সর্বমঙ্গলা
সর্বমঙ্গলা ঠাকরুনের দেহটি আশি বছর পরে সজ্জিত হয়ে উঠছিল। সাদা গরদের কাপড়ে সরু একটু মেরুন পাড়। সারদা-মার যেমন থাকত। ফুলের মালা গলায়। বস্তুত সারা শরীরই ফুলে ঢাকা। কপালে চন্দনের রসকলি। মাথার শনের নুড়ি চুলগুলি গুছিয়ে চারদিকে ছড়ানো, তার ওপর রঞ্জার মামিমারা ছোট ছোট সাদা ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছেন। মামিরা বলতে সাতজনের মধ্যে অবশিষ্ট তিনজন। চারজন এক-এক করে মারা গেছেন। মামারাও বেশির ভাগই গত। দুজন কোনওক্রমে বেঁচেবর্তে আছেন। যে মহিলা দুটি সর্বমঙ্গলার দিন ও রাতের সেবা করত তারাই খালি সা নয়নে বসে আছে। তাদের খুব সম্ভব চেষ্টা করলেই চোখে জল আসে এবং কোনও মৃত্যুর ক্ষণ কান্না ছাড়া অশুভ এমন একটা ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা সেই প্রফেশন্যাল মোর্নার বা রুদালিদের মতো কান্না সাপ্লাই করছিল। রঞ্জার মা বেদবতী চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন—সেজবউদি বললেন, বস বেদো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি কিছু করতে পারবি?
বেদবতী বসলেন। বেদবতীর আনা কাপড়ই মাকে পরানো হয়েছে। একমাত্র মেয়ে। জীবিত ছেলেমেয়েদের মধ্যে তিনিই এখন সবচেয়ে বড়। না, তিনি কিছু করতে চাননি। এর আগে যখন মা আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন, তখন কিছু করার ছিল কিনা ভাবছিলেন। কোথাও কোনও ত্রুটি হয়ে গেছে কি না। যে কোনও মানুষের মৃত্যুর সময়ে আপনজনদের মনে এই প্রশ্নটা জাগে। ‘একটু চিকিৎসার সময় পাওয়া গেল না’ কি ‘একটু সেবা নিলে না মা’—এই ধরনের কথাবার্তা মৃত্যুর পর শোনা যায় খুব। সবাই জানে চিকিৎসার সময় পাওয়া গেলে যে পরিমাণ অর্থব্যয় হত সেটা ভাবনার কারণ, কঠিন অসুখ এক চিকিৎসায় সারেও না। এক পৌনঃপুনিক কষ্ট ও দুশ্চিন্তা ও অর্থব্যয়ের উৎসও হয়ে থাকে। আর সেবা নেওয়া? সেবা যাকে নিতে হয়, আর যাকে দিতে হয়, দিনের পর দিন উভয়েই মনে মনে কী প্রার্থনা করে? সে কি উচ্চারণ করা যায়?
নাঃ, সর্বমঙ্গলার জন্য বেদবতীর কেন, কারওই কিছু করার ছিল না। তাঁর রোগ বার্ধক্য। বয়সের ভারে একটি একটি করে দেহযন্ত্র বিকল হয়েছে। সর্বমঙ্গলার মনের, মগজের মৃত্যু ঘটে গেছে অনেক দিন, বেদবতীর এখন যা বয়স তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। তিনি মনে করতে পারেন মা সামান্য কটা গোলমেলে কথা বলেছিলেন একদিন।
—নাতজামাই পরশু দিন এসেছিল, বড় ভাল লাগল রে।
—কে নাতজামাই?
—ওই যে রে তোর রঞ্জুর বর?
—সুবীর? এসেছিল?
—হ্যাঁ, বউমারা নুচি মাংস খাওয়ালে। আমায় পেন্নাম করলে। বেশ ভাল আঁব এনেছিল।
তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সুবীর কাউকে পেন্নাম করবার পাত্র নয়, মামা-শ্বশুরবাড়িতে কবে নাকি সে অপমানিত হয়েছিল, জীবনে কখনও পা দেয়নি। আজও আসেনি। তিনি জনান্তিকে বউদিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁরা অবাক! —সুবীর? নুচি…? আঁব… তুমিও যেমন বেদো, মায়ের আজকাল ভীমরতি হয়েছে। মনে মনে ভাবেন, কল্পনার জগতে বাস করেন।
তাঁর দাদাদের নাতি-নাতনিরা কেউ-কেউ হাসাহাসি করে বলেছিল কর্তা মা এবার গপ্পো লেখো। ভালই তো বানাতে পারো দেখছি।
ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিলেন মা। —সুবীর আসেনি? তবে কে এল খুকি? কে আঁব দিল? ছাড়িয়ে দিল আমাকে সেজবউমা, এখনও যে জিবে সোয়াদ লেগে রয়েছে রে!
তখন আরও বুঝেছিলেন বেদবতী— এ স্বপ্ন কল্পনা। সেজবউমা অর্থাৎ তাঁর সেজবউদি প্রমীলা মাকে আদর করে আঁব ছাড়িয়ে দেবার পাত্রীই নয়। সাত বউয়ের মধ্যে সবচেয়ে মুখরা, কুচুটে, মায়ের মুখের ওপর কড়া কথা বিশ্রীভাবে বলতে প্রমীলা বউদির কখনওই বাধত না।
—নুচি-ক্ষীর খেতে সাদ হয়েচে? আর কত খাবে মা? নিজের তিন তিনটে ছেলেকে, দুটো বউকে তো গপাগপ খেলে! এর ওপর আবার নুচি-ক্ষীর? হেগে ছত্রাকার করলে কে পোস্কার করবে? কোন বউ, ডিউটি ভাগ করে দাও দিকিনি!
এসব বেদবতীর উপস্থিতিতেই। ধমধম করে চলত সেজবউদি, সেজদা মারা যাবার পর খেপে গিয়েছিল একেবারে। সন্ন্যাস রোগে মারা গেলেন সেজদা, মা কী করবেন? দিবারাত্র ছেলের মাথার ওপর আইসব্যাগ ধরে বসে থাকতেন। সে-ও শেষ হয়ে গেল। অপয়া বুড়ি। ছেলের পরমাই নিজে কেড়ে থুয়েছে।
সর্বমঙ্গলা তখনও একেবারে অ-ব্যক্তি হয়ে যাননি, ছেলের মৃত্যুর খোঁটা শুনে তিনি জ্বলে গিয়েছিলেন, বলেন—বউমা এখন আমি যদি তোমাকে অপয়া বলি, তো কী হয়? গ্রামদেশ থেকে বউ এনে কী ভুলই করেছি। কথাবার্তা একেবারে যাচ্ছে-তাই। শোনো মা, কোথায় লাগছে তোমার আমি বুঝতে পারছি। তুমি পেড়ে শাড়ি পরবে, গয়না গা থেকে নামাবে না, এই আমি তোমার শাউড়ি আজ হুকুম দিয়ে দিচ্ছি। তোমার মাছ-ভাত যেন কেউ বন্ধ না করে। করলে আমার এই মেয়ের মাথার দিব্যি!
