কাঙাল মালসাট – ১৩
১৩
‘১৩’, সেই অপয়া ও ঢপয়া ১৩ নং অধ্যায় ঘোর অনিচ্ছা তুচ্ছ করে এসেই যখন পড়ল তখন তাকে তাসা পার্টির খুলিফাটানো ঢিং চ্যাক কুড়, ঢিং চ্যাক কুড় সহযোগে আমন্তণ জানানোই ভালো। ইতিহাসের সকল ঘনিষ্ঠ পাঠকই দেখিয়াছেন যে কি ডাইনোসরদের যুগে, কি অ্যামিবার আমলে বা হোমো স্যাপিয়েনদের জামানায় যখনই কোনো সাধু প্রচেষ্টা হইয়াছে অমনি এক দল ডাইনো, অ্যামিবা বা হোমো স্যাপিয়েন বিনা প্ররোচনায় বা খজড়াদের মদতে তাহাকে নস্যাৎ করিবার ঘৃণ্য চক্রান্তে মাতিয়াছে। কাজেই একই জাতের ও পাতের নিন্দামূলক অপপ্রচার যে চোক্তার ফ্যাতাড়ু-কমনম্যান কম্বাইনের বিরুদ্ধে লাগু হইবেক তাহাতে সন্দেহ কী? এর জবাবে অকুতোভয় বাঙালিরা একসময় এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলত,
‘নিন্দে যখন রটেছে তখন শালা বিয়েই করব।’
সে যুগ আর নাই। এখন কবির ভাষায় বহাল হইয়াছে ‘বিষাক্ত যুগ’। এই শিরোনামটি বসাইয়া পোয়েট বিশু দত্ত যদি অবসরগ্রহণ করিতেন তাহা হইলেও চলিত। কিন্তু পোয়েটরা সচরাচর তেমন করেন না। তাই বিশু দত্ত লিখিয়াছিলেন,
কারাপ্রাচীরের অন্তরালেতে এখন জাগিছে কারা?
এ যুগকে শুধু মেনে নিতে হবে, যদি বিষাক্ত তার
বাহু দুটি মেলি করে ফেলে গ্রাস। হে কবি আত্মহারা,
আমাদের তবু তার কাছে আজ নিষ্কৃতি নাই আর।
এই কাব্যাংশের ব্যাখ্যা সহজ নয়। কেবল ফল্টকে খুচরা লোডশেডিং ভাবিলে চলিবে না। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখিয়া শ্রী বিমলচন্দ্র চক্রবর্তী লিখিয়াছিলেন, ‘তাঁহার ছবি হইতে যদি কোনো অর্থ খুঁজিতে যাই তাহা হইলে নিরাশ হইব। আনন্দের প্রেরণায় ছবি আঁকা — এ ছাড়া তাঁহার তুলিকা ধারণের পিছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাই।’ পণ্ডিত কেন, মুর্খরাও এ কথা মানিবে না। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ একাধিক ভূতুড়ে ছবি আঁকতে গেলেন কেন? যা দেখলে শিশুরা অট্টক্রন্দন জুড়িয়া দিবে। কেন? এর উত্তর ঘোর ঘোরপ্যাঁচের আবর্তে লুক্কায়িত এক মুচকি রহস্য। লুপ্ত গোরস্থানের উপরে শ্মশানের ধূম। ঘাড় মটকানো ঠেকায় কে? যাই হোক, আর প্রসঙ্গান্তরে নানাবিধ চর্চা ছাড়িয়া আমরা বিষাক্ত যুগের নিন্দার কর্দমাক্ত খেলটি বরং পাকড়াই। এ যুগেরই এক ঘটনা। বিশেষ পুরনোও নয়। কংগ্রেস নেত্রী আভা মাইতি মেদিনীপুরের বুভুক্ষুদের মধ্যে সাধু অভিপ্রায়ে চালিত হইয়া মাইলো বিতরণ করিয়াছিলেন। অমনই কং-বিরোধী বাম দেবরা গান বাঁধিল, ‘একটি বালিকা চাইলো’র সুরে
