কাল তুমি আলেয়া – ১১
এগারো
অসুখে এত ঘটা সুলতান কুঠিতে আগে আর কেউ দেখেনি।
একটু-আধটু অসুখ হলে এখানকার রোগী যায় ডাক্তারের কাছে, আর রোগিণী বিনা চিকিৎসাতেই সেরে ওঠে। বাড়াবাড়ি অসুখ হলে প্রথমে আসে এক টাকা ভিজিটের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, তারপর দু’টাকা ভিজিটের অ্যালোপ্যাথ। বুড়োদের অসুখ-বিসুখে কবিরাজ ডাকা হয়, তাদের ফী বলে কিছু নেই, দরাদরি করে ওষুধের দামটা ধরে দিতে হয়।
কিন্তু বত্রিশ টাকা ভিজিটের ডাক্তারের কথা কেউ কখনো দেখেছে, শুনেছে, না ভেবেছে?
রমণী পণ্ডিতের কথা গল্প-কথা মনে হয়েছিল প্রথম। তারপর যা সব কাণ্ডকারখানা দেখা যাচ্ছে কদিন ধরে, আর অবিশ্বাস্য মনে হয়নি কারো!
ডাক্তারি ব্যাগ আর বুক-দেখা-যন্ত্র হাতে মেয়ে-ডাক্তার পর্যন্ত এসে গেল যখন, আর অবিশ্বাসের কি আছে? অমন মেয়ে-ডাক্তার রোগী দেখে কি করে আপাতত সেটাই বিস্ময় সকলের। রোগীই তো বরং ওই ডাক্তারকে হাঁ করে দেখবে চেয়ে চেয়ে।
ঘটা বলতে শুধু ডাক্তারের ঘটা নয়, অসুখ উপলক্ষে বেশ একটা সমারোহ দেখে উঠল সুলতান কুঠির বাসিন্দারা। এমন সব চিকিৎসক, এমন পরিচর্যা, আর এমন সব শুভার্থী-শুভার্থিনীর পদার্পণ ঘটলে অসুখেও সুখ।
প্রথমে এসেছেন হিমাংশু মিত্র।
তাঁর গাঢ় লাল গাড়িটা একটা লালচে বিভ্রম ছড়িয়েছে সকলের চোখে।
অসুখের দরুন ধীরাপদকে পর পর তিন দিন অফিসে অনুপস্থিত দেখে বাড়ি থেকে হিমাংশুবাবু প্রথমে কেয়ার-টেক বাবুকে পাঠিয়েছিলেন কেমন অসুখ দেখে আসতে। ঠিকানাপত্র নিয়ে কেয়ার-টেক বাবু সাড়ম্বরে এসেছে আর ধীরাপদকে দেখে গিয়ে সবিনয় আড়ম্বরেই বড় সাহেবের কাছে অসুখের ঘোরালো অবস্থাটি ব্যক্ত করেছে। রোগী দেখে গিয়ে কেয়ার-টেক বাবু নিজে যেমন বুঝেছে আর যতটা বলা উচিত বিবেচনা করেছে তাই বলেছে। কারণ তখনও পর্যন্ত ধীরাপদকে দেখার জন্যে কোনো ডাক্তারের পদার্পণ ঘটেনি। এমন কি প্রথম দিন-দুই ওইটুকু অসুখ নিয়ে ধীরাপদ অফিসেও যেত নিশ্চয়! সোনাবউদির জন্যে পেরে ওঠেনি। গণুদাকে দিয়ে সোনাবউদি টেলিফোনে অসুস্থতার খবর জানিয়ে দিয়েছিল। তারপর অম্বিকা কবিরাজের কাছ থেকে রমণী পণ্ডিত ওষুধ চেয়ে এনে দিয়েছিলেন। সোনাবউদি শুশ্রূষা করছিল, ধীরাপদ তার দরুন বিব্রত বোধ করছিল। তৃতীয় দিনে রমণী পণ্ডিত স্বয়ং কবিরাজকেই একবার ধরে নিয়ে আসবেন কিনা সেই চিন্তা করছিলেন। জিজ্ঞাসাও করেছিলেন।
শিয়রের পাশে মেঝেতে সোনাবউদি বসেছিল, রমণী পণ্ডিতকে দেখে চার আঙুল ঘোমটা টেনে দিয়েছিল। ধীরাপদ জবাব দিতে পারেনি, কারণ তার মুখে তখন থার্মোমিটার। সেটাও সোনাবউদির। ছেলেপুলের অসুখ লেগে আছে বলে থার্মোমিটারও আছে একটা।
জবাব ধীরাপদর বদলে সোনাবউদি দিয়েছে—কবিরাজে হবে না, আপনি আজই একজন ডাক্তার ডাকুন। হাত বাড়িয়ে থার্মোমিটারটা তুলে নিল।
রমণী পণ্ডিতের মুখ বন্ধ। সোনাবউদির জ্বর দেখার ফাঁকে ধীরাপদ ইশারায় নিষেধ করেছে, অর্থাৎ আপাতত কাউকে ডেকে কাজ নেই। জ্বর দেখার পর আবার কি হুকুম হয় ভেবে রমণী পণ্ডিত পায়ে পায়ে প্রস্থান করেছেন।
থার্মোমিটার ধুয়ে রাখতে রাখতে সোনাবউদি জিজ্ঞাসা করলে, ওঁকে ডাক্তার ডাকতে বারণ করলেন কেন?