সর্বনাশ! ছেলে খেয়েছে আবার মেয়েও খেতে চায়! সবাইকার মনোভাব তখন এইরকম। কিন্তু সত্যিই আজও সেজবউদির মাছ-ভাত অটুট আছে। অন্যরা বৈধব্য পালন করে। সেজবউদির বেলা ঠাকরুনের অমোঘ নির্দেশ। সেজবউদি দেখতে সুন্দর ছিল। মানে ফরসা, বড় বড় চোখ নাক এই। বেদবতীর ভাল লাগত না। সুন্দর হলেই কি আর সুন্দর হয়? যেন বিষধর সর্প। কথার বিষে সংসার জ্বালিয়ে দিত। সব তার চাই। কাপড় গয়না না পেলে সেজদার ধুধ্ধুড়ি নাড়িয়ে দিত। খাবার সময়ে বলত—আমার বাপ-কাকা সব জমিদার। পাত-কুড়োনো খেয়ে ভাই আমার অভ্যেস নেই। আগে আমার ভাত-তরকারি আলাদা করে রাখবে। বড় গাদার মাছ ছাড়া আমি খেতে পারি না। শেষ পাতে একটু দুধ চাই। খেতেও পারত খুব। বলত—বাপ মা চিরকাল খাইয়েছে মাখিয়েছে। সাত ছেলের পর এক মেয়ে, আদরে মানুষ হয়েছি—আমি সেইরকমই চালিয়ে যাব, না দিতে পারো তো বাপের বাড়ি চললুম।
মেয়েরা সব শেষে হাঁড়ি-কড়া-পোঁছা খাবে। মাছ জুটবে না, ছাল কাঁটা দিয়ে সধবা-ধর্ম রক্ষা করতে হবে, দুধ বাচ্চারা বুড়োরা আর ব্যাটাছেলেরা খাবে—এইরকমই তো নিয়ম তখন সব বাড়িতে। ভাল জিনিসটি আগে ব্যাটাছেলেদের পাতে পড়বে—এই। সেজবউদি তুমুল করত। কুটুম বাড়ি থেকে তত্ত্ব এল—আগে একটা বড় রেকাবির মতো ক্ষীরমোহন তুলে নিল। শাশুড়ি বললেন—ও কী করছ, তত্ত্বের জিনিস যে ভাগ হবে গো, ওই ক্ষীরমোহন যে তিন ভাগ হবে, বাড়ির সবাই, এপাশ ওপাশ দু বাড়ি, আত্মীয়স্বজন… সেজবউদি বলল—আমার মা-বাবা সবচেয়ে আগে আমার পছন্দের জিনিসটি তুলে নিতে দিত, সে শাড়িই হোক খাবারই হোক। এখন তো আপনাকে মা মেনেছি, আপনি না দিলে অগত্যা আমাকেই নিতে হয়। আমার বাপের বাড়ি থেকে ঠিলে ঠিলে পাটালি, কলসি কলসি নলেন গুড়, মুক্তকেশী বেগুন, কাঁড়ি কাঁড়ি সজনে ফুল খাচ্ছেন না? —খাউন্তি-বউ, জাঁহা বেজে, অলক্ষ্মী, কিছু বলেই সেজবউদিকে কায়দা করতে পারা যায়নি।
সেই সেজবউদি আজ বেদবতীর জন্যে এক গেলাস মিছরির পানা এনে দাঁড়িয়েছে—খাও দিকি! তোমার আমার বয়সটাও কিছু কম হল না। শোকবাড়িতে কারও সেসব মনে থাকবে না, আরেকটা মিত্যু ঘটে যাবে।
দাঁত বাঁধানো হলেও সেজবউদি র-ফলা ঋ-ফলা উচ্চারণ করতে পারছে না আজকাল।
—চলো, ভেতরে চলো বউদি।
—কেন বেদো? সবার সামনে খেতে লজ্জা করছে? আশি বছরে ঘা দিলুম, কেউ আর আমাদের দিকে দেখবে না। কী রে, দেখবি তোরা? মাঝখান থেকে পিত্তি পড়ে আমরাই ভুগব। নাও দিকি খেয়ে নাও। মায়ের পরানটা ঠান্ডা হবে। ‘আমার খুকি খাচ্ছে।’ খুকি বলবার আর কেউ রইল না তোমার।
গড় হয়ে সর্বমঙ্গলার পায়ে প্রণাম করলেন সেজমামিমা—কত অকথা কু-কথা বলেছি মা। মাফ করে দিয়ে। দু ফোঁটা চোখের জল পড়ল সেজমামিমার চোখ থেকে।
এখনও এক পিঠ কাঁচা-পাকা চুল মামির। মায়ের চেয়ে ক’ মাসের ছোট। মানে ওই আশিই। সোজা দাঁড়ায়, পেন্নাম করে হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মুখটি যেন ঘষামাজা, সবুজ নকশাপাড় টাঙাইল শাড়িটি পাটভাঙা। মৃতদেহ নামানোর পর মামিমা ভাল শাড়ি পরে চুলটুল গুছিয়ে পাবলিক-এ নেমেছেন।
হাসিও পেল। কিন্তু সূক্ষ্ম একটা শংসা এঁর জন্য তার বরাবরই ছিল। মা জীবনে কখনও কারও নিন্দে করেননি। সেজমামিরও না। কিন্তু অপছন্দটা তো বোঝা যেত! রঞ্জা কিছু বললে অবশ্য খুব মন দিয়ে শুনতেন, মাঝে মাঝে মাথা নাড়তেন।
—আচ্ছা মা, গ্রামের ধনী ঘরের আদরের দুলালি। নির্ভীক স্পষ্টবাদী তৈরি হয়েছেন। একটু স্পয়েল্ট মানছি। শ্বশুরবাড়িতে এসে একজন মেয়ে অর্থাৎ শাশুড়ির অন্য মেয়েদের জন্য বরাদ্দটা যদি পছন্দ না হয়, বঞ্চনা আর অপমানটা যদি ভাল না লাগে? অন্যরা মেনে নিয়েছে মুখ বুজে। আড়ালে গজগজ করেছে। সেজমামি সোজাসুজি প্রোটেস্ট করেছেন। নিজের অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছেন। না দিলে তো কেড়ে নিতে হবে। হবে না? কেড়ে নেওয়ার ভাষাটা কড়াই হয়।
মা মৃদু হেসে চিন্তিত মুখে মাথা নাড়তেন—কী জানিস রঞ্জা, মেয়েদের এই যে সব ব্রতপার্বণ জয় মঙ্গলবার, ইতু, শীতলষষ্ঠী, চাপড়াষষ্ঠী… এসব আমার মনে হয় মেয়েদের খাওয়ানোর জন্যেই সৃষ্টি হয়েছিল। জয় মঙ্গলবারে আম। ইতুতে নতুন শীতের তরিতরকারি ঘি দিয়ে, শীতল বা চাপড়া ষষ্ঠীর তরিবতও কিছু কম নয়। আমাদের গোটাসেদ্ধর সঙ্গে, ঝুরো পোস্ত, সজনে ফুল চচ্চড়ি, দই— এসব পাঁচরকম ব্যঞ্জন থাকতই, একেবারে মাস্ট।
তাই নাকি? তা দুর্গাষষ্ঠীর উপোসটা? জামাই-ষষ্ঠীতে ষোড়শ ব্যঞ্জন রান্না করে নিজের উপোস, না ফলার? তা-ও আবার কোন ভাগ্যবানের জন্য? কে না কে জামাই, যে নাকি কক্ষনো আপন হয় না তার জন্য। হাসালে মা।
—ফলার তো ভাল রে! ফলে শরীর সুস্থ হয়। ফল দুধ তো সব রকমের ভিটামিন তোকে দিচ্ছে। তাই তো মেয়েরা বেশি বাঁচে।
—যদিও সে বাঁচার তেমন কোনও…
‘মানে নেই’ বলতে গিয়েছিল রঞ্জা। সামলে নিয়েছিল। মায়ের জীবনের কোনও মানেও তো তা হলে অস্বীকার করা হবে। নিজেকে নিজে চড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল রঞ্জার।
মা মৃদু চোখে চেয়ে ছিলেন। রঞ্জার বরাবর ধারণা মাকে যতটা মনে হয় মা তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি ধরেন। অসাধারণ ডিপ্লোম্যাট। কোনও মেয়ের যদি মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস খুব বেশি থাকে তা হলে সে তার যুক্তি বুদ্ধি এসব স্বচ্ছন্দে প্রকাশ করতে পারে। কিছু কিছু লোকে তাকে বাড়ির বড়সাহেব কি ডেপুটি কিংবা জাঁহাবেজে ইত্যাদি বললেও সে তার অস্তিত্ব চমৎকার টিকিয়ে রেখে নিজের সংসারের মঙ্গল করতে পারে, যেমন দিদিমা সর্বমঙ্গলা। কিন্তু যে বুদ্ধিমতী অথচ মৃদু স্বভাবের, চাপা, তাকে অবলম্বন করতে হয় ডিপ্লোম্যাসি, যার ঠিকঠাক বাংলা ‘কূটনীতি’ নয়। কিছুই বুঝি না, আমি ভালমানুষ লোক বাপু এই ভাবে এরা বুদ্ধি খাটিয়ে যায় অন্তরাল থেকে। বেদবতী সেই জাতীয় মেয়ে। রঞ্জার হঠাৎ মনে পড়ল তার দিদি মঞ্জুলিকার যৌবনের একটা ঘটনার কথা। দিদি খুব ফরসা ছিল, খুব কেশবতী, বয়সের মায়ায় তার দেহে তখন রূপের জোয়ার, মনে আবেগের। পাড়ার একটি দাদা-গোছের ছেলের প্রেমে পড়ল দিদি। পুজোর সময়ে যেসব অস্থায়ী প্রেম গজায় তেমনই সবাই মনে করেছিল। কিন্তু দাদা অর্থাৎ সঞ্জয় একদিন এসে মুখ গম্ভীর করে ঘোষণা করল রমেনের সঙ্গে মঞ্জুকে এখানে সেখানে দেখা যাচ্ছে। মা বললেন—তোরা ওকে কেউ বকাঝকা করতে যাসনি!
