আপাই—নরমেধে আহুতি আবার
গ্রামটার চারদিকে একটিবার চোখ বুলিয়েই শংকরের বুকটা হঠাৎ ছাঁত করে উঠল! অকারণেই! হঠাৎ কোনও সরীসৃপের শীতল শরীরে মনভুলান্তে পা পড়ে গেলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি। শংকরের মনে হল, চারপাশের পরিবেশে কোথাও যেন কিছু একটা বিষম গণ্ডগোল রয়েচে! মনের ভুলও হতে পারে, কিন্তু রেলগাড়িটা থামার পর সঙ্গের মালপত্র নিয়ে নেমে, গাঁয়ের মাটিতে প্রথম পা দেওয়ামাত্রই শংকরের মনটা কু গাইল। অন্তত গোটা বাইশ দশাসই কুলি তাদের ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে নিতে এসেচে ইস্টিশনে, কিছু গাঁয়ের লোকজনও আছে, তার উপর এই ঝকঝকে দিনের আলো। এর মধ্যে ভয় পাওয়াটা নিতান্তই হাস্যকর, কিন্তু শংকরের কেন জানি বারবার মনে হতে লাগল, এ গাঁ ভালো নয়! এ তল্লাটের আকাশে-বাতাসে কিছু একটা ওঁত পেতে রয়েচে, যা দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না! এমন কিছু একটা ঘটচে, যা ঘটা উচিত নয়!
ইঞ্জিনিয়ার শংকর একটা নিশ্বাসের সঙ্গে মনের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে হাসিমুখে কুলিদের সঙ্গে এগিয়ে চলল গাঁয়ের ভিতরে। মাঝে মাঝে আমাদের বাল্যকাল থেকে অর্জিত শিক্ষাদীক্ষার সঙ্গে আমাদের পূর্ব্বপুরুষদের আজন্মলালিত প্রবাদ আর ধ্যানধারণার বড়ো গোল বাধে। শিক্ষা চিৎকার করে বলে, “ভূতপ্রেত স্রেফ ছোটো মানুষের কুসংস্কার। ভ্রান্ত ধারণা। অলীক, ভিত্তিহীন কল্পনা, আর আমাদের আত্মার ভিতরে লুকিয়ে-থাকা অন্তরাত্মা ফিশফিশ করে কয়, “পা বাড়াসনে মূর্খ! সামনে বড়ো বিপদ ঘাপটি মেরে বসে রয়েচে!” মজার কথা হল এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ অবধি দেখা যায়, আমাদের অবুঝ অন্তরাত্মাই সত্য কথাটা কয়েচিল, কিন্তু ততক্ষণে বড়ো বিলম্ব হয়ে যায়। শংকর যদি সেই দিন মনের হুঁশিয়ারি শুনে গাঁয়ের ভিতরে প্রবেশ না করত, তবে আমারও এই কাহিনি লিখতে বসার বিন্দুমাত্র দরকার পড়ত না।
যে সর্ব্বনাশা পাপের ঘটনাটার কথা আজ তোমাদের আমি বলতে চলেচি, সেইটা লেখার পরে আমার এই পাপবিদ্ধ অপবিত্র কলমখানা আমি ভেঙে ফেলব। সেই নরমেধের কুয়োয় বসে ঠিক কখানি এবং কত প্রকারের নৃশংস নরহত্যা যে আমাদের চাক্ষুষ করতে হয়েচিল, তার হিসেব হয়তো যমানুচর চিত্রগুপ্ত ঠিকঠাক জেনে থাকবেন, কিন্তু আমি শেষের দিকে মানসিক অবসাদে গণনা করা ছেড়ে দিয়েচিলাম। কেবল নৃশংস বললে কিছুই বোঝানো হয় না। অত্যন্ত ধূর্ত্ত এবং কুটিল বুদ্ধির অধিকারী যে শয়তানি মানুষখাকি অপজীবের খপ্পরে সেইবার আমরা পড়েচিলাম, সেইসব দিনের কথা স্মরণ হলে আমি এই শহর কলকাতার পাকা বাড়ির ভিতরে বসেও শিউরে উঠি। রাতবিরেতে অচেনা কণ্ঠস্বরের ডাক শুনলে চমকে উঠি, যা আমার পেশার পক্ষে অত্যন্ত বেমানান। একজন দায়িত্ববান ডাক্তার হিসেবে সেবারের সব ক-টি ঘটনার পুরোপুরি সত্য বিবরণ কোনওমতেই তোমাদের আমি বলব না, তোমরা তা সহ্যও করতে পারবে না, তাই যথাসম্ভব রাখঢাক করে যে ঘটনাটুকু আজ বলতে চলেচি, তা মন দিয়ে শোনো।
মানুষখাকির প্রথম থাবা যেদিন পড়ল, রাত তখন আন্দাজ আটটা কি পৌনে আটটা হবে। অথবা একটু বেশি। শীর্ণ কুমড়োফালি চাঁদ হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা উপরে উঠে আসায় বাইরের ঘুটঘুটে কালো আঁধারটা অতি সামান্যই তরল হয়েচে। সরমা নীচের তলায় রান্নার জন্য তিনদিক ঘেরা খুপরিতে বসে রাঁধচিল। রান্নার উপকরণ তেমন কিছু নেই। চাট্টিখানি আঁচল দিয়ে ধরা কুচো মাছ ভাজা, গতকালের মন্দিরের ভোগের স্বল্প মাংস আর মোটা লাল চাউলের ভাত। একটা বিড়াল উন্মুক্ত দোরখানার সুমুখে থাবা পেতে বসে মাছ ভাজার আঘ্রাণ নিচ্চে।
সরমা বাম হাতে কপালের ঘাম মুছে বাইরের দিকে চেয়ে ভ্রূ কুঞ্চিত করল। সরু চাঁদখানাকে একঝলক দেখে মনে হচ্চে, আচমকা কাউকে দেখে ভয় পেয়েই যেন সাত তাড়াতাড়ি অনেকখানি উপরে উঠে পড়েছে। মিঠে বাতাসের তাড়নায় দূরের তাল গাছের দল তিরতির করে কেঁপে চলেচে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সরমা কড়াইয়ের পানে মুখ ঘোরাতে যাবে, হঠাৎ মনে হল, খোলা উঠোনটা দিয়ে কালো রঙের কী একটা যেন সাঁৎ করে সরে গেল! নিজের ধোঁয়া-লাগা চোখের বিভ্রান্তি মনে করে সরমা আবার রসুইতে মন দিতে যাবে, তখন সে দেখলে যে, পাশে বসা বিড়ালটাও সতর্কভাবে বাইরের পানে চেয়ে রয়েচে। সরমার কপালে ক্ষুদ্র ভাঁজ পড়ল। সে কড়াই থেকে দুখানা মৌরলা তুলে বিড়ালের সামনে ছুড়ে দিয়ে অবাক হয়ে দেখল যে, এতক্ষণের মৎস্যলোলুপ প্রাণী এখন মাছের পানে ভ্রূক্ষেপ অবধি করচে না! সরমা বিড়ালের উদ্দেশে কিছু একটা কইতে যাচ্ছে, হঠাৎ পিছনের ডোবার কাছে একটা ক্ষীণ ‘ছপপ্’ করে শব্দ হল। কোনও বড়োসড়ো জন্তু জমা জলে পা ফেললে যেমনটা হয়, ঠিক তেমনি। বিড়াল সেই ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেয়েই নিজের রোঁয়া ফুলিয়ে একটা ভয়ার্ত্ত শব্দ করে মরি-বাঁচি ভঙ্গিতে এক বিরাট লাফে রসুই থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলে পর সরমা হতবাক হয়ে খুন্তি কড়াইতে রেখে দিয়ে উঠে পড়ল। বিড়ালটা কী দেখে এভাবে ছুটে পালাল?
আবার আওয়াজটা কানে এল! ছপাত! সরমা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। কোনও বুনো জানোয়ার যদি এসে থাকে, তবে এই দোরবিহীন রান্নাঘরের থেকে উপরের তলাটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। হোক চাঁচবেড়ার দোর, তবুও একটা আগল তো থাকে। সরমা চুলোটা নিবিয়ে, পেতলের থালা-বাসনে রাত্তিরের যৎসামান্য আহার্য সাজিয়ে এক হাতে নিয়ে, অপর হাতে কেরোসিন বাতিটা ধরে লঘুপদে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসে, বাসনপত্র নামিয়ে রেখে নীচে নেমে বেড়ানির্মিত দুয়ার বন্ধ করল। দোর দেবার পূর্ব্বে একবার তার স্বামীর কথা মনে এল। লোকটা এখনও ঘরে ফেরেনি। পড়ে রয়েচে কোথাও নেশা করে। ঘরে ফিরলেই আরম্ভ হবে মারধর আর অকারণ কুকথা। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সরমা উঠে এল উপরে। পায়ের শব্দ পেয়ে বৃদ্ধ রামচরণ হাঁক দিলে, “বউমা এলি?… অ মেয়ে….”
সরমা সারাটা দিন এতটুকু সময় পায় না। এখন সামান্য অবসর পেয়ে কাঠের পুরাতন কাঁকই দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বিরসকণ্ঠে উত্তর দিলে, “হ্যাঁ, আমি। কী হয়েচে, বাবা? আবার আপনি অযথা ভয় পাচ্চেন?”
“নারান কি ফিরেছে?”
“এখনই সে ফিরবে? দেখুন, চূড়ার গুলিখানায় গিয়ে নেশা করে পড়ে রয়েচে আপনার ছেলে। যতক্ষণ বাইরে থাকে, ততক্ষণ জিরেন, এলেই তো তার নিত্যির মারধর আরম্ভ হবে, বাবা। কিল মারার গোঁসাই।”
এই বলে শ্বশুরের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল সরমা। অনটনের সংসারে চক্ষুলাজ চিরকালই শিথিল। সরমা নিয়মরক্ষার জন্য এলোচুলের উপর ঘোমটাটা সামান্য টেনে দিয়ে এক বাটি কবোষ্ণ দুগ্ধ নিয়ে চৌপাইয়ের পার্শ্ববর্তী কাষ্ঠখণ্ডে রেখে চুল আঁচড়াতে থাকল। বৃদ্ধ গতকাল থেকেই অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে উঠে বসে কাঁপা হাতে দুধের বাটিটা তুলে নিয়ে কইল, “পুরুষমানুষের রাগ ধরতে নেই রে হতভাগি। সে আমাদের খাওয়ায় পরায়।”
আজ কষ্টে সংগ্রহ করা যৎসামান্য আহারবস্তুর কথা স্মরণ করে সরমা তিক্ত হেসে বললে, “হ্যাঁ বাবা, ঠিক।” এই বলে কাঁকইয়ের চুলটুকু ছাড়িয়ে নিয়ে ক্ষুদ্র মাটির জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলল, আর ঠিক তখনই জানালার ঠিক নীচ থেকে একটা জন্তুর গরগর, ক্রুদ্ধ আওয়াজে মাটির বাড়িটা কেঁপে উঠল যেন! রামচরণ খরচক্ষে সেদিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে বললে, “চুল কি অমনিই ফেললি হতভাগি?” সরমা মনে মনে জিব কাটল। কথায় কথায় সে চুলে থুতু দিতে ভুলে গিয়েচে। সে শ্বশুরের উদ্দেশে কিছু একটা বলতে যাবে, হঠাৎ সেই গরগর শব্দের বদলে একটা ভয়ংকর শব্দ কানে আসতেই দুইটি প্রাণী একত্রে শিউরে উঠল!
এ কক্ষনো মানুষের হাসি নয়! যেন একখানা প্রকাণ্ড হায়নাজাতীয় জীব ক্রোধে, আক্রোশে হাহাকার করচে! সরমা চমকে উঠে বাইরের ঘরে এসে তেলের বাতিটা হাতে নিয়ে জানালায় চোখ রাখল। শব্দটা এসেচে পিছনের ডোবার ধারের ঝোপের দিক থেকে। কোন জন্তু ওঁত পেতে রয়েচে ওই এঁদো মাটিতে? রামচরণ কম্পিত স্বরে বললে, “আমায় একা রেখে যাসনে মেয়ে। এই মিটমিটে তেলের আলোতে বাইরের তো কিচ্ছুটি দেখা যাবে না!”
“হ্যাঁ বাবা, কিন্তু কোনও রাতচরা নুকিয়ে থাকলে তার চোখের জ্যোতি ঝিকোবে এই আলোতে। মানুষটাও তো বাইরে রয়েচে এখনও।”
বাইরের খুব আবছা চাঁদের আলো-মাখা ঝোপঝাড় আর ডোবার দিকে চেয়ে তেমন কিছুই ঠাহর হয় না। গাছে গাছে জোনেই জ্বলচে, শুকো পাখি টি টি করচে, কিন্তু ডোবার ওই পারে ওইটে কী জিনিস? ঝোপের ওধারে মিশকালো আঁধারের মতো কী একটা যেন জমাট বেঁধে রয়েচে। সেটা মাঝে মাঝে নড়চে! দুখানা লালচে রঙের কুচফলের ন্যায় দানা জ্বলচে তাতে!
সরমার গলা শুষ্ক হয়ে এল। সে কয়েক কদম পিচিয়ে এসে শ্বশুরের কক্ষের দিকে এগোতে যাবে, আচমকা তার মেরুদণ্ড শীতল হয়ে এল। একটা খুব অস্পষ্ট শব্দ শুনে সরমার মনে হল, জানালার বাইরে কিছু একটা যেন ঠিক তার পিছনে এসে উপস্থিত হয়েচে এবং জানালা ধরে বাইরের দিকে ঝুলে রয়েচে! ভীষণ আতঙ্কে তার হাত থেকে বাতিটা পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
নরেন্দ্র কর্মকার সন্ধ্যা উতরে যাবার পর নেশায় মত্ত হয়ে ঘরের সুমুখে এসে একটু থমকে দাঁড়াল। এই সময়টা তার স্ত্রী নীচে ভাত রাঁধে, কিন্তু আজ উনান নিৰ্ব্বাপিত। বাতাসে কীসের একটা গন্ধ আসচে না? আবাগির বেটি কি রান্না পুড়িয়ে ফেলেচে? নাঃ, ঠিক পোড়া গন্ধ তো নয়! কেমন যেন বুনো জানোয়ারের মতো বিশ্রী ঘ্রাণ! নরেন্দ্র নেশাগ্রস্ত হলেও সামান্য বিপন্ন বোধ করল। টলোমলো পায়ে তাড়াতাড়ি কাঁচের দোরের সামনে এসে দেখল, দোরটা বন্ধ রয়েচে। এমনটা তো হয়নি কখনও। সে রাতবিরেতে ফিরলেও তার না-ফেরা ইস্তক সরমা দুয়ার আঁটে না। তবে কি তারাও ভয় পেয়েচে? দড়িখানা খুলে ভিতরে ঢুকে আবার দোরটা এঁটে দেওয়ামাত্র একটা গরগর শব্দ ক্ষীণভাবে কানে এল। নরেন্দ্র একটু বাইরে চোখ বুলিয়ে দেখল উঠোন শূন্য।
নরেন্দ্র উপরে উঠে এসে দেখল, সরমা থালায় খাবার ঢাকা দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রয়েচে। স্বামীর পায়ের শব্দ পেয়ে ভীষণ ভয়ে একটা অস্ফুট আওয়াজ করে উঠল, তারপর ধাতস্থ হয়ে সামলে নিয়ে বলল, “ওহ্, তুমি!”
নরেন্দ্র প্রথমে স্ত্রী-র এই চমকে ওঠা দেখে অবাক হয়েচিল, এক্ষণে তার কথার ধরন শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে কইল, “তবে কাকে আশা করেচিলি এই রাত্তিরে, হারামজাদি?”
স্বামীকে ফিরতে দেখে সরমার মুখে যেটুকু আলো দেখা গিয়েচিল, সেটুকু এই কুৎসিত অপবাদে নিবে গেল। সরমা বিষণ্ণ মুখে জলছড়া দিয়ে, কাঁসার থালায় খাবারগুলো বেড়ে দিয়ে, আলোটা এগিয়ে এনে হাতপাখা নিয়ে বসল। নরেন্দ্র আহার করতে লাগল নিশ্চুপভাবে। সরমা কথা বলবে না ভেবেও একটু উশখুশ করে আবার কইল, “বলচি, আমাদের আবাদে কি বাঘ বা কোনও বড়ো জানোয়ার বেরিয়েচে?”
নরেন্দ্র মাংসের টুকরা মুখে পুরে ভ্রূ তুলে বললে, “তুই থাকতে জানোয়ারের কমতি কীসে, হারামজাদি?”
সরমা অপমান গলাধঃকরণ করে আবার বলল, “এমনি এমনি বলচিনে, আজ একটা ভয়ানক জিনিস দেখেচি আমি। একা নই, বাবাও দেখেচেন। একেবারে স্বচক্ষে।”
“তাই বুঝি নীচের দোর এঁটে উপরে পা চিত্তির করে নুকিয়ে রয়েচিস? ভাবচিস, সোয়ামিটা মরলে তারপর…” কথায় কথায় নরেন্দ্র একবার বাপের কক্ষের পানে চেয়ে আবার ভ্রূ ভঙ্গ করে চিৎকার করে কইল, “এ কী! বাবার ঘরে আঁধার কেন? জানিসনে, বাবা আপারে ভয় পাচ্চে কাল রাত্তির থেকে? দেখি আলোটা! এ কী, এ যে বাবার ঘরের বাতিটা! এটা এইখেনে কেন? বাইরের বাতিটা কোথা?”
“আমার মাথা খাও, ধীরে কথা বলো। বাবা অনেক কষ্টে ঘুমিয়েচে। চিৎকারে জেগে যাবে। বাইরের বাতিখানা আমার হাত থেকে চমকে পড়ে গিয়ে খানখান হয়েচে। সে এক অদ্ভুত ঘটনা….।”
নরেন্দ্রর কর্ণকুহরে বাকি কথা প্রবেশ করল কি না সন্দেহ। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে সরমার চুলের মুঠি ধরে চিৎকার করে উঠল, “আবাগির বেটি, বেহায়া মেয়েছেলে! ঘরের জিনিসপত্তর কি তোর বাপ এসে দিয়ে গিয়েচে যে ভেঙে ভেঙে বেড়াবি?”
সরমা কাতর স্বরে হাতজোড় করে কইল, “ইচ্ছা করে ভাঙিনি আমি, দোহাই তোমার। এভাবে চিৎকার করলে বাবার ঘুম ভেঙে গেলে বড়ো সমস্যা হবে।”
নেশাগ্রস্ত নরেন্দ্রর মাথায় রক্ত চেপে গেল। কাঁসার জামবাটিটা তুলে স্ত্রী-র মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারামাত্র সরমার কপাল থেকে দরদর করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। বাটির আলু, মাংস গোটা ঘরে ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। নরেন্দ্র টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কইল, “বাবা! বাবা! হারামজাদির কথা শুনেছ একবার?”
সরমা ললাট চেপে বসে রয়েচে। নরেন হিংস্রভাবে বললে, “ঘুম ভাঙার ভয় দেখিয়ে আমার গলা বন্ধ করবি? পুরুষমানুষ কে, আমি না তুই? বাবা…… বাবা….”
বৃদ্ধ রামচরণের ক্লিষ্ট স্বর পাওয়া গেল, “নরেন? তুই এসেচিস, বাপ?”
এই কণ্ঠস্বর শুনে নরেন্দ্রর মাথায় গোল লেগে গেল! শব্দটা পিতার শয়নকক্ষ থেকে আসেনি! এসেচে এই ঘর থেকেই! কিন্তু….। নরেন্দ্র আবার চিৎকার করে ডাকতেই আবার পিতার কণ্ঠস্বর এল অতি ধীরে, “নরেন! তুই কোথা, বাপ?”
নরেনের অপ্রকৃতিস্থ মগজ যেন এই শব্দে সবেগে কশাঘাত খেয়ে নড়ে উঠল! এ কী! আওয়াজ আসচে তার পেটের ভিতর থেকে! হা ঈশ্বর! ছেলের উদরের অভ্যন্তর থেকে মুহুর্মুহু কাতর ডাক আসচে, “খোকা! তুই কোথা খোকা? আমাকে বাঁচা খোকা।”
নরেন হতবুদ্ধি হয়ে সরমার দিকে তাকাতেই সরমা হেসে কইল, “বলেচিলাম না, বাবা জেগে যাবে? নাও, জেগে উঠেচে।” এই বলে খিলখিল করে হেসে উঠল! সে কী হাসি! যেন ঘরের মধ্যে অনেকগুলো হিংস্র হায়না একসঙ্গে কেঁদে উঠল ক্ষুধায়। নরেন আলোটা নিয়ে দৌড়ে শয়নকক্ষে ঢুকতে গিয়েই পাষাণ হয়ে গেল। শয্যার উপরে তার পিতা আর সরমার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ ছড়িয়ে পড়ে রয়েচে! রামচরণের দুখানি হাত কেটে নেওয়া হয়েচে। উষ্ণ শরীরে পাগলের ন্যায় পিছনে ঘুরতেই চোখ গেল ছড়িয়ে-থাকা বাটির মাংসটুকুর দিকে। কয়েকখানা নখ সমেত মানুষের আঙুল আর হাতের টুকরো টুকরো মাংস ছিটিয়ে রয়েচে মেঝে জুড়ে। নরেন একবার হেঁচকি তুলেই বমি করে ফেলল। হাতের লণ্ঠনটা ফেলে দিয়ে পাগলের মতো ছুটে গেল সিঁড়ির দিকে। যাবার সময়ে একটা নখযুক্ত থাবা তার ঘাড়ের থেকে একটু মাংস তুলে নিল। নরেন্দ্র হুড়মুড় করে সিঁড়ি থেকে পলকা দোর ভেঙে আছড়ে পড়ল নীচে, আর ওই অবস্থাতেই নিজেকে টেনেহিঁচড়ে, বুকে ভর দিয়ে সরে যেতে থাকল বাড়ির থেকে দূরে। খোলা জানালা থেকে শ্মশানের শৃগাল-কুকুরের ক্ষুধার্ত্ত চিৎকার আর হাহাকারের মতো ইনিয়েবিনিয়ে ভেসে আসচে অপার্থিব, হাড়-কাঁপানো একটা মেয়েলি ছড়া কাটার সুর…
পাপের কথা আয় শোনাই
গাঁয়ের রানি একজনাই
ধরল শমন শতেক ছল
রানি গেল পাতালতল
তারার আলোয় ধাঁধায় চোখ
মুখখানি তার উলটো হোক….
সেই কুহকের সুর শুনতে শুনতে নরেন শক্তি হারিয়ে এলিয়ে পড়ল মাটিতে। পিছনে বাড়ির পানে চেয়ে দেখলে, উপরের জানালায় দুইখানি রক্তবর্ণ পুঁতির ন্যায় চোখ এদিকে চেয়ে রয়েছে। বাড়ির ভিতর থেকে শোনা গেল রক্ত-জল-করা হাসি, যে হাসির বহু উল্লেখ, বহু গল্পকথা আজও গাঁয়ে-গঞ্জে প্রবাদের মতো ভেসে বেড়ায়। যে হাসির গল্প শুনিয়ে যুগ যুগ ধরে কোনও কোনও মা তার অবাধ্য বাচ্চাকে ঘুম পাড়ায়।
***
ছয়খানা গাঁ মিলিয়ে একখানা আবাদি তালুক। তার নাম ডাকিনীর বিল। সেদিন সকালে গাঁয়ের লোকেদের ঘুম ভাঙামাত্র মহা হইচই পড়ে গেল। কয়েকজন ভাগচাষি কাকভোরে মাঠে যাবার পথে ডোবাকুলের নরেনকে অর্ধচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে ঝোপের ধারে। রক্তাক্ত ঘাড় একদিকে কাত হয়ে রয়েচে, শরীর পুড়ে যাচ্চে জ্বরে, আর নেশাগ্রস্তের ন্যায় সে বিলাপ বকে চলেচে। চাষিরা ভাবলে, নিশ্চয়ই হতভাগা আবার নেশা করে ফিরেছে রাতে আর ফেরার পথে কোনও বুনো জন্তু তাকে আক্রমণ করেচে। রাতে অনেকেই একটা হায়নার মতো ডাক শুনেচে, ফলে কথাটা অস্বাভাবিক বোধ হল না যেমন, শুধু তাকে চণ্ডীমণ্ডপে টেনে নিয়ে আসার পর বৃদ্ধ হরেন গাঙ্গুলি দুশ্চিন্তার স্বরে কইল, “নরেনের নেশা করে বাড়ি ফেরা তো কিছু নতুন কথা নয়, কিন্তু সে যে রাতভর বাড়ি ফিরলে না, তাতে তার বাড়ির লোক খোঁজখবর করল না যে বড়ো? রামা তো কাকভোরে এইখানে এসে বসে থাকে। আজ সে-ই বা কই? পরশুর ঘটনাটা থেকেই সে কেমন উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছিল, তোমরা তো দেখেছ। তা, রামার বাড়িতে তত্ত্ব নেওয়া হয়েচে?”
চারজন যুবা ছুটল নরেনের গৃহের অভিমুখে, আর কিয়ৎক্ষণ পরেই তারা এসে আছাড় খেয়ে পড়ল চণ্ডীমণ্ডপে। হাঁপাতে হাঁপাতে তারা ঘরে যা দেখেচে, সে কথা বলামাত্তর হরেন গাঙ্গুলি কানে হাত চাপা দিয়ে রাম রাম বলে ভূমিতে বসে পড়ল। ডাকবাংলোর চৌকিদার বৃদ্ধ কেশব গাঙ্গুলি কানে খাটো, সে প্রথমটা সবটুকু শুনতে পায়নি। ক্রমে ক্রমে সবটুকু তত্ত্ব অবগত হয়ে চিৎকার করে পাগলের ন্যায় হয়ে উঠল। কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ বমির উদ্রেক হওয়ায় দৌড়ে চলে গেল। ধীরে ধীরে গোটা তালুকেই রাতের বিষম খবর ছড়িয়ে পড়ল হু হু করে। নরেন কর্মকার ঘটনার পরে যে কয়েক ঘণ্টা জীবিত ছিল, প্রথমদিকে খুব আতঙ্কের মধ্যেও সে উদ্ভ্রান্তের মতো সব ঘটনা কয়েচে লোকজনকে, কিন্তু তারপর পুরো সময় জুড়ে ভুল বকেচে। কখনও “বাবা, বাবা” করে চেঁচিয়ে উঠেচে, কখনও আবার বিলাপের সুরে দুর্ব্বোধ্য ছড়া আওড়ে গিয়েচে, কখনও বা চিৎকার করে বলেচে, “মাংস খাবি? খাবিনে? খা খা, নিজের বাপের মাংস ছিঁড়েখুঁড়ে খা, পেট পুরে খা।”
বিকেলের মধ্যেই তড়িঘড়ি তার দাহ সেরে, সাঁঝ নামার পূর্ব্বেই ডাকিনীর বিলের প্রতিটি ঘরের কপাট বন্ধ হয়ে গেল। ঘরেদোরে কান পাতলে কেবল একটাই ফিশফিশ, সেই জন্তুটাকে নিয়ে। হায়নার মতো হাসি, অথচ যে-কোনও জানোয়ারের চাইতে সহস্রগুণ বিকট! সে ঘরের কপাট কেটে ঢুকে ঘরসুদ্ধ মানুষকে নিধন করতে পারে! হরেন গাঙ্গুলি চিন্তিতভাবে কইল, “তোরা ভুল করচিস মুখ্যুর দল, বুনো পশু নাকি কখনও মানুষ কেটে রাঁধতে পারে? ঘরের ভিতরের সে দৃশ্য কী ভয়ংকর! রাম রাম। এ আরও জবর কিছু রে বাপ! আরও শতগুণ ভয়ংকর কোনও আপদ! রামচরণ সেদিন ইস্টিশনের কাচে ইশারা-ইঙ্গিতে যে বিষম বিপদের কথা কইতে চেয়েচিল, তা-ই সত্য হল কি না কে জানে? রক্ষে করো মধুসূদন।” গাঙ্গুলির শরীরটা শিউরে উঠল।
গাঁয়ের লোকেরা এ কথা শুনে আঁতকে উঠল। গত পরশুর ইস্টিশনের ঘটনাটা অস্বাভাবিক হলেও কেউই তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু আজ মনে হল, সে ঘটনার মধ্য দিয়েই মরণের কীট প্রবেশ করেচে ডাকিনীর বিলের বাতাসে।
বিল্স হল্ট ইস্টিশনের মেরামতির কাজ চলচিল পুরোদমে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব শংকর রায় তার আগের দিনই গাঁয়ে এসে উঠেচেন, আর কুলিকামিনের দল এসে ডেরা ফেলেচে আরও দিন তিনেক পূর্ব্বে। শংকরের বয়স চল্লিশের আশপাশে, অকৃতদার খোলামেলা মানুষ।
পুরো ঘটনাটার মর্ম উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে এই বিস্তৃত পাহাড়ি আবাদটার অবস্থানটা ঠিকঠাক বোঝা দরকার। তাতে তোমরা বিরক্ত হলেও এটুকু জানাটা খুব দরকার। ডাকিনীর বিলের ভূপৃষ্ঠের ছবিটুকু মনে মনে এঁকে নিলে আক্রমণের ধরনগুলি বুঝতে অসুবিধে হবে না। বিল্স হল্ট ইস্টিশনটা তৈরি হয়েচে বহুকাল আগে। গোরা সাহেবদের হাতে গড়া এই ক্ষুদ্র রেলপথটা ঠিক যাত্রীবাহী গাড়ির জন্য নয়। পুরুলিয়ার মুরাদি ইস্টিশন থেকে যেখানে পরপর পাহাড়ের সারি ঠেলে উঠেচে, সেই পলাশবাড়ির জঙ্গল অবধি, সেই পাহাড়গুলির বুক চিরে, অর্ধচন্দ্রাকার পাহাড়ি পথ পরিক্রমা করে সরু লাইনের এই রেলপথ তৈরি হয়েচিল মূলত জলাধার ও বাঁধনির্মাণকর্মীদের পরিবহনের জন্য। লাইনের একপাশে খাদ, আর অপর পার্শ্বে গহিন বন আর দহ। পরবর্তীতে এই গাড়িতে সাহেবরা আসতেন কাঠ জোগান, আমোদপ্রমোদ এবং সরকার বাহাদুরের দেওয়া অন্যান্য নানান কাজের জন্য। ধনুকের ন্যায় বাঁকা পথটার পরেই, ডাকিনীর বিলে প্রবেশের পূর্ব্বে দুখানা পাহাড়ের সংযুক্তি হিসেবে একটা চল্লিশ হাত প্রশস্ত গুহার মতো সুড়ঙ্গ পড়ে। স্থানীয় নাম ধুয়ানালা। এই অর্ধচন্দ্রাকার সুড়ঙ্গখানা পার করে এইদিকে পড়লেই ডাকিনীর বিলের চৌহদ্দি আরম্ভ। এই পাহাড়-ঘেরা তালুক থেকে বাইরে যেতে গেলে পথ ওই ধুয়ানালার সুড়ঙ্গটাই। এ ছাড়াও এই তালুকের ছোটোবড়ো গাঁগুলির মাঝখানে অসংখ্য শীর্ণ পাহাড়ি ঝোরা পেরোনোর জন্য শাল গাছের গুড়ি দ্বারা মনুষ্য চলাচলের পায়ে হাঁটা সেতু নির্মাণ করেছে গাঁয়ের প্রজারা। ইঞ্জিনিয়ার শংকর এখানে আসার পূৰ্ব্বে তেমন কোনও বাড়তি উৎসাহ অনুভব করেনি। সাইটের মাটি কামড়ে পড়ে থেকে মাসের পর মাস ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার একঘেয়ে অভিজ্ঞতা শংকরের জীবনে নতুন নয়, তাই ডাকিনীর বিলে প্রবেশের পূর্ব্বেও শংকর কেবলমাত্র আসন্ন দায়িত্বের প্রতিই নিজের সবটুকু মনঃসংযোগ রেখেচিল। রেলগাড়ি যখন পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে সহস্রপদী বিছার ন্যায় বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে চলেচে, তখন দিনের প্রথম ভাগ। রোদের বিলক্ষণ তেজ। এই রেলগাড়ি চলার তেমন কোনও বাঁধাধরা সময় নেই, রেলকর্তা অথবা তৎসংশ্লিষ্ট কোনও আধিকারিক এলে বা অনুমতি দিলে তবেই গাড়ি নিশ্বাস ফ্যালে।
শংকর জানালার ধারে বসে বসে রৌদ্রে পুড়ে চলেচিল, তাই তীব্র দহনে বাইরের দৃশ্য তার মনে দাগ কাটতে পারেনি, কিন্তু পাহাড়ের গায়ে বাঁকা পথটায় গাড়িটা বাঁক নিতেই যখন রোদ চলে গেল উলটোদিকের জানালায়, তখন শংকরের চোখের সামনে ফুটে উঠল অপূর্ব্ব পাহাড়ি গাঁয়ের রূপ। ঘন সবুজ বন, পাথুরে ঝোরা, বাঁধ আর খাপছাড়া বিস্তৃত চাষের জমি মিলিয়ে আবাদখানা বড়ো মনোলোভা। গাড়ি বিল্স হল্ট ইস্টিশনের কাছাকাছি আসতেই কুলির দল হইহই করে তাদের নতুন সাহেবকে নজরানা দিতে ভিড় জমাল। কারও হাতে চাট্টিখানি ফল, কারও হাতে মাটির ভাঁড়ে গুড়ের চা। শংকর নিজের লটবহর নিয়ে হাসিমুখে গাড়ি থেকে নীচে নামল, আর মাটিতে পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক পলকের জন্য তার শরীরটা সামান্য শিউরে উঠল অকারণেই। একটা না-দেখা ভয়, বা একটা অজানা জন্তু পিছনে অনুসরণ করলে যে ধরনের শিহরণ জাগে, ঠিক সেইরকম। শংকর নিজেই অবাক আর লজ্জিত হল মনে মনে। তার সামনে অন্তত বাইশ-পঁচিশজন বলিষ্ঠ কুলি রয়েচে, কিছু গাঁয়ের লোকও আচে, এতগুলি লোকের মাঝে ভরা দিনমানে যদি তাকে শিউরে উঠতে হয়, তবে এখুনি চাকুরিতে ইস্তফা দেওয়া উচিত। ইস্টিশনের ধারে একখানা প্রকাণ্ড গাছ। কী গাছ ছিল কে জানে। যেন বাজ পড়ে ঝলসে গিয়ে কাঠামোটুকু দাঁড়িয়ে রয়েচে। শংকর কুলির দলের সঙ্গে তার জন্য বরাদ্দ ডাকবাংলোর পানে হাঁটতে আরম্ভ করল। ছবির মতো সুন্দর আবাদটার দিকে পরিতৃপ্ত দৃষ্টি মেলে দেখতে দেখতে শংকরের মনে হল, গাঁয়ের সব কিছু চিত্রবৎ পরিপাটি হলেও কোথায় যেন কিছু একটা গরমিল রয়েচে! কিছু একটা ব্যাপার ঘটচে, যা ঠিক স্বাভাবিক হচ্চে না, অথচ ঠিকঠাক ধরাও যাচ্চে না। এসব পরিশ্রান্ত চিত্তের অলীক ভ্রম বলে মনে করে শংকর আবার হাসিমুখে পথ চলা আরম্ভ করলে।
শংকর গ্রামে আসতেই কুলিদের ব্যস্ততা চূড়ান্ত হয়ে উঠল। পরদিন থেকেই প্রাচীন রেলপথ উপড়ে, নতুন গুঁড়ি বসিয়ে, লোহার চাদর বিছিয়ে রেলপথ নির্মাণের জন্য পাথুরে মাটি খোঁড়া আরম্ভ হল, আর বিষম চমকটাও অপেক্ষা কুরচিল ওই শুরুর দিনটাতেই, যা দেখার পর শংকরের মনে হল, তার মনের গতকালের সেই গণ্ডগোলের ধারণাটা একেবারে অলীক ছিল না। এ গাঁয়ে কিছু একটা রহস্য রয়েচে।
কুলিরা হইচই করে রেলপথ উপড়ে ফেলার কাজ করচে, অনেকখানি রেল উপড়েও ফেলা হয়েচে। কাজ আরম্ভ হয়েচিল ইস্টিশন থেকে কিছুটা এগিয়ে, এখন একটু একটু করে কুলির দলটা সরতে সরতে শালখুটি বাঁধানো প্ল্যাটফর্মের কাছাকাছি চলে এসেচে। ইস্টিশনের গায়ে কয়েকখানি ছোটো ছোটো দোকান। কোনওটি চায়ের, কোনওটি মুদির। চায়ের দোকানে বসে কয়েকটি গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো চা পান করচে। শংকরও একটা পয়সা এগিয়ে দিয়ে এক পাত্র চায়ের হুকুম দিতেই দোকানি জিব কেটে পয়সা ফেরত দিয়ে চা নিয়ে এল। সঙ্গে চাট্টিখানি মুড়ি আর বাতাসা। শংকর চায়ের পাত্র ঠোঁটে ঠেকাতে যাচ্চে, সহসা একখানা কান ফাটানো শব্দে শংকরের চা চলকে বুশশার্টে এসে পড়ল।
দোকানে উপস্থিত সকলেই চমকে উঠে দাঁড়িয়েচিল, কুলি সর্দ্দার লাখন এগিয়ে এসে কইল, “একটু এইদিকে আসবেন সাহেব?”
শংকর দেখল, সরকার নিযুক্ত যে হাতিগুলিকে কাজে লাগিয়ে রেলপথ ওপড়ানো হচ্চে, সেই সব ক-টি হাতি একসঙ্গে বেঁকে বসেচে কিছু একটা দেখে। শংকর অবাক হয়ে কুলিদের জটলা সরিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল, একটা স্থানে শালখুঁটি উপড়ে ফেলার পর গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েচে, আর তার ঠিক পাশে খুঁটির গোড়ার টানে মাটির তলা থেকে একখানা মাটি আবৃত তোরঙ্গের আধখানা বেরিয়ে এসেচে ভূখণ্ডের উপরে।
দেখে মনে হয়, বেশ মজবুত লোহার তোরঙ্গ। ডালার উপরে একখানা সিংহের মুখ খোদাই করা। দুপাশে পোক্ত হাতল। ডালাটা ভীষণ আঘাতের ফলে মুচড়ে, উন্মুক্ত হয়ে পড়েচিল। ভিতরে একখানা কুকুরজাতীয় জীবের বিনষ্টপ্রায় হাড়গোড় রয়েচে। লাখন নিরীক্ষণ করে কইল, “সাহেব, এইটে মাদি কুকুরের হাড়।”
শংকর লাখন সর্দ্দারকে বললে, “এইরকম অনেক জিনিসপত্তর খননের সময়ে বেরোয়। এতে এত হইচই করার কী হয়েচে? তুলে রেখে, পরে সদরে জমা করে দিয়ো।”
সর্দ্দার ইতস্তত করচে এবং তোরঙ্গখানার পানে অস্বস্তির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রয়েচে দেখে শংকর হাসিমুখে কইল, “যা ভাবছ, সেসব কিছুই নয়, সদার। ভয়ের কিচ্ছুটি নেই।”
“কিন্তু সাহেব, আমরা না হয় অপদেবতায় ভয় করি, কিন্তু হাতিগুলি কী কারণে ভয় পাচ্চে, বলতে পারেন? তা ছাড়া… ডালাটা ওপড়ানোর সময়ে আবছা আবছা যেন দেখলাম, একটা কুচকুচে কালো ধোঁয়ার ঝলক যেন ছিটকে বেরিয়ে গেল ওইখান থেকে! চোখের ভুল হবেও বা।”
এ প্রশ্নে শংকরের কপালে ভাঁজ পড়ল। এ কথাটা ফ্যালনা নয়। গভর্নমেন্টের এই হস্তীবাহিনী নিয়ে শংকর আগেও বহুবার কাজ করেচে। এদের ভয়ডর নেই। রাতবিরেতে মশাল জ্বেলেও এরা কাজ করতে পারে। কিন্তু আজ হয়েচেটা কী? ধূলিমলিন, পরিত্যক্ত বাক্সটাকে দেখে বাঘ দেখার মতো ছটফট করচে কেন এরা?
শংকর যখন আজকের মতো কাজ স্থগিতের হুকুম দিয়ে চায়ের দোকানে আবার এসে বসল, তখন কয়েকজন উৎসাহী গাঁয়ের লোক তাকে ঘিরে ধরল। শংকর তাদের সব কথা মোটামুটি বলার পর তারা ঘটনাটা ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে পারল না। এমন উদ্ভট বাক্সের কথা কেউই শোনেনি তারা। এককোণে বাংলোর চৌকিদার বৃদ্ধ কেশব আর কয়েকজন বৃদ্ধ চালভাজা খাচ্চিল, হঠাৎ সাহেবের দিকে চোখ পড়ায় কেশব তড়িঘড়ি খাবার লুকিয়ে, হাত মুছে এসে হাতজোড় করে কইল, “সাহেব, আপনার কিছু হয়নি তো?” শংকর বাংলোয় উঠেচে, তার পর থেকেই কেশব তার রান্নাবান্না, খিদমত করচে। লোকটি মন্দ নয়, তবে কানে বড়ো খাটো। শংকর বলল, “আমার আবার কী হবে?”
কেশব কানে হাত পেতে, সাহেবের ওষ্ঠাধর নড়া দেখে কথাটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করচে, তখন বুড়ো রামচরণ কইল, “না, ওইদিকে রেলপাটিতে ধস পড়েচে শুনলাম যেন?”
দোকানি এসে আবার চা দিয়ে গেল। কেশব সাহেবের সামনে উশখুশ করচে দেখে শংকর নির্লিপ্ত স্বরে কইল, “খাও খাও, চায়ের নেশায় দোষ নেই।” এই বলে রামচরণকে উদ্দেশ করে শংকর বলল, “ধস পড়েনি খুড়া, খুঁটি উপড়ে একখানা বাক্স বেরিয়ে পড়েছে।”
রামচরণ তেমন একটা অবাক হল না। নির্লিপ্ত কণ্ঠে একটা নিশ্বাস ফেলে কইল, “বাক্স? তাতে আর আমাদের কী! টাকাপয়সা, বসনভূষণ যা থাকে, সবই তো শুনি গভর্নমেন্টের কোশাগারে সেঁধোয়। তা-ই নয়, সাহেব?”
শংকর উত্তর দিলে, “হাঁ, আইন তা-ই বটে, তবে এ বাক্সে তেমন কিছু নেই সম্ভবত। অত বড়ো তোরঙ্গের যা ওজন, সেটুকু ছাড়া ভিতরে কিছু রয়েচে বলে মনে হচ্চে না। তোরঙ্গের উপরের কারুকাজ আর হাতলগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে ডালাটা খোলার চেষ্টা করতে হবে।”
“কারুকাজ? কীসের কাজ?”
“সূক্ষ্ম কাজ। খোপ খোপ চৌখুপি কাটা, তাতে লতাপাতার কাজ, কড়িবরগার কায়দায় লোহার পাত্তি এ মুড়ো-ও মুড়ো আটকানো রয়েচে।”
রামচরণ বিরসমুখে কইল, “এসব আর নতুন কী? ও তো থাকারই কথা। ওইগুলোকে টানা আর বাখরা বলে। ওই দিয়েই সিন্দুক আর তোরঙ্গের লোহার চাদরের বলবৃদ্ধি হয়।”
শংকর মরিয়া হয়ে বলে উঠল, “এবং ডালার ঠিক মাঝখানে একখানা লৌহনির্মিত সিংহের মুখ, তার চারখানা শ্বদন্ত, আর তোরঙ্গের ভিতরে একখানা কুকুরের…”
এতক্ষণের উদাসীন, নির্লিপ্ত রামচরণ হঠাৎ চমকে কেঁপে উঠল! তার কম্পিত হাত থেকে চায়ের পাত্র সশব্দে পড়ে চূর্ণ হয়ে গেল! শংকর হতবাক হয়ে দেখল, বাকি দু-তিনজন বৃদ্ধ হতবুদ্ধির ন্যায় চেয়ে রয়েচে রামচরণের দিকে। প্রায় বধির কেশব তার সঙ্গীর এই ভাবান্তর দেখে বিস্মিত হয়ে শুধোল, “হল কী, রামা? শরীরটে কি…?”
রামচরণ সশঙ্ক চাহনিতে বৃদ্ধদের দিকে তাকিয়ে বললে, “দিনের আলো থাকতে থাকতে গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো সকলকে ঘরে আগল দিতে বলো গাঙ্গুলি! সূর্য পাটে গেলে একটাও মনিষ্যি যেন পথে না বেরোয়! বড়ো সর্ব্বনাশ হয়েছে! এ সর্ব্বনাশা পাপ যে গাঁয়ের মাটির নীচেই লুকোনো আচে, তা আমার ধারণা ছিল না!”
শংকর ভ্রূ কুঁচকে শুধোল, “বাক্সটা উঠেচে বলে সকলকে লুকিয়ে পড়তে হবে? এসব কথা শুনতে পেলে একটাও কুলিকামিন কাজ করবে আর? তা-ও বলি, কীসের বাক্স ওখানা?”
শংকরের প্রশ্নের উত্তরে বৃদ্ধ রামচরণ শংকরের দিকে বিন্দুমাত্র দৃপাত না করেই, গাঙ্গুলির চোখের দিকে চেয়ে অসহায় স্বরে বললে, “ডাকিনীর তোরঙ্গ!”
বুড়া গাঙ্গুলি প্রথমটা ভ্রূ কুঞ্চিত করে যেন কিছু স্মরণ করল, আর তারপরই বজ্রাঘাতে শুষ্ক কদলীবৃক্ষের ন্যায় তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল! শুষ্ক কণ্ঠে সে বলে উঠল, “কী সর্বনাশ, রামা! কী ভয়ানক! এই আপদ তবে গাঁয়েই রয়ে গিয়েচে?” এইটুকু বলে, দ্রুত এলোমেলো পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল গাঙ্গুলি।
***
এই ঘটনার ঠিক পরের রাতেই রামচরণ প্রাণ হারায়। সে কথা তোমাদের শুরুতেই বলেচি। শংকর প্রেতযোনিতে ঘোর সন্দিহান হলেও, তার মনেও সন্দেহের বিষধর কীট প্রবেশ লাভ করেচিল। শংকর মনে মনে ভাবচিল, যদি গাঁয়ের অতিবৃদ্ধ মানুষগুলোর ভয়টা অমূলক না-ই হয়ে থাকে, তবে দ্বিতীয় পালা কার? আমি হলফ করে বলতে পারি, শংকরের মনে যখন এই চিন্তাভাবনা চলচিল, তখন নিয়তি সবার অলক্ষে তার দিকেই নিজের তর্জনী ইঙ্গিত করে অট্টহাস্য করেচিলেন।
পরদিন শংকর বেলা থাকতে গিয়েছিল একটা সাইটের পর্যবেক্ষণে। ইস্টিশনের দিকে নয়, অন্যদিকে। ডাকিনীর বিল তালুকের পূর্ব্ব ও পশ্চিমের দু-পাশে দুইখানি বিরাট গাঁ। একটির নাম গন্ধখোলা, অপরটি নিশুন্দি। কোন পাশে কোন গাঁ ছিল, তা আজ এতদিন পরে আমার স্পষ্ট স্মরণ নেই, তবে যতদূর মনে পড়ে, শংকরের ঘটনাটা নিশুন্দি গাঁয়েই হয়েচিল। ডাকিনীর বিল থেকে নিশুন্দি যেতে হলে মাঝে একখানা শুকনো নালা পড়ে। প্রজারা যাতায়াতের জন্য নালার উপর শাল গাছের দুখানি পোক্ত খুটি শায়িত করে, পাশাপাশি একগুচ্চ দড়ির টানা দিয়ে রেখেচে। ওই দড়ি ধরে খুঁটি দিয়ে হেঁটে ওপারে গেলেই নিশুন্দির মাটি। তো, শংকর নিশুন্দিতে পৌঁছে একখানা টিলার উপর বসে ওদিকের পাহাড়ি পথের নকশা আঁকচে। কোম্পানির রিক্লামেশন বিভাগ থেকে হুকুম এসেচিল, যদি বিল্স হল্ট ইস্টিশন ছাড়াও অপর কোনও বিকল্প পথ শুধুমাত্র মালগাড়ির জন্য পাওয়া যায়। এইদিকে একখানা জরাজীর্ণ, বহু পুরাতন, অব্যবহৃত রেলপথ রয়েচে। বহু বৎসর পূর্ব্বে এই পথে রেলগাড়ি আসত, কিন্তু মরিচা ধরে, ভূগর্ভে বসে গিয়ে, সে রেলপথ একেবারে বিনষ্ট হয়ে গিয়েচে। পাহাড়ের নীচে একটা মরিচা ধরা, ভগ্ন ইঞ্জিন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে অতীতের গৌরব রোমন্থন করচে।
শংকরের আঁকা শেষ হলে পর শংকরের মনে হল, এই লুপ্ত রেলপথ কিছুতেই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তার চেয়ে নতুন পথেই রেল চলা উচিত। খাতাপত্তর গুটিয়ে নিয়ে শংকর টিলা থেকে নেমে বাংলোর পানে এগোনোর সময়ে খেয়াল করল, আকাশ আচমকা ঘন মেঘে ঢেকে গিয়েচে। ঝোড়ো বাতাস আরম্ভ হল একটু পরেই। শংকর এতক্ষণের পরিশ্রম সংবলিত খাতাটা পোশাকের আড়ালে নিয়ে হনহন করে পা চালাল। ডাকিনীর বিল আসতে যখন আর সামান্যই বিলম্ব, হঠাৎ ঝড়টা যেন ফুঁসে উঠল। বৃষ্টিও নামল তেড়ে। শংকর আরও দ্রুত এগোতে এগোতে হঠাৎ থমকে গিয়ে দেখল, ঝোপের পাশে একটা বাছুর দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঠকঠক করে কাঁপচে। তার গলায় ওপড়ানো রশি এবং খোঁটা। হয়তো বৃষ্টি আর ঝড়ে দিশাহারা হয়ে খোঁটা উপড়ে পথ হারিয়ে ফেলেচে।
শংকর এগোতে যেতেই বাছুরটা করুণস্বরে ডেকে উঠল। অসহায় একটা ছোট্ট জীবকে এই দুর্যোগের সময় ফেলে যেতে সায় দিল না শংকরের মন। সে নীচু হয়ে খোঁটাটা ধরে কইল, “অ্যাই, চল চল।”
বাছুর তিড়িং তিড়িং লাফিয়ে চলতে শুরু করল মহা আনন্দে। যার বাছুর, তাকে কালকে ফিরিয়ে দিলেই হবে। নালা পেরিয়ে, ডাকিনীর বিলের পথ ধরে চলতে চলতে সামনে চলা শংকরের মনে হল, হাতের দড়ির টানটা যেন হঠাৎই অনেকগুণ বেড়ে গিয়েচে! যেন কোনও গুরুভার জন্তুকে টেনে নিয়ে চলেচে সে দড়ি বেঁধে! পিছনে না তাকিয়েও শংকরের মুখ শুষ্ক হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে আরেকটা কথা মনে পড়ায় শংকর থরথর করে কেঁপে উঠল। তা-ই তো!
এই একটু আগেই যে দুখানি শালখুঁটির সংকীর্ণ সাঁকোটা তারা পেরিয়ে এল, তা পেরোনো কোনও গো-মহিষাদি প্রাণীর পক্ষে আদৌ সম্ভব? অথচ অবলীলায় সেই সাঁকোটা পার করেচে বাছুরটা! একটা আপত্তিসূচক বা ভীতির ডাকও ডাকেনি সে। শংকরের হাতের দড়ির টানটা ঢিলা হল। শংকর মনে প্রমাদ গনল। তার মানে জন্তুটা নিঃসাড়ে তার পিছনে আরও এগিয়ে এসেচে!
শংকরের পিঠে একটা ফোঁস করে সজোরে নিশ্বাস এসে পড়ল। শংকর পরিষ্কার টের পেলে যে, তার ঠিক পিছনে যে জন্তুটা ওঁত পেতে তার দিকেই চেয়ে রয়েচে, সেটা কিছুতেই বাছুর নয়। খুব বড়ো, খুব শক্তিশালী ও শ্বাপদজাতীয় কিছু! শংকর মরিয়া হয়ে সবেগে পিছনে ঘোরামাত্র গালে এসে পড়ল একটা প্রচণ্ড বেগের থাবা। শংকর আছড়ে কাদার উপর পড়ে গিয়ে প্রাণভয়ে কাঁপতে থাকল। তার সামনে যে মূর্ত্তিটা দাঁড়িয়ে আছে, কোনও মানুষ অতি ভয়ংকর দুঃস্বপ্নেও তাকে দেখতে চাইবে না। শংকর কাদামাটি মাখা মেঠোপথে হামাগুড়ি দিয়ে প্রাণভয়ে এগিয়ে চলেচে। পিছনের জন্তুটাও যে নিশ্চল নেই তা স্থানে স্থানে জমা জলের উপরে ছপাৎ ছপাৎ করে পায়ের শব্দ শুনে টের পাওয়া চলে। হঠাৎ একটা গুরুভার জান্তব পা চেপে বসল শংকরের পিঠে। শংকর ইষ্টদেবতা স্মরণ করে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে জেদের বশে ঘুরে গেল উলটোদিকে। জন্তুটা মারণ আঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েচিল শিকারের মেরুদণ্ড বরাবর, কিন্তু শংকর ঘুরে তাকাতেই জীবটা হঠাৎ এক পলকের জন্য থমকে গেল, আর শংকরকে ভীষণ চমকে দিয়ে, একটা নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসে উঠে একলাফে ছিটকে গেল ঝোপের ওপারে! তার অপস্রিয়মাণ গর্জনের সঙ্গে হতাশা, ক্রোধ আর ক্ষোভ ঝরে পড়ছে।
শংকরের লুপ্ত চৈতন্য যখন ফিরল, তখন অনেক রাত্তির। তার গোটা শরীরে অসহ্য যাতনা। হাত দুটো প্রায় আড়ষ্ট। অবশ্যম্ভাবী নৃশংস মরণ থেকে রক্ষা পেয়ে শংকর মনের জোরে হিঁচড়ে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে। এই দুদিনে কেউ যে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে খুঁজতে বেরুতে পারে, সে আশা করাই বাতুলতা, কিন্তু বাংলোর কাছাকাচি পৌঁছে শংকর দেখলে, কয়েকখানা মশাল সেখানে ঘোরাফেরা করচে। সব শক্তি একত্রিত করে একটা অসহায় আৰ্ত্তনাদ করে শংকর পুনরায় বিগতচেতন হয়ে শুয়ে পড়ল। আবার যখন জ্ঞান ফিরল, তখন বাংলোর চৌকিদার কেশব তাকে কপালে জলসেঁক করচে। শংকরের মুখের আঁচড়গুলো তার মুখকে কিছুটা বিকৃত করে ফেলেচে। শংকরের পোষ্য কুকুর ভূমি বসে বসে প্রভুর হাত চেটে দিচ্চে।
***
ডাকিনীর বিলের মতো দরিদ্র তালুকে নব্বই ভাগ গৃহই মৃত্তিকানির্মিত। পরদিন সকলেই যে যার গৃহের আগল এঁটে নিজেদের বন্দি করেচে সূর্যাস্তের পর। তারা বিলক্ষণ টের পেয়েচে এই অশুভ অশনিসংকেত। শংকর ডাকবাংলোর বিরাট কক্ষে তেলের বাতির আলোতে বসে ভীষণ চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়ল। ভূতপ্রেতে তার বিশ্বাস নেই, কিন্তু রামচরণের নৃশংস আর পৈশাচিক হত্যার বহর সে নিজেই দেখেচে। তার সঙ্গেও যে ঘটনাটা ঘটল, তা কখনও লৌকিক ঘটনা হতেই পারে না। কোন পুণ্যবলে সেই সাক্ষাৎ পিশাচ তাকে বধ করার পূর্ব্বেই নিষ্কৃতি দিয়েচে, সেই রহস্য শংকর উদ্ধার করতে পারেনি, কিন্তু সাহেবের গলায় ছেলেবেলায় তার পিসিঠাম্মার দিয়ে-যাওয়া রুদ্রাক্ষের মালা দেখে কেশব বলেচিল, “ভগবান শংকরের এই রক্ষাকবচের জোরেই রাক্ষসীটা আপনার প্রাণহানি করতে পারেনি, সাহেব। মন্তরে বাঁধা রুদ্রাক্ষের অনেকরকম ক্ষমতা। আমার যদি এমন একখানা থাকত…”
ঘাতক যে বা যারাই হোক, তারা অসহায় বুড়ো রামচরণকে হত্যা করেচে যে দিন, ঠিক তার আগের দিনই কিন্তু রামচরণ গাঁয়ের আসন্ন তাণ্ডবের কথা বলেচিল। এই ভয়ানক নরমেধে যে আহুতি দিয়েচে, তার সঙ্গে কি লোহার তোরঙ্গের কোনও সম্পর্ক রয়েচে? হয়তো রয়েচে। সেদিনের কালো ধোঁয়াটা কি সর্দ্দারের চোখের বিভ্রান্তি ছিল? ভিতরে কুকুরের কঙ্কালের ন্যায় বিনষ্টপ্রায় ওই হাড়গুলো কীসের? এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ফলে ইস্টিশনের গায়ে কুলিদের বস্তিতে কিছুটা চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বটে, কিন্তু কাজ বন্ধ হয়নি। কিন্তু যদি এই হত্যাই শেষ হত্যা না হয়? যদি সেই অশরীরী ঘাতকের ক্ষুধা প্রশমিত না হয়ে থাকে? তবে পরের পালা কার? শংকর মাথা নীচু করে গাঁয়ের আপাত পরিচিতদের মধ্যে থেকে পরবর্ত্তী সম্ভাব্য শিকারের মুখটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগল, আর যখন কূলকিনারা না পেয়ে মাথা তুলল, তখন দেওয়ালে ঝোলানো উডপেস্টের বিলিতি আয়নায় নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল।
শংকর বড়ো হয়েচে বাঙ্গালা মুলুকের নবদ্বীপে। শংকরের পিতা ধূর্জটিপ্রসাদ যখন ছোটো, তখন থেকেই ধূর্জটি মানুষ হন তাঁর পিসিমার গৃহে। শংকরের ঠাকুরদা ছিলেন একজন ভবঘুরে, পাগলাটে গোছের জ্ঞানী মানুষ। একদিন ঝড়বৃষ্টিতে তিনি বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। তখন ধূর্জটিপ্রসাদ অনেক ছোটো। তিনি মাতৃস্নেহে লালিত হন তাঁর পিসিমার কাছে। শংকর যখন বেশ ছোটোই, তখন হঠাৎ একদিন সাপের ছোবলে মৃত্যু হয় ধূর্জটিপ্রসাদের। শংকরের মনে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে চলল, বজ্রাঘাত, সাপকাটি আর বাঘের কামড়—এই তিন মৃত্যুই নাকি অপঘাতের মধ্যে ভয়ংকরতম। তবে কি শংকরের জীবনও এই অখ্যাত গাঁয়েই সমাপ্ত হতে চলেচে? কিন্তু শুধু শংকর কেন, বাকিদেরকেও যে ওই নরঘাতী পিশাচটা রেয়াত করবে, তা তো বোধ হয় না।
শংকরের ললাট কুঞ্চিত হয়েই রইল। পায়ের কাছে চৌপাইয়ের নীচে থাবার মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েচে ডুমি। ডুমি দিশি কুকুর, কিন্তু অসম্ভব সাহস এবং ততোধিক ক্ষিপ্রতা। শংকর মাথা থেকে দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আপিসের কিছু পত্র লিখতে বসল। কিছু কাজকর্মের ফিরিস্তি লিখল, কিছু মালপত্রের হিসেবপত্র, এবং শেষে কয়েকখানা রঙিন চিঠির কাগজ নিয়ে তার আপিসের সহকর্মী বন্ধুকে পত্র লিখতে আরম্ভ করল,
‘প্রিয় সুহৃদ,
তোমার এই সাইটে দায়িত্ব নিয়ে আসার কথা শুনেচিলাম ফার্লন সাহেবের মুখে। মাসখানেক পরই হয়তো তুমি এসে পড়বে, ততদিনে আমাদের কাজ এই ডাকিনীর বিল ছাড়িয়ে মুড়াডিহিতে গিয়ে উঠবে হয়তো। তবে কয়েকখানা কথা তোমাকে জানানোর ছিল বলেই আপিসের লেফাফা ছেড়ে এই ব্যক্তিগত চিঠি লিখছি। শোনো মন দিয়ে…’
শংকর চিঠি রচনা সমাধা করে ডাকবিভাগের রঙিন লেফাফায় সেখানা ভরে, আঠা দ্বারা মুখ বন্ধ করে, টেবিলের টানা খুলে ঢুকিয়ে রেখে পরবর্ত্তী পত্রে হাত দিতে যাবে, হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল করে চমকে উঠল। ভূমি কাঁদচে। ঠিক দুঃখের কান্না নয়, সাহসী কুকুরটা কিছু একটা দেখে ভয়ানক ভয় পেয়েচে। ল্যাজটা পেটের তলে সেঁধিয়ে সে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে কুইকুঁই শব্দ করে অনবরত কাঁদচে। শংকর কিছুটা অবাক হল। এই ডুমি আদাড়েবাদাড়ে মরা পাখি খুঁজে আনে রাতের আঁধারেও। একাই। সেই কুকুর বন্ধ ঘরে ভয় পাচ্চে কী কারণে?
শংকর কলম, দোয়াত সরিয়ে রেখে হতভম্ব হয়ে লক্ষ করল, কুকুরটা ঘরের দেওয়ালে ছাতের দিকে তাকিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠচে। শংকর দেখল, সেদিকে দুই দেওয়ালে দুখানি চওড়া, শান-বাঁধানো তাক ছাড়া আর কিছু নেই। কী আছে ওই তাকে? ডুমির নজর লক্ষ করে একটু পরেই শংকরের শিরদাঁড়া শীতল হয়ে এল। ভূমি যা দেখে এতখানি ভীত হয়েছে, সেইটা কোনও জড়বস্তু হতে পারে না! কেউ একটা সচল অবস্থায় এক তাক থেকে আরেক তাকে লাফিয়ে পড়ছে। আবার কখনও সেখানে বসেই ঠান্ডা দৃষ্টিতে নিশ্চয়ই তাদের দিকেই চেয়ে দেখচে! ডুমি পাগলের মতো হয়ে উঠল। ক্রমে সে শংকরকেও আর মান্য না করে চৌপাইয়ের তলে গিয়ে লুকোল। তার কুইকুই বিলাপ এখন সামান্য হ্রস্ব হয়েছে। শংকর তাকে ডাকতে যাচ্চে, সহসা বাইরে থেকে খুব সতর্ক এবং সাবধানি কন্ঠে সে শুনতে পেল চৌকিদার কেশবের ডাক, “সাহেব, সাহেব, দয়া করে দোর খুলুন সাহেব।”
শংকর এই উদ্গ্রীব গলার স্বরে টের পেল, কেশব কোনও কারণে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে রয়েচে। শংকর উত্তর দিলে, “এত রাতে? কী হয়েচে?” কেশব তার ক্ষীণ শ্রবণশক্তিতে সে কথা শুনতে পেলে না। সে আবার চাপা স্বরে ডাকল, “ও সাহেব, শিগগির কপাট খুলুন সাহেব।”
শংকর মনে মনে ভাবল, বাইরে কেশবের রূপে যদি সত্যিই কোনও ‘ভয়’ অপেক্ষা করে থাকে, তবে সেই রাক্ষস কখনোই দরজা খোলার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। সে এগিয়ে গিয়ে দোরের আগল উন্মুক্ত করে, শিকলি নামিয়ে কপাট খুলে দেখল, বাইরে জোলো হাওয়া বইচে, আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকানি দিচ্চে। কেশব দোরের একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ততক্ষণে আবার দোরে টোকা দিতে যাচ্চে, তখনই সাহেবকে দেখে সে বলে উঠল, “সাহেব, ভয়ানক কাণ্ড ঘটেচে। একটা রাক্ষুসে জন্তু ধরা পড়েচে নালচের মোড়ে। ওই পারে। ওদিগড়ের রায়তরা জাল পেতে রেখেচিল শেয়াল ধরার জন্য, সেই ফাঁদে ধরা পড়েচে যে পশুটা, সেইটা যে কী জন্তু তা ঠাহর করা সমস্যা। ঠাকুর ঠাকুর। কী ভয়ানক চোখ-মুখ, কী রাক্ষুসে তার শরীর। আপনি বন্দুকটা নিয়ে এখুনি চলুন, সাহেব। ওই জালে কতক্ষণ ওই দানবকে ঠেকানো যাবে, তা বলা কঠিন।”
জন্তুটা যে ঠিক কতখানি দানবীয়, তা শংকরের জানতে বাকি নেই। সে ঘরে প্রবেশ করে নিজের সাড়ে তিনশো ম্যাগনামের ভারী রাইফেলটার দুখানি নলেই গুলি ভরে, আরও একটি গুলি সঙ্গে নিয়ে, ভুমির জলের পাত্রে কুঁজো থেকে জল বদলে দিয়ে, কপাট বন্ধ করে হাঁটা দিল কেশবের সঙ্গে। এই প্রথম ভূমি তার প্রভুর সঙ্গী হল না। কিছু দূর চলার পর নালার সাঁকোটা পেরোনোর সময়ে আরও দূরে অনেকগুলি মশালের আলো চোখে পড়ল। শংকর আন্দাজ করল, জায়গাটি নিশুন্দির অকেজো রেললাইনের দিকটায়, সেদিন যেখানে বসে শংকর ভৌগোলিক মানচিত্র তৈরি করচিল। রাইফেলের সেফটি বোল্ট তুলে দিয়ে, সেটাকে বাগিয়ে ধরে সাবধানে চলল শংকর, যাতে খানাগুন্দে পা পড়ে আচমকা ভারী গুলি না ছুটে বেরোয়।
বেশ কিছুক্ষণ মরচে ধরা রেলপথ অতিক্রম করার পরে যখন শংকর নিশুন্দির সীমানাও পার করতে চলল, তখন হঠাৎ শংকরের মনে ধন্দ এবং সন্দেহ উপস্থিত হল। আর কতদূরে রয়েচে মশালধারী লোকজন? এখন আর সেসব আলো চোখে পড়ছে না কেন? একেই তুমুল উত্তেজনার মধ্যে কখন যে ভীষণ তোড়ে ঝড়বৃষ্টি, বজ্রপাত আরম্ভ হয়েচে, তা লক্ষ করেনি শংকর। এইবার সংবিৎ ফেরায় সে দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ ঘুরিয়ে চাপাস্বরে করে বলে উঠল, “এ কী! কোথায় সেই জন্তু? কোথায় লোকজন! কোথায় নিয়ে চলেছ আমাকে?”
শংকর আগ্রহের বশে কেশবের অনেকটা আগে আগেই চলেচিল। কেশব তার পিছনে চলতে চলতে হঠাৎ যেন মোহভঙ্গের ন্যায় ঘোরের থেকে জাগ্রত হয়ে চারদিকে তাকিয়ে ভীষণ চমকে উঠল! যেন এতক্ষণ ধরে সে পথ দেখিয়ে আনেনি। যেন তাকে নিদ্রা থেকে টেনে নিয়ে এসে আচমকা এই কান-ফাটানো ঝড়বৃষ্টিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েচে কোনও ঐন্দ্রজালিক। সে হতবুদ্ধি হয়ে একবার চারপাশে, আরেকবার সাহেবের উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্রের দিকে চেয়ে কেঁপে উঠল। শংকরের থেকে হাত পনেরো দূরে লাইনের উপরে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে শিশুর ন্যায় কাপচে এই বৃদ্ধ চৌকিদার। ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা কিছুর শোঁ শোঁ শব্দ হচ্চে, যা ঝড়কে ছাপিয়ে কানকে বধির করে তুলচে। শংকর আবার ফিশফিশ করে শুধোল, “কী হল? বলো? এই রাতে কেন ডাকলে আমাকে?”
বৃদ্ধ কেশবের ঠোঁট দুটি বাকরুদ্ধ জীবের মতো নড়ল, কিন্তু তা থেকে কোনও ভাষা নির্গত হল না। সেই শোঁ শোঁ কর্ণবিদারী শব্দটা শতগুণ বেড়ে গিয়েচে। বৃদ্ধ বিস্ময়াকুল দুর্বল চক্ষে তার সাহেবের দিকে চেয়ে রয়েছে। শংকর যদিও বুঝতে পারচে যে, কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল নিশ্চয়ই হচ্চে, তবু সে আবার নীচুস্বরে ধমক দিল, “কী হল, উত্তর দাও। ডাকলে কেন?” সাহেবের মুখে নিজের অজানা এই বিস্ময়কর অপবাদ শুনে কেশব ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অবিশ্বাসের সুরে ফলে উঠল, “অসম্ভব। অসম্ভব! এখুনি পালাও সাহেব! এ কী করে সম্ভব?” শংকরের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল।
“আলবত সম্ভব। মিছে কথা বলছ কেন? তুমি একটু আগে বাংলোয় গিয়ে ডাকোনি আমাকে?”
