কাঙাল মালসাট – ১১
১১
বাংলার কবিদের যদি একটি আইডেন্টিফিকেশন প্যারেড আয়োজিত হয় তাহলে উড়ন্ত চাকতির উচ্চতা থেকে দেখলে মনে হবে পিঁপড়েদের এক মহামিছিল চলছে যার সামনের দিকটি অর্থাৎ মুণ্ডু যখন মিশরের পিরামিডের ছায়া পেরোচ্ছে তখন তার ল্যাজ হয়তো ঠনঠনে কালীবাড়ির সামনে। এত কবি পৃথিবীর কোনো দেশে হয় নাই, অদূর ভবিষ্যতে কোথাও হইবে বলিয়াও মনে হয় না। সেই মিছিলে যেমন কাহ্নপাদ ও ভুষুকপাদ চলিতেছেন, তেমনই চলিতেছেন রবীন্দ্রনাথ, হেমচন্দ্র, বিষ্ণু দে ও কে নয়? এই মহামিছিলেই দেখা যাইবে ‘সবৈ ভূমি গোপালকী’-র কবিও আগুয়ান। কিন্তু কেহই সেই গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়কে শনাক্ত করিতে পারিবে না। হয়তো মাইকেলকে চেনা গেল বা কাহাকেও দেখিয়া মনে হইল ইনিই তবে নজরুল কিন্তু বিজয়লালকে কে আইডেনটিফাই করিবে? সেরূপ পণ্ডিত বা কবিপ্রেমী আজ বিরল যেরূপই বিরল আর্মাডিলো বা স্নো-লেপার্ড।
জীবনে বাড়িবে আরোও একগোছা ভুল,
‘চাওয়া আর পাওয়া’ আজও নয় সমতুল।
বলো তো বাছা কার লেখা এইটি? চিনতে পার? পারিলে না তো। উনিটি হলেন গোপাললাল দে।
… কত না নবীন সৃষ্টি — আকাশে ও সাগরের নীলে
রজনীগন্ধার বৃন্তে একান্তে যে কবিতা লিখিলে,
আমারে দেখাবে সেই সংখ্যাহীন কবিতা তোমার
তুমি কবি, আমি কবি — আমার ও কামনা দুর্বার।
কোন হ্যায় ইয়ে পোয়েট? হায়, হায় — আ. ন. ম. বজরুল রশীদ।
খপ করে কোনো আঁতেলকে টুকরো প্রশ্ন করে দ্যাখো। ‘বাউল বাতাস হয়েছে আজ মউলবনে মাতোয়ালা’ বা ‘কুহুর গিয়াছে দিন কেকা আজ কাঁপায় অম্বর’ — বলিতে পার কার কলমের খোঁচায় এই দুটি লাইন খোদিত? শ্রী শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা বলিয়াছেন, ইঁহার ‘কাব্যে সুরার তীব্রতা নাই, শীতল পানীয়ের স্নিগ্ধতা আছে’। কে তিনি? যাঁর কবিতায় বাংলার কিক নাই, পেপসির মোলায়েমতা রয়েছে। কালিদাস রায় জানিয়া যান নাই যে ‘কবিশেখর’ উপাধি তাঁহাকে চিরকাল পাঠক-মুকুরে ধরিয়া রাখিতে পারিবে না।
বাংলা কবিদের মহামিছিল মহাকালের ফলস দাঁত পরা মুখগহ্বরের দিকে ধাবমান থাকুক। আমাদের অন্য গলতায় ডিউটি পড়েছে। আমরা বরং সেইদিকে ভাঁজ মারি …