—মানে? তোমার প্রশ্রয়েই…
—হ্যাঁ বাবা, প্রশ্রয়ও আমার, আশ্রয়ও আমার। আর দেখো, বাবার কানে তুলো না, আমি দেখি কী করতে পারি।
রঞ্জা পুরো ঘটনাটা জানত। সে উৎকর্ণ হয়ে আছে মা কী করেন, কী বলেন দেখতে। মঞ্জু তার প্রথম প্রেমের ঘোরে রাতে তখনও জেগে আছে, মা ভেবেছেন রঞ্জা বুঝি ঘুমিয়ে গেছে। আস্তে ডাকলেন—মঞ্জু-উ।
—উঁ!
—তোকে একটা কথা বলব?
—কী বলবে জানি মা। আমায় তোমরা ক্ষমা কোরো। আমি রমেন ছাড়া আর কাউকে…
—না না, আমি সে কথা বলছি না রে। ভালবাসার ওপর কারও হাত নেই। তুই যদি ওকে সত্যিই ভালবাসিস, নিশ্চয় দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেব। আমি নিজে। তা তুই সতিন নিয়ে ঘর করলেও।
—মানে?
—না, দ্বিতীয় বিয়ে এখন আইনে অসিদ্ধ হলেও অনেকেই করছে। লুকিয়ে রাখছে।
—তো?
—শুনেছি রমেনের কলাবাগান বস্তির যমুনার সঙ্গে গত বছর থেকে জানা-শুনো। যমুনার মা বলছিল। কে জানে কালীঘাটে সিঁদুর দিয়েছে কি না। ও বিয়ে অবশ্য সিদ্ধ নয়। যমুনা যমুনার মা কিচ্ছু করতে পারবে না… আমি ভাবছিলুম… মা কথা শেষ করলেন না।
কিছু দিন পর রমেন ও তার দলবলের হাতে মঞ্জুর ছোটভাই রঞ্জন যারপরনাই লাঞ্ছিত হল।
রাস্তার ঠিক মোড়ে, রঞ্জন বাড়ি ফিরছে। রমেন বলল—কী হে ছোট সম্বন্ধী, আমার নামে নাকি যা নয় তাই বলে বেড়াচ্ছ। খচড়ামো বার করে দেব মেরে, ঠ্যাং নিয়ে আর জীবনে হাঁটতে হবে না। আরও বহু গালাগাল। রঞ্জন কাঁদো-কাঁদো উত্তেজিত মুখে বাড়ি ফিরে মঞ্জুলিকা অর্থাৎ তার অতি প্রিয় দিদিকেই সব বলল—শালা, খচড়ামো, ঠ্যাং ভেঙে দেব…সব। রঞ্জন কিছুই জানত না। মঞ্জুলিকা শুনে চুপ। সাত দিন বাড়ি থেকে বেরোল না। তারপর তিন দিন ঠিক ইউনিভার্সিটি গেল। চতুর্থ দিন বাড়ি এসে বলল—মা, আমি রাস্তায় বেরোতে ভয় পাচ্ছি, যদি অ্যাসিড বাল্ব মারে! ভয় দেখিয়েছে।
বাগবাজারে এই মামার বাড়ি থেকে মঞ্জুলিকার বিয়ে হয়ে গেল। প্রথম বারো বছর সে আমেরিকায় ছিল, এখন দিল্লিতে দেবেশদা পোস্টেড। সেখানেই আছে। বাড়ি করেছে ময়ূর বিহারের দিকে। শিগগিরই দেবেশদার রিটায়ারমেন্ট।
সর্বমঙ্গলার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রঞ্জার মনে হল—এই মাতামহী ঈশার প্রমাতামহী, পুতির বিয়ে দেখে গেছেন। কী অসীম উৎসাহ ও দাপট। উনি যখন স্ববশে ছিলেন বাগবাজারের বাড়িতে, সর্বমঙ্গলার কথাই ছিল শেষ কথা। কত গ্রীষ্মের ছুটিতে বাগবাজারের বাড়িতে কাটিয়ে গেছে। মামাতো ভাইবোনেদের সঙ্গে হুল্লোড়। দিদিমার টঙের ঘর থেকে আচার চুরি করে খাওয়া। দিদিমা বুকে একটা কোমরে একটা গামছা পরে মাংস রাঁধছেন, সেই অপরূপ দৃশ্য দেখে ভাইবোনেদের হাসি, ছোটমামার ঘোষণা গামছা পরে রাঁধা পাঁঠা সে খাবে না, দিদিমার মুচকি হাসি—কী করব বল, তোদের বাবা বেঁচে থাকলে লাল পাড় শাড়ি পরে রেঁধে দিতুম এখন। কাপড়টা অবশ্য তারপর কেচে দিতে হত। কিন্তু এখন আর… গামছাই তো ভাল। কী ভীষণ শুচিবাই ছিল দিদিমার। দিনে কতবার যে স্নান করতেন! রাস্তার কাপড়ে ট্রেনের কাপড়ে কেউ ছুঁলে স্নান। সকালবেলা পুজোর আগে স্নান, দুপুরবেলা ভাত খেয়ে স্নান। বিকেলের নিয়মমাফিক গা ধোয়া, তাদের কারও দিদিমাকে প্রণাম করার হুকুম ছিল না।
রঞ্জু, মঞ্জু শুনে যা… ভাইবোনেরা ছুটল, সবার হাতে একটা করে আপেল দিলেন। দিদিমার রাত্রে ফলাহার বলে ফল থাকত বাড়িতে, আত্মীয়স্বজনও ফল হাতে করে আসতেন। ডাক্তারের হুকুম ছিল রোজ একটা করে আপেল তাঁকে খেতেই হবে। দরকার হলে সেদ্ধ করে। কিন্তু আপেল নাকি বিলিতি ফল, তাই নাতি-নাতনিদের একটা করে দিয়ে দায়মুক্ত হয়ে কাপড় কেচে ফেলতেন দিদিমা। তখন মাথায় জল দিয়ে স্নানকে ‘কাপড় কাচা’ বলত, বৈঠকখানাকে ‘বাইরের ঘর’ বলত, শৌখিন স্ন্যাক্স জাতীয় খাবারদাবারকে ‘খাবার’ বলা হত। ন’মামিমা খুব ভাল ‘খাবার’ করতে পারতেন। তখন লোকে বাড়ি এসে কড়া নাড়ত। ‘দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া/বন্ধ হল রাতের কড়া নাড়া’… সেই কড়া-নাড়ার রূপকল্পতে বছরকয় পরেই ফুটনোট দিতে হবে। এই অতীত এখন ওই খাটে শুয়ে। শ্মশানে চলে যাচ্ছেন সেজেগুজে। কিছু দিন স্মৃতি-ছবি হয়ে থাকবেন, তারপর সমাজে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবেন। ‘সেকালের নারী’ বলে কেউ ইতিকথা লিখবেন। ‘শেষ প্রমাতামহী’ বলে উপভোগ্য রম্যরচনা। কোথাও মধুর, কোথাও বিধুর কোথাও আবার হাস্যরসে টইটম্বুর।
হে সর্বমঙ্গলা, তুমি সমাজের হাতে গড়া রক্তমাংসের এক প্রতিনিধি পুতুল। আমি জানি না তুমি বিশেষ কি না। তুমি সেই সময়ের সব বধূর মতো শাশুড়ি-নিপীড়িতা, সব শাশুড়ির মতো বউ-কাঁটকি। সব মায়ের মতো ছেলেদের ব্যাপারে স্নেহান্ধ, মেয়েদের ব্যাপারে ভীত, তুমি সে সময়ের কলকাতা চব্বিশ-পরগনার ভাষায় আঁব, নুচি, নংকা বলতে, নেপ রোদে দিতে, নেবুর আচার করতে, কোনও অজ্ঞাত বিচারে বিলিতি আমড়ার ভক্ত থাকলেও বিলিতি বেগুন নৈব নৈব চ। টকের কাজ সারতে তেঁতুল দিয়ে, মিষ্টির কাজ সারতে গুড় দিয়ে, তোমার শিলে প্রতিদিন তিন চারটি গোলা পিষে ঘষে তৈরি হত হলুদ, জিরে, ধনে ও লংকা। এই এবং গুড়-তেঁতুল সম্বল করে তুমি অমৃত রাঁধতে তোমার কালিঝুলিমাখা রান্নাঘরে। তুমি কোনও পদ ‘বানাতে’ না, রান্না করতে কিংবা তোয়ের করতে। তোমার হেঁশেলে তরিতরকারি কোটা হত, আনাজ কাটা হত না। তুমি দইয়ে দম্বল দিতে, সাজা না, তুমি ঝোল সাঁতলাতে, ‘সম্বরা’ দিতে না। ব্রাহ্মণ-বালককে গুরুপুত্র বলে প্রণাম করতে। পইতের ওপর তোমার গভীর ভক্তি ছিল। ভক্তি করে তাকে মাছের ‘মুড়ো’ দিয়ে মুগের ডাল নামক এক নম্বর অমৃতটি খাওয়াতে। মাছের ‘মাথা’ কী জিনিস তোমার কাছে অজ্ঞাত বা অবজ্ঞাত ছিল; তুমি মাছের বিশেষত ইলিশ মাছের টক রাঁধতে ওস্তাদ ছিলে। তোমার গুরু ও গুরুপুত্র দুটি পাত চেটে চেটে পিঁপড়ের জন্য আর কিছু বাকি রাখত না। মৌরলা মাছ কুমড়ো বেগুন কখনও বা মুলো দিয়েও তুমি অম্বল রাঁধতে। মাছের টক, কিন্তু আঁবের অম্বল।
