কালীগুণীন বনাম রাক্ষুসে চোয়াল
পর্ব-১
সেদিনটা ছিল শিবঠাকুরের মানসকন্যা মনসা দেবীর পূজার দিন। তালুক সুন্দরবনের প্রজারা এই পূজা খুব জমজমাট এবং ধুমধাম করে করে থাকেন। প্রজারা সাধ্যমতো চাঁদা সংগ্রহ করেন বটে, কিন্তু যে গাঁয়ের ভূ-স্বামী যতো উচ্চবিত্ত, সে গাঁয়ের পূজায় তত জাঁক। সেই সঙ্গে হাঁস খেলা, মাছ ধরা, মোরগ লড়াই, বুলবুলির লড়াই, পাশা খেলা আর গরীব ধনী নির্বিশেষে এক পঙক্তিতে বসে খাওয়া।
তা, সেইবার মনসা পূজার ঠিক একদিন আগে জমিদার মশায়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হাজির হয়েচিলাম রায়দীঘড়ায়। মুখুজ্জেমশায়ের কড়া নির্দেশ ছিল পূজার আগের দিন আসতে অপারগ হলে পরের দিন আসতে, কারণ চারখানি পূজা বাঙ্গালা মাসের সংক্রান্তিতে পড়ে, শ্রাবণে মনসা পূজা, ভাদ্রে বিশ্বকর্মা পূজা, কার্তিকে মাসে কুমার কার্তিকের পূজা এবং চৈতালীতে চড়কপূজা। শাস্তরের মতে সংক্রান্তির দিন ঐ মাসের যত দূর্যোগ এবং অশুভ লক্ষণ প্রকট হয়, ফলে যাত্রা এবং রাত্রিবাস নাস্তিঃ। মহামুখী অগস্ত্য নাকি বিন্ধ্যপৰ্ব্বতকে পেরিয়ে সেই যে অগস্ত্য যাত্রা করেচিলেন, তা ঐ সংক্রান্তিতেই। যাক সে কথা।
আমি কিন্তু আপাইয়ের ঐ নরখাদক রাক্ষসীর ঘটনার পর থেকেই আর মুখুজ্জেমশায়ের সঙ্গ পরিত্যাগ করিনি। ধীরে ধীরে তাঁর বাড়ির একজন হয়ে উঠেছি। শুধু কালীপদ মুখুজ্জেরই নয়, তাঁর বাড়িতে একটিবার গেলে টের পাবে, এঁদের প্রতিটি মানুষের ব্যবহার এবং আপ্যায়ন এতোটাই আন্তরিক যে নিজেকে বাইরের লোক ভাবার জো নাই। আর সেই সঙ্গে বৌঠানের হাতের অপূর্ব রান্না। আহা, সেই সুস্বাদ আজ এই বুড়া বয়সেও আমি ভুলিনি। অনেক রান্না খেয়েচি, কিন্তু তেমনটি আর কপালে জুটল না এ হতভাগার।
গতকাল পূজা হয়ে গিয়েচে। দ্বিপ্রহরে আহার করতে বসে দেখি গতকালের নিরিমিষ্যি পুষিয়ে নেবার আয়োজন পুরোদমে বর্তমান রয়েচে সেইখানে। ঝকঝকে কাঁসার বড়ো বগি থালা, প্রমাণ আকৃতির গেলাস আর তাকে ঘিরে নক্ষত্রমন্ডলীর ন্যায় অসংখ্য ছোটো বড়ো বাটির সারি। এখনকার মতো তখন অত মাপে মাপে খাদ্যবস্তু থাকত না। পদ্মকাটা ছোট রেকাবিতে দুই রকমের লবণ, আকাশমুখী মরিচ আর গন্ধরাজ নেবু। সে নেবুর গন্ধে দশদিক মাৎ হয়। ছোটো চন্দনপত্রের মতো বাটিতে গলানো খাঁটি ঘি, বেগুন ভাজা, আলু ঝিঙ্গা পোস্ত, চালতার ডাল, মটরের ডাল, এই এতোখানি বড় পোস্তর বড়া, হিঙ্গের গন্ধে পাগল করা ধোঁকার ডালনা, মাছের মুড়ো দিয়ে লাউঘন্ট, নারিকেল পটল, ঝাল ঝাল সর্ষে বাটা দিয়ে ইলিশ মাছ, কচি পাঁঠার সুস্বাদু মাংস, আর দুধ জমাটি সর বাটা। একটা কথা কয়ে রাখি, এই সর্ষেবাটাটি কিন্তু প্রতিবারই প্রতিবাসী কারুর ঘরের থেকে বেটে নিয়ে আসা হতো। কারণ জিজ্ঞাসা করলে মুখুজ্জেমশায় অন্য কাজে ভারী ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন, ফলে একদিন বৌঠানকেই জিজ্ঞাসা করে উত্তর পেলুম-অতশত জানিনে ঠাকুরপো, তবে ঘরের ভিতর সর্ষে রাখতে উনি নিষেধ করেন। তাই রাখিনে।”
এই রহস্য কিন্তু কখনও আর জানা হয়নি আমার।
গুরুপাক ভোজনের পর আমি, মুখুজ্জেমশায় আর কানাই সর্দার ছাতে উঠে সামান্য পায়চারী করচি, আকাশে ঘন মেঘ মাকড়জীবির ন্যায় জাল বুনে চলেচে, কালীপদ মুখুজ্জে মুখে একখানা লবঙ্গ ফুল চিবুতে চিবুতে প্রকাণ্ড ছাতের এ মাথা ও মাথা হাঁটচে। কালীপদ পান খায় না, ফলে আমিও একখানা লবঙ্গ নিয়ে দাঁতে কাটচি। এই মানুষটাকে যতবার দেখি ততই যেন রহস্যময় মনে হয়। দৃঢ়, বলিষ্ঠ গড়ন, প্রশস্ত কাঁধ আর সুদীর্ঘ দেহাবয়ব। নিতান্ত আনমনা থাকার সময়ও তার চোখের জ্যোতিতে একটা যেন ঝকঝকে পারিপাট্য থাকে, যে জ্যোতি অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী ব্যাতীত কখনও থাকা সম্ভবপর নয়। একাধারে ন্যায়নিষ্ঠ সৎ জমিদার, অপরপক্ষে একজন ডাকসাইটে মহাতেজস্বী তান্ত্রিক, আবার একজন স্বামী, ভাই অথবা বন্ধুলোক হিসেবেও তাঁর তুলনা নাই। আমার থেকে বয়স বেশ কিছু অধিক হলেও আমি তাকে তুমি এবং দাদা বলে সম্বোধন করি।
আমি একবার গলাটা খাঁকারি দিলুম। মুখুজ্জেমশায়ের ভাবান্তর হল না। দ্বিতীয়বার একটু জোর করেই কাশলাম। কালীপদ নিরুৎসুক কণ্ঠে কইল, লবঙ্গ মুখে থাকলে কাশি পাবার কথা নয় হে। তোমার উদ্দেশ্য আমি বিলক্ষণ বুঝেচি। কিন্তু আজ আর গল্প নয়, ঐ দেখ, আকাশের একদিক পরিস্কার হয়ে গিয়ে রামধনু উঠেচে। পাখিরা আবার ফলের সন্ধানে বেরিয়েচে, পানকৌড়ি মাছ খুঁজতে ডুব মারচে। প্রকৃতি ঠাকরুণ চক্ষের সামনে এতো কিছু সাজিয়ে রেখেচে, আর সেইসব না দেখে তুমি কেবল ঐ…। আমি বাধা দিলাম।
এ কেমন অবিচার দাদা। চোখের সামনে যা সাজানো রয়েচে সেসব তো চোখ মেললেই দেখতে পাই, কিন্তু তোমার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুমি না বললে যে কোনও দিন জানতেই পারব না। তুমি কি চাওনা যে আমরা একটু ঘটনাগুলো শুনি, জানি?”
কালীপদ কটমট করে চেয়ে শুধালো— “আমরা? আবার বহুবচন আসচে কেন? তাই বটে। এসব তুমি কারুকে গল্প করো ডাক্তার?”
মনে মনে জিহ্বা দংশন করে বুঝলাম বেফাঁস কথা বেরিয়ে গিয়েচে। সামলে নিয়ে বললুম –“আমরা মানে আমি আর কানাই। সর্দার তো তোমার সবকয়টা ঘটনায় সঙ্গে ছিল না তাই না?”
কানাই উত্তর করল, “না থাকলেও, আমি কর্তাবাবার সব কথাই জানি ডাক্তারবাবু।”
আমি চোখের উগ্র রকমের ইশারা করে বললাম, “আহাঃ, তবুও। মুখুজ্জেমশায়ের ঘটনা তাঁর মুখ থেকেই শোনা ভালো নয়? তুমি বাপু অগোছোলা ভাবে কি বলতে কি বলবে, শেষে অশ্বডিম্ব প্রসব করার জো হবে। কানাই অবাক হয়ে বললে, “সে আবার কিসের ডিম্ব ডাক্তারবাবু?”
অশ্বডিম্ব মানে ঘোড়ার ডিম। ওটা একটা রূপক বৈ তো নয়। অর্থাৎ যে জিনিস অবাস্তব, যার ডিম হয়ই না, তাকেই বলে ঐ…”
কালীপদর গম্ভীর স্বরে আমার কথা চাপা পড়ে গেল।
“বটে? অবাস্তব বস্তু? তাই বটে। কিন্তু লোকপ্রবাদ যখন তৈরি হয়েচে তখন কিছু একটা তো ছিল নিশ্চয়ই। তুমি কত রকমের ডিম দেখেচো ডাক্তার? পাখীতে ডিম দেয়, সাপে ডিম পাড়ে, কচ্ছপেও ডিম দেয়, এই তল্লাটে খুঁজলে কুমীরের ডিমও দেখবে হেথা হোথা, কিন্তু তোমরা যাদের অবাস্তব জীব মনে কর, তাদেরও প্রাণের বীজ কিন্তু কখনও কখনও সুষুপ্ত ভাবে ডিমের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।”
আমি অকৃত্রিম বিস্ময়ের সঙ্গে কইলাম, “মানে? অবাস্তব জীব প্রজাতির ডিম? পেলেন কোথা?”
কালীপদ বিলক্ষণ বুঝেচে যে তার মুখ নিসৃতঃ একটামাত্র শব্দ আমার হাতে অমোঘ অস্ত্র তুলে দিয়েচে। অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর করল, “এই ধরো না কেন ব্রহ্মাণ্ড। সে কি সত্যিই ব্রহ্মার ডিম? তাই বলচি আর কি।”
একটু উশখুশ করে আরও কিছু সময় পায়চারী করে কালীপদ পিছনে ঘুরে যখন দেখল আমি মিটিমিটি মুখে তার দিকেই চেয়ে রয়েচি, তখন এত সহজেই আমার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না বুঝে আমার সামনের বেতের কেদারায় গা ডুবিয়ে দিয়ে কইল,
“জ্বালিয়ে খেলে ডাক্তার। নাহ। পরেরবার থেকে তোমাকে আর ডাকচি না।”
আমি ভবিষ্যতের হুমকিতে বিন্দুমাত্র শঙ্কিত না হয়ে, আরও একটু খোশামোদ করে যে অত্যাশ্চর্য ঘটনার কথা জানতে পেলাম তা তোমাদের কতখানি বিশ্বাস হবে জানি নে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি। কালীপদর আর এক দোষ, সে সব কথায় নিজের কৃতিত্বটুকু এতটাই ক্ষুদ্র করে দেখায় যে তাতে সত্যের কিঞ্চিৎ অপলাপ হয় বৈকি। তাই আমি এই আশ্চর্য ঘটনাটি নিজের বয়ানেই ব্যাক্ত করচি।
* * * * *
সেই দিন টাও এইরকমই একটা শ্রাবণ মাসের আকাশ কালো করা দিন। আজ সকালেই পঞ্চাশোর্ধ্ব নিতাইচন্দ্র ভরদ্বাজ তার কুমীরমারী গাঁয়ের বাড়িতে ফিরেচে, তাই গাঁয়ের পুরুষেরা দল বেঁধে উপযাচক হয়ে তার সাথে দুটো কথা কইতে এসেচে। কুমীরমারী তালুকে কোনও ভূ-স্বামী নাই। অসংখ্য ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জনবসতি এবং মধ্যে মধ্যে জলা জংলায় আচ্ছাদিত এই তালুকের প্রজার সংখ্যা কিন্তু প্রায় আটশ পঞ্চাশের উপরে, কিন্তু এলাকার প্রতিকূল চরিত্রের কারণে কোনও বড় মানুষ এইখানে জমিদারি স্থাপন করার ইচ্ছে প্রকাশ করেনি, তাই রমেশ ভরদ্বাজের কথাই এ গাঁয়ের কাছে অনুশাসনের সমতুল্য। এখন রমেশ ভরদ্বাজ কিঞ্চিৎ অশক্ত হয়ে পড়েচেন, ফলে তার বড়ো ছেলে নারায়ণচন্দ্র আর কনিষ্ঠ পুত্র নিতাইচন্দ্র মিলে ব্যবসা এবং শাসনের ভার সামলায়। নারায়ণের পুত্র রুদ্রের বয়স এই জষ্টিতে, অর্থাৎ দুই মাস আগেই ঊনিশ পুরেচে, ফলে গাঁয়ের রেওয়াজ অনুসারে তার বিবাহ স্থির হয়েচে আগামী ঊনত্রিশে শ্রাবণ, শুক্কুরবারে। পাত্রী পাশের গ্রামের শিবমণি ঘোষালের কন্যা কল্যাণী। শিবমণি ঘোষাল দরিদ্র মানুষ, কিন্তু কন্যাটি সুলক্ষণা। খরচাপাতি সব ভরদ্বাজরাই ব্যাবস্থা করবে, এবং কুমীরমারিতে পাত্রপক্ষের বউভাতের জন্য তৈয়ারি করা মন্ডপেই বিবাহ ক্রিয়া সম্পন্ন হবে। পরিবারের মর্যাদা অনুসারে বহু বড়ো মানুষদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েচে। আদরের ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহের সেই উপলক্ষ্যেই নিতাই বাড়ি ফিরেচে।
নিতাইচন্দ্র কপালে পুরুষ। অতি সামান্য লগ্নি সম্বল করে প্রথমে পেশকারীর খাতা, বই, দেশী কালির ব্যবসা, তার পর নানান কারবার ঘুরতে ফিরতে আজ নিতাইয়ের পান, চিনি এবং তুলার কারবারে বৎসরান্তে লক্ষাধিক টাকা আয়, তার অধীনে দেড়শ মাহিনা করা কর্ম্মচারী কাজ করেন। ছোটখাটো বরাতের কাজগুলি কর্ম্মচারীরা তাগাদা তদ্বির করলেও বড়মাপের বরাতের ক্ষেত্রে নিতাই নিজেই গিয়ে থাকে। সঙ্গে থাকে নিষ্কর্মা শ্যালক বীরভদ্র। শ্যালককে সঙ্গে নেবার অর্থ কিন্তু তার প্রতি আস্থা নয়, বরং ছেলেটি কিছু কিছু ভাঙা ইংরাজী জানে বলেই তাকে সঙ্গে নেওয়া। অভ্যাগতদের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় কারণে অকারণে হঠাৎ হঠাৎই নিতাই বলে ওঠে, “বলো না হে শালাবাবু, ঐটাকে ইংরাজীতে কী যেন বলে?”
মাস দুয়েক পূর্বে নিতাইচন্দ্র তার দুই চারিজন পদস্থ আমলা এবং গুণধর শ্বশুরপুত্র সহযোগে দুইখানা চিনির কলের বিরাট তহসিল আদায় করতে গিয়েচিল উত্তুরের রাওলপিন্ডি নামের এক প্রদেশে। আজ দুইমাস কাল ব্যাপী ব্যবসা পত্তরের কর্ম্ম সমাধার পর আজ দেশে ফিরেচে নিতাই। আগমন কালে রাওলপিন্ডির কিছু স্মারক কিনে আনার ইচ্ছে হয়েছিল তার। এই স্থানে জায়গায় জায়গায় তখন খননকার্য চলচে। ইংরাজ সাহেবদের তত্বাবধানে মাটি খুঁড়ে রাওয়ালপিণ্ডির ইতিহাস জানার প্রচেষ্টা হচ্চে। দামি জিনিসের সঙ্গে সঙ্গে বহু অকিঞ্চিৎকর জিনিসও উঠে আসচে মাটির থেকে। সেই সকল অপ্রয়োজনীয়, বাড়তি দ্রব্যগুলি তাঁবু খাটিয়ে নিলাম-ডাকে তোলা হচ্চে। তো, নিতাই নানান তাঁবুতে ঘুরে ঘুরে, বিভিন্ন সাহেবদের কাছ থেকে প্রায় সকল পরিজন এবং বাছাই করা গ্রাম মুরুব্বিদের জন্য কিছু না কিছু মণিহারী উপহার নিয়ে এসেচে। কারুর জন্য চীনেমাটির হুঁকা, কারুর জন্য হাতীর দাঁতের চিরুনি, মায়ের জন্য বর্ম্মাপ্রদেশের কাঠের কারুকাজ করা পেঁটরা, বাপের জন্য কারুকার্যময় পাথরের পাকদণ্ডী যষ্ঠিদণ্ড, বৌয়ের জন্য রূপায় আঁটা ঠাকুর দেবতার পট। কুমীরমারীর সীমান্তে ছয়মাস যাবৎ কুঠি ফেলে বসেচিল বনবিভাগের গোরা সায়েব মেজর জনসন, লোকে কয়, ‘জন-মেজর’, তার জন্য নজরানা এসেচে বিলিতি মদ, সুদৃশ্য কেরোসিন বাতি এবং ঝুটো জহরত আঁটা বহুমূল্য কাগজ-চাপা পাথর। জন-মেজর সায়েব তো উপহার পেয়ে মহা খুশী। গাঁয়ের প্রত্যেকেই ভীষণ আনন্দের সঙ্গে বস্তুগুলো নাড়াচাড়া করচে, হৈচৈ করে কেউ ডাবের জল, কেউ বা চিনির শরবৎ পান করচে আর গল্পগুজব করে চলেচে, আচমকা বিনি মেঘে বজ্র নির্ঘোষের ন্যায় ভিতর বাড়ি হতে ভয়ার্ত চিৎকার ভেসে আসায় সকলে একযোগে চমকে উঠে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে এ ওর পানে চাইতে থাকল, আর পলকের মধ্যে নিতাইয়ের স্ত্রী এসে বৈঠকখানার মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ে উন্মাদিনীর মতো ফুঁপিয়ে উঠল—
“ওগো সর্বনাশ হয়েচে। শঙ্করকে সাপে কেটেচে…” এই বলে পুত্রের শয়নকক্ষের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করেই অচৈতন্য হয়ে ঢলে পড়ল।
বৈঠকের জনতার মধ্যে মহা কোলাহল উপস্থিত হল। নিতাই একমুহূর্ত মাত্র বিহ্বল হয়ে থেকেই সবেগে দৌড় দিল শোবার ঘরের দিকে, তার সঙ্গে সঙ্গে ছুটল নিতাইয়ের বৃদ্ধ পিতা রমেশচন্দ্র, শালা বীরভদ্র এবং দুই তিনজন গ্রামের মুরুব্বি। কক্ষে প্রবেশ করেই চোখে পড়ল নিতাইয়ের চৌদ্দ বৎসরের পুত্র শয্যায় এলিয়ে পড়ে রয়েচে আর আবলুশ কাঠের কালো শয্যাপট্টের গায়ে জড়িয়ে রয়েচে ততোধিক কৃষ্ণবর্ণ একখানা কেউটে সাপ। অনেক মানুষের উপস্থিতি অনুভব করে তার হিংস্র ফোঁস ফোঁস শব্দ ঘরে ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেচে। এই সামান্য সময়ের মধ্যেই তার তীব্র গরল শঙ্করের সুন্দর শরীরকে নীল করে এনেচে। হিংস্র জীবটার দুখানি চক্ষু ভীষণ প্রতিহিংসায় যেন ধক্ ধক্ করে জ্বলচে। গাঁ গঞ্জের যে ভয়টিকে গাঁয়ের মানুষ সাক্ষাৎ শমন জ্ঞানে এড়িয়ে চলে, সেই মহা শত্রুরকে একেবারে সুমুখে দেখে সকলেরই শরীর বিবশ হয়ে গিয়েচিলো, সম্বিৎ ফিরল একটা ভোঁতা শব্দে। নিতাইয়ের পিতা বৃদ্ধ রমেশ বাবু হাতে থাকা পাথরের সুদৃশ্য যষ্ঠিখানা দিয়ে সজোরে এক ঘা মারলো সাপটির একেবারে ব্রহ্মরন্ধ্রে। আবলুশ কাষ্ঠ নির্ম্মিত খাটের কিনারার উপর সবেগ পাথরের দন্ডের আঘাতে সাপটার মাথা তৎক্ষণাৎ থেঁতলে গেল। কিছুক্ষণ হিংস্রভাবে ছটফট করে তার ভেঙে যাওয়া মুখখানা একবার ঈষৎ বিভক্ত হলো মরণ কামড়ের অন্তিম ইচ্ছায়, আর তারপর নিশ্চল হয়ে গেল।
ঘটনাটা এতোটাই বিদ্যুৎবেগে ঘটে গেল যে প্রায় প্রত্যেকেই মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় স্থির হয়ে পড়েচিল, এক্ষণে সম্বিৎ ফেরায় সবাই মিলে হুড়োহুড়ি করে শঙ্করকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ছেলেটাকে বাইরের দাওয়ায় শুইয়ে দিয়ে কর্তা কইল, “কেউ একটা কাঠকয়লার গুঁড়া নিয়ে আসো শীগগির, আর এক্ষুণি হারাণের মাকে একটা খপর দাও।”
হারাণের মায়ের নাম কুন্দ। সে সাপুড়ে ভোলার দ্বিতীয় পরিবার। ভোলা মারা যাবার পর কুন্দই গাঁয়ের একমাত্র বিষবৈদ্য। কুন্দ বিকেলবেলা চাট্টিখানি ভাত খেতে বসেচিল, এমন সময়ে চার পাঁচজন কাছারির কর্ম্মচারী এসে ডাকাডাকি শুরু করলে। কর্তার হুকুম পেয়ে খাবার ফেলে, অঞ্চলে হাত মুছে ছেলেকে কইল,
“ও হারু, আমি চললেম, তুই খাবারগুলা কুঁড়ায় ফেলে আয় গে যা, আর শোন…” কুন্দ গলা খাটো করে চাপা গলায় বলল, “বলচি কি, সে ছোকরা বেঁচেচে কি মরেচে বিষহরিই জানে। আহা, বামুনের ছেলে গো। তুই একটু আগুন আর নোয়ার জোগাড় করে রাখিস গে।” বলে লোকজনের সঙ্গে কুন্দ রওয়ানা দিলো ভরদ্বাজ গৃহের পানে।
****
শঙ্করকে শুইয়ে রাখা আছে, আর তার চতুর্দিকে বেষ্টনী করে বহু উৎসুক প্রজারা ভিড় করে চেঁচামেচি করে চলেচে, নিতাইয়ের খাতকরা আহা আহা করে উদ্বেগ প্রকাশ করচে, গাঁয়ে কে কবে সাপকাটিতে মরেচে সেই স্মৃতিচারণা করচে, এমন সময়ে কুন্দ এসে দাঁড়ালো, এবং দাঁড়িয়েই উচ্চৈঃস্বরে ধমক দিয়ে কইলো, “এত অকাজের নোকজন কেন চারদিকে? বাছাকে হাওয়া বাতাস অবদি ছাড়ার পথ রাখনি। তামাশা চলচে নাকি?”
