Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কালীগুণীন ও চতুরঙ্গের ফাঁদ – সৌমিক দে

    সৌমিক দে এক পাতা গল্প272 Mins Read0
    ⤷

    কালীগুণীন বনাম একচক্ষুর শাপ

    মধু মোড়ল হাতের তিনফলার গাঁইতিটা মাটিতে শুইয়ে রেখে বটগাছের

    নীচে পাথরের খণ্ড দিয়ে বাঁধানো বেদিটায় পরিশ্রান্ত হয়ে বসে পড়ল দেখে লালচাঁদ উদ্বিগ্ন স্বরে শুধালো, “কী হয়েচে মোড়লমশাই? শরীরটে কী…”

    মধু এই চুমুকের থান তালুকের ডাকসাইটে মোড়ল। তাঁর কথায় গোটা তালুক ওঠে বসে। গায়ের জোরও এই বয়সে যে কোনও জোয়ান মরদকে লজ্জা দেয়। মধুকে কেউ কখনও পরিশ্রান্ত দেখেনি, এমনকি জোয়াল দিতে দিতে যখন দশাসই বলদগুলা অবধি মুখে ফেনা তোলে, তখনও মধু মোড়ল ঘর্মাক্ত শরীরে হাসতে হাসতে মাঠ ছাড়ে। তার এই তিনফলা গাঁইতিখানা তুলতে দুইজন যুবা নাকাল হয়, সেই গাঁইতি কাঁধে ফেলে মধু হাসিমুখে হেঁটে চলে। সেই মধুকে এতখানি হতোদ্যম দেখে হাটের লোকজন একে একে জড়ো হল। লালচাঁদের কথায় মধু বললে, “দেহের সমিস্যে নয় হতভাগা, তার চাইতে ঢের বড়ো বিপদ আসচে।”

    লালচাঁদ ভ্রু কুঁচকে বললে, “হাঁ মোড়ল, শুনেচি উত্তুরে নাকি সেনাপতি খাঁ সাহেবের সঙ্গে একটা বিষম যুদ্ধ হয়েচে এক রাজার। সিংহাসন টলমল করচে। হাঁ মোড়ল, সেই যুদ্ধের তাপ কি এইখেনেও আসচে?”

    “না না, ওসব নয়। ব্যাপার আরও ভয়ানক। বুড়াবাবা আজ বিকেলে গাঁয়ের ছেলেবুড়া সবাইকে চুমুকের মাঠে তলব করেচে। তোরা খবর ছড়িয়ে দে। আজ সূর্য পাটে বসার মধ্যে মধ্যে সকলকে বুড়াবাবার কুটিরে যেতে হচ্চে। ব্যাপার বড়ো সুবিধার ঠেকচে না, বুঝেছিস?”

    বুড়াবাবা হল এই গাঁয়ের একজন সাধু। ঠিক এই গাঁয়ের নয় বটে, তবে যৌবনকাল থেকে সে এই চুমুকের থানেই এসে ঘাঁটি তৈরি করে থেকে গিয়েচে। এই চুমুকের থান সুন্দরবনের একেবারে দখিনে সাগরের উপরে প্রায় ঝুঁকে পড়া একখানা আবাদী তালুক। প্রজা সংখ্যা আনুমানিক তিন হাজার। তার মধ্যে সত্তর ভাগই মৎস্যজীবী, কিছু কৃষিজীবী, কিছু বারুজীবী আর কুমার, গোহালা। বুড়াবাবা থাকে চুমুকের থান তালুকের ঠিক মধ্যভাগে অবস্থিত একখানা বিরাট মাঠের মাঝখানে পাথরের তৈরি গৃহে। গাঁয়ের লোকেরা দুইবেলা কিছু দুধ আর ফল দিয়ে যায়। সাধু বেশিরভাগ সময়ই গোটা গাঁয়ে ঘুরঘুর করে, মাটি তোলে, আঁকজোক করে, নিয়মিত একখানা পুঁথি লেখে আর ঝুমরু কুমরুর পূজায় দিন কাটায়।

    ঝুমরু আর কুমরু এই তালুকের দুইটি জাগ্রত শিবলিঙ্গ। দু-জনের মূর্তি নাকি একরকম বিশেষ মণি দিয়ে তৈরি, যদিও এই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বহুযুগ পূর্বে, বর্তমানে তার গাত্রে কোনও মণির চিহ্ন পাওয়া যায় না, হয়তো কখনও কেউ লুঠ করে নিয়ে গিয়েচে। বুড়াবাবা যে বিস্তৃত মাঠে বাস করে, সেই মাঠের দুইদিকে দুইমুখ করে দু-খানি পাষাণ নির্মিত দেউল। ঝুমরুর মন্দিরের পিছন দিকে সাগর আর কুমরুর দেউল সাগরের দিকে মুখ করা। গাঁয়ের হিদু এবং মুসলমান প্রজা নির্বিশেষে এই ঝুমরু কুমরুকে ভীষণ সমীহ করে চলে। এই দুই মন্দিরের মধ্যে সংযোগ বলতে একখানা নাতিপ্রশস্ত অর্ধচন্দ্রাকার পরিখা রয়েচে। পরিখাটি আধখানা চাঁদের মতো ঘুরে, প্রায় আধমাইল পথ বেড় দিয়ে অপর দেউলটিতে এসে সমাপ্ত হয়েচে। এর চলতি নাম আয়েশের খাঁড়ি। কখনও হয়তো পূজারীরা এই পথ দিয়েই পরস্পর মন্দিরে পূজার্থে যাতায়াত করতেন অথবা বিশ্রাম নিতেন, তাই এমনধারা নাম। গাঁয়ের ধীবর ফয়জুলের নাতি রহিম এই সাধুর খুব গা ঘেঁষা। বছর চৌদ্দর এই কিশোর সাধুর কাছে ছবি আঁকা রপ্ত করেচে, অক্ষরজ্ঞান লাভ করেচে। বুড়াবাবার গৃহে তার অবারিত দ্বার।

    বুড়াবাবার খ্যাতি কিন্তু কোনও ভড়ং দেখিয়ে হয়নি। তালুকের কেউ কখনও তেমন পীড়ায় পীড়িত হয়ে পড়লে বুড়াবাবার নির্দেশে তাকে সাধুর ঐ পাষাণগৃহে তিনটি দিন ফেলে আসা হয়। বৃদ্ধ সাধু তার পরিচর্যা করে এবং তিনদিন পর সেই মুমূর্ষু রোগীর শতকরা আশিজনই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে আসে। এই সাধুকে বুড়াবাবা বলা হয় তার প্রাচীনত্বের কারণে, কারণ তাঁর বয়স এতগুলি বছরেও অদ্ভুতভাবে যেন থমকে রয়েচে। গাঁয়ের লোক এই মহাত্মা, মহাপ্রাণ জ্ঞানবৃদ্ধ মানুষটিকে ভগবান রূপে মান্য করে।

    বৈকাল হতেই সাধুর গৃহের মাঠে মানুষের ঢল নামল। বৃদ্ধ সাধু সেইদিকে চেয়ে উদ্বেগের স্বরে ধীরে ধীরে নিজের মুখ খুলল, – “তোমাদের আজ এভাবে ডেকেচি একটা বিশেষ কারণে বাছা। সেইবার যখন সাগরের পাড়ে যাযাবর সাধুর দলটা ডেরা ফেলল, তখন কী কুক্ষণে যে আমি নিজে সেইখানে একবার গেলাম না। গেলে হয়তো তাদের গোড়াতেই ধরে ফেলতাম এবং তাড়িয়ে দিতাম। তাহলে তারা ওভাবে গাঁয়ের পর গাঁ ঘুরে, তোমাদের সাথে সখ্যতা করে এই চুমুকের থানের গুপ্ত-রহস্যের আভাসটুকু অবধি পেতো না, আর এই বিষম বিপদও আসতো না। ঐ দলের দলপতির নাম বিকুম্ভ। কাপালিক বিকুম্ভ। তার ক্ষমতা যে ঠিক কতখানি তা তোমাদের ধারণার সম্পূর্ণ অতীত বাছা। শুনেছি, তার নাকি পোষা দানব রয়েছে। ওদের একটা শ্রেণি আছে, তার নাম যদ্দুর স্মরণ হয় ‘সংবর্তক’। এই সংবর্তক গুরুকুলের কাপালিকেরা বড়ো সর্বনাশা হয়। বিশ্ব চরাচরের যত অশুভ এবং সংহারক রাক্ষুসে জীব রয়েচে, তাদের নিয়ে ঘর সংসার এদের। বিকুম্ভ এই গাঁয়ের রহস্য ভেদ করে ফেলেচে বলেই আমার ভয় হচ্চে। একবার যদি এই মারাত্মক শক্তি তাঁর হাতে গিয়ে পড়ে, তবে মহা সর্বনাশ উপস্থিত হবে, চরাচর রসাতলে যাবে জেনে রেখো। সুমুখে অমাবস্যা। সে শয়তানের তৈরি অনুচরেরা এই দিনটাতেই সর্বাধিক ক্ষমতায় ভর করে। খুব সতর্ক থাকো তোমরা।”

    সবার হয়ে মধু মোড়ল মুখ খুলল। সে তার হাতের গুরুভার গাঁইতিটা তুলে আস্ফালন করে কইলো— “আসলেই হল বুড়াবাবা? আমরা রয়েচি না? এই অস্তরের এক ঘায়ে তাদের মুণ্ড খুলে নেব না? এ গাঁয়ের তিন হাজার প্রজা একযোগে রুখে দাঁড়ালে ঐ বিকুম্ভকে সাগরের ওইপারে রেখে আসতে আর কতক্ষণ? সে পাষণ্ড আমাদের মিঠে মিঠে কথা কয়ে ঝুমরু কুমরুর হদিশ জেনেচে বটে, কিন্তু আর একবার যদি সে এই…”

    বুড়াবাবা একখানা শ্বাস ফেলে বললে, “যদি ধরো ঐ পাষণ্ড চুমুকথানের শক্তির সন্ধান সত্যিই খুঁজে না পায়, অথবা এর রহস্য বুঝে উঠতে নাই পারে, তবুও তাঁর নিজস্ব শক্তিটুকু দিয়েই তোমাদের তিন সহস্র শক্তিশালী মানুষকে ছিন্নভিন্ন করতে তার সময় লাগবে ঠিক তিন পলকের সমান। দেহবলের গুমোর করো না বাছা। তোমাদের বুড়াবাবা যাঁকে ভয় পায়, সে কখনও সাধারণ শক্তিধর হয় কি?”

    একটু বিরতি নিয়ে সাধু আবার কইলো, “আমার সাধ্য নাই তাকে প্রতিরোধ করার, কিন্তু একটা কাজ হয়তো করা যেতে পারে। আজ সারারাত ধরে তোমাদের একটা কাজ করতে হবে। সবকয়টি লোক মিলে তোমরা মাটি, পাথর বা ডালপালা দিয়ে ঝুমরু অথবা কুমরুর যে কোনও একখানা দেউলকে চাপা দিয়ে দাও। আজই। ঐ হতভাগা মন্দিরের কথা ঠিক শুনেচে ইতিমধ্যে, তবে একই মন্দির যে দুইখানি থাকতে পারে পাশাপাশি, সেইটে তার ধারণা হবে না আশা করি। একটি মন্দিরের সন্ধান পেয়ে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না কখনও, কিন্তু একত্রে দুটির খোঁজ পেয়ে গেলে পৃথিবীতে গ্রহণ লেগে যাবে। সব সৃষ্টি তছনছ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীর কথা ভেবে আজ আমাদের এই যুদ্ধে নামতে হবে। আর বিলম্ব করো না। সাঁঝ নেমে গিয়েচে।”

    বৃদ্ধ ধীবর ফয়জুল কাঁপা কণ্ঠে কইলো, “কিন্তু বুড়াবাবা, দেবতারে মাটি চাপা দিয়া আমাদের বিপদ হবে না তো?”

    “না। হবে না। ঝুমরু আর কুমরুতে এমনিতে খুব ভাব, কিন্তু স্বভাবে দুইজন পুরোপুরি বিপরীত। দুই দেবতা যদি একজোট হয় তবে আমাদের আর ভাবনা কী? কিন্তু কখনও হয় না ফয়জুল। তোমরা এই তল্লাটের বাপ পিতামহের কাছে গল্প শোনোনি? বহুকাল পূর্বে যখন এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়, তখন ঝুমরু আর কুমরু দুইজনকেই একই দেউলে স্থাপন করা হয়েচিল। পরদিন সকালেই দেখা গেল দু-জন ঝগড়া করে মন্দিরের প্রাচীর ভেঙে বাইরে এসে গোঁসা করে বসে রয়েচে। রাজার সভাপণ্ডিত তখন দুইপাশে এই দুইটি পৃথক দেউল স্থাপন করে দুইজনকে বসিয়ে দেন। ঝুমরু বড়ো শান্ত ঠাকুর। সে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে রইল, কিন্তু কুমরু? সে বড়ো অবাধ্য। তাকে পেতলের তৈরি ইয়াব্বড়ো ভারী ভারী শেকল দিয়ে বেঁধে রেখে আসা হল। সেই থেকে কুমরু শান্ত হয়েচে। তবে রাজার পণ্ডিত সকলকে সাবধান করে দেন, যাতে কেউ কোনওরকম অস্ত্র নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ না করে। অস্ত্র দেখলে দেবতা ক্ষেপে ওঠেন। এই দুইজনকে দখল করতেই আসচে ঐ বিকুম্ভ, তার সাধুবেশী ডাকাইতের দল নিয়ে। আমার সন্দেহ তারা অমাবস্যার দিন, যখন মহাজগতের টান বিকট হয়ে ওঠে, তখন তারা আসবে।”

    মধু বিষণ্ণ স্বরে কইলো— “এ লোককথা আমিও শুনেচি, কিন্তু আপনি এসব রূপকথায় বিশ্বাস করেন বাবা?”

    বুড়াবাবা প্রশান্ত মুখে বললে, “না। করিনে। কিন্তু ঝুমরু কুমরুর মধ্যে যে অস্বাভাবিক এবং ভয়ঙ্কর শক্তি লুকিয়ে রয়েচে, তাতে বিশ্বাস করি। তোমরা কি জানো, এই মাঠে চাষ হয় না কেন? আমার শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে না কেন? এখানে থাকলে রোগী সুস্থ হয় কেন? সবচাইতে বড়ো কথা, এই গাঁয়ের নাম চুমুকের থান কেন?”

    লালচাঁদ ইতস্তত করে কইলো— “হাঁ বাবা, শুনেচি এইখানে নাকি এক বিরাট দীঘি ছিল এককালে। মন্দির পিতিষ্ঠের পরের দিন ঝুমরু কুমরু লড়াই করে রাগের বশে ঐ গোটা দীঘির জল চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলেচিল। সেই থেকেই এই নাম।”

    বৃদ্ধ সাধুর ঠোঁটে একচিলতে বিষণ্ণ হাসি খেলে গেল। বুড়া বললে- বাছা, তাই হবে হয়তো। তাই হবে।”

    লালচাঁদ আর মধু চোখে চোখে তাকাল। দু-জনেই বেশ টের পেলে যে বুড়াবাবা নিশ্চিত কিছু একটা অতি যত্নে নিজের বুকের পাঁজরে আগলে রেখেচে। অধিক বাক্য ব্যয় না করে গাঁয়ের তিনশত প্রজা কাজে লেগে পড়ল। সজল চক্ষে ভগবান কুমরু শিবলিঙ্গের কাছে শত ক্ষমা চেয়ে, বনের গাছ উৎপাটন করে, মাটি কেটে, পাথর ভেঙে, এক রাত্তিরের মধ্যে গোটা নাতিবৃহৎ মন্দিরকে লোকচক্ষুর থেকে মুছে ফেলা হল।

    পরের দিন সেই রাক্ষুসে কাপালিক সদলবলে পা রাখল চুমুকের থানে। বিকুম্ভর হিংস্র চোখে নরকের দৃষ্টি। পরনে মিশমিশে কালো আলখাল্লা, হাতে ত্রিশূল, কপালে ত্রিপুন্ড্রক, গলায় আর পায়ে লোহার রুলি। সঙ্গে এল একখানা শতজীর্ণ অকেজো কামান। এর পরের ঘটনা পুরোপুরি পরিষ্কারভাবে কোথাও জানা যায় না। শোনা যায় সেই বিভীষণ কাপালিক নাকি নিজের হাতে কামানখানাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলে, এবং গোটা তল্লাটে কোথাও তার বহু কাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান না পেয়ে কাপালিক বিকুম্ভ ঐ কামানের গুঁড়ো দিয়ে মন্ত্রের দ্বারা তার অনুগত ভয়ংকর একটা একচক্ষু দানবকে ছেড়ে দেয় গোটা তালুক জুড়ে। ঘোর অমাবস্যার মহা টানের দিন সেই হিংস্র রাক্ষস তার প্রভুর হুকুম পেয়ে গোটা চুমুকথানের সমগ্র প্রজাকে নিজের হাতে এক পলকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। কেবলমাত্র এক দেড়শত মানুষ, যারা রাক্ষসটার থেকে বাঁচতে নানান গর্তে বা টিলার ফাঁকফোকরে লুকিয়ে পড়েছিল, তাদের মধ্যে কিছু মানুষ জীবন রক্ষা করতে পারে। টিলার ভিতরে মানুষের লুকোচুরির সন্ধান পেয়ে সেই রাক্ষস নিজের প্রকাণ্ড বলশালী লেজের আঘাতে টিলাগুলিকে উপড়ে তার ভিতরের মানুষগুলোকে পিঁপড়ার ন্যায় ছুঁড়ে ফেলে সাগরের মাঝে।

    এই ভয়ংকর একচক্ষু রাক্ষসের হাত এড়িয়ে যে স্বল্প-সংখ্যক মানুষ বেঁচে গিয়েচে, সে খবর বিকুম্ভ অবগত হওয়া মাত্র নিজের মন্ত্রবলে একটি ভীষণ মেঘকে চুমুকথানে ছেড়ে দেয় সে। সেই শয়তান মেঘ প্রলয়ের রূপ নিয়ে উড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাঁয়ে। এরপর গাঁয়ের একটি মানুষও নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। একেবারে সাথে সাথে না হলেও, কিছুদিনের মধ্যেই কীভাবে যেন বেঘোরে মারা পড়ে তারা। বুড়াবাবাকে তীব্র আক্রোশে হত্যা করে বিকুম্ভ দলবল পাঠায় ঝুমরুর শিবলিঙ্গ উপড়ে আনার জন্য। সেই ডাকাতের দল নাকি কাঁপতে কাঁপতে এসে খবর দেয়, ঝুমরু দেবতা ভীষণ রূপ ধরে, প্রচণ্ড লড়াই করে তাদের সব অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছেন। এরপর ক্রোধে কাপালিক বিকুম্ভ নিজেই মন্দিরে প্রবেশ করে লড়াইতে আহ্বান করে ঝুমরুকে এবং কাঁচাখেগো দেবতা নাকি তাতে ভীষণ রুষ্ট হয়ে দুই হাতে বিকুম্ভর গলা টিপে ধরে তার প্রাণবায়ু নির্গত করে দেন।

    জীর্ণ, ক্রিষ্ট শরীরে কিশোর রহিম কোনওমতে এসে পৌঁছাল তার বুড়াবাবার ঘরে। বৃদ্ধের মৃতদেহ পড়ে রয়েচে মেঝেতে। রহিম ছোট হলেও সে বুঝে গিয়েচে যে তার আয়ুষ্কাল আর অতি সামান্যই বাকি। তার আদরের গাঁয়ের সব প্রিয় মানুষগুলো আর কেউই প্রায় জীবিত নাই। যে নৃশংস দুই মৃত্যুদূত তার সাধের তালুককে মশানে রূপান্তরিত করেচে তাদের কথা কি তার সঙ্গেই চিরকালের মতো লুপ্ত হয়ে যাবে? পৃথিবীর আর কেউই কখনও জানতে পারবে না এই সর্বনাশা পিশাচদের হত্যালীলার নির্মম ইতিহাস?

    সাধুর কুলুঙ্গি থেকে তুলোটপাতা আর কালি টেনে নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করল রহিম। এই ভয়ংকর দানবদের ছবি সে এঁকে রাখবে সবার জানার জন্য। কখনও-না-কখনও এই গাঁয়ে এমন কেউ নিশ্চয়ই পা রাখবে, যার কাছে থাকবে এই নৃশংস রহস্যকে ভেদ করার চাবিকাঠি! কালির প্রতিটি আঁচড়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনীশক্তি যেন ফুরিয়ে আসচে। ঠিক কেমন যেন দেখতে ছিল রাক্ষসদুটোকে? দু-খানি পাতায় মসীচিত্রিত করে, সাধুর নিজের লেখা দু-খানি স্থূল পুঁথির সঙ্গে বেঁধে ফেলল রহিম। বুড়াবাবা বলতো, দেশে নাকি একরকম অদ্ভুত কলকব্জা এসেচে, যা দিয়ে কাগজে লেখা ছাপা যায়। রশিবদ্ধ পুঁথিগুলি গুরুভার পিত্তলের তোরঙ্গে ভরে ফেলে, নিজের বলিষ্ঠ দুইখানি হাত দিয়ে তা আগলে ধরে পরম প্রশান্তিতে চোখ মুদ্রিত করল রহিম। তার দুই বাহুর নীচে সযত্নে রক্ষিত রইল এক ভয়াবহ, পাশবিক নরহত্যার ইতিহাস।

    “হেই ইডিয়ট কোথাকার! অত গায়ের জোরে কেউ শাবল চালায়? এটা কি চাষের মাঠ পেলে?” রবিন সাহেবের গলায় হতাশা ঠিকরে পড়ে। রবিন সাহেব কিন্তু গোরা সাহেব নয় আদপেই। তার নাম রবীন্দ্রমোহন রায়চৌধুরী। বিলেত থেকে বিস্তর ডিগ্রি অর্জন করে এসে, পুরোদস্তুর বিলিতিয়ানা বজায় রেখে সে দায়িত্ব পায় ভারতবর্ষের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের ফিল্ড কমান্ডার হিসেবে। তাকে তার সাহেবিয়ানার জন্য লোকে রবিন সাহেব বলে সম্বোধন করে থাকে। বিরক্তি সামান্য প্রশমিত হল, যখন চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে একজন বয় রবিন সাহেবের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সাহেব পাউরুটিতে কমলালেবুর মার্মালেড ছুরি দিয়ে মাখিয়ে তৃপ্তির কামড় বসিয়ে কইলো, “আচ্ছা হরিশ, তোমার মতে এইসব স্থাপত্যের বয়স কতো?”

    হরিশ মুখার্জী রবিন সাহেবের প্রিয় সহকারী। হরিশ পকেট থেকে একখানা নোটবুক খুলে বললে, “একটু বিভ্রান্তি রয়েচে সাহেব। এক-একটা বাড়িঘর এক-এক সময়ে তৈরি। মন্দিরের বয়স তো তারও শ’তিনেক বৎসর আগের। তবে আমার মনে হয় যে কোনও রহস্যময় কারণেই হোক, এই গোটা তালুকটা যখন ধ্বংস হয়, তখন সময়টা ছিল পনের’শ সালের মাঝামাঝি আন্দাজ। কিছু কিছু পরচা আর মুদ্রা দেখে বোধ হয় সে সময়টা ছিল পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের সময়কালের, অর্থাৎ যে সময়ে দিল্লীর সিংহাসন নিয়ে বৈরাম খাঁ সহ আকবর এবং হিমুর লড়াই হয়েচিল। আরও একটা কথা, কালকে এক্সকাভেশন পাথ এ আর একটা মন্দিরের সন্ধান পেয়েচে ফরোয়ার্ড টিম। পাথর আর মাটিতে একেবারে চাপা পড়ে গিয়েচিল।”

    রবিন ভ্রু নাচিয়ে বলল, “হাঁ, দেখেচি সকালে। মাটি পাথর সরিয়ে আর একখানা শিবমন্দির বেরিয়েচে। মাঠের এপার ওপারে হুবহু দুইখানি মন্দির। একটু আশ্চর্য বটে।”

    হরিশ উৎসাহিত হয়ে কইলো, “আপনি দেখেচেন সে মন্দির? কি অদ্ভুত না? ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা যেখানে মহাদেবকে পরম ভগবান হিসেবে পূজা করে, সেখানে ওই শিবলিঙ্গটি ভারী ভারী পেতলের শিকল দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল। দেখেচেন?”

    “না, আমি ভিতরে যাইনি। ওগুলো দেখার জন্য তোমরা রয়েচো। আমি দেখচিলাম মন্দির থেকে সরানো মাটি আর পাথরের আচ্ছাদনের স্তূপটা। ওখানে বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন আকারের পাথর রয়েচে। আমার মনে হয় কোনও প্রাকৃতিক কারণ নয় বরং ইচ্ছা করেই তখনকার লোকজন ওই মন্দিরটাকে মাটি চাপা দিয়েছিল নানান জায়গা থেকে পাথর মাটি বয়ে এনে। এমনটা দেখিনি কখনও যদিও।”

    “সাহেব, কুলিরা বলচিল যে ঐ দু-খানি মন্দির খুঁড়ে বের করার সময় নাকি তাদের একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েচে। যে দেহবল নিয়ে তারা কাজে নেমেচিল, মন্দিরের উপরে ওঠার পর নাকি তাদের গায়ের শক্তি অনেকখানি বেড়ে গিয়েচে অদ্ভুতভাবে, এবং আরও একটা কথা, তারা সবাই বলেচে যে পাথর খোঁড়ার সময় নাকি অদৃশ্য কেউ ওদের কুড়াল, বেলচা, গাঁতি ধরে বহুবার টান মেরেচে, কিন্তু কারুকে দেখতে পায়নি।”

    রবিন মুচকি হেসে উত্তর করল, “গায়ের জোর বেড়ে থাকে তো মন্দ কী? কিন্তু ঐ অদেখা মজুরদের কিন্তু সরকারি খাতে মজুরি দিতে পারব না আমরা।”

    বলার ধরনে হরিশ হেসে ফেলল।

    এমন সময়ে হেড জমাদার বিষণরাম এসে বলল, “সাহেব, উ বকসা খুল গিয়া। বকসে কে উপরে একঠো কঙ্কাল ভি ছিল।”

    বিষণরাম সোঁদরবনের বাদা জঙ্গলের ভূমিপুত্র। গায়ে অসম্ভব শক্তি এবং ততোধিক বিশ্বস্ত। এশিয়াটিক সোসাইটির এক সাহেবের সুপারিশে তাকে নিয়োগ করা হয়েচে। দশাসই এবং ভয়ডরহীন এই মাঝবয়সী আদিবাসী বিষণ একাধারে সাইটের হেড জমাদার, রাঁধুনি এবং রবিনের দেহরক্ষী।

    তড়িঘড়ি মাটির অনেকখানি তলা থেকে খুঁড়ে বের করা পাথরের ঘরখানাতে ঢুকে তারা দেখল কালো হয়ে যাওয়া পিতলের ভারী তোরঙ্গের মুখ হাঁ করে রয়েচে। পাশে দু-খানি অতি জীর্ণ নরকঙ্কাল শোয়ানো রয়েচে। হয়তো পাথরের কক্ষে থাকার হেতুই সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়নি, তবে একটু অসাবধানে নাড়াচাড়া করলে চূর্ণ হয়ে যাবে। রবিন সেদিকে একঝলক তাকিয়ে বললে— “পুওর ফেলো। ওইটে সম্ভবত কোনও বুড়ো মানুষের কঙ্কাল, আর এইটি কমবয়সী। আন্দাজ কুড়ির মধ্যে।”

    হরিশ আক্ষেপ করে কইলো, “বেচারিরা ঘরের মধ্যেই চাপা পড়ে মরেচে। পালাবার পথ পায়নি হয়তো।”

    রবিন পাইপে অগ্নিসংযোগ করে উত্তর দিল, “পরীক্ষা ছাড়া বলা মুশকিল, তবে এদের অবস্থান দেখে আমার মনে হয় এরা পালানোর কোনও চেষ্টাই করেনি। আমার ধারণা যদি সঠিক হয় তবে বয়স্ক মানুষটি মরেচে পাঁজরের হাড়ে কোনও অস্ত্রাঘাতে বা অতর্কিত আক্রমণের ফলে, আর ছেলেটি হয়তো মরার আগে বাক্সটিকে আগলে রেখেচিল কারোর থেকে। তবে তখনকার এ অঞ্চলের লোকেদের গায়ে শক্তি ছিল বিস্তর। কালকে যে তিনফলা যুক্ত ডিগারটা পাওয়া গেল সেইটে দেখেচো? তিনজন মিলে তুলতে হিমসিম হয়ে গেল কুলিরা, কিন্তু হয়তো ওইটাকেই তার মালিক একাই নিয়ে ঘুরে বেড়াত। নট সো শিওর মুখার্জী।”

    * * * * *

    দুইদিন পর রবিন সাহেব টেবল ল্যাম্প জ্বেলে তাঁবুর বাইরে বসে একগুচ্ছ ঝুরঝুরে পুঁথিপত্তরের উপরে গভীর মনোযোগে ঝুঁকে পরীক্ষা করচিল, এখন পাইপে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধূম নির্গত করে কইলো, “মুখার্জী, আমরা এই সাইটের নাম দিয়েচিলাম ব্লক-৩ (ই.এস)। তার যে ধাতব ফলকগুলো তৈরির কথা ছিল সেগুলি কি তৈরি?”

    “না সাহেব, কালকে লেখা হয়ে যাবে।”

    “ওয়েল, ভালোই হয়েচে, আগেরটা বদলে এটার নাম দিও- চুমুকের থান এক্সকাভেশন সাইট।”

    “আজ্ঞে?”

    “আরে চায়ের চুমুক বোঝো? সেই চুমুকের থান। কালকে পুঁথিটা ঘেঁটে পেলাম। এখানকার লোকেরা এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত হবার সময় থেকে, অর্থাৎ প্রায় সাতশো আটশো বছর আগে এই গাঁয়ের এমনটাই নামকরণ করেছিল দেখলাম। বড়ো অদ্ভুত নাম। শিবঠাকুর দুইজন নাকি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে এক দীঘি জল এক চুমুকে মেরে দিয়েচিল… হোঃ হোঃ হোঃ … রাবিশ অল। এই দুইজন ভগবান সম্ভবতঃ ভীষণ পরিশ্রমী এবং ছটফটে স্বভাবের ছিলেন। গড়িমসি বা অলসতা তাঁর না-পসন্দ।”

    “ছটফটে? ভগবান মহাদেব?”

    “আরে হ্যাঁ। পুঁথির একটা লাইনে লেখা রয়েচে যে পূজায় এসে আয়েশ করা নাকি ভগবানের চক্ষুশূল। ভগবান নিজের ত্রিনয়নে সেই আয়েশি হতভাগ্যর জীবন হরণ করে নেন, তাই একখানা অর্ধচন্দ্রাকার খাঁড়ি বানিয়ে সেইখানে সম্ভবত লুকিয়ে বিশ্রাম নিত পূজারিরা। বোঝো কাণ্ড। তার মানে আরাম করা ওনার স্বভাব বিরুদ্ধ। খাঁড়িটার বেড় বরাবর লোহার তৈরি শক্তপোক্ত নিকাশি নালা কাটা ছিল। সেই নালা উভয় মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে সমাপ্ত হয়েচে। সেইটে নিকাশি নালাও হতে পারে, আবার শিবলিঙ্গের শরীর ধোয়া জলের ধারা নিষ্ক্রমণের জন্যও হওয়া সম্ভব। সেসব অবশ্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েচে বলে কুলিরা উপড়ে ফেলে মার্কা দিয়ে রেখেচে, তবে তৎকালীন আর্কিওটেকচারটা অসাধারণ ছিল স্বীকার করতেই হয়। ওপাশের ওই মূর্তিটার কথা বলতে পারিনে, তবে এই এদিকের মূর্তিখানা দেখলুম পেতলের শেকল দিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ রয়েচে। সেটাও ছটফটে হবার পরিচায়ক বটে। আরও অনেক আজগুবি ঘটনা জানতে পারলাম পুঁথিটা পড়ে। যত্তোসব। সব স্থানীয় কুসংস্কার মুখার্জী। আবার সে যুগে নাকি রটনা রয়েচে ছিল যে এই দু’খানি শিবলিঙ্গ নাকি এক অমূল্য মণি দিয়ে তৈরি। সেসব মণি হয়তো লুটপাট হয়ে গিয়েচে, এখন শুধু নিরাভরণ শিবঠাকুর পড়ে রয়েচেন।

    এইবার হরিশের মুখেও হাসি দেখা দিল। বহু খননকার্যের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হরিশ খুব ভালোভাবেই দেখেচে, এইরকম বহু প্রাচীন শহর বা গ্রামে নানান গল্পকথা চালু থাকে। সে হেসে বললে, “বাঃ, এইটে একটু নতুন ধরণের গল্প বটে।”

    রবিন আকাশের নক্ষত্রের দিকে চেয়ে আবার ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিলে, “বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে। তুমি কি জানো হরিশ ঐ ঔষধটা কী ছিল? বাবাটিই বা কে?”

    “আজ্ঞা সাহেব? ওইটে তো একটা মনগড়া ছড়া, দিল্লীর বাদশাদের নাম মনে রাখার জন্য। ও ছড়ার কোনও ভিত্তি আছে নাকি। ছড়াটা কাল্পনিক।”

    “আর দিল্লীর বাদশারা? তাঁরা বাস্তব?”

    হরিশ ফাঁপরে পড়ল। সাহেবের মনের গতিপথ যে কোনদিকে এগোচ্চে তা ধরা দুষ্কর। তবু সে জবাব দিল— “সাহেব, ছড়াটা মনগড়া কিন্তু যাঁদের নিয়ে ছড়াটা, তাঁরা বাস্তব চরিত্র। তাঁরা ছিলেন বৈকি।”

    “আমারও তাই মত। পুরাণ বা মহাকাব্যে বর্ণিত বহু ঘটনা অলৌকিক গল্পের আকারে সাজানো রয়েচে দেখে আমরা সত্য মিথ্যার দোলাচলে পড়ে পাক খাই, কিন্তু আসল ঘটনার আসল সারমর্মটুকু ঐ গল্পের ভিতরেই সযত্নে লুকানো রয়। ইতিহাসের কচকচি মানুষ বেশিদিন স্মরণ রাখে না, কিন্তু মুখরোচক গল্পের আকারে মুড়ে দিলে তা যুগযুগ ধরে রয়ে যায়। তুমি শুম্ভ নিশুম্ভের সেনাপতি রক্তবীজের কাহিনি পড়েচো মুখার্জী? আমার মনে হয় ঐ গল্পের মধ্যে দিয়ে তৎকালীন কোনও ভয়ংকর মহামারীর বর্ণনা দেওয়া রয়েচে। রক্তবীজ একটি অতি সংক্রামক জীবাণু এবং তার আতঙ্কে দেবতারা সকলে নিজের নিজের আস্তানায় আত্মগোপন করে লুকিয়ে পড়লেন দিনের পর দিন,

    একটি জীবাণুর থেকে লক্ষ কোটি জীবাণুর জন্ম, সেই জীবাণুর একটি অংশমাত্র মাটিতে পড়লেই তা থেকে রক্তবীজের ছড়িয়ে পড়াটা গল্পের ছলে হলেও আমার মনে হয় এর ভিত্তি যে কোনও মহামারীর সঙ্গে মিলে যায়।”

    হরিশ আশ্চর্য হয়ে কইলো, “সেকি সাহেব! তাই যদি হতো, তবে মহামারী থেকে উদ্ধারের উপায় সেই গল্পে নেই কেন? সে সময়ে নিশ্চয়ই কোনও জীবনরক্ষাকারী উপায় বেরিয়েচিল, নাহলে গল্পটি বানালো কে?”

    “সাধু প্রশ্ন। মহামারীর ক্ষেত্রে জীবাণুর দল আমাদের শরীরের কোষের উপরে আক্রমণ হানে, তাই ঔষধ বেরোলে এই কোষের উপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকেই বেরোনো সম্ভব। পুরাণ অনুসারে রক্তবীজকে কে মেরেছিলেন মনে আছে তোমার?”

    মিটিমিটি হেসে রবিন নিজেই উত্তর দিল, “অদ্ভুত মিল। তাঁর নামও দেবী কৌষিকী। ঠিক তেমনই এই এক চুমুকে জলপান করারও নিশ্চয়ই কোনও ভিত্তি ছিল একসময়ে, কিন্তু এখন সে রহস্য চিরতরে হারিয়ে গিয়েচে। যা হোক, কালকে পুঁথিটা পড়তে গিয়ে তার মধ্যে দু-খানা ঝুরঝুরে ছবি পেলাম। আনাড়ি হাতের আঁকা হলেও ঐতিহাসিক মূল্য যথেষ্ট।”

    হরিশ উৎসাহিত হয়ে শুধালো— “কীসের ছবি সাহেব?”

    রবিনের এতক্ষণের কৌতুকপূর্ণ মুখচ্ছবি এইবার সামান্য পরিবর্তিত হল। “ছবি বড়ো অদ্ভুত মুখার্জী। কোনও বাস্তব সাযুজ্য দেখিনে। প্রথম ছবিটায় একটা আকাশ জোড়া মেঘের ছবি। সাধারণ মেঘ নয়। চিত্রকর সম্ভবত মেঘটাকে কোনও অশুভ শক্তি হিসেবে আঁকতে চেয়েচিল সে যুগে। মেঘখানা দাঁত নখ বিস্তার করে গাঁয়ের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়চে। আর আরও আশ্চর্যজনক হল দ্বিতীয় ছবিটা।”

    সাহেবের বলার ধরনে এই আঁধারে ঘেরা পুরাতত্ত্বের ধ্বংসপুরীর মাটিতে দাঁড়িয়ে হরিশের মনটা দুলে উঠল। একটু চেয়ে থেকে সে জিজ্ঞাসা করল,

    “কীসের ছবি সাহেব? আর আশ্চর্য ছবি কেন সেখানা?”

    “আশ্চর্যই বটে। মুখার্জী, তুমি পুরাণে কখনও কোনও একচক্ষু দানবের নাম শুনেচো? যার বিরাট লম্বাটে মাথা, বিকটাকৃতি দুইখানি হাতে দু’খানা বিশাল গাছ, প্রকাণ্ড বলশালী লেজ এবং …”

    “এবং?”

    “এবং ঠিক পেটের কাছটায় একখানা জ্বলজ্বলে, হিংস্র চোখ! এই যে, এই ছবিটা। একবার দেখো মুখার্জী, এক্সকাভেশন সাইটগুলোতে তো তুমি কিছু নতুন নও, বহুবার বহু প্রাচীন ছবি দেখেছো, কিন্তু এইরকম ভয়ঙ্কর চোখ কোথাও দেখেছো কি? দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে গোটা শহর, গাঁকে ঐ চোখের নজরেই ছাই করে ফেলবে। টেরেবল্।”

    * * * * *

    রবিন সাহেবের এই দলটা তাঁর তত্বাবধানে বহু সাইটে অনেক অনেক স্থাপত্য আবিষ্কার করেচে, কিন্তু রবিন মুখে কিছু না বললেও সে লক্ষ করেচে যে এই চুমুকের থানে এসে অবধি সবকয়টি লোক কেমন যেন নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছে। শুধু উৎসাহের অভাব নয়, প্রতিটি কর্মচারী যেন কেমন একটা ভীত হয়ে থাকচে।

    সেদিন শাবলচি কিষেণ সিং ভয়ে ভয়ে বললে, “সাহাব, এ সাইটে কুছু গড়বড় আছে জরুর। কাজ করি করি, শুধু মনে হয় কোনও জানবর আমাদের দিকে নজর রাখচে। বড়া সা জানবর। মুখ ঘুরিয়ে তাকাব তো সব বিলকুল সাফ, আর কেউ নাই!”

    রবিন বিরক্ত হয়ে বললে, “দেখতেই যদি না পেলি তো বুঝলি কী করে কেউ তাকিয়ে আছে? বড়া জানোয়ার আবার কী আছে এখানে? বাঘ তো থাকে সেই…”

    “না সাহাব, শের উর না। আরও জবর কুছু। তাকালেই ছুপে যায়।” রবিন হাঁক দিয়ে হরিশকে ডেকে কইলো, “হেই মুখার্জী, এই জঙ্গলে ডায়নোসর রয়েচে?”

    সাহেবের কথার ধরন শুনে হরিশ হো হো করে হেসে উঠে বলল, “না সাহেব, তারা বিলুপ্ত। কিন্তু কেন!”

    “কেন আবার কী? ব্যাটাচ্ছেলের কথা শুনে ওই বিলুপ্ত জীবটার কথাই মাথায় আসে।”

    কিষেণ সাহেবের বলা জীবটাকে ঠিক ধারণা করতে না পেরে মুখ গম্ভীর করে চলে গেল। রবিনের এই বিদ্রূপ কিন্তু তিন চারদিনের মধ্যেই ভীষণ আকার ধরল। বিষণরাম এই দলের মধ্যে অত্যন্ত ডাকাবুকো এবং নির্ভীক বলে পরিচিত। সেই বিষণরাম একদিন সন্ধ্যায় যখন সাহেব মাঠের মধ্যে নিজের টেবিল পেতে কাজ করচে, সে সময়ে নিজের হাতেই চায়ের জোগাড়যন্ত্র নিয়ে উপস্থিত ছিল। পিরিচের মধ্যে পেয়ালা বসিয়ে, তাতে চা ঢেলে চামচ দিয়ে শর্করা মিশিয়ে নাড়চে, এমন সময়ে পেয়ালা থেকে কিছুটা চা চলকে টেবিলে পড়ল। রবিন মুখ না তুলেই কিঞ্চিৎ বিরক্ত মুখে বলল,

    “হেই, সামলে। জরুরি কাগজ রয়েচে।”

    একটু পরেই আবার একটু চা ছিটকে কাগজে পড়া মাত্র সাহেব ক্ষিপ্ত হয়ে

    “হোঃ ইডিয়ট, তোমার চোখ কি…” বলে বিষণের দিকে তাকানো মাত্র বিস্মিত হয়ে পড়ল! বিষণরাম এক হাতে পেয়ালার চামচটা নাড়ছে, কিন্তু তার ভয়ার্ত দৃষ্টি রয়েচে ওপারের বনের দিকে। অসাবধান, কাঁপা হাতের থেকে চা ছিটকে পড়চে টেবিলে। চুমুকের থান সাইট চালু হয়েচে প্রায় দুই মাস, কিন্তু এই কয়দিনে রবিন এই ডাকাবুকো বিষণকে কখনও এত ভীত দেখেনি। রবিন একঝলক সাগরপাড়ের বনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে সামান্য কড়া সুরে কইলো- “কী আছে ওখানে! কী দেখচো?”

    বিষণের গলাটা যেন সামান্য কেঁপে গেল, “সাহেব, আমার চোখের ভুল হতে পারে, কিন্তু হঠাৎ মনে হল ঐ জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে আরও উঁচু কী একটা ছায়ামূর্তি যেন সরে গেল। আমি এই বাদাবনের মানুষ সাহেব, কিন্তু এইরকম দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি।”

    কথাটা সেখানেই চাপা পড়ে রইল, কিন্তু কুলি কামিনরা কেমন যেন বেঁকে বসেচে। তারা পরিষ্কার কিছু দেখতে না পেলেও সবসময় তাদের মনে হয় কিছু একটা যেন সবসময়ই আড়াল আবডাল থেকে তাদের দিকে হিংস্র নজর রেখেচে। রবিন মনে মনে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। এক্সকাভেশনের কুলিমজুরদের সে যথেষ্ট চেনে। এমনিতেই এই পুরাতত্ত্বের কাজকে তারা অভিশাপের চোখে দেখে, তায় একবার যদি এদের মনে কোনও ভয় বা কুসংস্কার ঢুকে পড়ে তবে লক্ষ টাকা খরচ করেও দলটাকে দিয়ে আর একতিল মাটি খোঁড়ানো যাবে না। কিন্তু এতগুলো মানুষ তো মিথ্যা বলচে না? আচ্ছা, এমন কী জন্তু রয়েচে, যেটা আক্রমণ করে না অথচ লুকিয়ে নজর রাখে?

    পরদিন দুপুরে রবিন, হরিশ এবং বিষণরাম লম্বা ঘুমিয়ে নিল, আর রাত্তিরে সবাইকে গোপন রেখে তারা ঘাপটি মেরে বসল প্রহরা দিতে। রবিনের হাতে এম.এল ফর্টির দুইনলা, হরিশের হাতে সাহেবের পঁয়তাল্লিশ বোরের পিস্তল। ব্রাউনিং সাহেবের তৈরি এই পিস্তলের একটি গুলিতে হাতিও মাটি নেয়, এবং বিষণরাম নিল সাইটের গাছ কাটার একখানা বিরাট খাঁড়ার মতো অস্ত্ৰ। তিনজন তিনদিকে লুকিয়ে থেকে সারা রাত ধরে পাহারা দিল কিন্তু সকালে টের পাওয়া গেল আততায়ী যেই হোক, সে সাহেবের থেকে শতগুণ অধিক বুদ্ধি ধরে। সকালে যখন মোটামুটি কুলির দল ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছে, তখন রবিন তাঁবুতে ঢুকে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

    গোটা তাঁবুটা কেউ যেন নিঃশব্দে তছনছ করে গিয়েচে! সাহেবের তোরঙ্গ, সুটকেস, কাগজপত্তর সব তোলপাড়, এবং সবচাইতে সর্বনাশের কথা হল ঐ পাথরের ঘরখানি থেকে পাওয়া পুঁথিপত্রের সঙ্গে একখানা অপেক্ষাকৃত ছোটো পুঁথিও ছিল। সেখানা কোথাও নাই। সেইটে কিছু দুর্বোধ্য ছবি আর সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে রচিত ছিল বলেই তার পাঠোদ্ধার করতে অক্ষম হয়ে রবিন সেইটা তুলে রেখেচিল এশিয়াটিক সোসাইটির পণ্ডিতদের কাছে পাঠানোর জন্য, কিন্তু সেই যুগের এই এতগুলি প্রামাণ্য পুঁথি থাকা সত্ত্বেও চোর সেগুলি ফেলে চুরি করেচে ঐ দুর্বোধ্য পুঁথিটাই! নাহ্, শুধু তাই নয়, সেদিনের ঐ ছবি দু-খানা কোথায়? আশ্চর্য! সেই দুটিও নাই গোটা তাঁবুতে! এইরকম চুরির উদ্দেশ্য কী?

    চার পাঁচজন মিলে যখন তন্নতন্ন করে তাঁবুর ভিতরে, বাইরে তল্লাশি করে চলেচে, হঠাৎ বিষণরাম সন্দিগ্ধ স্বরে ভ্রু কুঞ্চিত করে বললে— “হায় রামজী, ওটা কী আছে সাহেবজী?”

    সাহেব বন্দুক নিয়ে দৌড়ে এসে দেখলো, তাঁবুর পিছনের নরম জমি জুড়ে একরকম অতি অদ্ভুত পায়ের ছাপ। ছাপগুলি পিছনের জঙ্গল থেকে তাঁবু অবধি এসেচে, আবার জঙ্গলে ফিরে গিয়েচে। গোড়ালির দিকটা ভোঁতা এবং অনেকখানি প্রশস্ত এবং সেই পায়ের সামনে তিনখানা করে ছুঁচালো নখের ছাপ। ঠিক যেন কোনও বিরাট আকৃতির টিকটিকি জাতীয় জীব! কিন্তু এটা কী ধরনের জন্তু, যা কিনা আকারে আনুমানিক সরীসৃপ গোত্রের অথচ তার চুরি করার বুদ্ধি রয়েচে?

    রবিন বন্দুক হাতে জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল। সঙ্গে হরিশ, রবিন এবং আরও দুই চারজন অপেক্ষাকৃত সাহসী কুলি। বনের ভিতরে পায়ের ছাপ মিলিয়ে গিয়েচে ঝোপঝাড়ে। বিষণরাম একটু ভ্রু কুঁচকে হরিশের পিছনের একখানা ঝোপের ডালপালা থেকে একটা কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ জিনিস ছাড়িয়ে এনে বললে, “এই দেখুন সাহেব, এইটা গাছের গায়ে আটকে ছিল।”

    রবিন জিনিসটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে কইলো, “এ তো দেখছি একগাছি লোম। নিশ্চয়ই চলে যাবার সময়ে গাছের গায়ে তার দেহ ঘষা খেয়েচিল। কিন্তু আশ্চর্য বটে! সরীসৃপ জাতীয় জীবের দেহে লোম! মানুষের চুলের থেকে অনেকখানি মোটা এবং অত্যন্ত খসখসে। এমনটা তো শুনিনি! এটা কী ধরনের জন্তু? জন্তুই তো বটে?”

    কুলিদের মুখ দেখে বোঝা গেল, তারা পুরো ঘটনাটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেচে এবং এক মুহূর্তও এই অপয়া তল্লাটে থাকতে চায় না।

    *****

    রাতে সাহেবের শেষদফার চা পানের সময়ে রবিন লক্ষ করল বিষণরাম কিছু একটা বলার জন্য যেন উশখুশ করচে। রবিন ক্লান্ত স্বরে কইলো, “কিছু বলবে বিষণ?”

    বিষণ দূরে হরিশের তাঁবুর দিকে একবার চেয়ে নিয়ে বললে, “সাহেব, আমরা সকালে যখন জঙ্গলে উও শয়তানকে চুঁড়তে গেলাম, তখন মুখার্জী সাহেব ভি গাছের গায়ে ও শয়তানের পশম দেখেচিল, লেকিন আমার কেন যেন লাগল যে মুখার্জী সাহেব সেটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমার গলতি ভি হতে পারে সাহেব, লেকিন আমার মনে হল।”

    “না না, ওসব কিছু নয়। রাবিশ। মুখার্জী দেখতে পায়নি নিশ্চয়ই। ও খুব বিশ্বাসী লোক।”

    “তাই হবে সাহেব। গলতি মাফ।” বিষণরাম গম্ভীর মুখে চলে গেলে পর রবিন নূতন দুশ্চিন্তায় পড়ল। গত পরশুর নোট-শিট রিপোর্ট, সাইক্লিং লগবুক এমনকি আর্কিও বুক স্টাডির শেষ পাতাতেও পরিষ্কার করে সে সবকয়টি পুঁথি তথা উৎখননের পরে যা যা পাওয়া গিয়েচে, তার খুঁটিনাটি পুরো তালিকাই সে কলকাতার আপিসে পাঠিয়ে দিয়েচে। এখন তার থেকে কয়েকটি পুরাবস্তু না পাওয়া গেলে কিন্তু ক্ষমা চেয়ে পার পাওয়া চলবে না। এর দণ্ড কারাবাস। কঠোর শাস্তি। সবচেয়ে বড়ো কথা সারা জীবনের মতো তার সুনাম নষ্ট হয়ে পড়বে। আর কোনও আর্কিও সাইটের অধিকর্তা হবার যোগ্যতা তার থাকবে কি? আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল, ঐ প্রাচীন পুঁথিগুলি ঠিক সাহিত্য অথবা তৎকালীন সমাজদর্শন এর পুঁথি তো নয়। যেন অন্য কিছু। কী ছিল ঐ পুঁথিগুলোয়? কোনও গোপন বিদ্যে নয় তো? এই চুরির উদ্দেশ্য কী?

    *****

    মনের তীব্র উদ্বেগ কিন্তু বুদ্ধিমান রবিন মনেই আবদ্ধ রেখে দিল, কারণ বহু সাইটে কাজ করার সুবাদে রবিন ভালোই বোঝে যে উদ্বেগ এবং ভয় জিনিসটা ভীষণ সংক্রামক। একবার যদি মজুরদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে তবে দু’দিনে সাইটে কুলুপ পড়ে যাবে। রবিন আর হরিশ এক টেবিলে খেতে বসেচে রোজকার মতো। হরিশের মুখে চিন্তা, বিষণের মুখে সন্দেহ। রবিন পরিবেশটা হালকা করার জন্য একটু হেসে বললে, “মুখার্জী, আর এক চামচ মাংস নাও। খাঁটি পাঁঠার কালিয়া, তায় বিষণের হাতে রাঁধা…”

    সহকারী রাঁধুনি জগন্নাথ হাতজোড় করে বললে, “কালকে পাঁঠা পাওয়া যায়নি গাঁ খুঁজেও, দু-খানা ধাড়ি রামছাগল জোগাড় করেচে বিষণরাম। কিন্তু এই মাংসও বহুত বড়িয়া….

    বিষণ ঠাস করে জগন্নাথকে একটি চপেটাঘাত করে রেগে গিয়ে বললে,

    “নষ্ট করে দিলি সাহেবের খানা হতভাগা? রামপাঁঠা কোথাকার। তোর কি একতিল বুদ্ধিশুদ্ধি নাই রে?”

    রবিন হেসে বলল, “আহা, ঠিক আছে। ছাগ মাংসই বা মন্দ কীসে? তোমার হাতের গুণে সব সমান।”

    বিষণ লজ্জিত হয়ে একটু হেসে বলল – “সাহেব, একটা কথা। ঐ ছাগল জোগাড় করতে গাঁয়ে গিয়ে শুনলাম ঐ সাগরের তীরে নাকি একদল সন্নিসী তাঁবু ফেলেচে। গাঁয়ের লোকেরা বলে ওরা নাকি কাপালিক।”

    রবিন ভ্রু কুঁচকে জবাব দিলে, “কাপালিক? ধুরোঃ। তারা আবার তাঁবু ফেলে নাকি?”

    বিষণ এবার কিন্তু হাসলো না।

    “তাঁবুটা কথার কথা সাহেব, কিন্তু ডেরা তারা ফেলেচে তা ঠিক। অনেকেই দেখেচে তাদের।”

    হরিশ বিরক্ত স্বরে কইলো, “এই কথা সাহেব শুনে কী করবেন বিষণ? তারা তাদের মতো থাকবে, আমরা আমাদের মতো।”

    রবিন সমর্থন করে উত্তর দিল, “হাঁ বিষণ, বাইরের লোক সাইটে না ঢুকে পড়লেই হল। বাকি কিছু আমাদের দেখার কোনও…”

    বিষণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জী সাহেব।”

    ঠিক হপ্তা না পেরোতেই ছোট পুত্রসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সাইটে এসে নামল মিসেস সরোজিনী, রবিন সাহেবের যোগ্যা সহধর্মিণী। সরোজিনী বিভিন্ন এক্সকাভেশন সাইটের প্রামাণ্য ফোটোগ্রাফ এবং তেলরঙের প্রামাণ্য ছবি আঁকার কাজে গভর্নমেন্টের দ্বারা উচ্চ বেতনে নিযুক্ত। কর্মচারীরা উচ্চপদস্থ মেমসাহেবের কাজের জন্য তড়িঘড়ি একখানি স্বতন্ত্র তাঁবু ফেলে দিল। স্ত্রীকে নিকটে পেয়ে রবিনের দুশ্চিন্তার মধ্যেও কিঞ্চিৎ ভার লাঘব হল। সব কথা শোনার পর সরোজিনীর ললাটে ভাঁজ পড়ল। সাইটের নথিভুক্ত পুরাতাত্ত্বিক দ্রব্যের সন্ধান না পাওয়ার দন্ড সম্বন্ধে সে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমার বোধ হচ্চে কেউ বা কারা চাইচে যাতে এই সাইটের লোকেদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আমাদের চুমুকের থান থেকে তাড়াতে পারে। আমি এই অদৃশ্য বাধার কিছুটা টের পেয়েছি, কিন্তু কারুকে বলিনি। কিন্তু সরাসরি ভয় দেখিয়ে তাড়ানো অত সহজ নয়, বিশেষত তুমি থাকতে, ফলে তারা আমাদের বেরুবার পথ আটকে দিয়েচে যাতে আমাদের মনে পালানোর স্পৃহাটাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। কৈ আমার প্রবেশের সময় তো কোনও বাধা আসেনি। তাঁরা চাইচে যাতে সবকয়টি মানুষ একসাথে সাইট শূন্য করে পালাতে বাধ্য হয়, কারণ ছোট ছোট দলে পালাতে দিলে সাইট খালি হবার আগেই শহরে খবর পৌঁছে আরও দলবল চলে আসবে।”

    রবিন খতিয়ে দেখে স্ত্রী-র সিদ্ধান্ত নিতান্ত অবহেলা করতে পারলে না।

    *****

    রবিন নিজের পুঁথি হারানোর দুশ্চিন্তা সযত্নে গোপন রেখেছিল বাকিদের সাহস জোগানোর জন্য। একজন সুযোগ্য প্রশাসক মাত্রই তাই করবে, কিন্তু এইবার যে অদ্ভুত কাণ্ডটা আরম্ভ হল তাতে সমস্ত কুলিমজুরদের মধ্যে ভীষণ ত্ৰাস ছড়িয়ে পড়ল।

    সেদিন অন্য একটা দিকে মাটি খুঁড়ে, বুরুশ দিয়ে স্থাপত্যের অন্যান্য অংশগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ চলচে, লোকজন যে যার কাজে ব্যস্ত, আচমকা গোটা তল্লাট থরথর করে নড়ে উঠল। কুলি-মজুররা একযোগে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করল। সে কাঁপুনি কিন্তু এক মুহূর্তের কাঁপুনি নয়, একটু করে থামে আবার সবেগে মাটি দুলে ওঠে। দৌড়াতে থাকা লোকেরা কেউ কেউ মাথা ঘুরে পড়ে গেল, কেউ বা মাটিতেই আতঙ্কে শুয়ে পড়ল। কিছু সময় এইভাবে চলার পর একসময় তাণ্ডব শান্ত হলে পর কুলি-কামিনরা প্রাণপণ ছুটে ফিরে এল তাদের ডেরায়। রবিন নিজেও এই ঘটনায় হতচকিত হয়ে পড়েছে। সে কাঁপুনি এতটাই তীব্র যে সাগরের জল কয়েক রাশি এগিয়ে এসে বনের ভিতর ঢুকে এসেচিল। যা হোক, এই ঘটনাকে বড়োসড়ো ভূমিকম্প মনে করে দিন দুয়েক জোর আলোচনা চলল এবং স্বভাবতই তা ফিকে হয়ে গিয়ে যে যার কাজে আবার লিপ্ত হয়ে পড়ল।

    সেদিনের ওই আকস্মিক ভূকম্পন যে সত্যিই আকস্মিক ছিল না তার প্রমাণ পাওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। পরদিন দলে ভাঙন ধরল। সকালে নোটবাবু রামকৃষ্ণ শুষ্ক মুখে সাহেবের তাঁবুতে এসে কইলো, “সাহেব, আমার কিছুদিনের জন্য ছুটি মঞ্জুর করতে হবে। বাড়িতে বড়ো অসুখ।”

    রবিন ক্লিষ্ট মুখে নোটবাবুর দিকে চেয়ে বললে, “পালাচ্চো ভটচায্?” রামকৃষ্ণ অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে উত্তর দিল, “সেকি সাহেব, কক্ষণও না। সত্যিই আমার বৌয়ের…”

    “সত্যি? এই অজ গাঁয়ের সাইটে বসে খবর পেলে কী উপায়ে? চিঠি আসেনি তো বিগত একহপ্তায়?”

    রামকৃষ্ণ এইবার কিঞ্চিৎ উগ্র হয়ে উত্তরে জানাল যে ছুটি তার চাইই। রবিন হতোদ্যম হয়ে মনে মনে টের পেলে যে ভাঙন সবে আরম্ভ মাত্র। একখানা দস্তখত্ করে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে কইলো, “তুমি একজন পদস্থ কর্মচারী ভটচায্। তুমি যদি পালালে তবে থাকলো কে? আমি তো বরং নিজের পুরো পরিবার সমেত রয়েচি। বিপদ আমারই অধিক। এরপর সাইটের কুলি মজুর সকলেই এরপর একে একে…”

    বিষণরাম হাতজোড় করে বললে, “বেয়াদপি মাপ নোটবাবু, আপনি চলে গিয়েচেন জানলে আমার পক্ষে লোকজনকে সাহস দেওয়া আর চলবে না। ধীরে ধীরে সবাই আপনার পথ ধরবে কর্তা।”

    রামকৃষ্ণ নিম্নপদস্থ বিষণরামের ধৃষ্টতায় একবার অবাক হয়েও কোনও ওজর আপত্তি না শুনে চলে গেল সাইট ছেড়ে। প্রাণের মায়া বড়ো বালাই। খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বিলম্ব হল না। সাহেবের আশঙ্কা নির্ভুল। কুলির দল বিপদ আশঙ্কা করে পলায়নে মরিয়া হয়ে উঠল এবং পালাতে গিয়েই প্রথম তারা টের পেল যে গতিক বড়ো মন্দ। যতবার ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা চুমুকের থান থেকে বেরোনোর চেষ্টা করে, ততবারই যেন কোনও এক অদেখা রাক্ষস তাদের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে পড়ে! কখনও দাউদাউ করে বনে আগুন ধরে পথ রুখে দাঁড়ায়, তো কখনও বা পালাবার পথ ফেটে অতল হাঁ হয়ে বসে থাকে, আবার কখনও ভীষণ ঝড় বৃষ্টির সঙ্গে চাবুকের ন্যায় ভীষণ বজ্ৰ আছড়ে পড়তে থাকে দিগন্ত জুড়ে!

    কিছুদিন এভাবে পলায়নের চেষ্টা করে হতোদ্যম এবং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করল কুলির দল। রবিন মনে মনে প্রমাদ গণে টের পেলে যে তাঁরা সকলেই এক অদৃশ্য ফাঁদে ধরা পড়েছে।

    সাইটের কাজ একপ্রকার স্তব্ধ। সকলের মনে আশা এই যে খুব শিগগিরই এই তাণ্ডব থিতিয়ে পড়ে তাদের যাত্রাপথ মুক্ত হয়ে যাবে। রবিনের মনে আশা রয়েচে ঠিক পরের হপ্তাতেই সোসাইটি থেকে বার্তাবাহক এবং নূতন কিছু ডিগবয় (শাবলচি) আসার কথা। তাঁরা এলে উত্তম, নচেৎ যদি ঢুকতে নাও পারে তাহলে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির খবর নির্ঘাত শহরে পৌঁছে যাবে এবং সাহেবের দল এসে তাদের উদ্ধার করবে। সরোজিনী নিজেও অত্যন্ত চিন্তায় জেরবার হয়ে পড়েচিল কিন্তু মেয়ে মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি এই যে তাঁরা নিজেরা শত দুশ্চিন্তায় থাকলেও মায়ের ন্যায় বাকিদের সাহস জুগিয়ে চলে, ফলতঃ সে কুলি-বৌ (কামিন)-দের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তাদের প্রবোধ দিয়ে চলল।

    দিন দুই পরের কথা, কুলির দল সামান্য ধাতস্থ হয়ে কিছু কিছু কাজকর্ম আরম্ভ করেচে। সরোজিনী চুমুকের থানের গা দিয়ে বয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র লোনা নদী কঙ্কালীর পাড়ের পুলিনে দাঁড়িয়ে কাঠের পরকলায় কাগজ এঁটে ছবি আঁকচে। পাশে তার ছেলে বিস্তৃত বালিতে খেলা করচে তার বাপের সঙ্গে। বিষণরাম এভাবে খোলাখুলি মেমসাহেবের নদীতে আসায় আপত্তি করে বলেচিল, “ওদিকটা বড়ো নির্জন মা, ওদিকেই কোথায় যেন ঐ কাপালিকের দল ওৎ পেতে রয়েচে শুনেচি, আপনারা খোকাবাবুকে নিয়ে অমনভাবে…’

    সরোজিনী তাকে প্রবোধ দিয়ে নিজের স্বভাবসিদ্ধ অবিচল কণ্ঠে বললে, “ভয় নাই বিষণরাম, আমাদের স্বাভাবিক থাকতে দেখলে সবাই স্বাভাবিক রইবে।” অগত্যা বিষণ একখানা মোটা লাঠি নিয়ে সাহেবদের সঙ্গে সঙ্গে নদী অবধি গিয়েচিল। নিরুপদ্রবভাবে আড়ালে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ প্রহরা দেবার পর নিশ্চিন্ত হয়ে সাইটের দিকে পা বাড়াল সে। সে যদি ওখানে আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো তবে কী থেকে কী হতো কওয়া যায় না, কিন্তু যা ঘটলো তা অতি ভয়প্রদ।

    রবিন সাহেব তার পুত্রের সঙ্গে একখানা গেন্ডুয়া নিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলা করচে, সহসা সেই কন্দুক সাগরের বাতাসে উড়ে গিয়ে পড়ল কঙ্কালীর একেবারে কিনারে। রবিন সেখানা হাসিমুখে কুড়িয়ে মাথা তুলতেই চোখে পড়ল ক্ষুদ্র, ক্ষীণকায়া নদীর পরপারে এসে দাঁড়িয়েচে কয়েকজন মানুষ। পরণে রক্তাম্বর, হাতে পেঁচানো যষ্টি। তাদের মধ্যে একজনের বেশ স্বতন্ত্র! মিশমিশে কৃষ্ণবর্ণ আলখাল্লার মতো পোষাক, চোখদুটি ভিন্ন মুখ ও মাথার পুরোটাই কালো কাপড়ে আবৃত! হাতে একখানা ভারী লোহার দণ্ড! রবিন আরও অবাক হবার পূর্বেই আরও এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য চোখে পড়ল তাদের!

    সেই জনা পঁচিশের দলটি কোন অদ্ভুত মন্ত্রবলে নদীর জলের উপর দিয়ে হেঁটে নদী পার করে এদিকে এগিয়ে আসচে। তাদের পায়ে জল ঠেকচে না, জলে এতটুকু তরঙ্গ অবধি উঠচে না! রবিন ভীষণ বিপদ আসন্ন অনুমান করে ছেলেকে নিয়ে পিছনে ফিরে চিৎকার করে উঠল, “সরোজ পালাও, দৌড়াও সাইটের দিকে।” এবং তার মুখের বাক্য শেষ-না হতেই কীসে হোঁচট খেয়ে ছেলের হাত ছেড়ে রবিন ছিটকে পড়ল কয়েক হাত দূরে।

    কাপালিকের দল এসে পড়েচে এপারে। রবিন পাগলের মতো ছটফট করতে গিয়ে আবিষ্কার করল যে তার চারপাশে একখানা অদৃশ্য কাচের মতো অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি হয়েচে, যাকে ভাঙার সাধ্য তার নাই। শিশুটি দৌড়ে গিয়ে তার মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠল। কাপালিকের দলটা ঘিরে ফেলল মা আর পুত্রকে। কালো বস্ত্র পরিহিত সেই কাপালিক একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সরোজিনীর আঁকা ছবিখানার দিকে। ছবিতে নিখুঁতভাবে বুরুশের আঁচড়ে আঁকা রয়েচে কঙ্কালী নদী, গাছপালা আর বেলাভূমি। কাপালিক সেদিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কোঁচড় থেকে কিছুটা কালো গুঁড়ার মতো দ্রব্য বের করে ছুঁড়ে মারলো ছবিতে। রবিনের চোখের ভুল কিনা জানা নেই, তবে তার পরিষ্কার মনে হল ছবিখানার রঙে আঁকা নকল আকাশে যেন একবার সত্যিকারের বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। কাপালিক সেই ছবিখানা হাতে তুলে নিল। সরোজের মনে হল তার পা দু’খানি যেন বটের আটার মতো আটকে গিয়েচে মাটির সাথে। দলের লোকগুলি একবার মিটি মিটি হেসে উঠল, তারপর তারা দ্রুতপদে সে স্থান ছেড়ে নদী পেরিয়ে ওপারের বনে মিশে গেল। নদী পার হবার আগে সরোজিনীর ছবিখানা একটা ঝোপের কাছে অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেল তারা। সরোজিনী হতভম্ব হয়ে দেখলো যে লোকগুলি চলে যাবার সময়ে যেন কিছুটা তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল! কয়েকজন কাপালিক বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দূরের দিকে ভয়ার্ত ভাবে কী যেন একটা দেখার চেষ্টা করচিল। সরোজিনী সেদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল না যে তারা ঠিক কীসের কারণে ভয় পাচ্চে।

    সরোজিনী তার ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে কঙ্কালীর কাছাকাছি আর রবিন সেইখান থেকে আন্দাজ হাত চল্লিশের দূরত্বে। হঠাৎ রবিন বুঝতে পারলো তার বাঁধন কেটে গিয়েচে। আসন্ন একটা বিপদের আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় রবিন কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয়ে পা বাড়ালো স্ত্রী পুত্রের পানে, আর তখনই ভীষণ জোরে আকাশ গর্জন করে উঠল। বিস্মিত রবিন চোখ তুলে দেখলে একটু আগের রোদ্দুর ঝলমলে আকাশ হঠাৎ করে ঘোর কালো মেঘে ঢাকা পড়েচে। তাতে বিদ্যুৎ ঝলসে চলেচে। এলোমেলো পায়ে আরও একটু এগোতেই বহুদূর থেকে কিসের যেন একটা কলরব কানে এসে পৌঁছাল। তিনটি প্রাণী সভয়ে দেখলো যে অনেক দূরের থেকে কালো পাহাড়ের মতো কী একটা যেন ধেয়ে আসচে তাদের দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষীণকায়া কঙ্কালী নদী দানবের মতো ফুঁসে উঠল। দূরের থেকে আগত সেই মহাপ্রলয়ের মতো স্রোত ঝাঁপিয়ে পড়ল দুই কুল ছাপিয়ে। চোখের পলকে সরোজিনী আর তাদের শিশুপুত্রকে এক দমকায় ভাসিয়ে নিল সেই রাক্ষুসে গর্জনকারী স্রোত।

    রবিন উন্মাদের ন্যায় নদীর পাড় ধরে আছাড় খেতে খেতে দৌড়াতে শুরু করল। জলের খরস্রোতে দুইজন হাবুডুবু খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্চে, আবার কখনও ভেসে উঠচে। করাল ঢেউ তাদের টেনে নিয়ে চলেচে সামনের পাথুরে প্রপাতের দিকে, যেখানে কঙ্কালীর স্রোত হাত পঞ্চাশেক নীচের একটা পাথুরে খাঁড়িতে গিয়ে পড়েছে। আকাশ এতখানি আঁধার হয়ে এসেচে যে চোখের দৃষ্টি চলে না, শুধু চমকে ওঠা বজ্রের আলোতে কখনো-কখনো দুই নিমজ্জমান মাতা পুত্রের অবশ হয়ে আসা শরীরটা চোখে পড়চে।

    খাঁড়ির কাছাকাছি এসে ঘোর অন্ধকারে রবিন আছাড় খেয়ে পড়ল একখানা গর্তে। বিদ্যুতের ঝলকের আলোয় তাকিয়ে দেখলো সরোজিনী আর তার ছেলে কালো জলের ঘূর্ণিপাকে সোজা এগিয়ে গেল প্রপাতের শেষ প্রান্তে। রবিন বুকফাটা চীৎকার করে কেঁদে উঠল। কান ফাটিয়ে আকাশে আরও একখানা বাজ ডাকলো। তার তীব্র, চোখ অন্ধ করা আলোতে আকাশ যেন চিরে গেল। রবিন চোখের ধাঁধা কাটিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে দেখলো তার স্ত্রী আর ছেলে অর্ধচেতন হয়ে পড়ে রয়েচে নদীর পাড়ে। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও কোথাও নাই, রোদে চারদিক ঝলমল করচে, কঙ্কালী নদী তার ক্ষুদ্র রূপ নিয়েই দিব্যি বয়ে চলেচে। রবিনের মাথায় গোল লেগে গেল। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ দেখতে পেল তাদের নোটবাবু রামকৃষ্ণ তিন চারজন লোককে সঙ্গে নিয়ে নদীর চর বরাবর দৌড়ে আসচে। একজনের হাতে সরোজিনীর আঁকা ছবিটা, তা থেকে তখনও কালো জল ঝরে চলেচে। রবিন প্রশান্তি এবং আবেগ মাখা কন্ঠে ক্লিষ্টভাবে কোনওমতে শুধালো, “কে আপনি?”

    ভরাট পুরুষ স্বরে প্রত্যুত্তর এল, “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া গাঁ।”

    রবিন বিস্ময় আর হর্ষের যুগপৎ ধ্বনিতে ফের শুধালো,”কিন্তু ভটচায, তুমি… তুমি তো…”

    “রামকৃষ্ণ বামুন এতখানি বেইমান নয় সাহেব যে আপনাদের বিপদে ফেলে মুখ ঘুরিয়ে পালাবে। আমি বুঝেছিলুম যে আতঙ্কে পালানোর ভান-না করলে ঐ অদেখা শত্রুর আমাকে সাইট থেকে বেরুতে দিত না। আমাকে পালাতে দিলে সেই দেখাদেখি পুরো দলটাই আতঙ্কে পালাতে চাইবে সেই আশাতেই শয়তানটা আমাকে একবারের জন্য সুযোগ দিয়েচিল। আমি বেরিয়ে সোজা এই ঠাকুরমশায়ের কাছে গিয়ে হত্যে দিলুম। উনি আমার গাঁয়ের জামাই। এঁর কথা আপনাকে সময় করে…”

    কালীপদর হাতের ইশারায় রামকৃষ্ণ নিজের কথা অর্ধপথেই থামিয়ে দিলে। সরোজিনী ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরে আনন্দে কেঁদে উঠল। ঐটুকু ছোট্ট ছেলেও এক লহমায় বুঝে গিয়েচে যে এই আগন্তুক মানুষটির কাছে নির্বিঘ্নে নিজেকে সমর্পণ করা চলে। সে এক দৌড়ে কালীপদর কোলে ঝাঁপিয়ে এসে ভয়ে ভয়ে বললে, “আমরা আবার জলে ডুবে যাবো না তো দাদু?”

    কালীপদ হাসিমুখে তার মাথায় হাত রেখে বললে, “না দাদুভাই, আমি জলকে বকে দিয়েচি বেশ করে।” এই বলে সরোজের আঁকা ছবিখানার দিকে আরও একবার সকলে তাকালো। তা থেকে তখনও বিন্দু বিন্দু জল পড়ছে।

    *****

    কালীপদ, আমি আর কানাই রবিন সাহেবের দলের সঙ্গে কিছুটা পথ পদব্ৰজে এসে উপস্থিত হলাম কয়েকখানা তাঁবু ফেলা স্থানে। একটা টিনের তৈরি ফলকের উপরে আলকাতরা দিয়ে হাতে লেখা রয়েচে “চুমুকের থান ই এস-

    ১৫৫৭ এ সি

    ই বি— আর. এম. রায়চৌধুরী”

    কোনও পুরাতাত্ত্বিক তল্লাটে আমার পা রাখা এই প্রথম। এ মাটি তো মাটি নয়, আমরা দাঁড়িয়ে রয়েচি একখানা মাটিচাপা ইতিহাসের উপর। এর তলায় অবরুদ্ধ হয়ে রয়েচে কতো হাসিকান্না, মান অভিমান, জন্ম, মৃত্যু আর রহস্য! চারদিকটা একটু ভালো করে দেখতে না দেখতেই কয়েকজন কুলি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে যে কথাটা কইলো তাতে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেলুম যে আমরা কোনও বিনোদনমূলক স্থানে বেড়াতে আসিনি। শুকনো মাটির রূপে এ এক মহা জঙ্গল। কুলিরা হৈ হৈ করে বলল এই সাইটে বিষণরাম নামের বোধকরি একজন কর্মচারী ছিল, তাকে রসুইয়ের তাঁবু থেকে কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়েচে! লোকটা রান্নার তাঁবুতে একলা অন্যদিনের মতো রাঁধতে বসেচিল, হঠাৎ বাইরে থাকা লোকজন তাঁবুর ভিতরে হুড়মুড় করে বাসনপত্র ছিটকে পড়ার বিষম শব্দ শুনে একটু অবাক হয়ে ইতস্তত উঁকি দিয়ে দেখলে যে তাঁবুর ভিতরে যেন একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গিয়েচে এতক্ষণ! চারদিকে বাসনপত্র ছত্রখান হয়ে রয়েছে, তাঁবুর বাইরের কোমল মাটির উপর দিয়ে পিছনের জঙ্গল অবধি কিছু একটা ভারী জিনিসকে কেউ বা কারা যেন ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়েচে ভীষণ শক্তিতে। মাটিতে সেই আগের বারের মতোই ভোঁতা, তিন আঙুলওলা পায়ের বড়ো বড়ো ছাপ।

    আমরা ধড়মড় করে নরম মাটি পেরিয়ে পিছু ধরলাম সেই পায়ের ছাপের একজন কামিন বলল সে নাকি ঘটনার সময়ে তাঁবুর পিছনের জঙ্গলে একখানা বিরাট সাপকে পালাতে দেখেচে, অতঃপর আমরা অতি সাবধানে সেদিকে এগোতে শুরু করলাম। আততায়ী বিষণরামকে হেলায় টেনে নিয়ে গিয়েচে মাটি দিয়ে। সেদিকে চেয়ে কালীপদ ধীরে ধীরে বললে, “শয়তানটা হয়তো লোকটাকে বেহুঁশ করে টেনে নিয়ে গিয়েচে, নচেৎ এমন সাবলীলভাবে টানতে পারতো না।”

    দাগটা জঙ্গলের ভিতরের পচা পাতা আর অপেক্ষাকৃত কৃষ্ণমৃত্তিকা যুক্ত ভূমিতে গিয়ে আবছা হয়ে মিলিয়ে গিয়েচে। এরপর আর আততায়ীর অথবা হতভাগ্য বিষণের কোনও গতিপথ বোঝার উপায় নাই। হতাশ হয়ে বিষণ্ণ মনে রবিন ফেরার পথ ধরতেই পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখলো কালীপদর মধ্যে কিন্তু ফেরার কোনও তাড়া নাই। সে উবু হয়ে আশপাশের ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিছু একটা সন্ধান করে চলেচে। রবিন কিছু একটা বলার আগেই কালীপদ নীচু কণ্ঠে কইলো, “ঐটে কী সাহেব?”

    আমরা ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম একখানা পটপটির ঘন ঝোপের থেকে একখানা ভোঁতা দন্ড উঁকিঝুঁকি দিচ্চে। কানাই সেখানা তুলতে গিয়েই তার মুখ দেখে বুঝলাম জিনিসটা যথেষ্ট ভারী। কানাই টেনে যে জিনিসটা বের করে আনল সেইটে দেখে রবিন বিস্ময়ে চিৎকার করে বলে উঠল,

    “আরে! এটা তো হারিয়ে যাওয়া একখানা সাইটেরই জিনিস। এটা একটা ত্রিফলা গাঁইতি, এক্সকাভেশনে উঠেচে মাটি থেকে, আগেকার লোকেরা এ দিয়ে সম্ভবত ভূমিকর্ষণের কাজ চালাতো। অতি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটাকে কেউ চুরি করে এখানে ফেলে গিয়েচে।”

    কালী উত্তরে বলল, “তাই সম্ভব। হয়তো জিনিসটা এতটাই গুরুভার যে এখানা নিয়ে বেশিদূর পালানোর জো ছিল না। অগত্যা ফেলে গিয়েচে … অথবা… যাক গে… আচ্ছা এই দড়ির গাছাটা আসার পথেও দেখলাম। এগুলো কী জিনিস?”

    কালীপদ আর একটা ঝোপের থেকে একটা কালো রঙের মোটা দড়ির গোছা টেনে বের করল। গোটানো দড়ির গোলা নয়, বরং এলোমেলো, জটপাকানো খোলা দড়ি। দড়িও ঠিক নয়, লোহার তারের প্যাঁচ দেওয়া শক্তিশালী একটা লোহার দড়ির মতো বস্তু। দৈর্ঘ্যে অনেকখানি। তার পাশেই দুইখানা কাদামাটি মাখা মোটা বস্তা। হরিশ সেইটা দেখে সায় দিয়ে বললে— “হাঁ ঠাকুর, এইটেও সাইটেরই জিনিস। লোহার তৈরি। এ দিয়ে নূতন খোঁড়া পুরাতাত্ত্বিক অংশকে বেড়া দিয়ে রাখা হয় চিহ্নিত করার জন্য। কিন্তু এইটা এই জঙ্গলে কেমন করে এসে পড়ল? আর বস্তা দুটো?”

    কালীপদ উত্তর না দিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুধু বলল, “হুমম”

    *****

    আরও দু-খানি দিন অতিবাহিত হয়েচে। আমরা একাধিকবার গিয়ে সবকয়টি পুরাতাত্ত্বিক খননকৃত আবিষ্কারগুলো দেখে এসেচি। এই দুইদিনে তেমন কোনও নূতন উপদ্রব এসে উঁকি দেয়নি বটে কিন্তু কালীপদর হাবভাব হয়ে উঠেচে অতি সতর্ক, যেন কোনও বড়ো দুর্যোগ ওৎ পেতে রয়েচে খুব কাছেপিঠেই। এই দু-দিনে সমস্ত সাইট আমরা ঘুরে দেখেচি, বহু কুলির সাথে কালীপদ কথাবার্তা কয়েচে। এক্ষণে সাহেবের তাঁবুর বাইরে আমি, মুখুজ্জেমশাই, রবিন সাহেব, হরিশ আর সরোজিনী চা পান করতে করতে কথাবার্তা বলচিলাম। কানাই আর রামকৃষ্ণ একটু তফাতে বসে রয়েচে।

    রবিন বলল, “মুখুজ্জেমশাই, আমি বিজ্ঞান পড়ে বড়ো হয়েছি, কুসংস্কারের স্থান কিন্তু আমার ধাতে তেমন নাই।”

    কালীপদ অবাক হয়ে বলল, “সে কেমন কথা? কুসংস্কার থাকবেই বা কেন? সেসব তো সুস্থ কথা নয়। হঠাৎ এ প্রশ্ন?”

    রবিন উশখুশ করে উত্তরে বলল, “আপনার এই তন্ত্র মন্ত্র, ভোজবাজি, এসব যে বিশ্বাস করতে মন চায় না ঠাকুর, কিন্তু সেইদিন যা ঘটলো…”

    কালীপদ অকৃত্রিম বিস্ময়ে আবার কইল, “দাঁড়ান সাহেব, কিন্তু তন্ত্রের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিরোধ আছে এমন কথা আপনাকে কে বলল? বুজরুকি তন্ত্ৰ বা ভড়ং এর কথা বলিনে, কিন্তু খাঁটি তন্ত্র নিজেই তো এক বিজ্ঞান রবিন সাহেব। আমার গুরুদেব বলতেন “তন্ত্রবিজ্ঞান।” তিনি বলতেন, “বিশ্ব সংসারে যে যে পন্থায় কোনও কার্যের সিদ্ধি হয়, তা সবই বিজ্ঞানের একএকটা শাখাবিশেষ, তা সে পদ্ধতি যেমনই হোক, আর যে যে পদ্ধতির কোনও সারবত্তা নাই, কার্যকারিতা নাই, যার দ্বারা নির্দিষ্টভাবে কোনও উপযোগিতা পাওয়া চলে না, তাই ভড়ং। তন্ত্রই হোক আর মন্ত্রই হোক আপনি সেদিন এর উপযোগিতা যথেষ্ট উপলব্ধি করেচেন, আবার ঐ শয়তানদের অপশক্তির আভাসটুকুও আপনি হাড়ে হাড়ে পেয়েচেন, সুতরাং একে ভড়ং বলা আপনার আর সাজে না সাহেব। তবে একটা কথা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। ঐ শয়তান যেই হোক, সে কিন্তু দস্তুরমতো একজন সফল মায়াবী। মায়া বিস্তারে তার ক্ষমতা অতুলনীয়, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্চে কেবলমাত্র মায়াটুকুই তার সর্বোচ্চ শক্তি নয়। তাই যদি হতো তবে আপনার পাওয়া ঐ অদ্ভুত পুঁথি তার চুরি করার কোনও প্রয়োজনই পড়তো না হয়তো। সে বা তারা আরও অনেক, অনেক বড়ো কিছুর সন্ধান পেয়েচে ঐ পুঁথির থেকে। খুব বড়ো বিপদের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে সাহেব। বড়ো বিপদ আসচে।”

    কালীপদর কথা শুনে আমার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। কী এমন লেখা ছিল ঐ পাতাগুলোতে? একচক্ষু দানব কে? শিবঠাকুর বাঁধা কেন? কী হয়েচিল চারশো বচ্ছর আগে?

    পরের দিন আমরা এই বিপদের একটা ক্ষুদ্র আভাস পেলাম। ঘুম ভেঙে বাইরে বেরিয়ে একখানা নিমগাছের ডাল দিয়ে দাঁতন করচি, সহসা মনে হল মাথাটা যেন ঘুরে গেল আমার। প্রথমে ভাবলুম হয়তো বা মনের ভ্রান্তি, কিন্তু কুলির দল আতঙ্কে একবারে হৈচৈ করে উঠল শুনে বুঝলাম এই কাঁপুনি আমার কল্পনা নয়! আবার গোটা মাটিটা থরথর করে দুলে উঠল। আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই মাটিতে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ এভাবে কেঁপে কেঁপে ওঠার পর পৃথিবী নিশ্চলা হলে পর আমরা উঠে দাঁড়ালাম। কালীপদর দিকে আমরা সপ্রশ্ন চোখে তাকালেও তার কোনও ভাবান্তর চোখে পড়ল না।

    দ্বিপ্রহরে আহারকালে কালী সামান্য চিন্তা করে বললে, “একটা কথা সাহেব, আহার সমাধা করে দুই তিনজন লোককে একটু সাইট থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ-পুবে অনেকখানি হেঁটে কুলাইচন্ডীর বনে যেতে হবে। সে বন শ্বাপদসঙ্কুল, আপনি বন্দুক চালাতে জানেন, তাই আপনি, ডাক্তার আর হরিশ যাবেন সেথা কানাই আমার কাছে থাক। আমি ব্যবস্থা করে দেব, সাইট থেকে বেরোতে আপনাদের উপর কোনও মায়া বা বাধা কাজ করবে না।”

    রবিন ইতস্তত করে শুধাল, “সে নাহয় যাবো, কিন্তু সেখানে গিয়ে…”

    “কারণ, সেখানে আপনারা কয়েকজনকে খুঁজে আনবেন। তাঁরা বনেই রয়, তাঁদের আমার বিশেষ প্রয়োজন।”

    এবার আমিই বিস্ময়ে কইলাম, “বনের থেকে? কিন্তু কারা দাদা?”

    “তাদের আমাদের বুলিতে গরগেল বলা হয়। ঐ বড়ো আকারের গিরগিটি উপজাতি আরকি।”

    “গিরগিটি? গিরগিটি কী কাজে লাগবে দাদা?”

    “আহাঃ ডাক্তার, ওটা নাম। ওরা আসলে মানুষ। এই উপজাতির লোকেরা জঙ্গলে জঙ্গলে পশুপাখিদের রক্ষা করার কাজে নিযুক্ত হাজার হাজার বছর ধরে। এরা অদ্ভুত ছদ্মবেশ নিতে জানে বুঝলে ডাক্তার। হাত খানেক দূর দিয়ে স্বয়ং বাঘ অবধি এদের ছদ্মবেশ ধরতে পারে না, গন্ধও পায় না। একটা কথা শুধু মনে রেখো। জঙ্গলে ঢুকে একটু সাবধানে চোখ রেখে নীচু এবং চাপা গলায় বলতে থাকবে- আহুম্‌”

    আমরা মাঝদুপুর নাগাদ সাহেবের মোটরে বসে রওয়ানা দিলাম কুলাই বনের দিকে। সাইটের সীমানা পেরোনোর সময় হঠাৎ মনে হল যেন একতাল অদৃশ্য ননীর বেড়াজাল কেটে আমাদের শরীরটা ভেসে বেরোল। পরের ঘটনাগুলো আমার জীবনের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে যাবে, কিন্তু তবুও আমি সে ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত রূপেই বলব, কারণ মুখুজ্জেমশাই শতবার আমাদের বলেচেন যে গিরগিটি উপজাতির কথা যেন আমরা কোনও ক্রমেই বাইরে প্রকাশ না করি।

    আমরা বনে প্রবেশ করে বহুদূর পথ ঐ শেখানো শব্দটি বলতে বলতে এগিয়ে চললাম। সাইটে বসে যখন শব্দটা মুখস্থ করেচিলাম তখন ততোটা ভয়াবহ মনে হয়নি, কিন্তু এই ঘোর বনের ভিতরে নিজেদের উচ্চারিত সেই শব্দই যেন বিজাতীয় এক মহাজন্তুর শব্দ বলে মনে হতে থাকলো। প্রায় সাগরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে অনেকগুলি শ্বাসমূল উঁচু হয়ে রয়েচে, সেখানে বেদম হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে একটু বিশ্রাম নিচ্চি, আচমকা রবিন বন্দুক বাগিয়ে ধরে নীচু স্বরে বলে উঠল, “হুঁশিয়ার! বাঘ!”

    পিছনে তাকিয়ে আমার বুকের জল শুকিয়ে উঠল। আমার ধারণা ছিল বাঘ কখনো দলে ঘোরে না, কিন্তু আমাদের থেকে হাত কুড়ি দূরে তিনখানা বাঘ দাঁড়িয়ে রয়েচে! দুটি বড়ো, একটি অপেক্ষাকৃত ছোটো! রবিন হতভম্ব হয়ে বন্দুক ধরে দাঁড়িয়ে রইল। একখানা গুলি চালানোর মধ্যেই বাকি দুইটি এসে ঘাড়ে থাবা দেবে! আমি থরথর করে কাঁপতে শুরু করলাম আর তার মধ্যেই লক্ষ করলাম বাঘগুলি যেন এক পা এক পা করে অসন্তুষ্ট মুখে পিছিয়ে যাচ্চে! আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে টের পেলাম মুখুজ্জেমশাই যাদের সন্ধানে আমাদের পাঠিয়েচে তারা আমার সামনে।

    শ্বাসমূলের মাঝে মাঝে কোথা থেকে এসে উপস্থিত হয়েচে একদল বীভৎস মানুষ। তাদের সর্বাঙ্গ কর্দমাক্ত, গায়ে পাতা, ঝোপের টুকরো। আচমকা দেখলে মনে হবে মাটি বা গাছেরই একখানা টুকরো খসে পড়েচে বুঝি। সত্যিকারের মানুষ গিরগিটি!

    বাঘগুলি চলে গিয়েচে। কালীপদর দেওয়া একখানা অদ্ভুত নিদর্শন (সেটা বলা ওনার নিষেধ রয়েচে) দেখানো মাত্র তারা সমস্বরে “আহুম্ আহুম্” করে চীৎকার আরম্ভ করল। তাদের থেকে তিনজন বিনা বাক্য ব্যয়ে আমাদের সঙ্গে রওয়ানা দিল। আমরা মোটরে করে সাঁঝের মুখে এসে ঢুকলাম চুমুকের থানে।

    কালীপদ আর কানাই উদ্ভট কিছু একটা ভাষা এবং ইঙ্গিতে গরগেলদের কিছু একটা বুঝিয়ে দেওয়া মাত্র তারা ঘাড় নেড়ে সম্মতিবাচক ইঙ্গিত করল। প্রথমবার চুরির সময়ে জঙ্গলে যে জন্তুটার লোমের গোছা পাওয়া গিয়েচিল, সেখানা দেখে তাদের মধ্যে একজন আবার ইশারায় কী যেন কইলো এবং সেইটে শুনে ভ্রু কুঁচকে কালীপদ হনহন করে রসুইতে ঢুকে কী যেন পরীক্ষা করল। গরগেলরা রাত হলে পর বনে মিশে গেল।

    *****

    পরদিন সকালে তাঁবুর বাইরে বসে রবিন, সরোজিনী আর আমরা কথাবার্তা বলচি, হঠাৎ দূরে আঙুল দেখিয়ে সরোজিনী কইলো, “ওগুলো কী?”

    আমরা চকিতে তাকিয়ে মনে হল দূরে মাটির উপর দিয়ে আবছা কয়েকখানা মাটির ক্ষুদ্র ঢিবির মতো কী যেন নড়াচড়া করচে! একটু পরেই অনেকটা কাছে আসার পরে সহসা ঢিবির মতো গুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসা গরগেলদের ঠাহর করতে পারলাম। তাদের চোখে মুখে উত্তেজিত ভাব। তাদের সাথে মুখুজ্জেমশায়ের কিছু ভাষা আর কিছু ইশারায় কথা বিনিময় হল। কালীপদ কিছুক্ষণ তাদের সাথে কথা বলার পর ইশারায় ধন্যবাদ দিয়ে বিদেয় দিল যাবার পূর্বে গরগেল উপজাতির লোকেরা আমাদের আর সাহেবের সম্মানার্থে তাদের উপজাতির নাচ গান প্রদর্শন করে গেল। বিজাতীয় মিষ্ট সুরের সঙ্গে নিজেদের চারদিকে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরে এবং অনেকটা মশা মাছি তাড়ানোর মতো হাস্যকর শৈলীতে তাদের বন্য নাচ যখন সমাপ্ত হল, তখন এতদিন পর সাহেব থেকে আরম্ভ করে সবকয়টি কুলির মুখে হাসি ফুটে উঠেচে। তা দেখে কালীপদও মনে মনে সন্তুষ্ট হল, অথচ গরগেলরা যেইমাত্র বিদায় হলো তখন কালীপদর মুখ ভীষণ থমথমে। কিছু একটা ভয়ানক সংবাদ শোনার পরে যেমন হয় আর কী। আমি মনে মনে ভাবচি যে সাহেবের সামনে কিছু জিজ্ঞাসা করাটা সমীচীন হবে কিনা, হঠাৎ কালীপদ নিজেই কথা বলে উঠল, “সাহেব, গতিক বড়ো সুবিধার ঠেকচে না। গরগেলরা এক অদ্ভুত খবর নিয়ে এসেচে। তারা ঐ সাগরের ধারের কাপালিকের ডেরায় গিয়ে উঠেচিল।”

    রবিন চমকে বলল, “সেকি ঠাকুর। কেউ দেখেনি তো তাদের?”

    কালী অবহেলায় হাত নেড়ে বললে, “দুর দুর, খোদ রায়বাঘা যাদের সন্ধান পায় না তো মানুষ। ওরা ভেক ধরতে জানে তা তো দেখেচেন বেশ। কাপালিকের মধ্যে একজন দলপতি রয়েচে, তার লোকেরা নাকি দু-খানি বিরাট বিরাট লোহার থাম ঘষে ঘষে একেবারে গুঁড়ো করে ফেলেচে এবং দলপতি সেই লোহার গুঁড়ো দিয়ে মাটিতে দু-খানি ছবি আঁকচে। আপনার ঐ পুঁথিতে ও এইরকম কী একটা কথা ছিল বললেন না? চারশো বছর পূর্বে ঐ বিকুম্ভ কাপালিক নাকি লোহার কামান গুঁড়ো করে ফেলে, আর তারপরেই রাক্ষসেরা এসে সবকিছু… আচ্ছা সাহেব, আমার সন্দেহ হয় যে সেখানা আদৌ কোনও কামান ছিল না, বরং কোনও লোহার বিরাট থাম হওয়াই সম্ভব। কামান তো ভারতে এসেচে ঐ ঘটনার সামান্য কয়েক বৎসর আগে, তাও আবার পানিপথ আর দিল্লীতে। এখানে কেমন করে আসবে? কিন্তু সে-কথা নয়, কথা হল এই কাপালিকেরা লোহা গুঁড়ো করে কেন? লোহার গুঁড়ো দিয়ে কী কাজ হয় তাদের?”

    আমি ঢোঁক গিলে কইলাম, “আচ্ছা, তারা কী ছবি এঁকেচে?”

    “বড়ো অদ্ভুত ছবি। মাটির উপরে লোহার অজস্র গুঁড়ো দিয়ে আঁকা প্রথম ছবিখানা হল একখানি কালো, বিকট মেঘের। আর… আর দ্বিতীয় চিত্রটি হচ্চে একটা চোখের… ভয়ঙ্কর চোখ… চোখের নীচ থেকেই আরম্ভ হয়েচে বিশালাকার লেজ। চোখকে ঘিরে প্রকাণ্ড মাথা। কিন্তু এমন কোন জন্তু রয়েচে যার শরীর নাই অথচ কেবলমাত্র মাথা, একটাই চোখ আর প্রকাণ্ড লাঙ্গুল রয়েচে? পুরাতাত্ত্বিক চিত্র অনুসারে যে দুইহাতে দুইখানা বিরাট বৃক্ষ ধরে রাখে! আমার সন্দেহ হয় ঐ ছবিখানা আদৌ কোনও জন্তুর বটে তো? গরগেলদের সে প্রশ্নও করলাম, কিন্তু তারা সম্ভবত তার জবাব দিতে অপারগ। জন্তু? দানব? নাকি

    রূপকের আবডালে…

    “আবডালে! কী রয়েচে রূপকের আড়ালে ঠাকুর?” হতচকিত হয়ে সরোজিনী শুধালো।

    “তা আমিও ঠিকঠাক ধরতে পারিনি মা, তবে একটা খটকা লাগচে। তার ইচ্ছামতো মাটি কাঁপচে, বনে আগুন লাগচে, বাজ পড়ছে… আমি যা ভাবচি তাই যদি হয় তবে সর্বনাশ উপস্থিত হতে আর বেশি বাকি নাই। সেই যুগে সংবর্তক নামে একশ্রেণীর নিম্ন কাপালিক ছিল বলে শুনেচি… এরা তাদেরই কেউ নয় তো?”

    রবিন হাঁ হাঁ করে বললে, “বলেন কী ঠাকুর! এই নামটা আমি ঐ পুঁথিতেও পড়েচিলাম যে। কী আশ্চর্য!”

    কালী আবার চিন্তিত স্বরে কথা কইলো, “গরগেলরা মাটি বনের মানুষ, বড়ো অধিক জটিলতা তারা বোঝে না। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম যে তারা ঐ একচক্ষু দানব অথবা ঐ রাক্ষুসে মেঘের সম্পর্কে কিছুমাত্র অনুমান করতে পেরেচে কি না, কিন্তু… তারা সরল মানুষ, সম্ভবত সেসব তাদের বোধগম্য হয়নি। যাক, যেটুকু খবর পেয়েছি তাতেই এগোনো যাক।

    “কিন্তু এখন কী করবেন কর্তাবাবা? আমাকে কিছু করতে হবে? আজ্ঞা পেলে একাই গিয়ে এই সড়কি দিয়ে…” কানাই কইলো।

    কালীপদ তার জবাব না দিয়ে বলল, “ভাবতে হবে ডাক্তার, ভাবতে হবে। সব সুতোগুলো জট পাকিয়ে রয়েচে। শিবঠাকুরের গায়ে শেকল জড়ানো, তাও আবার পেতলের? কেন? পেতলের শিকল দরকার পড়ল কেন হঠাৎ? জায়গাটার নামটাও উদ্ভট। চুমুকের থান! মহামুনি অগস্ত্যর পর এক চুমুকে জলপানের ঘটনা তো কখনও শুনিনি। ঝুমরু কুমরু নামটাও সন্দেহজনক বড্ড ওগুলো অপভ্রংশ নয় তো ডাক্তার? তারপর ধরো, খাঁড়িটা জুড়ে লোহার জলনিকাশি নালিটা কেন পাতা হয়েচিল? কিসের জল আসতো ঐ খাঁড়িতে? ভাবতে দাও। যদি আমার খটকাটা নিরসন করতে পারি তবেই এর উত্তর পাওয়া যাবে।”

    আমি কিছু না বলে মানে মানে সরে পড়চিলাম, হঠাৎ কালীপদ ফের কইলো, “আচ্ছা ডাক্তার, তোমার কী মনে হয়, শয়তানটা যখন দুইখানা প্রেতমূর্তি গড়ে চলেচে তখন দুইটিকেই সে আমাদের প্রতি প্রয়োগ করবে, তাই নয় কী?”

    আমি হতবুদ্ধি হয়ে ঘাড় নাড়লাম দেখে কালীপদ যেন সামান্য আশ্বস্ত হয়ে বললে, “তার অর্থ এই যে ঐ কাপালিকের নিজের প্রথম রাক্ষসের মারণশক্তির উপরে শতভাগ আস্থা নাই। তার মনে হয় যে প্রথম দানবটির থেকে আমরা বেঁচে গেলেও যেতে পারি, কিন্তু পরের শয়তানটির হাত থেকে পরিত্রাণ নাই। সে খুঁজে খুঁজে ঠিক আমাদের হনন করবে, তাই তো? ছবি আর পুঁথি অনুযায়ী প্রথম রাক্ষসটিই ছিল ঐ একচক্ষু দানব। আর দ্বিতীয়টি… দ্বিতীয়টি ছিল একটা রাক্ষুসে মেঘ। গরগেলরাও বলল যে সংবর্তকরা ঐরকমই দু-খানি ছবি এঁকেচে লোহার গুঁড়ো দিয়ে। ঐ গুঁড়োতেই জন্ম হবে দুই রাক্ষসের। তাই তো? তবে সম্ভবত ঐ পুঁথিতে এমন কোনও পন্থা লেখা ছিল, যা দিয়ে লোহার গুঁড়োতে জীবন প্রতিষ্ঠা করে তাকে দানবের রূপ দেওয়া চলে।”

    আমি বিস্মিত হয়ে শুধালাম, “কেন? লোহা দিয়েই কেন?”

    “তা ঠিক বলতে পারিনে, তবে লোহা ধাতুটা ঠিক পৃথিবীর ধাতু নয় ডাক্তার। ধারণা করা হয় লোহা নাকি বাইরের কোনও উল্কা থেকে পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছে, ফলে ঐ দানব গড়তে নিশ্চয়ই পৃথিবীর ধাতুতে কাজ হয় না। এটাই আমার অনুমান।”

    আমি এমন আশ্চর্য কথা কখনও শুনিনি, ফলে অবাক হয়েই শুধালাম, “এ তো ভারী অদ্ভুত কথা দাদা! তবে এই ধরনের গূঢ় বিদ্যার চর্চা যে যুগে হতো, সেই যুগে কি লোহার প্রচলন ছিল? আগে তো শুনেচি… “

    “দূর দূর, তুমি তো একেবারে আদিম প্রস্তরযুগের তুলনা করে বসলে হে। শাস্ত্রচর্চার আমল থেকেই লোহার ব্যবহার চালু ছিল সভ্যতায়। মহাভারতে লৌহভীমের কথা পড়োনি? লোহার উল্লেখ সুপ্রাচীন সংস্কৃত ভাষাতেও ছিল। মঙ্গলগ্রহের স্তবে বলা রয়েচে, ‘ধরণী গর্ভসমভূতাং, বিদ্যুৎপুঞ্জ সমপ্রভঃ । কুমারং শক্তিহস্তঞ্চঃ লোহিতাঙ্গ প্রণম্যহম’ এখানে ‘লোহিতাঙ্গ’ বলতে কী বোঝায় ডাক্তার? অতঃপর লোহা সে যুগেও যথেষ্ট সহজলভ্য ছিল বলেই ধরে নেওয়া চলে। তাই নয়? তাই বলচি, আমাকে একটু ভাবতে দাও।”

    আমি একটা ঢোঁক গিলে চলে এলাম।

    *****

    বেলা অবধি কালীপদ কেমন যেন ঝিমিয়ে থেকে আকাশ পাতাল চিন্তার জাল বুনে চলেচিল, আমি একটুক্ষণ প্রতীক্ষা বললুম, “দাদা, বেলা যে গড়িয়ে যায়, স্নানাহারের সময় যে উৎরে যায় যায়। সব সেরে নিয়ে না হয় আয়েশ করে দুইজনে মিলে কষে ভাববো খন।”

    আমার কৌতুকে মুখুজ্জেমশায়ের ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। কামিজ আর কোঁচাটা আপসে নিয়ে কইলো, “চলো।”

    সাহেবের তাঁবুর বাইরে গিয়ে কানে এল ভিতরে উত্তেজিত কণ্ঠে রবিন এবং সরোজিনীর বাগবিতণ্ডা চলেচে। সরোজিনী সন্তানকে নিয়ে ভীত হয়ে সাইট ছেড়ে চলে যাবার পক্ষপাতী, কিন্তু রবিনের সেই এক গোঁ, তারা চলে গেলে সাইট বেদখল হয়ে যাবে, তার চাকুরি জীবনে কালি পড়বে। ঝগড়া এবং কান্নাকাটির মধ্যে সাহেবকে ডাকা বাঞ্ছনীয় মনে হল না। আমরা ইতস্তত করে কিছুটা ঘুরে এসে একটু পরে শুনলাম দম্পতির মিটমাট হয়ে গিয়েচে। সরোজ থাকতে রাজি হয়েচে স্বামীর যুদ্ধে। এতক্ষণের কলহের পর এখন গাঢ়, নীচু স্বরে তাদের মিষ্ট মানভঞ্জনের পালা চলচে। কালীপদ আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে বললে, “আবহাওয়া আর দাম্পত্য আলাদা কিছু নয় ডাক্তার, উভয়েই মেঘবৃষ্টি আর সূর্যালোক থাকে। তুমি বুঝবে না হে।”

    আমিও হেসে বললুম, “একদম বুঝিনে তা নয় দাদা। ঝগড়ার সময়ে দুইজনের মন দুটি অনেকখানি দূরে চলে যায়, ফলে তারা চিৎকার চেঁচামেচি করে একে অপরকে শোনানোর জন্য, কিন্তু আবেগের সময়ে দু’খানা হৃদয় পরস্পরের এতখানি নিকটে চলে আসে যে তখন ফিসফিস আর ঠোঁটের নড়াচড়াতেই কথা কওয়া চলে। দাম্পত্যের এই মনের বৈপরীত্যের জন্যই ঝগড়া এবং সোহাগের মধ্যে তফাৎ তৈরি হয়, তাই নয় দাদা?”

    কালীপদ অপ্রস্তুত হয়ে একটু কেশে এগিয়ে গেল। আমি লজ্জায় জিভ কেটে সাহেবকে মধ্যাহ্নভোজের জন্য হাঁক দিলাম।

    আহার্যের পরিমাণ অধিক হলেও বৈচিত্র্য ততোধিক নয়। এদিগড়ের মোটা দাগকাটা লাল চালের সুমিষ্ট অন্ন, কুলিদের মধ্যে থেকে নবনিযুক্ত বেহারী পাচকের রাঁধা পাঁচফোড়ন দেওয়া মাখো মাখো সুস্বাদু ডাল, সাদা পিঁয়াজ আর রসুন দিয়ে ভাজা জলকলমী শাক এবং তেলের বদলে পাঁঠার চর্বি দিয়েই পাক করা নরম তুলতুলে সুগন্ধি মাংস।

    কালীপদ টুকিটাকি কথাবার্তা কইতে কইতে আহার করচে, হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, “ডাক্তার, তুমি তখন আমাকে ঐ কথাখানা কইলে কেন যে খাবার পর আয়েশ করে বসে তখন চিন্তা করা যাবে? তোমার কি মনে হয় আমি এখানে আরাম করতে এসেচি?”

    আমি অপ্রতিভ হয়ে কিছু বলার পূর্বে সরোজিনী বলে উঠল, “ছিঃ ছিঃ বাবাঠাকুর, অমন কথা হয়তো উনি বলেননি, ওটা কথার কথা বৈ তো নয়।”

    “কথার কথা আবার কী মা? কথাতেই তো কথা ওঠে। তোমরা কি জানো না যে এই চুমুকের থানে আয়েশ করা মানা?”

    আমি থতমত খেয়ে কইলাম, “হাঁ, তা তো পুঁথিতেই লেখা ছিল শুনেচি, কিন্তু সেসব কি আর সত্য কথা? হয়তো কাল্পনিকভাবে…”

    “না, কাল্পনিক কখনও নয়। একেবারে সত্য কথা, আর সত্য বলেই বহুযুগ পূর্বে ঐ বিকুম্ভ কাপালিককে ভগবান মহাদেব গলা টিপে মেরেচিলেন, আর এখন এই সাইটের কুলিরা মন্দির খোঁড়ার সময়ে অদৃশ্য বাধা পেয়েচিল।”

    সাহেব হতভম্ব হয়ে শুধাল, “এ কেমন কথা ঠাকুর! ঐ বিকুম্ভ তো গিয়েচিল ঝুমরু শিবঠাকুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে, আর আমার কর্মীরা গিয়েচিল মন্দির এক্সকাভেট করতে, সেখানে বিশ্রাম বা আরাম করার প্রশ্নই যে ওঠে না। আপনিই বলুন, তারা কি ওখানে আরাম করতে গিয়েচিল?”

    কালীপদ বিষণ্ণ কণ্ঠে উত্তর দিলে, “না। তারা আরাম করতে যায়নি, গিয়েচিল আয়েশ করতে। বাংলা আর সংস্কৃতে অনেকখানি তফাৎ রয়েচে সাহেব।”

    আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতাকি করচি দেখে মুখুজ্জে আবার বলল, “না সাহেব, যা বলেচি ভেবেই বলেচি। আর হ্যাঁ, ওই শিবলিঙ্গ সত্যিই মণিময়। তার মণি খোয়া যায়নি, শিবলিঙ্গের শরীরেই রয়েচে। দেখার মতো চোখ না থাকলে তাকে দেখা চলে না।

    আচ্ছা সাহেব, আমি একবার দুটো মন্দিরে ঘুরতে যাবো। শিবলিঙ্গ দুটিকে দেখতে চাই আমি। আমাকে দু-খানা বড়মাপের নিখুঁত কীলক দিন। তাতে মন্তর পড়ে, পবিত্র সূতা বেঁধে, যথাবিধি তন্ত্রাচারে আমি ভৈরবকে ভেট দেব। এটা একটা তন্ত্র বিধি।”

    রবিন বিস্মিত হলেও কিছুক্ষণ পর হরিশের সঙ্গে আমাদের পাঠিয়ে দিলে মন্দিরের পানে। আমরা প্রথমে গেলাম ঝুমরুর মন্দিরে। খুব তীক্ষ্ণ চক্ষে লক্ষ করেও কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গের দেহে কোনও মণি বা রত্নের আভাস পেলাম না। হয়তো কখনও সেসব চুরি গিয়েচে। কুমরুর মন্দিরও তথাবিধি। দু-খানি মন্দিরেই কিছুক্ষণ দেখাশোনার পর কালীপদ আমাদের বাইরে বের করে দিলো।

    কিছুক্ষণ পর ভিতর ভেসে এল কালীপদর উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণ। সে তন্ত্রাচারে মহাকালকে তার মন্ত্রপূতঃ ভেট নিবেদন করে বাইরে এসে আপ্লুত কণ্ঠে হাতজোড় করে বললে, “ভৈরব এই দীনের নৈবেদ্য স্বীকার করেচেন কানাই, হয়তো আমরা বিপদ থেকে মুক্তি পাব তাঁর দয়ায়।”

    আমাদের চক্ষে জল এল। হাত জোড় করে মহাদেবের উদ্দেশ্যে শত প্রণাম জানালাম। কেবল হরিশকে দেখলুম চোখে কিঞ্চিৎ সন্দেহ নিয়ে সবকিছু বুঝতে চাইচে। তাঁবুতে ফেরার পথে এক মুহূর্তের জন্য পা থামিয়ে কালীপদ উদাস স্বরে বললে, “তুমি যথাযথ বলেচো ডাক্তার, ঝগড়া আর সোহাগ জিনিসটে আসলে মনের বৈপরীত্যের খেলা মাত্র।

    আমরা আবার চলতে আরম্ভ করলাম।

    *****

    তাঁবুতে ফিরে চা পান করচি, লক্ষ করলাম রবিন সাহেবের ছেলে তাঁবুর আড়াল থেকে আমাদের দিকে উৎসুক নজরে তাকিয়ে রয়েচে অথচ সাহস করে কাছে আসতে ভরসা পাচ্চে না। কালীপদর সঙ্গে ইতিমধ্যেই তার কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে পড়েচে, আমার চেহারা দেখেও ভয়ের উদ্রেক হবার তেমন কিছুই নাই, কিন্তু কানাইকে দেখেই বোধকরি… যা হোক, কালীপদ হাসিমুখে একবার হাতছানি দিয়ে ডাকা মাত্তর সে ছুটে এসে মুখুজ্জেমশায়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়ালো। কালী হাসিমুখেই কইলো, “এই যে ছোটোসাহেব, তুমি দাদুকে ভুলে যাচ্চো যে বড়ো? কালকে সারাদিন কাছে ঘেঁষলে না যে? আমার একা একা ভয় করে না বুঝি?”

    বিকুর হয়তো নিজেরই এই অচেনা পরিস্থিতিতে ভয় করচিল, কিন্তু এতখানি বয়স্থ লোকের মুখে ভয়ের কথা শুনে সে মুখ টিপে টিপে হাসতে শুরু করল। কানাইও হেসে ফেলল।

    কালীপদ আদরের স্বরে বললে, “একটা কবিতা শোনাও না দাদুভাই।”

    “কোন কবিতা? বেঙ্গলি কবিতা তো আমি জানি না, এনাদার এপ্রিল ইজ কামিং বলব? হ্যাঁ মা, বলব?”

    তাঁবুর মুখে সরোজ এসে দাঁড়িয়েচে। সে কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে বলল,

    “তুমি দুষ্ট হয়েচো বিকু, আমি তোমাকে বেঙ্গলি কবিতা শিখিয়েচি যে। ওর কথায় ভুলবেন না বাবাঠাকুর, ও বাংলা কবিতা দু-চারটে জানে, তাও কারোর সামনে…”

    আমি আশ্বস্ত করে বললুম, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, ইংরিজি কবিতা বলুক না।”

    বিকু একখানা ইংরেজি কবিতা অভিনয় করে আবৃত্তি করল। আমরা হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে পুরো পরিবেশটাকে ছোট ছেলেটির কাছে লঘু করে আনলাম। তারা বিদেয় হল পর কালীপদ হাসতে হাসতে কানাইকে বললে, “হ্যাঁরে হতভাগা, কতবার বলেচি ইংরেজিটা তোর বড়োকর্তাবাবার থেকে একটু আধটু শিখে নিতে, দেখলি তো, এখন কাজে দিত।”

    কানাই একটু আনমনা ভাবে প্রত্যুত্তরে বলল, “আচ্ছা কর্তাবাবা, একটা কথা শুধানোর আছে আমার। দুটো বাচ্চা ছেলে কি কখনও পাহাড়ের উপরে জল আনতে উঠেচিল? তারা কি কোনও কারণে বালতি নিয়ে পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে গিয়েচিল?”

    কালীপদ ধন্ধে পড়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আমিও একটু অবাক হয়েই চমকে উঠে বলল, “ সেকি রে কানাই। তুই ইংরেজি বুঝিস নাকি? ও মুখুজ্জেমশায়, এ হতভাগা দেখচি বিকুর কবিতাটা দিব্যি বুঝেছে।”

    কালীপদ সবিস্ময়ে বললে, “আরে আরে, তাইতো! তুই বুঝলি কেমন করে?”

    কানাই সলজ্জ হেসে বলল, “আমি তো শুধু বিকু বাবুর হাত পা নাড়া আর অভিনয় দেখে বুঝলুম। ঐরকমই কিছু একটা বলল কবিতাতে।”

    “দেখেছো তো ডাক্তার, প্রাচীনকালে যখন ভাষার উৎপত্তি হয়নি, তখন লোকে এইভাবেই ইঙ্গিতে কথাবার্তা কইতো। অভিনয়ের মার নাই। আজকের যুগেও অনেক প্রজাতি এইরকম ইশারা ইঙ্গিতে কথা কয়।”

    আমি সন্দিহান হয়ে শুধালাম, “এখনকার যুগেও ভাষাহীন প্রজাতি রয়েচে নাকি দাদা?”

    “একেবারে ভাষাশূন্য হয়তো নয়, তবে তাদের ভাষায় শব্দের সংখ্যা এতটাই কম যে অধিকাংশ কথাবার্তাই ইশারায় চলে। এককালে শুনেচি বুনো শিংওয়ালা পশুর ইশারার থেকেই ইংরাজি বর্ণমালার প্রথম হরফটার উৎপত্তি হয়েচে। ক্রমে ক্রমে পাহাড়ি ঢিবি, বাঁকানো হাতিয়ার, ধনুক, পাথুরে তিনফলা অস্ত্র থেকে পরপর বাকি হরফগুলি তৈরি হয়ে এসেচে। বেশিদূর যাও কেন, আমাদের এই গরগেল জাতিটার মধ্যেই এসব চলন রয়েচে। সবচেয়ে মজার কথা হল ওরা…’

    “কী দাদা? ওরা কী?”

    কালীপদর ভ্রু কুঞ্চিত। চক্ষু শাণিত। আঙুলগুলো পরস্পরবদ্ধ। আমার দিকে বিহ্বলভাবে তাকিয়ে কালীপদ ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠল, “তাই তো! বড়ো ভুল হয়ে গিয়েচিল যে! সেইজন্যই সুতোটাকে কিছুতেই মেলাতে পারচিলাম না! বড়ো বিপদ ডাক্তার!”

    *****

    সাঁঝের সময়ে কালীপদ আমাদের নিয়ে একত্রে বসলো। হরিশ কোনও একটা বিশেষ কার্যে নাকি সাইটের অন্যত্র গিয়েচে। কালীপদ কোনও রকম ভণিতা না করেই রবিনকে সরাসরি বলল, “শুনুন সাহেব, কয়েকটা কথা বলি খুব সতর্ক হয়ে শুনুন। সেইদিন যে বনে ঝোপের মধ্যে আপনাদের ঐ সাইটের লোহার তারের দড়ি পেলাম, ঐরকম দড়ি আপনাদের কাছে ঠিক কতখানি রয়েচে?”

    সাহেব চিন্তা করে বললে, “ঠাকুর, ঐ দড়ি তা ধরুন ছয় চাকা মতো আছে।”

    “ও তো গেল আপনাদের ভাষায়, ছয় চাকা মানে ঠিক কতখানি তা বলুন।”

    “ধরুন মোটামুটি এক মাইল তো হবেই হবে।”

    “চমৎকার। আচ্ছা, দুই ভৈরবের মাঝের পরিখাটির দূরত্ব কতখানি?”

    “আজ্ঞে, ভৈরব বলতে?”

    “শিবঠাকুর, শিবঠাকুর। দুটো মন্দিরের মাঝের ঐ আয়েশের খাঁড়ি নামক পরিখাটার বিস্তার কতখানি?”

    “সাফসুতরো করার পর মাপা হয়নি, আনুমানিক আধ মাইলের আশপাশ।” – “বেশ বেশ। আমারও তাই ধারণা। এইবার একটা কাজ করতে হবে। যে কোনও একখানা শিবলিঙ্গ, ধরুন ঝুমরুর শরীরে ঐ দড়ির একখানা প্রান্তকে বেঁধে, দড়িটাকে ঐ আয়েশের খাঁড়ি বরাবর বিছিয়ে বিছিয়ে আনতে হবে কুমরুর মন্দিরের কাছাকাছি। সেখানে মাথার দিকে কিছুটা দড়ি গুটিয়ে রেখে দেবেন। দরকার হবে। পরিখাটা কাটা না থাকলে এবং সেটা অর্ধচন্দ্রাকার না হলে এই সম্ভাবনাটা আমার মাথায় হয়তো আসতো না। সেকালের কারিগরেরা এই পরিখা দিয়েই একটা ক্ষীণ ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েচিল আমাদের। আমার সামান্য মেধায় আমি যে সেই ইঙ্গিত মোটামুটি ধরতে পারচি, তা কেবলই গুরুর দয়া সাহেব।”

    “ইঙ্গিত? কীসের ইঙ্গিত ঠাকুর?”

    “আয়েশের খাঁড়ি কেন তৈরি হয়েচিল এবং কেন তা ভগবান শিবের চক্ষুশূল, তার ইঙ্গিত। যা-ই হোক, আচ্ছা, আর একটি কথা, এই আধখানা চাঁদের ঠিক মধ্যবিন্দুর কাছাকাছি একখানা চওড়া গর্ত খুঁড়তে হবে কুলিদের দিয়ে। খুব প্রশস্ত একটা পরিখার মতো, যার পেটের মধ্যে আমরা সবকয়টি মানুষ আশ্রয় নিতে পারি। পরিখাটা ঢাকা দেবে তোমাদের এই সাইটের বিরাট ভারী ভারী ঐ লোহার পাতগুলি দিয়ে। খুব সাবধান, অন্যথায় দানবটা আমাদের সন্ধান পেয়ে যাবে।”

    “কোন দানব?” সরোজিনী সবিস্ময়ে শুধালো।

    কালীপদ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে “সেই দানব, যার পেটের মধ্যে একখানা ভয়ঙ্কর চক্ষু থাকে। আমি কেতাবে পড়েচি।”

    “কোন কেতাব! কী আশ্চর্য! ঐ চুরি যাওয়া পুঁথি ছাড়াও ঐ দানবের উল্লেখ রয়েচে নাকি কোথাও? কখনও শুনিনি তো?”

    “শুনেচো মা, আলবৎ শুনেচো। ছবিও দেখেচো। আমার আর তেমন পড়াশুনা হল কোথায়? তোমরা বিদ্বান, বিদূষী। তোমরা নিশ্চয়ই পড়েচো, কিন্তু ধরতে পারোনি বাছা।

    রবিন একটু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে শুধালো, “কী বলচেন ঠাকুর! সেই দানব এখানে আসবে? কবে?”

    “কাল অমাবস্যা। আমার ধারণা মহাজাগতিক এই মহাটানের দিনটা সেই কাপালিক কিছুতেই হাতছাড়া করবে না, কারণ আমার অনুমান যদি অভ্রান্ত হয়, তবে তার লৌহচূর্ণ দ্বারা মন্ত্রগঠিত রাক্ষস এই মহা আকর্ষণেই ভর করে প্রাণ পায়। যা করার রাতের মধ্যেই করতে হবে। সব কুলিকে কাজে লাগিয়ে দিন। কাল তারা এসে পড়বে।”

    এবার আমিই হতবুদ্ধি হয়ে বললাম, “কিন্তু মুখুজ্জেমশায়! তারা কারা? তুমি কী উপায়ে সেই দানবের আসল রূপটা…”

    “ইঙ্গিতে ডাক্তার ইঙ্গিতে। কানাই সর্দার যেভাবে বিকুবাবার ইংরেজি কবিতাটার মর্মার্থ ধরে ফেলেচিল, ঠিক সেভাবেই। গরগেলদের ঐ সেদিনের নাচ-গানগুলো আমরা সবাই দেখেচি বটে, কিন্তু তখন আমি বুঝতেই পারিনি যে আমার প্রশ্নের উত্তর হিসেবে তারা একটা ভয়ঙ্কর ইঙ্গিতের মধ্যেই উত্তরটা দিয়ে গিয়েচে। তারা সাগরের পাড়ে কিছু একটা দেখেচে, শুনেচে এবং যোগ্য ভাষার অভাবে বাধ্য হয়ে ইঙ্গিতের মাধ্যমে একটা আভাস দিয়ে গিয়েচে ঐ রাক্ষুসে শয়তান দুটোর আসল রূপের। যেভাবে হোক আজ রাতের মধ্যেই কাজগুলো সারতে হবে। ঝুমরুর দেউলটা সাগরের থেকে অপেক্ষাকৃত কাছে। কাপালিকরা এসে নিশ্চয়ই ওটাকেই আগে দখল নেওয়ার চেষ্টা করবে। আমরা থাকব ঐ কুলিদের খোঁড়া গর্তে।”

    আমার বাঙনিষ্পত্তি হল না। রবিন শুষ্ক স্বরে বললে, “ঠাকুর, আমরা বাঁচব তো? ধরুন যদি আমাদের গর্তে লুকানোর পরেও ওদের দুই চারজন আমাদের দিকে ছুটে এসে আক্রমণ করে তবে?”

    কালীপদ বিস্মিত হয়ে বলল, “তবে কী?”

    “না, মানে সেক্ষেত্রে কি আপনার মন্ত্রশক্তি দ্বারা তাদের রোখা যাবে?” কালীপদ বিরক্ত হয়ে কইলো, “সবসময় মন্ত্র মন্ত্র করো কেন? সেক্ষেত্রে তোমার বন্দুকখানা কি ফড়িং মারার জন্য রয়েচে সাহেব? তার ওপর কানাইয়ের মতো লেঠেল রয়েচে। বাঁচা মরা ঐ রাক্কুসীর ইচ্ছা, আমি মায়ের ইচ্ছা বৈ চলতে পারিনে। বিপদ থেকে বাঁচার মতো বিদ্যে বুদ্ধি সবই ঐ হতভাগী সময়মতো যুগিয়ে চলে। আর হ্যাঁ, আপনাদের সাইটের কাজের জন্য বিরাট বিরাট গুরুভার কয়খানা পেতল না কীসের হাতুড়ি দেখেচিলাম না? সেগুলোর একখানা আমার দরকার” এই বলে কালীপদ কানাইয়ের দিকে তাকানো মাত্র কানাই ইতিবাচক ঘাড় নাড়ল দেখে কালী পুনরায় কইলো, “বেশ, কানাই বলচে ও ঐ হাতুড়ি দিব্যি তুলতে পারবে। ঐ হাতুড়ি একখানা আমরা আজকের মধ্যে কুমরুর মন্দিরে লুকিয়ে রাখব। কারণ আছে। এবং তারপর…”

    সরোজিনী সামান্য ইতস্তত করে বললে, “কিন্তু বাবা, ঐ মন্দিরগুলিতে শুনেচি হাতিয়ার নিয়ে প্রবেশ করলে…”

    “কিছু হবে না মা। হাতুড়ি ঠিক অস্তর নয়, আর হলেও ক্ষতি নাই। আমি বলচি।”

    এমন সময়ে হরিশ এসে আলো দিয়ে গেল। কালীপদ তাকে শুধালো, “কী খবর বাছা?”

    হরিশ চিন্তিতভাবে উত্তর দিলে, “আপনার সন্দেহ যথার্থ ঠাকুর। লোকজন গোপনে জঙ্গল থেকে উঁকি মেরে যেটুকু বুঝেচে, কাপালিকদের ডেরায় ব্যস্ততা একেবারে তুঙ্গে। তারা ভারী ভারী কলকবজা এনেচে মনে হয় মন্দির ভাঙার জন্য। এবার আমাদের কী করণীয় ঠাকুর?”

    কালী একটুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে কইলো, “আমি যতক্ষণ জীবিত রয়েচি তোমাদের কিছু ক্ষতি হবে না বাবা। আমিও দেখি আমার রাক্ষসী মায়ের কী ইচ্ছা। রবিন সাহেবের চিন্তাটা কিছুটা অমূলক। তারা ঐ সময়ে মন্দির ভাঙাতেই ব্যস্ত রইবে, কারণ শিবলিঙ্গ দু-খানা তাদের প্রয়োজন, আর আপনাদের বন্দুক রয়েচে সে-কথা তারা বিলক্ষণ অবগত, ফলে তারা নিজেরা এদিকে ঘেঁষবে না। তাদের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের রাক্ষস দুটো।”

    এইবার হরিশ চমকে উঠে শুধালো, “সেকি! আমাদের বন্দুকের কথা তারা জানবে কী প্রকারে ঠাকুর?”

    কালী বিষণ্ণভাবে একটু হেসে কইল, “জানবে, কারণ বন্দুকের খবর বিষণরাম জানতো। বিষণরামই আমাদের শত্রু দলের প্রধান হরিশ, সেই মূল চক্রী। সে একজন দুর্ধর্ষ কাপালিক। তাঁবু থেকে তার অপহরণের যাত্রাপালা সে নিজেই রচনা করেচিল। সে জানতো আমার সুমুখে দাঁড়ালে তার ছদ্মবেশ টিকবে না।”

    রবিন হতবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু ঠাকুর, তার তাঁবুতে হুড়মুড় করে বাসনপত্র পড়ার শব্দ পেয়েই তো সবাই ছুটে গিয়েচিল! তখন তো বিষণকে কেউ বনের দিকে পালাতে দেখেনি!”

    “ভুল সাহেব। পুরোটাই দৃষ্টিবিভ্রম। আমরা অপহরণের স্থানে কাদামাখা বস্তা আর গাঁইতিখানা পেয়েচিলাম। সে ঐ বস্তা পায়ে জড়িয়ে রাতের আঁধারে অমন বড়ো বড়ো পায়ের ছাপ তৈরি করে, এবং ত্রিফলা গাঁইতি দিকে নখের মতো ছাপ দেয়। অপহৃত দেখানোর পূর্বে সে টলোমলো করে সাজিয়ে রাখা বাসনপত্রের সঙ্গে ঐ অকুস্থল থেকে পাওয়া দড়ির প্রান্ত আটকে রেখেচিল। সবার অলক্ষ্যে বনে প্রবিষ্ট হয়ে সেইখান থেকে দড়ি ধরে টান দেওয়া মাত্র জিনিসপত্র হুড়মুড় করে পড়ে। সেই শব্দ পেয়ে সবাই দৌড়ে গিয়ে স্বভাবতই দেখে তাঁবু ফাঁকা। বাইরে ছেঁচড়ে নিয়ে যাবার দাগ। কিছুটা রক্তের দাগ রয়েচে তাতে। সে রক্তে মানুষের না ছাগলের তা তখন বোঝা সম্ভব নয়। এটাই দৃষ্টিবিভ্রম। বিষণরাম বনের ভিতর থেকে দড়িখানা গুটিয়ে নেয়। ঐ দড়ি গুটানোর আগের মুহূর্তে হয়তো কেউ কেউ মাথাটুকু দেখতে পেয়েচিল। মনে পড়ে, তারা বলচিল যে ঐখানে তারা লম্বা সাপের মতো কিছু একটা দেখেচে? সে ভেবেচিল ভয়ে কুলিরা আর তখনই বনে ঢুকবে না, কিন্তু আমাদের হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে দেখে সে তড়িঘড়ি সবকিছু ফেলেই দৌড় দেয়।

    আপনাদের আর একটি রাঁধুনি জগন্নাথ বলচিল যে তাকে নাকি বিষণরাম সজোরে চপেটাঘাত করেচিল, কারণ সে নাকি বলে ফেলেচিল বিষণরাম সেদিন পাঁঠার বদলে রামছাগল রেঁধেচে। এই সামান্য কারণে সহকারীর গায়ে কেউ হাত তোলে না। কী থেকে কী হয় কে জানে। হয়তো ঐ রামছাগল আনার উদ্দেশ্য ছিল যাতে তার দাড়িটুকু কেটে নেওয়া যায়।”

    হরিশ বিষাদেও একটু হেসে ফেলে বললে, “বিষণরাম শেষে আমাদের হত্যা করতে চায়। চমৎকার ঠাকুর। একেই আমরা এতখানি স্নেহ করেচিলাম। কিন্তু সে রামছাগলের দাড়ি কাটলো কেন? ও দিয়ে কি কোনও মন্ত্রতন্ত্র…?”

    “আবার… আবার ঘুরে ফিরে সেই মন্ত্রের দোহাই। আরে বাবা, তোমরা অপহরণের অকুস্থল থেকে প্রথমবার যে জন্তুটার লোম পেয়েচিলে, সেইটে যে সেই ছাগলের দাড়ি নয় তা বলতে পারো জোর দিয়ে? মানুষের চুল থাকলে তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে যেত, তাই এই অভিনব পন্থা নিয়েচিল সে। নচেৎ রাঁধুনি জগন্নাথকে চড় মারার দরকার ছিল না।”

    রবিনের চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। তার চোখে ত্রাসের বদলে আগুন ঠিকরে বেরুচ্চে। সাহেব নিজের পাশে রাখা আগ্নেয়াস্ত্রে দু-বার চাপড় মেরে বলল, “আমিও এর শেষ দেখতে চাই।”

    *****

    সারারাত আমরা নিদ্রা যাইনি। বারবার পালা করে ঘুরে কুলিদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে করতে ভোরের আলো ফুটে উঠতেই চোখে পড়ল বহুদূরের ঝুমরুর মন্দিরে অসংখ্য রক্তবেশ পরিহিত শয়তানের দল জড়ো হয়েচে। তারা মন্দিরের প্রাচীর ভাঙার কাজ আরম্ভ করেচে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাইলের পর মাইল জুড়ে ঠিক যেন দুধের ছানা কেটে যাবার মতো সাদা মেঘের স্তর দেখা দিয়েচে! বাতাস এলোমেলো হয়ে বয়ে চলেচে! হঠাৎ ঝুমরুর দেউলের দিকে একবিন্দু আগুন চোখে পড়ল, আর তা দেখামাত্র কালীপদ চীৎকার করে উঠল, “হুঁশিয়ার! সবাই লুকিয়ে পড়ো। রাক্ষস জেগেছে!”

    আমরা অতগুলি মানুষ বিদ্যুতের গতিতে সদ্য খনন করা প্রশস্ত নালায় প্রবেশ করলাম। কয়েকজন কুলি গর্তের উপরিভাগে বিরাট মোটা মোটা লোহার পাত চাপিয়ে দিল। তাদের মাঝে মাঝে যৎসামান্য ফোকর থাকলো বাতাস চলাচলের জন্য। আমরা এক মহা বিপদের জন্য প্রহর গুণে চলেচি, আচমকা মাটি যেন গুরগুর করে মৃদু কেঁপে উঠল, বাতাসের গতিবেগ আচমকাই বহুগুণ বেড়ে গেল। আকাশের দিকে ফোকর দিয়ে চেয়ে দেখলাম মেঘগুলি যেন আতঙ্কে পাগলের ন্যায় ছুটতে শুরু করেচে! কালীপদ তিক্ত স্বরে ফিসফিস করে কইল, “একচক্ষু দানব সাগর থেকে মাটিতে উঠে পড়েচে ডাক্তার!”

    আমরা অতগুলি প্রাণী গর্তে বসে ঠকঠক করে কাঁপচি! বাইরে যেন বিরাট কোনও একটা জীব সবকিছু তছনছ করে চলেচে! প্রকাণ্ড ভারী ভারী ইঁট পাথর কেউ যেন আক্রোশে ছুঁড়ে চলেচে আমাদের দিকে! কামিনরা কেঁদে উঠল। তাদের বাচ্চাকাচ্চারা সমস্বরে কাঁদতে আরম্ভ করল। বিকু তার মায়ের কোলে আতঙ্কে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেচে। সহসা কালীপদ বাইরের কানফাটানো শব্দকে ছাপিয়ে চিৎকার করে বললে, “একচক্ষু দানব আসলে কে দেখতে চাও ডাক্তার? কি সাহেব, দেখতে চাও কোন শয়তান চারশো বছর আগে এই চুমুকের থানকে মশানে পরিণত করেচিল? খুব সতর্কভাবে একটুখানি মুখ বাড়িয়ে দেখো। সাবধান! বেশি বের হয়ো না!”

    আমরা তিনখানা ফোকর দিয়ে বাইরে চোখ রেখেই থরথর করে কেঁপে উঠলাম! এ কী! কী সর্বনাশ! চারদিক ধুলায় বালিতে একেবারে আচ্ছাদিত হয়ে গিয়েচে প্রায়। বিশাল বিশাল ডালপালা ছিটকে ছিটকে পড়ছে, আর দুই মন্দিরের থেকে সম দূরত্বে সাগরের বনের উপরে আবছা আবছা ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েচে একখানা অতি ভয়ঙ্কর চেহারার দানবের মতো কিছু একটা অবয়ব! তার প্রকাণ্ড একখানা লেজ এসে ঠেকেচে ভূমিতে, তার শরীরটাকে ঘিরে পাক খেয়ে চলেচে বিরাট বিরাট সব গাছপালা, আর… আর তার ঠিক পেটের কাছটায় আঁধারের চাইতেও আরও আঁধার একখানা সর্বগ্রাসী চোখের মতো বিন্দু! আমার চোখে ধাঁধা লাগলেও সাহেবের চোখে লাগেনি। রবিন চিৎকার করে সবিস্ময়ে বলে উঠল, “ঘূর্ণি… ঘূর্ণিঝড়!”

    *****

    কালীপদ আমাকে টেনে আনলো গর্তে। আমার গলা শুকিয়ে গিয়েচে প্রায়। কালীপদ তা লক্ষ্য করে কইল, “হাঁ। ঘূর্ণিঝড়। ভয়ংকর এক ঘূর্ণি। দুইটির মধ্যে এই সেই প্রথম দানব, যাকে বশ করার বিদ্যা লেখা ছিল ঐ চুরি যাওয়া পুঁথিতে। যে দানবের আভাস দিয়েচিল গরগেলরা তাদের নাচের ভঙ্গিতে। এমন এক রাক্ষস, যার পেটের কাছে চোখের মতো কেন্দ্র রয়, যার হাতে ধরা থাকে বিশাল সব বৃক্ষ, যার পুচ্ছ দিগন্ত বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সাক্ষাৎ যমের অনুচর এই শক্তিই অর্ধেক তালুককে শেষ করে দিয়েচিল।”

    রবিন ভাঙা স্বরে কোনও মতে বলল, “গরগেলদের দ্বিতীয় নাচের অর্থ কী ঠাকুর? মশা মারার ভঙ্গিতে ঐ নাচ কিসের ইঙ্গিত দিচ্চিল? এইবার কে আসচে? ঐ কালো মেঘের ছবিটা আসলে কীসের ছিল? ঐ দ্বিতীয় দানব আসলে কে? তাকে আটকানো যায় না ঠাকুর?”

    কালীপদ ভ্রু কুঞ্চিত করে উত্তরে কইল, “সে কথা সময়ে জানতে পারবে, তবে একে আটকালে চলবে না সাহেব। একে আসতে দিতে হবে। নাহলে ঐ শয়তান সংবর্তকের দল নির্বিঘ্নে শিবলিঙ্গ দু-খানি নিয়ে চলে যাবে, আর তার চাইতেও বড়ো কথা, ঐ পাতক বিষণরাম জীবিত থেকে পৃথিবীর সর্বনাশের যজ্ঞে আহুতি দেবে। সেসব পরে বলচি, তার আগে একটা কথা বলি, শিবের মুখ তো উত্তুরে থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কুমরুর মুখ সাগরের দিকে কেন? দখিনে কখনও শিবের মুখ রয় না সাহেব। উপরন্তু সেখানা শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েচিল। কেন? ঠাকুরের সামনে আয়েশ করা নিষিদ্ধ কেন? আয়েশের খাঁড়ি অর্ধচন্দ্রাকার কেন? এগুলির উত্তর জানেন?”

    আমরা হতবুদ্ধি হয়ে ঘাড় নাড়লাম। মনে হল বুঝি নিজের অজান্তেই চারশত বৎসর পূর্বের জলজ্যান্ত অতীতের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েচি! বাইরে আবার উঁকি মেরে দেখলাম, কোনও একটা অদৃশ্য শক্তিতে বাধা পেয়েই হয়তো দানবটা এই ছোট্ট এলাকাটুকুতে নিজের পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপাতে পারচে না। কেমন যেন একটা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুটে গেল সাইটের অপরপ্রান্তে, যেখানে আমাদের তাঁবুগুলি রয়েচে, এবং গোটা এলাকাটা এক লহমায় তছনছ করে দিয়ে তার তেজ কমতে আরম্ভ করল। বাইরের ঝোড়ো শব্দ কমে আসায় কালীপদ এবার অপেক্ষাকৃত ধীর স্বরে বলল, “এইবার আমি দ্বিতীয় দানবকে আমন্ত্রণ জানাই ডাক্তার। সে তখনই আসবে যখন বিষণরাম টের পাবে যে আমরা অক্ষত রয়েচি। তবে সবার উপরে ওঠার আবশ্যকতা নাই, আমি আর কানাই উঠলেই হবে। তোমরা…”

    আমরা সমস্বরে কথা থামিয়ে দিয়ে দৃঢ় সংকল্পের সুরে কইলাম, “অসম্ভব!” রবিন আর হরিশ দুইজনও আমার সুরেই সুর মেলাল। অগত্যা কালীপদ কিঞ্চিৎ দোনামনা করে রাজি হল। আমরা বাকিদের গুপ্ত রেখে পাঁচজন মিলে লোহার পাত সরিয়ে উপরে উঠে দাঁড়ালাম। কানাই সড়কিটা হাতে নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে এতক্ষণ অনড় হয়ে বসে থাকার আলস্য কাটাতে শুরু করল। সামান্য সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরেই বহুদূরে ঠাহর করে দেখলাম অতগুলি লাল কাপড়ের ভিড়ে একখানা দশাসই কালো আলখাল্লার মতো পোষাক পরিহিত মানুষ এসে দাঁড়াল। সে কিছুক্ষণ এইদিকে নজর করে কী একটা যেন করল, সঙ্গে সঙ্গে এক ভলক আগুনের মতো শিখা জ্বলে উঠল, আর তাই দেখে কালীপদ চেঁচিয়ে বলে উঠল, “খবরদার! হুঁশিয়ার! দ্বিতীয় পিশাচ এখুনি আক্রমণ করবে। যতো জোরে পারো কুমরুর দেউলে প্রবেশ করতে হবে আমাদের। দৌড়াও ডাক্তার।”

    আমরা পড়িমড়ি দৌড়াতে দৌড়াতেই আঁতকে উঠে লক্ষ্য করলাম ঐ শয়তান বিষণরাম আমাদের মন্দিরে যাওয়া আটকানোর জন্যই বোধকরি নিজের দলের থেকে জনাকতক পাষণ্ডকে নির্দেশ দিল মাঝপথেই আমাদের বধ করার উদ্দেশ্যে। তারা সশস্ত্র হয়ে প্রাণপণ ছুটে আসচে হিংস্রভাবে! এইখানে থেকে দৌড়াতে গিয়ে ঠিক বোঝা যাচ্চে না, তবে দশ বারোজন কমপক্ষে হবে তারা! আমরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে প্রায় মন্দিরের কাছাকাছি চলে এসেচি, সভয়ে দেখলাম ঐ খুনিয়াগুলোও আমাদের প্রায় ধরো ধরো হয়ে এসেচে, কিন্তু তার থেকেও ভয়াবহ কিছু আমার চোখে পড়েচে ততক্ষণে!

    হা ঈশ্বর! ওইটা কী?

    আকাশের প্রায় আধখানা সম্পূর্ণ কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ হয়ে ঢেকে গিয়েচে! একখানা বিভীষণ মেঘের পুঞ্জ যেন হু হু করে এগিয়ে আসচে মাটির দিকে! মেঘটা সরু হয়ে যেন এইদিকেই নেমে আসচে। কেউ যেন তাদের আদিষ্ট করেচে বেছে বেছে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যই! এই সর্বনাশা মেঘকেই কি চারশত বৎসর পূর্বে চুমুকের থানের লোকেরা মরবার আগে প্রত্যক্ষ করেচিল? আমরাও কি তবে…?”

    লোকগুলো হুড়মুড়িয়ে কয়েক হাতের মধ্যে এসে পড়েছে! তাদের হাতে দাউলি, সুতীক্ষ্ণ বল্লম এবং খাঁড়া। মন্দিরের ভিতরে হয়তো অস্ত্র নিয়ে তারা ঢুকতে চায় না বলেই আগেভাগেই আমাদের নিকেশ করতে চায় এই ঘাতকরা। রবিন সাহেব আর হরিশ তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বন্দুক ফেলে এসেচে গর্তেই। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অসম সাহসী কানাই চকিতে একটু ভেবে নিয়ে তার হাতের সামান্য সড়কিটা নিয়েই ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের বললে, “আপনারা ভিতরে পালান কর্তাবাবা, আমি রইলাম বাইরে। আপনারা গিয়েই মন্দিরের কপাট দিন।”

    আমার পা চলচে না দেখে কালীপদ একবার নির্নিমেষে এতদিনের সঙ্গী কানাইয়ের দিকে চেয়েই আমার হাত ধরে টান দিল। অনিচ্ছা সত্বেও আমরা এসে পড়লাম কুমরুর দেউলের ভিতরে। এত বৎসরের কপাট কিন্তু অনেক বলপ্রয়োগ করেও কিছুতেই বন্ধ করা গেল না। বাইরে দশের বিরুদ্ধে একের অসম আস্ফালন আর রক্তপিপাসু অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ একটু পরেই স্তব্ধ হয়ে গেল। আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমি চোখের জল মুছে কালীপদকে কিছু একটা বলতে যাব, এমন সময়ে রক্ত মাখা সড়কি হাতে কানাই এসে প্রবেশ করল। আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে কালীপদ নিরুত্তাপ কণ্ঠে শুধাল, “সবকয়টা নিকেশ হয়েচে তো হতভাগা?”

    কানাই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। আমরা চকিতে একবার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম কতকগুলি মৃতদেহ পড়ে রয়েচে ছড়িয়ে, আর আকাশের ঐ রাক্ষুসে মেঘ সোজা হয়ে নীচে নেমে এসেচে অনেকখানি! দোরের সামনেই যেখানে আয়েশের খাঁড়ি শেষ হয়েচে, সেখানে গুটি পাকিয়ে পড়ে রয়েচে গোটা খাঁড়ি জুড়ে গতকাল রাতে বিছিয়ে রাখা সেই লোহার দড়ি, যার অপরপ্রান্ত বাঁধা রয়েচে মাঠের ওপাশের ঝুমরুর লিঙ্গে। কালীপদ চোখের ইশারা করতেই কানাই সড়কিটা ফেলে দিয়ে মন্দিরে লুকানো গুরুভার

    হাতুড়িখানা তুলে নিয়ে ঘা বসালো কুমরুকে বেঁধে রাখা পেতলের ভারী শেকলে। মুখুজ্জেমশায় আমাদের বললে, “সাবধান ডাক্তার, দোরের সুমুখ থেকে সরে যাও, বিপদ ঘটবে।”

    আমরা দেওয়ালের একেবারে কোন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কানাই বলশালী বাহুতে আঘাতের পর আঘাত করে চলেচে শেকলের আঙটায়। কালীপদ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, “পুঁথি কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে সত্য সাহেব। এই শিবলিঙ্গ সত্যিই মহা মূল্যবান মণি দ্বারা তৈরি। সে মণি কোনও রত্ন বা মণিমুক্তা নয়, তার চাইতেও বহু মূল্যবান এক পাথরের তৈরি।”

    সাহেব হতবাক হয়ে শিবলিঙ্গের দিকে চেয়ে বলল, “মণি? কোথায় মণি?”

    “মণি আপনার চোখের সামনেই সাহেব। গোটা শিবলিঙ্গ দুটোই কালো পাথরের মতো মণিতে গঠিত। এর নাম অয়স্কান্ত মণি। দেবভাষায় লোহাকে অয়স্ বলা হয়। অয়স্কান্ত অর্থ চুম্বক। এই দু-খানি লিঙ্গই মহা শক্তিশালী দু-খানি চুম্বকে গঠিত। দুইটি আলাদা আলাদা চুম্বক, দুইদিকে মুখ ঘুরিয়ে স্থাপন করা, ফলে এদের মধ্যে চিরন্তন ঝগড়া। অনেকটা পৃথিবীর দুইখানি মেরুর মতোই। হয়তো সেই থেকেই নামদুটি বিকৃতি লাভ করে ঝুমরু কুমরুতে পর্যবসিত হয়েচে। আমি আমার অতি স্বল্পবিদ্যায় যেটুকু শুনেচি তাতে চুম্বক মাত্রেই দুইখানি মেরু বর্তমান, কিন্তু কেবলমাত্র বৈপরীত্য স্থাপনার অদ্ভুত কৌশলের মাধ্যমে এদের বিপ্রতীপ করে রাখা হয়েচে, কিন্তু এদের ঐ অশ্বক্ষুরাকৃতি সংযুক্তির মাধ্যমে যুক্ত করে দিলেই এরা একখানা নিটোল এবং অভিন্ন অয়স্কান্তে পরিণত হয়। তাই ভাবি ডাক্তার, এরা একে অপরের পাশে থাকলে ছিটকে যায় কেন, লড়াই করে কেন? তুমি পুঁথিটা কিছুটা অপভ্রংশ হিসেবে পড়েচো সাহেব, কারণ চারশো বছর আগের ঐ দুর্যোগের সময়েরও বহু আগে স্থাপিত এই মন্দির। এই মন্দিরে আয়েশ করা নিষিদ্ধ নয়, এই মন্দিরের ভিতরে অয়স্, অর্থাৎ লোহার কোনও সামগ্রী আনা নিষেধ। ভগবান তৎক্ষণাৎ সেই অয়স্ হরণ করেন। সেইদিন মন্তর পড়া কীলক ভেট দেবার নাম করেও আমি এর চৌম্বকত্ব পরীক্ষা করে গিয়েচি।

    আপনার কুলিরা মন্দিরে খননের সময়ে যে বাধা অনুভব করেচিল, তাও হয়েচিল তাদের লোহার যন্ত্রপাতির কারণেই। মাঠের এই দুইপাশের দুই মন্দিরের কারণে পুরো মাঠটাই একটা চুম্বক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েচে। এইজন্যই শিবলিঙ্গের গায়ে লোহার বদলে পেতলের শেকল জড়াতে হয়েছিল। এই বিক্রিয়ার জন্যই সম্ভবতঃ সে যুগের রোগীরা মাঠে থাকলে আরোগ্য লাভ করতো। চুম্বক ভাষাটা খাস বাংলা কিনা জানিনে, তবে ভাষাটা সেই যুগেও চলতি ছিল তা নিশ্চিত। তালুকটার নাম নিশ্চয়ই চুম্বকের থান ছিল, যেটা অপভ্রংশ হয়ে এখন…”

    ঝনাৎ শব্দে প্রকাণ্ড শেকলের আংটা খুলে পড়ল মন্দিরের প্রাচীর থেকে এবং আমরা চমৎকৃত হয়ে প্রত্যক্ষ করলাম কিসের যেন অমোঘ টানে কুমরুর মূর্তি নিজে থেকেই ঘড়ঘড় শব্দে উলটো পানে ঘুরে গেল। ভগবান মহাদেব নিজের চিরাচরিত নিয়ম মেনেই যেন উত্তরমুখী হয়ে বসলেন, এবং মুহূর্তের মধ্যে বাইরে গুটিয়ে রাখা লোহার দড়ির প্রান্তটি বজ্রের গতিতে ছুটে এসে শিবলিঙ্গের গাত্রে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল। কালীপদ আবার চিৎকার করে উঠল, “এইবার যত জোর আছে ছুটতে শুরু করো। গর্তে পৌঁছাতেই হবে। এখুনি নরভূক শয়তানের দল এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের উপর।”

    আমি দৌড়াতে দৌড়াতেই চমকে উঠে দেখি আকাশের সেই প্রায় মাটি ছুঁয়ে আসা বিকট মেঘ হঠাৎ দুইখানি সরু ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েচে। দূরে ঝুমরুর মন্দিরের নরপশুগুলোও কাজ থামিয়ে দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করেচে! আমরা বেদম হয়ে ছুটে গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোহার পাতগুলি টেনে দেওয়া মাত্ৰ যেন অজস্র ছররার গুলি ছিটকে এল পাতের উপরে। কালী সতর্ক করে বললে, “সবাই পাতের তলায় থাকো। জোড়ের ফাঁকের কাছে কেউ যেন না থাকে।” আমিও ভয়ে পিছিয়ে বসলাম। লোহার চাদরের উপরে যেন লুইস বন্দুকের গুলি বৃষ্টি হয়ে চলেচে! গোটা এলাকাটার উপরেই যেন একটা অশুভ অভিশাপ বর্ষিত হতে আরম্ভ করেচে! আমি কালীপদকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “দাদা, উপরে কী হচ্চে? এই রাক্ষস আসলে কে? পুঁথিতে আঁকা ঐ কালো মেঘটা আসলে কীসের প্রতীক ছিল? গরগেলরা মশা তাড়ানোর নাচের ইঙ্গিতে আসলে কীসের কথা…”

    আমার বাক্য সম্পূর্ণ নিঃসৃত হবার পূর্বেই জোড়ের ফাঁক দিয়ে গলে কী যেন একটা অদ্ভুত বস্তু ছিটকে এসে গেঁথে গেল নরম মাটিতে! আমি বিস্মিত হয়ে সেটাকে হাতে তুলে চমকে উঠলাম!

    আমার হাতে একখানা পতঙ্গ! রক্ত মাংসের পতঙ্গ নয়, কুচকুচে লোহার তৈরি একখানা অদ্ভুত পতঙ্গ! তার মুখে সরু সরু ধারালো দাঁতের পাটি। পতঙ্গের শরীরে এমন দাঁত কখনও কল্পনাও করা চলে না। সেটা একবার নিজের হিংস্র মুখটা ফাঁক করেই মরে গেল। আমি সেটাকে হাতে নিয়ে শুষ্ক কন্ঠে কইলাম, “একি দাদা! এ তো… এটা তো…”

    “পঙ্গপাল ডাক্তার। রাক্ষুসে পঙ্গপাল। এরাই কালো মেঘের মতো করে ছেয়ে আসে দিগন্ত জুড়ে। পঙ্গপাল কেবলমাত্র শস্য নষ্ট করে, কিন্তু লোহার গুঁড়ায় মন্ত্র পড়ে জীবন দেওয়া এই বুভুক্ষু জীবের দল আহার করে নরমাংস। এর আক্রমণের পর একটা জাতির বেশিক্ষণ জীবিত থাকা সম্ভব নয়। এরা আমাদেরও ছিঁড়ে খেতেই এসেচিল, কিন্তু বাধ সাধলো চুম্বক। শুধু ঝুমরু বা কুমরু নয়, এই আধা চাঁদের আকারের আয়েশের খাঁড়ি জুড়ে বিছানো লোহার দড়ির সংযোগে এই চুম্বক এখন অশ্বক্ষুরাকৃতি মহাচুম্বকে রূপান্তরিত হয়ে পড়েচে। সেই অমোঘ টান আকাশের থেকেই নিজের গায়ে টেনে নামিয়েচে লোহায় তৈরি এই দানবদের। ঝুমরু কুমরু এখন ঝগড়া ভুলে বন্ধুতে পরিণত হয়েচে। কতো বড়ো বিজ্ঞানকে মাথায় রেখে অতদিন আগে মানুষগুলো এই লিঙ্গ এবং এই খাঁড়ি বানিয়েছিল ভাবতে পারো ডাক্তার? যে বয়স্ক মানুষটির কঙ্কাল আপনারা পেয়েছিলেন, আমার মনে হয় ঐ দ্বিতীয় পুঁথিটি, অর্থাৎ গাঁয়ের জীবনচরিত লেখা যে পুঁথিটির কথা আপনি বলেচিলেন, সেটা হয়তো ওনারই লেখা। উনিও এই রহস্যের কথা উদ্ধার করেচিলেন নিশ্চয়ই, আয়েশের খাঁড়িকে অয়স্ দ্বারা পূরণ করবার ইঙ্গিতও হয়তো তাঁর অজানা ছিল না, কিন্তু কার্যকালে আকস্মিকতায় তা প্রয়োগ করতে পারেননি।

    খাঁড়িটা কিন্তু মন্দির থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে লোহা দ্বারা পূরণ করাই ছিল সাহেব, কিন্তু সেটাকে ঐ নিকাশি নালা ভেবে তোমরা উপড়ে ফেলেচো। লোহার নালাটার কথা শুনে আমার মনে একটা সন্দেহ উঁকি দিয়েচিল, কারণ খাঁড়ি দুটো তো মন্দিরের থেকে কয়েক হাত দূরেই শেষ হয়েচে, তাতে শিবলিঙ্গ ধোয়া জলই বা আসবে কোথা থেকে? গাঁয়ের লোকেরা যদি আমাদের মতো এই মাঠে এসে আশ্রয় নিত, তবে হয়তো এভাবে ইন্দুরের ন্যায় মরতে হতো না। অশ্বক্ষুরাকৃতি এই চুম্বকের বৃত্ত সম্পূর্ণ করায় তার ক্ষমতা সহস্রগুণ তেজোময় হয়েচে বটে, কিন্তু তা ছাড়াও এমনিতেও একটা বিরাট টান বিদ্যমান ছিলই মাঠ জুড়ে। যে কারণে ঐ দুইজন ব্যক্তি রাক্ষুসে আক্রমণের থেকে তখনকার মতো বেঁচে গিয়েচিল হয়তো। পরে কোনওভাবে তারা মারা পড়ে। চারশো বছর আগে কাপালিক বিকুম্ভের বর্ণনায় উনি লিখেচেন যে ‘বিকুম্ভর হিংস্র চোখে নরকের দৃষ্টি। পরনে মিশমিশে কালো আলখাল্লা, হাতে ত্রিশূল, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, গলায় আর পায়ে লোহার রুলি। ‘

    আমার সন্দেহ হয়, ঐ বিকুম্ভ শিবলিঙ্গের ক্ষমতাটুকু অনুমান করলেও আসল স্বরূপটি ভেদ করতে পারেনি এবং সেই কারণেই সে হতভাগা মুর্খের ন্যায় তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েচিলেন। বিকুম্ভের গলার লোহার রুলিকে সামনে পেয়ে তা তীব্র আকর্ষণে টেনে ধরে শিবলিঙ্গের চুম্বক এবং বিকুম্ভ ফাঁসি লেগে তৎক্ষণাৎ জীবন হারায়।”

    হরিশ উৎফুল্ল হয়ে শুধাল, “তাহলে কি ঠাকুর ঐ শয়তানের কোনও মন্ত্ৰ তন্ত্র আর আমাদের কোনও ক্ষতি…”

    বিকু হঠাৎ ছুটে এসে কালীপদর কোলে মুখ লুকাল। কালীপদ নিজের কথা অসমাপ্ত রেখেই আমাদের দিকে চেয়ে নিজের ঠোঁটে তর্জনী রেখে মৃদু ভর্ৎসনা করে কইল, “শশশশ্, বেচারাকে ঘুমুতে দাও। কথা পরেও হবে। তোমাদের শুধুই সারাক্ষণ মন্ত্র মন্ত্র আর মন্ত্র। আর পারিনে।”

    আমি চমৎকৃত হয়ে চেয়ে দেখলুম একটু আগের ক্ষুরধার মেধার এক অমিত বিক্রম তান্ত্রিক কোন মন্ত্রবলে এক স্নেহশীল মাতামহে পরিণত হয়েছে!

    *****

    বেলা বেশ বেড়ে গিয়েচে। ঘুমন্ত বিকুকে নিয়ে কুলিদের সঙ্গে সরোজিনী চলে গেল কুলিদের খাটানো নতুন তাঁবুতে। চারদিক সত্যিই যেন জোড়া দানবের বুভুক্ষু আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েচে। ঝুমরুর দেউলের বরাবর আমরা এগোনোর সময়ে লক্ষ করলুম ঐ আয়েশের খাঁড়ি বরাবর লক্ষ লক্ষ লৌহকীট মরে আটকে রয়েচে। সেসব পেরিয়ে মন্দিরের সামনে গিয়ে চোখে পড়ল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ইতিমধ্যে শয়তানের দল মন্দিরের প্রাচীর অনেকখানি ভেঙে ফেলেচে, কারণ প্রাচীর না ভাঙলে ঐ সুবৃহৎ শিবলিঙ্গ তারা তুলে নিয়ে যেতে পারতো না, আর সেইটা সরাতে গেলেই লোহার দড়িখানা তাদের চোখ এড়াতো না। সেদিকে মহাকাল স্বয়ং রক্ষা করেচেন।

    দু-খানি মন্দিরই যেন লৌহকীটের স্তুপের তলায় চাপা পড়েচে প্রায়। দুর থেকে কুমরুর দেউলের যেটুকু দৃশ্যমান হচ্চে সেইটেও তথৈবচ। আমাদের সামনে অজস্র রক্তবর্ণ পোষাক পরিহিত কাপালিকের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ ছড়িয়ে রয়েচে, আর কালো আলখাল্লা পরিহিত বিষণরাম নিজের সুপরিকল্পিত শয়তানি ফাঁদকে আরও ধুরন্ধর তান্ত্রিকের হাতে নিষ্ফল হতে দেখে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বিফল আক্রোশে শেষবারের জন্য চেষ্টা করেচিল অন্ততঃ একটি অয়স্কান্ত লিঙ্গকে তুলে নিয়ে যাবার জন্য। সে যথেষ্ট বুঝেচিল যে এই দুই মহা শক্তিময় বস্তু উপস্থিত থাকলে তার শক্তিতেও একটা প্রাকৃতিক খুঁত এবং মরণফাঁদ থেকেই যাবে।

    দশাসই বিষণরাম দুইহাতে ঝুমরুর মূর্তিকে জড়িয়ে রয়েচে। তার বিপুল দেহকে ননীর ন্যায় ছিন্নভিন্ন করে বাকি কাপালিকদের মৃতদেহের মতোই লোহার দানবরা এফোঁড়-ওফোঁড় করে ঝাঁকে ঝাঁকে শিবলিঙ্গে গিয়ে আটকে রয়েচে। ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ভয়ংকর শবগুলির দিকে তাকিয়ে জীবনে এতগুলি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা ক্যাম্পবেলের ছাত্র এই আমি অবধি চোখ মুদ্রিত করে ফেললাম।

    রবিন কাঁপা কাঁপা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে হাতজোড় করে কইল, “ঠাকুর, আজ আমি মুক্তকন্ঠে স্বীকৃতি দিলাম, ভারতবর্ষের তন্ত্র এবং ভারতবর্ষের বিজ্ঞান দুইই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আপনার তন্ত্রশক্তি এবং বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিযুক্ত মেধা ব্যতীত এই রাক্ষুসে একচক্ষু দানবের বিনাশ ঘটতো না। একটা দিন আসবে, যখন নতুন সূর্যের উদয় হবে, সেই আলোতে এই দুই সম্পদ গোটা বিশ্বের কাছে আদৃত হবে সসম্মানে। যুগ পেরিয়ে যাবে, আমরা হারিয়ে যাব, কিন্তু আপনার কীর্তি অমর হয়ে থাকবে বাঙ্গালির ঘরে। ধন্য আপনার তন্ত্র শিক্ষা।”

    “উঁহু সাহেব, তন্ত্র নয়, তন্ত্রবিজ্ঞান”

    ⤷
    1 2 3 4
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু
    Next Article বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    Related Articles

    সৌমিক দে

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    সৌমিক দে

    কালীগুণীন ত্রাহিমাম – সৌমিক দে

    March 20, 2026
    সৌমিক দে

    সর্বংসহ কালীগুণীন – সৌমিক দে

    March 20, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }