ইন্দুবালার ইঙ্গিত
ঊষায় নিদ্রাভঙ্গ হতে দেখি কালীপদ আর কানাই কক্ষে নাই। তাদের অবস্থান যদি এতদিন সঙ্গে সঙ্গে থেকেও অনুমান না করতে পারি তবে ধিক্ আমাকে। আমি গুটি গুটি পায়ে দক্ষিণ পশ্চিমে রাধাকান্তর শয়নকক্ষে পৌঁছে দেখি কালীপদ, কানাই আর ইন্দ্র সে ঘরেই রয়েচে। কালীপদ অত্যন্ত নিবিষ্ট চিত্তে রাধাকান্তর বিভিন্ন কাগজপত্তরে লেখা রায়বাড়ির ইতিহাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়চে। কিছুক্ষণ একাগ্র হয়ে পাঠ করার পর সেসব সরিয়ে রেখে কইলো, “লেখাগুলো পড়ে বিশেষ কিছু উদ্ধার করতে পারলুম না, কিন্তু কেন যেন মনে হলো উনি বেশ কিছু গুপ্তকথা জেনে গিয়েচিলেন তোমাদের পরিবারের ইতিহাস নিয়ে, কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে সেগুলি খুলে লিখে যাননি। এর দুইটি কারণ হতে পারে। এক, তিনি মনে করেচেন সেসব মন্ত্রগুপ্তির কথা কেউ জানলে পরে উপদ্রব হতে পারে। দুই, তিনি মনেই করেননি যে সেই গোপন কথার আদৌ কোনো সত্যতা আছে।” তারপর কী একটা ভেবে ইন্দ্রর পানে সরাসরি চোখ তুলে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা, ইন্দু কার নাম?”
ইন্দ্র অবাক হয়ে বললে, “আমারই ডাকনাম! সে কথাও আছে নাকি?”
“আহহ, তুমি নও, সেই আমলের আর কেউ?”
বলরাম দোরের কাছে এসে দাঁড়িয়েচিল। সে উত্তর দিলো, “ঠাকুরমশায়, আমি বিশদ জানিনে, তবে বাবার মুখে শুনেচি আমাদের বংশে বহুকাল আগে রাজমাতা ইন্দুমতী নামের কেউ একজন ছিলেন। মহারাজ বীরবাহু না বীরবলের স্ত্রী। তাঁর কথা বলচেন?”
“তাই হবে হয়তো। হওয়াই সম্ভব, তবে বেশিরভাগ রাজপরিবারের ইতিহাসে রানিরা যেমন আড়ালেই থেকে যান, এক্ষেত্রে তা নয়। উনি সম্ভবত একজন তেজস্বী মহারানি ছিলেন। দেবীগ্রাম নামের একখানা করদ রাজ্যে ছিল তাঁদের রাজত্ব। নেহাৎ ক্ষুদ্র রাজ্য নয়, সেই আমলেও তার বার্ষিক আয় ছিল বত্রিশ লক্ষাধিক টাকা।”
বলরাম বিষয়ী চিত্তে সেই আমলের তুল্যমূল্যে টাকার অঙ্কটা মনে মনে আঁচ করচে, হঠাৎ কালীপদ শুধালো, “আচ্ছা রায়মশাই, আপনার পরিবারে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েচিল কখন? রাধাকান্ত রায়ের মুখে শুনেচেন কখনও?”
ইন্দ্ৰ কইলো, “দাদাই যত কথা বলতো, আমাকেই বলতো কিন্তু তেমন কোনো ষড়যন্ত্র বা আঁতাতের কথা বলতে শুনিনি কখনও, অবশ্য কোন রাজপরিবারেই বা সেসব হয় না বলুন ঠাকুর?”
“উঁহু, ঠিক তেমনটি নয়। এমন কোনো একটা ষড়যন্ত্র হয়েচিল যা নাকি তোমাদের পরিবারের পিছু ছাড়বে না কখনও। পড়ে শোনাচ্চি রাধাকান্তর লেখা অংশটা, দাঁড়াও.. কোথায় গেল… এই যে, “আমি, দেবীগ্রামের রাজমাতা ইন্দুমতী, নিশ্চিত হয়ে বলচি যে, যুদ্ধবিগ্রহ তো রাজ্যে চিরকালই থাকবে কিন্তু যে ভয়ানক ষড়যন্ত্র আমার পরিবারে বয়ে চলবে বংশ পরম্পরায়, যুদ্ধমাঝে যতক্ষণ না সন্ধিস্থাপন হচ্ছে ততক্ষণ অবধি তার শেষ নাই’; আমার মনে হয় রাজমাতা ইন্দুমতীর যুগে দেবীগ্রাম রাজ্যে কোনো যুদ্ধ হয়েচিল এবং সেই যুদ্ধে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কোনোরকম যুদ্ধবিরতির চুক্তি করা সম্ভব হয়নি, তাই কোনো একটা কুটিল ষড়যন্ত্রের শাপ বয়ে চলেচে তোমাদের পরিবারে, রাজমাতা সেই ইঙ্গিতই রেখে গিয়েচেন, কিন্তু এত যুগ পর সেই দুর্দম প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমি মিত্রতা স্থাপন করবো কী প্রকারে? নাহ, এ যে বড়ো রহস্য দেখচি! এই প্রথম বোধহয় আমাকে পরাভব স্বীকার করতে হবে।”
কালীপদর গলায় বিষণ্ণতা মাখা নৈরাশ্য অনুভব করে আমি প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললাম, “না, পরাভব তোমার হবে না। হলে তোমার গুরুবচন মিথ্যা হয়ে যাবে যে। তোমার সদগুরু হংসী তান্ত্রিক তোমাকে আশীর্ব্বাদ করেচিলেন, তুমি সব পরিস্থিতিতেই মন্ত্রতন্ত্রের চেয়েও নিজের ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়ে নিজের প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেবে। সে কি মিছে কথা হল আজ দাদা?”
কালীপদ গুরুর নাম শ্রবণ করা মাত্র কপালে হাত ঠেকালো।
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে কক্ষ থেকে বেরোতে যাবো, কালীপদর পায়ে পালঙ্কের নীচে ধাতব কী একটা ঠেকতে সে নীচু হয়ে একটা বাটি তুলে এনে দেখচে, বলরাম বললে, “দেখেচ কাণ্ডজ্ঞান? এই জামবাটিতে গৌরী রোজ গরুর দুধ এনে দিতো রাতে। কী করে যেন পড়ে গিয়েচে, কেউ ঝাঁটপাটও দেয়নি আর, খেয়ালও করেনি।”
কালীপদ অধর দংশন করে কইলো, “এই দুধ পান করা অবস্থাতেই বোধহয় সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছিল ছাতের দিকে, তাই ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়েচে, তোলার সময় হয়নি আর এবং যেহেতু আপনার স্ত্রীই রোজ শ্বশুরকে এই খাবার এনে দিতো তাই মায়াবীটা মনে হয় গৌরীদেবীর ভেক ধরেই তাকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েচিল ছাতে। ঠিক বলতে পারিনে, তবে আমার অনুমান এটা। যা-ই হোক, এ কথাটা আবার আপনার স্ত্রীকে বলবেন না যেন। অসুস্থ মানুষ আঘাত পাবেন। মধ্যাহ্নভোজের পর আলো থাকতে দেবনগর যেতে হবে রায়মশাই। গড়িতে ঘোড়া জুতে রাখতে বলবেন।”
“আজ্ঞা ঠাকুর। আপনি এ বাড়িতে বাঁধন দিয়ে নিন, আমি আর ইন্দু দু-জনেই যাবো আপনাদের সঙ্গে।”
অপরাহ্নে আমরা বেরিয়ে পড়লাম দেবনগরের রায়বাটীর দিকে আর মিনিট কুড়ির মধ্যে সে বাড়ির উঠানে এসে থামলাম। প্রকাণ্ড মহল! সাদা ধবধবে কলি ফেরানো বাড়ি। উঠানে রাধামাধবের অসাধারণ রঙ্গিন চিত্রবিচিত্র অঙ্কন করা অলঙ্কৃত মন্দির, তার সামনে অপূর্ব কারুকাজ করা, কণ্ঠদেশে চওড়া ময়ূরকণ্ঠী রঙের পাড় দেওয়া মিনে করা ছোট কামান, মার্বেল বসানো মনোরম সোপান, ডাকাত-নিবারক বল্লমফটক, যে ফটকের ফোকর দিয়ে বাইরে দাঁড়ানো ডাকাতকে বল্লমে বিদ্ধ করা যেত। সব মিলিয়ে বৈভবের আর রুচির ছাপ।
কালীপদ একবার বলরামকে শুধালো, “বৈষ্ণব মন্দিরে কামান কেন?”
বলরাম বললে, “আসলে আমাদের উৎস তো দেবীগ্রামেই, তাঁরা ছিলেন
পরম শাক্ত, তাই দুর্গাপূজায় আমাদের দেবীগ্রামের প্রতিষ্ঠিতা দেবী মহিষমর্দিনীর পূজার সময়ে কামান ডাকে দেবীর সম্মানে।”
“বটে? এদিকে আগ্নেয়াস্ত্র, ওদিকে বল্লমফটক, এ বাড়ি না দুর্গ রায়মশাই? আমার তো মনে হয় আপনার পূর্বপুরুষ ধূর্জ্জটি রায় কিছুর আশঙ্কাতেই অস্ত্র এবং বর্মসম কপাট দিয়ে বাড়ি আগলে রেখেচিলেন। আপনাদের দুই পরিবারের সঙ্গেই দেবীগ্রাম আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েচে দেখচি। সেখানেই এই রহস্যের অর্ধেক পড়ে রয়েচে হয়তো।”
বাসুদেব রায় এবং তার পুত্রদের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্চে বিরাট অন্দর-উঠানে পুরু গালিচায় বসে। বাসুদেবের কথাবার্তা শুনে মনে হলো সে যেন কালীপদকে পেয়ে অকূলে কূল পেয়েচে। আজ অবধি যা যা ঘটেচে তার তুচ্ছাতিতুচ্ছ কথাও সে উজাড় করে দিল অকপটে। বাসুদেব কইলো, “আমাদের পূজায় বোধহয় ভদ্রা লেগে গিয়েচে ঠাকুরমশায়, ভাদ্দরের নষ্টচন্দ্রের দৃষ্টি পড়েচে, নাহলে পারিবারিক পূজা এভাবে বিনষ্ট হয়? এত বিপদ ঘটে?”
কালীপদ সে কথার উত্তর দিল না। আরও কিছু কথাবার্তার পর কইলো, “হাঁ, একটা কথা বড়ো রায়মশাই, আপনার বাড়ি সমেত ভদ্রাসনের চৌহদ্দি বাঁধন দিতে হবে রাতের মতো এবং গৃহকর্তার সম্মতি বিনে তা হয় না। আপনাকেও সঙ্গে থাকতে হবে।”
বাসুদেব বললে, “নিশ্চিন্ত হই ঠাকুর, তবে কথাটা হল…” এই বলে আড়চোখে বলরামের দিকে চেয়ে কথাটা গিলে নিলো। কালীপদ কঠোর মুখে নীচু স্বরে বললো, “না বলা কথা বোঝার মতো ক্ষুদ্রবুদ্ধি আমার আছে। আমি জানি রাধাকান্তর গৃহে নির্বিচারে নরমেধ হলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে আপনার চৌহদ্দির ভিতরে নরহত্যা ঘটেনি, কিন্তু তার কারণ তো আমরা জানি না। আজ হয়নি, কাল হতে আটকাবে কীসে? তাই বাঁধনের পন্থা। মনে রাখবেন আপনার বাড়ি-উঠানে সে না-ঢুকলেও তার বাইরে আপনার স্ত্রীকে হত্যা করতে কিন্তু তার আটকায়নি।”
বাসুদেব নীরবে সম্মতি দিলো।
সায়ংকালে উঠে কালীপদ একখানা তামার ঘটি আর আমপল্লব চেয়ে নিয়ে বললো, “আমি বাড়ির চতুদিকে রাতের মতো বাঁধন কেটে দিচ্চি, কিন্তু খুব সাবধান বাসুদেব মশায়, এই গণ্ডীর বাইরে যদি নিজের মা-বাপও এসে কাঁদাকাঁটি করে তবুও যেন কেউ বাঁধন অতিক্রম না করে। শুধু মানুষ নয়, কোনো পশু-পাখি-গাই-বাছুর-কুকুর-মেকুর যেই ডাকুক, কেউ যেন ফাঁদে পা না দেয়।”
সকলে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।
বাঁধন দিয়ে ফেরার পথে রাধামাধব মন্দিরে সুর করে মন্তর পড়ার শব্দে উঁকি দিয়ে দেখলাম বাসুদেব আর বলরামের বৃদ্ধা পিসি মানদা সুর করে দুলে দুলে গৃহদেবতার মূর্তিশূন্য বেদীর কাছে বসে সুর করে বন্দনা করচে। মুখ দেখতে না-পেলেও কণ্ঠে বোঝা যায় যে তার জীর্ণ বক্ষপিঞ্জরে এক পাহাড় অভিমান জমে রয়েচে সৃষ্টিকর্তার প্রতি। সে মন্দিরে দেবতা নাই, বন্দনায় প্রার্থনার সুর নাই, আবেগ নাই, এক বৃদ্ধা কেবল নিয়মরক্ষার্থে ফোকলা মুখে বিষণ্ণভাবে চিরাচরিত অভ্যাসে বলে চলেচে,
‘আধা মনে শ্রীমাধব
আধা মনে রাই,
পূর্ণমনে ভর করে
প্রতিষ্ঠিনু তাই,
এক ভরির বংশী দিলা,
পাঁচ ভরির চূড়া,
শতেক ভরি রত্নাদিতে
রহিলেক ভরা।
তোমা হেন গুরু যদি
থাকে কেহ হেন,
রুদ্রনাদী নীলকণ্ঠ
একমাত্র জেনো।’
বারংবার তার একই রুক্ষ, শুষ্ক স্তবে কেন যেন আমার মনটা ভার হয়ে গেল। বাসুদেব বললে, “এ আমাদের কুলদেবতা রাধামাধবের স্তবমন্ত্ৰ বিগ্রহ অদৃশ্য হবার পর আর পূজা হয় না, পিসিমাই শুধু রোজ নিয়ম করে এখনও দেবতার নামটুকু করেন।”
কালীপদ একটু ভেবে বললো, “আমার অনুমান ভুল না হলে এই মন্তর আপনার প্রপিতামহ ধূর্জটি রায়ের তৈরি কি?”
বাসুদেব অবাক হয়ে বললে, “হাঁ, তাই শুনেচি বটে, আপনি জানলেন কেমন করে?”
আমি উত্তর দিলাম, “কারণ আপনার প্রপিতামহের আমলেই এই মন্দির তৈরি হয়েচে, তাই।”
“তা বটে, কিন্তু মন্দির যিনি তৈরি করবেন, পূজার মন্তরও তিনি লিখবেন এমন কথা তো নাই ডাক্তারবাবু?”
আমি আতান্তরে পড়ে কালীপদর মুখের দিকে আড়চোখে তাকাতেই কালীপদ চোখের তীর্যক দৃষ্টি দিয়ে নীরবে ‘বেশ হয়েচে, লাও এবার ঠেলা বোঝো’ জাতীয় কিছু একটা ইঙ্গিত দিয়ে মুখে কইলো, “আপনি ডাক্তারের কথাটা বুঝলেন না আদৌ। উনি ঠিকই ধরেচেন। মন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠিলা, প্রতিষ্ঠিলর বদলে প্রতিষ্ঠিনু রয়েচে, অর্থাৎ ‘আমি প্রতিষ্ঠা করলাম’। তাই মন্তরটাও ওনারই তৈরি হবার সম্ভাবনা। ঠিক বললাম তো ডাক্তার? এইটেই বলচো তো?”
বাসুদেব বিস্ময়ের সঙ্গে বললো, “সাধু! সাধু ডাক্তারবাবু! একদম ঠিকই ধরেচেন!”
আমি একটু অপ্রস্তুত হেসে, “না না, এ আর এমন কী” জাতীয় কী একটা বলে এগিয়ে গেলাম। কালীপদ এগোলো না।
সে একটু হেসে বললে, “মাপ করবেন, এই ধূর্জ্জটি রায়কে আমার ঠিক মনে ধরলো না। বড় বেশি বিষয়ী আর অর্থপিশাচ ধরনের মানুষ। দেবতাকে কী কী জিনিস দিয়েচেন এবং কতটা করে দিয়েচেন সেটাও কুলমন্তরে বলে গিয়েচেন, পাছে কেউ ভুলে যায়। ছিঃ!”
বাসুদের অপ্রতিভ হয়ে মাথা নীচু করলো। এমন সময়ে মানদা মন্দির থেকে বেরিয়ে আসচে দেখে সে বললে, “বড়ো রায়মশায়, অনুমতি পেলে আমি পিসিমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। বাকি সবাইকেই জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গিয়েচে।”
বাসুদেব চিৎকার করে হাঁকলো, “পিসিমা, ইনি একটু কথা কইবেন তোমার সঙ্গে। খুব বড় গুণীন এই ঠাকুর।” তারপর গলা খাটো করে বললো, “পিসিমা কানে একটু খাটো, কিঞ্চিৎ জোরে কথা কইতে হয়।” পিসিমার দুর্বল চোখে যেন ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলো! সে এগিয়ে এসে কালীপদর কামিজ খামচে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলো!
“গুণীন? গুণীন এসেচে? গুণীন? সবাই মরার পর? আমার লক্ষ্মী বৌটা চলে গেল, দাদা গেলেন, দাদার বাড়ির চৌকিদার গেল আর তুই আজ এসেচিস? তুই কক্ষণও গুণীন নোস, তুই পুলিশের সেপাই, বল শিগগির?”
বলরাম আর বাসুদেব হাঁ হাঁ করে ‘পিসিমা পিসিমা’ করে ছুটে আসতেই কালীপদ তাদের হাতের ইশারায় থামিয়ে পিসিমার চোখের দিকে চেয়ে স্নেহভরা গলায় বললো, “আপনি মারুন ধরুন যা আপনার মনে চায় পিসিমা, আমি জানি আপনি যা করচেন মঙ্গলের জন্যই করচেন।”
কথাটা উচ্চারণমাত্র মানদা কালীপদর কামিজ ছেড়ে দুই হাত পিছিয়ে গিয়ে অদ্ভুত চোখে দেখলো তাকে।
কালীপদ আবার নরম গলায় বললে, “হ্যাঁ, মঙ্গলের জন্যই করেচেন। আপনি যাঁদের যাঁদের অপঘাত হয়েচে সবার কথা বললেন, ও বাড়ির শঙ্করের কথাও বললেন, কিন্তু যাঁর নামটা সবার আগে বলার কথা ছিল তাঁর কথা বললেন না যে? আপনি এখনও বিশ্বাস করেন সে বেঁচে আছে, তাই না পিসিমা?”
এতদিনে যে মানদার শুষ্ক চোখে একবিন্দু জল কেউ দেখেনি, সেই বৃদ্ধা আজ হাউহাউ করে কেঁদে ভূমিতে বসে পড়লো! কালীপদ তার সামনে নতজানু হয়ে বসে কইলো, “আর শুধু একটাই প্রশ্ন আছে, আপনার নাতি মঙ্গল কী খেতে সবচেয়ে ভালোবাসে পিসিমা? ফলপ্রসাদ?”
‘ভালোবাসতো’র জায়গায় বর্তমানকালের শব্দ ব্যবহারে মানদার মুখ উজ্বল হয়ে উঠলো। সে ধরা গলায় বললে, “মুড়কি আর মোয়া। তুমি সব বুঝেচো, না ঠাকুর?”
কালীপদ ক্লিষ্ট হেসে একবার উপর নীচে মাথা নাড়লো। মানদা চোখ মুছতে মুছতে নিজের মন্দির সংলগ্ন ঘরে ঢুকে দোর দিলো। আজ তার মন থেকে একটা বোঝা নেমে গিয়েচে।
আমরা ভিতরবাড়িতে প্রবেশের পর বলরাম আর বাসুদেব ব্যগ্র হয়ে প্রশ্ন করার আগেই কালীপদ বললো, “যেদিন পুলিশ এসে খবর দিলো যে দিন দুই আগে মঙ্গল গুলিতে মারা পড়েছে, সে কথা আপনার পিসিমা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করেনি, কারণ আগের রাতেই সে বাড়ির পিছনে মঙ্গলের অলক্ষ্য উপস্থিতি টের পেয়েচে। আসল মঙ্গল নয়, তার রূপধারী পিশাচ এসেচিল সে রাতে দূরের কূয়োপাড়ে। আপনার স্ত্রী যে ঘরটায় পরিচারিকাদের নিয়ে শেষ ক-দিন থাকতেন বলে দেখালেন, সে ঘরটা থেকে পিছনের কূয়োপাড়টা দেখা যায়, আমি জানালা দিয়ে দেখেচি। শয়তানটা মঙ্গলের রূপ নিয়ে তার মাকে মায়া-ডাক দিয়ে মায়ের কাছে খেতে চেয়েচিল হয়তো। সেই মায়াস্বর আর কেউ শুনতে পায়নি। তার মা ফেরারী পুত্রকে সবার থেকে লুকিয়ে দিতে গিয়েচিল তার সবচেয়ে প্রিয় প্রসাদের খাবারগুলি আর সেই পাষণ্ড, নরকের কীটটা পুত্রের রূপ নিয়ে মা-কে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
“আপনার পিসি সকালে সবার সঙ্গে ছুটে গিয়ে মৃতদেহের পাশে খাবারগুলি পড়ে থাকতে দেখেই অনুমান করে কাল রাতে কাকে খাবার দিতে গিয়ে পিশাচের শিকার হয়েচে আপনার স্ত্রী। শুধু ফেরারী হয়ে যাওয়া মঙ্গলের সন্ধান যাতে পুলিশ না পায় সেই কারণেই নিজের অনুমানটা কাউকে বলেনি সে এবং বলাই বাহুল্য পুলিশের দেওয়া মৃত্যুসংবাদের কথাও তাই কিছুতেই বিশ্বাস করেনি পরদিন। এই ক-দিন এই বৃদ্ধা শুধুমাত্র মনের জোরে সমস্ত কথা বুকে চেপে রেখেচে। আজ সে ভারমুক্ত হয়ে নির্বিঘ্নে ঘুমাবে।”
বাসুদেব বিষণ্ণ স্বরে বললে, “পিসিমার যে মনের মধ্যে কোনো মহামারী দ্বন্দ চলচে তা আমি অনুমান করতে পেরেচিলাম মুখুজ্জেমশায়, এমনকি আমার মনে হয়েচিল পিসিমা এই ঝোঁকে আত্মহত্যাও করে বসতে পারে, তাই পিসিমার ঘরদোর আর মন্দির থেকে আত্মহত্যার যোগ্য সবরকম জিনিসই আমি সরিয়ে ফেলেচি গোপনে। জাঁতিটে অবধি রাখিনি। পিসি বারবার ঠাকুরের ঘরে রাতে ইঁদুরে উৎপাত করচে, উৎপাত করচে বলে সেঁকো বিষ দিতে বললেও সে বিষ আমি তার হাতে দিইনি ঠাকুর। কী জানি, যদি ওই শয়তানের বশে পড়ে ঐ বিষই…”, বাসুদেবের গলা বুজে এলো।
