটির বক্ষস্থলে পাঠিয়ে দেয়
    গভীরতাকে জড়িয়ে ধরতে।

    তোমাদের বীণাগুলি তুলে নাও এবং গান গাও আমার সঙ্গে
    আমাদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষের জন্য মৃত্যুহীন গান

    না, আমার যুবতীরা তোমাদের হাতগুলিকে থামাও
    বীণাগুলো নামিয়ে রাখো।

    আমরা তাঁর গান এখন গাইতে পারি না।

    আমাদের গানের মূর্ছিত ফিসফিসানি তাঁর প্রচণ্ড ঝড়ের কাছে পৌঁছাতে পারে না,
    পারে না বিদ্ধ করতে তাঁর নৈশব্দের পরাক্রমশীলতা।

    বীণাগুলি নামিয়ে রাখো এবং আমার কাছাকাছি জড়ো হও,

    আমি তোমাদের কাছে তাঁর কথা পুনরাবৃত্তি করব
    এবং তোমাদেরকে খুলে বলব তাঁর কর্মকাণ্ড,
    কারণ তাঁর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি আমাদের আবেগমিশ্রিত
    অনুভূতির চেয়েও অধিকতর গভীর।

    অনুলেখক বেঞ্জামিন : মৃতকে তার মৃতদের সমাহিত করতে দাও

    বলা হত যে যিশু ছিলেন রোম সাম্রাজ্য ও যুদেয়ার শত্রু।

    কিন্তু আমি বলছি যিশু কোনো মানুষ বা প্রজাতির শত্রু ছিলেন না।
    আমি তাঁকে বলতে শুনেছি : ‘বাতাসে এবং পাহাড়চূড়ায় পাখিরা সাপের অন্ধকার গর্ত সম্পর্কে তত মনোযোগী নয়।

    মৃতকে সমাহিত করতে দাও তার মৃতদের, জীবন্তদের ভেতরে হয়ে ওঠো নিজে নিজে এবং অনেক উঁচুতে পাখা না নাড়িয়ে ভেসে থাকো।

    আমি, তাঁর শিষ্যদের একজন নই। কিন্তু আমি ছিলাম অনেকের ভেতরে একজন যে তাঁর পেছনে ছুটছে তাঁর মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য।

    তিনি তাকাতেন রোমের দিকে এবং আমাদের দিকে যারা রোমানদের দাস। পিতা হিসেবে তিনি তাঁর সন্তানদের প্রতি যত্নশীল ছিলেন, খেলা করতেন খেলনা নিয়ে এবং ঝগড়া করতেন তাদের সঙ্গে আরও বড় খেলনার জন্য এবং তিনি উচ্চহাসি হাসতেন তাঁর চূড়ান্ত পর্যায় থেকে।

    তিনি ছিলেন রাষ্ট্র ও জাতির চেয়ে বৃহত্তর, তিনি ছিলেন বিপ্লবের চেয়েও মহৎ

    তিনি ছিলেন একজন এবং একাকী এবং তিনি ছিলেন একটা জাগরণের ভেতরে।

    আমাদের ঝরে না পড়া অশ্রুগুলি তিনি কেঁদে ঝরিয়ে ফেলেন এবং আমাদের বিদ্রোহগুলি পরিণত হয় তাঁর হাসিতে।

    আমরা জানতাম, এটা ছিল তার ক্ষমতার ভেতরে তাদের সঙ্গে জন্ম নেওয়া যারা এখনও জন্মায়নি এবং তাদেরকে আদেশ দেওয়া দেখার জন্য, তবে তা চোখ দিয়ে নয় অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।

    যিশু ছিলেন পৃথিবীর ওপর একটা নতুন সাম্রাজ্যের শুরু এবং যে সাম্রাজ্য টিকে থাকবে।

    তিনি ছিলেন সমস্ত রাজার পৌত্রের পুত্র, যারা আত্মার সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছিলেন এবং শুধুমাত্র আত্মার রাজাই শাসন করেছে আমাদের পৃথিবী।

    জাক্কাইয়াস : যিশুর নিয়তি সম্পর্কে

    যা বলতে শুনেছ তাই তোমরা বিশ্বাস করো। তোমরা আরও বিশ্বাস করো যা বলা হয়নি; কারণ মানুষের নীরবতা হল সত্যের অধিকতর কাছাকাছি তার কর্মকাণ্ডের চেয়ে।

    তোমরা জিজ্ঞাসা করেছ, যিশু যদি তাঁর লজ্জাজনক মৃত্যু থেকে পালাতে এবং তাঁর অনুসারীদেরকে দুঃখকষ্টের হাত থেকে রক্ষা করতে পারতেন তা হলে কী হত।

    আমি বলছি বস্তুতপক্ষে তিনি পালিয়েছিলেন যেভাবে ঈশ্বর চেয়েছেন, কিন্তু তিনি অনুসন্ধান করেননি নিরাপত্তা, এমনকি তিনি মনোযোগীও ছিলেন না রাতের অন্ধকারে নেকড়ের হাত থেকে তাঁর শিষ্যের পালকে রক্ষা করতে।

    তিনি তাঁর নিয়তি সম্পর্কে জানতেন এবং জানতেন তাঁর বিশ্বস্ত শিষ্যদের আগামীকাল সম্পর্কে। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন এবং বলেছিলেন আমাদের ভাগ্যে কী ঘটবে। তিনি তাঁর মৃত্যুকে অনুসন্ধান করেননি কিন্তু মৃত্যুকে গ্রহণ করেছিলেন স্বামী হিসেবে যে মাটি দিয়ে তাঁর শস্য ঢাকছে একমাত্র শীতকাল ছাড়া এবং তারপর বসন্তের জন্য অপেক্ষা, অপেক্ষা ফসল তোলার এবং নির্মাতা হিসেবে ভিত্তিভূমিতে সবচেয়ে বিশাল পাথরটিকে শুইয়ে দেওয়া।

    আমরা হলাম গালীল এবং লেবাননের চড়াই-উত্রাই সম্বলিত স্থান থেকে আসা মানুষ। আমাদের প্রভু আমাদেরকে আমাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে নেতৃত্ব দিতে পারেন আমাদের বাগানে তাঁর যৌবনের সঙ্গে বসবাস করতে, যতদিন আমাদের বৃদ্ধবয়স না আসে এবং আমাদের পুরোনো বছরগুলির কথা ফিসফিস করে না বলে।

    তাঁর পথে কি কোনো বাধা আছে আমাদের গ্রামের মন্দিরে ফিরে যেতে যেখানে অন্যেরা নবীদের বাণী পাঠ করে এবং উন্মোচিত করে তাঁদের হৃদয়গুলি?

    তিনি কি বলতে পারতেন না, ‘এখন আমি পশ্চিমের বাতাসের সঙ্গে পূবদিকে যাব’ সুতরাং তিনি শুধুমাত্র হেসে আমাদেরকে বিদায় জানাতে পারতেন।

    হ্যাঁ তিনি বলতে পারতেন, ‘তোমরা ফিরে যাও আত্মীয়-পরিজনের কাছে। পৃথিবী আমার জন্য প্রস্তুত হয়ে নেই। আমি এখন থেকে হাজার বছর পেছনে ফিরে যাব। তোমাদের শিশুদেরকে শিক্ষা দাও আমার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকতে।’

    তিনি এসব করতে পেরেছিলেন, কারণ ঈশ্বর এভাবে পছন্দ করেছেন।

    কিন্তু তিনি জানতেন যে, অদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করতে হলে অবশ্যই নিজেকে তাঁর শায়িত করতে হবে মন্দিরের কোনার পাথরগুলির ওপরে এবং আমারও শুয়ে পড়ব তাঁর চারপাশে যেভাবে নুড়ি পাথর সিমেন্টের কারণে পরস্পর স্থায়ীভাবে কাছাকাছি আসে।

    তিনি জানতেন তাঁর বৃক্ষের প্রাণরস অবশ্যই বেড়ে উঠবে এর শিকড় থেকে এবং তিনি তাঁর রক্ত ঢেলে দেবেন এর শিকড়ের ওপর এবং তাঁর কাছে এটা উৎসর্গ ছিল না বরং তা ছিল প্রাপ্তি।

    মৃত্যু হচ্ছে সবকিছু প্রকাশকারী। যিশুর মৃত্যু তাঁর জীবনকে প্রকাশ করেছিল।

    যদি তিনি তাঁর শত্রু ও তোমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারতেন তাহলে তিনি পৃথিবী জয় করে ফেলতেন। সুতরাং তিনি পালাতে পারবেন না।

    শুধুমাত্র তাঁরই রয়েছে সবকিছুর আকাঙ্ক্ষা যা তাঁকে সবকিছু দান করবে।

    হ্যাঁ, যিশু তাঁর শত্রুদের কাছ থেকে পালাতে পারতেন এবং বসবাস করতে পারতেন প্রাচীন যুগে, কিন্তু তিনি জানতেন ঋতুদের চলাচল এবং তিনি আরও জানতেন তিনি নিজের গান গাইবেন।

    কোন্ লোকটি অস্ত্রসজ্জিত পৃথিবীর মুখোমুখি যে একমুহূর্তের জন্যও পারজিত হবে না, যে যুগগুলিকেও অতিক্রম করে যেতে পারে।

    তোমরা এখন জানতে চাও সেই সত্যের ভেতরে কে যিশুকে হত্যা করেছিল, রোমান জনগণ নাকি জেরুজালেমের যাজকেরা?

    রোমান অথবা যাজকেরা তাঁকে খুন করেনি। পুরো পৃথিবী ঐ পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়েছিল তাঁকে সম্মান জানাতে।

    যোনাথান : পদ্মফুলের মাঝখানে

    একদিন আমি এবং আমার প্রেমিকা মিষ্টি পানির লেকে নৌকা বাইছিলাম এবং আমাদের চারপাশে ছিল লেবাননের পাহাড়।

    আমরা যাতায়াত করছিলাম ক্রন্দনরত উইলোর পাশ দিয়ে এবং উইলোর ছায়া প্রতিফলিত হচ্ছিল জলের গভীরে আমাদেরকে ঘিরে।

    আমি যখন নৌকা চালাতে লাগলাম, তখন আমার প্রেমিকা তার বীণা তুলে নিল এবং গান গাইতে লাগল :

    পদ্ম ছাড়া কোনো সেই ফুল যা পানি ও সূর্যালোককে চেনে?

    পদ্মের হৃদয় ছাড়া কোন সেই হৃদয় যা আকাশ ও মাটিকে চিনবে?

    লক্ষ্য করো, আমার ভালোবাসা একটি সোনালি ফুল গভীরে ও উচ্চতায় যা পাকানো অবস্থায় ভাসে।

    এমনকি তুমি ও আমি যেভাবে ভাসি অনির্দিষ্ট একটি ভালোবাসার ভেতরে, যা চিরকালের জন্য আছে এবং তা চিরকালের জন্য থাকবে।

    প্রিয়তমা আমার কিছুক্ষণের জন্য তোমার গান ডুবিয়ে দাও লেকের জলে এবং স্পর্শ করতে দাও আমাকে যন্ত্রের তারগুলি।

    চলো আমরা উইলোকে অনুসরণ করি কিন্তু পদ্মফুলকে পরিত্যাগ না করে। নাজারেতে এক কবি বসবাস করে এবং তার হৃদয় পদ্মফুলের মতো।

    তিনি নারীদের হৃদয় পরিদর্শন করেছেন,

    তিনি জানেন পানি থেকে তার বেড়ে ওঠার তৃষ্ণা

    এবং সূর্যের জন্য তার ক্ষুধা, যদিও তার ঠোঁটগুলি বিবৰ্ণ।

    তারা বলে তিনি গালীলের পথে পথে ঘুরে বেড়ান।

    আমি বলি তিনি আমাদের সঙ্গে বৈঠা বাইছেন।

    প্রিয়তমা, তুমি কি তাঁর মুখ দেখতে পাচ্ছ না?

    তুমি কি দেখতে পাও না কোথায় উইলো শাখা ও তার প্রতিফলন একসঙ্গে মিলিত হয়। –

    তিনি চলাচল করছেন যেমন আমরা।

    হে প্রিয়তমা জীবনের যৌবনকে জানা খুবই ভালো
    এর উল্লসিত সংগীতকে জানা অধিকতর উত্তম।

    কোথায় পদ্মফুল সূর্যালোকে হেসে ওঠে এবং
    উইলো আরও পানির গভীরে প্রবেশ করে
    এবং তাঁর কণ্ঠস্বর মিশে যায় আমার
    বীণার তারের সঙ্গে।

    প্রিয়তমা আমার কিছুক্ষণের জন্য তোমার গান ডুবিয়ে দাও লেকের জলে
    এবং আমাকে স্পর্শ করতে দাও আমার তারগুলো।
    নাজারেতে এক কবি আছে যিনি আমাদের দুজনকেই
    চেনেন এবং ভালোবাসেন।

    প্রিয়তমা আমার, কিছুক্ষণের জন্য তোমার গান
    ডুবিয়ে দাও লেকের জলে,
    এবং আমাকে স্পর্শ করতে দাও
    আমার তারগুলি।

    বেথসেইদা’র হান্না : সে বলে তার পিতার বোন সম্পর্কে

    আমার পিতার বোন তার যৌবনে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তার পিতার পুরোনো আঙুরবাগানের পাশে একটা কুঁড়েঘরে বসবাস করতে।

    তিনি একা সেখানে বসবাস করতেন এবং গ্রাম এলাকার লোকেরা তাকে খোঁজাখুঁজি করত তাদের অসুস্থতার সময় এবং তিনি তাদেরকে সারিয়ে তুলতেন সবুজ উদ্ভিদ এবং সূর্যালোকে শুকানো শিকড় ও ফুল দিয়ে।

    তারা তাকে মনে করেছিল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কিন্তু সেখানে তারাই ছিল যারা তাকে ডাকত ডাইনি এবং মহিলা জাদুকর বলে।

    একদিন আমার পিতা আমাকে বলল, ‘এই রুটির টুকরো, জগভর্তি মদ এবং এই থলেভর্তি কিশমিশ আমার বোনের কাছে নিয়ে যাও।’

    এই সবকিছু একটা ঘোড়ার পিঠে বোঝাই করা হয়েছিল। সেই আঙুর বাগান ও কুঁড়েঘরের কাছে না-পৌঁছানো পর্যন্ত আমি ঘোড়াটাকে অনুসরণ করলাম এবং আমার বাবার বোন খুবই খুশি হলেন।

    তারপর আমরা একটা ঠাণ্ডা জায়গায় একত্রে বসলাম। রাস্তা দিয়ে একটা লোক তখন এগিয়ে আসছিল। কাছাকাছি এসে সে আমার ফুপুকে অভিবাদন জানাল এবং বলল, ‘আপনার প্রতি শুভ সন্ধ্যা এবং রাত্রির আশীর্বাদও আপনার ওপর বর্ষিত হোক।

    তারপর তিনি নড়েচড়ে বসলেন এবং শ্রদ্ধা ও ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রমবোধ নিয়ে তিনি তাঁর সামনে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘সমস্ত ভালো আত্মার প্রভু এবং যাবতীয় খারাপ আত্মার দখলকারী আপনাকেও শুভ সন্ধ্যা।’

    তারপর মানুষ তাঁর দিকে কোমলদৃষ্টিতে তাকাল এবং তারপর তিনি আমাদেরকে অতিক্রম করে গেলেন।

    কিন্তু আমি মনে মনে হাসলাম। আমার মনে হল আমার ফুপু পাগল ছিলেন।

    কিন্তু এখন তার মধ্যে পাগলামির কোনো লক্ষণ নেই। এটা ছিলাম আমি, যে তা উপলব্ধি করতে পারে না।

    আমার ফুপু আমার উচ্চহাসি সম্পর্কে জানতেন যদিও তা ছিল গোপনীয়

    তিনি বললেন, কিন্তু ক্রুদ্ধ হয়ে নয়, ‘প্রিয় কন্যা আমার, মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং আমার কথা স্মরণ রেখো : এইমাত্র যে লোকটা অতিক্রম করে গেল সূর্য ও মাটির মাঝখানে উড়ন্ত পাখির ছায়ার মতো তিনি সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করবেন সিজার ও সিজারের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। তিনি মল্লযুদ্ধে অংশ নেবেন চ্যালডিয়ার মুকুট পরানো ষাঁড় এবং মিশরের সিংহের মাথাওয়ালা মানুষের সঙ্গে এবং তিনি এদের সবাইকে অতিক্রম করে যাবেন এবং শাসন করবেন পৃথিবী।

    কিন্তু এই ভূমি যেখানে তিনি হেঁটে বেড়ান, যে পথ কোনোখানেই পৌঁছাবে না এবং জেরুজালেম, যা পাহাড়ের ওপর গর্বের সাথে বসে থাকে এবং বিষণ্নতার বাতাস যাকে তাড়িয়ে নেবে ধোঁয়ার ভেতরে।

    যখন আমার ফুপু এসব বললেন তখন আমার উচ্চহাসি মুহূর্তেই থেমে গেল এবং আমি শান্ত হয়ে গেলাম। তারপর আমি বললাম, ‘কে এই লোক এবং কোন্ দেশ ও কোন্ গোত্র থেকে এসেছেন? কীভাবে তিনি বিশাল রাজা ও তাদের সম্রাজ্য দখল করবেন?’

    তিনি উত্তরে বললেন, ‘তিনি এই ভূমিতে জন্মেছেন কিন্তু আমরা তাঁকে ধারণ করেছি আকুল আকাঙ্ক্ষার ভেতরে বছরের শুরু থেকেই। তিনি সব গোত্রের যদিও কোনো গোত্রেরই নন। তিনি তাঁর মুখের কথা এবং আত্মার শিখা দিয়ে পৃথিবীকে জয় করবেন।

    তারপর হঠাৎ করেই তিনি পর্বতশিখরের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘ঈশ্বরের দেবদূতেরা হয়ত এই কথা উচ্চারণের জন্য আমাকে ক্ষমা করতে পারেন : তাঁকে হত্যা করা হবে এবং তাঁর যৌবনকে কাফন পরানো হবে এবং তাকে শুইয়ে দেওয়া হবে নীরবতার ভেতরে মৃত্তিকার জিহ্বাহীন হৃদয়ের পাশে এবং যুদেয়ার তরুণীরা তাঁর জন্য কাঁদবে।’

    তারপর তিনি তার হাত তুললেন আকাশের দিকে এবং আবার বললেন, ‘তিনি খুন হবেন শুধুমাত্র শারীরিকভাবে।’

    ‘আত্মার ভেতরে তিনি বেড়ে উঠবেন এবং তাঁর আমন্ত্রণকারীকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন এই ভূমি থেকে যেখানে সূর্যের জন্ম হয় এবং সেই ভূমির দিকে যেখানে সন্ধ্যায় হত্যা করা হয় সূর্যকে।

    ‘মানুষের ভেতরে তাঁর নাম হবে প্রথম উচ্চারণ।’

    যখন তিনি এসব বলছিলেন তখন তাকে বয়স্কা ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো মনে হচ্ছিল এবং আমি ছিলাম একজন বালিকামাত্র, অকর্ষিত একটা শস্যক্ষেত, একটা পাথর যা এখনও দেয়ালে লাগানো হয়নি।

    এই সবকিছুই তিনি লক্ষ্য করলেন তাঁর মনের আয়নায়, যা আমার দিনগুলিকেও অতিক্রম করে গেছে।

    নাজারেতবাসী যিশু বেড়ে উঠেছিলেন মৃতদের থেকে এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নারী ও পুরুষকে সূর্যাস্তের দিকে। একটা নগর যা প্রাকৃতিক রীতিতে তাঁকে উৎপন্ন করেছিল ন্যায়বিচারের প্রতি এবং বিচারকক্ষে তাঁর বিচার করা ও দণ্ড দেওয়া হয়। পেঁচার ডাক একটা শোকগীতি যখন রাত্রির ক্রন্দনরত হৃদয় মর্মরপাথরের ওপর শিশিরের মতো অশ্রু ঝরায়।

    আমি একজন বৃদ্ধ নারী এবং বয়স আমাকে বাঁকা করে ফেলেছে। আমার আর কেউ নেই এবং আমার জাতিগোষ্ঠীও বিলুপ্ত।

    সেইদিনের পর আরও একবার আমি তাঁকে দেখেছিলাম এবং আরও একবার শুনেছিলাম তাঁর কণ্ঠস্বর। এটা ছিল একটা পাহাড়চূড়ার ওপরে যখন তিনি তার অনুসারী ও শিষ্যদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন।

    এখন আমি বৃদ্ধা এবং একাকী, যদিও এখনও পর্যন্ত তিনি আমার স্বপ্নগুলিকে পরিদর্শন করেন।

    তিনি আসেন পাখাযুক্ত একজন সাদা দেবদূতের মতো এবং তাঁর প্রশংসনীয় গুণসহ তিনি আমার অন্ধকারের আতঙ্ককে চুপ করিয়ে দেন এবং আমাকে তিনি উত্তোলন করেন স্বপ্নের কাছাকাছি যদিও তা অধিক দূরবর্তী।

    আমি এখনও পর্যন্ত একটা অকর্ষিত ভূমি, একটা পাকা ফল যা পতিত হবে না। আমার অধিকারে সবচেয়ে বেশি যা আছে তা হল সূর্যের উষ্ণতা এবং সেই মানুষের স্মৃতিগুলি।

    আমি জানি আমার লোকজনের ভেতরে কোনো রাজার উত্থান ঘটবে না, বেড়ে উঠবে না কোনো নবী অথবা যাজক, যেভাবে আমার পিতার বোন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন।

    আমরা অতিক্রম করে যাব নদীর স্রোতপ্রবাহের সঙ্গে এবং আমরা নামহীনে পরিণত হব।

    কিন্তু যারা মধ্য-স্রোতের ভেতরে তাঁকে অতিক্রম করে যায় তাদেরকে স্মরণ করা হবে।

    মানাসেহ, জেরুজালেমের একজন আইনজীবী : যিশুর বক্তব্য এবং তাঁর পদক্ষেপ সম্পর্কে

    হ্যাঁ, আমি তার কণ্ঠ শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম। সব সময়ই তার ঠোঁটের ওপর শব্দ প্রস্তুত থাকত।

    কিন্তু আমি তাঁকে নেতার চেয়ে মানুষ হিসেবে অধিক সম্মান করতাম। তিনি কখনও কখনও আমার পছন্দেরও বেশি কিছু প্রচার করতেন, সম্ভবত আমার কারণেরও ওপরের কিছু এবং আমার এখানে কোনো মানুষ নেই যে আমার কাছে কোনোকিছু প্রচার করবে।

    তাঁর কণ্ঠস্বর এবং তাঁর পদক্ষেপ আমাকে মুগ্ধ করেছিল কিন্তু তাঁর বক্তব্য নয়। তিনি আমাকে আকর্ষণ করেছিলেন কিন্তু কখনও উদ্বুদ্ধ করেননি, কারণ তিনি ছিলেন খুবই অস্পষ্ট, খুবই দূরবর্তী এবং খুবই ভাসাভাসা।

    তার মতো আরও অনেক মানুষকেই আমি চিনতাম। তারা কখনও নির্ভরযোগ্য ছিল না, ছিল না সংগতিপূর্ণ। তারা কথায় ছিল বাকপটু, কিন্তু কোনো আদর্শ ছিল না যা তাদের কান ও অতিক্রান্ত চিন্তাকে ধরে রাখে কিন্তু কখনও তোমাদের হৃদয়ের মর্মবস্তুতে তা পরিণত হবে না।

    করুণা হয় যে তাঁর শত্রুরা তাঁর মুখোমুখি হয় এবং তাকে পীড়াপীড়ি করতে থাকে, এটা অপরিহার্য ছিল না। আমি বিশ্বাস করি তাদের বৈরিতা যুক্ত হবে তাঁর মর্যাদার সঙ্গে এবং তাঁর নম্রতাকে পরিণত করবে ক্ষমতায়।

    কারণ বিস্ময়ের কিছু নেই যে একটা মানুষের বিরোধিতা করে তোমরা তাঁকে সাহসী করে তুলতে পারো এবং তাঁর পায়ের ওপর অবস্থান করে তাকে দান করতে পারো পাখাগুলি?

