প্রথম দিবস
কালীপদ মুখুজ্জে ওরফে কালীগুণীনের তন্ত্রবিদ্যা লাভ শেষ হয়ে গুরুর আশ্রম ত্যাগের পরপরই যে কয়টি ঘটনার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন, এই ঘটনাটিও কালীপদর পক্ষে নিজের গুরুদত্ত বিদ্যা প্রয়োগ করে নিজেকে প্রমাণ করার সেই শুরুর দিকের ঘটনাগুলোরই একখানি।
মহেশখালি গাঁয়ে সেইদিন দ্বিপ্রহরে বাড়ির বাইরে বড়ো একটা কেউ বেরোয়নি। গ্রীষ্মকালের দুপুরটা যেন উত্তাপে দাউদাউ করে জ্বলচিলো সেদিন। ক-দিন ধরেই উত্তাপ যেন সহ্যের সীমানা অতিক্রম করে বয়ে চলেচে। এই গতকালও সাগরের ওইদিকের বনে দাবানল ধরে গিয়েচিলো। লোকে গাঁ থেকে রাত্তিরে তার ধুঁয়া দেখেচে। নেহাত সমুদ্দুরের পাড়ে লোনা বাতাসে আগুন বেশি মাথা তুলতে পারে না, তাই রক্ষা।
মধ্যাহ্নভোজনের পূর্বে ঘরের দাওয়া শীতল জলে মুছে, আসন বিছিয়ে, কনকনে ঠান্ডা কাঁসার কুঁজো থেকে পেতলের গেলাসে জল গড়িয়ে, খাবার বেড়েছিল রতনের মা। রতন এ বাড়ির বড়ো ছেলে। বয়স বাইশ কি তেইশ। ভারি ডানপিটে আর ছটফটে স্বভাবের ছেলে। রতনের ঠাকুরদা ভারি বড়ো মানুষ ছিলেন, কিন্তু পাকেচক্রে আজ সে বৈভবের সামান্যই রয়ে গিয়েচে। ছোটো ভাই গেনু আর রতন একত্রে আহার করতে বসলে পর তাদের মা ভিতর বাড়িতে গেলো স্বামীর ভোজনের পাত্র নিয়ে। রতনের বাপ দিবাকর কিছুদিন যাবৎ অসময়ের বসন্ত রোগে ভুগচে। তার জন্য আহারের অন্য ব্যবস্থা। রতনের বৃদ্ধা পিতামহী একখানা কাপড়ের পাড় বসানো হাতপাখা নিয়ে আপনমনে বকবক করতে করতে শীর্ণ হাতে দুই নাতির অন্নপাত্রের থেকে মাছি তাড়াচ্চে। রতনরা মুগের ডাল আর ভাজাভুজি শেষ করে সবে মাছের চচ্চড়ির দিকে হাত বাড়িয়েচে, আচমকা ‘অউমমম্ কুররাআআ’ ধরনের একখানা কর্কশ শব্দে তারা ভীষণ চমকে উঠলো। শব্দটি একেবারেই অচেনা। দাওয়া থেকে মাথা নীচু করে উঁকি মেরে চালের বাতার তলা দিয়ে চোখে পড়লো উঠানের জামগাছটায় একটা ধূসর-কালো পেঁচার মতো দেখতে কি একটা পাখি এসে বসেচে। সেই অমন বিকট আওয়াজ করে চলেচে। একটা পাখি যে এই ধরনের হতে পারে তা রতনের ধারণা ছিল না। আকারে দেড় হাতের অধিক নয়, কিন্তু তার মুখখানা দেখলে শরীরে শিহরণ উপস্থিত হয়। শৃগালের ন্যায় সূঁচালো মুখের সুমুখে কতকগুলি শুঁড়ের মতো বস্তু, পেঁচার চাইতেও বড়ো দুইখানি খাড়া কান, পায়ের আগায় তীক্ষ্ণ নখ।
“কী দেখলি রে দাদা?”, বৃদ্ধা অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে শুধোলো।
“ও কিছু না ঠামা, পেঁচায় জাম খেতে এসেচে মনে হয়”— বলে রতন আহারে মন দিলো।
বৃদ্ধা বয়সের ভারে অধিক কথা কয়। এই কারণে তাঁকে বকাঝকাও শুনতে হয় বিস্তর। তবুও সে নাতিকে উদ্বিগ্নভাবে পুনরায়ঃ জিজ্ঞাসা করলে—”ও লক্ষ্মী দাদা, জাম খাচ্চে তুই দেখলি পষ্ট?”
রতন বিরক্ত হয়ে উত্তর করলে, “এই তোমার শুরু হলো ঠামা, অতগুনো ফলের মধ্যে এক আধটা খেলে তোমার জাম কিছু কম পড়বে না। এইবার খেতে দাও, পাখাটা নাড়ো এইদিকে।”
পাখিটা আবার রুক্ষ স্বরে ডেকে উঠলো, “অউমমম্ কুররাআআ”
*****
অপরাহ্নে অতিবৃদ্ধ ভট্চায মশায় নিজের মেটে বাড়ির পিছনের দিকে ফাঁকা জমিতে বসে হরিনাম করচিলো। অদূরে মালতীর মা আলুগাছের পাতায় হলুদ গুঁড়া ছিটাচ্চে। এইবার যা তাপ শুরু হয়েচে, তাতে খরা না শুরু হয়। এই আলুগাছগুলা একমাত্র খরা রোধ করতে পারে। ভট্চায ঠাকুরের বয়সের গাছপাথর নাই। লোকে বলে অন্ততঃ একশত বৎসর হয়েচে, আর ভট্চায নিজে বলে, “আমার পোড়া বয়সের হিসেব কে করে বাছা। একে একে সবাই গেল, মুখপোড়া যম আমায় ভুলে রয়েচে।”
এই মালতীর মা আট বৎসর পূর্বে সুন্দরবনের সেই কুখ্যাত মহাবন্যায় নিজের শাঁখা-নোয়া, আর কন্যাকে বিসর্জন দিয়ে, গাঁয়ের লোকের পরামর্শে এই বৃদ্ধের পরিচর্যায় নিযুক্ত। বুড়ার কিছু কিছু ব্রহ্মস্ব জমিজিরেত রয়েচে, তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে দুইটি মুখের সংস্থান হয়ে যায় কোনোক্রমে। এমন সময়ে বাড়ির সামনের দিক থেকে মেয়েমানুষের কণ্ঠ শোনা গেলো, “ঠাকুর বাড়ি আছেন কি?
ভট্চায লোলচর্ম কপাল কুঞ্চিত করে কইলো, “কে ও? সুধা নাকি?”
“না ঠাকুরমশায়, আমি। লক্ষ্মীমণি।”
বাড়ির গা ঘেঁষা পথের দাগ ধরে বাড়ির পিছনদিকে পেয়ারা ডালের যষ্টি হাতে এসে দাঁড়ালো এক বৃদ্ধা। রতনের ঠাকুরমা।
“আরে এসো এসো বউমা, সব কেমন কুশল তো?”
ভট্চাযের একটু তফাতে মাটির উপর অতি কষ্টে বসলো বৃদ্ধা। মালতীর মা এই বুড়ীকে ভারী পছন্দ করে। হাতের হলুদ গুঁড়া বসনপ্রান্তে মুছে নিয়ে সে তাড়াতাড়ি ভিতরে গেলো পানের ডিবে আনতে। বৃদ্ধ ভট্চায ক্ষয়াটে চক্ষে কিছু সময় চেয়ে থেকে বললে, “নাহ্, আজ যেন বৌমার মনটা ভালো নাই বলেই ঠেকচে। দিবাকরের শরীরটে কি….
বৃদ্ধা লক্ষ্মী একটা নিঃশ্বাস ফেলে কইলো, “না ঠাকুর, খোকার আমার মা শেতলার রোগ আর জ্বরটা একটু ছেড়েচে কাল। আজ চাট্টিখানি খেয়েচে। সে জন্য নয়।”
“তবে উদ্বেগ কীসের মা? বুড়ো বাপকে কইবি নে?”
লক্ষ্মীমণি মাথা তুলে মালতীর আসার পথটা একবার দেখে নিয়ে নীচু, শঙ্কিত স্বরে বললে, “ঠাকুর, আজ দুপুরে যমকুইলা পাখি ডেকেচে।”
ভট্চাযের ন্যুব্জ শরীর এক ধাক্কায় কেঁপে উঠলো। ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে লক্ষ্মীমণির দিকে চেয়ে বলে উঠলো, “ওরে হতভাগী! এ কি বলচিস তুই! হা মধুসূদন! তুই দেখেচিস যেন বেশ করে নিজের চোখে?”
“না ঠাকুর, আমি দেখিনি, রতন দেখেচে। বললে, পেঁচার মতো দেখতে একটা পাখি ফল খাচ্চে আর অমন করে ডাকচে।”
বৃদ্ধ আশ্বস্তভাবে বললে, “তাই তবে বল মা, নিজে দেখিসনি। হতেও তো পারে ওখানা সত্য সত্যই পেঁচা ছিল। বল, পারে না?”
লক্ষ্মী দৃঢ়ভাবে ঘাড় নেড়ে বললো, “না, পারে না। আমি যে ওই সর্বনাশা ডাক চিনি বাবা ঠাকুর। ও স্বর আমি ভুলি কেমনে? সেই কবে শুনেচি, ওই রাক্ষুসে ডাক আমার বাপ, মা-রে খেয়েচে, গাঁয়ের কত লোককে খেয়েচে, ও সুর আমি ভুলবো? আর পেঁচা কখনও নাকি দিনের বেলা ফল ঠোকরাতে বেরোয়?”
বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ সাময়িক আশ্বস্ত হয়েচিলো, কিন্তু এইবার তার মুখ থেকে স্বস্তির ভাব সম্পূর্ণ তিরোহিত হল। বিস্ফারিত ঘোলাটে নজরে দূরের জঙ্গলের গাছগুলির চূড়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললে, “যমকুইলা পাখি ডেকেচে! কত বৎসর ঘুমিয়ে থেকে আবার সেই রাক্ষস বুঝি জেগেচে। যমকুইলা ডেকেচে মানে নিশ্চিত কারুর আয়ু ফুরিয়েচে। মৃত্যু তাকে ডাকচে। এই পাখি যাকে ছোঁ মারে, তার তৎক্ষণাৎ মরণ উপস্থিত হয়। যেমন তেমন মরণ নয়, বড়ো ভয়ঙ্কর মরণ। তার মানে বৌমা, কালাডোংরার বনের সেই রাক্ষসও আবার জেগেচে। হা ঈশ্বর!”
*****
মহেশখালী গাঁ যেইখেনে নিজের সীমানা শেষ করেচে, সেইখান থেকে শুরু করে একেবারে সেই সাগরের পাড় অবধি ছড়িয়ে রয়েচে একটি বিশাল বন। কালাডোংরার বন। এমনিতে গাঁয়ের লোকেরা একদম যে এ জঙ্গলে প্রবেশ করে না তা নয়, তবে তা অতি সামান্য অংশ। বিরাট মহাবনের বিস্তৃত অংশ কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সকলেই এড়িয়ে চলে। বয়োঃজ্যেষ্ঠরা তো নয়ই, অল্প বয়সীরাও কেউ সেই দিকে চলাচল করে না। তাদের কেবলমাত্র বলা হয় জঙ্গলে ‘ভয়’ রয়েচে, কিন্তু কে রয়েচে তা বলা হয় না। এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ নাই। এই বনে ঢুকলেই কেন যেন একটা অসোয়াস্তি, একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। ভয় জাগে। মূলতঃ এই কারণেই মানুষ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে কালাডোংরাকে। এখন মহেশখালি, সন্দেশখালি, বেতোয়া আর তার আশপাশের গাঁ-গুলিতে যারা বয়স্থ ব্যক্তি রয়েচেন, তারা কিন্তু এই বনকে ভয় করে অন্য কারণে। পুরুষানুক্রমে কথিত রয়েচে এই বনের একেবারে ভিতরে এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস বাস করে। বাঘ নয়, তার নাম কালাডোংরার শয়তান। সেই অপদেবতা বহু বৎসর পরপর জেগে ওঠে, আর গোটা এলাকাকে তার শিকারের বধ্যভূমি বানিয়ে ছাড়ে।
এরা যখন অনেক ছোটো ছিল তখনও এমনই একখানা ঘটনা ঘটেচিলো, এ তাদের স্বচক্ষে দেখা। এখনকার ছেলেপিলেরা সেইসব কথা মোটেও জানে না, কাজেই তাদের ভয়টা কিছু কম, কিন্তু নিয়তির ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। এইবার তাদেরও সব চাক্ষুষ দেখার দিন এগিয়ে এল, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক ভয়াবহ আতঙ্কের সাক্ষী হিসেবে। এই কালাডোংরার রাক্ষুসে দানবের সাথে সেই যাত্রা কি হয়েচিলো সেই কথাই তোমাদের বলবো।
গ্রামে একটা শোরগোল পড়ে গেল। ভট্চায বামুন, রতনের ঠাকুরমা আরও যারা গাঁয়ের প্রাচীন ব্যক্তি রয়েচেন, তারা ঘুরে ঘুরে একে ওকে বলতে থাকলো, “তোমরা বেশ সাবধানে থেকো বাছা, রাতভিতে আর একলা বার হয়ো না, গাঁয়ে বড়ো খারাপ সময় নামচে। যমকুইলা পাখি ডেকেচে। এ বড়ো সব্বনেশে লক্ষণ। গাঁয়ে অপঘাত মৃত্যু নামতে চলেচে।”
কেউ কেউ ভীত হয়ে তাদের কথা মেনে নিলো, কেউ হেসে উড়িয়ে দিলে, কেউ বা গাল দিলো। রতন প্রথমে ভারী বিরক্ত হয়ে ঠাকুরমাকে ধমক দিতে গিয়ে আবিষ্কার করলো, পরিস্থিতি বদলে গিয়েচে। এতদিন সকলের ধমক ধামক খেয়ে কুঁকড়ে যাওয়া বৃদ্ধা হঠাৎ যেন পালটে গিয়েচে। রতন কিছু একটা বলতে গেলে পর লক্ষ্মীমণি স্থির চক্ষে নাতির দিকে চেয়ে কইলো, “দাদুভাই, তোমরা যেইটে আমার থেকে ভালো বোঝো, সেইটে নিয়ে আমি কিন্তু কক্ষণও তর্ক-বিতর্ক করিনে। এক্ষণে আমি যেইটা ভালো বুঝি সেই কথাও তোমাদের শোনা উচিত। নয় কি? যা বোঝো না দাদু, তা নিয়ে অযথা আমাকে হেয় কোরো না। বড়ো বিপদ নামচে গাঁয়ে।”
রতন কিন্তু ঘরকুনো শান্ত ছেলে নয়। রীতিমতো ডাকাবুকো এবং ছটফটে স্বভাব তার। আরেকটি কথা সে সযত্নে সকলের কাছ থেকে লুকিয়ে এসেচে। অলস মধ্যাহ্নে সকলে যখন দিবানিদ্রার সুখে মগ্ন রয়, রতন সেই সুযোগে বহুবার ঢুঁ মেরেচে কালাডোংরার বনে। প্রথম প্রথম পথ হারাতো, কিন্তু ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে গিয়েচে এই জটিল ভয়াল মহাবনের পথঘাটের সাথে। নানান ফলফলাদির গাছে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েচে সে পথ। বহু যুগ ধরে মানুষের পা পড়েনি সে রাস্তায়, ফলে প্রকৃতির বুক থেকে তার সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারেনি কেউ। এই স্থান রতনের নিজস্ব বনের একেবারে দক্ষিণে একটি স্থান সামান্য মুক্ত। সেইখানে বহুকালের প্রাচীন, জরাজীর্ণ একখানা মন্দির। তার ভিতরে কীসের বিগ্রহ রয়েচে রতন জানে না, কারণ সে কখনও ভিতরে ঢোকার তাগিদ অনুভব করেনি, এবং মন্দিরের আশপাশে যেটুকু রয়েচে, তার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে প্রবেশ করা মানুষের অসাধ্য। মন্দিরের সুমুখে প্রাচীন কালের পাথরের পরী, শান বাঁধানো ছোট্ট পুকুর, প্রস্তর নির্মিত বিরাট বিরাট ভগ্ন কলস, খিলান, দেউড়ি, সব অত্যন্ত জরাজীর্ণ দশায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েচে।
এই নিভৃত স্থানে বসে বসে রতন আকাশকুসুম কল্পনার জাল বোনে। সে একদিন হিউয়েন সাং-এর মতো মস্ত পরিব্রাজক হবে। দেশবিদেশ ঘুরে ঘুরে নানান রহস্যের মুখোমুখি হবে। এ তার জীবনের অতি অসম্ভব স্বপ্ন। গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালির গৃহে এমন কল্পনা স্পর্ধা বৈকি। বিকেল গড়ানোর পূর্বে আবার গুটিগুটি ফিরে আসে বাস্তবের গণ্ডীতে, তার গাঁয়ে।
*****
বোশেখের মাঝামাঝি মহেশখালির পীরফকিরার মাঠে ওলাংমারার মেলা বসে। ওলাংমারা এই এলাকার লৌকিক দেবতা। লোকে কয়, তিনি চতুর্দ্দিকে ঘুরে ঘুরে জঙ্গলের উপর নজর রাখেন, আর্তকে রক্ষা করেন। এই মেলায় বহু লোক উপস্থিত হয়, দেবতার অর্চনা, আবাহন করা হয়। তা, সেইদিন ছিল মেলার দ্বিতীয় দিন। ওলাংমারার আবাহনের পর খিচুড়ি বিতরণ চলেচে, কেনাবেচা চলেচে, হঠাৎ কয়েকজন লক্ষ্য করল অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ অদ্ভুতভাবে যেন একটু তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামচে ভালো করে খেয়াল করার পর নজরে এল, মুহূর্তের মধ্যে ওঠা ঘন কৃষ্ণবর্ণ মেঘের রাশি চতুর্দিক থেকে উড়ে এসে বিকেলের আকাশকে আবৃত করে ফেলেচে। পুরোহিত দীনে মুখুজ্জে মন্দিরের মাথার ঝুপসী অশ্বত্থ গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশের পানে চেয়ে ধীরে ধীরে বললে, “আশ্চর্য তো! এই তো এক লহমা আগেও আকাশ পরিষ্কার দেখলুম যেন! এত মেঘ করল কখন?”
“না না ঠাকুরমশায়, এই চোত বোশেখে তো কালাঝড় হবেই। যা গরমখানা…”
পুরোহিত চিন্তিত স্বরে উত্তর করলে, “সে হলে তো ভালোই অশ্বিনী, কিন্তু কালবোশেখে চিরকাল দেখেচি হোই সাগরের দিক থেকে মেঘ উড়ে আসে এদিকপানে, কিন্তু আজ দেখলে চেয়ে? চারদিক থেকে মেঘ এসে জুটলো। এমনটি হবার কথা নয় হে।”
অশ্বিনী কবিরাজ সহাস্যে বললে, “ও কোনো কথাই নয় ঠাকুর, আপনি অযথাই দুশ্চিন্তা করচেন। তাছাড়া আমরা কম করে অন্ততঃ শ-দুয়েক….”
বৃদ্ধ দীনে পুরোহিত সবেগে মাথা নেড়ে কইলো, “না না না বাছা, এ কোনো কাজের কথা নয়। চারদিক থেকে মেঘ ঘিরে আসা অমঙ্গলের লক্ষণ তা জানো না? আমার ঠাকুরদাদা বলতেন, ‘সবসময় স্থানলক্ষণ খেয়াল করতে হয়। মেঘ যখন একদিকের থেকে ঘিরে আসে, তবে ঝড়বৃষ্টি হয়। যদি ঈশান কোণের থেকে ছুটে আসে, তবে প্রলয়ংকরী দূর্যোগ হয়, আর যদি চারদিক থেকে সমানভাবে অতর্কিতে ঘনিয়ে আসে, তবে নির্ঘাৎ বুঝবে কোনো ভয়ঙ্কর অপশক্তি কাছে পিঠেই ওৎ পেতে রয়েচে। তাকে আড়াল করার জন্যই তেমন মেঘখানা জন্ম নেয়।’ আমার চক্ষের জ্যোতি হ্রস্ব হয়ে এসেচে, একটু দেখো তো অশ্বিনী, ওইপারের ওই যে গাঙের দিকের বনের গাছপালাগুলো বড়ো নড়চে বলেই মনে হলো!”
বৃদ্ধের এমন বাতুল আচরণ ইতিপূর্বে কেউ দেখেনি। অশ্বিনীর মুখ থেকে বিস্ময়ে বাক্যস্ফূরণ হলো না। সে কপালে হাতের চেটো ঠেকিয়ে মেলার মাঠের গুটিকয়েক গাছ পেরিয়ে দূরে নজর করলো সমুদ্রের দিকের কালাডোংরা বনের চূড়ায়।
হ্যাঁ। গাছগুলো সত্যিই নড়চে। পাগলের মতো দুলে চলেচে। তবে তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো ঐদিকে বেশ রকম হাওয়া হচ্চে, কিম্বা হয়তো দণ্ডী চলচে। সোঁদরবনের অনেক রহস্যের মধ্যে এটিও একটি। এই মহাবনে যাঁরা কখনও থেকেচেন তাঁরা জানেন, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিকেলের দিকে সুন্দরবনের জঙ্গলে একরকম গরমের হলকা বাতাস সবেগে সাগরের দিকে ছুটে চলে। কেউ বলে, এই সময়ে সোঁদরবনের সমস্ত বাঘের দল একজোট হয়ে বনবিবিকে প্রণাম জানায়। একে বাঘসাট বলে। তাদের সম্মিলিত উষ্ণ নিঃশ্বাসই নাকি এই ঝড়ের কারণ। যা-ই হোক, অশ্বিনী গাছগুলিকে ভারাক্রান্তের ন্যায় দুলতে দেখেও তত অবাক হলো না।
মেঘের আড়ম্বর লক্ষ্য করে দলে দলে লোকেরা গাঁয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করেচে ইতিমধ্যে। সকলের মনে বড়ো আনন্দ। এতদিন পরে বাদলা রাতে স্বস্তির সঙ্গে নিদ্রা হবে। জলা শীতল বাতাস বইতে শুরু করেচে। তুষারের কুচির মতো সিক্ত ঠান্ডা বাতাস এসে লাগচে চোখেমুখে। অশ্বিনী তাড়া দিয়ে বললে, “একটু শীঘ্র করুন ঠাকুর, গতিক ভালো নয়। একবার বাদলা নামলে বাড়ি ফেরার না রাম না গঙ্গা। লোকজন সবই যেতে আরম্ভ করেচে। একটু পরেই পুরো মাঠ…”
অশ্বিনীর কথা শেষ হবার পূর্বেই গোটা মাঠ জুড়ে আচমকা ভীষণ ঝড় উঠলো। খোলা মাঠের ধূলায় দশদিক অন্ধকার হয়ে এলো। মাঠ ততক্ষণে প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েচে, কেবল মন্দিরের সামনের চাতালে জনা চারেক মানুষ আর পুরোহিত। দীননাথ মুখুজ্জে প্রাণপণ ওলাংমারার বিসর্জনের মন্তর আউড়ে চলেচে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনায় অশ্বিনী চমকে উঠলো।
মাঠের মাঝখানের বড়ো বটগাছটা সহসা মড়মড় করে দুলে উঠলো। ঝড়ের দোলা ঠিক নয়, যেন বিরাট কিছু একটা সজোরে ওটার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোথাও থেকে, এবং তার এক মুহূর্ত পরেই মন্দিরের চূড়ার অশ্বত্থ গাছের ডালপালা হুড়মুড়িয়ে ঝুঁকে পড়লো। কোনো একটা অসীম শক্তিধর প্রাণী যেন এক লাফে গাছের উপর এসে পড়লো। চাতালের মানুষগুলি হাওয়ার দাপটে এবং আতঙ্কে মাটিতে বসে পড়লো এবং অশ্বিনী এই ঘন প্রলয়কারী অন্ধকার ভেদ করে যেটুকু আবছা আবছা দেখতে পেলো তাতে তার শরীরের সমস্ত রক্ত হিমশীতল হয়ে এলো।
বৃদ্ধ পুরোহিত সবেমাত্তর চামরখানা আনবার জন্য উঠেচে, হঠাৎ তার ঘাড়ের উপরে এসে বিদ্যুৎবেগে ছোঁ মারল একখানা ধূসর পেঁচার মতো দেখতে ভয়ানক পাখি। তার বাঁকা সুতীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে বিপ্রর ঘাড়ের থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্চে। বৃদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে সহসা নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে ভূমিতে পড়ে গেলো। এইবার অশ্বিনীর চোখ উপর দিকে ফিরলো। গাছের উপরে কি বা কে রয়েচে তা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ডালপালার স্তূপ ভেদ করে গাছের অন্ধকারের ফাঁক দিয়ে দু-খানি বৃহদাকার আধুলির ন্যায় আগুন ধক্কক্ করচে, অথচ কোনো শরীর চোখে পড়চে না। কিছু বুঝে উঠবার পূর্বেই গাছের উপর থেকে একটা তীব্র শিষের মতো শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে পেঁচার মতো হিংস্র পাখিটা আকাশে একবার অর্ধচন্দ্রাকার হয়ে পাক খেয়ে মাটিতে সবেগে আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে গেল। সেদিক থেকে পুনরায়ঃ নজর ঘুরতেই সকলে লক্ষ্য করল, বৃদ্ধের শরীর মন্দিরে নাই। গাছের মগডালে একটা ঝটপটির শব্দ, একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ আর তারপরেই একটা ভারী বস্তু পতনের আওয়াজ কানে আসা মাত্র একটা কানফাটানো শব্দের অভিঘাতে সকলে নিজের কান চেপে ধরলো। ঠিক শব্দ নয়, একটা চাপা তীব্র শব্দের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। একটানা, একঘেয়ে একটা তীক্ষ্ণ রেশ যা মানুষকে পাগল করে তোলে, আর সঙ্গে সঙ্গে ফের গাছটা হুড়মুড়িয়ে দুলে উঠলো। ঘোর কালো আকাশের বক্ষ বিদীর্ণ করে আরও অনেক বেশি কালো বর্ণের বিরাট একটা ছায়ার মতো কি যেন উড়ে গেলো। একটু পরেই ঝড়ের দাপট স্তিমিত হয়ে এল। ভীত মানুষগুলি কাঁপতে কাঁপতে উঠে একটু তাকাতেই ভীষণ ভয়ে কুঁকড়ে গেল। মন্দিরের পূজার স্থানে দীননাথ মুখুজ্জের মৃতদেহ পড়ে রয়েচে। তার ক্ষীণ শরীরটি রক্তশূন্য অবস্থায় দুমড়ে মুচড়ে বিবর্ণ হয়ে পড়ে রয়েচে। মুখের কষ বেয়ে ফেনা বেরুচ্চে। হাড়ের কাঠামোর গায়ে চামড়াটুকু বিবর্ণ হয়ে জড়িয়ে রয়েচে মাত্র। পুরো চত্বরে একবিন্দু রক্ত পড়েনি। কেউ যেন নিঃশেষে সবটুকু রক্ত আগ্রাসে শুষে খেয়েচে। নারায়ণ স্মরণ করে ভয়ার্ত দলটা এলোমেলো পায়ে দৌড় দিলো গাঁয়ের পানে। পলায়নরত অবস্থাতেও পিছনে একটা হুড়মুড় শব্দ শুনে অশ্বিনী পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলে, পাখিটা যেইখেনে আছড়ে পড়েচিলো, সেইখান থেকে মাটির বুক চিরে মাথা তুলচে একখানা প্রকাণ্ড বৃক্ষ। মুহূর্তে মুহূর্তে তার ডালপালা বাড়ছে হুহু করে। অশ্বিনী ভীষণ আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আবার
দৌড়াতে আরম্ভ করলো।
* * * * *
সকালে গাঁয়ের কিছু সাহসী লোকজন এসে ভয়ে ভয়ে ব্রাহ্মণের লাশ নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিলো। প্রত্যক্ষদর্শীরা যতই বলুক, গ্রামবাসীরা কিন্তু বিকেলের ওই অবিশ্বাস্য ব্যাখ্যা বিশ্বাস করলো না। গাঁয়ের এক মুরুব্বি হরিকিঙ্কর বললে, “ঘটনা বড়ো বেদনাদায়ক বাছা, কিন্তু তবুও বলি, তোমরা যখন ছিলেই হোথা তখন একটু সাহস করে তো দেখতে পারতে ব্যাপারখানা। তোমরাও অমনি ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেলে বলে কিছুই জানা গেল না।”
জবাব অশ্বিনীর মুখে চলেই এসেচিলো, কিন্তু নিজেকে সংযত করলো সে। গতকাল হরিকিঙ্করও মেলায় ছিল। ঝড়বৃষ্টি শুরু হতেই পলায়মান দলগুলোর সঙ্গে পালিয়ে এসেচিলো এই হতভাগা, আর আজ সে এসেচে সাহসের কথা কইতে। আশ্চর্য বটে। অশ্বিনী উত্তর দিলে, “না খুড়ো, দেখার অনুকূল পরিস্থিতি তখন ছিল না। চতুর্দিকে আঁধার আর ঝড়। তবুও আমরা মাটি কামড়ে পড়েচিলাম। আর দশজনের মতো পালাইনি। কিন্তু পরিষ্কারভাবে কিছুই দেখতে পাইনি।”
ঢেলা মৌচাকেই পড়েচে। হরিকিঙ্কর একটু অপ্রতিভ হয়ে কইলো, “আহা, তা নয়। আসলে কথা হলো এইধরনের কথা কখনও শুনেচি কি আমরা? অমন কোনো জন্তু কোথায় এইদিকে? বলি, জঙ্গল পেরিয়ে আবার…”
“না খুড়ো, বাঘ নয়। আরও বহুগুণ ভয়ঙ্কর কিছু। বাঘ নাকি কখনও ঐভাবে না কামড়ে কেবল রক্ত শুষে খায়? কেউ শুনেচে এদিগড়ে এমন কথা? প্রমাণ আরও বাকি রয়েচে। গতকাল ও মেলার পরব ছিল, কিন্তু কাল অবধি মন্দিরের চূড়োর গাছটি ব্যতীত কাছাকাছি অপর কোনো বড়ো গাছ ছিল না, কিন্তু আজ রয়েচে! ভীষণ দর্শন একখানা বিশাল বৃক্ষ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে সেই ভূমিতে। কলসের ন্যায় স্কুল গুঁড়ির উপরে প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ হাত দীর্ঘ এক কৃষ্ণবর্ণ গাছ। তার কাণ্ডের গায়ে তীক্ষ্ণ কাঁটার সারি। মগডালে দুইখানি বৃহৎ শাখা পাখনার মতো দুইদিকে বহুদূর নিজেকে বিস্তার করেচে। সে বৃক্ষের পানে একটিবার চেয়ে দেখলেই মনে শঙ্কা উপস্থিত হয়। সেই ভয়াল মহীরুহের দিকে তাকালে মনে হয় সেই গাছ যেন হিংস্র বধেচ্ছা নিয়ে চারদিকে নজর করচে।”
উপস্থিত একজনও এ কথার প্রতিবাদ করতে পারলে না। সকলের চিত্তেই প্রবল ধন্ধ উপস্থিত হয়েচিলো। এক জোঁক ছাড়া অপর কোনো প্রাণী এমন নিপুণভাবে রক্ত নিঃশেষে শুষে নিতে পারে না, কিন্তু জোঁকের পক্ষেও একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সবটুকু রক্ত পান করতে বহু সময় লাগে। একটি দুইটি পোকার কর্ম নয়। দীননাথের শরীরে রক্তের একটি বিন্দুও যে বাকি ছিল না, তা মৃতদেহ একটিবার দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। মোট কথা, এই অদ্ভুত হত্যাকাণ্ড অথবা দূর্ঘটনার কোনো সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যা মিললো না। সকলেই নিজেদের মধ্যে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য আলোচনা করতে করতে গৃহাভিমুখে হাঁটা দিলো, কেবল রতনের ঠাকুরমা পাথরের ন্যায় কঠিন চক্ষে অপসৃয়মান ভিড়ের দিকে চেয়ে রইলো। তার দুই চোখের কোলে তপ্ত অশ্রু, কিন্তু মনে আশঙ্কার ঝড়। তার সাবধানবাণী সত্ত্বেও বেশিরভাগ গ্রামবাসী তাদের বিশ্বাস করেনি। কালাডোংরার ভয়ঙ্কর অপদেবতার ঘুম ভেঙেচে। কারুর পরিত্রাণ নাই।
*****
দ্বিতীয় হত্যাটা হবার পর কিন্তু এই অবিশ্বাসের ছিটেফোঁটাও আর থাকলো না। সাতকড়ি ঘোষ বয়সজনিত কারণে আর গোরুবাছুর চরাতে যেতে পারে না বলে তার পুত্র পাঁচু এই কাজটি করে থাকে। তা, সেইদিন পাঁচুর ধুম জ্বর দেখা দিলো। রাত্তিরে শুরু হয়ে বেলা গড়াতেই কাঁপুনি দেখা দিলে পর সাতকড়ি তার দশ বৎসরের নাতির সঙ্গে গোচারণে বের হলো। যেইখেনে সাতকড়ি ঘোষ মারা পড়েচিলো সেই গোচারণের ভূমিটি আমি দুই একবার দেখেচি, কিন্তু তোমরা তো দেখোনি, তাই একটু জানা প্রয়োজন। ভূমিটি কিন্তু ফাঁকা মাঠ বা চারণযোগ্য ভূমি ঠিক নয়। জঙ্গলের সামান্য ভিতরে প্রবেশ করে চতুপাশে বৃক্ষ ঘেরা কিছুটা ফাঁকা স্থান পড়ে, যেন গাছে ঘেরা একখানা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। মাঝে দুই তিনখানি বট, কাঁটাল আর বকুল গাছকে বাদ দিলে আর কোনো গাছ নাই। একে গাঁয়ের লোকেরা কয় গাইবান্ধার মাঠ। মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু জলা জমির কারণে এই তল্লাটে পর্যাপ্ত সুমিষ্ট ঘাস, উলু, কসাড়, কচু, কলমী, শুষনি জন্মে। গবাদি পশুকে এইখানে ছেড়ে দিলে তারা গোটা এলাকা আপনিই ঘুরে ঘুরে খাবার আর জল খায়।
সাতকড়ি একটি কাঁটাল গাছের মোটা গুঁড়ির আড়ালে শীতল ছায়ায় ঠাঁই
করে বসলো। রোদ্দুর এখনও পুরোপুরি পড়ে যায়নি। বেশ গরম রয়েচে। তার নাতি তিনু এদিকে সেদিকে ছুটোছুটি করে দু-খানা গোবৎস্যের সঙ্গে খেলচে। সাতকড়ির চক্ষু শ্রান্তিতে মুদ্রিত হয়ে এসেচিলো, হঠাৎ চোখ মেলতেই সে ভয়ানক বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করল গোধূলির আকাশ ভীষণ ঘন মেঘে ঢাকা পড়েছে। এত সামান্য সময়ে এতখানি ঘনঘটা কীভাবে সম্ভব? আরও কথা রয়েচে, এতখানি মেঘ করা সত্ত্বেও প্রকৃতির উত্তাপ কিন্তু বিন্দুমাত্রও হ্রস্ব হয়নি। এ যেন ঠিক মেঘ নয়, কোনো অশুভ বিষবাষ্পে যেন দশদিক আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে! তার অতি দুরন্ত
নাতিটিও এই আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনে যথেষ্ট অবাক হয়েচে। সে খেলা থামিয়ে কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে চেয়ে রয়েচে। সাতকড়ি বৃক্ষান্তরাল ছেড়ে বেরিয়ে এলো। গোরুগুলি ঘাস খাওয়া ছেড়ে সব গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়িয়েচে আর চারদিকে ভয়মিশ্রিত চোখে উঁকি ঝুঁকি মারচে। তিনু একটু এগিয়ে এসে চাপা গলায় কইলো, “দাদাই, ভয় করচে।” সাতকড়ি একবার চারদিকটা দেখে নিয়ে বললে, “এইদিকে চলে আসো দাদুভাই।”
তিনু দুই পা যেই এগিয়েচে, অকস্মাৎ জঙ্গলের ধারের একটি গাছ ভীষণ জোরে দুলে উঠলো। সাতকড়ি ইষ্ট স্মরণ করে নাতির দিকে এগোতে যাওয়া মাত্র আরেকখানা হুটোপুটির শব্দ উত্থিত হয়ে মাথার উপরের কাঁটাল গাছে কিছু একটা ভীষণ গুরুভার প্রাণী এসে বসল। কয়েকখানা পাকা ফল গাছের থেকে নীচে এসে পড়ল। চারিদিকে আরও আঁধার চেপে বসেচে, গাছের উপরে পরিষ্কার কিছুই চোখে পড়ছে না, কিন্তু হা ঈশ্বর! পাতার আড়ালে ওইটে কী!
দুর্বল চোখের জ্যোতি সত্ত্বেও বৃদ্ধের নজরে এলো এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। গাছের উপরে দুইখানি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় আগুন যেন ধিকিধিকি করে জ্বলচে, আর একখানি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ লম্বা হাত নেমে আসচে তাকেই লক্ষবস্তু স্থির করে! সাতকড়ি অশক্ত শরীরেও ভয়ানক জোরে একটা লাফ দিয়ে ছিটকে এলো কিছুটা, আর সামান্য সময়ের ব্যবধানেই সে দেখলে তার ক্ষণ পূর্বের সেই দাঁড়িয়ে থাকার স্থানটিতে একখানা বিরাট কুচকুচে কালো হাত নেমে এসে খাবলা দিয়ে কিছু একটা যেন ধরতে চেষ্টা করল। হাত যারই হোক, সে সাতকড়ির সরে আসার ফলে লক্ষভ্রষ্ট হয়েচে। সেই সর্বনাশা হাত আবার উপরে উঠে গিয়ে পুনর্বার ঝাঁপিয়ে পড়লো। সাতকড়ি হাঁচোড়-পাঁচড় করে পালাতে গিয়ে দুই পা এগিয়েই মাটিতে আছড়ে পড়ল এবং ভীষণ আতঙ্কে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, তার থেকে ঠিক তিন চার হাত দূরেই মাটিতে এসে বিঁধলো সেই দানবীয় হাতের তীক্ষ্ণ নখ। ঠিক মানুষের মতো হাত নয়, বরং যেন বাঘের থাবার মতো একটা কিছু কালো চামড়ার পর্দায় মোড়া। তিনু বাছুরের আড়ালে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সাতকড়ি এইটেই ভয় করচিলো এতক্ষণ। কান্নার শব্দ পেয়ে ঐ অদেখা শয়তান তার নাতিকে লক্ষ্য করে বসবে হয়তো এইবার। এই আশঙ্কায় সাতকড়ি ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার হাঁটু, কাঁখ, পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্চে, হাত পায়ের ছালচামড়া উঠে গিয়েচে স্থানে স্থানে। বৃদ্ধ দৌড়ে এসে নাতির হাত ধরে কইলো, “পালাও দাদুভাই, দৌড়াও।” হাত ধরাধরি করে নাতি আর দাদু এলোমেলো দৌড়ানো আরম্ভ করলো, সঙ্গে গবাদি পশুগুলো। সাতকড়ি প্রাণপণ দৌড়াতে দৌড়াতেও সভয়ে খেয়াল করলো তাদের পিছনে পিছনে সেই বুভুক্ষু মৃত্যুর থাবা থেকে থেকেই এখানে ওখানে নেমে আসচে। কখনও গোরুবাছুরের গায়ে এসে বিধচে তার নখ, কখনও ঘাসমাটিতে লকলকে বিদ্যুতের ন্যায় আঘাত করচে। জলাজমিগুলোকে বাঁয়ে ফেলে যখন তারা জঙ্গলের সীমান্তের কাছে প্রায় পৌঁছে গিয়েচে, আচমকা পিলে চমকানো একখানা ভয়ানক আওয়াজে দুইজনেই আঁতকে উঠল।
‘অঅউউমমম্ কুররাআআআ’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাতকড়ির মাথায় প্রবল বেগে ছোঁ মারলো একটা পেঁচার মতো পাখি। তার নখরাঘাতে ঘাড়ের কাছে চিরে যাওয়া মাত্ৰ সাতকড়ির চক্ষের সুমুখে সব আঁধার হয়ে এল। একমুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে জীবনীশক্তির অন্তিম সঞ্চয়টুকু প্রয়োগ করে বৃদ্ধ তিনুর দিকে চেয়ে হাত নেড়ে কইলো, “থেমো না দাদুভাই, দৌড়াওওও।”
সাতকড়ির আশপাশে কোনো বড়ো গাছ ছিল না, কিন্তু পাখিটা আছাড় খেয়ে পড়ে মরামাত্র তার মৃতদেহের স্থানে মাথা তুলেচে এক ভয়ঙ্কর দর্শন গাছ। তার গুঁড়িতে একখানা বড়ো কোটর রয়েচে। সেইখেনে একবার সেঁধুতে পারলে এই করাল থাবার থেকে সাময়িক রক্ষে পাওয়া গেলেও যেতে পারে, এই ভেবে পাশ ঘোরা মাত্র একখানি অতিকায় লোমশ হাত নেমে এসে কোটরের মুখ রুদ্ধ করলো। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মরণজ্বালা শুরু হয়েচে। গোটা শরীরে এক তীব্র প্রদাহ শুরু হয়েচে। বৃদ্ধ সেদিকে চেয়ে একবার ইষ্ট স্মরণ করলো, তারপরেই সমস্ত শক্তি হারিয়ে হতচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। নির্নিমেষ দৃষ্টি মেলে দেখলো তার নাতি অনেক দূরে দাঁড়িয়ে কেঁদে চলেচে। বুড়ো সাতকড়ি জড়ানো বিকৃত স্বরে ফিসফিস করে বললে, “পালাও দাদুভাই, তোমাকে বাঁচতেই হবে।”
সামনের গাছের উপরে এসে হাজির হয়েচে সেই জ্বলন্ত চোখজোড়া। একটা হাত নেমে এসে সাতকড়িকে চেপে ধরল। তিনু এতক্ষণ পালায়নি, সে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে আগাগোড়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিজের অনভিজ্ঞ চোখে প্রত্যক্ষ করেচে। এই মারণলীলা এইটুকু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদ্র তিনকড়িকে অনেকখানি অভিজ্ঞ করে তুললো। সে মুখে হাত চাপা দিয়ে আপ্রাণ দৌড়াতে শুরু করলো।
*****
তিনুর চিৎকারে তার অসুস্থ পিতা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। কিছু সময়ের মধ্যেই গাঁয়ে রাষ্ট্র হয়ে গেলো সাতকড়ির হত্যা বৃত্তান্ত। প্রত্যুষে কিছু সাহসী ছেলেপিলে গিয়ে গাইবান্ধার সীমান্তের অনেকটা আগেই সাতকড়ির মৃতদেহটা খুঁজে পেলো। সেই একই মরণচিহ্ন। শরীরটা শুষ্ক হয়ে কুঁকড়ে গিয়েচে, দেহের মধ্যে সামান্যতম রক্তের চিহ্নও বিদ্যমান নাই। গোটা চামড়া নীলবর্ণ ধারণ করেচে। কেউ যেন গোটা দেহটাকে গিলে নিয়ে, সমস্ত রক্ত শুষে আবার উগরে দিয়েচে।
রতনের ঠাকুরমা দ্বিপ্রহরে আহার গ্রহণ করল না। গুটি গুটি পায়ে বৃদ্ধ ভট্চাযের গৃহে গিয়ে বসলো। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে আক্ষেপের সুরে বললে, “আর কি লক্ষ্মী বৌ, চোখের সামনে গাঁ উজাড়ের তামাশা দেখতে হবে মুখ বুজে। কিচ্ছু করার নাই। আমার শরীর অথর্ব, দেহে বল নাই, নয়তো…”
“নয়তো কি ঠাকুরমশাই? কিইবা করবে কোনো মানুষ এর বিরুদ্ধে। এই শয়তান দুইজন মানুষ মারলো, তার মধ্যে একটি তো সর্বসমক্ষে। কিন্তু কেউ চোখে দেখলো তারে? এই রাক্ষস যে আবডালে থেকে মানুষ মারে ঠাকুর। যারে দেখা যায় না, তারে কেউ ধরবে কী প্রকারে? আমাদের সাধ্যি যে অতি নগণ্য।”
“বৌমা, আমি এই দীর্ঘ জীবনে অনেক রকম দেখেচি, শুনেচি, বুঝেছি। যে নিজেরে নুকিয়ে রাখে, সে কখনও অদৃশ্য হতে পারে না বৌ। তাকে দেখা যায় বলেই এত নুকোচুরি। এই আমার হাতের আঙুল দেখচো? এইবার এই, এমনি ভাবে যদি দ্রুতগতিতে নড়াতে থাকি, তবে দেখতে পাচ্চো? পাচ্চো না তো? তাই বলচি বৌমা, আঙুলটা কিন্তু রয়েচেই, শুধু আমরা দেখতে পাচ্চিনে। এই রাক্ষসকেও ঠিক বের করে আনতে হবে। জঙ্গলের গহিনে নিশ্চয়ই কোথাও এর বাস। সেই স্থানকে চিনতে হবে। আবশ্যক হলে নৌকা করে গাঙ দিয়ে নজর রাখতে হবে।”
“ঠাকুর, আপনার কথা ঠিকই হবে, কিন্তু নৌকায় চেপে কালাডোংরার বনে নজর রাখা কি মৃত্যুকেই টোপ দেখানো নয়? তাছাড়া কাকেই বা পাঠাবেন? কে ছাড়বে নিজের বাড়ির ছেলেপিলেকে এই যমের মুখে? অন্য কোনো উপায় ভাবা যায় না?”
কথা বেশিদূর এগোলো না। লক্ষ্মী সাঁঝ হয় দেখে গৃহে ফিরে এলো। সন্ধ্যার মুখে অন্যান্য দিনে এই ভরা গ্রীষ্মে গাঁয়ের মেয়েপুরুষেরা পুকুরের ধারে গিয়ে বসে, কিন্তু আজ গাঁয়ের পথঘাট শূন্য। কয়েকটি ছেলেপিলে চণ্ডীমন্ডপে বসেচিলো। রতন বাইরে বেরুবার সময় ঠাকুরমা তার হাত চেপে ধরলো। রতন কইলো, “ভয় করোনা দিদি, আমি দূরে যাচ্চিনে। এই বামুনবাড়ির দালানেই….
লক্ষ্মীমণি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে রতনের দিকে চেয়ে বললে, “না রে দাদা, আটকাচ্চি নে। একটা কথা রাখবি লক্ষ্মী দাদা? আমি আজ দুপুরে ভটচায বাড়িতে গিয়েচিলাম…”
“কোন্ ভট্চায? বুড়ো ভট্টচার্য?”
“হাঁ দাদা। তেনারা হলেন বামুন দেবতা। তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হলো আজকে। আমার একটা কাজ করে দিতে পারবি ভাই?’
রতন কিছুক্ষণ ঠাকুরমার চোখের দিকে তাকালো। বৃদ্ধার চোখের কোল বেয়ে জল গড়াচ্চে। রতনের একটু মায়া হলো। কইলো, “বেশ, বলো।”
“আমি দীনেশের সঙ্গে কথা কয়েচি আসার পথে। তার নৌকা রয়েচে নিজের। একটা কাজ করতে পারবি দাদা? রাত্তির বেলায়…”
রতন বুড়ো ভট্চাযকে কেন যেন পছন্দ করতো না। সে ভীরু নয়, কিন্তু এই বৃদ্ধের সঙ্গে তার ঠাকুরমার শলা পরামর্শের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। কইলো, “আমি কোথাও যাচ্চিনে জেনে রাখো। তোমাদের এইসব ভীমরতি পরামর্শ অন্য কারুকে শোনাও গে। সারা গাঁয়ের রাজ্যির ছেলে বুড়া ভেবে কাবার, আর ওনারা নৌকায় করে চললেন ঐ সাক্ষাৎ শয়তানের ব্যবস্থা করতে।”
এই বলে রতন বেরিয়ে গেল বটে, কিন্তু তার চিত্তে বঁড়শি বিঁধে রইলো। ঠাকুরমার সঙ্গে এমনি রুক্ষভাবে কথা কওয়াটা তার উচিৎ কাজ হয়নি। সকলেই যেমন নিজের নিজের মতো করে চিন্তা করচে, তার ঠাকুরমারাও না-হোক তাই-ই করেচে। এতে নিশ্চয়ই সকলে তাকে ভীরু ভাববে। বেশ। রাতটুকু পোহাক, সকালে সে একাই ঢুকবে কালাডোংরার আদিম রাক্ষুসে বনে। এই বনের অনেকখানি তার চেনা। দেখা যাক কোনো কিছু চোখে পড়ে কিনা।
রতন বেরিয়ে যাবার পর লক্ষ্মীমণি কিছুক্ষণ শূন্য চক্ষে চেয়ে থেকে ভিতরে গিয়ে নিজের ছোটো নাতি গণপতির সামনে গিয়ে বসল। অসহায়ভাবে তার দিকে চেয়ে কইলো, “আমার একটা কাজ করতে পারবি গেনু? রাত্তিরে নৌকায় করে যেখানে বলি যেতে পারবি? ঠাকুরমাকে ভরোসা করিস? লক্ষ্মী বাপ আমার। তোকে নাটাই, ঘুড়ি আর মেঠাইয়ের পয়সা দোব’খন। বৌমা তো রাত্তিরে তোর বাপের ঘরেই জলপট্টি নিয়ে থাকচে, তারা কেউ জানবে না।”
রাত্তিরে রতন তখনও ফেরেনি, বৃদ্ধা গেনুর হাতে একখানা পুঁটলি দিয়ে, তাকে নৌকার ছইয়ের ভিতরে তুলে দিয়ে, দীনেশ মাঝি আর তার দুইজন লোককে সব বুঝিয়ে দিলে পর তারা নৌকা ছাড়লো। বৃদ্ধা কপালে হাত ঠেকিয়ে, ঘরে এসে দোর দিলে। রাতে রতন এসে শয্যাকালে ভাইয়ের খোঁজ করলে পর বুড়ি কইলো, “আজ তোর বাপের শরীরটে একটু আরাম হয়েছে কিনা। গেনু ওই ঘরেই শুয়েচে।”
*****
অতি প্রত্যুষে রতনের নিদ্রা ভঙ্গ হলো। এখনও ভোরের কিরণ ঠিক মতো পৃথিবীকে স্পর্শ করেনি। বাড়ির সকলে নিদ্রামগ্ন। কোনো সাড়াশব্দ নাই, কেবল তার বুড়ী ঠাকুরমা কেন যেন রাতে শয্যা গ্রহণ করেনি। এখন এই কাকভোরে সামান্য তন্দ্রা বিবশ হয়ে দাওয়ার কাছটিতে ঠেস দিয়ে তন্দ্রালু হয়ে পড়েচে। রতন বিন্দুমাত্র শব্দ না করে ঘরের থেকে বেরিয়ে এসে কিছুকাল দ্রুতপদে হেঁটে, গাইবান্ধার জলা পেরিয়ে কালাডোংরার নরসংহারক বনে প্রবেশ করলো। বিশাল বিশাল উচ্চ এবং ঝাঁকড়া গাছের সারি ভেদ করে ভোরের নরম আলোক এইখানে এখনও পৌঁছায়নি। চারিদিকে চাপ চাপ অন্ধকার জমে রয়েচে। কালাডোংরার বনের পথঘাট রতনের নিকট নিতান্ত নূতন নয়, সে জানে একমাত্র খটখটে দ্বিপ্রহর ব্যতীত এই ঘোর বনে পর্যাপ্ত আলোর মুখ দেখা যায় না। এই বনের মধ্যে চলাচলের পথ নাই। বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো ডোবার পাশ দিয়ে অতি সঙ্কীর্ণ পথ রয়েচে। রতন অন্ধকার জঙ্গুলে পথ চিরে চলতে থাকলো।
রতন আজ প্রথম এই বনে ঢোকেনি, সে মাঝেমধ্যেই এইসকল সঙ্কীর্ণ পথে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু আজ কেন যেন বারবার মনে হচ্চে কেউ বুঝি আড়ালে আবডালে লুকিয়ে তার দিকে লক্ষ্য রেখেচে। গাছের আড়াল থেকে, বনের আঁধারে গা ঢেকে কেউ তার গতিবিধি নজর করচে। চলতে চলতে একেবারে দখিনের অংশে চলে এসেচে সে। এতক্ষণে রতনের মনে হলো সে এত সময় খামোখাই ভয় পাচ্চিলো। তেমন কিছুই নাই জঙ্গলে। কিন্তু রতনের ভুল ভাঙার আর সামান্যই সময় বাকি ছিলো তখন। সামনের কয়েকটি গাছ পেরুলেই গাঙ পড়বে। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ কানে আসচে। এইদিকের গাঙপাড় বালুময় নয়, কর্দমাক্ত। সেইদিকে এখন গেলে জামাকাপড় কাদা মেখে যাবে। এই ভেবে রতন ফেরার জন্য মুখ ঘোরালো এবং আচমকা তার মনে হলো এতক্ষণ যে আশঙ্কাকে সে মনের জোরে ভুল ভেবে উড়িয়ে এসেচে, তা কিন্তু এক বিন্দুও মিথ্যা নয়!
ফিকে অন্ধকার-মাখা বিশাল গাছগুলোর মাথায় আরও ঘন অন্ধকার কি একটা নড়াচড়া করচে! তার ভারে গাছের ডালগুলি ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে নুইয়ে পড়চে! রতন একটা নলখাগড়ার ছোটো ঝোপে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে সেদিকে চেয়ে রইলো। জন্তুটা ধীর গতিতে নীচের দিকে নামচে। একজোড়া আগুনের গোলকের ন্যায় চক্ষু জ্বলচে। চোখদুটির পারস্পরিক দূরত্ব দেখেই শয়তানটার অতিকায় দেহাবয়ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়। অথচ দেহের অতুল আকৃতির অনুপাতে তার ওজন অনেকটাই কম, নাহলে যতো শক্তিশালী গাছ হোক, তা উপড়ে পড়তো। কিন্তু কী প্রাণী?
জীবটি অনেকখানি নেমে এসেচে। জঙ্গলে এখনও যথেষ্ট আলো প্রবেশ করেনি, তাই তার পরিষ্কার চেহারাটা কিছুতেই ধরা পড়চে না। রতন হয়তো তার ঝোপের থেকে বেরুতো না, কিন্তু এরপরেই যে অভাবনীয় ঘটনা ঘটলো, তাতে রতনের ধ্যান, জ্ঞান, বুদ্ধি সব ওলটপালট হয়ে গেল। জন্তুটা ঝড়ের মতো গাছপালা তোলপাড় করে হঠাৎ আকাশে লাফিয়ে উঠল, আর পুনরায় গাছের সারি ভেদ করে সোজা নেমে এলো নীচে, রতনের নলখাগড়ার ঝোপের থেকে মাত্র দশ বারো হাত দূরেই। রতনের হৃদযন্ত্র ধড়াস করে লাফিয়ে উঠলো। একটা ভয়ঙ্কর দর্শন শয়তান তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েচে! কালো কুচকুচে লোমশ শরীর, হাতে-বহরে চল্লিশ হাত প্রায়, মুখখানা নেকড়ের ন্যায়, না না নেকড়ে তো নয়, দুইপাশে দুইখানি বিরাট পাখা গুটিয়ে রয়েচে। পাখি? উঁহু, ঠোটের স্থানে অসংখ্য ঝকঝকে দাঁত বেরিয়ে রয়েছে!
জন্তুটা এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মুখ থেকে একটা তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ নির্গত করলো। সে শব্দে কান মাথায় গোল লেগে যায়। একটা চাপা তীক্ষ্ণ গুঞ্জন। দুই একদিকে ঐভাবে শব্দ করার পর সেই অতিকায় শয়তান সোজাসুজি মুখ ফেরালো রতনের দিকে। সেই বিকৃত চাহনিতে কোনো অস্পষ্টতা নাই, সে ঝোপে লুক্কায়িত রতনের অবস্থান পরিষ্কার বুঝতে পারচে। রতনের হাত-পা অবশ হয়ে এসেচে। এইবার? তবে তাকেও মরতে হবে এক ভয়াবহ মৃত্যু? একটা মরিয়া শক্তিতে রতনের হাঁটু আবার বল ফিরে পেলো। একটা লাফ মেরে ঝোপের থেকে ছিটকে বেরুনো মাত্র সে সভয়ে দেখলো, একটা বিরাট কালো হাত সবেগে আছড়ে পড়ল ঝোপের উপর। রতন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে খেয়াল করলে, তার চারপাশে ঝুপ ঝুপ করে সেই দানবের থাবা নেমে আসচে এলোপাথাড়িভাবে। সামান্য গতিবেগ কমলেই তাকে আঁকড়ে ধরবে মৃত্যু। আচমকা ‘অউমমম্ কুররাআআআ” শব্দ শোনা মাত্র সতর্ক রতন নিজের মাথা অনেকখানি ঝুঁকিয়ে ফেলল এবং বিদ্যুৎবেগে একটা পেঁচার মতো পাখি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছিটকে পড়লো মাটিতে। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্থানে একটা আকাশছোঁয়া বিকটাকৃতি গাছ গজিয়ে উঠলো। ছুটতে ছুটতে যখন একেবারে সাগরের সীমানায় পৌঁছে গিয়েচে সে, তখনই একটা কান্নার শব্দ শোনা গেল। সেদিকে নজর ফেরাতেই ভীষণভাবে আঁতকে উঠলো রতন। সাগরের ধারের মাটিতে একখানা ছই নৌকা ঠেকে রয়েচে। এ দীনেশ খুড়োর নৌকা। তার মাঝি পৈঠানি সকলে পড়িমড়ি করে পালিয়েচে, আর নৌকার সুমুখে একলা দাঁড়িয়ে হাউহাউ করে অঝোরে কেঁদে চলেচে তার ভাই গেনু! রতন ভয়ানক বিস্ময়ে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! গেনু এইখানে কোথা থেকে এল? তবে কি তার ঠাকুরমা রতনকে না পেয়ে তার ছোটোভাইকেই নৌকায় করে… কি সৰ্ব্বনাশ! এ কি সর্বনাশ! রতন মুহূর্তে তার কর্তব্য স্থির করে নিলে। একবার পিছনে তাকিয়েই ভীষণ বেগে সে দৌড় দিলো ভাইয়ের দিকে। পিছনের রাক্ষসটাও জঙ্গল হুড়মুড়িয়ে ধেয়ে আসচে। রতনের সামনে একখানা বুনো ঝোপ। ছুটন্ত অবস্থাতেই রতন একবার ভাবলে যে সে ঝোপটাকে পাশ কাটিয়ে দৌড়াবে, কিন্তু প্রচণ্ড গতির জন্য সে ঝোপের উপরেই গিয়ে আছড়ে পড়লো, এবং তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য করলো, ঐ ঝোপের পাশের রাস্তা, যেইখান দিয়ে সে দৌড়াবে ভেবেচিলো, সেইখানে একটা বিশাল হাত এসে ছোঁ মারলো। এইসময়ে ঘটলো একটা বিপত্তি। রতন ঝোপে পা আটকে আছড়ে পড়ল লোনা কাদামাটির স্তুপে। তার চোখ মুখ কাদায় আবৃত হয়ে পড়েচে, প্রাণপণ চেষ্টাতেও চোখ খোলা যাচ্চে না, কিন্তু তার মধ্যেই রতন উপলব্ধি করল, ঐ হিংস্র রাক্ষস তাকে পেরিয়ে গাছের উপর দিয়ে এগিয়ে চলেচে আরও সামনে, আরও অসহায় শিকার, তার নিষ্পাপ ভাইয়ের দিকে। গেনু ভীষণ ভয়ে কেঁদে চলেচে আর করুণ সুরে জীবনভিক্ষা করে বলচে—“দাদা আমাকে বাঁচা দাদা, আমার ভয় করছে।”
রতন ফুঁপিয়ে উঠে অন্ধ অবস্থাতেই নিজের কনুইতে ঠেলে হেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগোতে থাকলো ভাইয়ের কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে। গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্চে শামুক, ঝিনুককুচো আর সূঁচালো শ্বাসমূলের আঘাতে। ভাইয়ের ছোট্ট শরীরের বদলে তার নিজের শক্তসমর্থ শরীরের মাংসপিণ্ড আহুতি দেবে রতন কালাডোংরার হিংস্র দানবকে। গেনুর বুকফাটা চিৎকার শুনে বোঝা যাচ্চে দানবটা একেবারে তার সামনে পৌঁছে গিয়েচে। রতন বহু কষ্টে আরও একটু এগোনো মাত্র ঝপাৎ করে একটা ঢেউ এসে তার মুখে লাগলো, আর তখনই একটা পাখনার হুটোপুটি ঝটপটির শব্দ কানে এল এবং রতন ভীষণ চমকে উঠে খেয়াল করল, তার ভাইয়ের কান্না একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েচে। রতনের এতক্ষণের আটকে থাকা কান্না এইবার বুকচেরা আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে এলো। ঢেউয়ের জলে তার চোখের কাদা ধুয়ে গিয়েচে। রতন বাম হাতের তালু দিয়ে চোখদুটো ঘষে আকুল দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়েই হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো!
তার ঠিক সামনে তার ছোটোভাই কাতর চক্ষে চেয়ে রয়েচে, আর গেনুর মুখকে বাম হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েচে এক দীর্ঘকায় মানুষ। বয়স আন্দাজ ত্রিশ। পরণে সাদা ধবধবে কামিজ আর কাদামাখা ধুতি। তার দক্ষিণ হস্তের মধ্যমা নিবদ্ধ রয়েচে ঠিক মাথার উর্ধ্বপানে এবং ঠিক মাথার থেকে হাত পনেরো উচ্চতায় ঝটপট করে চলেচে একখানা বিশালকায় দানবের মতো বাদুড়। বিরাট বিরাট নখওলা হাত বাড়িয়ে সে আপ্রাণ নীচের দিকে ছোঁ মারার চেষ্টা করে চলেচে কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য বাধায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তার সেই মনস্কাম কিছুতেই সিদ্ধ হচ্চে না। রাক্ষুসে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করেও সেই সর্বনাশা জীব কিছুতেই নীচে নামতে পারচে না। বেশ কিছু সময় ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর হিংস্রভাবে ডানা মেলে সেই অতিকায় শয়তান জঙ্গলের দিকে উড়ে চলে গেল।
রতন এতটাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েচিলো যে এই অভাবনীয় জীবনরক্ষার পরেও বহুক্ষণ তার বাকযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে রইলো, তারপর অতি কষ্টে বল সংগ্রহ করে কাতর কণ্ঠে শুধোলো, “কে আপনি?”
ভরাট স্বরে প্রত্যুত্তর এল, “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া। তুমি বুঝি মণিমায়ের বড়ো নাতি? মণিমা আর আমার ঠাকুরমা গঙ্গাজল সই ছিলেন।”
লক্ষ্মীমণি কোনো উপায়ান্তর না দেখে দীনেশ পাটনীর সঙ্গে ছোটোনাতিকে রাতের নৌকায় চুপিসারে তুলে দিয়ে কয়েচিলো, “দীনে, যতো তাড়াতাড়ি পারিস হাত আপসে দাঁড় টান। দুই দণ্ডের মধ্যে মধ্যেই রায়দীঘড়ার ঘাটে নাও বাঁধবি, আর দাদুভাই, তুমি এই পুঁটুলিখানা কালীপদর হাতে দিয়ে কইবে তার মণিমা ডেকেচে।”
কালীপদর সঙ্গে গেনুর সাক্ষাৎ হবার পর সে পুঁটুলি খুলে একজোড়া রূপার অনন্ত বের করলো। এই হুবহু ছিলেকাটা একজোড়া অনন্ত কালীপদর ঠাকুরমারও রয়েচে। প্রমাণ হিসেবে অতি নগণ্য, কিন্তু গেনুর মুখে সব কথা শুনে কালী আর একদণ্ডও বিলম্ব না করে দীনেশকে নৌকা খুলতে আদেশ দেয়। ভোরের আলো যখন ফুটি ফুটি করচে, কালাডোংরার জঙ্গলের গাঙপাড় যখন প্রায় চলে এসেচে, হঠাৎ কালীপদ ছাউনির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে দীনেশকে কইলো, “জঙ্গলে কিছু একটা ঘোরাফেরা করচে মাঝি। কিছু একটা রয়েছে।”
দীনেশের দল বারবার নজর করেও কিছু দেখতে পেলে না। তারা বললে, “কৈ, কিছু তো চোখে….”
কথা শেষ হবার পূর্বেই কালীপদ ঠোটে আঙুল ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে কইলো, “শশসসসস্”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে বনের উঁচু গাছপালার মগডাল ভেদ করে লাফিয়ে উঠল একখানি অতিকায়, বিকটদর্শন জীব এবং পুনরায় যেন শিকার ধরার ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল জঙ্গলের ভিতরে। মাঝির দল ভয়ার্ত চিৎকার করে কাদামাটিতে লাফিয়ে পড়ে এদিকে ওদিকে পালিয়ে গেল। কালীপদ গেনুকে নিয়ে ছাউনির অভ্যন্তরে থেকে চারদিকে লক্ষ্য করচে, হঠাৎ অনেক দূরে দেখা গেল একটি ছেলে প্রাণভয়ে দৌড়ে আসচে এইদিকেই। তাকে দেখামাত্র গেনু ‘দাদা, দাদা’ চিৎকার করে এক লাফে নৌকা থেকে নীচে গিয়ে পড়লো। তার পরের ঘটনা রতনের সামনেই ঘটেচে।
রতন আর গেনু হাত ধরাধরি করে বনের পথ দিয়ে চলেচে, আর পিছনে পিছনে সতর্ক দৃষ্টি মেলে চলেচে কালীগুণীন। তার খরচক্ষু গাছের আনাচে-কানাচে ঘুরে চলেচে। হঠাৎ মৌনতা ভঙ্গ করে কালীপদ শুধোলো, “আচ্ছা রতন, একটা কথা বলো তো, তুমি যখন ঝোপের উপর এসে আছড়ে পড়লে, তার অনতিপূর্বে কি তুমি ঝোপটাকে পাশ কাটিয়ে যাবার কথা ভেবেচিলে?”
রতন অবাক হয়ে বললে, “হাঁ ঠাকুর। তাই ভেবেচিলাম বটে, কিন্তু গতি সামলাতে পারিনি। কিন্তু হঠাৎ এই কথাটা জানলেন কী করে ঠাকুর?” কালীপদ আনমনাভাবে উত্তর দিলে, “ভাবের ঘরে কি চুরি চলে?”
*****
কালীপদ রতনদের গৃহে প্রবেশ করে লক্ষ্মীমণিকে গড় করে রজতনির্মিত বলয়জোড়া ফেরৎ দিলো। বৃদ্ধা কালীপদর চিবুক স্পর্শ করে কইলো, “বটের আয়ু হোক বাছা, দীর্ঘজীবী হও”, বলে অঝোরে কেঁদে ফেললো। রতনের বাপ, মা রাতের ঘটনাটা কতক কতক বুঝলো বটে, কিন্তু বৃদ্ধাকে কেউ দোষ দিলে না। কালীপদ দ্বিপ্রহর ও অপরাহ্ন মিলিয়ে সাতকড়ির পরিবার, লক্ষ্মীমণি, আরও বাকি কিছু পরিবারের সঙ্গে বহুক্ষণ ধরে কথাবার্তা কইলো।
এইখেনে একটা কথা কয়ে রাখি, আমি কিন্তু মুখুজ্জে মশায়ের সাথে আজ নেহাৎ কম দিন পরিচিত নই, কিন্তু আজ এই বয়সেও দেখি ঠাকুরের কর্ম্মতোৎপরতার বিন্দুমাত্র শৈথিল্য নাই। তিনি বলেন, “ওরে, আমার গুরুদেব কইতেন কালকের ভরসায় কিছু ফেলে রাখতে নাই, নাহলে সত্য সত্যই ‘কালরাক্ষসে’ ধরে। দশানন যখন রামের বাণে মৃতপ্রায় হয়ে শুয়েচিলেন, তখন তিনি বলেচিলেন, যখন কোনো উত্তম কাজ করার মনস্থ করবে, তখন তা তৎক্ষণাৎ করবে। দেরি করার কারণেই আর রাবণের দ্বারা স্বর্গের সিঁড়ি বা ক্ষীরোদসাগরের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলো না। সৎ উদ্দেশ্য কার্যকর হবার আগেই রামের বাণে জীবন গেল, আর অপরপক্ষে যখন কারুর ক্ষতির ইচ্ছা বা অনিষ্টের মানস জন্মাবে, তখন যথাসম্ভব বিলম্ব করতে হবে নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। রাবণ যদি সূর্পণখার কথা অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে কিঞ্চিৎ চিন্তাভাবনা করতেন, তবে বুঝতে পারতেন যেই নারীর কারণে রামায়ণের মহাযুদ্ধের সূচনা, তার কারণ জানকী নয়, বরং তার সহোদরা সূর্পণখা।”
যা-ই হোক, একটা কাজের কথা কইতে বসলে হাজারটা অকাজের কথা এসে পড়ে, এই হলো বুড়া বয়সের দোষ। কালীপদ সকলের সাথে কথা বলে, শুনে, মনের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করে নিলো এই কালাডোংরার নরখাদকের ব্যাপারে। তখনও কিন্তু কালীপদর মনে মনে ইচ্ছে ছিলো আরও একটু বিশদভাবে তথ্য সংগ্রহ করে, একটু হেথা হোথা ঢুঁ মেরে, পরবর্তী কার্যপ্রণালী স্থির করবে। গাঁয়ের প্রজারাও তেমনটাই জানতো, কিন্তু তখনও কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে আজকের রাত পোহানোর পূর্ব্বেই এমন কিছু ঘটবে, যার ফলে কালকেই কালীপদকে এই নরবুভুক্ষু পিশাচের বিরুদ্ধে রীতিমতো সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।
রাত তখন দ্বিতীয় প্রহর হবে। প্রায় সমস্ত লোকজন গভীর নিদ্রায় অচৈতন্য প্রায়। কালীপদ অনেক রাত্তির অবধি নানান সম্ভাবনা চিন্তা করে সবেমাত্র নিদ্রাকর্ষণের চেষ্টা করচে, আচমকা দূর হতে বহু লোকের সম্মিলিত হাহাকার আর ভয়ার্ত কোলাহলে কালীপদ চমকে উঠে শয্যা ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে দোর খুলে বাইরে এসে দেখলো তার মতো আরও অনেকে চিৎকার শুনে উৎসুকভাবে বাইরে বেরিয়ে এসেচে। সকলেই নিশ্চিত বুঝেচে যে নিশ্চয়ই ঐ শয়তান কোনো একাকী মানুষকে বাগে পেয়ে তাকে হত্যা করে গিয়েচে। এই নিশুত রাতে বাইরের কোনো লোকের আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, আর গাঁয়ের লোক মরে গেলেও বাইরে বেরুবে না। তবে?
কিছু সময়ের মধ্যেই লোকমুখে ঘটনা প্রকাশ পেলো এবং প্রত্যেকটি মানুষ বিষ্ফারিত চক্ষে তা শোনামাত্র বুঝলো যে তাদের গাঁ মহেশখালি এইবারে পরিত্যক্ত গাঁয়ে পরিণত হতে চলেচে। খবর অত্যন্ত সঙ্গীন। রাতে বুড়ো ভট্চাযের ঘরের পিছনের যে চাষের জমিটার কথা তখন কইলাম, সেইদিকেই বৃদ্ধর শয়নকক্ষ। ভায তখন নিদ্ৰায় বিভোর, হঠাৎই একটা ঝটপট শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। বৃদ্ধ কষ্টে শয্যায় উঠে বসে পাশের ফোকরটা দিয়ে তাকিয়ে দেখলে চাষের জমিটুকুতে মেঠো ইঁদুরের দল দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে দৌড়চ্চে আর চিঁ চিঁ করে চিৎকার করে চলেচে। বুড়ো মনে মনে কইলো, “আশ্চর্য বটে। এই কি ইঁন্দুরের জাগার উপযুক্ত সময়? ব্যাপারখানা কী?”
আচমকা বুড়ো ঠাহর করল, তার কুটিরের খোড়ো ছাউনির উপরে যে ছায়া করা বটগাছটা রয়েচে, সেটির ডালে ডালে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে আবছা শব্দ হয়ে চলেচে। কিছুর ভারে যেন সেখানা নুইয়ে পড়েচে অনেকখানি। বুড়ো দুই পা পিছিয়ে পিছনে ঘুরে দেখলে মালতীর মা ভীত মুখে কক্ষের দোরে এসে দাঁড়িয়ে রয়েচে। বৃদ্ধ শুধোলো, “কী হয়েচে মা?”
মালতীর মা ফিসফিস করে ভয়জড়িত কণ্ঠে উত্তর দিলো, “জানিনে বাবাঠাকুর! গাছের উপরে কি একটা যেন এসে বসেচে। অমন মোটা ডালগুলো কতখানি করে নেমে এসেচে দেখুন।”
ভট্চায দোরের বাইরের লম্বা রোয়াকটা, যেইখানে মালতীর মা ঘুমুচ্চিলো, সেইদিকে চেয়ে দেখলো সত্যিই একটা শক্তপোক্ত ডাল চালা ভেদ করে নেমে এসেচে। সেটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দে মৃদু আন্দোলিত হয়ে চলেচে। মালতীর মা চাপা সুরে বললে, “বাবাঠাকুর, আমি খিড়কির দোর একচিলতে ফাঁক করে দেখলুম গাছের উপরে কালোপানা বিরাট কি একটা বসে রয়েচে। দুইখানি আগুনের মতো গোলা জ্বলচে সেথা। আমার বড়ো ভয় করচে ঠাকুর।”
ভয় বৃদ্ধরও হচ্চিলো, কিন্তু কন্যাসম এই মেয়েটির ভয় দেখে প্রবোধ দিয়ে বললে, “ভয় করিসনে মা, ভয় করিস নে। বাড়ির বাইরে বেরুবি নে। ঘরে থাকলে ভয় নাই।”
মালতীর মা সামান্য আশ্বস্ত হয়ে সবেমাত্র কি একটা বলতে যাবে, অকস্মাৎ একটা বিশাল পাখনার ঝাপটায় মেটে বাড়ির খড়ের চালা তুলার ন্যায় ছিটকে পড়ে গেল। মালতীর মা ভীষণ আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলো। মাথার উপর বিরাট ঝাঁকড়া বটবৃক্ষের ডালপালা নুইয়ে এসেচে, আর তার চূড়ার গোটাটা জুড়ে বসে রয়েচে একটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ অতিকায় প্রাণী। তার চোখদুটি উশকানো আখার মতো আগুন উগরাচ্চে, অন্ধকার বৃক্ষমধ্য হতে তার লোলুপ দাঁতের সারি ঝিকিয়ে উঠচে থেকে থেকে। পালানোর সব পথ রুদ্ধ। বৃদ্ধ ভট্টচার্য মাথার উপরে সাক্ষাৎ শমনকে প্রত্যক্ষ করে শুষ্ক কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল, “কালাডোংরার শয়তান!”
আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দুইখানি ভয়ঙ্কর বলশালী হাত নেমে এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল নিজের দু-খানি অসহায় শিকারকে।
কিছু সময়ের মধ্যেই আবার দুঃসংবাদ উড়ে এলো, মহেশখালির পশ্চিমের হরশঙ্কর খামারুর বাড়ি ভেঙে ঐ রাক্ষস হরির পুত্র ও কন্যাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েচে। তাদের রক্তশূন্য মৃতদেহ বাড়ির দেউড়িতে মিলেচে। আবার পশ্চিমেরই পেয়ারা বাগানের মালীর লাশ মিললো পথের ঠিক উপরে।
পরপর এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে গাঁয়ের লোকেরা আতঙ্কে উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠল। আজ সকালে তার কাঙ্ক্ষিত শিকারকে ছিনিয়ে আনার স্পর্ধা দেখিয়েচে কালীপদ, আর সেই ক্রোধেই পাগল হয়ে পড়েচে সেই সৰ্ব্বনাশা অভিশপ্ত পিশাচ। এইবার আর কারুর পরিত্রাণ নাই। ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকেও তার করাল থাবা এড়ানোর পথ বন্ধ। সকালের প্রথম কিরণ মাটিতে পড়া মাত্র গ্রামের লোকজন দুই দলে বিভক্ত হয়ে রতনদের গৃহের সুমুখে উপস্থিত হলো। তাদের সম্মিলিত কোলাহল আর অভিযোগের তোড় লক্ষ্মীমণি, রতন বা দিবাকর মিলে যখন কিছুতেই প্রশমিত করতে পারচে না, তখন কালীপদ বাইরের প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়ে নিজের দক্ষিণ হস্তের তর্জনী নিজের অধরে ছোঁয়ালো। সহসা সমগ্র জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার অপূর্ব তেজস্বী দৃঢ় রূপের দিকে চেয়ে রইলো। মুহূর্ত পূর্বের কোলাহল এখন নিস্তব্ধ কাননের নৈঃশব্দে রূপান্তরিত হয়েচে।
কালীপদ ভরাট স্বরে উপস্থিত জনতার দিকে তাকিয়ে মুখ খুললো, “এই গাঁ আপনাদের গাঁ, আমার নয়। এইখানের প্রতিবাসীরা আপনাদের প্রতিবাসী, আমার অধীনস্থ প্রজা নয়, তাই ধর্মতঃ আপনাদের ধন, প্রাণ, মান রক্ষার কোনো রূপ দায়িত্ব আমার বর্তায় না। তবুও নিজের জীবনের মায়া না করে আমি এক ডাকে, এক পরিধানে চলে এসেচি কেবল এবং কেবলমাত্র এইজন্য, যদি আপনাদের পরিত্রাণের কোনো রূপ উপায় খুঁজে পাওয়া যায়। যদি কোনো ক্রমে এই যুগ যুগ ধরে হানা দেওয়া কালাডোংরার রাক্ষসের হাত হতে আপনাদের মুক্ত করা যায়। তাই, আপনারা যদি নিতান্তই অরাজী বা ভীত হন তবে আমি এইক্ষণে মহেশখালি পরিত্যাগ করবো। এর আগেও শুনেচি এই কালাডোংরার তল্লাটে এমন আক্রমণ হয়েচিলো, কিন্তু এই গাঁয়ের বীর পুত্রেরা, আপনাদের পূর্বসূরীরা কিন্তু এই ধরনের কাপুরুষোচিত কথা কননি। আপনাদের অভিযোগ এই যে আমি তার শিকারকে ছিনিয়ে নেওয়ার কারণে এক রাত্তিরে নিয়ম ভঙ্গ করে একাধিক হত্যা ঘটিয়েচে এই শয়তান, কিন্তু রোজ রোজ একটি একটি করে হত্যাটুকুও কি প্রজাক্ষয় নয়? জীবনহানি নয়? একত্রে গণনিধন আর এককভাবে পরপর হত্যার মধ্যে খুব তফাৎ কিছু রয়েচে কি? আপনাদের গাঁয়ের ছেলে রতনের স্থানে যদি আপনার নিজের সন্তান থাকতো, তখনও আমি এইভাবেই তাকে বাঁচিয়ে আপনাদের কোলে ফিরিয়ে দিতুম। এইবার কথা কয়ে ঠিক করুন কি ভবিষ্যৎ আপনারা দিতে চান সন্তানদের।”
এইটুকু বলে কালীপদ দৃঢ় পদে সে স্থান ত্যাগ করে বাড়ির পিছনের পুকুরের রাণায় গিয়ে বসলো।
বাড়ির সুমুখে মানুষের গুঞ্জন উঠেচে। তারা বাদ-প্রতিবাদে নিজ নিজ মত প্রকাশ করচে। কালীপদ কিছু সময় বসে থাকার পর পিছনে না তাকিয়েই আঁচ করলে যে তার পিছনে বহু সংখ্যক মানুষ এসে দাঁড়িয়েচে। হরিকিঙ্কর ইতস্ততঃ করে প্রথম মুখ খুললো, “ঠাকুর, তুমি দেবতা বামুন, তোমারে অপমান করার ধৃষ্টতা আমার নাই, কিন্তু তুমি বাছা একা মানুষ কি উপায়ে ঐ অসম্ভব ধূর্ত্ত নরখাদকের বধ করবে?”
কালীপদ মুখ ঘুরিয়ে কইলো, “একা কোথা খুড়ো? আপনারা তো রয়েচেন।”
হরি ধীরে ধীরে মাথা দুলিয়ে বললে, “না বাছা, এই অদেখা অপদেবতার সন্ধানে তুমি কতদূর কারে সঙ্গে পাবে জানিনে। কেউ হয়তো যাবে না। তবে আমারে লোকে যথেষ্ট মান্যিগণ্যি করে, আমি কইলে কিছু যুবা হয়তো তোমার সঙ্গে সঙ্গে রইবে, কিন্তু এদের নিয়ে তুমি ঠিক কী করতে চলেচ বাছা? কোন্ পথে তুমি এই দুর্দান্ত অপশক্তির মোকাবেলা করবে?”
কালীপদ সরু চোখে উত্তর দিলো, “সকল পথের শেষ পথ, যে পথ মেবারকূলচূড়ামণি রাণারা অত্যাচারী আলমগীরের বিরুদ্ধে নিয়েচিলেন।”
“কোন্ পথ?”, হরি শুধালো।
কালীপদ মনের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে প্রত্যুত্তর করলো, “যুদ্ধ।”
*****
কালীপদ সঙ্গে পেলো রতন, অশ্বিনীসহ আরও ছয়জন যুবককে। সকাল থেকে গাঁয়ের ছেলে বুড়ো, নারী পুরুষ সকলেই মনের উচ্ছ্বাস আর আবেগ সংহত করে শান্ত হয়ে নিজের নিজের কাজ করে চলেচে। কোথাও দুই তিনজন গৃহবধূ মিলে ধান কাটার কাস্তেতে শান দিচ্চে, কোথাও যুবকের দল দৈনন্দিন অলস আড্ডা পরিত্যাগ করে পেয়ারার ডাল আর শরকাঠি নিয়ে তীর ধনুক তৈয়ারি করচে, কোনো স্থানে বৃদ্ধের দল বেতের ঝুড়ির ন্যায় অঙ্গত্রাণ বানাচ্চে। রতনের বাপ দিবাকর শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে দু-খানা মৌচাক ভেঙে এনেচে, সেগুলির মধু নিঙড়ে বাঁশদণ্ডের মাথায় বেঁধে, দেশীয় পদ্ধতিতে অনেকগুলি মশাল বানিয়ে ফেলেচে। বৃদ্ধ হরিকিঙ্কর হুঁকায় টান দিতে দিতে টহল দিচ্চে আর মধ্যে মধ্যে কইচে, “আহা হা, বেতের টোকাগুনো অমন সোজা হলো কেন, একটু বেঁকবে যে। আরে লক্ষ্মীদিদি, তোমাদের লাড়ুগুলো অমনতরো নরম পাকের হচ্চে বুঝি, ঐ নাকি দুই তিনদিন টিকবে মনে করচো? ও সোনার মা, তোমার পাটের বুনুনিগুলা একটু শক্ত করো, বনবাদাড়ের ব্যাপার।”
বিকেলের মধ্যে সকল যুদ্ধ সামগ্রী তৈয়ারি করে ফেললে সকলে মিলে। গাঁয়ের সকলের মনে একটা বেপরোয়া ভাব। যা হয় দেখা যাবে, যে আসুক মোকাবেলা করা যাবে। কালীপদর অপার প্রাণশক্তি এদের আবালবৃদ্ধবনিতা সবকয়টি অসহায় মানুষকে লড়াকু করে তুলেচে। বিকেলের আবছা আলোকে গহন রাক্ষুসে বনের প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়ালো নয়জনের দল। প্রত্যেকের কামিজ এবং হেঁটো ধুতির সন্ধিস্থলে শক্ত করে পাটের কোমরবন্ধনী বাঁধা রয়েচে, যাতে জলে জঙ্গলে নির্ভয়ে দৌড়ানো চলে। বন্ধনীতে একটি করে ছোরা অথবা হাঁসুয়া।
অশ্বিনী ফিসফিস করে কালীপদকে বললে, “ঠাকুর, এই যে জায়গাটা, এইখান হতেই বনে প্রবেশ করতে হয়। এই জায়গাকে আমরা বলি গাইবান্ধা। ওই যে বড়ো গাছদুটো দেখচেন, ওর তলাতেই আপনি যার সাথে কথা কইলেন, সেই তিনুর ঠাকুরদা সাতকড়িকে খেয়েচিলো রাক্ষসটা।” কালী খর চক্ষে চারদিকটা নজর করে শুধোলো, “আশ্চর্য তো! ওইটে কি সেই….”
রতন বললে, “আজ্ঞা দাদা, ওইটেই সেই গাছখানা।”
একটু এগিয়ে কালীপদ গাছটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। এমন গাছ বাংলা প্রদেশে জন্মায়না। প্রকৃতির অনেকগুলি দূর্বোধ্য রহস্যের মতো এটিও হয়তো একটি। কালীপদ নিজের জীবনের বহু অভিজ্ঞতায় দেখেচে, পুরাণ বা লোককথার সবটুকু কিন্তু মিথ্যা নয়। বহু হাত ঘুরে, বহু অতিরঞ্জিত হয়ে আমাদের কাছে যা পৌঁছায়, সেই অলংকারের জ্যোতিটুকু অলীক হলেও ভিতরের সোনাটুকু কিন্তু একেবারে নিখাদ। বাস্তবকে অবলম্বন না করলে রচনা জন্মে না। যখন মহাতেজস্বী অগস্ত্য মহামুনি, বাতাপি এবং ইল্বল নামক দুই রাক্ষস ভাইকে বধ করেন, তখনকার বর্ণনাতেও বলা হয়েচে “উক্ত ঋষি এবং ঋষিপুত্রেরা দুষ্ট রাক্ষসের হস্তে মৃত্যুর পর একেকখানি বাতাপি নেবুর বৃক্ষ হইয়া বনভূমি ছাইয়া ফেলিলো।”
এই যমকুইলা পাখিও হয়তো এমনই কোনো দুরূহ রহস্যে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া মাত্র বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। তখনও বনানীর সম্মুখভাগে কিছু দিবালোক রয়েচে। নয়জনের দল জঙ্গলের অধিষ্ঠাতা দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে এই মৃত্যু উপত্যকায় পা রাখলো। এইবার শুরু হবে এক অসম-যুদ্ধ। এক আবডালে লুকিয়ে আক্রমণ করা ভয়াবহ শক্তিশালী অপশক্তির সঙ্গে সামান্য কয়জন গ্রামবাংলার মানুষদের দুঃসাহসী অভিযান, যে অভিযানের কোনো ইতিহাস নাই।
অতি সন্তর্পণে সকলে পা ফেলে চলেচে। এই রাস্তা রতনের চেনা অনেকখানি। কিছুদূর এগোনোর পর গাছে ঘেরা সরু পথ যেইখানে দক্ষিণে বাঁক নিয়েচে, সেইদিকে ঘুরে জঙ্গলের প্রথম উপদ্রব হিসেবে চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত দৃশ্য। একটা বিশাল দীর্ঘ ময়াল সাপ সম্ভবতঃ গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মিশে খাপ পেতে বসেচিলো, সেই পথে একটি হনুমান তার শাবককে নিয়ে আসা মাত্র সেই করাল জীব ঝাঁপিয়ে পড়ে পেঁচিয়ে ধরেচে সেই হনুমানটিকে। শাবকটি অসহায়ভাবে একটু দূরে চিৎকার করে চলেচে, কিন্তু নিকটে যেতে পারচে না। মা হনুমানটি কাতরাতে কাতরাতে সাপটার দেহে আঁচড় কাটচে, কিন্তু ঐ বলশালী দীর্ঘ শরীরের তুলনায় সে আর কতটুকু।
অশ্বিনী কইলো, “আঁধার হয়ে আসচে বাবা, একটু পরেই আর কিছু দেখা যাবে না। এই সামনের দিকে তাই একটু আলো রয়েচে, ভিতরে ঢুকলেই… অন্য রাস্তা দিয়ে পাশ কাটিয়ে বরং…”
কালীপদ মাথা নেড়ে জবাব দিলো, “না কবরেজ মশায়, আপনারা বনবাদাড়কে কতটুকু চেনেন আমি জানিনে, কিন্তু আমি আজন্ম রায়দীঘড়ার বনে বনে বহু ঘুরেচি। জঙ্গলের কিছু অলিখিত বিধি-বিধান রয়েচে। এই অসহায় জীবটিকে আজ আমাদের সাহায্য করতেই হবে।”
কালী ডান দিকে ঘুরে কইলো, “এই যে, তোমার নাম কি? গিরীশ তো? নিশানা কেমন? বেশ করে নিশানা করে সাপটাকে মারতে হবে। একটিমাত্র ঘায়েই ঘায়েল করতে হবে কিন্তু। নাও…”
গিরীশ হলো মহাদেও শবরের ছেলে। জাত শিকারী। তাই এর হাতে ধনুক তুলে দেওয়া হয়েচে। সাপটা প্রায় হাত কুড়ি তফাতে রয়েচে। গিরীশ শরসন্ধান করে লক্ষ্যভেদের জন্য সামান্য ইতস্ততঃ করতে লাগল। একেই আলো অতি ক্ষীণ, তায় সাপটা হনুমানটিকে এমনভাবে পেঁচিয়ে চলেচে যে, লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। কিন্তু আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলেই প্রাণীটা মারা পড়বে। কালীপদ গিরীশের থেকে ধনুক নিজের হাতে নিয়ে টানটান হাতে ছিলা টানলো। বলিষ্ঠ হাতের আকর্ণ আকর্ষণে পেয়ারা ডালের ধনুক ক্যাঁচচ করে নুইয়ে এল। হাওয়ার গতি অনুভব করে, ডানদিকের কান অবধি ছিলা টেনে, শরীরকে সবেগে নিঃশ্বাস মুক্ত করে কালীপদ বাণ মোচন করল। একটা আবছা স্যুইইই শব্দ কানে এল, আর সকলে সবিস্ময়ে চেয়ে দেখলে, সেই সামান্য শরগাছের কাঠির তৈরি বাণ অতো বড়ো সাপের মুণ্ডুটা ফুঁড়ে হাঁ করে বেরিয়ে রয়েচে। সাপটি কয়েকবার মরণযন্ত্রণায় ছটফট করে এলিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় কাতর হনুমানটা একবার কালীপদদের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো, তারপর শাবককে বুকে আঁকড়ে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জঙ্গলের আবছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গেলো।
রতন কামিজের থেকে দিয়াশলাই বের করলো। বিনয় মৌচাক বাঁধা বাঁশের দণ্ডটি তুলে ধরলো। রতন যখন দিয়াশলাই ঠুকচে, তখন অভ্যাস বশতঃ উপস্থিত প্রত্যেকের লক্ষ্য ছিল মশালের দিকে, কিন্তু সুন্দরবনের মতো মহাবনের আনাচ কানাচ চষে বেড়ানো কালীপদর নজর ফিরচিলো ঘুটঘুটে অন্ধকার ঝোপঝাড়ে। কাঠি জ্বলে ওঠা মাত্তর কালীপদর মনে হলো সামনের নলখাগড়ার ঝোপের ওই পাশটায় কেউ যেন একটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইদিকেই চেয়ে রয়েচিলো, আগুনের আলো জ্বলে ওঠা মাত্র চোখের পলকে মিলিয়ে গেল। কালী ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে উঠলো, “বটে!”
“কিছু কইচেন ঠাকুর?”
কালীপদ গম্ভীর মুখে জবাব দিলো, “নাহ্। কিছু না।”
*****
কালী একমুঠা মাটি তুলে কিছুক্ষণ কি সব যেন মন্তর পড়ল, গাছের কয়েকটা পড়ে থাকা ডাল এনে সেগুলিকে হাত দিয়ে ঘষলো, তারপর সেগুলি স্থানে স্থানে স্থাপন করে বললো, “আপাততঃ কোনো আক্রমণ হয়তো ঐ শয়তান করতে পারবে না, কিন্তু আমার বিশ্বাস, সে আড়ালে থেকে আমাদের দিকেই নজর রেখেচে। রাত হয়েচে, অসংখ্য জোনাকিও দেখচি ছড়িয়ে পড়েচে, জঙ্গলে এই জোনাকি এক বড়ো বালাই কবরেজ মশায়। এইবার কোনো শ্বাপদ বা ঐ শয়তানের চোখ আর আমরা আলাদা করে ঠাহর করতে পারবো না, কিন্তু সে আমাদের দেখতে পাচ্চে। এক্ষণে একটু বিশ্রামের প্রয়োজন, কিন্তু পুরোপুরি শয়ন করে কাজ নাই, বরং এই শুকনো পাতাগুলো বিছিয়ে, তার উপর গাছে ঠেস দিয়ে বসা যাক। বিছা বা লতা এলে শব্দ পাওয়া যাবে অন্ততঃ।”
সকলেই বিকেল থেকে এখন অবধি সময়ের যতটা না কায়িক পরিশ্রম, ততধিক মানসিকভাবে ক্লিষ্ট ছিল, তাই অদূরবর্তী আগুন ঘিরে গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে সকলেই নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়লো। কালীপদ বহুক্ষণ চোখ খোলা রাখলো। আগুনের উপর রাজ্যের বুনো পোকা এসে পড়ছে, মশাল থেকে উত্থিত উষ্ণ ধোঁয়া লেগে গাছের একটি দুটি পাতা খসে পড়চে, বহু দূরে সাগরের দিক থেকে রাতচরা টিটি পাখি ডাকচে, কালীপদর ক্লান্ত চক্ষু ধীরে ধীরে মুদ্রিত হয়ে এলো। কতটা সময় কেটেচে ঠিক খেয়াল নাই, সহসা কি একটা অসোয়াস্তিতে কালীর মগ্ন চৈতন্য ফিরে এলো। একেবারে সামনে কেউ একটা দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ বন্ধ অবস্থাতেও যেমন অনুভূতি হয়, কালীপদরও তেমনটাই মনে হলো, কিন্তু ইচ্ছা করে সে চোখ খুললো না। দেখা যাক পরিস্থিতি কোন্ দিকে এগোয়। স্পষ্টই বোধ হচ্চে সামনে যে দাঁড়িয়ে রয়েচে সে দেহধারী নয়, কারণ শুকনো পাতায় তার পায়ের শব্দ হচ্চে না। তবে এ সেই শয়তান নয়, কিন্তু তাহলে….
আচমকা একটা অভাবনীয় ঘটনা ঘটলো। কালীপদর গালে সশব্দে একটা আঘাত এসে পড়ল। কালী ধড়মড় করে চোখ খোলা মাত্র ভীষণ চমকে দেখলো গাছের গুঁড়ি বেয়ে একখানা বিশালাকার কেউটে সাপ বেয়ে বেয়ে নেমে কালীপদর মুখের সামনে এগিয়ে এসেচে। এখনও কুলচক্র বিস্তার করেনি, কারণ শিকারের দিক থেকে কোনো বাধা আসেনি তার। কালী অতি সন্তর্পণে হাতখানা কোমরের কাছে নামালো, আর পরক্ষণেই সম্পূর্ণ খোলা চোখে চোখ রাখলো সেই ভয়াবহ বিষধরের চোখে। চক্ষুর পাতা খুলতে দেখেই সেই ভীষণ ক্রুদ্ধ প্রাণী বিশাল ফণা ধরে ছোবল মারতে গেলো এবং কালীপদর কোমরের হাঁসুয়া বিদ্যুৎবেগে তার শরীরকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললো। কিছুকাল ছটফট করে সাপটা স্থির হয়ে গেল। কালীপদ ততক্ষণে দরদর করে ঘামচে উত্তেজনায়।
******