হে সর্বমঙ্গলামঙ্গল্যে শিবে সবার্থসাধিকে, তুমি দু বছর অন্তর একটি করে শাবকের জন্ম দিতে। স্তন্য দিতে দিতে সংসারের কাজ সারতে। তোমার ঘুঁটে ও গুল দেওয়া আমি স্বচক্ষে দেখেছি, এরা সংসারের প্রভূত সাশ্রয় করত। কাপড় ছিঁড়লেই তা দিয়ে ছোট ও বড় কাঁথা সেলাই করা ছিল তোমার দুপুরের অবসরযাপন। বুড়ো আঙুলে পাড় বেঁধে তা থেকে সুতোর গুছি বার করার দৃশ্যটি ভাবলে এখনও আমরা রোমাঞ্চিত হই, বড়ি আচারের একটি সাংবৎসরিক ভাঁড়ার ছিল তোমার, যা প্রায় মধুসূদনদাদার ভাঁড়ের মতো অনিঃশেষ, তোমার ছোট ছাতের কিচেন গার্ডেনের দৌলতে দু’চার দিন ভারী বৃষ্টিপাত হলে বাড়ি থেকে কারও বাজার যাবার দরকার হত না। অর্থাৎ তুমি জন্মদাত্রী, তুমি মহাপালিকা। তুমি সেবিকা হিসেবেও অনন্যা। দাদামশাই, মামারা ও মামিরা যাঁরা দুরারোগ্য রোগে মারা গেলেন তাঁদের প্রত্যেককে তুমি অনন্য মনে সেবা করেছিলে, সেই সেবার মিষ্টতা আমার যখন চিকেনপক্স হয় আমিও পেয়েছিলাম। তুমি আমাদের টালিগঞ্জের পুরনো বাড়িতে এসেছিলে যত দিন না আমার নিম হলুদ হয়। সংসারের কত টাকা তুমি তোমার পরিশ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে বাঁচিয়ে দিতে ঈশ্বর জানেন। ঈশ্বরই একমাত্র। কেননা রোজগেরে পুরুষমানুষের অন্নপানের রাজকীয় ব্যবস্থা নিজেকে এবং বউমাদের বঞ্চিত করে তুমিই করতে। টাকার অঙ্কে সবটা অনেক। মামিরা কিছু হাত-খরচ হয়তো পেতেন তাঁদের স্বামীদের কাছ থেকে, কিন্তু ভাত-কাপড় ছাড়া আর কিছু তোমাকে দেওয়ার কথা কারও মনে হয়নি। নাপিত-বউকে পুজোয় একটা শাড়ি, ছোটনাতির একটা খেলনা, প্রতিবেশী গিন্নিকে অর্থাৎ সখীকে একখানা ছাঁটা ফুলের আসন বুনে দিতে ইচ্ছে করলে টাকাটুকুর জন্য শরণার্থী হতে হত। অসীম কর্ত্রীত্বময়ী তোমার নিজের বলতে কিছু ছিল না। গহনাগুলি বউমারা মেয়েরা নাতনিরা দফায় দফায় পেয়েছে। সাচ্চা জরির বেনারসি দিয়ে বাসন কিনেছ। আর কী থাকতে পারে এক গৃহকর্ত্রীর। যোগ বিয়োগ করে হাতে সে-ই একটা ক্ষয়া পেনসিল।
হে প্রপিতামহী, সুফলা তুমি এত দিন এত দীর্ঘ সময় নিষ্ফল বেঁচেছ যে আজ তোমার জন্য সামান্য দু ফোঁটা চোখের জলও ফেলতে পারছি না। ক্ষমা কোরো।
ইশ্শ্শ্শ্
সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়েছে ঈশা। মেয়েকে পড়তে বসিয়ে এসেছে। পড়া মানে আঁকাই একরকম। কী সোশ্যাল সায়েন্সের প্রজেক্ট ওয়র্ক আছে, তার প্রচুর আঁকা, সেইগুলোই করছে। শুধু পড়া হলে সে এতক্ষণে সারা বাড়ি বলে শুট মেরে বেড়াত আর টেবিলে এসে ডিঙি মেরে একটা করে পাতা উলটে যেত। সামনে না থাকলে পড়বে না। কবে যে মানুষের মতো হবে মেয়েটা? এদের পড়াশোনাটা মায়েদের জীবনে একটা বিরাট ইস্যু। সে তো নিজে মেয়ের জন্য প্রাণপণে খাটে। এখানে অন্য যেসব প্রদেশের মায়েরা আছেন, গুজরাতি, মাড়োয়ারি ইত্যাদি, তাঁরা টু-থ্রি থেকেই ছেলেমেয়েকে কোচিং-এ দিয়ে দেন। কেউ-কেউ হয়তো একটু খেয়াল রাখে। ফোন করে রায়ানের মা একদিন চলে এলেন। ছেলে হিন্দি হোম-ওয়র্ক লেখেনি, কোনও সময়ে বাচ্চারা নিজেরাই ব্যাগ ঘাড়ে করে চলে আসে, মিস ক্লাসে কী লিখিয়েছেন, সে লিখতে পারেনি বা চায়নি, সুতরাং সন্ধেবেলা টনক নড়েছে। আর এই শায়রীকে কারও বাড়ি পাঠাও তো! কিছুতেই যাবে না। শেষ পর্যন্ত যেতে বাধ্য করলে গোমড়া মুখে যাবে এবং বেশির ভাগ সময়েই গোমড়া মুখেই ফেরত আসবে। মেয়েটা কি তার মতো অমিশুক তৈরি হচ্ছে? তার পছন্দ অপছন্দ খুব দৃঢ়। অভদ্রতা সে করে না কারও সঙ্গে, কিন্তু কেউ তার সঙ্গে অভদ্রতা করলে বা মনে আঘাত দিয়ে কথা বললে সে তাকে পরিহার করে চলে। ক্ষমা করতে তার খুব অসুবিধে হয়। এই নিয়ম শিথিল হয় একমাত্র বাবা, মা ও নিশীথ অর্থাৎ তার স্বামীর বেলায়। বাবার ধরনটা উদাসীন গোছের, কোনও সমস্যাকেই গুরুত্ব দেয় না। নিজের নিয়ে থাকে, মা যেমন অনন্ত ভালবাসে তেমন অনন্ত উপদেশ দেয়। এত উপদেশ ঈশা পছন্দ করে না। সে-ও তো প্রাপ্তবয়স্ক, তারও তো কিছু ভাবার, চাওয়ার, করার বা না ভাবার, না চাওয়ার, না করার অধিকার আছে, না কি? সাধারণত সে মাকে এ সব বলে না। যদি কখনও বলে ফেলে মা চুপ করে যায়, কিন্তু হাল ছাড়ে না। হয়তো ধরনটা একটু বদলে গেল, হয়তো কিছু দিন চুপচাপ রইল। এই পর্যন্ত। তবে নিশীথের কাছে ঈশা জব্দ। নিশীথের জীবনে তার স্ত্রী, কন্যা ইত্যাদি সব যাকে বলে অ্যাকসেসরি। সে তাদের যেমন ভাবে ব্যবহার করবে ঠিক তেমন ভাবেই ব্যবহৃত হতে হবে। তার ইচ্ছে করলে বেড়াতে যাবে, ইচ্ছে না করলে যাবে না। ইচ্ছে হলে হেসে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলবে, ইচ্ছে না হলে ভুরু কুঁচকে মুখটা বিকৃত করে থাকবে এবং ঈশার কাছে তার প্রতিদানহীন দাবি-দাওয়ার অন্ত নেই। স্বাস্থ্য-হণ্টন হাঁটতে হাঁটতেও ঈশার মুখের বিস্বাদ যায় না। পুরো হাউজিংটা দু ফের হেঁটে ঈশা বাড়ি ফিরবে ঠিক করল। এই বাড়ি বা ফ্ল্যাটের চার দেওয়াল তার কাছে অসহ্য মনে হয়। যখন বাইরে থাকে বেশ থাকে। ঢুকলেই হুড়মুড় করে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিরক্তি ও কষ্ট ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাড়ে। এখন যেমন বেল দিল। দুবার দিতে হল, উদ্বেগ এসে দরজা খুলে দিল। উদ্বেগ মানে— শায়রী।
—তুই দরজা খুললি কেন? সানিয়াদিদি কী করছে? বলতে না বলতেই বিরক্তি সামনে এসে দাঁড়াল। বিরক্তি অর্থাৎ সানিয়া।
—ভাবিজি, মেরা কোই কসুর নহি, বেবি তো পয়লেই দওড় লাগায়া না?
