কাঙাল মালসাট – ১৫
১৫
‘বিদ্রোহে বাঙালী’ পড়তে যাবে কেন? পড়লে যে জেনে যাবে যে, মহাবিদ্রোহে বাঙালি কী যত্নসহযোগে সাহেবদের চামচাগিরি করত। তার চেয়ে সে পড়বে ফুকো যিনি, ভালো বাংলায়, শিঙে ফুঁকে আমাদের বাঁচিয়েছেন। অর্থাৎ পাঠকদের শৃঙ্খলা শেখানো ও শাস্তিপ্রদানের মহান দায়িত্বটি অতীব ক্ষমতাধারী ‘কাঙাল মালসাট’-এর ঘাড়েই বর্তেছে। ‘কাঙাল মালসাট’ কোনো বিদ্রোহী মোষ নয় যে, রক্তচক্ষু করে জোয়াল ফেলে দেবে ও বিপ্লবী গাড়োয়ানদের সঙ্গে প্রাক-পুঁজিবাদী অঘোর নৃত্যে মেতে উঠবে। তাই আমাদের (মানে কাঙাল মালসাট, লেখক ও পাঠকদের) মমজমার রহস্য জানিলেই চলিবে, ৩১৮ পৃষ্ঠার মালটি যেমন অজ্ঞাত রহিয়াছে তেমনই থাকুক। ব্রিটিশদের গুপ্তচরের কাজ। ১৮৫৭ তে ‘পাছে পথিমধ্যে যুবক গুপ্তচর বলিয়া ধৃত হয়, এই জন্য সেই পত্রখানি, দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া রাখিয়াছে। দেহ উলঙ্গ করিয়া, কাপড়-ঝাড়া হইলেও সে পত্র বাহির হইত না। পত্র অবশ্যই মুখের মধ্যে ছিল না। পত্রখানিকে মমজমায় মুড়িয়া, মলত্যাগের দ্বারের ভিতর সুরক্ষিত করা হইয়াছিল। আবশ্যক হইলে, যুবক পত্রখানি খুলিয়া লইত এবং শৌচাদির পর পুনরায় তৎস্থানে রাখিয়া দিত। রস বীভৎস বটে, কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের সময়, বীর-বীভৎসরসেরই বিশেষ বাড়াবাড়ি হইয়াছিল।’ এক হিসেবে ভদির কারবারও বিদ্রোহ বিশেষ। অতএব রসতাত্বিকরা রসমিল লক্ষ করিতেই পারেন। বাধা দেওয়ার কেহই নাই। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মহাকাহিনীর শেষে লিখিয়াছেন, ‘আবার বেরিলিতে ইংরেজের রাজত্ব বসিল। মনে অপূর্বভাবের উদয় হইল। অদ্য এইখানেই আমার জীবন-চরিত শেষ করিলাম। অবশিষ্ট জীবনী আর লিখিবার উপযুক্ত নহে।’ মহান উপলদ্ধি ও তৎসহ কী অকপট স্বীকারোক্তি। কী কন্ট্রোল ! আলফাল অনেক গান্ডুরই নিজের জীবনী রচনা করিবার একটি গুপ্ত বাসনা রহিয়াছে। কোনো কোনো পাঁচু তো লিখেই ফেলেছে। ছাপাও হচ্ছে খোলতাই করে। কিছু বলার নেই। মহাজনেরা যে পথে যেতে যেতে হায়দারি হাঁক ছাড়েন অ্যাং ব্যাং-ও সেই রাস্তায় হাওদায় বসে জাঁকাতে চায়। এদিকে হাতির সাপ্লাই নেই বহুদিন। আজ যদি নেতাজী থাকত!