আভাদিদির মাইলো
সবাই মিলি খাইলো
উদরাময় হইল
(ফের) আভাদিদির মাইলো…
সেই ট্রাডিশন চোক্তার-ফ্যাতাড়ু কেন, কাহাকেও ছাড়িবে না। তাই সদাপ্রস্তুত থাকিতে হইবে। প্রস্তুতি সম্বন্ধে জানানও দিতে হইবে। ইতিপূর্বে সরখেল যেমন করিয়াছে। খাপে খাপ, কেদারের বাপ।
দীর্ঘদিন হইল ক্যালকাটায় আর বসন্তকাল আসে না। মধ্য এশিয়াতে সোভিয়েতের কল্যাণে পুঁজিবাদকে বাইপাস করিয়া যেমন বিদ্যমান ও ‘প্রকৃত’ সমাজতন্ত্র চালু হইয়াছিল তেমনই গুটিকয় স্টুপিড কোকিলের আর্তরব হিসাবে না ধরিলে ক্যালকাটায় উইন্টারের পরই সামার আসে। এবং এই সামারেই অর্থাৎ মার্চের গরমে একটি পোস্টারে শহর ছয়লাপ। দিল্লী-বোম্বাই সাবাড় করিয়া এক হাফ-কাবলে সেক্স ভকিল ক্যালকাটায় আসিয়াছে যাহার অসাধ্য কিছুই নাই। পোস্টারটি এইরকম,
সেক্স-ভকিল! সেক্স-ভকিল!
ফরঘানার হেকিমি ঘরানার খলিফা
বাবরাক কামাল কাবুলী
কলকাতায়
সেক্স-ভকিল! সেক্স-ভকিল!
কাবুল, পেশোয়ার, দিল্লী, বোম্বাই টুর খতম
লাস্ট স্টপ! লাস্ট স্টপ!
এ যাত্রায় কলকাতা
ঘর-৩৭। হোটেল গোপাল, ৯৫-এ, লাকি লেন
কলকাতা-১৬
সকাল – আম দরবার সন্ধেবেলা – স্পেশাল
এই মর্মে বিভিন্ন বাংলা (আনন্দবাজার নহে), ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু দৈনিক-এ বিজ্ঞাপনও লোকের নজর কেড়েছিল। আম দরবারে বিপুল জনতা সামলাতে পুলিশ হিমসিম খেয়ে যায়। সবটাই ঘাড়ে গিয়ে পড়ল পার্ক স্ট্রিট থানার। একেবারে হুলো কেস। আগেই আমরা যার কথা জেনেছি সেই শ্মশান পাড়ার থানার টাকলা ও.সি-কে ফোন করে দুঃখের কথা বলতে বলতেই ঘেমে গেল পার্ক স্ট্রিটের বড়বাবু!
— ছিলুম ভালো। মাগির দালাল, ভেড়ুয়া, খদ্দের – চার পাঁচটা ধরো। দুখানা রদ্দা ঝাড়ো। তিন চারটে পেডলার ধরো। ধুমা ক্যালাও। একটা দুটো চামড়াচোর। গাঁড়ে লাথ, লক আপ। কোত্থেকে বাঁড়া এই সেক্স-ভকিল এল। ব্যাস, হালুয়া হয়ে গেল। রোজ সকালে রগড়ারগড়ি ভিড়। আর লোকেরও বাঁড়া খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। বুড়ো হয়ে গেছে। ধুকপুক করচে। তবু খিটকেলের ধান্দা। লাইফে লঙ্কাবাঁটা দিয়ে দিলে মাইরি। কোতায় দুজনে একদিন অলিপাবে গুছিয়ে বসব।
— তবে ভায়া লোকটা শুনচি ধন্বন্তরি। হালুয়া মোরব্বা কী সব দিচ্চে! রেজাল্ট নাকি ফ্যানটাসটিক। এক রাতে সব ঝটাঝট বনমোরগ হয়ে যাচ্ছে। অল টাইম অন।
— বলো কী ভায়া!
— এই জানবে। ঘোড়ার মুখের খবর। আমি তো ভাবচি রাত করে একটা ভিজিট মেরে দেব কিনা!
