Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কৃষ্ণা কুন্তী এবং কৌন্তেয় – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী এক পাতা গল্প1105 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    কর্ণ – ১০

    ১০

    দৌত্য সেরে ফিরে যাবার সময় কৃষ্ণ কুন্তীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বীরমাতার মতো কুন্তী এতকাল ধরে যে অবিচার হয়ে আসছে তাঁর ছেলেদের ওপর, সে সব কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কুন্তী কৃষ্ণের মাধ্যমে পুত্রদের উত্তেজিত করার চেষ্টাও করেছেন। পাশা খেলার সময় কুরুসভায় পাঞ্চালীর ওপর যে ধর্ষণাত্মক ব্যবহার চলেছে তার প্রতিকার চেয়েছেন কুন্তী। কিন্তু মজা হল, এই সমস্ত অপমানগুলির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন—কৌরব পক্ষের কারও নাম না করে। কারণ নাম করতে গেলেই সেখানে কর্ণের কথা আসবে। এ কী দ্বিধায় পড়েছেন কুন্তী! পুত্রবধূর ওপর যে অপমান হয়েছে তিনি তার প্রতিকার চান, অথচ এই মুহুর্তে তিনি দোষীদের নাম করতে পারছেন না ; অন্যদিকে তিনি এও বুঝতে পারছেন যে, যুদ্ধের সময় এগিয়ে আসছে, কৃষ্ণের শাস্তির বাণী ব্যর্থ হয়ে গেছে। এখন কী হয়, কী হয়? কৃষ্ণ কুন্তীর কথা শুনে কী বুঝলেন কে জানে। তিনি হঠাৎ এসে কর্ণকে তুলে নিলেন নিজের রথে। নগরের বাইরে নির্জন প্রান্তে এসে রথ থামালেন। অনুগামী যদুবীরেরা দূরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন, শুধু কৃষ্ণ কর্ণকে নিয়ে পৌঁছলেন নগরের বাইরে। কর্ণের সঙ্গে আরম্ভ হল গভীর আলোচনা এবং তাও অনেকক্ষণ ধরে—মন্ত্রয়ামাস চ তদা কর্ণেন সুচিরং সহ।

    কৃষ্ণের বলাটা ছিল অদ্ভুত। নরমে, গরমে, স্তুতিবাদে, টোপ ফেলে, সব রকমভাবে কৃষ্ণ কর্ণকে দুর্যোধনের থেকে বিযুক্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, যে কথাটা আজ পর্যন্ত তাঁকে কেউ বলেনি, সে-কথাটা কৃষ্ণ বললেন কী করে! কৃষ্ণ বললেন—কর্ণ! তুমি বিদ্বান এবং বিচক্ষণ মানুষ। সনাতন ধর্ম, বেদবাদ, ধর্মশাস্ত্র সবই তুমি জান এবং জান বলেই এখন যা বলছি, তা নিজের সঙ্গে মেলাতে তোমার অসুবিধে হবে না। কৃষ্ণ বললেন জান তো কর্ণ! শাস্ত্রকারেরা বলেছেন—পুরুষ যে মেয়েকে বিয়ে করে, সেই মেয়ের যদি অবিবাহিতা কুমারী অবস্থায় কোনও পুত্র থেকে থাকে তাহলে বিবাহিত পুরুষটি সেই পুত্রেরও পিতা হয় অর্থাৎ একই স্ত্রীলোকের কুমারী এবং বিবাহিত অবস্থায় যতগুলি পুএই জন্মাক, সবগুলিরই পিতা হবেন পাণিগ্রহণকারী পুরুষটি। এই নিয়মে কর্ণ তুমি কিন্তু মহারাজ পাণ্ডুরই ছেলে—পাণ্ডোঃ পুত্রো’সি ধর্মতঃ—কারণ তুমি তোমার জননী কুন্তীর কুমারী কালের পুত্র।

    কর্ণ একটুও চমকালেন না। সারা জীবন যাঁকে জন্মের লাঞ্ছনা ভোগ করে সুতজাতির কলঙ্ক-পঙ্কে তিলক রচনা করে জীবনের পথে চলতে হয়েছে, তাকে আগেই সব জানতে হয়। গ্লানির মধ্যে যে সন্তানকে চলতে হয়, সে সন্তান নিজেই তার জন্ম রহস্য ভেদ করে। কর্ণও তাই সব জানতেন, সব জেনেও পাথর-প্রতিমার মতো স্থির হয়ে কেবলই সংসারের কূটবুদ্ধি যাচাই করতে লাগলেন। ভাবটা এই—আমি ছাড়া অন্যেও তা হলে কেউ জানে এ রহস্য, তবে এতকাল ধরে সূতপুত্রের গালাগালিটা কেমন ন্যাকামো। যাই হোক কৃষ্ণ বলতে থাকলেন—নিয়ম অনুসারে কর্ণ তোমারই কিন্তু রাজা হওয়ার কথা—এহি রাজা ভবিষ্যসি। তা ছাড়া তোমার ‘ফ্যামিলি-প্রেস্টিজ’ কিছু কম নয়। তোমার পিতৃকুলে আছেন পাণ্ডবেরা, মাতৃকুলে আছি আমরা, বৃষ্ণিবংশের পুরুষেরা। তুমি ভাই আজকে আমার সঙ্গে চল, তোমাকে তোমার পাঁচ ভাই সবার বড় দাদা বলে জানুক—অভিজানন্তু কৌন্তেয়ং পূর্বজাতং যুধিষ্ঠিরাৎ।

    কর্ণ যদি ভাবেন এমনি উটকো গিয়ে পাণ্ডবদের ভাই ভাই করলে কেউ যদি ব্যঙ্গ-বক্রোক্তি করে কৃষ্ণ তাই শত-শতাংশ কথা দিয়ে বললেন—আরে, সবাই তোমার পায়ে পড়ে যাবে, পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই তাদের ছেলেপুলেরা, এমনকী আমরাও তোমার পায়ে পড়ে থাকব—পাদৌ তব গ্রহীষ্যন্তি সর্বে চান্ধক-বৃষ্ণয়ঃ। উত্তেজনার আতিশয্যে কৃষ্ণ প্রস্তাব দিলেন—যে রাজারা আজকে পাণ্ডব পক্ষে যুদ্ধ করবার জন্য উপস্থিত হয়েছেন, তাঁরা বরঞ্চ তোমার অভিষেকের জোগাড় করুন, মাঙ্গলিক বিধান করুক রাজকন্যারা, আর দিনের ষষ্ঠভাগে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে প্ৰেমনত নয়নের দীর্ঘচ্ছায়াময় পল্লবের মতো তখন তিন ভুবনের সেরা সুন্দরী দ্রৌপদী এসে দেখা করুক তোমার সঙ্গে—ষষ্ঠে ত্বাং চ তথা কালে দ্রৌপদী উপগমিষ্যাতি।

    কৃষ্ণ জানেন—দ্রৌপদীর ওপর কর্ণের লোভ ছিল। পরবর্তীকালে দ্রৌপদীর ওপর যত আক্রোশ দেখা গেছে কর্ণের, সেও দ্রৌপদীকে না পাওয়ার কারণেই। তবু যদি কর্ণের মনে এমন ভাবনা আসে যে—এতকাল তাকে পেলুম না, আর এখন এই মাঝ বয়সে এসে, যখন প্রেম প্রায়ই দাম্পত্য অভ্যাসে রূপান্তরিত হয়, এখন সেই প্রথম যৌবনের স্বপ্ন দেখানো—এতে কি যন্ত্রণা কিছু কমে, যন্ত্রণা আরও বাড়ে। কৃষ্ণ তাই কথা পরিবর্তন করে বললেন—তা হলে কী বল, ধৌম্য পুরোহিত অভিষেকের মন্ত্র পড়ুন, আমরাও সবাই অভিষেকের জোগাড় করি। তোমার যুবরাজ হবেন যুধিষ্ঠির, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে চামর দোলাবেন তিনি। তোমার মাথায় রাজচ্ছত্র ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন মহাবলী ভীমসেন, তোমার সাদা ঘোড়ার রথ চালাবেন স্বয়ং অর্জুন, আর আমরা সবাই থাকব তোমার অনুগামী হয়ে। সবার শেষে কৃষ্ণ বললেন—তুমি রাজা হও, নিজের রাজ্যপাট সামলাও আর তৃপ্ত কর জননী কুন্তীর পুত্রস্নেহাতুর হৃদয়খানি—প্রশাধি রাজ্যং কৌন্তেয় কুন্তীঞ্চ প্রতিনন্দয়,—দূর হোক সমস্ত শত্রুতা, ভাই ভাই মিলে যাক।

    খট করে কর্ণের কানে বাজল—‘কৌন্তেয়’। এতকাল তো কেউ তাঁকে কুন্তীর ছেলে বলে ডাকেনি, সবাই বলেছে রাধেয়—রাধার ছেলে। সারা জীবন লাঞ্ছনা সয়ে আজকে যদি হঠাৎ কুন্তীর ওর সোহাগে মা মা বলে ডেকে ওঠেন কর্ণ, তবে সে আদিখ্যেতা বুঝি তাঁর নিজেরই সইবে না। কর্ণ বললেন—আজকে তুমি ভালবেসে, আপন সখার মতো আমার ভাল চেয়ে যা কিছু বললে, সে সব আমি জানি—সর্বঞ্চৈব অভিজানামি। আমি জানি, আমি পাণ্ডুর ছেলে—পাণ্ডোঃ পুত্রো’স্মি ধর্মতঃ। আমি জানি আমার জননী কুন্তীর কুমারী কালের গর্ভে ভগবান ভাস্করের ঔরসে আমার জন্ম। আমি জানি, হ্যাঁ জানি যে, সূর্যদেবের কথামতই আমার জননী আমাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন—আদিত্যবচনাচ্চৈব জাতং মাং সা ব্যসর্জয়ৎ। কিন্তু আমার মা কী ভেবে আমাকে বিসর্জন দিলেন—যথা ন কুশলং তথা? কাজেই ধৰ্মত পাণ্ডুর ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, মায়ের প্রথম ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, আমি যদি মায়ের প্রথম সন্তানকামী হৃদয় থেকে মুছে যাই,—কুন্ত্যা ত্বহম্ অপাকীর্ণঃ—সেখানে আজ হঠাৎ তাঁকেই মা মা বলে সোহাগ দেখানো আদিখ্যেতা নয় কি?

    কর্ণের এই অভিমান স্বাভাবিক। আগেই বলেছি কর্ণের জীবনে দুটি নারীর বিশেষ ভূমিকা আছে এবং সে ভূমিকা তাঁর জীবন জটিলতর করার। দ্রৌপদী কর্ণের যৌবনের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছেন, তাঁর ওপরে আক্রোশ দেখিয়ে। অন্যদিকে সেই দ্রৌপদীকে অপমান করে, কর্ণের আক্রোশ খানিকটা প্রশমিতও হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু জননী কুন্তী, তাঁকে যে অপমানও করা যায় না আবার সওয়াও যায় না। কর্ণ বললেন—সূত অধিরথ আমাকে এনে জননী রাধার হাতে দিয়েছিলেন। আমাকে দেখামাত্র সুতজননীর-স্নেহস্তন্য আপনি ঝরে পড়েছিল—সদ্যঃ ক্ষীরমবাতরৎ। তিনিই শৈশব অবস্থায় আমার গু-মুত কেচে মানুষ করেছেন—সা মে মূত্র পুরীষঞ্চ প্রতিজাগ্রহ মাধব। সব বুঝে-সুঝে আজকে হঠাৎ আমি তাঁর ঋণ মুক্ত হয়ে চলে যাই কী করে? তা ছাড়া সেই যে সূত অধিরথ, তাঁকেই তো আমি পিতা বলে জানি। তিনি পিতার মতো জাতকর্ম, অন্নপ্রাশন সব করিয়েছেন, যৌবনে মেয়ে খুঁজে খুঁজে বিয়ে দিয়েছেন। সেই বিবাহিতা স্ত্রীদের গর্ভে আমার তো ছেলে-পিলেও আছে। আমার সেই পরিণীতা স্ত্রীদের আমি ভালবাসি, কৃষ্ণ—তাসু মে হৃদয়ং কৃষ্ণ সঞ্জাতং কামবন্ধন। কর্ণের ভাবটা এই যে, এতকালের বিয়ে-করা বউ যাঁরা, যাঁরা এতদিন যৌবনের ভোগ, সুখ, আনন্দ—সব দিয়েছেন হঠাৎ তাঁদেরকে নীচে ঠেলে বড় ঘরের সুন্দরী বউ দ্রৌপদীকে যদি আজকে বড় আপনার বলে মনে করি, তা হলে আমিই আমি থাকি না। সারথির ঘরে আমি লালিত, সারথির ঘরে আমার বিয়ে, সারথির ঘরের নীতি-নিয়ম আমার মজ্জায় মজ্জায়। কাজেই আজ আর ফিরে যাবার পথ নেই।