এই ক’দিন ধরেই সোনাবউদিকে গম্ভীর দেখেছে ধীরাপদ। সেই রাতের পর ক’টা দিন এড়িয়ে চলতে পারলে বাঁচত। একেবারে উল্টো হল। অত রাতে চান, তার ওপর মাটিতে শুয়ে ঘুম—জ্বর আর মাথার যন্ত্রণায় অনেক বেলা পর্যন্ত মাথা তুলতে পারেনি। তারপর এড়ানো দূরে থাক, সর্বক্ষণ সোনাবউদির চোখে চোখে।
ধীরাপদ জবাবদিহি করল, উনি কি কাউকে চেনেন না জানেন, কাকে ধরে নিয়ে আসবেন ঠিক নেই—ওঁকে দিয়ে হবে না।
কাকে দিয়ে হবে তাহলে? আমি বেরুব?
ধীরাপদ আমতা আমতা করে বলেছে, গণুদা এলে না হয়…
কে এলে? এত নির্বুদ্ধিতাই যেন বিরক্তির কারণ সোনাবউদির।—কারণ তার প্রমোশন হয়েছে না? মস্ত চাকরে না সে এখন? বুদ্ধির ঢেঁকি সব আপনারা—
গরগর করতে করতে ঘর ছেড়ে চলে গেছে।
জ্বরটা কত জিজ্ঞাসা করা হয়নি, যতই হোক ধীরাপদ চিন্তিত নয়। ডাক্তার ডাকারও গরজ নেই তেমন। বুকে সর্দি বসে জ্বর, দুদিন বাদে সেরে যাবে। সোনাবউদির এই উষ্মা ঘরের কারণে বোধ হয়, খিটিরমিটির তো লেগেই আছে…সেই রাতের অস্বাভাবিকতা হয়ত চোখে পড়েনি। সোনাবউদির রাগ দেখে ধীরাপদ স্বস্তি বোধ করছিল একটু।
সেই প্রথম কেয়ারটেক বাবুর আবির্ভাব।
বড় সাহেব দেখতে পাঠিয়েছেন, দায়িত্ব কম নয়। সেই দায়িত্ব-বোধে সর্দিটাকে যদি বুক-জোড়া নিউমোনিয়ার পর্যায়ে ফেলেন তিনি, আর গায়ের তাপ যদি খই-ফোটা জ্বর বলে মনে হয়—সেটা বড় রকমের অতিশয়োক্তি কিছু নয়।
দু’ঘণ্টার মধ্যেই বড় সাহেবের গাড়ি সুলতান কুঠির এলাকায় এসে ঢুকেছে।
কুঠির বাসিন্দারা হাঁ করে সেই গাঢ় লাল গাড়ি দেখেছে আর গাড়ির মনিবকে দেখেছে। নিজের ঘরের দোরগোড়া থেকে সোনাবউদিও দেখেছে। বিব্রত মুখে হিমাংশু মিত্রকে কেয়ার-টেক বাবু সরাসরি ঘরে এনে ঢুকিয়েছে। খবর শুনে বড় সাহেব এতটাই উতলা হবেন ভাবেনি বোধ হয়।
হকচকিয়ে গিয়ে ধীরাপদ বিছানায় উঠে বসতে যাচ্ছিল। হিমাংশুবাবু বাধা দিলেন, উঠো না, শুয়ে থাকো।
ধীরাপদ শুয়ে পড়ল। অসহায় বোধ করছে। ঘরের এই অবস্থা—কোথায় বসতে দেবে, কি বলবে?
হিমাংশুবাবু বসলেন না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখলেন একটু। ঘরের চারদিকে তাকালেন একবার। এই অবস্থায় থাকে এ যেন ভাবেননি।
কে দেখছে?
জবাব না দিলে নয়। বলল, এমনিতেই সেরে উঠব ভেবেছিলাম, আজ কাউকে খবর দেব…
বড় সাহেবের বিস্ময় এবারে আরো স্পষ্ট। ঝুঁকে একখানা হাত ওর কপালে ঠেকালেন। জ্বরটা বেশ চেপেই এসেছে ধীরাপদর।
হিমাংশুবাবুর মুখ গম্ভীর।—এখানে তোমায় কে দেখাশুনো করে?
আশেপাশের সব আছেন…
হুঁ। এখানে এভাবে থাকার দরকারটা কি তোমার? ওখানে অত বড় বাড়িটা খালি পড়ে আছে, গিয়ে থাকলেই তো হয়। এই মুহূর্তে সেই ব্যবস্থার সময় নয় ভেবেই আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে এসে উঠলেন।
সেই দুপুরেই কেয়ার টেক বাবু হন্তদন্ত হয়ে আবার এসে হাজির হয়েছে। একা নয়, সঙ্গে বড় ডাক্তার। ধীরাপদর শয্যাপাশে তখন রমণী পণ্ডিত। লাল গাড়ির ধোঁকা কাটতে না কাটতে বাইরে আবার গাড়ি থামার শব্দ শুনে দু কান আগেই খাড়া হয়ে উঠেছিল তাঁর।
মনে মনে এই আশঙ্কাই করছিল ধীরাপদ। বড় সাহেব ফিরে গিয়ে চুপ করে থাকবেন না। রাশভারী এই মানুষটির প্রচ্ছন্ন স্নেহটুকু ইদানীং উপলব্ধি করতে পারে। শুধু ধীরাপদ নয়, অনেকেই পারে।
বড় ডাক্তার বিবরণ শুনে নিয়ে রোগীকে পরীক্ষা করলেন, তারপর স-নির্দেশ প্রেসক্রিপশান লিখে দিয়ে গেলেন।
বালিশের তলা থেকে তাড়াতাড়িতে গোটা মানি-ব্যাগটাই রমণী পণ্ডিতের হাতে গুঁজে দিয়েছে ধীরাপদ—কেয়ার-টেক বাবুকে জিজ্ঞাসা করে ডাক্তারের ফী দিতে হবে। ডাক্তারের পিছনে হুমড়ি খেয়ে কেয়ার-টেক বাবুও যে-ভাবে তন্ময় হয়ে রোগী দেখছিল, ধীরাপদ চেষ্টা করেও ইশারায় ফী-টা কত জেনে নেবার সুযোগ পায়নি। প্রেসক্রিপশান লেখার সময়ও না। ডাক্তার গাত্রোত্থান করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যাগ-পত্র তুলে নিয়ে পিছনে পিছনে রওনা হয়েছে।
রমণী পণ্ডিত পিছন থেকে জামা ধরে টানতে কেয়ার-টেক বাবু ঘুরে দাঁড়াল। ডাক্তার ঘর ছেড়ে গাড়ির দিকে এগিয়েছেন। হাতে মানিব্যাগ দেখে কেয়ার-টেক বাবু রমণী পণ্ডিতের ইশারাটা বুঝে নিয়ে একটা দৃষ্টির ঘায়ে তাঁকে ছেঁটে ফেলে দিয়ে ঘুরে ধীরাপদর দিকে তাকালো। বলল, ভিজিট বত্রিশ টাকা, দরকার হলে দিনে তিনবার করে আসবেন উনি—আপনার অসুখ হলেও কি তা বলে টাকাটা আপনাকেই দিতে হবে?
নাটকীয় প্রস্থান।
পরদিন একটু বেলাবেলি এসেছে কোম্পানীর ছোট স্টেশান ওয়াগান। তার থেকে নামল লাবণ্য সরকার। একা।
আর সকলের মত বারান্দায় দাঁড়িয়ে গণুদাও হকচকিয়ে গিয়েছিল প্রথম। কোথায় দেখেছে তাও চট করে মনে করতে পারেনি। মনে পড়তে হন্তদন্ত হয়ে সাদর অভ্যর্থনায় ধীরাপদর ঘরে নিয়ে এসেছে তাকে।
ক’টা দিনের মধ্যে গণুদারও এই ঘরে এই প্রথম পদার্পণ।
ধীরাপদর হাতে দুধ-বার্লির গেলাস। পাশে সোনাবউদি বসে। নবাগতার সঙ্গে চোখাচোখি হল এক দফা। স্টেথোসকোপ হাতে দোলাতে দোলাতে লাবণ্য সরকার সামনে এসে দাঁড়ালো। মুখখানা হাসি-হাসি।
ত্রস্তে উঠে সোনাবউদি কোণ থেকে মোড়াটা এনে সামনে রাখল। লোকজন আসছে দেখে একটা মোড়া কালই এ-ঘরে রেখে দিয়েছিল। বসার ফাঁকে লাবণ্য আবারও তাকে দেখল একবার। ধীরাপদর বিব্রত বিস্ময়টুকুও প্রচ্ছন্ন কৌতুকের কারণ। বলল, বেশ কাহিল হয়েছেন তাহলে? আমি তো কিছুই জানতাম না—আজ শুনলাম।
কবে ফিরলেন? ধীরাপদ আত্মস্থ হতে চেষ্টা করছে তখনো।
বক্রাভাস কিনা এক পলক দেখে নিয়ে লাবণ্য বলল, কোথা থেকে? বম্বে থেকে? কবেই তো! ফিরে এসে আপনার অত সুখ্যাতি শুনে রেগে গেছি। বড় সাহেবেরও ধারণা দেখলাম, আপনি না থাকলে এই ক’দিনে গোটা ব্যবসাটা অচল হত।
পিছনে গণুদা দাঁড়িয়ে, এদিকে সোনাবউদি। হালকা ঠাট্টায় বিশেষ কিছু বোঝার কথা নয় তাদের। শুধু ধীরাপদ বুঝেছে। লোকজনের সামনে অন্তত লাবণ্য সরকার বড় সাহেব বলে না, মিস্টার মিত্র বলে। অন্যত্র বা অন্য সময় হলে পালটা ঠাট্টার ছলে ধীরাপদও বলত কিছু। কিন্তু বাড়ি বয়ে দেখতে আসার ফলে বলা গেল না।
হাতে দুধের গেলাসটার দিকে ইঙ্গিত করে লাবণ্য বলল, খেয়ে নিন আগে। সোনাবউদির দিকে তাকালো, প্রেসক্রিপশানটা কই?
আজও সকালে কেয়ার-টেক বাবু এসে বড় ডাক্তারকে খবর জানাবার জন্যে রোগীর অবস্থা খুঁটিয়ে জেনে গেছে। কিন্তু সে-কথা কেউ বলল না। সোনাবউদি ধীরাপদর বালিশের নিচে থেকে প্রেসক্রিপশানটা নিয়ে তার হাতে দিল।
সেই ফাঁকে ঘরের ভিতরটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়েছে লাবণ্য সরকার। সেই দেখাটাও ধীরাপদ লক্ষ্য করেছে। মনে মনে নিজের ওপরেই বিরূপ একটু, আগে তো বিব্রত বোধ করত না, এখন করে কেন?
প্রেসক্রিপশান পড়ে লাবণ্য বলল, ডাক্তারের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হয়েছে, আজকের রিপোর্টও পেয়েছেন, ওষুধ একটু বদলাতে বললেন… আগে দেখে নিই, ভালই তো আছেন মনে হচ্ছে—
ধীরাপদ অসহায় বোধ করছিল কেমন, আজ এতদিনে লাবণ্য সরকার যেন কিছুটা হাতের মুঠোয় পেয়েছে ওকে।
লাবণ্য নিজের থার্মোমিটার বার করে জ্বর দেখল, নাড়ি দেখল, জিভ দেখল, চোখের পাতা টেনে দেখল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে বুক-পিঠ পরীক্ষা করল। শেষে গম্ভীর মুখে বলল, উঠে বসবেন-টসবেন না অত, শুয়ে থাকবেন—পড়ন্ত শীতে বেশ করে ঠাণ্ডাটি লাগিয়েছেন বুঝি?
চকিতে ধীরাপদ সোনাবউদির দিকে তাকালো একবার। ঠোঁটের ফাঁকে হাসির আভাস কিনা দেখার জন্যে দ্বিতীয়বার চোখ ফেরাতে পারল না। ওধারে গণদা দাঁড়িয়ে। কেন দাঁড়িয়ে বা কি দেখলো তার নিজেরও খেয়াল নেই।
কাগজ চেয়ে নিয়ে লাবণ্য সরকার প্রেসক্রিপশান অদল-বদল করল একটু। সোনাবউদির হাতে সেটা দিয়ে কখন কোন ওষুধ দিতে হবে বুঝিয়ে দিল।
চিকিৎসকের অখণ্ড দায়িত্ব নিয়ে এখানে রোগী দেখতে আসেনি সে। প্রীতি এবং সৌজন্যবোধে সহকর্মীকে দেখতে এসেছে। তাই চিকিৎসকের মত বিদায়ও নিল না। ইঙ্গিতে সোনাবউদিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ইনি?
বউদি।
সোনাবউদি না বলে শুধু বউদি বলল ধীরাপদ।
সোনাবউদির উদ্দেশ্যে লাবণ্য যুক্ত-করে মাথা নোয়াল একটু, তারপর হাসিমুখে অনুযোগ করল, যে অনিয়ম করেন উনি, অসুখ হবে না—কড়া শাসনে রাখেন না কেন?
সোনাবউদি সবিনয়ে বলল, আমি পাতানো বউদি, কড়াকড়ি করলে পাছে সম্পর্কটা ছেঁড়ে সেই ভয়ে পারিনি।
সকৌতুকে লাবণ্য সরকার এবারে আর একটু মনোযোগ দিয়েই দেখে নিল তাকে। এই এক জবাব থেকেই যেমন গ্রাম্য বউটি ভেবেছিল তেমন মনে হল না। ওদিকে গণুদার মুখে বিরক্তির আভাস, স্ত্রীর জবাবটা মনঃপূত হয়নি।
যা বলেছেন—লাবণ্য সরকারের লঘু সমর্থন, কড়াকড়ি করার ফল আমি অন্তত হাতেনাতে পেয়েছি। ওঁকে দেখার পর থেকেই নিরীহ গোছের লোক দেখলে ভয় করে—সেই প্রথম দিন থেকে কতবার যে জব্দ হয়েছি ঠিক নেই।
ধীরাপদর সঙ্গে লাবণ্যের রেষারেষি যেমন, হৃদ্যতাও তেমনি। একটা থেকে আর একটায় পৌঁছুতে সময় লাগে না। তবু আজকের এই অন্তরঙ্গ সুরটা নতুন। ধীরাপদ হেসে ফেলেছিল। কিন্তু সোনাবউদির দিকে চোখ পড়তে শঙ্কিত একটু। তার সরল বিস্ময়ের বক্র-রীতি সে-ই জানে শুধু।
কিন্তু সোনাবউদি একটি কথাও বলল না, তার দিকে চেয়েই রইল শুধু।
অনুমান, তার এই চাউনিটা এড়ানোর জন্যে লাবণ্য অন্যদিকে মুখ ফেরালো। যেদিকে গণুদা দাঁড়িয়ে। গণদা স্ত্রীর উদ্দেশে তাড়াতাড়ি বলে বসল, একটু চা করে দিলে না?
লাবণ্য তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল।—রোগী দেখতে এসে চা কি, তাছাড়া তাড়াও আছে। ধীরাপদর দিকে ফিরল, আপনি ভালয় ভালয় শুয়েই থাকুন দিনকতক, তা না হলে অসুখটা আপনাকে আমাদের মত অত খাতির না-ও করতে পারে। চলি—
দরজার দিকে এগিয়ে গণুদাকে বলল, আমাকে দু-বেলাই টেলিফোনে একটা করে খবর দেবেন, সকালে নার্সিংহোমে, বিকেলে অফিসে—ফোন নম্বর ধীরুবাবুর কাছেই পাবেন।
সবিনয় ঘাড় নেড়ে গণুদা তাকে এগিয়ে দিতে গেল।
লাবণ্যকে ধীরুবাবু বলতে এই প্রথম শুনল ধীরাপদ। প্রথম মাঝে মাঝে মিস্টার চক্রবর্তী বলেছে। কাকে বলছে ধীরাপদরই এক-একসময় ভুল হয়ে যেত। এই নিয়ে অপ্রস্তুতও হয়েছে, বলেছে, এই পোশাকী ডাকটা এত কম শুনেছি যে সব সময় খেয়াল থাকে না। লাবণ্য এরপর একদিন ধীরাপদবাবু বলতে গিয়ে হেসে ফেলেছিল। ঠাট্টা করেছে, নাম বলতেই দম শেষ, কি জন্যে এলাম ভুলে গেলাম।
সামনাসামনি আর মিস্টার চক্রবর্তীও শোনেনি, ধীরাপদবাবুও শোনেনি। আজ ধীরুবাবু শুনল। নামের এই চালু সংক্ষেপটা কারো মুখে শুনেছে হয়ত। কোথায় শুনল? অমিতাভ ঘোষের মতে ধীরাপদ নামটা বিচ্ছিরি, ধীরু নামটি মিষ্টি। এই ঘরে বসেই মন্তব্য করেছিল সে। কিন্তু তার কাছ থেকে লাবণ্য সরকার শুনবে কেমন করে। বোধ হয় বড় সাহেবের মুখে শুনেছে। তিনি ধীরুই ডাকেন আজকাল। চারুদির মুখে হয়ত ওই নামই শুনে অভ্যস্ত তিনি।
কিন্তু এই একজনের মুখে নামটা আজ নিজের কানেই মিষ্টি লাগল ধীরাপদর।
সু-বচনীটি কে? সোনাবউদি হাতের প্রেসক্রিপশানটা নাড়াচাড়া করছে, আর কটাক্ষে তাকেই নিরীক্ষণ করছে।
হাসির চেষ্টায় ধীরাপদ ঢোক গিলল, লাবণ্য সরকার, কোম্পানীর মেডিক্যাল অফিসার।
ও…! পরিপূর্ণ পরিচয়টি জানা হয়ে গেল যেন। হাতের প্রেসক্রিপশানটা আর একবার উল্টেপাল্টে দেখে নিল সোনাবউদি।—এটা কি করব, এর আর দরকার আছে কিছু না ওতেই কাজ হয়েছে?
হাসি ছাড়া জবাব নেই। গণুদার পুনঃপ্রবেশে খানিকটা অব্যাহতি পেল। কিন্তু স্ত্রীর উদ্দেশ্যে গণদার রুক্ষ অনুশাসন কানে যেতে দু চোখ টান ধীরাপদর। ঘরে ঢুকেই বিরক্তি-বর্ষণ, তোমার কি বাক্সয় আর শাড়িটাড়ি নেই কিছু? দেখছ এ-ঘরে লোকজন আসছে যাচ্ছে—একটু ভদ্রলোকের মত এসে বসলেও তো পারো?
সোনাবউদির মুখে আবারও খানিক আগের সেই নিরীহ অভিব্যক্তি।
গণুদার বিরক্তির উপসংহার, বাড়ির ঝিও এর থেকে ভালোভাবে থাকে।
ধীরাপদ ঘাড় কাত করে দেখে নিল, সোনাবউদির পরনের শাড়িটা খুব ময়লা না হলেও আধময়লাই বটে। আর কাঁধের আঁচলের কাছটা খানিকটা ছেঁড়াও।
সোনাবউদি কি হাসছে? ঠাওর করে উঠতে পারল না। মনে হল, গাম্ভীর্যের বাঁধে কৌতুকের বন্যা ঠেকিয়ে রেখেছে। মাথা নিচু করে বুকে-কাঁধে চোখ চালিয়ে সোনাবউদি বেশ রয়েসয়ে নিজের জামাকাপড়ের অবস্থাটা দেখে নিল আগে, তারপর গগুদার চোখে চোখ রাখল।—আগে খেয়াল থাকলে তোমারও বুকটা দেখে দিতে বলতাম। হল না যখন কি আর করবে, ওষুধটাই দু’জনে মিলে ভাগাভাগি করে খাও। প্রেসক্রিপশান তার দিকে ঠেলে দিয়ে সোনাবউদি উঠে ঘর ছেড়ে প্রস্থান করল।
দরজাটাকে ভস্ম করা সম্ভব নয়, গণুদার উষ্ণ দৃষ্টি ধীরাপদর মুখের ওপর এসে থামল। ভরসা করে তাকেও কিছু বলতে পারল না। ভালো কথাতেই যে মূর্তি দেখেছে কিছুদিন আগে, ভরসা হবে কোথা থেকে? তবু তার নীরব অনুযোগের মর্ম, মেয়েছেলেকে বেশি আস্কারা দিলে কোথায় ওঠে নিজের চোখেই দেখে নাও এবার।
প্রেসক্রিপশান তুলে নিয়ে গণুদা চলে গেল।
সুলতান কুঠিতে অর্গ্যানিজেশন চীফ সিতাংশু মিত্রের ধপধপে সাদা ছোট গাড়িটা লাবণ্য সরকারের স্টেশান-ওয়াগানের থেকেও বেশি অপ্রত্যাশিত। সিতাংশুও রোগী দেখতে এসেছে।
কিন্তু আসলে এসেছিল বোধ হয় পদমর্যাদার খোলস ছেড়ে ধীরাপদর সঙ্গে সম্পর্কটা আর সকলের মত সহজ করে নেবার তাগিদে। তার প্রয়োজন বোধ করেছিল কেন সে-ই জানে। অসুখের দরুন দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে, চিকিৎসায় কোন রকম ত্রুটি না হয় সে কথা বার বার বলেছে। এই ফাঁকে সহজ হয়ে ওঠাটাও সহজ হয়েছে। আরো অনেক কথা বলেছে তারপর। এ-সময় ধীরাপদর বিছানায় পড়ে থাকলে চলবে কেন, কাজের কি শেষ আছে এখন? আসছে বছর কোম্পানী দশ বছরে পড়বে, সবাই উৎসব-উৎসব করছে বটে, কিন্তু ঝামেলার কথা ভেবে তার এখন থেকেই দুশ্চিন্তা। তাছাড়া কোম্পানীর নতুন শাখা পত্তন হচ্ছে শীগগিরই, প্রসাধন-সামগ্রী তৈরীর বিভাগ—পারফিউমারি ব্র্যাঞ্চ। এত বড় ঝুঁকিটা বাবা এখন না নিলেই পারতেন, কিন্তু মাথায় ঢুকছে যখন করবেন—করবেনই। কোথায় করবেন, কারখানার এলাকায় আর জায়গাই বা কোথায়, সিতাংশু ভেবে পায় না। এর জন্যে আলাদা ব্যবস্থা চাই, আলাদা যন্ত্রপাতি সাজ-সরঞ্জাম চাই, ব্যাপার কম নাকি! অথচ কাজের বেলায় তো হাত গুনতি ক-টি লোক। অবশ্য ধীরাপদর ওপর আস্থা আছে সকলেরই, সিতাংশুর নিজেরও আছে—বাবার লোক চিনতে ভুল হয় না।
আপসের সুর। বিনিময়ে ধীরাপদর শুধু একটি কথাই জানতে ইচ্ছে করছিল, বম্বে থেকে ফিরে আসার পরই এরা এমন সদয় কেন তার ওপর?
কেন, তার কিছুটা আঁচ ধীরাপদ পেয়েছে। সুলতান কুঠির আঙিনায় পর পর দু দিন আরো একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। চারুদির ক্রিম-কালারের চকচকে গাড়িটা। প্রথম দিনের আগন্তুক চারুদি নিজেই।
চারুদির খেদ আর অভিযোগ দুই-ই আন্তরিক। তিনি কিছু জানতেন না সেই খেদ, আর তাঁকে কিছু জানানো হয়নি সেই অভিযোগ। বড় ডাক্তার চিকিৎসা করছেন এবং তিনি অভয় দিয়েছেন জেনে কিছুটা নিশ্চিন্ত। এসে অনেকক্ষণ ছিলেন। অর্ধেকটা বিছানায় আর অর্ধেকটা মাটিতে বসেছিলেন। সোনাবউদি তাড়াতাড়ি একটা আসন এনে পেতে দিয়েছিল। হাত ধরে আপনজনের মত চারুদি তাকেই সেই আসনে টেনে বসিয়ে দিয়েছেন।—আমি বেশ বসেছি, তুমি বোসো। গাড়ি থেকে একদিন চোখের দেখা দেখেছিলেন, আজ সামনাসামনি ভালো করে দেখে নিলেন।—তোমার কথা একদিন ধীরুর মুখে শুনেছিলাম, আমি ওর দিদি হই সম্পর্কে জানো তো?
সোনাবউদি মাথা নাড়ল, জানে।
চারুদি ধীরাপদর দিকে তাকালেন এক পলক, তারপর তরল বিড়ম্বনায় বলে উঠলেন, ও যে ন বছর বয়সেই আমাকে বিয়ে করার জন্যে ক্ষেপে উঠেছিল তাও জানো নাকি?
বহুদিনের এই পরিহাস-প্রসঙ্গ আজ কেন কে জানে তেমন মিষ্টি লাগল না ধীরাপদর কানে। কতটা বলা হয়েছে তাঁর সম্বন্ধে, এবারের জবাব থেকে চারুদি তাই বুঝে নিতে চান হয়ত। কিন্তু বোঝা হল না।
হাসিমুখে সোনাবউদি মৃদু মন্তব্য করল, ওঠারই তো কথা—
চারুদি লজ্জা পেলেন, তুমিও তো আবার কম নও দেখি! একটু বাদে বললেন, এত বড় অসুখটার সব ধকল তোমার উপর দিয়েই গেল বুঝি?
বড় অসুখ ডাক্তার বললেন? সাদামাটা পাল্টা প্রশ্ন সোনাবউদির।
স্নেহভাজনের অসুখ-বিসুখ মেয়েরা সাধারণত বড় করেই দেখে থাকে, সেই রীতিতে বলা। সোনাবউদির সরল চাউনিতেও বক্রাভাস ছিল না একটুও। তবু ভিতরে ভিতরে ধীরাপদ শঙ্কাবোধ করেছিল একটু। চারুদি বললেন, কি জানি বাপু, আমার তো শুনে ভয়ই ধরেছিল। সময়ে ধরা না পড়লে কোথা থেকে কোথায় দাঁড়ায় কে জানে—এখনো তো চোখ-মুখের অবস্থা ভালো ঠেকছে না খুব।
সোনাবউদিও চারুদির উৎকণ্ঠা নিয়ে ধীরাপদকে দেখে নিল এক নজর, তার পর মাথা নেড়ে সায় দিল। অর্থাৎ ভালো ঠেকছে না ঠিকই।
সোনাবউদির সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে মগ্ন হলেন চারুদি। বাপের বাড়ি কোথায়, কত বছর বিয়ে হয়েছে, ক’টি ছেলেপুলে ইত্যাদি।
সোনাবউদি এক ফাঁকে উঠে যেতে চারুদি ঘুরে বসলেন।—বেশ বউটি। মন্তব্যের বাইরে আর কোনো কৌতূহল দেখা গেল না। জিজ্ঞাসা করলেন, অমিত এসেছিল?
ধীরাপদ ঘাড় নাড়ল, আসেনি।
কি যে হচ্ছে দিনকে-দিন ছেলেটার! বলতে বলতে চারুদির কিছু একটা রসালো ব্যাপার মনে পড়ল বোধ হয়। দুর্ভাবনাজনিত গাম্ভীর্যের ওপর খুশির ঝলক নামল। বললেন, সেদিন তো আমার ওখানেই মামা-ভাগ্নেতে এক হাত হয়ে গেল। তোমার কথাও হল, চারুদির উৎফুল্ল প্রশস্তি, তুমিও ওস্তাদ কম নয়—দু’পক্ষই দিব্যি তুষ্ট দেখি তোমার ওপর।
ধীরাপদর নীরব আগ্রহ গোপন থাকল না। ভিতরে ভিতরে উন্মুখ সে। চারুদির বাড়িতে মামা-ভাগ্নেতে এক হাত হয়ে গেল…কবে? যে-দিন চারুদি আর হিমাংশুবাবু বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, আর যে-দিন এক নগ্ন চাহিদার মুখে পার্বতীকে ফেলে ধীরাপদ পালিয়ে এসেছিল—সেই দিন? চারুদিই বা অত খুশি কেন—মামা-ভাগ্নেতে এক হাত হয়ে গেল বলে না ধীরাপদর কথাও হল বলে, নাকি ওর দুপক্ষকে তুষ্ট রাখার কেরামতি দেখে।
কিন্তু ঘটনা যা শুনল সেটা এমন কিছু নয়।
মামাকে হাতের কাছে পেয়ে ভাগ্নে কৈফিয়ৎ তলব করেছে—যে-সব কর্মচারী ছুটিতে ছিল বা যারা সাময়িক হারে কাজ করছে, এ মাসে তাদের অনেকের মাইনের গণ্ডগোল হয়েছে, অনেকে মাইনে পায়নি—এসব দেখাশুনোর দায়িত্ব যাদের, মাইনের মুখ জেনেও কাউকে কিছু না বলে খেয়ালখুশিমত তারা যেখানে-সেখানে চলে যাবে কেন?
হিমাংশু মিত্র হালকা টিপ্পনী কেটেছিলেন, এ বিদ্যেটা ওরা তোর কাছেই শিখেছে বোধ হয়।…পরে ভাগ্নের মেজাজের আঁচে আত্মস্থ হয়ে ভালোমানুষের মত জিজ্ঞাসা করেছেন, যাদের দায়িত্ব তারা কাজ-কর্ম দেখছে না ঠিকমত?
জবাবে বেপরোয়া আক্রমণ অমিতাভর, দেখবে না কেন, খুব দেখছে, যেমন বড় সাহেব নিজে দেখছেন আর সকলেও তেমনি দেখছে। রাগের মাথায় তখনই ধীরাপদর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে সে। নেহাত চারুমাসির কল্যাণে একটা ভালো লোক এসে মুখ বুজে সব ঝমেলা সামলে চলেছে তাই, নইলে এরই মধ্যে মজা দেখা যেত। মাসকাবারের গোটা ওষুধের দোকানের মাইনে বন্ধ করে সেই মজা দেখানোর ইচ্ছে ছিল তার—লোকটা অমন একেরোখা ভালো লোক বলেই হল না।
হিমাংশুবাবু আবারও ঠাট্টা করেছেন, তোর মতেও তাহলে ভালো লোক দু-একজন আছে?
ভাগ্নেও তেমনি ব্যঙ্গ করেছে, সেই ভালো লোকটিকে যত বড় তাঁবেদার ভাবছ নিজেদের তা যে নয় তাও টেরটি পাবে একদিন।
হিমাংশু মিত্র আর কিছু না বলে শুধু হেসেছিলেন শুনল। চারুদি চলে যাবার পরেও ঘুরেফিরে একটা কথাই মনে হয়েছে ধীরাপদর, মামা-ভাগ্নের এই বচসার কারণে চারুদি এত খুশি কেন? মামার প্রতি ভাগ্নেটি বিরূপ বলেই তো তাঁর দুশ্চিন্তা দেখে আসছে। কোম্পানীতে একজন ভালো লোক আমদানি করতে পারার তুষ্টি? কিন্তু ভালো লোক দেবার জন্যে কেউ তো তাঁর প্রত্যাশী ছিল না? নিজের গরজেই দিয়েছেন।
ধীরাপদর হঠাৎই মনে হল, চারুদি খুশি ওর ওপর স্বয়ং কর্তাটি খুশি বলে, আর ওরই ওপর অমিতাভরও এমন আস্থা দেখেছেন বলে। চারুদির এইটুকুই কাম্য ছিল হয়ত…
কিন্তু ঘুরেফিরে তেমনি হেঁয়ালিই থেকে গেল সব কিছু। একা ঘুরে ধীরাপদর এলোমেলো ভাবনাটা আর এক পথে গড়ালো। রমণী পণ্ডিতের গ্রহমাহাত্ম্যই বিশ্বাস করবে শেষ পর্যন্ত? সে তো সেই অকেজো মানুষ, সময় না কাটলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যে কার্জন-পার্কের লোহার বেঞ্চিতে বসে থাকত। আর এই এত বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবার পরেও সে এমন চমকপ্রদ কিছু করেনি যার বিনিময়ে এতখানি বিশ্বাস আর এতখানি মর্যাদা তার প্রাপ্য। সেই বিশ্বাস আর মর্যাদা বাড়ছেই। আরো যে বাড়বে তাও স্পষ্ট। আশ্চর্য!
আরো আশ্চর্য, বড় সাহেবের আস্থাভাজন, চারুদির প্রিয়পাত্র, অমিত ঘোষের অন্তরঙ্গ মানুষ, লাবণ্য এমন কি সিতাংশুরও স্বীকৃত-ব্যক্তি জেনারেল সুপারভাইজার ধীরাপদ চক্রবর্তী চেষ্টা করেও এই নতুন সাজে নিজেকে দেখতে পায় না কেন? যখনই দেখতে চায়, দেখে ওই লোকটাকে—সুলতান কুঠির ভূমিশয্যায় হাত-পা ছড়িয়ে নিস্পন্দের মত পড়ে আছে যে। যে লোকটা লোহার বেঞ্চ-এ বসে থাকত আগে। যে লোকটা ছেলে পড়াতো, অম্বিকা কবিরাজ আর দে-বাবুর জন্যে বিজ্ঞাপন লিখত। সেই ধীরাপদই যেন চোখ-ধাঁধানো নতুন খোলস পরেছে একটা, মনের আয়নায় তার প্রতিফলন নেই।
পরদিন। দুপুরের দিকে কোম্পানীর একটা প্যামফ্লেটে চোখ বোলাতে বোলাতে ধীরাপদ ঘুমিয়ে পড়েছিল। লাবণ্য সরকার লোক মারফৎ অফিস থেকে এই প্যামফ্লেটগুলো পাঠিয়েছে। প্রচার-পুস্তিকার মুদ্রণ-পরিচ্ছন্নতা, কাগজের মান, প্রচ্ছদ-পারিপাট্য—এক কথায় সমস্ত আঙ্গিক-বিন্যাস তার অনুমোদন সাপেক্ষ।
ঘুম ভাঙতে আবার সেই প্যামফ্লেটই নাড়াচাড়া করছিল। ঘরে পা দিয়ে সোনাবউদি বলল, সারা দুপুর পড়ে ঘুমোলেন, আবার জ্বর-জ্বালা না আসে—শরীর খারাপ হয়নি তো? কপালে হাত রাখল, ছ্যাঁকছ্যাঁকই তো করছে!
