কাঙাল মালসাট – ১৯
১৯
বেচামনি যেভাবে ককিয়ে উঠল তাতে মনে হতে পারে বাংলা সিরিয়াল জমে উঠেছে কিন্তু তা নয়, ঘটনাটা ‘কাঙাল মালসাট’ -এর হাঁপ ওঠার টাইমের একটি আন্তরিক আর্তনাদ,
– এ কী করলে ঠাকুর! এই তোমার মনে ছিল … এত নিদয়া তুমি … ঠাকুর!
রিটায়ার্ড ফৌজি বল্লভ বক্সী তো হাঁকড়ে উঠেছিল,
– মার্শাল ভদি। হুকুম করেন তো কম্যান্ডো পাঠাই। ট্যাট ফর টিট! নেহি তো এনিমি আমাদের বলবে চুহা।
ভদির উঠোনময় কলরোল জাগ্রত হল,
– ডি. এস -এর রক্ত, হবে না তো ব্যর্থ।
– ডি. এস অমর রহে।
– অমর শহিদ ডি. এস যুগ যুগ জিও।
টিনের দরজায় ফুটোয় চোখ সাঁটা বড়িলাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ডি. এস নেই। কুস্তিগির হলেও বুকের ভেতরটায় কেমন যেন এক নিংড়ে ওঠা ভাব … উঠোনে উদ্বেল শোকক্রন্দন … এবং মারাত্মক এই অবস্থায় ভদিও বুঝে উঠতে পারছিল না যে ঠিক কী করা উচিত তাই থেকে থেকে সে কুঁচকি চুলকোচ্ছিল আর আড়চোখে নজর রাখছিল বেচামণির দিকে -এই ক্যাচালের মধ্যে মাগী না আবার ফিটটিট হয়ে যায় …
এবং এই গোটা মায়ের ভোগের পালার জন্যে যে দায়ী সে অর্থাৎ পুরন্দর ভাট দু একবার চিল্লামিল্লি থামাবার সাধু প্রচেষ্টা চালাবার চেষ্টা করেও মাথাটি বোম হয়ে যায় কারণ চারদিকে রোলারুলি চিৎকার, হেভি চ্যাঁও ভ্যাঁও … উপরন্তু নিজেরও ধুম নেশা …
ভদি তার শিষ্যবর্গের কাছে আশু ও অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের ব্যাপারে লেকচার দিচ্ছে তার মধ্যেই পুরন্দর, হেভি বাংলা চার্জ করা অবস্থায় ঢুকে হাঁউ মাঁউ করে ডুকরে উঠেছিল।
– ‘ভদিদা! ডি. এস খতম, হাজরা পার্কে পুলিশ অ্যাকশান!’
– অ্যাঁঃ ফিনিশ!
– পুরো। ঘিরে ফেলল!
– তারপর?
– ফিনিশ। আমি এসকেপ। দেখলাম দুটো ঠ্যাং, দুটো হ্যান্ড ধরে চ্যাংদোলা করে ভ্যানে তুলচে। বডি ভারি তো। তুলতে পারচে না। শেষ অব্দি তুলল।
– মদন? মদন ছিলনা?
– না। আমি আর ডি. এস।
ফের বেচামণির আর্ত আকুতি,
– ঠাকুর। এত নিঠুর তুমি! এত!
নলেনের নাদ,
– বৌদি! বৌদি!
এই করুণ দৃশ্যে আবদ্ধ না থেকে আমরা যদি রিমোটে চ্যানেল পাল্টে এই মোমেন্টে মদনকে ধরি তাহলে দেখব সে তার ঘরে গামছা পরে, উবু হয়ে বসে স্টোভের থেকে ভাতের হাঁড়ি নামাবে ফ্যান গালার জন্যে, কিন্তু কি দিয়ে হাঁড়ির কানা ধরবে, অতএব গিঁট খুলে সে গামছাটাই খুলে নিল, ‘কাঙাল মালসাট’ -ও রিমোটের বোতাম টিপে দিল, এটা কিন্তু জি – টিভি বা আকাশ-বাংলা বা সনি-টিভি নয়, বি বি সি বা সি. এন. এন তো নয়ই, বরং , ধরা যাক কে. এম. টিভি – তাতেই দেখা যায় একটি বড়ই বড় লাল বাড়ি। রাত্তির বেলা। উরিঃ সাঁটি, চারদিকে বাড়ি । লালবাড়ি। কিন্তু কত বড় উঠোন রে বাবা! লে! সার দিয়ে গ্যাঁদাফুলের টব। পেতলের ফলকে ফলকে নাম লেখা। পাঠক ভায়া, আমরা মুখোমুখি দাঁড়ালে, বাঁ দিকের মানে ‘ইন’ লেখা যে গেট দিয়ে ঢুকেছি সেটা দিয়ে লালবাজারে ঢোকে। বুঝলে? ঢুকে বাঁয়া সেকেন্ড বাড়িটাই হল ডিটেকটিভদের। তলায় তলায় ফুলপরী – বম্ব স্কোয়াড, হোমিসাইড … চলো … ডি. এস যাচ্ছে … আমরাও যাচ্ছি। এরপরে ডানদিক দিয়ে ‘আউট’ লেখা গেটটা দিয়ে বেরোনো যাবে কিনা এখনই বলা যাচ্চে না। চলো … ‘কাঙাল মালসাট’ খাবি যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু এখনও সাইজ হয়নি। ইভনিং আর একটু গড়াবে।
তার আগে একটা ছোট্ট ব্রেক ! ফেমাস সমালোচক পিশাচদমন পালের নাম কে না জানে? প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এঁকে কেউ যেন কবি পি. ডি. পাল -এর সঙ্গে অভিন্ন বলে না ভেবে ফেলেন। পি. ডি. পাল সম্প্রতি একটি কবিতা সাইক্লো করে বিলি করেছেন যদিও সঙ্গত কারণেই কবিতাটি সাইক্লোন সৃষ্টি করতে পারেনি।
পি. ডি. পাল -এর সাইক্লো করা কবিতা-
নিউক্লিয়ার যুদ্ধে
বিশ্ব যেবার ধ্বংস হয়ে যায়
গোটা মানব সংসারই যখন
ছাই -এর গাদা
সব দেশ যখন শেষ
তারও পরে বেরিয়েছিল
শারদীয়া ‘দেশ’
অপ্রকাশিত, এক আঁটি
রাণুকে ভানুদাদা
কবি পি. ডি পালকে ধিক্কার কে না দেবে? পিশাচদমন পাল কবি পি. ডি পাল হতে পারেন না। তিনি ‘কাঙাল মালসাট’ -এর শেষ অর্থাৎ অষ্টাদশতম পাঁয়তাড়াটি পড়ে টি.ভি -তে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন – ‘ফাক! আমি যদি জার্মান হতাম এবং ‘কাঙাল মালসাট’ ১৯৩০ – ৩১ – ৩২, কখনও জার্মানিতে প্রকাশিত হত তাহলে আমি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি, পিশাচদমন পাল, সবার আগে গিয়ে নাজি পার্টির মেম্বার হতাম এবং ১৯৩৩ -এর ১০ মে ২০,০০০ বই পুড়িয়ে যে মেগা-ধামাকা হয়েছিল তাতে, উইদাউট ফেইল, ‘কাঙাল মালসাট’ -ও পোড়াতাম।’ বলাই বাহুল্য যে পিশাচদমনের এই চমকপ্রদ উক্তির ভেতরে যে উস্কানির পুর দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে আমরা বেকার মাথা ঘামাবো না। এ বিষয়ে আমরা দলাই লামার উপদেশই মেনে চলব – যে যা বলে বলুক, ধরে নিতে হবে এসবই নাথু সংকটে তিব্বতী হাওয়ার ফুসুরফুসুর। যাই হোক, ঐ টিভি সাক্ষাৎকারের দিন পাঁচেক পরে, তাঁর এগারতলাস্থ ফ্ল্যাটের স্টাডিরুমে বসে পিশাদদমন পাল রিডিং ল্যাম্পের মোহিনী আলোয় মন দিয়ে পড়ছিলেন ‘ডিকনস্ট্রাকশন ইন আ নাটশেল: আ কনভারশেসন উইথ জাকস দেরিদা’ – হঠাৎ শুনলেন জানলায় খচরমচর শব্দ। বিশাল এক দন্ডবায়স এবং তার ঠোঁটে ধরা একটি জ্বলন্ত চুরুট। দাঁড়কাক ভুস করে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ল। পিশাচদমন হতবাক। দাঁড়কাক পায়ের নখে চুরুটটি ধরে রাখে। অল্প কাশে।
তারপর বলল,
– এরকমই হয়।
– মানে?
– মানে সব হারামিরই এরকম হয়। স্পেশালি তোর টাইপের।
– হোয়াট?
– ছোটবেলার ডাক নাম যারা ভুলে যায় তাদের তোর দশা হয়।
– তুইতোকারি?
– ভুলটা কোথায়? তোর বাপ মানে কালীয়দমন আমাকে দাদা ডাকতো। সেই ব্যাটাই তো তোর ডাকনামটা দিয়েছিল। মনে আছে?
– স্ট্রেঞ্জ! বিজার!
– ওসব ঢপের কেওন ছাড়? তোর ডাকনাম ছিল পেদো। সেটা ভুলে মেরে আলবাল পড়ে ভাবচিস পার পেয়ে যাবি। এন্টার পাঁচপাবলিককে বলে দেব যে তোর নাম পেদো পাল। তখন বুঝবি। বোকাচোদা কোথাকার।
দাঁড়কাক ফ্লাই করিয়া চলিয়া গেল। চুরুটের গন্ধ। জানলার আলশেতে ন্যাড়ের মত দেখতে চুরুটের ছাই। পিশাচদমন চাকরকে নিচে পাঠিয়েছিলেন সোডা আনতে। ওপরে ওঠার আগে সে লেটার বক্স থেকে চিঠি এনেছে। প্রতিটি খামের ওপরেই লেখা- পেদো পাল। পিশাচদমন ফিল করলেন তাঁর পা দুটো ক্রমেই আইস কোল্ড হয়ে যাচ্ছে। কোনো ভুল নেই। প্রত্যেকটা খামের ওপরেই সেই ডাকনাম উইথ পদবী – পেদো পাল, পেদো পাল!
‘কাঙাল মালসাট’ – এর ভাগ্যে সামান্য যে নন – কমার্শিয়াল ব্রেকটুকু জুটেছিল তা শেষ হয়েছে। সেই সঙ্গে শেষেরও শুরু হয়েছে বলে দাবীও উঠেছে যদিও তা চটজলদি না মানলেও চলবে।
কমিশনারসাহেব জোয়ারদার। ছিন্ন মুন্ড বসানোর হেলমেটটি নেই। মুন্ডু কাটা যাওয়ার পরে অনেক টাইম পেরিয়েছে। এন.আর.এস -এর ডোমদের সঙ্গে স্পেশাল কনসালটেন্সির মাধ্যমে চাঁদনি- তে অর্ডার দিয়ে একটি এলুমিনিয়ামের হালকা কাঠামো বানানো হয়েছে যা মোটের ওপর হেডপিসটিকে ধড়ের সঙ্গে ধরে রাখতে পারে। স্লাইটলি খাঁচা ধাঁচের। তবে সুপ খাওয়ার সময়ে মাথা আর ঝুপ করে সুপের বোলের মধ্যে ডাইভ দেয়না। টাকা পয়সার টানাটানি থাকলেও এই কনট্র্যাপশনটির খরচ বহন করেছে রাইটার্স। প্রথমে শোনা গিয়েছিল সরকার খরচ দেবেনা। জোয়ারদার খচে গিয়ে বলেছিল,
– অন – ডিউটি বিহেডেড হলাম। সেটা যদি কনসিডার না করে তাহলে ঐ হেলমেট দিয়েই চালিয়ে নেব। আর তো দুটো বছরের মামলা। এরপর শান্তিনিকেতনের বাড়িতে যখন দোলনায় বসে বসে সুইং করবো তখন তো ফ্রি অ্যাজ আ বার্ড। মাথাটা না হয় পাশে মোড়ার ওপরে রেখে দেব।
ললিতা জোয়ারদার বলেছিলেন,
– পরের কথা পরে। এখন ও নিয়ে মাথা ঘামিও না। তোমার দোলনা চড়ার যেমন প্ল্যান আমারও একটা আছে।
– কী? বাগান?
– বাগান তো চাকররাই করতে পারে। ভাবছি একটা এন.জি. ও খুলব। সাঁওতালদের মধ্যে কাজ করবো। ব্ল্যাকস! পুওর নিগারস।
– এক একটা কথা বলো না শুনলে গা জ্বলে যায়। কোথায় শেষ কটা দিন টেগোরিয়ান অ্যামবিয়েন্স এনজয় করবো। তা না, উনি চললেন সাঁওতাল ধরতে। সাঁওতাল কী তা জানো? অসম্ভব ভায়োলেন্ট। যখন তখন ক্ষেপচুরিয়þাস হয়ে ওঠে! … বরাবরই এরা এরকম। রিড … রিড … সানতাল রেবেলিয়ন … মিষ্টিরিয়াস ড্রাম বিটস, পয়জনড অ্যারো … বৃটিশদের অব্দি হালুয়া টাইট হয়ে গিয়েছিল আর উনি কি না …
ডি.এস -এর কী হল সেটা এবার জানা যাক। অবশ্য তার আগে জেনে নিতে হবে কেন এমনটি হল। ক্যাপচার তো পরের মামলা।
পুরন্দর সেই বিকেলে যখন ডি. এস -এর সঙ্গে জগুবাবুর বাজারের সামনে দেখা করে তখন থেকেই দেখেছিল ডি.এস -এর মেজাজ বেশ খাট্টা। ফুটপাথের ফলের দোকানের সামনে হোঁচট খেয়ে ফলওয়ালির সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দিল। পানের দোকানে লোকটা অর্ডারি পান সাজছিল বলে পাঁচটা ছোট চারমিনার দিতে দেরি হওয়ায় ঝামেলা পাকালো।
– বড়লোকের অর্ডার বলে গাঁড়ে রস হয়েচে, না? পানের দোকানের লোকটা চালু মাল। না শোনার ভান করে চেপে গেল। ওখানে ডি. এস -কে ধরে প্যাঁদানো তার কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু পাকা ব্যবসাদাররা খুচরো ঝুটক্যাচালে কখনও যায় না। সেখান থেকে ওরা গেল গাঁজা পার্কের বাংলুর ঠেকে। ভেতরে হেভি ভিড়। সবসময়েই থাকে। আর বেশির ভাগ খদ্দেরই পাঞ্জাবি। ইয়া ইয়া আড়া। ঠেলেঠুলে কাউন্টারে যাও, পয়সা জমা করে গেলাস নাও, বসার জায়গা না পেলে যে কোনো ঘাপচি ঘুপচি দেখে উবু হয়ে বসে যাও – এক কথায় বিস্তর হাল্লাক।
– মদনদার কেসটা কী বলো তো! আসচে না দুদিন হয়ে গেল।
– কি জানি! ভদিদা হয়তো কোনো ডিউটি দিয়েচে। বলা বোধহয় বারণ।
– তা হবে। তবে গত বছরও এই টাইমটা দেখেছিলাম মদনদা কেমন মন মরা মন মরা ভাব। মনে হয় এমন টাইমে ওর বউ পালিয়েছিল।
পুরন্দর কোনো জবাব দেয় না। বাংলার গ্লাসে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সাবজেক্টটা নিয়ে পুরন্দর ঘাঁটাতে ইচ্ছুক নয়। তাই সে অন্য কথা পাড়ে,
– অনেকদিন তোমার বাচ্চাকে দেখিনি। কত বড় হলো মালটা?
– সাইজে বাড়চে কম। তবে খুব হারামি।
– কার পয়দা দেখতে হবে তো। পাঁইটটা জমলোনা। কি বলো?
– একটা পাঁইট, দুজনে জমে? শুনলে লোক হাসবে। যাই, আর একটা নিয়ে আসি।
ডি . এস পাঁইট আনতে গেল। পুরন্দর ভাবছিল মাল যখন ধরেছিল তখন একটা ফাইলেই কেমন মজে যেত। একটা কবিতার প্রথম লাইনটা ঝিলিকও দিয়েছিল – ‘খুললে বন্ধ হবে, এ ফাইল সে ফাইল নয়’। কিন্তু আর এগোনো গেলনা। ভেতরে মানে কাউন্টারের দিকে বাওয়াল। বাওয়ালের মধ্যে ডি . এস -এর গর্জন! পুরন্দর তড়িঘড়ি উঠে সেই দিকে গেল। পুরো কেলো। ঘিয়ে রঙের ঝোলা ফুল সার্ট আর ধুতি পরার সঙ্গে ডি . এস -এর লেগে গেছে। কাউন্টার থেকে মাল নিয়ে ব্যাক করার সময় ধাক্কা লেগে গেছে। লোকটাকে দেখেই পুরন্দর ধরতে পেরেছে – প্লেন ড্রেসে কনস্টেবল। বিহারী মাল। যেমন আড়া তেমনই বহর। অন্যরা ছাড়াচ্ছে, সে বলছে,
– দেখলেন তো, পহেলা হাত চালিয়ে দিল! শুনেন ফির ভি খিস্তি বানাচ্চে।
– স্রেফ তো হাত চলেচে। এরপর আর হাতফাত নয়, মেশিন চলবে – দনাদ্দন, দনাদ্দন!
– শালা পুলিশকা উপ্পর মেশিন। ছাড়িয়ে দিন, মালটাকে থানায় লিয়া যাই। আচ্ছাসে বানাই।
– উঃ পুলিশ দেখাচ্চে। পুলিশের আমরা ঘাড়ে হাগি! বানাচ্চে। উল্টে বানিয়ে দেব। হালুয়া জানতা? হালুয়া!
ক্রমেই ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠা এই ঝামেলার থেকে ডি.এস -কে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে পুরন্দর। ডি.এস ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে, ঘামছে।
– ফালতু বাওয়ালে জড়িয়ে ফয়দা আচে কিচু? কোতায় মাল টানবো, ধুনকি ধরে কেটে পড়বো – ছাড়োতো।
– হাত চালাতাম না। বাঞ্চোতটা ঘপ করে কলারটা ধরলো বলেই তো …
গাঁজা পার্কে রেলিং, মানে মোতাগলির দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ওরা পরে কেনা পাঁইটটা ভাগাভাগি করে খেয়েছিল। সঙ্গে চিংড়ির বড়া। এইসা ঝাল যে দুজনেরই হেঁচকি উঠতে থাকে। এরপর ওরা হাঁটতে শুরু করেছিল বড় রাস্তা ধরে, বাঁদিকে।
এদিকে পুলিশের ওপরে তো কড়া ইনস্ট্রাকশন ছিল যে চাকতি কোম্পানির মাল দেখলেই সাইজ করার। ঘিয়ে ফুল শার্টের ঘোর সন্দেহ হল যে দনাদ্দন দনাদ্দন মেশিন চালাবার থ্রেট যে দিতে পারে সে এলিতেলি নয়। বলা যায় না। নাটকা মালটাকে ক্যাপচার করার জন্যেই হয়তো অ্যাওয়ার্ড ফ্যাওয়ার্ড জুটে যেতে পারে। অতএত ঘিয়ে ফুল শার্ট উল্টো ফুট দিয়ে ডি. এস আর পুরন্দর ভাটকে ফলো করতে শুরু করে। ওদিকে ডি.এস -ও তখন যে কোনো সময়ে ফলো অন হয়ে যাওয়ার অবস্থায় যা ইন্ডিয়ার ক্রিকেট দল প্রায়শই এড়াতে পারে না। এর মধ্যে, যেটা ঘটেছিল সেটা হল সরকারী গোয়েন্দা বিভাগের তৎপরতা। একদিকে যেমন লড়াই -এর প্রস্তুতি (গেরিলা অথবা পোজিশনাল কায়দায়) অন্যদিকে দেদারে ইনটেলিজেন্স গ্যাদারিং। এ বিষয়ে স্পেশাল কিছু কোডও চালু করা হয়। ডি. এস আর পুরন্দর চক্রবেড়ের ঘোড়ার গাড়ির আড্ডার মোড় পেরলো। দুজনেই তখন জিগজ্যাগ ধাঁচে চলছে ফলে বাংলা সিনেমা দেখে বেরোনো মেয়েরা সভয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। অতীতেও এরকম হত। এই ফুটপাথ ধরেই সুর ভাঁজতে ভাঁজতে হেঁটেছিল সাইগল, রবীন মজুমদার – আর সেই ফুটেই চলেছে ডি. এস আর পুরন্দর ভাট। এরই ফাঁকে ঘিয়ে ফুল শার্ট পকেট থেকে পাস বের করে দেখিয়ে একটা ভ্যাঁটকামুখো লোকের মোটোরোলা মোবাইল থেকে ফোন করেছিল ভবানীপুর থানায়, কোড ল্যাঙ্গুয়েজ জানা গেল এবার,
– হুঁ … অঁ … হ্যালো।
– মুকদ্দর?
– সিকান্দর।
– ছপ্পর পর কৌয়া নাচে …
– নাচে বগুলা …
মেসেজ দিয়ে ঘিরে ফুল শার্ট ভ্যাঁটকামুখো লোকটাকে বলল,
– কিছু শুনেন নাই তো!
– না। ঐ কি ছপ্পড় টপ্পড়।
– ভুলিয়ে যান। চুপচাপ চলিয়ে যান। দিনকাল বহোৎ খারাব আছে।
ভ্যাঁটকা আর ট্যাঁ ফুঁ না করে ফেটে গেল।
ওরা পূর্ণ সিনেমার মোড় পেরোলো।
পুরন্দর ভাট বলল,
– চপ খাবে? একটু বাঁ দিকে হেভি সব ভাজে, কাটলেট …
– কঁক।
– আর একদিন বরং খাওয়া যাবে।
– অঁক!
– বমি পাচ্চে?
ডি. এস হেসে মাথা ঘুরিয়ে জানালো – না। তারপর জড়িয়ে জড়িয়ে বলল
– ধু … ন … কি। ধু … ন … কি!
এরপর ডি. এস কয়েক পা করে এগোয় আর দাঁড়িয়ে যায়।
– র মালটা কেন যে মারতে গেলে …
ডি. এস টলে, সামলায়, ফের টলে,
– ওসব র ফ – তে ডি. এস -এর … জা … ন … বে কিচু হয় না।
– সে তো জানি। ডি. এস বলে কথা।
ওরা ক্যানসার হাসপাতালের ফুটে। শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের খাবারের গন্ধ পেছনে। ঠিক এই সময়ে ক . পু. লেখা ভ্যানটা ফুট ঘেঁষে থামলো , হুইসল এর শব্দ, দুদ্দাড় দৌড়। কোত্থেকে পায় জোর পেয়ে গেল পুরন্দর, ডাইনে বাঁয় টলমলে দুটো আলতো ভাঁজ রোনাল্ডোর স্টাইলে তারপরে উইথ বল খিঁচে দৌড়। পাবলিকও ধুড়। তারাও হুটপাট, আনতাবড়ি দৌড়োদৌড়ি শুরু করে দেয়। ডি . এস ধরা পড়েও ঝটকাঝটকি করে। এর পরের ঘটনা আমাদের জানা।
ভদির উঠোনে চিৎকার চেঁচামেচি এমন তুঙ্গে উঠতে থাকে যে ভদি দেখল উত্তেজনা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। পুরন্দর উড়ে গিয়ে মদনকে খবর দিয়েছে। মদন উত্তেজিত অবস্থায় দাঁত না পরেই চলে এসেছে। বেচামণি মাঝেমধ্যে, গুমরোনোর ফাঁকে ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি বলছে। রিটায়ার্ড মেজর বল্লভ বক্সী ‘চার্জ! চার্জ!’ বলে হুঙ্কার দিচ্ছেন। নলেন একটি টিনের লগবগে খাঁড়া নিয়ে লাফাচ্ছে। পাঠকের নিশ্চয় স্মরণে আছে যে এই খাঁড়া দিয়েই একদা ফ্যাতাড়ু তিনজনকে বলি দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। এরকম অবস্থাতেই নেতৃত্বের হাত বদল হয়ে থাকে। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। এক্ষেত্রেও সেটা ঘটল। কিন্তু সাময়িকভাবে। হঠাৎ শোনা গেল গুমরোনো নয়, বিড় বিড়ও নয়, বেচামণি খিলখিলিয়ে হাসছে। ভদি রেগে মেগে বলে উঠেছিল,
– এ কেনে কি রগড় হচ্ছে না বটকেরা? নলেন তোর বউদির মাতাটা কি একেবারে গেচে?
বেচামণি সলজ্জ হাসিয়া ঘোমটা টানিল। সেইসহ মাজায় ছোট্ট একটু ঝাঁকুনি।
– আর চিন্তা নেই। বাবা আসচে।
সত্যি, সেই সময় দাঁড়কাক না এলে ‘কাঙাল মালসাট’ হয়তো বিয়োগান্ত এক সিরিয়াল গাথা হিসেবেই অমর হয়ে থেকে যেত।
– বাবা! বাবা! সব্বোনাশ হয়ে গেছে! ডি .এস নেই।
সকলেই চুপচাপ। দাঁড়কাক খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলো।
– সে কি বাবা। ডি. এস মরে গেল আর আপনি …?
– কেন, না হাসার হয়েচেটা কী? কি হয়েচে ডি. এস-এর?
– পুরন্দর সঙ্গে ছিল। হাজরা পার্কে পুলিশ অ্যাটাক। ডি. এস কিলড ইন অ্যাকশন।
– বাল!
– মানে?
– বাল মানে বাল। পিউবিক হেয়ার। কোঁকড়া।
– মুখ খারাপ করচেন করুন তাবলে ইংরিজিতে …
– চোপ। কিস্যু হয়নি ডি. এস -এর। আগে হাফ পাঁইট উইথ পানি তারপর এগেন টু থার্ডস পাঁইট উইদাউট পানি অর সোডা, কোক, পেপসি বগেরা বগেরা – এরপরে খোঁচোরের পেটে টিক – প্রায় আউট হয়ে গিয়ে রাস্তায় – কি রে ব্যাটা পুরন্দর!
– বাবা!
– ভেবেছিলিস তোরাই আচিস, তোরাই খাচ্চিস, আর কেউ নেই?
– আপনি ছিলেন? কই দেখলুম না তো।
– ছিলাম শুধু তাই নয়, একা ছিলাম না। বেগম জনসনও ছিলেন। তবে সূক্ষ্ম দেহে। দেখবি কি করে?
– বলুন বাবা, বলুন। ধড়ে যেন লাইফ ফিরে এল।
– বলচি। নলেন, একটু জল আন তো। নো মাল পাঞ্চিং – পিওর পানি।
গেলাসে জল এল। দন্ডবায়স চঞ্চুতে জল নিয়ে মাথা ওপরে ঝাড়লো তারপর এক পা এক পা করে ডুবিয়ে পা ধুলো।
– ডি. এস -কে ওরা আউট অবস্থায় নিয়ে গেল প্রথমে ভবানীপুর থানা। সেখানকার ও.সি ব্যাটা খবর দিল লালবাজারে যে ভেরি ইমপরট্যান্ট মাল ক্যাপচার্ড। এখন তাকে নিয়ে গেছে লালবাজারে। কাটামুন্ডু জোয়ারদার নাকি তাকে ইন্টারোগেট করবে।
এতক্ষণে ভদি একটু ধাতস্থ হয়েছে,
– লালবাজারে জেরা! কি করে কি হবে তাহলে?
– ওসব আমার ফিট করা হয়ে গেচে। আমি এক লাইনে ভাবছিলাম। কিন্তু বেগম জনসনের বাতলানো রাস্তাটাই দেখলাম ভাল। সব মিটে যাবে। ডি. এস ইজ সেফ অ্যান্ড সাউন্ড। তবে এখনও ধুনকিতে রয়েছে। থাকুক না।
ডি . এস -কে গাড়িতে তোলার পরে ভ্যানের তলাতেই শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিকট নাক ডাকার শব্দ। ভবানীপুরের ও. সি হটলাইনে জোয়ারদারকে বলেছিল,
– ওয়ান মাল কট সার। বলছিল পুলিশের ওপর মেশিন চালাবে। দনাদ্দন দনাদ্দন। আর একটা ছিল। এসকেপড।
– পকেটে কি ছিল? মেশিন মানে বামাল তো?
– আজ্ঞে হ্যাঁ সার। দেখেচি। নো বামাল। ওনলি চিরুনি।
– গুড। এখন কি করছে? তড়পাচ্ছে? না গাঁইগুঁই করছে?
– কিছুই না সার। মাল খেয়ে আউট।
– বলো কি? তাহলে তেমন ইমপরট্যান্ট এলিমেন্ট বলে মনে হয় না।
– না, না, সার। হেভি ইমপরট্যান্ট। দাম করে একটা ব্লো দিয়েছে আমাদের লোককে। পেটে।
– আ ব্লো ইন দা বেলি?
– ইয়েস সার।
– বুঝেছি।
– কি সার?
– তোমার আর জেনে কাজ নেই। স্ট্রেট পাঠিয়ে দাও। বাকিটা আমি দেখছি।
ডি . এস যখন ভবানীপুর থেকে লালবাজারে চালান হয় তখন সেই ফাঁকে জোয়ারদার কমরেড আচার্যকে জানিয়ে দিলেন যে মিউটিনির একজন সাসপেক্ট পাকড়াও। কমরেড আচার্য বললেন,
– বাঁচলাম। এই তাহলে শুরু হল।
– কী শুরু হল।
– মানে ধরা পড়া আর কি। আমি তো ভাবছিলাম আপনাদের যা হ্যাবিট সেই নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্চেন।
– কি যে বলেন সার।
– যাই হোক, কনগ্র্যাচুলেশন। এবার খাপাখাপ বাকিগুলোকেও ধরে ফেলুন। ল্যাটা চুকে যায়। তবে হ্যাঁ, সাবধানে। কথা বের করতে গিয়ে এমন কিছু করে বসবেন না যাতে হিউম্যান রাইটস কমিশন আবার হাঁ হাঁ করে ওঠে।
– ঐ এক ফ্যাকড়া হয়েছে সার। ধরবো অথচ বানাতে পারবো না। বলুন, এ করে পুলিশের কাজ চলে?
– যাই হোক, শুরু করে দিন তাহলে পেয়েই যখন গেছেন। কাল ডিটেলে শুনব। গুড নাইট।
– গুড নাইট!
এরপরে রাত যে কোনদিকে মোড় নেবে সে সম্বন্ধে তিলমাত্র ধারণা থাকলেও কেউ এমন রাতকে গুড নাইট বলতে পারে না। যাইহোক, সে তো পরের ব্যাপার। এখন এইটুকু গাওনা গেয়ে রাখলেই চলবে যে ‘১৬’ নং পক্কড়ে আমরা ক্ষণিকের জন্যে হলেও লালবাজারের এক অকিঞ্চিৎকর কনস্টেবলের সন্ধান পেয়েছিলাম যার নাম হল নক্ষত্র নাথ হাওলাদার। এতক্ষণ সে সাতটা হাতি মিলে খেতে পারবে না এরকম উঁচু খড়ের গাদায় একটি সামান্য ছুঁচ হয়ে অবহেলা অপমান বহন করে পড়েছিল। নক্ষত্রনাথ হল স্লিপার, পায়ে পরার নয়, ঘুমন্ত অর্থে। এবার তার ঘুম ভাঙবে এবং চোক্তারি মায়ার স্পর্শে সে পরিণত হবে ফালে। তাহলে একটু খুলে বলতে হয় যে গোলাপের ফেরে পড়ে প্রথমে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠেন তারকনাথ সাধু এবং তারপর তারকনাথ সাধুই নক্ষত্র নাথ হাওলাদারকে ‘বিদ্রোহী’ করে তোলেন। তারকনাথের খচে যাওয়ার কারণ ছিল কারণ তাঁকেই বলা হয়েছিল ‘রোজ’ -কে গ্রিল করতে। তিনি দেখেছিলেন যে এত বছরের বিশ্বস্ত যে গোলাম সেই হয়ে উঠেছে সন্দেহের টার্গেট। বলা যায় না তাঁকেও হয়তো ওরা টার্গেট করে ফেলবে যারা ফাইল ফেরৎ পাঠিয়েছিল ‘বাল’ ও ‘পাগলাচোদা’ জাতীয় অশ্রাব্য কথা মলাটে লিখে। হাওলাদারের ছিল সাধুর প্রতি শ্রদ্ধা। ‘সাধু’ পদবীটিই তাকে ম্যাগনেটের মত টেনেছিল। সেই সাধুবাবাই যখন লালবাজারের কাছেই একটি রেষ্টুরেন্টে বসে হাওলাদারকে মামলেট আর টোস্ট খাওয়াতে খাওয়াতে ও খেতে খেতে বললেন,
– হাওলা, এই যে পুলিশের ঘর করে বাল পাকিয়ে ফেললে, কালই যদি টেররিস্ট বা ড্যাকইটের দানা খেয়ে ফুটে যাও ভেবেছো কোনো মামা চোখের জল ফেলবে? কাঁড়ারের কেসটা দেখলে? মালাফালা দিল, পুড়ে গেল, তারপর? ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে ঘুরছে। বৌটার হাল দেখেছ?
হাওলাদারের জিগরি দোস্ত ছিল কাঁড়ার। তার চোখ জলে ভরে ওঠে এবং কপালের ভাঁজগুলো কাঁপতে থাকে।
– বশীরের বেলায় কি হল বলুন?
– ওফ বশীর। অমন একটা মানুষ। অমন তরতাজা। কেঁদোনা। হাওলা। কান্নাকাটি ঐ খানকির ছেলেরা অনেক দেখেছে। কাঁদলে হবে না। এদের দাওয়াই অন্য।
– আছে? দাওয়াই?
চ্যাংদোলা করে ডি. এস -কে লালবাজারে ঢোকানো হল।
ভদির উঠোন। সবাই চলে গেছে। দাঁড়কাক, ভদি, নলেন, বেচামণি, মদন, সরখেল, পুরন্দর ও মেজর বল্লভ বক্সী। দাঁড়কাক একটি কালো পাথরের বাটিতে ভরা জল একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখছিল ও বলে যাচ্ছিল,
– এই! এই! লালবাজারে ঢোকাচ্চে। বাসস, ঐ লাশ!
– বাবা! লাশ কেন বললেন? তবে কি?
– চাপ। বাটি দেখার সময়ে ওসব নিমকিছেনালি? হ্যাঁ, লাশ! জিন্দা লাশ। এবার নিয়ে যাচ্চে। যাবে বাবা কোথায়? সেই তো জোয়ারদারের ঘরে।
যদিও এখানে ইন্টারকাট পদ্ধতি লাগু তবু এটি কিন্তু সিনে-রোমাঁ নয়। জোয়ারদারের ঘর। কার্পেটের ওপরে ডি.এস -কে শুইয়ে দেওয়া হল। জোয়ারদার এক্সাইটেড।
– তুমি কে?
– আঁজ্ঞে, আমি হাওলাদার।
– গুড! গুড! বাইরে থাকো।
– স্যার?
– অঁ?
– মাল টেনে আউট কিন্তুক ডেঞ্জেরাস। আপনি একা দেখবেন?
– ওয়েল, মিঃ হাবিলদার, আই অ্যাম জোয়ারদার!
– ইয়েস সার।
নক্ষত্র নাথ হাওলাদার দরজার বাইরে দাঁড়ায় ও বিড়ি ধরায়।
দাঁড়কাক, পাথরের বাটির ভেতরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে,
– নড়চে ! নড়চে!
– কী নড়িতেছে পেভু?
প্রশ্নটি রিটায়ার্ড মেজর বক্সীর।
-তোমার ঐটি! বকরিচোদ।
এই খিস্তিটি মেজর বক্সীর মনে দাগ কাটায় তিনি মৌন হয়ে যান। মিলিটারির এই হল ধাঁচ। ন্যায্য খিস্তিþ তারা সংযতভাবে ভক্ষণ করে। আবার উল্টোটা হলে নল যে ঘুরিয়ে ধরে না এমনটাও বলা যাবে না।
ডি. এস. প্রথমে ভেবেছিল সে হাজরা পার্কে ঘাসের ওপরে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু হাজরা পার্ক তো ন্যাড়া। সেখানে আবার এত ঘাস কবে গজালো? এই ভাবনার মধ্যে জোয়ারদারের ইয়া বড় চেম্বারের কার্পেট তার কাছে বাড়ির বিছানা হয়ে গেল। আবার চোখে ঘোলা ঘোলা আলো, তার মধ্যে এলুমিনিয়ামের খাঁচা পরা জোয়ারদারের মুখ, রুম ফ্রেশেনারের গন্ধ, এ. সি. চলার শব্দ, এর মধ্যে আবার ফোন বাজলো।
– হ্যালো ……. ফালতু কেন যে জ্বালাও ……. আই অ্যাম অন ত্রু�শিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট …….. নিকুচি করেছে তোমার মাশরুম সুপের …….. হ্যাঁ, হ্যাঁ, একা একাই গেলো অ্যান্ড ফর গডস সেক এখন ডিসটার্ব কোরোনা ……. হ্যাঁ রে বাবা, গুড নাইট …… ঘুম পেয়ে গেছে তো ঘুমোও ….. গুড নাইট …… উফ – পেস্ট! ধিঙ্গি মাগি ……. ন্যাকামি ……. হান্টার দিয়ে চাবকাতে হয় ……
ডি. এস. হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসেছিল, দেখল জোয়ারদার, এলুমিনিয়াম ফ্রেমের মধ্যে মুন্ডু, হাসছে,
– কাটলো? নেশা! গন্ধটা বোধহয় কানট্রি লিকারের। তাই না?
ডি. এস. এরপর টোটাল তিনটে ডায়লগ দিয়েছিল। সেটা হতেই পারে কিন্তু তিনটি ডায়লগই কেন হিন্দিতে তা কখনও জানা যাবে না।
– কেয়া?
এর জবাবে জোয়ারদার কঠোর বা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্টার্ন’ মেজাজে বলেছিল,
– কেয়া এক্ষুণি বুঝবে। মাল খেয়ে আউট, তার ওপর রোয়াব? এবারে ঝেড়ে কাশোতো – আমাদের কাছে যে ইনটেলিজেন্স রিপোর্ট এসেছে তাতে রেবেলরা দুই পার্টির। চোক্তার অ্যান্ড ফ্যাতুাড়ু। তুমি কোনটা?
– পহলে মাল বুলাও!
– মানে? লালবাজারে বসে মাল খাবে? ইয়ার্কি দেওয়ার একটা লিমিট আছে। আর ইউ চোক্তার অর ফ্যাতুাড়ু?
এইবার ডি. এস. তার নোংরা টেরিকটনের প্যান্টের জিপটা ধরে টানতে থাকে,
– মুতেগা কাঁহা?
ওদিকে দাঁড়কাক আনন্দে ডানা ঝাপটায়। বাকি সকলেই সোৎসাহে তার দিকে তাকিয়ে।
– সলিড জবাব। লে, কী বলবি বল। বেশি তেড়িবেড়ি করলে কার্পেটেই দেবে ছনছন করে …….. চলবে …….. ডি. এস. …….. ব্রাভো ……
জোয়ারদার চেঁচায়,
– হাবিলদার! হাবিলদার!
হাওলাদার ঢোকে।
– সার!
– যাও! আসামীকে মুতিয়ে আনো। ধরে রাখবে। মালটা এসকেপ না করে।
– এখান থেকে পলায়ন। কী যে বলেন। চলেন …….. আপনাকে মুতিয়ে আনি, সাহেবের অর্ডার।
হাওলাদারের সঙ্গে টলমল করে বেরোতে বেরোতে ডি. এস. দেখেছিল জোয়ারদারের হাতে ব্যাটন। বাঁ হাতে ধরে ডানহাতের তালুর ওপরে আস্তে আস্তে, মোলায়েম করে বাজাচ্ছে। দরজা খুলে বিশাল বারান্দায় বেরোয় হাওলাদার ও ডি. এস.। আরও কয়েকজন কনস্টেবল ছিল। হাওলাদার ডি. এস.-এর কলার ধরে ছিল। অজানা ভৌতিক নির্দেশে আলগা করে দিয়েছিল। দেখলে মনে হবে ধরে আছে কিন্তু আসলে ফস্কা গেরো। আচমকা, গুনগুন করতে থাকে ডি. এস., ফ্যাতুড়াদের ওড়ার মোক্ষম মন্তর,
– ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই!
এবং টলমল করতে করতে টেক অফ করে। সাট করে দেড় মানুষ ওপরে উঠে যায়। তারপর দুহাতে ডানা নাড়তে নাড়তে উড়ে বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছু একটা হবে এটা হাওলাদার জানতো। কিন্তু সেটা যে এত সাবলীল সেটা ভাবতে পারেনি। সে এবং বাকি কনস্টেবলরা দৌড়ে বারান্দার শেষ অব্দি এসেছিল। আকাশে চাঁদনি প্লাস ডিজেল পোড়া ধোঁয়ার কুহকী ককটেল। তারমধ্যে উড়ে গিয়ে ডি. এস. ক্রমশঃ উঠতে থাকে, আরও, আরও ওপরে। অনেকটা ড্র্যাকুলার স্টাইলে।
জোয়ারদার তখন ভাবছিল যে ম্যারাথন মোতা চলছে। কিন্তু এত টাইম ধরে? জোয়ারদার বেল বাজালেন ও সেই সঙ্গেই চেঁচাতে লাগলেন,
– হাবিলদার! হাবিলদার!
হাওলাদার ও অন্যান্য সব কনস্টেবলই হাঁউ মাঁউ করতে করতে দৌড়ে এসেছিল। তাদের দেখতে ভীত ও উৎকন্ঠিত কৌয়া ও বগুলার মত। এর ঘন্টাখানেক পরেই, জোয়ারদার তখন কফিতে মাত্র দুটো চুমুক মেরেছেন, ভবানীপুর থানা থেকে ফোন।
– ওসি ভটচায বলচি স্যার। থানার ওপর বম্বার্ডমেন্ট হচ্চে সার।
– মানে? বম্ব না শেল?
– না সার থানকা ইট, নোংরা কাদা ভরা ভাঁড়, হাঁড়ি, গু, ভাঙা বালতি এই সব পড়চে। একেবারে কার্পেট বম্বিং!
– এর জন্যে আমাকে ফোন কেন? যারা এসব ফেলছে তাদের ধরে লক-আপ করে দাও।
– কাকে ধরব সার? ওপর থেকে পড়চে। কিছু উড়ন্ত ফিগার দেখা যাচ্চে কিন্তু ভিজিবিলিটি এত পুওর, তাছাড়া যে দেখবে তারও তো ডেঞ্জার ……… দমাদম ফেলচে
– মানে বলচো অ্যান অ্যাটাক ফ্রম আউটার স্পেস?
গদাম করে একটি শব্দ।
– শুনলেন সার …….. সাউন্ড?
– কি পড়লো ওটা?
ও. সি.-র চিৎকার শোনা যায়,
– কী পড়লো? ও …… সার, একটা টব ……. গাছ সমেত।
– দেখছি কী করা যায়।
জোয়ারদারের কিছুই করার ছিলনা ফোনটি রেখে দিয়ে চোঁ চোঁ করে বাকি কফিটুকু মেরে দেওয়া ছাড়া। খোদ লালবাজার থেকে আসামী উধাও। এবং তাও স্রেফ উড়ে। কাল রাইটার্সে কী বলবেন জোয়ারদার? সি. এম. এমনিতেই মেজাজী লোক তার ওপরে …….
আবার ফোন। দুরু দুরু বক্ষে ফোন ধরলেন নগরপাল। উল্টোদিকের কন্ঠস্বরটি বেশ জাঁদরেল।
– আপনি নগরপাল সাহেব আচেন?
– ইয়েস, মানে, আপনি কে?
– আমি রিটায়ার্ড মেজর বল্লভ বক্সী। লাইন ধরিয়া রাখেন। মার্শাল ভদি বাত করবেন।
– অ্যাঁ মার্শাল ভদি ……. তিনি কে?
ততক্ষণে ভদি রিসিভার নিয়ে নিয়েছে।
– আমি কে? আমি আমি। মার্শাল ভদি। কারেন্ট বংশধর অফ আত্মরাম সরকার। চাকতি মনে আছে। মুন্ডু কুচ। মনে আছে?
– মনে আর থাকবে না? অন-ডিউটি বিহেডিং। ভাল মনে আচে।
– ঐ চাকতি কোম্পানি আমার। আমি মার্শাল ভদি।
– নমস্কার ভদিবাবু!
– নমস্কার। আজ আমার লোককে আপনারা ক্যাপচার করেছিলেন।
– পারলাম না। রাখতে। উড়ে পালালো।
– যাই হোক, আমি ওয়ার ডিক্লেয়ার করচি।
– ভবানীপুর থানা তে তো ……
– ওতো সবে কনসার্ট! এরপরে আসল লড়াই। কালই ধুড়ধুড়ি নড়ে যাবে।
– মার্শাল! মার্শাল ভদি? মার্শাল!
ফোন চুপ। রিসিভার নামিয়ে রাখলেন জোয়ারদার। রাত বারটা দশ। লালবাজারের ওপরে আকাশ থেকে দুমদাম পেটো পড়া শুরু হল। বিদঘুটে আওয়াজ। দরজা জানলা সব কাঁপছে। টেবিলের ওপরে কফির পেয়ালা ও প্লেট নাচছে। বম্ব স্কোয়াডের লোক এসে বললো একটা পেটোতেও সচরাচর যা যা থাকে সেই পেরেক, বল-বিয়ারিঙের গুলি বা লোহালক্কড়ের টুকরো ওসব নেই।
– স্ট্রেঞ্জ!
– তবে হেভি সাউন্ড সার!
– অবাক হয়ে যাচ্ছি! বুঝলে। সেই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে জাপানীরা ক্যালকাটা বম্ব করেছিল। তার পর এই।