— দেবে? তাহলে বলো তো একটা ব্যবস্থা করে ফেলি। দুই ভাইতে মিলে না হয় আড়ালে-আবডালে…
— করে ফ্যালো। কদিন থাকবে মালটা?
— বুজতে পারছি না। হোটেলের মালিকটাও গাছহারামি। জানলেও ভাংচে না। বললেই বলচে, দেকুন স্যার এরা হচ্ছে বেদুইনের জাত, মরুভুমিতে সোর্ড হাঁকানো পার্টি। এই দেকচেন আতর চুলবুলিয়ে মাইফেল বসাচ্চে, গালচেতে শুয়ে গড়্গড়া টানচে আবার খেয়াল চাপল কি তেরাত্তির না পোয়াতেই চিচিং ফাঁক করে ভোঁ ভাঁ।
— তবে আর বিলম্ব কোরো না।
— তা করব না। তবে হেভি রাশ। বড় কত্তারা সব আসা যাওয়া করচে। মানে সব মহলেরই আর কি। নামের লিস্ট দেখলে কেলিয়ে পড়ে যাবে। কে নেই?
— আরে তার মধ্যেও একটা ফাঁক ফোঁকর দেখে গলিয়ে দিতে হবে।
— সে ম্যানেজ হয়ে যাবেখন।
— ব্যাস, তারপরই!
— কী তারপর?
— কী আবার! খাপে খাপ, কেদারের বাপ।
এরপরই টেলিফোনের দু প্রান্তেই খলখলিয়ে হাসির হাসনুহানা ফুটল। এ হল সেই হাসির ফুল যা অচিরেই ঝরে পড়ে। সামান্য টোকাতেই।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কিউরেটরের আজ মহানন্দ। কারণ স্বয়ং ছিন্নমস্তিষ্ক নগরপাল তাঁহাকে ফোনে জানাইয়াছেন যে অদ্য, ১৩ মার্চ, রাত সাড়ে দশটায় কাবলে সেক্স-ভকিলের সঙ্গে তাঁর এক্সক্লুসিভ অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং তিনি কোনো মতেই তাঁর বাল্যবন্ধু মহামান্য কিউরেটর মহাশয়কে সঙ্গে না লইয়া যাইতে নারাজ। বাল্যকাল, পোড়া শিবমন্দিরের ধসা দেওয়ালে বসিয়া তাঁহারা ও উহাকে নিজ নিজ সাধনদণ্ড দেখাইয়াছিলেন। তখন তাহারা সবেমাত্র উসখুস করিতে শিখিয়াছে, সংসার সমরাঙ্গণে মল্লক্রীড়ায় মাতোয়ারা হইবার মতো পাকাপোক্ত হয় নাই। সেই শিহরণ, সেই রোঁয়া রোঁয়া স্মৃতি, সেই অপাপবিদ্ধ হোমোখেলা কি ভোলা যায়? গেল না। এইসব সাতপাঁচ ভাবিতে ভাবিতে কিউরেটর মহোদয় তাঁহার এক প্রৌঢ়া অধ্যাপিকা বান্ধবীকে ফোন মারিলেন যাঁহার বিষয় ভূগোল হইলেও সাহিত্যপ্রীতি উভয়কেই অবুঝবন্ধনে বাঁধিয়াছে।
— বিরক্ত করলাম?
— একটা ক্লাস অফ পেয়ে চুপচাপ বসেছিলাম। ভালোই হল।
— কী ভালো হল?
— সে তুমি বুঝবে না।
(টেলিফোনে নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ)
— বুঝেছি।
— ভালো।
— এই শোনো, যে কারণে তোমাকে ফোন করলাম। হঠাৎ একটা নতুন আইডিয়া মাথায় এল। সাহিত্যের সমস্যাটা একটা মূল শ্রেণীতে, দুপাশে সাজালেই সব তর্ক মিটে যাবে। কেউ জানে না। তোমাকেই বলছি। কারণ তুমি বুঝবে।
— যদি বুঝতে না পারি? যদি মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়?