তবুও কিন্তু উৎসুক ভিড় বিন্দুমাত্র ফাঁকা হল না। একে অপরকে সবাই ধমক দিতে থাকল সরে যাবার জন্য, কিন্তু নিজে সরল না। কুন্দ শঙ্করকে পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে বললে, “যাকে ছুবলেচে, তাকে বাঁচাতে হলে বড় একবাটি রক্ত দরকার। পরিবারের রক্ত হলে কিন্তু চলবে না। যত শীঘ্র সম্ভব জোগাড় করুন ঠাকুর। এক্ষুণি।”
নিতাই এবং রমেশবাবু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চক্ষে নজর তুলতেই দেখল, এতক্ষণ যারা পরম হিতাকাঙ্ক্ষীর ভণিতা করে উৎসাহ চরিতার্থ করচিল, তারা যে যার সরে পড়েছে। পরিবারের লোক ব্যাতীত আর কেউই নাই। নিতাইয়ের শ্যালক বীরভদ্র শুধোলো, “আমি তো মামা হই। শঙ্করের পরিবারের মধ্যে ঠিক পড়িনে। আমি রক্ত দিলে চলবে ভোলার বৌ?”
কুন্দ দাঁড়িয়ে পড়ে উত্তর দিলে, “প্রয়োজন নাই ঠাকুর, সাপকাটিতে বাঁচাতে হলে রক্ত লাগে না। আমি আবাগীর ব্যাটাগুলোর ভীড় কমানোর জন্যই অমন কথা কয়েচিলেম। কিন্তু আমার মন্তর তন্তর বা বিষের চিকিৎসার মনে হয় আর দরকার হবে না বাবাসকল।”
রমেশ বাবুর স্ত্রী ডুকরে উঠে আকুল কণ্ঠে শুধালো, “কী বলচো বৌ, এ তুমি কি অলুক্ষুণে কথা বলচো বাছা। আমার ছোটো নাতিটা আমাদের বড়ো আদরে মানুষ…”
এইটুকু বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রমেশের স্ত্রী।
কুন্দ হাত তুলে কইল, “কথা তত অলুক্ষুণে নয় মা ঠাকরুণ। আমার প্রয়োজন হবে না এইজন্যই কয়েছি, কারণ মনসার পো বেশি বিষ ঢালতে পারেনি। ঐ, ঐ দেখো, বাপ আমাদের চোখ মেলেচে।”
সকলে হুড়োহুড়ি করে নীচু হয়ে দেখলো শঙ্কর সজাগ হয়ে চোখ পিটপিট করচে। শ্বাসপ্রশ্বাস ও স্বাভাবিক হয়ে এসেচে। শাশুড়ি বৌমা আবেগরুদ্ধ হয়ে, চোখের জল মুছে, একজোট হয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে কইল, “জয় বাবা মহাদেব। জয় মা মনসা।”
কুন্দ বেরুবার সময় বলে গেল, “এ যাত্রা আর ভয় নাই ঠাকুর। তবে দুটো দিন একটু গরম দুধ চাট্টি হলুদ বাটা দিয়ে দুইবেলা খাইয়ে দিও, আর ক্ষতস্থানের চারদিকে চুণের একটু প্রলেপ দিয়ে রেখো। রস টেনে যাবে। পানের বাটা আছে তো ঘরে? আর হ্যাঁ, মনসার পো কে পুড়িয়ে দিও যেন। আমি চললেম। আঁধার নামতে যায়। একজন চাকররে বলে দাও আমারে একটু আলো দেখাতে।”
কুন্দ প্রস্থান করলে পর ক্লিষ্ট শঙ্করকে তুলে শুইয়ে দেওয়া হল তার পিতামহের শয্যায়। নিতাই, তার পিতা এবং অপর একজন চাকর এবং ঝি মিলে চটের কাপড় নিয়ে অন্দরে গেল মরা সাপের দেহটা নিয়ে আসতে, আর রমেশ বাবুর স্ত্রী নলিনীবালা ভাঁড়ার থেকে খান-কতক কাঠকুটো নিয়ে অন্দরের অঙ্গনে আগুন জ্বালাল, ঐ সর্বনাশা মৃত্যুদূতকে ভস্মীভূত করে ফেলার জন্য। গ্রামগঞ্জে শুধু নয়, শহুরে কৃষ্টিতেও এই প্রথার চল রয়েচে। কথায় বলে, সাপের জাত মরার আগে ছদ্ম মরে। জীবনীশক্তির সব ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যাবার পরেও অনেকক্ষেত্রে আবার স্বমহিমায় বেঁচে ওঠে। তাই এই বিধান। অধিকাংশ সময়েই বিপদ যখন আসে, তখন তার সাময়িক বাহ্যিক রূপ দেখে তার ভবিষ্যতের কুটিলতা আঁচ করা যায় না। ক্ষুদ্রপ্রভা প্রদীপ থেকে গাঁ কে গাঁ ছাই হয়ে যায়। আজকেও ঠিক তাইই হলো। নিতাইরা শঙ্করের শয্যাগৃহে প্রবেশ করে ভয়ানক চমকে উঠল।
পালঙ্কের তকতকে চাদরে মৃত সরিসৃপের রক্ত লেগে রয়েচে, চাদর যথারীতি পূর্ব্বের মতোই পাতা রয়েচে, কিন্তু এ কি!
গোটা কক্ষে সাপটার চিহ্ন মাত্র নাই! তন্নতন্ন করে সন্ধান করেও তার মৃতদেহের খোঁজ পাওয়া গেল না। নিতাই একবার বিমূঢ় স্বরে শুধাল,
“তবে বুঝি ভিড়ের মধ্যে কেউ সাপটাকে নিয়ে গিয়েচে জ্বালাবার জন্য।” বৃদ্ধ রমেশ উদ্বিগ্নতার মধ্যেও বিরস কন্ঠে কইল, “না। তা মনে হয় না আমার। তাদের যে বীরত্বের নমুনা দেখেচি, তাতে তোমার কথা যুক্তিতে ঢেঁকেনা নিতাই। যা হচ্চে ভালো হচ্চে না। সাপটারে যদি বা কেউ নিয়ে গিয়ে থাকে, তবুও আমার ঐ লাঠিখানা কোথায় গেল, যেটা তুমি এনে দিয়েচিলে?”
তাও বটে! সেটাও ঘরে নাই।
বাইরের আগুন নিভিয়ে দেওয়া হল। বুভুক্ষু জীবের লাশ পাওয়া গেল না। কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারল না। মুখে প্রকাশ না করলেও কর্তা, গৃহিণী, চাকর, ঝি, সকলের চিত্তেই অমঙ্গলের একটা বড়শি কিন্তু বিঁধে রইল। বাইরের লোকেরা বা পাড়া প্রতিবাসীরা সব শুনলেও ততো অধিক চিন্তা প্রকাশ করল না, শুধু কুন্দ ছাড়া। কুন্দকে আলো নিয়ে বাড়ি ছাড়তে গিয়েচিলো ভরদ্বাজ বাড়ির চাকর নন্দ। কেতকী নামের একটা শীর্ণকায় নদী এই কুমীরমারি গাঁয়ের পূবদিক দিয়ে বয়ে গিয়েচে। তার পাশ দিয়েই ফিরচিলো তারা। দূর থেকে নদীর স্রোতের গর্জন আসচে। অন্যান্য সময়ে ক্ষীণকায়া হয়ে থাকলেও এখন এই ভরা বর্ষায় সে নদী ফুঁসচে। মেঘে আবৃত আকাশের ফাঁক দিয়ে যেই মাত্র চাঁদের আলো ফুটে বেরুলো, তখনই নদীর আলের দিকে তাকিয়ে কুন্দ এবং নন্দলালের হাড় হিম হয়ে এল।
কেতকীর আলের উপর ওটা কে দাঁড়িয়ে!
কুচকুচে কৃষ্ণবর্ণ এবং সুদীর্ঘ আকৃতির একটা মানুষ। তার গায়ে চাঁদের আলো পড়ে ঝিকিমিকি করচে, যেন তার সর্বাঙ্গ সিক্ত হয়ে রয়েচে। দীর্ঘ হাত, পা গুলি অদ্ভুত মুদ্রায় নাড়চে ওই মানুষটা। ইনিয়ে বিনিয়ে একটা কান্নার শব্দ আসচে। লোকটা যেন তীব্র শোকে বুকফাটা কান্না কেঁদে চলেচে। এত রাত্তিরে কেউ স্নান করতে আসবে তাও তো অসম্ভব বটে। এই ভরাভর্তি বাদলা মাথায় নিয়ে গাঁয়ের কোনও লোক অন্ততঃ বেরুবে না। তবে এ কে? নন্দলাল কিছুসময় অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে চীৎকার করে লোকটিকে ডাকতে গেল, কিন্তু তার আগেই কুন্দ সবলে তাকে আকর্ষণ করে বলে উঠল, “শশশশশ” নন্দ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে, “কী হল তোমার হারাণের মা? অমন করে থামিয়ে দিলে কেন আমাকে?”
কুন্দ ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে থেকে কয়েকবার শ্বাস নিল। তারপর কইল, “আমাকে আর এগোতে হবেনা। তুই চুপ করে বাড়ি চলে যা। যাবার সময়ে আলোটা নিভিয়ে যাবি। চাঁদ উঠেচে, দিব্যি পথ ঠাহর হবে।”
নন্দ ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারচে না, কিন্তু কুন্দর কথা বলার ভঙ্গিতে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই তারও স্বর কয়েক পরত নেমে এল। ফিসফিস করে বলল, “কেন রে হারাণের মা! কি হয়েচে। লোকটাকে দেখে ভয় পাচ্ছিস বুঝি?”
কুন্দ সেই মূর্তির দিকে দৃষ্টি রেখে চাপা সুরেই উত্তর দিল, “মানুষের ভয় আমি করিনে আবাগীর ব্যাটা। কিন্তু চারদিকে একটা বিশ্রী গন্ধ ছড়িয়ে পড়েচে টের পাচ্চি। বড়ো তীব্র গন্ধ। গতিক ভালো নয়, বুঝলি? হারাণের বাপের কাছে একবার শুনেচিলাম এই ধরণের একটা কথা। তুই বাড়ি চলে যা। আমি যদি পারি, কাল গিয়ে ও বাড়িতেই সব বলবো’খন। আলোটা নেভা।”
সভয়ে কাঁচ ঘুরিয়ে এক ফুঁয়ে বাতি নিভিয়ে, বাড়ির পানে দুই পা চলতে চলতে নন্দ উদ্বিগ্ন ভাবে জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু কিসের গন্ধ পাচ্চিস তুই হারাণের মা? কোনও জানোয়ারের?”
কুন্দ দূরের মূর্তির দিকে চেয়ে, একবার সজোরে শ্বাস টেনে, কাঁপা গলায় বলল, “বড় বেজন্মা জানোয়ার নন্দ। যে প্রাণীটার নাম গাঁয়ের লোকে রাতে মুখে আনে না।”
নন্দ কোনও দিকে আর না তাকিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে বাড়ির অভিমুখে দৌড় দিল। হাহাকারের মতো কান্নার আওয়াজটা আবার শোনা গেল।
****
কয়দিন পর নিতাই নিজের বাইর-বাড়ির কাছারীতে বসে অধীনস্থ আমলাদের থেকে হিসেব পত্তর দেখচে, এমন সময় কাছারীর দ্বারে এসে উপস্থিত হল সাহেবকুঠির চাপরাশি মাইকেল। সে সাহেব নয়, পাশের গাঁয়েরই ছেলে। তার বাপ রামানুজ মন্ডল সাহেবকুঠির কাজে লাগার পর খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। রামানুজ গতাসু হবার পর তার পুত্র এখন সেই কাজে বহাল হয়েচে। নিতাইয়ের খাস চাকর বাঘা এসে খবর দিলে,
“ছোটকর্তা, কুঠির থেকে মক্কেল মন্ডল এসেচে।”
নিতাই শশব্যাস্ত হয়ে উঠে পড়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। মাইকেল দাওয়ায় বসেচিলো, নিতাইকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে পায়ের ধুলা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ভালো আছেন ছোটকৰ্ত্তা?”
তখনকার ব্রাহ্মণদের মধ্যে ছুৎমার্গের কুশিক্ষার প্রভাব অত্যন্ত অধিক থাকলেও রমেশ ভরদ্বাজ অথবা তার পুত্রের মধ্যে সেই কুপ্রভাব তত বেশি ছিল না। তারা ব্রাহ্মণ হলেও ব্যবসায়িক বটে, হাজারো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়, খেতে হয়, এমতাবস্থায় ওসব অপসংস্কৃতি অঙ্কুর গজানোর অবকাশ পায়নি। নিতাই মাইকেলের চিবুক স্পর্শ করে কইলো, “বেশ আছি বাবা, তা এই সময় হঠাৎ, মানে সায়েব কি….”
মাইকেলের হাসিমুখে এইবার সামান্য চিন্তার ছায়া পড়ল। আনমনা ভাবে বলল, “সায়েব একবার আপনাকে ডেকেচে কৰ্ত্তা। তেমন কিছু নয় বটে, কিন্তু… একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেচে।”
নিতাইচন্দ্র আজকের কাজকর্ম স্থগিত করে শ্যালক বীরভদ্রকে নিয়ে উপস্থিত হল সায়েবের সমীপে। জন মেজর সায়েব নিতাইয়ের সঙ্গে মিত্রতা পূর্ণ সহৃদয় ব্যাবহারই করে থাকে, কিন্তু আজ যেন তার সদালাপী চরিত্রে চিন্তার ছাপ পড়েছে। কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সায়েব বলল, “হেই বাবু, তুমি যে খেলাৎ গুলি আমাকে দিয়াছো, উহা কোথা হইতে ক্রয় করিয়াছো?”
নিতাই ধন্ধে পড়ে প্রশ্ন করল, “ওগুলো আমি রাওলপিন্ডি শহর থেকে কিনে এনেচি। কেন সাহেব? জিনিস কি পছন্দ হয়নি?”
জন মেজর মাথা নেড়ে বলল, “না, তা নহে। দ্রব্য অতি উত্তম, কিন্তু… আইসো, তোমাকে দেখাইতেছি…।”
কুঠির অভ্যন্তরে সাহেবের খাস কক্ষে প্রবেশ করল সকলে। সাহেব পড়ালেখার চারপাইয়ের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করে বলল, “ঐ দেখো বাবু, তোমার দেওয়া উপহার। উহা কী বস্তু?”
নিতাই ভীষণ বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করল চারপাইয়ের উপরে রাখা রয়েচে তার দেওয়া কাগজ-চাপা গোলাকার পাথরখণ্ড। কিন্তু আশ্চর্য! সেটা আকারে যেন তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েচে! তার গায়ে বসানো ঝুটো সাজসজ্জার মণিগুলি খুলে পড়ে গিয়েচে। পূর্ব্বে তার আকৃতি ছিল আড়ে বহরে দুই আঙুল পরিমাণ, কিন্তু এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েচে প্রায় দুই বিঘৎ। এ কি অদ্ভুত ব্যাপার! কেমন করে সম্ভব? ক্লীব প্রস্তরখণ্ড কখনও এইরূপ বৃদ্ধি পায়, এমন ঘটনা আশ্চর্যজনক বৈকি। নিতাই সত্যিই অবাক হয়ে আপন মনেই বলে উঠল, “কি আশ্চর্য সাহেব! এমনটি তো কখনও শুনিনি।” জন-মেজর স্বভাব সুলভ গাম্ভীর্য রক্ষা করে ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“আমিও এমন কথা মুখে শুনিলে বিশ্বাস করিতাম না বুঝিলে বাবু। কিন্তু ইহার কারণ আমিও বুঝিতে পারিতেছি না। দিস এনডোড উইথ আন আনলাকি চার্ম উই থিঙ্ক।”
নিতাই বীরভদ্রের দিকে তাকাতে, বীরভদ্র বলল, “সাহেব বলছেন, এই জিনিসটা দুর্ভাগ্যের মূল।”
নিতাই বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞাসা করল, “বলচেন কি সাহেব! এমন কথা কেন মনে হল আপনার?”
“কেন মনে হইল? আইসো…”
সাহেব এদের নিয়ে কুঠির পিছনের জমিতে উপস্থিত হল। সেই স্থানে দুখানি শুষ্ক রক্তমাখা লাঠি, আর কিছু কাঠকুটো পড়ে রয়েচে। মাইকেল একটু ইতস্ততঃ করে বললে, “এই কুঠি বহুদিন ধরেই তো রয়েচে, কিন্তু আমার বাপের আমলেও এমন ঘটনা কখনও হয়নি। গতকাল রাত্তিরে সাহেব ঘরে বসে লিখচে, আমরা বাইরের রসুইতে খানা পাক করচি, এমন সময়ে গুলীর আওয়াজে চমকে উঠে সকলে মিলে কামরায় ঢুকেই দেখি, সাহেব খাটের উপর দাঁড়িয়ে রয়েচে, আর নীচের মেঝেতে কিলবিল করচে চার পাঁচখানা সাপ একটা সাপ গুলীতে মরেচে, বাকিগুলো খাটের পায়া বেয়ে ওঠার চেষ্টা করচে। আমি হাতের ভারী বেলচা দিয়ে একটা শয়তানের মাথায় মারলাম এক ঘা। ততক্ষণে বাকিরা লাঠি নিয়ে হাজির হয়েচে। কিছুক্ষণ খণ্ডযুদ্ধ চলার পর সবকয়টা সাপ মারা পড়ল। গুণে দেখলাম সবশুদ্ধ ছয়টা। সাপেরা কখনও দল বেঁধে চলাফেরা করে না, তাই এই ঘটনা কখনওই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।”
বীরভদ্র অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে কইলো, “অদ্ভুত ব্যাপার তো। এমনটি কখনও শুনিনি যে সাপেরা দল বেঁধে ঘরে ঢুকে পড়ে। সেই জন্যই সাহেব চিন্তায় পড়েছেন।”
মাইকেল শুষ্ক স্বরে বললে, “না। ঘটনা আরও বাকি রয়েচে। আমরা সাপগুলোর মৃতদেহ কুঠির পিছনে, এই এইখানে এনে রেখে, লাঠিগুলো ফেলে, কাঠ আনতে গেলাম জ্বালানোর জন্য। একটু পরেই ফিরে এসে দেখি… একটা সাপ ও সেখানে নাই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও লাভ হল না। অবাক হয়ে কুঠিতে ঢুকতে যাচ্চি, এমন সময় দূর থেকে একটা পুরুষ মানুষের কান্নার আওয়াজ এল। সে কি কান্না ছোটকর্তা। শুনলে বুকের রক্ত জল হয়ে ওঠে। স্বজন হারিয়ে কেউ যেন বুক চাপড়ে কেঁদে চলেচে। সে সুরের মধ্যে শুধু দুঃখ নয়, হতাশা, ক্রোধ, আক্ষেপ, সব ফুটে বেরুচ্চে। আমরা ভয়ে ভয়ে দোর বন্ধ করলুম। রাতে কেউ যেন খসখস করে কুঠির চারদিকে হাঁটচিলো। আমরা উঁকি মারার সাহস পাইনি কর্তা। সকালে উঠে সাহেব বলল আপনারে ডাক দিতে।”
*****
নিতাই গোলাকার পাথরটা নিয়ে গৃহে চলে এল। তার মাথাতেও গোল লেগে গিয়েচে। কি অদ্ভুত কথা। সে স্বীকার করেনি বটে, কিন্তু তার নিজের গৃহেও তো সাপটার সন্ধান সত্যি সত্যিই পাওয়া যায়নি। দেহগুলি যাচ্চে কোথায়? কাঁদচে কে? এত সাপ আসচে কোথা থেকে? পাথরটা এইভাবে বাড়ছে কেমন করে?