    কর্ণ-চরিত্রের পক্ষে এই সময়টা হল একদিকে ভীষণ সঙ্কটপূর্ণ অন্যদিকে সঙ্কট মোচনের এক চুড়ান্ত বিন্দু। মহাভারতের কবি এতদিন তাঁকে জন্মের লাঞ্ছনায় ভুগিয়ে, দুর্যোধনের মতো দুঃসঙ্গে পুষ্ট করে, লোভ, হিংসা, ঈর্ষা আর অহমিকায় বর্ধিত করে সমস্ত নীতি-পরায়ণ মানুষদের কাছ থেকে একেবারে একাকিত্বে এনে ফেলেছেন। মিথলজিষ্টদের ভাষায় একে ‘হেরোইক আইসোলেশন’ বলব কিনা জানি না, তবে ‘আইসোলেশন’ তো বটেই। এই ‘আইসোলেশনে’র বড় প্রয়োজন ছিল কর্ণের চূড়ান্ত মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। হিংসা-প্রতিহিংসার অন্তরে কর্ণ যে কতবড় মানুষ, সেটা বুঝি প্রতিতুলনায় প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এতদিন কর্ণের গায়ে শত কালিমা লেপন করা হয়েছে। ঠিক এই অংশে এসে মহাভারতের কবি তাঁর কবি-হৃদয়ের সমস্ত সম্মান উজাড় করে দিয়েছেন কর্ণের জন্য। সত্যি কথা বলতে কি কৃষ্ণের কথায় প্রণয় ছিল, সৌহার্দ্য ছিল, সান্ত্বনাও ছিল, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল কিছু প্যাচও। ইঙ্গিতজ্ঞ কর্ণ সে প্যাঁচ বুঝেছেন এবং সেইখানেই তাঁর মাহাত্ম্য। অনেক কথার মাঝে কৃষ্ণ বলেছিলেন—তোমায় আমরা সবাই মিলে রাজার আসনে বসাব, যুধিষ্ঠির হবেন তোমার যুবরাজ—যুবরাজস্তু তে রাজা ধর্মপুত্রো যুধিষ্ঠিরঃ। কর্ণ বললেন—আমার এই ছোট সংসারের মোহগণ্ডী পেরিয়ে আমার আর ফিরে যাবার উপায় নেই কৃষ্ণ। আমি চাই, তুমিও আমার এই জন্মের রহস্য এতকাল পরে আর ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের সামনে প্রকাশ কোরো না। তাঁকে যতটুকু জানি, তাতে সেই ধর্মভীরু মহাত্মা যদি জানতে পারেন যে, আমিই কুন্তীর বড় ছেলে, তা হলে কিছুতেই তিনি আর রাজা হবেন না। আর আমার দিক থেকে বিপদ হল, আমি রাজা হলে কখনই যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ করতে পারব না, রাজা তো তিনি হবেনই না। আমি রাজা হলে এই সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ রাজ্য আমাকে তুলে দিতে হবে দুর্যোধনের হাতে—স্ফীতং দুর্যোধনায় এব সম্প্রদদ্যামরিন্দম। তাই বলি যুধিষ্ঠির রাজা আছেন, তিনিই রাজা থাকুন।

    কুরুক্ষেত্রের যে যুদ্ধ ঘটতে যাচ্ছে কর্ণ তার ফল জানেন। কর্ণ জানেন যে, সে যুদ্ধে জয়ী হবে পাণ্ডব পক্ষই। জীবন মৃত্যুর সন্ধিলগ্নে দাঁড়িয়ে কর্ণ আজ কৃষ্ণের কাছে স্বীকার করেছেন—আমি এতকাল পাণ্ডবদের যে জঘন্য কটু কথা শুনিয়েছি, তা সবই দুর্যোধনকে তুষ্ট করার জন্য এবং সে জন্য আমার অনুতাপও আছে—প্রিয়ার্থং ধার্ত্তরাষ্ট্রস্য তেন তপ্যে হ্যকর্মণা। কর্ণ বললেন—যে যুদ্ধ হতে যাচ্ছে, সে যুদ্ধ হবেই। এ যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেওয়াটাই আমার আনন্দ। তুমি যাও, কৃষ্ণ! সমস্ত রহস্য যা তুমি জান, চেপে রাখ নিজের মধ্যে। নিয়ে এস কুন্তীপুত্র অর্জুনকে, যার সঙ্গে যুদ্ধ হবে আমার—সমুপানয় কৌন্তেয়ং যুদ্ধায় মম কেশব।

    কৃষ্ণ যেন এবার একটু শাসনের সুরে কথা বললেন। যুদ্ধের সময়ে পঞ্চপাণ্ডব যে তীক্ষ্ণ, তীক্ষ্ণতর হবেন এবং সে তীক্ষ্ণতা থেকে যে রক্ষা নেই কর্ণের, রক্ষা নেই কুরুকুলের কারও—সে কথাটাও বুঝিয়ে দিলেন বেশ করে। কর্ণ একটুও ভয় পেলেন না, উল্টে রীতিমতো জ্যোতিষ-চর্চা করে বুঝিয়ে দিলেন—জয় হবে পাণ্ডবদেরই, কৌরবদের নয়। কর্ণ দুঃস্বপ্নে দেখেছেন একে একে কৌরবের সব সেনাপতি অর্জুনের গাণ্ডীবের আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। এই স্বপ্ন কর্ণ সত্য বলেই মনে করেন। তিনি একদিকে স্বীকার করেন যে, ভারত যুদ্ধের নিমিত্ত কারণ তিনি নিজে, দুঃশাসন এবং শকুনি এবং অন্য দিকে মরণের মুখে ঝাঁপ দিয়ে কৃষ্ণকে বলেন—অন্তকালে আবার দেখা হবে তোমার সঙ্গে স্বর্গভূমিতে—অথ বা সঙ্গমঃ কৃষ্ণ স্বর্গে নো ভবিতা ধ্রুবম্।

    আচ্ছা, আমরা যদি এমন একটা কাল্পনিক ব্যবস্থা করি যে, কর্ণ কৃষ্ণের কথা শুনে, পঞ্চপাণ্ডবকে নিজের ভাই বলে মেনে পাণ্ডব শিবিরে রাজা হতে এসেছেন, তাহলে ব্যাপারটা কীরকম হত। হ্যাঁ, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির হয়তো সূক্ষ্ম ধর্মজ্ঞানে তক্ষুনি তাঁকে শাসিতার আসন ছেড়ে দিতেন, কিন্তু ধরুন ভীমের কথা। যে ভীমের খাওয়া নিয়ে, বুদ্ধি নিয়ে, চলা-বলা, সব নিয়ে এতকাল দুঃশাসন-দুর্যোধনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হেসেছেন, সে নাকি তাঁর আপন ভাই, তাঁকে তিনি মুখ দেখাবেন কী করে? যে অর্জুনের সঙ্গে চিরকাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছেন, যে তাঁর বিবাহের প্রথম গ্রাসটি কেড়ে নিয়েছে, যাঁর বিবাহিতা পত্নীকে তিনি সবার মধ্যে উলঙ্গ করার আদেশ দিয়েছেন, সে নাকি তাঁর আপন ভাই, তাঁকে তিনি মুখ দেখাবেন কী করে? সবার ওপরে দ্রৌপদী, প্রথম প্রেমেই যে তাঁকে বিবাহ করতে প্রত্যাখ্যান করেছে, যে প্রত্যাখ্যানের আক্রোশে প্রথম সুযোগেই তিনি যাঁকে ‘বেশ্যা’ বলে চিহ্নিত করেছেন, যাঁর সঙ্গে কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে ব্যবহারও করেছেন বেশ্যার মতো, সে নাকি তাঁর স্ত্রী, তাঁকে তিনি মুখ দেখাবেন কী করে? তাই আমরা বলি কি—দুর্যোধনের প্রতি নিষ্ঠাবশত বন্ধুকৃত্য করবার জন্য তো বটেই, এমনিতেও পাণ্ডব শিবিরে দাদা বলে উপস্থিত হওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি কর্ণের ছিল না, কিংবা সেটা বাস্তবসম্মতও ছিল না। বেঁচে থেকে এই রকম বিপ্রতীপ বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে, মরণও তাঁর কাছে শ্রেয় ছিল, তাই কর্ণ মরতেও চেয়েছেন, দুর্যোধনের পক্ষে থেকে বিরোধিতার প্রদর্শনী করে মরতে চেয়েছেন।

    ওদিকে আরেক বিপদ হল। কুরুসভা থেকে কৃষ্ণ চলে যাবার পর পরই মহামতি বিদুর এসে উপস্থিত হলেন কুন্তীর ঘরে। তিনি এসেই আপন মনে গজরাতে লাগলেন—আর কি, যুদ্ধ লেগে গেল বলে। এই দুর্যোধন কারও কথা শোনে না, ধৃতরাষ্ট্রের আস্কারায় একেবারে মাথায় উঠে গেছে। তার মধ্যে জয়দ্ৰথ, কর্ণ, দুঃশাসন, শকুনি—এরা সবাই কুবুদ্ধি দিয়ে উসকে দিচ্ছে দুর্যোধনকে। ব্যস, বিদুরের সমালোচনায় অনেকগুলো নাম শোনা গেল বটে, তবে কুন্তীর কর্ণশূল উৎপাদন করার জন্য একটা নামই ছিল যথেষ্ট—কর্ণ। তাঁর নিঃশ্বাস দৃঢ়তর হল, দুঃখ গভীরতর। পাঁচটি অভব্য ছেলের মধ্যে নিজের ছেলের অভব্যতাই যেমন জননীর বুকে বাজে, ঠিক সেই ভাবেই কুন্তী মনে মনে বলতে লাগলেন—দুর্যোধনের সঙ্গে থেকে থেকে ছেলেটা আমার বয়ে গেল। যুদ্ধ লাগলে কী অনর্থই না ঘটবে। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ—এঁরা সবাই দুর্যোধনের পক্ষ হয়ে লড়বেন বটে কিন্তু আচার্য দ্রোণও তাঁর পরম প্রিয় শিষ্যদের গায়ে হাত তুলবেন না, ভীষ্মও এড়াতে পারবেন না পাণ্ডুর ঘরের নাতিদের ওপর তাঁর স্নেহ। কিন্তু মুশকিল করেছে ওই কর্ণ। দুর্যোধনের সঙ্গে পড়ে তারই মোহে সে নিজের ভাই পাণ্ডবদের সঙ্গে ঝগড়া করে যাচ্ছে। ছেলের ক্ষমতাও আছে যথেষ্ট কিন্তু সেই ক্ষমতার জোরে সে অনর্থে মন দিয়েছে। তা এতদিন যা করেছে, করেছে, কিন্তু সে যে পাণ্ডবদেরই চরম সর্বনাশে মন দিয়েছে, এতেই আমার মন পুড়ে যাচ্ছে।

    কুত্তী ঠিক করে ফেললেন। এতদিন যা বলেননি, এবার তা বলতে হবে। কুন্তী ভাবলেন—আমি সব গুছিয়ে বলব। ভগবান ভাস্করের কথা, দুর্বাসার মন্ত্র-কথা, কর্ণের জন্ম, তাকে বিসর্জন—সব গুছিয়ে বলব। সে আমার কুমারী গর্ভের ছেলে, হাজার হোক আমি তো তাকে পেটে ধরেছি। সে আমার মুখ চেয়ে, ভাইদের হিতের দিকে তাকিয়ে নিশ্চয় আমার কথা শুনবে—কস্মান্ন কুর্যাদ্ বচনং পশ্যন্ ভ্রাতৃহিতং তথা। মনে মনে সব ঠিক করে কুন্তী যখন কর্ণের কাছে পৌঁছলেন, তখন অপরাহ্ন হয়ে এসেছে প্রায়। কর্ণ তখনও বেদ মন্ত্রে স্তুতি করে যাচ্ছেন সূর্যদেবকে। সূর্যের তাপ আজ বড় প্রখর। জননী কুন্তীকে প্রখর মধ্যাহ্নসূর্য মাথায় বয়ে আসতে হয়েছে। শুষ্ক পদ্মমালার মতো মুখ-চোখ শুকিয়ে গিয়েছিল তাঁর। ভাগীরথীর তীরে পুবমুখী কর্ণের সূর্যবন্দনা দেখে কুন্তী অপেক্ষা করতে লাগলেন। শ্বেতশুভ্র আঁচলখানি দিয়ে সূর্যের কিরণ থেকে কেবলই তিনি আড়াল করে রাখছিলেন নিজেকে—অতিষ্ঠদ..উত্তরবাসসি। হয়তো কন্যাবস্থার এই নায়ককে অতি তাপযুক্ত দেখলে এখনও কুন্তীর বড় লজ্জা করে। সূর্য কিরণের স্পর্শ অন্য কোনও গভীর অনুভূতি বয়ে নিয়ে আসে বুঝি। তাই হয়তো উত্তরীয়ের আড়াল খোঁজা। মধ্যাহ্ন কেটে গিয়ে যেই সূর্য পুবমুখী বসা কর্ণের পিঠের ওপর পড়ল, ওমনি বুঝি অপরাহ্নের ঘণ্টা বেজে কর্ণের সূর্য-পূজা শেষ হল—আপৃষ্ঠতাপাদ্ জপ্‌ত্বা সঃ। তিনি পশ্চিম দিকে ঘুরে বসতেই দেখেন—কুন্তী। বিস্ময়ে, আনন্দে, অভিভূত কর্ণ অভিবাদন জানালেন কুন্তীকে। কর্ণ এই চেয়েছিলেন। তিনি মায়ের পরিচয় জানা সত্ত্বেও আপনা আপনি গিয়ে সোহাগী হবেন না, মাকেই একদিন আসতে হবে তাঁর কাছে। মা এসেছেন। কর্ণ বললেন—আমি রাধা মায়ের ছেলে, অধিরথের ছেলে, কর্ণ। আমার প্রণাম গ্রহণ করুন ভদ্রে-রাধেয়ো’হম্ আধিরথিঃ কর্ণস্ত্বাম্ অভিবাদয়ে। বলুন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি—ব্রুহি কিং করবাণি তে।

    একেবারে ‘অফিসিয়াল’ কথা, এতটাই ‘অফিসিয়াল’ যে কুন্তী আর কোনও ভণিতা করার সময় পেলেন না। একেবারে প্রথম আক্ষেপেই তাঁকে বলতে হল—না, বাবা, না। তুমি বাধার ছেলে নও, কুন্তীর ছেলে—আমার ছেলে। অধিরথ তোমার বাবা নন, তুমি মোটেই সারথি ঘরের ছেলে সূতপুত্র নও। তুই আমার কোল-ছেঁচা ধন, আমার প্রথম ছেলে। আমার বিয়ে হয়নি, তখন তুই জন্মেছিলি। তাও এখানে নয়, সেই কুন্তিভোজ রাজার ঘরে। এই যে সূর্যদেব, সব কিছু প্রকাশ করাই যাঁর কাজ, তিনিই তুই হয়ে আমার পেটে এসেছিলি। সহজাত কবচ-কুণ্ডল ধারণ করে তুই আমার বাবার ঘরে থাকতেই জন্মেছিলি আমার কোলে। আর আজ নিজের ভাইদেরই তুই চিনিস না। ভাইদের ছেড়ে যে মোহে তুই দুর্যোধনের সেবা করছিস, সে ঠিক হচ্ছে না বাছা। বাপ-মাকে সন্তুষ্ট করা ছেলের কাজ। তুই বাবা ফিরে আয় পাণ্ডবের ঘরে। যে বিপুল সম্পত্তি একদিন অর্জুন দিগ্‌বিজয়ে জিতে এনেছিল, সে সম্পত্তি এখন ছলনার গ্রাসে দুর্যোধনের ঘরে। তুই সম্পত্তি ফিরিয়ে এনে ভাইদের সঙ্গে ভোগ কর। পৃথিবী আজ দেখুক, দুই বিরোধী গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ দুই বীর কর্ণ আর অর্জুন আজ এক জায়গায়। ঠিক যেমনটি যাদবদের ঘরে বলরাম আর কৃষ্ণ, তেমনি আমাদের ঘরে কর্ণ আর অর্জুন—কণার্জুনৌ বৈ ভবেতাং যথা রামজনার্দনৌ। তুই আমার সবার বড় ছেলে, সমস্ত গুণে গুণী। এতকাল যে সূতপুত্র বলে তোকে ধিক্কার করেছে লোকে, দূরে যাক সেই শব্দ—তুই পার্থ। পৃথার ছেলে—সূতপুত্রেতি মা শব্দঃ পার্থত্ত্বমসি বীর্যবান্।

