ফস্কাগেরোর গণ্ডী
ইন্দ্র ওষুধের মোড়কটা খুলে অবধি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গিয়েচিল!
মোড়কটায় একখানা কালো সূতোয় বাঁধা তাবিজ রয়েচে! নূতন নয়, বহু ব্যবহৃত বলেই মনে হচ্চে! ইন্দ্র হতবাক হয়ে চিন্তা করতে করতে ফটকের থেকে বেরোতে যেতেই ফটকে ভারী শিকলের আওয়াজ হল। কে যেন শিকল নাড়চে বাইরে থেকে। ইন্দ্র ফটকের ছোটো কপাটের লোহার অর্গলটা খুলে দিয়েই বিস্ময়ে বলে উঠলো, “এ কী! ডাক্তারবাবু, আপনি? এ সময়ে? আরে ভিতরে আসুন। কী আশ্চর্য কথা বলুন তো, আমি সদরে গিয়ে টেলিফোন করতুম আপনাকে আজই। একটা ওষুধের মোড়কের ভিতরে ওষুধের জায়গায় ভুল করে অন্য জিনিস চলে এসেচে! ওষুধ ছিল না!”
“ওইটেও ওষুধই ছিল। যে রোগের যে ওষুধ।”
গম্ভীর, ভরাট স্বরের এই উত্তর শুনে ইন্দ্র অবাক হয়ে তাকাতেই ডাক্তারবাবু মুচকি হেসে একটু সরে যেতে তার পিছনের ছোটো ফটক থেকে ভিতরে পা রাখলো এক দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ প্রৌঢ় মানুষ। পরণে শ্বেতশুভ্র কামিজ আর ধুতি, গলায় গুটিকতক রুদ্রাক্ষের মালা, কবজিতে কালো পুঁতির মালা জড়ানো। চোখে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর সরলতার যুগপৎ দৃষ্টি!
ইন্দ্ৰ আগন্তুককে দেখে মনে মনে বিস্মিত হয়ে মুখে শুধালো, “আজ্ঞে আপনি?”
“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া। গতকাল যখন তুমি এঁকে সব কথা বলচিলে, তখন আমি আর কানাই ভিতরে বসেচিলাম। সব শুনে আমার হাতের মণিবন্ধের কবচখানা ডাক্তারকে বলে তোমার ওষুধের মোড়কে ভরে দিয়েচিলাম। এ কবচ আমি এখনই আর ধারণ করতে পারবো না যদিও। কানাই এইটে যত্ন করে তোর ট্যাঁকে রেখে দে এখন। আমার মন বলচিল শয়তানটা তখনই নিষ্ক্রিয় থাকলেও ফেরার সময়েই তোমার প্রাণবধ করবে।”
“ফেরার সময়ে মানে? সে কি আমার সঙ্গে শহরেও গিয়েচিল নাকি?”
“হাঁ, শুধু শহরে নয়, হাসপাতালে ডাক্তারের ঘরের বাইরেই একটা গাংশালিখ হয়ে বসেচিল ওৎ পেতে। আমি জানালা দিয়ে দেখেচি তাকে। কলকাতার গাছে গাংশালিখ, যত্তোসব অনাসৃষ্টি কারবার।”
যৌবনের নিয়ম হলো, সে ভূতের কথা শুনতে ভালোবাসে, কিন্তু ভূতে বিশ্বাস করে না। তন্ত্রমন্ত্রের কাহিনী শুনতে ভালোবাসে, কিন্তু তাবিজ, কবচ, গুণীনে বিশ্বাস করে না। কালীপদকে দেখে ইন্দ্র প্রথম দর্শনেই কেন যেন মুগ্ধ হয়ে গিয়েচিল। তার মনে হলো, এই লোক বড়ো যেমন তেমন লোক নন। তার দেওয়া কবচটা থাকার কারণেই যে অমন ভয়ঙ্কর রাক্ষসটা আপাতঃ রণে ভঙ্গ দিয়েচে, সে কথাও তো ঠিক। ইন্দ্রর পিছু পিছু কালীপদ, আমি আর কানাই সর্দার ভিতরে প্রবেশ করলাম। খবর পেয়ে বলরাম এসে আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলো, তারপর কালীপদর পরিচয় পেয়ে তার মুখে সম্ভ্রম আর অপার ভরসার একটা ভাব ফুটে উঠলো। সে সম্ভ্রম কেবল কালীপদ ডাকসাইটে গুণীন বলেই নয়, একজন এতবড় জমিদার তার গৃহে অতিথি হয়েচেন বলেও বটে। বলরাম লোকটা যে শৌখিন এবং পরিশ্রমী মানুষের যুগপৎ সহাবস্থান, তা কালীপদর চোখ আর নাকে ধরা পড়লো। হাতের পেশী আর বুকের পাটা বেশ মজবুত আবার মাথা থেকে শৌখিন লক্ষ্মীবিলাস তৈলের আঘ্রাণ আসচে। প্রথম আলাপেই বলরাম বিস্মিত হয়ে বলেচিল, “রায়দীঘড়ার জমিদার? আপনি তবে বিষ্ণুচরণ মুখুজ্জের ভাই? কী আশ্চর্য! তাঁর সঙ্গে আমার বিলক্ষণ আলাপ রয়েচে। তিনি এ বাড়িতেও একবার এসেচেন সরযূদেবীকে নিয়ে। আপনার বহু কথা শুনেচি তার মুখে। কী কী সে বলেচিল শুনবেন?”
কালীপদ শশব্যস্ত হয়ে বললো, “কে বলেচিল? দাদা না বৌদিদি?”
“সরযূ, আপনার বৌদিদি।”
কালীপদ অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বললো, “ওহহ। বলুন তবে।” আমি অতি কষ্টে হাসি সংবরণ করে মুখ তুলতেই দেখি কালীপদ কটমট করে চেয়ে রয়েচে আমার দিকেই। কিছুক্ষণ পর বলরামের থেকেও বহু আনুপূর্বিক তথ্য সংগ্রহ করে আমরা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা কক্ষে প্রবেশের জন্য উঠে দাঁড়ালাম। মার্বেলের কারুকাজ করা মেঝেযুক্ত প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে চেয়ে উঠানের কালীমন্দিরের পাশের শাণ বাঁধানো মেঝেটার দিকে একটা জায়গায় তাকিয়ে কালীপদ সামান্য ভ্রু কুঞ্চিত করলো দেখে ইন্দ্র কইলো, “ওই জায়গাটাতেই দাদাইকে ছুঁড়ে ফেলেচিল শয়তান খুনীটা। আমি ছাতে তাকিয়েও কিছু দেখতে পাইনি জানেন?”
কালীপদ শ্বাস ফেলে বলল, “তার আর আশ্চয্যি কি বাবা, একে ছিল অমাবস্যা, তায় ঝুপসি গাছের ঝাড়, দেখা কি আর যায়?’
ইন্দ্র আক্ষেপের সুরে বললে, “তা ঠিক ঠাকুরমশায়, দাদাই মুখের কথাটুকু ছাড়াও কী যেন ইশারাতেও দেখাতে চেয়েচিলেন ছাতের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু আমি চকিতে তাকিয়েও গাছের পাতার রাশির মধ্যে দিয়ে কয়েকটা নক্ষত্র ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি। কিছু থাকলে তো দ্বারবান দু-জনও দেখতো নিশ্চয়ই, কারণ তারা সে সময়ে আততায়ীর সন্ধানে ছাতেই উঠেচিল।”
কালীপদ আত্মগত স্বরে বললে, “সে কথা নিশ্চয় করে বলা যায় না যে দ্বারবানরা বা তুমি দেখোনি বলে কেউ ছিল না ছাতে। এই পিশাচ যা অসম্ভব ধুরন্ধর বুঝচি, সে নিজেকে ওভাবে ধরা দেবে ভেবেচো? এর খলবুদ্ধির সঙ্গে কতখানি এঁটে উঠবে তাই-ই শুধু ভাবচি।”
আমাদের বিশ্রাম নিতে দিয়ে ইন্দ্র আগেই বলে রাখা জলযোগের তদারক করতে নীচে গেলে পর কালীপদ কপালের রগ টিপে কী যেন চিন্তা করতে থাকলো। কানাই নিজের পেতলে বাঁধানো সড়কিটা দরজার পাশে জোব্বা ঝোলানোর আলনাতে ঠেস দিয়ে রেখে কৌচের উপরে বসলো। আমরা বসলাম প্রকাণ্ড পালঙ্কের একাংশে। আমি কইলাম, “সবে সবে তো এলুম। এখনই এত পাহাড় প্রমাণ রণকৌশল চিন্তা না করে ঠিক হয়ে বসো দাদা।” কালীপদ একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বললে, “তোমার যেমন কথা ডাক্তার! ওসব পরের কথা, আমি ভাবচি অন্য কথা। বলরাম রায় আর তার ছেলের কথার মাঝে কী একটা জরুরি কথা যেন হারিয়ে গেল! ধরেও ধরতে পারলুম না হে।”
বিভা অলৌকিক সিরিজ
“কী কথা? মৃত্যুগুলোর যা বৃত্তান্ত শুনলাম, সেই সম্বন্ধীয়?”
“নাহ।”
“তবে? দেবনগরের রায়বাড়ির সম্বন্ধে?”
“আহহ, সে বাড়ি তো দেখিইনি, তার ফাঁকফোকর আমি ধরবো কেমন করে? ওসব নয়।”
ইতিমধ্যে নীচ থেকে বলরাম এসে জলযোগের জন্য অনুরোধ করলে পর আমরা গাত্রোত্থান করলাম। কালীপদ কইলো, “রায়মশাই, কানাইয়ের জন্য নীচে ঘর দেবার আবশ্যকতা নাই, ও আমাদের কক্ষেই বেশ থাকবে।”
“যে আজ্ঞা ঠাকুরমশাই। আপনার আপত্তি না থাকলে আমার কী? আমার দ্বারবানেরা এমনিই বাইরে প্রহরা দেয়, আপনার ঘরেও একজন রইলে ভালোই হবে।”
কালীপদ ভ্রু তুলে কইলো, “মাপ করবেন রায়মশাই, আমার কানাই দ্বারবান বা প্রহরী নয়। কানাই কী জানেন? লেঠেল… লেঠেল। যে লেঠেলদের লাঠির ভয়ে মোগল সেনাপতি মীর জুমলাও আতঙ্কিত থাকতো। দুটো বিষয়কে এক করবেন না।”
বলরাম অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বললে, “আপনি বরং আমাকে মাপ করুন ঠাকুর। আমার ভুল হয়েচে।”
আমি পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য অকারণেই হোঃ হোঃ করে একগাল হেসে কইলাম, “আরে ঠিক আছে রায়মশাই। কানাই থাকুক উপরেই। ওর জোর তো জানেন না, ওই পেতলের সড়কির ঘা ব্রহ্মতালুতে খেলে ওই পিশাচ অবধি দিনের আলোয় আকাশের তারা দেখবে। অশরীরী হলে আলাদা, কিন্তু শরীরধারী হলে রক্ষা নাই তার। পা খামচে যখন তাকে স্পর্শ করা গিয়েচে, তখন শরীর তো একটা রয়েচেই তারও। হাঃ হাঃ হাঃ।” বলরাম প্রায় লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠলো, “কী সর্বনাশ! কার পা? কে ধরলে?”
আমি তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলে ফেললাম। বলরাম এগিয়ে গেলে পর কালীপদ আমার কানে ফিসফিস করে বললো, “অমন হ্যা হ্যা করে হাসচো কেন কথায় কথায়? তুমি না একজন চিকিৎসক? শোকের বাড়ি, রোগীর বাড়ি যা হোক। এসেচো পর থেকে শুধু গল্পই করে চলেচো হাঁ করে রোগীনির কাছে তো একবার গেলে না কৈ? আর ভালো কথা, তোমার শেষ কথাটাতেই ওই হারিয়ে যাওয়া কথাটা আবার মনে পড়ে গিয়েচে। ধন্যবাদ। চলো, খেতে খেতে বলচি।”
আমি বিরক্ত হয়ে একটাও কথা না বলে আহার-কক্ষে গিয়ে ঢুকলাম। কানাই নিজের জলখাবার নিয়ে রোয়াকে আরাম করে বসলো। দুই চারজন দ্বারবান তার সঙ্গে আলাপ জমানোর জন্য উশখুশ করতে লাগলো। আমরা খাওয়ার জলচৌকিতে বসলাম। খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের সুবাসে মনটা হালকা হয়ে গেল। বিরাট বড় কাঁসার ফুলকাটা নকশী বগিথালা জুড়ে ঈষৎ স্বর্ণাভ বর্ণের ঘৃতপক্ক লুচির দিস্তা। থালার এক কোণে আট-দশ টুকরো বেগুনভাজা। থালার বাইরে দুইখানি বড় পদ্মবাটিতে নারিকেল কুচি দেওয়া হিংগন্ধী ছোলার ডাল আর অপরটিতে নৈনিতাল আলু আর কড়াইশুঁটি দিয়ে সদ্য ওঠা ফুলকপির ডালনা। সঙ্গে তিনটি করে ঘরে বানানো ছানার সন্দেশ।
সেসব গলাধঃকরণ করতে করতে কালীপদ ইন্দ্রকে কইলো, “তুমি যে বললে রাধাকান্ত রায় মুখের কথা ছাড়াও ইশারাতে কিছু দেখাতে চেয়েচিলেন, তো তার মুখের কথাটা কী ছিল তা তো বললে না?”
“সে আর কী বলি ঠাকুরমশায়, নিজেই তো কিছু বুঝলাম না। উনি ফিসফিস করে বললেন— ‘তারা, পাতা, জল / কোথা পাবি বল?/ চোখ ছলছল?’, ছাতে ঝুঁকে পড়া গাছে পাতাও ছিল এবং তার ফাঁক দিয়ে গুটিকতক তারাও দেখা গিয়েচিল বটে, কিন্তু জল কোথা?”
কালীপদ আত্মমগ্ন হয়ে বললে, “ভাবতে হবে। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ কখনও অবান্তর কথা কয় না। আমরা বুঝতে পারিনে, সে আমাদের দোষ।”
বলরাম হাতজোড় করে কইলো, “কিন্তু ঠাকুর, একটা বড় ধন্ধ রয়েচে। শয়তানটা আদৌ কোনো পিশাচ, নাকি রুষ্ট হওয়া রাধামাধব স্বয়ং, তাও বুঝচি নে। ও বাড়ির বৌঠান যেদিন কূয়ার কাছে মারা যান, তিনি রাধামাধবের ভোগের প্রসাদ নিয়ে গিয়েচিলেন কেন? কার জন্য?”
কালীপদ একটু ভেবে বললে, “তা বলতে পারিনে, তবে দেবতাকে উৎসর্গ করা প্রসাদ আবার কেউ সেই দেবতার জন্যই নিয়ে যায় শুনিনি কখনও।
জলযোগান্তে আমরা তিনজন এবং ইন্দ্র প্রশস্ত ছাতে উঠে ঘুরে ঘুরে দেখচি, কালীপদ ছাতস্পর্শী গাছের কাছে আততায়ীর দাঁড়ানোর সম্ভাব্য জায়গাটা অনুমান করে বিড়বিড় করে নিজের মনে বললে, “তারা, পাতা, জল / কোথা পাবি বল?/ চোখ ছলছল?”
এর অর্থ কী?
কানাই তার কর্তাবাবার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে ফিক্ করে হেসে আমাকে নীচু স্বরে কইলো, “কর্তাবাবাকে এর আগে কখনও এসব বলতে শুনিনি ডাক্তারবাবু।”
আমি ললাটে ভাঁজ ফেলে বললাম, “বুঝলাম না কানাই, কী বলতে শুনিসনি?”
“এইসব জামাই ঠকানো রহস্য।”
কালীপদ আনমনা থাকলেও আমাদের কথা কিছু কিছু শুনেচে। সে প্রশ্ন করতে কানাই অপ্রতিভ হয়ে বললো, “আজ্ঞে কর্তাবাবা, আপনি এখুনি যেটা কইলেন, সেইটে নূতন জামাইকে ঠকানোর বহু পুরোনো প্রশ্ন। শেষের কথাটা শুনিনি কখনও, তবে আসল প্রশ্নটা হবে— কোন জায়গায় পাতা আছে কিন্তু গাছ নাই, জল আছে কিন্তু মেঘ নাই, আর তারা আছে কিন্তু আকাশ নাই?”
কথাটা বলে কানাই তার কর্তাবাবার দিকে উত্তরের আশায় থেকেই পরক্ষণে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তড়িঘড়ি বললে, “উত্তরটা হবে চোখ।” কালীপদর ললাট একটু কুঞ্চিত হয়েই নিপাট হয়ে গেল! তার মুখে খুশির আভাস। কানাইয়ের পিঠে চাপড় দিয়ে কইলো, “শাবাস কানাই, শাবাস।”, আর তারপরই মুখে সামান্য দুশ্চিন্তার ছায়া এনে বললো, “শেষের অংশটার মানেটাও বুঝতে পেরেচি এতক্ষণে ডাক্তার। বুঝেচি কার চোখ ছলছল করেচিল সে রাতে। সতর্ক না থাকলেই বড়ো বিপদ!”
আমি এরপর শত চেষ্টা করেও কালীপদর মুখ থেকে একটা রা কাড়তে পারলাম না। অপরাহ্নে কালীপদ গোটা রায়বাটীর চৌহদ্দিতে বাঁধন দিয়ে দিলো, সঙ্গে নিলো বলরামকে। একটি বড় তাম্রপাত্রে মন্তরপড়া জল নিয়ে, আঙুলে কুশ বেঁধে, শেষ বেলার সূর্যের দিকে চেয়ে জলছড়া দিতে দিতে পশ্চিমের দিকে বিড়বিড় করে বলতে থাকলো-
“ওঁ শ্রীভাস্করায়া সবিতায়া বিদ্যহে,
বন্ধনম রক্ষঃ মহাদ্যুতিকরায়াঃ
ধীমহি তমো আদিত্য প্রচেদয়াৎ।”
দক্ষিণে জলছড়া দিয়ে বললে, “ওঁ শমনায় ধর্মাধিকরায় কালাকাল বিদ্যহে, বন্ধনম রক্ষঃ আদিত্যসূতায় প্রচেদয়াদ।”
একইভাবে পূর্বের বাঁধনে, “ওঁ ধরণীদেহা দিব্যশঙ্খ তুষারাভম্ বিদ্যহে, বন্ধনম রক্ষঃ শন্তোমুকুটভূষণম প্রচেদয়াৎ”, এবং উত্তরে অনুরূপ পবনকে রক্ষাকর্তা মেনে বাঁধন দেওয়া হল। আমি প্রথমে পশ্চিমে সূর্য এবং পূর্বে চন্দ্রকে রাখতে দেখে অবাক হলেও পরে অনুমান করলাম, তাদের অপরাহ্নিক অবস্থান দেখেই বাঁধন কাটা হয়েচে, এবং চাঁদকে ধরণীদেহা বলার কারণ শুনলাম, তন্ত্রমতের একটা ধারায় নাকি বলা হয় যে চাঁদ একসময়ে পৃথিবীরই অংশ ছিল, পরে কোনো মহাজাগতিক অভিঘাতে তা ছিটকে যায় অন্তরীক্ষ্যে।
কালীপদ বাঁধন দেবার পর সকলকে ডেকে সতর্ক করে দিলো, “শোনো, এ বাড়ির এই বাঁধনের বাইরে সায়ংকালের পর কেউ বেরোবে না। এই গণ্ডীর ভিতরে পিশাচটা প্রবেশ করতে পারবে না সূর্যোদয় অবধি। আর একটা কথা, গণ্ডীর মধ্যে থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু গণ্ডীর বাইরে মনভুলান্তে বেরোলেও সামনে যত চেনা মানুষই ডাকুক, তার চোখের দিকে চাইবে না। ভালো করে মনে রাখবে আমার কথা।”
বাড়ির সকলে সে কথা একবাক্যে মেনে নিয়ে পণ স্বীকার করলো।
সন্ধ্যায় রায়বাটীর দ্বিতলের টানা বারান্দায় দু-খানা বঙ্গলক্ষ্মীর হারিকেনবাতি জ্বেলে দিয়ে গিয়েচে ভৃত্যরা। রাজ্যির শ্যামাপোকা এসে ধুঁয়া নির্গমনের ফাঁকা দিয়ে ঢুকে পুড়ে মরচে তাতে। বাইরে কারোর গরু পথ হারিয়ে ওম্মা ওম্মা করে ডাকচে। উঠোনেও কতকগুলো হ্যাজাকবাতি রয়েচে, তাতে গৃহ প্রাঙ্গণ ভালোই আলো হয়েচে, কিন্তু সেই আলোর পরিধির বাইরে চোখ অন্ধ করা আঁধারের পানে চাইলে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে! যেন কোনো হিংস্র অপশক্তি আঁধারের ভেক ধরে গিলে খেতে চাইচে বাড়িটাকে, কিন্তু এক লৌহচিত্ত বজ্রকঠিন মানুষের ভয়ে ওৎ পাতা অবস্থা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারচে না! ঝিঁঝিঁপোকার আওয়াজে কান পাতা দায়। আমি বললুম, “দাদা, গণ্ডীর বাইরে চেনা মানুষেরও চোখের দিকে চাইতে নিষেধ করলে কেন?”
“কারণ তার চোখের পানে চাইলেই সম্ভবত শিকারকে বশবর্তী করে ফেলার বিদ্যা তার রয়েচে। এই ধরনের পিশাচদের অনেকগুলি জাত রয়েচে। কখনও বেতাল, কখনও বুড়া, কখনও ভুলো, নিশি বা আরও কিছু। কোনো অপশক্তির মোকাবেলা করতে সেই শয়তানটার সঠিক জাত চেনাটা বড় জরুরী। তবেই তার ক্ষমতা আর দুর্বলতাগুলো জানা যায়। তবে যে জাতের পিশাচই হোক, কেউ যদি তার মায়াজাল সৃষ্টির আগেই তাকে পিশাচ বলে চিনে নেয়, তবে তার উপরে মায়ার জারিজুরি আর কাজ করে না। এ একেবারে ধ্রুব সত্য।”— একটু থেমে কালীপদ বলরামের দিকে চেয়ে আবার বললো, “আপনার পিতৃদেব মরণকালে সেই ইশারাই দিয়ে গিয়েচিল রায়মশাই। সেই পিশাচকে সে হয়তো ছাতে দেখতে পাচ্চিলো, তাই ঘুরিয়ে বলা ছাড়া তার উপায়ান্তর ছিল না।
“তারা, পাতা আর জল দিয়ে সে চোখের কথা বলতে চেয়েচে, কিন্তু খটকা ছিল শেষের কথাটা নিয়ে, কিন্তু এখন আর নেই। চোখ ছলছল অৰ্থ, ওই শয়তানের চোখের দৃষ্টিতে ছল রয়েচে। হয়তো কোনো চেনা মানুষের ছদ্মবেশে তাকে ভুলিয়ে ছাতে নিয়ে গেছিল শয়তানটা এবং সেটা রাধাকান্ত রায়ের মতো বিচক্ষণ মানুষ মৃত্যুর আগের মুহূর্তে ধরে ফেলেচিল, কিন্তু ততক্ষণে বড় দেরি হয়ে গিয়েচে।”
ইন্দ্র হতভম্ব হয়ে বললে, “এই কথাই বলতে চেয়েচিল দাদাই? আমাদের সতর্ক করার জন্য? হা ঈশ্বর! এখন আমারও মনে হচ্চে আপনার কথাই সম্ভবত ঠিক।”
কালীপদ বিমনা স্বরে বললো, “সম্ভবত নয় ইন্দু, অভ্রান্ত। আরও প্রমাণ দিচ্চি। শঙ্কর লেঠেল যখন খুন হয় এবং তোমরা তার শেষাবস্থায় ছুটে যাও, তখন সে তোমার বাপকে দেখিয়ে জল চায় এবং পরমুহূর্তেই তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় ক্ষোভে। অসহায় অবস্থায় যার কাছে জল চাওয়া হয়, তাকে কি কেউ দূরদূর করে বাছা? কৈ আর কারুকে তো সে সরিয়ে দেয়নি? আসলে রায়মশাইয়ের উপর তার ভরসা ছিল না। তার কারণ এই নয় যে রায়মশাই ঘর ছেড়ে সাহস করে বেরোননি। শঙ্কর নিজেই তো নিষেধ করেচিল বেরোতে। আমার মনে হয় ঐ ভেকধারী পাষণ্ডটা রায়মশাইয়ের রূপ ধরেই শঙ্করকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েচিল বধ্যভূমিতে।” বলরাম কেঁপে উঠে মুখ ঢাকলো আর শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কালীপদ নরম কণ্ঠে কইলো, “উতলা হবেন না রায়মশাই, সে আপনার রূপ ধরে নরবধ করেচে, তাতে আপনার কী দোষ? কাল আমার রূপও নিতে পারে। এতে কোনো গ্লানি নেই।”
বলরাম চোখ মুছে ধরা গলায় কইলো, “শেষ সময়ে আমার কাছে জল চেয়েচিল হতভাগা। সেটুকু দেবারও সময় দিল না। বুকে তেষ্টা নিয়ে চলে গেল।”
ইন্দ্র মাথা নীচু করলো। কালীপদও বিষণ্ণ স্বরে বললো, “শঙ্কর নিঃসন্দেহে বড়ো কষ্ট পেয়ে মরেচে, কিন্তু মরার আগেও নিজের কর্তব্য করে গিয়েচে রায়মশাই। সে আপনার কাছে জল চায়নি। সে মরার আগে আপনার দিকে আঙুল দেখিয়ে জড়ানো গলায় বলে গিয়েচে ছল, ছল। ঠিক যেমনটি রাধাকান্ত বলেচিলেন। শঙ্কর তখনও ধন্ধে ছিল আপনিই আসল বলরাম রায় কিনা। তাই বলচি, আমার অনুমান বোধহয় মিছে নয়।”
নীচ থেকে সান্ধ্য জলপানের ডাক এলে পর সকলে উঠলাম। কালীপদ কইলো, “তোমরা যাও, আমি স্তব সেরে আসচি।”
বসামাত্র রাঁধুনি তড়িঘড়ি ছুটে এলো আহার্য্য নিয়ে, আর সেসব সাজিয়ে দিয়ে চলে গেল। জলপানের ব্যাবস্থা আহামরি না হলেও মন্দ নয়। জামবাটি ভর্তি আমতেল দিয়ে মাখা মুড়ি, গরম গরম বেগুনী আর গোটাকতক ফুলুরী, কাঁচালঙ্কা, ডালবড়া আর আখের গুড়ের চা। কালীপদর জন্য খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করে গরম গরম সদ্ব্যবহার করার লোভে আমি একটু পরেই একখানা বেগুনী তুলে নিতে বলরাম হেসে বললো, “শুরু করুন, দ্বিধা করবেন না। ঠাকুর এলে গরম ভেজে দেবেখন দুলাল।” কালীপদ তিনবার গুরুমন্ত্র জপ করে, প্রণাম সেরে নীচে নামতেই দেখলো একজন পরিচারক উঠান পেরিয়ে চলেচে। তার চলার দিকে তাকিয়ে কালীপদ হাঁকলো, “এইও, শোনো একবার।”
সে শুনতে পেলো না দেখে কালীপদ ছুটে গিয়ে তাকে ধরে মুখের দিকে চেয়েই চমকে বললো, “কী সর্বনাশ!”
নিজের তর্জনীটা তার কপালে চেপে ধরতেই লোকটা ছটফট করে সুপ্তোত্থিতের মতো যেন জেগে উঠে বললো, “ধলি কোথা?”
“কে ধলি? অ্যাঁ? ধলিটা কে?”
“ঠাউরমশায়, ধলি আমাদের গোহালের গাই। একটু আগেই দ্যাখলাম কলাবনের কাছে কী করে যেন ছাড়া পেইয়ে চলি গিয়েচে। আপনি উঠানের বাইরে যাতি মানা করিচেন, আমি ভাবলাম ধলিরে নিয়া আসি, কেউ ডাকলি না তাকালিই হইলো। ধলিরে আনতি গিয়া দেখি সে নড়চড়ে না, শুধু ডাকতিচে। আমি তার মুখির পানে তাকাতি সে ডাক বন্ধ করলে পর দ্যাখলাম, ও ভগমান! তার চোখ দুইটা ভাঁটির মতো জ্বলতিচে। তারপর আর কিছু মনে নাই ঠাউর।”
কালীপদ তাকে মরিয়া হয়ে ঝাঁকিয়ে চাপা গলায় বললো, “সে শয়তান যাদু করেচিল তোকে হতভাগা। এই সময়ের মধ্যে কী কী করেচিস তুই বল শিগগির?”
“আমি কী করবো ঠাউর? এই তো এখুনি ঘটলো হেইডা।”
“হতভাগা, এখুনি নয়, আমরা যখন উপরে বসে কথা কইচি তখনই কলাবন থেকে গরু ডাকচিল। এতক্ষণ সময় সম্মোহিত করে তোকে দিয়ে নিশ্চয়ই কিছু করিয়েচে রাক্ষসটা। তুই এ বাড়িতে কী কী কাজ করিস?”
“ঠাউর আমি পাচক।”
“রাঁধুনি! হা ভগবান!”; কালীপদ ঝড়ের মতো ছুটে এসে ঢুকলো খাবার ঘরে আর আমার হাতে তোলা বেগুনীটা এক টানে ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে! আমরা কিছু বলার আগেই ইন্দ্ৰ বোধহয় কতকটা বুঝতে পেরেছিল ঘটনাটা। সে লাফিয়ে উঠে বললে, “রান্নাঘর এইদিকে ঠাকুর।”— কালীপদ তার পিছন পিছন গিয়ে ঢুকলো রান্নাঘরে আর খুঁজে খুঁজে পেতলের জলের বালতিগুলোর পাশ থেকে কয়েক টুকরো জড়িবুটির মতো জিনিস তুলে নিরীক্ষণ করে এতক্ষণ ধরে রাখা শ্বাসটা ফেলে ক্লান্ত স্বরে কইলো, “প্রাণমুগরোর কাঁচা শেকড়! নাহহ, এ সর্বনাশা পিশাচের পাল্লা নেওয়া আমার কর্ম নয় ডাক্তার। একটু হলে কানাই আর তোমাকেও হারাতে বসেচিলাম আজ। প্রতিটা মুহূর্তে সজাগ না থাকলেই দানবটা ঠিক বাসরঘরের ছিদ্র খুঁজে ছোবল মারচে! এই দেখো না, গণ্ডীর বাইরে থেকেও ঠিক একটু হলেই তোমাদের বধের আয়োজন করেচিল সে।”
একটু থেমে বললে, “কাল একবার রাধাকান্তর ঘরটা আর তার পুঁথিপত্তরগুলো দেখবো রায়মশাই। তিনি নাকি আপনার পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতেন? দেখি সেখানে কিছু পাওয়া যায় কিনা। আর বেলাবেলি আহারের পর একবার দেবনগর যাওয়া দরকার। আপনারাও সঙ্গে যাবেন। দেখি কার কথায় কী সূত্র পাই আদৌ। বাকি ভবাণীই ভরসা।”
রাতে একবার ইন্দ্রর মাকে দেখে এলাম। ওষুধ খেয়ে এখন অনেকটাই সুস্থ। নূতন ঔষধ না দিয়ে এক ফাইল রক্তশোধক সারিবাদি-সালসা আর কুমারেশের লিভার টনিক একখানা আনিয়ে নিতে বললাম। রাতে শুয়ে সম্ভব-অসম্ভব এটা-সেটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম অবশেষে।