— যাবে না। যেভাবে ভেবেছি সেটা পুরোটাই মাথার তলার ব্যাপার।
— কোনো দুষ্টুমি আছে বলে মনে হচ্ছে।
— না, না, নো দুষ্টুমি। একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে বুফে সিস্টেম। ওখানেই আইডিয়াটা মাথায় এল। সাহিত্যকে দুভাগে আমরা দেখতে পারি — ভেজ আর নন-ভেজ।
লাল ল্যাঙট পরে অল্প ভুঁড়িওয়ালা বড়িলাল তার ঘরে, হনুমানজীর ছবির সামনে, দুটো থানকা ইট এক হাত ফাঁক করে বসিয়ে বুক-ডন মারছিল। রোজ দু সেট করে ডন মারে বড়িলাল। কুড়িটা করে এক এক সেটে। এতই আপার বডি টাটিয়ে যায়। এরপর রয়েছে পঞ্চাশ করে দুসেট পাতিয়ালা বৈঠক। লাফিয়ে জোড়াপায়ে এগিয়ে বৈঠক ফিনিস করে ফের লাফিয়ে পেছিয়ে যায়। পুরোনো আমলে এই বৈঠক মল্লবিদ ও বডিবিল্ডারদের মধ্যে সবিশেষ জনপ্রিয় ছিল। এখন চলে, একহারা বৈঠক। উঠ, বয়েঠ। এক এক পক্কড় শেষ করে বড়িলাল চিনির সরবত ছোট ছোট চুমুকে মেরেþ দিতে দিতে বিড়বিড় করছিল।
— সেক্স-ভকিল! আরে বাবা সিনার জোর, টেংরির জোর, আড়ার জোর নেই — এক কাট দিলেই পটকান — সব সেক্স-ভকিলের ঠেঙে চলেচে। সব ধড়কান হয়ে মরবে। এখনও দ্যাকো যেয়ে তোমরা মনোহর আইচ। পড় পড় করে পাঁজি চার টুকরো করে দেবে। পারবি? একনও দুটো কাবলেকে ধরে মাতা ঠুকে বাজিয়ে দেবে। পারবি? ওসব হল গিয়ে তোমার হিড়িক। যেমন পাড়ায় পাড়ায় জিমখেলা বানাচ্চে। সব ফঙ্গ বেনে কারবার।
বিশাল একটি টিকটিকি এই কথার ফাঁকে গোবর গুহর ফটোর পেছন থেকে বেরিয়ে স্যান্ডো-র ফটোর পেছনে চলে গেল। যদিও সেটা ব্যায়ামরত বড়িলালের চোখে পড়েনি। বড়িলাল হনুমানের সামনে যে নকুলদানা রাখে সেগুলো চাটতে আরশোলা আসে। তখন গামা, জিবিস্কো, গোবর গুহ, স্যান্ডো ও মহিলা কুস্তিগির হামিদা বানুর ফটোর পেছন থেকে টিকটিকির পাল বেরিয়ে আসে। আরশোলার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে টিকটিকিদের মধ্যেই ফ্রিস্টাইল বা গ্রিকো-রোমান কুস্তি লেগে যায়। এই দৃশ্যটিই বড় করে দেখলে বোঝা যাবে পুরাকালে ডাইনোসররা কীভাবে এ ওর খবর নিত। সিনেমায় ফাইট কম্পোজারের দরকার হয়। সে না থাকলে সব ফাইটই অচল। কিন্তু এই টিকটিকিদের ফাইটের কম্পোজার স্বয়ং ঈশ্বর। এবং আরও কি তাজ্জব ব্যাপার, এই অর্থসর্বস্ব বিশ্বে, বিনা পারিশ্রমিকেই তিনি এই কাজ করে চলেছেন। হাততালি-ফাততালিরও তোয়াক্কা করেন না। স্রেফ টিকটিকি লড়িয়ে দিয়েই আপন খেয়ালে বুঁদ! এর জন্য যে তারিফ তাঁর প্রাপ্য তা তিনি বাঙালি চোদখোরদের কাছে কোনোদিনও পাবেন বলেও মনে হয় না।