ভাল, তো তুমি এতক্ষণ কী করছিলে মা! তোমার সেই পিণ্ডিটা রান্না করা কি হয়ে গেছে? রান্নাঘরে ঢোকে ঈশা— রাগ ছুটে এসে তার ঘাড়ে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ে, আভনের পেছনে তেল ছিটকে পড়ে গড়াচ্ছে। রান্নার বেদিটায় সবরকমের মশলার গুঁড়ো জলে মাখামাখি, তরকারি কাটার ছুরি ও বোর্ডটা উপচে পড়ছে। পাশেই ডাল নামানো। তার পাশে গোটা তিনেক বাসন। গ্যাস জ্বলে যাচ্ছে … ওহ্ ওহ্ ওহ!
—এ ক্যা হ্যায় সানিয়া? ইতনা গন্ধা! ইতনা গন্ধা। ক্যা বোলি ম্যয় তুমে? বলতে বলতে তো মেরি জান নিকল যাতি হ্যায় বাবা। উঠাও সব, উঠাও জলদি, ট্র্যাশ ক্যানমে ফেকো উও সব ছিলকা-উলকা, পোঁছ নিকালো, নিকালো! আচ্ছা ছাককে পোঁছে লাগাও। গ্যাস বন্ধ করো। আভভি।
সে নিজেই হাত লাগাল। অমনি সানিয়া একপাশে খাড়া দাঁড়িয়ে গেল। এই এর রীতি। যতটা পারে কম কাজ করবে, যতটা পারে বেশি পয়সা আদায় করে নেবে, মাইনেতে, ছুটিতে, ধার-ধোরে …। সব শিখিয়ে দিলে তুমি, কী ভাবে পরিষ্কার করে কাজ করতে হবে, দুটো তিনটে ঝাড়ন সাপ্লাই দিলে, লাল ডোরাটা বাসন পোঁছার, সবুজ ডোরাটা বেদি পরিষ্কার করার, নীল ডোরাটা হাত মোছার, তলায় একটা আস্ত কালো টার্কিশ তোয়ালে আছে—বালিশ সাইজের। পা দিয়ে টেনে টেনে সব সময়ে পড়ে থাকা জল মোছে। জলে একবার পা পড়লে আর দেখতে হচ্ছে না। সব বুঝিয়ে তুমি চলে গেলে, একদিন করল, দু দিন কোনওমতে। তৃতীয় দিন নোংরা ও জল থই-থই রান্নাশাল। ডালটা এরা ভাল রাঁধে, সেটা একপাশে ঢাকা রয়েছে। মাছগুলো কাঁচা তেলে ছেড়েছে নির্ঘাত, সব ভেঙেচুরে একেক্কার। তরকারির রং বলে দিচ্ছে, মুখে দিলেই টাকরা অবধি জ্বলে যাবে। যেই তুমি হাত লাগাতে গেলে অমনি ধারে গিয়ে হাত গুটিয়ে ভিজে বেড়ালের মতো দাঁড়িয়ে রইল। চারশো টাকা কেজির পমফ্রেট। রাগে ব্ৰহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলছে।
—মালুম হ্যায় তুমে? এ চার শও রুপেয়া কা মছলি! কামাল কিয়া। বাহ্।
কলকাতার কাজের লোকগুলো, কত বেশি খাটে, এদের তুলনায় কত কম মাইনে পায়! ভাবলে এত কষ্ট লাগে। তা ছাড়া খোপড়িতে কিছু থাকা দরকার। এদের খোপড়ি শূন্য, কিংবা ভরা থাকলেও শয়তানি বুদ্ধিতে ভরা।
এবার ইনি বিদায় নেবেন। নিলেন। হাত থেকে একগোছা চিঠিপত্র সেন্টার টেবিলে রেখেছিল ঈশা। এখন সেগুলো তুলে নিল। রিলায়েন্স, আরও লোভজনক সব স্কিম দিচ্ছে। একটা লাইফ-স্টাইল ম্যাগের নাকাড়া— সস্তায় এক্সক্লুসিভ ফার্নিচার, পর্দা, কুশন ও কভার, টেবল ল্যাম্প, দাঁড়বাতি, ঝাড়বাতি, ল্যাম্প-শেড, ওয়াল হ্যাঙ্গিং রাখছি সব ফেং শুই-ফ্রেন্ডলি। বাস্তু-ফ্রেন্ডলি। আমাদের এক্সপার্ট বিনা পয়সায় আপনাকে পরামর্শ দেবার জন্য হুজুরে হাজির থাকবেন। জাঙ্ক মেল সব। এক্ষুনি কুচো কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া যায়। এটা কী? মায়ের হাতের লেখা না? মা যে চিঠি লেখে না তা নয়। মা চিঠি লিখতেই পছন্দ করে। কিন্তু ঈশা একটারও উত্তর দেয় না। ভীষণ কুঁড়েমি লাগে তার। লিখব, লিখব করে আর হয়ে ওঠে না।
মেয়েকে খেতে দিল ঈশা। ওদিকে ‘পোগো’ না কী একটা কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর প্রোগ্রাম হচ্ছে। সেইটি দেখতে দেখতে ইনি খাবেন। মাঝে মাঝে হাত আর মুখের গ্যাপটা এত বড় হয়ে যায় যে মনে হয় খাওয়া শেষ, পাতের দিকে নজর দিলেই মালুম হয় খাওয়াটা শুরুই হয়নি। শায়রী-ই-ই.., তাড়াতাড়ি একটা গরস মুখের দিকে ওঠে। মায়ের চিঠিটা খোলে ঈশা।
ঈশ্,
কেমন আছিস? অনেক দিন ফোন করিস না। আমার এবারে টেলিফোনের বিল চার হাজার উঠেছে। নিশীথ দেড় লাখ (?) টাকার চাকরি করে যদি এরকম বিল অ্যাফোর্ড করতে না পারে, তা হলে আমি বাইশ হাজার টাকার বোকা পণ্ডিত আর তোর অবসৃত বাবা সামান্য পেনশন আর একমুঠো টাকা হাতে দিয়ে বিদায় হওয়া বাবা কী করে এত অ্যাফোর্ড করব? অথচ একমাত্র সন্তান, একমাত্র নাতনির খবর সপ্তাহান্তেও একবার না পেলে মন আঁকুপাঁকু করে।
মা সবই জানে, তবু যে কেন রাগ করে। রাগটা জামাইকে দেখালেই তো পারে। কিপটের জাসু একটা! তার বেলায় তো বাড়িতে ডেকে খুব চপ-কাটলেট খাওয়ানো হয়, ঈশাকে যে উপদেশধারা বিতরণ করে জামাইকে তার কিছুটা অন্তত করলে পারে। কী, না, ভদ্রতায় বাধে। ভদ্রতা না আরও কিছু, আসলে ওই বাঘের মতো মুখ, রাগিমতো চোখ, কোঁচকানো ভুরু দেখে মা-ও ঘাবড়ে যায়। অবশ্য বাড়ির বাইরে নিশীথদার খুবই উদার মিশুক ভাবমূর্তি। কথা বলতে পারে ভাল। মেলামেশায় দড় এ কথা বলা যাবে না। যারা মিশুক এবং সত্যিকারের সপ্রতিভ হয়, তারা যে কোনও সমাবেশে সবরকম ধরনের অতিথির সঙ্গে মোটামুটি সব বিষয়েই কথা বলতে পারে। নিশীথ নিজের কাজের বিষয় ছাড়া আর কিছুটা ফিলমে ইন্টারেস্টেড। এ ছাড়া সে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারে না। অথচ এইটুকু ক্ষমতার পুঁজি নিয়েই সে বিশাল একটা সামাজিকতা গুণের দাবি করে থাকে।
মার চিঠিটা পড়া যাক— তোর বুড়োমা চলে গেলেন। গত ২৩শে মার্চ। মার্চ মাস আমাদের অনেককে কেড়ে নিয়েছে। বুড়ো মানুষরা সাধারণত শীতে শুকনো পাতার মতো ঝরে যান, বসন্তের মাঝমধ্যিখানে যখন দোলখেলার রেশ মেলায়নি, তখন যাওয়াটা খুব অদ্ভুত। মামিমা আর দাদা-বউদিরা এত দিনে মুক্তি পেল। সর্বমঙ্গলা দেবী তো আসলে অনেক দিনই গত হয়েছেন। জীর্ণ দেহের খাঁচায় প্রাণপাখিটুকু ঝিমিয়ে ছিল— দানাপানিটা খেত, কখনও খেত না, অর্থহীন কলকলানিও ইদানীং থেমে এসেছিল। কাজেই মুক্তিটা প্রধানত ও বাড়ির আর পাঁচজনের। মায়ের প্রজন্মের সেজমামিই এখন জ্যেষ্ঠ, তিনি তো দিবারাত্র বলছেন— ঠাকুর আমায় হাত পা মন মগজ থাকতে থাকতে তুলে নাও। কী অদ্ভুত জানিস, সেজমামির কীরকম একটা অদ্ভুত পাপবোধ হয়েছে। বলছেন আমি শাশুড়িকে যা জ্বালিয়েছি তার কর্মফলে আমিও বোধহয় ওইরকমই জ্বলব।
