কাঙাল মালসাট – ৭
৭
পর্বে পর্বে চোক্তার ও ফ্যাতাড়ুদের মধ্যমণি বানিয়ে এই যে গেঁতো মালগাড়ি চলেছে তা পাঠকদের মধ্যে, বলাই বাহুল্য, বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে কিছু বলার আছে এবং বলা হবেই। কিন্তু তার আগে কিছু না বলা কথা ট্রাজিক অবলার মতো নির্বাক থেকে বার বার সেমিজে চোখ মুছুক এমনটি নিশ্চয়ই হওয়া বাঞ্ছিত নয়। বাঞ্চতিত তো নেভার-ই নয়।
হাউই আকাশে উঠে কাস্তে হাতুড়ি হয়ে গেল এবং কক্ষপথে চিরতরে প্রোথিত না হয়ে ভস্মাকারে স্থাপিত হওয়ার জন্যে ধরাধামে নেমে এল – এ কাণ্ড অনেকেই মেনে নেবে না। কবুল করা ভালো যে, গত পর্বে একটু ‘তাও’ দর্শন ঢুকে পড়েছিল — যা কিছু ওঠে তা নামে এবং যাহা কিছু নামে তাহা ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি যদি একটি ধানি পটকাও না ফাটিয়ে (যদিও এখানে কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ম মানা হয় বলে কোনো পাকা খবর নেই) গোটা দেশটাকে মাফিয়া ও মাগি সাপ্লায়ারদের হাতে তুলে দিতে পারে তাহলে অসম্ভব বলে কিছু থাকল কি? এ মামলায় আর ফুট কাটতে আমাদের বয়ে গেছে। বেচামণি! বেচারি বেচামণি! ঘুমের মধ্যে ডগ শ্যাম্পুতে চুল খোলতাই বেচামণি যে মন্ত্র বলে উঠেছিল এবং যা শুনে ভদি খচে যায় এবং দাঁড়কাক বাবার কাছে থ্রেট খায় তা হল বশীকরণ মন্ত্র। বেচামণির মধ্যে নিরন্তর এই ভয় হিডেন অ্যাজেন্ডা-র মত কাজ করে চলে যে ভদি তার ভক্তদের মধ্যে কয়েকটি ফিমেলকে হুমা করার ধান্দায় আছে। সন্দেহটি অমূলক নয়। অজানা তো নয়ই। অবশ্য এর বিরুদ্ধে ভদি জবাব করতে পারে যে বেচামণিকেও সে ঝাড়ির টার্গেট হতে দেখেছে। নলেন হয়তো তাতে সায়ও দেবে। কিন্তু এই বিবাদে জড়িয়ে পড়লে আমাদের চলবে না। মাগি-মদ্দার কারবারে আদ্যিকাল থেকেই এই ঢং। ঠাকুর দেবতারাও এই লাইনে যথেষ্ট বলশালী। এসব চলবেই এবং এর রকমফের নিয়ে আধবুড়ো কিছু গান্ডু শারদীয় কত কী-তে আধলা নামাবে এবং বাঙালি পাঠকরা মলাঙ্গা লেন বা মঙ্গোলিয়া, যেখানেই থাকুক না কেন সেগুলি পেড়ে ফেলবে। পড়ে তো ফেলেই। এই অসুখের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ট্রিটমেন্ট হল হনুমানের বাচ্চা। কিন্তু সেখানেও ফ্যাকড়া। পশুপ্রেমীরা হাঁউ হাঁউ করে উঠবে। নিরপরাধ, ঐতিহ্যবাহী, রামভক্ত হনুমানের বাচ্চাদের আপনারা কোথায় পাঠাচ্ছেন! জায়গাটা খাঁচা হলেও বা একটা কথা ছিল!
