কাঙাল মালসাট – ২০
২০
র্যাফ সহ পুলিশের একটি বাহিনী কালীঘাট ট্রাম-ডিপোর দিক থেকে গোটা রাস্তা মানে দুপাশের আপ ও ডাউন রাস্তা ও ট্রামলাইন সংলগ্ন জমি ধরে এগোচ্ছিল। অন্তত দশটি ক.পু লেখা ভ্যান ছিল। এই বাহিনী মার্চ শুরু করে সকাল দশটা নাগাদ। এগোচ্ছে… এগোচ্ছে….।
রাসবিহারী মোড়ের কাছে একটি সেলফোনের কোম্পানীর বিশাল হোর্ডিং লাগানো বাড়ির ছাদে রং-ওঠা মিলিটারির জ্যাকেট, টুপি ও প্যান্ট পরে অপেরা-গ্লাসে লক্ষ্য রাখছিলেন মেজর বল্লভ বক্সী। ছাদের দুটি থামের বুরুজের মধ্যে অপেক্ষারত লিসবনে নির্মিত পর্তুগিজ নুনু কামান। বারুদ ঠেসে গোলা ভরে রাখা।
লক্ষণ-রেখা ছিল শাহরুক খানের পোস্টারে ঢাকা একটি দেওয়াল যার গায়ে ক্লান্ত পথচারীরা মুতে থাকে। এটা পুলিশের জানা ছিল না। আগুয়ান পুলিশ-বাহিনীর একটি ভ্যানে বসে ছিল টালিগঞ্জ থানার টাকলা-ও সি।
মেজর বল্লভ বক্সী মনে মনে গুনছিলেন ১০… ৯ … ৮… ৭ … ৬ … ৫… ৪… ৩… ২…১…
মেজর বল্লভ বক্সী হুঙ্কার ছাড়লেন,
-ফায়ার!
গর্জে উঠলো নুনুকামান! গুড়ুম!
কলকাতায় আম্রবন নেই ভাগ্যিস। তবে মেন গঙ্গা নদী না ডিসটার্বড হলেও আদিগঙ্গা যে কেঁপে উঠেছিল তা তো তার ঘোলা ওয়াটারই জানে। পাঠকেরা সেই জলেই আলোড়ন দেখে থাকবেন হয়তো। সেই বেলায় নভেলিস্ট একটি পোস্টকার্ড-এ ভাঁজ করে বানানো পেপার বোট ঐ জলেই ভাসিয়েছিল। সেটি কেতরে পড়ে ও তার গলুইতে নোংরা জল ঢোকে। এবং এর কিছু পরেই কাঁকড়ারা নৌকোটিকে দাঁড়ায় ধরে জলডোবা করে ফেলে। লেখকদের ভাগ্যে এরকমই সচরাচর ঘটে। ‘কাঙাল মালসাট’-এর বেলাতেও এই নিয়মের অন্যথা না হওয়ারই কথা। যুদ্ধের আস্ফালনে এসব মাইনর ডিটেল কারও চোখে পড়ার নয়। পড়েওনি। অতএব ইহা আপাতত ইগনোর করাই যায়।
প্রাচীন এইসব কামান এখনকার বোফর্স টাইপের নয় সে গোলা ভরো আর চালাও, ভরো আর চালাও। আবার মাল ঠাসতে হয়, নলচে ঠাণ্ডা করতে হয়, তবে না পুনরায় অগ্নিসংযোগ ও উদগীরণ। প্রথম গোলাটি গিয়ে টাকলা ও.সি-র ভ্যানের ছাদে পড়ে এবং তারপর পিং পং বলের মত এ ভ্যান ও ভ্যানের ছাদে ঘুরে ফিরে লাফাতে থাকে। এর ফলে ডুম, ডুম শব্দ হয় যা পুলিশের কানে দুন্দুভি বলেই মনে হয়।
মেজর বল্লভ বক্সীর হাঁকাড় চলে।
-পানি ডালো!
হাড় জিরজিরে গজা নামে এক সৈনিক ছাদের পায়খানার মগ থেকে জল ঢালে।
-পোঁদমে কাঁহে ডালতা? সিভিলিয়ান কুত্তা কাঁহাকা। বডিমে ডালো।
গজা কাঁপতে কাঁপতে নুনুকামানের বডিতে জল ঢালে। কেদার রায়ের আমলে ঠিক যেমনটি হত তেমনই আনন্দে কামানটি গায়ে জল পড়তে ভ্যাঁসভেঁসিয়ে ওঠে।
-ফির ঠাসো। শেল লাগাও। ফায়ার ….
এবারে আরও জমকালো। এই শেলটি কক্ষপথেই বিস্ফোরিত হয়ে অসংখ্য ছোট মার্বেল গোলায় পরিণত হয় এবং তারাও আগের বড় গোলাটির অনুসারী হয়ে ক.পু.র ভ্যানগুলির ছাদে ও বনেটে নাচানাচি শুরু করে।
নুনুকামানের গর্জন, সিটি মারার শব্দ করে গোলার আগমন ও ভ্যানের ওপরে নন-স্টপ নাচানাচি পুলিশ বাহিনীর মধ্যে প্যানিক-এর সৃষ্টি করে। তারা এ ওর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে হামাগুড়ি দিয়ে ভ্যানের তলায় ঢুকতে চেষ্টা করে।
-এনিমি স্ক্যাটার্ড। ফিরসে ঝাড়ো। ফায়ার…
এবারে গোলাটি নতুন কেরামতি দেখায়-কামানের মুখ থেকে বেরিয়ে সেটি আকাশ পথে খুবই ধীরগতিতে ভাসতে ভাসতে কিছু দূর এগোয় তারপর পুলিশ বাহিনীর মাথার ওপরে গিয়ে দোতলার হাইটে থেমে দাঁড়িয়ে যায়। এর ফলে অভূতপূর্ব সাসপেন্সের সৃষ্টি হয়। যে পুলিশরা তখনও হামাগুড়ি দেয়নি তারাও এবার পালাতে শুরু করে। মাথা থেকে টুপি খুলে টাকলা ও.সি টাক চুলকোয় এবং ওয়্যারলেসে লালবাজারে জানায়।
-হেভি শেলিং হচ্ছে স্যার! কেস গুবলেটিং!
-বলো কি ভায়া! শেলিং হচ্ছে!
গুড়ুম! এবারে ব্যাপক কর্ণবিদারী শব্দ হয়।
-শুনলেন সার। আবার ঝাড়লো।
-শুনবনা? মাথা ঝনঝন করছে। ক্যাজুয়ালটি ফিগার কত?
-নো ক্যাজুয়ালটি সার। তবে ফোর্স ঘাবড়ে গেছে।
-এক কাজ করো। কামানফামানের সঙ্গে গাঁড় মারিয়ে দরকার নেই। রিট্রিট করো। ইমিডিয়েটলি।
-থ্যাঙ্ক ইউ সার!
টাকলা ও.সি ভ্যানের জানলা দিয়ে টেকো মুণ্ডু বের করে চেঁচায়,
– ফোর্স ব্যাক করবে। সব ভ্যানে উঠে পড়ো। কামানের সঙ্গে নো গাঁড় মারামারি।
ভ্যানের তলায়, আশপাশের দোকানে, বাড়িতে যে সব পুলিশরা শেল্টার নিয়েছিল তারা দুড়দাড় করে ভ্যানে উঠতে থাকে। ভ্যানের ছাদে বড় গোলা ও ছোট গোলার দল মহানন্দে তাসা বাজাচ্ছে। পুলিশ বাহিনী পিছু হটতে থাকে।
মেজর বক্সী আনন্দে গজার দাবনায় আলতো করে একটা চাপড় লাগিয়ে অপেরা গ্লাসটি এগিয়ে গিয়ে বললেন,
-দেখো ইয়ার, এনিমি পলায়ন করিতেছে। যাও, ফির পানি লাও। টু সেলিব্রেট ভিক্টরি এক রাউণ্ড করে রাম হয়ে যাক।
গজা ফের ছুটলো পায়খানার মগে করে জল আনতে।
যুদ্ধের এই সাময়িক বিরতি পাঠক একটু ঝালিয়ে নেবার জন্যে কাজে লাগালে মন্দ হয় না। ঝালিয়ে নেওয়ার সঙ্গে কিন্তু ঝালাই করার কোনো যোগ নেই। অবশ্য ঝালাই -এর ব্যাপারটাও একটু পরে আসবে। আসবেই। গরচায় কাঠের গুদামের মালিক কারফর্মা গত রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দেখেছিল যে সে একটি ওভাল টেবিলের একধারে বসে আছে। বেশ খানদানি মহলের একটি বিশাল ঘর। সেই ঘরে একদিকে সাহেবী ফায়ার প্লেস। তাতে কাঠ পুড়ছে। আবার ঘরে টানা পাখাও চলছে। এবং পাখার হাওয়া হাপরের মতই বারে বারে ঐ কাঠের আগুন উস্কে দিচ্ছে। টেবিলে বিশাল একটি মোমবাতি। ভূতুড়ে পরিবেশ। বাঁদিকের দেওয়ালে ন্যাংটো দেবশিশুদের ছবি। নাদুসনুদুস, ডানা লাগানো। ছবির তলায় আবার আড়াআড়ি করে রাখা দুটো বিরাট সোর্ড। কারফর্মা ঘাবড়ে গিয়ে মনে মনে বলেছিল,
-সাতে নেই পাঁচে নেই, এ বাঁড়া কোথায় এসে পড়লুম!
যেই না বলা অমনি ঝটপট করে একটা বিরাট দাঁড়কাক এসে টেবিলের ওপরে ল্যাণ্ড করলো। কারফর্মা ঘাবড়ে গেল।
-ঘাবড়ে গেলি? অথচ তোর তো ঘাবড়াবার কথা নয়।
-আঁজ্ঞে!
-চার জম্মো আগের কথা অবশ্য তোর মনে না থাকতেই পারে। এই এই ঘরে বড়াখানা হয়েছিল, মাইফেল বসেছিল। ভুলে মেরেþ দিয়েছিস। সব সাহেবরা নেচেছিল। মালের ফোয়ারা ছুটেছিল। হেভি খানাপিনা। মনে পড়ছে? ল্যাম্ব রোস্ট!
-একটু একটু ! একটা ঘোড়ার গাড়ি, ছমছমা শব্দ, ঘুঙুর!
-এই তো। তোর ডিউটি পড়েছিল মিঃ স্লিম্যানের জন্যে একটা খানদানি নেটিভ খানকি আনার।
-মনে পড়ছে এবার!
-না পড়ে পারে? এই মেয়েটিই তোকে মার্ডার করেছিল পরে।
-অ্যাঁ।
-হ্যাঁ, মানে বিষ দিয়ে। যা হোক জায়গাটা চিনলি?
– না তো ।
– এটা হল বেগম জনসনের কুঠি।
ম্যাজিক গতিতে মুখোমুখি চেয়ারে, ওভাল টেবিলের ওপারে, গজিয়ে উঠলেন বিশালবপু জনসন। কারফর্মা যাতে ভালো করে দেখতে পায় তাই দাঁড়কাক এক লাফে পাশে সরে গেল। বেগম জনসন ধানাই পানাই করার পার্টি নয়,
-কাল সকালে, কারফর্মা তোমার দুটি ডিউটি। হামি কোন হ্যাংকি প্যাংকি শুনবো না। না করিলে কী হইবে সেও বলিয়া দিব।
-না,না, অবশ্যই করবো । আপনার অর্ডার।
-গুড ! এই কাগজটিতে মার্শাল ভদির অ্যাড্রেস লিখা আছে।
কাল ঘুম হইতে জাগিয়াই তোমার ড্রাইভার বলাইকে এই ঠিকানায় পাঠাইবে, সে মার্শাল ভদি, বেচামণি, নলেন ও সরখেলকে উঠাইবে। তুমি উয়াদের আন্ডারগ্রাউন্ডে রাখিবার ব্যবস্থা করিবে।
-আঁজ্ঞে আর একটা ডিউটির কথা বললেন।
-দ্যাটস লাইক -আ-গুড বয়, তোমার নেক্সট ডিউটি হইবে লালবাজারে ফোন করিয়া কমিশনার জোয়ারদারকে মার্শাল ভদির ঠিকানাটি বলিয়া দিবে। মিউটিনি লাগিয়াছে জানো, নিশ্চয়।
-আঁজ্ঞে না। গদি সামলাতেই নকড়াছকড়া হয়ে যাচ্ছি, কোথায় মিউটিনি -ফিউটিনি….
-চোপ নটিবয়। একটি মাগিও তো রাখিতেছ। রাখেল। লাস্ট মান্থে তাহার তরে একটি কালার টিভিও খরিদ করিয়াছ… আমার হুকুম যদি অমান্য করো তো ওই রাঁড়ই তোমাকে পয়জন করিয়া মারিবে। সেবার যেমন হইয়াছিল।
-না,না, অবশ্যই করব। দুটোই করব!
কারফর্মা ঘুম থেকে ঘেমেচুমে উঠলো । পাশে বউ। নাক ডাকাচ্ছে। কারফর্মার হাতে ধরা এক টুকরো কাগজ।
ওদিকে দাঁড়কাক বেগম জনসনকে বলছিল,
-তোমার এই কনট্রাডিকটরি স্টেপটা ঠিক ক্লিয়ার হলো না।
-খোলসা করিতেছি। ভদিতো ওয়ার ডিক্লিয়ার করিয়াছে। এখন ফেয়ার প্লেইং ফিল্ডে এসপার ওসপার হওয়া ভাল। আমি টিপুকেও লড়তে দেখিয়াছি। খোলা লড়াই। আর সত্যি যদি বলো হাজার হলেও ঐ লালবাজার আমরাই বানাইয়া ছিলাম। একে বলতে পারো ইভেন হ্যাণ্ডেড জাস্টিস। তবে ভদির বাড়িতে উহারা কিছুই পাইবে না। উপরন্তু নাজেহাল হইবে। লালবাজারে ঠিকানা না জানাইলে তামাশাটি হইবে না। তুমি তো জানই যে আই ক্যান নট লিভ উইদাউট ফান অ্যাণ্ড মার্থ।
এইবার কি ড্রাইভার বলাইকে মনে পড়ে? সেই যে গাল তোবড়ান, খোঁচা দাড়ি বলাই। টালিগঞ্জ ফাঁড়ির বাংলার ঠেকে ফেয়ারওয়েল ডায়লগে ফ্যাতুাড়ুদের বলেছিল,
-ঠিক আচে ভাই দেখা হবে। নামটা মনে রাখবেন। বলাই। অমি কখনো মুখ ভুলিনা।
‘৪’নং ঘাপটিতে বলাইয়ের আবির্ভাব ও অন্তর্ধান ঘটেছিল। আবার সে এসেছে ফিরিয়া। হে মহান পাঠক, তুমি কখনো চিড়িয়াখানায় ভোঁদড়দের সিঙি মাছ ছুঁড়ে ছুঁড়ে খাইয়েছ? যদি এমনটি করে থাকো তাহলে মনে রেখো ঐ একই টেকনিকে ‘কাঙাল মালসাট’ তোমাকে ভুলে যাওয়া সিঙি মাছ নয়, এক একটি ভ্যানিস হয়ে যাওয়া চরিত্রকে ফের উপহার দিচ্ছে- যেমন নক্ষত্রনাথ হাওলাদার। যেমন বলাই এটসেট্রা এটসেট্রা।
কাকভোরে টিনের দরজায় ডুমডুম করে ধাক্কা। ভদি ভেবেছিল পুলিস এসেছে। বেঢপ মিলিটারি টিউনিক পরে ভদি মোগলাই আমলের পেল্লায় মরচে পড়া সোর্ড ভুঁড়ির ওপরে রেখে ঘুমোচ্ছিল। নলেন দরজা খুলেছিল। পুলিশ নয়! বলাই এবং একটি বডি তোবড়ানো কালো রঙের, মান্ধাতার আমলের ল্যান্ডমাস্টার এবং একটু পরেই সরখেলের বাড়িতে ফোনের দড়ির ঘন্টা বেজে উঠল।
-বঁলো
-ঝঁটপঁট চঁলেঁ এসোঁ।
-কেঁনঁ?
-গাঁ ঢাঁকা দিঁতে হঁবে।
-পাইখানা হঁয়নি।
-ওঁ হবে। আঁমিও হাগিঁনি।
ল্যান্ডমাস্টারটা যখন পোঁটলায় বাঁধা সোর্ড, ভোজালি, খুরপি ইত্যাদির অস্ত্রাগার ও চারজন অ্যাবস্কন্ডারকে নিয়ে রওনা হয়ে যায় তখন কয়েকটা বাড়ির দূরে দাঁড়িয়ে ছিল বড়িলাল। সে এবারে গঙ্গাঁর দিকে পা চালাল। মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরে তাকে কাশীর চিনি দিয়ে ভেজানো ছোলা খেয়ে ডন বৈঠক মারতে হবে। যার যা কাজ। যেমন শশধরের কাজ শশক ধরা ও মহীতোষের কাজ মশক মারা। ল্যাণ্ডমাস্টারে সদলবলে ভদির কেটে পড়ার ঘণ্টা দুয়েক পরে আই.পি.এস অফিসার ডি.সি পীতাম্বর সিং-এর নেতৃত্বে রাইফেলধারী একদল পুলিশ ভদির বাড়ি ঘিরে ফেলে। পোর্টেবল মাইল থেকে ঘোষণা করা হয় ভেতরে যে যে আছে যেন সারেণ্ডার করে। সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে কোনো ফায়দা নেই। লে হালুয়া। সারা বাড়িই ফাঁকা। ন্যাড়া ছাদে শুধু একটা দাঁড়কাক বসে আছে। দাঁড়কাকের পাশেই পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন বেগম জনসন। অবশ্য সূক্ষ্মদেহে থাকার হেতু পুলিশরা তাঁর অস্বিত্ব টের পায়নি। চাকতির ঘর খোলা পড়ে ছিল। কয়েকটা শেকলটানা ঘরে ঢুকে দেখা গেল শুকনো ফুল, চাটাই-এর আসন, মালসা, মরা আরশোলা, খড়ের আধপোড়া আঁটি ইত্যাদি। পীতাম্বরের বাড়ি দারভাঙ্গায় হলেও সে কলকাতারই ছেলে। সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়েছে।
– মনে হচ্ছে এখানে উইচক্রাফট প্র্যাকটিস করা হয়। ইণ্টারেস্টিং। বাট নো রেবেলস। এরপরই তার চোখ পড়ে ভদি-সরখেল টেলিফোন লাইনের উপর।
-মিস্টিরিয়াস! সিমস টু বি আ প্রিমিটিভ কমিউনিকেটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট। দেখতে হচ্ছে।
তার-এর লাইন ফলো করে পুলিশ বাহিনী পৌঁছে যায় সরখেলের বাড়ি। এবং সেখানে আবিষ্কৃত হয় আড়ে বহরে প্রায় এক মানুষ ছড়ানো সেই বিশাল গর্ত যার গভীর থেকে উঠে এসেছিল লিসবনে বানানো পোর্তুগিজ নুনুকামান ও কতিপয় মরচে পড়া মোগলাই সোর্ড। গর্তের ভেতরে টর্চ মেরেছিল পীতাম্বর। অনেক তলায় কালো, দুর্গন্ধ জল জমে আছে। ভন ভন করছে মশা। এর মধ্যেই কেলোটা হয়েছিল। একজন কনস্টেবল ভদির একতলার একটা ছোট্ট ভাঁড়ার টাইপের ঘরে চারপাঁচটা বোতল দেখেছিল। মুখ বন্ধ। ভেতরে লিকুইড। মাল হতে পারে ভেবে একটা বোতলের ছিপি খুলেছিল। বোতলে ভূত পোষা হয় কি হয়না, যায় কি যায়না, এসব নিয়ে সুচিন্তিত কোনো সিদ্ধান্তে আসা আমাদের লক্ষ্য নয়, এক্ষেত্রে যা ঘটেছিল সেটিই আমরা জানতে পারি-কনস্টেবলটি সহসা দেখল শক্ত হাতে চুলের মুঠি ধরে অদৃশ্য কেউ তাকে টেনে উঠোনে এনে ফেলল। ঠাস করে এক থাবড়া বসালো। গালে হাত বোলাতে না বোলাতে পোঁদে এক লাথি। বেগম জনসন ও দাঁড়কাক গিটকিরি দিয়ে হাসতে থাকে। নামজাদা কোনো মাইম আর্টিস্টও এত ভাল করতে পারবে না। অন্য পুলিশরা যেটা দেখেছিল সেটা হল ভদির টিনের দরজা দিয়ে সে হাঁউ মাঁউ করতে করতে বেরোচ্ছে এবং একটি উড়ন্ত বালতি তাকে ধাওয়া করছে। দৃশ্যটি স্বচক্ষে না দেখলেও পীতাম্বর এর মিনিট খানেক পরে সরখেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশদের মধ্যে যে বিপর্যস্ত ভাব দেখল তা যেমনই করুণ তেমনই চিন্তার উদ্রেক করে। উড়ন্ত বালতি ততক্ষণে ঢুকে গেছে বাড়ির ভেতরে। দরজাও বন্ধ হয়েছে সপাটে। যদিও বাড়ির ভেতরে কেউ নেই। কেতরে পড়া সাইনবোর্ডটিতে লেখা ‘বিবিধ অশুভ অনুষ্ঠানে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়।’ ন্যাড়াছাদে জায়েন্ট দাঁড়কাকটি বসে। জিপে বসে আচমকা এক লহমা পীতাম্বরের মনে হল পাশেই বিশাল স্থূলকায়া এক হাস্যমুখ গাউন পরা মেম। থোবড়াটা গামলার মত। পরক্ষণেই নো মেমসাহেব। ওনলি দা ম্যাসিভ দাঁড়কাক। পীতাম্বর বিড়বিড় করতে লাগল,
-মিস্টিরিয়াস! ভূতিয়া চক্কর!
কমরেড আচার্য ফায়ার হয়ে গেলেন।
-ক্যানন-ফ্যানন নিয়ে অ্যাটাক করছে, ক্যানন বলস পুলিশ ভ্যানের ছাদে নাচানাচি করছে, নো ক্যাজুয়ালটি অথচ পুলিশের মধ্যে ওয়াইডস্প্রেড প্যানিক, এসব শুনলে সি.এম. কি বলবেন আপনি ভেবে দেখেছেন?
জোয়ারদার দেখলেন মিনমিন করে হজম করার কোনো মানেই হয়না।
-দেখুন , ষ্ট্রেট-কাট বলে দিচ্ছি এরা যে সে এনিমি নয়। এতো আর এস.ইউ.সি-র মিছিল পাননি যে বেধড়ক লাঠি দিয়ে পেঁদিয়ে দিলাম। ব্যাপারটা সি.এম. কে বোঝান। আমাকে অন ডিউটি বিহেড করে দিল। কিছু করতে পেরেছেন আপনারা? এখন ক্যানন চালাচ্ছে। এরপর ধরুন গাম করে একটা ওয়েপন অফ মাস ডেসট্রাকশন ঝেড়ে দিল। তখন কী করবেন?
-রাগ করবেন না কমরেড জোয়ারদার! রাগ করবেন না।
-সে না হয় না করলাম। তবে ঔ কমরেড ফমরেড না বলে মিস্টারই বলুন। আই হেট কমিউনিজম অ্যাণ্ড দা রেডস।
-কিছু একটা করুন। ফেস সেভিং কিছু একটা। মার্শাল ভদি যদি এইভাবে আমাদের হ্যাটা করতে থাকে….
-দেখছি। এখন লাইন ছাড়ুন। ভাবতে দিন।
পীতাম্বরের রিপোর্ট পেয়ে আরও দমে গেলেন জোয়ারদার। ফ্লাইং বালতি এসে পুলিশ প্যাঁদাচ্ছে। সরখেলের উঠোনে মিস্টিরিয়াস হোল। গত রাত্তিরের এরিয়াল বম্বার্ডমেন্ট। প্লাস ভবানীপুর থানায় দুমদাড়াক্কা!
নতুন একটা প্ল্যান করলেন জোয়ারদার। এবারে কালিঘাট-হাজরা সাইড থেকে নয়। এবারে দেশপ্রিয় পার্কের দিক থেকে ম্যাসিভ একটা ফোর্স এগোবে। তার আগে শুধু ঠিক করতে হবে ক্যানন কোন রুফ-টপে আছে।
ক্যানন যে রুফ-টপে ছিল সেখানে মেজর বল্লভ বক্সী তখন তড়কা-রুটি দিয়ে ওয়ার্কিং লাঞ্চ সেরে ফেলেছেন। সেই সঙ্গে হারকিউলিস রাম। গজা গত পুজোর ভাসানে সিদ্ধি খেয়েছিলো। মিলিটারি রাম তার বড়ই উপাদেয় লাগে। শেষে বলেই ফেলল,
-ছোট করে আর একটু ঢালুন না। মৌজটা ভাল করে জমতো।
-সে না হয় জমাইলাম কিন্তু এনিমি না সারপ্রাইজ অ্যাটাক করিয়া বসে। মাল ঠাসা হইয়াছে তো?
-পুরো রেডি। বলবেন আর প্যাঁকাটি ধরিয়ে আগুন দেব।
-গুড! ভেরি গুড! যাও, পানি লইয়া আসো।
গজা পায়খানার মগে করে জল আনতে গেল।
মেজর বক্সী ভাবলেন দুমিনিটের একটি শর্ট ন্যাপ মেরে দেবেন এই তালে। কিন্তু ব্যোমপথে বোঁ বোঁ শব্দের ক্রমবর্ধমান গুঞ্জরণ তাঁর সিয়েস্তার প্ল্যানটি ভেস্তে দিল। সেই সঙ্গে দেশপ্রিয় পার্কের সাইড থেকে এগোবার পরিকল্পনাটিও ভোগে গেল। ঐ প্রচণ্ড ঘূর্ণির শব্দ হল অসংখ্য নানা সাইজের চাকতির। ঝাঁকে ঝাঁকে চলেছে। এবং দিনের আলো থাকতে থাকতেই , চাকতির পালের ওপরে উড়ছে ফ্যাতুাড় Åর দল। এবার শুধু মদন, ডি .এস, পুরন্দর ভাট নয়। ডি.এস-এর বৌ, বাচ্চা, শালা জনা কেন আরও অনেক ফ্যাতাড়ু রয়েছে যাদের কথা কেউই জানতোনা। তারা মেজর বল্লভ বক্সীকে হাত নাড়তে থাকে। বল্লভ বক্সী আনন্দে ‘ব্রিজ অন দা রিভার কোয়াই’-এর বিখ্যাত সিটি-সঙ্গীতটি বাজাতে বাজাতে নাচতে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে চাকতির দুর্ভেদ্য বর্মের পাহারায় ফ্যাতাড়ুরা উড়ছে। এভাবেই ফাইটাররা বোমারুদের আগলে রাখে। দিনমানে এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য কলকাতার মানুষ দেখেছিল শুধু তাই নয়, সোৎসাহে দেখেছিল। আকাশে যাই হোক যেমন টোটাল সোলার একলিপ্স বা রাতকাবার করে উল্কা বৃষ্টি-কলকাতার লোক দেখবেই। আর এ দৃশ্য তো স্বর্গীয়-উড়ন্ত চাকতি, তদুপরি উড়ন্ত মানুষ। ফ্যাতাড়ুদের নানাবিধ রণধ্বনি গগন মথিত করে তোলে যেন দৈববাণী হচ্ছে।
-ওয়ে ওয়ে, ওয়ে ওয়ে আঃ
-লায়লা, ও লায়লা!
-লিঃ লিঃ
-ছাঁইয়া, ছাঁইয়া….
কানফাটানো শব্দ। বুদুম। টিগুম! বিভিন্ন রাস্তায় চলমান বা দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ভ্যানগুলো টার্গেট। পেটো বম্বিং শুরু হয়ে যায়। এবং দুগর্ন্ধ এঁদো কাদা জলে ভরতি পলিব্যাগের বেলুন। এই সরব পরিস্থিতিতে নতুন একটি মাত্রা সংযোজিত করে কলকাতার নানা মহল্লা ও পাড়ার ক্যাওড়ারা। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, ব্রেজিল বা ইণ্ডিয়া-র কারণে যে বিপুল পরিমাণে চকোলেট বোম সব সময়েই মজুত থাকে সেগুলোও মওকা বুঝে ফাটানো শুরু হয়। টাকলা ও.সি দুহাতে কান চেপে ভ্যানের মধ্যে বসেছিল। ভ্যানের ছাদে তখনও নুনুকামানের গোলা ধড়াক ধড়াক করে লাফাচ্ছে।
বিস্ফোরণমুখর সেই কলকাতায় সন্ধ্যা ঘনাইতে শুরু করিল যদিও তাতে থেকে থেকে জ্বলে ওঠা ঝলক ছড়ানো ছিল। মেজর বল্লভ বক্সী বলিলেন,
-মার্শাল ভদির মাস্টার স্ট্রোক এখনও কমপ্লিট হয় নাই। এয়ার অ্যাটাক চলিতেছে। এবারে অন্য খেলা। ফ্লেয়ার ছাড়া করো!
নুনুকামানের মুখ উঁচু করে তাতে একটি বড় হাউই বসিয়ে জ্বালানো হল। হাউইটি আকাশে উঠে গিয়ে ফেটে একটি আলোর গোল চাকতি হয়ে গেল।
কারফর্মার বাড়ির ছাদ থেকে হাউইটির ফেটে যাওয়া দেখে ভদি সরখেলের ঘাড়ে একটা চাপড় মেরে বলল,
-আকাশ থেকে প্যাঁদাবো, ডাঙাতেও ছাড়বোনা। সামলাও এবার।
ঐ হাউই উড়ে গিয়ে গোল চাকতি হওয়াটা ছিল মোক্ষম সিগনাল। এরপরেই দেখা গেল ছোট কি বড়, রোড, লেন, বাইলেনের সব রাস্তাতেই ম্যানহোল খুলে যাচ্ছে। এবং তার গর্ত থেকে যারা বেরিয়ে আসছে তারা চোখ ফুটো ফুটো শিরস্ত্রাণ পরা, গায়ে চকচকে বর্ম, হাতে নানা টাইপের খতরনাক মাল কিন্তু আবছা আলোয় ভাল বোঝা যায় না। রোমের হিংস্র সৈন্য বা আইভ্যান হো-র নাইট টাইপের। এই বাহিনীর আত্মপ্রকাশ পুলিশদের যারপরনাই আতঙ্কিত করে তোলে কারণ পেটো ও অন্যান্য পতনশীল জলীয় ও জলীয় নয় পদার্থের বৃষ্টিতে তারা নাজেহাল হয়েই ছিল। কাছে গেলেই বোঝা যেত যে এগুলো স্রেফ আলকাতরা মারা টিন- কোনোটা তেলের, কোনোটা বিস্কুটের। ভীতিপ্রদ এই নাইটদের ম্যানহোল থেকে বের করার পরিকল্পনাটি মেজর বল্লভ বক্সীর। তাঁর আর একটি উদ্ভাবন হল মেথরদের নোংরা ফেলার বাতিল লজঝড়ে গাড়িতে ঝালাই করে পাইপ বসিয়ে সেগুলিকে সাঁজোয়া কামানের রূপ দেওয়া। একেই বলে সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ার। সকাল থেকেই নুনুকামানের দাপট পুলিশের মনোবল অনেকটা ভেঙে দেয়। খ-লোক থেকে নিরন্তর হামলা বাকিটা শেষ করে দিয়েছিল। সব খুইয়ে ফেলার পরেও ছিটেফোঁটা যদি কিছু থাকে সেটাও শেষ করে দিল নাইটবাহিনী ও সাঁজোয়া কামানের গুরু-গম্ভীর আবির্ভাব।
লাগাতার বম্বিং। তৎসহ চাকতির বোঁ বোঁ। কমরেড আচার্য জোয়ারদারকে ফোন করলেন, এই গোলযোগের মধ্যেই,
-কী বুঝছেন মিস্টার জোয়ারদার?
-নো হোপ। খলখলে করে ছেড়ে দিচ্ছে।
-তাহলে বলছেন মিউটিনি থামানো যাবে না।
-রাতটুকু কাটলে হয়। ফোন রাখুন তো। আপনাদের ঐ প্যাঁ পোঁ আর টলারেট করা যায় না।
কমরেড আচার্য ফোন নামিয়ে রাখলেন।
যে রাতটিকে ঘিরে অত ভয় ছিল জোয়ারদারের সেই রাতেই এমন একটা কাণ্ড ঘটেছিল যা পরিস্থিতির সামালের কারণ হয়ে ওঠে। এ কথা কে না জানে যে কোথাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা কালবিলম্ব না করেই সদলবলে একটি ঘোষণাপত্র বা আবেদন বা ফাঁকা থ্রেট প্রকাশ করে থাকেন যাতে বড় থেকে ছোট, শুুডঢা থেকে কেঁচকি , লেখক, শিল্পী, গায়ক, নৃত্যশিল্পী, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্র শিল্পী থেকে শুরু করে সকলেই সই দিয়ে নিজেরাও বাঁচেন, অন্যদের ও বারটা বাজাবার রসদ যোগান। শুধু এই ধরণের আবেদনে বা প্রতিবাদপত্রে সই করেই অনেকে লেখক বলে নিজেদের পরিচিত করতে পেরেছেন। কেউই এই ধরণের ব্যাপারে সই দেওয়া থেকে বাদ পড়তে চাননা। বাদ পড়ে গেলে খচে লাল হয়ে যান। অনেক সময় ফোনেই জেনে নেওয়া হয় যে নামটা দেব তো! এবং কিছু মাল আছে যাদের কিছু বলারই দরকার হয় না। আজ অব্দি এরকম যত আবেদন বা প্রতিবাদ পত্র বাজারে ছাড়া হয়েছে তা এক করে ছাপানোর প্রস্তাব কি উঠেছে? কেউ কি বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন বা করার ইচ্ছে আছে?
যাইহোক, যে রাত্তিরের ভয় জোয়ারদারের ছিল সেই রাত ঘোর দড়াম দড়াম করে কেটে যাওয়ার পর, পরদিন সকালে দেখা গেল প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রেই একটি আবেদনপত্র বেরিয়েছে,
‘সরকার-বাহাদুর ও চোক্তার-ফ্যাতাড়ুযুগ্ম শক্তির মধ্যে যে অ-রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে তা আমাদের ঘুমে বড়ই ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। আমরা বহুদিন আগেই জেগে থাকা বৃথা, এই সিদ্ধান্তে এসে ঘুমিয়ে পড়েছি। এবং চারদিকে যা হালচাল তা স্বপনচক্ষে দেখে আমরা মনে করি যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা ঠিকই করেছিলাম। তাই আমাদের সর্বসম্মত আবেদন এই যে দু পক্ষই একটি শান্তি আলোচনায় বসুক। এবং একটি এমন রফায় আসুক যাতে সাপও না মরে আবার লাঠিও না ভাঙে। সংগ্রাম যেমন দরকার তেমন বিশ্রামেরও দরকার। শেষোক্ত প্রয়োজনটি আমাদের খুবই বেশি। আর্শীবাদ সহ,
কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মিঃ বি.কে. দাস, মিঃ প্যান্টো, মিঃপি.বি, জি.এস.রায়, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিনয়কুমার দাস, অমৃতলাল বসু, বিমলাচরণ দেব, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, সুবলচন্দ্র মিত্র, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস, গোপীনাথ কবিরাজ, হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, চারুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণকুমার চট্টোপাধ্যায়, অজিতেশ্বর ভট্টাচার্য, সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক, সুরবালা ঘোষ, গিরীন্দ্রশেখর বসু, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সুনির্মল বসু, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুখলতা রাও, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, কৈলাসচন্দ্র আচার্য, গোবিন্দচন্দ্র দাস, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, হেমেন্দ্রচন্দ্র কর, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, আত্মারাম সরকার, গঙ্গাগোবিন্দ রায়, আলী সরদার জাফরি, কৃষণচন্দর, রাধানাথ শিকদার, হরিহর শেঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জন স্টুয়ার্ট মিল, ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মা, জোসেফ টাউনসেন্ড, কাহ্ণপাদ, ভুষুকপাদ, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ হাল, মিখাইল বাখতিন, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, ওয়ের্নার হাইজেনবার্গ, বিশু দত্ত, হরিবর সরকার, মিসেল ফুকো, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দনদাস মণ্ডল, আলামোহন দাস, ভলাদিমির নবোকভ, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, নিগমানন্দ…
উপরোক্ত আবেদনটি নিয়ে ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে পরে মতভেদ হবে। একদল বলবেন যে ওরকম কোনো আবেদন পত্র আদৌ প্রকাশিত হয়নি। অপরপক্ষের দাবী হবে যে অবশ্যই হয়েছিল। কোনো পক্ষই জয়লাভ করবেনা কারণ ঐ দিনের কোনো সংবাদপত্রই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কিন্তু এই আবেদনটিই অবস্থার ভোল পাল্টে দিল। পরদিন সকালে কোনো সংঘর্ষ হয়নি। রাত চারটের পর বম্বিং -ও কমে গিয়েছিল। সকালে দেখা গেল যে ম্যানহোল যেখানে ছিল সেখানেই গেঁড়ে বসে আছে। নাইট, ফলস সাঁজোয়া গাড়ি-সব হাওয়া। আকাশও ফুরফুরে।
এরপরের ঘটনা সংক্ষেপে এরকম। উভয়পক্ষের মধ্যে ‘হেকটিক পার্লি’ যাকে বলা হয় তাই চলে। গোলাপ, তারকনাথ সাধু, নক্ষত্রনাথ হাওলাদার এবং বড়িলালও এই প্রচেষ্টায় জড়িয়ে পড়ে। আসলে উপরোক্ত আবেদনটি সকলেরই মনে প্রথমে নাড়া ও পরে দাগা দেয়।
বেগম জনসন বাইবেল স্মরণ করে বললেন,
-টাইম অফ ওয়ার যেমন হয় তেমন টাইম অফ পিস-ও হইবে। লাইক দা ডে ফলোইং দা নাইট। দাঁড়কাক বলেছিল,
-সবই আত্মারামের খেলা। দেড়শো বছর পরপর চাকতি নাচবে। এবার তো ভালই নাচনকেঁাদন হল। এবার গুটিয়ে নে। ভদি গাঁইগুঁই করেছিল,
-বলচেন গুটোতে, গুটিয়ে নেব। তবে এটাও তো দেখতে হবে যে গুটোতে গুটোতে বিচি না বেরিয়ে পড়ে।
দণ্ডবায়স হাসিয়া উঠিল,
-বংশের আর কিছু না পেলেও মুখটা পেয়েচে। কার ছেলে দেখতে হবে তো!
একই কেস ঘটেছিল কমরেড আচার্যের বেলায়। তাঁকে ঝাড়লেন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ সি.এম,
-ব্রেসৎ-লিতোভক্স ট্রিটির হিসট্রিটা পড়ো। বুখারিন তো চেয়েছিল জার্মানদের সঙ্গে গেরিলা ওয়ার চালাবে। লেনিন বুঝেছিলেন যে এ কাজ করলে তা হবে ডুবে মরার সামিল। ট্রটস্কিকে সেদিন লেনিনকে মানতে হয়েছিল বুঝলে? দরকার হলে সায়া পরে যাবে। স্টুপিডই থেকে গেলে।
কলকাতার মাঝবরাবর সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের লাগোয়া প্যারিস হলে এই ঐতিহাসিক আলোচনা বসে। পেপসি ও কোক-উভয়েরই ঢালাও সাপ্লাই ছিল। শান্তি আলোচনায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। কেউ কাউকে ঘাঁটাবেনা, এই মর্মেই শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। তবে শেষ পাদে, মানে আলোচনার অন্তিম লগ্নে ইণ্টারভেন করেছিলেন নগরপাল জোয়ারদার।
-সবই বুঝলাম মার্শাল ভদি। কিন্তু পীতাম্বরের রির্পোটে সরখেলের উঠোনে যে ব্ল্যাক হোল তার রহস্যটা থেকেই গেল। ক্যালক্যাটায় এটা সেকেণ্ড!
-সরখেল, তুমি বলবে? বলবেনা! ঠিক আচে। আমি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিচ্ছি। সরখেলই আমাকে আইডিয়াটা দেয়। ষাট সাল না কবে যেন সোভিয়েট একাডেমিসিয়ান কালিনিন না কে যেন বলেছিল যে কলকাতা তেলের ওপরে ভাসছে। পুরো কলকাতাটাই ইরাক। তাই সরখেল আর আমি তেলের জন্যে মাটি খুঁড়ছিলাম। এখানে কিন্তু একটা শর্ত থাকবে। নো খাবলাখাবলি। কমরেড আচার্য ভদির বক্তব্য নোট করতে করতে বললেন,
-বলুন, শর্ত বলতে আপনি, মার্শাল ভদি, কী বোঝাতে চাইছেন?
-এই যে তেল, যা বিক্রি করবে, তুলবে একটা কর্পোরেশন, একটা কোম্পানী, তার চেয়ারম্যান হবো আমি, মার্শাল ভদি সরকার।
কয়েক লহমার সাসপেন্স। সে সব স্টার টিভি ও অন্যান্য টিভি কোম্পানির ক্যামেরাতে তোলা আছে।
কমরেড আচার্য বললেন,
-তাই হবে মার্শাল ভদি।
-তাতে সব, ফ্যাতাড়ু , সব চোক্তার, প্লাস বলাই প্লাস সাক্ষী বড়িলাল সকলেরই চাকরি পাকা হবে।
-ইয়েস, আই গিভ ইউ মাই ওয়ার্ড মার্শাল ভদি।
এই সময়ে সি. এন.এন-এর টিভি রির্পোটার প্রশ্নটি ছুঁড়েছিলো,
-মার্শাল ভদি, এমনকী গ্যারান্টি আছে যে আপনি সাদ্দাম হুসেন হয়ে যাবেন না?