রাধাবাজারে ডি.এস যে ট্যাঁকঘড়িটা সারাতে নিয়ে গিয়েছিল সেটা দেখে দুঁদে দুঁদে ঘড়িয়ালরা অবধি চুপসে গেল। কারও কাছেই এই বিদঘুটে ঘড়ির স্প্রিং তো দুরের কথা, কোনো পার্টসই নেই।
— তাহলে দাদু বলচেন হবে না।
— হওয়া না হওয়া ভাই আমার নয়, ওপরওয়ালার ব্যাপার। তবে চান্স কম। এসব মালের আর পার্টস-ফার্টস হয় না।
— ঠাকুরদার একটা জিনিস। ফেলে দেব?
— না না, ফেলতে যাবেন কেন? বাক্সপ্যাঁটরায় তুলে রাখুন যত্ন করে। মান্ধাতার মাল। এখন এ সবের মর্ম কেউ বুঝবে?
— কিন্তু মাল তো অচল। কিছু একটা রাস্তা বাতলান?
— কোনো রাস্তা নেই ভাই। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় আধবুড়ো পাগলা সাহেবরা এই সব অ্যান্টিক মাল কিনতে আসে। দেখবেন, কাগজে দেয়। পুরনো খেলনা, কলের গান, ঘড়ি তারপর গিয়ে কলম — এইসব।…. ভালো হলে হেভি দাঁও মারতে পারবেন।
— বাংলা কাগজে দেয়?
দোকানে থেকে বেরিয়ে ডি.এস ঘড়িটা পকেটে ঢুকোল। পুরন্দর বলল,
— বেচবে না জানো, সারানো গেলেও সারাবে না। করতেও পারো ভ্যাড়রভ্যাড়র।
— কটা বাজে?
— দোকানে তো আড়াইটে দেখলুম।
— তো! গোলাপ আসবে সোয়া তিনটেতে। টাইম পাস করতে হবে তো! এখনও কড়কড়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
— হেঁটে হেঁটে বেল্লিক বনে লাভ আছে? পায়ের নড়াদুটো টনটন করচে। চলো, একটা চায়ের দোকানে বসি।
— পালকি যার বউ তার। চায়ের খরচ তাহলে তোমার!
— বেশ, তাই হবে। যা ছ্যাঁচড়া হয়ে উঠচ দিন কে দিন।
— আরে, তা নয়। হেভি ক্যাশ সর্ট। বালবাচ্চা নিয়ে তো ঘর করলে না। কবিতা লিখেই লাইফটা কাটিয়ে দিলে।
— আমি আর কবিতা লিখি না। জানো?
— মানে?
— মানে, আবার কী? কবিতা লিখবো না। ছেড়ে দিয়েচি।
— বলো কী?
— দূর। কোনো বাঞ্চোৎ পড়ে না। কেউ ছাপেও না। ও ল্যাওড়া লিখলেই কী আর না লিখলেই কী।
— তবে কী করবে?
— গান লিখব। গান এখন হেভি পপুলার। কাঁড়ি কাঁড়ি ক্যাসেট দেকচ না। হেগো পেদো সব্বাই পুঁক পাঁক করে ক্যাসেট ছাড়চে বাজারে। তাই গান লিখব। রেডি মার্কেট আচে। একটা লিখেচি। শুনবে? চা খেতে খেতে।
— গাইবে?
— না, না। পড়ব। এর ওপর টিউনিং হবে। তারপর আগে পরের বাজনা জুড়বে। মাল রেডি হলে আর্টিস্ট গানটা তুলবে।
পুরন্দর আর ডি.এস যে চায়ের দোকানটায় বসল সেখানে বিরাট ছবি সন্তোষীমার। এফ এম রেডিওতে তালাত মেহমুদের ঢেউখেলানো গলার সুর বাজছে। লোকেরা নোংরা গেলাসে গরম চা ও ঠাণ্ডা নিমকি খাচ্ছে। ড্রাইভারেরা বিড়ি ধরিয়ে মালিকদের মা বাপ তুলে খিস্তি করছে। চোখে ছানি কাটানোর পর কালো ঠুলি পরা একটা বুড়ো উবু হয়ে ফুটপাথে বসে চা খাচ্ছে। তার বুকপকেটে আনেক ময়লা কাগজ ভাঁজ করা এবং সেই কাগজের ফাঁকে একটি ডটপেনের ন্যাড়া রিফিল। দুটো চা অর্ডার দিয়ে ওরা বুড়োটার থেকে একটু দুরে দাঁড়ালো এববং পুরন্দর পকেট থেকে গান লেখা কাগজটা বের করল।
— কী টাইপের গান এটা?