অপয়া ‘১৩’ অধ্যায়েই ১৩ মার্চ বিকেলে, আচমকা হুড়মুড় করে ডি. এস কে দুপাশ থেকে ধরে মদন ও পুরন্দর ভাট যেভাবে ঢুকেছিল তা একমাত্র বড় মাপের ট্র্যাজিক নাটকেই মাঝে মাঝে দেখা যায়। নলেন তখন লন্ঠন পরিষ্কার করছিল। বেচামণি সালোয়ার ও কামিজ পরে উঠোনে কত্থক প্র্যাকটিস করছিল এবং ভদির বাপ বৃদ্ধ বায়স তা ধেই, তা তা এবং লচকতো মচকতো ইত্যাদি বোল ও ধাঁচ বোঝাচ্ছিল এবং অনতি দূরেই বারান্দায় ভদি ও সরখেল এমনই নীচু গলায় কথাবার্তা বলছিল যা শোনে কার বাপের সাধ্যি! এবং এই স্বাভাবিক, দৈনন্দিন ও গতানুগতিক কর্মকাণ্ড ও জীবন প্রবাহের মধ্যেই এক একটি চাকতি সহসা টাল খেয়ে বা কেতরে ঘরে ঢুকে যাচ্ছিল বা ঘর থেকে বেরিয়ে অন্তরীক্ষে বোঁ বোঁ মিলিয়ে যাচ্ছিল। বড় চাকতি বোঁ বোঁ শব্দ করে। যে গুলো নয়া পয়সা বা সোডার বোতলের ছিপি বা ক্যারামের স্ট্রাইকার সাইজের সেগুলি সাইরেন বাজির মত এক চিলতে খোনা শব্দ করে হয় ঘরে ঘোরে বা গৃহ ত্যাগ করে। চাকতির পেছনে ফুয়েল ছিল কি? থাকলেও তা কি জাতের? কোনোদিনই জানা যাবে না। যেমন জানা যাবে না শ্রী কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন বাদে আর কেউ শ্রী শ্রী কালীর অষ্টত্তোর শতনাম সংকলন করে উঠতে পেরেছিলেন কিনা অথবা পারলেও তা বাজারে নেই কেন অথবা লাল বাইয়ের প্রেমে পাগল রাজা রঘুনাথকে সত্যই তার রানী চন্দ্রপ্রভা খতম করেছিলেন কিনা বা মিশরের পিরামিড নির্মাতাদের সচিত্র পরিচয় পত্র ছিল কি? ভেজ ও নন ভেজরাও এসব গূঢ় রহস্য সম্বন্ধে হয় জানে না বা জানিলেও অন্তত আমাদের ভাষায় তা বলিবে না। ভাবিয়া লাভ নাই।
ডি. এস -এর আছড়িয়া পড়া ও সরব ক্রন্দন যেন সহসা বৃদ্ধ দাঁড়কাক, নলেন, বেচামণি, ভদি ও সরখেলকে নির্বাক ইতিহাসে পরিণত করিল। লেবেডেফ-এর সেই প্রসিদ্ধ থিয়েটারেও এরকম কোনো মুহূর্ত ও মূর্ছনা তৈরি হইয়াছিল কি?
সকলেই হতবাক। ক্রন্দনময় নীরবতা ভেঙে ককিয়ে উঠল বেচামণি।
— আহা, অমন করে কে মারলে গা! সারা পিট ডুমো ডুমো হয়ে উঠেছে। নলেন, এট্টু বরফ নিয়ে আয় তো।
ভদি খচে যায়।
— বরফ দিয়ে ঘেঁচুটা হবে। লেট হয়ে গছে। বাবা, আপনি একটু ডানার বাতাস দিন তো। যে ব্যাথার যা ওষুধ।
আত্মারাম সরকারের ভোজবাজিই যেন বা। ডানার ঝাপটা খেতেই ডি. এস-এর ককানি থেমে গেল। তারপর ঝিরঝিরি ফুঁপোনোটিও ধরল। বিকট ট্যাঁকঘড়ির মতো মুখে চাপা হাসিও ফুটল। দাঁড়কাকের হায়দারি হাঁক,
— কে তোর এই দশা করেছিল? কোন বাঞ্চোত?
— পু … পু… লিশ…।
— কেন? চোর-ডাকাত-মাগচালানী সব থাকতে তোকে পুলিশ হঠাৎ প্যাঁদাতে গেল কেন?
— আঁজ্ঞে, কাবলে সেক্স-ভকিলের কাছে গিয়েছিলুম।
— কী বলল খানকির ছেলে?
— বলবে কী? আম দরবার বলে কতা। সে একেবারে বারো ভূতের মেলার ভিড়। গাড়িঘোড়া সব বন্ধ। সামলাতে না পেরে ও. সি বলল — চালাও লাঠি। আমিও পড়ে গেচি সামনে। অমনি দমাদম, দমাদম। যত বলচি, আর মেরোনা, মরে যাব, তত মারচে। যত চিল্লাচ্চি তত মারচে।
মদন এরপর যা বলে তাতে পুরন্দর মাথা নেড়ে সাড়া দেয়।
— শুনেমেলে আমি আগেভাগেই বলেছিলুম, তোর কি রথের চাকা খসেচে যে তুই সেক্স ভকিল, সেক্স-ভকিল করে মরচিস। ঘরে বলে ডাকাবুকো বউ, এই সেদিন ছেলে বিইয়েচে — তোর দরকার সেক্স-ভকিলের? আমি গেলেও তা একটা কতা ছিল।
পুরন্দর বলে,
— সে তো আমিও যেতে পারতুম। বলো ভদিদা, গেলে দোষ হত?
— দোষের আবার কী? যার দরকার পড়বে সেই যাবে। লোকে যাতায়াত করে বলেই তো এসেচে। বাবা, কী বলেন?
— আমার কতা হল ঘরের লোকের গায়ে হাত দেবে কেন? তবে কাজটা ডি. এস ঠিক করনি। অবশ্য আমার সঙ্গে শলা-পরামর্শ না করলে এরকম গাড্ডায় ফাঁসতেই হবে।
— গাড্ডা কেন বাবা? কত নামী লোক। কাবলে হেকিম বলে কতা।
— ভ্যাড় ভ্যাড় করিসনা তো। কাবুলে এখন সব তালিবান। এ ব্যাটা কাবলে হেকিম না বাল। জালি মাল। পিওর ইন্ডিয়ান।
— অ্যাঁ!
— সকাল সকাল বেগম জনসনের কাছে গিছলুম। দেখি সেক্স-ভকিলের কথা কোন একটা গোরাসাহেব পেড়েচে কি বেগম একেবারে হেসে কুটিকুটি। বেগম জনসন কী বলল শুনবি?
— বলুন, শুনব তো। ইন্টারেস্টিং।
— বলল মালটা পুরো ফ্রড। আসলে আর্মস ডিলার। রাজস্থানের লোক। বর্ডার দিয়ে মাল আনে। খবর পেয়েচে সামনের বছর ভোট বলে ওয়েস্টবেঙ্গলে এখন হেভি আর্মস-এর খাঁই। ওয়ুধপত্তর, ঐ হালুয়া, মোরব্বা সব ঢপ। আসলি চেক রিভলবার, চিনে রাইফেল, রাশিয়ান রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড – সব কেবল অর্ডার নিচ্চে। আর অর্ডার বাবদ অ্যাডভান্স। মাল পরে লরিতে ঠেকে ঠেকে পৌঁছে যাবে। বুঝলি? ওপর থেকে দেখে বোঝবার জোটি নেই। নেপালে দুবছর জেলে ছিল। সেখান থেকে গেল বাংলাদেশ। সেখানে হুলিয়া অমনি কেটে গেল মিয়ানমার। সেখান থেকে কলম্বো।
— এই এতসব খুঁটিনাটি বেগম জনসন জানেন?
— মুখস্থ। আর ওষুধগুলো কী জানিস?
— সে যাই হোক বাবা, লোকের মুখে কিন্তু ওষুধের বদনাম শুনিনি।
— রাখ। ভায়াগ্রার ইন্ডিয়ান বেরিয়েচে-এডেগরা তারপর আরো কী সব যেন নাম। তাই গুলে দিচ্চে আটার সঙ্গে। সঙ্গে ওকাসা, থ্রি-নট-থ্রি, শিলাজিৎ সব পাঞ্চ। বলচে ইয়াকুতি হালুয়া। এ নাকি মোগলাই ফর্মূলা। আরে বাবা ইয়াকুতি হালুয়াতে আসল ইনগ্রেডিয়েন্ট হল চড়ুইপাখির ব্রেন। অত চড়ুই ধরা কি মুখের কতা নাকি? পাহারের টঙে পাথরের গায় ঘামের মতো শিলাজিৎ। তাই খেতে যত হিটিয়াল বাঁদরেরা পাহাড়ে চড়ে। নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে মুঠোয় ভরে যখন মুখে পুরতে যাবে তখন তলা থেকে গুলি করতে হয়। বাঁদর গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ল। তখন তার থাবা থেকে শিলাজিৎ কেঁকে নিতে হয়। বুঝলি? এসব যোগাড় করা যে সে কাণ্ড নয়। রেওয়াজি মোরব্বা, ইয়াকুতি হালুয়া — নাম শুনেই সব নাচতে শুরু করল। যাই হোক, ওর কারণেই যখন ডি. এস ঝাড় খেয়েচে তখন মালটাকে সাইজ করতে হবে। অ্যায়সা প্যাঁদাতে হবে যে কলকাতায় আর কখনও যেন পুড়কিবাজি না করতে আসে।
স্মিত হাসি মুখে ভদি বলল,
— আপনি আর মেজাজ গরম করবেন না বাবা। আপনি বৌমাকে যেমন নাচ শেখাচ্ছেন শেখান। সেক্স-ভকিলকে আমি দেখচি। কী বলো সরখেল?
সরখেল খিক খিক করে হাসে।
— তাহলে আজ রাতেই ব্যবস্থা করে দিই?
সরখেল মাথা এক দিকে কাত করে সায় দেয়।
— নলেন, ছেলেছোকরারা এসেচে। ভালো করে চা কর দিকিনি। আর ঝপ করে যেয়ে মুড়ি-ফুলুড়ি নিয়ে আয়।
বেচামণি বলে ওঠে,
— আমি আলুর চপ খাব।
দণ্ডবায়সের পছন্দ অন্য।
— গরম দেখে গোটা চারেক বেগুনি আনবি নলেন। ঠাণ্ডা যেন না হয়।
— নলেনকে ওসব বলতে হবে না। তুমি নাচের বোল বলো দিকিনি। দাদাবাবু যেমন বলল।
নলেন তেলেভাজার লিস্ট বিড় বিড় করে মুখস্থ করতে করতে চলে গেল। ভদি আর সরখেল ফের বারান্দায় ফিরে গিয়ে গুঁই গুঁই করে নিজেদের চক্রান্তমূলক আলোচনা শুরু করল। বেচামণি ওড়নায় কপালের ঘাম মুছে নিল। এক হাত কোমরে দিয়ে ও এক হাত বাতাসে মেলে ধরে দাঁড়াল। দুপায়ে ঘুঙুর। মদন, পুরন্দর ও ডি. এস উঠোনের একপাশে থেবড়ে বসে নাচ দেখতে লাগল। ডি. এস বলল,
— এই নাচটা আমি হেভি লাইক করি।
— নাম জানো নাচটার?
— হ্যাঁ। কুচিপুদি।
— বাল জানো। একে বলে কত্থক। টেংরির জোর না থাকলে এ নাচ নাচলে ঠ্যাং খুলে যাবে।
দণ্ডবায়স ধমকায়,
— তোরা চুপ করবি?
তাহলে লচোকতো মচোকতো।
তা, তা তা ধেই, ধেই তা তা, ধেই …
১৩ মার্চ রাত দশ ঘটিকায় হোটেল গোপালে রুম নাম্বার ৩৭-এ পুলিশী আঙুলের গাঁট্টা পড়ল … টুক, টুক … নগরপাল ও কিউরেটর। দরজা খুলিয়া দিল একটি বিচ্ছিন্ন হাত। নগরপাল বিচলিত কিন্তু বিস্মিত নন কারণ তিনি হেলমেট পরা। কিন্তু কিউরেটর। সে কী করে এই রমণীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবে? সোফার ওপরে বসে আছে ধড়। একটি হাত দরজা খুলে দেওয়ার পর সাবলীলভাবে করমর্দন করার জন্য এগিয়ে আসছে। টেবিলে বসানো পাগড়ি পরা সেক্স-ভকিলের মুণ্ডুতে গালভরা হাসি,
— আইয়ে, আইয়ে তসরিফ রাখিয়ে …
ওদিকে অপর একটি হাত একটি চামচ দিয়ে বয়ামের থেকে ইয়াকুতি হালুয়া বের করছে কারণ বয়ামের গায়ে লেবেলে সেরকমই লেখা। নাগরা পরা দুটি পা ঘরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। নগরপাল হেঁকে ওঠেন,
— অ্যাঁঃ এখানেও চাকতি! সেই চাকতিরই চক্কর! দ্যাট ত্রুয়েল ফ্লাইং সসার। ওহ গড।
কিউরেটর প্রথমে ভেবেছিলেন ঘরটি উল্টে গেছে এবং তিনি ভারহীন অবস্থায় উড়ছেন। তা নয়। ধীরে ধীরে তিনি জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। এমন সময় দরজা ঠেলে পার্ক স্ট্রিট ও শ্মশান পাড়ার ওসিও ঢুকল। দুজনেই মাল চার্জ করে একটু ঢুলু ঢুলু। তাই তারা হেলমেট পরা নগরপালকে চিনতে পারেনি।
— স্কাউন্ড্রেল। স্যালুট করতে অবদি ভুলে মেরে দিয়েছ। ক-বোতল টেনেছ দুটোতে? টাকলা ওসি গলার আওয়াজটা চিনে স্যালুট করবে কি করবে না ভাবছিল। পার্ক স্ট্রিটের ওসি, একে মাথামোটা তায় চার্জড। সে তড়পে উঠল,
— তুই ল্যাওড়া কে যে তোকে স্যালুট মারতে হবে?
— অ্যাঁ আমি ল্যাওড়া কে?
অলৌকিক ঘটনায় বহু সময়েই পুলিশ জড়িত থাকে। যেমন জলজ্যান্ত মানুষ হাওয়া করে দেওয়া। পুলিশ কখনোই দাবি করে না যে তারা ম্যাজিক জানে। তবুও ম্যাজিক দেখানোতে পুলিশ যে পারঙ্গম তা সকলেই জানে। আবার পুলিশকেও কখনও সখনও ম্যাজিক দেখতে হয়। তেমনই ম্যাজিক বিষয়েই কবি হরিবর সরকার লিখিয়াছেন,
লোচন গোস্বামী যবে জয়পুরে ছিল।
থানা হতে পরোয়ানা বাহির করিল।
জলে বাহ্য প্রস্রাব কেহই করিবে না।
কৈলে জেল জরিমানা হবে সাক্ষী বিনা।।
গোস্বামী তরীতে উঠি হাতে লয়ে বৈঠে।
করিল পুরিষ ত্যাগ থানার নিকটে।
দেখিয়া দারোগাবাবু ক্রোধে কম্পমান।
বলে ঐ বেটারে থানায় ধরে আন।।
শুনিয়া কনস্টেবল বলিল তখন।
দুর্গন্ধে নিকটে যেতে নারিব কখন।।
নিজেই দারোগাবাবু করিল গমন।
চন্দনের গন্ধ পেয়ে প্রফুল্লিত মন।।
হে পাঠক বাবাজী, বলিতে পারো ঐ লোচন গোস্বামী কে? পুলিশকে গু ও চন্দনের ম্যাজিক দেখাইবার শক্তি তিনি কোথা হইতে পাইলেন? তা তা ধেই … ধেই …
