রাধাকান্তর হেঁয়ালি
সোঁদরবনের অন্তর্গত হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীটা বইতে বইতে যখন নামখানা তালুক ছাড়িয়ে নৌকাঘাটের নিকটে বাঁক নিয়েচে, সেইখানে এ আরেক রায়বাটি। এই বাড়ির প্রধান পুরুষ হল রাধাকান্ত রায়। সম্পর্কে দেবনগরের বাসুদেব রায়ের খুড়া। দেবনগর থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব তেমন অধিক নয়, গোরুর গাড়িতে এক ঘন্টাটাক আর এক্কাতে এলে আরও অনেক কম। তো, ভাদ্রের সংক্রান্তির ঠিক আগের রাতের কথা। দুইদিন ধরে শতানিক বাণের ধারায় অনর্গল বৃষ্টি হয়ে চলেচে। চারদিক জলে থইথই। বিরাট বাড়িটার ভিত অনেকটাই উচ্চ, তাই পথের জল এখানে উঠতে পারেনি। উঠানের এক কোণে পোড়া মাটির তৈরি কালীমন্দিরে পূজা চলেচে। আজ অমাবস্যা লেগেচে। কাল ছেড়ে যাবে। রায়দের পারিবারিক লোহার কারখানায় কাল বিশ্বকর্মা পূজা। আজ সকালেও বহু লোকজন বাড়ির অনতিদূরে নদীতে পিতৃপুরুষের তর্পণ সেরেচে। গোটা বাড়ির প্রায় প্রত্যেকেই মন্দিরে উপস্থিত রয়েচে, শুধু রাধাকান্ত বাদে।
রাধাকান্ত বয়সোচিত কারণে নড়াচড়া বড়ো করতে পারেন না। অহোরাত্র কেবল বইপত্তর পড়েন আর দেশবাড়ি থেকে নিয়ে আসা কিছু প্রাচীন পুঁথিপত্র ঘেঁটে রায়বংশের গৌরবময় ইতিহাস অন্বেষণ করেন। নীচে হৈহৈ, হুলুধ্বনি আর শঙ্খ কাঁসরের শব্দে তিনি কিঞ্চিৎ বিমনা হলেও মন্দ লাগে না। গোটা পরিবারকে একসঙ্গে একজোট দেখাটাও একজন বৃদ্ধের পক্ষে খুবই পরিতৃপ্তির। প্রকাণ্ড ঘড়িটায় ঢং ঢং করে আটটার ঘণ্টা পড়তে রাধাকান্তর বৌমা, অর্থাৎ বলরাম রায়ের স্ত্রী কাঁসার বড়ো জামবাটিতে সিকি বাটি কবোষ্ণ দুধ আর দুটি চাঁপাকলা নিয়ে শ্বশুরের পালঙ্কে রেখে কইলো, “খেয়ে নিন বাবা, রাত হলো।”
রাধাকান্ত কলা দুটি খেয়ে দুধের বাটিতে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে বললো, “চাঁপাকলা কে আনলে বৌমা? পূজার কি?”
বৌমা গৌরী কলার খোসাদুটি তুলে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে বললে, “বাবার যেমন কথা, পূজার ফল পূজার আগে পাবো কোথা? ও কলা আপনার নাতি কলকাতা থেকে ফেরার সময়ে নিয়ে এসেচিল কাল। ইন্দুরের ভয়ে ছিকেয় রেখে দিইচিলাম, আজ নামালুম…”
“ভালো করেছ।”
হঠাৎ বাইরের জানালার বাইরে কী যেন একটা ঝটাপট শব্দ তুলে উড়ে গেল! গৌরী ভ্রু কুঁচকে সেদিকে চাইতে রাধাকান্ত বললে, “ও পেঁচা বৈ কিছু নয়।”
“এই অঝোর বৃষ্টিতে পাখি বেরোয় কখনও শুনিনি বাবা। এ বাড়ির সবই উলটো নিয়ম।”
কথায় কথায় গৌরী ঔষধের তেপায়ার দিকে চেয়ে সন্দেহের সুরে কইলো, “কুইনিনের মিক্সচারটা কমেনি কেন? সকালেও যা দেখলুম, এখনও তাই! খাননি না? সব ওষুধ কি যষ্টিমধু হয় বাবা?”
রাধাকান্ত বিপন্ন মুখে ইতস্ততঃ করে কইলো, “তা ধরো বৌমা, হ্যাঁ খেলুম তো? দিব্যি মনে রয়েচে। খেলুম না?”
গৌরী অসন্তুষ্ট হয়ে কইলো, “খেলেন বৈকী। আমি দেখতে গিয়েচি কিনা? সব মিছে কথা। আমাকে যদি শান্তা কান্তার মতো নিজের মেয়ে মনে করেন তবে আমার দিকে তাকিয়ে বলুন তো, হ্যাঁ বৌমা আমি খেয়েচি।”
বৃদ্ধ গৌরীর চোখের পানে চেয়ে অপরাধীর মতো মুখ করে বললো, “ভুল হয়ে গেছে মা এইবারটি…
গৌরী উত্তর দিল না।
“ভালো কথা বৌমা, ইন্দ্র যদি আবার কলকাতায় যায়, ওকে বলো রেডিওর লাইসেন্সখানা যেন অমনি সঙ্গে নিয়ে যায়। চালু করিয়ে আনতে হবে আবার। লাইসেন্স ছাড়া রেডিও চালালে আবার কি হাঙ্গামা হয়। ছাতে এন্টেনা দেখলেই হতভাগাগুলো বুঝে ফেলে যে ঘরে রেডিও যন্ত্র রয়েচে। এভারেস্ট রেডিও কোম্পানির আপিসে গেলে ওরাই করে দেবে সব। আর রেডিও চালানোর ব্যাটারী দু-খানার জল বদলে আনতে বলবে।”
“আচ্ছা, বলে দেবো। আমার বুকের ব্যামোর ওষুধ আনতে যাবার কথা আছে কলকাতায়। ইন্দ্ৰ কাল কী বলচিল জানেন? বলচে কলকাতার রাস্তায় নাকি রেলগাড়ির মতো একরকম টিকিওয়ালা…”-
বাইরে একটা ভয়ানক গম্ভীর গুম্ গুম্ গুম্ শব্দের সঙ্গে গৌরীর অর্ধোচ্চারিত শব্দ মুখেই আটকে গেল! নীচের কাঁসর ঘণ্টা থেমে গিয়ে ভীষণ কোলাহলের আওয়াজ পাওয়া গেল। সবাই যেন কিছুতে ভয় পেয়েচে!
রাধাকান্ত নড়তে পারে না বিশেষ, গৌরী ধড়মড়িয়ে প্রশস্ত বারান্দায় ছুটে গেল। নীচ থেকে বলরামের চিৎকার পাওয়া গেল, “বাবাকেও ছাতে নিয়ে চলো গৌরী!”
স্বামীর কথা শুনে আর স্বচক্ষে নীচের তলার অবস্থা দেখে পরক্ষণে প্রাণপণে ছুটে এসে ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার করে বলল, “সর্বনাশ হয়েচে বাবা! নদীর বাঁধ ভেঙে গিয়ে সব ডুবে গিয়েচে! নীচের তলায় এক লাফে জল উঠে গিয়েচে! কতদূর উঠবে জানি নে। আপনার ছেলে আপনাকে নিয়ে এখনই….
রাধাকান্ত অতি কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে টলমল করে বলল, “আমি শুনেচি বৌমা। আমাকে ধরো।” উঠতে গিয়ে পা টলে রাধাকান্তর ধাক্কায় তার কাগজপত্র আর দুধের পাত্র মেঝেতে ছিটকে পড়লো।
গৌরী খুব সামলে শ্বশুরকে নিয়ে ছাতে উঠে এলো। উঠতে উঠতেই চারদিক দেখে রাধাকান্তর চক্ষে জল এলো। সব ডুবে গিয়েচে! জল দুইতলা ছুইছুই করচে! না জানি বাইরে কত গরীবগুর্বো ডুবে গিয়েচে এর মধ্যেই! ছাতে ওঠার পরিশ্রমে সে ছাতের প্রাচীরে ঠেস দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কইলো, “বলরামকে বলো, ইতর-ভদ্র যে কেউই যদি আশ্রয় নিতে চায় রায়বাড়িতে, তাকে আশ্রয় দিতে।”
গৌরী উত্তরে অবাক গলায় বললো, “তাঁকে কী করে বলবো বাবা এখন? আপনার ছেলে তো পুজোয় বসে?”
“মানে?”
উত্তরে রাধাকান্ত কী একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ বিস্ময়ে কাঠ হয়ে গেল! নীচের উঠান থেকে হুলুধ্বনি আর শঙ্খের শব্দ আসচে! রাধাকান্ত কষ্টে পিছন ঘুরে নীচের দিকে তাকাতেই দেখে, কোথায় জল, কোথায় কী? সকলেই মন্দিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে রয়েচে, আর তাদের মধ্যে তার বৌমা গৌরীও শঙ্খ হাতে দাঁড়িয়ে! রাধাকান্ত ইষ্টস্মরণ করে পিছন ঘুরে দেখলো গৌরী তখনও মৃদু মৃদু হেসে চলেচে! রাধাকান্ত চাপা গলায় বললে, “রায় রাজপরিবারের প্রচলিত লোককথা তবে অলীক নয়? মনগড়া নয়? যদি ভ্রান্ত না হই তবে তুই-ই সেই নরকের কীট পিশাচ, যাকে রাজমাতা ইন্দুমতী…”, কথা শেষ হবার আগেই রাধাকান্তর শরীরটা এক রাক্ষুসে আঘাতে ছিটকে পড়লো মন্দিরের ঠিক সামনে, সবার মাঝে
গোটা রায়বাটীতে কান্না, আতঙ্কের চিৎকার আরম্ভ হয়ে গেল। পূজা অসমাপ্ত থেকে গেল বলাই বাহুল্য। পাইক, পিয়াদা, দ্বারবান থেকে বলরাম, গৌরী আর বাকিদের মধ্যে ভীষণ ত্রাস ছড়িয়ে পড়লো। কেউ কেউ ছাতে ছুটে গেল। রাধাকান্তর নাতি ইন্দ্রদেব তার দাদাইয়ের মাথা কোলে তোলার চেষ্টা করচিলো, সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, “দাদাই…”
সকলে ছুটে এসে দেখলো রাধাকান্ত তখনও অবধি জীবিত রয়েচে! বৃদ্ধ নাতিকে কিছু বলতে চাইচে, হঠাৎ রাধাকান্তর মুমূর্ষু চোখ গেল ছাতের দিকে! সেখানে সেই ভয়ঙ্কর পিশাচ আগুনের মতো চোখ মেলে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েচে! পিশাচটার গা ঘেঁষেই ছাতে ছুটে যাওয়া দুইজন দ্বারবান নীচে তাকিয়ে চিৎকার করে বলচে, “কৈ বাবু, ছাতে তো কেউই নাই?”
ইন্দ্র কেঁদে ফেলে বললে, “কী হয়েচে তোমার দাদাই? কিছু বলবে দাদাই? ও দাদাই…”
রাধাকান্ত পিশাচের মুখ থেকে নজর সরিয়ে দুই চোখ মুদ্রিত করে আপন মনে ভাঙা গলায় বললো, “তারা, পাতা, জল / কোথা পাবি বল? / চোখ ছলছল?” তারপরই নাতির কোলে চিরদিনের মতো ঢলে পড়লো রাধাকান্ত। ইন্দ্র তার দাদাইয়ের হেঁয়ালির স্বভাব জানতো, কিছু কিছু বুঝতোও। ইন্দ্ৰ চোখ মুছে, ভ্রু কুঞ্চিত করে একবার ছাতের দিকে চাইলো। কেউ নেই! শুধু ছাতের উপর ঝুঁকে পড়া আমগাছটার একরাশ পাতার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করচে। কিন্তু তার মন বলচে এখুনি কেউ ছাত থেকে তাকে দেখচিল।
