টেক্কা
আসার দিনের থেকেও ফেরার দিন ঝড়ের বেগে, বিনা বিরতিতেই গাড়ি হাঁকানো হলো। আমরা দেবনগরের রায়বাড়ি এসে ঢুকলাম সন্ধ্যা হবার মুখে, তখন অমন তেজী ঘোড়াগুলোও হাপরের মতো শ্বাস টানচে। রায়বাটীতে প্রবেশের মুখেই কালীপদ আমার সাধের ট্যাঁকঘড়িটা চেয়ে নিজের কামিজের পকেটে ভরে রাখলো। ঘরে ঢুকেই কালীপদ মানদাকে খুঁজে বের করে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে কী যেন একটা কাজ করতে বললে, মানদা ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ নিজের কক্ষে ঢুকে গিয়ে তারপর বেরিয়ে এসে একটু রাগতঃ স্বরে বললে, “এসব কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয় ঠাকুরমশায়। আমি ধর্মপ্রাণ বিধবা মানুষ, কারুর সাতে পাঁচে থাকি না। আপনার কিছু অভিসন্ধি আছে। এ আমি পারবো না।”
কালীপদ হতাশ হয়ে একটা শ্বাস ফেলে বললে, “বেশ। আমিই দেখচি। আপনারা অন্ধভক্তি নিয়েই বসে থাকুন।” একবার ট্যাঁকঘড়িটা দেখে নিয়ে কালীপদ ব্যস্ত হয়ে বললে, “আর দেরি নয়, কানাই, ইন্দ্র, তোমরা সিন্দুকটা বের করে আনো মন্দিরের বাইরে।”
আমি শুধালাম, “কিন্তু গণ্ডী দিয়ে নিলে ভালো হত না দাদা?”
কালীপদ কইলো, “কেন? আমার এই কবচ থাকতে গণ্ডীর প্রয়োজন কীসে? সে পিশাচ চৌহদ্দির আশপাশেও পা রাখতে পারবে না জেনে রেখো।” পিশাচ লম্ববেগা মন্দিরের পাশেই আমগাছের ডালে বসে সে কথা শুনে মনে মনে হাসলো। কানাই আর ইন্দ্র সেই মহাকায় সিন্দুককে টেনে বার করলে মন্দিরের বাইরে। কালীপদ একটা কয়লাভাঙা হাতুড়ি আনতে হুকুম দিলো। ভিতর থেকে একটা বড় হাতুড়ি এলে পর কালীপদ বললে, “এই সিন্দুকটা ভাঙামাত্র পিশাচটা তো মারা পড়বে, কিন্তু অন্য কোনো উপদ্রব যাতে না হয় সেজন্য এটা ভেঙেই সঙ্গে সঙ্গে গণ্ডীটা দিয়ে রাখবো। একটা তামার ঘটি আর আমের পল্লব রাখো এইখানে।”
লম্ববেগা মনে মনে হিসাব করে নিলো, কালীপদর সিন্দুক ভাঙা আর গণ্ডী দেওয়ার মাঝেই সবক-টাকে নিকেশ করতে হবে। সে আমগাছে অদৃশ্য হয়ে থাবা পেতে তৈরি হয়ে রইলো। কালীপদ হাতুড়ি তুলে সিন্দুকে আঘাত করলো।
শব্দ শুনেই বেশ বোঝা গেল যে গ্রামের সবচেয়ে বড় হাতুড়িটা আনলেও এই স্থূল পেতলের পাতওয়ালা সিন্দুকের গায়ে একটা আঁচড়ও বসবে না! কালীপদ উন্মত্ত হয়ে হাতের সামনে হলুদছেঁচা শিলনোড়া, ইট, পাথর যা পেলো তাই দিয়েই পাগলের মতো আঘাত করতে থাকলো সিন্দুকের ওপর কিন্তু সেসব চূর্ণ হয়ে গেলেও বজ্রসিন্দুক নড়লো না। হতাশায় কালীপদর চক্ষে জল এলো। বাতুলের ন্যায় ঘোলাটে চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ তার চোখ একটু উজ্বল হয়ে উঠলো! সে চিৎকার করে বললো, “এইবার দেখি এই আপদ সিন্দুকের কত জোর! কানাই…
কানাই তার প্রভুর কোনো একটা আদেশের জন্য উদগ্রীব হয়েই ছিল, এখন ডাক শোনামাত্র কালীপদর চোখের দিকে চেয়েই বুঝতে পারলো সে কী উপায়ে বজ্রকঠিন সিন্দুকটা ভাঙতে চাইচে! পেতলের কামানটার দিকে চোখ রেখেই বাসুদেবকে চিৎকার করে কানাই বললো, “রায়মশাই… গোলা… কামানের গোলা আনুন…”
বাসুদেব হতাশার স্বরে বললো, “এ গোলায় সিন্দুক ভাঙবে না কানাই…. এ শুধু দাগবার গোলা… নিয়মরক্ষার জন্য…”
কালীপদকে দেখে মনে হলো সে নিজের হাত কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবে হতাশায়! মরিয়া হয়ে কানাইকে বললো, “তবে এই কামানকেই উপড়ে নে। এর আঘাতেই আজ ওই রাক্ষসকে শেষ করবো চিরকালের মতো।” কানাই আর কালীপদ মিলে ওই গুরুভার কামানকে চাকার পাত থেকে তুলে নিলো কোনোমতে আর বাগিয়ে ধরে একটা ভয়ানক আঘাতের জন্য তুলে ধরলো মাথার উপরে। পিশাচ লম্ববেগা আসন্ন মুক্তির আনন্দে গাছের থেকে প্রথমেই বাসুদেবের উপর লাফ দেবে বলে তৈরি হচ্চে, হঠাৎ কামানটা দিয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানার বদলে যেন খুব আলতো হাতে নামিয়ে এনে তার ময়ূরকণ্ঠী কাজ করা মুখটাকে দুইজনে মিলে বসিয়ে দিলো বিগ্রহ রাখার এক হাত ব্যাসের ছিদ্রটায়!
একটা যান্ত্রিক শব্দের সঙ্গে সঙ্গে নলটা এঁটে বসে গেল বিগ্রহের স্থানটা দখল করে! সিন্দুকের ভিতরে কয়েকটা কলকবজার অস্পষ্ট শব্দ কানে এলো। পিশাচ লম্ববেগা ওৎ পেতে লাফ দেবে বলে তৈরি হয়েচিলো, হঠাৎ আকাশে কানফাটানো বাজের শব্দ শুনে চমকে উঠে দেখলো পরিষ্কার আকাশের সব নক্ষত্র এক পলকে ঢাকা পড়ে গিয়েচে কুণ্ডলীকৃত ফুঁসে ওঠা মেঘে! হিংস্র পিশাচ এক লাফে শূন্যে উঠতে গিয়ে টের পেলো, চারদিকের পালানোর পথ রুদ্ধ! যেন কাচের ঘেরাটোপ ফেলেচে কেউ। পলকের মধ্যে ধুরন্ধর কুটিল পিশাচ টের পেলো যে তার চেয়েও অধিক ধূর্ত গুণীনের ফাঁদে পা দিয়েচে সে! ক্ষোভে, আক্রোশে স্বমূর্তি ধরা মাত্র কান বধির করা শব্দে কড়াৎ করে বজ্র নেমে এলো সহস্র রসনা বিস্তার করে! পিশাচ ঝুপ করে অচৈতন্য হয়ে আছড়ে পড়লো কালীপদর ঠিক সামনে।
