কাঙাল মালসাট – ১৭
১৭
পাঠকপ্রবর, আজ অবধি কখনো শুনিয়াছ যে নভেল বলিয়া বাজারে যাহা চলে তাহা লঘু ত্রিপদী ছন্দে গান গাহিতেছে। ধরা যাউক যে ‘কাঙাল মালসাট’ একটি বালবিধবা হিন্দু যুবতী। আরো ধরা যাউক যে সারাদিন ধরিয়াই টপটপ আঁখিজলে বক্ষদেশ ভাসাইয়া সে বিকাল সন্ধ্যার সন্ধিলগ্নের সেই যাদুমন্ডিত জিন, হুরি, গবলিন ইত্যাদির জাগরকালে গান ধরিয়াছে,
জানিনা লো দিদি, কোন দোষে বিধি,
এই কুলাঙ্গার কূলে।
মোরে পাঠাইয়া, রাখিল গাঁথিয়া,
বিরহ বিশাল শূলে।
এইমত ট্র্যাজিক অবস্থায় আসিয়া পড়িল ‘কাঙাল মালসাট’। তাহাকে সাহারা দিবার কেহই নাই। থাকিলে সে এই গান না গাহিয়া হয়তো গাহিয়া উঠিত, ‘মেরি নাম চিন চিনচু’ বা ‘হাওয়ামে উড়তা যায়ে’… কিন্তু উপায় কই? তাই সে কোনো ধর্মান্ধ রাম-খচড়া রচিত ‘বিধবা-গঞ্জনা’ নামক ‘বিষাদ-ভান্ডার’ হইতে ওই গানটাই কাঁদিয়া উঠিল। সরলা ও তরঙ্গিনী নামধারী দুই বিধবার বিলাপ ওই দুষ্প্রাপ্য ভান্ডারের পত্রে ছত্রে কান্না হইয়া ঝরিতেছে।’ তপস্বী ও তরঙ্গিনী’-র সহিত এর কোনো যোগবিয়োগ নাই। যেমন নাই আনন্দবাজার পত্রিকার সহিত ওই পত্রিকাতেই প্রকাশিত যাদুকর আনন্দ-র বিজ্ঞাপনের যার মাধ্যমে তিনি ”বেঁটে মানুষ” চাহিয়াছিলেন। তবে আমাদের বিচারবুদ্ধি আর কতটুকু গা? এই জগতের ধন্দময়তায় দিশেহারা আমরা ভাবিতেছি যে বাজার সরকার, রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, কোম্পানির সরকার — ইহারাই সর্বেসর্বা। ইহারাই গোদা। কিন্তু ইহাদেরও ওপরে অপারেট করিতেছে অন্য কোনো সরকার। তাহার কেচ্ছা শুরু করা হয়তো যায় কিন্তু শেষ করা যায় না। জাহাজের খবর। সে জাহাজই বা কেমন? জলজাহাজও নয় আবার উড়োজাহাজও নয়। তবে?
সি.এম-এর নির্দেশমতো ফোর্স এসেই বিশিষ্ট শিল্পপতিদের নিয়ে যায়। বলাই বাহুল্য যে এঁদের মতো মান্য ব্যক্তিদের লালবাজারের লক-আপে নিয়ে গিয়ে আড়ং ধোলাই দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সি.এম-এর বিচক্ষণ নেতৃত্বেই যা করার তা করা হয়। সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় রায়চকের হোটেল র্যাডিসন ফোর্টে। সেখানে এঁদের প্রথমে টপ টু বটম পরীক্ষা করেন স্বনামধন্য ডঃ ক্ষেত্রী। তিনি বললেন যে প্রত্যেকেই নরম্যাল। নরম্যাল পালস, নরম্যাল প্রেসার, নরম্যাল স্টুল, নরম্যাল ইউরিন। হতে পারে পাগলছাগল। কিন্তু সেটা ধরা ডঃ ক্ষেত্রীর আওতায় নয়। এরপর এলেন বাংগুর ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল। সঙ্গে চারজন বিশিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, তাঁদের সঙ্গে নানাবিধ জটিল যন্ত্র। এলেন লাই ডিটেক্টর নিয়ে একজন মারাকু। এঁদের বাঁধভাঙা পরিশ্রমই এনে দিল সেই সাফল্য যার ফলে রহস্যের চাবিকাঠি ঘুরল বটে কিন্তু যা জানা গেল তা অতীব ভীতিজনক। সেই বিশাল রিপোর্ট পড়ে কারও পক্ষেই শেষ করা সম্ভব নয়। তাই ছোটো করেই মালটা সাইজ করতে হবে। সি.এম-ও এই মর্মেই খিঁচিয়ে উঠেছিলেন,
— নো বিটিং অ্যাবাউট দা বুশ, নো ঝোপঝাড়, মোদ্দা ব্যাপারটা কী?