কেশব দুই হাত আর মাথা নেড়ে চিৎকার করে কইল, “না, না, ডাকিনি সাহেব, ডাকিনি। এ যে অসম্ভব।”
শংকর আরও কিছু কইতে যেত হয়তো, কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে একটা ভয়ংকর ঘড়ঘড় জাতীয় শব্দ সজোরে ধেয়ে এল। শংকর ঘাড় ঘোরানোমাত্র তার অন্তরাত্মা আতঙ্কে শুষ্ক হয়ে এল। সে তৎক্ষণাৎ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারল যে, ঠিক কীসের শব্দকে লুকোনোর জন্য এই ঘনঘন বজ্রপাত আর ঝড়ের দরকার পড়েছে। নিশুন্দির বহুকালের বাতিল রেললাইন ধরে সবেগে ধেয়ে আসচে বহু বৎসর ধরে মরিচা আর লতাপাতায় ছেয়ে-থাকা পাহাড়ের নীচের সেই বাতিল, বিকল এঞ্জিনটা! কোনও এক অদেখা অশরীরী যেন তার লোহার দেহে ভর করে তার অকর্মণ্য শরীরটাকে দানবের মতো ছুটিয়ে নিয়ে আসচে কোনওরকম ইন্ধন ছাড়াই! শংকর ঠিকঠাকভাবে বিপদটা বুঝে ওঠার আগেই সেই রাক্ষুসে লৌহদানব ছুটে এল তার মুখের সামনে, এবং একটা দমকা, জোরালো বাতাসের তাড়নায় শংকর ছিটকে পড়ল লাইন থেকে বাইরের ভিজে মাটিতে। তার ছিটকে-যাওয়া ম্যাগনাম থেকে ছুটে বেরোলো লক্ষ্যহীন গুলি। বুভুক্ষু দানবটা অসহায় বৃদ্ধ কেশবকে নিজের চাকার তলে টুকরো করে দিয়ে যেন ক্ষুব্ধ হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল। শংকর কোনওমতে প্রাণের তাগিদে উঠে দাঁড়িয়েই এলোমেলোভাবে, প্রায় আছাড় খেতে খেতে দৌড়োতে আরম্ভ করল বাংলোর পানে। পিছন থেকে একটা হায়নার মতো হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাসি ভেসে এল, সেই সঙ্গে শিকার হাতছাড়া হবার আক্ষেপ। দৌড়োতে দৌড়োতেই শংকর সভয়ে নিজের রুদ্রাক্ষটা চেপে ধরে থাকল। কেশবের কথাগুলো এখনও কানে ভেসে আসচে,
“মন্তর-পড়া রুদ্রাক্ষের অনেকরকম রক্ষাগুণ, সাহেব… আমারও যদি এমন একখানা থাকত…।”
শংকর টলোমলো পায়ে ডাকিনীর বিলের দিকে দৌড়ে আসার সময়ে নিশুন্দির নালায় পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পায়, তারপর বেদনা অগ্রাহ্য করেই প্রাণভয়ে গাঁয়ের চণ্ডীমণ্ডপে কোনওমতে প্রবেশ করে লুকিয়ে থাকে। গাঁয়ের লোকজন যখন একটি-দুটি করে পথে বেরিয়েচে, তখন শংকরের ধুমজ্বর। সে চণ্ডীমণ্ডপে শুয়ে শুয়ে ধুঁকচে। নাপিত কান্তা তাকে কোলপাঁজা করে তুলে বাংলোয় নিয়ে গিয়ে ভাঁজ-করা খাটে শুইয়ে দিয়ে যখন বেরিয়ে আসচে, শংকর একগুচ্চ চিঠি আর দুটো টাকা তার হাতে দিয়ে কইল, “তোমার নাম জানিনে বাবা, তুমি আমার এই চিঠি কখানা কাউকে দিয়ে নীচের পোস্টবাক্সে ফেলে দিতে পারো? বড়ো জরুরি।” কান্তা টাকা দুটি খাটে রেখে দিয়ে কাগজগুলো হাতে নিয়ে কইল, “আজ্ঞা সাহেব।”
***
তিন দিন কি চার দিন কেটে গিয়েচে। একটি করে দিন বাদ দিয়ে চার দিনে দুবার নৃশংসভাবে নরহত্যা করেচে সেই সাক্ষাৎ শমন। প্রথমবার গাঁয়ের গৌরহরি সামন্ত সদরে যাবার জন্য গাড়োয়ান চিনিবাসের মোষের গাড়ি ভাড়া করে রওয়ানা দিয়েচিল দ্বিপ্রহর নাগাদ। তার নাকি সদরে কিছু কাজের বরাত রয়েচে। গৌরহরি কাঠের চালান দেয় সদরে, কিন্তু গাঁয়ের প্রবীণরা বেশ আঁচ করেচিলেন যে, গৌরহরি এই অভিশপ্ত গাঁ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্চে লটবহর নিয়ে। তো, চিনিবাসের গাড়ি যখন ধুয়ানালার সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করেছে, হঠাৎ ঝড় আরম্ভ হল। গুহার একমুখ দিয়ে গরম হলকা হাওয়ার স্রোত যেন ষাঁড়াষাঁড়ি বানের ন্যায় গাড়িটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইচে।
চিনিবাস হঠাৎ একটু চমকে উঠল। তার হঠাৎ মনে হল, বাতাসের স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ছাড়াও আরেকটা কিছু যেন সবেগে ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে। ভিতরের এতক্ষণের উষ্ণ বাতাসের প্রবাহ হঠাৎ এক মুহূর্ত্তের মধ্যে অত্যন্ত শীতল হয়ে উঠল। চিনিবাস গাঁয়ের ছেলে। সে এমন বহু ঘটনার কথা শুনে শুনে বড়ো হয়েচে। সে স্পষ্ট টের পেলে, গুহায় তারা ছাড়াও আরেকটি সত্তার আবির্ভাব ঘটেচে! মোষগুলো হঠাৎ দড়ি ছিঁড়ে দৌড় দিলে গুহার মুখের দিকে। চিনিবাস হায় হায় করে উঠে রশি নিয়ে তাদের পিছনে দৌড়ে, সুড়ঙ্গের বাইরে এসে তাদের আটক করে শান্ত করচে, গৌরহরি আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে ছুটে বেরিয়ে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল। ভীষণ ভয়ে তার মুখে-চোখে বিকৃতি দেখা দিয়েচে। গলার স্বর প্রবল ভয়ে রুদ্ধ হয়ে গিয়েচে। দরিদ্র চিনিবাস কেঁদে উঠে কইল, “বাবু, আমার গাড়িটা?”
গৌরহরির নিজেরও যথেষ্ট মালপত্র রয়েচে সেই গাড়িতে। সে এই প্রশ্নে ভীষণ ক্রোধে কিছু একটা বলতে গিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিল। চিনিবাস অসহায় হয়ে বললে, “মরণ স্বীকার, বাবু, কিন্তু আমার গাড়ি গেলে অন্ন জুটবে না। আপনি একটু রশিটা সামলান, আমি একটিবার ভিতরে যাই।”
চিনিবাস কম্পিত পদক্ষেপে সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকল। ভিতরের তাণ্ডব থেমে গিয়েচে। দূরে আবছা আঁধারে গাড়িখানা দেখা যাচ্ছে। চিনিবাস পায়ে পায়ে গাড়ির কাচে গিয়ে ছইয়ের আবরণ তুলে ধরেই একটা ভীষণ চিৎকার করে, তার মহিষগুলি যে মুখে রয়েচে, তার উলটো মুখে এলোমেলো পায়ে ছুটতে আরম্ভ করল এবং কুলিদের বসতির কাছাকাছি এসে বেদম হয়ে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল। চেতনা হারানোর পূর্ব্বে কয়েকটি কুলিকামিনের ভয়ার্ল্ড প্রশ্নের উত্তরে চিনিবাস এটুকু বলতে পারল, “সামন্তবাড়ির কাঠবাবুকে শয়তানে খেয়েচে… আমার গাড়িতে।”
দূরে ধুয়ানালার ওপার থেকে মহিষের আর্তনাদ আর একটা রক্ত-জমাট-বাঁধা হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ চিৎকার ভেসে এল। সে অপয়া হাসি ধুয়ানালার আবদ্ধ সুড়ঙ্গের কর্কশ পাথুরে প্রাচীরে রণিত হয়ে শতগুণ বৃদ্ধি পেয়ে গাঁয়ের উপর দিয়ে বয়ে গেল। কুলিরা ভীষণ ভয়ে কানে হাত চাপা দিতে দিতে চিনিবাসকে টেনে কুটিরে ঢুকিয়ে দোরে আগল দিল।
***
পরের থাবাটা পড়ল দু-দিন পরে, চিনিবাসকে আশ্রয় দেওয়া কুলিদের বসতিতেই। ঠিক বসতিতে বলাটা ভুল হল। ছোকরা কুলি রামাই আর একটি অল্পবয়স্কা কামিন (তার নামটা ঘটনার সময়ে শুনেচিলাম, কিন্তু স্মরণ নেই), এই দুজনে মিলে একটু অধিক রাত্তিরে অস্থায়ী কুটিরে ছাওয়া বসতি থেকে বেরিয়ে পাশের জঙ্গলে ঘুরতে বেরিয়েচিল। ঘটনার অকুস্থলের ওই জঙ্গলটার নাম খাতায় কলমে পোড়ানালা -ব্লক টু। তো, তারা ঘুরতে ঘুরতে একটু গভীরে চলে আসে। এই বিপদের সময়ে তারা কেন পোড়ানালায় প্রবেশ করেচিল, তা আমার জানা নেই, তবে কামিনটি নাকি বহুবার নিষেধ করা সত্ত্বেও রামাই জেদ ধরে।
দুজনে মিলে বনের ভিতরের সরু প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটচে, হঠাৎ পাখির চিৎকারে দুজন চমকে উঠল! নিশুত রাতের নৈঃশব্দ্য ভেঙে খানখান করে একসঙ্গে শয়ে শয়ে পাখি ভয়ে চিৎকার করে উঠল, যেন গাছের উপর সহসা ভয়ানক কিছু একটা জিনিসের আবির্ভাব ঘটেচে! কামিন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলে ওঠে, “গাছের উপর কিছু একটা এসে বসেচে, রামাই! গতিক সুবিধের ঠেকচে না বড়ো। এখুনি ফিরে যাই চলো।” রামাই বেপরোয়া পরিশ্রমী মজুর। সে থুতু ফেলে দর্পের সঙ্গে কয়, “যে সম্বন্ধী সামনে আসুক, তাকে কচুকাটা করার জোর আছে এই হাতে। ভয় পাসনে হারামজাদি, বানরটানর এসে পড়েচে নির্ঘাত।” কামিন এ কথায় বিন্দুমাত্র আশ্বস্ত হল না। মেয়েমানুষের মনের ভিতরে ঈশ্বর যে অলৌকিক মাপকাঠিটি দিয়ে রেখেচেন, তাতে মেপে কামিন টের পেলে, গাছের উপরে বানরের থেকে সহস্রগুণ ভয়াবহ কিছু একটা বসে রয়েচে, যাকে পাখিগুলো আগে কখনও দেখেনি।
একটা ঝড়ের মতো বাতাস জঙ্গলে পাক খেতে আরম্ভ করেচে। হঠাৎ এক লহমায় একটা ছোঁ মারার মতো শব্দ শুনে, গতিক সুবিধার নয় দেখে কামিনটি ভীষণ ভয়ে তার সঙ্গীর হাত আঁকড়ে ধরে বলে, “রামাই, বড়ো ভয় করছে রে। চল, এখুনি ফিরে যাই।”
অপর পক্ষের কোনও উত্তর না পেয়ে কামিন ঘাড় ঘুরিয়েই প্রচণ্ড ভীতিতে বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে। তার হাত ধরে যে ভয়ংকর মূর্ত্তিটা ঘাড় বেঁকিয়ে দাড়িয়ে মুখের পানে চেয়ে রয়েচে, তার দিকে একটিবার চাইলেই হৃদ্যন্ত্রের সমস্ত ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে আসে। প্রেতমূৰ্ত্তিটা ভীষণ শব্দে কুটিল হাসি হেসে ওঠামাত্র কামিনটি ভুল বকতে বকতে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যন্ত্রের ন্যায় দৌড়োতে শুরু করে। তার চারপাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া রামাইয়ের গলার স্বর ভেসে আসচে, “আমায় ছেড়ে চলে যাস না তুই… আমাকে বাঁচা… আমাকে নিয়ে চল…।” কামিনের মনে হল, রামাইকে কেউ এক হ্যাঁচকায় তুলে নিয়ে গিয়েচে এই জগতের ওপারে। তাকে এই মাটিতেই কেউ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলেচে ভয়ংকর এক মরণের পানে, কিন্তু তার আর্তনাদটুকু ছাড়া তাকে চোখে দেখা চলে না।
কামিন যন্ত্রবৎ দৌড়ে এসে কুটিরের কুয়াপাড়ে ডাঁই করে-রাখা ঘটিবাটির উপর আছড়ে পড়ে। বাকি কুলিরা হইহই করে বেরিয়ে আসে। ভুল বকতে-থাকা কামিন কয়েকটি মুহূর্ত্তের জন্য একটু প্রকৃতিস্থ হয়েচিল, কিন্তু আবার সে ভুল বকা আরম্ভ করল, এবং ভোরের পূর্ব্বেই তার জীবনের সুতোয় টান পড়ল। ভোরের দিকে রামাইয়ের রক্তাক্ত পোশাকটা পাওয়া গেল বসতির মুখে।
***
কুলিরা দল বেঁধে স্থির করেচে, আর মাত্র দুটি দিনে নতুন লাইনটুকু পেতে দিয়ে তারা সাইট ছাড়বে। এই আপদ কখনও দূর হলে, তবেই কাজের কথা ভাববে তারা। ইস্টিশন অবধি নতুন লাইন বসে গিয়েচে, এইবার তার পর থেকে বাকিটুক বসিয়ে দিয়েই তারা বিদেয় নেবে। শংকর তাদের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। কৌন জোরে প্রতিবাদ করবে সে? আজ বিমর্ষ মুখে তারা লাইনের কাজ করে চলেচে। বেলা সামান্য বেড়েচে কুলি বসতিতে দ্বিপ্রহরের আহারের তোড়জোড় চলচে। কেশবচন্দ্রর অবর্তমানে সাহেবের অনুমতিসাপেক্ষে কুলি সর্দ্দার তাঁর আহারের আয়োজন করেচে নিজের মহল্লাতেই। কুলি-বউরা বড়ো পরিষ্কৃত রেলপাথরের পাটায় ঘষে ঘষে আদা, রসুন, পেঁয়াজ আর কাঁচালংকা বেটে চলেচে, সেই বাটনার সুঘ্রাণ চারদিক্ট আমোদিত করচে। শংকর একদৃষ্টে সেই বাটনা বাটার দিকে চেয়ে তার পিসিঠাম্মার কথা মনে পড়ে গেল। ঠাম্মা শংকরের মা-কে বলতেন, “বুঝলি বউ, হিরার কুচি কুটনা, গতর চেপে বাটনা, মশলা হবে চন্দন, তবেই হয় রন্ধন।”
শংকরের মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার কর্মহীন, অখণ্ড অবসরের দিনগুলোর কথা। প্রথম বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে দুই নদীর সংগমস্থলের খাঁড়িতে মাছ ধরা, দ্বিপ্রহরে নদীতে স্নান করে, একপেট মাছ-ভাত, পোস্ত, কলাইয়ের ডাল আর কাঁচকলাভাজা খেয়ে, পিসিঠাম্মার পানের পেতলের ডাবর থেকে পান চুরি করে মুখে পুরে, সোজা দোতলার শয়নকক্ষে দোর এঁটে উপন্যাস পড়া, অথবা আরামে নিদ্রা। আবার সাঁঝ নামলে ইস্টিশনের পাশে তেলের বাতি-জ্বলা নিবুনিবু বাজারের মাঝে গল্পসল্প করা। সেসব দিন কেন যে স্থায়ী হয় না কারও। রাত নামলে ভূতের গল্প শুনে, ভয়ে কাতর হয়ে পিসিঠাম্মার জর্দ্দার গন্ধে ভুরভুর কোলের কাচে লেপটে ঘুমোনো….
শংকরের সংবিৎ ফিরল ভারী হাতুড়ির লোহাপেটা শব্দে। আজ এই দিনের ফটফটে আলোয়, এতগুলো লোকজনের কর্মব্যস্ততার মাঝে বসে শংকরের মনটা যেন ভারমুক্ত হয়ে এল। রাতের পর রাত যে বিভীষিকা গোটা গাঁ-কে তাড়িয়ে বেড়াচ্চে, সেই অপচ্ছায়াকে দিনের আলো আর এতশত লোকের মাঝে এসে স্বপ্ন বলেই মনে হচ্চে এখন। দিনের রৌদ্রোজ্জ্বল আলোয় শংকরের এই বিপন্মুক্তির ধারণা যে ঠিক কতখানি ভ্রান্ত ছিল, তার প্রমাণ দেবার জন্য বোধ করি ওই দুর্ধর্ষ কুটিল শয়তান আড়ালে থেকে হেসে চলেচিল অলক্ষে। সে বোধ করি প্রমাণ করতে চায়, ছোটোবেলায় ঠাম্মার কাছে শংকরের শোনা সেসব গল্প একবিন্দুও মিথ্যা নয়। সে বুঝিয়ে দিতে চায় এই গ্রামটিকে, যে তার গতিবিধি কেবলমাত্র রাত্তিরের আঁধারেই গণ্ডি কাটা নয়। কুলি সৰ্দ্দার লক্ষ্মণপ্রসাদ কাজ করতে করতে বাকি কুলিদের কইল, “খাবারের গাড়ি আসচে। বস্তা আর টিনগুলো ওধারে নিয়ে রাখ।”
নীচের লাইন বেয়ে মালপত্র আর রেলের কর্মচারীদের যাতায়াত আর রসদ বহনের জন্য নিযুক্ত ছোটো রেলগাড়িটাকে ধূম নির্গত করতে করতে আসতে দেখা গেল। বাইরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা বলতে এটুকুই। শংকর লজ্জা পরিত্যাগ করে রেলের গাড়ির চালকের হাতে সদর আপিসে এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে একখানা চিঠি পাঠাবে বলে পকেটেই ভরে নিয়ে এসেচিল। সেইটা সদারের হাতে দিয়ে সব বুঝিয়ে দিলে পর সর্দ্দার ইস্টিশনের যাত্রী নামার পাটাতনের দিকে এগিয়ে গেল। শংকর একটু পরেই শুনতে পেলে, সদার কাদের যেন খুব বকাঝকা করে চলেচে।
লক্ষ্মণের মেজাজ হারানোর কারণটাও চোখে পড়ল অচিরেই। এই রসদবাহী গাড়িটা প্রায়শই যাত্রীশূন্য থাকে, ফলে কুলিদের একগাদা বাচ্চা, যারা গোটা রেলপাড় ধরে খেলে বেড়ায় সারাদিন, তারা গাড়িটা আসতে দেখলেই একছুটে চলে যায় ধুয়ানালার কাছাকাছি, আর রেলগাড়ির মুড়োটা গুহা থেকে বেরোলেই তারা লাফিয়ে উঠে পড়ে রেলগাড়ির বিনি পয়সার সওয়ার হওয়ার জন্য। হতদরিদ্রদের সন্তানের এর চাইতে ভালো মনোরঞ্জন আর কিছু হয় না, ফলে শংকর অথবা কুলিরা, কেউই তাদের নিষেধ করেনি কখনও। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। রামাই কুলির হত্যাকাণ্ডের পর সর্দ্দার কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেচিল বাচ্চাদের অবাধ ছুটোছুটির ব্যাপারে, কিন্তু দিনের বেলা কাজকর্ম সামলে বাচ্চাদের চোখে চোখে রাখা বড়ো দায়।
গাড়িটা ধুয়ানালার থেকে বেরোতেই হইচই করে গোটা পনেরো বালক-বালিকা উঠে পড়ল ধীরগতিতে বাঁক-নেওয়া বাষ্পযানের ইঞ্জিনের পরবর্ত্তী কক্ষে। শংকর একটু হেসে কইল, “আরে, ঠিক আছে, লাখন, এইটুকু তো পথ, তায় ভরা রোদের বেলা। ভয় নেই। আমরা এতজন রয়েছি তো।” সাহেবের কথা শুনে লক্ষ্মণ শান্ত হল। সকলেই নিজের কাজে মন দিয়েচে, আচমকা খাবারের টিন নিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা বয়স্ক কুলিটি ভয়ের স্বরে বলে উঠল, “হা ভগবান! সর্দ্দার… সর্দ্দার….।”
শংকরের চকিত দৃষ্টি ঘুরে গেল রেলগাড়ির পানে। কিন্তু এ কী! ফটফটে পরিষ্কার, মেঘমুক্ত আকাশে এমন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ উড়ে এল কোথা থেকে? না না, এ কখনও মেঘ নয়! কক্ষনো নয়! একটা কুণ্ডলী-পাকানো ধোঁয়ার পিণ্ড ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেচে ছুটন্ত গাড়িখানাকে লক্ষ্য করে! অলীক দর্শন বা বিভ্রান্তি কখনও নয়, ধোঁয়াটা সত্যিই উড়ে চলেচে। নীচে পড়া তার ঘন ছায়াটা একটা বিকটাকার পাখির ছায়ার মতোই শংকরদের অতিক্রম করে গেল। শংকর ভাঁজ-করা টেবিলে রাখা ম্যাগনাম রাইফেলটা হাতে তুলে ধরে, তার আড়াই প্যাঁচের অগ্নিবর্ষী নলটা তুলে ধরল সেই কুণ্ডলীর দিকে। কুলি-বউরা পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠল। লাখন আর বাকি কুলিরা হায় হায় করে উঠতে না উঠতেই কুণ্ডলীটা একখানা ক্ষুধার্ত্ত মাকড়জীবীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়ির উপরে। পলকের মধ্যে অত বড়ো লোহার গাড়িখানা এতগুলো মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেল। আকাশ বিদারণ করে একটা অপার্থিব হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হিংস্র হাসি যেন সকলকে বিদ্রূপ করে ভেসে ভেসে বেড়াতে থাকল সেই অন্ধকার কুণ্ডলীর ভিতরে। আঁধার পিণ্ডের ভিতর থেকে ছোটো ছোটো বাচ্চার অসহায়, ভয়ার্ত কান্নার শব্দ ক্ষীণভাবে ভেসে এল।
শংকর, লাখন, বাকি কুলিরা, এমনকি কামিনরা অবধি কাঁদতে কাঁদতে রাঁধাবাড়া ফেলে উন্মাদের ন্যায় ছুটতে আরম্ভ করলে ধুয়ানালার দিকে, যদিও তাদের অবচেতন মন জানান দিচ্চে, যতক্ষণে তারা অকুস্থলে পৌঁচোতে সক্ষম হবে, ততক্ষণে একটিও শিশুর চিহ্ন পাওয়া যাবে না। চালক বোধ করি এই আঁধারে হতভম্ব হয়ে গাড়ির গতি একেবারে শ্লথ করে এনেচে, লৌহকর্কটের ন্যায় গাড়িখানা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসচে। হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল করে শংকরের হাত-পা শীতল হয়ে এল। শংকরের প্রথমে ধারণা হয়েচিল, বাকি শিকারগুলির মতো এইবারও ওই সর্বনাশা, বুভুক্ষু প্ৰেত কচি কচি শিশুকে হিংস্রভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে হত্যা করবে ওই ধোঁয়ার যবনিকার আড়ালে, কিন্তু সেই প্রেতাত্মার কুটিল, বিকৃত বাসনা ছিল আরও ভয়াবহ। সকলে এইবার বেশ টের পেলে যে, ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা থেকে থেকে বিকট শক্তিতে ধাক্কা দিচ্চে রেলগাড়ির দেহে। সেই অমানুষিক বেগের ধাক্কায় অত গুরুভার গাড়িখানা যেন থরথর করে কেঁপে উঠে, লোহার পাতের থেকে ছিটকে যেতে চাইচে। লাখন সর্দ্দার বাচ্চা ছেলের মতো কেঁদে উঠে নিষ্ফল আক্রোশে লাইন থেকে পাপ্পুর তুলে ছুড়তে আরম্ভ করল অদৃশ্য হয়ে-যাওয়া যন্ত্রদানবের দিকে, যার পেটের ভিতর থেকে বাচ্চাদের কণ্ঠস্বর প্রায় স্তব্ধ হয়ে এসেচে ইতিমধ্যেই। শংকর কিছু ভেবে ওঠার পূর্ব্বেই ঘটে গেল বিরাট অঘটন। আরেকটি প্রচণ্ড অশরীরী ধাক্কায় ধূমকুণ্ডলীর ভিতর থেকে খড়কুটোর ন্যায় ছিটকে বেরিয়ে এল রেলগাড়ির কামরাগুলো, আর এক পলকের জন্য বাতাসে ভর করে বিকট শব্দে আছাড় খেয়ে, চুরমার হয়ে পড়ল নীচের গহিন খাদে। খাদের মধ্যে পাখির দল মহা আতঙ্কে একসঙ্গে কলরব করতে আরম্ভ করল। শংকর এতক্ষণের উত্তেজনা বিস্মৃত হয়ে পাষাণের ন্যায় বসে পড়ল লাইনের উপরে। তার চক্ষের পাতা অপলক হয়ে চেয়ে রইল কিছু দূরে জমাট বেঁধে থাকা সেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধোঁয়াটে পিণ্ডের দিকে। কুলিরাও হতবুদ্ধি হয়ে চিত্রার্পিতের ন্যায় থমকে গিয়েচে যে যার স্থানেই। শংকরের বুকের জমাট বাষ্পটা নির্গত হতেই তার চোখ ফেটে জল এল। সে হাত তুলে চোখ মুছতে যাবে, সহসা একটি কামিন চিৎকার করে কেঁদে উঠল, “সাহেব! সাহেব!”
শংকরসহ বাকিরা চকিতে চোখ ফিরিয়ে হতবাক হয়ে দেখলে, ওই আঁধারের অভিশপ্ত পিণ্ড কিছুটা ফিকে হয়েচে, আর তার ভিতর থেকে লাইনের উপর রেলগাড়ির ইঞ্জিন এবং তৎসংলগ্ন একখানামাত্র কামরা পাথরের মতো নিশ্চলা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েচে! শংকর কিছুটা দৌড়ে রেলগাড়ির কাছে পৌঁছে থমকে গেল। কামরার দরজার ফাঁকা দিয়ে কয়েকটি বাচ্চাকে চোখে পড়চে, কিন্তু…. কিন্তু তারা নড়চে না। চিৎকার করচে না! তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক, তাদের নজর রয়েচে গাড়ির ভিতরের অন্যদিকে। শংকর বেশ টের পেলে যে, এই বাচ্চাদের সঙ্গে না-দেখতে-পাওয়া আরেকটি কিছু রয়েচে কামরার ভিতরে! শংকর কাঁপা হাতে রাইফেলটা বাগিয়ে ধরে ভগ্নস্বরে কইল, “কে? কে ভিতরে?”
কামরার ভিতর থেকে গম্ভীর পুরুষকণ্ঠে জবাব এল, “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দিঘড়া গাঁ।”
সেই সঙ্গে খড়খড়ির জানালা দিয়ে আরেকটি পরিচিত কণ্ঠস্বর এল, “রাইফেলটা নামাও শংকর।”
শংকর বিহ্বলের মতো বলে উঠল, “ডাক্তার!”
***
আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেচি শংকরের বাংলোর পানে। মুখুজ্জে মশায় মাঝখানে একবার দাঁড়িয়ে পড়ে বামদিকের বনের দিকে চেয়ে কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে, থুতু ফেলে কইল, “এ বনটায় কোনও একটা অশুভ শক্তি ঘুরে বেড়িয়েচে কিছু সময় আগেই। হতে পারে, এখানে বসেই সে নজরদারি চালিয়েচে আমরা আসার পূর্ব্বে।”
শংকর বললে, “ঠাকুর, এই বনটার নাম পোড়ানালা। আমাদের মানচিত্রে রয়েচে, এই অংশটা এই বনের দ্বিতীয় ভাগ। এখানে একজন কুলি প্রাণ হারিয়েচে ওই রাক্ষসের হাতে।”
কালীপদ বিড়বিড় করে কইল, “রাক্ষস? বটে? সে যে পুরুষ, তা তোমরা বুঝলে কী প্রকারে? তাকে চাক্ষুষ দেখা কেউ জীবিত রয়েচে?”
শংকর জবাবে বললে, “তা নেই বটে, তবে তার ভয়ংকর হাসির শব্দ আমরা সকলেই শুনেচি। অমন সর্বনাশা স্বর কি তবে…”
কালীপদ একটু কাষ্ঠ হেসে কইল, “তুমি জীবনে কখানা প্রেতকণ্ঠ শুনেছ, সাহেব? আচরণ, স্বর অথবা আক্রমণপদ্ধতি দেখে বাঘ না বাঘিনি, তা বিচার করা চলে, কিন্তু প্রেতাত্মার পুরুষ-নারী বিচার করা সহজ নয়। সম্ভবত মরণের ওপারে গিয়ে সেই প্রভেদটুকু আংশিক আকারগতভাবে বর্ত্তমান থাকলেও, মানসিকভাবে থাকে না আর, কারণ প্রাণীর শরীরই তার বিভেদের মন্দির।”
শংকর একটু ঠোঁট চেটে শুধোল, “আপনি তবে আরও শুনেচেন প্রেতের কন্ঠ?”
কালীপদ সজোরে হেসে উঠে বলল, “শোনো কথা পাগলের। আমি কি তা-ই বললুম নাকি! আমি সেসব শুনলে কখন ভিরমি যেতুম।”
বেলা কিছুটা চড়ে গিয়েচে নানান ঝঞ্ঝাটে। কুলিরা সহস্রবার প্রণাম জানিয়ে, যে যার সন্তানকে নিয়ে গিয়েচে বস্তিতে। শংকর পথ চলচে, আর আড়ে আড়ে কটাক্ষে মুখুজ্জে মশায়কে দেখচে। তার চাহনি দেখে আমি হেসে ফেললাম। শংকর অপ্রতিভ হয়ে কইল, “ডাক্তার, তোমাকে আমি চিঠি লিখে আসতে নিষেধ করেচিলাম, সে চিঠি তুমি পাওনি কি?”
আমি কইলাম, “বিলক্ষণ সেখানা আমার বরাবরই পৌঁচেচে এবং আদ্যোপান্ত পড়ে আমি মুখুজ্জে মশায়কেও পড়াই সেইটে। উনি কলকাতাতেই এস্টেটের কর্মে এসেচিলেন। তোমার পত্র পাঠ করে উনি আর অধিক বিলম্ব না করে টিকিট কিনতে বলেন সদরের।”
শংকর বিস্মিত হয়ে বললে, “সে কী? পড়ার পরেও?”
মুখুজ্জে মশায় স্মিতহাস্যে বললে, “হ্যাঁ বাছা, পড়ার পরেই বলেচি।” শংকর মনে মনে বিস্ময়ে কী একটা বলে চুপ হয়ে গেল।
আমরা এখানে আসার পর দু-দিন অতিবাহিত হয়েচে। সেই থেকেই এ তল্লাটের মোহময় প্রকৃতির শোভা দেখে চলেচি মুগ্ধ হয়ে! গাড়িতে চেপে আসার সময়ে রোদে ততটা উপভোগ করতে পারিনি, তবে গাঁয়ে ঢোকার আগে দীর্ঘ, বক্র পথটা পেরোনোর পর রোদের তেজ যখন দিক পরিবর্ত্তন করল, তখন তো যা যা ঘটল, তাতে আর বসে বসে প্রকৃতির শোভা দেখা চলে না। এক্ষণে অবসর পেয়ে কলকাতার বিলিতি মাটির জঙ্গলে বাস-করা আমি প্রাণভরে সেই মাধুর্যটুকু নিংড়ে নিতে থাকলাম।
এখন রাত্তির। আমরা বাংলোর প্রশস্ত কক্ষে বসে চা পান করচি। এই বাংলোখানা পুবমুখী। ভোরবেলা মুখুজ্জে মশায় দোরের মুখে দাঁড়িয়ে স্নানের পর সূর্য প্রণাম করে। বাংলোর সামনে প্রশস্ত জমি। বাঁদিকে একখানা পথ চলে গিয়েচে ভিতরের গাঁগুলোর দিকে। হপ্তায় একদিন এই পথের দুইপার্শ্বে টুকিটাকি হাট বসে। আমাদের দুইপার্শ্বে দুখানি রেড়ির বাতি জ্বলচে। অন্যান্য ইন্ধনের তুলনায় রেড়ির তেলে বাতি জ্বলেও ভালো, কালিও পড়ে কম, আর আলো হয় উজ্জ্বল। আমাদের ছায়াগুলি দেওয়ালে গিয়ে পড়েছে, জানালা দিয়ে আসা ফিরফির বাতাসে শিখা দুলচে, আর ছায়াও ঈষৎ কেঁপে চলেচে, যেন বায়োস্কোপ।
বাংলোর দেওয়ালের গায়ে কোনও এক দক্ষ শিল্পী দ্বারা অঙ্কিত পরকলায় আঁটা নানান চিত্র শোভা পাচ্চে। তার মধ্যে একখানায় ধরা রয়েচে এই বাংলোরই সম্মুখভাগের একটি দৃশ্য। শিল্পী বাংলোর দ্বারে বসেই সম্ভবত সেখানা চিত্রিত করেচেন। বাংলোর সামনের জমিতে অজস্র সূর্যমুখী ফুল হাসিমুখে চেয়ে রয়েচে শিল্পীর পানে, চাষিরা জমির উদ্দেশে চলেচে হাতে চিঁড়া-গুড়ের পুঁটলি নিয়ে, পাখি উড়চে, শিশুরা মাদুর হাতে দোয়াত দড়ি ঝুলিয়ে পাঠশালে চলেচে। ছবির উপরে সোনার জলে লেখা রয়েচে—’পবিত্র প্রভাত’। সত্যিই একখানা সুন্দর সকালের মন ভালো করা চিত্র। কালীপদ ছবির নৈপুণ্য লক্ষ করে বললে, “বাঃ! চমৎকার হাত বটে!”
একখানা পড়াশোনার টেবিলে দোয়াত, ঝরনা কলম, পেনসিল-কাটা ছুরি, কাগজ আর একখানা চামড়ায় মোড়া ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ শোভা পাচ্চে। কালীপদ সেইদিকে একবার চেয়ে একটু হেসে বললে, “এই উপন্যাসখানি তোমাদের বউঠানেরও ভারী পছন্দের। আমাকে বসিয়ে আগাগোড়া শুনিয়ে, তবে ক্ষান্ত হয়েচিল একবার। সেই সঙ্গে বলেচিল… নাহ্ থাক।”
মুখে না বললেও আমি বউঠানের কথাটা অনুমান করে হেসে ফেললুম। কেতাবখানা আমিও পড়েছি বইকি। ডুমির সঙ্গে এই দু-দিনে আমাদের ভাব হয়ে গিয়েচে। এই দু-দিন নরহত্যার ঘটনা কানে আসেনি, তবে কালীপদর
ললাটে কিন্তু প্রায় অদেখা একটা ভাঁজ পড়ে রয়েচে। এই দু-দিনের নিরুপদ্রব অবকাশের কথা তুলতেই কালীপদ আমাকে বললে, “গাঁয়ের মাটি, পাথর শুঁকে দেখেচি আমি। গোটা তল্লাটেই নরঘাতী অপদেবতাটির অবাধ বিচরণ। সে গোটা তালুকের আনাচকানাচে ঘাপটি মেরে গুড়ি দিয়ে বসে এবং সব কিছু সতর্ক নজরে লক্ষ রাখে। হিংস্র শ্বাপদকে দুই পা আর সাগরকে একশো পা পিছু হঠতে দেখে আনন্দ পেতে নেই। ধনুকের ছিলার ন্যায় শতগুণ ভয়ানক বেগে আক্রমণের জন্য তৈরি থাকো ডাক্তার। গাঁয়ের লোকেদের সঙ্গে এই দুটি দিন কথাবার্তা কয়ে যা বুঝচি, তাতে এই শয়তান অত্যন্ত ধূর্ত্ত এবং সুযোগসন্ধানী। মানুষের থেকে তার বুদ্ধি বহুগুণ এগিয়ে রয়েচে। প্রতিটি পা ফেলার পূর্ব্বে আমাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলবে, আর রাতবিরেতে একলাটি বেরোনোর কোনও দরকার নেই।”
শংকর ইতস্তত করে যে কথাটি কইল, তাতে আমি সত্য সত্যই অবাক হয়ে পড়লাম। সে বললে, “ঠাকুর, আমার বিপদের কথা জেনেই আপনারা এই মরণকুয়োয় ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তাই আপনাদের কিছু ঘটলে আমার নরকেও স্থানাভাব ঘটবে, তাই যে জোরে আমি এতবার ওই নরলোলুপ অপজীবের থাবা থেকে বেঁচে গিয়েচি, সেই রুদ্রাক্ষের তাবিজটি ডাক্তারকে দিতে ইচ্ছুক। আপনি অমত করবেন না। আপনার কিছু ক্ষতি সে সহসা করতে পারবে বলে মনে হয় না, আমারও যা হবে হবে, কিন্তু এই উপায়ে ডাক্তারের রক্ষা হবে।”
কালীপদ শংকরের বুকে ঝুলতে থাকা রুদ্রাক্ষে মমতাভরে হাত বুলিয়ে কইল, “পৃথিবীতে অপজীব আর হিংস্র পশু কম দেখলুম না। আমি নিজেও হিংস্র পশুর তালুকেরই মানুষ, কিন্তু তোমার মতো নিঃস্বার্থ, উদার মানুষদের সংস্পর্শে এলে মনে হয়, পৃথিবীতে খারাপের থেকে ভালোবাসার পরিমাণই অধিক। রুদ্রাক্ষ হাতবদল করার আবশ্যকতা নেই, বাছা। তাবিজ জিনিসটে কিছু লাউ, কুমড়া নয় যে ইচ্ছা করলেই যে ইচ্ছা কেটে খেতে পারে। ও জিনিস তোমার প্রতিই বিশ্বস্ত। তুমিই রাখো। ডাক্তারের কিছু হতে দেব না আমি।”
শংকর একটা শ্বাস ফেলল। তর্ক করল না। ডুমি বোধ করি শায়িত অবস্থায় কোনও ভয়ের স্বপ্ন, অথবা সেই দিনের স্মৃতি মনে পড়ে ঘুমের মধ্যেই ভয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করে চৌপাইয়ের পায়ার কিনারায় এসে শুয়ে পড়ল আর কুইকুই করতে শুরু করল। শংকর বিষণ্ণ স্বরে বলল, “ডুমিও সেই দিনের ঘটনার পর বদলে গিয়েচে ডাক্তার। সব সময় কেমন একটা আতঙ্ক আর সতর্কতা যেন তাড়া করে চলেচে তাকে।”
কালীপদ হঠাৎ বলে উঠল, “ভালো কথা, শংকর, কেশবের মৃত্যুর সেই রাতে তোমার ভূমি ভীষণ ভয়ে চিৎকার করচিল বললে, তার ভয়ের উৎসটা কোন বরাবর ছিল?”
শংকর একটু ভেবে উত্তর দিল, “এমনিতে সে গোটা ঘরেই নজর ফিরিয়ে ফিরিয়ে চলেচিল, যেন গোটা দেওয়াল বেয়ে কোনও অদৃশ্য মাকড়সা চলাফেরা করচে, কিন্তু বেশি দৃষ্টি ছিল এই… এই তাক দুটির দিকে।”
কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, “তাকের উপর তবে নিশ্চয়ই কেউ বসেচিল সেই সময়ে, যাকে দেখতে পেয়েই প্রচণ্ড ভীতিতে আক্রান্ত হয় ডুমি। এ বড়ো সুবিধার কথা নয় হে। আমি থাকতে কতটা কী হবে বলা যায় না, তবে আমার কিছু ভালোমন্দ হলে, তোমরা কখনও এ ঘরে আর থেকো না। রাক্ষুসে আপদটার গতিবিধি এই ঘরেও অবাধ।”
আমার বুকটা ঈষৎ ছাঁত করে উঠল! কালীপদ মুখুজ্জে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা করচে? আমি সামান্য ভাঙা স্বরে শুধালাম, “এ কেমন কথা তোমার, দাদা?”
“কথা তত মন্দ নয় হে ডাক্তার। আমি ভেবে ভেবে কূলকিনারা খুঁজে পাচ্চি নে। মাত্তর একবার দৈবক্রমে গুরুর দয়ায় যে নরসংহারক ভয়ংকর অপজীবের মোকাবিলা করতে পেরেচি, দ্বিতীয়বারেও যে গাঁয়ের শমন হয়ে দেখা দেওয়া, সেই শয়তানকে পরাভূত করতে পারব, এমনটা ভাবা বাতুলতা বই আর কী?”
আমার মুখে বহুক্ষণ বাক্য জোগাল না! অবশেষে আমি আর শংকর একযোগে অধীর হয়ে বলে উঠলাম, “কে এই অপজীব? সে কি আপনার শক্তিতেও পরাভূত হবে না? এ-ও কি সম্ভব?”
কালীপদ তিক্ত, ক্লিষ্ট কণ্ঠে চোখ তুলে ধীরে ধীরে কইল, “এই গাঁয়ে আপাই ঢুকেচে, ডাক্তার।”
শংকর ঠিকঠাক ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারল না। আমার শিউরে ওঠা হাত থেকে চা চলকে পড়ল।
***
সারাদিনের দুশ্চিন্তা এবং নানাবিধ আশঙ্কার ফলে রাত্তিরে ঘুমের মধ্যে নানান দুঃস্বপ্ন দেখেচি। কালীপদ শয়ন করেচে বাইরের বড়ো ঘরটার চৌপাইতে। আমি, শংকর আর ডুমি শয্যা নিয়েচি ভিতরের ঘরটায়। বাইরের ঘর আর ভিতরের এই কক্ষ, উভয় থেকেই বাইরের দিকের প্রশস্ত খোলা বারান্দায় যাতায়াত চলে। রাতের বেলায় নানান অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা মস্তিষ্কের মধ্যে চলাচল করেচে। প্রেতলোকে বাস করার প্রতিক্রিয়া সম্ভবত এমনটাই হয়। কখনও মনে হচ্চে, অসংখ্য লোকজন, ভয়ার্ত স্বরে বাঁচাও বাঁচাও বলে পরিত্রাহি চিৎকার করচে, কখনও বা কানে আসচে অলীক হাসির ভয়ংকর রক্ত-জল-করা নিনাদ। খুব ভোরে নিদ্রাভঙ্গ হয়ে চোখ খোলার পরেও সেই স্বপ্নের রেশ রয়ে গিয়েচিল। একত্রে বসে চা পান করার পর সেই পাথর ধীরে ধীরে বুক থেকে নেমে এসেচে, এমন সময়ে কুলি সর্দ্দার লাখনের হাঁকডাক আর বক্তব্য শুনে সেই দশমনি পাথর শতমনি হয়ে আবার চেপে বসল।
লাখন ভয়ানক এক বার্তা এনেচে! তার তাড়াহুড়ো করে প্রাণপণে বয়ান-করা বক্তব্য শুনে আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম, রাতে শোনা আমার সেইসব শব্দ একবিন্দুও অলীক ছিল না!
ঘটনা বড়ো ভয়াবহ। বিল্স হল্ট ইস্টিশনের সামনের দিকটা, অর্থাৎ যেদিকে কুলিদের বসতি হয়েছে, সেইদিকেই আরও অনেকখানি ভিতরে এগিয়ে গেলে পলাশডহরির নিকটে আরেকখানি ক্ষুদ্র বসতি রয়েচে। সেটি জয়চণ্ডী সাধুদের আবাস ও যাজনস্থল। এই সম্প্রদায়ের সাধুরা অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং গুপ্তবিদ্যায় পারঙ্গম। সংখ্যায় তারা আন্দাজি বাইশ অথবা তেইশ। তাদের প্রধান সাধু হচ্চে শিউচরণ। পদবি নেই।
গাঁয়ের এই সংকটের কথা নির্লিপ্ত সাধুদের কানে পৌঁছোয়নি এর আগে অবধি, কিন্তু গতকাল ভোরে মালিনী ভবানী সাধুদের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়ে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নিবেদন করে। মালিনী ভবানী সম্ভবত সেই চিনিবাসের কীরকম পরিজন। শিউচরণ এই বার্ত্তা শ্রবণ করে বিষণ্ণ হয় এবং অনুচরদের ডেকে বলে, “সাধুদের পূর্ব্বপরিচিতি নেই, পরিবার নেই, রাগ নেই, দুঃখ, আনন্দ কিছু নেই, কিন্তু কৰ্ত্তব্য আছে। স্বয়ং শ্রীভগবানও নির্লিপ্ত, গুণাতীত, কিন্তু কৰ্ত্তব্যবিমুখ নন। যে গাঁয়ের মাটিতে আমরা ধর্মাচরণ করচি, সেই গাঁয়ের আর্তদের রক্ষা করা আমার কর্তব্য বটে। তোমরা আমাকে সঙ্গ দিলে আমি মধ্যরাতে আবাহন আর আগামীকাল সূর্যোদয়ের মুখে বাণক্রিয়া করে এই আপদকে বেঁধে ফেলব।”
সাধুদের দলটা শিউচরণের তন্ত্রশক্তি সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞাত ছিল, ফলে তারা নিশ্চিন্তে রাজি হল রাতের গাঁ-বন্ধনে ভাগ নিতে। আমি হলফ করে বলতে পারি, সেই মুহূর্ত্তে একজন সাধুও ভাবতে পারেনি যে কী ঘোরতর খল আর ধুরন্ধর প্রেতযোনির মুখোমুখি তারা হতে চলেচে। তারা ধারণা করতে পারেনি যে কালকের সূর্যোদয় দেখাটা সকলের ভাগ্যে মঞ্জুর নেই।
সন্ধ্যার মুখে শিউচরণ দলবদ্ধ হয়ে কুটিরের আশপাশের বিরাট একটা এলাকাকে মন্তর পড়ে বেঁধে ফেলল, যাতে ক্রিয়াকালে সেই শয়তান বিঘ্ন ঘটাতে অপারগ হয়, আর নিজের লোকজনের উদ্দেশ্যে কইল, “শোনো তোমরা, আমি যে প্রশস্ত ভূখণ্ডে বাঁধন দিলাম, তোমরা মনের ভুলেও কেউ এই গণ্ডি অতিক্রম করবে না। ভবানী গাঁয়ে গিয়ে বলে দিক যে ভোরের পূর্ব্বে কেউ যেন এইদিকে না ঘেঁষে। একজন জীবিত মানুষও গণ্ডি পেরোলে এই গণ্ডি তার প্রভাব হারাবে। গণ্ডি পেরোনো শুধু নয়, গণ্ডির ভিতরে সে নিজে প্রবেশ করতে না পারলেও, অনেক সময় দাগের কয়েক হাত ভিতর অবধি তাদের ইচ্ছাশক্তির প্রভাব কাজ করে।”
রাত তখন একটু বেড়েচে। শিউচরণ যজ্ঞে আহুতি দিতে বসল। দুজন সাধু বাইরে কাঠ কাটচে, আর দুজন একটু দূরেই রাখা বাখারি, সেই রাতে ফোটা পপটি ফুলের প্রথম পাপড়ি আর কাদামাটির তাল আনতে গিয়েচে। এদের _একজনের নাম জলধর, অপরজন পানি। জিনিসপত্তর সংগ্রহ করে পানি যখন ফুলের পাপড়ি তুলচে, তখন জলধর সন্দেহের সুরে শুধোল, “গুরুভাই, ওইটে আবার কী?”
পানি মুখ তুলে জিনিসটা ঠিক ঠাহর করতে পারলে না। দূরের মজে যাওয়া পুকুরটার এইদিকে মাটির উপর লম্বা লম্বা কীসের যেন দাগের মতো। শিশলণ্ঠনের বাতিতে আবছা আবছা চোখে পড়ছে। জলধর সেইদিকে কয়েক পা এগোতে পানি কইল, “দরকার কী ওদিকে দেখার? ক্রিয়ার পূর্ব্বে কতশত বিভূতি দেখা যায়। মজা পুকুরের এ ধার ঘেঁষেই গণ্ডি পড়েছে, ভুলে যেয়ো না।”
জলধর উত্তর দিলে, “গণ্ডি এই দাগের থেকে অনেক দূর। দেখা দরকার শুগুলো কীসের দাগ।”
দুজন পায়ে পায়ে দাগগুলির একেবারে উপরে এসে দাঁড়াল। বাঁয়ে বাঁশঝাড়, তার পিছনে মজা পুকুর। মাটির উপরে চার-পাঁচখানা সমান্তরাল দাগ চলে গিয়েচে হাত কুড়ি প্রায়। দাগগুলি আচমকা আরম্ভ হয়ে একটা ছোটো বাঁশঝাড়ে গিয়ে শেষ হয়েচে। জলধর দাগের উপর দাঁড়িয়ে দাগের উপর হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ে পরীক্ষা করতে শুরু করল, আর একটু পরেই হতবাক হয়ে বললে, “এ কী!”
পানি চমকে উঠে দেখল, মাটি খোঁড়ার ফলে দাগের তলা থেকে একখানা আস্ত বাঁশের একপাশ বেরিয়ে পড়েছে। এর অর্থ, বেশ কয়েকখানা বাঁশকে কেউ সবল হাতে নুইয়ে ভূলগ্ন করে, তার উপরে মাটির আস্তরণ চাপিয়ে দিয়েচে, ফলে সেগুলো সমান্তরাল দাগের মতো দেখতে হয়েছে। পানি সভয়ে টের পেল যে, সেই বাঁশেরা মোটেই তাদের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ধনুকের ছিলার ন্যায় শক্তি সঞ্চয় করে ওঁত পেতে রয়েচে শিকারের অপেক্ষায়! পানি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, “জলধর। শীঘ্র পালাও! ফাঁদ। ফাঁদ।”
সাধকের আচরণবিধিতে দূষণীয় বলে মানা হয় যে কয়টি অনুজ্ঞা, তার মধ্যে একটি হল শোয়ানো বাঁশ অথবা গো-মহিষাদির বন্ধনরজ্জু লঙ্ঘন করা। জলধর সেই ভুলই করে বসেচে শয়তানের কুহকে। জলধর সংবিৎ ফিরে পেয়ে একলাফে দাগগুলি অতিক্রম করতে যাবে, হঠাৎ জলার ওপারে একটা দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকির মতো কট কট শব্দ শোনা গেল, আর চক্ষের নিমেষে শায়িত বাঁশগুলো জ্যা-মুক্ত বাণের গতিতে ছিটকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হতভাগ্য জলধর একটা আর্তনাদ করে ইন্দুরের ন্যায় ছিটকে, উড়ে গিয়ে পড়ল মজা জলার পাড়ে।
পানি চকিতে একবার লক্ষ করল, অন্ধকার তল্লাটটার চতুৰ্দ্দিকে একটা বৃত্তরেখার মতো আলোর দাগ ঝলসে উঠেই নির্ব্বাণ লাভ করল। পানি কাঁপতে কাঁপতে বুঝতে পারল, শিবচরণের দেওয়া রক্ষাগণ্ডি বিনষ্ট হয়েছে। হঠাৎ পানি ভীষণ আঁতকে উঠে ঘাড় ঘোরাল জলার পানে। মজে যাওয়া নাবাল জলাভূমির উপর দিয়ে একটা ঝাপসা শ্বেতমূৰ্ত্তি দু-পাশে দু-হাত ছড়িয়ে এবং পাখির পাখার মতো তা নাড়তে নাড়তে হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ শব্দ করতে করতে ছুটে আসচে! সেই ভয়ংকর অশরীরী শব্দ কানে একটিবার শুনলে হৃদ্যন্ত্রের সমস্ত ক্রিয়া স্তব্ধ হতে চায়। মূৰ্ত্তিটা ভীষণ গতিতে ছুটে এসে একটা বিরাট লাফে একবারেই একটা তাল গাছের মগডালে উঠে পড়ে আবার নৈঃশব্দ্য চুরমার করে হেসে উঠল। পানি কম্পিত দেহে “শিউজি, শিউজি, দেও, দেও” চিৎকার করতে করতে ছুটতে আরম্ভ করল।
শিউচরণ কুটিরে বহুসংখ্যক সাধুর সঙ্গে মিলে আবাহনী যজ্ঞের আয়োজন করচে, হঠাৎ একজন সাধু সন্দিগ্ধ কণ্ঠে কইল, “গুরুদেব, ছোটো সাধুর গলা পেলাম যেন। বহু দূর থেকে আপনার নাম ধরে ডাকচে!”
শিউচরণ শুধু পানির কণ্ঠস্বরই নয়, নিজের অভিজ্ঞ শ্রবণযন্ত্রে আবছা হাসির শব্দও শুনেচে। সে উদবিগ্ন হয়ে কইল, “পানির ডাক শুনেচি, তা তত চিন্তার কথা নয়, কিন্তু বাছা, তার ডাক মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল কেন? একবার বাইরে চলো তোমরা।”
দল বেঁধে হুড়মুড় করে বাইরে এসে দাঁড়াল। চতুৰ্দ্দিক আঁধারে ডুবে রয়েচে। কুটিরের বাইরে যে দুজন সাধু কাঠ চেলা করচিল, তাদের মশালের আলোতে কুটিরের সম্মুখভাগে কিছু আলো ছড়িয়ে পড়েছে। শিউজি দূরের পানে ঠাহর করে কইল, “ওই পটপটির বাগানের দিকটা একবার লক্ষ করো তো। একটা আলো দেখলাম যেন? জলধররা কি লণ্ঠন নিয়ে গিয়েচে?”
সঙ্গীরা লক্ষ করে দেখল, শিউজির কথা সত্য। ঝোপের দিকটায় একখানা তেলের বাতির ক্ষীণ আলো ভেসে আসচে, কিন্তু… সে আলো মাটির উপরে হয় নামিয়ে রাখা রয়েছে, নয়তো ছড়িয়ে পড়ে রয়েচে। তারা আলো লক্ষ করে দু-পা এগোতে যাচ্চে, আচমকা একটা ভোঁতা শব্দে তারা মুখ ঘুরিয়ে ভয়ে ছিটকে পড়ল! জলধর আর ছোটো সাধু পানির ঘাড়-ভাঙা মৃতদেহ দুটি ভয়ংকরভাবে আঁচড়ানো-কামড়ানো অবস্থায় কুটিরের সামনের শক্ত মাটিতে কেউ ছুড়ে ফেলেচে গাছের উপর থেকে। শিউচরণ এই প্রথম ভয় পেল। সে স্পষ্ট উপলব্ধি করল যে, তার মতো শক্তিধর তন্ত্রবিদের দেওয়া গণ্ডি সেই রাক্ষুসে প্রেতের কুটিল চক্রে পড়ে সমূলে বিনষ্ট হয়েচে। শিউচরণ একটু কাঁপা স্বরে দলের উদ্দেশে বললে, “পালাও? পালাও! গাঁয়ের দিকে পালাও। গতিক বড়ো ভয়ানক!” এই বলে সে নিজেই যথাসাধ্য ছুটতে আরম্ভ করল গাঁয়ের পানে, আর একটা খিলখিল হাসির সঙ্গে যেন একটা ঝড় সবেগে আছড়ে পড়ল বনভূমি জুড়ে।
অতগুলি মানুষের দলটা সংকীর্ণ পথের জন্যই হোক, আর প্রচণ্ড ভীতির কারণেই হোক, তারা বিভিন্ন দিক ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পালাতে আরম্ভ করল, আর পালাতে পালাতে শিউচরণ সভয়ে অনুভব করল সাক্ষাৎ শয়তানটার নরসংহারের বীভৎসতা। গাছের থেকে গাছের মাথায় মাথায় কী যেন একটা ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়চে, হঠাৎ হঠাৎ একেকজনের বুকফাটা মরণ আর্তনাদ কানে আসচে, সেই সঙ্গে খিলখিল কুটিল হাসি। শিউচরণ দৌড়োনোর সময়ই টের পেলে, তার ঠিক পাশাপাশি পলায়মান সাধু সারদাকে এক ছোঁ মেরে কে যেন লম্বা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলে আকাশপানে, আর তার মৃতদেহটি তৎক্ষণাৎ আছড়ে পড়ল একটু দূরের ডোবায় ঝপাত শব্দে। সারদার কণ্ঠ থেকে একটু শব্দ অবধি নির্গত হল না। এতক্ষণের চারদিকের মুহুর্মুহু মরণ চিৎকার প্রায় স্তিমিত হয়ে এসেচে। শিউচরণ বেশ বুঝল যে, তার সৎকুলের আর ততোধিক কেউ জীবিত নেই। শিউচরণ উপলব্ধি করল, এইভাবে বনবাদাড় ভেদ করে এলোমেলোভাবে দৌড়ে এই লোলুপ নরখাদকের থাবা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া চলবে না। শিউচরণ একখানা বট গাছের শিকড়-ঝোলা গুড়িকে আঁকড়ে ধরে অতি কষ্টে বেশ কিছুটা উপরে উঠে ঘন ডালপালায় আত্মগোপন করে বসে বসে বাতাসে তাড়িত বাঁশপাতার ন্যায় তিরতির করে কাঁপতে আরম্ভ করলে।
আকাশের ধুলোর ঝড় আর ধূম অপসৃত হয়ে ক্ষীণ চন্দ্রালোক এসে পড়েচে বনের গাছে গাছে। শিউচরণ ক্ষমতা থাকলে নিজের শ্বাসটুকুও রুদ্ধ করে ফেলত। থামিয়ে রাখত নিজের হৃদ্যন্ত্রের ধুকপুকানি। গভীর নৈঃশব্দ্যের মাঝে জৈবিক শরীরচালনার এইটুকু শব্দও যেন আততায়ীকে ডেকে আনতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে। জঙ্গল একেবারে শান্ত হয়ে রয়েচে। একটা পাতা নড়ার শব্দও কানে আসচে না। এখান থেকে নেমে মাত্র কিছুটা যেতে পারলেই ডাকিনীর চর গাঁয়ের লোকবসতি পড়বে। প্রেতের অনুপস্থিতি সম্পর্কে আরও কিছুটা নিশ্চিত হবার জন্য শিউচরণ অতি সন্তর্পণে একবার পাতার আড়াল থেকে নজর রাখল নীচের সরু বনপথের উপরে, আর ঠিক তখনই শিউচরণের থেকেও আর-একটু উপরে গাছের ডালপালার ভিতর থেকে ভেসে এল চাপা, খিলখিল করে হাসির আওয়াজ!
শিউচরণ থরথর করে কেঁপে উঠল। সে কী হাসি! কোনও জীবিত প্রাণী শত চেষ্টা করেও এমন বিষ-মাখা হাসি হাসতে পারে না। সে হাসি কানে প্রবেশ করে মরণকে ডেকে আনে। শিউচরণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল, এতক্ষণ ধরে সে যখন নিজেকে লুকিয়ে রেখে বাইরে নজর রেখেচে, তখন এই লোলুপ পিশাচ ঠিক তার পিছনেই ওঁত পেতে বসেচিল হিংস্র ব্যাঘ্রের ন্যায়। শিউচরণ দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ঝাঁপ দিলে অতখানি উপর থেকে, আর নীচের মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। যন্ত্রণাক্লিষ্ট দেহে কোনওক্রমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গাঁয়ের পানে ছুটতে আরম্ভ করল শিউচরণ সাধু, আর ঠিক তার পিছনে পিছনে একটা অশুভ কদাকার পিণ্ডের ন্যায় ভেসে ভেসে আসতে শুরু করল সেই অশরীরী ঘাতক। চলৎক্ষমতাহীন মৃগের পাশে নিশ্চিন্তে বসে বাঘ যেমন ধীরেসুস্থে তাকে একটু একটু করে হত্যা করে, ঠিক তেমনি এই নরঘাতী পিশাচ একটু একটু করে থাবা দিয়ে শিউচরণের শরীর থেকে খাবলা দিয়ে রক্তমাংস ছিন্ন করতে শুরু করল। সে তার শিকারের মৃত্যু সম্বন্ধে একেবারে নিশ্চিন্ত। একেকটি ছোবলের সঙ্গে সঙ্গে খিলখিল হাসি আর শিউচরণের মরণাহত আর্ত্তনাদের সঙ্গে কানে এল প্রেতসুলভ নির্মম
কণ্ঠের ফিশফিশ বিলাপ-
“পাপের কথা আয় শোনাই
গাঁয়ের রানি একজনাই
ধরল শমন শতেক ছল
রানি গেল পাতালতল
তারার আলোয় ধাঁধায় চোখ
মুখখানি তার উলটো হোক…”
একখানা খলস্বভাব হায়না যেন বাতাসে ভেসে থাবা দিয়ে চলেচে সাধুর পিঠে। শিউচরণ ঘাড়ের কাছে আরেকখানি নখের আঁচড় লেগে নিঃসাড়ে চেতনা হারাল।
***
আমরা অতি দ্রুতপদে ডাকিনীর বিলের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এসে উপস্থিত হয়ে দেখি ছয়-সাতজন পুরুষের জটলা। এই ধরনের ঘটনার পর সাধারণভাবে অকুস্থলে এতক্ষণে বহুতর লোকজন জড়ো হয়ে যাবার কথা, বিশেষত গাঁ-গঞ্জে, কিন্তু এই মৃত্যুর ছায়া ঘেরা পরিবেশে যখন লোকজন নিজের ঘরকেই জীবিত থাকার শেষ আশ্রয় বলে মনে করচে, তখন তাদের থেকে বীরত্বের আশা করাটা বাহুল্য। কালীপদ আমাদের নিয়ে ত্বরিত পায়ে সেইখানে পৌঁছোনোর পর লক্ষ করলাম, শিউজি তখনও জীবিত রয়েচে। অসম্ভব জীবনীশক্তি ব্যতীত এতখানি রক্তপাত আর আঘাতের পর বেঁচে থাকার কথা নয়। সে ধুঁকতে ধুঁকতে এতক্ষণে উপস্থিত জনতাকে গতকালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যে ইতিমধ্যেই কইতে পেরেচে, তা কালীপদ কয়েকজনের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আড়চক্ষে দেখে নিয়েই টের পেল। সে শিউজির নিস্তেজ মাথাটি নীচু হয়ে নিজের জানুতে স্থাপন করে তার দিকে করুণ চোখে চেয়ে রইল। কালীপদর নির্দ্দেশে আমরা সে স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে গেলাম। শিউজি ভগ্নস্বরে কালীপদকে কিছু কথা কইল। তারপর শিউজির এই জন্মের জন্য নিয়তির নির্ধারিত শেষ বাক্যটি নির্গত হবার পর চিরতরে বাকরোধ হল।
মৃত্যুর অনতিপুর্ব্বে মানুষ যেমন শিবনেত্র ধারণ করে, তেমনিভাবে উপরদিকে চেয়ে শিউচরণ সাধু কালীপদর মুখ নিরীক্ষণ করতে লাগল, আর-একটু পর তার ক্লিষ্ট ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসির আভা ফুটে উঠল। সে হাসির মধ্যে অনেকখানি আশ্বস্তির ভাব আর কিছুটা কারুণ্য মিশে রয়েচে যেন। শিউজি সত্যকারের সাধু ছিল। অনেকখানি ক্ষমতা তার মধ্যে ছিল। মরণের দেশে রওয়ানা দেবার পূর্ব্বে সে কী রহস্যের আভাস পেয়েচিল, তা জানিনে, কিন্তু সে নিজের আহত বাম হাতের তালুটি একবার অতি কষ্টে উত্তোলন করে কালীপদর সুমুখে মেলে ধরল, তারপর ধীরে ধীরে তালুর বিপরীত দিকটি ঘুরিয়ে আবার মেলে ধরল, শেষে হাতটি ঢলে পড়ল কালীপদর পায়ের কাছে। তার চক্ষু তখনও পরম আগ্রহে চেয়ে রয়েচে কালীপদর মুখের দিকে। আমি শিহরিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। কালীপদ শিউজির চক্ষুদ্বয় মুদ্রিত করিয়ে ধরা গলায় কইল, “এঁকে সমাধিস্থ করার উদ্যোগ করো।”
আমি দেখলাম, মুখুজ্জে মশায়ের চোখ থেকে দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তারপর সে আমার হাত ধরে পদচালনা আরম্ভ করল। আমি আর শংকর ফেরার পথে লক্ষ করলাম, মুখুজ্জে মশায় পুরোপুরি নির্বাক হয়ে রয়েচে, শুধু আড়ে আড়ে নিজের হাতের তালুটি দু-দিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কী যেন দেখচে। আমি একবার সাহস করে কইলাম, “কী দেখছ দাদা?”
কালীপদ স্বগতোক্তির মতো করেই আপন মনে বললে, “মুখখানি তার উলটো হোক।”
বাংলোর দেউড়িতে বসে কালীপদ কইল, “শিউজি অত্যন্ত ক্ষমতাবান সাধক ছিলেন। তাঁর রক্ষাকবচে যখন ওই নরঘাতক ছিদ্র বের করেছে, তখন ধরে নিতে পারি, সে আমাদের চাইতে দশ কদম এগিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তার কুটিলতা আর উগ্র বৃদ্ধির দৌড় আমাদের চিন্তার চাইতে বহুগুণ এগিয়ে। এমতাবস্থায় আমি কী ভাবচি, কী করছি—এসবের দখল পেতে তার সময় লাগার কথা নয়, তবে আমিও সদগুরুর শিষ্য। নিজের চিন্তায় লাগাম এবং বর্ম দেবার ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু তোমাদের নেই। ফলে আমি তোমাদের সঙ্গে আর কিছু আলোচনা করব না এসব কথা। এইবার শংকরকে একটা কথা শুধোই, যেদিন প্রথম ইস্টিশনের কাছে ওই তোরঙ্গটা খুঁজে পাওয়া যায়, সেই দিন তোমার সঙ্গে চায়ের দোকানে যে বৃদ্ধরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ জীবিত নেই। আমি জানতে চাই, তাঁদের মধ্যে এখনও জীবিত আচেন কে?”
শংকর একটু চিন্তা করে কইল, “ওঁর নাম জানিনে, তবে দেখিয়ে দিতে পারি। বটতলার কাছে বাড়ি।”
***
বিকেলবেলা। বটতলার মেটে বাড়ি থেকে বৃদ্ধ গাঙ্গুলি বেরিয়ে এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। তার চোখ-মুখে কিছু বিস্ময়। হাতজোড় করে বললে, “আজ্ঞা সাহেব, আবার বুঝি কিছু…”
শংকর বলল, “হ্যাঁ, ওপারের বনের শিউজি সাধু তার দলবল সমেত মারা পড়েছে রাতে।”
গাঙ্গুলি বিষণ্ণ মুখে কইল, “জানি সাহেব। শুনেচি। সাধুদের গোষ্ঠীকে দলবল বলতে নেই।”
কালীপদ শংকর আর বৃদ্ধের কথোপকথন থামিয়ে, মুখ তুলে গম্ভীর কণ্ঠে শুধোল, “ডাকিনী কে, গাঙ্গুলিমশায়?”
গাঙ্গুলি ভ্রূ কুঁচকে কইল, “আজ্ঞা ঠাকুর?”
“ডাকিনীর কথা শুধোচ্চি, গাঙ্গুলিমশায়। ডাকিনী কে?”
গাঙ্গুলি সম্ভবত প্রথমটা প্রশ্নটা ঠিকঠাক বুঝতেই পারল না। তারপর পালটা প্রশ্নের সুরেই বললে, “ডাকিনী? সে আবার কে!”
কালীপদ খরচক্ষে আবার কইল, “আপনি তালুকের প্রাচীন এবং স্বাধীন প্রজা। নিশ্চয়ই জানেন আপনি। বলুন শীঘ্র।”
কালীপদর ধমকের সুর শুনে গাঙ্গুলির মুখ অপমান আর ক্রোধে ভরে উঠল। আমি বুঝলাম, কালীপদ ফাঁকা গুড়ুল ছুড়ে মৌমাছির চাক নির্ণয় করতে চাইচে, কিন্তু বৃদ্ধের অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম, এর থেকে কোনও কথা পাবার সম্ভাবনা নেই। গাঙ্গুলির মুখটা একবার দেখে কালীপদ বললে, “ক্রুদ্ধ হয়ে বিশেষ লাভ নেই। আপনি যদি কিছু না-ই জানবেন, তো চায়ের দোকানে রামচরণের মুখে ডাকিনীর তোরঙ্গের কথা শুনে আপনি চমকে উঠে পালিয়ে গিয়েচিলেন কেন? এই গাঁয়ের নামই বা এমন কেন হল?”
এইবার বৃদ্ধের মুখ থেকে ক্রোধ অপসৃত হয়ে একচিলতে করুণ হাসি দেখা দিল। সে বললে, “সেইটেই আমার সবচাইতে বড়ো ভুল হয়েচে, ঠাকুর। আমি কথাটার মাথামুণ্ডু সেই দিন বুঝিনি, কিন্তু রামার আতঙ্ক আর কথা বলার ধরনে ঘাবড়ে গিয়ে আমি ভীত হয়ে পড়েচিলাম। ওই তোরঙ্গটা চিনল, অথবা তোরঙ্গ নিয়ে তার কীসের মাথাব্যথা, সেসব যদি চলে না গিয়ে সেই দিন রামাকে শুধাতাম, তবে এই দুর্বিপাক নিবারণের কিছু হদিস হয়তো পেতে পারতাম। এখন সে পথ বন্ধ, ঠাকুর।”
এতাদৃশ বিনয় আর কারুণ্য সত্ত্বেও কালীপদর মুখের ভাব বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হল না। সে আবার বললে, “আপনার বন্ধু রামচরণের পদবি যেন কী ছিল?”
গাঙ্গুলির শরীর শক্ত হয়ে উঠল। সে অসোয়াস্তি বোধ করচে তা বোঝাই যায়। কালীপদ তাচ্ছিল্যভরে বললে, “তার পুরো নাম রামচরণ কর্মকার। সে জাতে কামার। ওই তোরঙ্গের বর্ণনা শুনে তার চমকে ওঠার কারণ সম্ভবত, ওই তোরঙ্গের নির্মাতা চিলেন আপনার প্রয়াত বন্ধুটিই। আপনি যদি এখনও সব সত্য সত্য না বলেন, তবে ডাকিনী বাকিদের মতো আপনাকেও হত্যা করবে, গাঙ্গুলি মশায়। চুপ করে থাকলেও আপনি তার নজরে অবশ্যই থাকবেন। রামচরণ আর কেশবের মতো সে আপনারও সামনে এসে দাঁড়াবে।”
গাঙ্গুলি ঠকঠক করে কাঁপতে আরম্ভ করলে। শংকর বিস্মিত হয়ে বলল, “রামচরণের কথা বলতে পারিনে, তবে কেশবের মৃত্যুর সময়ে আমি তার সঙ্গে চিলাম, ঠাকুর। কেউ তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। তবে হ্যাঁ, তার কুহকেই ওই বাতিল রেলগাড়িটা…”
শংকরকে থামিয়ে কালীপদ তার চোখে চোখ রেখে কইল, “সে কেশবের সামনেই দাঁড়িয়েচিল, শংকর। কিন্তু সে ছিল তোমার পিছনে, তাই তুমি দেখতে পাওনি।”
এই ভয়াবহ বর্ণনায় শংকরের সঙ্গে সঙ্গে আমারও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল! শংকর কাঁপা স্বরে বললে, “কিন্তু… ঠাকুর, যদি তা-ই হবে, তবে কেশবের তো তাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ওঠার কথা। সে তা করল না কেন?”
“করেচিল, শংকর। তুমি বুঝতে পারোনি।”
“মানে! কখন?”
কালীপদ বিরস স্বরে বললে, “তোমাদের কথা অনুসারে যে কেশব নাকি দু-হাত দূরেও হেঁকে হেঁকে কথা না কইলে শুনতে পেত না, সে ওই প্রবল ঝড়জলের আর বজ্রপাতের মধ্যে তুমি যখন চাপাস্বরে তাকে অকারণে ডেকে নিয়ে যাওয়ার কারণ শুধোলে, তখন সে তার উত্তর দিল কী করে? সে অত ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনল কেমন করে যে উত্তর দেবে? সে তোমাকে ওই সময়ে যা বলেচে, তা তোমার সওয়ালের উত্তরে বলেনি শংকর! সে তোমার পিছনে ডাকিনীকে দেখেচে এবং তা-ই বলেচে। সে ঠিক কী বলেচিল, আরেকবার মনে করে দেখো বাছা।”
শংকর বিহ্বলের মতো বলে উঠল, “না, না! ডাকিনি, সাহেব, ডাকিনি। এ যে অসম্ভব! পালাও সাহেব।” এই বলে অসহায়ভাবে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল শংকর, আর অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে কইল, “আমি তাকে ভুল বুঝেচিলাম, ঠাকুর। তার শেষ কথাগুলোয় সে আমাকে সাবধান করে পালাতে বলেচিল। আমি ধরতে পারিনি।”
কালীপদ শংকরের পিঠে হাত রেখে প্রবোধ দিল।
বৃদ্ধ গাঙ্গুলিও কুঞ্চিত চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু মুছে ফেলে ধীরে ধীরে কইল, “চলুন ঠাকুর। আমি যতটুকু জানি, সবটুকু বলব। সে পাপের কথা আজ এতগুলো বৎসর ধরে আমার বুকের পাজর কুরে কুরে খেয়েচে। আর মরণকে ভয় করিনে। চলুন।”
***
বিকেল পড়ে এসেচে। আমরা বাংলোর সম্মুখভাগের প্রশস্ত ভূমিতে চৌপাই পেতে বসেচি। কালীপদ আমাদের চৌপাই থেকে হাত দশেক ঘের অবধি একখানা কাঠি দিয়ে দাগ কেটে, বিড়বিড় করে মন্তর পড়ে, চৌপাইতে বসে শুধোল, “গাঙ্গুলি মশায়, আপনি বয়োবৃদ্ধ জন, আপনার কথাবার্তা কইতে কইতে হয়তো রাত গড়াবে। আমি আপনাকে বাড়িতে ছেড়ে আসব। তার আগে তোমরা কেউ এই গণ্ডি পেরোবে না। আমি বাঁধন দিয়েচি। নচেৎ এখনকার কথাবার্তা আমরা ছাড়াও আড়ি পেতে শোনার মতোও কেউ রয়েচে। আচ্চা, আপনি বলতে পারেন, এই জমিতে কি কখনও সূর্যমুখীর চাষ হত? মানে, বাংলোর দেওয়ালে একখানা চিত্রে দেখেচি অমন একখানা দৃশ্য।”
“আমার যদ্দূর স্মরণ হয়, এই ভূমিতে এককালে কিছু কামিনী, রঙ্গন, গোলাপ আর চাঁপা ফুলের গাছ ছিল। সূর্যমুখীরও চাষ ছিল অনেকখানি জায়গা জুড়ে। কেন, ঠাকুর?”
কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে বললে, “কারণ আছে। ছবিতে একটা প্রশ্ন উঁকি মারচে। যা হোক, সেসব তাঁর নিজস্ব অভিরুচি। আমি বলচি কী…”
কালীপদর কথায় ব্যাঘাত ঘটল কতিপয় বাচ্চার কলরবে। ছোটো ছেলেগুলি এত বড়ো ফাঁকা জমি পেয়ে রোজই এসে খেলাধুলো করে। তাদের কেউ নিষেধ করে না, কিন্তু আজকে কলরব বাঞ্ছনীয় নয়। আমি আর শংকর উঠে দাঁড়িয়ে তাদের খেদাতে যাচ্চি, এমন সময়ে আমাদের উদ্যত হাবভাব দেখে কালীপদ অসন্তোষ প্রকাশ করে, হাত তুলে বোঝাল, “তোমরা ছাড়ো, আমি দেখচি। এই বিপদের দিনে ছোটো শিশুদের কেউ এভাবে ছেড়ে দেয় সাঁঝের মুখে?”
গাঙ্গুলির উত্তর, “ঠিক কথা, ঠাকুর, তবে রোজ রোজ এমনটা হয় না। যেদিন কেউ মারা পড়ে, তারপর একটা-দুটো দিন আর ভয় থাকে না।” কালীপদ রুষ্ট হয়ে বললে, “এ বড়ো ছের্দো এবং খারাপ সান্ত্বনা। ওই নরখাদক কিছু লেখাপড়া করে যায়নি যে, সে দু-দিন পরপরই শিকার ধরবে। সে নরহত্যা করে তার স্বার্থে। তার কোনও দিনক্ষণ আছে নাকি!”
কালীপদ একটি বাচ্চাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলে পর সে লাফিয়ে লাফিয়ে এসে বৃদ্ধ গাঙ্গুলির পায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। তার আসার ভঙ্গি দেখেই মালুম যে, তাদের দলটা এইদিকে আসার জন্য উদ্গ্রীব হয়েই ছিল। কালীপদ হেসে ফেলে বললে, “তুমি কোন বাড়ির ছেলে, খোকাবাবু? নাম কী?”
ছেলেটি প্রত্যুত্তরে আহ্লাদের ভঙ্গিতে বৃদ্ধের পানে চাইল। গাঙ্গুলি স্নেহের কণ্ঠে কইল, “এইটি আমার পৌত্র, ঠাকুর। মেয়ের ঘরের। নাম রাখালচন্দ্র। আমার কাছেই থাকে। পাঠশালেও যায়।”
কালীপদ ছদ্মবিস্ময়ে তাকে বললে, “বলো কী হে? তুমি পাঠশালে যাও? গুরুমশায় মারেন না তো?”
বাচ্চাদের সমস্বরে অকপট জবাব, “হ্যাঁ, মারেন।”
“পাঠশালে গিয়ে কী কী শিখলে?”
“অ, আ, ই, ঈ থেকে চন্নমিন্নু।”
কালীপদ চোখ কপালে তুলে বললে, “চন্নমিন্নু? সেটি আবার কী?”
বাচ্চাটি ঠোঁট উলটে কইল, “তুমি বুঝি পাঠশালে যাও না?” এই বলে হাতের ছোটো লাঠিটি তুলে মাটির উপরে আঁক কেটে একখানা প্রকাণ্ড চন্দ্রবিন্দু আঁকল। কালীপদ গাম্ভীর্য ভুলে, পরিস্থিতি ভুলে, নরহত্যা ভুলে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। আমরাও এই ক-দিনের টানটান হাত কামড়ানো উত্তেজনা ভুলে গিয়ে হেসে উঠলাম দেখে কালীপদ হাসি থামিয়ে, ছন্দগাম্ভীর্য এনে কইল, “কিন্তু দাদুভাই, আমরা যে এখন আঁক কষতে বসেচি। খুব কঠিন কড়াকিয়া আঁক। অবিশ্যি তোমরা যদি আঁক ভালোবাসো, তবে এইখানেই বোসো। আমি কাগজ, পেনসিল এনে দিচ্চি।”
আমার আর শংকরের হুমকির ফল কতদূর প্রসারিত হত জানিনে, তবে বাচ্চাদের দলটি এমন ভয়ানক প্রস্তাব শুনে তিলমাত্তর দেরি না করে অন্তর্হিত। কালীপদ একচিলতে হেসে, তৎক্ষণাৎ হাসি থামিয়ে বলল, “এইবার বলুন গাঙ্গুলিমশায়।”
***
গাঙ্গুলি কিছুক্ষণ দূরের দিকে চেয়ে থেকে, কিছু অতীতের ঘটনা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে, মৃদুকণ্ঠে মুখ খুলল, “যে সময়কার কথা আমি বলতে চলেচি, তখন আমি সোমত্ত জোয়ান পুরুষ। ধরে নিন, আজ থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ বৎসর, কি সামান্য কমবেশি পূর্ব্বের ঘটনা। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েচে, ঠাকুর। পুঙ্খানুপুঙ্খ স্মরণ করে কথা কওয়া সম্ভবে না, তবে যেটুকু মনে গেঁথে রয়েচে, সেটুকুই সংক্ষিপ্ত আকারে বলচি। এই পাপের অতীত আরম্ভ হয় রানিকে দিয়ে।”
আমি উৎসুক হয়ে কইলাম, “কোথাকার রানি?” আর সঙ্গে সঙ্গে মুখুজ্জে মশায়ের অসন্তুষ্ট নজর চোখে পড়ায় ঢোঁক গিলে, মুখ বন্ধ করলাম।
“না ডাক্তারবাবু, কোনও করদ রাজ্যের রানি নয়, তার আসল নাম ছিল রোহিণী। গাঁয়ের লোকের মুখে মুখে হয়ে যায় রানি। সে ওপারের পলাশডি আর বেতাইবন, অর্থাৎ যেখানে শিউচরণ সাধু ডেরা ফেলেচিল, সেইখানে একখানা প্রাচীন মন্দিরে বাস করত। মন্দিরের যাবতীয় ঐশ্বর্য আর বিগ্রহ ভাঙা পড়েচিল মনে হয় সেই কালাপাহাড়ের সময়কালে। তারপর থেকে মন্দির ছিল শূন্যগর্ভ। রোহিণী ছিল ভীষণ ক্ষমতাবতী সাধিকা। সে এসে নিজ হস্তে বেতাই মন্দিরকে সংস্কৃত করে, তাতে মহাকালীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে। রোহিণী ঠিক কীসের সাধনায় ব্রতী ছিল, তা জানতুম না আমরা কেউই, তবে তার জটা-পড়া কেশরাজি, ভস্ম-মাখা মুখ আর রহস্যময় চালচলন দেখে আমরা তাকে যথাসম্ভব এড়িয়েই চলতুম। গায়ের হাতে গোনা কয়েকজন দরকারি মানুষ ভিন্ন অপরাপর কারও সঙ্গেই রোহিণী বাক্যবিনিময় করত না, তবে কেউ খুব কঠিন পীড়ায় পড়লে, বা দৈব বিপাকে পড়লে একবার রানিমা বলে গিয়ে পড়লে, সেই প্রজা শত তিরস্কার, শাপবাক্য আর কুবাক্য শুনলেও শেষ অবধি একটা প্রতিকার নিয়েই ফিরত। এর ফলে আমাদের মধ্যে রোহিণীর সম্পর্কে ভীষণ ভয়মিশ্রিত একটা শ্রদ্ধা জন্ম নেয়, যাকে বলে সমীহ। তখনও বুঝিনি, ঠাকুর, এই ভরসার পরিণতি ঠিক কী হতে চলেচে।
“রোহিণী গাঁয়ের একজন গাড়োয়ানকে দিয়ে মাঝে মাঝে সদর থেকে জিনিসপত্তর আনতে পাঠাত। সে এসবের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ কোথায় পেত, তা জানিনে। জনরবে শুনতুম, সে দুর্গাপুরের ডাকাইত রানি দেবী চৌধুরানির ন্যায় মন্দিরের ভিতরে মোহরের ঘড়া পেয়েচে, যদিও মন্দির লুঠতরাজের পর কোথাও মোহর পড়ে থাকে বলে শুনিনি। রোহিণী যেসব মালপত্তর আনয়ন করাত, সেসব দ্রব্য একজন শক্তিসাধিকার ঠিক কোন কাজে লাগে, তা আমরা বুঝতে পারতাম না, আর পারতাম না বলেই রোহিণীর সম্পর্কে বিভিন্ন ভয়ানক গুপ্তকথা রটতে আরম্ভ করল। যদিও গুপ্তকথার একটা ভয়ংকর ভিত্তি আমাদের সামনেই ঘটেচিল। ধীরে ধীরে বলছি সবটাই।
“রোহিণী সদর থেকে আনাত লোহার কাছি, তামার পাত্তর, কাচের ছোটোবড়ো স্ফটিক, আতশকাচ প্রভৃতি দ্রব্য। কেউ কেউ বলত, রানিমা একজন বিদ্যেধরী। ছদ্মনামে, ছদ্মবেশে এইখানে লুকিয়ে রয়েচে। একদিন কীসের একটা পরবে যেন গাঁয়ের লোকজন ওপারের বামুনবাড়িতে মেয়েছেলেরা, বাচ্চাকাচ্চারা জমায়েত হয়েচিল, হঠাৎ রোহিণী তার ভয়ংকর চেহারা নিয়ে, শূল হাতে গাঁয়ের ভিতরে এসে ঢুকে, নিজের কর্কশ স্বরে তাদের উদ্দেশে শুধোল, “তোদের মধ্যে আট বৎসর কার কার হয়েচে?”
এমন প্রশ্নে সকলেই চমকে উঠল। একেই রোহিণী কখনও এভাবে গাঁয়ে প্রবিষ্ট হয় না, তদুপরি মেয়েমানুষের বয়স শুধোনোয় অনেকেই খেপে গেল। গৃহকর্তা তাকে প্রণাম জানিয়ে কইল, “কেন মা? গৌরীকন্যায় আপনার কী কাজ?”
“দরকার আছে, দরকার আছে। একখানা পরীক্ষা করার রয়েচে, যার জন্য আট বৎসরের কয়েকটি মেয়েকে দরকার। সন্ধ্যার মধ্যেই তাদের ঘরে পৌঁছে দেব।”
“বলাই বাহুল্য ঠাকুর, এমন একটা প্রস্তাবে কোনও মেয়ের মা রাজি হল না। বিশেষ, রোহিণীর নামে যত ভয়ানক কানাঘুষো শুনতে পাই, তাতে প্রত্যক্ষ কারও অনিষ্ট না করলেও তাকে ভরসা করে সন্তান সঁপে দেওয়া চলে কি? ঠাকুর-দেবতা ভক্তির পাত্র, কিন্তু তাঁকে আমরা নিজের সন্তান বলি দিতে পারি কি? রোহিণী নিরাশ হয়ে, ক্রুদ্ধ হয়ে ‘বেশ’ বলে মন্দিরে ফিরে গেলে পর আবার কানাকানি আরম্ভ হল তার অভিপ্রায় নিয়ে।
“সেই সময়ে গাঁয়ে শিক্ষিত বলতে কেবলমাত্র একজনই ছিল। মাস্টারবাবু। সে মাস্টারি কখনও করেচে বলে শুনিনি, তবে ইংরিজি কইতে পারত, লেখাপড়া জানত, জুতা-পেন্টুলুন পরিধান করত বলে লোকে মাস্টার বলে ডাকত। মানুষটা বড়ো অদ্ভুত, জানেন ঠাকুর? সে গাঁয়ের মেয়েমানুষদেরও জুতা পরতে বলত। তার মুখের প্রতি চাইলে তার মুখভরা ঝুপসি শ্মশ্রু-গুল্ফের জটাভার ভীতির সঞ্চার করত, কিন্তু বিশ্বাস করুন ঠাকুর, সেই প্রবল বহিরাবরণের তলায় তার মুখখানি ছিল দেবতুল্য। এই লম্বা চেহারা, অপূর্ব্ব সুন্দর কান্তি, অনেকটা ঠিক….”
“ভগবান মহাদেবের মতো, তা-ই তো? জটাভারে রুষ্ট, জটা বিনে তুষ্ট। বুঝেচি। তারপর?” কালীপদ বলল।
গাঙ্গুলি ঢোঁক গিলে কইল, “হাঁ ঠাকুর, তা-ই বটে। এই মাস্টার থাকত এই বাংলোতেই। তার সঙ্গে সদরের গোরা সাহেবদের ভারী ওঠা-বসা ছিল, মাস্টার সদর থেকে মাঝেমধ্যেই জঙ্গলে শিকার করার অনুমতি নিয়ে আসত, ফলে গভর্নমেন্টের বাংলোতে থাকার অনুমতি মিলেচিল সহজেই। মাস্টার ছিল জবর শিকারি, তার হাতের লক্ষ্য ছিল একঘাতী। বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করা, ছবি আঁকা, তন্ত্রচর্চা করা আর বনবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো ছিল তার শখ। মাঝেমধ্যে আমরাও তার সঙ্গী হয়েছি। জোয়ান কেশবচন্দ্র ছিল মাস্টারের সহচর।
“এই ঘোরাফেরার ফলেই হোক, আর অন্য কারণেই হোক, রোহিণী পাগলির সঙ্গে মাস্টারের কথাবার্তা চলত মাঝে মাঝে। রোহিণী আমাদের সঙ্গে যতই উগ্র আর চাঁড়ালিনির ন্যায় আচরণ করুক, মাস্টারের সঙ্গে তার বাক্যালাপ শুনে মনে হত বুঝি দুজন শিক্ষিত মানুষ কথাবার্ত্তা কইচে। আমার মনে সন্দেহ হয়, এই পাগলি সাধিকা যতই এলোমেলো হোক, সে হয়তো বেশ কিছু বিদ্যায় বিদুষী ছিল, নচেৎ মাস্টারের সঙ্গে কথাবার্তা চালানোর ক্ষমতা আর কার? আমরা তো পারিনি কখনও?
তো, ধীরে ধীরে আমাদের একটা খটকা লাগতে শুরু করল। মনে হল, দুজন মিলে বোধহয় কোনও একটা গোপন পরীক্ষায় ডুবে রয়েচে। হয়তো গবেষণা বা পরীক্ষাটা রোহিণীরই মস্তিষ্কপ্রসূত, এক্ষণে যোগ্য জুড়িদার হিসেবে স্টিমাস্টারের সঙ্গ পেয়ে তার কাজে বেশ সুবিধাই হয়েচে। দুজন মিলে অনেক সময়ই গভীর তত্ত্বকথা আলোচনা চলত, নানান পুথিপত্তর ঘেঁটে ঘেঁটে আঁক কষা চলত। তখন কেশবের শ্রবণশক্তির বিচ্যুতি ছিল না। সে আমাদের সঙ্গে ‘ কানাকানি করে বলত, “দুজন মিলে মনে হয়, তন্ত্রসাধনা আরম্ভ করেচে কিছু। মাঝেমধ্যে দেখি, মাস্টার একখানা লাল শালুতে আবৃত ঘটিতে জল নিয়ে মন্দিরের দোরের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ের চক্ষে ভিতরে কী যেন দেখচে, আবার একটু পরেই দোরের থেকে সেই জল মন্দিরের ভিতরে ছুড়ে দিত, তারপর ভিতরে ঢুকে কিছুক্ষণ কাটায়।”
“একদিন কেশবের মুখেই শুনলুম, এই দুজন মিলে কিছু একটা পরীক্ষা করচে, যার ফলে নাকি বয়স উলটোপানে হাঁটে! দেহের ভিতরকার ঘড়িতে নাকি সেই প্রভাব পড়বে।”
কালীপদ বিড়বিড় করে বলল, “দেহের ঘড়ি?”
“তবে, আর বলচি কী, ঠাকুর। এ কেমন ভয়ানক কথা বলুন? আমাদের মধ্যে বেশ কিছু কানাকানি হয়েছিল কেশবের থেকে শোনা এইসব গুজব নিয়ে, কিন্তু সেই সঙ্গেই খবর এল, এই পরীক্ষা নিয়ে দুজনের মতভেদ চুড়োয় উঠেচে। মাস্টার বলেচে, গাঁয়ের লোকেদের উপর এই পরীক্ষা করা চলবে না, আর রোহিণী বলচে, এই ভয়ানক পরীক্ষা গাঁয়ের বাইরে নয়, বরং গাঁয়ের ভিতরটুকুতেই করবে সে। এই নিয়ে মতান্তর চরম সীমায় উঠল। একদিন মাস্টার বাংলোতে বিষণ্ণ হয়ে বসে রয়েচে, তখন কেশব গিয়ে কারণ শুধোনোয় মাস্টার ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, ‘তোরা বুঝিসনে, হতভাগা, ওকে তোরা রানি বলিস? ও একটা ডাকিনী। হিংস্র জন্তুর থেকেও ভয়ংকরী ডাকিনী। আমার চিনতে বড়ো বিলম্ব হয়ে গেল রে। তবে আমি তোদের ইন্দুরের ন্যায় ওর শিকার হতে দেব না, এই জেনে রাখিস।’
“আমরা এমন খবরে স্বভাবতই আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, কিন্তু সাপের ছুঁচো গেলার ন্যায় দুজনের একজনকেও প্রকাশ করতে পারলাম না। ভরসা কেবলমাত্র মাস্টার। তারও কিছু বিদ্যে আছে এসবের। সে থাকতে ওই শয়তান্ত্রি আমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না, এই ভরসা আমাদের ছিল বইকি চ
“সেসময়ে যা খবরাখবর চলত, তা কেশবের মুখেই পাওয়া যেত। একদিন মন্দিরে কথাবার্তা চলাকালীন রোহিণী আর মাস্টারের বচসা তুঙ্গে ওঠে। মাস্টার ক্রোধের মাথায় বলে ওঠে, ‘তা-ই যদি হয়, তবে তোমার পুথিপত্র আর গোপন হিসেবপত্র আমি সমূলে বিনষ্ট করে ফেলব। তোমার তন্ত্র দ্বারা তুমি আর যাকেই ভয় দেখাও, আমার কোনও ক্ষতি তুমি করতে পারবে না। রোহিণীও সরোষে তার প্রত্যুত্তর দেয়। মাস্টার হতাশ হয়ে বাংলোতে ফিরে আসে।
“রাতে কেশব আর মাস্টার বাইরের দাওয়ায় বসে খাবার খেয়ে ঘরে ঢুকেই দেখে, রোহিণী ভিতরে বসে রয়েচে। দোর ব্যতীত যে ঘরে ঢোকার অপরাপর পথ নেই, তা তো সামনেই দেখতে পাচ্চেন। অর্থাৎ সে লুকিয়ে প্রবিষ্ট হয়েচে। কেশব চমকে উঠলেও মাস্টার অবাক হয়নি। সে রুষ্ট হয়ে কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্চে, হঠাৎ রোহিণী হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে বললে, ‘আমি তখনকার আচরণের জন্য মাপ চাইচি। আমার ক্ষমা চেয়ে কিছু কাজের কথা বলার আছে।’
“কেশব ইঙ্গিত বুঝে বাইরে বেরিয়ে এলে পর দুজনের মধ্যে কিছু আলোচনা হয়। মাস্টার যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তার মুখ হাসিতে আর আনন্দে উদ্ভাসিত। রোহিণীর সঙ্গে তার সেই বচসার বিষয়ে যে মিটমাট হয়ে গিয়েচে, তা বোঝা গেল। রোহিণী হাসিমুখে বিদায় নিলে পর কেশব তাকে দু-পা এগিয়ে দিয়ে পিছনে ঘুরেই বিস্মিত হল! তার মনিবের একটু আগের সহাস্য বদন অন্তর্হিত হয়ে রাগে থমথম করচে। কেশবের পানে লক্ষ করে মাস্টার বিপন্ন স্বরে বললে, ‘বড়ো বিপদ, হতভাগা। বড়ো বিপদ আসচে। কেউ বাঁচবে না। রাক্ষসী তার মারণ আবিষ্কারের প্রয়োগ করতে চলেচে আগামীকালই। সেই বিদ্যা প্রয়োগ করার মুহূর্ত্তেই গোটা গাঁ শ্মশানে পরিণত হবে। ওকে রুখতেই হবে। যথাসম্ভব বাধা দিতেই হবে। আমি তোদের গাঁয়ের ধ্বংসযজ্ঞের সর্ব্বনাশা কথা শুনেও মুখে দিব্য হাসি রেখেচি, ফলে রাক্ষসী আমার দিক থেকে সায় রয়েচে মনে করে নিশ্চিন্ত হয়েছে। এটাই সুযোগ। খুব গোপনে একটা কাজ করতে হবে, কেশব। গাঁ থেকে তোর মতো জোয়ান কয়েকজন মানুষকে জোগাড় কর খুব চুপিসারে। কাগে-কোগিলে যেন টেরটি না পায়। আর গাঁয়ে একঘর কামার রয়েচে না ওপারে? তার থেকে খুব মজবুত একখানা তোরঙ্গের সন্ধান কর। তৈরি থাকে ভালোই, নইলে একরাত্রি একদিনে গড়ে নিতে বল। লাঠিসোঁটা সঙ্গে নিস। রাক্ষসী টের পেলে আগে আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে, তারপর তোদের। আমিও কিছু তন্ত্রবিদ্যা জানি। কাল রাত্তিরে তোদের রানি মন্দিরের ভিতরে মারণযজ্ঞে আহুতি দেবে। সাক্ষাৎ মহাপিশাচ তার ডাকে সাড়া দিয়ে যে-কোনও পশুর রূপ নিয়ে হাজির হবে মন্দিরে। ঠিক সেই মুহূর্তে যদি ওই পিশাচকে সশরীরে বন্দি করে ফেলা যায়, তবে রোহিণী আপনিই ভস্ম হবে। আমি কতদূর তোদের রক্ষা করতে পারব, তা জানিনে, তবে প্রাণ দিয়েও চেষ্টা চালিয়ে যাব। যা বলেচি, সব বুঝেচিস?’
“কেশব বিহ্বলের মতো ঘাড় নাড়ল। সে সংগোপনে খবর দিল আমাদের আমরাও শয়তানির অভিপ্রায় নিয়ে নিত্যকার আশঙ্কায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেচিলাম, ফলে মনে মনে তার ধ্বংসসাধনের জন্য তৈরি ছিলাম বইকি। তারপর….”
কালীপদ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধকে থামিয়ে কান খাড়া করে কী যেন শুনল, আঘ্রাণ নিল। তারপর একটু সতর্কভাবে কইল, “একটু ঠারেঠোরে বলুন গাঙ্গুলি মশায়।”
আমরা কাছাকাছি ঘেঁষে বসলাম। আকাশে যেন তারার হাট বসে গিয়েচে। গাছে গাছে ঝিঝি ডেকে চলেচে। আমাদের সামনে একখানা লন্ঠন ছিল। সেখানা জ্বেলে মাটিতেই রাখা হল, কারণ চোখের সামনে আলো থাকলে দূরের সব কিছুই আঁধার লাগে। গাঙ্গুলি পইতাগাছ আঙুলে ধরে নারায়ণ স্মরণ করে বলা আরম্ভ করল, “পরদিন রাতের জন্য আমরা প্রস্তুত হলাম, কিন্তু দিনের বেলায় একটা অস্বস্তির ঘটনা ঘটল। গাঁয়ের তিনটি সাত-আট বছরের মেয়েকে সকালে খুঁজে পাওয়া গেল না। তারা খুব ভোরে জল আনতে বাঁধের ওধারে গিয়ে আর ফেরেনি। বাঁধে জাল ফেলা হল, কিন্তু লাশ মিলল না। সক্কলের মনেই একটা ভীষণ সন্দেহ উপস্থিত হয়েচিল, কিন্তু আমরা, গাঁয়ের মাথারা সেসব কথা কানে নিলাম না, কারণ সকলে মিলে যদি রাগের মাথায় মন্দিরে গিয়ে হাজির হয়, তবে রাতের গোপন পরিকল্পনা বিনষ্ট হবে।
“রাত বাড়লে প্র মাস্টার সতর্কভাবে চণ্ডীমণ্ডপে এসে ডাক দিলে পর আমরা একবুক সাহস নিয়ে রওয়ানা হলাম মন্দিরের পানে। মাস্টারের কাঁধে ঝুলচে দুইনলা বন্দুক। সঙ্গে কেশব, আমি, রামা কামার আর শ্রীমন্ত গাড়োয়ান। আমাদের দুজনের হাতে টাঙ্গি। রামা আর শ্রীমন্ত বয়ে নিয়ে চলেচে রামারই তৈরি করা একখানা ভারী শক্তপোক্ত তোরঙ্গ, যেটা আপনারা ইস্টিশনের মাটিতে পেয়েচিলেন। আমরা মন্দিরের ঠিক হাত কুড়ি দূরে একখানা কসাড় ঝোপে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। মন্দিরের ভিতর থেকে শয়তানির কর্কশ কণ্ঠে মন্তর পড়ার বিড়বিড় আওয়াজ কানে আসচে। পিশাচিনী তার মানে আমাদের মৃত্যুযজ্ঞের অতিথির আবাহনী আরম্ভ করেচে। ভীষণ রাগে আমাদের শরীরে আগুন লেগে গেল যেন। মাস্টার সন্তর্পণে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে চাপাস্বরে ‘রাম রাম রাম’ করে ফিরে এসে মুখ দু-হাতে ঢেকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আমরা হতভম্ব হয়ে পড়লাম। দেখলাম, মাস্টার কাঁদচে। কেশব ভীষণ বিস্মিত হয়ে শুধোল, ‘এ কী! কী হয়েচে, মাস্টারবাবু?’
“উত্তরে মাস্টার বললে, ‘দেখাতে মন চায় না, তবে দেখতে হবেই তোমাদেরও। গলা থেকে যেন একটুও শব্দ না বেরোয়। ওই বটতলায় দ্যাখো তোমরা। হা ঈশ্বর! কী নৃশংস এই দানবী!’
“আমরা আঁধারে আবছা চন্দ্রালোকে একটু ঠাহর করে ভীষণ চমকে উঠলাম! গাছতলায় তিনটি বালিকার রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে রয়েচে। যে দেহগুলি সারাদিন ধরে গাঁয়ের আনাচকানাচে পাগলের মতো সন্ধান করা হয়েচে। আমার হাতের টাঙ্গি শক্ত করে ধরলাম, কিন্তু মাস্টার ধরা গলায় বলল, ‘না না। একটু ধৈর্য ধরো। ঘরের ভিতরে আহুত শয়তান ঠিক কী জন্তুর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হবে জানিনে, তবে এটুকু জেনো, সে শরীরধারী অবস্থাতেই থাকবে, অশরীরী নয়। যদি ইতর জীব হয়, তবে তোমাদের টাঙ্গি যথেষ্ট, কিন্তু যদি বাঘজাতীয় পশু হয়ে থাকে, তবে এই আমার গুলিভরা বন্দুক রাখো কেশব। দরকারে চালারে।’
“মাস্টার কান খাড়া করে মন্তর শুনতে লাগল। একসময় যখন মন্ত্রের কর্কশ শব্দ থেমে গেল, মাস্টার তখন এক-পা, এক-পা করে এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের দোরে উঁকি দিয়ে একটু দেখে, আচমকা দৌড়ে ভিতরে ঢুকে গেল আর পলক ফেলতেই চকিতে একখানা শালু-জড়ানো ঘটি তুলে নিয়ে ঝড়ের মতো ছুটে বেরিয়ে এল আমাদের দিকে! মাস্টার সেই ঘটি নিয়ে আমাদের কাছাকাছি চলে এসেচে, হঠাৎ মন্দিরের ভিতর থেকে বিদ্যুৎ গতিতে আমাদের দিকে ধাবিত হয়ে এল একখানা বড়ো, হিংস্র নেকড়ে! আমার হাত কিছুক্ষণের জন্য বিবশ হয়ে পড়ল! এই শয়তান পিশাচ আমাদের পরিজনদের রক্তপানের আশায় মস্তরে সাড়া দিয়ে পাতাললোক থেকে উঠে এসেচে! এই শয়তান কি অস্ত্রের আঘাতে বাগ মানবে?
“মাস্টার ছুটে এসে ঘটিটা ছুড়ে দিল আমাদের কসাড় ঝোপের উপর দিয়ে পিছনের জলায়। তেমনটাই কথা ছিল। নেকড়েটা একটা ভীষণ গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝোপটা পেরিয়ে ওপাশের দিকে। তার দেহটা যখন ঝোপের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্চে, আমার হাতের টাঙ্গি যেন আমার অবচেতনেই সবেগে কোপ মারল জানোয়ারটার পেটের নীচে। সঙ্গে সঙ্গেই কেশবের আগুনে অস্ত্র গর্জন করে উঠল। লোলুপ জন্তুটা দুখানি মারণ আঘাত একসঙ্গে শরীরে ধারণ করে ছিটকে পড়ল ডোবার কিনারে। মাস্টার চিৎকার করে বলল, ‘শিগগির তোরঙ্গের ডালা খোলো। এই শয়তানকে বন্দি না করতে পারলে ভিতরে যজ্ঞে বসা পাপিষ্ঠা ভস্ম হবে না! সে এই মুহূর্ত্তে উঠতে পারচে না, কিন্তু সে একবার বেরিয়ে এলে সকলের মরণ নিশ্চিত।’
“রামা কাঁপা হাতে সিংহের মুখে চাবি ঘোরাতেই ডালা খুলে গেল। মাস্টার প্রাণের মায়া ত্যাগ করে, একলাফে গিয়ে চেপে ধরল নেকড়ের টুটি। জন্তুটা শেষ নখরাঘাতে ফালা করে তুলল মাস্টারের পোশাক আর হাত। মাস্টার প্রবল শক্তিতে সেটাকে ধরে টেনে ফেলল ডালার ভিতরে। রামা দড়াম করে বন্ধ করে দিল ভারী ডালাটা। চাবি ঘোরানোর সময়ও ভিতর থেকে ক্রূর জানোয়ারটার নখের আঁচড়ের শব্দ কানে এল।
“হঠাৎ মন্দিরের ভিতরে আগুন দেখা গেল! যজ্ঞের আগুন নয়, লোলুপ সৰ্ব্বগ্রাসী আগুন। অত বড়ো ঘরখানা যেন এক পলকের জন্য ঝিকিয়ে উঠল রাতের নিকষ আঁধারে, কিন্তু পলক ফেলতেই সে আগুন নিবে গিয়ে গোটা চত্বরটা আগের থেকেও বেশি আঁধারে ডুবে গেল। এত ভয়ংকর আগুন, অথচ একেবারেই ক্ষণস্থায়ী! আমরা দাঁড়িয়ে রয়েচি দেউলের উত্তরদিকে। একটু এগিয়ে গেলেই মন্দিরের উন্মুক্ত দ্বার। বাইরে দাঁড়িয়েই সেই প্রকাণ্ড উঁচু দ্বার থেকে ভিতরের পুরোটাই চোখে পড়ে। আগুন যে একটা দেখা যেতে পারে, তা আমরা ধারণা করেই রেখেচি, কারণ মাস্টার বলেচিল যে, ওই শয়তান নেকড়েকে বন্দি করামাত্র ভিতরের রোহিণী রাক্ষুসি জ্বলে ভস্ম হয়ে যাবে। কিন্তু অদ্ভুত কথা হল, যার সবচেয়ে কম অবাক হবার কথা, সেই মাস্টার হঠাৎ আগুন দেখে চমকে উঠে বললে, ‘হায় হায়! সৰ্ব্বনাশ হয়েচে।’
“হঠাৎ গোটা গ্রামটা যেন থরথরিয়ে দুলে উঠল! আমরা মাটিতে বসে পড়লাম। পিছনে ডোবার জল ছলাত ছলাত করে কাঁপতে থাকল। মাস্টারের মুখ ক্ষোভে, ক্রোধে ফেটে পড়ছে। সে চিবিয়ে চিবিয়ে পাগলের মতো বলল, ‘রাক্ষসী ডাকিনী ইতিমধ্যেই তার বিদ্যা প্রয়োগ করে ফেলেচে। আটকাতে পারলাম না। আটকানো গেল না। হায় হায়! আমার সব প্রচেষ্টা জলে গেল। শোনো তোমরা মন দিয়ে, কাল সকালে যদি কিছু অদ্ভুত, ভাষণ অবাক করা ‘ব্যাপার তোমাদের চোখে পড়ে, তবে তা এই গাঁয়ের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ থাকে। বাইরের একটি মানুষ সে কথা জানতে পারলেই প্রলয় ঘটবে। সকলে মরবে। আর যদি মন্ত্রগুপ্তি রাখতে পারো, তবে এই রাক্ষসী যতই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে যাক, আমার মন্ত্র তাকে রুখে রাখবে।….”
আমরা ভীষণ অবাক হয়ে গাঙ্গুলি বৃদ্ধের এই অদ্ভুত ইতিহাস শুনে চললাম, “মাস্টার এরপর উন্মাদের মতো আমাদের নিয়ে মন্দিরের আনাচকানাচে কী যেন একটা হাতড়ে হাতড়ে, চুলচেরা করে খুঁজে চলল। আমাদের কইল, ‘একখানা লাল চামড়ায় বাঁধানো পুথি, এই আধা হাত চওড়া, এক হাত দীর্ঘ যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। একমাত্র ওই পুথিতেই এই সৰ্ব্বনাশা স্ত মায়ার কুহককে আটকানো যেতে পারে।’
“আমরা ভোররাত অবধি মন্দির, গর্ভগৃহ আর আশপাশের জমিতে তল্লাশি করেও তেমন কোনও পুথির সন্ধান পেলাম না দেখে মাস্টার দুঃখিত হয়ে বসে পড়ল, তারপর কেশবের সঙ্গে দানববন্দি তোরঙ্গটা টানতে টানতে বেরিয়ে পড়ে বলল, ‘তোমরা যে যার গৃহে যাওঁ। গিয়ে ওই মৃতা বালিকাদের বাড়িতে সংবাদ দাও। কেশব, বাংলোয় যা। আমিও যাব, তবে এটাকে গাঁয়ের বাইরে কোথাও পুঁতে ফেলতে হবে। সে কাজ আমি একাই করব। মন্তর পড়ে এই ডালা আমি বেঁধে রাখচি। কখনও এর সন্ধান পেলেও ডালা খুলবি না মূর্খের দল।’
“এরপর সামান্য বেলায় মাস্টার বাড়ি ফিরে এল। আরেকটু পরেই খবর পেলাম, গাঁয়ের রাখহরি সামন্তর রাত থেকে কলেরা, ভেদবমি ধরেচে। আমরা তড়িঘড়ি ছুটে সামস্ত বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখি রাখহরিকে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায়, এক টুকরো কাপড় চাপা দিয়ে উঠোনে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। আমরা ব্যবধান রেখে দাঁড়ালাম। রাখহরিকে প্রবোধ দিতে যাব, এমন সময়ে মুমূর্ষু রাখহরি কেঁদে উঠে ক্ষীণস্বরে কইল, ‘আমাকে মাপ করো তোমরা। আমার পাপের ক্ষমা নেই। তাই তো ভগবান নিজ হাতে আমাকে দণ্ড দিলেন। আমিই অর্থের প্রলোভনে পড়ে তিনটি মেয়েকে ওপারের বাঁধ থেকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েচি। বলেছিল, তন্ত্রসাধনার কাজে ওদের দরকার। তবে হত্যা আমি করিনি। হত্যা করবে বলে জানলে এ পাপ আমি করতাম না। অনেক টাকা দিয়েচিল আমাকে। মন্দিরের মোহরও দেবে বলেচিল। সে টাকা কি সঙ্গে বয়ে নিতে পারচি, গাঙ্গুলি?” এই বলে রাখহরি ফুঁপিয়ে উঠে আবার বলল, ‘তোমরা দেখছ না? তাকিয়ে দ্যাখো! চারদিক কেমন বদলে গিয়েচে! সব আমার পাপের ফলে ঘটল।’ “আমি বিষণ্ণ মুখে বললাম, ‘সেই হত্যাকারী, কুচক্রী তার কৃতকর্মের ফল নিজের প্রাণ দিয়ে পেয়েচে, সামন্ত। তিনটে ফুটফুটে নিষ্পাপ বাচ্চাকে অমনভাবে হত্যা করার ফল।’
“রাখহরির মৃত্যুযাতনাযুক্ত মুখে ক্লিষ্ট হাসি ফুটে উঠল। সে কম্পিত স্বরে বললে, “তোমরা সেই পাপকে মারতে পেরেছ, গাঙ্গুলি? তোমরা পেরেছ তাকে বধ করতে? সত্যি বলছ? মরণের মুখে সান্ত্বনা দিতে দেয়ালা করছ না?”
“ছি ছি! তোমার কিচ্ছুটি হবে না, হরি। চূড়ামণি কোবরেজ আর তার নাতি ওই এসে গিয়েচে। আর ভয় নেই। শান্ত হও।”
“রাখহরি প্রশান্তির কণ্ঠে বললে, ‘আঃ, বড়ো বেদনা। কিন্তু শাস্তিও পেয়েচি তোমার কথা শুনে।’
‘কোবরেজ মশায় এক দাগ ওষুধ দিলেই ঠিক হবে তুমি। সংযত হও। মাস্টার কিন্তু আগেই বলেচিল, সে থাকতে আমাদের গাঁয়ের একতিল ক্ষতি করতে দেবে না ওই রাক্ষসীকে। মাস্টার তার কথা রেখেছে হরি। তার নির্ভীক পদক্ষেপ, তার নিজের প্রাণ বিপন্ন করা সহায়তা না পেলে এই রাক্ষসীর বধ করা অসম্ভব হত। মাথার উপর মাস্টার থাকতে আশা করি, ওই রাক্ষসীর করে-যাওয়া পরীক্ষার প্রভাবকেও কিছুদিনের মধ্যেই সে কাটিয়ে দিতে পারবে।’
“মৃত্যুপথযাত্রী রাখহরি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থাকলে পর আমরা বুঝলাম রাখহরির সময় আসন্ন। আমরা যে যার গৃহে চলে গেলাম। কবিরাজ আর তার শিক্ষানবিশ নাতি মিলে সারাদিন চেষ্টা করেও রাখহরিকে বাঁচাতে পারলে না।
“রাক্ষসী মরল বটে, কিন্তু সে মৃত্যু আহত বাঘিনির ন্যায় শিকারিকে একখানা মরণকামড় দিয়েই ছাড়ল। ঠিক ঘটনার পরদিন রাত্তিরে মাস্টার অন্যান্য বহু দিনের মতোই মনে হয় গাছগাছড়া খুঁজতে বেরিয়েচিল পরীক্ষার জন্য। ওইদিকে, ওই জঙ্গলটায়। সেখানে আচমকা বজ্রাঘাতে দেবতার মতো মানুষটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কেশব কিছুটা দূরে ছিল বলে সে মরেনি।”
***
কালীপদ একটু ভেবে শুধোল, “বেশ, আপনারা মাস্টারের কথামতো পরের দিন কোনও আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ করেচিলেন কি? অর্থাৎ মাস্টার যে ব্যাপারটা দেখার পরেও হয়তো ভালোর জন্যই গোপন রাখার জন্য বলেচিল? তেমনি কিছু ঘটেচিল সত্যি? ওই মৃত্যুকালে রাখহরি যে বলেচিল, ‘চারদিক কেমন বদলে গিয়েচে!’ তেমন কিছু সত্যিই ঘটেচিল?”
গাঙ্গুলি কাশতে কাশতে কইল, “হাঁ ঠাকুর। বড়ো আশ্চর্য আর মহাবিস্ময়কর ঘটনা ঘটেচিল। সব বদলে গিয়েচিল একরাতে। আমরা বৃদ্ধরা ছাড়া সে অত্যাশ্চর্য ঘটনার কথা হয়তো কারোই স্মরণ নেই। আসলে এখন যারা গাঁয়ের বাসিন্দা, তারা মোটামুটি বদলানো পরিবেশটা দেখেই বেড়ে উঠেচে, ফলে তাদের আর সেই ব্যাপারটা আশ্চর্য লাগে না, কিন্তু আমরা ভীষণ অবাক হয়েচিলাম সেই পরিবর্তনে। সব বলচি আমি। বড়ো তেষ্টা পেয়েচে বাবাসকল।” বৃদ্ধের কাশির দমক এতক্ষণের অবিরাম কথার দাপটে বেড়ে উঠল।
কালীপদ ভিতরে জল আনতে গেল। যাবার পূর্ব্বে কইল, “এত রাতে আর বাড়ি ফিরে কাজ নেই, গাঙ্গুলি মশায়। রাতটা আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। সবটুকু শোনা আর বোঝা আবশ্যক।”
আমি শংকরকে কী একটা যেন বলতে গিয়েচি, হঠাৎ ভিতর থেকে ডুমি কুইকুই করে উঠল। কালীপদ দোরের থেকে ঝড়ের গতিতে ছিটকে বেরিয়ে এসে উত্তেজিত স্বরে বলল, “খুব বিপদ! এখুনি লুকিয়ে পড়ো গাচের আড়ালে। তাড়াতাড়ি করো। রাক্ষসী বাংলোর ভিতরে ঢুকেচে। আমাদের সন্ধান করচে। এখুনি লুকিয়ে পড়ো।”
আমরা জড়াজড়ি করে একটু দূরের একখানা স্থল আম গাছের গুড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। শংকর বেদনার স্বরে কইল, “ভূমির কী হবে?”
আবছা আঁধারে দেখলাম, কালীপদ বাংলোর দিকে সতর্ক চোখে চেয়ে ঠোঁটে আঙুল রাখল! চৌপাইয়ের নীচে রাখা লণ্ঠনটার আলো বাংলোর দোরে পড়েচে। ক্ষীণ পদশব্দে বুঝলাম, কেউ একটা ভিতর থেকে ধীরপায়ে দুয়ারের দিকে এগিয়ে আসচে! আমার শরীর শিউরে উঠল। পায়ের শব্দ এগোতে এগোতে দুয়ারের মুখে আসামাত্র শংকর চিৎকার করে উঠল, “এ কী!”
আমার মাথায় গোল লেগে গেল। দুয়ারে কালীপদ দাঁড়িয়ে রয়েছে! হাতে জলের গেলাস! কালীপদ উদবিগ্ন হয়ে চিৎকার করে বললে, “ডাক্তার! ডাক্তরি! শংকর!”
মুহূর্তে আমাদের পাশে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। একটা খিলখিল ভয়ংকর হাসির শব্দের সঙ্গে একখানা বিকটাকৃতি লোমশ, প্রকাণ্ড হাত যেন ছোঁ মেরে পক্ষীশাবকের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেল বৃদ্ধ গাঙ্গুলিকে! আমরা আতঙ্কে পড়িমরি দৌড়ে বাংলোর ভিতরে এসে এলিয়ে পড়লাম। ব্যাপার অনুমান করে কালীপদ কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ে ক্ষোভের সঙ্গে কইল, “আমি যে বারংবার সাবধান করেচিলাম, যেন কেউ গণ্ডি না পেরোয়? কুহকিনীর ফাঁদে পড়ে সেই ভুলটাই করলে ডাক্তার? আমি প্রেত দেখে দুয়ার থেকে ভয়ে দৌড়ে পালাব, এমন কথা তুমি কেমন করে বিশ্বাস করলে, ভায়া? হায় হায়। শেষ কথাটুকু জানানোর মতো আর কেউ জীবিত রইল না গাঁয়ে।”
আমি অপরাধীর ন্যায় কাতর মুখে অধোবদন হয়ে বসে রইলাম।
***
রাতটা জেগেই কেটে গেল। পরদিন সকালে কালীপদর ক্ষোভ প্রশমিত হলে পর সে একটু একটু বুঝতে পারলে যে, ওই পরিস্থিতিতে আমাদের বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়ে গিয়েচিল, এবং সেইটেই খুব স্বাভাবিক। কালীপদ গতকালের গণ্ডিটা নষ্ট করে নতুন করে বাংলোর চারধারে একখানা গণ্ডি রচনা করল।
শংকর ভয়ে ভয়ে শুধোল, “ঠাকুর, এই ধরনের গণ্ডি কি আদৌ ওই সর্ব্বনাশী রাক্ষসীকে ঠেকাতে সক্ষম?”
কালীপদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “হাঁ বাছা। সক্ষম বলেই তোমাদের ছলনার মারফত বাইরে টেনে নিয়ে যাবার দরকার হয়েছিল। নচেৎ সে ছলনার আশ্রয় নিত কি? এই গণ্ডির গুণ রামায়ণে পাবে। একেবারে অনিবার্য না হলেও একে নিবারণ করা প্রায় অসম্ভব।”
আামি সভয়ে প্রশ্ন করলাম, “এ কী বিপদ! তবে দাদা, এই গণ্ডিরও বাঁধন কাটা যেতে পারে?”
“হ্যাঁ। কিছু একটা উপায় তো রয়েচেই। সংসারের কিছুই অমোঘ নয়। মৃত্যু হলে জীবন ফেরত আসে না, এইটা সংসারের নিয়ম। স্বয়ং মহাদেবও সতীকে বাঁচাতে পারেননি, কন্দর্প জীবন পেয়েচিলেন বটে, তবে দেহ পাননি। কিন্তু সেইসব নিয়মের বেড়াজাল ছিন্ন করে গণেশ ফিরে পেলেন তাঁর জীবন। তাই বলচি, কিছুই অমোঘ বা চিরস্থায়ী নয়।”
কালীপদ গণ্ডি দেওয়া শেষ করে কইল, “ভয় নেই, ডাক্তার। আমি বলচি, এ গণ্ডি পেরিয়ে রাক্ষসী আপাই ঢুকতে পারবে না।”
শংকর নিজের হাতে সাড়ে তিনজনের আন্দাজে রেঁধেছে। মুগের ডালের খিচুড়ি, হাঁসের ডিমভাজা, সুগন্ধি গব্যঘৃত আর কুমড়োভাজা। ডুমির খিচুড়িতে শুধু ঘি বাদ। আপাতত এটুকুই রসদ রয়েচে। সকালে আরও কিনে রাখা হবে। এই বাংলোর গা-ঘেঁষা পথটাতেই হাট বসে হপ্তায় দু-দিন। কাল হাটবার। বহুদিন পর কেন যেন কিছুটা স্বস্তি লাগচে। খেয়েদেয়ে গণ্ডির ঘেরাটোপে শুয়ে বেশ কিছুদিন পর নিরাপদ বোধ করলাম। আমি আর শংকর শুলাম ভিতরের শয়নকক্ষে, আর কালীপদ ভূমিকে নিয়ে বাইরের বিরাট ঘরটায়। গুরুপাক আহারের ফলস্বরূপ অচিরেই নিদ্রায় ঢলে পড়লাম।
***
ভোরবেলা ঘুম ভাঙল হাটের লোকজন আর দোকানিদের কলতানে। জানালা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েচে ঘরে। বাইরে থেকে ফেরিওয়ালা হাঁকচে জলখাবার আর জিলিপি, সন্দেশ নিয়ে। মানুষের কণ্ঠস্বর যে এতখানি সুমিষ্ট, তা আগে কখনও অনুভব করিনি এভাবে। কয়েকটা পাখি টি টি টি টি করে উড়ে গেল। জানালায় এসে দাঁড়িয়ে দেখি, কমপক্ষে শ-খানেক গ্রামবাসী আর দোকানি মিলে সমস্ত ভয়ভীতি ভুলে সওদা, চা-পান আর নানান গল্প করে চলেচে। শাকসবজি, বিরাট বিরাট রুই-কাতলার সঙ্গে অসংখ্য মাছের দোকান বসেচে। কতদিন মাছ খাইনি, মনে পড়ল। বেশ কিছু পরিচিত কুলিকামিন, এমনকি লাখন সর্দ্দারও টুকিটাকি বাজার নিয়ে চলেচে। আমাকে জানীলায় দেখে হাসিমুখে বললে, “পেন্নাম কর্তা। সাহেবকে কইবেন, আজ উত্তরের দিকে নতুন লাইন বসবে।” আমিও অভিবাদন জানালাম। গতকালের দমবন্ধ পরিবেশটা মানুষের ছোঁয়ায় যেন আমূল বদলে গিয়েচে। ফেরিওয়ালা জানালায় এসে বললে, “ভালো কচুরি, মোতিচুর আর বেসনের মন্ডা আছে, বাবু। নেবেন?”
এই খাদ্যদ্রব্যগুলির সোয়াদ কলকাতা ছেড়ে এসেচি ইস্তক পাইনি। আমি টেবিলে রাখা পোর্টম্যান্টো থেকে একটা টাকা বের করে বারান্দার দরজাটা খুলচি, কালীপদ অলসভাবে একটা জন্তুণ তুলে পিছন থেকে শুধোল, “হঠাৎ টাকা নিয়ে মতলবটা কী, ডাক্তার?”
আমি হেসে বললুম, “উঠে পড়েছ? দাঁড়াও, আজ তোমাদের ভালো কচুরি খাওয়াব, দাদা। ফেরিওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি বাইরে।”
কালীপদ ভ্রূ তুলে কইল, “প্রস্তাব তো বড়ো সাধুই মনে হচ্চে, কিন্তু বাইরে ফেরিওয়ালা অপেক্ষা করচে, নাকি তোমার মৃত্যু, তা কে জানে?”
আমি বিস্মিত হয়ে কইলাম, “সে কী! এত লোকের মাঝে? এই ভরা সকালে?”
কালীপদ একবার জানালায় উঁকি দিয়ে কইল, “কত লোক, ডাক্তার? কত সকাল?” কালীপদ এগিয়ে এসে আমার কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে কইল, “কপাট খোলো।”
আমি খোলা বারান্দার দোর খুলে ভয়ানক চমকে উঠলাম! কোথায় লোকজন? কোথায় জমজমাট হাট, দোকান? কোথায় ভোর? বাইরে ঘুটঘুট করচে মধ্যরাত্তিরের প্রহর! আরও শিউরে ওঠার মতো ব্যাপার হচ্চে, চারদিকে কোথাও কেউ নেই, অথচ এখনও ভরা হাটের সরগরম কলরব কানে আসছে! আমার দাঁতকপাটি লেগে যাবার মতো অবস্থা হল। কালীপদ ফিশফিশ করে কইল, “ওঁ শ্রী ঔস্মং বীরাং মহাবিষ্ণুং জ্বলন্তসৰ্ব্বতেঃ মুখা। শ্রী নৃসিংহং ভীষণম্ ভদ্রায়ৈঃ মৃত্যুং, মৃতঞ্চঃ নমোহম্যহম।”
সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে একটা ক্রুদ্ধ গরগর গর্জনের সঙ্গে সমস্ত অশরীরী কলরব একযোগে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে এখন শুধু ঝিঁঝির শব্দ। আমার সাদা বর্ণ ধারণ করা মুখের পানে চেয়ে কালীপদ কইল, “এতবার অসতর্ক হয়ে কুহকিনীর ফাঁদে পা দিলে তোমাকে বাঁচায় কার সাধ্যিল ডাক্তার? দেখতে পাচ্চ চোখের সামনে ভোরের দৃশ্য, অথচ রাতচরা পাখি টি টি করে হাঁকছে। এই পাহাড়ি নীরস তালুকে বাংলার মাছের হাট বসে গিয়েচে। এসব দেখে নিজেকে নিজের প্রশ্ন করতে হয়। আমরা যা দেখি, তার অর্ধেকই মিছা। প্রশ্ন করে ধোঁকার টাটি ভাঙতে হয়।
হ্যাঁ, তবে একটা কথা, সে এই বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকতে পারেনি বটে, তাই তোমাকে খোলা জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েচে, কিন্তু কালকে যে বাইরের গণ্ডিটা দিলাম, সেইটে সে কাটিয়ে ফেলল কী প্রকারে? আশ্চর্য তো!”
বাকি রাতটা মুখুজ্জে মশায়ের সঙ্গে বিনিদ্র হয়েই কাটালাম। সত্যিকারের ভোরের আলো ফোটার পরেও আমার বাইরে বেরুতে ভয় করচিল দেখে কালীপদ হেসে কইল, “ঘরপোড়া গাভীন।” আমরা গণ্ডিটা নিরীক্ষা করতে শুরু করলাম। কালীপদ চোখ বোলাতে বোলাতে কইল, “আমার আশ্রমিককালে আমি একবার এই গণ্ডির নিবারণ সম্পর্কে তোমাদের কালকের করা প্রশ্নটিই গুরুদেবকে করেচিলাম। আমার গুরুদেব যা বলেচিলেন,
‘একত্রে রয় মাছি, ঘোড়া
তাতেই এ দেশ জিতল গোরা
পেটে পেটে রইল যা
জলের সনে মিশল তা
গণ্ডি জুড়ে পড়ল ছিটা
দেখ তাকিয়ে, বাঁধন কাটা।’
“এই বলে গুরুদেব বললেন, ‘দ্রব্যগুণ বুঝিস হতভাগা? দ্রব্যগুণ? যে জিনিসটার কথা ছন্দের মধ্যে বললাম, সেই জিনিসটে নতুন হলেও নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে, পৌরাণিক আমল থেকেও বিভিন্ন রূপে এর ব্যবহার চলে আসচে। এই গণ্ডি নিবারণের এই একখানাই উপায়।”
হঠাৎ শংকর উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে উঠল, “এই দেখুন ঠাকুর!”
আমি চেয়ে দেখলুম, গণ্ডির একটা স্থানে হাতখানেক পরিমাণ দাগের উপর ফ্যাকাশে বর্ণের কিছু মিহি গুঁড়া ছড়িয়ে রয়েচে। সেইদিকে তাকিয়ে কালীপদর চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল।
“যা ভেবেচি, ডাক্তার। এই রাক্ষসী নিজেও অসামান্য তন্ত্রবিদুষী। সে ঠিক এর ফাঁক খুঁজে নিয়েচে। এই ভয়াবহ প্রেতাত্মাটি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চাইতে বহুগুণ বেশি মেধা ধারণ করে। এই গুঁড়া কীসের জানো শংকর?”
শংকর কিছুক্ষণ ঠাহর করে চাপাস্বরে বলে উঠল, “এ তো বারুদ মনে হচ্চে!”
“হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছ। তুমি বন্দুক নাড়াচাড়া করেছ, নিশ্চয়ই জানো যে বন্দুকই একমাত্র যন্ত্র, যাতে নলের ডগায় ধাতব মাছি এবং নীচে ঘোড়া থাকে। ভাষাটা দেহাতি এবং সম্ভবত বেহার প্রদেশের। এই অস্ত্রের পেটে পেটে বারুদ ঠাসা থাকে। জলের সঙ্গে বারুদ মিশ্রিত করে এই দাগে ছড়িয়ে দিলে কোনও একটা দ্রব্যগুণের ফলে গণ্ডি তার শক্তি হারায়। তবেই বুঝতে পারছ বাছা, কী ভয়ংকরী পিশাচিনীর সঙ্গে আমাদের ক্ষুরধার লড়াই লড়তে হচ্চে? এই রণে জয়লাভের সম্ভাবনা যে কতখানি, তা ঈশ্বর জানেন।”
***
বাংলোয় ঢোকার মুখে দেখলাম, দূরে বৃদ্ধ গাঙ্গুলির পরিবারের লোকজন কাঁদতে কাঁদতে চলেচে। সকালে বাংলোয় আসা একজন কুলির মুখে শংকর খবর পাঠিয়েচিল তাদের গৃহে। কালীপদ করুণ চোখে তাকিয়ে দেখল, গতকালের ছটফটে সেই বাচ্চাটি তার মাতামহের মৃত্যুর সংবাদ শুনে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে চলেচে। কালীপদ ভীষণ কষ্টে মুখ ফিরিয়ে নিতেই তার চোখ পড়ল গতকালের এই দুষ্টুমিভরা, হাস্যমুখ বাচ্চাটির মাটির উপর এঁকে-যাওয়া বিরাট চন্দ্রবিন্দুর দিকে। আমার মুখ থেকে মনের বিষাদে অজান্তেই বেরিয়ে এল, “চন্নমিন্নু।”
উত্তরে কালীপদ প্রথমে করুণ এবং পরে প্রখর দৃষ্টিতে চন্দ্রবিন্দুর দিকে নজর নিবদ্ধ করে, পরমুহূর্তেই একবার আকাশের পানে চেয়ে চাপা গলায় বিস্মিত হয়ে বলল,
“শশশশ… তা-ই তো!
এতদিন খেয়াল করিনি তো! সত্যিই সেই দিন পুরো পরিবেশ বদলে গিয়েচিল দেখচি। হা ভগবান!”
আমি হতচকিত হয়ে বললাম, “কী বদলে গিয়েচিল?”
“বিরাট বদল ঘটেচিল, ডাক্তার! তুমি খেয়াল করে দ্যাখো, চন্দ্রবিন্দুর চন্দ্রটা যতই বাঁকা হোক, বিন্দুটা কিন্তু সব সময় তার একটা পাশেই থাকে। কখনো নীচের দিকে চলে যায় না!”
আমাদের হাত-কামড়ানো উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলে কালীপদ বাংলোয় দৌড়ে ঢুকে মাস্টারের আঁকা বাংলোর তৈলচিত্রের দিকে ভ্রূ কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল।
***
শংকর ভয়ে ভয়ে বললে, “মুখুজ্জে মশায়, কী দেখচেন ছবিতে অত করে?”
কালীপদ হাতের আঙুলে আঙুল মটকে উত্তেজিত স্বরে কইল, “এই বাংলোটা পুবমুখী নয় কি, শংকর?”
“হ্যাঁ ঠাকুর, বিলক্ষণ। হঠাৎ এ প্রশ্ন?”
“কারণ আছে, বাছা। একজন এমন উঁচুদরের চিত্রকর যখন এমন প্রত্যক্ষ করে ছবি আঁকল, তখন সেই শিল্পী ছবিটিকে যথাসম্ভব নিখুঁত করার চেষ্টাই করবে। কিন্তু মাস্টার তা করেনি। এই ছবিতে সূর্যমুখীর দল তাকিয়ে রয়েছে চিত্রকরের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিমে বাংলোর দিকে। ছবিটা যে প্রভাতের, তা তো লেখাই রয়েচে, কিন্তু ভোরবেলা তো এই ফুলেদের তাকানোর কথা ঠিক উলটোদিকে, যেদিকে সূর্য উঠবে। সকালে বাংলোর থেকে তাদের পিছনের দিকটা দেখা যাবে। তাহলে এমন বেচাল কেন হল? নাকি বেচাল হয়নি আদৌ, শংকরও মাস্টার যা দেখেচে তা-ই এঁকেচে? ছবিটা নিখুঁত সকালের, অথচ আকাশে সূর্য আঁকেনি শিল্পী। অর্থাৎ সূর্যমুখীদের নির্ব্বাক সাক্ষ্য অনুযায়ী সূর্য ছিল মাস্টারের পিছনে। তবে কী দাঁড়ায়, ডাক্তার? এককালে যা পূর্ব্ব ছিল, রোহিণীর ভয়ংকরী পরীক্ষার পর তা হয়ে যায় পশ্চিম?”
আমি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “সে কী! এ যে অসম্ভব, দাদা! এ কখনও হতে পারে? সূর্য্য উলটে গেলে যে জগৎসংসার বিলুপ্ত হত!”
“উত্তেজিত হোয়ো না ডাক্তার। এই বিদ্যা, এই প্রয়োগ আর প্রভাব একমাত্র ডাকিনীর চরের গণ্ডিতেই আটকে রয়েচে। কেশব, গাঙ্গুলি প্রভৃতি বৃদ্ধেরা এই ঘটনা ঘটার সাক্ষী ছিল, কিন্তু তার পরবর্তী প্রজন্ম এই পরিবর্তনটা শৈশব থেকেই এমনভাবে দেখে আসচে, যে তাদের কাছে এটাই সাধারণ ঘটনা। এই গ্রামের থেকে বাইরের গ্রামে পা দিলেই দেখবে, সূর্য্য তার দিক বদলেচে। তেমনি ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে পার্থক্যটা ধরা পড়ে যেত, কিন্তু বাদ সাধল গাঁয়ের ভূপ্রকৃতি। অন্যান্য গাঁয়ে যেতে হলে অতিক্রম করতে হয় ধুয়ানালার বিরাট লম্বা এবং বক্র গুহা সুড়ঙ্গ, যার ফলে ওপারে পৌঁছে মনে হয়, এতখানি বাঁকা পথ পেরোনোর ফলেই সূর্য্য দিক বদলেচে, এবং এটাই নিশ্চয়ই স্বাভাবিকই হবে।
“মনে পড়ে তোমাদের, আমরা যখন রেলগাড়িতে করে আসচি, তখন রোদে মুখ পুড়ে যাচ্চে, অথচ যেই আধখানা চাঁদের মতো বাঁকা পথটা ধরল, অমনি সূর্য্য অপর জানালায় চলে গেল! এ ঘটনা কী করে সম্ভব, ডাক্তার? চন্দ্রবিন্দুর এপার ছেড়ে ওপারে বিন্দুটা গেল কীভাবে? অৰ্দ্ধচন্দ্রপথে চললেও সূর্য্যের অবস্থান একই থাকবে বইকি। এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখোমুখি পড়তে হবে, এতটা আশঙ্কা করিনি।
“আরও প্রশ্ন আছে। রোহিণীকে হত্যা করার পরে সকলে মিলে মন্দিরের ভিতরে ঠিক কী খুঁজতে গিয়েচিল, যা পেলে মাস্টারের কথা অনুসারে এই পরিবর্তনকে রোখা যাবে? তবে নিশ্চয়ই কিছু একটা রয়ে গিয়েচে, যা ধূ রৌহিণী আগেভাগেই সতর্ক হয়ে লুকিয়ে ফেলেচিল। তার বাসস্থান ওই মন্দির এবং আশপাশ ছুঁড়ে ফেলেও যখন তা পাওয়া গেল না, তখন নিশ্চিত সে ওই গুপ্ত বস্তুটি এমন স্থানে লুকিয়েছে, যা কারও মাথাতে আসবে না, কেউ খুঁজতে যাবে না।”
একটু সময় কপালের রগ টিপে দুশ্চিন্তায় বসে থাকতে থাকতে কালীপদ একবার সরু চোখে চৌপাইতে পড়ে-থাকা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর দিকে চেয়ে রইল। ডুমি চুপচাপ বসে থেকে হয়তো ক্ষুধার উদ্রেক হওয়ায় ভুক ভুক করে ডেকে উঠল। ডুমির দিকে চোখ পড়ায় কালীপদ একটু মুখ তুলে বললে, “তোমার ডুমি কেশবের মৃত্যুর দিন কোথায় রাক্ষসীকে ওঁত পাততে দেখেচিল বলেচিলে যেন?”
শংকর ভয়ে ভয়ে ছাতের দিকের তাকগুলোর দিকে তাকাতে কালীপদ বিড়বিড় করে কইল, “রোহিণী যা করেচিল, রোহিণীও তা-ই করেচে কি?” শংকর আমার দিকে চেয়ে কালীপদর অলক্ষে অসহায়ভাবে একটা ইঙ্গিত করল। আমি সেই ইঙ্গিতের জবাবে বিরক্ত হয়ে ফিশফিশ করে শংকরকে কইলাম, “দুর পাগল! অসম্ভব। নিশ্চয়ই কিছু মানে আছে কথাটার।”
কালীপদ সেই ক্ষীণ কথোপকথন শুনে বিমর্ষ হয়ে মুখ তুলে বললে, “না হে শংকর, বাতুলের প্রলাপ নয়। কৃষ্ণকান্ত পড়েছ তো? বিধবা রোহিণী কৃষ্ণকান্তের উইল চুরি করে আবার কৃষ্ণকান্তের ঘরেই লুকিয়ে এসেচিল। ডাক্তার, চট করে একবার চৌপাইটা টেনে নিয়ে তাকের উপরটা দ্যাখো তো? শেষের দিন রোহিণী সবাইকে লুকিয়ে বাংলোয় ঢুকেচিল কেন? সে তো সোজাসুজিই আসতে পারত।”
আমি আজ্ঞা পালন করে, কিছুক্ষণ তাকের উপরের ধুলোর রাশি ঘেঁটে চমকে উঠে বললাম, “এখানে কিছু একটা রয়েচে, দাদা! এই যে, একখানা পুথি ধরনের।”
কালীপদ ছোঁ মেরে সেখানা নিয়ে, তার পরিচ্ছন্ন পোশাকেই ঝেড়ে নিয়ে দেখে বললে, “ধন্যবাদ ডাক্তার। একখানা পুথিই বটে। খাতাও বলা যায়। ধূর্ত রোহিণী গাঁয়ের লোকেদের থেকে নিজের সর্বনাশা পুথি লুকোনোর জন্য এই ঘরটাই বেছে নিয়েচিল সবার অলক্ষে, ডাক্তার, কারণ সে জানত, এই দুঃসাহসী সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কারও ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ হবে না।”
অমিরা টেবিলের তিনপাশে আগ্রহী হয়ে বসে পড়লাম। পুথির উপর আবছা, পুরোনো বাংলা হরফে লেখা, ‘ঘড়ি সূত্র’। আমি একটু ধন্দে পড়ে শুধোলাম, “ঘড়ির সূত্র যখন, তখন নিশ্চয়ই এমন কিছু প্রাচীন জিনিস হবে না, তা-ই না?”
কালীপদ চোখ না তুলেই কইল, “ঘড়ি সূর্য্যেরই আরেকটি নাম।”
অজস্র হিজিবিজি আঁক, দাগ, অজানা রসায়নের নাম। একখানা রসায়নের নাম লেখা রয়েচে—’অগ্নিকপাটের গুঁড়া’। কালীপদ কইল, “আমার গুরুদেব এই অগ্নিকপাট আনাতেন পরীক্ষার জন্য। এর চলতি নাম ফটকিরি। কোনও দাহ্যপদার্থে ফটকিরির ঘন প্রলেপ কয়েকবার লেপে নিয়ে শুকিয়ে নিলে, সেই পদার্থে আগুন লাগলেও আগুন ছড়াতে পারে না।”
বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় আর দুর্বোধ্য সংকেতে ঠাসা পাতার পর পাতা উলটে একখানা পাতায় এসে চোখ আটকে গেল। পাতাতে দুখানি কাঁচা হাতের চিত্র। প্রথমটিতে একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ ঘুমিয়ে রয়েচে উঠোনে আর একটি নারী তাঁকে ডাকচেন। নারীমূর্ত্তির একটি চক্ষুর স্থানে কালি লেপন করা। সে চোখের মণি নেই। দ্বিতীয়টিতে ওই বৃদ্ধের নিদ্রা ভঙ্গ হয়েচে। ভঙ্গিতে বোধ হয়, তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে একচক্ষু নারীর প্রতি শাপবর্ষণ করচেন।
কালীপদ ধীরে ধীরে কইল, “ছবিখানা হয়তো ইঙ্গিতবাহী, কিন্তু এই ইঙ্গিত দেখে মনে হচ্চে, আমি তখন সূর্য্যের দিক বদলানোর ঘটনাটা বলেচি, তা ভ্রান্ত নয়। এ ছবি জরৎকারু আর মনসার ছবি। মনসা একচক্ষু। সূৰ্য্য অস্ত যায় যায় দেখে মনসা বাধ্য হয়েই তাঁর নিদ্রিত স্বামীকে ঘুম ভাঙান, এবং জরৎকারু ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়া সূর্য্যের সাধ্য কী অস্ত যাবার?’
“এইবার বলো ডাক্তার, জরৎকারু মুনি ঠিক কোন বিদ্যের বলে বলীয়ান হয়ে এমন কথা বলেন? কিছু একটা বিদ্যার শক্তি ব্যতীত শুধুমাত্র মস্তরের জোরে সূর্য্যের গতিপথ বদলানো সম্ভব কি? তবে কি সত্যিই সূর্য্যের গতিপথ আংশিকভাবে বদলে দেবার কোনও বিদ্যা রয়েচে লোকচক্ষুর আড়ালে? কী জানি। বাকি পাতাগুলো অতি যত্ন নিয়ে সাবধানে নাড়াচাড়া করে পাঠ করতে হবে। তবে একবার বেতাইয়ের মন্দিরটা দেখতে হচ্চে আজ। শংকরের তো রক্ষাকবচ রয়েচে, কিন্তু ডাক্তার, আমার কাছাকাচির মধ্যেই থেকো। আর হ্যাঁ শংকর, তুমি একবার লাখন সদারকে খবর পাঠাও কাউকে দিয়ে। তাকে একবার সদরের গোরাদের শিকারি আপিসে পাঠানো আবশ্যক। শুনেচি মাস্টার ওই গোরাদের ক্লাবের মেম্বার চিল। সেখানে হতভাগ্য মাস্টারের কিছু খবর পেতে পারি হয়তো।”
***
গাঁয়ের সতীশ ধুলিয়াকে বহু কষ্টে রাজি করিয়ে আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়ে চললাম। গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ হয়ে সেই প্রাচীন মন্দির মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব ধনসম্পদ লুট হয়ে গেলেও উচ্চ মন্দিরের মাথায় একখানা সুচাগ্র রৌপ্যনির্ম্মিত ত্রিশূল শোভা পাচ্চে। হয় মনের সংস্কারে, নয়তো দুরারোহণীয় বলেই চোরের হাতে সেটুকু রক্ষা পেয়েচে। মন্দিরের কাছে এসে সতীশ কইল, “আপনারা ভিতরে প্রবেশ করুন। আমি বাইরেই থাকব।”
আমরা পড়লাম মহাসমস্যায়। কালীপদ কানে হাত ঠেকিয়ে একবার কী যেন এনল দেখে সতীশ শঙ্কাপূর্ণ স্বরে শুধোল, “কী শুনচেন ঠাকুর?”
“ঠিক বুঝতে পারলাম না, তবে মনে হল, কেউ একটা লুকিয়ে রয়েছে বাইরে।”
সতীশ ভীষণ ভয়ে আমাদের সঙ্গেই মন্দিরে ঢুকে পড়ল। কালীপদর নির্লিপ্ত মুখ দেখে আমি তার মিছে কথাটা কিছুটা বুঝতে পারলাম বইকি। প্রথমে পিছনের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিমদিকের রোহিণীর সাধনকক্ষটি দেখলাম। বিরাট বড়ো একখানা ঘর, যার মধ্যে বড়ো মানুষের তিনখানা বৈঠকখানা এঁটে যায়। চারদিকে কিছু সাধনার সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েচে, তাতে সুদীর্ঘ বৎসরের ধুলোবালি। আমার শরীরটা শিউরে উঠল! এই ঘরে ওই সর্ব্বনাশা আপাই জীবৎকালে ভয়ংকর সাধনায় লীন থাকত, জীবজন্তুর রূপ পরিগ্রহ করত!
এই ঘটি থেকে একখানা ক্ষুদ্র দোর দিয়ে পুবের ভাগের মূল মন্দিরে যাতায়াত করা যায়। আমরা সেখানা দিয়ে ধুলোবালি-মাখা মেঝে অতিক্রম করে গর্ভগৃহে এসে দাঁড়ালাম। আমরা এসে পড়েচি দেবী কালীর বিগ্রহের পিছনদিকে। বিরাট মূর্ত্তি। ততোধিক বিরাট মন্দিরের মাথার গম্বুজ। সেই গম্বুজ থেকে একখানা রুপার সরু শিকল নেমেচে মায়ের ঠিক মাথার উপরে, যেমনভাবে মহাদেবের মাথায় শিকলি প্রলম্বিত করে দিবারাত্রি জল ঢালার ব্যবস্থা থাকে। আমরা মূর্ত্তির সামনের দিকে এলাম। কালীপদ মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম করল। মূর্ত্তির ঠিক সুমুখেই পুবের দরজাটা হাট করে খোলা। প্রকাণ্ড দরজা। বোধ করি বহু দূর থেকে দর্শনার্থী বাইরে দাঁড়িয়েও দেবীর পরিপূর্ণ দর্শন পাবে বলেই এই ব্যবস্থা।
কালীপদ উপরের বিরাট গম্বুজের ভিতর ভাগের দিকে তাকিয়ে দেখচে দেখে শংকর কইল, “কী বিরাট স্থাপত্য, তা-ই না ঠাকুর?”
কালীপদ একটু হেসে বললে, “হাঁ, বিলক্ষণ। আচ্ছা, একটা কথা ভেবে দেখেছ, নব্বুই ভাগ ধৰ্ম্ম বা উপাসনালয়ের মাথার ভাগটা সমতল না হয়ে এমন ওলটানো বাটির মতো গড়া হয় কেন?”
আমি ভ্রু নাচিয়ে কইলাম, “কেন?”
উত্তর না দিয়ে কালীপদ বললে, “আচ্ছা, আরেকটা কথা বলো, অধিকাংশ ধর্ম্মস্থানের চূড়ায় ধাতব ত্রিশূল, দণ্ড অথবা অন্যান্য ধাতব সুচাগ্র বস্তু থাকে কেন?”
শংকর হেসে বলল, “এটার কারণ, যাতে বজ্রপাত হলে ওই ধাতব দণ্ড বজ্রকে প্রশমিত করে ভূত্বকে সমাহিত করে দিতে পারে। এটা তো বিদ্যুৎ বিজ্ঞানের গোড়ার কথা।”
“ছেঁদো যুক্তি বটে। বিদ্যুৎ বিজ্ঞান সত্য, কিন্তু বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়েছে ক-দিন, আর ধর্ম্মস্থানে ধাতব দণ্ডের প্রচলন কত সহস্র বৎসর তা হিসেব করে দেখেছ?”
আমি ডাক্তার, শংকর ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু এই কূট প্রশ্নের আপাতদৃষ্টিতে উত্তর না দিতে পেরে অগত্যা কইলাম, “তাহলে এর প্রচলন কি তৎকালীন যুগে অবৈজ্ঞানিকভাবেই করা হত?”
কালীপদ রহস্যময় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে উত্তর দিল, “ভুল। বরং আরও বিরাট একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি চিল এর পিছনে। সে কথা আমার নিজস্ব পাগলের প্রলাপ বলেই ধরে নিতে পারো, কারণ এমন উদ্ভট কথা শুনলে লোকজন আমাকে মারতে আসবে হয়তো।”
“কী যুক্তির কথা বলচেন দাদা? শুনি?”
“বিশ্বাস-অবিশ্বাস তোমার নিজস্ব বিষয়। রেডিয়োতে এরিয়েল কেন থাকে, জানো ডাক্তার?”
“বিলক্ষণ জানি। বাতাসে ভেসে বেড়ানো রেডিয়ো তরঙ্গের গ্রহণকারী হিসেবে সেই এরিয়েলখানা উঁচিয়ে রাখা হয়।”
“ঠিক। অজস্র মানুষের ভক্তি, বিশ্বাস, আবেদন আর প্রার্থনা মিলে আরাধ্যের চারদিকে একখানা বিরাট শুভশক্তির বলয় তৈরি করে। যে শক্তি অসম্ভবরকম শুভকর এবং ইতিবাচক। যে মহাশক্তির একটা ক্ষুদ্র অংশ তৈরি হয় আমাদের সকলের গৃহস্থ বাড়িতেও, রোজকার সন্ধ্যা আরতি, উপাসনা আর বিভিন্ন আরাধনাপদ্ধতির মাধ্যমে, যে কারণে গৃহস্থ বাড়ি সচরাচর প্রেতের আবাস হয়ে ওঠে না। সেই মহাশক্তির বলয়কে ধারণ করার জন্যই এই গম্বুজ এবং সেই শক্তিকে মঙ্গলের জন্য তরঙ্গের আকারে আশপাশে ছড়িয়ে দেবার জন্যে এই ধাতুর এরিয়েল। বিদ্যুতের ব্যবহার জানার বহু যুগ আগে এই এরিয়েল নির্মাণের এই একটাই কারণ আমার বিশ্বাস হয়।”
আমরা পরস্পরের মুখে চাওয়াচাওয়ি করে কোনও কথা কইলাম না। কালীপদ ঘুরে ঘুরে মন্দিরের চারপাশ দেখতে লাগল। আমি সেই ভীষণদর্শন দেবীমূর্ত্তির পানে চেয়ে রইলাম। মূর্ত্তির উচ্চতা প্রায় পনেরো হাত। দুখানি হাত মাথা ছাড়িয়ে উপরে উঠেছে, তাতে খড়্গা আর অসুরমুণ্ড। আর দুইখানি হাত জঙ্ঘা অবধি প্রলম্বিত। লোলজিহ্ব, প্রলয়ংকরী রূপের দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবলাম, প্রলয়পালিতা মহামায়ার চাইতেও কি রাক্ষসী আপাইয়ের শক্তি অধিক? দেবীর তেজঃপুঞ্জ কি মন্দির থেকে গোটা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের রক্ষা করতে পারে না? নাকি দীর্ঘকাল পূজা না-পাওয়ায় তাঁর শুভ, রক্ষাকারী শক্তি বিলোপ পেয়েচে?”
আমরা আরও কিছুক্ষণ পর গাঁয়ে ফিরে এসে বিষম খবর পেলাম! দিনে দুপুরে রাক্ষসী একসঙ্গে তিনটি দিবানিদ্রায় মগ্ন মানুষকে ঘর ভেঙে তুলে নিয়ে গিয়েচে। তাদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ ছড়িয়ে রয়েচে নালার ধারে। তাদের ধড় রয়েচে, কিন্তু মুণ্ডু নেই! সেই ধড়ের সঙ্গে সুদীর্ঘ জবাকুসুমের মালা আর শ্বেতবেড়েলা, শ্বেতচন্দন আর অনন্তের শিকড় পেঁচিয়ে রয়েচে। কালীপদ বাংলোয় বসে খবর শুনে আমাদের নিয়ে অকুস্থলে গেল, আর মৃতদেহ নিরীক্ষণ করে শিহরিত হয়ে বলল, “সময় ফুরিয়ে এসেচেশংকর। মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। আমরা যে সর্ব্বনাশা আপাইয়ের রহস্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েচি, তারই জানান দিচ্চে রাক্ষসী। নরমুণ্ড সংগ্রহ করে সে উগ্র শক্তি সঞ্চয় করচে। দৈত্যপতি রাহুর আবাহনী যজ্ঞে নরমেধের আহুতি দিয়েচে সেই ডাকিনী। আজ রাতটা কাটলে ভাগ্য।
“আমাকে হাতখানেক লজ্জাবতীর ডাল এনে দাও কেউ, আর কিছু বেলের কাঁটা। আমি গাঁয়ের প্রতিটি ঘরের জন্য বাঁধন তৈরি করে দিচ্চি। এই জিনিসগুলো টুকরো করে নিয়ে সকলেই নিজের দোরে টাঙিয়ে রাখো। ঘর হতে বাহির হবে না, তবে নিরাপদে থাকবে রাতটুকু। যদিও সকাল হলেই সঙ্গে বাংলোয় চলো। বাংলোতেও বাঁধন দিয়ে এসেচি যাতে ডাকিনী ওই এর দ্রব্যগুণ নষ্ট হয়ে যাবে। আর সতীশ এবং আরও কয়েকজন পুরুষ আমার পুথির নাগাল না পায়। বেশি বিলম্ব করলে সেই বাঁধন কাটতে তার আটকাবে না। আমার মন বলছে, ওই পুথিতেই তার বিনাশ রচিত আছে। তাই এই আক্রমণ।”
মৃত গাঙ্গুলির পুত্র বীরচন্দ্র কইল, “আমি যাব, ঠাকুর।”
চিনিবাসের খুড়ার ছেলে বললে, “আমাকে নিন বাবাঠাকুর।”
কালীপদ তাদের পানে চেয়ে একটা বেদনার আবেগ রুদ্ধ করে কইল, “আমার সফলতার সম্ভাবনা শতকরা তিন ভাগ মাত্তর। তোমাদের প্রাণ নষ্ট করতে মন চায় না, তবে লোকবল আমার নিতান্তই দরকার। এই রাহু আবাহনের ভয়ংকর যজ্ঞ একদিন একরাতে সম্পন্ন হয়, তারপর আর ওই নরুখাকি ডাকিনীর মোকাবিলা করা অসাধ্য হয়ে পড়বে। যা হবার, যজ্ঞের সমাপনের পূর্ব্বেই করতে হবে বাবা সকল। কিন্তু… কিন্তু কী-ই বা করব আমি? কোন পথে দিশা পাব? সাড়া দে জগজ্জননী।”
কালীপদর কাতর আহ্বানে আমাদের চক্ষু ভরে অশ্রু এল। আমরা সকলের হাতে গৃহবন্দির শেকড় তুলে দিয়ে, কিছুটা নিজেরা নিয়ে, কিছু জরুরি কাজ সেরে বাংলোয় এসে দুয়ার আঁটলাম। লাখন সর্দ্দার সদরে খবর সংগ্রহের যে কাজে প্রেরিত হয়েচিল, তার নির্ব্বাহ করে সে কতকগুলি কাগজপত্র নিয়ে এসেচে। আমরা সবাই হামলে পড়ে সেগুলো দেখতে যাচ্চি, হঠাৎ লাখনের ধমক শুনে ভারী অবাক হলাম! কী আচে এই কাগজে, যে একজন কুলি সর্দ্দার তার উর্দ্ধতন ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, মায় একজন ডাক্তারকে অবধি এভাবে স্পর্দ্ধা দেখাতে পারে? আমরা পিছিয়ে গেলাম। লাখন ক্ষমা চেয়ে বলল, “ঠাকুর নিষেধ করেছেন।”
কালীপদ এসবে মন না দিয়ে কয়েকটি কাগজ খুব যত্ন সহকারে পাঠ করল, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল, তারপর মুখ তুলে আমাদের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কইল, “বুঝলাম এতক্ষণে।”
***
ঘরে অনেকগুলি তেলের বাতি জ্বালা হয়েচে। ঘরখানা অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে রয়েচে। কালীপদ এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে, একখানা পুরোনো কাচের চারদিক ঢাকা শিশলণ্ঠন নিয়ে এসে বলল, “এটাও জ্বালাও। চাকা ঘুরিয়ে সলতে বড়ো করে দাও।”
বাইরে হু হু করে বাতাস বইচে। গাছপালার শনশন শব্দ কানে আসচে। কালীপদ কানে হাত রেখে একটু ঠাহর করে সভয়ে বললে, “শুনতে পাচ্চ? শুনতে পাচ্চ ডাক্তার? রাক্ষসীর মারণযজ্ঞে আহুতি পড়চে?”
আমার শরীর উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করল। আমরা কান পেতে খুব মন দিয়ে শুনলাম, বাইরের ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দের আড়ালে খুব ক্ষীণভাবে গাঁয়ের আকাশ-বাতাস জুড়ে শোনা যাচ্চে কর্কশ নারীকণ্ঠে আবছা মন্ত্রোচ্চারণের একটানা বুলি, “ওঁ ভ্রাং স্ত্রী দ্রৌং সঃ বাহবেঃ নমঃ। অর্দ্ধকায়াং মহাঘোরং চন্দ্রাদিত্য বিমৰ্দ্দকম, সিংহীকায়াং সূতং রুদ্রং, ত্বং রাহুং প্রণম্যহম্ …”
কালীপদ পুথির পাতা ওলটাতেই একটা ঝড়ের দাপট যেন দানবের মতো আছড়ে পড়ল বাংলোটার উপরে! ঘরের ভিতরটা প্রবল বাতাসের স্রোতে লন্ডভন্ড হয়ে গেল। কালীপদ চিৎকার করে কইল, “জানালার কপাট বন্ধ করে দাও। বাইরের দিকে খুব বেশি হাত বাড়াবে না। রাক্ষসী যজ্ঞরতা রয়েচে, কিন্তু তার কুহক থাকতে পারে বাতাসে।”
আচমকা ফুঁসে-ওঠা বাতাসে বাতিগুলো সব নির্ব্বাপিত হয়ে গিয়েচে, শুধু কাচে আবৃত শিশলন্ঠনের আলোতে কালীপদ নিমগ্ন হয়ে রয়েছে। আমি একবার উঁকি দিলাম পুথির পাতায়। প্রাচীন বাংলা হরফে শুদ্ধ ভাষায় লেখা বিভিন্ন রসায়ন, প্রয়োগ আর ফলাফলের কথা। আমার পেশার কারণেই এই লেখাগুলি বুঝতে তেমন কষ্ট হল না। কালীপদ অসহায়ভাবে চোখ তুলে কইল, “একটু বুঝিয়ে দাও ডাক্তার, আমার এত বিদ্যা নেই।”
আমি একের পর এক পাতা পড়ে পড়ে তাঁকে বুঝিয়ে চললাম। একটি পাতায় লেখা রয়েচে—“উপরি-উক্ত বিদ্যার পরিপূর্ণ প্রয়োগ হইলে, চলমান প্রাণীর শরীরের সামান্য তারতম্য ঘটিয়া থাকে। শরীরে নিত্যকার ঘটিয়া চলা বিকৃতি, ক্ষয়, লয় ও বিবর্ত্তন হেতু কোষে কোষে যে জীবন-অবসাদ-রসায়ন প্রত্যহ জন্মিয়া থাকে, তাহা উক্ত প্রয়োগের ফলে আপনিই নিষ্কোষিত হইয়া যায়। দেহে অবস্থান করা দেহ-ঘড়ি উল্টা পথে চলিতে আরম্ভ করিয়া থাকে। জীব সুদীর্ঘ ও নীরোগ জীবন লব্ধ হয়।”
আরেকটি পাতায় লেখা—“পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ ও তদ্ অন্তে বুঝিলাম, দেহ-ঘড়ি কিছু নতুন উদ্ভাবন নহে। ঈশ্বরও বুঝি কখনও নিজ সুবিশাল পরীক্ষাগারে ইহা বিলক্ষণ পরীক্ষা করিয়াচেন, তবে মনুষ্যের প্রতি নহে, পুষ্পের প্রতি। সূর্য্যমুখীর কুসুমে সচল দেহ-ঘড়ি বিদ্যমান। ইহার শক্তিতেই সে নিত্যদিন সূর্য্যের অবস্থান বুঝিয়া থাকে। কেবলমাত্র দিবাভাগেই নহে, আমি রাত্রির পর রাত্রি জাগরণ করিয়া দেখিলাম, সূর্য্য যখন অস্তাচলে ডুব দিয়া এই পৃথিবী গ্রহের অপর পার্শ্বে নিজ পথ ধরিয়া চলিতে থাকেন, তখনও অবধি সূর্য্যমুখীর ফুল পৃথিবী ভেদ করিয়া তাঁহার অবস্থান ধরিতে পারে, ফলে সমগ্র রাত্রি ধীরে ধীরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া, সূর্যোদয়ের ঠিক পূর্ব্বে তাহারা পুনরায় পূর্ব্বদিকে মুখ করিয়া সাগ্রহে চাহিয়া রহে। ঈশ্বরের ইহা এক অত্যাশ্চর্য্য দান! শরীরযন্ত্রে এইরূপ ঘড়িযন্ত্রের অবস্থানের কথা সমগ্র বিশ্বের জানা আবশ্যক। লোলুপ শ্যেনপক্ষীর হস্তে পড়িলে ইহাই প্রলয় আনিবে।”
আমি কালীপদর পানে চাইতেই সে কইল, “এত বড়ো সাধিকা আজ একজন দুরাচারীর ন্যায় সর্ব্বনাশী রূপ ধরে গাঁয়ের ধ্বংস ডাকতে বসেচে, অথচ পুথি পড়ে মনে হয় সে চেয়েচিল গাঁয়ের লোকেদের ভালো করতে। রোহিণীর শরীরের সঙ্গে সঙ্গে বুঝি তার সেই স্বাভাবিক মনুষ্যসত্তাও বিলুপ্ত হয়েচে। আজ রয়েচে কেবল আপাই! নরলোলুপ, নৃশংস এক মারণসত্তা। তারপর পড়ো ডাক্তার।”
আরও কিছু কথা পড়ে শোনালাম। রোহিণী তার পরীক্ষায় সম্পূর্ণ দৈবনির্ভর। এক স্থানে লেখা – “করালবদনী মা আমার সদাই সব লক্ষ করিতেচেন। আমার ছেলেমানুষি দেখিয়া হাসিয়া কুটিপাটি যাইতেচেন। চারহস্তে অস্ত্র, মুণ্ডধারী ভয়ংকরী ভবানী যখন প্রসন্না হয়েন, দুই হাত ভরিয়া আশীর্ব্বাদ করেন, তখন ভক্ত তাঁহার অভীষ্ট লাভ করিবে, ইহাতে সন্দেহ কী? স্বয়ং জগন্মাতার হস্তক্ষেপ ঘটিলে মনুষ্যের অসাধ্য আর কী?”
শেষে একটা পাতায় চোখ পড়তে একটু হোঁচট খেলাম। সেখানা খাঁটি সংস্কৃত এবং হেঁয়ালি করা। কালীপদ পুথিটা টেনে, কিছুক্ষণ পাঠ করে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলল, “হেঁয়ালি নয়, হেঁয়ালি নয়, ডাক্তার! জয় মা। এই সেই রাক্ষসীকে বধ করার একমাত্র উপায়। ঠিক বধোপায় নয় বটে, এর ফলে সেই সেবারের ঘটে-যাওয়া সূর্য্যের গতিপথের যে ভ্রম তৈরি হয়েচিল, তাকে আবার নিজ স্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেই শক্তির টানেই ওই আপাই রাক্ষসী এই গাঁয়ের মাটি কামড়ে পড়ে রয়েচে। সূর্য্যের গতিপথের এই বিভ্রম দূর করতে পারলেই রাক্ষসীও বিনষ্ট হবে।”
ঘরে উপস্থিত সকলেই একযোগে বলে উঠল, “কী উপায়?”
কালীপদ কইল, “এর বাংলা করলে দাঁড়ায়— ‘যখন আকাশ জুড়ে স্নিগ্ধ তারার আলো ফুটে উঠবে, তখন সেই সদ্য ফুটে-ওঠা তারার আলো যদি তাঁর রাক্ষুসে, রক্তলোলুপ চোখের উপরে প্রতিফলিত হয়, তবে সূর্য্যযন্ত্রের পাকচক্রের উলটো বিপাক আরম্ভ হবে। অর্থাৎ সব আবার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে।’…”
শংকর সাগ্রহে বললে, “কিন্তু সব তারাই তো স্নিগ্ধ! রোহিণী কোন তারাটির কথা বলতে চেয়েচে ঠাকুর?”
কালীপদ হতাশ হয়ে বলল, “সহস্র তারার ভিড়ে কোনও একটি বিশেষ তারাকে হয়তো রোহিণী চিনত, কিন্তু সেইটে চেনার সংকেত সে লিখে যায়নি দেখচি। হা ভগবান। তবে না চিনলেও সেই তারাটি নিশ্চয়ই রাতের আকাশে রোজই ফুটে ওঠে, কারণ ওই তারাখানা যদি খুবই দুর্লভ হত, তাহলে রোহিণী লেখার সময়ে ‘যখন আকাশ জুড়ে’ না লিখে ‘যেদিন আকাশ জুড়ে’ লিখত নিশ্চয়ই। সারারাত যদি মন্দিরের দোর খুলে, ওই দানবীকে ঠেকিয়ে রাখতে পারি, তবে গোটা রাতের মধ্যে নিশ্চয়ই সেই তারার আলো দেবীর বিগ্রহের চোখে প্রতিফলিত হবেই, আর রাক্ষসীও চিরকালের জন্য বিনষ্ট হবে। আর বিলম্ব নয়, সকলে আমার কাছাকাছি থাকবে। এইবার বেরিয়ে পড়ি।”
***
আমরা বাংলোর দুয়ারের কপাট খুলতেই প্রবল বাতাসের তোড় ঝাঁপিয়ে পড়ল। খুব সাবধানে শিশলণ্ঠনটার আলো রক্ষা করে চললাম। কালীপদ পুথিখানা ঘরেই সযত্নে রেখে, বাংলোয় বাঁধন দিয়ে, ঝনাত করে দোর এঁটে শিকল তুলে দিল। কুলুপ দেবার আবশ্যকতা নেই, কারণ যাকে রোখার জন্য এত আয়োজন, তাকে কুলুপ দিয়ে আটকানো চলে না। আমরা ঝড়ে এঁকেবেঁকে আঁধার পথ দিয়ে বেতাইয়ের জঙ্গলের পানে চলতে আরম্ভ করলাম দলবদ্ধভাবে। ডুমিকে রেখে আসা হল ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য্যর গৃহে।
ঝড়ের বেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েচে। সেই অশরীরী, ইহলোকের ওপার থেকে আসা অশুভ মন্তরের গুঞ্জন আরও স্পষ্ট হচ্চে যেন। আমরা কিছুটা এগিয়ে এসে যখন গাঁয়ের সীমানার বনের শুরুটা দেখতে পাচ্চি, তখন কালীপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ফিশফিশ করে বলল, “কারা আসচে যেন। একের বেশি পায়ের শব্দ!” তারপর একটু থেমে, কান সজাগ করে কইল, “মানুষ!”
সামান্য ব্যবধানেই ডানদিকের ঝোপঝাড়-ঘেরা সরু পথটির ওপাশ থেকে একজোড়া মানুষ এসে থামল পথের উপরে। তাদের থমকানোর কারণ, তারা সম্ভবত আমাদের লণ্ঠনটা দেখতে পেয়েচে। একজন যুবা, অপরজনের বয়স সত্তরের এদিকে তো নয়ই। আকাশের কোমল আলোতে তাদের একটু আগের চলা দেখে মনে হল, এই বৃদ্ধ চোখে ভালো দেখেন না, তাই এই যুবক তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেচে। কালীপদ যখন ‘মানুষ’ বলে দিয়েছে, তখন আমাদের ভয় নেই। শংকর ইতস্তত করে হাঁক দিলে, “কে ও? কারা যায়?”
বৃদ্ধ হঠাৎ এই হাঁকে ভীষণ চমকে উঠল। সতীশ তাড়াতাড়ি কইল, “ঠাকুর, উনি মুকুন্দ কোবরেজ। গাঁয়ের লোক। কোবরেজমশায়, আপনি এই শরীরে এখানে? এই রাতে? খবর কিছু মন্দ নয় তো? ও বিনু, তুমিই বলো-না হে।”
“আজ্ঞা না খুড়ো, তেমনি কিছু নয় বটে, তবে কোবরেজমশায় অস্থির করে তুলেচেন আপনাদের সঙ্গে, বিশেষ এই ঠাকুরমশায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে। আমরা বাংলোর পানেই চলেচিলাম, কিন্তু পথেই দেখা হল। আমার বড়ো ভয় করছে, খুড়ো। আপনারা এই আঁধারে বনের দিকে চলেচেন কেন? ওপার থেকে ওইটে কীসের একটা ক্ষীণ আওয়াজ আসচে বিড়বিড় মন্তর পড়ার মতো? ওই মন্তর পড়া শুনেই কোবরেজমশায় কইলেন যে, ‘বিনয়, আমার সঙ্গে একটু চল, বাপ আমার। রাক্ষসী অন্তত এই সময়টা কারুকে মারতে বেরোবে না।’ তা-ই শুনেই জীবনটা হাতে করে এসেচি।”
কালীপদ কোবরেজের দিকে সরু চক্ষে চেয়ে বলল, “তন্ত্রকুল কার বরাবর?
প্রায় অন্ধ কবিরাজ এইবার মুখ খুলে ধীরে ধীরে কইল, “বিদ্যেধর আচার্য্য, হাতিবান্ধা, জিরে….”
কথায় বুঝলাম, এই কোবরেজও নির্ঘাত একজন তন্ত্রবেত্তা। কালীপদ কইল, “আমাদের বড়ো তাড়া রয়েচে, কোবরেজমশায়। আপনি যা বলতে এসেছেন, একটু সংক্ষিপ্ত আকারে বলুন।”
কবিরাজ বিমর্ষ কণ্ঠে বলল, “যা কইতে এসেচি, তা কখনও কারুকে কইব না ঠিক করেচিলাম, ঠাকুর, কিন্তু আজ না বললেই নয়। আজ আপনাকে সত্যিকারের এক নরমেধের কথা শোনাব। শোনাব সেই নরমেধের এক জিয়ন্ত রাক্ষসের কথা। আপনারা শুনবেন?”
আমরা সত্যিই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েচি। কালীপদ তিক্ত স্বরে কইল, “না বললেও অনুমান করেচিলাম আমি, কোবরেজমশায়। মাস্টারের কথা বলবেন কি?”
ক্ষীণদৃষ্টি কবিরাজ বিস্মিত হয়ে চুপ করে থেকে কইল, “বুঝেচি। পারলে তুমিই পারবে, ঠাকুর। হাঁ, আমি তার কথাই বলব, বাছা। অনুমানে বুঝচি তুমি আমার চাইতে বয়সে অনেক নবীন, তুমি সম্বোধনেই বলি। তুমি কেমন করে অতদিন অতীতের কথা ধরে ফেললে তা বুঝতে পারচি না, তবে আমার কথাটুকু সংক্ষেপেই বলব। শোনো, গাঙ্গুলি তোমাদের কী বলেচে আমি জানিনে, তবে যতটুকু সে জানে… দুঃখিত… জানত, সেটুকুই সে বালাচ নিশ্চয়ই। তার মধ্যে রাখহরির কথা নিশ্চয়ই শুনেচ ঠাকুর? যে রাখহরি টাকার লোভে বালিকাদের অপহরণ করেচিল? তার মরণকালে একজন কবিরাজ, নাম চূড়ামণি, আর তার নাতি মুকুন্দ মিলে তার শেষ চিকিৎসা করেছিল। রাখহরি মরণকালে কিছু গোপন কথা বলে গিয়েছিল তাদের। সেসব কথা বাইরের কেউ কখনও জানেনি।
“আমিই মুকুন্দ কবিরাজ, ঠাকুরমশায়। চূড়ামণি কোবরেজের পৌত্র। বাকিটুকু আমি বলি, শোনো তোমরা। রাখহরিকে ফেলে সবাই চলে গিয়েছিল যে যার গৃহে, অমন রোগীর নিকটে তার পরিজনরাও ছিল না। ছিলুম কেবল আমরা দুজন আর রোগী। রাখহরি শেষকালে কেঁদে ফেলে কইল, “বিরাট বড়ো প্রমাদ ঘটেছে, কবিরাজমশায়! ভয়ানক সর্ব্বনাশ ঘটেচে! এই গাঁ শ্মশান হয়ে যাবে একদিন গতকালের এই মহাপাতকের ফলে। রাক্ষসকে নিধন করার বদলে এক হিতাকাঙ্ক্ষীকে হত্যা করেচে গোটা গাঁ।’
“আমাদের পায়ের তলা থেকে শক্ত উঠোনের মাটিটা আচমকা সরে গেলেও এতখানি হতবুদ্ধি হতাম না! আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তাহলে কে তোমাকে টাকার লোভ দেখিয়েচে, সামন্তখুড়ো? কে ওই মেয়েগুলিকে হত্যা করেচে?’ রাখহরি কেঁদে উঠে কইল, ‘মাস্টারবাবু। সে-ই ওদের হত্যা করে বনের ভিতরে টেনে নিয়ে গিয়েচে গতকাল সকালে। সাঁঝের মুখে এসে আমাকে একতাড়া নম্বরি নোট গুঁজে দিয়ে বললে, “মুখ বন্ধ রাখবি, না হলে তোকেও এক গুলিতে শেষ করে ফেলব।”…’
“একটু পরেই রাখহরি চিরকালের জন্য টাকার মায়া কাটিয়ে চক্ষু মুদল। ভীষণ তোড়ে বৃষ্টি নামল।
“আমার শরীরে আগুন ধরে গেল, ঠাকুর। একজন পাষণ্ড, নরাধম জলজিয়ন্ত দাপিয়ে বেড়াবে, আর একজন হিতাকাঙ্ক্ষী মেয়েমানুষ নৃশংসভাবে মারা পড়বে, এ আমার নবীন রক্ত মানতে পারেনি। আমি কাউকে, এমনকি দাদামশায়কেও ঘুণাক্ষরে কিছু না জানিয়ে পরদিন রাত্তিরে জলকাদা অগ্রাহ্য করে যখন একখানা টাঙ্গি নিয়ে বাংলোয় পৌঁছোই, তখন মাস্টার রাতের ক্লান্তি অপনোদন করতে ব্র্যান্ডি নিয়ে বসেচে।
“কেশব গিয়েচিল গাঁয়ের ওইদিকটায় একটা কাজে। আমি টাঙ্গিটা তুলে নিয়ে ঢুকলাম এই সামনের ঘরটায়। নেশাগ্রস্ত শয়তান দোর বন্ধ করেনি। করলেও আমি শিকল নেড়ে ঢুকতাম। মাস্টার চমকে উঠেই আমাদের মনোভাব বুঝে রাইফেলটা তুলে নিল পলকের মধ্যে। আমি একলাফে গিয়ে রাইফেলের নলটা চেপে ধরলাম। দুজন ধস্তাধস্তি করার সময়ে যখন মাস্টার তার অস্ত্র চালনা করতে পারছে না, তখন আমি বাম হাতে মারলাম তার নাকে এক ঘুসি। নেশায় বুঁদ মাস্টার পড়ে গেল, আর আমি মেঝে থেকে তুলে নিলাম আমার অস্ত্র। এই হাতে ধরা ক্ষুরধার হাতিয়ার বসে গেল সেই শয়তানের গলায়।
“ঘরের রক্ত পরিষ্কার করে, মাস্টারের দেহটা আমি টেনে নিয়ে গেলাম বাংলোর সামনের গাছগাছালি ঘেরা পথে। ভীষণ বৃষ্টিবাদল হচ্চে তখন। আমার ইচ্ছা ছিল, সেই অপবিত্র শয়তানের দেহটা খাদের থেকে নীচে ফেলে দেব, কিন্তু একা একা মৃতদেহ বওয়াবড়ো দুঃসাধ্যের কথা। ওই গাছের আবডালে ঘেরা পথটায় যেতেই সভয়ে শুনলাম কেশবদাদার গলা। একটু পরেই তাকে পথের ওদিকে দেখা গেল। ছাতা মাথায় সে গান গাইতে গাইতে আসচে বাংলোর দিকেই। আমি খুনি নই, ঠাকুর। আমার হাত-পা শিথিল হয়ে এল ধরা পড়ার ভয়ে। আমি মৃতদেহ পথেই ফেলে আতঙ্কে বহু দূর পালিয়ে গিয়ে বসে থাকলাম, কিন্তু ধরা পড়া আমার নিয়তিতে বোধ করি তখন লেখা ছিল না।
“হঠাৎ আকাশ চিরে একখানা বাজ পড়ল গাছগুলোর মধ্যে! আমি বহুক্ষণ চোখে ধাঁধা দেখলাম। তারপর সব ভয় ত্যাগ করে ছুটে গেলাম কেশবদাদার কাছে। বাজ পড়েচে কেশবদাদার থেকে বেশ কিছুটা দূরে, পিশাচ মাস্টারের মৃতদেহের উপরে! এই ঘটনার পর কেশবদাদা শ্রবণশক্তি হারায়। গাঁয়ের লোক জানল, তাদের দেবতা মাস্টার বাজ পড়ে মারা পড়েছে। বাজে ঝলসানো দেহের গলার ক্ষতচিহ্ন কারও চোখে পড়েনি আর। রক্তও বিশেষ বাকি ছিল না। কেউ বলল, এসবই ওই রাক্ষসীর শাপ। মাস্টার এমনিতেও ঝোপঝাড় ঘুরে দিবারাত্রি পরীক্ষানিরীক্ষা করত, তাই ওই সময়ে জঙ্গলে যাওয়া নিয়ে তত সন্দেহ কেউই করেনি। দাদামশাই প্রবীণ মানুষ। মাস্টারের আসল রূপটা তিনি হয়তো কিছু বুঝেই বাকিদের বলেননি। আমি বলতে পারতুম, কিন্তু বিশ্বাস করো ঠাকুর, নিজের হাতে খুনটা করেছি বলেই ওই দানবের আসল রূপটা নিয়ে আমি মুখে কুলুপ দিয়ে ছিলাম এতদিন।
“কিছুদিন পর সদরের অল্টি সাহেব শিকারে এসে মাস্টারের খোঁজ করায় আমরা জানাই, মাস্টার কিছুদিন আগে জঙ্গলে গিয়ে বজ্রাঘাতে পুড়ে মরেছে। আমাদের সম্মিলিত গাঁয়ের একযোগে স্বীকারোক্তির পর সাহেব আমাদের অবিশ্বাস করতে পারেননি। মাস্টার সদরের গোরাদের শিকারি আপিসের পরিচিত মুখ ছিল। অল্টি সাহেব সদরে ফিরে মাস্টারের মৃত্যুসংবাদ প্রচার করে।” এই অবধি বলে বৃদ্ধ কবিরাজ চোখ মুছল।
কালীপদ তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ধন্যবাদ আপনাকে, কবিরাজমশায়। আপনি গৃহে যান। বিনয়, নিয়ে যাও বাছা।”
***
আমাদের পা চলছে না এমন হতভম্ব হয়েছি আমরা! দেবতা যখন এক লহমায় দানবে পরিণত হয়, তখন বোধ করি এমনই হতবাক ভাব আসে। বনের পথ এখনও অনেকখানি। শংকর দ্রুতপদে চলতে চলতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে কইল, “রোহিণী ঠিক কোন সর্বনাশা পরীক্ষায় ব্রতী হয়েচিল তা জানিনে, তবে তাকে যেভাবে বেইমানি করে হত্যা করা হয়েছিল, তা-ও যে বড়ো করুণ, ঠাকুর।”
“কীভাবে হত্যা করা হয়েচিল, শংকর?”
শংকর অবাক হয়ে বললে, “কেন? গতকাল গাঙ্গুলি যে কইল, শয়তানের আহৃত নেকড়েটাকে মাস্টার বন্দি করার পর রাক্ষসী নিজেই ভস্ম হয়ে গিয়েছিল?”
কালীপদ একটু গলাখাঁকারি দিয়ে উত্তর দিলে, “সেই ভস্ম হবার কথাটা গাঙ্গুলি শুনেচিল মাস্টারেরই মুখে। কেউ নিজে ভস্ম হতে দেখেনি। মাস্টারের মতো ইতরের কথা আর বিশ্বাস করা চলে কি? তারপর ধরো, রোহিণী ভস্ম হবার পূর্ব্বে মন্দিরের ভিতর থেকে একটা আর্তনাদও করল না বাছা? কেন? তার কারণ রোহিণী তখন মন্দিরের ভিতরে ছিলই না।”
আমি মহা বিস্মিত হয়ে শুধোলাম, “সে কী! তবে সে ছিল কোথায়?”
“অন্যান্য কোথাও নয়, সে ছিল সকলের সামনেই, শুধু তার শ্বাপদের রূপটা দেখে কেউ চিনতে পারেনি। মাস্টারের ধূর্ত্ত বুদ্ধিতেই এসব হয়েছে। সে পরিকল্পিতভাবেই সবাইকে বুঝিয়েচিল যে ওই পশু একজন আহূত শয়তান, এবং আসল রোহিণী নাকি মন্দিরের ভিতরে রয়েচে। আসলে রোহিণী ছিল কামাখ্যা সিদ্ধা। সে নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারত। মাস্টারকে বিশ্বাস করে সে কয়েকবার মাস্টারের সামনেই হয়তো নিজের রূপ বদলেচে। সেইজন্যই গাঁয়ের লোকেদের কানে রোজ রোজ দেওয়া কেশবের রোজনামচার বর্ণনা অনুযায়ী, মাস্টার পুনরাবৃত্তির মন্ত্রপূত জলের ঘটি নিয়ে মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা করত, আর আগের রূপে ফিরে আসার সময় হলে জলটা তার গায়ে ছুড়ে দিত। আগের রূপে ফেরার জন্য এই মন্ত্রপূত জলটুকু নিতান্তই প্রয়োজন। এটাই বিধান।
“শেষের দিনও রোহিণী নেকড়ের রূপ ধারণ করবে, সেটা হয়তো মাস্টার আগের দিনই হাসিমুখে কথোপকথনের সময়ে জেনেচে, কিন্তু গাঁয়ের লোকেদের কাছে সরল সেজে সে বলে, ভিতর থেকে কী ধরনের শ্বাপদ বেরোবে তা নাকি মাস্টার জানতই না। যত্তসব। আসলে মাস্টার ভালোই জানত সব, ফলে ওঁত পেতে সে চোরের মতো ঘটিটাকে বিনষ্ট করে দেয় এবং নেকড়েরূপী রোহিণীকে মনুষ্যরূপ পরিগ্রহ করার একতিল সুযোগ না দিয়েই নিৰ্ম্মমভাবে হত্যা করে।
“আরও কিছু খটকা আমার রয়েচে। আমার মনে হয়, সবার কাছে পাগলি, রানিমা, ইত্যাদি শুনে আসা রোহিণী এই মাস্টারের থেকেই প্রথম স্নেহ আর প্রণয় পেয়ে তাকে পাগলের মতো ভালোবেসে ফ্যালে এবং ভরসা করতে আরম্ভ করে। কঠিন শিলাতেও ঘাস ফোটে, কয়লাতেও হিরা জন্মে। সেই ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে কুটিল মাস্টার রোহিণীর অসাধারণ, অভূতপূর্ব্ব আবিষ্কার সম্বন্ধে পুরোটাই জেনে ফ্যালে এবং তারপর তার ইচ্ছা হয় সেই আবিষ্কারের আবিষ্কারক হিসেবে নিজেকে দেখার। সে রোহিণীকে বোঝাতে আরম্ভ করে যে, তার এই পরীক্ষা এই অখ্যাত গাঁয়ে না করে বরং দুজনে মিলে পরে পরীক্ষা করার। কিন্তু রোহিণী বলে দেয়, সে এই গাঁয়ের বাইরে পরীক্ষা করতে পারবে না। রোহিণীর উদ্দেশ্য ছিল গায়ের লোকেদের রোগমুক্ত করা।
“রাক্ষস মাস্টার মনে মনে ফুঁসতে থাকে, কিন্তু সরাসরি বিরোধে নামেনি ধূর্ত্ত শয়তানটা। রোহিণীও মাস্টারকে পাগলের মতো ভালোবাসত বটে, কিন্তু বেড়াল যেমন বাঘকে গাছে চড়া শেখায়নি, তেমনি রোহিণীও কিছু একটা বিদ্যা গোপন রেখে দিয়েচিল। অতঃপর দুজনের মতান্তর চরমে ওঠে। কিন্তু এরই মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটে, যার ফলে রোহিণীকে আবার ফিরে আসতে হয় মাস্টারের সঙ্গে বোঝাপড়ায়। বলো তো ডাক্তার, সেই ঘটনা কী হতে পারে?”
আমি এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো কালীপদর এই সাবলীল অতীত দর্শনের মতো কথামালা শুনে চলেচিলাম। সহসা প্রশ্নের মুখে পড়ে চমকে উঠে বললাম, “না, তা তো জানি না।”
“শংকর বলেচিল, প্রথম দিন তোরঙ্গটা পাবার পর যখন নেকড়ের ক্ষয়ে আসা কঙ্কালটি দেখে কুলি সর্দ্দার লাখন বলেচিল যে এইটা একটা মাদি কুকুরের কঙ্কাল, তখন শংকর রনি, কিন্তু আমার একটু খটকা লাগে। এত পুরোনো কঙ্কাল দেখে মাদি না মদ্দ তা নিরূপণ করলে কেমন করে সে? আমি লাখনের থেকে প্রশ্ন করে জানতে পারি আরেকটা নির্ঘুম, পাষণ্ড সত্যকে। বুঝলে ডাক্তার, রোহিণীকে হত্যা করার সময়ে সে ছিল সন্তানসম্ভবা। মাস্টারের কাছে এই কথাটি বলার জন্যই সে রাতে বাংলোয় গিয়েচিল। নেকড়ের কঙ্কালের পেটের শূন্যস্থানে আরেকখানা শিশু নেকড়ের ক্ষয়প্রাপ্ত কঙ্কাল দেখেই লাখনের সন্দেহ হয় যে সেটা নির্ঘাত মাদিই ছিল।”
আমি হাঁ হাঁ করে উঠে কইলাম, “কিন্তু দাদা, রোহিণী নিজের বিদ্যায় রূপ বদলেচে হয়তো, কিন্তু তার গর্ভস্থ মনুষ্যসন্তান কেমন করে নেকড়ের রূপ ধারণ করল? মায়ের রূপ বদলালে কি সন্তানের রূপও বদলে যায়? দুজন তো আলাদা সত্তা!”
কালীপদ উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ভালো প্রশ্ন। তবে সাধিকার বিদ্যার কিয়দংশ নিশ্চয়ই তার সন্তানের আয়ত্তেও এসেচিল।”
“এ যে অসম্ভব! গর্ভের ভিতরে থাকা সন্তান এমন ভয়ানক বিদ্যা আয়ত্ত করেচিল? এ-ও কি হয়?”
“হ্যাঁ তা-ই। নতুন কথা শুনচ কি? অভিমন্যু যে ক্ষমতায় গর্ভে থাকাকালীন চক্রব্যূহে প্রবেশের বিদ্যা শিখেচিলেন, ঠিক সেই বিদ্যার কথাই বলেচি আমি।” আমি একটা শ্বাস ফেললাম। আমরা মন্দিরের অনেকখানি কাছে চলে এসেচি। কালীপদ বলে চলল, “মাস্টার সব শুনে হাসির ভান করলেও সে মনে মনে সেই রাতেই রোহিণীকে বধ করার ষড়যন্ত্র করে ফ্যালে। রোহিণীও ধবন্ধর কম নয়। তাদের টক্কর ছিল বাঘ আর বাঘিনির মতোই। সে নিশ্চয়ই কিছু একটা আঁচ করে আগেভাগেই নিজের পরীক্ষায় আহুতি দিয়ে দেয় কোনও বাধা পড়ার আগেই, ফলত তাকে হত্যা করলেও তার তথাকথিত ‘মহাশ্চৰ্য্য পরীক্ষা’ ততক্ষণে আরম্ভ হয়ে গিয়েচিল।
“আর হ্যাঁ, রোহিণীকে ঠকিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা বলে আবেগে ভেসে তার প্রতি এখন আর তিলমাত্র সহানুভূতি রেখো না বাছা। সে এখন আগের মতো মানুষ নেই। সে সৰ্ব্বগ্রাসী, কুটিল এক প্রেত। তার বিদেহে রক্তের লালসা নেচে ওঠে। হিংস্রতম নরখাদক বাঘিনির চাইতেও সে নৃশংস। কোনওরকম মমতা তার নেই, বিশেষ আমাদের প্রতি তো নয়ই, ডাক্তার। তাই, খুব সাবধান থেকো।”
***
আমরা অতি কষ্টে পথটুকু অতিক্রম করে মন্দিরে ঢুকে পড়লাম। কালীপদ কামিজ থেকে একখানা নেবু, আকাশমরিচ, কয়েকটা শেকড়, পাতা আর এক টুকরো কাঁচা হলুদ বের করে দক্ষিণ পায়ের গোড়ালি দিয়ে পিষতে আরম্ভ করল। নিষ্পেষণ সম্পন্ন হলে পর একখানা পেনসিল কাটার ছুরি বের করে অবলীলায় নিজের হাতের পাতায় রেখে মুষ্টি অবরুদ্ধ করল। বলিষ্ঠ হাতের পেষণে হাত কেটে দরদর করে রক্তের ধারা এসে মিশল বাকি দ্রব্যের মধ্যে।
খাঁটি সাধকের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত সেই মন্ত্রপূত বস্তুটি মন্দিরের চারটি কোনায় স্থাপিত করে, হাতের ক্ষতে এক টুকরো কাপড় পেঁচিয়ে, কালীপদ ক্ষীণস্বরে বললে,
“এই চার কোণে রাখা উগ্র বস্তুটি কেবলমাত্র রাতটুকু আমাদের বাঁধন দেবে তা-ই নয়, বরং আমার রক্তের আঘ্রাণ ওই পিশাচীকে অন্যত্র মনঃসংযোগ করতে বাধা দেবে। আমার দিকে ধেয়ে আসবে সে। শোনো তোমরা, নিতান্তই যদি আমি ওই রাক্ষসীর হাতে জীবন হারাই, তবে তোমরা যেখানে পারো ছুটে প্রাণরক্ষা করবে। ডাকিনী আমাকে আগে না মেরে তোমাদের থাবা দেবে টিনা।”
কালীপদ মূর্ত্তিকে শতবার প্রণাম করে, পাদুকা খুলে বিগ্রহের বেদিতে উঠে পড়ল, আর তারপর শিশু যেরূপে মায়ের ক্রোড়ে অধিষ্ঠিত হয়, সেইরূপ কালীপদ দেবীর ক্রোড়ে উঠে এক টুকরো পরিচ্ছন্ন কাপড় দিয়ে দেবীর ধূলিমলিন চোখ দুটি মুছিয়ে দিল। দেবীর চক্ষুদ্বয় ঝলমলে হয়ে উঠল। আমরা প্রায় দম বন্ধ করে বিরাট একটা প্রলয়ের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। আমি মনে মনে ভবানীর চরণে ভিক্ষা জানিয়ে কইলাম, “হে রক্ষাকর্ত্রী, হে অসুরদলনী মা, আমাদের রক্ষা করুন। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহনক্ষত্র আপনার চরণের শিশিরের সমান। আপনার বশ। আপনার অধীন। এই চোখে যেন আজ রাতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত নক্ষত্রের পবিত্র আলো এসে পড়ে, যে তারার আলোককণায় লুকিয়ে রয়েচে ওই রাক্ষসীর মরণের বীজ।”
একটানা এতদিনের চাপা উত্তেজনা, ভীতি আর ভয়াবহতার মধ্যে বাস করে, আজ এই চূড়ান্ত ক্ষণে পৌঁছে আমাদের শরীর যেন অবসাদের ভারে অসাড় হয়ে এল। আমার চোখের পাতা গুরুভার হয়ে উঠল। চেয়ে দেখলাম, অতন্দ্র কালীপদ ব্যতীত বাকি সবার শারীরিক অবস্থা আমার অনুরূপ। কতক্ষণ সময় কেটেচে জানিনে, হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আমার শরীরটা নিদ্রা ছুটে জেগে উঠল! খুব শক্তিমান কোনও শব্দ ঘুমের মধ্যে শুনলে যেমনটি হয়, ঠিক তেমন। সকলেই তন্দ্রা ছুটে একলাফে জেগে উঠেচে। আমি ভীতস্বরে বলে উঠলাম, “কীসের শব্দ হল?”
কালীপদর প্রখর দৃষ্টি দেখেই বোঝা যায়, তার শরীর, মন এবং ইন্দ্রিয়গুলি টানটান হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কিছু হাতড়ে বেড়াচ্চে। সে চাপা গলায় কইল, “শব্দ শুনে তোমাদের চমক লাগেনি, ডাক্তার, চমক লেগেচে শব্দ বন্ধ হবার কারণে।”
আমার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল! বাইরের ঝড়ের গতিবেগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে উন্মাদ হয়ে উঠেচে, কিন্তু! কিন্তু মন্ত্রের গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে! তবে কি আমাদের অজান্তেই কাঙ্ক্ষিত তারার আলো ভবানীর চোখে এসে পড়েচে? তবে কি রাক্ষসী আর নেই? আমরা ঘুরে তাকাতেই কালীপদ ঠোঁটে আঙুল রেখে হতাশার স্বরে ক্ষোভের সঙ্গে বললে, “শশশ্। সে আসচে! তার সহস্রগুণ শক্তি বৃদ্ধি করে সে আসচে। সব বৃথা, ডাক্তার, সব বৃথা। রাত শেষ হতে চলেচে। আকাশগঙ্গার ঠিকানায় রাতের সমস্ত তারার দল একে একে আকাশে ঘুরে গিয়েচে, তাদের
আলো এই মুণ্ডমালী রাক্কুসির চোখে পড়েছে, কিন্তু আপাই ধ্বংস হয়নি। তার অপয়া শক্তি আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠেচে। মা যখন সন্তানের রক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তখন সুসন্তানের মৃত্যুই একমাত্র দণ্ড, ডাক্তার। আমাদের রক্তে এই দুই রাক্ষসীর ক্ষুধা নির্ব্বাণ হোক। আমি কোনও শয়তানি, পিশাচিনীর হাতে মরব না, ডাক্তার। কখনও না। আমি মরলে আমার আরাধ্যা এই সর্ব্বনাশিনীর হাতেই আত্মাহুতি দেব। আয় মা, রক্ত নে আমার।”
আমি বাধা দেবার আগেই কালীপদ পাগলের মতো উঠে পড়ল মূর্ত্তি বেয়ে। আমরা এই সাধকের লক্ষ্য বুঝতে পেরে কেঁপে উঠলাম! কালীপদ মূর্ত্তির কাঁধ বরাবর উঠে পড়ে তার বিরাট বাম হাতের উপর উঠে দাঁড়িয়ে দেবীর তীক্ষ্ণধার খঙ্গ বরাবর নিজের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত, কাপড়-বাঁধা হাতটা বাড়াল। আমি চিৎকার করে উঠলাম, “দাদা!”
কালীপদ খঙ্গের হাতলে হাত ছোঁয়াল। আচমকা একটা ঘড়ঘড় শব্দের সঙ্গে মায়ের মাথার উপরে উত্থিত দুখানি ভারী হাত কালীপদর শরীরের ভারে যন্ত্রের ন্যায় নেমে এল নীচের দিকে! কালীপদ হঠাৎ বেসামাল হয়ে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। আমরা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, দেবীর উপরের দুখানি হাত নীচের হাত দুটির ঠিক পিছনে এসে স্থির হয়েচে। দেবীকে এখন দ্বিভুজা বলে ভ্রম হচ্চে। কালীপদ কেঁদে ফেলে বলল, “ডাক্তার, এইবার বুঝেচি, রোহিণী তার পুথিতে কেন লিখেচিল যে, চারহস্ত দেবী দুই হাতে _যখন আশীর্ব্বাদ করেন, তখন সব বিপদ কেটে যায়। ‘হস্তক্ষেপ’ কথাটায় লুকিয়ে-থাকা অর্থটা আমি উত্তেজনায় ধরতে পারিনি।”
শংকর চোখ মুছে বললে, “কিন্তু ঠাকুর, দেবীর হাত নীচে নামায় কী লাভ হল?”
“হয়েচে, শংকর, হয়েচে। যে রক্তলোলুপ চোখের ইঙ্গিত আমরা পুথিতে পড়েচিলাম, সেই চোখ দেবীর চোখ নয়। ভবানীর চক্ষু তো বরদাত্রী, সে চোখ রক্তলোলুপ কেন হবে? রক্তলোলুপ চোখ এই দ্যাখো…”
আমি নির্নিমেষ চেয়ে দেখলাম, দেবীর হাতের ধূলিময় খঙ্গের রত্নময় চোখটা সামান্য তেলের বাতির আলোতে ঝিকিয়ে উঠচে। খরে চোখের কথা আমার অজানা নয়, তবে অতখানি উচ্চ হাতের দিকে ততখানি দৃষ্টি দিইনি। কালীপদও সেদিকটা ভুলে গিয়েচিল, কিন্তু…।
আমি কাতর হয়ে শুধোলাম, “কিন্তু দাদা, রাত তো শেষ হতে যায়। এই এত উচ্চতায় আঁধারে থাকা খঙ্গের চোখে তো একটিও তারার প্রতিচ্ছবি এতক্ষণ খোলা দুয়ার দিয়ে এসে পড়েনি। তবে কি ওই অজানা নক্ষত্র আকাশ বেয়ে আগেই চলে গিয়েচে? তাহলে তো চোখের সন্ধান পেয়েও ফল শূন্য।”
কালীপদ দেবীর পানে হাতজোড় করে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “হতেই পারে, না হতেও পারে, ডাক্তার। আমি আর কিছু বুঝিনে। পাগলি আমার জেগে উঠেছে, এই অধম সন্তানকে প্রথম পথটা দেখিয়েচে। বাকিটুকুও এই রাক্কুসিই ভাবুক।”
হঠাৎ যেন একটা ভয়ংকর ভারী ঢেউ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রাচীন মন্দিরের উপরে! উপর থেকে কিছু কিছু চুনসুরকির ঢ্যালা খসে পড়তে আরম্ভ করল সেই প্রবল ঝাঁকুনিতে। আমরা দেবীমূর্ত্তির তলে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েচি। বাইরের আকাশ যত নক্ষত্রহীন হয়ে রাত ফুরিয়ে আসচে, তত আমাদের মনের শেষ বাঁচার আশাটুকুও বিকল হয়ে আসচে। বাইরের আবছা আলোতে দেখলাম, একখানা ভীমদর্শনা কুচকুচে কালো ছায়ামূৰ্ত্তি ভীষণ শূল হাতে মন্দিরের দিকে মুহুর্মুহু আঘাত করচে! সে কী বিকট আকার! যেন সহস্ৰ সহস্ৰ কালসর্প একজোট হয়ে পিণ্ডের আকার পরিগ্রহ করেচে। থেকে থেকে হায়নার ন্যায় হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ রক্ত-জল-করা হাসির কান-ফাটানো আওয়াজ, ক্রুদ্ধ পশুর ন্যায় বিভীষণ গর্জন, আর সেই সঙ্গে শূলের আঘাত।
কালীপদর মন্ত্রপূত গণ্ডির চতুদিকব্যাপী আবরণ খানখান করতে চাইচে সেই নরলোলুপ মরণদূত। তার দাঁতে দাঁতে খটখট শব্দ উত্থিত হচ্চে।
আমি আকাশে রয়ে যাওয়া হাতে গোনা আবছা হয়ে আসা তারাগুলির বাইরে একটা অদ্ভুত শব্দ পেলাম। খুব পুরোনো, মরিচা ধরা ভারী তোরঙ্গের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠলাম। তালা খুললে যেমন শব্দ হয়, কিছুটা সেইরূপ। শব্দ শুনে কালীপদর পানে চাইতে দেখলাম, কালীপদর ললাট বেয়ে স্বেদবিন্দু গড়িয়ে পড়চে। কালীপদ ভাঙা গলায় কইল, “শুনেচ? ওই রাক্ষসী বাঁধন প্রায় কেটে ফেলেছে, ডাক্তার। সে যখন আমাকে আক্রমণ করবে, তখন তোমরা পালাবে। এই আমার আদেশ।” এই বলে কালীপদ আমাদের পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে, পিছনে ঘুরে একবার ভবানীর মুখের দিকে করুণ নয়নে তাকাল।
বিরাট একখানা শব্দের সঙ্গে মন্দিরের ভিতরে ঝড় আছড়ে পড়ল। আমাদের শরীরের সবটুকু শক্তি যেন শুষে নিল কেউ। আমি অবসন্ন শরীরে বসে পড়লাম। রাক্ষসী এসে দাঁড়িয়েচে মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে-থাকা কালীপদর দিকে। রাক্ষসী একবার ভীষণ শব্দে অপার্থিব স্বরে হেসে উঠে নিজের হাতের ভয়ংকর শূল তুলল মাথার উপর, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ভীষণ আর্তস্বরে মন্দিরের প্রতিটি প্রাচীর থরথর করে কেঁপে উঠল। আমি হতবুদ্ধি হয়ে লক্ষ করলাম, সেই সাক্ষাৎ মহাশক্তিধারী ডাকিনী চিৎকার করতে করতে পিছিয়ে যাচ্চে এক পা এক পা করে!
কালীপদ আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে আমার দিকে তাকিয়ে, দুয়ারের দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ করে কইল, “দ্যাখো ডাক্তার! নক্ষত্র!”
আমি বাষ্পাকুল নজরে বাইরের দিকে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল। রাতের আঁধারকে দ্বিখণ্ডিত করে দিগন্তে মুখ তুলেচে সব নক্ষত্রের সেরা নক্ষত্র। সেই নবীন সূর্যোদয়ের আলো এসে পড়েচে খঙ্গের মণিময় চোখে। চোখটি থেকে যেন আগুন ঝলসে উঠচে। সেই আগুনের আভা ছড়িয়ে পড়চে দেবীর ঠিক উপরে ছাতের থেকে ঝুলন্ত রুপার শিকলে, এবং হয়তো শিকল বেয়ে চূড়ার কলসে। রাক্ষসী রোহিণী আর্তনাদ করে নিজের শরীর নিয়ে দুয়ারকে আড়াল করে দাঁড়িয়েচে, কিন্তু তার আপাতস্বচ্ছ শরীর ভেদ করে আলো ঢুকে পড়চে ভিতরে। মুহূর্ত্তের মধ্যে বাইরে ভীষণ নির্ঘোষে একশত বজ্রপাত হল যেন! সেই সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করা রৌদ্র অদৃশ্য হয়ে গেল! সূর্য্য যেন ভীষণ একটা আঘাতে বক্ররেখা ধরে লাফিয়ে উঠে
সম্পূর্ণ উলটোদিকে গিয়ে স্থির হয়ে বসল। আমাদের শরীর, নাড়ি ঘুলিয়ে উঠল যেন। চারপাশ যেন পাক খেয়ে উঠল।
সর্ব্বনাশিনী আপাই রাক্ষসী বাতাসে টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে যাচ্চে, আবার হঠাৎ প্রবল ইচ্ছাশক্তির বলে টুকরোগুলি পুনরায় একত্রিত হয়ে আসচে। আবার ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে। সে এক নারকীয় দৃশ্য! দেহের ক্ষুদ্র টুকরোগুলোতে আর পারম্পর্য্য থাকে না বুঝি। হাতের স্থানে চক্ষু, চক্ষুর স্থানে সুচাগ্র দশন এসে জড়ো হয়, আবার ভেঙে গিয়ে নতুন বিকট রূপে ফিরে আসে। মহাকালীর বিভিন্ন কল্পে ধারণ করা বিভিন্ন বিকট রূপের মতোই ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তিত হতে হতে একটা সময়ে টুকরাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল। রাক্ষসীর মরণকালে তার চক্ষু নিবদ্ধ ছিল শংকরের পানে। কী জানি, হয়তো তার দুবার ফসকে যাওয়া শিকারকে সে শেষকালে মেরে যেতে চেয়েচিল। আমরা অসুরনিবারণী দেবীকে শতকোটি প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মন্দির ছেড়ে।
***
রেলগাড়ি চেপে ডাকিনীর চর পেরিয়ে আমরা দুজন এসে নামলাম সমতলে। এখান থেকে সামান্য পথ চললেই গোযানে সদর। কালীপদর মুখে তৃপ্তি আর প্রশান্তির ছোপ। আমি এতটা পথ একসঙ্গে চলার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ প্রশ্ন করলাম, “দাদা?”
“হুঁ, কী?”
“একটা প্রশ্ন রয়েচে।”
“বটেই তো। না থাকলেই তো ভাবতাম, সূৰ্য্য আজ উলটোদিকে উঠেচে।” বলেই আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে হেসে উঠে বললে, “এই চলতি প্রবাদটাও যে জীবদ্দশায় সত্যি হতে দেখে যাব, তা কস্মিনকালেও ভাবিনি। আহ্মার ক-দিন পশ্চিমে মুখ করে সূর্য্যপ্রণাম হল তবে। এইবার বলো, কী প্রশ্ন?”
আমি গলাটা ঝেড়ে বললাম, “শংকরের পিসিঠাম্মা ঘরোয়া মেয়েমানুষ হয়ে যদি মন্ত্রপূত রুদ্রাক্ষ তৈরি পারেন, এবং সেই মন্ত্রগুণে এমন ভয়ংকর রাক্ষসী পিছু হটে, তবে সত্যিই কি আপাইকে বধ করা এতখানি কঠিন ছিল?”
কালীপদ একটু হেসে কইল, “শংকরের রুদ্রাক্ষে সামান্য কিছু শুভশক্তি ছাড়া কোনও বাড়তি গুণ ছিল না, ডাক্তার। ভয়ংকর আপাইকে ঠেকিয়ে রাখা এই ধরনের রুদ্রাক্ষের কাজ নয়।”
“সে কী! তবে শংকর পরপর দুবার ডাকিনীর হাতের মুঠোয় চলে যাওয়া সত্ত্বেও তাকে বাঁচাল কে, দাদা?”
কালীপদ জবাব হিসেবে কামিজের বুকপকেট থেকে একখানা ফোটোগ্রাফ বের করে আমার সামনে মেলে ধরল। শংকরের সাদা-কালো ছবি। আমি মুখের পানে চাইতে কালীপদ বলল, “এটা খুনি মাস্টারের শিকার আপিসের ফোটোগ্রাফ। লাখন সৰ্দ্দার এনে দিয়েচিল সেদিন। মাস্টারের আদি বাড়ি ছিল নবদ্বীপ ধামে। শংকর এই মাস্টারেরই পৌত্র। নিয়তির সুতোর কী অমোঘ টান দ্যাখো ডাক্তার, হত্যাকাণ্ডের খলনায়কের বংশধর এসে পড়ল কোথায়? না, খোদ প্রতিশোধে পাগল হয়ে ওঠা হতভাগ্যের ডেরাতেই। খুনি পিতামহের পুঁতে-দেওয়া শবদেহ আলোর মুখ দেখল কার দ্বারা? না, খুানরই নাতির দ্বারা। আমি শংকরের সামনে তার পিতামহের কদাকার পরিচয়টা তুলে ধরতে চাইনি, ডাক্তার। গাঙ্গুলি যখন মাস্টারের বর্ণনা দিচ্ছিল, তখন সে আড়ে আড়ে শংকরের দিকে চেয়ে, তার সঙ্গে মাস্টারের আশ্চর্য্য সাদৃশ্যের কথা বলতে গিয়েচিল। আমি অন্য উদাহরণ দেওয়ায় সে মনে হয় কথাটা গিলে ফ্যালে। এ ছাড়াও বৃদ্ধ কোবরেজমশায় সেই রাতে আচমকা শংকরের স্বর শুনে যেভাবে চমকে উঠেচিল, তাতে মনে হল, হুবহু এই স্বর বহু যুগ পর কোবরেজের অবচেতন মনে আঘাত করল।”
আমার মুখ থেকে কিছুক্ষণ কথা সরল না। তারপর ধাতস্থ হয়ে আমার ব্রহ্মাস্ত্র মোচন করলাম। অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞাসা করলাম, “কিন্তু দাদা, তা-ই যদি হয়, তবে তো রোহিণী সবার আগে শংকরকেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলত দাঁতে-নখে। আপাই তো ধ্বংস হবার আগের মুহূর্তেও শংকরের দিকেই নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল। শংকরের কবচের যখন আপাইকে রুখে দেবার শক্তিই ছিল না, তখন রোহিণী শংকরকে বাগে পেয়েও হনন করল না কেন?”
কালীপদ কোনও উত্তর দিল না। একটা শব্দও ব্যয় করল না। ডানদিকে একখানা বৃক্ষশাখায় দুখানি পারাবত বসে পরম সোহাগে একে অপরের চঞ্চ চুম্বন করচিল। সেইদিকে মন দিয়ে তাকিয়ে থেকে কালীপদ একটু হেসে, নির্ব্বিকার স্বরে উত্তর দিল, “কী জানি।”