প্যামফ্লেট নামিয়ে ধীরাপদ হালকা জবাব দিল, এত ঘটার পরে এরই মধ্যে একটু ছ্যাঁকছ্যাঁকও না করলে লজ্জার কথা না? সকলে ভাববে কি?
তা অবশ্য…। সায় দিল সোনাবউদি, আপনার দিদির গাড়ি আজও এসেছিল—আমি আদর করে ডাকতে গিয়ে দেখি আপনার দিদি নয়, আর একজন।
আর একজন? আর একজন মানে অমিতাভ নিশ্চয়। বিরস দেখালো ধীরাপদর মুখ, আমাকে ডেকে দিলেন না কেন?
ঘুমোচ্ছেন দেখে ডাকতে দিলে না, আপনার খোঁজখবর নিয়ে আমার সঙ্গেই একটু গল্পটল্প করে চলে গেল।
হেঁয়ালির মত লাগল, সোনাবউদির মুখে না হোক চোখে চাপা হাসি। দ্বিধার সুরে ধীরাপদ জিজ্ঞাসা করল, সেই প্রথম দিন আমার সঙ্গে এসেছিলেন, সেই ভদ্রলোক তো?
অমিতাভ ঘোষ? উল্টে সোনাবউদিই বিস্মিত যেন, চাকরিতে প্রমোশন করিয়েছেন, ও-নাম তো জপের নাম—তিনি এলে তাঁকে আর চিনব না?
ধীরাপদ অবাক আবারও। চারুদির গাড়িতে কে আর আসতে পারে?
তার এই নির্বাক আগ্রহটুকু উপভোগ্য যেন, সোনাবউদি ধীরেসুস্থে জ্ঞাপন করল, ভদ্রলোক নয়, ভদ্রমহিলা…আপনার ভাগনী, মামাবাবুই তো বলল আপনাকে…নাম বলল পার্বতী।
শুনেও ধীরাপদ চেয়েই আছে ফ্যালফ্যাল করে। পার্বতী আসবে তাকে দেখতে, শুনলেও বিশ্বাস করার মত নয়।
আপনার আর কে কোথায় আছে ইদানীং বলে রাখুন তো, বড় গণ্ডগোলে পড়ে যাই। হেসে ফেলে মোড়াটা টেনে বসল, ভাগনীটি বেশ। বড় গম্ভীর ধীরাপদর বিড়ম্বিত মুখখানা দেখছে চেয়ে, উৎফুল্ল মুখে বলল আবার, বাড়িতে যে কাজ করে সেও অমন একখানা গাড়িতে চেপে দেখতে আসে আপনাকে—আপনি এখানে এ-অবস্থায় পড়ে আছেন কেন ভেবে তো অবাক আমি!
পার্বতীর আবির্ভাবের বিস্ময় এড়িয়ে ধীরাপদ লঘু জবাব দিয়ে ফেলল, আর কোথাও সোনাবউদি নেই যেন!
হুঁ। সোনাবউদির সমস্ত মুখখানি সেই আগের দিনের মত পরিহাস-সজীব। ঠোঁট উল্টে মন্তব্য করল, ঘষে-মেজে রূপ আর ধরে-বেঁধে প্রেম—কোন্টাই বা টেকে? দু চোখ সরাসরি ধীরাপদর মুখখানা চড়াও করল হঠাৎ।—তা বললেনই যখন, এ সোনাবউদি তো বাইরের পাঁচজনের মত রোগী দেখতে এসে কি-হল কি-হল করে চলে যাবে না! আমি তো জিজ্ঞাসা করব, কেমন করে হল—ঠাণ্ডাটা লাগল কি করে?
হাতে কি ওটা… প্যামফ্লেট দেখে রাখতে হবে।
কিন্তু সোনাবউদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়নি তখনো। দুই-এক মুহূর্তের প্রতীক্ষা।—সেদিন সেই ঠাণ্ডা রাতেও আপনি হঠাৎ অমন গুবগুবিয়ে চান করে উঠলেন কেন, আর সারারাত এই ঠাণ্ডা মেঝেতেই বা শুয়ে কাটালেন কেন?
নিরুত্তর একটু হাসতে পারলেও জবাব এড়ানো যেত বোধ হয়। ধীরাপদ চেষ্টাও করেছিল। হাতের প্যামফ্লেট চোখের সামনে উঠে এসেছে।
ধরণী দ্বিধা হও…।
সোনাবউদি আবারও কপালে হাত রাখতে দেখলে কপাল আর ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে না। কপাল ঘেমে ঠাণ্ডা হয়ে উঠেছে।
দরজার কাছে একাধিক পায়ের শব্দ। চটির চটচট আর খড়মের খটখট আওয়াজ। সোনাবউদির চোখ দুটো ওর মুখের ওপর থেকে দরজার দিকে ঘুরল এতক্ষণে। উঠে মাথায় কাপড় তুলে দিয়ে দেয়ালের দিকে সরে গেল।
শকুনি ভটচাজ, একাদশী শিকদার আর রমণী পণ্ডিত। আপনজনেরা রোগীর খবর নিতে এসেছেন। রোজই আসেন।
দেয়াল ঘেঁষে সোনাবউদি বাইরে চলে গেল। ধীরাপদ হাঁপ ফেলে বাঁচল।
