কাঙাল মালসাট – ১৮
১৮
এই ঘুঘুচক্করটি যে যুদ্ধের দিকে আগুয়ান বা নিন্দুকের মতে হাগুয়ান তা পাঠকরা বাদে সকলেই জানে। অর্থাৎ নানাবিধ পাখি, অমার্জিত মার্জার ও চাপাপড়া সারমেয়জগৎ – এখানেই শেষ নেই, শেষ কথা কার বাবা বলবে এখনো জানা যায়নি অতএব মাকড়দুনিয়া, মাইক্রোবমহল্লা ইত্যাদি নস্যপ্রায় অথচ নস্যাৎপ্রিয় নয়- তারাও রয়ে গেল। প্রবল বৃষ্টির আগে দেখা যায় কীটকলোনিতে অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য। মানুষ তখন কিছুই বোঝে না। কিন্তু পরে এমনভাবে সাজে যে তার মত বুঝদার কেউ নেই। এমতই হল হালের পাঠক। যে লেখা এখনো বাংলায় লেখা হয় (লেখক ইংরেজি জানে না বলেই) তা যদি ছোটবেলায় খেলে যাওয়া নুনু নুনু খেলার মতো সখসাধ্য না হয় তবে চেপে যাও। ওরে গান্ডু, সব লেখক বাঁধা মাসমাইনে, গায়ে গতরে শোধ হয়ে যাওয়া খুচরো হ্যান্ডবল, দুগগো পুজোয় মোটা ন্যাকড়ার পট্টি পয়দা বা লেখো বা না লেখো ফ্রি প্যাকেট (চব্বিশ পঁচিশ তারিখে তারিয়ে তারিয়ে একেবারে খোদ অ্যাকাউন্টেন্টের ঘর থেকে) না পেলেও রেকগনিশনের মাকে ট্রাম লাইনে ফেলে আটপয়সা সুদের তোয়াক্কা না করেও লেখে বা লেখার ভ্যানতাড়া করে। পাঠক চাঁদু, এগুলো বুঝবি কবে? সাহিত্য মড়া হলে তোদের হালকা করার জন্যে কামানো যেত। যেহেতু তোদের ওজন নেই, সিনা নেই, গ্রাভিটি নেই, আওকাৎ নেই তাই তোদের কামিয়ে পেডিগ্রীওলা রিয়্যাল অ্যাললেখকরা ব্লেড ভোঁতা করে না। ভারত ব্লেড/ইন্ডিয়া ব্লেড চকচক করবে। চুকলি চলবে। চাঁচাচাঁচি চলবে। আপাতত ওয়ার। ক্রস বর্ডার টেরো খিল্লি শেলিং শিলিং পাউন্ড ডলার – আঃ হোঃ, ওয়াহঃ, ভঁক, পুঁই, পঁক – পোঁ- লিঃ লিঃ
( )
নিমকি, নিমকিছেনালি, ছকবাহাদুর ছবিলাল, ওয়ে ওয়ে, ওয়ে ওয়ে আঃ
( > )
খুল্লামখুল্লা, ওফ ডার্লিং, বাসনওয়ালী
(< )
উঃ কী দিলি
( Δ)
পিরামিডের এক পিঠ বা একমাত্রিক
অধ্যাস
( = )
ভাংড়াপন + সালসা + লম্ভঝম্প
বা
KM
কিলোমিটার বা কোঁকড়া মালাই নয়
তাহলে কী?
লে বুড়ুয়া, ইয়ে হ্যায়
কাঙাল মালসাট
ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর। এই বলেই ডি. এসকে চমকাবে বলেই প্ন্যান করেছিল মদন বা পুরন্দর। তারপর কাজের কথা। কিন্তু উল্টে যে সিন তারা দেখল তা দেখলে পাবলিক সব চ্যানেলেরই পুড়কি উড়ে যাবে। ঘরের মধ্যে ডি. এস -এর বউ বাচ্চা খিলখিল হাসি সহযোগে উড়ছে এবং নেংটি পরা ডি. এস হাতের দশ আঙুলে দশটা হলদে কলকে ফুল পরে তাদের ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে তাড়া করছে। ডি. এস মুখেও দুটো কলকে ফুল ঢুকিয়েছে যাতে তাকে হলদে গজের দাঁতওয়ালা ড্র্যাকুলা বলেই মনে হচ্ছে। ডি. এস -এর ন্যাংটো ফ্যাতাডু বাচ্চা স্পেসে সাবলীল কসমোনটের মতো ভল্ট মারছে এবং এমন এমন অ্যাঙ্গেলে বাঁক নিচ্ছে যা দেখলে কোমানেচি জিমনাস্টিক ছেড়ে দিত। ডি. এস -এর মোটা, কালো কোলাব্যাঙ বউ নাইটি পরা এবং তার ওড়ার ধাঁচ অত সাহসী নয় কিন্তু যথেষ্ট খেলুড়ে – জলের গভীরে জব্বর কাতলারা যেমন হামেশাই করে থাকে। এবং এই দৃশ্যের সঙ্গেই চলেছে ডি. এস -এর ভৌতিক টিভি যাতে সবকিছুই চারটে করে দেখা যায়। তাতে তখন দেখা যাচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় চারজন সি. এম চারটি মাইক্রোফোনে একই কন্ঠস্বরে চলচ্চিত্র উৎসবের সভায় ভাষণ দিচ্ছেন। তার পাশে চার পিস করে একই বুড়ো ফিল্ম ডিরেক্টর, সেই হিরো কিন্তু এখন বুড়ো ভাম এবং প্রাক্তন এক ভ্যাম্প, যার সবই গেছে অবশ্য ট্যারা চোখে ধ্যাবড়া করে কাজল দেওয়ার কামশাস্ত্রীয় হ্যাবিটটি বাদে। কিছুক্ষণ ধরে এই খেলা স্টাডি করার পর মদন ঘ্যাঁক করে উঠল,
– থামবে? তুমি থামবে।
ডি. এস অমনি সুর করে বলল,
– নারে নারে না।
– না এইভাবে কেউ যদি ডিসিপ্লিন ভাঙতেই থাকে তাহলে আমি অন্তত ডিউটি করতে পারব না। আজই ভদিদাকে বলে দেব- যে পারে পারুক, আমাকে দিয়ে হবে না।
ডি. এস যা করে না বলেই সবাই জানে সেটাই করে দেখিয়ে দিল। চাপানের জবাবে উতোর।
-ওসব ভদিদা ফদিদা জানবে ডি. এস কেয়ার করে না। ভরদুপুরে পাঁটার মাথার ঘুগনি -ভাত মেরে ফ্যামিলি নিয়ে খেলা করচি তাতে ভদিদার কী? এখন খেলা জমে গেছে। থামানো যাবে না।
এতক্ষণ পুরন্দর ভাট কিছু না বলে মুচকি হাসি দিচ্ছিল। এবার চোখ বুজে ইনস্ট্যান্ট পোয়েমটি ছাড়ল।
– ঘরের বাহিরে শত্রু খাড়া
ঘরের ভিতরে গরিব বাঁড়া
করিয়া হেলা মারিছে খেলা
সহসা ঘাড়েতে নামিবে খাঁড়া
মেঘের আড়ালে উড়িছে বোমারু
যুদ্ধজাহাজ – নাম পোঙামারু
তবুও ডাকিয়া মেলে না সাড়া
ঘরে বাহিরে শত্রু খাড়া
– সাবাশ! ভাট, সাবাশ! এরকম জ্বালাময়ী কিছু পোয়েম শুনলে যদি এদের টনক নড়ে। ঘেন্না ধরিয়ে দিল।
– ঢের হয়েচে বাবা, ঘাট হয়েচে। খেলা বন্ধ করচি। ড্যাং ড্যাং করে তো এক্ষুনি ভদিদাকে নালিশ করতে যাবে। তোমার আবার যা নিন্দেকুটে স্বভাব।
ডি. এস. হাতের আঙুল থেকে কলকে ফুল খুলতে খুলতে এই কথাগুলো বলল।
– নেহাত বউ-বাচ্চা সামনে তাই বেঁচে গেলে। যা হোক গুলি মারো। মালমুল কিছু আচে স্টকে?
