দেবীগ্রামের রহস্য সংকেত
আমরা দেবনগর থেকে বেরিয়েচিলাম গতকাল, অর্থাৎ পঞ্চমীর দ্বিপ্রহরে, আর বাঙ্গলা মুলুক পেরিয়ে বেহারে মালভূমি ঘেরা এই ছোটোনাগপুরে সেই সাবেক রাজ্য দেবীগ্রামের টিকে যাওয়া প্রকাণ্ড রাজবাড়িতে পৌঁছেচি আজ, দুর্গাষষ্ঠীর সকালে। কী বিশাল রাজবাড়ি ছিল এই দেবীগ্রামের! এখন ওদিকের বেশ কিছুটা সংরক্ষণের অভাবে জীর্ণ হয়ে পড়েছে, কিন্তু মূল মহলটুকু বেশ রয়েচে। প্রকাণ্ড দেউড়ি প্রাঙ্গণ, ফুলের বাগান, দীঘি, শীকরগৃহ, হাতীশাল-ঘোড়াশাল, হাতীবান্ধা থামের ভগ্নাংশ, জাফরি দেওয়া ঝুলন্ত অলিন্দ, দুর্গামন্দির, প্রহরীঘর, হস্তীনখ-থাম, সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখতে আরম্ভ করলাম। আমার মনে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ হচ্চিল! একদিন হয়তো এই প্রাসাদটাই রাজা, রানি, রাজমাতা, সেনাপতি আর প্রহরীতে গমগম করতো? হয়তো এই জায়গাটাতে দাঁড়িয়েই রাধাকান্তর লেখায় পাওয়া সেই রাজমাতা ঘোষণা করেচিলেন, ‘আমি, রাজমাতা ইন্দুমতী, নিশ্চিত হয়ে বলচি যে…’ ইত্যাদি। রাজমহলের বাইরে যেখানে এখন বাজার-হাট, মোটরগাড়ির পথ, লোকজন গমগম করছে, সেইখানেই হয়তো একটা সময়ে এই পিশাচের আক্রমণের ভয়ে সবাই দিনের আলোতেই দোর আঁটতো।
মন্দিরে রাজবাড়ির কর্মচারীরা এবং পুরোহিতরা কালকের পূজার তোড়জোড়ে চূড়ান্ত ব্যস্ত, তার মধ্যে রাজপরিবারের দুই শরিকই চলে আসায় তাদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গিয়েচে। মন্দিরটা বাইরে থেকে দেখলাম। এ মন্দির নাকি রাজা মল্লর পিতামহ মহারাজ অপারশক্তির তৈরি। তিনি স্থাপত্যবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যা, চিত্রকলার অত্যন্ত গুণগ্রাহী ছিলেন। নিজেও বিলেত গিয়েচিলেন সমাজের চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে। পুরোনো পাথরের তৈরি বড়োসড়ো মন্দির। তার বাইরে টানা বেদীতে অজস্র মুনীঋষির গ্রানাইট পাথরের ধ্যানরত হাত চারেক দীর্ঘ মূর্তি যুগ যুগ ধরে ধ্যান করেই চলেচেন। তার মধ্যে সাতটি মূর্তি একই ছাঁচে তৈরি। সম্ভবত সপ্তর্ষি। এছাড়াও কিছু অচেনা ঋষিমূর্তি, পাথরের পরী, বন্ধ হয়ে যাওয়া হস্তীমুখ ফোয়ারায় সাজানো প্রাঙ্গণ।
আমাদের সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ির প্রবীণ কর্মচারী অনাথ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্চিল পুরো মহলটা। তার সঙ্গে তার বারো-তেরো বৎসরের নাতি জগন্নাথ। তারও দেখলাম রাজবাড়ির আতিপাতি মুখস্থ। আমরা অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি মেলে চলেচি দেওয়ালে দেওয়ালে। কোথায় যে কী সূত্র লুকিয়ে গিয়েচে সে আমলের লোকেরা, তা ধরতে না পারলে ওই ভয়ঙ্কর পিশাচকেও দমন করা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়বে। কালীপদর কবচের বলে সে আমাদের ত্রিসীমানায় না ঘেঁষতে পারলেও সে যে আমাদের পিছু পিছু দেবীগ্রামে এসে ওৎ পেতে রয়েচে তা জানা কথা, আর দেবীগ্রামের পথঘাট বদলে গেলেও তালুকটাকে সে আমাদের থেকে বেশি চেনে।
একেকটা কক্ষ একেক কাজের। অনাথ বলে চলেচে, “এইটে তোষাখানা, এইটে এলবাস মহল, এইটে মহাফেজখানা…”
কালীপদ বললে, “বাকি ঘরগুলোয় তো বিশেষ কিছু নাই দেখলাম, এই ঘরটার কুলুপ খুলুন তো, মহাফেজখানায় কিছু হদিশ মেলে কিনা।”
ঘড়াং শব্দে ভারী তালা খুলে আবছা ক্যাঁচচ শব্দে কপাট খুললো আর সেই শব্দই জানান দিলো যে এই ঘর নিয়ম করে খোলা হয়। ভিতরে প্রাচীন কাগজপত্রের গন্ধ নিয়ে একটা ভারী বাতাস নাকে ঝাপটা দিলো। বিরাট হলঘর, তার চারপাশে সারিসারি পাথরের তাক ছাত অবধি উঠে গিয়েচে, তাতে থরে থরে সাজানো প্রাচীন পুঁথিপত্র, কিছু তাম্রশাসন, কালি রাখার ছোটোবড়ো দোয়াত, দপ্তরী জিনিসপত্তর। মেঝেতে কয়েকটি জায়গায় লোহার কড়াইতে ছাই জমে রয়েচে। অনাথ কইলো, “হপ্তায় হপ্তায় এ ঘরে ধুনো দেওয়া হয় ঠাকুর, নাহলে কাগজপত্তর সোঁদা হয়ে যায়।”
এত বিরাট কক্ষে একটাও জানালা বা বাতাস চলাচলের ঘুলঘুলি নাই। শ্বাস নিতে একটু অসুবিধা হয়। অনাথ বললো, “ঘুলঘুলি থাকলেই রাজ্যির পায়রা আর কাঠবেড়ালী এসে মোচ্ছব বসিয়ে সব নষ্ট করে দেয় ডাক্তারবাবু। আমার পুর্বপুরুষেরা আগলিয়ে রাখতেন, আমিও আগলে রাখি, আমার পর জগাও শিখে নেবে। কত স্মৃতি, কত ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রাসাদ, সেসব কি নষ্ট হতে দেওয়া যায় ডাক্তারবাবু? দেবী মহিষমদ্দিনীর পূজা করতে কত দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে, সে পূজাতেও ত্রুটি হতে দিইনে।”
অনাথের কণ্ঠস্বরে কর্তব্যনিষ্ঠা, রাজভক্তি আর রক্ষণশীলতার আভাস। আমার লোকটার উপর ভক্তি হলো। কালীপদ বললে, “আপনার পুর্বসূরীরাও বুঝি এই রাজদরবারে ছিলেন?”
বাসুদেব উত্তরে বললো, “হাঁ ঠাকুর, অনাথকাকার পূর্বপুরুষ সুবোধ ছিলেন আমার পুর্বপুরুষ মহারাজ মল্লর বিশ্বস্ত সেনাপতি। তাঁরা একত্রে কোনো একটা যুদ্ধে জয়লাভ করেচিলেন পর রাজা মল্ল সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সেনাপতি থেকে সর্বাধিনায়কের পদ দিয়ে সম্মানিত করেন।”
“যুদ্ধ? যুদ্ধ হয়েচিল বললে? তোমার খুড়ো রাধাকান্তর লেখাতেও কিন্তু কোনো একটা তৎকালীন যুদ্ধবিগ্রহের উৎপাতের কথা রয়েচে। আর রয়েচে কোনো এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের আভাস, যা তোমাদের পরিবারে যুগ যুগ ধরে বয়ে চলেচে। আচ্ছা সিংহমশায়, আপনার পুর্বপুরুষ তো এই রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন, আপনার পরিবারে কি কখনও কোনো কুটিল ষড়যন্ত্র বা অভিশাপের কোনো গল্প প্রচলিত রয়েচে?”
অনাথ সিংহ মাথা নেড়ে বললে, “তেমন কিছু শুনিনি ঠাকুরমশায়, তবে এই দরকারি-অদরকারি কাগজপত্তরের বোঝার মধ্যে আলাদা করে রাজা মল্ল আর রাজমাতার দপ্তরখানা বের করে দিচ্চি। যা বুঝচি, আপনারা ওই সময়ের কিছু তথ্যই বের করতে চাইচেন। কিছু হয়েচে নাকি কর্তা?”
বলরাম কইলো, “সেসব পরে বলচি কাকা, অনেক কথা।”
একটা তাকে পেতলের চাকতিতে ‘দৌত্যপত্র’ লেখা দেখে অনাথের দিকে চাইতেই সে কইলো, “এতে শুধু মহারাজ মল্লর সময়ের দেশবিদেশে পাঠানো চিঠিপত্তরের নকল রয়েচে। জীর্ণ হয়ে গিয়েচে তালপাতার পুঁথিগুলো। মাঝামাঝি ধরে আলতো হাতে খুলবেন, কোণা ধরবেন না।”
কালীপদ হাতের মুঠোয় জল আগলানোর মতো সাবধানে সেসব পুঁথিতে চোখ রাখতে রাখতে অনেকটা সময় পর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কইলো, “এই লেখাটাতে যেদিন মহারাজা অপারশক্তি আর সম্বুদ্ধ মিলে পিশাচকে বন্দী করেন আর যেইদিন রাজমাতা পিশাচকে বন্দী করেন, সেই তারিখ-তিথি লেখা রয়েচে। এগুলি হয়তো রাজকার্য্যের রোজনামচার খাতা, কিন্তু এই নকলিকৃত নথিটা দেখো…
“রাজা মল্ল সে সময়ে এই চিঠিটা কোনো এক পন্ডিতকে লিখেচিলেন নবদ্বীপে। তার নকল এখানা। রাজমাতার বলে যাওয়া কোনো একটা হেঁয়ালীর মানে জানতে চেয়ে লেখা হয়েচিল এই পত্র। রাজমাতা ইন্দুমতী নাকি তার পুত্রকে কিছু একটা রহস্য বলবেন বলেও বলে যেতে পারেননি তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যুর কারণে।”
আমি শুধালাম, “কী জানতে চেয়েচিলেন রাজা?”
