লম্ববেগার নরমেধ
এই ঘটনার পর একটা হপ্তা কেটেচে কোনোক্রমে। অশৌচের কাজ তিনদিনে সমাপন হয়েচে। দেবনগরের বাটী থেকেও দ্বিপ্রহরে এসে শোকজ্ঞাপন করে গিয়েচে। তাদেরও অশৌচ পড়ে। দেবনগরের সেই ঘটনার কথা ইন্দ্রর কানেও লোকমুখাৎ পৌঁছালে পর ইন্দ্র টের পেল যে, ওই বাড়ির ওই দারোগার হত্যার সঙ্গে রাধাকান্তর হত্যার শতভাগ যোগাযোগ রয়েচে। কিন্তু সে কথা যদি সত্য হয় তবে গোটা রায়বংশকেই ঘরে ঘাপটি মেরে সতর্ক অবস্থায় দলবদ্ধ হয়ে থাকতে হয় অনন্তকাল। তাও কি সম্ভব! আজ নয় কাল কলকাতায় মায়ের চিকিৎসকের কাছে তাকে যেতেই হবে মায়ের হৃদরোগের ঔষধ আনার জন্য। সে কেমন করে ঘরে বসে থাকে?
ঠিক পরদিনই আরও একটা দুঃসংবাদ এসে আছড়ে পড়লো দেবনগরের নায়েবের মুখে। গতকাল রাতে বাসুদেবের স্ত্রী সরযু খুন হয়েচে! কাকভোরে তার ঘাড়-ভাঙা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েচে বাড়ির পিছনের পাতকূয়ার ভিতরে। কূয়ার পাশে রাধামাধবের প্রসাদের একরাশ মুড়কি, কদমা আর খইয়ের মোয়া ছিটিয়ে রয়েচে। সে রাত্তিরবেলা রাধামাধবের প্রসাদ নিয়ে কেন পাতকুয়োর পাড়ে গিয়েচিল, তা কেউ বলতে পারলে না। বাসুদেবও না। দারোগা হত্যার পরদিন থেকেই বাসুদেব একজন লেঠেল নিয়ে নিজের শয়নকক্ষে শুতো, আর স্ত্রী-সহ আরও তিনজন ঝিকে দোরের বাইরে দুইজন লেঠেল দিয়ে পশ্চিমের কক্ষে রেখেচিল, যাতে বাসুদেবের উপর আক্রমণ হলেও স্ত্রীর ক্ষতি না হয়, কিন্তু বিধি বাম!
দুঃসংবাদ আরও ছিল। পরদিন পুলিশ চৌকি থেকে নূতন দারোগা এসে খবর দিলে, গত পরশু মঙ্গলকান্ত পুলিশের গুলিতে মারা পড়েচে। বাসুদেব বা কেউ মৃতদেহ আনতে যাবে কিনা সেই কথা জানতে এসেচে তারা। বাসুদেব যে মঙ্গলকে কতখানি ভালোবাসে তা সেইদিন তার উন্মত্ত পাগলামিতে সবাই টের পেলে। শুধু কেঁদেকেটে শয্যা নেবার কথা ছিল যার, সেই মানদা প্রথমটা পুলিশদের নীচু গলার কথাবার্তা আঁচ করতে পারেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করামাত্র আগুনঝরা চক্ষে ছুটে এসে সেপাইটির হাত চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো, “মিথ্যা কথা, সব তোদের মিথ্যা কথা। তার সন্ধান কিছুতেই আমি দেবো না তোদের। আমি বিশ্বাস করিনে। বিশ্বাস করিনে তোদের…
সকলে চেপে ধরে মানদাকে অন্দরে নিয়ে গেল। সে কাতর মুখে সবাইকে বোঝাতে লাগলো যে তার মঙ্গল মরতে পারে না। কিছুতেই সে মরেনি। তার পাথর চোখ থেকে একবিন্দু জলও না পড়াই সবার কাছে প্রমাণ করলো তার নাড়ী ছেঁড়ার যন্ত্রণা। সবাই তাকে আগলে রাখলো। এই দুই দুঃসংবাদ নায়েব রতিকান্ত বাঁড়ুজ্জের মুখে রাধাকান্ত রায়ের বাড়িতে পৌঁছোলো।
বলরামের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। সে তার বাকি দুই ভাইপোর চেয়ে দামাল মঙ্গলকে মনে মনে অধিক স্নেহ করতো। তার বৌঠান মাটির মানুষ ছিল। বলরাম বাপের অপঘাতকে কিন্তু অশরীরী কিছু বলে মেনে নিতে পারেনি। তার ধারণা, মঙ্গলকে খুঁজতে এসে দারোগা মারা পড়াতেই পুলিশের লোকেরা চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে তার পরিবারকে বিনষ্ট করচে, কিন্তু তলিয়ে ভাবলে বলরাম বুঝতো যে, মঙ্গলের প্রতি পুলিশের ক্ষোভ দেবনগর ছাড়িয়ে নামখানায় তার পরিবারের উপর খামোখা পড়বে কেন? আর মঙ্গল নিহত হবার পরদিনই বা খামোখা তার মাকে হত্যা করবে কেন? বলরাম সাত পাঁচ ভেবে লেঠেল দ্বারবানের সংখ্যা দুইগুণ করে দিয়েচে, সর্বোপরি তার খাস লেঠেল শঙ্কর লাঠির আগায় রামদা বেঁধে ঘোরে। শরীরধারী কোনো শত্রুরই রেয়াৎ নেই। শঙ্কর বলল, “আপনি রয়েন কর্তা, আমি না ডাকলি বাইরে আসবেন না, মনের ভুলেও আমি দেখি সে কেমন খুনী। আমি শঙ্কর লেঠেল, আমি তার মওড়া নেবো।” শঙ্কর তক্কে তক্কে থাকলো গোপনে।
নূতন প্রহরা বসানোর পর দুইটি দিন পার হয়েচে। রাত বেড়েচে। গোটা গাঁ নিদ্রা গিয়েচে, শুধু গোটা রায়বাটীর উঠান জুড়ে শঙ্কর তার দলবল নিয়ে অতন্দ্র প্রহরা দিচ্চে। বলরামের স্ত্রীর হৃদযন্ত্রের ব্যামো বলে সে ছেলের কক্ষে শোয় কারণ রাতবিরেতে চিৎকার করলেও বলরামের গভীর নিদ্রা ভাঙে না। বলরাম নীচতলার কক্ষে শয়ন করতে যাবে, হঠাৎ একটা নাগরাই জুতার অতি ক্ষীণ মচমচ শব্দে তার কান সজাগ হয়ে উঠল! কে যেন সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ফটকের দিক থেকে এদিকে আসচে! বলরাম জানালার কপাটটা খুলে দেখলো, শঙ্কর এক হাতে সলতে কমানো লন্ঠন আর অপর হাতে তার সড়কি বাগিয়ে ধরে শিকারী বেড়ালের মতো দেউড়ি দিয়ে পিছনের বাগানের দিকে চলেচে অতি লঘু পায়ে! দুই পা এগোয়, আবার দাঁড়িয়ে কিছু একটা নিরীক্ষণ করে। তার হাবভাব বলে দিচ্চে তার চোখে এমন কিছু একটা পড়েছে, যা রোজকার দৃশ্য থেকে আলাদা! বলরাম ঘরে রাখা সড়কিটা হাতে নিলো।
শঙ্কর দেউড়ি পেরিয়ে এগিয়ে গিয়েচে, পিছনে বলরাম এগিয়ে এসে নীচু স্বরে বলল, “কোথা যাস শঙ্কর? কী দেখেচিস?”
বলরামের কণ্ঠস্বর শুনে অন্ধকারে শঙ্করের ঠোঁটে একচিলতে হাসি খেলে গেল, সে হাসি বলরাম দেখতে পেল না। শঙ্কর তার উৎসুক চোখের দিকে একবার চেয়ে আপন মনে বিড়বিড় করে বলল, “জানতাম আপনি নিষেধ করলেও আসবেন কর্তা। রায়বাড়ির রক্ত তো।”
“কিন্তু দেখলিটা কী শঙ্কর?”
“কিছু একটা জ্বলন্ত বিন্দু ঘুরে বেড়াচ্চিল কত্তা কলাবনের ভিতরে! সেটা ভিতরে গিয়ে সেঁধিয়েচে। দেখি গিয়ে।”
বলরাম ইতস্ততঃ করে কইলো, “কিন্তু আর জনা দুই দ্বারবান নিলে হতো না শঙ্কর?”
“কাজ কী কত্তা? দু-জনই ভালো।”
দুইজনে এগিয়ে চললো কলাবনের ভিতরে। শঙ্কর আগে, বলরাম পিছনে। এখানে পৌঁছে বলরাম ফিসফিস করে কইলো, “এখানে তো কেউ নেই শঙ্কর? কী দেখলি তুই?”
শঙ্কর উত্তরে পিছনে ঘুরে কোনো কথা না বলে দাঁড়িয়ে রইলো। তার নিশ্চুপ থাকার কারণ এই নয় যে তার বলার কিছু নেই, কিন্তু সে বলরামের মাথার পাশ দিয়ে হাত পঞ্চাশেক পিছনে ফেলে আসা রায়বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো, নীচতলায় বলরামের কক্ষের জানালা থেকে বলরাম সড়কি হাতে এদিকেই তাকিয়ে রয়েচে নির্নিমেষ! সে পুরোদস্তুর তৈরি থাকলেও শঙ্করের কথা অমান্য করে কক্ষের বাইরে বেরোয়নি! দূরের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে কাছে আনতেই বলরামের রূপধারী পিশাচ বিদ্যুৎবেগে শঙ্করের লোহার মতো ঘাড়টা ধরে মট্ করে ঘুরিয়ে দিলো। শঙ্করের বাঘের মতো শরীরটা আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে নিস্তেজ হয়ে এলো।
বলরাম নিঃসন্দেহে শঙ্করের দিকেই ঠাহর করে জানালায় দাঁড়িয়েচিল। সে দেখলো শঙ্কর একাই চলেচে কলাবনে। এখন লন্ঠনের আলোটা মাটিতে পড়ে যেতে দেখে বলরাম টের পেলে যে গতিক ভালো নয়! সে চিৎকার করে দ্বারবানদের ডেকে ছুটে গিয়ে দেখলো, শঙ্করের দেহে তখনও ক্ষীণ প্রাণ রয়েচে। দ্বারবান রামজয় কেঁদে উঠলো, “কী হয়েচে তোমার ওস্তাদ? কী হয়েচে?”
বলরাম তার বুকের উপর ঝুঁকে পড়ে কাতর কণ্ঠে শুধালো, “শঙ্কর! শঙ্কর!”
শঙ্কর ভাঙা ঘাড় নিয়ে নিস্তেজ হাতে বলরামকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আকাশের পানে দুই হাত তুলে শূন্যে হাতড়িয়ে, বলরামের দিকে তাকিয়ে জড়ানো এবং নিষ্ফল ক্রুদ্ধ স্বরে একবার বললে, “জল…. জল… জল….”. তারপরেই জল আনার এক পলকও সময় না দিয়েই তার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল! বলরাম পাথর হয়ে বসে রইলো। তার ধারণা হলো, দূর থেকে শঙ্কর তাকে জানালায় অলস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তাকে কাপুরুষ ভেবে ঘৃণা করলো শেষ সময়ে। বলরামের বুকে শতমণ পাথর চেপে রইলো। সেই চিন্তা দশগুণ হয়ে গেল যখন ভদ্রাসনের চৌহদ্দিতে পরপর দুটি অকালমৃত্যুর জেরে গৌরীর পরপর ফিটের ব্যামো আরম্ভ হল। ইন্দ্র পরদিন মায়ের রোগের বাড়বাড়ন্ত দেখে বাপকে কইলো, “আমি ঘোড়ার গাড়িটা নিয়ে চললাম। আর উপায় নাই বাবা। হাসপাতালে সার্জেন মাকে আগেই দেখেচিলেন, মায়ের রোগের নিদানপত্র সঙ্গে নিয়ে যাচ্চি, তিনি দেখেই ওষুধ দিয়ে দেবেন।”
বলরাম প্রথমটা হাঁ হাঁ করে কইলো, “না না না, সে হতে পারে না। উকিলের হাটে যে কবরেজ মশাই আছেন, তাঁকে দিয়েই না হয়….”
“কবরেজ পারলে কবরেজই দেখাতুম বাবা। এ কবরেজের কাজ নয়। মায়ের হৃদযন্ত্র অর্ধেক বিকল। হাসপাতালে গিয়েই ওষুধ মিলবে বাবা। আর একটা অপমৃত্যু আমি হতে দিতে পারি নে। সাঁঝ হবার আগেই প্রাণপণ ফিরে আসবো, আর রামজয়, সত্যবান আমার সঙ্গে যাক। ভয় নাই।”
বলরাম স্ত্রীর মুখ চেয়ে বিমর্ষ মুখে বললে, “অনেকখানি পথ। সাঁঝ হবার আগে ফিরে আসিস বাপ আমার। আর এই গা বন্ধনের মাদুলীখানা এই লাল সূতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে যা।”, তারপর একটু থেমে বললে, “একজন গুণীনকে খবর পাঠিয়েচি সাগরদ্বীপের কাছে। খুব বড় গুণীন। সে এলে কিছু উপায় হতে পারে এই বিপদের।”
এই কথাটুকুতে বলরাম যে কি পরিমাণ অপত্যস্নেহ ঢেলে দিয়েচিল, তা একমাত্র ইন্দ্ৰই বুঝলো। সকাল সকাল ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চললো ছড়ছড় শব্দে আর সবার চক্ষের অলক্ষ্যে উড়ে চললো একটা কালো মেঘের মতো কিছু, ঠিক গাড়ির সঙ্গে তাল রেখেই। ইস্টিশানের পাশেই হাসপাতালের সামনে যখন গাড়িটা থামলো, তখন মেঘটা ঝুপ করে একটা শালিখ পাখির আকার নিয়ে হাসপাতালের গাছে গিয়ে বসলো, যেখান থেকে চিকিৎসকের রোগীকক্ষের ভিতরটা দেখা যায়, কথাবার্তা শ্রুতিগোচর হয়।
ইন্দ্র যখন ধড়মড় করে সার্জেনের কামরায় গিয়ে ঢুকলো, তিনি তখন ভিতরের পর্দা ফেলা নিরীক্ষা-কক্ষে নিজের কম্পাউন্ডরকে নিয়ে সম্ভবত দুইজন রোগীর সঙ্গে কথাবার্তা বলচিলেন। কাউকে দ্রুতপদে ঢুকতে শুনে তিনি পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এসে বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, “একী? ইন্দু যে? সব ঠিক তো? খবর না দিয়েই এলে যে বড়ো? সব কুশল তো?”
ইন্দ্ৰ প্রেশক্রিপশনটা টেবিলে রেখে কইলো, “মায়ের বুকের ব্যাথাটা বড় বেড়েচে ক-দিন, ওষুধ নিতে ছুটে এলাম। একটু তাড়া রয়েচে, যদি এক্ষুনি দিয়ে দেন তবে বেরিয়ে পড়ি।”
পোড়খাওয়া সার্জেন মায়ের জীবনরক্ষায় সন্তানের আকুলতা বুঝে নিদানপত্রটার উপরে আরও দুই ছত্র লিখে ভিতর থেকে কম্পাউন্ডরকে ডেকে মিক্সচার তৈরির আদেশ দিয়ে কইলেন, “দেখো বাবা, আমি কম্পাউন্ডকে মিক্সচার তৈরি করতে দিলুম, কিন্তু তাতেও আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। তোমাকে দেখে বড়ো বিধ্বস্ত মনে হচ্চে! এ কি কেবল মায়ের অসুস্থতার জন্য? তোমার শরীর ঠিক আছে?”
ইন্দ্র প্রথমটা অস্বীকার করবে ভাবলেও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের খর দৃষ্টির সামনে আগল দিতে পারলো না। সে দুই বাড়িতে আদ্যোপান্ত যা যা ঘটেচে সব বলার পর কিছুটা মনের ভার লাঘব হল বটে, কিন্তু ডাক্তারবাবুর মুখচোখে করুণার দৃষ্টি দেখে ইন্দ্র পরিস্কার টের পেলে যে, তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে এই অলৌকিক কাহিনীর এক বিন্দুও বিশ্বাস করেননি, শুধু ভদ্রতার বশে চুপ আছেন। সার্জেন ভিতরে গিয়ে একটু পর তিনটি ওষুধের মোড়ক এনে দিয়ে বললে, “তোমার তাড়া রয়েচে বললে, এখন আর ওষুধের বিবরণ দিচ্চি না, মোড়কে মোড়কে লিখেই দিয়েচি, গিয়ে সেইমতো অনুপান করিও। আচ্ছা, আবার দেখা হবে পরে।”
ইন্দ্র বিষণ্ণ মনে ওষুধগুলি আর প্রেশক্রিপশনটা নিয়ে কামিজের বুক পকেটে ভরে বেরিয়ে এলো বাইরে। গাড়ি নামখানা অভিমুখে ফিরলো, সঙ্গে মেঘটাও আবার ফিরে এসেচে।
ঝড়টা উঠেচিল মোহনার কাছাকাছি পৌঁছাতেই। ধূলায় ঢাকা দৃশ্যমানতা পেরিয়ে গাড়িটাকে চলতে হয়েচিল মন্থর গতিতে। ফল যা হবার হল। মোহনার থেকে কাকদ্বীপের পথেই ঝুপ করে আঁধার নেমে এলো! গাড়ির নীচে দুইখানা ঝোলানো শিশ্ লন্ঠনেই আগুন দেওয়া হয়েচে। সেই আলোতেই পথ চলেচে গাড়ি। একে সাঁঝের আঁধার, তায় ঝড়ের দাপটে আকাশও অদৃশ্য। পথের দু-ধারে নিকষ বনবাদাড় আর তার বুক চিরে সরু পথ। সেই পথে যদি লণ্ঠনের আলোতে যাও তবে বুঝবে দু-পাশের ঝোপঝাড় আর অন্ধকারের পিন্ড কেমন করে বাঘের মতো ওৎ পেতে থাকে দুই ধারে। ঘোড়াগুলোর গ্রামের পথঘাটে চলে অভ্যাস আছে, ছোটখাটো ঝড়বৃষ্টিতেও ঘোড়ারা তেমন কাহিল হয় না, কিন্তু এবার যেটা হলো সেটা ভয়ঙ্কর!
পথের সুমুখে যেখানে লণ্ঠনের আলো আর পৌঁছায় না, সেই অন্ধকার জায়গাটা দিয়ে আরও অন্ধকার কী একটা যেন পথটা পেরিয়ে গেল! পেরোনোর পথে চকিতে একবার মাত্র সে এইদিকে তাকালো। তার আগুনের গোলার মতো দুইখানা জ্বলজ্বলে চোখ লন্ঠনের অল্প আলোতেও ঝিকিয়ে উঠলো! ঘোড়াদুটো প্রচণ্ড আতঙ্কে শির-পা করে লাফিয়ে উঠতেই ইন্দ্র বেসামাল হয়ে ছিটকে পড়ে গেল নীচে আর চোখের পলকে ঘোড়াদুটো ভীষণ বেগে দিশেহারা ভাবে গাড়ি সমেত বাকিদের নিয়ে পথের বাঁকে হারিয়ে গেল। ছিটকে পড়েই শরীরের যন্ত্রণা ছাপিয়েও ইন্দ্ৰ ভয়ে কাঠ হয়ে বুঝতে পারলো সে কী ভীষণ বিপদে পড়েচে! কতবড় ফাঁদে পা দিয়েচে! ঝড়টা হঠাৎই একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়ে চাঁদের আলো পড়লো বন-ঘেরা পথের উপর। দুইদিন পর পূর্ণিমা। চাঁদের জ্যোতি যথেষ্টই অধিক, কিন্তু এই গা ছমছমে জঙ্গুলে নির্জন পথের গাছে গাছে চাঁদের আলো পড়ে তার ভয়ঙ্করতাকেই বহুগুণ বাড়িয়ে তুললো। ইন্দ্ৰ স্বপ্নালোকে সরু পথটা ধরে দক্ষিণ মুখে প্রায় ছুটতে আরম্ভ করলো। তার প্রাণ যায় যাক, অন্তত দ্বারবানদের হাতেও যদি মায়ের ওষুধগুলো পাঠিয়ে দেওয়া যায়। মরিয়া হয়ে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ ইন্দ্র একেবারে কাঠ হয়ে থেমে গেল!
হাত বিশেক দূরে রাস্তার উপর ওটা কী? একটা মিশমিশে কৃষ্ণবর্ণ ভয়ঙ্কর অপচ্ছায়া! চোখের জায়গায় দুটো রাঙা আগুনের ভাঁটি! তার দুই রোমশ হাতের মাথায় তীক্ষ্ণ নখরগুলো চাঁদের আলো পড়ে ঝকঝক করচে! ইন্দ্র নিজের অজান্তেই এক পা, এক পা পিছু হটতে আরম্ভ করলো। এলোমেলো দৌড়াতে আরম্ভ করলো সে। তার গলার মাদুলিখানা বেরিয়ে এসেচে কামিজের বাইরে। ক্ষীণ চন্দ্রালোকে জ্বলজ্বল করচে সেটা পিশাচটা লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসচে এদিকে! ইন্দ্ৰ টলমল পায়ে পিছু যেতে গিয়ে কিসে পা লেগে আছাড় খেয়ে পড়লো। একটা ওষুধের শিশি ঠং করে পাথরের উপরে গিয়ে পড়লো। শয়তানটা এসে দাঁড়িয়েচে ঠিক তার মাথার কাছে। ইন্দ্র শিশিটা তুলতে যাবার আগেই শয়তানটা হিংস্র হেসে সেটা পদাঘাতে ছিটকে ফেলে দিল ঝোপের ওদিকে। অসহায় ইন্দ্রর চোখে অসুস্থ মায়ের কাতর মুখটা ভেসে উঠলো। শিয়রে শমনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইন্দ্রর শরীরে দুনো বল ফিরে এলো যেন। পিশাচটা বলশালী দুই হাতে ইন্দ্রর ঘাড়টা চেপে ধরলো। ইন্দ্র মরার আগে নরঘাতকটার নখওয়ালা পা-টা চেপে ধরলো মরিয়া হয়ে!
হঠাৎ ইন্দ্রর বুকের কাছে তাকিয়ে একটা রাক্ষুসে চিৎকার করে পিশাচ লম্ববেগা ছিটকে গেল কয়েক হাত! তারপর ক্ষোভ আর হতাশায় একটা কান ফাটানো গর্জন করে এক লাফে গাছের চূড়ায় গিয়ে পড়লো, তারপর গাছে গাছে হারিয়ে গেল দূরে! ইন্দ্র হতভম্ব হয়ে চারদিকটা একবার দেখে নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে, ভয়ে ভয়ে চলতে শুরু করলো। অত দুর্দান্ত খুনে পিশাচ যে ঠিক কী কারণে, কীসের ভয়ে পালিয়ে গেল, সেই ধাঁধা ইন্দ্ৰ শত ভেবেও বের করতে পারলে না। কিছুদূর গিয়ে দেখে গাড়িটা ধাতস্থ হয়ে তাকেই পাগলের মতো খুঁজতে আসচে।
রায়বাটীর ফটকে গাড়ি ঢুকতেই বলরাম পাগলের মতো ছুটে এলো। রাত হয় দেখে দুশ্চিন্তায় আধামরা হয়ে পড়েছিল সে। ইন্দ্র বাড়ি ঢুকে দেখলো মা ঘুমুচ্চে। বলরাম কইলো, “তোর আসার দেরি হয় দেখে তোর মা কেঁদেকেটে আরও অসুস্থ হয় দেখে আমি একখানা ঘুমের বড়ি খলে পিষে খাইয়ে দিয়েচি।”
ইন্দ্র বাপকে পথের ঘটনার কথা কিছু কইলো না। ঘুমন্ত মায়ের কপালে হাত বুলিয়ে শুয়ে পড়লো। মা এখন ঘুমুচ্চে, ওষুধ কাল সকালে দিলেও হবে। অনেক রাত অবধি ইন্দ্ৰ আকাশ পাতাল ভেবে ভেবেও উত্তর পেলে না কোনো যে অমন ভয়ানক রাক্ষস তার মধ্যে কী দেখে পিছু হটলো? বাবার পরিয়ে দেওয়া মাদুলিটা দেখে? কার দেওয়া মাদুলি ওখানা? ভাবতে ভাবতে তার ক্লান্ত বিধ্বস্ত চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এলো অচিরেই।
সকালের আলো পুরোপুরি না ফুটতেই ইন্দ্রর নিদ্রা ভেঙে গেল। সে ভাবলো, বেশি দূরে না গেলেও মহলের আশপাশের বাগান দিয়ে হেঁটে বেড়াবে একটু। পরে থাকা গেঞ্জিখানার উপরে ফতুয়াটা গায়ে দিয়ে ইন্দ্র রাতের ছেড়ে রাখা কামিজটার বুকপকেট থেকে ওষুধের মোড়কগুলো বের করে আনতেই চমকে উঠলো! তিনটে মোড়কই রয়েচে পকেটে! তবে কাল ঠং করে কী পড়ে গেল আর পিশাচটাই বা পা দিয়ে কী জিনিস ঠেলে ফেলে দিলো? ইন্দ্র বিদ্যুৎবেগে বুকে হাত রেখে দেখলো গলার লাল সূতায় বাঁধা মাদুলিখানা নাই! সে আছাড় খেয়ে পড়ে যাবার সময়ে সেইটেই তবে খুলে পড়ে গিয়েচিল! কিন্তু তা নিয়ে ইন্দ্র বিশেষ চিন্তিত হল না। যে মাদুলিকে পিশাচ নিজের পায়ে লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে, তার দৈবী ক্ষমতার বহর জানা হয়ে গিয়েচে তার, কিন্তু… কিন্তু মাদুলিটা যদি আগেই পড়ে গিয়ে থাকে, তবে তার পরেও পিশাচটা কী দেখে ভয় পেলো? আর কী ছিল তার?
ইন্দ্র কী একটু ভেবে ওষুধের মোড়কগুলো দ্রুত হাতে খুলতে শুরু করলো! প্রথম দুটিতেই মিক্সচার ওষুধ রয়েচে, কিন্তু এইটে কী? তৃতীয় মোড়কটা খুলতেই যে জিনিসটা বেরিয়ে এল, সেটা কখনও কোনো চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ হতেই পারে না! অসম্ভব! কী আশ্চর্য!