    সহৃদয় পাঠক! আমাদের কর্ণ চরিত্র বিশ্লেষণের এই অংশে কবিগুরুর কর্ণ-কুন্তী সংবাদ স্মরণ করিয়ে দিলেই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মনে রাখা দরকার, মহাভারতের কমলকলি থেকে এক মহাকবির হৃদয়ের মধু সঞ্চিত করে যে মধুকর বাংলা কবিতায় তা ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার মধ্যে সহজ, সরল কর্ণ গেছেন হারিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যেমন মহাভারতের কর্ণ-কুন্তী সংবাদ থেকে তাঁর কাব্যতথ্য সঞ্চয় করেছেন, তেমনি কৃষ্ণ-কর্ণ সংবাদের অনেক জিনিসও এসে গেছে বাংলায় কর্ণ-কুন্তী সংবাদের মধ্যে। তার ওপর আছে কবির আপন মনের মাধুরী। মহাভারতের কর্ণ কুটিল ব্যঞ্জনায়, গৃঢ় ভাবের অভিব্যক্তিতে কুন্তীকে জর্জরিত করেননি, বরঞ্চ তাঁর মর্মে আঘাত করেছেন একেবারে সোজাসুজি। এমনকী কুন্তী আপন সচেতন বক্তব্য বুঝিয়ে বলার পর ভগবান ভাস্কর সেই আকাশ থেকেই কুন্তীকে সমর্থন জানিয়ে কর্ণকে মায়ের কথা শুনতে বলেছিলেন, কিন্তু কর্ণের অবস্থা তাতে কিছু পালটায়নি। পিতার দ্বিতীয়া বিবাহিতা পত্নীকে মাতৃহীন বয়স্ক যুবক যেমন অদ্ভুত চোখে দেখে, যেমন চাঁচাছোলা কথায় বলে, ঠিক তেমনিভাবে কর্ণ উত্তর দিলেন কুন্তীকে।

    কর্ণ বললেন—আমি আপনার কথায় একটুও পাত্তা দিই না—ন চৈতৎ শ্ৰদ্দধে বাক্যম্। আপনার কথামত কাজ করলে ধর্ম তো দূরের কথা, অধর্ম হবে আমার। আপনি যে অন্যায় পাপ আমার জন্মলগ্নেই আমার ওপর করেছিলেন, তার জন্যেই আজকে আমি নিজেকে ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিতে পারি না। আপনি সেদিন আমাকে বিসর্জন দিয়ে, সমস্ত দুর্নামের ভাগী করেছেন আমাকে—অপাকীর্ণো’স্মি যন্মাতস্তদ্ যশঃ কীর্তিনাশনম্। আমি ক্ষত্রিয় হয়ে জন্মেছিলাম, কিন্তু আপনার জন্যেই আমি কোনও ক্ষত্রিয়ের সংস্কার লাভ করতে পারিনি, আপনি ছাড়া অতি বড় কোনও শত্রুও আমার এত বড় ক্ষতি করত না—তৃৎকৃতে কি পাপীয়ঃ শত্ৰুঃ কুর্যান্ মমাহিতম্। যে সময়ে আমার ক্ষত্রিয়োচিত জাতকর্মাদি সংস্কার করা উচিত ছিল, সে সময় আপনি কিচ্ছুটি করেননি, এখন আপনি আপনার নিজের কাজের জন্য আমাকে অনুরোধ করছেন। কই, আগে তো আপনি মায়ের মতো কোনও স্নেহ-ব্যবহার করেননি, আর আজকে নিজের কাজ গুছোনোর জন্য খুব ভালভালাই করে ‘ছেলে ছেলে’ বলে ডাকছেন—সা মাং সম্বোধয়সি অদ্য কেবলাত্মহিতৈষিণী।

    কুন্তী ভাবতেও পারেননি, এতটা ফিরে পাবেন। তিনি ভেবেছিলেন—কর্ণকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলে, পুত্রের কর্তব্য স্মরণ করালেই সে তাঁর শূন্য বুকে ফিরে আসবে। কিন্তু জন্ম-না-জানা পুত্রের দুঃখটা যে কী, তা তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। বস্তুত কর্ণের কথা এখনও শেষ হয়নি। তিনি বললেন—অর্জুন আর কৃষ্ণ এক জায়গায় হলে কে না ভয় পায়? কিন্তু আজকে যদি আমি অর্জুন-কৃষ্ণের গুষ্টিতে যোগ দিই, তা হলে লোকে আমাকেও ভিতু ভাববে। তা ছাড়া বাপের জন্মে যার ভাই-বেরাদর বলে কিছু ছিল না, হঠাৎ যুদ্ধের সময় তার পাঁচ পাঁচটা পাণ্ডব ভাই ভুঁইফোড়ের মতো উদয় হল, আর আমিও ‘ভাই ভাই’ করে হামলে পড়লাম—এ-কথা শুনে ক্ষত্রিয়-সুধীজনেরা বলবেটা কী—অভ্রাতা বিদিতঃ পূর্বং যুদ্ধকালে প্রকাশিতঃ। পাণ্ডবান্ যদি গচ্ছামি কিং মাং ক্ষত্রং বদিষ্যতি ॥

    কর্ণের আর একটা পয়েন্ট আছে, সেটা হল বাস্তবতার কথা। তাঁর কথা হল পাণ্ডবপক্ষে গেলে তাঁর বাড়-বাড়ন্তটা নতুন করে কী হবে? এ-কথা তিনি কৃষ্ণকেও বলেছেন, কুন্তীকেও বললেন। তিনি কৃষ্ণকে বলেছিলেন—ধৃতরাষ্ট্রের কুলে দুর্যোধনের ছত্র-ছায়ায় থেকে এই তেরোটা বছর আমি রাজার মতো নিষ্কণ্টক রাজ্যভোগের সুখই পেয়েছি—ময়া এয়োদশ সমা ভুক্তং রাজ্যম্ অকণ্টকম,—সেই দুর্যোধন যখন এই যুদ্ধে আমার ওপরেই ভরসা করছে, তখন তাঁকে আমি বঞ্চনা করতে পারি না—অনৃতং নোৎসহে কর্ত্তুম্। আজকে কর্ণ কুন্তীকে একই কথা বললেন—ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছে, যে সম্মান কেউ দেয়নি সেই সম্মান দিয়েছে, আমার কোনও ইচ্ছেই তারা না পুরিয়ে রাখেনি—সর্বকামৈঃ সংবিভক্তঃ পুজিতশ্চ যথাসুখম্। সেই ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা, যারা এখন আমার ওপর ভরসা করে যুদ্ধে নেমেছে, তাদের আমি ফেরাব কী করে? এ হয় না, হতে পারে না। বরঞ্চ সময় এসেছে, যতটা তারা করেছে, তার কিছুটা ফিরিয়ে দেবার।

    ইঙ্গিতটা কুন্তীর দিকেই। তুমি কিছু করনি, তোমাকে ফিরিয়ে দেবারও কিছু নেই। বস্তুত পিতা-মাতা যে বাল্যকালে অসহায় শিশুর মূত্র-পুরীষ ঘেঁটে পুত্রকে মানুষ করেন, সেই সময়েই নিজের কাছে তাঁরা পুত্রের ঋণ তৈরি করে দেন। পুত্র বড় হয়ে পিতামাতার কাছে তাঁর জন্ম-ঋণ শোধ করতে না পারলেও, কিছুটা শোধ করতে পারে——তাঁদের সেবা করে, তাঁদের ইচ্ছাপূরণ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে কুন্তী সে দাবি তো করতে পারেনই না এবং সেই সব বড় বড় কথা বলার তাঁর এক্তিয়ারই নেই, যা অন্য সাধারণ মা-বাবাও বলতে পারে। বিশেষত তিনি যে বলেছিলেন, পিতা-মাতার কথা পুত্রের শোনা উচিত—সে কথার যথার্থতা নস্যাৎ হয়ে যায় কর্ণের যুক্তিতে। কর্ণ বললেন—যুদ্ধ আমাকে করতেই হবে। আপনার কথাগুলি খুব যথার্থ, খুব মিষ্টি বাণীর মতো শোনাচ্ছে বটে, কিন্তু আপনি যা বলছেন তা আমি কিছুতেই করব না—ন করোম্যদ্য তে বচঃ।

    কর্ণের জেদ চেপে গেল। কৃষ্ণও তাঁকে একই কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাঁর বলার ভঙ্গির জন্যই হোক কিংবা তিনি অন্য লোক বলেই হোক, কর্ণ তাঁর সঙ্গে অতি মধুর ব্যবহার করেছিলেন। আলোচনা চলেছিল সৌহার্দ্যের সূত্র ধরে। কিন্তু এতদিন পরে নিজের মাকে সামনে পেয়েও তাঁকে তিনি ভালবাসতে পারলেন না। উল্টে ফেটে পড়লেন ক্রোধে। ক্রোধের কারণও বুঝি ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, কুন্তী যে এখনও কর্ণের কাছে উপস্থিত হয়েছেন, সেও যে বড় জননীর মমতা-রসে, তা নয়। এখানেও তাঁর স্বার্থবুদ্ধি কিছু ছিল। তা ছাড়া একেবারে জন্মলগ্নেই যে ছেলেকে বিসর্জন দিয়েছেন, তার প্রতি মমত্বও তাঁর সেইভাবে জন্মায়নি, যা দিন-প্রতিদিনের অভ্যাসে, ব্যবহারে জন্মায়। এখানে তাঁর শুধু এই স্বার্থবোধ কাজ করছে যে, কৌরবপক্ষের সাধারণ অন্য কারও পক্ষে ভীম-অর্জুনদের মারাই সম্ভব নয়। ভীষ্ম এবং দ্রোণ, পুত্র কিংবা শিষ্য-স্নেহের কারণে খানিকটা হাত গুটিয়ে থাকবেন। যদিও তাঁদের হত্যা করার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু কর্ণের তো সে সব বালাই নেই, সে সুযোগ পেলেই অর্জুন কিংবা ভীমকে হত্যা করবে, বিশেষত অর্জুনের সঙ্গে তাঁর চিরকালের টক্কর। এই অবস্থায় আপন পাঁচ পুত্রকে খানিকটা বিপন্মুক্ত করতেই কর্ণের কাছে কুন্তীর আসা। এই স্বার্থবুদ্ধি অতি কূটস্থ হলেও কুন্তীর অন্তরে তা ছিল এবং কর্ণ বুঝি তা বুঝতে পেরেছিলেন। কর্ণ হাজার হলেও বীর, হাজার হলেও দাতা, অতএব এতকাল পরে ফিরে-পাওয়া মাকে তিনি খালি হাতে ফিরে যেতে দেননি। বললেন—তোমার এই চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে না। আমি কথা দিচ্ছি, অর্জুন ছাড়া যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব—এদের কাউকেই আমি মারব না, অসহ্য হলেও না। কিন্তু অর্জুনকে হয় আমি মারব, নইলে তার মতো বীরের হাতে মৃত্যুবরণ করে যশের ভাগী হব। তবে হ্যাঁ তোমার পাঁচ ছেলে, পাঁচটাই থাকল—হয় অর্জুন থাকবে না, আমি থাকব। নয়তো আমি থাকব না, অর্জুন থাকবে—নিরর্জুনা সকর্ণা বা সার্জুনা বা হতে ময়ি।

    এই এতক্ষণে বোধহয় কুন্তীর স্বার্থবুদ্ধি কিছুটা লুপ্ত হল। আপন পুত্রের পরুষ-পৌরুষ বাক্যে এবার হয়তো তিনি খানিকটা বুঝলেন যে, শুধু বাক্য দিয়ে জননীত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সারা জীবন লাঞ্ছিত পুত্রের অভিমান বুঝে এবারে তাঁর বুক ভেঙে কান্না এল। ভাবী যুদ্ধফল প্রত্যক্ষ করে তিনি দুঃখে কাঁপতে থাকলেন—কুন্তী দুঃখাৎ প্রবেপতী। মনে মনে পুত্রস্থানে অর্জুন-কর্ণের ব্যক্তি পরিবর্তন করে কর্ণকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন—সবই আমার কপাল—দৈবন্তু বলবত্তরম্। চার ভাইয়ের জীবন সম্বন্ধে অভয় পেলাম তোর কাছে, এখন তোদের দুজনের মধ্যে কে থাকে, কে জানে। তোর ভাল হোক বাবা, তোর মঙ্গল হোক। মাতা-পুত্রের একবার মাত্র আলিঙ্গনের পর দুজনে দুজনের পথ ধরলেন। যুদ্ধের ভেরী বেজে উঠল।