– বলব কেন?
– ফের ভ্যানতাড়া!
– আরে বাবা আচে। বের করচি। প্যাঁটরা থেকে হরিণের ছবি আঁকা গেলাসগুলো বের করোতো। গেস্ট বলে কথা।
– ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে বাংলুফাংলু নয়।
– ওসব গরিবগুর্বো খায়। এটা পিওর কানট্রি মেড ফরেন। অফিসারস চয়েস।
– ট্যাঁক বেশ গরম বলে মনে হচ্ছে।
– না, না। ট্যাঁক কোল্ড। এটা গিফট। আমার শালাকে তো চেনো। পুরন্দর বোধহয় চেনে না।
– জনাকে চিনব না কেন? এই ঘরেই কত পোগ্রাম হল।
– ও সরি। জনা ব্যাটা করেছে কি এই বাজারে একটা বাগানবাড়ির দালালি লড়িয়ে দিয়েচে।
– হয়েচে! বিক্রি?
– হবে। আগাম কথা সব পাকা। সেই থেকে বলচে, জামাইবাবু, ওসব বাংলুমাংলু আর নয়। লিভার ড্যামেজ অনেক হয়েচে। এবার আমি ইংলিশ, তুমিও ইংলিশ, হাজার হলেও একটাই জামাই বাড়ির।
– দিল দরিয়া শালা পেয়েচ তো। লাকি চ্যাপ।
ডি. এস -এর বউ একঝাঁক সাদা দাঁত বের করে বলে উঠল,
– কার ভাই দেখতে হবে। সেটা তো কেউ বলচে না।
– বুঝেচি। খুব গেরমানি হয়েচে। ঘুগনি একটু বেঁচেছে না? দাও না। ভালো চাট হবে। এবার বলো, কাজটা কী?
– বলচি। ছোট করে বললে ইংরিজিতে বলে এরিয়াল সার্ভে। কিন্তু দিনের আলোয় হবে না। সন্ধে অব্দি মৌজ, তারপর, তারপর উড়িতে থাকিবে ফৌজ। কেমন মিলিয়ে দিলাম ভাট?
– হেভি। আসলে সকলেই কবি। এটাই আমি স্টাডি করে দেখলাম। যদিও উল্টোটাই বলা হয়। জে. দাস বলে একটা ছিটিয়াল পোয়েট ছিল। ওই বলেছিল। সেই থেকে চলচে।
– বাঙালি মানেই জানবে তোতা ঢ্যামনা। একবার যা শিখবে কপচেই চলবে, কপচেই চলবে। ভদিদা যে এত বড় একটার পর একটা রদ্দা ঝাড়চে কোনো ভাবগতিক দেখে টের পাচ্চ?
– বরাবরই হারামি জাত। তায় এখন হাড়হারামি হয়ে উঠেচে। যাকগে, ও ব্যাঙের কেচ্ছা ছেড়ে মোটা করে ঢালো তো।
মাল ঢালা হয়। তাতে জল ঢালার বগবগ শব্দও হয়। ভাট আবার জোলোমাল খেতে ভয় পায়। বেশি হিসু হবে।
– আর না। আর না।
– অত কড়া খেও না। লিভারে জং ধরে যাবে।
– ভালো হবে। পোয়েটদের বেশি দিন বাঁচলেই বদনাম। ইয়াং থাকতে থাকতে টেঁসে গেলে সবাই বলে, আহা, মালটা যদি বাঁচত!
– আর বুড়ো হলে?
– হরিবল! ইস্কুলে পড়ানো হবে। রেজাল্ট হল ছোটবেলা থেকেই পাব্লিক মালটার ওপরে খচতে থাকবে। বড় হলে আর টাচ করবে না।
– ওসব জ্ঞানমারানী ছেড়ে একটা ভালো পদ্য বলোতো। ওই গরিব বড়লোক – প্যাঁদাপেঁদি নয়।
– বলচি। একদিন দুপুরবেলা লেকের পুকুরপাড়ে বুঝলে, সে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুর, অনেকক্ষণ ধরে একটা একলা মেয়েকে সাইজ করার ধান্দা করলাম। হল না। ঢেমনি মাগি। যেই বড়লোক এল মোটরগাড়ি বাগিয়ে অমনি দেখি ভেতরে ঢুকে গেল। আমিও বললাম শালী, দেখবি, তেতে মেতে লিখেই ফেললাম।
খুলিতেছে ছাতা, বক্র বাঁট
ফুটিতেছে ছাতি, ফাটিছে কাঠ
সহসা দেখিনু স্নানের ঘাট
জলকে চলিছে বধূর দল
দোলায়ে কলসী, নামায়ে ঢল
দেহবল্লরী কী উচ্ছল
দিল না, দিল না তৃষিতে বারি
চাতক চিনিল ঘাতক নারী
ধুতুরার বিষ মিশানো তাড়ি
রৌদ্রে ভাজিছে পুকুরঘাট
তপ্ত কাঁচিতে ছাঁটিছে ঝাঁট
খুলিতেছে ছাতা, বক্র বাঁট
কাব্যপাঠ শেষ। মদনকে বড়ই আনমনা দেখায়। বিকেল ঘনাচ্ছে। ভাট ছোট একটা চুমুক মেরে গলা ঝাড়ল। মদন ডি. এস -কে বলল,
– হাই থট রয়েচে। বুঝলে।
– আমি খালি ওই হারামি মাগিটার কথা ভাবচি। গলা টিপে দিতে হয়।
– আহাহা তা কেন? নো গলা টেপাটেপি! ভাট মনটা কেমন যেন ভিজে নেতিয়ে গেল। হেভি ধরেচ মুখটা। ব্যাঁকা বাঁটওয়ালা ছাতা খুলচে। লিখতে না পারলে কী হবে, ধরতাই, মেজাজ সব ফিল করি। বুঝলে। তবে যারা হার্টে হাফসোল খায়নি তারা ঠিক এ কবিতা বুঝবে না।
– না বুঝল তো বয়েই গেল। আমার কাজ নামানো। নামিয়ে দিলাম। দুনিয়া যদি ছোল হয় আমার কিছু করার নেই।
ওদিকে ভদি ও সরখেলের মধ্যে তখন যা বাক্যবিনিময় হচ্ছিল তার ভারবেটিম প্রতিবেদন পেশ করা হল।
– দেদারে খালি জল উঠচে। বালতি বালতি তুলে বাইরে ঢালচি। কিন্তু জল।
– সে তো উঠবেই। পাশেই ওল্ড গ্যাঞ্জেস রিভার। জলের কালারটা দেখেচ?
– কালচে। আর ভেরি ব্যাড স্মেল।
– হবেই। কয়েকশো বছরের পচা মড়া, গু, কুকুর বেড়াল – তুমি কী ভেবেছিলে! প্যারিসের সেন্ট বেরোবে? না বাগদাদের আতর।
– দ্যাকো, তুমি হলে লিডার। তবুও বলচি কথাটা। বাগদাদ নিয়ে ঠাট্টা কোরো না। অত বোমফোম ঝাড়ল। তারপরেও ঠিক অ্যামেরিকার সঙ্গে তাল ঠুকচে।
– কতায় কতায় তোমারও সরখেল অত ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস টেনে আনলে চলে না।
– এইটাই তোমার বড় ভুল। নিজে যা করচ সেটা চাউর হয়ে গেলে দেখবে তুমিই তখন ইন্টারন্যাশনাল ফিগার। দুবেলা টিভির ক্যামেরা পোঁদে পোঁদে দৌড়বে।
– বলচ? এমনটা হবে?
– না হয়ে যায়? যা প্ল্যান কষেচ দশটা প্ল্যানিং কমিশনের ঘটে কুলোত না।
দুজনের এই কথোপকথনের মধ্যেই বিকেল গড়ায়। আকাশে সেই প্রসিদ্ধ সোনালি রঙ পরতে পরতে অন্ধকারের দিকে ধাবমান। এই টাইমে ঝাঁক বেঁধে ক্রো, গুয়ে শালিখ, বকপাঁতি, হাঁড়িচাঁচা, স্নাইপ, পানকৌড়ি ইত্যাদি এশিয়ান বার্ডরা বাড়ি ফেরে। কবে থেকে যে এইভাবে অফিসের কাজ সেরে তারা ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরছে তা কেউই বলতে পারে না। কেউ আকাশে ইংরেজি ডব্লিউ-এর মতো দল সাজায়। কেউ সাজায় ‘ভি’। আবার লোনলি একটি বার্ড বা ক্লান্ত দম্পতিও চোখে পড়ে। ভেবে সকলেই অবাক ও বোধহয় উদাস হতে পারে যে ব্রিটিশ আমলে বা তারও আগে, সেই পাল আমলেও এমনটি হত। এ সম্বন্ধে হান্টার বা মজুমদার কোনো উল্লেখই করেননি। সিভিলিয়ানদের অনবদ্য স্মৃতিচারণে পাখি শিকার রয়েছে। কিন্তু পাখিদের এই নিত্য যাতায়াত সম্বন্ধে কোনো স্নিগ্ধ অবজারভেশন নেই। যাই হোক, পাখিদের সঙ্গে সঙ্গে তখন নানা সাইজের চাকতিও তাদের ঘরে ব্যাক করেছিল।
– টাইম হয়ে গেল।
– কীসের?
– আর ঠিক মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফ্যাতাড়ুরা টেক অফ করবে।
– কেন?
– এরিয়াল সার্ভে করতে। গোলাপ যে রিপোর্টগুলো দিচ্চে সেগুলো নিয়ে আমার মনে কোনো আপত্তি সন্দেহ নেই কিন্তু তবু একবার দেখে নিতে চাই। এনিমি এখনো জানে না যে আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজিক এয়ার কম্যান্ড আচে। যখন জানতে পারবে তখন পাখি বহুদূরে উড়ে ভাগলবা।
– এক এক সময় ভাবনা হয় যে হঠাৎ তুমি এতবড় কাণ্ডটা ঘটাতে গেলে কেন? থই পাই না।
– পাবে কী করে। আমি কি নিজেও বুঝি। দ্যাখো, কোনোকিচুই আমাদের তাঁবে নেই। এই যে রহস্যময় বিজ্ঞাপন বেরোল আনন্দবাজারে – আমরা তো দিইনি। বাবা হয়তো জানেন। বেগম জনসনও জানতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু বলবে না। কেবল হেঁয়ালি করবে। দেড়শো বছর পর পর চাকতিবাজি হয়। কেন হয় কেউই জানে না। আমাদের সেই আদিপুরুষ, মানে আত্মারাম সরকারই বা এই ধুন্ধুমার লাগিয়ে দিয়ে কী চান? আমার ওপর যেমন যেমন আদেশ আসচে, আর্জি পাচ্ছি তেমন তেমন করে যাচ্ছি।
– খুবই হুড়ুমতাল কাণ্ড।
– হুড়ুমতাল বলে হুড়ুমতাল। জয় বাবা চাকতির জয়! জয় মা চাকতির জয়! শুধু কী চাই জানো? বরাভয়। আর কিছু নয়। ওইটুকু পেলেই এই লাইফটা কেটে যাবে।
– ওফ মাথায় যেন ঘোর লাগচে। এত বড় একটা কাণ্ড। তাতে সরখেলও খেলে যাচ্চে।
– ভেবো না। যত ভাববে তত ঘোর বাড়বে। নলেন সেদিন একটা ছড়া কাটছিল। বেশ মনে ধরেচে।
– কেমন ছড়া শুনি!
– যা ইচ্ছে তাই হোক, এবার পুজোয় চাই কোক। বলো! আমরা স্রেফ কোকের জায়গা চাইচি বরাভয়।
– ঠিক! একেবারে ঠিক!
– এই হল কতা। অনেক সিরিয়াস আলোচনা হল আজ। মাল খাবে একটু?
– একটুই। এখনো ধন্দ লেগে আচে।
আকাশ থেকে লালবাজার বড়ই নরম্যাল চোখে মনে হয়। তা নয়। মদন বলে
– কী দেখচ ডি এস?
– কী আবার নীল সাদা কাপড় শুকোচ্চে।
– বাল। ভালো করে দ্যাখো। র্যাফ টার্গেট শুটিং করচে।
– তাই তো!
– আরো ভালো করে দেখে রাখো। ওই মালটাকে চেনো?
– হাফ পাঞ্জাবী পরা?
– হ্যাঁ।
– ও কে?
– খানকির ছেলে। নক্সালদের উকুনবাছা করে মারত।
– ওরকম খোঁড়াচ্চে কেন?
– স্ট্রোক! চুৎমারানির পক্ষাঘাত হয়ে ডানদিকটা পড়ে গেছে। জানলে?
– ঝাড়ব?
– কী?
– আমার পকেচে একটা দুশো-র বাটখারা আচে।
– এখনই নয়। বম্ব করার কোনো ইনস্ট্রাকশন নেই।
আরো ওপরে আকাশ থেকে খ্যাংরা কথা ভেসে আসে মেঘের বাষ্প ধরে ধরে,
– গুড! গুড!
মদন, ডি. এস ও পুরন্দর ভাট ওপরে তাকিয়ে দেখেছিল কালপুরুষকে আড়াল করে বিশাল ডানা ছড়িয়ে উড়ছে সেই প্রাকৃত দাঁড়কাক।
– ওঃ গড আপনি।
– হ্যাঁ রে বাঁড়া আমি। নীচে তাকা।
চলচে!
– কী?
– লালবাজারে কুচকাওয়াজ!
– বুঝলি কী হচ্ছে!
– কুচকাওয়াজ!
– ল্যাওড়া! গভরমেন্ট ধন দাঁড়াচ্চে কি না দেখচে। কেন করচে জানিস?
– কেন?
– গরিবের গাঁড় মারবে বলে।
পুরন্দর একেই ও.সি. খেয়ে টং। সে বলল,
– আপনার রিডিং ভুল। এটা লেফটিস্ট গভরমেন্ট।
– ওসব ঢপ নিজে খেতে হলে খেও। দুনিয়া চালাচ্ছে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক আর ও লেফট মারাচ্চে।
– মানে? এই পুলিশ তো লেফট!
– ল্যাওড়া। যে মাইনে দেবে তার।
– চেপে যাও। আরগু কোরো না।
এই সাবধানবাণী ভাটের। কিন্তু ডি. এস অকুতোভয়।
– ওই বাড়িটাতে কী হচ্চে? ওই যে আলো জ্বলচে?
– আনন্দবাজার ছাপা হচ্চে। আর কী জানবে, বাঁড়া? কাল সাত লাখ বাঙালী এটা পড়েই সারাদিন বিচি চুলকোবে।
– সে না হয় হল। ওগুলো তবে কী?
– একই কেস। মিডিয়ার আলো। ইংলিশ, হিন্দি, বাংলা …
কিন্তু তারও তলায় ওই যে রোশনাই, ওগুলো কেন ঘটে ঢুকচে?
– চেল্লামেল্লি শুনতে পাচ্চি।
– উৎখাৎ চলচে। হটাবাহার। কলকাতা ছেড়ে ভাগো। যত বাঁড়া খালপাড়, ফুটপাথ দিওয়ানা সব ফোটো। ঝিংচ্যাক বাদে কিছু থাকবে না। ফোট শালা চল, ও হকার ফকার রেন্ডিগেন্ডি কোই লাফড়াবাজি নেহি চলেগা – চল – বুটকা ঠোক্করসে চল – বুলডগবাজারকা খিল্লিসে চল – চলো হে – পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলিলেন – হে অপু। পথের কি কোনো শেষ আছে? চলো এগিয়ে যাই। চরৈবেতি! চরৈবেতি!
– হে বাপ! হে দাঁড়কাক!
– বলে যা!
– বর্ডার দিয়েও তো ঢুকচে।
– ঢুকচে তো। বাংলাদেশ থেকে ঢুকচে। তাড়া খাচ্চে আর ঢুকচে।
– কারা?
– আপাতত হিন্দু বাঙালি। পরে কী হবে আমি জানি কিন্তু বলব না। জমি কাড়ো। তাড়াও। ওদের নাম্বার কম। যদি উল্টো হয়ে যেত কেসটা তাহলে মোল্লারা তাড়া খেত।
– আর ওই যে হেভি আলোর ছররা। গানবাজনা।
– কবে আর হালচাল জানবি? ওখানে চলচে সাহিত্য উৎসব। সবসময় একটা না একটা বাওয়াল লেগে রয়েচে।
– সাহিত্য উৎসব! তাহলে অত পুলিশ!
পুরন্দরের এই বিস্ময় মদনের রাগের উদ্রেক ঘটায়।
– আরে বাবা, কোনো উৎসব, মায় বিয়েবাড়ি অব্দি আজ আর মন্ত্রী ছাড়া হয়? মন্ত্রী মানেই পুলিশ।
দাঁড়কাক বলল,
– হেভি প্রিপারেশন। কলকাতায় যে হিস্টোরিক গাড়োয়ান ধর্মঘট হয়েছিল তখনো ব্রিটিশ পুলিশ এত গা ঘামায়নি।
– গাড়োয়ান ধর্মঘট ? কই, শুনিনি তো।
– শুনবি কী করে? এখনকার ফুটো আঁতেলগুলো কিছু জানে? বলবখন একদিন সময় করে। হেভি গল্প। সব পুরনো আমলের কমিউনিস্টদের ব্যাপার। এখনকার এসব উটকোদের সঙ্গে মিলবে না।
প্রোমোটারদের সঙ্গে লোকাল লেভেলের লিডারদের সম্পর্ক ঠিক কেমন হওয়া উচিত তাই নিয়ে গোপন মিটিং -এ ভাষণের পয়েন্ট নোট করছিলেন কমরেড আচার্য। তাঁর টেবিলে বসেই। আঙুলের ফাঁদে জ্বলন্ত সিগারেটটি স্টাডি করতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর মনে হল যে, ক্যাপিটালিস্টরা কিন্তু কমোডিটিটা মোক্ষম বানায়। একবার তিনি অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে বানানো সিগারেট খেয়েছিলেন। যেমন বিদঘুটে ধ্যাবড়া প্যাকেট তেমনই অখাদ্য মাল। জ্বালতেই মনে হয় ভিজে কাঠের গাদায় আগুন লেগেছে। হায় ব্রেজনেভ যাঁকে বাঁচাতে ওঝা অব্দি ডাকা হয়েছিল। হায় গোরবাচেভ। রাজনীতির অ্যালকেমি বুঝতে গিয়ে নিজেই রহস্যপূর্ণ লিকুইডে হাওয়া হয়ে গেল। চটকা ভাঙার মতোই কাণ্ড। টেবিলের সামনে মিলিটারি টিউনিক পরা লোকটিকে কমরেড আচার্য ভালো করে চেনবার আগেই পাইপ থেকে জর্জিয়ান তামাকের ধোঁয়ায় সবকিছু আচ্ছন্ন।
– ক্যাপিটালটা পড়েছিস মন দিয়ে?
হ্যামলেটের বাপ বা ম্যাকবেথের ব্যাঙ্কোর মতোই স্তালিনের ভূতও সহসা ধাঁ!
বেগম জনসন তাঁর স্লেভ গার্লদের সঙ্গে বাগানে আন্ডারহ্যান্ড ক্রিকেট খেলছিলেন। বলটি গড়িয়ে গড়িয়ে ঝোপের পাশে গিয়ে থেমে গেল। বেগম জনসন ঝটপট শব্দ পেয়ে মান্ধাতার আমলের বটগাছটির দিকে তাকালেন।
ভূত নয়। বাদুড়। সারাদিন তারা উল্টো হয়ে ঝুলে হেগেলিয়ান বিশ্ব দর্শন করছিল। ঘনায়মান সন্ধ্যায় তারাই উড়ন্ত হয়ে মার্কসীয় পৃথিবীতে ফল পাকুড়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে উদ্যত হয়েছে।
বেগম জনসন স্লেভ গার্লদের নিয়ে মকানের দিকে রওনা দিলেন। সেখানে ঘরে ঘরে মোমের আলো জ্বলছে।