    আমি তাঁর শত্রুদের চিনি না যদিও আমি নিশ্চিত যে, একজন নিষ্কলুষ মানুষ সম্পর্কে তাদের ভয়ের ভেতরে তারা তাঁকে ধার দেয় শক্তি এবং তাঁকে করে তোলে ভয়ংকর।

    যেফথা : যিশু সম্পর্কে ক্লান্ত একজন মানুষ

    এই লোক তোমাদের দিনগুলিকে পূর্ণ করে দেয় এবং শিকার করে রাত্রিগুলি যা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর যদিও তোমরা আমার চোখদুটিকে ক্লান্ত করে দেবে তাঁর কথা দিয়ে এবং মনকে তাঁর কর্মকাণ্ড দিয়ে।

    আমি তাঁর কথায় ক্লান্ত এবং যা-কিছু তিনি করেছিলেন তাঁর সবকিছুতে তাঁর নাম ও তাঁর গ্রামের নাম আমাকে পীড়া দেয়। আমি তাঁর কেউ নই।

    কেন একজন মানুষকে তোমরা নবীতে পরিণত করো যে একটা ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়? কেন তোমরা বালিয়াড়ির ভেতরে একটা অট্টালিকা দ্যাখো অথবা কল্পনা করো একটা লেক যা বৃষ্টির ফোঁটা একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে গবাদীপশুর খুরের ছাপের ভেতরে।

    আমি ঘৃণা করি না উপত্যকার গুহাগুলির প্রতিধ্বনি অথবা সূর্যাস্তের দীর্ঘ ছায়া, কিন্তু আমি প্রতারণার বাণী শুনি না যা গুঞ্জন তোলে আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে, পর্যবেক্ষণ করি না তোমাদের দৃষ্টির প্রতিফলন।

    কোন্ কথা যিশু উচ্চারণ করেছিল যা গুঞ্জরিত হয়েছিল কিন্তু বলা হয়নি? কোন্ বিচক্ষণতা তিনি প্রকাশ করেছিলেন? ফিলোর উদ্দেশে বলা কথার ভেতরে কোগুলি ছিল তাঁর আধো-আধো কথা? কোন্ করতাল তিনি বাজিয়েছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়, আগে যা বাজানো হয়নি?

    নীরব উপত্যকার গুহাগুলি থেকে আমি প্রতিধ্বনি শ্রবণ করি এবং স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি সূর্যাস্তের দীর্ঘ ছায়ার দিকে কিন্তু আমি শুনতে পারি না একজন মানুষ অন্যের হৃদয়ে যে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে তার শব্দ এবং আমার কাছে কোনো ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার ছায়া নেই যে নিজেকেই আহ্বান জানায় নবী বলে।

    কোন্ মানুষ কথা বলবে যখন ইসাইয়া কথা বলেন, কোন্ সেই সাহসী ব্যক্তি যিনি গাইবেন দাউদের গান? বিচক্ষণতা কি এখন জন্ম নেবে, নবী সোলেমান তাঁর পিতার কাছে একত্রিত হওয়ার পর?

    আমাদের নবী কী, কার জিহ্বা ছিল তরবারি এবং তাদের ওষ্ঠগুলি অগ্নিশিখা?

    গালীলের ফসল-কুড়ানিদের জন্য কি তারা পিছে ফেলে যায় ফসলসহ খড়কুটো অথবা একটি পতিত ফল উত্তর-দেশের ভিক্ষুকদের জন্য? সেখানে কেউ ছিলনা একমাত্র তিনি ছাড়া রুটির টুকরোটা ভেঙে ফেলতে যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা সেঁকেছেন এবং ঢেলে দিতে মদ, যা তাদের পবিত্র পা ইতিমধ্যেই অতিক্রম করে গেছে।

    এটা হচ্ছে কুমোরের হাত যাকে আমি সম্মান করি, যে হাত বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত পণ্য কেনে না।

    আমি তাদেরকে সন্ধান করি যারা গ্রাম্য লোকের মতো পোশাক পরার চেয়ে তাঁতে বসে থাকে।

    কে এই নাজারেতের যিশু এবং তিনি কী? একটা মানুষ যে তাঁর মনকে জীবন্ত রাখার জন্য কোনো ঝুঁকি নেয় না। অতঃপর সে বিস্মৃতির ভেতরে বিবর্ণ হয়ে যাবে এবং সেটাই হল তাঁর সমাপ্তি।

    আমি তোমাদের কাছে প্রার্থনা করি তাঁর কথা ও কর্ম দিয়ে আমার শ্রবণইন্দ্রিয় ভারী করে তুলো না। আমার হৃদয় প্রাচীন নবীতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে এবং সেটাই যথেষ্ট।

    যিশুর অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য জন : যিশু সম্পর্কে

    তোমরা আমাকে যিশু সম্পর্কে বলতে বলো, কিন্তু কীভাবে আমি একটা ফাঁপা নলখাগড়ার ভেতরে পৃথিবীর তীব্র আবেগসমৃদ্ধ গান গাওয়ার লোভ সামালাতে পারি?

    দিনের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে যিশু তাঁর পিতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি তাকে দেখতেন মেঘ ও মেঘের ছায়ার ভেতরে যা পৃথিবীর উপরিভাগ অতিক্রম করে যায়। তিনি দেখেছিলেন সেতুর শান্ত জলে পিতার মুখের প্রতিফলন এবং বালির ওপরে তাঁর মূর্ছিত পদচিহ্ন এবং প্রায়ই তিনি তাঁর চোখ বন্ধ করতেন সেই পবিত্র চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে।

    পিতার কণ্ঠে রাত্রি তার সঙ্গে কথা বলত এবং নির্জনতার ভেতরে তিনি শুনতে পেতেন প্রভুর দেবদূতেরা তাঁকে ডাকছে এবং যখন তিনি ঘুমুতে যাবার জন্য স্থির হয়েছেন তখন শুনতে পান স্বপ্নের ভেতরে স্বর্গের ফিসফিসানি।

    প্রায়ই তিনি আমাদের সঙ্গে আনন্দিত হতেন এবং আমাদের ডাকতেন ভাই বলে।

    লক্ষ্য করো, তিনি ছিলেন প্রথম শব্দ, যা আমাদেরকে ভাই বলে আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু অক্ষরগুলি উচ্চারিত হয়েছিল গতকাল।

    তোমরা জানতে চাও কেন আমি তাকে প্রথম শব্দ বলে ডাকি?

    আমার উত্তর মনোযোগ দিয়ে শোনো :

    শুরুতে ঈশ্বর, মহাশূন্যের ভেতরে চলাচল করতেন এবং তাঁর পরিমাপহীন জাগরণের বাইরে জন্মেছিল পৃথিবী এবং তার থেকে ঋতুগুলি।

    তারপর ঈশ্বর কথা বললেন এবং তাঁর কথারাই হল মানুষ এবং মানুষ ছিল একটা আত্মা ঈশ্বরের আত্মার কারণে।

    যখন ঈশ্বর কথা বললেন, ক্রাইস্ট ছিল তার প্রথম শব্দ এবং শব্দটি ছিল যথাযথ এবং নাজারেতের যিশু যখন পৃথিবীতে এলেন তখন প্রথম শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল আমাদের উদ্দেশে এবং সেই কথার শব্দ তৈরি করেছিল মাংস ও রক্ত।
    যিশু ছিল মানুষের উদ্দেশে উচ্চারিত ঈশ্বরের প্রথম শব্দ, যেন একটা কুঞ্জবনে একটি আপেল গাছ, যার অন্য গাছদের চেয়ে একদিন আগে পল্লবিত হয়ে ওঠা উচিত এবং ঈশ্বরের কুঞ্জবনে সেইদিন হচ্ছে একটি অপরিমেয় কাল।

    সবচেয়ে উচ্চতম মর্যাদাসম্পন্ন প্রাণের পুত্র ও কন্যা হলাম আমরা কিন্তু যিশু ছিলেন প্রথম সন্তান, যিনি বসবাস করতেন নাজারেতে, হেঁটে বেড়াতেন আমাদের ভেতরে এবং আমরা তাকে দেখতাম।

    এই সবকিছুই আমি তোমাদেরকে বলছি এ কারণে যেন তোমরা তাঁকে শুধু মনের ভেতরেই নয় বরং আত্মার ভেতরেও উপলব্ধি করতে পারো। মনের ওজন নেওয়া ও তা পরিমাপ করা যায় কিন্তু এটা হচ্ছে আত্মা যা জীবনের হৃদয়ে পৌঁছায় এবং আলিঙ্গন করে গোপনীয়তাকে এবং আত্মার বীজগুলি হল মৃতুহীন।

    বাতাস প্রবাহিত হতে পারে তারপর থামতে পারে এবং সমুদ্র ফুলে উঠতে পারে এবং তারপর ক্লান্ত হতে পারে কিন্তু জীবনের হৃদয় হচ্ছে একটা সম্পূর্ণ গোলক এবং তা স্থির এবং নক্ষত্রপুঞ্জ যাকে উজ্জ্বল করে তোলে এবং তা চিরকালের জন্য নির্ধারিত।

    একজন গ্রিক নাগরিকের প্রতি পম্পেইবাসী মান্নাস : সেমিটীয় দেবতা সম্পর্কে

    প্রতিবেশী ফিনিসীয় এবং আরবদের মতোই ইহুদিরাও তাদের ঈশ্বরকে কষ্ট দেবে না এক মুহূর্তের জন্য বাতাসের ওপর বিশ্রাম নিতে।

    তারা তাদের দেবতা সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তাশীল এবং অতি মনোযোগী তারা অন্যের প্রার্থনা, পূজা ও উৎসর্গের ব্যাপারে।

    যখন আমরা, এই রোমানেরা ঈশ্বরের উদ্দেশে মর্মরপাথরের মন্দির নির্মাণ করি যেখানে এসব লোকেরা তাদের ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করে। যখন আমরা পরমানন্দের ভেতরে থাকি তখন আমরা গান গাই এবং নাচি জুপিটার ও জুনোর বেদির চারপাশে, কখনও মার্স ও ভেনাসের চারপাশে এবং তারা তাদের মগ্নতার ভেতরে পরে আছে পাটের তৈরি পোশাক এবং ছাইভস্মে মস্তিষ্ক আবৃত- এবং শোকাবহ এই দিন যা তাদের জন্ম দিয়েছিল।

    যিশু, সেই মানুষটি, আনন্দের অস্তিত্ব হিসেবে যিনি ঈশ্বরকে প্রকাশ করেন, তারা তাঁকে নির্যাতন এবং হত্যা করেছিল।

    এসব মানুষ একজন সুখী ঈশ্বরের সঙ্গে আনন্দিত হতে পারে না। তারা কেবলই চেনে তাদের যন্ত্রণার ঈশ্বরদের।

    এমনকি যিশুর বন্ধু ও শিষ্যদের ভেতরে যারা তাঁর আনন্দোচ্ছ্বাস সম্পর্কে জানত এবং তাঁর উচ্চহাসি শুনেছিল, তারা তাঁর দুঃখের একটা প্রতিমূর্তি তৈরি করে নিত এবং পূজা করত সেই প্রতিমূর্তির।

    এ ধরনের প্রার্থনার ভেতরে তাদের ঈশ্বরের উত্থান ঘটত না, বরং তাদের ঈশ্বর পতিত হত তাদেরও নিচে।

    যা হোক আমি বিশ্বাস করি যে, দার্শনিক যিশু, যিনি সক্রেটিসের মতো ছিলেন না এবং ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তাঁর নিজের জাতি ও অন্যান্য জাতির ওপর।

    কারণ, আমরা সকলেই ক্ষুদ্র সন্দেহ এবং বেদনার প্রাণী। যখন কোনো মানুষ আমাদেরকে বলে, ‘চলো ঈশ্বরের সঙ্গে উল্লসিত হই’ তখন আমরা তার কথায় কর্ণপাত করি না। অদ্ভুত হল যে মানুষের এই বেদনা তৈরি হয়েছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে।

    এইসব মানুষ আবিষ্কার করবে অন্য এ্যাডোনিসকে, একজন ঈশ্বর, যে খুন হয়েছিল বনের ভেতরে এবং তারা তার মৃত্যু উদ্‌যাপন করবে। এটা একটা করুণা কারণ তারা তাঁর উচ্চহাসি শ্রবণ করেনি।

    চলো আমরা অপরাধ স্বীকার করি রোমানরা যেভাবে গ্রিকদের কাছে স্বীকার করে। আমরা কি এথেন্সের রাস্তায় সক্রেটিসের উচ্চহাসি শুনি নাই? আমরা কি চিরকালের জন্য হেমলকের পেয়ালাকে ভুলে যাব, এমন কি ডায়োনিসাসের নাট্যশালাকেও?

    বরং আমাদের পিতাদেরকে রাস্তার বাঁকে দাঁড় করিয়ে সমস্যা সম্পর্কে খোশগল্প করোনা এবং অর্জন করো একটা সুখী মূহুর্ত, যা আমাদের সব মহৎ মানুষের বেদনাময় সমাপ্তিকে স্মরণ করছে।

    পন্টিয়াস পিটুলাস : পূর্বাঞ্চলীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রার্থনারীতি সম্পর্কে

    তাঁকে আমার সামনে আনার আগেই তাঁর সম্পর্কে আমার স্ত্রী বহুবার বলেছিল কিন্তু আমার কাছে তা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

    আমার স্ত্রী ছিল কল্পনাবিলাসী এবং বহু রোমান নারীর মতোই তার পর্যায়ে তাকে দেওয়া হয়েছিল পূর্বাঞ্চলীয় ধর্মীয় আচার ও প্রার্থনারীতি এবং এই প্রার্থনারীতি ছিল সাম্রাজ্যের জন্য ভয়ংকর এবং যখন তারা আমাদের নারীর হৃদয়ে পথ খুঁজে পায় তখন তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

    মিশর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যখন আরবরা তার কাছে তাদের একজন মরুভূমির ঈশ্বরকে নিয়ে এসেছিল এবং গ্রিস অতিক্রম করেছিল ও পতিত হয়েছিল ধূলায় যখন এ্যাসতারতে এবং তার সাত যুবতী-সঙ্গী এসেছিল সিরীয় তীরভূমি থেকে। যিশুকে আমি আগে কখনও দেখিনি, তাঁকে আমার কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল অপরাধী হিসেবে যেন তিনি নিজের জাতির শত্রু এবং রোম সাম্রাজ্যেরও।

    তাঁকে বিচারকক্ষে নেওয়া হয়েছিল তাঁর অস্ত্র তাঁর শরীরের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে।

    আমি মঞ্চে বসেছিলাম এবং তিনি আমার দিকে হেঁটে এলেন দীর্ঘ ও দৃঢ় পদক্ষেপে; তারপর দাঁড়ালেন সোজা হয়ে এবং তাঁর মাথা ছিল উঁচু।

    সেই মুহূর্তে আমার ওপর যা উঠে এল আমি তার তল পেলাম না কিন্তু হঠাৎ করে তা আমার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হল, যদিও তা আমার ইচ্ছাশক্তি নয়, বেড়ে উঠতে, এবং মঞ্চ থেকে নেমে যেতে এবং পতিত হতে তাঁর সম্মুখে।

    আমি অনুভব করলাম যেন সিজার কক্ষে প্রবেশ করলেন, একটা মানুষ, বৃহত্তর, এমনকি রোম সম্রাজ্যের চেয়েও।

    কিন্তু এটা মুহূর্তমাত্র স্থায়ী হল এবং তারপর আমি দেখলাম একজন মানুষ যে রাজনৈতিক প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত তার নিজের লোকদের মাধ্যমে এবং আমি ছিলাম তাঁর গভর্নর এবং তাঁর বিচারক।

    আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি। তিনি শুধুই আমার দিকে তাকিয়েছিলেন এবং তাঁর দৃষ্টিতে ছিল করুণা, যেন এটা ছিলেন তিনিই, যিনি আমার গভর্নর এবং আমার বিচারক।

    তিনি নীরব হয়ে রইলেন এবং তখনও তাকিয়েছিলেন আমার দিকে এবং তাঁর চোখে ছিল করুণা।

    তারপর আমি বাইরে এলাম এবং জনগণ আমাকে দেখে কান্না থামাল এবং আমি বললাম, ‘এই লোকের সঙ্গে তোমাদের কী কাজ?’

    তারা চিৎকার করে উঠল যেন একটি কণ্ঠই চিৎকার করছে, ‘আমরা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করব। সে আমাদের ও রোমানদের শত্রু।

    কেউ একজন বলল, ‘সে কি বলে নাই, সে মন্দির ধ্বংস করবে এবং এটা কি সে নয়, যে দাবি করেছিল সম্রাজ্য? সিজার ছাড়া আমাদের কোনো রাজা নেই।’

    তারপর আমি তাদেরকে পরিত্যাগ করে পুনরায় বিচারকক্ষে ফিরে গেলাম এবং দেখতে পেলাম তিনি একাকী দাঁড়িয়ে আছেন এবং তখনও উঁচু করেছেন তাঁর মাথা।

    আমি স্মরণ করলাম কী আমি পড়েছিলাম যা একজন গ্রিক দার্শনিক বলেছিলেন, ‘একাকী মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ।’ সেই মুহূর্তে নাজারেতবাসীরা তাঁর জাতির চেয়েও বৃহত্তর ছিল।

    আমি তাঁর প্রতি কোনো ধরনের নম্রতা অনুভব করলাম না। তিনি ছিলেন আমার ক্ষমাশীলতার ঊর্ধ্বে।

    তারপর আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনি কি ইহুদিদের রাজা?

    তিনি কোনো কথা বলেননি।

    আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি বলেননি যে, আপনি ইহুদিদের রাজা?

    তখন তিনি আমার দিকে তাকালেন।

    তারপর খুবই শান্ত স্বরে তিনি জবাব দিলেন, ‘তুমিই আমাকে রাজা বলে ঘোষণা করছ। সম্ভবত আমি এই প্রান্তে জন্মেছিলাম এবং সেই কারণে আমি সত্যের পক্ষে স্বাক্ষী দিয়েছি।’

    লক্ষ্য করো একজন মানুষ এরকম মুহূর্তে সত্য সম্পর্কে কথা বলছে।

    অধৈর্য হয়ে আমি উচ্চৈঃস্বরে কথা বললাম, ‘সত্য কী? নিরপরাধের কাছে সত্য কী, যখন ঘাতকের হাত ইতিমধ্যেই তাঁর ওপর নেমে এসেছে।’

    তারপর যিশু ক্ষমতার সঙ্গে বললেন, ‘আত্মা ও সত্যের উপস্থিতি ছাড়া কেউই পৃথিবী শাসন করবে না।’

    আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি আত্মা?’

    তিনি বললেন, — এমনকি তুমিও আত্মা, যদিও তুমি তা জানো না।’

    আত্মা ও সত্য কী, যখন আমি রাষ্ট্রের খাতিরে এবং তারা হিংসা থেকে প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য একজন নিষ্পাপ মানুষকে সরবরাহ করে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত

    কোনো মানুষ, জাতি ও সাম্রাজ্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবে না আত্মাতৃপ্তির দিকে যেতে যেতে।

    আমি আবার বললাম, ‘আপনি কি ইহুদিদের রাজা?’

    তিনি উত্তরে বললেন, ‘তুমিই শুধু একথা বলছ। এই সময়ের আগেই আমি পৃথিবী দখল করেছি।’

    সব কথার মধ্যে শুধুমাত্র এটাই ছিল অনুচিত যা তিনি বলেছিলেন, কেননা রোমানরাই দখল করেছিল পৃথিবী।

    জনগণের কণ্ঠস্বর আবার বেড়ে গেল এবং তা আগের চেয়ে আরও বেশি মনে হল।

    আমি আসন থেকে অবতরণ করলাম এবং তাঁকে বললাম, ‘আমাকে অনুসরণ করুন।’

    আমি আবার প্রাসাদের সিঁড়ির ওপর দাঁড়ালাম এবং তিনি আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। জনগণ তাঁকে দেখে উন্মত্ত বজ্রের মতো গর্জন করে উঠল এবং তাদের উচ্চ কলরবের ভেতরে আমি ‘তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করো, ‘তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করো’ ছাড়া আর কিছুই শুনলাম না।

    তারপর যাজকের কাছে আমি তার বিরোধিতা করলাম এবং যাজক আমার কাছে তার বিরোধিতা করলেন এবং আমি তাদেরকে বললাম, ‘এই লোকটাকে নিয়ে আপনারা কী করবেন।’ যদি এটা আপনাদের আকাঙ্ক্ষা হয় তাহলে রোমান সৈন্যদেরকে আপনাদের সঙ্গে রাখুন তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য।’

    লোকটাকে নগ্ন করা হয়েছিল, চাবুক মারা হয়েছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল।

    আমি পারতাম আমার ক্ষমতা দিয়ে তাকে রক্ষা করতে, কিন্তু তাকে রক্ষা করলে বিপ্লব সংঘটিত হত এবং এটা ছিল সবসময়ই রোমান প্রদেশের একজন গভর্নরের জন্য বিচক্ষণতা এবং বিজিত জাতির ধর্মীয় দ্বিধার প্রতি অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন না করা।

    এই সময় পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করি যে, লোকটা একজন আন্দোলনকারীর চেয়েও অধিক কিছু। আমি যে আদেশ দিয়েছিলাম তা আমার ইচ্ছা ছিল না বরং তা ছিল রোমের খাতিরে।

    অল্প কিছুদিন পরই আমরা সিরিয়া ত্যাগ করলাম এবং সেইদিন থেকে আমার স্ত্রী দুঃখভারাক্রান্ত নারীতে পরিণত হয়েছে। কখনও কখনও এখানে এই বাগানের ভেতরে আমি তার মুখমণ্ডলে একটা বিয়োগান্তক নাটক দেখতে পাই।

    আমি বলেছিলাম আমার স্ত্রী রোমের নারীদের কাছে যিশু সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু বলে।

    লক্ষ্য করো সেই মানুষটিকে আমি যার মৃত্যু ঘোষণা করেছিলাম সে ফিরে এসেছে ছায়ার পৃথিবী থেকে এবং প্রবেশ করছে আমার নিজের গৃহে

    আমার ভেতরে আমি বারবার জিজ্ঞাসা করি, সত্য কী এবং কোটি সত্য নয়।

    এটা কি এমন হতে পারে যে সিরীয়রা রাত্রির শান্ত ও স্থির নীরবতার ভেতরে আমাদেরকে দখল করে নিচ্ছে? বস্তুতপক্ষে তেমন না-হওয়াই উচিত।

    কারণ রোম-সাম্রাজ্যের অবশ্যই প্রয়োজন সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করা আমাদের স্ত্রীদের দুঃস্বপ্নের বিরুদ্ধে।

    এফিসাসে বার্থোলোমিউ : দাস ও গৃহহীনদের সম্পর্কে

    যিশুর শত্রুরা বলে যে, তিনি তাঁর আবেদনকে দাস ও গৃহহীনদের সামনে তুলে ধরতেন এবং তাদেরকে উস্কানি দিতেন তাদের প্রভুর বিরুদ্ধে। তারা তা বলত কারণ তিনি ছিলেন বিনয়ী, তিনি নিজস্ব ভঙ্গিতে মানুষকে আহ্বান জানাতেন, যদিও তিনি অনুসন্ধান করতেন তাঁর নিজস্ব উৎসের জন্য গোপনীয়তা।

    চলো আমরা যিশুর নেতৃত্ব ও তাঁর অনুসারীদের কথা মনোযোগের সঙ্গে চিন্তা করি।

    শুরুতে তিনি উত্তরের দেশ থেকে কয়েকজন সঙ্গী পছন্দ করেন এবং তারা ছিল স্বাধীন মানুষ। তাদের শরীর ছিল শক্তিশালী এবং আত্মা ছিল দুঃসাহসী এবং গত দুই বছরে তারা স্বেচ্ছায় ও অবজ্ঞার সঙ্গে মৃত্যুকে মোকাবেলা করার সাহস অর্জন করেছিল।

    তোমরা কি মনে কর এইসব মানুষেরা দাস অথবা গৃহহীন ছিল? তোমরা কি মনে কর লেবানন অথবা আর্মেনিয়ার গর্বিত যুবরাজ তাদের গন্তব্য ভুলে গেছে যিশুকে ঈশ্বরের নবী হিসেবে গ্রহণ করে?

    অথবা তোমরা কি মনে করো উচ্চতম পর্যায়ে জন্মগ্রহণকারী এ্যান্টিওচ, বাইজেনটাইন, এথেন্স ও রোমের নারীরা মুগ্ধ হতে পারে দাসদের নেতার কণ্ঠস্বরে?

    না, নাজারেতবাসীরা ভৃত্যদের সঙ্গে ও প্রভুদের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল না প্রভুদের সঙ্গে ভৃত্যদের বিরুদ্ধে। একজনের বিরুদ্ধে অন্যজনের সঙ্গে যিশু কখনও ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানুষের ওপরের মানুষ, একটি স্রোতোধারা যা তাঁর মাংসপেশিতে দৌড়ায় এবং পরাক্রমশীলতা ও তীব্র আবেগজনিত অনুভূতিসহ একত্রে গান গায়।

    যদি সততা নিরাপত্তার ভেতরে শুয়ে থাকে তাহলে তিনি ছিলেন সমস্ত মানুষের ভেতরে সবচেয়ে সৎ। যদি চিন্তা, কথা ও কর্মে স্বাধীনতা থাকে তাহলে তিনি সমস্ত মানুষের ভেতরে সবচেয়ে স্বাধীন। যদি গর্বের ভেতরে উঁচুপর্যায়ের জন্ম হয়ে থাকে তাহলে তা প্রাকৃতিক রীতিতে ভালোবাসা উৎপন্ন করে এবং একাকিত্বের ভেতরে তা চিরকালীন কোমলতা ও মর্যাদাসম্পন্নতা। তারপর তিনি ছিলেন সমস্ত মানুষের ভেতরে উচ্চপর্যায়ের জন্মগ্রহণকারী।

    ভুলে যেও না যে শুধুমাত্র শক্তিশালী ও দ্রুতগতিসম্পন্নরাই প্রতিযোগিতায় জয়ী এবং তৃপ্ত হবে এবং সেই যিশুকে রাজমুকুট পরাবে তারা, যারা তাকে ভালোবাসে এবং যারা তার শত্রু, যদিও তারা তা জানত না।

    এমনকি এখন তাঁকে প্রতিদিন মুকুট পরায় আর্টেমিসের যাজিকারা তাদের মন্দিরের গোপনীয় স্থানে।

    ম্যাথু : যিশু সম্পর্কে

    এক সন্ধ্যায় যিশু একটা কারাগারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কারাগারটি ছিল দাউদের সুউচ্চ দালানের ভেতরে এবং আমরা তার পেছনে হাঁটছিলাম।

    হঠাৎ করেই তিনি মাথা নিচু করে কপোল ছোঁয়ালেন কারাগারের দেয়ালের সঙ্গে এবং বলতে লাগলেন :

    ‘হে আমার ভায়েরা, সেই প্রাচীনকাল থেকে তোমাদেরকে চিনি। এই বাধার দেয়ালের পিছনে আমার হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছে তোমাদের হৃদয়স্পন্দনের সঙ্গে। আমার স্বাধীনতার ভেতরে তোমরা মুক্ত হতে পারবে এবং আমার ও আমার সহকর্মীদের সঙ্গে হাঁটতে পারবে।

    ‘তোমরা সীমাবদ্ধ কিন্তু একা নাও। বহু বন্দি আছে যারা উন্মুক্ত রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়। তাদের পাখার পালক কাটা নয়, ময়ূরের মতো তারা পাখা ঝাপটায় যদিও উড়তে পারে না।

    ‘আমার দ্বিতীয় দিনের ভায়েরা, আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের সেলগুলি পরিদর্শন করব এবং এগিয়ে দেব আমার কাঁধ তোমাদের বোঝা বইতে। কারণ নিষ্পাপ ও অপরাধীরা বিভক্ত হয় না এবং কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত হাতের দুটি হাড়ের মতো বিচ্ছিন্ন হয় না তারা কখনও।

    ‘আমার আজকের দিনের ভায়েরা, যে দিনটা হচ্ছে আমার। তোমরা সাঁতার কেটেছিলে স্রোতের বিরুদ্ধে এবং ধরা পড়েছিলে। তারা বলে আমিও স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটব। সম্ভবত শিঘ্রই আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব—আইনভঙ্গকারীদের ভেতরে একজন আইনভঙ্গকারী।

    ‘যেদিন এখনও আসেনি আমার সেই দিনের ভায়েরা, এই দেয়াল পতিত হবে এবং এই সব পাথর থেকে তৈরি হবে বিভিন্ন আকৃতি তার দ্বারা, যার হাতুড়ি হচ্ছে আলো এবং বাটালি হচ্ছে বাতাস এবং তোমরা আমার নতুন দিনের স্বাধীনতার ভেতরে দাঁড়াবে স্বাধীন মানুষের মতো।’

    এসব কথা বলে যিশু হাঁটতে লাগলেন এবং তাঁর হাত ততক্ষণ কারাগারের দেয়ালের ওপর ছিল যতক্ষণ তিনি দাউদের সুউচ্চ অট্টালিকা অতিক্রম করে না যান।

    এ্যানডু : পতিতাদের সম্পর্কে

    তাঁকে ছাড়া জীবনের তিক্ততা মৃত্যুর তিক্ততার চেয়ে বেশি। দিনগুলি ছিল শান্ত যখন তিনি নীরব ছিলেন। শুধুমাত্র আমার স্মৃতির প্রতিধ্বনি পুনরাবৃত্তি করে তাঁর কথা কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর নয়।

    একবার আমি শুনেছিলাম তিনি বলছেন, ‘তোমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষার ভেতরে সামনে এগিয়ে যাও শস্যক্ষেতের দিকে এবং পদ্মফুলের পাশে বসো এবং তোমরা শুনতে পাবে সূর্যালোকে তাদের গুঞ্জনধ্বনি। তারা পোশাক বয়ন করে না, তৈরি করে না কাঠ ও পাথর দিয়ে আশ্রয়, যদিও তারা গান গায়।

    ‘তিনি হলেন সেই জন, যিনি তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করতে কাজ করেন রাতে এবং তাঁর সাবলীলতার শিশির ঝরে পড়ে তাদের পাপড়ির ওপর

    ‘তোমরা কি তাঁর পরিচর্যায় নেই যে কখনও ক্লান্ত হয় না এবং বিশ্রাম নেয় না?’

    একবার আমি শুনেছিলাম তিনি বলছেন, ‘আকাশের পাখিদেরকে গণনা ও তালিকাভুক্ত করেছিল তোমাদের পিতা, এমনকি তোমাদের মাথার চুলের সংখ্যাও। একটি পাখিও তীরন্দাজের পায়ে এসে পড়বে না, ধূসর হবে না তোমাদের মাথার একটি চুলও অথবা তাঁর ইচ্ছা ছাড়া যুগের শূন্যতার ভেতরে তা পতিতও হবে না।’

    আরও একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের হৃদয়ের ভেতরে তোমাদের গুঞ্জনধ্বনি শুনেছিলাম : ‘আমাদের ঈশ্বর আমাদের প্রতি আরও ক্ষমাশীল হবেন হে ইব্রাহিমের সন্তানেরা, তারপর ক্ষমাশীল হবেন তাদের প্রতি, যারা শুরুতে তাঁকে চিনত না।’

    ‘কিন্তু আমি তোমাদেরকে বলি, আঙুরবাগানের মালিক যিনি সকালে আঙুর জড়ো করার জন্য একজন শ্রমিককে ডাকেন এবং সূর্যাস্তের সময় ডাকেন অন্যজনকে, যদিও দুজনকেই তিনি সমান মজুরি দান করেন, বস্তুতপক্ষে লোকটি ন্যায্যতা প্রতিপাদন করেছেন। তিনি কি নিজের ইচ্ছায় এবং নিজের ভাণ্ডার থেকে এসব অর্থ প্রদান করেন না?

    সুতরাং আমার পিতা কি তাঁর বিশাল প্রাসাদের দরজা উন্মুক্ত করবেন ইহুদি নয় এরকম ব্যক্তির কড়ানাড়ার শব্দে, এমনকি তোমাদেরও। কারণ, তাঁর কান একই ভালোবাসার নতুন গান শ্রবণ করে বিশেষ অভ্যর্থনাসহ কারণ, এটা হচ্ছে তাঁর হৃদয়ের কমবয়সী তার।

    আরও একবার আমি শুনেছিলাম তিনি বলছেন, ‘স্মরণ কর : প্রয়োজনের ভেতরে একজন চোর হচ্ছে মানুষ, একজন মানুষ ভয়ের ভেতরে মিথ্যাবাদী, কিন্তু একজন শিকারি যাকে শিকার করে তোমাদের রাত্রির নৈশপ্রহরী, আবার তাকেই শিকার করে তার নিজস্ব অন্ধকারের প্রহরীরা।

    ‘আমি তাদের সবার জন্য তোমাদের করুণা প্রার্থনা করব।

    ‘তাদের কি উচিত তোমাদের গৃহ অনুসন্ধান করা? তোমরা তোমাদের দরজা খোলো এবং আদেশ দাও তাদেরকে তোমাদের টেবিলে বসতে। যদি তোমরা তাদেরকে গ্রহণ না করো তাহলে তোমরা স্বাধীন হতে পারবে না যা তোমরা অঙ্গীকার করেছ তা থেকে।’

    একদিন আমি তাঁকে জেরুজালেমের বাজার এলাকা পর্যন্ত অনুসরণ করলাম। অন্যরাও অনুসরণ করল তাঁকে। তিনি আমাদেরকে বললেন অপব্যায়ী এক পুত্রের নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী এবং এক ব্যবসায়ীর কাহিনী, যে তার সমস্ত সম্পদ বিক্রি করেছিল যা দিয়ে সে একটা মুক্তা কিনতে পারত।

    কিন্তু তিনি পারসীয়দের সঙ্গে কথা বলছিলেন জনতার ভিড়ের ভেতরে এবং তারা একজন নারীকে ডাকছিল পতিতা বলে। তারা মুখোমুখি হল যিশুর এবং বলল, ‘সে তার বিয়েকে কলুষিত করেছে। কলুষিত করেছে শরীর ও মন।’

    তিনি স্থিরদৃষ্টিতে তাকে দেখলেন, হাত রাখলেন তার কপালের ওপর এবং তাকালেন তার চোখের গভীরতায়।

    তারপর তিনি সেই লোকদের দিকে ফিরলেন যারা ঐ নারীকে তাঁর কাছে নিয়ে এসেছিল এবং তিনি দীর্ঘক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন এবং তারপর তিনি মাটিতে বসে ধুলার ওপর আঙুল দিয়ে লিখতে শুরু করলেন।

    তিনি প্রতিটি মানুষের নাম লিখলেন এবং নামের পাশে লিখলেন সেই পাপ যা প্রত্যেক মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে।

    তিনি লিখলেন তারা লজ্জায় পালিয়ে গিয়েছিল রাস্তায়।

    আগেই তিনি সেই নারী সম্পর্কে লেখা শেষ করেছিলেন এবং আরও শেষ করেছিলেন আমাদের সম্পর্কে লেখা, যারা আমরা তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।

    আবার তিনি সেই নারীর দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘তোমরা অত্যধিক ভালোবেসেছে। যারা তোমাদেরকে এখানে নিয়ে এল তারা ভালোবাসে কিন্তু খুবই অল্প। কিন্তু তারা তোমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে একটা ফাঁদ হিসেবে আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য।

    ‘এখন শান্তির ভেতরে প্রবেশ কর।

    ‘তাদের কেউ এখানে নেই তোমাদের বিচার করতে এবং যদি এটা তোমাদের আকাঙ্ক্ষার ভেতরে থাকে বিচক্ষণ হয়ে ওঠা যেমন, তোমরা ভালোবাসছ। তারপর অনুসন্ধান করো আমাকে, কারণ মানুষের পুত্র তোমাদের বিচার করবে না।’

    আমি বিস্মিত হলাম যখন তিনি ঐ নারীকে একথা বললেন, কারণ তিনিও পাপমুক্ত ছিলেন না।

    সেই দিন থেকে আমি দীর্ঘ সময় ভেবেছি এবং আমি এখন জানি যে শুধুমাত্র হৃদয়ের শুদ্ধতা সেই তৃষ্ণাকে ক্ষমা করে দিতে পারে যা মানুষকে বদ্ধ পানির দিকে নেতৃত্ব দেয়।

    শুধুমাত্র পায়ের নিশ্চয়তাই তাকে একটা হাত প্রদান করতে পারে যে হোঁচট খায়।

    যদিও আমি বারবার বলি, তাঁকে ছাড়া জীবনের তিক্ততা মৃত্যুর তিক্ততা চেয়ে বেশি।

    একজন ধনী লোক : অধিকার সম্পর্কে

    ধনী লোকদের সম্পর্কে তিনি কটূক্তি করতেন। একদিন আমি তাঁকে বললাম, ‘জনাব, আত্মার শান্তির জন্য আমি কী করব?’

    তিনি আমাকে আদেশ দিলেন গরিবকে আমার অধিকার প্রদান করতে এবং অনুসরণ করতে তাঁকে।

    কিন্তু তাঁর কিছুই ছিল না, সুতরাং অধিকারের নিশ্চয়তা ও স্বাধীনতা সম্পর্কে তিনি জানতেন না; জানতেন না তার ভেতরে শুয়ে থাকা মর্যাদা ও আত্মসম্মান সম্পর্কে।

    আমার বাড়ির লোকজনের ভেতরে সাতজন দাস এবং তত্ত্বাবধায়ক রয়েছে, কেউ কেউ আঙুরক্ষেত ও কুঞ্জবনে শ্রম দেয় এবং কেউ কেউ দূরবর্তী দ্বীপগুলিতে জাহাজ চালায়।

    আমি মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনেছিলাম এবং আমার অধিকৃত সম্পদ দান করেছিলাম গরিবকে। কী ঘটেছিল আমার দাস, ভৃত্য, তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ভাগ্যে? তারাও ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছিল নগরের প্রবেশ পথ ও মন্দিরের প্রাঙ্গণে।

    না, সেই ভালো মানুষ অধিকারের গোপনীয়তার তলদেশ স্পর্শ করতে পারল না, কারণ তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা অন্যের দানের ওপর বেঁচে থাকতেন এবং তিনি ভাবতেন প্রত্যেক মানুষেরই একইভাবে বেঁচে থাকা উচিত।

    লক্ষ্য করো, একটি অসঙ্গতি ও একটি ধাঁধা : ধনীলোকদের কি উচিত তাদের প্রাচুর্য গরিবদেরকে দান করা এবং গরিবদের অবশ্যই ধনীদের কাপ ও খাবারের গ্রাস অর্জন করতে হবে, ধনীদেরকে তাদের টেবিলে অভ্যর্থনা জানানোর আগেই

    নিজেকে নিজের ভূমির প্রভু হিসেবে ঘোষণা করার আগেই সুউচ্চ অট্টালিকার ধারককে তার ভাড়াটিয়ার কাছে আমন্ত্রণকারী হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।

    যে পিঁপড়ে শীতের জন্য খাবার মজুদ করে সে অধিক বিচক্ষণ একটা ফড়িঙের চেয়ে যে একদিন গান গায় এবং অন্যদিন ক্ষুধার্ত থাকে।

    গত বিশ্রাম দিবসে তাঁর একজন অনুসারী বাজার এলাকায় বলেছিল, ‘স্বর্গের প্রবেশদ্বারে যিশু তাঁর চটি পরিত্যাগ করতে পারেন।’

    কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করি যে, কার বাড়ির প্রবেশপথে একজন সৎ ভবঘুরে তার চটি পরিত্যাগ করতে পারত? তাঁর নিজের কোনো গৃহ ছিল না, ছিল না প্রবেশপথ এবং প্রায় সময়ই তিনি চটি ছাড়াই চলতেন।

    প্যাটমোসে জন : উদার ও বিনয়ী যিশু

    আরও একবার আমি তাঁর সম্পর্কে বলব।

    ঈশ্বর আমাকে কণ্ঠস্বর দিয়েছেন এবং দিয়েছেন জ্বলন্ত ঠোঁট যদিও কোনো বক্তব্য দেননি। পরিপূর্ণ কথারও যোগ্য নই আমি যদিও আমি আমার ওষ্ঠের ওপর হৃদয়কে তলব করব।

    যিশু আমাকে ভালোবাসতেন এবং কেন ভালোবাসতেন তা আমি জানিনা 1

    আমি তাঁকে ভালোবাসতাম কারণ তিনি আমার আত্মাকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করে তুলতেন আমার মর্যাদার ওপরে এবং আমার তলদেশের ওপরের গভীরতায়।

    ভালোবাসা হচ্ছে একটা ঐশ্বরিক রহস্য

    যারা ভালোবাসে তাদের কাছে তা থাকে চিরকাল পৃথিবীহীন;

    কিন্তু যারা ভালোবাসে না তাদের কাছে এটা হৃদয়হীন একটা ঠাট্টা

    যিশু যখন আমাকে ও আমার ভাইকে আহ্বান জানান তখন আমরা শস্যক্ষেতে নিয়মিত কাজ করতাম।

    আমি তখন যুবক ছিলাম এবং শুধুমাত্র ভোরের কণ্ঠস্বরই আমার কান পরিদর্শন করে গিয়েছিল।

    কিন্তু তার কণ্ঠস্বর এবং কণ্ঠস্বরের তূর্যধ্বনি ছিল আমার শ্রমের সমাপ্তি এবং আবেগজনিত তীব্র অনুভূতির শুরু।

    সেখানে আমার জন্য কিছুই ছিল না সূর্যালোকে হেঁটে বেড়ানো এবং সময়ের চমৎকারিত্বের পূজা করা ছাড়া।

    তোমরা কি একটা রাজকীয় ক্ষমতাকে ধারণ করতে পারো যে রাজকীয় হওয়ার ব্যাপারে খুবই দয়ালু? একটা সৌন্দর্য যা খুবই দীপ্তিময় সুন্দর মনে হওয়ার ক্ষেত্রে

    তোমরা কি একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পাও তোমাদের স্বপ্নের ভেতরে যা নিজের মগ্নতার ভেতরে লজ্জিত?

    তিনি আমাকে ডেকেছিলেন এবং আমি তাকে অনুসরণ করেছিলাম।

    সেই সন্ধ্যায় আমি আমার পিতার গৃহে ফিরে এসেছিলাম আমার অন্য একটা আলখাল্লা নিতে এবং আমি আমার মাকে বললাম, নাজারেতের যিশু আমাকে তার সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’

    তিনি বললেন, ‘তাঁর পথে যাও হে আমার প্রিয়পুত্র তোমার ভাইয়ের মতো।

    এবং আমি তাঁর সঙ্গী হলাম।

    তাঁর সুগন্ধ আমাকে আহ্বান জানাল এবং আদেশ দিল শুধু আমাকে মুক্ত করা ছাড়া।

    ভালোবাসা হচ্ছে একজন ভদ্র আমন্ত্রণকারী যদিও অনাহূতদের কাছে তার গৃহ হচ্ছে মরীচিকা এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ।

    এখন আমি তোমাদের কাছে যিশুর অলৌকিকতা ব্যাখ্যা করব।

    আমরা হলাম মুহূর্তের অলৌকিকতার ইঙ্গিত, আমাদের ঈশ্বর এবং প্রভু ছিলেন সেই মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।

    যদিও এটা তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল না যে তাঁর ইঙ্গিত হবে আমাদের চেনা।

    আমি শুনেছিলাম তিনি পঙ্গুদেরকে বলছেন, ‘ওঠো। সোজা হয়ে দাঁড়াও এবং বাড়ি যাও, কিন্তু যাজকদেরকে বোলোনা যে, আমি তোমাকে সারিয়ে তুলেছি।’

    যিশুর হৃদয় খোঁড়াদের সঙ্গে ছিল না বরং তা ছিল শক্তিশালী ও সুস্থদের সঙ্গে।

    তাঁর হৃদয় অনুসন্ধান করত অন্য হৃদয় এবং তাঁর সম্পূর্ণ আত্মা অন্য আত্মাকে পরিদর্শন করত।

    এবং তাঁর আত্মা এইসব হৃদয় ও আত্মাকে পরিবর্তন করত।

    মনে হত এটা অলৌকিকতা কিন্তু আমার ঈশ্বর ও প্রভুর কাছে তা ছিল কেবলই প্রতিদিনের বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করার মতো।

    এখন আমাকে অন্য বিষয়ে কথা বলতে দাও।

    একদিন যখন তিনি এবং আমি একাকী শস্যক্ষেতে হাঁটছিলাম তখন আমাদের খুব ক্ষুধা পেয়েছিল এবং আমরা একটা বন্য আপেলগাছের কাছে এলাম।

    গাছের শাখায় তখন মাত্র দুটো আপেলই ঝুলছিল।

    তারপর তিনি গাছ ধরে ঝাঁকি দিলেন এবং আপেলদুটি মাটিতে পতিত হল।
    তিনি দুটো আপেলই তুলে একটা আমাকে দিলেন এবং অন্যটা রাখলেন তাঁর হাতে।

    ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমি আপেলটি খেয়ে ফেললাম এবং দ্রুত খেয়ে ফেললাম।

    তারপর আমি তাঁর দিকে তাকালাম এবং দেখলাম তিনি তখনও হাতে আপেলটা ধরে রেখেছেন।

    তিনি আপেলটা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটাও খেয়ে ফ্যালো।’

    আমি আপেলটা নিলাম এবং আমার নির্লজ্জ ক্ষুধা তা খেয়ে ফেলল।

    তারপর হাঁটতে হাঁটতে আমি তাঁর মুখের দিকে তাকালাম।

    কিন্তু কীভাবে আমি তোমাদেরকে বলব যে কী আমি দেখেছিলাম?

    একটি রাত্রি, যেখানে মোমবাতি পোড়ে শূন্যতার ভেতরে,

    একটা স্বপ্ন আমাদের গন্তব্যেরও ওপরে,

    একটি মধ্যাহ্ন যেখানে সমস্ত মেষপালক সুখে ও শান্তিতে থাকে, কারণ তাদের পশুর পাল চরে বেড়াচ্ছে।

    একটি সন্ধ্যা, একটি স্থিরতা এবং ঘরে ফেরা, তারপর একটি ঘুম এবং একটি স্বপ্ন।

    এই সবকিছুই আমি তাঁর মুখে দেখেছিলাম।

    তিনি আমাকে দুটো আপেল দিয়েছিলেন এবং আমি জানতাম তিনি ক্ষুধার্ত, এমনকি আমিও ছিলাম ক্ষুধার্ত।

    কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারি যে, আমাকে আপেল দুটো দিয়ে তিনি তৃপ্ত হয়েছিলেন। তিনি নিজে খেয়েছিলেন অন্য ফল, অন্য গাছের।

    আমি তাঁর সম্পর্কে তোমাদেরকে আরও বলতাম কিন্তু কীভাবে আমি তা বলব।

    যখন ভালোবাসা বিশাল হয়ে ওঠে তখন ভালোবাসা কথাহীন হয়ে পড়ে

    এবং যখন স্মৃতিরা অতিরিক্ত বোঝায় ভারাক্রান্ত তখন তা অনুসন্ধান করে নীরব গভীরতা।

    পিটার : প্রতিবেশী সম্পর্কে

    একবার আমার প্রভু ক্যাপারনাউমে বলেছিলেন :

    তোমাদের প্রতিবেশী হল তোমাদের অন্য সত্তা যা বসবাস করছে একটা দেয়ালের পেছনে। উপলব্ধির ভেতরে সমস্ত দেয়াল পতিত হবে।

    তোমরা জানো তোমাদের প্রতিবেশীরা হচ্ছে তোমার উন্নত সত্তা, পরিধান করেছে অন্য শরীর। দ্যাখো, তোমরা তাকে ভালোবাসো যেমন তোমরা নিজেকে ভালোবাসো।

    তিনি হলেন সর্বোচ্চ উচ্চতার সুস্পষ্ট প্রকাশ যাকে তোমরা চেনো না।

    ‘তোমাদের প্রতিবেশীরা হচ্ছে তোমাদের শস্যক্ষেত যেখানে তোমাদের আকাঙ্ক্ষার বসন্ত তাদের সবুজ পোশাকের ভেতরে হেঁটে বেড়ায় এবং যেখানে তোমাদের আকাঙ্ক্ষার শীতকাল স্বপ্ন দেখে বরফাচ্ছাদিত উচ্চতার।

    তোমাদের প্রতিবেশীরা হচ্ছে একটা আয়না যেখানে তোমরা তোমাদের প্রসন্নতা লক্ষ্য করতে পারো যা উল্লাসের দ্বারা সুন্দর হয়ে ওঠে এবং তোমরা তা চেনো না এবং সুন্দর হয়ে ওঠে দুঃখভোগের দ্বারা যা তোমরা ভাগাভাগি করো না।

    আমি চাইব তোমাদের প্রতিবেশীদের তোমরা ভালোবাসো যেমন আমি তোমাদেরকে ভালবেসেছি।’

    তারপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীভাবে আমি আমার প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে পারি যে আমাকে ভালোবাসে না এবং আমার সম্পদের ওপরে যার লোভ আছে? এছাড়া সে প্রতবেশী আমার সম্পদ চুরি করবে?’