ঈশা, আমার মনে হয় প্রত্যেক পরিবারেই একজন মাদার ফিগার থাকে। যৌথ পরিবারে তো বটেই। এঁর ওপর সবাই নির্ভর করে, মানে এঁকে। এক ধরনের মাতৃতন্ত্র আমাদের পরিবারে পরিবারে এখনও বেঁচে আছে। অনেক ফ্যামিলি হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে, যে যার মতো চলছে। কিন্তু কোনও গুরুতর কিছু বৃহত্তর পরিবারে ঘটলে সবাই এঁকে জানায়, এঁর পরামর্শ নেয়। ছেলেরা বাইরের দিক থেকে অনেক কিছু ঠিক করে হয়তো, হয়তো কেন, করে তো বটেই। কিন্তু অন্দরের ব্যাপারে, নিয়মনীতির ব্যাপারে মাদার ফিগারের কর্তৃত্ব। আমার মামার বাড়িতে দিদিমার পরে সেই জায়গাটা সেজমামি নিয়েছিলেন, এখন এক ধাক্কায় তাঁর বুদ্ধি-বিবেচনা-সাহস কেমন গুলিয়ে গেছে। এখন ওখানে কর্ত্রীর স্থান নিচ্ছেন ছোটমামি। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা সেজমামির ছোট পুত্রবধূ পূর্ণা, সম্পর্কে আমার মামাতো বউদি হল, যদিও ছোট, দুজনের মধ্যে খুব গোপন একটা রেষারেষির খেলা চলছে। একদিন গিয়ে দেখলুম ছোটমামি চোখে চশমা এঁটে হিসেব কষছেন। পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণা। সেগুলো বলতে বলতে ছোটমামি কয়েকবার গুলিয়ে ফেলল। পূর্ণা বেশ ব্যক্তিত্বভরা গলায় বলল— আপনাদের দ্বারা হবে না ছোটমা, আমাকে দিন, অডিট মিলিয়ে দিচ্ছি। আমায় দেখে ছোটমামির হাতবাক্স থেকে টাকা নিয়ে খাবার-দাবার আনাতে চলে গেল। ছোটমামি আমায় বললেন— তুই-ই বল রঞ্জা, উনিশের নামতা শক্ত নয়? তোরা অবশ্য পড়ালেখা নিয়েই থাকিস। পূর্ণা আজকাল এমন করে যেন আমি, সেজদি, কনেদি কিচ্ছু জানি না।
বহুকাল আগে মাতৃতন্ত্রে এই কর্ত্রী হবার লড়াইটা মেয়েতে মায়েতেও হত। রাহুল সাংকৃত্যায়নের “ভোলগা থেকে গঙ্গা”য় এরকম একটা চিত্র আছে। আমার চোখে সিনেমার দৃশ্যর মতো সেটা ফুটে উঠল। মা মেয়ে দুজনে নদীর জলের মধ্যে সাঁতরে সাঁতরে যুদ্ধ করছে। কে শেষ পর্যন্ত হারল আমার মনে নেই। খুব সম্ভব মেয়েই। পূর্ণাবউদি কিন্তু জিতে যাবে। হারের কালি ইতিমধ্যেই ছোটমামির মুখে ভেসে উঠেছে। যাক গে, তোর খবর বল। আমার ইদানীং বড্ড মা-মা করে মন। মনে হয়, হয় মাকে আমার গর্ভে ঢুকিয়ে নিই নয় নিজেই মায়ের গর্ভে ঢুকে যাই। সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে নিকট স্থান।
এই পর্যন্ত পড়ে ঈশা কেমন শিউরে উঠল। কেন সে জানে না। সে, তার মা রঞ্জাবতী, তাঁর মা বেদবতী, তাঁর মা সর্বমঙ্গলা। মানুষ আলাদা, কিন্তু গর্ভ যেন এক। একই গর্ভ।
—তোর খাওয়া হয়েছে? সে জিজ্ঞেস করল। এক প্রাচীন, সুপ্রাচীন গর্ভের ভেতর থেকে জিজ্ঞাসাটা উঠে এল যেন।
—ন্ না। আমি এই বড়াগুলো ছাড়া আর কিচ্ছু খাব না।
কী যে হয়েছে আজকাল ছেলেমেয়েগুলো— দিবারাত্র চকলেট আর আইসক্রিম, আর গুচ্ছের বাহারি বাহারি টুকটাকের দিকে ঝোঁক। লিভারের বারোটা বাজাচ্ছে।
—তা হলে খা। শোবার সময় ড্রিংক দেব কিন্তু। আমি একটু মাকে ফোন করে আসি।
কিন্তু ফোনে মা বা বাবা কাউকেই সে পেল না। বাবাকে অবশ্য ফোন করাও যা, না করাও তা।—কী রে, কেমন আছিস? দিদিভাই ভাল করে পড়াশুনো করছে? বি ফিলজফিক্যাল ইন ইয়োর অ্যাটিটিউড টু লাইফ! ডিট্যাচড্। হেথা নয়, হেথা নয়। অন্য কোনখানে। ঠিক আছে, ভাল থাকিস সবাই।
এই।
আনসারিং মেশিন মায়ের গলায় বলল— আমরা কেউ এখন বাড়ি নেই। দয়া করে বিপ শব্দের পরে আপনার বক্তব্য, নাম, টেলি-নম্বর বলে রাখুন।
ঈশা বলল— ইশ্শশ্শ্শ্শ্। —বলে ফোনটা ঠক করে নামিয়ে রেখে দিল।
ঠিক যখন দরকার তখনই থাকবেন না এই ভদ্রমহিলা। কী যে করে বেড়ান! এত রাজ্যের এত বিচিত্র মানুষের সঙ্গে যে কী করে মেলামেশা করেন! ভালও তো লাগে! সে এবং নিশীথ এসব দিক থেকে খুব, খু-উব এক্সক্লুসিভ। নিশীথেরটা একরকম, সেটা তার বিরক্তিকর লাগে। একই আত্মীয়স্বজন, তাদের কারও সুবারি, কারও কালচারের অভাব এসব সে অনুভব করলেও সেসব জায়গায় তবু যাবে, কিন্তু ঈশার আত্মীয় তার বন্ধুবান্ধবের কাছে যেতে বলল— মুখ ভার, কিংবা ইচ্ছে করছে না। অথচ ওর প্রত্যাশা নিশীথদের মাসি-পিসি কাকা জ্যাঠা সংবলিত বিশাল পরিবারের সবার সঙ্গে সে, একমাত্র সে বউমা-সুলভ যোগাযোগ রেখে যাক।
নিশীথের নীতিদি কর্পোরেট হাউজে উচ্চপদে কাজ করে, তার স্বামী প্রশান্তদাও তাই। দুজনেই অহংকারে ডুবুডুবু। যাকে তাকে নিয়ে কেমন হাসাহাসি করে। নীতিদি, প্রশান্তদা, ওদের দুই মেয়ে টুল আর টিল, সব্বাই এরকম। অবাক লাগে তার। সে এরকম ব্যাপারে অভ্যস্ত নয়। শ্বশুরবাড়ি থাকতে তো প্রতিমুহূর্তে অবাক কাণ্ড ঘটত। একটা উচ্চশিক্ষিত পরিবার, কর্তা জজ, গিন্নি জজ-গিন্নি হওয়ার সুবাদে উঁচু পাহাড়ের বাসিন্দা, কিন্তু তাঁরা এমন কর্কশ, প্রচণ্ড ক্রিটিক্যাল, তার ওপর অত হৃদয়হীন হবেন, ভাবা যায়নি। সুযোগ পেলেই বলবেন নিশীথের কত কোয়ালিফায়েড মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ এসেছিল, সব এককথায় রাজি। নেহাত ঈশার বাবা-মা ধরে পড়লেন তাই। আরে দুর! নিশার বাবা মার— বাবার প্রশ্নই নেই। আর মা? মার বয়ে গেছে কাউকে ধরে পড়তে। সে বান্দাই তিনি নন। তাঁর ধারণা মেয়ে তাঁরই মতো উচ্চশিক্ষিত হবে, চাকরি করবে, যেসব পাত্র তাকে চাইবে তাদের মধ্যে স্যুটেবল বয়টিকে শুধু খুঁজে নিতে হবে। ঈশাই নিক না, তাতে কারও কোনও আপত্তি নেই। সেই ঈশাই নিল, বা তাকে নেওয়ানো হল। মাসতুতো দিদির বিয়েতে ঈশাকে দেখে একেবারে মাসির পায়ে পড়ে গেল নিশীথ। মা শুনে বলেছিল— নিশীথ? ওই গম্ভীরমতো ছেলেটি? ও যে হাসে না দিদি! স্যুট করবে কী?
এর আগে ঈশাকে ওইটুকু জীবনেই অনেকে চেয়েছে। ঈশা বিব্রত হয়েছে। এই নিশীথ, যাকে তার মোটেই তেমন কিছু লাগেনি, গম্ভীর, বাবা-রে-টাইপ মনে হয়েছিল, সে যে কী করে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিল সে নিজেও জানে না। আসলে যৌবন এলেই মেয়েদের মধ্যে এক স্বপ্নে-গড়া রাজপুত্তুরের প্রতীক্ষা শুরু হয়ে যায়। বিশেষত ঈশা একেবারেই কেরিয়ার মাইন্ডেড ছিল না বলে। স্কুল-কলেজের জীবনে যেসব ঈর্ষা-দ্বন্দ্ব, অসুবিধে আসে— কোনও সহপাঠিনী তাকে দেখে হিংসেয় নীল হয়ে যায়, সবসময়ে ছছাবল মারার চেষ্টা করে। কোনও টিচার অজ্ঞাত কারণে তাকে পছন্দ করেন না, কোনও পাঠ্য সহজে বুঝতে না পেরে ভেতরে ভয়— এ বোধহয় আমার দ্বারা হবে না … যা মোটের ওপর সবার জীবনেই আসে, কেন কে জানে এগুলোর চাপ ঈশার ওপর ভয়ানক বলে মনে হত। চাকরি-টাকরি করতে গেলে যেসব পরিস্থিতি আসে, সেসব গল্পও অনেকের কাছে, বিশেষত মায়ের কাছে যথেষ্ট শুনেছে এবং গৃহের বাইরের জীবন ততই তার কাছে ভীতিপ্রদ মনে হয়েছে। সে বিমুখ হয়ে গেছে। তার মা, ঈশার ধারণা, তাকে কিচ্ছু বোঝে না। মার আছে একটা মন-গড়া ঈশা। ঈশা ঠিক মায়ের মতো করেই সব জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে, ঈশা হতাশ হবে, হীনম্মন্যতার মুখোমুখি হবে। কিন্তু কতকগুলো অস্থায়ী দশা, সেগুলো ঈশা মনের জোরে কাটিয়ে উঠবে। স্ট্রাগল্ করবে। কী ভাবে বিরূপ সংসারকে জয় করে শেষ হাসিটা হাসতে পারা যায় সেটা ঈশা এমনি এমনিই শিখে যাবে। কেননা ঈশার আবার একটা অতিরিক্ত সম্পদ আছে, সেটা তার রূপ, তার স্বাভাবিক মাধুর্য। এমনিভাবে মা ভেবে যাচ্ছে, এদিকে ঈশা তার ইয়েসপার্সন হাতে নিয়ে ভাবছে— বাব্বা, কবে এসব শেষ হবে। এমন চমৎকার শেক্সপিয়র শেলি কিটস হার্ডির মধ্যে আবার ইয়েসপার্সন ঢুকে পড়েন কেন? নো-পার্সন হয়ে গেলেই তো পারেন। ঈশা, ছোট্ট ঈশা কত্থক নাচছে, লাবু বলে আর একটি মেয়ে একটু বড়, চমৎকার নাচে। একই বোল, একই স্টেপ, একই ফিগার অথচ লাবু তার খুব সাধারণ চেহারা নিয়েও অসাধারণ নাচছে। দেখতে দেখতে ঈশারই যেন মনে নাচের দোল লেগে যায়। মা কিন্তু কখনও বলে না, দেখেছিস? লাবু কীরকম নাচে! তোকেও ওরকম নাচতে হবে! কখনও বলেনি, কিন্তু ঈশার নিজেরই মনে হয় লাবুর মতো নাচতে না পারলুম তো নেচে কী হবে? অতসীর মতো গাইতে না পারলুম তো গেয়ে কী হবে, লহনার মতো লিখতে না পারলুম তো লিখে কী হবে, অর্ণার মতো রেজাল্ট না হল তো পরীক্ষা দিয়ে কী হবে! চুপিচুপি ঈশা বরাবর এরকম ভেবেছে, মাকে ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেয়নি। মা স্বপ্নে মশগুল— আমার ঈশা পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় এনে ফেলবে। ঈশাকে অক্সফোর্ড কিংবা ইউ.এস.এ-র কোনও ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পাঠাব। ‘জগৎ আসি যেথা করিছে কোলাকুলি’— সেইখানে তাঁর ঈশা জীবনকে দেখবে, উপভোগ করবে। বজ্রাঘাতের মতো এল স্বপ্নামাসির ফোনটা।
—রঞ্জা একটা দারুণ খবর আছে।
—কী খবর? মুনমুন চান্স পেয়েছে?
—হ্যাঁ মুনমুন চান্স পেয়েছে, আই.আই-টিতে কিন্তু এ খবরটা আরও দারুণ।
—কী!
—নিশীথ, সুতীর্থর বন্ধু রে! ওই ফরসামতো লম্বা-চওড়া ছেলেটি ও একেবারে ঈশার জন্যে পাগল। সবে চাকরির প্রোবেশন শেষ হয়েছে, ও এক্ষুনি বিয়ে করতে চায়। কম্পুটার ইঞ্জিনিয়ার।
—মানে? ঈশা মাস্টার্স করবে না? কুড়ি বছরের মেয়ের আবার বিয়ে কী? স্বপ্না, তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি এখন মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছি না। প্লিজ!
—আরে তোর ঈশাও তো রাজি! গত তিন চার মাস দুজনে একটু ঘোরাফেরা করেছে, দুজনের মন বোঝাবুঝি হয়েছে। মাস্টার্স-এর ভাবনা কী? একেবারে মডার্ন বাড়ি। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে নিজেদের বাড়ি। বাবা আর মা। বাবা হাইকোর্টের জজ হয়ে রিটায়ার করেছেন। ঝাড়া-ঝাপটা ফ্যামিলি। মেয়ের মতো থাকবে।
শেষ কথাটা মা ধীরে ধীরে উচ্চারণ করেছিল— মেয়ের মতো থাকবে?
কথাটা কেমন যেন লাগল! কাজের লোক মানে ছোট মেয়ে রাখলে চালাক-চতুর গিন্নিরা বলেন মেয়ের মতো থাকবে। বউ তো মেয়েই! সে মেয়ের মত থাকবে— এ কথা ঘোষণা করে বলতে হবে? আর ঘোরাফেরাই বা কবে করলি ঈশা, বলিসনি তো!
—আহা! মাসির বাড়ি গিয়ে! বলার কী আছে?
—কিছু নেই রে, কিন্তু তুই তো বলিস, তুই আমাকে স-ব বলিস বলেই আমার ধারণা ছিল! আমি তো তোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু… তুইও আমার! মা গভীর আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু জানতে দেয়নি। ঈশা এখন বুঝতে পারে। তখন সে পড়াশোনায় পণ্ডিতিতে গজগজ বাড়ি, আর ভাইয়ের অকাল-প্রয়াণের দুঃসহ বিমর্ষতা মাখানো চার দেয়ালের বাইরে অন্য কোনও স্বপ্নের জগতে যাবার জন্য উন্মুখ, রাজকুমার আসবে তাকে ভালবাসবে, শুধু তাকেই, আর কোনও বড় রানি, ছোট রানি থাকবে না। আর সেই আদর ভালবাসা সে দু হাতে বিলিয়ে দেবে সংসারকে। একচক্ষু হরিণের মতো সে মাত্র একটা দিক দেখতে পেয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি, স্বামী এসব যে এত অস্বাভাবিক জটিল ব্যাপার হতে পারে তা সে জানত না। জানত না শাশুড়ি এ ভাবে চেঁচিয়ে বকতে পারেন, ‘ফুলদানি থেকে এক ফোঁটা জল পড়েছে, কী করে পড়ল-ও-ও-ও চিৎকার! জানত না শ্বশুর এক্স জজসাহেব বলতে পারেন, —‘রাত্তিরে আমাদের বাড়ি মাছ-মাংস হয় না। তোমাকেও তাতেই অভ্যস্ত হতে হবে।’ কলেজের সময়ে সকাল সকাল খেয়ে যাবে আলুভাতে ভাত। একটু, একমুঠো বাসমতী চালের ভাত সে বরাবর খেতে অভ্যস্ত। — ‘সকালে কী খেয়ে যাবে?’ শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন। তাই সে বলল, মা, আমাকে একটু বাসমতীর ভাত আর আলুভাতে দিয়ো, আর কিছু খেতে পারব না।
বাসমতী? এ আইডিয়াটি আবার তোমার মাথায় কে ঢোকাল? তোমার মা বোধহয়!