রিপোর্টের সারাৎসার হল, কোনো অজানা পদ্ধতিতে এক রাতের মধ্যেই এঁদের প্রত্যেকের মাথায় লোবোটমি করা হয়েছে এবং শুধু তাই নয় — এঁদের মাথায় যা থাকার কথা নয় সেইসব নানাধরনের র্যাডিকাল চিন্তা ও তথ্য, সাজেশন বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এঁরা প্রত্যেককে দেখতে এক পিস করে হলেও এঁদের মধ্যে দুটি করে শিবির সক্রিয়। একটি ক্যাপিটালিস্ট, অন্যটি বিপ্লবী বা ওই গোছেরই কিছু একটা — মার্কসবাদী, স্তালিনপন্থী, নৈরাজ্যবাদী বা অ্যানার্কো সিন্ডিকালিস্ট, ট্রটস্কিপন্থী বা বার্নস্টাইন মার্কা, দুবচেক-ঘেঁষা, টিটোপন্থী, মাওবাদী — নানা ধারাই রয়েছে।
কিন্তু লোবোটমি ব্যাপারটা কী?
মস্তিষ্কের মধ্যে অস্ত্রোপচার করে দুভাগে ভাগ করা দেওয়াই হল লোবোটমি বা লিউকেটমি। এঁদের করা হয়েছে প্রি-ফ্রন্টাল লোবোটমি। মস্তিষ্কের সামনের অংশগুলির নিজেদের মধ্যে ও তাদের সঙ্গে থ্যালামাসের যোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। চার-এর দশক ও পাঁচ-এর দশকের গোড়ায় ক্রিমিনালদের ঠান্ডা করার জন্য এই জাতীয় বিস্তর অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল মার্কিন দেশে। এখন প্রায় হয় না বললেই চলে কারণ অনেক জবরদস্ত ওষুধ বেরিয়েছে। এ বিষয়ে ডব্লিউ.এল. জোন্সের ‘মিনিস্টারিং টু মাইন্ডস ডিজিজড’ (১৯৮৩) বইটিতে সব তথ্য দেওয়া আছে। এই বইটিতে যদি না মেটে সাধ তাহলে ‘স্লিট ব্রেন রিসার্চ’ সম্বন্ধে স্পেরি ও অর্নস্টেইন-এর কর্মকৃতিত্ব ঘাঁটা যেতে পারে। এঁরাই দেখেছিলেন যে এই অস্ত্রোপচার হয়েছে এমন এক স্বামীর আজব কারবার। ডানহাত দিয়ে তিনি বউকে কাছে টানছেন এবং বাঁ হাত দিয়ে দূর করে দেবার চেষ্টা করছেন। এটা অবশ্য মানতেই হবে যে লোবোটমি করা হয়নি এরকম বহু বাঙালিই অনুরূপ দ্বান্দ্বিক আচরণ করে থাকে। মিনসেদের এ জাতীয় খেলকুঁদ আজকাল আবার দার্শনিক তাৎপর্যও পায়। সবই নাকি গূঢ়তম কারণে ঘটে। সবই নাকি গভীর অসুখ। টোপাকুলের ডাল দিয়ে বেধড়ক চাবকালেই কিন্তু সবটা না হলেও অনেকটা ঢ্যামনাগিরি হাওয়া হয়ে যাবে।
যাহাই হউক, পাঠকের কী স্মরণে আছে যে পনেরো না ষোলো অধ্যায়ের অন্তে কী ঘটিয়াছিল। কোট করা যাউক — ‘ … ভদির চাকতির ঘরের দরজা সশব্দে খুলিয়া গেল এবং পূর্বে যেমনটি আমরা দেখিয়াছিলাম তেমন নয়, অজস্র অতি সূক্ষ্ম ও প্রায় স্বচ্ছ চাকতি বোঁ বোঁ শব্দ করিতে করিতে বাহির হইয়া আকাশে উড়িয়া গেল।’ এবার কি আঁচ করা যাচ্ছে যে অতীব চুলচেরা লোবোটমি কাদের কাজ? এবারে কি বোঝা যায় যে গত পক্কড়ে গোলাপ ‘সফল অপারেশন লোবোটমি’ বলে কী বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। এর আগে আমরা বড় সাইজের চাকতিকে অক্লেশে ও বিনা রক্তপাতে মুণ্ডু, হাত, পা সবই আলাদা করতে দেখেছি। এবারে দেখা গেল ব্রেন অপারেশনের মতো ঝকমারি কাজও অধিকতর ফাইন চাকতি দিয়ে করা যায়। আরও ফাইন চাকতি হয় যা অদৃশ্য ও শব্দহীন। এরা স্বপ্নজগতের নানাবিধ কাটাছেঁড়া করে এমন কোলাজ বানাতে পারে যার সঙ্গে তুলনীয় কিছুই হতে পারে না। সর্ববিধ ছেদন ও বিভাজনে চাকতিদের অনায়াস দক্ষতা বিস্ময়কেও ছাপিয়ে ওঠে। আধুনিক জীবনধারার একটি গুরুতর বৈশিষ্ট্য হল চড়া আলোয় বসে কৃত্রিম উত্তাপের ওম প্রথম ও শেষ আয়ত্ত বলে মনে করা। কফিনের মড়া যেমন ওই বাক্সটিকেই তার বিশ্রাম কক্ষ ও শেষ বাস্তবতা জেনে আরামে শয়নে থাকে। নিজের পচনও তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু কাঠ পচে মাটিতে মিশছে, মাটি ছড়িয়ে রয়েছে জলে ও পাথরে, তার ওপরে নিরন্তর আছড়ে পড়ছে মহাজাগতিক রশ্মি ও এইসব নিয়ে এক আনন্দপৃক্ত সার্কাস, তার এই ধরা এই ছেড়ে দেওয়া ট্রাপিজ, এরই মধ্যে কোথাও কোথাও ক্লাউনের পোশাক পরে প্রতীক্ষায় থাকা লেখকদের আত্মা, ডিক্টেটারদের লৌহ-ভূত, নর্তকীদের সলাস্য ঘুরপাক ও নিবিষ্ট পোকাদের স্তম্ভিত গম্ভীর প্রেতজীবনে প্রবেশ ও প্রস্থান — এ কি এক আশ্চর্য প্রদত্ত নয়? এরই মধ্যে কী সেই সম্ভাবনা নেই যাকে আমরা এখনো শব্দে প্রকাশ করতে অপারগ? পণ্ডিত বা বিদগ্ধ বলে কিছুই নেই। আছে বিভিন্ন মাপের বোকা ও তারও বেশি বেশি কিছু।
এরই মধ্যে ভদির ভর হল। একদিকে রাজ্য সরকারের যুদ্ধ প্রস্তুতি, গুমটিতে গুমটিতে সাজো সাজো রব, জি. ও. সি-ইন সি, ইস্টার্ন কম্যান্ডের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব ও অপরপক্ষে সরখেলের কালান্তক গর্ত খোঁড়া, ফ্যাতাড়ুদের টুকটাক খুচরো হারামিপনা, বেগম জনসনের সঙ্গে বৃদ্ধ দাঁড়কাকের বুড়ো বয়সের রোমান্সজাতীয় কিছু আলগা হুঁ হুঁ, ভদি-ভক্তদের ক্রমবর্ধমান উদ্দীপনা, গোলাপের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, কলকাতার সি. আই. এ, এম. আই ফাইভ, আই. এস. আই ও এফ. এস. ভি দপ্তরে ধোঁয়া ধোঁয়া আকাঙ্খা — এই দুই বিপরীত ও আনুষঙ্গিক থার্ড পার্টি নড়নচড়নের মধ্যেই ভদির ভর হল।
ন্যাংটো ভদি তার একতলার ছাদে, আলশের ধারে দাঁড়িয়ে ভুঁড়ি চাপড়াতে চাপড়াতে নানারকম ভালগারিটির বন্যা বইয়ে দিতে লাগল যার মধ্যে অবশ্য কিছু অন্য কথাও ছিল। আমরা তার অসংলগ্ন ও অকথ্য সংলাপের মধ্যে যেটুকুমাত্র মান্য ও শালীন বলে ছাড় পত্র পেতে পারে সেগুলোই বরং জেনে নেব কারণ আধুনিক নভেলের একটি নভেলটি হল নানা তথ্যের একটি ঘাপলা তৈরি করা যার মধ্যে অধিকাংশই হল ফালতু গ্যাঁজা। অনেক সময় আবার তথ্যের বদলে এমনই একটি দার্শনিক দার্শনিকভাব করে নন-স্টপ গ্যাঁজানো চলতে থাকে যে এই ভাটানোকে মহামূল্যবান মনে করে অনেকেই বমকে যায়। ‘কাঙাল মালসাট’ দু নৌকোতেই ঠ্যাং নাচাবে। ভাগ্যে যার সলিল-সমাধি সে অন্যরকমই বা করতে যাবে কেন?