    তিনি বললেন, ‘যখন তোমরা ভূমি কর্ষণ করছ এবং তোমাদের পেছনে তোমাদের দাসের বীজ বুনছে, তখন কি তোমরা কিছুক্ষণের জন্য থামবে এবং পেছনে তাকাবে এবং একটা কবুতরকে উড়িয়ে দেবে তোমাদের কিছু বীজ খেয়ে ফেলতে? তোমাদের তা করা উচিত, তারপরও দেখবে তোমাদের গোলা ফসলে ভরে উঠবে।’

    যিশুর কথা শুনে আমি লজ্জিত হলাম এবং চুপ করে থাকলাম। কিন্তু আমি ভয় পাইনি কারণ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন।

    জেরুজালেমে একজন মুচি : নিরপেক্ষতা

    আমি তাঁকে ভালোবাসতাম না যদিও আমি ঘৃণা করতাম না তাঁকে। তিনি কি বলছেন তার প্রতি আমার কোনো মনোযোগ ছিল না। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম তাঁর কণ্ঠস্বর, কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর আমাকে মুগ্ধ করত।

    তিনি যা-কিছু বলতেন তা আমার মনের কাছে অস্পষ্ট ছিল কিন্তু তাঁর কথার যে সংগীত তা আমার কানে ছিল খুবই স্পষ্ট।

    বস্তুতপক্ষে অন্যেরা তাঁর শিক্ষা সম্পর্কে যা আমাকে বলত, তাঁর কথার মধ্যে তা ছিল না, এমনকি আমি জানতামও না তিনি যুদেয়ার পক্ষে না বিপক্ষে?

    মেরির প্রতিবেশী, নাজারেতের সুজান্না : যিশুর যৌবন এবং তাঁর পুরুষসুলভ গুণাবলি সম্পর্কে

    আমি যিশুর মা মেরিকে চিনতাম কাঠমিস্ত্রি যোশেফ-এর স্ত্রী হওয়ার আগেই, যখন আমরা দুজনেই অবিবাহিত।

    সেইসব দিনগুলিতে মেরি বিভিন্ন দৃশ্য দেখতে পেত এবং শুনতে পেত বিভিন্ন কন্ঠস্বর এবং সে স্বর্গীয় প্রতিনিধির সাথে কথা বলত, সে পরিদর্শন করে যেত তার স্বপ্নগুলিকে।

    নাজারেতের লোকেরা তার প্রতি মনোযোগী ছিল এবং তারা তার যাওয়া-আসা পর্যবেক্ষণ করত। তারা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত তার ভ্রূ ও পদক্ষেপের দিকে।

    কিন্তু কেউ কেউ বলত সে নিয়ন্ত্রণাধীন। তারা এটা বলত কারণ সে কেবলই যেত তার নিজস্ব সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে।

    যুবতী বয়সেই তাকে আমার বৃদ্ধা মনে হত, কারণ তার বিকশিত হওয়া এবং বসন্তে ফল পাকানোর ভেতরে ছিল একটা ফসল তোলার মৌসুম।

    সে জন্মেছিল এবং লালিত পালিত হয়েছিল আমাদের ভেতরে, যদিও সে ছিল উত্তর দেশ থেকে আসা বহিরাগতের মতো। তার চোখে সবসময় ছিল বিস্ময় এমন একজন মানুষ সম্পর্কে, আমাদের মুখমণ্ডলের সঙ্গে যার কোনো পরিচয় নেই।

    সে ছিল মিরিয়ামের মতোই অহংকারী, যে তার ভাইয়ের সঙ্গে কুচকাওয়াজ করত নীল নদী থেকে ঊষর জনহীন প্রান্তর পর্যন্ত।

    মেরি ছিল কাঠমিস্ত্রি জোসেফের বাগদত্তা।

    যখন যিশু মেরির গর্ভে তখন সে সারাদিন পাহাড়ের ভেতরে হেঁটে বেড়াত এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসত তার চোখে কমনীয়তা ও বেদনা নিয়ে।

    যখন যিশুর জন্ম হল, আমি জেনেছিলাম মেরি তার মাকে বলেছিল, ‘আমি হলাম ছাঁটাই করা করা হয়নি এরকম একটি গাছ। দ্যাখো এই তার ফল।’ ধাত্রী মাতা একথা নিজের কানে শুনেছিল।

    তিনদিন পর আমি তাকে দেখতে পেলাম। তার চোখে ছিল বিস্ময় এবং বক্ষে ছিল দ্রুতগতির স্পন্দন এবং তার দুই বাহু জড়িয়ে ছিল তার নবজাতককে মুক্তার খোলসের মতো।

    আমার প্রত্যেকেই মেরির ছেলেকে ভালোবাসতাম এবং তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখতাম। কারণ তাঁর শরীরে ছিল উষ্ণতা এবং সে স্পন্দিত হত জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে।

    ঋতুগুলি অতিবাহিত হতে থাকে এবং সে দিনে দিনে পরিপূর্ণ বালকে পরিণত হয়। আমাদের কেউই জানত না সে কী করত কিন্তু সবসময়ই মনে হত সে আমাদের প্রতিযোগিতার বাইরে। কিন্তু তাকে কেউ তিরস্কার করত না যদিও সে ছিল বিপদসংকুল ও অতিসাহসী।

    সে অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলা করত, অন্যরা তাঁর সঙ্গে খেলা করার চেয়ে।

    যখন তাঁর বয়স বারো বছর তখন একদিন সে একজন অন্ধকে নদী পার করে নিরাপদে খোলা রাস্তায় পৌছে দেয় এবং কৃতজ্ঞতার বশে অন্ধ লোকটি জিজ্ঞাসা করে, ‘ছোট্ট ছেলে, তুমি কে বলো তো?’

    সে উত্তরে বলল, ‘আমি ছোট ছেলে নই। আমার নাম যিশু।’

    অন্ধ লোকটি বলল, ‘তোমার পিতার নাম কী?

    এবং সে বলল, ‘ঈশ্বর আমার পিতা।’

    অন্ধ লোকটি এবার শব্দ করে হেসে উঠল এবং বলল, ‘খুব ভালো বলেছ হে ছোট্ট ছেলে, কে তোমার মা?’

    যিশু উত্তরে বলল, ‘আমি ছোট ছেলে নই এবং আমার মা হচ্ছে এই পৃথিবী।

    অন্ধ লোকটি বলল, ‘তাহলে লক্ষ্য করো, আমাকে নেতৃত্ব দিয়েছিল ঈশ্বরের পুত্র এবং পৃথিবী, এই নদীর স্রোত অতিক্রম করতে।’

    যিশু উত্তরে বলল, ‘আপনি যেখানে যাবেন আমি সেখানেই আপনাকে নেতৃত্ব দেব এবং আমার চোখদুটো সঙ্গ দেবে আপনার পা দুটোকে।’

    এবং সে বেড়ে উঠল তালগাছের মতো আমাদের বাগানগুলির ভেতরে।

    তাঁর বয়স যখন উনিশ তখন হৃদয়বৃত্তির ব্যাপারে সে ছিল মনোরম এবং তাঁর চোখ ছিল সুন্দর এবং দিনের চমকে পরিপূর্ণ।

    তাঁর মুখমণ্ডলে ছিল মরুভূমির তৃষ্ণা জলাভূমির জন্য।

    সে শস্যক্ষেতে হাঁটত একাকী এবং আমাদের চোখ তাঁকে অনুসরণ করত এবং আরও অনুসরণ করত নাজারেতের সব যুবতীর চোখ। কিন্তু আমরা তাঁর ব্যাপারে লাজুক ছিলাম।

    ভালোবাসা হল সৌন্দর্যের চিরকালীন লজ্জা যদিও ভালোবাসা চিরকাল তাড়া করে ফিরবে সৌন্দর্যকে।

    তারপর সেই বছরগুলি আদেশ দিল তাঁকে গালীলের মন্দির এবং বাগানগুলিতে কথা বলতে।

    একসময় মেরি তাঁকে অনুসরণ করতে লাগল তাঁর কথা এবং নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে। কিন্তু যখন সে এবং সেইসব মানুষ, যারা তাঁকে ভালোবাসত, একত্রে জেরুজালেমের দিকে চলে যেত তখন সে আর অনুসরণ করত না।

    কারণ উত্তরের দেশে জেরুজালেমের রাস্তায় আমরা প্রায়ই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হতাম এমনকি মন্দিরে উৎসর্গ দিতে যাওয়ার সময়ও।

    মেরি গর্বের সঙ্গে দক্ষিণের দেশের বশ্যতা স্বীকার করত।

    যিশু পূর্ব এবং পশ্চিমের দেশও ভ্রমণ করত। আমরা জানতামনা কোন ভূমি সে পরিদর্শন করত যদিও আমাদের হৃদয় অনুসরণ করত তাকে।

    কিন্তু মেরি অপেক্ষা করত গৃহের প্রবেশপথের ওপর এবং প্রতি সন্ধ্যায় তার চোখ অনুসন্ধান করত যিশুর ঘরে ফেরার পথ।

    যদিও তাঁর প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে সে আমাদেরকে বলত, ‘আমার ছেলে হওয়ার পরও সে একজন বিশাল মানুষ এবং খুবই বাকপটু আমার হৃদয়ের নীরবতার জন্য। কীভাবে আমি তাঁকে নিজের বলে দাবি করব?’

    আমাদের মনে হত যে মেরি বিশ্বাস করত না সমভূমিই পাহাড়ের জন্ম দিয়েছিল, তার হৃদয়ের সাক্ষ্য প্রমাণের ভেতরে সে দেখতে পেত না ঢালের মধ্যবর্তী উঁচু এলাকাই হচ্ছে শিখরে পৌঁছানোর পথ।

    সে মানুষটাকে চিনত কারণ যে ছিল তার পুত্র এবং তাকে খুব বেশি জানার সাহস দেখাত না।

    একদিন যখন যিশু জেলেদের সঙ্গে জলাভূমিতে মাছ ধরতে গেল তখন মেরি আমাদেরকে বলল, ‘মানুষ ক্লান্তিহীন অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছু নয়; যে বেড়ে ওঠে পৃথিবী থেকে এবং মানুষ আকুল আকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কিছু নয় যে নক্ষত্রকেও কামনা করে থাকে।

    ‘আমার পুত্র হচ্ছে একটা আকুল আকাঙ্ক্ষা। সে হল আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা নক্ষত্রের জন্য।

    ‘আমি কি বলেছিলাম আমার পুত্র? ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করতে পারেন, যদিও হৃদয়ের ভেতরে আমি তাঁর মা।’

    এখন মেরি ও তার পুত্র সম্পর্কে আরও অধিক বলা খুবই কঠিন, যদিও আমার গলা শুকিয়ে গেছে এবং আমার কথা এখন তোমাদের কাছে ক্রাচে ভর দিয়ে চলা পঙ্গুর মতো গিয়ে পৌঁছাবে। তবে আমাকে অবশ্যই সম্পর্কিত করতে হবে আমি যা দেখেছি এবং শুনেছি।

    এটা ছিল বছরের যৌবনের সময় যখন নক্ষত্রসদৃশ বনফুল ফুটেছিল পাহাড়ের ওপর তখন যিশু তার শিষ্যদেরকে আহ্বান জানাল এই বলে, ‘আমার সঙ্গে জেরুজালেমে এসো এবং নিজের চোখে দ্যাখো পাসোভার উৎসবে মেষশাবক হত্যা করার দৃশ্য।

    একই দিনে মেরি আমার দরজায় এল এবং বলল, ‘যিশু পবিত্র শহর অনুসন্ধান করছে। তুমি কি আমার ও অন্যান্য নারীদের সঙ্গে আসবে তাকে অনুসরণ করতে।’

    আমরা মেরি ও তার ছেলের পেছনে দীর্ঘ পথ হাঁটলাম জেরুজালেমে না-পৌঁছানো পর্যন্ত এবং সেখানে সঙ্গী হিসেবে নারী ও পুরুষেরা ছিল যারা প্রবেশদ্বারে আমাদের সম্ভাষণ জানাল। কারণ তাঁর আগমনবার্তা আগেই শুনেছিল তারা, যারা তাঁকে ভালোবাসত।

    কিন্তু সেই রাতে যিশু তাঁর লোকদের নিয়ে শহর পরিত্যাগ করে গেল।

    আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে সে বেথানীতে গেছে।

    মেরি আমাদের সঙ্গে সরাইখানায় রয়ে গেল তাঁর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়।

    সেই সপ্তাহের বৃহস্পতিবার যিশু বন্দি হয়েছিল।

    যখন আমরা শুনলাম সে বন্দি হয়েছে, মেরি একটা শব্দও উচ্চারণ করল না, কিন্তু তার চোখে আবির্ভূত হল সেই প্রতিশ্রুত আনন্দ এবং বেদনার পরিপূর্ণতা যা আমরা তার চোখে দেখেছিলাম যখন সে নাজারেতের কনে ছাড়া আর কিছুই নয়।

    সে কাঁদল না। সে শুধুই আমাদের ভেতরে চলাচল করতে লাগল একজন মায়ের প্রেতাত্মার মতো যে তার পুত্রের প্রেতাত্মার কাছে বিলাপ করবে না।

    আমরা নিচু হয়ে মেঝের ওপর বসে পড়লাম কিন্তু সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, হাঁটা চলা করছিল কক্ষের ওপরে ও নিচে।

    সে জানালার পাশে দাঁড়াল এবং স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল পূর্বদিকে এবং তার হাতের আঙুল দিয়ে চুলগুলিকে টেনে পেছন দিকে আঁচড়াল।

    ভোরবেলায় সে আমাদের মাঝে দাঁড়িয়েছিল স্থির হয়ে বন্যতার ভেতরে একটা পতাকার মতো যেখানে কোনো নিমন্ত্রণকারী নেই।

    আমরা কাঁদছিলাম কারণ আমরা জানতাম তার পুত্রের আগামীকাল সম্পর্কে কিন্তু সে কাঁদল না কারণ সে জানত তাঁর ভাগ্যে কী ঘটবে।

    তার হাড়গুলি ছিল তামা এবং মাংসপেশি ছিল প্রাচীন দেবদারু গাছ এবং তার চোখ ছিল আকাশের মতো প্রশস্ত এবং সাহসী।

    তোমরা কি শুনেছ একটা গায়ক পাখি গান গায় যখন তার বাসা বাতাসে ছিন্নভিন্ন হতে থাকে?

    তোমরা কি একজন নারীকে দেখেছ যার বেদনা কান্নার জন্য খুবই বেশি অথবা দেখেছ একটা আহত আত্মাকে যা বেড়ে উঠবে নিজস্ব বেদনার ওপরে?

    তোমরা সেরকম নারী দেখ নাই, কারণ মেরির উপস্থিতিতে তোমাদের কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল না এবং কোনো অদৃশ্য মাতাও তোমাদেরকে জড়িয়ে ধরে নাই।

    সেই স্থির মুহূর্তে যখন নৈঃশব্দের খুর নিদ্রাহীনদের বক্ষে আঘাত করতে লাগল তখন জিবিদী’র যুবক পুত্র দ্রুত ছুটে এসে বলল, ‘মা মেরি, যিশু সামনে এগিয়ে চলেছে। চলুন আমরা তাকে অনুসরণ করি।’

    মেরি তার হাত রাখল জনের কাঁধের ওপর এবং তারপর তারা বেরিয়ে গেল এবং আমরাও তাদেরকে অনুসরণ করলাম।

    আমরা যখন দাউদের উঁচু অট্টালিকার কাছে এলাম তখন দেখতে পেলাম যিশু তার ক্রুশ বহন করছে এবং তার চারপাশে বিশাল জনতার কোলাহল।

    এবং আরও দুটো লোক তাদের নিজের ক্রুশ বহন করছে।

    মেরির মাথা ছিল উঁচু এবং সে আমাদের সঙ্গে হাঁটছিল তাঁর পুত্রের পেছনে এবং তার পদক্ষেপ ছিল দৃঢ়।

    তার পেছনে হাঁটছিল ইহুদিদের ঈশ্বরতন্ত্র এবং রোম সাম্রাজ্য, হ্যাঁ পুরো পৃথিবী একজন স্বাধীন মানুষের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে।

    যখন আমরা পাহাড়ে পৌঁছালাম তখন তাঁকে ক্রুশের ওপরে বেঁধে উঁচু করে তোলা হয়েছে।

    আমি মেরির দিকে তাকালাম এবং তখন তার মুখকে কোনো সাহসী নারীর মুখ বলে মনে হচ্ছিল না। উর্বর মাটির মতোই তা ছিল প্রসন্ন, চিরকাল জন্ম দিচ্ছে এবং চিরকাল সমাহিত করছে তার সন্তানদের।

    তারপর তার চোখে নেমে এল যিশুর শৈশবের স্মৃতি এবং সে শব্দ করে বলে উঠল, ‘আমার পুত্র যে আমার পুত্র নয়, সে হল সেই মানুষ যে একবার আমার গর্ভ পরিদর্শন করেছে এবং আমি তোমার ক্ষমতার কারণে গর্বিতা হে পুত্র। আমি জানি তোমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা যা তোমার বাহু থেকে দৌড়াচ্ছে তা থেকে তৈরি হবে একটা জাতির সুখ ও সমৃদ্ধির স্রোতোধারা।

    ‘এই প্রচণ্ড ঝড়ে তুমি মারা যাও যেমন একবার আমার হৃদয় মারা গিয়েছিল সূর্যাস্তের কালে এবং এখন আমি বেদনার্ত হয়ে পড়ব।’

    সেই মুহূর্তে আমার আলখাল্লা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলার ইচ্ছা হল এবং আরও ইচ্ছা হল উত্তরদেশে পালিয়ে যেতে। কিন্তু হঠাৎ করে শুনলাম মেরি বলল, ‘আমার পুত্র যে আমার পুত্র নয়, তোমরা তাঁর সম্পর্কে যা যা বলেছ তা-ই তার মর্মবেদনার ভেতরে তাকে সুখী করে তুলবে। তার মুখের ওপর মৃত্যুর ছায়া হচ্ছে আলোর মতো এবং সে তোমাদের ওপর থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারে না।’

    যিশু তার মায়ের দিকে তাকাল এবং বলল, ‘এই মুহূর্ত থেকে তুমি হবে জনের মাতা।’

    জনের উদ্দেশে যিশু বলল, ‘এই নারীর প্রিয় পুত্রে পরিণত হও। তার বাড়িতে যাও এবং তোমার ছায়াকে নেতৃত্ব দাও সেই প্রবেশ পথকে অতিক্রম করতে যেখানে একসময় আমি দাঁড়াতাম। আমাকে স্মরণ করার মাধ্যমে এসব করো।’

    মেরি তার ডান হাত তুলল যিশুর দিকে যেন এক শাখাওয়ালা একটি বৃক্ষ সে। সে কেঁদে ফেলল, ‘পুত্র আমার, কে আমার পুত্র নয়, যদি সে ঈশ্বরের হয় তাহলে ঈশ্বর আমাদেরকে ধৈর্য দান করুন এবং দান করুন সেই জ্ঞান যদি তা মানুষের জ্ঞান হয়, তাহলে ঈশ্বর তাকে চিরকালের জন্য ক্ষমা করুন।

    ‘যদি তা ঈশ্বরের হয় তাহলে লেবাননের সব বরফ হবে তোমার অবগুণ্ঠন এবং যদি তা শুধুমাত্র যাজক এবং যোদ্ধাদের হয় তাহলে আমি তোমার নগ্নতার জন্য এই পোশাক নিয়ে আসব।’

    সেই মুহূর্তে স্বর্গ তাকে প্রকৃতির রীতিতে উৎপন্ন করল পৃথিবীতে, একটি কান্না এবং একটি শ্বাস-প্রশ্বাস।

    মেরিও তাকে প্রাকৃতিক রীতিতে উৎপন্ন করেছে মানুষের কাছে একজন আহত ও একটি গন্ধতরুকে।

    মেরি বলল, ‘এখন লক্ষ্য করো, সে চলে গেছে। যুদ্ধ শেষ। নক্ষত্রেরা দীপ্তিমান পোতাশ্রয়ে পৌঁছেছে জাহাজ এবং যে একসময় আমার হৃদয়ের ভেতরে শুয়ে থাকত সে এখন শূন্যতার ভেতরে স্পন্দিত হচ্ছে।’

    আমরা মেরির আরও কাছে সরে এলাম। তারপর সে আমাদেরকে বলল, ‘এমনকি মৃত্যুর ভেতরেও সে হাসে। সে মৃত্যু জয় করেছিল। বস্তুতপক্ষে আমি একজন বিজয়ীর মাতা।’ মেরি জেরুজালেমে ফিরে গিয়েছিল যিশুর যুবক শিষ্য জনের কাঁধে ভর দিয়ে।

    এবং সে ছিল পরিপূর্ণ এক নারী।

    যখন আমরা শহরের প্রবেশপথে পৌঁছালাম আমি ভালো করে তার মুখের দিকে লক্ষ্য করলাম এবং বিস্মিত হলাম, কারণ সেইদিন যিশুর মর্যাদা ছিল সব মানুষের ওপরে, যদিও মেরির মর্যাদা কম ছিল না।

    এই সবকিছুই এসেছিল বছরের বসন্তকালকে অতিক্রম করে যেতে।

    এখন শরৎকাল। যিশুর মা মেরি আবার তার বসবাসের জায়গায় ফিরে এসেছে এবং সে একা।

    দুটি বিশ্রাম দিবস আগে আমার হৃদয় ছিল আমার বক্ষের ওপর একটা পাথরের মতো, কারণ আমার পুত্র জাহাজে চড়ে টাইরিতে যাবার উদ্দেশ্যে আমাদেরকে ছেড়ে গিয়েছিল। সে নাবিক হবে।

    সে বলেছিল সে আর কোনদিনই ফিরবে না।

    এক সন্ধায় আমি মেরিকে অনুসন্ধান করলাম।

    যখন তার বাড়িতে প্রবেশ করলাম তখন সে তাঁতে বসেছিল,কিন্তু কাপড় বুনছিল না। সে তাকিয়েছিল নাজরেতের ওপর দিয়ে আকাশের দিকে

    আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘কেমন আছ মেরি?’

    সে তার দু’বাহু বাড়িয়ে দিল আমার দিকে এবং বলল, ‘এসো এসো এবং আমার পাশে বসো। এসো আমরা দুজনেই পাহাড়ের ওপর সূর্যের রক্ত ঢেলে দেওয়া দেখি।’

    আমি একটা বেঞ্চির ওপর তার পাশে বসলাম এবং দুজনেই জানালা দিয়ে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

    এক মুহূর্ত পর মেরি বলল, ‘আমি বিস্মিত যে এই সন্ধ্যায় কে সূর্যকে ক্রুশবিদ্ধ করছে।’

    তারপর আমি বললাম, ‘আমি তোমার কাছে একটু স্বস্তি পেতে এসেছি। আমার ছেলে আমাকে ছেড়ে সমুদ্রে চলে গেছে। বাড়িতে আমি একা।’

    তারপর মেরি বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই স্বস্তি দেব কিন্তু কীভাবে?’

    আমি বললাম, ‘যদি তুমি শুধু তোমার পুত্রের কথা বলো তাহলেই আমি সবচেয়ে স্বস্তি পেতে পারি।’

    মেরি আমার কথা শুনে হাসল এবং আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আমি তাঁর সম্পর্কে সেইসব কথা বলব যা তোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি আমাকেও সান্ত্বনা দেবে।’

    তারপর সে যিশু সম্পর্কে কথা বলতে লাগল এবং বলতে লাগল সেইসব দীর্ঘ কাহিনী যা শুরুতে ছিল।

    আমার মনে হত, তার বক্তব্যের ভেতরে সে আমার ও তার পুত্রকে আলাদা করত না।

    কারণ সে আমাকে বলত, ‘আমার পুত্র একজন সমুদ্রযাত্রীও। কেন তুমি তোমার ছেলেকে বিশ্বাস করো না ঐ ঢেউয়ের ওপরে যেখানে আমি তাঁকে বিশ্বাস করেছিলাম।

    ‘নারীরা চিরকালই থাকবে একটা গর্ভ এবং একটা দোলনা হয়ে, কখনও তারা সমাধি হবে না। আমরা মারা যাই কারণ আমরা জীবনকে জীবন দান করতে পারি। এমনকি আমাদের আঙুল বয়ন করে পোশাকের জন্য সেই সূতা যা আমরা কখনও পরিধান করব না।

    ‘আমরা জলে জাল নিক্ষেপ করি মাছ ধরার জন্য যা আমরা কোনোদিন পরীক্ষা করব না।

    এসব কারণে আমরা দুঃখিত যদিও আমাদের উল্লাস এই সবকিছুর ভেতরে।

    মেরি আমাকে এসব কথা বলল।

    আমি বাড়ি ফিরে এলাম এবং যদিও দিনের আলো একেবারে শেষ হয়ে এসেছে তবুও আমি তাঁতে বসলাম আরও বেশি করে কাপড় বুনতে।

    জোসেফ, যার কুলনাম জুস্টাস : পথিক যিশু সম্পর্কে

    তারা বলত, তিনি ছিলেন অমার্জিত, সাধারণ বীজের সাধারণ সন্তান –অভব্য এবং হিংস্র।

    তারা বলত, শুধুমাত্র বাতাসই তাঁর চুল আঁচড়ে দিত এবং একমাত্র বৃষ্টিই বহন করে নিত তাঁর পোশাক এবং তাঁর শরীর।

    তারা তাঁকে পাগল ভাবত এবং তারা তাঁর কথাতে আবিষ্কার করত অশুভ আত্মার প্রভাব।

    লক্ষ্য করো যদিও তাকে ঘৃণা করা হত, কিন্তু সেই ঘৃণা ধ্বনিত হত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে এবং সেই ধ্বনি কখনও থামবে না।

    তিনি যে গান গাইতেন তার সুর কেউ বন্দি করতে পারত না। এই সুর পাখা না নাড়িয়ে শূন্যে ভেসে থাকবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এবং তা বেড়ে উঠবে এক গোলক থেকে আরেক গোলকে সেই ওষ্ঠকে স্মরণ করতে করতে যা এর জন্ম দিয়েছিল এবং সেই কানকে স্মরণ করতে করতে যা একে স্থাপন করেছিল।

    সে ছিল একজন আগন্তুক। হ্যাঁ সে ছিল একজন আগন্তুক, তীর্থস্থানে যাবার ক্ষেত্রে সে ছিল একজন পথিক, একজন পরিদর্শক যে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে, একজন অতিথি যে দূরবর্তী দেশ থেকে এসেছে।

    তিনি কোনো উদার ও ভদ্র নিমন্ত্রণকারী সেখানে দেখতে পাননি, তিনি তার নিজের জায়গাতেই ফিরেছেন।

    ফিলিপ : যখন সে মারা যায়

    যখন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দের ব্যক্তি মারা যায় তখন সমস্ত মানবজাতিই মারা গিয়েছিল এবং এই মহাশূন্যের সবকিছুই ছিল স্থির এবং ধূসর। পূর্বদিক ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং একটা ঝড় তীব্র বেগে বয়ে যায় এবং ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করে ভূমি। আকাশের চোখগুলো খুলে যায় এবং বন্ধ হয় এবং প্রবল বেগে বৃষ্টি নেমে আসে এবং বহন করে নিয়ে যায় রক্ত, যা তার হাত ও পা থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা স্রোতোধারা।

    আমিও মারা গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বিস্মৃতির গভীরতার ভেতরে আমি শুনলাম তিনি বলছেন, ‘পিতা তাদেরকে ক্ষমা করুন, কারণ তারা জানে না তারা কী করছে।’

    তাঁর কণ্ঠস্বর অনুসন্ধান করছিল আমার নিমজ্জিত আত্মা এবং আমাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল তীরভূমিতে।

    আমি আমার চোখ খুললাম এবং দেখলাম তাঁর শুভ্র শরীর ঝুলছিল মেঘের সঙ্গে এবং তাঁর কথা যা আমি শুনেছিলাম তা আমার ভেতরে একটা আকৃতি নিয়েছিল এবং পরিণত হয়েছিল নতুন মানুষে এবং আমার আর কোনো দুঃখ নেই।

    কে বেদনার্ত হবে একটা সমুদ্রের জন্য যা এর মুখমণ্ডলকে উদ্ঘাটন করবে অথবা একটা পাহাড়ের জন্য, যা সূর্যালোকে উচ্চহাসি হাসবে।

    এটা কি চিরকাল মানুষের হৃদয়ে ছিল, যখন সেই হৃদয় বিদ্ধ হয় এইসব কথার দ্বারা?

    মানুষের কোন বিচারক তাঁর বিচারকদের মুক্ত করেছে? এবং ভালোবাসা কি ঘৃণাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল ক্ষমতার সঙ্গে এ সম্পর্কে অধিক নিশ্চিত হয়ে?

    এরকম একটি তূর্যনিনাদ কি শোনা গিয়েছিল স্বর্গ এবং পৃথিবীর মাঝখানে?

    এটা কি আগে জানা গিয়েছিল, যে খুন হয়েছে তার সমবেদনা ছিল তার খুনির প্রতি? অথবা সেই উল্কা কি তার পদচিহ্নের ওপর অপেক্ষা করেছিল ছুঁচোর জন্য।

    ঋতুগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়বে এবং বছরগুলি বৃদ্ধ হয়ে যাবে এবং তার আগেই তারা বলে : পিতা তাদেরকে ক্ষমা করুন, কারণ তারা জানে না তারা কী করছে।

    এখন আমি আমার গৃহে যাব এবং দাঁড়াব মর্যাদাসম্পন্ন ভিক্ষুকের মতো তাঁর দরজায়।

    ইয়ামৌনি-এর বীরবারাহ : অসহিষ্ণু যিশু সম্পর্কে

    যিশু ধৈর্যশীল ছিলেন মূর্খ ও বোকাদের প্রতি, যেমন শীত ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে বসন্তের।

    বাতাসের ভেতরে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো সহিষ্ণু।

    তিনি তাঁর শত্রুদের রূঢ় প্রশ্নের জবাব দিতেন কোমলতার সঙ্গে।

    এমনকি তিনি নীরব থাকতেন অনাবশ্যক আপত্তি করা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে কারণ, তিনি ছিলেন শক্তিশালী এবং যে শক্তিশালী সে ধৈর্য ধারণ করতে পারে।

    কিন্তু যিশু অসহিষ্ণুও ছিলেন।

    তিনি ভণ্ডদেরকে দয়া দেখাতেন না।

    তিনি মানুষের চাতুরীকে প্রশ্রয় দিতেন না, শুনতেন না বাজিকরদের কথা এবং অন্যের দ্বারা তিনি নিয়ন্ত্রিত হতেন না।

    তিনি তাদের প্রতি অসহিষ্ণু ছিলেন যারা আলোকে বিশ্বাস করত না, কারণ তারা তাদেরকে বসবাস করতে বাধ্য করাত ছায়ার ভেতরে এবং তাদের সঙ্গে কে অনুসন্ধান করবে সেই চিহ্ন নিজের হৃদয় ছাড়া প্রশস্ত আকাশে যা তাদের কাম্য।

    তিনি অধৈর্য ছিলেন তাদের প্রতি যারা দিন ও রাত্রির পরিমাণ ও পরিমাপ নির্ধারণ করে সন্ধ্যা ও রাত্রির স্বপ্নকে বিশ্বাস করার আগেই

    যিশু ছিলেন ধৈর্যশীল।

    যদিও মানুষের ভেতরে তিনি ছিলেন সবচেয়ে অসহিষ্ণু।

    তিনি চাইতেন তোমরা পোশাক বয়ন করো যদিও তোমরা তাঁত এবং লিনেনের মাঝখানে কাটিয়ে দাও বছরের পর বছর।

    কিন্তু তিনি চান না বয়ন-করা কাপড়ের এক ইঞ্চি অংশও যেন কারও অশ্রুজলে না ভেজে।

    একজন রোমান নারীর উদ্দেশে পিলাতের স্ত্রী

    আমি যখন জেরুজালেমের বাইরে কুঞ্জবনের ভেতর আমার পরিচারিকার সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম তখন আমি তাঁকে কয়েকজন নারী ও পুরুষের সঙ্গে বসে থাকতে দেখেছিলাম এবং তিনি তাদেরকে যে-ভাষায় কথা বলছিলেন তার অর্ধৈক আমি বুঝতে পারি নাই।

    কিন্তু একটা আলোর স্তম্ভ অথবা একটা স্ফটিকের পাহাড়কে উপলব্ধি করার জন্য ভাষার কোনো প্রয়োজন হয় না। হৃদয় জানে জিভ কী কী কখনও উচ্চারণ করতে পারে না এবং কান কখনও শুনতে পারে না কোন্ কোন্ বিষয়গুলি।

    তিনি তাঁর বন্ধুদেরকে বলছিলেন ভালোবাসা এবং শক্তি সম্পর্কে। আমি জানি তিনি ভালোবাসা সম্পর্কে বলছিলেন, কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল সুরেলা এবং আমি জানি তিনি বলছিলেন শক্তি সম্পর্কে, কারণ তাঁর আকার-ইঙ্গিতে মনে হচ্ছিল সেখানে সেনাবাহিনী আছে এবং তিনি ছিলেন শান্ত। আমার স্বামীও এমন কর্তৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না।

    আমাকে অতিক্রম করে যাবার সময় তিনি থামলেন, কথা বললেন কয়েক মুহূর্তের জন্য এবং আমার দিকে দয়ার্দ্র চোখে তাকালেন। আমার আচরণে বিনয় প্রকাশ পেল এবং আমি জানতাম আমার আত্মার পথ আমি অতিক্রম করছিলাম ঈশ্বরের সাহায্যে।

    সেই দিনের পর তাঁর প্রতিমূর্তি আমার গোপনীয়তাকে পরিদর্শন করত, যখন কোনো নারী অথবা পুরুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত না এবং তাঁর চোখ অনুসন্ধান করত আমার আত্মা যখন আমার দু-চোখ বন্ধ থাকত এবং তাঁর কণ্ঠস্বর আমার রাত্রির স্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করত।

    সে সময় আমি প্রথম লক্ষ্য করলাম চিরন্তন কালকে এবং আমার যন্ত্রণার ভেতরে শান্তি ও আমার অশ্রুর ভেতরে স্বাধীনতাকে।

    হে আমার প্রিয় বন্ধুরা, তোমরা সেই লোকটিকে কখনও দ্যাখো নাই এবং তোমরা তাঁকে কখনও দেখবে না।

    তিনি আমাদের উপলব্ধির বাইরে চলে গেছেন, কিন্তু সমস্ত মানুষের ভেতরে আছেন। তিনি এখন আমার সবচেয়ে কাছে।

    জেরুজালেমের বাইরে এক লোক : জুডাস সম্পর্কে

    সেই শুক্রবার জুডাস আমার বাড়ি এসেছিল পাসোভার উৎসবের সময় এবং সে আমার দরজায় খুব জোরে কড়া নেড়েছিল।

    যখন সে ভেতরে প্রবেশ করল আমি তার দিকে তাকালাম এবং তার মুখ ছিল পাংশুটে। তার হাতগুলি কাঁপছিল বাতাসে শুকনো শাখার মতো এবং তার পোশাক ছিল ভেজা, যেন নদী থেকে উঠে এসেছে, কারণ সেই সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিল।

    সে আমার দিকে তাকাল এবং তার অক্ষিকোটর ছিল অন্ধকার গুহার মতো এবং চোখ ছিল রক্তভেজা।

    সে বলল, ‘আমি নাজারেতের যিশুকে তাঁর শত্রু এবং আমার শত্রুদের কাছে সরবরাহ করেছি।’

    তারপর সে তার হাত সামান্য ঘোরাল এবং বলল, ‘যিশু ঘোষণা করেছিলেন তিনি তাঁর শত্রু এবং আমাদের জনগণের শত্রুদেরকে অতিক্রম করে যাবেন। আমি তা বিশ্বাস করেছি এবং অনুসরণ করেছি তাঁকে।

    ‘যখন প্রথম তিনি আমাদেরকে তাঁর প্রতি আহ্বান জানান তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন একটি পরাক্রমশীল ও বিশাল সম্রাজ্যের এবং আমাদের বিশ্বাসের ভেতরে আমরা অনুসন্ধান করেছিলাম তাঁর আনুকূল্য যেন তাঁর আদালতে আমরা একটা সম্মানজনক স্থান পেতে পারি।

    ‘আমরা লক্ষ্য করেছিলাম, আমাদের রাজকুমারেরা এইসব রোমানদের সঙ্গে বিভিন্ন বিনিময় করছে যেভাবে তারা করছে আমাদের সঙ্গে। যিশু তাঁর সাম্রাজ্য সম্পর্কে অনেক কিছুই বলতেন এবং আমি ভাবতাম তিনি আমাকে তাঁর রথের চালক এবং যোদ্ধাদের প্রধান হিসেবে পছন্দ করেছেন। আমি তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করেছিলাম স্বেচ্ছায়।

    ‘কিন্তু আমি দেখেছিলাম এটা কোনো সাম্ৰাজ্য নয় যিশু যা অনুসন্ধান করেছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্য ছিল হৃদয়ের সাম্রাজ্য। আমি শুনেছি তিনি বলতেন ভালোবাসা, বদান্যতা এবং ক্ষমা সম্পর্কে এবং পথের ধারে দাঁড়িয়ে নারীরা তা আনন্দের সঙ্গে শুনত, কিন্তু আমার হৃদয় তিক্ত হয়ে উঠেছিল, আমি কঠিন মানুষে পরিণত হয়েছিলাম।

    ‘মনে হল আমার যুদেয়ার প্রতিশ্রুত রাজা পথভ্রষ্ট ও ভবঘুরেদের মনে প্রশান্তি আনতে হঠাৎ করেই বংশীবাদকে পরিণত হয়েছেন।

    ‘আমি তাঁকে ভালোবেসেছিলাম আমার গোত্রের অন্যান্য লোকদের মতোই। আমি তাঁর ভেতরে লক্ষ্য করেছিলাম একটি আকাঙ্ক্ষা এবং একটি পরিত্রাণ বহিরাগতদের জোয়াল থেকে নিস্তার পাবার জন্য। কিন্তু যখন সেই দেয়াল থেকে রক্ষা পেতে তিনি একটি শব্দ উচ্চারণ অথবা হাত তুলে একটি ইঙ্গিত করলেন না, এমনকি যখন তাকে সিজারের কাছে উপস্থাপন করা হয় তখনও নয়। তারপর আমি হতাশ হয়ে পড়ি এবং আমার আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু

    ঘটে এবং আমি তখন বলি, ‘যে আমার আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করেছে তাকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে, কারণ আমার আশা ও আকাঙ্ক্ষা যে-কোনো মানুষের জীবনের চেয়ে অধিক মূল্যবান।’

    তারপর জুডাস দাঁতে দাঁত পিষে কড়মড় আওয়াজ করতে লাগল এবং মাথা নিচু করল। তারপর সে বলল, ‘আমি তাকে হস্তান্তর করে এসেছি এবং তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে…. যখন তিনি ক্রুশের ওপর মারা যান তখন তিনি রাজার মতো মারা গিয়েছিলেন। তিনি মারা গিয়েছিলেন মৃত্যুর সরবরাহকৃত একটা ঝড়ে, বিশাল মানুষের মতো যিনি কাফন এবং পাথরের ওপরে বসবাস করেন।

    সর্বোপরি তিনি যখন মারা যাচ্ছিলেন তখনও তিনি ছিলেন বিনয়ী ও দয়ালু এবং তাঁর হৃদয় ছিল করুণায় পরিপূর্ণ। তিনি আমার জন্যও দয়া অনুভব করেছেন যে তাঁকে শত্রুর হাতে অর্পণ করেছিল।

    আমি বললাম, ‘জুডাস তুমি গুরুতর অন্যায় করেছ।’

    জুডাস উত্তরে বলল, ‘কিন্তু সে রাজার মতো মারা গিয়েছিল। কেন সে রাজার মতো বাঁচেনি?’

    আমি আবার বললাম, ‘তুমি একটা গুরুতর অন্যায় করেছ।’

    সে একটা বেঞ্চির ওপর বসে পড়ল এবং সে স্থির হয়েছিল একটা পাথরের মতো। কিন্তু আমি কক্ষের ভেতরে ইতস্তত হাঁটতে লাগলাম এবং আরও একবার আমি বললাম, তুমি একটা বিশাল পাপ করেছ।’

    কিন্তু জুডাস কোনো কথাই বলল না। সে নীরব হয়ে রইল মাটির মতো

    কিছুক্ষণ পর সে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল। মনে হল সে আমার চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ এবং যখন সে কথা বলল তখন তার কণ্ঠস্বর মনে হল ফেটে যাওয়া পাত্রের শব্দের মতো এবং সে বলল, ‘আমার হৃদয়ে পাপ ছিল না। এই রাতে আমি তাঁর সাম্রাজ্য অনুসন্ধান করব এবং তাঁর উপস্থিতিতে দাঁড়াব এবং ভিক্ষা করব তাঁর ক্ষমা।

    সে মারা গিয়েছিল রাজার মতো এবং আমি মারা যাব গুরুতর অপরাধীর মতো। কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরে আমি জানি, তিনি আমাকে ক্ষমা করবেন।’

    এসব বলার পর সে তার ভেজা আলখাল্লাটা ভাঁজ করল এবং বলল, ‘এই রাতে তোমার কাছে আসাটা ভালো হয়েছে যদিও আমি তোমার জন্য বিপদ নিয়ে এসেছি। তুমিও কি আমাকে ক্ষমা করবে?’

    তোমরা এবং তোমাদের পুত্রদেরকে ব’লো : ‘জুডাস ইসক্যারিওট নাজারেতের যিশুকে হস্তান্তর করেছিল তার শত্রুদের কাছে কারণ সে বিশ্বাস করত যিশু ছিলেন তাঁর প্রজাতির শত্রু।

    ‘এবং আরও ব’লো একই দিনে জুডাসের বিশাল ভ্রান্তি রাজাকে অনুসরণ করেছিল তাঁর সিংহাসনের সিঁড়ি পর্যন্ত সরবরাহ করতে নিজের আত্মা, বিচারের মুখোমুখি হতে।’

    ‘আমি তাঁকে বললাম, বিভক্তির জন্য আমার রক্ত ছিল খুবই অসহিষ্ণু এবং আমার পঙ্গু আত্মা অবশ্যই স্বাধীন হবে।’

    তারপর জুডাস দেয়ালে মাথাটা ঠেকাল এবং বলল, ‘হে ঈশ্বর তাঁর আতঙ্কিত নাম কোনো মানুষই উচ্চারণ করবে না মৃত্যুর আঙুল তার ঠোঁট স্পর্শ করার আগে এবং কেন তুমি আমাকে পোড়াচ্ছ সেই আগুনে যার কোনো আলো নেই?

    ‘কেন তুমি গালীলীয়দেরকে একটা অপরিচিত ভূমির জন্য দান করেছিলে আবেগজনিত তীব্র অনুভূতি এবং আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলে আকাঙ্ক্ষার বোঝা যা পরিবার ও অগ্নিকুণ্ড ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে না? এবং জুডাস, কে এই লোক যার দু’হাতই রক্তে ভেজা?

    ‘আমাকে একটা হাত ধার দাও তাকে নিক্ষেপ করতে যেন সে একটা পুরোনো পোশাক এবং ঘোড়ার ছেঁড়া সাজ-সরঞ্জাম।

    ‘আজ রাতে আমাকে এসব করতে সাহায্য করো।

    ‘আমাকে আবার দাঁড়াতে দাও এইসব দেয়ালের বাইরে।

    ‘এইসব পাখাহীন স্বাধীনতায় আমি ক্লান্ত। আমি নিজেই পরিণত হব ভূ-গর্ভস্থ একটি অন্ধকার কারাগারে যা অধিকতর বড়।’

    ‘আমি প্রবাহিত করব একটা অশ্রুর স্রোতোধারা তিক্ত সমুদ্রের প্রতি। আমি হব আপনার ক্ষমাপ্রাপ্ত মানুষ নিজের হৃদয়ের দরজায় যে কড়া নাড়ে তার চেয়েও।’

    এই কথা বলার পর জুডাস দরজা খুলল এবং ঝড়ের ভেতরে আবার বাইরে চলে গেল।

    তিনদিন পর আমি জেরুজালেম পরিদর্শন করেছিলাম এবং শুনেছিলাম সবকিছু এবং আরও শুনেছিলাম জুডাস উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে নিজেকে নিক্ষেপ করেছে।

    সেইদিন থেকে আমি মনে মনে অনেক ভেবেছি এবং উপলব্ধি করেছি জুডাসকে। সে তার ছোট্ট জীবনটাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছিল, যা এই ভূমির ওপর ধোঁয়াশার মতো স্থির হয়ে ভেসে আছে এবং তাকে দাসে পরিণত করেছে রোমানরা, যখন সেই বিশাল নবী উচ্চতারও ওপরে আরোহণ করছিলেন।

    একজন মানুষ একটা সাম্রাজ্যের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে যার ভেতরে সে রাজকুমারে পরিণত হবে।

    অন্য মানুষ এমন একটি সাম্রাজ্যের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে যেখানে সব পুরুষই হবে যুবরাজ।

    সারকিস, একজন বৃদ্ধ গ্রিক মেষপালক, যাকে পাগল বলা হত : যিশু এবং প্যান

    একটা স্বপ্নের ভেতরে আমি দেখেছিলাম যিশু এবং আমার ঈশ্বর প্যান একত্রে বনের হৃদয়ের ভেতরে বসেছিলেন।

    তারা একজন অন্যজনের বক্তব্য শুনে হাসছিলেন, নদীর স্রোতের সঙ্গে তা দৌড়েছিল তাদের কাছাকাছি এবং যিশুর উচ্চহাসি ছিল একটা বিশাল উল্লাস এবং তারা তা দীর্ঘ সময় ধরে রেখেছিলেন।

    প্যান কথা বলছিলেন পৃথিবী ও তার গোপনীয়তা সম্পর্কে এবং তার খুরওয়ালা ভাই ও শিংওয়ালা বোনগুলি এবং স্বপ্নগুলি সম্পর্কে। সে বলছিল শিকড় ও তাদের বাসা সম্পর্কে এবং সেই প্রাণরস সম্পর্কে যা উদ্দীপ্ত হয়, বেড়ে ওঠে এবং গান গায় গ্রীষ্মকালের উদ্দেশে।

    তারপর যিশু বনের গাছে গাছে নতুন গজিয়ে ওঠা অঙ্কুর সম্পর্কে কথা বলেন এবং ফুল, ফল ও বীজ সম্পর্কে যা তারা বহন করবে তাদের নিজস্ব ঋতুতে, যা এখনও আসেনি।

    তিনি কথা বললেন মহাশূন্যের পাখি এবং উচ্চতর পৃথিবীতে তাদের গান গাওয়া সম্পর্কে।

    তিনি কথা বললেন, মরুভূমির লাল হরিণ সম্পর্কে যেখানে ঈশ্বর হলেন তাদের রাখাল।

    এবং প্যান নতুন ঈশ্বরের বক্তব্যে খুবই খুশি হলেন এবং তার নাসারন্ধ্র শিহরিত হচ্ছিল।

    একই স্বপ্নের ভেতরে আমি লক্ষ্য করলাম প্যান এবং যিশু সম্পূর্ণভাবে বেড়ে উঠেছে এবং সবুজ ছায়ার স্থিরতার ভেতরে স্থির হয়ে আছে।

    তারপর প্যান তার বাদ্যযন্ত্র তুলে নিয়ে যিশুর উদ্দেশ্যে বাজাল।

    বৃক্ষসমূহ দুলতে লাগল, শিহরিত হতে থাকল ফার্ন গাছ এবং আমার সামান্য ভয় করছিল।

    যিশু বললেন, ‘চমৎকার, ভাই চমৎকার, তোমার জন্য রয়েছে বনের ভেতরে ফাঁকা জায়গা এবং তোমার বাদ্যযন্ত্রে রয়েছে পাথুরে উচ্চতা।’

    তারপর প্যান বাদ্যযন্ত্রটা যিশুকে দিল এবং বলল, ‘এখন আপনি বাজান। এবার আপনার পালা।’

    যিশু উত্তরে বললেন, ‘এই যন্ত্রের রিভ আমার মুখের জন্য অনেক বড়। আমার বাঁশি আছে।’

    তারপর তিনি তাঁর বাঁশি তুলে নিয়ে বাজাতে লাগলেন এবং আমি পাতার ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেলাম এবং শুনতে পেলাম পাহাড়ের ভেতরে স্রোতের সংগীত এবং আরও শুনতে পেলাম পাহাড়চূড়া থেকে বরফপতনের শব্দ।

    আমার হৃদস্পন্দন, যাকে একবার প্রহার করেছিল বাতাস তা আবার পুর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল বাতাসের কাছে এবং আমার গতকালের ঢেউগুলো ছিল আমার তীরের ওপর এবং আমি ছিলাম আবার সেই সারকিস, সেই মেষপালক এবং যিশুর বাঁশি পরিণত হয়েছিল গণনাহীন মেষপালকের বাঁশিতে গণনাহীন পশুর পালকে ডাকতে।

    তারপর প্যান যিশুকে বললেন, ‘আপনার যৌবন আমার বছরগুলির চেয়ে বাদ্যযন্ত্রের অধিকতর কাছাকাছি এবং আকুল আকাঙ্ক্ষা, যার আগেই আমি আমার স্থিরতার ভেতরে শুনেছি আপনার গান এবং আপনার নামের মর্মরধ্বনি।

    ‘আপনার নামের ধ্বনিটিই চমৎকার, প্রাণরসের সঙ্গে তা চমৎকারভাবে বেড়ে উঠবে এবং তা দৌড়াবে শাখাগুলির দিকে এবং তা চমৎকারভাবে দৌড়াবে পশুর খুরের সঙ্গে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে এবং এটা আমার কাছে বিস্ময়কর কিছু নয় যদিও আমার পিতা ঐ নামে আমাকে কখনও ডাকেনি। এটা ছিল আপনার বাঁশি, যা এসব আমার স্মৃতিতে ফিরিয়ে এনেছিল এবং এখন আসুন আমরা একসঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজাই।’

    এবং তারা একসঙ্গে বাজালেন।

    তাদের সংগীত স্বর্গ ও পৃথিবীকে সজোরে আঘাত করল এবং একজন সন্ত্রাসী আঘাত করল সমস্ত জীবন্ত জিনিসকে।

    আমি শুনতে পেলাম পশু এবং বনের ক্ষুধার বিকট চিৎকার এবং শুনতে পেলাম একজন নিঃসঙ্গ মানুষের কান্না এবং তাদের বিলাপ, যাদের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তবে কিসের জন্য তা তারা জানে না।

    আমি শুনেছিলাম তরুণীদের দীর্ঘশ্বাস তাদের প্রেমিকের জন্য এবং দুর্ভাগা শিকারির হাঁপানির শব্দ তার শিকারের জন্য।

    তারপর তাদের গানের ভেতরে শান্তি এল এবং পৃথিবী ও স্বর্গ একত্রে গান গাইতে লাগল।

    আমার স্বপ্নের ভেতরে আমি এসব দেখেছিলাম এবং শুনেছিলাম।

    উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন যাজক আন্নাস : নিচুতলার মানুষ যিশু

    তিনি ছিলেন নিচুতলার মানুষ, একজন দস্যু, একজন ধান্ধাবাজ এবং একজন তূর্যবাদক। তিনি সনির্বন্ধ অনুরোধ করতেন শুধুমাত্র তাদের কাছে, যারা অপবিত্র এবং অধিকারবঞ্চিত এবং এজন্য তাঁকে অনেক কলুষিত ও নোংরা পথে চলাচল করতে হয়েছিল।

    তিনি আমাদের ও আমাদের আইন নিয়ে রসিকতা করতেন। তিনি ঠাট্টা করতেন আমাদের সম্মানকে এবং বিদ্রূপ করতেন আমাদের মর্যাদাকে। এমনকি তিনি বলতেন যে তিনি মন্দির ধ্বংস করবেন এবং কলুষিত করবেন পবিত্র স্থানগুলিকে। তিনি ছিলেন নির্লজ্জ এবং একারণেই তাঁকে এমন লজ্জাজনক মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

    তিনি ছিলেন গালীল প্রদেশের ইহুদি নয় এরকম একজন মানুষ, উত্তর দেশের একজন বহিরাগত, যেখানে এ্যাডোনিস এবং এ্যাসতারতে তখনও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করেছিল ইসরায়েল এবং ইসরায়েলের ঈশ্বরের বিরুদ্ধে।

    তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যার জিভ থেমে যেত যখন তিনি আমাদের নবী সম্পর্কে কথা বলতেন এবং তিনি কান-ফাটানো উচ্চকণ্ঠে কথা বলতেন একধরনের জারজ ভাষায়, নিচুজাতের মানুষ এবং নোংরামি সম্পর্কে।

    সুতরাং তার মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া ছাড়া আমার আর কী করার ছিল?

    আমি কি মন্দিরের একজন অভিভাবক নই? আমি কি নই আইনের রক্ষক? আমি তাঁর দিকে পেছন ফিরে থাকতে পারতাম এই কথা বলে, ‘তিনি পাগলদের ভেতরে একজন পাগল। তাকে একাকী নিঃশেষ হতে দাও এবং অজস্র প্রলাপ বকতে দাও, কারণ পাগল, উম্মাদ এবং খারাপ মানুষেরা ইসরাইলের পথে থাকবে না।

    আমি তাঁর কথা না শুনে বধির হতে পারতাম যখন তিনি আমাদেরকে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, নেকড়ে, ভাইপার ও ভাইপারের পুত্র বলে ডাকতেন?

    না, আমি তাঁর সামনে বধির হতে পারিনি কারণ তিনি ছিলেন একজন পাগল। তিনি ছিলেন সুস্থির এবং তাঁর বৃহত্তর মানসিক সুস্থতার ভেতরে তিনি আমাদেরকে বিভিন্নভাবে ফাঁসাতেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুঁড়ে দিতেন।

    এ কারণে আমি চেয়েছিলাম ক্রুশবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হোক এবং তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াটা ছিল তাদের জন্য একটা সংকেত এবং সতর্কতা, যারা একই জঘন্য সিলমোহর দ্বারা সীলমোহরকৃত।

    এ কারণে আমি সানহেড্রিমের কিছু বয়স্কের দ্বারা অভিযুক্ত হয়েছিলাম। তারপর আমি মনোযোগী হয়েছিলাম যেমন এখন জনগণের কল্যাণে একজন মানুষের মারা যাওয়া উচিত, একজন মানুষের দ্বারা আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়ে।

    যিশু পরাজিত হয়েছিলেন শত্রুর দ্বারা। আমি দেখব যে যুদেয়া কখনও ভেতরের শত্রু দ্বারা পরাজিত হয়নি।

    অভিশপ্ত উত্তর থেকে আসা কোনো মানুষই আমাদের পবিত্রতার পবিত্রের কাছাকাছি পৌঁছাবে না, শায়িত হবে না তার ছায়া ইহুদিদের আইন সংক্রান্ত রচনাবলি রক্ষিত কাঠের সিন্দুকের ওপর

    মেরির প্রতিবেশী এক নারী : বিলাপ

    তাঁর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর সব প্রতিবেশী নারী মেরির বাড়িতে এল তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।

    তাদের একজন গাইল :

    কিসের জন্য আমার বসন্ত, কিসের জন্য?

    কোন্ সেই অন্য মহাশূন্য যেখানে তোমাদের সুগন্ধ আরোহণ করছে? অন্য কোন মাঠে তোমার হাঁটাহাঁটি করবে?

    কোন্ আকাশ তোমার মাথাকে উত্তোলন করবে তোমার হৃদয়ের সাথে কথা বলতে?

    এই উপত্যকা অনুর্বর হয়ে যাবে।

    আমরা কিছুই পাব না শুকনো ও অনুর্বর শস্যক্ষেত ছাড়া,

    সব সবুজ জিনিসই সূর্যালোকে শুকিয়ে যাবে

    এবং আমাদের কুঞ্জবন সামনে তুলে ধরবে টক আপেল।

    আমাদের আঙুর বাগান, সরবরাহ করবে তিক্ত আঙুর।

    আমরা তোমার মদের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকব

    এবং আমাদের নাসারন্ধ্রের আকুল আকাঙ্ক্ষা তোমার সুগন্ধের জন্য।

    কার জন্য আমাদের প্রথম বসন্তের ফুল, কিসের জন্য?

    তুমি কি আর একবারও ফিরবে না?

    তোমার জুঁইফুলেরা আমাদেরকে পুনর্বার পরিদর্শন করবে না
    এবং তোমার তীব্র গন্ধবিশিষ্ট ফুলগাছ দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের পথের ধারে, আমাদেরকে বলতে যে, আমরা প্রত্যেকেই আমাদের শিকড় পেয়ে গেছি মাটির গভীরতায়।

    সেটাই আমাদের অন্তহীন শ্বাসপ্রশ্বাস চিরকালের জন্য আরোহণ করবে আকাশে?

    কিসের জন্য যিশু, কিসের জন্য?
    আমার প্রতিবেশী মেরির পুত্র
    এবং আমার পুত্রের সহযাত্রী?
    কোথায় আমাদের প্রথম বসন্ত এবং অন্যান্য শস্যক্ষেতের কী অবস্থা?
    তুমি আমাদের কাছে আবার ফিরে আসবে,
    তোমার ভালোবাসার স্রোতের সঙ্গে প্রবাহিত হয়ে তুমি কি পরিদর্শন করবে আমাদের
    স্বপ্নের বন্ধ্যা তীরভূমি?

    হৃষ্টপুষ্ট আহাজ : সরাইখানার তত্ত্বাবধায়ক

    হ্যাঁ, আমি নাজারেতবাসী যিশুকে শেষবার দেখার স্মৃতি ভালোভাবেই স্মরণ করতে পারি। সেই বৃহস্পতিবার দুপুরবেলা জুডাস আমার কাছে এসেছিল এবং আদেশ দিয়েছিল যিশু ও তাঁর বন্ধুদের জন্য দিনশেষের খাবার তৈরি করতে।

    সে আমাকে দুটো রৌপ্যমুদ্রা দিয়েছিল এবং বলেছিল, ‘খাবার তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন বলে তুমি মনে করো তাঁর সবই কিনে নাও।’

    সে চলে যাবার পর আমার স্ত্রী আমাকে বলল, ‘এটা একটু আলাদা মনে হচ্ছে।’ কারণ যিশু ছিলেন নবী এবং বহু অলৌকিকতা দেখানোর ব্যাপারে তিনি প্রায়ই উৎসাহিত হতেন।

    গোধূলিবেলায় তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা এলেন এবং তারা উপরের কক্ষের টেবিল জুড়ে বসলেন কিন্তু তারা ছিলেন শান্ত এবং নীরব।

    গত বছর এবং তার আগের বছর যখন এসেছিলেন তখন তারা উৎফুল্ল ছিলেন। তারা রুটি খেয়েছিলেন এবং মদ্যপান করেছিলে এবং গেয়েছিলেন আমাদের প্রাচীন গানগুলি এবং যিশু তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন মধ্যরাত পর্যন্ত।

    তারপর তারা তাঁকে উপরের কক্ষে পরিত্যাগ করে অন্য ঘরে ঘুমাতে গেল, কারণ মধ্যরাতের পর তিনি একা থাকবেন এটা ছিল তার আকাঙ্ক্ষা।

    তিনি জেগে থাকলেন। আমি বিছানায় শুয়েও তাঁর পদশব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

    কিন্তু এই শেষ সময়ে তিনি এবং তার বন্ধুরা মোটেও সুখী ছিলেন না।

    আমার স্ত্রী গালীলের লেক থেকে আনা মাছ ও হৌরান থেকে আনা লম্বা লেজবিশিষ্ট পাখির মাংস রান্না করেছিল। সঙ্গেছিল প্রচুর ভাত ও ডালিম এবং আমি তাদের জন্য নিয়ে এলাম আমার সাইপ্রেস মদ

    যখন আমি তাদেরকে ছেড়ে গেলাম তখন অনুভব করলাম তারা একা হতে চেয়েছিলেন।

    পরিপূর্ণ অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করলেন এবং তারপর তারা উপরের কক্ষ থেকে অবতরণ করলেন, কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় এসে যিশু কিছুক্ষণের জন্য থামলেন, আমার ও আমার স্ত্রীর দিকে তাকালেন এবং আমার কন্যার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোমাদের সবাইকে শুভরাত্রি। আমরা আবার উপরের কক্ষে ফিরে আসব, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আমরা তোমাদেরকে ছেড়ে যাব না। আমরা অপেক্ষা করব যতক্ষণ দিগন্তের ওপরে সূর্য উঠে না আসে।

    ‘কিছুক্ষণের ভেতরেই আমরা ফিরে আসব এবং আরও রুটি খেতে চাইব এবং পান করতে চাইব আরও মদ। তুমি এবং তোমার স্ত্রী নিমন্ত্রণকারী হিসেবে খুবই চমৎকার এবং আমরা যখন আমাদের বাড়িতে নিজেদের টেবিলে বসব তখনও স্মরণ করব তোমাদের কথা।’

    আমি বললাম, ‘সমস্ত সরাইখানার রক্ষকদের উচিত মানুষের সেবা করে গর্ব অনুভব করা। কারণ যে রুটি ও মদ পরিবশেন করে সে হল তার ভাই যে ফসল পাকায়, জড়ো করে এবং আঁটি বাঁধে মাড়াইখানার জন্য এবং তার ভাই, যে আঙুর-পেষণকারী যন্ত্রে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে আঙুর এবং তোমরা সবাই দয়ালু। তোমরা তোমাদের অকৃপণ দান প্রদান করো তাদেরকে যারা ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আসে না।’

    তারপর তিনি জুডাস ইসক্যারিওটের দিকে ফিরলেন। দলের অর্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল তার ওপর এবং তিনি বললেন, ‘আমাকে দুটো রুপার মুদ্রা দাও।’

    জুডাস দুটো মুদ্রা দিয়ে বলল, ‘এই দুটোই হল আমার অর্থভাণ্ডারের সর্বশেষ রৌপ্যমুদ্রা।’

    যিশু তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি তোমার অর্থভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে যাবে।

    তারপর তিনি রুপার মুদ্রাদুটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা দিয়ে তোমার কন্যার জন্য একটা রেশমি অন্তর্বাস কিনবে এবং পাসোভার উৎসবের দিন এটা তাকে পড়তে বলবে আমার স্মরণে।’

    আবার তিনি আমার কন্যার দিকে তাকালেন এবং তার ভ্রূ চুম্বন করলেন এবং আরও একবার বললেন, ‘তোমাদের সবাইকে শুভরাত্রি।’

    এবং তিনি হেঁটে চলে গেলেন।

    আমাকে বলা হয়েছিল যে, তিনি যা বলেছিলেন তা চামড়ার পাণ্ডুলিপিতে নথিবদ্ধ করা আছে তাঁর এক বন্ধুর দ্বারা, কিন্তু আমি তোমাদের কাছে তা পুনরাবৃত্তি করেছি যেভাবে আমি তার মুখ থেকে শুনেছিলাম।

    কখনও আমি তার কণ্ঠের শব্দের কথা ভুলব না যেভাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের সবাইকে শুভরাত্রি।’

    যদি তোমরা তার সম্পর্কে আরও বেশি জানতে চাও তাহলে আমার কন্যাকে জিজ্ঞাসা করো। সে বর্তমানে নারীতে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সে তার শৈশবের স্মৃতি যত্নের সাথে লালন করেছে এবং তাঁর শব্দাবলি তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমার চেয়েও অধিক প্ৰস্তুত।

    বারাব্বাস : যিশুর শেষ কথা

    তারা আমাকে মুক্ত করে দিল এবং তাকে পছন্দ করল। তারপর তিনি উত্থিত হলেন এবং আমি পতিত হলাম।

    তারা তাঁকে শিকারে পরিণত করল পাসোভার উৎসবে উৎসর্গ করার জন্য।

    আমি আমার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছিলাম এবং জনতার সঙ্গে হাঁটছিলাম তার পেছনে পেছনে, কিন্তু আমি ছিলাম একজন জীবন্ত মানুষ যে তার নিজের কবরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।

    আমার উচিত মরুভূমিতে পালিয়ে যাওয়া, লজ্জা যেখানে সূর্যালোকে পুড়ে যায়।

    যদিও আমি তাদের সঙ্গে হাঁটছি, যারা তাঁকে পছন্দ করেছে আমার অপরাধ বহন করতে।

    যখন তারা তাঁকে পেরেক দিয়ে ক্রুশের ওপর আটকাল তখন আমি সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম,

    আমি দেখেছিলাম এবং শুনেছিলাম কিন্তু তা কেবলই প্রভাব ফেলেছিল আমার শরীরের বাইরে।

    যে চোর তার ডানপাশে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল সে তাঁকে বলল, ‘নাজারেতের যিশু হয়েও আপনি আমার সঙ্গে রক্ত ঝরাচ্ছেন।’

    যিশু উত্তরে বললেন, ‘আমার হাতে যে পেরেক মারা হয়েছে তা আমার হাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়নি। আমি আরও সামনে পৌঁছাব এবং জড়িয়ে ধরব তোমার হাত।

    ‘আমরা একত্রে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছি। তারা কি তোমার ক্রুশটি আমার আরও কাছাকাছি তুলে ধরবে?’

    তারপর তিনি নিচের দিকে তাকালেন এবং স্থিরদৃষ্টিতে তাকালেন তাঁর মা এবং এক যুবকের দিকে যে তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

    তিনি বললেন, ‘মা লক্ষ্য করো তোমার ছেলে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হে নারী, একজন পুরুষকে লক্ষ্য করো যে আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা উত্তরদেশে বহন করে নিয়ে যাবে।’

    যখন তিনি গালীলের একজন নারীর হাহাকার শুনলেন, তখন বললেন, ‘লক্ষ্য করো, তারা কাঁদে এবং আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠি।

    ‘আমাকে এত উঁচুতে বেঁধে রাখা হয়েছে যে আমি তাদের অশ্রুজলের কাছে পৌঁছাতে পারি না।

    আমি আমার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সিরকা অথবা গরল পান করব না।’

    তারপর তিনি চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘পিতা, কেন আপনি আমাদেরকে এত দ্রুত পরিত্যাগ করছেন?’

    তারপর আবেগের সঙ্গে আবার বললেন, ‘পিতা, তাদেরকে ক্ষমা করুন, কারণ তারা জানে না তারা কী করছে।’

    যখন তিনি এসব কথা উচ্চারণ করলেন, আমার মনে হল তখন সমস্ত লোক প্রতিবাদ করছিল ঈশ্বরের সম্মুখে এবং একজন মানুষের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার জন্য কাতরকণ্ঠে ক্ষমা প্রার্থনা করছিল।

    তারপর আবার তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, ‘পিতা আপনার হাতে আমি প্রাকৃতিক রীতিতে উৎপন্ন হয়ে আমার আত্মার ভেতরে ফিরে আসব।’

    অবশেষে তিনি তাঁর মাথা উপরের দিকে তুললেন এবং বললেন, ‘এখন সব কিছুই শেষ, এইখানে, শুধুই এই পাহাড়ের ওপর।’

    তিনি তাঁর চোখ বন্ধ করলেন।

    তারপর আলো-অন্ধকার আকাশকে ভেঙে চুরমার করে দিল এবং এটা ছিল একটা বিশাল বজ্ৰপাত।

    আমি এখন বুঝতে পারি যারা তাঁকে আমার পরিবর্তে হত্যা করেছিল তারা বহন করেছিল আমার সীমাহীন যন্ত্রণাকে।

    তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা ঘণ্টাখানেক স্থায়ী হয়েছিল।

    আমার বছরগুলির শেষে আমিও ক্রুশবিদ্ধ হব।

    ব্লুউদিয়াস, একজন রোমান পাহারাদার : গ্রিক দার্শনিক জোলোর মতাবলম্বী যিশু

    ধরা পড়ার পর তাঁকে তারা আমার হেফাজতে রেখে যায় এবং আমাকে পন্টিয়াস পিলাটুস নির্দেশ দিয়েছিল তাঁকে কারাগারে রাখতে ভোর না-হওয়া পর্যন্ত।

    আমার সৈন্যরা তাঁকে বন্দি হওয়ার জন্য নেতৃত্ব দিল এবং তিনি তাদের প্রতি খুবই অনুগত ছিলেন।

    মধ্যরাতে আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ঘরে রেখে বেরিয়ে পড়লাম এবং পরিদর্শন করলাম অস্ত্রাগার। এটা ছিল আমরা অভ্যাস, নিয়মিত পরীক্ষা করা যে জেরুজালেমে আমার ব্যাটালিয়নের সবকিছু ঠিক আছে কিনা এবং সেই রাতে আমি কারাগারও পরীক্ষা করলাম যেখানে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

    আমার সৈন্যরা এবং কিছু ইহুদি যুবক তাঁকে নিয়ে রসিকতা করছিল। তারা তাঁর পোশাক খুলে ফেলেছিল এবং তাঁকে পরিয়ে দিয়েছিল কাঁটার তৈরি গত বছরের একটা মুকুট।

    তাঁকে একটা পিলারের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তারা তাঁর সামনে নাচানাচি ও চিৎকার করছিল।

    তারা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল একটা বাদ্যযন্ত্ৰ।

    আমি সেখানে ঢুকতেই একজন চিৎকার করে উঠল, ‘লক্ষ্য করো হে ক্যাপ্টেন ইহুদিদের রাজাকে।’

    আমি তাঁর সামনে দাঁড়ালাম এবং তাকালাম তাঁর দিকে এবং আমার লজ্জা করছিল কিন্তু কেন আমি তা জানতাম না?

    আমি গাল্পীয়া এবং স্পেনে যুদ্ধ করেছিলাম এবং সে সসয় আমার লোকদের নিয়ে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু কখনও আমি ভয় পাইনি, প্রদর্শন করিনি কাপুরুষতা। আর যখন আমি যিশুর সামনে দাঁড়ালাম এবং তিনি আমার দিকে তাকালেন তখন মনে হল আমিই আমাকে হারিয়ে ফেললাম। মনে হল আমার ঠোঁট সিলমোহর করা হয়েছে এবং আমি একটা কথাও উচ্চারণ করতে পারলাম না।

    আমি সরাসরি কারাগার পরিত্যাগ করলাম।

    এই ঘটনা ঘটেছিল তিরিশ বছর আগে। তখন আমার যেসব পুত্র শিশু ছিল তারা এখন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ এবং তারা সেবা করছে সিজার এবং রোম সাম্রাজ্যের।

    কিন্তু প্রায়ই আমি পরামর্শ দেবার সময় তাঁর কথা বলি, একটা মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি এবং তাঁর ওষ্ঠের ওপর জীবনের প্রাণরস এবং তাঁর চোখে তাঁর হত্যাকারীদের জন্য তীব্র আবেগজনিত ভালোবাসা।

    এখন আমি বৃদ্ধ। জীবনের পরিপূর্ণ বয়স পর্যন্ত বেঁচে আছি এবং আমি প্রকৃত অর্থেই মনে করি যে, না পম্পেই না সিজার কেউই গালীলের ঐ লোকটির মতো বিশাল মানুষ ছিল না।

    তার অপ্রতিরোধ্য মৃত্যু যেন একটা সেনাবাহিনী যার উদ্ভব ঘটেছে মৃত্তিকা থেকে তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করতে… এবং তিনি উত্তম সেবা লাভ করবেন তাদের, যারা মৃত, অন্তত জীবন্ত পম্পেই ও সিজারের চিরকালীন সেবা লাভ করার চেয়ে।

    জেরুজালেমের জেমস : শেষ সান্ধ্যভোজ

    সেই রাতের স্মৃতি হাজারবার আমার কাছে ফিরে ফিরে এসেছে এবং আমি জানি তা আবার হাজারবার ফিরে ফিরে আসবে।

    মৃত্তিকাও ভুলে যাবে তার বক্ষের ওপর হলারেখার চিহ্ন এবং একজন নারী তার সন্তান জন্ম দেওয়ার বেদনা ও আনন্দ এবং তাঁর আগেই আমি ভুলে যাব সেই রাত্রিকে।

    বিকালে আমরা ছিলাম জেরুজালেম শহরের দেয়ালের বাইরে এবং যিশু বললেন, আমরা শহরে যাই এবং সরাইখানায় সান্ধ্যভোজে মিলিত হই।

    ‘চলো আমরা যখন সরাইখানায় পৌঁছালাম তখন অন্ধকার নেমেছে এবং আমরা সবাই ছিলাম ক্ষুধার্ত। সরাইখানার তত্ত্বাবধায়ক আমাদেরকে অভিবাদন জানিয়ে ভোজকক্ষের দিকে নেতৃত্ব দিলেন।

    যিশু আমাদেরকে আদেশ দিলেন ভোজের টেবিলে বসতে, কিন্তু নিজে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং তাকালেন আমাদের দিকে।

    তিনি কথা বললেন সরাইখানার রক্ষকের সঙ্গে এবং বললেন, ‘আমার জন্য একটা বড় পাত্রভর্তি পানি এবং একটা তোয়ালে নিয়ে এসো।’

    তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন, ‘তোমাদের চটি খুলে ফ্যালো।’ আমরা তার কথা উপলব্ধি করতে পারলাম না কিন্তু তাঁর আদেশ আমরা মান্য করলাম।

    তারপর সরাইখানার রক্ষক পাত্রভর্তি পানি ও তোয়ালে নিয়ে এল এবং যিশু বললেন, ‘এখন আমি তোমাদের পা ধুয়ে দেব। কারণ আমি তোমাদের পদযুগকে প্রাচীন ধুলো থেকে মুক্ত করতে চাই এবং নতুন পথের জন্য তাদের দান করতে চাই স্বাধীনতা।’

    আমরা প্রত্যেকেই বিব্রত ও লজ্জিত হয়ে পড়লাম।

    তারপর সাইমন পিটার উঠে দাঁড়াল এবং বলল, ‘আমি কীভাবে আমরা প্রভুকে আমার পা ধুইয়ে দেওয়ার কষ্ট করতে দেব?’

    যিশু বললেন, ‘আমি তোমাদের পা ধুয়ে দেব যেন তোমরা স্মরণ করতে পারো, যে মানুষের সেবা করে সে-ই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ।’

    তারপর তিনি প্রত্যেকের দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘মানুষের পুত্র, যিনি তোমাদেরকে তাঁর ভাই হিসেবে পছন্দ করেছেন, যার পায়ে গতকাল লেপন করা হয়েছিল আরবের গন্ধরস এবং তা শুকানো হয়েছিল নারীদের চুল দিয়ে, তাঁর আকাঙ্ক্ষা এখন তোমাদের পা ধুয়ে দেওয়ার।’

    তারপর তিনি পাত্রটা নিলেন এবং হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের পা ধুইয়ে দিলেন। শুরু করলেন জুডাস এসক্যারিওটকে দিয়ে।

    তারপর তিনি আমাদের সঙ্গে টেবিলে বসলেন, তার মুখমণ্ডল ছিল সারারাত ধরে রক্তপাত হয়েছে এরকম একটা যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর উদিত সূর্যের মতো।

    সরাইখানার রক্ষক ও তার স্ত্রী খাবার ও মদ নিয়ে এল।

    যদিও আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম যিশু আমার পা ধুয়ে দেওয়ার আগে, কিন্তু এখন মনে হল আমার কোনো পাকস্থলী নেই খাবারের জন্য এবং আমার গলার ভেতরে ছিল একটা অগ্নিশিখা যা আমি মদ দিয়ে নেভাতে পারব না।

    তারপর যিশু একটুকরো রুটি তুলে নিয়ে আমাদেরকে দিলেন এবং বললেন, ‘সম্ভবত আমরা এভাবে আর রুটিকে টুকরো করব না এবং এসো আমরা এই এক গ্রাস খাবার খাই গালীলে আমাদের সেই দিনগুলিকে স্মরণ করে।’

    তারপর তিনি জগ থেকে মদ ঢাললেন, নিজে খেলেন এবং আমাদেরকে দিয়ে বললেন, ‘পান করো আমরা যে তৃষ্ণাকে একত্রে জেনেছি সেই তৃষ্ণার কথা স্মরণ করে এবং পান করো দুষ্প্রাপ্য পুরোনো মদের আকাঙ্ক্ষায়। যখন আমি আলিঙ্গনাবদ্ধ এবং যখন তোমাদের

    মাঝে আমি আর নেই এবং যখন আমরা এখানে অথবা অন্য কোথাও মিলিত হব তখন তোমরা টুকরো করবে রুটি এবং মদ ঢালবে এবং খাবে ও পান করবে, এখন যেমন করছ। তারপর তোমাদের চারপাশে তাকাবে এবং দৈবাৎ তোমরা দেখতে পাবে আমি তোমাদের সঙ্গে টেবিলে বসে আছি।’

    একথা বলার পর তিনি আমাদের মধ্যে মাছ ও পাখির মাংসের টুকরো বিতরণ করলেন, যেন একটা পাখি, মাত্র উড়তে শিখেছে এরকম বাচ্চাকে খাবার খাওয়াচ্ছে।

    আমরা অল্প খেলেও আমাদের পেট ভরে গেল এবং আমরা পান করলাম প্রায় এক ফোটা মদ, কারণ আমাদের মনে হল কাপটা ছিল এই ভূমি ও অন্য ভূমির মাঝখানে একটি শূন্যতা।

    তারপর যিশু বললেন, ‘এই টেবিল ছেড়ে যাওয়ার আগেই আমরা চলো উঠে দাঁড়াই এবং গালীলের হার্ষোৎফুল্ল স্তুতিগান গাই।’

    আমরা উঠে দাঁড়ালাম ও একত্রে গান গাইলাম এবং তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল আমাদের ওপরে এবং তার প্রতিটি শব্দ যেন আলাদা আলাদাভাবে বেজে যাচ্ছিল।

    তিনি আমাদের মুখের দিকে তাকালেন, প্রত্যেকের দিকে এবং তারপর বললেন, —আমি এখন তোমাদেরকে বিদায়-সম্ভাষণ জানাচ্ছি। চলো এই দেয়ালের ওপর উঠে যাই। চলো মহাশূন্যের দিকে উঠে যাই।’

    জিবিদী’র পুত্র জন বলল, ‘প্রভু এই রাতেই কেন আপনি বিদায়-সম্ভাষণ বলছেন?’

    যিশু বললেন, ‘তোমাদের হৃদয়কে কষ্ট পেতে দিও না। আমি তোমাদেরকে ছেড়ে যাব শুধুমাত্র আমার পিতার গৃহে তোমাদের জন্য একটা জায়গা প্রস্তুত করতে। কিন্তু যদি তোমাদেরকে আমার প্রয়োজন হয় তাহলে আমি আবার ফিরে আসব। তোমরা যেখানে আমাকে আহ্বান জানাবে আমি সেখানেই তা শুনবে পাব এবং যেখানেই তোমাদের আত্মা অনুসন্ধান করবে আমাকে যেখানেই আমি থাকব।

    ‘ভুলে যেও না সেই তৃষ্ণা নেতৃত্ব দেবে আঙুর-পেষণকারী যন্ত্রের দিকে এবং সেই ক্ষুধা নেতৃত্ব দেবে ভোজ-উৎসবের দিকে।

    ‘এটা হচ্ছে তোমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষা, তোমরা মানুষের পুত্রকে খুঁজবে। কারণ আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে পরমানন্দের উৎস এবং পিতার কাছে যাবার রাস্তা।’

    জন আবার কথা বলল, ‘যদি আপনি আমাদেরকে পরিত্যাগ করেন তাহলে কীভাবে আমরা উৎসাহিত হব? কেন আপনি পৃথক হওয়ার কথা বলছেন?’

    যিশু বললেন, ‘শিকারকৃত হরিণ শিকারির তীরকে চেনে তার বক্ষে এটা অনুভব করার আগেই এবং নদীও সমুদ্র সম্পর্কে সচেতন, তার তীরভূমিতে আসার আগেই এবং মানুষের পুত্র ভ্রমণ করেছে মানুষের পথগুলি।

    অন্যকোনো কাঠবাদাম গাছ তার পুষ্পগুচ্ছকে বিকশিত করার আগেই আমার শিকড়গুলি অন্যকোনো শস্যক্ষেতের হৃদয়ে পৌছে যাবে।’

    তারপর সাইমন পিটার বলল, ‘প্রভু, আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন না এবং আপনার উপস্থিতির আনন্দ থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না। আপনি যেখানে যান, আমরাও সেখানে যাব।’

    সাইমন পিটারের কাঁধে হাত রাখলেন যিশু এবং হেসে বললেন, ‘কে জানে আজ রাত শেষ হওয়ার আগেই তুমি আমাকে অস্বীকার করতে পারো এবং আমি পরিত্যাগ করার আগেই তুমি পরিত্যাগ করতে পারো আমাকে

    তারপর হঠাৎ করে তিনি বললেন, ‘চলো আমরা এখান থেকে যাই।

    তারপর তিনি সরাইখানা পরিত্যাগ করলেন এবং আমরা তাঁকে অনুসরণ করলাম। কিন্তু আমরা যখন শহরের দরজায় পৌঁছালাম জুডাস তখন আমাদের সঙ্গে ছিল না এবং আমরা জাহান্নাম উপত্যকা অতিক্রম করে গেলাম। যিশু আমাদের একটু আগে আগে হাঁটছিলেন এবং আমরা হাঁটছিলাম খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে।

    একটা অলিভ কুঞ্জের কাছে এসে তিনি থামলেন এবং আমাদের দিকে ঘুরে বললেন, ‘এখানে এক ঘণ্টার জন্য বিশ্রাম নাও।’

    পরিপূর্ণ বসন্তকালেও সন্ধেটা ঠাণ্ডা, তুঁতগাছে মুকুল ধরেছে, আপেলগাছও পল্লবিত হয়ে উঠেছে।

    আমাদের প্রত্যেকেই অনুসন্ধান করছিল একটা গাছের গুঁড়ি এবং প্রত্যেকেই তার ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ছিল। আমি আমার আলখাল্লা জড়ো করে মাথার তলায় দিয়ে একটা পাইনগাছের নিচে শুয়ে পড়লাম।

    কিন্তু যিশু আমাদেরকে রেখে একা অলিভকুঞ্জের ভেতরে ঢুকলেন এবং তা আমি একাই দেখলাম, কারণ অন্যেরা ঘুমাচ্ছিল।

    তিনি হঠাৎ করেই স্থির হয়ে দাঁড়ালেন এবং তিনি হাঁটলেন ওপরে ও নিচে। এটা তিনি করলেন কয়েকবার।

    তারপর তিনি তাঁর মুখ আকাশের দিকে তুললেন এবং দুই বাহু প্রসারিত করলেন পূর্ব ও পশ্চিমের দিকে।

    একবার তিনি বললেন, ‘স্বর্গ, পৃথিবী এবং নরক সবই মানুষের।’ এখন আমি তাঁর কথা স্মরণ করতে পারি এবং আমি জানতাম, অলিভকুঞ্জে যিনি হাঁটছেন তিনি ছিলেন স্বর্গ, যিনি মানুষ তৈরি করেছিলেন এবং আমার মনে হল মৃত্তিকার গর্ভই শেষ কিংবা শুরু নয়, বরং একটা রথ, একটু বিরতি এবং বিস্ময়ের বিস্মিত একটি মুহূর্ত এবং নরকও আমি দেখলাম জাহান্নামের উপত্যকায় যা শায়িত অবস্থায় থাকে তাঁর এবং পবিত্র শহরের মাঝখানে।

    তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং আমি আমার পোশাক জড়িয়ে শুয়ে থাকলাম, আমি তার কথার শব্দ শুনছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন না। তিনবার আমি শুনলাম তিনি ‘পিতা’ শব্দ উচ্চারণ করলেন এবং আমি তাঁর সব কথা শুনেছিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি হাত নামালেন এবং আমার চোখ ও আকাশের মাঝখানে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন একটা সাইপ্রেস গাছের মতো।

    সবশেষে তিনি আবার আমাদের ভেতরে ফিরে এলেন এবং আমাদেরকে বললেন, ‘জেগে ওঠো। আমার সময় এসে গেছে। ইতিমধ্যেই পৃথিবী আমাদের ওপর অস্ত্রসহ যুদ্ধের জন্য প্ৰস্তুত।’

    তারপর তিনি বললেন, ‘এক মুহূর্ত আগে আমি আমার পিতার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। যদি তোমাদের সঙ্গে আমার আবার দেখা না হয় তা হলে সেই বিজয়ীকে স্মরণ করবে যে বিজিত না-হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাবে না।

    যখন আমরা জেগে উঠলাম এবং তাঁর কাছাকাছি এলাম তখন তাঁর মুখমণ্ডল ছিল মরুভূমির ওপর নক্ষত্রখচিত স্বর্গের মতো।

    তারপর তিনি প্রত্যেকের কপোলে চুমু খেলেন এবং যখন তিনি আমার কপোলে ঠোঁট ছোঁয়ালেন তখন তা ছিল জ্বরে আক্রান্ত শিশুর হাতের মতো উষ্ণ।

    হঠাৎ করেই আমরা দূরে একটা কোলাহল শুনতে পেলাম এবং মনে হল তারা সংখ্যায় অনেক এবং যখন কোলাহলটা কাছে এল তখন দেখলাম লণ্ঠন ও দাসসহ একদল লোক এবং তারা খুবই দ্রুত এসেছিল।

    তারা কুঞ্জবনের কাছাকাছি আসতেই যিশু আমাদেরকে পরিত্যাগ করলেন এবং সামনে এগিয়ে গেলেন তাদের সঙ্গে মিলিত হতে। কোলাহলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল জুডাস।

    ঢাল ও তরবারি নিয়ে তার সঙ্গে এসেছিল রোমান সৈন্যরা। আরো এসেছিল জেরুজালেমের লোকেরা মুগুর ও কুড়াল নিয়ে।

    জুডাস যিশুর কাছে এসে তার হাত চুম্বন করল এবং তারপর অস্ত্রসজ্জিত লোকদের বলল, ‘এই সেই লোক।’

    যিশু জুডাসকে বললেন, ‘জুডাস তুমি ছিলে আমার সঙ্গে সবসময়ই ধৈর্যশীল। এটা গতকালও হতে পারত।’

    তারপর তিনি অস্ত্রসজ্জিত লোকদের কাছে এলেন এবং বললেন, ‘নাও আমাকে বন্দি করো। কিন্তু দ্যাখো, তোমাদের খাঁচা এই পাখাগুলির জন্য যথেষ্ট বড়।’

    তারপর তারা তাঁকে মাটিতে ফেলে দিল এবং গ্রেফতার করল এবং অন্যেরা সবাই চিৎকার করছিল।

    কিন্তু আমরা তখন ভয়ে দৌড়াতে লাগলাম এলোমেলোভাবে এবং পালানোর চেষ্টা করলাম। আমি দৌড়ে প্রবেশ করলাম অলিভকুঞ্জে। সমস্ত কিছু ভুলে গেলাম এমনকি ভয়ে আমার মুখ থেকে একটা কথাও বেরুল না।

    সেই রাতে প্রায় দুই অথবা তিন ঘণ্টা ধরে আমি পালাচ্ছিলাম এবং নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছিলাম এবং ভোরবেলায় আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম জেরিখের কাছাকাছি একটা গ্রামে।

    কেন আমি তাকে পরিত্যাগ করেছিলাম? আমি জানি না। আমি আমার বেদনার ভেতরে তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলাম। আমি ছিলাম কাপুরুষ এবং তাঁর শত্রুদের সামনে থেকে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম।

    আমি ছিলাম আমার হৃদয়ের কাছে অসুস্থ এবং লজ্জিত এবং তারপর আমি জেরুজালেম ফিরে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি ছিলেন বন্দি এবং কোনো বন্ধু তাঁর সঙ্গে ছিল না।

    তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল কিন্তু তাঁর রক্ত মৃত্তিকায় নতুন কাদামাটির জন্ম দিয়েছিল।

    আমি এখনও বেঁচে আছি এবং বেঁচে আছি তাঁর মধুর জীবনের মৌচাকের ওপর।

    সাইমন : ক্রুশ-বহনকারী যিশু

    তখন আমি মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। দেখতে পেলাম যিশু তাঁর ক্রুশ-বহন করছেন এবং জনতা অনুসরণ করছে তাঁকে।

    আমিও তাঁর পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম।

    তাঁর বোঝা তাকে বহুবার থামিয়ে দিল, কারণ তাঁর শরীর নিঃশেষ হয়ে এসেছিল।

    তারপর একজন রোমান সৈন্য আমার কাছে এগিয়ে এল এবং বলল, ‘এসো, তুমি শক্তিশালী এবং তোমার শরীরও সুগঠিত। সুতরাং এই লোকের ক্রুশটা তুমি বহন করো।

    এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুক স্ফীত হয়ে উঠল এবং নিজেকে কৃতজ্ঞ মনে হল।

    আমি তাঁর ক্রুশ বহন করলাম।

    এটা ছিল খুবই ভারী, কারণ তা শীতের বৃষ্টিতে ভেজা পপলার গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি।

    যিশু আমার দিকে তাকালেন। তাঁর কপালের ঘাম তাঁর দাড়ি বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসছিল।

    আবার তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘এই কাপ তুমিও পান করছ? বস্তুতপক্ষে তুমি আমার সঙ্গে সময়ের শেষ পর্যন্ত পান করবে।’

    একথা বলে তিনি আমার কাঁধে হাত রাখলেন এবং আমরা একসঙ্গে খুলির পাহাড়ের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

    আমি ক্রুশের কোনো ওজনই অনুভব করলাম না। আমি শুধুই অনুভব করলাম তাঁর হাত এবং তা ছিল আমার কাঁধের ওপর একটা পাখির পাখার মতো।

    তারপর আমরা পাহাড়চূড়ায় পৌঁছালাম যেখানে তারা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল।

    তারপর আমি অনুভব করতে লাগলাম ক্রুশের ওজন।

    যখন তারা তাঁর হাতে পেরেক ঠুকছিল তখন তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না এমনকি কোনো শব্দও শোনা গেল না।

    তাঁর হাত এবং পা শিহরিত হল না হাতুড়ির নিচে।

    মনে হয় তার হাত এবং পা মারা গিয়েছিল এবং পুনরায় জীবন্ত হয়েছিল রক্তস্নাত হয়ে। আবার এটাও মনে হল, যদি তিনি একজন রাজকুমারের রাজদণ্ড অনুসন্ধানের মতো পেরেক অনুসন্ধান করতেন তাহলে তিনি উচ্চতারও ওপরে উঠে যাবার জন্য তা ব্যাকুলভাবে কামনা করতেন।

    আমার হৃদয় তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শনের কোনো চিন্তাই করল না, কারণ আমি ছিলাম বিস্ময়ে পরিপূর্ণ

    যার ক্রুশ আমি বহন করেছিলাম সেই লোকই এখন আমার ক্রুশে পরিণত হয়েছে।

    তাদের কি উচিত আমাকে আবার বলা, ‘এই লোকের ক্রুশটা বহন করো।’ আমি এটা বহন করব আমার পথের শেষ অর্থাৎ কবর পর্যন্ত।

    কিন্তু আমি প্রার্থনা করব তাঁর কাছে তাঁর হাত রাখতে আমার কাঁধের ওপর।

    এসব ঘটেছিল বহু বছর আগে এবং এখনও আমি যখন শস্যক্ষেতে হলরেখা অনুসরণ করি এবং ঘুমের আগের সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন মুহূর্তে সবসময়ই স্মরণ করি অত্যন্ত প্রিয় সেই মানুষকে।

    এবং আমি আমার বাম কাঁধের ওপর তাঁর পাখাযুক্ত হাত অনুভব করি।

    সাইবোরিয়া : জুডাসের মাতা

    আমার পুত্র ছিল একজন ভালো ও সোজাসাপ্টা মানুষ। আমার প্রতি তার আচরণ ছিল খুবই কোমল। সে ভালোবাসত তার আত্মীয়-পরিজন এবং দেশের মানুষকে। সে ঘৃণা করত আমাদের শত্রুদের, যদিও তারা সূতা কাটত না এবং তাঁতে বসত না এবং তারা ফসল তুলত এবং জড়ো করত সেইসব জমির যা তারা চাষ করেনি এবং বীজ বোনেনি।

    আমার ছেলের বয়স ছিল সতেরো বছর যখন তাঁকে বন্দি করা হয়। সে আমাদের আঙুরবাগানের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে থাকা রোমান সেনাবহিনীর দিকে তীর ছুঁড়েছিল।

    এমনকি সেই বয়সে সে অন্যান্য যুবকদের সঙ্গে ইসরাইলের গৌরব নিয়ে কথা বলত এবং সে বহু অদ্ভুত কথা উচ্চারণ করত, যার অর্থ আমি বুঝতাম না।

    সে ছিল আমার পুত্র, আমার একমাত্র পুত্র।

    সে আমার এই বক্ষ থেকে জীবন পান করেছিল যা এখন শুকনো এবং সে এই বাগানে প্রথম পদক্ষেপ ফেলেছিল এই আঙুলগুলি ধরে যা এখন নলখাগড়ার মতো কাঁপছে।

    এই একই হাতের সঙ্গে সে ছিল যুবক এবং তরতাজা, লেবাননের আঙুরের মতো, তার ব্যবহৃত প্রথম চটি আমি লিনেনের রুমালে জড়িয়ে রেখেছি যা আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। এখনও আমি তা জানালার পাশের সিন্ধুকে রেখে দিয়েছি।

    সে ছিল আমার প্রথম সন্তান এবং যখন সে প্রথম হাঁটার জন্য পা ফেলেছিল আমিও তখন প্রথম পা ফেলেছিলাম। কারণ নারীরা ভ্রমণ করে না সন্তানদেরকে হাঁটতে শেখানো ছাড়া।

    তারা আমাকে বলে সে আত্মহত্যা করেছে। সে উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে নিজেকে নিচে নিক্ষেপ করেছিল কারণ সে তার বন্ধু নাজারেতের যিশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

    আমি জানি আমার ছেলে মৃত, কিন্তু আমি জানি সে কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, কারণ সে তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসত এবং রোমানদের ছাড়া কাউকেই ঘৃণা করত না।

    আমার পুত্র ইসরাইলের গৌরব অনুসন্ধান করত এবং সেই গৌরব ছাড়া তার ঠোঁটে ও কর্মকাণ্ডে আর কিছুই ছিল না।

    যখন সে প্রধান সড়কের ওপর যিশুর সঙ্গে মিলিত হয় তখন আমাকে পরিত্যাগ করে তাঁকে অনুসরণ করতে এবং আমি জানতাম কোনো মানুষকে অনুসরণ করা তার জন্য একটা ভ্রান্তি।

    যখন সে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাল তখন তাকে বলেছিলাম সে ভুল করছে, কিন্তু সে আমার কথা শোনেনি।

    আমাদের সন্তানেরা আমাদের কথায় কান দেয় না আজকালকার প্রবল স্রোতের মতো, কিন্তু তারা পরামর্শও নেয় না গতকালের প্রবল স্রোতের কাছ থেকে।

    আমি প্রার্থনা করছি আমার ছেলে সম্পর্কে, তোমরা আমাকে আর কোনো প্রশ্ন কোরো না। আমি তাকে ভালোবাসতাম এবং ভালোবাসব চিরকাল।

    ভালোবাসা যদি মাংসের ভেতরে থাকে তাহলে আমি তা গরম লোহা দিয়ে পুড়িয়ে বের করে আনব এবং তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেব, কিন্তু তা কেবলই আত্মার ভেতরে যেখানে পৌঁছানো যায় না।

    আমি এখন এর বেশি আর কিছুই বলব না। যাও প্রশ্ন করো সেইসব নারীদের যারা জুডাসের মায়ের চেয়েও অধিক সম্মানিত।

    বরং যিশুর মায়ের কাছে যাও। তার বুকেও তরবারির আঘাত, সে তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে বলবে এবং তখন তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে।

    বিবলজের নারী : একটি বিলাপ

    আমার সঙ্গে কাঁদো হে এ্যাসতারতের কন্যারা এবং কাঁদে হে তামৌজের প্রেমিকারা।

    আদেশ দাও তোমাদের হৃদয়কে গলে যেতে এবং বেড়ে উঠতে এবং দৌড়ুতে রক্তের অশ্রুর সঙ্গে।

    কারণ তিনি, যিনি সোনা ও হাতির দাঁতের তৈরি, এর বেশি কিছু নয়।

    অন্ধকারে বনভূমির ভেতরে তাঁকে অতিক্রম করে যাবে পুরুষ শূকর; এবং শূকরের কর্মকাণ্ড ভেদ করবে তাঁর মাংস।

    এখন সে গত বছরের বিবর্ণ পাতার সঙ্গে শুয়ে আছে;

    কোন ভাবেই তাঁর পদক্ষেপ বীজগুলিকে জাগাবে না যা বসন্তের বুকের ভেতরে শুয়ে আছে।

    তাঁর কণ্ঠস্বর ভোরবেলার সঙ্গে আমার জানালায় আসবে না,

    এবং আমি চিরকালের জন্য একা হব।

    আমার সঙ্গে কাঁদো হে এ্যাসতারতের কন্যারা এবং কাঁদো হে তামৌজের প্রেমিকারা।

    কারণ আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ পালিয়ে গেছে,

    তিনি হলেন সেই মানুষ যিনি কথা বলেন, যেভাবে নদী কথা বলে,

    তিনি হলেন সেই মানুষ যার কণ্ঠস্বর ও সময় ছিল যময শিশু

    তিনি হলেন সেই মানুষ যার মুখের রক্তাক্ত যন্ত্রণা তৈরি করত মধুরতা,

    তিনি হলেন সেই মানুষ যার ঠোঁটের ওপর গরল পরিণত হত মধুতে।

    আমার সঙ্গে কাঁদো হে এ্যাসতারতের কন্যারা এবং কাঁদো হে তামৌজের প্রেমিকারা।

    তাঁর শবযানকে ঘিরে আমার সঙ্গে কাঁদো যেভাবে নক্ষত্রেরা কাঁদে
    এবং চাঁদের পাপড়ির মতো তাঁর আহত শরীরের ওপরে পতিত হয়।

    তোমাদের অশ্রুজলে ভিজিয়ে দাও আমার বিছানার চাদর; যেখানে আমার অত্যন্ত প্ৰিয় মানুষ আমার স্বপ্নের ভেতরে একবার শুয়েছিল এবং আমার জাগরণের ভেতরে সে অপসৃত হয়ে যায়।

    আমি তোমাদেরকে অভিযুক্ত করি হে এ্যাসতারতের কন্যারা এবং তামৌজের সব প্রেমিকারা, উম্মুক্ত কর তোমাদের বক্ষ, কাঁদো এবং আমাকে শান্তি দাও;

    কারণ নাজারেতের যিশু এখন মৃত।

    মেরি ম্যাগডালিন, তিরিশ বছর পর : আত্মার পুনরুত্থান সম্পর্কে

    আমি আরও একবার বলছি, যিশু মৃত্যুকে জয় করেছিলেন এবং কবর থেকে বেড়ে উঠেছিলেন, একটা আত্মা ও একটি ক্ষমতা এবং তিনি হেঁটেছেন আমাদের নিঃসঙ্গতার ভেতরে এবং পরিদর্শন করেছেন আমাদের আবেগজনিত তীব্র অনুভূতির বাগানগুলো।

    তিনি পাথরের পেছনে শিলার ফাটলে শায়িত নন।

    আমরা যারা তাঁকে ভালোবাসি তারা লক্ষ্য করেছি আমাদের সেই চোখ যা তিনি দেখার জন্য তৈরি করেছিলেন এবং আমরা তাঁকে স্পর্শ করেছিলাম আমাদের সেই হাতে, যাকে তিনি শিখিয়েছিলেন সামনে এগোতে।

    আমি তোমাদেরকে চিনি যারা তাঁকে বিশ্বাস করো না। আমিও তোমাদের একজন ছিলাম এবং তোমরা ছিলে সংখ্যায় অনেক কিন্তু তোমাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাবে।

    অবশ্যই তোমরা ভেঙে ফ্যালো তোমাদের অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র এবং বীণা, তা থেকে সুর অনুসন্ধান করতে।

    অথবা অবশ্যই তোমরা অনুভব করো একটা গাছকে, যা ফল বহন করতে পারে বিশ্বাস করার আগেই?

    তোমরা যিশুকে ঘৃণা করো কারণ উত্তরদেশের কেউ একজন বলেছিল তিনি ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র। কিন্তু তোমরা একজন অন্যজনকে ঘৃণা করো কারণ প্রত্যেকেই তোমরা নিজেকে বিশাল কিছু মনে করো অন্যের ভাইয়ে পরিণত হওয়ার চেয়ে।

    তোমরা তাকে ঘৃণা করো কারণ কেউ একজন বলেছিল কুমারীর ভেতর থেকে তাঁর জন্ম হয়েছে এবং মানুষের বীজে নয়।

    কিন্তু তোমরা সেইসব মাকে চেনো না যারা কুমারী অবস্থায় কবরে যায়, চেনো না তোমরা সেই পুরুষকে যে কবরে যায় নিজের তৃষ্ণায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। তোমরা জানো না যে পৃথিবীর বিয়ে হয়েছে সূর্যের সঙ্গে এবং পৃথিবী আমাদেরকে সামনে এগিয়ে দেয় পাহাড় ও মরুভূমিতে যেতে।

    সেখানে একটা স্থলবেষ্টিত উপসাগর রয়েছে, যা তাদের ভেতরে হাই তোলে। যারা তাঁকে ভালোবাসে এবং যারা তাঁকে ঘৃণা করে, তাদের ভেতরে কে বিশ্বাস করে এবং তাদের ভেতরে কে বিশ্বাস করে না।

    কিন্তু যখন বছরগুলি সেই উপসাগরে সেতু নির্মাণ করেছে তখন তোমাদেরকে জানতে হবে যে, তিনি আমাদের ভেতরে বেঁচে আছেন এবং তিনি মৃত্যুহীন। তিনি ছিলেন ঈশ্বরের পুত্র, যেমন আমরাও ঈশ্বরের সন্তান। তিনি জন্মেছিলেন কুমারীর গর্ভে যেমন আমরা জন্মাই স্বামীহীন পৃথিবীতে।

    এটা একটা বিস্ময় যে পৃথিবী অবিশ্বাসীদেরকে সেই শিকড় প্রদান করে না, যা তার বক্ষ চুষে খায়, প্রদান করে না সেই পাখা যার দ্বারা সে উঁচুতে উড়তে ও পান করতে পারে এবং পরিপূর্ণ হতে পারে তার মহাশূন্যের শিশির দিয়ে।

    কিন্তু আমি জানি এবং যা জানি তা যথেষ্ট।

    লেবাননের একজন মানুষ : উনিশ শতকের পর

    শিক্ষক, শিক্ষক গায়ক,

    কথার শিক্ষক যে কথা বলা হয়নি,

    সাতবার আমি জন্মেছিলাম এবং সাতবার আমি মারা গিয়েছিলাম

    তোমার সর্বশেষ দ্রুত পরিদর্শন এবং আমাদের সংক্ষিপ্ত সম্ভাষণের পর থেকে।

    এবং লক্ষ্য করো আমি আবার বেঁচে উঠছি,

    পাহাড়ের ভেতরে অতিবাহিত হয়ে যাওয়া একটি দিন ও একটি রাত্রির কথা স্মরণ করে,

    যখন তোমাদের স্রোত আমাদেরকে ওপরে উত্তোলন করেছিল।

    তারপর অনেক ভূমি এবং অনেক সমুদ্র আমি অতিক্রম করেছিলাম এবং যেখানেই আমাকে ঘোড়ার জিন ও নৌকার পাল নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেখানেই তোমার নাম ছিল প্রার্থনা অথবা মতবিনিময়।

    মানুষ তোমাদেরকে আশীর্বাদ অথবা অভিশাপ দেবে অভিশাপ হচ্ছে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ, আর আশীর্বাদ হচ্ছে শিকারির স্তোত্রগীতি,
    যে পাহাড় থেকে ফিরে আসে তার সঙ্গীর রসদসহ।

    তোমাদের বন্ধুরা যদিও আমাদের সঙ্গে আছে আয়েশ ও সহযোগিতার জন্য
    এবং তোমাদের শত্রুরাও শক্তি ও নিশ্চয়তার জন্য।

    তোমাদের মা এখন আমাদের সঙ্গে,

    আমি তার মুখের চাকচিক্য লক্ষ করি সমস্ত মায়ের প্রসন্ন মুখাবয়কে।

    তার হাত ধীরে ধীরে দোলনাকে দোলায়;

    তার হাত আচ্ছাদন ভাঁজ করে কোমলতার সঙ্গে।

    মেরি ম্যাগডালিন যদিও আমাদের মাঝখানে; সে জীবনের সিরকা পান করেছিল, তারপর জীবনের মদ এবং জুডাস, বেদনা ও হীন লক্ষ্যের মানুষ সেও পৃথিবীর ওপর হাঁটে, এমনকি সে নিজেকেই শিকার করে, যখন তার ক্ষুধা আর কাউকেই খুঁজে পায় না।

    অনুসন্ধান করে তার বৃহত্তর সত্তা আত্মবিনাশের ভেতর এবং সেই জন যার যৌবন সৌন্দর্য ভালোবাসত, সে আজ এখানে এবং সে গান গায় যদিও অমনোযোগী এবং অধৈর্য সাইমন পিটার তোমাদেরকে অস্বীকার করেছিল যে সে তোমাদের জন্য দীর্ঘকাল বাঁচতে পারে, সেও তোমাদের আগুনের পাশে বসে।

    সে তোমাদেরকে আবার অস্বীকার করতে পারে অন্যদিনের ভোরবেলার আগেই, যদিও সে তোমাদের উদ্দেশ্যেই ক্রুশবিদ্ধ হবে এবং মনে করবে এই সম্মান তার প্রাপ্য। এবং কারাকাস ও আন্নাস এখনও পর্যন্ত বেঁচে আছে, বিচার করে অপরাধী এবং নিষ্পাপ মানুষের।

    তারা ঘুমায় তাদের পালকসজ্জিত বিছানায়
    যখন তারা কারও বিচার করে তখন তাকে রড দিয়ে পেটায়।

    সেই নারী যাকে ব্যাভিচারের কারণে আনা হয়েছিল
    সে আমাদের শহরগুলির রাস্তায় হেঁটেছিল,

    রুটির জন্য যে ক্ষুধা তা তখনও সেঁকা হয়নি,
    এবং সে একটা শূন্য বাড়ির ভেতরে একা।

    পস্টিয়াস পিলাটুসও এখন এখানে
    সে তোমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে যাকে আতঙ্কের ভেতরে
    এবং তোমাদেরকে প্রশ্ন করতে থাকে কিন্তু সে কোনো ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখায় না
    অথবা প্রতিরোধ করেনা কোনো বহিরাগত প্রজাতিকে এবং এখনও সে তার হাত ধুচ্ছে।
    এমনকি এখন জেরুজালেম ধরে রাখে অববাহিকা এবং রোম ধরে রাখে পাত্রখানা
    এবং দুই হাজার হাত তার মাঝখানে ধৌত হবে শুভ্রতার জন্য।

    কবি, কবিদের গুরু।
    সেইসব কথার গুরু যা গাওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে।

    তারা মন্দির নির্মাণ করেছে তোমাদের নামকে গৃহবাসী করতে এবং প্রতিটি উচ্চতার ওপরে তারা তোমাদের ক্রুশকে তুলে ধরেছে, যা একটি চিহ্ন এবং একটি প্রতীক স্বেচ্ছাচারী পা-কে নির্দেশ দিতে, কিন্তু তোমাদের উল্লাসের প্রতি নয়।

    তোমাদের আনন্দ হচ্ছে একটি পাহাড় তাদের দৃশ্যমানতার ওপরে এবং এটা তাদেরকে আয়েশ দেয় না।

    তারা সম্মানিত করবে সেই ব্যক্তিকে যাকে তারা চেনে না এবং সেখানে কি সেই সান্ত্বনা একটা মানুষকে নিয়ে যে তাদের মতোই একটা মানুষ, যে মহানুভব তাদের নিজের মহানুভবতার মতোই।
    একজন ঈশ্বর যার ভালোবাসা তাদের ভালোবাসার মতোই
    এবং যাঁর ক্ষমা তাদের নিজস্ব ক্ষমার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়?

    তারা মানুষকে সম্মান করে না, জীবন্ত মানুষকে,

    সেই প্রথম যে তার চোখ খুলে দিয়েছিল এবং সে তাকিয়েছিল স্থিরদৃষ্টিতে সূর্যের দিকে স্থির চোখের পাতাসহ।

    না, তারা তাকে চেনে না এবং তারা তাঁর মতো হবে না।

    তারা অপরিচিত হয়ে থাকবে, যারা অপরিচিতদের মিছিলে হাঁটছে।

    তারা বহন করবে দুঃখ, তাদের নিজস্ব দুঃখ
    এবং তারা তোমাদের আনন্দের ভেতরে স্বস্তি অন্বেষণ করবে না।

    তাদের ক্ষতবিক্ষত হৃদয় স্বান্তনা খুঁজবে না তোমাদের কথার ভেতরে এবং সেই কথার ভেতরে যে গান আছে সেই গানের ভেতরে।

    তাদের যন্ত্রণা নীরবতা এবং আকৃতিহীনতা
    তাদেরকে নিঃসঙ্গ প্রাণীতে পরিণত করেছে যাদেরকে কেউ পরিদর্শন করেনা।

    তারা আতঙ্কের ভেতরে বাঁচে সঙ্গীসাথীহীন তবুও তারা নিঃসঙ্গ হবে না।

    তারা পূর্বদিকে নুয়ে পড়বে যখন প্রবাহিত হবে পশ্চিমের বাতাস।

    তারা আহ্বান জানাবে আপনাকে রাজা বলে
    এবং তারা থাকবে আপনার আওতায়।

    তারা আপনাকে বলে ত্রাণকর্তা,
    এবং তারা তাদের শরীরে পবিত্র তেল লেপন করবে।

    হ্যাঁ, তারা বেঁচে থাকবে আপনার জীবনের আদর্শের ওপর।

    শিক্ষক, শিক্ষক গায়ক,

    আপনার অশ্রুজল ছিল মে মাসের বর্ষণের মতো,
    এবং শুভ্র সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ছিল আপনার উচ্চহাসি।
    যখন আপনি কোনোকিছু বলেছিলেন তখন তা ছিল
    দূরবর্তী ফিসফিস ধ্বনি তাদের ঠোঁটের ওপর, যাদের ঠোঁটের উচিত
    আগুনের সঙ্গে সঙ্গে দয়ার্দ্র হয়ে ওঠা।

    আপনি হেসেছিলেন তাদের হাড়ের ভেতরের মজ্জার কারণে
    যা এখনও হেসে ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়নি।

    আপনি কেঁদেছিলেন তাদের জন্য যাদের চোখ ছিল শুকনো।

    আপনার কণ্ঠস্বর তাদের চিন্তা ও উপলব্ধিকে পিতৃত্ব দান করে
    এবং আপনার কণ্ঠস্বর তাদের কথা ও শ্বাস-প্রশ্বাসকে দেয় মাতৃত্ব।

    সাতবার আমি জন্মেছিলাম এবং সাতবার মারা গিয়েছিলাম
    এবং এখন আমি আবার বেঁচে উঠেছি এবং আপনাকে দেখছি
    যোদ্ধাদের ভেতরে একজন যোদ্ধা।

    কবিদের কবি।

    সমস্ত রাজার ওপরের রাজা।

    একজন লোক অর্ধনগ্ন আপনার সহযাত্রীর সঙ্গে

    প্রতিদিন যাজক তার মাথা নোয়ায়
    যখন উচ্চারণ করে আপনার নাম।

    প্রতিদিন ভিক্ষুকেরা বলে :
    ‘যিশুর নামের খাতিরে আমাদেরকে এক পেনি
    দান করুন রুটি কেনার জন্য।’

    আমরা আহ্বান জানাই পরস্পরকে
    কিন্তু সত্যের ভেতরে আমরা আপনাকে আহ্বান জানাই,
    আমাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার বসন্তের ভেতরে
    প্লাবনের স্রোতের মতো,
    এবং যখন আমাদের শরৎ আসে ভাটার স্রোতের মতো।

    জোরে অথবা আস্তে হোক, আপনার নাম আমাদের ওষ্ঠের ওপর,

    সীমাহীন আবেগজনিত তীব্র অনুভূতির শিক্ষক,
    শিক্ষক আমাদের নিঃসঙ্গ সময়ের,

    এখানে এবং সেখানে, কফিন এবং দোলনার মাঝখানে
    আমি সাক্ষাৎ করি আপনার ভাইদের সঙ্গে, যারা নীরব থাকে।

    মুক্ত মানুষ বেড়ি ও হাতকড়া ছাড়া,
    আপনার মৃত্তিকা ও মহাশূন্য মাতার সন্তানেরা।

    তারা হল আকাশের পাখিদের মতো,
    এবং মাঠের পদ্মফুলের মতো।

    তারা যাপন করে আপনার জীবন এবং ভাবে আপনার চিন্তাগুলি
    এবং তারা আপনার কথা প্রতিধ্বনিত করে
    কিন্তু তাদের হাতগুলি শূন্য,
    এবং তারা বিশাল ক্রুশে ক্রুশবিদ্ধ হয়নি,
    এবং তাতে রয়েছে তাদের বেদনা।

    পৃথিবী তাদের প্রতিদিন ক্রুশবিদ্ধ করে
    কিন্তু তা কেবলই ছোট ছোট ক্রুশে।

    আকাশকে বাঁকানো হয়নি
    এবং মটি বেদনা অনুভব করে না তার মৃতের সঙ্গে।

    তারা ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে এবং তাদের মর্মবেদনার কোনো সাক্ষী নেই।

    তারা শুধু তাদের মুখ ডাইনে ও বামে ঘোরায়
    এবং কাউকেই খুঁজে পায় না যে তাদেরকে তাঁর রাজ্যের
    গন্তব্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।

    যদিও তারা আবার ক্রুশবিদ্ধ হবে,
    আপনার ঈশ্বরই তাদের ঈশ্বর
    আপনার পিতাই তাদের পিতা

    হে দক্ষ প্রেমিক
    রাজকুমারীরা আপনার আগমনের অপেক্ষায় আছে তাদের সুরভিত কক্ষে
    এবং বিবাহিত ও অবিবাহিত নারীরা রয়েছে তাদের খাঁচায়,
    লজ্জা বিকিয়ে দিয়ে যে বেশ্যা রাস্তায় রুটি অনুসন্ধান করে
    এবং যে মঠবাসিনীর কোনো স্বামী নেই,
    নিঃসন্তান যে রমণী তার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে,
    যেখানে হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা জানালার শার্সিতে, বনভূমিকে চিত্রিত করে,
    এবং সেই ভারসাম্যের ভেতরে বনভূমি আপনাকে খুঁজে পায়
    এবং সেই বনভূমিই হবে আপনার মাতা এবং আপনি স্বস্তি পাবেন।

    শিক্ষক, কবিদের শিক্ষক
    শিক্ষক আমাদের নীরব আকাঙ্ক্ষার
    পৃথিবীর হৃদয় শিহরিত হয় আপনার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে,
    কিন্তু তা আপনার গানের সঙ্গে পুড়ে যায় না।

    পৃথিবী আপনার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য বসে থাকে প্রশান্ত উজ্জ্বলতার ভেতরে,
    কিন্তু তা তার আসন থেকে উত্থিত হয় না সেই তুলাদণ্ডের দিকে
    যা আপনার পাহাড়গুলির মাঝখানে উত্তোলিত হয়।

    মানুষ স্বপ্ন দেখবে আপনার স্বপ্নগুলি কিন্তু আপনার ভোরবেলায় সে জেগে উঠবে না, যা
    এর আরও বৃহত্তর স্বপ্ন।

    সে আপনার চোখ দিয়ে দেখতে পারবে
    কিন্তু সে তার ভারী পা আপনার সিংহাসনের কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারবে না।

    যদিও অনেকেই আপনার সিংহাসনে বসেছে
    এবং আপনার ক্ষমতার প্রতীক হচ্ছে বিশপের টুপি
    এবং তারা আপনার স্মরণীয় পরিদর্শনের নামে মাথায় পরে মুকুট
    এবং হাতে ধরে রাখে রাজদণ্ড।

    শিক্ষক, হে আলোর শিক্ষক
    কার চোখ অন্ধের আঙুল অনুসন্ধানের ভেতরে বসবাস করে

    আপনি এখনও ঘৃণা ও অবজ্ঞার শিকার;

    একজন মানুষ ঈশ্বর হওয়ার ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল ও ভঙ্গুর,
    একজন ঈশ্বর হচ্ছেন অতিরিক্ত মানুষ প্রার্থনার ক্ষেত্রে
    সামনে আহ্বান জানানোর জন্য।

    তাদের উৎসব এবং তাদের স্তোত্রগীতি,
    তাদের দীক্ষাদান ও তাদের চার্চের প্রার্থানাবলি সবই তাদের স্বাধীন সত্তার জন্য।

    যদিও আপনি সেখানে একটি দূরবর্তী সত্তা, তাদের দূরবর্তী ক্রন্দন এবং তাদের আবেগজনিত তীব্র অনুভূতি।

    কিন্তু হে শিক্ষক, আকাশের মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী,
    অধিকতর মার্জিত স্বপ্নের সম্মানিত পুরুষ,
    এই দিন পর্যন্ত আপনি হেঁটে যেতে পারেন,
    না ধনুক বা বর্শা কিছু আপনার পদচিহ্নের ওপর অবস্থান করবে না, কারণ আমাদের তীরগুলোর ভেতরে দিয়ে আপনি হেঁটে বেড়ান।

    আপনি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসেন, যদিও আপনি আমাদের ভেতরে সবচেয়ে কনিষ্ঠ এবং আপনিই আমাদেরকে পিতার মতো সবকিছু দান করেন।

    কবি, গায়ক ও বিশাল হৃদয়ের অধিকারী আমাদের ঈশ্বর আপনাকে আশীর্বাদ করতে পারেন এবং আশীর্বাদ করতে পারেন সেই গর্ভকে যা আপনাকে ধারণ করেছিল এবং সেই বক্ষকে যা দুগ্ধ দান করেছিল আপনাকে।

    ঈশ্বর আমাদের সবাইকে ক্ষমা করতে পারেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত
    Next Article স্তালিন : মিথ্যাচার এবং প্রাসঙ্গিকতা – মনজুরুল হক
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }