গুপ্তঘাতকের কবলে কালীগুণীন
যেবারের কথা আজ তোমাদের বলতে চলেচি, সেই সময়ে মুখুজ্জেমশাই রায়দিঘড়া থেকে কানাই সর্দারকে সঙ্গে করে কলকাতায় এসেচিলেন দেওয়ানি কিছু কাজকর্ম নিয়ে আলিপুরের সদরে। কাজ সমাধা হবার পর দিন দুয়েক আমার নেবুতলার বাড়িতে কাটিয়ে যাবেন, এমনটাই ছিল ইচ্ছা, কিন্তু বিধি বাম। পথে কোনো এক ভাতের হোটেলে আহারের পর তাঁকে ধরল পীতজ্বর রোগে। হয়তো দীর্ঘদিনের অনিয়ম আর অমানুষিক পরিশ্রমের জন্যই। অমন শক্তপোক্ত শরীরখানাকে পুরোপুরি কবজা না-করতে পারলেও রীতিমতো কাবু করে এনেচিলো তাকে। কানাইকে ফেরত পাঠিয়ে মুখুজ্জেমশায় বারংবার কয়ে দিল যে সে যেন গাঁয়ে ফিরে এইটেই বলে যে, হাকিম ছুটিতে রয়েচেন। তাঁর ফিরতে দিনকতক বিলম্ব হবে, তারপর কাজকর্ম মিটিয়ে একেবারে সে বাড়ি ফিরবে। আমি রাত্তির জাগরণ করে, ঔষধ বদলে বদলে খাইয়ে, শিশির পর শিশি মিক্সচার তৈরি করে মোটামুটি আরোগ্য করে এনেচি, এমন সময়ে একদিন দ্বিপ্রহরে কালীপদকে ঔষধ দিচ্চি, হঠাৎ শিশি সরিয়ে কালীপদ বড়ো বিব্রত হয়ে বলে উঠলে, “আহঃ, এ বড়ো জ্বালা হল।”
আমি অভিমানী স্বরে কইলাম, “তা বলবে বই-কি, রাত জেগে সেবা করলুম, আর এখন ঔষধসেবনের বেলায়…”
কালীপদ তিক্ত কণ্ঠে কইল, “তোমাকে বলিনি। আরও বড়ো বিড়ম্বনা এসে উপস্থিত। এখন কী জবাব দিই তা-ই ভেবে সারা হচ্চি।”
কিয়ৎক্ষণ পরেই কানাইকে সঙ্গে করে গৃহে পা রাখল বউঠান। কানাইকে পইপই করে যে কথাটির জন্য সাবধান করে দেওয়া হয়েচিলো, সরল কানাই বউঠানের হাকিমি জেরা সইতে না পেরে সেইটে ফাঁস করে বসে আছে। কানাই অপরাধী মুখ করে ছাতা রাখার আকর্ষির কাছে ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে রয়েচে, আমার মুখ দোটানায় পড়া দায়গ্রস্ত পিতার ন্যায়, কালীপদ শুষ্ক হেসে কী যেন একটা অজুহাত দিল, কিন্তু স্পষ্ট শ্রুতিগোচর হল না।
এমতাবস্থায় বউঠান যদি দুটো ভালোমন্দ কথা, নিদেনপক্ষে বকাঝকা করত, তা-ও ঝড়টা কেটে যেত, কিন্তু সে বাইরের কলে হাত-পা ধৌত করে সোজা কক্ষে গিয়ে ঢুকল। কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে কানাইয়ের পানে চাইতেই কানাই তড়িঘড়ি অন্যত্র চলে গেল।
দ্বিপ্রহরে দুইজনের কী কথা হয়েচে তা জানিনে, তবে সন্ধ্যা থেকে ঔষধের ভার আমার উপর ন্যস্ত করে নিজে রসবতীতে প্রবেশ করল পথ্যের ভার সামলাতে। এইভাবে আরও একটা হপ্তা গেলে পর কালীপদ শরীরে কিছুটা বল ফিরে পেয়েচে, ক্ষুধাও হচ্চে বিলক্ষণ। তো, সেইদিন রাত্তিরে দুইজন আহার করতে বসেচি, বউঠান আহার্য পরিবেশন করচে। ধোঁয়া-ওঠা অন্নরাশি, ঘন কলাইয়ের ডাল, আলু ভাজা, কাঁচকলার ব্যঞ্জন, গরমমশলার আঘ্রাণ-মাখানো ফুলকপির তরকারিতে লম্বা চৌচির-করা আলুর টুকরো আর ফুলকপির ডাঁটার সরষে চচ্চড়ি। কালীপদ আর বউঠান কলকাতায় এলেই আমি ন-টাকায় মোট দশ কিলোগ্রাম আলু কিনে আনি, আর মরশুম বুঝে আট থেকে নয় টাকা কিলোগ্রামের মধ্যে খুব ভালো ইলিশ মাছ। গ্রামে আর যা-ই সহজলভ্য হোক, আলু বেশ দুষ্প্রাপ্য। আলুকে একখানা বড়োমানুষি শৌখিন খাবারের মধ্যে ফেলা হয়। কানাই এই কয়দিন কালীপদর থেকে লুকিয়ে বেড়িয়েচে। আজ একরাশ রুটি আর ডাল নিয়ে বসেচে রসুইয়ের সুমুখে।
যাক, কাজের কথায় অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা এসে পড়ে। তো, আমরা আহার করচি, হঠাৎ সদরের দিকের জানালায় একখানা মুখ উঁকি দিয়ে কইল, “ডাক্তার, বাড়ি আছ?”
আমি প্রথমে চিনতে পারিনি, কারণ দুই বৎসর পূর্বে যখন দেখি, তখন এর ঝাঁকড়া চুল, আর এখন প্রায় ন্যাড়া বললেই চলে। ভালো করে তাকিয়ে আনন্দের সঙ্গে বললুম, “ও কে ও? ঈশ্বর নাকি? আসো, আসো ভায়া…
ঈশ্বর উদবিগ্ন স্বরে উত্তর দিলে, “না না, আজ নয়, কাল সকালে গাড়ি আছে শিয়ালদহ থেকে। কাল একবার আসব যাবার আগে। কথা রয়েচে ডাক্তার। এখন আসি।”
আমি হাঁ হাঁ করে উঠবার আগেই ঈশ্বর গবাক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে রাজপথে মিলিয়ে গিয়েচে। আমি বিরক্ত হয়ে কইলাম, “কেমন যেন হয়ে গিয়েচে লোকটা। এভাবে আসার মানে কী? দুয়োর থেকে ফিরে গেল, দুটো কথা অবধি নাই।”
কালীপদ বিরাট ডাবরের মতো জলপাত্রে হাত-মুখ ধুয়ে কইল, “দোষটা তার পরিস্থিতি না জেনেই আরোপ করাটা হয়তো উচিত নয়। সম্ভবত বড়ো জ্বালায় ভুগচে বেচারা। সকালে যখন আসবে, তখন জেনে নিয়ো।”
“কিন্তু কীসের জ্বালায় এমন বাণের গতিতে ছুটে চলেচে বাখরাবাদ থেকে কলকাতায় এসে? পুলিশ কর্মচারী পিছনে ফেউ লাগেনি তো?”
কালীপদ খর দৃষ্টি মেলে খালি জানালার পানে চেয়ে কইল, “তোমার অনুমান যথার্থ। ফেউ একটা লেগেচে, ডাক্তার। তবে সেটা লাল পাগড়ি নয়।”
আমি বিস্মিত হয়ে শুধালাম, “তবে?”
উত্তরে কালীপদ একটাও শব্দ খরচ করল না, শুধু আমার পানে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে এমনভাবে চাইল, যে দৃষ্টি দেখে আমি চমকে উঠে নিচু গলায় বলে উঠলাম, “কী সর্বনাশ!”
*****
রাত্তিরে আহারান্তে বৈঠকের ঘরে কালীপদ বই মুখে নিয়ে লবঙ্গ চিবুচ্চে, এমন সময়ে আমি প্রবেশ করতেই সে মুখ তুলে শুধাল, “পড়া ধরবে আবার?”
কালীপদ এই অলস দিনগুলিতে কর্মের অভাবে গোগ্রাসে বইপত্তর পড়ে চলেচিলো। সেগুলি এমন কিছু সুখপাঠ্য পুস্তক নয়, আমারই তাকে ঠাসা চিকিৎসা বিষয়ক কিছু বইপত্তর। কোনোটি অস্থি বিষয়ক, কোনোটি অণুজীব সংক্রান্ত এবং কোনোটি বা শুধুই স্নায়ুতন্ত্র। আমি ইতিপূর্বে ভেবেচিলাম যে এই কঠিন বইগুলি পড়া কেবলমাত্র কাল অতিবাহিত করার ছলমাত্র, কিন্তু কৌতূহলবশত অস্থি, অণুজীব নিয়ে বাইশটি কঠিন প্রশ্নের মুখে কালীপদ উনিশটি জবাবই যখন সঠিক দিল, তখন আমি যৎপরোনাস্তি বিস্মিত হলাম তার স্মৃতিশক্তির বিষয়ে!
আজ হেসে কইলাম, “নাহ্, আজ আর সওয়াল নয়। আজ এইটে কোন বইটা পড়চো?”
“এইটে চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে মহাভারত সংক্রান্তও বটে। দুই পাণ্ডবের মামার বিষয়ে।”
আমি চোখ কপালে তুলে কইলাম, “চিকিৎসা সংক্রান্ত, আবার পাণ্ডবদের মামা সংক্রান্ত? কোন বই এখানা?”
কালীপদ একগাল হেসে চামড়ায় মোড়ানো বইখানা পাশে রাখতেই লেখা দেখলুম, ‘শল্যচিকিৎসা”। আমি হেসে ফেললাম।
পরদিন সকালের জলযোগের পর ঈশ্বর তার আট বৎসরের পুত্রকে নিয়ে উপস্থিত হল। এখন পেটা ঘড়িতে নয়টা বাজে। বাখরাবাদের গাড়ির প্রথম ঘণ্টির সময় হল বারোটা দশ। এই তিনটি ঘণ্টা সে আমাদের সঙ্গে কাটাতে চায়। ঈশ্বরের পুত্র একখানা চোঙা দুরবিনের মতো খেলনা নিয়ে ইতিউতি দেখচিলো, বউঠান আদর করে শুধাল, “তোমার নাম কী বাবা?”
বালক মিঠা স্বরে উত্তর দিলে, “শ্রীমান ঐশিক নন্দি।”
কালীপদ আদরের স্বরে কইল, “তোমার হাতে ওইটা কী? বন্দুক?”
ঐশিক অবাক হয়ে বলল, “এ মা, দাদু তুমি তো কিছুই জানো না। এটা তো দূরবিন। দূরের জিনিস দেখা যায়।”
গুপ্তঘাতকের কবলে কালীগুণী ধিন্দু, একারুনিও
কালীপদ বিষণ্ণ কণ্ঠে কইল, “হাঁ দাদুভাই, আমি কিছুই পারিনে।”
বালক তাকে আশ্বস্ত করে আবার কইল, “আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দেব দাদু। তুমি ছবি আঁকতে পারো? শিব ঠাকুরের ছবি আঁকতে পারো?” কালীপদ অক্ষমভাবে দু-দিকে মাথা নাড়তে বালক কী যেন ভেবে শিক্ষকের ভঙ্গিতে বললে, “বানরের ছবি আঁকতে পারো?”
“তা-ও পারিনে দাদুভাই।”
বউঠান বিপদ বুঝে তার হাতে স্বহস্তনির্মিত দুইখানি নাড়ু দিতেই তাদের ভাব হয়ে গেল। আমি প্রথমাবধি লক্ষ করে চলেচি, ঈশ্বর কিছু একটা কইবার জন্য ছটফট করচে, কিন্তু মুখ ফুটে বলচে না। আমি দাদাকে একদাগ মিক্সচার সেবন করিয়ে শুধালাম, “কী হয়েচে তোমার ঈশ্বর? এই চেহারা করলে কেমন করে?”
ঈশ্বর কুণ্ঠার সঙ্গে কইল, “সে অনেক কথা ভাই, পরে যদি ভগবান সময় দেন তো বলব আর কখনও। এখন তোমার রোগীর সুমুখে সেসব কথা…”
আমি জিভ কেটে বাধা দিলুম, “আরে, রোগী কী হে? ইনি আমার দাদা বলতে পারো। সহোদরের অধিক। ইনি দক্ষিণের রায়দিঘড়া তালুকের জমিদার তোমাদেরই মতো।”
জমিদার শুনে ঈশ্বরের চক্ষে পূর্বের চাইতে সম্ভ্রম ও শিষ্টতা ফুটে উঠল বটে, তবে দ্বিধাজড়িতভাবে বললে, “বুঝেচি ভায়া, কিন্তু আমি যদি সব কথা কইতে থাকি তবে তোমরা আমাকে উন্মাদ ঠাউরে নেবে এখুনি। তোমারটা তা-ও সইবে, কিন্তু একজন অচেনা…”
কালীপদ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বিড়বিড় করে কইল, “আমি না হয় উঠে যাচ্চি বাছা, কিন্তু তোমার ললাটে বিষম বিপদ উঁকি দিচ্চে। বড়ো বিপদ! তোমার খুব সাম্প্রতিক পিতৃবিয়োগের যোগ সংঘটিত হবে। অপ্রিয় কথার জন্য আমাকে ক্ষমা কোরো।”
কালীপদ উঠে দাঁড়াতেই ঈশ্বর অবিশ্বাসের সুরে কইল, “আশ্চর্য! আপনি কেমন করে জানলেন? মাত্র মাসখানেক আগেই আমার পিতার ভয়ংকর মৃত্যু হয়েচে। আপনি কে ঠাকুর?”
“ব্রাহ্মণ, নাম কালীপদ মুখুজ্জে, নিবাস রায় দীঘড়া গাঁ। আমি ডাক্তারের চাইতে বয়সে প্রবীণ, কিন্তু অনেকখানি মিত্রভাবাপন্ন হয়েই মেলামেশা করে থাকি।”
ঈশ্বর অনেকখানি নিশ্চিন্ত হয়ে শ্বাস ফেলল। আমি হতচকিত হয়ে কইলাম, “সে কী! মেসোমশাই কীভাবে গত হলেন? তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য তো বেশ…”
“শরীরের ব্যামো তাঁকে স্পর্শ করেনি ডাক্তার, তাঁর মৃত্যু হয়েচে বড়ো ভয়ানকভাবে। আপনার স্ত্রী-কে ধন্যবাদ ঠাকুর, তিনি ঐশিককে ওই ঘরে নিয়ে গিয়েচেন, নচেৎ তার সুমুখে সবটুকু খুলে বলা সম্ভব হত না। ধীরে ধীরে সবটুকু বলচি।
“আমরা, নন্দিরা বাখরাবাদ তালুকের জমিদার। তালুকের আশি ভাগের সামান্য অধিক জমিই আমাদের আওতায়। বাকি জমি মনোতোষ সমাজপতিদের দখলে। ওইটুকু জমি নিয়ে জমিদার হওয়া সাজে না, কিন্তু তবুও মনোতোষের বাপ-পিতেমো নিজেদের ওই অংশের ভূস্বামী বলেই পরিচয় দিতেন, আদায় উশুল পার্বণীও নিতেন। এ নিয়ে আমরা কখনও কিছু কইতে যাইনি। সামান্য কুটুম্বিতের একটা দূর সম্পর্কও বাধত আমাদের মধ্যে, কারণ পালপার্বণে ওই একটি ঘরই আমাদের পালটি ঘর ছিল। হোক সে তেরো আনা আর তিন আনার ব্যবধান।
“এই মনোতোষের বাপ চিত্তপ্রিয় ছিলেন বড়ো বেহিসাবি এবং অমিতব্যয়ী ধরনের মানুষ। যার যা আয়, তা থেকে চাল বড়ো হলে মানুষ কেন, দেবতারও দুর্দশা হয়। চিত্তপ্রিয়রও হল তা-ই। পুত্রের অজ্ঞাতে তাঁর তিন আনার প্রায় সবটাই গচ্ছিত রইল আমার কাকা স্বর্গীয় ভগবান নন্দির কাছে। আমাদের জমিদারির বিষয়-আশয় তিনিই সামলাতেন। আমার পিতা স্বর্গীয় মহাদেব নন্দি বিলেত-ফেরত গবেষক। উনি বিলেতে আলো আর বর্ণ নিয়ে গবেষণা করে ডিগ্রি লাভ করে, পরে দেশের টানে চলে আসেন নিজের গাঁয়ে। কাকা নিজের দাদাকে বহির্বাটীতে, আমাদের মন্দিরের থেকে একটু দূরের একখানা বিরাট কক্ষ বরাদ্দ করে দেন তাঁর গবেষণার জন্য। বাবা অধিকাংশ সময়ই ওই ঘরেই কাটাতেন। বাকি সময়ে প্রথম প্রথম নিত্যপূজার জন্য মন্দিরে, অথবা আহারের জন্য ভিতরবাড়িতে আসতেন। পরে অবশ্য পূজাপাঠ একেবারেই বন্ধ করে দেন তিনি। আমাদের বাইরের সেই ঘরে অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল না। একমাত্র তাঁর নাতি ছিল তাঁর প্রাণাধিক প্রিয়। ঐশিক তার দাদুর সঙ্গে সারাদিন ঘুরঘুর করত। তার এই উপদ্রবকে বাবা হাসিমুখে মেনে নিতেন। মাঝে মাঝে খেলনা বানিয়ে দিতেন। ওই ওর হাতে যে খেলনা দূরবিনটা দেখলেন, ওটাও বাবার তৈরি করা উপহার। আমি চোখ লাগিয়ে দেখেচি, ওই ছেলে-ভোলানো যন্তরে দূরের বস্তু নিকটবর্তী হয় না মোটেই, কিন্তু ছেলেমানুষ অতশত বোঝে না। ওতেই খুশি। তার দাদুর হাতে তৈরি উপহার।”
ঈশ্বর আলগোছে চোখের কোণটুকু মুছে নিয়ে কইল, “যা হোক, যা বলচি, তো এই চিত্তপ্রিয় সমাজপতি লোকটি বড়ো ধড়িবাজ। গোপনে নিজের তিন আনা সম্পত্তি বিক্রয় করে সরে পড়ার ধান্দায় ওঁত পেতে ছিল, কিন্তু আমার কাকা বৈষয়িক মানুষ, তাঁরও গুপ্তচর রয়েচে। সেই খবর পেয়ে কাকা লোকজন নিয়ে গিয়ে গোটা গাঁয়ের সামনে চিত্তপ্রিয়কে বেশ দু-কথা শুনিয়ে দিলে। উত্তরে সমাজপতিও কটু কথা কইল। কাকা ক্রুদ্ধ হয়ে কইলেন, ‘বটে? এতদিনের দয়ার এই ফল তবে? আমি তোমার, বন্ধকির কথা গোপন রেখেচিলাম। ভেবেচিলাম, সুদিন এলে আপনিই ছাড়িয়ে নেবে, কিন্তু তোমার মতো জোচ্চোরের পক্ষে আদালতই সঠিক স্থান। এইবার মকদ্দমা উঠবে, তোমার সম্পত্তি ডিক্রি হবে। জারিও হবে। সে ডিক্রির জারি নেব আমি নিজে। তৈরি থাকো।’
“বেইমান চিত্তপ্রিয় বুক ফুলিয়ে সকলের সঙ্গে তর্ক করতে আরম্ভ করলে যে, এই মামলা নাকি ভুয়ো। আসলে ভগবান নন্দি হাকিমকে ঘুস দিয়ে বাখরাবাদের বাকি তিন-আনা দখল করতে চায়। সমাজপতিদের প্রজারা তাদের জমিদারকে দিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা গোপনে বিদ্রোহ করে আমাদের সহায়তা করতে আরম্ভ করলে। তারা আমাদের প্রজা হতে চায়, কারণ আমাদের কাছে অজন্মা, বান বা খরায় কর মকুব আছে, পার্বণীর ঝঞ্ঝাট নাই, স্বতন্ত্র কর নাই।
যথাসময়ে ডিক্রি হল। জারি নেওয়া হল আমার বাবার নামে। প্রজারা বৈকালে ফুল-মিষ্টি নিয়ে এসে তাদের নূতন ভূস্বামীকে সামান্য নজর দিয়ে গেল, আর পরদিন প্রত্যুষেই ওই তরফের কিছু বাগদি রায়ত হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিলে, গতকাল রাতে নিজের স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে, চিত্তপ্রিয় নিজে উদ্বন্ধনে আত্মহত্যা করেচে। বেলা বাড়তে পুলিশে বাড়ি ছেয়ে গেল তাদের। চিত্তপ্রিয়র ঝুলন্ত দেহ দড়ি কেটে নামানো হল। কাকা এবং আমি দুইজন নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে সঙ্গে রইলাম। গোটা বাখরাবাদ সাক্ষী দিলে যে, নন্দি জমিদাররা দেবতুল্য মানুষ। জুয়াচোর সমাজপতিরা মামলায় হেরে গিয়েই এই কাণ্ডখানা ঘটিয়েচে। দারোগা সাইকেল চেপে বিদেয় হল। আমরাও হাঁপ ছাড়লাম। সেই দিনটা যে বিপদের শেষ নয়, সূত্রপাতমাত্র, তা আমরা তখন বুঝতে পারিনি। বুঝলাম ঠিক দুই মাস পর, যখন চিত্তপ্রিয় সমাজপতির গৃহত্যাগী বড়োছেলে বাখরাবাদে ফিরে এল।
তার নাম যতদূর স্মরণ হয় অঘোর ছিল। সে ছাত্রাবস্থায় অত্যন্ত মেধাবী ছিল, পরপর তিনবার জলপানি পেয়েচিলো, তারপর কী মাথায় চাপলো, একেবারে গৃহত্যাগী হয়ে কামাখ্যায় চলে গিয়েচিলো বলেই জনশ্রুতি ছিল, এইবার তাকে চাক্ষুষ দেখে বুঝলাম জনরব এতটুকু মিথ্যা নয়! সে কী বলব ঠাকুর, দশাসই জটা-পড়া বলিষ্ঠ চেহারা। উচ্চতা আপনার থেকেও একটু বেশি, তাহলেই বুঝুন। মাথার জটা পিঠে এসে নেমেচে, চক্ষু নির্দয় এবং হিংস্র! বিরাট কঠিন বক্ষদেশ, পোড়া গায়ের বর্ণ। মানুষ তো নয়, যেন একটা হিংস্র দানব! সে নিজেদের শূন্য গৃহে ফিরে প্রথমটা নাকি থমকে যায়। আড়াল থেকে কৌতূহলী প্রজারা উঁকিঝুঁকি মেরে খবর দেয়, সে শয়তান নাকি বহুক্ষণ একেবারে পাষাণের ন্যায় শূন্য গৃহের পানে চেয়ে বসেচিলো। তারপর গাঁ ঘুরে ঘুরে সব সংবাদ আহরণ করে ভীষণ ক্রোধে ফুঁসতে থাকে। গাঁয়ের লোকেদের দাঁত পিষে বলে, ‘তবে তোরাও মিছে সাক্ষী দিয়েচিস বাবার বিরুদ্ধে? আচ্ছা? গোটা গাঁ-ই তাহলে আমার পরিবারকে হত্যা করেচিস?’
গাঁয়ের লোকেরা তার চেহারা আর ভাব দেখে কেউই বলতে সাহস করলে না যে মামলা আগাগোড়া সত্য ছিল। তারা ভয় পেয়ে আমাদের বাড়ি বয়ে এসে সংবাদটা দিলে পর কাকা সেসব উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এসব কি একটা কথা বাছা? সে একা মানুষ কী করতে পারবে? আমাদের গাঁ লেঠেলের গাঁ। তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো।”
“প্রজারা আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গেল, অঘোরও দিনকতক কোথায় যেন গা-ঢাকা দিল। মাঝে একদিন বাবা আহারের সময়ে বললেন, ‘আহাহা, এসব আবার কেন বউঠান?’…”
বউঠান লুচির পাত্র আর জল নামিয়ে রেখে হাসিমুখে ভিতরে চলে গেল। ঐশিক তার আঁচল জাপটে গল্প শুনতে চাইচে। বাচ্চাটির হাতে খেলনা দূরবিনের সঙ্গে আরেকখানা রামধনু রঙের রবারের বল হাজির হয়েচে। এই রবারের গোলা আমার বাড়ির ঠিক পিছনের দোকানেই পাওয়া যায়, অর্থাৎ বউঠান খিড়কির দোর দিয়ে বেরিয়ে এই চার আনা মূল্যের খেলনা উপহার দিয়েচে তার নূতন বন্ধুকে। পাত্রের দিকে তাকিয়ে ক্ষুধার্তভাবে খাবার মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে ঈশ্বর বলতে শুরু করল, “খেতে বসে বাবা বললেন, ‘বুঝলি ছোটো, আমাদের একখানা কুকুর পোষা দরকার। রাতে যখন কাজ করি, আমার ঘরখানার বাইরে কেউ মনে হয় উঁকিঝুঁকি দিয়ে লক্ষ রাখে আড়াল থেকে।’
“কাকা সে কথা উড়িয়ে দিলেন, এবং উড়িয়ে দিয়েই সবচাইতে বড়ো ভুলটা করলেন। দুই দিন পর আমার বাবার মৃতদেহ পাওয়া গেল তাঁর পরীক্ষার ঘরে। কী ভয়ংকর ঠাকুর, কী নৃশংস! বাবার ঘাড়টা ধরে মুচড়ে দেওয়া হয়েচে উলটোদিকে! তাঁর চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁটের থেকে কশ বেয়ে নেমে এসেচে রক্ত, গোটা পরীক্ষাগারে যেন দক্ষযজ্ঞ হয়ে গিয়েচে! সব বিশৃঙ্খল হয়ে ছড়িয়ে রয়েচে। আমরা কাঁদতে কাঁদতে দেহ আগলাচ্চি, হঠাৎ ঐশিক কইল, ‘দাদুর খাতা-বইয়ের দপ্তর গেল কোথা?’
“আমরা তখন লক্ষ করে দেখি, বাবার পরীক্ষার যাবতীয় নথিপত্র, নকশা, খাতা এবং যা যা দপ্তরি দ্রব্য ছিল, তার কিছুই প্রায় নাই। ঐশিক ইতিউতি ঘুরে আবার কইল, দাদুর বাক্সের ভিতরে যন্তরগুলো কোথা?’ আমরা সে কথা শুনে এগিয়ে এসে বাবার একখানা লোহার ভারী টেবিলে চারখানা স্ক্রু দিয়ে আঁটা একটা গুরুভার তোরঙ্গের সামনে এসে ভালো করে দেখলাম, তার ডালাটা উম্মুক্ত হয়ে রয়েচে, তার ভিতর থেকে গায়ের জোরে কিছু কিছু জিনিস যেন খুলে নেওয়া হয়েচে। হয়তো তোরঙ্গ সমেতই বেহাত হত, কিন্তু স্ক্রুয়ের প্যাঁচ খোলার আয়াস স্বীকার করেনি আততায়ী। তোরঙ্গের ডালাতে “ছয়খানা ছিদ্র রয়েচে।
আমরা এ ঘরে খুবই কম এসেচি, কিন্তু ঐশিক সারাদিন দাদুর গায়ে লেপটে রইত, অতঃপর তার কথা উড়িয়েও দেওয়া চলে না। তিন দিন পর নিরানন্দ পরিবেশে পারলৌকিক ক্রিয়া সমাধা হল। প্রজারা বাবাকে সত্যই শ্রদ্ধা করত, তারা একযোগে বললে, এ নিশ্চয়ই সমাজপতিদের ওই অঘোরের কাজ। সে-ই আমাদের চরম অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী এবং স্বভাবে হিংস্রও বটে। কাকা খেপে গিয়ে লেঠেল পাঠালেন তিনআনির দিকে, আর বৈকালে আহত, রক্তাক্ত লেঠেলরা ভগ্নদূত হয়ে এসে জানাল, সেই নররাক্ষস এই দশাসই চারজন পাকা লাঠিয়ালকে অবলীলায় ধরাশায়ী করে গাঁ ছেড়ে চলে গিয়েচে।
“আমাদের মন এত সহজে তার গাঁ-ত্যাগ মানতে পারল না। আগেই বলেচি, চারদিকে কাকার গুপ্তচর রয়েচে, তাদের মধ্যে একজন খবর দিলে, তিনআনির
অঘোর বাখরাবাদের সদর বাজারের থেকে একখানা বড়ো আকারের লোহার শক্তপোক্ত তোরঙ্গ খরিদ করেচে অনেক বেশি মূল্যে, প্রায় কুড়ি টাকা দিয়ে। সেই ভবঘুরে কোথায় যে টাকা পেল তা বুঝলাম না, তবে হয়তো সমাজপতি বাড়ির অভ্যন্তরে সে টাকা পেয়েচে কিছু।
“চমক আরও ছিল। সন্ধ্যার মুখে সদরের ময়রা ভবানীশংকর এসে জানালে, ওই অঘোরনাথ নাকি মণি স্যাকরার গদিতে গিয়ে ছয়খানি মাঝারি মাপের হিরা খরিদ করেচে! আমাদের মাথায় গোল লেগে গেল। ভবঘুরে হিংস্র সাধুসন্নেসি মানুষ, সে তোরঙ্গ বা অতগুলি হিরা দিয়ে কোন উদ্দেশ্য সাধন করবে? কাকা বললেন, ‘অত সহজে সব ধোরো না বাছা, ভুলে যাচ্চো কেন, দাদার পরীক্ষার সমস্ত নথি তার হাতে পড়ার পরেই সে এসব কিনতে আরম্ভ করেচে। দুইটার মধ্যে কিছু একটা সংযোগ রয়েচে বাপ। বড়ো বিপদের গন্ধ পাচ্চি। সে লোক মোটেই সুবিধার নয়, তায় এককালে ছোকরা ভীষণ মেধাবী ছিল। চারদিকে চোখ-কান খোলা রেখে চলাচল করো কয়টা দিন।’
“কাকা নিঃসন্দেহে আমাকেই সচেতন করেচিলেন, কিন্তু মরলেন তিনি নিজে। আরও ভয়ংকর তাঁর মৃত্যু! কয়দিন পরের কথা। কাকা রাতে বাইরে গিয়েচিলেন গাড়ু-গামছা নিয়ে। ফিরে আসতে দেখলাম তাঁর মুখটা দ্বিধাগ্ৰস্ত। তখন ঘরে ছিলাম আমি, আমার পুত্র, কাকা, আর একজন বেহারি রান্নার ঠাকুর আর জোগানদার। তাদের রন্ধন সমাপ্ত হয়েচে, কিন্তু আহারের তখনও বিলম্ব রয়েচে। আমার ছেলের ক্ষুধার উদ্রেক হয় দেখে আমি তাকে নিয়ে রসুইঘরে প্রবেশ করে নিজের হাতে দুধ জ্বাল দিচ্চি, কাকা বৈঠকে বসে ওই বামুন দুইজনের সঙ্গে কথা কইচে, হঠাৎ আমার মনে হল, সদরের দিকের কপাট-খোলা জানালা দিয়ে একটা আলোর ঝলক দেখা দিল। বাইরে অকালবৃষ্টি হয়ে চলেচে, বজ্রপাতেরও বিরাম নাই, কিন্তু এ আলো বাজের আলো নয়! এ যেন কেউ বাইরে আগুন জ্বেলেচে। আমি ভালো করে কিছু বোঝার আগেই একটা ভয়ংকর কাণ্ড ঘটল।
“আমি বৈঠকের দিকে চেয়ে দেখলাম, বৈঠকটা আলোকোজ্জ্বল হওয়া সত্ত্বেও যেন ঠিকঠাক ঠাহর করা যাচ্চে না! যেন একপাল ঘন মেঘ এসে সব ঢেকে দিয়েচে। না না, মেঘ নয়, যেন কিছু একটা শক্তি এসে সব আড়াল করে তুলেচে। আমি কী করে বোঝাই ঠাকুর!”
কালীপদ চকিতে একবার বিরাট ঘড়িটার পানে চেয়ে, নজর ফিরিয়ে কইল, “আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেচি বাছা, তারপর?”
“তারপর যেন সেই মেঘের জাল রসুইয়ের দিকে এগিয়ে আসতে আরম্ভ করল। আমি আতঙ্কে কাঠ হয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অদৃশ্য হয়ে-যাওয়া বৈঠক থেকে তিনজনেরই কাতর স্বর একবারের জন্য কানে এসেচিলো, তারপর রান্নাঘরের জানালার ঠিক বাইরের নারকেলের গাছটাতে কান-ফাটানো শব্দ করে একটা ভয়ানক বাজ পড়ল। আমি ছেলেকে বুকে জড়িয়েই অচৈতন্য হয়ে ঢলে পড়লাম।
“যখন ঐশিকের কান্না আর ঠেলাঠেলিতে আমার সাড় ফিরল, তখন চেয়ে দেখি, সেই আঁধার-করা সর্বনাশা মেঘের জাল দূর হয়েচে, কিন্তু বৈঠকের মেঝেতে কাকা আর ঠাকুর দুইজনের মৃতদেহ ছড়িয়ে রয়েচে। তাদের দেহের কঙ্কালে যেন শুধুমাত্র চামড়াটুকু লেগে রয়েচে। সেই শুষ্ক মৃতদেহগুলিকে যেন কোনো অজানা রাক্ষস এসে রক্তমাংস শুষে নিয়ে ফেলে দিয়েচে! আমরা দেওয়ালের আড়ালে ছিলাম বলেই বেঁচে গিয়েচি সেই খুনি নজর এড়িয়ে।
“আমি কক্ষে প্রবেশ করে কাঁপতে কাঁপতে দ্বার রুদ্ধ করে বাকি রাত্তিরটুকু জাগরণ করি। উষায় গোপালক এলে পর তাকে দিয়ে গাঁয়ে খবর পাঠাই। গোপালক কাঁদতে কাঁদতে জানায়, ধলা আর মুংলিরও মৃতদেহ পড়ে রয়েচে গোহালে! তাদেরও শরীর অমন ছিবড়ে হয়ে গিয়েচে। এই ভয়ংকর এবং ততোধিক রহস্যময় ঘটনায় গোটা বাখরাবাদে হইহই পড়ে গেল। প্রজারা সমস্বরে কইল, এ নিশ্চয়ই ওই শয়তান অঘোরের কাজ।
“এ ছিল সবে আরম্ভ। এরপর মাঝে মাঝেই একেকদিন, বিশেষত রাতের দিকে একেকটি গৃহে আক্রমণ আরম্ভ হল। গোটা বাড়ির সব কয়টি প্রাণী যেন একটা অদেখা, অজানা রাক্ষসের রাক্ষুসে ক্ষুধার শিকার হয়েচে। শরীরকে যতদূর শুষ্ক করে তুলে প্রাণরস শুষে নেওয়া যায়, ততদূর সে শুষে নিয়ে কাঠ হয়ে-আসা দেহগুলো ফেলে রেখে গিয়েচে।
“কারও গৃহে হয়তো ঘরসুদ্ধ লোক শুকিয়ে মরে রয়েচে, অথচ উনানের উপরে রান্না ব্যঞ্জন পুড়েঝুড়ে ছাই হয়ে রয়েচে, কারও বা সামনে অন্নপাত্র ভরতি পড়ে রয়েচে অমনিই, যেন ওই শয়তান একেবারে পলকের মধ্যে প্রাণবায়ু নিংড়ে নিয়েচে।
“এর মধ্যেই দুইখানি খবর আমার মনকে বিকল করে তুলল। মনোহর ঘোষ একদিন বেশ রাতের দিকে গামছা-গাড়ু নিয়ে বাইরে গিয়েচিলো। সে সকালে খবর দিলে যে, রাতে তার নজর একঝলক গিয়েচিলো তার প্রতিবাসী হরিহর পরামানিকের গৃহের দিকে। মনোহর হতভম্ব হয়ে লক্ষ করল যে হরিহরের বাড়িটি যেইখানে থাকার কথা, সেখানে কিছুই দেখা যাচ্চে না, অথচ সেই স্থানের আশপাশের সবকিছুই বিদ্যমান রয়েচে! মনোহর এই কাণ্ডে ভীত হয়ে ছুটে এসে দরজায় আগল দেয়। সকালে আবার দেখে হরিহরের গৃহ যথাস্থানেই আছে! সেই সকালে সাহস করে কিছু প্রতিবাসীকে জুটিয়ে পরামানিকের বাড়িতে ঢুকে সকলে আঁতকে ওঠে। এই কয়দিনে যে শাপ লেগেচে বাখরাবাদে, তারই আক্রমণ ঘটেচিলো নাপিতের গৃহেও। হরিহর, তার স্ত্রী, দুই কন্যা আর বৃদ্ধ পিতা শুকিয়ে কাঠ হয়ে মরে রয়েচে। চোখগুলো যেন ওই রাক্ষস খুবলে খেয়েচে। এইভাবে কতগুলো ঘর যে উজাড় হল ঠাকুর, তার গুনতি নাই। সকলে গাঁ ছেড়ে পালাচ্চে। এইবার বোধহয় আমাকে মেরে তবেই জঠরাগ্নি জুড়োবে তার।
“আর দ্বিতীয় খবরটি হল, ভবানীশংকর রায়ের বাড়িতে একটা পূর্ণিমায় আক্রমণ হল। তখন একজন প্রজা নিজের ফসল পাহারায় ছিল। সে পরিষ্কার দেখেচে যে, সমাজপতিদের ওই অঘোর নাকি একখানা ভারী তোরঙ্গের মতো জিনিস হাতে রায়বাড়ির বাইরে এসে বাক্সটা নামায়। তারপরেই বাক্সে আগুন জ্বলে ওঠে, আর সেই প্রহরারত প্রজাটির চোখের সামনেই রায়বাড়ি বাতাসে মিলিয়ে যায়, অথবা কিছুতে ঢাকা পড়ে। আবার কিয়ৎকাল পর অঘোর নিজের সরঞ্জাম তুলে নিয়ে চলে যায়। সকালে ভবানীদের অতগুলি লোকের মৃতদেহ পাওয়া যায়।”
কালীপদ হাত দেখিয়ে ঈশ্বরকে থামিয়ে কইল, “তুমি বাছা সেই প্রথম থেকেই রাক্ষস রাক্ষস বলে চলেচো, এর ভিত্তি কী? কেউ তো অঘোরকেও ওই ঘটনাগুলোর সময়ে হত্যা করতে দেখেনি। যদি আনুমানিক ঘটনাগুলোর জন্য সে-ই দায়ী বলে মানি, তাতেও রাক্ষসের তত্ত্ব আসচে কেন?”
ঈশ্বর বউঠানের রেখে যাওয়া গেলাসের পেতলের ঢাকনি সরিয়ে বাকি জলটুকু গলায় ঢেলে বললে, “তত্ত্ব আসচে, কারণ আছে ঠাকুর। আমার সন্দেহ, আমার বাবা কোনো পৌরাণিক তত্ত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিছু একটা সন্ধান পান এবং তা থেকে কোনো ভয়ংকর রাক্ষসের জন্ম দেওয়ার সূত্র আবিষ্কার করেন। সেই সূত্রই এখন ওই অঘোরের হাতে। সে ওই সূত্রকে আয়ুধ হিসেবে ব্যবহার করেই একটা রাক্ষুসে শক্তির জন্ম দিয়েচে। দাঁড়ান ঠাকুর, উতলা হবেন না, কারণটা বলচি এবার
“প্রথমতল একদিন রাতে আহারের সময়ে কাকা জিজ্ঞাসা করেন, ‘দাদা, আপনার গবেষণা কেমন চলচে?’
“উত্তরে বাবা বলেন, ‘গবেষণা আর কী রে ভগাই, সর্বনাশ বল। আমি যে আঁধারের পথের চাবিকাঠি খুলে ফেলেচি। বড়ো সর্বনাশা পরীক্ষা করে ফেলেচি অজান্তেই। এই অন্ধকারের পথ থেকে আমাকে উদ্ধার করার কেউ নাই।’
“কাকা আহারের পরে বহুক্ষণ যত্নপূর্বক সাধ্যসাধনা করেন বাবাকে সবটুকু বিপদ খুলে বলার জন্য, কিন্তু বাবা মুখে কুলুপ আঁটেন। শুধু এই নয়, আগে বাবা বিদেশ থেকে ফেরার পরেও নিয়মিত পূজার্চনা করতেন নিজের হাতে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেসব বন্ধ করে দেন। যেন সত্যিই তিনি অন্ধকারের সাধক হয়ে উঠছেন। যেন সত্যিই সেখানে কোনো শুভশক্তির আর স্থান নাই। আমাদের প্রাঙ্গণেই নিজস্ব মন্দির স্থাপিত রয়েচে, আমার প্রপিতামহের স্থাপন করা মহামৃত্যুঞ্জয় মহাদেব অধিষ্ঠিত আছেন সেথা। বড়ো ভয়ংকর উগ্রমূর্তি। আপনি কখনও দেখেচেন ঠাকুর? গলায় নরমুণ্ডের ন্যায় মালা, হাতে তীক্ষ্ণধার শূল, আবক্ষ ব্যাঘ্রচর্ম, রত্নময় চক্ষু আর মাথার জটায় বসানো রয়েচে যজ্ঞপাত্র। তাতে ধুনার আগুন যখন জ্বালানো হত, তখন সেদিকে চাইলে মনে হবে যেন স্বয়ং প্রচণ্ড রুদ্র মাথায় অগ্নি প্রজ্বলন করে সর্বরোগ নিরাময় করতে বসেচেন। আমরা কোনোদিনই তেমন একটা পূজার্চনা করিনি। বাবা নিজেই একমাত্র ভক্তিভরে মহামৃত্যুঞ্জয়ের পূজা করতেন, পশুবলিও হত, কিন্তু শেষের দিকে তাঁর যেন মন্দিরে পা দিতেই ঘৃণা হত। গাঁয়ের শেষ প্রান্তে ভাগাড়ে গিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, যেন সেই পচা, গন্ধময় স্থানটাই তাঁর পরম পাওয়া। ভাগাড়ের চৌকিদার দ্বারিক মাঝে মাঝে আমাদের এসব বলে যেত গোপনে।
“একদিন ঐশিক বাবার পরীক্ষার কক্ষে ঢুকে দেখেন, বাবা বড়ো ক্রুদ্ধ হয়ে রয়েচেন। ঐশিক বলে, ‘দাদু, তুমি রাগ করে আছ?”
“তার উত্তরে বাবা রাগে ফেটে পড়ে বলেন, “তুমি এখন এ ঘর থেকে যাও দাদুভাই। আমাকে একা থাকতে দাও।’
“আমার ছেলে হতভম্ব হয়ে শুধায়, “তুমি এমন করচো কেন দাদু? আমি কিছু ভুল করেচি?”
“আমার ছেলেটির বয়স অল্প, কিন্তু স্মৃতি বড়ো প্রখর। সে পুঙ্খানুপুঙ্খ আমাদের পরে সব কথা বলেচে। তার প্রশ্নের উত্তরে বাবা দস্তুরমতো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টেবিঙ্গে মুষ্ট্যাঘাত করে অদৃশ্য কারও উদ্দেশে গালি পেড়ে বলেন, ‘না না না, এই দুশ্চরিত্র, লম্পট জানোয়ারদের চরিত্রের ঠিকঠিকানা নাই দাদুভাই। আজ এক, কাল এক। শেকলে বাঁধা থাকলেও বড়ো নরঘাতক জিনিস এরা। ছদ্মবেশী ভণ্ড কোথাকার। স্নেহের মুখোশ পরে আশ্রয়দাতাকেই ছোবল মারে হতভাগা। রক্তবীজের ঝাড়কে উপড়ে ফেলব আমি।’
“তাঁর অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনে আমার ছেলে জিজ্ঞেস করে, ‘জানোয়ার? কেমন জানোয়ার?’
“উত্তরে বাবা চোখ পাকিয়ে বলেন, ‘ঠিক তোমার মতোই গুণধর।’
“এইবার আপনিই বলুন ঠাকুর, কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের ভদ্র মানুষ কখনও কি নিজের ওইটুকু নাতির সুমুখে এমন খারাপ ভাষা উচ্চারণ করতে পারে? ঐশিক কাঁদতে কাঁদতে আমাদের এসে সব বলার পর দুপুরে খাবার সময়ে কাকা একবার ইতস্তত করে কইল, ‘আজ ঐশিক কাঁদচিলো দাদা আপনার আচরণে। আপনি কোন জানোয়ার নিয়ে পরীক্ষা করচেন জানতে চাই। এটা কোনো জনশূন্য পরীক্ষাগার নয় দাদা, এ যে ভদ্রাসন! বাস্তু। এখানে আপনি কোন আপদদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বসে আছেন তা জানলে আমরাও সাবধান হতে পারি। ভূতপ্রেত নয় তো দাদা? না হলে এইবার যে বাখরাবাদের বাস তুলতে হচ্চে।’
“উত্তরে বাবা বিষণ্ণ হয়ে বলেন, ‘না, ঠিক জানোয়ার নয় রে। ভূতপ্রেতও নয়।’
‘তবে কী ধরনের প্রাণী?’
‘প্রাণী নয়।’
“কাকা কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে শুধালেন, ‘ওহহ, জড়বস্তু? কোনো রসায়ন কি?’
“বাবা বিহ্বল নজরে চেয়ে বলেন, ‘জড়বস্তু নয় ভাই, তাদের মধ্যে প্রাণ আসে মধ্যে মধ্যে।
“এবার শুধু কাকা নয়, আমিও আহার ফেলে চমকে উঠে দাঁড়ালাম। হয় বাবা উন্মাদ হয়ে গিয়েচেন, নচেৎ তাঁর অজান্তেই এমন কোনো রাক্ষুসে চাবিকাঠি তাঁর হাতে এসে ঠেকেচে, যার থেকে উৎপন্ন হয় খুব ভয়ংকর কোনো জীব।”
কালীপদ একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঈশ্বর নিজের তোড়ে কথা বলে চলেচিলো, কিন্তু আমি এ শ্বাসের মানেটা বিলক্ষণ বুঝি।
আমি কইলাম, “কিছু ধরতে পেরেচো কি দাদা?”
কালীপদ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় আমার প্রশ্ন শুনে ধীরে ধীরে বললে, “ধরতে কিছুই পারিনি, এতদূর থেকে বোঝা সম্ভবও নয়, কিন্তু শুধু একটা কথা ভাবচি, যখন ঈশ্বরের কাকা, রান্নার ঠাকুররা মারা পড়ল তখন ঈশ্বর বা তার পুত্রকে ওই রাক্ষসেরা রেয়াত করল কেমন করে?”
ঈশ্বর কইল, “এ কথা আমিও ভেবেচি ঠাকুর। আমরা রসুইয়ের প্রাচীরের আড়ালে ছিলাম বলেই তারা হয়তো আমাদের দেখতে পায়নি।”
কালীপদ অসন্তোষ প্রকাশ করে বললে, “বড়ো ছেঁদো কারণ। তোমার কথানুযায়ী, যে প্রজাটি অঘোরকে বাক্স হাতে একঝলক দেখেচিলো ভবানীশংকর রায়ের বাড়িতে আক্রমণের রাতে, তা তো সত্যি? তবে তো অঘোর অবশ্যই ওই রাক্ষসটিকে বা রাক্ষসের দলকে বাইরে থেকেই বাড়ির ভিতরে পাঠিয়েছিল, এবং সেই নরঘাতী জীবরা নিজেরাই বাড়িতে ঢুকে, সব স্থান খুঁজেপেতে সব কয়টি মানুষকে নিধন করে যায়। ফলে তোমাকেও রান্নাঘর থেকে খুঁজে পাওয়া তাদের পক্ষে একটুও অসম্ভব নয়।”
ঈশ্বর একটু ভ্রূ তুলে ভেবে নিয়ে কইল, “তবে হয়তো আমি বেহুঁশ ছিলাম বলে তারা কোনোভাবে আমাকে জীবিত বলে টের পায়নি। হয়তো তাদের এই ধরনের কোনো দুর্বলতা রয়েচে?”
কালীপদ আঙুল মটকে কইল, “দুর্বলতা হয়তো আছে, কিন্তু তুমি যা বললে, সেসব কখনও তাদের দুর্বলতা হতেই পারে না। তুমি না হয় অচেতন ছিলে, কিন্তু তোমার পুত্র তো অজ্ঞান হয়নি বাছা। তার প্রতিও রাক্ষসদের এমন দয়ার কারণ? এভাবে শুনে শুনে কোনো সিদ্ধান্তে আসা চলে না ঈশ্বর। আর-একটা কথা, তোমার বাবা হয়তো জেনে-বুঝে কোনো সর্বনাশা আবিষ্কার করেননি, দৈবাৎ হয়ে গিয়েচে। তোমার পুত্র যখন একটু আগেই আমাকে ছবি আঁকতে পারি কি না জিজ্ঞেস করচিলো, তখন আমি খেয়াল করিনি যে দাদুভাই আমাকে বেছে বেছে শিব ঠাকুর আর বানরের ছবির কথাই কেন বলেচিলো। মনে হয়, তোমার বাবা তার নাতির কাছে শিব গড়তে বাঁদর গড়ার উপমা দিয়েচিলো কখনও।”
ঈশ্বর এক মুহূর্ত বিচলিত হয়ে, কালীপদর হাত দুটো ধরে আকুল হয়ে বলে উঠল, “আপনি মনে হয় বড়ো সাধারণ মানুষ নন ঠাকুর। আপনি যাবেন বাখরাবাদে? আমার বাড়িতে? আমি বড়ো অসহায় ঠাকুর, না হলে ফিরে যেতাম না সেখানে। ওই অঘোর নানান তন্ত্রে পারদর্শী। আমরা শহরে লুকিয়ে থাকলেও পার পাব না। আর বিশেষ, সে আমাকে না পেলে গোটা গাঁ-কে চিতেয় তুলে ছাড়বে। আমার দুইজন পুরোনো চাকর আমাদের কলকাতার বাড়িতে দেখভাল করচিলো কিছুদিন, তাদের কাছেই ছেলেকে রেখেছিলাম কয়টা দিন, কিন্তু এখন সবাইকে নিয়ে ফেরত যাচ্চি। আপনি পারেন না যেতে?”
কালীপদ একটু নিশ্চুপ থাকল। রান্নাঘরের থেকে সজোরে বাসনপত্র রাখার আওয়াজ আসচে, সঙ্গে অকারণ চুড়ি-বালার ঝনঝন। কালীপদ নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা মনে করে আরেকটা শ্বাস ফেলল দেখে আমিই তড়িঘড়ি কইলাম, “না না ঈশ্বর, তা হয় না। দাদার শরীর বড়ো অসুস্থ এখনও। এই দেহে…”
ঈশ্বর বিষণ্ণ হয়ে হেসে বলল, “না না, আমার আবদার বড়ো অনুচিত। আচ্ছা, এইবার অনুমতি দিন তবে। গাড়ির সময় হল। আর হয়তো কখনও দেখা হবে না ডাক্তার।” এই বলে ছেলেকে হাঁক দিল। ঐশিক তার নতুন দিদুনের দেওয়া রামধনুরঙা বল নিয়ে বাবার হাত ধরল এসে। সেদিকে তাকিয়ে আমার বুকটা শতখান হয়ে গেল। দাদারও মনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ঈশ্বর বিদায় নিল।
রাতে আহারে বসে কালীপদ খাবার খুঁটে চলেচে দেখে আমি বললুম, “কী হল দাদা?”
কালীপদ একটু উদাস স্বরে বললে, “একটা কথা তুমি ভেবেচো কি না জানি না ডাক্তার, তবে আমি ভেবেচি। এই বিপদের সময়ে ঈশ্বর তো একাও গাঁয়ে ফিরে যেতে পারত। সে আদরের মা-মরা ছেলেটাকে ওই মৃত্যুপুরীতে নিয়ে গেল কেন?”
আমি অস্ফুট কণ্ঠে কইলাম, “কেন?”
“কারণ ঈশ্বরের মনের ভাবটা আমি ধরতে পেরেচি। সে ভাবচে, আমার মৃত্যু হলে ছেলেটাও এখানে বসে মরেই যাবে দু-দিন পর অনাহারে। পরের অচেনা ছেলেকে এই শহরে খাওয়াবে কে? কিন্তু ওখানে থাকলে সে অন্তত বাপের সঙ্গে নিশ্চিন্তে মরতে পারবে।”
বউঠান পাশে বসে চিলো। হঠাৎ সে কেঁদে ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে দৌড়ে চলে গেল। কালীপদ ধীরেসুস্থে উঠে, হেঁশেলে গিয়ে বউঠানের মাথায় হাত রেখে কইল, “তোমাকে দোষ দিইনে মন্দা, তুমি আমার লক্ষ্মী, আমার অন্নপূর্ণা। আমার মঙ্গলের চিন্তাতেই তুমি তখন অন্ধ হয়ে ছিলে, কিন্তু আপৎকালে যে পুরুষ আর্তের প্রাণরক্ষা করতে ভীত হয়, সেই পুরুষের স্ত্রী হওয়া কখনও গর্বের নয়।”
বউঠান স্বামীর দুই কাঁধ ধরে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, “ওদের গাঁ থেকে ফেরার সময়ে ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে এসো একবার। ও গল্প শুনতে চেয়েচিলো। শরীরের খেয়াল রেখো। আর সে রবারের বল পেয়ে আত্মহারা হয়ে তার খেলনা দূরবিনখানা ফেলে রেখে গিয়েচে, তাকে দিয়ে দিয়ো।”
কালীপদ বউঠানের মাথায় হাত রেখে কইল, “তুমি বরাবর আমার কারণে যে ত্যাগটুকু স্বীকার করে এসেচো, আজ তার ব্যতিক্রম নয় বটে, তবু ফেরার দিনে নিজের হাতে তোমার জন্য কিছু কিনে আনতে চাই। কী নেবে?”
আমি বুঝলাম যে এই কথাখানা কেবলমাত্র এইটে বোঝানোর জন্যই বলা, যাতে বউঠানের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে আমাদের ফিরে আসা নিয়ে। বউঠান আঁচলের খুঁটে চোখ মুছে কইল, “আমার নিত্য আরাধ্য ঠাকুরের একখানা বই নিয়ে এসো পারলে।”
আমি হেঁশেল থেকে বেরিয়ে এসে কোঁচা দিয়ে চোখ মুছে নিলাম। এই ক্ষুদ্র কথোপকথনের মধ্যে একজন স্ত্রী-র যে কতখানি ভরসা প্রচ্ছন্ন রয়েচে তাঁর স্বামীর ক্ষমতার প্রতি, তা আর কেউ বুঝবে না।
*****
ঈশ্বর বাখরাবাদে ফিরে এসেচে গতকাল। প্রজারা তাকে সত্যিই শ্রদ্ধা করে তারা প্রাণভয়ে ভীত হয়ে রইলেও একবার করে এসে দেখা করে গেল তার সঙ্গে। বৈকালের মুখে একজন বৃদ্ধ রায়ত এসে খবর দিলে, অঘোরকে সে বাক্স হাতে জমিদারবাড়ির পিছনের বনে ঘুরতে দেখেচে। ঈশ্বর হয়তো সত্যিই চেয়েচিলো যে তার নিষ্পাপ সন্তান তার সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করুক, কিন্তু এক্ষণে সন্তানের জীবনরক্ষায় তার চিত্ত উত্তাল হয়ে উঠল। কলকাতা থেকে আসা দুইজন ভৃত্যের মধ্যে রামশরণকে কইল, “বাজারের ফর্দ লিখেচি, ইস্টিশানের বাজার থেকে নিয়ে আয়। আর ছোটোবাবাকে সঙ্গে নিয়ে যা। সে ঘরে থাকতে চাইচে না মোটে।”
রামশরণ বাবুর তৈরি দীর্ঘ তালিকা দেখে অবাক হল। ঈশ্বর জেনে-বুঝেই হাবিজাবি দ্রব্যের মনগড়া তালিকা প্রস্তুত করে তাদের যথাসাধ্য বিলম্ব করাতে চায়। তার মন বলচে, হিংস্র অঘোর আজই বাড়িতে হানা দেবে। রামশরণ ঐশিককে নিয়ে চলে যাবার পর ঈশ্বর হাঁক দিয়ে দ্বিতীয় ভৃত্যকে ডেকে কইল, “জীবন, আমার কিছু পাওনা মনে হয় সরকারমশায়ের কাছে জমা পড়ে রয়েচে। চট করে একবার ওপারে গিয়ে তাঁর বাড়ি থেকে হিসেবটা লিখিয়ে নিয়ে আয় তো।”
জীবনরাম বহুদিনের ভৃত্য। সে মাথা নিচু করে কইল, “এই বিপৎকালে তুচ্ছ অর্থের হিসেবে বসার মানুষ আপনি নন। আমাকে মাপ করতে হচ্চে কর্তা, আমি আপনার মতলব বুঝেচি। শরণকে আর ছোটোবাবাকে পাঠিয়েচেন ভালো কথা, কিন্তু আমি মরলে আপনার সঙ্গেই মরব।”
ঈশ্বর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। হিসাব সে ঠিকই করেচিলো, শয়তান অঘোর মরণদূত হয়ে তার পরিবারের নিকাশের উদ্দেশেই আসচিলো, কিন্তু সেই লক্ষ্য হঠাৎ পরিবর্তিত হল। অঘোর বনের প্রান্তভাগ থেকে দেখলে যে, একজন ভৃত্য ঈশ্বরের পুত্রকে নিয়ে বাজারের পথ ধরেচে। তার মনের ভিতরে উথালপাথাল জিঘাংসা নেচে উঠল। অঘোর তার সর্বনাশা তোরঙ্গ বনেই লুকিয়ে রেখে গোপনে পিছু নিল রামশরণের
রামশরণ বাজারে গিয়ে বহু সময় নিল সেসব পণ্য খরিদ করতে, কিন্তু তার সতর্ক নজর রয়েচে ছোটোবাবার দিকে। মাঝখানে ইস্টিশানে রেলগাড়ি প্রবেশের সময়ে ঐশিক ছুটে যেতে চেয়েচিলো সেদিকে, কিন্তু রামশরণ হাত চেপে ধরে কইল, “খপরদার ছোটোবাবা, আমাকে ছেড়ে এক-পা-ও যাবে না কোথাও। চলো, আমরা এখন বাড়ি ফিরব।”
আসার পথে খালি হাতে যে সতর্কতা অবলম্বন করেচিলো রামশরণ, ফেরার কালে অতগুলি বোঝা নিয়ে কিন্তু তত সম্ভব হল না। সে চলেচে অনেকগুলো মোট বোঝা নিয়ে, ঐশিক চলেচে তার পিছুপিছু বল খেলতে খেলতে। ঘাড়ের বোঝার ভারে রামশরণ ঘাড় ঘোরাতে পারচে না। ইস্টিশানের সুমুখের রাস্তাটা দিয়ে চলার পর যখন বাঁদিকে পথটা বাঁক নিল, তখন রামশরণ সভয়ে ওই আলো-আঁধারিতে লক্ষ করল যে তার পিছনে জনপ্রাণী নাই। রামশরণ ঘাড়ের সওদা ছুড়ে পথে ছড়িয়ে ফেলে চিৎকার করে হতাশায় কেঁদে উঠল। সে পাগলের মতো দৌড়ে ছোটোবাবার নাম করে কাঁদতে আরম্ভ করল, কিন্তু উত্তরে কোনো শব্দ শোনা গেল না। রামশরণ পাষাণের ন্যায় পথে বসে পড়ল।
ইস্টিশানের যে পথটা থেকে অঘোর মুখ চাপা দিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে এনেচে, সেইটা পথের পাশেই একটা জলা ধরনের নিচু জমি। জলাজমিটুকু দিয়ে একটু এগোলেই একখানা ভাঙা, পরিত্যক্ত মন্দির। অঘোর সেই মন্দিরে ক্রন্দনরত ঐশিককে নামিয়ে সশব্দে একখানা চপেটাঘাত করল। সেই দৈত্যাকৃতি শরীরের প্রহারে ঐশিক চিতিয়ে পড়ল শক্ত মেঝেতে। তার কপাল কেটে রক্ত ঝরতে আরম্ভ করল, কিন্তু সেই ক্ষুদ্র প্রাণ তখন বোবার ন্যায় নিশ্চুপ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েচে এই দানবের দিকে।
অঘোর সেইদিকে চেয়ে সন্তুষ্ট হল। হাঁ, শিকার হিসেবে তুচ্ছ বটে, কিন্তু এমন কচি গলা টিপে সুখ আছে। যখন প্রাণবায়ুর অভাবে এই ছোট্ট শরীরটা ছটফট করবে, লাথি ছুড়বে, সে ভারী সুখের দৃশ্য। আরও সুখ হবে, যখন এর বাপ উঠানে ছড়িয়ে-থাকা ছেলের দেহটা আবিষ্কার করবে। অঘোর নিজের হিংস্র দাঁত ছড়িয়ে হেসে উঠে হিসহিস করে কইল, “দাদুকে তুই বড়ো ভালোবাসতি, তা-ই না?”
বালক ভয়ে ভয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই শয়তান শুধাল, “দাদুর কাছে যাবি?”
ঐশিক আবার সরল মনে কইল, “হাঁ।”
“তবে আয়, তোকে সেখানে পাঠাই”, এই বলেই নিজের রাক্ষুসে মুষ্টি দিয়ে ওই ক্ষুদ্র শিশুর কণ্ঠদেশ টিপে ধরল অঘোর। বালক দমবন্ধ হয়ে রুদ্ধকণ্ঠে শূন্যের দিকে চেয়ে একবার কেবল ফিসফিস করে উচ্চারণ করল, “দাদু…”
স্নেহমাখা স্বরে বাইরে থেকে প্রত্যুত্তর এল, “এই তো দাদুভাই।”
অঘোর চমকে উঠে পিছন ঘুরেই বিস্ময়ে বাদ্ধ হয়ে গেল! এই আঘাটায় যে কেউ সন্ধানে আসতে পারে এমনটা সে ভাবেনি। অঘোর দাঁতে দাঁত ঘষে চিৎকার করে উঠল, “কে তুই?”
“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দিঘড়া।”
কালীপদর হাতে ঐশিকের ইস্টিশানের পথে আচমকা ফেলে-আসা রবারের বলটা ধরা রয়েচে। অঘোর সেইদিকে চেয়ে হিংস্র কণ্ঠে কইল, “বুঝেচি। ওইটে দেখার পর চিনতে পেরে তারপর এই জলায় আমার পায়ের ছাপ খুঁজে খুঁজে এসে পড়েচিস ঠিক, তবে আজ একটা নরহত্যা করতাম, এইবার তিনটে করব।” এই বলামাত্র চকিতে তার দুটি বজ্রের মতো হাত কাঁকড়ার দাঁড়ার ন্যায় চেপে বসল আমাদের কণ্ঠে।
অঘোরের অস্বাভাবিক দৈহিক শক্তির কথা ঈশ্বরের মুখেই শুনেচি, কিন্তু আমার মনে হল, হাত নয়, কোনো লোহার যন্ত্র যেন আমাদের গলায় এঁটে বসেচে! এ যেন মানুষের হাত নয়, এ খুনি হাত দুটো দানবের শক্তি ধরে। কালীপদর শারীরিক বল খুব কম নয়, কিন্তু একে তার শরীর দুর্বল, তায় এই দৈত্যের মোকাবেলা করা তার সাধ্য নয়। অঘোর পিশাচের ন্যায় হেসে উঠে কইল, “আজকের সন্ধ্যা তোদের অন্তিম সন্ধ্যা হল। তোদের মতো কুড়িজন এলেও আমাকে শক্তিতে পরাস্ত করতে পারত না। তেমন কোনো মানুষ এখনও জন্মায় নাই।”
কালীপদ দুই হাতে যথাসাধ্য শক্তিতে ওই রাক্ষসের বাম হাতখানা সামান্য শিথিল করে ক্ষীণস্বরে ডেকে উঠল, “কানাই….”
কানাই বাইরেই প্রহরায় ছিল কালীপদর কথামতো। ভিতরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে সে হতবাক হয়ে চিৎকার করে উঠল, “কর্তাবাবা। এ কী!” এই বলে ছুটে এসে অঘোরের দুইখানি হাত নিজের মুষ্টিতে চেপে ধরামাত্র অঘোরের হাত শিথিল হয়ে আমরা মাটিতে পড়ে গেলাম। কানাই আমাদের উপরে নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়েচিলো। অঘোর সেইটুকু সুযোগে নিজের সবল হস্তে কানাইয়ের গলাটা পেঁচিয়ে ধরামাত্র কানাই একটা ভয়ংকর আওয়াজ করে অবলীলায় অঘোরের জটাভার মুঠিতে ধরে তাকে আছড়ে ফেলল মাটিতে। নিজের প্রাণপ্রিয় কর্তাবাবার দুর্দশায় বুঝি লেঠেল সর্দারের শরীরকে আজ দানোয় পেয়েচে! অঘোর উঠে দাঁড়াতেই কানাই তার বুকে একটা সবল পদাঘাত করে আবার চিতিয়ে ফেলে দিল। মট করে একখানা হাড় ভাঙার শব্দ হল। অঘোর ভীষণ বেদনায় চিৎকার করে উঠে চকিতে মন্দিরের ভাঙা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ল বাইরের জলাজমিতে, আর মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
কালীপদ আর আমি ধুলা ঝেড়ে উঠে ঐশিককে তুললাম। তার কপালে ধুলা-মাখা রক্ত। তাকে কোলে তুলে আমরা এগোনোর পথে দেখি, একজন মানুষ পাথরের মূর্তির মতো অন্ধকার পথে বসে রয়েচে। তার নিকটে আসামাত্র সে ‘ছোটোবাবা!” বলে আনন্দে কেঁদে উঠল।
ঈশ্বর সব কথা শুনে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে ধীরে ধীরে বলল, “আপনার অনুমান নির্ভুল, কিন্তু এখন আমি ভাবচি, এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে কেন আমি এই মরণ ফাঁদে মরতে নিয়ে এলাম। সে থাকত ডাক্তারের কাছে, খেতে-পরতে পেত, বেঁচে তো থাকত ঠাকুর।”
আমি লজ্জায় কানে হাত দিলাম। কালীপদ তার কাঁধে হাত রেখে কইল, “অযথা মিছে আশ্বাস দেব না, তবে এসে যখন পড়েছি তখন চেষ্টা করতে ক্ষতি কি বাঁচবার? আজ আর সে শয়তান এদিকে ঘেঁষবে না। কানাইয়ের হাত যার শরীরে দাগ রেখেচে, সে একদিনে সুস্থ হয় না। আমাকে তোমার বাবার পরীক্ষার ঘর, বসতবাড়ি আর যাবতীয় স্থান একবার দেখাতে পারো?”
বাড়িটি দুইতলা কিন্তু প্রকাণ্ড। নীচে একখানা বিরাট বৈঠকখানা, তার লাগোয়া দুইখানি বিশাল শয্যাকক্ষ, একখানা বড়ো রসুইঘর আর পিছনের কলতলায় বেরুবার দরজা। এই বৈঠকেই তিনজন মারা পড়ে বেঘোরে। কালীপদ সবটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে জানালাগুলো বন্ধ করে দিতে বলে নিজে একবার আলগোছে চোখ রাখল জানালা দিয়ে রান্নাঘরের লাগোয়া কলপাড়ের দিকে, আর খর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিজের মনেই বলল, “তা-ই কি?”
নীচের বড়ো শয়নকক্ষ দুটি ছিল স্বর্গত দুই ভায়ের। উপরের তলায় শোয় সপুত্রক ঈশ্বর এবং তার বাইরের ছোটো ঘরে দুইজন ভৃত্য। আমরা ঘর দেখা শেষ করে বাড়ির প্রাঙ্গণে স্থাপিত মৃত্যুঞ্জয় মন্দিরে প্রবেশ করলাম। ধ্যানস্থ যোগীর রূপে প্রশান্ত মহাদেবের মূর্তি, তবে ঈশ্বরের কথাও সত্য, এ মূর্তির মধ্যে একটা গা-ছমছমে ব্যাপার আছে। ক্ষুরধার শূলে পেঁচিয়ে রয়েচে ফণা উদ্যত সাপ, রত্নখচিত চোখগুলি যেন প্রখর দৃষ্টিতে মনের অন্তঃস্থল অবধি দেখতে পাচ্চে, মাথার জটায় বসানো রয়েচে ধুনায় ভরা পাত্র। এই পাত্রে আগুন জ্বেলে মহামৃত্যুঞ্জয় মহাদেব বসে থাকেন আর মানুষকে আয়ু এবং নীরোগ শরীর প্রদান করেন। বিগ্রহের পদপ্রান্তে ভোলানাথের বাহন শিং উঁচিয়ে বসে রয়েচেন। কালীপদ সম্ভ্রমের সঙ্গে দেবমূর্তিকে করজোড়ে প্রণাম করল। মন্দিরের নিশ্চিত কোনো নিজস্ব শুভকর শক্তি রয়েচে, যার ফলে অন্ধকারের পথে নামা বিজ্ঞানসাধক এই মন্দিরে প্রবেশ করতে চাইতেন না শেষের দিকে। কিংবা এমনও হতে পারে, যে গৃহদেবতাকে উনি নিত্যপূজা করতেন, সেই বিগ্রহের সামনে পাপিষ্ঠের আসতে লজ্জা হত।
আমরা বৈঠকে বসে চা পান করচি, সরকার এসে খবর দিলে, “ছিদামকে আনা হয়েচে। তাকে তো বৈঠকে আনা চলে না, তাই একটু কষ্ট করে উঠানের বাইরে আসতে হচ্চে।”
ছিদাম হল বাখরাবাদের ভাগাড়ের প্রহরী এবং দ্বারিক। গাঁয়ের লোকেরা চাঁদা তুলে তাকে বেতন দেয় পশুপাখির মৃতদেহ সৎকারের জন্য। আমরা বেরোতে ছিদাম অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে হাতজোড় করল। কালীপদ একটু চিন্তা করে বললে, “আচ্ছা শ্রীদাম, তুমি তো এ বাড়ির বড়োকর্তাকে বেশ চিনতে-জানতে, তো উনি তোমার ভাগাড়ে গিয়ে ঘুরে বেড়াতেন শুনেচি। কিন্তু ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কোনো অস্বাভাবিক আচরণ তোমার চোখে পড়েচে কি?”
ছিদাম কিঞ্চিৎ স্মরণ করে কইল, “অস্বাভাবিক কেমনে বলি ঠাকুরমশায়, বড়োবাবুর কাজকর্ম তো জানতুম আমি, তাঁর পক্ষে কিছু কিছু কাজ করা অতি স্বাভাবিক, যা আমাদের মতো গেরস্ত মানুষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।” আমি এই প্রায় অশিক্ষিত মানুষটার কথার সাবলীলতায় বিস্মিত হলাম। ছিদাম বলে চলল, “সামান্য বেচাল বলতে একটা কথা কইতে পারি, একদিন ভাগাড়ে তিনখানা কুকুরের মৃতদেহ এসেচিলো। বাবু আগেই বলে রেখেচিলেন কুকুরের মৃতদেহ পেলেই জানাতে। তখনও বাবু নিয়মিত ভাগাড়ে ঘোরাফেরা আরম্ভ করেননি। আমি খবর দিতে বাবু উপস্থিত হলেন ভাগাড়ে। কুকুরগুলোর দেহ নিরীক্ষা করে বাবু কইলেন, ‘শ্রীদাম, তুমি ওইদিকটে ঘুরে এসো। আমার কাজ রয়েচে।’
“এরপর আমি কিছু সময় পরে সেইদিকে গিয়ে দেখি, বাবু নিজের পুঁটুলিটা পাশে রেখেচেন, তার পাশে একখানা চিমটা, ছোটো ছুরি আর কৌটা। বাবু নিজেই কুকুরগুলোকে সমাধিস্থ করেন। এই কথা শুনে আমি লজ্জায় শিউরে উঠতে বাবু শান্ত স্বরে বলেন, ‘লজ্জা পেয়ো না শ্রীদাম, সমাধিস্থ অথবা দাহ করাকে শাস্ত্রমতে সৎকার্য বলা হয়, আর সৎকার্যে তো সবারই অধিকার রয়। এই বলে বাবু চলে গেলেন!”
কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ছুরি, কৌটা, সমাধি? ভারী আশ্চর্য বটে!” শ্রীদাম প্রস্থানোদ্যত হলে পর কালীপদ ইতস্তত করে তাকে পিছু ডেকে কইল, “আচ্ছা শ্রীদাম, তোমার কথায় বুঝেচি তুমি কিঞ্চিৎ পড়াশুনা শিখেচো এবং সাবলীল বুদ্ধিও ধরো। এই ভাগাড়ের কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার?”
শ্রীদামকে এই প্রশ্ন হয়তো আজ অবধি কেউ করেনি। তার মুখে পলকের জন্য একটা বিষাদের ছায়া পড়ল, পরমুহূর্তেই সে হেসে জবাব দিল, “যা করে বস্ত্রাহার জুটচে, তাকে মন্দ বলি কেমন করে ঠাকুরমশায়? তাতে পাপ বাড়ে বই কমে না।”
কালীপদ সে কথার উত্তর না দিয়ে বললে, “তুমি একটু গোপনে অঘোরের সুলুকসন্ধান নিতে থেকো বাছা।”
“আজ্ঞা ঠাকুর।”এই বলে শ্রীদাম প্রস্থান করল।
*****
দুইতলার দ্বিতীয় শয়নকক্ষে আমরা আশ্রয় নিয়েচি। কানাই দ্বিপ্রহরে ঘুমিয়ে নিয়েচে, এক্ষণে সে সুপ্রশস্ত ছাতে একখানা সড়কি নিয়ে একাই পাহারা দিচ্চে, এতটুকু সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লেই সে হাঁক দেবে। কালীপদর কোলে ঐশিক বসে ঢুলচে।
নন্দি পরিবারের পুরোনো আলোকচিত্র আলেখ্য কুঞ্চিকা পড়ে রয়েচে। এখন তোমরা যাকে ফোটো অ্যালবাম বলো, তার সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক। তখনকার দিনে প্রতিটা আলোকচিত্রের নীচে সুন্দর হরফে সেই চিত্রের ইতিহাস আর তারিখ লেখা থাকত ঝরঝরে ভাষায়। কালীপদ একটা ছবিকে মন দিয়ে দেখচিলো। ছবিতে দোর-খোলা মন্দিরের সিঁড়িতে ঈশ্বরের পিতা, কাকা আর ঈশ্বর হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে। তখন সবার বয়স অল্প। সেটাকে খুঁটিয়ে দেখে কালীপদ একবার ভ্রূ তুলে কী যেন ভাবতে লাগল।
কালীপদ পালঙ্কের একপাশে বসে রয়েচে, ঐশিক ঘুম-ঘুম চোখে কালীপদর কোলে বসে ঝিমুচ্চে। ঘরে ঈশ্বরের পিতা মহাদেবের যুবাকালের আবক্ষ তৈলচিত্র। কালীপদ একটু ভেবে শুধাল, “আচ্ছা ঈশ্বর, তোমাদের যে প্রজাটি ওই পরামানিকের বাড়িতে আক্রমণের রাতে অঘোরকে নিজের লোহার তোরঙ্গতে আগুন জ্বালতে দেখেচিলো, সেই আগুন ঠিক কী ধরনের ছিল তা জিজ্ঞাসা করেচিলে কি?”
“হাঁ ঠাকুর, করেচি। তা-ই বা কেন বলি, কাকার মৃত্যুর রাতে সেই আগুনের একটা আভা আমিও দেখেচি বাইরে। প্রথমে একটা সাধারণ মশালের ন্যায় আভা, তারপর অনেকগুলো মশালের সমান উজ্জ্বল আলো, আর চোখের পলক না ফেলতেই যেন চারদিক ধাঁধিয়ে-যাওয়া আগুনের প্রভা দেখতে পেয়েচি আমরা। মনোহরও তেমনটাই দেখেচে, কিন্তু এমন অস্বাভাবিক আগুনে দীপ্তি কখনও দেখিনি ঠাকুর।”
একটু পুরোনো কথা স্মরণ করে ঈশ্বর আবার কইল, “আরও একটা কথা মনে পড়ল ঠাকুর, যে বৃদ্ধ হারান দুলে অঘোরকে তোরঙ্গ নিয়ে বনের ভিতরে ঘোরাফেরা করতে দেখে খবর দিয়ে গিয়েচিলো, সে বলেচিলো, অঘোরের ওই সর্বনাশা লোহার তোরঙ্গের গায়ে অনেকগুলো চকচকে পুঁতির মতো কী যেন বসানো রয়েচে, সেগুলি আবছা আলোয় ঝলমল করে জ্বলচিলো। সেইজন্যই বৃদ্ধের চোখে পড়ে সেইগুলি। তো আমি তাকে তখন শুধালাম, কয়খানা পুঁতি দেখেচেন হারানকাকা? উত্তরে বৃদ্ধ ললাটে কুঞ্চন ফেলে কইল, ‘ঠিক যেন দুইখানি তিনকাটির মতো।’
কালীপদ অবাক হয়ে কইল, “তিনকাটি অর্থ?”
ঈশ্বর বললে, “এ আমাদের গ্রাম্য স্থানীয় বুলি। তিনকাটি বলতে ত্রিভুজাকৃতি কিছুকে বোঝায়।”
কালীপদ নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “দুইখানি ত্রিভুজের মতো দেখতে? মানে ছয়খানা মতো পুঁতি? জ্বলজ্বলে? ত্রিভুজ? তোমার বাবার তোরঙ্গের ডালাতেও ছয়খানা ছিদ্র ছিল, তা-ই না? তার অর্থ, স্রষ্টার তৈরি ওই একমাত্র বিস্ময়কর যন্ত্রকে ধ্বংস করে সেই জিনিসই নূতন করে গড়ে নিয়েচে ওই শয়তান। হয়তো তার তৈরি প্রাণঘাতী ওই যন্ত্রকে একমাত্র প্রতিহত করা যেত তোমার বাবার তৈরি যন্ত্র দিয়েই, কিন্তু সে পথ সুকৌশলে রুদ্ধ করেচে পাষণ্ড।”
“আজ্ঞা হাঁ ঠাকুর, তা-ই।”
আমি একটু বিলম্ব নিয়ে বললাম, “ঈশ্বর, ওই অঘোর যেন কয়খানা হিরা খরিদ করেচিলো? ছয়খানা নয় কি?”
ঈশ্বর চোখ বড়ো করে উত্তর দিল, “ঠিক তো! তা-ই বটে! তবে ওই শয়তান হিরাগুলিকে লোহার তোরঙ্গে বসিয়েচে? কিন্তু কেন?”
এর জবাবের প্রত্যাশায় আমি কালীপদর দিকে চেয়েও উত্তর পেলাম না। সে হতাশার স্বরে বললে, “কেন বসিয়েচে তা জানার উপায় নষ্ট হয়েচে ডাক্তার। আর কানাই সর্দার যতই বলবান হোক, ওই ধূর্ত পিশাচের মতো শয়তানটাকে তখনকার মতো পরাজিত করতে পারলেও হয়তো শেষ সময়ে তার দৈহিক বল কোনো কাজেই এল না। তোমার বাবার আবিষ্কৃত কোনো মারণ রাক্ষুসে সংকেত যদি অঘোর সমাজপতির হাতে পড়ে থাকে এবং সে ওই লোহার তোরঙ্গ, খরিদ-করা হিরা আর ওই আগুন দ্বারা সেই সুপ্ত রাক্ষসকে জাগ্রত করার পন্থা পেয়ে গিয়েই থাকে, তবে অঘোরকে পরাস্ত করা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি?”
কালীপদ আনমনে নিজের আঙুলগুলো মটকে নিয়ে শুষ্ক স্বরে বললে, ‘একজন আবিষ্কারক যখন কোনো আবিষ্কার করেন, তা সে ভালোমন্দ যা-ই হোক, তিনি নিজে আগে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করে তারপর সিদ্ধান্তে আসেন। এটাই স্বাভাবিক। তাই ঈশ্বরের পিতাও অতি অবশ্যই সেই তথাকথিত রাক্ষস জাগানোর কলকবজা নিজে আগে তৈরি করেচিলেন, এমনটা বিশ্বাস করা যেতেই পারে। অঘোর যখন ঈশ্বরের পিতাকে হত্যা করে পরীক্ষাগারে লুঠতরাজ করে, তখনই সে ওই একমাত্র যন্ত্রটি তছনছ করে রেখে যায়। উপায় হয়তো একটা হত, যদি উনি আরও একটি যন্ত্র তৈরি করে রেখে যেতেন, কিন্তু গোটা গৃহ তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেইরকম কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি, ফলে সেই আবিষ্কার এখন সম্ভবত একমেবাদ্বিতীয়ম্ রূপে একটা নররাক্ষসের হাতের অনিবার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেচে। হা ভবানী! বিফল চেষ্টা জানি, তবু কাল আরেকবার ওঁর পরীক্ষার ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে হচ্চে।”
পরীক্ষার ঘরে যাবার কথা শুনে ঐশিক কালীপদর কোল থেকে নেমে বাপের কোলে আশ্রয় নিল দেখে আমি বিষণ্ণ হয়ে কইলাম, “ছোটো ছেলেটা হয়তো এখনও তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় দাদুর আচরণটা ভুলতে পারেনি ঈশ্বর। মেসোমশায়ের অমন রুক্ষ আচরণ করা গর্হিত কাজ হয়েচে, ঠিক যতটা হয়েচে নাতির সামনে নোংরা ভাষা ব্যবহার করায়। তোমার ছেলে অন্তত বার চারেক আগ্রহ করে আমার কাছে জানতে চেয়েচে, ‘ডাক্তারকাকা, লম্পট মানে কী? চরিত্র কী? মেসোমশায়ের মতো বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল মানুষের থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করা যায় কি ঈশ্বর? উনি নিজে না হয় পাপের পথে, অন্ধকারের জগতে পা দিয়েচেন, কিন্তু তাতে কি একটা মানুষের শিক্ষাদীক্ষা এতটা হীন হয়ে যায়? কিছু মনে কোরো না ভায়া, হয় উনি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েচিলেন, আর নয়তো সত্যিই ওঁর চোখের চামড়াই নাই, যার ফলে চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করে, একটা এইটুকু শিশুর সামনেও অমন অশ্লীল…’
ঈশ্বর আমাকে অস্বস্তিতে থামিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েচিলো, কিন্তু তার আগেই কালীপদর “শশশশ” শব্দে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে থেমে গেলাম! কালীপদর মন এতক্ষণ এক বিন্দুতে একাগ্র হয়ে তীক্ষ্ণভাবে চতুর্দিক থেকে সামান্য কোনো সূত্র সংগ্রহের প্রচেষ্টায় হাতড়ে বেড়াচ্চিলো, এইবার সে ধ্যানভঙ্গ হয়ে বিস্ফারিত চক্ষে কইল, “তা-ই তো ডাক্তার! ঠিক বলেচো!”
“কী হয়েচে দাদা?”
কালীপদ আবার হিসহিস করে কইল, “চোখের চামড়া নাই, এইটে এতক্ষণ মনে পড়েনি আমার।”
ঈশ্বর হতভম্ব হয়ে একবার অজান্তেই নিজের চোখে হাত বুলিয়ে নিয়ে শুধাল, “কার?”
কালীপদ আলোকচিত্র সংগ্রহের বইখানার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করল। আমি উঁকি মারতেই চোখ পড়ল চিত্রটার পানে। আমি অবাক হয়ে খুব ভালো করে দেখেও ছবিতে তিনজনের কারও চোখেই তেমন কিছু খুঁত খুঁজে পেলাম না। ভদ্রমানের সেই আলোকচিত্রে কোনো শারীরিক বিচ্যুতি নাই। কালীপদ উত্তেজিত হয়ে কইল, “এইবার অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে গেল। ঠিক ঠিক। তাই তো সুতোটা জুড়তে পারচিলাম না। আর ভাগাড়ে গিয়ে সদ্যোমৃত কুকুরের কেন দরকার পড়ল তা-ও ধরতে পারচিলাম না। এইবার পেরেচি হয়তো। তোমরা শুয়ে পড়ো। আমাকে একবার নীচে যেতে হচ্চে। নীচের সব ঘরের দোরের চাবিকাঠি আমাকে দাও।” এই বলে কালীপদ নিজের স্যুটকেস খুলে বের করল ঐশিকের ফেলে-আসা খেলনা দূরবিনটা আর কইল, “দাদুভাই, তোমার দিদু এইটে তোমাকে ফেরত দিয়েচেন। আমার একটু দরকার রয়েচে এটায়, তারপর তোমাকে ফেরত দিয়ে দেব। সাবধানে রাখবে এইটা।” খোয়া-যাওয়া খেলনা দেখতে পেয়ে ঐশিক আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। নীচে সম্ভবত পরীক্ষাগারের ভারী দোর খোলার ক্ষীণ শব্দ কানে এল। কালীপদ ফিরে এল বেশ কিছুক্ষণ পর। তার শরীর ঘর্মাক্ত, মুখে উত্তেজনা। আমি কিছু শুধাবার আগেই কালীপদ কইল, “এখন আর সওয়াল-জবাব নয় ডাক্তার, আমার মন বলচে, খুব শীঘ্রই আক্রমণ করবে ওই পাষণ্ড। গণ্ডির ব্যবস্থা করে এলাম। আক্রান্ত হলে তবেই গণ্ডি বলবৎ করব। শোনো ডাক্তার, উঠানের এ মুড়ো-ও মুড়ো দেখবে একখানা গভীর দাগ কেটে এসেচি। ওই নরঘাতক আক্রমণ করলে তোমরা গণ্ডির ভিতরে ঢুকে পড়বে। আমিও প্রবেশ করব, তারপরেই গণ্ডি জেগে উঠবে। অঘোরকে রুখবার একেবারে নিশ্চিত কোনো উপায় আমি পাইনি। যেটুক পেয়েচি, তার প্রয়োগ নিয়েও যথেষ্ট ধন্দ রয়েচে, তাই নিজেদের রক্ষা করাই একমাত্র উপায়। গণ্ডির ভিতরে তারা ঢুকতে পারবে না, ঠিক যেমন পারেনি ঈশ্বরকে আক্রমণ করতে সেইদিন।”
আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি কম্পিত স্বরে কইলাম, “তারা? তারা কারা দাদা?”
“রাক্ষস, ডাক্তার রাক্ষস! বড়ো ভয়ংকর রাক্ষস! তাদের চরিত্রের কোনো ঠিকঠিকানা নাই, তারা স্নেহের মুখোশ পরে আশ্রয়দাতাকেই ছোবল মারে। মহাদেব নন্দি সত্যিই অন্ধকারের জগতের ভয়ংকর একটা দরজা খুলে ফেলেচে।”
মৃত মহাদেব নন্দির কথাগুলো হুবহু কালীপদর মুখে শুনে আমার শরীর কেঁপে উঠল। তবুও শুল্ক কণ্ঠে বললাম, “ঈশ্বর সেদিন কী কারণে রক্ষা পেয়েচিলো তা তুমি ধরতে পেরেচো?”
“পেরেচি। সে আড়ালে থাকার জন্য কক্ষনো বেঁচে যায়নি, সে রক্ষা পেয়েচে অপ্রত্যাশিত বজ্রপাতের কারণে। হয়তো ঈশ্বরের আর তার পুত্রের পরমায়ু ছিল বলেই বাজটা পড়ল একেবারে রান্নাঘরের গায়ে একটা নারকেলের গাছে। সেই অভিঘাতে ঈশ্বর জ্ঞান হারায়। বজ্রপাতের ফলে ক্ষণিকের জন্য যে বৈদ্যুতিক চুম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাবেই সেই রাক্ষসরা পরাভূত হয় তখনকার মতো। মহাদেব নন্দির আবিষ্কৃত নরখাদক শয়তানদের এই একখানা দুর্বলতা আমি খুঁজে পেয়েচি, তাই একখানা বিশেষ গণ্ডি আমি তৈরি করে রাখলাম।”
আমি কাতরস্বরে আজকের শেষ প্রশ্নটা ছুড়ে দিলাম, “প্রয়োগ নিয়ে ধন্দ রয়েচে বললে? কীসের প্রয়োগ দাদা? বিজ্ঞানী মহাদেব নন্দির সেই মারণযন্ত্র তো ধ্বংস হয়ে গিয়েচে চিরকালের মতো!”
উত্তর পাবার আশা করিনি, কিন্তু পেলাম। কালীপদ ঐশিকের সেই খেলার দূরবিনটা চৌপাইতে খুব সাবধানে রেখে, একেবারে চাপাস্বরে বলল, “রাক্ষসদের আহুত করার আরও একখানা যন্ত্র অতি সংগোপনে গড়ে গিয়েচিলেন ঈশ্বরের বাপ। সে যন্ত্র এতই খোলামেলা আর উন্মুক্তভাবে সবার চোখের সামনে ছিল, যে কেউ তাকে গুরুত্ব দেয়নি।” এই বলে আমার হাতটা ধরে কালীপদ গাঢ়স্বরে বললে, “এই দূরবিনটা কাল সকাল থেকে তোমার জিম্মায় রেখো ডাক্তার। চাইলেই যেন হাতে পাই।”
আমি সভয়ে একবার দুইদিকে মোটা কাচের পরকলা-বসানো চোঙাকৃতি দূরবিনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম! তার ভিতরে কয়েকখানা ঘষা কাচের গুডুলের ন্যায় পদার্থ বসানো রয়েচে।
নানান সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য কথার দোলাচলে পড়ে সারাদিনের মানসিক ক্লান্তিতে আমি নিদ্রা গেলাম অচিরেই।
*****
বেলা সামান্য বাড়লে পর শ্রীদাম এসে দাঁড়াল উঠানের বাইরে। কালীপদ তার সুমুখে যেতে ফিসফিস করে কিছু কথা কয়ে সে চলে গেল। কালীপদ আমার দিকে তাকিয়ে বিরস স্বরে কইল, “আমার ধারণাই ঠিক। সেই নরহস্তা দানব গভীর বনে তার যন্ত্রের পরীক্ষা করেচে দুইবার। হয়তো সবাইকেই আক্রমণের পূর্বে সে এভাবেই ঝালিয়ে নেয় নিজের মারণাস্ত্র, তাই সে আর দুই-তিন রাতেই হানা দেবে ডাক্তার। তৈরি হও। আত্মরক্ষাই এখন একমাত্র পন্থা। বাকিদের গণ্ডিটা বুঝিয়ে দিয়েচো ডাক্তার? যখনই আক্রমণ হবে, তৎক্ষণাৎ আমরা সকলে ওই দাগের ভিতরে চলে যাব। তার পাঠানো রাক্ষসরা গণ্ডি পেরোতে পারবে না। অঘোর নিজেও পারবে না। এ সর্বনাশা দাগ একবার জেগে উঠলে তাকে শরীরধারী কেউই এপার-ওপার করতে পারে না।” কালীপদর কথায় সকলে আরেকবার ভয়ে ভয়ে দাগটার দিকে চেয়ে দেখল!
আমরা, এমনকি কালীপদও জানতাম যে আক্রমণ হতে আর অধিক বিলম্ব নাই, কিন্তু পিশাচটা যে আজকেই ছোবল দেবে, তা কেউই ভাবিনি, কারণ কানাইয়ের হাতে ভীষণ আহত হবার পর আমার অন্তত চিকিৎসক মনে ধারণা হয়েচিলো যে সে অন্ততপক্ষে তিন দিনের আগে এদিকে ঘেঁষতে পারবে না। তখন সবে সন্ধ্যা হয়েচে। ভৃত্যবর্গ টুকিটাকি গার্হস্থ্যকর্ম সমাধা করচে, ভিতরে পাচকঠাকুর রন্ধনের আয়োজন করচে, ঈশ্বর ঐশিককে নিয়ে মন্দিরে পিদিম জ্বালচে এবং আমি আর কানাই উঠানের বেদিতে বসে চা পান করচি। কালীপদ উপরি উপরি যতই স্বাভাবিক আচরণ দেখাক, আমার চেনা চোখে দেখতে পাচ্চি, তার অন্তঃস্থল সর্বদা ভীষণ চকিত হয়ে রয়েচে। সে এখন মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ফটকের জোর পরীক্ষা করচে।
আমি সেদিকে একবার তাকিয়ে কানাইকে কী একটা যেন কইতে যাব, আচমকা বাইরে থেকে শ্রীদাম পড়ি-মরি দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বেদম হয়ে চিৎকার করল, “ঠাকুর… সে এসে পড়েচে! পালান ঠাকুর!” আমার হাতের থেকে পেয়ালা-পিরিচ পড়ে গেল। কালীপদ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “সবাই দাগের ভিতরে ঢুকে পড়ো এখুনি, শ্রীদাম তুমিও শিগগির করো।” আমরা হুড়োহুড়ি করে গৃহের কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কালীপদ ক্ষিপ্রহস্তে ফটকের গায়ে অঙ্গুলি স্পর্শ করে কী যেন একটা করতে যাচ্ছে, হঠাৎ যেন আঁধার ফুঁড়ে আবির্ভাব হল একখানা নরদানবের মূর্তি! অঘোর! তার হাতে বিরাট লোহার তোরঙ্গ, হাতে মশাল জ্বলে উঠেচে, তার ধীরেসুস্থে ফেলা পদক্ষেপ জানিয়ে দিচ্চে যে সে নিজের বাসনা, আসন্ন নরমেধের বিষয়ে শত ভাগ নিশ্চিত। সে যতখানি স্থিতধী এবং কৃতসংকল্প হয়ে রয়েচে, কালীপদও যদি ততখানি হতে পারত তবে হয়তো ঘটনাক্রম বদলাতে পারত, কিন্তু কালীপদ এই চূড়ান্ত উত্তেজনার মধ্যে এমন একখানা কাজ করে বসল, যা দেখে আমি প্রমাদ গনলাম।
শয়তানটা ঠিক ফটকের ওপারে এসে তোরঙ্গটা নীচে নামিয়ে রেখে তাতে হাতের মশালটা ছোঁয়াল। প্রথম নিভু নিভু, তারপর মুহূর্তে চোখ-ধাঁধানো উজ্জ্বল আগুনে ভরে উঠল তোরঙ্গের উপরে বসানো ইন্ধনপাত্রটা। কালীপদ তখনও ফটকের বাঁধন সমাধা করে উঠতে পারেনি। সমূহ সর্বনাশ উপস্থিত দেখে সে বাঁধন ফেলে আমাদের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের দক্ষিণ হাতের তর্জনীটা দুইবার কাটাকাটি দেবার মতো করে বাতাসে ঘোরাল। চোখের পলকে আমার মনে হল, কালীপদর দেওয়া গণ্ডি বরাবর একখানা নীলাভ স্বচ্ছ কাচের প্রাচীর জেগে উঠল মাটি ফুঁড়ে। সেই প্রাচীরের শরীর জুড়ে আবছা বিদ্যুতের চিড়বিড় ফুটে উঠচে! বর্ষার মেঘময় আকাশে যেমন নিঃশব্দ তড়িৎপ্রভা দেখা যায়, ঠিক তেমনি।
কালীপদ হয়তো ভেবেচিলো, সে গণ্ডির ভিতরে ঢুকে আসার পরেই গণ্ডি জেগে উঠবে, কিন্তু এক মুহূর্তের গোলমালে সব ওলটপালট হয়ে পড়ল। কালীপদ ছুটে এসে আমাদের দিকে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রাচীরে স্পর্শমাত্র বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছিটকে পড়ল ওপারেই। কানাই হায় হায় করে বেরুতে যাওয়ামাত্রই সে-ও ছিটকে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল। ঐশিক কেঁদে উঠল। কালীপদ উপায়ান্তর না দেখে মন্দিরের সিঁড়ির আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নিল। আমি কী করতাম বলা যায় না, কিন্তু হঠাৎ একটা নারকীয় দৃশ্য ফুটে উঠল চোখের সামনে! সেই বিদ্যুতের প্রাচীর জুড়ে যেন কোটি কোটি সূচিপ্রমাণ আলোকবিন্দু ফুটে উঠচে কাতারে কাতারে। আগুনের আলোতে যেমন শত শত শ্যামাপোকা এসে জ্বলে মরে, ঠিক তেমনি ওই ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে-থাকা পাষণ্ড যেন নিজের যন্ত্র থেকে আমাদের দিকে লক্ষ্য করেই ছুড়ে দিয়েচে অজানা, অদেখা কোনো একটা স্রোত, যে স্রোত সোজাসুজি আমাদের লক্ষ্য করেই ধেয়ে আসচে এবং শক্তিমান গুণীনের স্বহস্তে কেটে-দেওয়া গণ্ডিতে ঠেকে তৎক্ষণাৎ ভস্ম হয়ে যাচ্ছে! সেই সঙ্গে চারদিক যেন ঝাপসা আঁধারে ঢেকে যাচ্চে। একটা ভীষণ অন্ধকারের স্রোত আমাদের চোখ থেকে বাইরের দৃশ্য অস্ফুট করে তুলেচে।
একসময়ে আগুন নিভে গেল। আঁধারের বদলে আবার বাইরেটা দেখতে পেলাম। অঘোরের চোখে বিস্ময়, মুখে হিংস্র ভাব। সে বুঝি তার যন্ত্র-প্রেরিত রাক্ষুসে জীবদের এভাবে রুখে দেবার কথা কল্পনাও করতে পারেনি। এই বিদ্যুৎগণ্ডি ঠিক কীসের, তা-ও বুঝতে পারেনি, কিন্তু তখনই তার দৃষ্টি ফিরল সিঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কালীপদর দিকে। গণ্ডির যতই ক্ষমতা থাক, কালীপদ যে হাজার চেষ্টা করেও সেই বাঁধনের ভিতরে আর ঢুকতে পারবে না, তা দানবটা বেশ টের পেয়ে ভীষণ দৃষ্টি দিয়ে আমাদের প্রায় ভস্ম করে দিয়ে এগিয়ে চলল কালীপদর দিকে। ধীরপায়ে।
কালীপদ বিপদের চরম মুহূর্তে পৌঁছে সোজা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “ডাক্তার, দূরবিন”। আমি চকিতে দূরবিনটা বের করে উত্তেজনায় ছুড়ে দিলাম কালীপদর দিকে। সেখানা সোজাসুজি ছুটে গেলে কালীপদ তাকে ধরতে পারত সন্দেহ নাই, কিন্তু বাদ সাধল বিদ্যুতের গণ্ডি। সেই প্রায় স্বচ্ছ বলয়ে দূরবিনটা ঠেকামাত্র সজোরে ছিটকে পড়ল গৃহের বহিঃপ্রাচীরের গায়ে এবং তৎক্ষণাৎ চূর্ণ হয়ে মাটিতে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল! আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। কালীপদ একটা অস্ফুট হতাশার স্বরে কী যেন বলেই আত্মরক্ষার্থে ছুটে গেল একমাত্র আশ্রয়স্থল মন্দিরের ভিতরে এবং ভারী দুয়ার এঁটে দিল।
অঘোর মন্দিরের দোরের সামনে এসে নিজের বাক্সের ডালা দুয়ারের দিকে লক্ষ্য করে সেটাকে ভূমিতে বসাল। ইন্ধনের পাত্রকে পূর্ণ করল সঙ্গে আনা নূতন ইন্ধন দ্বারা, আর তারপর হাতের জ্বলন্ত মশালটা অপর হাতে নিয়ে মন্দিরের রুদ্ধ দ্বারে সবলে পদাঘাত করল। সেই গুরুভার কপাট দানবের পদাঘাতে মড়মড় করে উঠল। পরপর পাঁচবার পদাঘাতের পর প্রাচীন কপাটের একটি দড়াম করে বিচ্যুত হয়ে ভূমিশয্যা নিল। অপরটিকে হাতের ধাক্কায় উন্মুক্ত করে দিল অঘোর। তাকিয়ে দেখলাম, কালীপদ আত্মগোপন করেচে মন্দিরের একেবারে পিছনের দেওয়ালের গায়ে। তারপরে পালানোর সব পথ রুদ্ধ। অঘোর সেই জাঁতাকলে আটকে-পড়া ব্রাহ্মণের দিকে একবার নির্মম নজরে চেয়ে, আগুন ছোঁয়াল বাক্সের ইন্ধনে। আগুন হু হু করে জ্বলে উঠল, কিন্তু এ কী!
আগুনের দীপ্তি একটি নয়, দুইখানি। কালীপদ দিয়াশলাই ঠুকে আগুন জ্বেলেচে মৃত্যুঞ্জয় মহাদেবের বিগ্রহের জটায় বসানো ধুনার পাত্রে। দুইখানি আগুনই হু হু করে জ্বলে ওঠামাত্র কালীপদ বসে পড়ল বিগ্রহের পিছনে একেবারে অন্তরালে। অঘোর মন্দিরের সোপানে দাঁড়িয়ে প্রথমে এই পাগলামি দেখে হেসে উঠেছিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই কী যেন মনে করে তার হাসি ঠোঁটেই মিলিয়ে গেল। আমি বিস্মিত নয়নে হাঁ করে চেয়ে দেখলাম, ভগবান শংকরের তিনখানা রত্নময় চোখ ঝিকিয়ে জ্বলে উঠেচে। শুধু ভগবান শংকরই নন, তাঁর পদপ্রান্তে বসে-থাকা বৃষভের মুখেও তিনখানি চোখের মতো হিরার কুচি জ্বলে উঠেচে! অঘোর দৌড়ে পালাতে যাওয়ামাত্র একটা তীব্র সংঘাতে চারদিকটা যেন কেঁপে উঠল। মন্দির, সোপান সব একটা আঁধারের কালো স্রোতে ডুবে গেল চোখের সামনে, আর সেই আঁধারপিণ্ডের ভিতর থেকে কানে এল মরণাহত পশুর ন্যায় নরাধম অঘোরের আর্ত চিৎকার। সেই মরণাহত আর্তনাদ কিন্তু স্থায়ী হল না। কোনো এক অদৃশ্য রাক্ষস যেন নিজের শিকারের কণ্ঠরোধ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপরে।
কতটা সময় কেটেচে তার হিসাব নাই, কিন্তু একটা সময় পরে আগুন নিভে গেলে পর মন্দির আবার ধীরে ধীরে ফুটে উঠল চোখের সামনে। কালীপদ বাইরে এসে হাত ঘোরাতেই বিদ্যুৎ বাঁধন বাতাসে মিলিয়ে গেল। কালীপদ তড়িঘড়ি দৌড়ে এসে ভাঙা দূরবিনটা তুলে আপশোশ করে কইল, “একটা দারুণ আবিষ্কার নষ্ট হয়ে গেল ডাক্তার! ইশশ।”
আমরা উপরের কক্ষে এসে বসেচি সকলে মিলে। অঘোরের শুষ্ক, কাঠ হয়ে-যাওয়া মৃতদেহটা কানাই তুলে দিয়েচে গোযানে। শ্রীদাম সেটাকে নিয়ে চলে গিয়েচে ভাগাড়ে পুঁতে ফেলতে। আমি কইলাম, “ওই দূরবিনটা কীসের দূরবিন ছিল দাদা?”
কালীপদ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাক্ষস আবিষ্কার করার যন্ত্র কেবলমাত্র রাক্ষসের পালকে জন্ম দেয়, কিন্তু একমাত্র এই দূরবিনেই সেই রাক্ষুসে জীবদের চোখে দেখা যেত। এর ভিতরে এমন কয়েকখানা জিনিস বসানো রয়েচে, যার ফলে তা দিয়ে অতিপ্রাকৃত বহু এমন জিনিস বা ঘটনা চাক্ষুষ করা যায়, যা খালি চোখে অসম্ভব।”
ঈশ্বর শুধাল, “কিন্তু এমন কী জিনিস বসানো ছিল ওতে?”
কালীপদ উত্তর দিলে, “কুকুরের চোখ। হাঁ বাছা, কুকুরের চোখ। এ হল এমন এক আশ্চর্য বস্তু, যার মাধ্যমে কুকুররা এমন বহু সত্তা বা ঘটনা দেখতে পায়, যা আর কোনো প্রাণীই পায় না। তোমার বাবা ভাগাড়ে ঘুরে ঘুরে সদ্যোমৃত কুকুরদের শরীর থেকে ছুরি দিয়ে এই তিনজোড়া চোখ উপড়ে নিয়ে আসে এবং কিছু বৈজ্ঞানিক উপায়ে তা দিয়ে ওই দুরবিনটা প্রস্তুত করে।”
আমি উদ্গ্রীব হয়ে শুধালাম, “কিন্তু উনি ঠিক কী আবিষ্কার করেচিলেন?”
“বলচি। শুনতে বড়ো বিস্ময়কর লাগবে বটে। উনি বিদেশে থাকতে আলো আর বর্ণবিচ্ছুরণ নিয়ে গবেষণা করতে করতে দৈবাৎ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একখানা আবিষ্কার করে ফেলেন। বৈদ্যুতিক বাতি আলো উৎপাদন করে। আলোর অভাবকেই আমরা অন্ধকার বলি। কিন্তু উনি যান্ত্রিকভাবে অন্ধকার সৃষ্টির পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেন। সে যন্ত্র স্বল্প বিদ্যুতের ছোঁয়ায় প্ৰাণ পায়। উনি আগুনের মাধ্যমে সেই বিদ্যুৎ তৈরি করতেন। মৃত্যুঞ্জয় মহাদেবের মাথার ধুনার পাত্রে আগুন দিলে সেই পাত্রের আকৃতির যন্ত্র উত্তপ্ত হয়ে মহাদেবের বিগ্রহের ভিতরে বসানো অন্ধকার তৈরির যন্ত্র জেগে ওঠে, এবং ভগবান শংকর আর তাঁর বাহনের ছয় চক্ষু থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসে আলোর মতোই সরল পথে।
‘ঈশ্বরের বাপ এই ভগবানের বিগ্রহের আসল চোখের স্থানে যান্ত্রিক হিরার চোখের আকৃতির পরকলা বসিয়ে দেন, ইংরেজিতে যাকে বলে লেন্স, ফলে মূর্তির চোখ তার সৌন্দর্য কিছুটা হারায়। ধ্যানস্থ যোগী মহাদেবের চক্ষু সবসময়ই অর্ধনিমীলিত শিবনেত্র হয়ে থাকে, কিন্তু এই বিগ্রহের চোখের চামড়াই নেই, পুরোটাই হিরার মণি। আমি সেইদিন চোখের চামড়ার কথা বলার পর তোমরা জিজ্ঞেস করেছিলে, ‘কার চোখের চামড়া নাই?” আমি উত্তরে তোমার বাবার ছবিটা দেখিয়েচিলাম। উত্তরটা কিন্তু তখনও সঠিক ছিল। মহাদেব নন্দি। ভগবান মহাদেব এবং নীচে বসে-থাকা ষাঁড়রূপী নন্দি মহারাজের চোখে উনি নিজের আবিষ্কার বসিয়ে দেন। মহাদেবের চক্ষু আগে থেকেই রত্নগঠিত ছিল, ফলে তফাতটা দূর থেকে বোঝা যায়নি কারও নজরেই। ঈশ্বররা ভালো করে দেখলে হয়তো ধরতে পারত, কিন্তু তারা কখনোই নিজের হাতে পূজার্চনা করেনি, তাই খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ ঘটেনি। আমি দ্বার-খোলা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা পুরোনো আলোকচিত্রের মধ্যে জীবিত মানুষগুলোকে নয়, পিছনের বিগ্রহটাকেই দেখচিলাম। সেটার চোখের সঙ্গে এখনকার বিগ্রহের চোখের অনেক ফারাক।”
আমি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে কাঁপা গলায় আবার শুধালাম, “কিমাশ্চর্যম্! আঁধার তৈরি করারও যে যন্ত্র গড়া সম্ভব এমনটা কল্পনাও করিনি। এইজন্যই হয়তো উনি বলতেন, আমি অন্ধকারের জগতের চাবিকাঠি খুলে ফেলেচি। কিন্তু তার ফলে বাড়িঘর, লোকজন চোখের সামনে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেইসব প্রাণী, লোকজন শুষ্ক হয়ে মারা পড়ত কেন?”
কালীপদ হাত দেখিয়ে কইল, “ধীরে ডাক্তার, ধীরে। সবটুকু ধরতে পেরেচি অনুমানে। আলো জিনিসটা যেমন একটা বিশেষ কণার স্রোতমাত্র, তেমনি এই কৃত্রিম আঁধারও একটা সর্বনাশা স্রোতেরই ফল। ওই যন্ত্র থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসে সহস্র সহস্র, কোটি কোটি অণুজীব, যাদের খালি চোখে দেখা চলে না। বড়ো রাক্ষুসে জীব তারা। এ রহস্য আমি আমার সামান্য বিদ্যায় ধরতে পারতাম না। পেরেচি তোমার আর পীতজ্বরের কল্যাণে। সেইসব অলস দিনগুলিতে বসে বসে তোমার চিকিৎসার বইগুলি পড়তে পড়তে একদিন পড়চিলাম অণুজীবের কেতাব। তুমি পড়াও ধরেচিলে আমাকে, মনে পড়ে?
“ওই যন্ত্র থেকে ছুটে-আসা এই ধরনের অণুজীবরা এমনই বুভুক্ষু ক্ষুধা নিয়ে আসে যে তারা তাদের চলার পথে সবটুকু আলোর কণাকে গিলে ফেলে। ফলে সবকিছু আঁধারে ঢেকে যায়। কিন্তু এটুকু হলে ক্ষতি ছিল না তত, অথচ এই রাক্ষসদের চরিত্রের ঠিকঠিকানা নাই। এরা সামনে কোনো জীবিত প্রাণী পেলে মুহূর্তে নিজেদের চরিত্রে বদল ঘটিয়ে আক্রমণ করে তার শরীরকে।”
আমি অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলাম, “চরিত্র বদল করে? মানে, ভাইরাস!”
“হাঁ ডাক্তার, তেমন নামই রয়েছে কেতাবে। এরা জীব আর জড়ের মাঝামাঝি একটা সত্তা। একমাত্র প্রাণীদেহের আশ্রয় পেলেই এরা যথার্থ প্রাণীর মতো আচরণ করে। জীবদেহে থাকা কোষের স্নেহপদার্থের একটা নকল চাদর গায়ে জড়িয়ে এরা শরীরকে বিভ্রান্ত করে দেয়। স্নেহপদার্থের আড়ালে এই আত্মগোপন এবং আক্রমণকেই ঈশ্বরের বাপ ‘স্নেহের মুখোশ পরে ছোবল মারা’ বলেচিলেন। তখন বুঝতে পারিনি। এই সবটুকু আক্রমণ এতটাই চোখের পলকে সাধিত হয় যে হতভাগ্য নিজেকে রক্ষার সময়টুকু অবধি পায় না। তাদের দেহের সবটুকু রস শুষে নিয়ে শুষ্ক কাঠের মতো দেহটা পড়ে থাকে শুধু।”
আমি একটা শ্বাস ফেলে কইলাম, “কিন্তু মেসোমশাই থাকতে তো একজন মানুষও মারা পড়েনি, ওঁর পরীক্ষাগারে কোনো প্রাণীও রাখতেন না, তবে উনি কার উপরে পরীক্ষা করে এই মারণশক্তির বীভৎসতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে এলেন?”
কালীপদ একটু চিন্তা করে বললে, “একটা সম্ভাবনাই রয়েচে। উনি মন্দিরের ভিতরে পশুবলি দিতেন শুনেচি ঈশ্বরের মুখেই। হয়তো সেই পশুদের উপরেই রুদ্ধ দ্বারে সেই শক্তির পরীক্ষা করেচিলেন।”
বর্তমান পাচকঠাকুর দুয়ার থেকে হাতজোড় করে কইল, “আমি এ বাড়ির বহুদিনের লোক ঠাকুর। আগে আগে মন্দিরে বলির পরে সেই বলিপ্রদত্ত মাংস প্রসাদ হিসেবে রেঁধে খাওয়া হত। আমিই আমিষ রান্না রাঁধি বরাবর। কিন্তু শেষের দিকে দুই-তিনবার বলি হবার পর কর্তাবাবু মাংস খেতে দেননি, বলির পশুগুলোকে আঁশঘরেও পাঠাননি। জিজ্ঞেস করাতে বলেচিলেন, “ওতে আর মাংস নাই বামুন ঠাকুর। সবটুকু মৃত্যুঞ্জয় খেয়ে ফেলেচেন।’…”
কালীপদ এ কথা শুনে বললে, “তবে আমার অনুমান মিথ্যা নয়।” তারপর ঐশিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “এদেরকেই তোমার দাদু মহাদেব নন্দি ‘সর্বনাশা জানোয়ার’ বলে আখ্যা দিয়েচিলেন। আর এরা ঠিক তোমারই মতো গুণধর, এটাও সত্যি। না না ডাক্তার, বাধা দিয়ো না। ও ছোটো হলেও বোধবুদ্ধি হয়েচে। ওর সবটুকু জানা উচিত। শোনো দাদুভাই, তোমার দাদু তোমাকে জানোয়ার বলেননি সেদিন, শুধু তাদের স্বরূপটা তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েচিলো রাগের মাথায়।
“পুরাণে ঐশিক নামের একরকম বাণের কথা আছে। এই বাণের গুণ হল, একে যেমনভাবেই নিক্ষেপ করা হোক, এ ঠিক নিজের শত্রুকে ত্রিভুবন খুঁজে খুঁজে বধ করে। তুমি ছেলেদের রামায়ণ পড়েচো? একবার সীতার গলার কণ্ঠহার নিয়ে পালায় একটা কাক। রামচন্দ্র রেগে গিয়ে তার উদ্দেশে ঐশিক নিক্ষেপ করেন। সেই বাণ স্বর্গে পৌঁছে, ব্রাহ্মণের রূপ ধরে ‘জয়ন্ত’ নামের সেই কাককে খুঁজে বের করে এবং শাস্তিস্বরূপ তার একখানা চোখ নষ্ট করে রামচন্দ্রর তৃণীরে ফিরে আসে।
“এই অণুজীবরাও সরল পথে ঝাঁপিয়ে পড়ে বটে, কিন্তু জীবিত শিকারের সন্ধান পেলে তাকে খুঁজে খুঁজে নিধন করে। যেমন সেই রাতে তোমাদের খুঁজতে খুঁজতে হেঁশেলে চলে এসেচিলো। উনিও তোমাকে নয়, তোমার নামটার জন্যই ও কথা বলেচিলেন। তোমার দাদু তোমাকে খুব ভালোবাসতেন দাদুভাই।”
ঐশিকের ফুঁপিয়ে কান্না প্রমাণ করল কালীপদর কথাই সত্য। সেই বালক সবটুকু কথা আত্মস্থ করতে পেরেচে। ঈশ্বর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতজোড় করে কইল, “আপনি যা অসাধ্য সাধন করলেন, তার জন্য গোটা তালুক আপনার কাছে বিক্রীত হয়ে রইল। কিন্তু ঠাকুর, বিগ্রহের ভিতরে যখন এই মারণযন্ত্র এখনও লুক্কায়িত রয়েচে, তবে এই বিগ্রহের বিসর্জন আবশ্যক।”
কালীপদ মাথা নেড়ে কইল, “তার দরকার নাই। গৃহদেবতাকে কোন অপরাধে ত্যাগ করবে বাছা? ওঁর মাথার ধুনার পাত্রটা লোক লাগিয়ে খুলে ফেলো, তাতেই আপদ যাবে।”
*****
আমরা ফেরার সময়ে ইস্টিশানে দাঁড়িয়ে রয়েচি। বাখরাবাদ তালুকের অগুনতি প্রজা আমাদের বিদায় জানাতে এসেচে। হঠাৎ শ্রীদাম একখানা ধবধবে কামিজ ধুতি পরে এসে কালীপদকে কইল, “এসে গিয়েচি ঠাকুর।”
কালীপদ ঈশ্বরের উদ্দেশে কইল, “আরে হাঁ, ভুলে গিয়েচি বলতে, এই শ্রীদামকে আমি সঙ্গে নিয়ে চললুম। আমার তালুকের সরকারে একখানা কাজ দেব। আর তোমার খোকাবাবুকেও নিয়ে চললাম। কয়দিন পর কানাইকে দিয়ে পাঠিয়ে দেব।”
শিয়ালদহে নেমে কালীপদ কইল, “দাঁড়াও, একটা জিনিস কেনা বাকি রয়েচে।” আমরা কিছুক্ষণ পর নেবুতলায় পৌঁছে গেলাম। কালীপদ আমার গৃহের দোরের শিকলে নাড়া দিতেই বউঠান মুহূর্তে দোর খুলল। তার চকিত ভাব দেখে অনুমান করলাম, আমরা যাবার পর থেকেই অনুক্ষণ সে এই কাঙ্ক্ষিত শব্দের প্রতীক্ষা করেচে কান মেলে। ঐশিককে কোলে তুলে, চুমা খেয়ে বউঠান এইদিকে তাকিয়ে ভাঙা অথচ হাসি-মাখা গলায় কইল, “আমার নিত্য আরাধ্য ঠাকুরের একখানা বই আনতে বলেচিলাম, তা নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েচো?”
কালীপদ একখানা কাগজে মোড়া বই এগিয়ে দিল স্ত্রী-র দিকে। বউঠান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে ভিতরে গেলে পর আমি ভ্রূ নাচিয়ে শুধালাম, “বই কখন কিনলে?”
“একটু আগেই। ইস্টিশানের বাজারে।”
“বউঠানের সেই ঠাকুরের বইটির নাম জানতে পারিনে কী? লেখক কে?
কালীপদ বিষণ্ণ মুখে বললে, “দুঃখের কথা আর কী বলি ভায়া। লেখক আমারই মতো একজন সম্পন্ন জমিদার। শিলাইদহে তাঁর জমিদারি। অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ। উনিই মন্দাকিনীর আরাধ্য। তোমার বউঠান তাঁকে নিজের মনপ্রাণ সমর্পণ করে বসে রয়েচেন। আমারই কপালের ফের।”
আমি অবাক এবং বিপন্ন হয়ে কইলাম, “আচ্ছা আচ্ছা, সে যেন হল! বইটার নাম কী?”
একটু ফিক করে হেসে আমার চোখের দিকে চেয়ে কালীপদ কইল, ‘গীতাঞ্জলি’।
হেঁশেল থেকে বউঠানের গুনগুন কানে এল। সে আপামর বাঙালির নিত্য আরাধ্য ঠাকুরের লেখা গান গাইচে, “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে/ অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে।”
আমরা গানের কথাগুলো শুনে পরস্পরের দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখলাম। কালীপদ ঠোঁটে তর্জনী রেখে হেসে কইল, “শশশশ”।
