ছদ্মবেশীর মারণফাঁদ
রাত তখন গভীর। রায়বাটীর চৌহদ্দির বাইরে পিছনের দিকটা অর্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টিত করে রেখেচে কসাড়, জাম, আমলকী, পেয়ারা আর আমগাছের কানন। এগুলিও রায়দেরই সম্পত্তি। উঠানে জ্বালানো বাতিগুলো মন্দির অবধি কোনোক্রমে আলো পৌঁছে দিয়েই হারিয়ে যাচ্চে। তার বাইরের অংশ ঘুটঘুটে আঁধার। তার ভিতর থেকে শিবার দল থেকে থেকে হুয়ায়া হুয়ায়া করে ডেকে উঠচে! সে ডাক আচমকা শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে। রাতচরা পাখিগুলো কখনও টি টি টিহু করে ডেকে উড়ে চলে যাচ্চে। তিনজন প্রহরী তিনটি হ্যারিকেন নিয়ে একসঙ্গে দল করে বাড়ির চারদিক ঘুরে ঘুরে প্রহরা দিচ্চে। ঠিক সেই সময়ে কানাইয়ের ঘুম ভেঙে গিয়ে ‘বাইরে’ যাবার দরকার পড়লো।
কানাই পড়লো আতান্তরে! সে এসেচে পর থেকে কেন যে কলতলাটা চিনে রাখেনি তা ভেবে আপশোস হলো তার। এত রাতে কাউকে ডাকাও অসম্ভব। কানাই মনে মনে স্থির করলো বাইরে তো প্রহরী আছেই, তাদের জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে। এই ভেবে কী মনে করে সড়কিটা হাতে নিয়েই বাইরে বেরোলো সে। চতুর পিশাচ লম্ববেগা কিন্তু গণ্ডীর বাইরে থেকে এ বাড়ির প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করে চলেচিল। কানাইকে বল্লমফটক খুলতে দেখেই সে তড়িৎবেগে অদ্ভুত রণকৌশলের পরিচয় দিয়ে অবিকল কালীপদর রূপ ধারণ করলো!
ফটক খুলে উঠানে বেরিয়ে কানাই অবাক হল! উঠানে কোনো প্রহরী নেই। কানাই নিজেও জমিদারবাড়িতেই মানুষ, রাতপাহারার নিয়মকানুন সে বোঝে। কানাই বুঝলো প্রহরীরা পিশাচের ভয়েই একসঙ্গে বাড়ি প্রদক্ষিণ করে পাহারা দিচ্চে। সে তাদের দেখা পাবার জন্য বাড়ির বাঁ দিক ধরে এগোতে যাবে, হঠাৎ তার মনে হল মন্দিরের ওদিকের ঝোপটার ওপারে কে যেন দাঁড়িয়ে বনের দিকে ঘুরে মন দিয়ে ওদিকে কী যেন লক্ষ্য করচে! দূরে কোনো গাছের কোটর থেকে একটা কালপেঁচা ছদ্মবেশী পিশাচকে দেখে চিৎকার করে উঠলো, ‘ভূত ভূত ভুতুম’। কানাই সড়কিটা শক্ত করে ধরে পা টিপে টিপে কিছুটা এগিয়ে বিস্মিত হয়ে বলে উঠলো, “এ কী! কর্তাবাবা? আপনি?”
পিশাচের ঠোঁটে সামান্য হাসি দেখা দিয়েই অন্তর্হিত হলো কিন্তু সে হাসি কানাই পিছন দিক থেকে দেখতে পেলে না। সেই ভেকধারী নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বনের দিকে মুখ স্থির রেখেই ভারী দুশ্চিন্তার স্বরে কালীপদর কণ্ঠে বললে, “শশশশ কথা কসনে কানাই। বড়ো ভয়ঙ্কর জিনিস দেখলুম এখুনি! বড়ো বিপদ!”
“কীসের বিপদ কর্তাবাবা? আমি আছি তো? কানাই থাকতে আপনার দিকে কেউ চোখ তুলে চাইতে পারবে না এই জেনে রাখেন।”
পিশাচ বললো, “সে আমি জানি রে। সড়কিটা এনেচিস ভালোই হয়েচে। তুই একবার আমার সঙ্গে চল তো বনের মধ্যে।”
ঝোপটার দিকে একবার তাকালো কানাই। সে জানে ঝোপটা পর্যন্ত বাড়ি-বন্ধনির গণ্ডী দেওয়া। একটু ইতস্ততঃ করে কানাই বললো, “গণ্ডীটা পেরোবো?”
কালীপদ রূপী শয়তান এইবার সরাসরি পিছন ঘুরে কানাইয়ের চোখের মণির দিকে নিজের কূহক চোখ রেখে কইলো, “আমি রয়েচি নিজে, তোর ভয় কীসে?”
কানাই লজ্জিত হয়ে কইলো, “ছিঃ ছিঃ ছিঃ, ও কথা বলবেন না। আপনি যে কত বড়ো গুণীন কর্তা সে আর কারুর থেকে আমি তো বেশি জানি। যে কোনো তান্ত্রিক, এমনকি আপনার গুরু হংসী তান্ত্রিকের চেয়েও আপনি অনেক বড়ো গুণীন। আপনার সঙ্গে থাকলে যমকেও ডরাইনে।”
কালীপদ তুষ্ট হয়ে কইলো, “তবে আয় আমার সঙ্গে।” এই বলে দুই পা এগিয়ে গিয়ে খেয়াল করলো তখনও কানাই গণ্ডী পেরোতে দ্বিধা করচে। কালীপদ একটু রেগে গিয়ে কানাইয়ের মনের শেষ প্রতিরোধটা ভাঙার জন্য গলায় কষ্ট ঢেলে বললো, “তবে আমি একাই যাই। যা হবে হোক আর কি।”
“তা নয় কর্তা, আসলে ভয়ে বেরুতে পারচি না?”
পিশাচ অবাক হবার সুরে কইলো, “কার ভয়ে?”
কানাই একটু হেসে পিশাচের চোখের পানে চেয়ে উত্তর দিলো, “তোর ভয়ে।”
পিশাচের মুখের ভাব হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠলো।
“এ কথার মানে কী কানাই? এ কেমন ধৃষ্টতা?”
“ধৃষ্টতা? আমার কর্তাবাবা এখানে থাকলে তুই টের পেতি তার ক্ষমতা। আমি তার সঙ্গে বাল্যকাল থেকে ছায়ার মতো রয়েচি রে নরাধম, আমি তার ছায়াটুকুও চিনি। বন্ধ ফটক নিজের হাতে খুলে বাইরে এলাম আমি, আর উনি দোর না খুলে তার আগেই নাকি বন দেখচে দাঁড়িয়ে। আবার আমার দিকে না তাকিয়েই বলে দিলো, ‘সড়কি এনেচিস ভালোই করেচিস’। অন্তত এত রাতে পিছন থেকে যখন তোকে আচমকা ডাকলাম তখন তো একবার চমকে ওঠার ভান করতেও পারতি মূর্খ? সন্দেহটা কম হতো একটু। তা নয়, এমন সাবলীলভাবে উত্তর দিলি, যেন আমাকে আগেই দেখেচিস। যে গুরুর নাম শুনলেও কর্তাবাবা কপালে হাত ঠেকায়, তার নামে এখুনি যে কথা বললাম তা শুনলে কর্তাবাবা খুশি না হয়ে বরং আমাকে ছিঁড়ে ফেলতো দুই হাতে। শিয়ালের গায়ে ডোরা কাটলেই সে বাঘ হয়ে যায় না। আমার কর্তাবাবাও পৃথিবীতে একজনই হয়।”
কুটিল পিশাচ ঠকে গিয়ে আচমকা ভীষণ গর্জন করে স্বমূর্তি ধরতেই সেদিকে তাকিয়ে কানাইয়েরও বুক কেঁপে উঠলো! এ কী ভয়ঙ্কর পৈশাচিক রূপ! এ যেন অতি বড়ো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না! কানাইয়ের চেয়েও হাত দুয়েক দীর্ঘ কালো কুচকুচে রোমশ পিশাচমূর্তি, তার মাথাটা একটা হিংস্র নেকড়ের! ঝকঝকে দাঁতগুলো নরশোণিতের লালসায় খাপ পেতে রয়েচে! কুকুর দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ঝরে পড়চে! চোখদুটো আগুনের মতো জ্বলচে! গলা থেকে ঘড়ঘড় করে জান্তব আওয়াজ আসচে! কানাইয়ের শরীরটা শিউরে উঠলো, কিন্তু সে সত্যিই দ্বারবান নয়, সে জাত লাঠিয়াল। নিজের অজান্তেই তার হাতের সড়কিটা বজ্রের মতো গিয়ে পড়লো ঘাতকটার মাথায় আর বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল! পিশাচ মিলিয়ে গিয়েচে। কানাই কপালের স্বেদ মুছে যখন কপাট দিচ্চে, তখন প্রহরীরা বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেচে। ‘বাইরের’ কাজ সেরে কানাই উপরে উঠতেই কালীপদ ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে উদ্বিগ্ন স্বরে বললো, “একী! কোথা গিয়েচিলি তুই? বাইরে?”
কানাই একটু হেসে কইলো, “একটা ধেড়ে ইঁদুর ঢুকে পড়েচিলো, ন্যাজ ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসেচি। তাই বাইরে গিয়েচিলাম কর্তাবাবা।”
কালীপদ একটু সময় চুপ থেকে বললো, “তাই সড়কি নিয়ে গিয়েচিলি কানাই?”
কানাই অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি হ্যারিকেনের চাকাটা ঘুরিয়ে জ্যোতি কমিয়ে নিঃশব্দে শুয়ে পড়লো। কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে কপালে হাত ঠেকিয়ে কার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে চক্ষু মুদ্রিত করলো। সে সময়ে কালীপদর মনে ঠিক কতখানি চিন্তা, ভাবনা, বিচার আর পন্থা একত্রে ঘুরপাক খাচ্চিলো তা জানিনে কিন্তু সে সময়ে তার মস্তিষ্কের ভিতরে ঢুকে দেখতে পারলে নিশ্চিত দেখা যেতো যে সেখানেও তার মন-তোরঙ্গে একসঙ্গে শত শত জটিল যন্ত্র পাক খাচ্চে।
মানদার শয়নকক্ষটা মন্দিরের লাগোয়া এবং গণ্ডীর অদূরেই। ভোর হবার কিছু আগে আঁধার তখনও কাটেনি, মানদা হঠাৎ বনের দিক থেকে কাছাকাছির মধ্যে একটা জোরালো কোলাহল শুনতে পেলো। দ্বারবানরা কাকে যেন হৈহৈ করে নিয়ে আসচে দূর থেকে এদিকে। মানদা নিজের দুর্বল কান যথাসম্ভব সজাগ করে রেখে হাঁক দিলো, “কারা গোলমাল করে রে?” আর সেই ডাকের প্রত্যুত্তরে একটু পরেই পিশাচটা নিজেরই সৃষ্ট ছদ্ম কোলাহল ছাপিয়ে নিজেই মঙ্গলের কণ্ঠস্বর নকল করে ডাক দিলো, “দোর খোলো পিসিঠাম্মা, আমি এসেচি।”
মানদার শরীরে শিহরণ খেলে গেল! সে আস্তেব্যস্তে কাপড় সামলে চিৎকার করে কাঁপা গলায় বললে, “আমার মঙ্গল এসেচিস? আমি ঠিক শুনলাম বাবা? তুই এলি লক্ষ্মীটি?”
আবার চেনা স্বরে জবাব এলো, “হাঁ পিসিঠাম্মা, পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়েচে। আমি এসেচি। দোর খোলো তাড়াতাড়ি, বড়ো খিদে পেয়েচে। কিছু খাবার নিয়ে এসো।”
কপাট খোলার শিকলিতে হাত রেখে মানদা কইলো, “হ্যাঁ বাবা, এই তো খুলি। তার আগে আরেকবার বল লক্ষ্মীটি, আমার মঙ্গল এলি সত্যিই?”
বাইরে থেকে এবার কোনো জবাব এলো না! মানদা আরও কয়েকবার শুধালেও কেউ উত্তর দিলো না, শুধু একটা ক্ষোভের চাপা শব্দ করে রাক্ষসটা গণ্ডীর বাইরে থেকেই মিলিয়ে গেল। মানদা আর উত্তর না পেয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শিকলটা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে কইলো, “মা ঠাকমার সব কথা কি আর ফেলনা হয় গো? রাতভিতে, ভরদুপুরে তিনবার উত্তর না দিলে দোর খুলতে নাই।”
সেই রাতে আর কোনো উপদ্রব হলো না।
প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হয়ে দেখি কালীপদ ভিতর উঠানে আগুন জ্বেলে কী একটা করচে। আমি বেরোতে সে উঠে দাঁড়িয়ে হাতে একটা চওড়া কবচ নিয়ে কইলো, “শাকুন কবচ তৈরি করলাম ডাক্তার। এ কবচ আমার হাতে থাকতে সেই পিশাচ আমাদের কাছাকাছি ঘেঁষতে পারবে না। এর ভিতরের শেকড় তাকে তফাৎ রাখবে। যদিও আমার হাত থেকে খুলে ফেললে শেকড় সে সময়টুকু তার গুণ হারাবে। একমাত্র আমার হাতেই এ কবচ কার্যকর হবে, নাহলে তোমাদের জন্যও বানাতুম।”
আমি নিরুৎসুক হয়ে বললাম, “তোমার আবার কবচের কী দরকার? সে শয়তান এমনিও তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না এ আমি নিশ্চিত জানি।”
কালীপদ গম্ভীর হয়ে কইলো, “আমিও জানি, কিন্তু স্পর্শ না করলেও সে কিছুটা দূরে আবডালে থেকে আমাদের কথাবার্তা শুনতে পারে, পরবর্তী পদক্ষেপ জেনে ফেলতে পারে এবং সেইটে খুবই বিপজ্জনক। নরঘাতক খুনীয়াটা দিবারাত্র আমাদের নজর রেখে চলেচে। গণ্ডীর ভিতরে সে ঢুকতে পারে না, কিন্তু আমরা না থাকলে আবার রাতে গণ্ডী কাটবে কে? এ গণ্ডী রৌদ্র উঠলে প্রভাব হারায়। তাই তাকে কিছুটা তফাৎ রেখে তাকে নিঃশেষ করার ফাঁদ পাততে গেলে এই কবচ প্রয়োজন।”
আমি কালীপদর নাড়ী চিনি। এ কথায় উত্তেজিত হয়ে বললাম, “কেন? আমরা কোথাও যাচ্ছি?”
“হাঁ, দিনকতক লাগবে।”
“কোথা দাদা? সেই দেবীগ্রাম?”
কালীপদ নিরুত্তাপ স্বরে বললে, “এই একজন ডাক্তারকে দেখলাম যে ডাক্তারি ছাড়া সবকিছুতেই এক পায়ে প্রস্তুত। যাক গে, যাবার আগে ডাক্তারিটাও সেরে নিও। ওষুধের পেঁটরাটা তো এনেচ দেখলাম, বলরামের স্ত্রী-র নতুন ওষুধ তৈরি করে দিও, কারুর হাতে ও বাড়িতে পাঠিয়ে দেবোখন। ইন্দু, বলরাম আর বাসুদেবও আমাদের সঙ্গে যাবে। তাদের ছাড়া দেবীগ্রামের রাজমহলে ঢুকতে পাবো না। দুপুরেই বেরিয়ে পড়তে হবে।”
