দ্বিতীয় দিবস
সকাল হলে পর সাপের মুণ্ডুটিকে দাহ করে নয়জনের দলটি রাতের মন্তর দিয়ে স্থান-বন্ধন করা সীমারেখাকে টপকে ভিতরের দিকে এগোলো। পথের চারপাশে কিছু সদ্য ছিন্ন হওয়া ডালপালা পড়ে রয়েচে। এখনও তা থেকে কষ গড়াচ্চে। তার একটি হাতে তুলে নিয়ে কালী কইলো, “দেখো তোমরা, ওই রাক্ষস কিন্তু সমস্ত রাত গাছের ডালে ডালে ঘুরে আমাদের দিকে নজর রেখেচে, শুধু মন্তরের বলে সুবিধে করতে পারেনি তত। আর ভোর হবার মুখে স্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েচে। তার বিশাল শরীরের ঘষায় এইগুলো ভেঙে পড়েছে।”
আরেকটি ব্যাপারে আমি একটু ধন্ধে পড়েছি। সাতজন্ম যে বনের ভিতরে মানুষ ঢোকেনি সেই বনের মধ্যে এতগুলো বড়ো বড়ো ডোবা এল কোথা থেকে? এমন তো হয় না। আর প্রতিটা জলাশয়ের পাশেই অনেকখানি এলাকায় কোনো গাছ নাই। কেন?”
ঘন, নিবিড় বনজঙ্গল ভেদ করে দলটা চললো আরও, আরও ভিতরে। কালীপদ ইতি-উতি তাকাতে তাকাতে চলেচে দেখে রতন শুধোলো— “ঠাকুর, তুমি ঠিক কীসের সন্ধান করচো একটু খুলে বলবে?”
কালী নিজের মনেই বললে, “তাও তো ছাই জানিনে রতন, তবে কোনো সূত্র, কোনো পথ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। শয়তানটা কী খায় তা আমরা জানি, কিন্তু শরীর যখন রয়েচে তখন তার বাসস্থান তো একটা থাকবেই। এবং তা পেলে এই বনেই পাবো, অপর কোথাও নয়। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”
রতন উদাসভাবে বলল, “কী থেকে যে কী করতে পারবো জানিনে, এতদিন ধরে এই বনে এসে বসে থেকেচি, কতো দুপুর ঘুমিয়ে কাটিয়েচি। তখন মনে হতো আমিই এই বনের একমাত্র রাজা। বনের মধ্যে এই আমার ছোট্ট রাজপ্রাসাদ। কিন্তু এমন উপদ্রবের কথা তখন ভাবতেও পারিনি।” কালী হেসে বলল, “তোমার সাহস তো কম নয় রতন, এই বিজন বনে তুমি একলা একলা এসে শুয়ে বসে থাকতে?”
বাকি কেউ রতনের এই বনে ঢোকার ব্যাপারখানা অবগত ছিল না, তারা অবাক হয়ে সেসব কথা শুনচিলো। রতন একটু হেসে উত্তর দিতে যাচ্চিলো, হঠাৎ কালীপদ তাকে থামিয়ে শুধালো, “তাইতো রতন, বলচি তুমি রাজপ্রাসাদ কোন্ জায়গাটিকে মনে করতে?”
রতন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললে, “না, মানে ওই আর কি, প্রাসাদটা তামাশা করে বলেচি বৈ তো নয়, আসলে ওই ভিতরের দিকে একখানা ভাঙা মন্দির রয়েচে। আমি ঐটাকেই….”
“সে কথা আগে বলতে হয় রতন। আমি সন্দেহ করচিলাম হয়তো কোনো গোপন আস্তানা নিশ্চয়ই রয়েচে জঙ্গলে, যেইখানে ঐ শয়তান লুকিয়ে থাকে। বাদুড় জাতীয় জীব কিন্তু লুকানো আস্তানা পেলে আর কখনওই গাছে থাকতে চায় না। অত গুরুভার শরীর নিয়ে সাধারণ বাদুড়ের মতো গাছে ঝোলা তার সম্ভব নয়। আবার এসব দিকে পাহাড় বা গুহাও না থাকারই কথা। এখুনি ঐ জায়গায় নিয়ে চলো আমাদের।”
রতন পথ দেখিয়ে নিয়ে চললে।
**********
তখন প্রায় মধ্যাহ্ন, কিন্তু বাইরে আকাশ অন্ধকার করে মেঘ করেচে, ফলে জঙ্গলের ভিতরেও নেমে এসেচে আবছায়া। থেকে থেকে বাজ পড়চে চারদিকে, এই সময় দলটা এসে দাঁড়ালো পোড়ো মন্দিরের সুমুখে। গাছের আড়ালে আত্মগোপন করে দাঁড়িয়ে রয়েচে নয়খানি মানুষ। সামনে মন্দিরের বিরাট উন্মুক্ত দ্বার খোলা পড়ে রয়েচে।
কালীপদ রতনকে বললে, “রতন, এই দেউলের কি অন্য কোনো বড়ো পরিসর রয়েচে? নাকি এটুকুই?”
রতন কইলো, “না, এইটুকুই এর পরিসর।”
“হুমম্। তাহলে শয়তানটা আস্তানায় নাই। খুবই অন্ধকার করে এলো, কিন্তু তাও কিছুটা নজর চলচে। ঐ দেখো, শানের চারদিকে কেমন পুরু ধূলার রাশি জমা হয়ে রয়েচে, কিন্তু ঐ যে, ঐ কোণায় দেখো, কতটা জায়গা প্রায় পরিষ্কার। দানবটার বিরাট শরীরের ঘষটানিতেই মনে হয় ধূলোগুলো মুছে গিয়েচে। আর তার চেয়েও বড়ো কথা, এই যে এইদিকটা এসে দেখো, হ্যাঁ ওই পিছনদিকে বাতার উপরে কি একটা যেন নড়ছে, তাই না?”
সকলেই খরদৃষ্টি মেলে ভীষণ বিস্মিতভাবে জানালে, তারাও কিছু একটা দেখতে পেয়েচে। কালীপদ মনের উত্তেজনা গোপন করে বললো, “আমার সন্দেহ হচ্চে, ভিতরের ঐ পদার্থটিই হলো যমকুইলা পাখি। খুব সাবধানে এগোতে হবে। সবাই নিজের নিজের মাথা ঢেকে নাও, যেন আচমকা ছোঁয়া না লাগে। গোবিন্দ, তোমার বস্তায় জাল আনলুম না? সেখানা বের করো। এই পাখিটিকে আটক করতে হবে। এই হতভাগার নখে প্রাণঘাতী বিষ রয়েচে, সেইজন্য ছোঁ মারা মাত্র শিকার বিকল হয়ে পড়ে। যদিও এই পাখিটিকে ঐ শয়তানের কেন দরকার হয় তা এখনও ধরতে পারিনি। চলো এগোও।”
অতি ধীর পায়ে কালীপদর দল উঠে এলো মন্দিরের চাতালে। একটা ধূসর পেঁচার ন্যায় পাখি ঘুমিয়ে রয়েচে জাফরির উঁচু রোয়াকে। তিনজন মিলে জালটা নিঃশব্দে খুললো। আর একটু এগোলেই জাল ছুঁড়ে আটক করা যাবে পাখিটাকে, কিন্তু হঠাৎ অসাবধানতাবশত ঘটে গেল বিপত্তি। অশ্বিনী কবরেজ উৎসাহবশে একটু তাড়াতাড়ি এগোতে গিয়ে পায়ের তলায় একটা শুকনো কাঠি মাড়িয়ে ফেললো। ‘মট্’ করে একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে পাখিটা এক লাফে ছিটকে উঠে রক্ত জল করা শব্দে ডেকে উঠলো, “অউমম কুরররাআআ”, আর জালখানি ঠিকঠাক মেলে ধরার পূর্বেই ফোকর দিয়ে তড়িৎ বেগে উড়ে বেরিয়ে গিয়ে বসলো মন্দিরের বাইরের গাছের ডালে।
কালীপদ হতাশার দৃষ্টিতে একবার অশ্বিনীর দিকে চেয়ে বললো, “হায় ভগবান, এ কী করলেন কবরেজমশায়। আর ধরা যাবে না একে।”
অশ্বিনী অত্যন্ত লজ্জিত ও বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। তারা ধীরে ধীরে দেউল থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ দেখলো সামনের গাছটির পাতার অন্তরালে একটা হুটোপুটির আওয়াজ আসচে, আর পরমুহূর্তেই যমকুইলা পাখি ছিটকে পড়লো শুকনো পাতার উপরে। পাখিটা ছটফট করচে কিন্তু উড়তে পারচে না। কালীপদরা দৌড়ে গাছের তলে গিয়ে উর্ধ্বে তাকিয়ে দেখল, গাছের ডালে সেই সাপে ধরা হনুমানটি বসে রয়েচে, তার হাতে পাখিটির একখানা ছেঁড়া ডানা।
কালীপদ আনন্দে চোখের জল মুছে বললে, “দেখেছেন কবরেজমশায়? পৃথিবীতে কোনো কাজ নিষ্ফলা হয় না। কেশব যথার্থ বলেন। কাজ আমরাই করবো, কিন্তু ফল সময়মতো তিনিই দেবেন।”
কালী একখানা বেতের চুবড়ি দিয়ে পাখিটাকে চাপা দিয়ে বললো, “এই শয়তানের অনুচর এখানেই আটক থাক, নাহলে কখন কারে ছোঁ মেরে বসবে। এখনও মরেনি নিশ্চিত, কারণ মরলে হতভাগা প্রকাণ্ড গাছ হয়ে ঠেলে উঠত।”
দলটা মন্দিরের থেকে অনেকখানি তফাতে স্থিতু হলো। এইখানে একটি অতি বৃদ্ধ বটবৃক্ষের নীচে একটি বৃহৎ কোটর রয়েচে। বৃষ্টি বাদলা নামলে অন্ততঃ জনা তিনেক স্বচ্ছন্দে সেই ফোকরে আশ্রয় নেওয়া চলে। সেই গাছের নীচে দলটা যখন ডেরা বাঁধলো তখন প্রায় আঁধার হতে যায়। এই জায়গাটি থেকে কিছুটা দূরে একটি এলাকায় সমস্ত গাছপালা অর্ধদগ্ধ হয়ে রয়েচে। এইখেনেই সম্ভবতঃ দাবানল লেগেচিলো। সমস্ত এলাকায় একটা অচেনা পোড়া পোড়া গন্ধ, আর একটা অংশে গভীর একখানা গর্ত হয়ে রয়েচে, যেন তার মাটি হঠাৎ বসে গিয়েচে। কালীপদ পুনরায় আশপাশের জায়গাখানি বন্ধন করে আগুন জ্বাললে।
এখনও বাজ পড়ে চলেচে। কালী বললে, “তোমরা এই স্থান ছেড়ে নড়ো না। আমি দুই পা এগিয়ে একটু জল নিয়ে আসি।”
চোঙাগুলির জল প্রায় শেষ হয়ে এসেচিলো। তার মধ্যে দুইখানি বাঁশের চোঙ আর একখানা মশাল নিয়ে কালীপদ জল আনতে পৌঁছালো একটু দূরের একখানা ডোবার কাছে। ডোবার থেকে জল ভরতে গেলে কাদামাটির ঘাটে বসে নীচু হয়ে জল ভরতে হয়। কালী জল ভরার জন্য সবে মাথা নীচু করেচে, হঠাৎ মনে হলো ঠিক পিছনে কেউ যেন দাঁড়িয়ে এইদিকেই চেয়ে রয়েচে। কালীপদ মনে মনে প্রমাদ গুণলো। তীর ধনুক ছাড়া বিনা অস্ত্রে জঙ্গলে বেরুনোটা অনুচিত হয়েচে, সে বুঝতে পেরেচে পিছনে যে রয়েচে সে আচমকা আক্রমণ করবে না। খুব ধীরে ধীরে চোঙাগুলির পাশ থেকে এক আঁজলা জল নিয়ে মুখের কাছে তুলে ধরলো। পিছনে যে রয়েচে তার মনে হবে মানুষটা জল পান করচে। কালী জলের উপর মুখ নিয়ে খুব ফিসফিস করে কি যেন আউড়ে, আচমকা সেই জল তীরের বেগে পিছনে ছুঁড়ে মারলো।
পিছনের দিক থেকে একটা ধড়মড় শব্দ শুনে ঘাড় ঘোরাতেই চোখে পড়ল, একখানা ভয়ঙ্কর দর্শন মূর্তি যেন অদৃশ্য কোনো জালে বাঁধা পড়েছে। ছটফট করচে অথচ বেরুতে পারচে না। মানুষের মতোই তবে তার চেয়ে অনেকটা দীর্ঘ অবয়ব, গোটা শরীরে মাছের মতো আঁশ, মুখটি অত্যন্ত কদাকার।
কালীপদ দৃঢ় পদে তার থেকে সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “কে তুমি? আমার পিছু করচো কেন? মশালের আগুনে তোমার ছায়া পড়চে বটে, তবে অত্যন্ত ফিকে। তুমি কোনো দেহধারী জীব হতে পারো না। কোনো প্রেতাত্মা হওয়াই সম্ভব। কে তুমি?”
দীর্ঘাকৃতি মূর্তিটি ছটফট বন্ধ করে উত্তর দিলে, “তোমার ধৃষ্টতা দেখে আশ্চর্য হচ্চি আমি। তোমার ক্ষমতা কেমন করে হলো আমাকে বন্দি করার? কে তুমি?”
কালীপদ উত্তর দিলে, “আপনাকে আমি কখনও বন্দি বানাইনি। শুভ আত্মা আর দুষ্ট বিদেহীকে চেনার শক্তি আমার রয়েচে। আমি সম্ভবতঃ আপনাকে এইবার চিনতে পেরেচি।” এই বলে হাত ঘোরানো মাত্র বাঁধন খুলে গেল।
মূর্তি শান্ত চক্ষে চেয়ে বলল, “তুমি চিনতে পেরেচো?”
কালীপদ হাত জোড় করে কইলো, “আজ্ঞা। আপনি এই গাঁয়ের আরাধ্য লৌকিক দেবতা ওলাংমারা। আপনিই সেদিন আমাকে সাপে ধরার পূর্বে আমার গালে চড় মেরে জাগিয়ে দিয়েচিলেন।”
ওলাংমারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে উত্তর দিলে, “তোমার শক্তি বাছা অনেক তুমি আমার চারণভূমিতে আমাকেই বন্দি করেছো। তুমি হয়তো পারবে এই শয়তানকে জব্দ করতে। আমি চেষ্টা করে দেখেচি, কিন্তু আমার ক্ষমতায় আমি তাকে পরাস্ত করতে পারিনি। বরং সেই আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্চে। তুমিও ক্ষমতায় তার সঙ্গে কিছুতেই পারবে না। তোমার সাধ্য কি? কিন্তু বাছা, তোমার বুদ্ধি বড়ো শান্ত, মেধা অতি তীক্ষ্ণ, চতুরতায় তুমি অনেক এগিয়ে, তা তোমার আমাকে স্তম্ভন করার পদ্ধতি দেখে বুঝেচি। যদি তাকে পরাভূত করতে পারো, তবে হয়তো বুদ্ধি দিয়েই পারবে। আমার আবাহন হবার পর পুরোহিত মারা পড়ে, ফলে আমি ফিরতে পারচি না। তুমি গাঁয়ে ফিরে আমার বিসর্জন সম্পন্ন করবে।” এই বলে ওলাংমারা অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। কালীপদ প্রশান্ত চিত্তে দলের কাছে ফিরে এল।
*****
রাত তখন খুব একটা গভীর নয়, কালীপদ আর রতন ব্যতীত সকলেই তন্দ্রাবেশে নিমজ্জিত। কালীপদ আর রতন পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দুইদিক ঘুরে বসে রয়েচে। এই ব্যবস্থা কালীপদরই মস্তিষ্ক প্রসূত। কালী দূরের দিকে শূন্য নজর ছড়িয়ে এই কয়দিনের সমস্ত খুঁটিনাটি কথা মনে করে চলেচে। সমস্ত বিশদ সে মনোযোগ দিয়ে শুনেচে, কিন্তু কিছুতেই এই মহা শক্তিধর পিশাচকে বন্দি বা নিধন করার বিন্দুমাত্র উপায় ধরা যাচ্চে না।
শাস্ত্র বলে— দেব, দানব, মানব, যক্ষ, পৃথিবীর প্রতিটি জীব, এমনকি দুষ্ট খেয়ালে জন্ম নেওয়া বিদেহী আত্মাও অমর হতে পারে না। মহাকাল নিজের কুটিল বুদ্ধিতে তার জীবনরেখায় কিছু না কিছু ছিদ্র রেখে দেয়। সেই রেখাকে ধরতে হবে, চিনতে হবে। দৈহিক বলে বা মন্তরের বলে একে বধ করা অসম্ভব, নচেৎ সেইদিনে সাগরের পাড়ে কালীপদ যখন মন্ত্রের দ্বারা ষটচক্র বেড়া তৈয়ারি করেচিলো, তা ছোঁয়া মাত্র ঐ পিশাচের ভস্ম হয়ে যাবার কথা। কিন্তু হয়নি। সে বাধা পেয়েচে বটে, কিন্তু বহাল তবিয়তে ফিরে গিয়েচে, এবং লুকিয়ে লুকিয়ে হিংস্র নজরে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করচে। এতটুকু ছিদ্র পেলেই সে মানুষ তুলে নিয়ে যাবে। একদিকে অবশ্য মন্দের ভালো, এই কারণে সে গ্রামের দিকে আর পা বাড়াচ্চে না। যদিও সে নিজে কালাডোংরার বনে প্রবেশের অনতিপূর্বে গাঁ’কে বেঁধে দিয়ে এসেচে, কিন্তু তার মেয়াদ মাত্র তিনটি দিন। আগামী কাল বিকেলের পূর্বেই বাঁধন খুলে যাবার কথা। তখন?
গাঁয়ের লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদ করে অনেক কিছু জানা গিয়েচে, কিন্তু সেগুলিকে এক সূত্রে গাঁথা যাচ্চে না। একটা জিনিস কালীপদ হাড়ে হাড়ে বুঝেচে, যে এই শয়তানের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েচে, তা হলো শত্রুর মনে উঁকি মেরে তার মনের কথা পড়ে ফেলা। সেই কারণেই সাতকড়ি গাছের গুঁড়িতে ঢোকার কথা চিন্তা করা মাত্র ঐ দানব কোটর ছিদ্র রুদ্ধ করে দিয়েচিলো। রতন ঝোপের পাশ দিয়ে দৌড়ানোর কথা ভাবা মাত্ৰ কালাডোংরার রাক্ষস সেই পথে থাবা দিয়েচিলো। সেই জন্যেই কালীপদ সেইদিন রতনকে বলেচিলো, এই রাক্ষস ভাবের ঘরে চুরি করে।
মণিমা বৃদ্ধা, তায় মেয়ে মানুষ, তাই বহু বৎসর পূর্বের এই ধরনের আক্রমণের সম্বন্ধে তার থেকে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি বুড়ো ভটচায জীবিত রইতেন, তবে কিছু কথা পাওয়া গেলেও যেতে পারতো। কিন্তু তিনিও মণিমা’কে সবিশেষ কিছু কয়ে যেতে পারেননি। এখন একটাই উপায় অবশিষ্ট রয়েচে, যদি…
আচমকা পিছন দিক থেকে ভয়ানক বজ্রপাতের আলোক আর শব্দে সবকয়টি নিদ্রিত মানুষ ধড়মড় করে উঠে বসল। কাছেই কোথাও বাজ পড়েছে। কালীপদ সকলকে আশ্বস্ত করে বললে, “ভয় নাই, বজ্রাঘাতের শব্দ হয়েচে। তোমরা ঘুমাও।”
রতন উলটোদিকে ঘুরে বসেচিলো। সে বলল, “কালীপদদা, এত ভীষণ বাজ পড়া আমি আগে কখনো দেখিনি। কতক্ষণ ধরে পড়ল বাজটা।” কালী হেসে কইলো, “ধুর বোকা, বাজ বুঝি অনেকক্ষণ ধরে পড়ে? বাজ নিমেষের মধ্যেই আছড়ে পড়ে, কিন্তু আঁধারে মনে হয় যেন অনেক সময় ধরে পড়ল। চোখের ভুলে অমন হয়।”
রতন আবার শুধোলো, “চোখের ভুল কেমন? আমি দেখলুম যে।”
“শোনো রতন, আমাদের চোখের ক্ষমতা কিন্তু সীমিত। যতক্ষণ চোখের পক্ষে সহনশীল বস্তু আমাদের নজরে পড়ে, ততক্ষণ চোখের শক্তি যথাযথ রয়, কিন্তু তার চাইতে শক্তিশালী অথবা দ্রুততর বস্তু আমাদের চোখ ধরতে পারে না। চোখের থেকে মস্তিষ্কে অনেকক্ষণ আগের রেশটাই থেকে যায়। যেমন বিদ্যুৎপাখার ডানাগুলি ভীষণ জোরে ঘূর্ণিত হয় বলে আমরা ঠিকঠাক তাদের অবস্থানগুলো ঠাহর করতে পারি না। সবকয়টি মিলিয়ে একটিই অস্বচ্ছ বস্তু মনে হয়। এই ভ্রান্তি আমাদের মস্তিষ্কের জন্যেই ঘটে।”
রতন আরও কিছু কইতে যাচ্চিলো, কিন্তু কালীপদ তাকে থামিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থেকে তারপর বললে, “মন দিয়ে শ্রবণ করো, এতক্ষণ ভেবে ভেবে এই পিশাচকে বধ করার একটিই উপায় এখনও অবধি আমি বুঝতে পেরেচি, কিন্তু সে উপায় এতটাই পাশবিক এবং নির্মম, যে আমি কিছুতেই তোমাদের সে কথা বলে উঠতে পারচি না।”
অশ্বিনী ব্যগ্র হয়ে বলে উঠল, “আপনি কি যে কন ঠাকুর, আপনার কুণ্ঠা কীসে? এ উপায় তো আপনি আমাদের রক্ষার্থেই ভেবেচেন। দয়া করে বলুন কী উপায়?”
কালী সামান্য ইতস্ততঃ করে যেন নিজের মনের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে কথা কইলো, “দেখো বাবাসকল, আমি আজ বড়ো পাষণ্ডের মতো কথা বলচি বটে, কিন্তু ভগবান সাক্ষী তোমাদের জীবনরক্ষাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। বহুকাল পূর্বে সূদুর তিব্বতের এক পাহাড়ে গিয়ে একখানা পুঁথি আমি পাঠ করেচিলাম। রক্তহোরার নাম শুনেচো কখনও? আমাদের শাস্তরে একে বলে শয়তানের নৈবেদ্য। এই বিধিতে যে কোনো শয়তানের বধ করতে গেলে একটি ছোটো শিশুকে আহুতি দিতে হয়। তাহলে শয়তান যত শক্তিশালী হোক না কেন, সে ঐ শিশুকে ভক্ষণ মাত্র জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। এ একেবারে অমোঘ তন্ত্র। তোমরা পারবে একটি শিশুকে জোগাড় করে দিতে? তিন বৎসরের উর্দ্ধে হলে চলবে না। সেই হিসেবে এই প্রথম আমার হাতে নরহত্যা হবে, কিন্তু আজ আমার সুমুখে কোনো পথ খোলা নাই।”
এই অবধি বলে কালীপদর দুই চোখ থেকে ঝরঝর করে জল পড়তে থাকল।
গোবিন্দ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ খুললে, “ঠাকুর, আপনি কাঁদেন কেন? আপনার কোনো স্বার্থ নাই এতে। এমন কাজে মন সায় দেয় না, কিন্তু দশের রক্ষার জন্য একটি শিশুর বলির বিধি পুরাকালেও ছিলো বলে শুনেচি। গাঁয়ের সৎপতি হরিদাস কিছুদিন পূর্বে এই শয়তানের হাতে মারা পড়েছে। তার থাকার বলতে একটিমাত্র দেড় বৎসরের নাতি। সৎপতির ছেলে আর বৌ মাস ছয়েক আগের রায়মঙ্গল ধ্বসের সময় মারা গিয়েচে। এখন এই শিশুটি সম্পূর্ণরূপে অনাথ। কেউ একটু দুধ খেতে দেয়, কেউ দেয় না। পরের ছেলেকে মানুষ করে কে ঠাকুর? তায় ছেলেটি ভয়ানক রুগ্ন। নানান রোগে মূমুর্ষু হয়েই রয়েচে। এর পরমায়ু ভগবান নিয়েই রেখেচেন। তাই বলচি…..”
উপস্থিত সকলেই গোবিন্দর কথার যথার্থতা স্বীকার না করে পারলে না। এই ছোট্ট শিশুপুত্রের এমন ক্ষুদ্রায়ু হয়ে বাঁচার চাইতে যদি সবাইকে বাঁচাবার জন্য…
কালীপদ রতনের হাতে একখানা শেকড়ের মাদুলি পরিয়ে ধীর কণ্ঠে কইলো, “বড়ো নিষ্ঠুর কর্মে তোমাকে নিযুক্ত করলাম আজ, কিন্তু এ ভিন্ন অপর কোনো উপায় যদি আমার জানা থাকতো তবে কখন ওই… এতদিন তোমরা তন্ত্রশাস্ত্রের কোমল রূপটুকুই কেবলমাত্র দেখেচো, শুনেচো, কিন্তু এর যে একটা ভয়ঙ্কর কালো, সংহারক দিকও রয়েচে তা আজ বুঝতে পারচো রতন? আমি গৃহী সাধক। এমনধারা নিষ্ঠুর বিধিতে মন সায় দেয় না, কিন্তু আজ আমি নিরুপায়। সকলকে বাঁচাতে গেলে এইটুকু নিষ্ঠুরতাকে বৈধ বলেই ধরতে হয়। এই শিকড় তোমার থেকে ঐ শয়তানকে দূরে রাখবে। দ্রুত যাও, আর ভোরের মধ্যে শিশুটিকে আমার চাই।”
এই অবধি বলে কালী দ্রুতবেগে মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু সংবরণ করল। রতন কিছুকাল নিস্পৃহ চক্ষে এই সদালাপী, কোমলহৃদয় মানুষটির অচেনা
রূপের দিকে চেয়ে থেকে, একখানা মশাল নিয়ে হরিণের ন্যায় দ্রুত এবং লঘুপদে রওয়ানা দিলো।
*****
রাতে সকলেই জেগে থাকতে চেয়েও ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছে। কালীপদ উদাস নয়নে বিনিদ্র জেগে বসে রয়েচে। তার হৃদয় তোলপাড় হয়ে চলেচে। শিশুটিকে শয়তানের বলিপ্রদত্ত হিসেবে তুলে দিতে হবে সকালে। যজ্ঞভূমিতে শয়ান মাত্র তার চারপাশে এক অদৃশ্য তেজবলয় তৈয়ারি হবে। শিশুটিকে গ্রাস করতে এলে শয়তানটাকে ঐ বলয় ভেদ করেই আসতে হবে। হয়তো শিশুটিকে গ্রাস করতে সক্ষম হবে রাক্ষসটা, কিন্তু তাকেও মরতে হবে ঐ তেজের পিণ্ডতে জ্বলে পুড়ে। এই বনে সামান্য কিছু জীবজন্তু রয়েচে বটে, কিন্তু অপর কোনো পাখি নাই, ফলে ঐ তেজবলয়ে অন্যান্য কারুর আচমকা প্রবেশ করার বা ছুঁয়ে ফেলার সম্ভাবনা প্রায় নাই। কাল একটি ক্ষুদ্র, নিষ্পাপ জীবনের পরিবর্তে প্রাণ ফিরে পাবে সবাই। এই কঠিন কাজ না করলেও চলতো। কালীপদ একবার ভাবলো, “এদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে এমন কলঙ্কিত করি কেন আমি? কীসের দায় আমার?” কিন্তু পরমুহূর্তেই স্মরণ হয় তার গুরুর বাক্য, “কক্ষণও কোনো অসহায়কে, আর্তকে ফেরাবি নে। অযথা নামের জন্য কখনও কাতর হবি নে। যত শক্তি, যত সুনাম, যত আত্মতৃপ্তি, সব ভবাণীর পায়ে ছুঁড়ে ফেলে দে।”
কালীপদ চোখ মুছে স্থির সংকল্প করে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পরে তীব্র মানসিক টানাপোড়েনের চাপে নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়লো। কালীপদ ঘুমানোর পর গাছের উপর থেকে একটা বিশাল কালো মূর্তি অতি ধীরে সরে গেলো। তান্ত্রিকের মনের গহীনে চলতে থাকা গোপন কারসাজি কিন্তু আর গুপ্ত নাই। নিজের মনের ক্ষমতা দিয়ে কালাডোংরার ভয়ঙ্কর দানব কালীপদর মনের কথা লুকিয়ে পড়ে ফেলেচে।
অতি প্রত্যুষে শুকনো পাতার শব্দে কালীর নিদ্রাভঙ্গ হলো। উদগ্রীব হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেখল রতন এসে উপস্থিত হয়েচে। সে নিজের কার্য্যে সফল হয়েচে, কিন্তু তার মুখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কালী তার কাঁধে হাত রেখে কাঁথায় ঢাকা শিশুটিকে মুখের কাছে তুললো। নিজের বুড়ো আঙুল মুখে পুরে নিষ্পাপ শিশু ঘুমিয়ে পড়েছে। তার অজান্তে তাকে এক নির্মম বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা হয়েচে, সেই খবরে তার কিছু আসে যায় না। কালীপদ শুষ্ক চক্ষে একবার বাচ্চাটির মুখে নিজের কাঁপা কাঁপা আঙুল বুলিয়ে দিলো। তারপর মুখ ফিরিয়ে বাষ্পরুদ্ধ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো, “বিধির সময় হয়েচে। আর বিলম্ব অনুচিত।”
অশ্বিনী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, ক্ষণপূর্বের একজন স্নেহশীল পিতৃহৃদয় অন্তর্হিত হয়ে একজন কঠোর তান্ত্রিক তার কর্তব্য পালন হেতু জেগে উঠেচে।
কালীপদ তাদের দুইদিনের আশ্রয়, এই বুড়ো বটের তলাকেই বেছে নিলো মারণভূমি হিসেবে। গাছের ডালের আঁচড় দিয়ে যজ্ঞভূমি তৈয়ারি করে, একখানা পাটের বস্ত্রে ঘুমন্ত শিশুটিকে শুইয়ে দিয়ে রতনকে জিজ্ঞাসা করলো, “পাটের কাপড় দুইখানি এনেচো তো?”
রতন কালীপদর কথা মতো সব উপচার নিয়ে এসেচে। শিশুর গলে একখানা জবাফুলের মালা পরিয়ে, তার কপালে রক্তবর্ণ সিন্দুর লেপন করে, খল নুড়িতে কি সব শেকড় বাকড় বেটে তার সর্বাঙ্গে মাখিয়ে দিয়ে, শয়নের পট্টবস্ত্রটি দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হলো তার দেহ। কালী উচ্চৈঃস্বরে কইলো, “প্রত্যেকে আমার গা ছুঁয়ে দাঁড়াও।”
এদেরকে আগেই বলা ছিল, ফলে সকলেই বিনা বাক্যব্যয়ে শিশুটিকে গোলাকারে ঘিরে পরস্পরের শরীর ছুঁয়ে দাঁড়ালো। বিড়বিড় করে কিছুকাল মন্ত্র পড়ে, কালীপদ নিজের দক্ষিণ হস্তটি শিশুর উপর দিয়ে সবেগে ঘুরিয়ে, চিৎকার করে উঠলো, “শীঘ্র তোমরা লুকিয়ে পড়ো গাছের আড়ালে।”
শোনামাত্র সকলে পড়িমড়ি দৌড়ে এখানে ওখানে লুক্কায়িত হয়ে পড়লো।
নিজের নিজের নিঃশ্বাস স্তব্ধ করে প্রত্যেকটি মানুষ অপেক্ষা করচে এক পাশবিক ক্ষণের। তাদের হাতে বাঁধা রয়েচে কালীর দেওয়া শেকড়, ফলে আশু প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা তাদের নাই। প্রত্যেকের যখন উত্তেজনায় নিজের করতল দংশন করার উপক্রম হয়েচে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মড়মড় মৃদু শব্দ জানান দিলো কালাডোংরার অপরাজেয় দানব উপস্থিত। উপরের উঁচু চূড়াগুলিকে ঢেকে দিয়েচে একখানা নিকষ কালো দেহ। একটি দুইটি ডাল, পাতা খসে পড়চে নীচে। ধীরে ধীরে একখানা অতিকায় বাদুড়ের মতো লোমশ মুখ নেমে এলো নীচের দিকে। প্রত্যেকের হৃদযন্ত্র যেন লাফিয়ে উঠল ভীষণ ভয়ে। শিশুটির থেকে সামান্য উপরে এসে পড়েচে এই রাক্ষস। গিরীশের একবার মনে হলো একখানা সূচাগ্র তীরকাঠি যদি শয়তানটার চোখ লক্ষ্য করে ছোঁড়া যায়? কিন্তু নিজেকে অতি কষ্টে সম্বরণ করলে সে। আর এক লহমা পরেই কালীপদর তৈরি তেজবলয়ে এসে ঠেকবে পিশাচটা।
আরও নেমে এলো বাদুড়ের মতো কদাকার জীবটা। তেজরেখাকে স্পর্শ করার ঠিক পূর্বে এসে থমকে দাঁড়ালো সে। কালীপদ গোপন অন্তরাল থেকে উত্তেজনায় নিজের আঙুল মটকে ধরলো। শয়তানটা এদিকে ওদিকে তাকিয়ে এইবার যা করলো, তাতে সকলে ভীষণভাবে চমকে উঠল। তার দীর্ঘ, লোমশ হাত নেমে এল তার মুখের পাশে। তাতে ধরা রয়েচে একখানা শকুন। পাখিটা আতঙ্কে ছটফট করে চলেচে। কালী বিস্ফারিত চক্ষে বিহ্বলভাবে দেখল বাদুড়টা একবার জ্বলন্ত নজরে চারদিকে লক্ষ্য করে শকুনটাকে সজোরে ছুঁড়ে দিলো নীচের দিকে। মন্ত্রের রেখাকে স্পর্শমাত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেল পাখিটা, আর সেই সাথে কালীপদর গড়ে তোলা বন্ধনরেখা সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল, সেইসঙ্গে কালীপদ টের পেলো যে এই ধূর্ত জীবকে সে যতখানি ধূর্ত ভেবেচিলো, এ তার চাইতেও বহুগুণ কুটিল। কালীপদর মন্তরের জোরে সে এই দুইদিন তাদের নিকটে ঘেঁষতে না পারলেও, অন্তরালে থেকে সে প্রত্যেকের মনের কথা পড়ে নিয়েচে। যে বন্ধনে ঠেকা মাত্র শয়তানটা নিপাত যেত, সেই বাঁধনগণ্ডীকে এই নরখাদক হেলায় বিনষ্ট করেচে। বাঁধন কেটে যাবার পরেও সতর্ক রাক্ষস একবার নিজের প্রকাণ্ড হাতের অগ্রভাগ প্রবেশ করালো বন্ধনীর ভিতরে, তারপর সবেগে নিজের সূঁচালো দাঁতের সারি উন্মুক্ত করে ঝাঁপিয়ে পড়লো শিশুর নরম মাংসল শরীরের উপরে।
সকলে নীরবতা ভুলে হায় হায় করে উঠলো। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো গাছের বা ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে রয়েচিলো, কিন্তু পালানোর তাড়াহুড়োয় কেউ কালীপদর অবস্থান লক্ষ্য করার অবসর পায়নি। এইবার পেলো। সকলে হতভম্ব হয়ে দেখলে, বটগাছের সেই বিরাট কোটরের থেকে বিদ্যুৎবেগে একটা বলিষ্ঠ হাত বেরিয়ে এসে ছোঁ মেরে শিশুটিকে পাটের পুঁটলি সমেত তুলে নিলো, আর ততধিক ক্ষিপ্রবেগে সেই স্থানে হুবহু অপর একটি পুঁটুলি স্থাপন করল। রক্তলোলুপ বাদুড় নিজের দীর্ঘাকার হাত দিয়ে সেই দ্বিতীয় পুঁটুলিকে চোখের পলকে ছিনিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিজের করাল চোয়ালে পুরে গিলে ফেলল।
এক পলকেরও কম সময়ের মধ্যে নিজের বিরাট ভুল বুঝতে পেরে হিংস্র ভঙ্গিতে নিজের মুখ খুলল রাক্ষসটা, আর তার পেটের ভিতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল, – “অউমমম্ কুররাআআ।”
বাদুড়রূপী সেই রাক্ষুসে নরখাদক জীব তীব্র জিঘাংসায় কানফাটানো শব্দে হতাশায়, আক্ষেপে আর্তনাদ করে উঠল। তার শরীর ফুলে ফেঁপে তিনগুণ হয়ে গিয়ে সশব্দে দুই ভাগ হয়ে আছড়ে পড়ল, আর তার মধ্যস্থলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকল একখানা দীর্ঘ, কদাকার বৃক্ষ।
*****
দ্বিপ্রহর নাগাদ নয়জন মিলে ফিরে এল গাঁয়ে। গোটা গ্রামে তখন রীতিমতো বিজয় উৎসবের পরিবেশ। হরিকিঙ্কর যথারীতি হুঁকায় টান দিতে দিতে ঘুরে বেড়াচ্চে আর হাঁকডাক করে চলেচে, “বলি ও মিনতি, তোর নুচি ভাজা হতে হতে যে সূয্যি পাটে বসবে মা। আর তুমি ব্রাহ্মণী, ঐ বুঝি তোমার জলছড়া দেওয়ার ছিরি হচ্চে? বাছারা কতো হাঁপসে এয়েচে বনবাদাড় থেকে…।”
শুধু গাঁয়ের লোকেরাই নয়, কালীপদর দলের বাকি আটজনও কালীপদকে ঘিরে বসে রয়েচে। কালীগুণীন মুখে বেগুনভাজার সঙ্গে নরম লুচির টুকরো পুরে, তৃপ্তির সঙ্গে চিবুতে চিবুতে বলতে শুরু করল
“প্রথমেই কয়ে রাখচি, এই জয়ের কৃতিত্ব কিন্তু আমার সামান্যই রয়েচে, যা করেচি দশজনে মিলে করেচি। ছেলে, বুড়ো, নারী, পুরুষ মিলে আপনারা যেভাবে যুদ্ধের সাজোসাজো রব তুলেচিলেন, তাতে পঙ্গুও গিরিলঙ্ঘন করতে পারে। এই নরখাদক শয়তান যে কেন জন্মায় তা আমি জানিনে, কিন্তু কীভাবে জন্মায় তা আন্দাজ করতে হয়তো পেরেচি। যেদিন শয়তানটার আক্রমণ আরম্ভ হয় তার আগের রাতে জঙ্গলে আগুন লেগেচিলো শুনলাম। এই লোনা জলবাতাসে দাবানল হয় বলে শুনিনি। আমার সন্দেহ হয় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বহু বৎসর বাদে বাদে এই মহাবনে উল্কাপিণ্ড এসে পড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাঙে ঐ রাক্ষসের। সংসারের বহু বিষয় এমন রয়েচে, যা নিত্য ঘটে, কিন্তু যতদিন না স্বয়ং মহাকাল সেই রহস্যের যবনিকা উন্মোচন করেন, তদ্দিন সেই রহস্য অজানাই থাকে। বনের ভিতরে মানুষের বাস নাই, অথচ স্থানে স্থানে বিরাট বিরাট জলাশয়। কেন? তার আশপাশে উদ্ভিদই বা জন্মে না কেন? কারণ ঐসব যুগে যুগে উল্কাপাতের ফলেই হয়তো ওগুলি সৃষ্ট হয়েচে। তার চারদিকের জমি আর প্রাণধারণ করতে পারে না।
“আসলে ঐ শয়তানটার চালচলন আর শিকার ধরার বর্ণনা শুনে, এবং রতনের উপরে তার আক্রমণের ভঙ্গি দেখে এটুকু আমি আঁচ করেচিলাম যে এই শয়তান নির্ঘাৎ মনের ভিতরের কথা বুঝতে পারে। সে কথা তোমাদের আগেই তো কয়েচি, কিন্তু খটকা ছিল একটাই ব্যাপারে। রাক্ষসটা নিজের শিকারের পালাবার সময় প্রতিবারই এলোপাতাড়িভাবে থাবা চালাতে থাকে। তিনুর মুখেও শুনেচি এবং নিজেও দেখলুম। কিন্তু এর কারণ কি? এত ধূর্ত, এত চতুর একটা শয়তান, কিন্তু তার শিকারকে ধরার পদ্ধতি এত এলোমেলো কেন?
“দ্বিতীয় কথা, যমকুইলা পাখির নখে সম্ভবত তীব্র জীবনঘাতী বিষ রয়েচে, ফলে তার নখের আঁচড়ে শিকার অবসন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু এত শক্তিশালী কালাডোংরার রাক্ষসের এই ক্ষুদ্র পাখিটার দরকার পড়ে কেন? সে তো চাইলে নিজেই শিকার ধরতে পারে। এই প্রশ্নটাই আমাকে সবচাইতে বেশি ভাবাচ্চিলো। কিছুতেই জবাব পাচ্চিলাম না। পেলাম গতকাল রাতে, আর পাওয়া মাত্র আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে দেখা দিলো।
রাতে যখন বাজ পড়েচিলো, তখন রতন আমাকে বলল যে বাজটা নাকি অনেকক্ষণ ধরে পড়েছে। আমি তাকে এমন ভ্রান্ত ধারণার কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়েই কিন্তু নিজের অজান্তেই সেই অধরা সূত্রতে হাত দিয়ে ফেলেচিলাম। আমাদের মস্তিষ্কে মাঝে মাঝে একরকম ভ্রান্তি তৈরি হয়। আমরা অতি দ্রুতবেগে ছুটন্ত কোনো বস্তুর যথার্থ অবস্থান ধরতে পারি না। যেমন বিদ্যুৎ পাখার লোহার ডানা। আমরা চোখে কিছু দেখলে আমাদের মাথায় কিছুক্ষণ অবধি তার একটা ছবি রয়ে যায়। এই যে, আমার এই হাতখানা যদি আস্তে আস্তে নড়াই তবে তোমরা বুঝতে পারচো, কিন্তু এই… এইরকমভাবে যদি ভীষণ গতিবেগে নড়িয়েই আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনি, তবে তোমাদের মনে হবে যে হাতটা আগের জায়গাতেই রয়েচে। তাই না? বুড়ো ভটচায কিন্তু মণিমাকে এই ইশারাই দিয়ে গিয়েচিলো। মনে পড়ে?
“হয়। এই ভুলটা মস্তিষ্কের ধরে রাখা ওই ছবির কারণেই হয়। কালাডোংরার রাক্ষসটাও এই দূর্বলতার শিকার ছিল। বাদুড় গোছের জীবরা সাধারণতঃ শব্দ দিয়ে দেখার কাজটা চালিয়ে নেয়, কিন্তু এই নরখাদক চোখ দিয়ে সবই পরিষ্কার দেখতো, কিন্তু সামান্য দেরিতে। তাই শিকার দৌড়ে পালানোর সময়ে সে সেইসব স্থানে ভুল করে থাবা দিতো, যেইখানে তার শিকার একটু আগেই ছিল। রাক্ষসটার মাথাতেও ওই ছবি ধরে রাখার মনোবৃত্তিটা কাজ করতো, আর ঠিক এই দূর্বলতার কারণেই তার দরকার পড়তো শিকারকে চলৎশক্তিহীন করে ফেলার। এই কাজে তার প্রয়োজন পড়তো যমকুইলা পাখিকে। সে ছোঁ মেরে বিষ ঢেলে হতভাগ্য শিকারকে নিশ্চল করে ফেলতো। প্রতিবার একটি করে পাখি মরার পর সেই অপদেবতা আবার কোনো উপায়ে অবলীলাক্রমে আরেকটিকে জোগাড় করে নিতো। এইটি অবশ্য আমার পক্ষে অনুকূলই হয়েচে, কারণ আমি যখন তার ডানা ছেঁড়া পাখিটাকে বন্দি করেচিলাম, সে আর বিশেষ খোঁজাখুঁজি আবশ্যক মনে করেনি।
“আমিও তার এই দূর্বলতারই সুযোগ নিয়েচি। আমি জানতুম সে মনের কথা পড়তে পারে, তাই তোমাদের কারুকে আমি আমার পরিকল্পনা জানাইনি। নিজেকেও নিজে প্রাণপণে এটাই বুঝিয়েচি যে বাচ্চাটিকে আমি সত্যিই আহুতি দেবো। যমকুইলা পাখির কথাটা আমার মনের একেবারে গহীনে ছিল। উপর উপর আমি তোমাদের মতোই কেঁদেচি, মন থেকে দুঃখ করেচি, নিজেকে নিজেই ভুল বুঝিয়েছি, ফলে শয়তান আমার মনের ভাবের ঘরে সিঁধ কেটে মিথ্যা তথ্য পেয়েচিলো। চেষ্টা করলে মনকে এইরূপ শাসিত করা যায়। মহাত্মারা পারেন বলে শুনেচি, কিন্তু আমি ও যে পেরেচি তা শুধুই গুরুর দয়া। শিশুটির চারপাশে আমি যে বাঁধন দিয়েচিলুম তা কেবল ঐ দানবের আত্মতুষ্টির জন্য বৈ তো নয়। সে ওখানাকে ভেঙে ভেবেচে ঐটেই বুঝি আমার চালাকি ছিল। মনের ভিতরের কথা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।”
অশ্বিনী অত্যন্ত চমৎকৃত হয়ে হাসতে হাসতে শুধোলো, “তবে ঠাকুর, সৎপতির নাতিকে ঐ সিন্দুর মাখানো, ঐ খলনুড়ি, ওসব স্রেফ ভড়ং ছিলো বলো?”
“না কবরেজ মশায়, ভড়ং নয়। ওই প্রক্রিয়ার নাম সুবর্ণকরণী। এর ফলে রুগ্ন শিশু সম্পূর্ণরূপে রোগমুক্ত হবে। পরিমিত জ্বর ব্যতীত অপর কোনো রোগ তার থাকবে না।”
“কিন্তু জ্বর কেন?”
কালী হেসে উত্তর দিলে, “কারণ প্রতিটি জীবিত প্রাণীর শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বর থাকতেই হয় যে। আপনার তো জানার কথা।”
কবিরাজ অশ্বিনী নিজের ভুলে লজ্জায় জিভ কাটলো। কইলো, “তাই যেন হয় ঠাকুর। বাচ্চাটা সুস্থ থাকলে তাও কিছুদিন খাইয়ে দাইয়ে বাঁচবে। ওকে তো আর দেখভাল করার তেমন…’
কালীপদ স্মিতহাস্যে উত্তর দিলে, “তার আর আবশ্যকতা নাই কবরেজমশায়, আপনাদের সকলের জীবনদাতা এই শিশুকে আমি পালন করবো। ও রায়দীঘড়ার ছেলে হলো আজ থেকে। কিরে হতভাগা, যাবি তো?”
শিশু কালীপদর আঙুল নিজের ক্ষুদ্র হাতের মুঠায় পুরে জানালো তার অমত নাই। সকলে হেসে উঠলো।
পরদিনই যথাবিধি উপাচারে, কালীপদর পৌরহিত্যে ওলাংমারার বিসর্জন করে যজ্ঞের ঘট নড়িয়ে দেওয়া হলো। পূজা শেষে যখন আগামী এক বৎসরের জন্য মন্দিরের দ্বার বন্ধ করা হচ্চে, তখন মূর্তির দিকে চেয়ে কালীপদর মনে হলো ওলাংমারা হেসে বলচেন,
–“কি, বলেচিলাম না? পারলে তুমিই পারবে?”
কালীগুণীন একটু হেসে, জোড়হস্তে প্রণাম করে দেউলের দ্বার রুদ্ধ করলো।
***