তারা তো ধনী নয়। কিন্তু এইটুকু তো তারা বরাবর পেয়েছে। ছেলেমেয়ের খাবার পুষ্টিকর হচ্ছে কি না— এদিকে মায়ের ভীষণ নজর ছিল। যৌথ পরিবার, তারপর বামনি যা-তা করে রান্না করে, মা হরলিক্স-কমপ্লান খাওয়াবে, ফল আসবে! মাছ ছাড়া খেতে পারে না বলে দাদু তাকে বেড়াল বলে ডাকতেন। আর যখন কসবার বাড়িতে চলে এল, দাদু ঠাকুমা মারা যাবার পর, তখন তো মায়ের রান্নার হাতও খুলে গেল। তাদের যা খেতে ইচ্ছে করে, অন্যায় আবদার না হলে মা যথাসাধ্য মিটিয়েছে।
আর এই ধনী শ্বশুরবাড়ি, রিটায়ার্ড জজ, এঁদের কলকাতাতেই তিন চারটে বাড়ি, দুটো তিনটে ক্লাবের মেম্বারশিপ, এঁরা নিজেরাও এক তরকারি ভাত খাবেন। আচ্ছা, তাঁদের না হয় বয়স হয়েছে, তাই বলে তাকেও তাই খেতে হবে? খালি ছেলে সকালে খেয়ে যায় না বলে রাত্তিরে তার জন্য একটু স্পেশ্যাল ব্যবস্থা থাকে।
আর স্বামী? যে নাকি প্রায় তার পায়ে পড়ে গিয়েছিল! তার ওল্ড ফ্লেমের বাড়ি নিয়ে গেল। ওল্ড ফ্লেম, তার স্বামী আর তার নিজের নিশীথকান্ত পরস্পরের দিকে চেয়ে চোখ মটকাচ্ছে, হাসছে, ওল্ড ফ্লেমের স্বামী বলছে— ঈশা, লেটস লিভ দেম টু দেমসেলভস্। আমরা বরঞ্চ বারান্দায় গিয়ে বসি, দেখা যাক তোমার সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রি জমে কি না। —অবাক কাণ্ড। সে হতবাক। জড়সড় একেবারে।
সে নিজের বাড়ির বারান্দায় সন্ধেবেলা বসে আছে। রবিবার। নিশীথকান্ত না বলে কোথায় যে বেরিয়ে গেল? ও কী! সামনের বাড়ির বারান্দা থেকে তার চোখে টর্চ মারছে আর হাসছে। কে? ওই ত্রয়ী? এ কীরকম কুরুচিকর ঠাট্টা? এ কীরকম সোসাইটি! আর মৌ? কলেজের জুনিয়ার ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে মৌ? সে কোন সময়ের ফ্লেম কে জানে! সে বাড়িতে ঢুকে, বাবা না, মা না, ঈশা না, কারও সঙ্গে কথা না বলে ‘হ্যালো’ না করে সোজা ঢুকে যাবে নিশীথের ঘরে, বিছানায় গড়িয়ে পড়ে পড়ে গল্প করবে— আঁতেল আঁতেল গল্প, ফিচেল-ফিচেল কায়দায়। আর এক ফ্ল্যাটের মিষ্টি, তার গালে ফ্যাশন-চুমু দিল নিশীথকান্ত। যদিও সে প্রথম বিবাহের পর পরও কোনও দিন রাত ছাড়া তাকে কোনও সোহাগ-টোহাগ জানায়নি। শাশুড়ি পর্যন্ত বলতেন— মৌকে তুমি টলারেট করো কী করে ঈশা? অ্যালাও করবে না একদম। বাইরে বসে গল্প করুক। আর মিষ্টি? ডিটেস্টেবল্।
রাগে অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে, অভিমানে অপমানে আছড়ে পড়ছে ভেতরটা। এই শ্বশুর-শাশুড়ি, এই স্বামী মাথার ভেতর নিয়ে সে কী করে কিছু করবে? প্রাণের ভেতরটা সবসময়ে দপদপ করছে, পড়াশুনো, গানবাজনা— সব চুলোয় গেল, সে শুধু তার সামান্য হাতখরচের পুঁজি দিয়ে আইসক্রিম খেয়ে বেড়ায় আর চোখ-টানা শাড়ি কেনে, আইসক্রিম-চকোলেট খায় বাড়ির ডাঁটাচচ্চড়ি আর কাঁটা মাছের বরাদ্দর শোধ নিতে, খায় আর মোটা হয়। খায় আর মোটা হয়। অবশেষে… শায়রী। শায়রী এল তার সব ভোলানো, তার রুদ্ধ ভালবাসার দেয়াল চৌচির করে বেরিয়ে এল স্নেহের প্রবল জোয়ার, ভাসিয়ে নিয়ে গেল সব না-পাওয়ার দুঃখ, কিন্তু গর্ভাবস্থায় উপযুক্ত আহারও তো তার জোটেনি। একদিন টি.ভি-তে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করছিলেন— গর্ভাবস্থায় মাকে মাছ-মাংস বিশেষত মাছ খেতে হবে, কার্বোহাইড্রেট কম, দুধ ও দুগ্ধজাত জিনিস, কিন্তু ফ্যাটেনিং কিছু নয়… শুনতে শুনতে শ্বশুর বললেন—ও, আমাদের বাচ্চাটার তা হলে মাছ দরকার?
শাশুড়ি বললেন— সে তো আমি কবে থেকেই বলছি। কান দিয়েছ? বংশধর আসছে, খাওয়ার তরিবত দরকার। তা যা বাজার আনো তাতে বাচ্চার হয়?
বাচ্চা! বাচ্চাটা আসল! তার মা শুধু তার বাহক। ব্যস।
সেই তার মাছ বরাদ্দ হল। তার নয়, তার ভেতরে ওঁদের বংশধরের জন্য। কিন্তু তখন তো দেরি হয়েই গেছে। ভীষণ খিদে, বাড়িতে মাপা খাওয়া খেয়ে পেট ভরত না। তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই আইসক্রিম আর চকোলেট। পর্বতের মূষিক প্রসব হল। সেই একরত্তি শিশুর গায়ে সে কাউকে হাত দিতে দিত না। ডাক্তারের বারণ ছিল। বাইরের কাপড়ে বাইরের লোক ঘরের ভেতর আসবেই, ডাক্তারের সাবধানবাণী সবাই শুনেছেন তবু সবাই দিব্যি আসতে দিচ্ছেন। ভেতরে-ভেতরে সে ফুঁসছে, একান্তে নিশীথের কাছে ফেটে পড়ল, রাগ, কান্না। —কত কষ্ট করে জন্ম দিতে হয়, জানো?…
নিশীথ বলল— আমিও তো কত কষ্ট করে রোজগার করছি!
সন্তান-জন্ম আর উপার্জন হল এক গোত্রের? এর পর আর এর সঙ্গে কথা বলার কোনও মানে হয়? সে বিনীত ভাবে বলল— মা, আমি বাচ্চাকে নিয়ে ক’দিন মায়ের কাছে থেকে আসি।
—তোমার মা তো পোয়াতি অবস্থায়ও নিয়ে যেতে পারতেন! বারণ করিনি তো!
—চেয়েছিলেন, আমি-ই যাইনি, আপনাদের অসুবিধে হবে বলে!
—আমাদের অসুবিধে? তুমি আমাদের কী সুবিধে করছ, থেকে? বাপের বাড়ি যেতে চাও না কেন বলো তো?
সে কী করে বোঝাবে ওই মুন্নি কখন এসে তার স্বামীর পাশে শুয়ে পড়ে, কখন নিশীথকান্ত রাস্তার ওধারে ওল্ড ফ্লেমের বাড়ি চলে যাবেন, আর তার লিবার্যাল হাই-সোসাইটি স্বামী উইল লিভ দেম টু দেমসেলভস্! সে যে বড় দুর্ভাবনা।
কিন্তু শায়রী, ছোট্ট শায়রীর নিরাপত্তায় জন্য সব দুশ্চিন্তা অগ্রাহ্য করা যায়। তা ছাড়াও শিশু ভালবাসা, শিশু ভগবান, শিশুই প্রেম। সে দেখতে পাচ্ছে নিশীথের চোখ নরম হচ্ছে, সে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসছে। ডাক্তার বাড়ি ছুটছে….। এই শিশুই তাকে রক্ষা করবে, সে মায়ের কাছে চলে গেল অনেক দিন পর, অনেক দিনের জন্য। আহ্ কী শান্তি!