সন ২০০০-এর বইমেলাতে অন্যান্য সববারের মতোই (অবশ্য আগুন লাগার বছরটি বাদে) আনন্দ ও বাজার, আনন্দ ও বাণিজ্য, আনন্দ ও আইসক্রিম ইত্যাদি কোনোটিই গরহাজির ছিল না। একদিকে ধর্মের ধ্বজা উড়িতেছে তো এই নাও জিরাফের অন্তরঙ্গ জীবনী। তবে বড়ই দুঃখের বাত এই যে, এই মেলায় ‘লন্ডন রহস্য’ পাওয়া যায় না। এবং সারি দিয়া দণ্ডায়মান পুলিশকে কেহ এক সেট এনসাইক্লোপিডিয়া বলিয়া ভুলও করিতে পারে। মধ্যে এই মেলা বুক ফেয়ার না হইয়া কুক ফেয়ারে পরিণত হইয়াছিল। যারই ফল-পরিণামে সেই লেলিহান সার্কাস যাহাতে আগুন ও ধোঁয়া যথাক্রমে ক্লাউন ও ট্রাপিজের খেলা দেখাইয়াছিল। এবং এইসব সম্ভব করিয়াছিল মজুত একখানি ফায়ার ব্রিগেডের নল লাগানো বিকল পাম্প-সহ গাড়ি। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে দুইটি ভাগ আছে। এক দলের মতে ইহা ট্র্যাজিকমেডি। অন্য দলের মত — না, ইহা কমিট্রাজেডি। এই ডেমোরিপাব্লিকান ঢ্যামনামিতে ভাসিয়া গেলে আমাদের বাপু চলিবে না।
‘কাঙাল মালসাট’ যে বৎসরে তার অভিশপ্ত যাত্রা শুরু করে সেই ১৯৯৯ থেকেই কলকাতা বইমেলা লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের তীক্ষ্ণ তত্বাবধানে রয়েছে। কারণ বিদেশী, স্বদেশী — নানা টাইপের হারামি আছে। এবং তারা আছে এবং ভালোভাবেই আছে এটা জেনেশুনে এত বড় মেলাটা অরক্ষিত রাখা যায় না। বলাই বাহুল্য যে, এই নেকনজরের মূলে রয়েছে জনৈক মন্ত্রীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা। মেলায় নানা গোয়েন্দার নানা কাজ। তার মধ্যে প্রতিবারই গোলাপ মল্লিক পুং প্রস্রাবাগারের ডিউটি পায়। ছোট, বড় চোতা পোস্টার নিত্যই পড়ে। নানা মাপের ও ঢঙের। সেগুলির স্যাম্পল যোগাড় করা তার কাজ। অর্থাৎ গোলাপ মল্লিকের ডিউটি।
১৯৯৯তেই গোলাপ মল্লিক মেলার চতুর্থ দিনে একটি জেরক্স করা পোস্টার দেখে হতবাক হয়ে যায় — পোস্টারটির বাঁদিকে রয়েছে —
শ্রীঘৃত সম্বন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাণী
এবং ডানদিকে
Santiniketan, Bengal
বাংলাদেশে ঘৃতের বিকারের সঙ্গে সঙ্গে যকৃতের বিকার দুর্নিবার হয়ে উঠেছে। শ্রীঘৃত এই দুঃখ দূর করে দিয়ে বাঙালিকে জীবনধারণে সহায়তা করুক — এই কামনা করি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১ বৈশাখ, ১৩৪৪
পোস্টারটি সযত্নে জল দিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খুলে গোলাপ মল্লিক লালবাজারে নিয়ে যায়। সেখানে বড়বাবু দাঁ মালটি স্টাডি করে গোয়েন্দা তারকলাল সাধু-র কাছে পাঠালেন। তিনি গোলাপকে বল্লেন —
— দ্যাখো মিঃ রোজ, এই যে কলকাতা শহরটা দেখছ না এর মধ্যে অন্তত লাখ দশেক পাগলা রয়েছে। তারা নিজেরাও জানে না যে তারা পাগল। যারা তাদের সঙ্গে থাকে তারাও বুঝতে পারে না। ডেইলি ওঠাবসা করছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না। এমনই গাণ্ডু। বুঝলে?
— হ্যাঁ স্যার। আমি ভাবছিলুম গাণ্ডুর নাম্বার তাহলে লাখ পঞ্চাশেক হবেই।
— সে তো হবেই। এছাড়াও উদগাণ্ডু, তেঢ্যামনা, হাড়হারামি রয়েছে পালে পালে। তার মধ্যে কে ক্ষতিকর বা ফরেন সোর্সের এজেন্ট সেটা স্মেল করাই আমাদের কাজ। তোমার এই পোস্টারটা ইন্টারেস্টিং। রচনাবলীতে নেই। তবে এটা কেন জেরক্স করে মারতে গেল — এ, নির্ঘাৎ পাগলা কেস।
— কিন্তু স্যার, আমি ভাবছিলুম যদি কোনো কোডেড মেসেজ হয়? কোনো গোপন নির্দেশ বা কিছু। হতেই পারে সার।
— এই অ্যাঙ্গেলটা তো ভেবে দেখিনি। জব্বর ধরেছ গোলাপ। ফ্যাকড়াতে ফেলে দিলে।
-না, মানে হঠাৎ মনে হল সেয়ানা পাগল বা ট্যাটনও তো হয়।
— সে তো হয়ই। আমি ফালতু রিসক নেব না। কী বলো? একটা নোট দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দিই —
— হ্যাঁ, সেই ভালো স্যার। পরে যদি কোনো ঝুটঝামেলা হয়ে যায়।
তারকলাল নোট-সহ ওপরে পাঠিয়ে দিলেন।। একটি ফাইলে। ফাইল একদিন পরে ফেরত এল — ওপরে স্কেচ পেনে লেখা — ‘বাল’।
এই ঘটনার থেকে গোলাপ এই সিদ্ধান্তে আসে যে ওপরতলাতেই যখন সম্ভাব্য চক্রান্ত বা অন্তর্ঘাত সম্বন্ধে মাথাব্যথা নেই তখন সেই-বা কোন দুঃখে সাপের সন্ধানে কেঁচো খুঁড়ে খুঁড়ে হাল্লাক হবে? তারকলাল সাধুর মতো পোড়খাওয়া ঘোড়েল গোয়েন্দা অব্দি ব্যাপারটার গ্রাভিটি বুঝেছিল। কিন্তু তার ওপরে?
— আমার কী ল্যাওড়া! এরপর যা দেখব চুপচাপ দিয়ে দেব। তারপর বাঞ্চোতরা যা করবি করগে যা। এইসব ছোল দিয়ে দেশ চলবে! পড়ত বাঁড়া ব্রিটিশ সায়েবদের হাতে। গাঁড়ে রুল দিয়ে নাচাত।
এই উপলব্ধি গোলাপকে বড়ই উদাস ও বিবাগি করে তোলে। ২০০০-এর বইমেলাতে এই ধরণেরই একটা হু-হু মনোভাব নিয়ে গোলাপ পেচ্ছাপখানা টু পেচ্ছাপখানা খুবই আলগা পা ফেলে ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বড়ই শ্লথ সে পদচারণা। সন্ধের মুখে গোলাপ ভাঁড়ের চা খেয়ে চা-ওলাকে পাস দেখাল। তারপর ছোট সাইজের একটা ক্যাপস্টেন সিগারেট ধরাল। প্রায় তার ধোঁয়ার ধরতাই ধরে ফোকলা লোকটা গোলাপকে বলল,
— ধরে ফেলিচি। না বললে চলবে না।
— অ্যাঁ!
— গোপাল। টালিগঞ্জ থানার সামনে। সিমেন্টের বেঞ্চিতে। নকশাল টাইম। নিয়ারলি থার্টি ইয়ার্স বাট নো চেঞ্জ।
— সরখেল!
— তবে!
— একটা ভুল করেছ। গোপাল নয়, গোলাপ।
— কুড়ি বছরের গ্যাপ। মাইনর ভুল। হতেই পারে।
— রিটায়ার করেছ?
— কবে?
— হাতে এত কাটাকুটি, কড়া …
— ওই, মাটি খুঁড়তে … খুঁড়তে
সরখেল নিজেকে সামলে নেয়।
— কেন? মাটি খুঁড়ছ কেন?
— আরে, বাগান করচি। চুটিয়ে বাগান করচি। এক-একটা গ্যাঁদা দেকলে ভাববে বাঘের মুণ্ডু।
— তাই বলো। বৌদি?
— সে তো এইট্টি সিক্সেই …
— ও!
দুজনে ফের এক ভাঁড় করে চা খেল। সরখেলই খাওয়াল। তারপর কাঁধে ঝোলানো সাইডব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা চোতা গোলাপকে ধরাল।
— এটা রাকো। বেশি ছাপিনি তো। লোক বুজে বুজে দিচ্চি। ফ্রি। পরে পড়ে নিও এক ফাঁকে। তবে হালকা ব্যাপার নয়।
— তারপর, মেলায় কিছু কিনলে-টিনলে?
— কী কিনব? কেনার মতো কিচু আচে? সবই আলবাল। তবে কিনিনি তা নয়। ভূত সিরিজের তিনটে আমার ছিল না। এই তালে হয়ে গেল।
— দেখি?
তিনটি বই। চল্লিশ-পঞ্চাশ পাতার বেশি নয়। ‘মানুষখেকো ভূত’, ‘মস্তান ভূত’ ও ‘রেলগাড়িতে ভূত’।
– এই বুড়ো বয়সে তোমাকে ভূতে ধরল?
– তা বলতে পার। ওই সাবজেক্টটাই স্টাডি করচি একন। তোমার নির্ঘাৎ ডিউটি চলচে।
– বুঝতেই পারছ।
– আমি তাহলে এগোই। আর গোটা দশেক আচে। বিলি হয়ে গেলে কেটে পড়ব। যা ধুলো উড়চে। লেখাটা পড়বে কিন্তু!
– সে তো পড়ব। কিন্তু ফের দেখাটা হবে কবে?
– সে হবেখন। এই মেলাতেই হবে। পড়বে কিন্তু ভায়া। বড় খেটেখুটে লিখেচি।
সরখেল চলে যাওয়ার পর গোলাপ মল্লিক ভাঁজ করা ফর্দের মতো কাগজটা খুলল।
পিঁপিড়ার ডানা ওঠে …
কে. জি. সরখেল
অবসরপ্রাপ্ত করণিক, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া
‘পিঁপিড়ার কেন ডানা ওঠে তা সকলেই জ্ঞাত হয়। উড়িবার তরে। কবে হইতে এই ডানা গজানো শুরু হইল তা আমার সঠিক জানা নাই। কিন্তু বিভিন্ন প্যালিয়েন্টোলজিস্ট নির্মিত ক্ল্যাডোগ্রাম হইতে এই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানীরা উপনীত হইয়াছেন যে ডাইনোসরদের নানা প্রজাতির মধ্যে থেরোপড ডাইনোসর হইতেই পক্ষীকুল গজাইয়াছে। জন অসট্রম বলেন যে, অরনিথোলেসটেস, ডেইনোনিকাস ও অরনিথোসুকাস ইত্যাদি থেরোপড ডাইনোসরদের সঙ্গে প্রাচীন পাখি আর্কিওপটেরিক্স-এর বড়ই মিল। ডাইনোসরবিদ গ্রেগ পল বলেন, যে কম্পসগন্যাথাস নামক ডাইনোসরটি আর্কিওপটেরিক্স-কে ধরিয়া ভক্ষণ করিবার জন্য ধাওয়া করিয়াছিল, সেই ধাওয়া সামলাইতেই আর্কিওপটেরিক্স উড়িতে বাধ্য হয়। অবশ্য আমি এ-বিষয়ে ঠিক একমত পোষণ করি না। তাহার কারণ এই যে, ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে প্রাচীন পাখিরা অর্থাৎ আর্কিওপটেরিক্স (উৎপত্তি ১৫০ মিলিয়ন বৎসর পূর্বে) ইত্যাদি লুপ্ত হয়। তাহারা কী করিত না-করিত কেহই জানিতে পারে না। এই ধ্বংসরেখার নাম কে-টি দুর্ঘটনা অর্থাৎ ক্রিটেসিয়াস ও টার্সিয়ারি যুগের সন্ধিক্ষনে এই প্রলয় ঘটিয়াছিল। পাঠকভায়া, তুমি নিশ্চয়ই অবগত আছ যে তুমি সেনোজয়িক যুগের প্রথমাংশে জীবনযাপন করিতেছ। সেনোজয়িক যুগের হিংস্র ও উড্ডিয়ান আর্কিওপটেরিক্স, অ্যাপাটরনিস, প্যালিওকারসনিস, হেসপেররনিস, সিনোসরোপটেরিক্স প্রাইমা ও বহুশ্রুত টেরোড্যাকটিল দাঁড়ের ময়না বা কাকাতুয়া ছিল না। চিল-শকুনও নয়। সেসব অচিন পাখি খাঁচায় আসা-যাওয়া করিত না।
‘প্রথম অনুচ্ছেদে আমি যাহা কিছু বলিলাম তা একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ও অবান্তর। প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে ইহা হইতে ওড়াউড়ি যে মান্ধাতার আমলের ব্যাপার তাহা তুমি বুঝিতে পারিবে। অবান্তর এই কারণে যে আমরা বিহঙ্গের পাখা বন্ধ হইল কি হইল না তা ভাবিয়া কেন মরিতে যাই? আমরা প্রমাণ করিতে চাহি যে, মানুষ কোনো বিশদ বিবর্তন ছাড়াই উড়িতে সক্ষম। উড়ন্ত মানুষের ফসিল পাওয়া যায় না। যাবেও না। কিন্তু জীবন্ত উড়ুক্কু মানুষ আছে। শুধু আছে নয়, ধারে-কাছেই আছে। শুনিয়া তাজ্জব বনিলে তো! এই রচনায় আমি পুরা কেচ্ছা ফাঁস করিব না। কেবল ইঙ্গিত দিব। তাহার কারণ আমি চাই না যে উড়ুক্কু মানুষরা ধরা পড়ুক। অথবা তাহারা বিব্রত হোক। আমি কেবল চাই যে দেশ ও মান্যবর সরকার (রাজ্য ও কেন্দ্র) জানুক যে মানুষ উড়িতেছে। তাহাদের একটি বিশেষ নামও আছে। আমি কয়েকজনকে চিনিও। কিন্তু এই রচনায় সব কিছু প্রকাশ হইয়া যাক — এরূপ ইচ্ছা আমার নাই। কিন্তু আমি, কে. জি. সরখেল, এই প্রথম তাহাদের কথা বলিলাম। আর মাত্র কয়েকটি কথা বলিয়া দায়িত্ব হইতে খালাস পাইব। কিন্তু পাঠক, তোমার ঘাড়ে উড্ডয়নের নেশা ভূতের মতোই চাপিয়া বসিবে। বারংবার তুমি গগনের দিকে তাকাইবে। দেখিবে মেঘ উড়িতেছে। তোমারও উড়িতে ইচ্ছা যাইবে। উটপাখি, মুরগি ইত্যাদি হতভাগ্য কয়েকটি পাখ-পাখালির কথা না ধরিলে দেখিবে কত না পতঙ্গ ও পাখি ওড়াউড়িতে মাতিয়াছে। উড়িতেছে বিমান। কৃত্রিম উপগ্রহ। রকেট। বেলুন এমনকি শ্মশানের ধোঁয়াও উড়িতেছে। আর তুমি ভূ-পৃষ্ঠে দাঁড়াইয়া হাত কামড়াইতেছ। কোমোডো দ্বীপের ড্রাগন-সদৃশ ভয়াবহ গিরগিটি ও তোমার মধ্যে কেমন মিল! সে চারি পায়ে ও তুমি দুপায়ে চরিতেছ। এই জন্যই কবি পুরন্দর ভাট লিখিয়াছেন —
উড়িতেছে ডাঁস, উড়িছে বোলতা, উড়িতেছে ভীমরুল,
নিতম্বদেশ আঢাকা দেখিলে ফুটাইবে তারা হুল।
মহাকাশ হতে গু-খেকো শকুন হাগিতেছে তব গায়,
বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়।
এমন কবি ও কবিতা যে দেশে অনাদৃত থাকে, এই চারিটি লাইন ব্যাখ্যা করিবার জন্য যখন বাংলা এম. এ.-এর প্রশ্নপত্রে দেওয়া হয় না তখন অধিকাংশ বাঙালি ভূ-চর হইয়াই থাকিবে। খ-পোত বন্দরে ক-জনই বা যাইতে পারে বা চড়িতে পারে? উপরন্তু খ-পোত মোটেই নিরাপদ নয়। বিশেষত খ-পোত ছিনতাই-এর বিপদ যখন মড়ার ওপর খাঁড়া হইয়া ঝুলিতেছে। যাই হউক, আমরা আবেগের বশে বেপথু হইতে বসিয়াছি। ফের আমরা বিষয়ের সদর দপ্তরে কামান দাগা বরং শুরু করি।
‘আমি জানি যে একদল পণ্ডিত হাঁ-হাঁ করিয়া উঠিবে। মানুষ উড়িতে পারে না। আমার কাছে ওই আপত্তি শেয়াল-পণ্ডিতদের হুক্কা-হুয়া ব্যতিরেকে আর কিছুই না। কারণ প্রমাণ হাতে না লইয়া কে. জি. সরখেল আখড়ায় আসে নাই। তাঁহার সহিত মহড়া নেওয়া অত সহজ নয়।
‘শিবসংহিতায় আছে, ‘যিনি সর্বভূত জয় করত আশাহীন ও জনসঙ্গশূন্য হইয়া পদ্মাসনে উপবেশন পূর্বক নাসাগ্রে দৃষ্টিস্থাপন করেন, তাঁহার মনোনাশ হয় এবং তিনি ব্যোম পথে গমনাগমন করিতে সমর্থ হন।’ ঘেরণ্ড-সংহিতায় বায়বীধারণামুদ্রা আছে। এই মুদ্রাও শূন্যদেশে ভ্রমণশক্তি প্রদান করে। অত কথার কী প্রয়োজন? কারাগারে যোগসাধনাকালে শ্রী অরবিন্দ একদিন ভূপৃষ্ঠ হইতে উপরে উঠিয়াছিলেন।
সাহেবদের দেশেও এমনটি ঘটিয়াছে। ‘ফিওরেত্তি’ হইতে জানা যায় লা ভের্না পর্বতে উপাসনাকালে সন্ত ফ্রান্সিস জমি ত্যাগ করিয়া উপরে উঠিয়াছিলেন। সন্ত থেরেসা-র (মূর্খ পাঠক, ইনি কিন্তু মাদার টেরেসা নন) জীবনেও এমন ঘটনা ঘটিয়াছিল এবং সর্বসমক্ষে। নানদের তিনি নির্দেশ দিয়াছিলেন ঘটনাটি যেন তাহারা বলিয়া না বেড়ায়। কুপেরতিনো-র সন্ত জোসেফ শুধু নিজে উড়িতেন এমন নয়, ভারী লৌহ নির্মিত ত্রুস-ও সঙ্গে রাখিতেন। সন্ত আলফোনসাস লিগুয়োরি এবং ব্লেসেড টমাস অব কোরাই সম্বন্ধেও একই কথা শোনা যায়।
‘কিন্তু আমার পরিচিত যে মানুষগুলি উড়িতে পারঙ্গম তাহারা সাধক বা সন্ত কিছুই নহে। বরং উল্টাটি বলিলে খুব একটা ভুল হয় না। আমি তাহাদের কথা এই কারণে বলাবলি করিলাম কারণ আমার উপর তেমনই নির্দেশ আছে যাহা অমান্য করিয়া আমি ইহলোকে আমার বরাদ্দ মেয়াদটুকু আনন্দে কাটাইতে পারিব না। আমার এই বিনামূল্যে বিতরিত রচনাটির লক্ষ্য সরকার ও প্রশাসনকে আগাম হুঁশিয়ারি দেওয়া। কারণ এক প্রলয়াত্মক সংঘাত ক্রমেই নিকটবর্তী হইতেছে। কাহারও ক্ষমতা নাই এই লড়াই হইতে আমার পরিচিতদের মালসাট মারিয়া লাফাইয়া পড়া হইতে ঠেকায়। এই পক্ষে উড়িতে সক্ষম ও অক্ষম — দুই ধরনের পালোয়ানই আছে। আছে যাদুটোনা। কুহকছাতা। ও নানা সাইজের হনুর ছানা যাহারা নানা মাপের রন্ধ্রে ঢুকিতে সক্ষম। সরকার ও প্রশাসন যদি মোকাবিলার পথ বাছিয়া নেয় তাহা হইলে রচনাটির শিরোনাম স্মরণ করিতে বলিব। সেই পাখা যদি গজায় তবে তাহা উড়িবার তরে গজাইবে না। মরিবার জন্য গজাইবে।’
(সমাপ্ত)
এই ‘সমাপ্ত’ যে কে. জি. সরখেলের রচনার, ‘কাঙাল মালসাট’-এর নয়, তা খোলসা করে বলার কোনো প্রয়োজন আছে কী? অবশ্য কোনো পাঠক ওই ‘সমাপ্ত’-কে অন্তিম বা খতম জাতীয় কিছু ভেবে গোটাটাই পড়া বন্ধ করে দিতে পারে। এমন হুমকিও দিতে পারে। অধুনা যেমত সব খাজামার্কা আখ্যান লেখা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার একটি আবশ্যিক অঙ্গ হল যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে টক্কর দেবার মুরোদ রাখা। ‘কাঙাল মালসাট’-এর সে মুরোদ আছে কি নেই তা অচিরেই প্রমাণিত হবে। কুস্তিপ্রিয় বড়িলালের লাল ল্যাঙট দড়িতে ঝুলছে। নুনুকামানও রেডি। তার ভালোর জন্যই পাঠককে সাবধান করা খুবই সাধু প্রস্তাব। পরে ক্যাঁক-ম্যাঁক করে কোনো লাভ হবে না।
গোলাপ রচনাটি পড়ে প্রথমে ভেবেছিল যথারীতি কালই বড়বাবুকে দেবে কিন্তু পরে ভেবে দেখল সরখেল বন্ধুলোক, কী লিখতে কী ছাতা-মাথা লিখেছে! দাঁতফাঁত পড়ে গেছে। ওকে আর ফাঁসানো ঠিক হবে না। বইমেলা থেকে বেরোতে বেরোতে এই সিদ্ধান্তেই গেড়ে বসার দিকে যাচ্ছিল গোলাপ কিন্তু উল্টোদিকের অন্ধকার মাঠে আনকা ছুকরিফুকরি হয়তো বাজারে নতুন এসে নেমেছে এরকম একটা উটকো সম্ভাবনা তাকে ফুঁসলে মাঠের দিকেই টানল।
মাঠের মধ্যে কিছুটা এসে গোলাপের মনে হল, খাম কাজ হয়ে গেছে। সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি – কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বরং মাঠে ঢুকতেই ঠাণ্ডাটা বেড়ে গেছে আর ভয়-ভয় করছে। গোলাপ একটা সিগারেট ধরাল আর মাঠ ছাড়ার মতলব করল। মাঠ ছাড়ছিলই গোলাপ কিন্তু গাছের ওপর থেকে ডায়লগটি তাকে স্ট্যাচু করে দিল।
– সরখেলের চোতাটা কালই দপ্তরে জমা দিবি। বুঝলি?
গোলাপ ফাঁকা ঢোঁক গিলে ‘রাম, রাম’ বলতে শুরু করেছিল কিন্তু তাতে খুব একটা ফয়দা উঠল না।
– আমায় কি শালা ভূত পেয়েচ যে রাম-রাম করচ! ওসব রাম-ফাম আদবানিকে গিয়ে দেখিও। আমরা অনেক হার্ডনাট টু ক্র্যাক।
– আঁজ্ঞে, কিন্তু কে আপনি! ভূত না হলে গাছের ওপরে কেন?
হুম করে যা নেমে এল তা খতরনাক হলেও অন্তত মনুষ্যরূপী ভূত নয়। বিশাল দাঁড়কাক।
-গাছে যদি শুধু ভূতই থাকবে তাহলে পাখি-বাদুড়রা সব কী করবে? লালবাজারে ঘর ভাড়া নেবে?
গোলাপ ভয়েতে কাঠ। মুখে নাহি কথা সরে। কপালে বিন্দু বিন্দু কালঘাম ফোটে।
– স্পিকটি নট দেখচি যে! ওদিকে তো খুব রোয়াব। চা খেয়ে পয়সা দেবার নাম নেই। কাল কী করবি মনে আছে?
– সরখেলের লেখা জমা করে দেব।
– হ্যাঁ, জমা করে দিবি শুধু তাই না, সাধু মালটাকে বলবি যে জম্পেস নোট দিয়ে যেন চোতাটা ওপরে পাঠায়।
– তাই বলব স্যার।
– আবার স্যারফ্যার কেন? এটাও কী লালবাজার নাকি? অনেক বয়েস তো হল। এবার মাগির ধান্দাটা ছাড়। অনেক তো হল। ওদিকে নাতিপুতি হয়ে গেল।
– আর করব না স্যার।
– ফের স্যার! আমাদের টাইমের ক্যালকাটা হলে এতক্ষণ তোর দফা গয়া হয়ে যেত। কেন বল তো?
– আপনার টাইম মানে?
– অত তোকে জানতে হবে না। বর্মা থেকে এক দঙ্গল ফাঁসুড়ে এসেছিল। অন্ধকার মাঠে ঘাপটি কেস। অসহায় পথিক বা তীর্থমারানী হলেই ঘ্যাঁক। ফাঁসে টান আর গ্যাঁজলা তুলে মাল ফিনিশ। পয়াকড়ি যা পাও হাতিয়ে হাওয়া। এরকম রাতে বেশ কিছু মার্ডার করে ব্যাক টু রেঙ্গুন। প্যাগোডা। সাদা হাতি। চুপচাপ মাঠ পেরিয়ে চলে যা।
– সে যাচ্ছি কিন্তু আপনার পরিচয়টা পেলাম না।
– দেখতেই তো পাচ্ছিস দাঁড়কাক। বয়সের কোনো গাছপাথর নেই। আর ঘাঁটাসনি। তেড়ে ফুটে যা। তোরও মঙ্গল। আমিও ঠাণ্ডায় গাঁড় মারানো থেকে বাঁচি।
– যেমনটি বলেছেন তেমনটি করছি। একটু কৃপা করবেন। বুঝেছি আপনি এলি-তেলি নন।
– ঠিকই ধরেচিস। যা, সরখেলের বন্ধু আমাদেরও বন্ধু। কোনো বাঞ্চোৎ তোর একটা বালও যদি ছেঁড়ে আমাকে জানাবি।
– আজ্ঞে, ক্রাইসিসের সময় আপনাকে পাব কী করে?
– ভেরি ইজি। পর পর দুরাত তোর ঐ ছুঁচো কিচকিচে ধচা ছাদে উঠে খুব প্রেমসে আমার কতা ভাববি। এই চেহারাটা মনে করবি। ক্ষ্যাপাটে চোখ, খ্যাজাব্যাজা পালক, চোখ খুবলে নেবে এমন নখ-চোখ বুজে ভাবলেই আমি চলে আসব। প্রথম রাতে সিগন্যালটা পেয়ে যাব। এ তোমার মোবাইল নয়। মোবাইলের বাবা। তবে হয়তো তখন দূরে থাকব। ধর, ব্যাণ্ডেল চার্চের টঙে। তেমন হলে সিগন্যাল রিসিভ করে ডাউনলোড করে রেখে দেব। সেক্ষেত্রে পরদিন। আর ধারেবাড়ে হলে এসে পড়ব। একডাকেই …।
– আমি আসি তাহলে।
– আয়।
এবারেও বড়বাবু দাঁ গোলাপ মল্লিকের হাত থেকে সরখেলের ‘পিঁপিড়ার ডানা ওঠে…’ পড়ে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন।
– কী মাল জোগাড় করেচ গোলাপ! এ তো রীতিমতো ডিক্লারেশন অফ ওয়ার। এক কাজ করো। দলিলটা নিয়ে তুমি মিঃ সাধুর কাছে চলে যাও। আমি বলে দিচ্ছি। আমার ব্যাপারটা ভালো ঠেকচে না। সাফ বলে দিলুম।
অতএব মালটি নিয়ে গোলাপ পৌঁছে গেল তারকলাল সাধুর কাছে। শ্রী সাধু তখন খুনের ব্যবহৃত বুলেট এবং খুনের কাছে পাওয়া কানট্রিমেড পিস্তলে টেস্ট ফায়ার করা বুলেট মিলিয়ে দেখছিলেন।
– আরে, রোজ ফুটেচে আজ। কী ব্যাপার!
– আর রোজ ফোটাতে হবে না। কী ফোটে এবার দেখুন। মালটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিন।
পড়তে পড়তে সাধুর নিচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়ে।
– ইন্টারেস্টিং! আমার তো বাবা দৌড় ঐ টিভিতে জুরাসিক পার্ক দেখা অব্দি। এ সব ঘ্যাঁটম্যাট আমার মাথায় ঢুকবে না।
– আপনি বরং শেষ প্যারাটা পড়ুন।
একটু সময় গেল। সাধুর ভুরু কুঁচকোনো। কপালে ভাঁজ পড়ল। চক্ষু হইল চড়কগাছ।
– তার মানে? ফের প্যাঁদাপেঁদি। ফের ব্লাড বাথ। এই সরখেল বাঞ্চোৎ কি নকশাল নাকি? যাক গে বাবা, সে যা হবার হোক। সরকার ও প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। আমি রিসক না নিয়ে নোট দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
দুদিন পরে ফাইল ফেরত এল। ওপরে স্কেচ পেন দিয়ে লেখা — ‘পাগলাচোদা’।
বেগম জনসন দণ্ডবায়সের নিকট সব শুনিলেন। নিকটে দন্ডায়মান একটি স্লেভ গার্লের পিঠে আপনমনে ঘামাচি মারিতে মারিতে বলিলেন, ‘বাট মিস্টার ম্যাজিশিয়ান, এই যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ইহার কোনো ম্যাচিউরিটি নাই। শালারা এত বড় একটি দলিল হাতে পাইল কিন্তু মর্ম বুঝিল না। আই অ্যাম রিয়্যালি স্যরি। বাংলার ভাগ্যাকাশে এখন সাইক্লোনিক ডিপ্রেশন। আপনি মন খারাপ করিয়া কী করিবেন? ড্যাম ইট। বাই জোভ, এরূপ আহাম্মক কেউ দেখিয়াছে যে পশ্চাতে ধাবমান শূল দেখিয়াও রেকটাম সরাইয়া নেয় না? আমি একাধারে বিউইলডার্ড ও অ্যামিউজড বোধ করিতেছি।’
এরূপ বলিয়া বেগম জনসন স্লেভ গার্লটিকে আদর করিয়া একটি লাথি মারিলেন। এবং সেও এই বটকেরার জবাবে খিল্লি দিয়ে হাসি করিয়া দিল। একেই কী য্যায়সা কী ত্যায়সা বলে? কেউ জানে?