যাই হোক ‘কাঙাল মালসাট’, ইতিমধ্যেই, মানে, ধারাবাহিক পর্যায়েই,অর্থাৎ, গ্রন্থাকারে যন্ত্রস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াতে ঢুকে পড়ার আগেই, ফিডব্যাক পেতে শুরু করেছে যার কিছু নমুনা টেস্ট করা যেতে পারে। নাম, ঠিকানা, গুহ্য রাখা হল।
১। …. চোক্তার ফোক্তার নিয়ে এই ক্যাঁচড়াবাজি আর সহ্য করা যাচ্ছে না। ‘আগামী সংখ্যায় সমাপ্য’ — কবে দেখতে পাব? … কলম না বকলম … গর্দভের সন্দর্ভ।
২। লেখা স্মার্ট কিন্তু মার্কসীয় freedom from এর ঘেরাটোপেই খাবি খাচ্ছে, freedom to নিয়ে সেই ভাবনাচিন্তা কোথায় যা আমরা পশ্চিমের অধুনা আখ্যানে…
৩। … চাম্পি! পারি না! … ঘ্যাম হচ্ছে। একটাই অনুরোধ — সহসা, কয়টাস ইন্টেরেপটাস-এর মতো থামিয়ে দেবেন না। অথবা যেমন শীঘ্রপতন ঘটে যায়।…
৪। … মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও আর্ন্তজাতিক শোধনবাদী গাঁটছড়া-র দালালি করে হাততালি কেনার এক ঘৃণ্য চেষ্টা…
অবশ্য কেউ যদি বলেন যে এরকম কোনো চিঠি কেউ লেখেনি, পুরোটাই জালি কেস তাহলেও কিছু বলার নেই। সবই হতে পারে। অনন্ত সম্ভাবনা যুক্ত হয়ে রয়েছে অপার রহস্যের সঙ্গে যা আবার অজানার পথ ধরে এগিয়ে চলেছে কালো ছাতা মাথায় — কোথায়? সবটা বলা যাবে না। আপাতত বেঙ্গল ইনডাসট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের খোদকর্তার দপ্তরে।
উপরোক্ত সংস্থাটিকে অধিক বুদ্ধিমানেরা যেন নিম্নোক্ত সংস্থাটির সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলেন –WEST BENGAL INDUSTRIAL DEVELOPMENT CORPORATION (A Govt. of West Bengal Enterprise) 5, Council House Street, Calcutta – 700 001 Phone : 91-33-2105361-65 Fax : 91-33-2483737 E-mail : wbidc@vsnl.com, Internet : www.wbidc.com
ফেললেই কিন্তু ক্যাচাল হয়ে যেতে পারে। সকলেই জানে এবং বিশেষত দেশ-বিদেশের শিল্পপতিরা জানেন যে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে নতুন জোয়ার আসছে। এবং এতে আড্ডার গুরুত্ব অপরিসীম।
আড্ডা বলতে আমরা যা বুঝি এটা কিন্তু তা নয়। এখানে গ্যাঁজানো বা গজালি করার কোনো স্কোপ নেই। এই আড্ডা হল ADDA, আসানসোল প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন এবং দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এক হয়ে তৈরি হয়েছে আড্ডা বা ADDA যা হল আমাদের অর্থাৎ ভারতের রুর। হাওড়া যেমন ভারতের শেফিল্ড। সুন্দরবন যেমন ভারতের আফ্রিকা। দিল্লী যেমন ভারতের লন্ডন।
আমাদের একান্ত পরিচিত বড়িলাল একবার তার বোনের দ্যাওরের বউ এর বাপের শ্রাদ্ধ খেতে দুর্গাপুর গিয়েছিল। সেখানে হবি তো হ তখন WBIDC-র এক দারুণ মিটিং ছিল। বড়িলাল বাপের জন্মে যা আর দেখবে না তাই দেখল। কলকাতা থেকে স্পেশাল ট্রেনে সব হোমরা চোমরা ও শিল্পপতিরা স্বয়ং বা প্রতিনিধি মারফৎ হাজির। দুর্গাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটি কনটেসা গাড়ি দাঁড়িয়ে যেন সেও ট্রেনে উঠবে। চেয়ারম্যান সাহেব ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা কনটেসায় চেপে বসলেন এবং কনটেসা রওনা দিল। বড়িলাল তখনই অনুভব করল যে অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ গোটা দুনিয়ার পুঁটকি মেরে দেবে। Making things happen-এই স্লোগান নির্দোষ বাতকর্মের মতো ফাঁকা আওয়াজ নয়।
ডিসেম্বর ‘৯৯ এর শেষ পাদে যেন বা হাওয়া একটু ঠাণ্ডাটে হয়ে উঠেই থাকবে কারণ তা না হলে বেঙ্গল ইনডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের সামনে বেলা এগারোটা নাগাদ যে ট্যাক্সিটি এসে থামবে তা থেকে কোট প্যান্ট ও হ্যাট মাথায় ভদি, রোঁয়া ওঠা আদ্যিকালের মেমেদের লম্বা কোট পরা বেচামণি ও স্যান্ডো গেঞ্জি ও শর্টস পরা বৃদ্ধ বিদেশী একে একে নামবে কেন? বুড়ো সায়েব এসব কলকাতার শীতফিত নিয়ে যে মাথা ঘামায় না সেটা বোঝাই গেল।
চেয়ারম্যানের কাছে একটি কার্ড গেল। তাতে লেখা —
আ.কু.৪৭
(একটি বাঙালি প্রতিষ্ঠান)
মালিক শ্রী ভদি সরকার, শ্রীমতী বেচামণি সরকার
ব্যবসায়িক উপদেষ্টা : মিখাইল কালাশনিকভ
হিসাবরক্ষক : শ্রী নলেন
এই ঘটনাটির আগের দিন সল্টলেক এলাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক নিত্যকর্ম’-তে এই মর্মে একটি খবর বেরোয় যে কলকাতার আকাশে একাধিক উড়ন্ত চাকি দেখা দিচ্ছে। মানুষের মনে নানা প্রশ্ন উঠছে। কেন এই চাকতির আবির্ভাব? কী চায় এই চাকতি? এই চক্কর কতদিন চলবে? সরকার নীরব কেন? বিজ্ঞানীরা কেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন? ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’-র এই সরব প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পাদকীয় সংযোজন– ‘পশ্চিমী মনোবিদ যুং-এর কথা মানিলে মানুষ যাহা দেখিতেছে তাহা ঈশ্বরের চক্ষু। এই চক্ষু প্রতি মানুষের মধ্যেই মুদিত রহিয়াছে। সহস্রাব্দের মুখে কেন এরূপ ঘটিল তাহা জানা যায় নাই। পশ্চিমে উফো-চর্চা প্রবল। পূর্বে বিরল। কেহ যদি গোপনে উফো-চর্চা করিয়া থাকেন তাহলে এ ব্যাপারে আলোকপাত করিতে পারেন। তবে বিনা দক্ষিণায়। নাম ও ঠিকানা গোপন রাখা হইবেক।’ এই প্রতিবেদনটি কোনোই আলোড়ন সৃষ্টি করতে অপারগ হয় কারণ ‘দৈনিক নিত্যকর্ম’-র প্রচার সংখ্যা ৫ হইতে বাড়িয়া এই বছর ৭ হইয়াছে। কলকাতায় বেশ কিছু ছিটিয়াল মাল বাস করে । বরাবরই। বলা যায় এরকমই রেওয়াজ।
ওরা তিনজন ঘরে ঢুকতেই হুমদো চেয়ারম্যান দাঁড়িয়ে ওঠে। হেঁড়ে গলা।
— হাউ ডু ইউ ডু …
ভদিও গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে,
— নো হাডুডু। আমি বাঙালি। মাই বেটার হাফ বেচামণি বাঙালি। মিঃ কালাশনিকভ রাশিয়ান। কুছ পরোয়া নেই। আপনিও বাঙালি। বাংলাতেই বাৎচিত চলতে পারে।
— ইয়েস! পারেই তো। আচ্ছা, ইনি রাশিয়ান?
— স্পাসিবা। দোবরে উতরো!
— সে কী! বিখ্যাত লোক। আপনি মিঃ কালাশনিকভের নাম শোনেননি?
— ঠিক প্লেস করতে পারছি না। তবে শোনা শোনা লাগছে।
বেচামনি ফট করে কুমিরের চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ খোলে এবং একটি ফটো এগিয়ে দেয়।
— দেখুন তো, চেনা চেনা লাগছে?
— অ্যাঁ এটা তো বন্দুক।
— হ্যাঁ। এ. কে. ফর্টি সেভেন।
— মাই গড।
— এই এ. কে-র ‘কে’ হলেন কালাশনিকভ। মিখাইল কালাশনিকভ। এটা ওঁরই আবিষ্কার।
— ও লর্ড! আপনাকে ম্যাডাম কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে।
— অসম্ভব। আমি কোথাও যাই না।
— না, না। একবার হিথরো-তে আলাপ হয়েছিল।
— ভুল করছেন। আমি নয়। অন্য কেউ হবেন। আপনি বোধহয় বম্বের মিসেস পোচখানেওয়ালা-র সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই ফেলে।
— তা হবে। সরি ম্যাডাম।
এইবার চেয়ারম্যানের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত কারণ মিঃ কালাশনিকভ হঠাৎ বলে উঠেন,
— খারাশো! খারাশো! রবীন্দ্রনাথ আমার খুবই প্রিয়। রাজ কাপুর। ভারতকে আমি ভালোবাসে। আওয়ারা। জন-গণ-মন শুনি। মিঠুন। ডিস্কো ডান্সার।
— আরে, আপনি তো চমৎকার বাংলা বলেন।
— খারাশো। অচিন খারাশো। ভডিবাবু, আপনি প্রোপোজাল প্রকাশ করুন। আমড়াগাছি অনেক হইয়াছে।
— হ্যাঁ, ভদিবাবু, বলুন।
— বলচি। ব্যাপারটা টু সিক্রেট। নো গ্যাঁগো বিজনেস। ছুপকে ছুপকে করতে হবে। করলেই সব লাল হো যায়গা।
— ভডিবাবু, আপনি ঐ চুডুড়বুডুড় হইতে বিরত থাকুন। কাজের কথা বলুন।
— ইয়েস মিঃ কালাশনিকভ!
— আমরা একটি রাইফেল কারখানা বানাব।
— রাইফেল! কোথায়?
— এনিহোয়্যার। হলদিয়া, দুর্গাপুর, আসানসোল — ওপরে থাকবে অন্য জিনিস। ডিকয়। তলায় আসলি মাল। এ. কে. ফর্টিসেভেন — টি গিগ — টিগ-টিগ-টিগিটিগিটিগ …
— বলেন কী?
— শুনুন, ওপরে লোকে জানবে ক্যানড জুস বা টমাটো পিউরি তৈরি হচ্ছে বা পিভিসি ব্যাগ অ্যান্ড স্পেশালিটি পলিমারস। তলায় লে ধড়াধধড় …
— ইন্টারেস্টিং।
বেচামণি বলে, এবার আপনি প্রোডাক্ট সম্বন্ধে বলুন …
— ভেরি সিম্পল। রেগুলার আর্মি হোক, গেরিলা গ্রুপ হোক — সবার মন পসন্দ হল এ. কে. ফর্টিসেভেন। আমারই তনয় বলিয়া নয় ইহা অতীব উপাদেয় অ্যাসল্ট রাইফেল। অ্যামেরিকান আর্মালেট এর ধারে কাছেও আসে না। সত্যি বলিতে এ. কে. ফর্টিসেভেন হল এক উন্নত সাব-মেশিনগান যা মিডিয়াম পাওয়ার কার্টিজ ফায়ার করে। যুদ্ধবিগ্রহ সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন?
— সে প্রায় না জানালেই ভালো। বিশেষত এইসব অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপার …
— থাক, থাক, আর বলিতে হইবে না। বুঝিয়াছি। আজকাল দরকার র্যাপিড ফায়ার পাওয়ার যাকে আরও মজবুত করিয়া মার্চিং ফায়ার বলা যায়।
চেয়ারম্যান ঢোঁক গেলেন,
— কিন্তু এদিয়ে আমরা কী করব? মিলিটারি তো আমাদের হাতে নয় …
— চোপ, মিলিটারির দরকারটা কী? আশপাশে, এভরিহোয়্যার গেরিলা অ্যাকশন চলছে … এ. কে. ফর্টিসেভেন সকলের মনের কথা।
ভদি মাথা থেকে হ্যাট নামায়
— ফিজি, সেচিলিস, নেপাল, বর্মা, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, বিহার, আসাম, মেদিনীপুর, সাউথ চব্বিশ পরগণা, চেচনিয়া, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ডিম্যান্ডটা একবার ভেবে দেখেছেন? সাপ্লাই দিয়ে কূল পাবেন না। স্রেফ বন্দুক বেচে ওয়েস্ট বেঙ্গল লাল হয়ে যাবে। বাঙালির ঘরে ঘরে নোটের তাড়া আর কার্বাইন — ভাবা যায়?
— সে সব ঠিক আছে। কিন্তু …
চেয়ারম্যান ভদিদের কার্ডটা দেখেন।
— কিন্তু এখানে তো লেখা আ. কু. ৪৭, কেমন আকুপাংচার টাইপের নাম।
— প্রথমত নামে কি আসে যায়? দ্বিতীয়ত …
বেচামণি ভদিকে থামিয়ে দেয়।
— তুমি থামো ডার্লিং, লেট মি এক্সপ্লেন! এই নামটার একটা গভীর অর্থ আছে। ৪৭ হল স্বাধীনতার বছর আর আ. কু. মানে হল আকাশকুসুম।
— অ্যাঁ আকাশকুসুম।
— ঠিক তাই। ডিমের কুসুম নয়। ৪৭ সাল থেকে বাঙালি বন্দুকের স্বাদ পায়নি। প্রথমে আর. সি. পি. আই, পরে নক্সাল — সবই আনপ্রিপেয়ার্ড স্ট্রাগল। অথচ স্বপ্ন দেখা তো থামেনি। সেই বন্দুক আজ আমরা হাতে হাতে, ঘরে ঘরে …
— মিঃ চেয়ারম্যান, আমি করিয়া ছিলাম কি জার্মান এম. পি. ৪৩ ও এম. পি. ৪৪ যা থেকে ৭.৯২ মিমি কুর্জ এমিউনিশন ফায়ার হইত …
— প্লিজ মিঃ কালাশনিকভ ওসব টেকনিকাল ডিটেল আমার মাথায় ঢুকবে না …
— নিয়েৎ, আপনারা চাইলে আমি এ. কে ৭৪ অবধি বানাইতে পারি। ইহাতে এন. এস. পি নাইট সাইট এবং তার কাটার নাইফ-বেয়নেট ফিট হইতে পারে।
চেয়ারম্যান ঘামতে ঘামতে বেল বাজান।
— স্যার!
— চার ঠাণ্ডা লে কে আও। না কি বিয়ারই বলব?
ভদি হ্যাট পরে ফেলে।
— বলবেন না, বিয়ার আমরা খাই না।
— তা হলে স্কচ!
বেচামণি বলে ওঠে,
— আমি শুধু পেপসি।
চেয়ারম্যান একটু হিসু করার অছিলায় সংলগ্ন লাক্সারি টয়লেটে ঢুকে টাকে কোল্ড ওয়াটার স্প্রে করেন। আয়নায় নিজেকে দেখেন। কেউ নেই অথচ কানে ভৌতিক রেডিও বেজে ওঠে,
— নতুন প্লাস্টিক ম্যাগাজিনে ৩০ রাউন্ডই ভরা যায়। প্রত্যেকটা বুলেটের ওজন ৫৩.৫ গ্রেইন, সেকেন্ডে ৯০০ মিটার যায়, ফ্ল্যাট ট্র্যাজেক্টরি ধরলে ৪০০ কেন, প্রায় ৫০০ মিটার …
— ওরে বাবা, এসব জেনে আমি করবটা কী?
— হিসি।
— ঠিক আছে। করছি।
— হ্যাঁ, ঠিক করে করো আর যা বলছি শুনে যাও। কালাশনিকভ অ্যাসল্ট রাইফেলের সব মডেলই হল গ্যাস অপারেটেড।
— তাতে আমার কী?
— এক রাউন্ড ফায়ার করার সময় যে গ্যাস তৈরি হয় সেটা ব্যারেলের মাঝামাঝি জায়গা থেকে ওপরের গ্যাস সিলিন্ডারে চলে যায় ..
— আমি শুনতে চাই না।
— কেউই চায় না কিন্তু শুনতে হয়। সিলিন্ডারে ঐ গ্যাসটা প্রসারিত হয়ে পিস্টনটা পেছন দিকে ঠেলে দেয়।
— আমি শুনব না।
— এবারে একটা ঝাপড়া মারব। শুনব না। মামাবাড়ির আবদার। চোপ! পিস্টনটা লাগানো থাকে বোল্টের সঙ্গে যেটা পেছনে টান খায়। ফলে বুলেটের ফাঁকা খোলটা ইজেক্টর দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং ফায়ারিং হ্যামারটি ককড অবস্থানে চলে আসে। বোল্টটা চলার সময় একটা রিটার্ন স্পিং-এ চাপ দেয় সেটা আবার বোল্টটিকে …
— নিকুচি করেছে। এই আমি কানে আঙুল দিলাম।
— দে। কানে কেন। যেখানে পারিস দে। রিটার্ন স্প্রিংটা বোল্টটাকে এনে দেয় সামনে এবং এর মধ্যে ম্যাগাজিন এর থেকে নতুন এক রাউন্ড বুলেট চেম্বারে ঢুকে যায়। বোল্টটি তখন ফায়ারিং পোজিসনে লকড হয়ে যায় …
— বাঁচাও! বাঁচাও
টয়লেটের দরজা খুলে ঘরে ঢোকেন চেয়ারম্যান। গেলাস-এর ঢাকনাটা হাত দুয়েক ওপরে উঠে বনবন করে ঘুরছে। ঘরে কেউ নেই। কম্পিউটারের পর্দায় একটি এ কে ফর্টিসেভেনের নকশা নানাদিক থেকে দেখা যেতে থাকে। টিভি সেটটি সহসা চালু হয় এবং তাতে দেখা যায় মুখে কালো কাপড় বাঁধা একটি লোক চেয়ারম্যানের দিকে এ. কে. ফর্টিসেভেন তাক করছে, সেল ফোন বাজে, কানে ধরতেই ক্রমাগত ফায়ারিং-এর শব্দ … দ্বিবিধ পানীয়ের বোতল, গেলাস বরফ, চিমটে ইত্যাদি শোভিত ট্রে নিয়ে যে বেয়ারাটি ঢোকার কথা ছিল সে ঢুকল কিন্তু তারও হাতে অগ্নিবর্ষী এ. কে. ফর্টিসেভেন …
গুলিবিদ্ধ না হয়েই চেয়ারম্যান কেলিয়ে পড়লেন। পড়েও স্বস্তি নেই। মিঃ কালাশনিকভের সেই প্রসিদ্ধ রুশী হাসি ঘরে উড়ে বেড়াচ্ছে যার সঙ্গে স্তলিচনাইয়া ভদকার গন্ধ ও জোসেফ স্তালিনের পিঠ চাপড়ানি মিলেমিশে এক তাজ্জব সমাহার বানাইয়াছে … টিগিগ … টিগ … টিগিগ … টিগিটিগিটিগ …
এতক্ষণ যা ঘটল তা-যেমন আকাট সত্যি তেমনই তিন সত্যি হল ঘটনাটা ঘটার সময় ভদি ও বেচামণি কালীঘাটে ছিল এবং মিঃ মিখাইল কালাশনিকভ ছিলেন মস্কোতে। এসব হুজ্জুতিতে মাইরি আমাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু সমালোচকরা ছাড়বে না। ছাড়তে পারে না। কেননা তারা প্রত্যেকেই এক একটি তিলে খ।
প্রায় অন্ধকার বারান্দা। ভূতুড়ে নোংরা ডুমটি জ্বলছে। বলা নিস্প্রয়োজন যে এটি ভদির বাড়ি। রাত এইটিশ বলা ভুল হবে। উত্তরের থেকে হিমেল হাওয়ায় কত মৃত সভ্যতার দুর্বোদ্ধ ই-মেল যে আসে তার ইয়ত্তা নেই। কী বার্তা যে তারা পাঠাতে চায় তা বোঝা শিবের বাপেরও সাধ্যে কুলোবে না। এবং বিশেষভাবে উচ্চারিত হওয়ার দরকার যে পাঠোদ্ধারের কোনো চেষ্টা নেই। সকলেই যখন গা এলিয়ে দিয়েছে তখন আমাদেরও এ নিয়ে গাঁড় মারিয়ে কোনো লাভ নেই।
একটি নড়বড়ে টুল। তেপায়া। তার ওপরে বসে বিশাল দাঁড়কাক। সামনে ভক্তবৃন্দের মধ্যে ভদি, বেচামণি ও অন্য সকলকেই দেখা যাচ্ছে। র্যাপারে কান-মাথা ঢাকা দিয়ে বড়িলালও এক ফোঁকরে ঢুকে পড়েছে। সাক্ষী গোপাল সকলেরই ঘরের লোক। কিন্তু সাক্ষী বড়িলাল?
টুলের ওপরে দাঁড়কাকের সামনে বাটিতে বাংলা ঢালা হয়েছে। দাঁড়কাক ঠোঁট ডুবোয়। গলাধঃকরণ করার জন্য মাথা উঁচু করে। তারপর বলতে শুরু করে — ‘এই যে ভদি বাঞ্চোত গাঁড়ে জটা নিয়ে গুরুগিরি করচে, ওকে আমি বলেছিলুম, দ্যাখ, ভালো যদি চাস তো ভক্তের সংখ্যা বাড়াবি না। কিন্তু শালার হেভি খাঁই — স্রেফ মাল খাওয়ার ধান্দায় এলিতেলি ধরে ধরে শিষ্য বানিয়েচে। দ্যাখ, মাল সাপ্লাই কর বা নলেনকে তেল দে — আমার কিন্তু জানতে বাকি নেই কার পোঁদে গু। ভদি এখনো জানে না কিন্তু সেও একদিন বুঝবে। আমি সোজাসাপটা বলে দিলুম — যে বেইমানি করবে আমি কিন্তু গাঁড় মেরে খাল করে দেব।’
সামনে থেকে আওয়াজ ওঠে —
— ‘না, না, প্রভু, না।’
— ‘আমরা বেইমানি করব না।’
— ‘ছুটকো ছাটকা কিছু অশৈল করে থাকলে ক্ষমাঘেন্না করে দিন।’
দাঁড়কাক ফের চুক চুক করে বাটি থেকে বাংলা খায়। এক পা তুলে ঘাড় চুলকোয়। ফের শুরু করে —
— নতুন যারা এসেচে তাদের বলছি — আমরা হচ্চি আত্মারাম সরকারের বংশধর। বুঝলি? সুবল মিত্তিরের সরল বাঙ্গালা অভিধানে, নামও শুনিসনি বোধ হয়, যা আছে মেমরি থেকে কোট করে যাচ্ছি — ‘আত্মারাম সরকার বঙ্গের বিখ্যাত ভোজবিদ্যাবিশারদ। ইঁহার প্রার্দুভাবকাল সঠিকরূপে জানা যায় না।’ভারতবর্ষ’ পত্রে গঙ্গাগোবিন্দ রায় লিখিয়াছেন যে, আত্মারাম ‘বনবিষ্ণুপুর মহকুমার অন্তর্গত প্রকাশছিলিম নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।’ কিন্তু আত্মারামের বংশধর জীবনকৃষ্ণ সরকার উক্ত পত্রেই লিখিয়াছেন যে, আত্মরামের বাসস্থান হুগলী (বর্তমানে হাওড়া) জেলার অন্তর্গত কমলাপুর গ্রামে ছিল। আত্মারামের পিতার নাম মাধবরাম সরকার। মাধবরামের ৪ পুত্র, ১) বাঞ্ছারাম, ২) আত্মারাম, ৩) গোবিন্দরাম, ৪) রামপ্রসাদ। এক বাঞ্ছারাম ব্যতীত অপর তিন ভ্রাতার বংশ নাই। উল্লিখিত জীবনকৃষ্ণ সরকার বাঞ্ছারামের বৃদ্ধ প্রপৌত্র। ইঁহারা জাতিতে কায়স্থ …
দাঁড়কাক ফের বাংলা খায়। ঘাড়ের পালক ফোলায়।
— ফের কোট ঝাড়চি — মেমরি দেখেছিস … ‘শোনা যায়, আত্মারাম কামরূপ কামাখ্যা হইতে যাদুবিদ্যা শিখিয়া আসিয়াছিলেন, এবং দেশে আসিয়া বাজিকরদিগের কৌশল ব্যর্থ করিয়া দিতেন বলিয়া বাজিকরেরা অদ্যাপি তাঁহাকে গালি দিয়া থাকে। তাঁহার সম্বন্ধে অনেক অদ্ভূত গল্প শোনা যায়। তিনি নাকি চালুনি দ্বারা শিবিকা বহন করাইতেন। শেষে ভূতেরাই নাকি ছিদ্র পাইয়া তাঁহাকে মারিয়া ফেলে।’ আনকোট। কাজেই খুব সাবধান। ভদির বোতলবাজি দেখেচিস কিন্তু খালি বোতলে ভদি কী পোষে, কী বল ভদি — কাজেই খুব সাবধান। খুললেই সব বেরিয়ে আসবে। এইসা কেলাবে যে …
সামনে ফের কলরোল,
— ‘খুলবেন না দোহাই।’
— ‘ভদিদা জিন্দাবাদ। দণ্ডবায়স জিন্দাবাদ। বেইমানি নেহি চলেগা। নেহি চলেগা, নেহি চলেগা।
— চোপ । এত চ্যাঁ ভ্যাঁ করলে সব জানান হয়ে পড়বে। সায়লেন্স। তা আমাদের গুষ্টির নিয়ম হচ্ছে জন্মে জন্মে আমরা একবার করে মহাচক্রের খেলা, মহামণ্ডলের ঘুঘুচক্কর দেখিয়ে যাব। সেইমতোই চলেছে ভদির এই চাকতির মোচ্ছব। বুঝলি? আজ চেয়ারম্যান শালা নার্সিংহোমে গেছে, এর পরে দেখবি কী হয়। কোনো ঢপবাজকে আমরা রেয়াত করব না। কম করে ৫০ হাজার ছোট বড় কারখানা হয় বন্ধ নয় হাঁপের টানে ধুঁকছে। সেদিকে কারও খেয়াল নেই, বাঁড়া, ডাউনস্ট্রিম মারাচ্ছে। ফরমুলা ওয়ান রেসিং। হোটেল! কার পার্কিং প্লাজা! সামলাও এবার চাকতি?’
ফের রব ওঠে।
— ‘চাকতি কা খেল জিন্দাবাদ।
ডাউনস্ট্রিম মুর্দাবাদ’
— ‘বেচামণি বৌদি জিন্দাবাদ।
কমরেড নলেন জিন্দাবাদ।’
— ‘চেয়ারম্যানেরা নিপাত যাক।’
নিপাত যাক। নিপাত যাক।’
এরই মধ্যে পুরন্দর ভাট দুই লাইনের একটি মাল রেডি করে ডি. এস-কে কানে কানে বলে দেয়,
— ‘জয়, জয়, আত্মারাম
চেয়ারম্যানের পুঁটকি যাম।’
— বাঃ বেড়ে হয়েচে। ছাপতে দেবে না কি?
— ভাবচি।
ভাষণের শেষে দাঁড়কাক বলে
— ‘মহাপুরুষের বাণী শোন। এটাও মেমারি থেকে কোট করচি। সাধুসন্তের কথা তো। বলতে গেলেই চোখে জল এসে যায়।’
দাঁড়কাক ডানা দিয়ে চোখ মোছে। ভক্তবৃন্দের মধ্যে ফুঁপিয়ে কেউ, কেউ ডুকরে ওঠে। ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ শব্দ। দাঁড়কাক দুটি ডানাই দুপাশে মেলে দেয়। এ এক, এ এক অপার্থিব স্বর্গলোকেরই যেন বিজ্ঞাপন —
— ‘বৎস! আমি যে ভগবান ভুলিয়া তোদেরই সার করিয়াছি — তবে ভুলিব কাকে? তোদের ভুলিলে আর আমার থাকিবে কী? তোরা যে আমার হৃদয়-নিকুঞ্জের পোষা দোহেলা। সন্ধ্যা-সকালে তোদের কাকলি হৃদিতন্ত্রে না বাজিলে আমি যে অস্থির হইয়া পড়ি। … তোরা দুঃখ পেলেও আমার তাতে আনন্দ হয়, আমি তোদের ভাবে বিভোর হইয়া থাকি।’
এই বাণী কার? মূঢ় পাঠক, তুমি বলিতে পারো? পারার চান্স খুবই মিহি। যাইহোক, চেষ্টা মারানোতে দোষ নেই। ভুলভাল বললেও গর্দান যাবার চান্স নেই। একেই বোধহয় পণ্ডিতেরা বলেন বা বলবেন — গোলকায়নের বোম্বাচাক!