জবাবের ভাঁড়ার নিরুত্তর। তবে নিতাইয়ের একটা জেদ চেপে গিয়েচিলো। একটু বেলা বাড়তে গাঁয়ের সমস্ত পুরুষদের ডেকে সে কইলো, “শোন তোরা, আমার ঘরে যা ঘটেচে তা তোরা নিজেই দেখেচিস। গতকাল জন সাহেবের কুঠিতে ছয় সাতটা সাপ তাকে কাটতে গিয়েচিলো। কাল তোদের বাড়িতে ঢুকবে, পরশু আরেক জনের ঘরে। এই শয়তানী চলতে দেওয়া যায় না। তোরা কুড়ালি, বঁটি, কাস্তে, লাঠি, যা পাস তাই নিয়ে এক্ষুণি আয়। আজ গাঁ ছুঁড়ে সাপ বের করবো।”
সোঁদরবনের মানুষ সাপকে দেবতা জ্ঞান করে, পূজা করে। তারা ইতস্ততঃ করতে লাগল, কিন্তু উপায় নাই। গাঁয়ের অর্ধেক প্রজা নিতাইয়ের খাতক, দায় ঠেকায় ভরদ্বাজ বাড়িই ভরসা। অগত্যা তারা রাজী হল, আর দ্বিপ্রহরের মাঝামাঝি সকলে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল নিধনকার্য্যে। বিকেল হতে সন্ধ্যার মুখে সবাই ফিরে এল, আর ভরদ্বাজ বাড়ির অঙ্গনের বাইরে জমা হলো অন্ততঃ গোটা পনেরো সাপের লাশ। বৃদ্ধ রমেশ ভরদ্বাজ গৃহপ্রাঙ্গণে বসে রয়েচে। তার মুখ অপ্রসন্ন। পুত্রের এই হঠকারী আচরণে সে বাধা দেয়নি বটে, কিন্তু তার সু-অভিজ্ঞ হৃদয় বলচে যা ঘটচে তা মোটেই হিতকর নয়। নন্দ চাকর এসে সাপগুলোর গায়ে তেল ছিটিয়ে গেল। একজন চাকর গেল আগুন আনতে। নিতাই মৃত ভুজঙ্গের স্তুপের দিকে চেয়ে প্রতিহিংসার হাসি হাসল।
কুমীরমারি গাঁ কে পাক দিয়ে চলা কেতকী নদীর চারধারে যে ঘন জঙ্গলে কুন্দ ঐ ছায়ামূর্তিকে দেখেচিল, সেই বনের নাম ঘোড়াডোবার বন। সন্ধ্যার মুখে সেই পথ দিয়ে খুব দায়ে না পড়লে মানুষ চলাচল করে না। আজও সেই পথ বিজন ছিল। সাঁঝ নামার মুখে নদীর মুখের একটা গর্ভ থেকে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল একটা দীর্ঘদেহী জন্তু। গায়ের রঙ ঈষৎ হরিৎবর্ণ, মুখখানা ছুঁচালো, কান নাই, মেরুদণ্ডের নিম্নভাগে একখানা নাতিদীর্ঘ লাঙ্গুল, হাত, পা বলিষ্ঠ গড়ন, গোটা শরীর সবজেটে আঁশে আবৃত। তাতে আকাশের মিলিয়ে আসা প্রভা প্রতিফলিত হয়ে ঝকঝক করচে। সবচাইতে ভয়ঙ্কর হল প্রাণীটার চোখ। বর্তুলাকার দুইখানি পলকহীন চক্ষু ফিকে কমলা রঙের, তাতে সরু একখানি রেখার মতো লম্বাটে মণি। গৃহস্থ ঘরের দেওয়ালে যে পতঙ্গ লোলুপ গোধিকা ঘুরে বেড়ায়, অবিকল সেইরূপ আকৃতি।
হিংস্র সেই অদ্ভুত জন্তুটা এসে দাঁড়ালো শূণ্য মেটে পথের মাঝে। জান্তব কর্কশ স্বরে একটা বিজাতীয় ধ্বনি বেরুচ্চে তার কণ্ঠ দিয়ে, আর এক মূহুর্তে তার সেই কদাকার অবয়ব ঢেকে গেল ঘন, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধুঁয়ায়। যখন ধূম অপসৃত হলো, দেখা গেল জন্তুটার রূপ আমূল বদলে গিয়েচে। সেই স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েচে গৈরিক বসন পরিহিত একটি মনুষ্য মূর্তি। কৃশ, ক্ষীণ অবয়ব। ললাটে চন্দন চর্চিত করা। চক্ষুতারকার বর্ণ বদলে গিয়ে অবিকল মানুষের মতো কালো রঙা হয়ে উঠেচে। ঠিক যেন কোনও দক্ষিণ দেশীয় ব্রাহ্মণ। সেই ভেকধারী অশুভ প্রাণী জঙ্গলের চারদিকটা একবার নিরীক্ষণ করে নিয়ে মেঠো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল দক্ষিণ পশ্চিম দিকে। কুমীরমারি গাঁয়ের পানে।
*****
মৃত সাপগুলোর উপরে তেল ঢালা শেষ হলে পর নন্দ গিয়ে অপর ভৃত্যটির থেকে একখানা জ্বলন্ত মশাল নিয়ে হাজির হল নিতাইয়ের নিকটে। নিতাই মশালটা চাকরের হাত থেকে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“শয়তানী জানোয়ারের দল, আমার বংশের বাতিকে বিনষ্ট করতে এসেচিলি তোরা? আমার শঙ্করকে কামড়েচে তোদেরই এক শয়তান। তোদের ঝাড়েমুলে নিপাত করে তবে প্রাণ জুড়োবে আমার।”
এই বলে পরিতৃপ্ত নজরে সকলের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে সেই স্তুপের দিকে মশাল নামাল নিতাই।
মশালের আগুন যেই মাত্র সাপগুলোর দেহ স্পর্শ করতে যাবে, এমন সময়ে ভীষণ জোরে ছুটে আসা একটা দমকা বাতাসের তাড়নায় আগুন নিভে গেল। কেউ যেন অসীম বলশালী এক ফুৎকারে একটা গোটা মশালের আগুনকে হেলায় নিভিয়ে দিল। এতক্ষণ আগুনের আলো জ্বলচিলো বলে এই ভর সন্ধ্যায় সকলের চোখ সয়ে গিয়েচিলো। এক্ষণে আচমকা সেই আলো নিৰ্ব্বাপিত হওয়ায় সকলে চক্ষে আঁধার দেখলো, আর সেই সঙ্গে কয়েকবার ঘড়ঘড় ধরণের চাপা শব্দ পাওয়া গেল। নন্দ বাড়ির দাওয়াতেই দাঁড়িয়েচিলো, এখন এই ব্যাপার দেখে এক দৌড়ে ভিতর থেকে একখানা বাতি নিয়ে বাইরে এসেই হঠাৎ যেন চোখে পড়ল, একটা দীর্ঘদেহী আবছা মানুষের মূর্তি যেন সাঁৎ করে ছুটে চলে গেল। তেলের বাতির আবছা আলোকে অধিক দূর অবধি দেখা চলে না, কিন্তু অতটুকু সময়ের মধ্যেও নন্দর মনে হল ওটা যেন কোনও মানুষ নয়। অন্য কিছু। তার লুকিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে এবং অসম্ভব ক্ষিপ্রতার মধ্যে যেন একটা আদিম, জান্তব আচরণ রয়েচে। নন্দ এই ধরণের কথা চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ একজন প্রজা ভয়ে চীৎকার করে উঠল। সেদিকে নজর ফেরাতেই এক মুহূর্তের জন্য ভীষণ আতঙ্কে প্রতিটি মানুষের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যেন স্তব্ধ হয়ে পড়ল।
ভূমিতে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েচে চার পাঁচজন গ্রামবাসীর মৃত শরীর। শুধু শরীর বলাও ভুল, মৃতদেহগুলি যেন প্রচণ্ড তীব্র কোনও বিষের প্রভাবে কালচে বর্ণ ধারণ করেচে। স্থানে স্থানে প্রাণঘাতী মহাবিষের মারণ প্রভাবে চামড়া পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েচে। সেই স্থান থেকে বিষবাষ্পের ন্যায় ধুঁয়া উঠচে। এই অমোঘ বিষ এতই বিদ্যুৎবেগে মৃত্যুকে ডেকে এনেচে, যে অসহায় মানুষগুলো একফোঁটা আওয়াজ করারও অবকাশ পায়নি। যে সাপের দেহগুলি ভূমিতে রাখা হয়েচিলো, তার একটিও পড়ে নাই। কোনও এক অজানা মহা শক্তিধর এবং ক্ষিপ্রগতি প্রাণী এক লহমায় উপস্থিত হয়ে, মশাল নিভিয়ে, সাপগুলিকে ছিনিয়ে নিয়ে, এতগুলি শক্তসমর্থ মানুষকে একেক কামড়ে প্রাণবায়ু কেড়ে নিয়েচে। প্রতিটি মৃতের ঘাড়ের কাছে ঠিক মানুষের দাঁতের মতো দাগ বসে রয়েচে।
নিতাই হতভম্বের মতো মাটিতে বসে পড়ল। গ্রামবাসীদের মধ্যে তুমুল চিৎকার এবং ভয়ার্ত কোলাহল উঠল। এ নিশ্চয়ই কোনও ভয়ংকর অপদেবতার কাজ। কোনও ভয়াবহ উপদ্রব এসে উপস্থিত হয়েচে তাদের আড়ালে। সোঁদরবনের তালুকে বাস করে নিতান্ত আক্রান্ত না হলে সাপ হত্যা মহা পাতকের কাজ। নিশ্চয়ই কোপন স্বভাব নাগ দেবতা কুপিত হয়েচেন। যতজন এই দুরাচারে জড়িত রয়েচে, তাদের কেউ সেই কোপ থেকে রক্ষে পাবে না। তারা হুড়োহুড়ি করে প্রাণভয়ে যে যার গৃহের দিকে ছুটল। নন্দ চাকর প্রভুর পার্শ্বে মাটিতে বসে পড়ল। সে চকিতে যে অপসৃয়মান ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করেচিলো, সেটি অনেকখানি মানুষের মতোই দেখতে ছিল বটে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তার পরিস্কার কিছু একটা গরমিলও রয়েচে। এক পলকের দেখাতে নন্দ কিছুতেই সেই গরমিল স্মরণ করতে পারল না, কিন্তু তার মন বলচে ও মূর্তি মানুষের নয়। কক্ষণও নয়। অনেকটা যেন সেই কেতকীর পাড়ে দেখা মূর্তিটার মতো। কুন্দ তখন বলেচে ঐ মূর্তিখানার দিক থেকে ও নাকি সাপের মতো গন্ধ পাচ্চিলো, কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব… নাগ দেবতা বলে কি সত্যিই কেউ রয়েচে?
*****
লোকজন উর্দ্ধশ্বাসে পলাতক হবার পর বিষণ্ণ, ত্রস্ত নিতাই গৃহে ফিরে এসে ঘরের দোর দিল। আজ যে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে গেল তাতে সকলের মাথায় গোল পাকিয়ে গিয়েচে। এ কেমন সর্বনাশা জীব, যার দাঁতে এইরকম ভয়ঙ্কর পরিমাণ গরল রয়েচে, যা মানুষের ভিতরে প্রবেশ মাত্র তার মৃত্যু হয়। হতভাগ্য একটা টু শব্দ অবধি করার ক্ষমতায় থাকে না। জন্তু? তাই বা হয় কি করে? মানুষই তো বটে। উজ্জ্বল তেলের বাতির আলোয় প্রায় অনেকেই ঐ অপসৃয়মান অদ্ভুত আততায়ীকে এক লহমার জন্য নজর করেচে। মানুষের মতোই তো আকৃতি!
নিতাইয়ের চিন্তার জাল ছিন্ন হলো পুত্র শঙ্করের ডাকে, “বাবা, শিগগির ভিতরে আসো। মা কি একটা দেখাচ্চে।”
নিতাই ধড়মড় করে শয়নকক্ষে প্রবেশ করতেই শঙ্করের মাতা চারুলতা আঙুল দেখালো দলিল দস্তাবেজ রাখার চৌখুপির দিকে। সেখানে রাখা রয়েচে সাহেবের থেকে ফেরৎ নিয়ে আসা ঐ অপয়া পাথরখণ্ডটি। ঠিক সেই পাথরটি নয়। এই একটি মাত্র দিবসে তার আকৃতি প্রায় চতুর্গুণ বৃদ্ধি পেয়েচে। এখন তার বেধ লম্বায় চৌড়ায় আন্দাজ দেড় হাতের মতো। পরিধিও তদ্রুপ। তার বৃত্তাকার কান্তি পরিবর্তিত হয়ে ডিমের ন্যায় আকার পরিগ্রহ করেচে। নিতাই সেই অতিকায় ক্রমবর্ধমান অপদ্রব্যের দিকে চেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল।
অবাক কিন্তু সকলেই হয়েচে, কিন্তু নিতাইয়ের মনের অবস্থা অনুমান করে নন্দ সসঙ্কোচে নীচু গলায় বললে, কৰ্ত্তা, ছোট মুখে একটা কথা কইচি, অপরাধ নেবেন না। আপনারা মেলাই পড়ালেখা করেচেন, তাই অনেক অনেক বিদ্যে জানেন যা আমরা গাঁয়ের লোকেরা জানিনে, কিন্তু ছোটকৰ্ত্তা, এই পড়ালেখা হল একটা শামিয়ানার মতো। বিদ্যে শিক্ষা করলে পর এই শামিয়ানার ওপারের রঙবাহারী জগৎটা চক্ষের সুমুখে খুলে যায় ঠিকই, কিন্তু এই পারের সাদা কালোর জগৎটা আড়াল হয়ে যায়। আমরা গাঁয়ের মুখ্যু মানুষ। বাইরের দুনিয়ার খপর রাখিনে, কিন্তু এই সাদাকালোর দুনিয়াটা বেশ চিনি। খুব চিনি। আমার মন’টা কু গাইচে। এই আপদ পাথরটা আপনি বিদেয় করেন কুলোর বাতাস দিয়ে। এ কেমন অনাচ্ছিষ্টি জিনিস কৰ্ত্তা, যা দিনে রাতে বেড়েই চলেচে? পাথর নাকি কখনও এক আঙুলও বাড়ে? গাঁয়ে এই সাপ নিয়ে যা শুরু হয়েচে, তাতে আমার একটা খুব ভয় হচ্চে।”
নিতাই হতবিহ্বল হয়ে ধরা গলায় বলল, “কীসের ভয় হচ্চে নন্দ?”
নন্দ একবার মাথাটা নামিয়ে নিয়ে, মনে জোর সংগ্রহ করে মুখ তুলল।
“আমার সন্দেহ যদি সত্য হয়, তবে গাঁয়ে ঘোর দুর্দিন লেগেচে কর্তা। আমার মনে হয় এই পাথরের মতো দেখতে জিনিসটে আদপে কোনও বড়সড় জন্তুর ডিম! এর ভিতরে নুকিয়ে থাকা প্রাণশক্তি দিনে দিনে বেড়ে চলেচে। এই ডিমের ভিতর পানে কে রয়েচে তা জানিনে, কিন্তু সেই অপদেবতা বাইরে পা রাখার আগেই তাকে নিকেশ করতে হবে। আজকের ঐ শয়তান ছায়া মানুষটা নিশ্চয়ই এই অপদেবতার দূত। তাই এই বিপদ ডানা মেলার আগেই…।”
“মানুষ নয় নন্দ, মানুষ নয়…।”
বৃদ্ধ রমেশ ভরদ্বাজ যে পাশে এসে বসেচে, তা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত প্রভু বা নফর, কেউই লক্ষ্য করেনি। এক্ষণে তার স্বর শুনে মাথা তুললো নিতাই। কাঁপা কাঁপা স্বরে শুধালো, “বাবা, আপনি দেখেচেন তাকে?”
“দেখেচি নিতাই। যখন তোমরা দেখেচো, আমিও তখনই দেখেচি। আমার দৃষ্টি ক্ষীণ হয়েচে, কিন্তু তাতেও যেটুকু দেখার তা দেখেচি, আর সেই কারণেই হলপ করে বলচি, সে কখনও মানুষ নয়।”
“আপনি কেমন করে এ কথা বলচেন বাবা?”
“বলচি তার কারণ রয়েচে। সেই শয়তান তো যাবার সময় পিছন ঘুরেই ছিল। তোমরা তো তাকে পিছন থেকেই দেখেচো। তার পরেও কিছু লক্ষ্য করোনি বাবা?” এতক্ষণে নন্দ চাকরের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
তাই তো! এইবার তার মনে পড়েচে কেন তার বারবার খটকা লাগচিল যে ওটা মানুষ নয়। মূর্তিটার শরীরে দুইখানি করে হাত পা ছিল বটে, কিন্তু পিছনে? পিছনে ছিল একটা লেজের মতো কিছু! ক্ষিপ্রগতি শয়তানের চলার সঙ্গে সঙ্গে সেখানা দুলে চলেচিল! হা ঈশ্বর! তবে কি সত্য সত্যই সেটা মূর্তিমান একটা প্রেত?
রমেশ নিস্পন্দ কণ্ঠে আবার কথা কইল, “এইবার আমিও বলচি নিতাই, এই অশুভ জিনিসখানা তুমি বিনষ্ট করে ফেল। না জানি কোন সর্বনাশা দানো লুকিয়ে রয়েচে এই অপ্রস্ফুটিত প্রাণবীজের আড়ালে।”
নিতাইয়ের মনে হল তার চক্ষের সামনে সমগ্র চরাচর দুলে চলেচে। প্রভাত হলে পর সেই বিশাল ওজনের ডিমের ন্যায় পাথরখণ্ডটি ধরাধরি করে এনে রাখা হল উঠানের বাইরে। গাঁয়ে এত ভয়ঙ্কর অপঘাত ঘটে যাবার পরেও কেউ নিতাইকে দোষারোপ করল না। সরল মানুষগুলো ভরদ্বাজ পরিবারকে কেবল সমীহ করতো তাইই নয়, অত্যন্ত শ্রদ্ধাও করতো। তাঁরা যে স্ব-ইচ্ছায় কারুকে মরণের দিকে ঠেলে দেবে না, এ বিশ্বাস সকলেরই ছিল। ভৃত্যেরা গিয়ে পাঁচ ছয়জন জোয়ান ছেলেপিলেকে ডেকে আনলো। তাদের সঙ্গে মিলে নিতাই, নন্দ এবং অন্দরের অন্যান্য পরিচারকরা মোটা মোটা রায়চিতি বাঁশের গুরুভার দন্ড নিয়ে পাথরটাকে বেষ্টন করে দাঁড়াল। তারপর সেই স্থুল বংশদন্ড দ্বারা পাথরের উপর মারলো সজোরে আঘাত। দশ বারোজন বলিষ্ঠ পুরুষ মিলে ভারী ভারী দন্ড দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকলো সেই শিলাময় অজানা বস্তুখন্ডের উপরে, এবং কয়েক মূহুর্ত পরেই টের পাওয়া গেল, বাঁশের লাঠিগুলিতে চিড় ধরেচে বটে, কিন্তু ঐ বজ্রকঠিন শিলাখন্ডে একটা আঁচড় অবধি পড়েনি!
সকলে সভয়ে পিছিয়ে গিয়ে সন্দিগ্ধ চিত্তে বললে, “নাহ ছোটকর্তা, গতিক সুবিধের ঠেকচে না। এর ভিতরে নির্ঘাৎ কোনও ভয়ানক জানোয়ার রয়েছে। না জানি কোন অপশক্তি ঘুমিয়ে রয়েচে এই শয়তানের ডিমের ভিতর। আপনি আজ্ঞা করেন তো আমরা এই আপদকে ওই দূরের হেঁতাল বনে ফেলে দিয়ে আসি। সেখানে ঘন বনের মাঝে একখানা বিরাট দহ রয়েচে। তার এ কূল ও কূল ঠাহর হয় না। ঐ জলে ডুবিয়ে দিয়ে আসি এই বালাইকে। তাতে কতদূর রক্ষে হবে জানিনে, কিন্তু এমন ভয়ের জিনিস গাঁয়ের ভিতরে থাকার চাইতে সেই বরং ভালো।”
নিতাইও বিলক্ষণ বুঝে গিয়েচে গ্রামের লোকেদের কথা একেবারেই ফেলে দেবার নয়। একবার সেই গুরুভার ডিমের দিকে নেত্রপাত করে একটা অজানা আশঙ্কায় নিতাইয়ের হৃদয়ের অন্তঃস্থল অবধি কেঁপে উঠল। সে একটু ধাতস্থ হয়ে ভগ্ন কণ্ঠে নন্দর উদ্দেশ্যে বলল, “নন্দ, ধান বওয়া গাড়িখানাতে গোরু জুতে রাখ। এটাকে ধরাধরি করে সে গাড়িতে তোল, আর হেঁতালের বনে গিয়ে দহের ভিতর ডুবিয়ে দিয়ে আয়।”
নন্দ শীঘ্র শীঘ্র গো-যান তৈয়ারি করে বাকি সাহসী লোকেদের নিয়ে প্রবেশ করল জনহীন হেঁতালের মহা বনে। জঙ্গলের ভিতরে গোরুর গাড়ি আর যখন চলতে পারে না, তখন বলশালী চারজন অদম্য শক্তিতে পাথরটাকে বয়ে নিয়ে চলল দহের দিকে। প্রতি পদে গভীর কাদামাটির মধ্যে পা বসে যাচ্চে। সকলেই বনের চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি মেলে চলেচে, কিন্তু নন্দ দেখচিলো সেইসব জিনিস, যার দিকে বাকিদের নজর ছিল না। সে অবাক হয়ে দেখলো, তারা যেই আগাছায় আবৃত পথ ধরে চলেচে, তার ঠিক মাথার উপরে উড়ে চলেচে অসংখ্য পাখীর দল। দলটা তাদের ঠিক উপরেই উড়তে উড়তে এগিয়ে চলেচে, অথচ কি আশ্চর্য! কেউ একটা শব্দ অবধি করচে না। এমনটি নন্দ এত বছরের জীবনে কক্ষণও প্রত্যক্ষ করেনি। এতগুলি পাখপাখালী একসাথে উড়চে, অথচ একফোঁটা আওয়াজ নাই? শুধু তাই নয়, তারা যে মেটে পথে চলেচে, তার চারপাশের পোকামাকড়, পতঙ্গ, ক্ষুদ্রপ্রাণ জন্তুরা সভয়ে পথ ছেড়ে যেন প্রাণের ভয় পালিয়ে যাচ্চে। অন্যান্য সময়ে মানুষ দেখে এই প্রাণীগুলো যেভাবে পলায়ন করে, ঠিক তেমনটি কিন্তু নয়। এই মনুষ্যেতর জীবগুলো যেন কোনও একটা ভয়ঙ্কর কিছুর আভাস পেয়ে প্রাণ নিয়ে ছুটে চলেচে
এতগুলি লোক এই বাদলা দিনেও গলদঘর্ম হয়ে এসে পৌঁছালো দহের কিনারায়। অমানুষিক পরিশ্রমে তাদের শরীর থেকে দরদরিয়ে স্বেদ নির্গত হয়ে চলেচে। যাকে নিয়ে এত কর্মযজ্ঞ, সেই ডিমখানার রঙ ইতিমধ্যেই অনেকখানি বদলে গিয়েচে। দুগ্ধ শুভ্র বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে ফিকে হলদেটে রঙ ধারণ করেচে। গ্রাম্য মানুষগুলির অভ্যস্ত নজর বলচে, ডিমের ভিতরে শায়িত সেই অজানা মহাশক্তির আসল রূপটুকু বোঝা না গেলেও, সে কিছু দিনের মধ্যেই আত্মপ্রকাশ করতে চলেচে। তখন কোন মহা দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে তার আভাসটুকু অবধি এখন আঁচ করা যাচ্চে না। কিনারা থেকে সেই ডিম্বাকৃতি শিলাকে গড়িয়ে দেওয়া হল ঢালু পথে। কৰ্দ্দমাক্ত, পিচ্ছিল পাড় বেয়ে গড়িয়ে সেটা ঝপাস করে সজোরে গিয়ে পড়ল দহের কালো জলের ভিতরে, এবং নিঃসাড়ে ডুবে গেল। গাড়িতে চেপে গাঁয়ে ফেরার কালে নন্দ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পাখিরা এখন দহের উপরের আকাশে উড়ে চলেচে।
*****
সেদিন রাতের থেকে কুমীরমারির তল্লাটে শুরু হলো এক ভয়ানক উপদ্রব। হঠাৎ হঠাৎ গোটা গাঁ খানা যেন কেঁপে ওঠে, যেন কোনও বলশালী দানব প্রচণ্ড হিংসার সাথে গোটা এলাকায় মহা আক্রোশে পদাঘাত করচে। আলো নিয়ে বা দিনের বেলায় দল বেঁধে চলাচল করলে আচমকা আক্রমণ হয় না ঠিকই, কিন্তু সেই সুরক্ষা বলয়ে সামান্য ফাঁক পড়লেই সেই দানব ছোঁ মারে। অকস্মাৎ যেন ভূঁই ফুঁড়ে উদয় হয়, আর তীব্র বিষে দুই চারিটি জীবন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এত দ্রুত সব ঘটনা ঘটে, কেউ জায়গা থেকে নড়াচড়া করার অবধি সময় পায় না। দুই একটা ঘটনা বললে তোমরা বুঝতে পারবে ব্যাপারখানা।
পাথরখানা দহে ফেলে আসার ঠিক পরদিবসের ঘটনা। গাঁয়ের টুলোপন্ডিত ভবতোষ চাটুয্যে আর দুইজন কৃষাণ, চামারিয়া এবং শিবু গিয়েচিলো জন সায়েবের কুঠিতে। শেষোক্ত দুইজন গিয়েচিলো সাপ্তাহিক ফরমাশ খাটতে, আর ভবতোষ গিয়েচে তার কন্যার জ্বরের জন্য সায়েবের থেকে ওষুধ আনতে। তারা সাঁঝ নামার আগেই গাঁয়ে ফেরার জন্য হনহন করে পথ চলচিলো। গাঁয়ে ঢোকার ঠিক মুখে হঠাৎ মনে হলো যেন মাটিটা দুলে উঠল। তিনজনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভবতোষ শুষ্ক মুখে বললে, “নারায়ণ, নারায়ণ! এ কোন বালাই বল দেখি চামারিয়া? কারুকে কইনি আমি, কিন্তু কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্চে যেন মাটিটা হঠাৎ হঠাৎ নড়ে উঠচে। আমি ভাবি মনের ভুল হবেও বা…”
চামারিয়া চিন্তিতভাবে বললে, “নাহ বামুনঠাকুর, ভুল নয়। আমরাও লক্ষ্য করেচি কয়-দিন যাবৎ ব্যাপারখানা। কি হচ্চে কিছুই তো ঠাহর পাচ্চিনে কেউ।”
শিবু বয়স্থ চাষী। সে আর এক মুহূর্তও বাক্যালাপে কালহরণ করতে চাইচিলো না। তাড়া দিয়ে বলল, “নাও নাও, এখন আর মেলা কথা কইতে হবে না। আঁধার নামলো বলে। চটপট পা চালাও।”
তিনজনে মিলে গাঁয়ে প্রবেশের জন্য যেই মাত্তর পা বাড়িয়েচে, তখনই মনে হল পিছন থেকে একটা হিসহিসে শব্দ এল। আওয়াজ শুনে পিছু ঘুরতেই আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে এল সকলের। এদের পিছনে বড়োজোর হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে রয়েচে একটা কদাকার জীব। তারা হলপ করে বলতে পারে, এই জন্তুটা এক মুহূর্ত আগেও তাদের চতুর্দ্দিকে কোথাও ছিল না। হঠাৎই যেন বাতাস থেকে হাজির হয়েচে। কী ভয়ঙ্কর তার চেহারা। একটিবার তাকালেই হৃদযন্ত্রের আস্ফালন স্তব্ধ হয়ে আসে। ফিকে কমলা রঙের চোখে লম্বা দাগের মতো একটা চক্ষুতারকা, হাত পা অত্যন্ত বলিষ্ঠ, প্রাণীটা সামান্য ঝুঁকে রয়েচে, আর তার ঠিক পিছনে মাটিতে বিছিয়ে রয়েচে একখানা সুদীর্ঘ আঁশযুক্ত লেজ। তিনজনে অসম্ভব আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও ঐ শয়তানের চোখ যেন তাদেরকে মন্ত্রাবিষ্ট করে ফেলে স্থানচ্যুত হতে দিচ্চে না। সবাইকে ভয়ানক অবাক করে জন্তুটা অমানুষিক জোরে একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার করে উঠে অনেকটা মানুষের মতো সুরে কথা বলে উঠল, “পাপীষ্ঠের দল। নিজেদের মরণের থেকে পালাচ্চিস কোথা?” এই বলা মাত্র এক ভীষণ জোরে নিঃশ্বাসের সঙ্গে তার নাসারন্ধ্র দিয়ে যেন আগুনের হলকা বিচ্ছুরিত হল, এবং সবল লেজের প্রবল আঘাত এসে পড়ল শিবুর স্কন্ধে।
তার ধাক্কায় শিবু ছিটকে পড়ল কাদামাটিতে এবং অতি কষ্টে খিল লেগে যাওয়া ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, ভবতোষ এবং চামারিয়ার স্থানে দুই মুঠা ছাই পড়ে রয়েচে। লহমার মধ্যে সেই আধা মানুষ এসে দাঁড়ালো শিবুর একেবারে মুখের কাছে। তার শ্বাস মুখে পড়ে শিবুর শ্বাসযন্ত্রে মরণ জ্বালা ধরচে, মাথায় গোল বেধে যাচ্চে, হঠাৎ শিবু আসন্ন সাক্ষাৎ মরণের থেকে প্রাণভিক্ষার জন্য দুর্বল দেহে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার হিমশীতল একখানা পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, “দোহাই ভগবানের, আমাকে মেরো না। আমরা কোথাও পালাইনি। গাঁ ছেড়ে কোথাও যাচ্চি নে। গরীব মানুষ, তাই দুটো পয়সার জন্যি গাঁয়ের মধ্যেই জন-মেজর সায়েবের কুঠিতে খাটতে গিয়েচিলাম। আমাকে প্রাণে মেরো না, দোহাই তোমার…।”
শিবুর কান্না জড়িত কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ তার চুলের মুঠি ধরে সেই মরণদূত ঘড়ঘড়ে স্বরে শুধোলো, “কোথায়। কার কাছে?”
জন্তুটার চোখটা আগের থেকেও ঝিকিয়ে উঠেচে। শিবু কিঞ্চিৎ সাহস সঞ্চয় করে কম্পিত কন্ঠে উত্তর দিলো, “জন-মেজর সায়েবের কুঠিতে। গোরা সায়েব। এই গাঁয়েরই উত্তুরে তার…।”
শিবুর কথা অর্ধসমাপ্ত থাকা অবস্থাতেই সেই কদাকার শয়তান টা মুখে একটা বিশ্রী গৰ্জ্জন করে যেন চোখের পলকের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে গেল। অবশ্যম্ভাবী অপঘাতের থেকে রক্ষে পেয়ে শিবু আচ্ছন্নের মতো কিছুক্ষণ পড়ে রইলো, তারপর সম্বিৎ ফেরায় কাঁপতে কাঁপতে গাঁয়ের পানে দৌড় লাগালো, এবং গৃহের দোরের সামনে এসে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল।
*****
রাতে ভীষণ জ্বর এল শিবুর।
সকালে তার মুখ থেকে সব কথা শুনে লোকজনের মুখ শুকিয়ে গেল। এমন বিষধর একটা নরপশু, যার বিষদন্তের স্পর্শ মাত্র একটা বলিষ্ঠ নরদেহ জ্বলে ছাই হয়ে যায়, তার মোকাবেলা করা যে অসাধ্য। বিশেষতঃ সেটা কোথা থেকে কখন উদয় হয় তার কোনও স্থিরতা নাই। শিবুকে সে স্পর্শ করেছিল মাত্ৰ। তাতেই শিবুর শরীরে অস্বাভাবিক বিষক্রিয়া দেখা দিয়েচে। তার গায়ের চামড়া কালচে বর্ণ ধরেচে, চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেচে, শ্বাস দ্রুত চলচে, আর নাড়ী মন্দ মন্দ চলচে।
গতকাল সন্ধ্যা রাত্তিরে কুঠিতে জন-মেজর সাহেব বসে হিসেব লিখচিলো, আর বাবুর্চিরা খানা পাক করচিলো। সাহেবের খানসামা দুর্গাচরণ সন্ধ্যার খানা নিয়ে সাহেবের কক্ষে সবে প্রবেশ করতে যাচ্চে, এমন সময় একটা কানফাটানো তীব্র গর্জ্জনে তার হাতের রেকাবী ঝনঝন করে মাটিতে পড়ে গেল। শব্দটা এসেচে সাহেবের ঘরের ভিতর থেকেই, যেন কোনও হিংস্র পশু ঢুকে পড়েচে ঘরের মধ্যে। চীৎকার শুনে চাপরাশী মাইকেল আর দুইজন বাবুর্চিও ছুটে এসেচে। হুড়োহুড়ি করে দোর ঠেলে ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল জন সাহেব লেখার চারপাইয়ের উপরে ঢলে পড়ে রয়েচে। তার চোখ, মুখ, শরীর একেবারে কালিমালিপ্ত হয়ে পড়েচে এবং শরীর থেকে কিসের যেন বাষ্প নির্গত হচ্চে। মৃতদেহের সামনে রাখা লণ্ঠনের আবছায়া আলোতে হঠাৎ মনে হল ঘরের একদম কোণের অন্ধকারে একটা ভয়াল জীব দাঁড়িয়ে রয়েচে। তার লালচে চোখদুটি আঁধারে জ্বলচে। একজন বাবুর্চি তার হাতের বড়ো খুন্তীটা ছুঁড়ে মারলো সেই চোখ লক্ষ্য করে শরীরটা মনে মনে আন্দাজ করে। এক পলকেরও কম সময়ে মনে হলো এদের অতিক্রম করে ঝড়ের বেগে কিছু একটা বেরিয়ে চলে গেল। আড়ষ্ট ভাবটা কাটিয়ে মাইকেল লন্ঠনের সলতেটা উচ্চকিত করতেই দেখা গেল বাবুর্চি পীরবক্সের দেহটা পড়ে রয়েচে চৌকাঠের উপরে। এই নক্ষত্রবেগে যাবার সময়ও আততায়ী অসম্ভব দ্রুততায় একজনকে দংশন করে গিয়েচে, এবং তার চাইতেও চমকপ্রদ কথা হলো, দংশন মাত্রই হতভাগ্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। একটা শব্দ অবধি নির্গত হয়নি তার ঠোঁট থেকে।
ঘটনা কেবল এইখানেই থেমে থাকেনি। এই হত্যাগুলো আর যা হোক, হয়েচে গুটিকয়েক মানুষের সামনে, কিন্তু পরেরদিন রামা দলুইয়ের বাড়িতে যা ঘটল, তা বহু মানুষের চোখের সামনে। ভরা দিনের বেলায়। রামার খুড়া মারা গিয়েচে মাত্র কিছুদিন আগেই। আজ তার শ্রাদ্ধ বাসর। দ্বিপ্রহরে বাড়ির সামনে যজ্ঞের মন্ডপ তৈয়ারি করে তত্মধ্যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান চলচে। বেশ কিছু লোকজন, আত্মীয় বন্ধু ঘোরাফেরা করচে চাতালের সামনে। দিনের বেলা হলে হয় কি, ভরা শ্রাবণেবলা মেঘে আবৃত হয়ে রয়েচে। রামা ব্রাহ্মণের সামনে বসে মন্তর পড়চে, আচমকা বাইরে একটা ভীষণ ভয়ের কোলাহল শোনা গেল। লোকজন হুড়মুড় করে প্রাণের ভয়ে ঢুকে পড়চে শ্রাদ্ধের মন্ডপের ভিতরে। রামা কোষাকুষি ফেলে দিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো বাইরের প্রবেশ পথের দিকে। সকলেই আতঙ্ক মাখা দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ একটা কাপড় ছিঁড়ে যাওয়ার মতো শব্দ পেয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখলো, একটা লম্বা নখরযুক্ত সর্পিলাকার হাত সবলে মন্ডপের কাপড় ছিঁড়ে ফেলছে। রামা সভয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে দৌড় দেবার সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্র দিয়ে এক লাফে ভিতরে এসে পড়ল একটা অদ্ভুত জীব।
কি আশ্চর্য! তার দেহটা দেখতে ঠিক যেন একটা গৈরিক বসনাবৃত ব্রাহ্মণের মতো, মুখটাও মানুষের ধাঁচেই গড়া, কিন্তু তার চোখদুটি একবার দেখলেই যে কারও অন্তরাত্মা জানিয়ে দেয় যে এ কোনও মানুষ কখনওই নয়। মুখের থেকে শদন্তের মতো চারখানা দাঁত বেরিয়ে পড়েছে, চোখের মধ্যে যেন আগুন জ্বলচে। মুখটা সবজে আঁশে ঢাকা। বজ্রের ঝলকের ন্যায় বেগে সে ছুটে গিয়ে পড়ল পলায়মান রামার ঘাড়ে। রামা ধপ করে মাটিতে আছড়ে পড়ল। আর উঠল না। এর পর সেই বেপরোয়া দানব ঘূর্ণবাতের ন্যায় তুফানের গতিতে একেকজনের উপরে গিয়ে পড়ে, দংশন করে, এবং সে তৎক্ষণাৎ লুটিয়ে পড়ে। ভর দুপুরে সকলের নজরের সুমুখে এই ভীষণ নরমেধ সম্পন্ন করে সেই নরকের জীব যেন মাটিতে লুকিয়ে পড়ল। অবশিষ্ট লোকেরা জড়তা কাটিয়ে হায় হায় করতে করতে ছুটে এল। গণনা করে পাওয়া গেল মোট আটখানা মৃতদেহ। তার মধ্যে কয়েকটি একেবারেই ভস্ম হয়ে গিয়েচে, আর বাকীগুলোও স্থানচ্যুত করার অবস্থায় নাই। ভয়ানক তীব্র জারক রস যেমনভাবে কঠিন খাদ্যকে পরিপাক করে, তেমনি এই অপার্থিব অপ্রতিরোধ্য গরল তার শিকারদের ছাই করে ফেলেচে।
সুন্দরবনের যে কোনও গাঁয়ের পরিশ্রমী মানুষেরা হিংস্র জীবজন্তুদের বিন্দুমাত্র ডরায় না, বরং তাদের নিয়েই এদের রোজকার ঘর সংসার। কিন্তু এই শয়তান? এ তো কোনও জন্তু বা সাধারণ প্রাণী নয়! প্রাণীই বটে তো? এই মহা বনের প্রতিটি পোকামাকড়, জীবজন্তুর বিষের ব্যাপারে যথেষ্ট জানা চেনা রয়েচে এখানকার লোকেদের, কিন্তু এমন কোনও সৃষ্টি ছাড়া জীবের কথা আজ অবধি শোনা যায়নি যার দাঁত শরীরে বসার সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেহ জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে পড়ে। এমনকি তার শ্বাসের কণিকাতেও সমান তেজে বিষবাষ্পের উপস্থিতি রয়েচে। ও হ্যাঁ, এর দিন দুয়েকের মধ্যেই শিবু মারা গিয়েচিলো। তার শরীর জুড়ে ক্ষত, ফোসকা এবং বিষের ঘা ফুটে বেরিয়েচিলো।
তবে এত নির্বিচার হত্যালীলার মধ্যেও একটা ঘটনা লোকেদের শঙ্কিত চিত্তে সামান্য আশা ফুটিয়েচিলো, কিন্তু তা ভেঙে পড়তেও সময় লাগেনি। সেইদিন সারা দুপুর গোরুর আহারের জন্য বিচুলি কেটে, বস্তাবন্দি করে গোহালা জনার্দন আর তার বারো বৎসরের ছেলে চূণী যখন বাড়ি ফিরচিলো, তখনও সূর্য্যের আলো পড়ে যায়নি পুরোপুরি। গাঁয়ের পথ দিয়ে চলার সময় থেকেই কিন্তু তাদের মনে হল পাশে পাশে, গাছে গাছে কারা যেন হুটোপুটি করে এগিয়ে চলেচে। জনার্দন ছেলের হাত ধরে বললে, শোন চূণী, ভগবান না করুন, যদি কোনও অঘটন ঘটে পথে, তবে আমি রুখে দাঁড়াবো। তুই যেদিকে পারিস দৌড়ে পালাবি। কেমন তো?”
চূণী মাথা নেড়ে বলল, “হুঁ। বুঝেচি।”
চলতে চলতে চূণী হঠাৎ ফিসফিস করে উঠল, “বাবা… গাছের উপর একটা সাপ!”
“কৈ রে! কোথা?”
“হোই দেখো, বটগাছের ঐ ডালে।”
জনার্দন ঘাড় তুলে দেখলে সত্যিই তো! বটগাছের ডালে একখানা সাপ ঝুলচে। সেও ফিসফিস করে ছেলেকে কইলো, “চুপ। রা কাড়িস নে। চুপ করে চলে যাবো।”
“কিন্তু বাবা, তুমি ওদিকে তাকাচ্চো কেন, সাপ তো এই বটগাছে।” জনার্দন ঘাড় ফিরিয়ে চমকে উঠল। বাঁ পাশের বটগাছেও একটা সাপ ঝুলে রয়েছে।
চূণী শক্ত করে বাপের হাত আঁকড়ে ধরলো। জনার্দন প্রবোধ দিয়ে বললে, “ছিঃ চূণী। পুরুষমানুষের দুখানা সাপ দেখেই ভয় পেয়ে গেলে চলে বাপ আমার? চল আমরা আল পথ ধরে যাই।”
চূণীলাল কিন্তু পূর্বের মতোই বাপের হাত আঁকড়ে ধরে কইলো,
“বাবা, আমার খুব ভয় কচ্চে। দু-খানা কেন দশখানা সাপেও আমি ভয় করিনে, কিন্তু উপরে তাকিয়ে দেখো বাবা…”
জনার্দন ভীষণ চমকে উপরের দিকে তাকাতেই তার শরীরের রক্ত যেন জল হয়ে এল। উপরের গাছে গাছে, ডালে ডালে, কানাচে কানাচে ঝুলে রয়েচে অগুণতি সাপের দল। কেউ দুলচে, কেউ গজরাচ্চে, কেউ ছোবল তুলচে। প্রচণ্ড ভীতি এসে শরীরকে অবশ করে ফেলার আগেই ছেলের হাত মুঠোয় আঁকড়ে পালাতে যাওয়া মাত্র জনার্দন সভয়ে আবিষ্কার করল, এক্ষুণি যে পথে তারা দুইজন ব্যাতীত জনপ্রাণী অবধি ছিল না, সেখানে তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েচে এক ভয়ঙ্কর দর্শন জীব। শ্বাপদ জন্তুর মতোই ঝুঁকে ঝুঁকে পা ফেলে জনার্দনের কয়েক হাতের মধ্যে এগিয়ে এল জানোয়ারটা। তার গলায় ঘড়ঘড় করে শব্দ হচ্চে। অনেকটা অমানুষিক, জান্তব ধ্বনি বেরিয়ে এল তার গলা থেকে, “কোথায় পালাচ্চিলি?”