    কর্ণ-কুন্তী সমাগম সংবাদ কেউ জানল না। যুদ্ধের সাজ-সাজ রবে পাণ্ডব-কৌরব সকলেই ব্যস্ত। এরই মধ্যে পিতামহ ভীষ্ম সেনাপতির পদে বৃত হলেন। কিন্তু সেনাপতি হলে হবে কী, কুরুপক্ষে ভীষ্ম আর কর্ণের পুরনো ঝগড়াটা মোটেই মেটেনি। ভীষ্ম কিছুতেই কর্ণের সঙ্গে এক রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর স্পষ্ট মত ছিল—হয় কর্ণ আগে যুদ্ধ করুন, নয়তো আমি—কর্ণো বা যুধ্যতাং পূর্বমহং বা পৃথিবীপতে। এরই মধ্যে একদিন কুরুকুলের রাজবাড়িতে বসে সমস্ত যোদ্ধারা কৌরবকুলের প্রধান যোদ্ধাদের বলাবল নির্ধারণ করছিলেন। সেনাপতি হিসেবে এ ক্ষেত্রে ভীষ্মকেই প্রশ্ন করে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল। ভীষ্ম হিসেব-নিকেশ ভালই করেছিলেন। প্রতিপক্ষের সৈন্য কে কত ক্ষয় করতে পারে, এই নিয়মে কৌরবপক্ষের প্রধান পুরুষদের কাউকে ‘রথ’, কাউকে ‘অতিরথ’, কাউকে বা ‘মহারথ’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন ভীষ্ম। ক্ৰম অনুসারে ভীষ্ম দুর্যোধনের দুটি নাম-না-জানা ভাইকেও ‘রথ’ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু কর্ণের কথা উঠতেই ভীষ্ম দুর্যোধনকে বললেন,—বললেন এইজন্যে যে, এখন তাঁর মওকা, তিনি সেনাপতি,—ভীষ্ম বললেন—তবে, তোমার যে পরাণের বন্ধু কর্ণ—সখা তে দয়িতো নিত্যং, সে কিন্তু ‘রথ’ও নয়, ‘অতিরথ’ও নয়। সে তোমাকে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সব সময় উসকে দিচ্ছে বটে, কিন্তু আসলে ও মানুষটা বাক্যি দেয় বেশি এবং তার স্বভাবও অত্যন্ত নীচ। এই বৈকৰ্ত্তন কর্ণ তোমাকে চালনা করে। তোমার বুদ্ধিদাতা মন্ত্রী ও সে বটে। কিন্তু মনে রেখ সে ‘রথ’ও নয়, ‘অতিরথ’ও নয়—এষ নৈব রথঃ কর্ণো ন চাপ্যতিরথো রণে।

    বৈকৰ্ত্তন কর্ণ। কথাটার মধ্যে ইঙ্গিত আছে। সহজাত কবচ আর কুণ্ডল নিজের গা থেকে কেটে দিয়েছিলেন বলেই, কর্তন করে দিয়েছিলেন বলেই তাঁর বিশেষণ বৈকৰ্ত্তন। কিন্তু ভীষ্ম যেটা ইঙ্গিত করালেন, সেটা তাঁর নিজের ভাষায়—কবচ আর কুণ্ডল হারানোর ফলে কর্ণের অর্ধেক শক্তি গেছে কমে। তার ওপরে আছে পরশুরামের অভিশাপ, হোম-ধেনু-হারানো সেই ব্রাহ্মণের অভিশাপ—সময়কালে কোনও দিব্যাস্ত্র তাঁর স্মৃতিতে আসবে না—এ অবস্থায় সেই মূর্খ, পরনিন্দুক কর্ণের কী বাকি থাকল? তবু যদি ‘রথ’, ‘অতিরথ’ বলে মার্কা মারতে চাও তার গায়ে, তবে কর্ণ শুধু ‘অর্ধরথ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। মহামতি দ্রোণ কর্ণের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন পূর্বে। তিনি ভীষ্মের কথা সম্পূর্ণ সমর্থন করে উদাহরণ দিয়ে বললেন—যা বলেছেন ভীষ্ম। প্রত্যেক যুদ্ধেই এর হুঙ্কার শোনা যাবে—ওই নাকি সবাইকে শেষ করে দেবে, কিন্তু প্রত্যেকটা বড় যুদ্ধ থেকে ও সরে পড়েছে—রণে রণে’ভিমানী চ বিমুখশ্চ্যাপি দৃশ্যতে। কাজেই ভীষ্ম যে বলেছেন—‘অধরথ’—ঠিকই বলেছেন তিনি। ভীষ্ম-দ্রোণের কথা থেকে বোঝা যায় যে, যুদ্ধের মুখে সেনাপ্রধানদের অন্তঃকলহ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং এর জন্য দায়ী কর্ণ নিজে। রাগের চোটে চোখদুটি বড় করে কর্ণ ভীষ্মকে বলতে লাগলেন যেন ঘোড়ার ওপর চাবুক কষাচ্ছেন—তুদন্ বাগ্‌ভিঃ প্রতোদবৎ। কর্ণ বললেন—যথেষ্ট হয়েছে পিতামহ, যথেষ্ট। আমি নিজের মনে আছি, আপনি যখন তখন, আমাকে যে এইভাবে পদে পদে অপমান করছেন, এটা সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত এবং আমার ওপর রাগে—সদা দ্বেষাদ্ এবমেব পদে পদে। শুধু দুর্যোধনের মুখ চেয়ে আমি এতকাল সব ক্ষমা করেছি কিন্তু আর নয়। আরে! আপনি আমাকে কাপুরুষ, খারাপ লোক, কত কিছুই না বলছেন, কিন্তু আমি বলছি—আপনি কোন মহারথ? আপনিই ‘অর্ধরথ’—ভবান্ অর্ধরথো মহ্যম্—অন্তত আমার কাছে তাই। সবাই বলে গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম মিথ্যা কথা বলেন না, কিন্তু আমার মতে আপনার প্রতিটি ব্যবহার মিথ্যাচার, কেননা চিরটা কাল আপনি কুরুকুলের বিরোধিতা করে গেলেন, কিন্তু রাজা ধৃতরাষ্ট্র বুঝলেন না। নইলে, এই যুদ্ধের সময় কি কেউ কারও হীনতা প্রমাণ করে, কিংবা কেউ কি এমনভাবে মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে? আরে, বয়েসের ভার আর পাকা চুল দেখে—ন হায়নৈ র্ন পলিতৈঃ—রথ, মহারথ ঠিক হয় না, ওসব ঠিক হয় ক্ষমতায়, আপন ক্ষমতায়। ব্যক্তিগত রাগ আর ব্যক্তিগত মোহে, আপনি আপনার যেমন ইচ্ছে—কাউকে রথ সাজাচ্ছেন, কাউকে মহারথ সাজাচ্ছেন, বকেও যাচ্ছেন তখন থেকে, যা ইচ্ছে বকে যাচ্ছেন।

    ভীষ্মকে অনেকক্ষণ গালমন্দ করার পর কর্ণ দেখলেন, বলাটা বৃথা যাচ্ছে। তিনি তখন দুর্যোধনকে বলতে থাকলেন—দেখ দুর্যোধন সাফ কথা বলে দিচ্ছি—তাড়িয়ে দাও এই বদমাশটাকে—ত্যজ্যতাং দুষ্টভাবো’য়ম্‌—তোমার যত গণ্ডগোলের মূলে হল এইটা, নইলে এ সময়ে কেউ এমনিভাবে সামনাসামনি মনোবল ভেঙে দেয়? কোথায় রথ, অতিরথের বোধ আর কোথায় এই মাথামোটা ভীষ্ম—রথানাং ক্ক চ বিজ্ঞানং ক্ক চ ভীষ্মে’ল্পচেতনঃ। তাড়াও এটাকে, আমি একা তোমার পাণ্ডবসেনা সামাল দেব। এ বেটা বুড়ো ভাম, বয়স চলে গেছে—গতবয়া মাত্মা—অথচ একা একাই লড়বে বলে ফুটুনি কচ্ছে—একাকী স্পর্ধতে নিত্যম্। হ্যাঁ, বুড়ো মানুষের কথা শোনা উচিত, ঠিক আছে। কিন্তু সে বুড়ো, এইরকম বুড়ো নয়। এরকম ধেড়ে বুড়োর কথা শোনা, আর বাচ্চা ছেলের কথা শোনা একই রকম। আমি বলে দিচ্ছি দুর্যোধন আমি কিছুতেই ভীষ্মের সেনাপতিত্বে যুদ্ধ করব না। আমি যুদ্ধ করে মরব, আর সমস্ত ক্রেডিট’টা হজম করবেন সেনাপতি ভীষ্ম—যশো ভীষ্মং গমিষ্যতি,—তা হবে না। এই ভীস্ম বেঁচে থাকতে আমি যুদ্ধ করছি না। ভীষ্ম মরবে, তারপর থেকে আমি যুদ্ধে নামব—হতে ভীষ্মে তু যোদ্ধাস্মি।

    দুর্যোধন কিছুতেই ভীষ্ম আর কর্ণের উতোর চাপান থামাতে পারেন না। কিন্তু ক্ষতিটা তাঁরই হল। বস্তুত ভীষ্ম যদি পাণ্ডবদের গায়ে হাত না দিয়েও শুধুই অসংখ্য সৈন্য মেরে যেতেন, তা হলে সেই অবসরে কর্ণ পঞ্চপাণ্ডবের বিপদ ঘটাতে পারতেন অনেকটাই। কিন্তু তা হল না, দশদিনের সম্পূর্ণ যুদ্ধের পর ভীষ্ম মারা গেলেন এবং মহাভারতের ভীষ্মপর্বের শেষ অধ্যায়ে ‘জন্মশয্যা’র মতো মৃত্যুশয্যায় শয়ান ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হলেন কর্ণ। অত গালাগালি দিয়েছিলেন, তাই কর্ণের মনে আছে সংকোচ, সাশ্রুমুখে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের পায়ে এসে পড়লেন। বললেন—আমি রাধেয় কর্ণ, আপনার চোখের শত্রু। কথাটা শোনামাত্রই পক্ককেশ বৃদ্ধ, কুটিল বলিরেখায় আবৃত, চক্ষুদুটি উঁচু করে একখানা হাতেই কর্ণকে জড়িয়ে ধরলেন—জড়িয়ে ধরলেন আপন পুত্রের মতো—পিতেব পুত্রং গাঙ্গেয়ঃ পরিরভ্যৈকপাণিনা। বললেন—এস বাবা, এস। চিরটা কাল তুমি আমার সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে প্রতিস্পর্ধিতা করে গেলে। এখন যদি এই মরণের সময়েও তুমি না আসতে আমার কাছে, ভাল হত না তোমার। ভীষ্ম এবার স্পষ্ট করে বললেন—আমি জানি, তুমি কুন্তীর ছেলে, সূর্যের তেজে তোমার জন্ম! তুমি রাধা কিংবা অধিরথ কারওই ছেলে নও। আমি এ সব কথা ব্যাসের মুখে শুনেছি। সত্যি কথা বলতে কী আমি কোনওদিন তোমার ওপর বিদ্বেষ পোষণ করিনি—ন চ দ্বেষো’স্তি মে তাত। কিন্তু তবু যে আমি তোমার মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, তার কারণ হল—তুমি যে সব সময় পাণ্ডবদের নিন্দা করতে, এটা আমার সহ্য হত না। ব্যাপারটা কী হয়েছে জান—গুণী মানুষদের ওপর সব সময় যে তোমার একটা বিদ্বেষ আছে, এক ধরনের ঈর্ষা আছে, এর কারণ হল, স্ত্রী-পুরুষের স্বাভাবিক নিয়মে তোমার জন্ম হয়নি—জাতো’সি ধর্মলোপেন। এর ওপরে তুমি যাকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠেছ, সে নীচ লোক। এই সব কারণেই কুরুসভার নানা জায়গায় তোমাকে আমি বিস্তর বাজে কথা বলেছি—রুক্ষং শ্ৰাবিতঃ কুরুসংসদি।

    একমাত্র এই বৃদ্ধ মানুষটি, যিনি চিরকাল কর্ণকে গালমন্দ করে এসেছেন, তিনিই কিন্তু কর্ণচরিত্রের আসল মনস্তত্ত্বটি ধরতে পেরেছেন। সমাজের নিয়মের বাইরে কুমারী গর্ভে যার জন্ম হয়, সেই মানুষ যদি আবার স্বার্থপরায়ণ অহঙ্কারী বন্ধুর সাহচর্যে শিশুকাল থেকে বেড়ে ওঠে, তবে তার মধ্যে নানান জটিলতা আসবে, পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মে জাত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বকে সে সহ্য করতে পারবে না—এটা মেনে নিতেই হবে। এদিক দিয়ে ভীষ্মের বিশ্লেষণ অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। কর্ণের বুদ্ধি-বিপর্যয়ের কারণ বলেই ভীষ্ম কিন্তু স্বীকার করলেন—আমি জানি, আমি জানি তুমি কতটা ক্ষমতা রাখ। তোমার মতো শক্তিমান পুরুষ দেবলোকেই বা কটা আছে? কিন্তু আসলে কী জান, এই বিরাট কুলের পিতামহ হিসেবে এসব কথা আমার বলার উপায় ছিল না, বললে—পাণ্ডবেরা আমাকে ভুল বুঝত, ভুল বুঝত কৌরবেরাও, কুলভেদ গভীরতর হত। বস্তুত অস্ত্রচালনায় তুমি অর্জুন, কি কৃষ্ণের সমকক্ষ। এই স্বল্প-পরিসর জীবনে তুমি কতগুলো বড় যুদ্ধ একা জিতেছ, সেও আমি জানি। আমি বলি কি কর্ণ, তুমি আপন ভাইদের সঙ্গে আর বিবাদ-বিসংবাদের মধ্যে যেয়ো না। আমি মরেছি, আমার সঙ্গে সঙ্গেই এই যুদ্ধ শেষ হোক, তুমি ফিরে যাও ভাইদের কাছে।

    এতদিন যাকে শত্রু বলে জেনে এসেছেন, তাঁর কাছে আপন জীবনের একটা ব্যাখ্যা পেয়ে, মরণোন্মুখ বীরের কাছে আপন অস্ত্র-নৈপুণ্যের জয়ঘোষ শুনে কর্ণ বড় খুশি হলেন বটে, কিন্তু সত্যিই তো, তাঁর কি আর ফিরে যাবার উপায় আছে? খুব অল্প কথায় কর্ণ তাই তাঁর পুরনো যুক্তি প্রকাশ করলেন ভীষ্মের কাছে—সেই জন্মমাত্রেই কুন্তীমাতার পুত্রত্যাগের কথা, সুত পিতা-মাতার স্নেহমমতার কথা এবং সর্বশেষে এতকাল দুর্যোধনের খেয়ে-পরে, ভোগ করে, এই মুহূর্তে তাঁকে ত্যাগ করে কৃতজ্ঞতা ভঙ্গের কথা। কর্ণ তা পারেন না। সত্যপ্রতিজ্ঞ বীরের যুক্তি সত্যপ্রতিজ্ঞ ভীষ্ম বুঝলেন। কর্ণ যেহেতু ভীষ্মকে অকথ্য গালাগাল দিয়েছিলেন, আজ তাই তাঁর কাছেই অনুমতি চাইতে এসেছেন—অনুজানীহি মাং তাত যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ম্। ভীষ্ম অনুমতি দিলেন এবং দুজনেই বুঝলেন যে, সমস্ত পুরুষকার, সমস্ত শৌর্য-বীর্যের ওপরেও আরও এক শক্তি মানুষের অন্তর্গত ললাটের রেখায় চিহ্নিত থাকে—তার নাম দৈব। কর্ণের পুরুষকার কর্ণের স্বায়ত্ত থাকা সত্ত্বেও, এই দৈববলেই তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু! দুইই পরচ্ছায় সম্পন্ন—জন্ম, কুন্তী-সূর্যের আপন সম্ভোগবাসনার চরিতার্থতায়। মৃত্যু, দুর্যোধনের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে, তাঁরই কেটে যাওয়া পথ ধরে। অথচ কর্ণ দৈব মানেন না।

    আমরা যুদ্ধের কথা বেশি বলতে চাই না। তবে এটুকু বলা দরকার যে, দশদিন যুদ্ধ করে ভীষ্ম রণক্ষেত্রে শায়িত হবার পর কর্ণ কিন্তু দারুণ বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। মজা হল, ভীষ্ম শরশয্যার পর কৌরবপক্ষের সমস্ত রাজপুরুষেরা এবং কৌরবেরা সবাই কিন্তু কর্ণকেই একমাত্র ভীষ্মের সমান বলে মনে করেছিলেন। এমনকী সেনাপতি হিসেবে দ্রোণের কথাও কারও মনে আসেনি। উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে প্রত্যেক রাজপুরুষই তখন ‘কর্ণ’ ‘কর্ণ’ বলে ডাকছিলেন কারণ ভীষ্মের নৌকো ডুবে যাবার পর কর্ণই ছিলেন রণ-সাগর পাড়ি দেবার ভেলা। তা ছাড়া অনেকেই এটা ভাবছিলেন যে, দশদিন এই মহাযুদ্ধে কিছুই না করায় কর্ণ শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে অনেক ‘ফিট’ আছেন, অতএব ভীষ্মের পর তিনিই একমাত্র লোক যাঁকে সেনাপতিত্বে বরণ করা যেতে পারে। কৌরবদের সেই বিপন্ন মুহূর্তে শরশয্যায় শায়িত স্বয়ং ভীষ্ম পর্যন্ত কর্ণকে কৌরববন্ধুদের আশ্রয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উপমা দিয়ে বলেছেন, সমস্ত নদীর কাছে কর্ণ যেন সমুদ্রের মতো, সমস্ত আলোর মধ্যে কর্ণ যেন সূর্যের মতো অবলম্বন—জ্যোতিষামিব ভাস্করঃ।

    কিন্তু বললে হবে কী, কর্ণ কিন্তু এতদিনে বাস্তব অবস্থাটা বেশ বুঝতে পারছেন, বিশেষত ভীমের পতনের পর তাঁর এই উপলব্ধি গভীরতর হয়েছে। হ্যাঁ, একদিকে তিনি তাঁর স্বভাবতই বলে যাচ্ছিলেন যে, পাণ্ডবযোদ্ধাদের তিনি রণক্ষেত্রে হত্যা করবেন। কিন্তু অন্যদিকে সম্পূর্ণ বাস্তববোধে কর্ণ স্বীকার করেছিলেন যে, ভীষ্ম ছাড়া কৌরবযোদ্ধাদের মধ্যে আর কেউই তেমন নেই যে রণক্ষেত্রে অর্জুনের বাণ রোধ করতে পারে—কো হ্যর্জুনং যোধয়িতুং ত্বদন্যঃ। কর্ণ বুঝতে পেরেছেন যে, ভীষ্মহীন কৌরবসৈন্যকে এবং স্বয়ং কৌরবদেরও অর্জুন একেবারে ছারখার করে দেবেন—ধাৰ্তরাষ্ট্রান্ প্রধক্ষ্যন্তি তথা বাণাঃ কিরীটিনঃ। তবু কর্ণের মতো ক্ষত্রিয় বীর যে যুদ্ধে পিছুপা হবেন না, এ তো সবাই জানে। তার ওপরে কৌরবশিবিরে সমস্ত যোদ্ধারা যেখানে ‘কর্ণ’ ‘কর্ণ’ বলে তারস্বরে চিৎকার করছেন, সেখানে কর্ণের মতো মহাবীর যে অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সোজাই উপস্থিত হবেন, এতেও আশ্চর্য নেই কিছু। কর্ণের ব্যাপারে অনুগত রাজাদের উচ্চকিত আহ্বান শুনে দুর্যোধনই বা কী করেন। আমাদের ধারণা, দুর্যোধনের মধ্যে এই বোধ সম্পূর্ণ ছিল যে, ভীষ্মের পরে দ্রোণকেই সেনাপতি করা উচিত। কিন্তু সবাই এমন ‘কর্ণ’, ‘কর্ণ’ বলে চেঁচাচ্ছে যে তিনি শেষ পর্যন্ত কর্ণের ওপরেই ছেড়ে দিলেন সেনাপতি চয়নের ভার। কর্ণ বন্ধুর মন বোঝেন, উপযুক্ত বাস্তববোধও তাঁর আছে। তিনি বললেন—দুর্যোধন! তোমার পক্ষে অনেকেই আছেন যাঁরা সেনাপতি হবার উপযুক্ত, কিন্তু যেহেতু তাঁরা সবাই সমান মাপের যোদ্ধা, তাই একজনকে সেনাপতি করলে আরেকজন মনে মনে আহত হবেন এবং মনেপ্রাণে তোমার জন্য যুদ্ধ করবেন না—শেষা বিমনসো ব্যক্তং ন যোৎস্যন্তি হিতাস্তব। কিন্তু দেখ, এঁদের সবার মধ্যে সবচেয়ে গুণী মানুষ এবং গুরুজন হলেন দ্রোণ। অস্ত্রবিদ্যায় তিনি সবারই প্রায় গুরুস্থানীয়, তাঁকে সেনাপতি করলে কারওই কিছু বলার থাকে না। অতএব আচার্য দ্রোণকেই সেনাপতি করা উচিত।

    বাস্তব অবস্থার বিচারে দেখা যেত দ্রোণকে বাদ দিয়ে কর্ণকে সেনাপতি করলে, দ্ৰোণ অবশ্যই আহত হতেন এবং তাঁর অহংবোধেও লাগত। কাজেই এক্ষেত্রে কর্ণের বুদ্ধি-কৌশল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আচার্যের সঙ্গে সঙ্গ দিয়ে কর্ণ বারবার পাণ্ডবদের পর্যদস্ত করেছেন। অবশ্য শুধুই পর্যুদস্ত করেছেন বললে যুদ্ধের মূল কথাটাই নষ্ট হয়ে যায়। কেননা, দ্রোণপর্বের যুদ্ধে কর্ণ তো শুধুই জেতেননি অনেকবার পরাস্তও হয়েছেন, তাও অর্জুনের কাছে নয়, ভীমের কাছেই। জেতার মুহূর্তে ভীম নেচে কুঁদে কর্ণকে অনেক গালাগালি দিয়েছেন, কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হল যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থাতেও অন্যান্য পাণ্ডবদের ব্যাপারে কর্ণের সাধারণ নীতি ছিল ‘ডিফেনসিভ’। ব্যাসের ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে সেটা দাঁড়ায়-মৃদুপুর্বঞ্চ রাধেয়ো দৃঢ়পূর্বঞ্চ পাণ্ডবঃ। বেশি ‘ডিফেনসিভ্’ যুদ্ধ করতে গেলে কখনও বা পরপক্ষের হাতে নাকালও হতে হয়, কর্ণ তা হয়েছেন, এমনকী তাঁকে পালাতেও হয়েছে। আবার কখনও বা একটু শিক্ষা দেওয়ার তাগিদে যখন ভীমের মতো বিরাট যোদ্ধাকে বিরথ এবং নিরস্ত্র করে দেন কর্ণ তখন অন্য এক অনভূতি তৈরি হয়। কর্ণ বলেন—ভীম! তুমি হলে গিয়ে লোভী মানুষ—ঔদরিক। যেখানে ভাল খাবার দাবার আছে, ভাল ভাল পানীয় আছে—যত্র ভোজ্যং বহুবিধং ভক্ষ্যং পেয়ঞ্চ পাণ্ডব—সেইখানেই তুমি আদর্শ লোক, এই যুদ্ধক্ষেত্র তোমার উপযুক্ত নয়। কর্ণ এখানেই শেষ করলেন না, খোঁচা দিয়ে বললেন—তুমি আরেক কাজ করতে পার, ভীম! তুমি বনে চলে যাও। সেখানে যুদ্ধটুদ্ধর ঝামেলা নেই, বেশ ভাল থাকবে মুনিদের মতো, তুমি বনে চলে যাও—বনং গচ্ছ বৃকোদর।

    এসব কটুক্তি, খোঁচা যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় চলে। কিন্তু সুযোগ পেলে এবং না পেলেও ভীম যাঁকে ‘সূতপুত্র’ ছাড়া ডাকতেন না, সেই ভীমের প্রতি এই মুহূর্তে কর্ণের কটুক্তিগুলি কিন্তু প্রচ্ছন্ন মমতাও বহন করে, যদিও এ মমতা সাক্ষী-সাবুদ দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। যাই হোক জয়ে, পরাজয়ে, অন্যায়-আচরণে কর্ণ দ্রোণের সেনাপতিত্বে ভালই যুদ্ধ করলেন। অন্যায়ের কথাটা উল্লেখ করলাম এইজন্যে যে, যিনি কুরুপাণ্ডবের একমাত্র যোগ্য বংশধর হতে পারতেন, সেই অভিমন্যুবধে কর্ণের অবদান ছিল বিরাট। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কর্ণের রথের চাকা যখন আটকে গেছে মাটিতে, সেই সময় কর্ণ ধর্মের কথা তুলেছিলেন—অর্থাৎ সেই অবস্থায় তাঁকে হত্যা করাটা যে অর্জুনের মতো বীরের পক্ষে অধর্ম হবে, সেই কথাটা তুললেন। এর উত্তরে কর্ণের জীবনে হাজারো অন্যায় আচরণের মধ্যে সপ্তরথী মিলে বালক অভিমন্যুকে হত্যা করার কথাটাও বলেছিলেন কৃষ্ণ। বলেছিলেন—সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল— ক্ক তে ধর্মস্তদা গতঃ। দ্রোণপর্বে এই অভিমন্যুবধের পর পরই কৌরবপক্ষের জয়দ্রথ বধের সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা বড় ঘটনা ঘটে, কিন্তু সে ঘটনার একটা পূর্বপট আছে, সেটা আগে বলি।

    সোজা কথা, পঞ্চপাণ্ডব, বিশেষত ভীম এবং অর্জুনকে কিছুতেই আটকানো যাচ্ছিল না। তার মধ্যে কৌরবদের কাছে আরেক নতুন উৎপাত এসে দাঁড়াল। ভীমপুত্ৰ ঘটোৎকচের উদয় হল কোথা থেকে, আর সমস্ত কৌরবসৈন্যের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গেল। এমনকী দ্রোণ, অশ্বত্থামার মতো বড় বড় বীরেরাও তাকে কিছু করতে পারছেন না। কৌরবপক্ষের হাল যখন খুবই খারাপ, এই সময়ে কুরুরাজ দুর্যোধন যেন আর দ্রোণের সেনাপতিত্বে বিশ্বাস রাখতে পারছিলেন না। পাণ্ডবদের যুদ্ধোন্মাদ দুর্যোধনের মনে এমন শঙ্কা জাগিয়েছিল যে, দুর্যোধন শেষ পর্যন্ত দ্রোণের সেনাপতিত্বকালেই কর্ণকে ত্রাণকর্তা হিসেবে ধরে নিলেন। অনেকের সামনেই তিনি কর্ণকে বলে বসলেন—আমাদের বাঁচাও কর্ণ। কৌরব যোদ্ধাদের তুমি বাঁচাও। পাণ্ডবেরা সবাই মিলে আমাদের একেবারে বিষাক্ত সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে, আমাদের তুমি বাঁচাও-ত্রায়স্ব সমরে কর্ণ সর্বান্ যোধান্ মহারথান্।

    শুনেছি, মরণকাল এগিয়ে আসলেও স্বভাব পরিবর্তিত হয় না। কর্ণ তাঁর সেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দুর্যোধনকে হামবড়াই করে বলতে আরম্ভ করলেন। এটা ভাবলেন না যে, দিন প্রতিদিনের যুদ্ধে বৃদ্ধ গুরু দ্রোণাচার্য পর্যন্ত পাণ্ডবদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছেন না। এই অবস্থায় নিজের ক্ষমতা বীরত্ব সম্বন্ধে বেশি বলা মানে সেই পুরনো ঝগড়া চেতিয়ে তোলা। আমরা বেশ বুঝি কর্ণের কবচ-কুণ্ডল খোয়া গেলেও তিনি অতিমাত্রায় নির্ভর করছিলেন ইন্দ্রের দেওয়া সেই একাঘ্নী বাণটির ওপর। কিন্তু তাই বলে—অহম্—আমি একা অর্জুনকে মেরে ফেলব কোনও চিন্তা নেই, অর্জুনের বাবা আসলেও আমাকে রুখতে পারবে না—এই কথাগুলি মাত্রাছাড়া। কর্ণ বললেন—পাণ্ডবদের মেরে, পাঞ্চালদের শেষ করে তোমাকে জয় এনে দেব আমি। জান তো সেই একাঘ্নী বাণটির কথা। সব পাণ্ডব ভাইদের মধ্যে অর্জুনই যা একটু ক্ষমতা রাখে—তার ওপরে সেই একাগ্নী বাণটি ছাড়ব। অর্জুন মরে গেলে অন্য পাণ্ডবেরা হয় বনে চলে যাবে নয়তো তোমার বান্দা হয়ে থাকবে। চিন্তা নেই—সমাশ্বসিহি ভারত—আমি একা সমস্ত পাণ্ডবদের ঠাণ্ডা করে দেব—অহং জেষ্যামি সমরে সহিতান্ সর্বপাণ্ডবান। আমি বেঁচে থাকতে—ময়ি জীবতি কৌরব্য—তোমার দুঃখ কিসের, দুর্যোধন?

