রায়বাটীর পিশাচ
আজ যে ঘটনাটার কথা বলতে চলেচি, সে কথাখানা কখনও বলবো ভাবিনি। দেবনগরের বাসুদেব রায়ের কাতর অনুরোধেই আমি এতগুলো বৎসর সে কথা নিজের মনেই চাপা দিয়ে রেখেচিলাম। একটা সময়ে এই নেবুতলার রাস্তার উপরের কোলাহল মুখর পাড়ার বাড়িতে বসেও কখনও আকাশে বাজ পড়লে চমকে উঠেচি! মনে পড়ে যেত একদিনের একটা আকাশ কাঁপানো বজ্রপাতের কথা! কখনও কোনো টিন ব্যবসায়ী মাথায় করে টিনের তোরঙ্গ নিয়ে ‘এইই ট্রাঙ্ক কিনবে… তোরঙ কিনবে…’ করে হাঁক দিলে আমার বুকটা ধড়াস্ করে উঠেচে! আমি বাইরে জানালার গরাদ দিয়ে উঁকি দিয়ে তবে আশ্বস্ত হয়েচি। সবচেয়ে বড়ো কথা, রাতবিরেতে কোনো চেনা মুখ এসে বাইরে থেকে আকূল হয়ে ডাক দিলেও আমি পরপর তিনবার পরিচয় জিজ্ঞেস না করে দোর খুলিনি, যা আমার পেশার পক্ষে বেমানান। সেসব অবিশ্যি অনেককাল আগের কথা। আজ সকালটা একটু গড়াতেই দোরের বাইরে কিড়িং কিড়িং পরিচিত শব্দ শুনে কপাট খুলেই দেখি পরিচিত পোস্টম্যান মানোয়া দাঁড়িয়ে হাসচে। বললে, “রেজিস্টারি চিঠি আছে ডাগদারবাবু।”
আমি চশমাটা নাকে তুলে একটু হেসে শুধালাম, “এই বুড়োকে এখন আর কে রেজিস্টারি চিঠি পাঠাবে রে! ঠিক বরাবর দেখেচিস তো?”
মানোয়া হেসে কইলো, “কুনো ভুল নাই ডাগদারবাবু, আপনারই বরাবর।”
আমি অশক্ত হাতে সহি করে চিঠিখানা গ্রহণ করে দোর দিলাম। শোবার ঘরে ঢুকে লেফাফার উপরে চোখ রাখতে ঠিকানাটা চোখে পড়লো— ‘রায়বাটী, দেবনগর, সুন্দরবন’।
চিঠি বহু রকমের হয়। কোনো চিঠি পড়ে চক্ষে জল আসে, কোনো চিঠি হাসি ফোটায়, কোনো চিঠি বা উদাস করে দেয়। এই চিঠিখানার ঠিকানাটুকু পড়ে আমার স্মৃতির সমুদ্রের অতল থেকে যে মন্থন-সারটুকু ভেসে উঠলো, তা অমৃত নয়, কালকূট বিষ। এককালের হারিয়ে যাওয়া ঘটনাটা আবার পরতে পরতে মনের মধ্যে ভেসে উঠলো! একটা প্রকাণ্ড জমিদার বাড়ি, কয়েকটা হারিয়ে যাওয়া চেনা মুখ, আর… আর একটা প্রকাণ্ড গোখুরোর মুখওয়ালা সিন্দুক! আরও একটা ভয়ঙ্কর মুখ মনে পড়লো, যে মুখ কেউ চরম দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে না! আমার শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠলো। চিঠির সারমর্ম অধিক কিছু নয়, রায়বাটীর এক সদস্যের পরলোক গমনের সংবাদ। তাঁর পরিবার কতকটা কৃতজ্ঞতাবশেই হয়তো আমাকে চিঠি লিখে সংবাদ দিয়েচে আজ, কিন্তু এই সংবাদে আমার মন থেকে একখানা বহু বৎসরের জমে থাকা গুরুভার বোঝা যেন নেমে গেল। বাসুদেব রায় আর ইহলোকে নাই, তাই তাঁর শর্তমতো সেই রায় পরিবারে ঘটে যাওয়া দুর্দান্ত ছলনার নৃশংস ঘটনা আর বলতে বাধা নাই আজ। সেই কথাই বলচি, মন দিয়ে শোনো।
ঘটনাটা যেদিন প্রথম ঘটে, দিনটা ছিল ভাদ্র মাসের শেষ হপ্তা নাগাদ দেবনগরের রায়বাড়িতে সেদিন অন্যান্য দিনের তুলনায় কর্মব্যস্ততা কিঞ্চিত অধিক। রাধামাধব মন্দির পরিষ্কার করা, কলি ফেরানো, অর্চ্চনা আর সেই সঙ্গে সাতপুরুষ ধরে পূজিত বাড়ির এই রাধামাধব বিগ্রহের প্রজা দর্শনে বাইরে বেরোনোর দিন। প্রজা দর্শনটা হল এইরকম— রায়বাড়ির দেবতা রাধামাধব হলেন এই তালুকের আসল মালিক। এই গোটা গাঁ তাঁর নামেই দেবত্র করা। ভাদ্রের শেষ হপ্তায় তাঁকে প্রকাণ্ড বেদী-সহ মন্দিরের বাইরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মাত্র একটি দিনের জন্য। তাঁকে প্রথমে তৈলস্নান করিয়ে তারপর রৌদ্রস্নান করানো হয়। রায়ত-রা নিজ নিজ সমস্যা জানিয়ে যান দেবতার কানে।
এই তালুককে দেবত্র করে যান বর্তমান মালিক বাসুদেব রায়ের প্রপিতামহ ধূর্জ্জটি রায় স্বয়ং। শোনা যায়, রায় পরিবার বহুপুরুষ ধরে শাক্ত হলেও তাঁদের পূর্বপুরুষ ধূর্জ্জটি ছিলেন মনেপ্রাণে বৈষ্ণব, তাই ধূর্জ্জটি দুইরকম পূজাঅর্চ্চনা করতে কার্পণ্য বা ত্রুটি করতেন না। বেহার লাগোয়া দেবীগ্রামে তাঁদের আদি বাড়িতে এখনও বংশের দুই শাখাই দুর্গাপূজার টাকা পাঠায় পালা করে। রাধামাধবের বিগ্রহটিও তাঁদের দেবীগ্রামের দুর্গামন্দিরেরই একপাশে নিত্যপূজিত হতো। ধূর্জ্জটি সেই পারিবারিক বিগ্রহই দেবনগরে তুলে এনে স্থাপন করেন এই অপূর্ব মন্দিরের। রাধামাধবের মন্দিরের উঠানে শাক্ত প্রতীক হিসেবে ধূর্জ্জটি রায় পেতলের মাঝারি কামান বসিয়েচিলেন দেবীগ্রাম থেকেই এনে, কিন্তু তাতে বাহারি কাজ করিয়েচিলেন নিজে শিল্পী এনে। অসামান্য রুচিবোধ আর খাগড়াই শিল্পের অপূর্ব এক নিদর্শন এই কামানটির গায়ে নানান রঙ্গের মিনে করা কারুকার্য। গোলাবর্ষী মুখের কাছের পরিধি বরাবর চওড়া নীল রঙ্গের ময়ূরকণ্ঠী কাজ। মনেপ্রাণে বৈষ্ণব ধূর্জ্জটি রায় বিধ্বংসী কামানের ভয়ঙ্করতাকে নিজের শৈল্পিক রুচি দিয়ে যে কোমল রূপ দান করেচেন, তাতেই তার শাক্তোপাসক থেকে বৈষ্ণব হবার সঙ্গত মনোভাব পাওয়া যায়। দুর্গাষ্টমীর সন্ধিপূজাতে এই কামান থেকে ক্ষুদ্র নকল গোলা দাগা হয় দেবীর সম্মানে। ধূর্জ্জটিও পরিবারের প্রথা মতো নিয়ম করে টাকা পাঠান দেবীগ্রামের পূজায়। এইভাবে দেবনগরে বৈষ্ণব এবং দেবীগ্রামে শাক্ত সংস্কৃতিকে সমানভাবে লালন করতেন তিনি।
তো, এইবছর এই কর্মব্যস্ত দিনটাতেই ঘটে গেল দুর্ঘটনাটা! একটু খুলেই বলি। রায় পরিবারের বর্তমানে দুই শাখা। দ্বিতীয় শাখাটির প্রধান পুরুষ হলেন বাসুদেবের খুড়ামশাই রাধাকান্ত রায় (আমরা তাঁকে একটুর জন্য জীবিত অবস্থায় পাইনি সেবার)। তাঁর পরিবারের সঙ্গে এই শাখার হরদম মেলামেশা না-হলেও পালাপার্বণে সৌজন্য বিনিময় হয়। বাসুদেব রায়ের তিন পুত্র, বড়ো শ্যামাচরণ, মধ্যম কানাইচরণ এবং ছোটো মঙ্গলকান্ত। এই ছোটো ছেলে মঙ্গলকে নিয়েই রায়বাড়ির দোর্দণ্ড প্রতিপত্তি কিছুটা বিঘ্নিত।
এই মঙ্গলকান্ত জমিদার বংশের সন্তান হয়েও বুর্জোয়া জমিদার পরিবারকে ভালো চোখে দেখে না। কলকাতায় পড়ালেখা করার সময়েই আর দশটা যুবকের মতো ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সে সমস্ত পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। রায় পরিবার এমন কিছু অর্থপিশাচ বা অত্যাচারী, তা নয়। গাঁয়ের লোকেরা বাসুদেব রায়কে যথেষ্ট সম্মান করেন, কিন্তু ভবি ভোলার নয়। মঙ্গলকান্ত একদিন বাপের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়লে পর বাসুদেব ক্ষিপ্ত হয়ে দিলে তার মাসোহারা বন্ধ করে। মনে মনে বললে, ‘রোসো বাপু, এই বুর্জোয়া বাপের মাসোহারা ছাড়া শহর কলকেতায় তোমাকে কে পুষ্যিপুত্তুর নেয় দেখি।’ বাসুদেবের বুড়ি পিসি মানদা তার এই নাতিটিকে স্নেহ করত সবচাইতে বেশি। মঙ্গলের জন্মের সময়ে তার মা সূতিকা রোগে দীর্ঘকাল আক্রান্ত হওয়ায় মঙ্গল একরকম বাসুদেবের পিসিমার কোলেই মানুষ, কাজেই এই বচসার পর মানদা ভেঙে পড়ল।
মঙ্গল কিন্তু হার মানলো না, উলটে কী এক পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে একদিন ফেরার হয়ে গেল। বাসুদেবের স্ত্রী আর তার চেয়েও বেশি মানদা পুরোপুরি ভেঙে পড়লেও বাসুদেব মনকে বোঝালে, ছেলে ক-দিন পর ঠিকই গুটিগুটি ফিরে আসবেখন। এভাবেই দিনপাত হচ্চিল। তাল কাটলো বিগ্রহের প্রজাদর্শনের দিনটায়!
বৃদ্ধা মানদা মন্দির লাগোয়া ঘরখানায় শোয়। সকালে উঠে মন্দিরের দেউড়ি ধৌত করা, ফুল তোলার দায়িত্ব তারই উপরে। মানদা কানে কম শোনে আর ভারী দুর্মুখ। সকালে উঠেই গজগজ করতে করতে ফুল তুলচে দেখে, ঝি কাত্যায়নী হেসে পিসিমা শুনতে পায় এমন স্বরগ্রামে একট চিৎকার করে কইলো, “কী হয়েছে গো পিসিমা? সক্কাল সক্কাল কাকে এত গাল পাড়চো?’
মানদা ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, “তোর তাতে কী রে? তুই শুধোবার কে? রাজ্যের প্রতিপাল্যি অপোগন্ডো পুষে রেখেচে বাসুটা, চোখ থেকেও নাই। তোরা আছিস শুধু অন্নধ্বংস করতে, এদিকে মন্দিরটা যে একটু সাফসুতরো রাখি, সে বেলায় ঢুঢু। ইঁদুরের জ্বালায় রাতে ঘুম নাই, তোদের জ্বালায় দিনে, ভালোই আছি।”
মানদার এসব কথা কেউই গায়ে মাখে না। কাত্যায়নীও মাখলো না। “সে কী কথা গো পিসিমা? রাধামাধবের মন্দিরে ইঁদুর? প্রসাদ খেয়ে গেছে, না তোমার থান কেটে গেছে? অবিশ্যি তুমিও কি আর মিছে কথা কইবে? তেমন লোকই তুমি নও।”
মানদা স্তোকে একটু নরম হয়ে বললে, “সে তোরা তো জানবিই বাছা, তোরা হলি ভালোমানুষের ঝিয়ারী। ক-দিন ধরে রোজ রাতেই শুনচি ভিতরে কুটুর কুটুর করে ইঁদুর কাটে, তা কে বা সেঁকেবিষ আনে, কে বা দেয়। থাকতো আমার মঙ্গল, দেখতি এক বাক্যিতে….”
“তাকে দরকার নেই এ বাড়িতে, আমি আনিয়ে দেবোখন পিসিমা।” বাসুদেব রায়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর পেয়ে কাত্যায়নী জিভ কেটে দ্রুত পায়ে চলে গেল।
“একটু পরে শামিয়ানা আর ফুলের লোকজন এসে পড়বে পিসিমা, দেখে শুনে নিও ওদিকটা। আমি প্রজাদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকবো।”
মানদা একটু হেসে বললে, “সে সব নিয়ে ভাবনা নাই তোর। আমি দেখে নেবো। আগের তিন তিনটে বচ্ছর ভাদ্দরের শুরুতেই জ্ঞাতি মরলো, তেলস্নান সূয্যিস্নান হল না রাধামাধবের অশৌচে। প্রথমে গেল দেবীগাঁয়ের রঙ্গলালের বাপ হরলাল, তারপরের বছর শ্রীমন্তর বাপটা, কী যেন নামটা বল না…”
“আহ পিসিমা, আজকের দিনে থাক ওসব অলুক্ষুণে আলোচনা। ভালোয় ভালোয় সবটা কাটুক এইবছর। তিনটে বছর অশৌচ পড়ে গেল। রাধামাধব.. রাধামাধব…”
কথা চাপা পড়ে গেল। পূজার তোড়জোড় আরম্ভ হতে লাগলো বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু অন্তরীক্ষে বসে রায়বাড়ির নিয়তি বোধহয় তখন কুটিল হাসি হাসচিলো, কারণ এই বছর কেন, আর কোনোদিনই যে এই বাড়িতে রাধামাধবের বিগ্রহের পূজা হবে না, তা বাসুদেব রায় অথবা বৃদ্ধা মানদা জানতো না। জানা সম্ভব ছিল না।
পুরোহিত ভটচায্যি মশায় তৈরি, পুরস্ত্রীরা তৈরি, বাড়ির পুরুষরা আর প্রজারাও প্রস্তুত, এইবার বেদী সমেত রাধামাধব সস্ত্রীক দেউলের বাইরে আসবেন সবাইকে দেখা দিতে। বাসুদেবের দুই ছেলে আর পুরোহিতের দুই নাতি ভিতরে গিয়েচে গুরুভার বিগ্রহকে বয়ে আনতে। ফটকের কাছে গাঁয়ের মেয়ে বৌ-রা ঘনঘন শাঁখ ফুকচে আর হুলুধ্বনি দিচ্চে, হঠাতই সব সমবেত কলরব এক লহমায় নিশ্চুপ হয়ে গেল দেখে বাসুদেব পিছন ঘুরে চমকে উঠলো!
ফটকের কাছ থেকে পুলিশের একটা বড়ো বাহিনী বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে আসচে ভিতরে। কানাকানি আর ফিসফিসের মধ্যে পুলিশের দারোগা এগিয়ে এসে বাসুদেবকে শুধালো, “মঙ্গলকান্ত রায় কে চেনেন?”
বাসুদেবের মনটা ছ্যাৎ করে উঠলো!
“হাঁ, আমি তার বাপ, বাসুদেব রায়। কী হয়েচে দারোগা সাহেব?”
“ন্যাকা সাজা হচ্চে? লুঠের হাতিয়ার কোথায় লুকানো আছে সোজাভাবে না বললে গোটা বাড়ি তছনছ করে মেয়ে পুরুষ সবক-টাকে গারদে পুরে দেবো।”
বাসুদেবের মাথায় বাজ পড়লো! ক্রমে ক্রমে জানা গেল মঙ্গল কলকাতার এক গোপন দলের সদস্য এবং গতকাল তারা লালবাজার সদর থেকে ব্যারাকপুর যাওয়ার পথে একখানা অস্ত্রবোঝাই গাড়ি ডাকাইতি করেছে। এখন সব পুলিশ তাদের পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্চে। দেখতে দেখতে গোটা বাড়ির আনাচে কানাচে পুলিশ ছেয়ে গেল। ধানের গোলা ফেড়ে সব ওলট পালট করে সন্ধান করেও যখন বিকেলের মুখেও কিছু পাওয়া গেল না, তখন দারোগার রোখ চেপে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুটজুতা পরেই সোজা মন্দিরের বেদীর দিকে চললো। বৃদ্ধ পুরোহিত বাধা দিতে গেলে তাকে দারোগা এমন ধাক্কা দিলে যে ভটচায ছিটকে পড়লো মাটিতে! পুরোহিতের নাতি চিৎকার করে এই জুলুমের প্রতিবাদ করতে যাচ্চে, হঠাৎ ভটচায শশব্যস্ত হয়ে তার মুখ চাপা দিয়ে বললে, “কিছু বলিস না হারাণ, কথায় আছে, বাঘের সুমুখে হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা করলে প্রাণটাও যাবে, অপমানও উপরি পাওনা হবে। বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি রে দাদুভাই। দারোগার পিছনে ছায়া রয়েচে!”
বাসুদেব শুনে অবাক হয়ে ফিসফিস করে বললো, “কীসের ছায়া ঠাকুরমশায়?”
ভটচায ক্লিষ্ট হেসে বললে, “দারোগার পরমায়ু অতি ক্ষীণ রায়মশাই। দেখেই টের পেয়েচি। হয়তো দুই একদিনের…. কিমবা… কিমবা আরও অনেক কম…”
দারোগার নাম শিবনাথ ঘোড়ুই। পুলিশ মহলে নিষ্ঠুরতা আর শৃগালের ন্যায় ধূর্ত বুদ্ধির জন্য খ্যাত। শিবনাথ মন্দিরে একাই ঢুকেচিলো। এইবারে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠলো উঁচু গর্ভগৃহের ভিতরে। এদিক সেদিক দেখতে দেখতে, অনেকগুলি অস্ত্র লুকানো যায় এমন স্থান নিরীক্ষণ করতে করতে তার চোখ পড়লো রাধামাধব বিগ্রহের নীচের বেদীটার উপর।
বেদীটা প্রায় সাত হাত লম্বা আর হাত চারেক বহরে। উচ্চতাও আড়াই হাতের ওদিক নয়। এটা যদি ফাঁপা হয় তবে গোটা তোরঙ্গও ভরে রাখা যাবে। অনেকক্ষণ নিষ্ফল টানাটানি করতে করতে হঠাৎ বিগ্রহটা প্রচণ্ড টানে যেন একটু ঘুরে বসলো! শিবনাথের হিংস্র মুখে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো! বটে? বিগ্রহটা বেদীর উপরে প্যাঁচ এঁটে বসানো! কিছুটা ঘুরাতে ঘুরাতে পুরো দশাসই ভারী বিগ্রহটাই বেদীর থেকে উঠে এলো দারোগার হাতে! কিন্তু প্যাঁচ খুলে বিগ্রহ তুলে নেবার পরেও কোনো ছিদ্র দেখা দিল না বেদীর উপরিভাগে! মূর্তির নীচের বেড় মোটামুটি ব্যাসে এক হাত মতো। ঠিক হুবহু সেই বেড়ের একটা গোলাকৃতি পেতলের চাকতি যেন ভিতর থেকে ঠেলে এসে মূর্তির শূন্য ছিদ্রটা পূরণ করে বেদীর উপরিভাগকে আবার সমান করে দিয়েচে, শুধু একটা গোলাকার চাকতির দাগের মতো বোঝা যাচ্ছে! এ স্প্রিং-এর কারসাজি না হয়ে যায় না!
এবার শিবনাথ ভালো করে বেদীটার পানে চাইলো। ধাতব প্রকাণ্ড তোরঙ্গের মতো বেদীটার গায়ে একজোড়া গোখুরো সাপ একে অপরকে পেঁচিয়ে রয়েচে! তাদের চূনীখচিত চোখ ধিকিধিকি জ্বলচে গর্ভগৃহের স্বল্প আলোতেও! আর ভিতর থেকে কেমন যেন খুট খুট শব্দ হচ্চে, বেশ জোরেও মাঝেমধ্যে! দারোগা আক্রোশে টানাটানি করতে লাগলো বেদীটা খোলার জন্য! মাথার উপরে ছাত থাকায় দারোগা প্রথমটা খেয়াল করেনি, এখন দেওয়ালের বড় গবাক্ষটা দিয়ে চেয়ে দেখলো, বাইরের পড়ন্ত বেলার আকাশ হঠাৎই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘে একেবারে ঢেকে গিয়েচে!
শিবনাথ আবার ডালাটায় হাত দিতেই আকাশে মেঘ গর্জন করে উঠলো! শিবনাথ চেয়ে দেখলে, আকাশ যেন হঠাৎই ফুঁসে উঠেচে কোনো দানবের ফুৎকারে! হঠাৎই শিবনাথকে ভয়ানক চমকে দিয়ে বেদীর ভিতর থেকে নড়াচড়ার শব্দ কানে এলো! কে যেন ধাতব বাক্সের ভিতরে পাশ ফিরলো! শিবনাথ সাহস করে নীচু হতেই বাইরের গাছপালার সমস্ত পাখপাখালীর দল হঠাৎ প্রচণ্ড আতঙ্কে একসাথে উড়তে আরম্ভ করলো মন্দিরের আকাশ জুড়ে! ওরা কী যেন দেখেচে! কী যেন অশুভর সংকেত পেয়েচে! বাইরে থেকে একটা তীব্র ঝোড়ো বাতাস নক্ষত্রবেগে ধেয়ে গেল মন্দিরের ভিতরে! শিবনাথ সেই দিকে চেয়ে তার দাম্ভিক স্বভাবোচিত এক চিলতে বিদ্রুপের হাসি ঠোঁটের কোণে আনতে যাচ্চে, হঠাৎ মনে হলো পিছনে ‘ক্যাঁচচচ’ শব্দে ভারী ধাতব ডালাটা কেউ এক ধাক্কায় খুলে ফেললো, আর একটা ধাতব ভারী কিছু ছিটকে পড়লো মেঝেতে! পিছনে ঘুরেই শিবনাথ এক পলকের জন হতরিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! মেঝেতে একটা ধাতুর তৈরি দুই হাত প্রমাণ বস্তু পড়ে রয়েচে, অনেকটা কোনো প্রাণীর পাঁজরের মতো দেখতে, কিন্তু… কিন্তু তার সামনে এ কী বিভীষিকা দাঁড়িয়ে রয়েচে? এ কোথা থেকে এলো? কী ভয়ঙ্কর তার চাহনি! শিবনাথ স্থূলবুদ্ধি নয়, সে অতি ধুরন্ধর দারোগা। এই বিপদের মধ্যেও কী যেন একটা টের পেয়ে শিবনাথ তার দুই চোখ বন্ধ করে অন্ধের মতো ছুটলো বাইরের দিকে। প্রথমে ভারী কপাটে ধাক্কা খেয়ে টাল সামলে গর্ভগৃহের সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে ভুল করে বেপথু হয়ে সিঁড়ির পাশ দিয়ে পা হড়কে আছাড় খেয়ে পড়লো মেঝেতে। আর চোখ বন্ধ রাখতে পারলো না দারোগা। চোখ খুলেই আবার কেঁপে উঠলো শিবনাথ! মৃত্যু বুঝি এভাবেই শিয়রে এসে দাঁড়ায়! কীসের মায়ায় কে জানে, একবারের জন্যও শিবুর মনে পড়লো না যে বাইরে তার বিরাট বাহিনী দাঁড়িয়ে রয়েচে ওৎ পেতে, তার একটা চিৎকারে সেই পুরো ফৌজ তাকে বাঁচাতে ছুটে আসতে পারে। যখন মনে পড়লো, তখন দেরি হয়ে গিয়েচে। অভ্যাস বশে কোমরে হাতটা নিয়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই এদিকে ওদিকে এলোমেলো তিনটি গুলি ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই কালান্তক যম ঝাঁপিয়ে পড়লো শিকারের উপর।
বাইরে দাঁড়িয়ে বাকি পুলিশগুলোও ধৈর্য্য হারাচ্চে। এমনিতেই দারোগার বদমেজাজ আর শয়তানি প্রতিহিংসা প্রবণতার কথা তাদের অবিদিত নয়, তাই কোনো প্রমাণ না-পাওয়া গেলেও এই বুনিয়াদী পরিবারটিকে নাকাল করতে সে যে কোনো কসুরই রাখবে না তা তারা বেশ টের পাচ্চে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? সাঁঝ নেমে আসচে। হঠাৎ ক্ষীণভাবে একটা কপাটের আঘাত আর একটা ভারী বস্তু পতনের সঙ্গে তিনটে গুলির শব্দ কানে এলো সকলের! দারোগার খাস চেলা রাধিকাচরণ মাস্কেট্রি বন্দুক বাগিয়ে দৌড়ে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলো, আর একটু পরেই তার চেঁচামেচিতে বাকি বাহিনী, এমনকী এতক্ষণ অপমানে পাষাণবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাসুদেবও ভটচায্যিদের সঙ্গে নিয়ে ধড়মড় করে ছুটে গেল ভিতরে। ব্যাপার যা ঘটেচে, তা বড়ো ভয়ানক!
দারোগার আগ্নেয়াস্ত্রটা পড়ে রয়েচে মেঝেতে। শিবনাথ পাশেই উপুড় হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আছে এলোমেলোভাবে, কিন্তু তার চেয়েও সর্বনাশা দৃশ্য দেখে বাসুদেব অবধি টলে উঠলো! শিবু দারোগার মুণ্ডুটা পুরোপুরি উলটোদিকে ঘোরানো! তার চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসচে আতঙ্কে! নাকে এবং ঠোঁটের কষে সামান্য রক্ত। বাসুদেবের মনে হলো দারোগা কিছু দেখে মনে হয় দিশাহারা হয়ে অন্ধের মতো ছুটেচিল। গর্ভগৃহের কপাটে ধাক্কা খেয়েই দিগভ্রান্ত হয়ে সিঁড়ি ভুল করে উপর থেকে নীচে পড়েই এই মৃত্যু। কিন্তু ভটচাযের চিৎকারে হুঁশ ফিরে দেখলো বেদীর উপরে এতকালের উপাস্য রাধামাধবের ভারী বিগ্রহটা আর নেই! নেই মানে নেইই, গোটা মন্দির আর আশপাশ পাতিপাতি করে খুঁজেও দেখা মিললো না আর! পুলিশ কোনো হদিশ না পেয়ে ফিরে গেল, বাসুদেব পারিবারিক বিগ্রহের খোয়া যাওয়ায় বিষণ্ন হয়ে পড়লো এবং প্রজাদের মধ্যে রাষ্ট্র হলো যে, জাগ্রত রাধামাধব অনাচার সহ্য করতে না পেরে নরসিংহ রূপ নিয়ে দারোগাকে বধ করে বিলীন হয়ে গিয়েচেন।
গাঁয়ের প্রান্তের শ্মশানে বাস করা বৃদ্ধ ডোম মংলু বিড়বিড় করে কয়েকজনকে কইলো যে, সে সাঁঝের আঁধারে খুব বড়ো কিছু একটা কালো জিনিসকে এই গাছ থেকে ওই গাছে লাফিয়ে পালাতে দেখেচে!
লোকজন কইলো, “ধুরোঃ, তুই এমনিতেই চোখের বৃহস্পতি, তায় আবার সাঁজের আঁধার, হনুমান টনুমান দেখে থাকবি….”
মংলু চারদিকের বিদ্রুপে অপ্রতিভ হয়ে আপন মনে কইলো, “হনুমান বানর নয়… কক্ষণও নয়! আরও জবর কিছু জিনিস গো…”
বৃদ্ধ একবার গাছগুলোর পানে চাইলো। একটার থেকে অপরটার দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ পঞ্চান্ন হাত, এই দূরত্ব এক লাফে অতিক্রম করা কোন্ প্রাণীর সাধ্যি? তার হাতে আবার বড়োসড়ো কী একটা যেন ছিল! সাঁঝের তারার আলোতেও সেটা চকচকিয়ে উঠেচিলো একবার! মংলু নিজেই শিউরে উঠে কালীস্মরণ করলে।
আশপাশের দশটা গাঁয়ের লোকেরা পরম ভক্তিভরে রাধামাধবের আখ্যানই বিশ্বাস করলে, কিন্তু তারা যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতো যে বৃদ্ধ মংলু একতিলও ভুল দেখেনি, সত্যিই বেদীর কারাগার থেকে কোনো লোলুপ নরঘাতক রাক্ষস মুক্তি পেয়েচে বহু যুগ পর, তাহলে তাদের এই নিরাপদ নিদ্রা আতঙ্কের নৈশ জাগরণে পরিণত হতো।
ক্রমে রাত হল। গোটা দেবনগর নিদ্রা গেল। ঘুম নেই কেবল বাসুদেব আর মানদার চোখে। কী যেন একটা ঘটতে চলেচে, কী যেন একটা আছড়ে পড়তে চলেচে! মংলু কি সত্যিই ভুল দেখেচে? হঠাৎ বাসুদেবের তন্দ্রা ছুটে গেল! বাইরে ভয়ানক ঝড় উঠেচে হঠাৎ! প্রলয়ঙ্কর ঝড়! সেই দাপটে শয়নকক্ষের জানালার কপাটগুলো থরথর করে কাঁপচে, কেউ যেন দুই বলশালী হাতে উপড়ে ফেলতে চাইচে তার অনুপ্রবেশের বাধাগুলোকে! কেউ যেন তীব্র আক্রোশে ছুটে এসে বারংবার আছাড় খাচ্চে প্রাচীরগাত্রে! বাইরে কুকুরের দল ভীষণ সুরে কেঁদে উঠলো একসঙ্গে! সেই সুরে কারুণ্য নেই, আছে ভীষণ আতঙ্ক! কুকুর জীবটাই প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি। এদের ক্ষমতা সীমিত, ভাষা সীমিত, কিন্তু সাহস আর আনুগত্য দুর্জয়! চোখের সামনে নিজের থেকে সহস্রগুণ বলশালী কাউকে দেখেও তারা সমস্বরে চিৎকার করে সাবধান করে দিচ্চে রায়বাড়িকে। বলচে, ‘খুব সাবধান, বাইরে বেরিও না। বাইরে দানব ওৎ পেতে রয়েচে মরণফাঁদ বিছিয়ে।’ মানদা ভয়ে ভয়ে ঠাকুর দালানের পাশে নিজের কক্ষের খড়খড়ি একটু নামিয়ে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল! আশপাশে কোথাও ঝড় নাই, শুধু তাদের বাড়িটাকে বেষ্টন করে এক ধূলার ঘূর্ণীঝড় উঠেচে আকাশ ঠেলে! তার ভিতর থেকে আবছা হিংস্র গর্জন কানে আসচে! কোনো রাক্ষস যেন কিছুতে বিফল, নিষ্ফল হয়ে তীব্র আক্ষেপে হাহাকার করচে!
ধীরে ধীরে ঘূর্ণীঝড় মিলিয়ে গেল। মানদা আর বাসুদেব রাধামাধবের উদ্দেশে প্রণাম জানালো কাঁপা হাতে। কিন্তু বিপদ তো সবে আরম্ভ হয়েচিল। ঝড় তখন ভেক বদলে, তার সহজাত কুটিলতার পরিচয় দিয়ে ছুটে গেল অন্যত্র… নূতন শিকারের সন্ধানে।
