Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কালিন্দী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প412 Mins Read0

    কালিন্দী – ২৫

    ২৫

    বিশীর্ণ ন্যুব্জদেহ, রক্তহীনের মত বিবর্ণ পাংশু, এক পলিতকেশ বৃদ্ধ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চাহিয়া-দাঁড়াইয়া থরথর করিয়া কাঁপিতেছিলেন। উত্তেজনার অতিশয্যে কঙ্কালসার বুকখানা হাপরের মত উঠিতেছে নামিতেছে। হেমঙ্গিনী সুনীতিকে বলিলেন, ধর, ধর সুনীতি, হয়তো পড়ে যাবেন উনি।

    ইন্দ্র রায় বিস্ময়ে বেদনায় স্তম্ভিত হইয়া গেলেন,- এই রামেশ্বর! কৌতুকহাস্যে সমুজ্জল, স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ, বিলাসী রামেশ্বর এমন হইয়া গিয়াছে! সে রামেশ্বরের একটুকু অবশেষও কি আর অবশিষ্ট নাই! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া রায় দেখিলেন, আছে কঠোর বাস্তব একটি মাত্র পরিচয়-চিহ্ন অবশেষ রাখিয়াছে, চোখের পিঙ্গল তারা দুইটি এখনও তেমনি আছে। কয়েক মুহূর্ত পর রায় দেখিলেন, না, তাও নাই; চোখের তারা তেমনি আছে, কিন্তু পিঙ্গল তারার সে দ্যুতি আর নাই। সুরহারা গানের মত অথবা রসহীন রূপের মতই সকরুণ তাহার অবস্থা।

    ধীরে ধীরে রামেশ্বরের উত্তেজনা শান্ত হইয়া আসিতেছিল। খাটের বাজু ধরিয়া দেহের কম্পন তিনি রোধ করিয়াছিলেন; কেবল ঠোঁটের সঙ্গে চিবুক পর্যন্ত অংশটি এখনও থর থর করিয়া কাঁপিতেছে, পিঙ্গল চোখে জল টলমল করিতেছে। হেমাঙ্গিনী সুনীতিকে বলিলেন, একটু বাতাস কর তুমি।

    ইন্দ্র রায়েরও চোখে জল ভরিয়া উঠিল, কোনরূপে আত্মসম্বরণ করিয়া তিনি বলিলেন, কেমন আছ?

    চোখে জল এবং কম্পিত অধর লইয়াই রামেশ্বর হাসিলেন; ইন্দ্র রায়ের কথার উত্তর দিতে গিয়া অকস্মাৎ তাঁহার রঘুবংশের মহারাজ অজের শেষ অবস্থা মনে পড়িয়া গেল, সেই শ্লোকের একটা অংশ আবৃত্তি করিয়াই তিনি বলিলেন, ‘প্লক্ষ প্ররোহ ইব সৌধতলং বিভেদ।’ ব্যাধি বটবৃক্ষের মত দেহমন্দিরে ফাট ধরিয়ে মাথা তুলেছে ইন্দ্র। এখন ভূমিস্মাৎ হাবার অপেক্ষা।

    রায়ের চোখের জল এবার আর বাধ মানিল না, টপটপ করিয়া মেঝের উপর ঝরিয়া পড়িল, অশ্রু-আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলিলেন, না না রামেশ্বর, ও-কথা বলো না তুমি, তোমাকে সুস্থ হতে হবে। আর তোমার হয়েছেই বা কি?

    রামেশ্বর ঘৃণায় মুখ বিকৃত করিয়া বলিলেন, দেখতে পাচ্ছ না?-বলিয়া হাত দুইখানি আলোর সম্মুখে প্রসারিত করিয়া ধরিলেন।

    রায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আঙুলগুলির দিকে চাহিয়া দেখিলেন; প্রদীপের আলোকের আভায় শুভ্র, শীর্ণ, অকুণ্ঠিত-অবয়ব আঙুলগুলির ভিতরের রক্তধারা পর্যন্ত পরিস্কার দেখা যাইতেছে। রায় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া দৃঢ়স্বরে বলিলেন, না, তোমার কিছু হয় নি, ও কেবল তোমার মনের ব্যাধি। মনকে তুমি শক্ত কর। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ; তোমার ছেলের বিয়ে দাও, স্ত্রী পুত্র-পুত্রবধূ নিয়ে আনন্দ কর।

    রামেশ্বর অকস্মাৎ যেন কেমন হইয়া গেলেন, অর্থহীন দৃষ্টিতে শূন্য-লোকের দিকে বিহ্বলের মত চাহিয়া রহিলেন, ঠোঁট দুইটি ঈষৎ নড়িতে লাগিল, আপন মনেই তিনি যেন কিছু বলিতেছিলেন।

    রায় রামেশ্বরের এই অসুস্থ অবস্থা দেখেন নাই, তিনি প্রথম দেখিয়া শঙ্কিত হইয়া পড়িলেন, শঙ্কিত হইয়াই তিনি ডাকিলেন, রামেশ্বর! রামেশ্বর!

    ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফিরাইয়া রামেশ্বর রায়ের দিকে চাহিলেন ; রায় বলিলেন, কি বলছ?

    বলছি? ডাকছি, ভগবানকে ডাকছি, বলছি, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ’। এ অন্ধকারের মধ্যে আর থাকতে পারছি না।

    হেমাঙ্গিনী এবার সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আসিলেন; ইন্দ্র রায় ও রামেশ্বরের কথাবার্তার ভিতর দিয়া অবস্থাটা ক্রমশঃ যেন অসহনীয় বায়ুলেশহীন অন্ধকারলোকের দিকে চলিয়াছে। দীর্ঘকাল পরে দুই বন্ধু এবং পরম আত্মীয়ের দেখা হওয়ার ফলে উভয়েই আত্মসংযম হারাইয়া স্মৃতির বেদনার তীব্র আবর্তের মধ্যে অসহায়ের মতই আবর্তিত হইয়া ভাসিয়া চলিয়াছেন। রামেশ্বরের পক্ষে এ অবস্থাটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু উচ্ছ্বাসই কথাবার্তাকে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে, রায় কথাকে টানিয়া নিজের পথে চালিত করিতে পারিতেছেন না। এ ছাড়া, এই অবস্থাটাও আর সহ্য হইতেছে না। এই বেদনাদায়ক অবস্থাটিকে স্বাভাবিক করিয়া তুলিয়া তাহার মধ্যে একটু আনন্দ সঞ্চার করিবার জন্যই তিনি সম্মুখে আসিয়া বলিলেন, আমি কিন্তু এবার রাগ করব চক্রবর্তী মশায়, আপনি আমাকে এখনও একটি কথাও বলেন নি।

    রামেশ্বর ঈষৎ চকিত হইয়া হেমাঙ্গিনীর দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন, সঙ্গে সঙ্গে গভীর বিষন্নতার মধ্য হইতেও আনন্দে একটু চঞ্চল এবং সজীব হইয়া উঠিলেন। হেমাঙ্গিনীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং প্রীতির সীমা ছিল না। নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতার মধ্যে মৃদু বাতাসের আকস্মিক সঞ্চরণে সব যেমন স্নিগ্ধ সানন্দ চাঞ্চল্যে সজীব হইয়া উঠে, হেমাঙ্গিনীর সস্নেহ সরস কৌতুকে সমস্ত ঘরখানাই তেমনি চঞ্চল সজীব হইয়া উঠিল। রামেশ্বর সত্য সত্যই এতক্ষণ হেমাঙ্গিনীকে লক্ষ্য করেন নাই। দীর্ঘকাল পরে ইন্দ্র রায় ছাড়া অন্য সকল কিছু-স্থান কাল পাত্র-তাঁহার দৃষ্টির সম্মুখ হইতে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। হেমাঙ্গিনীর কথায় রামেশ্বর তাঁহাকে লক্ষ্য করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মুখ তাঁহার আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সস্নেহে সম্ভ্রমের সহিত মৃদু হাসিয়া তিনি বলিলেন,

    ‘স্বপ্নো নু মায়া নু মতিভ্রমো নু কপ্তং নু তাবৎ ফলমেব পুণ্যৈঃ।’

    এ আমার স্বপ্ন না মায়া, না মনের ভ্রম, কিংবা কোন পুণ্যফলের ক্ষণিক সৌভাগ্য, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি এসেছেন?

    হেমাঙ্গিনী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া অকপট আনন্দে কৌতুক করিয়া বলিলেন, আমি কিন্তু স্বপ্নও নই, মায়াও নই, পুণ্যফলের সৌভাগ্য না কি বললেন, তাও নই। আমি আপনার কুটুম্বিনী। আপনি পণ্ডিত লোক, কবি মানুষ, কবিতা দিয়ে আসল কথা চাপা দিলেন। কথা তো আমিই যেচে কইলাম, আপনি তো কথা বলেন নি।

    রামেশ্বর হাসিয়া বলিলেন, তা হলে বুঝতে পারছি, জীবনে সাগরতুল্য অপরাধের মধ্যেও কোথাও ক্ষুদ্রতম প্রবালদ্বীপের মত কোন একটি পুণ্যফল অক্ষয় হয়ে আছে, যার ফলে দেবীকে নিজে এসে দর্শন দিতে হল এবং ভক্তের সঙ্গে যেচেই কথা কইতে হল। ওর জন্যে আপনি নিজেও আক্ষেপ করবেন না, আমার প্রতিও অনুযোগ করবেন না; কারণ আপনি দেবধর্ম পালন করেছেন, আমিও ভক্তের অভিমান বজায় রেখেছি।

    রামেশ্বরের কথা শুনিয়া রায় আশ্বস্ত হইলেন, কিন্তু বেদনা অনুভব না করিয়া পারিলেন না। স্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচায়ক উত্তর শুনিয়া তিনি আশ্বস্ত হইলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মনে হইল, কল্পনায় ব্যাধির সৃষ্টি, রামেশ্বরের আপনাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই প্রয়াস-এ শুধু রাধারাণির অভাব। রাধারাণিকে হারাইয়া আজ এই অবস্থা, একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলিতে গিয়া সেটাকে তিনি রুদ্ধ করিলেন। রামেশ্বরের পাশে বসিয়া অবনতমুখী সুনীতি ব্যথিত মুখেও হাসি মাখিয়া ধীরসঞ্চালনে পাখার বাতাস করিয়া চলিয়াছেন। সুনীতির দিকে চাহিয়া, তাঁহার কথা ভাবিয়া রায়ের বেদনার বাস্প জমিয়া পাথর হইয়া গেল। দীর্ঘনিঃশ্বাস রোধ করিয়াও একটি অসম্বৃত মুহূর্তে গম্ভীর স্বরে তিনি ডাকিয়া উঠিলেন, তারা, তারা মা!

    ঘরখানা সে গম্ভীর স্বরের ডাকে মুহূর্তে আবার গম্ভীর হইয়া উঠিল। রামেশ্বর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, হেমাঙ্গিনী স্তব্ধ হইয়া গেলেন, সুনীতি উদাস হইয়া সকলের দিকে কোমল করুণ দৃষ্টি মেলিয়া চাহিয়া রহিলেন।

    দেওয়ালের ব্র্যাকেটের উপর পুরানো আমলের মন্দিরের আকারের ক্লকঘড়িটার পেণ্ডুলামটা শুধু বাজিতেছিল-টক-টক, টক-টক।

    * * *

    ঘড়ির শব্দেই সহসা ইন্দ্র রায়ের খেয়াল হইল, মাহেন্দ্রযোগ পার হইয়া যাইতে আর বিলম্ব নাই। তিনি চঞ্চল হইয়া নড়িয়া-চড়িয়া বসিলেন, গলাটা একবার পরিস্কার করিয়া লইলেন, তারপর প্রাণপণে সকল দ্বিধাকে অতিক্রম করিয়া বলিলেন, রামেশ্বর!

    চক্রবর্তী একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, ম্লান হাসি হাসিয়া বলিলেন, উঠবে বলছ?

    না, আমি তোমার কাছে আজ ভিক্ষে চাইতে এসেছি।

    ভিক্ষে! রামেশ্বর চোখ বিস্ফারিত করিয়া বলিলেন, আমার কাছে?

    সুনীতিও সচকিত হইয়া উঠিলেন, মাথার ঘোমটা বাড়াইয়া দিয়া বিস্মিতভাবে রায় ও হেমাঙ্গিনীর দিকে চাহিলেন। চোখে চোখ পড়িতেই হেমাঙ্গিনী হাসিলেন।

    ইন্দ্র রায় বলিলেন, হ্যাঁ, তোমার কাছেই ভিক্ষে।

    হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ভিক্ষে বলতে হয় উনি বলুন, আমি বলছি ডাকাতি; না দিলে শুনব না, জোর করে কেড়ে নেব।

    রামেশ্বর প্রশান্ত গম্ভীর মুখে ধীরভাবে বলিলেন, রায়-গিন্নী, ভাগ্যদেবতা যার বিমুখ হন, তার লক্ষ্মী ভাণ্ডারের দরজা খুলে দিয়েই বেরিয়ে যান, ভাণ্ডারের দরজা আমার খোলা, হা-হা করছে। আপনি সে ভাণ্ডারে কিছু নেবার অছিলায় প্রবেশ করলে বুঝব, লক্ষ্মী আবার ফিরে আসছেন। কিন্তু আমার লজ্জা কি জানেন, শূণ্য ভাণ্ডারের ধুলোয় আপানার সর্বাঙ্গ ভরে যাবে।

    হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ও-কথা বলবেন না। যে ঘরে সুনীতির মত গিন্নী আছে, সে-ঘরে ধুলোর পাপ কি থাকে, না থাকতে পারে? আর সে-ঘর শূন্যও কখনও হয় না। ভাগ্য বিমুখ হয়, লক্ষ্মীও লুকিয়ে পড়েন, কিন্তু মানুষের পুণ্যের ফল, আঁধার ঘরের মানিক কোথাও যায় না। আমরা আপনার সেই মানিকের লোভে এসেছি। আমাদের ঘরে আছে এক টুকরো সোনা, সেই সোনা-টুকরোর মাথায় আপনার মানিকটি গেঁথে গয়না গড়াতে চাই, সুনীতি আর আমি, ভাগাভাগি করে সে গয়না পরব।

    ইন্দ্র রায় একটা স্বস্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন, এমন করিয়া গুছাইয়া বলিতে তিনি পারিতেন না। পুলকিত মৃদু হাসিতে তাঁহার মুখ ভরিয়া উঠিল। ও-দিকে সুনীতি বিস্ময়বিহ্বল দৃষ্টিতে হেমাঙ্গিনীর দিকে তাকাইয়া রহিলেন, তাঁহার হাত স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে, মাথার অবগুণ্ঠন প্রায় খসিয়া পড়িয়াছে, বুকের ভিতরটা উত্তেজনার স্পন্দনে দুর্‌দুর্‌ করিয়া কাঁপিতেছে। সোনা ও মানিকের অর্থ তিনি যে বুঝিতে পারিতেছেন। কিন্তু সে কি সত্য!

    গভীর চিন্তায় সারি সারি রেখায় রামেশ্বরের ললাট কুঞ্চিত হইয়া উঠিল; অনন্ত আকাশ হইতে পৃথিবী পর্যন্ত কোথায় তাঁহার কোন ঐশ্বর্য আছে, তিনি যেন তাহাই খুঁজিয়া ফিরিতেছিলেন; কিছু বুঝিতে পারিলেন না, শঙ্কিতভাবে বলিলেন, রায়-গিন্নী, আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, লক্ষ্মী যখন যান, তিনি তো শুধু বাইরের ঐশ্বর্যই নিয়ে যান না, মনকেও কাঙাল করে দিয়ে যান। আমার বোধশক্তিও লোপ পেয়েছে। আমায় আরও বুঝিয়ে বলুন।

    এবার হেমাঙ্গিনী কিছু বলিবার পূর্বেই ইন্দ্র রায় বলিলেন, আমি কন্যাদায়গ্রস্থ হয়ে তোমার আশ্রয় ভিক্ষা করতে এসেছি, তোমার অহীন্দ্রের সাথে আমার কন্যার বিবাহের সম্বন্ধ করতে এসেছি।

    মুহূর্তে রামেশ্বর পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ নিশ্চল হইয়া গেলেন। স্থির বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ইন্দ্র রায়ের দিকে চাহিয়া রহিলেন। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, আমার উমাকে আপনি দেখেছেন, সেই যে, আপনাকে কবিতা শুনিয়েছিল-বাংলা কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

    তবু রামেশ্বর কোন উত্তর দিলেন না, তেমনি স্তব্ধভাবে বিস্ফারিত চোখে অর্থহীন দৃষ্টিতে রায়-দম্পতির দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিলেন। এবার ইন্দ্র রায় ও হেমাঙ্গিনী উভয়েই শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন। রামেশ্বরের পিছনে সুনীতি বসিয়াছিলেন, আনন্দের আবেগে তাঁহার দুই চোখ বাহিয়া অশ্রুর ধারা বিন্দু বিন্দু করিয়া কোলের কাপড়ের উপর ঝরিয়া পড়িতেছিল। অকস্মাৎ সে ধারা জলের প্রাচুর্যে যেন উচ্ছ্বাসময়ী হইয়া উঠিল। ঠোঁট দুইটি থরথর করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু সেদিকে কাহারও দৃষ্টি ছিল না, হেমাঙ্গিনী ও ইন্দ্র রায় শঙ্কিতভাবে রামেশ্বরের মুখের দিকেই চাহিয়া ছিলেন।

    রামেশ্বর মুখ বিকৃত করিয়া বলিয়া উঠিলেন, আঃ, ছি ছি ছি! ঘৃণিত রোগ, বীভৎস ব্যাধি ছড়িয়ে গেল, পৃথিবীময় ছড়িয়ে গেল! এঃ!

    ইন্দ্র রায়ের আশঙ্কা এবার বাড়িয়া গেল, তিনি আর থাকিতে পারিলেন না, ডাকিলেন, রামেশ্বর! রামেশ্বর!

    কে? কে?-অপেক্ষাকৃত সহজ দৃষ্টিতে রায়ের দিকে চাহিয়া রামেশ্বর এবার বলিলেন, ও, ইন্দ্র! রায়-গিন্নী!-বলিতে বলিতেই দারুণ বেদনায় তাঁহার মুখ চোখ আর্ত সকরুণ হইয়া উঠিল, বলিলেন, আঃ, ছি ছি ছি! রায়-গিন্নী, আমার কুষ্ঠ হয়েছে, কুষ্ঠ। আমার সন্তানের দেহে আমারই রক্ত। শাপভ্রষ্টা স্বর্গের উমা–ইন্দ্র, ইন্দ্র, আঃ, ছি ছি ছি, এ তুমি কি বলছ?

    রায় পরম আন্তরিকতার সহিত গভীর স্বরে বলিলেন, ছি-ছি নয় রামেশ্বর তোমার রোগ তোমার মনের ভ্রম। আর এ বিবাহ আমার ইষ্টদেবীর প্রত্যাদেশ। মা আমাকে আদেশ করেছেন।

    রামেশ্বর আবার যেন বিহ্বল হইয়া পড়িলেন, এত বড় অভাবনীয় ঘটনার সংঘাতে তাঁহার দুর্বল রুগ্‌ণ মস্তিষ্ক ক্ষণে ক্ষণে অস্থির হইয়া উঠিতেছিল; তিনি বিহ্বলের মত বলিলেন, ইষ্টদেবী? কিন্তু-কিন্তু-

    আর কিন্তু কি হচ্ছে তোমার, বল?

    সে কি। সে যদি! -সে না বললে-

    কে? কার কথা তুমি বলছ?

    হেমাঙ্গিনী পিছন থেকে স্বামীকে আকর্ষণ করিয়া কথা বলিতে ইঙ্গিতে বারণ করিলেন, তারপর রামেশ্বরের আরও একটু কাছে আসিয়া বলিলেন, বলেছে, সেও বলেছে, হাসিমুখে বলেছে।

    রামেশ্বরের চোখ হইতে টপটপ করিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, চোখের জলের মধ্যে ম্লান হাসি হাসিয়া এবার তিনি বলিলেন, সে কি অনুমতি দিয়েছে? আপনাকে বলেছে?

    হ্যাঁ। এ বিয়ে না হলে তার গতি হচ্ছে না, সে শান্তি পাচ্ছে না। হেমাঙ্গিনীও এবার কাঁদিয়া ফেলিলেন।

    ইন্দ্র রায় সজল চক্ষে উপরের দিকে মুখ তুলিয়া ডাকিলেন, তারা তারা মা!

    দুর্বল রামেশ্বর আর আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না; দরদর ধারায় চোখের জলে বুক ভাসিয়া গেল। হেমাঙ্গিনী তাঁহাকে সান্তনা দিয়া বলিলেন, অধীর হবেন না চক্রবর্তী মশায়।–বলিয়া তিনি সুনীতির পরিত্যাক্ত পাখাখানা তুলিয়া লইয়া বাতাস করিতে আরম্ভ করিলেন। ধীরে ধীরে আত্মসম্বরণ করিয়া রামেশ্বর হেমাঙ্গিনীকে বলিলেন, আপনি একটা কথা তাকে বলবেন? একটি কবিতা। বলবেন।

    “গিরৌ কলাপী গগনে চ মেঘো লক্ষান্তরেহর্ক সলিল চ পদ্মম্‌।

    দ্বিলক্ষ দূরে কুমুদস্যনাথো যো যস্য মিত্র ন হি তস্য দূরম্‌।।”

    হেমাঙ্গিনী অশ্রুসজল চোখে বহুকষ্টে আত্মসম্বরণ করিয়া বলিলেন, বলব।

    তারপর কিছুক্ষণের জন্য ঘরখানা একেবারে স্তব্ধ হইয়া গেল। সে স্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া হেমাঙ্গিনীই আবার বলিলেন, তা হলে আমাদের কথার কি বলছেন বলুন?

    রামেশ্বর বলিলেন, ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। উমা, উমা, পর্বতদুহিতা উমার মতই সে পুণ্যবতী। ইন্দ্র ইষ্টদেবীর আদেশ পেয়েছে, আপনি তার অনুমতি পেয়েছেন, এ যে আমারই মহাভাগ্য রায়-গিন্নী। চক্রবর্তী-বাড়িতে লক্ষ্মীর প্রত্যাগমনের সময় হয়েছে। সুনীতি! কই, শাঁখ বাজাও-

    রামেশ্বরের পিছনে আত্মগোপন করিয়া সুনীতি বিরামহীন ধারায় কাঁদিয়া চলিয়াছিলেন, স্বামীর শেষ কথাটির পর আর তিনি থাকিতে পারিলেন না, অতি মৃদুস্বরে করুণতম বিলাপধ্বনিতে তাঁহার বুকের কথা মুখে ফুটিয়া বাহির হইয়া আসিল, মহীন, আমার মহীন!

    * * *

    মুহূর্তে ঘরখানা স্তব্ধ হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, ঘরের মৃদু আলোটুকু পর্যন্ত কেমন বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। হেমাঙ্গিনী, ইন্দ্র রায় অপরিসীম বেদনার আত্মগ্লানিতে যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছিলেন, রামেশ্বর আবার বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিয়া নীরবে বসিয়া ছিলেন। সুনীতির কণ্ঠও স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল। মুখে দীর্ঘ অবগুণ্ঠন টানিয়া তিনি নিশ্চল হইয়া বসিয়া ছিলেন, যেন কত অপরাধ হইয়া গিয়াছে মুহূর্তের অসংযমে। এই স্তব্ধতার মধ্যে সুনীতির সেই মৃদু বিলাপের কয়টি কথার সকরুণ ধ্বনি যেন প্রতিধ্বনিত পুঞ্জীভূত হইয়া সমস্ত ঘরখানাকে পরিপূর্ণ করিয়া ভরিয়া দিয়াছে; নিশীথযাত্রীর নীরবতার মধ্যে মাটির বুকে কীটপতঙ্গের রব ধ্বনির নিরবিচ্ছিন্ন একটি উদাস সুরে যেমন পৃথিবীর বুক হইতে অসীম শূন্য পর্যন্ত পরিপূর্ণ করিয়া দেয়।

    কিছুক্ষণ পর রামেশ্বর বলিলেন, মহীন! হ্যাঁ হ্যাঁ, মহীন। আচ্ছা, দ্বীপান্তরে এক রকম পাতা পাকিয়ে দড়ি করতে দেয়, যাতে হাতে কুষ্ঠ হয়, না?

    রায় বলিলেন, আঃ রামেশ্বর, তুমি মনকে একটু দৃঢ় কর ভাই। ও সব মিথ্যা কথা।

    হেমাঙ্গিনী একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বিবর্ণ মুখে অতি কষ্টে একটু হাসির সৃষ্টি করিয়া বলিলেন, বেশ তো, সম্বন্ধ হয়ে যাক।

    রামেশ্বর বলিলেন, না না না। এ-বিয়ে না হলে সে যে শান্তি পাচ্ছে না, তার যে গতি হচ্ছে না। রায়-গিন্নী বলেছেন, রায়-গিন্নী-

    রায় বলিলেন, না না। হবে, দু দিন পরেই হবে। তুমি ব্যস্ত হয়ো না।

    সুনীতি অন্দরের মধ্যে নির্বাসিতার মত নিতান্ত একাকিনী বাস করিলেও বায়ুতরঙ্গ ধ্বনি বহন করিয়া আনিয়া কানে তুলিয়া দেয়। এই অপমানকর রটনার ধ্বনির ক্ষীণ প্রতিধ্বনি কানে আসিয়া পৌঁছিয়াছিল। এখন হেমাঙ্গিনীর কথা- ‘এ বিবাহ না হইলে রাধারাণী শান্তি পাইতেছে না, তাঁহার গতি হইতেছে না’, ইহার মধ্য হইতে সহজেই তিনি একটি গূঢ় অর্থ উপলব্ধি করিলেন। রাধারাণীকে লইয়া রায়-বাড়ির লজ্জা সময়ক্ষেপের ক্ষয়ে ক্ষয়িত হইয়া ইন্দ্র রায়কে মাথা তুলিবার অধিকার দিয়াছিল, কিন্তু রায়-বাড়ির জীবন গণ্ডীর মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করিয়া তিনি এবং অহীন্দ্রই আবার সে ক্ষয়িত লজ্জাকে দ্বিগুন করিয়া তুলিয়াছেন, পুরানো লজ্জা আরও নূতন হইয়া উঠিয়াছে। সে আত্মগ্লানি এবং লজ্জাতেই সুনীতি অপরাধিনীর মত স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। তিনি ধীরে মৃদুস্বরে ইন্দ্র রায় এবং স্বামীর সমক্ষেই ডাকিলেন, দিদি!

    হেমাঙ্গিনী সচকিত হইয়া সুনীতির মুখের দিকে চাহিলেন, দেখিলেন, অনবদ্য প্রশান্তির একটি ক্ষীণ হাস্যরেখা সুনীতির মুখে নিশান্তের ক্ষীণ প্রসন্নতার মত ফুটিয়া উঠিয়াছে। সুনীতি বলিলেন, না দিদি, হোক, বিয়ে হোক। আমি একা আর থাকতে পারছি না। মহীন যখন ফিরে আসবে, তখন তার বিয়ে দিয়ে আবার আনন্দ করব। সুখের মধ্যে হঠাৎ তাকে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। হোক, হোক, বিয়ে হোক।

    কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া রায় বলিলেন, তোমার মঙ্গল হবে বোন, তুমি আমাকে সত্য-লজ্জা না হোক লোকলজ্জার হাত থেকে ত্রাণ করলে।

    সুনীতি উঠিয়া বলিলেন, ঠাকুরের পূজোর টাকা তুলে আসি দিদি, আর মানদাকে বলি, শাঁখ বাজাক, বাজাতে হয়। আপনি একটু বসুন দিদি, মিষ্টিমুখ করে যেতে হবে।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকবি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article চাঁপাডাঙার বউ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাঁসুলী বাঁকের উপকথা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    রাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    চৈতালী-ঘূর্ণি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গণদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.