    যেখানে বিভিন্ন ব্যুহ-প্রতিব্যুহ সাজিয়ে, নিজে প্রচণ্ড যুদ্ধ করেও দ্রোণাচার্য পাণ্ডবদের কিছু করতে পারছেন না, সেখানে কর্ণের এই দম্ভোক্তি যে দ্রোণাচার্য এবং তাঁর প্রিয়জনদের ক্রুদ্ধ করে তুলবে, এতে আশ্চর্য কী! বিশেষত দ্রোণের শ্যালক বয়োবৃদ্ধ কৃপাচার্য এবং দ্ৰোণপুত্র অশ্বত্থামা, যিনি নিজে কর্ণের থেকে কম বীর নন, তাঁরা কর্ণের এই সাহঙ্কার আত্মম্ভরিতা সহ্য করবেন কেন। কৃপাচার্য তো কর্ণের কথা শুনে প্রায় হাততালি দিয়ে উঠলেন। বললেন—দারুণ বলেছ, কর্ণ, দারুণ, দারুণ—শোভনং শোভনং কর্ণ—বুঝতে পারছি দূর্যোধন আর অনাথ নয়। তবে হ্যাঁ কথা দিয়ে আর বাকি মেরেই যদি পৃথিবী জয় হয়ে যেত, তা হলে তো ভালই হত- বচসা যদি সিধ্যতি। এই দুর্যোধনের সামনে তোমার এমনিধারা বচন-গর্জন অনেক শুনেছি কিন্তু তোমার বিক্রমও কোথাও দেখনি কিংবা এই বচনের ফলও কিছু হয়নি। কৃপাচার্য আবার সেই পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে তুললেন, কারণ রাগটা তাঁর রয়েই গেছে। কৃপ বললেন—এমনতো নয় যে, অর্জুনের সঙ্গে তোমার কোনওদিন সামনাসামনি যুদ্ধ হয়নি। যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে সবগুলোতেই তুমি হেরেছ। তুমি একা অর্জুনকেই সামলাতে পার না, সেখানে ভাবছ কৃষ্ণসহায় সমস্ত পাণ্ডবদের তুমি মারবে।

    কৃপাচার্য এবার একটু রেগেই উঠলেন। বললেন-দেখ কর্ণ! যুদ্ধ করতে হয় কর, তবে মুখে এত বেশি ফটর-ফটর কোর না—অব্রবন্ কর্ণ যুধ্বস্ব কত্থসে বহু সূতজ। তোমার সমস্ত তর্জন-গর্জন শরৎকালের মেঘের মতো আড়ম্বর-সার মৌখিকতা। তা বেশ, অর্জুনকে যতক্ষণ না দেখছ, ততক্ষণ তোমার এই চিল্লানি চালিয়ে যাও—-তাবদ গর্জস্ব রাধেয় যাবৎ পার্থং ন পশ্যসি—অর্জুনকে যখন সামনে দেখবে তখন আর তোমার গলা দিয়ে শব্দ বেরবে না। দেখ কর্ণ-ক্ষত্রিয়রা বাহুবলে নিজের বীরত্ব দেখায়, আর মুখে বীরত্ব দেখায় বামুনেরা—বাগ্‌ভিঃ শূরা দ্বিজাতয়ঃ,—তেমনি অর্জুন তার ক্ষমতা দেখায় ধনুকের মুখে, আর কর্ণ! তোমার মতো স্ব-প্রতিষ্ঠিত বীর মনে মনেই সেই ক্ষমতা দেখায়—কর্ণঃ শূরো মনোরথৈঃ।

    কর্ণ আর থাকতে পারলেন না। বললেন—আমি গর্জাচ্ছি তো তাতে তোর কী হয়েছে রে, বিটলে বামুন—তব কিং তত্র নশ্যতি। যা বলেছি, ঠিক বলেছি, পাণ্ডবদের মেরে এই পৃথিবী আমি অবশ্যই দূর্যোধনকে দেব। কৃপ আবার প্রতিবাদ করলেন। পাণ্ডবদের নানা ক্ষমতা এবং জনবল, অস্ত্রবলের পরিচয় দিলেন। কিন্তু কর্ণ তাতে মোটেই দমবার পাত্র নন। এবার তিনি একাঘ্নী বাণের কথাটা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন এবং আরও জানিয়ে দিলেন যে, ওই অমোঘ বাণই হবে অর্জুনের কাল। বাস! এটুকু বললেই হত, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ে কর্ণ মাথা গরম করে কৃপকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন—আমার এলেম বুঝেই আমি চেঁচিয়েছি, তুই বেটা বামুন, বুড়ো-হাবড়া, যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই—ত্বন্তু বিপ্রশ্চ বৃদ্ধশ্চ অশক্তশ্চাপি সংযুগে—ফের যদি আবার উল্টোপাল্টা কথা শুনি—বক্ষ্যসে ভূয়ো মমাপ্রিয়মিহ—তা হলে তোর জিব কেটে দেব মাথামোটা—জিহ্বাং ছেৎস্যামি দুর্মতে।

    আমরা জানি—যে একবীরঘাতিনী শক্তিটির ওপর এত নির্ভর করছিলেন কর্ণ, সেটি তাঁকে খোয়াতে হয়েছে ভীমপুত্ৰ ঘটোৎকচের সঙ্গে যুদ্ধেই। ঘটোৎকচ এমন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিলেন যে, সমস্ত কৌরবেরা সেদিনকার রাত্রিযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সমস্ত সৈন্যেরা পালিয়ে যাচ্ছিল, পালিয়ে যাচ্ছিলেন বড় বড় যোদ্ধারা। কৌরবেরা সবাই মিলে সমস্বরে সেদিন কর্ণকে ইন্দ্রদত্ত শক্তি প্রয়োগ করতে বলেছিলেন, না হলে সেদিন তাঁরা মারা পড়তেন—শক্ত্যা রক্ষো জহি কর্ণাদ্য তৃর্ণং নশ্যন্ত্যেতে কুরবো ধার্ত্তারাষ্ট্রাঃ। কর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন, ঘটোৎকচও মারা পড়েছিল, কিন্তু কর্ণের কঠিন কথাগুলি কৃপাচার্যকে যেভাবে বিদ্ধ করেছিল, তার মূল্য ছিল আরও বেশি। কর্ণ যেভাবে কুলগুরু কৃপাচার্যের জিব ছিঁড়ে নিতে চেয়েছেন, তাতে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা থেমে থাকেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে খড়গ নিয়ে তেড়ে গিয়েছিলেন কর্ণের দিকে—খড়্গমুদ্যম্য বেগেন দ্রৌণিরভ্যপতদ ভৃশম্। নিজেদের মধ্যে বিশেষ করে কৃপাচার্য-অশ্বত্থামা এবং কর্ণের মধ্যে যে সম্বন্ধটা মোটেই ভাল ছিল না, সেটা তো অশ্বত্থামার ব্যবহার থেকেই বোঝা যায়। তিনি কর্ণের ধড় থেকে মুণ্ডু নামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন—শিরঃ কায়াদ্ উদ্ধরামি সুদর্মতে। নেহাত দুর্যোধন কোনওমতে সব ব্যাপারটা চাপাচুপি দিয়ে দেন। নিজেদের মধ্যে এই যে গণ্ডগোল, তার ফলভোক্তা দুর্যোধন। বস্তুত তিনিই কর্ণকে এত দূর বাড়তে দিয়েছেন। দুর্যোধনের নিজের ভাষার লাগাম ছিল না, কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ যে তবু তাঁকে মেনে চলতেন, সে যুবরাজ বলে, ধৃতরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলে। কিন্তু কর্ণ যদি দুর্যোধনের মতোই দুর্বিষহ কথা বলেন, সেখানে কৃপ, দ্রোণ, অশ্বত্থামার কী দায় আছে তা শোনবার? কুরুগৃহে এঁরা যদি বাইরের লোক হন, তবে কর্ণও তাই। কাজেই দুর্যোধন যা বলতে পারেন, কর্ণ তা বলতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে কর্ণ তাই বলতেন। এর ফল ভাল হয়নি। নিজেদের মধ্যে এই ঝগড়া কতটা বেড়ে গিয়েছিল, তার একটা চিত্র পরবর্তীকালের সংস্কৃত নাট্যকার ভট্টনারায়ণ দিয়েছেন তাঁর বেণীসংহার নাটকে। কর্ণের সঙ্গে অশ্বত্থামার ঝগড়ার সময়টা যদিও নাট্যকার পালটে দিয়েছেন, তবু ঝগড়াটা চলেছে মহাভারতের সুরে এবং এই ঝগড়াটা সচেতন নাট্যকারের চোখ এড়িয়ে যায়নি বলেই বলতে পারি যে, এটা ছিল পরিণামে দুর্যোধনের পক্ষে ক্ষতিকর।

    বেণীসংহার নাটকে অশ্বত্থামার সঙ্গে কর্ণের বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে দ্রোণবধের পরে। নাট্যকার একটা দারুণ যুক্তিসই কথাও এখানে কৃপের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। কৃপের মতে এখানে দ্রোণাচার্যের পর সেনাপতি হওয়া উচিত ছিল অশ্বত্থামার, কর্ণের নয়। পিতার মৃত্যুর পর স্বভাবতই তিনি রাগে টগবগ করে ফুটছিলেন, তা ছাড়া বীরত্বেও তিনি কর্ণের থেকে কম ছিলেন না এবং লোকান্তক ব্রহ্মশিরা অস্ত্রটিও ছিল তাঁর দখলে। কৃপাচার্য এই বীর যুবকটির পিতৃবধজনিত ক্রোধ এবং ক্ষোভ পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেয়ে তাঁকে সেনাপতি করার প্রস্তাব নিয়ে আসছিলেন দুর্যোধনের কাছে। কিন্তু দুর্যোধন এবং কর্ণ সেখানে পূবাহ্নেই ব্যস্ত ছিলেন আচার্য দ্রোণের সমালোচনায়। দ্রোণ কতটা বীর, কতটা স্বার্থপর, পাণ্ডবদের প্রতি তিনি উদাসীন কেন—এইসব কথা দুর্যোধনের মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন কর্ণ। ঠিক এই সময়ে কৃপ এবং অশ্বত্থামার প্রবেশ। কর্ণের মতে, রণক্ষেত্রে যুধিষ্ঠিরের মুখে অশ্বত্থামার বধ সংবাদ শুনেও আচার্য দ্রোণের অস্ত্রত্যাগ করা উচিত হয়নি। কর্ণ বললেন—তিনি নিজেই যেখানে নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন, সেখানে অশ্বত্থামা! আপনি কী। করবেন?

    এ-কথা শুনে অশ্বত্থামা ক্রোধে ফেটে পড়লেন এবং কী কী তিনি করতে পারেন তার একটা কাল্পনিক চিত্র দিলেন। প্রায় এই রকম একটা অবস্থায় কৃপাচার্য প্রস্তাব করলেন অশ্বত্থামাকে সেনাপতিত্বে নিযুক্ত করতে। কিন্তু বেণীসংহারের নাট্যকার জানেন যে, ভীষ্ম-দ্রোণের নিরিখে দুর্যোধন আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কাজেই দুর্যোধন যখন বললেন যে, কর্ণকে তিনিই আগেই সেনাপতিত্বে নিযুক্ত করেছেন তখন কৃপের যুক্তি আমরা বুঝি। কৃপ বলেছিলেন—কর্ণের জন্য, শুধুমাত্র কর্ণকে তোয়াজ করার জন্য অশ্বত্থামাকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না, কারণ শোকসন্তপ্ত অবস্থায় তাঁকে সেনাপতি করলে তাঁর পিতৃশোকের ভারও কিছু লঘু হত, অন্যদিকে তাঁর পিতৃশোকজনিত ক্রোধও ব্যবহার করা যেত পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে।

    মহাভারতে কৃপাচার্যের এসব যুক্তিজাল বর্ণিত হয়নি, কিন্তু মহাকবির অন্তরে হয়তো বা তা কিছু ছিল, নইলে কর্ণকে সেনাপতি করার প্রস্তাব সেখানে অশ্বত্থামার মুখ দিয়েই এসেছে কেন? যাই হোক বেণীসংহার নাটকেও অশ্বত্থামা শেষ পর্যন্ত সেনাপতিত্ব নিয়ে মাথা ঘামাননি। শুধু দুর্যোধনকে তিনি বলেছিলেন—আজ সকালের যুদ্ধে আপনি ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখবেন—পৃথিবী অর্জুনহীন এবং কৃষ্ণহীন হয়ে গেছে—অকেশবম্ অপাণ্ডবং ভুবনম্। আজ থেকে আর যুদ্ধের কথা থাকবে না। বেণীসংহারের কর্ণ এবার ফুট কাটলেন—এসব কথা মুখে বলা সহজ, কাজে করা কঠিন, তা ছাড়া। কৌরবশিবিরে অনেকেই এ কাজ করতে পারে। ‘অনেকেই’ বলতে কর্ণ নিজেকে অবশ্যই মনে করছেন। কারণ যে কথা তিনিই সচরাচর বলে থাকেন, সে-কথা অন্যে বললে তাঁর পরশ্রীকাতরতা আসে। অশ্বত্থামা কর্ণের কথাটা মেনে নিয়ে বললেন, হয়তো শোকাবেগে তিনি এমন গবৌক্তি করে ফেলেছেন, কোনও বীরের নিন্দা করাটা তাঁর অভিপ্রেত ছিল না। কিন্তু এতেও কর্ণ আবার উপদেশ দিয়ে বসলেন। বললেন—শোকার্তের কাজ চোখের জল ফেলা আর বীরের কাজ হল যুদ্ধে যাওয়া। তুমি আর প্রলাপ বোকো না—নৈবংবিধাঃ প্রলাপাঃ।

    একে তো পিতৃশোক, তাতে সেনাপতিত্বও জুটল না, তার ওপরে এখন থেকেই কর্ণের কাছ থেকে সেনাপতির মতো উপদেশ। অশ্বত্থামা আর থাকতে পারলেন না। বললেন—ওরে রাধামায়ের গর্ভের ভার, সারথির বেটা—রাধাগৰ্ভরভূত, সূতাপশদ। আমার নাম অশ্বত্থামা, দুঃখ হলে চোখের জলের উপদেশ দিচ্ছিস আমাকে। কেন, আমার এই অস্ত্রগুলো কি গুরুর অভিশাপে নিবীর্য হয়ে গেছে, যেমনটি তোর হয়েছে। আমি কি তোর মতো এইমাত্র রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসেছি? আমি কি তোর মতো অপরের বংশ-স্তাবক সারথির ঘরে জন্মেছি।

    এসব কথা শুনে কর্ণই বা আর থাকেন কী করে? প্রথমতঃ বংশের কলঙ্কটা এড়াতে চেয়ে তিনি একটি কালজয়ী উক্তি করলেন। বললেন—আমি সূতই হই, আর সূতপুত্রই হই, কিংবা যাই হই না কেন—যো বা কো বা ভবাম্যহম্—মানুষ কোন ঘরে জন্মাবে সেটা একেবারেই দৈবায়ত্ত, কিন্তু পৌরুষ জিনিসটা মানুষ আয়ত্ত করতে পারে, আমি সেটাই করেছি—দৈবায়ত্তং কুলে জন্ম মদায়ত্তং তু পৌরুষম্। কর্ণ যখন দেখলেন, তাঁর জাত তুলে কথা বলেছেন অশ্বত্থামা, তখন তিনিও তাঁর জাত তুলেই কথা আরম্ভ করলেন, কারণ জাতি হিসেবে ব্রাহ্মণেরও তো কিছু দোষ আছে। কর্ণ বললেন—ওরে বেটা বাচাল বামুন, বৃথাই তুই অস্ত্র ধরেছিস। ক্ষমতা থাকুক আর নাই থাকুক, আমি তো অস্ত্রত্যাগ করিনি, কিন্তু ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তোর বাপ পাঞ্চাল ধৃষ্টদ্যুম্নের ভয়ে অস্ত্র ফেলে দিয়েছিল কেন হাত থেকে? কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়, কিন্তু ঝগড়ার সময় অনেক ঘটনাই এমন বিকৃত করে দেখা হয়। কিন্তু তাতে অশ্বত্থামা চুপ থাকবেন কেন? সদ্য পিতৃশোক পাওয়া হৃদয়ে পিতার সম্বন্ধে এই উলটো কথা তাঁর ক্রোধ আরও বাড়িয়ে তুলল। আবার খুব খানিকটা জাত তুলে গালাগালি দিয়ে অশ্বত্থামা বললেন—আমার বাবা ভিতু ছিল, নাকি বীর ছিল, কিংবা এই যুদ্ধে তিনি কী করেছেন না করেছেন তা দুনিয়ার লোক জানে। আর সেই চরম যুদ্ধের সময়ে তিনি অস্ত্রত্যাগ করেছিলেন কেন, তা জানেন সত্যবাদী যুধিষ্ঠির। কিন্তু সে যাই হোক, আমার বাবা যখন অস্ত্রত্যাগ করলেন, তখন তুই ছিলি কোথায়, কাপুরুষ কোথাকার।

    সত্যি কথা বলতে কি, বেণীসংহারের কর্ণ দ্রোণকে বিশ্বাস করেন না। মহাভারতের কর্ণও প্রায় তাই। তবে মহাভারতে যদি বা কোথাও দ্রোণের প্রতি কর্ণের শ্রদ্ধাও আছে, বেণীসংহারের কর্ণের সে শ্রদ্ধা নেই। এই কর্ণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, দ্রোণ ভীষণ স্বার্থপর। তিনি অশ্বত্থামাকে পৃথিবীর রাজা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন এবং সেইজন্যেই আচমকা পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে হতাশ হয়ে অস্ত্রত্যাগ করেছিলেন। কর্ণ দুর্যোধনের মাথাতেও তাঁর এই যুক্তি ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন, কেননা দুর্যোধন দ্রোণের অস্ত্ৰত্যাগের ব্যাপারে ব্রাহ্মণোচিত নরম স্বভাবকেই কারণ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু কর্ণের কথা শুনে দুর্যোধনের ধারণা পালটাল এবং কর্ণ বললেন—পুত্র বিষয়ে দ্রোণাচার্যের এই উচ্চাশার কারণেই পাণ্ডবসৈন্য বধে তাঁর উপেক্ষা ছিল এবং জয়দ্রথ বধেও তিনি ছিলেন উদাসীন। এমনকী বেণীসংহারে কর্ণ দ্রোণের ব্যাপারে এতটাই সন্দেহপ্রবণ যে তিনি দ্রুপদ এবং দ্রোণাচার্যের বাল্যকালের ঝগড়াকেও অন্যভাবে চিন্তা করেছেন। কর্ণ দুর্যোধনকে বুঝিয়েছেন যে, মহারাজ দ্রুপদ যে কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজের রাজ্যে তাঁর বাসস্থান দেননি, তার কারণ হল। দ্রুপদ দ্রোণাচার্যের ওই কু-অভিপ্রায় জানতেন।

    মহাভারত পড়ে অবশ্য কর্ণকে আমরা এইভাবে চিনব না। কিন্তু দ্রোণের সম্বন্ধে কর্ণের যে অনেক বক্তব্য ছিল এবং সে বক্তব্য যে দ্রোণ-চরিত্রের অনুকুল নয়, সেটা আমরা আগেই খানিকটা বুঝেছি। যাই হোক বেণীসংহারে অশ্বত্থামার মুখে কাপুরুষতার অভিযোগ শোনামাত্র কর্ণ একেবারে জ্বলে উঠলেন। বললেন—আমি কাপুরুষ, তাই না? আর তুমি খুব বীর, তোর বাপের কথা মনে হলে তোর বলবিক্রম সম্বন্ধে আমার খুব সন্দেহ হয় রে মূর্খ! নইলে শত্রু এসে তাঁর চুল টেনে ধরল আর তিনি মেয়েছেলের মত সবার সামনে চুপ করে বসে থাকলেন—সুচিরং স্ত্রিয়েব নৃপচক্রসন্নিধৌ। অশ্বত্থামা রাগে কাঁপতে কাঁপতে এবার দুর্যোধনের সামনেই সত্য কথাটা বলে ফেললেন। বললেন—ওরে সারথির বেটা, দুর্যোধনের প্রিয়পাত্র বলে এত বড় কথা। যে কোনও কারণেই হোক আমার বাবা ধৃষ্টদ্যুম্নকে বাধা দেননি। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আমি তোর মাথায় এই আমার বাঁ পা রাখছি, তোর ক্ষমতা থাকে তো সরিয়ে দে—শিরসি চরণ এষ ন্যস্যতে বারয়ৈনম্। অশ্বত্থামা এই কথা বলে মাটিতে বাঁ পাখানি দাপিয়ে বেড়ালেন বারবার অর্থাৎ কর্ণের মাথায় পা রাখার প্রতীকী অভিনয় করলেন। কর্ণ এবার সোজা শাণিত তরবারি বার করে নিলেন কোষ থেকে। তারপর ব্রাহ্মণত্বের মুখে ছাই দিয়ে বললেন—বেটা বাচাল বামুন, যদি তুই ব্রাহ্মণ না হতিস তা হলে আজ এতক্ষণে দেখতিস তোর বাঁ ‘পা’টা কাটা পড়ে রয়েছে মাটিতে। বিবাদের চরম সীমায় অশ্বত্থামাও সব ভুলে বললেন—ও তুই বামুন বলে আমায় মারতে পারছিস না, তো নে এই আমি ব্রাহ্মণত্ব ত্যাগ করলাম। বলেই অশ্বত্থামা নিজের পৈতে-টৈতে ছিঁড়ে ফেললেন—ইতি যজ্ঞোপবীতং ছিনত্তি। দুজনেই খড়্গ হাতে তেড়ে গেলেন দুজনের দিকে।

    মহাভারতে কৰ্ণ কৃপর দিকে ধেয়ে গিয়েছিলেন খড়্গ হাতে, আর অশ্বত্থামা কর্ণের দিকে ধেয়ে গেলেন খড়্গ হাতে। এই অবস্থায় দুর্যোধনের অনুনয়ে বিনয়ে শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষই শান্ত হল। বেণীসংহারেও তাই। কর্ণ সেনাপতি হলেন, অনেক যুদ্ধ করলেন। কিন্তু তিনি এমনই ভাগ্যহত যে, যা তিনি মুখে বলেছেন এতদিন, তা তিনি কিছুই করতে পারেননি। আজকে তাঁর দেবদত্ত কবচ-কুণ্ডল নেই, ইন্দ্রের অমোঘ শক্তি নেই, মাথার ওপরে খাঁড়ার মতো ঝুলছে গুরু পরশুরামের অভিশাপ, হোমধেনু হারানো ব্রাহ্মণের অভিশাপ—এত কিছু বিরুদ্ধতা নিয়েও কর্ণ ভাবলেন—তিনি অর্জুনের বিরুদ্ধে জয়ী হবেন। অভিমানই কর্ণকে চিরকাল স্থান, কাল, পাত্র সব ভুলিয়েছে, এই আত্মম্ভরিতার ওপরে দাঁড়িয়েই মহাবীর কর্ণ আজ কৌরবের সেনাপতি। ধৃতরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের আনুক্রমিক ধারা বিবরণী দিতে দিতে সঞ্জয় পর্যন্ত একটুখানি বক্রোক্তির আভাস দিয়ে বলেছেন—আপনার ছেলে দুর্যোধন মনে মনে এই আশা করে আশ্বস্ত হয়েছেন যে, ভীষ্ম গেছে, দ্রোণ গেছে, তো কী হয়েছে, কর্ণ অবশ্যই পাণ্ডবদের জয় করবে—হতে ভীষ্মে চ দ্রোণে’ চ কণো জেষ্যতি পাণ্ডবান্। কর্ণকে সেনাপতিত্ব দান করার সময় দুর্যোধন পরিষ্কার তাঁকে জানিয়েছেন যে, ভীষ্ম এবং দ্রোণের ওপর তিনি কোনওদিনই আস্থা রাখতে পারেননি। একে তো তাঁরা বৃদ্ধ, তার ওপরে অর্জুনের ওপরে তাঁদের পক্ষপাত ছিল—বৃদ্ধৌ হি তৌ মহেষ্বাসৌ সাপেক্ষৌ চ ধনঞ্জয়ে। এখন তো আর সেসব বালাই নেই, কাজেই দুর্যোধন কর্ণকে অপার প্রশংসা করে সেনাপতিত্বে বরণ করলেন। কর্ণের মধ্যে দুর্যোধন দেবসেনাপতি কার্তিককে দেখতে পেয়েছেন, দেখতে পেয়েছেন অসুর নিহত ইন্দ্রের মাহাত্ম্য, দেখতে পেয়েছেন দেবসহায় বিষ্ণুর পরাক্রম।

    কিন্তু এত বিশ্বাস যেখানে, সেখানে বিশ্বস্ত জনের দায়িত্বও বড় বেশি বেড়ে যায়। অনেক গুণ, অনেক পরাক্রম এবং দুর্যোধনের অনন্ত বিশ্বাস নিয়েও কর্ণ দুর্যোধনের প্রাণপ্রিয় দুঃশাসনকে বাঁচাতে পারলেন না। বাঁচাতে পারলেন না নিজের ছেলেকেও। অনেক যুদ্ধ হল, অনেক লোকক্ষয় হল, কর্ণ অনেক যুদ্ধ করলেন কিন্তু দুর্যোধনের অনেক বিশ্বাসই তিনি পূর্ণ করতে পারলেন না, রাখতে পারলেন না আত্মবিশ্বাসও। অর্জুনের সঙ্গে শেষ এবং চরম যুদ্ধের আগে তিনি আরও একটা ভুল করে ফেললেন মদ্ররাজ শল্যকে নিজের রথের সারথি নির্বাচন করে। শল্য নিঃসন্দেহে খুব ভাল সারথি ছিলেন, কিন্তু দুর্যোধনের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে কৌরবপক্ষে যোগ দেবার পরপরই তিনি কিন্তু যুধিষ্ঠিরের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন যে, কর্ণের সারথ্য করার সময় তিনি কর্ণের মনোবল ভেঙে দেবেন। তাই হল। দুর্যোধনের মাধ্যমে কর্ণ শল্যকে সারথি পেলেন বটে। কিন্তু সারাটা কর্ণপর্ব জুড়ে কর্ণের চরম সমাপতন পর্যন্ত শল্য কেবলই কর্ণের কাছে ভ্যানভ্যান করে অর্জুনের প্রশংসা করে গেছেন, আর ক্রমাগতই কর্ণের মনঃস্থিতি নষ্ট হয়েছে। যুদ্ধকালে অথবা রথস্থ বীরকে যদি ক্রমাগতই ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়, তবে অল্পসত্ত্ব ব্যক্তির পতন ঘটে, আর মহাসত্ত্ব ব্যক্তি, তিনি যতই যুদ্ধক্ষম হোন না কেন, তাঁর মনঃসংযোগ ব্যাহত হয়। প্রথম প্রথম যখন শল্য বলে যেতেন, তখন কর্ণ উদাসীনভাবে খানিকটা ধরে খানিকটা ছেড়ে দিয়ে শল্যকে বলতেন—ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখন চল দেখি—যাহি যাহাতি। কিন্তু শেষে তাঁর ধৈর্য চলে গেল এবং শল্যকে তাঁর দেশ তুলে, ব্যক্তিত্ব তুলে, অশ্লীল কথা বলে মাথা গরম করতে থাকলেন কর্ণ। মনঃসংযোগ ক্রমেই নষ্ট হতে থাকল। তিনি বাইরে যতই ভয়কে অস্বীকার করুন না কেন তাঁর অন্তরে নিশ্চয়ই এক অজানা, অনামা আশঙ্কা ছায়া ফেলতে লাগল।