কালীপদ অংশটুকু পড়ে বললো, “ব্রহ্মার কোনো এক সন্তানের জন্ম হয়েচিল ভগবান শিবের চৌকাঠে। তারই পশ্চিমে নাকি রাবণের তৈরি কোনো এক পিশাচের দীঘি রয়েচে। এই দীঘির সন্ধানেই নাকি পিশাচ লম্ববেগার পরিচয় লুকিয়ে রয়েচে! আমাদের এই ঘাতক পিশাচটির নামই বোধহয় লম্ববেগা নামে পরিচিত। এটা কোনো পিশাচের জাতের নাম নয়। এ নাম মানুষেরই দেওয়া বোধহয়। কিন্তু যে জিনিসটা জানার জন্য পত্রটা লেখা হয়েচে, তা বড়ো অদ্ভুত! ব্রহ্মার সন্তান শিবের চৌকাঠে জন্মেচে এমন কথা কখনও শুনিনি। তবে রাবণের তৈরি কোনো এক জলাশয়ের গল্প কোথায় যেন শুনেচিলাম, মনে পড়চে না আর। আচ্ছা সিংহমশায়, এতকিছু এ ঘরে দাঁড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়, দম বন্ধ হয়ে আসচে। এই ক-খানা পুঁথি আর রাজমাতার তাকের এই তামার ফলকগুলো কাউকে দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিন দয়া করে।”
আমরা বেরিয়ে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষের পানে চললাম। অনাথ সিংহ দুইজন লোককে ডেকে পুঁথিগুলো আনার কাজে নিয়োগ করচে, আমি তাকিয়ে দেখি তার নাতি জগন্নাথ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আসচে। আমি হেসে বললাম, “জগাবাবু, দাদুর সঙ্গে গেলে না?”
সে গম্ভীর হয়ে বললে, “আমার নাম জগন্নাথ সিংহ।”
কালীপদ এতদিন পর হো হো করে হেসে উঠলো। আমি তার মাথায় হাত বুলাতে সে আমাকে নিরীক্ষণ করে বললে, “তুমি নাকি ডাক্তার? তোমার চশমা কৈ?”
“আমি চশমা পরিনে জগন্নাথ।”
“এই দাদু কী করে?”
কালীপদ অপরাধীর সুরে বললো, “কাজের থেকে অকাজই করে বেড়াই বেশি দাদুভাই।”
আমি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আপনমনে বললুম, “ব্রহ্মার সন্তান কে দাদা?” ‘একজন নয়, অজস্র। সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাতজন ঋষিই ব্রহ্মার সন্তান, এছাড়াও হিমবান, জাম্ববান, মনু, আরও আছে।”
“দাদা, মন্দিরটার বাইরেও কিন্তু সপ্তর্ষির মূর্তি ছিল।”
কালীপদ ভাবতে লাগলো।
আমি বললাম, “আচ্ছা, ব্রহ্মার কি কন্যাও আছে?”
“আছে। কেন?”
“না মানে, লেখাটায় সন্তানের কথা লেখা রয়েচে। ব্রহ্মার কন্যা কি ব্রহ্মার পুত্র, তা কিন্তু পড়িনি, মনে করে দেখো?”
“আমি পড়েচি।”; বালকোচিত কণ্ঠে চটকা ভেঙে কালীপদ জগন্নাথের মুখের দিকে চেয়ে ম্লান হেসে বললো, “বড়োদের কথায় থাকে না দাদুভাই।”
“দাদু, সত্যি এটা পড়েচি আমি ইশকুলে।”
“ইশকুলে? কী পড়েচ?”
“ব্রহ্মপুত্র একটি দক্ষিণবাহিনী নদ। এটি পূর্ব ভারত দিয়ে প্রবাহিত হয়েচে। এইটেই তো?”
“ব্রহ্মপুত্র?”; কালীপদ উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিত স্বরে বললে, “তাই তো! হতেও পারে বটে! আর কী আছে তোমার বইতে দাদুভাই?”
“ব্রহ্মপুত্র একটি দক্ষিণবাহিনী নদ। এটি পূর্ব ভারত দিয়ে প্রবাহিত হয়েচে। এই নদের উৎপত্তি উত্তরের কৈলাস পর্বতের নিম্নে অবস্থিত…. কী যেন… কী যেন…
“রাক্ষসতাল হ্রদের কাছে”. কালীপদ জগন্নাথের চুলে হাত বুলিয়ে ঘোলাটে দৃষ্টিতে কঠিন মুখে বললো, “কৈলাস পর্বতই শিবের চৌকাঠ রায়মশাই! ব্রহ্মার পুত্র এই নদ সেখানেই সৃষ্ট আর তার পশ্চিমেই রাবণের তৈরি রাক্ষসতাল হ্রদের গল্প পড়েচিলাম বহুকাল আগে। এই নদের জলপান তো দূর, কেউ ঘুরেও তাকায় না। এই হ্রদ নাকি অশুভ।’
“তবে কী সেই হ্রদেই এই পিশাচের জন্ম?”
“পিশাচের আবার জন্ম কী? তারা সৃষ্টির শুরুর থেকেই ঘুমিয়ে আছে। তাদের শুধু জাগানো বা চিরস্থায়ী প্রশমন করা যায়, জন্ম মৃত্যু হয় না বলেই জানি। তা নয়, অত্যন্ত ধুরন্ধর বুদ্ধিমতী রাজমাতা ছদ্মরূপে সেই পিশাচের জাতটা চিনিয়ে গিয়েচেন। আমি সত্য বলচি ডাক্তার, এই ইন্দুমতী নিজে একজন তন্ত্রবিদ না হয়ে যায় না। পিশাচের ঠিকঠাক জাতটা চেনা যে তার সঙ্গে লড়ার ক্ষেত্রে কতখানি জরুরি, তা তিনি জানতেন। এই লম্ববেগা পিশাচ হলো পিশাচ জগতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হিংস্র দুইটি জাত ‘তাল’ আর ‘বেতাল’-এর গোষ্ঠীর মধ্যে ‘তাল’ প্রজাতির। এই তাল আর বেতালরা বিকট অশুভ শক্তি আর ছলনায় দক্ষ হয়। এরা ইচ্ছামাত্র কারুর রূপ, কণ্ঠস্বর বা আচরণ নকল করতে পারে। এরা পিশাচ আর রাক্ষসের মাঝামাঝি একটা উগ্র, কোপনস্বভাব সত্বা। রাক্ষসতালের মাধ্যমে রাজমাতা এই পরিচয়ই দিয়ে গিয়েছেন লম্ববেগার।”
সন্ধ্যায় কালীপদ পুঁথিপাঠ ফেলে উঠে রাজবাড়ি আর মন্দির সংলগ্ন প্রকাণ্ড চত্বরে কষ্ট করে ঘুরে ঘুরে গণ্ডী দিয়ে বিরস স্বরে কইলো, “এভাবে ক-দিন আর লক্ষণরেখা দিয়ে চলবো? কোনো হদিসই পাচ্চিনে এখনও অবধি পুঁথিপত্তরে। আজ মন্দিরে যেতে পারেন কিন্তু কাল থেকে সন্ধ্যার পর রাজবাড়ি থেকে বেরোবেন না কারণ, কালকে সপ্তমীতে দেবীর আবাহন হয়ে গেলে আর মন্দিরের চারদিকে বাঁধন দেওয়া চলবে না। দেবীর চলাচলে সমস্যা হবে। আমি সঙ্গে থাকলে বেরুতে পারেন। আমার কবচের শেকড়ের কারণে সে আশপাশ ছেড়ে পালাবে, কিন্তু এ কবচ আপনাদের হাতে কাজ করবে না, নইলে দিতুম। এমনকি আমার হাত থেকে খুলে রাখলেও এ কবচ ততক্ষণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। তন্ত্রোক্ত তাবিজ কবচ পরে দেবীসন্নিধানে যাওয়া উচিত নয়। আপনারা যখন উপস্থিত আছেন তখন কলাবৌ স্নান আপনাদেরই অধিকার, কিন্তু রাতে বেরোবেন না।”; এই কথাগুলো বলার সময়ে কালীপদ নিজেও বোধহয় বুঝতে পারেনি যে সপ্তমীর রাতটা অন্যরকম হতে চলেচে, যা আমরা কল্পনাও করিনি! সে কথায় আসচি পরে।
প্রথম দিনটা এভাবেই কেটে রাত পার হলো। পরের দিন সকালে উঠে কালীপদ একেবারে দ্বিপ্রহর অবধি পুরো রাজমহলটা আতিপাতি করে তল্লাশি করে নিরাশ হয়ে আবার পুঁথিতে মগ্ন হয়ে গেল।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই রাজবাড়ির কানন থেকে যখন শৃগালের প্রথম প্রহর ঘোষণার শব্দ পাওয়া গেল, তখন কালীপদ দীর্ঘক্ষণের নীরবতা ভঙ্গ করে কথা কইলো, “ইন্দ্র, একবার এইদিকে এসো তো। আপনারাও আসুন। রাজমাতার এই তামার পত্রে এই লেখাটাই একমাত্র রাজকার্য্যের বাইরের লেখা বলা যেতে পারে। কোনো একটা অস্ত্রের কথা বলা হয়েছে, যেইটে নাকি পিশাচটাকে বন্দী করার পর তার কয়েদখানায় রাখতে হয়। এইটের কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারেন?”
আমরা ব্যগ্র হয়ে ঝুঁকে পড়ে পুরোনো ধাঁচের খোদাই করা লেখাটা পড়তে শুরু করলাম-
‘দশমাপ্রহর মান-ধারিনীর
মাশুল নিয়া মাভৈঃ রব
ত্রিলোচন বিদ্ধ করে
অস্ত্র মেলে দেহোদ্ভব।
যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেই
সন্ধি হবে, ফুরায় দিন।
মা কে যদি করিবি ত্যাগ,
পাইবি রে ফল চেতনহীন।’
আমি বারবার পাঠ করে দ্বিধাজড়িতভাবে বললাম, “আমার যা মনে হচ্চে বলবো?”
“বলতেই তো বলচি।”
“দেখো, অষ্টপ্রহরের কথা শুনেচি কিন্তু দশমাপ্রহর বলে কিছু শুনিনি। তন্ত্রের কোনো বিষয় কী? আর মান বা অভিমান ধরে থাকে এমন কিছুর কথা বলা হয়েচে। আবার মাশুল বা উপযুক্ত অর্থদণ্ড দিয়ে সেই মান ভাঙাতে হয়। সে-ও কি তন্ত্রোক্ত কোনো দেবদেবী বা…”
কালীপদ বিরক্ত হয়ে বললে, “মানে বের করলে যা হোক একখানা। সবই যদি তন্ত্রোক্ত হয় তবে আমি জানতুম না? তোমাদের জিজ্ঞেস করি?”
ইন্দ্ৰ ভয়ে ভয়ে বললে, “ত্রিলোচন মানে তো শিবও হয়, তিন চোখও হয়। তাকে কী দিয়ে বিদ্ধ করবো? আর দেহের মধ্যেই বা কোন্ অস্ত্র তৈরি হয় বলুন তো?”
কালীপদ শ্বাস ফেলে কইলো, “উত্তরের বদলে তোমরা সেই আমাকেই প্রশ্ন করচো। আমি জানলে তো বলতামই ইন্দ্ৰ? যুদ্ধ বা সন্ধিস্থাপনের কথা আবারও ফিরে এসেচে এখানে। আর মা বলতে দেবীকেই বোঝানো হয়েচে নিশ্চয়ই। তাঁকে ত্যাগ করলে যথোপযুক্ত ফল পাবে সেই ত্যাগকারী মূর্খ। কিন্তু ত্যাগ করবেই বা কেন? বিসর্জনের কথা বলা হয়নি তো?”
বাসুদেব হাঁ হাঁ করে বললে, “না না, আমাদের পরিবারে মায়ের প্রতিমা বা বিগ্রহ বিসর্জন হয় না ঠাকুর। অন্য কোনো কিছু বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েচে হয়তো। পাষাণের গড়া স্থায়ী বিগ্রহের পূজা হয় সেই আমল থেকে। অক্ষরে অক্ষরে সত্য কথা বলচি, বিশ্বাস করুন। আর তা ছাড়াও… ও কী? কী হলো ঠাকুরমশায়!”
কালীপদ কিয়দক্ষণ লম্বা লম্বা আঙুল দিয়ে শূন্যে আঁকিবুকি কেটে এক পা, এক পা করে এগিয়ে গিয়ে আচমকা বাসুদেবের কাঁধ খামচে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে উচ্ছ্বাসের স্বরে পাগলের মতো বলে উঠলো, “শাবাশ বড়োরায়, শাবাশ! ঠিকই তো, অক্ষরে অক্ষরেই বটে! তাই তো! সবই মিলে যাচ্চে!”
রায় পরিবারের তিনজন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো, কিন্তু আমার বা কানাইয়ের কাছে কালীপদর এহেন আচরণ নূতন নয়। আমি দেখলাম কালীপদর চোখের সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেচে! আমি একটু কেশে বললাম, “যুদ্ধের কোনো হদিশ পেলে?”
“পেয়েচি ডাক্তার, নিশ্চিত পেয়েচি।”
ইন্দ্ৰ কাষ্ঠ হেসে কইলো, “কিন্তু চিরকাল জেনেচি যে যুদ্ধের শেষে সন্ধিস্থাপন হয়, কিন্তু এখানে তো বলা হয়েচে যুদ্ধের মাঝেই… তেমন আপোষ কখনও হয় বলে তো শুনিনি?”
“হয়, হয়। হয় ইন্দু হয়। চিরকালই হয়ে আসচে। আর কথা নয়, এখুনি মন্দিরে চলুন। একটি নিশানা পেয়েচি বোধহয়।”
আমরা বেরোনোর মুখেই দেখি অনাথবাবু নৈশাহার নিয়ে আসচে। থাকলো তখন খাওয়া, আমাদের হনহন করে বেরোতে দেখে সে-ও উত্তেজিত হয়ে আমাদের সঙ্গ নিলো। আমরা সাতজন প্রায় ছুটে পৌঁছালাম মন্দিরের সামনে। সেখানে শুধু পুরোহিত রয়েচেন, অনাথের আদেশে তিনি তড়িঘড়ি বেরিয়ে বাইরে দাঁড়ালেন। মন্দির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অনাথ কইলো, “রাজা মল্ল অত্যন্ত মাতৃভক্ত ছিলেন। তাঁর মা ইন্দুমতী ভুল করে ভুল বানান লেখা সত্বেও সেই ফলককেই তিনি প্রধান ফটকে বসিয়েচিলেন তাঁর সম্মানে। এই দেখুন…”
ফটকের বাইরে প্রাচীন পাষাণ ফলকে সম্ভবত চুনসুড়কির উপরে কাঠি বা কিছু দিয়ে লেখা ‘দুরগতিনাশিনীর দেউল’। কালীপদ সেদিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, “দুর্গতিনাশিনী কেন? দেবীর নাম তো মহিষমৰ্দ্দিনী? পুঁথিতেও সেই নামই পেয়েচি।”
“হাঁ, ঠিকই। তবে দুটোই তো মায়েরই নাম।”
“না। এক হলেও কোনো রাজপরিবার বা অভিজাত বনেদী পরিবারেই আবহমান কাল ধরে চলে আসা কুলদেবদেবীর নামের পরিবর্তন করে না কেউ। সিংহবাহিনী, মহিষমৰ্দ্দিনী, দুর্গতিনাশিনী জাতীয় নামগুলি চিরকালই অপরিবর্তনীয় থাকে। তাহলে রাজমাতার মতো মানুষ নিজের হাতে ভুল নাম লিখলেন? তাও আবার বানান ভুল করে? কৈ, পুঁথি বা তামার ফলকে তো কোনো বানান ভুল নেই?” কিছুক্ষণ চিন্তা করে কালীপদ কপালে ভাঁজ রেখেই বললো, “আমার ধারণাকেই পুষ্ট করচে এই লেখা। এই মন্দিরেই যা পাবার পাবো। সবার সামনে বসে, অথচ সবাইকে লুকিয়ে অসামান্য উপায়ে পিশাচটার উপরে একহাত কিস্তি দিয়েচিলেন বুদ্ধিমতী রাজমাতা। তিনি বানানে ভুল করেননি। দূর-গতি আর লম্ব-বেগ অর্থে কিন্তু খুব বেশি হেরফের নেই ডাক্তার। কী অসাধারণ চতুরা ছিলেন এই ইন্দুমতী! চলো, এবার ভিতরে চলো। জুতোগুলো এক জায়গায় রাখো, উঁহু কানাই, ওসব বাইরে রেখে ঢোক।”
আমরা জুতা ত্যাগ করে ভিতরে প্রবেশ করলাম। কানাই নিজের সড়কিটা সাবধানে রেখে আমার পাশে পাশে এলো। দেবী মহিষমর্দিনীর পাষাণ প্রতিমার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কালীপদ প্রণাম করে নীচু স্বরে বললে, “যুদ্ধবিগ্রহ!”
“কোথায় দাদা?”
“তোমার সামনে, ডাক্তার! যুদ্ধরত বিগ্রহ! রণংদেহী রূপা দেবী প্রতিমা! একেই যুদ্ধের বিগ্রহ বলেচে।”
আমি প্রথমে হতবাক, তারপর অভিভূত হয়ে পড়লাম। বলরাম ধরা গলায় বললো, “কিন্তু মাকে বাদ দেবার কথা কী বলেচিল যেন ঠাকুর?”
“আসল মাকে নয়, মা অক্ষরগুলোকে বাদ দেবার কথা বলেচিলেন তিনি। এবার মা শব্দটা বাদ দিয়ে বাকি লেখাটা পড়ে দেখো কী আসচে?” এই বলে নিজের হাতে একটা ছোটো কাগজে ছড়াটার নকল এগিয়ে দিলো।
ইন্দ্ৰ ‘মা’ শব্দটা বাদ দিয়ে পড়তে থাকলো,
‘দশপ্রহরন-ধারিনীর
শূল নিয়া ভৈঃরব
ত্রিলোচন বিদ্ধ করে
অস্ত্র মেলে দেহোদ্ভব।
যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেই
সন্ধি হবে, ফুরায় দিন…
কালীপদ মিটিমিটি হেসে কইলো, “দেবীর হাতের শূলটা দেখেচো? এক সারিতে তিনটে ফলা নয়, অনেকটা সুতরাং চিহ্নের মতো বসানো। দেবীর পিছনে চিরকালই শিবের মূর্তি থাকেই। এই শিবের ত্রিলোচনও মনে হচ্চে একই মাপের। এই শূলটা আসলে একটা প্রকাণ্ড চাবিকাঠি। এই চাবি শিবের ত্রিলোচনে বসিয়েই দেখি, ছড়াটার কথামতো পিশাচটাকে ‘চেতনহীন’ করার কোনো অস্ত্র পাওয়া যায় কিনা। কানাই…”
কানাই প্রস্তুতই ছিল, কর্তাবাবার হুকুম পাওয়ামাত্র দেবীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে একটু কৌশল করে দেবীর হাতের ভারী পেতলের শূলটা খুলে আনলো। তারপর অনেক কসরত করা সবাই মিলে হাত লাগিয়ে সেই শূলের তিনটে ফলাকে ভৈরবের ত্রিলোচনের ছিদ্রে প্রবেশ করিয়ে চাপ দিতেই বাইরে ভীষণ জোরে একটা যান্ত্রিক কড়াং শব্দ আর পুরোহিতের ‘ওরে বাবা গো’ শব্দ শুনে দৌড়ে গিয়ে তার ভয়ার্ত দৃষ্টি অনুসরণ করে যা দেখলাম তাতে আমাদের হৃৎস্পন্দন বহুগুণ বেড়ে গেল!
বাইরের বাকী মুনীঋষির মূর্তিগুলো ঠিকই রয়েচে, শুধু একটি মূর্তি ধ্যানরত মুদ্রাতেই সামনে ঝুঁকে পড়েচে আর তাঁর পিঠের থেকে একটা কী যেন ধাতব জিনিস ঠেলে বেরিয়ে এসেচে! কালীপদ মূর্তির কাছে গিয়ে যে জিনিসটা টান দিয়ে হাতে তুলে আনলো সেটা একটা দুই হাত প্রমাণ লম্বা ধাতুর তৈরি শিরদাঁড়া বলা চলে! মুনীর পরিচয়টাও তখনই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। দধিচী! মহামুনী দধিচী, যিনি বৃত্রাসুরকে বধ করার জন্য নিজের দেহত্যাগ করে নিজের শিরদাঁড়া দিয়ে তৈরি বজ্রাস্ত্র দান করেচিলেন দেবরাজ ইন্দ্রকে। আজও এই মহামুনীর মূর্তিই আমাদের পিশাচ দমনের অস্ত্র তুলে দিলো, হেঁয়ালীর ভাষায় যা নাকি রাক্ষসটাকে চেতনহীন করে রাখার অমোঘ অস্ত্র। কালীপদ দধিচীর মূর্তির দিকে চেয়ে ধীর স্বরে বললো, “দেখেচো ইন্দ্ৰ, দধিচীরা কখনও ফুরিয়ে যান না। তাঁরা আবহমান কাল ধরেই থাকেন নিজেকে আহূতি দিয়ে পরের মঙ্গলের জন্য।”
ইন্দ্র কালীপদর দীর্ঘ শরীরটার দিকে চেয়ে শ্রদ্ধার স্বরে বললো, “হাঁ ঠাকুর, দেখচি। তাঁরা শুধুই শরীর বদল করেন।”
কালীপদ একটু বিরতি নিয়ে আবার মুখ তুললো। তার ঠোঁটে সামান্য হাসি লেগে রয়েচে।
“আচ্ছা ইন্দ্র, এই যে একটা ষড়যন্ত্রের আভাস দেওয়া হয়েচে যা তোমাদের পরিবারে নাকি বংশ পরম্পরায় বয়ে চলেচে, সেইটে কী হতে পারে বলে তোমাদের মনে হয়?”
বাসুদেব, বলরাম বা ইন্দ্র সমস্বরে কইলো, “সে বিষয়ে কিছু শুনিনি কখনও ঠাকুর।”
“ঠিক। না শোনাই স্বাভাবিক, কারণ এমন কোনো অভিশাপ যদি বা বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয় তবে কেউই জানবে না? কিছুই বুঝবে না? কোনো ক্ষতিই হবে না? কৈ, শিবু দারোগার ঘটনার আগে তো কোনো আমলেই কোনো উপদ্রব হয়নি?”
“তবে কি ঠাকুর গুপ্ত ষড়যন্ত্রের কথাটা রাজমাতার কল্পনামাত্র?”
“তাও কি হয় রায়মশায়? ইন্দুমতীর মতো দুর্ধর্ষ এবং অসামান্য চতুরা মহিলা কি এমন একটা অবাস্তব কল্পনা করে আবার তা লিখেও রেখে যাবেন? তা নয়। একটু ভেবে দেখুন তো, কী এমন জিনিস আছে যা সেই আমল থেকে বংশানুক্রমে প্রবাহিত হয়ে চলেচে?”
“কী জিনিস ঠাকুরমশায়?”
“ভাবুন। এমন একটা জিনিস, যা এককালে এই রাজবাড়িতে ছিল, কিন্তু আপনার প্রপিতামহ সেটা নিজের গাঁয়ে নিয়ে যান?”
আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম, “রাধামাধবের বিগ্রহ!”
“হুমম, আর সেই সঙ্গে পাঁচখানা জটিল কলকবজা বসানো বেদীটা, যেটা আসলে ছিল হিমনিদ্রায় থাকা পিশাচ লম্ববেগার কয়েদখানা। ওইটেই বজ্রসিন্দুক, ওইটেই ষড়যন্ত্র, অর্থাৎ ছয়খানা যন্ত্র বসানো সিন্দুকটা। কিন্তু আমরা তো সিন্দুকের পাঁচদিকে পাঁচটা যন্ত্র পেয়েচি, তবে ওটা ষড়যন্ত্র হচ্চে কেমন করে? তবে ষষ্ঠ যন্ত্রটা কোথা?”
আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, “রাধামাধব? রাধামাধবের মূর্তি?”
“একদম সঠিক ভায়া। ওই মূর্তিটাই ছিল ছয় নম্বর যন্ত্র। ওইটে সিন্দুকের ডালার ছিদ্রে বসানো থাকলে তবেই যন্ত্র কাজ করে। পুঁথিতে পড়লাম, একসময়ে নাকি রাধামাধবের মূর্তির জায়গায় একটা পেতলের দণ্ড বসানো থাকতো এবং সেইটে সরিয়ে দিয়েই রাজবর্মা নামক এক শয়তান সেনাপতির অনুচর ওই পিশাচকে মুক্ত করে। তার মানে রাধামাধব বিগ্রহই একমাত্র চাবিকাঠি নয়, কোনো একটা বিশেষ গুণ আরোপ করলে যে কোনো বস্তুই ওই ষড়যন্ত্র বজ্রসিন্দুকের চাবি হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু তার ঠিক কী গুণ থাকতে হবে সে কথা কোথাও লেখা নাই। ওদিকে রাধামাধব ও অদৃশ্য। কী যে করি। আরেকটা কথা… মনে হয় পিশাচটাকে ঘুম পাড়ানোর সময়ে বজ্রসিন্দুকের ভিতরে এইরকমই একটা পাঁজরের মতো যন্ত্র রাখা ছিল। পিশাচটা বাইরে এসেই সেই বিগ্রহ আর ওই অস্ত্রটাকে লুকিয়ে ফেলে, যাতে তাকে আর বন্দী না করা যায়। কী ভয়ানক ধূর্ত! এই পিশাচ বুদ্ধিতে আমাকেও টেক্কা দিতে পারে। খুব সতর্ক থাকতে হবে।”
আমরা চলেই আসচিলাম, কিন্তু কালীপদ ক্লিষ্ট ভাবে হেসে কইলো, “কী স্বার্থপর আমরা দেখেচো ভায়া, নিজের কাজটুকু হয়ে যেতেই দেবীকে প্রণাম না করেই চলে যাচ্চি, অথচ উনিই সব পথ দেখালেন।”
আমরা লজ্জিত হয়ে আবার মন্দিরে প্রবেশ করলাম। দেবীর সামনে তন্ত্রজাত মাদুলী কবচ নিয়ে প্রবেশ করতে নেই তা কালীপদর আগেরবার স্মরণ ছিল না। এইবার নিজের দেহের সমস্ত মাদুলি কবচ খুলে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে দেবীর সামনে গেল আর কানাইকে প্রহরায় রেখে গেল সে সবের। সবাই ভিতরে প্রবেশ করে প্রণাম করচে, কানাই সতর্ক হয়ে পাহারা দিচ্চে, এমন সময়ে ধূর্ত পিশাচ অদৃশ্য হয়ে সন্তর্পণে গিয়ে দাঁড়ালো কালীপদর কবচের কাছে, যে কবচ এতক্ষণ তাকে কাছেই ঘেঁষতে দেয়নি। এখন হাত থেকে খুলে রাখায় সে কবচ নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েচে। নিপুণ হাতে কানাইয়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে কবচের ভিতরে থাকা দৈব শেকড় বের করে তার জায়গায় ঘাসপাতা ভরে দিলো।
সবাই দেবীপ্রণাম সেরে বেরিয়ে এসেচে, শুধু কালীপদ তখনও চোখ বন্ধ করে জোড়হস্ত হয়ে প্রার্থনা জানাচ্চে, লম্ববেগা নিঃসাড়ে ঢুকে পড়লো মন্দিরে আর প্রবেশদ্বারের উপরে ভিতরদিকে নিজের মায়াবলে সৃষ্টি করলো একটা ছদ্ম হেঁয়ালির, যা প্রাচীন লেখার মতোই দেওয়ালের গায়ে খোদাই করার মতো ফুটে উঠলো;
শূন্য সিন্দুক যদি ভাঙ্গিবে নিঃশেষে
পিশাচ সে পৌঁছিবে মরণের দেশে
কালীপদ ফিরে আসতে গিয়ে হঠাৎ উপর দিকে চোখ পড়াতে বিস্মিত হয়ে উত্তেজিত স্বরে হাঁকলো, “ডাক্তার, রায়মশায়, এদিকে আসুন শিগগির! এই দেখো ডাক্তার, আমরা খেয়ালই করিনি, কেউ খেয়াল করেনি! পিশাচটাকে বধ করার উপায় তো সেই আমল থেকেই লিখে গিয়েচেন ইন্দুমতী!” তারপর ভাবিত কণ্ঠে বললো, “একটা কথা মনে হচ্চে ডাক্তার, রাধাকান্ত দেব যে কিছু কিছু হেঁয়ালি লিখে গিয়েচিলেন, সেগুলো তিনি পেলেন কোথা? নিশ্চয়ই কিছু পুঁথি তিনি নিয়ে গিয়েচিলেন এখান থেকে এবং তাতেই নিশ্চয়ই এই দেওয়ালে লেখা পঙক্তি দুটোরও উল্লেখ ছিল! সেই পুঁথিগুলো পিশাচটা লোপাট করেচে বলেই এই লেখাটার কোনো হদিশ পাইনি, কিন্তু কপাল ভালো, দেবীকে প্রণাম করতে এলাম বলে পূণ্যবলে চোখে পড়ে গেল। এবার বুঝলাম। ওই শূন্য সিন্দুকটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেললেই রাক্ষসটাও মরবে। কাল সকালেই আমাদের দেবনগর বেরিয়ে পড়তে হবে রায়মশাই। আর বিলম্ব নয়।”
কালীপদ বাইরে বেরিয়ে অক্ষমালা, মাদুলীর সঙ্গে কবচটিও বাঁধলো হাতে। কোনো তফাৎই কেউ টের পেলো না। কানাই পাহারায় ছিল বলে কেউ সন্দেহও করলো না। টের পেলো শুধু পিশাচ লম্ববেগা। সে এখন এই ছয়জনের কাছাকাছিই থাকতে পারচে, কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনতে পারচে, অথচ মজা এই যে, লোকগুলো ভাবচে তাদের কবচের গুণে লম্ববেগা নিশ্চয়ই তাদের কাছাকাছি আসতে পারবে না। ভারী মজার কথা। পিশাচের অধরোষ্ঠে কুটিল হাসি খেলে গেল। এখন আর সে এই ছয়জনকে বধ করবে না। তার সৃষ্ট কূহকের ফাঁদে পড়ে ধূর্ত গুণীনও বেপথু হয়েচে। সে ভাবচে সিন্দুকটা ভেঙে ফেললেই পিশাচ নিহত হবে, কিন্তু আসলে হবে তার বিপরীত। সিন্দুকটা ভাঙামাত্র লম্ববেগা হয়ে যাবে চিরকালের মতো স্বাধীন, অপরাজেয়। চরাচরের কেউ আর তাকে বন্দী করতে পারবে না। সিন্দুকটা গুণীনের হাত দিয়েই চূর্ণ করবে সে, আর সেটা বিনষ্ট হওয়ামাত্র ঝড়ের বেগে উপস্থিত সবক-টা মানুষকে চোখের পলকে ছিঁড়ে ফেলবে সে।
মনে অতি ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা নিয়ে কালীপদদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আলোচনা আর অভিসন্ধি জানতে জানতে মেঘের আকারে উড়ে চললো আদিম পিশাচ।