জনার্দনের কণ্ঠ সম্পূর্ণরূপে শুষ্ক হয়ে পড়েছে। তা থেকে কোনও শব্দ বেরুলো না। অতি কষ্টে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তাকে পালিয়ে যেতে বলল। চূণীও ঠকঠক করে কাঁপচে, কিন্তু সে বাপকে ছেড়ে নড়লো না। শয়তান টা আরও এক পা এগিয়ে জনার্দনের গলায় হাতটা ছোঁয়াতে যাবে, এমন সময়ে চূণী কেঁদে উঠে বলল, “আমার বাবাকে ছেড়ে দাও। আমরা কোথাও পালাচ্চিলাম না। শুধু গোরুর খাবার জন্য বিচুলির আঁটি আনতে….”
এই অবধি উচ্চারণ মাত্র হঠাৎ জন্তুটা সভয়ে যেন কিছুটা ছিটকে গেল, আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা ভীষণ গর্জ্জনে চারদিক কাঁপিয়ে চোখের পলকে হারিয়ে গেল। জনার্দন তাকিয়ে দেখল গাছের ঐ সাপের দলও অন্তর্ধান করেচে। তৎক্ষণাৎ ইষ্ট স্মরণ করে দুইজনে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দিলো গোহালা পাড়ার পানে।
এই আশ্চর্যজনক ঘটনা শোনার পর সকলেই বুঝল এই বিচুলির আঁটিতে নরপশুটা কোনও কারণে ভয় পায়। নির্ঘাত বিচুলির মধ্যে কিছু একটা দ্রব্যগুণ রয়েচে, যা এই শয়তানের পক্ষে অসহনীয়। সেদিনের মধ্যে বাড়িতে বাড়িতে, দুয়ারে দুয়ারে বিচুলির আঁটি বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু পরের দিন সকালেই তাদের সেই ভ্রম কেটে গেল, কারণ সেই রাতে তিন চারটি গৃহে শয়তানের হানা পড়েচিলো। বিচুলির আঁটি টপকে, ভিতরে ঢুকে দংশন করে গিয়েচে সেই অমোঘ বিষধর। কোনও অজ্ঞাত কারণে সেইদিন গোহালা বাপ ব্যাটা রক্ষে পেলেও এই খড়ের বিচুলি কোনও ভাবেই রাক্ষসটার দুর্বলতা নয়, তা কিন্তু দিনের আলোর মতোই সুস্পষ্ট। আঁধার থেকে রক্ষা পাবার যে মৃৎপ্রদীপের ক্ষীণ আলোকটুকু দেখা দিয়েচিলো, তাও প্রবল চৈত্রবাত্যার ফুৎকারে নির্বাপিত হয়ে গেল।
গাঁয়ের লোক ভীষণ আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়ল। মধ্যে মধ্যেই সেই নর দানব অতর্কিতে হানা দিতে লাগল এখানে ওখানে আর বেপরোয়া ভাবে মানুষ মারতে শুরু করল। একা রামে রক্ষা নাই, সেই সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে গিয়েচে বিষাক্ত সাপের সংখ্যা। যত্রতত্র সাপের ছোবলে জীবন হারাতে শুরু করল মানুষ, গোরু বাছুর, ছাগল বা অন্যান্য পোষা জীব। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েচে যে কুমীরমারির প্রজা দূর হতে একখানা দড়ি পড়ে থাকতে দেখলেও দৌড়ে গিয়ে ঘরের দোর দিতো। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার চারদিকে চোখে পড়তে লাগল। রাতভিতে হঠাৎ হঠাৎ গোটা গ্রামের কেঁপে ওঠা তো নিত্যদিনের বালাই ছিলই, কিন্তু এইবার আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়ল। গাঁয়ের বিশাল বিশাল অসংখ্য গাছকে কেউ যেন প্রবল হিংসেয় ধারালো নখ দিয়ে আঁচড় দিয়েচে। নরঘাতক সেই অপদেবতার দাঁতের ন্যায় নখেও বিলক্ষণ বিষের উপস্থিতি রয়েচে। গাছগুলিও নিহত মানুষগুলোর মতোই বিষের জ্বালায় পুড়ে শেকড় হতে মগডাল অবধি ছাই হয়ে পড়েছে। সান্ত্বনার মধ্যে এই যে, আক্রান্ত শিকার কোনও মরণ যন্ত্রণা উপলব্ধি করার সুযোগ পায় না।
শুধু তাই নয়, এই দিন দুয়েক পূর্বেই নারায়ণ ভরদ্বাজের পুত্রের বিবাহের মন্ডপ তৈয়ারি হচ্চে, গোটা দশ বারো মজুর বাঁশ খাটাচ্চে, নারায়ণ, নিতাই আর রমেশ দাঁড়িয়ে কাজ দেখচে। আমন্ত্রিতদের প্রত্যেককে পত্র দ্বারা বিনীত ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে গাঁয়ে আসতে মানা করে দেওয়া হয়েচে। রমেশবাবু কোনও কথা না লুকিয়ে সব সত্য কথা জানিয়েই পত্র লিখেচে। তোমরা তো পল্লীসমাজের নিয়ম কানুন তত জান না। বিবাহার্থে আমন্ত্রণ জানাবার পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া মানেই হল তাকে নিকৃষ্টতম অবমাননা করা। এক্ষেত্রে যতো বড়ো পরিবারই হোক না কেন, এমন অপকৃষ্টি ঘটাবার পর তাকে একঘরে করা হতো। ফলে যা হয়েচে, যা ঘটেচে, সব সত্যটা জানিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। পরবর্তীতে গাঁয়ের লোককে কেউ সাক্ষী মানলে সেই সত্যি ভরদ্বাজ পরিবারের পক্ষেই আসবে। বিবাহ নিরানন্দের সঙ্গে মানে মানে মিটে গেলেই বাঁচোয়া। পরিবারের লোকজন, ভৃত্যরা এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে কয়েকজন মাত্তর মুরুব্বির উপস্থিতিতে নিয়মরক্ষার পরিণয় সম্পন্ন হবে। পুরোহিত হিসেবে খবর দেওয়া হয়েচে বেতাই গ্রামের কালীমন্দিরের পূজারী ভুজঙ্গভূষণ-কে। কথিত আছে এই ভুজঙ্গভূষণ নিজে একজন নামকরা তন্ত্র সাধক। বয়সে বৎসর চল্লিশের অধিক না হলেও তার বিদ্যার খ্যাতি লোকের মুখে ছড়িয়েচে। এমনিতেই ঊনত্রিশে শ্রাবণে বিয়ের লগণ পড়েচে বিকেলের শেষ মুখে। বলা যায় না, যদি বিবাহের দিনেও তেমন তেমন কিছু হয়, তবে ভুজঙ্গ তান্ত্রিক কিছুটা প্রতিকার করলেও করতে পারে।
তো যে কথা বলতে বলতে থেমে গেলাম…
ঐদিন বিয়ের মন্ডপ গড়ার সময় কয়েকজন লোককে নিয়ে রমেশ আর দুই ছেলে কাজকর্ম তদারকি করচে, হঠাৎ আবার থরথর করে চারদিক কেঁপে উঠল। গাঁয়ের লোকেরা এই ঘটনায় কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েচে বটে, কিন্তু ভিন গাঁয়ের মজুররা চঞ্চল হয়ে উঠল। রমেশবাবু একটু গলাটা ঝেড়ে ধীরে ধীরে বলল, “ভয় পেয়ো না বাছারা, ও তেমন কিছুই নয়। এখন তো ভরা বাদুলে মাস, কেতকীর পাড় ভেঙে অমন একটু আধটু…”
রমেশ ভরদ্বাজ কথা কইতে কইতে মুখ তুলতেই মজুরদের মুখের দিকে চোখ পড়ায় তার কথা মাঝপথেই অবরুদ্ধ হয়ে গেল। মজুরগুলো নিতাইদের মাথার উপর দিয়ে তাদের পিছনের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে হাঁ করে চেয়ে রয়েছে। নিতাইরা বিস্মিত হয়ে পিছনে ঘুরতেই এক অস্বাভাবিক দৃশ্যের মুখোমুখি হলো। বহু দূরে কেতকীর গায়ে ঘোড়াডোবার ঘন জঙ্গলের উপর একখানা দানবাকৃতির লিকলিকে কি যেন একবার দেখা দিয়েই সাঁৎ করে মিলিয়ে গেল। নারায়ণ হতবাক হয়ে আপন মনে বলে উঠল, “হা ঈশ্বর! ওটা কোন জন্তু?”
রমেশ বিরস কন্ঠে চাপা গলায় উত্তর দিলে, “জন্তু নয় নারাণ, ওটা প্রাণীটার লেজ মাত্র। শুধু লেজটাই যখন তার আকাশ ছুঁয়েচে, তখন তার পূর্ণ স্বরূপ আন্দাজ করতে পারচো? সেটা নিজের বিশাল রূপকে ধামাচাপা দিয়ে ছদ্মরূপ পরিগ্রহ করে আক্রমণ করে। সাক্ষাৎ এই কালরাক্ষসের কবল থেকে একমাত্র পারলে ঈশ্বরই পারেন রক্ষা করতে।”
*****
দুপুরে আহারের পূর্বে রমেশ একরাশ প্রাচীন ঝুরঝুরে পুঁথি খুলে বসেচিলো। তার পাশে একখানা কাগজ আর কাঠ পেনসিল। পাতার পর পাতা উলটে বৃদ্ধ কি যেন খুঁজে চলেচে, এমন সময় শঙ্কর এসে দুয়ারে দাঁড়ালো।
“দাদু, ঠাকুমা খেতে ডাকছে।”
“এই যে, যাই দাদুভাই।”
“দাদু, তুমি কি কিছু খুঁজচো এই বইগুলোতে? নাকি পড়চো?”
“খুঁজচি বৈকি। এক রাক্ষসের নাম, গোত্রের হদিস খুঁজচিলাম। পেয়েচি কিনা তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারচি না!”
“আচ্ছা দাদু, তুমি খেতে যাও। আমার পেনসিলটা কি আমি নিয়ে নেবো?”
“হ্যাঁ, নিয়ে নাও দাদুভাই।”
বৃদ্ধ আহারের স্থানে চলে গেল পর শঙ্কর তার পেনসিলটা তুলে নিলো এবং তখনই চোখে পড়ল রমেশ ভরদ্বাজ কাগজের উপর কিছু একটা আঁকিবুকি কেটেচেন। কাগজখানা তুলে ধরে শঙ্কর দেখলো কাগজের উপরে একটা ছবির মতো আঁকা রয়েচে। একটা বিরাট বড়ো গোরুর গাড়ির মতো চাকা। সেই চাকাতে পেঁচিয়ে রয়েচে একটা সাপ।
*****
দেখতে দেখতে শুভ এবং উদ্বেগের দিনটাও শিয়রে এসে পড়ল। আজ ঊনত্রিশে শ্রাবণ। ভরদ্বাজ পরিবারের বড়ো নাতি রুদ্রের বিবাহ। সূৰ্য্য যখন ঠিক মাথার উপরে উঠেচেন তখন তান্ত্রিক ভুজঙ্গভূষণ এসে উপস্থিত হল। সমস্ত উপচার ছাদনাতলে যোগাড় করে রাখা হয়েচে। গ্রামের কিছু বয়স্থ কর্তাস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ম রক্ষার জন্য হাজির হয়েচেন। বিকেলে লগ্ন আসন্ন হলে পর কনেকে ছাদনাতলে বসানো হল। কনের মা অনুপস্থিত, ফলে তার বাপ দুরুদুরু বক্ষে চারদিকে একবার নজর করে বললে, “শুভ কাৰ্য্য নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক মা। তুমি রাজরাজেশ্বরী হও। তোমার বাপ দরিদ্র মানুষ। কখনও মন ভরে খেতে পরতেও দিতে পারিনি তোমায় মা। আজ যদি ভগবান থেকে থাকেন, তবে এই বাপের আশীর্বাদ তোমাদের মঙ্গল করবে। যাও মা।”
বিবাহের প্রক্রিয়া আরম্ভ হল। ভুজঙ্গ মণ্ডপের চতুর্দ্দিকে সর্পভয় নিবারণ গভী দিয়ে যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণ আরম্ভ করল। যজ্ঞের পবিত্র আগুন জ্বলে উঠল। ভুজঙ্গ যখন বেশ কিছুক্ষণ মন্তর পড়েছে, হঠাৎ ভীষণ ঝড় উঠল। শ্রাবণ মাসের নিত্যকার বাদলা ঝড় নয়, এ অন্য কিছু! ভলকে ভলকে উষ্ণ বাতাস এসে আছড়ে পড়চে মন্ডপের উপর। গাছপালা বেজায় ঝাপটা খাচ্চে, পুকুরের জলে ঢেউ উঠচে। বাসরে কুন্দ উপস্থিত ছিল, সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চক্ষে চারদিক দেখতে লাগল। নারায়ণ ভরদ্বাজ ভীত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এ কি ঠাকুরমশায়? এ কীসের ঝড় শুরু হলো? আপনি কিছু করুন ঠাকুর।”
ভুজঙ্গ ধীরে ধীরে বললে, “আমি যজ্ঞাগার ছেড়ে উঠতে অক্ষম বাবা, নচেৎ যজ্ঞ পণ্ড হয়। শয়তান টা অনেক ভেদ জানে, ফলে বেছে বেছে এই সময়টাই সে বেছে নিয়েচে।”
নিতাই ভীত, শুষ্ক সুরে শুধোলো, “এই সময়টা বেছে নিয়েচে মানে? তবে কি…!”
“হাঁ বাপু, যা ভাবচো তাই-ই। এই উষ্ণ বাতাস কিন্তু আদৌ কোনও বাতাস নয়, এ নির্ঘাত ঐ দানবের নিঃশ্বাস। দেখচো না পুকুরে জল দুলচে? সেই রাক্ষস বেরিয়ে পড়েছে। আমি আসার সময়ে এই মন্তরপড়া নেবু ক’খানা নিয়ে এসেচিলাম। প্রাণীদের দেহ থেকে যে অদৃশ্য তেজ বেরোয়, এই নেবু তাকে পড়তে পারে। এই দেখো, এর মধ্যে একখানা নেবু ঘোর রক্তবর্ণ হয়ে উঠেচে, তার অর্থ কোনও একটা এমন জীব আশপাশে গা ঢাকা দিয়ে আছে, যার মধ্যে অতীন্দ্রিয়, বিপুল শক্তি রয়েচে। যার মোকাবেলা করা প্রায় দুঃসাধ্য।” ভুজঙ্গের বাক্য সমাপ্ত না হতেই, তার অনুমানকে সত্য সাব্যস্ত করে আচমকা উদয় হলো এক শীর্ণকায় ব্রাহ্মণবেশী মূর্তি। তার চক্ষুতে মৃত্যুর হিম শীতলতা। চোখের পলকে সেটা বদলে গেল একটা বিকটদর্শন জন্তুতে। তার ভয়াল চিৎকারে সকলে কানে হাত চাপা দিয়ে ভূমিতে বসে পড়ল। কিছু মানুষ এদিকে ওদিকে ছুটে পালিয়ে গেল। মহা বিশৃঙ্খলা আর কলরব উপস্থিত হলো। মরণদূতটার হিংস্র নজর কিন্তু আজ পলায়মান জনতার দিকে নাই, সে তীক্ষ্ণ লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েচে নিতাইদের দিকে। সে চাহনি দেখলে শরীরের অস্থি অবধি বিকল হয়ে পড়ে। নিতাই, নারায়ণ, রমেশ আর শঙ্কর এক পা করে পিছিয়ে যেতে যেতে মরীয়া হয়ে ঢুকে পড়ল একেবারে ছাদনাতলার ভিতরে। ভুজঙ্গর দৃষ্টি কোনও দিকে নাই, সে একনিষ্ঠ হয়ে বিবাহের মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেচে। বর বধূ ঠকঠক করে কাঁপচে। ভরদ্বাজ পরিবারের সদস্যরা আর তাদের দেখাদেখি বাকী হাতেগোনা অভ্যাগতরাও গা ঘেঁষে জড়োসড়ো হয়ে ঢুকে পড়ল ছাদনায়। এই যজ্ঞভূমির চারদিকের চারখানা খুঁটি ব্যতীত অপর কোনও আত্মগোপনের স্থান একেবারেই নাই, তাই অগত্যা…।”
শয়তান’টা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসচে। তার ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ খুব আস্তে আস্তে খসে পড়চে। শরীরের পিছন থেকে একটা চাবুকের ন্যায় লাঙ্গুল বেরিয়ে এসেচে। তার সামনে আর কোনও অবরোধ নাই, অথচ শিকার রয়েচে অগণিত। অর্ধ বিভক্ত লকলকে জিহ্বা দ্বারা একবার অধরোষ্ঠ চেটে নিয়ে সেই নরপিশাচ পা রাখলো ছাদনাতলের ভূমিতে, আর কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য! যজ্ঞের ভূমির গন্ডীতে পা রাখা মাত্র ভয়ঙ্কর একটা আর্তনাদ করে উঠে প্ৰায় হাত বিশেক ছিটকে পড়ল সেই পিশাচ। ভিতরের আত্মরক্ষার্থে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোও বিস্মিত কম হয়নি। এ কি অদ্ভুত পরিত্রাণ!
শয়তানটা আবার উঠে দাঁড়িয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে এল শিকারের গলায় দাঁত বসানোর তীব্র বাসনায়। তার প্রতিহিংসার প্রবৃত্তি বাধা পেয়ে দুনো হয়ে উঠেচে। এইবার কিন্তু সেই ধুরন্ধর দানব আর মাটিতে পা রাখলো না। কিছুটা দূর থেকেই সেটা বিরাট ঝাঁপ দিলো নিতাইয়ের কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে, কিন্তু আজ দিনটা ওই রাক্ষসের নয়! শূন্যে উড়ন্ত অবস্থাতেই অদৃশ্য কিছুতে বাধা পেয়ে সে আবার ছিটকে পড়ল অনেক দূরে।
এইবার তার সেই পূর্বের বেপরোয়া ভাবটা যেন অনেকখানিই তিরোহিত হয়েচে। তার স্থানে বিস্ময় এবং ভয় ফুটে উঠেচে যেন। সে যে ঠিক কিসে বাধাটা পাচ্চে, সেইটা নিজেও যেন হৃদয়ঙ্গম করতে পারচে না। আরও কয়েকবার ব্যার্থ আক্রমণ করার পরেও বারংবার অকৃতকার্য হয়ে, একটা অসহায়, আক্রোশের কর্ণ বিদারী গৰ্জ্জনে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে, বাতাসের বেগে জঙ্গলের দিকে মিলিয়ে গেল। একটুক্ষণ পরেই সকলে দেখলো, ঐ শয়তান টা যেই পথ দিয়ে পালিয়েচে, সেইদিকের সবকয়টি গাছ যেন বিষের দহনে আপাদমস্তক পুড়ে গিয়েচে।
*****
এক অপার্থিব বিস্ময়ে লোকজন একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েচিলো, এখন সম্বিৎ লাভ করে রমেশ আকুল হয়ে ভুজঙ্গর দিকে চেয়ে কইলো,–“আপনার তো অসাধারণ ক্ষমতা ঠাকুর। এই শয়তানকে আপনি মন্তরের দ্বারা রুখে দিতে পেরেচেন। আমাদের শিয়রে সাক্ষাৎ শমন উপস্থিত হয়েচিলো, কিন্তু…”
হাত নেড়ে রমেশকে থামিয়ে ভুজঙ্গ চিন্তামগ্ন ভাবে বললে, “না কৰ্ত্তা, আমি কিছুই করিনি। হ্যাঁ, সর্পভয় নিবারণার্থে চারভিতে একটা গন্ডী দিয়েচিলাম, কিন্তু ঐ বেজন্মা জানোয়ার হেলায় সে গন্ডী অতিক্রম করে মন্ডপ অবধি চলে এসেচে। ও গণ্ডি তখনই কেটে গিয়েচে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সে ছাদনায় প্রবেশ করতে পারেনি। এতে আমার কোনও কৃতিত্ব নাই।”
নিতাই উত্তর দিলে, “কিন্তু ঠাকুর, সে শয়তান কি বিবাহের মধ্যে আবার ঘুরে আসতে পারে?”
ভুজঙ্গ কইলো, “সে যেমনটি প্রতিহত হয়েচে, তাতে তার এখনই এখনই ফিরে আসার শক্তি রয়েচে বলে বোধ হয় না, কিন্তু কৰ্ত্তা…
নারায়ণ অধীর হয়ে শুধালো, “কিন্তু কি ঠাকুর?”
ভুজঙ্গ জঙ্গলের দিকটা একবার নিরীক্ষা করে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রত্যুত্তরে বলল, “সে জন্তুটা আসবে না সত্য, কিন্তু তার সম্ভবত আরেকটি দোসর রয়েচে এ আমি বেশ বুঝতে পারচি।”
এই কথায় কেবল ভরদ্বাজ বাড়ির পুরুষেরাই নয়, সকলেই চমকে উঠল। নিতাই একবার নানান কথা চিন্তা করে মুখ খুলল, – “কিছুদিন পূর্বে আমরা একটা ডিমের মতো জিনিস পেয়েচিলাম। সেটা আমরা ওই দূরের হেঁতালের দহে ভাসিয়ে দিয়ে এসেচি। আপনি যে দোসরের কথা বললেন, তাতে আমার খুব সন্দেহ হচ্চে ঐ ডিমের থেকেই…”
ভুজঙ্গ কটমট করে চেয়ে রাগতঃ স্বরে বলল, “এই পবিত্র বাসরে ঐ অযাত্রা জিনিসটার নাম না করাই উচিত। তবে হতে পারে তোমার কথাই সত্য। যাই হোক, আমি জানিনে কীসের থেকে কী হয়েচে, কিন্তু এইটুকু বলতে পারি আক্রমণ আরেকটা নিশ্চয়ই হবে।”
রমেশ কিছুক্ষণ উদাসভাবে কি চিন্তা করে শূন্য স্বরে শুধালো,–“আমার দৌহিত্রর বিবাহ আমি এই আসরেই দেবো। নরপিশাচটা কখন আক্রমণ করতে পারে ঠাকুর?”
ভুজঙ্গ বিমর্ষ ভাবে জবাব দিলো, “বেশি অপেক্ষা হয়তো করতে হবে না আর। সে আসচে। জঙ্গলের বুক চিরে আসচে। এই দেখো, দ্বিতীয় নেবুটাও লাল হয়ে গিয়েচে, তার মানে যে আসচে তার মধ্যেও আগেরটার মতোই অতিমানবীয় শক্তি পূর্ণমাত্রায় রয়েচে। আমার ক্ষমতা সীমিতো, তবে আমি আরেকটি শক্তিশালী গণ্ডি কেটে দিচ্চি চারদিকে। যে ধরনের অপশক্তিই হোক, এই গণ্ডির ভিতরে প্রবেশ করলে সে সাময়িক ভাবে ঘায়েল হবেই। আমাকে একটা ছুঁচালো কিছু জিনিস…
“আচ্ছা, ঐখান থেকে একটা পাটকাটি তুলে এনে দাও বাছা, আর ঐযে, ঐ মাটির সরাটা।”
শঙ্কর দুখানি দ্রব্য এনে ভুজঙ্গের হাতে দিলো। ভুজঙ্গ যখন মন্ত্র পড়া আরম্ভ করতে যাবে, তখন রমেশ কথা বলল, “তুমি গণ্ডি দিয়ে রাখচো রাখো ঠাকুর, কিন্তু আমার মন বড়ো তিক্ত হয়ে উঠেচে। যদি এই বাঁধনে শয়তান’টা না আটকায়, তবে যে কয়জন রয়েচো কাউকে সে রেহাই দেবে না। আমি জঙ্গলের মুখে পথ আটকে রাখবো একলা। বৃদ্ধ দেহে আমি তাকে পথভ্রষ্ট করবো। সময় নষ্ট করো না ঠাকুর। বিধি শুরু করো।”
রমেশের দুই পুত্র কেঁদে উঠে তাকে নিরস্ত করার বহু চেষ্টা করল, কিন্তু বৃদ্ধকে আটকানো গেল না। তবে রমেশ একলা নয়, অসমসাহসী কুন্দ মেয়ে মানুষ হয়েও তার সঙ্গে থাকল। কুন্দ সাপুড়ের মেয়ে, সাপুড়ের বউ। তার চুলের কাঁটা সাপের বিষে ছোপানো থাকে। সেটাকে হাতে বাগিয়ে ধরে সে বললে, “চলুন বড়োকৰ্ত্তা।”
একখানা মশাল হাতে নিয়ে দুইজনে মরণকে তৃণজ্ঞান করে জঙ্গলের মুখে প্রবিষ্ট হয়ে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো।
*****
ভুজঙ্গ গণ্ডি কাটতে আরম্ভ করল। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার শব্দ ছাড়া চারদিকে একটা অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়েছে। পাটকাটির মাথা থেকে মাঝে মাঝে যেন বিদ্যুৎ ঝিকিয়ে উঠচে। বিবাহ প্রাঙ্গণে আট দশখানা মশাল জ্বলচে। ভুজঙ্গ গণ্ডির দাগ কাটতে কাটতে যখন প্রায় শুরুর জায়গাটিতে এসে পড়েছে, হঠাৎ মশালের আলোয় একটা বিশালাকার ছায়া এসে মাটিতে পড়ল। ঘাড় ফিরিয়ে তাকানো মাত্র প্রত্যেকের বুক ধড়াস করে লাফিয়ে উঠল। তাদের থেকে কিছুটা মাত্র দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সেই আধা মানুষ আধা জন্তুটা। সে আবার ফিরে এসেচে আগের চাইতে দশগুণ শক্তি নিয়ে। ভুজঙ্গ বাদে বাকীরা ছাদনাতলার দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করা মাত্র তাদের নজরে পড়ল, ছাদনা ঘিরে চতুর্দিকে কিলবিল করে চলেচে অজস্র বিষধর সাপের পাল। তারা ক্রোধে মাটিতে ছোবল মারচে। আত্মরক্ষার একমাত্র স্থানটুকুকেও রুদ্ধ করেচে তারা।
ভুজঙ্গ বহুবার প্রাণপণ চেষ্টা করল গণ্ডির বাকি থাকা আর সামান্য বেষ্টনিটুকু সম্পূর্ণ করতে, কিন্তু কোনও এক অদেখা মহাশক্তি তার হাতকে বিবশ করে ফেলেচে। হাতের থেকে পাটকাটিটা খসে পড়তেই ভুজঙ্গ সভয়ে দুই হাত পিছিয়ে দাঁড়াল। দানবটা কিন্তু ভুজঙ্গর দিকে চাইলো না, সে বিষাক্ত নয়নে চেয়ে রয়েচে নিতাইয়ের পানে। কি ভয়ঙ্কর সেই দৃষ্টি। চোখের রঙ সবজে কমলা, তার মাঝে কৃষ্ণবর্ণ একখানা দাগের মতো মণি, কষের কাছে দুইখানি সূঁচালো দাঁত। নিজেকে সামান্য ঝুঁকিয়ে নিয়ে প্রবল জিঘাংসায় প্রাণীটি লাফ দিলো নিতাইয়ের উপরে। একটা বিকট বাজ পড়ার মতো ভয়ানক শব্দ হলো, আর ভুজঙ্গ হতবাক হয়ে চেয়ে দেখলো সেই প্রবল পরাক্রমশালী পিশাচ যেন উড়ন্ত অবস্থাতেই অদৃশ্য হাতের সবল কিল খেয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল গণ্ডির থেকে দশ হাত দূরে, এবং মুহূর্তে একটা চাপা হিসহিস শব্দ করে মিলিয়ে গেল বাতাসের মতো, আর সেইসাথে ছাদনার ভূমি ঘিরে রাখা সাপের দল ও।
ভুজঙ্গ বিগতবুদ্ধি হয়ে পড়েচিলো। গণ্ডি কাটা তো এখনও সমাপ্ত হয়নি! তবে কেমন করে…!
পিছনে ঘুরে তাকাতেই চোখে পড়ল, যে স্বল্প স্থানটুকুতে মাত্র গণ্ডির বাঁধন দেওয়া বাকী ছিল, সেইখানে দাঁড়িয়ে রয়েচে রমেশ ভরদ্বাজ আর কুন্দ, আর তাদের ঠিক পাশে কুন্দর মাথার কাঁটাটা হাতে নিয়ে উবু হয়ে বসে রয়েচে এক দীর্ঘ দেহী ব্যাক্তি। ঐ কাঁটা দিয়েই অবশিষ্ট গণ্ডির বেষ্টনী সম্পন্ন করা হয়েচে। ভুজঙ্গ ভীষণ অবাক হয়ে বিস্ময়াকুলভাবে শুধালো,
“কী আশ্চর্য! কে আপনি?”
ভরাট পুরুষ কণ্ঠে উত্তর এল, “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।”
* * * * *
অন্যান্য সম্ভ্রান্ত আমন্ত্রিতদের মধ্যে রায়দীঘড়ার দুই জমিদার বিষ্ণুপদ এবং কালীপদও ছিল। রমেশের যাত্রা স্থগিত করার অমন পত্রখানা হাতে পাবার পর প্রত্যেকেই প্রবল আতঙ্কে আর এইদিগড়ে পা অবধি বাড়ায়নি, আর ওদিকে বিষ্ণুপদ ভ্রু কুঁচকে স্ত্রী সরযুকে বলেচিলো, “নাহ, এ দেখছি ভয়ানক কথা। কালীকে একবার বলে দেখি হতভাগা কি বলে। এমনটা তো চলতে দেওয়া যেতে পারে না।”
কালীপদ আর তিলমাত্র বিলম্ব করেনি, কিন্তু গাঁয়ের কাছাকাছি এসে পড়ল মহা আতান্তরে। কোনও ডিঙিই এইদিকে বিকেলের দিকে আসতে চায় না। এই গোলমালে পড়ে বাসরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। পূর্বেও কালীপদ ভরদ্বাজ গৃহে এসেচে, তাই পথ আন্দাজ করে এসেও পড়েছে, হঠাৎ জঙ্গলের মুখে রমেশ বাবুর সঙ্গে দেখা। কথাবার্তা বলার মুখেই হঠাৎ দুরে বিবাহ বাসরের দিক থেকে অনেকের ভয়ার্ত চীৎকার শুনে তারা পড়িমড়ি ছুটে এসে দেখে এই অবস্থা। কালীপদ মাটির সরা আর পাটকাটিটা পড়ে থাকতে দেখেই ব্যাপার বুঝতে পেরেচিলো। তড়িঘড়ি কাঁটাখানা দিয়ে বন্ধনের জোড় আবদ্ধ করতেই সেই শয়তান মন্ত্রের কষাঘাতে ছিটকে গিয়েচে। ভুজঙ্গ একরাশ সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধা নিয়ে অবাক হয়ে শুধালো,
“আপনিও তন্ত্রবিদ?”
“হাঁ, ওই একরকম।”
ভুজঙ্গ আরও বিস্মিত হয়ে বললে, “একরকম কি বলচেন! আমাকে দোলাচলে রাখবেন না। আপনি অপর একজন অচেনা তান্ত্রিকের অর্ধসমাপ্ত বাঁধনকে পূরণ করেচেন, এমনকি সেই তান্ত্রিক কোন বিধিতে, কোন যোগিনীর নামে বন্ধন করেচে, তা না জেনেই। আপনি কক্ষণও সাধারণ গুরুমুখী নন। আমি ভুজঙ্গভূষণ তান্ত্রিক। আমারে সত্য বলুন, আপনি কি কোনও মহাতেজাঃ অঘোরীর শিষ্য? আপনি কি আষাঢ়ে পুরুষ?”
কালীপদর চক্ষে গুরুর উল্লেখ মাত্র আবেগ ছড়িয়ে পড়ল। স্থির কন্ঠে সে বললে, “হ্যাঁ, আমার জন্ম সাতাশে আষাঢ়, ভরা পূর্ণিমাতে। আমার যিনি গুরু, তিনি শুধু অঘোরী নন ভুজঙ্গ। তিনি অঘোরীনাথ।”
ভুজঙ্গ ললাটে করতল স্পর্শ করে অবিচল স্বরে কইলো, “হওয়াই সম্ভব মুখুজ্জে মশায়। অঘোরী বিনে এমন বিদ্যে আয়ত্ত করা সম্ভব নয় বৈকি। আমি এই শয়তানের শক্তির কাছে পরাহত হয়েচি। আপনি হয়তো বা পারবেন।”
“আশাহত হবার কারণ নাই। তুমি পরাহত হওনি ভুজঙ্গ, কিন্তু প্রতিকারের মূলে হয়তো একটা ভুল করেচো।”
“ভুল করেচি? কোন ভুল?”
“এই ভুল আমার সাধনার সময়ে বহুবার ঘটেচে। সাধনায় যখন আমি সবে শিক্ষানবিশ, তখনও আমার গুরুদেব আমাকে পরীক্ষা করার নিমিত্ত বহুক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য পাঠিয়েচেন। অনেক কিছু শিখেচি। সেসব ঘটনা পরে বলবো খন, কিন্তু এই অগ্নিপরীক্ষায় আমি এটুকু শিখেচি যে, কোনও অন্ধকারের শক্তিকে পরাস্ত করতে হলে প্রথমেই যেটা কর্তব্য, তা হলো ঐ শয়তানের ঠিক ঠিক জাত পরিচিতিটা খুঁজে বের করা। এইটে ভীষণ জরুরী। তুমি তো জানবেই, এই আঁধারের অ-প্রাণীগুলো কিন্তু সকলে সমান হয় না। তাই… যাই হোক, এখন তুমি বিবাহ সম্পন্ন করো। অনেক বিলম্ব হয়ে গিয়েচে।”
“ঠিক বলেচেন ঠাকুর, আমি ভয় করচিলাম এই আপদের কারণে কন্যা লগ্নভ্রষ্টা না হয়।”
কালীপদ একটু হেসে বলল, “এইটেও একটা বিরাট ভ্রান্তি ভুজঙ্গ। বিরাট ভুল ধারণা। ভগবান প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা পল আমাদের জীবনে সযত্নে যুক্ত করেচেন। প্রতিটি মুহূর্তই ঈশ্বরের দান করা শুভ মুহূর্ত। তার ক্ষণ অক্ষণ বিচার করে কে? যা-ই হোক, তোমার আচার বিধি আরম্ভ করো। আমি প্রহরায় রইলাম।”
কালীপদ সতর্ক চক্ষু মেলে যখন জঙ্গলের দিকে চেয়ে রইলো তখন সকলের মধ্যেই কেন যেন একটা পরম ভরসা উপস্থিত হলো। তারা নিশ্চিন্ত চিত্তে বিবাহ দেখতে বসলো। কালীপদর চিত্ত কিন্তু উচাটন হয়ে ছিল। রমেশ ভরদ্বাজ বিপদের মুখে নিরস্ত করার জন্য বিস্তারে পত্র দিয়েচিলো, কিন্তু সে পত্র কালীপদর কাছে রসদের সামিল হয়েচে। পূর্বের বহু ঘটনাই জানা গিয়েচে সেখানা থেকে, কিন্তু এ কেমন শয়তানের দূত, যে কিনা শ্রাদ্ধের বাসরে বিনা বাধায় প্রবিষ্ট হয়ে নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়, অথচ বিবাহের ছাদনা তলে প্রবেশ করতে অক্ষম? ভগবান নারায়ণ হলেন যজ্ঞভাগের প্রথম অধিকারী, যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা পরমপুরুষ। তবে শ্রাদ্ধের মণ্ডপ আর বিবাহের মণ্ডপে কি এমন প্রভেদ রয়েচে যা ঐ পরাক্রান্ত দানবকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েচে? আশ্চর্য বটে।
* * * * *
সেই রাত্তিরে কোনও নূতন আক্রমণের সংবাদ পাওয়া গেল না। বিবাহ সমাধা হয়ে বর কনে গিয়েচে শিবমণি ঘোষালের গৃহে। আগামীকাল বৈকালে তারা এই বাড়িতে আসবে। কালীপদ আসাতে চেনা অচেনা লোকগুলোর অনেকখানি ভরসা জেগে উঠেচে। মানুষটার অসম্ভব আন্তরিক বাক্য এবং দৃঢ় পৌরুষ দেখে সত্যিই মনে একটা পরম নিশ্চিন্তির ভাব জন্ম নেয়, তাই অনেকেই সাহস করে এই রাতেও ঘর থেকে বেরিয়ে তার সঙ্গে দুটো কথা কইতে এসেচে। কালীও গল্প করার অছিলায় বহু জরুরি তথ্য আর খুঁটিনাটি জেনে নিচ্চে। জেরার মতো করে প্রশ্ন করলে অনেকেই ঘাবড়ে গিয়ে অনেক ছোটো ছোটো কথা বলতে ভুলে যায়, কিন্তু আন্তরিক গল্পগুজবের মধ্যে দিয়েই আসল কাজের কথাগুলো ধরা দেয়।
তথ্য যা জানার তা মোটামুটি সংগ্রহ হয়ে গিয়েচে, কিন্তু আসল সমস্যা হলো সেগুলিকে জোড়া দেওয়া। এইখানেই কালীগুণীন ধন্ধে পড়েছে। একটা ডিমের মতো বৃহদাকার পাথরখণ্ড, যা কিনা প্রত্যহ একটু একটু করে বেড়ে চলেচে, সেইটে আসলে কী?
সাপের ডিম? ঐ পিশাচটা কি ডিমটা ফোটার অপেক্ষা করচে? কোন মহা দানব লুকিয়ে রয়েচে ঐ রাক্ষুসে প্রাণবীজের ভিতরে। সে যখন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করবে তখন কোন বিপর্যয় নেমে আসবে?
বিবাহের মন্ডপে ভুজঙ্গ তান্ত্রিক কোনও বন্ধন করেনি, তবে কার আঘাতে প্রতিহত হয়েচে ঐ দানব? এবং কেন?
যেই রাতে ছোটো তরফের পুত্র শঙ্করকে সাপে কেটেচিলো, সে রাতে কুন্দ আর নন্দ ঐ ভয়ঙ্কর ছায়ামূর্তিটাকে প্রবল আক্রোশে বিলাপ করতে দেখেচিল। কার জন্য এই বিলাপ? রমেশবাবু যে সাপটাকে হত্যা করেচিল, সেটার জন্য কি?
সবার অলক্ষ্যে শয়তান’টা না হয় সাপটার মৃতদেহ সরিয়ে নিয়েচে, কিন্তু আরেকটা কথা কিন্তু সকলেই এড়িয়ে গিয়েচে। যে উপহার পাওয়া আঁকাবাঁকা পাথরের দণ্ড দিয়ে রমেশ ভরদ্বাজ সাপটাকে মেরেচিলো, সেইটে গেল কোথায়? ঐ জন্তুটাই নিয়ে গিয়েচে কি? কেন? সাপের রক্ত লেগে রয়েচিলো বলে ক্ষোভে সেটাকে নিয়ে গিয়েচিলো? তাহলে সাহেব কুঠির পিছনে সাপ মারা লাঠিগুলোকে নিলো না কেন?
জন সাহেবের নাম শোনা মাত্র নিজের হাতের মুঠোয় ধরা শিকারকে ছেড়ে দিয়ে শয়তান টা কুঠির দিকে দৌড়ালো কেন? সাহেবের সাথে তার কীসের আক্রোশ? সে সাপ মেরেচিলো বলে? তাহলে বাকী নিরীহ লোকেরা তার শিকার হলো কেন? আর জনার্দন গোয়ালা আর তার পুত্রের মুখে বিচুলির কথা শুনে ঐ অপরাজেয় পিশাচটা পালিয়েই বা গেল কেন? জন্তুটা আসলে কী? কোনও পিশাচ? প্রেত? না অন্য কিছু? নিতাই ভরদ্বাজ উপহারগুলো নিয়ে এসেচিলো উত্তুরের রাওলপিণ্ডি শহরের থেকে। ঐ শহরখানা আর্যাবর্তের প্রাচীনতম জনপদ গুলির মধ্যে একটি। ঐ এলাকায় কি যেন একটা ঘটেচিলো? কিছুতেই স্মরণে আসচে না।
কালীপদর নিবিষ্ট মনের চিন্তা জাল হঠাৎ ছিন্ন হয়ে গেল প্রবল একটা আলোড়নে। ভীষণভাবে মাটিটা যেন দুলে উঠল একবার। কালীপদ বিস্মিত হয়ে এক দৌড়ে বাইরে এসে দেখলো দূরের গাছগুলিও তখনও নড়চে। তার মানে এই কম্পনের পরিধি বেশ অনেকখানি স্থানে। কালীপদকে বাইরে আসতে দেখে নিতাই আর নারায়ণ বাইরে বেরিয়ে এল। নিতাই বিরস কন্ঠে বললে, “এ ঘটনা নুতন নয় ঠাকুর। এই আপদ গাঁয়ে আসার পর থেকে এ ব্যাপারখানা শুরু হয়েচে। এখন আর ততো চিন্তা করিনে।”
কালীগুণীন সরু চোখে তাকিয়ে জবাব দিল, “কিন্তু আমি করি। জন্তুটা হামলা করে, প্রাণহানি করে সব মানচি, কিন্তু তার মাটিতে আন্দোলন তোলার দরকার পড়চে কীসের জন্য? এ ব্যাপারটা হেলার কথা নয় কিন্তু। রাক্ষসটা আচমকা উদয় হয়, চোখের নিমিষে মিলিয়ে যায়, এই অবধি জেনেই তোমরা ক্ষান্ত, কিন্তু সে যায় কোথায় সেইটে ভাবার কখনও ইচ্ছা হয়েচে?”
দুই ভাই নতমস্তকে নীরব হয়ে রয়েচে দেখে কালী নরম হয়ে বলল,
“তোমাদের বা দোষ দিই কেন, এমন সৃষ্টিছাড়া আতঙ্কের মধ্যে থেকে সাধু সন্ন্যেসীর অবধি বুদ্ধি বিলোপ হয়, আর… সে কথা থাক, আমাকে কয়েকটি জিনিস জোগাড় করে দাও এখুনি। নেবুর গাছ রয়েচে তো বাড়িতে? দুইখানা নেবু ছিঁড়ে আনো, আলোটা নিয়ে যাও চট করে, আর নিতাই, তুমি আমাকে মাটির তলার যে কোনও একটা কন্দমূল এনে দাও। বামুন বাড়ির রসুইতে তো পেঁয়াজ, রসুন পাবে না হয়তো, রাঁধুনিকে বলে এক টুকরো আদা এনে দিলেই হবে।”
বাড়ির প্রাঙ্গণে বর্ষার জলে কিছুটা কাদামাটি জমে ছিল। কালীপদ সেই তুলতুলে কাদার উপরে স্থাপিত করল দুইখানা পাতিলেবু। কাদায় অর্ধপ্রোথিত করল আদার টুকরোটা, আর তারপর মহাশক্তি পাতালভৈরবীকে আহ্বান করে বিড়বিড় করে মন্তর পড়তে শুরু করল,
“ওঁ মহাকালং যৎ যেঃ দব্যং দক্ষিণে ধূমবর্ণম…. বিভ্রতায়ং দন্ডম খটাঙ্গৌ দংস্ট্রাভীমমূখম শিশুণামখখ ব্যাঘ্রচর্মাবৃতকটীঃ তূন্দীলং রক্তবাসম… ত্রিনেত্রমূর্ধাং কেশঞ্চ মুণ্ডমালা বিভূষিতাম… জটাভারেঃ অলস চন্দ্র খণ্ডমুগ্রং জলন্নিভং…”
মন্ত্র সমাপ্ত হবার পূর্বেই যেন আকাশ ফুঁসে উঠল, প্রবল দাপটে হাওয়া বইতে শুরু করল, মুহুর্মুহু ভীষণ শব্দে বজ্র ঝলক দিতে আরম্ভ করল। নিতাই আর নারায়ণ ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কালীপদ হাত জোড় করে শূণ্যের উদ্দেশ্যে বলল, “প্রসীদ মেঃ বরদা ভবঃ। মা, আপনি প্রসন্ন হোন। আপনার এই অধম সন্তান কোনও হানিকর বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনাকে আহ্বান করেনি, করেছে আপনারই অসংখ্য সন্তানকে কালশক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।
বাতাসের বেগ হঠাৎ স্তিমিত হয়ে এল, প্রকৃতি পুণরায়ঃ শান্ত রূপ ধারণ করল, আর মাটিতে রাখা নেবুর উপরে এসে বসলো একটা বড়ো কালো ভীমরুল। তাকে দর্শনমাত্র কালীপদ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। সেই ভীমরুল প্রথমে নেবুতে বসে তার রস পান করল এবং তার পরেই সেই কাদামাটির উপরে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেয়ে উড়ে পালিয়ে গেল। কালীপদ সাগ্রহে সেই আঁকিবুকির উপরে ঝুঁকে পড়ে, নিবিষ্ট ভাবে তা নিরীক্ষণ করে যখন মুখ ফেরালো, তখন তার মুখের প্রসন্নতা বিষাদের মেঘে ঢাকা পড়েছে।
“কী ব্যাপার মুখুজ্জেমশায়! কিছু বুঝলেন?”
কালীগুণীন কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে অবশেষে মুখ খুললো,
“পরিস্থিতি যতখানি ভয়ানক ভেবেচিলাম, আসলে তার চাইতেও অনেকখানি ভয়ংকর। তোমাদের দুই তিনখানা গাঁয়ের নীচের মাটিতে কোনও একটা বিরাট জানোয়ার নড়াচড়া করচে। ঐটেই তার আসল রূপ। সে আধা মানুষের রূপে তোমাদের আক্রমণ করে আবার আস্তানা নেয় মাটির তলে। সে যখন নড়েচড়ে, তখন গোটা গাঁ দুলে ওঠে। কিন্তু সেই নরহত্যাকারী লোলুপ পাষণ্ডটারও কিছু একটা ভয় নিশ্চয়ই রয়েচে, না-হলে সে হানা দেবার সময়টুকু ব্যাতীত নিজেকে কারুর থেকে লুকিয়ে রাখে কেন? সমস্ত ঘটনা শুনে, বুঝে আমার কীসের যেন একটা কথা মনে পড়তে চাইচে, কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারচি নে বাবাসকল। তবে যতোক্ষণ না তার সঠিক পরিচয় আমি ধরতে পারচি, তাকে চিরতরে শায়েস্তা করা আমার অসাধ্য। দেখাই যাক ভবাণীর মনে কি রয়েচে।” বলে কালীপদ একটা বিষাদের নিঃশ্বাস ফেললো। রহস্য কিছু মিমাংসা হল না।
রাত্তিরে তখন বাড়ির পুরুষেরা নৈশাহারে বসেচে। রমেশ বাবু এই কয়দিনের অসহ্য মানসিক উদ্বেগে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাই তাকে আর ছোটোবৌমার ভাই বীরভদ্রকে আহার করিয়ে বিশ্রাম করতে পাঠিয়ে দিয়েচে গৃহিণী। কালীপদ, নারায়ণ, নিতাই আর শঙ্কর মিলে খেতে বসেচে। যেহেতু প্রায় সকল নিমন্ত্রিতকেই আসতে নিষেধ করা হয়েচিলো, তাই আয়োজন ততো কিছু করা হয়ে ওঠেনি। কালীপদ আহারকালে সাধারণতঃ কথা কয় না, কিন্তু আজ বিবাহোপলক্ষ্যে আনীত মিষ্টান্ন ভোজন করতে করতে কালী শুধাল,
“আচ্ছা, তুমি ভিনদেশ হতে যে উপহারগুলো এনেচিলে সেগুলোর কিছু কিছু আমি ঘুরেফিরে দেখলাম। প্রায় সবই অতি প্রাচীন দ্রব্য। ঐ শহরে এসব পেয়েচো কোথায়?”
“রাওয়ালপিন্ডি শহরে মাটি খোঁড়া সাহেবদের তাঁবু থেকে অনেক জিনিস বিক্রিবাটা হয়। সেইখান থেকেই…”
“মাটি খোঁড়া সাহেব মানে?”
“মানে, ওই এলাকার স্থানে স্থানে মাটির ঢিবি রয়েচে। সেসব খুঁড়ে সাহেবরা পুরনো জিনিস তুলে আনে। যেগুলো দরকার রাখে, আর বাকীগুলো রসিদ দিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমি যেইখান থেকে ওগুলো কিনেচি তার রসিদে লেখা ছিল ট্যাঁকশাল ঢিবি।”
“ট্যাঁকশাল? ঐ প্রাচীন তল্লাটে মাটির তলে ট্যাঁকশাল? আমি যতোদূর জানি… আচ্ছা সাহেবরা কি বাঙলায় রসিদ লিখেচে?”
“না না, বাঙলায় কেন হবে। ইংরাজিতেই লেখা।”
“বটে! কিছু মনে করো না নিতাই, তুমি ইংরাজি পড়তে জান বেশ?”
নিতাই ইতস্ততঃ করে বললে, “আমি তত পারিনে, কিন্তু কুমুর ভাই বীরু, সে চৌকশ ছেলে। সে আমার সঙ্গেই যায় সর্বত্র। সেই পড়ে বলেচে।”
“আপনার শ্যালকের সঙ্গে একবার কথা বলা যায়?”
নিতাই উত্তর দিলে, “আলবৎ যায়, নন্দ, যা বাবা একবার চট করে গিয়ে বীরুকে ডেকে নিয়ে আয়। বলবি ঠাকুর মশায় ডেকেচে।”
বীরভদ্র রমেশের মাথায় জলপট্টি দিচ্চিল। নন্দর কথা শুনে কইল,
“আমি গিয়ে দেখা করে আসচি। তুই ততোক্ষণে এইখানে বসে কপালের কাপড়টা পালটাতে থাক। ঘর ছেড়ে নড়বি নে আমি আসা ইস্তক।”
কালীপদরা খাওয়া শেষ করে আচমন করচে, বীরভদ্র এসে কালীগুণীনকে প্রণাম করে দাঁড়ালো।
কালীপদ মুখের জলটুকু ফেলে শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“শোনো বাছা, ভালো করে ভেবে জবাব দাও। তোমরা রাওয়ালপিন্ডির ওই ট্যাঁকশাল নামের কোন একটা জায়গা থেকে ঐ উপহারগুলো…”
নিতাই কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েচে। বীরভদ্র একবার দূরত্বটুকু মেপে নিয়ে চাপা গলায় একটু হেসে বললে,
“ও কথা জামাইবাবু বলেচে বুঝি? মাপ করবেন ঠাকুর, আমার জামাইবাবু ইংরিজি একেবারেই বলতে পারেন না। ওই ঢিবিটার নাম ট্যাঁকশাল নয়।”
“তবে? কী নাম?”
“রসিদের ইংরেজি ভাষাকে তর্জমা করলে বলা যায় তক্ষশীলার ঢিবি।” চমকে উঠে কালীপদর হাত থেকে জলের ঘটিটা মাটিতে পড়ে গেল।
*****
বাড়ির লোকেরা কালীপদকে হাজারো সওয়াল করেও একতিল ও কথা বলাতে পারল না। কালী আত্ম নিমগ্ন হয়ে আকাশ পাতাল ভেবে চলেচে। তক্ষশীলা। তক্ষশীলা। পাথরের প্যাঁচানো দণ্ড! দানবাকৃতি ডিম! বিষের তেজে গাছের জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাওয়া! সব খুব চেনা ঠেকচে। কিছুতেই ধরা দিচ্চে না।
সকলে যখন নিজ নিজ কক্ষে নিদ্রার্থ প্রবেশ করেচে এবং কালীপদ একলা বসে রয়েচে, গুটি গুটি পায়ে শঙ্কর এসে দাঁড়ালো। কালীপদ আর নীরব থাকতে পারলো না। মুখ তুলে শুধালো, “বল বাবা, কিছু বলবে?”
শঙ্কর একটু দোনামনা করে বলল, “তুমি কি কাপালিক? শ্মশানে থাকে যারা?”
কালী চিন্তার মধ্যেও হেসে উঠে বলল, “শোনো কথা ছেলের। আমি হলুম গে তোমাদের মতোই ঘর গেরস্ত মানুষ। দেখচো না আমার পোষাক? আর শ্মশানে থাকতে যাই কেন বলো, আমার ঘর দোর নাই বুঝি? নাকি আমার ভয় লাগে না?”
শঙ্কর যতটা ভয়ানক কিছু মনে করে এসেচিল, এখন দেখল লোকটা আর দশটা লোকের মতোই সাধারণ। একটু সহজ হলে পর সে হাতের একখানা কাগজ কালীপদর দিকে এগিয়ে দিল। কালী সেখানা খুলে অবাক হয়ে গেল। কাগজের উপর পেনসিলের কালিতে একখানা ছবি আঁকা রয়েচে। একটা বিরাট বড়ো চাকা। সেই চাকার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে রয়েচে একখানা সাপ। এর অর্থ কি?
শঙ্কর আবার বললে, “এই ছবিটা দাদু এঁকেচে। বড়ো বড়ো বই পড়ে পড়ে এঁকেছে।”
কালীপদ ছবিটা ভাঁজ করে কামিজের পকেটে রেখে কইল, “ছবিটা এঁকে দাদু কিছু বলেননি তোমাকে?”
শঙ্কর সবেগে মাথা নেড়ে জবাব দিল, “না, কিচ্ছু বলেনি। শুধু এইটা এঁকে, খেতে যাবার সময়ে বিড়বিড় করচিল, ‘গাঁয়ে মহা শত্রুর এসে ঢুকেচে। ভীষণ আপদ এসে জুটেচে। কেউ বাঁচবে না’।”
কালীপদ শুনে নীরব ভাবে চিন্তা করতে থাকল, তারপর অধিক কালহরণ না করে অতিথি-কক্ষে গিয়ে শয়ন করল আর সারা দিনের মানসিক ও কায়িক অবসাদে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। রাতে ঘুমিয়ে কালীপদ স্বপ্ন দেখল, অনেক দূরের একটা পাহাড়ি জায়গা, চারদিকে পাহাড়ের বেষ্টনী, মাঝের উপত্যকায় বিরাট আগুন জ্বলচে, বহু মানুষ ঐ আগুনকে ঘিরে পূজায় বসেচে যেন, আর… আর কাদের যেন বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে আসচে। কারা যেন মরণের আতঙ্কে চীৎকার করে চলেচে। একটা কানফাটানো ভীষণ চীৎকার ভেসে এল হঠাৎ।
কালীপদ ধড়মড় করে উঠে বসেই বুঝলো চিৎকারটা সত্য সত্যই হয়েচে এবং এই বাড়িতেই হয়েচে!
“কে রয়েচে বাইরে?” এই বলে সজোরে হাঁক দিয়ে, গায়ের চাদরটা সরিয়ে দোর খুলে বেরিয়েই চোখে পড়ল সকলেই রমেশের ঘরের দিকে ছুটচে। কালীও তাদের সঙ্গে রমেশ বাবুর ঘরে ঢুকেই দেখলো, জানালা সমেতো সেইদিকের দেওয়াল অনেকটা ভগ্ন হয়ে পড়ে রয়েচে আর রমেশের শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। রমেশের স্ত্রী হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে যা বলল, তার মর্মার্থ দাঁড়ায়, বাড়ির সকলেই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, বাড়ি যখন নিঝুম, হঠাৎ খুব অস্পষ্ট ভাবে জানালার ঠিক গায়ের ডোবাটায় যেন একটা ছলাৎ করে শব্দ হলো। রমেশের গৃহিণী ততটা গা করেনি, কিন্তু রমেশ হঠাৎ উঠে বসে বলে উঠল, “নলিনী, ও কীসের শব্দ?”
নলিনী সে কথায় রমেশকে বলল, “কোন শব্দ?”
রমেশ উত্তর না দিয়ে চুপ করে রয়েচে দেখে নিদ্রালু নলিনী আবার নিদ্রা গেল। ঘুম ভাঙল একটা হাতের ঝাপটায়। হুড়মুড়িয়ে উঠে বসেই নলিনীর হাত পা ঠান্ডা হয়ে উঠল। ডোবার গায়ের জানালা সমেত দেওয়ালটা অনেকখানি ভাঙা, অথচ এই ভাঙার বিন্দুমাত্র শব্দও কেউই পায়নি, এবং তার স্বামীর উপরে ঝুঁকে রয়েচে একটা বিকটদর্শন জীব। তাকে দেখেই নলিনী ভীষণ আর্তনাদ করে উঠল। বিশ্রী জন্তুটা রমেশকে ছেড়ে নলিনীর দিকে দুই পা এগোনো মাত্র বাইরে থেকে কালীপদর হাঁক এল, “কে রয়েচে বাইরে?”
এই কথাটুকু শোনা মাত্র এক লাফে শয়তান টা ঐ ফোকর দিয়েই পালিয়ে গেল, আর রমেশের শরীরে পক্ষাঘাতের লক্ষণ ফুটে উঠল। তার হাত, পা, জিহ্বা সব অসাড় হয়ে পড়েচে। কালীপদ ক্ষোভে নিজেকেই নিজে দুষল। শোবার পূর্বে বাড়ির চতুশ্চত্বরে সে মন্তর পড়া জলের ছিটে দিয়েচে, কিন্তু এই ডোবার দিকটা বাধ্য হয়েই যেতে পারেনি, আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অপয়া প্রাণীটা ঢুকে এসেচে।
বাড়িতে মহা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। রাতে আর কারুর ঘুম হল না, সকলে একসাথে মিলে নিতাইয়ের শয়নকক্ষে বসে রাতটা কাটিয়ে দিল, কেবল কালীপদ শঙ্করকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। শঙ্কর ঘুমিয়ে পড়ল, আর কালী চিন্তার জাল রচনা করে রাত্তির অতিক্রান্ত করল।
একেবারে কাকভোরে ছুটতে ছুটতে আসা ঘোষাল বাড়ির একজন লোকের মুখে নতুন একটা দুঃসংবাদ এসে আঘাত করল। ভোর রাত্তিরে শিবমণি ঘোষালের বাড়িতে আক্রমণ করেচে ঐ দানো। শিবমণির গৃহ বলতে চারখানা মেটে ঘর আর একচিলতে প্রাঙ্গণ। একখানা ঘরে জামাইকে নিয়ে দুইজন প্রতিবাসী শয়ন করেচিল, আর কনে ছিল পাশের ঘরে শিবমণির এক বয়স্কা পিসির সঙ্গে। বাকী সকলে শুয়েচিলো বাকী দুইখানা ঘরে। রাতে হঠাৎ কোলাহল কানে আসায় সকলে আঁতকে উঠে বরবধূর দুখানি ঘরে ঢুকে দেখে, শিবমণির পিসি অচৈতন্য, আর বরের ঘরের দুইজন লোক মরে ছাই হয়ে রয়েচে। বর বধূ কোথাও নাই।
শিবমণি আর তার স্ত্রী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। পিসির সম্বিৎ ফিরলে পর সে ভীষণ ভীতির সঙ্গে জানালে, ঐ শয়তান টা চলে যাবার আগে তাকে বলে গিয়েচে, যদি বর বধূকে জীবিত ফিরে পেতে হয় তবে বরের বাপ, খুড়া এবং তার ঘরে আশ্রয় নেওয়া তান্ত্রিক যেন সকাল হতেই পোড়া টিলার মাঠে এসে হাজির হয়। নচেৎ এই দুইজনকে এক কামড়ে সে…।”
বাড়ির মেয়েমানুষদের আকুল কান্না আর কাকুতি মিনতি সত্ত্বেও দুই ভাই কঠোর হৃদয়ে সিদ্ধান্ত নিল, জীবন যায় তো যাক, কিন্তু বাড়ির বংশধরকে রক্ষা করার একটা চেষ্টা করতেই হবে। হয়তো কেউই বাঁচবে না, তাও সারাজীবন নিজের কাপুরুষতাকে দুষবার চাইতে এই ভালো। নচেৎ গাঁয়ের লোক ভরদ্বাজ পরিবারের নামে ঘৃণার বাক্য বলবে, সে বড়ো অসহ্য।
কালীপদ বেরুবার মুখে একবার রমেশের ঘরে ঢুকল। বৃদ্ধ কথা বলার শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেচে। তার চক্ষু বেয়ে অঝোরে জল পড়ে চলেচে। কালীপদ তার সুমুখে শঙ্করের দেওয়া কাগজের ছবিখানা মেলে ধরে নীচু কণ্ঠে কইল, “আমি জানি এখন কথা বলার মতো বাকশক্তি আপনার নাই। আমারও অনেক কথা বলার ছিল, কিন্তু… যাক সে-কথা। একটা কথা জানাতে এলাম। যদি ভবাণীর কৃপা থাকে তবে আপনার পরিবারকে আমি জীবিত ফিরিয়ে আনবো। কালোর থেকে ফেরার উপায় আলোই দেখায়। আমি খুব গোপনে হেঁতালের দহে বীরভদ্রকে পাঠিয়েচিলাম। সে যা খবর দিলো, তাতে ঐ দানবাকৃতি ডিম হয়তো আজই ফুটে বেরুবে। তার থেকে কী বেরুবে তাও আমি আঁচ করতে পেরেচি হয়তো। তার পরে কী হবে আমার জানা নাই। আমার ক্ষমতা অতি নগণ্য, কিন্তু ততটুকু দিয়ে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব সকলকে রক্ষা করার। এইবার তবে চলি।”
দুয়ার থেকে নিষ্ক্রান্ত হবার ঠিক আগে কালীপদ ঘুরে দাঁড়িয়ে পুনর্বার কইলো, “আমার মনে হয় আমি চাকায় প্যাঁচানো সাপটাকে চিনতে পেরেচি। কুঠির সাহেব কেন মরেচে আর বিচুলির রহস্যও বুঝতে পেরেচি…”, এই বলে কালীগুণীন বাকী দুইজনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। রমেশের চোখে তখনও অশ্রু ঝরচে, কিন্তু এই অশ্রু বিষাদের নয়, বরং প্রশান্তির।
*****
কুমীরমারি গাঁ পেরিয়ে যে হেঁতালের জঙ্গলটার কথা তখন কইলাম, তার থেকে আধ ক্রোশ দূরে পোড়া টিলার অবস্থান। একটা বিরাট বড়ো টিলা, তার গা বেয়ে গজিয়ে ওঠা বনে একবার ভয়াবহ আগুন লেগেচিল। তারপর থেকে গোটা এলাকা ধূসর, রুক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে মাটির উপরে। একটা জীবিত গাছপালা নাই চারদিকে। বিশাল বিশাল মহীরুহের সারি প্রাণহীন হয়ে তাদের প্রকাণ্ড, দীর্ঘ শাখাপ্রশাখা মেলে শ্মশান ভূমির ন্যায় বিস্তৃত হয়ে রয়েচে, যেন একখানা বন্ধ্যা, উষর, মৃতের জঙ্গল। সেই শুষ্ক, নীরস তরুরাজির তলা দিয়ে বহু সময় হেঁটে পোড়া টিলার পাদদেশে এসে পৌঁছালো কালীপদ। লক্ষ্য করল নারায়ণ আর নিতাইয়ের পা ভয়ে তিরতির করে কাঁপচে। সাহিত্যে জীবজন্তু, পোকামাকড়, মানুষের মাতৃস্নেহ নিয়ে কবিতা, গল্প, রূপক রয়েচে ভুরিভুরি, কিন্তু পিতার অপত্য স্নেহের এর চাইতে বড়ো দৃষ্টান্ত খুব কমই হয়।
কারুকে দেখতে না পেয়ে তিনজনে যখন এদিকে ওদিকে তাকাচ্চে, হঠাৎ একটা ফোঁসফোঁস শব্দ পেয়ে চমকে তাকিয়ে চোখে পড়ল ইতিমধ্যে পিছনে এসে হাজির হয়েচে অনেকগুলি ফণাধর সাপ। তাদের আচরণে আদিম হিংসে “প্রকাশ পাচ্চে, কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়চে না। নারায়ণ কাঁপা গলায় বললে, “ঐ, ঐ দেখুন ঠাকুর!”
কালীপদ নজর ঘুরিয়ে দেখলো চারদিকের সবকয়টি মৃত গাছের ডালে ডালে ঝুলে রয়েচে সহস্র সহস্র সাপের দল। কেউ গজরাচ্চে, কেউ মরা শাখাতেই ছোবল বসাচ্চে, কেউ বা নির্নিমেষ চক্ষে চেয়ে রয়েচে এইদিকেই। সে এক নারকীয় পরিবেশ। আচমকা নিতাই চিৎকার করে উঠল, “হা ঈশ্বর! ওই দেখুন ঠাকুর!”
কালীপদ সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে দেখতে পেল নারায়ণের পুত্র আর বধূমাতা ক্লিষ্ট পায়ে এগিয়ে আসচে, আর তাদের হাসি মুখে নিয়ে আসচে একজন শীর্ণকায় ব্রাহ্মণ। তার মুখ স্নেহময়, চক্ষু মমতা ভরা।
রুদ্র সামনে এসে কাকার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নারায়ণ পুত্রবধূর মাথায় হাত রেখে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে। কালীপদর চোখেও জল চলে এসেচিল, সেটুকু মুছে ফেলে সে চাইল ব্রাহ্মণের দিকে।
শীর্ণ ব্রাহ্মণ হাসি মুখে কইল, “তুমি একজন তান্ত্রিক, তা তোমার মুখের দিকে চেয়েই ধরতে পারচি, কিন্তু আমিও বাছা কিছু কিছু ক্ষমতা রাখি। সেই জোরেই এই ছেলেমানুষ দুইজনকে উদ্ধার করেচি আজ ঐ শয়তানের হাত থেকে। আমার পরিচয় সকলের সুমুখে প্রদান করতে কিছু বাধা রয়েচে, তাই তুমি চাইলে কানে কানে বলতে পারি, কিন্তু পাঁচ কান করতে পারবে না সেই শর্তে।”
কালীপদ স্থির চক্ষে ব্রাহ্মণের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচলিত স্বরে উত্তর দিল, “তোকে পরিচয় দেবার কষ্ট স্বীকার করতে হবে না পাপীষ্ঠ। তুই সত্য বলেচিস, আমি একজন তান্ত্রিক, আর সেই কারণেই তোর এই ছলনা আর ছদ্মবেশ আমি চিনতে পেরেচি আগেই। এই ব্রাহ্মণের বেশ ধরেই তো হাজার হাজার বছর আগেও গিয়েচিলি তক্ষশীলায়, তাই না?”
বিপ্রর ক্ষণ পূর্বের মায়াময় চোখ বদলে গিয়ে তা থেকে আগুন ঠিকরে বেরুচ্চে। চোখের মণি বদলে গিয়ে একটা সরু, কালো দাগের আকার নিচ্চে। কালীপদ না থেমে বলতে থাকল,
“তবে আর যাই হোক, আমি গল্পগাথা শুনে ভাবতুম তোর আকার হয়তো আকাশ ছোঁয়া, তোর পায়ের ভারে হয়তো পৃথিবী কেঁপে ওঠে, কিন্তু
এখন দেখচি আমাদের থেকে তোর প্রভেদ সামান্যই। তার উপরে তুই একটা ছলনাকারী শঠ, তাই আমাকে ভয় পেয়ে কানে কানে পরিচয় দেবার বাহানা করে অতর্কিতে দংশন করতে চেয়েচিলি, তাই না? এত ভয় আমাকে? দুটো নিরীহ ছেলেমেয়েকে ধরে এনে আমাকে এখানে এনেচিস। একটা সামান্য সাপের চাইতেও তুই নিকৃষ্ট।”
শয়তান টার আকার ভীষণ ক্রোধে দ্বিগুণ হয়ে উঠেচে। নাক থেকে ভয়াল ফণীর ন্যায় গৰ্জ্জন ভেসে আসচে। কালীপদ আড় চক্ষে একবার অনেক দূরে হেঁতালের বনের মাথার দিকে চেয়ে দেখল, সেখানে ঝড় উঠেচে, পাখিগুলো বনের মাথায় পাগলের মতো ঘুরপাক খাচ্চে, বনের ভিতরে কী যেন একটা ঘটচে।
শয়তান-টা ভয়ানক ক্রুদ্ধ কণ্ঠে হিসহিস করে কথা বলল, “একজন সামান্য মানুষ, একটা পৃথিবীর কীট, তুই আমার আসল স্বরূপ দেখতে চাইচিস? বেশ, তোকে আমি এ সুযোগ দেবো। আমার পূর্ণ স্বরূপ ধারণ করেই তোকে রসাতলে পাঠাব আমি। বিষের জ্বালায় যখন তোর শরীরের সবকয়টি অঙ্গ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তখন আমার চিত্ত জুড়োবে। তোর এত স্পর্ধা, তুই আমাকে বাধা দিতে গাঁয়ে পা রেখেচিস? সাধ্য কি তোর? এমনিতেও তোদের সবকটা নরাধমকে আমি মেরেই ফেলতাম, এখনও তাইই করবো, তবে…।” পিশাচটা কুটিল হাসি হেসে ধীর পায়ে দুই পা এগিয়ে গেল রুদ্রর দিকে
কালীগুণীন এইবার সত্যিই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ল। দৌড়ে শয়তান টার দিকে যাবার চেষ্টা করতেই পা জড়িয়ে ধরলো অসংখ্য কালভুজঙ্গের দল। নারায়ণ, নিতাই আর বাকি দুইজনেরও পা বেয়ে উঠচে সেই ভীষণদর্শন কালসর্পের পাল। বজ্রকঠিন রজ্জুর ন্যায় পাকে পাকে শরীরগুলি পেঁচিয়ে ধরতেই সকলে মাটিতে ধরাশায়ী হয়ে পড়ল। উন্মত্ত, লোলুপ শয়তানের অনুচরগুলো শুধু শ্বাস নেওয়ার অবকাশটুকু রেখে বাকী গোটা শরীর বেঁধে ফেললো তীব্র বাঁধনে। সেই বিষধরের দলার ফাঁক দিয়ে তারা দেখতে পেলো, ওই ব্রাহ্মণকে ঘিরে কালো ধুঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠচে, আকাশ বিভীষণ মেঘে অন্ধকার হয়ে পড়েচে, আকাশের বুক থেকে ভীষণ শব্দে চাবুকের মতো বজ্র ছুটে বেরুচ্চে, আর তার সঙ্গে… ঐ শয়তানের শরীর বিশাল, আরও বিশাল আকার ধারণ করচে। বাতাস ভরে যাচ্চে শ্বাসরোধকারী দুর্গন্ধে আর তাকে ছাপিয়ে ভেসে আসচে এক প্রতিহিংসাপরায়ণ মহাদানবের অট্টহাস্য।
নিতাই আর নারায়ণ আতঙ্কে অসাড় হয়ে পড়ে ভীত কণ্ঠে বলে উঠল,
“এ কি মুখুজ্জে মশায়! ওটা কি জন্তু? ওটা যে পাহাড়ের ন্যায় বেড়ে চলেচে। হা ভগবান! এর থেকে আজ বুঝি রক্ষা নাই ঠাকুর!”
কালীপদ অসাড় দেহে ক্লিষ্ট কণ্ঠে জবাব দিল,
“রক্ষা করা বা বধ করা ভগবানের মর্জি নিতাই, তাঁর ইচ্ছে তিনিই জানেন। এখনও এই শয়তানের পরিপূর্ণ রূপে আসতে হয়তো কিছু বিলম্ব রয়েচে, তাই দুটো কথা বলি। এই যে বিকটাকার জানোয়ার তার রাক্ষুসে চোয়াল মেলে বড়ো হয়ে চলেচে, এর নাম তক্ষক। নাগযোনীর সবচাইতে বিষধর এবং হিংস্রতম জীব। পুরাণে মহারাজা জনমেজয়ের সর্পনিধন যজ্ঞে এরই উল্লেখ পেয়েচো এতদিন। সে ঘটনা তো জানো নিশ্চয়ই। মহারাজা পরীক্ষিৎ যখন জলের পিপাসায় জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে এক ধ্যানস্থ মুনীর কাছে জল চায়, তখন মুনী সাড়া না-দেওয়ায় ক্রোধের বশে ধনুকের অগ্রভাগ দিয়ে একখানা মরা সাপ নিয়ে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়। পরমন্তপ সাধু কিন্তু প্রতিবাদ করেননি, কিন্তু তাঁর পুত্র ঐ অবস্থায় বাপকে দেখে ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে শাপ দেন, ‘যে নরাধম আমার পিতার এই অপমান করেচে, সে আজ থেকে তিন দিনের মধ্যে তক্ষকের ছোবলে মরবে।’
পরে মুনীর কথায় পরীক্ষিততের গুণাবলী অবশ্রুত হয়ে বিমর্ষ হয়ে তিনি দূত পাঠিয়ে রাজাকে সতর্ক করে দেন এবং প্রাণভয়ে মহারাজা এক আকাশছোঁয়া মিনার নির্মাণ করে তার উপরে সশস্ত্র রক্ষী নিয়ে বসে থাকলেন। তক্ষক কিন্তু ব্রহ্মশাপ পুষ্ট হয়ে এই তিনদিন মিনারে ওঠার ফাঁকফোকর খুঁজচিলো, অবশেষে রাজার জন্য নিয়ে যাওয়া ফলের থালায় ক্ষুদ্র রূপে উঠে পৌঁছে যায় শিকারের কাছে এবং প্রকাণ্ড রূপ নিয়ে তাকে হত্যা করে।
বহু বৎসর কেটে যাবার পর পরিক্ষীতের পুত্র মহারাজা জনমেজয় এই পিতৃহত্যার বৃত্তান্ত জানতে পেরে প্রবল প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এক ঐতিহাসিক যজ্ঞে বসলেন। এর নাম জনমেজয়ের সর্প-নিধন যজ্ঞ। যজ্ঞের আগুন জ্বলে উঠল চারপাশে পাহাড় ঘেরা উপত্যকায়। বহু মানুষ, বহু সাধু দেখতে এলেন সেই মহাযজ্ঞ। এই দৃশ্য আমি পাতাল ভৈরবীর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দেখেচি।
একের পর এক আহুতি যজ্ঞে পড়ে, আর দলে দলে সাপ এসে যজ্ঞের আগুনে এসে পড়তে থাকল। সাপের কূল যখন প্রায় বিনষ্ট হয়ে এসেচে, তখন পড়ল তক্ষকের পালা। ভীত সন্ত্রস্ত এই বেজন্মা শয়তান প্রাণভয়ে ইন্দ্রের রথের চাকায় পেঁচিয়ে বসে রইলো। এই ছবিটাই রমেশবাবু এঁকেচিলেন কিছু আঁচ করে। তো, মন্ত্রের তেজ স্বয়ং ইন্দ্রের রথ সমেত আগুনে এসে পড়ার জোগাড় হলো। ঠিক এই সময়ে মনসা আর জরৎকারু মুনীর পুত্র আস্তিক এসে উপস্থিত হলো যজ্ঞের ভূমিতে। বহু মিষ্ট কথা কয়ে, ছলনা করে সেই বালক জনমেজয়কে বচনবদ্ধ করিয়ে নিল যে এই সপযজ্ঞ এইখানেই স্তব্ধ হোক। সঙ্গে সঙ্গে যজ্ঞ থেমে গেল। তখন তক্ষক আগুনের ঠিক উপরে এসে ঝুলচে।
এই ঘটনায় সমগ্র সর্পকূল মনসাপুত্র আস্তিকের প্রতি আজন্ম কৃতজ্ঞ হয়ে শপথ করলে, যে আস্তিকের নাম নেবে, চরাচরের কোনও সাপ তাকে বিষ ঢালবে না। যদিও এই আস্তিক উচ্চারণের একটা কৌশল রয়েচে, যা-ই হোক, কিন্তু এই ঘটনাতেও স্বভাব হিংস্র তক্ষকের কিন্তু হৃদয় আর্দ্র হল না। সে বাসুকী এবং অনন্তর নিষেধাজ্ঞা না-শুনে কিছু অনুচরকে নিয়ে সভাস্থল থেকে পলায়ন করল।
ভগবান শ্রীবিষ্ণু তক্ষকের মতো শয়তানের পলায়নের মানে বুঝেই নিজের বাহন গরুড়কে পাঠান তাকে ধরে আনতে, কিন্তু গরুড় তার সন্ধান পেল না। না তার দেখা, না তার গন্ধ, কিছুই পাওয়া গেল না। সে যেন কর্পূরের মতোই উবে গিয়েচে। গরুড় ব্যার্থ মনোরথ হয়ে প্রভুর পাদপদ্মে ফিরে এসে জানাল, সে তক্ষকের সন্ধান পায়নি এই ত্রিভুবনে, কিন্তু সেই শয়তানকে নিরস্ত করার একটা উপায় সে করে এসেচে। সেই উপায় কী, সে সম্বন্ধে কেউ জানে না। আমার খুব সন্দেহ হচ্চে ঐদিন তক্ষক গরুড়ের ভয়ে নিজেকে ক্ষুদ্র এবং পাথরে রূপান্তরিত করে ফেলেচিল, ফলে তার দর্শন বা ঘ্রাণ পাওয়া যায়নি। সহস্র সহস্র বৎসর ধরে ঘুমিয়ে থেকে হয়তো তার নির্বেদ ঘটেচিলো, কিন্তু তুমি তক্ষশীলা ঢিবি থেকে তোলা তক্ষককে সামান্য বাহারী লাঠি ভেবে কিনে নিয়ে এলে, আর তা দিয়েই তোমার বাপ সাপ মারলো, ফলে সাপের রক্তে স্নান করে তক্ষক আবার জেগে উঠল তার ভীষণ প্রতিহিংসা নিয়ে।
যুগ যুগ ধরে প্রস্তুর রূপে সমাহিত হয়ে থেকেও শত্রুদের নামগুলো জপমন্ত্রের ন্যায় সে তার মনের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রেখেচিল। তাই সে সাহেবের নামটা শোনামাত্র মহারাজ জনমেজয় ভেবে জ্বলে উঠেচিল। সেইদিন সামান্য বিচুলির আঁটি দেখে সেই কালরাক্ষস পালায়নি নিতাই, সে পালিয়েচিলো ‘গোরুর বিচুলি’ শুনে, কারণ এর মধ্যে তার যমের নাম লুকিয়ে ছিল। সেই শত্রুর ভয়েই ঐ শয়তান আক্রমণের সময়টুকু ছাড়া গাঁয়ের মাটির তলায় লুকিয়ে থাকতো। আমি একটা ভুল ধারণায় ছিলাম। শ্রাদ্ধের মণ্ডপ আর বিবাহের মণ্ডপের কোনও তফাৎ নাই, কিন্তু তফাৎ আছে মন্ত্রে। বিবাহের মন্ত্রে মঙ্গলময় ভগবান বিষ্ণু এবং গরুড়কে আহ্বান করা হয় শুভকার্যের রক্ষক হবার জন্য। সেই কারণেই ঐ শয়তান-টা মণ্ডপে পা রাখা মাত্র বিতাড়িত হয়েচিল, এবং তা ছাড়াও…”
কালীপদর বাক্য শেষ হবার আগেই তক্ষকের ‘কট কট কট কট’ হাসি এবং সহিংস গৰ্জ্জনে সেই কথা চাপা পড়ে গেল। তক্ষক নিজের আসল ভয়াল রূপ ধারণ করেচে, তার কুমীরের ন্যায় মাথা টিলা ছাড়িয়ে আরও উপরে উঠেচে, ধারালো আঁশযুক্ত পুচ্ছ বিদ্যুতের সমান আছড়ে পড়চে গাছপালার মরা ডালগুলিতে, তার মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসচে বিরাট লম্বা লকলকে বিভক্ত জিহ্বা। নিজের সুতীক্ষ্ণ নখরযুক্ত বিশাল পা ফেলে তক্ষক এসে দাঁড়ালো ঠিক এদের মাথার উপরে। গায়ে জড়িয়ে থাকা সাপেরা তাদের বন্ধন এত বলিষ্ঠ করে তুলেচে যে কালীপদর শরীরে যন্ত্রণা আরম্ভ হয়েচে। সেই মহাকায় দানব নিজের মুখটা খুলল আর তার জিভ বেরিয়ে এসে স্থির হল কালীপদর একেবারে মাথার হাত চল্লিশেক উপরে, একদম সরলরেখায়। সেই জিভের অগ্রভাগে জমা হচ্চে এক বিন্দু বিষ। জমতে জমতে ভারী হলেই সেই জ্বালাময়ী তরল গরল এসে ছাই করে ফেলবে কালীকে। একেবারে সমাগত মৃত্যুর মুখে পৌঁছে কালীপদর দেহ, মন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে আবিষ্ট হয়ে এল। তার জীবন মৃত্যু ভবাণীর পায়ে সমর্পিত, তার কর্তব্য, কর্ম, যশ সবই মহাকালীর পায়ে নিবেদিত। মরণে আজ তার শঙ্কা নাই।
হঠাৎই ভয়ঙ্কর ভূকম্পের ন্যায় মাটি থরথর করে লাফিয়ে উঠল। বহু দূরে যেন একসঙ্গে এক লক্ষ বজ্র আছড়ে পড়ল। তক্ষকের তেজে জন্ম নেওয়া যে ঘোর মেঘের রাশি পৃথিবীকে আবৃত করে রেখেচিল, তা যেন কেউ এক আলোর তরবারির আঘাতে চিরে ফেলল। মাটির কম্পনের দাপটে বিশালদেহী তক্ষকও টলে গিয়েচিল, ফলে তার জিহ্বাগ্রের ঐ গরলবিন্দু কালীপদর থেকে কিছুটা তফাতে ছিটকে পড়ল। জায়গাটা দপ করে আগুন ধরে উঠেই চোখের পলকে ভস্ম হয়ে গেল। আরও আশ্চর্যজনক কথা হলো, এতক্ষণ শ্বাসরুদ্ধকর যে লুব্ধ ভুজঙ্গের দল তাদের শত পাকে বেঁধে রেখেচিল, সেই নাগপাশ হুড়মুড়িয়ে বিকল হয়ে পড়ল। কালী তাকিয়ে দেখলো, লক্ষ লক্ষ সাপ কিলবিল করে পালিয়ে যাচ্চে। কালীগুণীন মুক্তি পাওয়া মাত্র নতজানু হয়ে বসে আবেগের স্বরে উচ্চারণ করল, “নমঃ পন্নগনদ্ধায় বৈকুণ্ঠবশবর্তিনে। শ্রুতিসিন্ধু সুধোৎপাদমন্দরায় গরুত্মতে।।” আর মুহূর্তের মধ্যে ভীষণ বিস্ময়ের সঙ্গে তারা দেখলে, আকাশের যেন এ মাথা ও মাথা অবধি ডানা বিস্তার করে ঝড়ের গতিতে উড়ে আসচে এক ভীষণদর্শন পাখি। হেঁতালের বনে সেই অজ্ঞাত প্রাণীর ডিম ফুটেচে একটু আগে।
গরুড়!
বিষ্ণুবাহন খগরাজ গরুড়
সর্পকূলের সর্বনাশা গরুড়।
কালীপদ রুদ্ধ কণ্ঠে হাত জোড় করে উঠে দাঁড়াল।
সেই পর্বতসন্নিভ মহাশত্রুর আগমনে তক্ষক ভীষণ আতঙ্কে মাটির বিবরে প্রবেশ করার জন্য লাফিয়ে পড়ল, আর ছুটন্ত মুষিকছানাকে শ্যেনপক্ষী যে রূপে শিকার করে, ঠিক সেই ভাবে তক্ষকের অত বড়ো শরীরটাকে আরও অনেক বড়ো শক্তিশালী থাবা দিয়ে অনায়াসে আঁকড়ে ধরল সেই মহাপক্ষী এবং নিমিষের মধ্যে মিলিয়ে গেল বহু দূরের আকাশে। সেদিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে রইলো কালীপদ। তার চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়চে তপ্ত আনন্দাশ্রু।
পোড়া টিলার পথ দিয়ে অবগুন্ঠনাবৃত নববধূকে নিয়ে বাকী চারজন ফেরার পথে রুদ্র হাত দেখিয়ে বলল, “ঐ দেখুন।”
সকলে মাথা তুলে দেখতে পেলো, এত বৎসরের মরা গাছের জঙ্গল পরম শুভকর গরুড়ের আবির্ভাবের সাথে সাথে জীবিত হয়ে উঠেচে। তাতে ফুল ধরেচে, মৌমাছি বসেচে। পাখির দল নির্ভয়, সুরেলা কন্ঠে যেন গান গাইচে, “আমাদের রাজা এসেচিলেন, আমাদের রাজা এসেচিলেন।”
পরবর্তীতে রমেশ ভরদ্বাজও হঠাৎই কী করে যেন সুস্থ হয়ে উঠেচিলো।
* * * *
কালীপদ মুখুজ্জের কথা মুগ্ধ হয়ে শোনার সময় খেয়ালই করিনি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেচে। কথা শেষ করে মুখুজ্জে মশায় তাড়া দিলে,
“নাও ডাক্তার, এইবার নীচে চলো। আমার সন্ধ্যা বন্দনার সময় হয়ে গিয়েচে।”
মুখুজ্জেমশায় যখন ভক্তি ভরে সন্ধ্যাহ্নিকে নিমগ্ন, আমি কানাইকে সঙ্গে নিয়ে চমৎকার রান্নার গন্ধ পেয়ে বৌঠানকে পাকড়াও করে শুধোলাম,
“আরে বৌঠান, এমন প্রাণকাড়া খোশবাই বেরুচ্চে, কি রাঁধচো? পাঁঠা? “ বৌঠান হেসে জবাব দিলে, “না ডাক্তার ঠাকুরপো, পাঁঠা নয়। ডিম। আমি আর কানাই একবার চোখাচোখি করে হো হো করে হেসে উঠলাম।
***