    একটা কথা মনে রাখতে হবে যে কর্ণের সেনাপতিত্বকালে তাঁর ন্যায়নীতির দিকটা বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। দেখুন, সারা জীবন ধরে যিনি দুর্যোধনের দুঃশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কত শত অন্যায় আচরণ করেছেন, পাণ্ডবদের প্রতি অসহ্য অত্যাচার করেছেন, তাঁদের প্রিয়তমা কুলবধূকে পর্যন্ত আপন বিকার থেকে রেহাই দেননি, সেই কর্ণ কিন্তু নিজের সেনাপতিত্বকালে কোনও অন্যায় করেননি, এমনকী সামান্য নীতিভঙ্গও নয়। অর্জুনের খাণ্ডবদহনের কালে যে সাপটি প্রতিশোধস্পৃহায় এসে কর্ণের তুণে আশ্রয় করেছিল, সেই সর্পমুখ বাণ কর্ণ অর্জুনের বিরুদ্ধে ছুঁড়েছিলেন নিজের অজান্তে—ন চাপি তং বুবুধে সূতপুত্রঃ। সেই সর্পবাণে অর্জুনের রেহাই ছিল না, তিনি বাঁচলেন শুধু কৃষ্ণের সারথ্যকৌশলে। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর সাপ আবার এসে কর্ণের তুণে প্রবেশ করতে চাইল এবং কর্ণকে সে অনুরোধ করল দেখেশুনে যাতে তাকে ঠিকমত অর্জুনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়, কারণ ঠিকমত প্রয়োগ করতে পারলে এই সর্পমুখ বাণ থেকে অর্জুনের রেহাই নেই। কিন্তু কর্ণ রাজি হননি, তার সেই চিরাচরিত বলদর্পিতাই কিন্তু এখানে তাঁর গুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্ণ বললেন—অন্যের শক্তি আশ্রয় করে কর্ণ কোনওদিন কারও ওপরে জয়ী হতে চায় না—ন নাম কর্ণো’দ্য রণে পরস্য বলং সমাস্থায় জয়ং বুভুষেৎ। একশোটা অর্জুনকে মেরে ফেলতে পারলেও কর্ণ কোনওদিন এক শর দুবার ধনুকে যোজনা করে না। কথাটা আরও একটু ঘটা করে একেবারে গুরু পরশুরামের নাম জড়িয়ে কর্ণ বলেছেন পরবর্তীকালের এক কবির লেখনীতে। কর্ণ বলেছেন—সারা গায়ে যেন জল পিছলে পড়ছে এমনিতর কর্ণ-বধির সাপ তুমি কর্ণকে চেননা—ন বেৎস্যপকর্ণ কর্ণম্—তুমি জান না যে পরশুরামের শিষ্য কর্ণ কখনও দু’বার একই শর সন্ধান করে না—দ্বিঃ সন্দধাতি ন শরং হরশিষ্য-শিষ্যঃ। সমস্ত দুনিয়ার সঙ্গে তুমিও বরং তাকিয়ে দেখ কী করে এই মানুষের উপযুক্ত শরপ্রহারেই কিরীটী অর্জুনের কিরীট-পরা মাথাটা আমি ধড় থেকে নামিয়ে দিই—মৰ্ত্তৈঃ শরৈরপি কিরীটি-কিরীটমাথম্।

    পরবর্তী কবির লেখনীতে কর্ণের এই দম্ভোক্তির মধ্যেই কর্ণের চরিত্রটি মহাভারতের মতো করে পাব। এই যে কর্ণ বললেন—‘মানুষের উপযুক্ত শর’—এই কথাটাই প্রণিধানযোগ্য। সমস্ত কর্ণপর্বে কর্ণ একজন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছেন, যা তিনি হতে চেয়েছেন। যে মুহূর্তে কর্ণ কুন্তীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে হীনকুলে লালিত হতে লাগলেন, সেই মুহূর্তেই দৈবায়ত্ত জন্মের ওপরে কর্ণের ঘৃণা ধরে গেছে। দৈববশে নিজের জন্মের জন্যই যে মানুষ কলঙ্কিত, মহামতি ব্যাস একটু একটু করে সেই মানুষের সমস্ত দৈবাধীনতা হরণ করেছেন। সূর্যের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও সেই পরিচয় থেকে তাঁকে বঞ্চিত করেছেন, তাঁর সহজাত দৈব কবচ-কুণ্ডল কেটে দিয়েছেন ইন্দ্রের হাতে, অমোঘ দৈব-শক্তি প্রয়োগ করিয়েছেন রাক্ষসের ওপর। এখন একমাত্র দৈবসম্পদ যে সর্পমুখ বাণ, সেটিকেও তিনি দ্বিতীয়বার কর্ণের তূণে ঢুকতে দিলেন না। মহাকবি যেন একে একে কর্ণের সমস্ত দৈবসজ্জা মুক্ত করে, তাঁকে রণদর্পে, আত্মশ্লাঘায় নিতান্ত মাটির মানুষটি করে তুলেছেন। ঠিক এমন একটা মানুষের রথের চাকা মাটিতেই দেবে যায়, অন্তকালে সে চাকা আর মাটি থেকে তোলা যায় না। ভাগ্যহত পুরুষের ভাগ্যচক্র বার বার মাটিতেই প্রোথিত হয় আর ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে ঝলসে ওঠে অগ্নিবাণ, বায়ুবাণ, ব্রহ্মাস্ত্র—মানুষ কর্ণের ছিন্ন মুণ্ড তখন মাটিতে গড়াগড়ি যায়।

    আমরা আগেই বলেছি কর্ণের উচ্চাভিলাষ ছিল অসম্ভব রকমের এবং সেই উচ্চাভিলাষ তিনি পূর্ণ করতে চেয়েছেন দুর্যোধনের কাঁধে ভর রেখে। বাস্তবে পাণ্ডবদের প্রতি অতি কঠিন দুর্যোধন কর্ণের এতটাই বন্ধু যে সময়ে অসময়ে কর্ণের আজ্ঞাবাহী হতেও দুর্যোধনের বাধে না। এই বন্ধুত্বের সুবাদে কর্ণ দুর্যোধনের বকলমে পুরো হস্তিনাপুরের রাজনীতি চালনা করেছিলেন—এতটাই বলা যায়। ঠিক এই কারণেই কুরুসভার যত অন্যায়, তার সমস্ত দায় এসে পড়েছে কর্ণের ঘাড়েই। অন্তিমলগ্নে যখন কর্ণের রথচক্র গ্রাস করেছে পৃথিবী, তখন কর্ণ অর্জুনকে ধর্মের কথা তুলে থামতে বলেছিলেন, নিরস্ত্রের ওপর শর যোজনা করতে বারণ করেছিলেন। উত্তরটা দিয়েছিলেন স্বয়ং বাসুদেব কৃষ্ণ। কর্ণ মুখ ফসকে বলেছিলেন—দৈববশে এই মুহূর্তে আমার রথের চাকা আটকে গেছে মাটিতে। অন্তত এই সময়টাতে তুমি বাণের অভিসন্ধি ত্যাগ কর অর্জুন। ‘দৈব’, কর্ণের মুখে ‘দৈব’—কথাটা মহাভারতের কবির কানে লেগেছে তৎক্ষণাৎ স্বয়ং পুরুষোত্তম কৃষ্ণের মুখ দিয়ে মহাকবি বলিয়েছেন—বদমাশ লোকেরা যখন বিপদে পড়ে, তখনই দৈবের দোষ দেয়, নিজের বদমায়েশির কথা মনে করে না—প্রায়েন নীচা ব্যসনে নিমগ্না নিন্দন্তি দৈবং কুকৃতং ন তু স্বম্।

    অর্থাৎ কবি বলছেন—না দৈব নয়, যিনি দৈবকে এতকাল ঘৃণা করে এসেছেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য দৈব দায়ী হবে কেন, তার মৃত্যুর জন্য তিনি নিজেই দায়ী। তিনি কর্ণের অসহায় মৃত্যুর সমস্ত মানুষোচিত কারণগুলি একে একে কৃষ্ণের মুখে আবার স্মরণ করেছেন। কৃষ্ণ বলেছেন—যেদিন একটি মাত্র কাপড় পরা দ্রৌপদীকে তুমি আর দুর্যোধনের দল সবাই মিলে কুরুসভায় নিয়ে এসেছিলে সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? যেদিন পাশাখেলায় অজ্ঞ যুধিষ্ঠিরকে অক্ষশৌণ্ড শকুনি জিতে নিল, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল- ক্ক তে ধর্মস্তদা গতঃ? যেদিন তোমার মত অনুসারে দুর্যোধন ভীমকে বিষ খাইয়েছিল—আচরত্তন্মতে রাজা ক্ক তে ধর্মস্তদা গতঃ—সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? তেরো বচ্ছর বনবাসে কাটিয়ে যেদিন পাণ্ডবেরা এসে তাঁদের রাজ্য-ভাগ চেয়েছিলেন এবং তোমরা এক টুকরো জমি দাওনি সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? যেদিন বারণাবতের জতুগৃহে সমস্ত পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার মতলব করেছিলে, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? যেদিন রজস্বলা পাণ্ডববধূকে দুঃশাসনের হাতে ছেড়ে দিয়ে তুমি হাঃ হাঃ করে হেসেছিলে, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল কর্ণ—সভায়াং প্ৰাহসঃ কর্ণ ক্ক তে ধর্ম স্তদা গতঃ? যেদিন সমস্ত নারীসমাজের মধ্যে থেকে টেনে এনে গজগামিনী কৃষ্ণাকে তুমি বলেছিলে—পাণ্ডবদের হয়ে গেছে দ্রৌপদী, তুমি অন্য কোনও স্বামী খুঁজে নাও, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল, কর্ণ? রাজ্যের লোভে যেদিন শকুনি পাশাখেলায় পাণ্ডবদের হারিয়েছিল, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল? যেদিন সমস্ত মহারথীরা একসঙ্গে মিলে একটি বাচ্চা ছেলে অভিমন্যুকে বধ করেছিলে, সেদিন তোমার ধর্ম কোথায় ছিল, কর্ণ? এত শত সব ঘটনার মধ্যে যদি তুমি এতকাল ধর্মানুষ্ঠান না করে থাক, তা হলে এখন আর ‘ধর্ম’ ‘ধর্ম’ করে গলার তালু শুকিয়ে কী হবে—কিং সর্বথা তালুবিশোষণেন? আর এখন এই মুহূর্তে যদি তুমি খুব ধর্মপরায়ণও হয়ে ওঠ, তবু এখন আর তোমার রক্ষা নেই।

    দেখা যাচ্ছে, সারা জীবন ধরে দুর্যোধন যত অপকর্ম করেছেন, তার সবকিছুরই দায় এসেছে কর্ণের ওপর। কৃষ্ণের আক্ষেপোক্তি শুনে এই প্রথম এবং এই শেষবারের মতো কর্ণের মাথাটা লজ্জায় নত হয়ে গেল, এক পংক্তি উত্তর পর্যন্ত তাঁর মুখে জোগাল না—লজ্জয়াবনতো ভূত্বা নোত্তরং কিঞ্চিদূক্তবান্। মহাভারতের কবি বলতে চাইলেন—দৈব নয়, এতগুলি স্বকৃত, অন্যায়ের জন্যই কর্ণ আজ এত অসহায়। তিনি যা করেছেন এবং করেননি, তা সবই তিনি চুকিয়ে দিয়েছেন নিজের অসহায় মৃত্যু দিয়ে। কর্ণ মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে কৌরবদের যশ, দর্প এবং জয়াশা একসঙ্গে উবে গেল। যুদ্ধশেষের অপরাহ্নে কর্ণের ছিন্ন মুণ্ডটি পড়ে রইল মাটিতে, তার ওপরে সন্ধ্যাসুর্যের শেষ অস্তরাগের ছোঁয়া এসে লাগল, ছিন্ন মুণ্ডটি মনে হল যেন অস্তসুর্যের সম্পূর্ণ বিম্ব বুঝি—অস্তঙ্গতং ভাস্করস্যেব বিম্বম্। কর্ণ মারা যাবার পর কর্ণকে নিয়ে যত উপমা দিয়েছেন ব্যাস, তা সবই প্রায় সূর্যকে নিয়ে। ভাবে বুঝি সূর্য যে অন্যায় করেছিলেন কর্ণের জন্ম দিয়ে, তাঁর মৃত্যুর পর মহাকবি যেন সূর্যের উপমায় তাঁর পুত্রতৰ্পণ সমাপ্ত করছেন এখন। ব্যাস লিখলেন—অস্ত যাবার সময় সূর্য যেমন তাঁর সমস্ত প্রভা প্রত্যাহার করে নিয়ে যান, তেমনি কর্ণের জীবন-জ্যোতিও তিনি প্রত্যাহার করে নিলেন পৃথিবী থেকে। এতদিন যাঁর শর-কিরণজালে শত্রুসেনা তপ্ত হয়ে উঠেছিল, সেই কর্ণসূর্য গ্রস্ত হল অর্জুনের রাহুগ্রাসে। দিনের শেষে যখন অপরাহ্ন ঘনিয়ে আসছিল যুদ্ধভূমিতে, ঠিক সেই সময় কর্ণেরও জীবন-অপরাহ্ন ঘনিয়ে এল। সহস্রনেত্র ইন্দ্রের মতো যাঁর ক্রিয়াকলাপ, সহস্রদল পদ্মের মতো যাঁর মুখ, সেই কর্ণের ছিন্ন মুগু মাটিতে পড়ে থাকল যেন দিনশেষের অস্তরাগে রাঙানো সহস্ররশ্মি সুর্যটি।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবাল্মীকির রাম ও রামায়ণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    Next Article মহাভারতের প্রতিনায়ক – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    Related Articles

    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    কথা অমৃতসমান – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    কলিযুগ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    মহাভারতের অষ্টাদশী – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    চৈতন্যদেব – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    দেবতার মানবায়ন : শাস্ত্রে সাহিত্যে ও কৌতুকে – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

    September 9, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }