দেবীগ্রামের অভিশাপ
দেবীগ্রাম নামেই গ্রাম, আসলে একটা মাঝারি করদ রাজ্য। দেবীগ্রামের ভৌগলিক অবস্থানটা বড় মনোরম। বর্তমানে যে রাজ্যটাকে তোমরা ঝাড়খণ্ড নামে চেনো, সেইটে এই কয় বচ্ছর আগেও ছিল সুবা বিহারের অংশ। তো, বাংলা শেষ হয়ে যে পথটা বোকারো হয়ে রাঁচির দিকে চলে গিয়েচে, তার কাছাকাছিই ছিল দেবীগ্রামের রাজ্যপাট। রাজ্যের এক দিক সমভূমি, একাংশ মালভূমি। নিরুত্তাপ, নির্বিঘ্ন এই রাজ্যের রাজার নাম মল্ল রায়। তাঁর পিতামহ শ্রী অপারশক্তি রায়ের আমলে এই রাজ্য কারিগরি, যন্ত্রশিল্প, স্থাপত্য আর উন্নতির শীর্ষে গিয়েচিলো। তিনি নিজে কালাপানি পার করে বিলেত গিয়ে কারিগরিবিদ্যা আয়ত্ত করে বিদেশী শিল্পী নিয়ে ভূমিদান করে তাদের বসত করিয়েচিলেন গাঁয়ে। তাদের দিয়ে বহু অসামান্য স্থাপত্যের নিদর্শন তৈয়ারি করেচিলেন তিনি। অপারশক্তি নিজে ছিলেন একাধারে ধুরন্ধর তন্ত্রবিদ এবং অসাধারণ শাসক। শোনা যায়, তার আমলে এক অতি ভয়ঙ্কর পিশাচ লম্ববেগা আক্রমণ করে দেবীপুরে। সেই পিশাচ নাকি এক ভয়ানক তান্ত্রিকের অগ্নিমন্থন সাধনায় পাতাল থেকে নিজের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করে জেগে উঠে প্রথমেই সেই তান্ত্রিককে হত্যা করে কোনো এক প্রক্রিয়ায় পঞ্চমুন্ডির বাঁধনমুক্ত হয়ে যায়, ফলে সে হয়ে ওঠে দুর্দমনীয় এক অতি ভয়াল সত্বা।
তার হাতে অজস্র প্রজা বিনষ্ট হয় দেখে অপারশক্তি নিজে তার প্রিয় মিত্র সম্বুদ্ধ রায়কে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। রাজা সম্বুদ্ধ রায় নিজেও বলবান পিশাচসিদ্ধ ছিলেন। তারা দুইজনে দুর্গাপূজার সময়ে দেবীর আশীর্বাদ নিয়ে মন্ত্রবলে দুইখানি অব্যর্থ আয়ুধ তৈয়ারি করেন ওই মহা বলশালী পিশাচকে পরাভূত করার জন্য। তারা পিশাচ লম্ববেগাকে পরাস্ত করে হিমনিদ্রায় অভিভূত করে বন্দী করেন, কারণ লম্ববেগার মৃত্যু নেই। সম্বুদ্ধর তৈয়ারি করা অস্ত্র দিয়েই পিশাচকে নিদ্রাভিভূত করা হয় এবং অপারশক্তি পরবর্তীতে নিজের তৈরি অব্যবহৃত অস্ত্রখানি লুকিয়ে ফেলেন রাজবাড়িতেই। অপারশক্তি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ নিজের পুত্র বীরবলের সঙ্গে সম্বুদ্ধর কন্যা ইন্দুমতীর বিবাহ দেন। পুত্রের বিবাহের আনন্দে রাজ্য জুড়ে দীর্ঘিকা খনন, দেউল নির্মাণ, রাজবাড়িতে দেবী মহিষাসুরমর্দ্দিনীর প্রকাণ্ড মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। রাজ্যে শান্তি ফিরে আসে। সেই অধুনা প্রয়াত রাজা বীরবলেরই সন্তান বর্তমান রাজা মল্ল রায়।
মল্ল বাপের মতোই বীর, সুপুরুষ আর বিচক্ষণ, কিন্তু বর্তমানে দেবীগ্রামের রাজপুরুষদের মধ্যে সাজো সাজো রব। সেনাপতি রাজবর্মা গোপনে চার সহস্র সৈনিককে নিজের দলে টেনে যুদ্ধ ঘোষণা করে রাঁচি থেকে এগিয়ে আসচে। এমনকি রাজ পুরোহিত তথা মন্ত্রণাদাতা বীরভদ্রও তার সঙ্গে যোগ দিয়েচে। আগামীকাল দেবীগ্রামে পৌঁছালেই যুদ্ধ অনিবার্য। রাজবর্মা ইচ্ছে করেই ঠিক এই সময়টাই বেছে নিয়েচে, কারণ এই রাজপরিবারের দুর্গাপূজা আশপাশের মধ্যে বিখ্যাত। পূজার মধ্যে সকলে আয়োজন নিয়েই মেতে থাকবে, ফলে সতর্ক হবার সময় পাবে কম। মল্ল পূজার কাজ পুরনারীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকলো পাঁচ হাজার বাছাই সেনা নিয়ে, কিন্তু ধূর্তামিতে মল্ল কখোনোই রাজবর্মার সমকক্ষ ছিলো না। রাজবর্মা তার ভাই সুলোচনকে এক সহস্র সৈন্য দিয়ে সঙ্গোপনে দেবীগ্রামের মহাবনে লুক্কায়িত থাকার জন্য পাঠিয়ে দিলো।
রণনীতিতে রাজবর্মা পন্ডিত ছিল নিঃসন্দেহে। দেবীগ্রামের বনের পাশ দিয়ে মল্লর পাঁচ হাজার সেনা যখন রাজবর্মার মুখোমুখি হবে, তখন আচমকা সুলোচন তার হাজার সৈন্য নিয়ে পিছন থেকে আক্রমণ করবে। পিছন থেকে আক্রমণ করা শত্রুকে রণে বিমুখ করা অসাধ্য, এ তত্ব রাজবর্মার জানা ছিল। সে এগিয়ে আসতে থাকলো। এদিকে রাজবর্মার অনুপস্থিতিতে সেনাপতিত্ব করার মতো সুযোগ্য লোক মল্ল এত দ্রুত পাবে কোথা? তাই বাধ্য হয়ে নিজের শ্যালক সুবোধ সিংহকেই এই দায়িত্ব দিলো। রাতে মল্লর নিজস্ব সেনা তৈরি, সকাল হলেই যুদ্ধ বাধবে, মল্ল পরিদর্শনে গিয়ে দেখলো সুবোধ ঘুমুচ্চে। মল্ল মহা ক্রুদ্ধ হয়ে কইলো, “এ তোমার কী আচরণ সুবোধ? তুমি কোনো আয়োজন তদারক করচো না?”
সুবোধ কাঁচা ঘুম ভেঙে কইলো, “দেখবো আর কী মহারাজ, সেনাদের নির্দেশ দেওয়াই রয়েচে। যুদ্ধ তো কাল। আজ শরীরটে ঝরঝরে রাখা প্রয়োজন।” কথার মাঝেই একজন সেনা আধিকারিক বীরপ্রতাপ এসে কী যেন ইশারা করে গেল। সুবোধের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলে গেল। সুবোধ বললে, “মহারাজ, হাতাহাতি যুদ্ধের চেয়েও বড়ো যুদ্ধ হল শত্রুর মস্তিষ্কের গতিবিধি অনুধাবন করা, আমি শুয়ে শুয়ে সেইটেই করচিলাম। সেনাদের আদেশ দিতে হবে যাতে যুদ্ধ হলেও রাজপুরোহিত বীরভদ্রকে নিহত না করে জীবন্ত বন্দী করে।”
“সেই তুচ্ছ পুরোহিতটাকে নিয়ে কালব্যয় না করে রাজবর্মাকে নিয়ে ভাবো সুবোধ।”
সুবোধ হেসে কইলো, “যুদ্ধে মানুষ সবসময়ে শক্তিমান মিত্রকে পাশে চায়, যে যুদ্ধ জেতার সহায়ক হবে। সেখানে রাজবর্মার রাজবাড়ির পুরোহিতকে সযত্নে দলে নেবার কারণটা কী? কারণ তো কিছু আছেই মহারাজ, সেটাই তার থেকে জানতে হবে।”
মল্ল সহসা কথাটা উড়িয়ে দিতে পারলো না। মল্ল যখন চিন্তিত মুখে কক্ষ থেকে চলে যাবে, তখন সুবোধ কইলো, “দুশ্চিন্তা করবেন না মহারাজ, জিত আপনারই হবে কাল। রাজবর্মার সেনা চার হাজার, আমাদের পাঁচ। আর তা ছাড়া রাজবর্মা থানা ফেলচে দেবীগ্রামের বন পেরিয়ে জুমলার চরে। সে চাইলে বন পেরিয়ে দেবীগ্রামের ভিতরে ঢুকে আসতে পারতো রাতের মধ্যে, কিন্তু সে ঢোকেনি। রাজবর্মার মতো শয়তানের থেকে এতটা উদারতা আমি আশা করি নে। তাই ভাবলাম, আমাদের তো ভোরে দেবীগ্রামের বন পাশে রেখেই যেতে হবে অগত্যা, তো রাজবর্মা আবার বনের মধ্যে গুপ্তঘাতক লুকিয়ে রাখেনি তো? যা বদবুদ্ধি, বিশ্বাস কি? তাই বীরপ্রতাপকে পাঠিয়েচিলাম গোপনে। সে এখুনি ইশারা করে গেল যে আমার অনুমান নির্ভুল। কম করে সাতশত আটশত সেনা ছিল লুকিয়ে। বীরপ্রতাপ তাদের বনেই নিকেশ করে রেখে এসেচে। রাজবর্মা তাদের আশাতে বসে থেকেই বোকার মতো পরাস্ত হবে কাল।”
সুবোধের কথাই সত্য হল। তার ধুরন্ধর বুদ্ধির চালে রাজবর্মার সৈন্য খড়ের গাদায় ছুঁচের ন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। রাজবর্মা শূলে গেল এবং সুবোধের উৎপীড়নে আধমরা হয়ে বেঈমান রাজপুরোহিত যা বললে, তাতে সকলের মাথায় বজ্রাঘাত হল! বীরভদ্র গোপনে রাজবাড়ির পরিত্যক্ত কয়েদঘরে ঢুকে বাঁধন কেটে ঘুমন্ত পিশাচকে মুক্ত করে দিয়েচে তার এক চেলার সাহায্যে। পিশাচ বেরিয়েই সেই চেলাকে সংহার করেচে, কিন্তু তাকে যুদ্ধে লাগিয়ে মল্লকে হারানোর পরিকল্পনার আগেই রাজবর্মা পরাজিত ও নিহত হল!
কথা শুনে মল্ল আর সুবোধের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল! তারা কয়েদঘরে গিয়ে দেখলে, যে বিশেষ গোখুরো সাপের কলকা করা কলকবজা আঁটা পেতলের তোরঙ্গে পিশাচ লম্ববেগাকে হিমনিদ্রায় ভরে রাখা হয়েচিল, সেই তোরঙ্গের মাথায় বসানো ছিল একখানা গুরুভার পেতলের স্থূল দণ্ড! সেইটে পাশে পড়ে আছে। আর পড়ে রয়েচে একখানা হাত খানেক লম্বা ধাতব বস্তু, যেটা ধাতুর তৈয়ারি না হলে অনায়াসে কোনো জীবের অস্থিপঞ্জর বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। এইটিই হল রাজা সম্বুদ্ধের তৈরি করা সেই মহাস্ত্র, যা দিয়ে পিশাচকে নিদ্রিত অবস্থায় তোরঙ্গবন্দী করার পর তোরঙ্গের ভিতরে রেখে ডালা বন্ধ করে পেতলের ভারী চাবিকাঠিটা এঁটে দেওয়া হয়। এই পঞ্জরাকৃতি অস্ত্রটিই পিশাচের নিদ্রাকে আপাতঃ অনন্ত নিদ্রায় পরিণত করে। এই চাবিকাঠির দণ্ডটিও যেমন তেমন দণ্ড নয়। এটি পেতলবরণ হলেও পিতল নয়, কিছু বিশেষ ধাতুর সংমিশ্রণে তৈয়ারি করা বস্তু, যার ক্ষয় অতি নগণ্য। বিশেষ ওজনের এই দণ্ডটির ওজনে হেরফের হলে চাবি তার গুণ হারাবে। এক্ষণে মল্ল অসহায়ের মতো দেখচে, তোরঙ্গের ডালা উন্মুক্ত। এই নিষ্ঠুর কুটিল পিশাচের নরসংহারের আখ্যান সে শুনেচে ঠাকুরদাদার কাছে ছেলেবেলায়। কিন্তু তিনি বা তাঁর মিত্র সম্বুদ্ধ আজ জীবিত নেই। এই পিশাচের মূল লক্ষ্য এখন রাজপরিবার, কিন্তু আজ তার সংহার রুখবে কে?
মল্ল রাজপরিবারের সকলকে রাজবাটীর বাইরে যাবার নিষেধাজ্ঞা প্রচার করলেও, পরদিন দুর্গাষ্টমীতে নিজের মায়ের নদীতে পূজা-স্নান-চণ্ডীপাঠ করতে যাওয়া আটকাতে পারলেন না,-ধর্মপ্রাণ বৃদ্ধার ধমক আর বাক্যবাণে। রাজমাতা বৃদ্ধা হলেও দশাসই এবং মুখরা। মল্ল তাঁকে কিছু ভয় করতেন আবার অত্যন্ত ভালোওবাসতেন। রাজমাতা দুইজন পুরস্ত্রী আর কয়েকজন প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে তিনটি গো-যানে বেলা বাড়তে রওয়ানা হল নদীর উদ্দেশে এবং রক্তলোলুপ পিশাচ লম্ববেগা এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল ওৎ পেতে। বহু বহু কাল সে নিদ্রায় ছিল। আজ তার রক্তপান করার দিন। আগে মায়ের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ দেখুক তার পুত্র, তারপর পুত্রের দেহ দেখবে তার পুত্র…, এভাবে গোটা রাজপরিবারকে নিঃশেষ করে সে তাকে বন্দী করার অপমানের শোধ নেবে। লম্ববেগা একটা কালো মেঘ সেজে উড়ে চললো গো-যানের সঙ্গে সঙ্গে।
দামোদরের শাখানদী হিসেবে বয়ে গিয়েচে একটা মাঝারি শাখানদী, দেবীগ্রামের গা ছুঁয়ে। সেই ঘাটের কাছে নরঘাতক পিশাচ একটা প্রাচীন বটগাছের রূপ নিয়ে বসে রইলো বাকি দু-একটা গাছের সঙ্গে গা মিশিয়ে। আশপাশের গাছগুলিতে অনেক পাখপাখালি উড়চে, বসচে, কিন্তু এই গাছের কাছে ঘেঁষচে না। মানুষের দল টেরটি না পেলেও মনুষ্যেতর জীবদের ফাঁকি দেওয়া যায় না। পিশাচ লম্ববেগা অপেক্ষা করে রইল মোক্ষম সুযোগের। অনেক লোকের মাঝে নরহত্যা করা তার প্রিয় পন্থা নয়। তার চোখে রয়েচে সম্মোহনের মহাশক্তি। তার চোখের পানে একটিবার সরাসরি চাইলেই যে কোনো জীব তার বশবর্তী হয়ে পড়ে। তখন সে যা দেখাতে চায়, যা শোনাতে চায়, সেই হতভাগ্য তাই-ই দেখে, তাই-ই শোনে। তারপর সেই অসহায় শিকারকে বোকা বানিয়ে আবডালে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সে মনের আনন্দে। লম্ববেগা ওৎ পেতে রইল।
নদীতে আসার আগে একটা ছোটো বন পড়ে পথে। সেইটে পেরোলেই নদীর ঘাট। বন থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক আগের মুহূর্তেই বনের সীমানায় একখানা গোরুর গাড়ি খারাপ হয়ে আটকে গেল। শত চেষ্টাতেও কেন জানি নড়ানো গেল না। অগত্যা বাকি দুটিকে নিয়ে রাজমাতা নামলেন নদীর ঘাটে, ঠিক পিশাচের পাশ দিয়েই। লম্ববেগা তার বৃক্ষরূপী পাতায় পাতায় লক্ষ চোখে লক্ষ্য রাখলো দুর্বল মুহূর্তের। সকলে মিলে জলে নেমে স্তব করচে, স্নান করচে, হঠাৎ রাজমাতার মনে পড়লো তার সোনার চশমাখানা সে ফেলে এসেচে ওই খারাপ হয়ে যাওয়া গরুর গাড়িতে। নামে গো-যান হলে হয় কি, সেটি রাজ পরিবারের যুগ্যি করেই তৈয়ার করা। দুই পাশে কিংখাবের পর্দায় ছাওয়া, ঝালর দেওয়া, গদি আঁটা গাড়ি। বাকি দুইটি সাধারণ। বৃদ্ধা হেঁকে বললে, “ও লো কামিনী, চশমাখানা যে রয়ে গেল মা গাড়িতে, সেখানা না হলে গীতা পাঠ করি কেমনে?”
কামিনীর জল থেকে ওঠার তৎপরতা দেখা গেল না বিশেষ। সে অনুনয়ের স্বরে বললো, “এই তো নামলাম মা, একটু পরেই আনচি গিয়ে।”
রাজমাতা অসন্তুষ্ট হয়ে বিড়বিড় করে বললে, “তবেই হয়েচে মা, তুমি জলে নেমেচ মানে দিন ফুরিয়েচে আর কি।” এই বলে নিজেই স্থূল শরীর নিয়ে বকবক করতে করতে চললো গরুর গাড়ির পানে।
.
ভূতপূর্ব রাজবৈদ্য বিষাণজীর বয়স একশোর ঊর্দ্ধে হলেও এখনও চলৎশক্তি হারায়নি, কিছু কিছু চিকিৎসাও করে, যদিও তার পুত্র শঙ্করজীই বর্তমান রাজবৈদ্য। বিষাণজী অশক্ত পায়ে লাঠি নিয়ে ঠুকঠুক করতে করতে মল্লর কাছে এলো একটু দ্বিপ্রহর পড়লে পর। মল্ল তখনও দিবানিদ্রা ভেঙে ওঠেনি, বিষাণজীর সানুনয় অনুরোধে রানিমা স্বামীকে ডেকে তুললে পর মল্ল বিস্মিত এবং ইতস্ততঃ হয়ে বাইরে এসে কইলো, “বৈদজী! এই অসময়ে! সব কুশল তো?”
বিষাণজী বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন মুখে কইলো, “মহারাজ, আপনার অনিদ্রার রোগ, তায় রক্তচাপের রোগী, এভাবে ডাকার জন্য লজ্জিত, কিন্তু একটা কথা বলা দরকার মনে হল বলে তড়িঘড়ি এলাম মহারাজ।”
“না না, ওসব ঠিক আছে, বলুন বৈদজী কী বলবেন?”
“মহারাজ, আমি বেলা থেকেই পাতা-লতা চয়ন করি রোজ। আজও করচিলাম। তখন দেখি রাজমাতার বহর চলেচে বোধকরি নদীস্নানে। দুর্গাষ্টমী তো আজ। কিন্তু হঠাৎ ঠাহর করলাম, একখানা মেঘের মতো কি একটা উড়ে চলেচে বহরের মাথায় মাথায়। প্রথম ভাবলুম মেঘ, তারপর দেখি বহরটা বহুদূর চলে যাওয়ার পরও মেঘটা তেমনি উড়ে চলেচে গাড়ির মাথাতেই। বাতাস ছিল বিস্তর, কিন্তু সে মেঘ ভাঙেও না, গড়েও না, একই আকারে রয়ে গিয়েচে। এমনটা তো দেখিনি কখনও। আমার বয়স হয়েচে মহারাজ, অনেক রকম দেখেচি, শুনেচি। লক্ষণ বড় ভালো ঠেকচে না আমার।”
মল্লর শিরদাঁড়া বেয়ে আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল! শয়তান পাষণ্ড পিশাচ তবে পুরুষদের বাগে না পেয়ে তার বৃদ্ধা মা-কে… মল্লর চোখ থেকে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়লো। সে তার মা-কে যে কী ভীষণ ভালোবাসে তা সেই জানে। বড়ো দেরি হয়ে গিয়েচে! হা ঈশ্বর! বিফল হবে জেনেও মল্ল লোকজন নিয়ে তেজী ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়লো নদীর পানে নক্ষত্র বেগে। হয়তো পিশাচটা তাকে বের করতেই চায় বাইরে। তাই হোক। তাকে নিয়ে মাকে মুক্তি দিক নিষ্ঠুর পিশাচ। যাবার পথে মল্ল থামলো পারিবারিক মহিষমদ্দিনী মন্দিরে। মল্লর পিতামহের স্থাপিত মহার্ঘ্য দেউল। মল্ল চোখ মুছে প্রতিমার পানে চেয়ে ধরা গলায় বললো, “হে ভবাণী, যদি কখনও এতটুকু পূণ্য করে থাকি, তবে আজ দয়া করো দেবী।”
বৃদ্ধা একাকী নদীর পাড় থেকে একটু দূরে যেতেই পিশাচটা গাছের রূপ ত্যাগ করে বায়ুর বেগে উড়ে গেল গোরুর গাড়ির কাছের বনে আর এক শীর্ণদেহী ব্রাহ্মণ সেজে দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধা রাগে দুই একবার পিছনে তাকিয়ে কেউই জল থেকে ওঠেনি দেখে যখন গাড়ির কাছে পৌঁছেচে, তখনই সে আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বিস্মিত সুরে বললে, “এ কী! মা আপনি এখানে? প্রণাম হই”–এই বলে রাজমাতার চোখের পানে সোজাসুজি চেয়ে এগিয়ে এসে প্রণাম করলো। বৃদ্ধাও ব্রাহ্মণকে যথোচিত মর্যাদা দিয়ে হাতজোড় করে তারপর কইলো, “তুমি কে বাছা? আমাদের প্রজা?”
“হাঁ মা, কতবার রাজবাটী গিয়েচি। আমাকে চিনতে পারলেন না মা? ভালো করে দেখুন তো।”
পিশাচের উদ্দেশ্য, যাতে বুড়ী তার চোখের পানে চায়। বুড়ীর ছিন্নভিন্ন শরীরটা নিয়ে যখন তার লোকজন কাঁদতে কাঁদতে রাজবাড়িতে যাবে, সে ভারি মজা হবে। সে রাজবাড়িতে ঢুকতে পারবে না মজা দেখতে, কারণ সেখানে ওই সর্বনাশা জাদু তোরঙ্গটা রয়েচে, তার উপর আজকে দুর্গাষ্টমী। আজ সেটার কাছাকাছি গেলে বড়ো বিপদ হতে পারে। যদিও এখন আর ওই তোরঙ্গের বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে তাকে বন্দী করার বিদ্যা জানা মানুষ দেশে নাই।
এই সব ভাবতে ভাবতেই পিশাচ দেখলো, বৃদ্ধা তার দিকে তাকালেও তখনও তার বশ হয়নি। প্রথমে একটু বিচলিত হলেও পরক্ষণেই তার কারণটা তার কুটিল মাথায় এলো। বুড়ী চশমা ছাড়া তার চোখের মণি দেখতে পায়নি। ব্রাহ্মণ গলায় একটু বিদ্রূপ ঢেলে কইলো, “গাড়ির থেকে চশমা পরে নিন দেবী। বেলা পড়ে আসচে বলে ঠাহর হচ্চে না বোধহয়। এখনও কত কিছু পরিষ্কার দেখতে হবে আপনাকে।
বৃদ্ধা কিংখাব সরিয়ে চশমা খুঁজচিল, এ কথায় খাপ্পা হয়ে বেরিয়ে এসে কইলো, “কেন? কমটা কী দেখলাম শুনি। তোমার এত সাহস, আমার সঙ্গে এমন রসিকতা করো? আমি কে জানার পরেও?”
আকাশে হঠাৎই মেঘ ছেয়ে এসেচে। পিশাচ চিবিয়ে চিবিয়ে কইলো, “রসিকতা আমি করি না বুড়ী। তোর মহামূল্য সোনার চশমা পর, তারপর তোকে দেখাচ্ছি তুই কী দেখতে চলেচিস।”
বৃদ্ধা এহেন স্পর্ধায় নির্বাক হয়ে থেকে বলল, “বেলা কমে এলে চশমা ছাড়া অসুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু একেবারে দেখিনে তা নয় বাছা। ঘাটের কাছে গিয়ে বেছে বেছে একটা গাছেই পাখি বসচে না যেমন দেখেচি, তেমনি হঠাৎ করে ঘাটের কাছে একখানা বটগাছ গুণতিতে কম পড়ছে, তাও দেখেচি। আসলে আমার চশমাটা শুধুই পুঁথিপত্তর পড়ার জন্য লাগে। তুই ঠিক আসবি আমি জানতুম, তাই সঠিক ক্ষণের অপেক্ষায় তোর জন্য অষ্টমীর বরণডালা সাজিয়ে রেখেচি। এই দেখ…”– এই বলে বৃদ্ধা বলিষ্ঠ হাতের এক টানে ছইয়ের কিংখাবটা সরিয়ে দিতেই, লম্ববেগা পিশাচ সরু নজরে ভিতরটা দেখেই ভয়ে কেঁপে উঠে পিছিয়ে গেল কয়েক পা! গাড়ির ভিতর সেই সর্বনাশা গোখুরোর ছাপওয়ালা তোরঙ্গটা! সেই ভয়ঙ্কর বজ্রসিন্দুক! এই যন্তরের ফাঁদটাই তার একমাত্র যম! ভয়ঙ্কর কলকবজা বসানো এক মারাত্মক টোপ, আর সেই ফাঁদের মূল চাবিকাঠি, যে পেতলের গুরুভার দণ্ডটা রাজপুরোহিতের চেলাটা তোরঙ্গ থেকে সরিয়ে তাকে মুক্ত করেচিলো, এই ধূর্ত বৃদ্ধা চশমা খোঁজার নাম করে তার বলশালী হাতে তোরঙ্গতে আবার এঁটে দিয়েচে তাকে সিন্দুকের চৌহদ্দির মধ্যে টেনে এনে! তাই আকাশে এত মেঘ জমেচে চোখের পলকে! এখুনি এই তল্লাট ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে। আজকের দিনটা কেটে গেলে আর ভয় নেই। লম্ববেগা বিপ্রর ছদ্মবেশ ছেড়ে নিজের ভয়াল পিশাচরূপ পরিগ্রহ করে আকাশ কাঁপানো গর্জন করে দেখলো অসীম সাহসিনী এই বৃদ্ধার চোখের পলকটুকুও কাঁপলো না! লম্ববেগা হিংস্র ঘড়ঘড়ে গলায় চিৎকার করে উঠলো, “চাবিকাঠি খুলে ফেল মূর্খ স্ত্রীলোক! নয়তো আজ নয় কাল হোক, হাজার বছর পরে হোক, আমি তোর বংশধরদের খুঁজে খুঁজে নিকেশ করবো। আর আজ যদি মুক্তি দিস আমাকে, তবে তোর পরিবারের দিকে আমি আর দৃষ্টি দেবো না। কেন তুচ্ছ প্রজাদের জন্য নিজের বংশকে বিনষ্ট করচিস?”
বৃদ্ধা স্থির, অবিচলিত স্বরে কইলো, “কারণ আমি দেবীগ্রামের রাজমাতা। সকল প্রজার মা।”
তাদের ঠিক মাথার উপরে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ ঝড়ের মতো ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করেচে দেখে লম্ববেগা হিংস্র মুখে একবার অগ্নিদৃষ্টি হেনে বায়ুর বেগে বাতাসে লাফিয়ে উঠলো, কিন্তু চারদিকে যেন একটা অদৃশ্য কাচের বলয় তৈরি হয়েচে! পিশাচ সেই বলয় ভাঙতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করচে, তখনই চোখের পলকে মেঘ চিরে, চরাচরের যেন সব শব্দকে ছাপিয়ে চোখ ধাঁধানো বজ্র নেমে এলো পিশাচের উপরে। লম্ববেগা অচৈতন্য হয়ে ঝুপ করে আছড়ে পড়লো মাটিতে। রাজা সম্বুদ্ধের কন্যা, বাপের সুযোগ্যা তন্ত্রশিষ্যা, রাজমাতা ইন্দুমতী একটা শ্বাস ফেলে মহিষাসুরমর্দ্দিনীর উদ্দ্যেশে প্রণাম জানালো। কামিনী ছুটে এসে কইলো, “তুমি যতই আসার পথে আমাদের শিখিয়ে পড়িয়ে আনো মা, তুমি যখন একলা গাড়িটার দিকে এলে তখন আমার প্রাণটা ভয়ে উড়ে যাচ্চিলো মা! আচ্ছা, তুমি এই গাড়িটা এইখানে খারাপ হবার মতো করে ফেলে রাখতে বললে কেন তখন?”
বৃদ্ধা ক্লিষ্ট হেসে বললে, “লম্ববেগা অতি ধুরন্ধর পিশাচ। আমি যদি শুধু শুধুই তোদের ছেড়ে একা দলছুট হতুম, তবে হতভাগা ঠিক বুঝে ফেলতো যে নিশ্চয়ই বুড়ীর কিছু চালাকি রয়েচে। কিন্তু যখন তোকে বকাবকি করে চণ্ডীপাঠের জন্য চশমা আনতে গাড়ির দিকে এলাম, তখন সে ফাঁদটা ধরতে পারেনি। এইও প্রহরীরা, তোমরা এটাকে তুলে তোরঙ্গয় ভরে দাও। ভয় নেই, জাগবে না। আসার সময়ে পুকুরপাড়ে বৈদজীকে দেখেচিলুম উপরের মেঘটার দিকে হাঁ করে চেয়ে রয়েচে। সে-ও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেচে যে ওটা মেঘ নয়। এতক্ষণে মল্লকেও বলেচে নিশ্চয়ই। যা কানভাঙানি স্বভাব। মল্ল এলো বলে।”
প্রহরীরা লম্ববেগাকে ভয়ে ভয়ে তুলে তোরঙ্গয় ঢুকিয়ে দিতেই ইন্দুমতী গাড়িতে রাখা হাত দুই লম্বা অস্থিপঞ্জরের মতো ধাতব অস্ত্রটা লম্ববেগার বুকের উপর রেখে ডালা চাপা দিয়ে দিলো। হিংস্র পিশাচ মহা হিমনিদ্রায় অভিভূত হয়ে অন্ধকারে ঢেকে গেল, যে হিমনিদ্রা ভবিষ্যতে শত শত বৎসর পর আবার কেউ ভাঙাবে এবং যা আমার জীবনের একটা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে যাবে।
মল্ল এসে সব শুনে আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরলো। তার পিতামহ, মাতামহের মতো মায়েরও যে তন্ত্রবিদ্যায় এতদৃশ পারদর্শীতা আর সাহস রয়েচে, তা মল্লের জানা ছিল না! ইন্দুমতী ধীরে ধীরে বললে, “শোনো বাবা, এই পিশাচের মরণ নাই হয়তো। একে কেবল হিমনিদ্রায় পাঠাতে পারি, কিন্তু ভবিষ্যতেও যে কোনো বেঈমান রাজবর্মা এসে আবার একে জাগিয়ে তুলবে না, তার ঠিক কি? এ ভাবে হবে না। বিশেষতঃ এখন এই তোরঙ্গর কথা রাজ্যশুদ্ধ লোক জেনেই গিয়েচে। একে ধর্ম আর বিশ্বাসের বাঁধনে মোড়ক দিয়ে যুগের পর যুগ আড়ালে রাখতে হবে। এই পিত্তল দণ্ডটা যে একটা বিশেষ ওজনের দণ্ড তা জানো তো? এক রতি ওজন হেরফের হলেও তোরঙ্গর কলকবজা কাজ করবে না বলেই বিশেষ ধাতু দিয়ে এই দণ্ড তৈয়ার করা হয়েচে। আমি তোমাকে ধাতুর অনুপাত আর নির্দিষ্ট নিখুঁত ওজন বলে দেবো। ঠিক সেইভাবেই একটা রাধামাধবের যুগল বিগ্রহ তৈয়ারি করাবে। তার নিম্নদেশটা হবে… এই দেখো… এই দণ্ডটার মতোই প্যাঁচওয়ালা। এবার থেকে এই গুরুভার দণ্ডটার জায়গায় ঐ সম ওজনের বিগ্রহটা বসবে। মন্দিরে থাকবে এই তোরঙ্গ। সবার সুমুখে পূজা পাবে। কেউ কখনও একে রাধামাধবের বেদী ছাড়া কিছুই ভাবতে পারবে না।
আর হ্যাঁ, যেইটে তোরঙ্গের ভিতরে দিয়েচি, সেইটে আমার পিতা, রাজা সম্বুদ্ধের তৈয়ারি অস্ত্র। কিন্তু তোমার পিতামহের গড়া অস্ত্রখানা সেবার প্রয়োজন পড়েনি বলে তিনি সেইটে লুকিয়ে রেখে গিয়েচিলেন রাজভবনেই। আমি এতদিনে খুঁজে খুঁজে তার সন্ধান পেয়েচি। তোমাকেও বলবো। আজ নয়। কখনও সে জেগে উঠলে তার মূল আক্রমণ হবে আমাদের পরিবারকে ঘিরেই, এটুকু অনুমান করতে পারি…” – রাজমাতা নিজের রসনাকে সংযত করে পিশাচের বলা শেষ কথাগুলো গোপন করে গেল।
মল্ল সামান্য বিরতি নিয়ে ইতস্ততঃ করে মায়ের মুখের পানে চাইতেই বৃদ্ধা একটা শ্বাস ফেলে কইলো, “বুঝেচি বাবা, বলচি। আমি আমার পিতার মুখে এই পিশাচের জাত সম্পর্কে শুনেচিলাম, কিন্তু তুমি তো তন্ত্রজ্ঞ নও, তাই তোমার মুখে সেই ভয়ঙ্কর পিশাচ প্রজাতির নাম উল্লেখও তাকে আকৃষ্ট করতে পারে। শুধু এটুকু জেনে রাখো, ব্রহ্মার সন্তানের জন্ম হয়েচিল ভগবান শিবের চৌকাঠে। তারই পশ্চিমে রাবণের তৈরি এই পিশাচের দীঘি আজও লুকিয়ে রয়েচে। তোমাকে কিছু কিছু বিদ্যাভ্যাস করিয়ে তবে নামটা বলবো।”
(এখানে একটা কথা কয়ে রাখা দরকার। রাজমাতা কিন্তু এই ঘটনার পর অধিক দিন জীবিত ছিলেন না। হঠাৎই তাঁর মৃত্যু হয় সন্ন্যাস রোগে। কিছু কিছু সঙ্কেত তাম্রপত্রে লিখে গেলেও নিজের পুত্রকে তিনি পিশাচ সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলে যেতে পারেননি। মাতার মৃত্যুর পর রাজা মল্ল পত্রযোগে কোনো এক পন্ডিতকে এর সমাধান করতে অনুরোধ করেন যথোপযুক্ত রাজকোষ ব্যায় করে, কিন্তু কোনো সন্ধান মেলে না)
যা-ই হোক, পিশাচ বন্দীর পর সকলে ফিরে এলো দেবীগ্রাম রাজভবনে। রাজমাতা ইন্দুমতী পিশাচ দমনের খুশীতে গোটা দুর্গামন্দির ফুলে ফুলে সাজিয়ে অর্ঘ্য দিলো। মহিষমর্দ্দিনীর মন্দিরের নূতন নামকরণ হলো দুর্গতিনাশিনী। নামকরণের সম্মান প্রজারা রাজমাতাকেই দিলে। মহানবমীর পূণ্য প্রভাতে সাঁচের উপর চুনসুড়কি গুলে ইন্দুমতী আঙুল দিয়ে লিখলো, ‘দুরগতিনাশিনীর দেউল’। ভূতপূর্ব রাজবৈদ্য বিষাণজী মাথা নেড়ে কইলো, “উঁহুহু রাজমাতা, বানান-প্রয়োগে প্রমাদ হল যে।”
বৃদ্ধা অপ্রস্তুত হয়ে রেগে উত্তর দেবার আগেই মল্ল হেসে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বললে, “হোক ভুল বৈদজী, এই ছাঁচই মন্দিরগাত্রে রাখবো আমি।”
বৃদ্ধা সগর্বে মুখ তুলে প্রগলভ বিষাণজীকে নজর দিয়ে প্রায় ভস্ম করে দেওয়ার জোগাড়। উপস্থিত পৌরজন সকলে বহুদিন পর প্রাণ খুলে হেসে উঠলো। শুধু হাসির মধ্যেও সামান্য বিষণ্ণ স্বরে মল্ল তার মাকে শুধালো, “কিন্তু যদি সত্য সত্যই কখনও পিশাচ লম্ববেগা মুক্তি পায়, তবে তাকে পরাস্ত করার বিধি ভবিষ্যতের মানুষ পাবে কোথা মা? ততোদিনে মানুষের মেধা, মনন, চাতুৰ্য্য ঊর্দ্ধগামী হবে নাকি কালের গর্ভে নিকৃষ্ট হয়ে পড়বে, তা-ই বা কে বলতে পারে? এইবারই তো ভেবেচিলাম পিতামহ আর মাতামহের অবর্তমানে আর কেউই তেমনটি নাই, কিন্তু আপনি সেই বিদ্যা জানতেন বলেই এ যাত্রা দেবীগ্রাম রক্ষা পেল। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে?”
“সে চিন্তা আমারও আছে মল্ল। আমার পরিবার আর প্রজাদের রক্ষার দায় আমারই, হোক তারা ভবিষ্যতের মানুষ। ভবিষ্যত হোক বা ভূত, লোভী, দাম্ভিক আর ইতর মানুষ চিরকালই থাকবে। বলা যায় না, আবার কখনও কারুর দাম্ভিক হস্তক্ষেপে যদি এই কালান্তক যম আবার জেগে ওঠে, নির্বিচার নরহত্যায় মেতে ওঠে, তবে তাকে প্রশমন করার বিধি আবশ্যক হবেই হবে। গোপন ষড়যন্ত্রের সে সব সংকেত আমি হেঁয়ালির ভাষায় লিখে রাখবো পুঁথিতে। তোমাকেও পড়াবো।”
মল্ল বিস্মিত হয়ে শুধালো, “গোপন ষড়যন্ত্র? দেবীগ্রামে?”
“হাঁ বাবা, এই রাজ্যেই।”
রাজমাতা ইন্দুমতীর ঠোঁটে একচিলতে রহস্যের হাসি খেলে গেল। তা দেখে মল্লর ধ্রুব প্রত্যয় হল যে, তার মা সর্বসমক্ষে কিছু একটা গোপন করচেন। কারা কীসের ষড়যন্ত্র করে চলেচে গোপনে যা রাজমাতা ধরে ফেলেচেন? তারপর বৃদ্ধা একটা শ্বাস ফেলে নিজের মনে ভবাণীর প্রতিমার পানে চেয়ে বললে, “তোমার সসাগরা পৃথিবীতে তোমার সন্তান কেউ না কেউ তো নিশ্চয়ই সে যুগেও থাকবে মা, যে সব হেঁয়ালি, সংকেত আর নিশান ভেদ করে নিজের ক্ষুরধার মেধা দিয়ে এই ভয়ানক কুটিল পিশাচের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা নেবে? থাকবে না মা?”
দেবী দুর্গা উত্তর দিলেন না, তাঁর বরাভয় দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইলেন কেবল। সে দৃষ্টির পানে চেয়ে রাজমাতা ইন্দুমতী হৃষ্ট হলেন। তার মানসদৃষ্টি সময়ের বাধা অতিক্রম করে যেন ভেসে চললো ভবিষ্যতের ওপারে, যেখানে এতক্ষণে ইতিমধ্যেই নূতন পটভূমিতে, নূতন নূতন চরিত্রদের অবলম্বন করে আরম্ভ হয়ে গিয়েচে সেই একই মানুষে-পিশাচে বুদ্ধির চতুরঙ্গ খেলা।
