কাঙাল মালসাট – ১৬
১৬
কবিতার (কোনো ফিমেলের নাম নয়) হাত ধরেই নাবালক বাংলা সাহিত্য, যে দিকেই হোক, এগিয়েছিল। এই পক্কড়টির সূত্রপাতেও তাই কবিতার আবির্ভাব। কবি কোনো প্রখ্যাত মিহিদানা নয়, নয় কোনো অভিমানী আন্দামান। বরং আমাদেরই প্রিয়জন পুরন্দর ভাট।
সবই আছে বাংলায় — বউ, ছুঁড়ি, আয়া
তবে কেন বিমর্ষ মুখে বসে ভায়া?
নিশিনাথ, আব্দুল — কাঁদো কেন ভাই?
চলো মোরা রামপাখি ধরে ধরে খাই।
বিশিষ্ট কেউ যদি বলেও না দেন যে এই কবিতায় ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিমডিম রবে’-র মতো সাসপেন্স পাওয়া যায়নি তাহলেও আমাদের খুব একটা মুষড়ে পড়ার কারণ নেই। না হয় সেসব ফাইনার পয়েন্ট আমাদের না জানাই থেকে গেল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশে যেটুকু পাওয়া গেল তা কি কাফি নয়? সেলুকাস! তলা দিয়ে মারচ ফোকাস? যেমন নাটকীয়, তেমনই সাবলাইম। এভাবেই এগোতে হবে। দুদশ পা পিছিয়ে পড়লে ক্ষতি কী? সামনে অগাধ খাদ। বরং উল্টো দিকে দৌড় দিলে কেমন হয়? সবাক থেকে নির্বাক চলচ্চিত্রে?
— স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট!
কে চেচাঁল? ফুয়েরার না ইয়াহিয়া খাঁ? নাকি মার্শাল জুকভ? কেউই নয়। মিলিটারি টিউনিক পরে এই চিৎকার দিয়ে চিত্রাপির্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভদি। চেঁচানোর পরেই চোখ বন্ধ। সামনে হাজির ভক্তের দল বাকরুদ্ধ। লন্ঠনের আলো দপদপিয়ে বেড়াচ্ছে। কোনো খুক খুক কাশি বা অন্যবিধ ট্যাঁ ফুঁ নেই। এই মুগ্ধ নীরবতা ভাঙল কে? মেজর বল্লভ বক্সি। তাঁর বাংলা মান্য নয়।
— ঠিক ঠিক সমঝ তো হইল না। স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট! একটু যদি খুলেন..
— খুলব? খুলছি। … গভরমেন্ট হাই অ্যালার্ট। মোড়ে মোড়ে স্পাই। এখানেই হয়তো বসে আচে বাগড়া মারার ধান্দায়! একটাও খোঁচড় নেই এমন কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবে ক্যাপ্টেন?
বল্লভ বক্সি মেজর ছিল কিন্তু ভদি তাকে সবসময় ক্যাপ্টেনই বলে। বল্লভ গোঁফ নাচিয়ে কিছু ভাট বকার আগেই ভক্তবৃন্দ সরব হইয়া উঠিল।
— না প্রভু। না। আমরা নিজেরা নিজেদের ওপর নজর রাখছি।
— থাকলে ঠিক আইডেন্টিফায়েড হয়ে যেত।
— আপনি নাম বলুন। কাঁচা মুন্ডু নামিয়ে দিচ্ছি।
ভদি গর্জে উঠল,
— চোপ! চোপরাও! একটা কিছু বললাম তো অমনি চেল্লাতে শুরু করল। ওরে পাগলা আমার ভক্ত সেজে কোনো খানকির ছেলে টিকে থাকতে পারত? ফেস কাটিং দেখেই ধরে ফেলতুম। দত্তবাবুর লাটে অঘোর সাধনায় তাহলে শিখলুমটা কী? আর্মির হেডকে এসব বলতে হয়। একে বলে হাওয়া গরমানো। বুঝলি! হাওয়া গরমানো। এর টেকনিক যে ধরে ফেলবে তার মার নেই।