কেউই ঠাহর করতে পারলো না কোথা থেকে কী হচ্চে, কিন্তু পিশাচটা যে কালীপদর কাছে হেরে গিয়েচে এ যাত্রা, তা অনুমান করতে কারোর দ্বিধা ছিল না। কানাই বলিষ্ঠ হাতে বজ্রসিন্দুকের ডালা খুলে ধরলো কামানের নল বসানো অবস্থাতেই। এতদিনের ভয়ঙ্কর নরঘাতক পিশাচ, গোটা দেবীগ্রামের এককালের ত্রাস লম্ববেগাকে লেঠেল কানাই অবহেলায় ইঁদুরের মতো তুলে ছুঁড়ে ফেললো সিন্দুকের ভিতরে। কালীপদ তার বুকের উপর ধাতব পাঁজরের ন্যায় হিমনিদ্রার অমোঘ অস্ত্রটা রেখে দিয়ে ডালা বন্ধ করে দিলো আরও কয়েকশত বৎসরের জন্য।
আমি এগিয়ে যেতেই কালীপদ একটু হেসে হাত নেড়ে বললো, “আহহ জ্বালালে, পিপাসা পেয়েচে। একটু জল পান করে সব বলচি।”
*****
রাতে রায়বাটীর প্রকাণ্ড ছাতে শতরঞ্জি পেতে বসেচি সকলে। কালীপদর দিকে বহু জোড়া চোখ উৎসুক হয়ে চেয়ে রয়েচে দেখে সে ধীরে ধীরে বললো, “কিছু বলার আগে আপনার কাছে একটা কথার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্চি বড়ো রায়মশায়, আপনার প্রপিতামহ ধূর্জ্জটি রায় অর্থপিশাচ ছিলেন না। আপনার বংশের সবাইই দেখচি বেশ বুদ্ধিধর। উনি ঐ কুলমন্ত্রটা না লিখে গেলে এই পিশাচটাকে কাবু করা যেতো কিনা সন্দেহ।”
বাসুদেব বিস্মিত হয়ে বললে, “আমাদের কুলমন্ত্রে কীসের সন্ধান পেলেন?”
“বলচি, কিন্তু আরেকটা কথাও বলি, একটা খুব খুব জরুরি প্রশ্ন কিন্তু দেবীগ্রামে গিয়েও আপনাদের মনে পড়েনি, কিন্তু ধূর্জ্জটি রায়ের মনে পড়েচিল। পিশাচটাকে রাজমাতা ইন্দুমতী বন্দী করার পর তার উপরে ষষ্ঠ যন্ত্র হিসেবে রাধামাধবের বিগ্রহ বসিয়ে দেন, কিন্তু তার আগে যে পিতলের দণ্ডটা বসানো থাকতো, যেটা লম্ববেগাকে কাবু করার পর রাজা সম্বুদ্ধ আর রাজা অপারশক্তি এই বজ্রসিন্দুকে এঁটে দিয়েচিলেন এবং যেটা খুলে নিয়ে বিশ্বাসঘাতক রাজবর্মার অনুচর পিশাচটাকে মুক্ত করেচিলো, ঘটনার পর সেই দণ্ডটা গেল কোথায়? সেটা তো রাধামাধব বিগ্রহের মতো লম্ববেগা চুরি করেনি, কারণ সেটা ওই নিহত অনুচরের পাশেই পাওয়া গিয়েচিলো বলেই লেখা ছিল। সেই পিতলের দণ্ডটাকেই উদ্ধার করেন ধূর্জ্জটি রায়। তিনি সম্ভবত অনেক কিছুই খোঁজ রাখতেন। পিশাচের হিমনিদ্রার কথাও জানতেন। তিনি পিশাচ সমেত রাধামাধবকে নিজের হেফাজতে নিয়ে সুরক্ষিত রেখেচিলেন। সেই সঙ্গে ভেবেচিলেন, যদি কখনও এই রাধামাধব রূপী চাবিকাঠিটা খোয়া যায় এবং পিশাচটা মুক্তি পায় তবে বিকল্প উপায় কী হবে? ধূর্জ্জটি রায় নিজের অসামান্য চাতুর্য্যের পরিচয় দিয়ে সেই পিত্তলের দণ্ড, অর্থাৎ সাবেক চাবিকাঠিটা খুঁজে বের করেন এবং সবার চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতে তার উপর নানাবিধ কাজ করিয়ে কামানের রূপ দেন। এইভাবে সবার সামনেই সেটা এতদিন পড়েচিলো।
“এবার বলি, এই যে রাধামাধবের বিগ্রহ এবং এই কামানের নলটা, এদের মধ্যে চাবিকাঠি হবার কী গুণ আছে? শুধুই কি সম-আকারের প্যাঁচ? তা হলে তো যে কোনো দণ্ডকেই একই প্যাঁচমুখ তৈরি করে চাবি হিসেবে ব্যবহার করা যায়? তা নয়, বজ্রসিন্দুকের ষষ্ঠ যন্ত্র হতে গেলে যে দুটি অব্যর্থ শর্ত পূরণ করতে হবে তা হল, সমান প্যাঁচওয়ালা মাথা এবং একটা নির্দিষ্ট ওজন। ওজনের বেশি হেরফের হলে যতই সিন্দুকে এঁটে বসুক, ভিতরের কলকবজা প্রাণ পাবে না।”
ইন্দ্র বিহ্বল হয়ে বললে, “মানে, রাধামাধবের বিগ্রহ আর এই কামানের নলটার ওজন এক? এটা কেমন করে ধরলেন?”
“ধরলাম ধূর্জটিরই লেখা কুলমন্ত্র থেকে। যত তদন্ত এগোতে লাগলো, আমার মনে ধূর্জ্জটি লোকটির প্রতি ধারণা বদলে চলেচিলো, তাই ভাবলুম এইরকম একজন মানুষ কি শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্যই কুলমন্ত্রে ওসব কথা লিখেচিলেন? তখনই অন্ধকার সরে গেল! উনি গোটা মন্ত্রে রাধামাধবের বিগ্রহর নিখুঁত ওজনটাই বুঝিয়ে গিয়েচেন ইন্দ্ৰ!
“—আধা মনে শ্রীমাধব, আধা মনে রাই, পূর্ণমনে ভর করে প্রতিষ্ঠি তাই; মাধব এবং রাধার ওজন আধ-মণ করে মোট এক মণ।
“—এক ভরির বংশী দিলা, পাঁচ ভরির চূড়া, শতেক ভরি রত্নাদিতে রহিলেক ভরা— অর্থাৎ পুরো বিগ্রহটার ওজন দাঁড়ালো এক মণ-একশো ছয় ভরি। এটাই চাবিকাঠির নিখুঁত ওজন। বহুদিনে যৎসামান্য ক্ষয় হতে পারে ধরেই হয়তো ভরির হিসাবটাও ধরা হয়েছিল। ঠিক এই ওজনই ছিল মন্দিরের কামানটারও।
“–তোমা হেন গুরু যদি থাকে কেহ হেন, রুদ্রনাদী নীলকণ্ঠ একমাত্র জেনো; এই গুরু অর্থ গুরুদেব নয়, গুরুত্ব অর্থাৎ ওজন। রাধামাধবের সমান গুরুভার যদি একমাত্র কেউ থাকে, সে হচ্চে ওই গলার কাছে ময়ূরকণ্ঠী কাজ করা নীলকণ্ঠ কামানটাই। যেটা এককালে সিন্দুকের চাবি ছিল।”
আমি হতবাক হয়ে থেকে শুষ্ক কণ্ঠে শুধালাম, “কিন্তু তুমি মানদা পিসিমাকে কী করার কথা বলচিলে যা শুনে উনি রেগে গেলেন?”
কালীপদ হেসে বললে, “রাগবেন কেন? উনিও ভীষণ ভালো অভিনয় করলেন। এই যে, সিন্দুকের মধ্যে চাবি আঁটার বিষয়টা কিন্তু যখন তখন করলেই আকাশ থেকে পিশাচের জন্য বজ্র নামবে না। গোটা বচ্ছরের মধ্যে এক এবং একমাত্র একটা সময়েই এটা করা যায়।”
“কখন?” বলরাম কইলো।
কালীপদ মুখে হাসি এনে বললো, “যখন যুদ্ধের মাঝে সন্ধি হয়। যুদ্ধবিগ্রহের মানে যদি যুদ্ধরতা দুর্গা হয় তবে তার যুদ্ধের মাঝে সন্ধি কখন হয়? সন্ধিপূজার সময়ে। তাও আবার কেবলমাত্র দুর্গাষ্টমীর সন্ধিলগ্নেই। যে নকলিকৃত নথিটায় পিশাচটার পরপর দুইবারের বন্দী হবার তারিখ লেখা ছিল বলেচিলাম, সেই দুটোই ছিল দুর্গাষ্টমীর সন্ধিক্ষণ। আমি পিসিমাকে কানে কানে বলেচিলাম আজ সন্ধি কখন লাগচে সেটা আমাকে কানেকানেই জানাতে, কিন্তু পিসিমা বোধহয় বুঝতে পেরেচিল যে এত গোপনীয়তা যখন করচি তখন পিশাচটা কাছাকাছিই ঘাপটি মেরে রয়েচে নিশ্চয়ই। পরপর দুইবার কানাকানি হলে সে সন্দেহ করবে। যা কুটিল মনের রাক্ষস, কিছুই বলা যায় না। পিসিমা ভিতর থেকে পাঁজি দেখে এসে ওইসব রাগের কথাগুলোর মধ্যে ‘অভিসন্ধি’ আর ‘সাতেপাঁচে’ শব্দদুটো দিয়েই ইঙ্গিতে জানিয়ে গেল যে আজকের সন্ধিপূজা আরম্ভ হবে ঠিক সন্ধ্যা সাতটা পাঁচে। আমি ডাক্তারের ট্যাঁকঘড়িটা এইজন্যই সঙ্গে রেখেচিলাম।”
বাসুদেব রুদ্ধস্বরে কইলো, “বাপ রে বাপ! কী ভয়ঙ্কর! কিন্তু মন্দিরের দেওয়ালে যে পিশাচটাকে চিরতরে বধের জন্য সত্যিই সিন্দুক ভাঙার কথা লেখা ছিল ঠাকুরমশায়? তাহলে ভাঙলেন না কেন?”
কালীপদ বহুদিন পর প্রাণখোলা হেসে উঠে বললে, “কারণ ততোটা পাগল আমি এখনও হইনি। শূন্য সিন্দুক ভাঙলেই যদি পিশাচটা মরতো, তবে রাজমাতা বা অপারশক্তি-সম্বুদ্ধ অত লড়াই করলেন কেন শয়তানটার সঙ্গে? সিন্দুক ভাঙলেই তো যেতো ল্যাঠা চুকে। তাছাড়া পিশাচটাকে হত্যা করা যায় না বলেই তো হিমনিদ্রার এত আয়োজন। সিন্দুক ভাঙলেই যদি বধ হয়ে যায় তবে তো কথাই ছিল না। তখনই বধ করতেন তাঁরা। আসলে নিজেকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ভাবা অপজীবরা বাকি সবাইকেই মূর্খ ভাবে। লম্ববেগারও এই অহঙ্কার ছিল। সে হতভাগা নিজেই ওসব লেখা লিখেছিল আমাকে বিপথে চালনা করার জন্য।”
“কিন্তু ঠাকুর, আপনার কবচ থাকতে সে মন্দিরে ঢুকলো কী করে?”
“কবচ আর ছিল কোথা? প্রণাম করার নাম করে ও কবচ হাত থেকে খুলে রেখে আমিই তাকে সুযোগ দিয়েছিলাম কিছু একটা ভুল করার। হতভাগাটা এতবড়ো শয়তান, আমার কবচ খুলে শেকড় বের করে আবার কী সব হাবিজাবি ভরে রেখেচে তাতে। পেটে পেটে কম শয়তানি তার? আনন্দে ডগমগ হয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে সে আসচিল সঙ্গে সঙ্গে। ভেবেচে গুণীনটাকে বোকা বানিয়ে সিন্দুকটা ভাঙাবে। আমিও তাকে তুষ্ট করার জন্য সে কথাই বলতে বলতে এলুম। যতক্ষণে সে সব টের পেলো ততক্ষণে সে ফাঁদে পড়েই গিয়েচে।”
সবাই কালীপদর কথা বলার ধরনে হেসে উঠলো, শুধু বাসুদেব বাদে। তার চোখে জল। সে আমাদের দু-জনের হাত চেপে ধরে আবেগের স্বরে বললো, “আপনারা নিজের জীবন তুচ্ছ করে আমাদের জন্য যা করলেন, আমি যতদিন জীবিত থাকবো ততদিন বিস্মৃত হবো না। কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, আমার গাঁয়ে রাধামাধবকে সকলে দেবজ্ঞানে ভক্তি করে। যদি তারা জানতে পারে যে এতদিন পূজা করা রাধামাধব আসলে একটা চাবিকাঠিমাত্র ছিল, তবে আমি তাদের মুখ দেখাতে পারবো না।”
আমি তার হাতে চাপ দিয়ে কইলাম, “কথা দিলাম, এ কথা কেউ কখনও জানবে না।”
বাসুদেব কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে চেয়ে কইলো, “আমি যেদিন জীবিত থাকবো না, সেদিন যদি আপনারা জীবিত থাকেন, তবে এ কথা কাউকে বলতে বাধা থাকবে না। আমি অনুমতি দিয়ে গেলাম ডাক্তারবাবু।”
আমরা ছাতের থেকে উঠে পড়লাম। কানাই আর ইন্দু মিলে সেই তোরঙ্গটা আবার মন্দিরের গর্ভগৃহে ঠেলে দিলে পর রাতেই মিস্ত্রি এনে বাসুদেব সেই বজ্রসিন্দুককে গেঁথে দিলো মেঝের সঙ্গে। শুধু কামানের নলটা সামান্য জেগে রইলো বৎসরে একবার তৈলস্নান করানোর জন্য। আমি ফিসফিস করে কালীপদকে কইলাম, “কিন্তু যদি সত্য সত্যই কখনও পিশাচ লম্ববেগা আবার মুক্তি পায়, তবে তাকে পরাস্ত করার বিধি ভবিষ্যতের মানুষ পাবে কোথা দাদা? ততোদিনে মানুষের বুদ্ধির ধার কেমন থাকবে, তা কে বলতে পারে? এইবারই তো হেঁয়ালির বহর দেখে ভয় পেয়ে ভেবেচিলাম পৃথিবীতে বোধহয় আর কেউই তেমনটি নাই, কিন্তু তুমি ছিলে বলেই এ যাত্রা রায়পরিবার রক্ষা পেল। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে?”
“সে চিন্তা আমারও আছে ডাক্তার। হোক তারা ভবিষ্যতের মানুষ, তাদের রক্ষার্থে আমি কিছু সংকেত, কিছু নিশানা তৈরি করে যাবো। ভবাণীর তৈরি সংসারে সে যুগেও নিশ্চয়ই এমন কেউ থাকবে যে নিজের ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়ে সে সব সংকেত ভেদ করতে পারবে? নিশ্চয়ই পারবে।” কথাটা শেষ হতেই আকাশের এ মাথা, ও মাথা জুড়ে বজ্রের রেখা চলে গেল। সেই আলোতে একপলক তাকিয়ে মনে হলো যেন আকাশজুড়ে একজন বৃদ্ধা, পরণে মহার্ঘ্য পট্টবস্ত্র আর চোখে উন্নত চাহনি নিয়ে বিজয়িনীর হাসি হেসেই আকাশের আঁধারে মিলিয়ে গেল। কালীপদ সেদিকে চেয়ে হাত জোড় করে আত্মগত স্বরে বললো, “প্রণাম রাজমাতা।”
***