— ফোক। শোনো না। কথাতেই ভাবটা ধরতে পারবে। আচ্ছা না হয় একটু বলেই নিই-এটা হল মাছমারানীদের গান। রাতের বেলায় পাল বেঁধে মেছোমাগিরা মাছ ধরতে যাচ্ছে।
— হেভি তো!
— হ্যাঁ। এবার পড়চি,
গজাল মাছের ভুড়ভুড়িতে কাতলা মারে ঘাই
মাছ মারিতে যাই গো মোরা মাছ মারিতে যাই
ঘোমটা ফেলে, আদুল বুকে
গিরগিটি তেল মাখ লো মুখে
আড়ের ভুঁড়ি, শোলের মুড়ি, কুমীরপানা ঢাঁই
মাছ মারিতে যাই গো মোরা মাছ মারিতে যাই
আবছায়াতে পেত্নি মোরা
পায়ের পাতা পিছনমোড়া
মাছের তেলে মাছটি ভেজে সোহাগ করে খাই
মাছ মারিতে যাই গো মোরা মাছ মারিতে যাই
– পুরো ঝাক্কাস কেস হয়েচে গুরু কিন্তু লাস্টের দিকটায় তো মনে হচ্ছে ওরা ভূত!
— ভূত নয়। ওটা হল মনের ভাব। আঁশটে ভাবনাটা যাতে বেরোয় তাই তো ওরা নিজেদের মেছোপেত্নি বলচে। বুঝলে?
— সে না হয় হল কিন্তু গাইবে কে? আশার গলায় মালটা যা খুলতো না! সঙ্গে খিলখিলে হাসি!
— ওসব ভেবে লাভ নেই। আমার গান তো, ফিউচার ইজ ডার্ক। হেঁজি পেঁজি কোনো ছুঁড়িফুঁড়ি গাইবে। আবার কী হবে? এই বাজারে সি.পি.এম, তৃণমূল, নয়তো কোনো দরাজদিল… কেউ পেছনে লগা না ধরে উঁচু করলে নো চান্স।
— তবে কিছু হয়নি বলে আমি মানি না।
— যেমন?
— আরে বাবা, ফ্যাতাড়ু তো হয়েছ। চোক্তারদের সঙ্গে দোস্তি তো হয়েছে। তারপর গিয়ে কথা বলা দাঁড়কাক, চাকতির চক্কর, এবেলা বেঙ্গল ও বেলা ইংলিশ – এরকমই বা কজনের হয়?
— এদিকটা নিয়ে এত ভাবিনি।
— না চাইতেই তো পাচ্চ। তাই ভাবচ না। এইজন্যেই আমার বউ বলে মিনিমাগনাকে কেউ ইজ্জত দেয় না।
— ঠিকই বলে। ভালোই হল। এই কতা দিলুম এসব নিয়ে আর ভাবব না। ওফ চিড়িক করে একটা সং মাথায় এল।
— এটাও কি জেলেমাগিদের …?
— না, না। এটা হল গিয়ে তোমার শহরের, কলেজে পড়া মেয়েদের গান। মুখড়াটাই পেলুম। শুনবে?
— বলো!
— হব না ননদ, হব না জায়া
হব সরকারি হোমের আয়া …
— হিটিয়াল দাঁড়াবে গুরু। এরপর মিল দেওয়ার জন্যে তোমার হাতে সায়া, মায়া, ছায়া, পায়া – সব আচে।
— পায়া-টা কাজে লাগবে না। অবশ্য খাট বা তক্তপোষ যদি সিনে ঢুকে পড়ে তাহলে আলাদা ব্যাপার।
ডি. এস বলল,
— সামনে দেখো,
— কী?
