Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কালিন্দী – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প412 Mins Read0

    কালিন্দী – ৩১

    ৩১

    শুধু ইন্দ্র রায়ই নয়, হেমাঙ্গিনীও ভুল করিলেন।

    ফুলশয্যার দিন-দুই পরেই বর ও কন্যার জোড়ে কন্যার পিত্রালয়ে আসবার বিধি আছে, ‘অষ্টমঙ্গলা’র যাহা কিছু আচার-পদ্ধতি সবই কন্যার পিত্রালয়েই পালনীয়; সুতরাং অহীন্দ্র ও উমা-রায় বাড়িতে আসিল। হেমাঙ্গিণী ও বাড়িতে আসা-যাওয়া করিলেও উমাকে ভাল করিয়া দেখিবার সুযোগ পান নাই, সুযোগ তিনি ইচ্ছা করিয়াই গ্রহণ করেন নাই। হাজার হইলেও তিনি মেয়ের মা। নদীকূলের বাসিন্দার মত, নিন্দারূপ বন্যার ভয় যে মেয়ের মায়ের অহরহ। কঠোরভাবে তিনি কন্যার জননীর কর্তব্য পালন করিয়াছেন, উমার কাছে গিয়া একদিন বসেন নাই পর্যন্ত। মানুষের মনকে বিশ্বাস নাই, কে হয়তো এখনই বলিয়া বসিবে যে, মেয়েকে তিনি কোন গোপন পরামর্শ দিতে আসিয়াছেন।

    আপন গৃহে কন্যাকে পাইয়া কন্যার মুখ দেখিয়া তিনি প্রথমটায় শিহরিয়া উঠিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই হাসিলেন, স্বামীর কথাটা তাঁহার মনে পড়িয়া গেল। রায় সেদিন বাড়ি আসিয়াই হেমাঙ্গিনীকে কথাটা বলিয়াছিলেন। হেমাঙ্গিনী হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ওদের তো আমাদের মত অজানা-অচেনাও নয়, পনেরো বছরের বর, দশ বছরের কনেও নয়।

    রায় হাসিয়া বলিয়াছিলেন, তা বটে।

    হেমাঙ্গিনী মৃদু হাসিয়া, উমার কপালে খসিয়া-পড়া চুলগুলিকে আঙুলের ডগা দিয়া তুলিয়া দিলেন, বলিলেন, স্নান করে খেয়ে-দেয়ে বেশ ভাল করে একটু ঘুমো দেখি।

    উমা নিতান্ত ছোট মেয়ে নয়, সে মায়ের মৃদু হাসি ও কথাগুলির অর্থ দুইই বেশ বুঝিতে পারিল। দুঃখে অভিমানে তাঁহার চোখ ফাটিয়া জল আসিতেছিল কিন্তু প্রাণপণে আপনাকে সংহত করিয়া সে-আবেগ সে রোধ করিল। মাথা নীচু করিয়া ধীরে ধীরে সে উঠিয়া গেল। মা মনে করিলেন, কন্যার লজ্জা। তিনি আরও একটু হাসিয়া অহীন্দ্রকে জলখাবার দিতে উঠিলেন। বিবাহ উপলক্ষে সমাগতা তরুণী কুটুম্বিনীর দল উমার সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া গিয়াছিল, উমার আজ তাহাদের মধ্যেই থাকিবার কথা। ভাঁড়ারের দিকে চলিতে চলিতে হেমাঙ্গিনী আবার হাসিলেন।

    অমল বাড়ি নাই, ইন্দ্র রায় তাহাকে সদরে পাঠাইয়াছেন। ওই চরের ব্যাপার লইয়াই সে খোদ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের নিকট এক দরবার করিতে গিয়াছে। চক্রবর্তী-বাড়ির প্রতিনিধি হইয়াই সে গিয়াছে। কলওয়ালার অত্যাচারে চরের প্রজা উৎখাত হইয়া যাইতেছে, জোরপূর্বক নদীতে বাঁধ দিয়া পাম্প করিয়া জল তোলায় জলাভাবে চাষ নষ্ট হইয়া যাইতেছে; এমন কি গরীবদের গার্হস্থ্যজীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত হইয়া গেল। যাওয়া উচিত ছিল অহীন্দ্রের। কিন্তু বিবাহের আচার-আচরণগুলির জন্য তাহার যাওয়া চলে না বলিয়াই অমল গিয়াছে চক্রবর্তী-বাড়ির প্রতিনিধিরূপে। শ্বশুর-জামাই দুইজনে উপরের ঘরে বসিয়া আলোচনা করিতেছে; আলোচনা অবশ্য একতরফা। রায় একাই কথা বলিতেছিলেন। অহীন্দ্রকে সমস্ত কথা ভাল করিয়া বুঝাইতেছিলেন।

    অহীন্দ্র নীরবে বসিয়া শুনিতেছিলেন। হেমাঙ্গিনী জলখাবার আনিয়া রায়কে বলিলেন, না বাপু তুমি কি অদ্ভুত মানুষ, জমিদারি, মকদ্দমা, দাঙ্গাহাঙ্গামা এই ছাড়া কি আর কথা নাই তোমাদের? অমলকে তো পাঠিয়ে দিলে সদরে, এইবার অহীনকে পার তো হাইকোর্টে পাঠাও?

    রায় হাসিয়া বলিলেন, জান, আকবর-শা বাদশা বারো বছর বয়সে হিন্দুস্থানের বাদশা হয়েছিলেন। জমিদারের ছেলে জমিদারির কাজ না শিখলে হবে কেন? জেলার হাকিমদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় রাখতে হবে, বিষয়-সম্পত্তির কোথায় কি আছে জানতে হবে; তবে তো! আর মোটামুটি আইন-কানুন-এগুলোও জেনে রাখতে হবে। আর দাঙ্গা-হাঙ্গামা-এগুলোও একটু-আধটু শিখতে হবে বৈকি। জান তো, ‘মাটি বাপের নয়, মাটি দাপের’? একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া মৃদু হাসিয়া রায় আবার বলিলেন, দাঙ্গাই বল, আর হাঙ্গামাই বল, আসলে হল যুদ্ধ! রাজায় রাজায় হলেই হয় যুদ্ধ, আর জমিদারে জমিদারে হলেই হয় দাঙ্গা। আসলে হলাম আমরা রাজা। ছোট অবশ্য-গরুড় আর চামচিকে যেমন আর কি! -বলিয়া তিনি হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। তারপর উঠিয়া বলিলেন, তা হলে তুমি বস বাবা। আমি একবার দেখি, সেরেস্তার কাজ অনেক বাকি পড়ে আছে। অমল এই বেলাতেই এসে পড়বে।

    অমল ফিরিল অপরাহ্নে-অপরাহ্নের প্রায় শেষভাগে। অহীন্দ্র তখন বেড়াইতে বাহির হইয়া গিয়াছে। স্বভাবধর্ম অনুযায়ী অমল শোরগোল তুলিয়া ফেলিল। সে উমাকে এক নূতন নামে চীৎকার করিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিল, উম্‌নী! উম্‌নী! এই উম্‌নী!

    হেমাঙ্গিনী ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন, ও কি? উম্‌নী আবার কি?

    হাসিয়া অমল বলিল, উমার নূতন নাম বের করেছি আমি।

    দাদার সাড়া পাইয়া উমা ঈষৎ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে হাসিমুখে আসিয়া অমলের কাছে দাঁড়াইল, অমল বলিল, তোর নূতন নাম দিয়েছি উম্‌নী; পছন্দ কি না, বল? সে আপনার সুটকেসটি খুলিতে বসিল।

    উমা কোন জবাব দিল না, হাসিতেছিল, হাসিতেই থাকিল। অমলকে পাইয়া তাহার মন যেন অনেকটা হাল্‌কা হইয়া উঠিয়াছে।

    অমল সুটকেসের তলায় চাবিটা পরাইয়া বলিল, বল্‌ বল্‌, শিগগির বল্‌- yes or no?

    উমা এবার বলিল, খারাপ নাম আবার কেউ পছন্দ করে নাকি?

    ও সব আমি বুঝি না। Say, yes or no।

    ঘাড় নাড়িয়া উমা বলিল, No।

    No! আচ্ছা, তবে থাকল, পেলি না তুই। অমল সুটকেস হইতে হাত সরাইয়া লইল।

    উমা উৎসুক হইয়া প্রশ্ন করিল, কি?

    সে জেনে তোর দরকার কি?

    অত্যন্ত ব্যগ্র হইয়া উমা এবার বলিল, না না না, তবে no নয়, no নয়। Yes-yes।

    অমল সুটকেস খুলিয়া বাহির করিল-সাঁওতাল-তাঁতীর বোনা মোটা সুতার একখানি সাঁওতালী কাপড়। সাদা ধবধবে দুধের মত জমি, প্রান্তে লাল কস্তার চওড়া সাঁওতালী মইপাড় শাড়ি। দেখিয়া উমার চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। অমল শাড়িখানি উমার হাতে দিয়া বলিল, Queen of the Santhals- মহামহিমান্বিত উম্‌নী ঠাকরুণ। যা পরে আয়, এক্ষুণি পরে আয়, দেখি কেমন মানায়। যা।

    উমা গেল, কিন্তু উৎসাহিত চঞ্চল গমনে নয়; মন্থর গতিতেই চলিয়া গেল।

    অমল হাসিয়া বলিল, তিন দিনে দেখছি, উম্‌নীর তেত্রিশ বছর বয়স বেড়ে গেছে। মেয়েটার লজ্জা এসে গেছে।

    হেমাঙ্গিনী একটু ধমক দিয়া বলিলেন, তোর জ্ঞানবুদ্ধি কোন কালে হবে না অমল। নে, মুখ-হাত ধুয়ে নে। অহীন বেড়াতে গেছে, তুই বরং একটু বেরিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে আয়।

    উত্তম কথা। উম্‌নী ঠেক্‌রুণকেও তা হলে সঙ্গে নিয়ে যাব। বলিয়াই সে হাঁকিতে আরম্ভ করিল, উম্‌নী! উম্‌নী!

    হেমাঙ্গিনী বলিলেন, না। গাঁয়ে শ্বশুর-বাড়ি; ও সব তোমার খেয়াল-খুশি মত হবে না। শ্বশুর-বাড়ির কথা ছেড়ে দিয়েও তোমার বাপই শুনলে রাগ করবেন।

    উমা সাঁওতালী শাড়ি পরিয়া আসিয়া দাঁড়াইল। অদ্ভুত রকম দেখাইতেছিল উমাকে। হেমাঙ্গিনী দেখিয়া হাসিয়া ফেলিলেন, বলিলেন, যা যা, ছেড়ে ফেল্‌ গে। অমল বলিল, না না না, এক কাজ কর উম্‌নী, সাঁওতালদের মত চুলটা বাঁধ্‌ দেখি, কতকগুলো গাঁদাফুল পর্‌ খোঁপায়। একটা ফোটো তুলে নিই তা হলে।

    ফোটোর নামে উমা আবার একটু দীপ্ত হইয়া উঠিল।

    * * *

    অমল আসিয়া উপস্থিত হইল কালিন্দীর ঘাটে। সে ঠিক জানে অহীন্দ্রকে কোথায় পাওয়া যাইবে। ঘাটের পাশে অল্প একটু দূরে একটা ভাঙনের মাথায় ঘাসের উপর অহীন্দ্র বসিয়া ছিল। ভাঙনটার ঠিক সম্মুখে ও-পারে চরের উপর সাঁওতাল-পল্লীটি দেখা যাইতেছে। পল্লীটি স্তব্ধ। চরের ও-পাশে কারখানার হিন্দুস্থানী শ্রমিক-পল্লীতে একটা ঢোল বাজিতেছে। পচুই মদের দোকান হইতে ভাসিয়া আসিতেছে উচ্ছৃঙ্খল কলরব। অহীন্দ্র স্থাণুর মত বসিয়া ও-পারের দিকে চাহিয়া ছিল। অমল পা টিপিয়া আসিয়া তাহার পিছনে দাঁড়াইল। কিন্তু তাহাতেও অহীন্দ্রের একাগ্রতা ক্ষুণ্ণ হইল না। অমল বিস্মিত হইয়া সশব্দে অগ্রসর হইয়া অহীন্দ্রের পাশে বসিয়া কহিল, ব্যাপার কি বল তো? ধ্যান করছ নাকি?

    এ আকস্মিকতায় অহীন্দ্র কিন্তু চমকিয়া উঠিল না, ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বিরক্তিভরেই সে অমলের আপাদমস্তক দৃষ্টি বুলাইয়া লইল, তারপর মৃদু হাসি হাসিয়া বলিল, তুমি!

    হাসিয়া অমল বলিল, হ্যাঁ, আমি। কিন্তু তোমার যে দেখি ধ্যানি বুদ্ধের মত অবস্থা।

    অহীন্দ্রও একটু হাসিল, তারপর বলিল, ভাবছি ওই চরটার কথা।

    ওই চরটাই তোমাকে খেলে দেখছি। ও-সব ভাবনা ছাড়, ওর ব্যবস্থা আমি করে এসেছি। কালেক্টর খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনলেন। ইমিডিয়েটলি এর ব্যবস্থা তিনি করবেন; আর্জেন্ট নোট দিয়ে তিনি আমার সামনে এস.ডি.ও-কে এন্‌কোয়ারির ভার দিলেন। সাঁওতালদের জমি সম্বন্ধে একটা স্পেশাল আইন আছে। তাতে ওদের জমি বিক্রি হয় না। সে আইন এখানে চালানো যায় কি না দেখবেন।

    কথা বলিতে বলিতে অমল অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল কলওয়ালা বিমলবাবুর উপর। বলিল, স্কাউণ্ড্রেলটার সমস্ত কথা আমি বলেছি কালেক্টারকে। দ্যাট পুয়োর ইনোসেন্ট গার্ল-ওই সারী বলে মেয়েটার কথা সুদ্ধ আমি বলেছি কালেক্টারকে।

    অহীন্দ্রের মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটিয়া উঠিল। সে হাসি দেখিয়া অমল আহত ও বিরক্ত না হইয়া পারিল না, বলিল, হাসছ যে তুমি?

    হাসছি ওই লোকটার ওপর তোমার রাগ দেখে।

    কেন? রাগের অপরাধটা কি?

    অপরাধ নয়, অবিবেচনা। মানে, ও-লোকটা আর নতুন অন্যায় কি করেছে বল? চিরকাল পৃথিবীতে বুদ্ধিমান্‌ শক্তিশালীরা দুর্বল নির্বোধের ওপর যে আচরণ করে এসেছে, তার বেশী কিছু করে নি ও বেচারী। সম্রাট বাদশা রাজা দিগ্বিজয়ী থেকে আরম্ভ করে রায়হাটের জমিদার-বংশের পূর্বপুরুষেরা পর্যন্ত সকলেই এই একই আচরণ করে এসেছেন, আপন আপন সাধ্য এবং সামর্থ্য অনুযায়ী। তুমি আমিও সুযোগ পেলে এবং সামর্থ্য থাকলে তাই করতাম; হয়তো ভবিষ্যতে করবও।

    অমল বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেল, শুধু বিস্ময় নয়, অন্তরে অন্তরে সে একটা তীব্র জ্বালাও অনুভব করিল। সে ঈষৎ উষ্মাভরেই প্রশ্ন করিল, হোয়াট ডু ইউ মীন?

    হাসিয়া অহীন্দ্র বলিল, বিশ্বচরাচরে আদিকাল থেকে যা ঘটে, ওই চরেও ঠিক তাই ঘটল বন্ধু। সাঁওতালগুলো ওই ভাবে বঞ্চিত হতেই বাধ্য, ওই মেয়েটার ওই দুর্দশাই স্বাভাবিক। চরটা এবং তোমার মধ্যে টাইম অ্যাণ্ড স্পেসের ডাইমেন্‌শন বাড়িয়ে নাও না, দেখবে চরটা বেমালুম পৃথিবীর সঙ্গে মিশে গেছে, পার্থক্য নেই।

    অমল এবার স্তব্ধ হইয়া গেল। অহীন্দ্রের কথা এবং তাহার কণ্ঠস্বরের সকরুণ আন্তরিকতা তাহাকে প্রতিবেশীর শোকের মত স্পর্শ করিল, আচ্ছন্ন করিল। অর্ধস্ফুট হাসিটুকু অহীন্দ্রের মুখে লাগিয়াই রহিল, সেই অবস্থাতেই সে গভীর চিন্তায় মগ্ন হইয়া গেল।

    অনেকক্ষণ পর অমল জোর করিয়া চিন্তাটাকে ঝাড়িয়া ফেলিয়া বলিল, হ্যাং ইয়োর বিশ্বপ্রেম। ওঠ এখন, সন্ধ্যে হয়ে গেল।

    অন্যমনস্কভাবে অহীন্দ্র বলিল,অ্যাঁ?

    ওঠ ওঠ, সন্ধ্যে হয়ে গেল। যত সব উদ্ভট চিন্তা! চল, এখন বাড়ি চল। আচ্ছন্ন স্বপ্নাতুরের মতই অহীন্দ্র উঠিল এবং অমলের সঙ্গে রায়-বাড়ির পথ ধরিল। চলিতে চলিতে অমল বলিল, দিস ইজ ব্যাড, অহীন।

    অহীন্দ্র কোন উত্তর দিল না।

    অমল তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল, ভো-ভো চিন্তাকুল মনুষ্য!

    অ্যাঁ!

    আরে রাম রাম, তুমি যে শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যাবে।

    অহীন্দ্র এ কথার কোন জবাব দিল না। তাহার কানে কোন কথাই যেন প্রবেশ করিতেছে না, শব্দ কর্ণপটহে আঘাত করিলেও অর্থ মন পর্যন্ত পৌঁছিতে পারিতেছে না। তাহার মনের অবস্থা ঠিক যেন ভাটার সমুদ্রের মত; তাহার পরিচিত পৃথিবীর সুন্দর শ্যামল তটভূমি ক্রমশ যেন মিলাইয়া একাকার হইয়া যাইতেছে-দূর হইতে দূরান্তরের অস্পষ্টতায় অপরিচয়ের মধ্যে। অথচ কোন গোপন অতল পথে কেমন করিয়া যে জীবনের সকল ঊর্ধ্বমূখী জলোচ্ছ্বাস নিন্মমুখে নিঃশেষিত হইয়া যাইতেছে, সে রহস্য তাহার অজ্ঞাত।

    উমা তখন উত্তেজিত হইয়া একটা ড্রেসিং টেবিলের কোণ ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। বেশভূষা প্রসাধন লইয়া প্রচণ্ড একটা ঝড় বহিয়া গিয়াছে ইহারই মধ্যে। সে কোনমতেই বেশভূষার পরিবর্তন করিবে না, যেমনই আছে তেমনি থাকিবে। হেমাঙ্গিনী মেয়ের উপর ভীষণ চটিয়া গিয়া হাল ছাড়িয়া দিয়াছেন, বলিয়াছেন, ‘ঘি দিয়ে ভাজ নিমের পাত, নিম না ছাড়েন আপন জাত’, তোর দোষ কি বল্‌, তোদের বংশের ধারাই এই!

    উমা কোন উত্তর করে নাই, কিন্তু তাহার কালো বড় চোখ দুইটি হইয়া উঠিয়াছিল বিদ্যুতালোকিত মেঘের মত। হেমাঙ্গিনী সে-দিকে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার ভাজ-উমার মামীমা তাঁহাকে শান্ত করিয়া মৃদুস্বরে বলিয়াছেন, ঠাকুরঝি, ও-সব হচ্ছে আজকালকার ফ্যাশান। তুমি রাগ করছ কেন? আমাদের চোখে খারাপ লাগলে কি হবে, ওদের চোখে এ-সব খুব ভাল লাগে।

    উমা তখন হইতেই ড্রেসিং-টেবিলের কোণ ধরিয়া তেমনি ভাবেই দাঁড়াইয়া আছে। সেই সাঁওতালদের মত সিঁথি বিলুপ্ত করিয়া চুল বাঁধা, খোঁপায় গাঁদাফুলের মালা, পরনে মোটা সূতার সাঁওতালী শাড়ি; এক নজরে উমাকে চিনিবার পর্যন্ত উপায় নাই। অকস্মাৎ উমা চকিত হইয়া সরিয়া দাঁড়াইল, আয়নার মধ্যে ছায়া পড়িল অহীন্দ্র ও অমলের। অহীন্দ্র ও অমল ঘরে প্রবেশ করিতেই উমা বিব্রত হইয়া পড়িল, সাঁওতালী শাড়িটা অবগুন্ঠন দিবার মত পর্যাপ্ত দীর্ঘ নয়। অমল হাসিয়া বলিল, লেট মি ইনট্রোডিউস, উম্‌নী টেকরুন অ্যাণ্ড রাঙাবাবু।

    উমা দ্রুতপদে পাশ কাটিয়া পালাইবার উদ্যোগ করিল। কিন্তু অমল বলিল, বস পোড়ারমুখী বস। একেবারে যেন নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির কলাবৌ!

    অন্যমনস্ক অহীন্দ্র পর্যন্ত এই অভিনব সজ্জায় সজ্জিতা উমাকে দেখিয়া সমস্ত ভুলিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার চোখে প্রদীপ্ত মুগ্ধ দৃষ্টি ফুটিয়া উঠিল। উজ্জ্বল মুগ্ধ হাসি হাসিয়া সে আবার বলিল, বস না উমা। ও, তুমি বুঝি ঘোমটা দেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ? কিন্তু সাঁওতালরা তো কাপড়ের আঁচলে ঘোমটা দেয় না। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

    আলনা হইতে উমার লাল ডুরে গামছাখানা টানিয়া লইয়া অহীন্দ্র বলিল, ওরা গামছার ঘোমটা দেয় এমনি করে। অগ্রসর হইয়া গামছা দিয়া সে উমার মাথায় ঘোমটা টানিয়া দিল।

    অমল হাসিয়া বলিল, দাঁড়াও দাঁড়াও, চায়ের ব্যবস্থা করি। তারপর উমিকে আজ সাঁওতালের মেয়ের মত নাচতে হবে। -বলিয়া সে বাহির হইয়া গেল।

    উমা ঘাড় হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, অহীন্দ্র অকস্মাৎ অনুভব করিল উমা কাঁদিতেছে। সে সবিস্ময়ে চিবুক ধরিয়া তাহার মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া দেখিল অনর্গল ধারায় উমার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছে। অহীন্দ্র তাহার অশ্রুসিক্ত মুখখানি বুকে চাপিয়া সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, তুমি কাঁদছ? কি হয়েছে উমা?

    উমা জোড় করিয়া চিবুক হইতে অহীন্দ্রের হাত সরাইয়া দিয়া তাহার বুকে মুখ লুকাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল। অহীন্দ্র সস্নেহে তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল, কি হয়েছে, বলবে না আমাকে? এইবার তাহার মনে হইল, সে উমাকে অবহেলা করিয়াছে। অনুতাপের উত্তাপে তাহার আবেগ গাঢ়তর হইয়া উঠিল।

    উমা তাহার বুকের মধ্যেই সবেগে মাথা নাড়িল। অহীন্দ্র দুই হাতে তাহার মুখখানি আবার তুলিয়া ধরিল। উমা চোখ বন্ধ করিল, অকস্মাৎ অহীন্দ্র চুমায় চুমায় তাহার মুখখানি ভরিয়া দিয়া তাহাকে অস্থির করিয়া তুলিল।

    আকাশে যেন পূর্ণচন্দ্র উঠিয়াছে, জীবনের রিক্ত বালুময় বেলাভূমি জলোচ্ছ্বাসের উল্লাসে আবৃত হইয়া গিয়াছে, তাহা চিরপরিচিত তটভূমির বুকের কাছে অসীম আগ্রহে আবার আগাইয়া আসিতেছে।

    * * *

    পরদিন তখনও অন্ধকারের সম্পূর্ণ ঘোর কাটে নাই। উমা এবং অহীন্দ্র সবিস্ময়ে দেখিল, কালো কালো ছায়ার মত সারিবদ্ধ কাহারা সম্মুখের রাস্তা দিয়া চলিয়াছে। সমস্ত রাত্রির মধ্যে উমা ও অহীন্দ্র ঘুমায় নাই। অহীন্দ্র উমাকে বলিয়াছে তাহার অন্তরের সকল চিন্তা সকল বেদনার কথা। উমা নিতান্ত অজ্ঞ পল্লীকন্যা নয়, সে শহরে বড় হইয়াছে, স্কুলে পড়িয়াছে। অহীন্দ্রের কথার প্রতিটি শব্দ না বুঝিলেও, আভাসে সে বুঝিয়াছে অনেক। তাহার তরুণ চিত্ত অহীন্দ্রের গৌরবে কানায় কানায় ভরিয়া উঠিয়াছে।

    অহীন্দ্র ওই কালো ছায়ার সারি দেখিয়া সবিস্ময়ে উমাকে প্রশ্ন করিল, কারা বল দেখি?

    উমা শঙ্কিত হইয়া বলিল, ডাকাত নয় তো?

    অহীন্দ্র উঠিয়া বাহিরের দরজা খুলিয়া বারান্দায় আসিয়া রেলিঙের উপর ঝুঁকিয়া দাঁড়াইল। পুরুষ-নারী-শিশু, গরু-মহিষ-ছাগল সারি বাঁধিয়া চলিয়াছে। পুরুষদের কাঁধে ভার, মেয়েদের মাথায় বোঝা, গরু-মহিষের পিঠে ছালায় বোঝাই জিনিসপত্র; নীরবে তাহারা পথ অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে। কয়খানা গরুর গাড়িও আসিতেছে ধীর মন্থর গতিতে সকলের পিছনে। বোঝাগুলির মধ্যে নিশ্চয় কোথাও মুরগীর পাল আছে, আসন্ন নিশাবসানের আভাসে তাহাদের একটা চীৎকার উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে আর একটা, তাহার পর আরও কয়েকটা।

    উমাও অহীন্দ্রের পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, সে অহীন্দ্রকে বলিল, সাঁওতাল?

    তাই মনে হচ্ছে। পরক্ষণেই সে ডাকিয়া প্রশ্ন করিল, কে? কারা যাচ্ছ তোমরা?

    মেয়েদের কণ্ঠে মৃদু গুঞ্জন ধ্বনিত হইয়া উঠিল, তাহার মধ্যে অহীন্দ্র ও উমা বুঝিল একটা শব্দ, রাঙাবাবু।

    কে একজন পুরুষ উত্তর দিল, আমরা গো-মাঝিরা।

    মাঝিরা! কোথায় যাচ্ছিস সব?

    ইখান থেকে আমরা উঠে যাচ্ছি গো-হু-ই মৌরক্ষীর ধারে লতুন চরাতে!

    উঠে যাচ্ছিস তোরা? চলে যাচ্ছিস এখান থেকে? এবারে ব্যাথিত কণ্ঠে উমা প্রশ্ন করিয়া ফেলিল।

    হেঁ গো। অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিকভাবে কথাটার উত্তর দিল, অন্য কথা শুনিবার বা উত্তর দিবার জন্য মুহূর্তের অপেক্ষাও করিল না।

    সবাই চলে যাচ্ছিস তোরা?-সকরুণ মমতায় উমা নিতান্ত শিশুর মতই অর্থহীন প্রশ্ন করিতেছিল। অহীন্দ্র নীরব, তাহার চোখে গভীর একাগ্র নিস্পলক দৃষ্টি, মুখে ক্ষুরের তীক্ষ্ণ স্বল্পপরিসর হাসি। আবার জীবনের সকল উচ্ছ্বাস স্তিমিত হইয়া ভাটায় নামিয়া চলিয়াছে।

    উমার প্রশ্নের উত্তরে একজন জবাব দিল, উই বজ্জাত চূড়া মাঝিটো আর ক-ঘর থাকলো গো। উয়ারা সায়েবের সঙ্গ সাঁট করলে, উয়ার কলে খাটবে। -বলিতে বলিতে দলটি অগ্রসর হইয়া চলিয়া গেল। মানুষের ও পশুর পায়ে, গাড়ির চাকায় পথের ধূলা উড়িয়া শূন্যালোক আচ্ছন্ন করিয়া দিল। রহস্যময় প্রত্যুষালোকের মধ্যে ধুলার আবরণখানি যবনিকার মত কালো মানুষগুলির পিছনে প্রসারিত হইয়া ক্রমে তাহাদিগকে বিলুপ্ত করিয়া দিল।

    ধীরে ধীরে আঁধার কাটিয়া আসিতেছিল। চরের উপর বয়লারের সিটি বাজিয়া উঠিল। প্রভাতের আলোকে লাল সুরকির পথ, সুদীর্ঘ চিমনি, নূতন মিল হাউস, কুলি-ব্যারাকের বাড়িঘর লইয়া চরখানা একটি নগরের মত ঝলমল করিতেছে।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকবি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article চাঁপাডাঙার বউ – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গল্পসমগ্র – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাঁসুলী বাঁকের উপকথা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    রাইকমল – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    চৈতালী-ঘূর্ণি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    ধাত্রী দেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    গণদেবতা – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025

    মহাভারতের নারী – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.