টিনের দরজায় দাঁড়িয়ে সবই শুনছিল বড়িলাল। বড়িলালকে কেউ যেন আবার আগ বাড়িয়ে নধর স্পাই বা কিম ফিলবি গোছের কিছু ভেবে না বসে। আগেই বলা হয়েছে যে বড়িলাল হল সাক্ষী। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটুক না কেন তার একজন না একজন সাক্ষী থাকবেই। অবশ্য তাকে যে মানুষ হতেই হবে এমন কোনো সরকারি নিয়ম নেই। সে একটা হাঁড়ি পাতিল বা বগিথালা বা পেদো গন্ধপাতার গাছ বা এক চোখকানা হুলো — যা কিছু হতে পারে। দুনিয়াদার নানা কৌশলে কার সঙ্গে কার যে ঘেঁষপোট করে রেখেছে তা বোঝার সাধ্যি কারও নেই। এনিয়ে অধিক উচ্চবাচ্য না করাই ভালো। কীভাবে বা কোনদিকে কেস টার্ন নেবে তা নিয়ে অনেকেই ফতোয়া দেয় এবং হেভি বেইজ্জৎ হয়ে শেষে হয় ঘাপটি মেরে দিন কাটায় বা পাড়ার লোকের কাছে গুপিবাজ বলে নাম কেনে। গুপি দেওয়া অবশ্য অন্য মেকদারের ব্যাপার। হাওড়া জেলার আমতা বলে একটা থানা আছে। এবং এই থানার আন্ডারে খিলা বরুইপুর নামে একটি ভিলেজ এখন আছে কিনা বলা যাচ্ছে না। যাই হোক, সেই গ্রামেই গোপী মোহন ও বিরাজময়ীর একটি ছেলে হয়। তখন গাম্বাট টাইপের নাম রাখার একটা কেতা চালু হয়েছিল — ছেলের নাম রাখা হল সুরেন্দ্রমোহন। এবং শিশু সুরেন্দ্রমোহন দু বছর বয়সেই মিস্টিরিয়াস কোনো অসুখে সকলকে কাঁদিয়ে টেঁসে গেল। তখন সেই শিশু মড়াটিকে নিয়ে গিয়ে প্রচলিত রিচুয়াল অনুযায়ী পুঁতে ফেলার জন্যে মাটি খোঁড়া হচ্ছে — এমন সময় শিশু মড়াটি চোখের পাতা নাড়তে থাকল এবং অচিরেই বেঁচে উঠল। গোপীমোহনের মা তখন বলেছিলেন যে এলা ছেলেকে ওষুধ না দিয়ে চরণামৃত দিতে- বাঁচলে এতেই বাঁচবে। এলা ছেলেকে এই যে ‘এলা’ (উচ্চারণ হবে অ্যালা), ‘এলা’ বলা হতে লাগল তার থেকেই শেষে সুরেন্দ্রমোহন ভায়া অ্যালামোহন লাস্টে আলামোহন হয়ে উঠলেন। ইনিই তিনি। বেঙ্গলের প্রাইড আলামোহন দাশ। এই রিয়াল লাইফ স্টোরিটি জানার পরেও ঢ্যামনা ঘুঘুর দল যদি সবজান্তার মাজাকি ত্যাগ না করে তাহলে স্পিকটি নট। প্রসিদ্ধ দাশ ব্যাঙ্কের মতো তারাও ফেল মারবে এবং বিস্তর লোককে ডোবাবে । দাশ কোম্পানী, ঘুঘু কোম্পানি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি — কোনো কোম্পানিই থাকবে না। অন্তত পূর্বোক্ত তিনটির মধ্যে দুটি এখনই নেই। তৃতীয়টি অর্থাৎ রক্তচক্ষু ঘুঘু কোম্পানি এখন কবে লাটে ওঠে সেটারই ওয়াস্তা।
ভদির লেকচার একটু এখন শোনা খুবই আরামদায়ক হতে পারে।
— গওরমেন্ট নড়ে চড়ে বসচে। বন্দুকের নলে ফুঁ দিচ্ছে। গোলাগুলি যাতে সেঁতিয়ে না যায় তার জন্য রোদ্দুরে দিচ্ছে। পাবলিককে তাতাচ্ছে। শালাদের বন্দোবস্ত আমরা ধরে ফেলেচি। অত সহজে আমাদের সাইজ করা কারও বাপের সাধ্যে কুলোবে না। তাই আমাদের এখন মতলব হয়েচে স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিটের, গুটোতে থাকব। এইসা গুটোন গুটোব যে বারো হাত কাঁকুড় প্রায় দেখা দেয় আর কি। তারপরই শুরু হবে খোলা। পুরোদস্তুর খোলতাই। লে ধড়াদ্ধড়, লে ধড়াদ্ধড়। মাথায় ঢুকেচে?
— হ্যাঁ প্রভু।
— তাই সকলকেই আগড় বেঁধে থাকতে হবে। একদিকে আড়চোখে তক্কে তক্কে থাকা, অন্যদিকে গাঁড়ভোলা গোঁসাই, কদমা কাকে বলে চেনেন না। এই হল যুক্তি। বাবা পটল।
— কর্তা!
— গঙ্গায় যা ছাড়ার কথা ছিল ছেড়েছিস।
— ও রোববারেই সেরে দিয়েচি। ছাড়া পেয়ে কী আনন্দ। দাঁড়া নাচাচ্ছে আর এ ওকে ধাওয়া করচে।
— বাঃ বাঃ এই তো। অর্ডার দিলুম। কাজ ফতে। নলেন,পটলকে ভালো করে এক গেলাস টনিক বানিয়ে দে।
টনিক খাওয়ার জন্যে পটল উঠে গেল। ভদি এমনিতে তার মিলিটারি প্ল্যানের খুঁটিনাটি বলে না কিন্তু আজ তার অন্যথা ঘটল।
— ভেবে দেখলুম ডুবোজাহাজের খরচা অনেক। খোল বানাও। ইঞ্জিন বসাও। পেরিস্কোপ লাগাও। সব করে যে নিশ্চিত হবে সে উপায় নেই। ভাঁটায় হয়তো ছাই গাদায় সেঁটে গেল। কী করবে তুমি? কিচ্ছু করার নেই। তখনই আইডিয়াটা মাথায় খেলে গেল। অমনি বুঝলাম এ বাবা স্বয়ং বাঞ্ছারাম সরকারের মাথা ছাড়া আর কোথাও আসবে না। রেডিওর মতো। তিনি বলচেন, আমি ধরচি, তোরা শুনচিস গান কি হেঁয়ালি হচ্ছে। তা যে কথা সেই কাজ। পটলের তিন পুরুষের মাছের ব্যবসা। দেখলাম ওই পারবে। বলুলম, যা রে পটল — নেনো ভেড়িতে যে ধুমো ক্যাঁকড়া হয় তার বাচ্চা এই মণটাক এনে মা গঙ্গায় মুক্ত করে দে। এই জল তো হাই প্রোটিন — রোজ অন্তত শতখানেক মরা কুকুর বেড়াল পড়চে। বস্তা করে মানুষও ফেলে। খেয়ে দেয়ে কদিনেই ডাগর হয়ে উঠবে। ব্যাস সাবমেরিনের বাবা। যেই পুলিশ জলে পা ফেলবে অমনি ক্যাঁক!
– আজ্ঞে প্রভু, জলে নামলে তো আমাদেরও কামড়াবে।
– ওইখানেই তো বুদ্ধির দৌড়। ফন্দিফিকির করে ওদের জলে এনে ফেলব। কিন্তু নিজেরা বড়জোর পাড় অব্দি। তারপর সামলাও। হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে জল থেকে হয়তো উঠল কিন্তু বাঁচবে কী করে? বেজায়গায় হয়তো কামড়ে ঝুলচে। ধুমো ক্যাঁকোড়, অনেকটা গিয়ে কচ্ছপের টাইপের। কামড়ালো তো কামড়েই রইল। এই রকম ভাবগতিক ছিল সায়েবদের বুলডগ কুকুরের। আজকাল দেখতেই পাই না। তাছাড়া হেগো বাঙালি বুলডগ খাওয়াবার মুরোদ কোথায় পাবে। ডেলি দেড় কেজি, দুকেজি গরুর মাংস খাবে। থ্যাবড়া মুখ। দেখলেই পিলে উড়ে যাবে। বুলডগ পুষবে। তাই দেখি ভাতার, মাগ সব আজকাল শাদা শাদা শেয়ালের বাচ্চার মত কী একটা নিয়ে ঘুরছে, হাগাচ্চে। সবকটা দেখতে একরকম। বাজারের মুরগির মতো।
বড়িলাল আড়চোখে দেখেছিল গলির থেকে ছায়াটা এগোচ্ছে। এই মোড় ঘুরল বলে। ঘুরে তো গেলই। তখনই বড়িলাল মোতা শেষ করার অ্যাক্টো করে প্যান্টের জিপ টেনে রওনা দিল। গোলাপ ও বড়িলাল ত্যারচা মুখোমুখি হল। কার কেমন ব্যাটারির জোর তা টুক করে মাপামাপিও হয়ে গেল। ছায়ায় ছায়ায় টক্করে এরকমই হয়। গোলাপ বুঝে গেল মালটা নাটা কিন্তু সাঁটিশ। বড়িলালও টের পেল যে একটু পেটের দিকে বেড়ে গেলেও খোকন একসময় ডনফন টেনেছে।
গোলাপের ট্রেইনড চোখ। দরজার কাছে পেচ্ছাবের নদ বা হ্রদ কিছুই চোখে পড়ল না। টিনের গায়ে ধাক্কাতে নলেন দরজা খুলে দিল। ভক্ত সমাবেশে তখন অধিবেশন শেষের দোলাদুলি শুরু হয়েছে।
— কী করচ নলেন ভায়া, দোরগোড়ায় এনিমি ওয়াটার মাইনাস করে পালাচ্ছে, কিছু করতে পারচ না?
নলেন দৌড়ে বাইরে দেখতে গেল। অথচ দেখার মতো কিছুই নেই। একটা বেড়াল রাস্তা পেরোচ্ছে। সে নলেনকে চোখ মারল। এবং গোঁফ নাচিয়ে সেই হাসি হাসল যাকে বিশ্বকবি বলেছিলেন ‘মুচুকি’।
— গোলাপ! আমার গোলাপবাগ, আয়রে বুকে আয়।
ভদির সঙ্গে জড়াজড়ি করে দেখা গেল গোলাপ কানে কানে কি যেন বলছে। ভদি চেঁচিয়ে উঠল,
— সরখেল, গোলাপ বলচে খেল জমে গেচে। জমে ক্ষীর হয়ে গেচে।
সরখেল তড়বড় করে এগোয়।
— বলো কী!
এরপরই সরখেল, গোলাপ ও ভদি যারপরনাই আনন্দে টইটম্বুর হয়ে একটা ঘরে (চাকতির ঘর নয়) ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল এবং দরজার সামনে ক্রেমলিন গার্ডদের মতো নলেন দাঁড়িয়ে গেল। শিষ্যবর্গকে সাময়িকভাবে বিচলিত করে ঝটপটিয়ে দণ্ডবায়স এসে পড়তে নলেন দরজা একটু ফাঁক করল এবং বৃদ্ধ কাকটি ভেতরে গ্যারেজ হয়ে গেল।
শিষ্যবর্গ তখন হাউসকোট পরা বেচামণির হাত থেকে একটি একটি করে নকুলদানা নিয়ে বিদায় নিচ্ছে। মেজর বল্লভ বক্সি নকুলদানা নেওয়ার সময়ে বেচামণিকে আগে স্যালুট করে নিল। ফাঁকা উঠোন। বেচামণির হাত থেকে নকুলদানার থালাটি পাক খেয়ে উড়ে গেল। বাতাস এসে টগরগাছে এমন বেহালার ছড় টানল যে মুহূর্তে উঠোনটি ভিয়েনার নৃত্যাঙ্গনে পাল্টাল ভোল। বেজে উঠল ব্লু দানিয়ুব। আহা কী তালে তালে ফেলে পা বেচামণি আগুপেছু করে। নলেনের চোখদুটি কাচেরই বলে ভুল হয়ে যেতে পারে। দু পা ফাঁক। হাত কোমরে। সামরিক তো বটেই, তদুপরি জালি গামছা পরা।
গোলাপ যে টপ সিক্রেট সফল অপারেশন লোবোটমির কথা ভদি, সরখেল ও দাঁড়কাককে বলছিল তা আমরা তার মুখেও শুনতে পারি। কিন্তু রহস্যময় কোনো তৃতীয় পক্ষের বয়ানই হয়তো বা ঘটনাটির সমকক্ষ হওয়ার মতো পালোয়ান।
সকালেই সেদিন সি. এম-এর ঘরে বঙ্গীয় বণিক সভার প্রতিনিধিবর্গের আসার কথা ছিল। বিষয় বরাবরের মতোই, হলদিয়া পেট্রোকেম এবং বিভিন্ন শিল্পে শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান তিতিবিরক্ত ও বেপরোয়া মনোভাব, হোসিয়ারি শিল্পে নিউ গিনি ও পাপুয়ার সঙ্গে যৌথ গবেষণা গড়ে তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি। পাঁউরুটি ও চানাচুর শিল্পে আশ্চর্য অগ্রগতি সম্বন্ধেও আলোচনা হতে পারত কিন্তু পারল কই? আলোচনা বানচাল হয়ে গেলে কেমন এক ট্র্যাজিক সুর যেন বেজে ওঠে। আলোচনা যে কেন ভেস্তে যায় এ নিয়ে এক নিরবচ্ছিন্ন লাগাতার সেমিনার কেন যে হয় না তা নিয়ে বিলাপ করার অধিকার আছে কি?
বঙ্গীয় বণিকসভার নেতৃবৃন্দ যে পরিকল্পনাটি করেছিলেন তা বড়ই রমণীয় বললে কমই বলা হয়। পিয়ারলেস ইন থেকে প্রাতরাশ সেরে কিছুক্ষণ আড্ডা মস্করা ও বটকেরার পর ঠিক হয় যে বিশিষ্ট শিল্পপতিরা ব্যাটারি চালিত বাসে করে রাইটার্সে যাবেন। ব্যাটারি-চালিত বাস এই বার্তাই চারদিকে রটনা করবে যে পশ্চিমবঙ্গ দূষণমুক্ত শিল্পায়নের পথে আগুয়ান — চিমনি দিয়ে বিকট কালো ধোঁয়া ছেড়ে আবহমান বাংলার শকুন, চিল ও বকবার্ডদের বারোটা বাজানো হবে না, নির্মল জলে রাসায়নিক হুলিয়া জারি করে খলসে, তেচোখা ও পুঁটিমাছদের ঝাড়েগুষ্টিতে লোপাট বন্ধ থাকবে এবং আশা করা যায় যে বিকট গন্ধময় গ্যাস ছাড়ার যে অভ্যাস বাঙালি রপ্ত করেছে তাতেও কিছুটা ভাঁটা পড়বে। ভাগ্যে ব্যাপারটা মি. বিলিমোরিয়ার মাথায় খেলেছিল এবং তিনি তা মি. সেন বরাটকে কানে কানে বলেন। মি. সেন বরাট তখন মি. ন্যাওটাকে বললেন ব্যাপারটা। ব্যাটারি-বাস রাস্তায় যে কোনো সময় কেলিয়ে পড়তে পারে। তাই নিজ নিজ মোটরযানগুলিও যেন রেডি থাকে। ধন্য মি. বিলিমোরিয়ার সন্দেহ! শিল্পপতিদের দূরদৃষ্টি যে কত জোরালো তা পুনরায় প্রমাণিত। গ্রেট ইস্টার্নের সামনে হঠাৎ ঘঁক ঘঁক শব্দ করে ব্যাটারি বাস কেলিয়ে পড়ল। প্রচুর পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশরাই দল বেঁধে রাইটার্সের দিকে মিছিল করে কাউকে ক্যালাতে চলেছে বলে কেউ ভুলও করতে পারত। অতএব মি. ন্যাওটা গিয়ে নিজস্ব কোয়ালিস, মি. বিলিমোরিয়া নিজস্ব মার্সিডিজ ও মি. সেন বরাট নিজস্ব সিয়েলোতে উঠতে বাধ্য হলেন এবং এঁদের দেখাদেখি অন্যান্য শিল্পপতিরাও নিজের নিজের টাটা সুমো, ওপেল করসা, ভলভো, মারুতি সুপ্রিম, অ্যাম্বাসাডর ইত্যাদিতে উঠে পড়লেন। গাড়ি ও পুলিশের শোভাযাত্রা এগিয়ে গেল এবং দূষণমুক্ত ব্যাটারি বাস পড়ে থাকল। দু পাশেই উৎসাহী লোকেরা এসব দেখছিল ও মুখ খারাপ করছিল।
— কী রে, চড়বি ব্যাটারি বাসে?
— বাল চড়বে। শালা চলেই না। ধ্বজামাল।
— দাদা, কটা ব্যাটারি লাগে?
— আপনার মতোই দুটো।
— দিল তো, ট্র্যাফিকের গাঁড়টা মেরে। এমনিতেই বলে জাম্প লেগে আছে।
— পুরো বোকচোদ কেস। পোঁদে নেই ইন্দি, ব্যাটারি মারাচ্ছে।
— ফাকিং শিট! হোয়াট ফাকিং মেস ইয়ার!
পাবলিক এসব বলবেই। বলুক। চলৎশক্তিহীন ব্যাটারি বাসের কাছে ক্যালানের মতো দাঁড়িয়ে এইসব অসাধু মন্তব্য শুনে গেলে আমাদের চলবে না। মড়া যাদের ঘাড়ে তারা এগিয়ে যাবেই। যেমন আমরা।
সি. এম-এর আগেই কমরেড আচার্যকে বলেছিলেন যে আলোচনায় তিনিও যেন থাকেন। কিন্তু কমরেড আচার্য গাঁইগুঁই করছিলেন।
— ও স্যর, ক্লাস এনিমিদের সঙ্গে কেন আমায় ডাকেন আপনি। ওই সব ন্যাওটা ফ্যাওটা … জানেনই তো। আমার অলমোস্ট অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন হয়।
— থামবে? ন্যাওটা কি গলদা চিংড়ি না ডিম যে তোমার অ্যালার্জি হবে। সব ব্যাপারে তোমার ওই অর্থোডক্সি। এই করেই গেলে। কাল তুমি আলোচনায় থাকবে। আমার তোমাকে দরকার।
— ওবেলা তো আপনার সঙ্গে দেখা হবে। তখনই ফাইনাল করা যাবে।
— ওবেলা তোমার সঙ্গে আমি দেখা করব মানে? সে আবার কী?
— আহা, ও বেলা তো আপনি নাট্যোৎসব ইনগুরেট করছেন।
— হোয়াট!
— নাট্যোৎসব। ড্রামা ফেস্টিভাল।
— ও হ্যাঁ, কিছুই মনে থাকে না আজকাল। নাটক-ফাটক কেন যে এসব ননসেন্স ব্যাপারে আমাকে জড়াও।
— তা বললে কী করে হয়।
— দ্যাখো। তোমাদের ওই এখনকার ওসব দেখলে গা জ্বলে যায়। যে সব পারফরমেন্স দেখেছি … ওফ। গিলগুডের হ্যামলেট। বুঝলে? তারপর গিয়ে অলিভিয়ার। এরপর ওই স্টুপিডিটি — ইনটলারবেল। আমি যাব। ফিতে কাটব। ব্যাস …
— আজ্ঞে ফিতে কাটা নয়, প্রদীপ জ্বালাবেন।
— ওই হল, অল দা সেম। তারপরেই আমি আর নেই। নট পসিবল।
দমাস করে রিসিভারটা রেখে দিলেন সি. এম। কমরেড আচার্যও বুঝলেন যে কোনোভাবেই আগামী কালের মিটিংটায় গরহাজির থাকা চলবে না। কোথায় পরিত্রাণ? কমরেড আচার্য দেওয়ালে কমরেড লেনিনের দিকে তাকালেন। লেনিনের ছবির পেছন থেকে ছোট সাইজের একটি টিকটিকি দেয়াল বেয়ে দৌড়তে থাকল এবং জায়েন্ট টিকিটিকি তাকে তাড়া করতে লাগল। কমরেড আচার্য স্বগতোক্তি করলেন,
— ডিসকভারি চ্যানেল। একেবারে ডিসকভারি চ্যানেল? মার্ভেলাস।
রাইটার্সের তলায় যে কনস্টেবলরা থাকে তার মধ্যে একমাত্র নক্ষত্রনাথ হাওলাদারই লক্ষ করেছিল যে , ফুলের তোড়া হাতে যে শিল্পপতিরা বিচক্ষণ ও ভারালো পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে তাদের চোখ স্বাভাবিক নয়। প্রত্যেকেরই দুটি করে চোখ যা দেখছে তা দেখছে না, যা দেখা যায় না বা যাবে না সেদিকেই নিবদ্ধ। হাওলাদার তৎক্ষণাৎ এই সিদ্ধান্তে পোঁছে গেল যে দিনের আলো ফুটল কি না ফুটল অমনি শুরু হল চুক চুক বিজনেস। হাওলাদারের সঙ্গে অধিকাংশ ঐতিহাসিকরাই একমত নন। তাঁদের মতে সেইদিন সকালে বাংলার শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা যে যে লিকুইড খেয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল ত্রিফলা ডোবানো জল, চা, কফি, হরলিক্স, নিম্বু-পানি ও অ্যাপল জুস। ঐতিহাসিকরা হয়তো ঠিক কিন্তু আমাদের বিকৃত সহানুভূতি বারবার হাওলাদারের দিকেই হেলে পড়ছে। বাঙালির সত্যানুসন্ধান এইভাবে ইতিহাসেও বারবার কার্ণিক খেয়ে গোঁত্তা মেরেছে। সবকিছু আমাদের হাতে নয়।
সি. এম-এর ঘরে সি. এম তো থাকবেনই, এছাড়া ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব, কমরেড আচার্য, অর্থমন্ত্রী, শ্রমিক দপ্তরের মন্ত্রী এবং মৎস ও মুরগির মন্ত্রী যাঁর সঙ্গে কমরেড আচার্যের সম্পর্ক মোটে ই সাবলীল নয়। আই. জি আউট অফ স্টেশন। অ্যান্টি টেররিস্ট ব্যবস্থা স্টাডি করার জন্যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে। অতএব সি. এম আই. জি-র পরের অফিসারদের বাইপাস করে ‘নগরপাল জোয়ারদারকে ডাকা করিয়ে নিয়েছেন। জোয়ারদারের মাথায় হেলমেট কারণ তা না হলে বিচ্ছিন্ন মাথাটি বৃন্তচ্যুত বাতাবি লেবুর মতো ধপ করে পড়ে ভীতিজনক বাতাবরণের সৃষ্টি করতেই পারে।
মি. বিলিমোরিয়া লাল গোলাপের তোড়া আলতো করে সি. এম-কে এগিয়ে দিলেন কারণ তলায় মোড়া রাংতা ফুঁড়ে কাঁটা বেরোচ্ছিল। জীবনে বহু গোলাপের তোড়া নিয়েছেন সি. এম। নিতে হবে ভাবলেই গা জ্বলে যায়, কিন্তু উপায় নেই। সেই হাসি তাঁর মুখে যা অতীতে কখনও হাসা আরম্ভ হয়েছিল এবং মাঝে মাঝে ফিরে আসে। এবারে তোড়া-দান সারলেন মি. ন্যাওটা। তারপর সেন বরাট। পরপর সবাই তোড়া ধরবেন বলেই প্ল্যান ছিল কিন্তু পেছন থেকে জুট ব্যারন মি. ঢোলোকিয়ার বাজখাঁই কন্ঠ ফেটে পড়ল,
— ওসব ফুল খেলা করিবার দিন আজ নয়, কবুল করুন যে মিলিট্যান্ট ওয়ার্কারদের উপর দমদম বুলেট ফায়ারিং হোবে — দনাদ্দন, দনাদ্দন একটা লাশ পড়ল — ধপ — আউর ভি এক ধড়াস — লাশ — ফায়ারিং — দনাদ্দন — দনাদ্দন …
সি. এম বিস্মিত এবং হতবাক। জোয়ারদারের মুখ ফ্যাকাশে। কমরেড আচার্য গজরে উঠলেন,
— নো পাসারান, শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনের ওপরে ফায়ারিং, এবং সেটাও দমদম বুলেট দিয়ে, আপনি কোথায় কাদের সঙ্গে কথা বলছেন জানেন মি. ঢোলেকিয়া?
মি. ঢোলেকিয়ার মুখে স্বর্গীয় হাসি। র সিল্কের সাফারি সুটটিও যেন হাসির রঙে মাতোয়ারা।
— প্রপার্টি কি সমঝেন? প্রপার্টি হইলো থেফট। লেবর পাওয়ার হইল একটি পণ্য। ইহা মজুরীভোগী শ্রমিক ক্যাপিটালকে বিক্রয় করে। কেন করে? বাঁচিবার জন্য। তাহাকে আপনারা কতদিন বঞ্চিত করিবেন, কতদিন দাবাইবেন? জালিমশাহী নেহি চলেগা …
সমস্বরে অন্য পুঁজিপতিরাও হুঙ্কার ছাড়িলেন,
— নেহি চলেগা। নেহি চলেগা।
— তানাশাহী নেহি চলেগা!
— নেহি চলেগা। নেহি চলেগা।
অর্থমন্ত্রী উচ্চশিক্ষিত। মান্য ভাষা বাদে কিছুই তাঁর মুখে আসে না। সেই তিনিই বলিয়া ফেলিলেন,
— লে হালুয়া!
সি. এম বলেছিলেন,
— এসব জিনিস কী হচ্ছে আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
কমরেড আচার্য উসকোখুসকো চুল ঠিকঠাক করতে করতে বললেন,
— ভেরি ষ্ট্রেঞ্জ! উইয়ার্ড! বিজার!
মি. বিলিমারিয়া সোবার কন্ঠে বলিলেন,
– অহ, মি. ঢোলোকিয়া, যা বলতে চান লজিক্যালি বলুন, শান্তভাবে বলুন, ভুলবেন না যে উই হ্যাভ গ্রেভ সোশাল রেসপনসিবিলিটি।
মি. ঢোলোকিয়া আড়চোখে মি.বিলিমোরিয়াকে দেখতে দেখতে হিস হিস করে উঠলেন।
– ব্লাডি ক্যাপিটালিস্ট পিগ!
সি.এম প্রায় বাধ্য হয়ে বলে উঠেছিলেন
— আহ, মি. বিলিমোরিয়া, আলোচনা এগোক।
বিলিমোরিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল মহলে টি-ম্যাগনেট বলে সর্বজনবিদিত।
— দার্জিলিং অ্যান্ড সারাউন্ডিং থেকে যে রিপোর্ট আমি ডেলি পাচ্ছি স্যর তা খুবই অ্যালারমিং। ওয়ার্কাররা ইমপোর্ডেড সব মেশিন, যেমন ধরুন ড্রাইং মেশিন সব ড্যামেজ করছে। ম্যানেজারদের কোনো ভয়েস নেই। প্রোডাকশন লেভেলে এত বেশি ডিসরাপশন নিয়ে কোন সাহসে আমরা বিগ এক্সপোর্ট অর্ডারগুলো অ্যাকসেপ্ট করব বলতে পারেন?
মৎস্য ও মুরগির দপ্তরের মন্ত্রীটির বয়স কম। ফড় ফড় করে বলে ওঠেন —
— রাশিয়ানরা এখনও আপনাদের চা কিনছে? কাউন্টার রেভলিউশনের পর?
— কিনছে কিছু কিছু তবে আগের মতো নয়।
সি. এম ছোকরা মন্ত্রীটির ওস্তাদি মোটেই রেলিশ করেননি।
— রাশিয়ানরা চা খেল কি না খেল উই কেয়ার আ ফিগ। ইরেলেভেনট কথা কেন যে বলো? মি. বিলিমোরিয়া, আপনি বলে যান…
– বলছি স্যার, কিন্তু তার আগে আপনার ফিশ অ্যান চিকেন মিনিস্টারকে একটু এডুকেট করা দরকার। খুব তো রাশিয়ায় কাউন্টার রেভলিউশন মারাচ্ছো। রাশিয়ান রেভলিউশনারি স্ট্রাগেলের হিস্ট্রি জানো?
— জানি বলেই তো শুনতে পাই।
— একটি থাবড়া মারব টি-ব্যাগের মধ্যে ঢুকে যাবে। ক্যাপিটালিজমের ডেঞ্জার ইন রাশিয়া কে প্রথম বুঝেছিল বলতে পারবে?
— লেনিন।
— ১৮৭৪ সালে লেনিন? চার বছরের বাচ্চা ছেলে। এই ডেঞ্জারটাকে হেরজেন বা বাকুনিন তেমন আমল দেয়নি। প্রথম এটা বুঝেছিল ৎকাচেভ — নাম জানো? জানো না। তাঁর চটজলদি বিপ্লবের আহ্বান নিয়ে এঙ্গেলস-এর সঙ্গে ডিবেট পড়েছ? ওই ৎকাচেভ-এর সঙ্গে প্লেখানভকেও তর্কযুদ্ধে নামতে হয়েছিল। কিন্তু যার যা ডিউ তাকে তো সেটা দিতে হবেই। দ্যাখো ছোকরা, ইতিহাস কিন্তু একটাই এবং সেটাই সত্যি। পড়ো, পড়ো, সব পড়ো। হাবভাব দেখে তো চ্যাংড়া ফক্কড় ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। যাইহোক, স্যার ফরোয়ার্ড মার্কেটস কমিশন যে ফিউচার্স ট্রেডিং করবে ভাবছে সে বিষয়ে … কয়েকজন শিল্পপতি চেঁচিয়ে উঠলেন,
— কমরেড ট্রটস্কি লাল সেলাম। লং লিভ দা রেড আর্মি।
— মাং রহা হায় হিন্দুস্তান।
— লাল কিল্লা পর লাল নিশান।
মি. ন্যাওটা হঠাৎ বিকট চেঁচিয়ে গান ধরলেন,
— কালি কালি আঁখে
গোরে গোরে গাল …
সি. এম চেঁচিয়ে উঠলেন,
— রোগস! স্টপ ইট। স্টপ! ফোর্স বুলাও।
জোয়ারদার, স্টুপিডের মতো দাঁড়িয়ে কী দেখছ? ফোর্স ডাকো। নিয়ে যাক এগুলোকে।
তখন সেন-বরাট ভরাট গলায় চেঁচাচ্ছেন,
— দুনিয়ার পুঁজিপতি এক হও!
— এক হও! এক হও!
— শিল্পে সরকারি খবরদারি চলবে না!
— চলবে না! চলবে না!
— পুঁজিপতিদের কালো হাত!
— ভেঙে দাও! গুঁড়িয়ে দাও!