ভদি ভরের বশে বলেছিল,
১) ঐ কর … দিন নেই, রাত নেই টিভির বাক্স খুলে মানষির পালের গাঁড়দুলুনি নাচ দ্যাখ … হবিষ্যিও হবে না, মালসাও কেউ জলচুবুনি করবে না … গাঁড় দুলচে … আহারে আমার বাঙালির ঠাকুর্দার ঝাড় দুলচে … গেল, রোল-মুরগি গেল আর ঐ দ্যাখ … থেকে থেকে হাওয়া খেলিয়ে নে, ফ্যান ছেড়ে হাওয়া খেলা, পেন্ডুল দুলচে … ওরে আমার রাসবাড়ির ঝুলন রে, ওমা, গোপালের মুখ আমার গরম দুধে পুড়ে লাল, হোল রেস, হোল রেস, হোল! হোল!…
২) খলখলে করে দেবে গো, গরিবগুলোর গাঁড় মেরে একেবারে খলখলে করে দেবে, হাওদা করে দেবে .. গরিবদের ওই ঠাটবাট সহ্য হচ্ছে না, গরিব যে আমার বেড়ালমামারে … এদিক ওদিক দুদিক চেয়ে চুমুক মারো দুধের বাটি… গওরমেন্ট দেখেচে গরিবের গাঁড়ে মধুর চাক… একেবারে ভূতোমোল্লার খাল করে ছেড়ে দেবে … সব আস্তানা দেদূর করে দেবে, চোলাই-এর ভাঁড়, পাতিল সব লেথিয়ে ঝেঁটাবে, রেকটোলিকার … রেকটোলিকার …রাতবিরেতে ভিডিও-ভাড়া…রেকটো কিলার … রেকটোকিলার …
৩) অ ঠুঁটো ঠুঁটো! ঘর খালি করে ঠুঁটো গেলি কোতায়?
ঠুঁটো হেঁকে বলে — গুন্ডিচা বাড়ি গো, আমি এখন গুন্ডিচা বাড়ি।
হালুয়াভোগ! হালুয়াভোগ! গবগবিয়ে ঘবঘবিয়ে হালুয়াভোগ! হালুয়াভোগ!
চার আনা পউয়া। চার আনা পউয়া। হালুয়াভোগ; হালুয়াভোগ!
৪) অ বাঁজা বউ! বাঁজা ব..উ! তোর কোল ভরবে কে? ফটকেরাজা। ফটকেরাজা কে? ফটকেরাজা হল ভুক্কাড়। ফটকেরাজা কী খায়? খই-মুড়কি আর লাইনকলের জল। লাইনকলের জলে কেমন ভাত হয়? সাদা, সাদা, ডাগরডোগর। ফটকেরাজাকে মোহর দেবে কে? ভদি দেবে। ভদির বাঁজা বউ কী দেবে গো ফটকেরাজাকে? ভদির বাঁজা বউ মাই দেবে। ফটকেরাজার নুনুর ওপরে কালো কার দিয়ে ভুঁড়ি জড়িয়ে ওটা কী বাঁধা? ফুটোপয়সা। কী বাঁধা? আরে, এ যে দেকি কানফুটো মোহর? অ্যাঁ, ফটকেরাজা মোহরধারী? হ্যাঁ। আর কী? ভদির বাঁজা বউয়ের বুকে ও দুটো কী গা? মাদার ডেয়ারির টোনাদুধের প্যাকেট! ধর শালা নলেনব্যাটাকে ধর। ধর … ধর… নলেনগুয়োকে ধর। কী হে বাবা হাঁড়িকচ্ছপ! ঘপৎ ঘপৎ করতেছো ক্যানো গো! বাবা হাঁড়িকচ্ছপ! যাঃ শালা! ফটকেরাজা মুতে দিল!
ভদির বাবা বুড়ো দাঁড়কাক বেশ কিছুক্ষণ ভদির এই দাপাদাপি দেখে কলতলায় বসে লাইনকলের জলে ভালো করে ডানা ধুয়ে ঝটরপটর করে চান করল, করে বলল
— বউমা, ব্রহ্মতালুতে একটু তেল দিয়ে দাও তো আমার। বেগম জনসন সোহাগ করে এমন ঘেঁটে দিল যে রোঁয়া সব খাড়া খাড়া হয়ে গেচে। সিঁথেটা কোথায় ঠাওর হচ্ছে না। তেল দিয়ে আলতো করে আঁচড়ে দাও। তোমার হাতে যা জোর। নলেন উবু হয়ে বসে টগরগাছতলায় খুঁজে খুঁজে, টিপে টিপে একটা একটা করে পিঁপড়ে মারছিল আর ন্যাংটো ভদি বার বার ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে আর নামছে যেন দম দেওয়া জাম্বুবান। বেচামণি দণ্ডবায়সের মাথায় রোঁয়া আঁচড়াইয়া দিতে লাগিল।
— খুব আরাম হচ্ছে। কতদিন তেলজল পড়েনি।
— বাবা, একটা কতা বলি?
— বলো বউমা।
— এই ভদির মাতায় ওটা কী ভূত চেপেছে?
— ও কিচু নয়, নেশু। কাল ছেড়ে যাবে।
— নেশু। এ ভূতের নাম তো এ বাড়িতে পা দেওয়া থেকে শুনিনি।
— কতা ওঠেনি। ও একটা বুড়ো ছিল। খুব খচ্চর। কালো ঠুলি পরত। সকাল থেকে নেশাভাঙ করত। সেই থেকে নাম হয়েছিল নেশু। তবে হ্যাঁ, ঘোড়ার খোঁজপত্তরের জন্যে লোকে আসত বলে ওর কাচে। বলত নেশু হচ্ছে রেসের ধন্বন্তরি। যে ঘোড়ার নাম বলবে টিপ লেগে যাবে। জ্যাকপট, কুইনালা, ট্রিপল টোট, প্লেসিং — কত লোককে জিতিয়ে ক্যাপ্টেন করে দিল। আর কিসের বদলে? দুটো পুরিয়া বা একটা বড় বোতল। নেশুর নামডাক যেমন ছিল তেমন আবার বদনাম, ওর ছেলেবয়েসের কেচ্চার জন্যে। ঝি বিয়ে করেছিল। বুকের পাটাও ছিল — আজ কতাটা লোকের মুকে মুকে ফেরে কিন্তু প্রথম বলেছিল নেশু — নিন্দে যখন রটেইচে তখন বিয়েই করব। এই সময়টা ওর একটু ভরের বাসনা হয়। তবে আধার কোতায় যে ভরবে? ভদিকে দিয়ে যা বোল বলাচ্চে তার মধ্যে কিন্তু এমন কতাও থাকবে জানবে তা তেরাত্তিরে না হলেও ফলবে ঠিক।
— কী হবে না হবে আপনি তো বাবা সবই জানেন।
— তা জানি। কিন্তু বলার উপায় যে নেই বউমা।
নলেন খচড়ার ডিম। দাঁড়কাককে খচানোর জন্যে আপন মনে বলে উঠল,
-ওফ জ্ঞানীগুণী সব হেগেমুতে দিল আর দাঁড়কাক হল ব্রহ্মজ্ঞানী!
— তোর মতো চোদনাবুলি না কপচালে ঘোর কলিটা জমবে কেমন করে। বুঝবি, টাইমে সব বুঝবি। তকন মামা বলে চ্যাঁচালেও কেউ আসবে না।
নলেন কম ঘোড়েল নয়।
— তুমি থাকতে মামাকে ডাকতে যাব। তোমাকে ডাকব। পারবে না এসে থাকতে।
উত্তরে দাঁড়কাকের মুখে সেই হাসির স্মিতরূপই ফুটে উঠল যা আমাদের বরাভয় সাপ্লাই দিয়ে চলেছে। প্রায়শই ফটো থেকে যদিও। দুনিয়া জুড়ে দুমদাড়াক্কা চলেছে। কিন্তু বাঙালি জীবন নির্বিকার। কারণ সে জানে যে তার বাড়িতে সর্ববিপদ রক্ষার জন্যে ফটো রয়েছে। এবং আগামীকাল সকালে আনন্দবাজার বেরোবেই। এই কেলো যে কতদিন চলবে তা বলার ক্ষমতা কোনো সুপার কম্পিউটারেরও নেই।
বড়িলাল বড়বাজারে গিয়ে পাঁচটা পাপি-হাউস (কুকুরছানা থাবা দিয়ে টেনে নেয়), তিনটে ডিম পাড়তে পাড়তে চলা হাঁস-পুতুলের ফ্যামিলি এবং একটি হেলিকপ্টার কিনে নিল যা সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে ঘোরানো যায়, পাখা চলে, আলো জ্বলে নেভে। এসব খেলনা সাপ্লাই হচ্ছে চীনেম্যান ল্যান্ড থেকে। খেলনা রপ্তানি বা পাচারের পেছনে ভারতীয় শিশুদের ‘ক্যাচ দেম ইয়ং’ পদ্ধতিতে কব্জা করার কোনো দূরভিসন্ধি আছে কিনা তা কেউ জানে না। কিন্তু বাঙালি যতই চীনেম্যান চ্যাংচুং মালাই কা ভ্যাট বলে আনন্দ পাক না কেন এটা কিন্তু প্রায় মান্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে চীনেম্যানরা হাসিমুখে কী ভাবছে তা বোঝা সহজ নয়। কাঠি দিয়ে তারা যে শুধু ভাতই খায় না তা সকলেই মুখে না বললেও টের পায়।
‘কাঙাল মালসাট’ যখন তার প্রাথমিক পাখসাট মারা শুরু করেছিল তখন প্রকাশ হয়ে পড়ে যে বড়িলালের নানাবিধ পোকা-পিঁপড়ে সম্বন্ধে এক জাতীয় ফোবিয়া রয়েছে। সেইমতোই সে মেঝেতে চারদিকে লক্ষ্মণরেখা দিয়ে দাগ কেটে মাঝখানে বিছানা করে ঘুমোচ্ছিল। চেতলা সাইড থেকে মৃদুমন্দ সেই বাতাস আসছিল যা বাঙালি দ্যাওরদের ঘুম কেড়ে নেয় ও ডোন্ট কেয়ার ভাব এনে দেয়। এতে বড়িলালের কিছু হবার কথা নয়। হয়ওনি। সে অকাতরে ঘুমোচ্ছিল এবং স্বপ্নলোকের ভারচুয়াল রিয়্যালিটিতে দেখছিল কালী ও তার সংসার-জীবন এতই গা-সওয়া হয়ে গেছে যে দুজনে কালীর ঘরের সামনের চাতালে উবু হয়ে বসে চাল বাচছে এবং রোদের তাড়া খেয়ে শুঁড়-ওলা পোকাগুলো তিড়তিড় করে পালাচ্ছে। বড়িলাল যখন বাজারে গিয়েছিল কালী তখন সেই ফাঁকে স্নানটান সেরে রেখেছে। এই কালী কখনোই খানকি ছিল না। চাতালেই বাঁশ পুঁতে, তাতে তার বেঁধে শুকোতে দেওয়া হয়েছে সদ্য ধোয়া বড়িলালের লাল ল্যাঙট। লাল ল্যাঙট, দে চাবি, চাবি না দিলে মার খাবি। এটি একটি দুরূহ ধাঁধা। পালোয়ানরা কেন যে নিজেদের মধ্যে অশালীন ইঙ্গিতবাহী এই ছড়া বলে অনাবিল আনন্দ পায় তা অজানাই থেকে গেল। দুজনেই চাল বাছা ছেড়ে গগনাভিমুখে তাকায়। দিনের ফটফটে আলোতেই ঘুড়ি-লন্টন উড়িয়েছে কারা। ওমা, ফানুসই বা ছাড়ল কে? তার মধ্যেই আবার উড়ন তুবড়ি টেস্টিং চলছে বলে ফিকে ধোঁয়ার দড়ি একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। আকাশ জোড়া এক আনন্দ। ঐ দ্যাখো মোমবাতি ঘুড়িতে কী লম্বা ল্যাজ। ঘুড়ি সুতো পেয়ে লাট মেরে এগোয় তো ল্যাজও মায়াবী রিবনের মতো খেলা দেখায়। এরমধ্যেই আবার পাশ কাটিয়ে উড়ছে কালো বক। এখান থেকে চিড়িয়াখানা আর কতটুকু আকাশ। কী সামান্যই এই ফুরসৎ। আকাশ দেখার।
কিন্তু সেই ফুরসতেই যা ঘটার ঘটল। ল্যাজের কাছে দপদপ করে লাল আলো জ্বলে উঠল। সাঁই সাঁই করে ঘুরতে লাগল ব্লেড। টয় হেলিকপ্টার ঘরে দুটো পাক মারল। তারপর জানালা দিয়ে বেরিয়ে বাইরে উড়ে গেল। সেই রাতেই জোড়া মার্ডার সাইট থেকে ফিরে টাকলা ও. সি দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে প্রোমোটারের দেওয়া ওল্ড স্মাগলার রাম পাঁইয়া হোটেলের টিকিয়া দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিল। ও. সি-র ঘরে নোংরা তার থেকে ঝুলছে আধকানা বাল্ব। টিউবটা অকেজো। সেই ঘরের জানলা দিয়ে ঢুকল হেলিকপ্টার। ঢুকেই বাল্বের পাশে ঘন হয়ে পাক মারতে শুরু করল বলে দেওয়ালে বিদঘুটে চলন্ত ছায়া দেখা গেল। ও. সি খচে গেল।
— মালটা একটু রিল্যাক্স করে খাব তা না বাঁড়া চামচিকের উৎপাত শুরু হল। ঝাড়তো, ওই ব্যাটনটা দিয়ে ঝাড়।
এর উত্তরে হেলিকপ্টার নেমে টেবিলের ওপরে ল্যান্ড করল। আলো জ্বলছে নিভছে। পাখা ঘুরছে। একজন কনস্টেবল হাত বাড়াচ্ছিল কিন্তু ও. সি চিল্লে উঠল,
— হাত সরা। রিমোটে চালাচ্ছে। যে কোনো মোমেন্টে ফাটতে পারে। আমি যেমন করব তোরাও করবি। সাট করে মেঝেতে শুয়ে পড়। ঘরবার উড়ে গেলেও লাইফটা বেঁচে যাবে। জয় বাবা …
ধাড়াম করে চেয়ার উল্টোয়। কনস্টেবলরা উপুড় হয়ে শুয়ে হাত দিয়ে মাথা ঢাকে। লাঠিচার্জের সময় ভুক্কাড়রা এরকমই করে। হেলিকপ্টার টেবিলের ওপরে গড়াচ্ছে। ঠাশ করে বোতল পড়ল। উড়ছে। ব্লেডে লেগে বাল্বটা ফাটল। সারা ঘরে অন্ধকার। বোঁ বোঁ শব্দ। শব্দ নেই। সারা ঘরে রামের গন্ধ। এক মিনিট কাটল। শব্দ নেই।
— মালটা বোধহয় উড়ে গেচে স্যার।
— সে তো আমারও মনে হচ্চে। কিন্তু ঘাপটি কেস নয় কে বলবে? আলোটাও নেই।
— আপনার ড্রয়ারে তো টর্চ আছে। বের করুন না স্যার।
— তাই করি। শালা, কী হ্যাপা মাইরি। ঘামিয়ে ছেড়ে দিল।
টর্চের আলোয় যা দেখা গেল তা এইরকম। হেলিকপ্টারের ধাক্কায় ওল্ড স্মাগলারের বোতল মায়ের ভোগে।
গেলাস উল্টে সব মাল ফাইলের কাগজফাগজ ভিজিয়ে জাব করে দিয়েছে। ছোট সাইজের একটা তছনছ করে হেলিকপ্টার ধাঁ।
— মালের পুঁটকিটা মেরে দিল। তবে ভাগ্য ভালো ফাটেনি। পিওর টেররিস্ট অ্যাটাক। একজন কনস্টেবল তড়িঘড়ি জানালা বন্ধ করে দেয়।
— ভালো করেচিস। কাল রিপোর্ট দিতে হবে লালবাজারে। আমরা কেন, গোটা থানাটাই বেঁচে গেল।
আরেকজন কনস্টেবল মোমবাতি জ্বালল।
— স্যার একটা কতা বলব?
— বল। ঢ্যামনামি করচিস কেন?
— বলছিলাম যে ভালো মালটা তো ভন্ডুল করে গেল। আমার স্টকে দুবোতল বাংলা আচে। আনব?
— অ্যাঁঃ বলিস কি? যা, যা, ঝটপট নিয়ে আয়। প্রাণটা বেঁচে গেল। এবার একটু আরামও পাবে। বাঁচালি মাইরি।
–আচ্ছা স্যার, ওইটুকু হেলিকপ্টার–ফাটলে কী হবে! বড়জোড় চকলেট টাইপের …
— ওরে মুখ্যু, বাঞ্চতরা আজকাল ওসব পেটো ফেটো ঝাড়ছে না। এইটুকু জেলি জেলি মাল। আর . ডি. এক্স.। সেমটেক্স। পুরো বাড়িটা ধসিয়ে দিয়ে চলে যাবে। দেখিস না, কাগজে দিচ্চে। দেখলি বাঁড়া ট্রানজিস্টার রেডিও। দিব্যি গান বাজচে। তুলেচো কি ফিনিশ। এই জানবি। আজ যা বাঁচা বেঁচে গেলুম তা আমিই জানি। বৌদির মুখটা আর দেখতে হত না।
এমন সময় ফোন বাজল।
— হ্যালো, হ্যাঁ, ও সি বলচি। অ্যাঁ সন্ধেবেলা দুটো লাশ পড়ল। তাতে মেটেনি? কী? এপার ওপার বোমচার্জ করচে। করুক না। এতে যদি কয়েকটা মরে। কি হবে? যাব, দু রাউন্ড ফায়ার করব, থেমে যাবে। তার থেকে চলুক না। না মরলেও তো চোটফোট লাগবে। না। না। এখন ফের গিয়ে গাঁড় মারামারি আর ভালো লাগে না। ও কাল দেখবখন। এদিকে যা কেস হয়ে গেল শুনলে ভিরমি খেয়ে যাবে। একদিকে টেররিস্ট অ্যাটাক অন্যদিকে গ্যাংফাইট — একলা আমাকে দিয়ে অত বাঁড়া হবে না। না, না, বডি এখানে রাখতে যাব কেন? পাঠিয়ে দিয়েচি। তোমার পাশে ওটা কে গ্যাঁও গ্যাঁও করচে। তাই বলো। এই হয়েচে এক বালের এফ. এম.। দিন নেই, রাত নেই, ঢ্যামনামি চলচে। হ্যাঁ, ছাড়ো। অনেক ভাটিয়েচো। কী করচি? একটা মালের মিটিং বানচাল হয়ে গেল। আরেকটা অ্যারেঞ্জ করচি। ছাড়লুম।
বড়িলাল তখন কোনো স্বপ্নই দেখছিল না। অসাড়ে কাদা হয়ে ঘুমোচ্ছিল। পুতুল হাঁসগুলো হঠাৎ দল বেঁধে প্যাঁক প্যাঁক করে ডেকে উঠল। দরজা খুলে বেরিয়ে কুকুরছানা একবার জোড়া থাবা দেখিয়ে ঢুকে গেল। জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকল হেলিকপ্টার। ঘরে একপাক উড়ে যেখানে রাখা ছিল অবিকল সেখানে গিয়ে ল্যান্ড করল।