–ঐ যে, রাস্তাপারের পানের দোকানে।
গোলাপ পান কিনে খেল। তারপর পানের বোঁটার থেকে চুন দাঁতে কেটে বোঁটাটা যখন ছুঁড়ে ফেলল তখন হাতের তেলোতে লুকোনো একটা কাগজের দলাও সেইদিকে পড়ে গড়িয়ে গেল।
— গোলাপটা এখন লালবাজারে ব্যাক করবে। আমি পা চুলকোবার ছকে মালটা ক্যাচ করব। তুমি গার্ড দেবে।
— আমিও পা চুলকোব?
— পাগলা নাকি? দুজনে পা চুলকোচ্চে দেখলেই সব স্পাই অ্যালার্ট হয়ে যাবে। চারদিকে কিলবিল করচে। চলো! কোনো বাঞ্চোৎ হয়তো এক কিকে নর্দমায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে। কাগজের দলা দেখলেই অনেকে ভাবে বল।
গুপ্তচরদের একটি জমজমাট জগৎ রয়েছে। সেখানে নানা দেশের গুপ্তচর সংস্থাই খেলায় মেতে রয়েছে। সি. আই. এ, কে. জি. বি. (বর্তমানে এফ. এস. বি), এম. আই . ফাইভ, মোসাদ, অধুনা বিলুপ্ত স্টাসি, আই. এস. আই — কত শিশুই যে নিকারবোকার পরে এই রহস্যাবৃত ক্রীড়াঙ্গনে আঁকুপাঁকু খেলা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই নিষ্পাপ খেলায় যে চোক্তার-ফ্যাতাড়ুরাও পেছিয়ে নেই তা আশা করা যায় পাঠকের মগজ এড়াবে না। ভদি দলা পাকানো কাগজটি খুলল। একটি হ্যান্ডবিলের উল্টোপিঠ। সেখানে লেখা,
ALL M AND CT UNDER I
— হুঁ হুঁ বাবা। আমার নাম হল ভদি। আমার সঙ্গে টিগড়মবাজি! নলেন কোতায়? নে… লো…!
নলেন দুদ্দাড় করে ছাদ থেকে নেমে এল।
— এই কাগজটাকে উনুনে দিয়ে দে। ভাল করে পুরোটা জ্বলে যেতে দেখবি। তারপর বড় করে একটা বাংলা রাম পাতিয়ালা পাঞ্চ বানা। জানতাম, খেলা জমবে। জমে দই হয়ে যাবে।
সেদিন রাতেই ভদি, দাঁড়কাক ও সরখেল স্পেশাল কোর মিটিং-এ বসে গেল। লালবাজারের গোয়েন্দারা কলকাতার মাগি ও চোলাই-এর ঠেকে হেভি নজর রাখা শুরু করেছে। সরখেল দেখা গেল ব্যাপারটার গ্র্যাভিটি ঠিক ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।
— আমরা মাগিবাড়ি যাই না, চোলাইও খাই না। ও উকুন আমাদের কারো নেই। তবে কেন আমরা উত্যক্ত হতে যাব?
— গোড়াতেই এমন চোদনার মতো কথা বলে বসো যে মটকা গরম হয়ে যায়। তোমার মতো মেজর জেনারেল নিয়ে লড়তে হয়েছিল বলেই হিটলারের খুপড়ি উড়ে গিয়েছিল। ভাবা যায় না। বোকাচোদামির একটা লিমিট থাকে।
— দাঁড়কাক এই স্ট্র্যাটেজিক আলোচনায় এতক্ষণ এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পা দিয়ে বাতাসে ইকড়িমিকড়ি আঁকছিল। ভদির মেজাজ টং দেখে সরখেল কথা ঘুরিয়ে দাঁড়কাককে বলে,
— আপনি কী লিখছেন প্রভু?
— ও কিছু নয়।, ডুডলস। যুদ্ধ লেগে যাব লেগে যাব হলেই আমি ডুডলস আঁকি। স্ট্যালিনও আঁকত – শেয়াল।
— আর আপনি?
— কোনো ধরাবাঁধা সাবজেক্ট নেই। কখনো ভূত, কখনো কচ্ছপ, কখনো ঝাড়াঝাড়ি।ভদির সব ভালো কিন্তু বড় অল্পতে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ে। ওর ঠাকুর্দাও এরকম ছিল। থার্ড জেনারেশন বলে রিপিট করছে। গ্রেগর মেন্ডেলের নাম শুনেছিস।
— আজ্ঞে না।
— ১৮৬৫ সালে কেসটা ধরেছিল। মিউটিনির আট বছর পর। একদিন বলবখন। এই মেন্ডেলকে আবার আংলি করতে গিয়েছিল লাইসেনকো বলে একটা বোকাচোদা। স্ট্যালিনও পুড়কি খেয়ে নিকোলাই ভাভিলভকে ঝেড়ে দিল। ব্যাস — পুঁটকিজাম। কিছুই জানিস না। আর কী করেই বা জানবি! গাণ্ডুর দেশের যত উদগাণ্ডুরা হচ্ছে লিডার। তোর লিডার যেমন ভদি। মগরার বালি দিয়ে চারবেলা পোঁদ মারালে যদি বুদ্ধি খোলে।
— না, না, বাবা। অমন কঠোর দণ্ড দেবেন না।
— ঠিক আচে, দেব না। এবার যা বলবি বল। তবে চোপা দেখলেই এবার কিন্তু হেভি খচে যাব।
— নাক মলচি, কান মলচি, আর হবে না।
— বেশ, এবার বলে যা।
এই সময়েই দরজার বাইরে একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সকলে চমকে গেল।
— কে? হু ইজ দেয়ার?
— আমি। নলেন।
— হোয়াই? কী চাই?
– বৌদিমণি বলল কি যে সেনাপতিরা ফন্দি আঁটচে, যা রে নলেন, এক বোতল মাল দিয়ে আয়, তাই এলুম।
– কাম। গুড।
দরজা খুলে নলেন ঢুকল। থালার ওপরে এক বোতল বাংলা। তিনটে ছোট গেলাশ। এক মগ জল। কুচো চিংড়ির বড়া।
— রাখ। বাইরে কী ফাটল? পাদলি?
— আঁজ্ঞে না। পায়ের তলায় পড়ে আরশোলা ফাটল।
— তাই বল। আমি ভাবলুম ক্যাপ ফাটল। যা, দরজাটা টেনে দিয়ে যেমন এসেচিস তেমনি পা টিপে টিপে চলে যা।
নলেন পা টিপে টিপে চলে গেল।
— বাবা, শুনুন। সরখেল, ধ্যানসে শুনো। মিউটিনির প্রথম দিকটায় আমরা পুরো ক্যান্টার করে দিয়েছি। এমন দিয়েচি যে বাঞ্চোৎদের পোঁদে যমের ভয় ধরে মাথা গুগলি হয়ে গেচে।
— খোলসা করে বল।
— এক নম্বর হচ্ছে যে চাকতিফাকতি উড়ে ওদের তো পিলে চমকে গেচে। বুঝতেও পারচে যে সরখেলের চরমপত্র ফ্যালনা নয়। এ. কে. ফর্টি সেভেনের কারখানা, ভিক্টোরিয়ার চোদখোর কিউরেটর — সব মিলিয়ে কেস গুবলেটিং। কিছু একটা আসচে অথচ কী করবে জানে না। মোটা মাথা তো … হেডপিসে হরতাল … ভাবচে কমন ক্রিমিনালরা গ্যাং আপ করেচে তো … তাই এম অ্যান্ড সি টি মানে মাগি আর চোলাই-এর ঠেকে খোঁচর বসানো … এগুলো হচ্চে পাতি রেসপন্স .. এই দিয়ে যদি মিউটিনি ঠেকানো যেত তাহলে আর কতা ছিল না। একদম চোদু। পিওর চোদু। তবে হ্যাটস অফ টু গোলাপ। একে বলে স্পাই।
— ওফ এইবার বুঝলুম। না, প্রভু, আমরা ঠিক নেতাই বেছেছি। আপনি কী বলেন?
– বাপ হয়ে ছেলের প্রশংসা আমি কখনও করিনি। ওসব ঢ্যামনামি আমাদের বংশের ধাতে নেই। তবে আমি চাই যে ওরা যখন একটা স্টেপ নিয়েচে তখন আমাদের একটা কাউন্টার স্টেপ নিয়ে দেখিয়ে দেওয়া দরকার যে আমরা বাল কেয়ার করি। ভদিই সেটা ঠিক করবে। চুক করে একটা কড়া ডোজ মেরে আমাকে কাটতে হবে।
— কেন প্রভু?
— বলা বারণ কিন্তু তোরা হলি কোলের গ্যাঁদা। তোদের বলা যায়। আজ ওল্ড পার্ক স্ট্রিট কবরখানায় মি. স্লিম্যান ও মি. শেরউডের মধ্যে ডুয়েল হবে। আমাকে রেফারি থাকতে হবে।
— আঁজ্ঞে, রাজার জাতের মধ্যে কী নিয়ে বিবাদ যে ডুয়েল লড়তে হবে?
— সেই, এজ ওল্ড ফ্যাড, মিস এমা র্যাংহামকে নিয়ে কামড়াকামড়ি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় যার ছড়াছড়ি। রাস্তাতেও তাই। মাদি কুত্তা নিয়ে মদ্দাগুলোর ঘ্যাঁক ঘ্যাঁক। বাই চান্স হয়তো কোনো ওল্ড কুত্তা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। ব্যাস সেও সোলডা বের করে ভিড়ে পড়ল। ফিউচারেও এরকম চলবে। কিছু করার নেই।
— আচ্ছা প্রভু, ঐ আপনার গিয়ে স্লিম্যান, তারপর কী যেন, হ্যাঁ শেরউড — এরাতো কবে পটলিফায়েড হয়ে গেচে। এখনও এদের ভূত লড়ে যাচ্ছে?
— নো, নো, সাহেবদের ভূত বলা বারণ। গোস্ট বলতে হবে। কী বাবা, ঠিক বলিনি?
— ঠিকই তবে গোরাভূত বললে দেখেচি আজকাল ওরা মাইন্ড করে না। কতায় কতায় রাত গড়াচ্চে। ওদিকে পিস্তল-ফিস্তল রেডি। মিস এমা র্যাংহাম বার বার মূর্ছা যাচ্ছে। বেগম জনসন একা কতদিন সামলাবে। চলি।
খোলা জানালা দিয়ে ভৌতিক অন্ধকারের মধ্যে ডানা মেলিয়া দণ্ডবায়স ডুয়েল-এ রেফারিং করিতে উড়িয়া গেল। পাঠক, নিপাতনে সিদ্ধ গবাক্ষের বাহিরে মোহিনী মন লইয়া তাকাও। তুমিও দেখিবে পিয়ানোর টুং টুাং শব্দে সেই শিশিরই পড়িতেছে যা তখনও পড়িত। ঘাসে ঘাসফুল ফুটিয়াছে। তখনও ফুটিত। এই দৃশ্যে মগ্ন থাকো। ঐ দ্যাখো মেম-বালিকারা খিলখিল করিয়া মাঠে নামিতেছে। স্নো- মোশানে স্কিপিং করিতেছে। কী সুন্দর সোনলি চুল। কী দুধেল গলা। কী ফুলেল বুক। আরো নামো। যেন লিফটে চড়িয়া তুমি বালিকা মেমের পেট বাহিয়া নামিতেছ। এ লিফট থামিবে না। স্বপ্নদোষ অবধি এই চটকা থাকিবেক। হায় নবোকভ, পৃথিবীর সবকটি রান্নাঘরের ঝুল একত্র করিলেও আপনার ন্যায় একটি ঝুল লেখক মিলিবে না।
— সরখেল, আমিও তাহলে উঠি।
— সে কি? প্রভু যে কাউন্টার স্টেপের কথা বলে গেলেন, তার কিছু করবে না।
— সেই কারণেই তো যাচ্ছি। কাল একটা ঘটনা ঘটবে জানো?
— কী?
— ওয়েস্টবেঙ্গলের টপ সব ক্যাপিটালিস্টরা সি. এম-কে মিট করবে।
— তাতে আমাদের কি ছেঁড়া গেল?
— দেখবে। দেখবে মানে কাগজে পড়বে। টিভিতে দেখালেও দেখাতে পারে।
— একটু আঁচ দাও। এত সাসপেন্স।
— অনেকটা মাল আচে। একাকী চার্জ করে যাও। আমি চাকতির ঘরে ঢুকব। ঘন্টা দুয়েক দরজা বন্ধ থাকবে। আর বলব না। চলি।
ভদি যখন উঠে দাঁড়াল তখন সরখেল দেখল হারিকেনের আলোয় ভদির যে ছায়া পড়েছে তা ফসফোরাসের ঝিকিমিকিতে দ্যুতিময়। কেঁচোর তেল থেকেও এরকম অপার্থিব আলো বের হয়। ভালটের বেঞ্জামিন ইহাকেই বলিয়াছিলেন ‘অরা’। আমরা ‘আভা’ বলতে পারি। এই আভা-কে পাঠক যেন আভাদিদির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলেন। ফেললেই কেলো।
সেই রাতেই মদনের বাড়িতে বসে পুরন্দর ভাট তার লেখা দ্বিতীয় গানটি কমপ্লিট করল।
হব না ননদ, হব না জায়া
হব সরকারি হোমের আয়া
সুপারের সনে
যাব কচুবনে
রচিতে নধর মিলনমায়া
না রবে পিত্তি, না রবে হায়া
হয় এসপার
নয় ওসপার
দেখিবে জগৎ যুগলছায়া
হব না ননদ, হব না জায়া।
মদন গানের কথাগুলো শুনে বলল,
— তোমার দুটো গানেই দেখচি মেয়েদের হ্যাটা করার একটা ধান্দা। আমার মতো তোমারও বউ পালিয়েছে নাকি?
— বিয়েই করলুম না। বউ পালাচ্চে!
— ও তাহলে হাফসোল কেস। বুঝেচি । নাও, রাত হয়েছে। লেটে যাও।
— সেই ভালো। লেটে একবার গেলে কোনো ঝুটঝামেলা নেই।
রাত ফুরোতে বেশ খানিকটা বাকি তখনও। কালী ও বড়িলাল পাশাপাশি কালীর ঘরে মাদুরের ওপর অন্ধকারে উদোম হয়ে শুয়েছিল। বড়িলাল কাশল।
— ঘুম আসচে না?
— এসে গিয়েছিল কিন্তু চালের ওপর সড় সড় একটা শব্দ।
— ও কিছু না। বাস্তু সাপ।
— অ্যাঁ
— আরে বাবু ক্যাঁওম্যাঁও করার মতো কিচু ঘটেনি। ওকেনেই থাকেন। মাঝেমাঝে রাতে বেরোন। ব্যাঙ, ইঁদুর – যা খেলেন খেলেন, এসে আবার শুয়ে থাকেন। ভালো। এবারে ঘুমোও।
— যা শোনালি তাতে ঘুমের বাপও আর ধারেবাড়ে ভিড়বে না।
— এই নাকি তিনি কুস্তি নড়তেন। কুস্তিগির।
— কুস্তি তো মানুষে মানুষে হয়। সাপখোপ, পোকামাকড়, পিমড়ে – এসব আমার ধাতে সয় না।
— থামো তো। ওরা কেউ কিছু করবে না। যে করবে সে জানান দিয়ে গচে।
— কে?
— পুলিশের লোক। ঘরে ঘরে বলে গেচে।
— কী?
— বলেচে, দ্যাখ মাগেরা, কার ঘরে কোন খদ্দের আসচে, কী বলচে, কী আনচে সব রিপোর্ট দিতে । বড়বাবুর অর্ডার। কিছু গোপন করবিনি। তাহলে মেয়ে-পুলিশ এনে, চাবকে পোঁদের চামড়া গুইটে দেবে। বড়বাবুর হুকোম। যে সে লোক নয়।
— তুই আমার নাম বলবি?
— বলব।
— বলবি?
— থামো তো। রাত বলে ভোর হতে চলল আর ওনার বটকেরা থামে না। কেন বলব? বড়বাবু আমার ভাতার না কে? পুলিশ দেখাচ্ছে। বলি ফি মাসে গুনে গুনে টাকা নিয়ে যাস না? এমনিতেই আমাদের লজ্জাশরম কম। এমন কথা শুনিয়ে দেব যে ধন গুইটে পালাবে।
— ধর আমাকে দেখে ফেলল।
— তো কী হবে?
— বলবে, এই কালী, ডেমনী খানকি, তোর ঘরে খেলনার দোকানের বড়িলাল মৌজ মারতে আসে, শালী, বলিসনি কেন?
— আমিও চুপ করে থাকার লোক না। বলব, বড়িবাবুর ঠেঙে আমি একবেলা নগদ ধার নিয়েছিলাম। সেই টাকা শোধ কোত্থেকে করব? তো গায়ে গায়ে শোধ করে দিচ্চি। তাতে তোর তবিলে জ্বালা ধরচে কেন রে বোকাচোদা! আসুক না।
— বেশ বলিচিস কিন্তু। গায়ে গায়ে শোধ! আয় কাচে চলে আয়।
— কেন, তোমার আসতে বারণ আচে?
— থাকলেই বা মানচে কে?
পাঠক, তুমি কালীঘাটের খানকি কালীর প্রেমে পড়িতে চাও? পাঠিকা যদি হও তো কালীর সম্মানে মাথা নত করো। বরং আইস, আমরা খানকি কালীর বন্দনাতে সমস্বরে গাই, চরাচর শুনুক, দেবতা, মানুষ সকলে জানুক,
কসিয়া কোমর বান্ধে অতি মনোহর ছন্দে
অস্ত্র বান্ধে বহু যত্ন করি।
জড়ির পটুয়া আনি কাঁকলে বান্ধিল রাণী
পটি টাঙ্গি বান্ধে তারোপরি।।
পীঠেতে বান্ধিল তূণ কৈল তায় বাণে পূর্ণ
শেলশূল মুষল মুদগর।
ঝাটি ঝকড়া আনি বান্ধিলা প্রমীলা রাণী
সাজ করি হইল তৎপর।।
শ্রী চন্দনদাস মণ্ডল বিরচিত ‘মহাভারত’ হইতে সমস্বরে যখন কালীর বন্দনা ধ্বনিত হইতেছিল সেই সময়েই, রজনী তখনও আছে, ভদির চাকতির ঘরের দরজা সশব্দে খুলিয়া গেল এবং পূর্বে যেমনটি আমরা দেখিযাছিলাম তেমন নয়, অজস্র অতি সূক্ষ্ম ও প্রায় স্বচ্ছ চাকতি বোঁ বোঁ শব্দ করিতে করিতে বাহির হইয়া আকাশে উড়িয়া গেল।
